রাজনীতি
অভিযান ও পর্যটন
সমাজসেবা
জ্ঞান ও শিক্ষা
2 of 2

লিয়েফ তলস্তোয় (১৮২৮–১৯১০) – বিশ্বের মহান সাহিত্যিকদের অন্যতম

লিয়েফ তলস্তোয় (১৮২৮–১৯১০) – বিশ্বের মহান সাহিত্যিকদের অন্যতম

লিয়েফ তলস্তোয় (Leo Tolstoy) ছিলেন এমন একজন বিশ্ববরেণ্য ও প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব যে, সেকালে তাঁর পোশাকের প্রান্তভাগ একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য অগণিত ভক্ত অনবরত তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করত, দাঁড়িয়ে থাকত তাঁর গমনপথের পাশে। লিয়েফ তস্তোয়—পুরো নাম লিয়েফ নিকোলায়েভিচ তল্স্তোয়। জন্ম ১৮২৮ সালে।

তলস্তয়রা চার ভাই। তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর মা ভকোনস্কি ছিলেন রাশিয়ার স্বনামখ্যাত রানি ক্যাথেরিন দি গ্রেটের দেহরক্ষী দলের প্রধানের কন্যা। পিতা কাউন্ট নিকোলাই ইলিচ তলস্তোয় ছিলেন একজন সেনাপতি ও বীর যোদ্ধা।

তবে তাঁর নিজের জীবনকাহিনীই ছিল বর্ণাঢ্য এক উপন্যাসের কাহিনীর মতো। জন্মগ্রহণ করেছিলেন রাশিয়ার এক ধনী পরিবারে। বিয়াল্লিশ কক্ষবিশিষ্ট ও প্রাচুর্য- পরিবেষ্টিত এক সুরম্য প্রাসাদে তাঁর জন্ম। আর লালিতপালিত হয়েছিলেন প্রাচীন রুশ আভিজাত্যের বিলাসী পরিবেশে। যৌবনে তিনি নিজেও ছিলেন বিলাসী যুবক। পদচারণা করতেন অপূর্ব সুন্দর ভঙ্গিমায়। কথা বলতেন অহঙ্কারী ঢঙে। মস্কোর সেরা দরজির দোকানে তৈরি হতো তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ। প্রতিদিন খরচ করতেন অঢেল অর্থ।

অর্থের সাথে অনর্থমূলক কিছু বদঅভ্যাসও মানুষের থাকে। লিয়েফ তলস্তোয়েরও তা ছিল। যৌবনে তিনি প্রচুর মদ খেতেন, মারামারি করতেন—করতেন খুনখারাবিও। মোট কথা, হেন কুকর্ম নেই তলস্তয় যৌবনে যা করেননি। এই সময়ের জীবনটাকে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন ‘একটা নোংরা পাপময় জীবন’ বলে।

তাঁর জীবনে এমন আচার-আচরণের মূলে সম্ভবত কাজ করেছে তাঁর পিতা-মাতার অকাল মৃত্যু। তাঁর যখন মাত্র দুবছর বয়স, তখনই ১৮৩০ সালে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয় এবং তাঁর যখন মাত্র নয় বছর বয়স, তখন তিনি হারান পিতাকে।

এর অল্প কিছুদিন আগেই তাঁদের পরিবার চলে আসে মস্কোতে এবং তলস্তোয়ের পিতার ইচ্ছে ছিল তিনি ছেলেদের ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে মানুষ করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু তিনি বেশিদিন ছেলেদের দেখাশোনা করার সুযোগ পাননি। ১৮৩৭ সালেই তিনি মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর তলস্তোয়দেরও আর মস্কো থাকা হলো না। তাঁরা ১৮৪১ সালে মস্কো ছেড়ে চলে এলেন মফস্বল শহর কাজানে তাঁর এক মাসির তত্ত্বাবধানে।

তবু পড়াশোনা একেবারে বন্ধ হলো না তাঁর। স্কুলের পড়াশোনা করে ১৮৪৪ সালে তিনি ভর্তি হলেন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি প্রথমে ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পড়াশোনায় তেমন অগ্রসর হতে পারেননি। উচ্ছৃঙ্খলতা, বিলাসিতা, মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করা, মদ্যপান আর জুয়া খেলার আড্ডায় কেটে যেত তাঁর সারাদিন।

১৮৪৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে চলে আসেন ইয়াসনায়া পোলিয়ানায়। এখানে তিনি পারিবারিকসূত্রে পেয়েছিলেন প্রায় সাড়ে চার হাজার একরের এক বিশাল কৃষিখামার। এখানে আসার পর অবশ্য তাঁর চরিত্রের সাময়িক কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। তিনি মদ-জুয়া কমিয়ে দিয়ে আবার পড়াশোনায় মন দেন। তিনি নিজের ঘরে বসেই চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষা-সাহিত্য, কৃষিবিদ্যা, প্রকৃতি-বিজ্ঞান, অঙ্কশাস্ত্র ও পরিসংখ্যান ইত্যদি নিয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন।

কিন্তু জীবনে আনন্দফুর্তি, মজা, নারীসঙ্গ এবং মদ-জুয়ার আড্ডা থেকে এই নির্জনতায় বেশিদিন থাকতে পারলেন না তিনি। সব ছেড়ে আবার চলে আসেন মস্কো শহরে। মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গে এসে ১৮৪৯ সালে তিনি আবার শুরু করেন মদ খাওয়া আর জুয়োখেলা।

কিন্তু এই সময়েই তাঁর জীবনে আসে আরেক ধরনের পরিবর্তন। ১৮৫১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নাম লেখান সেনাবাহিনীতে। অংশ নেন সরাসরি যুদ্ধে। সেখানে তিনি প্রত্যক্ষ করেন দুঃখ, হিংস্রতা আর মানবতার বিপন্নতাকে। এরপর পাঁচ বছর পর যখন তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মানুষ। এক অসাধারণ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। বুঝবার এবং দেখবার অসামান্য ক্ষমতা জন্ম নিয়েছে তাঁর মধ্যে।

যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি লেখেন প্রথমে একটি কিশোর উপন্যাস—চাইল্ডহুড’। এই গ্রন্থে তিনি বলেছেন তার শিশুকালের স্বপ্নময় রাজ্যের কথা। বইটি প্রকাশের পরপরই জনপ্রিয়তা লাভ করে। ফলে তিনি ভয়ানক উৎসাহিত হন। লেখেন এর পরবর্তী আরও দুটো খণ্ড—‘বয়হুড’ (Boyhood) এবং ‘ইয়োথ’ (Youth)।

যুদ্ধে প্রচণ্ড সাহসিকতা ও দক্ষতা দেখানোর জন্য তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে প্রমোশন পান। কিন্তু তা সত্ত্বেও মনের খেয়ালে তিনি ছেড়ে দিয়ে আসেন সামরিক বাহিনীর চাকরি। ১৮৫৬ সালে তিনি আসেন সেন্ট পিটার্সবার্গে।

তারপর একদিন পরিবর্তন এল তাঁর জীবনে। তিনি অন্ধকার ছাওয়া পৃথিবী থেকে বের হয়ে মুক্ত আলোতে এলেন। বুক ভরে নিশ্বাস নিলেন মুক্ত বাতাসে। তিনি যিশুর ধর্মকে গ্রহণ করলেন মনেপ্রাণে। অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলেন খ্রিস্টধর্মের ধর্মীয় সব ধরনের নিয়মনীতি। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সবচেয়ে ধর্মীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেন। হয়ে ওঠলেন সকলের শ্রদ্ধার পাত্র, প্রিয় মানুষ। সেই সাথে চলল সাহিত্যসাধনাও। এককালের অকালকুষ্মাণ্ড তলস্তোয়ই মাত্র কয়েক বছর পর লিখে ফেললেন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুটো উপন্যাস, যা আজো বিশ্বসাহিত্যের অমর উপন্যাসের মর্যাদার অধিকারী। আর এ দুটো উপন্যাস লিখেই এককালের অপদার্থ, বখাটে যুবক লিয়েফ তলস্তোয় হয়ে গেলেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তাঁর এই দুটো অমর উপন্যাসের নাম যথাক্রমে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ (War and Peace) এবং ‘আন্না কারেনিনা’ (Anna Karenina)।

এর পর থেকেই তাঁর লেখা চলতে থাকে অবিশ্রান্ত গতিতে। তিনি আরোহণ করে খ্যাতি আর সম্মানের শীর্ষচূড়ায়।

ভক্তরা তাঁর বাড়িতে এসে একাধারে দিনের পর দিন লিখে নিতেন তাঁর সমস্ত কথা। তখন তলস্তোয়ের অবস্থা এমন যে, তাঁর জীবনের সামান্যতম কথাও যেন সকলের কাছে অমূল্য সম্পদ। এই সমস্ত খুঁটিনাটি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিয়েই পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়েছে বহু ধরনের গ্রন্থ।

গবেষকরা বলেন, লিয়েফ তলস্তোয়ের জীবনবৃত্তান্ত ও তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আজ পর্যন্ত যেসব গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজারের মতো। তাঁর ওপর পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে যেসব প্রবন্ধ রচিত হয়েছে তার সংখ্যাও প্রায় পৌনে এক লাখের মতো।

সেন্ট পিটার্সবার্গে কিছুদিন অবস্থানের পর তিনি আবার বের হন দেশভ্রমণে। যান ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালিতে। দেশে ফিরে এসে তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু স্কুলের কাজটা ঠিকমতো চালাতে পারলেন না। পারলেন না নিজের দোষেই। কারণ মদ আর জুয়া খেলা ছেড়ে দিলেও জীবনে শৃঙ্খলাবোধ তখনও তাঁর আসেনি। তাঁর স্কুলের পড়ানোর না ছিল নিয়মকানুন, না কোনো সময়জ্ঞান। একটি স্কুলের যে আদর্শ থাকা প্রয়োজন, তার কিছুই ছিল না তলস্তোয়ের স্কুলে। তাই স্কুলও বেশিদিন চলল না। ফলে তা বন্ধ হয়ে গেল।

বস্তুত তিনি শিক্ষক হতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পারলেন না। ফলে নিজেই ব্যক্তিগত পড়াশোনায় মন দিলেন। শিক্ষাপদ্ধতির ওপর আরও পড়াশোনা করার জন্য এবার গেলেন তিনি ইংল্যান্ডে। বছর কয়েক পর তিনি ফিরে এলেন দেশে।

দেশে ফেরার পর তাঁর এই ধারণা হলো যে, শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর অর্জিত জ্ঞানকে সমগ্র রাশিয়াতেই ছড়িয়ে দিতে হবে। এই শিক্ষার দ্বারাই তিনি এদেশের সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে পারবেন।

তাই তিনি আবার ছাত্র সংগ্রহ করতে লাগলেন এবং কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তৎকালীন জার প্রশাসন শিক্ষিত যুবকদের খুব ভয় করতেন। তাই তলস্তোয় যখন তাঁর স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়ার পর ১৮৬২ সালের একদিন তাঁকে পুলিশ বিপ্লবী সন্দেহে গ্রেফতার করে বসল। তবে তাঁর কাছে সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে তাঁকে তারা ছেড়ে দিল।

তার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আর সময় নষ্ট না করে এবার সংসারধর্ম পালন করবেন।

তিনি মস্কোর এক ডাক্তরের কন্যা সোনিয়া বেহর্স (Sonya Behrs) নামের এক শিক্ষিতা, সুন্দরী ও আধুনিকা মেয়েকে বিয়ে করলেন।

লিয়েফ তলস্তোয়ের বিবাহিত জীবনটা ছিল রোমাঞ্চকর। প্রথম কয়েক বছর তাঁর বিবাহিত জীবন ভালোই কেটেছিল। শুধু ভালো নয়, তাঁরা দাম্পত্যজীবনে এত সুখী ছিলেন যে সর্বক্ষণ নতজানু হয়ে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে এই আনন্দময় ও সুখময় জীবনকে দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে প্রার্থনাও করতেন।

কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, তাঁদের এই সুখের দিন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তাদের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। তাঁদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য শুরু হয়। শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি আর দ্বন্দ্বসংঘাত। তাঁদের সুখের জীবনে নেমে আসে দুঃখের কালো মেঘ। এর জন্য অবশ্য তাঁর স্ত্রীই দায়ী। তলস্তোয় তাঁর শেষ জীবন স্ত্রীর অকথ্য অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।

তিনি স্ত্রীকে এই সময় এত বেশি ঘৃণা করতেন যে, তিনি তার মুখদর্শন করতেও ঘৃণা বোধ করতেন এবং তাঁর অস্তিম ইচ্ছে ছিল স্ত্রীকে যেন তাঁর মৃত্যুর সময় সামনে আসার অনুমতি দেওয়া না হয়।

তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা কেমন ছিল সেটা তাঁদের ডায়েরি থেকেই জানা যায়। যেমন, ১৮৬২ সালে সোনিয়া তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “যদি আমি তাঁকে খুন করতে পারতাম, তা হলে অবিকল তাঁর মতোই আরেকটি মানুষ সৃষ্টি করতাম। এটা করতাম অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে।”

১৮৮৫ সলে তলস্তোয় তাঁর স্ত্রী সোনিয়া সম্পর্কে লিখেছেন, “তুমি তোমার চারপাশের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছ।” সোনিয়া ১৮৮৬ সালে লিখেছেন, “ওর অন্তরে একটু ভালবাসারও অস্তিত্ব নেই। না আমার জন্য, না আমার সন্তানের জন্য কিংবা অন্য কারও জন্য। সে শুধু বোঝে নিজেকে।” সোনিয়া ১৯০৩ সালে লিখেছেন, “একজন স্ত্রী যে প্রেমময় স্বামী কামনা করে আমার সে স্বামীর মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই, আর বন্ধুরূপী স্বামী তো আমার কোনোদিন ছিলই না।

আসলে তলস্তোয়ের স্ত্রী ছিলেন তাঁর প্রথম জীবনের প্রতিচ্ছবি। তিনি প্রথম জীবনে উচ্ছৃঙ্খল আর বিলাসী ছিলেন। তাঁর স্ত্রীও তা-ই ছিলেন। আর সে কারণেই হয়তো প্রথম জীবনে দুজনের আদর্শেও মিল ছিল। কিন্তু তলস্তয় তো পরবর্তীকালে জীবনের আদর্শে ঘটিয়েছিলেন পরিবর্তন। উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে জীবনকে করেছিলেন অনুশাসন নিয়ন্ত্রিত, যেটা তাঁর স্ত্রী পছন্দ করেননি। দ্বন্দ্বের শুরুটা এখান থেকেই।

তাঁর স্ত্রী পছন্দ করতেন ধনসম্পদ, খ্যাতি আর বিলাসিতা। কিন্তু তলস্তোয় মনে করতেন যে, ধনসম্পদ এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলো একটা পাপস্বরূপ জিনিস। তাঁর স্ত্রী বিশ্বাস করতেন শক্তির শাসানিতে, আর তিনি বিশ্বাস করতেন ভালোবাসার শাসনে। তলস্তোয় সাহিত্যসাধনায় এতখানি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন যে, প্রাচীন রাশিয়ার জার সম্রাটদের চেয়েও তাঁর খ্যতি ছিল অনেক বেশি।

অথচ তিনি শেষ জীবনে একেবারে সন্ন্যাস জীবনযাপন করেছেন। এই সময় তিনি ধর্মাদর্শের দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর বিখ্যাত দুটো উপন্যাস (ওয়ার অ্যান্ড পিস এবং আন্না কারেনিনা) রচনার জন্যও লজ্জিত হয়েছিলেন। তাই শেষ জীবনে শান্তি, ভালোবাসা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ধর্মীয় উপদেশবাণীপূর্ণ পুস্তিকা প্রণয়নের কজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

পুস্তিকাগুলো সুলভ সংস্করণে ছাপানো হয়েছিল এবং গরুর গাড়ি ও রেলগাড়িতে করে বয়ে নিয়ে ঘরে-ঘরে বিক্রি করা হত। এভাবে তিনি যে পরিমাণ পুস্তিকা বিক্রি করেছিলেন, তার পরিমাণের কথা শুনলেও বিস্মিত হতে হয়। তিনি চার বছরে এধরনের পুস্তিকার প্রায় ১,২০,০০,০০০ কপি বিক্রি করেছিলেন।

আগেই বলা হয়েছে, এককালের বিলাসী তলস্তোয় শেষ জীবনে এসে যাপন করতেন পুরোপুরি সন্নাসীর জীবন। নিজের হাতে ঘরদোর পর্যন্ত ঝাঁট দিতেন। একটা সাধারণ ও আবরণহীন টেবিলে কাঠের বাসন থেকে কাঠের চামচ দিয়ে খাবার তুলে খেতেন।

এই মহান ব্যক্তিত্বের বয়স যখন বিরাশি বছর, তখন ঘরের অশান্তি আর স্ত্রীর গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরে তিনি এক বুক জ্বালা নিয়ে ১৯১০ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে রাতের বেলা প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এলেন। এর এগারোদিন পর এক রেল-স্টেশন সংলগ্ন ছোট্ট একটা খামারবাড়ির কামরায় তিনি নিউমোনিয়ায় বিনা চিকিৎসায়, বিনা যত্নে মারা যান।

যখন তাঁর মৃত্যু হয়, তখন তাঁর পাশে ছিল কয়েকজন স্থানীয় কৃষক, যারা তাঁকে চিনত না, তাঁর নামটা পর্যন্ত জানত না।

মৃত্যুকালে তিনি বলেছিলেন, ঈশ্বর সবকিছুর ব্যবস্থা করবেন। আমি সবসময় কেবল তাঁকেই খুঁজেছি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *