০৭. মুসলমান ভারতের ইতিহাসের উপকরণ

মুসলমান ভারতের ইতিহাসের উপকরণ

মুসলমান যুগে ভারত

১০০৭ খ্রিস্টাব্দে ঘাজনীর সুলতান মাহমুদ পাঞ্জাব জয় করিয়া ভারতে প্রথম স্থায়ী মুসলমান প্রদেশ সৃষ্টি করিলেন; আর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ক্লাইব সাক্ষীগোপাল শাহ আলমকে নিজের হাতে সিংহাসনে বসাইলেন। মধ্যের সাড়ে সাত শত বৎসর ভারতের মুসলমান যুগ। এই যুগের ভারতবর্ষের ইতিবৃত্তের অভাব নাই; যদিও বর্তমান সভ্য জগৎ ইতিহাস বলিতে যাহা বুঝেন এসব গ্রন্থ তাহা অপেক্ষা অনেক নিকৃষ্ট। হিন্দু যুগের ভারত সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণ দু-চারটি প্রস্তরলিপি বা মুদ্রা হইতে ধীরে ধীরে ইতিহাস পুনর্গঠন করিতেছেন; মাঝে অনেক অজ্ঞাত অন্ধকারপূর্ণ রাজত্ব এবং শতাব্দী পড়িয়া আছে; অনেক স্থলে শুধু রাজার নামটি পাওয়া গিয়াছে, আর কিছু জানিবার উপায় নাই। কিন্তু মুসলমান আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে প্রচুর ইতিহাসের আলো পড়ে। এই আলোর কেন্দ্র মুসলমানশাসিত ভারতীয় প্রদেশগুলি বটে, কিন্তু ইহাতে পার্শ্ববর্তী হিন্দু দেশগুলিও অনেকটা উদ্ভাসিত পরিজ্ঞাত হইয়াছে।

মুসলমান ইতিহাসের গুণ দোষ

ইতিহাসের তিন অঙ্গ- কালনির্ণয়, সাক্ষীবিচার এবং দর্শন।

১. যে-সব ইতিহাসে শুধু ঘটনাগুলি কাল অনুসারে সাজান হয়, তাহাদিগকে Chronicle বলে এবং সেগুলি আজকাল পণ্ডিতেরা অবজ্ঞা করেন। কিন্তু একদিকে দেখিতে গেলে এগুলি অমূল্য; যেমন অস্থিপঞ্জরের উপর শরীর গঠিত হয়, তেমনি কালনিৰ্দ্দেশ না থাকিলে ইতিহাসের জন্মই হইতে পারে না। হিন্দুরা অনন্ত অসীম পরলোকের চিন্তায় এত মগ্ন থাকিতেন যে তাঁহারা পার্থিব ঘটনার কাল নির্দ্দেশ করা বা লিপিবদ্ধ করা হেয় জ্ঞান করিতেন; এইজন্য সংস্কৃতে ও হিন্দীতে কাব্য আছে, ইতিহাস নাই। কোন কোন হিন্দু রাজার নাম ও কীৰ্ত্তি বিষয়ে ভুরি ভুরি সংস্কৃত শ্লোক বিদ্যমান আছে, কিন্তু তাহার সময় সম্বন্ধে একটি কথাও লেখা নাই। এ বিষয়ে মুসলমান লেখকগণ ঠিক বিপরীত; তাহারা প্রথমে তারিখটি না দিয়া বর্ণনা আরম্ভ করেন না; এমন কি স্থানাভাব হইলে অন্ততঃ নাম ও তারিখ সহিত ঘটনার উল্লেখ থাকে, বর্ণনাটা বাদ যায়। এই সময় জ্ঞান (Chronological Sense) তাঁহাদের প্রধান গুণ। সমগ্র মুসলমান জগৎ এক সাল (হিজরা) মানিয়া চলায় তাহাদের পক্ষে তারিখ দেওয়া বড় সহজ। কিন্তু আমার মনে হয় যে এই পার্থক্যের প্রধান কারণ এই যে হিন্দুদের বাড়ীঘর শৃঙ্খলাহীন তাই তাহারা ঘটনা গুছাইয়া রাখিতে জানে না, আর মুসলমানদের আদব কায়েদা দুরস্ত, জীবনের সব কাজে একটা শৃঙ্খলা আছে, এবং অবনতিতে এই শৃঙ্খলা শৃঙ্খলে পরিণত হইলেও ইহা ইতিহাস লেখায় বিশেষ সাহায্য করিয়াছে।

২. স্বাক্ষী বিচার অর্থাৎ একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থে যে বর্ণনা আছে তাহার মধ্যে কোনটি সত্য এবং কতদূর সত্য তাহা স্থির করা; (historical criticism)। আমরা স্বভাবতই সমসাময়িক বা কিছু পরে লিখিত বৃত্তান্ত পরবর্তী বৃত্তান্তের চেয়ে বেশী বিশ্বাস করি, এবং যাহারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করিয়াছে তাহাদের বা তাহাদের বন্ধুদের কথাগুলি পাইবার ইচ্ছা করি। মুসলমান লেখকরাও কতকটা এইরূপে সত্যের আদি নির্ঝরে গিয়া তথ্য সংগ্রহ করিতে চেষ্টা করিতেন। তবে তাহাদের সাক্ষ্য বিচারে যে বর্তমান ইউরোপের ঐতিহাসিকদের মত গভীর ও সূক্ষ্ম হইবে এরূপ প্রত্যাশা করা অস্বাভাবিক।

৩. তৃতীয় ও সর্ব্বোচ্চ অঙ্গ, ঐতিহাসিক দর্শন (The philosophy of History) অর্থাৎ বর্ণিত ঘটনাগুলি হইতে মানবচরিত্র বা জাতীয় জীবন সম্বন্ধে গভীর উপদেশ লওয়া ৷ এই গুণ থাকিলে তবে ইতিহাস সর্ব্বোচ্চ সাহিত্যের সঙ্গে সমান আসন পায়; ইহাই ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি উপকারিতা। যেমন শ্রেষ্ঠ কাব্য ব্যক্তিবিশেষ সম্বন্ধে মানবগণকে শিখায়

Of their sorrows and delights;
Of their passions and their spites;
Of their glory and their shame;
What doth strengthen and what main;

তেমনি শ্রেষ্ঠ ইতিহাস জাতিকে অর্থাৎ ব্যক্তি সমষ্টিকে সেই মহা উপদেশ দেয়। ইংলণ্ডেও শুধু গত দেড় শত বৎসর ধরিয়া ঐতিহাসিকেরা এই গুণের চর্চ্চা করিতেছেন। মুসলমান ইতিহাস তাহার পূর্ব্বে লেখা, তাহাতে এই দর্শনের লেশ মাত্র নাই। তবে এই সব পুরাতন মুসলমানী গ্রন্থ হইতে প্রকৃত ঘটনা সংগ্রহ করিয়া বর্তমান যুগে শিক্ষিত ভারতবাসীরা দর্শন রচনা করিতে পারেন, জাতীয় উন্নতি ও অবনতির কারণ উদ্ভাবন করিতে পারেন।

মুসলমান ঐতিহাসিকদের যে গুণগুলি বলিলাম তাহা আরব জাতি হইতে প্রাপ্ত। আরবেরা প্রাচীনকালে, বিশেষত : আব্বাস-বংশীয় খলিফাঁদের শাসনকালে, সত্য নির্দ্ধারণ করিবার জন্য, নূতন নূতন বিষয় জানিবার জন্য, ব্যগ্র ছিল; মনকে সঙ্কীর্ণ করিয়া, নিজ দেশ বা জাতিতে আবদ্ধ রাখিয়া বাহিরের সমস্ত জগৎকে ম্লেচ্ছ বলিয়া অবহেলা করিত না। সে সময়ের আরব প্রকৃতিতে বেশ একটা কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসুতা ছিল। দ্বিতীয়ত:, অতি প্রাচীনকাল হইতে অসংখ্য আরব জাহাজ চালাইয়া বাণিজ্য করিত; ভিন্ন ভিন্ন দেশ দেখায় তাহাদের মন উদার হইত, নূতন বিষয়ের জন্য উন্মুক্ত দ্বার থাকিত। কিন্তু তাহারা দার্শনিক ছিল না। রোমানদের মত আরবদের দর্শন যৎসামান্য এবং সব চুরি করা। পরবর্তী যুগের মুসলমান ঐতিহাসিকেরা জাতিতে পারসিক অথবা হিন্দুস্থানী হইলেও আরবগণ সাহিত্য ক্ষেত্রে যে প্রথা প্রবর্তন করিয়া দিয়াছে তাহা ছাড়িতে পারে নাই।

আর এটাও মনে রাখা উচিত সে মুসলমান জগতে কড়াকড়ি বর্ণভেদ ছিল না, লেখক ও যোদ্ধারা, রাজা ও মন্ত্রীরা, যে আহার-স্পর্শ-বিবাহ-বৰ্জ্জিত ভিন্ন ভিন্ন জাতির লোক হইবে এরূপ হইত না। কাজেই মুসলমানদের মধ্যে অনেক সময় একই লোককে অসিজীবী ও মসীজীবী দেখা যায়, ইহাতে তাহাদের ইতিহাসকে সজীব ও সত্য করিয়া তুলিয়াছে।

ভাষা

এখন ভারতীয় মুসলমান ইতিহাসের ভাষা আলোচনা করা যাউক। মুহম্মদের মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দী ধরিয়া আরবীই পণ্ডিতদের ভাষা ছিল, সব দেশেই মুসলমান লেখকরা এই ভাষায় গ্রন্থ রচনা করিতেন। ভারতেও তাহাই ঘটে। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি দেখা গেল যে এদেশে আর কেহ ইচ্ছা করিয়া আরবী পড়ে না বুঝে না, তখন ফার্সী ইতিহাসের যুগ আরম্ভ হইল। ভারতের পাঠান সুলতান এবং মুঘল বাদশাহগণ পাঠান বা মুঘল ছিলেন না, তাঁহারা সকলেই তুর্কী জাতীয়। (কেবল ক্ষীণজীবী লোদীবংশ ভিন্ন)। কিন্তু মন্ত্রীরা প্রায়ই শিক্ষিত লিপিকুশল চতুর পারসিক জাতীয় লোক হইত, মুসলমান জগতে কাব্য ও ভদ্রালাপের ভাষা ফার্সী ছিল, এইজন্য ইতিহাস ও চিঠিপত্র ফার্সীতে লেখা হইত। সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী এবং আরও দুই একখানি ইতিহাস তুর্কী ভাষায় লিখিত। কিন্তু ভারতে অনেক সৈন্য থাকিলেও ভদ্র মুসলমানদের মধ্যে তুর্কীর পাঠক কম ছিল, এজন্য আকবরের সময়ে পূর্ববর্তী আরবী ও তুর্কী ইতিহাসগুলি ফার্সীতে অনুবাদ করা হইল। সেই অনুবাদ ভারতের সাহিত্য জগতে প্রচলিত রহিল, তাহাই ইংরাজরা ইংরাজীতে ভাষান্তরিত করিলেন; যেমন Erskine’s Memoirs of Babar এবং Reynold’s Memoirs of the Sultans of Ghazni পূর্ব্বোক্ত অনুবাদের অনুবাদ ৷

ফার্সী ভাষার রাজত্ব অষ্টাদশ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি শেষ হইল। এমন দিন আসিল যখন ভারতীয় মুসলমান ও কায়েৎগণ ফার্সী পড়িতে ও লিখিতে আর সুখ বা আয়াস পান না। তখন উর্দুতে অধিকাংশ ইতিহাস রচিত হইতে লাগিল, যদিও ২/৪ জন পণ্ডিত ফার্সীতে লেখা ছাড়িলেন না। পদ্যে উর্দুর জয় আরও আগে হইয়াছিল– প্রথমে ওয়ালী নামক আওরাঙ্গাবাদ-বাসী কবি খুব সাহস দেখাইয়া উর্দু পদ্য রচনা করেন। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার পুঁথি দিল্লী পৌঁছিল; রাজধানীর কবিরা দেখিলেন যে এই মাতৃভাষার পদ্যগুলি পড়িতে খুব সুন্দর, লেখা যেন হৃদয় হইতে আসিয়াছে; আর তাঁহারা যে এত মাথা ঘামাইয়া অসীম কৌশল দেখাইয়া ঝুড়ি ঝুড়ি ফার্সী পদ্য লেখেন তাহা কেহ পড়ে না, কেহ আবৃত্তি করে না। এমনকি লেখকগণও তাহা পড়িয়া অন্তরে সন্তুষ্ট নন। তখন উর্দু পদ্য লেখার ধুম পড়িয়া গেল। গদ্যে উর্দু চলিত হইতে অবশ্য আরও কিছু দেরী হইল। কিন্তু উর্দু ইতিহাস মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর হইতে আরম্ভ; ইহার মূল্য কম।

পাঠান যুগের ইতিহাস

ভারতের ফার্সী ইতিহাসগুলি দুই শ্রেণীর।

প্রথম ধারাবাহিক ইতিহাস, অর্থাৎ আদম ও ঈভ হইতে আরম্ভ করিয়া লেখার সময় পর্যন্ত মুসলমান জগতের ইতিহাস। ইহার প্রথমাংশ অতি সংক্ষিপ্ত, সঙ্কলন মাত্র এবং অসার। শুধু লেখকের নিজ সময়ের বৃত্তান্ত অর্থাৎ গ্রন্থের শেষটুকু মূল্যবান। তাহাও আবার সব গ্রন্থে নয়। এই ইতিহাসগুলিতে রাজার তালিকা ও রাজত্ব বিবরণ ছাড়া সাধু এবং কবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনীও আছে। মুঘল বাদশাহদের পূর্ব্বের এই শ্রেণীর ইতিহাসের মধ্যে তিনখানি অতি মূল্যবান-

১. তবাকাৎ-ই-নশিরি, ১২৬০ খ্রিস্টাব্দে লিখিত। Major Raverty প্রচুর ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ টীকা সহ ইহার অনুবাদ করিয়াছেন। প্রথম পাঠান যুগের ইহা আদি ও প্রামাণিক গ্রন্থ; ফেরিশ্তা, ষ্টুয়ার্ট প্রভৃতি সকলেই ইহার নিকট ঋণী।

২. জিয়াউদ্দিন বরণী লিখিত ইতিহাস, (১৩৫৬ খ্রি.)। ইহাতে আলাউদ্দিন ও ফিরুজ শাহের শাসন প্রণালীর বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। ইহার অনেকটা Elliot’s History of India এবং Asiatic Society of Bengal-এর Journal-এ ইংরাজীতে অনুবাদ করা হইয়াছে।

৩. আব্বাস খাঁ লিখিত শের শাহের জীবনী। ইহা হইতে সংগ্রহ করিয়া নিয়ামউল্লা যে ইতিহাস লেখেন তাহা ডাক্তার ডর্ন History of Afgans নামে অনুবাদ করিয়াছেন।

শেষ দুইখানি গ্রন্থে আমরা রাজা রাজড়ার লড়াই ছাড়া দেশের অবস্থা ও শাসন প্রণালীর অনেক কথা জানিতে পারি।

মুঘলযুগের সরকারী ইতিহাস

দ্বিতীয়, সরকারী ইতিহাস, Official Histories, অর্থাৎ কোন বাদশাহের আজ্ঞায় তাঁহার সভাসদদের লিখিত শুধু সেই রাজত্বকালের ইতিহাস। এই শ্রেণীর সূত্রপাত আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল লিখিত আকবর নামা হইতে এবং সেই সময় হইতে রাজত্বের পর রাজত্বের এইরূপ কাহিনী চলিয়া আসিয়াছে। যেমন,

আকবরের আকবরনামা, ৩ বড় ভলুম

জন্ম হইতে রাজত্বের……….বৎসর পর্যন্ত।

জাহাঙ্গীরের রাজত্বের “মাসির-ই-জাহাগিরি” এক ভলুম, এবং বাদশাহের সুদীর্ঘ আত্মজীবনী।

শাহজাহানের প্রথম ২০ বৎসরের ইতিহাস আবদুল হামিদ লাহোরী লিখিত পাদশাহ নামা, ৪ ভলুম।

২১ হইতে ৩০ বৎসর পর্যন্ত ওয়ারিস লিখিত পাদশাহ নামা, ২ ভলুম।

আওরংজীবের প্রথম দশ বৎসরের মুহম্মদ কাজিম্ লিখিত আলমগীর নামা ২ ভলুম (১১০৭ পৃষ্ঠা।)

তাহার সম্পূর্ণ রাজত্বের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, মুহম্মদ সাকী মুস্তাদ খাঁ রচিত মাসির-ই-আলমগিরি, ৫৪০ পৃষ্ঠা।

আওরংজীবের উত্তরাধিকারী হীনবল বাদশাহদেরও ২/১ খানি এইরূপ গ্রন্থ আছে।

কিরূপে রচিত হইত

এখন এই শ্রেণীর ইতিহাসের উপকরণ, ছন্দ, রচনা-প্রণালী ও মূল্য বর্ণনা করিব। আগেই বলিয়াছি যে মুসলমানদের মনে একটা স্বাভাবিক ইতিহাসস্পৃহা ও সময়-জ্ঞান ছিল। এইজন্য বাদশাহী শাসনকালে প্রত্যেক প্রদেশে, প্রত্যেক রাজপুত্রের সভায় এবং প্রত্যেক সামরিক অভিযানের সঙ্গে এক এক জন কর্মচারী নিযুক্ত থাকিত যে তথাকার বিশেষ ঘটনাগুলি নিয়মিতরূপে বাদশাহের নিকট লিখিয়া পাঠাইত। এইরূপ চিঠিকে “ওয়াকেয়া” (news letter) এবং লেখককে “ওয়াকেয়ানবিস্” বলিত। আরও এক শ্রেণীর রিপোর্টার ছিল, নাম সওয়ানেহ-নিগার, অর্থাৎ সংবাদদাতা। এইসব পদের বেতন বেশী ছিল না, এবং অনেক সময় বখ্শী (Paymaster) এর উপর “ওয়াকেয়ানবিসির” কাজও চাপাইয়া দেওয়া হইত। প্রতি যুদ্ধের পর বিজয়ী সেনাপতি বাদশাহের নিকট এক বিবরণ পাঠাইতেন, নাম “ফহনামা” ( despatch of victory) আবার বাদশাহ প্রাদেশিক কর্মচারী বা সেনাপতিদের নামে যে-সব চিঠি স্বয়ং লিখিতেন (নাম “ফৰ্ম্মান”) অথবা মন্ত্রীকে দিয়া লেখাইতেন (নাম–হ-উঁহুকুম্” অর্থাৎ by order) এবং কর্মচারীরা অথবা কুমারেরা বাদশাহকে যে সব পত্র পাঠাইত (নাম “আর্জদা”) তাহা– এবং পূর্ব্বোক্ত ওয়াকেয়া ও সাওয়ানেহগুলি– সমস্ত রাজধানীর দস্তরখানায় যত্নে রাখা হইত। বাদশাহের রাজত্বকাল দশ দশ চান্দ্র বৎসরে ভাগ করিয়া প্রতি ভাগকে এক দত্তর্ এবং তিন ভাগ অর্থাৎ ৩০ বৎসরকে এক করণ বলা হইত। দশ বৎসর পূর্ণ হইবার কিছু আগেই সম্রাট রাজসভার কোন সুলেখককে তাহার ঐতিহাসিক নিযুক্ত করিয়া হুকুম দিতেন যে তাঁহাকে ঐ সমস্ত কাগজপত্র দেখিতে দেওয়া হউক। সে দফতরখানায় বসিয়া ওয়াকেয়া এবং চিঠিপত্র পড়িয়া রাজ্যাভিষেকের দিন (অথবা বাৎসরিক) হইতে বৎসর গণিয়া, প্রতি বৎসরের ঘটনাগুলি তারিখ অনুযায়ী লিখিয়া লইত ৷ কখন কখন কোন প্রদেশের বা যুদ্ধের বা ব্যক্তির বিস্তারিত বিবরণ এক স্থলে লিখিত। বাদশাহের দুই-চারিখানি চিঠিও ইতিহাসের মধ্যে গাঁথিয়া দেওয়া হইত; সময়ে সময়ে তাঁহার দুই একটি মৌখিক উক্তিও শুনিয়া লিপিবদ্ধ করা হইত। কিন্তু অনেক স্থলে এইসব সরকারী ইতিহাস পড়িতে ঠিক গেজেটের মত বোধ হয়– শুধু পদোন্নতি, কর্ম্মচারী পরিবর্তন, পুরস্কার, নজর ইত্যাদির তালিকা। যাহা হউক এইসব ইতিহাস হইতে আমরা মূল্যবান সংবাদ স্থান বর্ণনা (Topographical notes) এবং ঠিক তারিখ পাই।

এইরূপে সরকারী কাগজপত্র দেখিয়া ত লেখক তাঁহার ইতিহাস শেষ করিল, এবং শুভদিনে তাহা বাদশাকে উপহার দিল। তাহার পর অবসর মত বাদশাহকে বইখানি পড়িয়া শুনান হইত এবং তাঁহার আজ্ঞায় স্থানে স্থানে পরিবর্তন বা যোগদান করা হইত। কখন রাজ আজ্ঞায় মন্ত্রীই এই revision করিতেন, যেমন শাহজাহানের মন্ত্রী সাদুল্লা খাঁ ওয়ারিসের পাদিশাহনামা সংশোধন করেন। অবশেষে এইরূপে মার্জ্জিত ও অনুমোদিত ইতিহাসের কয়েকখানা নকল লওয়া হইত। একখানা বাদশাহী পুস্তকালয়ে প্রাসাদে থাকিত, এবং কুমারদিগকে ও বিজাপুর গোলুকণ্ডা প্রভৃতির বন্ধু রাজাদিগকে এক এক খণ্ড উপহার দেওয়া হইত। গ্রন্থকার কয়েক হাজার টাকা বিদায় পাইত।

ভাষার আড়ম্বর ও পেঁচ

এইরূপ Revision-এ দুইটি অবশ্যম্ভাবী ফল ফলিত। প্রথম, ভাষার আড়ম্বর ও খোসামোদ চরমকেও ছাড়াইয়া উঠিত। এবিষয়ে আবুল্‌ল্ফ আদি পাপী। তাঁহার আকবরনামা এই শ্রেণীর গ্রন্থের আদর্শ হওয়ায় সমস্ত সরকারী ইতিহাস এক অদ্ভুত ছাঁচে ঢালা হইয়াছে। উপাধি ও বিশেষণের আতিশয্য দেখিয়া সংস্কৃত কবিরাও হার মানিয়া যায়। ছয় সাত লাইন ধরিয়া বাদশাহের গুণবাচক বিশেষণ চলিতেছে, কুমারদের অন্তত: দুই লাইন, প্রধান মন্ত্রীর দেড় লাইন। তাঁহাদের নামটি লেখাও ভয়ানক বেআদবী, কোন এক নির্দ্দিষ্ট বিশেষণের দ্বারা খুব দূর হইতে ইঙ্গিতে বাদশাহ বা কুমারকে উল্লেখ করা হয়। যেমন বাদশাহ তেমনি নবাব। শিহাবুদ্দিন্ তালিশ্ লিখিত বাঙ্গলার ইতিহাসে তাহার প্রভু মির জুলা ও শায়েস্তা খাঁর নাম নাই, শুধু বিশেষণ! তাহা হইতে ব্যক্তিকে বুঝিতে হয়! এই ধরনের গ্রন্থে সোজাসুজি মনের ভাবপ্রকাশ করা একটা ভয়ানক মূৰ্খতা ও অসভ্যতার চিহ্ন বলিয়া মনে করা হইত, কেবল কথার পাকে পাণ্ডিত্য ও রাজভক্তি দেখান হইত। নীচে কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। “অমুক তারিখে বাদশাহের শত্রুদের শরীরে ব্যারাম প্রকাশ পাইল”, একথা হইতে কাহার সাধ্য বুঝিবেন যে সেই দিন বাদশাহ স্বয়ং অসুস্থ হইয়াছিলেন; অথবা “অমুক তারিখে স্বর্গ-সদৃশ সিংহাসনের পার্শ্বে দাঁড়াইবার অধিকার-প্রাপ্ত লোকদিগের জ্ঞানগোচর হইল যে” ইত্যাদি, ইহার অর্থ আর কিছুই নয় শুধু এই যে সেই তারিখে মফঃস্বল হইতে আগত চিঠি পড়িয়া বাদশাহ জানিলেন যে ইত্যাদি। এই ইতিহাসের ভাষায় বাদশাহের শত্রুপক্ষ, হিন্দুই হউক আর মুসলমানই হউক, যুদ্ধে হত হইল না, “নরকে যাইল” আর বাদশাহের পক্ষে অতজন সৈন্য “কাজে লাগিল”, কারণ ফলষ্টাফ্ সত্যই বলিয়াছেন যে সৈন্যগণ food for powder, যুদ্ধে মরাই তাদের কাজে লাগা। যাহা হউক এই সব লেখার ঢং অল্পদিনেই আয়ত্ত করা যায় এবং শেষে আর পড়িয়া হাসি পায় না।

দ্বিতীয় ফল এই যে, ইতিহাসখানি স্বয়ং বাদশাহের পড়ার জন্যে লিখিত হওয়ায় এবং তাঁহার আজ্ঞায় ঘষে মেজে নেওয়ায়, সব অপ্রীতিকর সত্য একেবারে অদৃশ্য হইয়া যায়, লেখককে অনবরত গাইতে হয়–

জয় মুঘল ব্যাঘ্রের জয়,
আমি মুঘল ব্যাঘ্রের ভক্ত প্রজা।

প্রভুর পক্ষের পরাজয় গোপন করা অথবা হতের সংখ্যা কম করিয়া লেখা ত ঘটিবেই, কারণ বিশ্বনিন্দুকদের কাছে শুনিতে পাই যে এই ব্যাধিটা এসিয়া খণ্ডের ঐতিহাসিকদের একচেটে নয়, মধ্যে মধ্যে ইউরোপীয় Despatches এবং Moniteur-এও ইহার আবির্ভাব হয়।

যাহা হউক, এইসব দোষ সত্ত্বেও মুঘল ইতিহাসগুলি অনেক কারণে মূল্যবান, অনেক স্থলে প্রকৃত সত্য নির্দ্ধারণের চেষ্টা আছে, অনেক স্থান ও আচার বর্ণনা, দেশের প্রাকৃতিক অবস্থার বিবরণ এবং Statistics ও topography আছে। আর আছে বাদশাহী জীবনের ও রাজসভার উৎসবের জীবন্ত চিত্র। ইতিহাসের এক কর্তব্য অতীতকে আমাদের চোখের সম্মুখে আনিয়া দেওয়া (to visualise the past)। তাহা মুসলমান ইতিহাসে অনেকটা হয়। পাঠককে হিন্দুযুগের মত শুধু কল্পনার দাস হইতে হয় না।

প্রাদেশিক রাজবংশ

দিল্লীর সাম্রাজ্য ভিন্ন প্রাদেশিক মুসলমান রাজবংশেরও ইতিহাস আছে, কিন্তু তাহা এত বিস্তারিত নয় এবং সকল রাজারও নাই। গুজরাতের দুই-ইতিহাস ডাক্তার বার্ড ও বেলী সাহেব অনুবাদ করিয়াছেন, তাহার মধ্যে শেষের খানা কাজের জিনিস। এইসব প্রাদেশিক সুলতানদিগের বিবরণ সংক্ষেপ সঙ্কলন করিয়া নিজামুদ্দিন আহমদ ও তাহার পর ফেরিতা নিজ নিজ মুঘল রাজ—ইতিহাসের পরশিষ্টে দিয়াছেন। ফেরিতার লেখা বড় সুখপাঠ্য এবং বিষয়গুলি সুন্দররূপে গোছান; খাফি খাঁরও সেই গুণ। কিন্তু তাহার কেহই মৌলিক লেখক নহেন, অপর প্রামাণিক গ্রন্থ হইতে ঘটনা সংগ্রহ করিয়াছেন মাত্র। যেটুকু নিজের দেখা বা শুনা হইতে লেখা কেবল তাহাই আদরণীয়।

বেসরকারী ইতিহাস

মুঘল ভারতের ইতিহাসের প্রথম উপকরণ সরকারী ইতিহাসগুলির বর্ণনা শেষ করিয়াছি। দ্বিতীয় উপকরণ, বেসরকারী লেখকদের গ্রন্থ। ইহারা রাজকীয় দপ্তরখানায় ঢুকিতে পায় নাই, কাজেই ঠিক তারিখ ও সংবাদ দিতে পারে না, অনেক বৃত্তান্ত সরকারী ইতিহাস হইতে ধার করিয়াছে একথা স্বীকার করে। কিন্তু এই বইগুলির মহাগুণ এই যে বাদশাহের চোখে পড়ার ভয় না থাকায় অনেক সত্য ইহাতে প্রকাশ পাইয়াছে; বিশেষতঃ যেসব ঘটনা লেখক স্বয়ং দেখিয়াছে অথবা বন্ধুদের নিকট শুনিয়াছেন তাহা আর কোথায়ও পাইবার উপায় নাই, এবং এইরূপ গল্পগুলি সেকালের উপরে বেশ আলো ফেলিয়া দেয়। এইজন্য আওরংজীবের রাজত্বকাল জানিতে হইলে আমরা খাফি খাঁ ইতিহাস ছাড়িতে পারি না, যদিও তাহা বাদশাহের মৃত্যুর প্রায় ২৪ বৎসর পরে লেখা। আওরংজীবের সময়ে দুইখানি হিন্দু রচিত ফার্সী ইতিহাস আছে, প্ৰথম ভীমসেন কায়েথ লিখিত নুস্থা-এ-দিলকষা, দ্বিতীয় ঈশ্বরদাস নাগর প্রণীত ফতুহাৎ-এ-আলমগিরি। এই দু’খানি যে কত মূল্যবান তাহা আর বলিতে পারি না। এ ভিন্ন ছোট ছোট আংশিক ইতিহাসও আছে, তাহাতে কোন কুমার বা সেনাপতির কীর্তিমাত্র বর্ণিত হইয়াছে।

চিঠিপত্র

তৃতীয় চিঠিপত্র। আওরাংজীবের সময়ের প্রায় তিন হাজার ফার্সী চিঠি পাওয়া গিয়াছে। এগুলি ইতিহাসের উৎকৃষ্ট উপকরণ। কারণ ঠিক ঘটনার সময়ে লেখা এবং লেখকের প্রকৃত মনোভাব প্রকাশকারী। অনেক পরে ঘটনা আধআধ ভুলিয়া গিয়া অথবা সত্য গোপন করিবার চেষ্টায় লেখা বিবরণ নহে। যুবরাজকালীন আওরংজীব মন্ত্রীকে দিয়া যেসব চিঠি লেখান তাহাতে পূর্ণ ফুলস্কাপ আকারের ৬০০ পৃষ্ঠা এক গ্রন্থ হইয়াছে, নাম আদাব্-ই-আলমগিরি। ইহার ভাষা কৃত্রিম ও গুললিত আড়ম্বরপূর্ণ। তাহার পর তাঁহার রাজত্বকালীন নিজের লেখা অথবা মুর্শী ইনয়েউল্লাকে বলিয়া দেওয়া চিঠিরও অনেক ভিন্ন ভিন্ন সংগ্রহ আছে– এসব চিঠি ছোট, সরল, কাজের জন্য, সোজা কথায় লেখা কখন মিঠে, কখন কড়া, প্রায়ই বিষম ঝাল। কেহ নিয়ম লঙ্ঘন করিলে বা কাজে শৈথিল্য দেখাইলে, বাদশাহের কলমের কাছে আর তাঁর রক্ষা নাই। এই চিঠির প্রায় সবগুলিই তাঁহার জীবনের শেষ ১০/১৫ বৎসরে লেখা। রাজত্বের মধ্যম ভাগটা, প্রায় ২৫ বৎসর, কতকটা অন্ধকার, চিঠিও নাই, বিস্তারিত ইতিহাসও নাই। চিঠির কথা বলিতে এটাও বলা আবশ্যক যে রাজা জয় সিংহ, শিবাজী প্রভৃতি মহাপুরুষদের কতকগুলি ফার্সী চিঠি পাওয়া গিয়াছে।

ভ্রমণবৃত্তান্ত

চতুর্থ, ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বৃত্তান্ত। ইহারা যে প্রজাদের অবস্থা ও দেশের বাণিজ্য বর্ণনা করিয়াছে তাহা মূল্যবান সন্দেহ নাই, কারণ ফার্সী ইতিহাসে ঠিক এইসব জিনিষটারই অভাব। আর, দেশের আচার ব্যবহার বিদেশী লোকে সমালোচনা করিলে তাহা বেশ নূতন ও শিক্ষাপ্রদ হয়। কিন্তু ঘটনা সম্বন্ধে ইহাদের সাক্ষ্য অগ্রাহ্য। এই ভ্রমণকারীরা অর্থহীন ভবঘুরে (adventurers ) মাত্র, ইহাদের পক্ষে ভারতের প্রকৃত খবর জানিবার উপায় ছিল না, কারণ ইহারা বড় বড় মন্ত্রী সেনাপতি বা রাজপুত্রদের সহিত মিশিতে পাইত না, শুধু দিল্লী ও আগ্রার বাজারের এবং ফিরিঙ্গী ও আম্মানি পাড়ার গুজব লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছে।

হিন্দুলিখিত বিবরণ

পঞ্চম, রাজপুতানার কবিদের লেখা কাব্য ও গাথা। এগুলি ফার্সী সরকারী ইতিহাসের অপেক্ষাও বাগাড়ম্বর ও মিথ্যা স্তুতিতে পূর্ণ। হিন্দু রাজকবিরা দূরে ভ্রমণ করিত না, বিভিন্ন লোকের সঙ্গে মিশিত না, যুদ্ধক্ষেত্রে ও মন্ত্রণাগারে উপস্থিত থাকিত না এবং রাজপুতজাতির মধ্যে লেখাপড়ার ব্যাপার ছিল না বলিলেই হয়। সুতরাং এইসব রাজকবিরা সমস্ত সত্য জানিতে পারিত না। ইহারা রাজপুতদিগকে মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে যতদূর জয়ী বলিয়া বর্ণনা করিয়াছে তাহা বিশ্বাস করা যায় না, কারণ তাহার পরবর্তী অনেক ঘটনা হইতে দেখা যায় যে সেই রাজপুত রাজাই বিজিতের কর্ত্তব্য পালন করিতেছেন। আর উভয় পক্ষের সভ্যতা, লোক-বল ও বুদ্ধি তুলনা করিয়া দেখিলে রাজপুতদের জয় অসম্ভব, অস্বাভাবিক নিয়মবিরুদ্ধ বলিয়া মনে হয়। রাজপুতরা বীর বটে কিন্তু মুঘল সেনারাও বীর ছিল। তাহার উপর মুঘলের সভ্যতা গতিশীল, অন্যদেশের সংস্রবে প্রতিদিন উন্নতির দিকে ধাবিত, তাহারা রাজপুত অপেক্ষা অনেক বেশী সুসজ্জিত ও চালাক। আর রাজপুতগণ সেই সঙ্কীর্ণ মরুপৰ্ব্বতবেষ্টিত দেশে ‘বন্দী, জগতের খবর রাখিত না, সভ্যতার স্রোতকে স্পর্শ করিতে পারিত না; তাহাদের অস্ত্র ও যুদ্ধপ্রণালী অতি পুরাতন; তাহারা যেন তিন চারি শতাব্দী পূর্ব্বের লোক। এইসব মনুষ্য ও আরাবলী পর্ব্বতের গায়ে নিবদ্ধ fossil-এর মধ্যে পার্থক্য নাই। টডের রাজস্থান রাজপুত কাব্য গাথা ও প্রবাদ অবলম্বনে লিখিত; এই কারণে উহা উপন্যাস, ইতিহাস নহে। ঐতিহাসিকগণ প্ৰায় প্ৰথম হইতেই উহাকে ত্যাগ করিয়াছেন। কান্যকুব্জের ভূষণ কবির গ্রন্থাবলী ও লাল কবির ছত্র প্রকাশ প্রভৃতি হিন্দী রাজজীবনীও এই শ্রেণীর।

মারাঠা ঐতিহাসিক কাগজপত্র বড় পুরাতন নহে, অধিকাংশ পেশবেদের সময়ের অর্থাৎ ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী। শিবাজী কর্তৃক সুদৃঢ় রাজ্য ও ধন বিদ্যাপূর্ণ রাজধানী স্থাপন করিতে প্রায় ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দ অতীত হইল, তাহার পর ত ইতিহাস লেখা আরম্ভ হইবে। শিবাজীর জীবনকালে একখানি ইতিহাসও লেখা হয় নাই। তাঁহার মৃত্যুর পর ১৬৮০ হইতে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যে নিত্য যুদ্ধ ঘোর অশান্তি ও অরাজকতা। এই সময়ের কাগজপত্র সংখ্যায় কম।

ষষ্ঠ Statistics। আকবরের সময়ে রাজা ও অমাত্যগণের মন সকল প্রকার সত্যের দিকে উন্মুক্ত ছিল, তাঁহাদের আশ্চর্য্য জ্ঞান-স্পৃহা ছিল। তাহার ফলে, বাদশাহের আজ্ঞায় প্রত্যেক প্রদেশ হইতে বিবরণ ও statistics সংগ্রহ করিয়া সে যুগের স্যার উইলিয়াম হান্টার, আবুল্ ফজল, তাঁহার আইন-ই-আকবরী নামক Imperial Gazetteer of India বাহির করিলেন। সেটা দৃষ্টান্ত হইল। তাহার পরের শতাব্দীতে ছোটখাট কয়েকখান দেশবর্ণনার বহি এবং অনেকগুলি Statistics সংগ্রহ (“দস্তুর-উল্-আম্‌ল” নামে) ফার্সীতে সঙ্কলন করা হয়, কিন্তু তাহাদের মধ্যে কোনখানাই আইন্-ই-আকবরীর মত নহে। সে সময়ের মুসলমান সাধুদিগের কয়েকখান জীবনরচিত আছে; তাহা হইতে দেশের লোকেদের বিশ্বাস ও জ্ঞানের অবস্থা অনেকটা জানা যায়, কিন্তু তাহা আমাদের পক্ষে বিশেষ নূতন খবর নহে।

ইতিহাসের এত প্রচুর এত বিচিত্র উপকরণ আমাদের দেশে আছে। নাই শুধু যথেষ্ট সংখ্যায় ঐতিহাসিক এবং তাঁহাদের মধ্যে সহযোগিতা এবং পরামর্শ। জ্ঞানের বিশাল ক্ষেত্রে একদল পণ্ডিতের মধ্যে ভাগ করিয়া দিলে প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ কর্ষণ করিয়া অচিরে ফল লাভ করিবেন; আমাদের ঐতিহাসিক দৈন্য ও বিদেশীর নিকট ঋণ ঘুচিয়া যাইবে; অতীত ভারত হইতে অন্ধকারের যবনিকা অপসৃত হইবে, আমাদের নূতন আনীত আলোকে পূৰ্ব্ব পুরুষগণের কীর্ত্তি ও স্মৃতি উজ্জ্বল হইয়া জগতের সম্মুখে রহিবে।

এই ইতিহাসগুলি ফার্সীতে লেখা বলিয়া ভয় করিবার কারণ নাই। ফার্সী ভাষার ব্যাকরণ এত সরল যে একজন বুদ্ধিমান বাঙ্গালী সাতদিনে তাহা লিখিতে পারেন। তবে শব্দসংখ্যা অত্যন্ত বেশী, আশি হাজার, এবং আরবী, তুর্কী, গ্রীক প্রভৃতি নানা ভাষা হইতে সংগৃহীত। কিন্তু সাধারণ গ্রন্থে তিন হাজারের বেশী শব্দ ব্যবহার হয় না। এক হাজার শব্দ শিখিয়া অভিধানের সাহায্যে অনায়াসে ফার্সী ইতিহাস পড়িতে আরম্ভ করা যাইতে পারে।*

[প্রবাসী, ভাগ ৯, সংখ্যা ১১, ফাল্গুন, ১৩১৬]

* ভাগলপুর সাহিত্য সম্মেলনের (১৩১৬) কার্য বিবরণ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *