১৩. শাসন-নীতি (১৯৩৫-৪২)

ত্রয়োদশ অধ্যায় – শাসন-নীতি (১৯৩৫-৪২)

১৯৩৫ সনের নূতন সংবিধান অনুসারে প্রদেশের দ্বৈত শাসনপ্রথা বিলুপ্ত হইল এবং শাসনের সমগ্র ভার বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যদের হস্তে ন্যস্ত হইল। তবে কয়েকটি গুরুতর পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হইলে প্রাদেশিক লাটসাহেব বা গভর্নর মন্ত্রীদের সহিত পরামর্শ না-করিয়াই নিজেই যথোচিত ব্যবস্থা করিতে পারিবেন–এই ক্ষমতা তাঁহাকে দেওয়া হইল। বাংলা (ও আরও কয়েকটি) প্রদেশে দুইটি ব্যবস্থাপকসভা গঠিত হইল–বিধানসভা (Legislative Assembly) ও বিধানপরিষদ (Legislative Council)। এই সভা ও পরিষদের সদস্যগণ ভোটের দ্বারা নির্বাচিত হইতেন। ভোট দিবার অধিকার সকলের ছিল না। শিক্ষা, সম্পদ, প্রভৃতি নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকিলেই যে-কোন সাবালক ভারতবাসী ভোট দিতে পারিতেন।

তবে এই পরিমাণের সীমা বিধানসভার সদস্যের জন্য কম ও বিধানপরিষদের সদস্যের জন্য অনেক বেশী ছিল। সুতরাং ভোটদাতাগণের সংখ্যা বিধানসভার সদস্যনির্বাচনে বেশী এবং বিধানপরিষদের নির্বাচনে কম ছিল।

মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ১৯৩৪ সনেই শেষ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু ইহার প্রভাব একেবারে বিলুপ্ত হয় নাই। সুতরাং নূতন সংবিধান-অনুসারে নির্বাচন আসন্ন হইলে কংগ্রেসের পক্ষে কী করা উচিত তাহা একটি গুরুতর সমস্যা হইয়া দাঁড়াইল, এবং ১৯৩৬ সনের এপ্রিল মাসে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে ইহাই একটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হইল।

কংগ্রেস ১৯৩৫ সনের নূতন সংবিধানের তীব্র নিন্দা করিয়াছিল এবং কংগ্রেসের সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুও এই নির্বাচন বর্জন করিবার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তথাপি কংগ্রেসের এই অধিবেশনে স্থির হইল, কংগ্রেস এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবে। কিন্তু, নির্বাচনে কংগ্রেস দলের সদস্যেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হইলে এই দল মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করিবে কি না, তাহা লইয়া গুরুতর মতভেদ উপস্থিত হইল। নির্বাচনের পর নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করিবেন বলিয়া আপাততঃ স্থির হইল।

১৯৩৭ সনের জানুআরি মাসে এই নূতন সংবিধান অনুসারে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইল। নির্বাচিত সদস্যরা যে-সকল বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিলেন তাহার নাম ও সদস্য-সংখ্যা দিতেছি :

মোট সভ্য সংখ্যা-২৫০

(১) কংগ্রেস – ৬০

(২) নির্দলীয় মুসলমান – ৪১

(৩) মুসলিম লীগ – ৪০

(৪) কৃষক-প্রজা পার্টি – ৩৫

(৫) ইউরোপীয় – ২৫

(৬) নির্দলীয় অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দু – ২৩

(৭) নির্দলীয় বৰ্ণহিন্দু – ১৪

(৮) নির্দলীয় অতিরিক্ত – ১২

কংগ্রেসের ৬০ জন সদস্যের মধ্যে ১৭ জন নানা দল (তপশীলভুক্ত হিন্দু, শ্রমিক এবং ত্রিপুরা কৃষক সমিতি) হইতে নির্বাচিত হইয়াছিলেন। কৃষক-প্রজা পার্টির অধিকাংশ সদস্যই মুসলমান কৃষকসম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন। বিধানপরিষদের ৬৩ জন সদস্যের মধ্যে ছিলেন :

(১) নির্দলীয় মুসলমান – ১৩

(২) নির্দলীয় হিন্দু – ১২

(৩) মুসলিম লীগ – ১১

(৪) কংগ্রেস – ১০

(৫) ইউরোপীয় – ৬

(৬) বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর – ১১

নির্বাচনের পর নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে (১৭ই ও ১৮ই মার্চ, ১৯৩৭) অনেক বাদানুবাদের পর স্থির হইল, যে-সকল প্রদেশে বিধানসভায় কংগ্রেস দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কেবল সেইসব প্রদেশেই কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠন করিতে পারিবে, অর্থাৎ কোন প্রদেশে অন্য দলের সহিত যোগ দিয়া মন্ত্রীসভা গঠন করিতে পারিবে না। সুতরাং বঙ্গদেশে অন্যান্য দল অপেক্ষা কংগ্রেস দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকিলেও মন্ত্রীসভা গঠনের চেষ্টা করিল না। অতঃপর কৃষক-প্রজা দলের নেতা ফজলুল হককে গভর্নর মন্ত্রীসভা গঠন করিতে আমন্ত্রণ করিলেন। তিনি কংগ্রেস দলের নেতা শরৎচন্দ্র বসুকে তাঁহার সঙ্গে যোগ দিয়া মন্ত্রীসভা গঠন করিবার প্রস্তাব করিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের নির্দেশ অনুযায়ী শরৎচন্দ্র এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করিতে না পারিয়া মৌলানা আজাদকে লিখিলেন যে, এই সুযোগ গ্রহণ করাই উচিত। কিন্তু পুনঃ পুনঃ আবেদন করিয়াও কোন ফল হইল না। কংগ্রেস কর্তৃপক্ষ অবিচলিত রহিলেন। এই সুযোগে মুসলিম লীগ প্রস্তাব করিল, যদি ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগদান করেন, তবে এই উভয় দল মিলিয়া মন্ত্রীসভা গঠন করিতে পারেন। ফজলুল হক এই প্রস্তাব গ্রহণ করিতে রাজী হইলেন এই শর্তে যে, তাঁহাকে এই যুক্তদলের নেতা নির্বাচিত করিতে হইবে। মুসলিম লীগ ইহাতে সম্মত হইলে দুইদলে মিলিয়া মন্ত্রীসভা গঠিত হইল। ইহার ফলে বঙ্গদেশে মুসলিম লীগের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা দিন দিন বাড়িতে লাগিল এবং পরিণামে প্রধানতঃ ইহারই ফলে বঙ্গদেশ দুইভাগে বিভক্ত হইল। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে যে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হইল-কংগ্রেসের অদূরদর্শিতা ও অবিমৃষ্যকারিতাই যে তাহার জন্য প্রধানতঃ দায়ী তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। দ্বিতীয় পরিশিষ্টে এই বিষয়টি বিস্তৃতভাবে আলোচিত হইয়াছে।

বিধানসভার রাজনীতিক দলের যে তালিকা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে তাহার ৩, ৪, ৬ ও ৭-সংখ্যক দলগুলি একত্র হইয়া ফজলুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠন করিল। ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হইলেন এবং অবশিষ্ট দশজন মন্ত্রীর মধ্যে পাঁচজন হিন্দু এবং পাঁচজন মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু, মন্ত্রীদের মধ্যে দলাদলি ও মতানৈক্যের ফলে মন্ত্রীসভা শক্তিশালী, কার্যক্ষম বা স্থায়ী হইল না। অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় ইহা বঙ্গদেশের শাসননীতির একটি চিরস্থায়ী ক্রটি বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। ইহার কারণ তিনটি। প্রথমতঃ, হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান, যথাক্রমে শতকরা ৪৫ ও ৫৫। কিন্তু ইহা ছাড়াও উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেও যে একাধিক দল ছিল তাহা ১৯৩৭ সনে নির্বাচিত বিধানসভার সদস্যদের পৃষ্ঠান্তরে দেওয়া তালিকা হইতে বুঝা যাইবে। দ্বিতীয়তঃ, ঐ তালিকা হইতেই দেখা যাইবে যে, ইউরোপীয়দের প্রতিনিধি-সংখ্যা অনেক বেশি, কারণ বঙ্গদেশে প্রায় ২০,০০০ ইউরোপীয় ছিল আর বোম্বাই প্রদেশে তাহাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫০০। ইহার ফলে ভারতীয় দলের মধ্যে সংখ্যালঘু দলও ইহাদের সাহায্য ও সমর্থনে মন্ত্রীসভা গঠন করিতে পারিত। তৃতীয়তঃ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলি কখনও মন্ত্রীগণকে সমর্থন করিত, কখনও বা করিত না-তাহাদের নির্দিষ্ট কোন নীতিও ছিল না। মন্ত্রীসভায় প্রথমেই গোল বাধিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে লইয়া। তাঁহাকে পদত্যাগ করিতে বলায় তিনি অস্বীকার করেন (১৯৩৮)। তখন মন্ত্রীসভা পদত্যাগ করে এবং তাঁহাকে বাদ দিয়া অন্যান্য মন্ত্রীদের লইয়া মন্ত্রীসভা পুনর্গঠিত হয়। কংগ্রেসের এককালের প্রসিদ্ধ নেতা রাজস্বমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকারকে কংগ্রেসের পক্ষ হইতে পুনঃপুনঃ পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করা হয়।

১৯৩৮ সনে মহাত্মা গান্ধী দুইবার বাংলায় আসেন এবং তাহার প্রভাবে ২৪ জন নির্দলীয় অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দুসদস্য কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ দেন। এই সুযোগে দশজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক ভাবে অনাস্থাজ্ঞাপক প্রস্তাব বিধানসভায় উপস্থিত করা হয়। ইহাতে সমস্ত কলিকাতা শহরে তুমুল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। মন্ত্রীদের বিরোধী সদস্যেরা রাস্তায় আক্রান্ত হন এবং কয়েকজন ভয়ে ভোটগ্রহণের আগের রাত্রে বিধানসভায়ই রাত্রিযাপন করেন। ভোটগ্রহণের দিন একদল মুসলমান শোভাযাত্রা করিয়া মন্ত্রীদের সমর্থনসূচক ধ্বনি দিতে দিতে বিধানসভায় আসে। প্রথম অনাস্থাসূচক প্রস্তাবটি ভোট গণনা না-করিয়াই অগ্রাহ্য হইয়া যায়, বাকী প্রস্তাবগুলি পরিত্যক্ত হয়।

২৫ জন ইউরোপীয় সদস্য মন্ত্রীদের পক্ষে ভোট না দিলে মন্ত্রীসভার পতন হইত। ইহা সত্ত্বেও যদি কংগ্রেস দলের সদস্যেরা সর্বদা একযোগে কার্য করিত তাহা হইলে মন্ত্রীসভা ভাঙ্গিয়া যাইত। কিন্তু বাংলার কংগ্রেস দলের সদস্যদের মধ্যে ঐক্য ছিল না, বরং রেষারেষির ভাব চরমে পৌঁছিয়াছিল। গান্ধী বহু চেষ্টা করিয়াও ইহার প্রতিকার করিতে পারেন নাই। গান্ধী দ্বিতীয়বার কলিকাতায় আসিয়া ফজলুল হকের সহিত কংগ্রেসের যুক্ত মন্ত্রীসভা গঠনের চেষ্টা করেন (১৯৩৮)। কিন্তু তাহা ব্যর্থ হয়। ইহার সঠিক কারণ জানা যায় না। তবে ফজলুল হকের এক ঘোষণায় (১৯৩৮, এপ্রিল) ইহার কিছুর আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “কংগ্রেস একাধিকবার আমার নেতৃত্বে যুক্ত মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব করিয়াছে, কিন্তু ইহা স্বীকার করার অর্থ ইসলামের মৃত্যুদণ্ড স্বাক্ষর করা (sign the death warrant of Islam)। কিন্তু কংগ্রেসের স্থায়ী বিরোধিতা এবং পুনঃপুনঃ মন্ত্রীসভা ভাঙ্গিয়া দিবার চেষ্টা করায় মুসলমান সদস্যেরা ফজলুল হকের দৃঢ় সমর্থক হইয়া দাঁড়াইল। ইহার ফলে তাঁহার মন্ত্রীসভা স্থায়ী হইল। কিন্তু, ইহা আর হিন্দু-মুসলমানের মিলিত যুক্ত মন্ত্রীসভার দাবি করিতে পারিত না। কংগ্রেস দল প্রকাশ্যেই ইহাকে মুসলিম মন্ত্রীসভা বলিয়া অভিহিত করিত। ইহার প্রমাণও শীঘ্রই পাওয়া গেল। মন্ত্রীসভা বিধানসভায় এই মর্মে একটি প্রস্তাব আনিল, “যুদ্ধের পরে ভারতকে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হউক–কিন্তু সংবিধানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পুরাপুরি সম্মতি ও অনুমোদন না থাকিলে কোন আইন গৃহীত হইবে att (safeguards based on their full consent and approval),” artaldea সরকার তখন রাজস্বমন্ত্রী, কিন্তু তিনি ইহার পক্ষে ভোট দিতে সম্মত হইলেন না, কারণ ইহাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হাতেই যে কোন উন্নতিমূলক বিষয়েই বাধা দিবার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হইবে। ইহার ফলে মন্ত্রীসভার মুসলমান সমর্থকেরা নলিনীরঞ্জনের মন্ত্রীপদ ত্যাগের দাবি করিলে তিনি পদত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন (১৯৩৯)।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হইলে ফজলুল হক দেশবাসীকে এই সঙ্কটের সময় সর্বপ্রকারে গভর্নমেন্টকে সাহায্য করিতে আহ্বান করিলেন এবং কেন্দ্রীয় গভর্নমেন্টকেও সর্বতোভাবে সাহায্যদান করিতে লাগিলেন। সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায় এবং হিন্দুদের মধ্যেও এক শ্রেণী এ-বিষয়ে তাঁহাকে সমর্থন করায় মন্ত্রীসভাও বিধানসভায় সমর্থন পাওয়া সম্বন্ধে অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলেন। বিশেষতঃ, এই সময় সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস হইতে বিতাড়িত হইয়া গান্ধীর দলের বিরুদ্ধে ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) নামে এক নূতন দল গঠন করায় কংগ্রেসের শক্তি ও প্রভাব অনেক কমিয়া গেল।

কিন্তু শীঘই মুসলমান সদস্যদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দিল। ১৯৪১ সনের অগষ্ট মাসে মুহম্মদ আলি জিন্না পরিচালিত মুসলিম লীগ দাবি করিল যে, বঙ্গদেশ, আসাম ও পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীদের যুদ্ধকালে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠিত ভারত রক্ষা সমিতির (Defence Council) সদস্যপদ ত্যাগ করিতে হইবে। ফজলুল হক প্রথমে ইহাতে রাজী হইলেন না, কিন্তু অনেক প্রতিবাদ ও বাদানুবাদের পর অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঐ পদ ত্যাগ করিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম লীগের কার্যনির্বাহক সমিতির সদস্যপদও ছাড়িয়া দিলেন। কারণ ফজলুল হকের মতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর উপর জিন্নার এই আধিপত্য অন্যায় ও অসঙ্গত। কিন্তু তাঁহার সহযোগী অপরাপর মুসলমান মন্ত্রীগণ তাঁহার এই মতপ্রকাশে ও পদত্যাগে বিলম্ব করায় তাঁহার প্রতি ক্রুদ্ধ হইলেন এবং ঢাকার নবাববাড়ীর খাজা নাজিমুদ্দীন ও নবাব সুরাওয়ার্দির নেতৃত্বে মুসলিম লীগের অধিকাংশ সদস্য তাঁহার বিপক্ষে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করিলেন। অতিকষ্টে এই দুইদলের মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধ করা গেল বটে, কিন্তু পুরাপুরি মনের মিল আর ফিরিয়া আসিল না।

যখন নভেম্বর মাসে (১৯৪১) বিধানসভার অধিবেশন বসিল তখন শোনা গেল, ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা দল, ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) এবং অন্য দুই-একটি ক্ষুদ্র দলের সহিত মিলিয়া ‘Progressive Coalition Party’ অর্থাৎ ‘প্রগতিশীল যুক্ত দল’ নামে একটি নূতন দল গঠিত হইয়াছে। ফজলুল হক ইহা অস্বীকার করিলেন। ১৯৪০ সনে যখন সাম্প্রদায়িক বিরোধ খুব বাড়িয়া গিয়াছিল তখন তিনি এইপ্রকার একটি দল গঠনের জন্য জিন্নার নিকট প্রস্তাব করিয়াছিলেন, জিন্নার আপত্তিতে তাহা সম্ভব হয় নাই। সুতরাং মুসলিম লীগের সদস্যগণ ইহা বিশ্বাস করিলেন না। যথাসময়ে ফজলুল হক প্রকাশ্যে এই নূতন দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করিলেন। ইহার ফলে মুসলিম লীগভুক্ত মন্ত্রীগণ পদত্যাগ করিলেন এবং পুরাতন যুক্তদল ভাঙ্গিয়া নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ’ দল নামে বিধানসভায় একটি স্বতন্ত্র দল গঠন করিলেন। কিন্তু, কিছুদিন আলোচনার পর ফজলুল হক বিধানসভার সদস্যদের অধিকাংশের সমর্থনে পুনরায় নূতন মন্ত্রীসভা গঠনে সমর্থ হইলেন (১৭ই ডিসেম্বর)। নূতন মন্ত্রীসভায় নয়জন মন্ত্রীর মধ্যে চারিজন হিন্দু ছিলেন। ইহাদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মহাসভার প্রসিদ্ধ নেতা ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের দুইজন ও তপশীলভুক্ত সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি। শ্যামাপ্রসাদ অর্থসচিবের পদ গ্রহণ করিলেন। প্রসঙ্গক্রমে বলা যাইতে পারে যে, ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রতিষ্ঠাতা তখন জার্মানিতে এবং তাঁহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা অন্যতম নেতা শরৎচন্দ্র। বসু তখন শক্রদেশ জাপানের সহিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অন্তরীণ অবস্থায় আটক থাকা সত্ত্বেও এই দলেরই দুইজন সদস্য ব্রিটিশরাজের আনুগত্য শপথ করিয়া। মন্ত্রীপদ গ্রহণ করিলেন।

ফজলুল হক প্রচার করিলেন যে, এই নূতন মন্ত্রীসভাই প্রকৃত প্রস্তাবে হিন্দু মুসলমানের যুক্ত মন্ত্রীসভা। কিন্তু মুসলিম লীগের সদস্যেরা ইহা স্বীকার করিতেন না–বলিতেন ইহা এখন হিন্দু মন্ত্রীসভা।

নবগঠিত মন্ত্রীসভায় শ্যামাপ্রসাদেরই প্রাধান্য ছিল, এই কারণেই অপরপক্ষ বলিত, ফজলুল হক শ্যামাপ্রসাদের হাতের মুঠায় ছিলেন। ইহা সত্য না হইলেও ফজলুল হক যে ক্রমেই মুসলমানসম্প্রদায়ের বিরাগভাজন হইতেছিলেন সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। ১৯৪২ সনে একটি মুসলমান-সদস্যপদ শূন্য হওয়ায় যে নূতন নির্বাচন হয় তাহাতে মুসলিম লীগের প্রার্থী পাইলেন ১০,৮৪৩ ভোট, আর ফজলুল হকের দলের প্রার্থী পাইলেন মাত্র ৮৪০ ভোট।

পূর্বেই বলিয়াছি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ফজলুল হকের মন্ত্রীসভায় অর্থদপ্তরের ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। চিত্তরঞ্জন ও সুভাষচন্দ্রের পরেই তখন বাংলার রাজনীতিতে তাহার স্থান। তিনি একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক ছিলেন কংগ্রেসের সঙ্গে তিনটি মৌলিক বিষয়ে তাঁহার মতের প্রভেদ ছিল। প্রথমতঃ, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কিত ব্যাপারে যেমন গান্ধীপরিচালিত কংগ্রেসে মুসলমানের সম্বন্ধে যে অতিরিক্ত ও অসঙ্গত পক্ষপাতিত্ব ছিল শ্যামাপ্রসাদের তাহা ছিল না। তিনি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে অপক্ষপাত ব্যবহারের দাবি করিতেন। যে-কোন প্রকারেই (মূল্যেই) হউক মুসলমানদের তুষ্টিবিধানপূর্বক তাহাদের সহযোগিতা লাভ করিতে হইবে, নচেৎ ভারতের মুক্তিসংগ্রাম সফল হইবে না–গান্ধী ও তাঁহার অনুগত কংগ্রেসের এই নীতির তিনি প্রতিবাদ করিতেন। দ্বিতীয়তঃ, কংগ্রেসের মত তিনি প্রাদেশিক শাসনের নূতন আইন (১৯৩৫) একেবারে তুচ্ছ বলিয়া অগ্রাহ্য করেন নাই। তাহার বিশ্বাস ছিল, নূতন সংবিধানে যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা আছে তাহা পূর্ণ স্বাধীনতার তুল্য না হইলেও তাহা যথাযথ অনুসরণ করিলে জাতি পূর্ণস্বাধীনতার পথে অগ্রসর হইবে। তৃতীয়তঃ, তিনি জানিতেন, মুসলিম লীগ হিন্দুস্বার্থের বিরোধী এবং বাংলা দেশের রাজ্যশাসনে তাহাদের আধিপত্য বা প্রভাব হিন্দুর পক্ষে অনিষ্টকর। সুতরাং তিনি ফজলুল হকের আমন্ত্রণে মন্ত্রীপদ গ্রহণ করিলেন। ইহার বোধহয় আর একটি কারণও ছিল। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ বাড়াইয়া ব্রিটিশ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গভর্নমেন্ট মুসলিম লীগের রাজনীতিক প্রভাব বাড়াইতে সচেষ্ট ছিলেন। এইজন্যই তাঁহারা অপেক্ষাকৃত অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ফজলুল হকের পরিবর্তে মুসলিম লীগের প্রভাব ও ক্ষমতা যাহাতে বাড়ে তাহার জন্য সর্বদাই চেষ্টা করিতেন। সুতরাং ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাংলার মন্ত্রীসভা যাহাতে মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত না হয় এইজন্য শ্যামাপ্রসাদ তাহার সহিত যোগ দিলেন।

ফজলুল হকের নবগঠিত মন্ত্রীসভায় শ্যামাপ্রসাদের তুল্য বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনচেতা আর কোন মন্ত্রী ছিলেন না, একথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে।

মুসলিম লীগের পরিবর্তে হিন্দুদের সহযোগিতায় মন্ত্রীসভা গঠনের স্বপক্ষে ফজলুল হকের মনেও যে আর একটি যুক্তি ছিল, তাহার উল্লেখ করা আবশ্যক। ফজলুল হক অদূরদর্শী ও অব্যবস্থিতচিত্ত হইলেও তাঁহার মধ্যে কয়েকটি প্রশংসনীয় গুণও ছিল। ভারতের বৃহত্তর রাজনীতিক পটভূমিকায় বাংলার স্বার্থ যাহাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকে তাঁহার সজাগ দৃষ্টি ছিল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই ভারতের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে দৃষ্টি রাখিয়াই বাংলার রাজনীতি গঠিত করিতে চেষ্টা করিত। উভয়েই এইজন্য বাংলার প্রাদেশিক রাজনীতিতে অযথা হস্তক্ষেপ করিত। ফজলুল হক মনে করিতেন যে, ইহা অন্যায় ও অসঙ্গত এবং কোন প্রদেশের সমস্যা সম্পর্কে যথাসম্ভব প্রাদেশিক নেতৃত্বের মতামত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তব্য। এ-বিষয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই সমানভাবে অপরাধী। দুঃখের বিষয়, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কয়েকজন হিন্দু ব্যতীত আর কেহই যেমন গান্ধী-প্রভাবিত কংগ্রেসের এই নীতি বোধ করিতে চেষ্টা করেন নাই–ঠিক তেমনি ফজলুল হক ব্যতীত আর কোনও মুসলমান নেতাই জিন্নার প্রভাবযুক্ত মুসলিম লীগের অনুরূপ নীতির বিরুদ্ধাচরণ করিতে পারেন নাই। এ-বিষয়ে সুভাষচন্দ্রের সহিত গান্ধীর পত্রবিনিময় পরিশিষ্টে উল্লেখ করা হইয়াছে। দুঃখের বিষয়, প্রাদেশিক ব্যাপারে গান্ধী ও জিন্নার হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকিয়া বাংলা দেশের প্রভূত অনিষ্ট সাধন করিয়াছে।

অতঃপর এই মন্ত্রীসভার শাসনকার্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতেছি।

জনগণের নির্বাচিত মন্ত্রীদের হাতে শাসনক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ায় অনেকেই আশা করিয়াছিল যে, সরকারের কঠোর দমনমূলক বিধি-বিধানগুলি এবার বাতিল করিয়া দেওয়া হইবে এবং বিনাবিচারে কারারুদ্ধ অসংখ্য ব্যক্তি মুক্তি পাইবে। এই আশার প্রথমাংশ সফল হয় নাই, অর্থাৎ দমনমূলক বিধি-বিধানগুলি বাতিল করা হয় নাই; কিন্তু শেষের অংশটি সফল হইয়াছিল। ১৯৩৮ সনের ২৫শে অগষ্টের মধ্যে দফায় দফায় ২৩০৪ জন বিনাবিচারে আটক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হইয়াছিল। আদালতের বিচারে দণ্ডিত সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে পীড়িত বন্দীদেরও অবিলম্বনে মুক্তি দেওয়া হইল এবং প্রত্যেকের বিষয়ে তদন্ত করিবার জন্য একটি তদন্ত কমিটি নিযুক্ত হইল। ইহার ফলে ১৯৩৯ অক্টোবর মাসের মধ্যে ১২ জন সন্ত্রাসবাদী কয়েদী মুক্তিলাভ করে, ৪১ জনকে কয়েকটি শর্তে মুক্তিদানের ব্যবস্থা হয়, ৭ জনের দণ্ডকাল হ্রাস করা হয়, ৪১ জনের অবস্থার কোন পরিবর্তন করা হয় না।

মোটের উপর দুই হাজারেরও বেশী সন্ত্রাসবাদী জেলখানা ও অন্তরীণ অবস্থা হইতে মুক্তি পায়। এই নীতি যে সঙ্গত ও সময়োপযোগী হইয়াছিল তাহার প্রমাণস্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, এই দুই হাজারের বেশী ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া সত্ত্বেও পুরাতন সন্ত্রাসবাদের পুনরাবির্ভাব হয় নাই। তবে এই দলের অনেকে কমিউনিষ্ট মতবাদের প্রভাবে প্রজাদিগকে জমিদারদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে। পুরাতন গুপ্ত বিপ্লবীদলের প্রতিষ্ঠানগুলিও একেবারে লোপ পায় নাই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হইবার পর সন্ত্রাসবাদের সূচনা দেখা দেয়। সরকারী রিপোর্টে বলা হয় যে, সদ্যমুক্ত সন্ত্রাসবাদীদের কেহ কেহ আবার পূর্বপথ অনুসরণ করিতে থাকে যাহার ফলে ২০ জনকে পুনরায় আটক করা হয়।

কিন্তু পুরাতন রকমের সন্ত্রাসবাদ লোপ পাইলেও অন্যরকমের শান্তিভঙ্গকারী আন্দোলন পরিলক্ষিত হইতে থাকে। ইহার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অন্ধকূপ হত্যার স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণ আন্দোলন। ইতিহাসে লিখিত আছে যে, বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ অধিকার করিয়া ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দীকে একটি ক্ষুদ্র কক্ষে সারারাত্রি অবরুদ্ধ রাখেন, ফলে কমধ্যে ১২৩ জনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা চিরস্মরণীয় করিবার জন্য ইংরেজরা ঐ কক্ষটি যেখানে অবস্থিত ছিল (বর্তমান ডালহৌসী স্কোয়ার, পরে বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ, অথবা বি-বা-দী বাগের নামান্তরিত স্থানটির উত্তর-পশ্চিম কোণে) একটি প্রস্তরনির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। কোন কোন ঐতিহাসিক এই অন্ধকূপ-হত্যার কাহিনী বিশ্বাস করেন না, বরং মনে করেন, নবাব সিরাজের মিথ্যা কলঙ্ক প্রচারের জন্যই এই স্তম্ভটি নির্মিত হইয়াছিল। এই কারণেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার কলঙ্ক চিহ্নস্বরূপ ঐ স্তম্ভটি ধ্বংস করার জন্য একটি আন্দোলন আরম্ভ হয় এবং ইহার নেতা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।

১৯৪০ সালের ২৫শে মে ঢাকা শহরের প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় কনফারেন্সে সুভাষচন্দ্রের আহ্বানে বহু মুসলিম তরুণ যুবক হলওয়েল মনুমেন্টটি নিশ্চিহ্ন করিবার জন্য অগ্রসর হইলেন।

সুভাষচন্দ্র বসু ২৯শে জনু (১৯৪০) কলিকাতার অ্যালবার্ট হলে এক বিরাট জনসভায় ঘোষণা করিলেন, “হলওয়েল মনুমেন্ট জাতীয় পরাধীনতার অন্যতম চিহ্নস্বরূপ। বহু বৎসর যাবৎ এই অলীক কলঙ্গচিহ্ন বাংলার বুকে দাঁড়াইয়া আছে। …৩রা জুলাই সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি-দিবসের মধ্যে হলওয়েল মনুমেন্টটি লোকচক্ষুর অন্তরালে সরাইয়া লইবার দাবি বাংলা সরকারের নিকট করা হইয়াছে।” হিন্দু-মুসলমানের এই মিলিত আন্দোলনে ইংরেজ সরকার বিচলিত হইলেন। সুভাষচন্দ্র ৩০শে জুন (১৯৪০) আনন্দবাজার পত্রিকায় এক বিজ্ঞপ্তি দিলেন, “আগামী ৩রা জুলাই থেকে আমাদের অভিযান শুরু হবে। আমি সিদ্ধান্ত করেছি যে, প্রথম দিনের বাহিনী পরিচালনা করব আমি নিজে।”

তাহার আগের দিনই (২রা জুলাই) পুলিশ সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করিল, কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখেই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম আরম্ভ হইল। পুলিশ প্রস্তুত ছিল। দলে দলে স্বেচ্ছাসেবকগণ অগ্রসর হইলে পুলিশ তাহাদের লাঠির প্রহারে জর্জরিত করিয়া অনেককে গ্রেপ্তার করিল। পরবর্তী তিন সপ্তাহ ধরিয়া প্রতিদিনের আন্দোলন এইভাবে চলিল এবং প্রায় তিনশত স্বেচ্ছাসেবক গ্রেপ্তার বরণ করিল।

সুভাষচন্দ্রের গ্রেপ্তারে এবং পুলিশের অত্যাচারে হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে জনগণ উত্তেজিত হইয়া উঠিল। ১৩ই জুলাই অ্যালবার্ট হলেও জনাব আবদুল করিমের সভাপতিত্বে বিরাট প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হইল। গভর্নমেন্ট কড়া নির্দেশ দিলেন, এই আন্দোলন-সক্রান্ত কোন সংবাদ যেন কোন খবরের কাগজে ছাপা না হয় এবং ছাত্রগণও যেন ইহাতে যোগ না দেয়। প্রত্যুত্তরস্বরূপ ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রগণ (অধিকাংশই মুসলমান), এই ‘বেআইনী’ আদেশ অগ্রাহ্য করিয়া কলেজপ্রাঙ্গণে সভা করিল। পুলিশ তাহাদের উপর বেপরোয়া লাঠি চালাইল। ইহার ফলে কলিকাতার বিরাট ছাত্রসমাজ রাস্তায় রাস্তায় প্রকাশ্যে আন্দোলন শুরু করিল। মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ইহার পরদিনই ঘোষণা করিলেন, হলওয়েল মনুমণ্ট অপসারিত করা হইবে। যাহাদের গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল, সুভাষচন্দ্র ব্যতীত তাহাদের সকলকেই ছাড়িয়া দেওয়া হইল।

বঙ্গদেশে কমিউনিষ্ট মতবাদের প্রভাব খুব বেশি না হইলেও গভর্নমেন্ট বিচলিত হইয়া উঠিল। ১৯৩৮ সনে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও মুদ্রাকরকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথম আদালতের বিচারে দণ্ড হইলেও আপীল আদালত তাঁহাদিগকে খালাস দেন। ১৯৩৯ সনে কমিউনিষ্ট নেতা বাটলিওয়ালা এবং কংগ্রেস সোসিয়ালিস্ট পার্টির (সমাজতন্ত্রবাদী) নেতা ও নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির বিদেশী বিভাগের ভূতপূর্ব সেক্রেটারি রামমনোহর লোহিয়া বিদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত হন। বাটলিওয়ালার ছয়মাস কারাদণ্ড হয় এবং লোহিয়ার কোন শাস্তি হয় নাই। কিন্তু, যখন কমিউনিষ্ট মতবাদের জনক ও প্রধান কেন্দ্র রাশিয়া বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির (ইংলণ্ড ও ফ্রান্স) সঙ্গে যোগ দিল তখন রাতারাতি বাংলার তথা ভারতীয় কমিউনিষ্টদের মতবাদ একেবারে পাল্টাইয়া গেল।

‘সাম্রাজ্যবাদী সংগ্রামে’র নায়ক ইংলণ্ড তখন জনগণের প্রতিভূস্বরূপ হইয়া সাম্রাজ্যবাদী জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতেছে। সুতরাং, কমিউনিষ্ট দল তাহাদের শত্রুর বদলে পরম মিত্র হইয়া দাঁড়াইল, ইংরেজ গভর্নমেন্টও কমিউনিষ্ট বন্দীদের মুক্তি দিল এবং বেআইনী সমিতির তালিকা হইতে কমিউনিষ্ট দলের নাম কাটিয়া দিল (১৯৪২)।

কমিউনিষ্ট আন্দোলনের ন্যায় শ্রমিক-আন্দোলনও অন্য প্রদেশের তুলনায় বঙ্গদেশে খুব বেশী প্রভাব বিস্তার করে নাই। কলিকাতার পাটকলগুলিতে ১৯৩৭ সনে এবং পরবৎসর কুলটি ও হীরাপুরের লৌহ-ইস্পাতের কারখানায় ধর্মঘট হইয়াছিল। কিন্তু গভর্নমেন্ট ইহা মিটাইয়া দিয়াছিল। ১৯৩৮ সনের নভেম্বর মাসে টিটাগড়ের পাটকলগুলিতে গুরুতর ধর্মঘট হয়। প্রায় ৪৩ হাজার শ্রমিক ছয়সপ্তাহ ধরিয়া এই ধর্মঘট চালাইয়াছিল। দলগত মারামারি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় পরিণত হয়। ফলে তিনজন নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়। ইহা ছাড়াও ১৯৩৮ সনে একটি জুতাতৈরীর ফ্যাক্টরিতে এবং বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হইবার পর ১৯৩৯, ১৯৪১ ও ১৯৪২ সনে পাটকলে বড়রকমের ধর্মঘট হয়। ১৯৪০ সনে কলিকাতার মেথরেরা ধর্মঘট করে। গভর্নমেন্ট হস্তক্ষেপ করায় এবং কিছু বেতন বাড়াইবার ফলে এইসব ধর্মঘট মিটিয়া যায়।

নূতন মন্ত্রীদল বিধানসভায় প্রথম অধিবেশনে ভূমির রাজস্ব সম্বন্ধে ঘোষণা করেন যে, ১৭৯৩ সনে প্রতিষ্ঠিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কোন পরিবর্তন আবশ্যক কিনা তাহা তদন্তের জন্য একটি কমিশন বসাইয়াছেন। এই কমিশনের অধিকাংশ সদস্য জমিদারি প্রথার পরিবর্তে রায়ওয়ারী প্রথার প্রবর্তন করার স্বপক্ষে মত দিলেন। কিন্তু এ-বিষয়ে মন্ত্রীরা কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নাই বলিয়া কোন পরিবর্তন হইল না। নূতন মন্ত্রীসভা যে কয়েকটি লোকহিতকর কার্য করেন তাহার মধ্যে রায়দের অবস্থার উন্নতিসাধনই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইহার জন্য প্রচলিত আইনের সংশোধক দুইটি আইন পাশ হয়। ১৯৩৮ সনের আইনে (১) বাকী খাজনা আদায়ের জন্য জমিদারের ক্ষমতা খর্ব করা হয়, (২) বাকী খাজনার সুদের হার শতকরা ১২.৫ হইতে ৬.২৫ করা হয়, (৩) জমিদার কর্তৃক প্রজাদের দেয় খাজনা বৃদ্ধি করার ক্ষমতা দশবৎসরের জন্য স্থগিত রাখা হয়। ১৯৪১ সনের আর একটি আইনে মর্টগেজ ও বাকী খাজনা আদায় সম্বন্ধে প্রজাগণকে অনেক সুবিধা দেওয়া হয়।

বহুদিন যাবৎ উচ্চহারে সুদ দিয়া মহাজনদের নিকট হইতে টাকা কর্জ করিয়া দরিদ্র প্রজারা সর্বস্বান্ত হইত। ইহার প্রতিকারের জন্য ১৯৪০ সনে নূতন আইনে সুদের উচ্চতম হার নির্দিষ্ট করা হয়। চক্রবৃদ্ধি (অর্থাৎ, সুদ বাকী থাকিলে তাহা আসলের সঙ্গে যোগ করিয়া লইয়া এই টাকার উপর সুদ লওয়ার ব্যবস্থা) রহিত করা হয়। সাধারণ সুদের হারও-বন্ধক রাখিয়া কর্জ করিলে শতকরা ৮ টাকা এবং বিনা-বন্ধকে কর্জের জন্য ১০ টাকার বেশী হইতে পারিবে না, এই আইনও প্রবর্তিত হইল।

১৯৩৯ সনে হিন্দুসম্প্রদায়ের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও কলিকাতা মিউনিসিপালিটির গঠনসম্বন্ধে একটি সংশোধক আইন পাশ হয়। ইহাতে পৃথকভাবে মুসলমান ও অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা হয় এবং তপশীলভুক্ত জাতির জন্য কয়েকটি সদস্যের আসন সংরক্ষিত করা (reserved seat) হয়।

একটি আইনে দুর্ভিক্ষ, বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আত্রাণের জন্য একটি ধনভাণ্ডারের ব্যবস্থা হয়। আর একটি আইনের দ্বারা শ্রমশিল্প কারখানায় নিযুক্ত স্ত্রীলোকদের সন্তানপ্রসবের অব্যবহিত পূর্বে ও পরে নির্ধারিত সময়ের জন্য পুরা মহিনায় ছুটির ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৪০ সনে দোকানের কর্মচারীদের সুবিধার জন্য একটি আইনে স্থির হয় যে, প্রতি সপ্তাহে কর্মচারীরা দেড়দিন এবং প্রতি বৎসর ১৫ দিন পুরা বেতনে ছুটি পাইবে, সরকারী ছুটির দিন দোকান বন্ধ থাকিবে, রাত্রি আটটার সময় দোকান বন্ধ করিতে হইবে। দরিদ্র ও বেকারের সাহায্যের জন্যও একটি আইন পাশ হয়।

নূতন মন্ত্রীসভা গঠনের পর কয়েক বৎসর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রায় বন্ধ ছিল; কিন্তু ১৯৪০ সনের পর ইহা আবার দেখা দিল। ঐ বৎসরেরই অগষ্ট মাসে ঢাকায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হয়। মুসলমান জনতা পুলিশকে আক্রমণ করে এবং পুলিশের গুলিতে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়। সেপ্টেম্বর মাসে বর্ধমানে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গায় হিন্দুজনতা পুলিশকে আক্রমণ করে, পুলিশের গুলিতে ৪ জন হিন্দু এবং মুসলমান জনতার আক্রমণে ১ জন হিন্দুর মৃত্যু হয়। ১৯৪১ সনের ফেব্রুআরি মাসে মহরমের শোভাযাত্রা উপলক্ষে হিন্দু মুসলমানে মারামারি হয়, পুলিশ লাঠি চালাইয়া ও কাঁদুনে গ্যাস ছাড়িয়া হাঙ্গামা থামায়। ঐ মাসের শেষে লোকগণনা (census) উপলক্ষে নানাস্থানে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিরোধ হয়। কারণ, সংবিধানে সাম্প্রদায়িক লোকসংখ্যার উপর জোর দেওয়া হয় এবং এইজন্য প্রত্যেক সম্প্রদায়ই লোকসংখ্যা বেশি দেখাইবার জন্য ব্যস্ত হয়। হিন্দুরা অভিযোগ করে যে মুসলমানেরা অসৎ উপায়ে তাহাদের লোকসংখ্যা বেশী করিয়া লেখাইয়াছে; ইহাই বিরোধের কারণ। মার্চ মাসে (১৯৪১) গোড়ার দিকে নিছক একটি ব্যক্তিগত কলহের ফলে খুলনা জিলায় সাম্প্রদায়িক সংগ্রাম আরম্ভ হয়। ইহার ফলে বহুলোক হতাহত হয়, দুইটি গ্রাম ভস্মসাৎ হয় ও বহু শস্য নষ্ট হয়।

সর্বাপেক্ষা গুরুতর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এই বৎসর হয় ঢাকা শহরে। ১৭ই মার্চ (১৯৪১) দাঙ্গা আরম্ভ হয়। পরদিন লুঠপাট মারামারি চলে এবং হিন্দুরা মসজিদ আক্রমণ করিয়াছে এই জনরব রটিবার ফলে তিনদিনব্যাপী শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে রীতিমত যুদ্ধই হয় বলা যাইতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে ছোরা-মারা, আগুন দেওয়া ও ব্যাপকভাবে লুণ্ঠনকার্য চলিতে থাকে। পুলিশ ও সৈন্যদল গুলিবর্ষণ করিতে বাধ্য হয়। ইহার ফলে ২১শে মার্চ শহর অনেকটা শান্ত হয়। পুনরায় ১০ই এপ্রিল দাঙ্গা আরম্ভ হয়। প্রায় সাতশত লোক গ্রেপ্তার হয়। তিনমাসের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ শহরে মোতায়েন করা হয়। এই গ্রন্থের লেখক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (Vice-Chancellor)। তাঁহার জীবনস্মৃতি হইতে কিছু উদ্ধৃত করিতেছি :

“১৯৪১ সনের মার্চ মাসে ঢাকা শহরের বুকের উপর যে বীভৎস তাণ্ডব নৃত্য কয়েকদিন যাবৎ প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম আজও তাহার স্মৃতি মনে উজ্জ্বল হইয়া। আছে।

প্রায় একসপ্তাহ কাল যাবৎ অতর্কিতে ছোরা মারিয়া হত্যা করা, আগুন লাগান এবং লুঠপাট অবাধে চলিতেছিল। পুলিশ ইহা দমন করিতে অসমর্থ হওয়ায় সৈন্য ডাকিতে হইয়াছিল এবং কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করিতে হইয়াছিল। পঞ্চাশ জন নিহত ও কয়েকশত আহত হইয়াছিল। ঢাকা শহরের শত শত হিন্দু নরনারী বালক বালিকাসহ শহরের উপকণ্ঠে রমনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি হিন্দুছাত্রের হোষ্টেলে আশ্রয় লইয়া কোনমতে মান ও প্রাণরক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিল।”

ক্রমে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শহরের বাহিরে গ্রামে ছড়াইয়া পড়িল। মুসলমানেরা অনেক স্থলে হিন্দুর বাড়ীঘর লুঠপাট করিয়া পোড়াইয়া দিয়াছিল। সরকারী বিবরণে প্রকাশ যে, অন্ততঃ দশহাজার হিন্দু ঘরবাড়ী ত্যাগ করিয়া নিঃস্ব অবস্থায় পলাইতে বাধ্য হইয়াছিল। সম্ভবতঃ প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। গভর্নরের আহ্বানে ছয়জন মন্ত্রী ও গভর্নমেন্টের বিরোধীদলের সাতজন নেতা একত্র হইয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাইবার উপায় উদ্ভাবন করিবার জন্য ১০ই মার্চ এবং এপ্রিলের শেষভাগে কয়েকদিন আলোচনা করেন। ইহার ফলে একটি ঘোষণাপত্র (communique) প্রচার করিয়া দুই সম্প্রদায়ের নিকট শান্তিতে বসবাস করিবার আবেদন জানান এবং এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পাড়ায় ‘শুভেচ্ছা সমিতি’ (Goodwill Committee) প্রতিষ্ঠা করেন। একজন জজের দ্বারা ঢাকার দাঙ্গা-হাঙ্গামা-সংক্রান্ত ব্যাপার অনুসন্ধান করারও ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ২৬শে জুন ঢাকায় আবার দাঙ্গা আরম্ভ হয়। ইহা শীঘই থামিয়া যায়, কিন্তু এইপ্রকার ছোটখাট দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রায় ৭ই জুলাই পর্যন্ত চলিতে থাকে। মোটের উপর এইসব দাঙ্গায় ৩০ জনেরও বেশী নিহত হয়। পরে কয়েকমাস বন্ধ থাকিয়া আবার অক্টোবর মাসে দাঙ্গা আরম্ভ হয়। কিছুদিন পরে ইহা থামিয়া যায়।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাইতে পারে, ১৯৪০ সনের ডিসেম্বর মাসে সুভাষচন্দ্র বসু বড়লাট লর্ড লিনলিথগোর নিকট এক পত্রে লেখেন যে, বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিবাদের জন্য ফজলুল হকের মন্ত্রীসভাই দায়ী এবং অনুরোধ করেন, বিধানসভার সরকারী ও ইউরোপীয় সদস্যগণ যেন এই মন্ত্রীদের টিকিয়া থাকিতে সহায়তা ও সমর্থন না করে এবং প্রয়োজন হইলে বর্তমান মন্ত্রীসভা বরখাস্ত করিয়া গভর্নর যেন নিজের হস্তে শাসনভার গ্রহণ করেন।

ঢাকার পূর্বোক্ত দাঙ্গা-হাঙ্গামার রকম দেখিয়া হিন্দুদের মনে দৃঢ় ধারণা হইয়াছিল যে, সরকার এই ব্যাপারে মুসলমানদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাইয়াছিলেন। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা প্রকাশ্যে ফজলুল হকের মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনিয়াছিল যে, তাহারা হিন্দুর রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব খর্ব করিবার জন্যই এইপ্রকার সাম্প্রদায়িক বিরোধে উৎসাহ দিয়াছে। ফজলুল হক মুখে মাঝে-মাঝে হিন্দুর বিরুদ্ধে মন্তব্য প্রকাশ করিলেও সে-যুগের মুসলমান নেতাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত অনেক কম পরিমাণে সাম্প্রদায়িক মনোভাব পোষণ করিতেন এবং হিন্দুসম্প্রদায়ের প্রতি তাঁহার উদার মনোভাবের অনেক পরিচয় দিয়াছেন। তিনি এককালে কংগ্রেসের সেক্রটারী ও মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন (১৯১৮)। পূর্বোক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় ব্যথিত হইয়া তিনি জিন্নাকে কংগ্রেসের সহিত আপস করিতে বলিয়াছিলেন। জিন্না তাহার উত্তরে বলিয়াছিলেন যে, তিনিও এই ইচ্ছা পোষণ করেন, কিন্তু কংগ্রেস ইংরেজ গভর্নমেন্টের কাছে যেসব দাবি করে সে-সম্বন্ধে মুসলমানদের সঙ্গে কোন পরামর্শ করা আবশ্যক মনে করে না এবং কংগ্রেসকেই ভারতের রাজনীতিক ক্ষেত্রে একমাত্র যোগ্য প্রতিষ্ঠান বলিয়া মনে করে। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, ফজলুল হক সর্বপ্রথম কংগ্রেসের সহিত যোগ দিয়াই মন্ত্রীসভা গঠন করিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু কংগ্রেস রাজী না-হওয়ায় বাধ্য হইয়াই মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগদান করিয়া যুক্ত মন্ত্রীসভা (Coalition Ministry) গঠন করিয়াছিলেন। ইহার ফলে যে সরকারী নীতি সাম্প্রদায়িকতা-দোষে দুষ্ট হইয়াছিল সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

ফজলুল হক যখন দ্বিতীয়বার মন্ত্রীসভা গঠন করেন (১২ই ডিসেম্বর, ১৯৪১) তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংলণ্ডের অবস্থা খুব সঙ্কটজনক। ৮ই ডিসেম্বর অর্থাৎ চারিদিন পূর্বে ইংলণ্ড ও জাপানের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। ১৯৪২ সনের ২৮শে জানুআরি জাপানীরা রেঙ্গুনের উপর বোমা বর্ষণ করে, ১৫ই ফেব্রুআরি তাহারা সিঙ্গাপুর অধিকার করে এবং ৭ই মার্চ ব্রিটিশসৈন্য রেঙ্গুন হইতে পলায়ন করিতে আরম্ভ করে। ১৫ই মে সশস্ত্র ব্রহ্মদেশ জাপানের পদানত হয় এবং জাপানী সৈন্য ভারতের দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। ২০শে ডিসেম্বর জাপানীরা কলিকাতার উপর প্রথম বোমাবর্ষণ করে। এই বৎসরের প্রথম হইতেই সহস্র সহস্র ভারতবাসী ব্রহ্মদেশ হইতে পদব্রজে বাংলা দেশের অভিমুখে যাত্রা করেন।

এই সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেন্টের চাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল (Churchill) ভারতের সঙ্গে একটি বোঝাপড়া করিবার জন্য তাঁহার মন্ত্রীসভার ক্রিসকে (Cripps) ভারতে পাঠাইলেন। ক্রিস ১৯৪২ সনের ২৩শে মার্চ দিল্লী আসিয়া পৌঁছিলেন। ইংলণ্ড হইতে তিনি যে-প্রস্তাব আনিলেন তাহাতে ইংরেজ ভারতকে যুদ্ধের পরই উপনিবেশের ন্যায় স্বাধীনতা দিতে স্বীকৃত হইল। যতদিন এই নূতন শাসন প্রবর্তিত না হয় ততদিন পর্যন্ত ভারতের প্রতিনিধিগণ বড়লাটের সহিত শাসনকার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিবেন। যুদ্ধ থামিবামাত্র নূতন সংবিধান গঠন করিবার জন্য ভারতীয়গণ মিলিত হইবেন। তবে কোন প্রদেশ যদি এই সংবিধান মানিতে প্রস্তুত না থাকে, সেই প্রদেশের অধিবাসীগণ স্বতন্ত্র সংবিধান গঠন করিয়া পৃথকভাবে ঔপনিবেশিক স্বাধীনতা ভোগ করিতে পারিবে।

পরবর্তীকালের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, ইহার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কোন প্রস্তাব তখন সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই ইহাতে আপত্তি করিল। কংগ্রেস বলিল–ইহার অনিবার্য ফলস্বরূপ ভারতবর্ষ হিন্দু ও মুসলমান শাসিত দুইটি স্বতন্ত্র রাজ্যে বিভক্ত হইবে। মুসলমানদের আপত্তির কারণ হইল যে, এইরূপ বিভাগের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নাই। ইহা ছাড়া আরও কোন কোন সমস্যার মীমাংসা লইয়া মতভেদ হইল। মোটের উপর ক্রিপসের দৌত্য ব্যর্থ হইল। অতঃপর গান্ধী প্রস্তাব করিলেন যে, বর্তমান সমস্যার একমাত্র সমাধান ইংরেজকে ভারত ছাড়িয়া যাইতে হইবে। যদি জাপান ভারত আক্রমণ করে তবে ভারতীয়েরাই অহিংস অসহযোগ দ্বারা সেই আক্রমণের প্রতিরোধ করবে। এই ‘ভারত ছাড়’ (Quit India) নীতি নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সমর্থন করিল (এপ্রিল-মে ১৯৪২) এবং অতঃপর এই নীতির সমর্থনে গান্ধী বহু প্রবন্ধ লিখিয়া দেশকে ইহার জন্য প্রস্তুত করিলেন। তাঁহার বিশ্বাস ছিল, ইংরেজ ভারত ছাড়িয়া গেলে জাপানীরা ভারত আক্রমণ করিবে না। ২৪শে মে তিনি লিখিলেন : “আমি ইংরেজকে এমন কথা বলি না যে, তোমরা কংগ্রেস বা হিন্দুদের হাতে ভারত ছাড়িয়া দাও। তোমরা ভারত ত্যাগ কর, তারপর পরস্পরের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি করিয়া বিভিন্ন দলের মধ্যে দায়িত্বের চাপ পড়িলে একটা মিটমাট হইবেই। এইসব মারামারি ও বিশৃঙ্খলার মধ্য হইতেই অহিংসার আবির্ভাব হইবে।”

উপরোক্ত মন্তব্য হইতে সুস্থমস্তিষ্ক সাধারণ লোক মনে করিতে পারে যে, গান্ধী যেন দেশটা লইয়া ছিনিমিনি খেলিতেছেন। কিন্তু তাঁহার ভক্তগণের অচলা ভক্তি অটুট রহিল। ১৯৪২ সনের ১৪ই জুলাই কংগ্রেসের কার্যকরী সমিতি ওয়ার্ধার অধিবেশনে ভারত ছাড়’-নীতি অনুমোদন করিয়া এক সুদীর্ঘ প্রস্তাব গ্রহণ করিল। ইহাতে দাবি করা হইল যে “ব্রিটিশ শাসন এই মুহূর্তেই শেষ করিতে হইবে (British rule in India must end immediately)। ব্রিটিশ ভারত ছাড়িয়া যাইবার পরই ভারতীয় প্রতিনিধিগণ মিলিত হইয়া স্বাধীন ভারতের জন্য এমন একটি সংবিধান প্রস্তুত করিবে যাহা সকল সম্প্রদায়েরই অনুমোদন লাভ করিবে। যদি ইংরেজ ও তাহার মিত্র শক্তিবর্গ ইচ্ছা করে, তবে জাপানের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ভারতের সৈন্য রাখিতে পারে।

“যদি ইংরেজ এই প্রস্তাব গ্রহণ না করে তবে ভারত তাহার ন্যায্য দাবির জন্য ১৯২০ সনের চেয়েও প্রবলতর শক্তিতে অহিংস আন্দোলন আরম্ভ করিবে।

বিষয়ের গুরুত্ববোধে আগামী ৭ই অগষ্ট তারিখে বম্বে নগরীতে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি এই বিষয়টি সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন।”

এই প্রস্তাব-অনুসারে ৭ই অগষ্ট বম্বে নগরীতে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে ওয়ার্ধার প্রস্তাব গৃহীত হইল। স্থির হইল, “যতদূর সম্ভব সারা ভারতে ব্যাপকভাবে গান্ধীর নেতৃত্বে জনগণের এই অহিংস সংগ্রাম আরম্ভ হইবে।”

প্রস্তাবটি পাশ হইবার পর গান্ধী বলিলেন, “এই মুহূর্ত হইতে ভারতের প্রত্যেক নরনারী নিজেকে স্বাধীন মনে করিবে এবং তদনুরূপ আচরণ করিবে। …পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া আর কিছুতেই আমি সন্তুষ্ট হইব না। হয় সিদ্ধি, নয় মৃত্যু। আমরা ভারত স্বাধীন করিব, অথবা মৃত্যু বরণ করিব।”

৮ই অগষ্ট রাত্রে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশন শেষ হইল। পরদিন ভোর হইবার পূর্বেই গান্ধী ও কংগ্রেসের অন্যান্য নেতাগণ গ্রেপ্তার হইলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের সমস্ত বিশিষ্ট নেতাগণ কারারুদ্ধ হইলেন। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রতিষ্ঠানগুলি বেআইনী বলিয়া ঘোষিত হইল।

গভর্নমেন্টের ব্যবস্থায় বিপরীত ফল ফলিল। গান্ধীর অহিংস আন্দোলন তাঁহার নেতৃত্বের অভাবে অনেক স্থলেই হিংসাত্মক হইয়া উঠিল। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দুঃখ করিয়া বলিয়াছেন, “বিশ বৎসর ধরিয়া যাহাদের কানে অহিংসার মন্ত্র জপ করা হইয়াছে তাহারা ইহা ভুলিয়া গেল।” সমগ্র ভারতে রেললাইন তোলা, টেলিগ্রাফ-পোষ্ট ভাঙ্গিয়া ফেলা, ডাকঘর লুঠ করা ও পোড়ানো, গভর্নমেন্ট অফিস, গুদাম প্রভৃতি নষ্ট করা, পুলিশ কর্মচারীদের উপর আক্রমণ প্রভৃতি অবাধে চলিয়াছে। ওদিকে গভর্নমেন্টের যে নির্মম পাশবিক অত্যাচার চলিয়াছিল, সভ্যজগতের ইতিহাসে তাহার তুলনা দুর্লভ। এখানে সংক্ষেপে শুধু বঙ্গদেশের কথাই বলিব।

অগষ্ট বিপ্লব

১৯৪২ সনের অগষ্ট মাসে সারা ভারতে যে অহিংস ও সহিংস আন্দোলন হয় তাহার মধ্যে বাংলা দেশের মেদিনীপুর জিলার অধিবাসীগণ শীর্ষস্থান অধিকার করে। কালক্রমানুসারে চট্টগ্রামের বিপ্লবের পরে হইলেও লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যপ্রণালী বিবেচনা করিলে অগষ্টের এই আন্দোলনই ইংরেজের শাসনকালে বঙ্গদেশের সর্বপ্রধান হিংসাত্মক বিদ্রোহ বলিয়া পরিগণিত হইবার যোগ্য। চট্টগ্রামের বিদ্রোহের সহিত তুলনা করিলে ইহার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

প্রথমতঃ, চট্টগ্রামের বিদ্রোহ অল্পসংখ্যক বিপ্লবী বীরের অভিযান-চট্টগ্রাম শহরে অল্প সময়ের জন্য ইংরেজ-শাসন অচল করাই ছিল ইহার লক্ষ্য। বিপ্লবীদলের বাহিরে জনসাধারণের ইহার প্রতি সহানুভূতি থাকিলেও তাহারা ইহাতে কোন সক্রিয় অংশগ্রহণ করে নাই, বরং কতকাংশ ইহার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া পুলিশকে সাহায্য করিয়াছে–ইহার অনেক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হইয়াছে। মেদিনীপুরে যাহা ঘটিয়াছিল তাহা গণবিদ্রোহ-সমগ্র জিলার সর্বশ্রেণীর নরনারীই এই বিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছিল এবং তাহাদের সংখ্যা ছিল অগণিত।

দ্বিতীয়তঃ, চট্টগ্রামের বিদ্রোহের ফলে দুই-তিনদিনের জন্য ইংরেজশাসনের পরিবর্তে বিপ্লবীদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। কিন্তু মেদিনীপুরে প্রায় দেড় বৎসরের অধিক ইংরেজ-শাসন বিলুপ্ত হইয়াছিল। তমলুকে বিপ্লবীরা যে সর্বাঙ্গীণ শাসনপ্রথা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল তাহা ১৭ই ডিসেম্বর, ১৯৪২ হইতে ৮ই অগষ্ট, ১৯৪৪ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এইভাবে তাম্রলিপ্ত ও ইহার প্রতিটি থানায় জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল–ইহার সর্বাধিনায়ক ছিলেন সতীশচন্দ্র সামন্ত।

তৃতীয়তঃ, একটি সমগ্র জিলার নরনারীর প্রতি সুসভ্য ইংরেজশাসনে যে বর্বরোচিত অত্যাচার অনুষ্ঠিত হইয়াছিল, কোন সভ্যজগতের ইতিহাসে তাহার তুলনা মিলে না। চট্টগ্রামেও বর্বরোচিত অত্যাচার হইয়াছিল, তবে তাহা সংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এরূপ ব্যাপকভাবে লুণ্ঠন, গৃহদাহ, অমানুষিক অত্যাচার ও পাইকারী নারীধর্ষণ প্রভৃতি সেখানে হয় নাই।

নানাদিক দিয়া গুরুত্ব থাকিলেও মেদিনীপুরের গণবিদ্রোহ বাংলার আধুনিক যুগের ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় মাত্র; সুতরাং বর্তমান গ্রন্থে ইহার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নহে। কেবল বিশেষ বিশেষ ঘটনার ও পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতেছি।

মেদিনীপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের সংগ্রামী দল রীতিমত আধুনিক সৈন্যদলের নিয়মপ্রণালী অনুসারে গঠিত হইয়াছিল। সরকারী রিপোর্টের নিম্নলিখিত মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

“In Midnapore in Bengal the operations of the rebels indicated considerable care and planning, effective warning system had been devised, elementary tactical principles were observed, for instance, encirclement and flanking movements clearly on pre-arranged signals. The forces of disorder were accompanied by doctors and nursing orderlies to attend the casualties and its intelligence system was effective.”

অর্থাৎ সৈনিক দলের মত মেদিনীপুরের বিদ্রোহীরা বিশেষ যত্নের সহিত অভিযানের কার্যক্রম পূর্বেই ঠিক করিত; নিজের দলকে সতর্ক করিবার বা আদেশ দিবার সংকেত (signal), শত্রুপক্ষের সৈন্যদলকে ঘেরাও করা বা পার্শ্বদেশ ভেদ করিয়া ইহাকে পর্যুদস্ত করা ইত্যাদি সমরকৌশল, যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা শুশ্রষার জন্য ডাক্তার নার্স ও বাহকের বন্দোবস্ত এবং সংবাদ প্রেরণের ও সংগ্রহের ব্যবস্থা-সকলই তাহারা অনুসরণ করিত।

একজন সর্বাধ্যক্ষের অধীনে জাতীয় সরকার গঠিত হইয়াছিল। তাঁহাকে সাহায্য করিবার জন্য বিচার, শৃঙ্খলা ও শান্তিরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও প্রচার বিভাগের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রী নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ডাক বিভাগ স্থাপিত হইয়াছিল। কারামুক্ত চোর-ডাকাতের দমনের জন্য ব্যবস্থা ছিল। স্বেচ্ছাসেবকদের লইয়া সৈন্যদল গঠিত হইয়াছিল এবং উপযুক্ত সর্বাধ্যক্ষ ও সেনানায়ক নিযুক্ত হইয়াছিল। সৈনিকদলের মধ্যে যোদ্ধা ছাড়াও সংবাদ-সংগ্রহকারী, ডাক্তার, কম্পাউণ্ডার, নার্স এবং পীড়িত ও আহত সৈন্যদের বহনেরও ব্যবস্থা ছিল। এইগুলি ছিল সাধারণ ব্যবস্থা। এবার দুই-একটি বিশিষ্ট কেন্দ্রের বিবরণ দিব।

১. তমলুক

২৭শে সেপ্টেম্বর (১৯৪২) এক সভায় স্থির হইল, একসঙ্গে থানা, আদালত ও সরকারী কয়েকটি অফিস আক্রমণ করা হইবে। বাহির হইতে যাহাতে সরকারপক্ষ কোনরূপ সাহায্য না করিতে পারে সেইজন্য ২৮শে রাত্রে বড় বড় গাছ কাটিয়া চারিদিক হইতে তমলুকে প্রবেশ করিবার রাস্তাগুলির উপর ফেলিয়া দেওয়া হইল। ৩০টি রাস্তার উপরকার ছোট ছোট সেতু (culverts) ধ্বংস করা হইল, ২৭ মাইল টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের তার কাটিয়া দেওয়া হইল ও ১৯৪টি টেলিগ্রাফের থাম উপড়াইয়া ফেলা হইল। ঐদিন তিনটি ও পরদিন একটি পুলিশের থানা আক্রমণ করা হইল। পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা-অনুসারে প্রায় বিশ হাজার লোক পাঁচটি বিভিন্ন দলে বিভিন্ন দিক হইতে আক্রমণ করিল। পুলিশ প্রথমে লাঠি চালায় এবং জনতা তাহা গ্রাহ্য না করিয়া অগ্রসর হইলে গুলিবর্ষণ করে। ইহাতে অনেক হতাহত হয়। আহতদের সেবা–এমনকি, মুমূর্ষকে জল দিবার জন্য কোন স্বেচ্ছাসেবিকা অগ্রসর হইলে তাহাকে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের সহিত সংঘর্ষে অনেকে অপূর্ব দেশভক্তি ও অসাধারণ সাহস দেখাইয়া এবং গুলির আঘাত অগ্রাহ্য করিয়া অগ্রসর হইয়াছেন এবং বীরের ন্যায় মৃত্যুকে বরণ করিয়াছেন। ইঁহাদের একটি দলের নেত্রী মাতঙ্গিনী হাজরা মৃত্যুবরণ করিয়া অমরত্ব লাভ করিয়াছেন। সত্তর বৎসর বয়স্কা এই বৃদ্ধা মহিলা সরকারী সৈন্যের গুলিবর্ষণ অগ্রাহ্য করিয়া জাতীয় পতাকা হস্তে লইয়া সদর্পে অগ্রসর হইলেন, তাঁহার হাতে গুলি লাগিয়া আহত হওয়া সত্ত্বেও পতাকা হস্তচ্যুত হইল না। সেই অবস্থাতেই তিনি দেশীয় সৈনিকগণকে নোকরী ছাড়িয়া স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগ দিতে আহ্বান করিলেন। প্রত্যুত্তরে একটি গুলি আসিয়া তাঁহার ললাট বিদ্ধ করিল, বৃদ্ধা মাতঙ্গিনীর মৃতদেহ ভূমিতে লুটাইয়া পড়িল। কিন্তু তখনও তিনি জাতীয় পতাকা দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়া রাখিয়াছেন। এই শ্রেণীর বহু বীরত্ব ও আত্মোৎসর্গের ঘটনা মেদিনীপুরের গণঅভ্যুত্থানকে চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিয়াছে।

সুতাহাটায় সামরিক পোষাকপরিহিত বিদ্যুৎ বাহিনী এবং ভগিনী সেনাশিবির’ (নারী সেনাবাহিনী) পরিচালিত প্রায় চল্লিশ হাজার ব্যক্তি থানা অধিকার করিয়া উহা পোড়াইয়া দেয়।

মহিষাদল থানাও এইভাবে আক্রান্ত হয়। প্রায় বিশ হাজার লোক থানার সম্মুখে আসিয়া স্বাধীনতার প্রস্তাব পাঠ করে। সব-ডিভিশনের কর্তা মি. শেখ আই. সি, এস, চারিজন বক্তাকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য কনষ্টেবলদের আদেশ করেন; কিন্তু কনষ্টেবলেরা তাহা পালন না-করায় তিনি প্রস্থান করিতে বাধ্য হন। এই মহিষাদলেই প্রথমে বিদ্যুৎ বাহিনী’ নামে সেনাদল গঠিত হয় এবং পরে অন্য স্থানেও ইহার অনুকরণ করা হয়। জাতীয় সরকার গঠিত হইলে এই বাহিনীই জাতীয় সৈন্যদলে পরিণত হয়। সৈন্যদলের প্রয়োজনীয় বিভাগের সবগুলিই যে বর্তমান ছিল, পূর্বেই সরকারী রিপোর্টে তাহার উল্লেখ উদ্ধৃত করা হইয়াছে। পরে একটি গেরিলা ও একটি নারীসৈন্য বিভাগ যোগ করা হয়।

এই স্থানে পুলিশ যেরূপ ব্যাপকভাবে পশুর মত নারীধর্ষণ করে এবং বিভিন্ন প্রকারের অকথ্য ও অমানুষিক নির্যাতন ও অত্যাচার করে তাহা অবর্ণনীয়। যে কোন সভ্যজাতির পক্ষে ইহা দুরপনেয় কলঙ্ক। দুই-একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করিতেছি। ৯ই জানুআরি (১৯৪৩) ছয়শত সৈন্য তিনটি গ্রামে প্রবেশ করিয়া একদিনের মধ্য ৪৬ জন নারীকে পুনঃ পুনঃ ধর্ষণ করে, ঘরবাড়ী লুণ্ঠন করে ও জ্বালাইয়া দেয় এবং শিশুদেরও মারপিট করে। গ্রামের শত শত লোককে অনাহারে রাখিয়া বহুদূরে দুর্গম স্থানে লইয়া গিয়া ছাড়িয়া দেয়, প্রচণ্ড শীতে পুকুরের ঠাণ্ডা জলে ডুবাইয়া রাখে, পুরুষদিগকে উলঙ্গ করিয়া গায়ে শীতল জল ঢালিয়া দেয় এবং আরও যেভাবে উৎপীড়ন করে, শ্লীলতা বজায় রাখিয়া তাহা বর্ণনা করা যায় না।

ফজলুল হকের মন্ত্রীসভার কেহ কেহ সরেজমিনে তদন্ত করিতে গেলে অত্যাচারিত নরনারীরা তাহাদের লাঞ্ছনার কথা বর্ণনা করে এবং এই সময়ে তাঁহাদের উপস্থিতিতেও পুলিশ ঘরবাড়ীতে আগুন লাগায়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ফজলুল হকের মন্ত্রীপদ ত্যাগ করার পরে অত্যাচার আরও বেপরোয়াভাবে চলিতে থাকে।

২. কাঁথি

কাঁথি মহকুমাতে প্রায় আট হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রতি ইউনিয়নে শিবির স্থাপন করে এবং প্রতি গ্রামে আন্দোলন চালায়। এমনকি, পুলিশও ভয়ে এই সকল গ্রামে যাইতে বা কাহাকেও গ্রেপ্তার করিতে সাহস করিত না। এখানকার স্কুল কলেজ বন্ধ হইয়া যায়, কারণ শিক্ষক ও ছাত্র সকলেই আন্দোলনে যোগদান করে। সরকারী অফিস, আদালত, বাজার, দোকান-পত্র সবই বন্ধ-শহরটি প্রায় জনশূন্য হইয়া পড়ে। ২০শে সেপ্টেম্বর পিচ্ছবাণী গ্রামে ১১ জন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিরাট জনতা পুলিশকে ঘেরাও করায় পুলিশ স্বেচ্ছাসেবকদিগকে ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হয়। নানা স্থানে পুলিশের লাঠি ও গুলিতে বহু লোক আহত। এক স্থানে প্রায় ২৪ জন লোক আহত হয়–পুলিশ তিনজনের পা ধরিয়া রাস্তা দিয়া টানিয়া লইয়া যায়–তিনজনেরই মৃত্যু হয়। একজন আহত ‘জল জল’ বলিয়া কাতর প্রার্থনা জানাইলে একটি বালক জল লইয়া অগ্রসর হইলে পুলিশ তাহাকে বেয়নেট দিয়া আঘাত করে। ২০শে সেপ্টেম্বর পুলিশ স্বেচ্ছাসেবকের একটি শিবির আক্ৰমণ করিয়া মারধোর করে এবং ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করে। প্রায় দশ হাজার লোক আসিয়া দাবী করিলে ১১ জন ব্যতীত আর সকলকেই ছাড়িয়া দেয়। মহকুমা হাকিম বলেন যে, জনতা চলিয়া গেলে ঐ ১১ জনকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। কংগ্রেস-সেক্রেটারীর অনুরোধে জনতা প্রস্থান করে, কিন্তু ঐ ১১ জনকে মুক্তি দেওয়া হইল না। প্রতিশোধ লইবার জন্য জনতা মহকুমা হাকিমের লঞ্চ ও নৌকা ডুবাইয়া দেয়। নানা স্থানে পুলিশ স্বেচ্ছাসেবকদের শিবির, জাতীয় বিদ্যালয়, স্বদেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তাঁতে-বোনা কাপড়ের ভাণ্ডার ও কাগজপত্র তছনছ করিয়া স্বেচ্ছাসেবকগণকে গ্রেপ্তার করে। লোকের বাড়ীঘর, কংগ্রেস অফিস পোড়াইয়া দেয়, স্বেচ্ছাসেবকগণকে হাত-পা বাঁধিয়া পুকুরে ফেলিয়া দেয়। পাল্টা জবাবে স্বেচ্ছাসেবকরা থানা আক্রমণ করিয়া জিনিসপত্র নষ্ট করে, কনষ্টেবলদিগের অস্ত্রশস্ত্র কাড়িয়া নিয়া আটকাইয়া রাখে, এবং সমস্ত দ্রব্যাদি নষ্ট করিয়া তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেয়। বহু থানা, ডাকঘর, টোল অফিস, কর্মচারীদের বাসস্থান পোড়াইয়া দেয় ও টেলিগ্রাফের তার কাটিয়া দেয়।

১লা অক্টোবর হইতে কাঁথি মহকুমায় প্রায় ৫০০ সৈন্য নানা স্থানে ১২টি শিবির স্থাপন করে। প্রতিদিন তাহারা বাহির হইয়া সরকারী কর্মচারীদের সম্মুখে দলে দলে ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে গিয়া বাড়ীঘরে আগুন লাগায় এবং যতক্ষণ-না গৃহগুলি ভস্মসাৎ হয় ততক্ষণ দাঁড়াইয়া দেখে। অবশ্য আগুন লাগাইবার পূর্বেই টাকা পয়সা, গয়নাগাটি সবই আত্মসাৎ করে। কেবল এই একটি মহকুমার ৭৬৬টি গৃহ এইভাবে আগুন দিয়া ধ্বংস করা হয়। দূরে পুলিশ ও সৈন্য দেখিলে গৃহবাসীরা ধানক্ষেতে লুকাইয়া পড়িত এবং পুলিশ ও সৈন্যদল চলিয়া না-যাওয়া পর্যন্ত বাড়ীতে ফিরিত না। এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে যে, স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে যাহাকে পাইত তাহাকেই মারধোর করিয়া কোথায় কী মূল্যবান দ্রব্য আছে তাহার সন্ধান লইত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মারাঠা-বর্গীর আক্রমণের কাহিনী, সুসভ্য ইংরেজ আমলে ভারতীয় অধিকাংশ স্থলে বাঙ্গালী, সরকারী কর্মচারীদের চোখের উপর তাহার পুনরভিনয় হইত। গ্রামের সম্ভ্রান্ত লোকেদের ধরিয়া আনিয়া বলপূর্বক নাকে খৎ দেওয়ান হইত। তারপর বেত্রাঘাত, মারপিট, নারীধর্ষণ–এই সকল প্রতি গ্রামেই অনুষ্ঠিত হইত। কোন কোন সময় সারা গ্রাম ঘিরিয়া পুরুষদিগকে সরাইয়া নারীধর্ষণ আরম্ভ হইত। বহু স্ত্রীলোককে তিন-চারিবার, এমনকি সন্তান প্রসবের মাত্র ১৯ দিন পরে প্রসূতি মাতাকে, ধর্ষণ করা হইয়াছে। কেহ আপত্তি করিলে বন্দুকের গুঁতা ও লাথি মারিয়া বলপূর্বক তাহাদিগকে ধর্ষণ করিত। একটি রিপোর্টে এইরূপ ২২৮টি নারীধর্ষণের কথা পাওয়া যায়।

মেদিনীপুরের সদর মহকুমায় এবং অন্যান্য স্থানেও এইরকম বীভৎস অত্যাচার অনুষ্ঠিত হইয়াছে, তথাপি সরকার গণশক্তির বিদ্রোহ থামাইতে পারে নাই। শতসহস্র নিরস্ত্র গ্রামবাসী প্রতিদিন সশস্ত্র পুলিশের হাতে এইরূপ লাঞ্ছনা ও নির্যাতন সহ্য করিয়াও তাহাদের বিদ্রোহী মনোবল হারায় নাই–এইরূপ দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।

মেদিনীপুরে সরকারের অত্যাচার সম্বন্ধে বঙ্গদেশের গভর্নমেন্ট ও মন্ত্রীসভা সম্পূর্ণভাবে উদাসীন ছিলেন। মন্ত্রীদের মধ্যে কেবল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ইহার তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, “মেদিনীপুরে সরকার যেভাবে অত্যাচার করিয়াছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান জাতি-ইংরেজের বর্ণনা-অনুসারে-অধিকৃত প্রদেশে যে অত্যাচার করিয়াছিল, কেবল তাহার সহিতই ইহার তুলনা হইতে পারে। আমাদের কাছে পুলিশসৈন্য কর্তৃক শত শত ঘরবাড়ী পোড়ানো এবং নারীধর্ষণের সংবাদ আসিয়াছে।

হিন্দুর ঘরবাড়ী পোড়ানো ও লুঠতরাজ করিবার জন্য সরকারী কর্মচারীরা মুসলমানদিগকে উত্তেজিত করিয়াছে এবং নিজেরাও ঐরূপ করিয়াছে। কলিকাতা হইতে গভর্নমেন্ট ইহা নিষেধ করা সত্ত্বেও স্থানীয় কর্মচারীরা তাহাতে কর্ণপাত করে নাই এবং আমরা ১৬ই অক্টোবর যখন বন্যা ও ঝড়ের (cyclone) প্রকোপে মেদিনীপুরের যে কী দুরবস্থা হইয়াছে তাহা দেখিবার জন্য ১৫ দিন পরে গিয়াছিলাম, বাড়ী পোড়ানো ও লুটপাট তখনও ঐ জিলার কোন কোন অংশে চলিতেছে।”

কিন্তু বর্বরতা ও মেদিনীপুরের রাজ-কর্মচারীদের নৃশংসতার এখানেই শেষ হয় নাই। ইতিমধ্যে ঝড়-ঝঞ্ঝাবাতে (cyclone) তমলুক মহকুমা বিধ্বস্ত হয়। প্রায় দশ হাজার অধিবাসীর মৃত্যু হয়। গবাদি পশুর তিন-চতুর্থাংশ নিহত হয় এবং প্রায় এক লক্ষ গৃহ ধ্বংস হয়। সেই নিদারুণ রাত্রেও মহকুমা হাকিম অল্পকালের জন্যও তাঁহার কারফিউ (curfew) অর্থাৎ গৃহ হইতে বাহিরে যাইবার নিষেধাজ্ঞা তুলিয়া নিলেন না। জোয়ারের (বোরের) সময় যাহারা কোনমতে ঘরের চালের উপর বা গাছে উঠিয়া জীবন রক্ষা করিয়াছিল তাহাদের ত্রাণের জন্য নৌকা চলাচল করার অনুমতিও মিলিল না। মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ব্যবস্থাপকসভায় বলিয়াছিলেন (১২ই ফেব্রুআরি ১৯৪৩) “জিলা শাসক মেদিনীপুরের বিদ্রোহীদের প্রতি বিরাগ ও বিদ্বেষবশতঃ লোকের কষ্ট লাঘব করার জন্য একজন দায়িত্বশীল কর্মচারীর যাহা অবশ্যকর্তব্য তাহা পালন করিতেও বিরত রহিলেন। এমনকি, তিনি রাজ্য সরকারকে লিখিয়া জানাইলেন, মেদিনীপুরবাসীরা সরকারের যে বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছে তাহার শাস্তিস্বরূপ সরকার কোনরূপ ত্রাণকার্য (relief work) চালাইবে না এবং বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠানকেও ত্রাণকার্য করিতে অনুমতি দিবে না।” সংবাদপত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী হইল যেন মেদিনীপুরবাসীদের দুর্দশার কোন বিবরণ প্রকাশিত না হয়। বিংশ শতকে কোন তথাকথিত সভ্যরাজ্যের গভর্নমেন্ট যে কতদূর নৃশংস হইতে পারে, মেদিনীপুরে এই সময়ের ইংরেজশাসন তাহার দৃষ্টান্তস্থল।

৩. কলিকাতা ও মফঃস্বল

অগষ্ট মাসের ১৪ তারিখ হইতে কলিকাতায় হরতাল-অর্থাৎ স্কুল-কলেজ, দোকানপাট বন্ধ। ট্রামগাড়ীর চলাচল প্রায়ই বন্ধ, যে দুই-একখানি বাহির হইত তাহাও পুড়াইয়া দেওয়া হইত। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন ও বৈদ্যুতিক আলোর তার কাটা, গভর্নমেন্টের নিষেধ-সত্ত্বেও দলে দলে শোভাযাত্রা, সাহেবী পোশাকপরিহিত বাঙ্গালীর প্রতি আক্রমণ–ইহাই ছিল দৈনন্দিন ঘটনা। অপরদিকে পুলিশের লাঠি ও বন্দুকের গুলি অবিরাম চলিত। সংবাদপত্রে এই সমুদয় প্রকাশ নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশীয় পত্রিকাগুলি প্রতিবাদস্বরূপ কাগজ বাহির করিত না। প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক স্বীকার করিয়াছিলেন যে, অগষ্ট মাসের দুইসপ্তাহে পুলিশের গুলিতে ২০ জন হত ও ১৫২ জন আহত হয়–প্রকৃত সংখ্যা অবশ্য ইহা অপেক্ষা অনেক বেশী। ফজলুল হক ইহাও স্বীকার করেন যে, কোন কোন স্থলে পুলিশের গুলিবর্ষণের কোন সঙ্গত কারণও ছিল না।

ঢাকা, ফরিদপুর, যশোহর, বগুড়া, মালদহ, নদীয়া, বরিশাল, হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান, দিনাজপুর, দার্জিলিং প্রভৃতি স্থানেও জনসাধারণের অনুরূপ উত্তেজনার ও পুলিশের অকথ্য অত্যাচারের অনেক কাহিনী আছে। বীরভূম জিলার বোলপুরে সাঁওতাল ও মুসলমানেরা বোলপুর রেলওয়ে স্টেশন আক্রমণ করিয়া ইহার অনেক ক্ষতি করে। অন্যান্য স্থানেও ডাকঘর, রেলওয়ে স্টেশন, কাছারী প্রভৃতি বিভিন্ন অফিসগৃহ জনতার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল–অপরদিকে পুলিশের লাঠি ও সৈনিকের বন্দুক ইহার প্রতিশোধ লইবার জন্য সর্বদাই প্রস্তুত থাকিত। গভর্নমেন্টের সহিত জনগণের এই অসম যুদ্ধ প্রায় দুইসপ্তাহ চলিয়াছিল।

জনতা সাধারণতঃ নিরস্ত্র হইলেও তীর-ধনুকের দ্বারা এবং অন্যান্য উপায়ে কিছু পুলিশ নিহত ও আহত হইয়াছিল, এরূপ কয়েকটি সংবাদ পাওয়া যায়।

শাসন ব্যবস্থা

দেশের এই দারুণ সঙ্কটের সময়ে মুসলিম লীগ দেশের স্বার্থের ও বিপদের কথা ভুলিয়া কিভাবে ফজলুল হকের নবগঠিত দ্বিতীয় মন্ত্রীসভা ভাঙ্গিয়া দিয়া তাহাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ হইতে অপসারিত করিয়া লীগ মন্ত্রীসভা গঠন করা যায় তাহার জন্যই ন্যায়-অন্যায় নানারূপ চেষ্টা করিতে লাগিল। লীগকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে ফজলুল হকের প্রজাপার্টির সভায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অপমানিত ও কর্মীদের আক্রমণ করে। মুসলিম লীগ-বিরোধী মুসলমানদের নিজেদের দলে টানিবার জন্য নানা অসদুপায় অবলম্বন করিত। বিধানসভার অধিবেশনে দিনের-পর-দিন লীগের নেতা নাজিমুদ্দীন, সুরাওয়ার্দি, তমিজুদ্দীন ও অন্যান্য লীগ-সদস্যগণ তীব্র ভাষায় ফজলুল হককে আক্রমণ করিয়া তাহার সম্বন্ধে অনেক মিথ্যা কুৎসা প্রচার করেন। সুরাওয়ার্দি বিধানসভায় বলেন যে (২৪শে ফেব্রুআরি, ১৯৪২), “ফজলুল হক তাঁহার সহকর্মী, তাহার পার্টি এবং তাঁহার সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছেন, এইজন্য মুসলিম সমাজ তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়াছে এবং মুসলিম বাংলা একদিন তাঁহার এই আচরণের প্রতিশোধ লইবে।”

ইহার উত্তরে শ্যামাপ্রসাদ বলেন, “সুরাবর্দির এইসব কুৎসিৎ অভিযোগসমূহের আমি তীব্র প্রতিবাদ করি-সুরাবর্দির দল মন্ত্রিসভা হইতে বিতাড়িত হইয়া গায়ের জ্বালাতেই এইসব বলিতেছে।” তাহার পর তিনি লীগমন্ত্রীদের দুষ্কর্যের উল্লেখ করেন এবং উপসংহারে বলেন, “ফজলুল হক সাহস সহকারে যে নূতন পন্থায় চলিয়াছেন বাংলা তথা ভারত রক্ষার তাহাই একমাত্র পথ।”

“জাপানী আক্রমণের আশঙ্কায় বাংলা দেশে ব্রিটিশ সরকার যেসব ব্যবস্থা অবলম্বন করে তাহাতে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা অসম্ভব হইয়া উঠে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। এই ‘Denial Policy’ যানবাহনের সমস্যাকে জটিল করিয়া তুলে। খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি দেখা দেয় ও মূল্যও বৃদ্ধি পায়। যে ইংরেজ রাজকর্মচারী (মি. পিনেল) সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি দক্ষতার সঙ্গে এই বিভাগ পরিচালনা করিতে না পারায় সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। ইংরেজ গভর্নর, মিলিটারি কর্তৃপক্ষ ও আমলাতন্ত্র মন্ত্রীসভাকে এড়াইয়া এমন কতকগুলি নীতি নির্ধারণ করেন যাহার ফলে মুনাফাখখারেরা ও মজুতদারেরা অবাধ লুণ্ঠনের সুযোগ পায়। উপরন্তু কংগ্রেস-নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করার পরে বাংলাদেশের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণ ক্ষোভ প্রকাশ করে। ভারত-সরকারের নীতির ফলে ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। ব্যক্তিগতভাবে ফজলুল হক সরকারের এইসব নীতি পছন্দ করেন নাই এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক আইন প্রয়োগেরও তিনি বিরোধী ছিলেন।”

কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে ইহার প্রতিবাদ না-করায় জনসাধারণ তাঁহার ও তাঁহার মন্ত্রীসভার প্রতি বীতরাগ হয়। সুযোগ বুঝিয়া মুসলিম লীগ অভিযোগ করে যে, প্রকারান্তরে বর্তমান মন্ত্রীসভা সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর বিদ্রোহাত্মক কার্যের সমর্থন করে। কারণ ইঁহারাই ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা। এই ফরোয়ার্ড ব্লক দল কোয়ালিশন পার্টির অন্তর্ভুক্ত একটি দল এবং মন্ত্রীসভায় এই পার্টির লোকও আছেন। এই সকল উল্লেখ করিয়া নাজিমুদ্দীন বলেন, “সুতরাং এই মন্ত্রীসভা ভারত-সরকারের নীতি যথাযথভাবে পালন করিবে ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। ইহা দেশদ্রোহাত্মক কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং শত্রুপক্ষের ভারত আক্রমণের পথ সুগম করিয়া আমাদের যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করিয়া দিতেছে।” বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের ইংরেজগণ এবং তাহাদের মুখপত্র Statesman-এর যে মতামত, লীগ তাহাই প্রতিধ্বনিত করিত। সুতরাং বঙ্গদেশের বিধানসভার ইউরোপীয় সদস্যগণ মুসলিম লীগের সঙ্গে যোগ দিয়া মন্ত্রীসভাকে আক্রমণ করে ও ইহার পদত্যাগের দাবী করে।

ইতিমধ্যে অব্যবস্থিতচিত্ত ফজলুল হক মুসলিম লীগের ক্ষমতাবৃদ্ধিতে শঙ্কিত হইয়া ১৯৪২ সনের ১৩ই নভেম্বর গোপনে জিন্নার নিকট এক চিঠিতে পুনরায় তাঁহার সমর্থক দলসহ মুসলিম লীগে যোগদান করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তাঁহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু জিন্না যে-কয়েকটি শর্ত দেন তাহা ফজলুল হক গ্রহণ করিতে অসমর্থ হওয়ায় তাঁহার মুসলিম লীগে যোগদান করা সম্ভব হয় নাই। কিন্তু সুচতুর জিন্না এইসকল চিঠিপত্র প্রকাশিত করেন। ইহার ফলে হিন্দু এবং তাঁহার দলীয় অনেক মুসলমানেরও তিনি আস্থা হারান। ফলে, ১৯৪৩ সনের মার্চ মাসে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে বিধান পরিষদের ছয়টি আসনই মুসলিম লীগ দখল করে। ইহার পূর্বেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মন্ত্রীপদ ত্যাগ করেন।

শ্যামাপ্রসাদ (এবং আরও অনেকে) আশঙ্কা করিতেন যে, জাপানী সৈন্য ভারতের নিকটবর্তী হইলেই ইংরেজ সরকার ও তাহাদের সৈন্যদল পশ্চাদপসরণ করিবে এবং শত্রুপক্ষ যাহাতে বঙ্গদেশে কোন যুদ্ধোপকরণ সংগ্রহ করিতে না পারে বা যুদ্ধে কোন সাহায্য না পায় তজ্জন্য যানবাহন (বিশেষতঃ নৌকা), দুর্গ প্রভৃতি ধ্বংস করিয়া যাইবে (এই আশঙ্কা যে একেবারে অমূলক ছিল না, পরবর্তী ঘটনায় তাহা প্রমাণিত হইয়াছিল)। এই বিপদের সম্ভাবনায় শ্যামাপ্রসাদ একটি গৃহবাহিনী (Home Army) গঠন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়াছিলেন। এই সৈন্যবাহিনীর পক্ষে জাপানী সৈন্যকে বাধা দিতে না-পারিলেও গেরিলাযুদ্ধে তাহাদিগকে ব্যতিব্যস্ত করিতে পারিবে, এই উদ্দেশ্যে ১৯৪২ সনের ৭ই মার্চ শ্যামাপ্রসাদ বাংলার গভর্নর সার জন হারবার্টকে একখানি পত্রে লেখেন : “বঙ্গদেশকে রক্ষা করিবার জন্য একটি গৃহবাহিনী গঠনের অধিকার আমাদের দেওয়া হউক–এই প্রস্তাব অতীতে বহুবার আপনার নিকট উপস্থিত করিয়াছি।… বর্তমানে প্রবল বিপদ আমাদের দ্বারে হানা দিয়াছে এবং আপনাদের সঙ্গতি নৈরাশ্যজনকভাবে সীমিত।…এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশে গৃহবাহিনী গঠন ভারতীয় সামরিক নীতির বিরোধী বলিয়া আপনি আমাকে জানাইয়াছেন।” (লাটসাহেবের যুক্তি খণ্ডন করিয়া লিখিয়াছেন) “আপনারা আমাদের বিশ্বাস করিতে পারেন না, আসলে ইহাই বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আজ আমাদের গুরুতর প্রয়োজনের সময়ও যদি সৈন্যবাহিনী গঠনের অধিকার দিতে আপনারা অস্বীকৃত হন তবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিচারে আপনারা অপরাধী বলিয়া সাব্যস্ত হইবেন।” বলা বাহুল্য, গভর্নর কোন লিখিত জবাব দেন নাই। তবে মৌখিকভাবে জানাইয়াছিলেন যে, এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নহে।

কিছুদিন মন্ত্রীপদে থাকিয়াই শ্যামাপ্রসাদ বুঝিতে পারিলেন, তিনি যে আশা লইয়া মন্ত্রীপদ গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা সফল হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। তাঁহার বিশ্বাস ছিল যে, নূতন সংবিধান-অনুযায়ী প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার সীমিত হইলেও ইহার সদ্ব্যবহার করিলে দেশের অনেক কল্যাণসাধন করা যাইবে এবং তাহার ফলে পূর্ণস্বাধীনতালাভের অগ্রগতি বৃদ্ধি পাইবে। কিন্তু এই আশায় উৎসাহিত হইয়া তাহার মন্ত্রীহিসাবে দায়িত্বপালন ও তজ্জন্য ক্ষমতার প্রয়োগ করিতে গিয়া দেখিলেন যে, উচ্চপদস্থ সরকারী আমলাগণ (Bureaucracy) কোন মন্ত্রীকে স্বাধীনভাবে কাজ করিতে দেখিলে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করে। নূতন সংবিধান-অনুসারে মন্ত্রীর অধীনস্থ বিভাগীয় সেক্রেটারি (I. C. S.-সম্প্রদায়ভুক্ত উচ্চ কর্মচারী) প্রয়োজন মনে করিলে গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া নিজের মতামত ব্যক্ত করিতে পারিতেন। সুতরাং কোন বিষয়ে মন্ত্রীর নির্দেশ মনোমত না হইলে তাঁহারা গভর্নরের কাছে ইহার প্রতিবাদ করিতেন। নূতন সংবিধানে গভর্নরের হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকায় তিনিও মন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করিয়া সেক্রেটারির মতামতই গ্রহণ করিতেন। অবিলম্বেই শ্যামাপ্রসাদ বুঝিতে পারিলেন যে, এইসকল কর্মচারী নাজিমুদ্দীন ও মুসলিম লীগকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করিতে চায়, এবং ইহার জন্যই বর্তমান মন্ত্রীসভার সকল কার্যেই বাধা সৃষ্টি করিতেছে। কিছুদিন পরে তিনি ইহাও লক্ষ্য করিলেন যে, স্বয়ং গভর্নর এইসব ব্যাপারে ঐসকল কর্মচারীর পৃষ্ঠপোষকতা করিতেছেন। ইহাতে আশ্চর্যান্বিত ও কতকটা আশাভঙ্গে ব্যথিত হইয়া ১৯৪২ সনের ২৬শে জুলাই তিনি লাটসাহেবকে একখানি সুদীর্ঘ পত্র লেখেন।

এই পত্রের প্রথমে ‘রাইটার্স বিল্ডিংস’-এর আমলাতন্ত্র ফজলুল হকের নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত মন্ত্রীসভাকে ভাল চোখে দেখিতেছে না ও তাঁহার কার্যে বাধা সৃষ্টি করিতেছে–এই অভিযোগ তুলিয়া বলেন : “আমাদের প্রায়ই শোনান হয় যে, হিন্দু ও মুসলমান নেতারা একযোগে শাসনকার্য পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ায় ভারতের রাজনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হইতেছে। বৃটিশ-অধিকৃত ভারতের ইতিহাসে এই বাংলাদেশেই সর্বপ্রথম নিজ নিজ সম্প্রদায়ের উপর প্রচুর প্রভাবশালী হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা যে গণতান্ত্রিক সংবিধান তাহাদের দেওয়া হইয়াছে তাহাতে প্রচুর ত্রুটি ও অপূর্ণতা থাকা সত্ত্বেও তাহা কার্যকরী করিবার চেষ্টা করিতেছে। এই পরীক্ষা সার্থকতা অর্জন করিলে তাহা স্বাভাবিকভাবে সাম্প্রদায়িক বিরোধের জন্যই ভারতের রাজনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা জন্মিতেছে, এই অজুহাতকে মিথ্যা বলিয়া প্রমাণ করিবে। সেইজন্য এই পরীক্ষা যাহাতে ব্যর্থতা অর্জন করে তাহা স্বৈরাচারী আমলাতন্ত্রের স্বার্থের অনুকূল।” গভর্নরের নিজস্ব ব্যবহারের সমালোচনা করিতেও তিনি ভীত বা কুণ্ঠিত হন নাই। তিনি সোজাসুজি বলিয়াছেন : “ফজলুল হক ও তাঁহার সহকর্মীদের পূর্ণগতিতে অগ্রসর হইতে উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে আপনি সময়ে ও অসময়ে মুশ্লিম লীগের পক্ষে ওকালতি করাই প্রয়োজনীয় মনে করিয়াছেন। মুশ্লিম লীগের স্বপক্ষে এই বিশেষ ওকালতি, সত্যকথা বলিতে গেলে, আমাদের দৃষ্টিতে আপনাকে নিরপেক্ষ নিয়মতান্ত্রিক প্রধান অপেক্ষা মুশ্লিম লীগের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক রীতিনীতির পরিচালক হিসাবেই প্রতিভাত করিয়াছে এবং আমাদের কাছে আপনার আচরণ রহস্যজনক বলিয়া মনে হইয়াছে….। গভীর দুঃখের বিষয় এই যে, জনগণের দাবী ও অধিকার-সম্পৰ্কীয় গুরুতর ব্যাপারেও আপনি আপনার নিয়মতান্ত্রিক পরামর্শদাতাদের পরিবর্তে একশ্রেণীর স্থায়ী কর্মচারীদের পরামর্শ দ্বারা নিজেকে পরিচালিত হইতে দিয়াছেন। গভর্নমেন্ট অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্টের ৫২ ধারা আপনাকে যে বিশেষ দায়িত্ব’ দ্বারা ভূষিত করিয়াছে, বিশেষভাবে এই যুদ্ধের সময়, তাহার সুদূরপ্রসারী ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যায়। আপনি এই প্রদেশে শাসনতন্ত্রের মধ্যে আর একটি শাসনতন্ত্রকে কার্যকরী করিয়াছেন। সেখানে আসল ক্ষমতা এমন সকল লোকদের হাতে চলিয়া গিয়াছে যাহাদের এই প্রদেশে জন-মতানুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসন পরিচালনা করিবার কোনই দায়িত্ব নাই। ইহা একটি গুরুত্ববিশিষ্ট অভিযোগ। তাহা হইলেও আপনার জানা দরকার যে, আপনি জ্ঞানতঃ অথবা অজ্ঞানতঃ আপনার মন্ত্রীদের মনে এমনি একটি ধারণা জন্মাইয়া দিয়াছেন যাহা এই প্রদেশে সত্তাবে শাসন পরিচালনার অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে।”

ঐ পত্রের শেষ-অংশে তিনি কংগ্রেসকর্তৃক ঘোষিত গণআন্দোলন সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন। যুদ্ধের সময় এই আন্দোলন জনমতকে উত্তেজিত করিয়া আভ্যন্তরিক বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করিবে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন, এবং যে-কোন সরকারের পক্ষেই বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আন্দোলন দমন করা উচিত বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন। তবে শুধুমাত্র নিপীড়নের দ্বারা এই আন্দোলন দমন করা যাইবে না, এই কথা জানাইয়া গভর্নরকে নূতন দৃষ্টিভঙ্গীর দ্বারা এই আন্দোলনকে দেখিবার জন্য তিনি অনুরোধ জানাইয়াছেন। তিনি এই আন্দোলনের মোকাবিলা করিবার জন্য কী কাৰ্যপন্থা গ্রহণ করা উচিত তাহারও একটি তালিকা ঐ পত্রে সন্নিবেশ করিয়াছেন এবং অবিলম্বে নির্বাচিত মন্ত্রীদের হস্তে রাজ্যশাসনের সকল ক্ষমতা ন্যস্ত করিবার পরামর্শ দিয়া বলিয়াছেন : “আমি এই কথা বলিয়াই পত্রখানি শেষ করিতেছি যে, আমি যাহা চাহিয়াছি তাহা এই যুদ্ধের কালে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সহিত আপনাদের একত্রে ক্ষমতা পরিচালনা ব্যতীত আর কিছুই নয়। যদি আপনারা মনে স্থির করিয়া থাকেন যে এই যুদ্ধ একদিকে পাশব শক্তি ও প্রভুত্ব এবং অপরদিকে মানবিকতা ও স্বাধীনতা –এই দুইটি আদর্শের সংঘর্ষ–এবং আপনারা শেষেরটি সমর্থন করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তাহা হইলে আমি যাহা চাহিয়াছি তাহা দিতে আপনাদের অসুবিধা হইবার কথা নয়।”

বলা বাহুল্য, শ্যামাপ্রসাদের এই চিঠিতে সরকারী মনোভাব ও কার্যনীতির কোনই পরিবর্তন হয় নাই। গভর্নর শ্যামাপ্রসাদকে জানাইলেন যে, “বর্তমান সংবিধান-অনুসারে তাঁহার প্রস্তাবগুলি গ্রহণ করা সম্ভব নয়।” এই উত্তর পাইয়াই শ্যামাপ্রসাদের মনে হইল যে, তাহার পক্ষে আর মন্ত্রীগিরি করা সম্ভব নয় এবং দেশের ইষ্ট ও আত্মমর্যাদার কথা বিবেচনা করিলে সঙ্গতও নহে। তবে শেষ চেষ্টা হিসাবে তিনি ১৯৪২ সনের ১২ই অগষ্ট বড়লাট লর্ড লিনলিথগোকে একখানি পত্র লেখেন।

এই পত্রে তিনি ভাইসরয়কে অবিলম্বে ভারতকে স্বাধীনতা দিবার পরামর্শ দিয়া অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ইহা ছাড়া ভারতের পক্ষে সাফল্যের সহিত যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। যে শাসনতন্ত্র প্রচলিত রহিয়াছে তাহাতে বৃটিশ প্রতিনিধির হাতে “ভিটো ক্ষমতা থাকায় মন্ত্রীরা কোনরকমেই দেশের যুদ্ধকালীন প্রয়োজন মিটাইতে সমর্থ নহেন, ইহা তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝিতে পারিয়াছেন বলিয়া জানান। কংগ্রেস “ইংরাজ, ভারত ছাড়” বলিয়া যে দাবী তুলিয়াছে, তাহার সম্বন্ধে তিনি মন্তব্য করেন : “কংগ্রেসের শেষ প্রস্তাবে যে দাবী সন্নিবিষ্ট করা হইয়াছে তাহা সর্বভারতের জাতীয় দাবী।”

তিনি অবিলম্বে কেন্দ্রে ও প্রদেশে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি লইয়া জাতীয় সরকার গঠন করিতে ও তাঁহাদের হস্তে ক্ষমতা অর্পণ করিতে বলেন। তিনি অবশ্য একথাও জানান, ঐ জাতীয় সরকার মিত্রশক্তির নীতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়াই তাহার যুদ্ধনীতি স্থির করিবে এবং তদানীন্তন কম্যাণ্ডার-ইন চীফের হস্তেই ভারতে যুদ্ধ-পরিচালনার ভার অর্পণ করিবে। যদি কোন দল এই প্রস্তাবে অসম্মত হয় তাহা হইলে তাহাকে বাদ দিয়াই জাতীয় সরকার গঠন করিতে তিনি পরামর্শ দেন। পত্রের উপসংহারে তিনি লিখিলেন-”যদি আপনিও মনে করেন যে, বৃটিশ সরকার আর অধিকদূর অগ্রসর হইবে না এবং এই কোণঠাসা অবস্থাই চলিতে দিবে, তাহা হইলে স্বাধীনভাবে এই দাবীর অনুকূলে জনমত গঠনের কার্যে আত্মোৎসর্গ করিবার জন্য আমি গভীর দুঃখের সহিত গভর্নরকে আমাকে মন্ত্রীত্ব পদের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করিব।” লর্ড লিনলিথগো এই পত্রের উত্তর দিয়াছিলেন কিনা জানা নাই, তবে ইহার কিছুদিন পরেই শ্যামাপ্রসাদ মন্ত্রীসভা হইতে পদত্যাগ করিয়াছিলেন।

শ্যামাপ্রসাদ গভর্নরের নিকট যে পদত্যাগপত্র পেশ করিয়াছিলেন ভারত রক্ষা আইন-অনুসারে তাহার প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল। ঐ পদত্যাগপত্রে কী ছিল তাহাও জানা যায় না, তবে ১৯৪৩ সালের ১২ই ফেব্রুআরি তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদে তাঁহার পদত্যাগের কারণ সম্বন্ধে যে বিবৃতি দিয়াছিলেন তাহা হইতে ইহার একটি আভাস পাওয়া যায়। ঐ বিবৃতিতে তিনি স্থায়ী বৃটিশ কর্মচারীদের ঔদ্ধত্য ও মন্ত্রীসভার কার্যে বাধাদান ও গভর্নর কর্তৃক তাহাদের পৃষ্ঠপোষকতা সম্বন্ধে সুদীর্ঘ আলোচনা করিয়া বলেন যে, ঐ পরিস্থিতিতে কোন আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে মন্ত্রীপদে আসীন থাকা সম্ভব নয়। গভর্নর ও ভাইসরয়ের নিকট লিখিত পত্রে তিনি শত্রুর হস্ত হইতে ভারতকে রক্ষা করিবার জন্য তাহাকে অবিলম্বে স্বাধীনতা দেওয়ার ও ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর হস্তে ভারতের রক্ষার ভার অর্পণ করার সম্বন্ধে যে সকল যুক্তি দিয়াছিলেন তাহার পুনরাবৃত্তি করেন। তাহা ছাড়া ১৯৪২ সালের আন্দোলন দমনের জন্য গভর্নরের পৃষ্ঠপোষকতায় আমলাতন্ত্র মেদিনীপুরে ও অন্যান্য স্থানে যে-সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করিয়াছে এবং মেদিনীপুরে সাইক্লোন-বিধ্বস্ত নরনারীকে তাহাদের রাজদ্রোহের অপরাধের শান্তিস্বরূপ কোনরূপ সাহায্য না দিয়া নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলিয়া দিয়াছে তাহার উল্লেখ করিয়া তিনি গভীর দুঃখের সহিত বলেন যে, মন্ত্রীরা এই অত্যাচারিত আর্ত নরনারীকে রক্ষা করিতে অথবা কোনরূপে সাহায্যে করিতে পারেন নাই। তাঁহার মতে কূটচক্রী আমলাতন্ত্র উদ্ধত কর্মচারীদের সাহায্য তাঁহাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছে এবং গভর্নর প্রতি পদে তাহাদের সাহায্য করিয়াছেন।

ব্রিটিশ কর্মচারীদের ঔদ্ধত্যের উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, “একজন বৃটিশ সিভিলিয়ানের ধৃষ্টতা এত উচ্চপর্যায়ে পৌঁছিয়াছিল যে, এই সিভিলিয়ান লিখিতভাবে জানাইয়াছিলেন যে, পূর্ববঙ্গ হইতে আগত হতভাগ্য উদ্বাস্তুদের যে হারে টাকা দেওয়া হইতেছে তাহারা তাহার যোগ্য নয় এবং এইজন্য একজন ইম্পিরিয়াল অফিসার হিসাবে তিনি প্রাদেশিক সরকারের নির্দেশ মানিতে প্রস্তুত নন। এই অফিসার এখনও বহাল তবিয়তে বিশেষ বিশ্বাসভাজন ও দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রহিয়াছেন।”

মেদিনীপুরে রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের নামে যে অত্যাচার চালান হইয়াছিল তাহা সভ্যদেশের শাসন-পরিচালনায় সকল নীতিরই বহির্ভূত বলিয়া তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন যে, নিরপরাধ লোকের উপর গুলিবর্ষণ, সম্পত্তিলুঠ ও ধ্বংস, এক সম্প্রদায়কে অপর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অযথা উত্তেজিত করা ও নারীধর্ষণ প্রভৃতি গুরুতর অভিযোগ যে-সকল লোক কোনদিন এই বিপর্যয়মূলক আন্দোলন সমর্থন করেন নাই, তাহাদের নিকট হইতেও বিস্তৃত বিবরণ মন্ত্রীদের নিকট পৌঁছিয়াছিল। শ্যামাপ্রসাদ বলেন যে, তিনি নিজে এই ধরনের অপরাধের বিস্তৃত বিবরণসহ একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র বিভাগের জনৈক কর্মচারীর হাতে দিয়া তদন্ত করিতে নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু, এ সম্বন্ধে কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয় নাই। শ্যামাপ্রসাদ তাহার পর বলেন যে, ১৬ই অক্টোবর তারিখে মোদিনীপুর একটি প্রচণ্ড সাইক্লোনের দ্বারা বিধ্বস্ত হওয়ার পর সকলেই আশা করিয়াছিলেন যে, রাজনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটিবে এবং সরকার ও জনসাধারণ একযোগে দুর্গতদের উদ্ধারকার্যে মনোনিবেশ করিবে। শ্যামাপ্রসাদ অতঃপর দুঃখের সহিত জানান যে, এই আশা সফল হয় নাই। সিভিলিয়ানরা দুর্গতদের সাহায্যের জন্য অগ্রসর হওয়া দূরে থাকুক, যাহাতে অন্য কেহ তাহাদের সাহায্যের জন্য চেষ্টা করিতে না পারে এই অভিপ্রায়ে এই বিপত্তির সংবাদ পনের দিন যাবৎ প্রকাশিত হইতে দেয় নাই। জেলাশাসক সম্বন্ধে তিনি মন্তব্য করেন, “আমাদের নিকট প্রেরিত বিবরণে যখন তিনি রাজনৈতিক দুষ্কৃতিকারীদের সরকারের সাহায্য তো বন্ধ করাই উচিত, এমনকি, কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণকার্য করিতে দেওয়া উচিত নয় বলিয়া মন্তব্য করিলেন, তখনই তাঁহার মনোবৃত্তি যে কিরূপ তাহা আমরা বুঝিতে পারিলাম। হৃদয়হীনতা কি ইহা অপেক্ষা অধিকতর হইতে পারে? গভর্নর স্বয়ং বিস্ময়জনকভাবে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকিয়া সাহায্যকার্য পরিচালনার জন্য সকল শ্রেণীর সহযোগিতা আহ্বান করিলেন। কিন্তু আমরা যখন সকল রাজনৈতিক বিরোধকে পশ্চাতে ফেলিয়া ত্রাণকার্য চালাইবার জন্য সকল সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধ করিবার উপযুক্ত আবহাওয়া সৃষ্টি করিতে চেষ্টা করিতেছিলাম তখন আমরা পুনঃ পুনঃ বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছি। …জেলের ভিতরে ও বাহিরে অবস্থিত আন্দোলনের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন করিবার চেষ্টা হয় নাই। তাহার পরিবর্তে সরকার দিবসে ত্রাণকার্য ও নিশীথে লুণ্ঠন ও নিপীড়ন চালাইবার একটি ক্ষিপ্ত ও দুরভিসন্ধিমূলক নীতির অনুসরণ করিয়াছে।…স্থানীয় অফিসারদের সামনে আমাদের নিকট লোকে অত্যাচারের বহু অভিযোগ পেশ করিয়াছে, কিন্তু আমরা তাহাদের রক্ষা করিতে অক্ষম হইয়াছি। আমি মেদিনীপুর সম্বন্ধে এই বলিয়াই শেষ করিব যে, মাত্র এক মাস পূর্বেও যে গ্রাম আক্রমণের সংবাদ আমাদের নিকট পৌঁছিয়াছে, তাহাতে আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষকদের দ্বারা ধারাবাহিকভাবে অসহায় স্ত্রীলোকদের ধর্ষণের বহু লজ্জাজনক ঘটনা প্রকাশ পাইয়াছে। অত্যাচারিতাদের নিজস্ব প্রদত্ত বিবরণ আমার নিকট আছে এবং ইহা দেশের সরকারের উপর কলঙ্কের কালি লেপন করিয়াছে।”

যে-সকল কারণে ফজলুল হকের প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস পায় তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। শ্যামাপ্রসাদের পদত্যাগে তাহার মন্ত্রীসভা আরও দুর্বল হইয়া পড়ে। ইতিমধ্যে মুসলিম লীগের নেতারা হিন্দুদের বুঝাইতে চেষ্টা করেন যে, তাহারা সকল সময়েই হিন্দুর সঙ্গে সহযোগিতা করিয়া উভয় সম্প্রদায়ের মন্ত্রী বজায় রাখিতে ইচ্ছুক, কিন্তু ফজলুল হককে বিতাড়িত না করিলে এই উদ্দেশ্য সফল হইবে না–কারণ হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পথে তিনিই বাধা সৃষ্টি করিতেছেন।

১৯২০ সনের ২৭শে মার্চ সুরাওয়ার্দি এইপ্রকার মনোভাব ব্যক্ত করিয়া খুব জোরের সহিত বলেন যে, “মুসলিম লীগ দলের পক্ষ হইতে আমি এই প্রতিশ্রুতি দিতেছি যে, ফজলুল হক সরিয়া দাঁড়াইলেই আমরা হিন্দু মুসলমান মিলিয়া শান্তি পূর্ণভাবে শাসনকার্য চালাইতে পারিব।” ঠিক ঐ তারিখেই নাজিমুদ্দীনও বিধানসভায় এই মর্মে ভাষণ দেন। মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই-প্রস্তাব উপলক্ষে উপরোক্ত মর্মে বক্তৃতা দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে ফজলুল হক বলেন যে, তাঁহার মতে এই সঙ্কটের কালে বিধানসভার সমস্ত দল লইয়া একটি জাতীয় সরকার গঠন করা দরকার, কারণ কেবলমাত্র নির্দলীয় ক্যাবিনেটই বাংলার দুরবস্থা লাঘব করিতে সক্ষম। ফজলুল হক প্রতিশ্রুতি দেন যে, এইপ্রকার প্রকৃত জাতীয় সরকার গঠন করা হইলে তিনি ইহাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিবেন। যে ছাঁটাই-প্রস্তাব উপলক্ষে এইসব বক্তৃতা দেওয়া হয় (২৭শে মার্চ, ১৯৪৩), দশ ভোটের ব্যবধানে তাহা বাতিল হয় এবং ফজলুল হকের জয় হয়।

ইহার পরদিন যে ঘটনাচক্রে ফজলুল হক পদত্যাগ করেন, এই গ্রন্থের লেখকের সে-সম্বন্ধে ব্যক্তিগত যাহা জানা আছে তাহা পরিশিষ্টে দেওয়া গেল। ফজলুল হকের জীবন-চরিতকারও এ-সম্বন্ধে বলিয়াছেন :

“২৮শে মার্চ (১৯৪৩) গভর্ণর স্যার জন হার্বাট ফজলুল হককে ডেকে পাঠান। রাত ৭-৩০ মিঃ থেকে ৯টা পর্যন্ত গভর্ণরের সঙ্গে জাতীয় ক্যাবিনেট গঠন করার বিষয়ে তিনি কথা বলেন। গভর্ণর কয়েকটি প্রস্তাব তাঁর কাছে রাখেন। আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় ফজলুল হক তা গ্রহণ করতে অক্ষম হন। গভর্ণর তাঁকে পদত্যাগপত্র দাখিল করতে বলেন। ফজলুল হক বলেন, নিজের দল ও সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার সময় না পেলে তা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু গভর্ণর তাঁকে কোন সময় দিতে চান নি। তখন গভর্ণর একটি টাইপ-করা পদত্যাগপত্র ফজলুল হককে স্বাক্ষর দেবার জন্য দেন। আর এই কথা বলেন, তিনি যদি এই কাগজে স্বাক্ষর না দেন, তবে তিনি তাঁকে পদচ্যুত করবেন। ফজলুল হক অভিযোগ করেন, এক গভীর ষড়যন্ত্র করে গভর্ণর তাঁকে এই পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করেন। ঐদিন এই পদত্যাগপত্র গ্রহণের খবর রাত দশটায় ফজলুল হকের বাড়ীতে পৌঁছে দেওয়া হয়।”

ইহার পরদিন (২৯শে মার্চ) কিরণশঙ্কর রায়ের প্রশ্নের উত্তরে ফজলুল হক বলেন যে, তিনি পদত্যাগ করিয়াছেন, তবে তিনি পরদিনই দিল্লী যাইবেন। সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া সমস্ত ঘটনা বিবৃত করিবেন। তিনি বলেন যে, তাঁহার বিশ্বাস, তিনি বিধানসভার অধিকাংশ সদস্যেরই আস্থাভাজন।

এদিকে বিধানসভার সভাপতি ঘোষণা করিলেন, যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়াছেন এবং গভর্নরও তাহা গ্রহণ করিয়াছেন, অতএব ফজলুল হক মন্ত্রীসভার আর অস্তিত্ব নাই। নূতন মন্ত্রীসভা গঠিত না-হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ৯৩ ধারা অনুসারে গভর্নর সমস্ত শাসনক্ষমতা নিজহস্তে গ্রহণ করিয়াছেন।

পরিশিষ্ট

ফজলুল হুকের পদত্যাগ সম্বন্ধে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। লাটভবনে যাইবার সময় ফজলুল হক সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসকে সঙ্গে লইয়া যান। সুরেনবাবু গাড়ীতে অপেক্ষা করেন। লাটসাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া ফিরিয়া আসিয়া গাড়ীতে উঠিয়াই ফজলুল হক বলিলেন, “আমি পদত্যাগ করিয়া আসিয়াছি। সুরেন্দ্রনাথ বিস্ময় প্রকাশ করিলে ফজলুল হক লাটসাহেবের সঙ্গে কী কথাবার্তা হইয়াছিল তাহা বলেন। এই গ্রন্থের লেখক সুরেনবাবুর কাছে যাহা শুনিয়াছিলেন এবং ফজলুল হক ১৯৪৩ সনের ৫ই জুলাই বিধানসভায় সেই ঘটনা বিস্তারিত করিয়া যাহা বলেন-এই দুই বিবরণের মধ্যে সম্পূর্ণ ঐক্য আছে। সুতরাং ইহার সত্যতা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই। ফজলুল হকের বিবরণের সারমর্ম এই :

“দীর্ঘ আলোচনার ফলে গভর্নর ফজলুল হককে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি সকল দলের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া জাতীয় মন্ত্রীসভা (National Cabinet) গঠন করিতে ইচ্ছুক। ফজলুল হকের উপর তাঁহার আস্থা আছে এবং তাঁহাকেই তিনি প্রধানমন্ত্রী রাখিতে চান। তবে তিনি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে (formally) একখানি পদত্যাগপত্র দেন তাহা হইলে এইরূপ সর্বদলীয় মন্ত্রীসভা গঠনের কার্য সহজসাধ্য হইবে। ফজলুল হকও পূর্বদিন এইরূপ যুক্ত মন্ত্রীপরিষদ গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন; সুতরাং ইহাতে তাঁহার কোন আপত্তি নাই বলিয়াই গভর্নর বিশ্বাস করেন। ফজলুল হক রাজী হইলে তৎক্ষণাৎ একটি টাইপ-করা পদত্যাগপত্র ফজলুল হকের সম্মুখে রাখেন এবং ফজলুল হক সরল মনেই তাহা স্বাক্ষর করেন।”

সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস এই গ্রন্থের লেখককে বলিয়াছিলেন যে, তিনি এই কাহিনী শুনিবা মাত্রই ফজলুল হককে বলেন যে, তিনি নির্বোধের মত কাজ করিয়াছিলেন এবং ইহা তাঁহাকে তাড়াইবার দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছুই নহে। বস্তুতঃ তাহাই হইল। লাটসাহেব ফজলুল হকের নেতৃত্বে জাতীয় মন্ত্রীসভা (ক্যাবিনেট) গঠনের কোন চেষ্টাই করিলেন না এবং ২৪শে এপ্রিল (১৯৪৩) গভর্নরের আমন্ত্রণে খাজা নাজিমুদ্দীন মন্ত্রীসভা গঠন করিলেন। এই মন্ত্রীসভাকে জাতীয় মন্ত্রীসভা বলা যায় না।

কংগ্রেস ও বঙ্গদেশের মন্ত্রীসভা

১৯৩৭ সনে ১৭-১৮ই মার্চ নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস কমিটির দিল্লী অধিবেশনে স্থির হয় যে, ১৯৩৭ সনের নির্বাচনে যে-সকল প্রদেশে কংগ্রেস দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, কেবল সেইসব প্রদেশেই কংগ্রেস মন্ত্রীসভা গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করিবে-অর্থাৎ কোন প্রদেশেই অন্য কোন দলের সঙ্গে মিলিত হইয়া মন্ত্রীসভা গঠন করিবে না। এই কারণেই ফজলুল হকের আগ্রহসত্ত্বেও প্রজা-কৃষক পার্টির সহিত মিলিত হইয়া বাংলাদেশে কংগ্রেস-প্রজাপার্টির যুক্ত মন্ত্রীসভা গঠিত হইল না। তাহার ফলে মুসলিম লীগ বাংলাদেশে প্রাধান্য স্থাপন করিল ও পূর্ববঙ্গ ভারত হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হইবার ভিত্তি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হইল। ইহা যে আকস্মিক কোন ঘটনা নহে, বাংলার নেতারা যে এই বিপদ উপলব্ধি করিয়াছিলেন-তথাপি গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস এই সিদ্ধান্ত হইতে কিছুমাত্র বিচলিত হইল না–ইহার প্রমাণস্বরূপ গান্ধী ও সুভাষ বসুর মধ্যে পত্র-বিনিময়ের উল্লেখ করা যাইতে পারে।

১৯৩৮ সনের ডিসেম্বর মাসে গান্ধী সুভাষ বসুকে লিখিলেন : “মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, নলিনীরঞ্জন সরকার এবং ঘনশ্যামদাস বিড়লার সহিত দীর্ঘ আলোচনার ফলে আমার বিশ্বাস পূর্বের অপেক্ষাও দৃঢ় হইয়াছে যে, বাংলার বর্তমান (অর্থাৎ যুক্ত প্রজা-কৃষক ও মুসলিম লীগ) মন্ত্রীসভার পরিবর্তন করা উচিত নহে। ইহাতে কোন লাভ হইবে না। বরং কংগ্রেস ফজলুল হকের দলের সঙ্গে মিলিত হইয়া মন্ত্রীসভা গঠন করিলে অনিষ্টের সম্ভাবনা আছে। নলিনী সরকার বলিয়াছেন যে, বর্তমান মন্ত্রীসভা যদি দেশের অনিষ্টকর কিছু করে তাহা হইলে তিনি পদত্যাগ করিবেন।”

এই চিঠির উত্তরে সুভাষ বসু গান্ধীকে লিখিলেন (২১শে ডিসেম্বর, ১৯৩৮) :

“আপনার চিঠি পাইয়া গভীরভাবে বিচলিত হইলাম (profound shock to me)। বাংলা দেশের মন্ত্রীসভা গঠন সম্বন্ধে বহুবার আপনার সহিত আলোচনা করিয়াছি। কিছুদিন পূর্বেও ওয়ার্ধাতে এ বিষয়টি পুনরায় আমাদের মধ্যে আলোচিত হইয়াছে। আমার দাদা শরৎ বসুও এ-বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করিয়াছেন। আমাদের দুইজনেরই পরিষ্কার মনে আছে যে, আপনি বরাবর কংগ্রেস ও কৃষক-প্রজাপার্টির যুক্ত মন্ত্রীসভা সমর্থন করিয়াছেন। ওয়ার্ধায় সাক্ষাতের পর কী কারণে আপনার মতের এরূপ গুরুতর পরিবর্তন হইয়াছে তাহা জানি না। বেশ বোঝা যাইতেছে যে আজাদ, নলিনী ও বিড়লার সহিত কথাবার্তার ফলেই আপনার মতের এই পরিবর্তন ঘটিয়াছে। তাহা হইলে ব্যাপারটা দাঁড়াইতেছে এই যে, যাহাদের উপর বাংলা দেশের কংগ্রেস চালাইবার দায়িত্ব অর্পিত হইয়াছে, তাহাদের মতামতের চেয়ে উল্লিখিত তিনজনের মতই আপনার নিকট বেশী মূল্যবান।

আপনার চিঠিতে যে গুরুতর সঙ্কট উপস্থিত হইয়াছে তাহাতে আমি খোলাখুলিভাবেই কয়েকটি কথা বলিতে চাই। আসামের বেলায় মৌলানা আজাদ সাহেব এইরূপ যুক্ত মন্ত্রীসভা স্থাপনে আমার বিরোধী ছিলেন এবং সর্দার প্যাটেল আমাকে সমর্থন না করিলে কংগ্রেসের কার্যকরী সমিতিতে আপনি আমার মত গ্রহণ করিতেন না এবং আসামে যুক্ত মন্ত্রীসভা গঠিত হইত না। সিন্ধু দেশের বেলায়ও মৌলানা সাহেব ছিলেন যুক্ত মন্ত্রীসভার বিপক্ষে এবং আমি ও আর কয়েকজন কার্যকরী সমিতির সদস্য ছিলাম তাঁহার সপক্ষে। বাংলা দেশের বেলায়ও তাঁহার মত আমার মতের বিরোধী। মৌলানা সাহেব মনে করেন যে, যে-প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সে-প্রদেশে সাম্প্রদায়িকতা-দোষে দুষ্ট হইলেও মুসলমান মন্ত্রীসভাই রাখিতে হইবে। বেশ বোঝা যাইতেছে যে, সিন্ধুপ্রদেশে আল্লা বসের মন্ত্রীসভাকে কংগ্রেস সমর্থন করায় মৌলানা সাহেব অসুখী হইয়াছেন।

আমি ইহার ঠিক বিপরীত মত পোষণ করি। আমি মনে করি যে, বাংলা দেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িক মন্ত্রীসভাকে যত শীঘ্র সম্ভব দূর করা প্রয়োজন। এই প্রতিক্রিয়াশীল মন্ত্রীসভা যতদিন থাকিবে, ততদিনই বাংলায় সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি বাড়িতে থাকিবে এবং মুসলিম লীগের তুলনায় কংগ্রেসের প্রভাব ও প্রতিপত্তি কমিতে থাকিবে। ৯ই ডিসেম্বর আমি কলিকাতা ত্যাগ করিবার পূর্বে নলিনীবাবু বলিয়াছিলেন, তিনি বাজেট সেশনের পূর্বেই পদত্যাগ করিবেন।

এক সপ্তাহের মধ্যেই কেন তাঁহার মতের পরিবর্তন হইল আমি জানি না। মনে হইতেছে যে, তাঁহার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও যখন তাঁহার পদত্যাগ বাঞ্ছনীয় মনে করেন তখন আপনার সাহায্যেই তাঁহার মন্ত্রীসভায় টিকিয়া থাকিবার ব্যবস্থা হইতেছে। এইসব গুরুতর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আপনি আমার সহিত একবার পরামর্শ করাও প্রয়োজন মনে করেন নাই, ইহাতে আমি আশ্চর্যবোধ করিতেছি।”

সুভাষ বসু তাঁহার মতের সপক্ষে আরও অনেক যুক্তি দেখাইয়াছেন। নীরদচন্দ্র চৌধুরী এই সময়ে শরৎ বসুর প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন এবং সুভাষ বসুর চিঠিপত্রও অনেকটা তাহার হাত দিয়া যাইত। তিনি (নীরদবাবু) বলেন যে, সুভাষের বিশ্বাস হইয়াছিল যে, গান্ধীর এই মত-পরিবর্তনে কেবল আবুল কালাম আজাদ নহে, ঘনশ্যামদাস বিড়লারও হাত ছিল। কারণ, বিড়লা মনে করিতেন যে, যদি হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতিক ঐক্য ও বন্ধন দুইয়ে মিলিয়া যুক্ত মন্ত্রীসভা (coalition) স্থাপিত হয় তাহা হইলে কলিকাতার বাণিজ্য ও অর্থনীতির ব্যাপারে মাড়োয়ারীদের প্রাধান্য (domination) নষ্ট হইবে। নীরদবাবুর মতে গান্ধী প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়াও মাড়োয়ারীদের স্বার্থে এবং তাঁহার নিতান্ত অনুগত ভক্ত ছাড়া অন্য বাঙ্গালী–বিশেষতঃ শরৎ ও সুভাষ বসুর উপর বিরূপ ছিলেন। অবশ্য গান্ধীর সম্বন্ধে এই ধারণার কোন বিশিষ্ট প্রমাণ তিনি উল্লেখ করেন নাই। তবে ইহার অনতিকাল পরেই গান্ধী ও সুভাষ বসুর মধ্যে যে প্রকাশ্য বিরোধ হয়, এইরূপ বিশ্বাস তাহার অন্যতম কারণ হইতে পারে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা আবশ্যক যে অস্থিরচিত্ত ভাবপ্রবণ ফজলুল হকের রাজনীতিক মতের কোন দৃঢ়তা ছিল না। তিনি কখনও হিন্দুদের সঙ্গে মৈত্রী ও মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির নিন্দা করিতেন, আবার কখনও মুসলিম লীগের অধিবেশনে যোগ দিয়া হিন্দুদের তীব্র নিন্দা করিতেও কুণ্ঠিত হইতে না। তিনি যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন (১৭ই এপ্রিল ১৯৩৮) কলিকাতার মহম্মদ আলি পার্কে জিন্নার সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের একটি বিশেষ অধিবেশন হয়। ফজলুল হক অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং তাঁহার ভাষণে বলেন, “কংগ্রেস শাসিত প্রদেশে মুসলমানেরা নির্যাতিত হচ্ছেন, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পর্যদস্ত করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই অবস্থায় যদি পানিপথের ও থানেশ্বরের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে মুসলমানেরা নিশ্চয়ই তাদের পূর্বপুরুষদের মত গৌরবজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। … আমাদের সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, ভারতে ইসলামের ঐক্য ও নিরাপত্তা রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব (sacred trust) আমাদের পূর্বপুরুষদের নিকট হইতে আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি।”

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই ভাষণে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে একযোগে কার্য করিতে হইলে যে-কয়েকটি শর্তের উল্লেখ করেন তাহা জিন্নার প্রতিধ্বনিমাত্র। মুসলিম লীগের প্রশংসায় শতমুখ হইয়া তিনি বলেন যে, “ইহা শত শত কংগ্রেসের তুল্য”। অন্য এক সভায় তিনি বলেন, “অন্য প্রদেশে মুসলমানদের উপর কোন অত্যাচার হইলে বাংলাদেশে তাহার প্রতিহিংসা নেওয়া হইবে।” ১৯৩৮ সনের পয়লা অক্টোবর নিখিল ভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন (All India Muslim Educational Conference) সভাপতির ভাষণে তিনি হিন্দীর পরিবর্তে উর্দুকে ভারতের সাধারণ ভাষা (lingua franca) রূপে গ্রহণের প্রস্তাব করেন। এই গ্রন্থের লেখক ফজলুল হকের সঙ্গে বিশেষ পরিচিত ছিলেন এবং তাঁহাকে উদার নীতিসম্পন্ন মুসলমানদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা বলিয়া মনে করিতেন। তাঁহার এইসব উক্তির কথা স্মরণ করিলেই বাংলাদেশের শিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায়ের আবহাওয়া কিরূপ ছিল এবং ফজলুল হকের ব্যর্থতার কারণ সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা যাইবে।

অনেক মনে করেন, ফজলুল হকের মুখ অনেক সময় আলগা হইয়া পড়িলেও তাঁহার মনটা ছিল উদার। ইহা আংশিকভাবে সত্য হইলেও স্মরণ রাখিতে হইবে যে, কেবল তাঁহার মুখ নহে–তাহার লেখনীও তাঁহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। ১৯৩৯ সনের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত তাঁহার লিখিত একখানি পুস্তিকায় (Muslim Sufferings Under Congress Rule) কংগ্রেস-শাসিত প্রদেশে মুসলমানদের উপর হিন্দুর শতাধিক নিষ্ঠুর অত্যাচারের তালিকা দিয়া মন্তব্য করিয়াছেন, “মুসলিমদের অভিযোগ এই যে, কংগ্রেস-শাসনে মুসলমানেরা সততই ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকে এবং শাসনযন্ত্র এত মন্থর গতিতে চলে যে ইহার প্রতীকার বহু বিলম্বে হয় এবং অনেক সময় মোটেই হয় না।”

এই পুস্তিকা প্রকাশের দুই বৎসর পরেই শ্যামাপ্রসাদ প্রমুখ জাতীয়তাবাদী হিন্দু এবং সুভাষ বসুর দলভুক্ত নেতাগণ ফজলুল হকের সঙ্গে মিলিত হইয়া ‘প্রগতিশীল যুক্ত মন্ত্রীসভা (Progressive Coalition) গঠন করেন। স্বাধীনতালাভের অব্যবহিত পূর্বে আমাদের রাজনীতিক বিচক্ষণতা ও সতোর কতদূর অবনতি হইয়াছিল এবং রাজনীতিক ব্যাপারে সুবিধাবাদের (opportunism) প্রভাব কিরূপ বাড়িতেছিল এই ঘটনা হইতে তাহার কতকটা আভাস পাওয়া যায় এবং স্বাধীন ভারতের রাজনীতিক পটভূমিকার বিবর্তন ও পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *