০৩. হরিদাস সামন্ত বিদায় নেবার পর

হরিদাস সামন্ত বিদায় নেবার পরই কৃষ্ণা এসে ঘরে ঢুকল।

কেন এসেছিলেন গো ভদ্রলোক?

লোকটা কে জান কৃষ্ণা?

না। ‘এককালে মঞ্চের নামকরা অভিনেতা ছিল, এখন যাত্রার দলে অভিনয় করে। বয়েস হয়েছে। বোধ করি তিপ্পান্ন-চুয়ান্ন হবে?

তা কি চান উনি তোমার কাছে?

কিরীটী সংক্ষেপে হরিদাস-বৃত্তান্ত কৃষ্ণাকে শোনাল।

কৃষ্ণা সব শুনে বললে, বুড়োর এখনও এত রস!

বুড়ো বয়সেই তো রসাধিক্য হয়, বুঝতে পারছ না আমাকে দিয়ে?

তা কিছু কিছু বুঝতে পারছি বৈকি।

অতএব হে নারী, সতর্ক হইও।

বয়ে গেছে আমার।

বটে! এত সাহস!

যাও না, একবার দেখ না চেষ্টা করে।

পাচ্ছি না যে।

ওহো, কি দুঃখ রে!

 দুজনেই হেসে ওঠে।

কিরীটী হরিদাস সামন্তর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই স্থির করেছিল—যাত্রার দলের মানুষগুলো যারা হরিদাস সামন্তর জীবনে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী—বিশেষ করে শ্যামলকুমার ও সুভদ্রা তাদের সে দেখবে। ওদের অফিসে গিয়েও পরিচয় হতে পারে। কিন্তু একজন উটকো লোক দেখলে—বিশেষ করে কোনক্রমে যদি তারা পরিচয় জানতে পারে, তারা হয়ত কিছুটা সচেতন হয়ে যেতে পারে। তাই সে মনে মনে স্থির করে যাত্রার আসরে গিয়ে যাত্রাও দেখা হবে, লোকগুলোকে দেখাও হবে। চাই কি পরিচয়ও হতে পারে।

এবং তাতে করে হয়ত তাদের মনের খবরাখবরও কিছু আঁচ করাও যেতে পারে। সেই ভেবেই চন্দননগরে যেদিন পালাগান সেদিন সেখানে সে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়।

চন্দননগর শহরে এক বনেদী ধনীগৃহের বিরাট নাটমঞ্চে যাত্রার আসর বসেছে।

আর সে যুগ নেই—এখন কৃষ্টির অন্যতম ধারক ও বাহক যাত্রাপালা। আজকাল টিকিট কেটে যাত্রা-গান হয়। শ্রোতাও হয় প্রচুর। তাছাড়া নবকেতন যাত্রা পার্টির নাম খুব ছড়িয়েছিল এ সময়। বিশেষ করে তাদের অভিনেতা-অভিনেত্রী শ্যামলকুমার ও সুভদ্রার জুটির জন্য।

পালা শুরু হবে রাত আটটায়। কিরীটী সন্ধ্যার মুখোমুখিই গিয়ে চন্দননগর স্টেশনে নামল ট্রেন থেকে। গ্রীষ্মকাল। কিন্তু শহরের প্যাচপেচে গরম এদিকটায় নেই যেন। কিরীটীর চেহারা ও বেশভূষা দেখে তাকে কারও চিনবার উপায় ছিল না। মাথার মাঝখানে টেরি। অনেকটা সেকেলে কলকাতা শহরের বনেদী লোকেদের মত বেশভূষা।

 পরনে শান্তিপুরের মিহি ধৃতি, গায়ে গিলে-করা আদ্দির পাঞ্জাবি, চোখে চশমা—পুরুষ্ট একজোড়া গোঁফ মোম দেওয়া। গলায় একটি পাকানো চাদর-গিঁট দেওয়া। পায়ে চকচকে পাম্পসু। হাতে বাহারে ছড়ি।

এককালে ঐ ধরনের বাবুদের কলকাতা শহরে প্রায়ই দেখা যেত।

স্টেশনের বাইরে এসে একটা সাইকেল-রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করতেই কিরীটী জানতে। পারল যাত্রার আসর কোথায় বসেছে।

রিকশাওয়ালা শুধায়, যাত্রা দেখবেন বাবু?

কিরীটী হেসে বলে, আমার এক বন্ধু ঐ দলে অভিনয় করে। শ্রীরামপুরে থাকি। অনেকদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তার সঙ্গেও দেখা হবে, যাত্রাও দেখা হবে ঐ সঙ্গে।

উঠুন বাবু, পৌঁছে দিচ্ছি। এক টাকা ভাড়া লাগবে।

তাই পাবে। চল।

উঠুন।

কিরীটী উঠে বসল সাইকেল-রিকশায়। রিকশাওয়ালা একটা হিন্দী ফিল্মের গান গুন গুন। করে গাইতে গাইতে রিকশা চালাতে লাগল।

মিনিট পনেরো লাগল যাত্রার আসরে পৌঁছতে।

মস্ত বড় সেকেলে পুরাতন জমিদারবাড়ি।

বিরাট নাটমঞ্চ। চারিদিক ঘিরে সেখানে আসরের ব্যবস্থা হয়েছে।

গেটের সামনে সাইকেল-রিকশা থেকে নেমে কিরীটী রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ভেতরের দিকে এগুল।

অল্পবয়সী যাত্ৰর দলের একটি ছোকরা গেটের সামনে বসেছিল। শ্রোতাদের আসা তখনও ভাল করে শুরু হয়নি।

কিরীটী সেই ছেলেটিকেই শুধাল, হরিদাস সামন্ত মশাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে?

এখন তো তিনি গ্রীনরুমে আছেন।

তা জানি, তাঁকে যদি একটা খবর দেন বলবেন তাঁর অনেক কালের বন্ধু ধূর্জটি রায় তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে চান—

আসুন আমার সঙ্গে। তারপর আবার কি ভেবে ছেলেটি অন্য একটি তরুণকে ডেকে বললে, ওরে সুবল, এই বাবুটিকে সামন্ত মশাইয়ের কাছে নিয়ে হ্যাঁ।

সুবল একবার কিরীটীর আপাদমস্তক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললে, চলুন।  

বিরাট নাটমঞ্চে কতকগুলো পাশাপাশি টিনের পাটিশান তুলে ছোট ছোট ঘরের মত করে সাজঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারই একটার সামনে এসে সুবল বললে, যান ভেতরে, সামন্তদা এই ঘরেই আছেন।

কিরীটী ভিতরে প্রবেশ করল। কিন্তু ভিতরে পা ফেলেই থমকে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বৎসরের যুবতী। উভয়েই পিছন ফিরেছিল বলে কিরীটীক ওরা দেখতে পায়নি।

মেয়েটির সারা দেহে যৌবন টলমল করছে। মেয়েটি বিশেষ লম্বা নয় বরং একটু বেঁটেরই দিকে। কিন্তু ছিপছিপে গড়নের জন্য বেমানান দেখায় না। পরনে একটা মুর্শিদাবাদ সিল্কের শাড়ি। একমাথা চুল, এলো খোঁপা করে। খোঁপাটা পিঠের উপর যেন ঝুলছে।

মেয়েটি দাঁড়িয়ে—সামন্ত মশাইও দাঁড়িয়ে। তাঁর পরনে একটা লুঙ্গি ও আদ্দির পাঞ্জাবি। ওঁদের কথাবাত কিরীটীর কানে আসে।

কেন, ডাকছ কেন? মেয়েটি বলল।

সুভদ্রা, আজ পালা শেষ হলে আমরা বের হয়ে পড়ব। হরিদাস সামন্ত বললেন।

না, আমি কাল ভোররাত্রের টেনে বর্ধমান যাব। সুভদ্রা বললে।

বর্ধমান! বর্ধমান কেন?

সবই তোমাকে বলতে হবে নাকি? সুভদ্রার কণ্ঠে যেন বিদ্রোহের সুর।

তা বলতে হবে না! সঙ্গে বোধ হয় শ্যামলকুমার চলেছে?

চলেছে কি না চলেছে যাওয়ার সময়ই দেখতে পাবে।

সুভদ্রা, তুমি ভাব, আমি কিছুই বুঝি না।

কি বুঝেছ শুনি?

সেদিনকার পিটুনির কথা নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওনি?

শোন, তোমাকেও আমি স্পষ্ট করে আজ বলে দিচ্ছি, তোমার নেবুতলার বাসায় আর আমি যাব না।

উঃ! তলে তলে তাহলে বাসাও ঠিক হয়ে গিয়েছে?

সুভদ্রা কোন জবাব দিল না, যাবার জন্যই বোধ করি ঘুরে দাঁড়াল। আর দাঁড়াতেই কিরীটীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল।

কে আপনি?

হরিদাস সামন্তরও দৃষ্টি ইতিমধ্যে পড়েছিল কিরীটীর উপরে।

কি হে সামন্ত, চিনতে পার।

কে?

ধূর্জটি—আমি ধূর্জটি রায় হে!

ধূর্জটি?

চিনতে পারছ না? সেই যে–

হরিদাস সামন্ত প্রথমটায় সত্যিই কিরীটীকে চিনতে পারেনি। কিরীটীর চোখ টিপে ইশারা করায় দুদিন আগেকার সব কথা তাঁর মনে পড়ে যায়। বলে ওঠেন—ও হ্যাঁ হ্যাঁ, ধূর্জটি! কোথা থেকে হে?

শুনলাম তুমি পালা-গান গাইতে এসেছ—তাই ভাবলাম অনেককাল দেখাসাক্ষাৎ নেই, দেখা করে যাই।

হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার চিনেছি। উঃ, কতদিন পরে দেখা! তা বেশ—বেশ করেছ।

আজ তোমাদের পালা তো সুভদ্রা হরণ?

কথাটা বলে আড়চোখে একবার কিরীটী সুভদ্রার দিকে তাকাল।

হ্যাঁ।

উনিও বুঝি তোমাদের দলে অভিনয় করেন?

হ্যাঁ। ওই-ই তো নায়িকা সাজে। ওর নাম সুভদ্রা মন্ডল।

নমস্কার। কিরীটী হাত তুলে নমস্কার করে।

সুভদ্রাও প্রতিনমস্কার জানায়।

কিরীটী বললে, পালার নামটির সঙ্গে আপনার নামটিও তো বেশ মিল করাই। পালাটা কে লিখেছে হে সামন্ত? পৌরাণিক?

না, সামাজিক জবাব দিল সুভদ্রা।

সামাজিক?

হ্যাঁ। দেখবেন না পালাটা! ভাল লাগবে পালাটা আপনার। কথাগুলো বলতে বলতে বার দুই সুভদ্রা আড়চোখে হরিদাস সামন্তর দিকে তাকাল।

কিরীটীর মনে হল সুভদ্রার ওষ্ঠের প্রান্তে যেন একটা বাঁকা হাসির চকিত বিদ্যুৎ খেলে গেল।

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই দেখব, এসেছি যখন! কিরীটী বললে।

সুভদ্রা, ওকে এক কাপ চা পাঠিয়ে দাও।

তা ওহে সামন্ত, শুনেছি তোমাদের শ্যামলকুমার নাকি অদ্ভুত অভিনয় করে। তার সঙ্গে একটিবার আলাপ হয় না?

জবাব দিল সুভদ্রা, কেন হবে না? শ্যামলই তো এ নাটকের নাট্যকার। আমি এক্ষুনি শ্যামলকে ডেকে আনছি।

খুশিতে যেন ডগমগ হয়ে সুভদ্রা লঘুপদে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সুভদ্রার পদশব্দ মিলিয়ে গেল বাইরে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *