০১. আঠারোশো ষাট সালের এক রাত্রি

আঠারোশো ষাট সালের এক রাত্রি।…পুঞ্জীভূত অন্ধকারকে কাঁপিয়ে ঘুমন্ত রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে একটা নাকাড়া বেজে উঠল…ড্যাম, ড্যাম, ড্যাম, ড্যাম…। তারপর আর একটা, আরও একটা, আরও আরও। ছোট ফরাসি অধিকৃত অঞ্চলটুকু যেন শত শত নাকাড়ার শব্দে কেঁপে উঠল, দুলে উঠল,। এক প্রলয়ের মহাক্ষণে প্রকম্পিত ফরাসিভূমি। দিক হতে দিগন্তে, আকাশে-আকাশে, বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল সেই শব্দ।…বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে উঠে আসা চৈত্র রাতের উদাস হাওয়া মুহূর্ত থমকে নাকাড়ার প্রলয় শব্দে যেন দিগবিদিকে এলোমেলো হয়ে উঠল।

ফরাসডাঙা থেকে উত্থিত হয়ে দীনেমারডাঙার গড়ে ঢেউ খেয়ে সে শব্দ আছড়ে পড়ল দক্ষিণের ইংরেজ এলাকায়। ছড়াল উত্তরে, জোয়ার-ভরা গঙ্গার উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে ছিটকে পড়ল সে শব্দ ওপারে পুবের মাটিতে।

এ যেন নরখাদক অনার্য রাজপুত্রের রাজ্যাভিষেকের নরবলি উৎসবের পবিত্র উল্লসিত উদ্দাম পটহ-পিটন। কাছ থেকে দূরে, আরও দূরে, বহু দূরে সারিবদ্ধ নাকাড়ার শব্দে খানখান হয়ে গেল রাতের নিস্তব্ধতা, দমবন্ধ অন্ধকার ছটফট করে উঠল। খটখট শব্দ উঠল ঘোড়ার খুরের। ভীত ও উত্তেজিত সাবধানী উচ্চ গলা হেঁকে উঠল, পিস্তলের শব্দ গর্জন করে উঠল কিন্তু আততায়ীর মৃত্যু-যন্ত্রণার কাতর ধ্বনি শোনা গেল না। গঙ্গার ঢালু পাড়ে রাতজাগা ফরাসি প্রহরীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জ্বলে উঠল সন্ধানী শ্বাপদের মতো। মুঘলের লুট করা সেই মান্ধাতার আমলের বন্দুক বা ব্রাউনবেস নয়, বসাযুক্ত টোটা দাঁতে কেটে লহমায় নতুন রাইফেলের মধ্যে ভরে শক্ত করে তা বাগিয়ে ধরল। বুঝি বা একবার মনে পড়ল, বহু দূরে ইউরোপে ফেলে আসা জন্মভূমি ফ্রান্সের কথা, দ্রাক্ষাকুঞ্জে ছাওয়া, আপেলঝাড়ে ভরা গাঁয়ের কথা, প্রেয়সীর রাঙা ঠোঁট, বিদায়ক্ষণে বিচ্ছেদকাতর নীল চোখে ঘন মেঘের অশ্রু, সুডৌল বুকের হৃদয়স্পন্দন। আমেন!…সিপাহির ক্রোধ্বহ্নির আগুন নির্বাপিত হলেও হিন্দুস্থানের দিকে দিকে বিভীষিকার ঢেউ। নিশ্চিন্ত ফরাসিভূমিতে দাঁড়িয়েও মনে হয় যেন এ অন্ধকারে হাওয়ায় হাওয়ায় মৃত্যু-ষড়যন্ত্রের ফিসফিসানি। দাঁতে দাঁত কষা টেপা, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নাকাড়ার বজ্ৰশব্দে অস্ফুট ধ্বনি মিলিয়ে গেল, ক্রাইস্ট!

নাকাড়ার বুকে বাদকের ঘাম ঝরে, কিংবা অনর্গল আঘাতে আঘাতে তার টান করা টনটনে চামড়ার ড্যাম ড্যাম শব্দ তখন বাজছে ঢ্যাপ ঢ্যাপ ট্যাপ ঢ্যাপ…।

ফরাসডাঙায় শক্ত প্রবেশের এ হল সঙ্কেতধ্বনি। নতুন অচেনা মানুষ, খুনি কি ডাকাত, বিদ্রোহী কি গুপ্ত ঘাতক, যে-ই হোক এত রাত্রে নগরের পথে বেরুবার বা প্রবেশ করার অধিকার নেই কারও। কিন্তু সে আইন লঙ্ঘন করেছে কেউ, রুদ্ধদ্বার নগরে প্রবেশ করেছে কেউ, শান্তিভঙ্গ করেছে। তাই থানা থেকে থানায়, আর এক থানায় নাকাড়া বেজে চলল। জাগিয়ে সচকিত করে তুলল নগরকে।

কিন্তু ফরাসি প্রহরী দেখতে গেল না তার বিশ হাত দূরে অন্ধকারে এক দীর্ঘ বলিষ্ঠ মূর্তি গঙ্গার জোয়ার তরঙ্গে নিঃশব্দে নিজেকে ভাসিয়ে দিল। ঢেউয়ের বুকে দুলে দুলে, জোয়ারের স্রোতে এক খণ্ড আবর্জনার স্তুপের মতো মূর্তির মাথা ভেসে চলল। দীনেমারগড়ের ধারের ঘূর্ণি কাটিয়ে, বলিষ্ঠ হাতে জোয়ারের স্রোত কেটে মূর্তি ওপারের পুবের জমির ঝাপসা রেখা দেখে ড়ুব দিল। বিশাল জলচর জন্তুর মতো জোয়ারের তীব্র ধাক্কাকে মাথার গোঁত্তা দিয়ে তলে তলে তীরবেগে সে এগুল পুবের ডাঙার দিকে।

বৃথাই দীনেমার গড়ের বাতি জ্বলল। ফরাসি অশ্বারোহী প্রহরীর ঘোড়ার খুরের ধ্বনি গঙ্গার খাড়া ধারে এসে আচম্বিতে থেমে গিয়ে বিলীন হয়ে গেল জলের ছলছল শব্দে। শান্ত হয়ে এল বন্দুকধারী প্রহরীর অস্থিরতা। কেবল নাকাড়ার ক্লান্ত ঢসকানো চামড়ায় বাজতে লাগল ঢ্যাপ ঢ্যাপ ঢ্যাপ ঢ্যাপ…।

ওপারের মানুষদের কাছে শুধু পুবের ওই শব্দ নাম কিনল ঢ্যাপ ঢ্যাপের ঘাট বলে।

সে তখনও নিঃসাড়ে স্রোত কেটে কেটে চলেছে। তার খেয়াল নেই বন্দুকের রেঞ্জের সীমা সে অতিক্রম করতে পেরেছে কি না। মাথা ভোবাবার ক্ষমতা আর নেই। অতি দ্রুত নিশ্বাস যেন ক্রমাগত নিজের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে, অবশ হয়ে আসছে হাত পা, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। জোয়ারের দুরন্ত টানকে, উদ্যত ঢেউকে দাঁতে দাঁত চেপে ক্লান্ত হাতে সে যেন চাবকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, ভেঙে ফেলতে চাইছে খানখান করে। কারা যেন জলের তলে তার দুই পা ধরে পাতালে টেনে নিতে চাইছে, কার সহস্র থাবা তাকে নিষ্ঠুর ঝাপটায় ঝাপটায় অবশ করে দিতে চাইছে। কোথায় ডাঙা! ডাঙা ডাঙা ডাঙা! এত নগর, এত গ্রাম, এত পথ, পাহাড় ডিঙিয়ে শেষে চিরআরাধ্যা সুরেশ্বরীর বুকে চিরদিনের জন্য তলিয়ে যেতে হবে! কানের সমস্ত শিরা উপশিরা ব্যথায় টাটিয়ে উঠল, নাকের ভেতর ঝলকে জল ঢুকে চোখ জ্বালা করে ঝিম ধরে গেল মাথা। খালি পেটে জল ঢুকে উদগার উঠতে লাগল আপনাআপনি। শিথিল হয়ে এল হাঁটু, স্রোতের বুকে গোঁজড়ানো মুখে ভেঙে পড়ল ঢেউ। জমি জমি, মায়ের বুকের মতো এক ফোঁটা মাটি। হায়, মাটি কি নেই এ পৃথিবীতে! মৃত্যু হোক, তবু হাতের মুঠোয় ধরা দিক এক খামচা মাটি।

সে চেঁচিয়ে উঠতে চাইল, জয় হোক হিন্দু সিপাহির! বরবাদ হোক কোম্পানি। শক্ত করে বাঁধা কোমরের কাপড়ের দিকে হাত নামিয়ে নিল সে। মহান বিদ্রোহী নেতার দেওয়া গুপ্ত চিহ্নের ছিয় টুকরা কোম্পানির বিভীষিকা তার নেতার দেওয়া হিন্দুস্থানে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকামী বীর সেনাপতি তাঁতিয়া টোপি! বিদায় দাও তোমার বীর সিপাহিকে, তোমার বিশ্বস্ত বন্ধুকে, তোমার পদাশ্রিত বেরিলির সহযোদ্ধাকে।

কটিতে বাঁধা বিদ্রোহী সেনাপতির গুপ্তচিহ্ন খুঁজতে লাগল সে কোমর হাতড়ে। অন্য হাতে জোয়ার তরঙ্গকে ঠেকিয়ে রাখবার চেষ্টা করল। সব অবশ হয়ে আসছে। হাত পা ঠোঁট। বুজে আসছে চোখের পাতা, ভারী হয়ে আসছে শরীর, নিশ্বাসে নিশ্বাসে ঢুকছে জল, ছিঁড়ে যেতে চাইছে কানের পরদা। একটু মাটি; মাটি মাটি!

হঠাৎ গঙ্গা যেন স্থির হয়ে গেল, স্তব্ধ নিঃসাড়। কে যেন তার দুরন্তপনাকে বলিষ্ঠ দুই হাতে বেষ্টন করে ধরেছে। হাওয়া হয়ে এল শান্ত, একটানা মৃদুমন্দ। ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ল যেন সর্ব চরাচর। বাতি নিভে গেল দীনেমারগড়ের। ফিরে গেছে অশ্বারোহী। নতুন প্রহরী এসে পুরনো প্রহরী চলে গেছে। স্তিমিত হয়ে আসছে নাকাড়ার শব্দ।

জলে ভাসা মূর্তি উত্তর থেকে আবার দক্ষিণে ভাসল। ভাঁটা পড়ছে। প্রায় জ্ঞানশূন্য, অবশ শরীর তার। সে শুধু তলিয়ে চলেছে। কিন্তু কী যেন ঠেকল হতে! ঠাণ্ডা, কর্দমাক্ত। বুঝি মাটি। হ্যাঁ মাটি!…আবার যেন জ্ঞান ফিরে এল। মাটি নয়, মায়ের বুক। দু হাতে সাপটে ধরল সে মাটি। আঁকড়ে খামচে ধরল, ঘা-খাওয়া জন্তুর মতো জোয়ারে ভেজা নরম মাটিতে মাথা ঠুকে ঠুকে গর্ত করে উঠে আসতে চাইল। তারপর এক সময় নিঃসাড় হতচেতন হয়ে হাত দিয়ে আর মুখ দিয়ে মাটিতে পড়ে রইল সে।

শুকতারা যেন বড় বেশি দপদপ করে উঠল নিভে যাওয়ার আগে। পুবের আকাশে দিনের আভাস দেখে আগামী দিনের খবর ছড়াল আলো প্রত্যাশী।

ফরাসডাঙা থেকে বুড়ো পাটনি ছেলে চুড়ামণিকে নিয়ে দো-মাল্লাই মাঝারি নৌকাখানি ভাসিয়ে দিল।

পুব দিগন্ত লাল হয়ে উঠেছে। চৈত্র প্রভাতের উজ্জ্বল নীল আকাশ। হাওয়া মত্ত নয় তবু যেন মাতাল করে। দু চোখ আরামে বুজে আসতে চায়। পাখির আনাগোনা চলেছে এ-পারে ও-পারে। রাত না পোহাতেই দিন যেন উদাস হয়ে উঠল কোকিলের গানে। গান নয়, সুর করে কান্নার এ শব্দ স্ফটিকের মতো আকাশ, সমুদ্রোখিত হাওয়ার কাছে যেন জিজ্ঞেস করছে, এ ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনিতে হাহাকার ভরা চৈত্রের দীর্ঘ দিন কেমন করে কাটবে।

বুড়ো পাটনি নৌকার মুখ উত্তর দিকে ঘুরিয়ে বৈঠা ধরল। জলের টান এখন দক্ষিণে সাগরের দিকে। ওপারে যেতে হলে উত্তরে খানিক উজান না গেলে ঠিক জায়গায় ভেড়ানো যাবে না। সমুদ্র কাছে বলে জোয়ারের সময় জলের যে স্বচ্ছতা চোখে পড়ে এখন আর তা নেই। জোয়ার যা নিয়ে এসেছিল, শুধু তাই নয়, যা নিয়ে আসেনি তাও নিয়ে চলেছে। নদীর দুধারে গ্রাম ও জনপদের ফেলাছড়া আবর্জনা কাঠকুটা ঝরাপাতা কত কী চোখে পড়ে। এ-সবই মিশে যাবে সাগরের নীলাম্বুধি অন্ধকারে! শুধু কি আবর্জনা কাঠকুটাই। শেষ রাতের সুখস্বপ্নের কথা জলের কাছে বলে গেলে স্বপ্ন সার্থক হয়। কত নরনারী গঙ্গাকে তার স্বপ্নের সাক্ষী রেখেছে, এ জলই তার হিসাব জানে। গঙ্গা গিয়ে সাগরের কানে সে কথা ঢেলে দিয়েছে, সাগর তার অতল রহস্যে সে কথা নিয়ে কী কারবার করেছে বুঝি গঙ্গার কাছেও তা রহস্যাবৃত রয়ে গেছে। হয়তো স্বপ্ন সার্থক হয়েছে কিংবা হয়নি। সে সুখ বা দুঃখ দু তরফেরই অশ্রু নিয়ে গঙ্গা বহু জনপদ উজান গিয়ে আবার সাগরের কোলে দিয়ে এসেছে।

জল এখন অনেকখানি নেমে এসেছে, পলি ছড়ানো পাড় জেগে উঠেছে অনেকটা। কাঁথার বুকে টানা সুতোর ছোট ছোট ফোঁড়ের মতো ছোট ছোট ঢেউ যেন কাচ পাখির কাঁচা পাখসাটের মতো দক্ষিণ মুখে উড়াল দিয়েছে। কুঁচো কাঁকড়া দু পাড় জুড়ে কিলবিল করছে, ভেজা মাটিতে বুক দিয়ে চলে চলে শামুক খাচ্ছে মাটি। তাই পাড়ে, বকের ভিড়। গাঙচিলের উপর নীচে এত ওঠা-নামা।

চুড়ামণি কোঁচড় থেকে এক গাল মুড়ি মুখে পুরে পাড়ের ফরাসি প্রহরীর নীল কোর্ট বারেক দেখল। তারপর চোখ বড় বড় করে বাপকে জিজ্ঞাসা করল, ভোর রাতে মস্ত এক ডাকাতের দল ধরা পড়েছে, জানো বাবা?

বুড়ো পাটনি তখন বাঁ হাতে হাল ধরে ডান হাতে গাঁজার কলকে বেড় দেওয়ার ন্যাকড়াটা ভাল করে ধুয়ে নিচ্ছে। ছেলের কথায় একবার দিয়ে এক মুখ থুতু ফেলে বৈঠাটা শক্ত হাতে বারকয়েক চাড় দিল। গলুইয়ের দক্ষিণ মুখ আবার পুব পানে ফিরল।

চিবানো মুড়ির দলাটা গিলে চূড়ামণি আবার বলল,  লয় গো, বদ্যিদের আদালি খুড়ো নিজের চোখে দেখে এয়েছে।

সে কথার জবাব না দিয়ে বুড়ো পাটনি বলল, তোর ও মুড়োর পাটাতনের নীচে থেকে আগুনের মালসাটা দে দিকিনি এ দিকে। বলে আবার বারকয়েক চাড় দিয়ে বৈঠাটা বগলে চেপে ধরে হাতের চেটোয় গাঁজা ডলতে লাগল সে।

চুড়ামণি সে আদেশ পালন করল কিন্তু গতকালের ডাকাতদলের কথাটা বুড়ো বাপ এরকম হুঁ হাঁ দিয়ে লোমহর্ষণকারী গল্পটাকে নষ্ট করে দেবে এটা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। আগুনের মালসা তুলতে তুলতেই সে আবার বলল, তুমি খবর পেয়ে গেছ আগেই খুড়োর কাছ থেকে? মালসাটা বাপের সামনে রেখে বলল, জলড়াকাত দুটো আমনি ফিরিঙ্গি সায়েবও বুঝি ধরা পড়েছে? বাপকে নিরুত্তর দেখে কিশোর চূড়ামণির মুখ রাগে আর অভিমানে থমথমিয়ে উঠল। পর মুহূর্তেই কী যেন মনে পড়তেই মুড়ি মুখে পুরতে গিয়ে থেমে বলল, সায়েব দুটোর কপালেও কাতকালীর সিঁদুর মাখা ছেল?

আরে ধ্যাত তোর সায়েব ডাকাত, বুড়ো পাটনি এবার খিঁচিয়ে উঠে কটমট করে ছেলের দিকে তাকাল। সকালবেলায় পয়লা ছিলিম না টেনে সে কথা বলতে পারে না, একথা জেনে শুনেও ছেলেটা এরকম ঠেটামো করছে কেন? কোমরের গেজে থেকে গাঁজার কলকেটা বের করে, গাঁজা সাজিয়ে বিরক্ত মুখে বলল, নে হালটা ধর।

কিন্তু চুড়ামণি ধমক খেয়ে গোঁজ হয়ে রইল। অভিমানক্ষুব্ধ মুখে ফুটে উঠল কান্নার অভিব্যক্তি। বুড়ো বয়সের ছেলেপুলে হলে এরকম ছিচকাঁদুনেই হয়। বুড়ো পাটনি অবশ্য তাতে গলল না। প্রথম ছিলিমটা না হলে স্বয়ং মহাদেব এসেও বোধ হয় তার রাতের জড়তা কাটাতে পারবে না। বলল, দেখবি, দেব পিঠে দু ঘা?

এর পরও যখন দু ঘার কথা বলছে তখন চুড়ামণি আর অবাধ্যতা করতে সাহস করল না। তার ছোট ছোট নরম কচি হাতে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাল বাগিয়ে ধরল সে। ভবিষ্যতে খেয়াঘাটের ভার চুড়ামণিকেই তো নিতে হবে। তাই এখন থেকেই শক্ত করে না নিলে চলবে কেন? আজ বাদে কালই তো বুড়ো চোখ বুজতে পারে। বয়স তো আর কম হল না!…কলকেয় আগুন তুলে কপালে ঠেকিয়ে বারকয়েক মহাদেবের নাম নিল সে। অদূর দক্ষিণে শ্যামনগরের কালীবাড়ির কোল ঘেঁসে গঙ্গা বাঁক ফিরে গারুলিয়ার এগুনো জমির নীলখেতের কোল বেয়ে নবাবগঞ্জের বুকে যেন ঠেকে গেছে, তার পরে আর নেই। এখান থেকে গঙ্গাকে তাই মনে হয়, যেন হঠাৎ হারিয়ে গেছে। বাঁকের মুখে খাড়া পাড়ের উপর ঘন গাছের মাথা ডিঙিয়ে উঠেছে কালীমন্দিরের চুড়ো আর সারিবদ্ধ শিবমন্দিরের ত্রিশুলের ছুঁচলো মাথা।

বুড়ো পাটনি সেদিকে চেয়ে দু হাত কপালে ঠেকিয়ে মিনিটখানেক নিশ্চুপ রইল। তারপর বারকয়েক ছোট ছোট টানে কলকে অভ্যর্থনা করে প্রাণপণ শক্তিতে মারল টান। পাঁজরের হাড়গুলো যেন আচমকা ভেতরে ঠেলা খেয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল, থরথর করে কাঁপতে লাগল নাভিস্থলের চারপাশ, কপালের শিউপশিরাগুলো। এ টানের কেরামতি চূড়ামণি রোজই নিবিষ্ট মনে সপ্রশংস চোখে দেখে। আজও দেখল অভিমান ভুলে। তারপর খানিকক্ষণ দম আটকে ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়ে বুড়ো পাটনি। চূড়ামণিরও একটা নিশ্বাস পড়ে।

নৌকা তখন পাড়ে ভিড়ছে। বুড়ো পাটনি চোখ খুলে শান্ত মোটা গলায় বলল, হাঁ, ডাকাতের কথা কী বলছিলি বাপ, বল দি নি এবার?

এই মুহূর্তটির জন্যই চূড়ামণি এতক্ষণ চুপ করে ছিল। কোনও কথা না বলে প্রাণপণে বৈঠার শেষ চাড় দিয়ে খস করে নৌকো ঠেকিয়ে দিল পাড়ে। দুমদাম শব্দে নেমে দড়িতে বাঁধা লোহার খুঁটি চেপে বসিয়ে দিল মাটিতে।

বুড়ো পাটনি বলল, আমানি ফিরিঙ্গির কথা বলছিলি। ডাকাত কালীর বয়ে গেছে ওদের কপালে সিঁদুর মেখে দিতে। তবে হাঁ কাল রাতে গোটা পঞ্চাশ ডাকাত ধরা পড়েছে আর সব কটাকে বড় সায়েবের কুঠির উঠানে খুঁটিতে বেঁধে রেখেছে।

সব ভুলে কিশোর চূড়ামণির দু চোখ বিস্ময়ে ঝিলিক দিয়ে উঠল, পঞ্চাশ-জন? সে কশো হবে গো বাবা?

আরে ধু–র দাম্‌ড়া কোথাকার। কশশা আবার। শয়ের আদ্ধেকখানিক তত পঞ্চাশ রে ব্যাটাচ্ছেলে।

আর ওরা সব ডাকাতকালীর সিঁদুর মেখে খাঁড়া নিয়ে এয়েছিল?

না, খাঁড়া একটা ছেল, আর সব লাঠি সড়কি। বলতে বলতে বুড়ো পাটনি কাছা খুলে কোমরে গুঁজল।

ডাকাতদের মেলাই সোনাদানা না গো বাপ? সেগুলো মাকালীর মন্দিরেই রয়েছে?

তা নয় তো কী। বুড়ো নৌকা থেকে নেমে এল।

সেগুলো কারা পাবে?

তোর শউর, বলদ কোথাকার। আমি আসছি কেউ এলে বসতে বলিস। বলে বুড়ো পাটনি জঙ্গলে ঢুকে পড়ল।

একটানা নয়, গঙ্গার ধারে কোথাও কোথাও চাষ হচ্ছে। যশোরের চাষার রাজাদের আতপুরের বাড়ির বিরাট অট্টালিকা আকাশ ফুঁড়ে উঠেছে। আতপুরের মধ্যে এত বড় ইমারত আর একখানিও নেই। প্রায় গঙ্গার কাছটাতে এসে শেষ প্রাচীর উঠেছে। প্রাচীরের নীচেই খানিক ঢালু জমি, তারপর আগাছা জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে হাঁটা পথ একেবেকে দক্ষিণে চলে গেছে শ্যামনগর কালীবাড়ির দিকে, উত্তরে সেনপাড়া জগদ্দল, আরও দূরে ভাটপাড়া কাঁটালপাড়া। এ জঙ্গলের পায়ে হাঁটা আঁকাবাঁকা সরু পথ দিয়ে গঙ্গার ধারে ধারে তুমি নাকি হিমালয়ে পৌঁছতে পারো। বড় সোজা নয় এ পথ।

মুড়ি চিবুতে চিবুতে উত্তর দিকে খানিক এগুতেই চুড়ামণি আঁতকে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাটিতে উবু হয়ে মস্ত এক মানুষ পড়ে আছে। জীবন্ত কি মৃত কিছু বোঝবার জো নেই। দাননা প্রেত কি না সে বিষয়ে তর্কের সুযোগ থাকলেও অশরীরী মাহাত্ম্য কিছু যে আছে নিঃসময়ে চূড়ামণি তা বিশ্বাস করল। হুগলির নীলকুঠি থেকে, গাড়ুলিয়ার নীলকুঠির কুঁড়ে থেকে নাকি মেয়েপুরুষ ডাক-ডাকিনী গঙ্গার দু পাড় জুড়ে এরকম পড়ে থাকে, কাজ মিটে গেলে আবার গঙ্গায় ড়ুব দিয়ে সরে পড়ে। বুকে গাদাখানেক থুতু ছিটিয়ে চুড়ামণি চিৎকার করে উঠল, হেই গো বাপ, বাপ গো এখানে একটা…

….এর বেশি সে উচ্চারণ করতে পারল না।

তার সেই চিৎকারই বোধ হয় মাটিতে পড়ে থাকা মূর্তি একটু নড়েচড়ে উঠল। চুড়ামণি কয়েক পা পিছিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে দাঁড়াল যেন ওর নিশ্বাসে ঝপ করে মাটিতে না পড়ে যায়। পড়ে গেলেই তো তৎক্ষণাৎ ঘাড় মটকে শেষ করে দেবে। সে দেখল অদুরে সেনপাড়ার কাছাকাছি মাঠের চাষীরা চাষ করছে। আতপুরের রাজবাড়ির হাতির গলার ঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে টুন টুন টুন। ওপারে ফরাসডাঙার কোল ঘেঁসে তেরঙ্গা নিশান উড়িয়ে চলেছে একখানা মস্ত ফরাসি ভাউলে।

সে আবার চিৎকার করে ডাকল, হই বাবা গো। এই এদিকে, ঝপ করে এসো।

জঙ্গল থেকে জবাব এল,কেন রে, কী হল?

জবাব দিল সে, এই মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে এটা…

কী?

চুড়ামণি নিরুত্তর। ভয়ে আড়ষ্ট কাঠ হয়ে সে দেখল মাটিতে পড়ে থাকা মূর্তি মুখভরা গোঁফদাড়ি নিয়ে অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সারা গায়ে তার মাটি, গোঁফদাড়িতে কাদা লেপা, ছোট ছোট চোখ দুটোতে তারা আছে কিনা ঠাহর করা যায় না। আর কী বিশাল মূর্তি। মুখে তার রোদ পড়েছে, তাতে যেন চোখ মেলতে তার কষ্ট হচ্ছে। এদেশি লম্বা ফতুয়ার মতো তার গায়ের জামাটা ছিঁড়ে গেছে, কাদায় তার রং চেনা ভার। অবসন্ন শরীরটাকে কোনও রকমে ঠেলে তুলে বসল সে।

চুড়ামণি আরও অবাক হয়ে দেখল মূর্তিটার ছায়া পড়েছে মাটিতে। বাপকে ডাকতে গিয়েও সে থেমে গেল। মুর্তিটা নীলকুঠির দানো কিনা সে বিষয়ে সংশয় হল তার মনে। দানোনা হলে ছায়া পড়বে কেন? কাদামাখা জামা আর গোঁফদাড়িতে কুঁচো কাঁকড়া গুরগুর করছে কেন? গাছপালা তো থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েনি। দক্ষিণ হাওয়ার দোল খেয়ে কেমন নাচছে। ছুটে এল ঘূর্ণি হাওয়া, উঠল ধুলোর ঝড়, অন্ধকারে ছেয়ে গেল না আকাশ মাটি। তবে কি দস্যির মতো ওই মূর্তি মানুষ। সে মূর্তি ক্লান্ত হাত তুলে কী যেন ইশারা করল। বুঝি কাছে ডাকল চুড়ামণিকে।

চূড়ামণি আরও কয়েক পা পেছিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ কী মনে করে একটা মাটির ডালা তুলে ছুড়ে মারল সেই মূর্তির দিকে। দানো যদি হয় তো নিঘাত এবার হাওয়ায় মিশে যাবে। বুকের মধ্যে দুরন্ত ধুকপুকুনি নিয়ে ঢিল মেরে সে অপেক্ষা করতে লাগল।

কিন্তু না, বারেক কটমটিয়ে সেই মূর্তি দেখল চুড়ামণির দিকে তারপর নিঃশব্দে হেসে উঠল। না হাসি তো নয় দত্যির মতো। মস্ত মানুষটা কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে। মুখ ঢেকে ফেলেছে দু-হাতে।

পাগল নাকি! চুড়ামণি এবার চেঁচিয়ে উঠল। ওগো ও কত্তা বাড়ি কোথা তোমার?

কে র‍্যা? বলতে বলতে পেছন থেকে বুড়ো পাটনি এসে হাজির হল। চূড়ামণি বলল, দ্যাখো না কে কাঁদতে নেগেছে।

মুর্তি এবার বুড়োমানুষের গলা পেয়ে মুখ তুলল। হাত তুলে ডাকল বুড়ো পাটনিকে, ইধার আও।

কথাটা বুঝল না, ডাকটা বুঝল। বাপ ব্যাটা একবার চোখাচোখি করে এক মুহূর্ত থমকে বুড়ো পাটনি এক পা এক পা করে এগুল, এগিয়েও বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে বলল, কী বলছ বলো। কোত্থেকে এয়েছ, পড়ে আছ কেন অমন করে?

বোঝা গেল সে পাটনির কথা কিছুই বুঝতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, ইয়ে হ্যায় কৌন মুলুক, কৌন জিলা, ক্যা নাম হ্যায় গাঁওকে?

চুড়ামণিও ততক্ষণে সন্তর্পণে বাপের পাশটিতে এসে দাঁড়িয়েছে এবং পরম বিস্ময়ে এ বিচিত্র মানুষের বিচিত্র ভাষা শুনতে লাগল। বুড়ো পাটনি হাত মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে তার কথার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারেনি। বলল, বাংলায় বলল মিঞা, বাংলায়। ওসব ইঞ্জিরি ফারসি আমরা বুঝিনে।

মিঞা শব্দটা ঠাহর করতে সে বলল, হম হিন্দু হ্যায়।

তুমি হিন্দু?

সে ঘাড় নাড়ল।

বাড়ি কোথা, বাড়ি? ঘরবাড়ি গো, ঘরবাড়ি।

ঘর? সে মূর্তি অলসভাবে শুন্যে তাকিয়ে রইল। কোথায় তার ঘর? চোখের সামনে ভেসে উঠল বালু ছড়ানো উঁচু-নিচু বিস্তৃত প্রান্তর, তার ফাঁকে ফাঁকে ঝলসানো সবুজের পাঁশুটে গ্রাম। সেই পাঁশুটে সবুজই মা লক্ষ্মীর রং সেখানে। সেই বালুছড়ানো কঠিন জমিনে ইতস্তত ছড়ানো যব ভুট্টার খেত, সোনালি গমের ঢেউ-দোলানি। ইদারায় ইদারায় মাথায় কলসি নিয়ে আওরতের ভিড়, কক্ষনের মিঠা আওয়াজ, মধুর কলহাস্যে মুখরিত ইদারার রোয়াক। অকারণ ঘোমটার ফাঁকে বিশাল নয়নে নয়নে নীরব কথার আদান-প্রদান, কাঁচুলি-বেষ্টিত বুকে উত্তাল ঢেউ ওঠে অকারণ বেদনায়। মরুভূমির উত্তাপের জ্বালায় বুঝি বা কোনও আওরত কাঁচুলির বেষ্টনী খুলে ইদারার ঠাণ্ডা জলে নিটোল বুক ধুয়ে নেয়, অবহেলিত জটবাঁধা চুলে জল ঢালে, জ্বালাধরা চোখে ছিটা দেয়। দিয়ে বসে থাকে জল ঢালা ঠাণ্ডা রোয়াকে, অবিন্যস্ত বিস্ত। উষর মরুতাপে দগ্ধ সোনার নখ বুঝি কেঁপে কেপে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে হয়তো বিদ্রোহী সিপাহির লড়াই, কামান বন্দুক গুলি, খুন জখম রক্ত আর মৃত্যুর আর্তনাদ। তারপর উন্মুক্ত বুক ঠাণ্ডা রোয়াকে চেপে মুখ গুজে হয়তো বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে! এ বালুভরা প্রান্তরই তার জীবন, কোনও চাষীর সুতীক্ষ্ণ লাঙলের ফালা মাটি তুলে সেখানে মরুদ্যান তৈরি করবে না।

…মূর্তি হাসল, বিচিত্র শান্ত হাসি। কোথায় তার ঘর? ঘর নেই। মাথা নাড়ল সে। হয়ছড়া, জঙ্গল-ছাড়া পাহাড়-পর্বত নদীনালা ডিঙানো, ধাবিত নেকড়ের জীবন, জোড়া জোড়া মৃত্যুবী বন্দুকের নল তার পিছে পিছে ছুটছে। মাস দিনের হিসাব নেই, হিসাব নেই জীবনের। কখনও সূর্য উঠেছে, কখনও মেঘ ঝড় শিলা বৃষ্টি। কখনও অন্ধকার, শুভ্র চন্দ্রলোক কখনও বা আঘাটায় আশ্রয়হীন পলায়মান উর্ঘশ্বাস জোয়ানের বুকে মাতন লাগিয়ে দিয়েছে। ঘোমটা-খা মাথায় অবহেলায় এলানো টিকুলি দুলেছে চোখের উপর, চাঁদের আলোয় ঠাণ্ডা বালুময় প্রান্তরের গন্ধ, আকুল নাসারন্ধ্র উঠেছে ফুলে ফুলে ফুলে। সে তো ক্ষণিকের। ছেটার বিরাম নেই। পেছনের সমস্তটাই ক্ষণিক, ফেলে আসা একটা স্মৃতিমাত্র। না না, তার ঘর নেই। অতীতেও থাকবার মধ্যে আছে শুধু এক বিজাতীয় ক্রোধ, তীব্র বিদ্বেষ গোলার আগুনে ধোঁয়ার রক্তে আচ্ছন্ন যুদ্ধক্ষেত্র সারা হিন্দুস্থান আর অসহ্য পরাজয়ের জ্বালা। আর আছে সেনাপতির মূর্তি আঁকা বুকে, যে সেনাপতির কপালে সে দেখেছিল রাজটিকা, স্বপ্ন দেখেছিল সেই বীর-মূর্তি দিল্লির সুবর্ণমণ্ডিত সিংহাসনে সম্রাটের সাজে আসীন, সহস্র বর্ষের পুনরধিকৃত হিন্দু সাম্রাজ্য, সে হল তার এক বীর সেনা, যার মাথার উষ্ণীষ প্রতি মুহূর্তে সম্রাটের সম্মানস্পর্শে গরীয়ান।

সে বার বার মাথা নাড়াল। না, তার কিছু নেই। কিছু নেই। দুর্ধর্ষ শক্ত-তাড়িত ক্লান্ত নেকড়ের জীবন।

পাটনি বাপ ছেলে আবার চোখাচোখি করল। বুড়ো পাটনি বলল, তবে কি হওয়ায় ভেসে   এলে? ঘরবাড়ি তো শেয়ালেরও থাকে, তোমার কি মাথা গোঁজবার ঠাঁই ছেল না কোথাও?

সে পাটনির কথা বুঝল না, চুপ করে রইল। চূড়ামণির তো বিস্ময়ের শেষ নেই। এ আবার কেমন মানুষ, যার ঘরবাড়ি নেই, দেশ নেই, বাপ-ভাই কেউ নেই! তবে কি কাদার ভেতর থেকে আপনাআপনি গজিয়ে উঠেছে মানুষটা! আর একবার বুকে থুতু ছিটিয়ে দিল সে।

মাথা খারাপ, পাগল ভেবেই বুড়ো পাটনি আবার জিজ্ঞেস করল, যাবে কোথায়? ঠাঁই নিশানা আছে কিছু? দেখে তো মনে হচ্ছে কতকাল খাওয়া বিনা ধুকছু।

সে আবার আপন মনে মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ বলল, ঔর মেরা তাগদ হ্যায় নহি, ঔর কাঁহি যা-না মুঝে মুশকিল।

বুড়ো পাটনির গঞ্জিকার ধোঁয়াতপ্ত লাল চোখে একটু যেন আশা দেখা দিল। অর্থাৎ কথা খানিক ঠাহর করতে পারছে সে। বলল, মুশকিল তো বুঝলাম, দুটো মুড়ি গুড় খাবে তো বলল, এনে দেই। ওই লৌকোর মধ্যেই আছে। বলে সে চুড়ামণিকে ইশারা করতেই বাপের ভাগের ন্যাকড়ায় বাঁধা মস্ত একটা মুড়ির পুঁটলি নিয়ে এল।

পুঁটলি দেখে সে বিস্মিত আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠল। খাবার! ও হো, কত দিন পেটে দানা পড়েনি। পেটের মধ্যে শূন্য কোষ্ঠে কতগুলো সরীসৃপ যেন কিলবিল করে উঠল, জিভটা ভিজে উঠল জলে। মৃত্যুর মধ্যে জীবনের সঙ্কেত যেন। সে জিজ্ঞেস করল, কেয়া হ্যায়?

বুড়ো পাটনি বলল, কেয়া সুঁই-টুই কিছুই লয় বাবা লখীন্দর, সে পাবে তুমি হুই স্যানপাড়া কেরেস্তান বাবুদের বাগানে। এগুলো মুড়ি, চুড়োর মা বেরোবার সময় দিয়েছে। ওই খেয়ে খানিক জল খাও, পানটা একটু ঠাণ্ডা হবে। এবং যথেষ্ট বুদ্ধি খাটিয়ে হাত মুখ দেখিয়ে বলল, পানি দিয়ে এসো এটটু মুখে চোখে। কী করবে বাবা, মা মনসা তোমার ভ্যালা নে এখানেই রেখে গেছে, কিন্তু পানটা তো ফিরে পেয়েছ? বলে সে দু-হাত তুলে নমস্কার করল শ্যামনগরের কালীবাড়ির দিকে মুখ করে।

চূড়ামণি, তো বাপের কাণ্ডকারখানা দেখে বিস্ময়ে ফেটে যাওয়ার জোগাড়। পাটনির কথা লখীন্দর ভাবে বুঝে গঙ্গায় নামল হাত মুখ ধুতে।

চুড়ামণি বলল, ও লখীন্দর হল কেমন করে গো বাবা? চিনে ফেলে দিয়েছ?

পাটনি বলল ভীষণ গম্ভীর হয়ে, তা বেহুলাই না হয় নেই, এ তো চাঁদরাজার খায়ের বিত্তান্তই ঘটল। বলে কপাল টেনে ভ্রূ তুলে বলল, বুঝলিনে? মানুষটা সাপে কাটা-মরা, মা বাপ ভেলায় ভাসিয়ে দিয়েছে যদি মনসা দয়া করে আবার বিষ তুলে নেয়। হ কপাল বটে! মনসার দয়া আছে ওর উপর। তবে এ কালের মানুষ কিনা, তাই আগের জন্মের কথা সব ভুলে গেছে।

বলে সে আবার কপালে হাত দিল। বিস্ময়ে ভয়ে-ভক্তিতে বিচিত্র মুখভঙ্গিতে চূড়ামণিও বাপের দেখাদেখি নমস্কার করল। মরা মানুষ ফের জ্যান্ত হয়েছে। মনসার আশীর্বাদ-প্রাপ্ত পুত্রের দেহের প্রতিটি অঙ্গ সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কল্পনায় সে স্পষ্টই দেখতে পেল, ভেলায় ভাসা নীল মড়াকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে মা মনসা, বিরাট ফণা তুলে জিভ দিয়ে বিষ তুলে নিচ্ছে। কিন্তু দেখা তো দিতে পারে না, ততখানি পুণ্যি নিশ্চয়ই করেনি মানুষটা। তাই বিষ তুলে পাডে রেখে দিয়ে গেছে।

কাদার থেকে উঠে এসে সে শুকনো মাটিতে বসল। পাটনি তার হাতে তুলে দিল মুড়ির পুঁটলি।

ইতিমধ্যে জগদ্দলের আর আতপুরের দু-চার জন এসে ভিড় করেছে ফরাসডাঙার খেয়া পেরুবার জন্য। মদন কৈবর্ত জিজ্ঞেস করল, ব্যাপারখানা কী গো পাটনি খুড়ো, কে এল?

বলতে বলতে তারা সকলেই পাটনির কাছে এসে হাজির হল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল বিড়ম্বিত মানুষটাকে। গোঁফ দাড়ি ভরা মুখ, শতচ্ছিন্ন জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি। চেহারা বটে, যেন বিভীষণ কিন্তু মুখোনি শিশুর মতো কোমল। মুড়ি খেতে খেতে এক-একবার মুখ তুলে সে অনুসন্ধিৎসু চোখে সবাইকে দেখছে, চেষ্টা করছে হাসবার, থেকে থেকে একটা ভয়চকিত সন্দেহের ছায়া পড়ছে তার চোখে। এ মানুষগুলোকে অবশ্য তার ভয় নেই। আতপুরের রাজপ্রাসাদ, জগদ্দল সেনপাড়ার যে ইমারত গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারছে সেগুলোই তার ভয়ের উদ্রেক করছে বেশি। গোরা কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেছে হিন্দুস্থানের, দোস্ত-ইয়ার পেয়েছে মেলাই। ওই সব বড় আদমিরা গোরাদের সহায়। যদি তারা তাকে ধরিয়ে দেয়? তুলে দেয় যদি কোম্পানির কামানের মুখে। হায় রাম! এ ভাবে কত দিন সে জিন্দিগি বহন করবে? আর তো তার চলার ক্ষমতা নেই। সমস্ত শক্তি নিঃশেষ। আর ওই ঢোল ড্যামডেমিয়া সর্বনেশে মুলুক। সে ফাসডাঙার দিকে ফিরে তাকাল। যেন একটা শিকারি কুকুর তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

শ্যাম বাগদী বলল, চুপ করে রইলে যে খুড়ো? বিত্তান্ত কী? লোকটা এল কোত্থেকে? পাটনি বুড়ো চুড়ামণিকে বলা বৃত্তান্ত সবাইকে ফিসফিসিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল। খানিক দক্ষিণে আতপুরের কানাচে জঙ্গলপীরের দহ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ওইখানের মা মনসা ওকে দয়া করে এখানে দিয়ে গেছে। হ্যাঁ, ও তোমার দিনু হারু (দিনেমার হার্মানি অর্থাৎ আমানি) য্যাতই ভোল পালটে দিক, ভগমানের নীলা থাকবে চেরকাল ধরে। তা, এখন আমাদেরই এট্টা কিছু করতে হবে না।

বুড়ো পাটনির এ কাহিনীকে সকলেই মেনে নিল শুধু নয়, জঙ্গলপীরের দহের দিকে তাকিয়ে সকলেরই বুকের মধ্যে ছমছম করে উঠল। শুধু মা মনসা বলে কথা নয়, সমস্ত রুষ্ট আর ক্ষুব্ধ দেবদেবীর আস্তানা হল জঙ্গলপীরের দহ। দেখতে পাও বা না পাও, আতপুর ও শ্যামনগরের মধ্যখানে ওই জঙ্গলপীরের বড় বড় গাছের ঝুপসিঝাড়ের মাথার উপরে দেবদেবীর শ্যেনদৃষ্টি প্রতি মুহূর্তে এই গাঁয়ের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও একটু অনাচার করেছ কী আর রেহাই নেই। রাগে ফোঁসা নিশ্বাসের ঝোড়ো ঝাপটাতেই তোমাকে আছড়ে ফেলবে ওখান থেকে। তাই জলপীরের দহে পুজো লেগেই থাকে। জগদ্দল-আতপুরের মানুষরা যেতে আসতে মাথা নোয়ায়।

শ্যাম বাগদী বলল, তা হলে ব্যবস্থা-ট্যবস্থা এট্টা করো। সেনপাড়ায় পাইটে দ্যাও, হিল্লে এট্টা করে দেবেখন তারা।

মদন কৈবর্ত একটু বোকাসোকা মানুষ। কথার আগোক বোঝে না সব সময়। কথায় কথায় তার রসিকতা। বলল, বলি তা হলে এট্টা কথা। মায়ের পেটে ছাওয়াল জম্মায় বিঘৎখানেক, তা এত বড়টারে নিয়ে কী শেখাবে তোমরা? বলছ যখন, মরা মানুষ ফের জম্মে নিয়েছে?

তার চেয়ে যে অনেক ছোট কিশোর চুড়ামণি, সেও পর্যন্ত মদনকে বোকা ঠাউরে জবাব দিল, মায়ের পেটে তো কবেই জন্মেছে, কিন্তু একবার মরে যে আবার বেঁচে এল সেটা বুঝছ না?

মদন বুঝবে কী, হেসেই গড়িয়ে পড়ল। বলল, শিবের দিব্যি দিয়ে বলছি, এমন অবাক কাণ্ড আর দেখিনি।

শ্যাম ধমকে উঠল, থাম থাম। সব কথায় অমন খ্যাল খ্যাল করে হাসিসনে, মাকড়া কোথাকার।

মাকড়া না মাকড়া। রাগে দম আটকে গিয়ে বুড়ো পাটনির হাড়পাঁজর যেন রুখে উঠল। তার নিয়ত গোলাপী চোখ জবার মতো লাল করে বলল, জলি তো সেদিন, দেখলি আর কতখানি যে শিবের দিব্যি গালছিস?

জগলের মুসলমান পাড়ার গনি মিঞা বলল, পীর আর ওর মাথায় নেই। ফরাসডাঙার পাদরি সাবেরা পেয়ার করে ওকে মাড়ুন বলে ডাকে, ডাব খাইয়ে বকশিশ পায়, ধর্মে কি আর ওর মতিগতি আছে?

চুপ করে গেল মদন। শ্যাম খানিকটা দ্বিধা করে হঠাৎ বলল, তা খুড়ো, এক কথা বলি। আমাদের বংশটাতে মা মনসার বড় কোপ রয়েছে। বড় ছেলেটাকে সাপে কাটল গেল সনের আগের সনে। পুজো-আচ্চা তো নিলুম মেলাই কিন্তু অ্যাই সেদিনে আমার ভাই লারানটা মজুমদারদের দেউড়িপিলের কোলে একটা সাপকে শুধু ঢিল মারলে। একেবারে মারতেও পারল না। এখন বলো তো, ঘা খাওয়া সে বেটি কি ছেড়ে দেবে ওকে?

সকলেই সর্বনাশের গন্ধ পেল। বুড়ো পাটনি ঠোঁট নেড়ে কী যেন বলল বিড় বিড় করে। চূড়ামণি এবার হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে চাইছে এ-সব আলোচনা থেকে। কিন্তু এ মানুষগুলোকে আজ পেয়ে বসেছে এ-সব মৃত্যু আর অমঙ্গলের সাংঘাতিক কথায়। নড়ে চড়ে নৌকায় গিয়ে বসে যে মুড়ি চিবোবে সেটুকু মনের জোরও তার নেই। জঙ্গলপীরের দিকে আড়চোখে দেখতে লাগল সে।

গনি মিঞা বলল শ্যামকে, তা এক কাজ করতে পারো। জঙ্গলপীরের থানে মানত করে রাখো।

পলাতক সিপাহি এ মানুষগুলোর কোনও কথাই বুঝল না। কেনই বা এরা কপালে হাত তুলছে আর শঙ্কায় থমথমিয়ে উঠছে এদের মুখ, কী এমন দুর্ঘটনা ঘটল কিছুই সে বুঝতে পারল না। ইতিমধ্যে মুড়ির পুঁটলিটা সাবাড় করে চুপ করে বসে রইল সে।

শ্যাম বলল, শঙ্কিত গম্ভীর গলায়, এই সেদিন ছোঁড়ার বে দিয়ে বউ আনলুম, সেই ফুর্তিতেই ছোঁড়া বাঁচে না। এ-সব ভাবলে আমার আর ভাল লাগে না কিছু বাপু। বাপ-মা হাইরেছি সেই কবে। বড় ছেলেটা মল আবার যদি কোনও বেপদ-আপদ হয়, কী গতি হবে এ সংসারের?

সকলেই চুপচাপ। কেবল মদন বলল, ওদিকে হাটবাজার গুটোবার সময় হল গো খুড়ো।

বেশ খানিকক্ষণ চিন্তার পর শ্যাম যেন স্থির বিশ্বাসে এবার বলল, খুড়ো, এট্টা মতলব দাও দিনি। তোমার এ লখাই মা মনসার বর-পাওয়া-মানুষ। একে আমার ঘরে নিয়ে তুললে মায়ের কিপা হবে না?

বুড়ো পাটনি একবাক্যে সায় দিল। বলল, ঠিক বলেছিস শ্যামা। বলতে গেলে মানুষটা তো মনসার কোলের পুকুর। ও যেখানেই থাক, মা আমার সেখানেই অমঙ্গলের নিশেস ফেলে সব্বেনাশ করতে পারবে না। তবে…

তবে?

না, কিছু লয়। জাতবেজাতের কথা বলছিলাম। তা হিঁদু তো বটে। নাম ধাম ঘর কুলের কোনও কিনারা আর হবে কী করে। ওই লখাই বলেই ডাকবে, থাকবে। মা লক্ষ্মীর কিপায় তোমার তো আর অনটনের সংসার লয়।

ইতিমধ্যে বেলা বেড়ে উঠেছে। জোয়ার এসেছে আবার, শান্ত হাওয়া জোর হয়েছে। গলা ফাটিয়ে একটা কোকিল ডাকছে। কোম্পানির নিশান উড়িয়ে দুখানা মস্ত ভাউলে উত্তরে চলছিল ধিকিয়ে। জোয়ার পেয়ে তার গতি বেড়ে গেল।

বুড়ো পাটনি বলল, কই গো লখাই, যাও বাবা, এখেনে আর কতক্ষণ থাকবে। শ্যামের সঙ্গে ঘরে যাও।

সিপাহি উঠে দাঁড়াল। বলল, কেয়া করেঙ্গে হম, কাঁহা যানা হ্যায়?

হায় ট্যায় নয় রে বাপু, গতি তো এট্টা করতে হবে তোমার? বুড়ো পাটনি বলল, শ্যামকে দেখিয়ে, যাও, এর ঘরে যাও। বলে সে আবার গাঁজার কলকেটা বার করল।

সিপাহির মনে সংশয় এলেও এটা সে বুঝেছিল, এরা তার আসল পরিচয় জানে না, এরা তার প্রতি নির্দয় নয়, এরা তাকে কোনও বিপদে ফেলবার ষড়যন্ত্র করছে না। তা ছাড়া, এ দুর্বিষহ জীবনের অবসান চায় সে। সে জানে না যে, কোন মুলুকে এসেছে, এ অপরিচিত মানুষ ও পরিবেশ এ-সবই তার জীবনে আর অস্বাভাবিক নয়। জীবনের কোনও নির্দিষ্ট গতি তার কাছে নেই, সে শুধু পলায়মান ভীত ত্রস্ত অসহ্য জীবনের গণ্ডির বাইরে যেতে চায়। সে আবার সকলের মুখের দিকে দেখল, দেখল শ্যামের আগ্রহ ও কৌতূহলভরা মুখের দিকে। ফিরে দেখল ফরাসডাঙার দিকে, তারপর কাছে ঘেঁষে এল শ্যামের। তার অতীত বলে কিছু নেই। যে পথ সে পেছনে ফেলে এসেছে, সে পথ থাকুক পেছনেই। পেছনেই থাকুক বেরিলির যুদ্ধক্ষেত্র, মনের মধ্যে হারিয়ে যাক তার অশান্ত ক্রোধ, বিরাট আকাঙক্ষা। মানসপট থেকে যা উপড়ে ফেলা যাবে না তা হল বীর তাঁতিয়া টোপির উদ্দীপ্ত মুখমণ্ডল, উন্মুক্ত কৃপাণ হাতে সিপাহির পথদ্রষ্টা সেই তেজস্বী মূর্তি। আর…, না আর কিছু নেই। সামনে শুধু আছে অপরিচিত ভবিষ্যৎ, নতুন জীবনের আশা ও সংশয়। কে জানে তার শেষ কোথায়।

ধামা বগলে শ্যাম চলল আগে আগে নারকেল আর আমবাগানের ভেতর দিয়ে, পায়ে চলা আঁকাবাঁকা পথে। নীরবে চোখের দৃষ্টি দিয়ে বুড়ো পাটনি ও চুড়ামণির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাদের মা মনসার বরপুত্র লখীন্দর বিশাল শরীর নিয়ে শ্যামের পেছন পেছন চলল। তাদের চলার শব্দ চৈত্রের ঝরা পাতায় মর্মরিত হয়ে উঠল। আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল সেনপাড়ার আমবাগানের ধারে ধারে বিশাল বনস্পতির আড়ালে।

কেবল মদন বলল, কই গো খুড়ো, দেও তা হলে একটু জুত করে বানিয়ে নিই। বুড়ো পাটনি ট্যাঁক থেকে গাঁজার ড্যালাটা তুলে মদনের হাতে দিল। কিশোর চূড়ামণি খুঁটি তুলে ভাসাল নৌকা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *