ভাষা

ভাষা

হঠাৎ চমকে উঠলাম।

ভাল গান শুনে যদি বলি কানে যেন মধু ঢালছে তা হলে এই বিদঘুটে আওয়াজ কানে যেন পাঁচন ঢালছে ছাড়া আর কী বলা যায়!

মনে হল আকাশটাকে মিহি মোটা দাঁতওয়ালা করাতে কে যেন রসিয়ে রসিয়ে চিরছে।

এত কথা বলেও যার মহিমা ঠিক বোঝাতে পারছি না, তা হল সন্ধে রাত্রে কাছাকাছি কোথায় কাদের বাড়ির নিরিবিলি ছাদে কোনও শ্রীমান হুলোর কণ্ঠসংগীত। সারা পাড়াটার যেন কান কটকটিয়ে দিলে।

আর তার চেয়ে যা লোকসান করলে আমাদের। একেবারে যাকে বলে ঘাটের কাছে এনে ভরাড়ুবি।

অমন একটা পাকা চাল একেবারে মাত-এর মুখে দিলে কাঁচিয়ে!

আর স্রেফ ওই একটি হলো বেড়ালের মার্জারসংগীতের গিটকিরিতে।

হুলো বেড়ালটা অমন দুশমনি করে বাদ সেধে ঠিক ওই ক্ষণটিতে কালোয়াতি গলা সাধতে শুরু না করলে কী করতেন ঘনাদা?

ফাঁদ থেকে বেরুবার কোনও রাস্তা কি তাঁর ছিল?

আড্ডা-ঘরে শনিবারের রাত্রের খ্যাঁটের পর যা শুরু করেছিলাম তা আর মিনিট, দশেক চালাতে পারলেই আর দেখতে হত না।

ঘনাদাকে ল্যাজে গোবরে হয়ে রণে ভঙ্গ দিতে হত কিংবা সাদা নিশান ওড়াতে হত সন্ধির।

কারণ এবার তো আর এলেবেলেদের দিয়ে খেলানো নয়, একেবারে পেশাদারি পাকা ওস্তাদ আমদানি।

ঘনাদাকে ঘুণাক্ষরে জানতেও দিইনি যে অমন একটি বোমা তাঁর জন্য ঠিক সময় কষে নিয়ে সলতে ধরিয়ে জালিয়ে রেখেছি দোতলার আড্ডা-ঘরে। সুতরাং ঘনাদা তৈরি থাকবার সময়ই পাননি।

একেবারে যে অতর্কিতে আচমকা ল্যাংমারা, তা অস্বীকার করতে পারব না। সুতরাং ঠিক ধর্মযুদ্ধের কোঠায় পড়ে না। কিন্তু কুরুক্ষেত্রেই বা সত্যিকার মহাবীরদের ক-জনকে ধর্মযুদ্ধে কাবু করেছে পাণ্ডবেরা।

না, ঘনাদাকে জব্দ করতে যা আমরা করেছি আদালতে তার সপক্ষে সেই সেকালের মহাভারত পুরাণ থেকে শুরু করে হালের ভিয়েতনাম পর্যন্ত অনেক নজিরই দিতে পারি।

শুধু লজ্জার কথা এই যে জব্দ ঘনাদা হননি, হয়েছি আমরাই।

কিন্তু কী মোলায়েম ভাবেই না নিঃশব্দে জালটি ঘনাদার চারিধারে গুটিয়ে এনেছিলাম।

অত্যন্ত বেয়াড়া দিনকাল। কনট্রোল করলেও যা, ছাড়লেও তা-ই বাজারে কোনও কিছুই মনের মতো পাওয়ার জো নেই খোলাখুলি ভাবে।

তবু সেদিন শিশির তক্তাঘাটের ভরসায় না থেকে সন্ধ্যার আগের ট্রেনেই গঙ্গার বদলে রূপনারায়ণের জোড়া ইলিশ নিয়ে ফিরে এসেছে।

ঘনাদাকে অবশ্য শুধু জোড়া ইলিশের খবরটাই জাঁক করে জানানো হয়েছে তাদের জাতকুল গোপন করে।

রাত্রের ভোজটা একরকম ভালই হয়েছে। ভাজা থেকে ইলিশ ভাতে পর্যন্ত ঘনাদা বেশ তারিয়েই খেয়েছেন মনে হয়েছে, ঝালটা খাবার সময় একটিবার যে খিচটুকু দেখা দেবার উপক্রম হয়েছিল আর গৌরের বোকামিতে যা প্রায় মারাত্মক হতে চলেছিল আমরা সবাই কোনও রকমে তাপ্লি দিয়ে সে-বিপদ কাটিয়েছি।

ঝালের ইলিশটা কাঁটা বেছে মুখে তুলতে তুলতে ঘনাদা যেন চোখ দুটো ছোেট। করে ফেলেছিলেন।

তারপর ঈষৎ সন্দিগ্ধ ভাবে বলেছিলেন, ইলিশটা কোথাকার হে?

কেন? কেন? গঙ্গার! আমরা সমস্বরে জানিয়েছিলাম।

উহুঁ! ভুরু কুঁচকে ছিলেন ঘনাদা, ঠিক গঙ্গার বলে তো মনে হচ্ছে না।

টেমস কি সেন নদীর হবে তা হলে! গৌর বেয়াড়া রসিকতা করে ফেলেছিল।

ঘনাদার মুখে ঘনঘটা শুরু হবার আগেই আমরা যেন ব্যস্ত হয়ে গৌরকে ধমক দিয়ে বলেছিলাম, ঠাট্টার কথা নয়, মাছটা তেমন টাটকা মনে হচ্ছে না, না ঘনাদা?

আমাদের বেশ একটু থ করে দিয়ে ঘনাদা বলেছিলেন, না, টাটকা হবে না কেন! তবে গঙ্গার বদলে যেন রূপনারায়ণের তার পাচ্ছি।

গৌর আবার কী বলতে যাচ্ছিল। তাকে সে সুযোগ না দিয়ে আমরা ঘনাদাকে সমর্থন জানিয়ে বলেছি, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আনাড়ি পেয়ে তক্তাঘাটের নামে আমাদের কোলাঘাটই চালিয়ে দিয়েছে হয়তো।

বানচাল হতে হতে সামলে নিয়ে তারপর ঘনাদাকে এতটুকু সন্দেহ করবার সুযোগ দিয়ে টার্কিশ সিগারেটের লোভে লোভে দোতলার আজ্ঞা-ঘরে এনে তুলেছি।

শিশির খাবার সময়েই টোপটি ফেলেছিল। ঘনাদা ঝোল ঝাল ছাড়িয়ে ডিমের অম্বলটা পর্যন্ত পৌঁছেছেন, তখন হঠাৎ যেন একটা কথা মনে পড়ায় লজ্জিত হবার সুরে বলেছিল, বড় কিন্তু ভুল হয়ে গেছে—ছি! ছি! টিনটা বদলে আনতেই মনে নেই।

ঘনাদা শুধু মুখ তুলে চেয়েছেন। তাঁর হয়ে আমরাই জিজ্ঞাসা করেছি, কীসের টিন?

কীসের আবার। শিশির নিজেই এবার যেন বিরক্ত হয়ে বলেছে, সিগারেটের টিন। কাল দোকানে গেছলাম। কী এক টার্কিশ সিগারেটের টিন দিয়েছে না জানিয়ে। আজ বদলে আনতে ভুলে গেছি।

টার্কিশ সিগারেটের টিন বদলে আনবে? ঘনাদার গলার অনুকম্পা মেশানো ব্যঙ্গের সুরেই আমরা খুশি হয়ে উঠেছি।

শিশির যেন একটু ধোঁকায় পড়ে জিজ্ঞাসা করছে, বদলাবার দরকার নেই নাকি? আপনি তা হলে দেখুন না একটু চোখে!

সেই লোভে লোভেই আড্ডা-ঘরে তুলে এনে তাঁর মৌরসি কেদারাটিতে ঘনাদাকে বসিয়ে শিশির নিজের কামরায় গেছে সিগারেটের টিন আনতে।

সিগারেটের টিন সে এনেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে ঘনাদাকে কুপোকাত করবার সেই জ্যান্ত বোমাটি।

সিগারেটের টিনটা খুলে শিশির বিনীতভাবে ঘনাদার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঘনাদা তা থেকে সিগারেট তুলতে গিয়েও থমকে থেমে গেছেন। তাঁর দৃষ্টি শিশিরের সঙ্গে যে-মূর্তিটা বিনা নোটিশে এ ঘরে এসে হাজির, তার দিকে।

শুধু ঘনাদারই নয়, আমাদেরও যেন চমকে লোকটির দিকে তাকিয়ে তাজ্জব হতে হয়েছে।

প্যান্ট শার্ট পরা ছোটখাটো রোগা-পটকা একটি মানুষ। কিন্তু চেহারা দেখে নয়, তার মুখের বুলিতেই আমরা যেন হতভম্ব।

শিশিরের পিছু পিছু ঘরে ঢুকেই ঘনাদাকে দেখে যা বলেছে তাতে দিশাহারা হবারই কথা। বলেছে, স্লা মাহাটু মালম সি আপানামা ইয়া কামু?

হ্যাঁ, এই লোকটির কথাই আপনাকে বলব ভেবেছিলাম, শিশির যেন নেহাত তুচ্ছ একটা খবর দিয়েছে, ক-দিন ধরে রোজ বিকেলে এসে কিচিরমিচির করে কী যেন বলে! ইংরাজি বাংলা হিন্দি ওড়িয়া কোনও ভাষা বলেই ওকে কিছু বোঝাতে পারিনি। কিচিরমিচিরের ভেতর আপনার নামটা যেন দু-একবার শুনে ওকে আজ ধরে রেখেছি আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব বলে।

ঘনাদার হাতটা তখনও থমকে আছে টিনটার ওপর। চোখ দুটো যেন আরও কোঁচকানো।

আমাদের নতুন অতিথি হাসিমুখে ঘনাদার দিকে ফিরে আবার বলেছে, জাং-আন তা কুট সায়া বুকাহমু সুহ!

ঘনাদা সিগারেটটা এবার তুলে নিয়েছেন টিন থেকে। তারপর যা একটি প্যাঁচ ছাড়বার চেষ্টা করেছেন তাতে প্রথমটা একটু ভাবনাই হয়েছে, সব আয়োজন বুঝি গোড়াতেই ভেস্তে যায় এই ভয়ে।

আমাদের নতুন অতিথির কিচিরমিচিরের ঠেলায় দিশাহারা হয়েই বোধ হয় ঘনাদা হঠাৎ গলায় ঢেউখেলানো সুর তুলে আমাদের ভড়কে দিতে চেয়েছেন।

পালটা জবাবে তিনি ছেড়েছেন, নী-ঈ শের শে!

ঢেউ খেলানো সুরে ওই প্রলাপটুকু ছেড়ে, একটু থেমে, তিনি আবার বলেছেন, দ্য-অং ঈ! দ্য-অং? ওয়-আ ঈ, আঃ উ ইয়াং হোঅ-আ?

ঘনাদার তারপর শিশিরের হাত থেকে দেশলাইটা প্রায় টেনে নিয়ে যতক্ষণ সিগারেট ধরিয়েছেন ততক্ষণে আমাদের নতুন অতিথির মুখের দিকে চেয়ে আমরা একটু প্রমাদ গনেছি সত্যিই।

আমাদের নতুন অতিথিকে একটু ভ্যাবাচাকাই মনে হয়েছে।

এত শেখানো পড়ানো সত্ত্বেও ঘনাদার এই সস্তা প্যাঁচেই ভদ্রলোক কাবু হবেন নাকি? তা হলেই তো সব ভণ্ডুল।

ভদ্রলোক আসলে বাঙালি, নাম অভয় দাস, কিন্তু তিন পুরুষ মালয়ে কাটিয়ে পুরো না হন, প্রায় বারো আনাই ম্যালে হয়ে গেছেন। বাংলা জানেন না এমন নয়, কিন্তু ম্যালেটাই মাতৃভাষা বলা উচিত। শিশিরের মামাতো ভাইয়ের বন্ধু। কী একটা ব্যবসার কাজে মাসখানেকের জন্য ভারতবর্ষে এসেছেন। মামার বাড়ি গিয়ে ভদ্রলোকের পরিচয় পেয়েই শিশিরের মাথায় আজকের ফন্দিটা এসেছে। তারপর সবাই মিলে সেটা চেঁছে ছুলে পালিশ করে ভদ্রলোককে ভাল করে তালিম দিয়ে আজকের আসরে এনে হাজির করেছি।

এত কাণ্ডের পর ঘনাদার এই সামান্য চালাকির কাছে হার মানা তো কিছুতেই উচিত নয়।

অভয় দাসের খাঁটি ম্যালে বুকনির মাথামুণ্ডু না বুঝে মরিয়া হয়েই ঘনাদা যে আবোল-তাবোল সুর ধরেছেন সে বিষয়ে আমাদের তখন কোনও সন্দেহই নেই। ঘনাদার এই ধাপ্পায় আর খানিকক্ষণ অটল থাকলেই তাঁকে নির্ঘাত জব্দ হতে হবে।

অভয় দাস আর একটু যদি ধৈর্য ধরে থাকেন!

অভয় দাস আমাদের মুখ রক্ষা করলেন। প্রথমটা কেমন ফ্যাকাশে মেরে গেলেও আমাদের মুখে চকিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জোর পেয়ে, ঘনাদার সিগারেট ধরানো শেষ হতে না হতেই তিনি আবার শুরু করলেন, সায়া টিডা মং আর টি। মীন টা বিচারা প্লান্ প্লান্‌।

ঘনাদার কাত হতে আর বেশি দেরি নেই তা তাঁর পরের সুর ভোলা থেকেই যেন বোঝা গেল। তিনি মান বাঁচাবার শেষ চেষ্টাতেই যে একটা লম্বা কাঁদুনে সুর ছাড়লেন, চিংনী ইয়ং দিয়ান ত ইয়াউ তো হোয়ে ঈ দা। ওয়া হোয়ে শোওয়া ইং গোয় হোয়া । ফা গোয়া হোয়া মিয়ান দিয়ান হোয়া রের ব্যন হোয়া..

এই হোয়ার মাঝেই হঠাৎ চমকে উঠলাম সেই শ্রীমান হুলোর নেপথ্যে সংগীত লহরিতে।

ঘনাদাও যেন স্তম্ভিত হয়ে থেমে গিয়ে কান খাড়া করেছেন।

সে কান খাড়া করার ভেতরের চালাকিটুকু তখন সত্যিই ধরতে পারিনি।

ঘনাদার ফাঁকা আওয়াজ যে বেফজুল হয়েছে তা বোঝাতে শেষ কিস্তি ঠেলবার জন্য অভয় দাসকে চোখের ইশারা করলাম।

অভয় দাস সোৎসাহে তাঁর পরের খেপের গোলাবর্ষণ করতে যাচ্ছেন হঠাৎ ঘনাদা ভ্রুকুটি করে হাত তুলে আঁকে থামালেন!

হল কী? কুটির সম্মান রেখেও না বলে পারলাম না, ও তো কোথায় কোন হুলো চেঁচাচ্ছে!

হ্যাঁ, তা-ই? ঘনাদা যেন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে স্বীকার করলেন।

কৌতুকের সঙ্গে কৌতূহলও একটু আর না মিশে পারে! শিবু জিজ্ঞাসা করলে, আপনি কী ভেবেছিলেন?

কেউ আলাপ করছে ভাবলেন বোধ হয়! গৌর যেন সরল মনে মন্তব্য করলে।

ওটাও কারুর ভাষা ভেবেছিলেন নাকি! আমি বিমূঢ় বিস্ময় প্রকাশ করে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঘনাদা তার সুযোগ দিলেন না। আমার অসাবধানে এগিয়ে দেওয়া কথার ছুতোটুকু ধরেই আমাদের ফাঁকটুকু কেটে পিছলে বেরিয়ে গেলেন।

হ্যাঁ, ভাষাই ভেবেছিলাম! ঘনাদা আমার মুখের কথার ওপর যেন থাবড়া দিয়ে বললেন, আর ও-ভাষা ব্যবহার করার মতো কে এই শহরে আসতে পারে ভেবেই অবাক হচ্ছিলাম। তারপর অবশ্য নিজের ভুলটা বুঝলাম। ওটা সে-ভাষা নয়, শুধু হুলোরই ডাক!

তখনও সাবধান হয়ে ঘনাদাকে আবার চেপে ধরার সময় ছিল। কিন্তু তা আর পারলাম কই!

হঠাৎ বেঁফাস কথা শিশিরের মুখ দিয়ে বাঁকা সুরে বেরিয়ে গেল, ওরকম ভাষাও তা হলে আছে! কাদের?

আর ঘনাদাকে পায় কে! লোহার শিকল দিয়েও তখন আর তাঁকে ধরে রাখবার নয়।

শিশিরের ওই শেষ প্রশ্নের জবাবে গম্ভীর মুখে তিনি বললন, অর্সিন্যস অর্কা-র!

আর অর্সিন্যস অকা শুনে আমাদের হাঁ মুখ বোজবার আগেই ঘনাদা শুরু করে দিলেন,সে দিন ওই ভাষা শুধু আমাকেই প্রাণে বাঁচায়নি,দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচা খুনে এক ঠগবাজের হাত থেকে নিশো বছর আগেকার এক ডোবা জাহাজের অমূল্য সব সম্পদ রক্ষা করেছে।

সে খুনে ঠগবাজের নাম হল কাউন্ট কার্নেরা। তার আসল পরিচয় কিন্তু তখন খুব কম লোকই জানত। ইউরোপের নানা মিউজিয়মে কাউন্ট কার্নেরা নামে একজন বদান্য শিল্প-প্রেমিকের নাম কিছু কিছু মূল্যবান শিল্প নিদর্শনের সঙ্গে জড়িত দেখা যায়। কোথাও দামি একটি আধুনিক ভাস্কর্য, কোথাও অতি প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য ধাতুর পাত্র, কোথাও গ্রিক ভাষার প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, কোথাও বা ভারতীয় বিরল প্রাচীন বিগ্রহ দান করে নানা মিউজিয়মকে তিনি কৃতজ্ঞ করে রেখেছেন।

তখন কিছুদিনের জন্য আমেরিকার একেবারে পশ্চিম উপকূলে ব্রেমারটন শহরে গ্ৰেহাম বলে এক স্যামন মাছধরা সামুদ্রিক জেলেদের সর্দারের অতিথি হয়ে আছি। হঠাৎ সেইখানেই এক দিন একটি কেবল পৌছোল। সাংকেতিক লিপিতে পাঠানো অবশ্য। তারটা অনুবাদ করে যা জানলাম তা অপ্রত্যাশিত। তারটি এই—স্পেনের তিনশো বছর আগেকার ড়ুবো জাহাজের ঐশ্বর্য উদ্ধার করবার উৎসাহ যদি থাকে তা হলে এখুনি বাবুদা চলে এসো।–লোম্যান।

এ-কে পেয়ে সত্যি একটু অবাক হলাম।

সাংকেতিক লিপিতেই তার পাঠানো হয়েছে সত্যি, কিন্তু এরকম একটা খবর কোনও গোপন কোডে পাঠানোও তো নিরাপদ একেবারে নয়। এ ধরনের গুপ্ত খবর জানবার জন্য একটা আন্তর্জাতিক গুণ্ডার দল তো যে-কোনও শয়তানি করতে প্রস্তুত।

লোম্যান একদিকে ছিটগ্রস্ত হলেও এ রকম আহাম্মক নয় বলেই জানি! একেবারে জায়গার নাম জানিয়ে কেবল করা তার পক্ষে অস্বাভাবিক।

তবে জীবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলো ড়ুবো জাহাজের ঐশ্বর্য উদ্ধারের নেশায় এক রকম বৃথাই নষ্ট করে হয়তো তার মাথার সামান্য ছিট এখন সত্যিকার গোলমাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, কাণ্ডজ্ঞান হয়ে গেছে ঝাপসা।

তা না হলে এরকম একটা দাঁওয়ের হদিস সত্যিই পেলে লোম্যানের তো সশরীরে আমার কাছে ছুটে আসার কথা। বিশ্বাস করে এরকম খবর চিঠিতে বা তারে বেতারে সে কিছুতেই জানাবে না।

লোম্যানের এই সাংঘাতিক নেশার সঙ্গে তাল দিতে অনেক বার অনেক জায়গাতেই বুনো হাঁসের পেছনে ছোটায় তার সঙ্গী হয়েছি। বেশির ভাগই ভুয়ো খবর পেয়ে তোড়জোড় আর হয়রানিই সার হয়েছে! ডোবা জাহাজের সন্ধান মিলেছে ঠিকই, কিন্তু ক-টা পচা তক্তা আর মরচে ধরা নাট বল্ট বা শিকলি ছাড়া তা থেকে উদ্ধার করবার কিছু পাইনি।

লোম্যান আমাদের তুলনায় মুখে রুপোর চামচে নিয়েই জন্মেছিল। তার বাবা। টেকসাসের তেলের খনির যে সম্পত্তি তার জন্য রেখে দিয়ে গেছলেন, এমন আজগুবি নেশা না ধরলে, তা দিয়ে ইউরোপ আমেরিকাতে হেসে খেলে পায়ের ওপর পা দিয়ে সে কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এই ভোবা জাহাজের ঐশ্বর্য উদ্ধারের নেশায় লোম্যান তার প্রায় সব কিছুই ধীরে ধীরে খুইয়েছে। বড় আর ছোট অ্যান্টিলিজ-এর দ্বীপগুলির মাঝে ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে ভোবা জাহাজ থেকে ওঠার বদলে তার সমস্ত পয়সাকড়ি ড়ুবেছে বলা যায়।

ওই ক্যারিবিয়ানই আমেরিকা প্রথমে আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে অন্তত তিনশো বছর ধরে দুর্দান্ত সব বোম্বেটেদের লীলাভূমি ছিল। ইংরেজ পর্তুগিজ স্প্যানিশ ফ্রেঞ্চ ডাচ ইটালিয়ান পশ্চিম দুনিয়ার যত দুশমন সব দল বেঁধে তখন তাদের বোম্বেটে জাহাজ নিয়ে ওই অঞ্চল লুটে বেড়িয়েছে। তাদের সে লুটের জাহাজও কখনও কখনও বেকায়দায় পড়ে ড়ুবে গেছে রাজার ঐশ্বর্য বুকে নিয়ে।

সেসব ডোবা জাহাজের একটার সন্ধান পেয়ে তার ঐশ্বর্যের ভান্ডারের নাগাল পেলে মার্কিন ধনকুবেরদের ওপরও টেক্কা দেওয়া যায়।

অনেকের ওরকম ভাগ্য সত্যিই হয়েছে। কিন্তু লোম্যান অভাগাদের একজন। সম্পদের চেয়ে এরকম একটা অজানা ড়ুবো জাহাজ খুঁজে বার করার বাহাদুরি তার কাছে বড় বলেই ভাগ্য যেন তাকে নিয়ে নির্মম ঠাট্টাই করে এসেছে এ পর্যন্ত।

লোম্যানের এ নেশা ছাড়াবার চেষ্টা করেছিলাম প্রথম প্রথম তারপর এই নেশাই তার জীবন জেনে নিরস্ত হয়েছি।

বহুদিন তার অবশ্য কোনও খোঁজ খবর পাইনি।

হঠাৎ এ কে পেয়ে একটু ধোঁকা লাগলেও বাবুদা দ্বীপে রওনা না হয়ে পারলাম না।

তার আগে একদিন শুধু গেছলাম ভ্যানকুভারের সরকারি অ্যাকোয়ারিয়মের কিউরেটরের সঙ্গে দেখা করে একটা জিনিস ধার নিতে।

কোথায় ব্রেমারটন আর কোথায় বাবুদা দ্বীপ! স্টেটসের উত্তর-পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের কুল থেকে একেবারে মহাদেশ পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্বের অ্যাটলান্টিক সমুদ্রে ছোট অ্যান্টিলিজ দ্বীপপুঞ্জের একটি বালির দানার মতো দ্বীপ।

দ্বীপটা ব্রিটেনের অধীন। পঁচিশ মাইল দক্ষিণে আন্টিগুয়া দ্বীপটি থেকেই পরিচালিত হয়। নেহাত খুদে একটি ডাঙা। সর্বসাকুল্যে বাষট্টি বর্গমাইল। হাজার দুয়েক মাত্র মানুষের বাস। তারা বেশির ভাগ তুলোর চাষ আর ঘোড়া গোরু গাধা মিউল পালন করে। তাতেও দ্বীপটার কেমন নির্জন পোবন গোছের চেহারা একটু হয়েছে। পশ্চিমে প্রবালের বেড়ায় ঘেরা সুন্দর একটি নীল লেগুন। সে লেগুন-এ জেলেরা মাছ ধরে। আর তার তীরের উপবনে এখনও বুনো হরিণ একটা-আধটা দেখা যায়।

কিন্তু যা ভয় করেছিলাম তা-ই ঠিক। কেটায় কিছু গোলমাল আছে। কোথায় সে দ্বীপে লোম্যান?

এ দ্বীপটি প্রায় দুশো বছর ধরে কডরিংটন নামে এক পরিবারের দখলে ছিল। এখন অবশ্য এটা ব্রিটেনের খাস সরকারি সম্পত্তি। কডরিংটন পরিবারের এক বংশধর সেখানে নুন আর ফসফেট অফ লাইমের চালানি কারবার করেন। আগেকার পরিচয়ে তাঁরই অতিথি হয়েছিলাম।

তিনি তো লোম্যানের কেন্দ্র-এর কথা শুনে অবাক। বললেন, লোম্যান এখানে এলে আমি জানতে পারতাম না? আমাকে লুকিয়ে সে এখানে থাকবে কোথায়? আর কেন?

কেন, আর কোথায়, সেই রাত্রেই জানতে পারলাম। অতিথি হিসেবে বারবাড়ির একটি একানে বড় ঘর আমার থাকার জন্য বরাদ্দ ছিল। মাঝরাত্রে সবে একটু তন্দ্রা এসেছে এমন সময় দরজায় মৃদু একটা টোকার শব্দ শুনলাম! যেন খুব সন্তর্পণে কে আমায় ডাকছে। এ-দ্বীপে এমন গোপনে আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা কে করতে পারে ভেবে অবাক হয়ে পিস্তলটা বালিশের তলা থেকে বার করতে গিয়েও আর করলাম না। সেই ভুলেই অসন্দিগ্ধ ভাবে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই পেটের ওপর একটা পিস্তলের খোঁচা টের পেলাম। সেই সঙ্গে চাপা গলায় হুকুম, গোলমাল না করে যেমন আছ চলে এসো।

তা-ই গেলাম। হেঁটে লেগুন পর্যন্ত, তারপর ছোট একটি মোটর বোটে লেগুনের প্রবল দেয়ালের ফাঁক দিয়ে পেরিয়ে ভোলা সমুদ্রের একটি মাঝারি মাপের স্টিমারে। স্টিমারটি যে সমুদ্রের তলায় ড়ুবুরি নামাবার জন্যই তৈরি তা চাঁদনি আলোর রাত্রে তার গড়ন দেখেই বুঝলাম।

স্টিমারের সবাই আমাকে প্রায় সমাদর করেই খাসকামরায় নিয়ে গিয়ে বসালো। তারপর যিনি হাসিমুখে এসে ঢুকলেন তিনি আমার অচেনা নন।

আপনি! কাউন্ট কার্নেরা।আমি যেন আকাশ থেকে পড়ে বললাম, আপনি ডাকছেন জানলে আমি তো নিজে থেকে ছুটে আসতাম। আমায় এমন করে পিস্তল উঁচিয়ে ধরে আনবার দরকার ছিল কি?

তাই এনেছে বুঝি?কাউন্ট যেমন অবাক তেমনই মর্মাহত।

আমার সামনেই তারপর বেয়াদপ অনুচরদের এই মারেন তো সেই মারেন।

তাদের গালাগাল দিয়ে বিদেয় করে নিরিবিলি কামরায় গলা নামিয়ে বললেন, এ রহস্যের মানেটা কী বলুন তো, দাস! লোম্যানের এরকম কেবলের মানে কী?

আপনাকেও কেবল করেছে বুঝি? ন্যাকা সেজে জিজ্ঞাসা করলাম, কী বলেছে তাতে?

বলেছে, এই বার্বদা দ্বীপে আসতে! কাউন্ট কার্নেরা যেন বিমূঢ়ের মতো জানালেন, শুধু তাই নয়, যে ডোবা জাহাজের খোঁজ পেয়েছে, কোথায় তা আছে তার হদিস দেওয়া মানচিত্রও পাঠিয়ে দিয়েছে।

তাই নাকি!আমি একেবারে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠলাম, তা হলে আর দেরি কীসের? ড়ুবুরি জাহাজ তো নিয়েই এসেছেন, কাজ শুরু করে দিন।

হ্যাঁ, তা তো দেওয়াই যায়। তবে মুশকিল হয়েছে এই যে ম্যাপটাও সাংকেতিক ভাবে অকা। গুপ্ত হদিস না জানলে ও-ম্যাপ দেখে ডোবা জাহাজের অবস্থান সঠিক জানা যাবে না। বাবুদার চারিদিকের সমস্ত সমুদ্রের তলা তো আর খুঁজে বেড়াতে পারি না।

তা পারেন না বটে! আমি যেন কাউন্ট কার্নেরার মনের কথাটা এতক্ষণে বুঝে বললাম, তাই আমাকে ডেকে আনানো! কেমন? লোম্যানের গোপন কোড আর যদি কেউ জানে তো আমারই জানা সম্ভব! তা ঠিকই তো করেছেন! নিয়ে আসুন লোমানের ম্যাপ। ওর গুপ্ত সংকেত বার করে দিচ্ছি এখুনি।

কাউন্ট কার্নেরাকে এবার সত্যই একটু হতভম্ব হতে হল। আমার মুখে এ ধরনের কথা তিনি আশাই করতে পারেননি। একটু সন্দিগ্ধ ভাবে আমাকে লক্ষ করে বললেন, আমার ভয় হচ্ছিল, লোম্যান নিজে উপস্থিত না থাকলে হয়তো আপনি এ সাংকেতিক ম্যাপের অর্থ বলতে চাইবেন না।

কেন চাইব না! আমি যেন অবাক হলাম, লোম্যান থাকলে সে-ই তো ম্যাপের মানে বলে দিত। আমাকে দরকারই হত না। কিন্তু লোম্যান-ই বা গেল কোথায় বলুন তো! আপনাকে আমাকে এরকম কে করার পর নিজে গা-ঢাকা দিয়ে আছে কেন?

তাই তো বুঝতে পারছি না!কাউন্ট কার্নেরা যেন ভাবনায়-ঘুম-হচ্ছে-না এমন মুখ করবার চেষ্টা করে বললেন, তাঁর তো আমাদের আগেই এখানে পৌছোবার কথা।

আচ্ছা! যেন হঠাৎ একটা দুর্ভাবনা আমার মাথায় এল, লোম্যান কোনও দুশমনের হাতে পড়েনি তো?

কী রকম? প্রায় চমকে উঠলেও কাউন্ট সেটা গোপন করে যেন না বোঝার ভান করলেন।

এই ধরুন,আমিও ধৈর্য ধরে বোঝানো শুরু করলাম, লোম্যান যে সারা জীবনের চেষ্টার পর এবার পোর্টো পেড্রোর সত্যিই সন্ধান পেয়েছে, এ খবর যদি…

আমাকে কিন্তু কথা শেষ করতে দিলেন না কাউন্ট কার্নেরা। কথার মাঝখানেই বাধা দিয়ে বললেন, পোর্টো পেড্রো? লোম্যানের এ ম্যাপে যে জাহাজের হদিস আছে। তা পোর্টো পেড্রো বলে আপনার অনুমান?

চেষ্টা করা সত্ত্বেও কাউন্ট তাঁর উত্তেজনাটা তখন আর লুকোতে পারছেন না।

আমি একটু যেন উদাসীন ভাবে বললাম, অনুমান কেন হবে। আমি জানি পোর্টো পেড্রোর সন্ধানই ও পেয়েছে এতদিনে। ১৬৬৮ সালে তখনকার দিনের হিসেবেও দু কোটি টাকার সোনায় বোঝাই হয়ে জাহাজটি মধ্য আমেরিকা থেকে স্পেনে যাবার পথে ড়ুবে যায়। কোনও জলদস্যুর হাতে যে সে জাহাজ পড়েনি সেটা ঠিক। পড়লে তারা বড়াই করেই তা জানিয়ে যেত। জাহাজটা ড়ুবেই গেছে কোথাও। ইংরেজ ফরাসি ও সাধারণ বোম্বেটেদের এড়াবার জন্যই স্পেনের এইসব জাহাজ তখন সিধে পথ ছেড়ে আঁকাবাঁকা পথে স্পেনে পাড়ি দিত। বোম্বেটেদের হাতে না পড়লেও পোর্টো পেড্রো কোথায় যে ড়ুবে যায়, এতকাল ধরে দেশবিদেশের বহু লোক বৃথাই সন্ধান করে ফিরেছে। সন্ধানটা দক্ষিণ বাহামার দ্বীপগুলিরই ভেতর বেশির ভাগ চালানো হয়েছে, কারণ নব আবিষ্কৃত মধ্য আমেরিকা থেকে লুট করা সোনাদানা নিয়ে স্পেনের জাহাজ এই সব পথেই লুকিয়ে দেশে ফেরবার চেষ্টা করত। মাত্র কয়েক বছর হল আমার পরামর্শে দক্ষিণ বাহামা ছেড়ে ঘোট অ্যান্টিলিজের লিওয়ার্ড দ্বীপগুলিতে লোম্যান সন্ধান চালাতে শুরু করে। সে যে পোটো পেড্রোরই সন্ধান পেয়েছে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। আর তার সে আবিষ্কারের খবর ঘুণাক্ষরে কোনওরকমে জেনে, জুলুম জবরদস্তিতেও তার হদিস আদায় করতে, কোনও দুশমনই সম্ভবত তাঁকে ধরে রেখেছে।

কাউন্ট কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে বাধা দিয়ে আবার বললাম, আপনি কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছেন না জানি, কাউন্ট। কিন্তু সবাইকে নিজের মতো ভাববেন না। আপনার মতো মহৎ উদার ক-জন আছে যে, কোনও স্বার্থ ছাড়াই, শুধু ললাম্যানের একটা কে পেয়ে তাকে সাহায্য করবার জন্য নিজের বিশেষভাবে তৈরি ড়ুবুরি জাহাজটা নিয়েই ছুটে আসবেন। এইরকম ডোবা জাহাজের সন্ধানী ভাল লোক যেমন আছে তেমনই শয়তানও আছে অনেক। তাদেরই কেউ বন্ধু সেজে সাহায্য করার ছলে লোম্যানকে বন্দী করে রেখেছে বলে আমার বিশ্বাস।

আমার লম্বা বক্তৃতায় কাউন্ট যে ক্রমশই অস্থির হয়ে উঠছেন তা বুঝেই ইচ্ছে করে। বক্তৃতাটা বাড়িয়ে গেছি। এবার একটু থামতেই কাউন্ট অধৈর্যের স্বরে বলে উঠলেন, আপনার আমার অনুমান যদি ঠিক হয় তা হলে তো আর দেরি করা চলে না। জাহাজটার খোঁজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হয়। লোম্যানের জন্য অপেক্ষা না করে? আমি যেন মৃদু একটু আপত্তি তুললাম।

তার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে তো সব কিছু খোয়াতে হতে পারে! কাউন্ট আমায় বোঝাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, যে-দুশমনের কথা ভাবছেন, সে তো জুলুম করে হদিস আদায় করে ইতিমধ্যে নিজের নামেই খোদ ব্রিটিশ সরকারের কাছে এ অঞ্চলে ডোবা সম্পদ খোঁজার লাইসেন্স আনিয়ে নিতে পারে। তখন লোম্যান তো পুরোপুরি ফাঁকি পড়বে।

ঠিক বলেছেন, আমি যেন তাঁর কথায় একেবারে জল বুঝে বললাম, আমাদের নিজেদেরও লাইসেন্স যখন নেই, তখন, এই বেলা সময় থাকতে ডোবা জাহাজ থেকে যা পারি সরিয়ে নিই। কী বলেন?

চোখে একটু সন্দেহের ছায়া থাকলেও কাউন্ট আমার কথায় যেন হাতে চাঁদ পেয়ে পাশে রাখা একটা ফোলিও জিপ টেনে খুলে ফেললেন।

তার ভেতর থেকেই লোম্যানের গোপন ম্যাপটা বার হল।

ম্যাপটা হাতে নিয়ে একটু চোখ বুলিয়ে বললাম, আপনার কোনও ভাবনা নেই। আধ ঘণ্টার মধ্যেই এ-ম্যাপের রহস্য ভেদ করে দিচ্ছি।

তা-ই করলাম। তারপর সেইদিন বিকালেই কাউন্ট কার্নেরার বিশেষ স্টিমার বাবুদার উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্রের এক জায়গায় আমার নির্দেশে গিয়ে থামল।

কাউন্ট তো তখুনি ড়ুবুরি নামিয়ে ডোবা পোর্টো পেড্রোর সোনার তাল লুটতে উদগ্রীব। তাঁর উৎসাহে একটু বাধা দিয়ে বোঝালাম যে ম্যাপের হদিস মতে পোর্টো পেড্রোর ডোবা কঙ্কাল সত্যিই ওখানে আছে কি না আগে একবার নিজেদের দেখে আসা দরকার। তা না হলে সত্যিই ম্যাপের গুপ্ত সংকেত ধরতে পেরেছি কি না বুঝব কী করে! নিজেই তারপর চোখে ঠুলি-চশমা, মুখে অ্যাকোয়া লাংস মানে জলের নকল ফুসফুস আর হাতে পায়ে ফ্লিপার লাগিয়ে সমুদ্রে নামলাম শুধু একটা ছোট এয়ার-টাইট ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে।

ব্যাগটা কী জন্য? জিজ্ঞেস করেছিলেন কাউন্ট।

হেসে বলেছিলাম, সোনার নমুনা আনতে। সেনমুনা পরীক্ষা করে আপনাকে ফেরত দেব, ভাবনা নেই।

কাউন্ট আর আপত্তি করেননি।

সমুদ্রের জলে নেমে ড়ুবসাঁতারে পোর্টো পেড্রোর পচা, গলা সামুদ্রিক আগাছায় ঢাকা তিনশো বছরের পুরোনো কাঠামোটা খুঁজে বার করতে দেরি হয়নি। দেরি হয়েছে আর দুটো কাজে। তার মধ্যে একটা হল জলের নীচেই ড়ুবুরি জাহাজের পেছন দিকে গিয়ে তলায় কয়েকটি টোকা দেওয়া। সে টোকা দেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ কোনও সাড়া না পেয়ে সত্যিই একটু ভয় পেয়েছিলাম। আমার অনুমান কি তাহলে সবই ভুল?

কিন্তু ভুল যে নয় তার প্রমাণ পেয়েছিলাম ভেতর থেকে টোকার জবাব আসায়।

সাধারণ জাহাজ হলে নাগাল পেতাম না। কিন্তু ড়ুবুরি নামাবার কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বলে এ-জাহাজের পেছন দিকে একটা পাল্লা দেওয়া জানালা গোছের আছে! সেইখান দিয়েই ড়ুবুরিরা নামে ওঠে—আর সমুদ্রের তলায় খুঁজে যা পায় সেইসব জিনিস তোলে।

সেই কাটা জানালার পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে খুব বেগ পেতে হল না। ড়ুবুরির সাজ নিয়ে তারপর প্রায় ডাঙায় ওঠা মাছের মতোই শুয়ে শুয়ে কেতরে কেতরে একটা বিশেষ কেবিনে গিয়ে পৌছলাম।

কাউন্ট কার্নেরার এ-জাহাজে মাঝিমাল্লা আর ড়ুবুরির সংখ্যা খুব বেশি নয়। পাহারা দেবার কোনও দরকার নেই জেনে সবাই তখন ওপরের ডেকে আমার ভোবা জাহাজের খবর নিয়ে ফিরে ভেসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছে।

জাহাজের ধারে শেষ পর্যন্ত আবার ভেসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু ধৈর্য হারিয়ে কাউন্ট কার্নেরা আমার খোঁজে অন্য ড়ুবুরি নামাবার ব্যবস্থা প্রায় যখন করতে যাচ্ছেন তার আগে নয়।

আমায় ভেসে উঠতে দেখেই জাহাজ থেকে কাছি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেকাছি ধরে ওঠবার শক্তিটুকু যেন নেই এমনিভাবেই কোনওমতে জাহাজের ডেক পর্যন্ত উঠে চিৎপাত হয়ে পড়লাম।

মুখ দিয়ে তখন আর কথা বার হচ্ছে না। কাউন্ট কার্নেরার কাছে তখন আমি সোনার তালের মতোই দামি। তাঁর হুকুমে লোকজন আমায় ধরাধরি করে কাউন্টের খাস কামরাতেই নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলে। গরম গরম খাবার-দাবার এল আমায় চাঙ্গা করতে।

চাঙ্গা হলাম ঠিক সময় বুঝে প্রায় শেষ রাত্রে। ভোর হতে আর তখন ঘণ্টা দুয়েক বাকি।

কাউন্ট আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছেন।

তাঁকে আশ্বস্ত করে জানালাম, পোর্টো পেড্রোর সন্ধান ঠিকই পাওয়া গেছে। আমার ফিরতে দেরি হওয়ার যে-অজুহাত দিলাম, চোখ একটু কপালে উঠলেও, কাউন্টকে তা হজম করতে হল। বললাম তিনশো বছরের পুরোনো জাহাজের ভাঙা কঙ্কাল শুধু যত অক্টোপাসের বাসা। তারা যেন যখের ধনের মতো ডোবা জাহাজের সোনা আগলে আছে। সেই একটা অক্টোপাসের নাগপাশ ছাড়িয়ে আসতে গিয়েই এই দশা হয়েছে।

কাউন্ট কার্নেরা নিজে কখনও সমুদ্রের তলায় নামেননি জানতাম। সন্দেহ মনে হোক বা না হোক মুখ ফুটে কিছু তাই বলতে পারলেন না।

তা ছাড়া আসল কার্যোদ্ধারের জন্যই তিনি তখন ব্যাকুল। আর ঘণ্টা দুয়েক বাদে ভোর হলেই তাঁর নিজের মাইনে করা ড়ুবুরি নামাবার তোড়জোর করতে তখনই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

ভোর হতে শরীরে একটু যেন জুত পেয়ে সকলের সঙ্গে আমিও ডেকে গিয়ে দাঁড়ালাম। ড়ুবুরিরা তৈরি হয়ে গেছে নামবার জন্য। কাউন্ট হুকুম দিলেই হয়।

কাউন্ট রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে সেই হুকুমই দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় হাত তুলে তাকে নিষেধ করে চেঁচিয়ে উঠলাম, দাঁড়ান, কাউন্ট, সমুদ্রের জলে কাউকে নামতে বলবেন না।

কেন? কাউন্ট কার্নেরার আসল চেহারা বেরিয়ে এল এবার। বাঁকানো নাকে মুখখানা যেন হিংস্র কণ্ডর শকুনের মতো।

রেলিঙের ধারে তাঁর কাছেই গিয়ে দাঁড়িয়ে এবার বললাম, আসল কথাই আপনাকে বলতে ভুলে গেছি। পোর্টো পেড্রোর সোনা অন্য কারুর ছোঁবার অধিকার নেই।

কেন? ওই কটা অক্টোপাসের পাহারা! কাউন্ড অবজ্ঞায় নাকটা আরেকটু বাঁকালেন, অক্টোপাস তাড়াবার ওষুধ আমাদের আছে।

সামান্য অক্টোপাসের কথা কে ভাবছে? আমিও তাচ্ছিল্য ভরে বললাম, পৃথিবীর সবচেয়ে ভীষণ পাহারাদারেরা ওই জাহাজ চোখে চোখে রেখেছে। কেউ যেন এখানে সমুদ্রে না নামে!

তার মানে? কাউন্ট জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে চাইলেন, এটা কী ধরনের রসিকতা?

রসিকতা কেন করব, কাউন্ট? সবিনয়ে বললাম, সত্যিই পাহারাদারদের যে ডেকেছি!

তুই ডেকেছিস! কাউন্টের গলা দিয়ে আগুনের হলকা বার হল, কোথায় সে পাহারাদার?

খুব বেশি দূরে নয়, কাউন্ট। তারা এবার এসে পড়ল বলে!

বটে!কাউন্ট কার্নেরা এবার হিংস্র বিদ্রুপের হাসি হাসলেন, তোর ডাকেই তারা আসছে তাহলে! পাহারাদার তারা কী রকম শুনি?

আজ্ঞে চেহারাগুলো মোটেই সুবিধের নয়! যেন দুঃখের সঙ্গে বললাম, ওজন প্রায় একশো ত্রিশ-চল্লিশ মণ আর লম্বায় বিশ-পঁচিশ ফুট তো বটেই।

হুঁ, তাহলে মানুষ-টানুষ নয়,কাউন্ট যেন এখন আমায় নিয়ে খেলিয়ে মজা করতে চাইলেন।

আমি কিন্তু সরল মুখে বললাম, না, মানুষ নয়, তবে পৃথিবীতে মানুষের পরই এমন বুদ্ধিমান প্রাণী নাকি আর নেই।

এমন দুর্দান্ত প্রাণী তোর ডাকে আসছে? কাউন্ট কার্নেরা হায়নার মতো হেসে উঠলেন, এত তোর পোষ মানা?

পোষ মানা কেন হবে, কাউন্ট? অর্সিন্যস অকা পোষ মানার জীব নয়। তবে ওদের ভাষাটা জানি। তাই ডাক দিতেই আসছে।

আসছে! কাউন্ট যেন আমায় বাঁদর নাচ নাচাবার জন্য বললেন, এখন তাহলে কী করতে হবে?

বেশি কিছু নয়, যেন কুষ্ঠিতভাবে নিবেদন করলাম, ড়ুবুরিদের নামতে মানা করে এ জাহাজ অ্যান্টিগুয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর তার আগে আপনার জলিবোটটা সমুদ্রে ভাসিয়ে তাতে আমার বন্ধু লোম্যানকে আপনার পকেটের ম্যাপটা সমেত তুলে দিতে হবে। আপনি আর আমিও অবশ্য ওই জলিবোটেই থাকব। বার্বুদার লেগুন তো এখান থেকে কম দূর নয়!

কাউন্ট কার্নেরা বোধহয় হতভম্ব হয়েই আমার কথায় বাধা দিতে ভুলে গেছলেন। এবার একেবারে যেন ফেটে পড়লেন রাগে।

কিন্তু হুংকারটা তিনি ছাড়তে না ছাড়তেই জাহাজের মাস্তুল থেকে হাঁক এল।

খুনে তিমি! এক পাল খুনে তিমি আসছে চতুর্দিক থেকে!

কাউন্ট নিজের অজান্তেই মুখটা দূর সমুদ্রের দিকে তুলেছিলেন। সেখানে সাদা চোখেই তখন খুনে তিমির পাল দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের হিংস্রতম হাঙরও এই খুনে তিমির পালের কাছে বাঘের তুলনায় বেড়ালের সমান।

যেমন হতভম্ব তেমনই রাগে আগুন হয়ে আমার দিকে মুখ ফেরাবার আগেই ঝটকায় কাউন্ট কার্নেরাকে নিয়ে রেলিং টপকে সমুদ্রের জলে গিয়ে পড়লাম।

কাউন্টের অবস্থা তখন দেখবার মত। মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে হঠাৎ এভাবে জলে পড়ার সঙ্গে অদূরে খুনে তিমির পালের কথা ভেবে। পাগলের মতো কাউন্ট সাঁতরে আবার জাহাজ ধরবার চেষ্টা করতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে ধরে টেনে রেখে বললাম, উঁহুঃ, ও-জাহাজে আর আমরা উঠব না, কাউন্ট। খুনে তিমি অর্থাৎ অর্সিন্যস অকার পাল এসে পড়ল বলে। এখন ওরা এইখানেই ঘুরবে ফিরবে অন্তত দিন সাতেক। সুতরাং লাখ টাকা দিলেও কোনও ড়ুবুরি জলে এখন নামবে না। আপনাকে তাই আগে যা বলেছি তাই করতে হবে। লোম্যানের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এই জাহাজ দিয়ে সাহায্য করার নাম করে সঙ্গে এনে বন্দী করে রেখেছেন নীচের কেবিনে। তার ম্যাপের মানে মরে গেলেও সে জানাবে না। তাই তার বন্ধু ও জুড়িদার আমাকে কেবল করে ডেকে এনেছেন। কিন্তু সব শয়তানি আপনার ভেস্তে গেল কাউন্ট, শুধু ওই খুনে তিমির জন্য। ভাগ্যিস ভ্যাঙ্কুভারের উত্তরে স্যামন-শিকারিদের জালে ধরা-পড়া একটা খুনে তিমির বিচিত্র সব ডাকের রেকর্ডটা কিছুদিন শুনে শুনে রপ্ত করেছিলাম। কাল সন্ধ্যার পর সমুদ্রে তলায় নেবে সেই হুলোর চিৎকারের মতো সাহায্যের ডাকই দূর-দূরান্তরে পাঠিয়ে দিই। পাঁচ মাইল দূর পর্যন্ত ওরা এ-ডাক শুনতে পায়। তাই আসছে। এখন ওই খুনে তিমির পেটেই যাবেন, না যা বলছি তা-ই শুনে জলিবোটে আমার আর লোম্যানের সঙ্গী হয়ে, লোম্যানের নিজের ড়ুবুরি জাহাজ ফ্লোরিডা থেকে না এসে পৌছোনো পর্যন্ত বাবুদা দ্বীপে কডরিংটনের অতিথি হবেন, ভাবুন।

কাউন্ট আর একবার আমার হাত ছাড়াবার বিফল চেষ্টা করে জাহাজের ওপরে সাহায্যের আশায় চাইল।

হেসে বললাম, ওখান থেকে কোনও সাহায্যের আশা নেই, কাউন্ট। একবার চোখে খুনে তিমির ঝাঁক দেখে কেউ ওরা আর সমুদ্রে নামবে না। আর যেভাবে আমি আপনাকে জড়িয়ে আছি তাতে গুলি চালানোও ওদের পক্ষে নিরাপদ নয়। সুতরাং এখনও যদি প্রাণে বাঁচতে চান, জলিবোট নামিয়ে তাতে লোম্যানকে তুলে দিয়ে জাহাজ নিয়ে সোজা অ্যান্টিগুয়া দ্বীপে গিয়ে ওদের অপেক্ষা করতে বলুন।

তা-ই শেষ পর্যন্ত করেছিল কাউন্ট কার্নেরা। পোর্টো পেড্রোর সোনাদানা আর সে শয়তানের হাতে পড়েনি।

হঠাৎ ঘনাদা কেদারা ছেড়ে উঠে পড়ে বাইরের দরজার দিকে পা বাড়ালেন। দরজার কাছে ফিরে দাঁড়িয়ে শিশিরের আনা নতুন অতিথির দিকে চেয়ে শুধু একবার বলে গেলেন, স্লামাৎ তিংগাল।

আমরা তখনও হতভম্ব! শিশিরের ডেকে আনা অতিথি ঘনাদার ছেড়ে যাওয়া আরাম কেদারায় যেন ভেঙে পড়ে বললেন, ছিঃ ছিঃ! আগে আমায় বলতে হয়!

কী বলতে হয়? আমরা একটু অপ্রসন্ন, ঘনাদা সত্যিকার ম্যালে ভাষায় কুল না পেয়ে অমন হুলোর ডাকের ছুতোয় পিছলে পালাবেন, তা কি জানি!

আরে না, না। ভদ্রলোক প্রতিবাদ করলেন জোরের সঙ্গে, জানেন না কী! উনি ম্যালে ভাষার জবাব চিনে ভাষায় দিয়ে আমায় লজ্জা দিয়ে গেলেন যে!

আমরা হাঁ হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। তাহলে ও শেয়াল কুকুরের ঝগড়া যা শুনিয়েছিল তা ম্যালে আর চিনে ভাষার লড়াই?

আপনার ম্যালের জবাব ঘনাদা দিয়েছেন চীনে ভাষায়? জিজ্ঞেসই করলাম হতভম্ব হয়ে।

তাই তো দিলেন, করুণ মুখে স্বীকার করলেন তিনপুরুষ মালয়ে কাটানো শিশিরের মামাতো ভাইয়ের বন্ধু অভয় দাস।

ভাষার লড়াই অভয় দাস ব্যাখ্যাও করলেন! তারপর বললেন, আমি প্রথম বলেছিলাম, ক্লা মাহা মাল। সি আপানামা ইয়া কামু।তার মানে। গুড ইভনিং। আপনার নাম কী? তারপর ঘনাদা কাবু হয়েছেন মনে করে আবার বলেছিলাম– জাং-আন তা কুট সায়া বুকাহমু সূহ! ওর মানে হল, ভয় পাবেন না। আমি শত্রু নই। ভেবেছিলাম আপনাদের ঘনাদা বুঝি ওতেই একেবারে কাত। কাত তো নয়ই, আমার হাত-বোমার জবাবে এমন একটি আই-সি-বি-এম ছাড়লেন যে, আমিই আর হালে পানি পাই না। তিনি প্রথমে বললেন, নী-ঈ শের শে।ম্যালে নয়, ভাষাটা চোস্ত চিনে, আর তার মানে হল, তুমি কে? চিনে ভাষা আমি সামান্যই জানি। তাঁর প্রথম প্রশ্নের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতে ঘনাদা আবার বললেন, দ্য-অং ঈ! দ্য-অং। ওয়-আ ঈ, আঃ উ ইয়াং হোত-আ।ওর বাংলা মানে, দাঁড়াও! দাঁড়াও! আগে আমার একটা দেশলাই দরকার।

ঘনাদা যখন শিশিরের হাত থেকে দেশলাই নিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন তখন লেজ গুটিয়ে আমি পালাতে পারলে বাঁচি। তবু আপনাদের উসকানিতে নিরুপায় হয়ে ঘনাদার কাছে হার স্বীকার করলাম। বললাম, সায়া টিডা মং আর টি! মীন টা বিচারা প্লান্ প্লান্। অর্থাৎ, আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। দয়া করে একটু আস্তে আস্তে বলুন। ঘনাদা তখন বললেন, চিং নী ইয়ুং দিয়ান তু ইয়াউ তু হোয়ে ঈ দা। ওয়া হোয়ে শোওয়া ইং গোয় হোয়া! ফা গোয়া হোয়া মিয়ান দিয়ান হোয়া রের ব্যন হোয়া… ওর মানে হল, বেশ! মাথা হেলিয়ে কিংবা নেড়ে হাঁ কি না জবাব দাও। আমি এসব ভাষা বলতে পারি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, বমি, জাপানি…ঘনাদার তালিকা ওই জাপানি পর্যন্ত পৌঁছবার পর ঠিক মোক্ষম সময়ে ওই হুলোর ডাকই আমায় বাঁচিয়েছে!

অভয় দাস থামলেন। আমাদের সকলের চোখ তখন ছানাবড়া। অভয় দাস যা বললেন ম্যালে চিনে তরজার তা-ই কি সঠিক ব্যাখ্যা? না ওই আরামকেদারার গুণেই ঘনাদার ওপরেও টেক্কা দেওয়া হল?

ম্যালে আর চিনে কারুর জানা থাকলে বিচার করুন।

আমরা হাঁ করে এবার ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। বলেন কী ইনি! ঘনাদার উপযুক্ত জুড়িদার জুটল নাকি এতদিনে!

ভদ্রলোক আমাদের দৃষ্টি গ্রাহ্য না করে ক্লান্তভাবে বললেন, একটা সিগারেট খাওয়াতে পারেন?

না। শিশিরের স্পষ্ট জবাব শোনা গেল। টিন এখন তেতলায়।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *