০৬. এর প্রায় ছমাস পরের কথা

এর প্রায় ছমাস পরের কথা। দীর্ঘদিন জ্বরে ভুগে স্বাস্থ্যের জন্য ফারুক গিয়েছিল কক্সবাজারে মাসখানেকের জন্যে। সেখান থেকে ফিরে এসে কথাটা শুনল। কিছুই সে জানে না। তাহমিনাও তাকে জানায়নি। তাহমিনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে সুন্দরবনের টিম্বার মার্চেন্ট আবিদ চৌধুরীর সাথে। আসছে মাসের পনেরো তারিখেই বিয়ে।

প্রথম যখন কথাটা শুনলো ফারুক, তখন কিছুই মনে হয় নি তার। কিছুই ভাবতে পারেনি। অবিশ্বাসও করেনি। যেন কথাটা তার জানাই ছিল। যেন সে সব কিছুই জানতো। কিন্তু সেদিন রাত্রে সে পরিষ্কার করে পাতা নিখুঁত বালিশ সাজানো বিছানায় গিয়ে শুতে শুতে অনুভব করল, হঠাৎ কোথায় যেন কী ভুল হয়ে গেছে। স্থির একপাশে মুখ ফিরিয়ে সে ভাবল। সে কিছুই ভাবতে পারল না। তাহমিনা কেন তাকে কিছুই লিখল না? এই কথা বারবার তার বুকের ভেতরে অশান্ত হয়ে রইল। একটা দম আটকানো শক্ত কিছু যেন গড়ে উঠলো ভেতরে, ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে চুপচাপ পড়ে রইল বিছানায়, অন্ধকারে।

দুদিন বেরুলো না কোথাও। যেন তার সব কাজ ফুরিয়ে গেছে, আর কিছুই করবার নেই।

বারান্দায় মিষ্টি রোদে ইজিচেয়ার টেনে বসে রইল সামনের দিকে তাকিয়ে। মা এসে একবার বললেন, কিরে এখনো ভালো লাগছে না তোর?

কই নাতো। ভালো হয়ে গেছি আমি।

ফারুক হেসে উত্তর করল মার দিকে তাকিয়ে।

 তাহলে বেরোস না যে কোথাও?

কোথায় আর যাবো মা? পাশ করেছি। কাজের জন্য দরখাস্ত করেছি। উত্তর না এলে আর নড়ব কোথায়?

তোর যত সব সৃষ্টিছাড়া কথা। কেন দুদণ্ড বাইরে বেরুলে ক্ষতিটা কী? এমন করে বসে থাকলে শরীরটা যে ভেঙে ফেলবি বাবা।

মাত্তর দুদিন তো এসেছি। এই মধ্যেই কী বেরুবো? যেতে দাও আর কটা দিন, তারপর। মা ক্ষুণ্ণ হয়ে চলে যান। ফারুক তার দিকে তাকিয়ে থাকে। পায়ের কাছে এখনো শূন্য চায়ের কাপ পড়ে রয়েছে। বিনষ্ট। রোদে দেখাচ্ছে উজ্জ্বল। কিন্তু দূরে পাচিলের ওধারে শিরীষের ডালে বাতাসের অগুনতি খুশি। না সে আর দেখা করবে না তাহমিনার সাথে। ভুলে যাবে তাকে। তাহমিনা যদি তার জীবনে না আসতো কোনদিন, তাহলে সে কী করতো? ও ভাববে এখন থেকে তাহমিনা বলে কাউকে সে কোনদিন চিনত না। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো আত্মপ্রবঞ্চনা করছে সে।

না, এ তার আত্মসংযম–ফারুক ভাবলো। আর এমনি হাজারো ভাবনার ভেতরে একটা অনুভূতিই স্থির হয়ে রইল ব্যথাবিদ্ধ তারার মত, সে আজ থেকে একেলা। কোথাও যাবার নেই। করবার নেই। কথা বলবার কেউ নেই। সে নিঃসঙ্গ।

তারপর যখন দুপুর হলো শিরীষ ডালের ওপর, তখন ফারুক ঠিক করল তাহমিনার সাথে সে দেখা করবে। জিজ্ঞেস করব সঃ কিছু। চুপ করে সে থাকবে না।

একটু পরেই বেরুলো সে। মা বললেন, কিরে বেরুচ্ছিস বুঝি?

হ্যাঁ, তুমিই তো তখন বলছিলে, তাই।

মা হাসলেন। ফারুক বেরিয়ে এলো।

তোপখানা রোডে প্রেসক্লাব পেছনে রেখে তার রিকশা মোড় নিল, সেই ছোট্ট বেগুনি ফুলের বিরাট গাছটার পাশ দিয়ে। পাসপোর্ট অফিস পেরিয়ে সারকিট হাউসের কাছে এলো রিকশা। আর কিছুক্ষণ গেলে পরেই পৌঁছুবে সে তাহমিনাদের একতলার সামনে। এই মুহূর্তে হঠাৎ এক বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা কিংবা হয়ত শংকা তাকে ভর করল।

ছেড়ে দিল বিকশা। তারপর আবার উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল সে।

.

সেদিন দুপুরেই অপ্রত্যাশিতভাবে তাহমিনার সাথে মুখোমুখি হয়ে গেল ফারুক ইউকালিপটাস এভেন্যুর ওপর। ফারুক হাঁটতে হাঁটতে উদ্দেশ্যহীন এসে পড়েছে এখানে। আর তাকে দূর থেকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়েছে তাহমিনা! ভার্সিটি থেকে ফিরছিল। কোলের ওপর বই আর খাতা—-লাল মলাট দেয়া। পরনে সাদা সিফনের শাড়ি। পিঙ্কের ওপর বৃটি ভোলা কনুই অবধি চোলি। পায়ে কর্ক টম স্যাণ্ডেল। মুখে তার ক্লান্তির ছায়া। অলস এলানো বেণি। চোখে সেই দীপ্তি দেখতে পেল না ফারুক।

কিছুক্ষণ তারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল নীরবে। দ্রুত শ্বাসের তালে দুলে উঠল বুঝি তাহমিনার উন্নত বুক। সে পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু আর কম্পিত গলায় শুধালো, কবে এলে?

ফারুক কিছুই বলল না। যেন একটি মুহূর্তে অতিবাহিত হলো পৃথিবীর অনন্ত উত্থান ও পতনের সংকেত। শেষ অবধি বলল, কয়েকদিন।

আমাকে খবর দিলে না কেন?

সব কি সত্যি তাহমিনা?

তাহমিনা বুঝি মাথা দোলাতে চাইল কী বলতে গিয়ে। থামল। তারপর বলল, এস কোথাও বসিগে। বলছি।

চুপচাপ পাশাপাশি দুজনে হেঁটে উঠে এলো রমনা রাদেবুতে। একটা কেবিন বেছে নিয়ে বসল। ফারুক শুধালো, কি বলব?

যা খুশি। আমি কিছু খাবো না।

কেন?

আচ্ছা বলো। সামান্য কিছু।

ফারুক অর্ডার দিল পটেটো চিপস আর লেমন ড্রিঙ্ক।

চিপস এলো। কিন্তু একটাও ছুঁলো না কেউ। তাহমিনার আনত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল ফারুক। তারপর হঠাৎ ছেলেমানুষের মত বলে উঠল, আমার কথা একবার ভাবলে না মিনু? আমি কি করব, ভেবে দেখলে না? উত্তরের প্রতীক্ষায় সে চুপ করল। কিন্তু তাহমিনা কিছুই বলতে পারল না। ফারুক নিজের হাত টেনে নিয়ে গলা খাদে নামিয়ে বলল, তুমি আমার দিকে তাকাও তাহমিনা। জানি, তুমি তাকাতে পারবে না।

তাহমিনা এবার চোখ তুলল। তাকাল তার পরিপূর্ণ স্বচ্ছ দৃষ্টি মেলে। বলল, সব সত্যি ফারুক। কিন্তু আমি কী করব? আমাকে দুঃখ দিও না।

তুমি কিছুই করতে পারতে না?

কী করতে পারতাম?

তাহমিনা!

আমার কোন উপায় ছিল না

ছিল, তুমি সব করতে পারতে।

তাহমিনা চোখ নিচু করল। পেন খুলে খাতার ওপর হিজিবিজি কাটল খানিক। তাকিয়ে রইল সেদিকে। তারপর উচ্চারণ করল, দোষ আমাকে দিতে চাও, দাও। আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু আমাকে তুমি বোকো না ফারুক। উপেক্ষা করতে চাও, কোরো। ভুলে যেতে চাও, যেও। কিন্তু আমাকে তুমি ঘৃণা কোরো না।

বেশ, করবো না।

আমি কী করতে পারতাম বলো? বাবা ভারী দুঃখ পেতেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি কোন কথা বলতে পারি নি। বাবাকে আমি অসুখী করব কি করে? আমি কী করব? এ আমার হয়ত আত্মহত্যা, তুমি বুঝতে পারবে না ফারুক।

এইখানে আর বলতে পারল না সে। ঝুপ করে টেবিলে রাখা দুহাতের ভেতর মুখ নামিয়ে নিল। কান্নার মুদ্রায় কেঁপে উঠল তার পিঠ, কাঁধ। ফারুক বাঁ হাতের তেলোয় ন্যস্ত করল তার কপালের ভার। একটু পরে বলল, মিনু মুখ তোলো। সকলে কী ভাববে? ওঠ।

মুখ তুলল তাহমিনা। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুছে নিল এক ফোঁটা অশ্রু। সরিয়ে দিল কপালের ওপর পড়ে থাকা একগুচ্ছ চুল। চিবুকের ভাঁজ একবার কেঁপে উঠল। গালে তার ছোট্ট টোল উঠেই মিলিয়ে গেল।

সামান্য কিছু চিপস মুখে দিয়ে সরিয়ে রাখল চিপসের রেকাবি। ফারুক টেনে নিল লেমনের গ্লাশ। দীর্ঘ ফিনফিনে কাঁচের গ্লাশে স্বচ্ছ সবুজ ড্রিঙ্ক। ছোট ছোট বুদবুদ উঠছে। ভেতরে কাঁচের গায়ে লেগে রয়েছে। দুএকটা এখুনি মিলিয়ে গেল। আর কী অদ্ভুত স্বচ্ছতা। মসলিন জমিনের মত। ফারুক হাত রাখল গ্লাশের পিঠে। আর সেই পানীয়ের শীতলতা মুহূর্তে প্রবাহিত হয়ে গেল তার স্নায়ুর গতীরে। সে অসম্ভব জোর দিয়ে গ্লাশটা আঁকড়ে ধরে বলল, অদ্ভুত শিশুকণ্ঠে, আমি তোমাকে বিয়ে করব তাহমিনা।

সে আর হয় না ফারুক।

কেন হয় না?

ওকথা শোনাও আমার পাপ এখন। তুমি বোল না।

তুমি বলতে পারলে মিনু! কিন্তু আমি যে কোনদিনই তা ভাবতে পারব না। আমি তোমাকে—-

তোমার পায়ে পড়ি ফারুক।

ফারুক গ্লাশ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল।

তাহমিনা ভাবল, আমাকে তুমি ভুলে যেও ফারুক। আমাকে তুমি, তোমার ঈশ্বরের মত জড়িয়ে ধরে রাখতে চেয়ো না। আমি জানি তুমি কষ্ট পাবে। কিন্তু আমি কী করব? আমি কী করতে পারতাম ফারুক? বিশ্বাস করবে যা তুমি, আমি কত অসহায়, কত রিক্ত! যদি আমাকে ঘৃণা করেও তোমার মুখ বালিশে মিগ্ন থাকতে পারে তবু ভালো, কিন্তু আমাকে বাসনা করে যেন বিন্দ্ৰি না থাকো। তাহমিনা মুখে শুধু বলল, তুমি রাগ করেছ ফারুক।

না রাগ করব কার ওপর? কিন্তু জানো তাহমিনা, সত্যি করে বলছি, তোমার হাত ছুঁয়ে বলছি, তুমি যেখানেই থাকো যার কাছেই যাও, চিরকাল তোমার কথা আমি মনে করব। কোনদিন ভুলব না।

তুমি মনে কর তোমাকে আমি ভুলে যাবো?

কী জানি।

না আমি ভুলব না ফারুক।

তুমি ভুলে যাবে তাহমিনা। না মিনু, যে মনে রাখা পাপ, তা ভুলে যাওয়াই ভালো।

দুজনেই চুপ করে ভাবল খানিক। এক সময় তাহমিনা বলল, এখন কেমন আছো?

ঠিক তেমনি।

ফারুক নির্লিপ্ত সুরে অন্যমনে উত্তর করল তার।

কক্সবাজারে গিয়েও ভালো হলো না?

কিছুটা। কিন্তু ওকথা তুমি শুধিও না তাহমিনা।

কেন ফারুক?

তুমি কি তা বোঝো না?

বুঝি। এ অধিকারও তুমি আমার মুছে দেবে?

আমি তো কেউ নই মিনু।

তাহমিনা কোনো কথা বলল না এর জবাবে। শুধু মাথা নিচু করল একবার, উবু হয়ে ঝুঁকে পড়ে ঠিক করে নিল স্যাণ্ডেলের স্ট্র্যাপ। কেউ তাকে বুঝবে না। তারপর আবার সেই নিস্তব্ধতা। নিশ্চল দুজনে। যেন দুজনের কথাই ফুরিয়ে গেছে। চুপ করে থাকা ছাড়া যেন আর কোন ভাষা নেই। তাহমিনা আর ফারুক মুখোমুখি তেমনি গভীর নীরবতায় ডুবে রইল। বহুক্ষণ সেই কেবিনে। ফারুক মাথা তুলে বলল, আমি কোনদিন ভাবিনি এমন হবে। প্রথম এসে যখন শুনেছি তখন যে আমার কী হয়েছিল তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না তাহমিনা। আজ গিয়েছিলাম দেখা করতে তোমাদের ওখানে। কিন্তু মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছি। কেন জানো? তোমাকে আমি বিব্রত করতে চাইনি, তুমি যে আমার আপন। দৈবে দেখা না হলে হয়ত আর কোনদিন আমাদের দেখা হতো না। ফারুকের স্বর শোনাল ফিসফিস, যেন স্বগত উচ্চারণ করছে সে। এখানে সে একটু থামল। তারপর বলল, তুমি আমাকে কিছুই লিখলে না কেন তাহমিনা?

তাহমিনার গলা ভারী হয়ে এলো। উত্তরে বলল, তুমি মনে কর এ বিয়েতে আমি খুশি হয়েছি? ফারুক চুপ করে রইল।

তোমার যা খুশি মনে করতে পার ফারুক, দুঃখ রইল, বুঝলে মা। আমি কী করে তোমায় লিখতাম? কী করতে পারতাম? আর সে কিছুই উচ্চারণ করতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল।

পর্দা সরিয়ে এলো বেয়ারা নিয়ে গেল রেকাবি আর গ্লাশ। তাহমিনা বারেক চোখ বুজলো। ফারুক এতক্ষণ পরে একটা সিগারেট ধরালো। ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে অ্যাসট্রেতে ডুবিয়ে দিল কাঠিটা। বলল, যাবার সময় হয়ে এল তাহমিনা। তুমি ভুল বুঝবে না। দোষ আমি কাউকে দেব না। তুমি কি করতে পারতে? সে আমি জানি। চল উঠি।

হ্যাঁ।

এই হয়ত আমাদের শেষ দেখা।

তাহমিনা চোখ নিচু করে বই ভ্যানিটি ব্যাগ গুছোলো। তারপর বলল, একটা কথা তোমায় বলব?

বলবে।

আমার কথা তুমি মনে রেখ। কোনদিন যে চিনতে সে কথা মনে রেখ।

সেও আমার পাপ। এ অন্যায় মিনু।

আর, যদি কোনদিন আমাদের দেখা হয়, তাহলে বলো মুখ ফিরিয়ে নেবে না।

আমি কিছুই বলতে পারছি না তাহমিনা। আমি কিছুই বলতে পারছি না।

একটু পরে ও বলল, মা তোমাকে ডেকেছিলেন। একবার যেও। শুনেছেন তুমি শীগগীরই ফিরবে।

কেন?

জানি না।

এরপর আর কোনো কথা হয় নি তাদের। দুজনে যখন উঠে দাঁড়িয়েছে তখন হঠাৎ পরস্পর থমকে দুজনের মুখের দিকে অপলক তাকিয়েছে। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। আর সেই এক পলেই যেন কেটে গেল এক বিশাল সময়। তাড়াতাড়ি পা বাড়ালো তাহমিনা। পেছনে এলো ফারুক। আর তারা কথা বলল না। আর কেউ কারো দিকে তাকাতে পারল না।

.

কয়েকদিন পরেই সে গিয়েছিল তাহমিনাদের বাসায়। তাহমিনা ছিল বাসাতেই। কিন্তু সমুখে আসেনি। মালেকাবাণুও প্রথমে কিছুই বলেন নি ওর বিয়ের কথা। ঠিক আগের মতই আদর করে চা করে এনে দিলেন ফারুকের জন্য। বসে বসে এটা সেটা জিজ্ঞেস করছিলেন। আর তার অসুখের কথা।

ফারুক জানতো একসময় সেই কথা উঠবে, আর তখন সে কি পারবে নিজেকে ধরে রাখতে? বিয়েতে এসো ফারুক। আসবে তো?

এত মিষ্টি করে তিনি বলেছিলেন যে তা আজো সে ভুলতে পারবে না। আর তার স্বর এত স্নেহগভীর যে সে বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু উত্তরে মিছে করে বলেছে, ঢাকায় সে তখন থাকবে না। সিলেটের এক চা বাগানে কাজ পেয়েছে, এ মাসেই জয়েন করবে। মালেকাবাণু আর কিছু বলেন নি ওকে। তার কাছ থেকেই ফারুক শুনলো, তাহমিনা অনার্স ছেড়ে দিয়ে পাস দিচ্ছে। আর শুনলো আবিদের কথা।

সুন্দরবনের টিম্বার মার্চেন্ট আবিদ চৌধুরী, তার দাদার সময় থেকে এই কারবার ছিল বার্মায়। বাবা তার সম্প্রসারণ করেছিলেন সুন্দরবন অবধি। বিয়াল্লিশের বোমার পর বার্মা ছেড়ে তিনি চলে আসেন। আবিদ রেঙ্গুনে নি এম.কম পড়ত। সমস্ত পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বোমায়। শুধু তারা দুজন পালিয়ে এসেছিল বাঙলা মুলুকে। সেই শোকের ভার সইতে পারেন নি বৃদ্ধ আবিদেব বাবা। দেড় বছর পাই একমাত্র ছেলে আবিদের হাতে কয়েকলাখ টাকা আর বিরাট ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে মারা নি তিনি। তারপর সাত বছর কেটে গেছে। দিনরাত অমানুষিক খেটে সেই ব্যবসা দিনে দিনে বাড়িয়েছে আবিদ। একদিনের জন্য বিশ্রাম নেয় নি। দেশের এ মাথা ও মাথা চষে বেড়িয়েছে সে কারবারের জন্যে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মজুবদের তদারক করেছে। বন্দরে গেছে। কোম্পানির প্রায় প্রৌঢ় ম্যানেজার আশরাফ মাঝে মাঝেই অনুরোধ করেছে, এমনি করে আর কতদিন, এবারে তার সংসারি হওয়া দরকার। সে কথায় সে কান দেয় নি। হেসে উড়িয়েছে। তারপর বছর দুএক বাদে আশরাফ গোঁ ধরে বসেছে, এবার তাকে বিয়ে করতেই হবে। সে নিজে সব ঠিক করবে, তার কিছু ভাবতে হবে না।

এবারে আবিদ না করতে পারেনি। আশরাফ ব্যবসা সূত্রে ঢাকায় আসা যাওয়া করত। সেই থেকে জাকির সাথে আলাপ তার ফার্মে। তারপর আশরাফ আর আবিদ এসেছিল তাহমিনাকে দেখতে। সেই দিনেই বিয়ের কথা ঠিক হয়ে যায়। এত তাড়াতাড়ি যে হয়ে যাবে। তা কেউ ভাবতে পারে নি।

মালকাবানু উঠে গিয়ে আবিদের ছবি এনে দেখালেন।

তারপর তিনি আবার বললেন, ফারুক বিয়ের সময়ে ঢাকায় থাকলে খুশি হতেন। কিন্তু ফারুক উত্তর সেই একই দিয়েছে।

উঠে আসবার সময় পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে এসেছে ফারুক। দোয়া করুন তিনি, চাকরিতে যেন তার ভালো হয়। মালেকাবাণু প্রাণ খুলে প্রার্থনা করলেন আল্লার দরগাহে। গেটের কাছে এসে ফারুক অনুভব করতে পারল অন্ধকার বারান্দায় তাহমিনা এসে দাঁড়িয়েছে। সে আর তাকাল না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *