তেল

তেল

ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর নাম আর ক-জন শুনেছে!

আমরাও যদি না শুনতাম! তা হলে আমাদের কপালে ওই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী অত বড় দুর্ভাগ্যের দূত তো আর হতে পারত না।

সকাল থেকেই আমরা প্রমাদ গনছি!

এবারে যা গিঠ পড়েছে তা ছাড়ানো শিবেরও অসাধ্য। হয়ে গেল!

আমাদের বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের দফারফা হয়ে গেল। সব খেল এবার খতম।

এরপর কী আর থাকবে!

ইতিহাসের পাতায় একটা উল্লেখ—এককালে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কলিকাতা শহরের এক প্রান্তে তদানীন্তন করপোরেশনের কর্তব্যনিষ্ঠার নিদর্শন স্বরূপ, আঁকাবাঁকা একটি নোংরা গলির একটি জীর্ণপ্রায় বাড়ি কিছুকাল শ্রীঘনশ্যাম দাস ওরফে ঘনাদার বাসগৃহরূপে ধন্য হয়েছিল।

এরপর তিক্ত মন্তব্যটুকুও নিশ্চয় থাকবে—অর্বাচীন অপদার্থ কয়েকটি কাণ্ডজ্ঞানহীন যুবকের অবিমৃষ্যকারিতাতেই শ্রীঘনশ্যাম দাস এ বাসস্থান ও তার সঙ্গে জড়িত দুর্জন সংসর্গ বর্জন করতে বাধ্য হন।

শুধু ইতিহাসে কেন?

রাস্তার ধারে বাহাত্তর নম্বরে ঢোকবার দরজাতেই একটা শিলালিপি মানে প্রস্তরফলকও কি থাকবে না?

তাতে কী লেখা থাকবে? ও কী হরফে?

তর্কটা তুমুল হয়ে উঠেছে প্রথমে শুধু হরফ নিয়েই।

ভেতরের রাগ দুঃখ হতাশার জন্য উত্তেজিত আঘাত প্রতিঘাতগুলোও একটু বেশি কড়া হয়ে গেছে।

প্রথমত শিলালিপিতে কোন হরফের লেখা থাকবে সে বিষয়ে কিছুতেই একমত হওয়া যায়নি।

শিশির বলেছে, হরফ আবার কী হবে? সোজা বাংলা।

কখনও না, প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছি আমি, বাংলা কখনও শিলালিপি হয়! মন্দির-টন্দিরের উঠোনে চাতালে মার্বেল পাথরের নাম লেখা যেমন টালি বসানো থাকে এ কি তেমনই খেলো ব্যাপার নাকি?

তা হলে কী হরফে লেখা থাকবে শুনি! শিশিরের বেশ বাঁকা জিজ্ঞাসা, মিশরীয় না সুমেরীয়?

মিশরীয় সুমেরীয় হবে কেন? আমি ভাবালু গলায় দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছি, থাকবে দেবনাগরীতে, রাষ্ট্রভাষার যা হরফ, তাইতে।

রাষ্ট্রভাষার হরফে থাকবে! শিবু তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে, তা হলে বিকল্পে ইংরেজির রোমান হরফেই বা থাকবে না কেন! অন্য বারোটা ভাষার হরফের দাবিও মানতে হবে।

তার চেয়ে সব গোল তো অনায়াসেই চুকিয়ে দেওয়া যায়। আমি এই গুরুতর পরিস্থিতিতে ঝগড়াঝাটি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টাই করেছি, হরফ হবে অশোকের অনুশাসনের, অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপিতে।

ব্রাহ্মীলিপিতে! শিবু মানতে চায়নি এ-সহজ মীমাংসা, ও-লিপি কে পড়বে শুনি?

তার জন্যই তো বললাম, শিলালিপির অক্ষর হবে বাংলা, শিশির আবার তার দাবি জোরদার করবার সুবিধে পেয়েছে, সবাই গড়গড় করে যাতে পড়তে পারে।

কিন্তু পড়বেটা কী? আমার অমন ভাল পরামর্শটা নাকচ করায় একটু ক্ষুণ্ণ না হয়ে পারিনি, শিলালিপিতে কী লেখা থাকবে তা জানো?।

তা আর জানি না! শিশির মুরুব্বিয়ানার ভঙ্গিতে বলেছে, লেখা থাকবে, শ্রীঘনশ্যাম দাস, তার নীচে ব্র্যাকেটে, ঘনাদা। তার তলায় দু-লাইন থাকবে পর পর। প্রথম লাইন থাকবে, এখানে ছিলেন, নীচের লাইনে থাকবে, এখন নেই।

শুধু এই? শিবুর গলায় দুঃখ আর রাগ একসঙ্গে উথলে উঠেছে, কেন তিনি নেই, তার কিছু থাকবে না! আর অত সংক্ষেপেই বা সারা হবে কার খাতির রাখতে?

শিবু একটু থেমে, মুখ ভেংচেই আবার বলেছে, এখানে ছিলেন। এখন নেই। শুধু ওইটুকু কেন? বেশ সবিস্তারে সমস্ত ভাবীকালে পৃথিবীর উনিশশো সাতষট্টির হতাশ বেদনা পৌঁছে দিতে হবে না?

কী করে! প্রশ্নটা শিশিরের অবশ্য। সুরটা একটু বাঁকা।

শিবু গ্রাহ্য না করে বলেছে, এই এমনই ভাবে : প্রথমেই থাকবে একটা সম্বোধন—হে ভাবীকালের সুখী নাগরিক! এখানে একটু দাঁড়াও।

তার বদলে যা থেকে টুকলিফাই করছিস সেই আসল কবিতাটাই দিতে আপত্তি কীসের? একটু স্পষ্ট কথা না শুনিয়ে পারিনি, লিখলেই তো হয়, দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি তব বঙ্গে।

ধরা পড়েও শিবু ভড়কায়নি, বলেছে, ওকবিতার লাইনে যে আর এখন কুলোয় । শুধু বঙ্গ তো নয়, এখন যে সম্বোধনটা বিশ্বে ছড়ানো। তাই লেখা থাকবে, হে ভাবীকালের সুখী নাগরিক! এখানে একটু দাঁড়াও। দাঁড়ালে বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস নিশ্চয় শুনতে পাবে, একটু কান পাতলে পৃথিবীর বুকেরই যেন হতাশ ধুকধুকুনি।

আর সেই সঙ্গে ক-টা আহাম্মকের গা-জ্বালানো বকবকানি!

অ্যাঁ!

আমাদের সকলের চমকিত দৃষ্টি এক জায়গাতেই গিয়ে স্থির হল। শ্রীমান গৌর সেখানে গোমড়া মুখ করে বসে আছে। এই খেঁকিয়ে ওঠা মন্তব্য তো তারই। কিন্তু তা-ও কি সম্ভব?

বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের সঙ্গে যৎসামান্য পরিচয় যাদের আছে, তারাও অবাক হয়েছে নিশ্চয়। এতক্ষণের আলোচনায় গৌরের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি দেখে গৌর এ সমাবেশে অনুপস্থিত বলে ধরে নেওয়াই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। আসরে থেকেও গৌর একেবারে নীরব, এমন ব্যাপার বিশ্বাস করা একটু শক্ত।

কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ব্যাপারই ঘটেছে। আর তার কারণ আছে সবিশেষে।

কারণটা সত্যিই গুরুতর।

আর গুরুতর বলেই গৌর একেবারে মরমে মরে গিয়ে আমাদের এত হুঙ্কার হাহাকারে মধ্যে এতক্ষণে একবার টু শব্দটি করেনি।

শেষটা অসহ্য হওয়াতেই বোধ হয় একটিবার শুধু চিড়বিড়িয়ে উঠেছে।

ওই একবার খেকিয়ে ওঠার পরেই সে কিন্তু আবার ঠাণ্ডা।

তা ঠাণ্ডা হবে না তো গরম হবে কোন মুখে!

সব নষ্টের মূল যে ওই গৌর! ওর বেয়াড়া বেয়াদপির জন্যই তো আজ বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের এমন বারোটা বাজতে চলেছে।

ওর পক্ষেও একটু বলবার কথা আছে বটে। ওর মেজাজ বিগড়ে যাবার কারণ একেবারে ছিল না তা নয়। দিনের পর দিন সত্যিই কম কষ্ট তো গৌর করেনি, ওই একটি সাত রাজার ধন মহামূল্য জিনিস জোগাড় করতে।

কার কাছে যেন প্রথমে সেই অসাধারণ কবিরাজের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেছিল যিনি ধন্বন্তরী হয়েও এ-যুগে এই কলকাতা শহরে একেবারে অজ্ঞাতবাস করছেন।

গোটা একটা বিকেল হাঁটাহাঁটি করে ট্যাংরা না তিলজলার কোথায় একটা নাম-ভুলে যাওয়া গলির মধ্যে সেই কবিরাজকে খুঁজে বার করেছে। তারপর ট্যাঁক থেকে থেকে বেশ কিছু খসিয়ে কবিরাজকে দিয়ে শুধু তারই জন্য বিশেষ করে সেই অব্যর্থ মহৌষধটি তৈরি করিয়েছে, যার নাম ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী।

সবে সেদিন সকালবেলা সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী আধারটি এনে স্নানের ঘরে রেখে সে বাইরে শুকোতে দেওয়া পরিষ্কার কাচা ভোয়ালেটা আনতে গেছল।

এরই মধ্যে স্নানের ঘরে ঢুকে কে দরজা বন্ধ করেছে। কে ঢুকেছে, কে? আর কে, স্বয়ং ঘনাদা।

এত সাত সকালে তাঁর স্নানের কী এমন গরজ পড়ল? নীচে আমাদের পাঁচকঠাকুর রামভুজের কাছে রান্না প্রায় শেষ হবার খবর না নিয়ে তিনি তো স্নান করতে নামেন না।

তা ঠিক, তবে আজ তাঁর জরুরি দরকার পড়েছে।

আচ্ছা তা-ই মানা গেল। কিন্তু অন্যদিন যেখানে পাঁচ মিনিটে তাঁর স্নান সারা হয়ে যায়, সেখানে আজ প্রায় পুরো একটি ঘন্টা লাগাবার মানে কী?

তাও ঘণ্টা পার করছেন করুন, কিন্তু দরজা খুলে বার হবার সঙ্গে সঙ্গে একী সৌরভে দশদিক আমোদিত!

এ তো সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীই মনে হচ্ছে।

গৌর ব্যস্ত হয়ে স্নানের ঘরে ঢুকেছে।

তারপর বনমালি নস্কর লেন থেকে বোধহয় উত্তরে বরানগর আর দক্ষিণে বড়িশা পর্যন্ত তার আর্তনাদ শোনা গেছে।

কী ব্যাপার, কী! এক ঘনাদা বাদে আমরা যে যেখানে ছিলাম শশব্যস্ত হয়ে ছুটে গেছি। এই বুকফাটা চিৎকার গৌর ছাড়ল কোন দারুণ দুঃখে।

আর কোন দুঃখে! সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর শোকেই এ হাহাকার।

কী হল সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর?

ঘনাদা পরমানন্দে তার সদ্ব্যবহার করেছেন। তা করেছেন বেশ করেছেন। কিন্তু স্নানের ঘরের মেঝেতে ব্যবহারের পর অবশিষ্টটুকু এমনই করে ছড়িয়ে নষ্ট করতে হয়?

সব কিছুতেই তো পরস্মৈপদী, তবু পরের জিনিস ব্যবহার করতে একটু সাবধান হতে নেই? আর জিনিস বলে জিনিস। ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী।

গৌর আর এক মুহূর্ত স্নানের ঘরে দাঁড়ায়নি।

সে যে আর আমাদের গৌর নয়, বিগড়ি হাঁসে যে আমাদের অরুচি ধরিয়ে গেছে সেই দ্বিতীয় বাপি দত্ত হয়ে সিঁড়ি কাঁপিয়ে তেতলায় উঠেছে। আমরাও তার পিছু পিছু তাকে অনুনয় বিনয় করেছি রোখবার চেষ্টায়।

শোন, গৌর শোন!

অত অস্থির হোসনি! গৌরকে প্রায় শারীরিক বলে থামাতে হয়েছে।

অস্থির হব না? গৌর দোতলার বারান্দার কাছে ফিরে দাঁড়িয়ে খিঁচিয়ে উঠেছে, কত বড় অন্যায় উনি করেছেন তা বুঝেছ?

আহা তা তো বুঝছিই! আমরা প্রায় একবাক্যে বলেছি, কিন্তু তোর সেই ধন্বন্তরী কবিরাজ তো তোকে তাঁর শেষ কীর্তি গছিয়েই ফেরারি হননি। তাঁকে দিয়ে আর একটা তৈরি করে নিলেই হবে।

তৈরি করে নিলেই হবে! তার পরম ভক্তিভাজন কবিরাজকে মুখ ফসকে একটু তুচ্ছ করায় দ্বিগুণ চটে গৌর বলেছে, এ তোমার অ্যালোপ্যাথি পেটেন্ট ওষুধ পেয়েছ! গলাকাটা দাম দিলে যখন খুশি কিনতে পারো। এ-জিনিসের এমন সব অনুপান আছে যা বছরের সব সময়ে পাওয়াই যায় না।

বলতে গিয়ে যেন নতুন করে শোক উথলে উঠেছে গৌরের, আর সেই সঙ্গে রাগ।

এবার আর তাকে রোখা যায়নি।

গৌর আর তার পিছু পিছু আমরা তেতলার টঙের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াবার পর যা হয়েছে তা শোনবার আগে গৌরের রাগের রহস্যটা একটু বোধ হয় খোলসা করে দেওয়া উচিত।

ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীই যে সবকিছুর মূল তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বোঝা গেছে। এখন এই বস্তুটি কী জানলেই সব ধাঁধা আপনা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী শুনে ভড়কে যাওয়ার কথা। গৌর প্রথম আমাদেরও বেশ ভড়কে দিয়েছিল।

গৌরের জন্য আমরা সবাই তখন রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছি। কলির চরক না সুশ্রুত কাকে খুঁজে বার করে ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর মতো দাওয়াই আনবার মতো কী হয়েছে গৌরের?

লিগের গোড়ায় মোহনবাগানের একটু বরাত ভাল থাকার দরুন বাইরে থেকে তো চেকনাই-ই দেখা গেছে তার চেহারায়।

তা সত্ত্বেও কী যে হয়েছে ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী নামটার অর্থ জানবার পর বোঝ গেছল।

ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী হল স্রেফ টাকের ওষুধ, মানে টাকপড়া বন্ধ করার ভরসা দেওয়া কবিরাজি মাথার তেল।

কিন্তু তোর টাকের ওষুধ কী দরকার? জিজ্ঞেস করেছিলাম আমরা, মাথায় তো পরচুলা নয় ওগুলো।

টাক নেই, কিন্তু হতে কতক্ষণ! গৌর তার যুক্তি দেখিয়েছিল, প্রত্যেক দিন চুল আঁচড়াতে কতগুলো করে চুল উঠছে জানিস?

জানব না কেন, শিবু তাচ্ছিল্যভরে বলেছিল, ও তো সকলেরই ওঠে! বিশেষ বর্ষাকালে।

হ্যাঁ, ওঠে। গৌর মুখটা করুণ করে বলেছিল, কিন্তু কেউ তবু সাবধান কি হয়? তাই জন্যই তো দুনিয়ায় টাক এত বেড়ে যাচ্ছে। কবিরাজমশাই বলেছেন, স্নানের পর মাথা আঁচড়াবার সময় চিরুনিতে রোজ কতগুলো করে চুল ওঠে গুণতে। তুই তাই গুণিস নাকি? আমরা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

তা না গুণলে চলবে কেন। গৌর কর্তব্যনিষ্ঠা দেখিয়েছিল, এই আজই তো উঠেছে সতেরোটা। কাল উঠেছিল বারোটা। কবিরাজমশাই তাই বলেছেন— এরকমভাবে গুণলেই বোঝা যাবে মাথার চুল শেষ হতে আর কতদিন।

কিন্তু চুল উঠছে যেমন, তেমনই গজাচ্ছেও তো! আমরা তাকে আশ্বাস দেবার চেষ্টা করেছিলাম।

কিন্তু ফল কিছু হয়নি।

এ তো আর গাছের পাতা নয়,দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে কবিরাজমশাই-এর যুক্তিটাই গৌর আমাদের শোনাচ্ছে মনে হয়েছিল, যে যত ঝরবে তত গজাবে। মানুষের মাথায় যত ঝরে তত আর ঝরে না যদি না ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর মতো তেল থাকে সার দিতে।

একথা শোনবার পর গৌরকে কোনও যুক্তি শোনানো বৃথা বুঝেই সে চেষ্টা আর করিনি।

কিন্তু এই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী অমন বিপদ ঘনিয়ে তুলবে আমাদের ভাগ্যে তা-ও পারিনি ভাবতে।

এ হেন অমূল্য জিনিস নষ্ট হওয়ায় রাগে দুঃখে গৌর প্রায় ক্ষিপ্ত হয়েই ঘনাদার দরজায় গিয়ে হাজির হয়েছে তখন। সঙ্গে সঙ্গে আমরা। আমাদের কাউকেই কিন্তু চৌকাঠটাও পার হতে হয়নি।

ঘনাদার সাজগোজ এরই মধ্যে হয়ে গেছে। তাঁর খুদে প্লাস্টিকের চিরুনিতে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে তিনি বলেছেন, এসো! এসো! আমি-ই তোমাদের ডাকব ভাবছিলাম।

আমাদেরই ডাকবেন ভাবছিলেন! আমাদের কাকে? গৌরের গলা শুনেই তার মেজাজ বুঝতে দেরি হবার কথা নয়। কথাগুলো যেন গায়ে ছ্যাঁকা দিচ্ছে।

ঘনাদা কিন্তু কিছু যেন টেরই পাননি। প্রসন্ন মুখে বলেছেন, হ্যাঁ, বাথরুমে ওই বিতিকিচ্ছি তেলটা কে রেখেছে তা-ই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম।

তা-ই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলেন? ওটা আপনার কাছে বিতিকিচ্ছি তেল? গৌর প্রায় তোতলা হয়ে গেছে।

বিতিকিচ্ছি আর কাকে বলে! ঘনাদা ঘেন্নায় নাক কুঁচকেছেন, গন্ধটা দেখোনা! এখনও যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। মাথায় ভাল তেলের গন্ধ নিজে ছাড়া

আর কেউ পাবে কেন?

যুক্তিটা অস্বীকার করবার নয়, গৌর তাই আরও চটে উঠে বলেছে, তা ওই বিতিকিচ্ছি তেল আপনার মাখবার কী দরকার ছিল, আর…

ঠিক বলেছ। গৌরকে সমর্থন করেই ঘনাদা অত্যন্ত চিন্তিত মুখে বলেছেন, পরীক্ষা করতে মাথায় একটু দেওয়া খুব ভুল হয়েছে। যা চটচট করছে, ভয় হচ্ছে শেষে টাক না পড়তে শুরু করে।

ওই তেল মেখে আপনার মাথায় টাক পড়বে! গৌরের ফেটে পড়তে আর দেরি নেই।

ওরকম আজেবাজে তেল মাখলে পড়ে যে? ঘনাদা দুঃখের মধ্যে যেন সান্ত্বনা খুঁজে পেয়ে বলেছেন, তবে অন্য কারুর আর টাক পড়বার ভয় নেই।

কেন? এবার আমাদেরই জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে সবিস্ময়ে।

বেকায়দায় হাত লেগে শিশিটা শেষকালে পড়ে গেছে!ঘনাদা যেন শুভ সংবাদ শুনিয়েছেন সব তেল গড়িয়ে পড়ে গিয়ে আপদ চুকে গেছে।

আপদ চুকে গেছে! এইবার গৌর বিস্ফোরিত হয়েছে, কী আপদ আপনি। চুকিয়েছেন জানেন? আপদ যাকে বলছেন জানেন তার নাম? জানেন ওই একটি শিশি মাথার তেল জোগাড় করতে কী তপস্যা আমায় করতে হয়েছে…

কখনও হুংকারে কখনও হাহাকারে গৌর কী যে তখন বলে গেছে ভাল করে শুনিওনি। কোনওরকমে গৌরকে থামিয়ে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গিয়ে ভরাড়ুৰি আমরা বাঁচাতে চেয়েছি। কখনও ধমকে কখনও অনুরোধে গৌরকে টেনে বাইরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে বলেছি, তুই কি সত্যি পাগল হয়ে গেলি একটা তেলের শোকে! তোর ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী গেছে, তার বদলে বৃহৎ টাকান্তক গজসিংহ পেয়ে যাবি। ঘনাদাই সে তেল তোকে পাইয়ে দেবেন! ।

না। সন্ত্রস্ত হয়ে আমরা ফিরে তাকিয়ে দেখেছি। মেঘের গর্জন নয়, ঘনাদারই গলা থেকে বেরুচ্ছে—তেল আমি কাউকে দিই না। তেল বেশি হলে বার করে দিই দাওয়াই দিয়ে। সেবার যেমন বার করে দিয়েছিলাম কুলোর কাছে। দশ হাজার টন তেল!

অ্যাঁ! আমাদের সকলের মুখই হাঁ।

সেই সঙ্গে বুকের ভেতরকার ভয়ের গুড়গুড়ানিটা আশার কাঁপুনি দুলুনি হবার উপক্রম।

এ তো গুঁড়ো করতে করতে মাথা বাঁচিয়ে পায়ের কাছে সোনার চুড়ো ভেঙে পড়া।

যে যার জায়গা নিয়ে বসে পড়লেই হয়।

কিন্তু সে আশায় ছাই পড়েছে।

এরকম একটা কিছু হবে জেনেই কি না বলতে পারি না, ঘনাদা আগে থেকেই সেজেগুজে ছিলেন। শেষ ধাঁধাটি ছেড়ে চিরুনিটা পকেটে আর দেয়ালের পাশ থেকে ছড়িটা হাতে নিয়ে তিনি কোনও দিকে না চেয়ে খটখট করে বেরিয়ে গেছেন।

আমরা হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে, এবার গায়ের সমস্ত ঝাল ঝেড়েছি গৌরের ওপর!

সে অবশ্য নিজেই তখন থেকে অনুতাপে আধ-পোড়া।

নেহাত দিতে হয়, তাই দুপুরে ক-গ্রাস মুখে দিয়ে সবাই বসবার ঘরে এসে জমায়েত হয়ে সেই থেকে হা-হুতাশ করছি।

এবারে ফাঁড়া কাটবার কোনও উপায়ই যে নেই সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। ভেবেচিন্তে কেউ একটা আজগুবি ফন্দিও বাতলাতে পারেনি।

বাতলালেই বা হবে কী? ঘনাদা-ই নেই, তা ফন্দি খাটাব কার ওপর?

ঘনাদা সেই যে বেরিয়েছেন আর ফিরবেন বলেই মনে হয় না। সত্যিকার অগস্ত্যযাত্রাই হয়তো করেছেন। সেই সেবারে এভারেস্টের চুড়োয় টুপি নিয়ে টিটকিরির পর যেমন তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন।

সেবার তবু শেষ পর্যন্ত অনেক দিন বাদে আমাদের মনে মনে নাকমলা কানমলা খাইয়ে ফিরে এসেছিলেন। তার কোনও আশাই নেই এবার।

অথচ আজ মাসের দ্বিতীয় শনিবার ছুটির দিনে সন্ধে থেকে আসর জমাবার কী চুটিয়ে বন্দোবস্তই না করা গেছল?

বিকেল থেকে ভাজাভুজি ডালমুট পাঁপরের ব্যবস্থা তো করাই হয়েছে, তার ওপর বনোয়ারিকে যে ধান্দায় পাঠানো হয়েছে তা সফল হলে, মোক্ষম একটি টোপ ঘনাদার সামনে ধরা হবে বলে ঠিক হয়ে আছে।

টোপটি হল ঘনাদার পরম লোভনীয় তপসে মাছ। এই দর্মল্যের বাজারেও কদিন ধরে বৌবাজার শিয়ালদা শ্যামবাজার ঘোরাঘুরি করেছি। মনের মতো তপসে কোথাও পাওয়া যায়নি।

তপসে যা উঠেছে তা বাজার পর্যন্ত পৌঁছোতেই পারছে না হয়তো, কিংবা ঘেরাও-র ভয়ে ইলিশের সঙ্গে যুক্তি করে তারাও কলকাতার গঙ্গা বয়কট করেছে।

বনোয়ারিকে তাই কলকাতা ছাড়িয়ে একেবারে রায়গঞ্জে পাঠিয়ে দিয়েছি সকালেই। সেখান থেকে কলকাতার কাড়াকাড়ির আগেই যদি আনতে পারে।

কিন্তু এখন আনলেই বা আর লাভ কী! সে তপসে আর আমাদের মুখে রুচবে।

কিন্তু ও কী?

আমরা সবাই উৎকর্ণ হয়ে উঠি একসঙ্গে। নীচের সিড়িতে কার যেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না? আওয়াজ কি আমাদের চেনা?

নিজেদের কানগুলোকেই যে বিশ্বাস করতে সাহস হচ্ছে না!

আওয়াজের ভাষা কিছু বোঝা যাচ্ছে কি? ঘৃণা, অবজ্ঞা, বিদ্বেষ—তা-ই কি ফুটে উঠেছে ও-পদধ্বনিতে?

এই বর্বরধামে নেহাত বাধ্য হয়ে একবার আসার গ্লানিতে পা যেন ভারী হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে কি?

এ-পায়ের আওয়াজের গতি কোন দিকে? আমাদের ঘরের বারান্দার সামনে দিয়ে অবজ্ঞাভরে এ-ধ্বনি তেতলার সিঁড়ির দিকেই উঠে যাবে নিশ্চয়। তারপর সেখান থেকে হাঁক শোনা যাবে, বনোয়ারি! মালগুলো নামিয়ে নিয়ে যাও।

বনোয়ারি এখনও অনুপস্থিত। তার বদলে আমাদেরই যেতে হবে মাল নামিয়ে সাহায্য করতে।

ঘনাদাকে ধরে রাখবার মতো কোনও কিছু উপায় কি তখন হতে পারে? কিন্তু উপায় ভাবার দরকার হল না। আমাদের স্তম্ভিত নির্বাক করে ঘনাদা বৈঠকের ঘরেই এসে ঢুকলেন। আষাঢ়ের মেঘ নয়, একেবারে শরতের আকাশের মতো প্রসন্ন মুখে।

আরামকেদারাটা খালিই ছিল। আয়েস করে তাতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে আপনা থেকেই বললেন, কেটা পাঠিয়ে এলাম।

কী কেবল, কেন, কাকে, কিছুই না বুঝলেও কৃতার্থ হয়ে আমরা বললাম, ও, পাঠিয়ে দিলেন বুঝি?

ঘনাদার প্রসারিত তর্জনী ও মধ্যম অঙ্গুলির মধ্যে শিশির ইতিমধ্যেই ভক্তিভরে একটি সিগারেট স্থাপন করে লাইটার জ্বেলে সেটি ধরিয়ে দিয়েছে।

ঘনাদা তাতেনা, রামটান নয়—নে আদর করে একটু আলতো টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, হ্যাঁ, তখন কথায় কথায় পুরোনো স্মৃতি সব মনে পড়ে গেল কি না! অনেকদিন খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। তাই শুভেচ্ছা জানিয়ে কেল করলাম, পিড়ি ছেচল্লিশ আশা করি এখনও অগাধ, তোমার পেছনে লাগবার মতো তেলও কারুর আর এখনও হয়নি।

ঘনাদা নিজেই এবার হায়না-বিনিন্দিত হাসি একটু হাসলেন। সেই সঙ্গে মাথামুণ্ড কিছুই না বুঝে আমরাও। গৌরের মুখখানা দেখেই শুধু মনে হল তেতো মুখ নিয়ে মিষ্টি খাবার ভান করছে।

কিন্তু ঘনাদার এত ধোঁয়ার মধ্যে নিজেকে রাখা তো চলবে না।

শিশিরই একটু ধোঁয়া সরাবার চেষ্টা করলে। ঘনাদার রসিকতাটার উহ্য মানে যেন দারুণ রসিয়ে বুঝে হাসতে হাসতে বললে, কে পেয়ে খুব অবাক হবে, কী বলেন? বুঝতেই পারবে না মানে!

অন্য দিন হলে কাঁচা চালাকি ঘনাদা বরদাস্ত করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু আজ যেন তিনি অন্য মানুষ!

শিশিরের এ বেয়াদবি অনায়াসে মাফ করে বললেন, না, না, মানে বুঝবে না। কেন? ম্যাক অর্থাৎ পিটার ম্যাকডোনাল্ডের চেয়ে ও ঠারে-ঠাট্টার মানে আর বেশি কে বুঝবে! তবে হ্যাঁ, অবাক একটু হবে এতদিন বাদে আমার কে পেয়ে। আমাকে কম খোঁজাখুঁজি তো করেনি বছর দশেক ধরে।

আপনাকে এত খোঁজাখুঁজি কেন? শিবু সরলভাবে জিজ্ঞাসা করলে, ওই যা নিয়ে ঠারে-ঠাট্টা করেছেন সেই তেল দেবার জন্য!

না, তেল দেবার জন্য নয়।ঘনাদা শিবুর মতো সরলভাবে কথাটা নিয়ে বললেন, খুজছে কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করবার জন্য। ম্যাকের বড় ইচ্ছে কুলোর কাছে তার একটা দ্বীপ আমায় দেয়। দেবার জন্য ঝুললাঝুলি করেছে। তাই তো পালিয়ে এসেছিলাম কিছু না বলে। আর আজকের কেল্ল-এও ঠিকানা জানাইনি।

একটা দ্বীপ আপনাকে একজন দিতে চায় আর আপনি তা নিতে চান না বলে ঠিকানা লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন! পরম বিস্ময়ের ভান করে বললাম, কী রকম দ্বীপ সেটা? কত বড়?

তা নেহাতই ছোট।ঘনাদা যেন সত্যের খাতিরে জানালেন, লম্বায় মাইল চার আর চওড়ায় বড় জোড় মাইল দুই হবে।

এই মাত্র! শিবু অবজ্ঞাভরে হাসল, ওরকম দ্বীপ না নিয়ে ভালই করেছেন। সমুদ্রে ওই একটা পাথর কি বালির ফুটকি দিয়ে আবার কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ!

হ্যাঁ, দ্বীপটা পাথুরে বালির ফুটকিই বটে, ঘনাদা শিবুর মূঢ়তায় চোখে ক্ষমার দৃষ্টি এনে বললেন, কিন্তু ওইটি আর ওপাশের প্রায় ওরই যেন যমজ আরেকটি দ্বীপের লোভে এমন চক্রান্ত একজন করেছিল, শয়তানির দিক দিয়ে যার তুলনা মেলা ভার।

কেন? গৌর এতক্ষণে হাওয়া বুঝে মুখ খুললে, ওই একরত্তি দুটো দ্বীপে ছিল কী?

ছিল পাহাড়ি ঢিপির গায়ে গোরু ছাগলের কাছে উপাদেয় গিনি ঘাসের জঙ্গল, কিছু আধবুনো গোরু ছাগল আর দু-দ্বীপের চারিধারের সমুদ্রে প্রচুর নানা জাতের মাছ, যা শিকারের শখের দরুনই ম্যাক দ্বীপ দুটো কিনে প্রতি বছর শীতের দিনে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসে মাসখানেক কাটিয়ে যেত।

ঘনাদা দ্বীপের বর্ণনা একটু বিশদ করে একটা প্রশ্নের জন্যই আমাদের দিকে। তাকালেন, বুঝলাম। তাঁকে হতাশ করলাম না।

এই দ্বীপের জন্য শয়তানি চক্রান্ত! জিজ্ঞাসা করলাম যথারীতি চক্ষু বিস্ফারিত করে, কেন বলুন তো?

কেন, তা বোঝা দূরে থাক, চক্রান্তটাই গোড়াতে কেউ ধরতে পারেনি। ঘনাদা এবার গল্পের রাশ ছাড়লেন, নিউইয়র্কের ইয়াটস ক্লাবে সেদিন একটা পার্টিতে যেতে হয়েছিল।

এত হা-হুতাশের পর বরাত একটু ফিরতে না ফিরতেই বুঝি আবার সব ভেস্তে যায়। নিউইয়র্ক ইয়াটস ক্লাব শুনেই আমাদের গলায় একটা খুকখুকে কাশি এমন চাড়া দিয়ে উঠল যে চাপাই দুষ্কর। ওই ক্লাবটির বাছবিচার এমন কড়া বলে শুনেছি যে গণ্যমান্যরাও নিমন্ত্রণ পেলে ধন্য হন। আর ঘনাদা যেন রাসের মেলায় যাচ্ছেন এমনইভাবে তুড়ি দিয়েই তার পার্টিতে চলে গেলেন!

আমাদের গলাগুলো যত অবাধ্যই হোক, ঘনাদা এখন একেবারে হাঁচিকাশি-ফ! সবকিছু অগ্রাহ্য করেই বলে চললেন, পার্টিতে হঠাৎ ম্যাকের সঙ্গে দেখা। একটি কোণে বেশ দশাসই চেহারার জয়টাকের মতো গোল, আর টোম্যাটোর মতো লালমুখো একটি লোকের সঙ্গে যেন লুকিয়ে বসে আছে।

ম্যাককে দেখে খুশি যেমন হলাম তেমনই বেশ অবাকও। শীতকাল। নেহাত ফুটন্ত জলের ধারা তলা দিয়ে বইয়ে দেওয়ার দরুন নিউইয়র্কের রাস্তাগুলো গরম ও পরিষ্কার হলেও আর যেদিকে চাও তুষারে ঢাকা পড়ে যেন সাদা চিনির মোড়ক দেওয়া মনে হচ্ছে। এমন সময়ে এই নিউইয়র্কে ম্যাকের তো থাকবার কথা নয়। ম্যাক অর্থাৎ পিটার ম্যাকডোনাল্ড মার্কিন মাপকাঠিতে এমন কিছু ধনী নয়। মাত্র লাখখানেক ডলার তার বছরের আয়। সে আয় পৈতৃক যা সে পেয়েছে তা-ই থেকেই হয়। ব্যবসায় খাটিয়ে সে আয় বাড়াবার কোনও উৎসাহ তার নেই। যা আছে তাতেই খুশি থেকে সে নিজের নির্দোষ কটি শখ মেটায়। সে শখের মধ্যে প্রধান হল মাছ ধরা। নদী-পুকুরের নয়, একেবারে সমুদ্রের দামাল মাছ-টুনি, মার্লিন ইত্যাদি।

মাছ ধরবার জন্য তো বটেই, ছোট একটি বন্ধু বান্ধবের দল নিয়ে একান্ত নিরিবিলিতে কাটাবার জন্য, সে দুটি খুদে খুদে দ্বীপ কিনেই ফেলেছে একেবারে।

আমেরিকার ফ্লোরিডার তলা দিয়ে কিউবা,হিসপানিওলা, পুয়ের্তোরিকার সঙ্গে সার বেঁধে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-এর যে বড় ছোট থেকে নেহাত ফুটকির মতো সব দ্বীপের মিছিল একটু বাঁকা অর্ধচন্দ্রাকার রেখায় ট্রিনিডাড হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার মাথা ছুঁই ছুঁই করছে, তারই মধ্যে কুমারী দ্বীপাবলি মানে ভার্জিন আইল্যান্ড একটা দ্বীপের জটলা। এ-জটলায় দ্বীপের সংখ্যা মোট শ-খানেক। তার মধ্যে সেন্ট টমাস, সেন্ট জন আর তাদের দক্ষিণের সেন্ট ক্রয় দ্বীপ তিনটিই যা একটু বড়সড়। তা-ও এ তিনটির কোনওটাই পঁচিশ মাইলের বেশি লম্বা নয়। তা থেকেই ভার্জিন আইল্যান্ড-এর বাকি দ্বীপগুলির বহর বোঝা যাবে। বেশির ভাগ দ্বীপই নীল সমুদ্রের অসীমতায় তিন-চার মাইলের মাটি-বালি পাথরের ফোঁটা মাত্র।

এমনই একজোড়া দ্বীপের ফোঁটা কিনে ফি বছর শীতকাল হলেই সবান্ধবে সেখানে মাছ ধরে, পানসি চালিয়ে আর যেন দুধে-ধধায়া বালির সমুদ্র-সৈকতে স্নান করে রোদ পুহিয়ে কাটানো ম্যাকের বাঁধা দস্তুর ছিল। এর নড়চড় এ পর্যন্ত হয়নি বলেই জানি।

ম্যাকের অতিথি হয়ে তার জোড়া দ্বীপে আমি বার-দুই শীতকালটা কাটিয়ে এসেছি। ম্যাক দ্বীপ দুটোর নাম দিয়েছিল কমা আর ড্যাশ। কমা আর ড্যাশের সঙ্গে আকারের একটু মিল থেকেই নামগুলো দেওয়া হয়েছিল। একটা দ্বীপ কমার মতো একটু বাঁকানো আর একটা ড্যাশের মতো লম্বা।

কমা আর ড্যাশ দুই দ্বীপের চারিধারের সমুদ্র সত্যই মাছ ধরার দিক দিয়ে স্বর্গ। কমা-ড্যাশে ম্যাকের নিমন্ত্রণ পাওয়াটা তাই আমেরিকার খানদানি মহলেও মস্ত সৌভাগ্য মনে করা হত। সমুদ্রের মাছ ধরা যাদের নেশা শীত এলে তাদের অনেকেই আশায় থাকত ম্যাকের নিমন্ত্রণের।

কিন্তু এবারে সে-দস্তুর এমন উলটে গেল কী করে? এই শীতের দিনে নিউইয়র্কের মতো হিমেল শহরের এক কোণে ম্যাক এমন ঘাপটি মেরে বসে আছে। কেন?

তার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম। একটু ঠাট্টার সুরে বললাম, তোমার কি রোদে অরুচি ধরেছে, ম্যাক, না হঠাৎ মাছে অ্যালার্জি? কমা-ড্যাশ ছেড়ে দিয়ে এই ডিসেম্বর মাসে তুমি নিউইয়র্কে বসে আছ!

ম্যাক কোনও জবাব দিলে না। যেন না জেনে তার পায়ের কড়া মাড়িয়ে ফেলেছি এমন যন্ত্রণা-মাখানো দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার তাকিয়ে মুখটা ফিরিয়ে নিলো।

তার বদলে ম্যাকের সঙ্গীই জবাব দিলেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে ম্যাক গোড়াতেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। নাম ফ্রাঙ্ক ডুগান। টেকসাস-এর লোক, কোটিপতি। তবে পেট্রোলের দৌলতে নয়, কী সব ফ্যাক্টরি আছে, আর সব অন্য রাসায়নিক নিয়েও কারবার।

ডুগান সহানুভূতির স্বরে বললেন, ও-দুটো নাম ওর কাছে করবেন না। ওর বুকের ঘা তাতে খুঁচিয়ে তোলা হয়!

সত্যিই অবাক হয়ে একবার ম্যাক আর একবার ডুগানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। তারা আমায় নিয়ে ঠাট্টা করছে নাকি! ডুগানকে জানি না। কিন্তু ম্যাক তো আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবার পাত্র নয়।

ব্যাপারটা যে ঠাট্টা নয়, অত্যন্ত শোচনীয় ট্রাজেডি—দু-একদিনের মধ্যেই ডুগানের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম।

ম্যাক এ-বিষয়ে কোনও কথা বলতেই চায় না। ডুগান বন্ধুর দুর্ভাগ্যে মর্মাহত হলেও আমার পেড়াপীড়িতে কমা-ড্যাশের করুণ ট্র্যাজেডিটা আমায় জানাল।

ট্র্যাজেডিটা করুশ সন্দেহ নেই, কিন্তু একেবারে রহস্যময়।

যে জোড়া দ্বীপে মাছ ধরে সত্যি অরুচি ধরে যেত সেখানে একটি চুনো মাছও আর পাওয়া যায় না গত দু-বছর ধরে। সমুদ্রের জলে মাছ নেই, দ্বীপ দুটিতে উড়ো পাখিও আর বসে না। সত্যিই যেন কোনও শাপমন্যি দ্বীপ দুটোতে লেগেছে।

ডুগান বন্ধুকে অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে ব্যাপারটার মানে বুঝতে পারা যাক বা না যাক এ দুর্ভাগ্য হয়তো সাময়িক। যেমন হঠাৎ আপনা থেকে ব্যাপারটা ঘটেছে, তেমনই আপনা থেকেই হয়তো আগের সুদিন ফিরে আসবে।

কিন্তু ম্যাককে এ-আশ্বাসে চাঙ্গা করা যায়নি। কমা-ড্যাশ যে তার বুকের দুটি ফুসফুস। তাদের এই দুর্দশায় সে একেবারে ভেঙে পড়েছে।

বিজ্ঞানের দিক দিয়ে কমা-ড্যাশের রহস্যের কোনও হদিস পাওয়া যায় কি না দেখবার জন্য ডুগান জোর করে নিজের একদল বৈজ্ঞানিককে সেখানে নিয়ে গেছে।

তারা নানারকম জমকালো দাঁতভাঙা বিজ্ঞানের বুকনি ছেড়েছে। কিন্তু রহস্যের কোনও কিনারা করতে পারেনি।

তাতে হাল না ছেড়ে দিয়ে ডুগান নিজের খরচাতেই আবার অন্য একদল বৈজ্ঞানিককে সেখানে পাঠাতে চেয়েছে, কিন্তু ম্যাক তাতে উৎসাহ দেখায়নি।

নিজেও সে কমা-ড্যাশের জন্য কিছু করতে নারাজ। বন্ধু নিজের পয়সা এ ব্যাপারে নষ্ট করবে তা-ও সে চায় না।

ডুগানের স্বভাবে কিন্তু টেকসাসের গোঁ। এ রহস্যভেদের জেদ চেপে গেছে তার মাথায়। ম্যাক যখন দ্বীপ দুটোকে অভিশপ্ত আর ডাহা লোকসান বলেই মনে করে, ডুগান সেগুলো কিনেই নিতে চেয়েছে ম্যাকের কাছ থেকে।

কিনতে হবে না, অমনিই তোমায় দিয়ে দিচ্ছি,বলেছে ম্যাক। কিন্তু ডুগান তাতে রাজি হয়নি। দ্বীপ দুটির দুর্ভাগ্যের দরুন কম দামে কিনতেও আপত্তি করেছে। কিনতে হলে সেন্যায্য দামে কিনবে এইটেই ঠিক হয়ে আছে। এখন শুধু পাকাপাকি সই-সাবুদটুকুই বাকি।

ডুগানের কাছে সব শুনে তাকে ধন্যবাদই দিয়েছি। বলেছি, ম্যাক যা নিয়ে গুমরে মরছে সেই দ্বীপ দুটো তার হাত থেকে সরিয়ে নেওয়া সত্যিই বন্ধুর কাজ।

দ্বীপ দুটোর এ-অবস্থা কবে থেকে শুরু হয়েছে জানতে চেয়েছি তারপর।

ডুগান একটু ভেবে নিয়ে বলেছে, ঠিক চার বছরই হল। তার আগের বছরই ম্যাকের অতিথি হয়ে আমি কমা-ড্যাশে গিয়েছিলাম। তখন এ-দুর্ভাগ্যের কিছুমাত্র আভাসও পাওয়া যায়নি। সত্যিই এ যেন কোনও অপদেবতার অভিশাপ বলে ভাবতে ইচ্ছে করে এক-এক সময়ে।

অপদেবতার কথাটা মিথ্যে না-ও হতে পারে, গম্ভীরভাবে বলেছি।

সে কী! দুগান বিস্মিত কণ্ঠে বলেছে, আপনি এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন?

দেবতায় বিশ্বাস করলে, অপদেবতাতেও করতে হয়। এবার হেসেই বলেছি, সরেজমিনে তাই একটু তদারক করে আসতে চাই।

এবার ডুগান হেসে ফেলে বলেছে, আপনার কি মাথা খারাপ, দাস? আপনি এ-ব্যাপারে অপদেবতার হাত আছে মনে করেন? আর সে-দ্বীপে গেলে অপদেবতাকে ধরতে পারবেন এমন আপনার আশা?

হেসে আমি বলেছি, আশা করতে ক্ষতি কী!

তারপর সত্যিই একদিন সকলের অনিচ্ছা অমত অগ্রাহ্য করে কমা-ড্যাশের জোড়া দ্বীপে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি। একরকম জোরজুলুম করে ম্যাক আর ডুগানকেও বাধ্য করেছি সঙ্গে আসতে।

কমা-ড্যাশ দুটি দ্বীপের মাঝখানের ব্যবধান মাত্র এক মাইলের। সমুদ্রের একটা খাঁড়িই যেন দুটো দ্বীপের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। নিজেদের মোটর বোটে ওই খাঁড়িটুকু পার হওয়া সোজা বলে ম্যাক আর ডুগানের সঙ্গে কমা দ্বীপের স্থায়ী আস্তানায় না থেকে ড্যাশে একটা তাঁবু ফেলে নিজের থাকবার ব্যবস্থা করেছি।

মাছ পাখি ছেড়ে যাবার ওই অভিশাপটুকু না থাকলে দ্বীপ দুটি সত্যিই বড় সুন্দর বলা যেত।

অভিশাপের দরুন শুধু যে মাছ পাখিরাই লোপাট হয়েছে তা নয়, দ্বীপের বাতাসটাও মনে হয়েছে কেমন যেন বিষাক্ত।

ডুগানকে সে কথা বলায় সে আমার মস্তিষ্কের সুস্থতাতেই একটু যেন সন্দেহ করে বলেছে, বিষাক্ত মনে হচ্ছে কী থেকে?

মনে হচ্ছে সমুদ্রের সেই ফুসফুস তাজা করা নিঃশ্বাসের হাওয়া যেন পাচ্ছি না। বলে।

আপনার হাঁপানি-টাপানি নেই তো? এবার ঠাট্টা করেছে ডুগান।

আমার হাঁপানি থাকলেও ম্যাকের তো নেই! হেসে বলেছি, তাকেই জিজ্ঞাসা করা যাক।

তাকে জিজ্ঞাসা করে কিন্তু লাভ হয়নি কিছু। ম্যাক সেই বিরল মানুষের একজন যাদের নাকের গন্ধের গ্ল্যান্ডগুলো অসাড়। বিশুদ্ধ বা বিষাক্ত তার নাকে সব হাওয়াই সমান।

অপদেবতাকে চোখে না দেখা যাক, কমা-ড্যাশ ছেড়ে ফেরবার আগের দিন তার উপদ্রবের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সেদিন সকালে মোটর বোটে ড্যাশ থেকে কমাতে ফিরে আসবার পর থেকেই। লক্ষ করেছি যে ডুগান কী যেন একটা ব্যাপারে দারুণ উত্তেজিত।

মোটর বোটটা রাত্রে আমায় ড্যাশে পৌঁছে দিয়ে আবার কমাতেই রোজ ফিরে যায়। আগের দিন রাত্রে বোট যে চালায় সেই ম্যানুয়েল বোটটা ফেরত এনেছিল কি

বারবার খোঁজ নিয়েছে ডুগান।

ম্যাকই শেষ পর্যন্ত ডুগানকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে আগের রাত্রে মোটর বোটটা ফেরার সময় তারা সমুদ্রের তীরেই বসেছিল দুজনে। দুজনেই তখন মোটর বোটটাকে নোঙর ফেলে তীরে বাঁধা পর্যন্ত লক্ষ করেছে।

মোটর বোটটার ফেরা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হবার পর ডগান আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে যেন। আমাদের সঙ্গে অনুচর এসেছে মাত্র পাঁচজন। তাদের প্রত্যেককে রাত্রে কোথায় কে ছিল জেরা করেছে অনেকবার।

ব্যাপারটা কী বলুন তো, ডুগান? শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা না করে পারিনি, আপনাকে কামড়াচ্ছে কীসে?

কীসে কামড়াচ্ছে, দেখবেন! ডুগান এবার তার নোটবইটা প্যান্টের পকেট থেকে বার করে আমাদের সামনে এক জায়গায় খুলে ধরেছে।

ম্যাক সেটা দেখে একটু হেসে ফেলে বলেছে, এ তো শুধু হিজিবিজি কাটা দেখছি!

শুধু হিজিবিজি! ডুগান ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

হিজিবিজির সঙ্গে দু-একটা লেখাও রয়েছে। আমি খাতাটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে বলেছি, কী যেন পি.ডি. ৪৬ তারপর ১০৬.৭ বার কয়েক লেখা, আর-এক জায়গায় আবার ও. এস. ৭৬ তার সঙ্গে ১৯০.৮! তা নোটবই-এ এসব লেখার মানে কী? লিখেছেই বা কে?

আমিও তো তা-ই জানতে চাই। ডুগান অত্যন্ত অস্থির ভাবে বলেছে, আমার নোটবই রাত্রে ঘরের মধ্যে টেবিলের ওপর রাখা ছিল। তাতে এ সব লেখা কার পক্ষে সম্ভব? কেনই বা সে লিখেছে?

এ তো ভৌতিক ব্যাপার মনে হচ্ছে?আমি চিন্তিত হয়ে বলেছি, সবচেয়ে মজার কথা হাতের লেখা প্রায় হুবহু আমার মতো।

আপনার মতো?

ম্যাক ও ডুগান দুজনেই অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়েছে।

তারপর ডুগান একটু বিরক্তির সঙ্গে বলেছে, ঠাট্টার ব্যাপার এটা নয়, দাস। লেখাটা আপনার মতো কী করে হতে পারে? আর তা-ই যদি হয় তা হলে আপনাকেই তো ভূত বলে বুঝতে হয়। রাত্রে ড্যাশ থেকে হাত বাড়িয়ে কমাতে আমার টেবিলের নোটবুকে হিজিবিজি কেটেছেন।

নোটবই-এর রহস্যের মীমাংসা হয়নি। ডুগান বেশ একটু বিমূঢ় বিচলিত হয়েই আমাদের সঙ্গে স্টেটস-এ ফিরে এসেছে।

ফেরবার পর ম্যাক তার আপদ চুকিয়ে ফেলবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কমা আর ড্যাশ এখন যেন তার দু-চক্ষের বিষ। কোনও রকমে ও দুটো দ্বীপের মালিকানা থেকে মুক্ত না হতে পারলে যেন তার স্বস্তি নেই।

ডুগান বন্ধুকে শান্তি দেবার জন্য দ্বীপ দুটো বেফায়দা জেনেও কিনে নিতে রাজি হয়েছে। ঠিক হয়েছে, মাসখাকে বাদেই বিক্রিটা পাকাপাকি করা হবে।

আমি ও ডুগান নিউপোর্টে ম্যাকের নিজের বাড়িতেই এসে উঠেছিলাম। একদিন সেখান থেকে ডুগান তার নিজের কাজে নিউইয়র্কে চলে গিয়েছে। আমারও তার সঙ্গে যাবার কথা। তা কিন্তু আমি যাইনি! সকালে ডুগান বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর দুপুরে লাঞ্চ খেতে বসে হঠাৎ বলেছি, আমায় কিছু টাকা ধার দিতে পারো, ম্যাক?

ধার! ম্যাক প্রথমটা আমার ধার চাওয়ায় একটু অবাক হলেও তারপর হেসে বলেছে, কত তোমার দরকার, আর কবে?

এই ধরো লাখ দেড়েক ডলার। আর চাই এখুনি।

এখুনি লাখ দেড়েক ডলার তুমি ধার চাইছ? ম্যাক হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছে, দিতে চাইলেও আমি লাখ দেড়েক ডলার পাব কোথা থেকে? আমার যা কিছু আয় সব বাবা যা কিনে রেখে গিয়েছিলেন, সেই সব রেল রোডের শেয়ার থেকে। তা বেচবার বা বন্ধক দেবার অধিকার আমার নেই।

বেশ, সেসব শেয়ার হুঁতে হবে না। আমি দাবি করেছি, আমায় ওকালতনামা দাও তোমার শেয়ার-টেয়ার না ছুঁয়ে লাখ দেড়েক টাকা তোলবার।

ম্যাক এবার সত্যি বেশ ফাঁপরে পড়েছে। একটু ইতস্তত করে বলেছে, সত্যি এত টাকা তোমার দরকার, দাস?

হেসে ফেলে বলেছি, দরকার সত্যিই আছে, তবে তার জন্য তোমায় বিব্রত হতে হবে না। আমায় শুধু একটা কথা দাও।

কী কথা? ম্যাক একটু যেন সভয়ে জিজ্ঞাসা করেছে।

না, এমন কিছু শক্ত কথা নয়, আমি তাকে আশ্বস্ত করেছি, শুধু কথা দাও যে অন্য কোথাও নয়, কমান্ড্যাশ বিক্রির দলিলটা ওই দ্বীপে গিয়েই পাকা করে লেখা হবে এক মাস বাদে।

এরকম অনুরোধের মানেটা বোঝবার বৃথা চেষ্টা করে ম্যাক শেষ পর্যন্ত খুশি হয়েই সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সেইদিন বিকেলেই নিউপোর্ট ছেড়ে আমি বেরিয়ে পড়েছি। মাসখানেক ধরে ঘোরাঘুরিটা একটু বেশিই করতে হয়েছে। শুধু আমেরিকার এধার-ওধার নয়। পাড়ি দিতে হয়েছে ইংল্যান্ড পর্যন্ত।

একমাস বাদে নির্দিষ্ট দিনে ঠিকই অবশ্য হাজির হয়েছি নিউপোর্টে ম্যাকের বাড়িতে। ডুগান আমার আগেই সেখানেই উপস্থিত।

সে হেসে আমায় জিজ্ঞেস করেছে, কমা-ড্যাশে গিয়েই দলিল লেখবার এ অদ্ভুত খেয়াল মাথায় এল কেন?

এল, ওখানকার অপদেবতা তাড়াবার শেষ সুযোগ নেবার জন্য।

অপদেবতা তাড়াবার আশা এখনও করেন? ডুগান আমার পাগলামিতে কৌতুক বোধ করে জিজ্ঞাসা করলে, কীসে অপদেবতা তাড়াবেন? মন্ত্রে?

না, ফেনা দিয়ে!

আমার সত্যিই মাথা খারাপ হয়েছে ধরে নিয়ে হাসি চেপে ডুগান সেখান থেকে সরে গেছে তারপর।

ম্যাকের সুলুপে কমা ও ড্যাশে পৌছোবার আগে সুলুপের মাঝি-মাল্লারা পর্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছে একটা ব্যাপারে।

ম্যাক হতভম্ব আর ডুগান তো রীতিমতো উত্তেজিত।

দুরবিন ছাড়া খালি চোখেই দুটি স্টিমার দ্বীপের ধারে তখন দেখা যাচ্ছে।

ও স্টিমার কাদের? জিজ্ঞাসা করেছে ম্যাক।

কার হুকুমে দ্বীপে ওরা স্টিমার বেঁধেছে? ডুগান জানতে চেয়েছে।

হুকুমটা ধরুন আমার? হেসে বলেছি, আর স্টিমার দুটোর একটা এসেছে ফেনা ছড়াতে আর একটা মাটি খুঁড়তে।

ফেনা ছড়াতে আর মাটি খুঁড়তে? তার মানে? ডুগানের গলার স্বরে মনে হয়েছে আমার বাতুলতা এবার তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে।

তাকে শান্ত করবার জন্য বলেছি, চটবেন না, মি. ডুগান। আপনার একটা উপকারই করেছি এসব ব্যবস্থায়। বন্ধুকে শান্তি দেবার জন্য দুটো রদ্দি দ্বীপ কিনে আপনাকে আর স্বার্থত্যাগ করতে হবে না।

তাই নাকি! ডুগানকে অত্যন্ত খুশিই দেখিয়েছে, কিন্তু কেনার দরকার আর নেই কেন? ওই ফেনা ছড়ানো আর মাটি খোঁড়ার দরুন?

হ্যাঁ, মি. ডুগান, বিনীত ভাবে বলেছি, ওই ফেনা ছড়িয়েই জোড়া দ্বীপের অপদেবতাকে তাড়ানো হয়েছে। এখানকার সমুদ্রে আবার এখন মাছের গুতোগুতি। তবে অপদেবতা বেশ একটু না খসিয়ে বিদেয় হয়নি। ফেনা ছড়িয়ে তাকে তাড়াবার খরচ হল লাখ দেড়েক ডলার।

লাখ দেড়েক ডলার! এতক্ষণে ম্যাকের প্রায় আর্তনাদ শোনা গেছে, এত টাকা যেখান থেকেই জোগাড় করে থাকো, আমি শোধ করে দেব কোথা থেকে?

তোমায় শোধ দিতে হবে না,ম্যাককে শান্ত করে বলেছি, তোমার জোড়া দ্বীপে মাটি খোঁড়ার ইজারা যারা নিচ্ছে তারাই ও-দেনা চুকিয়ে দিয়ে আরও লাখ দুয়েক ডলার তোমায় বায়না দেবে।

মাটি খোঁড়ার ইজারা নেবার জন্য তারা লাখ দেড়েকের ওপর আরও দু-লক্ষ ডলার দেবে! ম্যাক এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমার মতো বদ্ধ উন্মাদকে আর একমূহূর্তও ছাড়া থাকতে দেওয়া উচিত নয়।

তার মুখের চেহারা দেখে আশ্বাস দিয়ে বলেছি, দেবে, দেবে, নিশ্চিন্ত থাকো। কারণ তোমার জোড়া দ্বীপের ভেতরকার মাটি সব পি. ডি. ৪৬ আর ১০৬.৭। কিছু ও.এস. ৭৬ আর ১৯০.৮-ও আছে।

ম্যাক হতাশ ভাবে আমার দিকে তাকাতে আবার বলেছি, আজ নয়, কাল সকালে সব ভাল করে বুঝিয়ে দেব।

পরের দিন সকালে ম্যাককে সব বুঝিয়ে বলার সুযোগ পাবার আগে সেই রাত্রেই একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটেছে।

অন্যবারের মতো এবারেও আমি আর সকলের সঙ্গে কমা দ্বীপে না থেকে একলা ড্যাশে তাঁবু ফেলে থাকবার ব্যবস্থা করেছি।

ঘর অন্ধকার না হলে আমার ঘুম আসে না। সে-রাত্রে কিন্তু হ্যাসাক বাতিটা জ্বেলেই রেখেছিলাম। রাত দুটো নাগাদ হাতের মোটা ব্র্যাডশটা মুড়ে ক্যাম্পখাট থেকে নেমে তাঁবুর দরজার পর্দাটা সরিয়ে বললাম, আসুন, মি. ডুগান, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন? ডুগান ভুরুটা একটু কুঁচকে সামনে পেতে রাখা তাঁবুর স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ারটা সরিয়ে কাঠের একটা শক্ত বাক্সের ওপর সাবধানে দেহভার নামিয়ে বললে, কেন বলুন তো?

বাঃ, আপনার বন্ধুকে বাঁচাবার জন্য আমায় ধন্যবাদ দিতে না এসে আপনি পারেন! আমার গলায় সরল উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে বললাম, তবে আপনি সাঁতরেই আসবেন ভেবেছিলাম।

যেমন আপনি সে রাত্রে গেছলেন! ডুগানের টোম্যাটোর মতো রাঙা মুখ বিটের মতো আধা বেগনি হয়ে উঠল।

হ্যাঁ, মোটর বোটটার আওয়াজ যে বড় বিশ্রী, আমি অস্বস্তির সঙ্গে বললাম, এসব কাজ যত চুপিচুপি সারা যায় ততই ভাল নয় কি! আমার বেলা দেখুন, কখন খাঁড়ি পার হয়েছি, কখন আপনার ঘরে ঢুকে নোটবই খুলে ওসব লিখেছি, আপনি টেরও পাননি। অথচ পাড়ে লাগাবার আগেই মোটর বন্ধ করা সত্ত্বেও আপনি যে আসছেন তা আমি টের পেয়েছি।

টের পেয়েও কিছু সুবিধে হবে কি?

কাঠের বাক্সটার কাছেই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ এক ঝটকায় আমার হাত থেকে ব্র্যাডশটা ছিনিয়ে নিয়ে ডুগান আবার মোলায়েম গলায় জিজ্ঞাসা করলে, জেগে থাকবার জন্য এই বই পড়ছিলেন বুঝি? কিন্তু এ তো উপন্যাস-টুপন্যাস নয়, রেলের টাইম টেবল দেখছি। তাও আমেরিকার নয়, বিলেতের।

হ্যাঁ, বিলেতের ব্র্যাডশ, আমি সবিনয়ে স্বীকার করলাম, এখান থেকে বিলেতে গিয়ে কিছুদিন ঘুরতে হবে কিনা। তাই ওখানকার ট্রেন-ফ্রেনের খোঁজখবর নিচ্ছিলাম।

ওখানকার খোঁজখবরের আর আপনার দরকার হবে না। মুখের ভাবটা যতদর সম্ভব মধুর করে মোটা ব্র্যাডশটা অবলীলাক্রমে দু-হাতে ছিঁড়ে ফেলে ডুগান ঘেঁড়া খণ্ড দুটো আমার হাতে দিয়ে বললে, বিলেতে যাওয়াই যখন আপনার হচ্ছে না, তখন ও-ব্র্যাডশ ছিঁড়ে ফেলাই ভাল।

হ্যাঁ, তা ঠিকই বলেছেন! একটা ঘেঁড়া খণ্ডের ওপর আর একটা খণ্ড রেখে দু হাতের এক মোচড়েই ছিঁড়ে চার খণ্ড করে ফেলে দিয়ে বললাম, তা ছাড়া আজকাল প্লেন থাকতে ট্রেনে ওঠারই তো মানে হয় না।

বিশেষ করে হাত-পা যাদের ভাঙা দোমড়ানো তাদের। ডুগান স্টিলের ফোন্ডিং চেয়ারের একটা রড মোমের বাতির মতো বাঁকিয়ে দুমড়ে দিয়ে আমার দিকে ছুঁড়ে দিলে।

সেটা ধরে টেনে টেনে আবার সোজা করে পাশে নামিয়ে রেখে বললাম, তাই হুঁশিয়ার থাকাই ভাল, হাত-পা যাতে আস্ত থাকে। সবাই তো আর দোমড়ানোকে সোজা করতে পারে না।

হঠাৎ বাঘের মতো থাবা বাড়িয়ে আমার টুটিটা যেন লোহার রেঞ্চে চেপে ধরে ডুগান বললে, তোর বেয়াদবি অনেক দূর পর্যন্ত সহ্য করে করেছি, কেলে উচ্চিংড়ে! গলার নলি চিপটে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মরবার আগে কটা কথা পরকালের খোরাক হিসেবে শুনে যা। এত বুদ্ধি খাটিয়ে এত কষ্টে আর চেষ্টায় যা করে তুলেছিস সব আমি ভেস্তে দেব। খানিক বাদে মোটর বোটের ওপরে গিয়ে, নেমে তোর লাশটা বোটের ভেতর রেখে সেটা আবার সমুদ্রমুখখা করে স্টার্ট দিয়ে ছেড়ে দেব। যদি আগেই না ডোবে তো অথৈ ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে কোথায় যে সে মোটর বোট তেল ফুরোলে গিয়ে পৌছোবে কেউ জানে না। সকলের কাছে রটিয়ে দেব, তুই আমাদের টাকা চুরি করে মোটর বোটে পালিয়েছিস। অজ্ঞান হতে আর তোর বাকি নেই বুঝতে পারছি, তাই দু কথায় সারটুকু শোনাচ্ছি! তোকে সরাবার পর এ-জোড়া দ্বীপ ওই হাঁদারাম ম্যাকের কাছে ধাপ্পা দিয়ে না পারলে জবরদস্তি করে আমি বাগাবই। ও পি. ডি. ৪৬ আমার আবিষ্কার। আমিই ওর মালিক!

এবার তা হলে গলাটা ছাড়ুন।

ডুগানের চোখ-মুখের ভাবটা সত্যি তখন দেখবার মতো। এতক্ষণ ধরে বজ্রের মতো মুঠোয় নলিটা চেপে ধরে রাখবার পর নিতান্ত সহজ গলায় আমায় কথা বলতে শুনে সে একেবারে থ।

ক্ষণেকের জন্য হাতটা তার আপনা থেকেই শিথিল হয়েছিল। না হলেও ক্ষতি ছিল না অবশ্য। গলাটা এক ঘাড়-নাড়ায় ছাড়িয়ে নিয়ে তার মাথায় একটা থাবড়া দিলাম। কাঠের বাক্সের শক্ত মজবুত ডালাটা ভেঙে তার ভেতরে সে অর্ধেকটা সেঁদিয়ে যেতে যেন লজ্জিত হয়ে বললাম, ছি ছি কাঠটা অত হালকা তা বুঝতেই পারিনি!

হাত বাড়িয়ে তাকে তুলতে গিয়ে আবার হাতটা সরিয়ে নিয়েই তারপর বললাম, থাক, যেমন আছেন তেমনিই থাকুন। আমার গলাটার দিকে অমন করুণ চোখে চাইবেন না। ওটা রক্ত-মাংসের তৈরি, শুধু যোগের ব্যায়ামে একটু বেশি মজবুত। এ-গলা টিপে কিছু করা যায় না। এখন আসল কথাগুলো শুনুন। এ জোড়া দ্বীপ প্রায় কুবেরের ভাণ্ডার বুঝে তা হাত করবার যে শয়তানি ফন্দি আপনি এঁটেছিলেন তা সত্যিই তারিফ করবার মতো। পাঁচ বছর আগে আপনি ম্যাকের অতিথি হয়ে কমা-ড্যাশে মাছ ধরতে আসেন! আপনি নিজে একজন খনিজতাত্ত্বিক। আপনার গ্লিসেরাইডস-এর কারখানা আছে। আপনি একটু ঘুরে-ফিরেই বুঝেছেন এ দুই দ্বীপে অমূল্য কিছু আছে। এখানকার মাটি খুঁড়ে নমুনা নিয়ে আপনি পরীক্ষা করিয়ে জেনেছেন যে, এখানে অঢেল পি. ডি. অর্থাৎ প্যালেডিয়ম আছে যার অ্যাটমিক নম্বর ৪৬ আর অ্যাটমিক ওজন ১০৬.৭। তা ছাড়া ও. এস. মানে অসমিয়মও আছে কিছু পরিমাণ যার অ্যাটমিক নম্বর ৭৬ আর ওজন ১৯০.৮।

প্যালেডিয়ম আর অসমিয়ম হল প্ল্যাটিনমের মিশ্র ধাতু। কয়েকটি কাজে এ ধাতুর জুড়ি নেই। প্যালেডিয়ম গলে ১৫৫° সেন্টিগ্রেডে। খাদ্য হিসেবে গ্লিসেরাইডস তৈরির ব্যাপারে প্যালেডিয়ম কি প্ল্যাটিনমের চেয়ে সেরা ক্যাটালিস্ট নেই! শুধু অত্যন্ত দামি বলেই এ-ধাতুর বদলে আপনাদের নিকেল ধাতু ব্যবহার করতে হয়। প্যালেডিয়ম এখানে অঢেল দেখে আপনার লোভের জিভ লকলক করে উঠেছে। জোড়া দ্বীপ হাত করবার অদ্ভুত ফন্দিও আপনি করেছেন। ছোট এই দুটি সমুদ্রের ফুটকির মতো দ্বীপ। উত্তর বিষুব সমুদ্রস্রোত এই দ্বীপ দুটির প্রায় মাথার কাছ দিয়েই ঘুরে যায়। আপনি সস্তা পেট্রোলের গাদ কিনে জোড়া দ্বীপের পুবের দিকে কাছাকাছি কোথাও ঢালাবার ব্যবস্থা করেছেন গোপনে। সে-তেল সমুদ্রের জলের ওপর নোংরা সরের মতো ভেসে এসে এই দ্বীপ দুটিকে ঘিরে জমতে শুরু করেছে। তেলের সরের তলায় প্রথমে সমুদ্রের আণুবীক্ষণিক প্ল্যাঙ্কটন বাঁচতে পারেনি অক্সিজেনের অভাবে।

প্ল্যাঙ্কটন যাদের আহার সেই ছোট মাছ পোকা গোছের সামুদ্রিক প্রাণী তারপর মরেছে। তারপর ধাপে ধাপে এই মৃত্যুর ঢেউ বিরাট সব জলচরদের স্তর পর্যন্ত পৌছেছে। খাবারের অভাবের দরুন মাছেরা এ-তল্লাটই ছেড়ে দিয়েছে। মাছেদের সঙ্গে মাছ যাদের আহার সেই পাখিরাও বন্ধ করেছে এ-দ্বীপে আসা।

মাছ ধরার নেশাতেই ম্যাক এ জোড়া দ্বীপ কিনেছিল! মনমরা হয়ে দ্বীপ দুটো অভিশপ্ত মনে করে বেচে দেবার কথাই সে ভেবেছে এবার। তার মনে এ-ভাবনা অবশ্য আপনিই কায়দা করে ঢুকিয়েছেন। বৈজ্ঞানিকদের নিয়ে এসে এখানকার রহস্যভেদের চেষ্টা করার নামে প্যালেডিয়ম-এর পুঁজি এখানে কত তা-ও একবার পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এত শয়তানি প্যাঁচ সব এক ফেনাই ভেস্তে দিলে।

কী সে ফেনা? ডালা ভাঙা বাক্সের ভেতর থেকে ওঠবার বিফল চেষ্টার সঙ্গে ডুগানের গলা থেকে যেন আক্রোশ আর কাকুতি এক সঙ্গে মিশে বার হল!

ও-ফেনা কী জানেন না! যেন অবাক হয়ে বললাম, ও, আপনি তো খনিজতাত্ত্বিক, কেমিস্ট তো নন। তবু জানেন হয়তো যে, অবাধ বেপরোয়া জাহাজ চালিয়ে আর কলকারখানার নোংরা কেরানি নির্বিচারে ঢেলে সমুদ্রটাকে ডাস্টবিন করে তোলার দরুন, দুনিয়ার সমস্ত সাগর এমন নোংরা তেলা হয়ে উঠেছে যে, এ-তেল যেভাবে তোক তুলে সমুদ্র আবার নির্মল করবার ব্যবস্থা না করলে সেখানকার প্রাণিজগতেরই বিপদ ঘনাবে। সে বিপদ ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা যেসব উপায় বার করেছেন, তার একটি হল ওই ফেনা! ও-ফেনাকে কুচোনো পলিউরেথিন বলতে পারেন!

বিলেতের একটি কোম্পানি অনেক দিনের গবেষণায় ওটি উদ্ভাবন করে পরীক্ষা চালাচ্ছে। এরই জন্য বিলেত ছুটতে হয়েছিল। তেলের ওপর ছড়ালে তেল শুষে নিয়ে ওই ফেনা দেখতে দেখতে কালো হয়ে ওঠে। তখন ও তেল-শোষা কালো ফেনা অনায়াসে জলের ওপর দিয়ে টেনে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে কোথাও জমা করা যায়। ও-ফেনা নিংড়ে আবার তেল বার করে নেওয়াও শক্ত নয়। সমুদ্রের জল তেল কাটিয়ে নির্মল করবার আরও এক জিনিস আছে। এটি আমেরিকায় উদ্ভাবিত। নাম হল পলি কমপ্লেক্স এ জলে ভাসা তেলের ওপর ছড়ালে তা তেলকে সূক্ষ্মভাগে ভাগ করে তার সঙ্গে মিশে গিয়ে জীবাণুদের এমন সুখাদ্য হয় যে আলো হাওয়ায় তেল উবে যেতে দু মিনিটও লাগে না। তেল তোলার এ ব্যবস্থায় খরচা একটু বেশি, পলিউরেথিনে খরচ কম। তাতেও একশো টন তেল শুষতে তেরোশো ডলার খরচ পড়ে। এ জোড়া দ্বীপের অভিশাপ কাটাবার খরচ ওই হিসেব অনুসারেই ধরেছি।

একটু চুপ করে থেকে আবার বলেছি, ভাবছি আপনার মতলব আপনারই ওপর খাটাই। শুধু আপনি আমার লাশটা বোটে ভাসাবেন ঠিক করেছিলেন আর আমি আপনাকে জ্যান্তই বোটটা চালাবার সুযোগ দেব। আমি এখন সাঁতার কমা দ্বীপে চলে যাচ্ছি। মোটর বোটটা এখানে রইল। বাক্সের গর্ত থেকে উঠতে আপনার একটু দেরি হবে মনে হচ্ছে। তা হোক, ওঠবামাত্র মোটর বোটে গিয়ে স্টার্ট দিয়ে রওনা হবেন। এখান থেকে সেন্ট টমাস দ্বীপ খুব দূর নয়। বোট চালাবার যেটুকু অভিজ্ঞতা আছে তা-ই দিয়েই সেখানে পৌঁছে বলবেন ঝড়ে পড়ে মোটর বোটে আপনার দিক ভুল হয়ে গেছে। সেন্ট টমাস থেকে আমেরিকায় ফিরে যাবেন, কিন্তু খবরদার কোনও দিন আর ম্যাকের ধারে কাছে আসবেন না।

ডুগানকে বাক্সের মধ্যেই রেখে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেলাম। ডুগানের সঙ্গে আর দেখা হয়নি! সে আর ম্যাকের ধার মাড়ায়নি বলেই জানি।

ঘনাদা কথাটা শেষ করেই উঠে নিজের টঙের ঘরে চলে গেলেন। শিশিরের কাছে। একটা সিগারেট চেয়ে প্যাকেটটাও নিয়ে যেতে ভুলে গেলেন এই প্রথম।

ঘনাদা চলে যাবার পর আমাদের কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন গোছের অবস্থা। বিশেষ করে গৌরের অত বড় বেয়াদবি মাফ করে ঘনাদার অমন খোলসা মন নিয়ে ফিরে আসা, আর যা নিয়ে তাঁর মানে ঘা সেই তেলের ওপরই গল্পের আসর জমিয়ে যাওয়ার আশাতীত উদারতায় তখন আমরা কৃতজ্ঞতায় গদগদ। তারই মধ্যে বনোয়ারিকে যেন দেখতে পাওয়া গেল বারান্দা দিয়ে যেতে।

ব্যস্ত হয়ে হাঁক দিয়ে তাকে ডাকলাম। ঘরে এসে দাঁড়াবার পর উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী রে, কখন এলি? তপসে মাছ পাসনি বুঝি?

বনোয়ারির মুখে গর্বের হাসি দেখা গেল, পাইয়েছে না কী রকম? হামি গিয়েছে আর মাছ মিলবে নাই!

পেয়েছিস তা হলে। আমাদের দন্তও বিকশিত হয়। তারপর একটু সন্দেহের সুর বাজল কণ্ঠে, হ্যাঁ রে, ভাল তাজা তপসে তো?

হাঁ, ভাল না তো লিবো কেনো! বনোয়ারি আমাদের সন্দেহের বিরুদ্ধে তার সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করলে—বড়বাবু নিজে দেখিয়েছে না?

বড়বাবু মানে ঘনাদা দেখেছে! কখন দেখল! আমাদের সবিস্ময় উদগ্রীব প্রশ্ন এবার।

ওই হামি বাস-সে নামলাম। বনোয়ারি বিবরণ দিলে, আর বড়বাবু উখান দিয়ে যেতে যেতে হামাকে দেখলে। তারপর ডাক দিয়ে আমার মছলি সব ভাল করে দেখে তারিফ করলে। বড়বাবুর ফরমাস নিয়ে তো তারপর বিস্কুটপিসাই লা-তে গেলাম। তাই তো দের হয়ে গেল আসতে।

বনোয়ারি নিজের কাজে বেরিয়ে গেল।

আমরা নীরবে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম কিছুক্ষণ।

তেলের গল্প আর তপসে মাছের মধ্যে কোনও নিগুঢ় সম্বন্ধ আছে কি!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *