আঠারো নয়, উনিশ

আঠারো নয়, উনিশ

হ্যাঁ-কে না করা যায়?

এক-কে দুই, কি আঠারো-কে উনিশ?

আর কিছু পারা যাক বা না যাক আঠারো-কে যে উনিশ করা যায় হলফ করে ভার সাক্ষ্য দিতে পারি! কারণ সেটা আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

আর এ ভানুমতীর খেল কে যে দেখাতে পারেন তা নিশ্চয় আর বিশদ করে বলতে হবে না।

হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলছি। আমাদের বাহাত্তর নম্বরের ন্যাড়াছাদের টঙের ঘরের তিনি।

বিশেষ করে মেজাজ একটু বিগড়ে গেলে তো কথাই নেই।

যেমন বিকেলের আড্ডাঘরে এসে যদি দেখেন চায়ের সঙ্গে তাঁর মনের মতো টা-টা, যা দু-এক দিন আগে ঠারেঠোরে জানিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও, গরহাজির। শুধু গরহাজির নয়, সেখানে যা হাজির তা কিছুদিন থেকে একরকম তাঁর দু-চক্ষের বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলে সবকিছুই হতে পারে।

এবারের জিনিসটা হল নিজেদের হেঁশেলেই তৈরি ভেজিটেবল স্যান্ডুইচ।

আমাদের রামভুজ ঠাকুরের রান্নার কেরামতি যতই থাক, টোস্ট করা দু-টুকরো পাঁউরুটির মধ্যে নানা কায়দায় বদলানো নিরামিষ পুর দিয়ে কে পরপর ক-দিন জিভে-জল-আনা আহামরি কিছু আমাদের বিকেলের চায়ের আসরে হাজির করতে পারে?

কিন্তু তাই তাকে করতে হচ্ছে।

হচ্ছে আমাদের গৌর মহাপ্রভুর কথায়। অর্থাৎ বাহাত্তর নম্বরের যেমন দস্তুর সেই অনুসারে এ মাসের বিকেলের জলখাবারের তদারকির ভার পড়েছে গৌরের ওপর। সে ভার পেয়ে গৌর যে এমন গবেষণামূলক খাদ্যপরীক্ষা চালাবে তা কে জানত?

খাবার সে যে কিছু আজেবাজে সস্তা খাওয়াচ্ছে তা নয়। কিন্তু জলখাবার বিষয়ে সে তার নিজস্ব মৌলিক থিয়োরি খাটিয়েই যত গোলমাল বাধিয়েছে।

তার থিয়োরি হল নিত্য নিত্য বদল করলে অতি বড় উপাদেয় সবকিছুরও ধার ভোঁতা হয়ে যায়। সেরা সেরা সব খানাদানার মানও তাতে রাখা হয় না। সে তাই ব্যবস্থা করেছে যে আমাদের দুপুরের কি রাত্রের খাবারে যেমন চলছে তাই চলতে দিলেও বিকেলের জলখাবারে এক-এক ধারার অন্তত এক হপ্তায় আর বদল হবে না।

তার সেই ব্যবস্থাতেই গত চারদিন ধরে আমাদের নিরামিষ স্যান্ডুইচের পালা চলছে। নিরামিষ পুরের অবশ্য রকম ফের আছে, যেমন একদিন আলু কপির মণ্ডের সঙ্গে বিট-এর গুঁড়ো, তার পরের দিন কড়াইশুটি বাটার সঙ্গে হিং-ফোড়ন বাঁধাকপি ভাজি, এইরকম আর কী? কিন্তু সে বৈচিত্র্যে আর যে-ই কেন, খুশি না হলেও, অন্তত মুখ বুজে থাকুক, টঙের ঘরের তিনি সে পাত্র নয়।

দু-দিনের পর তিনদিনের দিনেই তিনি স্যান্ডুইচের প্লেটগুলোর দিকে চেয়ে ভ্রুকুটিভরে বলেছেন, কী ব্যাপার হে? আমাদের যেন ভদ্রলোকের-এক-কথা চলছে বলে মনে হচ্ছে? চোখে ভ্রূকুটি থাকলেও মুখটা প্রসন্ন রেখেই তিনি তারপর বলেছেন, তা, ওই কী বলে আমাদের আজও তো নিছক বোট্যানিক্যাল গার্ডেনস মনে হচ্ছে।

আজ্ঞে হ্যাঁ, গৌর গম্ভীরভাবে জানিয়েছে, আজ স্কোয়াশ-এর সঙ্গে সয়াবিনস-এর একটা মিক্সচার মাস্টাড দিয়ে কী রকম জমেছে দেখুন না।

তা তত দেখতেই হবে, ঘনাদা একটা স্যান্ডুইচ যেন বেশ সন্দিগ্ধভাবে তুলে নিয়ে বলেছেন, এক্সপেরিমেন্ট বেশ ভালই করছ। কিন্তু ওই কী বলে স্যান্ডুইচ যদি হয় তো সেই চিকেন হ্যাম-ট্যাম বা সসেজ-টসেজও তো চালানো যায়?

আজ্ঞে না, গৌর সশ্রদ্ধ অথচ গম্ভীরভাবেই জানিয়েছে, এই হপ্তায় তা আর হবে না।

এই হপ্তায় আর হবে না? ঘনাদার চমকিত চোখমুখের বিস্মিত প্রশ্নটা আমাদের একজনের মুখ দিয়েই বেরিয়েছে, তার মানে?

তার মানে, গৌর ধৈর্য ধরে শান্তভাবে তার বক্তব্যটা বিশদ করেছে, এক-এক হপ্তায় এক-এক রকম ধারা চলবে। যেমন এ হপ্তায় নিরামিষ স্যান্ডুইচ, এবং পরের হপ্তায় হল আমিষ কাবাব কোপ্তা কাটলেটের।

ওঃ!—ঘনাদা যে রকম সুবোধ বালকের মতো ব্যবস্থাটা মেনে নিয়ে হাতে নেওয়া স্যান্ডুইচটি শেষ পর্যন্ত সদ্ব্যবহার করে উঠে গেছেন তাতে ফাঁড়াটা এবারের মতো কেটে গেছে ভেবেই আমরা মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি।

কিন্তু তার পরদিন যা হয়েছে তাতে বুঝেছি ঘনাদাকে আমরা থোড়াই চিনি।

বিকেলের আসর তখন আমাদের বসে গেছে। গৌরের নব ব্যবস্থাপনায় টেবিলের ওপরে যথারীতি থাক-থাক স্যান্ডুইচ সাজানো। সেই নিরামিষই বটে, তবে রাজমা বাটার সঙ্গে চিজ আর অন্য মশলায় জিনিসটা অখাদ্যের বদলে যে বেশ উপাদেয়ই হয়েছে আমাদের জমে-ওঠা আলোচনাটাই তার প্রমাণ।

আলোচনাটা বসেছে এক-এক যুদ্ধে মহাযুদ্ধে কত মানুষ মরে তাই নিয়ে। পৃথিবীর সেই আদিকাল থেকে মহামারী আর যুদ্ধ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করে আসছে তার বিষয় বলতে বলতে গৌর তখন একেবারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পৌঁছে। গেছে।

কিন্তু এমন জমাটি সময় টঙের ঘরের তিনি কোথায়? আমরা উত্তেজিত আলোচনার মধ্যে কানটা ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িটার দিকেই পেতে রেখেছি। – নিরামিষ স্যান্ডুইচের প্রতিবাদে ঘনাদা এ বিকেলের আসরই ত্যাগ করলেন নাকি শেষ পর্যন্ত? না, তা তিনি করেননি।

এলেন তিনি ঠিকই, তবে একটু দেরি করে। নিরামিষ স্যান্ডুইচ মুখে দেবার দায়টা যেন এড়াবার জন্যই।

আমাদের আলোচনাটাও তখন উত্তেজনার তুঙ্গে গিয়ে পৌঁছেছে বলা যায়। প্রতিদিন সে যুদ্ধে—গৌর চড়া গলায় আমাদের শোনাচ্ছে—এক অক্ষৌহিণী করে সৈন্য মারা পড়েছে তা জানো? এক অক্ষৌহিণী মানে না।

গৌরকে তার কথা আর শেষ করতে হয়নি। বারান্দার দরজা দিয়ে আড্ডাঘরে ঢুকে তাঁর মৌরসি আরাম-কেদারার দিকে আসতে আসতেই গৌবের বক্তব্যটা শুনে ঘনাদা বজ্র গম্ভীর স্বরে তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারপর আরামকেদারায় বসতে বসতে বলেছেন, এক অক্ষৌহিণী নয়, কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে প্রতিদিন মারা গেছে নয় অনিকিনি, এক চমূ, এক পৃতনা, দুই গণ, এক সোনামুখ আর দশমিক নয়-চার-সাত-তিন-ছয়-জন সেনা।

কয়েক সেকেন্ড ঘর একেবারে নিস্তব্ধ। তারপর গৌর বাদে আমাদের সকলের গলায় একই জিজ্ঞাসা উথলে উঠল—কী? কী বললেন—?

বললাম, ঘনাদা ধৈর্য ধরে তাঁর বক্তব্যটা আবার বলতে শুরু করলেন, এক অক্ষৌহিণী করে নয়, প্রতিদিন কুরুক্ষেত্রে মারা গেছে নয় অনিকিনি, এক চমু, এক পৃতনা—

কী বলছেন, কী?-ঘনাদার কথা শেষ হবার আগেই তীব্র প্রতিবাদ শোনা গেল এবার—কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কত সৈন্য প্রতিদিন মারা গেছে তারা সোজা হিসেব আপনি উলটে দিতে চান?

উলটে দিতে নয়—ঘনাদার অনুকম্পা মেশানো উক্তি—ভুলটা শুধরে দিতে চাই শুধু।

ভুল!–গৌর রীতিমত উত্তেজিত—কুরুক্ষেত্রে প্রতিদিন এক অক্ষৌহিণী করে সেনা মারা গেছে এটা আমাদের হিসেবের ভুল বলছেন আপনি? পাটিগণিতের সোজা যযাগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগও আমরা কি ভুলে গেছি?

ঘনাদা কি ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ? না, তিনি নির্বিকারভাবে ঠাণ্ডা অথচ গায়ে-জ্বালা-ধরানো গলায় বলেছেন, গুণ-ভাগে না হোক, কিছুতে একটা ভুল করেছ বলেই মনে হচ্ছে!

ভুল করেছি মনে হচ্ছে? গৌর যেন অতি কষ্টে গলাটা উদারায় নামিয়ে রেখে হিসেবটা বোঝাতে চেয়েছে, মোট কত সেনা ছিল পাণ্ডবদের? সাত অক্ষৌহিণী! আর কৌরবদের ছিল এগারো। এগারো আর সাতে হল সবসুদ্ধ আঠারো অক্ষৌহিণী। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ জীবিত ছিল মাত্র দশজন! কৌরবদের তিন আর পাণ্ডবদের সাত। এই দশজনকে ধর্তব্য না করলে মোট আঠারো অক্ষৌহিণী সেনা যদি আঠারো দিনে সব শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তা হলে প্রতিদিন এক অক্ষৌহিণী করে মারা যায় কি না!

তাই যাবার কথা—ঘনাদা যেন সায় দিতে গিয়েও সামান্য একটু ফ্যাকড়া তুলেছেন—যদি যুদ্ধটা আঠারো দিনের হয়?

আঠারো দিনের হয় মানে! গৌরের সঙ্গে আমরাও এবার অবাক!

গৌর ঝাঁঝালো গলায় বলেছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যে মোট আঠারো দিনে শেষ হয়েছিল এ কথা তো পাঁচ বছরের ছেলেও জানে! সঞ্জয়ের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনা পড়লে কারও তা জানার বাকি থাকে না।

ও, সঞ্জয়ের যুদ্ধ বৃত্তান্ত? ঘনাদার গলায় যেন চাপা টিটকিরি—সঞ্জয় বুঝি আঠারো দিনেরই কথা বলেছে?

হ্যাঁ, বলেছেই তো!—গৌর যেন ঘনাদার অজ্ঞতাকে লজ্জা দেবার সুরে জানাল——তাও জানেন না?

হ্যাঁ, জানি একরকম? ঘনাদা বিদ্রুপের সুরটা একটু চড়িয়েই এবার বললেন, সঞ্জয় যা বলেছে তার ওপর আর কথা নেই।

নেই তো! স্বয়ং ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রের কাছে কী বলে সঞ্জয়কে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন, জানেন!—গৌর যেন কিস্তিমাত-এর চাল চেলে ঘনাদাকে তার কণ্ঠস্থ ছত্রগুলো শুনিয়ে দিলে—

ক্ষণেক চিন্তিয়া তিনি কহেন বিধান।
তব প্রিয় সঞ্জয় তো মহা বিচক্ষণ॥
দিব্যচক্ষু বর আমি দিতেছি উহারে।
সকল যুদ্ধের কথা কহিবে তোমারে॥
বর দিয়ে সঞ্জয়েরে করি নিয়োজিত।
অন্তর্ধান হইয়া ব্যাস গেলেন ত্বরিত॥

ছত্রগুলো শুনিয়ে যেন মনে ভাল করে দাগ কাটবার একটু সময় দিয়ে গৌর আবার বললে, স্বয়ং ব্যাসদেব যাকে ভারতযুদ্ধের বর্ণনা দেবার জন্যে দিব্যচক্ষু দিয়েছিলেন তার ওপর কথা বলার কেউ আর থাকতে পারে?

পারে না বলছ? বেশ! বেশ!—ঘনাদার গলার সুরটা কেমন একটু বাঁকা মনে হল—কিন্তু ব্যাসদেব এই দিব্যচক্ষু দিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের কাজে সঞ্জয়কে লাগিয়েছিলেন কবে থেকে?

কবে থেকে আবার? যুদ্ধের গোড়া থেকে! গৌরের চটপট জবাব।

ওঃ, যুদ্ধের গোড়া থেকে? ঘনাদা একটু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, কিন্তু যুদ্ধের গোড়া বলতে কী বুঝব সেইটে একটু পরিষ্কার হলে হত না?

পরিষ্কার আবার কী হবে?—গৌরের স্বরে তাচ্ছিল্য—গোড়া মানে যুদ্ধ যেদিন আরম্ভ হয় সেদিন। অর্থাৎ ভীষ্মের সেনাপতিত্বে কুরুরা আর ধৃষ্টদ্যুম্নের সেনাপতিত্বে পাণ্ডবেরা যেদিন লড়াই শুরু করল।

যেদিন যুদ্ধ শুরু করল? ভাল! ভাল! ঘনাদা যেন সরল ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, তা শুরুটা করলেন কোথায়?

কোথায় আবার? ঘনাদার মূর্খতাকে লজ্জা দেওয়া সুরে গৌর বললে, কুরুক্ষেত্রে।

ও, কুরুক্ষেত্রে?—ঘনাদার সুরটা এবার কেমন গোলমেলে—তা কুরুক্ষেত্রটা ওদের পায়ের তলাতে ছিল, না যেতে হয়েছিল সেখানে?

পায়ের তলায় থাকবে কেন?—গৌর আমাদেরই মত এবার ঘনাদার কথায় কোথায় যেন একটা প্যাঁচ আছে মনে করে একটু সন্দিগ্ধ—সেখানে যেতে হয়েছিল।

যেতে হয়েছিল!—ঘনাদার গলা এবারে ধাপে ধাপে চড়ছে—আর সে যাওয়াটার মানে বোঝো? দু-দশ হাজার নয়, পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী আর কৌরবদের এগারো অক্ষৌহিণী বলতে কী বোঝায় তা জানা আছে নিশ্চয়? ঘনাদার প্রশ্নটা গৌরকে ছাড়িয়ে এবার আমাদের দিকেও ছুঁড়ে দেওয়া।

হ্যাঁ, জানা মানে—গৌর তখন আমতা আমতা করতে শুরু করেছে। আমরা তাকে সাহায্য করতে পারছি না।

থাক, থাক! আর মাথায় ড়ুবুরি নামাতে হবে না। ঘনাদা আমাদের যথাস্থানে নামিয়ে বসিয়ে বললেন, এক অক্ষৌহিণী হল ইষট্টি হাজার ছ-শো দশ ঘোড়া, একুশ হাজার আটশো সত্তর হাতি, রথও ওই অত, আর পদাতিক সেনা হল এক লক্ষ নয় হাজার তিনশো পাঁচ। এই রকম আঠারো অক্ষৌহিণীর ওই কুরুক্ষেত্রে গিয়ে ঘাঁটি গাড়াটা কীরকম তা একটু বোঝার চেষ্টা ওই কাশীরাম দাস থেকেই করা যেতে পারে। দুপক্ষের মধ্যে কারা প্রথম কুরুক্ষেত্রে গিয়ে চড়াও হয়? হয় পাণ্ডবেরা।

একটু চুপ করে যেন ভাল করে দম নিয়ে ঘনাদা গৌরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া শুরু করলেন,

এত শুনি আজ্ঞা দেন ধর্মের নন্দন।
সৈন্য সেনাপতি শীঘ্র করহ সাজন॥
পাইয়া রাজার আজ্ঞা চারি সহোদর।
সৈন্য সেনাপতিগণ সাজিল বিস্তর।
পঞ্চকোটি সহস্র শতেক মহারথী।
লক্ষ কোটি শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ সাজে সেনাপতি॥
কোটি কোটি অশ্ব আর পত্তি অগণন।
সাত অক্ষৌহিণী সেনা করিল সাজন॥
ঘটোৎকচ বীর আসে পেয়ে সমাচার।
দুকোটি রাক্ষস হয় যার পরিবার।।
চতুরঙ্গ দলে সৈন্য সাজে অগণন।
এই মতো পাণ্ডু সৈন্য করিল সাজন।।
শূন্যে দেবগণ করে জয় জয় ধ্বনি।
অতি শুভক্ষণে চলে পাণ্ডব বাহিনী।।
সাত অক্ষৌহিণী সেনা করিয়া সাজন।
রহেন উত্তরে করি সিংহের গর্জন॥

ঘনাদা একটু থেমে বললেন, এ তো গেল পাণ্ডবদের কথা। কৌরবরাও কুরুক্ষেত্র দখলে কিছু কম যায় না। তাদের সৈন্য আর সাত নয়, এগারো অক্ষৌহিণী।

অসংখ্য সাজিল রথ লিখিতে না পারি।
অর্বুদ অর্বুদ কত সাজিল প্রহরী॥
গজ অশ্ব পত্তি সাজে রথ অগণন।
সমুদ্র প্রমাণ সৈন্য সাজে কুরুগণ॥
ধ্বজ ছত্র পতাকায় ঢাকিল আকাশ।
বাসুকী সৈন্যের ভারে পায় বড় ত্রাস॥
টলমল করে পৃথ্বী যায় রসাতলে।
প্রলয় কালেতে যেন সমুদ্র উথলে॥
একাদশ অক্ষৌহিণী করিল সাজন।
একশত ক্রোশ জুড়ি রহে সৈন্যগণ॥

একটু থেমে আমাদের মুখের ওপর সদর্পে চোখ বুলিয়ে ঘনাদা আবার বললেন, কুরুক্ষেত্রে এমনই করে যুদ্ধের জায়গা দখল কি যুদ্ধেরই একটা পালা নয়? সত্যি কথা বলতে গেলে, যুদ্ধের আসল মার পাণ্ডবেরা তো ওইখানেই মেরেছে। মাত্র সাত অক্ষৌহিণী তাদের সেনা, লড়তে হবে প্রায় দুগুণ—এগারো অক্ষৌহিণীর সঙ্গে। বুদ্ধি করে সাহসভরে আগেই তারা গিয়ে কুরুক্ষেত্রের উত্তরের পাথুরে এবড়ো খেবড়ো চড়াইয়ের দিকটাই দখল করেছে। আহাম্মক দুর্যোধন নিজেদের ক্ষমতার গর্বে– তারপর পশ্চিমে সুন্দর সবুজ সমতল দিকটায় গিয়ে উঠে ভেবেছে কী বাহাদুরিই না করেছে। যুদ্ধের পয়লা চালেই ভুল করে তারা যে তাইতে শেষ সর্বনাশ ডেকে এনেছে হামবড়া আহাম্মকদের তা মাথাতেই আসেনি। তা, সে যা হবার তা হয়েছে, কিন্তু গোড়াতে ওই! জায়গা দখলের দৌড় দিয়েই যে যুদ্ধের প্রথমদিন শুরু তাতে কি কোনও সন্দেহ থাকতে পারে। হ্যাঁ, দিনটা সঞ্জয়ের হিসেবে না আসতে পারে। আসবেই বা কেমন করে? কুরুক্ষেত্র দখলের দৌড় যখন চলছে তখন সে ছিল কোথায়? কুরুক্ষেত্রের ধারেকাছে অন্তত নয়। এর পরের দিন ভীষ্ম যেমন কৌরবদের সেনাপতি হয়েছেন তেমনই ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডবদের। সেইদিনই ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রের স্বচক্ষে যুদ্ধ না দেখার দুঃখ ঘোচাবার জন্য দিব্যচক্ষু দিয়ে সঞ্জয়কে তাঁর কাছে ভিড়িয়ে দেন। সঞ্জয়ের কাছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তাই সেদিন থেকেই শুরু আর তাঁর গুনতিতে মোট আঠারো দিনেই শেষ। আসলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যে হয়েছিল কিন্তু পুরো উনিশটি দিন—তা আরও বুঝিয়ে বলতে হবে?

ঘনাদার রণংদেহি চাউনিটা সোজা এবার গৌরের দিকে! গৌর কি কোনও জবাব দেবে?

সে মুখ খোলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আমরা সমস্বরে ঘনাদাকে সমর্থন করে বললাম, না, না। যা বললেন তারপর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ক-দিনে শেষ কেউ প্রশ্ন করে দেখুক দিকি?

হারের খেসারত হিসেবে গৌর প্রস্তাব যা করল তাতে আমরা তো বটেই, ঘনাদাও বুঝি একটু তাজ্জব।

গৌর বেশ একটু যেন মুগ্ধস্বরেই বলল, ভাবছি কুরুক্ষেত্র সম্বন্ধে এমন একটা যুগান্তকারী গণনার সম্মানে সত্যিকার স্পেশাল কিছু আজ করা দরকার। এই যেমন বড় রাস্তা মোড়ের দোকানের চিকেন প্যাটিস আর ফিশরোল হলে কেমন হয়?

এ প্রস্তাব স্বয়ং গৌরের! আমাদের কারও মুখে খানিকক্ষণ আর কথা নেই। ঘনাদারও না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *