২৫. ঘুম ভেঙে গেলো ব্লমকোভিস্টের

অধ্যায় ২৫

শনিবার, জুলাই ১২-সোমবার, জুলাই ১৪

ভোর ৫টার দিকে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলো ব্লমকোভিস্টের। গলা থেকে ফাঁসটা খোলার জন্য হাতরাতে লাগলো সে। সালান্ডার কাছে এসে তার হাতটা ধরে ফেললো, প্রশমিত করলো তাকে। আধো ঘুমে চোখ খুলে দেখতে পেলো মেয়েটাকে।

“আমি জানতাম না তুমি গলফ খেলো,” চোখ দুটো আবারো বন্ধ করে বললো সে। ব্লমকোভিস্ট আবারো ঘুমিয়ে পড়ার আগপর্যন্ত তার পাশে বসে থাকলো সালান্ডার। সে যখন ঘুমাচ্ছিলো মেয়েটা তখন মার্টিনের বেসমেন্টে গিয়েছিলো আবার, ক্রাইমসিনটা পরীক্ষা করে ছবি তুলে এসেছে। নির্যাতন করার যন্ত্রপাতির সাথে সহিংস পর্নোগ্রাফি ম্যাগাজিন আর বিশাল সংখ্যক পোলারয়েড ছবির কতোগুলো অ্যালবামও খুঁজে পেয়েছে।

কোনো ডায়রি ছিলো না। অবশ্য এ৪ কাগজের দুটো বাইন্ডার পেয়েছে, সেইসাথে পাসপোর্ট সাইজের কতোগুলো ছবি আর মেয়েদের সম্পর্কে তথ্য সংবলিত হাতে লেখা নোট। উপর তলায় মার্টিনের ডেল ল্যাপটপ আর বাইন্ডার দুটো একটা নাইলনের ভ্যাগে ভরে নিয়ে এসেছে। ব্লমকোভিস্ট যখন বেঘোর ঘুমে তখন মার্টিনের ল্যাপটপ আর বাইন্ডারটা পরীক্ষা করে দেখলো সালান্ডার। ভোর ৬টার দিকে ল্যাপটপটা বন্ধ করে একটা সিগারেট ধরালো।

ব্লমকোভিস্ট আর সে অতীতের এক সিরিয়াল কিলার ধরার জন্য কাজ করে যাচ্ছিলো। কিন্তু এখন যা পাওয়া গেছে সেটা একেবারেই ভিন্ন কিছু। মার্টিন ভ্যাঙ্গারের বাড়ির বেসমেন্টে যে ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটতো সেটা তার কল্পনাতেও ছিলো না।

বোঝার চেষ্টা করলো সে।

ষাট দশক থেকে মার্টিন ভ্যাঙ্গার নারী হত্যা চালিয়ে আসছে, বিগত পনেরো বছর ধরে প্রতি বছর দুয়েকটি করে হত্যা করেছে সে। খুনগুলো এতো নিখুঁত পরিকল্পনা আর সতর্কতার সাথে করা হতো যে ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারে নি এখানে একজন সিরিয়াল কিলার সক্রিয় আছে। এটা কিভাবে সম্ভব?

বাইন্ডারে প্রশ্নটার আংশিক জবাব মিললো।

তার ভিকটিমদের বেশিরভাগই একেবারে নতুন আসা কেউ, অভিবাসী মেয়ে, সুইডেনে যার কোনো বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিচিতজন নেই। পতিতা আর সমাজচ্যুতরাও আছে এই তালিকায়। হয়তো মাদকাসক্ত অথবা অন্য কোনো সমস্যায় জড়ি পড়া কোনো মেয়ে।

যৌন-মর্ষকামীদের সাইকোলজি স্টাডি করে সালান্ডার জানতে পেরেছে এ ধরণের খুনিরা খুনের স্মারক সংরক্ষণ ক’রে থাকে। এইসব স্মারক খুনিকে মনে করিয়ে দেয় তার হত্যার কথা, সেইসাথে আনন্দ লাভ করার জন্য অতীতের করা খুনগুলো পুণঃউৎপাদন করে আনন্দ লাভ করে এরা। মার্টিন ভ্যাঙ্গার অবশ্য ‘ডেথবুক’ নামের একটি বই রেখেছে। নিজের শিকারদের ক্যাটালগ আর গ্রেড করেছে সে। তাদের যন্ত্রণার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছে বইয়ে। নিজের এই খুনগুলোর প্রমাণ হিসেবে ভিডিও আর স্টিল ছবিও তুলে রেখেছে।

সহিংসতা আর খুনখারাবি ছিলো তার আসল উদ্দেশ্য কিন্তু সালান্ডারের কাছে মনে হলো শিকার করার ব্যাপারটাই মার্টিনকে বেশি আনন্দ দিতো। ল্যাপটপে সে একশ’রও বেশি মহিলার ডাটাবেস তৈরি করে রেখেছে। ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশনের কর্মচারি, নিয়মিত যেসব রেস্তোঁরায় সে খাওয়াদাওয়া করে সেখানকার ওয়েট্রেস, হোটেলের রিসেপশনিস্ট, সোশ্যাল সিকিউরিটি অফিসের ক্লার্ক, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি, আরো অনেক মহিলা রয়েছে তার তালিকায়। মনে হয় তার সংস্পর্শে আসা সব মহিলা সম্পর্কেই তার কাছে কিছু তথ্যভাণ্ডার রয়েছে।

এসব মহিলার মধ্যে অল্পসংখ্যককেই সে হত্যা করেছে। তবে তার কাছাকাছি থাকা প্রায় সব মহিলাই তার সম্ভাব্য শিকার ছিলো। মহিলাদের সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জোগার করে ক্যাটালগ তৈরি করাটা মনে হয় তার শখের বিষয় ছিলো। অনেক অনেক সময় ব্যয় করেছে এ কাজে।

মেয়েটা কি বিবাহিত নাকি সিঙ্গেল? তার কি কোনো বাচ্চাকাচ্চা কিংবা পরিবার-পরিজন রয়েছে? সে কোথায় কাজ করে? থাকে কোথায়? কি ধরণের গাড়ি চালায়? লেখাপড়া কতোদূর করেছে? চুলের রঙ কি? চামড়ার রঙ? ফিগার?

সম্ভাব্য শিকারদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাটা মার্টিন ভ্যাঙ্গারের সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসির উল্লেখযোগ্য অংশ। প্রথমত সে একজনের পেছনে লেগে থেকে খবরাখবর নেয়, দ্বিতীয়ত সে খুন করে।

পড়া শেষ করার পর বাইন্ডারের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা এনভেলপ খুঁজে পেলো সালান্ডার। ভেতর থেকে দুটো বিবর্ণ পোলারয়েড ছবি বের করলো সে। প্রথম ছবিতে টেবিলে বসে আছে কালো চুলের এক মেয়ে। কালো জিন্স পরে থাকলেও মেয়েটার উর্ধ্বাঙ্গে কোনো কিছু নেই। স্তনজোড়া একেবারেই ছোটো। ক্যামেরা থেকে মুখ সরিয়ে রেখেছে মেয়েটি, এক হাত তুলে ছবি তুলতেও বাধা দিচ্ছে। যেনো ছবি তুলতে দেখে সে খুব অবাক হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ছবিতে মেয়েটি একেবারে নগ্ন। নীল রঙের বিছানার চাদরের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। এই ছবিতেও তার মুখ ক্যামেরা থেকে সরিয়ে রেখেছে।

ছবি দুটো তার জ্যাকেটের পকেটে রেখে দিলো সালান্ডার। বাইন্ডার দুটো ফায়ারপ্লেসে রেখে ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলো সে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলে সেগুলো নেড়েচেড়ে ছড়িয়ে রাখলো যেনো বোঝা না যায় কোনো কিছু পোড়ানো হয়েছে। এরপর সে গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যে হাটতে বের হলো, হঠাৎ বসে পড়ে জুতোর ফিতে বাঁধছে এরকম একটি ভান করে বৃজের উপর থেকে নীচের পানিতে ফেলে দিলো মার্টিন ভ্যাঙ্গারের ল্যাপটপটি।

.

৭:৩০-এ যখন খোলা দরজা দিয়ে হন হন করে ফ্রোডি প্রবেশ করলো সালান্ডার তখন রান্নাঘরের টেবিলে বসে সিগারেট আর কফি খাচ্ছে। ফ্রোডির মুখটা একেবারে ফ্যাকাশে, দেখে মনে হচ্ছে দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে এইমাত্র।

“ব্লমকোভিস্ট কোথায়?” জানতে চাইলো সে।

“ঘুমাচ্ছে।

“রান্নাঘরের একটা চেয়ার টেনে ধপাস করে বসে পড়লো ফ্রোডি। এক কাপে কফি ঢেলে তার দিকে বাড়িয়ে দিলো সালান্ডার।

“মার্টিন…আমি আজ সকালে জানতে পারলাম সে নাকি গতরাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

“খুবই দুঃখের কথা,” কফিতে চুমুক দিয়ে বললো সালন্ডার।

তার দিকে তাকিয়ে রইলো ফ্রোডি। প্রথমে বুঝতে না পেরে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপরই তার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেলো।

“কি…?”

“সে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।”

“এ সম্পর্কে আপনি কি জানেন?”

“সে গাড়ি চালিয়ে সোজা একটা ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। আত্মহত্যা করেছে সে। পত্রিকা, মানসিক চাপ, পতিত এক শিল্পসাম্রাজ্য, ইত্যাদি সব কিছুর ভার সহ্য করতে পারছিলো না। আমার তাই মনে হচ্ছে।

ফ্রোডিকে দেখে মনে হচ্ছে তার বুঝি ব্রেন হ্যামারেজ হবে। হুট ক’রে উঠে শোবারঘরের দিকে ছুটে গেলো সে।

“তাকে ঘুমাতে দিন,” অনেকটা ঝাঁঝালো কণ্ঠেই বললো সালান্ডার

ঘুমন্ত ব্লমকোভিস্টের দিকে তাকালো ফ্রোডি। তার চেহারায় কালচে দাগগুলো দেখতে পেলো সে। পাঁজরের কাছে আঘাতের চিহ্নটাও। এরপর চামড়ার স্ট্র্যাপটা যেখানে পোড়ানো হয়েছিলো সেখানে একটা আগুনের রেখা দেখতে পেলো। তার হাতটা ধরে সরিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো সালান্ডার। পিছু হটে এসে ধপ্ ক’রে চেয়ারে বসে পড়লো ফ্রোডি।

.

লিসবেথ সালান্ডার গতরাতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা এক এক করে তাকে বলে গেলো। মার্টিন ভ্যাঙ্গারের বেসমেন্টে নির্যাতন কক্ষের ভয়ঙ্কর চিত্রটার কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলো ফ্রোডি। এর আগে কোম্পানির আর্কাইভে কি খুঁজে পেয়েছিলো সেটাও বললো, আরো বললো মার্টিনের বাবা কমপক্ষে সাতজন মহিলাকে হত্যা করেছে।

মাত্র একবারই তার কথার মাঝে ফ্রোডি বাধা দিলো। সালান্ডার কথা বলা শেষ করলেও ভদ্রলোক বেশ কয়েক মিনিট চুপ মেরে বসে থেকে অবশেষে গভীর করে দম নিয়ে বললো : “আমরা এখন কি করবো?”

“এটা তো আমার বলা ঠিক হবে না,” সালান্ডার বললো।

“কিন্তু…”

“আমি শুধু বুঝতে পারছি, হেডেস্টাডে আর কখনও আসবো না। “

“বুঝতে পারলাম না। “

“আমি চাইবো না কোনোভাবেই যেনো আমার নাম পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়। এসবের মধ্যে আমি নেই। এই পুরো ঘটনায় যেনো আমার কোনো উপস্থিতিই নেই, সেটাই আমি চাইবো। এই ঘটনার সাথে যদি আমার নামটা কোনোভাবে চলেও আসে আমি সেটা অস্বীকার করবো। বলবো আমি এখানে কখনও আসি নি। এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্নেরই জবাব আমি দেবো না।

তার দিকে ভুরু কুচকে তাকালো ফ্রোডি।

“বুঝতে পারছি না।”

“আপনার এসব বোঝার দরকার নেই।’

“তাহলে আমি কি করবো?”

“সেটা আপনি নিজেই খুঁজে বের করুন। কেবল মিকাইল আর আমাকে বাদ রাখবেন এসব থেকে।”

ফ্রোডির চেহারাটা মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।

“ব্যাপারটা এভাবে দেখুন : আপনি কেবল জানেন মার্টিন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সে যে জঘন্য এক সিরিয়াল কিলার ছিলো সেটা আপনি জানতেন না, আর তার বাড়ির বেসমেন্টে কি ছিলো না ছিলো সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণাই নেই।”

টেবিলের উপর দিয়ে চাবিটা ঠেলে দিলো তার দিকে।

“আপনার হাতে সময় আছে-অন্য কেউ মার্টিনের বাড়িতে ঢুকে বেসমেন্টের সব দেখে ফেলার আগে এখনও কিছুটা সময় আছে।”

“আমাদেরকে পুলিশে খবর দিতে হবে। “

“আমরা নয়। আপনি। চাইলে আপনি পুলিশে খবর দিতে পারেন। আপনার খুশি।”

“এই ব্যাপারটা তো কার্পেটের নীচে রেখে দেয়া যাবে না।”

“আমি বলছি না ব্যাপারটা কোথাও ধামাচাপা দিয়ে রাখা দরকার। কেবল বলছি মিকাইল আর আমাকে বাদ দিয়ে সব কিছু করবেন। আপনি যখন রুমটা আবিষ্কার করবেন তখনই বুঝতে পারবেন কার কাছে এটা বলবেন।”

“আপনি যা বলছেন সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, মানে মার্টিন মহিলাদের অপহরণ করে খুন করতো…তাহলে এমন অনেক পরিবার আছে যারা তাদের মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমরা তো এভাবে ধামাচাপা….”

“ঠিক বলেছেন। তবে এখানে একটা সমস্যা আছে। লাশগুলো নেই। হয়তো পাসপোর্ট কিংবা আইডি কার্ডগুলো পাবেন কোনো ড্রয়ারের মধ্যে। হয়তো ভিডিওটেপ দেখে কিছু ভিকটিমকে চিহ্নিতও করা যাবে। তবে আজকে কোনো সিদ্ধান্ত নেবার দরকার নেই। ব্যাপারটা ভালো ক’রে ভেবে দেখুন আগে।”

ফ্রোডির চোখেমুখে সুতীব্র ভীতি দেখা যাচ্ছে।

“ওহ্ ঈশ্বর! এটা তো পুরো কোম্পানিটাকে শেষ করে দেবে। কতো পরিবার চাকরি হারাবে ভেবে দেখুন।

সামনে পিছে দুলতে দুলতে নৈতিকতার এই সংকটটা নিয়ে ভাবতে লাগলো ফ্রোডি।

“এটা একটা ইসু। ইসাবেলা ভ্যাঙ্গার যদি উত্তরাধিকারী হয়, তাহলে ভেবে দেখুন, নিজের ছেলের এই কীর্তিকলাপ উদঘাটন করাটা তার জন্য যথার্থ হবে না।”

“আমি গিয়ে দেখি কি…”

“আমার মনে হয় আজকের জন্য ঐ ঘরটা থেকে আপনার দূরে থাকাই ভালো,” বেশ কর্কশভাবে বললো সালান্ডার। “আপনাকে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হবে। হেনরিককে গিয়ে কথাটা বলতে হবে, একটি স্পেশাল বোর্ডমিটিং ক’রে ঘোষণা দিতে হবে আপনাদের সিইও গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে।“

কথাটা বোঝার চেষ্টা করলো ফ্রোডি। তার হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছে। পুরনো একজন আইনজীবি সে। সমস্যা সমাধানে বেশ অভিজ্ঞ। তারপরেও নিজেকে অসহায় লাগছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। আচমকা তার মনে হলো এক বাচ্চা মেয়ের কাছ থেকে সে আদেশ নির্দেশ নিচ্ছে। যেভাবেই হোক এই পিচ্চি মেয়েটা পুরো পরিস্থিতি উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। তাকে গাইড লাইন দিচ্ছে কি করতে হবে না হবে।

“আর হ্যারিয়েটের ব্যাপারটা…?”

“মিকাইল এবং আমি সেটা এখনও শেষ করতে পারি নি। তবে হেনরিককে বলতে পারেন আমরা সেটা সমাধান করে ফেলছি।”

.

ব্লমকোভিস্ট ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলো সকাল ৯টার রেডিও’র খবরে মার্টিন ভ্যাঙ্গারের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর খরটাই প্রধান শিরানাম হিসেবে ঠাঁই পেয়েছে। রাতে কি ঘটেছে না ঘটেছে সেসবের কোনো কিছু নেই, শুধু বলা হলো দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। গাড়িতে সে একাই ছিলো।

স্থানীয় রেডিও ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশনের ভবিষ্যত নিয়েও আশংকা প্রকাশ করলো। কোম্পানিটি যে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে সেটাও জানালো তারা।

টিটি ওয়্যার-সার্ভিস শিরোনাম দিলো : পুরো শহর স্তম্ভিত। তারাও ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশনের ভবিষ্যত নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করলো। হেডেস্টাড শহরের ২১০০০ বাসিন্দার মধ্যে যে ৩০০০ জনই ভ্যাঙ্গারদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সেটা কারো নজর এড়িয়ে গেলো না। ফার্মের বর্তমাস সিইও মারা গেছে আর সাবেক সিইও শয্যাশায়ী। কোনো উত্তরাধিকারী নেই। কোম্পানির ইতিহাসে এটা সবচাইতে কঠিন সময়।

ব্লমকোভিস্টের ইচ্ছে হচ্ছিলো পুলিশের কাছে গিয়ে সব খুলে বলবে কিন্তু এরইমধ্যে সালান্ডার পুরো ব্যাপারটা অন্যভাবে সাজিয়ে ফেলেছে। যেহেতু পুলিশের কাছে গেলো না তাই প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে বেশ কঠিন বলে মনে হতে লাগলো, কারণ তার কিছুই করার নেই। পুরো সকালটা রান্নাঘরের টেবিলে বসে কোনো রকম কথা না বলে জানালা দিয়ে বাইরের বৃষ্টি দেখে কাটিয়ে দিলো সে। লাঞ্চটাইমের আগপর্যন্ত বৃষ্টি পড়লো। বৃষ্টি থেমে গেলে বাইরের বাগানে গিয়ে কফি নিয়ে বসলো সে। এমন একটা শার্ট পরেছে সে যার কলার তুলে রাখা হয়েছে।

মার্টিনের মৃত্যু হেডেবির জনজীবনে বেশ ভালো প্রভাবই ফেলেছে। ইসাবেলা ভ্যাঙ্গারের বাড়ির সামনে একের পর এক গাড়ি আসছে। আত্মীয়স্বজনরা সমবেদনা জানাচ্ছে তাদের। একেবারে আবেগহীনভাবে এসব দেখে যাচ্ছে সালান্ডার।

“তোমার এখন কেমন লাগছে?” জানতে চাইলো মেয়েটা।

“মনে হচ্ছে এখনও ধকল কাটিয়ে উঠতে পারি নি,” বললো সে। “আমি একেবারে অসহায় বোধ করছি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমার মনে হয়েছে আমি মারা যাবো। মৃত্যুভয় কাকে বলে এখন জানি।”

মেয়েটার হাটুর উপর হাত রাখলো সে।

‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ,” সে বললো। “তুমি না এলে আমি মারাই যেতাম।”

সালান্ডার ঠোঁট বেকিয়ে হাসলো।

“আমি বুঝতে পারছি না তুমি লোকটাকে একা একা মোকাবেলা করতে গেলে কোন আক্কেলে। ওখানে আমাকে শেকল দিয়ে বেধে রাখা হয়েছিলো। মনে মনে কামনা করছিলাম তুমি যেনো ছবিটা দেখে পুরো ব্যাপারটা বুঝে পুলিশকে খবর দাও।”

“আমি যদি পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতাম তাহলে তুমি আর বেঁচে থাকতে পারতে না। ঐ বানচোতটার হাতে তোমাকে মরতে দিতে চাই নি আমি।”

“তুমি পুলিশের সাথে কথা বলতে চাইছো না কেন?”

“আমি কখনও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের সাথে কথা বলি না।”

“কেন বলো না?”

“এটা আমার ব্যাপার। তবে তোমার জন্যেও সেটা ভালো কিছু হতো না! আমার মনে হয় না তোমার মতো এক সাংবাদিককে মার্টিনের মতো সিরিয়াল কিলারের ঘরে নগ্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখলে ভালো কিছু হতো। তুমি যদি কাল ব্লমকোভিস্ট নামটা পছন্দ না করো তাহলে নতুন আরেকটি বাজে নাম রাখতে পারো নিজের জন্য। শুধু এই অধ্যায়টি নিয়ে বীরত্বপূর্ণ কোনো কিছু বলার চেষ্টা করো না কখনও।

ভুরু কুচকে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রসঙ্গটা বাদ দিলো সে। “আমাদের এখনও একটা সমস্যা রয়ে গেছে,” বললো মেয়েটা।

মাথা নেড়ে সায় দিলো মিকাইল। “হ্যারিয়েটের কি হয়েছিলো। তাই না?” তার সামনে সালান্ডার দুটো পোলারয়েডের ছবি মেলে রাখলো। কোত্থেকে এগুলো পেয়েছে জানালো তাকে। বেশ মনোযোগের সাথে মিকাইল ছবি দুটো দেখে অবশেষে মুখ তুলে তাকালো।

“এটা সম্ভবত তার ছবি,” বললো সে। “একেবারে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না তবে শারীরিক গঠন আর চুলের রঙ দেখে মনে হচ্ছে ছবিটা তারই।”

একঘণ্টা ধরে বাগানে বসে রইলো তারা, টুকরো টুকরো অংশ জোড়া লাগিয়ে নিলো এ সময়টাতে। সব দিক থেকেই তারা খতিয়ে দেখে বুঝতে পারলো মার্টিন ভ্যাঙ্গারই ছিলো মিসিং লিঙ্ক।

ব্লমকোভিস্ট যে রান্নাঘরের টেবিলে ছবিটা রেখে গেছিলো সেটা সালান্ডার দেখতে পায় নি। সার্ভিলেন্স ক্যামেরার ফুটেজ দেখে মেয়েটা বুঝতে পেরেছিলো ব্লমকোভিস্ট বোকার মতো একটা কাজ করেছে। মার্টিনের বাড়ি গিয়ে সব জানালা বন্ধ দেখতে পায় সে। ভেতরে কেউ আছে বলে মনে হয় না। তারপরও নীচ তলার সবগুলো দরজা খোলার চেষ্টা করে যখন দেখতে পায় ওগুলো বন্ধ তখন পাইপ বেয়ে উপরতলার একটা বেলকনি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে সালান্ডার। বাড়ির ভেতর প্রতিটি ঘর খুব সন্তর্পনে খুঁজে দেখে সে। এক সময় বেসমেন্টের সিঁড়িটা খুঁজে পায়। মার্টিন একটু বেখেয়ালে বেসমেন্টে ঢোকার দরজাটা বন্ধ করে রাখতে ভুলে গিয়েছিলো। ফলে সেই দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে কি হচ্ছে সবই দেখতে পায় মেয়েটি।

ব্লমকোভিস্ট তার কাছে জানতে চাইলো মার্টিনের বলা কথাগুলো কতোটুকু শুনেছে।

“খুব বেশি না। আমি যখন উঁকি দিলাম তখন সে তোমার কাছে হ্যারিয়েটের ব্যাপারে জানতে চাচ্ছে। ঠিক তোমাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর আগমুহূর্তে সেটা। এরপর কিছুক্ষণের জন্য ওখান থেকে চলে গিয়ে আমি একটা অস্ত্র খুঁজে নিয়ে আসি।”

“হ্যারিয়েটের কি হয়েছে সে সম্পর্কে মার্টিনের কোনো ধারণাই নেই, “ বললো ব্লমকোভিস্ট।

“তুমি সেটা বিশ্বাস করো?”

“হ্যা,” কোনো রকম ইতস্তত না করেই বললো মিকাইল। “মার্টিন সিফিলিসে আক্রান্ত কোনো বেড়ালের চেয়েও বেশি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলো-নিজের সমস্ত অপরাধ সে স্বীকার করেছে আমার কাছে। মনে হয়েছে আমাকে মুগ্ধ করার জন্যই এটা করেছে সে। কিন্তু হ্যারিয়েটের প্রসঙ্গটা আসতেই সে ঘটনাটা জানার জন্য হেনরিকের মতোই উদগ্রীব হয়ে উঠলো।”

“তাহলে…এর ফলে আমরা কি ভেবে নেবো?”

“আমরা এখন জানি গটফ্রিড ১৯৪৯ সালে থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রথম সিরিজ হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে।”

“ঠিক আছে। তারপর সে যুবক মার্টিনকে এ কাজে নামায়।”

“অকার্যকর একটি পরিবারের কথা কলছি,” বললো ব্লমকোভিস্ট। “মার্টিনের আসলেই কোনো সুযোগ ছিলো না।”

অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকালো সালান্ডার।

“মার্টিন আমাকে বলেছে, সাবালক হতেই তার বাবা তাকে দিয়ে এ কাজ করাতে শুরু করে। ১৯৬২ সালে উদেভিল্লার লিয়ার হত্যাকাণ্ডের সময় সে তার বাবার সাথেই ছিলো। হায় ঈশ্বর, তার বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ! ১৯৬৪ সালে সারাকে যখন খুন করা হয় তখনও সে ছিলো, খুন করার কাজে অংশও নিয়েছিলো সে। তার বয়স তখন ষোলো।”

“আর?”

“সে বলেছে সে কখনও কোনো পুরুষ মানুষকে স্পর্শ করে নি-শুধুমাত্র তার বাব ছাড়া; তাতে করে আমার মনে হয়েছে…মানে এর একটাই অর্থ হয়, তার বাবা তাকে ধর্ষণ করেছিলো। মার্টিন এটাকে ‘তার দায়িত্ব’ বলে অভিহিত করেছে। যৌননির্যাতনের ব্যাপারটা নিশ্চয় বহুদিন ধরে চলেছিলো। বাবার কাছেই সে মানুষ হয়েছে।”

“জঘন্য ব্যাপার,” বললো সালন্ডার। তার কণ্ঠে সুতীব্র ঘৃণা।

ব্লমকোভিস্ট অবাক হয়ে চেয়ে রইলো তার দিকে। তার চোখমুখ ঘৃণায় বিকৃত হয়ে আছে। এরমধ্যে এক ছটাক সমবেদনাও নেই।”

“মার্টিনও একই কাজ করেছে। হত্যা আর ধর্ষণ। কারণ এটা করতে তার ভালো লাগতো।

“আমি অন্য কিছু বলছি না। বাবার ছায়ায় ভীতু আর মুখচোরা হিসেবে বেড়ে উঠেছিলো মার্টিন। ঠিক যেমনটি গটফ্রিড তার নাৎসি বাবার অধীনে নিগৃহীত হয়ে বেড়ে উঠেছিলো।”

“তাহলে তুমি বলতে চাচ্ছো মার্টিনের কোনো নিজস্ব ইচ্ছেশক্তি ছিলো না, মানুষকে যেভাবে গড়ে তোলা হয় সেভাবেই সে গড়ে ওঠে।”

হেসে ফেললো ব্লমকোভিস্ট। “এটা কি খুবই স্পর্শকাতর ইসু?”

সালান্ডারের চোখ দুটো জ্বলজ্বল ক’রে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে ফেললো সে।

“আমি বলতে চাচ্ছি কোনো লোককে কিভাবে গড়ে তোলা হয় সেটা অনেক ভূমিকা রাখে। গটফ্রিডের বাবা তাকে নির্দয়ভাবে বছরের পর বছর ধরে পেটাতো। এটার ফল তো ভালো হয় নি।”

“বাজে কথা,” সালান্ডার বললো। “গটফ্রিডই একমাত্র বাচ্চা নয় যার সাথে এরকম করা হয়েছিলো। এজন্যে সে নারীদের হত্যা করে বেড়াবে নাকি। এটা সে নিজেই বেছে নিয়েছে। মার্টিনের বেলায়ও এটা প্রযোজ্য।

হাত তুলে ক্ষান্ত দিলো ব্লমকোভিস্ট।

“আমরা কি ঝগড়া না করে থাকতে পারি?”

“আমি তো ঝগড়া করছি না। আমার শুধু মনে হচ্ছে এরকম শূয়োরের বাচ্চারা সব সময়ই অন্যকে দোষ দিয়ে থাকে।“

“তাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বও আছে। পরে আমরা এ নিয়ে কাজ করবো। মার্টিনের বয়স যখন ষোলো তখন তার বাবা মারা যায় ফলে তাকে গাইড করার মতো কেউ রইলো না। এটা একটা ব্যাপার। সে নিজের বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ অব্যাহত রাখে। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপসালায় সে একটা হত্যা করে।”

সালান্ডারের সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিলো ব্লমকোভিস্ট।

“গটফ্রিড কেন কিংবা কিসের জন্য নিজেকে এরকম কাজে তৃপ্ত করতো, নিজের কাজকে কিভাবে মূল্যায়ণ করতো সে হিসেবে আমি যাবো না। এসব বাইবেল সংক্রান্ত ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে দেখবেন। বিশেষ করে শাস্তি দেবার ধরণ আর শুদ্ধি করার ব্যাপারগুলোর কথা বলছি। সেগুলো কি তাতে কিছু যায় আসে না। আসল কথা হলো সে একজন সিরিয়াল কিলার।

“গটফ্রিড মহিলাদের খুন করতে চাইতো, নিজের এই কর্মকে অনেকটা ধৰ্মীয় রূপ দেবার চেষ্টা করতো সে। মার্টিন অবশ্য এরকম কোনো অজুহাত দেখানোর ভান করে নি। সে খুব সুশৃঙ্খলভাবে, সিস্টেমেটিক্যালি পদ্ধতি অনুরসণ করতো, নিজের শখ মেটানোর জন্য তার ছিলো যথেষ্ট টাকা। তার বাবার থেকেও সে অনেক বেশি চতুর ছিলো। গটফ্রিড কাউকে মেরে ফেললে তা নিয়ে পুলিশী তদন্ত হয়েছে, তার ধরা পড়ার ঝুঁকি ছিলো তাতে।”

“মার্টিন ভ্যাঙ্গার তার বাড়িটা তৈরি করে সত্তুর দশকে,” চিন্তিত হয়ে বললো সালান্ডার।

“আমার মনে হয় হেনরিক বলেছিলো ১৯৭৮ সালে ওটা বানানো হয়েছিলো। ধরে নেয়া যায় নিজের গোপন নথিপত্র আর ফাইল রাখার জন্য নিরাপদ কিছু রুম বানানোর অর্ডার দিয়েছিলো সে। জানালাবিহীন, শব্দনিরোধক আর স্টিলের দরজার ঘর আছে তার।’

“প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তার সেই ঘরটা ছিলো।”

তারা দু’জনেই চুপ মেরে গেলো। ব্লমকোভিস্ট ভাবতে লাগলো এই সিকি শতাব্দীতে কতো নারকীয় ঘটনাই না ঘটে গেছে। সালান্ডারের অবশ্য এসব ভাবার দরকার পড়লো না, ভিডিও টেপগুলো সে দেখেছে। খেয়াল করলো আনমনে ব্লমকোভিস্ট নিজের ঘাড় স্পর্শ করছে।

“গটফ্রিড নারী-বিদ্বেষী ছিলো, নিজের ছেলেকেও নারী-বিদ্বেষী হিসেবে গড়ে তুলেছিলো। একই সময় ছেলেকে ধর্ষণও করে গেছে সে। এর মধ্যে অন্য কিছুও আছে…আমার মনে হয় গটফ্রিড কল্পনা করতো তার ছেলেমেয়েরা তার মতো বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করবে। আমি যখন মার্টিনকে তার বোন হ্যারিয়েটের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম তখন সে আমাকে বলেছিলো : “আমরা তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সে ছিলো খুবই সাধারণ এক বেশ্যা। হেনরিককে সব বলে দেবার পরিকল্পনা করছিলো সে। “

“তাকে এ কথা বলতে শুনেছি আমি। ঐ সময়েই আমি বেসমেন্টে গিয়ে হাজির হই। তাহলে হেনরিককে সে কি বলতে চেয়েছিলো সেটা আমরা জেনে গেছি।”

ব্লমকোভিস্ট ভুরু কোচকালো। “ঠিক তা নয়। সময়ের হিসেবটা মাথায় রাখো। আমরা জানি না গটফ্রিড কখন তার ছেলেকে ধর্ষণ করেছিলো, তবে ১৯৬২ সালে উদেভিল্লায় লিয়া পারসনকে হত্যা করার সময় তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলো সে। ১৯৬৫ সালে সে পানিতে ডুবে মারা যায়। তার আগেই সে আর মার্টিন তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলো। এর মানে কি দাঁড়ালো?”

“গটফ্রিডকেই কেবল মার্টিন নির্যাতন করে নি। সে হ্যারিয়েটকেও নির্যাতন করেছে।”

“গটফ্রিড ছিলো শিক্ষক। মার্টিন ছিলো তার ছাত্র। তাহলে হ্যারিয়েট কি ছিলো? তাদের ক্রীড়নক?”

“গটফ্রিড তার ছেলে মার্টিনকে শিখিয়েছিলো নিজের বোনের সাথে যৌনকর্ম করতে।” সালান্ডার পোলারয়েড ছবি দুটোর দিকে ইঙ্গত করলো। “তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না তাই এ ব্যাপারটা সে কিভাবে নিয়েছিলো সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। তবে সে ক্যামেরা থেকে মুখ লুকাতে চাইছে।

“ধরা যাক তার বয়স যখন চৌদ্দ তখন থেকে এসবের শুরু। তার মানে ১৯৬৪ সাল থেকে। নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলো সে-এসব মেনে নিতে পারছিলো না কোনোভাবেই। এটাই সে হেনরিককে বলতে চেয়েছিলো। এ ব্যাপারে মার্টিনের কিছুই বলার ছিলো না, তার বাবা তাকে যা করতে বলেছিলো সে তাই করেছে। তবে সে এবং গটফ্রিড একধরণের চুক্তিতে উপণীত হয়েছিলো…তারা এসবের মধ্যে জড়াতে চেয়েছিলো হ্যারিয়েটকে।“

সালান্ডার বললো : “তুমি তোমার নোটে লিখেছো হেনরিক ১৯৬৪ সালে হ্যারিয়েটকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে।

“হেনরিক হ্যারিয়েটের পরিবারের মধ্যে উল্টাপাল্টা কিছু হচ্ছে বলে আন্দাজ করতে পেরেছিলো। সে ভেবেছিলো গটফ্রিড আর ইসাবেলার মধ্যে যে সমস্যা হচ্ছে সেটাই সন্তানদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সেজন্যেই নিজের কাছে তাকে নিয়ে আসে যাতে করে শান্তিতে থাকতে পারে, ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে

“গটফ্রিড আর মার্টিনের জন্য অপ্রত্যাশিত একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায় ব্যাপারটা। তারা আর মেয়েটাকে দিয়ে কিছু করাতে পারতো না। আচ্ছা…এই যৌন অনাচারগুলো কোথায় সংঘটিত হতো?”

“সম্ভবত গটফ্রিডের কেবিনে। আমি একদম নিশ্চিত এই সব ছবি ওখানেই তোলা হয়েছে-এটা চেক ক’রে দেখা সম্ভব। কেবিনটা একেবারে গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জায়গায় অবস্থিত। একদম নিরিবিলি। এরপর গটফ্রিড একদিন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়।”

“তো, হ্যারিয়েটের বাবা নিজের মেয়ের সাথে সেক্স করার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু আমার মনে হয় না সে হ্যারিয়েটকে দিয়ে খুনখারাবি শুরু করাতে পেরেছিলো।”

ব্লমকোভিস্ট বুঝতে পারছে এটা খুবই দুর্বল যুক্তি। হ্যারিয়েট তার ডেটবুকে গটফ্রিডের হাতে নিহত মেয়েদের নাম লিখে রেখেছিলো বাইবেলের উদ্ধৃতির পাশে। কিন্তু বাইবেলের প্রতি তার আগ্রহ জীবনের শেষ বছরের আগে দেখা যায় নি। ততোদিনে গটফ্রিড মারা গেছে। একটু থেমে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলো সে।

“কোনো এক সময় হয়তো হ্যারিয়েট বুঝতে পেরেছিলো তার বাবা গটফ্রিড শুধু নিজের মেয়ের সাথে অনাচার করতেই আগ্রহী নয় বরং সে একজন ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার, যে কিনা যৌননির্যাতন করার পর শিকারকে খুন করে,” বললো মিকাইল।

“আমরা জানি না সে কখন হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছিলো। তার বাবা গটফ্রিডের মৃত্যুর পর পর হতে পারে, আবার মৃত্যুর আগেও হতে পারে সেটা। বাবার রেখে যাওয়া পেপার কাটিং কিংবা ডায়রি থেকেও জানতে পারে।”

“কিন্তু হেনরিককে বলে দেবার যে হুমকি দিয়েছিলো এটা সে রকম কিছু ছিলো না,” ব্লমকোভিস্ট বললো।

“মার্টিনের ব্যাপারে বলতে চেয়েছিলো সে,” সালান্ডার বললো। “তার বাবা মারা গেলেও মার্টিন তাকে নিপীড়ন করতে থাকে।”

“ঠিক বলেছো।”

“কিন্তু সেটা তো তার কানো রকম পদক্ষেপ নেবার এক বছর আগের ঘটনা।”

“তুমি যদি জানতে পারো তোমার বাবা একজন খুনি, এবং সে তোমার ভাইকে ধর্ষণ করে যাচ্ছে তাহলে তুমি কি করবে? “

“আমি সেই বানচোতটাকে খুন করতাম,” একেবারে শান্ত কণ্ঠে বললো সালান্ডার। ব্লমকোভিস্টও বিশ্বাস করে মেয়েটা তাই করতো। মার্টিনকে আঘাত করার সময় তার ভয়ঙ্কর রূপ দেখেছে সে। মুখ টিপে হেসে ফেললো মিকাইল।

“ঠিক আছে, কিন্তু হ্যারিয়েট তো তোমার মতো ছিলো না। মেয়েটা কিছু করার আগেই গটফ্রিড মারা যায়। গটফ্রিডের মৃত্যুর পর মার্টিনকে উপসালায় পাঠিয়ে দেয় ইসাবেলা। সে হয়তো ক্রিসমাস কিংবা অন্য কোনো ছুটিতে বাড়ি আসতো। তবে সেই সময়গুলোতে হ্যারিয়েটের সাথে তার খুব একটা দেখা হতো না। তার কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম ছিলো সে।”

“হ্যারিয়েট বাইবেল পড়তে শুরু করে তখন।”

“এখন আমরা জানতে পেরেছি এটা সে ধর্মীয় আবেগ থেকে করে নি। হয়তো সে জানতে চেয়েছিলো তার বাবা কিসের মধ্যে জড়িয়ে আছে। ১৯৬৬ সালের শিশুদের প্যারেডের দিনের আগপর্যন্ত এটা নিয়ে সে উদ্বিগ্ন ছিলো। এরপর আচমকা তার ভাইকে ইয়ার্নভাগাটানে দেখে বুঝতে পারে সে ফিরে এসেছে। আমরা জানি না তাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা হয়েছিলো কিনা। যাইহোক না কেন, হ্যারিয়েট তাড়াহুড়া করে বাড়ি ফিরে আসে হেনরিককে সব বলে দেবার জন্য।”

“এরপরই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”

.

সব ঘটনা আর ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ ক’রে ব্লমকোভিস্ট আর সালান্ডার বুঝতে পারলো পাজলের বাকি অংশগুলো কি। তারা দু’জনেই নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে নিলো। চলে যাবার আগে ব্লমকোভিস্ট ফোন করলো ফ্রোডিকে। সে জানালো কিছু দিনের জন্য সে আর সালান্ডার বাইরে যাচ্ছে, তবে যাবার আগে হেনরিক ভ্যাঙ্গারের সাথে দেখা করতে চাইছে।

ব্লমকোভিস্টকে জানতে হবে ফ্রোডি কি বলেছে হেনরিককে। টেলিফোনে লোকটার কণ্ঠ এতোটাই ভঙ্গুর শোনালো যে তাকে নিয়ে কিছুটায় চিন্তায় পড়ে গেলো সে। ফ্রোডি জানালো হেনরিককে মার্টিনের মৃত্যুসংবাদ জানানো হয়েছে।

হেডেস্টাড হাসপাতালের বাইরে ব্লমকোভিস্ট যখন গাড়িটা পার্ক করলো আকাশে তখন বজ্রপাতের খেলা চলছে। ঘন মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ।

বাথরোব পরে আছে ভ্যাঙ্গার। নিজের ঘরের জানালার সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে সে। ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। তারা হাত মেলালো। নার্সকে কিছুক্ষনের জন্য বাইরে যেতে বললো ভ্যাঙ্গার।

“তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছো,” ভ্যাঙ্গার বললো।

মাথা নেড়ে সায় দিলো মিকাইল। “কারণ আপনার পরিবার চাচ্ছে না আমি এখানে আসি। তবে আজকে সবাই ইসাবেলার ওখানে গেছে তাই এসেছি।”

“বেচারা মার্টিন,” বললো ভ্যাঙ্গার।

“হেনরিক। আপনি হ্যারিয়েটের ব্যাপারে সত্য উদঘাটন করার জন্য আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন। আপনি কি সেই সত্যটা জানতে চান?”

তার দিকে তাকালো বৃদ্ধ। বিস্মিত হলো যেনো।

“মার্টিন?”

“সেও গল্পটার অংশ।”

দুচোখ বন্ধ করে ফেললো হেনরিক।

“আপনার কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে,” বললো ব্লমকোভিস্ট।

“বলো।”

“আপনি কি এখনও জানতে চান তার কি হয়েছিলো? এমনকি সেটা খুব যন্ত্রণাদায়ক হলেও?”

স্থিরচোখে চেয়ে রইলো হেনরিক তার দিকে। “আমি জানতে চাই। এটাই তোমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিলো।”

“ঠিক আছে। মনে হচ্ছে এখন আমি জানি হ্যারিয়েটের কি হয়েছিলো। তবে আমি নিশ্চিত হবার আগে পাজলের একটা অংশ খুঁজে বের করতে হবে।”

“আমাকে বলো।”

“না। আজকে নয়। আমি চাই আপনি এখন বিশ্রাম নিন। ডাক্তার বলেছে আপনি সেরে উঠছেন।”

“আমার সাথে বাচ্চাছেলের মতো ব্যবহার কোরো না, ইয়াংম্যান।”

“আমি পুরোটা উদঘাটন করতে পারি নি। আমার কাছে কেবল একটা তত্ত্ব আছে। পাজলের শেষ অংশটা আমি খুঁজে বের করবো খুব শীঘ্রই। এরপর আপনি যখন আমাকে দেখতে পাবেন বুঝতে পারবেন আমি পুরো গল্পটা নিয়ে হাজির হয়েছি। একটু সময় লাগতে পারে, তবে আপনি জেনে রাখুন আমি ফিরে আসবো, সত্যটা উদঘাটন করে চলে আসবো আপনার কাছে।”

.

সালান্ডার তার বাইকটা কেবিনের পাশে ছায়াঘন একটা অংশে রেখে তারপলিন দিয়ে ঢেকে ব্লমকোভিস্টের ধার করা গাড়িটাতে উঠে বসলো + নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বজ্রপাত শুরু হয়েছে আবার। গাড়িটা পথে নামতেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়ে গেলে রাস্তার সামনের দৃশ্য দেখতে বেগ পেতে হলো ব্লমকোভিস্টের। নিরাপত্তার খাতিরে রাস্তার পাশে একটা পেট্রলপাম্পে গাড়িটা পার্ক করে রাখলো সে। ফলে ঠিক ৭টা বাজে স্টকহোমে পৌছাতে পারলো না তারা। ব্লমকোভিস্ট তার ভবনের সিকিউরিটি কোডটা সালান্ডারকে দিয়ে পথে নামিয়ে দিলো তাকে। নিজের অ্যাপার্টমেন্টে এসে তার কাছে খুব অচেনা বলে মনে হলো।

সালান্ডার এখন প্লেগের সাথে দেখা করতে গেছে, এই ফাঁকে ঘরের ধুলোবালি পরিস্কার করতে শুরু করলো সে। মাঝরাতের দিকে মেয়েটা ফিরে এলো তার অ্যাপার্টমেন্টে। ঘরে ঢুকেই ভুরু কুচকে চারপাশটা দেখে নিলো একবার। এরপর জানালার সামনে দাঁড়িয়ে স্লাসেন লকটার দিকে তাকিয়ে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ সময়।

শরীর থেকে সব পোশাক খুলে ফেলে তারা দু’জনেই বিছানায় চলে গেলো ঘুমানোর জন্য।

.

পরের দিন দুপুরে তারা পৌছে গেলো লন্ডনের গ্যাটউইক এয়ারপোর্টে। ওখানেও বৃষ্টি তাদের পিছু ছাড়লো না। হাইড পার্কের কাছে হোটেল জেমসে একটা রুম বুক করলো ব্লমকোভিস্ট।

৫টার দিকে তারা যখন বারে দাঁড়িয়ে আছে তখন অল্পবয়সী এক ছেলে এলো তাদের কাছে। তার মাথাটা প্রায় টেকো, সোনালি রঙের দাড়ি আর পরে আছে এমন একটি জিন্স জ্যাকেট যা তার সাইজ থেকে অনেক বড়।

“ওয়াস্‌প?”

“ট্রিনিটি?” বললো মেয়েটা। তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলো। ছেলেটা ব্লমকোভিস্টের নাম জানতে চাইলো না।

ট্রিনিটি তার পার্টনারকে বব দ্য ডগ নামে পরিচয় করিয়ে দিলো। একটা পুরনো ফক্স ওয়াগন গাড়ি নিয়ে এসেছে সে। তারা সবাই গাড়িটার স্লাইডিং ডোর দিয়ে ভেতরে ঢুকে ফোল্ডিং চেয়ারে বসে পড়লো। বর যখন লন্ডনের পথঘাটের যানবাহন এড়িয়ে গাড়িটা চালিয়ে যাচ্ছে তখন ওয়াপ কথা বলতে লাগলো ট্রিনিটির সাথে।

“প্লেগ বললো এটা নাকি ক্র্যাশ-ব্যাং কাজের মতো কিছু একটা।

“টেলিফোন ট্যাপিং আর একটা কম্পিউটার থেকে ই-মেইল চেকিং করতে হবে। খুব দ্রুত কিংবা কয়েক সপ্তাহের ব্যাপারও হতে পারে সেটা। নির্ভর করে কি পরিমাণ প্রেসার দিতে পারে সে।” বুড়ো আঙুল দিয়ে ব্লমকোভিস্টের দিকে ইঙ্গিত করলো সালান্ডার। “কাজটা কি করতে পারবে?’

“না পারার তো কিছু দেখছি না!” বললো ট্রিনিটি।

.

আনিটা ভ্যাঙ্গার থাকে সেন্ট আলবান্সের চমৎকার একটি এলাকায়। সেদিন রাত ৭:৩০-এর দিকে ভ্যান থেকে তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখলো তারা। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো যাতে করে রাতের খাবার খেয়ে নিতে পারে মহিলা। ব্লমকোভিস্ট যখন তার দরজায় নক করলো তখন সে টিভি দেখছে।

অবিকল সিসিলিয়া ভ্যাঙ্গারের মতো দেখতে এক মহিলা দরজা খুললো। তার চোখেমুখে ভদ্রতা থাকলেও প্রচ্ছন্ন একটা প্রশ্ন আছে তাতে।

“হাই, আনিটা। আমার নাম মিকাইল ব্লমকোভিস্ট। হেনরিক ভ্যাঙ্গার আমাকে আপনার সাথে দেখা করতে বলেছে। আশা করি আপনি মার্টিনের দুঃসংবাদটি শুনেছেন।”

তার অভিব্যক্তি বিস্ময় থেকে উদ্বিগ্নতায় রূপান্তরিত হলো। সে ভালো করেই জানে মিকাইল ব্লমকোভিস্ট কে। তবে হেনরিকের নামটা বলা মানে তাকে বাধ্য হয়ে ঘরে ঢুকতে দেয়া। মহিলা তাকে লিভিংরুমে বসতে দিলো।

“এভাবে হুট করে চলে এসে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা করবেন, আমি আসলে আলবান্সে ছিলাম, আপনাকে ফোন করে পাবার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পাই নি।”

“বুঝতে পেরেছি। এবার বলুন আমার কাছে কেন এসেছেন?”

“আপনি কি শেষকৃত্যে যাবার কথা ভাবছেন? “

“না। সত্যি বলতে কি মার্টিনের সাথে আমার তেমন একটা ঘনিষ্ঠতা ছিলো না। তাছাড়া এ মুহূর্তে এখান থেকে চলে যেতেও পারছি না। আমার কাজ আছে।

আনিটা ভ্যাঙ্গার ত্রিশ বছর ধরে হেডেস্টাড ছেড়ে লন্ডনে বাস করছে। তার বাবা হেডেবি আইল্যান্ডে চলে আসার পর থেকে ওখানে আর থাকে নি। যায় ও খুব কম।

“আমি জানতে চাই হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গারের কি হয়েছিলো। সময় এসেছে সত্যটা জানার।”

“হ্যারিয়েট? আমি বুঝতে পারছি না আপনি কি বলতে চাচ্ছেন।”

মহিলার বিস্ময় ভাব দেখে মুচকি হাসলো সে।

“আপনি ছিলেন হ্যারিয়েটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আপনাকে সে তার জীবনের ভয়ঙ্কর ঘটনাটা বলে গেছে।”

“আমি আসলেই বুঝতে পারছি না আপনি কি বলছেন,” বললো আনিটা।

“আনিটা, ঐ দিন আপনি হ্যারিয়েটের ঘরে ছিলেন। আমার কাছে এর ফটোগ্রাফিক প্রমাণ আছে। ইন্সপেক্টর মোরেলকে আপনি মিথ্যে বলেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যে আমি হেনরিকের কাছে পুরো ব্যাপারটা রিপোর্ট করবো। ভালো হয় আপনি যদি এখনই আমাকে বলেন ঐদিন আসলে কি হয়েছিলো।”

উঠে দাড়ালো আনিটা ভ্যাঙ্গার।

“আমার বাড়ি থেকে এক্ষুণি বের হয়ে যান।”

ব্লকোভিস্ট উঠে দাঁড়ালো।

“আজহোক কাল হোক আপনাকে এটা বলতেই হবে।

“আপনার কাছে বলার মতো কিছুই নেই আমার। বেরিয়ে যান।”

“মার্টিন মারা গেছে,” বললো ব্লমকোভিস্ট। “আপনি কখনও মার্টিনকে পছন্দ করতেন না। আমার মনে হয় আপনি যে লন্ডনে চলে এসেছেন সেটা কেবল আপনার বাবার কাছ থেকে দূরে থাকার জন্যই না, বরং আপনি চেয়েছিলেন মার্টিনের কাছ থেকেও দূরে থাকতে। তার মানে আপনিও মার্টিনের সম্পর্কে সব জানেন। আর এটা আপনাকে বলেছে হ্যারিয়েট। প্রশ্ন হলো : এটা জানার পরও আপনি কি করেছেন?”

আনিটা ভ্যাঙ্গার তার মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দিলো সশব্দে।

.

ব্লমকোভিস্টের শার্টের ভেতর থেকে মাইক্রোফোনটা খোলার সময় তৃপ্তির হাসি হাসলো সালান্ডার।

“দরজা বন্ধ করার বিশ সেকেন্ড পরই সে ফোনটা করেছে,” বললো সে।

“কান্ট্রি কোডটা ছিলো অস্ট্রেলিয়ার,” কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে রেখে ট্রিনিটি বললো। “এরিয়া কোড চেক ক’রে দেখতে হবে এখন।” ল্যাপটপটা চালু করলো সে। “ঠিক আছে। মহিলা এই নাম্বারটায় ফোন করেছে। এটা অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলের অ্যালিস স্প্রিংসের টেনান্ট ক্রিক শহরের একটি নাম্বার। তাদের কথাবার্তাটা কি শুনতে চান?”

সায় দিলো ব্লমকোভিস্ট। “অস্ট্রেলিয়ায় এখন ক’টা বাজে?”

“প্রায় ভোর ৫টা।” ট্রিনিটি একটা ডিজিটাল প্লেয়ার চালু করে দিলো। আটবার রিং হবার পর ফোনটা তুলে নিলো কেউ। ইংরেজিতে কথাবার্তা হলো।

“হাই, আমি বলছি।”

“হুমমম, আমি খুব সকালে উঠি কিন্তু তাই বলে…”

“তোমাকে গতকাল ফোন করার কথা ভাবছিলাম…মার্টিন মারা গেছে। গত পরশু একটা ট্রাকের সাথে তার গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করেছে।”

কোনো সাড়া শব্দ নেই। তারপর গলা খাকারি দেবার শব্দ শোনা গেলো। “ভালো।”

“কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। হেনরিক যে হারামজাদা সাংবাদিককে তদন্ত করতে নিয়েজিত করেছে সে আমার এখানে এসেছিলো একটু আগে। ১৯৬৬ সালে কি হয়েছে সে ব্যাপারে আমার কাছে জানতে চেয়েছিলো লোকটা। সে কিছু জেনে গেছে।”

আবারো নীরবতা। তারপর অনেকটা কর্তৃত্বের সুরে কণ্ঠটা বললো।

“আনিটা। ফোনটা নামিয়ে রাখো। এক্ষুণি। কিছুদিন আমাদের মধ্যে কোনো রকম যোগাযোগ থাকবে না “কিন্তু…”

“চিঠি লেখো। কি হচ্ছে না হচ্ছে আমাকে জানিও।” এরপরই লাইনটা কেটে গেলো।

“খুব চালাক,” বললো সালান্ডার।

১১টা বাজার কিছু আগে হোটেলে ফিরে এলো তারা। ফ্রন্ট ডেস্কের ম্যানেজার অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী ফ্লাইট রিজার্ভ করতে বেশ সাহায্য করলো তাদের। তাদের প্লেনটা পরদিন সকাল ৭:০৫-এ ছাড়বে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে। মাঝে যাত্রাবিরতি করবে সিঙ্গাপুরে।

.

এটা সালান্ডারের প্রথম লন্ডন সফর। হাটতে হাটতে হোটেল থেকে একটু দূরে ওল্ড কম্পটন স্টুটের একটা ক্যাফে গিয়ে বসলো তারা। ৩টার দিকে আবার ফিরে এলো হোটেলে লাগেজ গোছগাছ করতে। ব্লমকোভিস্ট হোটেলের বিল পরিশোধ করার সময় সালান্ডার মোবাইল ফোনটা চালু করে একটা টেক্সট মেসেজ পড়তে শুরু করলো।

“আরমানস্কি বলছে তাকে এক্ষুণি ফোন করতে।”

“লবি থেকে একটা ফোন ব্যবহার করলো সে। তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লমকোভিস্ট দেখতে পেলো মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো মুহূর্তে। সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে চলে এলো মিকাইল।

“কি হয়েছে?”

“আমার মা মারা গেছে। আমাকে এক্ষুণি সুইডেনে ফিরে যেতে হবে

সালান্ডারকে এতোটাই বিষণ্ন দেখালো যে তার কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্ত না দিলো ব্লমকোভিস্ট। কিন্তু তার হাতটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো সে।

হোটেলের বারে গিয়ে তারা বসলো। ব্লমকোভিস্ট যখন বললো অস্ট্রেলিয়া সফর বাতিল করে দিয়ে সেও তার সাথে সুইডেনে ফিরে যাবে তখন সে মাথা দুলিয়ে না করলো।

“না,” বললো সে। “আমরা আমাদের কাজটার বারোটা বাজাতে পারি না। তুমি একাই যাও সেখানে। “

হোটেলের বাইরে এসে তারা দু’জন দু’দিকে পাড়ি দিলো।

অধ্যায় ২৬

মঙ্গলবার, জুলাই ১৫-বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৭

ব্লমকোভিস্ট মেলবোর্নে নেমেই অ্যালিস স্প্রিংসে রওনা হয়ে গেলো। স্প্রিংসে পৌছে গন্তব্যের বাকি ২৫০ মাইল ট্যাক্সিতে ক’রে পাড়ি দিলো সে।

জওয়া নামের এক অজ্ঞাত লোক তার জন্য একটি এনভেলপ রেখে গিয়েছিলো মেলবোর্ন বিমানবন্দরে। সম্ভবত লোকটা প্লেগ কিংবা ট্রিনিটির রহস্যময় আর্ন্তজাতিক নেটওয়ার্কের কেউ হবে।

যে নাম্বারে আনিটা ফোন করেছিলো সেটা কোচরান ফার্ম নামের একটি এলাকার। একটি বিশাল ভেড়ার খামার। ইন্টারনেট থেকে এ সংক্রান্ত একটি আর্টিকেলও ছিলো সেই এনভেলপে।

অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখের মতো, তার মধ্যে ভেড়ার খামারি আছে আনুমানিক ৫৩০০০। মোট ভেড়ার সংখ্যা ১২০ কোটির মতো। বছরে উলের রপ্তানী হয় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। ৭০০ মিলিয়ন টন ভেড়ার মাংসও রপ্তানী করে দেশটি, সেইসাথে ভেড়ার চামড়া। মাংস আর উল উৎপাদন সেই দেশের উল্লেখযোগ্য রপ্তানী খাত…

কোচরান ফার্মটি ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করে জেরেমি কোচরান নামের এক ভদ্রলোক। এটি অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম কৃষিজখামার। প্রায় ৬০০০০ মেরিনো ভেড়া আছে তাদের (যাদের লোম থেকে ভালো মানের উল তৈরি করা হয়)। খামারে গরু, শূকর আর মুরগিও লালন পালন করা হয়। আমেরিকা, জাপান, চায়না আর ইউরোপে রপ্তানী করে থাকে কোচরান ফার্ম।

ব্যক্তিত্ত্বের জীবনীটা আরো দারুণ।

১৯৭২ সালে ফার্মটি রেমন্ড কোচরান থেকে স্পেন্সার কোচরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্পেন্সার কোচরান অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট। ১৯৯৪ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে এটি দেখাশোনা করেন তার বিধবা স্ত্রী। কোচরান ফার্মের ওয়েবসাইট থেকে মহিলার একটি ছবি ডাউন লোড করা হয়েছে, তবে ছবিটা অস্পষ্ট আর নীচু মানের রেজুলেশনের। ছোটো করে কাটা সোনালি চুলের মহিলা ভেড়া কোলে নিয়ে ছবি তুলেছে। ভেড়ার শরীরের আড়ালে তার অর্ধেক মুখ ঢাকা।

জওয়ার নোট অনুযায়ী মহিলা ১৯৭১ সালে স্পেন্সারকে বিয়ে করেছেন।

তার নাম আনিটা কোচরান।

রাতের বেলাটা ওয়ানাডো নামের ছোট্ট একটি শহরের এক পাবে থামলো ব্লমকোভিস্ট। স্থানীয় কিছু লোকজনের সাথে বসে ভেড়ার মাংস আর মদ পান করলো সে, স্থানীয়রা তাকে ‘মেট’ নামে ডাকলো।

রাতে বিছানায় শুতে যাবার আগে নিউইয়র্কে অবস্থানরত এরিকা বার্গারকে ফোন করলো সে।

“আমি খুব দুঃখিত, রিকি, অনেক ব্যস্ত ছিলাম তাই তোমাকে ফোন করতে পারি নি।”

“এসব কি হচ্ছে, মিক?” রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়লো সে। “ক্রিস্টার আমাকে ফোন করে জানালো মার্টিন ভ্যাঙ্গার নাকি দুর্ঘটনায় মারা গেছে।”

“লম্বা কাহিনী।”

“তুমি আমার ফোন ধরছো না কেন? আমি পাগলের মতো তেমাকে ফোন করে যাচ্ছি এ ক’দিন।”

“এখানে আমার ফোনটা কাজ করবে না।

“এখানে মানে কোন্‌খানে?”

“এখন আমি আছি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে আড়াইশ’ মাইল দূরের এক শহরে।”

মিকাইল এইমধ্যে এরিকাকে অবাক করতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু এ কথা শোনার পর টানা কয়েক সেকেন্ড চুপ মেরে রইলো সে।

“তুমি ওখানে কি করছো? আমি কি সেটা জানতে পারি?”

“আমি আমার কাজটা শেষ করতে এসেছি। কয়েক দিনের মধ্যে ফিরে আসছি। তোমাকে শুধু এটুকু জানাতে চাচ্ছি যে হেনরিকের কাছ থেকে যে কাজটা নিয়েছিলাম সেটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।”

.

পরের দিন দুপুরে কোচরানে এসে পৌছালো সে। ওখান থেকে জানতে পারলো আনিটার ভেড়ার খামারটা আরো পচাত্তর মাইল পশ্চিমে মাকাওয়াকা নামক একটি এলাকায় অবস্থিত।

মাকাওয়াকার একটি ভেড়ার খামারে পৌছে এক লোককে আনিটা কোচরানের কথা জিজ্ঞেস করতে সে জানালো তাদের বস্ আরো আঠারো মাইল ভেতরে একটি খামারে আছে এখন। সেই লোকটা জিপে করে সেখানেই যাচ্ছে সুতরাং ব্লমকোভিস্ট তার জিপে উঠে গেলো।

জেফ নামের সেই লোকটাকে ধন্যবাদ জানালো মিকাইল। জানতে পারলো সে এখানকার খামারের ম্যানেজার। জিপ চলতে চলতে তাদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হলো, আর তা থেকে ব্লমকোভিস্ট জানতে পারলো এরা খামারকে স্টেশন নামে ডাকে।

“আমি যতোটুকু শুনেছি কোচরান খামারটি অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বৃহৎ খামার।

“অস্ট্রেলিয়াতে আমরাই সবচাইতে বড় খামার,” গর্বভরা কণ্ঠে বললো জেফ।

তারা দুটো পাহাড়ের মাঝখানে সংকীর্ণ একটি জায়গায় এসে পড়তেই গুলির শব্দ শুনতে পেলো ব্লমকোভিস্ট। সামনেই দেখতে পেলো অসংখ্য মৃত ভেড়া স্তুপ ক’রে রাখা হয়েছে। কয়েক জন লোকের হাতে রাইফেল। ভেড়াগুলো গুলি করে মারা হচ্ছে এখানে।

তার মনে পড়ে গেলো বাইবেলে ভেড়া বলি দেবার কথাগুলো।

এরপরই সে দেখতে পেলো ছোটো করে ছাটা সোনালি চুলের এক মহিলাকে, জিন্স আর লাল-সাদা চেক শার্ট পরে আছে সে। জেফ তার জিপটা মহিলার কাছে নিয়ে থামালো।

“হাই, বস। আমাদের এখানে একজন টুরিস্ট এসেছে,” বললো সে।

জিপ থেকে নেমে মহিলার দিকে তাকালো ব্লমকোভিস্ট। মহিলাও তার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।

“হাই, হ্যারিয়েট। অনেক দিন পর আপনাকে দেখলাম,” কথাটা সে সুইডিশ ভাষায় বললো।

আনিটা কোচরানের খামারে কাজ করা কোনো লোকই তার এ কথাটার অর্থ বুঝতে পারলো না। তবে সবাই মহিলার প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু পিছিয়ে গেলো আনিটা। একেবারে হতবুদ্ধিকর দেখাচ্ছে তাকে। আশেপাশে যেসব কর্মচারি হাসি ঠাট্টা করছিলো তারা চুপ মেরে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। কয়েকজন তাদের দিকে এগিয়েও আসতে লাগলো। জেফের বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব পাল্টে গেলো মুহূর্তে। সে অনেকটা তেড়েই এলো ব্লমকোভিস্টের দিকে।

ব্লমকোভিস্ট ভালো করেই জানে সে একেবারে নাজুক অবস্থায় আছে। আনিটার মুখ থেকে একটা শব্দ বের হলেই তার প্রাণবায়ু চলে যাবে।

তবে এই কঠিন মুহূর্তটার অবসান হলো যখন হাত তুলে তার লোকজনদেরকে অভয় দিলো আনিটা কোচরান। লোকগুলো এবার পিছু হটে গেলো। ব্লমকোভিস্টের আরো কাছে এসে তার চোখের দিকে তাকালো মহিলা। তার মুখে ঘাম আর ধুলোবালি লেগে আছে। সোনালি চুলগুলোর গোড়া কালচে দেখাচ্ছে সামনে থেকে। বয়স হয়ে গেছে তাই মুখে বলিরেখা পড়েছে তবে যৌবনের সৌন্দর্য এখনও অনেকটা অম্লান।

“আপনার সাথে কি আমার আগে থেকে পরিচয় ছিলো?” জানতে চাইলো মহিলা।

“হ্যা। ছিলো। আমি মিকাইল ব্লমকোভিস্ট। আমার বয়স যখন তিন বছর তখন এক গ্রীষ্মে আপনি আমার বেবিসিটার ছিলেন। তখন আপনার বয়স বারো কি তেরো হবে।”

তার হতবুদ্ধিকর অভিব্যক্তিটা পরিস্কার হতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেলো, তারপরই দেখতে পেলো মহিলা স্মরণ করতে পারছে। খুব অবাক দেখাচ্ছে তাকে।

“তুমি কি চাও?”

“হ্যারিয়েট, আমি আপনার শত্রু নই। আপনাকে সমস্যায় ফেলার জন্য আমি এখানে আসি নি। তবে আপনার সাথে আমার কথা বলার দরকার আছে।

জেফের দিকে ফিরলো সে, তাকে বললো ফার্মটা তদারকি করতে, এরপর ব্লমকোভিস্টকে তার সাথে আসার জন্য ইশারা করলো। কয়েকশ’ ফিট দূরে গাছের নীচে একটা সাদা তাবুর দিকে এগিয়ে গেলো তারা দু’জনে। ওখানে একটা চেয়ারে তাকে বসতে দিয়ে তাবুর ভেতর থেকে হাতমুখ ধুয়ে জামা পাল্টিয়ে দুটো বিয়ার নিয়ে ফিরে এলো হ্যারিয়েট।

“তাহলে কথা বলো।“

“ভেড়াগুলো গুলি করে মারছেন কেন?”

“সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বেশিরভাগ ভেড়াই ভালো আছে কিন্তু মহামারির ঝুঁকি নিতে পারি না আমরা। সামনের সপ্তাহে ছয়শ’র মতো ভেড়া মেরে ফেলা হবে। সুতরাং বুঝতেই পারছো আমার মনমেজাজ ভালো নেই।”

ব্লমকোভিস্ট বললো : “আপনার ভাই কয়েক দিন আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই তার মৃত্যু হয়েছে মনে হয়।”

“খবরটা আমি শুনেছি।”

“আনিটার কাছ থেকে। সে-ই আপনাকে ফোন করেছিলো।”

অনেকক্ষণ ধরে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো সে। তারপর মাথা নেড়ে সায় দিলো, বুঝতে পারছে অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই।

“তুমি কিভাবে জানলে? “

“আমরা আনিটার ফোন ট্যাপ করেছিলাম।” মিথ্যে বলার কোনো কারণ আছে বলে মনে করলো না ব্লমকোভিস্ট। “আপনার ভাই মারা যাবার কয়েক মিনিট আগে আমার সাথে দেখা হয়েছিলো।”

হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার বেশ অবাক হলো কথাটা শুনে। এরপর মিকাইল তার গলা থেকে দেখতে হাস্যকর একটা মাফলার খুলে শার্টের কলার সরিয়ে গলায় ফাঁস দেবার দাগটা দেখালো তাকে। এখনও বেশ লালচে হয়ে আছে। সম্ভবত এই দাগটা থেকেই যাবে। তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে মার্টিন ভ্যাঙ্গারের কথা।

“আপনার ভাই আমাকে একটা হুকের সাথে ঝুলিয়ে ফেলেছিলো কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় ঠিক সময় আমার পার্টনার চলে আসাতে আমি বেঁচে গেছি।”

হ্যারিয়েটের চোখ দুটো হঠাৎ করে জ্বলজ্বল ক’রে উঠলো।

“আমার মনে হয় শুরু থেকে পুরো গল্পটা তোমার বলা উচিত।”

.

এক ঘণ্টার মতো লেগে গেলো। নিজের পরিচয় আর কি নিয়ে কাজ করছে সব বললো হ্যারিয়েটকে। হেনরিক ভ্যাঙ্গার তাকে যে অ্যাসাইনমেন্টটা দিয়েছে সেটাও বিস্তারিত বললো। পুলিশের তদন্ত কিভাবে মুখ থুবরে পড়েছিলো সেটাও জানালো তাকে। শেষে জানালো তার বন্ধুদের সাথে ইয়ার্নভাগসগাটানে তোলা একটা ছবি থেকে কিভাবে সূত্রটা পেয়েছে সে।

কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। লোকজন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। চারপাশে আগুন জ্বালানো শুরু হয়ে গেলো। ব্লমকোভিস্ট লক্ষ্য করলো জেফ তার বসের সাথেই থেকে গেলো। তার দিকে কড়া নজর রাখছে সে। কুক তাদের জন্য ডিনার পরিবেশন করলো। ডিনার শেষে আবারো বিয়ার পান করলো তারা। তার সব কথা বলা শেষ হলে হ্যারিয়েট দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললো না। উদাস হয়ে চুপ মেরে থাকলো।

অবশেষে মুখ খুললো সে : “আমার বাবা যে মারা গেছিলো তাতে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। বর্বরতার সমাপ্তি ঘটেছিলো বলতে পারো। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কখনও ভাবি নি মার্টিন…তার মৃত্যুতে আমি খুশিই হয়েছি।”

“আমিও সেটা বুঝতে পারছি।”

“কিন্তু তোমার গল্প শুনে তো বুঝতে পারছি না আমি যে বেঁচে আছি সেটা কিভাবে জানতে পারলে তুমি।”

“কি ঘটেছে সেটা যখন জানতে পারলাম তখন বাকিটা বুঝে নিতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় নি। উধাও হয়ে যাবার জন্য আপনার সাহায্যের দরকার ছিলো। আনিটা ছিলো আপনার ঘণিষ্ঠ বান্ধবী। একমাত্র তাকেই আপনি বিশ্বাস করতেন। তার সাথেই গ্রীষ্মকালটা কাটিয়েছেন। আপনার বাবার কেবিনেও তার সাথে কিছুদিন থেকেছেন। কারো কাছে যদি আপনি সব বলে থাকেন সেটা একমাত্র আনিটা ছাড়া আর কেউ না। তাছাড়া আনিটা সেই সময় তার ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছিলো হাতে।”

দুর্বোধ্য অভিব্যক্তি নিয়ে তার দিকে তাকালো হ্যারিয়েট।

“তো এখন তো তুমি জেনে গেছো আমি জীবিত। এবার তুমি কি করবে?”

“হেনরিককে এটা বলতে হবে। তার এটা জানা দরকার।

“তারপর? তুমি তো আবার সাংবাদিক।”

“আপনার পরিচয় ফাঁস করার কথা আমি ভাবছি না। ইতিমধ্যেই আমি আমার পেশাগত জীবনে অনেক নিয়ম লঙ্ঘন ক’রে ফেলেছি। আমি যদি আপনার ব্যাপারে কিছু করি তো সাংবাদিক সমাজ আমাকে বহিষ্কার করে ছাড়বে।” ব্যাপারটা হালকা করার চেষ্টা করলো সে। “আপনার কথা ফাঁস করে আমার কোনো লাভও হবে না। তাছাড়া আমি আমার পুরনো বেবিসিটারকে মোটেও ক্ষ্যাপাতে চাইবো না।”

কথাটা শুনে মোটেও খুশি হলো না সে।

“এই সত্যটা কতোজন লোক জানে?”

“আপনি যে বেঁচে আছেন সেটা? এখন পর্যন্ত আপনি, আমি, আনিটা আর আমার পার্টনার। হেনরিকের লইয়ার অনেক কিছুই জানে তবে সে এখনও মনে করে আপনি মারা গেছেন।”

মনে হলো হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার কিছু ভাবছে। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে মহিলা। একটা অস্বস্তি পেয়ে বসলো তাকে। সে ভালো করেই জানে কতোটা নাজুক অবস্থায় আছে সে। হ্যারিয়েটের নিজের রাইফেলটা তিন-চার কদম দূরে একটা ক্যাম্প খাটের উপর রাখা আছে। মাথা ঝাঁকিয়ে এ চিন্তাটা বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করলো সে।

“কিন্তু এতো দূর অস্ট্রেলিয়াতে এসে একজন ভেড়ার খামারি হলেন কিভাবে? আমি জানি আনিটা আপনাকে হেডেবি থেকে অন্য জায়গা সরে যেতে সাহায্য করেছে, সম্ভবত পরদিন বৃজটা চালু হলে তার গাড়ির বুটের ভেতর লুকিয়ে কাজটা করেছে সে।”

“আসলে আমি পেছনের সিটের ফ্লোরে একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলাম। কেউ তার গাড়িটা চেক ক’রে দেখে নি। আনিটা আইল্যান্ডে আসতেই আমি তাকে বলি যে আমাকে পালাতে হবে। তোমার কথাই ঠিক, তাকে আমি সব বলেছিলাম। সে আমাকে পালাতে সাহায্য করে, আর এতোগুলো বছর পরও সে আমার সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েই আছে।”

“অস্ট্রেলিয়ায় কেন এলেন?”

“কয়েক সপ্তাহ আমি আনিটার স্টকহোমের বাড়িতে ছিলাম। আনিটার নিজের টাকা-পয়সা ছিলো, সেখান থেকে আমাকে উদারভাবে ধার দেয়। তার পাসপোর্টটা পর্যন্ত আমাকে দিয়েছিলো সে। আমরা দেখতে প্রায় একই রকম। আমাকে শুধু চুলের রঙ পাল্টাতে হয়েছে। চার বছর আমি ইটালির এক কনভেন্টে থাকি- আমি কোনো নান ছিলাম না। ওখানকার অনেক কনভেন্ট আছে যেখানে আপনি খুব সস্তায় রুম ভাড়া করে থাকতে পারবেন। এরপর আমার সাথে স্পেন্সার কোচরানের পরিচয় হয়। আমার থেকে কয়েক বছরের বড় ছিলো সে। ইংল্যান্ড থেকে ডিগ্রি শেষ করে সারা ইউরোপ ঘুরে বেড়াচ্ছিলো তখন। আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ে গেলাম। আমি ‘আনিটা’ ভ্যাঙ্গার নামে তাকে বিয়ে করলাম ১৯৭১ সালে। খুবই চমৎকার এক লোক ছিলো সে। দুঃখের বিষয় হলো আট বছর আগে মারা গেছে আমার স্বামী। তার মৃত্যুর পরই আমি এই ফার্মের মালিক হয়ে যাই।”

“কিন্তু আপনার পাসপোর্ট-নিশ্চয় কেউ না কেউ জেনে গিয়েছিলো দু দু’জন আনিটা ভ্যাঙ্গার আছে?”

“না। কেন জানবে? আনিটা ভ্যাঙ্গার নামের এক সুইডিশ মেয়ে বিয়ে করেছে স্পেন্সার কোচরান নামের একজনকে। সে লন্ডন নাকি অস্ট্রেলিয়ায় থাকে তাতে কিছু যায় আসে না। লন্ডনে যে আনিটা থেকে সে হলো স্পেন্সার কোচারনের সাজানো স্ত্রী। কাগজের বউ আর কি। আর অস্ট্রেলিয়ায় যে থাকে সে হলো তার আসল স্ত্রী। লন্ডন আর ক্যানবেরার কম্পিউটার ফাইলে তারা ম্যাচ করবে না। তাছাড়া অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমি আমার বিবাহিত নামে একটি পাসপোর্ট পেয়ে যাই। সবই ঠিকঠাক মতো চলেছে। তবে আনিটা বিয়ে করলে হয়তো সমস্যা তৈরি হতো। আমার বিয়েটা সুইডিশ ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন ফাইলে রেজিস্টার করা ছিলো।”

“কিন্তু আনিটা কখনও বিয়ে করে নি।”

“সে বলে মনের মতো কাউকে নাকি পায় নি। তবে আমি জানি এটা সে আমার জন্যে করে নি। আমার সত্যিকারের বন্ধু সে।”

“ঐদিন সে আপনার ঘরে কি করছিলো?”

“ঐ দিন আমি খুব একটা যৌক্তিক আচরণ করি নি। মার্টিনকে আমি ভয় পেতাম, কিন্তু সে যতোক্ষণ উপসালায় ছিলো আমি পুরো ব্যাপারটা মাথা থেকে দূরে রাখতাম। এরপর সে হেডেস্টাডে চলে এলে বুঝতে পারলাম আমি আর বাকি জীবনে নিরাপদ থাকতে পারবো না। হেনরিক আঙ্কেলকে আমি বার বার বলার চেষ্টা করেছি পারি নি, পালিয়ে যাবার কথাও ভেবেছি। যখন দেখলাম হেনরিক আমার কথা শোনার মতো সময় বের করতে পারছে না তখন আমি গ্রামের মধ্যে অস্থিরভাবে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। অবশ্য আমি জানতাম বৃজের ঘটনাটি নিয়ে সবাই ব্যস্ত, এখানে আর কোনো বিষয় নিয়ে কেউ আলোচনা করার মেজাজে নেই। কিন্তু আমার জন্য ব্যাপারটা খুব জরুরি ছিলো। আমি আমার নিজের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত, দুর্ঘটনার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগ পর্যন্ত ছিলো না। আমার কাছে সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছিলো। এরপরই আমি আনিটার কটেজে চলে যাই। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। তার সাথেই আমি ছিলাম। বাইরে আর বের হই নি। তবে একটা জিনিস আমার সঙ্গে করে নেবার দরকার ছিলো-যা ঘটেছে সবই একটা ডায়রিতে লিখে রেখেছিলাম। সেটা আর কিছু জামাকাপড় সঙ্গে নিতে হবে। আনিটা ওগুলো আমার জন্যে এনে দেয়।”

“আমার ধারণা আপনার ঘরে গিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখার লোভ সামলাতে পারে নি সে।” একটু ভাবলো ব্লমকোভিস্ট। “আমি বুঝতে পারছি না আপনি হেনরিকের কাছে কেন গেলেন না, আপনি তো তাকে সব বলতে চেয়েছিলেন।”

“কেন যাই নি ব’লে মনে করো?”

“আমি আসলেই জানি না। হেনরিক অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করতো। মার্টিনকে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দেয়া হতো। সম্ভবত অস্ট্রেলিয়া কিংবা এমন কোনো জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হতো যেখানে থেরাপি আর ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা যেতো।”

“তুমি বুঝতে পারছো না কি ঘটেছিলো।”

এই মুহূর্ত পর্যন্ত ব্লমকোভিস্ট কেবল গটফ্রিড কর্তৃক মার্টিনকে বলাৎকার করার কথাই বলেছে, এতে যে হ্যারিয়েটও শিকার হয়েছিলো সেটা বলে নি।

“গটফ্রিড মার্টিনকে বলাৎকার করতো,” সতর্কতার সাথে বললো সে। “আমার সন্দেহ সে আপনার সাথেও ঐ কাজ করতো।”

হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার স্থির হয়ে বসে রইলো। তারপর গভীর করে নিঃশ্বাস নিয়ে দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে রাখলো সে। কিছুক্ষণ পরই জেফ এসে তার কাছে জানতে চাইলো কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা। হ্যারিয়েট তার দিকে তাকিয়ে মলিন হাসি দিলো। এরপর ব্লমকোভিস্টকে অবাক করে দিয়ে সে তার খামারের ‘ম্যানেজারকে জড়িয়ে ধরে তার গালে চুমু খেলো সবার সামনে।

“জেফ, এ হলো মাইকেল, আমার বহু পুরনো….এক বন্ধু। সে সমস্যা আর দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। তবে আমরা এই মেসেঞ্জারকে গুলি ক’রে মারবো না। মিকাইল, এ হলো জেফ কোচরান, আমার বড় ছেলে। আমার আরো একটা ছেলে আর মেয়ে আছে!”

উঠে দাঁড়িয়ে জেফের সাথে করমর্দন করলো ব্লমকোভিস্ট। বললো দুঃসংবাদ নিয়ে এসে তার মাকে আপসেট করার জন্যে সে যারপরনাই দুঃখিত। হ্যারিয়েট ছেলের কানে কানে কি যেনো বলে তাকে পাঠিয়ে দিলো অন্য কোথাও। চেয়ারে বসে পড়লো সে। মনে হলো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

“আর কোনো মিথ্যে নয়। মেনে নিচ্ছি সব মিটে গেছে। সত্যি বলতে কি, আমি সেই ১৯৬৬ সাল থেকেই অপেক্ষা করে আসছি। বছরের পর বছর ধরে আমি এই আশংকায় ছিলাম যে কোনদিন বুঝি কেউ এসে আমার নাম ধরে ডাকবে। কিন্তু তুমি জানো কিনা জানি না, হঠাৎ করেই আর এসব নিয়ে মাথা ঘামানো বাদ দিয়ে দিলাম। আমার অপরাধ ভিন কোনো দেশে সংঘটিত হয়েছে। তাছাড়া লোকজন আমার সম্পর্কে কি ভাবলো না ভাবলো সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই

“অপরাধ?” বললো মিকাইল।

তার দিকে অবাক হয়ে তাকালো হ্যারিয়েট। ব্লমকোভিস্ট তারপরও বুঝতে পারলো না মহিলা কি বলছে এসব।

“আমার বয়স ছিলো মাত্র ষোলো। খুব ভয়ে ছিলাম। লজ্জিত ছিলাম! মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম আমি। একাকী এক মেয়ে। চারপাশে কেউ নেই। সত্যটা কেবল আনিটা আর মার্টিন জানতো। আনিটাকে আমি যৌন নিপীড়নের কথা বলেছিলাম কিন্তু আমার বাবা যে একজন উন্মাদগ্রস্ত সিরিয়াল কিলার সেটা বলার সাহস পাই নি। আনিটার পক্ষে সেগুলো জানাও সম্ভব ছিলো না। তবে আমি যে অপরাধটি করেছিলাম সেটা আনিটাকে বলেছিলাম। আমি এ নিয়ে এতোটাই ভয় পেয়ে গেছিলাম যে হেনরিককে সেটা বলতে পারি নি। ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি যাতে তিনি আমার অপরাধ মার্জনা করেন। এ কারণেই একটা কনভেন্টে কয়েক বছর নিভৃতে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।”

“হ্যারিয়েট, আপনার বাবা একজন ধর্ষণকারী আর খুনি। এতে তো আপনার কোনো দোষ নেই। ‘

“আমি সেটা জানি। বছরখানেক ধরে আমার বাবা আমাকে বলাৎকার করে গেছে। এ থেকে নিষ্কৃতি পেতে আমি সবই করেছি…কিন্তু লোকটা আমার বাবা ছিলো। আমি ছিলাম নিরুপায়। তাই মিথ্যে বলতাম, ভান করতাম সব ঠিক আছে। সে যেমন চাইতো তেমনই করতাম। আমার মা জানতো সে কি করছে আমাদের সাথে। কিন্তু সে এ নিয়ে মাথা ঘামায় নি।”

“ইসাবেলা জানতেন?”

হ্যারিয়েটের কণ্ঠটা আরো কর্কশ হয়ে উঠলো।

“অবশ্যই সে জানতো। আমাদের পরিবারের কোনো কিছু তার অগোচরে হয় না। কিন্তু অপ্রীতিকর এবং বদনাম রটতে পারে এরকম কিছু এড়িয়ে যেতো সে। আমার বাবা যদি তার চোখের সামনেও আমাকে ধর্ষণ করতো না দেখার ভান করতো সে। আমার কিংবা তার জীবনে বাজে কিছু ঘটছে এটা স্বীকার করার মতো মনমানসিকতা তার ছিলো না।”

“তার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। আপনাদের পরিবারে সে আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব নয়।”

“আজীবন সে এরকমই থেকে গেছে। মাঝেমধ্যেই আমি আমার বাবা-মা’র সম্পর্কটা নিয়ে ভাবি। বুঝতে পারি তারা হয়তো আমার জন্মের পর খুব কমই সেক্স করেছে, কিংবা আদৌ করে নি। আমার বাবার জীবনে অবশ্য অনেক নারী- ছিলো, তবে অদ্ভুত এক কারণে ইসাবেলাকে সে ভয় পেতো। তার কাছ থেকে সব সময় দূরে থাকতো, কিন্তু ডিভোর্স করার সাহস ছিলো না।”

“ভ্যাঙ্গার পরিবারের কেউই ডিভোর্স নেয় না।”

প্রথমবারের মতো হেসে ফেললো হ্যারিয়েট।

“তা ঠিক বলেছো। তবে আসল কথা হলো আমি এসব কথা বলতে পারি নি। সারা দুনিয়া জেনে যেতো। আমার স্কুলের সহপাঠী আর আত্মীয়স্বজনরা…”

“হ্যারিয়েট, আমি দুঃখিত।”

“আমার বয়স যখন চৌদ্দ তখনই আমাকে প্রথমবারের মতো ধর্ষণ করে। এরপরের বছর আমাকে নিজের কেবিনে নিয়ে যেতো। অনেক সময় তার সাথে মার্টিনও থাকতো। সে আমাদের দু’জনকেই বাধ্য করতো তার সাথে ওসব করার জন্য। মার্টিনের সাথে ওসব করার সময়…সে আমার হাত ধরে রাখতো। আমার বাবা মারার যাবার পর তার ভূমিকা নিয়ে নিলো মার্টিন। সে আমাকে তার প্রেমিকা হিসেবে দেখতে চাইলো। তার অধীনস্ত হওয়াটা যেনো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই মনে করতো সে। ঐ সময়টাতে আমার আর কোনো উপায় ছিলো না। মার্টিন যা বলতো সেটা করতে বাধ্য হতাম আমি। একজনের হাত থেকে মুক্ত হয়ে আরেকজনের হাতে গিয়ে পড়লাম। শুধু চেষ্টা করতাম তার সাথে যেনো একা না থাকি।”

“হেনরিক হয়তো…”

“তুমি এখনও বুঝতে পারছো না।”

কণ্ঠটা একটু চড়া করলো হ্যারিয়েট। ব্লমকোভিস্ট দেখতে পেলো মহিলার কথা শুনে আশপাশের তাবু থেকে অনেক লোক বেরিয়ে এসে তাদের দিকে চেয়ে আছে। মহিলা কণ্ঠটা নামিয়ে তার দিকে ঝুঁকে এলো।

“টেবিলের উপর সবগুলো কার্ডই আছে। বাকিটা তোমাকে বের করে নিতে হবে।”

উঠে দাঁড়ালো হ্যারিয়েট। তারপর আরো কিছু বিয়ার নিয়ে ফিরে এলো। মিকাইল শুধু একটা কথাই বললো তাকে।

“গটফ্রিড।”

মাথা নেড়ে সায় দিলো হ্যারিয়েট।

“১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসের ৭ তারিখে আমার বাবা আমাকে জোর করে তার কেবিনে নিয়ে যায়। হেনরিক তখন দেশের বাইরে। আমার বাবা মদ খেয়ে আমার সাথে জোড়াজুড়ি করার চেষ্টা করলো। কিন্তু না পেরে উন্মত্ত হয়ে উঠলো একেবারে। আমি যখন তার সাথে একা থাকতাম তখন সে খুব হিংস্র আর বাজে ব্যবহার করতো। তবে ঐদিন সীমা লঙ্ঘন করে ফেললো। প্রশ্রাব করলো আমার উপর। তারপর বলতে লাগলো আমার সাথে কি করবে। যেসব মহিলাকে খুন করেছিলো তাদের কথা বলছিলো আমায়। নিজের কৃতিত্বের কথা জাহির করছিলো মদ্যপ হয়ে। বাইবেল থেকে উদ্ধৃত করছিলো। এটা চললো প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। সে কি বলছে তার অর্ধেকও আমি বুঝতে পারি নি তখন। তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম সে ভয়ানক অসুস্থ এক লোক।”

এক ঢোক বিয়ার পান করলো হ্যারিয়েট।

“মাঝরাতের দিকে সে একেবারে উন্মত্ত হয়ে যায়। আমরা তখন মাচাঙের উপর ঘুমানোর জায়গায় ছিলাম। আমার গলায় একটা টি-শার্ট পেচিয়ে ফাঁস দেয়। আমি জ্ঞান হারাই সঙ্গে সঙ্গে। আমার বিন্দুমাত্রও ধারণা ছিলো না সে আমাকে খুন করার চেষ্টা করবে। আর তখনই প্রথমবারের মতো আমাকে পুরোপুরি ধর্ষণ করতে সক্ষম হয় সে।”

ব্লমকোভিস্টের দিকে তাকালো হ্যারিয়েট। তার চোখ যেনো কিছু একটা বলছে।

“তবে সে এতোটাই মাতাল ছিলো যে আমি তার হাত থেকে পালাতে সক্ষম হই। মাচাঙ থেকে লাফ দিয়ে দৌড় দেই। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ নগ্ন, কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই ছুটতে থাকি। এক সময় পৌছে যাই নদীর তীরে জেটির কাছে। আমার পিছু পিছু টলতে টলতে এসে পড়ে সে।”

ব্লমকোভিস্টের মনে হলো এসব কথা আর শোনার দরকার নেই।

“একজন বৃদ্ধ মাতালকে পানিতে ফেলে দেবার মতো শক্তি আমার ছিলো। একটা বৈঠা দিয়ে তাকে অনেকক্ষণ পানিতে ডুবিয়ে রাখতে সক্ষম হই। খুব বেশি সময় লাগেনি মরে যেতে।”

মহিলা যখন থামলো বরফ শীতল নীরবতা নেমে এলো।

“তাকিয়ে দেখি কাছেই মার্টিন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে একই সাথে ভয়ার্ত আর হাসি হাসি মুখে দেখা যাচ্ছিলো। আমি জানি না কতোক্ষণ কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের উপর নজর রাখছিলো সে। সেই মুহূর্ত থেকে আমি তার দয়ার উপর বেঁচে থাকলাম। কাছে এসে আমার চুল মুঠোয় ধরে টানতে টানতে আবার কেবিনে নিয়ে গেলো- গটফ্রিডের বিছানায়। আমাদের বাবা যখন পানিতে ভাসছে তখন সে আমার হাত-পা বেধে আমাকে ধর্ষণ করতে লাগলো। আমি বিন্দুমাত্র প্রতিরোধও তৈরি করতে পারি নি।”

চোখ বন্ধ করে ফেললো ব্লমকোভিস্ট। নিজের কাছেই খুব লজ্জিত লাগছে তার, ইচ্ছে করছে হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গারকে দু’দণ্ড শান্তি দেবার জন্য এক্ষুণি চলে যেতে। তবে তার কণ্ঠে যেনো নতুন শক্তির দেখা মিললো এবার।

“সেদিন থেকে আমি তার অধীনে চলে গেলাম। সে যা বলতো আমি তাই করতাম। আমাকে কেবল বাঁচাতে পারলো ইসাবেলা-অথবা আমার আঙ্কেল হেনরিক। ইসাবেলা সিদ্ধান্ত নিলো মার্টিনকে উপসালায় গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। এর কারণ সে বুঝতে পেরেছিলো আমার সাথে মার্টিন কি করছে। এটা ছিলো সমস্যা সমাধানে তার নিজস্ব পদ্ধতি। মার্টিন খুব হতাশ হয়েছিলো। এরপর থেকে কেবল ক্রিসমাস আর ছুটিতেই বাড়িতে আসতো সে। গ্রীষ্মের ছুটিতে আনিটা চলে এলে আমি তার কাছে সব খুলে বলি। সে আমাকে আগলে রাখলো পুরোটা সময়। মার্টিন আমার ধারেকাছেও ঘেষতে পারলো না।”

“তারপর ইয়ার্নভাগসগাটানে তাকে দেখলেন।”

“আমাকে বলা হয়েছিলো সে আমাদের পরিবারের ঐ অনুষ্ঠানে থাকবে না। উপসালায়ই থেকে যাবে। তবে সে তার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে। আচমকাই আমি দেখতে পাই রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে সে। চেয়ে আছে আমার দিকে। মুচকি মুচকি হাসছে। আমার কাছে ব্যাপারটা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হলো। আমি আমার বাবাকে খুন করেছি, বুঝতে পারলাম আমার ভায়ের হাত থেকে আর কখনও মুক্তি পাবো না। তখন পর্যন্ত আমি আত্মহত্যার কথাই ভেবেছি, তবে তা না করে আমি পালিয়ে গেলাম।” ব্লমকোভিস্টের দিকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসলো সে। “সত্যি কথাটা বলতে পেরে দারুণ স্বস্তি বোধ করছি। এখন তো তুমি সবই জেনে গেলে।”

অধ্যায় ২৭

শনিবার, জুলাই ২৬-সোমবার, জুলাই ২৮

লুন্ডাগাটানের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ১০টার দিকে সালান্ডারকে গাড়িতে তুলে নিলো ব্লমকোভিস্ট। তারা চলে এলো নোরা ক্রিমেটোরিয়ামে। পুরো শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় তার পাশেই থাকলো সে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত যাজক আর তারা দু’জন ছাড়া অন্য কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলো না। কিন্তু শেষকৃত্যানুষ্ঠান শুরু হতেই আরমানস্কি চলে এলো সেখানে, ব্লমকোভিস্টের দিকে ইশারা করে সালান্ডারের পেছনে এসে আস্তে করে তার কাঁধে হাত রাখলো। তার দিকে না ফিরেই সালান্ডার এমনভাবে মাথা নেড়ে সায় দিলো যেনো সে জানে হাতটা কে রেখেছে।

মা সম্পর্কে সালান্ডার কিছুই বলে নি। তবে হাসপাতালের লোকজনের কাছ থেকে জানা গেছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা গেছে মহিলা। পুরো শেষকৃত্যানুষ্ঠানে মেয়েটি কিছুই বলে নি। অনুষ্ঠান শেষ হতেই সোজা চলে গেলো। কোনো রকম ধন্যবাদ জানানো কিংবা সৌজন্যতার ধার ধারলো না। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আরমানস্কি তাকালো ব্লমকোভিস্টের দিকে।

“মেয়েটার মন খুব খারাপ,” বললো আরমানস্কি।

“জানি। আপনি আসাতে ভালোই হয়েছে।”

“আমি অবশ্য নিশ্চিত হতে পারছি না ভালো নাকি মন্দ হলো

ব্লমকোভিস্টের দিকে স্থির চোখে তাকালো আরমানস্কি।

“আপনারা দু’জন যদি এক সাথে উত্তরাঞ্চলে যান তো মেয়েটার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন।

আরমানস্কিকে বিদায় জানিয়ে গাড়ির কাছে চলে এলো মিকাইল। সালান্ডার গাড়ির ভেতরেই চুপচাপ বসে আছে।

তার সাথেই হেডেস্টাডে যাবে মেয়েটি, কারণ ওখানে তার মোটরসাইকেল আর মিল্টন সিকিউরিটি থেকে ধার করে আনা যন্ত্রপাতিগুলো রাখা আছে। উপসালা পর্যন্ত মেয়েটি কোনো কথা বললো না। প্রথমেই তার কাছে জানতে চাইলো অস্ট্রেলিয়া সফর কেমন হলো। আগের দিন রাতে আরলান্ডা থেকে স্টকহোমে এসে পৌছেছে সে। খুব বেশি ঘুমাতে পারে নি। ড্রাইভ করতে করতেই তার কাছে হ্যারিয়েটের গল্পটা বলে গেলো। টানা আধ ঘণ্টা চুপ মেরে রইলো গল্পটা শুনে।

“কুত্তি,” বললো সালান্ডার!

“কে?”

“হ্যারিয়েট কুত্তি। মহিলা যদি ১৯৬৬ সালে কিছু একটা করতো তাহলে মার্টিন ভ্যাঙ্গারের পক্ষে সাইত্রিশ বছর ধরে খুনখারাবি আর ধর্ষণ করা সম্ভব হতো না। অনেক মেয়ের জীবন বেঁচে যেতো।”

“হ্যারিয়েট জানতো তার বাবা মেয়েদের খুন করতো, তবে এর সাথে যে মার্টিনও জড়িত ছিলো সেটা জানতো না। ধর্ষণকারী ভাইয়ের হাত থেকে সে পালিয়েছিলো, যে কিনা তাকে হুমকি দিতো তার কথামতো না চললে তার বাবাকে ডুবিয়ে মারার কথা সবাইকে বলে দেবে

“জঘন্য।”

ব্লমকোভিস্ট তাকে হেডেবিতে নামিয়ে দিলো, তাকে এখন যেতে হবে হেনরিকের সাথে দেখা করতে। সালান্ডারের কাছে জানতে চাইলো সে কি তার কটেজে অপেক্ষা করবে তার জন্য।

“তুমি কি এখানে রাতে থাকার কথা ভাবছো?” বললো সালান্ডার।

“মনে হচ্ছে থাকতে হবে।

“তুমি কি চাও আমিও তোমার সাথে থাকি?”

গাড়ি থেকে নেমে সালান্ডারের কাঁধে হাত রাখতেই ঝটকা মেরে তার হাতটা সরিয়ে দিলো সে।

“লিসবেথ, তুমি আমার বন্ধু।”

“তুমি কি চাও আমি তোমার সাথে থাকি, নাকি অন্য কারোরর সাথে ওসব করতে চাইছো?

তার দিকে তাকিয়ে রইলো ব্লমকোভিস্ট, তারপর গাড়িতে ফিরে গিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট করলো। জানালার কাঁচ নামিয়ে দিলো সে। মেয়েটার দুর্ব্যবহার করার কারণ খুবই স্পষ্ট।

“আমি তোমার বন্ধু হতে চাই,” বললো সে। “তুমি যদি অন্য কিছু চাও তাহলে কটেজে ফিরে যাবার দরকার নেই।”

.

হেনরিক ভ্যাঙ্গার বসে আছে, ভালো পোশাক পরে আছে সে। ডার্চ ফ্রোডি তাকে নিয়ে ঢুকলো হাসপাতালের রুমে।

“তারা আমাকে মার্টিনের শেষকৃত্যে যোগ দেবার জন্য বাইরে যেতে দিচ্ছে।”

“ডার্চ আপনাকে কতোটুকু বলেছে?”

মেঝের দিকে চেয়ে রইলো হেনরিক।

“মার্টিন আর গটফ্রিডের কথা আমাকে বলেছে সে। কল্পনাতেও কখনও আমি এরকম কিছু ভাবি নি।”

“আমি জানি হ্যারিয়েটের কি হয়েছিলো।”

“বলো আমাকে : সে কিভাবে মারা গেলো?”

“উনি মারা যান নি। এখনও বেঁচে আছেন। আপনি চাইলে উনি আপনার সাথে দেখা করবেন। আপনার সাথে দেখা করার জন্য উনিও খুব ব্যাকুল হয়ে আছেন।”

তারা দু’জনেই মিকাইলের দিকে এমনভাবে চেয়ে রইলো যেনো এইমাত্র পুরো দুনিয়াটা উল্টে গেছে।

“উনাকে এখানে আসার জন্য অনেক বোঝাতে হয়েছে। বেশ ভালোভাবেই বেঁচে আছেন। ভালো অবস্থায়ই আছেন। হেডেস্টাডে আছেন এখন। আজ সকালে এসে পৌছেছেন। এক ঘণ্টার মধ্যে এখানে চলে আসবেন। আপনি যদি তার সাথে দেখা করতে চান তো দেখা করতে পারবেন।”

.

পুরো কাহিনীটা বলে গেলো ব্লমকোভিস্ট। ফ্রোডি কিছুই বললো না। একেবারে চুপ মেরে শুনে গেলো তার কথা। হেনরিক অবশ্য দুয়েকবার প্রশ্ন করে আরো বিস্তারিত জেনে নিতে চাইলো ঘটনাটি।

সব কথা শুনে হেনরিক চুপ মেরে বসে রইলে ব্লমকোভিস্ট ভয় পেয়ে গেলো, বৃদ্ধ এতো কিছু শুনে না আবার স্ট্রোক করে বসে। কিছুক্ষণ পর ভারি গলায় কথা বললো হেনরিক।

“বেচারি হ্যারিয়েট। একবার যদি আমার কাছে এসে সব বলতো!”

ঘড়ির দিকে তাকালো ব্লমকোভিস্ট। চারটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। “আপনি কি তাকে দেখতে চান? উনি ভয় পাচ্ছেন আপনি হয়তো সব শুনে তার সাথে দেখা করতে চাইবেন না।”

“ফুলগুলোর ব্যাপারটা কি বের করতে পেরেছো?” জানতে চাইলো হেনরিক।

“আসার সময় প্লেনে এ কথাটা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আনিটা ছাড়া এই পরিবারে আর একজনকেই উনি ভালোবাসেন, আর সেটা হচ্ছেন আপনি। হ্যারিয়েটই ফুলগুলো পাঠাতেন। আমাকে বলেছেন উনি নাকি এই আশায় ফুল পাঠাতেন যাতে করে আপনি বুঝতে পারেন আপনার প্রিয় হ্যারিয়েট বেঁচে আছে। ভালো আছে। কিন্তু তার একমাত্র তথ্য পাবার চ্যানেল ছিলো আনিটা, আর সে এখানে কখনই আসতো না তাই এই ফুলগুলো যে আপনাকে কতোটা মানসিক অশান্তিতে রাখতো সেটা উনি বুঝতে পারতেন না। ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন নি আপনি সেই ফুলগুলো পেয়ে ভাবতেন তার খুনি বোধহয় আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।”

“আমার মনে হয় আনিটাই ফুলগুলো পোস্ট করতো।’

“হ্যা। সে একটা এয়ারলাইনে কাজ করে, তাই বিভিন্ন জায়গা থেকে ফুলগুলো পাঠাতে পারতো সে।”

“কিন্তু তুমি জানলে কি করে আনিটাই তাকে সাহায্য করেছে?”

“হ্যারিয়েটের জানালায় তাকেই দেখা গেছিলো।”

“কিন্তু সেটা দেখে কি কিছু বোঝার উপায় আছে…তাকে তো খুনি হিসেবেও ও সন্দেহ করা যেতো। হ্যারিয়েট বেঁচে আছে সেটা তুমি কিভাবে খুঁজে বের করলে?”

ব্লমকোভিস্ট স্থিরচোখে ভ্যাঙ্গারের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর হেসে ফেললো সে।

“যখন বুঝতে পারলাম আনিটা হ্যারিয়েটের নিখোঁজ হবার সাথে জড়িত তখন এও বুঝতে পালাম তাকে সে খুন ক’রে নি।”

“তুমি এতোটা নিশ্চিত হলে কি ক’রে?”

“কারণ এটা কোনো লক-রুম মিস্টেরি উপন্যাস নয়। আনিটা যদি হ্যারিয়েটকে খুনই করতো তাহলে আপনারা তার মৃতদেহ খুঁজে পেতেন। সুতরাং একমাত্র যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো সে হ্যারিয়েটকে উধাও হয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আপনি কি তাকে দেখতে চান?”

“অবশ্যই আমি তাকে দেখতে চাই।”

.

লবিতে যে লিফটটা আছে সেখানে হ্যারিয়েটের সাথে দেখা হলো ব্লমকোভিস্টের। প্রথমে তাকে দেখে চিনতে পারে নি। এয়ারপোর্ট থেকে তারা দু’জন দু’দিকে চলে গেছিলো। এরপর হ্যারিয়েট তার চুলের রঙ আবারো বাদামি করে নিয়েছে। কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট আর ধূসর রঙের জ্যাকেট পরেছে সে। তাকে খুব অভিজাত দেখাচ্ছে। ব্লমকোভিস্ট প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে।

মিকাইল দরজা খুলতেই হেনরিক চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। গভীর করে নিঃশ্বাস নিলো হ্যারিয়েট।

“হাই, হেনরিক,” বললো সে।

বৃদ্ধ তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। হ্যারিয়েট কাছে এসে তার গালে চুমু খেলো আলতো ক’রে। দরজা বন্ধ ক’রে দেবার জন্য ব্লমকোভিস্ট ইশারা করলো ফ্রোডিকে।

*

ব্লমকোভিস্ট যখন হেডেবি আইল্যান্ডে ফিরে এলো তখন সালান্ডার কটেজে ছিলো না। ভিডিও সরঞ্জাম আর তার মোটরসাইকেলটা নেই। সেইসাথে মেয়েটার জামাকাপড়ের ব্যাগটাও দেখা যাচ্ছে না। কটেজটা একেবারে ফাঁকা মনে হলো তার কাছে। মনে হলো খুব অচেনা একটি জায়গা। অফিসে কিছু কাগজপত্র স্তুপ করে রাখা আছে, এগুলো হেনরিকের বাড়িতে নিয়ে যাবার কথা। তবে ওগুলো নিয়ে ব্যস্ত হতে ইচ্ছে করলো না তার, রাতের খাবারের জন্য চলে গেলো রুটি, দুধ আর পনির কিনে আনতে। ফিরে এসে কফি বানাবার জন্য পানি বসিয়ে বাগানে বসে বসে সান্ধ্যকালীন পত্রিকা পড়তে লাগলো আনমনে।

৫:৩০-এর দিকে বৃজের উপর দিয়ে একটা ট্যাক্সি আসতে দেখলো সে। তিন মিনিট পর যেখান থেকে এসেছিলো সেখানেই ফিরে গেলো সেটা। পেছনের সিটে ইসাবেলাকে বসে থাকতে দেখলো ব্লমকোভিস্ট।

৭টার দিকে বাগানে বসে যখন ঝিমুচ্ছে তখন ফ্রোডি এসে তাকে জাগালো।

“হেনরিক আর হ্যারিয়েটের কি খবর?” বললো সে।

“অসুখী কালো মেঘের আড়ালে আশার আলো দেখা যাচ্ছে,” হেসে বললো ফ্রোডি। “বিশ্বাস করবেন না, ইসাবেলা হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছিলো। মহিলা দেখেছে আপনি ফিরে এসেছেন। চিৎকার করে সে বলছিলো হ্যারিয়েট নিয়ে এসব পাগলামি বন্ধ করতে হবে। সে আরো অভিযোগ করেছে আপনি এই পরিবারে নাক গলানোর কারণেই নাকি মার্টিনের অকাল মৃত্যু হয়েছে।“

“এক দিন থেকে দেখতে গেলে মহিলা তো ঠিকই বলেছে।”

“সে হেনরিককে বলেছে এক্ষুণি আপনাকে যেনো এ কাজ থেকে বাদ দিয়ে এখান থেকে চিরতরের জন্য বিদায় করে দেয়া হয়, আর সেইসাথে ভ্যাঙ্গার ও যেনো হ্যারিয়েট নামের ভূতের পেছনে ছোটাছুটি বন্ধ ক’রে দেয়

“ওয়াও!”

“মহিলা এমনকি হেনরিকের পাশে বসে থাকা হ্যারিয়েটের দিকে তাকিয়েও দেখে নি। সে হয়তো মনে করেছে ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশনের কোনো স্টাফ হবে। কিন্তু হ্যারিয়েট যখন উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘হ্যালো, মা,’ সে মুহূর্তটা আমি কখনও ভুলতে পারবো না।”

“তারপর কি হলো?”

“ইসাবেলাকে চেক করার জন্য আমাদেরকে ডাক্তার ডাকতে হয়েছিলো। এখন সে বিশ্বাস করতে চাইছে না যে ঐ মহিলা হ্যারিয়েট। অভিযোগ করে বলছে আপনি নাকি অন্য একজনকে হ্যারিয়েট বানিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন।”

ফ্রোডি চলে যাবার সময় হ্যারিয়েটের জীবিত হবার খবরটা সিসিলিয়া আর আলেকজান্ডারকে জানিয়ে দিয়ে গেলো।

.

উপসালার উত্তরে এসে এক পেট্রলপাম্প থেকে তেল ভরে নিলো সালান্ডার। তারপর আরো কয়েক মাইল এগোতেই সিদ্ধান্তহীনতায় থেমে গেলো।

তার মনমেজজাজ মোটেও ভালো নেই। হেডেবি ছাড়ার সময় প্রচণ্ড রেগে ছিলো, তবে মোটরবাইক নিয়ে পথ চলতে চলতে সেই রাগ অনেকটাই কমে এসেছে। ব্লমকোভিস্টের উপর কেন রেগে আছে সেটা বুঝতে পারছে না। এমনকি তার উপরেই যে রেগে আছে সেটা পর্যন্ত বুঝতে পারছে না সে।

মার্টিন ভ্যাঙ্গার, বালের ঐ হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার, ডার্চ ফ্রোডি আর পুরো ভ্যাঙ্গারগুষ্ঠি যারা একে অন্যের বারোটা বাজানোর জন্য বসে বসে ষড়যন্ত্র করছে তাদের কথা ভাবলো। তার সাহায্যের দরকার ছিলো তাদের। সাধারণত পথেঘাটে তার সাথে দেখা হলে তারা তাকে ‘হাই’ও বলতো না, তাদের জঘন্য গোপন ব্যাপার স্যাপারগুলো তো দূরের কথা।

বালের ভ্যাঙ্গারগুষ্ঠি।

তার মায়ের কথা ভাবলো সে। আজ সকালে তার মা ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। তার কাছে যেসব প্রশ্ন করার ছিলো সেগুলো আর কখনও করা সম্ভব হবে না।

তার মায়ের শেষকৃত্যের সময় আরমানস্কির উপস্থিতি নিয়ে ভাবলো। লোকটার সাথে কিছু কথা বলা উচিত ছিলো তার। কিন্তু সে জানে লোকটার সাথে সেরকম কিছু করলেই তাকে জড়িয়ে ধরতো নইলে তার হাত ধরে তাকে সমবেদনা জানাতো। এটা সে চায় নি।

আইনজীবি বুরম্যানের কথা ভাবলো সে। বদমাশটা এখনও তার গার্ডিয়ান হিসেবে আছে। তবে আপাতত তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। তাকে যা বলা হবে সে তাই করবে।

টের পেলো সুতীব্র ঘৃণায় দাঁতে দাঁত চেপে আছে।

ব্লমকোভিস্টের কথা ভাবলো সে। এই লোকটা যখন জানতে পারবে সালান্ডার কোর্টের অধীনে আছে, তার পুরো জীবনটা ইঁদুরের গর্ত ছাড়া আর কিছু না তখন কী ভাববে।

তার এখন মনে হচ্ছে ব্লমকোভিস্টের উপর সে রেগে নেই। আসলে তার সমস্ত রাগ উগলে দেবার জন্য এই লোকটাকে বেছে নিয়েছে। কয়েকটা খুন করতে ইচ্ছে করছে তার। মিকাইলের উপর রাগ করার কোনো মানেই হয় না।

তার ব্যাপারে এক ধরণের অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে সালান্ডারের।

লোকটা অন্যের ব্যাপারে নাক গলায়, তার জীবনে অযাচিতভাবে ঢুকে পড়তে চায়…তবে…তার সাথে কাজ করে বেশ ভালো লাগে। তবে এটাও ঠিক মিকাইল তাকে কোনো রকম উপদেশ দেয় না। কিভাবে জীবনযাপন করতে হবে সে বিষয়েও জ্ঞান দেয় না।

লোকটা নয় বরং সে-ই ব্লমকোভিস্টকে প্রলুব্ধ করেছে।

সব থেকে বড় কথা তার সাথে ওটা করে বেশ তৃপ্ত হয়েছে সে।

তাহলে তার কেন ইচ্ছে করছে তার মুখে লাথি মারতে?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ে দেখলো ই৪ হাইওয়ে দিয়ে একটা বড় ট্রাক ছুটে আসছে।

.

৮টা পর্যন্ত ব্লমকোভিস্ট বাগানে রইলো। মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে উঠে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো সালান্ডার কটেজে ঢুকছে তার বাইকটা নিয়ে। তার কাছে এসে বাইকটা থামিয়ে মাথা থেকে হেলমেট খুলে ফেললো সে। বাগানের টেবিলের কাছে এসে মিকাইলের কফি মগটা আলতো করে ধরে দেখলো। অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো ব্লমকোভিস্ট। কফির মগটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো সালান্ডার। ভেতর থেকে যখন আবার ফিরে এলো তখন দেখা গেলো তার জ্যাকেটটা নেই। শুধু একটা টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট পরা। টি-শার্টে লেখা আছে

: I CAN BE A REGULAR BITCH. JUST TRY ME.

“আমি ভেবেছিলাম এতোক্ষণে তুমি স্টকহোমে চলে গেছো,” বললো সে। “উপসালা থেকে ব্যাক করেছি।”

“ভালোই বাইক চালিয়েছো দেখছি।”

“আমার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে

“তুমি ফিরে এলে কেন? “

কোনো জবাব নেই। তারা বাইরে বসে কফি খেলো। দশ মিনিট পর অনিচ্ছায় বললো সালান্ডার, “আমি তোমার সঙ্গ পছন্দ করি।”

এ রকম কথা কখনও তার মুখ দিয়ে বের হয় নি।

“এটা…মানে, তোমার সাথে কাজ করাটা খুব মজার।”

“তোমার সাথে কাজ করে আমারও ভালো লাগে,” বললো সে।

“হুমমম।”

“সত্যি কথা বলতে কি, আমি জীবনে কখনও এরকম প্রতিভাবান রিসার্চারের সাথে কাজ করি নি। ঠিক আছে, তুমি একজন হ্যাকার, অবৈধভাবে টেলিফোন ট্যাপিং করার মতো নেটওয়ার্কের সাথেও জড়িত আছো। তবে তুমি যেভাবেই হোক কাজ বের ক’রে আনো।”

টেবিলে বসার পর এই প্রথম সালান্ডার তার দিকে তাকালো। তার অনেক

গোপন ব্যাপার সে জানে।

“সেটাই। আমি কম্পিউটার ভালো বুঝি। কোনো লেখা পড়তে আমার কখনও সমস্যা হয় না, সেগুলো বুঝতেও পারি খুব সহজে।

“তোমার যে স্মৃতিশক্তি সেটাকে বলে ফটোগ্রাফিক মেমোরি,” শান্ত কণ্ঠে বললো সে।

“আমি সেটা মানছি। কিভাবে এটা কাজ করে আমি জানি না। এটা শুধু কম্পিউটার আর টেলিফান নেটওয়ার্কের বেলায়ই প্রযোজ্য নয়, আমার বাইকের মোটর, টিভি সেট, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, রাসায়নিক প্রক্রিয়া আর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ফর্মুলা সবই এরমধ্যে পড়ে। আমার সমস্যা আছে। আমি স্বাভাবিক নই। আমি মানছি : আমার মাথায় ছিট আছে।”

বেশ অবাক হলো ব্লমকোভিস্ট। দীর্ঘক্ষণ বসে রইলো চুপচাপ।

অ্যাসপারগার্স সিন্ড্রোম, ভাবলো সে। অথবা সেরকম কিছু। অন্য সবাই যেখানে বিমূর্ত কিছুর মধ্যে কোনো সাযুজ্য কিংবা অর্থ খুঁজে পায় না সেখানে এ ধরণের লোকেরা বেশ অনায়াসেই সেসব দেখতে পায়। এটাই তাদের প্রতিভা।

টেবিলের দিকে চেয়ে আছে সালান্ডার।

“বেশিরভাগ লোক এ রকম প্রতিভার অধিকারী হতে পারলে যারপরনাই খুশি হবে।

“আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।”

“ঠিক আছে, এসব কথা তাহলে থাক। তুমি কি ফিরে আসতে পেরে খুশি হয়েছো?”

“জানি না। হয়তো ভুলই করেছি।”

“লিসবেথ, তুমি কি আমার জন্যে বন্ধুত্ব শব্দটি সংজ্ঞায়িত করতে পারবে? “ “যখন কাউকে ভালো লাগে সেটাকেই বন্ধুত্ব বলে।”

“অবশ্যই, কিন্তু ভালো লাগে কেন?”

কাঁধ তুললো মেয়েটা।

“আমার দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব দুটো জিনিসের উপর তৈরি হয়,” বললো মিকাইল। “শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস। দুটোই থাকতে হবে। আর সেটা হতে হবে দু’জনের তরফ থেকেই। তুমি কাউকে শ্রদ্ধা করতে পারো কিন্তু তাকে যদি বিশ্বাস না করো তাহলে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে না।”

এখনও মেয়েটা চুপ করে আছে।

“আমি বুঝতে পারি তুমি তোমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমার সাথে কথা বলতে চাও না। তবে একদিন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাকে বিশ্বাস করবে নাকি করবে না। আমি চাই আমরা ভালো বন্ধু হবো। কিন্তু সেটা তো আমি একা চাইলে হবে না।”

“তোমার সাথে সেক্স করতে আমার ভালো লাগে।”

“বন্ধুত্বের সাথে সেক্সের কোনো সম্পর্ক নেই। বন্ধুর সাথে সেক্স করা যেতেই পারে, কিন্তু আমাকে যদি সেক্স আর বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে আমি কোনটা বেছে নেবো সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই আমার।”

“বুঝতে পারলাম না তোমার কথা। তুমি আমার সাথে সেক্স করতে চাও নাকি চাও না?”

“যাদের সাথে কাজ করো তাদের সাথে তোমার সেক্স করা উচিত না,” বিড়বিড় করে বললো সে। “এতে সমস্যা হয়।’

“আমি কি কিছু মিস করলাম? আচ্ছা, এটা কি সত্যি না, এরিকা বার্গার আর তুমি সুযোগ পেলেই সেক্স করো? সে তো বিবাহিত

“এরিকা আর আমি…আমাদের দীর্ঘ একটা ইতিহাস আছে, আর সেটা শুরু হয়েছে তোমার সাথে আমার কাজ করার অনেক দিন আগে থেকে। সে বিবাহিত কিনা সেটা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই

“ওহ্ আচ্ছা। এখন তো দেখছি তুমিই নিজের সম্পর্কে কথা বলতে চাচ্ছো না। একটু আগেই আমি শিখেছি, বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস আর আস্থার ব্যাপার!”

“আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, কোনো বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে আমি কথা বলি না। তাহলে তার সাথে আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করবো। তোমার অনুপস্থিতিতেও আমি এরিকার সাথে তোমাকে নিয়ে কোনো কথা বলবো না।”

কথাটা একটু ভাবলো সালান্ডার। তাদের কথাবার্তা খুবই অদ্ভুত হয়ে উঠছে। সে অদ্ভুত কথাবার্তা পছন্দ করে না।

“তোমার সাথে সেক্স করতে আমার ভালো লাগে,” বললো সে।

“আমারও লাগে…কিন্তু আমি তোমার বাবার বয়সী

“তোমার বয়স নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই।“

“না। তুমি আমাদের বয়সের পার্থক্যটা উড়িয়ে দিতে পারো না। এটা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।“

“দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের কথা কে বললো?” জানতে চাইলো সালান্ডার। “আমরা কেবলমাত্র একটা কেস শেষ করেছি। এমন একটা কেস যেখানে পুরুষেরা যৌনতাকে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। যদি সম্ভব হতো তাহলে তাদের প্রত্যেককে আমি খতম করে ফেলতাম।”

“তুমি কোনো রকম আপোষ করবে না।

“না,” দৃঢ়ভাবে বললো সে। “অন্তত তুমি তাদের মতো নও।” উঠে দাঁড়ালো সালান্ডার। “এখন আমি গোসল করবো তারপর নগ্ন হয়ে চলে আসবো তোমার বিছানায়। তুমি যদি মনে করো তোমার অনেক বয়স হয়ে গেছে তাহলে বাইরের ঐ ক্যাম্প বেডটাতে শুয়ে থেকো।”

সালান্ডারের মধ্যে আর যাইহোক বিনয় বলে কিছু নেই। তার সাথে প্রতিটি তর্কবিতর্কে হেরে যায় মিকাইল। কফির পাত্র আর কিছু ডিশ ধোয়ামোছা করে বিছানায় চলে গেলো সে।

.

তারা ঘুম থেকে উঠলো ১০টার দিকে, একসাথেই শাওয়ার করে নাস্তা করলো বাগানে বসে। ১১টার পর ডার্চ ফ্রোডি ফোন করে জানালো শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে বেলা ২টা বাজে। তারা ওখানে যাবে কিনা জানতে চাইলো সে।

“আমি যাবার কথা ভাবছি না,” বললো মিকাইল।

ফ্রোডি তাকে জানালো সন্ধ্যা ৬টার পর তার এখানে চলে আসবে কথা বলার জন্য। মিকাইল জানালো ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই।

কাগজপত্র গোছগাছ করে বাক্সে ভরে হেনরিকের বাড়িতে পাঠানোর জন্য কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করলো সে। নিজের ল্যাপটপ আর ওয়েনারস্ট্রমের উপর দুটো বাইন্ডার ছাড়া সবই বাক্সে ভরে ফেললো। বিগত ছয়মাসে এই বাইন্ডার দুটো একবারের জন্যেও খুলে দেখে নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগের ভেতর রেখে দিলো।

ফ্রোডি ফোন করে জানালো তার একটু দেরি হবে, সুতরাং ৮টার আগে বাড়ি ফিরতে পারছে না। তার সাথে দেখা হলো তার রান্নাঘরে। এখনও শেষকৃত্যের পোশাকে আছে। সালান্ডার ফ্রোডিকে কফি সাধলে সে সাদরে গ্রহণ করলো সেটা। মেয়েটা তার কম্পিউটার নিয়ে একমনে কী যেনো ক’রে যাচ্ছে। ব্লমকোভিস্ট তার কাছে জানতে চাইলো হ্যারিয়েটের এই নাটকীয় ফিরে আসাটা ভ্যাঙ্গার পরিবার কিভাবে গ্রহণ করেছে।

“আপনি বলতে পারেন তার এই আগমন মার্টিনের মৃত্যুকে ছাপিয়ে গেছে। মিডিয়া এখন তাকে নিয়েই মেতে থাকবে।”

“আপনারা কিভাবে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করবেন?”

“হ্যারিয়েট কুরিয়ার-এর রিপোর্টারের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন নিজের পরিবারে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো বলে ঘর পালিয়েছিলেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। তার স্বপ্ন সফল হয়েছে বেশ ভালোভাবে। ভ্যাঙ্গারদের সাথে থাকলে তার যে অবস্থান হতো তারচেয়ে এখন অনেক ভালো আছেন।”

ব্লমকোভিস্ট শিষ বাজালো।

“অস্ট্রেলিয়ান ভেড়ার খামার যে খুব লাভজনক সেটা আমি দেখেছি কিন্তু এতোটা ভালো ব্যবসা হয় সেটা জানতাম না।

“ভেড়ার খামার থেকে বেশ ভালো আয় কিন্তু এটাই তার একমাত্র ব্যবসা না। কোচরান কর্পোরেশন খনি, মূল্যবান রত্ন, ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিবহন আর ইলেক্ট্রনিক্সসহ আরো অনেক ব্যবসা করে থাকে।”

“ওয়াও! তাহলে এখন কি হবে?”

“সত্যি বলতে কি, আমি জানি না। সারাদিন ধরে প্রচুর লোকজন আসছে আজ। অনেক বছর পর পুরো পরিবারটি এই প্রথম একত্রিত হয়েছে বলা যায়। প্রায় চল্লিশজন ভ্যাঙ্গার আজ উপস্থিত হয়েছে হেডেস্টাডে।”

“নিশ্চয় হ্যারিয়েটকে নিয়ে সবাই দারুণ আগ্রহী। তাদের মধ্যে মার্টিনের কথা কতোজন জানে?”

“এখন পর্যন্ত শুধু আমি, হেনরিক আর হ্যারিয়েট। আমরা তিনজনে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছি। মার্টিন আর…আপনি তার সম্পর্কে যে ভয়ঙ্কর সত্য আবিস্কার করেছেন সেটা এই মুহূর্তে চেপে যাওয়া হচ্ছে। এটা জানাজানি হলে কোম্পানির ইমেজ ধ্বংস হয়ে যাবে।”

“আমি সেটা বুঝতে পারি।”

“স্বাভাবিক কোনো উত্তরাধিকারী নেই, তবে হ্যারিয়েট কিছুদিন হেডেস্টাডে থাকবেন। কে কি পাবে সেটা তারা সবাই মিলে ঠিক করে নেবে। হ্যারিয়েট যদি এখানে থেকে যান তাহলে বেশ ভালো একটি অংশ পাবেন তিনি। এটা একটা দুঃস্বপ্ন।”

হেসে ফেললো মিকাইল। তবে ফ্রোড়ি মোটেও হাসলো না।

“শেষকৃত্যের সময় ইসাবেলা জ্ঞান হারিয়েছিলো। এখন হাসপাতালে আছে। হেনরিক বলেছে তাকে দেখতে হাসপাতালে যাবে না।“

“হেনরিকের জন্য সেটাই ভালো হবে।“

“ভালো কথা, আনিটা লন্ডন থেকে আসছে। আগামী সপ্তাহে একটা মিটিং হবে বলে পরিবারের সবাইকে বলে দিয়েছি। পঁচিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম আনিটা এরকম মিটিংয়ে উপস্থিত থাকবে।”

“নতুন সিইও হবে কে?“

“বার্জার এই পদটি নিতে চাচ্ছে। তবে তার সিইও হবার কোনোই সম্ভাবনা নেই। পরিবারের কাউকে কিংবা বাইরে থেকে একজনকে এ পদে নিয়োগ দেবার আগ পর্যন্ত হেনরিকই অস্থায়ী সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবে…”

ভুরু তুললো ব্লমকোভিস্ট।

“হ্যারিয়েট? সত্যি বলছেন?”

“কেন নয়? হাজার হোক আমরা এমন একজন মহিলার কথা বলছি যে কিনা বিরাট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনা করে আসছে। যথেষ্ট অভিজ্ঞ আর শ্রদ্ধেয় একজন মহিলা।”

“অস্ট্রেলিয়ায় বিরাট একটি প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতে হয় তাকে।“

“সত্যি, কিন্তু তার ছেলে জেফ কোচরান তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করে যাবে।”

“সে তো খামারের ম্যানেজার। সঠিকভাবে ভেড়ার প্রজনন করা ছাড়া তার কোনো অভিজ্ঞতা আছে ব’লে মনে হয় না।’

“অক্সফোর্ড থেকে ইকোনমিক্সে এবং মেলবোর্ন থেকে আইনের উপর ডিগ্রি রয়েছে তার।”

ব্লমকোভিস্ট ঘর্মাক্ত, পেশীবহুল খালি গায়ের সেই তরুণের কথা ভাবলো। সুট-টাই পরলে কেমন লাগবে তাকে সেটাও ভাবার চেষ্টা করলো সে। কেন নয়?

“সবকিছু করতে একটু সময় লাগবে,” বললো ফ্রোডি। “তবে হ্যারিয়েট সিইও হিসেবে দারুণ মানানসই হবেন। অন্যদের থেকে ভালোমতো সমর্থন পেলে কোম্পানিটা আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।”

“উনার তো অভিজ্ঞতা নেই, বিশেষ করে…”

“তা ঠিক। তবে তিনি তো আর হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসছেন না। ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশন আর্ন্তজাতিক একটি প্রতিষ্ঠান। এক বর্ণও সুইডিশ জানে না এরকম একজন আমেরিকান সিইও আমরা নিয়োগ দিতে পারি…এটা একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই আসলে এক জিনিস।”

“আজ হোক কাল হোক আপনাদেরকে মার্টিনের কর্মকাণ্ডগুলো প্রকাশ করতেই হবে।”

“জানি। তবে হ্যারিয়েটের কোনো ক্ষতি করা ছাড়া এটা করা যাবে না…এসব ব্যাপারে যে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে না সেজন্যে আমি খুব খুশি।”

“এসব কি বলছেন, ফ্রোডি! মার্টিন যে একজন সিরিয়াল কিলার এই সত্যটা আপনারা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারেন না।”

“মিকাইল, আমি…খুবই অস্বস্তিকর অবস্থায় আছি।”

“আমাকে বলুন।”

“হেনরিকের একটি মেসেজ নিয়ে এসেছি আপনার জন্য। আপনি যে অসাধ্য সাধন করেছেন তার জন্য সে আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সে আরো মনে করে কনট্রাক্ট অনুযায়ী কাজটা পুরোপুরি সম্পন্ন করা হয়েছে। আপনার কাজ শেষ। আপনি এখন নিজের শহরে ফিরে যেতে পারেন।

“তিনি চাচ্ছেন আমি দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে যাই, এটাই তো মূল কথা, তাই না?”

“একদম না। সে চায় আপনি তার সাথে দেখা করে ভবিষ্যত নিয়ে আলাপ আলোচনা করবেন। সে বলেছে মিলেনিয়াম-এর বোর্ডে তার যে অবস্থান সেটা আরো এগিয়ে নিতে চায়। তবে…”

ফ্রোডিকে আরো বেশি অস্বস্তিবোধ করতে দেখা গেলো।

“ডার্চ, আমাকে বলবেন না…তিনি ভ্যাঙ্গার পরিবারের ইতিহাস লেখার কাজটা বাদ দিতে চাচ্ছেন।”

মাথা নেড়ে সায় দিলো ফ্রোডি। একটা নোটবুক তুলে নিয়ে সেটা খুলে মিকাইলের দিকে বাড়িয়ে দিলো সে।

“আপনাকে এই চিঠিটা লিখেছে সে।”

প্রিয় মিকাইল,

তোমার সততার ব্যাপারে আমার অশেষ শ্রদ্ধা আছে। কি লিখতে হবে না হবে সেটা বলে তোমাকে আমি অপমান করতে চাই না। তোমার যা খুশি তাই লিখতে পারো তুমি। এ ব্যাপারে তোমার উপর আমি কোনো চাপ প্রয়োগ করবো না।

তুমি চাইলে আমাদের চুক্তিটা বহাল থাকবে। ভ্যাঙ্গার পরিবারের ইতিহাস লেখার মতো পর্যাপ্ত রসদ তোমার কাছে আছে।

মিকাইল, আমি আমার সমগ্র জীবনে কারো কাছ থেকে কোনোদিনও কিছু চাই নি। সব সময় মনে করে এসেছি একজন ব্যক্তি তার নিজস্ব নৈতিকতা আর বিশ্বাস থেকেই সব কিছু করবে। কিন্তু আজ আমি নিরুপায়।

আমি এই চিঠির মাধ্যমে একজন বন্ধু এবং মিলেনিয়াম-এর একজন অংশীদার হিসেবে তোমার কাছে একটা জিনিস ভিক্ষা চাইবো-গটফ্রিড এবং মার্টিন সম্পর্কে যা জেনেছো সেসব নিয়ে কোনো কিছু লেখা থেকে বিরত থাকবে। আমি জানি এটা ভুল। কিন্তু এই অমানিশা থেকে বের হবার আর কোনো পথও আমি দেখছি না। দুটো খারাপের মধ্যে আমাকে একটি বেছে নিতে হচ্ছে। তাছাড়া এ ঘটনায় কেউ লাভবানও হবে না।

হ্যারিয়েটের আরো ক্ষতি হোক সেরকম কিছু লেখা থেকেও তুমি বিরত থাকবে বলে আমি তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি। মিডিয়া এসব নিয়ে কি করতে পারে সে ব্যাপারে তোমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তোমির বিরুদ্ধেও এরকম প্রচারণা হয়েছে। সত্যটা প্রকাশ হলে হ্যারিয়েটের কেমন লাগবে সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছো। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে মেয়েটার উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে সেটা আরো প্রলম্বিত হোক তা আমি চাই না। এসবের জন্য তো সে নিজে দায়ি নয়। এই অন্যায় করেছে তার বাবা আর ভাই। তাছাড়া এই কথাটা প্রকাশ হলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের কি হবে সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারছো। সেইসব হাজার হাজার কর্মচারির দিকটাও তুমি দেখবে বলে আমার বিশ্বাস। এই সত্যটা হ্যারিয়েটকে যেমন শেষ করে দেবে সেইসাথে আমাদেরকেও ধ্বংস করে দেবে।

-হেনরিক

“হেনরিক আরো বলেছে বইটা প্রকাশ না হবার জন্য যদি আপনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন তো সেই ক্ষতিপূরণ করার ব্যবস্থা করবে সে। এ নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। আপনি নিজেই টাকার পরিমাণ কতো হবে সেটা বলতে পারেন।”

“হেনরিক আমার মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। তাকে বলবেন আমি তার কাছ থেকে এ রকম প্রস্তাব আশা করি নি। তিনি যেনো এরকম কোনো প্রস্তাব আমাকে না দেন।

“এটা হেনরিক এবং আপনার জন্যে খুবই কঠিন একটি পরিস্থিতি। সে আপনাকে খুব পছন্দ করে, আপনাকে একজন বন্ধু হিসেবেই মনে করে সে।“

“হেনরিক ভ্যাঙ্গার একজন ধূর্ত বানচোত,” বললো মিকাইল। হঠাৎ করেই রেগে গেলো সে। “পুরো গল্পটা ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে। আমার আবেগ নিয়ে খেলছে। সে ভালো করেই জানে আমি তাকে অনেক পছন্দ করি। একদিকে সে বলতে চাচ্ছে আমি সবকিছু প্রকাশ করার ব্যাপারে পুরোপুরি স্বাধীন, আবার অন্যদিকে ইঙ্গিত করছে আমি যদি সেরকম কিছু করি তো মিলেনিয়াম-এর ব্যাপারে তার মনোভাব বদলে যাবে।“

“দৃশ্যপটে হ্যারিয়েটের আবির্ভাব সব কিছু বদলে দিয়েছে।”

“হেনরিক এখন আমার মূল্য কতো সেটা জানতে চাইছে। হ্যারিয়েটের কোনো অনিষ্ট হোক সেটা আমি কখনওই করবো না, কিন্তু মার্টিনের বেসমেন্টে যেসব মেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের সম্পর্কে কাউকে তো কিছু বলতে হবেই। ডার্চ, এমনকি আমরা এও জানি না কতোজন মেয়ে অত্যাচারিত হয়ে মারা গেছে। তাদের পক্ষে কে কথা বলবে?”

কম্পিউটার থেকে মুখ তুলে তাকালো সালান্ডার। ফ্রোডিকে যখন বললো তখন তার কণ্ঠটা একেবারে ম্রিয়মান শোনালো। “আমার মুখ বন্ধ রাখার জন্য কি আপনাদের কোম্পানিতে কেউ নেই?”

বিস্মিত হলো ফ্রোডি।

“মার্টিন ভ্যাঙ্গার যদি বেঁচে থাকতো তাহলে তাকে আমি ফঁসিতে ঝুলিয়ে শুটকি বানিয়ে রাখতাম,” বলতে লাগলো সালান্ডার। “মিকাইলের সাথে আপনাদের কি চুক্তি আছে জানি না, আমি কিন্তু পুরো ঘটনাটি স্থানীয় সংবাদপত্রে পাঠিয়ে দেবো। মার্টিনকে যদি হাতের কাছে এখন পেতাম তাকে তার নির্যাতন করার কক্ষে নিয়ে গিয়ে হাত-পা বেধে সূঁচ দিয়ে ওর বিচি ফুটো ক’রে দিতাম। দুর্ভাগ্য, বদমাশটা এখন আর বেঁচে নেই।”

ব্লমকোভিস্টের দিকে তাকালো সে।

“সমাধানটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। মার্টিন ভ্যাঙ্গার তার শিকারদের সাথে যা করেছে আমরা সেটার কোনো ক্ষতিপূরণ করতে পারবো না। তবে অদ্ভুত একটি পরিস্থিতির আবির্ভাব হয়েছে। নির্দোষ মহিলাদের আরো বেশি ক্ষতি করার মতো অবস্থায় চলে এসেছো তুমি-বিশেষ করে তোমার ঐ হ্যারিয়েটের কথা বলছি, যার পক্ষ নিয়ে আমার সাথে অনেক তর্ক করেছো। তোমার কাছে আমার প্রশ্ন হলো : কোনটা বেশি খারাপ- মার্টিন ভ্যাঙ্গার হ্যারিয়েটকে কেবিনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করতো, নাকি এসব কথা পত্রপত্রিকায় ছাপানো? তুমি চমৎকার একটি অবস্থায় পড়েছো। হয়তো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের নীতিবাগিশ কমিটি তোমাকে এ ব্যাপারে পথ দেখাতে পারে।

মেয়েটা থামলেও তার চোখের দিকে তাকালো না ব্লমকোভিস্ট। টেবিলের দিকে চেয়ে আছে সে।

“তবে আমি কোনো সাংবাদিক নই,” অবশেষে বললো সালান্ডার।

“আপনি কি চান?” জানতে চাইলো ফ্রোডি।

“মার্টিন তার শিকারদের ভিডিও করে রাখতো। আমি চাই আপনারা ওসব ভিডিও দেখে যতোদূর সম্ভব ভিক্টিমদের চিহ্নিত করে তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেবেন। এরপর আমি চাইবো সুইডেনের ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর ওমেন্স ক্রাইসিস সেন্টার এবং গার্লস ক্রাইসিস সেন্টারের তহবিলে ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশন বছরে ২ মিলিয়ন ক্রোনার অনুদান দেবে।”

টাকার অঙ্কটা শুনে কিছুক্ষণ ভেবে নিলো ডার্চ ফ্রোডি। তারপর আস্তে করে মাথা নেড়ে সায় দিলো ভদ্রলোক।

“আমার প্রস্তাবে কি তোমার সায় আছে, মিকাইল?” জানতে চাইলো সালান্ডার।

সমগ্র পেশাগত জীবনে অন্যায় আর দুর্নীতি উন্মোচন করাই ছিলো ব্লমকোভিস্টের একমাত্র কাজ। তার কোনো সহকর্মী যদি কোনো সত্য প্রকাশ করতে পিছপা হতো তাহলে তীব্র ভর্ৎসনা করতো সে। অথচ এখন কিনা তাকে মার্টিন ভ্যাঙ্গারের মতো জঘন্য সিরিয়াল কিলার এবং ধর্ষণকারীর সমস্ত অপকর্ম গোপন রাখতে বলা হচ্ছে।

দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো সে। তারপর সালান্ডারের প্রস্তাবে সায় দিয়ে মাথা নাড়লো আনমনে।

“তাই হবে,” বললো ফ্রোডি। “আর আপনার জন্য হেনরিক যে আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব-

“ঐ প্রস্তাব দেবার কোনো দরকার নেই। ডার্চ, আমি চাই আপনি এক্ষুণি এখান থেকে চলে যান। আপনার অবস্থা আমি বুঝতে পেরেছি কিন্তু এ মুহূর্তে হ্যারিয়েট, হেনরিক আর আপনার উপর আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। আপনি যদি এখানে আরো কিছুক্ষণ থাকেন তাহলে হয়তো আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ব’লে কিছু থাকবে না। “

এরপরও ফ্রোডি বসেই রইলো।

“আমি এখনই চলে যেতে পারছি না। আমার কাজ শেষ হয় নি। আরেকটা মেসেজ আছে আপনার জন্য। এটাও হয়তো আপনি পছন্দ করবেন না। আজরাতেই এ কথাটা বলার জন্য হেনরিক আমাকে অনেক চাপাচাপি করেছে। চাইলে আগামীকাল সকালে হাসপাতালে গিয়ে আপনি তার গায়ের চামড়া তুলে আসতে পারেন।

অবাক হয়ে চেয়ে রইলো ব্লমকোভিস্ট

ফ্রোডি বলতে লাগলো : “এটা আমার জীবনে করা সবচাইতে কঠিন একটি কাজ।”

“ভণিতা না ক’রে বলে ফেলুন।”

“গত ক্রিসমাসে যখন হেনরিক আপনাকে এই কাজের প্রস্তাব দেয় তখন আমি এবং সে কেউই ধারণা করতে পারি নি কোনো রকম সমাধান বেরিয়ে আসবে। এ কথাটা সেও আপনাকে বলেছে। তারপরও আপনাকে চেষ্টা করতে বলেছিলো। আপনার পরিস্থিতি নিয়ে সে অনেক ভেবে দেখেছিলো, বিশেষ করে আপনার উপর ফ্রোকেন সালান্ডারের তৈরি করা রিপোর্টটা পড়ে। আপনার সেই অবস্থার সুযোগে আপনাকে বিরাট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একটি কাজের প্রস্তাব করে সে। এজন্যে তাকে একটা টোপও দিতে হয়েছিলো।”

“ওয়েনারস্ট্রম।”

সায় দিলো ফ্রোডি।

“আপনারা আমাকে ধোকা দিয়েছেন?”

“না, না,” ফ্রোডি বললো।

কৌতূহলী হয়ে ভুরু তুলে তাকালো সালান্ডার।

“হেনরিক কথা দিলে কথা রাখে। একটা ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করছে সে, আর এটা হবে সরাসরি ওয়েনারস্ট্রমের বিরুদ্ধে। পরে আপনি বিস্তারিত সব কিছু হাতে পাবেন। তবে সংক্ষেপে বলছি : ওয়েনারস্ট্রম যখন ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশনের ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে কাজ করতো তখন সে বৈদেশিক মুদ্রার রেট ওঠানামা আগে থেকে আন্দাজ করে কয়েক মিলিয়ন ক্রোনার খরচ করেছিলো। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ের তেজি ভাবের অনেক আগের ঘটনা এটি। এ কাজটি সে করেছিলো কর্তৃপক্ষের কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই। একের পর এক ডিল মার খেলে প্রায় সাত মিলিয়ন ক্রোনার লোকসান হয়। এই পরিমাণ টাকা সে বিভিন্নভাবে পুষিয়ে দেবার চেষ্টা করে, তবে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে তাকে বরখাস্ত করা হয়।”

“এ থেকে কি সে কোনো মুনাফা করতে পেরেছিলো?”

“ওহ্ হ্যা। প্রায় আধ মিলিয়ন ক্রোনারের মতো হবে। সত্যি বলতে কি ঐ পরিমাণ টাকা ওয়েনারস্ট্রম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্টই ছিলো। এসব অনিয়মের ডকুমেন্ট আমাদের কাছে আছে। আপনি চাইলে এই তথ্যগুলো ব্যবহার করতে পারেন। হেনরিক সব ধরণের অভিযোগের ব্যাপারে প্রকাশ্যে আপনাকে সমর্থন দেবে, কিন্তু …’

“কিন্তু, এটা হলো বড় একটা কিন্তু, ডার্চ। এই তথ্যটার কোনো মূল্য নেই, “ টেবিলে চাপড় মেরে বললো ব্লমকোভিস্ট। “এসব ঘটেছে ত্রিশ বছর আগে, এসব ব্যাপার নিয়ে এখন আর কেউ মাথা ঘামাবে না

“আপনি এমন তথ্য পাবেন যাতে করে প্রমাণ করতে পারবেন ওয়েনারস্ট্রম একজন জোচ্চোর।”

“এই তথ্যটা ফাঁস করা হলে ওয়েনারস্ট্রম কিছুটা বিব্রত হবে কিন্তু সেটা তাকে ঢিল ছুড়ে মারার চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। সে একটা প্রেসরিলিজ ক’রে জানাবে হেনরিক ভ্যাঙ্গার বুড়ো বয়সে তার কাছ থেকে কিছু ব্যবসা হাতিয়ে নেবার জন্য এসব করছে। তারপর হয়তো এমনও কথা বলবে যে, সে যা কিছু করেছে সবই হেনরিক ভ্যাঙ্গারের নির্দেশে করেছে। এসব গল্প এখন আর হালে পানি পাবে না। এটা নিয়ে কোনো শোরগোলও হবে না।”

ফ্রোডিকে খুব বেজার দেখালো।

“আপনারা আমাকে ধোকা দিয়ে কাজ উদ্ধার করেছেন,” বললো ব্লমকোভিস্ট।

‘এরকম কিছু করার উদ্দেশ্য আমাদের ছিলো না।”

“এরজন্য আমি নিজেকেই দায়ি করবো। আমি আসলে খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম।” উদভ্রান্তের মতো হেসে ফেললো সে। “হেনরিক একজন ধূর্ত লোক। আমার দুরাবস্থার সুযোগ নিয়ে আমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছে সে। আপনি চলে যান, ডাৰ্চ।”

“মিকাইল…আমি দুঃখিত…”

“ডার্চ। চলে যান।

সালন্ডার বুঝতে পারছে না সে কি ব্লমকোভিস্টকে একা রেখে চলে যাবে নাকি তার কাছে গিয়ে বসবে। তাকে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিলো মিকাইল নিজেই। জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো সে।

এক ঘণ্টা ধরে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করলো সালান্ডার। তার নিজের কাছে এতোটাই খারাপ লাগলো যে টেবিল আর ডিশগুলো পরিস্কার করে সময় পার করলো-এ কাজটা সে ব্লমকোভিস্টের উপরেই ছেড়ে দিতো। জানালার কাছে গিয়ে দেখলো তাকে দেখা যায় কিনা। শেষে ঘাবড়ে গিয়ে জ্যাকেটটা পরে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়লো সে।

প্রথমেই গেলো মেরিনার দিকে। কেবিনগুলোতে বাতি জ্বলছে এখনও তবে তার কোনো দেখা নেই। জলরাশির তীর ধরে হাটতে লাগলো সে কারণ এ পথ ধরেই তারা অনেক সময় হাটাহাটি করে। বিশাল একটা পাথরের কাছে গেলো, যেখানে প্রায়ই তারা বসে বসে কথা বলে থাকে। তাকে না পেয়ে অবশেষে বাড়ি ফিরে এলো সালান্ডার। এখনও ব্লমকোভিস্ট বাড়ি ফিরে আসে নি।

চার্চে গেলো। তার কোনো দেখা নেই। কি করবে ভেবে পেলো না সে। মোটরসাইকেলটা নিয়ে সোজা চলে এলো গটফ্রিডের কেবিনে। পোর্চের কাছে ব্লমকোভিস্ট নেই। দরজায়ও তালা মারা।

গ্রামে ফিরে আসার পথে জেটির কাছে মিকাইলের আবছায়া মূর্তিটা চোখে পড়লো তার। যেখানে হ্যারিয়েট তার বাবাকে পানিতে ডুবিয়ে মেরেছে ঠিক সেখানে চুপচাপ বসে আছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সালান্ডার।

তার পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে তাকালো মিকাইল। কোনো কথা না বলেই চুপচাপ তার পাশে বসে পড়লো মেয়েটা। শেষে ব্লমকোভিস্টই মুখ খুললো।

“আমাকে ক্ষমা করবে। একটু একা থাকতে চেয়েছিলাম।”

“বুঝতে পেরেছি।”

দুটো সিগারেট ধরিয়ে একটা দিলো ব্লমকোভিস্টকে। সালান্ডারের দিকে তাকালো সে। এই মেয়েটা তার দেখা সবচাইতে অসামাজিক একটি মেয়ে। ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চায় না সে। কাউকে সান্ত্বনা দেয়াও তার স্বভাব না। এই মেয়েটিই তার জীবন বাঁচিয়েছে, আর এখন তাকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে এখানে। তার কাঁধে হাত রেখে তাকে জড়িয়ে ধরলো ব্লমকোভিস্ট।

“এখন আমি জেনে গেছি আমার মূল্য কতো,” বললো মিকাইল। “ঐসব হতভাগিনী মেয়েদের পরিত্যাগ করেছি আমরা। তারা পুরো কাহিনীটাই মাটি চাপা দিয়ে দেবে। মার্টিনের বেসমেন্টের সবকিছুই উধাও হয়ে যাবে সালান্ডার কিছু বললো না।

“এরিকার কথাই ঠিক,” বললো মিকাইল। “স্পেনে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে চলে আসলেই ওয়েনারস্ট্রমের বিরুদ্ধে ভালোভাবে লড়াই করতে পারতাম। এতোগুলো মাস নষ্ট করেছি আমি।’

“তুমি যদি স্পেনে যেতে তাহলে মার্টিন ভ্যাঙ্গার এখনও বহাল তবিয়তে নিজের অপকর্ম চালিয়ে যেতে পারতো।”

অনেকক্ষণ বসে থাকার পর ব্লমকোভিস্টই বললো তাদের এখন বাড়ি ফিরে যাওয়া উচিত।

সালান্ডারের আগেই ঘুমিয়ে পড়লো মিকাইল। রান্নাঘরে বসে বসে কয়েকটি সিগারেট ফুকলো মেয়েটি। ভ্যাঙ্গার আর ফ্রোডি যে মিকাইলের সাথে ধোকাবাজি করেছে সেটা সেও বুঝতে পারছে। তাদের স্বভাবই এরকম কাজ করা। তবে এটা ব্লমকোভিস্টের সমস্যা, তার নয়। নাকি তার?

অবশেষে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো সে। সিগারেট ফেলে দিয়ে শোবার ঘরে চলে এলো। ল্যাম্পের বাতি জ্বালিয়ে ঘুম থেকে জেগে তুললো ব্লমকোভিস্টকে। রাত প্রায় আড়াইটা বাজে।

“কি হয়েছে?”

“আমার একটা প্রশ্ন আছে। উঠে বসো।”

ঘুমের ঘোরেই উঠে বসেলা ব্লমকোভিস্ট।

“তোমার বিরুদ্ধে যখন মানহানির মামলা চলছিলো তখন কেন নিজেকে ডিফেন্ড করো নি তুমি?”

চোখ ঘষে ঘড়ির দিকে তাকালো ব্লমকোভিস্ট।

“লম্বা কাহিনী, লিসবেথ।”

“আমার হাতে সময় আছে। আমাকে খুলে বলো।”

অনেকক্ষণ বসে থেকে ভেবে নিলো কি বলবে। শেষে সিদ্ধান্ত নিলো সত্যটাই বলবে তাকে!

“ডিফেন্ড করে লাভ হতো না। আর্টিকেলের তথ্যটা ভুল ছিলো।’

“আমি যখন তোমার কম্পিউটার হ্যাক করি তখন দেখেছি তুমি আর এরিকা বার্গার অনেক ই-মেইল আদানপ্রদান করেছো। তাতে ওয়েনারস্ট্রম বিষয় নিয়ে অনেক রেফারেন্স ছিলো। তবে তোমরা দু’জনে বিচারের রায় কি হবে না হবে সেটা নিয়ে অনেক কথা বললেও আসলে ঘটনাটা কি ছিলো সেটা বলো নি। হয়েছিলোটা কি?”

“লিসবেথ, আমি সত্যিকারের গল্পটা বলতে পারি নি। একটা ফাঁদে পড়ে গেছিলাম। এরিকা আর আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আসলে কি ঘটেছিলো সেটা যদি বলি তাহলে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।”

“শোনো, কাল ব্লমকোভিস্ট, গতকাল তুমি এখানে বসে বসে ‘বন্ধুত্ব কাহাকে বলে’ সেসব নিয়ে আমাকে অনেক সবক দিয়েছো। আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা-আরো কতো কি! আমি কিন্তু তোমার কাছ থেকে গল্পটা শুনে নেটে ছেড়ে দেবো না।”

ব্লমকোভিস্ট একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলো। এই মাঝরাতে পুরো কাহিনীটা বলতে ইচ্ছে করছে না তার। কিন্তু সালান্ডার নাছোরবান্দা। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে কফিপটে পানি গরম করতে দিলো সে। এরপর সালান্ডারের কাছে তার পুরনো স্কুলবন্ধু রবার্ট লিন্ডবার্গের সাথে দেখা হওয়া এবং তার কাছ থেকে পুরো গল্পটা শুনে কিভাবে কৌতুহলী হয়ে উঠেছিলো সে কথা বললো।

“তার মানে তোমার ঐ দোস্ত তোমার কাছে মিথ্যে বলেছিলো?”

“না, মোটেও না। সে জানতো তাই আমাকে বলেছে। তার বলা কথাগুলো খতিয়ে দেখেছি আমি। সবটাই সত্যি। এমনকি আমি পোল্যান্ডে গিয়েও মিনোস নামের কারখানাটি দেখে এসেছিলাম। ওখানে বেশ কয়েকজন লোকের ইন্টারভিউ পর্যন্ত নিয়েছি। তারাও আমাকে ঠিক একই কথা বলেছে।

“মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।”

দীর্ঘশ্বাস ফেললো ব্লমকোভিস্ট। একটু চুপ করে থেকে আবারো বলতে শুরু করলো সে।

“আমার কাছে একটি ফাটাফাটি কাহিনী ছিলো। যার সবটাই ছিলো সত্যি। ঐ সময় যদি আমি গল্পটা প্রকাশ করতাম তাহলে তাকে একেবারে বিধ্বস্ত করে ফেলতে পারতাম।”

“তাহলে সমস্যাটা কি হয়েছিলো?”

“এই কাহিনীটা নিয়ে যখন কাজ করছিলাম তখন কেউ একজন হয়তো টের পেয়ে গেছিলো। ওয়েনাস্ট্রমের কাছে ব্যাপারটা ফাঁস করে দিলে সে সতর্ক হয়ে ওঠে। এরপর আচমকাই কতোগুলো অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে। প্রথমে আমাকে হুমকি দেয়া হলো। এমন সব কার্ডফোন থেকে ফোন করে হুমকি দেয়া হলো যেগুলো ট্রেস করা প্রায় অসম্ভব। এরিকাকেও হুমকি দেয়া হয়েছিলো। এটা অবশ্য নতুন কোনো ব্যাপার ছিলো না আমাদের জন্য। তবে এরিকা একেবারে ঘাবড়ে যায়।”

সালান্ডারের কাছ থেকে একটা সিগারেট নিলো সে।

“তারপর একেবারেই অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা ঘটলো। অফিস থেকে কাজ শেষে বের হতেই দু’জন লোক এসে আমাকে এলোপাথারি ঘুষি মারলে আমার ঠোঁট ফেঁটে গেলো। রাস্তায় পড়ে রইলাম আমি। তাদেরকে আমি চিনতে পারি নি তবে তাদের একজন ছিলো পুরনো একজন বাইক চালক।’

“তারপর…”

“এসব ঘটনা আমাকে আরো ক্ষেপিয়ে তুললো। মিলেনিয়াম-এর নিরাপত্তা বাড়ানো হলো। আমরা বুঝতে পারলাম না কেন এসব করা হচ্ছে।”

“কিন্তু তুমি যে গল্পটা ছাপিয়েছিলে সেটা তো একেবারেই ভিন্ন কিছু।”

“ঠিক। আচমকা আমরা দুর্দান্ত একটি জিনিস পেয়ে গেলাম তখন। ওয়েনারস্ট্রমের সার্কেলে এক সোর্স পেয়ে গেলাম। সোর্স লোকটি নিজের জীবনের ভয়ে ভীত ছিলো। তার সাথে আমরা কেবল হোটেলরুমেই দেখা করতাম। সে আমাদের জানালো মিনোস-এর সমস্ত টাকা-পয়সা যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসায় খাটানো হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার ডানপন্থী দল উতাশের সাথে অস্ত্র ব্যবসা করছে ওয়েনারস্ট্রম। কেবল মুখেই বললো না, সেই সোর্স তার কথার সপক্ষে আমাদেরকে কিছু ডকুমেন্টের কপিও দিয়ে দিলো।”

“তোমরা তাকে বিশ্বাস করেছিলে?”

“খুব চতুর ছিলো সে। আমাদেরকে এমন তথ্য দিতো যেটা কিনা আরেকজন সোর্সের কাছে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যেতো। আর ঐ সোর্স তখন তথ্যটার সত্যতা নিশ্চিত করতো আমাদের কাছে। ওয়েনারস্ট্রমের এক ঘনিষ্ঠ লোক অস্ত্র ব্যবসায়ীর সাথে হাত মেলাচ্ছে এরকম একটি ছবিও আমাদেরকে দেয়া হয়েছিলো। এতো ডিটেইল তথ্য ছিলো যে আমরা বিশ্বাস করতে বাধ্য হই। সিদ্ধান্ত নেই গল্পটা প্রকাশ করার।”

“পুরোটাই ছিলো ভুয়া।”

“শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেটা ছিলো ভুয়া একটি কাহিনী। ডকুমেন্টগুলো দক্ষহাতে জাল করা ছিলো। আদালতে ওয়েনারস্ট্রমের আইনজীবি প্রমাণ করে দেয় যে, ছবিটি দুটো ভিন্ন ভিন্ন ছবির মিশ্রনে তৈরি করা একটি জাল ছবি।”

“অসাধারণ,” বললো সালান্ডার।

“পরে বুঝতে পারলাম কতো সহজেই না আমাদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিলো। আমাদের আসল গল্পটা ওয়েনারস্ট্রমকে সত্যি বিপদে ফেলে দিতো। কিন্তু আমরা ভুয়া একটি কাহিনী ছাপিয়ে নিজেরাই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেললাম। আদালতে ওয়েনারস্ট্রম সেটাকে জাল হিসেবে প্রমাণ করতে পারলো।”

“এরপর তোমরা সত্যি কথাটা বলতে পারলে না কেন?”

“আমরা সেটা করলে কেউ আমাদের কথা বিশ্বাস করতো না! মনে হতো আমরা আদালতে হেরে গিয়ে ওয়েনারস্ট্রমের বিরুদ্ধে আরেকটা ভুয়া কাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি।”

“বুঝতে পেরেছি।“

“ওয়েনারস্ট্রমের দুই স্তরের সুরক্ষা ছিলো। আমরা যদি প্রমাণ করতে পারতাম আমাদেরকে জাল ডকুমেন্ট দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে তাহলে ওয়েনারস্ট্রম দাবি করতো তার শত্রুরা তার সুনামহানি করার জন্য এটা করেছে। আর আমরা, মিলেনিয়াম আরেকবার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতো সবার কাছে।”

“তাই তুমি নিজেকে ডিফেন্ড না করে আদালতের সাজা মাথা পেতে নিলে।“

“এটা আমার প্রাপ্য ছিলো,” বললো ব্লমকোভিস্ট। “আমি মানহানি করেছি। এখন তো সব জানলে। এবার কি আমি ঘুমাতে যেতে পারি?”

ল্যাম্পটা বন্ধ করে চোখ দুটো বন্ধ করলো সে। কিন্তু তার পাশে চুপচাপ বসে রইলো সালান্ডার।

“ওয়েনারস্ট্রম একজন গ্যাংস্টার।”

“আমি সেটা জানি।”

“না, আমি মিন করেই বলছি কথাটা। আমি জানি সে একজন গ্যাংস্টার। রাশিয়ান মাফিয়া থেকে কলম্বিয়ান ড্রাগ কার্টেল, সবার সাথেই সে কাজ করে।”

“কি বলতে চাচ্ছো তুমি?“

“ফ্রোডির কাছে যখন আমি রিপোর্টটা দিয়েছিলাম তখন সে আমাকে আরেকটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলো। তোমার মামলায় আসলে কি হয়েছিলো সেটা জানতে চেয়েছিলো সে। আমি কাজটা শুরু করতেই সে আরমানস্কিকে ফোন করে অ্যাসাইনমেন্টটা বাতিল করে দেয়।”

“কেন?”

“আমার ধারণা তুমি হেনরিকের প্রস্তাবটা গ্রহণ করার ফলে তাদের আর এ কাজের কোনো দরকার ছিলো না।”

“তো?”

“আমি আবার অসমাপ্ত কোনো কাজ করতে ভালোবাসি না। কয়েক সপ্তাহ হাতে ছিলো আমার…ঐ সময় কোনো কাজ ছিলো না। তাই এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু খোড়াখুড়ি করি আমি। নিছক মজা পাওয়ার জন্য।’

উঠে বসে ল্যাম্পটা আবারো জ্বালালো ব্লমকোভিস্ট। অবাক হয়ে চেয়ে রইলো সালান্ডারের দিকে। মেয়েটার চোখেমুখে অপরাধবোধ।

“তুমি কি কিছু খুঁজে পেয়েছিলে?”

“তার পুরো হার্ডডিস্কটা আমার কম্পিউটারে রাখা আছে। লোকটা যে একজন গ্যাংস্টার সে সম্পর্কে অনেক প্রমাণ তুমি সেখানে পাবে

অধ্যায় ২৮

মঙ্গলবার, জুলাই ২৯ শুক্রবার, অক্টোবর ২৪

তিনদিন ধরে ব্লমকোভিস্ট সালান্ডারের কম্পিউটারের প্রিন্টআউট নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে রইলো। সমস্যা হলো বিষয়গুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। লন্ডনে একটি অপশন ডিল। এক এজেন্টের মাধ্যমে প্যারিসে একটি মুদ্রা ডিল। জিব্রাল্টারে এক কোম্পানির পোস্টঅফিস বক্স। নিউইয়র্কের চেজ ম্যানহাটন ব্যাঙ্কের এক একাউন্টে আচমকা দ্বিগুন পরিমাণ ব্যালান্স হয়ে যাওয়া।

এরপর হতবুদ্ধিকর প্রশ্নগুলো মার্ক করে রাখা হলো : ২০০০০০ ক্রোনারের একটি ট্রেডিং কোম্পানির একাউন্ট চিলির সান্তিয়াগোতে পাঁচ বছর আগে রেজিস্টার্ড করা হয়েছে-বারোটি ভিন্ন ভিন্ন দেশে ত্রিশটির মতো কোম্পানির একটি-কোন্ ধরণের কর্মকাণ্ড জড়িত সেটার অবশ্য কোনো উল্লেখ নেই। গোপন একটি কোম্পানি? কিসের জন্য অপেক্ষা করছে? অন্য কোনো ধরণের কার্মকাণ্ডের জন্য একটি ফ্রন্ট? কম্পিউটারে অবশ্য এমন কোনো কিছু নেই যাতে বোঝা যাবে ওয়েনারস্ট্রমের মাথায় কি পরিকল্পনা ঘুরছে। অথবা কি ধরণের কাজ করতে যাচ্ছে সে।

সালান্ডার নিশ্চিত এসব প্রশ্নের বেশিরভাগেরই জবাব কখনও মিলবে না। মেসেজগুলো তারা দেখতে পাচ্ছে, তবে কোনো রকম চাবি ছাড়া এসবের কোনো মানে বের করা যাবে না। ওয়েনারস্ট্রমের সাম্রাজ্যটা পেঁয়াজের মতো, একটা স্তর ভেদ করলে আরেকটা স্তর চলে আসে। একটি এন্টারপ্রাইজের অধীনে আরেকটি এন্টারপ্রাইজ। এভাবে গোলকধাঁধার মতো ব্যাপার। কোম্পানি, একাউন্ট, তহবিল, সিকিউরিটিজ। তারা বুঝতে পারলো ওয়েনারস্ট্রম নিজেও এসব বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখে না। ওয়েনারস্ট্রম সাম্রাজ্যটা যেনো জীবন্ত কোনো কিছু। আপনা আপনিই কাৰ্যক্ষম।

তবে একটা প্যাটার্ন আছে। কিংবা বলা যেতে পারে প্যাটার্নের আভাস রয়েছে। ওয়েনারস্ট্রমের সমগ্র সাম্রাজ্যের আনুমানিক মূল্য ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন ক্রোনার। তবে সেটা নির্ভর করছে যারা ক্রেতা তাদের উপর। তারা কতোটা মূল্য হাঁকাবে সেটা অনুমান করা যেতে পারে কিন্তু এই অনুমান ভুলও হতে পারে। তবে প্রতিটি কোম্পানির যদি একে অন্যের সম্পদের উপর অধিকার থেকে থাকে তাহলে তাদের আসল মূল্য কতো হবে?

ওয়েনারস্ট্রম সম্পর্কে সালান্ডারের বোমাটি বিস্ফোরণের পরদিন সকালেই বেশ তাড়াহুড়া করে তারা হেডেবি আইল্যান্ড ছেড়ে চলে গেলো। ব্লমকোভিস্টের ধ্যানজ্ঞান এখন সেই বিষয়টা নিয়েই। হেডেবি থেকে তারা সোজা চলে গেলো সালান্ডারের অ্যাপার্টমেন্টে, সেখানে গিয়ে টানা দু’দিন কাটিয়ে দিলো কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে। মেয়েটা তাকে ওয়েনারস্ট্রমের সাম্রাজ্য ঘুরিয়ে আনলো। তার মনে অসংখ্য প্রশ্ন। তার মধ্যে একটা একেবারেই কৌতুহল থেকে।

“লিসবেথ, তুমি কিভাবে তার কম্পিউটারে ঢুকে এতোসব দেখতে পারলে?”

“এটা আমার বন্ধু প্লেগের ছোট্ট একটি আবিষ্কার। অফিস এবং বাড়িতে কাজ করার জন্য ওয়েনারস্ট্রম একটি আইবিএম ল্যাপটপ ব্যবহার করে। তার মানে সবধরণের তথ্য একটামাত্র হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করা আছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশান রয়েছে তার বাড়িতে। প্লেগ ‘কাফ’ নামের এমন একটি জিনিস আবিষ্কার করেছে যেটা ঐ ব্রডব্যান্ড ক্যাবলে পেচিয়ে রাখলেই কাজ করবে। তার হয়ে আমি নিজে সেই কাজটা করেছি। যাইহোক, ওয়েনারস্ট্রম যা কিছু দেখে সবই আসলে ঐ ‘কাফ’-এর মাধ্যমে চলে আসা জিনিস। অন্য কোথাও রাখা একটি সার্ভার থেকে সব ডাটাস ফরোয়ার্ড করা হয়।

“তার কি কোনো ফায়ারওয়াল নেই?”

হেসে ফেললো সালান্ডার।

“অবশ্যই আছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ঐ কাফটা এক ধরণের ফায়ারওয়াল হিসেবেও কাজ করে থাকে। এভাবে কম্পিউটার হ্যাক করতে একটু সময় লাগে। ধরো ওয়েনারস্ট্রম একটা ই-মেইল পেলো; ওটা প্রথমে আসবে প্লেগের ‘কাফ’-এ, সেটা ফায়ারওয়াল-এর মধ্য দিয়ে চলে যাবার আগেই আমরা পড়ে ফেলতে পারবো। কিন্তু এই কাফ-এর আসল বিশেষত্বটা হলো ঐ ই-মেইলটা রি-রাইটেন হয়ে যাবে আর তার সোর্স কোডের কিছু বাইটও যোগ হয়ে যাবে সেইসাথে। সে তার কম্পিউটার থেকে যতোবারই ডাউনলোড করবে এভাবে সবকিছু আমরা পেয়ে যাবো। ছবি ডাউনলোড করলে আরো ভালো হয়। লোকটা প্রচুর নেট সার্ফ করে। যখনই সে নতুন কোনো পর্নো ছবি কিংবা হোমপেজ ওপেন করে আমরা তার সাথে বেশ কয়েকটি সোর্স কোড জুড়ে দেই। কিছু দিন কিংবা কয়েক ঘণ্টা পর-সেটা নির্ভর করে সে কতোটা বেশি নেট ব্যবহার করলো তার উপর-ওয়েনারস্ট্রম ধীরে ধীরে তিন মেগাবাইটের পুরো প্রোগ্রামটিই ডাউনলোড করে ফেলেলো।”

“তারপর?”

“সবগুলো বাইট ডাউনলোড হয়ে যাবার পর আমাদের তৈরি করা প্রোগ্রামটি তার ইন্টারনেট ব্রাউজারে ইন্টেগ্রেটেড হয়ে যায়। তার কাছে মনে হয়েছিলো তার কম্পিউটারটা বুঝি হ্যাঙ্গ হয়ে গেছে, সে রিস্টার্ট করে। এই রিস্টার্টের সময় নতুন প্রোগ্রামটি তার কম্পিউটারে ইনস্টল হয়ে যায় আরামসে। সে ব্যবহার করে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার। রিস্টার্ট করার পর এক্সপ্লোরার ওপেন করতেই একটি নতুন প্রোগ্রাম ওপেন হয়ে গেলো যা কিনা তার কাছে একেবারেই অদৃশ্য, কেননা এটা তার ডেস্কটপে কোনো আইকন শো করে নি। ঠিক এক্সপ্লোরারের মতোই কাজ করে ঐ প্রোগ্রামটি। তবে সেইসাথে বাড়তি আরেকটা কাজও করে। প্রথমে এটা তার ফায়ারওয়ালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং সবকিছু ঠিকঠাকমতো কাজ করছে কিনা সেটা নিশ্চিত করে। এরপর পুরো কম্পিউটারটি স্ক্যান করে এবং যখনই সে নিজের কম্পিউটার সার্ফ করে তার প্রতিটি বাইট ট্রান্সমিট করে দেয় আমাদের কাছে। তার কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের অনুরূপ একটি হার্ডডিস্ক তৈরি হয়ে যায় অন্যকোথাও রাখা একটি সার্ভারের হার্ডডিস্কে। এরপরই এইচ.টি করার সময় চলে আসে

“এইচ.টি?”

“সরি। এটা প্লেগ বলে। হস্টাইল টেকওভার।”

“বুঝেছি।”

“তবে এরপর যা হয় সেটা একটু জটিল। পুরো কাজটা শেষ হয়ে গেলে দেখা গেলো ওয়েনারস্ট্রমের কম্পিউটারে আসলে দুটো হার্ডডিস্ক আছে। একটা তার নিজের কম্পিউটারে আর অন্যটি আমাদের সার্ভারে। এরপর সে তার কম্পিউটার চালু করলে আসলে আমাদের কাছে থাকা হার্ডডিস্কটা চালু হয়। সে আর নিজের কম্পিউটারে কাজ করছে না, সে কাজ করছে আমাদের কম্পিউটারে। তার কম্পিউটারটা একটু স্লো হয়ে গেলেও সেটা তার চোখে পড়ে না। বোঝার কোনো উপায় থাকে না আর কি। আমি যখন সার্ভারে কানেক্ট করি. তখন তার কম্পিউটারে কি হচ্ছে না হচ্ছে সবই দেখতে পাই। ওয়েনারস্ট্রম তার কম্পিউটারের কি-বোর্ডে কোন কি চাপলো না চাপলো তাও আমি দেখতে পাই আমার কম্পিউটারে।”

তোমার বন্ধুও একজন হ্যাকার?”

“লন্ডনে টেলিফোন ট্যাপ করার ব্যবস্থা সে-ই করে দিয়েছিলো। একটু অসামাজিক লোক হলেও নেট-এ সে একজন কিংবদন্তী।”

“ঠিক আছে,” তার দিকে হেসে বললো মিকাইল। “দুই নাম্বার প্রশ্ন : ওয়েনারস্ট্রম সম্পর্কে এসব কথা তুমি আমাকে আগে কেন বলো নি?”

“তুমি তো কখনও জিজ্ঞেস করো নি আমাকে।

“আমি যদি কখনও তোমাকে জিজ্ঞেস না করতাম-ধরো তোমার সাথে আমার কখনও দেখাই হলো না—তাহলে কি তুমি এসব জানার পরও বসে থাকতে আর মিলেনিয়াম-এর দেউলিয়া হয়ে যাওয়া দেখতে?”

“ওয়েনারস্ট্রম কেমন লোক সে সম্পর্কে কেউ আমার কাছে কখনও জানতে চাই তো না,” সবজান্তার মতো ক’রে বললো সালান্ডার।

“হ্যা, কিন্তু আমি বলছি যদি’র কথা?”

“আমি তো তোমাকে বলেছিই,” বললো মেয়েটি।

প্রসঙ্গটা বাদ দিলো ব্লমকোভিস্ট।

.

ওয়েনারস্ট্রমের হার্ডডিস্কের সব কিছু দশটি সিডি’তে রাইট করে নিলো সালান্ডার। প্রায় পাঁচ গিগাবাইটের সমপরিমাণ তথ্য। তার কাছে মনে হলো সে বুঝি ব্লমকোভিস্টের অ্যাপার্টমেন্টে চলে এসেছে। ধৈর্য ধরে তার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে গেলো মেয়েটি।

“আমি বুঝতে পারছি না সে কেন তার সমস্ত নোংরা জিনিস কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে রাখে,” বললো সে। “পুলিশ যদি এটার খোঁজ পেয়ে যায় তো…”

“লোকজন খুব বেশি যৌক্তিকভাবে চিন্তা করে না। সে বিশ্বাস করে পুলিশ কখনওই তার কম্পিউটার সিজ করবে না।”

“তা অবশ্য ঠিক। আমি মানছি লোকটা খুব উন্নাসিক একজন। আস্ত একটা বানচোত। তবে তার উচিত নিজের কম্পিউটারের নিরাপত্তা নিয়ে একজন সিকিউরিটি কনসালটেন্টের সাথে পরামর্শ করা। তার কম্পিউটারে এমন ম্যাটেরিয়ালও আছে যা কিনা ১৯৯৩ সালের ঘটনা সম্পর্কিত।”

“কম্পিউটারটা অবশ্য অপেক্ষাকৃত নতুন। এক বছর আগে এটা নির্মাণ করা হয়েছে, লোকটা তার আগের সমস্ত ডকুমেন্ট আর চিঠিপত্র সিডি’তে না রেখে হার্ডডিস্কে সেভ ক’রে রেখেছে। কিন্তু একটা এনক্রিপশন প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সে। তবে এই এনক্রিপশন প্রোগ্রাম কোনো কাজেই লাগবে না যদি তুমি তার কম্পিউটারে ঢুকে পাসওয়ার্ডটা পড়ে ফেলতে পারো।”

.

তারা স্টকহোমে ফিরে আসার চারদিন পর রাত ৩টার দিকে মাম ফোন করলো ব্লমকোভিস্টকে।

“হেনরি কোর্তেজ আজরাতে তার মেয়েবান্ধবীকে নিয়ে একটা বারে গিয়েছিলো।”

“তাই নাকি,” ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললো মিকাইল।

“বাড়ি ফেরার পথে তারা সেন্ট্রালেনের বারে ঢুঁ মেরে যায়।

“রোমান্স করার জন্য তো জায়গাটা মোটেও ভালো নয়।”

“শোনো না কি হয়েছে। ডালম্যান তো ছুটিতে আছে। কিন্তু হেনরি তাকে ঐ বারে এক লোকের সাথে দেখতে পেয়েছে।”

“তারপর?”

“হেনরি ঐ লোকটাকে চিনতে পেরেছে। ক্রিস্টার সোডার।”

“নামটা শুনে চিনে পারছি না, তবে…”

“লোকটা মনোপলি ফিনান্সিয়াল ম্যাগাজিন-এ কাজ করে, যার মালিক ওয়েনারস্ট্রম গ্রুপ।”

কথাটা শুনে বিছানায় উঠে বসলো ব্লমকোভিস্ট।

“তুমি কি আমার কথা শুনছো?”

“শুনছি। এটা হয়তো কোনো ব্যাপার না। সোডার একজন সাংবাদিক, সে হয়তো তার পুরনো কোনো বন্ধু হবে।

“হয়তো আমি একটু বেশি সন্দেহগ্রস্ত আচরণ করছি কিন্তু কিছুদিন আগে মিলেনিয়াম এক ফ্রিল্যান্সারের কাছ থেকে একটা রিপোর্ট কিনে নিয়েছিলো…আমরা সেটা প্রকাশ করার এক সপ্তাহ আগেই সোডার সেটা নিজের পত্রিকায় প্রকাশ করে ফেলে। সংবাদটি ছিলো একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বাতিল যন্ত্রাংশ ব্যবহারের উপর।

“বুঝতে পারছি তুমি কি বলতে চাচ্ছো। তবে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। তুমি কি এরিকার সাথে এ নিয়ে কথা বলছো?”

“না, সে তো সামনের সপ্তাহে ফিরে আসবে।”

“কাউকে কিছু বোলো না। আমি তোমাকে পরে ফোন করছি,” বললো ব্লমকোভিস্ট।

“কোনো সমস্যা হয়েছে?” জানতে চাইলো সালান্ডার।

“মিলেনিয়াম,” মিকাইল বললো। “আমাকে সেখানে যেতে হবে। যাবে আমার সাথে?”

.

এডিটোরিয়াল অফিসটি একেবারে ফাঁকা। ডালম্যানের কম্পিউটারের পাসওয়ার্ডটা ভাঙতে মাত্র তিন মিনিট লাগলো সালান্ডারের। সেটা থেকে ব্লমকোভিস্টের ল্যাপটপে সব তথ্য ট্রান্সফার করতে লাগলো আরো দু’মিনিট।

ডালম্যানের বেশিরভাগ ই-মেইলগুলো সম্ভবত তার ল্যাপটপে রাখা আছে। সেটাতে তারা ঢুকতে পারছে না এখন। তবে মিলেনিয়াম-এ তার যে ডেস্কটপ কম্পিউটার আছে সেটা ব্যবহার করে সালান্ডার জানতে পারলো মিলেনিয়াম-এর একাউন্ট বাদেও ডালম্যান আরো একটি ই-মেইল একাউন্ট ব্যবহার ক’রে থাকে। ছয় মিনিট লাগলো সেই একাউন্টের কোডটা ভাঙতে, তারপর বিগত এক বছরে যতোগুলো মেইল আদানপ্রদান করা হয়েছে সব ডাউনলোড ক’রে ফেলা হলো। পাঁচ মিনিট পরই ব্লমকোভিস্ট বুঝতে পারলো ডালম্যান মিলেনিয়াম-এর সব ধরণের তথ্য লিক করে থাকে। এরিকা বার্গার কি ধরণের সংবাদ মিলেনিয়াম-এ ঠাঁই দেবে সেসবই মনোপলি ফিনান্সিয়াল ম্যাগাজিন-এর এডিটরকে আগেভাগে জানিয়ে দিতো সে। গত শরৎকাল থেকে এসব ক’রে আসছে ডালম্যান।

কম্পিউটার বন্ধ করে তারা দু’জনেই ঘুমানোর জন্য চলে গেলো মিকাইলের অ্যাপার্টমেন্টে। তবে খুব অল্প কয়েক ঘণ্টাই ঘুমালো তারা। সকাল ১০টার দিকে মামকে ফোন করলো ব্লমকোভিস্ট।

“ডালম্যান যে ওয়েনারস্ট্রমের হয়ে কাজ করছে সে ব্যাপারে আমার কাছে প্রমাণ আছে।

“আমি জানতাম। ঠিক আছে, তাহলে ঐ বানচোতটাকে আজই বরখাস্ত করে দেই।”

“না, এটা কোরো না। কিছুই কোরো না

“কিচ্ছু করবো না?”

“ক্রিস্টার, আমার উপর আস্থা রাখো। ডালম্যান কি এখনও ছুটিতে আছে?”

“হ্যা, সোমবার কাজে যোগ দেবে সে।”

“আজ অফিসে কতোজন আছো?”

“প্রায় অর্ধেক কর্মচারি উপস্থিত আছে।’

“তুমি কি ২টার দিকে একটা মিটিং ডাকতে পারবে? কি নিয়ে মিটিং হবে সেটা বোলো না। আমি অফিসে আসছি।”

.

কনফারেন্স টেবিলে মোট ছয়জন উপস্থিত আছে। মামকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে আজ। কোর্তেজকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে নতুন প্রেমে পড়া একজন। নিলসন খুব অস্থির হয়ে আছে, কারণ মাম কাউকে বলে নি মিটিং কেন ডাকা হয়েছে। শুধুমাত্র পার্টটাইম কাজ করে যে মেয়েটা সেই ইঙ্গেলা ওস্কারসন একেবারে নির্বিকার। আরেকজন পার্টটাইমার হলো লোট্টা করিম, সে অবশ্য কিছুটা উদ্বিগ্ন। ছুটিতে থাকা ম্যাগনাসনকেও ডেকে এনেছে মাম।

সবাইকে স্বাগত জানিয়ে নিজের দীর্ঘ বিরতির জন্য ক্ষমা চেয়ে বলতে শুরু করলো ব্লমকোভিস্ট।

“আজ আমরা যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করবো সেটা নিয়ে আমি আর ক্রিস্টার এখনও এরিকার সাথে কোনো রকম কথাবার্তা বলি নি। তবে আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আমি এরিকার হয়েই কথা বলছি। আজ আমরা মিলেনিয়াম-এর ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে যাচ্ছি।”

তার কথাগুলো সবাই যাতে অনুধাবন করতে পারে সেজন্যে একটু থামলো সে। কেউ কোনো প্রশ্ন করলো না।

“বিগত বছরটা খুব বাজে গেছে আমাদের। তবে আমি খুব গর্বিত যে এখানকার কেউই আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায় নি। ধরে নিচ্ছি এখানে যারা আছে তারা সবাই বেশ বিশ্বস্ত। এই ম্যাগাজিনটাকে ভালোবাসে। এজন্যেই আপনাদের সাথে পুরো ব্যাপারটা আলোচনা করবো বলে এই মিটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটাকে আমাদের শেষ একটা চেষ্টা বলে ধরে নিতে পারেন।”

“শেষ চেষ্টা?” মনিকা নিলসন বললো। “আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে পত্রিকাটা বন্ধ ক’রে দেয়ার কথা ভাবছেন।”

“ঠিক, মনিকা,” বললো মিকাইল। “কথা শুনে মনে হবে যেনো আমরা পত্রিকাটি বন্ধ ক’রে দিচ্ছি। এরিকা ফিরে এলে এরকম আরেকটি মিটিং ডেকে সবাইকে জানিয়ে দেবে আগামী ক্রিসমাসের সময় এই পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হবে। সবাইকে বরখাস্ত করবে সে।”

এবার পুরো ঘরে উদ্বিগ্নতা ছড়িয়ে পড়লো। এমনকি মামও মনে করতে শুরু করলো ব্লমকোভিস্ট বুঝি সিরিয়াসলি এটা বলেছে। এরপরই সবাই দেখতে পেলো ব্লমকোভিস্টের মুখে চওড়া হাসিটা।

“এই শরৎকালে আপনারা যা করবেন সেটা এক ধরণের নাটক। দুঃখজনক ব্যাপার হলো আমাদের ম্যানেজিং এডিটর জেইন ডালম্যান হ্যান্স-এরিক ওয়েনারস্ট্রমের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে আসছে। তার মানে আমাদের শত্রু আমাদের ভেতরে সবকিছু জেনে যেতো। এর আগে বেশ কয়েকটি বাজে ঘটনার ব্যাখ্যা এবার মিলিয়ে নিতে পারেন। বিশেষ করে বিজ্ঞাপনের কথা বলা যেতে পারে। অনেকবারই দেখা গেছে শেষ মুহূর্তে বিজ্ঞাপনদাতারা সটকে পড়েছে।”

ডালম্যান কখনই অফিসে জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলো না তাই এই কথাটা শুনে কেউই অবাক হলো না। একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলে মিকাইল সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলো।

“আপনাদের এখানে ডেকে আনার কারণ আমি আপনাদেরকে বিশ্বাস করি। জানি আমার কাছ থেকে আসল কথাটা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। মিলেনিয়াম বন্ধ হয়ে যাবার পথে আছে ওয়েনারস্ট্রম যাতে এরকম ধারণা পোষণ করে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবাইকে এটা করতে হবে। “

“আমাদের আসল অবস্থাটা কি?” কোর্তেজ জানতে চাইলো।

“ঠিক আছে। বলছি। মিলেনিয়াম মোটেও বন্ধ হবে না, এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। এক বছর আগে পত্রিকাটি যতো শক্তিশালী ছিলো বর্তমানে এটা তারচেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থায় আছে। এই মিটিংটা শেষ হয়ে যাবার পর আমি আবারো দুই মাসের জন্য উধাও হয়ে যাবো। অক্টোবরের শেষের দিকে ফিরে আসবো এখানে, তারপর সবাই মিলে ওয়েনারস্ট্রমের ডানা কেটে দেবার ব্যবস্থা করবো।”

“এটা আমরা কিভাবে করবো?” নিলসন বললো।

“দুঃখিত, মনিকা। এই মুহূর্তে আমি বিস্তারিত বলতে পারবো না। তবে আমি নতুন একটি গল্প লিখবো, এবারে কোনো রকম ভুল হবে না। ক্রিসমাস পার্টিতে আমি ওয়েনারস্ট্রমকে রোস্ট হিসেবে পেতে চাই আর সমালোচকদের চাই ফলাহার হিসেবে।”

সবাই বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। ব্লমকোভিস্ট বুঝতে পারলো মিলেনিয়াম- এর হাতেগোনা কর্মীদের মাঝে এখনও তার ট্রাস্ট ক্যাপিটাল অক্ষুন্ন আছে। হাত তুললো সে।

“এটা করতে হলে আমাদেরকে এমন কাজ করতে হবে যাতে করে ওয়েনারস্ট্রম মনে করে আমাদের পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ সে যেনো আমাদের পেছনে লেগে না থাকে, আমরা তার সম্পর্কে যে খবরটা প্রকাশ করতে যাবো সে সম্পর্কিত কোনো আলামত যেনো নষ্ট করে ফেলতে না পারে। সুতরাং আগামী মাস থেকে আমরা তার উপর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট শুরু করতে যাচ্ছি। তার আগে আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে এখানে যা কিছু আলোচনা হলো তা যেনো কোনোভাবেই লেখা না হয়, কিংবা এ বিষয়ে মেইলে যেনো কোনো উল্লেখ না করে। আমরা জানি না ডালম্যান আমাদের সবার কম্পিউটারে কতোটুকু প্রবেশ করতে পেরেছে। তবে ভবিষ্যত সতর্কতার জন্য সবাই সজাগ থাকবে সেটাই আশা করি। সুতরাং আমরা পুরো কাজটাই করবো মৌখিকভাবে। কোনো দরকার পড়লে সোজা ক্রিস্টারের বাড়ি চলে যাবেন। ফোন কিংবা মেইলে কিছু আলোচনা করবেন না। একেবারে সতর্ক থাকতে হবে সবাইকে।”

পেছনের হোয়াইট বোর্ডে ‘কোনো ই-মেইল করা চলবে না’ লিখলো ব্লমকোভিস্ট।

“দ্বিতীয়ত, আমি চাইবো আপনারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি করবেন, আমার সম্পর্কে ডালম্যানের সামনে অনুযোগ করবেন তীব্র ভাষায়। বাড়াবাড়ি করবেন না। আপনাদের এসব উষ্মা প্রকাশ যেনো খুব স্বাভাবিক দেখায়। ক্রিস্টার, আমি চাই তুমি আর এরিকা তুমুল বাকবিতণ্ডা করবে। কিভাবে করবে সেটা তুমিই ঠিক করে নেবে।”

‘ঝগড়া-ফ্যাসাদ শুরু করা’ কথাটি লিখলো এবার।

“তৃতীয়ত, এরিকা ফিরে এলে সে ডালম্যানের সামনে এমন সব কথা বলবে যাতে মনে হবে হেনরিক ভ্যাঙ্গারের সাথে আমাদের চুক্তিটা বাতিল হয়ে যাচ্ছে, কারণ সে খুব অসুস্থ আর মার্টিন ভ্যাঙ্গার মারা গেছে।”

‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ কথাটা লিখলো সে।

“কিন্তু চুক্তিটা তো আসলে বহালই থাকবে, নাকি?” জানতে চাইলো মনিকা নিলসন।

“বিশ্বাস করেন, ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশন মিলেনিয়াম-এর টিকে থাকা নিয়ে আমাদের চেয়েও বেশি মরিয়া। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছে এ ব্যাপারে। ধরে নিতে পারেন, আগস্টের শেষ দিকে এরিকা মিটিং ডেকে কর্মী ছাটাইয়ের ঘোষণা দেবে। আপনারা জানেন এটা আসলে সাজানো ঘটনা। এই ঘোষণার পর একমাত্র ডালম্যানই চাকরিচ্যুত হবে।”

“আপনি মনে করছেন এই খেলাটা খেললে মিলেনিয়াম রক্ষা পাবে?” বললো ম্যাগনাসন।

“আমি জানি তাই হবে। আর সনি, আমি চাই তুমি প্রতি মাসে একটা ভুয়া রিপোর্ট দেবে যে মিলেনিয়াম-এর বিজ্ঞাপনদাতারা একে একে সটকে পড়ছে, সেইসাথে এর পাঠকের সংখ্যা কমে আসছে আশংকাজনক হারে।”

“খুব মজা লাগছে আমার,” বললো নিলসন। “এইসব কথা কি অফিসের ভেতরই থাকবে নাকি বাইরেও চাউড় করে দেবো, বিশেষ করে মিডিয়ার কাছে?”

“এটা নিজেদের মধ্যেই রেখো। তবে এ কথা বাইরে চলে গেলে আমরা বুঝতে পারবো কে এই কাজটা করেছে। এ নিয়ে যদি বাইরের কেউ আমাদের কাছে জানতে চায় তাহলে তাকে আমরা বলবো : আপনি ভিত্তিহীন একটি গুজব শুনেছেন। আমরা মিলেনিয়াম বন্ধ করার কথা মোটেও ভাবছি না। সবচাইতে ভালো হয় ডালম্যান এই খবরটা মিডিয়ায় চাউড় করলে। সম্ভব হলে আপনারা এ রকম আরো অনেক ভুয়া খবর দিয়ে ডালম্যানকে বিভ্রান্ত করতে পারেন।”

কার কি ভূমিকা সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করে গেলো আরো এক ঘণ্টা ধরে।

.

মিটিং শেষে হর্নগাটসপুকেনে জাভা নামক এক ক্যাফে’তে বসে মামের সাথে কফি পান করলো ব্লমকোভিস্ট।

“ক্রিস্টার, তুমি এয়ারপোর্ট থেকে এরিকাকে রিসিভ করবে, তারপর এসব কথা বিস্তারিত জানিয়ে দেবে তাকে। এই খেলাটা যেনো সে ভালোমতো খেলতে পারে সে ব্যাপারে তাকে রাজি করাবে তুমি। আমি তাকে যতোদূর চিনি, সে ডালম্যানকে মোকাবেলা করতে চাইবে সঙ্গে সঙ্গে—কিন্তু সেটা হতে দেয়া যাবে না। আমি চাই না ওয়েনারস্ট্রম আগেভাগে কিছু টের পেয়ে সতর্ক হয়ে উঠুক।”

“তাই করবো। চিন্তা করো না।”

“পিজিপি এনক্রিপশন প্রোগ্রাম ইনস্টল করা এবং সেটার ব্যবহার শেখার আগপর্যন্ত এরিকা যেনো কোনো রকম ই-মেইল আদানপ্রদান না করে সেটা ও নিশ্চিত করবে। আমরা কার কাছে কি মেইল করি সেসব কিন্তু ডালম্যানের মাধ্যমে ওয়েনারস্ট্রম জেনে যাবে। আমি চাই পুরো অফিসে সবার কম্পিউটারে পিজিপি ইনস্টল করতে বলবে তুমি। তবে এমনভাবে এটা করবে যেনো বেশ স্বাভাবিক নিয়মেই করা হচ্ছে। তার চোখে যেনো ব্যাপারটা সন্দেহজনক না ঠেকে।”

“আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো। কিন্তু মিকাইল-তুমি কি নিয়ে কাজ করছো?”

“ওয়েনারস্ট্রম।”

“তার কোন্ বিষয়টা নিয়ে?”

“আপাতত এটা গোপনই থাক।”

মামকে বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়তে দেখা গেলো। “আমি তোমাকে সব সময় বিশ্বাস করি, মিকাইল। এর মানে কি তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না?”

হেসে ফেললো ব্লমকোভিস্ট।

“অবশ্যই আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি খুবই মারাত্মক একটি ক্রিমিনাল কাজের সাথে জড়িত আছি যা কিনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধরা খেলে কয়েক বছরের জেল হবে নির্ঘাত। আমার এই রিসার্চটি অন্যরকম…ওয়েনারস্ট্রম আমাদের সাথে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলো আমি এখন ঠিক সেই পদ্ধতিই ব্যবহার করছি।”

“তোমার কথা শুনে তো আমি ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়ছি।

“নিশ্চিন্তে থাকো, ক্রিস্টার। এরিকাকে বোলো আমার এবারের রিপোর্টটা বেশ বড়সড় কিছু একটা হবে। বিশাল বড় কিছু।”

“তুমি কি নিয়ে কাজ করছো সে ব্যাপারে জানার জন্য এরিকা কিন্তু চাপাচাপি করবে…

একটু ভেবে নিলো মিকাইল। তারপর হেসে ফেললো।

“তাকে বোলো, আমি যখন হেনরিক ভ্যাঙ্গারের সাথে চুক্তিটা করি তখন সে আমাকে বলেছিলো আমি নিতান্তই একজন সাধারণ ফুল্যান্সার সাংবাদিক, মিলেনিয়াম বোর্ড এবং পত্রিকার নীতি নির্ধারণীতে আমার কোনো স্থান নেই। তার মানে তাকে সব জানাতে হবে এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা আমার নেই। তবে সে যদি আমার কথা মতো কাজ করে তাহলে তাকেই প্রথম জানাবো কি করছি না করছি।”

“আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে সে,” উৎফুল্ল হয়ে বললো মাম।

ব্লমকোভিস্ট জানে মামের সাথে সে পুরোপুরি সততা দেখায় নি। ইচ্ছেকৃতভাবে বার্গারকেও এড়িয়ে চলছে সে। সবচাইতে স্বাভাবিক ব্যাপার হলো তার সাথে এক্ষুণি যোগাযোগ করে সব খুলে বলা। তবে তার সাথে সে কথা বলতে চাচ্ছে না। কয়েকবারই মোবাইল হাতে নিয়ে তাকে ফোন করতে উদ্যত হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর করে নি।

সমস্যাটা কি তা সে জানে। এরিকার চোখের দিকে তাকাতে পারবে না।

হেডেস্টাডে কি হয়েছে সে ব্যাপারে তার কাছে মিথ্যে বলতে হবে কিন্তু এরিকার কাছে মিথ্যে বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

তারচেয়ে বড় কথা ওয়েনারস্ট্রমের ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে যাচ্ছে সে, অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর শক্তি তার নেই। সেজন্যই তার সাথে দেখাসাক্ষাত থেকে বিরত আছে। নিজের মোবাইলটা পর্যন্ত বন্ধ করে রেখেছে সে। তবে এও জানে এটা খুব বেশি দিন চালানো যাবে না।

এডিটোরিয়াল মিটিংয়ের পর পরই স্যান্ডহামের কেবিনে চলে গেলো মিকাইল। প্রায় বছরখানেক ধরে কেবিনে যায় নি। তার ব্যাগেজের মধ্যে সালান্ডারের দেয়া দুই বাক্স প্রিন্ট করা কাগজ আর কতোগুলো সিডি রয়েছে। বেশ ভালো পরিমাণে খাবার-দাবার মজুদ করে দরজা বন্ধ করে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে লিখতে শুরু করে দিলো সে। প্রতিদিন অল্প একটু সময়ের জন্য হাটাহাটি করে বাইরে গিয়ে খাবার আর সংবাদপত্র কিনে আনলো। ঘুমে দু’চোখ বন্ধ হয়ে আসার আগপর্যন্ত লিখে গেলো ব্লমকোভিস্ট।

.

এডিটর ইন চিফ এরিকার কাছ থেকে একটি এনক্রিপ্টেড ই-মেইল পেলো সে।

বরাবর, ছুটিতে থাকা প্ৰকাশক :

মিকাইল। আমি জানতে চাই এসব কি হচ্ছে-ভালোই ভোগাচ্ছো। আমি ছুটি কাটিয়ে এসে দেখি বিরাট হট্টগোল। জেইন ডালম্যানের বিশ্বাসঘাতকতা আর তোমার ডাবল-গেমের ব্যাপারে বলছি। মার্টিন ভ্যাঙ্গার মারা গেছে। হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার বেঁচে আছে। হেডেবিতে হচ্ছেটা কি? তুমি এখন কোথায়? কোনো খবর আছে নাকি? তুমি আমার কল রিসিভ করছো না কেন?

-এরিকা

পি.এস. ক্রিস্টারের মাধ্যমে তোমার কথাগুলো আমি শুনেছি। তুমি কি আমার সাথে সিরিয়াসলি ঝগড়া-ফ্যাসাদ করবে?

পি.পি.এস. আমি তোমাকে কিছুদিনের জন্য বিশ্বাস করছি। তবে তোমাকে প্রমাণ দিতে হবে তোমার মনে আছে তো, আদালতে যেসব জিনিস বলা থেকে বিরত ছিলে- জে.ডি’র বিষয়ে।

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম >

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

হাই রিকি। একদমই না। আমি কোনো ঝগড়াঝাটির মধ্যে যাবো না। তোমাকে সব না জানানোর জন্য আমাকে ক্ষমা করবে। তবে বিগত কয়েকটি মাস আমার জীবনটা একেবারে বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে গেছে। দেখা হলে সবই বলবো তোমায়। তবে ই-মেইলে কিছু বলবো না। আমি এখন স্যান্ডহামে আছি। একটা খবর আছে তবে সেটা হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার সংক্রান্ত নয়। এখানে আমি কম্পিউটার নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকবো কয়েকটা দিন তারপরই কাজটা শেষ হয়ে যাবে। আমার উপর আস্থা রাখো। অনেক অনেক আদর আর চুমু।

এম।

প্রেরক<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম >

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম

স্যান্ডহ্যাম? আমি তোমর সাথে দেখা করার জন্য খুব শীঘ্রই আসছি।

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

এখন না। কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করো। অন্তত কাহিনীটা গুছিয়ে নেবার আগ পর্যন্ত। তাছাড়া অন্য একজনের আগমনের আশায় আছি আমি।

.

প্রেরক<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম >

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

তাহলে আমি দূরেই থাকি। তবে আমাকে জানতে হবে আসলে কি হচ্ছে। হেনরিক ভ্যাঙ্গার আবারো সিইও হয়েছে, আমার ফোন ধরছে না সে। ভ্যাঙ্গারের সাথে আমাদের চুক্তিটা যদি বাতিল হয়ে থাকে তাহলে সেটা আমার জানা দরকার। রিকি।

পি.এস. মেয়েটা কে?

.

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

প্রথমত : হেনরিক ভ্যাঙ্গারের সাথে চুক্তি বাতিলের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সে কিছুদিনের জন্য সিইও হিসেবে কাজ করবে। আমার ধারণা মার্টিনের মৃত্যু আর হ্যারিয়েটের পুণর্জন্মের মতো ঘটনা সামলে উঠতে কিছুটা সময় লাগছে তার।

দ্বিতীয়ত : মিলেনিয়াম টিকে থাকবে। আমি আমাদের পত্রিকার জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি রিপোর্ট নিয়ে এখন কাজ করছি। এটা প্রকাশ হবার পর চিরতরের জন্যে ওয়েনারস্ট্রমের ভরাডুবি ঘটবে।

তৃতীয়ত : আমার জীবনটা এখন উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তবে তুমি, আমি আর মিলেনিয়াম-এর জন্য কোনো কিছুই বদলায় নি। আমার উপর বিশ্বাস রাখো। অনেক চুমু

-মিকাইল।

পি.এস. শীঘ্রই তার সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেবো।

.

সালান্ডার স্যান্ডহামে গিয়ে দেখতে পেলো দাড়ি না কামানো আর চোখের নীচে কালি পড়া এক ব্লমকোভিস্টকে। তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে তার জন্য কফি বানাতে বললো, আর এই ফাঁকে যে লেখাটা লিখছিলো সেটা শেষ করে ফেলবে।

কেবিনটার চারপাশে তাকিয়েই সালান্ডারের পছন্দ হয়ে গেলো। একটা জেটির পাশে সেটা অবস্থিত। দরজা থেকে তিন পা এগোলেই জলরাশি। মাত্র পনেরো বাই আঠারো ফুটের একটি কেবিন তবে ছাদটা বেশ উঁচু আর ঘুমানোর জন্য মাচাঙের ব্যবস্থা করা আছে। ঐ মাচাঙে সে আরামসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে তবে ব্লমকোভিস্টকে মাথা নীচু করে রাখতে হবে। বিছানাটা বেশ বড়, তাদের দু’জনের জন্য যথেষ্টই বলা যায়।

একটা বিশাল জানালা আছে জলরাশির দিকে মুখ করে রাখা। তার ঠিক ডান দিকেই সামনের দরজাটা, ওখানেই আছে রান্নাঘরের টেবিল। দেয়ালে একটা শেলফে সিডি প্লেয়ার, আর এলভিস প্রিসলি এবং কতোগুলো হার্ডরক ব্যান্ডের অসংখ্য সিডি রয়েছে সেখানে। এগুলো সালান্ডারের খুব বেশি পছন্দের গান নয়।

ঘরের এককোণে আছে একটি ফায়ারপ্লেস। কাপড়চোপড় রাখার বড়সড় একটি ওয়ারড্রব আর তার ঠিক পেছনেই বাথরুমের পর্দা দেখা যাচ্ছে। সিঙ্কের পাশে ছোট্ট একটি জানালা আছে। ঘুমানোর যে মাচাঙ আছে সেটাতে ওঠার জন্য একটা পেচানো সিঁড়ি রয়েছে, সেই সিঁড়ির নীচে আছে ছোট্ট একটি টয়লেট। পুরো কেবিনটা দেখে মনে হবে কোনো প্রমোদতরীর ভেতরের কক্ষের মতো।

মিকাইলের উপর ইনভেস্টিগেশন করার সময় সালান্ডার জানতে পেরেছিলো এই কেবিনের ভেতরে সব কিছুই ব্লমকোভিস্ট নিজে বানিয়ে নিয়েছে। স্যান্ডহামের এই কেবিন ঘুরে গিয়ে তার এক বন্ধু তাকে ই-মেইলে এসব কথা লিখে জানিয়েছিলো সে নাকি মিকাইলের হাতের কাজে একেবারে মুগ্ধ। এখন কেবিনটার ভেতর সব দেখে বুঝতে পারছে কেন ব্লমকোভিস্ট এই কেবিনটা এতো ভালোবাসে।

দু’ঘণ্টা পর মিকাইলের মনোযোগে বেশ ভালোমতোই বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারলো। বাধ্য হয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করে শেভ করে তাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হলো সে। তবে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি আর দমকা বাতাসের কারণে খুব জলদিই তারা কেবিনে ফিরে এলো। ব্লমকোভিস্ট যখন বললো সে কি নিয়ে লিখছে তখন সালান্ডার তাকে একটা সিডি বের করে দিলো। সিডিটাতে ওয়েনারস্ট্রমের কম্পিউটারের আপডেট রয়েছে।

এরপর মাচাঙের উপর নিয়ে গিয়ে মিকাইলের সব জামাকাপড় সব খুলে ফেলে তার মনোযোগ আরো বেশি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে সক্ষম হলো সালান্ডার। শেষ রাতের দিকে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলো বিছানায় ব্লমকোভিস্ট নেই। মাচাঙ থেকে নীচে তাকিয়ে দেখলো কম্পিউটারে আপন মনে কী যেনো লিখে চলছে সে। কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখে গেলো তাকে। মিকাইলকে দেখে খুব সুখি মনে হচ্ছে। আজব ব্যাপার হলো তার নিজেরও বেশ ভালো লাগছে এখন।

মাত্র পাঁচ দিন তার সাথে থেকে আরমানস্কির একটা কাজ করার জন্য সালান্ডার ফিরে গেলো স্টকহোমে। এ কাজটায় এগারো দিন ব্যয় করলো সে। তারপর রিপোর্ট জমা দিয়ে আবারো ফিরে গেলো স্যান্ডহামে। মিকাইলের ল্যাপটপের পাশে প্রিন্ট করা কাগজের স্তুপ বেড়েই চলেছে।

এবার এসে একটানা চার সপ্তাহ থাকলো সে। একটা রুটিন মেনে চললো তারা দু’জনে। সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে এক ঘণ্টা কাটাতো। এরপর মিকাইল দুপুর পর্যন্ত একমনে কাজ করে যেতো। দুপুরের পর দু’জনে বের হতো একটু হাটাহাটি করার জন্য। বেশিরভাগ সময় বিছানায় শুয়ে বই পড়ে নয়তো ইন্টারনেট ব্রাউজিং করে কাটাতো সালান্ডার। দিনের বেলায় মিকাইলকে বিরক্ত করার চেষ্টা করতো না। রাতে ডিনার করার পর সালান্ডার নিজে উদ্যোগি হয়ে তাকে জোর করে বিছানায় নিয়ে যেতো। সেখানে শুধু তার প্রতিই নিবিষ্ট করে রাখতো মিকাইলকে।

মনে হতো মেয়েটি যেনো জীবনের প্রথম ছুটি কাটাতে এসেছে।

.

এরিকার কাছ থেকে এনক্রিপ্টেড ই-মেইল পেলো মিকাইল :

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

হাই, এম। এটা অফিশিয়াল মেইল। তিন সপ্তাহ পর জেইন ডালম্যান চাকরি ছেড়ে মনোপলি ফিনান্সিয়াল-এ যোগ দেবে। তুমি যা যা করতে বলেছো তাই করছি আমি। সবাই মিলে বানরের খেলা খেলছি।

-এরিকা

পি.এস. মনে হচ্ছে তারা খুব মজা পাচ্ছে। কয়েক দিন আগে হেনরি আর লোট্টা বেশ ভালো মতো ঝগড়া করেছে। একে অন্যের দিকে জিনিসপত্র ছুড়ে মেরেছে তারা। ডালম্যানের সামনে তারা এতোটাই বাড়াবাড়ি আচরণ করছে যে আমি বুঝতে পারছি না সে কেন বুঝতে পারছে না এসবই সাজানো নাটক।

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম >

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

তার জন্য আমার শুভ কামনা জানিয়ে দেবে কি? তাকে চলে যেতে বাধা দিও না! দরকারি জিনিসগুলো তালা মেরে রাখো। অনেক অনেক আদর আর চুমু।

—মিকাইল

.

প্রেরক<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

পত্রিকা ছাপা হওয়ার দু’সপ্তাহ আগে আমার হাতে কোনো ম্যানেজিং ডিরেক্টর নেই। এদিকে আমার ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার স্যান্ডহামে বসে বসে কী যেনো করছে। সে আমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না। মিকি, আমি তোমার কাছে অনুনয় করবো। তুমি কি আসবে?

-এরিকা

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম > বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

আরো কয়েকটা সপ্তাহ পর। তারপরই আমরা একেবারে ফ্রি হয়ে যাবো। ডিসেম্বরের সংখ্যার জন্য পরিকল্পনা শুরু করে দাও, ওটা হবে আমাদের এ যাবৎকালে করা সবচাইতে অন্যরকম একটি কাজ। পুরো রিপোর্টটা ৪০ পৃষ্ঠার মতো হবে।

—মিকাইল

প্রেরক<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম >

৪০ পৃষ্ঠা!!! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম> বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

এটা হবে স্পেশাল একটি সংখ্যা। আমার আরো তিন সপ্তাহ লাগবে। তুমি কি এই কাজগুলো করতে পারবে : (১) মিলেনিয়াম-এর নামে একটি প্রকাশনী সংস্থা রেজিস্টার করবে, (২) একটা আইএসবিএন নাম্বারও সংগ্রহ করে রাখবে, (৩) আমাদের নতুন প্রকাশনী সংস্থার জন্য ক্রিস্টারকে চমৎকার দেখে একটি লোগো বানাতে বলো, (৪) দ্রুত এবং সস্তায় পেপারব্যাক বই ছাপা এবং বাধাই করার জন্য ভালো একটি প্রেসের সাথে যোগাযোগ করো। ভালো কথা, প্ৰথম বইটি প্রকাশ করার জন্য আমাদের কিছু টাকা-পয়সার দরকার হবে। অনেক অনেক চুমু।

—মিকাইল

.

প্রেরক<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম

স্পেশাল সংখ্যা। বইয়ের প্রকাশনী। টাকা। জি, হুজুর। আপনার জন্য আর কিছু করতে পারি? স্নাসপ্লানে নগ্ন নৃত্য?

-এরিকা

পি.এস. ধরে নিচ্ছি কি করছো সে ব্যাপারে তুমি ভালোমতোই অবগত আছো। তবে ডালম্যানের ব্যাপারে আমি কি করবো?

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম >

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

ডালম্যানের ব্যাপারে কিছু কোরো না। তাকে বলে দাও যেকোনো সময় সে চলে যেতে পারে। তুমি আর তাকে পুষে রাখার মতো বেতন-ভাতা দিতে পারছো না। মনোপলি খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে না। এই সংখ্যার জন্য আরো বেশি বেশি ফুল্যান্স ম্যাটেরিয়াল জোগার করো। আর ঈশ্বরের দোহাই, নতুন একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ দাও।

—মিকাইল

পি.এস. স্লাসপ্লান? তা-ই সই।

.

প্রেরক<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম

স্লাসপ্লান-স্বপ্নের মধ্যে হবে। আমরা তো যেকোনো নিয়োগ একসাথে বসে করি।

-রিকি

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

কাকে নিয়োগ দেবো সে ব্যাপারে আমরা সব সময়ই একমত থাকতাম। তুমি যাকেই বেছে নাও আমার তাতে সায় থাকবে। আমরা ওয়েনারস্ট্রমকে অতর্কিতে আক্রমণ করবো। এটাই হলো মোদ্দা কথা। আমাকে শান্তিতে এ কাজটা করতে দাও শুধু।

-মিকাইল

অক্টোবরের প্রথম দিকে হেডেস্টাড কুরিয়ার-এর ইন্টারনেট সংস্করণের একটি আর্টিকেল পড়ে ব্লমকোভিস্টকে ব্যাপারটা জানালো সালান্ডার। অসুস্থ হয়ে ইসাবেলা ভ্যাঙ্গার মারা গেছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে চলে আসা তার মেয়ে হ্যারিয়েট উপস্থিত ছিলো তার শেষকৃত্যে।

এরিকার বার্গারের কাছ থেকে এনক্রিপ্টেড ই-মেইল এলো :

হাই, মিকাইল।

আজ আমার সাথে দেখা করার জন্য আমার অফিসে হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার এসেছিলো। মাত্র পাঁচ মিনিট আগে ফোন ক’রে জানায় যে সে আসছে। আমি একেবারে অপ্রস্তুত ছিলাম। দারুণ সুন্দরী এক মহিলা। অভিজাত পোশাক আর প্ৰসন্ন দৃষ্টি।

আমাকে জানালো হেনরিক ভ্যাঙ্গারের প্রতিনিধি হিসেবে মার্টিন ভ্যাঙ্গারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে সে। মহিলা খুব ভদ্র আর বন্ধুভাবাপন্ন। আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছে চুক্তি থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছে ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশনের নেই। বরং পুরো পরিবার হেনরিকের ইচ্ছেকে মূল্য দিয়ে ম্যাগাজিনের পক্ষে থাকবে সব সময়। এডিটোরিয়াল অফিস পরিদর্শন করার আগ্রহ দেখায় মহিলা। আর আমি পরিস্থিতি কেমন ব’লে মনে করছি সেটাও জানতে চেয়েছে।

আমি তাকে সত্যি কথাই বলেছি। বলেছি আমার পায়ের নীচে শক্ত কোনো মাটি নেই ব’লে মনে করছি। তুমি যে আমাকে ছেড়ে স্যান্ডহামে পড়ে আছো সেটাও জানিয়েছি। তুমি কি করছো সে ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে এটুকু জানি তুমি ওয়েনারস্ট্রমের বারোটা বাজানোর পরিকল্পনা করছো (আমার মনে হয় তার কাছে এটা বলা ঠিকই আছে। হাজার হলেও মহিলা আমাদের বোর্ডে আছে)। ভুরু তুলে মহিলা হেসে বলেছে তোমার সফলতা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ আছে কিনা। তার এ কথার জবাবে আমি কি বলতে পারতাম? বলেছি তুমি কি লিখছো সেটা যদি জানতে পারতাম তাহলে আরেকটু ভালোভাবে ঘুমাতে পারতাম। আরো বলেছি, অবশ্যই তোমার প্রতি আমার আস্থা আছে। তবে তুমি আমাকে পাগল করে ফেলছো।

তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম তুমি কি নিয়ে লিখছো সেটা মহিলা জানে কিনা। সে বলেছে সে এ ব্যাপারে কিছু জানে না। তবে তার ধারণা তুমি খুবই মেধাবী আর অভিনবভাবে চিন্তা করতে পারো। (এটা তার কথা। )

আমি তাকে বলেছি আমার কাছে মনে হচ্ছে হেডেস্টাডে হয়তো নাটকীয় কিছু ঘটেছে। তার নিজের গল্পটা শোনার জন্যও আমি ব্যাকুল হয়ে আছি। কথাটা বলেই মনে হয়েছিলো বোকার মতো বলে ফেলেছি বোধহয়। সে আমার কাছে জানতে চাইলো তুমি কি আসলেই আমাকে কিছু বলো নি। সে আরো বলেছে তোমার আর আমার মধ্যে বিশেষ একটা সম্পর্ক আছে বলেই জানে। নিশ্চয় সময় এলে তার গল্পটা তুমি আমাকেই প্রথম বলবে। এরপর সে জানতে চাইলো তাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি কিনা। আমি কি বলতে পারতাম? মিলেনিয়াম-এর বোর্ডে আছে ভদ্রমহিলা। আর তুমি আমাকে একেবারে অন্ধকারে রেখেছো।

এরপর হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার একটা অদ্ভুত কথা বললো। আমাকে বললো তাকে এবং তোমাকে যেনো ভুলভাবে বিচার না করি। তোমার প্রতি নাকি তার অনেক ঋণ আছে। আমাকে একজন ভালো বন্ধু হিসেবে পেতে চেয়েছে সে। তারপর বলেছে তুমি যদি আমাকে না বলো তাহলে সে নিজেই একদিন তার গল্পটা আমাকে শোনাবে। মাত্র আধঘণ্টা আগে সে চলে গেলেও এখনও আমি ঘোরের মধ্যে আছি। মনে হয় মহিলাকে আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেছে।

-এরিকা।

পি.এস. তোমাকে খুব মিস করছি। আমার মনে হচ্ছে হেডেস্টাডে খুব জঘন্য কিছু ঘটেছে। ক্রিস্টার আমায় বলেছে তোমার ঘাড়ে নাকি অদ্ভুত একটা দাগ দেখতে পেয়েছে সে।

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

বরাবর<এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম>

হাই রিকি। হ্যারিয়েটের গল্পটা এতোই দুঃখজনক আর বিভৎস যে তুমি সেটা কল্পনাও করতে পারবে না। মহিলা নিজেই যদি তোমাকে গল্পটা বলে তাহলে ভালো হয়। আমি তো ভাবতে গেলেই ভিমড়ি খাই।

ভালো কথা, তুমি তাকে বিশ্বাস করতে পারো। সে বলেছে আমার কাছে সে ঋণী, মনে করো কথাটা সত্যিই বলেছে। বিশ্বাস করো, সে কখনও মিলেনিয়াম- এর ক্ষতি করবে না। চাইলে তুমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারো। সম্মান আর শ্রদ্ধা পাবার দাবি রাখে সে। মহিলা বিরাট একজন ব্যবসায়ীও বটে।

—মিকাইল

.

পরের দিন মিকাইল আরেকটা মেইল পেলো।

প্রেরক<হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার, ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশন>

বরাবর<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম

হাই মিকাইল। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি তোমার কাছে মেইল করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এতো ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে আজকাল যে লেখার ফুরসতই পাচ্ছিলাম না। তুমি এতো দ্রুত হেডেবি ছেড়ে চলে গেলে যে আমি তোমাকে বিদায় পর্যন্ত জানাতে পারি নি।

সুইডেনে ফিরে আসার পর থেকে আমার দিনগুলো বিস্ময় আর কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশন। হেনরিকের সাথে মিলে আমরা এটাকে আগের অবস্থায় নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। গতকাল আমি মিলেনিয়াম-এ গেছিলাম। আমি বোর্ডে হেনরিকের প্রতিনিধি হয়েছি। ম্যাগাজিনটির পরিস্থিতি আর তোমার ব্যাপারে বিস্তারিত সবই আমাকে হেনরিক জানিয়েছে।

আমি আশা করবো আমার এভাবে পত্রিকা অফিসে যাওয়াটা তুমি ভালোভাবেই গ্রহণ করবে। তুমি যদি চাও আমি কিংবা আমাদের পরিবারের কেউ বোর্ডে থাকবে না তাহলে সেটা আমি মেনে নেবো। তবে তোমাকে আশ্বস্ত করে বলছি, মিলেনিয়াম-এর সব ধরণের সাপোর্ট তুমি আমার কাছ থেকে পাবে। তোমার কাছে আমি অনেক অনেক ঋণী। আর এ কথাটা আমি চিরকাল স্মরণ রেখেই কাজ করবো।

তোমার কলিগ এরিকার সাথে আমার দেখা হয়েছে। ও আমার সম্পর্কে কি ভাবছে আমি জানি না, তবে তুমি যে তাকে আমার গল্পটা বলো নি সেটা শুনে খুব অবাক হয়েছি।

আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। অবশ্য তুমি যদি ভ্যাঙ্গার পরিবারের জন্য আরো কিছু করতে চাও তো। ভালো থেকো।

– হ্যারিয়েট

পি.এস. এরিকার সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি তুমি আবারো ওয়েনারস্ট্রমের পেছনে লেগেছো। ডার্চ ফ্রোডি আমাকে বলেছে হেনরিক তোমার সাথে কি করেছে। আমি আর কি বলবো? আমি খুব দুঃখিত। তোমার জন্য যদি কিছু করতে পারি আমাকে অবশ্যই জানাবে।

.

প্রেরক<মিকাইল ব্লমকোভিস্ট, মিলেনিয়াম>

বরাবর<হারিয়েট ভ্যাঙ্গার, ভ্যাঙ্গার কর্পোরেশন>

হাই হ্যারিয়েট। খুব তাড়াহুড়া করে হেডেবি ছেড়ে এসেছি আমি, এখন এমন একটি কাজ করছি যা আরো আগে করা উচিত ছিলো। আমি মনে করি বিগত বছরের সমস্যা খুব শীঘ্রই কেটে যাবে।

আশা করি এরিকা এবং আপনি বেশ ভালো বন্ধু হবেন। আর মিলেনিয়াম, বোর্ডে আপনার যোগ দেয়ায় আমার কোনো সমস্যা নেই। কি হবে না হবে সেটা আমি এরিকাকে জানাবো। হেনরিক চাইছে আমি যেনো কাউকে কিছু না বলি। দেখা যাক, তবে এ মুহূর্তে সময় আর ইচ্ছে কোনোটাই আমার নেই। আমাকে কিছুদিন দূরে দূরেই থাকতে হবে।

মেইলে যোগাযোগ থাকবে। ভালো থাকুন।

-মিকাইল

মিকাইল কি লিখছে না লিখছে সে ব্যাপারে সালান্ডারের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। ব্লমকোভিস্ট কিছু একটা বললে বই পড়া থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকালো সে তবে তার কথাটা বুঝতে পারলো না।

“দুঃখিত। কথাটা জোরে বলে ফেলেছি। বলছিলাম এটা খুবই ভয়ঙ্কর।”

“কোন্‌টা ভয়ঙ্কর?”

“বাইশ বছরের এক ওয়েট্রেসের সাথে ওয়েনারস্ট্রমের সম্পর্ক ছিলো, এরফলে মেয়েটা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। তার আইনজীবিকে লেখা চিঠিগুলো পড়েছো তুমি?”

“মাই ডিয়ার মিকাইল-তোমার কাছে দশ বছরের চিঠিপত্র, ই-মেইল, চুক্তি, ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ আরো অনেক কিছুই আছে। ওয়েনারস্ট্রম সম্পর্কিত ছয় গিগাবাইটের আর্বজনা পড়ার সময় আমার নেই। অল্প কিছু আমি পড়েছিলাম। তাতেই জানতে পেরেছিলাম লোকটা একজন গ্যাংস্টার।”

“ঠিক আছে। ১৯৯৭ সালে মেয়েটাকে গর্ভবতী করে সে কিন্তু মেয়েটা যখন এর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে তখন তার আইনজীবি তাকে গর্ভপাত করাতে রাজি করাতে সক্ষম হয়। আমার ধারণা উদ্দেশ্যটা ছিলো তাকে কিছু টাকার প্রস্তাব দেয়া কিন্তু মেয়েটা তাতে আগ্রহী ছিলো না। এরপর মেয়েটাকে জোর করে পানির নীচে ডুবিয়ে রেখে বাধ্য করা হয় ওয়েনারস্ট্রমকে না ঘাটানোর জন্য। আর বোকাচোদা ওয়েনারস্ট্রম এসব কথা তার আইনজীবিকে ই-মেইলে লিখেছে—অবশ্য সেটা এনক্রিপ্টেড ছিলো, তারপরও…লোকটার নির্বুদ্ধিতার প্রশংসা না করে পারছি না।”

“মেয়েটার কি হয়েছিলো?”

“গর্ভপাত করিয়েছিলো সে, ফলে ওয়েনারস্ট্রম শংকা মুক্ত হয়।”

দশ মিনিট ধরে কিছু বললো না সালান্ডার। তার চোখ দুটো আচমকা কালো হয়ে গেলো।

“আরেকজন নারীবিদ্বেষী পুরুষ,” অবশেষে বিড়বিড় করে বললো সে।

এরপর ওয়েনারস্ট্রমের সিডিগুলো মিকাইলের কাছ থেকে নিয়ে তার ই- মেইল আর অন্যান্য ডকুমেন্টগুলো বেশ কয়েকদিন ধরে পড়ে গেলো সালান্ডার। ব্লমকোভিস্ট যখন কাজ করতো তখন সে মাচাঙে বসে নিজের ল্যাপটপে ওয়েনারস্ট্রম সম্পর্কিত সব কিছু পড়তে থাকলো।

একটা আইডিয়া তার মাথায় চলে এলে সেটাকে আমলে নিলো সে। মনে মনে ভাবলো কেন আরো আগে এটা তার মাথায় আসে নি।

.

অক্টোবরের শেষের দিকে এক সকালে মিকাইল তার কম্পিউটারটা বন্ধ করলো। মাত্র এগারোটা বাজে। ঘুমানোর জন্য যে মাচাঙটা আছে সেটাতে উঠে সালান্ডারের হাতে তুলে দিলো এতোদিন ধরে লিখে আসা কাগজের বান্ডিলটা। এরপরই গভীর ঘুমে ঢলে পড়লো সে। বিকেলের দিকে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আর্টিকেলের ব্যাপারে নিজের মতামত জানালো সালান্ডার।

রাত ২টার দিকে নিজের কাজের একটি শেষ ব্যাকআপ বানিয়ে রাখলো।

পরদিন সাকালে উঠেই কেবিনের জানালাগুলো বন্ধ করে দরজায় তালা মেরে দিলো, সেইসাথে শেষ হয়ে গেলো সালান্ডারের ছুটি। তারা একসাথেই স্টকহোমে ফিরে যাবার জন্য রওনা হলো।

ভ্যাক্সহোম ফেরিতে কফি খেতে খেতে একটা বিষয়ের অবতারণা করলো মিকাইল।

“এখন আমাদের দু’জনকে ঠিক করে নিতে হবে এরিকাকে এ ব্যাপারে কি বলবো। এসব ম্যাটেরিয়াল কোত্থেকে জোগার করেছি সে কথা যদি তাকে না বলি তাহলে এই আর্টিকেলটা ছাপাতে রাজি হবে না।”

এরিকা বার্গার। ব্লমকোভিস্টের এডিটর ইন চিফ এবং দীর্ঘ সময়ের প্রেমিকা। তার সাথে সালান্ডারের কখনও দেখা হয় নি, সত্যি বলতে কি তার সাথে দেখা করবে কি করবে না সেটাও বুঝতে পারছে না সে। তার কাছে মনে হয় বার্গার তার জীবনের এক অব্যাখ্যাত বিড়ম্বনা।

“এরিকা আমার সম্পর্কে কি জানে?”

“কিছুই না।” একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে। “সত্যি কথা বলতে কি, গ্রীষ্মকাল থেকে তাকে আমি এড়িয়ে চলছি। হেডেস্টাডে কি ঘটেছিলো সেটা তাকে বলি নি বলে একেবারে ক্ষেপে আছে। আমি যে স্যান্ডহামে বসে বসে একটা লেখা লিখছি সেটা সে জানে, তবে কি নিয়ে লিখছি তার কিছুই জানে না।”

“হুমমম।”

“কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে পুরো লেখাটা হাতে পেয়ে যাবে, এরপরই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে আমাকে। এখন প্রশ্ন হলো তাকে আমি কি বলবো?”

“তুমি তাকে কি বলতে চাও?”

“তাকে আমি সত্যি কথাটা বলতে চাই।”

ভুরু কপালে তুললো সালান্ডার।

“লিসবেথ, এরিকা আর আমি প্রায় সব সময়ই তর্কবিতর্ক করে থাকি। এটা আমাদের কাজের অংশ হয়ে গেছে। তবে সে একেবারেই বিশ্বস্ত একজন। তুমি একজন সোর্স। সে মরে যাবে কিন্তু তুমি কে সেটা প্রকাশ করবে না।”

“আর কতোজনকে তুমি এ কথা বলবে?”

“কাউকেই না। আমি আর এরিকা ছাড়া আর কেউ এটা জানতে পারবে না। তবে তুমি যদি চাও তো আমি তোমার এই গোপন কথাটা বলবো না। আসলে এরিকার সাথে মিথ্যে বলা ঠিক হবে না। এমন কোনো সোর্সের কথা বলা যাবে না যার কোনো অস্তিত্ব নেই।”

তারা দু’জনে গ্র্যান্ড হোটেলে ঢোকার আগ পর্যন্ত এই ব্যাপারটা নিয়ে সালান্ডার ভেবে গেলো। পরিণতি কি হতে পারে সেট নিয়ে ভাবলো এক মনে। একান্ত অনিচ্ছায় ব্লমকোভিস্টকে তার ব্যাপারটা এরিকার কাছে বলার জন্য অনুমতি দিলো সে। মোবাইল ফোনটা বের করে ফোন করলো মিকাইল।

.

মলিন এরিকসনের সাথে বার্গার লাঞ্চ করছে, এই মেয়েটাকে ম্যানেজিং এডিটর হিসেবে নিয়োগ দেবার কথা ভাবছে সে। ঊনত্রিশ বছরের এরিকসন পাঁচ বছর ধরে অস্থায়ীভাবে কাজ করে আসছে। মেয়েটি কখনও স্থায়ী চাকরি করে নি। মলিনের অস্থায়ী কাজটা যেদিন শেষ হলো সেদিনই বার্গার তাকে ফোন করে জানায় মিলেনিয়াম-এর একটি পদে সে যোগ দিতে ইচ্ছুক কিনা।

“এটা কয়েক মাসের জন্য একটি অস্থায়ী চাকরি,” বললো বার্গার। “তবে সব কিছু ভালোমতো চললে পদটা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।”

“আমি গুজব শুনেছি মিলেনিয়াম নাকি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।” বার্গারের ঠোঁটে মুচকি হাসি।

“গুজবে কান দিও না।”

“ডালম্যানের স্থলাভিষিক্ত হবো আমি…” ইতস্তত করে বললো এরিকসন। “সে তো হান্স-এরিক ওয়েনারস্ট্রমের মালিকানাধীন পত্রিকায় যোগ দিতে যাচ্ছে…”

সায় দিলো বার্গার। “আমরা যে ওয়েনারস্ট্রমের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছি সেটা কোনো লুকোছাপার ব্যাপার নয়। মিলেনিয়াম-এ কাজ করে যারা তাদেরকে সে পছন্দ করে না।”

“তাহলে আমি যদি মিলেনিয়াম-এ কাজ করি আমার বেলায়ও সেটা প্রযোজ্য হবে।”

“তা তো হবেই।”

“কিন্তু ডালম্যান তো মনোপলি ফিনান্সিয়াল ম্যাগাজিন-এ কাজ পাচ্ছে, তাই না?”

“তুমি এটাকে বলতে পারো ওয়েনারস্ট্রমের হয়ে কাজ করার একটি পুরস্কার বিশেষ। তুমি কি আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী

সায় দিলো এরিকসন।

“কবে থেকে আমি কাজে যোগ দেবো?”

ঠিক তখনই ব্লমকোভিস্টের ফোনটা এলো।

.

নিজের কাছে থাকা ব্লমকোভিস্টের অ্যাপার্টমেন্টের একটি চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই লিভিংরুমের সোফায় এক হাড্ডিসার মেয়েকে দেখতে পেলো সে। ছেঁড়াফাড়া চামড়ার জ্যাকেট পরে আছে মেয়েটা, আর পা দুটো তুলে রেখেছে কফি টেবিলের উপর। প্রথমে তার মনে হলো মেয়েটির বয়স পনেরোর মতো হবে, তবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে সেই ধারণা বাতিল করে দিলো সঙ্গে সঙ্গে। কফিপটে করে কফি আর কফি-কেক নিয়ে ব্লমকোভিস্ট ঘরে ঢোকার আগ পর্যন্ত মেয়েটার দিকে হা করে চেয়ে রইলো এরিকা বার্গার।

“তোমাকে ভড়কে দেবার জন্য আমাকে ক্ষমা করবে,” বললো সে।

মাথাটা একটু কাত করলো বার্গার। মিকাইলকে একটু অন্য রকম লাগছে তার কাছে। ক্লান্তশ্রান্ত আর রোগাটে। তার চোখ দুটোও সেই ক্লান্তি প্রকাশ করছে। সবচেয়ে বড় কথা মিকাইল তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে না। তার ঘাড়ের দিকে তাকালো এরিকা। লালচে দাগটা চোখে পড়লো তার।

“আমি তোমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। বিরাট কাহিনী। যা করেছি তার জন্য আমি মোটেও গর্বিত নই। এ নিয়ে আমরা পরে কথা বলবো…তোমাকে এই তরুণীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। এ হলো লিসবেথ সালান্ডার। আর লিসবেথ, এ হলো এরিকা বার্গার, মিলেনিয়াম-এর এডিটর ইন চিফ এবং আমার সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।”

প্রায় দশ সেকেন্ড ধরে বার্গারের অভিজাত পোশাক-পরিচ্ছদ আর মার্জিত আচার ব্যবহার দেখে সালান্ডার বুঝতে পারলো এই মহিলা কোনোদিনও তার ঘণিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠবে না।

তাদের মিটিংটা চললো টানা পাঁচ ঘণ্টা। দু’দুবার বার্গারকে ফোন করে অন্য সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করতে হলো। এক ঘণ্টা ধরে ব্লমকোভিস্টের লেখা পাণ্ডুলিপিটা পড়ে গেলো সে। তার মনে হাজার হাজার প্রশ্নের উদ্রেক হলেও বুঝতে পারলো এসব প্রশ্নের জবাব পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো পাণ্ডুলিপিটা। এখানে যা লেখা হয়েছে তার একবর্ণও যদি সত্য হয় তাহলে একেবারে নতুন একটি পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটবে।

ব্লমকোভিস্টের দিকে তাকালো বার্গার। সে যে একজন সৎলোক সে ব্যাপারে তার মনে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন তার সেই বিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরেছে, অবাক হয়ে ভাবছে ওয়েনারস্ট্রমের ঘটনা শেষ পর্যন্ত তাকে তার সততা থেকে বিচ্যুত করলো কিনা-প্রতিশোধ নেবার জন্য কাল্পনিক গল্প ফেঁদে বসলো কিনা মিকাইল। ব্লমকোভিস্ট দুই বাক্স প্রিন্ট করা কাগজের সোর্স ম্যাটেরিয়াল তার সামনে হাজির করলে বার্গারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। এসব জিনিস মিকাইলের হস্তগত হলো কিভাবে সেটা জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠলো সে।

মিকাইল তাকে বোঝালো ঘরে চুপচাপ বসে থাকা আজব কিসিমের মেয়েটা ওয়েনাস্ট্রমের কম্পিউটারে অবাধে প্রবেশ করতে পারে। কেবল তারই নয়, এই মেয়ে ওয়েনারস্ট্রমের আইনজীবি আর ঘণিষ্ঠ সহযোগীদের কম্পিউটারও হ্যাক করেছে।

বার্গারের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিলো তারা বে-আইনীভাবে জোগার করা কোনো ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করতে পারবে না।

তবে অবশ্যই তারা সেটা ব্যবহার করতে পারে। ব্লমকোভিস্ট যুক্তি দিয়ে বোঝালো এগুলো কিভাবে জোগার করা হয়েছে সেটা জানাতে কোনো সমস্যা নেই তাদের। তারা শুধুমাত্র ওয়েনারস্ট্রমের কম্পিউটার হ্যাক করেছে এরকম একজনকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করেছে।

শেষে বার্গার বুঝতে পারলো কতো বড় একটা অস্ত্র তার হাতে রয়েছে এখন। তার মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও বুঝতে পারছে না কোত্থেকে শুরু করবে। অবশেষে সোফায় হেলান দিয়ে বসে দু’হাত প্রসারিত করলো সে।

“মিকাইল, হেডেস্টাডে কি হয়েছিলো?”

চোখ কুচকে তাকালো সালান্ডার। একটা প্রশ্ন করে ব্লমকোভিস্টই জবাবটা দিলো।

“হ্যারিয়েটের সাথে কেমন কথা হলো তোমার?”

“চমৎকার। তার সাথে আমার দু’বার দেখা হয়েছে। গত সপ্তাহে ক্রিস্টার আর আমি তার সাথে বোর্ড মিটিং করার জন্য গাড়ি নিয়ে হেডেস্টাডে চলে গেছিলাম। মিটিং শেষে আমরা বেশ মদ পানও করেছি।”

“আর বোর্ড মিটিংটা?”

“মহিলা তার কথা রেখেছে।”

“রিকি। আমি জানি তোমাকে সব কথা খুলে বলি নি বলে তুমি আমার উপর রেগে আছো। তোমার আর আমার মধ্যে কখনও কোনো গোপন ব্যাপার ছিলো না। কিন্তু আমার জীবনে হঠাৎ করে চলে আসা ছয়টি মাস…মানে, এসব ব্যাপার বলার জন্য আমি এখনও প্রস্তত না।”

ব্লমকোভিস্টের চোখের দিকে তাকালো বার্গার। তাকে সে ভালো করেই চেনে। তবে এখন তার চোখে এমন কিছু দেখতে পেলো যা এর আগে কখনও দেখে নি এরিকা। তার চোখে এক ধরণের আর্তি, যেনো ব্যাপারটা জানার জন্য সে কোনো প্রশ্ন না করে। তাদের এই নিঃশব্দ কথোপকথন দেখে গেলো সালান্ডার। এসবের কিছুই তার মাথায় ঢুকলো না।

“খুব খারাপ কিছু নাকি?”

“একেবারেই জঘন্য ব্যাপার। এসব কথা বলতে গেলেও আমার গা শিউড়ে ওঠে। কথা দিচ্ছি তোমাকে সব বলবো। এই কয়েক মাস আমি ওয়েনারস্ট্রমকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত ছিলাম যে এসব নিয়ে ভাবি নি…আমি এখনও এসব কথা বলার জন্য প্রস্তত নই, বরং হ্যারিয়েট নিজে যদি তোমাকে সব বলে তো আমার জন্য ভালো হয়।”

“তোমার গলায় ওটা কিসের দাগ?”

“লিসবেথই আমার জীবনটা বাঁচিয়েছে। সে যদি না থাকতো আমি নির্ঘাত মারা যেতাম।”

বার্গারের চোখ দুটো বিস্ফারিত হবার জোগার হলো। জ্যাকেট পরা অদ্ভুত দর্শনের মেয়েটির দিকে তাকালো সে।

“এখন তোমাকে এই মেয়েটার সাথে একটা চুক্তিতে আসতে হবে। সে হলো আমাদের সোর্স।”

কিছুক্ষণ বসে থেকে ভেবে নিলো বার্গার। এরপর সে যা করলো তাতে ব্লমকোভিস্ট অবাক হলেও সালান্ডার একেবারে ভড়কে গেলো। মিকাইলের লিভিংরুমে বসে থাকার সময় তার কাছে মনে হচ্ছিলো সালান্ডার মেয়েটি সারাক্ষণ তার দিকে চেয়ে আছে। চুপচাপ আর তার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন এক মেয়ে।

বার্গার সোফা থেকে উঠে মেয়েটাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলে কেঁচোর মতো জড়োসড়ো হয়ে গেলো সালান্ডার।

অধ্যায় ২৯

শনিবার, নভেম্বর ১- মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৫

ওয়েনারস্ট্রমের সাইবার-সাম্রাজ্যে ঘুরে বেড়ালো সালান্ডার। প্রায় টানা এক ঘণ্টা ধরে নিজের কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে ছিলো। গত সপ্তাহে স্যান্ডহামে থাকার সময় তার মাথায় যে আইডিয়াটা ভর করেছিলো সেটা এখন ফুলেফেপে নতুন আকৃতি লাভ করতে শুরু করেছে। চার সপ্তাহ ধরে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বন্দী হয়ে আরমানস্কির সাথে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে রাখলো সে। দিনে বারো ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে ব্যয় করলো, কোনো কোনো দিন তারচেয়েও বেশি। যতোক্ষণ সজাগ থাকলো ততোক্ষণই আইডিয়াটা নিয়ে ভেবে গেলো সে।

বিগত মাসটায় মাঝেমধ্যেই ব্লমকোভিস্টের সাথে যোগাযোগ করলো সালান্ডার। সেও মিলেনিয়াম-এর অফিসে কাজকর্ম নিয়ে বেশ ব্যস্ত আছে। প্ৰতি সপ্তাহে টেলিফোনে তাদের মধ্যে কিছুটা সময় ধরে কথাবার্তা হয়। ওয়েনারস্ট্রমের মেইল আর ডকুমেন্টগুলোর সাম্প্রতিক আপডেট তাকে জানিয়ে দিচ্ছে নিয়মিত।

শত শতবার প্রতিটি ডিটেইল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো সে। কোনো কিছু যেনো তার চোখ এড়িয়ে না যায় যায় সে ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকলো। তবে একটা বিষয়ের সাথে আরেকটা বিষয় কিভাবে সংযোগ ঘটিয়ে কংক্রিট ধারণায় চলে আসবে তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত সে।

ওয়েনারস্ট্রমের সাম্রাজ্য অনেকটা আকৃতিহীন আর বাড়ন্ত কোনো জীবের মতো ক্ষণে ক্ষণে যার আকৃতি বদলে যায়। কোম্পানির পোস্ট-অফিস-বক্সে অবিশ্বাস্য পরিমাণের সম্পত্তি ডিপোজিট করে রাখা আছে।

ফিনান্সিয়াল পণ্ডিতেরা ওয়েনারস্ট্রমের সম্পত্তির পরিমাণ আন্দাজ করেছে আনুামানিক ৯০০ বিলিয়ন ক্রোনারের মতো। এটা একদমই ভুল। অনেক বাড়িয়ে হিসেব করা হয়েছে। তবে এটাও ঠিক ওয়েনারস্ট্রমের যা আছে তা নেহায়েত কম নয়। সালান্ডার হিসেব করে দেখলো লোকটার সম্পদের পরিমাণ ৯০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ক্রোনারের মতো হবে। পুরো প্রতিষ্ঠানের অডিট করতে এক বছরের মতো সময় লাগবে। তারপরও মোটামুটি একটা হিসেব করে সালান্ডার দেখতে পেলো সারাবিশ্বে কর্পোরেশনটির প্রায় তিন হাজারের মতো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ওয়েনারস্ট্রম দুই নাম্বারি কাজে এতোটাই দক্ষ যে সেটাকে ক্রিমিনাল কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন ব্যাপারটা যেনো নিতান্তই আট দশটা ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো।

ওয়েনারস্ট্রমের প্রতিষ্ঠানে আরো একটা ব্যাপার রয়েছে। উপরের দিকে তিনটি সম্পদ বার বার দেখানো হয়েছে। স্থায়ী সুইডিশ সম্পদ প্রশ্নাতীত আর একদম জেনুইন জিনিস। এর ব্যালান্স শিট এবং অডিট সর্বসাধারণ খতিয়ে দেখতে পারে। আমেরিকান ফার্মটি একেবারে সলিড, নিউইয়র্কের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি সব ধরণের লিকুইড ক্যাপিটালের যোগান দিয়ে থাকে। পোস্ট- অফিস-বক্স কোম্পানির ব্যবসা বাণিজ্যগুলোতেই কাহিনী লুকিয়ে আছে, বিশেষ করে সাইপ্রাস, ম্যাকাও আর জিব্রাল্টারেরগুলো। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, কলম্বিয়ার সন্দেহজনক কিছু প্রতিষ্ঠানের হুন্ডি বাণিজ্য, আর রাশিয়ার কিছু অপ্রচলিত ব্যবসার ক্লিয়ারিং হাউজ হিসেবে কাজ করে থাকে ওয়েনারস্ট্রম।

কেম্যান আইল্যান্ডের ছদ্মনামের একাউন্টটি একেবারেই অনন্য একটি জিনিস। এই একাউন্টটি ওয়েনারস্ট্রম নিজেই পরিচালনা করে থাকে। প্রতিটি .ডিলে ওয়েনারস্ট্রমের যে পার্সেন্টিজ সেটা পোস্ট-অফিস-বক্স কোম্পানির মাধ্যমে চলে আসে কেম্যান আইল্যান্ডের একাউন্টে।

সালান্ডার একটানা বসে থেকে কাজ করে গেলো। একাউন্ট এবং ব্যালান্স শিট সবই খতিয়ে দেখলো সে। বিস্তারিত নোট করে রাখলো সাম্প্রতিক ট্রান্সফারগুলো। জাপান থেকে সিঙ্গাপুর এবং লুক্সেমবার্গ হয়ে কেম্যান আইল্যান্ডে চলে আসা অল্প পরিমাণের একটি ট্রানজাকশান চিহ্নিত করতে পারলো সে। কিভাবে এটা কাজ করে সেটাও বুঝতে পারলো সালান্ডার। ওয়েনারস্ট্রম একেবারে গুরুত্বহীন একটি মেসেজ পাঠিয়েছে রাত ১০টার দিকে। তার কম্পিউটারে কেউ যদি ঢোকে তাহলে পিজিপি এনক্রিপ্টেড প্রোগ্রামটি তার কাছে এক ধরণের জোক বলে মনে হবে। তবে মেসেজটি বলছে :

বিজ্ঞাপন নিয়ে বার্গার চিল্লাফাল্লা করা বন্ধ করেছে। সে কি হাল ছেড়ে দিয়েছে নাকি তার মনে অন্য কিছু আছে? এডিটোরিয়ালে তোমার সোর্স আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছে তারা একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে তারা নতুন আরেকজনকেও নিয়োগ দিয়েছে। কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা খুঁজে বের করো। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্লমকোভিস্ট স্যান্ডহামে গিয়ে একটা বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু তার এই কাজের ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না। পরবর্তী সংখ্যার একটি অগ্রীম কপির ব্যবস্থা কি করতে পারবে?

—এইচ.ই.ডব্লিউ

নাটকীয় কিছু নেই। তাকে দুশ্চিন্তায় সময় কাটাতে দাও। তোর হাঁস রান্না করা হচ্ছে, বুড়ো।

ভোর ৫:৩০-এর দিকে কম্পিউটার বন্ধ করে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বসলো সালান্ডার। রাতের বেলায় পাঁচ পাঁচটি কোক খেয়েছে সে। এবার ছয় নাম্বার কোক নিয়ে বসে পড়লো সোফায়। নিকার্স আর রঙচটা ক্যামোফ্লেজ শার্ট পরে আছে, তাতে লেখা আছে সোল্জার অব ফরচুন আর কিল দেম অল অ্যান্ড লেট গড সর্ট দেম আউট। একটু পরই বুঝতে পারলো খুব ঠাণ্ডা লাগছে তাই একটা কম্বল মুড়িয়ে নিলো।

ফুরফুরে মেজাজে আছে সে যেনো উল্টাপাল্টা আর বেআইনী কিছু ধরতে পেরেছে। জানালা দিয়ে বাইরের স্ট্ট ল্যাম্পের দিকে চেয়ে থাকলেও খুব দ্রুত কাজ করছে তার মাথা।

মাথা। মামা-ক্লিক-বোন-ক্লিক-মিম্মি-ক্লিক-হোলগার পামগ্রিন। ইভিল ফিঙ্গার্স। আর আরমানস্কি। হেডেস্টাডের কাজটা। হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গার। ক্লিক। মার্টিন ভ্যাঙ্গার। ক্লিক। গলফ ক্লাব। ক্লিক। আইনজীবি বুরম্যান। ক্লিক। ভুলে যাবার চেষ্টা করছে এরকম তুচ্ছ বিষয়ও তার মনে দ্রুত খেলে যাচ্ছে।

ভাবলো, বুরম্যান এ জীবনে কোনো মেয়ের সামনে নিজের জামাকাপড় খুলতে পারবে কিনা কে জানে। আর যদি খুলতে পারেও তার তলপেটে ঐ টাট্টুটার ব্যাপারে কি বলবে? এরপর ডাক্তারের কাছে গেলেই বা কি করবে? জামাকাপড় না খুলে কিভাবে ডাক্তারে কাছে নিজের চেকআপ করাবে?

আর আছে মিকাইল ব্লমকোভিস্ট। ক্লিক।

তাকে অবশ্য ভালো মানুষ বলেই মনে করে সে। তবে কিছু কিছু নৈতকতার ইসুতে সে একেবারে অসহ্য রকমরে আনাড়িপনা দেখায়। সে খুব ধৈর্যবান আর ক্ষমাশীল একজন ব্যক্তি। তার কথা ভাবলেই প্রটেক্টিভ অনুভব করে সালান্ডার।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো সে কথা মনে করতে পারলো না তবে ঘাড়ে চুলকানি হতেই ঘুম থেকে জেগে উঠলো সকাল ৯টার দিকে। সোফা থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে আবারো শুয়ে পড়লো সে।

.

সন্দেহাতীতভাবেই এটা তাদের জীবনের সেরা রিপোর্টিং। দেড় বছরের মধ্যে এই প্রথম বার্গার একজন এডিটর হিসেবে দারুণ সুখি বোধ করছে। ব্লমকোভিস্ট আর সে মিলে যখন আর্টিকেলটা ঘষামাজা করছে তখনই ফোন করলো সালান্ডার।

“তোমার লেখাটা নিয়ে ওয়েনারস্ট্রম যে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে সে কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। আগামী সংখ্যার একটি অগ্রীম কপি পেতে চাইছে সে।”

“তুমি এটা কিভাবে জানলে…ওহ্, ভুলে গেছিলাম। সে কি পরিকল্পনা করছে সে ব্যাপারে কি কোনো ধারণা আছে?

“নিক্স। একটাই যৌক্তিক অনুমান করতে পারছি।

ব্লমকোভিস্ট কয়েক সেকেন্ড ভাবলো। “প্রিন্টার,” বিস্ময়ে বলে উঠলো সে। ভুরু তুলে তাকালো বার্গার।

“এডিটোরিয়াল অফিসে যদি ঢাকনা লাগিয়ে রাখতে পারো তাহলে খুব বেশি সম্ভাবনা থাকবে না। এই বানচোতগুলো রাতের বেলায় যাতে এখানে ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থাও করতে হবে।”

বার্গারের দিকে ফিরলো ব্লমকোভিস্ট। “এ সংখ্যার জন্য নতুন একজন প্রিন্টারকে বুক করো। এক্ষুণি। ড্রাগান আরমানস্কিকে ফোন করে বলো আগামী সপ্তাহের জন্য আমি এখানে সিকিউরিটি চাচ্ছি।” এবার সালান্ডারকে বললো সে। “ধন্যবাদ তোমাকে।”

“এর কি মূল্য আছে?”

“মানে?”

“এইযে খরবটা দিলাম তার মূল্য কি?”

“তুমি কি রকম মূল্য চাইছো?”

“কফি খেতে খেতে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি। এক্ষুণি।”

.

হর্নসগাটানের ক্যাফেবার-এ দেখা করলো তারা। ব্লমকোভিস্ট যখন উদ্বিগ্ন হয়ে সালান্ডারের পাশে এসে বসলো তখন তার দিকে খুব সিরিয়াস চোখে তাকালো মেয়েটি। যথারীতি একেবারে আসল কথায় চলে এলো সে।

“আমার কিছু টাকা ধার করতে হবে।”

বোকার মতো হেসে ব্লমকোভিস্ট তার মানিব্যাগটা বের করলো।

“অবশ্যই। কতো লাগবে?”

“১২০০০০ ক্রোনার।”

“আস্তে বাবা, আস্তে।” মানিব্যাগটা রেখে দিলো সে।

“আমি ঠাট্টা করছি না। ছয় সপ্তাহের জন্য আমাকে ১২০০০০ ক্রোনার ধার করতে হবে। একটা ইনভেস্টমেন্ট করার সুযোগ এসেছে আমার, কিন্তু তুমি ছাড়া আর কেউ নেই যার কাছে টাকা ধার চাইতে পারি। তোমার কারেন্ট একাউন্টে এই মুহূর্তে আনুমানিক ১৪০০০০ ক্রোনার জমা আছে। তুমি তোমার টাকা ফেরত পাবে।”

সালান্ডার যে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডটা হ্যাক করেছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

“আমার কাছ থেকে তোমার টাকা ধার করার কোনো দরকার নেই,” বললো সে। “এখনও তোমার শেয়ার নিয়ে আমরা কোনো আলোচনা করি নি তবে সেটা তোমার ধার করা টাকার চেয়ে অনেক বেশিই হবে।”

“আমার শেয়ার?’

“লিসবেথ, আমি হেনরিক ভ্যাঙ্গারের কাছ থেকে মাথা খারাপ করার মতো বিশাল পরিমাণের টাকা পাবো। এ বছরের শেষের দিকে সেটা দেয়া হবে। তোমাকে ছাড়া মিলেনিয়াম এবং আমি রসাতলে চলে যেতাম। আমি ঠিক করেছি যে টাকা পাবো তা তোমার সাথে ভাগ করে নেবো। অর্ধেক অর্ধেক।”

তার দিকে ভুরু কুচকে তাকালো সালান্ডার। কিছুক্ষণ পর মাথা ঝাঁকাতে শুরু করলো সে।

“আমি তোমার টাকা চাই না।”

“কিন্তু…”

“তোমার কাছ থেকে আমি এক ক্রোনারও চাই না, যদি না সেটা আমার জন্মদিনের উপহার হিসেবে আসে।”

“তাহলে ভেবে দেখতে হবে। কারণ তোমার জন্মদিন কবে সেটাও আমি জানি না।”

“তুমি একজন সাংবাদিক। নিজেই খুঁজে বের করো সেটা।”

“আমি সিরিয়াস, লিসবেথ। টাকা ভাগাভাগির কথা বলছি।”

“আমিও সিরিয়াস। আমি কেবল ধার করতে চাইছি। আর সেটা আগামীকালের মধ্যেই পেতে হবে।”

তার শেয়ারের পরিমাণ কতো হতে পারে সেটা পর্যন্ত জানতে চাইছে না মেয়েটা। “তোমাকে সঙ্গে করে ব্যাঙ্কে নিয়ে গিয়ে টাকাটা তুলে দিতে পারলে আমার দারুণ ভালো লাগবে। তবে মনে রেখো, এ বছরের শেষের দিকে তোমার শেয়ার নিয়ে আরেকটা আলোচনায় বসতে হবে আমাদের।” হাত তুললো সে! “ভালো কথা। তোমার জন্মদিনটা কবে?”

“মে মাস শুরু হবার ঠিক আগের রাতে,” বললো সালান্ডার। “খুবই সঙ্গতিপূর্ণ, তুমি কি বলো?”

.

৭:৩০-এ জুরিখে পৌছালো সালান্ডার সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলো ম্যাটারহর্ন হোটেলে। আইরিন নেসার নামে একটা রুম বুক করলো সে। একটা নরওয়েজিয়ান পাসপোর্ট বহন করছে এই ভ্রমণে। আইরিন নেসারের কাঁধ অবধি সোনালি চুল। এই উইগটা স্টকহোম থেকে ১০০০০ ক্রোনার দিয়ে কিনেছে সালান্ডার। ব্লমকোভিস্টের কাছ থেকে যে টাকা ধার করেছে তা দিয়ে দুটো পাসপোর্টও কিনেছে প্লেগের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে পোশাক আশাক খুলে বিছানায় শুয়ে পড়লো সে। ইতিমধ্যেই ধার করা টাকার অর্ধেক খরচ হয়ে গেছে। খুব টাইট বাজেটের মধ্যে চলতে হবে এখন। এসব ভাবনা বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সালান্ডার।

ভোর পাঁচটার দিকে ঘুম থকে উঠে গোসল করে গায়ের টাট্টুগুলো ভারি মেকআপ দিয়ে ঢেকে নিলো। ৬:৩০-এ খুবই ব্যয়বহুল একটি বিউটি পার্লারে যাওয়ার কথা। আরেকটা পেজ-বয় স্টাইলের সোনালি উইগ কিনে ম্যানিকিউর করে গোলাপি নেইলপলিশ লাগিয়ে নিলো হাতে। শেষে কৃত্রিম আইল্যাশ আর ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে মেকআপ করে নিলো সে।

মোনিকা শোল্স নামের একটি ক্রেডিটকার্ড থেকে সব খরচ পরিশোধ করলো সালান্ডার। এই নামে তার কাছে একটা বৃটিশ পাসপোর্টও আছে।

এরপর সে চলে গেলো খুব কাছেই অবস্থিত ক্যামিল’স হাউজ নামের একটি ফ্যাশন হাউজে। একঘণ্টা পর কালো বুট, ধূসর রঙের স্কার্ট আর ব্লাউজ, কোমর অবধি লম্বা একটি জ্যাকেট এবং কাপড়ের টুপি। প্রতিটি আইটেমেই ব্যয়বহুল ডিজাইনারের লেবেল লাগানো আছে। কাপড়চোপড় কেনার পাশাপাশি একটা দামি চামড়ার বৃফকেসও কিনে নিলো সে। দামি কানের দুল আর গলায় স্বর্নের চেইন দেখে যে কেউ মনে করবে সে একজন কেউকেটা টাইপের কেউ।

আয়নায় নিজেকে দেখেই বুঝতে পারলো জীবনে এই প্রথম তার বুক এতোটা স্ফীত দেখাচ্ছে। মোনিকা শোসের এই বুকটা অবশ্য কৃত্রিম। কোপেনহেগেনের লিঙ্গ-পরিবর্তনকারীদের যে দোকান আছে সেখান থেকে এই ল্যাটেক্সের তৈরি স্তনযুগল লাগিয়ে নিয়েছে।

যুদ্ধের জন্য সে প্রস্তত।

দুই ব্লক হেটে জিমারটাল হোটেলে গেলো ঠিক ৯টার দিকে, ওখানে মোনিকা শোল্স নামে একটা রুম বুক করেছে সে। তার সুটকেসটা যে ছেলে রুম পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এলো তাকে বেশ ভালো বখশিস দিলো সালান্ডার। রুমটা খুব ছোট্ট, এর ভাড়া দৈনিক ২২০০০ ক্রোনার। এক রাতের জন্য এটা বুক করেছে। ঘর থেকে রুমবয় চলে গেলে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলো। জানালা দিয়ে লেক জুরিখের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়, কিন্তু সেটাতে তার কোনো আগ্রহ নেই। পাঁচ মিনিট ধরে নিজেকে আয়না দেখে নিলো সে। তাকে চেনাই যাচ্ছে না। বিশাল বক্ষা আর বয়কাট সোনালি চুলের মোনিকা শোল্স। এতো মেকআপ সে করেছে যে লিসবেথ সালান্ডারের একমাসের মেকআপের চেয়েও পরিমাণে তা অনেক বেশি। তাকে একেবারে অন্য রকম লাগছে।

সাড়ে ন’টার দিকে হোটেলের বারে নাস্তা সেরে নিলো।

১০টা বাজে কফির পেয়ালা নামিয়ে রাখলো মোনিকা শোল্স। মোবাইল ফোনটা বের করে হাওয়াইয়ের সাথে আপলিংক করা একটি মডেমের নাম্বার পাঞ্চ করলো সে। তিনবার রিং হবার পর কাঁপা কাঁপা টোনটা বাজতে শুরু করলো। মডেমটা কানেক্টেড হয়ে গেছে। ছয় সংখ্যার একটি কোড নিজের মোবাইলে পাঞ্চ করে একটা টেক্সট মেসেজ করলো মোনিকা শোল্স, এই মেসেজটাতে এমন একটি প্রোগ্রাম শুরু করার নির্দেশ আছে যা কিনা সালান্ডার নিজে তৈরি করেছে বিশেষ একটি উদ্দেশ্যে।

হনুলুলু’তে এক সার্ভারে এই প্রোগ্রামটি অজ্ঞাত একটি হোমপেজ ওপেন করলো। এই সার্ভারটি কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। প্রোগ্রামটা খুবই সহজ সরল। এর একমাত্র কাজ হলো অন্য আরেকটা সার্ভার স্টার্ট করার নির্দেশ দেয়া। এই সার্ভারটি হল্যান্ডের একটি সাধারণ কমার্শিয়াল আইএসপি’র। এই প্রোগ্রামের কাজ হলো হান্স-এরিক ওয়েনারস্ট্রমের মিরর হার্ডডিস্কটা ওপেন করা। ওটাতে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৩০০০ ব্যাঙ্ক একাউন্টের হিসেব রয়েছে।

তবে তার টার্গেট মাত্র একটা একাউন্ট। সালান্ডার লক্ষ্য করেছে প্রতি সপ্তাহে দুয়েকবার একাউন্টগুলো চেক করে থাকে ওয়েনারস্ট্রম। সে যদি তার কম্পিউটার ওপেন করে নির্দিষ্ট ফাইলটি দেখে তো সবই ঠিকঠাক দেখতে পাবে। প্রোগ্রামটি সামান্য হেরফের দেখাবে, যা কিনা একেবারেই প্রত্যাশিত, কারণ বিগত ছয়মাসে একাউন্টটিতে এরকম হেরফের হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপারই। পরবর্তী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ওয়েনারস্ট্রম যদি নিজের একাউন্ট থেকে টাকা তুলতে চায় কিংবা জমা করতে যায় তাহলে প্রোগ্রামটি সবকিছুই ঠিকঠাক দেখাবে তাকে। ওয়েনারস্ট্রম কিছুই বুঝতেই পারবে না। বাস্তবে পরিবর্তনটা শুধুমাত্র হল্যান্ডের সার্ভারে থাকা মিরর হার্ডডিস্কেই শো করবে।

প্রোগ্রামটা শুরু হবার ইঙ্গিত দিয়ে ছোট্ট একটা টোন বাজতেই মোনিকা শোল্স তার ফোন বন্ধ করে দিলো।

জিমারটাল হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপারে ব্যাঙ্ক হসার জেনারেলে চলে গেলো সে। জেনারেল ম্যানেজার ওয়াগনারের সাথে ঠিক ১০টায় তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে। শিডিউলের তিন মিনিট আগেই সেখানে পৌছালো সালান্ডার। এই বাড়তি সময়টাতে সার্ভিলেন্স ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালো, ক্যামেরায় তার ছবি তুলে রাখার পর একান্ত গোপনীয় আলাপ আলোচনার জন্য নির্ধারিত যে ডিপার্টমেন্ট আছে সেখানে চলে গেলো সে।

“বেশ কয়েকটি ট্রানজাকশানের জন্য আমাকে একটু সহযোগীতা করতে হবে,” খাঁটি অক্সফোর্ড ইংরেজিতে বললো। নিজের বৃফকেসটা খোলার সময় ইচ্ছে করেই জিমারটাল হোটেলের একটি কলম মেঝেতে ফেলে দিলে ম্যানেজার ওয়াগনার মুচকি হেসে তাকে কলম তোলা থেকে বিরত রেখে নিজেই সেটা তুলে দিলো তার জন্য। সালান্ডার তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নোটপ্যাডে একাউন্ট নাম্বারটা লিখে দিলো।

ওয়াগনার সাহেব তাকে বখে যাওয়া বড়লোকের মেয়ে, সম্ভাব্য রক্ষিতা হিসেবে আন্দাজ করে নিলো মনে মনে।

“এটা কেম্যান আইল্যান্ডের ক্রোয়েনফেল্ড ব্যাঙ্কের একটি একাউন্ট নাম্বার। সিকোয়েন্সিয়াল কোডের সাহায্যে অটোম্যাটিক ট্রান্সফার করা যাবে,” বললো সালান্ডার।

“ফ্রলেইন শোল্স, আপনার কাছে নিশ্চয় সবগুলো ক্লিয়ারিং কোড আছে?” জানতে চাইলো সে।

“অ্যাবার ন্যাচারলিখ,” খুবই অপটু জার্মান ভাষায় জবাব দিলো সালান্ডার।

ষোলো সংখ্যার বেশ কয়েকটি সিরিজ মুখস্ত বলতে শুরু করলো সে। ম্যানেজার ওয়াগনার বুঝতে পারলো আজকের সকালটা খুব ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে যাবে, তবে ট্রানজাকশান থেকে ৪ শতাংশ কমিশন পাবে ব’লে লাঞ্চ করার ব্যাপারটা বাদ দিতে একটুও কার্পন্য করলো না ভদ্রলোক।

.

বিকেলের আগে ব্যাঙ্ক হসার জেনারেল থেকে বের হতে পারলো না সালান্ডার। সেখান থেকে সোজা পায়ে হেটে চলে এলো হোটেল জিমারটালে। রুমে এসে কাপড়চোপড় আর বয়কাট সোনালি চুলের উইগ খুলে ফেললেও কৃত্রিম বক্ষটা খুলে রাখলো না। এবার তার চিরচেনা পোশাক পরে নিলো : সূঁচালো হিলের বুট, কালো প্যান্ট, সাদামাটা একটি শার্ট আর কালো রঙের একটি জ্যাকেট। আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো এবার। কতোগুলো বন্ড গোছগাছ ক’রে একটা পোর্টোফোলিওতে ভরে আইরিন নেসার হিসেবে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে।

নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট পর, ১:০৫-এ ব্যাঙ্ক হসার জেনারেল থেকে কয়েক গজ দূরে অবস্থিত ব্যাঙ্ক ডরফমানে চলে এলো সে। ব্যাঙ্কের এক কর্মকর্তা হের হাসেলমানের সাথে আগে থেকেই আইরিন নেসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছিলো। দেরি হবার জন্য ক্ষমা চাইলো আইরিন নেসার। নরওয়েজিয়ান টানে ভাঙা ভাঙা জার্মানে কথা বললো সে।

“কোনো সমস্যা নেই, ফ্রলেইন,” বললো হের হাসেলমান। “আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“আমি একটি একাউন্ট খুলতে চাই। আমার কাছে কিছু প্রাইভেট বন্ড রয়েছে, ওগুলো আমি টাকায় রূপান্তর করতে চাই এখন।”

ভদ্রলোকের সামনে থাকা ডেস্কে পোর্টোফোলিওটা রাখলো আইরিন নেসার। প্রথমে দ্রুত তারপর বেশ সময় নিয়ে বন্ডগুলো দেখে নিলো হাসেলমান। ভুরু কপালে তুলে মুচকি হাসি দিলো সে।

ইন্টারনেট থেকে ঢোকা যাবে এবং টাকা লেনদেন করা যাবে এরকম কয়েকটি একাউন্ট খুললো আইরিন নেসার। এই একাউন্টগুলোর মালিকানা জিব্রাল্টারে অবস্থিত অজ্ঞাতনামা একটি পোস্ট-অফিস-বক্স কোম্পানির। তার হয়ে এক ব্রোকার ৫০০০০ ক্রোনারের বিনিময়ে এটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। এসবই খরচ করা হয়েছে ব্লমকোভিস্টের কাছ থেকে ধার করা টাকায়। পঞ্চাশটি বন্ড ক্যাশ করে টাকাগুলো একাউন্টে ডিপোজিট করে রাখলো সে। প্রতিটি বন্ডের মূল্য এক মিলিয়ন ক্রোনারের সমপরিমাণ।

যতোটা সময় আশা করেছিলো তারচেয়ে অনেক বেশি সময় লাগলো ব্যাঙ্ক ডরফমানের কাজ শেষ হতে, ফলে শিডিউলে আরো দেরি হয়ে গেলো। আজকের মতো ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যাবার আগে শেষ ট্রানজাকশানটি করার মতো সময় তার হাতে নেই তাই আইরিন নেসার হোটেল ম্যাটারহর্নে ফিরে গিয়ে এক ঘণ্টার মতো ঘুরেফিরে নিজের উপস্থিতিটা পোক্ত করে নিলো, কিন্তু মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গেলে আগেভাগেই বিছানায় চলে গেলো লিসবেথ সালান্ডার। ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে কিছু এসপিরিন কিনে তাদেরকে বলে দিলো তাকে যেনো সকাল ৮টায় ডেকে দেয় তারা।

প্রায় ৫টা বাজতে চললো, সমগ্র ইউরোপে যতো ব্যাঙ্ক আছে সব বন্ধ হয়ে গেছে এখন। তবে উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার ব্যাঙ্কগুলো খোলা আছে। ল্যাপটপটা চালু করে মোবাইল ফোনের সাহায্যে ইন্টারনেটে প্রবেশ করলো সে। ডরফমান ব্যাঙ্কে সদ্য খোলা একাউন্টগুলো খালি করতে এক ঘণ্টার মতো সময় লেগে গেলো তার।

টাকাগুলো ছোটো ছোটো পরিমাণে ভাগ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ভূয়া কোম্পানির ইনভয়েস পরিশোধ করে দিলো সে। তার কাজ শেষ হলে টাকাগুলো অদ্ভুতভাবেই ট্রান্সফার হয়ে কেম্যান আইল্যান্ডের ক্রোয়েনফেল্ড ব্যাঙ্কে চলে এলো আবার, তবে এবার জমা হলো একেবারেই ভিন্ন একটি একাউন্টে।

আইরিন নেসার এটাকে একেবারেই নিরাপদ এবং ট্রেস করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অসম্ভব বলে বিবেচনা করলো। একাউন্ট থেকে একটা পেমেন্টও করলো সে : প্রায় এক মিলিয়ন ক্রোনারের মতো টাকা তার কাছে থাকা একটি ক্রেডিটকার্ডে ট্রান্সফার করলো। এই একাউন্টটি ওয়াসপ এন্টারপ্রাইজের, সেটা রেজিস্টার করা হয়েছে জিব্রাল্টারে।

কয়েক মিনিট পর সোনালি বয়-কাট চুলের মেয়েটি ম্যাটারহর্ন থেকে বের হয়ে হোটেলের বারে চলে গেলো। মোনিকা শোলস প্রবেশ করলো জিমারটাল হোটেলে। ডেস্ক ক্লার্কের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নেড়ে লিফটে করে উপর তলায় নিজের রুমে ফিরে এলো সে।

রুমে ঢুকেই মোনিকা শোলসের কমব্যাট ইউনিফর্ম পরে টাট্টুগুলো আবারো ভারি ক্রিম আর মেকআপে ঢেকে নিয়ে সোজা চলে গেলো নীচতলায় হোটেলের রেস্তোরাঁয়। বেশ উপাদেয় খাবার খেলো ডিনারে। ১২০০ ক্রোনার দিয়ে জীবনে নাম শোনে নি এরকম একটি অভিজাত মদ কিনে নিলো। মাত্র এক গ্লাস পান করেই পুরো বোতলটা রেখে চলে গেলো হোটেল বারে। ওয়েটারকে অস্বাভাবিক পরিমাণের বখশিস দিলে ব্যাপারটা রেস্তোরাঁর সব স্টাফই লক্ষ্য করলো বিস্ময়ের সাথে।

বারে কিছুক্ষণ থাকার পর এক মদ্যপ ইটালিয়ান যুবকের সাথে খাতির জমিয়ে ফেললো। যুবকটির নাম কি সেটা নিয়েও মাথা ঘামালো না। তারা দু’বোতল শ্যাম্পেইন নিয়ে বসলেও মাত্র এক গ্লাস পান করলো সালান্ডার।

রাত এগারোটার দিকে তার মদ্যপ সঙ্গী তার দিকে ঝুঁকে বেশ উত্তেজিতভাবে তার স্তনযুগল মর্দন করতে আরম্ভ করলো। যুবকের হাতটা ধরে টেবিলের নীচে দিয়ে দিলে খুব ভালো অনুভূত হতে লাগলো তার। মদ্যপযুবক বুঝতেই পারলো না সে আসলে কৃত্রিম স্তনে হাত রেখেছিলো। এক পর্যায়ে তারা দু’জনে এতো জোরে জোরে শব্দ করতে লাগলো যে বারে থাকা বাকি লোকজনের জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠলো সেটা। মাঝরাতের দিকে মোনিকা শোলস লক্ষ্য করলো বারের এক লোক তাদের দিকে কটমট চোখে তাকাচ্ছে। মদ্যপ ইটালিয়ান সঙ্গীকে ধরে বার থেকে বের হয়ে চলে এলো তারই রুমে।

বাথরুমে যাবার আগে আরো এক গ্লাস মদ ঢেলে নিলো সে। ভাঁজ করা একটি কাগজ খুলে একটা স্লিপিং পিল বের করে মদ দিয়ে খেয়ে নিলো সেটা। যুবকটির সাথে বিছানায় বসে আরেক দফা মদ পান করার কয়েক মিনিট পরই বেহুশ হয়ে পড়ে রইলো তার সদ্য শিকার করা ইটালিয়ানটি। ছেলেটার টাই আলগা করে, তার জুতো জোড়া খুলে গায়ে একটা চাদর টেনে দিলো সালান্ডার। বোতলটা বাথরুমে নিয়ে গিয়ে খালি করে গ্লাসগুলো ধুয়েমুছে ফিরে গেলো নিজের রুমে।

মোনিকা শোস সকাল ৬টা বাজে নিজের ঘরে বসে নাস্তা করে ৬টা ৫৫ মিনিটে চেকআউট করলো জিমারটাল হোটেল থেকে। রুম থেকে বের হবার আগে পাঁচ মিনিট ধরে সমস্ত রুমে নিজের আঙুলের ছাপ যেখানে থাকার কথা সেসব জায়গা মুছে নিলো সে।

তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার একটু পর, ৮:৩০-এ ম্যাটারহর্ন থেকে চেকআউট করলো আইরিন নেসার। একটা ট্যাক্সি নিয়ে রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে তার লাগেজটা রেখে এলো। এরপর কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করলো নয়টি প্রাইভেট ব্যাঙ্কে ছুঁ মেরে। কেম্যান ব্যাঙ্ক থেকে তোলা কিছু প্রাইভেট বন্ড সেখানে ডিস্ট্রিবিউট করলো সে। বেলা ৩টার মধ্যে বন্ডগুলোর দশ শতাংশ ক্যাশ করে নিয়ে সেই টাকা আবার ত্রিশটি একাউন্টে ডিপোজিট করলো। বাকি বন্ডগুলো একটা সেফডিপোজিটে রেখে দিলো সালান্ডার।

আইরিন নেসারকে আরো কয়েকবার জুরিখে আসতে হবে, তবে তার জন্য এতো তাড়াহুড়ার কোনো দরকার নেই।

৪:৩০-এ আইরিন নেসার ট্যাক্সিতে করে এয়ারপোর্টে গিয়ে লেডিস রুমে ঢুকেই মোনিকা শোলসের পাসপোর্টটা কেটে টুকরো টুকরো করে কমোডে ফ্ল্যাশ করে দিলো। ক্রেডিটকার্ডটাও কেঁচি দিয়ে কয়েক টুকরো করে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ডাস্টবিনে কেঁচিটাসহ ফেলে দিলো। ওয়ান ইলেভেনের পর ধারালো কিছু প্লেনে বহন করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু না।

লুতফানসার এক বিমানে করে নরওয়ের অসলোতে নেমেই সেখান থেকে চলে এলো ট্রেনস্টেশনে। স্টেশনের লেডিসরুমে ঢুকে ছদ্মবেশের জন্য যেসব কাপড়চোপড় আর উইগ ছিলো সবগুলো তিনটি প্লাস্টিকব্যাগে ভরে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে একটি আনলকড লকারে খালি বৃফকেসটা রেখে দিলো সে। কানের দুল আর স্বর্নের চেইন দুটো ডিজাইনারের জুয়েলারি, এগুলো ট্রেস করা সম্ভব; স্টেশনের বাইরে একটি ড্রেনে ঠাঁই পেলো সেগুলো।

এর কিছুক্ষণ পর কৃত্রিম বক্ষটা খুলে ফেললো আইরিন নেসার।

হাতে বেশি সময় নেই বলে ম্যাকডোনাল্ডে গিয়ে একটা হ্যামবার্গার খেতে খেতে বৃফকেসে রাখা জিনিসগুলো ছোট্ট একটা ট্রাভেল ব্যাগে ভরে রাখলো। খালি বৃফকেসটা টেবিলের নীচে রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো সালান্ডার। রাতের একটা ট্রেনে করে স্টকহোমে ফিরে আসার জন্য ট্রেনের প্রাইভেট স্লিপিংবার্থ বুক করলো।’

কম্পার্টমেন্টে ঢুকে দরজা লক করতেই বিগত দুদিনের মধ্যে নিজেকে বেশ হালকা বলে মনে হলো তার। কম্পার্টমেন্টের জানালা খুলে সিগারেট পানের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো সে।

চেকলিস্টটা আবারো খতিয়ে দেখলো কোনো কিছু ভুলে গিয়েছে কিনা। কিছুক্ষণ পর জ্যাকেটের পকেট হাতরে জিমারটাল হোটেল থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া কলমটা বের করে মুচকি হেসে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো।

পনেরো মিনিট পর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো লিসবেথ সালান্ডার!

উপসংহার

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৭-মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৩০

হান্স-এরিক ওয়েনারস্ট্রমের উপর মিলেনিয়াম-এর বিশেষ প্রতিবেদনটি ম্যাগাজিনের পুরো ছেচল্লিশ পৃষ্ঠা দখল করে নিলো। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এটা বোমা বিস্ফোরণের মতোই প্রকাশিত হলো যেনো। প্রধান স্টোরিটা মিকাইল ব্লমকোভিস্ট আর এরিকা বার্গারের যৌথনামে প্রকাশিত হয়। প্রথম কয়েক ঘণ্টা মিডিয়া বুঝতে পারে নি এই স্কুপটি কিভাবে সামলাবে। এক বছর আগে এরকম একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হলে ব্লমকোভিস্টকে মানহানির মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো। আদালত তাকে আর্থিক আর জেল জরিমানা করে অপসাংবাদিকতার জন্য, সেইসাথে পত্রিকা থেকেও তাকে বরখাস্ত করা হয়। এ কারণে খবরটার বিশ্বাসযোগ্যতা একটু কমই ছিলো। ঐ একই সাংবাদিক একই ম্যাগাজিনে, একই লোকের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ এনেছে যা কিনা আগেরবারের চেয়েও বেশি ভয়ানক। রিপোর্টের কিছু কিছু অংশ এতোটাই অবাস্তব বলে মনে হয় যে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেও সেটা ধরা পড়বে। সুইডিশ মিডিয়া বরং অবিশ্বাসের সাথে অপেক্ষা করলো ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার জন্য।

কিন্তু ঐদিন সন্ধ্যায় টিভি৪-এর শি ব্লমকোভিস্টের রিপোর্টের উপর এগারো মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত হাইলাইট তুলে ধরে তাদের অনুষ্ঠানে। রিপোর্ট প্রকাশ হবার কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠানের উপস্থাপককে লাঞ্চের দাওয়াত দিয়ে খবরটার সম্পর্কে আগাম আভাস দিয়েছিলো এরিকা।

টিভি৪-এর এই অনুষ্ঠানের পর সরকার পরিচালিত সংবাদ চ্যানেলগুলো নড়েচড়ে বসে। তারা রাত ৯টার সংবাদে এই রিপোর্টটা ঠাঁই দেয়। কিন্তু ততোক্ষণে টিটি ওয়্যার সার্ভিস এ সংক্রান্ত প্রথম শিরোনাম প্রকাশ করে সর্ব প্রথম অভিযুক্ত সাংবাদিক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন। খবরটার ভেতরের ম্যাটেরিয়াল টিভি৪-এর অনুষ্ঠান থেকে নেয়া। তবে টিটি ওয়্যারের এই খবরের কারণে পরদিন সবগুলো পত্রিকা বাধ্য হয়েই রিপোর্টটা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। বেশিরভাগ পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠা দখল করে নেয় সেটা। এরপরই শুরু হয়ে যায় মিডিয়ার দৌড়ঝাঁপ।

ঐ দিনই বিকেলে মিলেনিয়াম-এর রিপোর্টের উপর লিবারেল মর্নিং তাদের সম্পাদকীয়তে একটি মন্তব্যপ্রতিবেদন প্রকাশ করে, লেখাটা লেখে এডিটর ইন চিফ নিজে। এডিটর ইন চিফ যখন ডিনারপার্টিতে ছিলেন তখন টিভি৪ তাদের সংবাদটি প্রচার করছিলো। তাকে অবশ্য তার সেক্রেটারি আগেই বলে দিয়েছিলো খবরটার মধ্যে ‘কিছু একটা আছে’। তবে যথারীতি ভদ্রলোক এ বলে উড়িয়ে দেয় যে, ‘এরকম কিছু যদি আদৌ থাকতো তাহলে আমাদের রিপোর্টাররা সেটা অনেক আগেই জানতে পারতো।’ ফলস্বরূপ লিবারেল-এর এডিটরই একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলো যে কিনা সংবাদটির গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়। ভদ্রলোক আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মন্তব্য করে বসে ‘এরকম একজন সম্মানিত নাগরিকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগের জন্য ঐ সাংবাদিকের বিচার হওয়া উচিত।’ কিন্তু তার এই কথা হালে পানি পেলো না।

ঐদিন রাতে মিলেনিয়াম-এর অফিসে সবাই জড়ো হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেবলমাত্র বার্গার আর সদ্য নিয়োগ পাওয়া ম্যানেজিং এডিটর মলিন এরিকসনই সব ধরণের ফোন কলের জবাব দেবে বলে ঠিক করা হয়। রাত ১০টার মধ্যে সবাই উপস্থিত হয়, সেইসাথে মিলেনিয়াম-এর সাবেক চারজন স্টাফ আর আধডজন ফুল্যান্সারও চলে আসে তাদের সাথে যোগ দিতে। রাত আরেকটু গাঢ় হতেই মাম শ্যাম্পেইনের বোতল খুলে ফেলে। ঠিক তখনই তাদের পুরনো এক বন্ধু একটি সান্ধ্যকালীন পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যার অগ্রীম কপি পাঠিয়ে দেয় তাদের কাছে। ঐ সংখ্যায় ওয়েনারস্ট্রমের এই ব্যাপারটা নিয়ে ষোলো পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। শিরোনামটি দেয়া হয় ফিনান্সিয়াল মাফিয়া নামে। পরের দিন পত্রিকাটি বের হতেই আরো ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। মিডিয়া যেনো উন্মাদগ্রস্ত হয়ে ওঠে।

মলিন এরিকসন সিদ্ধান্ত নিলো সে মিলেনিয়াম-এ স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। ফিনান্সিয়াল দুর্নীতি তদন্তে পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠতেই সুইডিশ স্টক এক্সচেঞ্জে দরপতন শুরু হয়ে যায়। ভয়ে অনেকেই নিজের শেয়ার বিক্রি করে দিতে শুরু করে। ফলে টালমাটাল হয়ে ওঠে পুঁজিবাজার। রিপোর্টটি প্রকাশ হবার দু’দিন পর বাণিজ্যমন্ত্রী ‘ওয়েনারস্ট্রম ঘটনা’র উপর মন্তব্য করেন।

তবে মিডিয়ার এসব হৈচৈয়ের মানে এই নয় যে, মিলেনিয়াম-এর দাবিটি সবাই বিনাপ্রশ্নে মেনে নিয়েছে। তবে মিলেনিয়াম-এর শক্ত আর জোড়ালো প্রমাণ উপস্থাপনের কারণে এ যাত্রায় তারা সবার আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় : ওয়েনারস্ট্রমের নিজের ইমেইল, তার কম্পিউটারের অনেক কিছুর কপি, যাতে রয়েছে ব্যালান্স শিট, গোপন চুক্তিপত্রসহ অন্য অনেক কিছু। সবাই মেনে নিয়েছে এই ঘটনাটি ১৯৩২ সালের কুখ্যাত ক্রুগার ক্র্যাশ নামে পরিচিত দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। আদালতে মামলা হলে নির্ঘাত ফেঁসে যাবে ওয়েনারস্ট্রম। এই জালিয়াতিটি এতোটাই ব্যাপক যে কতোগুলো আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে সে হিসেব করতেও হিমশিম খেলো লোকজন।

সুইডিশ ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিংয়ে এই প্রথম ‘সংগঠিত অপরাধ,’

‘মাফিয়া, ‘ এবং ‘গ্যাংস্টার সাম্রাজ্য’ পদবাচ্যগুলো ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ওয়েনারস্ট্রম

আর তার তরুণ স্টকব্রোকার এবং আরমানি সুট-টাই পরা আইনজীবিগণ পরিচিতি পেলো একদল দস্যু হিসেবে।

মিডিয়ার এই হট্টগোলের প্রথম কয়েকটি দিন লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেলো ব্লমকোভিস্ট। ইমেইল কিংবা ফোনে তাকে পাওয়া গেলো না। মিলেনিয়াম-এর পক্ষে সব ধরণের সম্পাদকীয় মন্তব্য করলো এরিকার বার্গার নিজে। সবগুলো বড় পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিয়ে বেড়ালো সে। এমনকি বেশ কয়েকটি বিদেশী টিভি চ্যানেল আর পত্রিকাও তার ইন্টারভিউ নেবার জন্য প্রতিযোগীতা শুরু করে দিলো। যতোবারই তাকে জিজ্ঞেস করা হলো এসব গোপন দলিল-দস্তাবেজ তারা কিভাবে জোগার করতে সক্ষম হলো ততোবারই এরিকা বার্গার একটা কথাই আউড়ে গেলো : আমরা আমাদের সোর্সের পরিচয় প্রকাশ করি না।

তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো গতবছর ওয়েনারস্ট্রমের সাথে মামলা চলাকালীন সময়ে তারা কেন নিশ্চুপ ছিলো তখন সে ঘুরিয়ে পেচিয়ে একটা কথাই বুঝিয়ে দিলো : আমরা যদি আত্মপক্ষ সমর্থন করে প্রমাণগুলো উপস্থাপন করতাম তাহলে আদালত সোর্সের পরিচয় জানতে চাইতো, তাকে উপস্থিতও হতে হতো। সোর্সকে বাঁচানোর জন্যই তারা নিশ্চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। মিকাইল ব্লমকোভিস্ট সেইসব কিংবদন্তীতুল্য আমেরিকান সাংবাদিকের মতো যারা নিজেদের সোর্সকে উন্মেচন করার চেয়ে জেল খাটাই শ্রেয় মনে করে। এরিকার এমন কথার পর সারা দেশের মিডিয়া মিকাইল ব্লমকোভিস্টকে এমন সব প্রশংসায় ভাসিয়ে দিতে শুরু করে যে খোদ মিকাইলের কাছেই সেটা বিব্রতকর ব’লে মনে হতে লাগলো।

তবে একটা বিষয়ে একমত পোষণ করলো সবাই : যে ব্যক্তি এইসব ডকুমেন্ট পাচার করেছে সে ওয়েনারস্ট্রমের একান্ত বিশ্বস্ত লোকজনই হবে। এই ‘ডিপ থ্রোট’টা কে সেটা নিয়ে অনেক অনুমাণ শুরু হয়ে গেলো : অসন্তুষ্ট কোনো কলিগ, আইনজীবি, এমনকি ওয়েনারস্ট্রমের কোকেন-আসক্ত কন্যা অথবা তার পরিবারের কেউ। ব্লমকোভিস্ট কিংবা বার্গার কেউই এ ব্যাপারে একটুও মুখ খুললো না।

তৃতীয় দিনেও যখন একটি সান্ধ্যকালীন পত্রিকা মিলেনিয়াম-এর প্রতিশোধ হিসেবে শিরোনাম করলো তখন বার্গারের ঠোঁটে মুচকি হাসি দেখা দিলো। এই হাসি বিজয়ের। ঐ আর্টিকেলে তাদের পত্রিকার সামগ্রিক একটি চিত্র তুলে ধরা হলো, বিশেষ করে বার্গারের প্রশংসা করা হলো বেশ গুরুত্ব দিয়ে। তাকে অভিহিত করা হলো ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার রাণী’ হিসেবে। চারপাশে গুঞ্জন উঠতে শুরু করলো বার্গার এজন্যে সাংবাদিকতার সবচাইতে বড় পুরস্কারটিও হয়তো পেয়ে যাবে।

রিপোর্টটি প্রকাশ হবার মাত্র পাঁচ দিন পর প্রকাশ হলো ব্লমকোভিস্টের নতুন বই মাফিয়া ব্যাঙ্কার। মিলেনিয়াম নতুন একটি প্রকাশনা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করলো সেইসাথে। উৎসর্গে লেখা হলো : স্যালি’কে, যে আমাকে গলফ খেলার বাড়তি সুবিধা দেখিয়েছিলো।

৬০৮ পৃষ্ঠার মোটা একটি বই। প্রথম সংস্করণের ২০০০ কপি খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেলে বার্গার আরো ১০০০০ কপির প্রিন্ট করার অর্ডার দিয়ে দিলো সঙ্গে সঙ্গে।

বইটা যেহেতু প্রকাশিত হয়ে গেলো তাই অনেক সমালোচক মন্তব্য করলো মিকাইল ব্লমকোভিস্ট এবার আর নিজের কাছে থাকা যাবতীয় প্রমাণপত্র আটকে রাখবে না। তাই হলো; তার বইয়ের দুই তৃতীয়াশং জুড়ে আছে ওয়েনারস্ট্রমের কম্পিউটার থেকে সংগৃহীত ডকুমেন্ট। বইটি প্রকাশ হবার সাথে সাথে মিলেনিয়াম-এর ওয়েবসাইটে এইসব ডকুমেন্টগুলোর পিডিএফ ফরমেট ফাইল আপলোড করা হলো সর্ব সাধারণের জন্য।

বার্গার আর ব্লমকোভিস্ট দুজনে মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বেশ কয়েক দিন মিকাইল লোকচক্ষুর আড়ালে থাকবে। এটা ছিলো তাদের মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিরই অংশ। দেশের সব পত্রিকা আর টিভি চ্যানেল হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করলেও বইটি প্রকাশ হবার আগ পর্যন্ত তাকে মিডিয়ায় উপস্থিত হতে দেখা গেলো না। টিভি৪-এর শি অনুষ্ঠানে এক ইন্টারভিউ দিলো সে। আর সেটা হয়ে উঠলো ঐদিনের জন্য সবচাইতে বড় একটি খবর।

ঐ ইন্টারভিউয়ের একটা অংশে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো সুইডেনের স্টকমার্কেটে যে দরপতন শুরু হয়েছে তাতে করে সুইডিশ অর্থনীতি বিশাল একটি ধাক্কা খেতে পারে, এ ব্যাপারে মিলেনিয়াম-এর দায় দায়িত্ব কতোটুকু।

“সুইডেনের অর্থনীতি ধাক্কা খাবে বলে যে অনুমাণ করা হচ্ছে সেটা একেবারেই অর্থহীন একটি প্রলাপ,” বললো ব্লমকোভিস্ট।

টিভি৪-এর শি অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। তার এমন জবাবের প্রত্যাশা করে নি সে। বাধ্য হয়ে তাকে উপস্থিত বুদ্ধি খাটাতে হলো। “সুইডিশ স্টকএক্সেঞ্জে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ পতন হয়েছে-আর আপনি কিনা বলছেন অর্থহীন প্রলাপ?”

“সুইডিশ অর্থনীতি আর সুইডিশ স্টকএক্সচেঞ্জ, এ দুটো ব্যাপারের মধ্যে আপানাকে পার্থক্য করতে হবে। এ দেশে প্রতিদিন যে সমস্ত পণ্য আর সার্ভিস উৎপাদিত হয় সেটা হলো সুইডিশ অর্থনীতি। এরিকসনের ফোন, ভলভো’র মোটরগাড়ি, স্ক্যানের মুরগি-ডিম, এবং কিরুনা আর স্কভদির যাবতীয় শিপমেন্ট-এ সবই সুইডিশ অর্থনীতির মধ্যে পড়ে। এগুলো এক সপ্তাহ আগে যতোটা দুর্বল কিংবা শক্তিশালী ছিলো আজো তাই আছে।”

একটু থেমে পানি পান করে নিলো সে।

“কিন্তু স্টকএক্সচেঞ্জ একেবারেই জটিল একটি বিষয়। এটা কোনো অর্থনীতি নয়। এখানে কোনো পণ্য কিংবা সেবা উৎপাদিত হয় না। এখানে কেবল কল্পনা আর আন্দাজের খেলা চলে। অমুক কোম্পানি ভালো লাভ করবে কিংবা তমুক কোম্পানি লোকসান করবে মনে ক’রে লোকজন শেয়ার কেনা-বেচা করে থাকে। এর সাথে সুইডিশ অর্থনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।”

“তাহলে আপনি মনে করছেন সুইডিশ স্টকএক্সচেঞ্জ ধরাশায়ী হলেও তাতে কিছু আসে যায় না?”

“না, কিছু আসে যায় না সেটা বলা ঠিক হবে না,” ব্লমকোভিস্টের কথাটা এমন শোনালো যেনো ভবিষ্যতদ্রষ্টার ভূমিকায় নেমেছে এখন। তার এই কথাটা অনেক বছর ধরেই উদ্ধৃত করা হবে।

“এর মানে হলো একদল স্পেকুলেটর এখন সুইডিশ কোম্পানি থেকে সরে গিয়ে জার্মান কোম্পানির দিকে চলে যাবে। তো এটাকে কতিপয় জাঁদরেল ফিনান্সিয়াল রিপোর্টাররা একধরণের অর্থনৈতিক শয়তানি কিংবা দেশদ্রোহী হিসেবেও অভিহিত করতে পারে। তারা আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে সিস্টেমেটিক্যালি সুইডিশ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করে যাচ্ছে নিজেদের মুনাফার সুবিধার্থে।”

এরপরই টিভি৪-এর শি এমন একটি ভুল করে বসলো যা কিনা ব্লমকোভিস্ট আগে থেকেই আশা করে ছিলো।

“আপনি মনে করছেন মিডিয়ার কোনো দায়দায়িত্ব নেই?”

“ওহ্, হ্যা। মিডিয়ার বিশাল দায়িত্ব আছে। কমপক্ষে বিশ বছর ধরে ফিনান্সিয়াল রিপোর্টাররা হান্স-এরিক ওয়েনারস্ট্রমের ব্যাপারে চোখ-কান বন্ধ করে রেখেছিলো। তারা তো তার বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধান করেই নি বরং লোকটাকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে চিত্রিত করে তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে। তারা যদি নিজেদের কাজটা ভালোভাবে করতে পারতো তাহলে আজকে আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।”

ব্লমকোভিস্টের এই ইন্টারভিউয়ের পর তার মন্তব্যকে ধার করে স্টকএক্সচেঞ্জের কতিপয় ব্রোকারের জার্মান কোম্পানির শেয়ার কেনার খবরের দিকে ইঙ্গিত করে একটি পত্রিকা শিরোনাম করলো : তারা নিজের দেশকে বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে সব ব্রোকারকে মন্তব্য করতে বলা হলেও কেউই মন্তব্য করতে এগিয়ে এলো না। দিন দিন স্টকএক্সচেঞ্জের পতন বাড়তে লাগলে নিজেদেরকে দেশপ্রেমী হিসেবে জাহির করা কতিপয় ব্রোকারও যখন জার্মান কোম্পানির দিকে ঝুঁকে পড়লো খবরটা শুনে ব্লমকোভিস্ট অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়লো।

চারদিক থেকে চাপ এতোটাই বাড়তে লাগলো যে কালো সুট-টাই পরা লোকজন নিজেদের অভিজাত ক্লাব থেকে বেরিয়ে এসে এক সময়কার কলিগের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে শুরু করে দিলো। আচমাকাই যেনো অবসরে চলে যাওয়া শিল্পপতি আর ব্যাঙ্কাররা হাজির হতে শুরু করে দিলো টিভি পর্দায়। এটাকে তারা ড্যামেজ কন্ট্রোল পদক্ষেপ হিসেবে দেখলো। সবাই বুঝতে পারলো পরিস্থিতির গুরুত্ব। ওয়েনারস্ট্রমের সাথে যতোটুকু সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলো তারা। প্রায় সবাই একবাক্যে একটা কথাই আউড়াতে লাগলো : হান্স-এরিক ওয়েনারস্ট্রম আদৌ কোনো শিল্পপতি নয়। তারা কখনই এই ভদ্রলোককে নিজেদের একজন ব’লে মনে করতো না। লোকটা নরল্যান্ডের অতি সাধারণ এক শ্রমিক পরিবার থেকে উঠে আসা ঠগ-ব্যবসায়ী। কেউ কেউ তার ঘটনাকে ব্যক্তিগত একটি ট্র্যাজেডি হিসেবেও অভিহিত করলো। আবার অনেকেই গলা চড়িয়ে বলতে লাগলো অনেক আগে থেকেই তারা এই লোকটার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ ক’রে আসছিলো।

এরপরের কয়েক সপ্তাহে মিলেনিয়াম-এর ডকুমেন্টগুলোর উপর ভিত্তি ক’রে অনুসন্ধান শুরু হয়ে গেলে দেখা গেলো ওয়েনারস্ট্রমের সাথে আরো অসংখ্য আর্ন্তজাতিক মাফিয়া, অস্ত্রব্যবসায়ী, মুদ্রাপাচারকারী, দক্ষিণ-আমেরিকার মাদকব্যবসায়ী, এমনকি মেক্সিকোতে শিশু পতিতা বাণিজ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। সাইপ্রাসে রেজিস্টার করা ওয়েনারস্ট্রমের একটি কোম্পানি ইউক্রেনের কালোবাজার থেকে অবৈধভাবে সমৃদ্ধ ইউরোনিয়াম সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে বলেও খবর বেরোলো। দেখা গেলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওয়েনারস্ট্রমের পোস্ট-অফিস-বক্স কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরণের অবৈধ লেনদেনের সাথে জড়িত।

বার্গারের মতে যে বইটি ব্লমকোভিস্ট লিখেছে সেটা তার জীবনে লেখা সেরা কাজ। অবশ্য তথ্য-প্রমাণে ঠাসা থাকলেও বইটি লেখার মান খুব একটা উঁচুমানের নয়। ঘষামাজা করার মতো সময় পায় নি মিকাইল। তবে এই বই না পড়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না নিয়মিত পাঠকেরা। বিক্রি হচ্ছে দেদারসে।

হঠাৎ করেই পুরনো শত্রু উইলিয়াম বর্গের সাথে ব্লমকোভিস্টের দেখা হয়ে গেলো। বার্গার আর অফিসের অন্যান্য কলিগদের সাথে সান্তা লুসিয়া হলিডে উদযাপন করার জন্য কেভারনানে গিয়ে ইচ্ছেমতো মদ্যপান ক’রে ফিরছিলো তারা, সেখানেই দেখা হয়ে গেলো তার সাথে। বর্গের সঙ্গী ছিলো সালান্ডারের সমবয়সী এক মাতাল মেয়ে।

বর্গকে যে ব্লমকোভিস্ট যারপরনাই ঘৃণা করে সেটা বার্গার জানে সেজন্যেই লোকটা যখন তার হাত ধরে তাকে আবারো বারের ভেতর নিয়ে যাবার চেষ্টা করলো তখন বার্গার এসে তাকে উদ্ধার করলো।

ব্লমকোভিস্ট ঠিক করলো কোনো এক সুবিধাজনক সময়ে সালান্ডারকে দিয়ে বর্গের বিষয়ে তদন্ত করাবে।

মিডিয়ার এতো হৈচৈয়ৈর মধ্যেও নাটকের আসল পাত্র ওয়েনারস্ট্রম একেবারেই পর্দার আড়ালে রয়ে গেলো। মিলেনিয়াম যেদিন তাদের রিপোর্টটা প্রকাশ করলো সেদিন বাধ্য হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করেছিলো ওয়েনারস্ট্রম গ্রুপ। সেই কনফারেন্সে ওয়েনারস্ট্রম উপস্থিত না হয়ে লিখিত বক্তব্য দেয়। সব ধরণের অভিযোগ অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে যে সব ডকুমেন্ট আছে সেগুলোকে বানোয়াট বলে দাবি করে সে। সবাইকে আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয় এই একই রিপোর্টার এক বছর আগে মানহানির মামলায় আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলো।

এরপর সব ধরণে প্রশ্নের জবাব দিতে শুরু করে ওয়েনারস্ট্রমের আইনজীবিরা। ব্লমকোভিস্টের বইটা বের হবার দু’দিন পর একটা গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, ওয়েনারস্ট্রম নাকি সুইডেন ছেড়ে চলে গেছে। এরপরই সান্ধ্যকালীন এক পত্রিকা তার এই চলে যাওয়াকে ‘পলায়ন’ হিসেবে অভিহিত করে বসে। দ্বিতীয় সপ্তাহে সিকিউরিটি পুলিশ দুর্নীতি তদন্ত করার জন্য ওয়েনারস্ট্রমের সাথে যোগাযোগ করতে গেলে তাকে আর খুঁজে পেলো না কোথাও। নতুন বছরের শুরুতে পুলিশ ওয়েনারস্ট্রমের নামে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে সমগ্র ইউরোপে। ঐ একই দিনে ওয়েনারস্ট্রমের এক উপদেষ্টা লন্ডনগামী এক বিমানে ক’রে পালিয়ে যাবার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

এর কয়েক সপ্তাহ পর এক সুইডিশ পর্যটক রিপোর্ট করে যে, ওয়েনারস্ট্রমকে সে বার্বাডোজের রাজধানী বৃজটাউনে দেখেছে। নিজের প্রমাণের সপক্ষে একটা ছবিও দেখায় ভদ্রলোক। দূর থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায় সাদা শার্ট আর সানগ্লাস পরা এক শ্বেতাঙ্গ গাড়িতে উঠছে। ছবি দেখে নিশ্চিত ক’রে বলা সম্ভব না হলেও এক পত্রিকা দাবি করে ফেরারি লোকটাকে বার্বাডোজ থেকে এক্ষুণি গ্রেফতার করা হোক।

ছয়মাস পর ওয়েনারস্ট্রমকে ধরার যে অভিযান সেটা সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। স্পেনের মারবেলা নামক এক অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। ওখানে ভিক্টর ফ্লেমিং নামে বসবাস করছিলো সে। খুব কাছ থেকে তার মাথায় তিনটি গুলি করা হয়। স্পেনিশ পুলিশ তদন্ত করে জানায় তার অ্যাপার্টমেন্টে কোনো চোর ঢুকে পড়েছিলো, কাজটা সেই চোরই করেছে।

.

ওয়েনারস্ট্রমের মৃত্যু সালান্ডারের কাছে কোনো অবাক করা ঘটনা ছিলো না। লোকটা যে কেম্যান ব্যাঙ্ক থেকে আর কোনো রকম লেনদেন করতে পারে নি তার ফলেই এরকম একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে। সম্ভবত কলম্বিয়ার মাদক সম্রাটদের পাওনা টাকা শোধ করতে পারে নি।

কেউ যদি সালান্ডারের কাছে জানতে চাইতো ওয়েনারস্ট্রম কোথায় আছে তাহলে সে প্রতিদিনকার খবরাখবর জানিয়ে দিতে পারতো। ইন্টারনেটের সাহায্যে সে লোকটার ফ্লাইটের গন্তব্য অনুসরণ ক’রে জানতে পেরেছিলো এক ডজনের মতো দেশে ঘুরে বেরিয়েছিলো ওয়েনারস্ট্রম। তাছাড়া তার ইমেইল থেকে সব তথ্যই জানতো সালান্ডার। এই বিলিয়নেয়ার যে নিজের কম্পিউটার সঙ্গে ক’রে নিয়ে যাবে এমন দুরাশা ব্লমকোভিস্টও করে নি, কিন্তু সেটাই করেছিলো ভদ্রলোক। ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে নি তার কম্পিউটারই তার সর্বনাশ করেছে।

ছয় মাস পর ওয়েনারস্ট্রমকে ট্র্যাকিং করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো সালান্ডার। নিজেকে প্রশ্ন করে এ ঘটনায় তার জড়িয়ে পড়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা। ওয়েনারস্ট্রম যে একজন অলিম্পিক-ক্লাসের জোচ্চোর সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু এটাও তো ঠিক, লোকটা তার নিজের শত্রু নয়। সুতরাং তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছেও তার নেই। ব্লমকোভিস্টকে সে জানাতে পারতো লোকটার অবস্থানের কথা, কিন্তু সে আর কি করতো এ নিয়ে? বড়জোর পত্রিকায় একটা রিপোর্ট লিখেই শেষ করতো নিজের দায়িত্ব। পুলিশকেও জানাতে পারতো সালান্ডার, কিন্তু ওয়েনারস্ট্রম আগেভাগে টের পেয়ে সটকে পড়ার সম্ভাবনাও ছিলো তাতে। সবচাইতে বড় কথা হলো সে কখনও পুলিশকে পছন্দ করে না। তাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না তার।

তবে পরিশোধ করার মতো অন্য একটা ঋণও আছে তার। এক সময় এক ওয়েট্রেস গর্ভবতী হয়ে গেলে তার মাথা পানিতে ডুবিয়ে তাকে অপদস্ত করা হয়েছিলো।

ওয়েনারস্ট্রমের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার চারদিন আগে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সে। মায়ামির এক আইনজীবিকে ফোন ক’রে তার সেক্রেটারির সাথে কথা বলে একটা সাংকেতিক মেসেজ পাঠাতে সক্ষম হয়। ওয়েনারস্ট্রমের নাম এবং মারবেলার ঠিকানা ছাড়া আর কিছু তাতে ছিলো না।

ওয়েনারস্ট্রমের নাটকীয় মৃত্যুর খবরটা চলার সময় টিভি সেটটা বন্ধ ক’রে দিয়ে কিছু কফি আর স্যান্ডউইচ নিয়ে বসলো সালান্ডার।

.

বার্গার আর মাম যখন বার্ষিক ক্রিসমাস অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ব্লমকোভিস্ট তখন এরিকার চেয়ারে বসে বসে তা দেখছে আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জুস পান করছে। তাদের পত্রিকার সবাই ক্রিসমাস উপহার পাবে-এ বছর বাড়তি হিসেবে আরো পাবে মিলেনিয়াম প্রকাশনীর লোগো সংবলিত একটি কাঁধের ব্যাগ। এরিকা অনেকগুলো কার্ড নিয়ে পরিচিতদের পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।

ব্লমকোভিস্ট অনেক চেষ্টা করেও অবশেষে নিজেকে একটা কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারলো না। একটা কার্ড তুলে নিয়ে লিখলো সে : মেরি ক্রিসমাস এবং শুভ নববর্ষ। গত বছরে তোমার অসাধারণ সাহায্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

কার্ডে জেইন ডালম্যানের নাম আর মনোপলি ফিনান্সিয়াল-এর ঠিকানা লিখলো।

রাতের বেলা বাড়ি ফিরে একটা পোস্টাল প্যাকেজ পাবার নোটিফিকেশন পেলো ব্লমকোভিস্ট। পরদিন অফিসে যাবার পথে প্যাকেজটা তুলে নিলে দেখতে পেলো সেটার ভেতরে মশা মারার একটি ওষুধ আর এক বোতল মদ রয়েছে, সেই সাথে একটা চিরকুট : তোমার যদি অন্য কোনো পরিকল্পনা না থাকে তাহলে বলছি, আমি মিডসামার ইভে আরোমা ডকে থাকবো। প্যাকেজটা এসেছে রবার্ট লিন্ডবার্গের কাছ থেকে।

সাধাণত ক্রিসমাসের এক সপ্তাহ আগে মিলেনিয়াম-এর অফিস বন্ধ হয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে খুলে থাকে, এ বছর অবশ্য তার ব্যতিক্রম করা হলো। সারা বিশ্বের সব জায়গা থেকে সাংবাদিকেরা যখন তখন ফোন ক’রে যাচ্ছে। ক্রিসমাসের আগের দিন হঠাৎ করেই ব্লমকোভিস্টের নজরে পড়লো ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর একটি আর্টিকেল। তারা আর্ন্তজাতিক ব্যাঙ্কিং কমিশনের তদন্তের উপর একটি রিপোর্টিং করেছে। এই কমিশনটি গঠিত হয়েছিলো ওয়েনারস্ট্রমের সাম্রাজ্য পতনের পর পরই। কমিশন অনুমাণ করতে পেরেছে যে, ওয়েনারস্ট্রম শেষ মুহূর্তে জেনে গিয়েছিলো তার সব কিছু ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।

কেম্যান আইল্যান্ডের ক্রোয়েনফেল্ড ব্যাঙ্কে তার একাউন্টে গচ্ছিত ২৬০ মিলিয়ন ডলার-আনুমানিক ২.৫ বিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার মিলেনিয়াম-এর রিপোর্টটা প্রকাশিত হবার আগের দিন তুলে ফেলা হয়েছিলো।

অনেকগুলো একাউন্টে টাকাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কেবলমাত্র ওয়েনারস্ট্রমই এসব টাকা তুলতে পারতো। তাকে অবশ্য ওখানে উপস্থিত হয়ে টাকাগুলো তোলার দরকার ছিলো না। কতোগুলো ক্লিয়ারিং কোডের সাহায্যে বিশ্বের যেকোনো ব্যাঙ্কে টাকা ট্রান্সফার করা সম্ভব। টাকাগুলো নাকি সুইজারল্যান্ডে ট্রান্সফার করা হয়েছে, তার এক নারী সহযোগী এইসব ফান্ড অজ্ঞাত প্রাইভেট বন্ডে রূপান্তর ক’রে নিয়েছে। সবগুলো ক্লিয়ারিং কোডই ঠিকঠাক মতো প্রদান করা হয়েছিলো।

ইউরোপোল তার সেই সহযোগীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মোনিকা শোলস নামের ঐ মেয়ে একটি বৃটিশ পাসপোর্ট চুরি করে জুরিখের ব্যয়বহুল হোটেলে অবস্থান করছিলো। এক সার্ভিলেন্স ক্যামেরা থেকে মেয়েটির পরিস্কার ছবি পাওয়া গেছে—ছোটোখাটো এক মেয়ে, বয়কাট সোনালি চুল, প্রশ্বস্ত ঠোঁট আর বিশাল বক্ষ। নামী ডিজাইনারের পোশাক আর জুয়েলারি পরে আছে।

পত্রিকায় ছাপানো ছবিটা দেখেই ব্লমকোভিস্টের চোখ কুচকে এলো। ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে আরো ভালোভাবে দেখে নিলো সে।

শেষে পত্রিকাটা রেখে নির্বাক হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে এমন উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করলো যে মাম দরজার কাছে এসে বিস্ময়ে চেয়ে রইলো তার দিকে।

.

ক্রিসমাসের দিন সকালবেলায় সাবেক স্ত্রী আর মেয়ে পারনিলাকে দেখার জন্য অস্তায় চলে গেলো ব্লমকোভিস্ট। পারনিলাকে তার চাহিদামতো একটি কম্পিউটার উপহার দিলো সে। সাবেক স্ত্রী মনিকার কাছ থেকে একটা টাই আর মেয়ের কাছ থেকে এইক এডওয়ার্ডসনের একটি ডিটেক্টিভ উপন্যাস উপহার পেলো। গত ক্রিসমাসের তুলনায় এই ক্রিসমাসে তাদের আনন্দ অনেক বেশি, কারণ চারদিকে মিলেনিয়াম আর ব্লমকোভিস্টের প্রশংসা আর স্তুতি এখনও চলছে।

তারা সবাই একসাথে লাঞ্চ করলো। আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকালো মিকাইল। তার মেয়ে হেডেস্টাড থেকে চলে আসার পর তাকে আর দেখে নি। বুঝতে পারলো মেয়ের স্কেলেফটিয়া ধর্মীয় গ্রুপের ব্যাপারে যে আগ্রহ সেটা নিয়ে মনিকার সাথে কথা বলতে পারে নি আর। তাদেরকে বলতে পারলো না মেয়ের বাইবেল জ্ঞানের পরিধি এতোটাই ব্যাপক যে তার কাণেই আসলে হ্যারিয়েট রহস্যটা উন্মোচিত করা সম্ভব হয়েছে। হেডেস্টাড থেকে চলে আসার পর মেয়ের সাথে তার কথাও হয় নি।

বাবা হিসেবে সে খুব একটা সুবিধার নয়।

লাঞ্চের পর মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে সালান্ডারের সাথে দেখা করার জন্য চলে এলো স্লাসেনে। ওখান থেকে তারা দু’জনে চলে গেলো স্যান্ডহামে। মিলেনিয়াম-এর বোমা বিস্ফোরণের পর থেকে তাদের মধ্যে খুব একটা দেখা হয় নি। বাকি ছুটির দিনগুলো তারা একসঙ্গেই কাটিয়ে দিলো।

সালান্ডার সব সময়ই ব্লমকোভিস্টের সঙ্গ পছন্দ করে কিন্তু তার কাছ থেকে ধার করা ১২০০০০ ক্রোনার যখন ফিরিয়ে দিতে গেলো তখন তার অভিব্যক্তি দেখে এক ধরণের অস্বাস্তিকর অনুভূতি হতে লাগলো মেয়েটির।

আশেপাশে ঘুরে বেরিয়ে এবং ভালো রেস্তোরাঁয় খাবার খেয়ে কটেজে এসে তারা এলভিস প্রিসলির গান শুনলো আর ইচ্ছেমতো সেক্স করলো। ওখানে থাকার সময় মাঝেমধ্যেই নিজের অনুভূতিগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলো সালান্ডারের।

ব্লমকোভিস্টকে প্রেমিক হিসেবে মেনে নিতে তার কোনো সমস্যা নেই। তাদের সম্পর্কের মধ্যে অবশ্যই শারীরিক আকর্ষণ রয়েছে। তাছাড়া লোকটা কখনও তাকে জ্ঞান দেবার চেষ্টা করে না।

তার সমস্যা হলো মিকাইলের প্রতি নিজের অনুভূতিটা বুঝতে না পারা। সাবালকত্ব হবার পর থেকে কোনো পুরুষকেই তার জীবনে এতো কাছাকাছি আসতে দেয় নি সে। সত্যি বলতে কি, মিকাইল তার সমস্ত প্রতিরক্ষা বুহ্য ভেদ করে ঢুকে পড়েছে। তার একান্ত ব্যক্তিগত সব ব্যাপারগুলো জানতে চায়। সেসব নিয়ে কথা বলতে চায় তার সাথে। তার বেশিরভাগ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেলেও এমন অনেক কথা তার কাছে বলেছে যা এর আগে কখনও কারো কাছে বলে নি। এমনকি তাকে মৃত্যুর হুমকি দিলেও সেসব কথা বলতো কিনা সন্দেহ আছে। এই ব্যাপারটা তাকে ভীত করে তোলে, তার কাছে মনে হয় মিকাইলের কাছে সে একেবারে নগ্ন হয়ে পড়েছে, নাজুক হয়ে যাচ্ছে তার ইচ্ছের কাছে।

আবার ঠিক একই সময়-তাকে যখন ঘুমিয়ে থাকতে দেখে, তার নাক ডাকা শুনতে থাকে-তার কাছে মনে হয় এ জীবনে অন্য কাউকে এতোটা বিশ্বাস করে নি। সে খুব ভালো করেই জানে তার সম্পর্কে মিকাইল যা জানে সেসব ব্যবহার করে কোনোদিনও তার কোনো ক্ষতি করবে না সে। এটা তার স্বভাবও নয়।

কেবলমাত্র তাদের সম্পর্কটা নিয়েই তারা কোনো রকম আলাপ আলোচনা করে নি। সালান্ডারের কখনও সাহস হয় নি, আর ব্লমকোভিস্ট কখনও এই প্রসঙ্গটা তোলে নি।

দ্বিতীয় দিনের সকালে, কোন এক সময় হঠাৎ করেই মারাত্মক একটি বোধোদয় হলো সালান্ডারের। কিভাবে, কেন এটা হলো সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। আর এটার সাথে কিভাবে খাপ খাইয়ে চলবে তাও বুঝতে পারলো না। জীবনে এই প্রথম প্রেমে পড়েছে সে।

সে যে তার দ্বিগুন বয়সী সেটা নিয়েও তার মধ্যে কোনো খচখচানি নেই। কিংবা এই লোকটাই যে বর্তমান সময়ে সুইডেনের সবচাইতে পরিচিত আর জনপ্রিয় মুখ সেটাও তার কাছে কোনো ব্যাপার নয়। ব্লমকোভিস্ট এখন নিউজউইক-এর প্রচ্ছদকাহিনীতে ঠাঁই পেয়েছে। সেলেব্রেটির মর্যাদা পাচ্ছে সে। তবে ব্লমকোভিস্ট কোনো উত্তেজক ফ্যান্টাসি কিংবা দিবাস্বপ্ন নয়। এটার পরিসমাপ্তি হতে হবে। এই সম্পর্কটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সালান্ডারকে তার কিসের দরকার? অন্য আরেকজন তার জীবনে আসার আগে সে হয়তো নিতান্তই একটি টাইমপাসের বিষয়।

সালান্ডার বুঝতে পারলো ভালোবাসা মানে হৃদয় বিস্ফোরিত হবার মুহূর্ত।

ঐদিন শেষ রাতে ব্লমকোভিস্ট ঘুম থেকে উঠলে সালান্ডার তার জন্য কফি বানিয়ে নাস্তা কেনার জন্য বাইরে চলে গেলো। নাস্তার টেবিলেই মেয়েটার আচার আচরণে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলো সে-আগের চেয়ে অনেকটাই শান্তশিষ্ট। তার কাছে যখন জানতে চাইলো কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা তখন নির্বিকারভাবে শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা।

ক্রিসমাসের ছুটি শেষে, নতুন বছরের আগের দিন ব্লমকোভিস্ট ট্রেনে ক’রে হেডেস্টাডে চলে গেলো। ফ্রোডি যখন স্টেশনে তাকে নিতে এলো দেখতে পেলো শীতের পোশাক পরেই এসেছে, আগের বারের মতো ভুল করে নি। তার রিপোর্টের সফলতার জন্য তাকে কংগ্রাচুলেট করলো ভদ্রলোক। আগস্টের পর এই প্রথম হেডেস্টাডে এলো সে, আর ঠিক এক বছর আগে এই সময়টাতেই প্রথম এখানে পা রেখেছিলো। তাদের মধ্যে হালকা কথাবার্তা হলো, তবে অনুচ্চারিত রয়ে গেলো অনেক অকথিত বিষয়। ব্লমকোভিস্টের খুব অস্বস্তি লাগছে।

সব কিছুই প্রস্তত করে রাখা ছিলো ফলে ফ্রোডির সাথে কাজ সেরে নিতে কয়েক মিনিট লাগলো তার। ফ্রোড়ি পুরো টাকাটা বিদেশী কোনো ব্যাঙ্কে ডিপোজিট করার প্রস্তাব দিলেও ব্লমকোভিস্ট পুরো লেনদেনটা স্বাভাবিক আর বৈধভাবে করার পক্ষপাতি।

“আমি অন্য কোনোভাবে এই পেমেন্টটা নিতে চাইছি না,” ফ্রোডি জোর করলে তাকে থামিয়ে বললো সে।

তার এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য কেবলমাত্র অর্থনৈতিক নয়। সে এবং সালান্ডার যখন তড়িঘড়ি করে হেডেবি ছেড়ে চলে যায় তখন কিছু বইপত্র আর জামাকাপড় রেখে চলে গিয়েছিলো।

অসুখ থেকে সেরে ওঠার পরও ভ্যাঙ্গারের শরীর বেশ দুর্বল, তবে হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে চলে এসেছে সে। তাকে দেখাশোনা করে সার্বক্ষণিক একজন প্রাইভেট নার্স। সেই নার্স তাকে হাটাহাটি করতে কিংবা সিঁড়ি বাইতে বারণ করেছে। এমনকি তাকে আপসেট করতে পারে এরকম কোনো কথাও যেনো না বলা হয় সে ব্যাপারে সতর্ক ক’রে দিলো তাকে। ক’দিন আগে তার সর্দি লেগেছে, তাই বিছানায় শুয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে নার্স।

“তারচেয়ে বড় কথা এই নার্সটি খুবই ব্যয়বহুল,” ভ্যাঙ্গার অভিযোগের সুরে বললো।

ব্লমকোভিস্ট ভালো করেই জানে এরকম ব্যয়বহুল নার্স পোষার ক্ষমতা ভ্যাঙ্গারের রয়েছে। সে হেসে ফেলার আগপর্যন্ত মুখ গোমড়া করে রাখলো ভ্যাঙ্গার।

“যা করেছো তাতে প্রতিটি ক্রোনারই তোমার প্রাপ্য।”

“সত্যি বলতে কি, আমি কখনও ভাবতে পারি নি যে এই কেসটার সমাধান করতে পারবো।“

‘তোমাকে ধন্যবাদ দেয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই,” বললো ভ্যাঙ্গার। “আমিও আশা করি না আপনি সেটা করবেন। আমি এখানে এসেছি এ কথাটা বলতে যে কাজটা শেষ হয়ে গেছে।”

ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো ভ্যাঙ্গার। “তুমি কাজটা এখনও শেষ করো নি,” বললো সে।

“আমি জানি।”

“চুক্তিমতো তুমি তো এখনও ভ্যাঙ্গার পরিবারের ইতিহাস লেখো নি।”

“জানি। আমি সেটা লিখবোও না। সত্যি বলতে কি আমি সেটা লিখতে পারবো না। মুখ্য একটি ঘটনা বাদ দিয়ে আমি ভ্যাঙ্গারদের ইতিহাস লিখতে পারবো না। মার্টিনের অধ্যায়ে আমি কি লিখবো? তার সিইও থাকাকালীন সময়টাকে লিখবো আর তার বেসমেন্টের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু লিখবো না সেটা তো হতে পারে না। হ্যারিয়েট ভ্যাঙ্গারের জীবন ধ্বংস না করে এই ইতিহাসটা লেখাও যাবে না।

“তোমার সংকটটা আমি বুঝতে পারছি, তুমি যে না লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছো তার জন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

“আপনাকে কংগ্রাচুলেশন। আপনি আমাকে দুর্নীতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। আপনার সাথে যেসব কথোপকথন রেকর্ড করেছিলাম আর এ সংক্রান্ত যতো নোট জোগার করেছিলাম সবই নষ্ট ক’রে ফেলেছি।”

“আমি অবশ্য মনে করি না তুমি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছো,” বললো ভ্যাঙ্গার।

“এরকমটি আমিও মনে করতে পছন্দ করি।

“তুমি সাংবাদিক এবং মানুষ, এ দুয়েরর মধ্যে একটা ভূমিকাকে বেছে নিয়েছো। আমি কখনও তোমার মুখ বন্ধ রাখতে পারতাম না।”

ব্লমকোভিস্ট কিছু বললো না।

“সিসিলিয়াকে পুরো গল্পটা আমরা বলেছি। ফ্রোডি আর আমি খুব জলদিই চলে যাবো, পরিবারের মধ্য থেকে হ্যারিয়েটের একজন সমর্থক দরকার আছে। বোর্ডে সিসিলিয়া সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। এখন থেকে সে আর হ্যারিয়েট ফার্মের সব দায়িত্ব পালন করবে।”

“সবকিছু শোনার পর ব্যাপারটা কিভাবে নিলো সে?”

“সব শুনে রীতিমতো কাঁপতে শুরু করে দেয়। কিছুদিনের জন্য সে দেশের বাইরে গেছে। আমি এমনকি ভয় পেয়ে গেছিলাম সে বুঝি আর ফিরে আসবে না।”

“কিন্তু সে ফিরে এসেছে।

“আমাদের পরিবারে সিসিলিয়ার সাথে যে ক’জনের ভালো সম্পর্ক ছিলো . তার মধ্যে মার্টিন ছিলো অন্যতম। সুতরাং তার পক্ষে ঘটনাটা হজহম করা সহজ ছিলো না। তুমি এই পরিবারের জন্য কি করেছো সেটাও এখন সে জেনে গেছে।”

ব্লমকোভিস্ট কাঁধ তুললো কেবল।

“সুতরাং, মিকাইল…তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ,” বললো ভ্যাঙ্গার। “এই পরিবারের সাথে জড়িয়ে পড়েছি বলেই হয়তো তাদের ইতিহাস লিখতে পারি নি। এখন আমাকে বলুন, আবারো সিইও হতে পেরে কেমন লাগছে?”

“খুব অল্প সময়ের জন্য হয়েছি, তবে…আমার বয়স যদি আরেকটু কম হতো তাহলে দারুণ হতো। দিনে মাত্র তিন ঘণ্টা কাজ করি। এই ঘরেই সবগুলো মিটিং হয়ে থাকে। ডার্চ আবারো আমার লিগ্যাল উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে।

“তাহলে তো জুনিয়র এক্সিকিউটিভরা নড়েচড়ে বসেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে ডার্চ কেবলমাত্র আপনার ফিনান্সিয়াল উপদেষ্টাই নয়, বরং আপনার হয়ে সব ধরণের সমস্যা সমাধান করে থাকে সে।”

“ঠিক বলেছো। তবে এখন সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয় হ্যারিয়েটের সাথে আলাপ আলোচনা করে। অফিসে নিয়মিত বসছে সে।”

“সবকিছু কিভাবে সামলাচ্ছেন উনি?”

“তার ভাই আর মায়ের শেয়ারের উত্তরাধিকার পেয়েছে সে। এখন সে একাই কর্পোরেশনের মোট ৩৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।”

“এটা কি যথেষ্ট?”

“জানি না। বার্জার তার সাথে ঝামেলা তৈরি করার চেষ্টা করছে। আলেকজান্ডারও যোগ দিয়েছে তার সাথে। আমার ভাই হেরাল্ডের ক্যান্সার ধরা পড়েছে, খুব বেশিদিন বাঁচবে না। তার ৭ শতাংশ শেয়ার পাবে তার ছেলেমেয়েরা। সিসিলিয়া আর আনিটা হ্যারিয়েটের পক্ষেই থাকবে।’

“তাহলে তারা সবাই মিলে মোট ৪৫ শতাংশের মালিক।”

“এই পরিমাণ ভোটিং কার্টেল আমাদের পরিবারে এর আগে ছিলো না। এক-দু শতাংশের মালিক এরকম অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। ফেব্রুয়ারিতে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে হ্যারিয়েট।”

“তাহলে তো উনি খুব খুশি হবেন।”

“না, এটা প্রয়োজনে করা হচ্ছে। আমাদের দরকার হবে নতুন পার্টনার আর নতুন কর্মীবাহিনী। অস্ট্রেলিয়াতে তার কোম্পানির সাথে আমাদের যৌথ কারবার করার সুযোগ আছে। অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এখন।”

“হ্যারিয়েট এখন কোথায় আছেন?”

“তোমার ভাগ্য ভালো নয়। সে এখন লন্ডনে আছে। সেও তোমাকে দেখতে চাইছে।“

“উনি যদি আপনার স্থলাভিষিক্ত হন তাহলে জানুয়ারিতে আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে উনার সাথে দেখা হচ্ছে।”

“জানি সেটা।”

“আমার মনে হয় উনি বুঝতে পেরেছেন ষাট দশকে কি ঘটেছিলো সেটা আমি এরিকা বার্গার ছাড়া অন্য কাউকে বলবো না। আর এরিকা বার্গারের এটা জানতেই হবে তেমনটা মনে হচ্ছে না আমার কাছে।”

“তাকে অবশ্যই জানতে হবে। তুমি নীতিবান একজন লোক, মিকাইল।”

“কিন্তু তাকে এটা জানালে পরবর্তীতে সমস্যা হতেও পারে।”

“আমি তাকে সতর্ক ক’রে দেবো।”

বৃদ্ধের চোখে ঘুম ঘুম ভাব চলে এলে ব্লমকোভিস্ট বিদায় নিলো। নিজের সবকিছু দুটো সুটকেসে ভরে কটেজের দরজাটা শেষবারের মতো বন্ধ ক’রে দিলো সে। একটু ভেবে সিসিলিয়ার দরজায় গিয়ে নক করলো মিকাইল, তবে সে বাড়িতে নেই। পকেট ক্যালেন্ডার থেকে একটা পাতা ছিড়ে তাতে লিখলো : তোমার জন্য শুভ কামনা। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। মিকাইল। চিরকুটটা তার লেটার বাক্সে ফেলে দিয়ে পা বাড়াতেই মার্টিন ভ্যাঙ্গারের ফাঁকা বাড়ির রান্নাঘরের জানালা দিয়ে দেখতে পেলো একটা ইলেক্ট্রক ক্রিসমাস মোমাবাতি জ্বলছে।

শেষ ট্রেনটা ধরে স্টকহোমে ফিরে এলো ব্লমকোভিস্ট।

.

ছুটির দিনগুলোতে সালান্ডার সারা বিশ্বের সাথে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ক’রে রাখলো। টেলিফোনে কোনো কল রিসিভ করলো না, এমনকি নিজের কম্পিউটারটা নিয়েও বসলো না একবারের জন্য। জাামকাপড় ধুয়ে আর অ্যাপার্টমেন্টটা সাফসুতরো ক’রে দু’দিন পার করে দিলো সে। বছরখানেক আগের পিজ্জা বক্স আর সংবাদপত্র বান্ডিল করে নীচের তলায় রেখে এলো। তার কাছে মনে হলো নতুন একটি জীবন শুরু করতে যাচ্ছে বুঝি। নতুন একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার কথাও ভাবলো সে-যথা সময়ে সেটা করা হবে-তবে যতোদিন এখানে আছে সবকিছু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ক’রে রাখবে। আগের মতো আর নোংরা পরিবেশে থাকবে না।

সব গোছগাছ ক’রে মূর্তির মতো বসে রইলো সালান্ডার। এ জীবনে কখনও এতোটা উদগ্রীব হয় নি। মনে মনে চাচ্ছে মিকাইল ব্লমকোভিস্ট তার দরজার কলিংবেল বাজাক…তারপর? তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নেবে? কামনায় জ্বলে উঠে তাকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে তার শরীর থেকে সব জামাকাপড় খুলে ফেলবে? না। সে কেবল তার সঙ্গ কামনা করছে। সে চাচ্ছে মিকাইল এসে বলুক সে যেমনই হোক না কেন তাকে সে খুব পছন্দ করে। তার জীবনে সালান্ডার খুবই বিশেষ কিছু। সে চাচ্ছে তাকে ভালোবাসার কথা বলুক, শুধুমাত্র বন্ধুত্ব আর সঙ্গী হিসেবে নয়। আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, ভাবলো সে।

নিজের উপর তার কোনো আস্থা নেই। ব্লমকোভিস্ট বাস করে জনবহুল এক দুনিয়ায়, সম্মান আর ভালো চাকরি আছে তার, সুশৃঙ্খল এবং পরিপক্ক সব লোকজনের এক জগৎ সেটা। তার বন্ধুবান্ধবেরা এমন সব কাজ করে যার জন্য তারা টিভি পর্দায় হাজির হয়, খবরের শিরোনাম হয়, সবার জন্য দারুণ দারুণ সব খবর প্রস্ততও করে তারা। আমাকে তার কি দরকার? সালান্ডার সবচাইতে বেশি যে জিনিসটা নিয়ে ভয় পায় সেটা হলো লোকজন তার অনুভূতির কথা শুনে হেসে গড়াগড়ি খাবে। আচমকা তার সযত্নে তৈরি করা সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে ব’লে মনে হলো তার কাছে।

ঠিক তখনই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো সে। প্রয়োজনীয় সাহস সঞ্চয় করতে কয়েক ঘণ্টা লেগে গেলো। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলো তার সাথে দেখা করবে, তাকে জানাবে নিজের অনুভূতির কথা।

অন্যথায় সে আর সহ্য করতে পারবে না।

তার দরজায় নক করার জন্য একটা অজুহাত লাগবে। ক্রিসমাসে তাকে কোনো উপহার দেয় নি, তবে সে জানে কি কিনতে হবে। জাঙ্কশপে পঞ্চাশ আর ষাট দশকের অনেক মেটাল প্লেটের বিজ্ঞাপন-পোস্টার দেখেছে সে। তারমধ্যে একটা ছিলো গিটার হাতে রক এন রোল কিং এলভিস প্রিসলির একটি ছবি, ছবিটার পেছনে একটা কার্টুন বেলুনে লেখা ছিলো হার্টব্রেক হোটেল। ইন্টেরিয়র ডিজাইন সম্পর্কে তার কোনো ধারণা না থাকলেও বুঝতে পারলো ব্লমকোভিস্টের স্যান্ডহামের কেবিনে এটা বেশ ভালো মানিয়ে যাবে। মাত্র ৭৮০ ক্রোনার দাম জিনিসটার। ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে ছাড় পাওয়াতে ৭০০ ক্রোনারেই কিনতে পারলো সেটা। র‍্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে রওনা হলো তার বেলমাঙ্গসগাটানের অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে।

হর্নসগাটানে এসে ক্যাফেবারে উঁকি মারতেই দেখতে পেলো ব্লমকোভিস্ট বার্গারকে নিয়ে বের হচ্ছে। বার্গারের কানে কানে কিছু একটা বললে সে হেসে তার গায়ের উপর ঢলে পড়লো। দু’হাতে জড়িয়ে ধরে প্রগাঢ় চুমু খেলো তাকে। বেলমাঙ্গসগাটানের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তারা। তাদের শরীরি ভাষা দেখে ভুল বোঝার কোনো উপায় নেই-তাদের মনে কি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে।

যন্ত্রণাটা এতো দ্রুত আর তীব্রভাবে তাকে গ্রাস করলো যে রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো লিসবেথ। নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো সে। তার মনের একটা অংশ বলছে এক্ষুণি তাদের কাছে ছুটে যেতে, মেটাল প্লেটের ধারালো কোণা দিয়ে বার্গারের মাথাটা দু’টুকরো ক’রে ফেলতে। কিন্তু কিছুই করলো না। পরিণতির কথা ভাবো। অবশেষে শান্ত হয়ে এলো সে।

“কতো বড় বোকা তুমি, সালান্ডার,” কথাটা সশব্দেই বললো সে।

ঘুরে নিজের ঝকঝকে তকতকে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে পা বাড়ালো। জিঙ্কেনসডামের কাছে আসতেই শুরু হয়ে গেলো তুষারপাত। রাস্তার পাশে এক ডাস্টবিনে এলভিসকে ছুড়ে ফেলে দিলো লিসবেথ সালান্ডার।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *