০৬. সকলের জবানবন্দি নেওয়া

তাহলে এবার ওদের সকলের জবানবন্দি নেওয়া যাক, কি বলেন মিঃ রায়? কথাটা বলে মণীশ চক্রবর্তী কিরীটীর দিকে তাকালেন।

নিন না। তবে আপনি যদি অনুমতি দেন তো—

কি, বলুন?

এই ঘরে আমি—

থাকবেন জবানবন্দি নেওয়ার সময়?

হ্যাঁ।

থাকুন, থাকুন। আপত্তির কি আছে এতে?

ধন্যবাদ। আপনাদের কাছে কত কিছুর শিখবার আছে। কেমন করে আপনারা জবানবন্দি। নেন, তার process–

শিখতে চান? বেশ, বেশ। কিউরিয়সিটি থাকা ভাল–ওতে জ্ঞানবৃদ্ধি পায়।

কিরীটীর বোধ হয় নোকটার পাকামি সহ্য হচ্ছিল না, তাই বললে, হ্যাঁ, আপনাদের বর্তমান আই.জি. মিঃ মল্লিক তাই বলেন।

মিঃ মল্লিক! তাঁকে আপনি চেনেন নাকি? সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় মণীশ চক্রবর্তীর কণ্ঠস্বরে।

সুকান্ত মল্লিক আমার বিশেষ বন্ধু।

আ–আপনার বন্ধু আমাদের বড়সাহেব, তা এ কথাটা এতক্ষণ বলেননি কেন?

আপনার কাছে কি সেকথা বলতে পারি?

পারবেন না কেন? হাজারবার পারেন। তা আপনি দাঁড়িয়ে কেন-বসুন। মণীশ চক্রবর্তীর কণ্ঠস্বর ও চেহারা যেন সম্পূর্ণ পাল্টে যায় মুহূর্তেই, ভদ্রলোক যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ।

কুণ্ডু মশাই, ও কুণ্ডু মশাই? চেঁচিয়ে ওঠেন মণীশ চক্রবর্তী।

গৃহকর্তা রমণীমোহন কুণ্ডু হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে প্রবেশ করলেন, কিছু বলছিলেন স্যার?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওঁর বসবার জন্য একটা চেয়ার এনে দিন।

এখুনি এনে দিচ্ছি স্যার।

হ্যাঁ, তারপর পাল মশাইকে এ ঘরে পাঠিয়ে দিন।

রমণীমোহন কুণ্ডু যেমন হন্তদন্ত হয়ে এসেছিলেন, তেমনি আবার হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে গেলেন ঘর থেকে।

মিঃ চক্রবর্তী?

বলুন।

আমি যদি আপনার জবানবন্দি নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দু-একটা প্রশ্ন করি?

একশোবার করবেন। হাজারবার করবেন।

কিরীটী মনে মনে হাসল, চাকরির কি মহিমা! আই.জি. সুকান্ত মল্লিকের সঙ্গে আলাপ আছে শুনেই মণীশ চক্রবর্তী একেবারে যেন বিনয়াবনত, বশংবদ।

.

আরও মিনিট দশেক পরে।

প্রথম জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছিল দলের অধিকারী রাধারমণ পালের। মণীশ চক্রবর্তী প্রশ্নাদি করবার পর কিরীটী মুখ খুলল।

পাল মশাই, শুনেছি হরিদাস সামন্ত একদিন আপনার পার্টনার ছিলেন, তাই না?

হ্যাঁ।

তা পার্টনারশিপ ছেড়ে দিলেন কেন?

আপনি তো তার বন্ধুজন ছিলেন, জানেন না তার চরিত্রের কথা?

দীর্ঘদিন দেখা-সাক্ষাৎ ছিল না—

ওর দুটি বিশেষ ব্যাধি ছিল।

ব্যাধি?

হ্যাঁ। একটি মদ্যপান, আর—

আর?

স্ত্রীলোক সম্পর্কে ওর একটা বিশ্রী দুর্বলতা, তাই তো–

কি?

একের নম্বরের যাকে বলে লম্পট। ঐ দুটি রোগই ওর সর্বনাশ করেছিল। নচেৎ অভিনয়-প্রতিভা যেমন ছিল লোকটার তেমনি অন্য দিক দিয়ে সৎও ছিল। কিন্তু ঐ যে মদ্যপান ও স্ত্রীলোক-ব্যাধি, সর্বগুণ হরে নিয়েছিল। নইলে মনে করুন কিনা, সুভদ্রা মেয়েটা তো ওর মেয়ের বয়সী, না কি–

বাধা দিল কিরীটী, থাক ওকথা। আচ্ছা সবার আগে আপনিই তাহলে সামন্ত মশাইকে মৃত আবিষ্কার করেন?

আজ্ঞে।

এ ঘরে কি করতে এসেছিলেন, উনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন।?

না।

তবে?

কিছু টাকা চেয়েছিলেন, সেই টাকা দিতে এসেই তো—

আপনি ঘরে ঢুকে দেখলেন, ঐভাবে বসে আছেন?

হ্যাঁ, প্রথমটা তো বুঝতেই পারিনি, তারপর—

পাল মশাই?

আজ্ঞে?

নাটকের শেষ দৃশ্যে ছিল ভৃত্য গিয়ে আসরে খবর দেবে কর্তবাবুর মৃত্যু হয়েছে, তাই না?

হ্যাঁ।

ভৃত্য কে সেজেছিল?

ভৃত্য যে সাজত সে অনুপস্থিত আজ। তাই দোলগোবিন্দবাবুকে বলেছিলাম। দ্বিতীয় অঙ্কের পর তার তো পার্ট ছিল না, তাই বলেছিলাম সে-ই যেন ভৃত্যের মেকআপ নিয়ে আসরে গিয়ে কথাগুলো বলে আসে।

পাল মশাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিরীটী বললে, কিন্তু তিনি তো যাননি।  

যাননি! সে কি! দোলগোবিন্দবাবু যাননি?

 না। ফলে যা হবার তাই হয়েছিল। নাটকটি শেষ হতে পারেনি। কিরীটী অতঃপর দৃশ্যের শেষ ব্যাপারটা খুলে বললে।

দাঁড়ান তো, দোলগোবিন্দবাবুকে ডাকি।

ব্যস্ত হবেন না পাল মশাই, পরেও কথাটা জিজ্ঞাসা করলে চলবে।

কেন গেল না—

এবার আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিন তো?

কি প্রশ্ন?

মণীশ চক্রবর্তী খিঁচিয়ে ওঠেন, যা জানতে চান উনি তার জবাব দিন।

আজ্ঞে?

পাল মশাই? কিরীটী ডাকল, এই ব্যাপারে আপনার দলের কাউকে কি সন্দেহ হয়?

সন্দেহ? সন্দেহ কাকে করব? না না, আমার দলের মধ্যে কেউ এমন কাজ করতে পারেই না। তাছাড়া সামন্ত মশাইকে দলের সকলেই শ্রদ্ধা করত, ভালবাসত, ভক্তি করত।

মণীশ চক্রবর্তী ঐ সময় প্রশ্ন করলেন, শ্যামলকুমার? শ্যা

মলকুমার!

হ্যাঁ, তার সঙ্গে তো শুনলাম সুভদ্রা বলে আপনার দলের মেয়েটিকে নিয়ে সামন্তর সঙ্গে রীতিমত একটা রেষারেষি চলছিল ইদানীং।

না না, রেষারেষি আবার কি! সামন্ত মশাইয়ের অবিশ্যি মনে তাই হয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, সুভদ্রা সেরকম মেয়ে নয়, ওটা সামন্ত মশাইয়ের মনের ভুল। তাছাড়া শ্যামল ছেলেটি যেমন ভদ্র তেমনি ধীরস্থির, এসব খুনখারাপির মধ্যে সে থাকতেই পারে না।

ঠিক আছে। মণীশ চক্রবর্তী বললেন।

কিন্তু পাল মশাই, আমাদের ধারণা, কিরীটী বললে, আপনাদের দলেরই কেউ সামন্ত মশাইকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছে।

এ আপনি কি বলছেন? না না, হয়তো—

কি?

সামন্ত মশাই আত্মহত্যা করেছেন।

আত্মহত্যা!

কেন, পারেন না?

তা পারেন–তবে বোধ হয় তা করেননি। ঠিক আছে, আপনি দয়া করে শ্যামলকুমারকে এখন একবার পাঠিয়ে দিন।

রাধারমণ পাল ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। একটু পরে শ্যামলকুমার এসে ঘরে ঢুকল।

মণীশ চক্রবর্তীই প্রথমে তাকে নানাবিধ প্রশ্ন শুরু করলেন, একটার পর একটা। অবশেষে কিরীটীর দিকে তাকিয়ে একসময় বললেন, ওঁকে জিজ্ঞাসা করবেন নাকি কিছু? জিজ্ঞাসা করবার আর কিছু আছে?

কিরীটী তাকাল শ্যামলকুমারের দিকে।

শ্যামলকুমার যেন কেমন একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছে।

হাতের আঙুলগুলো নিয়ে কেবলই নাড়াচাড়া করছে।

শ্যামলবাবু!

আজ্ঞে?

সুজিতবাবু বলছিলেন তখন—

কি—কি বলছিলেন সুজিতবাবু?

আজকের তৃতীয় অঙ্কের শুরু হবার পর একবার আপনি এই ঘরে এসেছিলেন।

হ্যাঁ, এসেছিলাম। সামন্তদা ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সে কথা তো তখুনি আপনাকে বললাম।

হ্যাঁ বলেছেন, তা কেন ডেকে পাঠিয়েছিলেন তা বলেননি।

সামন্তদার মনে ইদানীং একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল–

জানি। আপনার ইদানীং সুভদ্রা দেবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হবার জন্য। তিনি আদপেই ব্যাপারটা সহ্য করতে পারছিলেন না, তাই না?

হ্যাঁ।

আপনি—আপনি কি করে জানলেন? শ্যামলকুমার প্রশ্ন করে।

জানি। তারপর একটু থেমে—এবার বলুন শ্যামলবাবু, সুভদ্রা দেবীর সঙ্গে সত্যিই কি আপনার–

হ্যাঁ, আমি তাকে ভালবাসি।

আর সুভদ্রা দেবী?

সেও আমাকে ভালবাসে।

হুঁ। তা কি কথা হয়েছিল আপনাদের মধ্যে?

ঘরে এসে ঢুকতেই আজ উনি আমাকে বললেন, শেষবারের মত তোমাকে বলছি শ্যামল, আমাদের ভিতর থেকে তুমি সরে দাঁড়াও, নচেৎ এমন শিক্ষা তোমাকে পেতে হবে যে জীবন দিয়ে তোমাকে তা শোধ করতে হবে।

আপনি কি জবাব দিলেন?

আমি বলেছিলাম, এই জন্যই যদি ডেকেছেন জানলে আসতাম না—যা বলবার আপনি সুভদ্রাকে বলবেন। সে যদি আমাকে না চায় তো আমি নিশ্চয়ই সরে দাঁড়াব।

আর কোন কথা হয়নি?

না।

তারপর আর এ ঘরে আপনি আসেননি?

না।

আচ্ছা, এ ব্যাপারে আপনার দলের কাউকে সন্দেহ হয়?

না।

আর কারও সঙ্গে দলের মধ্যে হরিদাসবাবুর কোন মনোমালিন্য বা ঝগড়াঝাঁটি কখনও হয়েছে বলে জানেন?

সুজিতের সঙ্গে তো ওঁর খিটিমিটি লেগেই ছিল।

তাই নাকি? কেন?

তা জানি না, তবে—

তবে?

এককালে শুনেছি ওর অবস্থা নাকি খুব ভাল ছিল, রেস খেলে ও মদ্যপান করে সব খুইয়েছে। সুজিতবাবু! তাছাড়া–

তাছাড়া?

শুনেছি সুভদ্রাকে ও-ই দলে এনেছিল। একসময় সুভদ্রার সঙ্গে ওর যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতাও ছিল। সামন্তদা আসার পর থেকেই সামন্তদার সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিল সুভদ্রা।

আচ্ছা, সুভদ্রাকে আপনার কি রকম মনে হয়?

খুব ভাল মেয়ে।

আজ পালা শেষ হবার পর রাত্রে সুভদ্রা বলছিল বর্ধমান যাবে। আপনি জানেন সেকথা?

হ্যাঁ, আমাকে ও বলেছিল।

আপনারও সঙ্গে যাবার কথা ছিল কি?

না।

কেন যাবে বলেছিল সুভদ্রা বর্ধমানে, জানেন কি?

তার এক মাসী বর্ধমানে নাকি থাকে, তার অসুখ, তাকেই বলেছিল দেখতে যাবে বর্ধমানে।

আপনাকে সঙ্গে যেতে বলেনি?

বলেছিল, কিন্তু আমি বলেছিলাম যাব না।

ঠিক আছে, আপনি যান, সুজিতবাবুকে একবার পাঠিয়ে দিন।

শ্যামলকুমার চলে গেল।

মণীশ চক্রবর্তী কিরীটীর দিকে তাকালেন, ছেলেটাকে কি রকম মনে হল কিরীটীবাবু?

আপনার কি মনে হল?

গভীর জলের মাছ। তা বাছাধন জানেন না যে আমারও এ লাইনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। তাছাড়া ও সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। এ আপনাকে আমি বলে রাখছি, ঐ—ঐ হচ্ছে—

মণীশ চক্রবর্তীর কথা শেষ হল না। সুজিতকুমার এসে ঘরে ঢুকল।

সুজিতকে প্রথমে মণীশ চক্রবর্তী প্রশ্ন করতে শুরু করলেন।

কিরীটী তখন ঘরের চারিদিকে আবার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ঘরটা ভাল করে দেখা হয়নি। হঠাৎ কিরীটীর নজরে পড়ল, দরজার গোড়ায় একটা সিগারেটের পোড়া টুকরো। কিরীটী গিয়ে নীচু হয়ে সিগারেটের টুকরোটা তুলে নিতে গিয়ে নজরে পড়ল যে চেয়ারের উপরে হরিদাস সামন্তর মৃতদেহটা উপবিষ্ট, তার নীচে কি একটা পড়ে আছে, চকচক করছে।  

মণীশ চক্রবর্তী তখন সুজিতকে নিয়ে ব্যস্ত, সেদিকে নজর দেবার মত অবকাশ ও মন কোনটাই ছিল না। সে তাকালও না কিরীটীর দিকে।

কিরীটী নীচু হয়ে চকচকে বস্তুটি তুলে নিয়ে দেখল একটা শৌখিন গালার চুড়ির ভগ্নাংশ, আয়না কাচের চুমকি বসানো। সেই আয়না কাচের উপরেই আলো পড়ে ঝিলিক দিচ্ছিল।

সিগারেটের শেষাংশটাও পরীক্ষা করল।

চারমিনার সিগারেট এবং সেই সিগারেটটা যে খাচ্ছিল সে নিশ্চয়ই পান খেয়েছিল, কারণ শেষাংশে পানের ছোপ শুকিয়ে আছে।

 দুটো বস্তুই কিরীটী পকেটে রেখে দিল সযত্নে।

 মিঃ রায়—

মণীশ চক্রবর্তীর ডাকে কিরীটী ওর দিকে তাকাল।

ওঁকে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন নাকি?

দু-একটা প্রশ্ন করব। সুজিতবাবু, আপনি বলেছিলেন তৃতীয় অঙ্ক শুরু হবার পর আপনি একবার শ্যামলকুমারকে এ ঘরে আসতে দেখেছিলেন!

হ্যাঁ।

তখন রাত কটা হবে বলে আপনার মনে হয়?

কত আর হবে, রাত সোয়া দশটা কি সাড়ে দশটা।

শ্যামলবাবু এ ঘরে কতক্ষণ ছিলেন জানেন?

তা মিনিট পনের-কুড়ি হতে পারে।

বুঝলেন কি করে? আপনি বুঝি ততক্ষণ দরজার বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন?

তা কেন! আমি—আমি চলে গিয়েছিলাম।

তাহলে জানলেন কি করে শ্যামলবাবু এ ঘরে মিনিট পনের-কুড়িছিলেন?

মানে মিনিট পনের-কুড়ি বাদে এদিকে আসছিলাম, তখন তাকে বেরুতে দেখেছিলাম এই ঘর থেকে।

হুঁ। তাদের পরস্পরের মধ্যে কি কথাবার্তা হয়েছিল বলতে পারেন?

তা কেমন করে বলব! আমি তো আর ঘরে যাইনি।

তা ঠিক। তবে অনুমান তো করতে পারেন?

অনুমান!

হ্যাঁ, অনুমান।

না। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে—

কি?

দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও তো তাদের দু-একটা কথা আপনার কানে আসতে পারে?

না মশাই, তাছাড়া কোথাও আড়ি পাতা আমার অভ্যাস নেই।

হঠাৎ কিরীটী বলে, আপনি খুব পান খান সুজিতবাবু মনে হচ্ছে?

সুজিত একমুখ পান নিয়ে চিবোচ্ছিল। দোক্তাসিক্ত লালচে এবড়োখেবড়ো দুপাটি দাঁত বার করে সুজিত বললে, হ্যাঁ, সর্বক্ষণ পান-দোক্তা না হলে আমার চলে না।

আর কোন কিছুর প্রতি আসক্তি নেই আপনার সুজিতবাবু?

আসক্তি তো অনেক কিছুর উপরেই ছিল, কিন্তু একে একে সবই ছেড়েছি।

তাই নাকি!

হ্যাঁ, বড় বদ অভ্যাস। আর বদ অভ্যাসের উপর একবার আসক্তি জমলে তা সে যেমনই হোক না কেন ছাড়তে বড় কষ্ট হয়।

তা তো হবারই কথা। তা ড্রিঙ্ক-ট্রিঙ্ক করেন না?

একসময় করতাম, এখন পেলে করি, না পেলে করি না, বুঝলেন না—মানে ঐ আর কি, পরের পয়সায় বলতে বলতে সুজিত পানের রসে রাঙানো লালচে দাঁতগুলো বের করে হাসল।

কিরীটীর যেন সে হাসি দেখে গা ঘিনঘিন করে।

আর সিগারেট?

ধূমপান?

পানের সঙ্গে ওটা ঠিক জমে না, বুঝলেন না!

তাই বুঝি?

হ্যাঁ। তবে মিথ্যে বলব না, খাই। মানে ধূমপানে অভ্যস্ত আমি।

কি ব্র্যান্ড খান?

যা পাই।

আপনার পকেটে সিগারেটের প্যাকেট আছে?

হ্যাঁ। সুজিত পকেটে হাত চালিয়ে একটা দোমড়ানো সিগারেটের প্যাকেট বের করল। অর্ধেক খালি বাক্সটার।

কিরীটী সিগারেটের প্যাকেটটা দেখে ফিরিয়ে দিল।

সুজিতবাবু, আচ্ছা হরিদাস সামন্ত পান খেতেন?

সুজিত লালচে দাঁতগুলো বের করে বললে, হ্যাঁ। তবে পাতা পান নয়, বোতল পান করতেন, মাত্রাধিক্যেই।

আর সিগারেট?

হ্যাঁ, তাও খেতেন।

কি ব্র্যান্ড খেতেন বলতে পারেন?

চারমিনার।

আচ্ছা সুজিতবাবু?

আজ্ঞে!

শ্যামলকুমার লোকটি কেমন!

ছুঁচো।

কি রকম?

ছুঁচো যেমন সর্বদা ছোঁকছোঁক করে, তারও অভ্যাসটি তেমনি।

কি রকম? কিসের জন্য ছোঁকছোঁক করতেন?

বুঝলেন না?

না।

স্ত্রীলোক-বুঝলেন, স্ত্রীলোক!

হুঁ। তা এ দলে কোন মেয়ের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল নাকি?

কেন—হরিদাস সামন্ত মশাইয়ের বন্ধু আপনি, শোনেননি তার কাছে কিছু?

না।

তার স্ত্রীলোকটির উপরেই যে নজর ছিল শ্যামলকুমারের!

তাই নাকি? একটু থেমে কিরীটী আবার প্রশ্ন করে, আচ্ছা সুজিতবাবু, হরিদাস সামন্তর সঙ্গে শ্যামলকুমারের কি রকম সদ্ভাব ছিল বলুন তো?

সাপে-নেউলের সম্পর্ক যেমন তেমনি ধরনের সদ্ভাব ছিল বলতে পারেন।

কেন বলুন তো?

ঐ যে একটু আগেই বললাম-বুঝলেন না!

মানে?

মানে সামন্ত মশাইয়ের মেয়েমানুষ ছিল সুভদ্রা, শ্যামলকুমার এসে সেই মেয়েমানুষটিকে হাতিয়ে নিয়েছিল। তার ফলে যা হবার তাই হয়েছিল।

হুঁ। আচ্ছা আর একটা কথা—

কি, বলুন?

আগে তো, মানে শ্যামলকুমার আসার আগে এ দলে বোধ হয় হিরোর পার্ট আপনিই করতেন, তাই না?

করতাম, আর এখনও করতে পারি। শুধু তো মাকাল ফলের মত চেহারাই হলে হয় না মশাই, অভিনয়-বস্তুটি হচ্ছে একটা আর্ট, বুঝলেন, গড়গড় করে তোতাপাখীর মত খানিকটা শেখানো বুলি আওড়ে গেলেই সেটা অভিনয়—acting হয় না। শ্যামল অভিনয়ের কি বোকে? কিন্তু পাল মশাইয়ের কি সে খেয়াল আছে?

আপনার অভিনয় কিন্তু আজ আমার সত্যি চমৎকার লেগেছে।

লেগেছে তো? লাগতেই হবে। আপনাদের মত অভিনয়রসিক বলেই বুঝেছেন?

আচ্ছা, হরিদাস সামন্ত কেমন অভিনয় করতেন?

এককালে ভাল অভিনয়ই করত। কিন্তু ঐ যে মহা দুটি ব্যাধি—মদ আর স্ত্রীলোক, এতেই ওর সর্বনাশ হল।

আপনি বলতে চান তাহলে মেয়েমানুষের জন্যই ওর প্রাণটা গেল?

নির্ঘাত।

মেয়েমানুষটি তাহলে আপনার মনে হয়—

আজ্ঞে হ্যাঁ, আমাদের সুভদ্রা দেবী। সাক্ষাৎ কালনাগিনী, বুঝলেন—বিষকন্যা!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *