১৪. খবরটা স্বর্ণলতাকে হরেনই এনে দিলে

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

খবরটা স্বর্ণলতাকে হরেনই এনে দিলে। কথাটা অভয়পদর অফিস থেকে শুনে এসেছিল হরেনের এক ভগ্নিপতি, সে আবার একদিন কী কাজে এসে শুনিয়ে গেল ওকে! সেদিন অবশ্য হরেন কিছু বলে নি–পরে একটা শনিবার দেখে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল, সেখান থেকে পাকা খবর শুনে এসেছে। চোখে দেখেও এসেছে অবস্থাটা। বললে, ‘তোমার বাবাকে আর চেনা যায় না। অমন সাজোয়ান পুরুষটা কদিনেই যেন এতটুকু হয়ে গেছেন! সামনে ঝুঁকে পড়েছেন একেবারে। মেজ কাকীমার মুখে শুনলুম–খাওয়া- দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন সব। এমনি তো কিছু খাওয়া ছিলই না–দুবেলা দুমুঠো ছাড়া; জীবনে নাকি জলখাবার কাকে বলে তা জানেন না, বাড়িতে যজ্ঞিটজ্ঞি হলে যখন বাড়িতে মিষ্টির এউঢেউ চলে তখনও নাকি কেউ কোন দিন সকালে বিকেলে একটা খাওয়াতে পারে না কখনও, ঐ যা করে দুবেলা ভাতপাতে;–তা সে ভাতও এমন কমিয়ে দিয়েছেন যে ওঁরা সবাই ভয় পেয়ে গেছেন, সে খাওয়া খেয়ে মানুষটা বাঁচবে কী করে। অথচ যেমন অফিস-ঠেলা তা তো ঠিকই আছে; হাঁটারও কমতি নেই–বিকেলে নাকি ফেরেন মড়ার মতো নির্জীব হয়ে।…. মেজ কাকী বলছিলেন যে মানুষটা যেন আত্মহত্যা করছে একেবারে!’

‘তা ওরা জোর করে খাওয়াতে পারছে না? মা কী করছে? আড় হয়ে পড়তে পারছে না খাওয়ার সময়?’

স্বর্ণলতা বিষম উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

‘সেই তো হয়েছে আরও মুশকিল! মা নাকি এর ওপরও সামনে হাহুতাশ ক’রে যাচ্ছেন–ঐ টাকার জন্যে, ওঁকে যা-নয়-তাই শোনাচ্ছেন দুবেলা! ঐ সামান্য খাওয়া –তাও এক একদিন নাকি খেতে পারেন না মার বাক্যি-যন্ত্রণায় আর চেঁচামেচি কান্না-কাটিতে। ওঁর পাতের সামনে এসে ঢিপঢিপ ক’রে মাথা খুঁড়লে কি কেউ খেতে পারে বসে? অথচ ওঁর যত কান্না আর যত মাথাখোঁড়া নাকি সেই সময়েই। এমন অবুঝ, কেউ বললেও বুঝতে পারেন না যে অনিষ্টটাও ওঁরই হচ্ছে!… তোমার দিদিমা নাকি পইপই ক’রে বারণ করেছিলেন–মা শোনেন নি, নিজের গয়না বন্ধক দিয়ে টাকা এনে দিয়েছিলেন বাবাকে–সেই হয়েছে ওঁর আরও বেশি জ্বালা, কেবল বলছেন যে শত্রু হাসল। টাকার শোকের চেয়েও ঐটে বড় হয়ে উঠেছে।…নিজের মা নাকি ওঁর শত্রু–বোঝো ঠেলা।’

হরেন হাসে কিন্তু স্বর্ণলতা হাসতে পারে না। সে মাকে চেনে। কী যে করছে মহাশ্বেতা–কী পমিাণ চেঁচাচ্ছে আর তুড়িলাফ খাচ্ছে তা সে এখানে থেকেই বলে দিতে পারে। মানুষটা চিরকালের নির্বোধ, নিজের ভালমন্দ ভবিষ্যৎ কখনও দেখতে পায় না চোখে। যেটা একেবারে প্রত্যক্ষ, সেটাও না। অভয়পদর কিছু হলে ওর কি হবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে–কী অবস্থা হবে সংসারের–ঐ একপাল মুকে খাওয়াবে কোথা থেকে তা একবারও ভাববে না মহাশ্বেতা, সে লোকই নয়। এখন–এই এত বড় লোকসানটার পর বরং আরও বেশি ক’রে যত্ন করা দরকার তাও বুঝবে না সে। বোঝাতে যাওয়াও বিপদ দরকার হ’লে ওর গলার ওপর গলা চড়াতে পারে এক মেজ কাকী–তা সে কিছু বলতে গেলে উল্টো উৎপত্তি হবে। ওরাও তো শত্তুর!

কী হচ্ছে বাড়িতে–তা যেন এখানে বসেই স্পষ্ট দেখতে পায় স্বর্ণ। তার দুই চোখে জল ভরে আসে। বলে, ‘আমি যাই একবার, কদিন থেকে আসি গে।… দুবেলা দুমুঠো ভাত, তাও যদি এমন করে ছেড়ে দেয় তাহ’লে সত্যিই বাঁচবে না বাবা। আর কেউ খাওয়াতে পারবে না, আমি ছাড়া। আড় হয়ে পড়তে হবে, নিজে অন্নজল ত্যাগ করতে হবে–তবে খাবে। আমি গিয়ে অন্ততঃ পাঁচ-সাতটা দিন খাইয়ে আসি সামনে বসে, তারপর বরং বৌদিকে শিখিয়ে দিয়ে আসব–সেই খাওয়াবে অমনি জোর করে। বৌদিকেও বাবা ভালবাসে মেয়ের মতো, মুখে কিছু না বললেও সেটা আমি বুঝি। কিন্তু সে তো কিছু জানে না, ছেলেমানুষ, অত বড় বড় শাশুড়ীদের সামনে সে আর কি বলবে, তাকে শিখকে পড়িয়ে আসতে হবে। প্রথমটা আমি না গেলে চলবে না। যাবো? পাঁচসাতটা দিন?’

উৎসুক মিনতিভরা কণ্ঠে বলে স্বর্ণ।

হরেনের মুখ কিন্তু গম্ভীর হয়ে ওঠে।

একটু চুপ ক’রে থেকে বলে, ‘তুমি যাবে–তারপর? এধারে?’

মুখ ম্লান হয়ে যায় স্বর্ণর।

কোনমতে উপায় হয় না–হ্যাঁ গো?’

‘উপায় কি আর হবে বল। এক উপায় আমার বসে বসে হাঁড়ি-ঠেলা। এই গুষ্টির হাঁড়ি ঠেলা কি সোজা কথা! আপিস তো আছে, আটটায় বেরোতে হয়–দেখতেই তো পাচ্ছ!… তা ছাড়া ওখান থেকে বলে পাঠায় নি, কেউ নিতে আসে নি–মা কি পাঠাবে?’

এবার স্বর্ণ একটু রাগ করে।

‘কেউ নিতে আসে নি–বড্ড অন্যায় কথা বটে। কিন্তু এলেই কি তোমার মা পাঠান হুট্ বলতে? এই তো ছোট ভাইটার পৈতে গেল–তাও যেতে পেলুম না। তোমাদের সংসার নিয়েই পড়ে থাকতে হ’ল।…বাপের অসুখ, বাপ যদি মরেই যায়–একবার দেখতে যেতে পাবো না? কেন, আমি কি কইদী নাকি? তাও জেলখানার কইদীরাও তো এক-আধবেলা ছুটি পায় শুনেছি!’

‘অতশত আমি জানি না!’ হরেনও একটু ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, ‘পারো মাকে ব’লে যাবার হুকুম করিয়ে নাও গে। আমি বলতে-টলতে পারব না।… আমরা না হয় হোটেলে- টোটেলে খেলুম, রাত্রে বাজারের খাবারও খেতে পারি–কিন্তু মার কি ব্যবস্থা করব তাহ’লে তাঁকে কদিনই দই চিঁড়ে খেয়ে থাকতে হয়।’

স্বর্ণ খানিকটা চুপ ক’রে থেকে বলে, তা তিনি কি কটা দিনও চালাতে পারবেন না? এককালে তো সবই করেছেন একহাতে–’

‘সে যখন করছেন তকন করেছেন, মানুষের শরীর কি চিরদিন সমান যায়? এখন যদি শরীরে না বয় তাঁর–তো কি চাবুক মেরে চালাবে?’

হরেন রাগ ক’রে উঠে চলে যায়।

উত্তরটা মুখের কাছে এসেছিল তবু চুপ ক’রে যায় স্বর্ণ। স্পষ্ট কথা বলেও কোন লাভ নেই, তিক্ততা বাড়বে। মার দোষ ছেলেকে দেখাতেও নেই, মহাপাপ। ছোট কাকী বার বার বলে দিয়েছে। নইলে সে বলতে পারত যে শরীর যদি অতই খারাপ তাহলে অমন ডবল খোরাক একা হজম করেন কি করে? কোন রোগও তো দেখা যায় না কোথাও!

কিন্তু বলে কোন লাভও নেই। ও হরেনের কাছে বলতে পারে বড়জোর–শাশুড়ীর মুখের ওপর কিছু বলতে পারবে না এটা ঠিক। আর বলেই বা কি হবে, শাশুড়ী যে তাতে কিছুমাত্র চক্ষুলজ্জা বোধ করবেন সে সম্ভাবনা নেই। তিনি পারবেন কি কিছুই, চিঁড়ে-দইও খাবেন না–হয়ত হরেনকেই শেষ পর্যন্ত রেঁধে দিতে হবে মায়ের জন্যে। সে জন্যে যদি আপিস কামাই হয় তো তাও করতে হবে। মা বলবেও না যে, তুই যা, আমার যা হয় হবে এখন!

না, যাওয়া ওর হবে না কোথাও কোনদিন। এইখান এই চার দেওয়ালের মধ্যেই আটক থেকে হাঁড়িবেড়ি ধরে কাটাতে হবে চারকাল। যেমন ওর হাঁড়িবেড়ি ধরার সাধ ছেলেবেলা থেকে–তেমনিই ভগবান তাকে এই বাড়িতে এনে ফেলেছেন। সাধটা মিটিয়ে দিচ্ছেন ভালরকম ক’রেই।

স্বর্ণ শ্বশুরবাড়ি পা দিয়েই শুনেছে ওর শাশুড়ীর শরীর খারাপ–সংসারের কাজকর্ম তিনি কিছুই দেখতে পারেন না। তবু তখনও অতটা বোঝে নি, কারণ সে সময় ওর এক পিসতুতো ননদ সুশীলা এখানে ছিল, সংসারের হাল ধরে ছিল সে-ই। অল্পবয়সী বিধবা মেয়ে–কিন্তু তাই বলে কারও গলগ্রহ নয়। স্বর্ণর শাশুড়ী সে কথাটা প্রথম দিনেই ওকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ও অক্ষ্যাম নয় বৌমা, পেটের দায়ে পড়ে নেই এখানে। ওর বর খুব সেয়ানা ছিল, ঐ যে বিদ্যেসাগরের কী এক কোম্পানি আছে না–বিধবাদের জন্যে?– সেইখানে বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কী সব টাকাকড়ি দিয়ে বোয়ের নামে আটকে বেঁধে রেখেছিল। এখন ও মাসে মাসে সেখান থেকে মাসোহারা পাচ্ছে। যতদিন বাঁচবে মাসে পনেরো টাকা ক’রে পাবে। ছোঁড়া যেন দেখতে পেয়েছিল চোখে যে বেশিদিন বাঁচবে না।…ও টাকা ছাড়াও, ওর শ্বশুরের মস্ত বাড়ি কলকাতার বৌ-বাজারে, তারও একটা ভাগ সে ভদ্দরলোক ওকে লিখে দিয়ে গেছেন। বেশ পাকা ব্যবস্থা, ওর সে অংশ ও ইচ্ছে করলে ভাড়া দিতে পারবে, এমন কি বেচতেও পারবে। অবিশ্যি সেসব কিছুই করে নি ও, তেমনি ওর ভাশুর-দেওররা জোড়-হস্তে থাকে সর্বদা। কোথাও তিখিধম্ম করতে যেতে চাইলে মড়মড় টাকা গুনে দেয়। ও এখানে আছে স্বেচ্ছাসুখে, নেহাৎ মামীকে ভালবাসে ব’লেই তাই। ওকে যেন অবীরে বিধবা ভেবে হেনস্তা কি অছেদ্দা ক’রো নি বাপু!

অছেদ্দা কি হেনস্তা করার কথা স্বর্ণর মাথাতেও যেত না কখনও। গলগ্রহ আশ্রিত হ’লেও সে হেনস্তা করতে পারত না, সে রকম মানসিক গঠনই নয় ওর। তার ওপর সুশীলা মানুষটা তো খুবই ভাল। স্বর্ণর তাকে খুবই ভাল লেগেছিল। সে যতদিন ছিল–টুকরো- টুকরো ফায়ফরমাস খাটা ছাড়া বিশেষ কিছুই করতে হয় নি ওকে হাঁড়ি-হেশেল ঠেলার মোটা কাজ সুশীলাই করত।

কিন্তু, বোধহয় স্বর্ণরই বরাত, মাস ছয়েক যেতে না যেতেই খবর এল সুশীলার বড় জায়ের মরণাপন্ন অসুখ, তার অনেকগুলো ছেলেমেয়ে, কে কার মুখে জল দেয় তার ঠিক নেই, আতান্তর অবস্থা। সুশীলাকে তারা সবাই খুব ভালবাসে, খুবই অনুগত। সুতরাং সে খবর পাওয়ার পর সুশীলার পক্ষে হাত-পা গুটিয়ে চুপ ক’রে বসে থাকা সম্ভব নয়। সে বলতে গেলে তখনই একবস্ত্রে চলে গেল–যে খবর এনেছিল তার সঙ্গেই। তার সে জা তারপর মারাও গেল–সুশীলার হাতেই পড়ল সেই সংসার, তার আর আসাও হ’ল না। এখন কখনও সখনও দৈবেসৈবে আসে মামীকে দেখতে–এক-আধঘণ্টার জন্য। পাঁচ দশদিন এসে থাকার মতো তার অবস্থা নেই আর।

সেই সুশীলা চলে যাওয়ার দিনটি থেকেই গোটা সংসারটার ভার এসে পড়ল স্বর্ণর মাথায়। তাতেও আপত্তি ছিল না, যদি সাধারণ খাওয়া-দাওয়া হ’ত এদের। একটা ঠিকে ঝি আছে, সে শুধু বাসন মেজে ঘরদোর মুছে চলে যায়, তার হাতের জল-বাটনা নেন না এঁরা। একটু শুচিবায়ুও আছে, ঝি বাসন মেজে বাসন উপুড় করে রেখে যায় রোয়াকে, দুবেলা সেইসব বাসন আবার ভিজে কাপড় পরে জলে ধুয়ে নিতে হবে। এর পর খাওয়া। খাওয়ার এত তরিবৎও জানে এরা। হরেনের দুবেলা পোস্ত চাই। যদি কালিয়া পোলও-ও রান্না হয় কোনদিন–তবু পোস্ত না দেখলে পাতে বসবে না সে। তাছাড়া ধোঁকা, ছানার ডানলা, এঁচোড়ের গুলি-কাবাব, মোচার দম-পোক্ত–নানান্ ঝঞ্ঝাটের রান্না সব ফরমাশ করবে সে। নিজেও জানে রাঁধতে। সে-ই দেখিয়ে শিখিয়ে দিয়েছে। এর ওপর আবার পুরুষরা কাছারি-ইস্কুলে বেরিয়ে গেলে শাশুড়ীর জন্যে ছত্রিশ ব্যঞ্জন রান্না আছে। তাঁর আবার প্রত্যহ ঘি-ভাত চাই দুটিখানি। তাঁর নাকি পেট খারাপ, ঘি ভাত ছাড়া সহ্য হয় না। এমন কথাও স্বর্ণ শোনে নি কোন-কালে। ঘি-ভাত খেলেই পেট খারাপ হয়–এইতো সে জানত, এদের সবই উল্টো।

শুধু কি ঘি-ভাত! তার সঙ্গে আবার দুটি সাদা ভাত। বাজারের ভাজামুগের ডাল তিনি খান না, তাঁর জন্যে কাঁচামুগের ডাল ধুয়ে রোদে দিয়ে শুকিয়ে তুলে রাখা হয়– সে-ই কাঠখোলায় ভেজে নিয়ে রাঁধতে হবে। তাও, পান থেকে চুন খসবার উপায় নেই। একটু কম ভাজা হ’লে বলবেন, ‘আজ বুঝি ডাল কটা ভাজো নি বৌমা?’ আবার একটু কড়া ভাজা হ’লে বলবেন, ‘এঃ, ডালগুলো পুড়ে যে আা হয়ে গেছে বৌমা, সেই জন্যে ভাল ক’রে গলে নি। কট্‌কট্ ক’রে লাগছে দাঁতে।…যদি ভাজতে এত কষ্ট হয় বৌমা তো এ ডাল আর রেঁধো না, যা হয় ঐ অড়র ছোলাই ভাল আমার। রোজ খেয়ে পেট চাড়ে না হয় দুদিন খাবো না–উপোস দেব! কী আর হবে!’

একটি তো কাজ করবেন না, কোনদিন সংসারের কুটি ভেঙে দুটি করতে দেখল না স্বর্ণ, অথচ বাক্যির বেলায় ষোল আনা আছেন! আজকাল আর এসব ক্ষেত্রে মেজাজ সামলাতে পারে না স্বর্ণলতা, রান্নাঘরে এসে আপন-মনে গজগজ করে–’উঃ উনি আবার উপোস দেবেন! তবেই হয়েছে। এখনও তো ছেলে বৌ সকলের চেয়ে বেশি খান–ঠিক ডবল খোরাক।…বসে বসে হজমও তো করে। পেটও তো ছাড়ে না! মুয়ে-আগুন, নোলা- সব্বস্ব মেয়ে-মানুষ! ভাতার খেয়ে বসে আছে, গণ্ডাখানেক ছেলেমেয়ে খেয়েছে–তবু নোলার কম্‌তি নেই। আমাদের সব্বাইকে খেয়ে তবে যাবে–তুমি দেখে নিও!’

সত্যিই আর পেরে ওঠে না সে। দুরকম ভাত, ডাল, আবার তার সঙ্গে বড়ি-বড়া দিয়ে ঝোল একটা (লোককে বলেন, ‘কী আর খাওয়া, দিনান্তরে দুটো ঝোল-ভাত, এটুকুও যে কেন ভগবান রেখেছেন তা জানি না। এর জন্যেই লোকের মুখ-নাড়া আর খোঁটা খাওয়া!’–কে যে খোঁটা আর মুখনাড়া দেয় তা স্বর্ণ জানে না, এ বাড়িতে কারও সে সাহস নেই, সবাই তো তটস্থ!), ডালনা চচ্চড়ি অম্বল-একেবারে সাধের খাওয়ার ব্যবস্থা চাই প্রত্যহ। নিহাৎ বোধহয় লোকলজ্জার ভয়ে মাছের মুড়োটা খেতে পারেন না, নইলে তাও আনতে বলতেন। পায়েস তো লেগেই আছে, কোনদিন যদি একটু দুধ বাঁচল খবর পেলেন তো আর রক্ষা নেই, ঠিক বলে বসবেন, ‘তাহ’লে একটু পায়েস কেন বসিয়ে দাও না বৌমা, তোমরা খেতে!’

ছেলেপুলের সংসারে দুধ যা বাঁচে তাতে পায়েস ক’রে গুষ্টিসুদ্ধ খাওয়া যায় না–তা উনি ভালরকমই জানেন। তবু ন্যাকামি ক’রে ঐটুকু বলা চাই। সে পায়েস যখন সামনে ধরে দেয় স্বর্ণ তখন কিন্তু একবারও জিজ্ঞাসা করেন না, কোনদিন ভুলেও না–যে, ‘তোমাদের জন্যে রেখেছ তো?’…জিজ্ঞাসা করেন একেবারে সন্ধ্যে বেলা, ‘ছেলেদের পায়েস দিয়েছিলে তো বৌমা মনে ক’রে? তোমার যা আবার ভুলো মন।’

আগে আগে, নতুন নতুন ভয়ে ভয়ে চুপ ক’রে থাকত, হুঁ-হাঁ বিশেষ করত না। এখন আর রেয়াৎ করে না, কট্‌ট্ ক’রে শুনিয়ে দেয়, ‘কী আমার এত ভুলো মন দেখছেন মা রোজ রোজ। কী এমন জিনিস আমি আপনার ছেলেদের না দিয়ে পরে নিজে বসে দশহাতে খাচ্ছি!…একপো দেড়পো দুধ ছিল, তা তো আপনিও দেখেছেন–তাতে কত পায়েস হবে যে সবাইকে বেটে দোব? যেটুকু হয়েছিল বাটিসুদ্ধু আপনাকেই তো ধরে দিলুম। আর আসবে কোত্থেকে।

‘ওমা তাই নাকি। তা তো জানি না।’ শাশুড়ী অপ্রস্তুতভাবে বলেন, ‘তা তাহলে আমাকেই বা ধরে দাও কেন বৌমা অমনভাবে? সবাইকে বঞ্চেসঞ্চে নিজে খাব–এমন নোলা আমার নয় বৌমা। আগে ছেলেরা আমার–তারপর তো নিজে!… আমি কি আর অতশত হিসেবে ক’রে রাখতে পারি বাছা–শোকাতাপা মানুষ, তার ওপর চিরকাল রোগে ভুগছি, আমার মাথায় কি আছে। বলে মানুষের মতো চলে-ফিরে বেড়াচ্ছি যে এই ঢের! না বৌমা, কাজটা ভাল করো নি বাছা!’

বলেন কিন্তু আবারও যেদিন পায়েস তাঁর সামনে ধরে দেওয়া হয়, আবারও তেমনি নিঃশব্দে খেয়ে নেন, খোঁজ পড়ে আবার সেই বিকেলের দিকে কিংবা তার পরের দিন। একবার ইচ্ছে ক’রেই স্বর্ণ সন্ধ্যেবেলা এইরকম কথা শোনার পর পরের দিনই একটু পায়েস করে দিয়েছিল, বলতে গেলে শিশুদের ভাগ কমিয়েই–কিন্তু সেদিনও কোন প্রশ্ন করা কথা মনে পড়ে নি তাঁর। তবে সেদিন আর বিকেলেও কোন কথা উত্থাপন করেন নি, বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন।

অবশ্য এমন অনেক জিনিসই এ সংসারে শুধু ওঁর জন্যে আসে বা রান্না হয়। সকালে আহ্নিক ক’রে উঠে একটু ফল আর মিষ্টি খাওয়া অভ্যেস নাকি ওঁর চিরদিনের! যে দুটি ক’রে সন্দেশ কি রসগোল্লা আসে প্রত্যহ–তার বেশি আনবার ক্ষমতা নেই এদের– সেগুলো খাওয়ার সময় কিন্তু নাতিনাতনীদের কথা একবারও মনে পড়ে না। ফল, শরবৎ, মিষ্টি–পূজোর নৈবিদ্যির মতো পরিপাটি ঠাঁই ক’রে সাজিয়ে দিতে হয় তাঁকে। শুধু দয়া করে বিকেলটাতেই কিছু খান না, সন্ধ্যেবেলা আহ্নিক ক’রে উঠে শুধু এক কাপ চা-ই খান। আবার কিন্তু রাত্রিবেলা ষোড়শোপচার আছে। আটখানা ফুলকো লুচি, অন্তত দু-রকম ভাজা–একটু আলুচচ্চড়ি। তাও করে রেখে দিলে চলবে না। যখন খাবেন তখনই গরম গরম ভেজে দিতে হবে। শুধু লুচিই যে গরম চাই তা নয়, বেগুন পটল ভাজাও তখন তখনই ভেজে দিতে হবে, ‘ঠাণ্ডা হ’লে ওর আর কি সোয়াদ থাকে বৌমা! সে তো অখাদ্যি! খাওয়ার কোন বাঁধা সময়ও নেই, কোনদিন রাত নটায় বলবেন খোলা চাপাতে, কোনদিন বা সাড়ে দশটায়। সব খাওয়া-দাওয়া চুকে গেলেও ও’র জন্যে চুপ ক’রে বসে থাকতে হবে, কখন মর্জি হবে বলবেন, ‘বৌমা কি ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বাছা!… কী দেবে দাও এবার, যা হয় কিছু গালে ফেলে শুয়ে পড়ি। বসে বসে ঢুলুনি আসছে!’ বসে যে আছেন সে যেন স্বর্ণরই দোষ। অনেক আগেই ওঁকে শুইয়ে দিতে পারলে স্বর্ণ বাঁচে। ওঁর খাওয়ার আগে তার খাওয়া সম্ভব নয়–যদিও শাশুড়ী মাঝে মাঝে বলেন, ‘তুমি এত রাত অবধি বসে থাক কেন বৌমা, বালস্পোয়াতী–তুমি তো পাট চুকিয়ে নিলেই পারো।’ কিন্তু সে জানে যে ওঁর উপদেশ শুনলে উনিই বাঁকা বাঁকা এতটি কথা শোনাবেন! আরও অনেক শোনাবে। এ ঝাড়কে চিনতে বাকি নেই তার। একদিন দুপুরবেলা থাকতে না পেরে খেয়ে নিয়েছিল–তা জেনে হরেন বলেছিল, ‘খাও তো লুকিয়ে খেও, মার খাওয়া হয়ে গেলে আর একবার লোক-দেখানো সদুরেও খেতে বসো।…নইলে শাশুড়ীর আগে বোয়ের খেয়ে নিলে বড় নিন্দে হয়।’

ফলে এক একদিন স্বর্ণর খেয়ে হাঁড়ি হেঁশেল তুলে ঘরে ঢুকতে রাত বারোটা বেজে যায়। ক্লান্তিতে সমস্ত শরীর ভেঙে পড়ে একেবারে, হাত-পা যেন কুকুরে চিবুতে থাকে! তবু তখনই কি ছুটি আছে, কোন্‌টা কি অকর্ম করেছে, কোনটাকে সোজা করে শোওয়াতে হবে–কাকে দুধ খাওয়ানো বাকি এসব সেরে তবে শোওয়া। তখন আছেন স্বামী। যত রাত্রেই আসুক, হরেনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। হরেন ভালবাসে ওকে ঠিকই–একটু বেশি ভালবাসে। আর একটু কম বাসলেই যেন বাঁচত স্বর্ণ। বছর বছর আঁতুড় ঘরে ঢোকা–এ যেন ভাল লাগে না ওর। এদিক দিয়ে সে মা কাকী সকলকে টেক্কা দিয়েছে। তারা কেউই বছর বিয়োনী ছিল না। ওর বছর বছর। ফলে ছেলেমেয়েগুলোর স্বাস্থ্য ভাল না, এরই মধ্যে একটা গেছে। আবার সেজন্যে দোষী হয় স্বর্ণই–হরেন বলে, ‘কই এত তো আছে আমার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়স্বজন–এমন কাণ্ড তো কারও দেখি নি!’ কাণ্ডটা যে হরেন ইচ্ছে করলেই বন্ধ করতে পারে, সে কথাটা ঠোঁটের ডগায় এলেও মুখ ফুটে বলতে পরে না স্বর্ণ। ছিঃ, এসব কি পুরুষের সঙ্গে বলবার মতো কথা! কী ভাববে মানুষটা। এমনিই তো, একটু চেঁচিয়ে কথা বলার অভ্যাস হয়ে গেছে বাপের বাড়িতে–এখন আর খুব গলা নামাতে পারে না, সেজন্যে বেহায়া দুর্নাম রটেছে। শাশুড়ী হেসেই বলেন, কিন্তু কথাগুলো গায়ে বেঁধে ঠিকই। বলেন, বৌমা আমার বাপের বংশের এক মেয়ে তো–একটু আদুরে হয়ে গেছেন–ঝিউড়ী বেলার অভ্যেসটা ছাড়তে পরেন না, শ্বশুরবাড়ি যে গলা খাটো করতে হয়, সেটা একেবারেই মনে থাকে না। তবে তাও বলি–ও ছেলে-মানুষ, তাঁদেরই একটু হুঁশ রাখা উচিত ছিল। মেয়ে একদিন পরের বাড়ি যাবে জানতেন তো তাঁরা! আমাদের বাড়ি বলে তাই–ও আমার মেয়ের মতোই থাকে–বাড়িতে আলশোলও বিশেষ কেউ নেই–নইলে খোয়ার হ’ত এর জন্যে!

মুখে ‘পারব না’ বললেও শেষ পর্যন্ত হরেনই গিয়ে মার কাছে কথাটা পাড়ল। তিনি সব শুনে মুখটা বিরস ক’রে বললেন, ‘এসব আর আমাকে বলতে এসেছে কেন বাছা। তোমরাই এখন কর্তাগিন্নী এ বাড়ির, যা ভাল বুঝবে তাই করবে। আমি তো মনিষ্যির বার, আমি যখন কিছু পারব না–তখন বলবই বা কি বলো! ব্যবস্থা ক’রে পাঠাতে পার পাঠাও সত্যিই তো, ছেলেমানুষ বাপের বাড়ি যেতে পায় না ––বাপের শরীর খারাপ, পাঠানো উচিত। কিন্তু এদিকেই বা করে কে! আমার এক পোড়া শরীর-একটু আগুন-তাত সয় না, করতে গেলেও বিপুয্যেয়ে কাণ্ড হবে, সে ভুগতে হবে তোমাদেরই।..আর কে আসবে তাও তো জানি না। এক তো বছর বছর তোমার বোয়ের আঁতুড়-ঘরে ঢোকা আছে–সে সময় একে ওকে তাকে পায়ে ধরে আনতে হয়, তাতেই বিরক্ত হয় সবাই। আবার সুখসোমন্দা কি আসতে চাইবে কেউ?’

একটু চুপ ক’রে থেকে আবার বললেন, ‘আমার সর্বনাশ ক’রে দিয়ে গেছেন যে তোমাদের গুষ্টি। মোটা মাইনের চাকরি করতেন–ভেবেছিলেন চার কাল বাঁচবেন আর এমনি আদরে রাখতে পারবেন। একটু যদি কোনদিন শখ ক’রে তাঁর জন্যে কিছু রাঁধতে যেতুম তো মহামারী কাণ্ড বাধাতেন একেবারে। কী সমাচার, না তোমার শরীর খারাপ, উনুনশালে গেলে আধকপালে ধরে–তুমি এ বাহাদুরী করতে যাও কেন! তারপর ঠেলা সামলাবে কে, ম্যাও ধরতে গেলেই তো সেই আমাকেই ধরতে হবে।…আর কেনই বা–এত সাতগুষ্টি বসিয়ে খাওয়াচ্ছি, তারা পারে না? …. তা কথাটাও সত্যি, তখন তো তোর পিসী-খুড়ির দল কম ছিল না এ বাড়িতে। বসিয়ে খাওয়াতেন আবার জনা-জাত হাতখরচা ব্যবস্থা ছিল। কম কি উড়িয়েছেন ঐ ক’রে। ফল কি হ’ল–নিজে নবাবী করে চলে গেলেন, আমাকেই পথে বসিয়ে গেলেন। একপয়সা রেখে যেতে পারলেন না– অব্যেসটি খারাপ ক’রে দিয়ে গেলেন। এমন মুখ ক’রে দিয়ে গেছেন যে যা-তা কিছু গলা দিয়ে ওলে না!’…

দীর্ঘ বক্তৃতার পর তিনি চুপ ক’রে গেলেন একেবারেই। প্রশ্নটার কোন মীমাংসাই হ’ল না। হরেনও খানিকটা চুপ করে বসে থেকে থেকে উঠে এল। কাছাকাছির মধ্যে আছে এক ওর খুড়তুতো বোন নন্দ–তা সে এই সেদিন আঁতুড় তুলে গেছে একমাস থেকে, আবার তাকে আনতে গেলে সে কি আসবে! তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরাই বা বলবে কি?

কথাটা চাপা পড়ে যায় একেবারেই। তুলতে যাওয়া বৃথা বলেই স্বর্ণও আর তোলে না। কথা তুললে ব্যবস্থাটা বাতলে দিতে হবে ওকেই। সে ব্যবস্থা কিছু খুঁজেও পায় না। এঁরা রাঁধুনীর হাতে নাকি খেতে পারেন না। খাবেন কি–কোন্ রাঁধুনী এত নানান্-খানা তোয়াজের রান্না ক’রে খাওয়াবে সারাদিন ধরে? করলেও মাইনে হাঁকবে কত। সুশীলা ঠাকুঝির মুখে শুনেছে যে সে চেষ্টা বার কতক ক’রে দেখেছেন, কোন বানীই টেঁকে নি। এক উড়ে ঠাকুরও রেখেছিলেন, সে চুরি ক’রে ভুষ্টিনাশ ক’রে দিয়েছিল একেবারে–দুদিনে একমাসের উনো শেষ ক’রে দিয়েছিল। তাকে ছাড়াতে পথ পান নি এঁরা…

সুতরাং যাওয়া হ’ল না। একদিনের জন্যে যাওয়া যেত হয়ত কিন্তু তাতে লাভ নেই বলেই গেল না স্বর্ণলতা। শুধু শুধু মনখারাপ করতে যাওয়া। তার চেয়ে এই হাঁড়িবেড়ির মধ্যেই জীবনটা যখন কাটাতে হবে তখন এই নিয়ে ভুলে থাকাই ভাল।

তাই ভুলতেই চেষ্টা করে। থাকেও ভুলে–শুধু সকালের খাওয়া চুকে গেলে, ছেলেমেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নির্জন দুপুরে–কিংবা রাত্রে সকলের খাওয়াদাওয়া চুকে গেলে শাশুড়ির মর্জির জন্য অপেক্ষা করতে করতে অন্ধকারে বসে আর সামলাতে পারে না নিজেকে। আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। দেবতার মতো বাপ তার, সর্বংসহ। কাউকে কিছু বলবে না, কোনদিন কোন অন্যায়ের কোন প্রতিবাদ করবে না–নিঃশব্দে মুখ বুজে সব সহ্য ক’রে তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করবে! আর হয়ত দেখাই হবে না এ জন্মে–কে জানে! অত আদরের এক মেয়ে তাঁর–তবু সে কিছুই করতে পারল না, কাছে গিয়ে একটু সান্ত্বনা দেওয়া তাও হয়ে উঠল না!…

এক এক সময়ে আর থাকতে পারে না–প্রাণ ভরে গালাগাল দেয় শাশুড়ীকে, ‘মর, মর! ওলাউঠা হোক তোর। ঐ নোলা চিরকালের জন্যে ঘুচে যাক!…. গলা দিয়ে যা-তা নামে না! আ মর্–আমি যখন আঁতুড়ে থাকি মেয়েরা ভাইঝি দেওর-ঝিরা এসে যখন থাকে তখন কে অমন ষোড়শোপচারে ক’রে দেয় শুনি, সে তো তখন যা দেয় তাই সোনা- হেন মুখ ক’রে উঠে যায় গপাগপ্। আবার সে কি সুখ্যেত!

আসলে গতর নেই যে গতরখাগীর! তাই তখন যা পায় তাই ভাল বলতে হয়। যত টাইস আমার ওপর। আমারই নিকড়ে গতর পেয়েছে খুব। আঁতুর ওঠার পর আর একদিনও তর্ সয় না, গঙ্গা চান করিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অমনি হেঁশেলে জুতে দেবে!.. রক্ত শুষে খেয়ে নিলে আমার, ডাইনী কোথাকার!’

এক একদিন এই সময় ওর অরুণদার কথাও মনে পড়ে যায়। মনটা হু হু ক’রে ওঠে। মুখচোরা লাজুক মানুষ–কোথায় যে গেল, দুবেলা দুমুঠো ভাত জুটছে কি না জুটছে। কী যে মতি হ’ল, কী করতে গেল অমন ক’রে। যদি থাকত তো আজ তিনটে না হোক আরও দুটো পাস দিয়ে ভাল চাকরি পেয়ে যেতে পারত। এখানে না থাকলেও, স্বর্ণ বললে ছুটে এসে দেখত সে।

আহা, কোথায় আছে সে–ঠিকানাটাও যদি জানত!

॥২।।

তবে অরুণের খবর মধ্যে একজন পেয়েছিল। তার সঙ্গে একদিন দৈবাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল ঐন্দ্রিলার। কিন্তু সে এমন একটা সময় যে, সে কোথায় থাকে কী করে তা জিজ্ঞাসা করার কথা মনেও পড়ে নি ওর।

এর ভেতর বহু জায়গা ঘুরেছে ঐন্দ্রিলা। ভাল রাঁধতে পারে বলে যেমন তার কাজেরও অভাব হয় না, তেমনি টিক্‌তেও পারে না বেশিদিন কোথাও। প্রধান অন্তরায় তার রূপ; এত বয়সে এত দুঃখকষ্টেও তা এখনও বহ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল–পতঙ্গ মনকে দুর্বার আকর্ষণে টানে। দ্বিতীয় অন্তরায় তার প্রখর রসনা; বলা-মুখ আর চলা-পা নাকি কোনমতেই সংযত করা যায় না–এ প্রবাদ ঐন্দ্রিলার ক্ষেত্রে সার্থক হয়েছে অনেকটাই। চণ্ডাল রাগ তার, একবার মাথা গরম হ’লে আর কোন হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, লঘুগুরু হিসেব থাকে না। অবশ্য মনিবেরা অনেক ক্ষেত্রে সহ্য করেন–বাধ্য হয়ে। লোক চাই বললেই সব সময় লোক মেলে না। কোন কোন বাড়িতে এমন অবস্থা যে, রান্নার লোক ছাড়া এক মিনিটও চলে না। হয়ত বিরাট সংসার, গৃহিণী অসুস্থ, তেমন কোন বয়স্কা মেয়েও নেই–কি বিধবা আত্মীয়-স্বজন–সে সব ক্ষেত্রে অনেকটাই সইতে হয় মুখ বুজে। ঐন্দ্রিলার হাতের রান্না ভাল, কাজকর্ম পরিষ্কার, চেহারা দেখলে ‘ছেদ্দা’ হয়–হাতে খেতে ইচ্ছে করে, বিশেষ চুরি করে না–সেদিক দিয়ে বিবেচনা করার মতো গুণও আছে ঢের। তবু সহ্যেরও সীমা আছে, যারা পয়সা দেবে তারা আর কতটা সইতে পারে!…. সুতরাং কোথাও তিন মাস কোথাও বা চার মাস, এর বেশি টিকতে পারে না ঐন্দ্রিলা। খুব বেশি হ’লে আট মাস। বছর পোরে নি কোথাও।

চাকরি ছাড়া আর নতুন ক’রে পাবার মধ্যের সময়গুলো বেশির ভাগ তাকে মার কাছে এসেই উঠতে হয়। কিন্তু এখন কনক নেই–যেন আরও অসহ্য হয়ে উঠেছে ওখানের আশ্রয়। শ্যামা বরং আজকাল ধরে রাখতেই চান, কারণ তাঁরও আর কেউ নেই। তরু জড়ভরত জন্তুর মতো হয়ে গেছে, চুপ ক’রে বসে থাকে সর্বসা, খেতে দিলে খায় শুইয়ে দিলে শোয়–না দিলে সারা দিনরাতই বসে থাকে ঠায় এক জায়গায়। তার ছেলে বলাইটা হয়েছে শ্যামার এক বোঝা, পোড়া মেয়ে যদি নিজের ছেলেটার দিকেও তাকাত একবার। বুড়ো বয়সে তাঁর এক কী খোয়ার!… কান্তিটাও ফেল করার পর থেকে যেন কী রকম হয়ে গেছে। টো টো ক’রে ঘোরে চাকরির জন্যে–কিন্তু একে ম্যাট্রিক ফেল তায় বদ্ধ কালা–তাকে চাকরি কে দেবে? গোবিন্দ মধ্যে ম্যাপের কাজ শেখাবার জন্য নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেও কিছুদিন পরে ওদের বাবু বিরক্ত হয়ে জবাব দিয়ে দিলেন। কার এত সময় আছে কর্মচারীদের মধ্যে যে হাত-পা নেড়ে ইশারায় কাজ শেখাবে ওকে বসে বসে!

ওদিকেও কিছু হয় না, এদিকেও শ্যামার কাজে লাগে না। অবসর সময়ে বাগান- বাগিচার কাজে কিছু কিছু সাহায্য করে এই মাত্র–ফল-ফসল বিক্রির কাজ বিশেষ ওকে দিয়ে হয় না। শ্যামা আজকাল নিজেই যান বাজারে–ফোড়েদের সঙ্গে দর-দস্তুর ক’রে হয় তাদের ডেকে নিয়ে আসেন, নয়তো, কান্তি থাকলে তাকে দিয়ে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সংসারের উনখুটি-চৌষট্টি কাজ করতে করতে বাগান দেখবারও সময় হয় না, অসুমর কাজ পড়ে থাকে, পাতার পাহাড় জমতে থাকে, কোন কাজটাই হয়ে ওঠে না। ঐন্দ্রিলা এলে আজকাল তাই তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তিনি যেন বেঁচে যান।

কিন্তু ঐন্দ্রিলা টিকতে পারে না। তার পিছটান আছে, নগদ টাকা চাই। মেয়েকে না পাঠালে চলবে না। তাছাড়া খাওয়ার মুখটাও বড় হয়ে গেছে। যারা রাঁধুনী রেখে চালায় তাদের অবস্থা ভাল, খাওয়া-দাওয়াও সেই অনুপাতে ভাল। ঐন্দ্রিলার হাতেই তা তৈরি হয়-সুতরাং নিজের নিরামিষ রান্না একটু তেল-ঘি বেশি দিয়ে ভাল ক’রেই করে। যেখানে বুড়ো বিধবা গিন্নী বা কর্তাদের মধ্যে কেউ নিরামিষ খাবার লোক থাকে সেখানে তো কথাই নেই–নিত্য-নতুন রান্না করে তাদের তাক্ লাগিয়ে দেয়, নিজেরও সুবিধা হয়।… এখানে দিনদিনই যেন খাওয়ার কষ্ট বাড়ছে। ওর দাদা এখানে থাকতেও যে টাকা দিত এখনও সেই টাকাই দিচ্ছে, তবু ক্রমশ কৃপণতা বেড়েই চলেছে শ্যামার। এখন সব দিকেই হাত টান তাঁর। তেল মাসে আধ সের আসে কিনা সন্দেহ। আজকাল আর এত কম তেল- মশলায় রাঁধতে পারে না ঐন্দ্রিলা–সে অভ্যাসটাই চলে গেছে। তাছাড়া এখানে থাকলেই ভূতের খাটুনি, এও আর ভাল লাগে না। সে পালাই-পালাই করে। কোথাও একটা নতুন কাজের সন্ধান পেলেই সরে পড়ে।

না বলেও চলে যায় কখনও কখনও। সে সময়গুলোর শ্যামা ক্ষেপে যান, আবার নতুন করে ছড়া বেঁধে উদ্দেশে গাল দেন মেয়েকে। বলেন, ‘চেপে ধরলেই চিঁ-চিঁ করেন ছেড়ে দিলেই লাফ মারেন! যখন মাথার ওপর চাল থাকে না, পেটে ভাত জোটে না তখন মনে পড়ে মাকে, তারপর একটা কিছু হলেই মার মুখে লাথি মেরে চলে যাবেন। কেন, একটা বেলাও কি আর থাকা যেত না, বলে-কয়ে গেলে কী হ’ত? আমি কি ওর ন্যাজ ধরে ঝুলে পড়তুমনা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতুম!… মুখে আগুন মেয়ের! অমন মেয়ের মুখে জ্যান্তে নুড়ো জ্বেলে দিতে হয়।… ভাত দেবে না আকার ছাই দেবে। আসুক না এবার, ঐ সদর থেকে না যদি দূর দূর ক’রে তাড়িয়ে দিই তো কী বলছি। বলে, যখন তোমার কেউ ছিল না তখন ছিলুম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি। কাজের সময় কাজী কাজ ফুরুলেই পাজী।…. মা ছাড়া তো গতি নেই, ঘুরে-ফিরেই তো আসতে হয় এখানে–এলতলা বেলতলা সেই বুড়ির পাছতলা! তা তার দিকেও তো চাইতে হয় এক-আধবার! জুতো পায়ে থাকে–তবু সে জুতোরও যত্ন করে লোকে। মা-টা মুখের রক্ত তুলে মরে যাচ্ছে তা একবার ভাবে না। যেমন দিন কিনে নেওয়া হয়ে গেল অমনি মার মুখে লাথি। ঝ্যাঁটা মারো এমন সব সন্তানের মুখে। কী ঝাড়ে জন্ম সব, ঝাড় দেখতে হবে তো! উচিত ছিল আঁতুড়ে নুন দিয়ে মেরে ফেলা। হাত্তোর ভাল হোক রে!

বলেন–কিন্তু আবার যখন আসে–দূর দূর ক’রে তাড়াতেও পারে না। ওরই দুঃসময়ে শুধু নয়–তাঁরও বড় দুঃসময়ে আসে যে!

এমনি ক’রে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় খড়গপুরে রেলের এক অফিসারের বাড়ি কাজ মিলেছিল। সে ভদ্রলোকের স্ত্রী রুগ্ন, কঠিন রোগে শয্যাশায়ী, হয়ত কোনদিন আর ভাল হবে না। তার ওপর পাঁচ-ছটি ছেলে-মেয়ে, নেহাৎই ছোট ছোট, বড়টিরই বয়স আট নয় হবে। খুবই বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল ঐন্দ্রিলা, ওঁর ভগ্নীপতি ঐন্দ্রিলাকে জানতেন, তাঁর কোন্ আত্মীয়ের বাড়ি দেখেছেন ওকে, খোঁজ-খবর ক’রে আনিয়ে দিয়েছিলেন। ঐন্দ্রিলারও সে সময় চরম দুরবস্থা। দু মাস মেয়েকে টাকা পাঠাতে পারে নি। সে এক নজরে অবস্থাটা দেখে নিয়ে নিজে থেকেই প্রস্তাব করল যে–রান্না ছাড়াও ছেলে-মেয়েদের নাওয়ানো- খাওয়ানো, স্ত্রীর পরিচর্যা সব করবে সে–মাইনে বেশি চাই এবং এক মাসের মাইনে আগাম চাই। ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে স্বর্গ পেলেন একবারে। তিনি নিজে থেকেই ত্রিশ টাকা মাইনে বললেন; তা ছাড়া একাদশীতে চার আনা ক’রে নগদা পয়সা। পান-সুপুরী যা চায় সব পাবে। বছরে চারখানা কাপড়। ত্রিশ টাকা তখনই বার করে দিলেন। তাও– নোংরা কাজ কিছু করতে হবে না–সেটা এক জমাদারের বৌয়ের সঙ্গে ব্যবস্থা করা আছে, সে সকালে দুপুরে সন্ধ্যেয় তিনবার ক’রে আসে–সন্ধ্যার সময় এসে থাকেও অনেকক্ষণ। তবে ঐ বাঁধা সময় ছাড়াও যদি কখনও এক-আধবার দরকার হয়, তখন হয়ত করতেই হবে। ভদ্রলোক নিজে বাড়ি থাকতে থাকতে সে রকম দরকার হ’লে তিনিই ক’রে নেবেন–তাও জানিয়ে দিলেন।

ঐন্দ্রিলার ভাল লেগেছিল জায়গাটা। মেয়েটি বড় শান্ত, এমনভাবে সবাইকে বিব্রত করার জন্যে যেন নিজেকে সকলের কাছে অপরাধী মনে করত সর্বদা, চোরের মতোই থাকত। ছেলে-মেয়েগুলো খুব দুর্দান্ত নয়–সহজেই সামলানো যেত। কিছুদিন যাবার পর ঐন্দ্রিলার স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পড়াতেও খুব ক্ষতি হয় নি–ভদ্রলোক, ছেলেমেয়েদের যত্ন হচ্ছে এবং নিজেও সময়ে ভাত-জল পাচ্ছেন দেখে ওর মেজাজ হাসিমুখেই সহ্য করতেন। বৌকে বলতেন, ‘ওসব তুমি গায়ে মেখো না। গিন্নীবান্নীর মতো বাড়িতে আছেন, একটু আধটু বকাঝকা করবেন বইকি। তোমার ননদ ছিল না. মনে করো যে বড় বিধবা ননদ এসে আছেন একজন। সংসারটার চার চালের ভার তুলে নিয়েছেন সেটা তো কম কথা নয়! যে গরু দুধ দেয় তার চাট সহ্য করতেই হবে–উপায় কি বলো!

কিন্তু তিন মাস না কাটতেই হঠাৎ একদিন খবর এল সীতা বিধবা হয়েছে। সীতার বড় সতীন-পো চিঠি দিয়েছে জামাই মরবারও তিন-চার দিন পরে। চিঠি পৌঁছতেও দু-দিন চলে গেছে–অর্থাৎ আর দিন তিনেক পরেই কাজ।

এ খবরের পর আর ঐন্দ্রিলার জ্ঞান থাকবার কথা নয়। রইলও না। বিচার-বিবেচনা মুহূর্তে তলিয়ে গেল। চিঠি যখন পৌঁছল তখন বেলা দশটা। ঐন্দ্রিলা বললে, ‘আমি এখুনি যাব সেখানে। ইস্টিশানে যাই–প্রথম যে গাড়ি পাব তাতেই চলে যাব।’

সেদিনই ভদ্রলোকের বড় সাহেব আসবেন, তাঁর সঙ্গে লাইনে বেরোবার কথা– কোনমতেই কামাই করা চলবে না। এদিকে শয্যাশায়ী স্ত্রী ও অসহায় কটা শিশু। তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন একেবারে। মিনতি করে বললেন, ‘আপনি এ বেলাটা অন্তত থাকুন, দেখছেনই তো এই আতান্তর–কে কার মুখে জল দেয় তার ঠিক নেই। আমি আজকের দিনটা সামলে নিই–কাল পরশু কামাই করলে অতটা ক্ষতি হবে না। না হয় সিক-রিপোর্ট ক’রে তিন-চার দিনই ছুটি নেব। এখন আপনাকে ছাড়ি কি ক’রে? আর যা হবার তা তো হয়েই গেছে–আপনার পক্ষে আজ যাওয়াও যা কাল যাওয়াও তা। কাল ভোরের ট্রেনেই যাবেন বরং আমি নিজে গিয়ে তুলে দিয়ে আসব। কিম্বা আজ রাত্রের কোন প্যাসেঞ্জার ধরবেন, ভোরে হাওড়া পৌঁছে যাবেন, বেলা নটা-দশটার মধ্যে মেয়ের বাড়ি পৌঁছতে পারবেন।’

কিন্তু সে সব কোন কথাই শুনল না ঐন্দ্রিলা, তার তখন পাগলের মতো অবস্থা। কাঁদতে কাঁদতে তখনই বেরিয়ে গেল–ছেলে-মেয়েগুলোর, অসুস্থ বৌটার পর্যন্ত খাওয়া হয় নি তখনও। দুশ্চিন্তায় ভদ্রলোকের চোখে জল এসে পড়েছিল–শেষে বৌটিই বুদ্ধি দিলে, পাশের কোয়ার্টারের মাদ্রাজী অফিসারটির স্ত্রীকে সব জানিয়ে মিনতি করতে তিনি তখনই এ বাড়িতে চলে এলেন এবং আশ্বাস দিলেন যে ভদ্রলোক না ফেরা পর্যন্ত তিনি এখানেই থাকবেন। রাত্রের ডাল-ভাত তাঁর বাড়িতেই হবে–ভদ্রলোক যেন কিছু না ভাবেন–। একটা লোকও তিনি তিন-চার দিনের মধ্যে যোগাড় করে দিতে পারবেন- এমন আশ্বাসও দিলেন।

.

ওখানে শ্রাদ্ধ-শান্তির পর ঐন্দ্রিলা মেয়েকে ও নাতিকে নিয়ে যাবে, মনে মনে ঠিক ক’রেই রেখেছিল। সেইটেই সহজ ও স্বাভাবিক পন্থা বলে মনে হয়েছিল ওর। এমন কি সীতার পক্ষে অন্য কিছু ভাবা যে সম্ভব তা-ই মাথায় আসে নি ওর।

সেইভাবেই সে কথাটা তুলেছিল। একেবারে এখানকার পাট উঠিয়ে চলে যাবার কথা।

কিন্তু সীতা রাজি হ’ল না। সে এখনও, বাইরের আচরণে, তেমনি শান্ত ও ভালমানুষ আছে, কিন্তু তার ভেতরের কাদার তালটা যে শুকিয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে, তাকে দিয়ে আর যে কেউ যা-খুশি করাতে পারবে না–সে খবরটা ঐন্দ্রিলা জানত না। ঐন্দ্রিলা কেন অনেকেই সে সম্বন্ধে সচেতন ছিল না। সীতার বয়স আজও খুবই কম–তার যে কোন পুত্রবধূর থেকেই বয়সে ছোট সে–কিন্তু গত কবছরের চরম দুঃখ ও মর্মান্তিক আঘাত তাকে ভেতরে ভেতরে বেশ খানিকটা বয়স্ক করে দিয়েছে। ও বয়সের অন্য মেয়ের থেকে ঢের বেশি পরিণতবুদ্ধি হয়ে উঠেছে সে। যে সব প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে তার জীবন কেটেছে–তাতে এক এক বছরে বহু বছরের অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে। এখন সে অনেক কিছুই তলিয়ে ভাবতে শিখেছে। আর একটা ধারণা তার মনে দৃঢ়মূল হয়েছে যে তার জীবনের ভার তাকেই বইতে হবে–অন্য কারও ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। সে মার প্রস্তাবের উত্তরে একান্ত অনুত্তেজিত ও নির্বিকার কণ্ঠে শুধু প্রশ্ন করল, ‘তারপর?’

ঐন্দ্রিলা বুঝতে পারল না, থতমত খেয়ে গেল কেমন। সেও ভ্রূ কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তারপর কি আবার?’

‘মানে তোমার সঙ্গে যাব কোথায়? তোমার মনিব-বাড়ি?’

‘না না, সেখানে যাবি কি? তা নয়–। কেন, তোর বাপের বাড়ি? কাকাদের কাছে যাবি। এখন তো জোর করে যাবি। তারাই তো জেনে-শুনে এই সর্বনাশ করলে তোর– এখন এ দায় অপরে কেন বইবে। তাদেরই ঘাড়ে গিয়ে চাপগে যা, যেমনকে তেমনি!’

‘হ্যাঁ, এই গুঁড়োটুকু–আমার জীবনের শেষ ভরসা, তারপর তাকেও নিকেশ করুক। ওরা সব পারে। যারা এ কাজ করেছে তাদের অসাধ্য কি আছে বলো। …না, আর তাদের মুখ দেখতে পারব না আমি, হয়ত হিতাহিত জ্ঞান থাকবে না, কী করতে কি করে বসব। আমি জেনে রেখেছি যে আমার কেউ কোত্থাও নেই, সে-ই ভাল। তা ছাড়া তারা তো সব ভেন্ন হয়ে গেছে, কার ঘাড়ে গিয়ে চাপব, কেই বা ঘাড়ে করবে। তারা কি অত সহজে ঘাড় পাতবার লোক?’

একটু চুপ করে রইল ঐন্দ্রিলা। নিয়ে যেতে হবে এই কথাটাই মনে বড় হয়ে ছিল, কোথায় নিয়ে যেতে হবে তা বোধ হয় ভাল করে ভাবে নি।…খানিকটা পরে বললে, ‘তাহলে দিদিমার কাছেই চল্, তারও লোকের দরকার। এ বয়সে দুটো ভাত রেঁধে দেয় এমন লোক নেই, সে ফেলবে না।’

‘না মা, সে আমি যাব না।’ সীতা তেমনি শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে, ‘সেখানেও গতর খাঁটিয়ে ঝি-গিরি করতে হবে–হয়ত এখানেও তাই। তবু এ আমার স্বামী-শ্বশুরের ভিটে, খানিকটা জোর আছেই, এখানে ঝিগিরি করাও সম্মানের। তা ছাড়া যদি বনিয়ে মন যুগিয়ে চলতে পারি–শেষ পর্যন্ত হয়ত ছেলেটাকে দেখবে ওরা। হাজার হোক–ওদেরই ভাই, ওদেরই কাকা। দিদিমার ওখানে গেলে দুবেলা দুমুঠো ভাত জুটবে হয়ত–তার বেশি কিছু না। ছেলে মানুষ হবে না। দিদিমা যে পয়সা খরচ করে লেখাপড়া শেখাবে তা মনে হয় না। অথচ একবার বেরোলে আর এ বাড়ি ঢুকতে পারবো না, চিরদিনের মতো এ আশ্ৰয়টাও যাবে।’

‘তা বলে এখানে এই বাঁদীর বাঁদী হয়ে থাকবি?’

‘তাই তো ছিলুম মা এতকাল। এই গত ক বছরই তো তাই আছি। যে কপাল নিয়ে জন্মেছি সে কপাল আমার সঙ্গেই যাবে, যেখানেই যাই না কেন। গেল জন্মে সারাজিবন ধরেই বোধহয় পাপ করে গেছি, তাই এ জন্মে মায়ের পেট থেকে পড়া ইস্তক শুরু হয়েছে তার শাস্তিভোগ। সে পাপের দেনা শোধ হয়ে যাওয়াই ভাল–আর পরের জন্মের জন্যে না কিছু তোলা থাকে।’

ঐন্দ্রিলা একটু অবাক হয়ে তাকায় মেয়ের মুখের দিকে। গত ক বছরে অনেকবারই আসা-যাওয়া করেছে, কিন্তু কোথা দিয়ে কেমন করে তার এতটা পরিবর্তন হয়েছে তা কৈ লক্ষ করে নি তো! আশ্চর্য, এ কোন্ সীতা! এ আবার কবে জন্মাল!…দারুণ একটা বিস্ময় বোধ হতে লাগল ঐন্দ্রিলার।

সীতার মুখে কোন রকমের উত্তেজনার ভাব নেই। খুব একটা দুঃখেরও না। বৈধব্যের যে করুণ অসহায় ভাব থাকে সদ্যোবিধবাদের মুখে–সেটাও নেই। আর কারণ বৈধব্যটা আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত নয়, গত দু বছর ধরেই জামাই শয্যাগত ছিলেন। প্রতিদিনই বলতে গেলে মৃত্যুর সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁর। ঐন্দ্রিলাও তা জানত, তাই সংবাদটার অভাবনীয়তায় কোন আঘাত সে পায় নি–কিন্তু দুঃখ তো হবেই। সীতার মুখে সেটুকুও যেন নেই।

কোনদিনই ছিল না অবশ্য। ভীতু ভীতু–বোবা রকমের শান্ত নম্রতা নিয়েই যেন জন্মেছে সে। তবু–। এ যেন অন্য এক রকমের অবিচল স্থৈর্য, এর সঙ্গে ঐন্দ্রিলার আগে যেন কোন পরিচয় ছিল না। আরও একটু লক্ষ করে দেখল অপরিচয়ের অন্য কারণও আছে। সেই ভীতু অসহায় ভাবটাও কবে যেন সীতার মুখ থেকে অন্তর্হিত হয়েছে, তার ভাবলেশহীন মুখে কোথায় যেন একটা দৃঢ়তা ফুটে উঠেছে সে জায়গায়, কোন বিশেষ রেখা বা ভঙ্গিতে তা ধরা যায় না–কিন্তু অনুভব করা যায়।

মেয়ের এই নতুন চেহারার সামনে ঐন্দ্রিলা কেমন একটু কুণ্ঠিত হয়ে পড়ে। খানিকটা পরে, একটু সঙ্কোচের সঙ্গেই যেন বলে, ‘জামালপুরে যাবি? বৌদির কাছে?’

‘আমি কোথাও যাব না মা। এইখানেই পড়ে থাকব। পৃথিবীতে এই একটি জায়গাতেই তবু আমার একটু অধিকার আছে, আইনত না হোক ন্যায়ত ধর্মত। অন্য যে জায়গাতেই যাব–সেখান আমায় ভিখারী হয়ে যেতে হবে। আর তাতে দরকার নেই। বলে, এখানেও ঘাস-জল সেখানেও ঘাস-জল। আমার অদৃষ্টে ঘাস-জলে বেশি জুটবে না তা জানি মিছিমিছি এখান ছাড়ি কেন! এদের তবু এতদিনে ভাগ দেবার ভয়টা ঘুচেছে, বুঝেছে, আমি কোনদিই ওদের সঙ্গে মামলা-মকদ্দমা করব না–সংসারে আছি খাটছি-খুটছি–ওদের সুবিধেই হচ্ছে। এখন অনেকটা ভাল ব্যবহার করে। এ-ই আমার ভাল। যদি কোনদিন তাড়িয়ে দেয়, তখন অন্য জায়গায় যাব। যেখানেই যাই গতর খাঁটিয়ে খেতে হবে–অমনি বসিয়ে কেউ খাওয়াবে? না কেউ লেখাপড়া শেখাবে পয়সা খরচ করে? একটা পাস দিতে পারলে আমিও চাকরি করে খেতে পারি, আজকাল শহরে অনেক মেয়েই করছে শুনছি। কিন্তু সে তো পাঁচ-ছ বছরের ফের–এতদিন টানবে কে?’

‘তা তুই না হয় দাদার কাছে যা। আমি যা পারি পাঠাব–তাতে তোর পড়ার খরচ হবে না?’

‘না, না, সে বাংলাদেশ নয়, কোথায় ইস্কুল কোথায় মাস্টার–সেখানে হবে না। তোমারও চাকরির ঠিক নেই। এমনিই–ছেলেটাকে যদি লেখাপড়া শেখাতে হয় সেও খরচ আছে। তুমি আর কত টানবে! তুমি ফিরে যাও, তাঁদের আতান্তরে ফেলে চলে এসেছ শুনছি। কালই বরং চলে যাও!’

অগত্যা ঐন্দ্রিলাকে একাই ফিরে আসতে হ’ল। কিন্তু খড়গপুরে পৌঁছে দেখল যে তাঁরা কোয়ার্টারে কেউ নেই। শুনল যে ভদ্রলোক এখানে কোনমতে লোক ঠিক করতে না পেরে একেবারে মাস-দুয়েকের টানা ছুটি নিয়ে দেশে চলে গেছেন, সম্ভবত সেখানেই কোন একটা বন্দোবস্ত করে ওদের রেখে আসবেন। উনি একা থাকলে ওঁর ট্রলির ঠেলাওয়ালারাই কেউ রেঁধে দিতে পারে–কিম্বা কোন মেসেও খেতে পারেন। সেই রকমই একটা কিছু করে নেবেন।

এইবার ঐন্দ্রিলার চোখে অন্ধকার দেখার পালা।

টাকা এঁদের কাছে কিছু পাওনা ছিল না, বরাবরই আগাম আগাম নিচ্ছিল ঐন্দ্রিলা। বিশেষ কিছু হাতেও ছিল না, যা ছিল যাবার সময়ে গাড়িভাড়াতেই চলে গেছে। আসবার গাড়িভাড়া সীতার বড় সতীনপোর কাছ থেকে ধার করে এসেছে, এখানে এসেই পাঠিয়ে দেবার কথা। ওর মনে মনে বল ছিল যে যদিও এঁরা নতুন লোক রেখে থাকেন, সে লোক ঐন্দ্রিলার মতো কিছুতেই আপন ক’রে টেনে কাজ করবে না–ও ফিরে এসে নিজের কাজ পাবেই। নিতান্ত না পায়–এঁদের বাসায় থেকে এখানেই কোথাও কাজ জুটিয়ে নিতে পারবে। ভদ্রলোকই বলে দিতে পারবেন কোথাও না কোথাও। ঠিক এ অবস্থা হবে তা একবারও ভাবে নি।

সেই অস্নাত অভুক্ত অবস্থাতেই কাছাকাছি কটা কোয়ার্টারে ঘুরল ঐন্দ্রিলা–কাজের চেষ্টায়। আশ-পাশে বেশি মাইনের লোক যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশই মাদ্রাজী–তেলেঙ্গিনী। ও তাঁদের কথাও বোঝে না, তাঁরা যদি-বা বোঝেন–বাঙালি রাঁধুনী নিয়ে তাঁরা কী করবেন? তাঁদের লোক বিশেষ দরকারও হয় না। বাঙালিরা অনেকেই অফিসের বেয়ারা কুলী দিয়ে কাজ সারেন, তাদের শুধু খোরাকী দিলেই চলে। দু-একজনের বাড়ি ঠাকুর থাকে–সে সব বেশির ভাগ জায়গাতেই পুরনো লোক আছে তাদের তাড়িয়ে রাখার কথাই ওঠে না। এক জায়গায় দরকার ছিল, তা সেখানকার গৃহিণী স্পষ্টই বললেন, ‘তুমি মিছিমিছি এখানে ঘুরছ গো বাছা বামুন-মেয়ে, অজানা অচেনা মানুষকে তো হুট করে কেউ কাজ দেবে না, আর যারা চেনে তারা তোমাকে রাখবে কোন্ ভরসায় বলো? তুমি যে অবস্থায় বোসবাবুদের ফেলে চলে গিয়েছিলে–সে কথা কি কারুর শুনতে বাকি আছে? জেনে শুনে তোমার মতো নির্মায়িক লোককে কেউ রাখবে না!…ঐ কি একটা মানুষের মতো কাজ হয়েছিল! মানুষের চামড়া গায়ে থাকলে কেউ পারে!’

অপমানে মুখ রাঙা হয়ে উঠলেও বিনীত করুণভাবে বলবার চেষ্টা করে ঐন্দ্রিলা, ‘কিন্তু কী অবস্থায় গেছি তাও তো শুনেছেন দিদি, আপনার মেয়ের যদি ঐ খবর আসত–’

‘ষাট ষাট! আমার মেয়ের ও খবর আসবেই বা কেন! কী এমন মহাপাপ করেছি আমি!…ই কী কথার ছিরি তোমার বাছা! ও খবর আমার শত্তুরের আসুক। আর যারা তিন পুরুষের রাঁড়ী তাদের আসুক।…তবে অবস্থা যাই হোক বাছা, যারা মনিব যাদের অন্ন খাচ্ছ, তাদের অবস্থাটাও ভাবতে হয় একটু, ভাবা দরকার। এ তো মরণাপন্ন অবস্থার খবর নয় যে ছুটে গেলে শেষ দেখাটা হবে বলে, ছুটে গেছ–হস্বিদিঘি জ্ঞান ছিল না! মরেই গেছে তাও চার-পাঁচ দিন আগে–তুমি ত্যাখন গিয়ে কী কাজে লাগবে বাছা–ক ঘণ্টা আগুপিছুতে এমন কি এসে যেত? জামাইকে কি তুমি ফিরে পেলে অমন রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে…না বাছা, কাজটা তুমি খুবই গর্হিৎ করেছ। ভদ্দরলোক বামুনের ঘরের মেয়ের মতো কাজ করো নি। মরণাপন্ন খবর পেলেও মানুষ ও অবস্থায় যেতে পরে না। একটা লোক হাত-পা নাড়তে পারে না, মুখে জল না ঢেলে দিলে গলা শুকিয়ে মরে পড়ে থাকবে–বাচ্ছাগুলো টা-টা করছে তাদের কে দেখে ঠিক নেই, হয়ত কোনটা রাস্তায় বেরিয়ে গাড়ি চাপাই পড়বে–সব জেনেশুনে তুমি আর আট-দশটা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারলে না? পরের দিনে পঁওছালে কি মহাভারত অশুদ্ধু হ’ত শুনি?…না বাছা, তুমি এখান থেকে সরে পড়ো–এ খপুরে আর তোমার ঠাঁই হবে না!’

সরে পড়া ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না হয়ত, কারণ তখনই অপরাহ্ণ গড়িয়ে পড়েছে, সন্ধ্যার আর বিশেষ দেরি নেই। অন্ধকারে এখানে ঘুরে বেড়ানো নিরাপদ নয় তা সে অনেকের কাছেই শুনছে। শরীরও বইছে না। কোন্ সকালে সেখানে থেকে বেরিয়েছে একটু শরবত খেয়ে–মুখে এখনও জল পড়ে নি। পা ভেঙ্গে আসছে শান্তিতে।

পা-পা ক’রে স্টেশনে এসেই বসে ছিল। মার কাছে যাওয়া ছাড়া কোন গতি নেই। একবার ভাবলে বৌদির কাছেই চলে যাবে–কিছু দিন সেখানে থেকে মনটা দেহটা সারিয়ে আসবে। কিন্তু গাড়ি-ভাড়ার পয়সা কই! আঁচলে সাতটি মাত্র পয়সা বাঁধা আছে, মার কাছেই যাবার ভাড়া হবে না তাতে। বিনা টিকিটে যেতে হবে, ধরা পড়লে ফৈজৎ–হয়ত পুলিশেই দেবে। আজকাল এধারে খুব চেকার হয়েছে। ধরলে যা তা বলে, মেয়েছেলে বলে রেয়াৎ করে না–তা ও নিজের চোখেই দেখেছে।

থার্ড ক্লাস টিকিটঘরের সামনে মেঝেতে পুঁটুলিটা পেতে বসে হাপুস নয়নে কাঁদছে- এমন সময় কে একটি অল্পবয়সী ছেলে সামনে থমকে দঁড়াল, ঈষৎ দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘এ কী–খেঁদী-মাসীমাঃ

সাগ্রহে মুখ তুলে তাকাল ঐন্দ্রিলা। তার তখন সেই প্রবাদবাক্যের মজ্জমান ব্যক্তির অবস্থা–একটা তৃণও তার কাছে অবলম্বন। এই নির্বান্ধব অপরিচিতদের রাজ্যে বিপদের সময় একটা পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর শুনলেও অনেকটা ভরসা হয়। কিন্তু বার বার চোখ মুছে ভাল করে তাকিয়ে দেখেও ছেলেটিকে চিনতে পারল না সে। একটু চেনা চেনা বোধ হচ্ছে–অথচ ঠিক ধরতে পারছে না।

আশ্বাসের আলো ম্লান হয়ে আসে কিছুটা–তবু এ-ও মনে হয়, সে না চিনতে পারুক, এ তো চিনেছে। চেনা কেউ নিশ্চয়ই। সে সোৎসুক কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ বাবা, কিন্তু তুমি– মানে তোমাকে তো ঠিক

‘চিনতে পারছেন না–না? আমি অরুণ, আপনার দিদির বাড়ি থাকতুম। মেজ- বৌয়ের বোনপো। মনে পড়ছে এবার?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ–মনে পড়ছে বৈকি! কী আশ্চর্য!…তা তুমি যে পেল্লায় বড় হয়ে পড়েছ বাবা, চিনব কী করে?’

‘কিন্তু আপনি এখানে একা–এমনভাবে বসে কান্নাকাটি করছেন–কী হয়েছে বলুন তো?’ ঐন্দ্রিলা উঠে দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে সব কথা বলে। শুনতে শুনতে অরুণের চোখ আসে ছলছলিয়ে। নিজের দুর্দিনের কথা, অসহায় অবস্থার কথা আজও ভোলে নি সে। নিজেকে দিয়েই তাই পৃথিবীর তাবৎ দুঃখীর অবস্থা বুঝতে পেরেছে। খেদী-মাসীমারই বা কী জীবন আশা বলতে আশ্রয় বলতে অবলম্বন বলতে ঐ তো একটি মাত্র মেয়ে। তারও কী সর্বনাশা বিয়ে হল–কী ভয়াবহ বিয়ে। তবু সাধবা আছে এখনও, এই আশ্বাসটুকু ছিল এতদিন– সেটুকুও ঘুচল। ঐ মেয়েকে বুকে করেই নিজের বৈধব্য একদিন ভুলেছিলেন–সেই মেয়ের বৈধব্য না জানি কী নিদারুণই বেজেছে।…অরুণ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে প্রাণপণে চোখের জল সামলাবার চেষ্টা করতে লাগল।

কিন্তু সেটাকে ভুল বুঝল ঐন্দ্রিলা। নিস্পৃহতা বা ঔদাসীন্য মনে করল। হয়ত বা বিরক্তিও। সে ওর হাত দুটো চেপে ধরে বলল, ‘দোহাই বাবা, নিদেন আমাকে একটা টিকিট কেটে দাও, মার কাছে চলে যাই, নইলে সত্যি-সত্যিই ভিক্ষে করতে হবে শেষ পর্যন্ত হাত পেতে!’

হঠাৎ যেন অরুণের মনে হ’ল তার কানের কাছে বুঁচি ঝঙ্কার দিয়ে উঠছে, ‘হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছ কি! মেজমাসীর একটা যাহোক ব্যবস্থা করে দাও না। কী মানুষ তুমি! চিরকাল কি তোমার সমান গেল গা!’

যেন চমকে উঠল অরুণ। তাড়াতাড়ি ঐন্দ্রিলার অলক্ষ্যে চোখটা মুছে নিয়ে বলল, ‘এক জায়গায় কাজ করবেন মাসীমা–আমি এইমাত্র সেখান থেকে আসছি, কাজ খালি আছে, লোকের খুব দরকার!’

‘কোথায় বাবা? ক’রে দাও না–তাহ’লে তো আমি বেঁচে যাই!…তাহলে আর মায়ের কাছে যাই না। দোহাই বাবা, তোমায় ব্যাগত্তা করি–সেখানেই পাঠিয়ে দাও আমায়!’

‘কিন্তু একটা কথা। ভদ্রলোক একা থাকেন সেখানে। তাঁর স্ত্রী নেই–ছেলে-বৌ বোম্বেতে, মেয়েরা কেউ কলকাতা–কেউ দিল্লীতে। উনি সরকারি ডাক্তার ছিলেন, পেন্‌সন নিয়ে ওখানে গিয়ে আছেন–ও জায়গাটায় কোন ডাক্তার নেই, লোকের সেবা করবেন বলে। খুবই ভদ্রলোক, কারও কাছ থেকে–স্বেচ্ছায় না দিলে–এক পয়সাও নেন না, বরং বহু লোককে ওষুধপত্র পর্যন্ত বিনা পয়সায় দেন। পেনসনের টাকা থেকে অর্ধেকেরও বেশি স্বদেশী কাজে খরচ করেন লুকিয়ে লুকিয়ে।…অদ্ভুত মানুষ–দেবতার মতো। তবে একাই থাকেন, কোন মেয়েছেলে নেই বাড়িতে। খেটেখুটে এসে হাত পুড়িয়ে রেঁধে খেতে হয় অর্ধেক দিন খাওয়াই হয় না। আজই বলছিলেন আমাকে লোকের কথা। খুব ভাল মানুষ নির্ঝঞ্ঝাট লোক!’

‘একা থাকেন? একেবারে একা!’ হতাশায় যেন গলা ভেঙ্গে আসে ঐন্দ্রিলার।

‘কিন্তু ওঁর বয়স হয়েছে মাসীমা। ষাট বছর বয়স অন্তত। দু-তিন বছর আগে পেনসন হয়েছে।

’তবে আবার কি! যেন গাঢ় অন্ধকারে হঠাৎ আলো দেখতে পায় ঐন্দ্রিলা, ‘তাহলে আর কে কী বলবে! বুড়োমানুষ–বাবার মতো। তুমি সেখানেই পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করো বাবা।’

‘দাঁড়ান। এখুনি গাড়ি আসবে, আমি টিকিট কেটে দিচ্ছি–গিয়ে কোলাঘাটে নামবেন। সেখান থেকে স্টীমারে যেতে হয়, আমি কোলাঘাটের স্টেশনমাস্টারকে চিঠি লিখে দিচ্ছি, তাঁর বাড়িতেই রাত্রে থাকবেন–খুব ভদ্রলোক, ব্রাহ্মণ–আমার বিশেষ পরিচিতও–উনি যত্ন ক’রে রাখবেন, কাল ভোরে উনিই লোক দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন সেখানে। তাহলেই হবে তো?’

‘খুব হবে বাবা। এ তো আমার আশার অতিরিক্ত। বেঁচে থাকো বাবা, রাজ-রাজেশ্বর হও। একশ বছর পেরমাই হোক। ভগবান তোমার ভাল করুন–কী বলব বাবা, দুঃখিনী অবীরের জীবন রাখলে আজ!’

অজস্র আশীর্বাদ করতে থাকে ঐন্দ্রিলা।

।।৩।।

অনেক কাণ্ড করে আসতে হ’ল বলে প্রথমটা একটু দমেই গিয়েছিল ঐন্দ্রিলা। ট্রেন, স্টীমার, নৌকো–শেষে মাইল-খানেক আবার গরুর গাড়ি–যানবাহনের কিছুই বাকি রইল না। নিতান্ত নিরুপায় বলেই শেষ পর্যন্ত এসেছিল বোধ হয়–নইলে অনেক আগেই ফিরে যেত।

কিন্তু এখানে পৌঁছে ভালই লাগল তার। গ্রামে বেশির ভাগ মাটির বাড়ি, মাটির দোতলাও আছে ঢের–তবে ডাক্তারের বাড়িটা ছোট হলেও পাকা। একটু গ্রামের শেষ দিকেও বটে। বেশ ফাঁকা–বাগানও আছে ছোটখাটো। বাড়িটায় দুটো বড় ঘর, একটা ছোট। একটাতে ডাক্তার নিজে থাকেন, আর একটাতে ডাক্তারখানা। ছোট ঘরটাই ঐন্দ্রিলার জন্য নির্দিষ্ট হ’ল। একটা তক্তাপোশ পাতাই ছিল, ডাক্তারবাবু নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ঘর ধুইয়ে মুছিয়ে সাফ্ করিয়ে একটা পরিষ্কার বিছানা বিছিয়ে দেওয়ালেন। ঝি আছে একজন, কাজ ক’রে দিয়েই চলে যাবার কথা তার–কিন্তু সে কাছেই থাকে। দিনের মধ্যে দশবার আসতেও তার আপত্তি নেই। তাছাড়াও, ঐন্দ্রিলা দু-একদিন থেকেই বুঝে নিল, গ্রামের বহু লোকই ডাক্তারবাবুর কোন কাজ করে দিতে পারলে নিজেকে কৃতার্থ মনে করে। অর্থাৎ সে রাজার হালেই থাকবে, রান্নার কাজ ছাড়া তাকে কুটোটি ভেঙ্গে দুখানা করতে হবে না।

রান্না-ভাঁড়ার ঘর পাকা নয়–মাটির, তবে বেশ বড় বড়। তাতে ঐন্দ্রিলার কিছু অসুবিধা নেই, সে কাঁচা রান্নাঘরই পছন্দ করে, জন্মাবধিই বলতে গেলে তাতে অভ্যস্ত–মধ্যে কটা বছর দিদিমার ওখানে ছাড়া। মাটির ঘর একবার গোবর-ন্যাতা বুলিয়ে নিলেই তকতক করে–পাকা ঘরে অনেক হ্যাঁঙ্গামা। মাটির ঘরে নিচু উনুন করা যায়, সেও একটা সুবিধা।

সবচেয়ে যেটা এখানে এসে ভাল লাগল তার, সেটা হ’ল অবাধ স্বাধীনতা। ডাক্তারের নাম অমরবাবু, তাদের সজাতি, ব্রাহ্মণ। ভদ্রলোক একেবারেই নির্ঝঞ্ঝাট নির্বিরোধ মানুষ, কোন সাতে-পাঁচে থাকেন না–থাকতে চান না। ডাক্তারি–ডাক্তারিও নয় সেবা–কারণ ঐন্দ্রিলা দেখল এতে যা আয় হয় তার থেকে ঢের বেশি ব্যয় হয় ডাক্তারের–এই নিয়েই থাকতে চান তিনি, তার বাইরের কোন কিছু বোঝেন না। ঘরে কি হচ্ছে তার থেকে গ্রামে বা গ্রামান্তরে কোন চাষী কি গোয়ালার ঘরে কি হচ্ছে তাই নিয়ে বেশি চিন্তা তাঁর। তাঁদের খবরই বেশি দরকারি বলে মনে করেন।

ঐন্দ্রিলা এসে কাপড়-চোপড় কেচে একটু সুস্থ হতেই অমরবাবু একেবারে কুড়িটা টাকা তার সামনে নামিয়ে রেখে বললেন, ‘ঘরে কি কি আছে জানি না, দেখে-শুনে নাও। বোধ হচ্ছে বিশেষ কিছুই নেই।…যা দরকার হবে–ঝি মঙ্গলা আছে, তার ভাইপো ধনা আছে, তার পাশে অক্রূররা আছে–যাকে যা বলবে সে-ই তা ক’রে দেবে- ওদের দিয়েই যা লাগে আনিয়ে নাও। কাল হাটবার–সেও ওরা করে দিতে পারবে। আমি মাছ খাই না– মাছের পাট নেই, যা হোক দুটো ডালভাত করে দিও তাই আমার ঢের। অবিশ্যি তোমাকেও ডালভাত খেয়ে থাকতে বলছি না, যা খুশি করে খেতে পারো। যদি পান- দোক্তার নেশা থাকে তাও আনিয়ে নিও, সঙ্কোচের কোন কারণ নেই। হিসেবপত্র আমাকে দিতে হবে না, ও তুমিই বুঝে নিও। টাকার দরকার হলে আমাকে বলো!’

ঐন্দ্রিলা স্তম্ভিত হয়ে গেল। যাকে দীর্ঘকাল ধরে পরের তাঁবে কাজ করতে হয়েছে এবং সন্দিগ্ধ দৃষ্টির মধ্যে প্রতিটি পদক্ষেপ চলতে হয়েছে–(অধিকাংশ মনিবই ধরে নেন যে তাঁদের বানী বা রসুয়ে ঠাকুর চুরি করছে)–তার পক্ষে এতখানি বিশ্বাস এবং এই অবাধ স্বাধীনতা একেবারেই কল্পনাতীত। এক কথায় এতদিন পরে একটা সংসারে–তা হোক না কেন ছোট সংসার–সর্বময়ী কর্ত্রী হয়ে বসল। মনে মনে আর এক দফা অরুণকে আশীর্বাদ করল ঐন্দ্রিলা। আর তখনই মনে পড়ে গেল যে তার ঠিকানাটা জিজ্ঞাসা করা হয় নি, কী করছে তাও না। …

এই স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করল না ঐন্দ্রিলা। মনের মতো করে ভাঁড়ার সাজাল সে। মনের মতো করেই রান্না করল। কাছে বসে যত্ন করে খাওয়াল ডাক্তারবাবুকে। ভদ্রলোক কিছুই খেতে চান না–নিজে হাত পুড়িয়ে ভাতে-ভাতই খেয়েছেন এতকাল, খাওয়ার শক্তিটাই গেছে কমে। ঐন্দ্রিলা প্রথম প্রথম একটু সঙ্কোচ করেছিল, তার পর বুঝল মানুষটা আপনভোলা উদাসীন–সে জোর করে ধমক দিয়ে খাওয়াতে লাগল। তাতে অমরবাবুরও বিস্ময়ের অবধি রইল না। মাইনে করা লোক এমন যত্ন করে তা কখনও দেখেন নি তিনি–জানা ছিল না। আরও অবাক হলেন যখন ঐন্দ্রিলা স্বেচ্ছায়–যে সব কাজ তার করবার কথা নয়–তাও করতে লাগল। অমরবাবুর কাপড়- চোপড়ের কোন হিসেব থাকত না, ভাল ভাল কাপড়, ময়লা হবার পর এককোণে গুঁজড়ে হয়ত পড়ে আছে দীর্ঘকাল–তিনি ছেঁড়া কাপড় পরে কাটাচ্ছেন। সে সব কাপড় সেইভাবে থেকে হয়ত মষে ধরে গেছে, হয়ত পোকাতে কেটেছে, তাও ভ্রূক্ষেপ নেই। তাদের অস্তিত্বই মন থেকে ধুয়ে মুছে গেছে। বিছানারও সেই হাল। ঐন্দ্রিলা কয়েকদিন দেখে নিজেই একদিন ক্ষারে ফুটিয়ে মঙ্গলাকে দিয়ে কাচিয়ে নিল। জামাগুলো অক্রূরকে দিয়ে পাঠাল রজকবাড়ি। বিছানার নতুন চাদর কিনে আনাল হাট থেকে। পরিষ্কার বিছানার ওপর পরিষ্কার পাট-করা জামা-কাপড়ের স্তূপ যখন দেখলেন ডাক্তারবাবু তখন তাঁর বিস্ময়ের সীমা রইল না।

‘মঙ্গলা-এত কাপড় জামা কার রে? কোথা থেকে এল? কেউ এসেছে নাকি?’ ঝিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন। যখন শুনলেন তাঁরই সব–তখনও বিশ্বাস হ’ল না। উল্টেপাল্টে দেখে যখন মনে হ’ল সত্যিই তাঁর–তখন আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় ছিল এগুলো রে, কোথা থেকে বেরোল এতদিন বাদে?’

তারপর সব ইতিহাস শুনে খুব একচোট বকাবকি করলেন–ঐন্দ্রিলাকে, ঝিকে,– নিজেকেও।

‘দেখ দিকি! এসব করার কী দরকার ছিল এখন। তাও মঙ্গলকে বললেই হ’ত–আর তুইও হয়েছিস তেমনি, তোদের কি নজরে পড়ে না এসব। অক্রূরকে দিয়ে রজক-বাড়ি পাঠালে তো হ’ত!…ছি ছি! বিষম অন্যায় হ’ল। বামুনের মেয়ে–ওঁর কি এই সব করার কথা! আমারও হয়েছে যেমন, কোনদিন হুঁশ থাকে না। এবার থেকে একটু হুঁশ ক’রে চলতেই হবে।…কিন্তু তোমারও এসব করার দরকার নেই–বুঝলে! আমার ভারী খারাপ লাগছে–’

দোরের বাইরে থেকে ঐন্দ্রিলা জবাব দেয়, ‘আমি আর কি করলুম–টেনে বার করেছি বই তো নয়, মঙ্গলাই তো করেছে একবেলা ধরে।…পয়সার জিনিস অমনভাবে নষ্ট হওয়া আমরা দেখতে পারি না, গা করকর করে।’

মুখে যাই বলুন–অমরবাবু খুশিই হন ওর আন্তরিকতায়–আর সেটা চাপাও থাকে না। স্বাচ্ছন্দ্য না পেলে চলে যায় অনেকেরই হয়ত সে জন্য চেষ্টা বা উদ্যম করাও পোষায় না তাদের, কিন্তু অযাচিত ভাবে পেলে সকলকারই ভাল লাগে।

অমরবাবুরও ভাল লাগল এবং সে জন্য তিনি তাঁর নতুন বামুন ঠাকরুনের কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করলেন। কিন্তু সে কৃতজ্ঞতা কিভাবে প্রকাশ করবেন–তাঁর তরফ থেকে কী প্রতিদান দেওয়া উচিত ভেবে পেলেন না। এসব সাংসারিক জ্ঞান তাঁর চিরদিনই কম। শেষ পর্যন্ত, আর কিছু ভেবে ঠিক করতে না পেরে, পরের হাট থেকে একজোড়া থান আনিয়ে দিলেন, এক তাঁতি তাঁর নিজের ব্যবহারের জন্য একটি ভাল সাদা উড়ুনি দিয়ে গিয়েছিল সেটা বার ক’রে দিলেন এবং সে ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করছে কি না, তার জলখাবারের ব্যবস্থা কিছু থাকে কি না, চা খাবার অভ্যাস আছে কি না–যখন তখন প্রশ্ন করতে লাগলেন।

প্রথম প্রথম ওঁর এই অতিরিক্ত মনোযোগে একটু অস্বস্তি বোধ করেছিল ঐন্দ্রিলা। কারণ বয়স যতই হোক–ডাক্তারবাবু নিজে মুখে বলেছেন বাষট্টি পেরিয়ে তেষট্টি চলছে তাঁর–কিন্তু বুড়ো তাঁকে আদৌ দেখায় না। বেশ শক্ত-সমর্থই আছেন, চুলও খুব পাকে নি এখনও পর্যন্ত। খাটতে পারেন অসুরের মতো, সকাল থেকে পায়ে হেঁটে আশপাশের চার- পাঁচখানা গ্রামে রোগী দেখে বেড়ান–দিনে-রাতে হাঁটেন সব মিলিয়ে অন্তত পাঁচ-ছ ক্রোশ। অর্থাৎ বয়স তাঁকে দেহে মনে কোথাও স্পর্শ করতে পারে নি।

তবে–যতই দেখতে লাগল ততই বুঝল ঐন্দ্রিলা–এ মনোযোগের বিশেষ কোন তাৎপর্য নেই ওঁর কাছে। সাংসারিক জ্ঞানের দিক দিয়ে মানুষটা শিশুর মতোই সরল। তাছাড়া এ ধরনের মনোযোগ ওঁর পরিচিত সকলের সম্বন্ধেই। নজরে পড়ে কম–কিন্তু দৈবাৎ যদি কোন কারণে লক্ষ হয় যে মঙ্গলা বা অক্রূর বা অন্য কোন ওঁর অনুগত লোক ছেঁড়া কাপড় পরে আছে তো, তৎক্ষণাৎ তাকে কিছু না বলে অপর কাউকে দিয়ে একেবারে এক জোড়া কাপড় আনিয়ে দেবেন। দয়া এবং মায়া ভদ্রলোকের সকলকার ওপরই, সেও সেই সকলেরই একজন, তার বেশি কিছু নয়।

এখানে এসে অবধি মেয়েকে কিছু পাঠাতে পারে নি–বিশেষ করে ওর সতীন-পোর কাছ থেকে দেড়টা টাকা ধার করে এনেছে–সেটা অবধি শোধ করা হয় নি–কথাটা কাঁটার মতোই খচখচ করছিল ঐন্দ্রিলার মনে। কিন্তু প্রথম থেকেই ভদ্রলোক যে অমায়িক ও উদার ব্যবহার করছেন, তারপর আগাম মাইনে চাইতেও লজ্জা করছিল ওর। সংসার- খরচের টাকা থেকে ধারের দেড় টাকা অনায়াসে পাঠাতে পারত কিন্তু পাছে কথাটা কানে গেলে তিনি মনে করেন যে চুরি করছে, সেই ভয়ে পাঠাতে পারে নি।…এখন দিন-কুড়ি- বাইশ কাটতে–মানুষটাকে মোটামুটি চিনে নেবার পর–ভরসা ক’রে কথাটা একদিন পেড়েই ফেলল।

খেতে বসার সময় ছাড়া ওঁকে ধরা মুশকিল, তাও খেতে বসারও কোন নির্দিষ্ট সময় নেই–তবু যখন হোক একবার বসেন–নইলে বিশ্রাম বলে কোন কথা জানেন না ভদ্রলোক, ডাক্তারি ছাড়াও গ্রামের উন্নতি-উন্নতি করে পাগল, সে জন্যেও (ঐন্দ্রিলার মনে হয়) বহু বাজে পরিশ্রম করেন। সুতরাং সেদিন খেতে দিয়েই কথাটা পাড়ল। মাথা নিচু করে বলল, ‘একটা কথা বলছিলুম, কিছু মনে করবেন না–নিতান্ত নাচারে পড়েই বলা- আমার মাইনে তো কিছু ঠিক হয় নি, তা সে যা হয় দেবেন, এখন একটা ঠিকানা লিখে দেব, সেইখানে গোটা আষ্টেক টাকা পাঠিয়ে দেবেন? আমার মাইনে থেকে কেটে নেবেন–এক মাসে না হয় দুইমাসেই শোধ হবে–?’

‘তা দেব না কেন, নিশ্চয়ই দেব। বা-রে! কিন্তু কাকে পাঠাবে? তোমার কে আছে তাও তো জিজ্ঞাসা করি নি।’

সত্যিই কিন্তু জিজ্ঞাসা করেন নি উনি–ঐন্দ্রিলার মনে পড়ল। চেনা লোক চিঠি লিখে পাঠিয়েছে, বামুনের মেয়ে, এ-ই যথেষ্ট। পরিচয় কিছু জানবার কথা মনেই পড়ে নি ওঁর।

ঐন্দ্রিলা একটু চুপ ক’রে থেকে বলল, ‘আমার একটি মেয়ে আছে বাবু। ওকে নিয়েই বিধবা হয়েছি, বলতে গেলে ওর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই–অনেক কষ্টে, ভিক্ষে দুঃখু ক’রে মানুষ করা–তাও দেখুন না, আমি তো এই ঘুরে ঘুরে বেড়াই–ওর আপন-কাকারা সড় ক’রে এমন বিয়েই দিলে যে এরই মধ্যে আমার মতো হাতের দশা করে বসে রইল। এখনও বোধহয় ওর কুড়ি বছরও বয়স হয় নি। এরই মধ্যে–। এই তো এখনও দু-মাসও হয় নি, দু কি বলছি দেড় মাসও হয় নি–এই দশা হয়েছে। সেখান থেকেই আপনার এখানে এসেছি।…সতীন-পোর ঘর, একটা বাচ্ছা নিয়ে কি করছে কে জানে, খেতে পাচ্ছে কিনা– ‘

খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল অমরবাবুর। বলতে বলতে স্বাভাবিকভাবেই ঐন্দ্রিলার গলা অশ্রুকম্পিত হয়ে উঠেছিল, সেই কণ্ঠস্বর এবং ওর একমাত্র কচি মেয়ের সদ্য-বৈধব্যের বিবরণ শোনার পর তাঁর মতো লোকের গলা দিয়ে ভাত নামা সম্ভব নয়।

তিনিও প্রায় রুদ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘সে কী? কী হয়েছিল জামাইয়ের? এত শিগগির– ‘

তখন মেয়ের এবং ওর নিজের দুর্ভাগ্যের আনুপূর্বিক ইতিহাস বিবৃত করতে হ’ল ঐন্দ্রিলাকে। খাওয়া যে ডাক্তারবাবুর বন্ধ হয়ে গেছে,–থালার ভাত কড়কড়িয়ে উঠছে, হাত উঠছে শুকিয়ে–তা ওর নজর এড়ায় নি। খাওয়া আর হবেও না। কথাটা হয়ত এ সময় না পাড়াই উচিত ছিল, অন্তত শেষের দিকে পাড়লেও হ’ত–তাও বুঝতে পারল, কিন্তু এখন আর উপায় কি? যা হবার তা তো হয়েই গেছে–মিছিমিছি এ সুযোগ ছাড়ে কেন সে?

অবিশ্বাস্য কাহিনী, কারুরই বিশ্বাস হবার কথা নয়, প্রথমটা ডাক্তারবাবুরও বিশ্বাস হয় নি। কিন্তু ঐন্দ্রিলা যখন ভাত ছুঁয়ে–ইষ্টদেবতার নামে গুরুর নামে দিব্যি গালল তখন আর অবিশ্বাস করার কোন হেতু রইল না। তিনি যেন কী একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছটফট্ করতে লাগলেন। বিশেষত সীতার বিবাহের ইতিহাস শুনতে শুনতে তাঁর চোখের জল বাধা মানল না। তিনি ভাতের থালা সরিয়ে দিয়ে উঠে পড়লেন। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘এসব কথা তুমি এতদিন বলো নি–চেপে রেখেছিলে! আশ্চর্য মা তো!…তোমার পাওনা হোক না হোক–কটা টাকা আমি দিতে পারতুম না? সেই কচি মেয়েটা–ইস্! হয়ত তারা ওকে খেতেই দিচ্ছে না ভাল করে, বাপ ছিল তবু একটা চক্ষুলজ্জা ছিল।…তাই তো। তুমি ঠিকানাটা লিখে দাও। এখনও বোধহয় সময় আছে, আমি ফর্ম লিখে অক্রূরকে পাঠিয়ে দিচ্ছি ডাকঘরে। এ গাঁয়ে ডাকঘরও একটা নেই ছাই–যেতে আসতে দেড় ক্রোশ যার নাম। তা অক্রূর পারবে, ওর খুব পা। আর দেরি হলেও আমার নাম করলে নিশ্চয়ই নেবেন মাস্টারবাবু–’

এই লোককে নিজের স্বার্থের জন্যে আহারে বঞ্চিত করে এমন কি ঐন্দ্রিলার মনেও অনুশোচনা হ’ল। সে একটু ব্যাকুলভাবেই বলল, ‘কিন্তু আপনার যে কিছুই খাওয়া হ’ল না বাবু, ও ভাত তো আপনি খেতেও পারবেন না আর!…কেন যে আবাগী এই সময়ে কথাটা পাড়তে গেলুম।…আপনি বরং বসুন–আমি দুখানা লুচি ভেজে দিই–ঘি ময়দা সবই আছে, দশ মিনিটের মধ্যে হয়ে যাবে!’

‘না, না, ওসব কিছু করতে হবে না।’ একটু যেন ধমকই দেন ডাক্তারবাবু, ‘আমার ওতেই চলে যাবে। ঠিকানা–তুমি আগে ঠিকানাটা দাও, আর মোটে সময় নেই। দুটো বাজে–অক্রূরের যেতে যেতে তিনটে বেজে যাবে হয়ত–। শিগির, শিগগির!

আট টাকা নয়, তিনি একেবারেই কুড়ি টাকাই পাঠিয়ে দিলেন সীতার নামে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *