২. নাগরিক সমাজের রূপায়ণ

২. নাগরিক সমাজের রূপায়ণ

আধুনিক সমাজের অন্যতম ঐতিহাসিক গতি হল নগর—রূপায়ণের (urbanisation) দিকে। ইংরেজ আমলের উষাকালে গঙ্গাতীরের কয়েকটি গ্রামে বাংলা দেশে এই নাগরিক রূপায়ণ ও জনকুণ্ডলায়নের (urban agglomeration) সূচনা হয়। গ্রামগুলির নাম—কলিকাতা, গোবিন্দপুর ও সুতানুটি। পরে অবশ্য আরও অনেক গ্রাম এই তিনটি গ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু বর্তমানের বৃহৎ মেট্রোপলিস কলকাতার একদা উৎপত্তিকেন্দ্র ছিল এই তিনটি গ্রাম।

জোব চার্নক নামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মচারী ১৬৫৫—৫৬ সালে ভারতবর্ষে আসেন। এই জোব চার্নক ভারতবর্ষে ইংরেজদের প্রথম শাসনকেন্দ্র ও রাজধানী কলকাতা শহরের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু চার্নক আজও ইংরেজ ঐতিহাসিকদের কাছে একজন অজ্ঞাতকুলশীল। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম ভিত—স্থাপয়িতা যিনি তাঁর বংশবৃত্তান্ত আজও অজ্ঞাত। কর্নেল ইউল বলেছেন যে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসে জোব চার্নক “memorable figure”, কিন্তু তা সত্ত্বেও “he figures as yet in no Biographical Dictionary, nor have I been able to ascertain anything regarding his origin.”  ১৬৫৭ সালের ১২—১৩ জানুয়ারি তারিখের Court Book—এ জোব চার্নক নামটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। এই তারিখের কোম্পানির খাতায় সেকালের হস্তাক্ষরে লেখা আছে—

Job Charnock, Fourth, (Salary) 20 £

বাংলাদেশে কাশিমবাজার কুঠির জুনিয়র কর্মী ছিলেন চার্নক। পরে পাটনা—কুঠির ‘চিফ’ নিযুক্ত হন। ১৬৮১ সালে বাংলা দেশ যখন মাদ্রাজ—কুঠির অধীনতা থেকে মুক্ত হয়, তখন চার্নক ভেবেছিলেন তিনিই প্রধান কর্মকর্তা নিযুক্ত হবেন, কিন্তু তা হননি, হেজেস হয়েছিলেন। চার্নক কাশিমবাজার থেকে হুগলির ‘চিফ এজেন্ট’ নিযুক্ত হন এবং সেখানে নবাবের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ও সংঘর্ষ বাধে। নবাবের শত্রুতায় বাধ্য হয়ে তাঁকে হুগলি ছাড়তে হয় এবং গঙ্গাতীরে কুঠি স্থাপনের জন্য নতুন একটি নিরাপদ স্থানও সন্ধান করতে হয়। উলুবেড়িয়া—হিজলি—চট্টগ্রাম—এর মধ্যে যে—কোনও একটি স্থান চার্নকের কুঠি স্থাপনের জন্য নির্বাচিত হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। সুতানুটিতে চার্নক দু—বার ঘাঁটি করেছেন, দু—বারই ছেড়ে চলে গিয়েছেন। অবশেষে ২৪ আগস্ট ১৬৯০ সালে চার্নক তৃতীয়বার সুতানুটির ঘাটে অবতরণ করেন এবং সামরিক ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সুতানুটিতেই তিনি কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের সিদ্ধান্ত করেন। চার্নকের সিদ্ধান্তের ফলে এই ঐতিহাসিক দিনেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের, এবং কলকাতা শহরের, ভিত স্থাপিত হয়।

উইলসন বলেছেন : “The fact remains that Charnock, and Charnock alone, founded Calcutta.” কথাটি ব্রিটিশ ইতিহাসের দিক থেকে অনেকটা সত্য, কিন্তু চার্নক যদি প্রধানত তাঁর কুঠির সামরিক নিরাপত্তার কথা, অথবা শুধু বাণিজ্যিক সুযোগ—সুবিধার কথা বিবেচনা করতেন, তাহলে হয়তো চট্টগ্রামের ইতিহাস হত কলকাতা শহরের ইতিহাস। উলুবেড়িয়া বা হিজলিতে কুঠি স্থাপিত হলেও কোনও অসুবিধা হত না, কিন্তু তা হয়নি বা চার্নক তা করেননি। ভেবেচিন্তেই করেননি। সামরিক আত্মরক্ষা ও বাণিজ্যিক সুযোগ—দু—দিকের কথা চিন্তুা করেই গঙ্গার পূর্ব তীরে সুতানুটি চার্নক আদর্শ স্থান মনে করেছিলেন। ফার্মিঙ্গার বলেছেন : “In selecting Sutanuti as the place for the chief settlement in Bengal, Job Charnock made his choice deliberately and well.” ভাগীরথীর পশ্চিমে সপ্তগ্রাম ছিল তখন পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বন্দর, পূর্ববঙ্গে ছিল চট্টগ্রাম। সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধি সরস্বতী নদীর দান। ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগ থেকে সরস্বতী নদী দ্রুত মজে যেতে থাকে এবং তার উপর দিয়ে বাণিজ্যপোত চলাচলের অসুবিধা হয়। তার আগে পোর্তুগিজ বণিকরা গঙ্গার পশ্চিম তীরে বেতোড়ে (বর্তমানে ব্যাঁটরা) বাণিজ্যের বেশ বড় একটি বাজার গড়ে তুলেছিল। গোয়া থেকে যখন তারা বাণিজ্যের পণ্য কেনাকাটা করতে আসত তখন সাময়িকভাবে বাজার বসত বটে, যেমন গ্রামের হাটবাজার বসে, কিন্তু সেটা বেশ বড় বাজার এবং বাড়ন্ত বাজার। সরস্বতী নদী মজে যাওয়ার ফলে যখন সপ্তগ্রাম বন্দরের অবনতি হতে থাকে, তখন বাঙালি বণিকদের মধ্যে কেউ কেউ গঙ্গার পশ্চিমদিক থেকে পুবদিকে এসে নতুন বসতি স্থাপনের চেষ্টা করেন। এই বণিকদের মধ্যে প্রধান হলেন বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ ও বসাকরা। কলকাতার বড়বাজার অঞ্চল বর্তমানে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের প্রধান কর্মক্ষেত্র হলেও বাঙালি শেঠ—বসাকরাই বাণিজ্যকেন্দ্র বড়বাজারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, এবং একদা তাঁদের প্রতিপত্তি এ অঞ্চলে যথেষ্ট ছিল। তার ঐতিহাসিক নিদর্শনস্বরূপ আজও বড়বাজারে শেঠ—বসাকদের পূর্বপুরুষদের ঘরবাড়ি ও তাঁদের নামে কিছু রাস্তাঘাট দেখা যায়।

ষোড়শ শতকে কোনও সময় শেঠ—বসাকদের পূর্বপুরুষরা গঙ্গার পূর্ব তীরে এসে নতুন বসতি স্থাপন করেন। এই নতুন বসতির নাম গোবিন্দপুর। ময়দানের যে অঞ্চলে ফোর্ট উইলিয়াম অবস্থিত, সেখানে ছিল গোবিন্দপুর গ্রাম। শেঠ—বসাকদের পারিবারিক গৃহদেবতার নাম ‘গোবিন্দ’, তাঁর নামে গোবিন্দপুর। অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকে প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত এই বাঙালি শেঠরাই—জনার্দন শেঠ, বারাণসী শেঠ, বৈষ্ণবদাস শেঠ, শ্যামসুন্দর শেঠ—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সব চেয়ে বড় দাদনি—বণিক ছিলেন। তাঁতবস্ত্র ছিল কোম্পানির প্রধান বাণিজ্যের পণ্য এবং তাঁতিদের টাকা দাদন দিয়ে এই বস্ত্র সরবরাহের প্রধান দায়িত্ব বহন করতেন শেঠরা। বাংলা দেশের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের তাঁতিদের উপর তাঁদের যে কতখানি প্রভাব ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই প্রভাব ও সম্মানের কারণ আছে। চার্নকের আগেই পূর্ব তীরের উত্তর ভাগে তাঁর সুতিবস্ত্রের কেনা বেচার জন্য একটি বড় বাজার স্থাপন করে ছিলেন। এই সুতার হাট বা বাজারের জন্য কলকাতার গঙ্গাতীরের উত্তরাঞ্চলের নাম হয়েছিল সুতানুটি। শেঠদের একটি বাগানও ছিল এই অঞ্চলে, নাম শেঠবাগান। এই বাগান প্রসঙ্গে সরকারি নথিপত্রে (১৭০৭) উল্লেখ করা হয়েছে—”আমরা এই টাউন অধিকার করার আগে থেকেই তাঁরা (অর্থাৎ শেঠরা) এই জমির মালিক ছিলেন।” এই উক্তি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে ইংরেজরা আসার আগে কলকাতার এই অঞ্চলে বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ—বসাকরা বসতি ও সুতাবস্ত্রের বাজার স্থাপন করেছিলেন। তন্তুবায় সমাজে তাঁদের প্রতিপত্তির জন্য তাঁরা কোম্পানির দাদনি—বণিক হয়েছেন। কলকাতার তাঁতবস্ত্রের বাজারে ১৭৪১ সালের পর থেকে প্রায় শেঠদের বংশানুক্রমিক আধিপত্য একাধিক কারণে কমে যেতে থাকে। কিন্তু কলকাতা শহরের প্রতিষ্ঠার আদিপর্বে বাঙালি শেঠ—বসাকদের কীর্তিকথা তাতে লোপ পায় না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসের দিক থেকে জোব চার্নকই অবশ্য কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু বাংলা দেশ ও বাঙালির ইতিহাসের দিক থেকে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতার গৌরব শেঠ—বসাকদেরও খানিকটা প্রাপ্য।

১০ জানুয়ারি ১৬৯৩ চার্নকের মৃত্যু হয়। তাঁর স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে অনেকে অভিযোগ করেছেন। সুতানুটিতে আসার পর প্রায় আড়াই বছর তিনি বেঁচে ছিলেন, কিন্তু বাণিজ্যকুঠির প্রসারের জন্য বিশেষ কিছু কাজ করেননি। এ দেশের লোকজনদের সঙ্গে মিশে তিনি নাকি প্রায় আধা—বাঙালি আধা—ইংরেজ হয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতা শহরের উৎপত্তিকেন্দ্র, চার্নকের আমলে, কয়েকটি মাটির কুঁড়েঘর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ধর্ম বলেও তাঁরা বিশেষ কিছু মানতেন না। অধিকাংশ ইংরেজ ‘মার্চেন্ট’ ও ‘ফ্যাক্টর’ ‘black wives’ বিবাহ করে মনের আনন্দে জীবন কাটাতেন। ১৬৯৬ সালে শোভা সিং ও রহিম খাঁ—র বিদ্রোহের ফলে পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান—হুগলি অঞ্চলে যে অরাজকতার সৃষ্টি হয়, তাতে সন্ত্রস্ত হয়ে নবাব (ইব্রাহিম খাঁ) ইংরেজ ফরাসি ও ডাচদের কলকাতা, চন্দননগর ও চুঁচুড়ায় সামরিক বাহিনী ও দুর্গ গঠন করে আত্মরক্ষার অনুমতি দেন। ১৬৯৮ সালে জুলাই মাসে মাত্র ১৬,০০০ টাকার বিনিময়ে ইংরেজরা কলকাতা—গোবিন্দপুর—সুতানুটির জমিদারি উপস্বত্বলাভের অধিকার পান। এই অধিকার পাওয়ার পর স্থানীয় জমিদার সাবর্ণ চৌধুরী পরিবারের রামচাঁদ রায়, মনোহর রায় প্রভৃতির কাছ থেকে সামান্য ১৩০০ টাকা নজর দিয়ে ইংরেজরা কলিকাতা—গোবিন্দপুর—সুতানুটির জমিদারি উপস্বত্ব হস্তান্তরিত করে নেন।১০

কলকাতার নগর—রূপায়ণ এইভাবে আরম্ভ হয়। সুতানুটির গঙ্গাতীরের কয়েকটি মাটির কুঁড়েঘর কলকাতার প্রথম নাগরিক কেন্দ্রস্থল। কিন্তু ইংরেজদের কলকাতার জমিদারিলাভ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। ফার্মিঙ্গারের ভাষায়—“By this acquisition the Company obtained for the first time a legal position within the Mughal Empire”—এবং মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে মাত্র তিনটি গ্রামের আইনসংগত জমিদারি অধিকার লাভের পর, ধীরে ধীরে ২৪পরগনার জমিদারি (১৭৫৭), চট্টগ্রাম (১৭৬০), বর্ধমান ও মেদিনীপুরি এবং অবশেষে বাংলা—বিহার—উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫) খুব স্বাভাবিক যুক্তিসংগত পরিণতি বলা চলে (‘final logical completion’–Firminger)। ১১ শুধু যে বণিকদের মানদণ্ড, কবির ভাষায়, রাত পোহালে রাজদণ্ডরূপে দেখা দিয়েছিল তা নয়, মধ্যে বেশ কিছুদিন ইংরেজরা এ দেশের জমিদারদের সামন্তদণ্ডও ধারণ করেছিলেন। ইংরেজদের জমিদারিকালেই কলকাতার আদিপর্বের (অষ্টাদশ শতক) নাগরিক রূপায়ণ হয়েছে বললে ভুল হয় না। যথোচিত পদমর্যাদা ও ক্ষমতাসহ কোম্পানির কর্তারা নতুন একটি অফিস সৃষ্টি করলেন, ‘Jimmidar’—এর (জমিদার) পদ। এই জমিদারই হলেন কলকাতার ‘কালেক্টর’। ১৭০০ সালে র‍্যালফ শেলডন কলকাতার কালেক্টর নিযুক্ত হন। হলওয়েলও কলকাতার জমিদার ছিলেন। আজ পর্যন্ত কলকাতা শহরে এই কালেক্টরের পদটি লোপ পায়নি। প্রায় ২৬৮ বছরের ঐতিহ্য কলকাতার কালেক্টর বহন করছেন, এবং একদিক থেকে বিচার করলে তাঁকে কলকাতার সুদীর্ঘ নাগরিক রূপায়ণের সবচেয়ে প্রবীণ ঐতিহাসিক সাক্ষী বলা যায়।

১৭৬৫ সালে দেওয়ানিলাভের আগে, এমনকী ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের আগেও, কলকাতার নগররূপের বেশ খানিকটা বিকাশ হয়েছিল। ১৭০৬ সালে কলকাতার কৌন্সিল কোম্পানির ডিরেক্টরদের লিখে জানান : “Revenues especially the Rent to the Towns increase yearly, people flocking there to make the Neighbouring Jemindars envy them.”১২ কৌন্সিলের এই রিপোর্টের মধ্যে কলকাতা প্রসঙ্গে ‘people flocking there’ উক্তিটি উল্লেখযোগ্য। কলকাতা শহরের (যদিও শহর তখনও হয়নি) প্রতি লোকের টান এত বেশি যে স্থানীয় দেশীয় জমিদাররা প্রত্যেকে নতুন ইংরেজ জমিদারকে হিংসা করতে আরম্ভ করেছেন। ইংরেজদের বাণিজ্যকুঠি ও জমিদারির কেন্দ্রস্থল কলকাতা অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকেই যে চারদিকের গ্রাম্য সমাজের উপর তার আকর্ষণশক্তির বিস্তার করেছিল তা কৌন্সিল ও ডিরেক্টরদের বিবৃতির আদনপ্রদান থেকে বোঝা যায়।১৩

কলকাতার নাগরিক গতি

কলকাতার এই আকর্ষনশক্তির কারণ কী? নগরের ক্রমবিকাশ ও নাগরিক রূপায়ণের জন্য আর্থনীতিক কর্মজীবনেরও বিস্তার ও বিকাশ প্রয়োজন। কিন্তু কলকাতার মতো বিদেশি আর্থস্বার্থের অধীন ঔপনিবেশিক শহরে অর্থনীতিক্ষেত্রে বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনের বিস্তার বা বিকাশ সম্ভব হয়নি। তাই ইউরোপের স্বাধীন শিল্পপ্রধান শহর—নগরের মতো কলকাতার নগর—রূপায়ণের স্বাভাবিক ঐতিহাসিক গতি লক্ষ করা যায় না। কলকাতার মতো ঔপনিবেশিক শহরের রূপায়ণ যতটা আধুনিক যন্ত্রশিল্পভিত্তিক নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক নানাবিধ কাজকর্মের উপর নির্ভরশীল। এ সম্বন্ধে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত এই :

“In many cases, the cities in less developed areas were established in a colonial period as centres of administrative control and of export of raw materials… Such cities have always attracted a number of rural residents… looking for jobs (in trades, construction, services and administration) for small amounts of cash, city goods, excitement, or independence from their families; or more generally pursuing the hope of changing their status in life.” ১৪

ইংরেজদের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাজকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবার প্রলোভনে চারদিকের গ্রামাঞ্চল থেকে লোকজন কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করতে আরম্ভ করেছিল। এই প্রলোভন তখনকার দিনে কিছুটা অদম্য হওয়াই স্বাভাবিক। কাজকর্মের মধ্যে, অষ্টাদশ শতকে, প্রধান ছিল এইগুলি :

(ক) নির্মাণ ও গঠন (Construction)

(খ) চাকরি (Service)

(গ) ব্যাবসাবাণিজ্য (Trade and Commerce)

 এই তিন ধরনের কাজেরই সুযোগ ছিল কলকাতা শহরে বেশি, একেবারে অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকে ব্রিটিশ আমলের শেষ বিংশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত, গঠন—নির্মাণের কাজের মধ্যে পুরোনো ও নতুন কেল্লা তৈরির কাজ, জঙ্গল—বাগান ইত্যাদি পরিষ্কার করার কাজ, রাস্তাঘাট তৈরির কাজ—এইগুলি ছিল প্রধান। অর্থাৎ নগরনির্মাণের আদিপর্বে কুলিমজুরের কাজের চাহিদা ছিল অত্যধিক, দরিদ্র গ্রামবাসীর পক্ষে ইংরেজের অধীন শহর কলকাতার প্রতি আকৃষ্ট হবার একটা বড় কারণ। আর কিছু না হোক, কলকাতায় এলে কুলিমজুরের একটা কাজ পাওয়া যেত। কলকাতায় ইংরেজদের কর্মকেন্দ্র ও বসতিকেন্দ্র ক্রমে যত প্রসারিত হতে থাকে, তত আশপাশের গ্রামের জলাজঙ্গল, পুকুর প্রভৃতি পরিষ্কার করার সমস্যা দেখা দেয়। এ কাজ গ্রাম্য চাষি ও মজুরের পক্ষেই ভালো করে করা সম্ভব। তাই গ্রাম থেকে চাষি ও মজুররা শহরে এসে কুলিমজুরের কাজ করেছে। নির্মাণের কাজে সর্দার সরকার ঠিকাদার প্রভৃতির কাজও একস্তরের মধ্যবিত্তকে শহরের দিকে আকর্ষণ করেছে। নানা রকমের ব্যাবসাবাণিজ্যের সুযোগ—সুবিধাও বর্ধিষ্ণু কলকাতা নগরের বড় আকর্ষণ ছিল। ইংরেজদের অধীনে কেরানি সরকার মুতসুদ্দি বেনিয়ান দালাল, গোমস্তা দেওয়ান মুনশি দোভাষী প্রভৃতির কাজ, বহু রকমের গৃহভৃত্যের কাজ, গ্রামাঞ্চল থেকে ভাগ্যান্বেষীদের নগরাভিমুখে আকর্ষণের আরও একটি বড় কারণ। বেশ স্পষ্টই বোঝা যায়, গ্রাম থেকে কলকাতামুখী জনপ্রবাহের কারণ শিল্পায়ন (industrialisation) নয়, নানা রকমের চাকরি, বাণিজ্যলব্ধ মুনাফা ও হঠাৎ—লভ্য টাকার প্রলোভন। নগদ টাকা (Cash), শহরের নতুন নতুন ভোগ্যসামগ্রী আমোদপ্রমোদ—উত্তেজনা, বেশ খানিকটা ব্যক্তিস্বাধীনতা, জীবনের একটা নতুন মর্যাদাবোধ ও অস্তিত্ববোধ—এইগুলি ছিল কলকাতার অদম্য আকর্ষণ। অবশ্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল টাকার।

কলকাতা শহরের সবচেয়ে বড় টান ছিল নগদ টাকার টান। সামান্য নগদ টাকার লোভে গ্রামাঞ্চল থেকে কলকাতা শহরে এসে অনেকে অজস্র টাকার মালিক হয়েছেন এবং নতুন শহরে নতুন অভিজাতশ্রেণিতে (new urban aristocracy) পরিণত হয়েছেন। তাঁদের কথা আমরা পরে বলব। কিন্তু ঔপনিবেশিক শহর কলকাতায় কুলিমজুর—ভৃত্যের কাজের যথেষ্ট প্রাচুর্য ছিল বলে দুঃখ—দারিদ্র্যক্লিষ্ট গ্রামের লোকও শহরে এসে আশ্রয় খুঁজছে। এই গতিকে “the transfer through migration, of rural Poverty to the cities” বলা যায়, এবং এই কারণেই দেখা যায় যে—“The overflow of rural distress into urban districts is an outstanding characteristic of economically underdeveloped countries.”১৫ অষ্টাদশ শতকে শিল্পায়নের প্রশ্ন অবশ্য প্রধান ছিল না এবং পরাধীন শহরে অন্যান্য কাজকর্ম যা আকর্ষণীয় হতে পারে তা ইংরেজের জমিদারি ও বাণিজ্যকেন্দ্র কলকাতায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল বললে অত্যুক্তি হয় না। কলকাতার জনসংখ্যাবৃদ্ধির গতি দেখে এই আকর্ষণ যে অন্তত স্থায়ী ছিল তা কিছুটা অনুমান করা যায়—

কলকাতার জনসংখ্যাবৃদ্ধির গতি দেখে এই আকর্ষণ যে অন্তত স্থায়ী ছিল তা কিছুটা অনুমান করা যায়

অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে কলকাতার লোকসংখ্যা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। একাধিক ঐতিহাসিক কারণে এই লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে। তিনটি কারণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য—

(ক) অষ্টাদশ শতকের চল্লিশ থেকে (১৭৪২—৪৪) মারাঠাদের আক্রমণ।

(খ) এই সময় (১৭৪৫) আফগান সেনাপতি গোলাম মুস্তাফা খাঁ—র বিদ্রোহ এবং রঘুজি ভোঁসলের পুনর্বার বাংলা দেশ আক্রমণ, মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত (২১ ডিসেম্বর ১৭৪৫)।

(গ) ১৭৫৬—৫৭ সালে নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের সংঘর্ষ এবং পলাশির যুদ্ধ।

এই তিনটি ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের ফলে গঙ্গার পশ্চিম তীর ও চারদিকের গ্রামাঞ্চল থেকে এ দেশীয় বণিক—ব্যবসায়ী ও অন্যান্য বৃত্তিজীবীরা অনেকে ইংরেজদের অধীনে নিরাপদে বসবাস ও কাজকর্ম করার জন্য পূর্ব তীরে নতুন কলকাতা শহরে চলে আসেন। “Stories about the security and protection of life and property afforded by the English factory at Calcutta were on all men’s lips. The fair dealings of the English traders with Hindu merchants, and the latter’s faithfulness to the Company became the talk of the day.”১৬ বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ এই সময় দিল্লিতে জানিয়েছিলেন যে গঙ্গার পশ্চিম তীরে প্রত্যেকটি জেলায় বর্গির হাঙ্গামার ফলে এমন ক্ষতি হয়েছে যে একটি কড়িও কারও কাছ থেকে আদায় করার উপায় নেই।১৭ ইংরেজদের কলকাতা—কুঠির সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার কথা লোকের মুখে তখন চারদিকে রটে গিয়েছিল। হিন্দু বণিকদের প্রতি ইংরেজদের উদার ব্যবহারের কথাও লোকমুখে প্রচারিত হয়েছিল। এইসব যুদ্ধবিগ্রহ ও বিপর্যয়কে ‘push factor’ বলা যায়, যেমন শহরের নিজস্ব আকর্ষণশক্তিকে ‘pull factor’ বলা হয়। গ্রামাঞ্চল থেকে এই সমস্ত বিপর্যয়ের সঙ্গে আরও একটি বড় বিতাড়নশক্তি (push factor) যুক্ত হয়েছিল—সেটি হল ইজারাদারি পদ্ধতি (farming) ইংরেজদের রাজস্ব—সংগ্রহের নানা রকমের পরীক্ষা ও অবশেষে অষ্টাদশ শতকের শেষ দশকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দ্বারা তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। তার ফল হয়েছে রাজস্বের ইজারাদারির সুবিস্তৃত স্তরবিন্যাস, মধ্যস্বত্বভোগীর বিস্তার, কৃষকদের চরম লাঞ্ছনা ও দুর্দশা ও গ্রাম্য সমাজের দ্রুতগতি অবনতি। তারপর থেকে শহরমুখী গ্রাম জনপ্রবাহ, সাময়িক—স্থিতি—নিরাপত্তাসন্ধানী গ্রাম্য দুঃখকষ্টের প্রবাহে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক, এবং সত্যই তা—ই হয়েছিল। পরবর্তীকালে কলকাতা শহরে এই “overflow of rural distress” একই ধারায় চলে এসেছে দেখা যায়। আজ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

অষ্টাদশ শতকের চতুর্থ পর্বে ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনকালে কলকাতা শহরের সমৃদ্ধি ও জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলার রাজধানী, হেস্টিংসের চেষ্টায়, কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। হেস্টিংসের আগে পর্যন্ত মুর্শিদাবাদই ছিল বিচার ও রাজস্ব সংক্রান্ত প্রধান কর্মকেন্দ্র। হেস্টিংস মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় বিচারালয় ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিভাগগুলিকে স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনা করে কলকাতাকে ব্রিটিশ আমলের প্রথম রাজধানী—শহরে পরিণত হবার ঐতিহাসিক সুযোগ করে দেন। কলকাতার সিদ্ধান্ত জানিয়ে হেস্টিংস ডিরেক্টরদের লেখেন :১৮

“Another good consequence will be the great increase of inhabitants and of wealth in Calcutta, which will not only add to the consumption of our most valuable manufactures imported from home, but will be the means of conveying to the natives a more intimate knowledge of our customs and manners and of conciliating them to our policy and government.”

রাজস্ববিভাগ ও বিচারবিভাগ মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হলে ফলাফল ভালোই হবে। কলকাতার জনসংখ্যা ও সম্পদ অনেক বৃদ্ধি পাবে এবং ইংলন্ডের শিল্পজাত মূল্যবান পণ্যদ্রব্যের ভোগেচ্ছাও অনেক বৃদ্ধি পাবে। শুধু তা—ই নয়, হেস্টিংস পরিষ্কার ইঙ্গিত করেছেন যে কলকাতা শহর রাজধানী হলে এ দেশীয় লোকদের ইয়োরোপীয় রীতিনীতি ও আচার—ব্যবহার শিক্ষা দিতে এবং ব্রিটিশ শাসননীতির পক্ষপাতী করে গড়ে তুলতে অনেক সুবিধা হবে। অর্থাৎ হেস্টিংসের ইচ্ছা ছিল কলকাতা শহরকে পাশ্চাত্য রীতিনীতি ও ভাবধারার একটি মিলনতীর্থে পরিণত করা। হেস্টিংসের ইচ্ছাই পূর্ণ হয়েছিল। ফার্মিঙ্গার ঠিকই বলেছেন যে “If Job Charnock is to be considered the founder of Calcutta as a seat of trade, Hastings may be regarded as the founder of Calcutta as the policital capital of the British Empire.” ১৯

হেস্টিংসের আমলে কলকাতার শাসনবিভাগ ও বিচারালয় স্থাপিত হবার পর প্রকৃত ইংরেজি শিক্ষা না হলেও, ইংরেজি ভাষাচর্চার সূত্রপাত হয়। দেওয়ান রামকমল সেন ১৮৩৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি—বাংলা অভিধানে লিখেছেন : “In 1774 the Supreme Court was established here, and from this period a knowledge of the English language appeared to be desirable and necessary.” রামকমল সেন সুপ্রিমকোর্টের প্রতিষ্ঠাকালে এ দেশের লোকদের ইংরেজি ভাষাচর্চার চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। তখন ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের সাহেব অ্যাটর্নি ও অ্যাডভোকেটদের বাঙালি কেরানিরা। তাঁরা ইংরেজিতে আবেদনপত্রাদি লিখতে পারতেন, এবং কাজকর্ম চালানোর মতো yes-no-verywell প্রভৃতি কিছু ইংরেজি শব্দের স্টকিস্টও ছিলেন। এই বাঙালি কেরানিবাবুরা একটি নোটখাতার মধ্যে ইংরেজি শব্দ লিখে লিখে ‘স্টক’ করে রাখতেন। যাঁর যত বেশি স্টক থাকত তিনি তত বড় ইংরেজি পণ্ডিত বলে খাতির পেতেন। কয়েকজনের নামও রামকমল এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রামরাম মিশ্র নামে একজন ব্রাহ্মণ, রামকমলের ভাষায়, “was the first who made any considerable progress in the English language.” অনেক বাঙালিবাবু তখন তাঁর ছাত্র ছিলেন। রামরামের পর রামনারায়ণ মিত্র, আনন্দীরাম দাস, রামলোচন নাপিত, কৃষ্ণমোহন বসু এবং আরও পরে ভবানী দত্ত, শিবু দত্ত ও আরও দু—একজন “were celebrated as complete English scholars”। ইংরেজির এই ‘complete scholar’—দের বিদ্যা তখন একখানি spelling book ও word book—এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এঁরা নিজেরা স্কুল করে ইংরেজি শিক্ষা দিতেন এবং বাঙালি ছাত্রদের কাছ থেকে মাসিক বেতন দিতেন ৪টাকা থেকে ১৬টাকা পর্যন্ত।

সামাজিক ইতিহাসের দিক থেকে রামকমলদের এই ইংরেজি শিক্ষার বিবরণের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথম পাদে ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত বাংলা দেশে নতুন ইংরেজি শিক্ষার বাস্তব চিত্রটি রামকমল অল্প কথায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। নবযুগের বাংলার নতুন নগরকেন্দ্রিক বিদ্বৎসমাজে সামাজিক রূপের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি এর মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। তখনকার দিনে মাসিক ৪টাকা থেকে ১৬টাকা বেতন দিয়ে তাঁরা তাদের ছেলেদের শিবু দত্ত, ভবানী দত্ত, রামলোচন নাপিত অথবা তাঁদের সমসাময়িক ফিরিঙ্গি আরাতুন পিত্রুশ, শেরবোর্ন, ড্রামন্ড, হুটেমান প্রভৃতির স্কুলে ইংরেজি শিক্ষার জন্য পাঠাতেন? কলকাতা শহরের নতুন অভিজাত সমাজের লোকরা। হেস্টিংসের ভবিষ্যদবাণী যে সত্য হয়েছিল তা এ দেশীয়দের ইংরেজিচর্চার এই কাহিনি থেকেই বোঝা যায়। পাশ্চাত্য রীতিনীতি ও ভাবধারার অন্যতম ঘাতপ্রতিঘাতের কেন্দ্র হবে কলকাতা শহর, এই ছিল হেস্টিংসের আশা। সে আশা তাঁর পূর্ণ হয়েছিল। হেস্টিংস নিজে বিদ্যোৎসাহী ছিলেন, প্রাচ্য বিদ্যা অনুশীলনেও তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল। সংস্কৃত ও ফারসিচর্চায় তার শাসনকালে চার্লস উইলকিনস, উইলিয়াম জোনস, কোলব্রুকের মতো ইংরেজি পণ্ডিতেরা সংস্কৃতচর্চায় উৎসাহী হয়েছিলেন। ১৭৮৪ সালে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানানুসন্ধান ও বিদ্যানুশীলনের জন্য বাংলা দেশে কলকাতা শহরে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ স্থাপিত হয়। অষ্টাদশ শতকের মধ্যেই কলকাতা শহর বাংলা দেশের তো বটেই, ভারতের অন্যতম সংস্কৃতিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। হেস্টিংসের দ্বিতীয় ইচ্ছাও অপূর্ণ থাকেনি, বিদেশি ব্রিটিশ পণ্য আমদানিরও সবচেয়ে বড় বন্দর ও বাজার হয়ে উঠেছিল কলকাতা। অষ্টাদশ শতকের শেষদিকেই হয়েছিল। বিদেশি জাহাজের ভিড় দেখে তা বোঝা যায়।২০

বিদেশি জাহাজের ভিড়

অর্থনীতি ও সংস্কৃতি উভয়েরই প্রাণকেন্দ্র হল কলকাতা। অষ্টাদশ শতকের মধ্যেই প্রধানত ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতার নাগরিক রূপায়ণের পথ প্রশস্ত ও বাধামুক্ত করে দিয়েছিলেন।

মধ্যযুগীয় নগরবিন্যাস

অষ্টাদশ শতকে কলকাতা শহরের নাগরিক রূপায়ণে মধ্যযুগীয় নগরবিন্যাসের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। অবশ্য অষ্টাদশ শতকে ইংলন্ডেও শহরের আধুনিক যুগোপযোগী রূপায়ণ সম্ভব হয়নি, লন্ডন শহরও তখন অনেকটা মধ্যযুগের শহরের মতোই ছিল। জনসনের যুগের ইংরেজ যাঁরা কোম্পানির চাকরি নিয়ে অথবা ব্যক্তিগত ব্যাবসাবাণিজ্যের উদ্দেশ্য নিয়ে এ দেশে আসতেন, তাঁরা অধিকাংশই শিক্ষাদীক্ষা বা সুরুচির দিক থেকে নিম্নস্তরের লোক ছিলেন বললেও অত্যুক্তি হয় না। জোব চার্নক থেকে ক্লাইভের আমল পর্যন্ত এই ধরনের ইংরেজই এ দেশে বেশি এসেছেন। হেস্টিংসের আমল থেকে এই ধারার কিছু পরিবর্তন হয়, কিন্তু সেটা খুব সামান্য পরিবর্তন। উনিশ শতকে উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের শাসনকালের (১৮২৮—৩৫) আগে পর্যন্ত এই ধারার উল্লেখ্য পরিবর্তন হয়নি। সুতরাং ইংরেজ শাসকদের দিক থেকেও বলা যায় যে অষ্টাদশ শতকে অন্তত তাঁরা মধ্যযুগ বা সামন্ত যুগের প্রতিনিধি হয়ে এ দেশে এসেছিলেন। তাঁদের সেই সামন্ত যুগের মনোভাবই কলকাতার নাগরিক রূপায়ণে আঠারো শতকে প্রতিফলিত হয়েছে।

কোম্পানির ডিরেক্টররা ১৭৫৫ সালে এবং ১৭৫৮ সালে কলকাতার কর্মকর্তাদের জানান যে তাঁদের একমাত্র স্বার্থ হল দেশীয় তাঁতিদের যতরকম উপায়ে সম্ভব উৎসাহ দিয়ে কলকাতা শহরের সীমানার মধ্যে বসবাসের জন্য নিয়ে আসা এবং তাঁদেরই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রাখা। তা করতে পারলে কোম্পানির ইনভেস্টমেন্টে লাভ হবে যথেষ্ট এবং তাঁতিদের নিজেদের তত্ত্বাবধানে রেখে বস্ত্র উৎপাদন করাতে পারলে মধ্যবর্তী দালাল বা দাদনি—বণিকদের উপর নির্ভর করতে হবে না—

“As it is evidently for our interest therefore to encourage not only all the weavers in our bounds, but likewise to draw as many others as possible from all countries to reside under our protection, we shall depend on your utmost efforts to accomplish the same… wherein we shall find a great share of your investment made under your own eyes.২১

কোম্পানির ইনভেস্টমেন্টের* প্রধান বস্তু ছিল বস্ত্র, তাই তাঁতিদের নতুন কলকাতা শহরে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসার জন্য তাঁরা উদগ্রীব হয়েছিলেন। কিন্তু বাঁধা চাকরির মতো ইংরেজদের অধীনে কাজ করার সুবিধা হবে মনে করে তন্তুবণিকরা কলকাতা শহরে এসে বসবাস করেছেন বলে মনে হয় না। তাঁতিরা না হলেও অন্যান্য কারুশিল্পীরা অষ্টাদশ শতকে কলকাতা শহরে এসে বসবাস করেছেন। পলাশির যুদ্ধের বছরে, ১৭৫৭ সালে, কোম্পানির কর্মকর্তারা কলকাতার একটি নগর—পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয় যে তন্তুবায়, সূত্রধর, কর্মকার, দরজি প্রভৃতি বিভিন্ন বৃত্তিজীবীদের গোষ্ঠীবদ্ধভাবে কলকাতার এক—একটি অঞ্চলে (‘district’) বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে, প্রত্যেক বৃত্তিজীবীগোষ্ঠী তাদের নিজেদের ভিতর থেকে একজন করে ‘headman’ বা ‘চৌধুরী’ নির্বাচন করবে এবং এই চৌধুরী হবে সেই গোষ্ঠীর দাবিদাওয়া অভাব—অভিযোগ নিবেদনের প্রতিনিধি। টাউনের আঞ্চলিক মণ্ডলরা তাঁদের অধীন বিভিন্ন অঞ্চলের বৃত্তিজীবীদের কাজকর্মের একটি করে মাসিক হিসেব কলকাতার জমিদারের কাছে দাখিল করবেন। কার কীরকম মজুরি হবে—না হবে তা জমিদার ঠিক করবেন, এবং প্রত্যেক বৃত্তিজীবীকে তার কাজের (trade) জন্য লাইসেন্স নিতে হবে, লাইসেন্সের অর্থমূল্য হবে মাসিক মজুরির এক চতুর্থাংশ।২২

এ হল পুরোপুরি মধ্যযুগের নগরবিন্যাস। তখনকার কলকাতার ইংরেজ জমিদারের মস্তিষ্কপ্রসূত নগর—পরিকল্পনা আধুনিকতার পথে এর চেয়ে বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’—কাব্যে কাল্পনিক গুজরাত নগরপত্তনে জাতিবিন্যাসের কথা মনে হয়—

তেলি বৈসে শত জনা কার ঘানী কার ঘনা
কিনিয়া বেচয়ে কেহ তেল।
কামার পাতিয়া শাল কোদালী কুঠার ফাল
গড়ে টাঙ্গী অঙ্গবেধী শেল।।…
কুম্ভকার গুজরাটে হাঁড়ি কুঁড়ি গড়ে পেটে
মৃদঙ্গ দগড় কাড়া পঢ়া।
শত শত একজায় গুজরাটে তন্তুবায়
ভুনী ধুতি খাদি বুনে গড়া।।…

‘গুজরাত’ কথার বদলে ‘কলিকাতা’ বসালে অষ্টাদশ শতকে ইংরেজ জমিদারদের নগরপত্তনের পরিপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের নামের মধ্যে আজও সেই অষ্টাদশ শতকের বৃত্তিভিত্তিক বসতিবিন্যাসের রূপটি লুকিয়ে আছে। যেমন :

বৃত্তিভিত্তিক বসতিবিন্যাস

এই আঞ্চলিক বৃত্তিকেন্দ্রিক বসতিবিন্যাস ছিল অষ্টাদশ শতকে ইংরেজের জমিদারি কলকাতার নাগরিক রূপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বেশ বোঝা যায়, অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অন্তত কলকাতার নাগরিক সমাজের অনুভূমিক গতি (horizontal mobility) যা—ই থাকুক—না কেন ঊর্ধ্বাধ গতি (vertical mobility) বিশেষ ছিল না। গ্রাম্য সমাজের মতো কুলবৃত্তিকেন্দ্রিক (caste-occupational) সমাজের রূপ কলকাতার দৈহিক গড়নের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল। এই কুলবৃত্তিগত সংস্কার যে কত দূর গভীর ছিল তা শেঠ—বসাকদের ব্যবহারের একটি দৃষ্টান্ত দিলে বোঝা যাবে। আগেই বলেছি, বাঙালি তন্তুবণিক শেঠ—বসাকরা কলকাতার প্রাচীনতম বাসিন্দাদের মধ্যে অন্যতম এবং অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় তাঁরা কোম্পানির দাদনি—বণিক ছিলেন। ১৭৪৮ সালের নথিপত্রে উল্লেখ আছে :২৩

“The Sets being all present at the Board inform us that last year they dissented to the employing of Fittick Chund, Gosserain, Occore and Otteram, they being of different caste and consequently they could not do business with them, upon which account they refused Dandey, and having the same objection to make this year, they propose taking their shares of the Dandey if we should think proper to consent therto.”

‘Fittick Chund’ (ফটিকচাঁদ), ‘Gosserain’ (গোঁসাই?), ‘Occore’ (অক্রুর?) ও ‘Otteram’ (আত্মারাম?) নামে চারজন লোককে দাদন দেওয়ার বিরোধী ছিলেন শেঠরা, কারণ তাঁরা জাতিতে তন্তুবণিক নন। যাঁরা তাঁদের স্বজাতি নন তাঁদের সঙ্গে কোনও বাণিজ্য করতে তাঁরা রাজি ছিলেন না। শেঠদের এই মনোভাবের জন্যই কলকাতা শহরে তন্তুবণিকদের নিয়ে এসে বসবাস করানো ইংরেজদের পক্ষে সম্ভব হয়নি, কারণ বস্ত্র—দাদনের ব্যাবসাটা শেঠরা ইংরেজদের তত্ত্বাবধান করতে সম্মত ছিলেন না। সেইজন্য দেখা যায়, শেঠদের আধিপত্য ও প্রভাব কমে যাওয়ার পর (১৭৫০—৫২) ইংরেজরা তন্তুবণিকদের কলকাতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনাও যে বিশেষ সার্থক হয়নি, তার প্রমাণ কলকাতায় অন্যান্য বৃত্তিজীবীদের স্বতন্ত্র ‘টোলা’ ও ‘টুলি’ ও ‘পাড়া’ গড়ে উঠলেও ‘তাঁতিপাড়া’ বা ‘তাঁতিটোলা’ বলে কিছু ছিল না। অথচ বাংলা দেশের গ্রামে ‘তাঁতিপাড়া’র অভাব নেই। বাংলার সকল শ্রেণির কারুজীবীদের মধ্যে তন্তুবণিকদের সঙ্গেই ইংরেজ বণিকদের স্বার্থসংঘাত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি এবং তার জন্য বাঙালি তন্তুবণিকদের ক্ষতিও যা হয়েছিল তা অন্য কোনও বৃত্তিজীবীর হয়নি। কলকাতার আদিপর্বে কুলবৃত্তিগত আঞ্চলিক রূপায়ণে তাই তন্তুবণিকদের কোথাও গোষ্ঠীবদ্ধভাবে দেখতে পাওয়া যায় না, অন্তত আঞ্চলিক নামের মধ্যে তার চিহ্ন নেই।

উনিশ শতকের কলকাতা

কলকাতার নাগরিক রূপের বহিরাঙ্গিক বিন্যাস উনিশ শতকের গোড়া থেকে আরম্ভ হয়ে। ওয়েলেসলি তার সূত্রপাত করেন। নগর উন্নয়ন সম্বন্ধে তাঁর বিখ্যাত প্রস্তাবে ওয়েলেসলি বলেন (১৬ জুন ১৮০৩) :

“The increasing extent and population of Calcutta, the capital of the British Empire in India and the seat of the Supreme authority, require the serious attention of Government. It is now become absolutely necessary to provide permanent means of promoting the health, the comfort, and convenience of the numerous inhabitants of this great Town.”

এই প্রস্তাব অনুযায়ী ওয়েলেসলি ৩০ জন সদস্য নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটি একটি উন্নয়নের পরিকল্পনা রচনা করেন, কিন্তু তা বিশেষ কার্যকর করতে পারেনি। ১৮১৪ সালে এই কমিটি লোপ পেয়ে যায় এবং ১৮৭১ সালে গভর্নমেন্ট নতুন লটারি কমিটি নিয়োগ করেন। আগেকার কমিটি লটারির টাকায় কলকাতার টাউন হল, বেলেঘাটা খাল, এলিয়ট রোড ও ট্যাঙ্ক ইত্যাদি তৈরি হয়। কমিটি আর কী করেন তা সঠিক জানা যায় না, কারণ তাঁদের কার্যবিবরণ কিছু পাওয়া যায়নি। কলকাতার নাগরিক উন্নয়নের কাজ নতুন লটারি কমিটি উৎসাহ নিয়ে আরম্ভ করেন। এই কমিটির উদযোগে ওয়েলিংটন স্ট্রিট ও স্কোয়্যার, হেস্টিংস ও হেয়ার স্ট্রিট, ম্যাঙ্গ লেন ও কসাইতলা, ক্রিক রো, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, কিড স্ট্রিট, উত্তরদিকে কলেজ স্কোয়্যার, দক্ষিণদিকে পার্ক স্ট্রিট প্রভৃতি নতুন করে তৈরি হয় ও চওড়া করা হয়। ১৮৭১ থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত লটারি কমিটির হাতে লেখা যে কার্যবিবরণ পাওয়া যায়, তা থেকে বোঝা যায়, কলকাতা শহরের মধ্যভাগ, পূর্বভাগ ও উত্তরভাগে উন্নয়নের কাজ বেশি হয়, দক্ষিণভাগে চৌরঙ্গি অঞ্চলের খানিকটা উন্নতি হলেও তার বাইরে বেশি দূর পর্যন্ত বিশেষ কিছু করা হয়নি। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে কলেজ স্ট্রিট, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, এই নামের ট্যাঙ্ক ও স্কোয়্যার, আমহার্স্ট স্ট্রিট ও মির্জাপুর স্ট্রিট, নিমতলা থেকে হেস্টিংস পর্যন্ত স্ট্র্যান্ড রোড প্রভৃতি পথঘাট তৈরি করা হয়। ১৮৩৬ সালে অকল্যান্ডের ‘ফিভার হসপিটাল কমিটি’ ও ‘মিউনিসিপ্যাল ইনকোয়্যারি কমিটি’র বিশাল রিপোর্টে কলকাতার পথঘাট উন্নয়নের বিস্তৃত পরিকল্পনা পাওয়া যায়। পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল, উত্তর মধ্য কলকাতায় বড় বড় রাস্তাগুলিকে প্রসারিত করে, এবং সংযোগকারী মাঝারি ও ছোট ছোট রাস্তা তৈরি করে সংযুক্ত করে দেওয়া। এত পরিকল্পনার পরেও দেখা যায় যে ১৮৮৮ সালে কলকাতার প্রায় ১৮২ মাইল মোট পাকা রাস্তার মধ্যে ৩৫ মাইল আন্দাজ সংকীর্ণ অলিগলি ছিল, যা খোলা নালা—নর্দমা বুজিয়ে করা হয়েছে। বর্তমান দক্ষিণ কলকাতা তখন শহরতলি অঞ্চল ছিল। ১৮৮৮ সালের পর কলকাতার ওই দক্ষিণ অঞ্চলের অধিকাংশ বড় বড় রাস্তা তৈরি হয়—যেমন ল্যান্সডাউন রোড, হরিশ মুখার্জি রোড, হাজরা রোড, চেতলা রোড, স্টার্নডেল রোড, জজকোর্ট রোড, গোপালনগর রোড, কালী মন্দির রোড, উডবার্ন রোড ইত্যাদি, উত্তরে গ্যাস স্ট্রিট ও আপার সার্কুলার রোডও এই সময়ে তৈরি হয়। ১৮৩৪—৩৫ সাল থেকে কলকাতায় পাথর বাধানো (stone-metalling) রাস্তা তৈরি আরম্ভ হয়। ১৮৭৫ সালে দেখা যায় যে প্রায় ১৩২ মাইল বাঁধানো রাস্তার মধ্যে ৮২ মাইল পাথর এবং ৫০ মাইল ইট দিয়ে বাঁধানো। ‘ম্যাকাডামাইজড’ (tar-macadam) রাস্তা তৈরি আরম্ভ হয় বিশ শতকে—১৯১৩—১৪ সাল থেকে।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় পর্যন্ত কলকাতা শহরে শুধু তেলের আলো জ্বলত। চৌরঙ্গির রাস্তায় প্রথম গ্যাসের আলো জ্বলে ১৮৫৭ সালের ৬ জুলাই তারিখে। সেই গ্যাসের আলোর শিখাও খুব উজ্জ্বল ছিল না। সাদা আলোর বার্নার (incandescent burner) কলকাতার গ্যাসের আলোয় জ্বলতে থাকে বিশ শতকের গোড়া থেকে ১৯০১ সালে। রাস্তার আলোর এই কাহিনিটুকু থেকে বোঝা যায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় গ্রামের মতো কলকাতা শহর সন্ধ্যার পরে ঘুমিয়ে না পড়লেও, কর্মব্যস্ততা বিশেষ কিছু তার থাকত না। তেলের মিটমিটে আলোয় রাতের নাগরিক জীবন স্ফুরিত হয় না। তারপর যে গ্যাসের আলো জ্বলল তা—ও উজ্জ্বল নয়, তাতে জীবনের পথে পর্যাপ্ত আলোকসম্পাত হয় না। তা না হলেও এ কথা ঠিক যে উনিশ শতকের মধ্যে, পথঘাট—ট্যাঙ্কস্কোয়্যার—ড্রেন—আলো প্রভৃতির বহিরাঙ্গিক বিন্যাসে, কলকাতা শহর একটা বিশিষ্ট নাগরিক রূপ ধারণ করেছিল।

কলকাতার নাগরিক উন্নয়ন সম্পর্কে লটারি কমিটির যে অপ্রকাশিত হাতে লেখা কার্যবিবরণ (১৮১৭ থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত) আছে, তা পাঠ করলে কলকাতার মতো পরাধীন ঔপনিবেশিক শহরের (এবং খানিকটা অন্যান্য শহরেরও) ক্রমবিকাশের আদিস্তরের কতকগুলি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য নজরে পড়ে।২৪  লোকজনের সংখ্যাবৃদ্ধি ও ব্যাবসাবাণিজ্যের বিস্তারের ফলে শহরের সীমানা প্রসারিত হতে থাকে পাশাপাশি গ্রামগুলিকে একটির পর একটি গ্রাস করে এবং দরিদ্র গ্রামবাসীদের উচ্ছেদ করে। কলকাতার প্রধান প্রশাসনিক—বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থল (administrative-commercial core) ছিল পুরাতন ‘কুঠি’ ও ‘ফোর্ট’ অঞ্চল অর্থাৎ গঙ্গাতীর থেকে ট্যাঙ্ক স্কোয়্যার, হেস্টিংস স্ট্রিট, ক্লাইভ স্ট্রিট অঞ্চল। এইটাই ছিল কলকাতার ‘ডাউন—টাউন এরিয়া’—“The hub of the city is the down-town area of maximum land rent, where… the basic functions of finance and government are carried on.”২৫ এই অঞ্চল থেকে উত্তরে, দক্ষিণে ও পুবে কলকাতার ধীরে ধীরে প্রসার হতে থাকে উনিশ শতকে। লটারি কমিটির রিপোর্টে (১৮১৭—২১) শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের জমির মূল্য থেকে এই প্রসারের গতির আভাস খানিকটা পাওয়া যায় :

জমির মূল্য

এই জমির মূল্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় কলকাতা শহরের ‘ডাউন—টাউন’ অঞ্চল কোনটি। তারপর ধর্মতলা—জানবাজার—বউবাজার—ফ্রি স্কুল স্ট্রিট অঞ্চল বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রাধান্য লাভ করেছে এবং এই অঞ্চলের জমির মূল্য (৩০০ থেকে ২০০ টাকা কাঠা) লটারি কমিটির পথঘাটের উন্নয়নের পর প্রায় তিন—চারগুণ বেড়েছে। ১৮২০ সালের একটি ‘মিনিট’ বলা হয়েছে—“The value of ground in Calcutta generally rises in proportion to its contiguity to a great thoroughfare.”২৬ বড়রাস্তার কাছাকাছি জমির দাম কলকাতা শহরে বেশি। উন্নয়নের পর সাধারণত ১০০ টাকা কাঠার জমি ৩০০ টাকায় বিক্রি হয় এবং তাতে কমিটির প্রতি কাঠায় ১০০ টাকা লাভ থাকে, অর্থাৎ কাঠাপ্রতি ১০০ টাকা উন্নয়নের জন্য খরচ হয়। ধর্মতলা—বউবাজার অঞ্চলের উন্নয়নের পর জমির দাম গড়ে তিন—চারগুণ বেড়ে যায় অর্থাৎ ২০০/২৫০ থেকে ৬০০/৮০০/১০০০ টাকা পর্যন্ত হয়। ওয়েলিংটন স্কোয়্যার তৈরি হয় এই সময়ে—“…that you will be pleased to designate the new Square in the Dhurumtollah under the name of Wellington Square.”২৭ চৌরঙ্গি অঞ্চল তখন পুরোপুরি গ্রাম্য ছিল। চৌরঙ্গির উন্নয়নের জন্য কমিটি এই অঞ্চলের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ :

“The greatest part of the tract in question is covered with ranges of small huts situated nearly in close contiguity to one another, and occupied by the very lowest descriptions of the natives… The native huts are as numerous and as fully occupied as in any other portion of the city… With respect of Europeans lying in its vicinity, the Board observe, that however offensive the effluvia from the tanks and privies must occasionally prove to them, the houses are never from these cause left unoccupied… the total destruction of huts and the appropriation of the ground now occupied by them for large buildings would unquestionably add considerably to the comfort and agreeableness of the neighbourhood and to the beauty of the city.”২৮

বেশ ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম ছিল চৌরঙ্গি। তবু কলকাতায় ইয়োরোপিয়া’নদের বসতিকেন্দ্র এই সময় ক্রমে যে চৌরঙ্গি অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছিল তা বোঝা যায়। গ্রামবাসীদের নির্মমভাবে উচ্ছেদ করে, তাদের কুঁড়েঘর—বাগান—পুকুর সমস্ত ধ্বংস করে, চৌরঙ্গির গ্রামাঞ্চলের জমি সাহেবদের বসবাসের জন্য দখল করা উচিত, এ কথা পরিষ্কার করে লটারি কমিটি বলেছেন। চৌরঙ্গি থেকে দক্ষিণে চক্রবেড়ে পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের জমিদারি বেশির ভাগ ইংরেজরাই ভোগ করতেন। ক্যামাক সাহেবের (যাঁর নামে ক্যামাক স্ট্রিট) অনেক ভূসম্পত্তি ছিল এই অঞ্চলে। প্রায় ২৫০ বিঘা জমি ১৮২০ সালে, ১০০০ বিঘা হিসাবে ক্যামাক সাহেবের কাছ থেকে কেনার প্রস্তাব করেন লটারি কমিটি। ভবিষ্যতে এই অঞ্চল কলকাতায় ইয়োরোপিয়ানদের বসতিকেন্দ্র হবে বলে এই প্রস্তাব করা হয়।২৯ কলকাতা শহরের বহিরাঙ্গিক প্রসার কী উপায়ে হয়েছে, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত। সাধারণত দেখা যায়, উনিশ শতকে পথঘাটের উন্নয়নের পর কলকাতায় জমির মূল্য তিন—চারগুণ বেড়েছে। বর্তমানে কলকাতার মেট্রোপিলটন প্রসারের যুগে প্রধানত জমির ‘স্পেকুলেটার’রা এই উপায়ই অবলম্বন করেছেন, তবে উন্নয়নের পর সাধারণত প্রতি বিঘার মূল্য প্রতি কাঠায় ধার্য করে তাঁরা অন্তত বিশগুণ মুনাফা করে থাকেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি মুনাফা করতে দেখা যায়। তার কারণ, উনিশ শতকের তুলনায় বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে, অত্যধিক লোকসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে, বসতজমির চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। উনিশ শতকের গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত লোকসংখ্যার বৃদ্ধির হার বর্তমানের তুলনায় অত্যন্ত কম ছিল, তাই জমির মালিকদের মুনাফার লালসা বর্তমানের মতো বীভৎস সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেনি। অবশ্য তখনকার টাকার বাজারমূল্য বিচার করলে, জমির মালিকরা কলকাতা শহরের প্রসারের সুযোগ নিয়ে যে খুব কম মুনাফা করেছিলেন তা বলা যায় না।

কমিটির কার্যবিবরণ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, কলকাতা শহরের উন্নয়নের কাজে প্রচুর সংখ্যায় কুলিমজুরের প্রয়োজন হয়েছে। কলকাতার রাস্তা তখন খোয়া দিয়ে তৈরি হত, এবং খোয়া তৈরি করা হত ইট ভেঙে। হাতে ভাঙা হত, কোনও যন্ত্র ছিল না। খোয়া ভাঙার মজুরি ছিল প্রতি ৩৬০০ ইটের জন্য দু—টাকা করে, এক লক্ষ ইটের জন্য মজুরি লাগত ৫৫।৩০ এর থেকে অনুমান করা যায়, কত হাজার হাজার কুলিমজুর প্রয়োজন হয়েছে কলকাতার খোঁয়া—বাঁধানো রাস্তা তৈরির জন্য। কলকাতার নাগরিক বিস্তারের জন্য যারা উৎখাত হয়েছে তারা এবং কলকাতার কাছাকাছি গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র কৃষিজীবী ও কারুশিল্পীরা তখন নতুন শহর কলকাতায় এসেছে এই দিনমজুরের কাজের জন্য। শুধু খোয়া—ভাঙা কাজ নয়, কলকাতায় তখন মজুরের কাজের অভাব ছিল না। অধিকাংশই নগরপত্তনের কাজ। খোয়া—ভাঙা, বনজঙ্গল পরিষ্কার করা, শত শত এঁদো পুকুর, খাল—নালা মাটি কেটে ভরতি করার জন্য কুলিদের মজুরি দেওয়া হত মাসিক ৩ করে অর্থাৎ দৈনিক মজুরি দু—আনার কিছু কম। ‘ডিঙাভাঙা খাল’ বুজিয়ে রাস্তা তৈরি করার সময় (বর্তমান ক্রিক রো) ২২০ জন কুলি নিয়োগ করা হয়েছিল, তার জন্য প্রতিমাসে তাদের মজুরি দিতে হত ৭৫০ টাকা।৩১ লটারি কমিটির এই বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে উনিশ শতকে কলকাতার নাগরিক উন্নয়নের কাজের জন্য ‘non-productive proletariat’ কুলিমজুরের সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিল্প কারখানার মজুরের তুলনায় এই দিনমজুরের সংখ্যা ছিল কলকাতায় অনেক বেশি। ঔপনিবেশিক শহরের বিদেশমুখী অর্থনীতির এই পরিণতি স্বাভাবিক।

লটারি কমিটির বিবরণ থেকে আরও অনেক টুকরো খবর পাওয়া যায় যা কলকাতার ইতিহাসের দিক থেকে ‘ইন্টারেস্টিং’। যেমন নবাব মীরজাফর বর্তমান ক্লাইভ স্ট্রিট থেকে গঙ্গাতীরের মধ্যবর্তী স্থানে একটি প্রাসাদে বাস করতেন। নবাবের এই প্রাসাদ ও সংলগ্ন সমস্ত জমি লটারি কমিটি এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য দখল করেন। এই সময় নবাবের প্রাসাদ ধূলিসাৎ করা হয়।৩২ বর্তমান ব্যাঙ্কশাল স্ট্রিট অঞ্চলে শিক্ষাব্রতী ডেভিড হেয়ারের বাড়ি ও অনেক জমি ছিল। তখনকার শহরের অন্যতম ধনী রামদুলাল দে এই অঞ্চলে অনেক জমির মালিক ছিলেন। জমির লেনদেন সম্পর্কে রামদুলাল দে ও ডেভিড হেয়ার অনেক জমি কিনেছিলেন—তার মোট মূল্য ধার্য হয়েছিল ৩৮,৯৩৭২। কমিটির সেক্রেটারি ট্রটার সাব—ট্রেজারারকে একটি চিঠিতে লেখেন (১৭ সেপ্টেম্বর ১৮২১) : ৩৩ “I am directed by the Lottery Committee to transmit to you the accompanying sum of sicca rupees thirtyeight thousand nine hundred and thirty seven, nine annas and two pies, received from Mr. David Hare in payment of ground sold to him in the vicinity of Bankshall and to request that you will carry the sum to the credit of the Lottery Committee in their account with the General Treasury.” এ ছাড়া ৬১০০০ টাকা দিয়ে ডেভিড হেয়ার এই অঞ্চলে আরও তিনখণ্ড জমি লটারি কমিটির কাছ থেকে কিনেছিলেন।৩৪ শিক্ষাব্রতী ডেভিড হেয়ার যে বিরাট ধনী ব্যক্তি ছিলেন এবং কলকাতা শহরে তাঁর প্রচুর ভূসম্পত্তি ছিল তা লটারি কমিটির এরকম কয়েকটি টুকরো খবর থেকে জানা যায়।

আঠারো শতকের গোড়া থেকে উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কলকাতা শহরের দৈনিক ক্রমবিকাশের ধারা, লোকসংখ্যা, ঘরবাড়ি, পথঘাট প্রভৃতির বৃদ্ধির হার দেখে কিছুটা বোঝা যায়। টাউন কলকাতায় ১৭১০ সালে লোকসংখ্যা ছিল ১২০০০, ১৯০১ সালে ৫৭৭,০৬৬। ১৮৫০ সালে কলকাতা শহরে একতলা পাকা বাড়ির সংখ্যা ছিল ৫৯৫০, দোতলা ৬৪৩৮, তিনতলা ৭২১, চারতলা ১০, পাঁচতলা ১। ১৯০১ সালে বাড়ির সংখ্যা হয় যথাক্রমে ২২১৭৫, ১২৯৭৬, ৩১০৪, ২৯৮, ২১। হিন্দুদের সংখ্যা ১৭১০ সালে ৮০০০ থেকে ১৯০১ সালে ৩৮৬৫০২ হয়, মুসলমানদের সংখ্যা হয় ২১৫০ (১৭১০) থেকে ১৫২,২০০ (১৯০১), ইয়োরোপিয়ানদের সংখ্যা হয় ২৫০ (১৭১০) থেকে ৯৫৬৭ (১৯০১)। উনিশ শতকের শেষ পাদে রাস্তাঘাট, আলো ও গাড়িঘোড়ার সংখ্যাও অনেক বেড়ে যায়। ১৮৭৬ সালে কলকাতায় মোট ৮২ মাইল পাথর বাঁধানো ও ৫০ মাইল খোয়া বাঁধানো রাস্তা ছিল, ১৯০১ সালে এই বাঁধানো রাস্তা যথাক্রমে ১০৩ মাইল ও ১৬৫ মাইল হয়। ১৮৬৩ সালে কলকাতায় গ্যাসের আলো ও তেলের আলো ছিল ৯৮৬ ও ৭০৪, ১৮৭৬ সালে হয় ২৭৭০ ও ৭১৭, ১৯০১ সালে হয় ৬৮১১ ও ২২৯৫। ১৯০১ সালে ১০৬৬৯ ঠেলাগাড়ি ও গোরু—গাড়ি এবং ১৮৭৬ সালে গাড়ির সংখ্যা এর অর্ধেকেরও কম ছিল।৩৫ প্রায় দু—শো বছরের কলকাতা শহরে পাঁচ লক্ষ লোকের আগম, এবং রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি গাড়িঘোড়া আলো ইত্যাদির প্রসারণের এই গতি বর্তমানের গতির তুলনায় অনেক মন্থর মনে হয় বটে, কিন্তু ঐতিহাসিক কাল ও কলকাতার আকর্ষণের কথা বিচার করলে আঠারো—উনিশ শতকের নাগরিক রূপায়ণের এই গতি একেবারে মন্দগতি বলে মনে হয় না।

সেকালের সাময়িকপত্র থেকে কলকাতার এই আঙ্গিক অগ্রগতি ও তার সংশ্লিষ্ট সমস্যাদির খানিকটা পরিচয় পাওয়া যায়। ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৭ বৈশাখ ১২৫৭) ঘোড়া—গাড়ি ও ঘোড়ার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন :

দুই অশ্বে যোজিত চারি চাকার গাড়ি ৬৭৬

এক অশ্বে যোজিত ১৬৮৯

ছেকড়া ও অন্যান্য গাড়ী ১৩৯১

দুই চাকার গাড়ী ৮৬৪

সোয়ারি পনি ঘোড়া ৪২৬

গাড়ীটানা বড় ঘোড়া ২৮৫০

গাড়ীটানা টাট্টু ঘোড়া ২০০৩

কলকাতার জনপথে ‘Commit no nuisance’ বিধিবদ্ধ হওয়ার ফলে লোকজনের উপর পুলিশের যে উৎপাত আরম্ভ হয়, ‘সংবাদ প্রভাকর’ সে সম্বন্ধে লিখেছেন (১২ চৈত্র ১২৫৮) : ”নগরের মধ্যে কি উৎপাত হইল, এক মূত্র সূত্র লইয়া পুলিসের কর্তারা কি ফ্যাসাৎ করিয়া তুলিলেন, যেখানে যেখানে শুনা যাইতেছে অমুক ব্যক্তি নরদমার ধারে প্রস্রাব করিতে বসিয়াছিল তাহাকে চৌকিদার ও সারজন আসিয়া ধৃত করিল, অনেকেই বলেন এই প্রস্রাবে অমুকের অপমান, অমুকের জরিমানা, অমুকের ঘোড়দৌড়, অমুক ব্যক্তির কানমলা প্রভৃতি প্রহার প্রাপ্ত হইয়াছে, গত দিবস আমারদিগের পল্লীতে বিদ্যালয়ের দুইটি বালক হেদুয়ার পূর্বদক্ষিণ ধারের নরদমায় মূত্র ত্যাগ করিতেছিল, তদ্দৃষ্টে রাজদূতেরা অনায়াসেই তাহারদিগে তেরিমেরি বাক্যে অপমানকরত হস্তধারণ পূর্বক রাস্তা দিয়া লইয়া গেল…।” পরে এ বিষয়ে ‘প্রভাকর’ আরও লিখেছেন (১৭ শ্রাবণ ১২৫৯) : ”চৌর্য্যাদি দূষণাবহ ব্যাপার দমনে দশের নিকট যশের ভাজন হইতে না পারিয়া পুলিস মূত্রক্ষান্তি কার্য্যে যত্নারূঢ় হইয়া বুঝি প্রতিপত্তি লাভের সূত্রপাত করিতেছেন।… আমারদের এই এক ভারী আশঙ্কা হইতেছে, যদি বিশেষ কারণবশতঃ ইংরাজীটোলায় যাইয়া ঐ মহাপাপ কর্মেতে আসক্ত হইতে একান্তই বাধ্য হই তবে আমারদের কি দুর্দশা ঘটিবেক।” রাস্তার ধারে গাড়িঘোড়া রাখা নিয়েও কলকাতার লোকের উপর পুলিশ অনেক অত্যাচার করেছে। ‘প্রভাকর’ লিখছেন (২৩ আশ্বিন ১২৫৯) : ”ভদ্রলোকেরা শকটারোহণে কোন স্থানে গমন করিয়া যদ্যপি রাস্তার ধারে শকট রাখিয়া যান, তবে ভেড়িওয়ালা মেড়ুয়াবাদী চৌকিদারেরা কোচম্যান অথবা সহীসকে তৎক্ষণাৎ তথা হইতে সেই গাড়ি লইয়া যাইতে বলে, তাহাতে কোন আপত্তি করিলে চৌকিদার মারিতে উদ্যত হয়, গাড়ি ধরিয়া স্টেসিয়ানে লইয়া যায়, এই নিয়ম প্রজাদিগের পক্ষে অতিশয় পীড়াদায়ক হইয়াছে।” শহরের ট্যাক্স বাড়ছে, কিন্তু কোনও উন্নতি হচ্ছে না, লোকের দুঃখকষ্ট বাড়ছে। ‘প্রভাকর’ লিখেছেন (৩০ বৈশাখ ১২৬০) : ”ধূলার নিমিত্ত রাজপথে গমনাগমন করা যায় না, নরদমার পচা গন্ধে বিবিধ প্রকার পীড়ার প্রার্দুভাব হইতেছে, এদিকে টেক্সের দায়ে প্রতি দিবস দুঃখী লোকদিগের হাঁড়ি, কলসি, ঝ্যাঁটা, কুলা পর্যন্ত বিক্রয় হইয়া যাইতেছে…।” পাশাপাশি গ্রামগুলি গ্রাস করে কলকাতা শহরের সীমানা কীভাবে প্রসারিত হয়েছে, সে সম্বন্ধে ‘প্রভাকর’ লিখেছেন (৫ কার্তিক ১২৬০) : ”ভবানীপুর, কালীঘাট, চক্রবেড়ে, শিবাদহ, ইটালি, বৈঠকখানা, বরাহনগর, কাশীপুর, চিৎপুর, পাকপাড়া প্রভৃতি গ্রামসকল নগরভুক্ত হইবেক।”৩৬

শহরের গাড়িঘোড়ার উপর ট্যাক্স ধার্য হবে বলে গোরুর গাড়ির গাড়োয়ানরা ধর্মঘট করে এবং তাদের সঙ্গে মুটেরাও যোগ দেয় (১৮৪৯)। ‘সম্বাদ ভাস্কর’ লিখেছেন (২৬ জুন ১৮৪৯) : ”কলিকাতা নগরীয় গাড়িঘোড়া প্রভৃতির টাক্স হইবে, ইহাতে গোশকট বাহকেরা ঐক্যবাক্য হইয়া গত সোমবারাবধি তাহাদিগের গাড়ি চলায়ন বন্ধ করিয়াছে… মুটেরাও গাড়োয়ানদিগের সহিত যোগ দিয়াছে, গাড়োয়ান ও মুটে পাঁচ ছয় সহস্র লোক একত্র হইয়া ডেপুটি গবর্নর বাহাদুরের নিকট প্রার্থনা করিয়াছে তাহাদিগের প্রতি এই টাক্স ক্ষমা হয়…।” কলকাতা শহরের লোকসংখ্যা ও গাড়িঘোড়া বৃদ্ধির ফলাফল প্রসঙ্গে ‘ভাস্কর’ লিখেছেন (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬) :৩৭

”কলিকাতা নগরে পূর্বাপেক্ষা লোকসংখ্যা বৃদ্ধি হইয়াছে এবং বাণিজ্য কার্য্যেরও উন্নতি হইতেছে তাহাতে গো—গাড়ির ভাগ অধিক হইয়া উঠিয়াছে, বাঙ্গালিরা ইংরাজী রীতি ব্যবহারের অনুগত হইয়াছেন তদ্ধেতুক অনেকে পাল্কী ব্যবহার উঠাইয়া দিয়া গাড়ি ব্যবহার করিতেছেন, প্রতিদিন গাড়িতে গাড়িতে নগরীর পথ পরিপূর্ণ হইয়া যায়, নগর মধ্যগত বড় রাস্তা ও গলী পথ সকল অত্যন্ত অপ্রশস্ত, তাহা প্রায় গাড়িতেই পুরিয়া যায়, পথিকেরা চলিতে পথ পায় না, যাহারদিগের গাড়িতে সবল ঘোটক যোজিত থাকে তাঁহারও সম্পূর্ণ বেগে ঘোটক চালাইতে ত্রুটি করেন না, সেই বেগে অনেক পথিক মারা পড়ে, বহু লোকের হস্তপদাদি ভঙ্গ হইয়া যায়,… সারথিরা পথে স্থান থাকিতেও পথিকদিগের গাত্রোপরি গাড়িঘোড়া চালাইয়া দেয়, নগরবাসী লোকেরা সর্বদা সন্তর্পণে গমন করেন, পল্লিগ্রামস্থ লোকসকল যাহারা পূর্বে কখনও কলিকাতায় আইসে নাই তাহারাই অগ্রে গাড়ি চাপা পড়ে…।”

‘সম্বাদ ভাস্কর’ পত্রিকার এই বিবরণ উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কলকাতা শহরের বাস্তব চিত্র বলা যেতে পারে। নাগরিক বাস্তবতার কুশ্রী দিকের আভাস এই বিবরণের ভিতর থেকে খানিকটা পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ নয়। বস্তিজীবন কলকাতার নাগরিক সমাজের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। মনে হয় অষ্টাদশ শতক থেকেই এই বস্তির উৎপত্তি হয় এবং উনিশ শতকে কলকাতার দেহের উপর ক্ষতস্থানের মতো অনেক বস্তি গজিয়ে ওঠে। লুইস মামফোর্ড বলেছেন : “Slum housing for a large part of the population, not simply for beggars, thieves, casual labourers and other outcasts, became the characteristic mode of the growing seventeenth century city.”৩৮ সপ্তদশ শতকে পাশ্চাত্য শহরে যে কারণে বস্তির বিকাশ হয়েছিল, ঠিক সেই কারণে কলকাতা শহরে হয়নি। পরে উনিশ শতকে ইউরোপে কারখানা শিল্প ও শিল্পনগরের প্রতিষ্ঠার ফলে নগরজীবনের বৈশিষ্ট্যরূপে যে কারখানা ও বস্তির বিকাশ হয়েছিল—“The two main elements in the urban complex were the factory and the slum.” (Mumford)৩৯—বাংলা দেশে কলকাতা শহরে তা—ও হয়নি। উনিশ শতকের মধ্যে কলকাতা শহরের প্রান্তে বা আশপাশে কলকারখানার প্রতিষ্ঠা যে হয়নি তা নয়, এবং কারখানা ও বস্তি মিলিয়ে নতুন ‘urban complex’ যে সেইসব শিল্পকেন্দ্রে গড়ে ওঠেনি তা—ও নয়, তবে কলকাতার ভিতরের বস্তির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিশেষ নেই। কলকাতার বস্তি একদিকে শহরের ইংরেজ জমিদার ও অন্যান্য বাঙালি জমিদারদের জমিদারি এবং অন্যদিকে শহরের বিপুল ভৃত্যশ্রেণি (domestic servants) ও কুলিমজুরশ্রেণির ‘agglomeration’—এর ফল। গ্রামের পর গ্রাম গ্রাস করে কলকাতা শহরের সীমানা যখন প্রসারিত হয়েছে, তখন সেইসব গ্রামের উৎখাত দরিদ্র চাষিমজুররা হয়তো কেউ কেউ গ্রামান্তরে চলে গিয়েছে, সকলে যায়নি। যারা যায়নি তারা সহজেই শহরের উন্নয়নপর্বে ও দৈনন্দিন কাজকর্মে কুলিমজুরশ্রেণিভুক্ত হয়ে গিয়েছে। বাইরের গ্রামাঞ্চল থেকেও গৃহভৃত্য ও কুলিমজুরের কাজের জন্য অনেক লোক শহরবাসী হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথম পর্বেই লটারি কমিটির কার্যবিবরণে আমরা দেখেছি, নাগরিক উন্নয়নের কাজে শতকরা প্রায় ৯৫ জন শুধু কুলিমজুরেরই প্রয়োজন হয়েছিল। এই বিপুলসংখ্যক কুলিমজুরদের ও ভৃত্যদের শহরের বসবাসের কেন্দ্র হয়েছিল বস্তি।

গ্রামে জমিদারদের যেমন জমিদারি থাকে ও প্রজা থাকে, শহরের বস্তিও তেমনি একশ্রেণির শহুরে জমিদারের জমিদারিতে ও বস্তিবাসীরা প্রজায় পরিণত হয়েছিল। উনিশ শতকে কলকাতার কয়েকটি বিখ্যাত বস্তির দৃষ্টান্ত দিলে তা বোঝা যাবে। ক্যামাক সাহেবের বিরাট জমিদারি, বর্তমান ক্যামাক স্ট্রিট থেকে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত, লটারি কমিটি উন্নয়নের জন্য কিনেছিলেন, সে কথা আগে বলেছি। এই জমিদারিতে প্রজা বিলি করে বস্তিরই পত্তন করা হয়েছিল। এখানেই ছিল ‘দক্ষিণ বস্তি’—প্রায় ৯ বিঘা ৫ কাঠা অঞ্চল জুড়ে—উত্তরে পার্ক স্ট্রিট, পূবে উড স্ট্রিট, পশ্চিমে ক্যামাক স্ট্রিট। ১৮৫৮ সালে কলকাতার কমিশনাররা ৪৫,০০০ টাকা দিয়ে এই বস্তি কিনে নেন উন্নয়নের জন্য। এই বস্তিতে বাস করত কারা : “It was crowded by huts occupied chiefly by domestic servants and native lively stables and was a great nuisance to the residents within its immediate vicinity.”৪০ বামুন—বস্তি ও মনি—বস্তিও বিখ্যাত বস্তি ছিল। বামুন—বস্তির উত্তরে থিয়েটার রোড ও পুবে হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট, পশ্চিমে ক্যামাক স্ট্রিট ও দক্ষিণে সার্কুলার রোড। বস্তির মালিক ছিলেন ব্যারিস্টার পিটারসন। এই বামুন—বস্তির অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে সাহেব জমিদারকে যথেষ্ট টাকা দিয়ে, কলকাতার কমিশনাররা ইংরেজদের বসতিকেন্দ্র তৈরি করেন। মনি—বস্তির মালিক ছিলেন মনিসাহেব (J.W.B. Money) । মনি—বস্তির দক্ষিণে থিয়েটার রোড, পুবে লাউডন স্ট্রিট, পশ্চিমে হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট, উত্তরে একটি ট্যাঙ্ক। ওই বস্তিও ইউরোপীয়দের বসবাসের জন্য কমিশনাররা দখল করে উন্নয়ন করেন। এই কয়েকটি বস্তির বিবরণ থেকেই বোঝা যায় যে কলকাতা শহরে ইংরেজ ও বাঙালিদের জমিদারি থেকেই বস্তি গড়ে উঠেছে এবং সেই বস্তিতে প্রধানত শহরবাসী ভৃত্য ও মজুররা অতি দীনদরিদ্র প্রজাদের মতো, অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে জীবনযাপন করেছে। চৌরঙ্গি যখন ‘white town’ হয়ে উঠেছে, তখন চৌরঙ্গি অঞ্চলের বস্তিবাসীরা ‘black town’ অঞ্চলে গিয়ে নতুন বস্তি গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ শহরের বাঙালি রাজা—মহারাজারা ও ধনীরা বস্তি স্থাপন করে কলকাতা শহরেই এক নয়া—জমিদারির পত্তন করেছেন। ‘‘Slum, semi-slum, and super-slum–to this has come the evolution of cities.”৪১ বিখ্যাত নগরবিজ্ঞানী প্যাট্রিক গেডেসের উক্তি উনিশ শতকের ‘কলোনিয়াল’ কলকাতার নাগরিক ক্রমবিকাশের ইতিহাসেও সত্য হয়ে উঠেছিল।

উনিশ শতকে কলকাতা শহরে ইংরেজদের বসতিকেন্দ্র ক্রমে যত চৌরঙ্গির দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তত সাদা—কালো, ইউরোপীয়—নেটিভ জাতিবৈষম্যবোধ প্রবল হতে থাকে। আঠারো শতকে সাদা—কালোর জাতিগত বর্ণচেতনা তেমন প্রখর ছিল না। আঠারো শতকে জনসনের যুগে ইংলন্ডে প্রধানত দু—রকমের লোক দেখা যেত, একরকম robust ও boorish, আর একরকম thin ও quizzical ধরনের। ওই রোবস্ট ও ব্যুরিশ টাইপ ইংরজেদের মধ্যে কোম্পানির রাইটার—ফ্যাক্টর হয়ে যাঁরা এ দেশে আসেন, তাঁদের মধ্যে রাজকীয় ঔদ্ধত্য যত না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল অ্যাডভেঞ্চারের স্পৃহা। তখন যে সমস্ত বাঙালি ‘fortune-hunter’ কলকাতা শহরে আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন, তাঁরাও মোটামুটি রোবাস্ট ও ব্যুরিশ টাইপ ছিলেন। চারিত্রিক সাদৃশ্যের জন্য তখন কোনও বর্ণবৈষম্যবোধ উভয়ের মধ্যে সচেতন সামাজিক ব্যবধান রচনা করতে পারেনি। তখন বড় বড় বাঙালি দেওয়ান ও বেনিয়ানবাবুরা নানাবিধ কাজকর্মে সহজেই ইংরেজদের সান্নিধ্য লাভ করতেন এবং দোল—দুর্গোৎসবে নিজেদের গৃহে খানাপিনা ও নৃত্যগীতের আসরে ইংরেজদের সাদরে আপ্যায়ন করতে কুণ্ঠিত হতেন না। প্রায় ওয়ারেন হেস্টিংসের আমল পর্যন্ত দেখা যায়, ইংরেজ—ভারতীয়ের মধ্যে সামাজিক দূরত্ববোধ প্রখর ছিল না। কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করে কেবল যে আমাদের দেশে ব্রিটিশ স্বার্থের পরিপোষক নতুন এক হঠাৎ—অভিজাত জমিদারশ্রেণি সৃষ্টি করেছিলেন তা নয়, এ দেশের লোককে দায়িত্বপূর্ণ সরকারি কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে শাসক—শাসিতের মধ্যে সামাজিক দূরত্ববোধও জাগিয়ে তুলেছিলেন।

উনিশ শতকের গোড়া থেকে ইংরেজ—ভারতীয়দের এই সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তন হতে আরম্ভ হল। ওয়েলেসলি এলেন খাঁটি রাজকীয় মেজাজ নিয়ে এবং তাঁর চালচলনে হাঁকডাকে ও জাঁকজমকে তার উদ্ধত রূপ প্রকাশ পেল। লাটভবনে এ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করা তিনি অনেক কমিয়ে দিলেন। তারপর থেকে উভয় পক্ষের মেলামেশার মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের একটা ভিন্নরূপ ক্রমে প্রকট হতে থাকল। পারস্পরিক সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হল না, তা হতেও পারে না, কিন্তু সেটা নিতান্ত শাসক—শাসিতের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কে পরিণত হল। বিদেশিনি শ্রীমতী গ্রাহাম ১৮১০ সালে কলকাতা শহরে এসে ইংরেজ ও এ দেশীয়দের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের দূরত্ব দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন : “The distance kept up between the Europeans and the natives… is such that I have not been able to get acquainted with any native family… every Briton appears to pride himself on being out-rageously a John Bull.” ৪২

শাসক—শাসিতের এই মনোভাব ও বর্ণবৈষম্যবোধ স্বভাবতই কলকাতা শহরের বসতিবিন্যাসে প্রতিফলিত হয়। ‘নেটিভ টাউন’ ‘ব্ল্যাক টাউন’ এবং ‘ইংলিশ টাউন’ ‘হোয়াইট টাউন’ শহরে গড়ে উঠল। ভৌগোলিক ব্যবধানের মধ্যে জাতিগত ও মনোগত ব্যবধান বাস্তব রূপ ধারণ করল। এই সাদা ও কালো টাউনের মধ্যে পার্থক্য অনেক। অর্থনীতিক্ষেত্রে ব্রিটিশ মূলধন, উদ্যম ও কর্মকুশলতা যেমন এ দেশে স্বাভাবিক কারণে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ রচনা করেছিল, পরিপার্শ্বের দেশীয় অর্থনীতির সঙ্গে যেমন তার কোন সংযোগ ছিল না, ঠিক তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ইংরেজ সমাজ ও বাঙালি সমাজের সঙ্গে মনের ও জীবনের কোনও যোগাযোগ ছিল না। ইংরেজরা যখন থেকে এ দেশে সপরিবারে আসতে আরম্ভ করেন এবং অধিক সংখ্যায় যখন ব্রিটিশ সৈন্যের আমদানি হতে থাকে, তখন থেকে (উনিশ শতক) ইংরেজরা এ দেশের সমাজ থেকে দূরে সরে গিয়ে দ্বীপান্তরিত জীবনযাপন করা বাঞ্ছনীয় মনে করতে থাকেন। ‘ইংলিশ টাউন’ কলকাতা শহরের মধ্যে একটা দ্বীপে পরিণত হয়। চৌরঙ্গি হয় কলকাতা শহরে নতুন ইউরোপীয় কালচারের ‘আইল্যান্ড’। চৌরঙ্গির পথঘাটের আঙ্গিক বিন্যাস ‘নেটিভ’ টাউনের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও প্রশস্ত হল। দুই টাউনের বাস্তব নাগরিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠল। কলকাতার বাঙালি পাড়া সম্বন্ধে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ লিখেছেন (১২ মার্চ ১৮৪৯) : ৪৩

”এইক্ষণে সর্বসাধারণ লোকেরা দৃষ্টি করুন, বাঙ্গালী পাড়ার প্রতি পথের পার্শ্বে পার্শ্বে নর্দমার কত ময়লা উদ্ধৃত হইয়াছে, এক এক পথের উভয় পার্শ্বে স্থানে স্থানে পর্বতাকার এমত ময়লা রহিয়াছে পথিকেরা এরূপ কখন দেখেন নাই, গলিপথের কথা হস্তে থাকুক, শিমলার প্রশস্ত পথ যাহা শ্রীযুক্ত বাবু আশুতোষ দেব মহাশয়ের বাটীর গেটের সম্মুখ দিয়া পূর্ব মুখে গিয়াছে, তাহাতেও দুইখানি গাড়ি সম্মুখাসম্মুখি হইলে আরোহিরা জ্ঞান করিয়াছেন ঘোর বিপদে পড়িলেন, শিমলার পরিসর পথের উভয় পার্শ্বেই যখন নর্দমার ময়লায় পরিপূর্ণ হইয়াছিল তখন গলিপথের দশা সহসাই বোধগম্য হইবে…”

কলকাতার বাঙালিপাড়ার সঙ্গে ইংরেজপাড়ার তুলনা করে ‘সংবাদ প্রভাকর’ লিখেছেন (২৪ ভাদ্র ১২৬১) : ৪৪

”ইংরাজ পল্লীতে জেনরল ও বিশিষ্ট ইংরাজ রাজকর্মচারিরা বাস করেন, এ কারণে ভয়ে ভয়ে কমিস্যনরগণ তথাকার রাস্তাদিতে নিয়তই খোয়া ও সুর্কি দিয়া পরিষ্কার রাখিয়াছেন, রজনীযোগে তথাকার সকল রাস্তাই আলোকিত হয়, বিশষতঃ গলি পথের ভিতরেই অধিক আলো, নর্দমাদিতে দুর্গন্ধের লেশও নাই, কিন্তু বাঙ্গালি পল্লীর অধিকাংশই কর্দমে পরিপূর্ণ, খোয়া ও সুর্কির অভাবে অনেক রাস্তার পঞ্জর বাহির হইয়াছে…গলি পথে একটিও আলো নাই, নর্দমার দুর্গন্ধে প্রজাদিগের নানা প্রকার পীড়া হইতেছে…”

এ বিষয়ে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পরে লিখেছেন (১৪ শ্রাবণ ১২৬৫) : ৪৫

”আমরা বাঙ্গালি বলিয়া বাঙ্গালি পল্লীর রাস্তাসকল নিয়তই ভগ্নাবস্থায় কালযাপন করে… তবে একবার জিজ্ঞাসা করি যে আমারদিগের সদ্বিদ্বান ইংরাজ রাজপুরুষেরা কেন আমারদিগের বাঙ্গালিগণের প্রতি ঈদৃশ হীনস্তা প্রকাশ করেন? যাহা হউক অতঃপর বিনীতভাবে রাজপুরুষগণকে নিবেদন করি তাঁহারা না হয় আমারদিগের প্রতি কৃপা কটাক্ষ বিস্তার করতঃ একবার দিব্যজ্ঞান—বাহনেই বাঙ্গালি পল্লীতে আসিয়া স্ব স্ব চক্ষে দৃষ্টিপাত করিয়া রাস্তা সকলের প্রতি সমুচিত সদ্ভাব প্রদান করিবেন। বাঙ্গালি পল্লীর সকল রাস্তাই অদি কদর্য অবস্থায় অবস্থিত হইয়াছে সন্দেহ নাই, ফলতঃ চীৎপুর রোড ও তাহার শাখা পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো প্রভৃতি স্থলের কতকগুলীন গলী যেমত দুস্থগ্রস্ত তাহা বলিবার নহে।”

শ্রীমতী ফ্যানি পার্কস ১৮২২ সালে কলকাতা শহরে ইংরেজপাড়া চৌরঙ্গি অঞ্চল দেখে লিখেছেন : “that part called Chowringhee, filled with beautiful detatched house, surrounded by gardens.”৪৬ ইংরেজপাড়া বলে চৌরঙ্গি অঞ্চলের বাড়িভাড়াও খুব বেশি ছিল, ১৮২২ সালে ফ্যানি পার্কস লিখেছেন, মাসিক ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। বাঙালিপাড়ার বড়লোকের বাড়ির সমান স্থানের (space) ভাড়া এর চার ভাগের এক ভাগও ছিল না। আরও পনেরো—কুড়ি বছর পরে একজন বিদেশি পর্যটক বাঙালিপাড়া দেখে লিখেছেন : ৪৭

“There is behold a countless number of flat-roofed houses with or without balustrades, so close do these roofs appear to be one another, that he who inclines, may apparently walk and jump over them from one end of the native town to the other without interruption from streets, lanes, squares and compounds. In other parts of the native town the houses are covered with tiles… closer to one another than the flat-roofed ones, and have not a pleasing appearance… and the most of the chunamed houses in the north-east part of it are dingy.”

শাসক—শাসিতের সম্পর্ক কলকাতা শহরে ইংরেজপাড়া ও বাঙালীপাড়ার নাগরিক রূপের বৈসাদৃশ্যের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। কলকাতার দেহ ও মন প্রথম খণ্ডিত করে শ্বেতাঙ্গ—কৃষ্ণাঙ্গের জাতিবৈষম্যবোধ। তারপর কলকাতা শহর ক্রমে হিন্দুপ্রধান ও মুসলমানপ্রধান অঞ্চলেও ভাগ হয়ে গিয়েছে। জাতি ও সম্প্রদায়গত বৈষম্যের রেখার সঙ্গে ধনী—নির্ধনের শ্রেণিগত বিভেদরেখাও কলকাতা শহরের বহিরঙ্গে চিহ্নিত হয়ে উঠেছে। সামাজিক বিভেদ—বৈষম্যের বিপরীতমুখী রেখা কলকাতা শহরকে খণ্ড খণ্ড করে তার নাগরিক রূপ বিকৃত করেছে। শহর যে সমাজবিজ্ঞানী সরোকিনের (Sorokin) ভাষায় : ‘a real coincidentia oppositorum, or the place of coexistence of the greatest contrasts and contact of people of most opposite social status, standards, capacities, occupations, religions, mores, manners and what not.” ৪৮—তা কলকাতার ক্রমবিকাশের ধারা থেকে উনিশ শতকের মধ্যেই বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

কলকাতার সামাজিক গতিশীলতা

সাধারণত গ্রামের তুলনায় শহরের সমাজ ও জীবন অনেক বেশি গতিশীল। নাগরিক সমাজে গতিশীলতার (Social mobility) ধারা অনেক বেশি প্রবল। যে—কোনও সমাজের গড়ন স্তরবিন্যস্ত। কালভেদে, দেশভেদে এবং ঐতিহাসিক প্রতিবেশভেদে এই সামাজিক স্তরবিন্যাসের (social stratification) রূপ সর্বত্র এক রকমের হয় না, এবং তা হয় না বলেই স্তর থেকে স্তরান্তরে আরোহণ ও অবরোহণের গতির মধ্যেও পার্থক্য থাকে যথেষ্ট। সামাজিক গতি প্রধানত দু—রকমের—নিচে থেকে উপরে অথবা উপর থেকে নিচে ঊর্ধ্বাধগতি (vertical mobility) এবং স্থান থেকে স্থানান্তরে অনুভূমিক গতি (horizontal-mobility)। নগরকেন্দ্র থেকে যখন কোনও ভাবধারা, শিক্ষা—সংস্কৃতি, রাজনীতি—অর্থনীতি বা সমাজসংস্কারের আদর্শ বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, স্থান থেকে স্থানান্তরে গমনাগমন ও বসবাসের পথে কোনও বাধা থাকে না, তখন এগুলিকে আমরা অনুভূমিক গতিশীলতার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। যখন এক পেশা ও বৃত্তি ছেড়ে মানুষ স্বচ্ছন্দে অন্য পেশা ও বৃত্তি গ্রহণ করতে পারে, পুরোহিত ব্যবসায়ী হতে পারে, স্বর্ণকার কর্মকার হতে পারে, কেরানি অধ্যাপনা করতে পারে, নির্ধন ধনী হতে পারে, তখন এগুলিকে আমরা ঊর্ধ্বাধগতির দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। যোগাযোগ ও চলাচলের ব্যবস্থা শহরে অনেক বেশি চলে। স্বভাবতই নাগরিক সমাজের অনুভূমিক গতিবেগ গ্রামের তুলনায় বেশি। সামাজিক স্তর থেকে স্তরান্তরে ওঠানামার গতির নিয়ন্ত্রকগুলিকে ‘social elevators’ বলা হয়। টাকাকড়ি, ব্যাবসাবাণিজ্য, শিক্ষাদীক্ষা, সাহিত্য—বিজ্ঞান—সংস্কৃতি, বিচারালয় ও মন্ত্রণালয়, সামরিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল হল শহর এবং আধুনিক সমাজে এগুলি হল ‘এলিভেটার’। আধুনিক সমাজের যাবতীয় গতিনিয়ন্ত্রকের মহাকেন্দ্র হল মহানগর। সরোকিন বলেছেন : “All the institutions which serve as channels of vertical circulation (social promotion and demotion) of individuals in society… and other ‘social elevators’ are located in cities…”৪৯

গ্রাম্য সমাজে বৃত্তিগত গতিশীলতা (occupational mobility) নেই বললেই হয়। সেখানে যে যার বংশগত বৃত্তি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অনেকটা ধর্মশাস্ত্রীয় কর্তব্য মনে করে পালন করে। চাষি চাষ করে, কারুজীবীরা যে যার কারুকর্ম করে, পুরোহিত পৌরোহিত্য করে, পণ্ডিত অধ্যাপনা করে। ভিন্ন বৃত্তিগ্রহণের জন্য কারও কোনও আগ্রহ নেই, এবং বাস্তব জীবন থেকে তার জন্য কোনও প্রেরণাও সেখানে সঞ্চারিত হয় না। ধীর মন্থর গতিতে, গতানুগতিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে একটানা জীবনের স্রোত তাই গ্রাম্য সমাজে বইতে থাকে। আধুনিক নাগরিক সমাজে বৃত্তিগত স্বাধীনতা (occupational freedom) মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার অন্যতম নিদর্শন। এই বৃত্তিগত ব্যক্তিস্বাধীনতা নাগরিক সমাজের অজ্ঞাতকুলশীলতার মধ্যে প্রকাশ করার যে সুযোগ আছে, গ্রাম্য সমাজের প্রত্যক্ষ পরিচয় ও আত্মীয়বন্ধনের মধ্যে সে সুযোগ নেই। নাগরিক সমাজে তাই কুলবৃত্তিগত বন্ধন শিথিল হবার সম্ভাবনা বেশি এবং সেখানে বৃত্তিগত ও বংশগত বা পুরুষানুক্রমিক গতিশীলতা (inter-generational mobility) গ্রামের তুলনায় অনেক বেশি। শহরে পিতা—পুত্র—প্রপৌত্রের মধ্যে বৃত্তিগত ও বিত্তগত স্তরের বিরাট পার্থক্য ঘটাও আশ্চর্য নয়। সামান্য দরিদ্র রাঁধুনির পুত্র হয়তো শহরের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী ও ধনিক হতে পারেন, যেমন কলকাতার রামদুলাল দে হয়েছিলেন। তার জন্য শহুরে সমাজে ধনী—নির্ধন—মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে পুরুষানুক্রমে বিস্ময়কর ভাঙাগড়া ও উত্থান—পত্তন দেখা যায়। একই পরিবারে বিভিন্ন পুরুষে (generation) সামাজিক মর্যাদার বিরাট পার্থক্যও এই কারণে শহরে ঘটে থাকে। গ্রামে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে এই ঊর্ধ্বাধ গতিশীলতা প্রায় দেখাই যায় না বলা চলে। সেখানে ধনিক জমিদারের বংশধর দরিদ্র হয়ে গেলেও পূর্বপুরুষের সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন না। সেখানে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ধনবানই হন, আর দরিদ্রই হন, তার জন্য তাঁর সামাজিক মর্যাদার কোনও তারতম্য হয় না। এইজন্য গ্রাম্য সমাজে ঊধ্বার্ধ গতিশীলতা অত্যন্ত দুর্বল, এবং নাগরিক সমাজে স্বভাবতই প্রবল।৫০

উনিশ শতক শেষ হতে দেখা যায়, কলকাতা শহরের আঞ্চলিক রূপায়ণ খানিকটা বৃত্তিপ্রধান রূপ (dominant occupational zones) ধারণ করেছে। বিভিন্ন অঞ্চলের মোট লোকসংখ্যার শতকরা কতটা অংশ কোন বৃত্তিজীবী তার পরিচয় থেকে এই আঞ্চলিক রূপায়ণের বৈশিষ্ট্য বোঝা যাবে : ৫১

কতটা অংশ কোন বৃত্তিজীবী
কতটা অংশ কোন বৃত্তিজীবী

ভবানীপুরকে বলা হয়েছে “the chief seat of the Indian lawyers in Calcutta”—এবং এরকম কলুটোলা—জোড়াসাঁকো—বড়বাজার—মুচিপাড়া (বউবাজার) অঞ্চলগুলিকে প্রধানত শিল্পজীবী ও বাণিজ্যজীবীদের বসবাসকেন্দ্র বলা যায়। মিশ্র—অঞ্চলও কলকাতায় কয়েকটি গড়ে উঠেছিল—যেমন জোড়াসাঁকো—কলুটোলা অঞ্চল—যেখানে পূর্বোক্ত তিন শ্রেণির বৃত্তিজীবীর বাস ছিল যথেষ্ট।

বৃত্তিকেন্দ্রিক আঞ্চলিক রূপায়ণ শহরে হয় খানিকটা ব্যাবসা—বাণিজ্যের বিশেষ বিশেষ কেন্দ্র গড়ে ওঠার ফলে, কিন্তু তার সঙ্গে গ্রাম্য সমাজের কুলবৃত্তিকেন্দ্রিক বসতিবিন্যাসের কোনও সম্পর্ক বা সাদৃশ্য নেই। যেমন কলুটোলা হয়তো উৎপত্তিকালে কুলবৃত্তিজীবী কলুদের জন্যই গড়ে উঠেছিল, কিন্তু কলকাতার ক্রমবিকাশের বিভিন্ন পর্বে সেখানে নানা রকমের ব্যবসায়ীর সমাগম হয়েছে এবং তাঁরা সকলেই যে কুলানুগামী ব্যবসায়ী তা—ও নয়। প্রশ্ন হল, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বাণিজ্যিক স্বাধীনতা কলকাতার নাগরিক সমাজে, ব্রিটিশ আমলে, কুলবৃত্তির বন্ধন কতটুকু শিথিল করতে পেরেছিল? খানিকটা নিশ্চয় পেরেছিল এবং তার ফলে স্তরবিন্যস্ত সমাজে কিছুটা উত্থান—পতনের গতিও সঞ্চারিত হয়েছিল। ১৯০১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে কলকাতার হিন্দুসমাজের বিভিন্ন বর্ণের লোকের কুলবৃত্তি ও অন্যান্য বৃত্তি অবলম্বনের পরিচয় থেকে এ বিষয় সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা করা যায় :৫২

বিভিন্ন বর্ণের লোকের কুলবৃত্তি ও অন্যান্য বৃত্তি
বিভিন্ন বর্ণের লোকের কুলবৃত্তি ও অন্যান্য বৃত্তি
বিভিন্ন বর্ণের লোকের কুলবৃত্তি ও অন্যান্য বৃত্তি
বিভিন্ন বর্ণের লোকের কুলবৃত্তি ও অন্যান্য বৃত্তি

সংখ্যাগুলি কলকাতা ‘টাউন’ এলাকার। উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কলকাতা শহরে কুলগত বৃত্তিবন্ধন একেবারে ছিন্ন না হলেও, অন্তত খানিকটা যে শিথিল হয়েছিল তা বিভিন্ন বর্ণের এই বৃত্তিপরিচয় থেকে কিছুটা বোঝা যায়। পরাধীন নাগরিক সমাজে বিদেশি শাসকের স্বার্থে স্বাভাবিক আর্থনীতিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হওয়ার ফলে স্বাধীন বৃত্তি বা উপজীবিকার ক্ষেত্র যে কত সংকীর্ণ ও বৈচিত্র্যহীন হতে পারে তা—ও এই সেন্সাস থেকে জানা যায়। কলকাতার মতো ঔপনিবেশিক শহরে, আগে বলেছি, স্বাধীন উপজীবিকার বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি হয় ছোট ছোট ব্যাবসাবাণিজ্যে, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে এবং সংগতিপন্ন নাগরিক পরিবারে গৃহভৃত্যের কাজে। ব্রাহ্মণ কায়স্থ কৈবর্ত চামার গোপ তন্তুবায় সুবর্ণবণিক তেলি সদগোপ প্রভৃতি প্রত্যেক বর্ণের মধ্যে দেখা যায় ভৃত্যের সংখ্যা যথেষ্ট। কুলি, দিনমজুর ও ছোট ব্যবসায়ীর সংখ্যাও কম নয়। কুলগত বৃত্তির বন্ধন শিথিল হলেও, উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব কলকাতার নাগরিক সমাজে একেবারে নগণ্য ছিল না। কলকাতা টাউনে বংশগত বৃত্তিজীবী তন্তুবায়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ার কারণ সেন্সাসে উল্লেখ করা হয়েছে, “a clear proof of the influence of Manchester” বলে।৫৩ কলকাতার সমাজে উপজীবিকার ক্ষেত্র প্রসারিত হলেও, সেই প্রসারের একটা নির্দিষ্ট সীমানা ছিল বোঝা যায়। বৃত্তিপ্রবাহ প্রবল ছিল না, বিচিত্রগামী ও বহুমুখীও ছিল না। কাজেই যে ওঠানামার গতি কলকাতার নাগরিক সমাজে ব্রিটিশ আমলে সঞ্চারিত হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়া কলকাতার বাইরের সমাজে খুব সামান্যই দেখা দিয়েছে, এমনকী কলকাতার সমাজেও তা দুর্বল ও সীমাবদ্ধ ছিল। ঔপনিবেশিক শহরের সামাজিক গতির বিশেষত্ব কলকাতার নাগরিক ক্রমবিকাশের এই ধারার মধ্যে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ধারার উল্লেখ্য পরিবর্তন বিশ শতকের প্রায় মধ্যভাগে, ব্রিটিশ শাসনযুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত, কলকাতার সমাজজীবনে ঘটেনি।

নির্দেশিকা

বন্ধনীর মধ্যে সূচকসংখ্যা

 (১)  “…historically, the English Capital of India has grown up out of the union of a cluster of riverside places. The three hitherto recognised members of this cluster are Calcutta, Sutanuti, and Govindpur…”C. R. Wilson : Early Annals of the English in Bengal, London 1895, Vol. I, 129

 (২) Henry Col Yule : Diary of William Hedges, london, 1888 Vol. II, pt. II.

 (৩) C. R. Wilson : op. cit, I, 142

 (৪) Walter Kelly Firminger : Fifth Report, intro (Cambray 1917) LXIV

 (৫) J. J. A. Campos : History of the Portuguese in Bengal (Calcutta 1919), Ch. III-V

 (৬) মদনমোহন হালদার : বসুক কলকাতা ১৮৯৫, পৃঃ ১২৯—৭৫। নগেন্দ্রনাথ শেঠ : কলিকাতাস্থ তন্তুবণিক জাতির ইতিহাস (কলকাতা ১৩৫৭)

 (৭) Consultation, September 11, 1707

 (৮) Bengal : Past and Present, Vol, LXXXIX. Pt. I, No. 147, January-June, 1960 : Benoy Ghosh : Some old family-founders in 18th Century Calcutta : The Setts of Sutanuti, p. 42-55.

 (৯) C. R. Wilson : Early Annals, I, p. 143-44 Hedges’ Diary, II, p. 92-94

 (১০) Census of India, 1901, Vol. VII, Pt. I : A. K. Ray : A Short History of Calcutta.রায় মহাশয় নিজে সাবর্ণ চৌধুরী পরিবারভুক্ত। এই পরিবারের বংশধররা এখনও কলকাতার দক্ষিণে বড়িশায় ও চব্বিশ পরগনার হালিশহর অঞ্চলে জীবিত আছেন। ‘লক্ষ্মীকান্ত’ নামে একখানি ইংরেজি বইতে এই বংশের বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। বইখানি সাবর্ণ চৌধুরী পরিবারে অনুসন্ধান করে আমি পেয়েছিলাম। এই বংশের আদি প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীকান্ত সপ্তদশ শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন। তিনি নদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ এবং বাঁশবেড়িয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জয়ানন্দর সমসাময়িক।কলিকাতা—গোবিন্দপুর—সুতানুটির বায়নামা (deed of purchase), সাং ৯ নভেম্বর ১৬৯৮, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে (Addt. Mss. No. 24039)। W. Irvine—কৃত এই বায়নামার একটি ইংরেজি অনুবাদ উইলসন তাঁর Old Fort William in Bengal, I, ৪০—৪৮ পৃষ্ঠাতে প্রকাশ করেছেন।

 (১১) Walter Kelly Firminger : Fifth Report, Introduction, Ch. IV, VI, VII, VIII

 (১২) Home Department Miscellaneous Records, 31 December, 1706

 (১৩) Charles Robert Wilson : Old Fort William in Bengal (Indian Records Series) 1906. Vols. I & II

 (১৪) Report on the World Social Situation, including Studies of Urbanization in under-developed Areas (U.N.O.) N.Y. 1957 : Pt. II, Chapter VII-‘Social problems of urbanization in Economically under developed areas’. 124, 111-143

 (১৫) Report on the World Social Situation, p. 112

 (১৬) A. K. Ray. A short History of Calcutta, 1901. p. 19Hedges Diary III, 17

 (১৭) R. C. Majumdar : History of Bengal, II, 463

 (১৮) Walter Kelly Firminger : Fifth Report, intro : CCXXXI

 (১৯) Walter Kelly Firminger : op cit, CCXXX

 (২০) Proceedings of Council, 22 April 1775Walter Kelly Firminger : op. cit, CCXXXI, fn (1)

 (২১) Court’s letter ; Jan. 31, 1775 & March 3, 1758

 (২২) Home Dept. Public Proceedings, No. 834, 2 May 1757

 (২৩) Consultations, 23 May, 1748

 (২৪) বড় বড় তিনটি খণ্ডে বাঁধানো লটারি কমিটির Manuscript Proceedings বর্তমানে ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল হলে আছে। ১৮৭৬ সালের কলকাতার সেন্সাস রিপোর্টে বেভারলে সাহেব লিখেছেন : “A full account of the works effected by the Lottery Committee would form one of the most interesting chapters in the history of the Town… Three large manuscript volumes, containing their proceedings from the date of the Committee’s appointment in 1817 to the close of 1821, are still in existence in the Municipal office…”(H. Beverley–Report on the census of the Town of Calcutta–1876) Part III, p. 48মনে হয় পরে এই তিন খণ্ড কার্যবিবরণ (কার্জনের আমলে) ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখানেই এই কার্যবিবরণ পাঠ করবার সুযোগ আমি পেয়েছি এবং তার জন্য কিউরেটর ও ট্রাস্টিদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।—বি. ঘোষ

 (২৫) Arnold W. Green : An Analysis of Life in Modern Society, 4th ed. N.Y. 1964, pp. 287-90

 (২৬) L. C. MS proceedings, Gordon’s Minute dt. 3 February 1820

 (২৭) L. C. MS proceedings, Trotter to Bepareetollah, Sub. Committee dt. 9 Nov. 1820

 (২৮) L. C. MS proceedings, dt. 20 July 1820

 (২৯) L. C. MS proceedings, letter to Trotter, dt. 4 May 1820

 (৩০) L. C. MS proceedings, Memorandum dt. 2 May 1820

 (৩১) L. C. MS proceedings, July 1820

 (৩২) L. C. MS proceedings, Letter to Russell, acting Agent to G. G. at Murshidabad, from Prinsep, Persian Secretary to Government, dt. Fort William 15 September 1821

 (৩৩) L. C. MS proceedings, dt. 27 September 1821

 (৩৪) L. C. MS proceedings dt. 5 July 1821

 (৩৫) A. K. Ray : Census 1901, Vol. VII, Part I, A Short History of Calcutta, p. 66 Appendix, p 80

 (৩৬) সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ১ম খণ্ড, ১৭৫, ১৮৫, ১৮৭—৮৮, ১৮৯, ১৯৫—৯৬, ১৯৭—৯৮

 (৩৭) সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, ২৮৫—৮৬, ৪৬২—৬৩

 (৩৮) Lewis Mumford : The Culture of Cities, 3rd ed. London 1944, 85-86

 (৩৯) Op. cit, 161

 (৪০) S. W. Goode : Municipal Calcutta, Edin 1916, p. 265

 (৪১) Lewis Mumford : op. cit, p. 168

 (৪২) Percival Spear : The Nabobs; London 1963, p. 139

 (৪৩) সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র ৩য় খণ্ড, ২৭৭

 (৪৪) সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র ১ম খণ্ড, ২১০

 (৪৫) সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র ১ম খণ্ড, ২৪০—৪১

 (৪৬) Fanny Parkes : Wanderings of Pilgrim etc. London 1850Vol. I, Chapter 3, p. 20

 (৪৭) A Griffin : Sketches of Calcutta, or Notes of a Late Sojourn in the City of Palaces, Glasgow 1843, pp. 119-43

 (৪৮) Pitirim Sorokin & Carle C. Zimmerman : Principal of Rural-Urban Sociology, N.Y. 1929, p. 48

 (৪৯) Sorokin & Zimmerman : Op. cit., p. 41

 (৫০) Sorokin & Zimmerman : Op. cit., 43-44 Sorokin : Social Mobility, Chsp VIII & IX

 (৫১) J. R. Blackwood : Census of India 1901, Vol. VII, Calcutta : Town and Suburbs, Part IV, Chapter XI

 (৫২) Blackwood. Op. cit, Chapter XII

(৫৩)Blackwood. Op. cit., p. 116

* ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের দেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যা কেনাকাটা করতেন তাকে ‘investment’ বলা হত।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *