০২. মিস্টার আর মিসেস ফান ডান

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মিস্টার আর মিসেস ফান ডানের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল। এই জিনিস বাপের জন্মে আমি কখনও দেখিনি। মা-মণি আর বাপি তো এভাবে চেঁচিয়ে পরস্পরকে মুখনাড়া দেওয়ার কথা কল্পনাই করতে পারবেন না। কারণটা ছিল এত তুচ্ছ যে, মোটা ব্যাপারটাই হয়ে দাঁড়াল শুধু কথার ফুলঝুরি। অবশ্য এও ঠিক, যার যেমন অভিরুচি।

পেটারকে যে ঘুর ঘুর করে বেড়াতে হয়, এটা স্বভাবতই তার ভালো লাগার কথা নয়। ও এমন ভয়ঙ্কর রকমের ছিচকাঁদুনে আর আসে যে, কেউ তাকে গুরুত্ব দেয় না। কালকেও দেখি ওর জিভ লাল হওয়ার বদলে নীল হয়ে রয়েছে–ভয়ে ওর মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। এই অসাধারণ প্রকৃতিক ঘটনাটি হুট করে দেখা দিয়ে হুট করে উবে গিয়েছিল। আজ ও গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে ঘুরছে, ওর ঘাড়ে নাকি ফিক-ব্যথা; এর ওপর কর্তাবাবা’রও নাকি কোমরে বাতের ব্যথা। তাছাড়া হৃৎপিণ্ড মূত্রাশয় এবং ফুসফুস–এসবের আশপাশেও ওর যখন-তখন ব্যথা হয়। ও হচ্ছে সত্যিকার রোগাতঙ্ক ব্যাধিগ্রস্ত (এইসব লোকদেরই তো হাইপোকনড্রিয়াক বলে, তাই না?)। মার সঙ্গে মিসেস ফান ডানের পুরোটাই যে একটা মধুর সম্পর্ক তা নয়; তিক্ততার কারণ আছে।

একটা ছোট দৃষ্টান্ত দিই, সকলের জন্যে কাপড়ের যে আলমারি–সেখান থেকে মিসেস ফান ডান তিনটি চাদরের সব কয়টিই হস্তগত করেছেন। উনি এটা ধরেই নিয়েছেন যে মা মণির চাদরে আমাদের সবারই কাজ চলে যাবে। ওর পিত্তি জ্বলে যাবে যখন উনি দেখবেন মা-মণি ওঁরই মহৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছেন।

সেই সঙ্গে, ওঁর গা জ্বলে যায় যখন উনি দেখেন, আমাদের থালাবাসনের বদলে ওঁর জিনিসে খাবার দেওয়া হচ্ছে। উনি সবসময় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন আমাদের প্লেটগুলো আমরা কোথায় রাখি। ওঁর যা ধারণা তার চেয়ে কাছে, চিলেকোঠার একগাদা হাবিজাবি জিনিসের পেছনে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সে। আমরা যতদিন এখানে আছি, ততদিন আমাদের প্লেটগুলোর নাগাল পাওয়া যাবে না, সেটা একপক্ষে ভালোই। আমি সব সময় অপয়া; মিসেস ফান ডানের একটা সুপ-প্লেট কাল আমার হাত থেকে পড়ে চুরমার। হয়ে গেছে। উনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেছিলেন, ‘তোমার কি একটি বারের জন্যেও আক্কেল হল না-ওটা ছিল আমার শেষ সুপ-প্লেট।’

মিস্টার ফান ডান আজকাল গলায় মধু ঢেলে আমার সঙ্গে কথা বলেন। এই ভাব দীর্ঘজীবী হোক। আজ সকালে মা-মণি আমাকে শুনিয়ে ভয়ানকভাবে আরেক প্রস্থ উপদেশ ঝাড়লেন; এসব শুনলে আমার গা জ্বালা করে। আমাদের ধ্যান-ধারণা একেবারেই বিপরীত। বাপি হলেন সোনামণি, যদিও মাঝে মাঝে আমার ওপর রেগে যেতে পারেন। তবে পাঁচ মিনিটেই তার রাগ পড়ে যায়। গত সপ্তাহে আমাদের একঘেয়ে জীবনে একটা সামান্য ছেদ। পড়েছিল; এর মূলে মেয়েদের সংক্রান্ত একটি বই এবং পেটার। গোড়ায় বলা দরকার, মিস্টার কুপহুইস্ যেসব বই আমাদের ধার দেন, তার মধ্যে প্রায় সবই মারগট আর পেটার পড়তে পারে। কিন্তু মেয়েদের বিষয়ে লেখা এই বইটা বড়রা আটকে দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পেটারের কৌতূহল চেয়ে উঠল।

বইতে এমন কী আছে যা ওদের দুজনকে পড়তে দেওয়া গেল না? ওর মা যখন নিচের তলায় কথা বলতে ব্যস্ত, তখন পেটার চুপিচুপি বামাল বগলদাবা করে পালিয়ে চিলেকোঠায় চলে গেল। ক’দিন গেল নির্ঝঞ্ঝাট। পেটারের মা তার কাণ্ডকারখানা জানতেন। কিন্তু সে কথা কাউকে বলেননি।

এমন সময় পেটারের বাবা ব্যাপারটা জানতে পারলেন। তিনি খুব চটে গিয়ে বইটা সরিয়ে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন এখানেই গোটা ব্যাপারটা চুকেবুকে গেল। কিন্তু বাবার এই মনোভাবে ছেলের ঔৎসুক্য ক্ষয় পাওয়ার বদলে যে আরও বৃদ্ধি পাবে এটা তার হিসেবের মধ্যে ছিল না। পেটার তখন সেই চিত্তাকর্ষক বইটা পড়ে শেষ করবার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে সেটা হাতাবার এক উপায় বার করল। ইতিধ্যে মিসেস ফান ডান এই গোটা ব্যাপারটাতে মার কী মত সেটা জানতে চাইলেন। মা-র ধারণা, এই বিশেষ বইটা মারগটের উপযুক্ত নয়, তবে বেশির ভাগ বই নির্বিঘ্নে মারগটকে পড়তে দেওয়া যায়।

মা-মণি বললেন, দেখুন মিসেস ফান ডান–মারগট আর পেটারের মধ্যে বিস্তর ফারাক। প্রথমত, মারগট হল মেয়ে এবং মেয়েরা সব সময়ই ছেলেদের চেয়ে বেশি সাবালক; দ্বিতীয়ত, মারগট যথেষ্ট গুরুগম্ভীর বিষয়ে লেখা বই পড়েছে, কোনো বই ওকে পড়তে না দিলে তার জন্যে ও ছোঁক ছোঁক করে বেড়াবে না এবং তৃতীয়ত, মারগটের বাড় বৃদ্ধি বেশি, বুদ্ধিও বেশি–ইস্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে তার পড়া থেকেই তা বোঝা যায়। মিসেস ফান ডান সে বিষয়ে একমত; কিন্তু তবু তিনি মনে করেন, বড়দের জন্যে লেখা বই ছোটদের পড়তে দেওয়াটা নীতিগতভাবে ভুল।

ইতিমধ্যে পেটার দিনের এমন একটা ফাঁক বেছে নিয়েছে যখন পেটার এবং ঐ বইটার কথা কারো আর তেমন মনে নেই; সময়টা হল সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা–সবাই তখন অফিসের খাস কামরায় বসে রেডিও শুনছে। পেটার ঠিক সেই সময় তার মহামূল্য বস্তুটি নিয়ে ফের চিলেকোঠায় উঠে গেছে। কিন্তু বইটাতে সে এমনই জমে গিয়েছিল যে সময়ের কথা আর তার খেয়াল থাকেনি। যখন সে সবে নিচে নেমে আসছে ঠিক তখন ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন ওর বাবা। তারপর কী হল বুঝতেই পারছ। একটা চড় মেরে টান দিতেই বইটা ধপাস করে পড়ল টেবিলে আর পেটার দৌড় দিয়ে পালাল চিলেকোঠায়। এই অবস্থায় তারপর আমরা খেতে বসে গেলাম। পেটার রইল ওপরতলায়–কেউ তাকে ডাকাডাকি করল না। রাত্রে না খেয়েই তাকে শুয়ে পড়তে হল।

আমরা খেয়ে চলেছি, খোশমেজাজে কথাবার্তা বলছি–এমন সময় হঠাৎ হুইসেলের তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ; খাওয়া থামিয়ে আমরা ভয়ে পাংশুবর্ণ হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। এমন সময় চিমনির ভেতর দিয়ে পেটারের গলা ভেসে এল। ‘আমি কিছুতেই নিচে যাব না, এই বলে দিচ্ছি।’ মিস্টার ডান ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন, মেঝেতে তাঁর ন্যাপকিনটা গড়িয়ে পড়ল। চোখ মুখ লাল করে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আর আমি বরদাস্ত করব না।‘

বিশ্রী কিছু ঘটার আশঙ্কায় বাপি উঠে গিয়ে তার হাত ধরলেন, তারপর দুজনে গেলেন চিলেকোঠায়। খানিকক্ষণ ঠেলাঠেলি গুঁতোগুতির পর টেনেহিঁচড়ে ওকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। তারপর আবার আমরা খেতে শুরু করে দিলাম। মিসেস ফান ডান চাইছিলেন তাঁর আদুরে ছেলেটির জন্যে এক টুকরো রুটি রেখে দিতে। কিন্তু ছেলের বাবা খুব কড়া। ও যদি এখুনি মাপ না চায়, চিলেকোঠাতেই ওকে রাত কাটাতে হবে। আমরা বাকি সবাই চেঁচিয়ে এর প্রতিবাদ করলাম; আমাদের মতে রাত্রে খেতে না পাওয়াটাই হবে ওর পক্ষে যথেষ্ট শাস্তি। তাছাড়া পেটারের ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে এবং এ অবস্থায় ডাক্তরবদ্যিও ডাকা যাবে না।

পেটার মাপ চায়নি; অনেক আগেই চিলেকোঠার ঘরে চলে গেছে। মিস্টার ফান ডান আর এ নিয়ে বেশি কিছু করেননি; কিন্তু পরের দিন সকালে আমি লক্ষ্য করলাম পেটারের বিছানায় রাত্রে ঘুমোবার চিহ্ন। সাতটার সময় পেটার চিলেকোঠায় ফিরে গিয়েছিল; কিন্তু আমার বাপি ওকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে আবার নিচে নামিয়ে এনেছিলেন। তিনদিন ধরে চলল বিরস বদন আর মুখ বুজে গোঁয়ার-গোবিন্দপনা–ব্যাস্, তারপর আবার সব যে কে সেই।

তোমার আনা।

.

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আজ তোমাকে আমাদের সাধারণ খবরাখবর দেব।

মিসেস ফান ডানকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। আমি সারাক্ষণ বকবক করি বলে উনি কেবল ‘ঝাড়’ দেন। কোনো না কোনোভাবে সব সময়ই উনি আমাদের জ্বালাতন করেন। একেবারে হালের ব্যাপার হল–হাঁড়ি-পাতিলে যদি একটুও কিছু পড়ে থাকে, তাহলে আর তিনি ধোবেন না; কাঁচের ডিশে তুলে রাখলেই হয়, আমরা যা এতদিন করে এসেছি–তা নয়, প্যানেই সেটা রেখে দিয়ে জিনিসটা উনি নষ্ট হয়ে যেতে দেন।

পরের বারের খাওয়াদাওয়া শেষ হলে মারগটকে কখনও কখনও গোটা সাতেক প্যান মাজতে হয় আর তখন শ্ৰীমতী বলেন, ‘ইস, মারগট, তোর ঘাড়ে বড় বেশি খাটুনি পড়ে যাচ্ছে।‘

বাবা তার বংশপঞ্জী তৈরি করছেন; আমি বাবার সঙ্গে সেই কাজে ব্যস্ত। যেমন যেমন আমরা এগোচ্ছি বাবা সেই মত প্রত্যেকের সম্বন্ধে কিছুটা কিছুটা বলছেন–কাজটা করতে দারুণ মজা লাগছে। এক সপ্তাহ অন্তর মিস্টার কুপহুইস আমার জন্যে কয়েকটা করে বিশেষ বিশেষ বই আনেন। ‘য়ুপ টের হয়েল’ সিরিজ দারুণ রোমহর্ষক। সিসি ফান্ মার্ক্সফেটের পুরাটাই আমার খুব ভালো লেগেছে। আর ‘ঈন্‌ৎ সোমেন্‌সোথেইড’ পড়েছি চারবার এবং কোনো কোনো হাস্যকর অবস্থার উদ্রেক হলে সেই নিয়ে এখনও হাসি।

পড়াশুনা আবার শুরু হয়ে গেছে; আমি ফরাসী নিয়ে আদাজল খেয়ে লেগেছি এবং দিনে পাঁচটা করে অনিয়মিত ক্রিয়াপদ কোনো রকমে মগজে ঠাসছি। ইংরেজি সামলাতে পেটারের দম বেরিয়ে যাচ্ছে আর কেবল মাথা চাপড়াচ্ছে। কিছু স্কুলপাঠ্য বই সদ্য এসেছে; লেখার। খাতা, পেন্সিল, রবার আর লেবেল যা আছে তাতে অনেকদিন চলে যাবে–এসবই আসার সময় আমি নিয়ে এসেছিলাম। লণ্ডন থেকে ওলন্দাজদের বিষয়ে যে খবর বলে আমি কখনও কখনও শুনি। সম্প্রতি প্রিন্স বের্নহার্ডকে বলতে শুনলাম। উনি বললেন যে, রাজকুমারী উরিয়ানার বাচ্চা হবে জানুয়ারী নাগাদ। এটা একটা চমৎকার খবর; রাজপরিবার সম্পর্কে আমার এই আগ্রহ দেখে অন্যেরা তো অবাক।

আমাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে এখন সবাই স্থিরনিশ্চিত যে, আমি তাহলে একবারে হাবা নই–এর ফল হল এই যে, পরের দিন আমার ঘাড়ে আরও বেশি বোঝা চাপানো হল। আমার এই চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে আমি এখনও সেই প্রাথমিক শ্রেণীতেই থাকব এটা নিশ্চয়ই আমি চাই না।

সেই সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে আরও একটা ব্যাপার উঠেছিল–আমাকে কোনো সাচ্চা ধরনের বই না পড়তে দেওয়া সম্পর্কে। মা-মণি এখন পড়চ্ছেন ‘হীরেন্‌, ফ্লুডেন্ এন্ ক্রেশ্‌টেন’; ওটা আমার পড়বার অধিকার নেই (মারগটের আছে)। গোড়ায় আমাকে বুদ্ধিতে আরও পাকা হতে হবে, আমার গুণবতী দিদির মত। তারপর দর্শনে আর মনোবিজ্ঞানে আমার অজ্ঞতা সম্বন্ধে আমাদের কথা হয়; ও দুটো বিষয় সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। হয়ত পরের বছরে আমার বুদ্ধি পাকবে। (এই খটমটে শব্দগুলোর মানে জানার জন্যে তাড়াতাড়ি আমি ‘কোয়েনেনে’র পাতা উল্টে নিলাম)।

আমি ঘাবড়ে আছি, কারণ এইমাত্র আমার হুশ হল যে শীতের জন্যে আমার থাকার মধ্যে আছে একটা লম্বা-হাতের পোশাক আর তিনটে কার্ডিগান। বাবার কাছ থেকে সাদা ভেড়ার উলের একটা জাম্পার বোনবার অনুমতি পেয়েছি; উলটা খুব সরেস নয়, কিন্তু গরম হওয়া নিয়ে কথা। আমাদের কিছু জামাকাপড় বন্ধুদের বাড়িতে এদিক সেদিকে পড়ে রয়েছে; যুদ্ধ না মিটলে সেসব আর উদ্ধার হবে না, তাও যদি যে যেখানে ছিল সেখানেই তখনও থাকে। মিসেস ফান ডান সম্পর্কে সবে আমি দু-একটা কথা লিখেছি, এমন সময় তার। আবির্ভাব। অমনি ফটাস্ করে খাতাটা আমি বন্ধ করে দিলাম। ‘আনা রে, একটুখানি আমাকে দেখাবি নে?’

‘উঁহু, সম্ভব নয়।’

‘তাহলে শুধু শেষের পাতাটা?’

‘কিছু মনে করবেন না, দেখাতে পারছি না।’

স্বভাবতই আমি ভয়ানক ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছিলাম; কারণ ঠিক ঐ পৃষ্ঠাতেই ওঁর সম্পর্কে একটা অপ্রশংসাসূচক বর্ণনা ছিল।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল সন্ধ্যেবেলায় আমি ওপরতলায় ফান ডানেদের ঘরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে গল্প করতে আমি এরকম যাই। কখনও কখনও বেশ জমে। খানিকটা পোকা-মারা বিস্কুট (পোকা-মারা ওষুধে ভর্তি কাপড়ের আলমারিতে বিস্কুটের টিনটা রাখা হয়) আর লেমোনেড খাই। পেটারের সম্পর্কে আমাদের কথা হল। আমি ওদের বললাম পেটার কিভাবে আমার গালে টোকা মারে, ওরকম ও না করে এটা আমি চাই, কেননা ছেলেরা আমার গায়ে হাত দিলে আমার বিচ্ছিরি লাগে।

বাপ-মায়েদের একটা বিশেষ ধরন আছে, সেইভাবে ওঁরা জিজ্ঞেস করলেন–পেটারকে আমি ভালো লাগাতে পারি কিনা, কারণ পেটার নিশ্চয় আমাকে খুব পছন্দ করে। আমি মনে মনে ভাবলাম মরেছে এবং মুখে বললাম, ‘আজ্ঞে, না। ভাবো একবার।

আমি জোর দিয়েই বললাম পেটারকে আমার একটু হাতে-পায়ে জড়ানো বলে মনে হয়–হয়ত সেটা ওর লাজুক স্বভাবের জন্যে–মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার অভাবের দরুন অনেক ছেলে যেরকমটা হয়ে থাকে।

স্বীকার করতেই হবে যে, ‘গুপ্ত মহলের (পুং বিভাগ) শরণঙ্কর সমিতির খুব মাথা আছে। মিস্টার ভ্যান ডীক হলেন ট্রাভিস কোম্পানীর প্রধান প্রতিনিধি; বন্ধুত্ব থাকায় আমাদের কিছু জিনিস উনি আমাদের হয়ে চুপিসাড়ে লুকিয়ে রেখেছেন; মিস্টার ডীক যাতে আমাদের খবরটা পেয়ে যান তার জন্যে ওঁরা কী করেছেন বলছি।

আমাদের ফার্মের সঙ্গে কারবার করে দক্ষিণ জীল্যাণ্ডের এমন একজন কেমিস্টকে ওঁরা টাইপ করে এমনভাবে একটা চিঠি দিয়েছেন যা সে ব্যক্তিকে উত্তর পাঠাতে হবে বন্ধ করা একটি ঠিকানাযুক্ত খামে। বাপি খামের ওপর অফিসের ঠিকানা দিয়েছেন। জীল্যাণ্ড থেকে ঐ খাম যখন আসবে, ভেতরের চিঠিটা সরিয়ে ফেলে তার ভেতর বেঁচে থাকার প্রমাণ হিসেবে বাপির স্বহস্তে লেখা একটি চিরকুট ভরে দেওয়া হবে। এভাবে হলে, ভ্যান ডী চিরকুট পড়ে কোনো কিছু সন্দেহ করবেন না। ওঁরা বিশেষভাবে জীল্যাণ্ড বেছে নিয়েছিলেন এই জন্যেই যে, জায়গাটা বেলজিয়ামের খুব কাছে; সীমান্ত পেরিয়ে সহজেই চিঠিটা গোপনে চালান করা যেতে পারে; তার ওপর, বিশেষ ধরনের পারমিট ছাড়া কাউকেই জীল্যাণ্ডে ঢুকতে দেওয়া হয় না; সুতরাং ওরা যদি ভেবেও নেয় যে, আমরা সেখানে আছি–উনি চেষ্টাচরিত্র করে কখনই সেখানে আমাদের খুঁজতে চলে যাবেন না।

তোমার আনা।

.

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এইমাত্র মা-মণির সঙ্গে বেশ একচোট ফাটাফাটি হয়ে গেল; ইদানীং আমরা কেউই তেমন মানিয়ে চলতে পারছি না। অন্যদিকে মারগটের সঙ্গে আমার সম্পর্কও ঠিক আগের মত নেই। সচরাচর আমাদের পরিবারে এ ধরনের মেজাজ খারাপ করার রেওয়াজ নেই। তাহলেও সব সময় এটা আমার কাছে কোনোমতেই ভাল লাগে না।

মা আর মারগটের ধরন-ধারণ আমার কাছে একেবারেই অদ্ভুত লাগে। আমি আমার নিজের মার চেয়ে বন্ধুদের বরং বেশি বুঝতে পারি–এটা খুবই খারাপ!

আমরা প্রায়ই যুদ্ধের পরের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করি; যেমন বাড়ির চাকরবাকরদের কিভাবে ডাকা উচিত।

মিসেস ফান ডান ফের চটাচটি করেছেন। ওঁর মেজাজের কোনো ঠিক নেই। ওঁর নিজের জিনিসপত্র উনি ক্রমাগত লুকিয়ে রাখেন। মা-মণির উচিত ফান ডানদের ‘হাওয়া হওয়া’র উত্তরে আমাদেরও ‘হাওয়া করে দেওয়া’। কিছু কিছু লোক আছে যারা নিজেদের ছেলেপুলেদের ওপর আবার পরের ছেলেপুলেদেরও মানুষ করতে ভালবাসে। ফান ডানেরা হলেন সেই গোত্রের। মারগটের বেলায় দরকার হয় না; ও হল যাকে বলে সুবোধ বালিকা, একেবারে নিখুঁত মেয়ে–কিন্তু আমার একার মধ্যে যোগ হয়েছে একসঙ্গে দুজনের দুষ্টুমি। খাওয়ার সময় কি রকম দুই তরফা নিন্দে-মন্দ আর তার চ্যাটাং চ্যাটাং জবাব হয় একবার শুনে দেখো। মা-বাবা সব সময়ই জোরালো ভাবে আমার পক্ষ নেন। ওঁরা না থাকলে আমাকে হাল ছেড়ে দিতে হত। ওঁরা অবশ্য আমাকে বলেন আমি যেন বেশি কথা না বলি, আমার উচিত আরেকটু নম্র হওয়া এবং সব কিছুতে নাক না গলানো। বাবা যদি অমন ফেরেশতার মতো মানুষ না হতেন তাহলে আমাকে নিয়ে আমার মা-বাবার পরিতাপের অন্ত থাকত না; ওরা আমার অনেক দোষই ক্ষমার চোখে দেখেন।

আমি যদি আমার অপছন্দসই কোনো তরকারি কম নিয়ে সে জায়গায় একটু বেশি করে আলু নিই, তাহলে ফান ডানেরা, বিশেষ করে সেফরোফ, কিছুতেই এটা বরদাস্ত করতে পারেন না যে, কোনো ছেলেমেয়ের কেন এত আদরে-মাথা খাওয়া হবে।

সঙ্গে সঙ্গে উনি বলে উঠবেন, অমন করে না, আনা–আরেকটু বেশি করে সব্জি নাও।

তার উত্তরে আমি বলি, রক্ষে করুন, মিসেস্ ফান ডান–আমি যথেষ্ট আলু নিয়েছি।

সব্জিতে তোমার উপকার হবে, তোমার মাও সেকথা বলেন। নাও আরেকটু নাও।’ এই বলে যখন উনি চাপাচাপি করতে থাকেন, বাপি এসে আমাকে বাঁচান।

এরপর মিসেস্ ফান ডান আমাদের ওপর এক হাত নেন–’তোর উচিত ছিল আমাদের। বাড়ির মেয়ে হওয়া, তবে ঠিকমত মানুষ হতিস। আনাকে এতটা আদর দিয়ে মাথায় চড়ানোর কোনো মানে হয় না। আনা যদি আমার মেয়ে হত, আমি তো সহ্যই করতাম না।’

‘আনা যদি আমার মেয়ে হত,’ এটা সব সময়ই ওর ধরতাই বুলি। ভাগ্যিস, আমি ওঁর মেয়ে হইনি।

‘মানুষ হওয়ার ব্যাপারটায় আবার ফিরে আসি। কারণ মিসেস ফান ডানের বকুনি শেষ হওয়ার পর খানিকক্ষণ কারো টু শব্দ নেই। তখন বাবা মুখ খুললেন, ‘আমি মনে করি, আনা অত্যন্ত ভালোভাবে মানুষ হয়েছে; আর যাই হোক না হোক, একটি জিনিস সে শিখেছে আপনার সাতকাণ্ড উপদেশ বচনের উত্তরে ও মুখে কুলুপ দিয়ে থেকেছে। আর সব্জির কথা বলছেন, আপনার নিজের থালার দিকে একবার তাকান। মিসেস ফান ডানের থোতা মুখ একেবারে ভোতা। তিনি নিজেই সব্জি নিয়েছেন যৎসামান্য। তাই বলে তিনি তো আদরে মাথা-খাওয়া নন। বারে! সন্ধ্যেবেলায় সব্জি বেশি খেলে ওঁর যে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়! বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এত কিছু থাকতে আমার ব্যাপার নিয়ে উনি তো চুপ থাকলেই পারেন তাহলে তো আর ওঁকে নিজের কোলে ওভাবে ঝোল টানতে হয় না। মিসেস ফান ডানের লজ্জায় কান লাল হওয়া একটা দেখবার জিনিস। আমার হয় না এবং সেটাই ওর দু-চক্ষের বিষ।

তোমার আনা

.

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল শেষ করবার অনেক আগেই আমাকে লেখা বন্ধ করতে হয়েছিল। আরও একটা ঝগড়ার বিষয়ে তোমাকে না বললেই নয়, কিন্তু সেটা শুরু করার আগে অন্য একটা কথা বলে নিই।

বুড়োবাড়ির দল এত চট করে, এত বেশি মাত্রায় এবং এত সব তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে কেন ঝগড়া করে? এতদিন ভাবতাম শুধু ছোট থাকলেই মানুষ খুনসুটি করে আর বড় হলে সেটা চলে যায়। কখনও কখনও ঝগড়ার সত্যিই কারণ ঘটে, কিন্তু এটা হল নেহাত খিটিমিটি। হয়ত এটা আমার গা-সওয়া হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তা হতে পারে না বা হবে না, যতদিন প্রায় প্রত্যেকটা আলোচনার (বচসার নাম দিয়েছেন ওঁরা আলোচনা’) বিষয়বস্তু থাকছি আমি। আমার কিছুই, আবার বলছি, আমার কিছুই নাকি ঠিক নয়; আমার চেহারা, আমার চরিত্র, আমার চলনবলন–আদ্যোপান্ত সবকিছু নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। আমাকে (বলা হয়েছে) কড়া কড়া কথা আর চিৎকার চেঁচামেচি একেবারে নীরবে গিলে যেতে হবে; আমি এতে অভ্যস্ত নই।

সত্যি বলতে আমাকে দিয়ে তা হবে না। এইসব অপমান আমি মুখ বুজে সহ্য করব। আমি দেখিয়ে দেব আনা ফ্র্যাঙ্ক মাত্র কাল পেট থেকে পড়েনি। যখন ওঁদের নজরে পড়বে যে আমি ওঁদের শিক্ষা দিতে শুরু করেছি তখন ওঁদের চোখ কপালে উঠবে এবং হয়ত তখন ওঁরা চুপ করে যাবেন। নেব নাকি তেমন ভঙ্গি? স্রেফ বেআদবি! বার বার আমি শুধু অবাক হয়ে যাই ওঁদের জঘন্য আচরণে এবং বিশেষ করে… মিসেস ফান ডানের বোকামিতে, তবে একবার আমার গায়ে একটু সয়ে যাক–সেটা হতে খুব বেশিদিন লাগবে না। তখন ওঁরা কিছু ঢিলের বদলে পাটকেল ফিরে পাবেন, এবং ব্যাপারটা আদৌ আধাখাচড়া হবে না। তখন ওদের গলা দিয়ে বেরোবে ভিন্ন সুর।

ওঁরা যে রকম বলেন আমি কি সত্যিই সেইরকম বেয়াদব, অহঙ্কারী, একগুয়ে, ওপরপড়, বোকা, কুঁড়ের বাদৃশা ইত্যাদি, ইত্যাদি? না, কখনই তা নয়। আর পাঁচজনের মতই আমারও দোষত্রুটি আছে, আমি তা জানি, কিন্তু ওঁরা প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই তিলকে তাল করে দেখান।

এইসব ঠাট্টাবিদ্রুপের খোঁচায় আমার গা মাঝে মাঝে কি রকম রী রী করে ওঠে তুমি যদি জানতে, কিটি! জানি না আর কতদিন আমি আমার রাগ সম্বরণ করে রাখতে পারব। একদিন না একদিন ঠিক ফেটে পড়ব।

যাক গে, এ নিয়ে আর কচলাব না, এমনিতেই এইসব ঝগড়াঝাটির ব্যাপারে ঘ্যান ঘ্যান করে তোমার কানের পোকা বের করে ফেলেছি। তবু টেবিলে যেসব গজালি হয়, তার একটি বেজায় মজাদার, যার সম্পর্কে তোমাকে না বলে পারছি না। কথায় কথায় কিভাবে যেন পিমের (আমার বাপির ডাকনাম পিম্) বিনয়ের পরাকাষ্ঠার প্রসঙ্গটি এসে পড়ে। যে বোকাস্য বোকা তাকেও বাবার এই গুণের কথা স্বীকার করতেই হবে। হঠাৎ মিসেস ফান ডান বললেন, ‘আমারও অমনি নিরভিমান স্বভাব, আমার স্বামীর চেয়েও বেশি।

বটে বটে! এই বাক্যটিই পরিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভদ্রমহিলা যাচ্ছেতাই রকমের বেহায়া এবং এপরপড়া। মিস্টার ফান ডান মনে করলেন তাঁর নিজের সম্পর্কে যে উক্তি করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছুটা ভেঙে বলা দরকার। আমি ওরকম বিনয়ী হওয়াটা পছন্দ করি। আমার অভিজ্ঞতা, ওতে কোনো ফায়দা হয় না। তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, আমার কথা শোন আনা, খুব বেশি বিনয়ের অবতার হয়ো না। ওতে না-ঘাটকা না-ঘরকা হবে।

মা-মণিও তাতে সায় দিলেন। তবে মিসেস ফান ডান এ বিষয়ে তার ধারণাটা জুড়ে দিলেন, যা তিনি সব সময়ই করে থাকেন। এরপরই তার মন্তব্যটা হল মা-মণি আর বাপিকে লক্ষ্য করে। জীবন সম্পর্কে তোমাদের দেখছি অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি। ভাবো একবার, কী জিনিস ঢোকানো হচ্ছে আনার মাথায়; আমি যখন ছোট ছিলাম তখন এমন ছিল না। আমি এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ যে, এখনও তাই; তোমাদের আজকালকার বাড়ি বাদ দিলে। মা যেভাবে তার মেয়েদের মানুষ করেছেন এটা তার ওপর সরাসরি আঘাত।

ততক্ষণে মিসেস ফান ডানের চোখমুখ রাঙা হয়ে উঠেছে। মা-মণির মুখে শান্ত নির্বিকার ভাব। যারা রেগে লাল হয় তারা এমন তেতে ওঠে যে, এ ধরনের অবস্থায় তারা অসুবিধের পড়ে। মা-মণির তাতেও কোনো ভাবান্তর হল না; কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কথাবার্তায় ছেদ টানার আগ্রহে এক মুহূর্ত একটু ভেবে নিয়ে তারপর বললেন, ‘আমিও দেখতে পাই, মিসেস ফান ডান, অতিরিক্ত বিনয়ী না হলে জীবনের সঙ্গে তবু কিছুটা মানিয়ে গুছিয়ে চলা যায়। এখন আমার স্বামী আর মারগট, আর পেটার–এরা হল অসম্ভব ভালোমানুষ; অন্যদিকে তোমার স্বামী, আনা, তুমি আর আমি, আমরা একেবারে উল্টো ধরনের না হলেও, কেউ আমাদের ঠেলে এগিয়ে যাবে একটা আমরা কিছুতেই হতে দেব না।’

মিসেস ফান ডান বললেন, ‘কিন্তু, মিসেস ফ্রাঙ্ক, এ আপনি কী বলছেন? আমি হলাম। অত্যন্ত নম্র, মুখচোরা; আপনি আমাকে কী হিসেবে অন্যরকম বলেন?’

মা-মণি বললেন, আমি বলিনি তুমি ঠিক জাহাবাজ, তবে কেউ বলবে না যে তুমি লজ্জাবতী লতাটি।’

মিসেস ফান ডান—‘আগে এটার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। বলুন, কী দিক থেকে আমি ওপরপড়া? আমি একটা জিনিস জানি, যদি আমি নিজের আঁচলে গেরো না দিতাম। তাহলে আর দেখতে হত না–পেটে কিল মেরে বসে থাকতে হত।‘

আত্মরক্ষার এই আগডুম বাগডুম শুনে মা-মণি তো হেসেই খুন। তাতে মিসেস ফান ডান চটে গিয়ে গুচ্ছের জার্মান–ওলন্দাজ বুলি ঝাড়লেন, তারপর একেবারে চুপ মেরে গেলেন; শেষে চেয়ার থেকে উঠে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার উপক্রম করলেন।

এমন সময় হঠাৎ আমার দিকে তার চোখ পড়ল। তখন যদি তাঁকে দেখতে। দুর্ভাগ্যবশত যখন তিনি আমার দিকে ফিরেছেন ঠিক সেই মুহূর্তে আমি সখেদে মাথা নাড়ছিলাম–ঠিক ইচ্ছে করে নয়, নিজেরই অজান্তে–কেননা আমি খুব মন দিয়ে এঁদের বাক্যালাপ শুনছিলাম।

মিসেস ফান ডান আমার দিকে ফিরে জার্মানে গড়গড় করে একগাদা কড়া কড়া কথা। শোনালেন; বাজার-চলতি অভদ্র ভাষায়। ঠিক যেন একজন গেঁয়ো লালমুখ মাছওয়ালী–সে এক দেখবার মত দৃশ্য। আমি যদি আঁকতে পারতাম, তাহলে ওঁর চেহারাটা ধরে রেখে দিলে বেশ হত। সে এক গলা-ফাটানো চিৎকার–এমন বোকা, নির্বোধ ছোট মানুষ।

যাই হোক, এ থেকে এখন আমার একটা শিক্ষা হয়েছে। কারো সঙ্গে বেশ ভালোমত বচসা হলে তবেই আসলে লোক চেনা যায়। একমাত্র তখনই তাদের আসল চরিত্র তুমি যাচাই করতে পারো।

তোমার আনা

.

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

অজ্ঞাতবাসে গেলে মানুষের জীবনে অভাবিত সব ঘটনা ঘটে। ভাবো একবার, বাথটাব না থাকায় আমাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে হাত ধোয়ার পানির জায়গা। গরম পানি মেলে অফিসঘরে (অফিস বলতে সবসময়ই বুঝবে গোটা নিচের তলা); ফলে, আমরা সাতজন সবাই পালা করে এত বড় বিলাসিতাটা কাজে লাগাই। আমরা একেকজন একেক রকম; কারো কারো শ্লীলতাবোধ অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। সেই কারণে সংসারের প্রত্যেকে তার নিত্যকর্মের জন্যে নিজস্ব জায়গা বেছে নিয়েছে। কাঁচের দরজা থাকা সত্ত্বেও পেটার ব্যবহার করে রান্নাঘর। গোসলের ঠিক আগে একে একে আমাদের সকলের কাছে সে যাবে এবং গিয়ে বলবে যে আধঘণ্টা সময় আমরা কেউ যেন রান্নাঘরের পাশ দিয়ে না যাই। ওর ধারণা এটাই যথেষ্ট। মিস্টার ফান ডান সোজা উপরতলায় চলে যান; অতটা পথ গরম পানি টেনে নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা কম নয়। কিন্তু ওঁর চাই নিজস্ব ঘরটুকুর আড়াল। মিসেস ফান ডান আজকাল স্রেফ গোসলের পাটই তুলে দিয়েছেন; উনি সেরা জায়গা বের করার অপেক্ষায় আছেন। বাবা গোসল সারেন অফিসের খাসকামরায়; রান্নাঘরে অগ্নিবারক দেয়ালের পেছনের জায়গায় মা-মণি। মারগট আর আমি গা মাজাঘষার জন্যে বেছে নিয়েছি সামনের। অফিসঘর। শনিবার বিকেলগুলোতে ঘরের পর্দাগুলো ফেলে দেওয়া হয়, সুতরাং আধো অন্ধকারে আমরা গা ধুই। অবশ্য, এই জায়গাটা আর আমার ভালো লাগছে না; গত সপ্তাহের পর থেকে যেখানে আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্য থাকবে এমন একটা জায়গার খোঁজে আছি। পেটার একটা ভালো মতলব দিয়েছে–বড় অফিসঘরের শৌচাগারটা আমার পছন্দ হতে পারে। সেখানে বসা যায়, আলো জ্বালানো যায়, দরজা বন্ধ করা যায়, নিজস্ব গোসলের পানি ঢাললে বাইরে বেরিয়ে যাবে। তাছাড়া চোরাচাহনির হাত থেকে বাঁচব।

রবিবার দিন এই প্রথম আমার মনোরম গোসল-ঘরটা আমি পরখ করে দেখলাম বাপরে, কী শব্দ! তবুও আমার মতে এটাই হল সবার সেরা জায়গা। অফিসের শৌচাগার থেকে ড্রেন আর পানির পাইপ সরিয়ে দালানে লাগানোর জন্যে গত সপ্তাহে কলের মিস্ত্রি নিচের তলায় কাজ করেছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়লে পাইপ যাতে জমে না যায় তারই জন্যে আগে থেকে সারানোর এই ব্যবস্থা। কলের মিস্ত্রির আসাতে সারা দিন আমরা পানি তো নিতে পারিইনি, উপরন্তু শৌচাগারেও যেতে পারিনি। এই মুশকিল আসানের জন্যে আমরা কী করেছিলাম সেটা বললে অবশ্য তোমার কাছে মোটেই প্রীতিকর ঠেকবে না।

এখানে যেদিন আমরা চলে আসি, আমি আর বাবা আমাদের জন্যে যাহোক করে একটা টুকরি বানিয়ে নিয়েছিলাম। আর কিছু না পেয়ে কাজে লাগানোর জন্যে আমরা একটা কাঁচের বয়াম নষ্ট করেছি। যেদিন কলের মিস্ত্রি আসে সেইদিন এইসব পাত্রে দিনের বেলায় বসার ঘরে প্রকৃতিদত্ত জিনিসগুলো জমা করা হয়েছিল। তার চেয়েও খারাপ ছিল মুখে কুলুপ দিয়ে সারাটা দিন বসে থাকা। কুমারী ‘প্যাক-প্যাক’-এর পক্ষে সেটা যে কী যন্ত্রণাকর ব্যাপার তুমি তা ধারণাই করতে পারবে না। এমনিতেই সাধারণত দিনের বেলায় আমাদের কথা বলতে হয় ফিস্ ফিস্ করে কিন্তু তার চেয়ে দশ গুণ খারাপ মুখ বুজে ঠায় বসে থাকা। তিন দিন সমানে বসে থেকে থেকে আমার নিচটা অসাড় হয়ে টনটন করছিল। রাত্তিরে শোয়ার সময়। খানিকটা শরীর চালনা করাতে ব্যথা খানিকটা কমল।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল আমার অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড় হয়েছিল। আটটার সময় হঠাৎ খুব জোরে বেল বেজে উঠল। আমি ভাবলাম ঐ এল; কার কথা বলছি বুঝতেই পারছ। কিন্তু সবাই যখন বলতে লাগল যে, কোনো চ্যাংড়া ছেলে কিংবা হয়ত ডাক-পিওন, তখন আমি খানিকটা আশ্বস্ত হলাম।

দিনগুলো এখানে ক্রমেই ভারি চুপচাপ হয়ে পড়ছে। মিস্টার ক্রালারের কাছে রসুইখানায়। কাজ করেন ছোট্টখাট্টো ইহুদী কম্পাউণ্ডার লিউইন। সারা বাড়িটাই তাঁর নখদর্পণে; তাই আমাদের সর্বদাই ভয় এই বুঝি তিনি খেয়ালবশে পুরনো ল্যাবরেটরিতে একবার উকি দিয়ে বসেন। আমরা নেংটি ইঁদুরের মতন ঘাপটি মেরে আছি। তিন মাস আগে ঘুণাক্ষরেও কি কেউ ভাবতে পেরেছিল যে ছটফটে আনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকতে হবে এবং তার চেয়েও বড় কথা, সেটা সে পারবে।

ঊনত্রিশে ছিল মিসেস ফান ডানের জন্মদিন। অবশ্য দিনটি বড় করে পালন করা যায়নি; তাহলেও তাঁর সম্মানে আমরা একটু প্রীতি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলাম, সঙ্গে কিছুটা উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল; কিছু ছোটখাটো উপহার আর ফুলও তিনি পেলেন। পতিদেবতার কাছ থেকে পেলেন লাল কারনেশান ফুল, ওটা ওঁদের কুলপ্ৰথী।

মিসেস ফান ডানের বিষয়ে একটু কচলে নেওয়া যাক; তোমাকে আমার বলা দরকার যে বাপির সঙ্গে উনি প্রায় চেষ্টা করেন ফষ্টিনষ্টি করতে; সেটা হয়ে পড়েছে আমার সারাক্ষণ বিরক্তির কারণ। উনি বাপির মুখে আর চুলে ঠোনা মারেন, স্কার্ট টেনে তোলেন এবং বন্ রসিকতা করেন। এইভাবে তিনি চান বাপির নজর কাড়তে। বরাত ভালো, বাপি পান না ওঁর ভেতর কোনো আকর্ষণ বা কোনো রসকস–কাজেই বাপির কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলে না। মিস্টার ফান ডানের সঙ্গে মা-মণি অমন ব্যবহার করেন না–একথা আমি মিসেস ফান। ডানের মুখের ওপর বলেছি।

মাঝে মাঝে পেটার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে আর তখন ও বেশ মজাদার হয়। আমাদের একটা জিনিসে মিল আছে, তাতে সাধারণত সবাই খুব রঙ্গরস পায়–আমরা দুজনেই সাজতে ভালবাসি। দেখা গেল, মিসেস ফান ডানের বেজায় সিঁড়িঙ্গে একটা পোশাক পরেছে পেটার আর আমি পরেছি পেটারের প্যান্ট কোট। ওর মাথায় হ্যাট আর আমার মাথায় ক্যাপ।

বড়রা তাই দেখে হেসে কুটোপাটি আর আমরাও তেমনি মজা পাই। মারগটের আর আমার জন্যে বিয়েন কফের দোকান থেকে এলি নতুন স্কাট কিনে এনেছেন। কাপড় একেবারেই রদ্দি, ছালার কাপড়ের মতন–দাম নিয়েছে যথাক্রমে ২৪,০০ ক্লোরিন আর ৭.৫০ ক্লোরিন। যুদ্ধের আগে কী ছিল, আর এখন কী হয়েছে।

আরেকটা চমৎকার জিনিস আমি ঢাকঢাক গুড়গুড় করে রেখেছি। এলি কোনো এক সেক্রেটারিশিপ পড়ানোর ইস্কুলে না কোথায় যেন লিখে মারগট, পেটার আর আমার জন্যে শর্টহ্যাণ্ডের করেসপণ্ডেস কোর্সের অর্ডার দিয়েছেন। রও, আসছে বছরের মধ্যেই দেখবে আমরা সব কিরকম ষোল আনা পোক্ত হয়ে উঠেছি। যাই হোক আর তাই হোক, সঁটে লিখতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তোমার আনা

.

শনিবার, ৩ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল আবার একচোট খুব হয়ে গেল। মা-মণি ভীষণ চোটপাট করলেন এবং বাপির কাছে আমার ধুড়ধুড়ি নেড়ে দিলেন। তারপর যখন হাউমউ করে কাঁদতে বসলেন তখন আমিও ফেটে পড়লাম। এদিকে আমার যা মাথা ধরেছিল কী বলব। শেষ অবধি বাবাকে আমি বললাম মা-মণির চেয়ে ওঁর ওপর আমার টান বেশি। তার উত্তরে বাপি বললেন, আমি ওটা কাটিয়ে উঠব। আমি তা বিশ্বাস করি না; মা-মণির কাছে যখন থাকি নিজেকে স্রেফ জোর করে আমি শান্ত রাখি। বাপি চান শরীর খারাপ হলে কিংবা মাথা ধরলে মাঝে মাঝে নিজে যেচে আমি যেন মা-মণির সেবা করি। আমি ওর মধ্যে নেই। আমি এখন ফরাসী নিয়ে আদাজল খেয়ে লেগেছি এবং এখন পড়ছি ‘লা বেলে নিফেরনাইসে’।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ১৯৪২

 আদরের কিটি

আজ তোমাকে শুধু বিশ্রী মন-খারাপ-করা খবর দেব। আমাদের ইহুদী বন্ধুদের ডজনে ডজনে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে ব্যবহারে গেস্টাপো কোনোরকম ভদ্রতার বালাই রাখছে না, গরু-ভেড়ার ট্রাকে বস্তাবন্দী করে তাদের পাঠিয়ে দিচ্ছে ভেস্টারব্রুকের ডেন্টির বিশাল ইহুদী বন্দীশিবিরে। ভেস্টারব্রুক মনে হচ্ছে সাংঘাতিক জায়গী; একশো লোকের জন্যে একটি করে ছোট্ট কলঘর এবং পায়খানাও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আলাদা আলাদা থাকার ব্যবস্থা নেই। মেয়ে-পুরুষ-বাচ্চা সবাই একসঙ্গে গাদা হয়ে শোয়। এর ফলে সাংঘাতিক নৈতিক অধঃপতন ঘটেছে বলে শোনা যায় এবং কিছুদিন থেকেছে এমন প্রচুর স্ত্রীলোক, এমন কি কমবয়সী মেয়েদেরও পেটে বাচ্চা এসেছে।

পালাবে যে তারও কোনো উপায়ই নেই; শিবিরের বেশির ভাগ লোকেরই মার্কা মারা চেহারা–মাথা কামানো এবং সেই সঙ্গে অনেককেই ইহুদী-ইহুদী দেখতে।

হল্যাণ্ডে থেকেই যখন এই হাল, তখন যে-সব দূর-দূর এবং অজ জায়গায় তাদের পাঠানো হচ্ছে সেখানে কী দশা হবে? আমরা মনে করি, ওদের অধিকাংশকেই খুন করা হচ্ছে। ইংলণ্ডের রেডিও বলছে ওদের নাকি গ্যাস দিয়ে দম বন্ধ করে মারা হচ্ছে।

হয়ত মারবার পক্ষে ওটাই সবচেয়ে সিধে রাস্তা। আমি ভীষণ উতলা হয়ে পড়েছি। মি যখন এই সব ভীষন ভীষন কাহিনী শোনাচ্ছিলেন, তখন আমি কিছুতেই উঠে যেতে পারছিলাম না। সেদিক থেকে উনি নিজেও খুব টান টান হয়ে ছিলেন। যেমন খুব সম্প্রতিকার একটা ঘটনা–এক অসহায় পঙ্গু ইহুদী বুড়ি মিপের দোরগোড়ায় বসে ছিল; গেস্টাপোর লোক বুড়িতে ঐখানে বসে থাকতে বলে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়ি ডাকতে চলে গিয়েছিল। মাথার ওপর তখন ইংরেজদের প্লেন লক্ষ্য করে গোলা ছোড়া হচ্ছে। আর কেবলি এসে এসে পড়ছে সার্চলাইটের ঝাঝালো আলো–বুড়ি বেচারা সেই সব দেখে ঠক ঠক করে কাঁপছিল। কিন্তু মিপের সাহস হয়নি বুড়িকে ঘরের ভেতরে ডেকে নেওয়ার; অত বড় ঝুঁকি কেউ নেবে না। জার্মানদের শরীরে দয়ামায়া বলে কিছু নেই–মারতে ওদের কিছুমাত্র তর সয় না। এলিও খুব চুপচাপ হয়ে পড়েছে; ওর ছেলে বন্ধুটিকে জার্মানিতে চলে যেতে হবে। ওর ভয়, যে বৈমানিকেরা আমাদের ঘরবাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যায়, তারা ডীর্কের মাথায় বোমা ফেলবে, প্রায়ই সে সব বোমা হয় দশ লক্ষ কিলো ওজনের। ‘ওর ভাগে দশ লাখ পড়বে বলে মনে হয় না এবং একটি বোমাতেই কাবার’–এসব পরিহাস বরং কুরুচিরই পরিচয় দেয়। অবশ্য ডিককে একা যেতে হচ্ছে তা ঠিক নয়; রোজই ট্রেন ভর্তি করে করে ছেলেরা চলে যাচ্ছে। রাস্তায় ছোটখাটো ট্রেন থামলে কখনও কখনও দু-চারজন চোখে ধুলো দিয়ে কেটে পড়ে, বোধ হয় সংখ্যায় তারা খুবই কম। তাই বলে আমার দুঃসংবাদের এখানেই শেষ নয়। তুমি কখনও হোস্টেজের কথা শুনেছ? অন্তর্ঘাতের শাস্তি হিসেবে একেবারে হালে এই জিনিস চালু হয়েছে। এই রকম ভয়াবহ ব্যাপার আর কিছু ভাবতে পারো?

গণ্যমান্য সব নাগরিক–তারা একেবারে নিরপরাধ তাদের মাথার ওপর খাড়া ঝুলিয়ে হাজতে পুরে রাখা হয়েছে। অন্তর্ঘাতকের পাত্তা করতে না পারলে গেস্টাপো সোজা পাঁচজন করে হোস্টেজকে দেয়ালে লটুকে দেবে। এইসব নাগরিকদের মৃত্যুর খবর প্রায়ই কাগজে বেরোয়। এই অপকর্মকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু’ বলে বর্ণনা করা হয়। খাসা লোক, এই জার্মানরা! ভাবি, আমিও একদিন ওদেরই একজন ছিলাম। না, হিটলার আমাদের জাতিসত্তা অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে। আদতে জার্মানরা আর ইহুদীরা এখন দুনিয়ার পরস্পরের সবচেয়ে বড় শত্রু।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমি সাংঘাতিক ব্যস্ত। এইমাত্র আমি ‘লা বেলে নিফেরনাইসে’ থেকে একটি অধ্যায় তর্জমা করেছি এবং নতুন শব্দগুলো খাতায় টুকেছি। এরপর একটা যারপরনেই ভজোঘটে বুদ্ধির অঙ্ক আর তিন পৃষ্ঠা ব্যাকরণ। আমি সোজা বলে দিই রোজ রোজ এই সব বুদ্ধির অঙ্ক আমাকে দিয়ে হবে না। অঙ্কগুলো যে অতি যাচ্ছেতাই, এ বিষয়ে বাপি আমার সঙ্গে একমত। আমি বোধ হয় অঙ্কে বাপির চেয়ে এককাঠি সরেস, যদিও দুজনের কেউই আমরা খুব একটা ভালো নই। প্রায়ই আমাদের মারগটকে ডাকতে হয়। শর্টহ্যাণ্ডে তিনজনের মধ্যে আমিই আছি সব চেয়ে এগিয়ে।

কাল আমি ‘দি অ্যাসণ্ট’ বইটা শেষ করলাম। বইটা বেশ মজার। কিন্তু ‘যুপ টের। হয়েল্‌’-এর কাছে লাগে না। আদতে আমার মতে সিসি ফান মার্ক্সফেট হলেন প্রথম শ্রেণীর লেখিকা। আমি আমার ছেলেমেয়েদের অবশ্যই ওঁর বই পড়তে দেব। মা-মণি, মারগট আর আমি আবার এখন আমাদের খুব আঠা-আঠা ভাব। এটা সত্যিই অনেক ভালো। কাল সন্ধ্যেবেলায় মারগট আর আমি দুজনে এক বিছানায় শুয়েছিলাম। ঠাসাঠাসি করে শুতে হলেও সেটা ভালোই লেগেছে। মারগট জিজ্ঞেস করল আমার ডায়রিটা ও পড়তে পারে কিনা। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, পারো অন্তত খানিকটা খানিকটা।‘ তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম ওরটা আমি পড়তে পারি কিনা। মারগট বলল, ‘হ্যাঁ।’ এরপর কথায় কথায় ভবিষ্যতের প্রসঙ্গ উঠল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম বড় হয়ে ও কী হতে চায়। কিন্তু ও কিছুতেই ভাঙল না। এবং ব্যাপারটা চেপে গেল। আমি আঁচ করে বুঝলাম ওর ইচ্ছে বোধ হয় মাস্টারি করার। আমার অনুমান সঠিক কিনা জানি না। আমার মনে হয় অবশ্য, আমারই বা জানার জন্যে অত ছোঁকছোঁকানি কেন!

আজ সকালে পেটারকে ভাগিয়ে আমি ওর বিছানা দখল করেছিলাম। ও ভীষণ চটে গিয়েছিল, আমি কেয়ার করিনি। আমার ওপর অতটা রাগ না করলেই ও পারত, কাল যখন ওকে আমি একটা আপেল দিয়েছি।

আমি দেখতে খুব কুৎসিত কিনা মারগটকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলেছিল বিলক্ষণ মনে ধরার মতন আমার চেহারা, এবং আমার চোখজোড়া চমৎকার। কথাগুলো, একটু রেখেঢেকে বলা তাই না?

বারান্তরে কথা হবে।

তোমার আনা

.

মঙ্গবার, ২০ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

এখনও আমার হাত কাঁপছে, যদিও আমাদের আচকা ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা ঘটেছিল সেই দু ঘন্টা আগে। খোলাসা করে বলছি। বাড়িটাতে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম আছে পাঁচটা। আমরা জানতাম যে ওগুলো ভর্তি করবার জন্যে কেউ একজন আসছে; কিন্তু আসছে যে ছুতোরমিস্ত্রি, বা তাকে তুমি যাই বলো, এটা আগে থেকে আমাদের জানানো হয়নি।

ফলে, আলমারি-ঢাকা দরজার উল্টোদিকের দালানে হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ আমার কানে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা মুখে চাবি আঁটার কোনো প্রচেষ্টা করেনি। তক্ষুনি ছুতোরমিস্ত্রির কথা আমার মাথায় আসে; এলি আমাদের সঙ্গে খেতে বসেছিল, ওকে আমি সাবধান করে দিয়ে বলি ও যেন নিচের তলায় না যায়। বাবা আর আমি গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়াই যাতে লোকটা চলে গেলে আমরা টের পাই। মিনিট পনেরো ধরে হাতুড়ি পেটানোর পর লোকটা তার হাতুড়ি আর যন্ত্রপাতিগুলো আলমারির মাথায় রেখে দিল (আমরা ধারণা–করেছিলাম) এবং তারপর আমাদের দরজায় টোকা দিতে শুরু করল। শুনে আমরা একেবারে ভয়ে সাদা হয়ে গেলাম! ও বোধ হয় কোনোরকম আওয়াজ পেয়ে থাকবে এবং আমাদের গোপন আভড়ার ব্যাপারে খোঁজ খবর করতে চাইছিল। দেখে শুনে সেই রকমই মনে হয়েছিল। দরজা ঠোকা, টানাটানি, ঠেলাঠেলি, খোলাখুলি–এইসব সমানে চলছিল। কোথাকার কে না কে আমাদের এমন সুন্দর আত্মগোপনের জায়গাটা জেনে যাবে, এটা ভেবে আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলাম। যখন আমি ভাবছি যে মৃত্যু আমার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই আমার কানে গেল মিস্টার কুপহুইস বলছেন, ‘দরজা খোলো, আমি হে আমি।’ সঙ্গে সঙ্গে আমরা দরজা খুলে দিলাম। যে-আংটার সঙ্গে আলমারিটা লাগানো, সেটা খুলতে পারে যারা ভেতরের খবর জানে। কিন্তু আংটাটা সেঁটে গিয়েছিল। তার ফলে ছুতোরমিস্ত্রি আসার ব্যাপারটা আগে থেকে আমাদের কেউ জানিয়ে দিতে পারেনি। ছুতোরমিস্ত্রি নিচে চলে গেছে এবং কুপহুইস চাইছিলেন এলিকে ডেকে নিয়ে যেতে, কিন্তু আলমারিটা আর খোলা যাচ্ছিল না। বাপ রে, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যে লোকটা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল সে আমার কল্পনায় ফেঁপে ফুলে উঠতে উঠতে দানবের আকারে দুনিয়ার সবচেয়ে ডাকসাইটে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিল।

যাক গে, কপাল ভালো, তাই এবারে সব ভালোয় ভালোয় উৎরে গেল। ইতিমধ্যে সোমবারটা তফা কেটেছে। মিথু আর হেংক রাত্তিরে থেকে গিয়েছিলেন। ফান সাপ্টেদের আমাদের ঘর ছেড়ে দিয়ে মারগট আর আমি সে রাতে মা-বাবার ঘরে শুয়েছিলাম। খাবারটা হয়েছিল গরম উপাদেয়। শুধু একটাই যা বিঘ্ন ঘটেছিল। বাবার বাতিটা গোলমাল করায় গোটা বাড়ি ফিউজ হয়ে যায়। হঠাৎ দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমরা বসে আছি। কী করা যায়? বাড়িতে কিছুটা ফিউজের তার আছে বটে, কিন্তু ফিউজবক্স রয়েছে অন্ধকার গুদাম ঘরের একদম পেছনদিকে–সন্ধ্যের পর খুব খিটকেল কাজ। তবু পুরুষমানুষেরা পিছু হটল না। দশ মিনিট পর মোমবাতিগুলো আবার ফু দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া গেল।

আমি আজ ভোরে উঠেছি। সাড়ে আটটায় হেংককে চলে যেতে হল। জমিয়ে বসে সকালের খাওয়া সেরে মি নিচে চলে গেলেন। বৃষ্টি হচ্ছিল মুষলধারে। তার মধ্যে সাইকেল চালিয়ে যে অফিসে আসতে হয়নি, মিপ্‌ তাতে খুশি। পরের সপ্তাহে এলি আসছে; এখানে এক রাত কাটাতে।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমি খুবই চিন্তায় আছি, বাপি অসুস্থ। খুব জুর আর গায়ে লাল লাল কি সব বেরিয়েছে, হাম বলে মনে হয়। আমরা ডাক্তারও ডাকতে পারছি না, ভাবো! মা-মণি চেষ্টা করছেন বাপির যাতে ঘাম বের হয়। হয়ত তাতে গায়ের তাপ কমবে।

আজ সকালে মি আমাদের বললেন যে, ফান ডানদের বাড়ি থেকে সমস্ত আসবাবপত্র নিয়ে গেছে। মিসেস ফান ডানকে আমরা এখনও বলিনি। এমনিতেই উনি যে রকম তেতে পুড়ে রয়েছেন, তাতে বাড়িতে ওঁর ফেলে-আসা মনোরম সব চিনেমাটির বাসন, আর সুন্দর সুন্দর সব চেয়ার নিয়ে আরেকবার উনি ফোপাতে শুরু করলে সেটা শুনতে আমাদের ভালো। লাগবে না। আমরা বাধ্য হয়ে, আমাদের প্রায় সমস্ত ভালো জিনিস ফেলে রেখে চলে এসেছি; সুতরাং ও নিয়ে এখন গাইগুই করে লাভ কী?।

ইদানীং তুলনায় বড়দের বইপত্র আমি পড়তে পারছি। এখন আমি পড়ছি নিকো ফান জুখটেলেনের ‘ইভার যৌবন’। এর সঙ্গে স্কুলের মেয়েদের প্রেমের গল্পের খুব বেশি তফাত দেখতে পাচ্ছি না। এটা ঠিক যে এদো গলিতে অচেনা পরপুরুষের কাছে মেয়েরা নিজেদের বিক্রি করছে, এ সব কিছু কিছু জিনিস এতে আছে। এর জন্যে তারা একমুঠো টাকা চাইছে। আমার জীবনে এ রকম ঘটলে আমি মরে যেতাম। এতে আরও বলা আছে যে ইভার মাসিক। হয়। ইস, আমার কবে যে হবে; মনে হয় জীবনে এটা একটা দামী জিনিস।

বড় আলমারিটা থেকে বাবা এনেছেন গোটে আর শিলারের নাটক। প্রত্যেক দিন। সন্ধ্যেবেলায় বাবা আমাকে পড়ে শোনাবেন। ‘ডন্ কার্‌রস্‌’ দিয়ে আমাদের এই পড়ার ব্যাপারটা শুরু হয়ে গেছে।

বাপির দেখাদেখি জোর করে মা-মণি তার প্রার্থনাপুস্তক আমার হাতে ঠেসে দিয়েছেন। মুখরক্ষার জন্যে জার্মান ভাষার কিছু কিছু স্ত্রোত্র আমি পড়েছি; পড়তে বেশ সুন্দর, কিন্তু আমার কাছে খুব একটা অর্থবহ বলে মনে হয় না। আমাকে অমন উনি জোর করে ধার্মিক করতে চান কেন, কেবল ওঁকে খুশি করার জন্যে?

কাল আমরা এই প্রথম ঘরে আগুন জ্বালাব। শেষটায় ধোয়ার চোটে আমরা দমবন্ধ হয়ে। মারা না যাই। কত যুগ ধরে যে চিমনি সাফ করা হয়নি তার ঠিক নেই। আশা করা যাক, চিমনিটা ধোয়া টানবে।

তোমার আনা

.

শনিবার, ৭ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মার মেজাজ সাংঘাতিক তিরিক্ষে, এবং মনে হয় আমার জীবনে সেটা সব সময় অশান্তি ডেকে আনে। না বাবা, না মা–ওঁরা কেউই কখনও মারগটকে বকেন না এবং ওঁরা সব সময় সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপান–এটা কি নেহাতই একটা আকস্মিক ব্যাপার? কাল সন্ধ্যের কথাই ধরা যাক; মারগট একটা বই পড়ছিল, তাতে সুন্দর সুন্দর সব আঁকা ছবি; বইটা উপুড় করে রেখে ও উঠে ওপরে চলে গেল যাতে ফিরে এসে আবার পড়া শুরু করতে পারে। আমার হাতে কোনো কাজ ছিল না বলে বইটা তুলে নিয়ে ছবিগুলো দেখতে শুরু করে দিলাম। মারগট ফিরে এসে ‘ওর’ বই আমার হাতে দেখে ভুরু কুঁচকে বইটা ফেরত চাইল। আমি শুধু চেয়েছিলাম আরও কয়েকটা পাতা উল্টে বইটা দেখতে, তার জন্যেই মারগট ক্রমশ রাগে ফুলে উঠতে লাগল। মা-মণি তার সঙ্গে যোগ দিয়ে বললেন, ‘মারগটকে বইটা দিয়ে দে; ও পড়ছিল।’ বাবা এই সময় ঘরে এলেন। কী ব্যাপার কিছুই না জেনে, শুধু মারগটের মুখে ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভাব দেখেই উনি আমাকে নিয়ে পড়লেন—‘তোমার কোনো বইতে যদি মারগট হাত দিত, তাহলে তুমি কী বলতে আমি দেখতাম।‘ আমি কোনো আপত্তি করে তক্ষুনি বইটা নামিয়ে রেখে ঘর ছেড়ে চলে গেলাম–ওঁরা ভাবলেন, আমি অভিমান করেছি। যেটা হল, সেটা রাগও নয়, অভিমানও নয়–শুধু আমার খুব খারাপ লাগতে লাগল। কী নিয়ে গোলমাল সেটা না জেনে রায় দিয়ে দেওয়া বাবার এটা উচিত হয়নি। আমি বইটা নিজেই মারগটকে দিয়ে দিতাম, এবং ঢের তাড়াতাড়ি, মা-বাবা যদি এ ব্যাপারে নাক না গলাতেন। ওঁরা এসেই এমনভাবে মারগটের পক্ষ নিলেন যেন তার প্রতি এক মহা অপরাধ করা হয়েছে।

মা-মণি মারগটের পক্ষ নেবেন এটা বোঝাই যায়; উনি আর মারগট, ওঁরা দুজনে সব সময়ই পরস্পরকে সমর্থন করে চলেন। এটা আমার কাছে এমন ডালভাত হয়ে গেছে যে মার বকবকানি আর মারগটের মেজাজ এসব আমি একেবারেই গায়ে মাখি না।

আমি ওদের ভালবাসি, তার একমাত্র কারণ ওরা মা আর মারগট বলে। বাবার ব্যাপারটা একটু আলাদা। বাবা মারগটকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখালে, ওর কার্যকলাপ মঞ্জুর করলে, বাবা ওকে প্রশংসা আর আদর করলে আমার বুক ফেটে যায়, কেননা বাবাকে আমি মনে মনে পূজো করি। আমার ভরসা আমার বাবা। দুনিয়ায় বাবাকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভালবাসি না। এটা বাবার নজরে পড়ে না যে, মারগটের সঙ্গে বাবা যে ব্যবহার করেন আমার সঙ্গে তা করেন না। মারগটের মত সুন্দর, মিষ্টি, রূপসী মেয়ে দুনিয়ায় দুটি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি নিশ্চয় এটা দাবি করতে পারি যে, আমার দিকেও তাকানো হোক। বাড়িতে আমি হলাম সব সময়ই উজবুক, হাতে পায়ে জড়ানো; কিছু করলে সব সময়ই আমার হয়। দুনো খোয়ার, প্রথমে জোটে গালমন্দ এবং তারপর আবার আমার মনঃক্ষুণ্ণ হওয়ার ধরনের জান্যে। এই স্পষ্ট পক্ষপাত আর আমি বরদাস্ত করতে রাজী নই। আমি বাপির কাছ থেকে এমন কিছু চাই যা উনি আমাকে দিতে পারছেন না।

মারগটকে আমি হিংসে করি না, কখনই করিনি। ওর চোখমুখ ভালো, ও সুন্দর দেখতে–তার জন্যে আমার গা জ্বলে না। আমি শুধু উন্মুখ হয়ে থাকি বাপির সত্যিকার ভালবাসার জন্যে; শুধু তার সন্তান বলে নয়, আমি আনা হিসেবে।

আমি বাপিকে আঁকড়ে ধরি, কারণ শুধু তার ভেতর দিয়েই বাড়ির প্রতি আমার অবশিষ্ট টানটুকু আমি বাঁচিয়ে রাখতে পারি। বাপি বোঝেন না যে, মাঝে মাঝে মা-মণির ব্যাপারে আমার চাপা অভিমান প্রকাশ করার দরকার হয়। বাপি এ নিয়ে কথা বলতে নারাজ; শেষে মা-মণির ভুলত্রুটি নিয়ে কোনো মন্তব্য হয় এমন যে কোনো জিনিস বাপি স্রেফ এড়িয়ে চলেন। ঠিক তেমনি, আমি আর সব পারি কিন্তু মা-মণি এবং তার ভুলত্রুটিগুলো সহ্য করা আমার পক্ষে শক্ত হয়। এর সবটাই কিভাবে নিজের মনে চেপে রাখতে হয় আমি জানি না। মার জবরজং কাজ, বাঁকা বাঁকা কথা এবং তাঁর মিষ্টত্বের অভাব–সব সময় চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়; অন্য দিকে এটাও মানতে পারি না যে আমি যা করি তাতেই দোষ।

সব কিছুতেই আমরা একে অন্যের ঠিক বিপরীত; কাজেই আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যাব, এটা স্বাভাবিক। মা-মণির স্বভাবের ব্যাপারে আমি কোনো রায় দিচ্ছি না, সে বিচারে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তাকে দেখছি শুধু মা হিসেবে এবং আমার কাছে সেদিক থেকে তিনি মোটেই সার্থক নন; আমাকে আমার নিজেরই মা হতে হবে। আমি ওদের সকলের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। আমি আমার নিজের কর্ণধার এবং পরে দেখা যাবে কোথায় তরী ভেড়াব। এ সব কথা ওঠে বিশেষ করে এই জন্যেই যে, নিখুত মা। আর সহধর্মিণী কি রকম হওয়া উচিত তার একটা ছবি আমার মানসপটে আঁকা আছে; যাকে আমি ‘মা’ বলতে বাধ্য, তার ভেতর ঘুণাক্ষরেও সে ছবির কোনো আদল দেখতে পাই না।

আমি সবসময় এই বলে মনকে বেঁধে নিই যে, মা-মণির কু-দৃষ্টান্তগুলোর দিকে আমি নজর দেব না। আমি মার শুধু ভালো দিকটাই দেখতে চাই এবং তার ভেতর যেটা না পাব সেটা আমি নিজের ভেতর খুঁজব। কিন্তু তাতে কাজ হয় না এবং এর ভেতর সবচেয়ে খারাপ জিনিস হল–বাপি না, মা-মণি না-ওঁরা কেউই আমার জীবনের এই ফঁাকটা দেখতে পান না এর জন্যে আমি ওঁদেরই দায়ী করি। কেউ কখনও তাদের সন্তানদের একেবারে পুরোপুরিভাবে খুশি করতে পারে বলে মনে হয় না।

মাঝে মাঝে আমি বিশ্বাস করি, ভগবান আমাকে বাজিয়ে দেখতে চান, যেমন এখন তেমনি এর পরেও আমাকে ভালো হতে হবে নিজের চেষ্টায়, কাউকে দেখে নয়, কারো সদুপদেশ শুনে নয়। তাহলে এরপর আমি আরও বেশি জোর পাব। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কে আর এই চিঠি পড়বে? নিজের কাছ থেকে ছাড়া দ্বিতীয় আর কার কাছ থেকেই বা আমার সান্ত্বনা মিলবে? প্রায়ই আমার সান্ত্বনার দরকার হয় বলে, অনেক সময়ই নিজেকে মনে হয় দুর্বল এবং নিজের ওপর অসন্তুষ্ট; আমার দোষত্রুটি বিস্তর। এটা আমি জানি এবং প্রত্যহ আমি আত্মন্নতির চেষ্টা করি, বার বার করি।

আমার রোগ তাড়ানোর প্রথাটা খুবই বিচিত্র। একদিন আনা হয় ভারি বুঝদার মেয়ে এবং তাকে সবজান্তা বলে মেনে নেওয়া হয় এবং পরের দিনই শুনি আনা একটা বোকা পাঠা, একেবারে গণ্ডমূর্খ এবং সে মনে করে বই পড়ে পড়ে ভারি দিগগজ হয়ে উঠেছে। আমি কচি খুকী নই, অথবা এখন আর আদরে-মাথা খাওয়াও নই যে, যাই কিছু করুক সে হবে হাসির পাত্র। কথায় প্রকাশ করে উঠতে না পারলেও আমার নিজস্ব মতামত, ছক এবং ভাবনাচিন্তা আছে। যখন আমি বিছানায় শুই আমার ভেতর কত কিছু যে টগবগ করে ফোটে যাদের সম্পর্কে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি, যারা সব সময় আমার মনোগত অভিপ্রায় ধরতে না পেরে তার কদৰ্থ করে, তাদেরই সঙ্গে আমাকে ওঠাবসা করতে হচ্ছে। সেইজন্যেই আমার শেষ আশ্রয়স্থল হয় আমার ডায়রি। আমার সূচনা আর পরিণতি সেখানেই, কেননা কিটি, সব সময় সহনশীল। আমি তাকে কথা দেব, আমি সব সত্বেও সমানে লেগে থাকব এবং এই সব কিছুর ভেতর দিয়ে আমার নিজস্ব পথ খুঁজে নেব এবং আমার চোখের পানি নীরবে গিলব। এরই মধ্যে যেন দেখতে পাই তাতে ফল হয়েছে অথবা যে আমাকে ভালোবাসে তেমন কারো কাছ থেকে যেন উৎসাহ পাই, এটাই আমার মনোগত বাসনা।

আমাকে দোষী সাব্যস্ত করো না; বরং মনে রেখো, কখনও কখনও আমিও ফেটে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছুতে পারি।

তোমার আনা

.

সোমবার, ৯ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

কাল ছিল পেটারের জন্মদিন, ওর বয়স হল ষোল বছর। ও বেশ সুন্দর সুন্দর কিছু উপহার পেয়েছে। নানা জিনিসের মধ্যে রয়েছে একটা মনোপলি খেলা, একটা দাড়ি কামানোর ক্ষুর আর একটা লাইটার। ও যে খুব একটা সিগারেট খায় তা নয়; আসলে নিছক দেখানোর জন্যে।

সবচেয়ে তাক লাগানোর ব্যাপার এল মিস্টার ফান ডানের কাছ থেকে। বেলা একটার সময় তিনি ঘোষণা করলেন যে ব্রিটিশরা তুনিস, আলজিয়ার্স, কাসাব্লাঙ্কা আর ওরানে অবতরণ করেছে। প্রত্যেকে বলছিল, ‘এইবার শেষের শুরু’, কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বোধ হয় ইংল্যাণ্ডে একই জিনিস শুনেছিলেন, তিনি বললেন, ‘এটা শেষ নয়। এমন কি এটা শেষেরও শুরু নয়। আসলে এটা বোধ হয় আরম্ভে শেষ।’ তফাতটা কি ধরতে পারছ? আশাবাদী হওয়ার রীতিমত কারণ আছে। রুশরা তিন মাস ধরে যে স্তালিনগ্রাদ শহরে সমানে। প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, এখনও তা জার্মানদের হাতে চলে যায়নি।

আমাদের গোপন ডেরার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। আমাদের খাবার জিনিসের যোগান সম্বন্ধে তোমাকে কিছুটা বলা দরকার। তুমি জানো, আমাদের ওপরতলায় কিছু আছে একেবারে সত্যিকার লুভিস্টি শুয়োর।

আমরা রুটি পাই কুপহুইসের বন্ধু এক চমৎকার রুটিওয়ালার কাছ থেকে। বাড়িতে থাকতে যতটা পেতাম, স্বভাবতই সেই পরিমাণ মেলে না। তবে ওতে আমাদের কুলিয়ে যায়। সেই সঙ্গে বেআইনীভাবে চারটে রেশন কার্ড কেনা হয়েছে। এই সব রেশন কার্ডের দাম দিন দিনই বাড়ছে। সাতাশ ফ্লোরিন থেকে বেড়ে এখন তার দাম হয়েছে তেত্রিশ ফ্লোরিন। তাও কী, না ছাপানো এক টুকরো কাগজের জন্যে।

কিছু খাবার বাড়িতে রেখে দেওয়ার জন্যে, ১৫০ টিন তরিতরকারি ছাড়াও, আমরা ২৭০ পাউন্ড শুকনো কড়াইশুটি আর বি কিনেছি। সবটাই আমাদের জন্যে নয়, তার কিছুটা অফিসের লোকদের জন্যে। আমাদের যাতায়াতের ছোট রাস্তায় (লুকানো দরজার ভেতরদিকে) বস্তায় করে জিনিসগুলো হুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ভেতরের জিনিস খুব ভারী হওয়ায় তার চাপে বস্তার কিছু কিছু সেলাই ছিঁড়ে গিয়েছে।

কাজেই আমরা ঠিক করেছিলাম যে, শীতের জন্য রাখা মালগুলো চিলেকোঠায় রেখে দিলেই ভালো হয়। পেটারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ও যেন মালগুলো টেনে টেনে ওপরে তোলে।

ছটার মধ্যে পাঁচটা বস্তা অক্ষত অবস্থায় সে ওপরে তুলেছিল। ছয় নম্বর বস্তাটা যখন সে টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল, তখন বস্তাটার তলা ফেলে যায়। ফলে, বেগুনে বিনগুলো ঝুর ঝুর করে না, একবারে যথার্থ মুষলধারে বেরিয়ে এসে সিঁড়িতে ঝম ঝম করে পড়তে লাগল। বস্তায় পঞ্চাশ পাউণ্ডের মত জিনিস ছিল এবং তার এত আওয়াজ যে, তাতে মরা মানুষও জেগে ওঠে।

নিচেরতলার লোকেরা ভাবল ঝরঝরে পুরনো বাড়িটা বুঝি তাদের মাথায় ভেঙে পড়ছে। (ভগবানের দয়ায় বাড়িতে তখন কোনো বাইরের লোক ছিল না) পেটার এক মুহূর্তের জন্য। ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই হাসতে হাসতে ওর পেট ফাটার যোগাড়, বিশেষ করে ও যখন দেখল সিঁড়ির নিচে আমি দাঁড়িয়ে আছি বিনের সমুদুরের মাঝখানে যেন ছোট্ট একটা দ্বীপ হয়ে। আমার গোড়ালি অব্দি বিনের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ডোবা।

তাড়াতাড়ি আমরা কুড়োতে শুরু করে দিলাম। কিন্তু বিনের দানা এত পিছল আর ছোট যে গড়িয়ে গড়িয়ে যেন সম্ভব অসম্ভব যত আনাচকানাচ আর গর্তে গিয়ে পড়ছিল। এখন হয়েছে কী, যখনই কেউ নিচে যায় এক দুবার হাঁটু মুড়ে নিচু হয়ে যাতে সে মিসেস ফান ডানকে একমুঠো করে বিন ভেট দিতে পারে।

আরেকটু হলে বলতে ভুলে যেতাম যে বাপি আবার বেশ ভালো হয়েছেন।

তোমার আনা

পুনশ্চ : এইমাত্র রেডিওতে খবর বলল যে, আলজিয়ার্সের পতন হয়েছে। মরোক্কো, কাসাব্লাঙ্কা আর ওরান বেশ কয়েকদিন ধরে ব্রিটিশের কব্জায়। এইবার তুনিসের পালা, আমরা তার অপেক্ষায় আছি।

.

মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

দারুণ খবর–আমরা আরেকজনকে আশ্রয় দিতে চলেছি, উনি এলে আমরা হব আটজন। হ্যাঁ, সত্যি। আমরা বরাবর ভেবেছি যে, আরও একজনের থাকার মতন আমাদের যথেষ্ট জায়গা আর খাবারদাবার আছে। আমাদের ভয় ছিল তাতে কুপহুইস আর ক্রালারের আরও কষ্ট বাড়বে। কিন্তু ইহুদীদের মর্মান্তিক দুর্দশার খবর এখন যে হারে বেড়ে চলেছে, তাতে যে দুজনের কথামত কাজ হবে বাপি তাদের ধরে বসেন এবং তারাও মনে করেন প্রস্তাবটা খুব ভালো। ওঁরা বলেছেন, সাতজনকে নিয়ে যে ভয়, আটজন হলেও সেই এই ভয়, খুব ঠিক কথা। কথা পাকা হওয়ার পর আমরা আমাদের বন্ধুবর্গের মধ্যে বাছাই করে কোন্ একজনকে নিলে আমাদের পরিবারের সঙ্গে ভালভাবে খাপ খাবে, এই নিয়ে আমরা ভাবনাচিন্তা করতে লেগে গেলাম। একজনের সম্বন্ধে মনস্থির করতে কোনো মুশকিল ছিল না। ফলে ডান পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের বাপি যখন নাকচ করে দিলেন, তখন আমরা অ্যালবার্ট ডুসেল বলে এজন দাতের ডাক্তারকে মনোনীত করলাম। যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ভাগ্যক্রমে তার স্ত্রী ছিলেন দেশের বাইরে। খুব চুপচাপ ধরনের মানুষ বলে লোকে তাকে জানে। আমরা এবং মিস্টার ফান ডান তাকে যতটা জানি, তাতে দুই পরিবারেরই ধারণা–ভদ্রলোক নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। মিপ ওকে চেনেন। কাজেই ওঁকে এখানে আনার ব্যাপারে মি্প সব ব্যবস্থা করতে পারবেন। উনি এলে মারগটের জায়গায় আমার ঘরে এঁকে শুতে হবে, মারগট ঘুমোবে ক্যাম্পখাটে।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মিপ্‌ যখন ডুসেলকে জানান যে তার জন্যে একটা গা ঢাকা দেওয়ার জায়গার ব্যবস্থা হয়েছে, ডুসেল বেজায় খুশি হন। মিপ্‌ ওঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসার জন্যে তাগাদা দেন। ভাগো হয় শনিবারে এলে। ডুসেল বলেন শনিবারেই চলে আসা বোধহয় সম্ভব হবে না, প্রথমত ওঁর কার্ডের সূচিপত্র হাল অবধি টেনে আনতে হবে, জনা দুয়েক রোগীকে দেখতে হবে এবং দেনাপাওনাগুলো মিটিয়ে ফেলতে হবে। মিপ্‌ আজ সকালে এসেছিলেন এই খবরটা দিতে। আমরা বলি যে, ওঁর দেরি করা উচিত হবে না। ওঁকে এভাবে গোছগাছ করে আসতে গেলে একগাদা লোকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তারা জেনে যাক এটা আমরা চাই না। মিপ্‌ ওঁকে জিজ্ঞেস করবেন শনিবারে কোনোমতে উনি চলে আসতে পারেন কিনা।

ডুসেল না বলেছেন, উনি জানিয়েছেন, সোমবারে আসবেন। এরকম একটা প্রস্তাবে তা সে যেরকমই হোক–কোথায় তিনি লাফিয়ে চলে আসবেন, তা নয়। আমার কাছে একটা এক রকমের পাগলামি বলে মনে হয়। বাইরে থাকা অবস্থায় ওঁকে যদি তুলে নিয়ে চলে যায়, তখন কি উনি আর ওঁর কার্ড সাজানো, দেনাপাওনা মেটানো, রোগী দেখা–এসব করতে পারবেন? তাহলে আর দেরি করা কেন আমার মনে হয় বাবা তাতে রাজী হয়ে বোকামি করেছেন। আর কোনো খবর নেই।

তোমার আনা

.

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

ডুসেল এসে পৌঁচেছেন। সব ভালোভাবে চুকেছে। মিপ ওঁকে বলেছিলেন ডাকঘরের সামনে একটা বিশেষ জায়গায় ঠিক এগারোটার সময় এসে দাঁড়াতে, সেখানে একটি লোক ওঁর সঙ্গে দেখা করবে। ডুসেল একেবারে কাটায় কাটায় যথাসময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। মিস্টার কুপহুইস–ডুসেল তারও পরিচিত–ওঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলেন, যে ভদ্রলোকের আসার কথা ছিল তিনি আসতে পারেননি। ডুসেল যেন সটান অফিসে চলে গিয়ে মিপের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর কুপহুইস ট্রামে উঠে অফিসে ফিরে আসেন, আর সেই একই দিকে ডুসেল হাঁটতে থাকেন। এগারোটা কুড়িতে অফিসে এসে ডুসেল দরজায় টোকা দিলেন। মিপ তাঁকে কোট খুলতে সাহায্য করলেন যাতে হলদে তারার চিহ্নটা না দেখা যায়। তারপর তাকে খাসকামরায় নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে ঘর পরিষ্কার করার মেয়েলোকটি থাকা অব্দি কুপহুইস এটা সেটা বলে তাকে ব্যস্ত রাখলেন। তারপর মিপ এসে, একটা কাজের জন্যে ঘরটা ছাড়তে হবে, এই রকমের ভাব দেখিয়ে ডুসেলকে ওপরে নিয়ে গেলেন। ওপরে গিয়ে মিপ ঝোলানো আলমারিটা ঠেলে চোখের সামনে ভেতরে ঢুকে পড়তে দেখে। ডুসেল একেবারে হতভম্ব।

আমরা সবাই ওপরতলায় টেবিলে গোল হয়ে বসে কফি আর কনিয়াক নিয়ে অপেক্ষা করছি, নবাগতকে অথ্যর্থনা জানাব। মিপ ওঁকে প্রথমে আমাদের বৈঠকখানাটা দেখালেন। উনি আমাদের আসবাবপত্র দেখেই চিনতে পারলেন এবং উনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না যে আমরা এখানে রয়েছি, ওঁর ঠিক মাথার ওপর। মিপ যখন ওঁকে খবরটা দিলেন তখন উনি প্রায় মূৰ্ছা যাওয়ার উপক্রম হলেন। ভাগ্যিস্ মিপ ওঁকে বেশি সময় না দিয়ে সটান ওপরতলায় নিয়ে তুললেন।

ডুসেল ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে নির্বাক হয়ে বেশ খানিকক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন গোড়ায় উনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। খানিকক্ষন পরে তোলাতে ভোলাতে বললেন, কিন্তু…আবার, সিন্দ…তোমরা তাহলে বেলজিয়ামে নয়? ইশট ডের মিলিটার নিশট কাম, ডাস আউটো….তোমরা তাহলে পালাতে গিয়ে পালাতে পারোনি?

আমরা ওঁকে সব পরিষ্কার করে বললাম সৈন্যদের আর গাড়ির গল্পটা ইচ্ছে করেই রটানো হয়েছিল যাতে লোকে, বিশেষ করে জার্মানরা আমাদের খোঁজে এলে ভুল ধারণা করে।

এতটা বুদ্ধি খাটানো হয়েছে দেখে ডুসেল আবার হাঁ হয়ে গেলেন। এরপর যখন আমাদের দারুণ বাস্তববুদ্ধির পরিচায়ক অতি সুন্দর এই ছোট্ট ‘গুপ্ত মহল’টা ঘুরে ঘুরে দেখলেন, তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া তার আর কিছু করার রইল না।

দুপুরের খাওয়া আমরা সবাই একসঙ্গে বসে খেলাম। তারপর উনি খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়ে আমাদের সঙ্গে চা খেয়ে নিলেন। তারপর ওঁর জিনিসপত্রগুলো (মিপ আগেই এনে রেখেছিলেন) খানিকটা গোছগাছ করলেন। ততক্ষণে উনি এটাকে অনেকটা নিজের বাড়ি বলে মনে করতে আরম্ভ করেছেন। বিশেষ করে নিচের টাইপ করা একখানা গুপ্তমহলের নিয়মকানুন’ (ফান ডানের করা) উনি হাতে পেলেন।

গুপ্ত মহলের ছক ও সহায়িকা’

 ইহুদী ও ঐ জাতীয় লোকদের সাময়িক বসবাসের জন্যে বিশেষ সংস্থা।

বছরের বারোমাসই খোলা থাকে। সুন্দর, শান্ত, জঙ্গলমুক্ত পরিবেশ, আমস্টার্ডামের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। ১৩ আর ১৭ নম্বর ট্রামের রাস্তায়, গাড়িতে অথবা সাইকেলেও আসা। যায়। বিশেষ ক্ষেত্রে পায়ে হেঁটেও আসা যায়, যদি জার্মানরা যানবাহনে চড়া নিষিদ্ধ করে।

থাকা খাওয়া ও বিনামূল্যে।

বিশেষ রকমের চর্বিমুক্ত খাবার।

সব সময় পানি পাওয়া যাবে বাথরুমে (হায়, গোসলের ব্যবস্থা নেই) এবং বিভিন্ন ভেতর বাইরের দেয়ালের গায়ে।

প্রচুর গুদামঘর আছে সব রকমের মাল রাখার জন্যে।

নিজস্ব বেতার কেন্দ্র, লন্ডন, নিউইয়র্ক, তেল আবিব এবং আরও বিস্তর বেতারঘাটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। সন্ধ্যে ছ’টার পর কেবল এখানকার বাসিন্দারা ব্যবহার করতে পারবেন। কোনো রেডিও স্টেশনই নিষিদ্ধ নয়, এটা ধরে নিয়ে যে কেবল বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেই জার্মান স্টেশন শোনা যাবে, যেমন চিরায়ত সঙ্গীত ইত্যাদির জন্যে।

বিশ্রামের সময় : রাত ১০টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। রবিবারে সওয়া ১০টা। পরিচালকদের নির্দেশ অনুসারে, অবস্থা অনুকূল হলে, বাসিন্দারা দিনের বেলায় বিশ্রাম নিতে পারবেন। সাধারণের নিরাপত্তার জন্যে বিশ্রামের সময়কাল অক্ষরে অক্ষরে অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

ছুটিছাটা (ঘরের বাইরে) : অনির্দিষ্টকালের জন্যে স্থগিত রইল। বাক-ব্যবহার ও সমস্ত সময় নিচু গলায় কথা বলবেন, এটা আদেশ। সমস্ত সভ্য ভাষা ব্যবহার করা যাবে, সুতরাং জার্মন ভাষা চলবে না।

অনুশীলন ও প্রতি সপ্তাহে একটি করে শর্টহ্যাণ্ড লেখার ক্লাস। অন্য সমস্ত সময়ে ইংরেজি, ফরাসী, গণিত এবং ইতিহাস।

ছোটোখাটো পোষা জীব-বিশেষ বিভাগ (অনুমতিপত্র লাগবে) ও ভালো ব্যবহার মিলবে (উকুন মশা মাছি ইত্যাদি বাদে)।

আহারের সময় : রবিবার এবং ব্যাংকের ছুটির দিন বাদে রোজ সকাল ৯টায় প্রাতরাশ। রবিবার এবং ব্যাংকের ছুটির দিনগুলোতে আনুমানিক সাড়ে ১১টায়।

দুপুরের খাওয়া (খুব এলাহি নয়) ও সওয়া ১টা থেকে পৌনে দুটোর মধ্যে।

নৈশভোজ ঠাণ্ডা এবং/অথবা গরম ও কোনো বাঁধাধরা সময় নেই (বেতারে খবর বলার ওপর নির্ভর করবে)।

কর্তব্য কর্ম : বাসিন্দারা সমস্ত সময় অফিসের কাজে সাহায্য করার জন্যে তৈরি থাকবেন।

গোসল ও রবিবার সকাল ৯টা থেকে সমস্ত বাসিন্দা পানির টব পেতে পারবেন। পায়খানা, রান্নাঘর, অফিসের খাসকামরা অথবা সদর দপ্তর, যার যেটা ইচ্ছে, পেতে পারেন।

মদ্য জাতীয় পানীয় ও একমাত্র ডাক্তারের পরামর্শে।

সমাপ্ত

তোমার আনা।

.

বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

ডুসেল অতি চমৎকার মানুষ, ঠিক যেমনটি আমরা মনে মনে ভেবেছিলাম। আমার ছোট্ট ঘরটাতে ভাগযোগ করে থাকতে ওঁর কোনোই আপত্তি হয়নি।

সত্যিকথা বলতে গেলে, বাইরের একজন লোক আমার জিনিসপত্র ব্যবহার করবেন এ ব্যাপারে আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু একটা ভালো কাজে কিছুটা আত্মত্যাগ তো করতেই হয়; সুতরাং আমি ভালো মনেই আমার এইটুকু স্বার্থ জলাঞ্জলি দেব। বাপি বলেন, আমরা যদি কাউকে বাঁচাতে পারি, তার কাছে আর সব গৌণ এবং তাঁর একথা যথার্থ।

ডুসেল যেদিন এখানে প্রথম এলেন, এসেই আমার্কে, রাজ্যের প্রশ্ন করেছিলেন ঘর পরিষ্কার করার মেয়েলোকটি কখন আসে? বাথরুমটা কখন ব্যবহার করা যায়? পায়খানায় যাওয়া যেতে পারে কোন্ সময়? শুনে তোমার হাসি পাবে, কিন্তু অজ্ঞাতবাসের জায়গায় এই বিষয়গুলো অত সহজ সরল নয়। দিনের বেলায় আমাদের এমন আওয়াজ করা যাবে না যা নিচে থেকে শোনা যেতে পারে। আর যদি বাইরের কোনো লোক থাকে–যেমন ঘর পরিষ্কার করার মেয়েলোকটি–তাহলে আমাদের অতিরিক্ত সাবধান হতে হবে। আমি এ সমস্তই ডুসেলকে ভেঙে খোলসা করে বললাম। কিন্তু একটা জিনিস আমাকে অবাক করল কথাগুলো ভদ্রলোকের মাথায় ঢুকতে বড়ড সময় লাগে। একই জিনিস তিনি দুবার করে জিজ্ঞেস করেন এবং তাও মনে রাখতে পারেন বলে মনে হয় না। হয়ত সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে এবং এটা হয়েছে শুধু হঠাৎ ঠাঁইবদলের জন্যে উনি সম্পূর্ণ ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন। বলে। নইলে আর সবাই ঠিকঠাক চলছে।

বাইরের জগৎকে আমরা হারিয়েছি আজ কম দিন হল না; ডুসেল এসে সেখানকার সম্বন্ধে অনেক কথা বললেন। তিনি যা বললেন তাতে বোঝা গেল খবর খুবই খারাপ। অসংখ্য বন্ধুবান্ধব এবং চেনা মানুষ নিদারুণ অদৃষ্টের ফেরে পড়েছে। দিনের পর দিন সন্ধ্যে হলেই সবুজ আর পশুটে মিলিটারি লরি পাশ দিয়ে টিকিয়ে টিকিয়ে যায়। প্রত্যেক সদর দরজায় এসে জার্মনরা খোঁজ করে সে-বাড়িতে কোনো ইহুদী বাস করে কিনা। থাকলে তক্ষুনি পরিবারকে পরিবার উঠিয়ে নিয়ে যাবে। কাউকে না পেলে তখন পরের বাড়িতে যাবে। গা-ঢাকা দিতে না পারলে তাদের হাত থেকে কারো পরিত্রাণ নেই। অনেক সময় তারা নামের তালিকা নিয়ে ঘোরে এবং তখনই দরজায় বেল্ টেপে যখন জানে যে বেশ বড় ঝাক পাওয়া যাবে। কখনও কখনও তারা নগদ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়–মাথা পিছু এক কাড়ি করে টাকা। আগেকার কালের ক্রীতদাস-খেদায় যাওয়ার মতন। মোটেই হাসির কথা নয়; অত্যন্ত হৃদয়বিদারক সব ব্যাপার। আমি প্রায়ই দেখতে পাই সার সার হেঁটে চলেছে ভালো, নিরীহ মানুষ; সঙ্গের ছেলেপুলেগুলো কাঁদছে; ভারপ্রাপ্ত জন দুই সেপাই তাদের মুখ-নাড়া দিচ্ছে আর মাথায় মারছে যতক্ষণ না তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার মত হয়। বুড়ো, বাচ্চা, পোয়াতী, রুগ্ন, অথর্ব ছাড়াছাড়ি নেই। জনে জনে সবাইকে যেতে হবে মৃত্যুর মিছিলে।

এখানে আমরা কত ভাগ্যবান। কি রকম তোফা আরামে আছি, কোনো ঝামেলা ঝাট নেই। এই সব দুঃখ কষ্ট নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা থাকত না যদি সেইমত প্রিয়জনদের সম্বন্ধে আমরা উতলা বোধ না করতাম যাদের আমরা আজ আর সাহায্য করার অবস্থায়

যখন কিনা আমার প্রিয়তম বন্ধুদের মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা এই শীতের রাত্রে তারা হয়ত কোনো খানাখন্দে পড়ে রয়েছে তখন উষ্ণ বিছানায় শুয়ে আমার নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়। আমার সেই সব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যাদের এখন দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম জানোয়ারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের কথা মনে হলে আমি বিভীষিকা দেখি। আর এ সবই ঘটছে তারা ইহুদী হওয়ার জন্যে।

তোমার আনা

.

শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি, এসব কি ভাবে যে গ্রহন করব সত্যিই আমরা ভেবে পাচ্ছি না। ইহুদীদের সংক্রান্ত খবর প্রকৃতপক্ষে এতদিন আমাদের কানে এসে পৌঁছায়নি, এখন আসছে। আমরা ভেবেছিলাম যত দূর সম্ভব হেসেখেলে কাটানোই ভালো। মিপ এসে যখন বলে ফেলেন আমাদের কোন বন্ধুর কী হয়েছে, আমার মা-মণি আর মিসেস ফান ডান থেকে থেকে কান্না জুড়ে দেন। সেই জন্যে মিপ আর আমাদের কানে এসব তুলবেন না ঠিক করেছেন। কিন্তু আসা মাত্র চারদিক থেকে প্রশ্নবাণ ডুসেলকে জর্জরিত করা হল। এবং তিনি যে সব কাহিনী বললেন তা এতই নৃশংস আর নিদারুণ যে শোনার পর সারাক্ষণ মনের মধ্যে খচখচ করতে থাকে।

বস্তুত এই বিভীষিকা যখন আমাদের মনের মধ্যে ফিকে হয়ে আসবে, আবার আমরা ঠাট্টামস্করা করব, আবার আমরা এ ওর পেচনে লাগব। এখন আমরা যে রকম মন-খারাপ করে রয়েছি সেইভাবে থাকলে আমাদেরও তাতে ফল ভালো হবে না, বাইরে যারা আছে তাদেরও কোনো উপকারে আমরা আসব না। আমাদের গুপ্ত মহলকে ‘হতাশার গুপ্ত মহল’ করে তুলে কোন্ উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে? আমি যাই করি না কেন, আমাকে কি অষ্টপ্রহর শুধু ঐ ওদের কথাই ভেবে যেতে হবে? কোনো ব্যাপারে আমার হাসতে ইচ্ছে করলে কি তাড়াতাড়ি আমাকে হাসি চাপতে হবে এবং উফুল্ল হওয়ার জন্যে আমাকে লজ্জা পেতে হবে? তবে কি আমায় দিনভর কেঁদে যেতে হবে? না, আমি তা পারব না। তাছাড়া সময়ে এই বিবাদ ঘুচে যাবে।

এই দুঃখকষ্টের সঙ্গে এসে জুটেছে আরও একটা যা পুরোপুরি আমার ব্যক্তিগত; যেমন মরা অবস্থার কথা এখুনি তোমাকে বললাম তার পাশে আমার দুঃখটা কিছুই নয়। তবু তোমাকে না বলে পারছি না যে, ইদানীং আমার কেন যেন মনে হচ্ছে সবাই আমাকে ত্যাগ করেছে। আমার চারপাশে যেন এক দুস্তর শূন্যতা। আগে কখনও আমার এরকম অনুভূতি হত না। আমার হাসি-খেলা, আমার মজা আনন্দ আর আমার মেয়ে বন্ধুরা–এই সবই আমার ভাবনা সম্পূর্ণ ভাবে জুড়ে রাখত। এখন আমি হয় দুঃখের জিনিসগুলো নিয়ে কিংবা নিজের কথা ভাবি। বাবা আমার খুব প্রিয় হলেও, শেষ অব্দি এখন আমি আবিষ্কার করেছি যে, আমার বাপি এখনও আমার ফেলে আসা দিনগুলোর যে ছোট্ট জগৎ তার পুরোটা জুড়ে বসতে পারেন না। কিন্তু এইসব আজেবাজে ব্যাপার নিয়ে তোমাকে জ্বালানোর কোনো মানে হয়? কিটি, আমি খুবই অকৃতজ্ঞ; আমি তা জানি। কিন্তু আমার ওপর যদি বেশি লাফাই-ঝাপাই হয় তাহলে অনেক সময় আমার মাথার মধ্যে ভো ভো করতে থাকে এবং তার ওপর আবার যদি অতসব দুঃখকষ্টের কথা ভাবতে হয় তাহলেই তো গিয়েছি।

তোমার আনা

.

শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

আমরা আমাদের বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি বিজলি খরচ করে ফেলেছি। ফলত, যতদূর সম্ভব খরচ বাঁচানো এবং ইলেকট্রিক কেটে দেওয়ার আশঙ্কা। পনেরো দিন বিন আলোয়; অবস্থাটা ভাবতে পারো? তবে কে জানে, শেষ পর্যন্ত হয়ত সেটা ঘটবে না! আমরা যত রকমের খামখেয়ালি করে সময় কাটাচ্ছি। বাধা জিজ্ঞেস করা, অন্ধকারে ব্যায়াম-চর্চা, ইংরেজিতে ফরাসীতে কথা বলা, বইয়ের সমালোচনা করা। কিন্তু শেষমেশ এ সবই কেমন যেন ভোতা হয়ে যায়। কাল সন্ধ্যেবেলায় আমি একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছি; একজোড়া জোরালো দূরবীনের কাঁচের ভেতর দিয়ে পেছনের বাড়িগুলোর আলো-জ্বালা ঘরগুলোতে উকি দিয়ে দেখা! দিনের বেলায় আমাদের পর্দায় একচুল ফাঁক হতে আমরা দিই না, কিন্তু রাতের বেলায় সেটা হলে কোনো ভয় নেই। পাড়াপড়শিরা যে এত মজার মানুষ। হয় এর আগে আমি জানতাম না। সে যাই হোক, আমাদের প্রতিবেশীরা তাই। আমি দেখতে পেলাম এক ঘরে স্বামী-স্ত্রী খেতে বসেছে; একটি বাড়ির লোকজনেরা ঘরে সিনেমা দেখার সরঞ্জাম সাজাচ্ছে। উল্টো দিকের বাড়িতে একজন দাতের ডাক্তার এক বুড়ি মহিলাকে দেখছেন, তিনি তো ভয়ে কাঠ।

সব সময়ে বলা হত যে, মিস্টার ডুসেল নাকি ছেলেপুলেদের সঙ্গে খুব মিশতে পারেন এবং তাদের সবাইকে তিনি ভালবাসেন। এখন তার আসল রূপ ধরা পড়ে গেছে, উনি এক রসকষহীন, সেকেলে নিয়মনিষ্ঠ লোক এবং আদবকায়দার ব্যাপারে লম্বা-চওড়া বুকনি ঝাড়তে ওস্তাদ।

আমি যেহেতু আমার শোবার ঘর–হায় রে, ছোট্ট একটু–শ্রীমৎ মহাপ্রভুর সঙ্গে ভাগযোগ করে থাকার অমূল্য সৌভাগ্যের (!) অধিকারী এবং তিনজন কমবয়সীর মধ্যে সবাই যেহেতু আমাকেই সবচেয়ে বে-আদব বলে গণ্য করে, সেইহেতু আমাকে প্রচুর ভুগতে হয় এবং একঘেয়ে বস্তাপচা বাক্যযন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্যে আমাকে কালা সাজতে হয়। এ সবও সয়ে যেত, ভদ্রলোক যদি ভীষণ কুচুটে প্রকৃতির না হতেন এবং অন্য সবাই থাকতে সব সময় মা-মণির কানে গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর না করতেন। একচোট ওঁর কাছ থেকে হুড়ো খাওয়ার পর নতুন পালা শুরু হয় মা-মণির কাছ থেকে, সুতরাং আগুপিছু দুদিক থেকেই আমাকে ঝাড় খেতে হয়। তারপর আমার কপাল যদি ভালো হয়, তাহলে মিসেস ফান ডানের কাছে আমার ডাক পড়ে জবাবদিহি করার জন্যে এবং তখন একেবারে তুফান। বয়ে যায়।

সত্যি বলছি, পালিয়ে-থাকা অতিরিক্ত খুঁত-কাড়া একটি পরিবারের মানুষ-না-হয়ে ওঠা চোখের-কাটা হওয়াটা ভেবো না সহজ ব্যাপার। রাত্তিরে যখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমার ওপর আরোপ-করা রাজ্যের অপরাধ আর দোষত্রুটির কথা মনে মনে ভাবি, আমার কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যায়, হয় আমি হাসি নয় কাদি; কখন কি রকম মেজাজ তার ওপর সেটা নির্ভর করে।

আমি যেমন তা থেকে অথবা আমি যা হতে চাই তা থেকে ভিন্ন কিছু হওয়ার একটা ভোতা চাপা বাসনা নিয়ে তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি; আমি যেভাবে চলতে চাই কিংবা আমি যে ভাবে আচরণ করি হয়ত তার থেকে ভিন্ন কোনো আচরণ। হা ভগবান, এবার তোমাকেও আমি গুলিয়ে দিচ্ছি। মাপ করো, লিখে ফেলে সেটাকে আমি কাটতে চাই না এবং কাগজের এই অভাবের দিনে আমি কাগজ ফেলে দিতে পারব না। সুতরাং তোমাকে আমি শুধু এই পরামর্শই দিতে পারি যে, শেষের বাক্যটা তুমি যেন ফিরে পড়ো না, এবং কোনোক্রমেই ওর অর্থোদ্ধারের চেষ্টা করো না, কেন না চেষ্টা করেও তুমি তা পারবে না।

তোমার আনা

.

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি চানুকা আর সেন্ট নিকোলাস এ বছর প্রায় একই সময়ে পড়েছে মাত্র একদিন আগে পরে। চানুকা নিয়ে আমরা কোনো হৈচৈ করিনি। আমরা শুধু পরস্পরকে দিয়েছি টুকিটাকি উপহার এবং সেই সঙ্গে মোমবাতি জ্বালানো। মোমবাতির অভাবের জন্যে আমরা শুধু দশ মিনিটের জন্যে বাতিগুলো জ্বেলে রেখেছিলাম। গান থাকলে ওতে কিছু যায় আসে না। মিস্টার ফান ডান একটা কাঠের বাতিদান বানিয়েছেন, সুতরাং সবদিক থেকে তাতেও সুব্যবস্থা হয়েছে।

শনিবার, সেন্ট নিকোলাস দিবসের সন্ধ্যেটা অনেক বেশি মজাদার হয়েছিল। মিপ্‌ আর এলিকে সব সময়ে বাপির কানে কানে ফিসফিস করে বলতে দেখে আমাদের খুব কৌতূহলের উদ্রেক হয়েছিল, স্বভাবতই আমরা আন্দাজ করেছিলাম কিছু একটা জিনিস আছে।

হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম তাই। রাত আটটার সময় কাঠের সিঁড়ি বেয়ে সার বেঁধে নেমে ঘুটঘুটে অন্ধকারে গলির ভেতর দিয়ে এসে (আমার গা-ছমছম করছিল এবং মনে মনে চাইছিলাম যেন নিরাপদে ওপরতলায় ফিরে যেতে পারি) ছোট্ট ঘুপচি ঘরটাতে জমা হলাম। কোনো জানালা না থাকায় সেখানে আমরা আলো জ্বালাতে পারি। আলো জ্বলে উঠতে বাপি বড় আলমারির ঢাকনাটা খুলে দিলেন। ‘ওঃ, কী সুন্দর’ বলে সবাই চেঁচিয়ে উঠল। এক কোণে সেন্ট নিকালাসের কাগজে সাজানো একটা বড় বেতের ঝুড়ি আর তার ওপর ছিল কৃষ্ণ-পেটারের একটা মুখোশ।

তাড়াতাড়ি ঝুড়িটা নিয়ে আমরা ওপরে চলে গেলাম। তাতে ছিল প্রত্যেকের জন্যে একটা করে সুন্দর ছোট্ট উপহার, তাতে গাঁথা একটা করে লাগসই কবিতা। আমি পেলাম একটা ডল পুতুল, তার স্কার্টটা হল টুকরো-টাকরা জিনিস রাখার থলি। বাবা পেলেন বই রাখার ধরুনি এবং ইত্যাকার সব জিনিস। যাই হোক, মাথা থেকে ভালো জিনিস বেরিয়েছিল। যেহেতু আমরা কেউই সেন্ট নিকোলাসের দিন আগে কখনও পালন করিনি, আমাদের হাতেখড়িটা ভালোই হল।

তোমার আনা

.

বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি,

মিস্টার ফান ডান আগে ছিলেন মাংস, সসেজ আর মশলার কারবারে। এই পেশা ওঁর জানা ছিল বলে ওঁকে বাবার ব্যবসায় নিয়ে নেওয়া হয়। এখন উনি ওঁর সসেজগত দিকের পরিচয় দিচ্ছেন, যেটা আমাদের পক্ষে মোটেই অপ্রীতিকর নয়।

এ দুর্দিনে পড়তে হতে পারে এই ভেবে আমরা প্রচুর মাংস কিনে রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম (অবশ্যই ঘুষ দিয়ে)। দেখতে বেশ মজা লাগে, প্রথমে কিভাবে মাংসের টুকরোগুলো কিমা করার যন্ত্রের ভেতর দিয়ে দুবারে বা তিনবারে যায়, তারপর কিভাবে সঙ্গের মালমশলাগুলো কিমায় মেশানো হয়, এবং তারপর সসেজ তৈরির জন্যে নাড়িভূঁড়ির ভেতর কিভাবে নল দিয়ে তা ভর্তি করা হয়। সসেজের মাংস ভেজে নিয়ে সেদিন রাতে আমরা বাঁধাকপির চাটনির সঙ্গে টাকনা দিয়ে খেলাম, কেননা গোল্ডারল্যাণ্ড সসেজ খেতে হলে আগে খটখটে শুকনো করে নিতে হয়। সেই কারণে মটুকার সঙ্গে সুতো দিয়ে লাঠি বেঁধে তাতে সসেজগুলো আমরা টাঙিয়ে দিলাম। ঘরে ঢুকতে গিয়ে এক ঝলক সার-বাধা সসেজ ঝুলে থাকতে দেখে প্রত্যেকেই হেসে কুটোপাটি হচ্ছিল। সেগুলো সাংঘাতিক মজাদার দেখাচ্ছিল।

ঘরের মধ্যে সে এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। মিস্টার ফান ডান তাঁর বপুতে (তাকে দেখাচ্ছিল আরও বেশি মোটা) তার স্ত্রীর একটা অ্যাপ্রন চড়িয়ে মাংস কুটতে ব্যস্ত। রক্তমাখা দুটো হাত, লাল মুখ আর নোংরা আনে তাকে ঠিক কশাইয়ের মত দেখাচ্ছিল। মিসেস ফান ডান একসঙ্গে সব কাজ সারতে চাইছিলেন, একটা বই পড়ে পড়ে ডাচ ভাষা শেখা, সুপের মধ্যে খুন্তি নাড়া, মাংস কিভাবে বানানো হচ্ছে তা দেখা, দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং তার পাজরে চোট লাগা নিয়ে নাকে কাঁদা। যেসব বুড়ি ভদ্রমহিলারা (!) চ্যাটালো পাছা কমাবার জন্যে ঐসব বোকামিপূর্ণ শরীরচর্চা করেন তাঁদের ঐ রকমই দশা হয়।

ডুসেলের একটা চোখ ফুলেছে। আগুনের পাশে বসে ক্যানোনিল ফোঁটানো পানি দিয়ে উনি চোখে সেঁক দিচ্ছেন। জানালা গলে আসা একফালি রোদূরে চেয়ার টেনে নিয়ে বসা পিকে অনবরত এদিক-ওদিক করতে হচ্ছিল। তাছাড়া আমার ধারণা ওর বাতের ব্যাথাটা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। কেননা মুখে একটা কাতর ভাব নিয়ে উনি পুঁটুলি পাকিয়ে বসে মিস্টার ফান ডানের কাজ করা দেখছিলেন। তাকে দেখাচ্ছিল ঠিক বৃদ্ধাশ্রমে থাকা একজন কুঁকড়ে যাওয়া বুড়োর মত। পেটার তার বেড়ালটা নিয়ে ঘরময় খেলার কসরত করে বেড়াচ্ছিল। মা-মণি, মারগট আর আমি আলুর খোসা ছাড়াচ্ছিলাম। মিস্টার ফান ডানের দিকে নজর পড়ে থাকায় আমরা সকলে অবশ্য অনেক ভুলভাল করে ফেলছিলাম।

ডুসেল তার দাঁতের ডাক্তারি শুরু করেছেন। মজার ব্যাপার বলে আমি তাঁর প্রথম রুগীটির বিষয়ে বলব। মা-মণি ইস্ত্রি করছিলেন এবং মিসেস ফান ডানকেই প্রথম অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। ঘরের মাঝখানে রাখা একটা চেয়ারে গিয়ে উনি তো বসলেন। ডুসেল বেজায় গম্ভীর মুখ করে তার ব্যাগ খুলে জিনিসপত্র বের করতে লাগলেন। বীজাণুনাশক হিসেবে খানিকটা ওডিকোলন আর মোমের বদলে ভেজলিন চেয়ে নিলেন।

মিসেস ফন ডানের মুখের ভেতর তাকিয়ে উনি দুটো দাঁত পেলেন যা ছোঁয়া মাত্র মিসেস ফান ভান এমন কুঁকড়ে-মুকড়ে গেলেন যেন এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন আর সেই সঙ্গে ব্যথায় আবোলতাবোল আওয়াজ করতে থাকলেন। লম্বা পরীক্ষার পর (মিসেস ফান ডানের ক্ষেত্রে, বাস্তবে কিন্তু দুই মিনিটের বেশি সময় লাগেনি) ডুসেল একটি গর্ত খুঁড়তে শুরু করে দিলেন। কিন্তু করবে কার বাপের বাধ্যি রোগিণী এমন ভাবে ডানে-বামে হাত পা ছুঁড়তে শুরু করে দিলেন যে–একটা পর্যায়ে গিয়ে ডুসেলকে তার হাতের কুরুনি ছেড়ে দিতে হল–সেটা বিধে রইল মিসেস ফান ডানের দাঁতে।

তারপর আগুনে সত্যিকার ঘৃতাহুতি পড়ল। ভদ্রমহিলা চেঁচাতে লাগলেন (অমন একটা যন্ত্র মুখে নিয়ে যতটা চেঁচানো যায়), হাত দিয়ে যন্ত্রটা মুখ থেকে টেনে বের করতে চেষ্টা করলেন। তাতে হিতে বিপরীত হল। আরও সেটা ঢুকে বসে গেল। মিস্টার ডুসেল তার হাত দুটো দুই পাশে সেঁটে চুপচাপ থেকে প্রহসনটুকু দেখতে লাগলেন। বাকি দর্শকের দল আর থাকতে না পেরে হাসিতে ফেটে পড়ল। কাজটা খারাপ করেছি, কেননা নিজের কথা বলতে পারি, আমার উচিত ছিল আরও জোরসে হেসে ওঠা। অনেকবার এপাশ ওপাশ করে, পা ছুঁড়ে, চেঁচামেচি করে এবং বাচাও বাঁচাও বলে শেষ অবধি যন্ত্রটা উনি টেনেটুনে বের করলেন এবং যেন কিছুই হয়নি এমনিভাব করে তার কাজ চালিয়ে গেলেন।

জিনিসটা উনি এমন চটপট করে ফেললেন যে মিসেস ফান ডান কোনো নতুন ফিকির করার আর সুযোগ পেলেন না। তবে ডুসেল তাঁর জীবনে কখনও এতটা পরের সাহায্য পাননি। দুজন সাকরেদ তার খুব কাজে লেগেছিল। ফান ডান আর আমি আমাদের কর্তব্যকর্ম ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলাম। কর্মরত একজন হাতুড়ে’–এই নামের মধ্যযুগের কোনো ছবির মত দৃশ্যটা দেখাচ্ছিল। ইতিমধ্যে অবশ্য রোগিণীটি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন; তার সুপ আর তার খাবারে তাকে নজর রাখতে হবে। একটা বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভবিষ্যতে আর কখনও ডাক্তারের হাতে নিজেকে সঁপে দেবার মতন এমন তাড়া। তাঁর কদাচ থাকবে না।

তোমার আনা।

.

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৪২

আদরের কিটি, সদর দপ্তরে আরামে বসে পর্দার ফাঁকটুকু দিয়ে বাইরেটা দেখছি। পড়ন্ত বেলা, তবু তোমাকে লেখার মত আলো এখনও রয়েছে।

লোকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে, এ এক ভারি অদ্ভুত দৃশ্য; সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে যেন পেছনে ষাঁড়ে তাড়া করেছে এবং এখুনি সবাই হোঁচট খেয়ে পড়বে। সাইকেল চালিয়ে এখন যারা যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে তাল রেখে চলা অসম্ভব। আমি এমন কি দেখতেও পাচ্ছি না সাইকেল চড়ে যে যাচ্ছে সে কে।

এ পাড়ার লোকজনদের দিকে খুব একটা তাকাতে ইচ্ছে করে না। বিশেষ করে বাচ্চার দল এত নোংরা হয়ে থাকে যে তাদের ছুতে ঘেন্না হয়। নাক দিয়ে পেটা গড়ানো একেবারে বস্তির বাচ্চা। ওদের একটা কথাও আমি শুনলে বুঝব না।

কাল আমি আর মারগট এখানে গোসল করার সময় আমি বলেছিলাম, ‘হেঁটে যাচ্ছে যে বাচ্চারা, ধর, আমরা যদি ওদের এক-একটাকে একটা মাছ ধরার ছিপ দিয়ে টেনে তুলে প্রত্যেককে গোসল করিয়ে দিই, ওদের কাপড়চোপড় কেচে দিই, ফুটোফাটা সেলাই করে দিই, এবং তারপর আবার ওদের ছেড়ে দিই, তাহলে…।’ মারগট আমাকে শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠল, কালই আবার দেখবি ওরা আগের মতই যে-কে সেই নোংরা এবং গায়ে শতছিন্ন কাপড়-জামা।

আমি কী আজে-বাজে বকছি। এসব বাদেও দেখার অনেক কিছু আছে–মোটরগাড়ি, নৌকো আর বৃষ্টি। আমার বিশেষ করে পছন্দ চলন্ত ট্রামের ক্যাচর-ক্যাচর আওয়াজ।

আমাদের যেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই, আমাদের ভাবনাচিন্তারও সেই একই দশা। ঘুরে ঘুরে ক্রমাগত সেই একই জায়গায় আমরা এসে হাজির হই–সেই ইহুদী থেকে খাবার জিনিসে আর খাবার জিনিস থেকে রাজনীতিতে। হ্যাঁ, ভালো কথা, ইহুদী বলতে মনে পড়ল, কাল আমি পর্দার ফাঁক দিয়ে দুজন ইহুদীকে দেখেছি। দেখে আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস। হচ্ছিল না; কী বিশ্রী যে লাগছিল, আমি যেন তাদের বিপদে ফেলে পালিয়ে এখন তাদের দুর্দশা দেখছি। ঠিক উল্টোদিকে আছে একটা বজরা; সেখানে সপরিবারে থাকে একজন। মাঝি। তার একটা ঘেউ-ঘেউ করা ছোট কুকুর আছে। যখন সে পাটাতনের ওপর ছুটোছুটি করে তখন ছোট কুকুরটাকে আমরা চিনতে পারি শুধু ওর ডাক শুনে আর ল্যাজ দেখে। এহ, শুরু হল বৃষ্টি, এখন বেশির ভাগ লোক গা-ঢাকা দিয়েছে ছাতার তলায়। চোখে পড়ছে শুধু বর্ষাতি আর মাঝে মাঝে কারো কারো টুপির পেছনটা। সত্যি এখন আর বেশি দেখার আমার দরকার নেই। ক্রমশ এক নজরেই সব মেয়ে আমার জানা হয়ে যাচ্ছে, আলু খেয়ে খেয়ে মোটা ধুমসী, গায়ে লাল কিংবা সবুজ কোট, জুতার হিল ক্ষয়ে-যাওয়া এবং একটা করে ব্যাগ বগলদাবা করা। তাদের মুখগুলো দেখে হয় করুণ নয় দয়ালু বলে মনে হয় সেটা নির্ভর করে স্বামীদের ভাবসাবের ওপর।

তোমার আনা।

.

মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ১৯৪২

 আদরের কিটি, ‘গুপ্তমহল’ এই আনন্দ-সংবাদ শুনেছে যে, বড়দিন উপলক্ষে প্রত্যেকে বাড়তি সিকি পাউণ্ড করে মাখন পাবে। খবরের কাগজে বলেছে আধ পাউণ্ড, তবে সে তো সেইসব ভাগ্যবান মর্ত্যের জীবদের জন্যে যারা সরকারী রেশন-খাতার অধিকারী। পালিয়ে-থাকা ইহুদীদের জন্যে নয়–আটের বদলে মাত্র চারটি বেআইনী শেনখাতা কেনা তাদের সাধ্যায়ত্ত।

আমরা সবাই আমাদের মাখন দিয়ে কেকবিস্কুট কিছু বানাব। আজ সকালে আমি কয়েকটা বিস্কুট আর দুটো কেক তৈরি করেছিলাম। ওপরতলায় সবাই খুব ব্যস্ত। মা-মণি বলেছেন গেরস্থালির কাজকর্ম শেষ না করে আমি যেন সেখানে কাজ করতে বা পড়াশুনো করতে না যাই। মিসেস ফান ডান তাঁর চোট-লাগা পাঁজরের দরুন শয্যাশায়ী, দিনভর তাঁর নাকী কান্না, সারাক্ষণ নতুন ড্রেসিং করাতে দিতে তার আপত্তি নেই, এবং কোনো কিছুতেই তাঁর মন ওঠে না। উনি আবার নিজের পায়ে দাঁড়ালে এবং নিজেরটা নিজে গুছিয়ে নিতে পারলে আমি খুশি হব। কেননা তার পক্ষ নিয়ে এটা আমাকে বলতেই হবে–তিনি অসাধারণ পরিশ্রমী এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, বরাবর দেহে মনে সুস্থ। সেই সঙ্গে সদা প্রফুল্ল।

দিনের বেলায় যেন বেশি আওয়াজ করার জন্যে আমাকে যথেষ্ট ‘চুপ চুপ’ শুনতে হয় না= আমার শয়নকক্ষের সঙ্গী ভদ্রলোক রাত্তিরেও এখন আমাকে বার বার ডেকে বলেন, চুপ চুপ।’ তার কথা শুনে চললে, আমার তো পাশ ফেরাও বারণ। আমি ওঁকে আদৌ পাত্তা দিতে প্রার্থী নই। এর পরের বার কিছু বলতে এলে উল্টে আমিই ওঁকে ‘চুপ, চুপ’ বলব।

ওঁর ওপর আমি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠি, বিশেষ করে রবিবারগুলোতে, সাতসকালে উঠে ব্যায়াম করার জন্যে উনি আলো জ্বালিয়ে দেন। মনে হয় স্রেফ ঘণ্টার পর ঘণ্টা উনি চালিয়ে যান, আর ওঁর জ্বালায় আমি বেচারা, আমার শিয়রে জোড়া-দেওয়া চেয়ারগুলো, ঘুম ঘুম চোখে আমার মনে হয়, যেন অনবরত সামনে আর পেছনে সরতে নড়তে থাকে। পেশীগুলো আলগা করার জন্যে বার দুয়েক প্রচণ্ড জোরে হাত ঘুরিয়ে ব্যায়ামের পর্ব শেষ করে শ্রীমৎ মহাপ্রভু শুরু করেন ওঁর প্রাতঃকৃত্য। তার প্যান্টগুলো ঝোলানো থাকে, সুতরাং সেগুলো যোগাড় করে আনতে ওঁকে এখান থেকে সেখানে যেতে আসতে হয়। কিন্তু টেবিলে পড়ে থাকা টাইয়ের কথা ওঁর মনে থাকে না। সুতরাং ফের সেটা আনতে চেয়ারগুলোতে তিনি ধাক্কা মারেন এবং হোঁচট খান।

থাক, আমি আর বুড়ো লোকদের বিষয়ে এর বেশি বলে তোমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাব না। এতে অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না এবং আমার শোধ তোলবার সমস্ত মতলব (যেমন ল্যাম্প ডিস্কানেক্ট করা, দরজায় খিল দেওয়া, ভদ্রলোকের জামা-কাপড় গায়েব করা) ত্যাগ করতে হবে শান্তি বজায় রাখার জন্যে। ইস, আমি কিরকম বিচক্ষণ হয়ে উঠছি! এখানে সর্ব বিষয়ে একজনকে তার বিচারশক্তি প্রয়োগ করতে হবে, মান্য করতে শিখতে হবে, মুখ বুজে থাকতে হবে, ভালো হতে হবে গোঁয়ার্তুমি ছাড়তে হবে এবং আমার জানা নেই আরও কত কী। আমার ভয় হচ্ছে, খুব কম সময়ের মধ্যে আমাকে আমার পুরো বুদ্ধি খরচ করে ফেলতে হবে এবং আমার বুদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি নয়। যুদ্ধ যখন শেষ হবে, তখন আর ঘটে কিছু থাকবে না।

তোমার আনা

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *