গ্রন্থভূক্ত কবিতা (কাব্যগ্রন্থ)
গান
অগ্রন্থিত কবিতা
গল্প
চলচ্চিত্র কাহিনী ও চিত্রনাট্য
সম্পাদকীয়, গদ্য ও বক্তৃতা
সাক্ষাৎকার
1 of 2

কৃষ্ণচুড়ার মৃতদেহে একখানি রঙিন ইনভেলাপ

কৃষ্ণচুড়ার মৃতদেহে একখানি রঙিন ইনভেলাপ

বাইরে তুমুল বর্ষা। ভেতরে অন্ধকার ছোট্ট রুমটি নিঃসাড় অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। পাঁচটি সিগারেট নিশব্দ বিক্ষোভে দশটি আঙুলের ভেতর নিঃশেষ হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা পাঁচজন। বর্ষাক্রান্ত শহরে বিদ্যুৎ পলাতক। আমরা প্রত্যেকেই অন্যতম আলোর প্রতীক্ষায় সময় মাপছি। ঘড়ির সাথে সাথে একাধিকবার হেঁটে চলেছি। বর্ষার ছাট জানালার কবাট অতিক্রম কোরে ভেতরে ঢুকছে। শীত শীত অনুভূতি সুড়সুড়ি দিচ্ছে প্রত্যেককেই। অনেকক্ষন সকলে জীবন্ত ফুলের মতো নিশ্চুপ। শুধু সিগারেটের আগুনের মৃদু ছটায় কারো কারো মুখের সামান্য অস্পষ্ট দ্যাখা যাচ্ছিলো। তাছাড়া আমার সিংগেল বেডের চৌকি, তিনখানা চেয়ার, বই-ঠাসা টেবিলটা এবং রশিতে ঝুলানো জামা কাপড় এর কিছুই দ্যাখা যাচ্ছিলো না। অন্ধকার যেন জমাট হয়ে আছে।

আমি রুদ্র। পাশে তন্দ্রা। তারপর রাজা। সামনে চেয়ারে বসা নিরু এবং টেবিল সামনে কোরে বোসে আছে লাল। আমাদের মধ্যে তন্দ্রা একমাত্র ব্যতিক্রম। ও মেয়ে কিন্তু ওর কোনো মেয়ে-বন্ধু নেই। ওর স্বভাবটাও অনেকটা পুরুষের মতো। প্যান্ট শার্ট পরে। বড়ো একটা তোয়াক্কা রাখে না কারো। যেন সর্বত্রই ওর নিজস্ব স্বাধীন এলাকা। কিন্তু ওর কোনো প্রেমিক নেই। অর্থাৎ ওর স্বীকৃত প্রেম বিষয়ক কোনো পুরুষ নেই। সব সময়ই দুরন্তপনা। জঘন্য রকম দুঃসাহস ওর। আমার যদ্দুর মনে হয় ওর নিজস্ব কথাগুলো ও আমাকে ছাড়া আর কাউকেই বলতো না। চুমু খেতে ওর আপত্তি ছিলো না তবে খুব কম ছেলেই ওর ঠোঁটের স্বাদ পেয়েছে। চুমু পর্যন্তই এসে ও স্থির। নিজের স্বভাবগত এক সীমাবদ্ধতায় সীমিত কোরে রেখেছিলো ওর অস্তিত্ব। এটাই ওর সব থেকে আশ্চর্যরকম দক্ষতা।

রাজার সংস্কার ভিন্নমুখি। বড্ড একরোখা গোছের। নিরুর সার্বক্ষনিক মেয়েঘেঁষা মানসিকতা সম্প্রতি একটি বৃত্তে স্থিতিশীলতায় পরিধির রেখা-পথ বারবার পরিক্রমন করছে। ইচ্ছা সত্ত্বেও বৃত্তকে সরল রেখায় পরিনত করবার প্রয়াসে ব্যর্থ ও। লাল ইদানিং জটিলতায় বিশ্বাসী হতে চাচ্ছে না আর। পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া অর্থহীন পাথরের ইচ্ছাগতিতে যেন ও অনুরক্ত। অর্থাৎ যেরকম গড়াচ্ছে গড়াক; মাটিতে তো ঠেকবে একসময়। দীর্ঘদিন রোমান্টিকতা-বিরোধী থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি ও আর হতাশার মেনড্রাক্স সেবন করছে না। আর আমি?

তন্দ্রা নিরবতা ভাঙে।

—ক’টা বাজে রুদ্র?

—সাড়ে ন’টা।

-এতো রাতে যাবো না।

—রাতে থাকবি নাকি?

—হ্যাঁ। তোর অসুবিধা হবে?

-তা হলেও করা কি!

কোনের চেয়ারে লাল ন’ড়ে চ’ড়ে বসে। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে পায়ের নিচে ফেলে ধীরে ধীরে জুতোর আগা দিয়ে ঘষতে থাকে। ঘস ঘস আওয়াজ হয় তাতে। লাল তন্দ্রার দিকে কথা ছুঁড়ে দেয়।

–সোনিয়ার সাথে তোর দ্যাখা হয়েছিলো তন্দ্ৰা?

—কবে?

-গেল কাল?

–হু, হয়েছিলো।

—কিছু বলেছে?

—ওর কথা রাখ তো। ও মাগী আস্তো শুয়োরের বাচ্চা। সবার সাথে ক্লিক লাগাবার তালে ব্যস্ত।

সবাই উচ্চগ্রামে হাসতে থাকে। হাসির দমক ফিকে হয়ে এলে ওরা লক্ষ্য করে বর্ষার শব্দ ম্রিয়মান প্রায়। রাজা উঠে দাঁড়ায়। জানালাটা খুলে বাইরে হাত বার কোরে বর্ষার অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করে। অতপর প্রসন্ন মুখে পুনর্বার চৌকির কাছে ফিরে আসে। তন্দ্রার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে

—নে একটা চুমু খা। নয়তো সারারাত ঘুম হবে না। ওর ঠোঁটে স্বচ্ছ হাসির প্রলেপন। চোখে অনুরোধের নীল স্কেচ।

—বেশি দুষ্টুমি শুরু করেছিস কিন্তু রাজা!

বোলেই তন্দ্রা ওর ঠোঁটদুটো আলতো কোরে ছোঁয়ায় রাজার ঠোঁটে। আমেজে চোখ বন্ধ কোরে চুকচুক শব্দ করতে করতে রাজা স’রে আসে। ইতিমধ্যে নিরু ও লাল উঠে পড়েছে। তন্দ্রা টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে চৌকিতে এলিয়ে পড়ে।

—নিরু, কিয়োর পামেস্ট্রির বইটা নিয়ে আসবি কাল মনে থাকে যেন। লাল, রাজা, নিরু কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যায়, আমি দরোজার খিলটা লাগিয়ে তন্দ্রার পাশে এসে বসি। টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতিটি বের কোরে জ্বালিয়ে টেবিলে রাখি— কিংস্ট্রক-এর প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বার করতেই তন্দ্ৰা হাত বাড়ালো।

—একটা দে।

—বাজে সিগরেট।

-দে-না।

প্রথম সিগারেটটি তন্দ্রার ঠোঁট কামড়ে লেগে গেল। আমি দ্বিতীয় সিগারেটে অগ্নি সংযোগ কোরে ম্যাচটি ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম। ও লুফে নিয়ে পুনর্বার ছুঁড়ে দিলো আমাকে।

—ধরিয়ে দে।

ম্যাচের আগুনে ওর সিগারেট দগ্ধ হলে ও চারপাশে ধোঁয়ার প্রলেপ ছড়াতে লাগলো। আমি ওর অনুভূতিহীন চোখদুটির ভেতর এক রকম উজ্জ্বলতা অনুভব করলাম। ওর চিবুকে দৃঢ়তার স্পষ্ট ছাপ। তীক্ষ্ণ নাকের সামান্য নিচে চিকন ঠোঁট জোড়া কোমলতাহীনতায় মোটেও আক্রান্ত না হলেও নারী সুলভতা নেই। কপালটা বেশ চওড়া। ঘাড় পর্যন্ত চুলগুলো সব সময়ই এলোমেলো অগোছালো থাকে। এ জন্যই ওকে আরো বেশি সুন্দর মনে হয়। টেবিলে পা দোলাতে দোলাতে ও সিগারেটের স্বর্গে হারিয়ে যায়।

এতোক্ষন শরৎ-এর বিচ্ছিন্ন বর্ষারা নিশব্দে সময় খাচ্ছিলো কিন্তু এখন বর্ষারা নিষ্প্রভ হয়ে যেন পালিয়ে গেছে। বেশ লাগছে।

—তন্দ্ৰা, কি ভাবছিস?

-তোর কথা।

-আমাকে নয়তো?

–তোকে তো নয়-ই, তোর কথা।

-কী?

—কিভাবে বেঁচে আছিস এখনো?

—সুইসাইড করবো ভেবেছিলি?

–তোর মতো মানুষ যে সুইসাইড করবে না তা আমার বিশ্বাসেই ছিলো!

—অনেক কিছুই ভাবিস দেখছি।

টোকা দেয়ার মতো সিগারেটটি ছুঁড়ে দিয়ে পা দুটো নামিয়ে নেয় টেবিল থেকে।

শার্টের ওপরের বোতাম খুলতে খুলতে বলে ‘এদিকে তাকাবি না’। কন্ঠে শাসনের গাঢ়তা বাজে।

—তাকিয়েছি কখনো?

আমি প্রতিবাদ করি। তন্দ্রা সারা মুখে হাসির প্রসাধনী লাগিয়ে নেয়, স্বর নেমে অভিমানে আসে।

—এটুকুতেই রাগ করলি?

—বাহ্ রাগ করবো না?

ও ঝট্ কোরে উঠে বসে। হাত দুটো সাপের মতো জড়িয়ে যায় আমার গলায়। ওর বুকটা ঠেকেছে আমার পিঠে। সজোরে একটা চুমুর তুলি টানে আমার বাঁ-গালে। গাঢ় অভিমানে বিশ্বাসী হয়ে ও আলতো কোরে স্পর্শ রাখে ঠোঁটে। ‘এবার হাস’। আমি বাধ্য বালকের মতো হাসলাম। ও আমাকে ছেড়ে দিয়ে চৌকি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে হাত দুটি ওপরে তুলে অলসতা ছুঁড়ে দিলো।

—তোর লুংগিটা কোথায়?

—রশিতে আছে দ্যাখ।

আমার হাতে সিগারেটটি তখন সুখটানের সীমানায় পা দিয়েছে। আমি তাতেই মগ্ন হলাম। ওটাকে বিদায় দিয়ে আয়েসি হাই তুলে তাকিয়ে দেখলাম তন্দ্রা প্যান্ট ছেড়ে লুংগি প’রে নিয়েছে। এ পোশাকে ওকে বড়ো অদ্ভুত দেখায়। শার্টের হাতা গুটিয়ে পাশে বোসে চুলগুলো পেছনে ঝেড়ে ফ্যালে।

-খাবার আছে কিছু?

-একজনের।

—আধপেটা হলেই চলবে।

ওকে এখন দারুন গম্ভীর মনে হচ্ছে।

—খাবি এখন?

—পরে।

ও যেন অন্য জগৎ-এর হয়ে গেল মুহূর্তে।

-সাবু ধরা পড়েছে শুনলাম!

—হ্যাঁ। কে ধরিয়ে দিয়েছে সে খবরও পেয়েছি। ব্যাটা আর দুদিনও বাঁচবে না। —আমি কিন্তু ইকবালকে সন্দেহ করছিলাম।

—আসলে কিন্তু ও না।

তন্দ্রার চোয়ালের হাড় দুটি অসম্ভব দৃঢ়তায় উঁচু হয়ে ওঠে। পার্টির কথা উঠলেই ও দারুন গম্ভীর হয়ে যায়। ওর যেকোনো অপারেশানের কথা কাজ সম্পূর্ন শেষ না হলে ও আমাকেও বলে না। কোনোভাবেই ওর কাছ থেকে কোনোদিন কোনো কথা বার করতে পারিনি। আজো তেম্নি এড়িয়ে গেল। ওর পার্টির কথা আমাদের বন্ধু মহলে আমি ছাড়া আর কেউই জানতো না।

খাওয়া শেষ হলে ও জানালা খুলে গ্লাস থেকে জল গড়িয়ে হাত ধোয়। গ্লাসটা টেবিলে রাখতে রাখতে বলে।

–আকাশটা নিমেষে কেমন স্বচ্ছ হয়েছে দ্যাখ।

—মেঘ কেটেছে?

–এতো তারা কখনো দেখিনি।

—বাবা তারা দেখে দিক নির্নয় করতে পারতেন।

—তুই পারিস?

—শিখিনি।

টাওয়ালে হাত মুছে ও ঘড়ি দ্যাখে। ভ্রূজোড়া কুঁচকিয়ে সামান্য ওপরে তুলে ধনুকের ছিলার মতো ছেড়ে দেয় আবার।

—রাত হয়েছে।

—তুই ঘুমো।

–তুই?

—লিখবো।

-আলো তো শেষ।

—মোম আছে আরো।

—আলোয় ঘুম পাবে না।

—ঠিক আছে, লিখবো না না-হয়!

তন্দ্রা শুয়ে পড়লে আমি বাতিটি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ফেলে খানিকক্ষন জানালার পাশে অর্থহীন দাঁড়িয়ে থাকি। ফিনফিনে বাতাস ঢুকছে। জানালা দিয়ে সামনের দালানের ছোট ছোট আলোগুলো দ্যাখা যাচ্ছে। কোথাও বৈদ্যুতিক আলো নেই আজ। এরকম শহরটা আমার খুব সুন্দর লাগে। কেমন আলোছায়ার লুকোচুরি। এসব আলোহীন রাতগুলো শুধুমাত্র বিবাহিতদের জন্য। নিসঙ্গ জীবনে এসব রাত আরো নিসঙ্গতা বয়ে আনে। তন্দ্ৰা কথা বলে।

–কি হলো শুবি নাকি? —অসুবিধা হবে।

-কেন?

—পাশাপাশি শোয়া যাবে না। মন ভালো নেই।

—ঠিক হয়ে যাবে।

—তুই বুঝতে পারছিস না।

—পারছি। তুই আয় তো।

আমি চৌকির পাশে পা ঝুলিয়ে বসি। তন্দ্রা ন’ড়ে চ’ড়ে শোয়। হাত দুটো মাথার নিচে বাঁকা কোরে রেখে অনিদ্রায় ভোগা মানুষের মতো শুয়েছে ও। জানালা দিয়ে হালকা হলুদ আলো এসে ছড়িয়ে পড়েছে চৌকির ওপর। তন্দ্রাকে রহস্যময়ী মনে হচ্ছে।

—তন্দ্ৰা…

—হু।

মাথা কাৎ কোরে তাকায়।

–এতো ফ্রিলি চলাফেরা করা কি ভালো হচ্ছে?

–কেন?

—ধর পাকড় হচ্ছে কেমন দেখছিস না?

-আমাকে ধরতে পারবে না।

—কী কোরে সিওর হচ্ছিস?

—সিওরিটি আছে বোলেই তো।

—এতোটা আস্থা করা ভালো না কিন্তু।

তন্দ্রা আর কোনো কথা বলে না। আমিও একসময় আলতো কোরে নেমে আসি বিছানায়। তখন তন্দ্রার টানা টানা নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই আমি শুনতে পাচ্ছি না।

অনেকক্ষন এপাশ ওপাশ কোরেও ঘুম এলো না। পাশ ঘুরে শুতে গেলেই তন্দ্রার শরীরের সাথে স্পর্শ লাগে। কেন জানি মনটা অসংযত হয়। অথচ এই সিংগল বেড়েই আমি আর তন্দ্রা অনেকগুলো রাত পাশাপাশি শুয়েছি। কিন্তু কোনোদিন এরকম তো মনে হয়নি। চৌকির ওপর ছড়িয়ে পড়া আলোকচূর্ন আরো উজ্জ্বল হয়েছে। আবছা আলোয় ওর ঘুমন্ত শরীর বড়ো মোহময় লাগছে। আস্তে আস্তে ওর কপালের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে সামান্য ঝুঁকে পড়ি ওর মুখের ওপর। ওর মসৃন গালে ধীরে ধীরে আঙুল ঘষছি আমি। তন্দ্রা চোখ মেললে অন্ধকারে ওর চোখের শাদা অংশটুকু কেমন গভীর মনে হয়।

—কি রুদ্র?

—ঘুমোসনি?

—মাত্রই পাচ্ছিল।

আমি হাতটা সরিয়ে নিলে ও ডান হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। আলতো কোরে ওর হাতে হাত ঘষতে থাকি।

-তন্দ্ৰা…

—হুউ।

—কতোদিন এভাবে থাকবি?

–কেন ভালোই তো আছি।

—নিসঙ্গতা কি তোর কাম্য?

—কেন তুই তো আছিস!

—আমি তো সর্বক্ষনের নয়।

তন্দ্রা দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে। আমার হাতটি টেনে নেয় ওর বুকের ওপর। অনেকক্ষন পর্যন্ত কোনো কথা বলে না। একসময় কথা বললে ওর কন্ঠস্বর ভেজা ভেজা মনে হয়।

—মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, আমাদের এই বন্ধুত্বকে চিরদিনের করবো।

—কিন্তু তাতে কি বন্ধুত্বের অবমাননা হবে না?

ও আবার নিশ্চুপ হয়ে যায়। আমি কথা বলি।

—বিয়ে কোরেও তো বন্ধুত্ব থাকতে পারে।

—তখন যে আমি সম্পূর্ন তোর থাকবো না।

– কেন?

—তুই কি ভাবিস আমি বিয়ে কোরে তোর কাছে ইচ্ছে হলেই আসতে পারবো, থাকতে পারবো?

চাপা উত্তেজনায় ওর দ্রুত হৃদস্পন্দন আমার হাতে আমি অনুভব করি। ও আমার কাছে আরো সরে আসে। মুখটা সামান্য সামনে তুলে ধীরে কাঁপা কাঁপা স্বরে তন্দ্রা বলে

-রুদ্র, আমরা যদি কেউই বিয়ে না করি।

-পারবি তুই?

-কেন পারবো না?

-ভেবে দ্যাখ।

ও আলতো কোরে মাথা নামিয়ে নেয়। কোনো কথা বলে না। আমার হাত ধরা ওর হাতটির বাঁধন শ্লথ হয়ে যায়। ছোট্ট একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও পাশ ঘুরে শোয়। আমি ওর অবিন্যস্ত চুলগুলোয় আঙুল দিয়ে বিলি করতে থাকি। একসময় আমি আর কিছুই বলতে পারি না।

.

ইতিমধ্যে বিশ দিন অতিক্রম কোরে এসেছি। অথচ তন্দ্রার দ্যাখা নেই। যেখানে যেখানে ও থাকতে পারে তার সর্বত্রই সন্ধান কোরে ব্যর্থ হয়েছি। কেউই ওর সন্ধান দিতে পারলো না। অথচ বাইরে কোথাও গেলে তন্দ্রা নিশ্চয়ই আমাকে জানিয়ে যেতো। বিবিধ দুশ্চিন্তার পোস্টারে ভ’রে গেছে মগজের দেয়াল আমার। একরকম অন্যমনস্কতায় সারাক্ষন আচ্ছন্ন হয়ে আছি। ঠিক এমন একটি দিনে বাবার চিঠি পেলাম। বাড়ি যেতে হবে। অথচ এ মুহূর্তে তন্দ্রাকে আমার ভীষন প্রয়োজন। অভিমানে কন্ঠের নিচে ব্যথা করে। বুকের ভেতরে বিবর্ন অনুভূতিরা অস্থিরতায় ভুগে ভুগে একসময় ম্লান হয়ে যায়।

গতকাল দেশের বাড়ি এসে পৌঁছেছি। এসে যা শুনলাম বা দেখলাম তাতে বিরাজমান অসুস্থতায় আরো ঘনীভূত হলো যন্ত্রনার মেঘ। এক সপ্তাহ পরে আমার বিয়ের দিন স্থির। বাবাকে বোঝালাম কিন্তু ফল হলো না। তার ওপর মায়ের আবদার। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলাম মত দিতে।

শিলা নামক মেয়েটি আমার বাধ্যগত রমনী হয়ে এলো অর্থাৎ স্ত্রী। ওর শান্ত কমনীয় মুখটি আমার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগলো। আমি ক্রমশ একজন নিয়মিত সংসারি হয়ে গেলাম। অথচ তন্দ্রার সামান্যতম সন্ধানও কোথাও পেলাম না। গত মাসে লালের একটি চিঠি পেয়েছিলাম। এছাড়া আর কেউই লেখেনি।

আজকাল ব্লাকআউট রাতগুলো শিলার দেহের উত্তাপে পূর্ন। শিলা সুখ দিতে জানে। ওর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে উন্মত্ত যৌবন খেলা করে। গুণ দা-র ‘স্ত্রী’ কবিতার মতো আমি ওকে ব্যবহার করি। আমি শিলাকে ভালোবাসি। শিলাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করিনি। বিয়ে কোরে ভালোবেসেছি। এর স্বাদ ভিন্নতর। আমার সমস্ত চেতনার এলাকায় এখন শুধু শিলা। আমার প্রিয়তমা স্ত্রী শিলা।

সকালটা দরোজায় করাঘাত করলে আমি শিলাকে দিনের প্রথম চুমু খেলাম। চায়ের টেবিলে সদ্য স্নাত অপরূপা শিলাকে আমি অবাক চোখে দেখছি। হঠাৎ দরোজায় করাঘাত হলে আমি দোর খুলে বিস্মিত হলাম। তন্দ্রা এবং একজন অচেনা পুরুষ ঘরে ঢুকলো। আমি বসতে বল্লে তন্দ্রা শিলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো এবং উভয়ে বসলো। আমি কিছু বলার আগেই তন্দ্রা পাশের লোকটাকে নির্দেশ করে বল্লো

—রুদ্র, ইনি আমার স্বামী শাহজান মাখন।

.

আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমাদের বিয়ের রঙিন কার্ডটি শোকেচের ভেতর স্পষ্ট জ্বলছে। বিয়ের পর শিলাই ওটাকে সাজিয়ে রেখেছিলো ওখানে।

১৯৭৬

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *