১.১৫ আবার আততায়ীর আবির্ভাব

আবার আততায়ীর আবির্ভাব

বিকাশ চটপট প্রস্তুত হয়ে নিল এবং দুজনে আর বিলম্ব না করে রাজবাড়ির দিকে দ্রুত পা চালিয়ে দিল।

সুব্রত বিকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ব্যাপারটা যেন কেমন মনে হচ্ছে বিকাশবাবু! রাজবাড়ির অন্দরে অচেনা লোক এসে স্বয়ং রাজাবাহাদুরকে ছুরিকাঘাত করবার চেষ্টা করেছে!

আমিও কিছু বুঝে উঠতে পারছি না কল্যাণবাবু।

চলুন দেখা যাক।

রাত্রি বোধ করি পৌনে নটা হবে, রাত্রির কালো আকাশটা ভরে অসংখ্য হীরার কুচির মত তারাগুলো ঝিলমিল করছে।

ছোট শহর এর মধ্যেই নিঝুম হয়ে এসেছে। রাস্তায় লোকজন বড় একটা দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে দুএকটা কুকুরের ডাক শোনা যায় কেবল।

রাস্তার দুপাশে কেরোসিনের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলে।

কারো মুখেইকোনো কথা নেই, দুজনে নিঃশব্দে পাশাপাশি এগিয়ে চলে বেশ দ্রুত পদক্ষেপেই।

সুব্রতর মনে অনেক কথাই স্রোতের আবর্তের মত পাক খেয়ে খেয়ে ফিরছিল। ব্যাপারটা সত্যিই কেমন যেন একটু গোলমেলে। কেউ রাজাবাহাদুরকে হত্যা করবার চেষ্টা করেছিল। তাও রাজবাড়িতে রাজাবাহাদুরের নিজ শয়নকক্ষের সামনের ছাতে। আজও কি তাহলে ছোট্ট সিং বেশী সিদ্ধির নেশা করেছে? আশ্চর্য, যা কিছু অঘটন ঘটছে, সবই রাজ-অন্তঃপুরের মধ্যে! এতগুলি লোকের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে আততায়ী কেমন করেই বা রাজ-অন্তঃপুরে প্রবেশ করে এবং নির্বিঘ্নে তার কাজ হাসিল করে?

রহস্য ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে।

সহসা একসময় বিকাশ চলতে চলতে সুব্রতকে লক্ষ্য করে বলে, আপনাকে আজ কদিন থেকেই একটা কথা বলব বলব মনে করছিলাম কল্যাণবাবু, কিন্তু রোজই ভুলে যাই, শেষ পর্যন্ত বলা হয়ে উঠছে না।

কি বলুন তো?

এর মধ্যে একদিন কিন্তু লাহিড়ীর বাড়ীটা আমি সার্চ করে এসেছি।

তাই নাকি! কবে সার্চ করলেন?

সে যেদিন খুন হয় তার পরদিনই সকালে লাহিড়ীর বাড়িটা গিয়ে সার্চ করি।

সার্চ করে কিছু পেলেন?

না। তবে আপনি শুনলে হয়তো আশ্চর্য হবেন, আমার সার্চ করবার পূর্বেই, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি সে বাড়িতে গিয়ে কিছু সার্চ করে এসেছেন মনে হল যেন আমার!

কি রকম? সুব্রত যেন কিছুই জানে না এইভাবে প্রশ্নটা করে।

ঘরের মধ্যে তার সব বাক্স-প্যাঁটরাগুলোই তালাভাঙা অবস্থায় পড়েছিল, তাই আমার কষ্টটা ন দেবায় ন ধর্মায়ই হয়ে গেল।

বাক্স-প্যাঁটরাগুলো খুঁজে কিছুই পেলেন না?

না। কতকগুলো জামাকাপড় নগদ কিছু টাকা ও খানকয়েক পুরাতন চিঠিপত্র। এবং তাতেই আমার ধারণা যে বাড়ির চাকর-বামুন বাক্সগুলো ভাঙেনি। বাইরে থেকে কেউ সকলের অলক্ষ্যে, যখন লাহিড়ীর মৃতদেহটা নিয়ে আমরা সবাই এদিকে ব্যস্ত ছিলাম, সেই ফাঁকে তার কাজ হাসিল করে চলে গেছে।

সুব্রত কোনো জবাব দেয় না, নিঃশব্দে পথ অতিক্রম করে চলে।

কিছুক্ষণ বাদে একসময় প্রশ্ন করে, হ্যাঁ ভাল কথা, একটা জিনিস কি আপনি লক্ষ্য করেছিলেন বিকাশবাবু যে, এই পুরাতন রাজবাড়ির ছাদ দিয়ে এক অংশ হতে অন্য অংশে অনায়াসেই যাতয়াত করা যায়?

কই না তো! তাই নাকি?

হ্যাঁ।

ইতিমধ্যে ক্রমে এরা দুজনে মৃদুস্বরে কথাবার্তা বলতে বলতে প্রাসাদের সামনে এসে পৌঁছে গেছে। রাজবাটির মধ্যে এসে প্রবেশ করল দুজনে। আজ সদর ও অন্দরের মধ্যবর্তী দরজাটা খোলাই ছিল এবং স্বয়ং ছোট্টু সিং দরজার সামনে লাঠি নিয়ে প্রহরায় নিযুক্ত ছিল। ওদের আসতে দেখে সে সেলাম জানাল।

অন্দরের আঙিনায় পা দিতেই ওদের কানে এল উন্মাদ নিশানাথের কণ্ঠস্বর, সাবধান, সাবধান! That boy, that mischievous boy again started his old game!

সুব্রত থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।

আকাশে চাঁদ নেই, কেবল তারা। তারই মৃদু আলো আঙিনার উপরে এসে যেন অপূর্ব একটা মৃদু আলোছায়ার সৃষ্টি করেছে। অতর্কিতেই সুব্রতর মনে পড়ে যায়, মাত্র কয়েকদিনের আগেকার একটা বীভৎস দৃশ্য। ঐ তো ঐখানে সতীনাথ লাহিড়ার বিষজর্জরিত মৃতদেহটা ধনুকের মত বেঁকে পড়েছিল। তার অশরীরী আত্মা হয়ত এখনও এখানে নিঃশ্বাস ফেলে বেড়াচ্ছে, কে জানে!

সহসা আবার নিশানাথের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমায় তোমরা বোকা ঠাউরেছ বটে, অ্যাঁ! ভাবছ এ আগুন নিভবে? না, নিভবে না। কে? ও বৌদি! তোমার চোখে জল নেই কেন? কেন কাঁদতে পার না? কাঁদ, একটু কাঁদ বৌদি। কেমন করে এ পাপ সহ্য করে আছ আজও? দেখছ না সব পুড়ে গেল!

রাত্রির স্তব্ধ অন্ধকার যেন গম গম করে ওঠে নিশানাথের কণ্ঠস্বরে।

চলুন মিঃ রায়, বিকাশবাবুর ডাকে সুব্রত নিজেকে যেন সামলে নিয়ে আবার পা বাড়াল।

ঘোড়ানো সিঁড়ি বেয়ে দুজনে এসে উপরের দালানে দাঁড়াতেই সামনে রাজাবাহাদুরের খাসভৃত্য শঙ্কুকে দেখা গেল, আসুন বাবু,রাজাবাহাদুর এই ঘরেই আছেন।

ওরা বুঝলে শম্ভ ওদের জন্যই বোধ হয় অপেক্ষা করছিল। সামনের ঘরটাই রাজাবাহাদুরের বসবার ঘর। শম্ভুর আহ্বানে দুজনে দরজার পদা তুলে ঘরে গিয়ে প্রবেশ করে।

ঘরটার মধ্যে একটা যেন মৃত্যুর মতই স্তব্ধতা।

একটা বড় আরামকেদারায় সুবিনয় মল্লিক চোখ বুজে আড় হয়ে শুয়ে আছেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন মনে হয়। তাঁর কোলের উপর দুটি হাত জড়ো করা। বুকে ও পিঠে একটা পট্টি বাঁধা।

ওদের পায়ের শব্দে রাজাবাহাদুর চোখ মেলে তাকালেন।

কে?

আমরা।

কল্যাণবাবু, বিকাশবাবু—আসুন!

ব্যাপারটা কি রাজাবাহাদুর?

বলছি, বসুন।

দুজনে রাজাবাহাদুরের সামনাসামনি দুটো চেয়ার অধিকার করে বসল।

একটুখানি থেমে রাজাবাহাদুর বললেন, এই দেখুন। এবারে আপনাদের আততায়ীর আক্রোশটা আমার উপরেই এসে পড়েছিল। কিন্তু অল্পের জন্য বেঁচে গেছি।

ব্যাপার তো কিছুই বুঝতে পারছি না রাজাবাহাদুর! বিকাশ প্রশ্ন করে।

আপনারা জানেন হয়ত, আমার শোবার ঘরের সংলগ্ন সামনে একটা ছোট খোলা ছাদ আছে। সন্ধ্যার দিকে অনেক সময় আমি সেই ছাদে একা একা ঘুরে বেড়াই। আজও বেড়াচ্ছিলাম, রাত্রি তখন বোধ করি আটটার বেশী হবে না, হঠাৎ একটা পায়ের শব্দ, চোখ মেলে চেয়ে দেখবার আগেই পিছন থেকে কে যেন আমায় ছোরা মারলে। কিন্তু অন্ধকারেই হোক বা আমার নড়াচড়ার জন্যই হোক, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছোরাটা বাঁদিককার কাঁধের উপরে গিয়ে বিঁধে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমিও বিদ্যুৎবেগে সরে যাই। আততায়ী ততক্ষণে একলাফে সিঁড়িতে গিয়ে পড়েছে—আমার নাগালের বাইরে। লোকটার পিছু পিছু ছুটে গেলাম বটে, কিন্তু ধরতে পারলাম না।

তখুনি চাকরবাকরদের ডাকলেন না কেন? প্রশ্ন করে সুব্রত।

সেটা আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি নিজেই ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি পর্যন্ত আসি, কিন্তু পরমুহূর্তে লোকটা কোথায় যে উধাও হয়ে গেল, তার আর কোন পাত্তাই পেলাম না। তারপরে অবিশ্যি চাকরদের ডেকে খোঁজ করলাম অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু সবই বৃথা। আততায়ী পালিয়েছে তখন।

কিন্তু সত্যি যদি কেউ এসে থাকে, তাকে পালাতে হলে পালাতে হবে সেই নীচ দিয়েই, আর তো অন্য কোন পথ নেই শুনেছি। বিকাশবাবু বললেন।

ছোট্টু সিংও কি কাউকে পালাতে দেখেনি? প্রশ্ন করে সুব্রত।

না, ছোষ্ট্র সিং তো সেই সন্ধ্যা থেকে নিচেই ছিল।

আশ্চর্য! সুব্রত মৃদুস্বরে বললে।

আপনার বাড়ির চাকরদের প্রতি আপনার খুব বিশ্বাস, না রাজাবাহাদুর? প্রশ্ন করলেন এবারে বিকাশবাবু।

হ্যাঁ, ওদের কাউকেই সন্দেহ করতে পারি না দারোগাবাবু। একাদিক্রমে বহির্মহলে যারা অন্তত আট-দশ বছর চাকরি করে, তারাই পরে আমাদের অন্দরে স্থান পায়, এ বাড়ির এই নিয়ম বরাবর চলে আসছে বহুকাল থেকে।

তার মানে সন্দেহের বাইরে? সুব্রত বলে।

হ্যাঁ।

আঘাতটা কি খুব গুরুতর হয়েছে? সুব্রত প্রশ্ন করে।

বোধ হয় না। ডাক্তারকেও ডাকতে পাঠিয়েছি, এখনও এসে পৌঁছায়নি, কোথায় নাকি বাইরে বেড়াতে গেছে। নিজেই শম্ভুকে দিয়ে ফার্স্ট এড় নিয়েছি।

ঠিক এই সময় একপ্রকার হন্তদন্ত হয়েই ডাক্তার সোম এসে ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে ডাক্তারীর কালো ব্যাগটা, ব্যাপার কি রাজাবাহাদুর? হঠাৎ এত জরুরী তলব? বাড়িতে ছিলাম না, এসেই শুনলাম, এখুনি ওষুধপত্র নিয়ে আসতে হবে!

এস ডাক্তার, মরতে মরতে বেঁচে গেছি। রাজাবাহাদুর কাঁধের ব্যাণ্ডেজটা খুলতে লাগলেন।

অপেক্ষা করুন, আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না, আমি হাতটা ধুয়ে আসি। যা করবার আমিই করবো। ডাক্তার মৃদুস্বরে বললেন।

পাশের অ্যাটাচড় বাথরুমে ঢুকে হাত ধুয়ে এসে ডাঃ সোম ব্যাণ্ডেজ খুলতে লাগলেন। স্ক্যাপুলার ঠিক মাঝামাঝি একটা দেড়ইঞ্চি পরিমাণ ক্ষতচিহুঁ। খুব বেশী রক্তক্ষয় হয়েছে বলে মনে হয় না। গোটা-দুই স্টীচ দিয়ে চটপট ডাক্তার ব্যাণ্ডেজটা বেঁধে দিল। টিটেনাস ইনজেকসনও। দিতে ভুল হল না। রাজাবাহাদুর ডাঃ সোমকে সমগ্র ব্যাপারটা তখন খুলে বললেন।

কিন্তু ব্যাপারটা যে ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে রাজাবাহাদুর! ডাঃ সোম বলতে লাগলেন, একেবারে রাজঅন্তঃপুরের মধ্যে এরকম খুনজখম হতে শুরু করল? কার উপরে কখন বিপদ নেমে আসে—কেউ বলতে পারে না!

রাজাবাহাদুরও যেন বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেছেন। মুখের ওপরে তাঁর নেমে এসেছে যেন একটা চিন্তার কালো ছায়া।

রাজাবাহাদুর, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, আমি একবার আপনার শয়নকক্ষ ও তার আশপাশটা ঘুরে দেখতে চাই। বিকাশ বললে।

স্বচ্ছন্দে। যান না, ঘুরে আসুন। মৃদু ক্লান্ত স্বরে রাজাবাহাদুর বললেন।

আসুন কল্যাণবাবু, বিকাশ ডাকলে।

আমাকেও যেতে হবে?

আসুন না। একজোড়া চোখের চাইতে দুজোড়া চোখ অনেক বেশীই দেখতে পায়, আসুন!

যান কল্যাণবাবু। ঘুরে দেখে আসুন। রাজাবাহাদুর বললেন।

আগে আগে বিকাশ, পশ্চাতে সুব্রত ঘর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল।

সামনেই একটা টানা বারান্দা,পর পর তিনটে ঘর, একটি রাজাবাহাদুরের বসবার ঘর, তার পরই তাঁর লাইব্রেরী-ঘর ও সর্বশেষটি তার শয়নঘর। প্রত্যেকটি ঘরই বেশ প্রশস্ত। এক ঘর থেকে অন্য ঘরে দুঘরের মধ্যবর্তী দরজাপথে ও বারান্দা দিয়ে যাতায়াত করা যায়।

শয়নঘরের পরেই ছোট একটি সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই সামনে খোলা ছাত। ছাতটিও বেশ প্রশস্ত।

ছাতের ওপরে উঠলে দেখা যায় বাড়ির পশ্চাৎ দিকটা। চমৎকার একটা ফুলের বাগান, বাগানের সীমানায় উঁচু প্রাচীর, প্রায় দুমানুষ সমান। বাইরে থেকে কারও আসা একেবারেই সম্ভব নয়। এবং ছাতে আসবারও ভিতর-বাড়ি দিয়ে ছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই।

ঐ ছাতের ওপরে দাঁড়ালেই পিছনদিকে তিনতলার ছাত দেখা যায়।

ছাতটি ভাল করে দেখে, দুজনে আবার রাজাবাহাদুরের শয়নকক্ষে এসে প্রবেশ করল। শয়নকক্ষের সামনের দিককার জানালাপথে অন্দর ও বাহিরের সংযোগস্থল প্রশস্ত আঙিনাটি চোখে পড়ে। জানালাগুলোর কোনটাতেই শিক দেওয়া নয়, খোলা।

এই জানালাপথেই সেদিন রাজাবাহাদুর বিষজর্জরিত সতীনাথকে দেখতে পান। সুব্রত ঘুরে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শয়নকক্ষটি বেশ ভাল করে দেখতে লাগল।

ঘরে আসবাবপত্রের তেমন কোন বাহুল্য নেই।

একটি দামী শয্যা-বিছানো পালংক, ঘরের এক কোণে একটি মাঝারি গোছের আয়রন সে। একটি আয়না-বসানো আলমারী, ছোট ছোট দুটি বইভর্তি ঘূর্ণায়মান বুক-শেলফ।

দেওয়ালের গায়ে একটি দোনলা বন্দুক ঝোলানো, একটি পাঁচ সেলের টর্চবাতি ও দেওয়ালের কোণে একটি ছাতা।

বিকাশ পাশের লাইব্রেরী-ঘরে গিয়ে ঢুকল।

একটু পরে সুব্রতও সেই ঘরে এসে প্রবেশ করে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *