০৯.১ ডায়রির পাতা

০৯. ডায়রির পাতা

২৪ নভেম্বর

করন থাপর লিখেছেন হিন্দুস্থান টাইমস। ‘ডু উই পাস দ্য তসলিমা টেস্ট?’ ‘The India I would be proud of would welcome Taslima Nasreen and grant her sanctuary. The India I’m embarrassed by wreaks violence on the streets of Calcutta, van dalises art schools in Baroda and threatens peaceful worshippers in Sirsa. Alas, that is the India I live in.’

চমৎকার লেখা। কিন্তু লেখাটির শুরুতে লিখেছেন, ‘Taslima Nasreen may not be a great novelist. She may even be motivated by a quest for publicity. And many say she deliberately and calculatedly compromises other people by revealing their personal secrets. But those are literary or moral judgements. No doubt each of us will accept or reject them as we deem fit. The question is, do we have a right to silence her voice because of them?’

করন থাপর আমার লেখা পড়েননি, তা অনুমান করতে পারি। লেখা না পড়েও লেখকের মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। লেখা যারা বুঝে পড়েছেন, আমাকে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সঠিক চিনেছেন, তাঁরা জানেন আমি কী লিখি, কেন লিখি। পাবলিসিটি পাওয়ার জন্য লিখি, ভালো কোনও সাহিত্যিক নই, বিতর্ক তৈরি করার জন্য লিখি –ইত্যাদি কথা বাতাসে ভাসতে শুরু করেছে সে অনেক বছর। সেই বাংলাদেশের আমল থেকেই। বাংলাদেশ আর ভারতে পার্থক্য তো খুব বেশি নেই, থাকলেও বাতাসের পার্থক্যটা নেই বললেই চলে। এই হাওয়ার মন্ত্র থেকে মন সরিয়ে অন্য একটি বিশ্বাস এবং ধারণা তৈরি করা কম কঠিন নয়। অনেকে কঠিন কাজটি করেন। অনেকে বাতাসে ভর দিয়েই চলেন। যদি একটুও নিজের প্রতি যত্ন নিতাম, তবে লেখার প্রতিও যত্ন নিতাম, ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ বার করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার চিরকালের উদাসীনতা। লিটারেরি এজেন্টদের তাড়িয়েছি। জাল বইয়ে ভারত আর বাংলাদেশ ছেয়ে গেছে। বই নিয়ে যা ইচ্ছে তাই হয়েছে। জগতের কত লোক বই পড়তে চেয়েছে, সুযোগই হয়নি।

.

২৭ নভেম্বর

‘..তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ হইতে সরাইয়া দিবার সিদ্ধান্ত আগেই পাকা হইয়া গিয়াছিল। এই সিদ্ধান্ত, এবং যে ভাবে তাহা কার্যকর হইয়াছে, তাহা সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত এবং অনৈতিক। প্রথমত, তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তার জন্য তাঁহাকে অন্য রাজ্যে প্রেরণের কোনও প্রয়োজন ছিল না, এই শহরেই তাহার সুবন্দোবস্ত করা সরকারের অসাধ্য ছিল না। সঙ্গত কারণেই সন্দেহ হয়, নিরাপত্তার যুক্তিটি অজুহাত মাত্র, তাঁহার মৌলবাদী বিরোধীদের সন্তুষ্ট করিবার বাসনাতেই তাঁহাকে অপসারণ করা হইয়াছিল। দ্বিতীয়ত, যে প্রক্রিয়ায় এই স্থানান্তর তথা অপসারণ ঘটানো হইয়াছে, তাহা অত্যন্ত আপত্তিকর। প্রশাসন, দল, এবং উভয়ের ঘনিষ্ঠ প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গের এই যোগসাজসের পরম্পরা একটি সামগ্রিকভাবে অসুস্থ পরিবেশের সংকেত দেয়, যাহা একটি উদার আধুনিক শাসনতন্ত্রের পরিপন্থী। তৃতীয়ত, ইহা মৌলবাদীদের অন্যায় দাবির নিকট আত্মসমর্পণ। এবং ইহাই সর্বাপেক্ষা উদ্বেগজনক। পশ্চিমবঙ্গের শাসকরা উঠিতে বসিতে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার বড়াই করেন, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বার বার দেখা যায়, মুসলিম মৌলবাদীদের তোষণে তাঁহারা অতীব তৎপর। তসলিমা নাসরিন সম্পর্কিত ঘটনাবলি তাহার প্রমাণ এবং প্রতীক। …পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ শাসকরা মুসলমান তোষণ করিতেছেন না, মুসলিম মৌলবাদীদের তোষণ করিতেছেন। দলের মন্ত্রণাদাতারা হয়তো বিশ্বাস করেন, এই তোষণের ফলে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক সুরক্ষিত থাকিবে। কিন্তু ভোটব্যাংক রাজনীতির তাড়নায় এমন ভয়ানক অন্যায়কে তোষণ করিলে তাহার পরিণাম অশুভ হইতে বাধ্য।‘ –আনন্দবাজার পত্রিকা।

আনন্দবাজার অন্য সময় সঙ্গে থাক বা না থাক, কলকাতা থেকে আমাকে তাড়াবার শুরু থেকে পাশে আছে। স্টার আনন্দতে এ নিয়ে খবর হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে। আমার সাক্ষাৎকারও নিলেন সুমন দে। আনন্দবাজার থেকে মিলন দত্ত বড় একটা সাক্ষাৎকার নেবেন। হায়দারাবাদ থেকে ফেরার পর আমাকে কী করে আটকে রাখা হয়েছিলো বাড়িতে, কী বলেছিলো কে, কীভাবে আমাকে কলকাতা থেকে বিদেয় করা হল, শুরু থেকে সব শুনতে চান তিনি। প্রশ্ন করা হচ্ছে, আমি উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ একটা গুঞ্জন। ফোনেই শুনতে পাচ্ছি মিলন দত্তকে কেউ ডাকছেন। কথা বলছেন। আলোচনা করছেন। শেষ পর্যন্ত আমাকে মিলন দত্ত জানিয়ে দিলেন, অভীক বাবু বলেছেন সাক্ষাৎকার বন্ধ করতে, কারণ প্রণব বাবুর সঙ্গে তার কথা হয়েছে, প্রণব বাবু বলেছেন এখন যেন আমার কোনও খবর, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি মোটেও প্রচার করা না হয়, তিনি কথা দিয়েছেন দিন পনেরোর মধ্যে আমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনছেন।

ওদিকে স্টার আনন্দও সব আলোচনা বন্ধ করে দিল। আমার পক্ষে জনমত গড়ে ওঠার সম্ভাবনার এখানেই ইতি টানা হল।

.

২৮ নভেম্বর

‘তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে সকলকে, বিশেষত মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের, একটা কথা ভেবে দেখতে অনুরোধ করবো। ভদ্রমহিলা তার মতবিরোধীদের ইট মারেননি, গাড়ি পোড়াননি, খুন করে দেওয়ার কথাও বলেননি। তবে বিশেষত মুসলমান মেয়েদের ওপর নির্যাতন প্রসঙ্গে তিনি যা লিখেছেন তা বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মতে ইসলামবিরোধী। কিন্তু তাঁকে তাঁর কথা বলতে না দিলে তসলিমার সমালোচকরাও অনুচ্চারিত ইসলাম বিরোধী বক্তব্যের সমুচিত জবাব দিতে পারবেন না। এতে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। গণতন্ত্র না থাকলে সবার আগে, এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই। তাই তসলিমার স্বাধীনভাবে এবং অকপটে লেখার অধিকার রক্ষার দাবি শেষ বিচারে গণতন্ত্র রক্ষারই সংগ্রাম।‘ –সুনন্দ সান্যাল

প্রণব মুখার্জি লোকসভায় আমার প্রসঙ্গে বলবেন। সে গতকাল থেকেই জানা। বসে আছি অপেক্ষায়। বারোটায় বলবেন। সাড়ে বারোটায় বলবেন। এরকম শুনছিলাম। যা বললেন তা হল –“Throughout history, India has never refused shelter to those who have come and sought our protection. This civilisational heritage which is now a government policy, will continue and India will provide shelter to Ms Nasreen. Those who have been granted shelter here have always undertaken to eschew political activities in India or any action, which may harm India’s relation with friendly countries. It is also expected that the guest will refrain from activities and expressions that may hurt the sentiments of our people. While these guests are in India the Union and the state governments provide them protection –this policy will also apply in Ms Taslima Nasreen’s case”

দাদা বললো, ‘একেবারে রিয়েল ডিপ্লোমেট’।

যে ডুবছে, সে একটা খড়কুটো চায়। আমাকে যে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না এ দেশ থেকে, আমাকে যে থাকতে দেওয়া হবে, এই খবরটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় খবর। . আমি আশা করেছিলাম অন্য এক বিবৃতির যার বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায় –‘ভারত এমন একটি দেশ, যে উদার, অতিথিপরায়ণ, পৃথিবীর নানা দেশের নানা সংস্কৃতির মানুষকে বিভিন্ন সময়ে বরণ করে নিয়েছে এবং ঋদ্ধ হয়েছে। তসলিমা একজন নির্যাতিত এবং নির্বাসিত লেখক, বাংলা তাঁর মাতুভুমি। পুর্ব বাংলায় না হলেও পশ্চিম বাংলায় বাস করার তাঁর এই ইচ্ছেকে আমরা স্বাগত জানাই। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। এখানে যারা বাস করছে, সবারই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজের মত প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু ২১শে নভেম্বর কলকাতার রাস্তায় যা ঘটেছে, তা বর্বরতা ছাড়া আর কিছু নয়। সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান শর্ত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা। মত প্রকাশের অধিকার এবং বাক স্বাধীনতা আর সবার মতো তসলিমা নাসরিনের আছে। সুতরাং তাঁর মত প্রকাশের অধিকার ছিনিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে যারা রাস্তায় নেমেছে এবং লুঠপাট, আগুন জ্বালানো এবং জনগণের জীবন নিরাপত্তাহীন করে তুলেছিল, তাদের অগণতান্ত্রিক আচরণের কারণে তাদের বিরুদ্ধে সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অশুভ কাজ থেকে বিরত থাকে সে ব্যাপারে প্রশাসন সতর্ক থাকবে। সেকুলার গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, এ ব্যাপারে প্রত্যেককে সচেতন থাকতে হবে। তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে অন্য রাজ্যে স্থানান্তর করা হল, সে ব্যাপারে তদন্ত চলবে। এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা হবে। এবং ২১ নভেম্বরের তান্ডবকারীদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা হবে। তসলিমাকে আগামীকাল কেন্দ্র থেকে কলকাতায় পাঠানো হবে। কেন্দ্র চাইছে পশ্চিমবঙ্গে তসলিমার পূর্ণ নিরাপত্তা। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও তাঁর পূর্ণ নিরাপত্তা তাঁকে দেবে ভারত সরকার এবং রাজ্য সরকার। শুধু তসলিমা নয়, এদেশের সব নাগরিকের, অতিথিদের, এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভারতের নিয়ম একই, ভিন্ন নয়।’

হ্যাঁ এরকম হবে মনে মনে ভেবেছিলাম। কিন্তু যা হল তা ঠিক কী হল, বুঝে পাচ্ছি না। একটাই স্বস্তি পাচ্ছি তা হল রেসিডেন্স পারমিটই আর দেওয়া হবে না–এমন কিছু বলা হয়নি।

.

৩০ নভেম্বর

‘সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম পুলিশ আর পার্টির ভাড়াটেদের বন্দুকনির্ভর নির্মম দখলদারির পর্ব পেরিয়ে তসলিমা ইস্যুতে এসে একটা দমকা হাওয়াতে উড়ে গিয়েছে সিপিএম-এর এতদিনের সযত্ন লালিত ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশটা।

.. তসলিমা দেশে দেশে, রাজ্যে রাজ্যে এভাবেই ছিন্নমূল ঘুরতে থাকুন, আর আমরা কড়ায় গণ্ডায় ভোটের হিসেব করি। নিক্তিতে মেপে দেখি, তসলিমা এখানে থাকলে তাদের লাভ বেশি,

বিদেয় হলে। কী করলে, কী বললে মুসলিম ভোট টানা যাবে। কোন ইস্যুতে মৌলবাদের কথায়। ঘাড় নাড়তে হবে, কোন ইস্যুতে রাস্তায় নেমে মৌলবাদের বিরুদ্ধে মিছিল করে চেঁচাতে হবে, সবই ভোটের নিক্তিতে ওজন করা।‘–আশিস ঘোষ

সকালে এনামুল কবীর ফোন করলেন বীরভূম থেকে। না, এখন অবধি কোনও রাজনৈতিক দল বলেনি সিপিএম যা করেছে ভুল করেছে, এভাবে কোনও লেখিকাকে তাড়িয়ে দেওয়াটা অন্যায়।

আজ দ্বিখণ্ডিত থেকে কিছু বাক্য বাদ দিয়ে দিলাম। সারা দেশে এই চরম দুঃখের খবরটি হৈ হৈ করে ছাপা হল।

.

২ ডিসেম্বর

ক্যান্টনমেন্টের প্রধান একদিন দেখা করে গেছেন। সম্মান দেখিয়ে গেছেন। সজ্জন শিক্ষিত ভদ্রলোক। বললেন, লজ্জার লেখকের সঙ্গে দেখা হবে কোনোদিন, এ কল্পনাও করেননি। সবাই আমার নাম জানেন লজ্জা’র লেখক হিসেবে। লজ্জা পড়েননি, ভারতবর্ষের শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে এমন লোক কমই আছে। পেঙ্গুইন ঘোষণা করেছে, লজ্জা ভারতবর্ষের মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বিক্রিত বই।

ভদ্রলোকের নামের পদবী, সেন। বাঙালি ভেবে কী খুশিই না হয়েছিলাম। পরে শুনলাম, উনি বাঙালি নন।

.

৪ ডিসেম্বর

‘She does not have any choices. She is just like a person who has now got the protection of the mafia which is the state in some way. She has nowhere to go. She has no protection. She just has to blunder her way through this kind of humiliation and I really feel for her’. –Arundhati Roy

আজ দাদার বিয়ের পঁচিশ বছর পূর্তি উৎসব। প্রতিবছর এই দিনটি দাদা উদযাপন করে। কিন্তু দিল্লির এই অজ্ঞাতবাসে উদযাপনের কিছু নেই। আজ সকালে দাদা স্নান করে তৈরি হয়ে রইলো। দুপুরের খাবার খেয়েই রওনা হয়ে গেল। দিল্লি থেকে কলকাতা গেল। বিকেল পাঁচটায় কলকাতায় নামবে। আমরা একসঙ্গে কলকাতা থেকে এসেছিলাম, দাদা একা ফিরে গেল। আমি যেতে পারলাম না। আমার যাওয়া সম্ভব নয়। দাদার চলে যাওয়ার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করেনি। বুক ফেটে যাচ্ছিল। দাদাও কষ্ট পাচ্ছিল হয়তো। কিন্তু এখানে থেকেই বা কী করবে! ভালো লাগে এভাবে লুকিয়ে থাকতে!

.

৫ ডিসেম্বর

‘Secularism is not appeasing fundamentalism and terrorism. The November 21 incidents could have led to communal riots in Kolkata. Fundamentalism, whether Muslim or Hindu is a challenge which must be taken very seriously. The Taslima Nasreen issue is no longer about Taslima Nasreen the writer. It has revealed a much larger conspiracy in the making.

It was a test case, and the CPM’s decision has conveyed to the Islamic fundamentalists that they have won the round one!’ -Bhaskar Roy.

আজ উল্লেখ করার মতো তিনটে জিনিস পেলাম, দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়, আনন্দবাজারের উপসম্পাদকীয় আর একটি ঘটনা, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের বইয়ে মুহম্মদ নবীর একটি ছবি ছাপানো হয়েছে বলে কলকাতায় বিক্ষোভ শুরু হতেই দিল্লির প্রকাশককে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। হিন্দু লিখেছে, এই ২৯৫(ক)ই তো বাংলাদেশে আমার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছিল সরকার। সেই পনেরো ষোলো বছর থেকে বাক স্বাধীনতাবিরোধী আইনটিকে বাদ দেওয়ার কথা বলছি। আমার এবং আমার মতো দু’একজনের কথা কে শোনে।

আজকের আনন্দবাজার পত্রিকার লেখাটি দেখে হ্যাঁ হয়ে গেলাম। কদিন আগেই আমাকে সমর্থন করেছে, আর আজ একশ’ আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল! হতবাক হতে হয় আমাকে। বাকরুদ্ধ বসে থাকি। কল্যাণ সান্যাল আমার বিরুদ্ধে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। বিতর্কের জন্য যদি ছাপানো হয়ে থাকে লেখাটি তাহলে কোনও আপত্তি নেই। সুস্থ বিতর্ক সবসময়ই ভালো। কিন্তু যদি এ বাক-স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান হিসেবে হয়, তাহলে নিশ্চিতই আশংকার কারণ বৈকি। আমি অনুমান করি, আমার পক্ষে লেখা কোনও নিবন্ধ বা চিঠি এখন আনন্দবাজার ছাপাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কল্যাণ সান্যালের বক্তব্য শিল্প মানেই শুদ্ধ নয়, রাজনীতি মানেই দূষিত নয়। সিপিএমের রাজনীতি দূষিত নয়, আমার লেখা শুদ্ধ নয়। আমার লেখা যেহেতু শুদ্ধ নয়, আমাকে রাজনীতিকরা বা ক্ষমতাবানরা তাড়িয়ে দিতেই পারে, এতে কোনও অসুবিধে নেই। আরও লিখেছেন, আমার লেখার ধরন এবং মর্মবস্তু কোনওটাই তিনি পছন্দ করেন না। পছন্দ করেন না, সুতরাং যেন তাড়িয়ে দেওয়াটায় অন্যায় কিছু নেই। তিনি সিপিএমের বিরোধিতা করছেন নন্দীগ্রামের ব্যাপারে। কিন্তু আমার ব্যাপারে তিনি সরকারের পক্ষ নিচ্ছেন। আমার একটা ধারণা হয়. কল্যাণ সান্যালের মতের পক্ষে বেশির ভাগ শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী, তা না হলে আমার বিরুদ্ধে যে অন্যায় সিপিএম সরকার করেছে, তার কোনও প্রতিবাদ নেই কেন?

.

৬ ডিসেম্বর

আজ বাবরি মসজিদ আক্রমণের পনেরো বছর পূর্তি। লজ্জা লিখেছিলাম পনেরো বছর আগে। দিন যে কীভাবে উড়ে যায়! মনে হয় এই সেদিন। ভালোবাসা জন্মেছিল ঠিক পনেরো বছর আগে, ৬ ডিসেম্বর তারিখে, ১৯৯২ সালে। আজ নাকি হরকাতুল জিহাদি দলের সদস্যরা একটা সাদা গাড়ি করে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ থেকে দিল্লিতে ঢুকেছে, ইচ্ছে কিছু জনবহুল জায়গায় বোমা মেরে মানুষকে সন্ত্রস্ত করা। যদুর মনে পড়ে এই হরকাতুল জিহাদি দলটি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল, আমার বিরুদ্ধে ধর্মবাদীদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন। কী লাভ হচ্ছে তাদের মানুষ মেরে, আমি জানি না।

আজ প্রশান্ত রায়ের সঙ্গে কথা বললাম ফোনে সকালে, অনেকক্ষণ। উনি আশাবাদী কলকাতায় কিছু একটা আন্দোলন হবে আমার পক্ষে। আমি বললাম আন্দোলন হলে শুরুতেই হত। চোখের সামনে মানুষ দেখলো আমাকে কী করে বের করে দেওয়া হল পশ্চিমবঙ্গ থেকে। কী ভয়ংকর অন্যায়ভাবে বের করা হল। দিনের পর দিন মনের ওপর অত্যাচার চালিয়ে তারপর বের করলো। তারপরও কোনও একটি মিছিল বেরোলো না কলকাতার রাস্তায়! নিজেদের হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াতে হল আমার চার পাঁচজন বন্ধুকে। কেউ নেই আমার জন্য? আমার জন্য কেউ না থাকুক, অন্তত বর্বর একটি ঘটনার বিরুদ্ধে কি কারও দাঁড়াবার নেই? হ্যাঁ কিছু লেখা হচ্ছে বটে এদিক ওদিক কিন্তু জনগণকে ততটুকু ক্ষুব্ধ করছে না, যতটুকু ক্ষুব্ধ হলে মিছিলে যেতে হয়।

পাগলের মতোকাঁদলাম। তপন রায় চৌধুরী ফোন করেছিলেন। বললাম যেন আমাকে কলকাতা নিয়ে যান। যদি কলকাতা না-ই যেতে পারি, যদি পশ্চিমবঙ্গ আমাকে না-ই নেয়, আমাকে যেন বাংলাদেশেই পাঠিয়ে দেয়। ওখানে হুজি ফুজিরা কখনও মেরে ফেলে রাখবে। তাই ভালো। তবু পরের দেশকে নিজের দেশ ভেবে ভুল যে করেছিলাম, মানুষকে ভালোবাসলেও মানুষ যে শেষ অবধি ভালোবাসে না, বরং দূরে বসে মজা দেখে, তা তো আর নিজের চোখে দেখতে হবে না।

আমার ছিঁড়ে যাচ্ছে মাথা। আর পারছি না সইতে। প্রভুকে বললাম, আমাকে বাংলাদেশে ফেলে আসুন। ওখানেই যা হবার হোক। প্রভু শুনলেন। কণ্ঠে তার আগ্রহ আরও কিছু শোনার। এরকম কিছু শোনার জন্য যেন অনেকদিন অপেক্ষা করছেন। মনে আছে প্রভুর মতোই আরও একজন সরকারি বড় অফিসার বলেছিলেন, রাজস্থান হাউজে বসে, আমি যেখানে নিরাপদ, সেখানেই থাকা উচিত আমার।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোথায় নিরাপদ?

লোকটি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে কি নিরাপদ জায়গার অভাব আছে?’

‘কোথায় সেই নিরাপদ জায়গা, শুনি!’

‘কেন, ইওরোপ বা আমেরিকা!’

‘না। আমি বিদেশ যাবো না।‘

কী রকম যেন ভয় লাগছিল আমার।

.

৭ ডিসেম্বর

সকালে কলকাতা থেকে শর্মিলা ফোনে শোনালো আজকের প্রতিদিনের উইকএন্ডে বের হওয়া জয় গোস্বামীর একটা লেখা। ‘কোনও লেখককে যদি তার কোনও লেখা প্রত্যাহার করে নিতে হয়, তখন কী অনুভূতি হয় তাঁর? কী অপরিসীম কষ্টের মধ্য দিয়ে তসলিমাকে যেতে হয়েছে এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতে, তা, আমরা অনুমান মাত্র করতে পারি। কারণ, আমাদের কাউকেই নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত অবস্থায় দিনের পর দিন, দেশের পর দেশে, নিরাপত্তা রক্ষী পরিবৃত হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়নি। আমাদের কারোরই নিজের দেশে ফেরার পথ বন্ধ নয়। আমাদের কারো বই বেরোনো মাত্র নিজের দেশে পর পর নিষিদ্ধ হয়ে আসছে না। আর আমরা কেউই জানি না, নিজের মাথার উপর মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া ঝুলে থাকলে কেমন লাগে।

আমরা শুধু তসলিমার সমালোচনা করতে পারি। এটা লেখা তসলিমার উচিত হয়নি। ওটা বলা তসলিমার ঠিক হল না। এমনকী, আমরা এতটাও বলেছি কখনো যে, এসবই তসলিমা প্রচার পাওয়ার জন্য করেছেন। হয়াঁ, নিজের জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে কোনও উন্মাদ ধর্মান্ধ ঘাতকের হাতে এটা জানার পরেও হয়তো প্রচারের জন্যই করেছেন। এতটাও বলেছি আমরা।’

শুধু এটুকুই নয়, আমার অবস্থা বোঝাতে বোঝাতে গ্যালিলিওর প্রসঙ্গও এনেছেন জয়। গ্যালিলিকেও পুড়িয়ে মারার ভয় দেখানো হয়েছিল। অসম্ভব চাপের সামনে শেষ ম্যে ভেঙে পড়লেন গ্যালিলিও। প্রত্যাহার করে নিলেন নিজের মতবাদ। বললেন, ‘চার্চই ঠিক, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে।‘ চোখ রাঙালে না হয় গ্যালিলিও বলে দিলেন পৃথিবী ঘুরছে না, পৃথিবী তবু ঘুরছে, ঘুরবেও যতই তাকে চোখ রাঙাও না।

শিবনারায়ণ রায়কে ফোন করেছিলাম, ওঁর শরীর মন কোনওটাই ভালো নেই। লিখতেও, বললেন, পারছেন না। বললাম ‘ব্লাড প্রেশার হয়তো খুব বেশি, ডাক্তার দেখান। নাহ, ডাক্তার দেখানোর খুব আগ্রহ নেই। বয়স বাড়লে, সবাই যেন কেমন কুঁকড়ে যান, ‘বেঁচে না থাকলেও চলে, অনেক তো হল’ ধরনের বাক্য আওড়ান।

বয়স ছিয়াশি। বললাম ‘জ্যোতিবাবুর বয়স তো পঁচানব্বই। আপনার চেয়ে তো অনেক বেশি বয়স।‘

কী অন্যায় করেছি যে আমাকে শাস্তি পেতে হবে? শিবনারায়ণ রায় বললেন, ‘কে বলেছে মানুষ শাস্তি পায় অন্যায় করলেই? তুমি একটা ক্ষমতাসীন শক্তির স্বার্থে আঘাত দিয়েছে, সে কারণে শাস্তি পাচ্ছো।

আজ ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’এ একটা লেখা পড়ে খুব ভালো লাগলো। মনের সঙ্গে মিলে যাওয়া কথা। সৌদি আরবের এক মেয়ে অপহরণ আর গণধর্ষণের শিকার। ইসলামের বিচারে ধর্ষকদের কোনও শাস্তি হল না। শাস্তি হল মেয়েটির। জেল হল। চাবুক হল। সুদানে এক ইস্কুল শিক্ষিকাকেও শাস্তি পেতে হল, কারণ পড়াতে গিয়ে টেডি বেয়ারের নাম রেখেছিল মুহম্মদ। এদিকে আমাকে পেতে হল শাস্তি। কবে কোন বইএ কী লিখেছি তা তাদের পছন্দ হয়নি বলে। তো ইসলামে নাকি বেশির ভাগ মুসলমানই অমৌলবাদী। ইসলামকে নাকি কিছু মৌলবাদীরা হাইজ্যাক করেছে। তাছাড়া ইসলাম খুব ভালো, ভালোর অন্ত নেই। লেখকের মতো আমারও প্রশ্ন, সেই মডারেটরা বা নরমপন্থীরা বা আধুনিক মুসলমানরা এখন কোথায়? তাঁরা মৌলবাদীদের কোনও দাঙ্গা হাঙ্গামা, কোনও শঠতা শয়তানি, কোনও ধর্ষণ লুঠের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না তো, তাঁরা তো পথে নামেন না দল বেঁধে! অল্প কিছু মুসলমান এত বড় জঘন্য কান্ড ঘটাচ্ছে, আর বেশির ভাগই চুপ করে বসে দেখছে, তা কি হয়? মাঝে মাঝে আমার কিন্তু মনে হয় মডারেট’ বলে কিছু নেই। মুসলমান সমাজে দু’ধরনের মানুষ আছে, এক ইসলাম-বিশ্বাসী, আরেক ইসলামে অবিশ্বাসী। ইসলামে অবিশ্বাসীর সংখ্যা তুলনায় খুব কম, খুবই কম। বাদবাকি পুরোটাই ইসলাম-বিশ্বাসী। এই ইসলাম-বিশ্বাসীদের কেউ কেউ টুপি পরে, জোব্বা পরে, দাড়ি রাখে। কেউ কেউ এই পোশাকের বাইরে অন্য পোশাক পরে। বিশ্বাসীদের কেউ কেউ নামাজ রোজা ইত্যাদি করে, কেউ কেউ করে না। এই হল ঘটনা। বিশ্বাসীদের কেউ কেউ যখন মানবতার বিরুদ্ধে নামে, তার প্রতিবাদ বিশ্বাসীদের মধ্য থেকে আসে না। মডারেটদের তাই চোখে পড়ে না। মডারেট বা নরমপন্থী বলতে কিছু নেই বলেই চোখে পড়ে না।

সারাদিন কিছু ফোন। পাটনা থেকে কেয়া। বীরভুম থেকে এনামুল। ২৪ পরগণা থেকে মোজাফফর। আর একটি চিঠি পেয়ে মন ভরে গেল আজ। পাচুর চিঠি। চিঠি বলতে ই মেইলকেই বুঝি। অনেকমাস ধরে যোগাযোগ নেই পাঁচর সঙ্গে। এমন ভালো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার পিছনে কারণ ছিল, অভিমান। পাচু লিখেছে, ‘নিরাপদে আছিস এটা বুঝি। কিন্তু তোর মন যে একেবারে তছনছ, সেটা ভেবে বড় ব্যাকুল লাগে। আমাদের এই সময় কি তাহলে শাসিত হবে শুধুই ধর্ম, শুধুই মৌলবাদ, শুধুই ভোট কেন্দ্রিকতার যাঁতাকলে? কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখোমুখি হয়ে তুমি তিনটি পাতা প্রত্যাহার করেছো বুঝে শরীর মন হিম হয়ে যায়। আশা রাখবো এই দুর্দিন আবার কাটবে, তুমি আবার ফিরে আসবে তোমাতে, আবার ঝলসাবে তোমার কলম অনির্বাণ! ভালো থাকিস। এই অবস্থায় যতটুকু ভালো থাকা যায়। উত্তরে আমি লিখলাম, ‘পাচু তোর চিঠি পেয়ে ভালো লাগলো এই অসহ্য কষ্টের মধ্যেও। জানি না কী করবো আমি। কলকাতা যেতে চাই। কিন্তু প্রগতিশীল কলকাতা তো আমাকে নিচ্ছে না। আমি একটা অন্ধকার ঘরে হতাশা আর অনিশ্চয়তায় ডুবে আছি। এরা হয়তো চাইছে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে একদিন আমি আত্মহত্যা করি নয়তো এদেশ ছেড়ে চলে যাই। উত্তর লিখলো পাচু। তসলিমা, কাকেই প্রগতিশীল কলকাতা বলিস জানি না। যে কলকাতায়, আমরা জানি, মৌলবাদকে নির্লজ্জ ব্যবহার করে লাল ঝান্ডাওলা একটি দল স্রেফ মুসলিম ভোটের কারণে যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠতে গিয়ে অন্য ঝাল্ডাধারীরা সুতীব্র ধিক্কারে এককাট্টা হয়ে গলা ফাটিয়ে সর্বব্যাপী আওয়াজ তুলতে পারে না–যারা বোঝে না কোন অসহনীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে অসহায় একজন লড়াকু লেখককে তার সাধের তিনটি পাতা ছিঁড়ে ফেলতে হয়–সেই কলকাতাকে তুই প্রগতিশীল কলকাতা বলবি? এই চরম অন্যায়ের শোধ তুই একদিন না একদিন নিতে পারবি। এত অন্ধকারেও আমি বিশ্বাস করি, মৌলবার শেষ কথা বলে না।

বলে না? বাংলাদেশে তো আজও মৌলবাদই শেষ কথা বলে তেরো বছর হয়ে, গেল, ফিরতে পারি না। আর কী কথা বাকি আছে বাংলাদেশের বলার? চুপ করে আছে পশ্চিমবঙ্গ, আর কী কথাই বা তার শেষ কথা। নীরবতা, প্রত্যাখ্যান, অবজ্ঞা, অপমান, মৌলবাদই তো শেষ কথা।

যেখানে আছি আমি, একটি ঘর, সামনে একচিলতে বারান্দা, বারান্দার লাগোয়া একটা ছাদ। ছাদে দাঁড়ালে বা হাঁটলে আবার কেউ না কেউ কোথাও থেকে দেখে ফেললে আবার কী না কী হয়, তাই ওদিকটায় যাই-ই না। যেন না যাই, আমাকে বলে দেওয়া হল। এ আর কী, ঘরবন্দি হয়ে থাকতে তো পারিই আমি। মাসের পর মাস তো কাটিয়েছি, দেশে, বিদেশে। নিরাপত্তার নামে যন্ত্রণা ভোগ কী কম করেছি। শেকল ভাঙার কথা বলতে গিয়ে নিজের পায়ে শেকল পরতে হয়েছে, সে কী আজ থেকে!

.

৮ ডিসেম্বর

‘I think the Taslima Nasreen case has tested, and will test, the integrity of the Left intelligentsia even more than Nandigram’–Ramachandra Guha.

৬ ডিসেম্বরে কলকাতায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পনেরো বছর উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি বললেন, রাম হচ্ছে কবির কল্পনা। রামসেতুটা প্রাকৃতিক সেতু। রামসেতু নিয়ে যা হচ্ছে তা ধর্মীয় উন্মাদনা। টেলিভিশনে কাল এই খবরটি দেখে আমি তাজ্জব। কদিন আগে মুসলিম মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিলেন, শহরে ওদের বর্বরতা আর উন্মাদনার বিরুদ্ধে একটা শব্দ খরচ করলেন না, বরং বললেন, কারওর অধিকার নেই ওদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার। আর এদিকে দোষীকে শাস্তি দেবার বদলে নির্দোষকে রাজ্যছাড়া করলেন, তারপর আজ কি না তিনি হিন্দুর ধর্মীয় অনুভূতিতে নিজেই আঘাত দিচ্ছেন।

.

৯ ডিসেম্বর ‘অধিকাংশের মতামতের সঙ্গে একমত না হওয়ার অধিকার চিন্তাশীল মানুষের প্রাথমিক, মৌলিক, সর্বশ্রেষ্ঠ অধিকার। এক লেখককে ‘তুমি এত দূর অবধি লিখতে পারো, কিন্তু তার বেশি এগোবে না’ বলা আর ‘তুমি কিছুই লিখবে না’ বলার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। কারণ আসলে বলা হচ্ছে ‘তুমি বাপু বাক পরাধীন, তবে আমার ন্যাজে পা না-দেওয়া অবধি বাকস্বাধীন’। এই থ্রেট-সহ ছাড় স্বাধীনতা নয়। খাঁচার মধ্যে পায়চারি করার অনুমতি।

বাক স্বাধীনতার কোনও চৌকাঠ হয় না। সীমা হয় না। কারণ তা হলে যে কোনও ক্ষমতাশীল গোষ্ঠী (রাষ্ট্র। মৌলবাদী/ফাটাকেষ্ট ও চ্যালারা) যখন খুশি ইচ্ছেমতো চৌকাঠ নির্মাণ করবে, এবং পৃথিবীর যে কোনও শিল্পকেই নিজের সুবিধেমত কারও না কারও ভাবাবেগ-আঘাতকারী হিসেবে চিহ্নিত করবে, তার পর গুলি’। –চন্দ্রিল ভট্টাচার্য

একটা চিঠি লিখলাম তাঁকে। চিঠি তাঁকে পাঠানো হয়তো সম্ভব নয়, তবু লিখতে ইচ্ছে হল একটি চিঠি

মাননীয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য,

আমার অশেষ শ্রদ্ধা জানবেন। আপনার সঙ্গে একসময় আমার আলাপছিল, বেশ কয়েকদিন কথাও হয়েছে। আপনাকে একজন আন্তরিক মানুষ হিসেবেই তো আমি জানতাম। মনে আছে নন্দনে বসে আপনি একবার আমার বম্বে হয়ে প্যারিস যাবার বদলে দিল্লি হয়ে প্যারিস যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কারণ বোম্বের মৌলবাদী মুসলিমরাবিক্ষোভ দেখাচ্ছিল আমার বোম্বে যাওয়ার বিরুদ্ধে, বিমানবন্দর নাকি জ্বালিয়ে দেবে, আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে। আমি আপনার প্রস্তাব মেনে নিচ্ছিলাম, কিন্তু শাবানা আজমি, জাভেদ আখতার, জাভেদ আনন্দ আর তিস্তা শীতলবাদীরা যখন বারবার আমাকে ফোন করছিলেন, বলছিলেন আমাকে যেতেই হবে বোম্বে, আমাকে বোঝাতেই হবে যে মৌলবাদীরা যা দাবি করে, তা হতে দেওয়া যায় না, বোম্বে যেতে হবেই, না যাওয়া মানে মৌলবাদীর কাছে নতি স্বীকার করা, না যাওয়া মানে তাদের অন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তাদের বিজয়ী করা। আমি আপনার উপদেশ মেনে চলছিলাম বলে তাঁরা আপনার শরণাপন্ন হলেন। আপনাকেই বোঝালেন কত যে জরুরি আমার বোম্বে যাওয়া। আপনি বুঝলেন এবং মেনে নিলেন আমার বোম্বে হয়ে প্যারিস যাওয়া।

তারপরও ওই নন্দনেই দু’একবার দেখা হয়েছে। আমজাদ আলী খানের সরোদ শুনতে গিয়েও একবার দেখা হল, সম্ভাষণ বিনিময় হল। শ্রদ্ধেয় আমজাদ আলী খান আপনাকে এবং আমাকে নমস্কার জানিয়ে বাজনা শুরু করলেন। তখন ২০০২ সাল, কলকাতায় পাকাঁপাকিভাবে বাস করার ইচ্ছে মনে, মনে আছে চারদিকে ফ্ল্যাট খুঁজে বেড়াচ্ছি কেনার জন্য। আপনি আমাকে সাহায্য করছিলেন একটা ফ্ল্যাট কিনতে। মন্ত্রী গৌতম দেবএর জন্য যে একটা ফ্ল্যাট বরাদ্দ ছিল উদিতায়, বলেছিলেন সেই ফ্ল্যাটটি আমার কিনে নিতে কোনও অসুবিধে নেই। আমি তৈরি ছিলাম। কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে দিল্লি নাকি বোম্বেতে। রিজার্ভ ব্যাংক থেকে নাকি অনুমতি চলে আসছে। না, সেই অনুমতি অবশ্য আমার কোনওদিন পাওয়া হয়নি। কোনও কাগজপত্র ফেরত পাইনি। ফ্ল্যাট কেনাও হয়নি। কিছুই হয়নি। আপনার সঙ্গেও আর কোনও সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়নি। সম্ভব হয়নি আপনার আর নাগাল পাওয়া। আপনার বন্ধুরা, যারা আমারও বন্ধু ছিল, হঠাৎ আমার পর হয়ে উঠলো।

মনে হচ্ছে এই সেদিনের কথা এসব। কী থেকে কী হয়ে গেল, অবিশ্বাস্য সব ওলোটপালোট।

আমি তখন হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকুলারিজমের ওপর একটা ফেলোশিপ করছি। ওখানেই শুনি আপনি আমার দ্বিখন্ডিত বইটিকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। সত্যি, যেন আকাশ থেকে পড়লাম। এও কি সম্ভব? কলকাতার বন্ধুরা জানালো, সম্ভব। ছোটবেলা থেকে বামপন্থায় বিশ্বাস আমার। বামপন্থী রুশ লেখকদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি। আমি তো ‘দ্বিখন্ডিত’তে মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমার লড়াইএর কথা লিখেছি, নারীর স্বাধীনতা আর অধিকারের কথা লিখেছি, আমি তো সমতার কথা লিখেছি! কোথায় তবে বামপন্থার সঙ্গে সংঘাত হল আমার? আমি শুনলাম আপনি বলছেন, কয়েকজন বুদ্ধিজীবী আপনাকে বলেছেন বইটাকে নিষিদ্ধ করতে, এবং আপনিও একাধিকবার পড়ে দেখেছেন ওটা, ওটা নাকি নিষিদ্ধ হওয়ার মতোই বই। তাই কি? আপনি কি মন থেকে বলেছেন ওসব কথা, আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে আমি যা লিখেছি, একটি শব্দ বা বাক্য ভুল লিখেছি? যদি মনে করেন লিখিনি, তবে কি আশংকা জন্মেছিল আপনার, যে, শহরে কোনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যাবে বইয়ের কারণে? কোথাও তো দাঙ্গার আভাস মেলেনি। হাইকোর্ট বইটাকে মুক্ত করে দেওয়ার পর তো বই চলেছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কোথাও তো দাঙ্গা লাগেনি। কোনও একজন মুসলমানও তো আপত্তি করেনি। বইটি নিষিদ্ধ করার কারণ দেখাতে গিয়ে বলা হয়েছিল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবে। দুটো সম্প্রদায়ে নাকি দাঙ্গা লাগবে। পরে হাইকোর্টে এই কারণটি উড়িয়ে দেওয়া হয় এই বলে যে, দুটো সম্প্রদায় এখানে জড়িত নয়। তখন নিষিদ্ধ করার পক্ষে আপনি নতুন কারণ দেখালেন যে, বইটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবে। তিনজন বিচারক রায় দিলেন বইয়ের নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে। না, বুদ্ধবাবু, সবিনয়ে জানাই, রায় আমার দেওয়া নয়। নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলাও, আমার নয়, কলকাতার একজন মানবাধিকার কর্মীর রুজু করা। আপনি আমার বই নিষিদ্ধ করেছেন, তারপরও আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কিছু কমেনি। চেষ্টা করেছি আপনার সঙ্গে দেখা করতে, সম্ভব হয়নি। আপনার কাছে পৌঁছোনোর সব দরজা জানালা আপনি বন্ধ করে রেখেছেন। আপনার যাঁরা কাছের মানুষ, যাঁদের সঙ্গে আমারও যোগাযোগ ছিল, তারাও দূরে সরে গেলেন হঠাৎ। তারপরও বিশ্বাস হারাইনি আপনার ওপর থেকে। ‘ভালো ছবি’ নামে একটা সিনে ক্লাব গড়ে তুলেছিলাম, ইচ্ছে ছিল বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা আমার ভালো ভালো সব ছবি কলকাতার মানুষকে দেখাবো। নন্দনে দেখাতে পারবো, এরকম একটি আশ্বস অংশু সূরের কাছ থেকে পেয়ে পৃথিবীর প্রায় দু’হাজার শ্রেষ্ঠ ছবি যোগাড় করে দেখলাম, নন্দনে আমি নিষিদ্ধ। আমি বোকার হদ্দ, অনেক পরে ধীরে ধীরে বুঝেছি আমি মানুষটাই আসলে নিষিদ্ধ সব সরকারি জায়গায়। সরকার আয়োজিত কোনও উৎসব অনুষ্ঠানে যাওয়ার অধিকার আমার নেই, অংশ নেওয়ার তো প্রশ্ন ওঠে না। কী ভীষণ একা হয়ে গেলাম।

এত ঘৃণা কেন আমার প্রতি আপনার? আমি ইসলাম ধর্ম নিয়ে লিখেছি বলে? আপনি সত্যি করে বলুন তো আপনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন? ইসলাম গেল ইসলাম গেল বলে যারা চেঁচাচ্ছে, আমার মুন্ডু চাইছে, কুশপুত্তলিকা পোড়াচ্ছে, আমাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেবার কথা বলছে, তাদের কি ভালো লোক বা সৎ লোক বলে আপনার মনে হয়? তাদের দাবিকে ন্যায্য দাবি বলে আপনি মনে করেন? যদি তা না মনে করেন, তা হলে বলছেন না কেন? হিন্দু মৌলবাদীরা অন্যায্য দাবি করলে, রামসেতু নিয়ে লাফালে আপনি তো পছন্দ করেন না। ওদের চেঁচামেচিকে নির্দ্বিধায় বলেন, ধর্মীয় উন্মাদনা। মুসলমান মৌলবাদীদের সামনে আপনি নাকি আমাকে ‘বাজে মহিলা’, ‘হরেবল উওম্যান’ বলেছেন, এবং আমাকে রাজ্য ছাড়া করবেন বলে ওদের কথা দিয়েছেন। বিশ্বাসে, আদর্শে, চেতনায় আমি তো ভেবেছিলাম আমি আপনার কাছের মানুষ, কিন্তু আশ্চর্য আপনি তাদের আপন মনে করেছেন, যারা সমাজটাকে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলতে চায়, যে অন্ধকারে মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে দিনের পর দিন, যেখানে সত্য এবং সাম্যের পক্ষে মুখ খোলা নিষেধ।

কী অন্যায় করেছি আমি, আমার কী অপরাধের শাস্তি আপনি আমাকে দিলেন, খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার। আপনার দলের পত্রিকা এবং বন্ধুর পত্রিকায় আমাকে বছরের পর বছর যা তা ভাষায় গালি দেওয়া হচ্ছে। আমার সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা লেখা হচ্ছে। দেখেও বছরের পর বছর মুখ বুজে থেকেছি। পথে প্রান্তরে সিঙ্গুর নিয়ে, নন্দীগ্রাম নিয়ে, রিজওয়ান নিয়ে মানুষ প্রতিবাদ করছে, কোনওদিনও কিছু বলতে পারিনি, লিখতে পারিনি। এদেশি লোক নই, এদেশি রাজনীতি নিয়ে আমার মুখ খোলা নাকি উচিত নয়। বন্ধুরা বলেছে, আমি পথে নামলেই আপনি আমার ওপর প্রতিশোধ নেবেন, পশ্চিমবঙ্গে আমাকে আর থাকতে দেবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা আমার স্বভাববিরুদ্ধ, তারপরও আমি নির্লজ্জের মতো মুখ বুজে থেকেছি। হাঁ, পশ্চিমবঙ্গে থাকাটা আমার জন্য ভীষণ জরুরি বলে মুখ বুজে থেকেছি। আজ যদি বাংলাদেশ আমাকে দেশান্তরী না করতো, বাংলাদেশে বাস করা আমার পক্ষে সম্ভব হত, তাহলে ওখানেই থাকতাম। এখানে বাস করতে চাইতাম না। এগারো বছর আমি ইওরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরেছি। কোথাও মন বসাতে পারিনি। কোনও দেশকেই নিজের দেশ বলে মনে হয়নি আমার। ওসব দেশে আমাকে যথেষ্ট সম্মান করা হয়েছে, বাক স্বাধীনতা নিয়ে কোনওদিন কোনও শর্ত দেওয়া হয়নি, আশ্রিত বলে আমাকে সংযত হয়ে কথা বলতে বলেনি কেউ, তারপরও আমি আমার নিজের দেশে চলে যেতে চেয়েছি, নিজের বাবা মা, ভাইবোনের কাছে ফিরতে চেয়েছি, বন্ধুদের কাছে ফিরতে চেয়েছি। নির্বাসন জীবন শুরুর পর ইওরোপে বসে বসে হতাশায় ভুগতে ভুগতে বাংলাদেশের দরজায় কড়া নেড়ে বিফল হয়ে ভারতের দরজায় কড়া নেড়েছি। ভারত খুলেছে দরজা, তবে ছ’ছটি বছর নিয়েছে দরজা খুলতে। অল্প যে-কদিনের জন্য অনুমতি দেওয়া হত ভারত ভ্রমণের, সে কদিনই এসে থেকে যেতাম পশ্চিমবঙ্গে। প্রাণ ভরে দেশের স্বাদ নিতাম। ওপার থেকে আত্মীয়স্বজন আসতো এপারে আমার সঙ্গে দেখা করতে। ভারতে বাস করার অনুমতি বছর তিন আগে মিলেছে, মেলার পর এক মুহূর্ত দেরি করিনি, থাকতে শুরু করেছি। পশ্চিমবঙ্গে বাস করা আমার কাছে পশ্চিমবঙ্গে বাস করা কখনও ছিল না।

বছর তিনেক কলকাতায় বাস করছি। কারও তো অনিষ্ট করিনি। নিজের ঘরে বসে নিজের লেখালেখি করি, কিছু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। কারও সাতে নেই, পাঁচে নেই। রাজনীতি বুঝিও না। রাজনীতি থেকে সহস্র মাইল দূরে থাকি। আমার শান্তশিষ্ট জীবন কার বাড়া ভাতে ছাই দিল? পশ্চিমবঙ্গের ঘরটি আমার কাছে শুধু ঘর ছিল না। ঘরের চেয়েও অনেক বড়। আমার নিজের যে একটি ঘর ছিল বাংলাদেশে, যে ঘরটি ছেড়ে আমাকে নির্বাসিত হতে হয়েছিল, সেই ঘরটি আমি প্রাণপণে ফিরে পেতে চেয়েছিলাম। অপেক্ষার প্রহর গেছে কেবল সেই স্বপ্নের কাছে যেতে। সেই ঘর, সেই স্বপ্ন, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পাওয়া যায় না। সেই ঘরটি, নিজের সেই ঘরটি, আমার দীর্ঘ এগারো বছরের পথে পথে ঘোরার ক্লান্তির পর পেয়েছিলাম কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গে, আমার বাংলায়। বাংলাকে আমি কোনওদিনই ভাগ করে দেখিনি, তাই পেরেছিলাম অত দ্রুত পশ্চিমবঙ্গকে নিজের দেশ করে নিতে, কলকাতাকে নিজের শহর করে নিতে। পশ্চিমবঙ্গের ঘর শুধু ঘর ছিল না, বহুকালের হারানো স্বপ্ন ফিরে পাওয়া ছিল। নিজের যে ঘরটি যে স্বপ্নটি আমাকে ত্যাগ করতে হয়েছিলো, সে ঘরটি ফিরে পাওয়া, সেই স্বপ্নকে ফিরে পাওয়া, সেই নিশ্চিন্তিটি, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। দীর্ঘ বছরের সাধনার পর সাধের ধন ফিরে পাওয়া। আমার মা খুব চেয়েছিলেন দেশের মেয়ে দেশে ফিরে আসি। বিদেশে আমার বিষণ্ণ পড়ে থাকা দেখে তিনি কাঁদতেন। চেয়েছিলেন যে করেই হোক যেন নিজের বাড়িঘরে, নিজের আত্মীয় বন্ধুদের নিয়ে থাকি। মার সেই স্বপ্ন সফল হয়নি, শত চেষ্টা করেও আমি দেশে ফিরতে পারিনি। কিন্তু বেঁচে থাকলে মা নিশ্চয়ই অন্তত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন এই ভেবে যে, অন্তত বাঙালির মধ্যে আছি, দেশ না হলেও দেশের মতো জায়গায় আছি।

নিশ্চিন্তে নির্বিয় ছিলাম কলকাতায়। হঠাৎ হায়দারাবাদে আমার ওপর মৌলবাদীদের আক্রমণ হল। সাধারণ মানুষ সহানুভূতি প্রকাশ করলো। না, বুদ্ধবাবু, আপনি ফিরেও তাকালেন না। আমি মার খাই, কী মরে যাই, তাতে আপনার কিছু যায় আসে না। একটিবার বললেন না হায়দারাবাদে যা হয়েছে, তা হওয়া উচিত হয়নি। না, বুদ্ধবাবু, হায়দারাবাদের অনুষ্ঠানে ধর্ম নিয়ে আমি একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি। তারপরও অসভ্য ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটিয়েছে মৌলবাদীরা। এই ঘটনার পর কোথায় আমি সহানুভূতি পাবো, তা নয়, এই আপনারই শহরে, ধর্মতলার মোড়ে আমার মাথার দাম ঘোষণা করলো ক’জন মৌলবাদী। না, তাদের কাউকে আইন অমান্যের দোষে গ্রেফতার করা হয়নি। ওরকম ফতোয়া পেয়ে আমার অভ্যেস আছে। জীবন তো আমার কখনও কোনওদিন মসৃণ ছিল না। সইতে হয়েছে মৌলবাদীদের অনেক হুমকি, অনেক ফতোয়া, অনেক নির্যাতন, অনেক নিষেধাজ্ঞা। জীবন আমার এরকমই। ফতোয়ায় ভয় পাইনি। আপনি অনুগ্রহ করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন, তাই দুশ্চিন্তা কখনও ছিল না। আর, সত্যি কথা কী, আমার মনে হয়নি কলকাতায় আমাকে কেউ মেরে ফেলবে। নিরাপত্তা রক্ষীদের বিদেয় করে কত আমি গড়িয়াহাটে, যদুবাবুর বাজারে একা একা বাজার করেছি, ভিড়ের রাস্তায় একা একা হেঁটেছি। কই, কখনও তো কেউ মারতে আসেনি। যারা এসেছে, ভালোবেসে কাছে এসেছে।

এমন জীবনে হঠাৎ দেখি আমাকে বলা হচ্ছে ঘরের বাইরে আর বেরোনো চলবে না। কেন, বাইরে কী? নিরাপত্তা রক্ষীরা বলেন, ওপর থেকে অর্ডার পেয়েছেন ওরা, আমার বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণই বন্ধ। রাস্তাঘাটে বাজার হাটে তো নয়ই, কারও বাড়িতেও নয়। নিভৃতে, কেউ জানবে না, তাও নয়। এমনকী দু’গাড়ি নিরাপত্তা রক্ষী নিয়েও বেরোনো যাবে না। পায়ে যে আসলে শেকল পরানো হচ্ছে, বুঝিনি। ভেবেছিলাম, সত্যি বুঝি ঘরের বাইরে আমাকে মেরে ফেলার ফাঁদ পাতা আছে। প্রসূন মুখার্জি যেদিন বাড়ি এসে দু’ঘণ্টা কথা বলেছেন, বুঝিয়েছেন, আমি বাইরে বেরোলেই আমাকে মেরে ফেলা হবে, উন্মত্ত ধর্মান্ধরা সব ধেয়ে আসবে আমার বাড়িতে আমাকে মেরে ফেলতে, এবং আমার জন্য কিছুতেই এই কলকাতায়, এই পশ্চিমবঙ্গে থাকা নিরাপদ নয়, আমি যেন চনে যাই, চলে যাই ইওরোপ আমেরিকায়, চলে যাই সিঙ্গাপুর থাইল্যান্ডে, চলে যাই কেরালা বা মধ্যপ্রদেশ, কোথাও, যেন কিছুতেই পশ্চিমবঙ্গে না থাকি, থাকলে রায়ট লেগে যাবে–সেদিনও বুঝিনি আসলে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আমাকে দেশ থেকে বা রাজ্য থেকে বের করাই আসল উদ্দেশ্য। আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছুই করা হচ্ছে না। এরপরও প্রসূনবাবু ফোন করে করে চলে যাবার কথা বলতেন। হুমকির মতো শোনাতো তার কথা। শেষ ফোনটি যেদিন করেছিলেন আমাকে, নিজেই বললেন, সিএম বলেছেন আপনাকে অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল চলে যেতে। উনি কেরালায় সব ঠিকঠাক করে ফেলেছেন। ওখানে সরকারের সঙ্গে কথাও হয়েছে সিএমের। ওখানে আপনাকে সিকিউরিটি দেওয়া হবে।

আমি, বিশ্বাস করুন বুদ্ধবাবু, বিশ্বাস করতে পারিনি আপনি প্রসূন মুখার্জিকে পাঠাতেন, আমাকে বুঝিয়ে, না বুঝলে ভয় দেখিয়ে, নানা কায়দায় আতংক সৃষ্টি করে, আমাকে দেশ ছাড়া, নয়তো রাজ্য ছাড়া করতে। আমি বলেছিলাম আমাকে যে এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নিরাপত্তা দিতে পারছে না, আমাকে যে অন্য রাজ্যে চলে যেতে বলা হচ্ছে, মানুষ জানুক তা, কারণ কেরালায় গেলে ওখানেও তো হানা দিতে পারে আততায়ীরা। কী ভরসা আছে বাঁচবো আমি! আমি যে কেরালায় নিজের ইচ্ছেয় মরতে যাইনি, তা আমি তাহলে বলি সবাইকে। প্রসূন মুখার্জি বললেন, না, যেন গোপনে চলে যাই, যেন ঘুণাক্ষরেও কাউকে এসব না জানাই। শুধু প্রসূনবাবুকে দিয়ে নয়, আপনি আপনার দু’একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দিয়েও, যাদের আমি শ্রদ্ধা করি, বলিয়েছেন চলে যেতে। অন্যায় করেছি আমি, আপনার আদেশ আমি মানিনি, আমি কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাইনি। যাইনি কারণ আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, তাই আমাকে চলে যেতে বলছেন। শহর শান্ত, নিরাপত্তার অভাব কী করে হবে, ভেবে পাইনি। তারপর তো শহর একদিন অশান্ত হল। অশান্ত হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু হল।

আপনি আমাকে কলকাতাতেই শাস্তি দিয়েছেন। ঘর থেকে এক পা বার হওয়াও নিষেধ আমার জন্য। পাগল হয়ে যেতাম। বিশ্বাস করুন বুদ্ধবাবু, আমি পাগল হয়ে যেতাম। ঠিক আমার জায়গায় নিজেকে ফেলে দেখেছেন কেমন লাগে? ধরুন আপনাকে যদি ওভাবে বন্দি করে রাখা হত, যে বন্ধুদের আপনি কাছে পেতে চাইতেন, দেখতেন তারা আর আসছে আপনার কাছে, কারণ আপনার দরজায় যে পুলিশেরা বসে, সেই পুলিশেরা যারাই আসতো আপনার সঙ্গে দেখা করতে তাদের নাম ঠিকানা লিখে রাখতো, কবে আবার কী না কী হয়, এই ভয়ে যদি বন্ধুদের আসা বন্ধ হয়ে যেত এবং আপনি একা বসে থাকতেন ঘরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, কেমন লাগতো? আপনার নিশ্চয়ই শ্বাসকষ্ট হত। একটা ঘরের দরজা যখন বাইরে থেকে বন্ধ থাকে, এবং কোনও শক্তি থাকে না, উপায় থাকে নাসেই দরজা খোলার, তখন নিশ্চয়ই মৃত্যুময় নিস্তব্ধতা ঘিরে থাকে চারদিক, অসহায়তা আর হতাশা ডুবিয়ে নিতে থাকে অদ্ভুত অন্ধকারে। আমার জন্য খুব গোপনেও কি আপনার একবার দুঃখ হয়নি?

প্রসূনবাবু পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে চলে যাবার পর আমাকে গৃহবন্দি করা, ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়ার দায়িত্ব পড়লো নিরাপত্তা প্রধান বিনীত গোয়েল বাবুর ওপর। উনি প্রায়ই ফোন করতেন। কেরালা বা মধ্যপ্রদেশে বা বিদেশে অজানা কোথাও উনি আমাকে ফেলে দেননি। উনি প্রথম থেকেই বলেছেন জয়পুর যেতে। জয়পুরে আমার জন্য সব আয়োজন থাকবে, একটা চমৎকার রিসর্ট থাকবে, কুক থাকবে, আমি ওখানে দু’দিন যেন থেকে আসি, যাওয়ার ব্যবস্থা উনি নিজেই করবেন। কেন যাবো, কারণ এখানে এই কলকাতায় মুসলিম মৌলবাদীরা আমাকে মেরে ফেলবে। বাঁচার জন্য যেতে হবে জয়পুর। একে গৃহবন্দি, তার ওপর যারা আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছেন, তাঁরা বারবারই আমাকে জানাচ্ছেন যে আমি যদি সরকারের উপদেশ না মানি, নিজ দায়িত্বে কোথাও চলে যেতে পারি। জয়পুর কেন, পরে আমি বুঝতে পারলাম যখন সন্দীপ ভুটোরিয়া আমাকে ফোন করতে শুরু করলেন। বিনীত গোয়েলের হয়ে অতপর সন্দীপ ভুটোরিয়ার কাজ আমাকে বোঝানো, যেন জয়পুর চলে যাই। ওখানে থাকার সব বন্দোবস্ত তিনিই সব করে দেবেন। যেন একটুও দুশ্চিন্তা না করি। ক’দিন কাটিয়ে পরিস্থিতি একটু শান্ত হলেই ফিরে আসতে পারবো। প্রসূনবাবু আমার চেনা এমন কাউকে খুঁজে পাননি, যাকে বিশ্বাস করে অন্য রাজ্যে পাড়ি জমাতে পারি। বিনীত গোয়েল আগে লোক খুঁজেছেন, পেয়েছেন, তারপর আমাকে পার করতে নেমেছেন। অন্য রাজ্যে আমি কী করে যাবো, কোথায় থাকবো, নিরাপত্তার ব্যবস্থা কী, এসব ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে বিনীত গোয়েল এবং তাঁর বন্ধু, আমার চেনা পরিচিত সন্দীপ ভুটোরিয়া লেগে রইলেন। আমি কী যে ভুল করছি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পড়ে রয়েছি কলকাতায়। মাথায় এক ছটাক বুদ্ধি থাকলে, মোদ্দা কথা প্রাণে বাঁচতে চাইলে জয়পুরে চলে যেতাম, ক্রমাগতই বলে চলেছেন দুজন।

যে পনেরো নভেম্বর তারিখে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীদের ‘বনধ’ পালন হওয়ার কথা, এবং সেই ভয়ে আগে থেকেই পুলিশ কর্তারা আমাকে দেশ বা রাজ্য ছাড়ার জন্য বলতেন, সেই পনেরো নভেম্বরে বনধ তো হলই না, একটা মিছিল হল শুধু, অথচ ভোর পাঁচটায় আমাকে তড়িঘড়ি বের করে রাসবিহারী অ্যাভিয়ে ডলি রায়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। ওখানে আমাকে একা রেখে পুলিশরা সবাই চলে গেল। কোথায় গেল? খবর নিয়ে দেখি সবাই পুলিশ অফিসে গিয়ে খামোকা বসে আছে। শেষ বিকেলে বিনীত গোয়েলকে ফোন করেছিলাম জানতে কখন বাড়ি ফিরবো। ভীষণ ক্রুদ্ধ তিনি আমার ওপর, বললেল, কখন বাড়ি ফিরবেন তার আমি কী জানি? তাঁর রাগ, আমি জয়পুর যাইনি, তার জয়পুরী দূতকে বারে বারেই ফিরিয়ে দিয়েছি। আতঙ্কে কেটেছে সারাদিন। আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা ১৫ নভেম্বরের আগেই শুরু হয়েছিল যখন আমার বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী কমিয়ে দেওয়া হল। কী, না, যারা বাড়ির সামনে বসে, তারা এখন থেকে পুলিশ অফিসে বসবে। কেন পুলিশ অফিসে? না, এমনি। ১৫ নভেম্বরে মিল্লি ইত্তেহাদ পরিষদের অর্থাৎ সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীদের পথ অবরোধ বিকেলে। ইস্যু নন্দীগ্রাম, রিজওয়ান, সাচার কমিটির রিপোর্ট, আমি। টেলিভিশনে দেখি আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয় ধর্মান্ধগুলো আমার কুশ পুতুল পোড়াচ্ছে। উন্মত্ত ধর্মান্ধতা আমার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে, ভয় সত্যিই হল। সাদা পোশাকের যে পুলিশরা আগস্ট মাসের ন’তারিখ থেকে আমার বাড়ির সামনে ছিল, তারা তখন সবাই বসে আছে অফিসে। যে দিনটায় তাদের থাকার কথা সবচেয় জরুরি, সে দিনটাতেই ওরা নেই। আমি ওদের অনুরোধ করলাম আসতে। ওরা এলো। কিন্তু মিনিট পনেরো থেকে চলেও গেল। কুশ পুতুল পোড়ার আগুন নেভেনি তখনও।

একুশ তারিখে কিছু হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু হল। ভেবেছিলাম ইদ্রিস আলীর সংগঠন কী আর এমন করতে পারবে, যখন ১২টা সংগঠনই পনেরাই নভেম্বরে তেমন কিছু গন্ডগোল বাধাতে পারেনি। কিন্তু ২১ তারিখের ভয়াবহ কান্ড টেলিভিশনে দেখে স্তম্ভিত বসে রইলাম। স্তম্ভিত এইজন্য যে, এরা কারা, এরা তো আমার বই পড়ার ছেলে নয়, এরা আমাকে তাড়াতে চাইছে কেন, এদের তো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার কোনও কারণ নেই। দীর্ঘদিন থেকে এদের কি ব্রেইনওয়াশ চলেছে, নাকি কেউ লেলিয়ে দিয়েছে আজ? পেছনে কোনও চক্রান্ত নিশ্চয়ই কাজ করছে। ছেলেরা লুঙ্গি তুলে পুলিশদের পুরুষাঙ্গ দেখাচ্ছে। বিভিন্ন অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছে। পুলিশ মারার পুলকে একেকজন দিশেহারা। এরা তো আমাকে চেনে না জানে না, কোনওদিন পড়েওনি আমাকে। শুধু কি আমাকে, এরা তো মনে হয় না এদের ধর্মগ্রন্থও কোনওদিন পড়ে দেখেছে! যেহেতু ওরা শুনেছে যে আমি ইসলাম বিরোধী, তাই আমি ইসলাম-বিরোধী, তাই আমাকে দেশ থেকে তাড়াতে হবে, এই দাবি নিয়ে কি পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়ছিল, গাড়ি পোড়াচ্ছিল? এদের মুখ দেখে আমার মনে হচ্ছিল, পুলিশের ওপর এদের রাগও প্রচন্ড, রিজওয়ান হত্যার শোধ যেন নিচ্ছিল এরা। না, নন্দীগ্রাম নিয়ে এদের কোনও মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না। আমি হিম হয়ে যাচ্ছিলাম দেখে যে পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে। পুলিশদের গুলি চালালো না, র‍্যাফ নামলো, র‍্যাফও চালালো না, সেনা নামানো হল, সেনাদেরও বলা আছে। গুলি যেন না ছোঁড়ে কারও দিকে। আমার ধারণা, উন্মত্ত ছেলেগুলো যদি আমার বাড়ির দিকে আসে আমাকে খুন করতে, পুলিশ, র‍্যাফ, সেনা এভাবেই নিশ্ৰুপ বসে থাকবে। নড়বে চড়বে না। ওদের বলে দেওয়া আছে মার খাওয়ার, মার না দেওয়ার।

একুশ তারিখ রাতে বাড়ি এলেন সন্দীপ ভুটোরিয়া। ভক্ত হিসেব দেখা সাক্ষাৎ করেন মাঝে মাঝে। একবার দরিদ্র শিশুদের সাহায্যের জন্য জয়পুরের একটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, গিয়েছিলাম। রাজভবনে অনুষ্ঠান হয়েছিল। প্রতিভা পাটেল ছিলেন সভানেত্রী, আমি প্রধান অতিথি। সন্দীপের সেই ওই একই কথা। আপনি তো জানেন জয়পুরে আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, আপনি নামবেন জয়পুরে, সরকারকে ওখানে সব বলে রাখা আছে, আপনাকে প্রটেকশন দেবার সব ব্যবস্থা পাকা, আপনি কদিন একটু বেড়াতে যাবেন। খাবেন, দাবেন, ঘুরবেন, একটু বেড়িয়ে আসুন। এখানে যে কোনও মুহূর্তে এরা মেরে ফেলবে। এত বোকার মতো কাজ কেন করছেন। সন্দীপকে সোজা বলে দিই, স্পষ্ট বলে দিই, আমি যাবো না কোথাও।

পরদিন টিভিতে সকাল থেকেই দেখাচ্ছে পার্কসার্কাস মোড়ের লোকদের। কেউ কেউ বলছে, ‘আমি তসলিমাকে খুন করবো, এতে যদি আমার প্রাণ যায় যাবে। কী ভীষণ বর্বরতা আর হিংস্রতা কণ্ঠস্বরে ওদের। দুপুরে কথা হল বিনীত গোয়েলের সঙ্গে। কাল শুক্রবার নামাজের পর আমার বাড়িতে আক্রমণ হবে, খবর দিলেন। এরকম হলে চলে যাই সল্ট লেক বা বেলঘরিয়া, বা বেহালা বা গোলপার্ক, বা এরকম কোনও জায়গায়, আমি বললাম। না, ওসব জায়গায় সিকিউরিটি ছাড়া থাকতে হবে। সিকিউরিটি থাকলে তোক জেনে যাবে। সিকিউরিটি ছাড়া থাকা তো নিরাপদ নয়, ইন কেইস। না সে দায়িত্ব আমরা নিতে পারবো না। বিনীতবাবুর সাফ কথা, আমাকে বাঁচতে হলে জয়পুর যেতে হবে। তিনি সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছেন। জয়পুর না গেলে বাঁচবো না, আমার জন্য বাঁচার কোনও রাস্তা খোলা নেই এই শহরে। আগামিকাল জুম্মার নামাজ, নামাজ শেষে মুসলমান মৌলবাদীরা, একুশ তারিখের বিজয়ী উন্মত্তরা বেরিয়ে পড়বে, গত চারমাস ধরে ভয় আর আতঙ্ক আমার ভেতর জোর জবরদস্তি করে ঢোকানোর চেষ্টা করে অবশেষে সফল হলেন বিনীতবাবু। আতঙ্ক আমার সর্বশরীরে, বেঁচে থাকতে হবে, লিখতে হবে, তাহলে দুদিনের জন্য যাই জয়পুর। তক্ষুনি একটা সাদা অ্যামবাসাডার পাঠালেন তিনি, যেন ঝড়ের মতো উড়ে এলো গাড়ি। কেবল ল্যাপটপটা নিলাম, আর কিছু নেওয়ার সময় হল না। পুলিশের লোকেরা হাতে টিকিট দিলেন বিমান বন্দরে। এভাবেই কলকাতা আমাকে গুডবাই জানালো। স্টালিন বুঝি এভাবেই মানুষকে গুলাগ পাঠাতো। স্টালিন তাদেরই পাঠাতো, যারা কট্টর স্টালিন বিরোধী ছিল। কিন্তু আমি তো বুদ্ধবিরোধী ছিলাম না।

তারপর তোজয়পুরে পৌঁছে বুঝলাম, বিনীতবাবু এবং তার জয়পুরী দূত যা বলেছিলেন সব ভুল। জয়পুরের পুলিশদের বলা হয়েছে আমি কোনও এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছি, আমাকে একটি সস্তা হোটেলে তোলা হল, ওই হোটেল বিনীত গোয়েল আর জয়পুরী দূত কলকাতা থেকেই ঠিক করে রেখেছেন। গভীর রাতে পুলিশ আমাকে জানিয়ে দিল যে আমাকে রাজস্থান থেকে চলে যেতে হবে, কারণ ল এন্ড অর্ডার প্রবলেম শুরু হবে বা শুরু হয়ে গিয়েছে। গা হিম হয়ে গেল। ঠিক আছে, কলকাতায় চলে যাবো। কিন্তু দেখি ভোরবেলা আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এয়ারপোর্টে নয়, কলকাতার পথে নয়, দিল্লির পথে। উড়োজাহাজে নয়, গাড়িতে। কেন, সে পরে জেনেছি, রাজস্থানে যেমন আমাকে লাথি দিয়ে ফেলা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে, তেমনি রাজস্থান থেকেও একই রকম লাথি দিয়ে আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল রাজ্যসরকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জানিয়ে দিয়েছে, বল যেন তার এলাকায় এসে না পড়ে। বল তারা চায় না। অতএব ডাম্প করতে দিল্লি, কেন্দ্র। কোনও নো ম্যানস ল্যান্ডের দিকে, উদ্বাস্তু, রাজ্যহারা, এতিম, অনাথ, অসহায়কে নিয়ে চললো পুলিশ। বসে আছি পথ চেয়ে, কবে ফিরবো কলকাতা। আপনি যদিও জানিয়ে দিয়েছেন যে আপনি কিছু জানেন না আমার বিষয়ে, জানে কেন্দ্র, সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র। আসলে কিন্তু কেন্দ্রকে নিজের সিদ্ধান্তটি আপনি দিয়েই রেখেছেন, আপনি আমাকে চাননা কলকাতায়, চাননা পশ্চিমবঙ্গে।

লোকে বলে, আপনার ভয়, আমি পশ্চিমবঙ্গে বাস করলে আপনি মুসলমান ধর্মান্ধদের সমর্থন পাবেন না, না পেলে পুরো মুসলমান জাতটারই ভোট পাবেন না। তাই আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে ভোট নিশ্চিত করেছেন। ধর্মান্ধতা ঘোচানোর জন্য আমি লিখি, আপনি আমাকে সমর্থন না করে সমর্থন করলেন উন্মত্ত ধর্মান্ধতাকে। ওদের জিতিয়ে দিলেন। ওরা কি আপনাকে ভালোবাসে বলে আপনি মনে করেন? ওরা কি নিজেরাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো আপনার মুণ্ডু চাইবে না একদিন?

কলকাতায় বাড়িঘর পড়ে আছে, আমার লেখালেখি সব পড়ে আছে। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন আমি, নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, আমি ঠিক কোথায় আমি জানি না। এখানে আপনার অনুমতির অপেক্ষায় কত দিন বসে থাকতে হবে আমি জানি না। আপনি কবে আমাকে বাড়ি ফিরতে অনুমতি দেবেন জানি না। হতাশায়, অনিশ্চয়তায়, অস্থিরতায় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমার রক্তচাপ বাড়ছে, প্রচন্ড উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা আমাকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করছে। আপনি খুশি হবেন, তাই আমি আপনার চক্ষুশূল ওই ‘দ্বিখন্ডিত বইটির যে লাইনগুলোকে সহ্য করতে পারতেন না, তুলে নিয়েছি। না, মৌলবাদীদের ভয়ে আমি আমার লেখা তুলে নিইনি। আমি ভয় করেছি আপনাদের, ভয় করেছি সেকুলার এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে, ভয় পেয়েছি আশ্রিতের জন্য যে ধর্ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সেটিকে। ভয় পেয়েছি অগুনতি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের ভয়াবহ মুখ বুজে থাকাকে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমার নিজের দেশে ছিল না বলেই তো আমি আজ নিজের দেশের বাইরে, এখানে আমি সেই অধিকার পাবো বলেই তো আজ আমি এখানে। একটি গণতন্ত্র যদি আমাকে অধিকারটি না দেয়, কে দেবে? আমাকে যে মুখ বুজে থাকতে বলা হল, আমাকে যে বাধ্য করা হল নিজের লেখাকে অস্বীকার করতে, নিজের বই ছিঁড়ে ফেলতে, এ কার অপমান? আমার?

বুদ্ধবাবু, আমার বিশ্বাস হয় না আমার কারণে আপনার দলের ভোট পাওয়ায় কোনও হেরফের হবে। আপনার দল খুব শক্তিশালী দল। ভয় পাবেন না, আপনার দল যে কোনও নির্বাচনেই জিতে যাবে। তারপরও যদি আপনার বিশ্বাস হয়, যে, আমাকে তাড়িয়েছেন বলে দুটো ভোট আপনার বেশি হতে যাচ্ছে, তাহলে সেই ভোট আপনার নির্বিঘ্নে জুটুক, আপনার আরাম হোক। ভোট শেষ হলে, আপনি বিজয়ী হলে আমাকে আমার ঘরে ফিরতে দেবেন তো! অপেক্ষা করছি আপনার অনুমতির। কোনও ক্ষতি আমি আপনার করিনি। করতে চাই না। আমাকে শুধু নিরুপদ্রব নিজের লেখালেখি নিজের মতো করতে দিন। আমি আপনার শত্রু নই। শত্ৰু তারা, ওই মৌলবাদী, যাদের বন্ধু বলে জড়িয়ে ধরেছেন আপনি, সমাজকে অন্ধকার আর কুসংস্কার আর ভয়াবহ সংকীর্ণতা দিয়ে গ্রাস করতে চাইছে, এ আপনি জানেন না, আমি বিশ্বাস করি না।

আপনি যদি বিশ্বাস করেন সত্যিকার সেকুলারিজমে, সমতায়, সততায়, সাহসে, তবে আমাকে বন্ধু বলে মনে করতে আপনার তো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। ভোটই জগতের এবং জীবনের শেষ কথা নয়। মানবতা বলে একটি কথা আছে, আদর্শ বলেও একটি কথা আছে। সেসব খুইয়ে ফেললে কী আর থাকে। জেতে তো কত রাজাই। রাজারা সিংহাসন থেকে আবার কখনও কখনও খসেও পড়ে। রাজা কতদিন সিংহাসনে ছিল, তা দিয়ে রাজার চরিত্র বিচার হয় না। রাজার কাজ দিয়েই রাজার চরিত্র বিচার হয়।

তসলিমা

.

১০ ডিসেম্বর

‘তসলিমাকে এভাবে আটক করে রাখাটা ভারতের মতো একটি দেশের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাহানিকর। সাম্প্রতিককালে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায় এই ঘটনা আমাদের খুব ছোট করে দিয়েছে।.. Taslima has suffered too much and has gone through prolonged distress and agony. This must be brought to an end without delay. She should also, without much ado, be allowed to return to Kolkata, her preferred place for stay. Moreover, she should be granted Indian citizenship before her current visa expires so that her creative work does not suffer and she is never again rendered fugitive and stateless. The award of citizenship would also make it easier for her to protect her rights. In urging this, I am not alone; hundreds of millions of Indians desire likewise.’

-Muchkund Dubey

আজ মানবাধিকার দিবস। দীর্ঘ দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলছি জীবনের কথা ভেবে। দীর্ঘ তেরো বছরের নির্বাসন জীবন আমার। আজও নিজের দেশ বাংলাদেশে যাওয়ার এবং বাস করার কোনও অধিকার আমার নেই। কী কারণে বাংলাদেশ সরকার আমার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করছে, তা কোনওদিনই আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি।

আজ মানবাধিকার দিবস। আমি পড়ে আছি প্রিয় বাংলা থেকে শত শত মাইল দূরে অজানা একটা ঠিকানায়। পূর্ববঙ্গও নির্বাসন দিল, পশ্চিমবঙ্গও পাঠালোনির্বাসনে। বাংলায় আমার ঠাঁই নেই। আমি কোথায় আছি তা কেউ জানবে না, তা কারও জানার নিয়ম নেই। কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। আমিও কারও সঙ্গে দেখা করতে পারবো না।

একা একা সকাল হয়। একা একা দুপুর, বিকেল। একা একা রাত হয়। মানবাধিকার দিবস জুড়ে বসে থাকি এক জীবন অধিকারহীনতা নিয়ে। অসহায়। অনাথ। অবলা। হ্যাঁ অবলাই তো। কথা বলার অধিকারও তো আমার নেই। আমি যেন কথা না বলি। কথা বলার অধিকার বা মত প্রকাশের অধিকারকেও তো মানবাধিকার বলে। কথা না বলতে বলতে, মত প্রকাশ না করতে করতে আমার মনে হচ্ছে, আমি ভুলে যাব কথা বলতে। আমি ভুলে যাবো ভাবতে। ভুলে যাবো নিজের কোনও মত যে থাকতে হয়, ভিন্ন মত হলেও যে থাকতে হয়, এবং তা প্রকাশ করতে হয়, তা। ভুলে যাবো মানবাধিকারের মূল অর্থ কী। প্রতি বছর দশই ডিসেম্বর যাবে, আসবে। আমার কিছু যাবে আসবে না।

আজ রাতেই এলেন প্রভু। প্রভু আসা মানে নতুন কোনো খবর আসা। মূলত যা বললেন, তা হল, সুদূর সুইডেন থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন মিস্টার সুয়েনসন, তাঁকে আমার অজ্ঞাত ঠিকানায় আনার কোনও অধিকার আমার নেই, এমনকী আমারও অধিকার নেই তার হোটেলে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার, যদি দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করে আমি দরখাস্ত করি, এবং যদি ওপরওয়ালা রাজি হন, তবে বড়জোর ঘণ্টাখানেকের জন্য তৃতীয় কোনও জায়গায় দু’জনকেই পৃথক পৃথক ভাবে নিয়ে গিয়ে দুজনের দেখা করাবার একটি ব্যবস্থা করা হবে। এর বেশি কিছু যেন আমি আশা না করি। ওপরওয়ালা এখানে ভগবান জাতীয় কিছু নন, সত্যি বলতে কী, ভগবানের চেয়েও শক্তিমান।

দুনিয়া জুড়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আবশ্যকতা নিয়ে বলছি সেই কতকাল, বিভিন্ন মঞ্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। কত শত মানুষ কত শত দেশে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। আর আমাকে কি না কোনো একটা ঘরে আটকে রেখে বলা হচ্ছে, এ করা যাবে না, ও করা যাবে না? যাঁরা আমাকে বন্দি করছেন এবং নানারকম নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করছেন, শেকল পরাচ্ছেন পায়ে, চোখ বেঁধে রেখেছেন কাপড়ে, তাঁরা আদৌ জানেন না আমি কে, কোনোদিন শোনেননি আমার সামান্য ইতিহাস!

আমার তো কলকাতায় থাকার কথা ছিল, সুয়েনসনের কলকাতায় আমার কাছে বেড়াতে আসার কথা ছিল। আমি কলকাতায় থাকলে তো সুয়েনসন নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে আমার কলকাতার বাড়িতে আমার সঙ্গে ক’দিন কাটাতে পারতো। স্টকহোম-কলকাতা টিকিট ছিল তার। তিন চার মাস আগেই করে রাখা টিকিট। আমি দিল্লিতে আছি শুনে কলকাতা বদলে গন্তব্য দিল্লি করে নিয়েছে শুধু। তাকে বলেছি ফোনে, দিল্লিতে আমি অনেকটা গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাচ্ছি, তোমার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে কি না জানি না। সুয়েনসন খুশি নয় আমার কথায়। তার বক্তব্য, ওঁরা যা বলছেন, তা কেন আমি মেনে নিচ্ছি! কেন আমি যে করেই হোক তাকে আমার কাছে রাখায় যে বাধা তৈরি করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি না! যুদ্ধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় জেনেও সুয়েনসন টিকিট বাতিল করেনি। সস্তা টিকিট বাতিল করলে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। দিব্যি উড়ে চলে এলো।

আমার এই মানসিক অবস্থায় হাতে গোনা দু’একজন বন্ধুর সঙ্গে আমি যদি দেখা করতে না পারি, তাহলে কী ধরনের জীবন আমি যাপন করবো এখানে, এই অজ্ঞাতবাসে? আমি তো স্বাস বন্ধ হয়ে মারা পড়বো! অন্তত কলকাতার বন্দি জীবনে বন্ধুরা আসতে পারতো আমার বাড়িতে। এখানে তো জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন আমি। প্রভু একসময় যা বললেন, প্রসূন মুখার্জির কথার মতো লাগলো শুনতে, বললেন, ‘এত যখন উনার সঙ্গে দেখা করার আপনার প্রয়োজন, আপনি সুইডেনে গিয়ে দেখা করে আসুন না! তাহলে কি ওঁরা এই-ই চাইছেন যে আমি এ দেশ ছেড়ে চলে যাই?

আহ, আজ তো মানবাধিকার দিবস! প্রভু কি জানেন আজ মানবাধিকার দিবস!

.

১১ ডিসেম্বর

যদি এই কমপিউটারটা না নিয়ে আসতাম আমি, যদি ইন্টারনেট আমার না থাকতো এই কমপিউটারে, আমি বোধহয় নির্ঘাত মারা পড়তাম। দুদিনের জন্য জয়পুর যেতে হচ্ছে, দু’দিন কী আর এমন লিখবো, কী দরকার কমপিউটার নিয়ে। একবার ভেবেছিলাম। পরে আবার ভাবলাম, যদি দু’একটা কবিতাও লেখা হয়। হাতে শুধু কমপিউটার, আর কিছু নেই। এভাবেই বেরিয়েছিলাম ঘর থেকে।

লেখাপড়া আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে। যখন রবেন দ্বীপে নেলসন ম্যাণ্ডেলার সেই সেলটা, যেখানে তাঁর সাতাশ বছরের বন্দীজীবনের আঠারোবছরই কাটাতে হয়েছিলো, দেখেছিলাম, চোখের জল রোধ করতে পারিনি আমি। অবিরল ঝরে যাচ্ছিল। ভাবছিলাম ওই লাইম স্টোন কাটার বাইরে আর কী করতেন তিনি, ছোট্ট একটুকরো ঘরে বই ছিল পড়ার, কাগজ কলম ছিল লেখার! লিখতে পড়তে দিলে অনেক কষ্টই হয়তো ভুলে থাকা যায়।

কলকাতা থেকে প্রায়ই ফোন আসে ওখানকার বাংলা কাগজে আমার সম্পর্কে কারও যদি খুব ভালো কোনও লেখা থাকে, পড়ে শোনানোর জন্য। এনামুল কবীর আজকাল ফোনে এই পড়ে শোনানোর কাজটা করছেন। সকালে বর্তমান পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পড়ে শোনালেন। সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের লেখা। লেখক ইতিহাস থেকে নমুনা এনে এনে দেখিয়েছেন রাজনৈতিক আশ্রয় যে দেওয়া হয়েছে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে কত মানুষকে, কখনও শর্ত আরোপ করা হয়নি। আমার মতো নিরাশ্রয় লেখককে যদি আশ্রয় দেওয়া হয় তবে তিনি এই গণতন্ত্র, এই ধর্মনিরপেক্ষতা, এই ভারত, ভারতীয় জাতকে শত ধিক দিয়েছেন। সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। অপরিচিত অচেনা কত কত মানুষ যে দাঁড়িয়েছেন আমার পক্ষে। এখন আমার পক্ষে দাঁড়ানো মানে ভীষণ রকম একটা অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ানো।

অরুন্ধতী রায় এসএমএস পাঠালেন কলকাতা থেকে। অ্যাম ইন কলকাতা। এভরিবডি আই মীট ওয়ান্টস ইউ ব্যাক হিয়ার। আই অ্যাম সিওর ইট উইল হ্যাঁপেন। স্টে স্ট্রং। অ্যাম ইন এ ক্রাউড। উইল কল হোয়েন আই ক্যান। সি ইউ। লটস অব লাভ’।

কী যে ভালো লাগে অরুন্ধতীর ওইটুকু লেখা পেয়ে। ওঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে এই ‘সেইফ হাউজে’ ঢোকার প্রথম দিনই। করন থাপরের মাধ্যমেই যোগাযোগ। অরুন্ধতাঁকে সব বলি, সেই শুরু থেকে, হায়দারাবাদ থেকে ফেরার পর আমাকে বাড়ির বাইরে আর বেরোতে না দেওয়া, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের আমার বাড়িতে আসা, আমাকে চলে যেতে বলা, ২১শে নভেম্বরের তাণ্ডব, ২২ শে নভেম্বর আমাকে মিথ্যে কথা বলে জয়পুরের উড়োজাহাজে তুলে দেওয়া, সব। অরুন্ধতাঁকে পরে আমার ব্যাপারে কথা বলার জন্য করন থাপর ডেভিলস এডভোকেটে ডাকেন। অসাধারণ বলেছিলেন অরুন্ধতী। আমার ওপর যে অত্যাচার চলেছে, এরকম তাঁর ওপর চললে তিনি লেখালেখি বন্ধ করে দিয়ে অন্য কিছু করতেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাকে বের করার কারণ তিনি মনে করেন, সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামে যে নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ও থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানো। পার্ক সার্কাসের রাস্তায় একটা মিছিল নামক নাটক করে আমাকে ওই ছুতোয় রাজ্য ছাড়া করা হয়েছে। গ্রামে মুসলমান মরেছে, রিজওয়ান নামের একটা মুসলমান ছেলেও পুলিশের অত্যাচারে মরেছে–এসব খবর বাতাসের আগে রাষ্ট্র হয়েছে। দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় থাকা বামপন্থীরা এই প্রথম মুসলমানের ভোট হারানোর ভয়ে কাতর। হাতের কাছে আর কিছু না থাক, আমি আছি। আমার গায়ে ইসলামবিরোধী তকমা আঁটার মতো সহজ কাজ আর কী আছে, আর আমার মতো অসহায় একা একটি প্রাণীকে ঘাড় ধরে বের করে দিলে কার কী এমন ক্ষতি! এতে যদি একটা ছোটখাটো ভোটও কোনও তসলিমা বিরোধী মুসলমান খুশি হয়ে দেয়!

সেই যে তেইশে নভেম্বরের রাতে কথা হয়েছিল ভ’র সঙ্গে, এর পর আর কথা হয়নি। যদিও বলেছিলেন, যখন প্রয়োজন মনে করি, যেন ফোন করি। কিন্তু প্রয়োজন মনে করলেও ফোন করিনি। এত বড় একজন মানুষ, তাঁকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে হয় না। আজ তাকে ফোন করার কারণ, সুয়েনসন। সুয়েনসন আমি যেখানে আছি, সেখানে থাকবে দু’সপ্তাহ, এ আমার ইচ্ছে। ভ বললেন একটা যেন দরখাস্ত লিখি। এও বললেন মৌলবাদীরা আমাকেই শুধু অসুবিধে করেনি, তাঁকেও করেছে। কীরকম সেসব, কিছুই বলেননি। অনুমান করি, তিনি আমাকে দেখা শোনা করার ভার নিয়েছেন, আমাকে দেশ থেকে বের না করে উল্টে খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন, এ কারণে তাঁকে তিরস্কার করেছে মুসলমানরা।

কবে ফিরতে পারবো? আমার হঠাৎ প্রশ্ন। কবে ফিরতে পারবোকলকাতায় তার তিনি কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, সবই নির্ভর করে হুজুগের ওপর। যা হয়েছে তা হুজুগে হয়েছে। অন্য একটা হুজুগে লোক যদি আবার মাতে, হয়তো পরিস্থিতি আমার জন্য স্বাভাবিক হবে। তার আগ অবধি আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাইরে থাকতে হবে, অন্তত থাকাটা উচিত।

ব্রাত্য আমি। আমাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিচ্ছে না। ব্রাত্য আমি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আমাকে চাইছে না। কেউ কেউ চাইছে, কিন্তু খুব জোর দিয়ে কেউ চাইছে না। এরকম যে কিছু ঘটতে পারে জগতে, বা ঘটবে কোনওদিন, তা আমার ভাবনার ধারে কাছেও আসেনি কখনও।

.

১২ ডিসেম্বর

দিনগুলো কাটছে। কী করে কাটছে, ঠিক বুঝতেও পারি না। একটা কালো সোয়েটার কিনে দিয়েছে ওরা। ত্বকে খরা পড়েছে। ভেনোসিয়া বলে একটা ক্রিম লাগাতে বলেছেন ত্বক বিশেষজ্ঞ মালাকার। ওরা তাও কিনে দিলো। দুজোড়া মোজাও দিল। সকালে নাস্তা তৈরি, দুপুরে ওই একই ধরনের খাবার, রাতেও তাই। দিন চলে যাচ্ছে, যেমন যায়। খাবারের ডাক পড়ে। খাই। কেন যে খাই, বুঝি না। খুব যে ক্ষিধে পায়, তাও মনে হয় না। অনুভূতিগুলো কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে মনে হচ্ছে মৃত্যু এসে বসছে আমার শরীরে। ক’দিন আগে চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। প্রভুকে বলেছিলাম, বিষ নিয়ে আসুন। প্রভু আমার এই রিকোয়েস্টটিকেও সিরিয়াসলিই নিয়েছেন। এই রিকোয়েস্টটিকেও পুট করেছে নির্দিষ্ট দপ্তরে।

দুতিনটে পাথুরে মুখ আমার সামনে মাঝে মাঝে দেখা যায়। তারা আমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি নজরবন্দি রাখছে ঠিক বুঝতে পারি না। গৃহবন্দি এবং নজরবন্দি এই দুই অবস্থার মধ্যে পেণ্ডুলামের মতো আমি ঘুরছি। পাথরগুলোও আমার ধৈর্য দেখে অতিষ্ঠ হচ্ছে। কবে একবার মুখ ফুটে বলবো, ”না আর পারছি না, এ দেশ থেকে চলে যাবো আমি। –তখনই সম্ভবত পাথুরে চেহারায় প্রাণ দেখা দেবে। শুধোবে, কোন দেশ ম্যাডাম? টিকিট কি ইকোনোমি ক্লাস করবো, নাকি বিজনেস ক্লাস?

আমার স্বাসকষ্ট হচ্ছে, কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কেউ টের পাচ্ছে না, কেউ শুনতে পাচ্ছে না শ্বাসকষ্টের শব্দ। এই শব্দ কি কেউ কোনওদিন পাবে শুনতে! স্বাসকষ্টের শব্দ মোড়া থাকে নৈঃশব্দে।

জানি না কোন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। জানি না আমি আবার কোনওদিনও ফিরতে পারবো কি না বাংলায়। বাংলা হয়তো একটা স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে চিরকাল।

জয় গোস্বামী একটা খুব ভালো লেখা লিখেছেন আমাকে নিয়ে। ওর সঙ্গে কথা বললাম ফোনে। ও বললো, আপনার জন্য আমাদের গর্ব হয়।

অপর্ণা সেন বিকেলে ফোন করলেন। দুঃখ করে বললেন, যারা অপরাধী তাদের শাস্তি দিয়ে নিরপরাধকে শাস্তি দেওয়া হল। হ্যাঁ হল। এই হওয়াটাকে কি মেনে নেওয়া হবে? অবশেষে বললেন, কিছু একটা করার চেষ্টা করবেন।

জয়শ্রী দাশগুপ্তও ফোন করলেন, আমার জন্য দুঃখ করলেন। কিন্তু কলকাতার বাইরেই অন্য কোথাও আমি থাকবো, তা-ই মনে করছেন তিনি। কিন্তু আমি তো কলকাতায় ফিরবো, জয়শ্রীদি।

রাতে ফোন করলেন ডলি রায় আর সৌগত রায়। সৌগত রায় বললেন, ‘সিপিএম তোমাকে চায় না। আমাদের ক্ষমতা নেই তোমাকে আনার।‘

আমি যখন বলছি, ‘বলছেন কী, আমি কি ফিরবোনা কলকাতায়? আমাকে তোফিরতে হবে কলকাতায়। সৌগত রায় বললেন, ”দেখি, আমি একবার প্রিয়দা আর প্রণবদার সঙ্গে কথা বলে দেখবো। কী অবস্থা একটু বুঝবো।’

বললাম, কণ্ঠ ভেজা, ‘আজও ফোন করেননি?’

হয়তো একটু অপ্রস্তুত হলেন। ওখানে, কলকাতায়, আমি অনুমান করি, প্রায় সকলেই হয়তো ভেবেই নিয়েছেন আমাকে আর কলকাতায় ফেরত যেতে দেবে না। এবং আমার পক্ষেও সম্ভব নয় ফেরা। তারা কেউ কেউ প্রসঙ্গ উঠলে দুঃখ করবেন। কেউ কেউ বলবেন, ‘মিস করছি’। কেউ কেউ বলবেন, ‘বেচারা’। আমার কপালের প্রসঙ্গও হয়তো কেউ তুলবেন। কপালটাই খারাপ।

আর যারা আমাকে জানে না, চেনে না, বোঝে না, তারা তো বলবেই ইচ্ছে করেই এমন সব করেছি, যেন নাম হয়, যেন জনপ্রিয়তা বাড়ে, যেন বই বিক্রি হয়, যেন বিতর্ক হয়।

এসবের জন্য ঠিক কী করেছি তারা বলতে পারবে না কিন্তু। অনেকে শান্তি পাবে বলে যে আমার লেখায় সাহিত্যগুণ এক ছটাকও নেই। সাহিত্যগুণ না থাকলে রাজ্য থেকে যে কোনও লেখককে তাড়িয়ে দেওয়া যায়, দিলে খুব একটা ক্ষতি কিছু হয় না। অথবা গন্ডগোলের অজুহাত দিয়েও তাড়ানো চলে। তাড়ানো নিয়ে কথা।

.

১৩ ডিসেম্বর

তুমি যখন একা, তোমার কেউ থাকে না। সলিটারি কনফাইনমেন্ট থাকে শুধু। এক ঘর বন্দিত্ব থাকে। তুমি যখন একা, তুমি তখন একাই। জগতে কেউ নেই তোমার জন্য।

.

১৪ ডিসেম্বর

কলকাতা থেকে প্রায়ই ফোন করছেন তপন রায় চৌধুরী। উনি নামি দামি লোক। বই লিখেছেন। ভারত সরকারের পদ্মবিভূষণ পুরস্কার পেয়েছেন। আমাকে একদিন বললেন, ‘ওদের খুব বড় একজনের সঙ্গে কথা বললাম। আমাকে বললেন, অবস্থা ভীষণ খারাপ।’

ত–খারাপ অবস্থা, কোথায়?

চৌ–দেশে।

ত–কেন হবে খারাপ অবস্থা! কোনও খারাপ অবস্থাই তো দেখছি না।

চৌ কে বলেছে? লস্কর-এ-তৈবার একটা লোক তো বলছে যে তোমাকে মেরে ফেলবে, খুঁজছে নাকি তোমাকে।

ত–না। এরকম কোনও খবর আমি পড়িনি।

চৌ–টেলিগ্রাফে আছে।

ত–আমার মনে হয় না টেলিগ্রাফে এসব কিছু লিখেছে। বাংলাদেশের হুজির কথা সম্ভবত পড়েছেন। ওরা বেশ অনেক বছর আগে আমাকে মেরে ফেলার একটা প্রোগ্রাম করেছিল। এখন কেউই চাইছে না। যে গুন্ডা পাণ্ডাআর অ্যান্টি সোশাল ছেলেরা নভেম্বরের একুশ তারিখে কলকাতায় হাঙ্গামা বাধাতে নেমেছিল, ওরা আমার বই টই পড়েনি। ওদের নামানোর পেছনে অন্য কোনও ষড়যন্ত্র আছে।

চৌ–এখন একটা নিগোসিয়েসন হোক। তোমাকে লিখিত দিতে হবে কিনা কিছু, মৌলবাদীরা এখন কী দাবি করছে, সেটা জানার চেষ্টা হচ্ছে। যে দাবিই ওরা করুক, সেই দাবি মতো ওদের সঙ্গে একটা বোঝাঁপড়া হওয়া ভালো।

ত–আমি দ্বিখন্ডিত থেকে বাদ দিয়েছি কিছু অংশ। তারপর ওদের বড় বড় নেতাই বলে দিয়েছেন, ম্যাটার ক্লোজড। ব্যস। এখন আবার কী? যে কেউ যে কোনও দাবি করলেই আমাকে মেনে নিতে হবে কেন?

চৌ–লিখিত দিলে হয়তো ওরা শান্ত হবে।

ত–লিখিত মানে?

চৌ–লিখিত, যে, তুমি তোমার বই থেকে কিছু আপত্তিকর পৃষ্ঠা বাদ দিয়েছে।

ত–সে তো বলাই হয়ে গেছে। টিভিগুলোতে দেখিয়েছে। সারাদিন ধরে প্রচার করেছে এ খবর। বইএর ওই অংশটুকু কেটে বাদ দিয়ে নতুন এডিশনও ছাপা হয়ে গেছে।

চৌ–ওরা তো মানছে না।

ত–কে বলেছে মানছে না? ওরা মানছে। বিমানবাবু মানছেন না। উনি বলছেন আরও বই লিখেছি। আরও বই থেকেও কেটে বাদ দেওয়া হোক। আসলে কি জানেন, না মানতে চাইলে কিছুতেই মানবে না। লিখিত দিলেও মানবে না। শয়তানি করতে চাইলে আপনি কি পারবেন শয়তানি বন্ধ করতে?

চৌ–পরিস্থিতি তো অশান্ত।

ত–পরিস্থিতি অশান্ত ভাবলেই অশান্ত। না ভাবলেই শান্ত। কে বললো পরিস্থিতি শান্ত নয়?

চৌ–ওরা বললো। মৌলবাদীরা নাকি ভীষণ তান্ডব করছে।

ত–কিছুই করছে না। ওদের আস্কারা দিলেই তাণ্ডব করবে। যদি মিডিয়া ওদের খবর কভার করে, পলিটিশিয়ানরা নমো নমো করে, তাহলেই যা ইচ্ছে তাই করবে। এখন করছে না, করলে আপনি দেখতে পেতেন। দেখছেন কোনও মিটিং মিছিল! কিছুই দেখেননি। টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম শুধু একবার বলেছেন তিনি নাকি কী মানেন না। ইমামকে একটা ধমক দিলেই ইমাম মানা না মানা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। গতবার একটা ফতোয়া দিয়েছিলেন তিনি। বেশ হম্বিতম্বি করলেন, যেই না পুলিশ কমিশনার তাঁকে ডেকে নিয়ে একটা ধমক দিয়ে দিলেন, বা হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেন, অমনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ইমাম টেলিভিশনে বললেন, না তো, কোনও ফতোয়া তো দিই নি। আমার মতো লোকের ফতোয়া দেওয়ার এক্তিয়ার নেই। মুশকিল হল, ওই চাওয়া নিয়ে। ওই ধমকটা তো এখন দিতে চাইছেন না কেউ। পরিস্থিতি সামাল যাঁরা ইচ্ছে করলেই দিতে পারেন, তাঁরা চাইছেন না দিতে।

চৌ–তা তো বুঝতে পারছি। কিন্তু এরা তো সব পলিটিক্স করছে। এটা কি কোনও সভ্য দেশ হল! সব শুয়োরের বাচ্চা।

এসব কথা তপন রায় চৌধুরীর সঙ্গে হয়েছিল। উনি বলেছিলেন, খুব বড় একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, আজ বা কাল। জিজ্ঞেস করেছিলাম, বড় একজনটি কে। বলেননি। শুধু বলেছেন, আমি নাম বলবো না, তবে আমি জানি তিনিই একমাত্র তোমাকে সাহায্য করতে পারেন, সত্যি কথা বলতে কী, বাঁচাতে পারেন তোমার এই ভয়ংকর দুর্দশা থেকে তোমাকে’। বলেছিলেন আমার বিষয়েই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন।

আমি আশায় আশায় ছিলাম। জানি তপন রায় চৌধুরী আমাকে খুব স্নেহ করেন। কিন্তু সেই বিরাট বড় মানুষটির সঙ্গে কথা বলে এসে তিনি যা বললেন আমাকে, শুনে আমি থ।

চৌ–শোনো, কথা বললাম, উনি বললেন, সবচেয়ে ভালো হয় এখন যদি তুমি বিদেশে চলে যাও। তোমার কোনও পয়সাকড়ি খরচ হবে না। ভারত সরকারই তোমার প্লেন টিকিট দেবে, বিদেশে তোমাকে রাখার খরচও ভারত সরকার দেবে।

ত–বলছেন কী? কে বলেছে?

চৌ–তাঁর নাম বলা যাবে না। তাঁর নাম তুমি আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না। তবে খুব বড় একজন।

ত–আমাকে তাহলে বের করে দিতে চাইছেন ওঁরা!

চৌ–একটুও না। তোমার ভিসা এক্সটেনশানটা হয়ে যাওয়ার পর তুমি যাবে। সুতরাং কোনও চিন্তা নেই। ভিসা থাকলে ফিরতে তো পারবেই।

ত–ভিসা থাকলেও ইমিগ্রেশনে আটকে দিতে পারে।

চৌ–না। কোনওদিন হতে পারে না।

ত–পারে। নিশ্চয়ই পারে। সরকারি সিদ্ধান্ত হলেই পারে।

চৌ–ভারতবর্ষে কোনওদিন এরকম হয় না। কোনওদিন এরকম হতে শুনিনি।

ত–ভারতবর্ষের কোনও রাজ্য থেকে কোনও লেখককে তাড়িয়ে দিতে শুনেছেন এর আগে?।

চৌ-না।

ত–দেখলেন তো আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হল! আমার তো রেসিডেন্স পারমিট আছে। কলকাতায় থাকার অধিকার তো আমার আছে। যেতে পারছি কলকাতায়?

চৌ না।

ত–একবার ভারত থেকে চলে গেলেও আমাকে আর ঢুকতে দেওয়া হবে না। যেভাবে এখন ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গে। আর, একটা কথা কি আপনার মনে হয়নি কখনও, যে, কেন আমাকে যেতে হবে ভারতের বাইরে?

চৌ–একটা নিগোসিয়েশন করার চেষ্টা করছিলাম। বলেছি, ও আমার মেয়ের মতো। ও কলকাতায় ফিরবে। লেখালেখি করবে। কী করতে হবে তার জন্য বলুন।

ত–কিসের নিগোসিয়েশন?

চৌ–যেন তুমি ফিরতে পারো।

ত–ফেরার জন্য হলে ফিরবো কলকাতায়। বিদেশ যাবো কেন?

চৌ–ওরা ওদের ভোটের ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে চায়।

ত–যথেষ্ট কি হয়নি? রাজ্য থেকে বের করলো। বই থেকে কেটে বাদ দেওয়া হল। মৌলবাদীরা চুপ হয়ে আছে। তারা খুশি। তারপরও আর কী দাবি তাদের মেটাতে চাইছে? এতগুলো দাবি মেটানোর পরও ভোট পাবে বলে তাদের মনে হচ্ছে না? এখন আমাকে ভারতবর্ষ ছাড়তে হবে? এরপর মৌলবাদীরা ডিমান্ড করবে, তসলিমাকে মেরে ফেললো, তাহলে তোমাদের ভোট দেব। তখন কি আমাকে ওরা মারতে আসবে ভোটের জন্য? দাবির কি সীমা আছে? দাবি মেটানোর কি সীমা আছে? দাবি সম্ভবত নিজেরাই তুলছে, দাবি নিজেরাই তুলে নিজেরাই মিটিয়ে অশিক্ষিত মূর্খদের ভোট চাইছে।

প্রভু এলেন রাতে। ভ’বাবুর পরামর্শ মতো যে দরখাস্ত লিখে প্রভুর হাতে দিয়েছিলাম, প্রভু তা যথাস্থানে বিবেচনার জন্য পাঠানোর পর আজ সেই দরখাস্তের জবাব এসেছে। জবাব শোনার জন্য কান পেতে থাকি। প্রভু বললেন, হবেনা, আমার সুইডেনের বন্ধু আমার কাছে আসতে পারবে না, আমিও তার কাছে যেতে পারবো না। আমাদের যদি দেখা হয় কোথাও, তৃতীয় কোনও জায়গায় হবে সেই দেখা। আয়োজনটা আমার বা বন্ধুর ইচ্ছেমতো হবে না। আমি আবেদন পেশ করবো, সেই আবেদন ওপরওয়ালা মঞ্জুর করলেই প্রভু আমাকে তৃতীয় জায়গায় নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবেন।

কেন দেখা করা যাবে না? কী কারণে আমার বন্ধুরা আমার কাছে আসতে পারবে না, বা আমি তাদের কাছে যেতে পারবো না। এর উত্তর প্রভু বললেন, তিনি জানেন না। তিনি শুধু ওপরওয়ালার নির্দেশ আমাকে জানিয়েছেন।

আমি যতই বলি না কেন যে আমার কষ্ট হচ্ছে, এভাবে মানুষ বাস করতে পারে না, আমি একটা স্বাভাবিক জীবন চাই, এমন জীবন যেখানে আমি শ্বাস নিতে পারবো, যেখানে আমি ইচ্ছে হলে বাইরে বেরোতে পারবো, বন্ধুরা আমার বাড়ি আসতে পারবে, আমি যেতে পিরবো তাদের বাড়ি, একটা স্বাভাবিক জীবন নাহলে চলছে না–প্রভুর কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। মাছের মতো মুখ করে শোনেন আমাকে। রোবটের সামনে কথা বলারও হয়তো কোনও মানে হয়। প্রভু রোবটের চেয়েও প্রাণহীন। দেয়ালের মতো। মাথা ঠুকলে মাথা ভাঙে, দেয়ালের কিছু হয় না।

রাতে ফোন করে প্রভু জানতে চাইলেন, যে লেখকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাঁর পুরো নাম ঠিকানা ইত্যাদি।

ত–তপন রায় চৌধুরী।

প্র–রাইট তপন রায় চৌধুরী। উনি আর কী বললেন?

ত–সব তো বলেছিই আপনাকে।

প্র–উনি তো নিগোসিয়েশনের ব্যাপারে কথা বলেছেন।

ত–যাঁ, কিন্তু আমি মেনে নিইনি। আর যা কিছুই মেনে নিই, আমাকে দেশ ছাড়ার কথা বললে তা আমি মেনে নেবো না।

প্ৰ–কেন মানবেন না?

ত-মানবোনা কারণ কলকাতা ফেরার জন্য বিদেশ যাওয়ার শর্ত নিতান্তই যুক্তিহীন।

প্র–যুক্তিহীন?

ত–হ্যাঁ যুক্তিহীন।

আচ্ছা আপনিই বলুন, বিদেশ চলে গেলে কলকাতা যাওয়ার পথ সুগম হবে, এ কথা তপন বাবু যে এত বার বললেন, এর মাথামুণ্ডু আপনি কিছু বুঝতে পারেন? আপনি হয়তো পারেন, আমি পারি না। আর আসল কথা, আমি তো কচি খুকি নই। আরে বাবা, আমার তো একটা দেশ ছাড়ার অভিজ্ঞতা আছে। এখনও ঘা-টা খুব কাঁচা। আমাকেও তো এভাবে বলা হয়েছিল, ক’দিনের জন্য যাও, কিছুদিন পর ফিরে আসতে পারবে। যারা দেশ থেকে তাড়ায়, তারাই ‘বিদেশ’, ‘কিছুদিন পর’ এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। আর যারা তাড়ায় না, তারা কোথাও কাউকে আটকে রাখে না, যার যেখানে যাওয়ার, সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে যে করেই হোক। কোনও কিছুর ছুতোয় কারও যাত্রা ভঙ্গ করে না।

.

১৫ ডিসেম্বর

সকালে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় এক নিরাপদ বাড়ি থেকে আরেক নিরাপদ বাড়িতে, সেখানে রক্ত নেওয়ার একটা লোককে ধরে আনা হয়েছে। রক্ত নিল লোক। কাগজে আমার নাম লেখা হল, মিকু শ্রীবাস্তব।

.

১৬ ডিসেম্বর

দিন যেভাবে কাটে, সেভাবেই কাটছে। মৃত কচ্ছপ পড়ে আছে। দিন বলে ডাকি তাকে।

আজ বাংলাদেশে বিজয় দিবস। বাঙালির বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর আন্দোলন বড় হতে হতে যুদ্ধে গিয়ে থামে। আজ এই দিনটিতে আমি বাংলার এক মেয়ে, বাংলা ভাষার লেখক, বন্দি। বিজয় বলতে কিছু নেই আমার। আইন ও সালিশ কেন্দ্রর হামিদা হোসেন বাংলাদেশে আমার চরম দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, তাঁকে লিখেছিলাম অনেক বছর কোনও যোগাযোগ নেই। আশা করি ভালো আছেন। আমার জীবনের দুর্ভোগ তো আজও কমলো না। দেশে ফিরতে তো সবসময় চাই। এখন কি ফিরতে পারবো দেশে? যদি মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয়, সরকার আমাকে ফিরতে বাধা না দেয়, নিরাপত্তা দেয় তবে তো ফিরতে পারি, সেটা কি সম্ভব হবে? আপনি যদি আমাকে সাহায্য করেন ফেরার ব্যাপারে, কৃতজ্ঞ থাকবো।

এর উত্তরে উনি লিখেছেন, .. ‘তোমার ভুলে গেলে চলবে না যে তোমার বিরুদ্ধে কোনও মামলা যদি নাও থাকে, কিছু লোক তো আছেই তারা তোমার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে নিজেদের সুবিধে আদায় করতে। তুমি নিশ্চয়ই প্রথম আলো’র কার্টুনিস্টএর কথা শুনেছো। ও এখন জেলে। ওর জামিনের জন্য চেষ্টা চলছে। দেখা যাক কী হয়। আসলে আমাদের সেই স্বাধীনতা এখনও নেই, যে স্বাধীনতা যা বলতে চাই আমাকে তা বলতে দেবে। আমার মনে হয় ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করাটা এখন আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। লেখক সাংবাদিকদের সতর্ক থাকতে হয়। সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক দিক থেকে তো মনে হচ্ছে আমরা আরও বেশি সংকীর্ণ হয়েছি।

আরিফুর রহমানের কথা জানি, বেচারা কার্টুনিস্ট জেলে বসে আছে। কী অপরাধ ছিল তার! প্রথম আলোর কার্টুন ম্যাগাজিন আলপিনে কার্টুন এঁকেছিল। গ্রামের এক মোল্লা, বেড়াল কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়ানো এক গরিব বাচ্চা ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই তোর নাম কী?’ ছেলে বললো, ‘বাবু।‘ মোল্লা ধমক দিয়ে বললো, ‘নামের আগে মোহাম্মদ বলতে হয় জানিস না?’ ছেলে ভয়ে বিস্ময়ে কুঁকড়ে গেল। এর পর আবার মোল্লার জিজ্ঞাসা, ‘তোর বাবার নাম কী?’ ছেলে বললো, ‘মোহাম্মদ আবু’। মোল্লা খুশি হল। এবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তোর কোলে এটা কী?’ ছেলে বললো, ‘মোহাম্মদ বেড়াল।’

অশিক্ষিত কাঠমোল্লাগুলো যারা মনে করে সব নামের আগেই হয়তো মোহাম্মদ বসাতে হবে, তা যে ভুল এবং হাস্যকর, তা বোঝাতেই সম্ভবত আরিফুর রহমান ওই কার্টুন এঁকেছিল। কিন্তু কুড়ি পঁচিশ হাজার লোক বেরিয়ে গেছে ওই কার্টুনের বিরুদ্ধে মিছিল করতে। প্রথম আলোর সম্পাদক প্রাক্তন কমিউনিস্ট মতিউর রহমান এরপর ভয়ংকর লজ্জাজনক কাজ করলেন। তিনি কার্টুনিস্ট আর কার্টুন পত্রিকার সম্পাদক দুজনকেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেন। দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন। শুধু তাই নয়, ক্ষমা চাইলেন বায়তুল মোকাররমের খতিবের কাছেও, তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে।

কে যেন বলেছিল, কমিউনিস্ট যখন পচে, ভীষণ পচে। দেশ ভেসে যায় দুর্গন্ধে।

যে দেশে বাক স্বাধীনতা নেই, সে দেশ আমার নয়। এই বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ নয়। এই বাংলাদেশ পেতে তিরিশ লক্ষ মানুষ জীবন দেয়নি, দু’লক্ষ মেয়ে ধর্ষিতা হয়নি।

.

১৭ ডিসেম্বর

ইঁদুর ঘোরাঘুরি করছে সুয়েনসনের হোটেলের ঘরে, আর তীব্র গন্ধ নাকি আসছে কেরোসিনের। বাথরুমের জানলা খোলা, টেনেও বন্ধ করা যায় না। অশোকা প্যালেসে বসে সুয়েনসন এই অভিযোগ করলো।

প্রভু আমাকে জানিয়েছেন, সুয়েনসনের কোনোঅসুবিধে হচ্ছেনা, তারাই তাকে বিমান বন্দর থেকে নিয়ে এসেছেন, হোটেলে রাখছেন, খাওয়াচ্ছেন, ঘোরাচ্ছেন। এই আরামে থেকে সুয়েনসন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তো করছেই না, বরং খুঁত ধরার চেষ্টা করছে। সে তো কস্মিনকালেও পৃথিবীর কোথাও কোনও সরকারি লোক দ্বারা আপ্যায়িত হয়নি। ইউরোপের কোথাও যদি কখনও এরকম হতো যে তাকে বিমান বন্দর থেকে নিয়ে এসে খাইয়ে দাইয়ে, শহর দেখিয়ে ঘুরিয়ে, শহরের পাঁচতারা হোটেলে ঘর দেওয়া হচ্ছে ঘুমোতে দিন রাত শুধু মাথা নুইয়েই পড়ে থাকতো সুয়েনসন। ওর হাতে একটা কাঠিলজেন্সও যদি কোনও সাদা লোক দেয়, অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে সাদা লোকের আর কাঠিলজেন্সের প্রশংসা। আর কালোবা বাদামি উজাড় করে দিলেও ও নাক সিঁটকাবে। ভেতরে ভেতরে আস্ত একটা বর্ণবাদী এই সুয়েনসন, আজ নয়, বহুদিন আগেই আমি টের পেয়েছি। সুয়েনসনের সঙ্গে আমি দেখা করতে চাইছি, ‘আমার বাটীতে সে থাকিবেক’ এই আবেদন জানিয়ে আমি দরখাস্তও করেছি, যত না সুয়েনসনের জন্য, তার চেয়ে দ্বিগুণ ত্রিগুণ চতুগুণ আমার জন্য। আমার স্বাধীনতার জন্য। বাক স্বাধীনতার জন্য।

দুপুরে আমাকে নিয়ে আসা হল রক্ত যেখানে নিতে এসেছিল সেই বাড়িতে। ওখানে অন্য একটি গাড়িতে করে সুয়েনসনকে আনা হল। সাক্ষাৎএর অনুমতি শুধু। প্রভু বললেন, সাক্ষাতের সময় তিনি নিজে থেকে বাড়িয়ে দিয়েছেন। এক ঘণ্টার বদলে আমাদের তিন ঘণ্টা সময় দিয়েছেন দেখা করার। কী চান প্রভু, যেন কৃতজ্ঞতায় নুয়ে থাকি। এক ঘণ্টাকে তিন ঘণ্টা করা হয়েছে বলে? আমি চোর না ডাকাত না খুনী! আমার কি জেল হয়েছে। আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে, আমি কতক্ষণ ঘরের বাইরে থাকতে পারবো, কতক্ষণ আমার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে পারবো, তার সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিচ্ছে, আমার নেওয়ার অধিকার নেই।

দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা প্রভুই করলেন ও বাড়িতে। বাড়িটাতে কেউ থাকে না। খুব নির্জন নিঝুম বাড়ি। সরকারি বাড়ি, হঠাৎ হঠাৎ কোনও গোপন দেখা সাক্ষাৎএর জন্য ব্যবহার হয়, বিশাল টেবিল জুড়ে নানারকম খাবার এমন সাজিয়ে দেওয়া হয় যে কেউ বুঝতেই পারবে না সবই বাইরে থেকে কিনে আনা, ঘরের রান্না নয়। বাড়িটা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু আমি জানি না, কারণ আমার কৌতূহলের কোনও জবাব প্রভু কখনও দেন না।

বিকেলে জীবনের দুর্ভোগের কথা ভাবতে ভাবতে কেঁপে কান্না এলো৷ কান্না রাতে ঘুমোবার আগ অবধি থামেনি।

.

১৮ ডিসেম্বর

আজ ঘুম ভালো হয়নি। জেগে গেছি শেষ রাতে। ইন্টারনেটে খবর দেখতে গিয়ে দেখি গ্লোরিয়া স্টাইনেম কলকাতায়। আমার সম্পর্কে বলছেন। দিজ ইজ অ্যান আউটরেজাস ভায়োলেশন অব হার হিউমেন রাইটস। শি হ্যাঁজ এ রাইট টু বি সেইফ”। আমি যে দ্বিখন্ডিত থেকে তুলে নিয়েছি অংশ, সে নিয়ে গ্লোরিয়া বলেছেন, একজন লেখক যখন নিজের ইচ্ছেয় তার লেখা কাটে সে এক ব্যাপার, আর যখন সে কাটতে বাধ্য হয়, সেটা অন্য ব্যাপার। কী সহজ ভাষায় গ্লোরিয়া বলতে পারেন সত্য! চিন্তার খোরাক জোটাতে সবসময়ই তিনি পারেন। বলেছেন তার মেজ ম্যাগাজিনে লিখেছেন আমাকে নিয়ে, আমার লেখাও ছেপেছেন। দেখা হয়েছিল দিল্লিতে সাউথ এশিয়ান লেখক সম্মেলনে, বলেছেন। গ্লোরিয়াকে নিয়েও তো আমি কত লিখেছি। আজ যদি কলকাতায় সেই জীবন আমার থাকতো, গ্লোরিয়াকে আমার বাড়িতে নিয়ে যেতাম। তাঁর সান্নিধ্য পেতে পারতাম। তাঁর উপস্থিতির উৎসব করতাম।

ষাট-সত্তর দশকের জগৎ কাঁপানো নারীবাদী লেখিকা গ্লোরিয়া। সেই ষাট দশকে যা ভাবতেন, যা বলতেন, গ্লোরিয়ার কোনও বই বা লেখানা পড়েও আশির দশকে আমি একই যন্ত্রণা অনুভব করেছি, একই ভাষায় প্রতিবাদ করেছি, একই যুক্তি ব্যবহার করেছি, একই কথা ভেবেছি আর বলেছি।

.

১৯ ডিসেম্বর

আমন্ত্রণ জুটলো লেখক খুশবন্ত সিংএর সঙ্গে দেখা করার। ওঁর বাড়িতে আমাকে যেতে হবে শনিবার সন্ধ্যে সাতটায়। পেশ করেছি আবেদনটি। খুশবন্ত সিংএর নাম ঠিকানা ফোন নম্বর লিখে প্রভুর হাতে দিয়েছি। উনি যথাস্থানে জানিয়েছিলেন। কিন্তু নাকচ হয়ে গেছে আবেদন। কমিউনিস্ট পার্টির বৃন্দা কারাতের সঙ্গেও একবার দেখা করার দিন তারিখ ঠিক করেছিলাম, সেটিও নাকচ।

বৃন্দা কারাতের সঙ্গে ফোনে যেদিন প্রথম কথা হল, বললেন, তোমাকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরত নেওয়া সম্পূর্ণ কেন্দ্র’র হাতে, রাজ্যের হাতে নয়। ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। নানা লোকেনানাকথা বলে, কোনটাকে বিশ্বাস করবো, কোনটাকে করবোনা, বুঝতে পারি না। সবার কথাই বিশ্বাস হয়। কেউ মিথ্যে বলতে পারে, কেউ বানিয়ে অযথা কিছু বলতে পারে, আমার বিশ্বাস হতে চায় না। এত মিথ্যে শুনেও, এত ঠকেও বুদ্ধি বাড়ে না আমার। আমি রাজ্য, কেন্দ্র বুঝি না। মারপাঁচ বুঝি না। খুব সরল সোজা সত্য কথা বুঝি। বুঝি যে আমি কোনো অন্যায় করিনি। বুঝি যে শাস্তি আমি পাচ্ছি, তা পাওয়া আমার উচিত নয়।

সময় যাচ্ছে। বুঝি যে যাচ্ছে। আগে সাংবাদিকরা পাগল হয়ে যেতো কী করছি, কেমন আছি, কী ভাবছি জানার জন্য। এখন তেমন কেউ পাগল নয়। ফোন বাজে না আগের মতো। অবশ্য ফোন যখন ঘন ঘন বাজতো, আমি তো ফোনই ধরিনি। সাংবাদিকদের। এড়িয়ে চলেছি, কাউকে সাক্ষাৎকার দিইনি, কারও সঙ্গেই কথা বলিনি। প্রভু বারবারই সাংবাদিক মহল সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। এরা সব লোভী, যা করে টাকার জন্য বা নামের জন্য। এরা কাজ ফুরোলে চলে যাবে। তুমি মরলে কী বাঁচলে তার দিকে ফিরেও তাকাবে না। প্রভু যে সবসময় খুব ভুল বলেন, তা নয়।

গ্লোরিয়া স্টাইনেমের একটা ইমেইল পেলাম। লিখেছেন, ”প্লিজ প্লিজ টেল মি ইফ আই ক্যান ডু এনিথিং –অ্যান্ড ইউ অলওয়েজ হ্যাঁভ এ রুম উইথ মি ইন নিউইয়র্ক। বিষণ্ণ মন মুহূর্তে ভালো হয়ে যায়। কিছু ভালো মানুষ এখনও বাস করে বলে পৃথিবীটা এখনও সুন্দর। এত বাধা, এত নিষেধ, এত অনাচার, অবিচার –কিন্তু তারপরও বাঁচতে ইচ্ছে করে।

আজ ঘটলো সেই ঘটনাটি, যেটি ঘটা উচিত নয় এই দেশে। এই দেশ তো গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানেই তো সবার বাক স্বাধীনতা থাকবে এ দেশে। এই দেশ হৃদয়ে অনেক বড়, এমনই তো জানি। বড় এক মন্ত্রণালয়ের বড় এক অফিসার এসেছিলেন। কী পদে আছেন, বললেন না। জানি না কী কারণে নামটা বললেন। ধরা যাক নাম তার সনাতন সেনগুপ্ত। এও অনেকটা প্রভুর মতো, নাম বলেন, কোথায় চাকরি করছেন, কী করছেন, বলেন না। আমার কাছে লুকোনোর কী কারণ থাকতে পারে, জানি না। অনুমান করি ভ’বাবুই তাঁকে পাঠিয়েছেন। কী বলতে এসেছেন তিনি? নতুন কিছু নয়, অনেকটা সে কথাই বলতে এসেছেন যে কথা প্রসূন মুখার্জি কলকাতায় বলেছেন।

স–আপনি চলে যান।

ত–কোথায় যাবো?

স–ভারত ছাড়ুন।

ত–কেন?

স–আপনি কেন আছেন এ দেশে? কলকাতায় যাওয়ার জন্য তো! ওই অপেক্ষাই তো করছেন? তাই না?

ত–হা করছি। ওখানে আমার বাড়িঘর। আমার সব কিছু। আমার বইপত্র, কাপড়চোপড়।

স–কিন্তু আপনার কলকাতায় যাওয়া চলবে না।

ত–কেন চলবে না?

স–ওখানে আপনাকে মেরে ফেলবে। তার চেয়েও বড় কথা আমাদের লোকদের জীবন বাঁচাতে হবে।

ত–আমাদের লোকদেরও জীবন বাঁচাতে হবে, মানে? স মানে হল, আপনার কারণে মানুষ মরবে এ দেশে।

ত–এ কেমন কথা!

স–আপনি কি চান আপনার কারণে দশটা লোক মরে যাক?

ত–আমি কেন কারণ হতে যাবো মানুষের মৃত্যুর! আমি মানবতায় বিশ্বাস করি। মানবতার কথা বলি। লিখি। মানুষকে বাঁচার কথা বলি। আমি মানুষ মারতে যাবো কেন?

স–আপনার জন্য মিছিল হবে, সেই মিছিলে গুলি হবে, মানুষ মরবে।

ত–আমার মনে হয় না এসবের কিছু হবে। কই, মিছিলের তো কোনো আভাস দেখছি না। কেউ তো বলছে না মিছিল করবে! কোনো কারণ নেই হঠাৎ করে মিছিল হওয়ার। আর, মিছিল হলেই বা মানুষ মরবে কেন?

স–আপনি কি চান আপনার জন্য একজন বৃদ্ধ মরে যাক?

ত–আমি কেন চাইবো আমার জন্য একজন বৃদ্ধ মরে যাক। কিন্তু কী কারণে একজন বৃদ্ধকে মরে যেতে হবে? কে মারবে বৃদ্ধকে?

স–আপনি কি চান আপনার জন্য নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাক? ওদের মৃত্যুর কারণ হতে চান আপনি?

ত–আশ্চর্য! শিশুরা মরবে কেন? আমিই বা চাইব কেন ওরা মরে যাক।

স–না চাইলে আপনি চলে যান।

ত–আমি চাই না একটি প্রাণীরও মৃত্যু। কিন্তু আমি মনে করি না, চাই না বলে আমাকে দেশ ছাড়তে হবে। মিছিল যদি হয়ই, হবে। কত লোকের বিরুদ্ধেই তো লোকে মিছিল করে। তাদেরকে কি চলে যেতে হয় দেশ ছেড়ে?

স–এটা তো আপনার দেশ নয়।

ত–আমি জানি এ দেশ আমার দেশ নয়। এ দেশে আমি রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে থাকি। আজ রেসিডেন্স পারমিট আছে, তাই থাকছি। কাল যদি তা না থাকে, আমাকে চলে যেতে হবে।

স–হ্যাঁ। আপনি চলে যান, আপনি যদি মনে করেন, আপনি চলে গেলে আপনার রেসিডেন্স পারমিট পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, না, বন্ধ হবে না। রেসিডেন্স পারমিট যেমন পাচ্ছিলেন, তেমন পেয়ে যাবেন। আমি কথা দিচ্ছি। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন দশটা লোক এ দেশে বাঁচুক।

ত–আমি যাবো না। আমি কারও ক্ষতি করছি না। আমি কোনও অন্যায় করিনি। কোনো অপরাধ করিনি আমি। আপাদমস্তক একজন সৎ মানুষ আমি। অনেক বছর কলকাতায় থাকছি। কোনোদিন কেউ আমাকে মারতে আসেনি, কেউ আমার জন্য মরেওনি। আমাকে পারলে কলকাতায় পাঠিয়ে দিন। আমাকে নিয়ে আপনাদের এত দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

স–আপনি বিদেশে যাবেন না?

ত–না। আমি ভারত ছেড়ে কোথাও যাবো না। স এ দেশ আপনার দেশ নয়।

ত–তারপরও আমি এ দেশেই থাকবো। এ দেশ আমার পূর্বপুরুষের দেশ বলে নয়, এ দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসি বলেই আমি এ দেশে থাকি, থাকতে চাই এবং থাকবো। ঘাড় ধরে ঠেলে ধাক্কিয়ে দূর করবেন, করুন।

.

২০ ডিসেম্বর

অরুন্ধতী রায় বললেন, ‘পলিটিশিয়ানদের কখনও বিশ্বাস করো না। এরা তোমাকে মানুষ মনে করে না, মনে করে কারেন্সি। তোমাকে নিয়ে ব্যবসা করবে। তোমাকে ভালোবাসবে না’।

আজ আমার সারাদিন মন খারাপ। ভীষণ মন খারাপ। আজ আমি ভেঙে যাওয়া। সন্ধ্যায় প্রভু এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। কাল সনাতন সেনগুপ্ত আমাকে চলে যাওয়ার কথা বলার পর আমার সিদ্ধান্ত জানতেই সম্ভবত এসেছেন। আমি সনাতন বাবুকেও বলেছি, প্রভুকেও জানিয়ে দিলাম, আমি কোথাও যাবো না। দাঙ্গা হাঙ্গামার পেছনে লেখক শিল্পীরা থাকে না, থাকে অন্য লোক। থাকে রাজনীতি। মানুষ মারার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকে। লেখক শিল্পীরা বই লেখেন, ছবি আঁকেন, দাঙ্গা তাঁরা বাধান না।

.

২১ ডিসেম্বর

আজ একুশ তারিখ। একমাস হল কলকাতার রাস্তায় ছেলে ছোঁকরাদের গুন্ডামির পর। মনে হচ্ছে এই সেদিন ঘটলো যেন। দিন কী করে উড়ে যাচ্ছে।এখনও চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে রাস্তার ওই অভদ্র অশিক্ষিত ছেলেগুলোর নোংরামো, ওদের নোংরা আনন্দনৃত্য।

রাতে আর পারিনি। ভ’বাবু ফোন ধরছেন না, এত ব্যস্ত মানুষের ফোন না ধরার কারণ আমি বুঝতে পারি। এসএমএস করি না পারতপক্ষে। এসএমএস পড়ার কি ব্যস্ত মানুষদের সময় থাকে। তবু লিখলাম, অনেক করেছেন আমার জন্য। আমি কৃতজ্ঞ। আপনার ওপরই ভরসা করি। এভাবে বন্দি জীবন কাটাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। দিল্লিতে তো একটু স্বাভাবিক জীবন পেতে পারি? বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে তো বাঁচতে পারবো না। একদিন কি . দেখা করতে পারি আপনার সঙ্গে?

.

২২ ডিসেম্বর

‘In response to demands from a few religious fundamentalists, India’s demo cratic and secular government has placed a writer of international repute under virtual house arrest. Shorn of all cant, that is what the Centre’s treatment of Tas lima Nasreen amounts to. She was forced into exile from her native Bangladesh because of the books she had written and it looks as if the UPA government is about to repeat the same gesture by placing intolerable restrictions on her stay in India.

She is living under guard in an undisclosed location. She will not be allowed to come out in public or meet people, including her friends. Without quite say ing so, the government is clearly sending her a message that she isn’t welcome in India and ought to leave. Earlier, she was turfed out of West Bengal by the state government. It’s not quite clear who’s ahead in the competition to pander to fundamentalist opinion, the Centre or the West Bengal government. Earlier, Left Front chairman Biman Bose had said that Taslima should leave Kolkata if her stay disturbed the peace, but had to retract the statement later. Now ex ternal affairs minister Pranab Mukherjee echoes Bose by asking whether it is”desirable” to keep her in Kolkata if that”amounts to killing 10 people”. In other words, if somebody says or writes something and somebody else gets suffi ciently provoked to kill 10 people, then it is not the killer’s but the writer’s fault.

That is an astounding statement for the foreign minister of a liberal dem ocratic state to make. The Greek philosopher Plato thought that artists were dangerous people and exiled them from his ideal Republic. But such views can hardly be reconciled with modern democracy, which survives on tolerance. De mocracy also accords a valuable place to the arts, where boundaries are pushed and new thinking becomes possible. Taslima’s views on women’s rights may seem threatening from the point of view of patriarchal codes governing society. That would explain why the animus towards her is not confined to Muslim con servatives, but includes Congress and Left luminaries.

The ministry of external affairs must think through the implications of what it is doing. If it forces Taslima out of the country, India will be placed on the same platform as Bangladesh, which is close to becoming a failed state. At a time when India’s image is ascendant in world affairs the official guardians of that image must not act like weaklings who cave in to every illiberal or funda mentalist threat to this republic’s constitutional values.’ –Times of India

কাল আমাকে ফেরানোর দাবিতে মিছিল হয়েছে কলকাতায়। কেউ বলে পাঁচশ লোক। কেউ বলে এক হাজার। ওরা তো ওদিকে ছিল অনেক হাজার। গত বছর সিদ্দিকুল্লাহর মিছিলে ছিল এক লাখ, আর রাস্তার ছেলেরাও নাকি একুশ তারিখে ছিল দশ থেকে পনেরো হাজার। গাড়িঘোড়া আটকে না থাকলে বড় মিছিল চোখে পড়ে না। ইট না ছুড়লে কারও গায়ে লাগে না। কম তো শব্দ খরচা হল না। অনেকে তো লিখেইছেন। তারপরও কি সত্যিকার কিছু হল?

.

২৩ ডিসেম্বর

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও বিপদ, না বললেও বিপদ। কথা বললে লোকে বলে আমি পাবলিসিটি চাই। আর না বললে, যেসব পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিইনা, সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলি, তারা যা তাদের ইচ্ছে করে তা-ই ছাপিয়ে দেয়। আজ ডিএনএ পত্রিকায় লিখলো, নরেন্দ্র মোদি এসেছিলেন দিল্লিতে, আর আমি নাকি তাঁর সঙ্গে দেখা করে আমাকে গুজরাটে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছি। মনে আছে বোম্বের মিড-ডে পত্রিকা আমার কোনও একটা ছবি ইন্টারনেট থেকে যোগাড় করে সারা গা মাথা কালি দিয়ে ঢেকে পেছনে বোম্বের দালানকোঠা জুড়ে দিয়ে প্রথম পাতায় ছাপালো, খবরের শিরোনাম দিল, তসলিমা বোরখা পরে বোম্বেতে চলে এসেছে। কত শত মানুষ যে বিশ্বাস করেছিল এই মিথ্যে খবর। সাধারণ মানুষ ছাপার অক্ষরে কিছু দেখলেই সত্যি বলে বিশ্বাস করে।

ভারতে বসে ‘পলিটিক্যাল গেইম’ যেন না খেলি, প্রভু বিরক্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন। গেইমটা কখন খেলোম, কিভাবে খেলোম তা আমি অবশ্য জানি না। আমাকে লোকে কেন ভুল বোঝে তা আমি বুঝে পাই না। আমার আচরণে কিছু কি থাকে যে আমাকে মনে হয় আমি রাজনীতির মতো দুর্বোধ্য কিছু জিনিস নিয়ে খেলছি! অতি সরল, অতি সোজা, একটু গবেট, খানিকটা বোকা –এই আমাকে খেলোয়াড় ভাবে তারাই যারা নানা রকম খেলা দেখতে দেখতে, খেলোয়াড় দেখতে দেখতে চোখ নষ্ট করে ফেলেছে, এখন চোখের সামনে যাকে দেখে তাকেই খেলোয়াড় বলে মনে করে।

টেলিগ্রাফে মিথ্যে মিথ্যে খবর ছাপা হচ্ছে আজকাল, আমি নাকি একটা হেয়ার ড্রায়ারএর জন্য আমার যারা দেখাশোনা করছে, তাদের জ্বালিয়ে মারছি। শ্যাম্পু করবো, আর হেয়ার ড্রায়ার থাকবে না, তা কী করে হয়? ‘অ্যান অফিশিয়াল’এর সূত্র দিয়ে মিথ্যে খবর। একবার লিখলো, আমি মাছ খাবার জন্য নাকি উন্মাদ হয়ে গেছি, নানা রকম মাছের অর্ডার দিয়েছি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমার রসনা তৃপ্তির জন্য সরকার থেকে সব যোগাড় করা হচ্ছে। এমন একটি চিত্র তুলে ধরছে ওরা, যেন আমি সরকারি বাড়িতে শুধু রাজার হালে নয়, অত্যাচারী রাজার হালে আছি। আবদারে আদেশে অতিষ্ঠ করে মারছি সবাইকে। প্রভুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘অফিসিয়াল সূত্রের খবর, তার মানে আপনাদের অফিস থেকে খবরগুলো যাচ্ছে। কিন্তু কে দিচ্ছে খবর!

প্রভু সোজা বললেন, মন্ত্রণালয় থেকে কেউ কোনও খবর ওদের জানায় না। ওরা বানিয়ে লেখে।

দিনের পর দিন টেলিগ্রাফের মতো একটা উন্নতমানের কাগজ বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখবে অন্যের নামে! আমি ধন্দে পড়ি। এক সাংবাদিক বন্ধুর কাছ থেকে পরে জেনেছি, মন্ত্রণালয় থেকে লিখতে বলা হয় এসব। তবে কারও নাম উল্লেখ না করে অফিসিয়াল সূত্র’ লিখে দেওয়াটাই শর্ত। অফিস থেকে স্বীকার বা অস্বীকার করাও সময় বুঝে করা যায়। কোনও ব্যক্তির কাঁধও দায় দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকে। এগুলো না হয় কমজোর দুর্বল সাংবাদিকরা লিখলেন। বীর সাংবাদিকরাও কম যান না। নামকরা বীর সাংভি লিখলেন আমার বিরুদ্ধে কলাম। ক্ষুদ্র তুচ্ছর ঊর্ধ্বে উঠেছি অনেক, কিন্তু মানুষ যখন আমাকে দেখে বা বিচার করে, ঊর্ধ্বে উঠে করে না। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের দেখা ক্ষুদ্র রাজনীতি আর ক্ষুদ্র সমাজ আর স্বার্থপর সুযোগসন্ধানী নিজেদের এবং সতীর্থদের ক্ষুদ্র মানসিকতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলে আমাকে নিয়ে কোনও মত। কোনওদিনই তাদের আর বোঝা হয় না যে তারা ভুল, কোনওদিন আর ভুল শোধরানোও তাদের হয়ে ওঠে না। কাছ থেকে আমার জীবন দেখার এবং বোঝার কোনও সুযোগ তাদের ঘটে না। কী আনন্দ পেলেন বীর সাংভি আমার সম্পর্কে বস্তা বস্তা মিথ্যে বলে, কে জানে! একটা বিচ্ছিরিরকম অসহায় মানুষ, ঘরবন্দি অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পড়ে আছে, যাকে নিয়ে রাজনীতির খেলা চলছে চারদিকে, আর তাকেই বলা হচ্ছে যে সে নাকি খবরের হেডলাইন হওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। তার নাকি সাংবাদিকদের ফোন করে করেই দিন যাচ্ছে! লেখার সময় নেই। ঠিক এভাবে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা অভিযোগ করতো। যখনই সত্যের চাবুক এসে ওদের গায়ে লাগতো, বলতো আমি যা করছি সবই নাকি খ্যাতি পাওয়ার জন্য করছি।

সম্ভবত বরখা দত্ত আর করন থাপর-এর কাছে শুনেছে আমি ওদের ফোন করেছিলাম। হা করেছিলাম। করেছিলাম জানার জন্য কী হচ্ছে আমাকে নিয়ে। সরকারি লোক যেদিন আমাকে জানিয়ে দিয়েছে যে কিছুই সম্ভব হবে না, না কলকাতা যাওয়া, না দিল্লিতে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা, না বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, আউট অব সাইট হতে হবে, দেশ ছাড়তে হবে –আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল, আকাশ টুকরো হয়ে গিয়েছিল, জগৎ চুপসে গিয়েছিলো। এত বড় শক্তির সঙ্গে আমার মতো তুচ্ছ প্রাণীর তো পেরে ওঠার কথা নয়। বিদেশের জগৎটা আমার দেখা, সেই জগতে আমি আর যেতে চাই না। বাংলাদেশ নেই, ভারতই ছিল একমাত্র, আর এই ভারতই কি না দুলে উঠছে, কেঁপে উঠছে, সরে যাচ্ছে আমার নাগাল থেকে তখনই করন থাপর আর বরখা দত্তকে ফোন করেছিলাম জানতে, যেহেতু তারা রাজনীতি ভালো বোঝেন, কী হচ্ছে যা হচ্ছে, যা হচ্ছে। তা কেনই বা হচ্ছে, আমি থাকলে দশটা লোকের মৃত্যু হবে এ দেশে, এসব কথা এত জোর দিয়ে বলছেন কেন, যাঁরাই বলছেন!

টেলিভিশনের জন্য সাক্ষাঙ্কার চেয়েছিলেন করণ থাপর। দিইনি। বলেছি, সরকারের লোকেরা এমন সব দুর্বোধ্য কথা বলছেন, আপনি কি অনুগ্রহ করে মনমোহন সিং বা সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে একটু কথা বলবেন। একটু দেখবেন, কী ওঁরা চাইছেন। করণ থাপর বললেন, তিনি জানতে চাইলে কেউ তাঁকে কিছু জানাবেন না। তিনি কথা বললে কেউ শুনবেনও না।

তারপর সন্ধেবেলায় সিএনএন জানালো সেদিন নাকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটা মিটিং হয়েছে সেক্রেটারি এবং আইবির মধ্যে, আমার ব্যাপারে বলা হয়েছে হয় দিল্লি থাকতে হবে যেভাবে আছে সেভাবে নয়তো চলে যেতে হবে দেশ ছেড়ে। আমি চূর্ণ হয়ে গেছি, আমি আর আমি নেই। প্রতিক্রিয়া চাইলে বললাম আমাকে যা যা বলে গেছে সরকারি লোক। এও বললাম, আমাকে একরকম গৃহবন্দি করা হয়েছে।

বীর সাংভির রাগ, কেন আমি জানিয়েছি আমি গৃহবন্দি অবস্থায় আছি। একই সঙ্গে নাকি ছ’টা এক্সকুসিভ দিচ্ছি। বাথরুমে যাওয়ার টাইম নেই। ফরেনার হয়ে নিরাপত্তা পাচ্ছি। কী দরকার আমাকে এত খাতির করার। এত টাকা পয়সা আমার মতো খারাপ লেখকের পেছনে খরচ করার। খারাপ লেখক আমি, তাবীর সাংভি জেনেছেন আমার বই পড়ে নয়, কলকাতার কেউ নাকি বলেছেন। অবশ্য কে বলেছেন তা তিনি বলেননি। এদিকে সরকারি অফিসাররা নাকি বলছেন, তাঁদের কাছে আশ্রয় চাইছি, তারপর দৌড়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে বলছি। বীর সাংভির প্রশ্ন, বিরুদ্ধে কেন বলবো ফরেনার হয়ে! আমি নাকি হেডলাইন হয়েছি নানারকম কান্ড করে। মনে মনে বলি, কান্ড কি আমি করলাম? আমি তো আমার মতো কলকাতায় আমার ফ্ল্যাটখানায় লেখাপড়া করছিলাম, কারও পাকা ধানে মই দিইনি। তোদের সরকারই তো তাড়ালো, আমাকে হেডলাইন বানালো। তোদের সরকারই তো আমাকে আটকে রেখেছে ঘরে, বেরোতে দিচ্ছে না, কাউকে আসতে দিচ্ছে না আমার কাছে। হেডলাইন তো তোরা বানাস। রাজনৈতিক অত্যাচার আমার ওপর করে আমাকে হেডলাইন তো তোরা করিস বাপু। আমাকে তোরা তোদের ধর্ম আর রাজনীতির শিকার বানিয়েছিস। তোরা তো তোদের শিকারকে হেডলাইন করছিস। ভিকটিম তো ভিকটিম হতে চায়নি। ভিকটিম মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিল। কবে কোন পাঁচ বছর আগে সে কী লিখেছিল, তা নিষিদ্ধ করে তোরাই তো হেডলাইন বানালি তাকে। হাইকোর্ট সেই লেখা যে নিষিদ্ধ হওয়ার মতো নয় তা দুনিয়াকে জানিয়ে বইটাকে মুক্তি দিয়ে তো আবারও হেডলাইন করলো তাকে। তারপর তোদের ধর্মবাদীরা তো আবার সেই লেখার ওপর হামলে পড়লো, তোদের অধর্মবাদীরাও ধর্মবাদীদের খুশি করতে বেচারা আমার ওপর ঝপালো। তোদের ঝপাঝাপি, তোদের তান্ডব নেত্য তো আমাকে বারবার ‘হেডলাইন’ করছে। পাঠক নির্বিঘ্নে পড়ছিল আমার বই। বই তো বছরের পর বছর ছিল বইয়ের বাজারে। কেউ তো কিছু বলেনি। তোরা গন্ডগোল করবি, আর দোষ দিবি আমাকে। তোরাই রাগ দেখিয়ে বলবি, ফরেনার হয়ে অত বাড় বেড়েছে কেন, অত হেডলাইন হওয়া কেন!

সারাদিন মন খারাপ ছিল।

সন্ধের দিকে এক বন্ধু বললো, বীর সাংভিকে নাকি ভ’বাবু ওই লেখাটি লিখতে বলেছিলেন। আরও কিছু সম্পাদক এবং সাংবাদিককেও নাকি বলেছেন, আমার নামটি কোথাও তিনি ছাপার অক্ষরে দেখতে চান না।

মানুষ যে কেন ধর্মীয় মৌলবাদীদের দোষ দেয়! ওদের যত না দোষ, তার চেয়ে বেশি দোষ এইসব রাজনীতিক, সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী যাঁরা মৌলবাদী দ্বারা আক্রান্তদের অনুভূতির আঘাতের দিকে ফিরে তাকান না, কিন্তু আক্রমণকারী মৌলবাদীদের অনুভূতির আঘাত নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন, এবং সহানুভূতিশীল।

.

২৪ ডিসেম্বর

সুয়েনসনের সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। নাকচ হল অনুরোধ। ওকে আমার হিন্দি প্রকাশক অরুণ মাহেশ্বরীর কাছে চলে যেতে বললাম। আমার প্রকাশকই নিলেন ওর দেখাশোনার ভার।

আর এদিকে আমি। মন খারাপের আমি। অবশ্য আজ একটু একটু করে মন ভালো হল ক’টি ফোন পেয়ে। কলকাতা থেকে বিভুতিভূষণ নন্দী, সুনন্দ সান্যাল, দেবব্রত বন্দোপাধ্যায় ফোন করে সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। একজন তো বললেন, নেলসন ম্যান্ডেলার কথা ভাবতে। ম্যাণ্ডেলা দু’যুগেরও বেশি ছিলেন জেলে। এই অবস্থা আমার থাকবে না দীর্ঘদিন, এরকমই আশ্বাস দিলেন সকলে। লিখতে বললেন। লেখার চেয়ে বড় আশ্রয় আমার আর কোথাও নেই, বললেন। আমি কী আর বুঝি না! লিখতে গেলে জানিনা কী এসে আমাকে উদাস করে দেয়। তাকিয়ে থাকি জানালার ওপারে, দীর্ঘশ্বাস আমাকে ডুবিয়ে নিতে থাকে।

আউটলুকের শীলা রেড্ডি বললেন, লেখক বুদ্ধিজীবীরা সই দিলেন আমার সমর্থনে। এও জানালেন, বৃন্দা কারাত দিতে চাননি।

ইউনেস্কোর গুডউইল অ্যামবাসাডার মনজিৎ সিং জ্যোতি বসুকে চিঠি লিখেছেন, টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা সম্পাদকীয় আমার লেখা একটি চিঠির সঙ্গে সেঁটে দিয়ে। মদনজিৎ সিংএর তুলনা হয় না। মানুষটার সঙ্গে ভালো করে কোনোদিন কথাও হয়নি, অথচ আমার জন্য কী আশ্চর্য সব কাজ করছেন।

অরুণ মাহেশ্বরী বললেন, তাঁর লেখকরা সব একজোট হয়ে আন্দোলন করছেন।

কলকাতা থেকে কিছু বন্ধু দিল্লিতে এসে অনশনে বসতে চাইছে। সোজা না বলে দিলাম। এসব করে কিছু লাভ হবে না, সে বুঝি। কারণ এই একশ কোটি লোকের দেশে লাখ লোক মিছিল করলে কাজ হয় হয়তো, দু’চারজন লোকের অভিমান বা অনশনের দিকে কেউ তাকায় না।

মন ভালো ছিল, রাতে খারাপ হয়ে গেল। দ্য স্টেটসম্যানে দেখি কলকাতায় বসে লেখা। ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’ এর অনুবাদ ব্যানিসড উইদিন অ্যান্ড উইদাউট’ লেখাটা ছাপা হয়েছে, কিন্তু লেখার শেষে যে তারিখটা উল্লেখ করেছিলাম, সেটা নেই। তারিখ উড়িয়ে দিয়ে ঘটা করে এই বলে ছাপা হল, দিল্লির সরকারের কান্ডকারখানা দেখে বিরক্ত হয়ে লিখেছি। স্টেটসম্যানের কান্ডকারখানা দেখে আমিও বিরক্ত। তারিখ জানালে জানি না ওদের কেন ভয় হয় যে পাঠক লেখা পড়বে না। ইতিহাসের মূল্য কি তবে কিছু নেই? তুই নিষিদ্ধ, তুই কথা কইস না’ বিভিন্ন সময় ধরে আমার প্রকাশিত লেখার একটা সংকলন। সদ্য বেরিয়েছে। উনিশশ তিরানব্বই সালে লেখা প্রথম লেখাটি। শেষ লেখাটি এ বছরের। মাঝখানে বিভিন্ন সময়ে দেশের কথা মনে করে ইওরোপে বসে, অথবাকলকাতায় বেড়াতে এসে লেখা। সাল উল্লেখ না করে প্রকাশক দেখাতে চাইলো, সবই এবছর লেখা। শুধু তাই নয়, ভাবটা এমন, কলকাতা থেকে আমার নির্বাসন হওয়ার পর কেঁদে কেটে লেখাগুলো লিখেছি। ঘটনায় ঘনঘটায় দিল্লিতে ছিটকে পড়েছি, এখান থেকেই পাঠিয়েছি পান্ডুলিপি। এসব কি পাঠক ঠকানো ছাড়া অন্য কিছু? এই অসততা আমি একেবারে সইতে পারি না।

আকাশে বড় একটা গোল চাঁদ। আজ হয়তো পূর্ণিমা। পূর্ণিমা হলেই বা কী! আমি কি পূর্ণিমায় ভিজে ভিজে কোথাও কারও সঙ্গে খোলা মাঠে গান গাইতে পারবোআর। জানালা দিয়েও আনমনে চাঁদ দেখা যায়। কতদিন পর চাঁদের মুখ! আমিও চাঁদের মতো খুব একা। চারদিক ঘোর কালো আঁধার। আমি আর চাঁদ শুধু জেগে থাকি, একা একা।

.

২৫ ডিসেম্বর

সেই বাড়িটায় নিয়ে যাওয়া হল আমাকে নিয়ে আসা হল সুয়েনসনকে, নিয়ে আসা হল অশেষ আর মুনাকে। অশেষ আর মুনা এসেছে কলকাতা থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে। একটা ছোট সুটকেসে ভরে কলকাতার বাড়ি থেকে কিছু জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। যেহেতু যেখানে আছি, সেখানে কারও আসার নিয়ম নেই, তৃতীয় জায়গায় দেখা করে সুটকেসটি নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন প্রভু। ওদেরকে হোটেল থেকে তুলে এ গলি ও গলি ঘুরিয়ে গোলক ধাঁধার মধ্যে ফেলে নিয়ে আসা হয়েছে। সবাইকেই তাই করা হয়, যাদেরকে এই গোপন জায়গাটিতে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে। সুটকেসের ঘটনা আছে বলেই অশেষ আর মুনার সঙ্গে দেখা হতে পারলো। অবশ্য কোনো ঘটনাই ঘটনা নয়, প্রভু যাঁর সঙ্গে লিয়াজোঁ রাখছেন, তিনি সম্মতি দিলেই তবে দেখা হওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন প্রভু। প্রভু একা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক নন, হলে তিনি আমাকে অনেক আগেই কলকাতা পাঠিয়ে দিতেন।

সুয়েনসনের জন্য একটা ঝাউ গাছ, গাছ সাজানোর যাবতীয় জিনিস সবই ভারত সরকারের দান। দুপুরে বিশাল খানাপিনা। সেও সরকার। খাওয়ার পর চকলেট কেক। সেটাও। এমনকী সুয়েনসনকে যে একটাবই উপহার দিলাম, সেটাও। আমি বলিনি এসবের ব্যবস্থা করতে, শুধু বলেছিলাম সুয়েনসন নিশ্চয়ই বড় দিনটা কাটাতে চায় আমার সঙ্গে। সুয়েনসন নাস্তিক লোক। কিন্তু নাস্তিক হয়েই বড় দিনের উৎসবটা দেখেছি ঠিকই করে। অযৌক্তিক গাছ সাজানো আর পরস্পরকে এটা সেটা উপহার দেওয়া ধার্মিক উৎসবের চেয়েও বড় সামাজিক উৎসব।

অশেষরা একসময় চলে গেল। ট্রেন ধরবে কলকাতা ফেরার। ওদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমারও তো ঘর ওই শহরে। কেবল আমারই ফেরার কোনও উপায় নেই। আর সবাই, গাধা ঘোড়া গরু মোষ, চোর ডাকাত খুনী সন্ত্রাসী কলকাতা শহরে ফিরতে পারে, কেবল আমি পারি না।

সারাদিনে বড়দিনের উপহার এল টেলিভিশনে। কলকাতা থেকে এক বন্ধু ফোনে বললো যে জ্যোতি বসু আমাকে বলেছেন কলকাতায় স্বাগতম। টেলিভিশনের সব চ্যানেলগুলোই দেখাচ্ছে জ্যোতি বসুর কথা। স্বাগত আমাকে জানিয়েছেন বটে তিনি, তবে জানানোর পরই বলে দিয়েছেন আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রের। তাহলে তো কমিউনিস্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, সিতারাম ইয়েচুরির কথার মতোই কথা হল অনেকটা। ওঁরাও মাঝে মাঝে বলছেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রকে নিতে হবে। তবে জ্যোতি বসুর মুখে ওই ‘স্বাগতম’ শব্দটি, শুনেছি মেয়েটার মন খারাপ’ বাক্যদুটো আমার মন ছুঁয়ে যায়। জানি যে এর পরের কথাগুলো খুব রাজনৈতিক, কেন্দ্রের কাঁধে দায়িত্ব দেওয়া। দ্বিখন্ডিত বইয়ে যা লিখেছি তা লেখা আমার উচিত হয়নি, এ লেখা কোনও মুসলমান মানতে পারবে না। জ্যোতি বসু বললেন। এসব কী কোনও নাস্তিকের মুখে মানায়! নাকি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইহুদিদেরই নাস্তিক হওয়া মানায়, তাদেরই অধিকার আছে ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করার, মুসলমানের নেই, কারণ মুসলমান মৌলবাদীরা তা সইতে পারে না বলে? পিছিয়ে পড়া একটি অন্ধকার সমাজকে কেবল সংস্কার দিয়ে আলোকিত করা যায় না, আঘাত দিয়ে আগে সজাগ করতে হয়। সজাগ না হলে অন্ধকারে যে ডুবে আছে, তা কী করে টের পাবে। আর সত্যি কথা বলতে কী, মুসলমান সমাজকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে আমি কোনও লেখালেখি করি না। লিখি মনের কথা, বিশ্বাসের কথা। লিখতে গিয়ে কোনও সম্প্রদায় বা কোনও লিঙ্গ ভাবনা আমাকে আঁকড়ে ধরে না। মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি আমি, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে মানুষকে ভাগ করি না। নিজে ধর্মমুক্ত, সম্প্রদায়মুক্ত, সংস্কারমুক্ত হলেই সবাইকে সমান চোখে দেখা সম্ভব।

সন্ধেয় প্রভু ফিরলেন তৃতীয় বাড়িতে। প্রভুর ফেরা মানে বিদায় ঘণ্টা। এখন চলে যেতে হবে আবার সেই ঘরটিতে, লোকচক্ষুর আড়ালে, যে ঘরটিতে থাকার কারণ নিরাপত্তা নয়, কারণ রাজনীতি। যে রাজনীতি আমি বুঝি, কিন্তু মেনে নিতে পারি না। সারাপথ প্রভু শুধু একটিই তথ্য দিলেন, আমার সঙ্গে ইউটিভির রাম মার্চেনড়ানির দেখা হবে না। ইউটিভি আমার ওপর ছবি বানাতে চাইছে। কর্তারা দেখা করে চাইছেন কথা বলতে। দেখা হওয়ার জন্য যে প্রভুর কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম, তা নাকচ হয়ে গেছে। কে নাকচ করলো, তা প্রভুও বলেন না, আমিও জানতে চাই না। প্রভু বলেছিলেন, আমার আবেদন নিবেদন তিনি যথাস্থানে জানিয়ে দেন, সেই যথাস্থান থেকে যা আদেশ আসে, তাই তিনি মাথা নত করে পালন করেন।

প্রভু বিদায় না নিয়েই চলে গেলেন। এরকম হয় না কখনও। তাঁর রাগের কারণ আমি বুঝি। রাগ তাঁর, আমি কেন জ্যোতিবাবুর বক্তব্যের উত্তরে টিভিতে আমার অনুভূতি ব্যক্ত করেছি। প্রচুর সাংবাদিকের ফোন বেজেই চলছিল, একজন চেনা সাংবাদিককে শুধু বলেছি, ‘খুব ভালো লাগছে জ্যোতি বাবুর কথায়, আশা করি একদিন মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে, একদিন আমিও ফিরতে পারবো আমার প্রিয় শহরটিতে। এইটুকু কেন বলবো না আমি! জ্যোতি বাবু আমাকে স্নেহ করতেন, তিনি স্বাগতম বলার পরও আমাকে কেন মুখ বন্ধ রাখতে হবে, কেনই বা আমি আমার ইচ্ছেগুলোর কিছুই মুখ ফুটে বলতে পারবোনা! প্রভুর কড়া আদেশ এবং অনুরোধ ছিল, প্রেস খারাপ, প্রেসের চৌদ্দ গুষ্ঠি খারাপ, প্রেসের সঙ্গে ফোনে কথা বলোনা। প্রভুর আদেশ আমি প্রথম দিন থেকেই মেনে চলছিলাম। ধীরে ধীরে প্রভুকে যত দেখছি, তত জানছি, প্রভু এবং প্রভুর ওপরওয়ালারা কেউই দেবতা নন।

.

২৭ ডিসেম্বর

সন্ধেবেলায় প্রভুর সঙ্গে বসে কথা বলছিলাম। টেলিভিশনে ‘টাইমস নাও’ চ্যানেলের হেডলাইন খবরে প্রণব মুখার্জির মন্তব্য দেখাচ্ছিল তখন, যে, কারও নিরাপত্তা দেওয়া রাজ্যের দায়িত্ব, কিন্তু রাজ্য যদি এ ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রকে বলে, কেন্দ্র সানন্দে সেই বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। এই খবরের মধ্যে হঠাৎ রাওয়ালপিন্ডিতে বেনজিরের নির্বাচনী সভায় বোমা হামলার খবর। টেলিভিশনে চোখ আমার। কিছু লোক মরে পড়ে আছে, কারও ঠ্যাং নেই, কারও খুলি উড়ে গেছে, মানুষ ছোটাছুটি করছে, চিৎকার করছে, কাঁদছে। কী ভয়ংকর! কী বীভৎস দৃশ্য! নিচের স্ট্রিপগুলো দেখছি, বেনজির সেইফ। এর একমিনিট পর বেনজির ইনজুর্ড, এর কিছুক্ষণ পর বেনজির আনকনশাস। এর আধমিনিট পর বিশাল বড় ব্রেকিং নিউজ, বেনজির ডেড। স্তব্ধ হয়ে গেলাম। শুধু অস্ফুট উচ্চারণ, এ কী! এ কী কান্ড! এ কী সত্যি! এ কী হতে পারে!

হ্যাঁ হতে পারে। পাকিস্তান নামের দেশটিতে সবই হতে পারে। সন্ত্রাস ছড়াতে এবং সন্ত্রাসী তৈরিতে এর চেয়ে চমৎকার দেশ আর জগতে কোথাও নেই। ভয়, ও দেশের কোনও পাগল যদি পারমাণবিক বোমাগুলোর নাগাল পায়! জগৎটা নিমেষে ছাইয়ের মতো উড়িয়ে দেবে।

বেনজির আমার কাছে এমাসেই দুটো চিঠি লিখেছিলেন। প্রথম চিঠির উত্তর অনেকদিন পর দিয়েছিলাম। একটু একটু সন্দেহ ছিল। সত্যিই কি বেনজির ভুট্টো আমাকে চিঠি লিখেছেন। কেন তিনি এত ব্যস্ততার মধ্যে আমার মতো অরাজনৈতিক একজন মানুষকে চিঠি লিখে যাচ্ছেন। আমাকে সমর্থন করা মানে তো তাঁর মুসলমানের ভোট না পাওয়া। আমার এরকম একটি সংজ্ঞাই তো এই উপমহাদেশের গোপন অভিধানে করা হয়েছে। এ খবর যদি লোকে জেনে যায়, তবে তাঁরই বিপদ হবে ভীষণ। জীবনে আমি কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কোনও চিঠি-টিঠি পাইনি। এই প্রথম। তারপরও হটমেইলের ঠিকানা দেখে মনে খটকা তো লেগেই আছে, যে, বেনজির নয়, অন্য কোনও লোক মজা করার জন্য, অথবা কোনও বদ উদ্দেশ্যে চিঠি লিখেছে। চিঠি সম্পর্কে প্রভুকেই কিছু বলিনি, যে প্রভুকে আমি সব কথাই বলি। কী করছি, কী ভাবছি, সব। প্রথম চিঠিটি পাওয়ার বেশ কিছুদিন পর বেনজিরকে একটি চিঠি পাঠাই আমি। সাদামাটা ধন্যবাদ জানানো চিঠি। চিঠি পাঠানোর দুদিনের মধ্যেই তার দ্বিতীয় চিঠিটি আসে। দ্বিতীয় চিঠি পাওয়ার পর কোনও উত্তর দিইনি। কারণ হটমেইল থেকে কোনও বড় রাজনৈতিক দলের চিঠি আসবে, এটা অনেক ভেবে দেখেছি, মানতে পারিনি। হটমেইল যদি কষ্টেসৃষ্ঠে মেনে নেওয়া যায়, সোনিয়া মানা যায়। তিনি একজন নেত্রী, আরেকজন নেত্রীকে মিসেস সোনিয়া গান্ধি অথবা সোনিয়া গান্ধি না বলে শুধু সোনিয়া বলে ডাকবেন না। কোথাও ভুল হচ্ছে। নিশ্চয়ই এই চিঠি বেনজিরের পাঠানো নয়। নিশ্চয়ই কেউ মজা করছে। কিন্তু কারইবা মজা করার দায় পড়েছে! মজাটা করে কার কী লাভ! দ্বিতীয় চিঠির কোনও উত্তর বেনজির ভুট্টো পাননি, সোনিয়া গান্ধিকে সোনিয়া লেখার অপরাধে।

এই সেই চিঠি, যেগুলো একবার পড়লে মনে হয় হ্যাঁ বেনজিরের লেখা। আবার মনে হয়, না, তাঁর লেখা নয়। হয়তো তাঁরই লেখা ছিল। মাত্র আট নদিন আগে পাঠিয়েছেন চিঠি। দ্বিতীয় চিঠির উত্তর না দিয়ে আমি হয়তো ভুলই করেছিলাম। না, চিঠি বড় কথা নয়। জলজ্যান্ত মানুষটা একটু আগে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চ থেকে নামলেন, নেমে গাড়িতে উঠলেন, গাড়ি সামান্য এগোতেই তাঁকে গুলি করা হল, তাকে মেরে ফেলা হল। আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ হল। কিন্তু আততায়ী কী করে বেনজিরের গাড়ির এত কাছে আসতে পারলো! পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের জন্য যে ধরনের কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা, সে রকম বেনজিরের জন্য ছিল না।

প্রথম চিঠি–

Dear Ms. Taslima Nasreen,

I have been impressed by your courage and determination in the face of such backwardness and fundamentalism. I was not able to contact you before due to my pressing engagements at home. I would extend my unflinching sup port to you. I have contacted Sonia and have urged her to provide you with all legal avenues of protection. I was saddened to know that you had to make amends in your book. Your prose and poetry have been an integral part of my collection and I would like it to bloom further with fresh and bold ideas like yours. Keep up the struggle but please remember that some times discretion is the better part of valor.

With warm regards.
Benazir Bhutto
Chairperson –Pakistan Peoples Party

দ্বিতীয় চিঠি —

Dear Ms Taslima Nasreen,

I am so glad that you are fine. I know what it is like to live under the puritani cal yoke of our backward looking societies. It is like trying to find fresh oxygen in a room filled with smoke. I hope you reach a safe and functional destination soon. I am sure Sonia will chalk out something for your safety. Congress should enhance its liberal image by extending all support to you.

Remember dear, home is where your human soul finds resonance. Wishing you all the best.

Sincere regards
Benazir Bhutto
Chairperson –Pakistan Peoples Party

শুনেছি জারদারি একটি অপদার্থ লোক। অনেকে বলে বেনজিরের মতো শিক্ষিত মহিলা কী করে জারদারির মতো একটা চোর আর অপদার্থকে বিয়ে করে! ঠিক এরকমও আমার বেলায়, আমিও তো বিয়ে করেছিলাম অপদার্থ আর বদমাশকে। ভুল যে কেউ করতে পারে। বেনজিরের আর আমার মধ্যে পার্থক্য হল, আমি তালাক দিয়েছি অপদার্থদের, বেনজির দেননি। আরও একটি বড় পার্থক্য, বেনজির ভোটের জন্য অনেক মৌলবাদীর সঙ্গে আপোস করেছেন, আমি কোনও স্বার্থে বা কোনও কারণেই মৌলবাদীদের সঙ্গে আপোস করিনি।

.

২৮ ডিসেম্বর

‘নির্ভীক, সত্যসন্ধ, বিশ্ববিশ্রুত বাঙালি লেখিকা তসলিমা নাসরিন সম্প্রতি দিল্লিতে বস্তুত নিঃসঙ্গ গৃহবন্দি। যদিও তাঁর অনেক রচনা ভারতের বিভিন্ন ভাষায় এবং পশ্চিমের অধিকাংশ প্রধান ভাষায় তর্জমাকৃত রূপে প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর মাতৃভাষা বাংলা, এবং সেই ভাষাতেই তিনি অসামান্য শক্তিশালী লেখিকা। তাঁর সাহসী সত্যকথনের জন্য তিনি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত। তসলিমা শিল্পের জন্যই শিল্প এই তত্ত্বের শিল্পী নন। তিনি চান সমাজ এবং সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন –উভয়ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়, সতোর প্রতিষ্ঠা। ভাষা তাঁর নিপুণ হাতে সেই যন্ত্র যাকে তিনি প্রয়োগ করেন মানুষের রচিত শৃঙ্খলের মোচনে, সেই মহৎ প্রয়াসে অত্যাচারিতের চেতনায় উদ্যোগের উদ্দীপনে’ –শিবনারায়ণ রায়।

বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি শেষ পর্যন্ত ছাপা হল পত্রিকায়। শীলা রেড্ডি বিবৃতিটা লিখেছেন বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে আমার খুব খারাপ সময়ে তাকে যে কথাগুলো বলেছি, সেগুলোই সাজিয়ে। পড়ে আমি সত্যিই আহত হই। এ কারণেই কি শীলা একবারও আমাকে পড়ে শোনায়নি বিবৃতি? শোনালেই আমি আপত্তি করবো বলে! সই করেছেন খুশবন্ত সিং, অরুন্ধতী রায়, শ্যাম বেনেগাল, গিরিশ কারনাড, এম এ বেবি, আউটলুকের সম্পাদক বিনোদ মেহতা। এ আর ক’জন। শীলা তো বলেছিল প্রচুর বুদ্ধিজীবী নাকি সই দিচ্ছেন। উচিত ছিল ওঁদের নিজেদের বলা, আমার অভিযোগ উল্লেখ করে বিবৃতি তৈরি করাতে আমার এমন মনে হচ্ছে যে মুক্ত চিন্তার বা মত প্রকাশের অধিকার চাওয়াটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। অভিযোগগুলো আমি তো বিবৃতিতে ব্যবহার করার জন্য করিনি। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণে এখন যদি আমার ওপর বুলডোজার চলে, কেউ কি আমাকে বাঁচাবেন। এসব কারণে মন খারাপ।

বেনজিরের মৃত্যু এখনও চোখের সামনে। আল কায়দা আজ জানিয়ে দিয়েছে তারা মেরেছে বেনজিরকে। আমাকেও কি একদিন এভাবে মেরে ফেলবে আল কায়দার লোক? যখন বাংলাদেশে ছিলাম, যখন আল কায়দার নাম বা দুর্নাম কিছু হয়নি, ওসামা বিন লাদেনও চেনা কোনও নাম নয়, তখনই একবার লেখা হয়েছিল ওসামা বিন লাদেন এবং আফগানিস্তান থেকে জঙ্গী ট্রেনিং নিয়ে আসা বাংলাদেশি তালিবানরাও নাকি আমার মৃত্যু চায়। তারপর নানা কারণে ওসামা বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে উঠলো। আমাকে ভুলে গিয়ে বা আমার চেয়ে বড় টার্গেট পেয়ে গিয়ে বাঁচিয়েছে আমাকে। বাংলাদেশে হরকতুল জেহাদি ঠিক ওই সময়টাতেই গড়ে উঠেছিল, উঠেই আমার ফাঁসি চাইতে শুরু করে। তাদের নাম এখন বিশ্বের বাজারে হুজি। হুজি এখন বড় সন্ত্রাসী দল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতেও সময় সময় বোমা ফাটিয়ে যায়। প্রচুর নিরীহ মানুষকে নিশ্চিন্তে খুন করে যায়।

মেরে কি সত্যিই আমাকে ফেলবে কোনও ইসলামি সন্ত্রাসী দল। বিশ্বাস হতে চায় na, আবার মনে হয় বুক বরাবর গুলি ঢুকে গেল, মনে হয় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলাম কোনও আত্মঘাতী বোমা হামলায়। হয়তো মরতেই হবে ওভাবে। এই ভয়ে ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়ে থাকতে হবে কেন আমাকে? মরবো বলে কি বাঁচবো না?

রাতে টিপু সুলতান মসজিদের ইমামের বক্তব্য পড়লাম নেটে। প্রেস কনফারেন্স করেছে ইমাম। ইমামের বক্তব্য, আমি কলকাতায় ফেরত গেলে আগুন জ্বলবে, এত বুলেট নেই পুলিশের শেষ করার, এত বড় জেলখানা নেই এত মুসলিমকে পোরার। জ্যোতি বসুর বক্তব্য তাদের ভালো লাগেনি। তারা কলকাতায় আমাকে চায় না। এই হল মোদ্দা কথা। আমার নাকি দ্বিখন্ডিতর পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে সব শেষ হয়নি। ক্ষমা চাইতে হবে এতদিন যত ইসলামবিরোধী লেখা লিখেছি তার জন্য, তারপর কলমা পড়ে মুসলমান হতে হবে। অল ইণ্ডিয়া মাইনরিটি কমিটির ইদ্রিস আলীও ভিড়েছে দলে। হাউমাউখাউ করে জানিয়ে দিল, রাস্তায় নাকি মুসলমানের ঢল নামবে আমি কলকাতায় ফিরলে।

কোন দেশে বাস করছি। এ কি পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশ।

ইচ্ছে করলেই কি সিপিএম আর কংগ্রেসের নেতারা সামাল দিতে পারতেন না এই মোল্লাদের! শুনেছি, ইমাম সিপিএমের দালাল, আর ইদ্রিস আলী কংগ্রেসের। কোনও দল থেকে কি এদের বালখিল্য উগ্রতার জন্য ধমক দেওয়া হয়েছে। কেউ এদের তো কিছু বলছেই না। কেউ কেউ বলছে, কানে আসছে, কোথাও কোথাও পড়ছি যে এদের দিয়ে নাকি করানোও হচ্ছে এই দাঙ্গা হাঙ্গামা। যেন এদের ধমকে হুমকিতে আমি কলকাতা যেতে না পারি। আর মুসলিম ভোট হারানোর কোনও ঝুঁকিও কারও রইলো না।

যে ইদ্রিস আলীকে ২১ নভেম্বরের কীর্তির জন্য কংগ্রেস বহিষ্কার করেছিল, সেই কুখ্যাত ইদ্রিস আলীকে দেখতে জেলখানায় গেলেন কংগ্রেস নেতারা। কংগ্রেসে তাকে ফিরিয়ে তো নেওয়া হলই, রীতিমত সংবর্ধনা দেওয়া হল। এই যদি হয়, এতই যদি আস্কারা ইদ্রিস আলীকে দেওয়া হয়, যা কিছু করার ছাড়পত্র তাকে যদি দেওয়াই হয়, তবে দেবে না কেন সে হুমকি!

২৯ ডিসেম্বর সারাদিন কী করে কাটলো? না, কিছু করে কাটলো না। কিছু না করে কাটলো। আমার এই অবস্থাকে আমি হাউজ অ্যারেস্ট বলি না। বলি না এই কারণে যে হাউজ অ্যারেস্ট হলে লোক আসতে পারতো দেখা করতে। হাউজ অ্যারেস্ট হলে দেশ থেকে বেরোতে দেয় না। আমি দেশ থেকে বেরোতে চাইলে এরা খুশিতে লাফিয়ে বিমান বন্দরে গিয়ে বিমানের সৰ্বোত্তম আসনে আমাকে বসিয়ে দিয়ে আসবে।

একে আমি জেলখানাও বলি না। বলি না কারণ জেলখানায় ভিজিটিং আওয়ার্স থাকে। আমার এখানে নেই। জেলখানার ঠিকানা আছে, আমার কোনও ঠিকানা নেই। জেলখানায় যারা আছে, তারা জানে কতদিনের জন্য তাদের জেল হয়েছে। তারা জানে কবে তারা বেরোবে। আমি জানি না আমার মুক্তি কবে।

এরকম জায়গায়, তথাকথিত ‘সেইফ হাউজ’এ রাখা হয় বড় ক্রিমিনালদের। গোয়েন্দারা পুঁতিয়ে, খুঁচিয়ে, লাথি মেরে, কিল মেরে, চুল টেনে, গায়ে গরম জল ঢেলে ক্রিমিনালদের পেটের কথা বার করে। কিন্তু এত দীর্ঘদিন কাউকেই রাখা হয় না। আমাকেই রাখা হচ্ছে। আমি ক্রিমিনাল নই, আমার পেটে কোনো গোপন কথা নেই খুঁচিয়ে বার করার। যখনই আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কে ফোন করেছে, কী কথা হয়েছে, কোথায় কী হচ্ছে আমাকে নিয়ে, আমার মনে কী হচ্ছে, কী ভাবছি, কী ভাবছি না, সবই বলে দিই প্রভুকে।

ফোনে আড়ি পাতার ব্যাপারটা আমি ধারণা করতে পারি না। কিন্তু কয়েকজন বন্ধু কোনো রকম প্রমাণ ছাড়া এবং দ্বিধা ছাড়া বলেছে আমার ফোনে আড়ি পাতা হয়। বলার পর আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি আড়ি পাতা ব্যাপারটা ঠিক কেমন। বেশ কিছুদিন পর লক্ষ্য করেছি যে ওদের দেওয়া ফোনটায় কেউ ফোন করলে কথা খুব আস্তে শোনা যায়। প্রভু কথা বললে কিন্তু অত আস্তে শোনা যায় না। আমি জানি না আড়ি পাতা ফোনের এমনই চরিত্র কি না।

আমি নজরবন্দি নাকি আমি গৃহবন্দি। ওপরওয়ালারা বলে দিয়েছেন, আমি গৃহবন্দি নই। কেউ তো এসে দেখে যেতে পারবে না, আমার বন্দিত্বের ধরন। কেউ আমার ত্রিসীমানায় আসতে পারবে না। কেউ জানবে না কোনওদিন কেমন আছি, কীভাবে আছি। একা একা এখানেই আমি পচে মরবো। এই বন্দিত্ব ঠিক কী কারণে, এর ধরনটাই বা কী, কাউকে আমি বোঝাতে পারি না। নিজেও কি খুব বুঝি আমি! মেইনস্ট্রিম পত্রিকার সম্পাদক সুমিত চক্রবর্তী, শীলা রেড্ডি এবং আরও কয়েকজন আমাকে নিয়মিতই ফোন করেন। এরা আমার চেয়ে অনেক কিছুই অনেক বেশি বোঝেন। শীলা রেড্ডির কাছে একবার জানতে চেয়েছিলাম আমাকে কলকাতায় না যেতে দিয়ে এ জায়গাটায় রেখেছে কেন, শীলা রেড্ডি দিব্যি বলল, তোমাকে মানসিক অত্যাচার এমন করবে যেন তুমি বাধ্য হয়ে এ দেশ ছেড়ে চলে যাও।

কিন্তু সংসদে তো বলা হয়েছে অতিথিকে বাস করতে দেওয়া হবে, এ ভারতের ঐতিহ্য!’ ভাঙা কণ্ঠ আমার, ‘আমি তো কোনো দোষ করিনি।’

‘দোষ করেছো তুমি।‘

‘কী দোষ?’

‘মৌলবাদী ক্ষেপিয়েছো, ওটাই দোষ।’

শীলা রেড্ডি রহস্যের হাসি হাসেন।

তাহলে মানসিক কষ্ট দেওয়া কেন? এত কিছুর দরকার কী। টেনে হিঁচড়ে বিমানবন্দরে ফেলে এলেই হয়। চলে যেতে তো বাধ্যই হব। আর এই আসছে ফেব্রুয়ারিতে যদি ভিসা বাড়ানোনা হয়, তা হলে তো চলেই যেতে হবে আমাকে।

সিগারেট আনানোর ব্যবস্থা করলাম। যে সিগারেট চার বছর আগে ছেড়ে দিয়েছি, সেই সিগারেট। আনার ব্যবস্থা করা মানে যে প্রভুর অফিসারের কাউকে আমার ইচ্ছের কথাটা জানাবো, সেই অফিসার যে লোকটা খাবার দিতে আসে, তাকে পয়সা দিয়ে দেবে, সে যখন আবার খাবার দিতে আসবে, সিগারেট নিয়ে আসবে। যে সিগারেটের গন্ধ পর্যন্ত সইতে পারিনি এই চার বছর, সেই সিগারেট। জীবন অর্থহীন লাগছে। জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে। সিগারেট কি আমার দুঃখ কমাবে? কমায় যদি, দেখি না! সিগারেট আনিয়েছি, এই ঘটনাও অফিসারদের জানাতে হয় ওপরে। আমার প্রতিমুহূর্তের নড়াচড়া, কথাবার্তা, দাঁড়ি কমা, সব। কিছুই এখানে প্রভুর অফিসারদের আড়ালে হতে পারে না, যা হবে, সবই ওদের সামনে হতে হবে। শুধু আমার ভাবনাগুলো ওরা না পারে দেখতে, না পারে শুকতে, না পারে স্পর্শ করতে, না পারে অনুমান করতে, না পারে নথিবদ্ধ করতে।

তাদের চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি এখানেই। আমার ঘরের লাগোয়া ঘরগুলোয় থাকে। একদল আজ আসে কাল চলে যায়, আরেক দল কাল যারা আসে পরশু চলে যায়। কারও দিনে, কারও রাতে। তাদের প্রায় সবার সঙ্গেই আমার খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সবাই খুব আন্তরিক, সহানুভূতিশীল, নম্র, ভদ্র। সবাই আমার মতোই তো মানুষ। তাদের জীবনের সুখ দুঃখের সব কাহিনী আমি জানতে পারবো, শুধু পিরবোনা জানতে কী চাকরি করছে তারা, কোন পদে করছে, নামের পদবীই বা কী।

আজ অঝোরে আবার কাঁদলাম। কেঁদে কেটে শান্ত হয়ে গাফফার চৌধুরীকে ফোন করলাম। তাঁকে বললাম, দেশের সরকারের কারও সঙ্গে পরিচয় থাকলে তিনি যেন আমার হয়ে একটু বলেন ওঁদের, আমাকে যে করেই হোক দেশে ফেরাতে যেন বলেন। যে কোনও শর্ত মেনেই আমি দেশে ফিরতে চাই। হাতের কাছে নিজের দেশ, যে দেশে জন্মেছি, বড় হয়েছি, যে দেশে বাবা মা, যে দেশে আত্মীয় স্বজন, যে দেশে শৈশব কৈশোর, যে দেশে স্মৃতি, সে দেশে যাওয়ার অধিকার আমার নেই। কেন থাকবে না আমার অধিকার? আর কত দিন এভাবে এ দেশে ও দেশে ঘুরবো! এবার ফিরতে দিন আমাকে। গাফফার চৌধুরী আমাকে কোনো আশার বাণী শোনান না।

এই বন্দি জীবন আমার আর সইছে না। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় এখানে থাকা। ফোন ট্যাপড হয়। কারা আড়ি পেতে শোনে আমার কথা মনে মনে নিশ্চয়ই খুশি হয় শুনে যে আমি কাঁদছি, নিশ্চয়ই খুশি হয় যে এ দেশ থেকে চলে যেতে চাইছি। হৃদয় বলে কারও কিছু নেই। কিছু নেই কেন? একটা অসহায় মানুষের জন্য সামান্য করুণাও কেন কারওর হয় না?

আমি ভেঙে পড়তে থাকি। আমার স্বপ্ন সাধ সব ভেঙে পড়তে থাকে। পায়ের তলার মাটি নাকি সরে যাচ্ছে আমার। কোথায় যাবো? দেশ ছাড়া, আর এই ভারত ছাড়া আমার আর কোনো মাটি নেই দাঁড়াবার।

শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে কথা বললাম। কান্না রোধ করতে পারি না। এত কাঁদছি কেন আমি? কোনওদিন তোএত কাঁদিনি। কোনওদিনই এত কাঁদিনি। মার অসুখের খবর পেয়ে কিছুদিন কেঁদেছিলাম। সেই তো মনে হয় শেষ কাদা। শঙ্খ ঘোষও কোনো আশা দেন না।

দীর্ঘ দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পর পাচু ফোন করলো। বললো, কী ভাবে আমাকে রাখা হয়েছে, বাইরের কেউ জানে না। সবাই ভাবছে ভালোই আছি। আমি যে কীভাবে বাস করছি, কতটা পরাধীনতার শৃঙ্খল আমার গায়ে পায়ে জড়ানো, তা কল্পনাও কেউ করছে না।

পাচু বললো, বর্বরতা ছাড়া এ আর কিছু নয়। বললো, তুমি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার, মৌলবাদের নয়।

কী রকম ভয় হতে থাকে আমার। মৌলবাদীরা যদি না চেঁচাতে, রাষ্ট্রের কেউ আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাতো না। ওপরওয়ালা যদি ইচ্ছে করেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলে মৌলবাদীদের তোষণ করতেও পারেন। তোষণ করতে গেলে ক্ষতিটা অবশ্য আমার হয়। এ পর্যন্ত যত ক্ষতি আমার করেছে, আমাকে গৃহহীন, সমাজহীন, স্বজনহীন, বন্ধুহীন করেছে রাষ্ট্রের লোকই, মৌলবাদীরা নয়। রাষ্ট্রের লোকই আমাকে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করেছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিয়েছে, ছুঁড়ে দিয়েছে শূন্যে, মহাশূন্যে।

মৌলবাদীদের এবং মৌলবাদী তোষণকারীদের অত্যাচারে কোনও সত্যিকার পার্থক্য আছে কি না আমার জানা নেই।

.

৩০ ডিসেম্বর

‘তসলিমাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তিনি যেন সতর্ক হন, কাউকে যেন আঘাত দিয়ে কথা বলেন। কিন্তু এই সৎ পরামর্শ শুধু তসলিমাকে দেওয়া হচ্ছে, মৌলবাদী নেতাদের দেওয়া হচ্ছে না কেন? এসব পক্ষপাতিত্বের সুদূর এমনকী অনতিদূর পরিণাম কিন্তু ভয়ংকর। প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে যারা সরব হন তাঁদের বাক্যে কিছু মানুষ অনিবার্যভাবে আঘাত পায়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, এই কথাটা একদিন ইউরোপের কিছু ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে আঘাত দিয়েছিল। সব নতুন চিন্তাই কিছু মানুষকে আঘাত দেয়। তসলিমা নিজের মানবিক পরিচয়কে অকুণ্ঠভাবে স্থাপন করেছেন সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এই সাহসী প্রত্যয়ের জন্যই তিনি আজ বিশেষভাবে শ্রদ্ধার যোগ্য। তার জন্য রক্ষা করা হোক উদার আতিথ্যের আসন।‘ –অম্লান দত্ত

আমি যেভাবে বেঁচে আছি, সেভাবে বেঁচে থাকাকে বেঁচে থাকা বলে না। কোনও অন্যায় করিনি আমি। অথচ কলকাতায় আমার বাড়িতে আমাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ চার মাস আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি। শুধু তা-ই নয়, বারবারই সরকার পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে দেশ ছেড়ে নয়তো রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে কোথাও। আমি মাটি কামড়ে পড়ে ছিলাম। কলকাতা ছেড়ে, প্রিয় শহর ছেড়ে, দীর্ঘদিন ধরে সাজানো সংসারটি ছেড়ে, নিজের বাড়ি ছেড়ে, কোথাও যাইনি। যাইনি, কারণ যাওয়ার কোনও কারণ দেখিনি। আমি বিশ্বাস করিনি আমার কারণে শহরে দাঙ্গা লাগবে। বিশ্বাস করিনি আমার কারণে শহরে মানুষ মরবে। আমি তো জানি যে এই শহরেই আমি সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করি। এই শহরেই কোনও নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া দিনের পর দিন আমি নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়িয়েছি। কোনওদিন কোনও মৌলবাদী এগিয়ে আসেনি সামনে, যারাই কাছে এসেছে, ভালোবেসে এসেছে। যে দুএকজন মুসলমান নেতা আমার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে কথা বলেন, তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে বলেন। তারা যখন সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করেন, কোনও ধর্মীয় অনুভূতি থেকে করেন না। উদ্দেশ্য সম্পূর্ণই রাজনৈতিক। একুশে নভেম্বরের তান্ডবের সঙ্গে, আমি বিশ্বাস করি, আমার লেখার কোনও সম্পর্ক নেই। যদি সম্পর্ক থাকতো তাহলে ‘দ্বিখন্ডিত’ থেকে বিতর্কিত অংশ বাদ দেওয়ার

পর আমি কলকাতায় ফিরতে পারতাম।

আমি নিশ্চিত, যে ছেলেরা একুশে নভেম্বরে পথে নেমেছিল, তারা কেউ আমার লেখা পড়েনি। যে ঘৃণায় বা যে ক্রোধে তারা পুলিশের দিকে ইট ছুঁড়েছে, সেই ঘৃণা অন্য কারণে, সেই ক্রোধ অন্য কারণে, আমি কলকাতা শহরে বাস করি বলে নয়। উত্তেজনা তাদের মধ্যে যা ছিল, তা আরোপ করা।

দেশ থেকে বা রাজ্য থেকে আমাকে বের করে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন থেকে চলছিল, তা বাইশে নভেম্বর যে করেই হোক সফল করা হল। কিন্তু কী দোষ আমি করেছি? কী দোষে কলকাতায় আমাকে গৃহবন্দি থাকতে হল, কী দোষে আমাকে কলকাতা থেকে বের করে দেওয়া হল, কী দোষে চরম অনিশ্চয়তা, হতাশা আর শূন্যতা নিয়ে পড়ে আছি দিল্লির কোনও একটি ঠিকানাহীন ঘরে, যে ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর কোনও অধিকার আমার নেই! যে ঘরে আমার কোনও আত্মীয় বা কোনও বন্ধু কোনওদিন ঢুকতে পারবে না! কী দোষে আমাকে প্রতিদিন দম বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিবেশে ফেলে রাখা হয়েছে? কী দোষ আমি করেছি? কেন্দ্রীয় সরকার বলেছেন, আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর নাম কি নিরাপত্তা? আমাকে বন্দি করে কি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে আমাকে নাকি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে অন্য কাউকে? জেলখানাতেও ভিজিটিং আওয়ার্স থাকে, আমার এখানে নেই। জেলখানাতেও কয়েদিরা জানে কবে তারা মুক্তি পাবে। আমি জানি না কবে এই দুঃসহ একাকীত্ব থেকে, ভয়াবহ অনিশ্চয়তা থেকে, মৃত্যুময় নিস্তব্ধতা থেকে আমার মুক্তি জুটবে। কলকাতায় আমাকে গৃহবন্দি করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল যেন দেশ ছেড়ে বা রাজ্য ছেড়ে কোথাও চলে যাই। আর দিল্লির এই ঠিকানাহীন জায়গায় এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমাকে পুরে রাখার কারণ কি এই, যে, অতিষ্ঠ হয়ে নিজেই যেন এ দেশ ছেড়ে কোথাও চলে যাই? যদি তা না হয়, তবে কেন আমাকে পরাধীনতার শেকলে বাঁধা হয়েছে? কী কারণে শত অনুরোধ করার পরও আমাকে কলকাতায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না? কী কারণে আমাকে দিল্লিতেও কোনও স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না?

না, দিল্লির কোথাও আমার বিরুদ্ধে কোনও সভা হয়নি, কোনও মিছিল হয়নি। আমার জীবনের ওপর কোনও হুমকি নেই। বরং সুশীল সমাজের সত্যিকার সেকুলার, সচেতন মানুষই আমার পক্ষে সভা করেছেন, মিছিল করেছেন, বুদ্ধিজীবীরা লিখছেন, লিখেছেন। তারপরও কেন বন্দি জীবন যাপন করতে হবে আমাকে? যদি হুমকি দেয় কেউ, তবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। যেমন এ দেশের প্রচুর মানুষের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। (বিদেশে প্রতিটি দেশেই আমার জন্য নিরাপত্তা দেওয়া হয়, ওসব দেশের আমি নাগরিক নই, তবুও। ভারত তো জাতিসঙ্রে বা রাষ্ট্রপুঞ্জেরই একটি দেশ।) জীবন যাপন স্তব্ধ করে কি কেউ বসে আছে? আমার কেন তবে সব স্তব্ধ হবে? কী যুক্তি এর পেছনে?

এ অবধি আমার সঙ্গে যে কাউকেই দেখা করতে দেওয়া হয়নি তা নয়। দেওয়া হয়েছে, তবে যেভাবে দেওয়া হয়েছে তা ভয়ংকর। ফাঁসির আসামি বা বড় কোনও ক্রিমিনালের বেলায় সম্ভবত এমন করা হয়। আমি যদি কারও সঙ্গে দেখা করতে চাই, যারা আমাকে এই জায়গায় রেখেছেন, তাঁদের কাছে বলতে হবে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে চাই আমি। সেই একজনটি কে, কোথায় বাড়ি, কী করেন, ইত্যাদি নানা কিছু জেনে তারা যথাস্থানে আমার লিখিত বা মৌখিক আবেদন জানিয়ে দেবেন। ওখানে আমার ব্যাপারে। যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁরা কারা আমি জানি না, কয়েকদিন সময় নেবেন। দিন কয় পর আমার আবেদনের উত্তর তারা জানিয়ে দেবেন, দেখা হবে অথবা দেখা হবে না। বেশির ভাগ আবেদনকেই দেখা না হওয়ার কাতারে ফেলে দেওয়া হয়। যদি তারা দেখা করানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে কবে কখন কোথায় কতক্ষণের জন্য দেখা হবে, তার নির্দেশ তারাই দেন। এসবে কোনও স্বাধীনতা আমার নেই। তারপর দেখা করার যে দিনক্ষণ যা তাঁরা নির্ধারণ করেন, সেই অনুযায়ী আমাকে একটি কালো কাঁচ গাড়িতে ওঠানো হয়, গাড়িকে একটি তৃতীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, ওখানে আমাকে বসানো হয়। আমার যে বন্ধুর সঙ্গে আমি দেখা করবো, তার জায়গা থেকে তাকেও একই ভাবে আরেকটি কালো কাঁচ গাড়ি করে তৃতীয় জায়গায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাদের বেঁধে দেওয়া সময় পর্যন্ত আমি বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে পারবো। কী কথা বলবো, কী করবো তা লক্ষ্য রাখা হবে। রোমহর্ষক এই দেখা হওয়া। কী অর্থ এসবের? যেন আতঙ্কে, যেন ভয়ে, যেন কুণ্ঠায় আমি কুঁকড়ে থাকি। যেন মরে যাই? যেন দেশ ছেড়ে চলে যাই এসব আর সইতে না পেরে? এ ছাড়া আর কী? এ ছাড়া আর কিছুই না।

কিন্তু এ দেশ ছেড়ে আমি যাবো না। যাবো না কারণ এ দেশ ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কোনও দেশ নেই যে দেশকে আমি নিজের দেশ বলে ভাবতে পারি। এ দেশে সবচেয়ে বড় হুমকি পাওয়া মানুষ আমি নই। হুমকি পৃথিবীর যে কোনও দেশেই যে কেউ দিতে পারে। আজ তেরো বছর আমাকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। যতনা আমি মৌলবাদের হুমকির শিকার, তার চেয়ে বেশি আমি মৌলবাদ -তোষণের রাজনীতির শিকার। আমাকে মৌলবাদীরা বাংলাদেশ থেকে বের করেনি, বের করেছিল বাংলাদেশ সরকার। আমাকে আজও যে দেশে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না, তা কার নির্দেশে? কোনও মৌলবাদীর নির্দেশ এ নয়, এ সরকারের নির্দেশ। আমি বিশ্বাস করি না সরকার আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বাংলাদেশ সরকার নিজেদের নিরাপত্তার কথাই ভেবে এসেছেন বরাবর।

আমি ভারতকে বাংলাদেশ বলে ভাবতে চাই না। যেটুকু নিরাপত্তা আমার দরকার, সেটুকু দিয়ে আমাকে স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপন করতে দিতে, আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, ভারত সরকার পারেন। আমার কারণে কোথাও দাঙ্গা বাধবে, মানুষ মরবে, এসব আশংকা সম্পূর্ণই অমূলক। এসব আতঙ্ক তৈরি করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল, আছে। আমার কারণে কোনওদিন পৃথিবীর কোথাও দাঙ্গা লাগেনি। কোনও লেখকের কারণে দাঙ্গা কোথাও লাগে না। কিছু মৌলবাদী আমার দ্বিখন্ডিত বইটির অংশ নিয়ে আপত্তি করেছেন। বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার আগে, এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে হাইকোর্ট বইটিকে মুক্তি দেওয়ার পর বইটি বাজারে বিক্রি হয়েছে, নির্বিঘ্নে, একটি দিনের জন্য বইএর বিরুদ্ধে কোনও বিক্ষোভ দেখায়নি কেউ। দাঙ্গার ভয় আমাকে অনেক দেখানো হয়েছে। ভয় দেখিয়ে আমাকে তাড়াবার চেষ্টা অনেক হয়েছে। আমি শুধু এই কথা বলতে চাই, আমি দোষী নই। আমি এও বলেছি, যে, আমি কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু লিখিনি, যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন আমি দুঃখিত। দ্বিখন্ডিত থেকে, নিজের লেখা বই থেকে দুটো প্যারাগ্রাফ বাদ দেওয়ার পর জামাতুল উলেমা হিন্দের প্রধান মৌলানা মাদানি, যিনি আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার প্রচুর করেছেন, তিনিও বলছেন, ব্যস, ম্যাটার ক্লোজড, তসলিমা এ দেশে থাকতে পারেন, যে শহরে তার থাকার ইচ্ছে থাকতে পারেন, আমরা আর বিরোধিতা করছি না। তবে কোন বিরুদ্ধ-শক্তি আমাকে কলকাতায় যেতে বাধা দিচ্ছে?

ইমাম বরকতি আর ইদ্রিস আলী সেদিন আস্কারা পেয়ে চেঁচিয়েছেন। মনে আছে, সেই দুহাজার ছয় সালে, ইমাম বরকতি ফট করে মনের সুখে একটা ফতোয়া দিয়ে ফেলেছিলেন, মাথা নাকি কিসের যেন একটা দামও ঘোষণা করে ফেলেছিলেন, তারপর পুলিশ কমিশনার প্রসূন মুখার্জি তাঁর ঘরে ইমামকে ডেকে নিয়ে কিছু তাঁকে বোঝালেন, ঘর থেকে বেরিয়ে ইমাম বরকতি পুরো অস্বীকার করলেন ফতোয়ার কথা, তিনি নাকি আদৌ কোনও ফতোয়াই দেননি। ইমাম বরকতি বা ইদ্রিস আলীকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়ার আজ কেউ নেই কেন? দাঙ্গা বাধাবার, ফতোয়া দেওয়ার, সন্ত্রাস করার অধিকার যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারওরই থাকার কথা নয়, সে কথা তাদের বোঝাবার কেউ নেই আজ। সন্ত্রাস করার পর যদি তাদের সংবর্ধনা জোটে, তাহলে কেনই বা তারা বিরত থাকবে সন্ত্রাস থেকে? এও তো কথা।

কী অন্যায় করেছি আমি? হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাইকে আমি মানুষ হিসেবে দেখি। এ কি অন্যায়? মানুষের মধ্যে আমি সমতা চাই। মানবতার জন্য, সমানাধিকারের জন্য আমি নিরলস লিখে যাচ্ছি। মৌলবাদী, রক্ষণশীল, অনুদার, সংকীর্ণমন-লোকেরা আমার বিরুদ্ধে বলছে, তারপরও আমি লিখে যাচ্ছি মানুষের জন্য, মানুষের কথা। যে মানুষ দারিদ্রের শিকার, শিক্ষা স্বাস্থ্য থেকে বঞ্চিত, ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের কারণে যার মানবাধিকার লঙ্খন করা হয়, তার পাশে আমি চিরকাল দাঁড়াই। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানের পাশে আমি ঠিক একইভাবে দাঁড়াই, যেভাবে দাঁড়িয়েছিলাম বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুর পাশে। ইসলাম নিয়ে রাজনীতি করার অসৎ উদ্দেশ্যে যে স্বার্থান্বেষী মৌলবাদীরা তাদের গলা চড়াচ্ছে, তারা কোনও কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের প্রতিনিধি নয়।

এখনও কি চিহ্নিত করার সময় আসেনি কে সমাজের শত্ৰু, কে নয়? এখনও কি এই অযৌক্তিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আমার সময় আসেনি? মানবতার জন্য লিখে, চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে লিখে, নিজের মত প্রকাশ করে আমি কি তবে ভুল করেছি এই ভারতবর্ষে? কী অন্যায়ের শাস্তি আমাকে ভারত সরকার দিচ্ছেন? পুরো ভারতবাসী কি তাহলে দেখবে যে –যন্ত্রণায়, কষ্টে, স্বাসকষ্টে, হতাশায়, শূন্যতায় ভুগতে ভুগতে, অন্ধকারে, সবার চোখের আড়ালে পড়ে থেকে যেন ধীরে ধীরে আমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই? দেশহীন, রাষ্ট্রহীন, রাজ্যহীন, সমাজহীন, বান্ধবহীন হয়ে যেন আমি মরে যাই? কী অপরাধ করেছি আমি, যার শাস্তি এই সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমাকে দিচ্ছে? রাজনীতি আমি কোনওদিনই করিনি। আমি রাজনীতি বুঝিও না। একজন লেখককে নিয়ে রাজনীতি, অনুরোধ করছি, বন্ধ করা হোক। একজন লেখককে দেওয়া হোক লেখার পরিবেশ, মুক্তচিন্তার পরিবেশ। একজন লেখককে দেওয়া হোক নির্ভয়ে লেখার অধিকার। আমার বিনীত অনুরোধ এই। এই দেশের কাছে, এই রাষ্ট্রের কাছে আমার এই একটিই চাওয়া। সেই আদিকাল থেকে যে মানুষই আশ্রয় চেয়েছে, ভারতবর্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছে। ভারতবর্ষের এই মহান উদার ঐতিহ্য নিয়ে আমি গৌরব করি। এই ভারতবর্ষ নিয়ে লেখক হিসেবেও আমি যেন বাকি জীবন গৌরব করতে পারি।

আপনারা যারা আজ আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, যারা আজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সমবেত হয়েছেন, তাঁদের আমি অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের কাছে করজোড়ে আমি বলছি, আমাকে উদ্ধার করুন আপনারা। নিরন্তর মানসিক যন্ত্রণা থেকে আমাকে বাঁচান। আপনারাই আমার আত্মীয়, বন্ধু। জগতে আপনারা ছাড়া আমার কোনও স্বজন নেই। শুভবুদ্ধির মানুষের চেষ্টায় আমি কোনও একদিন মুক্তি পাবো, এই বিশ্বাসে আমি এখনও এখানে শ্বাস নিচ্ছি। এই একটি আলোই, এই একটি আশাই এখন আমার সামনে। বাকি সব অন্ধকার।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *