৬. ষষ্ঠ পর্ব : জগৎ-শিকারী

ষষ্ঠ পর্ব : জগৎ-শিকারী

৪২. মেশিনে ভূত

স্যরি, হেউড, আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। নিশ্চই কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা আছে। মানব মন বুঝে উঠতে পারবে না এমন কিছুই নেই।

মানছি, তানিয়া। কিন্তু হালডনের সেই বিখ্যাত উক্তিটা মনে করিয়ে দিচ্ছি, ইউনিভার্স আমাদের কল্পনার মতো অদ্ভুত না-বরং কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত।

এবং হালডন ফোঁড়ন কাটল কার্নো, একজন দারুণ কমিউনিস্ট ছিলেন।

হয়ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর উক্তি সব ধরনের অদ্ভুত ব্যাপারকে প্রথমেই সমর্থন করে। হালের সেই অবাক করা আচরণ অবশ্যই কোনো না কোনো প্রোগ্রামিংয়ের ফল। যে…ব্যক্তিত্ব সে গড়ে তুলেছিল তা অবশ্যই কোনো না কোনো রকমের কৃত্রিম সৃষ্টি। আমার সাথে একমত তুমি, চন্দ্র?

এ ব্যপারটা ভয়াবহ। একটা পাগলা ষাঁড়ের সামনে লাল পতাকা নাড়লে যা হয় আর কী! তানিয়ার হতাশ হতেই হবে। চন্দ্রের ব্যবহার কিন্তু খুবই শান্ত। যেন তাকে। দখল করে রাখা হয়েছে আগে থেকেই। যেন তার মনেও কম্পিউটারের নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

অবশ্যই কোনো বাহ্যিক ইনপুট থাকতে হবে, ক্যাপ্টেন অর্লোভা। হাল নিজে নিজে হাওয়া থেকে এমন অডিওভিজুয়ায় ব্যাপার করতে পারে না। যদি ডক্টর ফ্লয়েড সঠিকভাবে রিপোর্ট করে থাকে, তাহলে কেউ না কেউ হালকে কন্ট্রোল করছিল। এবং অবশ্যই করছিল সাথে সাথে, সে সময়েই। কারণ দু কথার মাঝে কোনো সময় পার্থক্য নেই।

তো, দোষটা আমার ঘাড়েই চাপবে, কারণ তখন আর কেউ জেগে ছিল না। বলল ম্যাক্স।

ঠাট্টা করোনা, ম্যাক্স। জবাব দিলো নিকোলাই, অডিও সাইড হয়ত সহজ, কিন্তু …অন্য ব্যাপারটার কথা বলছি। খুব বেশি শক্তিময় বেশকিছু যন্ত্র ছাড়া কীভাবে সম্ভব? লেসার বিম, ইলেক্ট্রিক ফিল্ড ছাড়া…আমি জানি না। একজন স্টেজ ম্যাজিশিয়ান হয়ত করতে পারত, কিন্তু তারও দরকার পড়বে ট্রাক বোঝাই যন্ত্রপাতি।

জাস্ট এ মোমেন্ট, উজ্জ্বল হয়ে বলল জেনিয়া, সত্যি সত্যি হয়ে থাকলে হালের মনে থাকবে। তাকে জিজ্ঞাসা করছ না কেন…

তার কথা বন্ধ হয়ে গেল চারপাশের গুমোট ভাব দেখে। ফ্লয়েড প্রথমবারে তার কথার উপর দয়া দেখায়, চেষ্টা করেছি, জেনিয়া; তার কিছুই মনে নেই। যেহেতু সবার কাছে এরিমধ্যে আমি বলে ফেলেছি, হালের বলা না বলায় কিছু যায় আসে না। চন্দ্র দেখিয়েছে কীভাবে হালের নির্দিষ্ট স্মৃতি বাদ দেয়া যায়। আর অক্সিলারি স্পিচ সিন্থেসাইজারের সাথে মূল মেইনফ্রেমের৬২ তেমন যোগাযোগ নেই। হালকে na জানিয়ে সিন্থেসাইজারকে অপারেট করা যায়… এক মুহূর্তের জন্য থেমেই সে তার আসল অধিকার নিয়ে কথা বলল, আমি বলতে চাই এখানে খুব বেশি অল্টারনেটিভ নেই। হয় আমি পুরো ব্যাপারটা কল্পনা করেছি, নাহয় সব সত্যি। স্বপ্ন যে না তা আমি জানি, কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারব না সম্মোহন বা হেলুসিনেশন ছিল কিনা। ক্যাথেরিনা দেখেছে আমার মেডিক্যাল রিপোর্ট। সে জানে, এমন সমস্যা থাকলে আমার শিপে থাকার অধিকার নেই। এখন আমি বেরিয়ে যেতে পারি না। আর আমার ভুলকে তাদের এক নম্বর হাইপোথিসিস মনে করে নিলেও দোষ দেব না। আমিও হয়ত সেটাই ভাবতাম, যা অন্যে ভাবছে।

এটা যে ভুল না তা প্রমাণের একমাত্র উপায় দু-একটা প্রমাণ রেখে দেয়া। তাই একবার মনে করিয়ে দিতে দাও…এ কদিনে যেসব অদ্ভুত ব্যাপার হল…আমরা জানি ডেভ বোম্যান বিগ ব্রাদা…জাগাদকার ভিতর দিয়ে গেছে। আবার সেখান থেকেই কিছু একটা বেরিয়ে এসে গিয়েছে পৃথিবীর দিকে। ভ্যাসিলি দেখেছে-আমি না! তারপর তোমাদের অর্বিটিং বোমাতে রহস্যময় বিস্ফোরণ

তোমাদের!

স্যরি। ভ্যাটিকানের। তারপর আবার অদ্ভুত দেখায় যখন বৃদ্ধা মিসেস বোম্যান। হঠাৎ করে মারা যান; কোনো মেডিক্যাল কারণ ছিল না। আমি বলছি না এখানে যোগাযোগ আছে… আচ্ছা, তোমরা প্রবাদটা শুনেছ, একবার হলে দুর্ঘটনা, দুবার হলে কাকতালীয়, আর তৃতীয়বার হলে গোপন কোনো ব্যাপার আছে; অবশ্যই আছে।

এবং এখানে আরো কিছু আছে, ম্যাক্স উত্তেজিত হয়েই যেন বলল, আমি দৈনিক সংবাদপ্রচারে পাই খবরটা। ছোট একটা খবর। কমান্ডার বোম্যানের এক পুরনো গার্লফ্রেন্ড দাবী করে সে ডেভের কাছ থেকে মেসেজ পেয়েছে।

শাসা স্বীকার করল, আমিও খবরটা দেখেছিলাম।

আর তোমাদের কেউ খবরটা বলোনি। দুজনকেই একটু রাগের সাথে দেখল ফ্লয়েড।

শাসা আর ম্যাক্স একটু লজ্জা পেয়েছে কথাটায়। কাঁচুমাচু হয়ে ম্যাক্স বলল, আসলে এটা হাল্কাভাবেই নিয়েছিলাম। মহিলার স্বামী রিপোর্ট করার পর মহিলা নিজেই অস্বীকার করে। মনে করেছিলাম জোক।

রিপোর্টার বলে এটা হল পাবলিসিটি ট্রিক। যেমন চলত ইউ এফ ও নিয়ে। সবাই ইউ এফ ও দেখার দাবী করে বিখ্যাত হতে চেয়েছে তখন। প্রথম সপ্তাহেই ডজন ডজন দাবীর রিপোর্ট আসে। তারপর এ বিষয়ে রিপোর্টিং বন্ধ করে দেয় সংবাদ সংস্থাগুলো।

হয়ত তাদের কেউ কেউ দেখেছে সত্যি। এ নিয়ে স্পেসশিপ আর্কাইভে কী করে লেখা এল বা মিশন কন্ট্রোলের সাথে আবার কথা বলারই বা কী ছিল?

হাজারটা গল্পও আমাকে টলাতে পারবে না। মাথা নাড়ল তানিয়া কঠিনভাবে, আমি কঠিন প্রমাণ চাই।

যেমন?

ওহ-এমন একটা কিছু যা হাল জানে না। আর আমাদের কেউ তাকে শিখাইনি। কিছু বাহ্যিক আ…আকার।

একটা পুরনো ফ্যাশনের জাদু?

হ্যাঁ। আমি সেটার জন্যই বসে থাকব। এদিকে মিশন কন্ট্রোলকে এ ব্যাপারে কিছুই বলতে চাই না। আর আমি তোমাদের সবাইকে তাই করতে উপদেশ দেব, হেউড।

ফ্লয়েড বুঝল এটা সরাসরি অর্ডার। কুঁকড়ে গিয়ে একটু নিচু করল মাথাটা, আমি এটা মেনে চলতে যার পর নাই খুশি। কিন্তু একটা সাজেশন করতে পারি?

বল।

আমাদের একটা ঠিক প্লানিং থাকা উচিত। আচ্ছা, চল ধরে নেই যে এ ওয়ানিং সত্যি-যেমনটা আমি মনে করি।

এ নিয়ে আমরা কী করতে পারি। একেবারে কিছুই না। অবশ্যই, আমরা যখন চাই তখুনি বৃহস্পতির স্পেস ছেড়ে যেতে পারি। কিন্তু কোনো আর্থ রিটার্ন অরবিট করতে পারব না যে পর্যন্ত লঞ্চ উইন্ডো না খুলছে।

মরার এগারো দিন পর।

া। আমি আগে আগে চলে যেতে পারলেই খুশি হই। কিন্তু একটা ভাল এনার্জির অর্বিটের জন্য আমাদের যথেষ্ট ফুয়েল নেই… তানিয়ার কন্ঠ হঠাৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল, আমি পরে এটাই ঘোষণা করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা সামনে পড়ে গেল…

একটা অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, আর অস্বাভাবিক নিরবতা।

আমি আমাদের বেরিয়ে যাওয়া পাঁচদিনের জন্য পিছিয়ে দিতে চাই, যাতে আমাদের অর্বিটাল একটা আদর্শ হোহম্যান অর্বিটাল হয়ে যায়। ফলে আমরা একটু ভাল জ্বালানি পেতে পারি।

ঘোষণাটা অপ্রত্যাশিত না, তবু একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল চারপাশে।

আমাদের যাত্রা শুরুর সময়ের উপর এটা কী প্রভাব ফেলবে? নাটকীয় নিচু স্বরে প্রশ্ন করল ক্যাথেরিনা। দুই শক্তিময় মহিলা যেন একে অন্যের শত্রু হয়ে গেছে এক মুহূর্তের জন্য। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও যেন কেউ কাউকে ছাড় দেবে না।

আজ থেকে দশদিন পর। বলল তানিয়া; অবশেষে।

বেটার লেট দেন নেভার। আনন্দিত ভঙ্গীতে বলল ম্যাক্স প্রবাদটা। আসলে সে পরিস্থিতি আর টেনশন সহজ করার চেষ্টা করছে। পারছে না তেমন।

ফ্লয়েড খেয়াল করেনি; নিজের চিন্তায় বুদ। ট্রিপের জন্য যে সময় ঠিক করা হয়েছে সেটা তার আর বাকি দু কুর টেনশনে কোনো কমতি এনে দেয় না। তাদের রাত যে স্বপ্নহীনই কাটবে সেটাই একটু একটু সত্যি এখন।

সে নিশ্চিন্ত বোধ করলেও তার জ্ঞান তাকে উল্টো অসহায় হতাশ করে। যতটুকু বোঝা যায়, সেই ডেডলাইনের কাছাকাছি সময়ে যাওয়ার চিন্তা করলে আদৌ আর যাওয়া হবে না।

…অদ্ভুত অবস্থা, দিমিত্রি। ভয়াবহ। পৃথিবীতে তুমিই একমাত্র মানুষ যে এগুলো জানে। কিন্তু অচিরেই মিশন কন্ট্রোলের সাথে আমি আর তানিয়া একটা শো ডাউনে নামব।

এমনকি তোমার দেশের বস্তুকেন্দ্রিক কমুনিস্টরাও তা মানতে প্রস্তুত। অন্তত একটা ওয়ার্কিং আইডিয়া, অনুমান হিসেবে নিতে প্রস্তুত। একটা অস্তিত্ব আছেই-হাল স্বীকার করেছে বলা যায়। শাসা পুরনো একটা ফ্রেজ খুঁড়ে বের করেছে এ নিয়ে, মেশিনেই ভূত।

থিওরি বাদ দাওঃ ভ্যাসিলি প্রতিদিন একটা করে থিওরি কপচায়। বেশিরভাগই পুরনো সায়েন্স ফিকশন নিয়ে পাগলামি। একীভূত এনার্জি ফিল্ড! আরে, কোন ধরনের এনার্জি? ইলেক্ট্রিক্যাল নয়, হলে আমাদের মেশিন তাকে ঠিকই ধরতে পারত। একই কথা খাটে রেডিয়েশনের বেলায়ও। এক কথায়, শক্তির যত নমুনা আমরা জানি, তার যে কোনোটা হলেই কিন্তু ধরা যায়। ভ্যাসিলি বেশি বেড়ে গেছে, ওয়েভের কথা বলছে। নিউট্রিনোর ওয়েভ! তাও আবার অন্য ডাইমেনশনের সাথে ক্রস কানেকশন। তানিয়া অবশ্য বলে এসবই ননসেন্স রহস্যময় কথা-এটা আবার ওর পছন্দের কথা, সুযোগ পেলেই ঝেড়ে দেবে। তাদের মধ্যে একটা লড়াই হয়ে যাওয়ার অবস্থা আর কী! কাল রাতে চিৎকার শুনেছি। আগে কখনো চেঁচামেচি করেনি-ব্যাপারটা খারাপ প্রভাব ফেলবে মানসিক দিক দিয়ে।

ভয় হচ্ছে। সবাই খুব টেনশনে, প্রত্যেকেই সীমা ছাড়ানোর পথে। এ ওয়ার্নিং তার উপর দেরিতে রওনার ডেট। তার উপর বিগ ব্রাদারের ব্যাপারে একটুও এগোতে পারিনি, মূল মিশন যেটা–অন্তত আমি মনে করি। জাগাদকার হতাশা আগেই ছিল, সাথে যোগ দিয়েছে ওগুলো। আমি বোম্যানের সাথে…জিনিসটার সাথে যোগাযোগ করতে পারলে হয়ত ওটা সাহায্য করতে পারত। আরে, গেল কোথায় তাই ভেবে পাচ্ছি না। মনে হয় আমাদের সাথে একবারের বেশি কথা বলতে এক বিন্দুও আগ্রহ নেই ওটার। কী বলতে পারত, যদি চাইতও আমাদের বলতে! দোজখ! কিয়র্ট ভ্যাজমি! ড্যাম-আমি আবার শাসার সেই বিশ্রী রাশলিশে কথা বলছি! আচ্ছা, সাবজেক্ট চেঞ্জ করি, নাকি?

প্রথমবারের মতো আমি ভয় পাচ্ছি, আমাদের কেউ আর কোনোদিন পৃথিবীর দেখা পাবে তো?

৪৩. থট এক্সপেরিমেন্ট

একজন যখন মাসের পর মাস মাত্র কয়েকজন মানুষের সাথে কোনো বদ্ধ জায়গায় কাটায় তখন তার প্রত্যেক সঙ্গীর আবেগ-অনুভূতির মূল্য খুব বেড়ে যায় তার কাছে। ফ্লয়েডের প্রতি কারো কারো আচরণে হঠাৎ পরিবর্তনটা তার চোখ এড়ায়নি। এর সবচে অদ্ভুত প্রমাণ হল, অনেকেই আজকাল তাকে ডক্টর ফ্লয়েড বলা শুরু করেছে। এ কথাটা বহুদিন যাবৎ না শুনতে না শুনতে জবাব দেয়ার কথাও তার মনে আসে না সাথে সাথে।

সে জানে, কেউ সত্যি সত্যি বিশ্বাস করে না ফ্লয়েড আধপাগলা; কিন্তু তারা সম্ভাবনাকে হিসাবে রাখে। সে এজন্য ঠিক ব্যথা পায়নি। খুব মন খারাপের সাথে সাথে উপভোগও করেছে তার সুস্থতার পরীক্ষা ব্যাপারটাকে।

পৃথিবী থেকে কিছু হালকা প্রমাণ যোগাড় হয়; হোসে ফার্নান্দেজ এখনো রিপোর্ট করেছে যে তার স্ত্রী কথা বলেছে আবারো ডেভিড বোম্যানের সাথে। এবারও মহিলা মিডিয়ার সাথে কোনো কথা বলতে নারাজ। কেন বেচারা হোসে এ ব্যাপারটা বারবার সেধে আবিষ্কার করতে যাবে, যেখানে বিটি খুব শক্ত আর রাগী মহিলা এবং বিষয়টাও গোলমেলে! তার হাসপাতাল বেডে শুয়ে বেচারা বলেছে যে বিটির সাথে মনোমালিন্য সাময়িক এবং তারা এখনো একে অপরকে ভালবাসে।

ফ্লয়েড আশা করে তানিয়ার শীতলতাও সাময়িক; কেটে যাবে খুব দ্রুত। তার মতোই তানিয়াও ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেয়, মেয়েটার ব্যবহার এম্নিতেই এমন। এমন কিছু হল, যা তার মতের-বিশ্বাসের-চিন্তার বাইরে; সুতরাং ও অবশ্যই এর বাদবাকি যা থাকে তা এড়িয়ে চলবে। এর মানে ফ্লয়েডের কাছাকাছি যতটা পারা যায় কম আসা। প্রায় সব জটিল মিশনে যে সময়টা আসে সেটা আসছে এগিয়ে।

বাকি অধীর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জন্য তার কী করার তা-ই বোঝা যায় না। বিশেষ করে অস্থির টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোকে কী দিয়ে বুঝ দেবে সেই বিগ ব্রাদার নিয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার ব্যাপারে, তাও বোঝা যায় না।

আপনি সারাক্ষণ চুপচাপ বসে আছেন। অসম্ভব পয়সা খরচ করে আরামে সিটে বসে বসে জিনিসটাকে দেখছেন। কিছু করেন না কেন? সব প্রশ্নে তানিয়া একটা জবাবই দেয়, আমি করব-যখনি লঞ্চ উইন্ডোটা খোলে, তখুনি। যাতে কোনো রকমের খারাপ কিছু দেখলেই সটকে পড়তে পারি।

বিগ ব্রাদারের সাথে যা করার সবকিছুর পরিকল্পনা মিশন কন্ট্রোলের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা শেষ। লিওনভ ধীরে, সব ফ্রিকোয়েন্সিতে তদন্ত করে যাবে। আস্তে আস্তে শক্তি বাড়িয়ে প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীতে খবর পাঠাতে পাঠাতে চলবে। চূড়ান্ত যোগাযোগ হয়ে গেলে তারা সাবধানে জিনিসটাকে খোঁড়ার অথবা লেসার বিম ফেলার সিদ্ধান্ত নেবে। লেজার স্পেকট্রোস্কোপ দরকার হতে পারে। যেখানে এক দশক ধরে টি এম এ-১ এর সাথে সব কাজই বৃথা সেখানে কেউ অবশ্য বিরাট কোনো সাফল্য আশা করে না। টি এম এ-১ এর উপাদানও বের করা যায়নি। মানব বিজ্ঞানীরা এটা নিয়ে যে ধরনের কাজ করে চলেছে তার সাথে তুলনা চলে প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষের দাঁতের করাত দিয়ে ব্যাংকের স্ট্রং রুমের ভল্ট ভাঙার চেষ্টার সাথে।

তার উপর, ইকো সাউন্ডার আর সিসমিক ডিভাইসগুলো৬৭ হয়ত বিগ ব্রাদারের গায়ে আটকে যাবে বা ভিতরে রয়েও যেতে পারে। অনেক অনেক আঠা আনা হয়েছে এ উদ্দেশ্যে। তাও যদি কাজ না দেয় তো… ভাল, এক অভিযাত্রী মাত্র কয়েক কিলোমিটার নেমে যেতে পারে সহজেই, যদি দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে; সৌরজগতের সবচে বড় রহস্যের দুয়ার খোলার অভিযান হিসেবে-যতই হাস্যকর দেখাক না কেন; যে কেউ এটাকে পার্সেল পাঠানোর মতো ব্যাপার বলে হাসাহাসি করুক না কেন।

এখনো বিগ ব্রাদারের আশপাশে বোমা ফাটানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। এ বোমার ফল ভাল হতে পারে, যেসব মেসেজ সেখান দিয়ে যায় তার কিছু না কিছু বিস্ফোরণে বাধা পাবে, কিছু প্রতিফলিত হবে। আরো ভয়াবহ কাজ করলে হয়ত বিগ ব্রাদারের ভেতরটাও দেখা দেবে। এই শেষ প্রস্তাবের উপর তর্কাতর্কি হয়েছে খুব। যারা আশা করে কাজ হবে তারাও, আর যারা ভয় পায় তারাও খুব বিতর্ক করেছে। অনেকক্ষণ ফ্লয়েড চিন্তা দুটোর মাঝে ভেসে বেড়ায়; এখন ব্যাপারটা জটিল সিদ্ধান্তে র দিকে এগিয়ে যাবে।

বিগ ব্রাদারের সাথে মিলিত হওয়ার সেই মুহূর্ত, সেই গ্রেট মুহূর্তই পুরো অভিযানের আসল অধ্যায়; কিন্তু তা ডেডলাইনের পরে কোনো একদিন পড়ে যাচ্ছে। হেউড ফ্লয়েড সন্দেহ করে মাঝে মাঝে-এ অভিযান এমন একটা সময়ে পড়বে যেটার আদৌ আসার সম্ভাবনা নেই; শুধু নিজের মতের সাথে কাউকে রাজি করতে পারে না। এটাই তার সবচে বড় সমস্যা। তারা যদি ফ্লয়েডের মতো মনেও করে, কিছু লাভ নেই। কারণ বাকিরাও এ নিয়ে তেমন কিছু করতে পারবে না।

ওয়াল্টার কার্নোই শেষ মানুষ যাকে সে আশা করেছিল নিজের মতে আনার; কারণ ওয়াল্টার হল একজন পার্ফেক্ট ইঞ্জিনিয়ার-যে কোনো ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে জানে সে। তাকে কেউ হয়ত জিনিয়াস হিসেবে মেনে নেবে না; কিন্তু অন্ধ পরিণতি দেখতে হলে, অপ্রতিরোধ্য পরিণতি দেখতে হলে অবশ্যই জিনিয়াস হতে হয়।

এ মতটাকে বুদ্ধিচর্চা মনে কর, তারপর পথ বের কর-সামনে যদি সত্যি সত্যি বন্দুক ধরা থাকে? সে খুব ইতস্তত ভাব নিয়ে শুরু করেছিল কথাটা।

আমি গুলি খেয়ে মরতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

এরপর আর কী বলা যায়?

চালিয়ে যাও, বলেছিল ফ্লয়েড, আমি ভদ্রভাবে তোমার সব কথাই শুনে যাব। শুধু এটুকুই করতে পারি আমি। প্রত্যেকেই আমার সাথে খুব ভদ্রতা করছে। খুব বেশি। ভয় পাচ্ছি এসব দেখে।

কার্নো একটা কোঁকড়ানো লম্বা মুচকি হাসি দিল, তুমি ওদের দোষ দিতে পারবে? তবু, অন্তত তিনজন তোমাকে বিশ্বাস করে আর বাকিরাও ভয় পাচ্ছে, কখন বিশ্বাস করতে হয়!

তোমাকে নিয়ে তিনজন?

না। আমি এখনো রেলিংয়ের উপর দাঁড়ানো। ভাইরে, জায়গাটা কক্ষনোই মজার না। কিন্তু তুমি যদি ঠিক বলে থাক… আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে চাই না, কী হতে যাচ্ছে তা জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আর থাকবে না। আমার বিশ্বাস প্রতি সমস্যারই একটা সমাধান আছে, যদি তুমি ঠিক কাজ করতে থাক।

একটা পিঁপড়াকে পিষে ফেলতে কোনো মানুষ এগিয়ে গেলে পিপড়ার জন্য সবচে নিরাপদ হয় মানুষটাকে পিষে ফেলা, এটাই তোমার শর্ত অনুযায়ী সমাধান। যাই হোক, শুনে খুশি হয়েছি। আমি আছি খুব কষ্টে। সম্ভবত তোমার দেয়া ধারণাটা ভুল।

হতে পারে। তবে আমাদের পনেরদিনের মধ্যে চলে যেতে হলে, ডেডলাইনকে বিট করতে হলে আরও বাড়তি একটা ডেল্টা ভির দরকার হবে। বাড়তি তুরণ, বাড়তি গতি। সেকেন্ডে ত্রিশ কিলোমিটার।

এটা ভ্যাসিলির হিসাব। আমি পরীক্ষা করতে চাইনি। তবু আমি শিওর, ওর হিসাব ঠিক। হাজার হলেও সেই এখানে নিয়ে এসেছে আমাদের।

এবং সেই বের করে নিয়ে যেতে পারত, যদি প্রয়োজনীয় প্রোপ্যাল্যান্ট থাকত।

অথবা আমাদের হাতে স্টার ট্রেক বিম ট্রান্সপোর্টার থাকলে একঘণ্টায়ই আমরা পৃথিবীতে চলে যেতাম।

পরের বার একটা বাড়তি মুহূর্ত পেলেই আমি যন্ত্রটার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। কিন্তু আমি কি বলতে পারি যে, একটু দূরেই ডিসকভারির ফুয়েল ট্যাঙ্কে অনেক অনেক প্রোপ্যাল্যান্ট পড়ে আছে?

বহুবার ভেবেছি সেটার কথা। সেটুকু লিওনভে ট্রান্সফার করার কোনো পথই খোলা নেই। কোনো পাইপ লাইন নেই, কার্যকর পাম্প নেই; আর তুমি বাকেটে করে তরল অ্যামোনিয়া বয়ে আনতে পারবে না, এমনকি সৌর জগতের এ অংশেও না।

ঠিক। কিন্তু এ অকাজ করার কোনো দরকার নেই।

হ্যাঁ? মানে?

সেগুলো যেখানে আছে সেখানেই জ্বালাও। ডিসকভারিকে ফেরার পথে প্রথম স্টেজ বা প্লটফর্ম হিসেবে ব্যবহার কর।

ওয়াল্টার কার্নো ছাড়া আর কেউ এ প্রস্তাব করলে ফ্লয়েড হাসত। কিন্তু সে বলায় ফ্লয়েড কয়েক সেকেন্ডের জন্য হাঁ করে থেকে কী বলবে ভেবে পেল না। উপযুক্ত কথা না পেয়ে বলল, ধ্যাৎ, আগেই আমার ভাবা উচিত ছিল।

প্রথমে শাসাকে তারা বলেছে ব্যাপারগুলো। সে ধৈর্য্য ধরে শুনল, তারপর ঠোঁট গোল করে নিজের কম্পিউটারে একটা র‍্যালেন্টান্ডো গেম খেলে নিয়ে যখন জবাবটা পেল, খুব ভেবে চিন্তে একটু মাথা নুইয়ে জানালো নিজের সমর্থন, ঠিক। এটা আমাদের বাড়তি গতি দিতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমস্যা আছে যে…

আমরা জানি। দু শিপকে একত্র করা; ডিসকভারির কারণে অক্ষ-বিপরীতে ঝোঁক; আসল মুহূর্তে ডিসকভারিকে বাদ দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সব প্রশ্নেরই একটা জবাব পাবে।

আই সি! এর মধ্যেই হোমওয়ার্ক শুরু! কিন্তু শুধুই সময় নষ্ট। তানিয়াকে জীবনেও রাজি করাতে পারবে না।

এ মুহূর্তে চাই না। ফ্লয়েড জবাব দিল, এখন শুধু জানাতে চাই যে সম্ভাবনা ফুরোয়নি। আমাদের নীতিগতভাবে সমর্থন দিবে তুমি?

আমি শিওর না। তবে দেখতে আসব, ঘটনা ইন্টারেস্টিং হবে।

তানিয়া ফ্লয়েড যেমন আশা করেছিল তারচে বেশি ধৈর্য নিয়ে শুনল। কিন্তু মনোযোগের যথেষ্ট অভাব। তারা শেষ করার পর সে শুধু যা বলল তাকে অস্থির কিছু কিছু সমর্থন বলা যায়। দারুণ বুদ্ধিমানের কাজ, ফ্লয়েড-

আমাকে কিছুই বলল না। সব গুণ বল বা দোষ, তা ঐ ওয়াল্টারের।

মনে হয় না এখানে খুব বেশি পথ পাওয়া যাবে। কী বলেছিল এটাকে আইনস্টাইন…থট এক্সপেরিমেন্ট। ওহ! ধরে নিলাম তোমাদের কথামতো কাজ হবে, অন্তত থিওরিতে কাজ করবে, কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালের ঝুঁকি নেবে কে? আমি তখনি মেনে নিব যখন-সত্যি সত্যি আমরা বিপদে-প্রমাণ মিলবে। অনেক ভুল হতে পারে। ঘটতে পারে যে কোনো কিছু। কিন্তু সব সম্মান রেখেই বলছি, হেউড, এক বিন্দু প্রমাণও আমার সামনে নেই।

যথেষ্ট ভালভাবেই বলেছ কথা। কিন্তু এখন নিশ্চই সামনে আরেকটা পথ দেখা যায়? যদি দরকার হয়েই পড়ে, তাহলে আমরা বাস্তব পরীক্ষাটাও করে বসলে তুমি কি মাইন্ড করবে?

অবশ্যই না, যে পর্যন্ত এটা ফ্লাইটের আগের চেক আউটে প্রভাব না ফেলে। আইডিয়াটা ভাল লেগেছে-বলতে দ্বিধা নেই। কিন্তু সত্যি, সময় নষ্ট করছ, আমি কখনোই এর অনুমতি দেব না। ব্যক্তিগতভাবে আমার সামনে ডেভিড বোম্যান হাজির হলে আলাদা কথা।

তখনো কি অনুমতি দিবে, তানিয়া? ক্যাপ্টেন অর্লোভা একটু হাসল, কিন্তু রসবোধ নেই তাতে, জানো, হেউড, আমি শিওর না। তাকে খুবই প্রভাব ফেলতে হবে আমার উপর। সে যদি তা পারে, তাহলে ভাবব।

৪৪. পালানোর কৌশল

এক ভয়ংকর খেলায় সবাই অংশ নিয়েছে, কিন্তু শুধু অফ ডিউটির সময়। এমনকি তানিয়া সেই থট এক্সপেরিমেন্ট-এ আইডিয়া দেয়। সে এখন কার্নো-ফ্লয়েড তত্ত্বকে এ নামেই ডাকে।

কিন্তু ফ্লয়েড ঠিকই জানে, এ কাজে কেউ তার মতো করে ভিন্ন কোনো প্রাণী বা অস্তিত্বের কথা ভেবে ভয় পেয়ে অংশ নিচ্ছে না। তারা সবাই আনন্দ নিয়েই এ কাজ করছে আর সেটা শুধু পৃথিবীতে ফেরার উত্তেজনায়। তারা মনে করে আর মাসখানেক পরে সেখানে পৌঁছবে। যা ভেবেই করুক না কেন, সে সন্তুষ্ট। নিজের শ্রেষ্ঠ কাজটা করেছে ফ্লয়েড, বাকিরা করবে কিনা তা ভাগ্যের উপর।

একটু ভাগ্য আছে ব্যাপারটায়। তা না হলে পুরো আশাই দুমড়ে-মুচড়ে যেত। লিওনভকে তৈরি করা হয়েছে শুধুই বৃহস্পতির জগতে আসার জন্য। এর গতি দ্রুত করে তুলতেই আকার করা হয়েছে অনেক ছোট-প্রায় ডিসকভারির অর্ধেক। সেই বিরাট লম্বা জিনিসটা হয়ত লিওনভকে কাঁধে করে সত্যি সত্যি এগিয়ে দিতে পারবে। শিপের মাঝখানের অ্যান্টেনার জায়গাটা পুরোপুরি নোঙরের কাজ দিবে। আশার কথা হল, এটা লিওনভের ভার ভালভাবেই নিতে পারবে, কারণ এখানে মাধ্যাকর্ষণ নেই।

পরের কয়েকদিন পৃথিবীতে যেসব অনুবোধ পাঠানো হয়েছে তা দেখে মিশন কন্ট্রোল যারপরনাই অবাক। শিপ দুটোরই অদ্ভুত ভার বহনের সময় কেমন আচরণ হয়; লম্ব-বিপরীত বলের ফলাফল; শিপ বডির কোনো কোনো জায়গা খুব দুর্বল অথবা শক্ত…এগুলো হল মাত্র কয়েকটা প্রশ্ন। আরো অনেক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করছে। ইঞ্জিনিয়াররা, পাঠাচ্ছে পৃথিবীতে।

কোনো সমস্যা? হল মিশন কন্ট্রোলের প্রধান প্রশ্ন।

না। আমরা খুব খতিয়ে দেখছি সব ধরনের সম্ভাবনাকে। জবাব দিয়েছে তানিয়া। প্রতিবার বলেছে, আপনাদের সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ। ট্রান্সমিশন শেষ।

আর প্রোগ্রাম এদিকে চলছে ঠিকই। দু শিপের সব সিস্টেম সতর্কভাবে চেক করা হয়। প্রত্যেক যন্ত্রকেই আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে অভিযানের জন্য। ফেরার কোর্সের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভ্যাসিলি। চন্দ্র হালকে আরো শিখাচ্ছে যখন অন্য মেশিনগুলো ডিবাগিং ১৩৯ করা যায়। হালকে ফাইনাল চেক করার মতো করে তুলছে। ওদিকে তানিয়া আর ফ্লয়েড দুজনে বিগ ব্রাদার নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণে মেতে গেছে, যুদ্ধ শুরুর আগে সারা জীবনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বুড়ো জেনারেলরা যেভাবে পর্যবেক্ষণ আর আক্রমণ পরিকল্পনা করে।

শুধু এটুকুই করতে চেয়েছিল সে। ব্যাপারটায় কোনো মজা পাচ্ছে না ফ্লয়েড। সে এমন একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে যার অনুভূতি বিশ্বাসীদেরও বোঝাতে পারবে না। কাজগুলো ঠিকই করেছে, বেশিরভাগ সময় মন ছিল অন্য কোথাও।

তানিয়া ঠিক ঠিক বুঝতে পারে তার আনমনা ভাবকে, তুমি এখনো সেই জাদু আশা করছ, যাতে আমি রাজি হই, না?

অথবা আমি নিজেই ভেগে যাবার ধান্ধা ছেড়ে দেই এমন একটা কিছু হোক। এই অবস্থা অসহ্য।

আমিও। হাতে সময় কম। ঝুলে না থেকে যে কোনো একদিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ভালভাবে তানিয়া পরিস্থিতি ডিসপ্লের উপর চোখ বুলালো। জ্বলছে ২০ সংখ্যাটা। এটা সবচে বেশি অপ্রয়োজনীয় ইনফরমেশন। সবাই জানে আর কদিন পর লঞ্চ উইন্ডো খুলবে।

জাগাদকার অভিযানের সময়ও এসেছে এগিয়ে।

.

দ্বিতীয়বারের মতো ফ্লয়েড কী হয়েছে তা খোঁজা শুরু করল। অন্যপথে। কিন্তু এত কিছু করেও কোনো ফারাক দেখা দেয় না। জরুরি মনিটর ক্যামেরা শুধু একটা ক্ষীণ চিহ্ন দেখাচ্ছে একটা ভর্তি আরেকটা খালি ফ্রেমের মাঝখানে।

এখনো ফ্লয়েড ডিসকভারিতে রাত-দুপুরে ডিউটি করে। তার জেগে থাকা সাথী একমাত্র শাসা, তাও সে লিওনভে বসে। নিয়মমতো রাতটা কাটে একেবারেই অলস। অটোমেটিক যন্ত্রগুলি তাদের কাজ ঠিকই চালিয়ে যায়। এক বছর আগেও সে কল্পনা করেনি যে বৃহস্পতির অর্বিটে, গ্রহ থেকে মাত্র কয়েক লাখ কিলোমিটার দূরে থেকে ফ্লয়েড ক্রোজার সোনাটা পড়তে পারবে। শাসার মতে এটা এখনো পুরো রাশিয়ান সাহিত্যের সবচে যৌনোদ্দীপক কিন্তু শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য উপন্যাস। কিন্তু এ কথাটা প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট এগোয়নি ফ্লয়েড। এখন সে কিছুতেই শেষ করবে না বইটা।

০১২৫টায় বিরক্ত হয়েছিল একটা কিম্ভুত ব্যাপার দেখে। অবশ্য অস্বাভাবিক বলা যায় না…আইওর আলো আর আঁধারের মাঝামাঝি এলাকায় এক বিরাট ছাতা আকৃতির মেঘ স্পেসে হারিয়ে গেল। এর অবশিষ্টটা নিচের জ্বলন্ত ভূমিতে পড়ে গেল আবার। ফ্লয়েড এমন বহু ঘটনা দেখেছে, কিন্তু কোনোটাই তার মনোযোগ কেড়ে নেয়নি। এখন মনে হচ্ছে এত ছোট কোনো দুনিয়ায় এত বড় এনার্জি থাকতেই পারে না।

একটু ভালভাবে দেখতে আরেক অবজার্ভেশন উইন্ডোর দিকে গেল ফ্লয়েড। এরপর এমন একটা কিছু সে দেখল, যা তাকে আইওর কথা ভুলিয়ে দিয়েছে, ভুলিয়ে দিয়েছে আর সবকিছুর কথা। যখন সে নিজেকে নতুন করে সন্তুষ্ট করছে আবার শুধু তার কপালেই ভোগান্তি নেই…এমন সময়ে! সে অন্য শিপকে কল করল।

গুড মর্নিং, উডি। হাই তুলল শাসা, না…আমি কিন্তু ঘুমাচ্ছিলাম না। বুড়ো টলস্টয়ের সাথে সময়টা কেমন কাটছে?

কাটছে না। একবার বাইরে তাকাও, কী দেখলে?

মহাবিশ্বের এ পাশে ঘাপলা লাগানো কিছুই নেই। আইও তার কাজ করে চলছে। বৃহস্পতি, তারাগুলো…হায় খোদা!

আমি কিন্তু এবার নিজের চোখে দেখার কথা বলিনি, পাগলও হইনি। থ্যাঙ্কস, আমি যে সজ্ঞান সেটা প্রমাণ করার জন্য। আমাদের জন্য সবচে ভাল হয় যদি কাপ্তানকে জাগানো যায়।

অবশ্যই। আর যারা আছে সবাইকে। উডি, ভয় পেয়েছি খুব।

না পেলেই তুমি একটা পাগল। শুরু হোক। তানিয়া? তা-নি-য়া? উডি ডাকছি। স্যরি, তোমাকে জাগাতে হল-কিন্তু তোমার সেই মিরাকল ঘটেছে। জাদু ফলেছে, তানিয়া। বিগ ব্রাদার ইজ গন। হ্যাঁ, ভ্যানিশ। ত্রিশ লাখ বছর পর চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাগাদকা।

আমার মনে হয় সে এমন কিছু জানে যা আমরা কেউ জানি না।

আঁধারে আঁধার মুখ নিয়ে একদল একত্র হয় পনের মিনিটের মধ্যেই। একটা কনফারেন্স হবে, ওয়ার্ডরুম কাম অবজার্ভেশন লাউঞ্জে। এইমাত্র যারা ঘুমাতে গেছে তারাও সাথে সাথে হাজির। ওরা ঘুমিয়েছিল কফির ফুটন্ত কাপের কথা মনে করে, কারণ বাইরে যে পরিবেশটা দেখা যায় তা অনেকটা ফেনিল কফি মগের মতোই। কিন্তু কফির কালো, ঢাউস পাত্রটা কোথায়? বিগ ব্রাদার?

এটা এমনকিছু অবশ্যই জানে যা আমরা জানি না… সেই ফ্লয়েড-ফ্রেজটা শাসার মুখ থেকে বেরিয়ে বাইরে বাতাসে ঝুলে রইল; এজন্যেই যেন কেউ কিছু বলতে পারছে না। সর্বগ্রাসী একটা বাক্যের অংশমাত্র! তানিয়া সহ চিন্তায় পড়ে যায়।

এখনো ফ্লয়েড বলতে পারবে না, বলেছিলাম না। এখনো সময় আসেনি। আসলে তেমন কিছুই প্রমাণ হয় না। তবে মজার ব্যপার হল, এখন এখানে থাকার যুক্তি হাজারটা হাজির করলেও তানিয়া হেরে যাবে, মিশন টার্গেট হাওয়ায় উবে গেছে! তদন্তের কিছু নেই, করার কিছু নেই, তাই যাও ফিরে বাড়ি। এর অর্থ সেই একই, থেকোনা এখানে।

হেউড, বলল তানিয়া, আমি এবার আরো সিরিয়াসলি সেই মেসেজ বা যাই হোক সেটা-গ্রহণ করতে প্রস্তুত। এসব যদি না বুঝি তো আমার মতো বোকা আর কেউ নেই। কিন্তু এখানে থাকা যদি সত্যি রিস্কি হয়, তবু আরেক রিস্ক এড়াতে থাকতেই হবে। ডিসকভারি আর লিওনভকে একত্রে জুড়ে দিয়ে অক্ষের বাইরে লিওনভের মতো ওজন দিয়ে ডিসকভারির পুরনো মেশিনে ভরসা করে বৃহস্পতীয় এলাকা ছাড়ার ঝুঁকি নিয়ে রওনা করে বেরিয়ে যাওয়ার পর মিনিটের মধ্যে দু শিপকে আলাদা করে একেবারে ঠিক সেকেন্ডে লিওনভের ইঞ্জিন স্পার্ক শুরু করার ঝুঁকি-আচ্ছা! কোনো ভাল ক্যাপ্টেন অনেক বেশি জোরালো কারণ ছাড়া…না, ভুল বললাম, একেবারে শতভাগ নিশ্চয়তা ছাড়া এ ঝুঁকি নেবে না। কক্ষনো না। এখনো আমি তেমন প্রমাণ বা কারণ দেখি না। শুধু একটা…ভূতের ঘোষণা শুনেছি, ধরি আমিই শুনেছি। আইনের আদালতে তেমন কোনো যুক্তিই না এটা।

অথবা তদন্তের আদালতে… অতি ঠাণ্ডা গলায় বলল ওয়াল্টার কার্নো, যদি আমাদের বাকি সবাইও সাক্ষ্য দেই যে তোমাকে ভূতটা ঠিকই মেসেজ দিয়েছিল এবং আমরা সবাই তা দেখেছি, তাও নরক… আদালতে… বাদ দাও।

হ্যাঁ, ওয়াল্টার, ভাবছিলাম এটাই। আমরা যদি বাড়িতে ঠিকমতো ফিরি, তখনই সমস্যা দেখা দেবে। সব প্রমাণ করতে হবে, পারব? এবার আর আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। আমরা যখন ঘুমে, তখন জাগাদকা উধাওর রিপোর্ট হয়েছে, ঠিক না? সিদ্ধান্ত কাল সকালে হবে। হেউড, শাসা, আমার সাথে একটু ব্রিজে আসবে? তোমাদের কাজে ফেরার আগে আমাদের মিশন কট্রোলকে জাগাতে হবে।

রহস্য-নিশির রহস্য শেষ হয়ে যায়নি। মঙ্গল-অর্বিটের আশপাশে কোথাও তানিয়ার ছোট্ট রিপোর্টটা আরেক বিপরীতগামী রিপোর্টকে অতিক্রম করে।

অবশেষে কথা বলেছে বিটি ফার্নান্দেজ। সি আই এ আর ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি এমনভাবে ধরেছে…তাদের যৌথ ভদ্র তেল মারা কথা আর তদন্ত পুরো ভাসিয়ে দিয়েছে পথটাকেই; এখনো হাল্কা গুজবের নেটওয়ার্ক সফল। ভিডিও ডোমের ভিতরে অমর করে রাখা হয়েছে ডেভ বোম্যানকে।

অর্ধেক সুযোগ আর অর্ধেক উৎসাহে কাহিনী এগিয়ে গেছে আরো অনেকদূর। হ্যালো, আর্থ এর নিউজ ডিরেক্টর তার এক কর্মচারীর সাথে ডেভিড বোম্যানের চেহারার মিল খুঁজে পেয়েছেন। অত্যন্ত মিল; তার উপর এক দামী মেক আপ আর্টিস্ট হাত বুলিয়েছে সে চেহারায়। হোসে ফার্নান্দেজ তাকে সতর্ক করতে পারত যে তরুণ লোকটা বড়সড় ঝুঁকি নিচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝেই ভাগ্যদেবী সাহসীদের সাথে থাকেন। একদিন লোকটা দরজায় পা রাখল, এবার বিটি কাৎ! আর অস্বীকার করার যো নেই। মহিলার হাতে যতটুকু সময় ছিল, তাকে খুব ভদ্রভাবে তাড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং সফলও হয়েছে-ততোক্ষণে হাঁড়ির সব খবর লোকটার কজায়। এত বেশি ঝুঁকি নিয়ে এত সুন্দর করে কাজ করতে তার প্রতিষ্ঠানের আর কেউ পারেনি কোনোদিন। এমনকি সেই কাজের জন্য সাংবাদিকতায় পুলিঞ্জার পুরস্কারও জুটে গেল তার!

আশা করি, ফ্লয়েড হতাশ আর ক্লান্তভাবে শাসাকে বলল, মেয়েটা আগে আগেই কথা বলে রাখবে যাতে নিজেকে বাঁচাতে পারি আমি হাজার তদন্তের হাত থেকে। যাই হোক, এটাই কিন্তু কাজে লাগবে, তানিয়ার সম্ভবত আর কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো এসব নিয়ে ভাবার সময় হয়নি, আগে ও জেগে উইক-কী বল?

অবশ্যই, ব্যাপারটা এখুনি করার মতো কিছু না, যদিও হঠাৎ আর গুরুত্বপূর্ণ…ওর একটা ঘুমের দরকার। একটু একটু কেমন যেন লাগছে, হাতে বেশি সময় নেই, ফ্লয়েড।

আমি শিওর, তোমার ভাবনাটা ঠিক-ভাবল ফ্লয়েড। খুব ক্লান্ত লাগছে তার, যদিও ডিউটি নেই-ঘুমানো আসলে অসম্ভব। মনটা খুব বেশি ব্যস্ত। আজকের রাত, এর ঘটনা, পরে কী ঘটতে পারে, আগে কী হয়েছে…একদিক ভেবে অনেকটা মুক্তি পেল যেন; তারা যে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। তানিয়ার আর অন্য সিদ্ধান্ত নেয়ার যো নেই।

কিন্তু বড় একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। হচ্ছেটা কী!

ফ্লয়েড তার জীবনে এমন আর মাত্র একটা ঘটনা মনে করতে পারে। অনেক আগে, টগবগে তরুণ ও। একটা ক্যানো নিয়ে অভিযানে বেরিয়েছিল। সাথে বন্ধুবান্ধব। কলোরাডো নদীর এক উষ্ণ প্রস্রবণের কাছাকাছি যাবার পর পথ হারিয়েছিল ওরা। ক্যানিয়নের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে একের পর এক, বাদামের খোসার মতো। নিয়ন্ত্রণ ছিল এক বিন্দু। শুধু ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পেরেছে খেয়াটাকে। সামনে অদেখা বিপদ। হয়ত কোনো ডুবো খাজ আছে, থাকতে পারে ডুবো পাথর, কিংবা স্বয়ং কোনো বিরাট ঝর্না; তারা জানত না। আর সে সময়টায় এই অনিশ্চয়তার পথে চলতেই হয়েছে, কারণ করার প্রায় কিছুই ছিল না।

আবারো ফ্লয়েড নিয়তির শক্ত হাতে আটকে গেল। টেনে হিঁচড়ে নিয়তি তাদের কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে, কোনো অজানা পরিণতির দেশে। এবারের ভয়গুলো শুধু অদেখা না, হয়ত ব্যাখ্যাতীত।

৪৫. মুক্তির ট্রেনিং

…হেউড ফ্লয়েড বলছি, সম্ভবত ল্যাগ্রেস থেকে এটাই আমার শেষ রিপোর্ট…

আমরা বাড়ি ফেরার জন্য গুছিয়ে নিচ্ছি সব। কয়েকদিনের মধ্যে এ অদ্ভুত জায়গা ছেড়ে যাব, এ জায়গা-আইও আর বৃহস্পতির মাঝখান, যেখানে আমরা সেই বিরাট, রহস্যময়, বর্তমানে অদৃশ্য আর্টিফ্যাক্টটার সাথে দেখা করেছিলাম…নাম দিয়েছি বিগ ব্রাদার। এখনো বিন্দুমাত্র সূত্র পাইনি যাতে বোঝা যায় কেন বা কোথায় সেটা গেল।

অনেক কারণে আমরা আর এখানে প্রয়োজনের চেয়ে এক মুহূর্ত বেশি সময় দিতে পারব না। পরিকল্পনার কমপক্ষে দু সপ্তাহ আগে রওনা দিচ্ছি আমরা। আমেরিকান স্পেসক্রাফট ডিসকভারিকে কাজে লাগিয়ে লিওনভ বেরিয়ে যাবে।

বেসিক আইডিয়া খুবই সরল, বড় শিপটার সাথে বোঝার মতো জুড়ে দিয়ে শুরু করা হবে। ঠিক পথে যাওয়া শুরু করলে ডিসকভারির সব জ্বালানি শেষ হওয়ার পর এটাকে ঠিক খালি ফার্স্ট স্টেজের মতো ফেলে দেয়া হবে-লিওনভ প্রথম স্পার্ক করবে ঠিক সে সময়। আগে লিওনভ জ্বলবে না, তাহলে মরা ডিসকভারির পেছনে শক্তি খরচ করা হবে। আমরা স্পেস ট্রাভেলের আরো একটা চালাকি কাজে লাগাব। আমাদের উদ্দেশ্য বৃহস্পতিকে ছাড়িয়ে যাওয়া হলেও, প্রথমে যত কাছে পারি যাব। আগে একবার আমাদের গতি কমিয়ে শিপটাকে অর্বিটে আটকে দেয়ার জন্য এ কাজ করেছি। এবার আর অত কাছে যাচ্ছি না।

আমাদের প্রথম প্রজ্বলন হবে আইওর সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার উপরের অর্বিটে। ফলে সরাসরি বৃহস্পতির দিকে পড়তে শুরু করব। বায়ুমণ্ডলে ঢুকে একেবারে কাছে চলে যাবার সাথে সাথে সব ফুয়েল জ্বলে উঠবে যাতে সাঁই করে লিওনভের স্পিড বেড়ে যায়, তারপরই পৃথিবীর অর্বিট।

এমন পাগলা পরিকল্পনার গাণিতিক ব্যাখ্যা একেবারে জটিলতম অঙ্কের কাজ ছাড়া এটা শেষ করা সম্ভব না। কিন্তু আমরা সাধারণ নিয়মগুলোকে এজন্যই কাজে লাগাব। যেহেতু বৃহস্পতির অসীম আকর্ষণে পড়তে দিচ্ছি আমাদের, গতি পাব, এটাই এনার্জি। আমরাটা হচ্ছে আমাদের দুনৌকা আর তাদের ফুয়েল। জানি, কী ভাবছেন, দুনৌকায় পা দিয়ে মরার অবস্থা হবে? আমরাতো মরেই আছি এখানে।

ফুয়েলটাকে ঠিক সেখানেই বার্ন করব যেটাকে লোকে বলে বৃহস্পতির আকর্ষণ কুয়া। উপরে ওঠার কোনো চেষ্টাই চলবে না। আমাদের রিয়্যাক্টরগুলো বাস্ট হলেই সেটার কাজে সরাসরি লাগবে এ কাইনেটিক এনার্জি গতিশক্তি। আমরা পৃথিবী ফেরার দোলনা বানাচ্ছি বৃহস্পতিকে…খুব একটা আরামদায়ক দোলনা না নিই। আর বিপরীতে কাজ করবে বায়ুমন্ডল। এর বাধার কারণে গতি কিছুটা কমবে, কুয়াতে পড়ে যাব না। শুধু ঠিকমতো হিসাব করতে হবে কৌণিক গতিশক্তির ব্যাপারগুলো। আর, এট খুব কমই হয়। মাতা প্রকৃতি দু-দিকেই সাফল্য খুব কম দেন, এই যা ভয়…

কাজ করবে এই তিন শক্তি, বৃহস্পতির আকর্ষণ, ডিসকভারির ফুয়েল আর ডিসকভারির বাড়তি ভরের কারণে বাড়তি গতি। আমরা পাঁচ মাস পর পৃথিবীতে আসছি। খুবই দ্রুত। অন্যভাবে চেষ্টা করলে অন্তত দু মাস বেশি লাগত।

আপনারা একেবারে চিন্তায় পড়ে যাবেন বুড়ো ডিসকভারির কী হবে তা ভেবে। পরিকল্পনা অনুসারে এটাকে আর অটোম্যাটিক যান হিসেবে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারছি না। ফুয়েল ছাড়া এর গতিই হবে না। কিন্তু ঠিক থাকবে। একের পর এক চক্কর মেরে যাবে বৃহস্পতির বিরাট এক অর্বিট ধরে। ফাঁদে পড়া ধূমকেতুগুলোর মতো ডিম্বাকার পথে ঘুরবে। পরের কোনো অভিযান মিলতেও পারে ওটার সাথে। কিন্তু তাদের অনেক বাড়তি ফুয়েল দরকার হবে এটাকে নিয়ে আসতে হলে। মনে হয় সামনের কয়েক বছরে সম্ভব না। এখন রওনার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। অনেক কাজ বাকি। ফাইনাল বার্ন না হওয়া পর্যন্ত বিরাম নেই।

আমাদের সব কাজ করতে পারিনি, তবু গ্রহরাজকে ছেড়ে যেতে এক বিন্দু আফসোস নেই কারো। বিগ ব্রাদারের উবে যাওয়ার রহস্য…নাকি হুমকি, যাই হোক, আজো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেটাকে নিয়ে করার মতো কিছুই নেই আমাদের।

যতদূর সম্ভব করেছি আর এবার ফিরছি বাড়িতে।
হেউড ফ্লয়েড বলছি, যোগাযোগ বন্ধ করলাম।

আশপাশের সবাই একটা কৃত্রিম আওয়াজ তুলল। কিন্তু এ আওয়াজটাই লাখ-কোটি গুণ জোরালো হয়ে উঠবে; মেসেজটা পৃথিবীতে আগে পৌঁছাক। একটু লজ্জা পেয়ে ফ্লয়েড সবাইকে বলল, আমি তোমাদের সাথে কথা বলছি না। চাইনি তোমরা শোন। যাই হোক…।

ঠিক কাজটাই করেছ, হেউড। তানিয়া স্বাভাবিক সুরে বলে, আমাদের সবাই তোমার প্রত্যেক কথার সাথে একমত, যা পৃথিবীর মানুষকে শোনালে।

আমি পারছি না একমত হতে। চন্দ্রের মৃদু কণ্ঠ শুনে সবাই চুপ মেরে গেল, একটা সমস্যা রয়ে গেছে।

অবজার্ভেশন লাউঞ্জ হঠাৎ একেবারে শান্ত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো ফ্লয়েড বাতাস ডাক্টের মৃদু শব্দ শুনতে পেল। ওয়াল প্যানেলের পেছনে আরো একটা যান্ত্রিক আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আর সব স্পেস শিপের মতো লিওনডেও নানা ধরনের আওয়াজ সব সময় হতেই থাকে। কিছু কিছু একেবারে নিরব অবস্থায় শোনা যায়।

আমি কোনো সমস্যা দেখছি না, চন্দ্র। শান্তভাবে তাকিয়ে আছে তানিয়া, কী প্রব্লেম হতে পারে?

কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি হাল-কে পৃথিবীর কক্ষপথের দিকে হাজার দিনের যাত্রার জন্য প্রস্তুত করছি। এখন সব প্রোগ্রাম নষ্ট করতে হবে।

স্যরি, আমরা সবাই এ ব্যাপারে দুঃখিত, তানিয়া বলল, কিন্তু পরিস্থিতি এত খারাপ যে…।

আমি এ কথা বলিনি, চন্দ্রকে চিন্তিত দেখাচ্ছে, কণ্ঠের ঢেউয়ে বিস্ময়। এর আগে কোনোদিন কাউকে ডক্টর চন্দ্রশেখর কথার মাঝে থামিয়ে দেয়নি, তানিয়াকে তো নয়ই।

মিশন টার্গেটের জন্য হাল কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা সবাই জানি। একটু নিরবতা নিয়ে বলে যাচ্ছে সে, এখন তোমরা এমন কোনো প্রোগ্রাম দিতে বলছ যা

ওর মৃত্যু ডেকে আনবে। এ পরিকল্পনা ডিসকভারিকে একটা স্থিত অর্বিটে নিয়ে যাবে এ কথা ঠিক, কিন্তু যদি সেই ওয়ার্নিংয়ের মানে শিপের উপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে? আমরা জানি না। কিন্তু এ চিন্তাই আমাদের ভয় পাইয়ে দেবে। এ অবস্থায় হালের রিঅ্যাকশন কী হবে ভেবেছ কেউ?

তুমি কি সিরিয়াসলি বলছ যে, তানিয়া সেই ঠাণ্ডা সুরে বলে যাচ্ছে, হাল মিশনের আগ মুহূর্তে অর্ডার নাও মানতে পারে, গত মিশনের মতো?

গতবার কিন্তু তা হয়নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ও মনে রেখেছে নিজের মিশনের কথা। অর্ডার মানার চেষ্টা করেছে।

তাহলে এবার আর কোনো সমস্যা হবে না। সব ঠিকঠাক।

আমাদের কাছে পরিস্থিতি ঠিক হতে পারে, কিন্তু হালের সবচে জরুরি মিশনের একটা হল ডিসকভারিকে বিপদের বাইরে রাখা। ও সেটাই মানার চেষ্টা করবে। আর হালের মতো জটিল সিস্টেমের কোনো একটা নীতিকে বদলে দেয়া বা অগ্রাহ্য করা খুব কঠিন।

আমি খুব বেশি বাস্তব সমস্যা দেখি না। শাসা নাক গলায়, আমরা তাকে কোনো ঝুঁকির কথা বলব না। তখন সে…তার প্রোগ্রাম চালানোর সময় কোনো রিজার্ভেশন রাখবে না। এটাকে অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখবে না।

একটা পাগলা কম্পিউটারকে বাচ্চার খেলনা দিয়ে বুঝ দেবে? মুখ ভেঙুচাচ্ছে কার্নো, আমার মনে হয় কোনো দ্বিতীয় স্তরের সায়েন্স ফিকশন নাটকে কাজ করছি। ডক্টর চন্দ্র তার দিকে চেয়ে আছে শত্রু-শত্রু ভাব নিয়ে।

চন্দ্র, হঠাৎ যেন তানিয়া ভয় পেয়েছে, এ নিয়ে হালের সাথে কথা বলেছ?

না।

এক বিন্দু ইতস্তত ছিল কি কথাটায়? ফ্লয়েড সন্দেহ করছে। হয়ত হাল পুরোপুরি নিষ্পাপ, চন্দ্র এর মেমরি পুরোপুরি চেক করে থাকতে পারে। নাকি মিথ্যা কথা? কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।

তাহলে শাসার কথামতো নতুন একটা প্রোগ্রাম লোড করতে দিয়ে বাকিটা তার হাতেই ছেড়ে দেব।

যখন সে আমাকে প্ল্যান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করবে তখন?

তোমার উস্কানি ছাড়া ও কি তা করবে?

অবশ্যই। প্লিজ, মনে করে দেখ, ওর ডিজাইন ছিল আগ্রহ আর জানতে চাওয়ার জন্য বানানো। কুরা যদি নিহত হয়েও থাকে, সে অবশ্যই মিশন চালানোর ক্ষমতা রেখেই করেছে বাকিটা।

কথাটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল তানিয়া, এখনো এটা এক সাধারণ সমস্যা। সে তোমাকে মানবে। বিশ্বাস করবে। তাই না?

অবশ্যই।

তাহলে তুমি অবশ্যই তাকে বলবে যে ডিসকভারির কোনো ভয় নেই। এ মিশনটা সম্মিলিত, এর মাধ্যমেই ডিসকভারিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেয়া হবে, কদিন পরে।

কখাটাতো মিথ্যা।

আমরা জানি না এটা মিথ্যা কিনা। এবার জবাব দিল তানিয়া একটু অধৈর্যের সাথেই।

আমরা ধরেই নিয়েছি সামনে মহাবিপদ। নাহলে শিডিউলের বাইরে এভাবে দৌড়াতাম না।

তাহলে তুমি কী করতে বল? এবার কথায় স্পষ্ট বিরক্তি।

যতটা জানি তাকে সব সত্যি কথাই বলতে হবে। কোনো আধা সত্যি বা মিথ্যা। পুরো সত্যি। তার পর তার সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দাও।

ইস, খোদা! চন্দ্র! ও শুধুই একটা মেশিন।

চন্দ্র এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালো ম্যাক্সের দিকে যে তরুণ ছেলেটা সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলে, আমরা সবাই তা, ডক্টর ব্রেইলোভস্কি। এখানে শুধুই উপাধির ব্যাপার, আর কিছু না। আমরা কার্বনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছি আর ও সিলিকন। কোনো পার্থক্যই নেই। আমাদের প্রত্যেককে যথেষ্ট সম্মানের সাথে দেখা উচিত।

অবাক ব্যাপার! ফ্লয়েড ভাবছে, কীভাবে-ঘরের সবচে খাট লোকটাকেই এখন মনে হচ্ছে সবচে বড়। কিন্তু সংঘাত এগিয়েছে অনেকদূর। যে কোনো মুহূর্তে তানিয়া সরাসরি অর্ডার ইস্যু করা শুরু করে দিবে। পরিস্থিতি হয়ে যাবে একেবারে বিশ্রী।

তানিয়া, ভ্যাসিলি, আমি কি তোমাদের সাথে একটু কথা বলে নিতে পারি? সমস্যার একটা পথ বের করা যায়।

ফ্লয়েড যে কথা বলল সবাই বেশ সহজে নিয়েছে। দু মিনিট পরে অর্লোভদের সাথে তাদের কোয়ার্টারেই বিশ্রাম করছিল সে।

থ্যাঙ্ক ইউ, উডি, আমি জানতাম তুমি এ কাজ করবে। হাতার ভিতর এটাকে লুকাবে কী করে? বলছে তানিয়া। সমস্যা দেখা দিয়েছে তানিয়ার গিফট নিয়ে। ফ্লয়েড আজারবাইজান শুমাখা পছন্দ করে। কিন্তু তার চিন্তা এখনো মদের কয়েক সেন্টিমিটারের মধ্যে ঘুরছে না। আনন্দিতভাবে সে বলল, চন্দ্ৰ কঠিন হলে আমার দুঃখ পেতে হবে।

আমারও। যাক, তাও শুকরিয়া। আমাদের সাথে আছে মাত্র একজন পাগলা বিজ্ঞানী।

এ কথাটা কিন্তু তুমি আমাকে বল না। ভ্যাসিলি একটু কৌতুক করল, হয়ত তানিয়ার সেই দ্বিতীয় পাগলটা ফ্লয়েড অথবা ভালবাসার আতিশায্যে ভ্যাসিলি নিজেই। চলো, উডি, শুরু করা যাক।

এটাই আমি বলছি, চন্দ্রকে নিজের মতো চলতে দাও, করতে দাও। তারপর মাত্র দুটো সম্ভাবনা থাকে। হয় হাল আমাদের কথামতো চলবে, দু প্রজ্বলন মুহূর্তে কাজ করবে ঠিকমতো, নাহয়…আইওর পথ থেকে চলে যাওয়ার পর আমাদের হাতে অনেক সময় থাকবে। এটাই আমাদের সামনে হাল-কে পরীক্ষা করিয়ে নিবে।

কিন্তু সময়মতো কি কাজ হবে? একেবারে নিখুঁত ভেক্টর আর জ্বালানি খরচ, তার সাথে শিপ কন্ট্রোল-কম্পিউটারটা দরকার।

ম্যানুয়ালি…মানে হাতে হাতে সম্ভব?

আমি এ কাজটাকে অন্তর থেকে ঘেন্না করি। একচুলের হাজার ভাগের একভাগ ভুল করার পর বৃহস্পতির দিকে ছুটতে ছুটতে জ্বলে যেতে হবে, নাহয় চিরস্থায়ী উপগ্রহ। হাজার বছর ধরে।

তোমার হাতে যদি কোনো বিকল্প না থাকে?

ভাল, সময় মতো কন্ট্রোল নিতে পারব যদি সম্ভাব্য দু অর্বিটাল ঠিক করে রাখতে পারি-হুম! বেঁচেও যেতে পারি-হয়ত।

তোমাকে যতটুকু চিনি, ভ্যাসিলি, হয়ত কথাটার মানে হল, হবে। এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার দিকে যাই-হাল এক বিন্দু তেড়িবেড়ি করলে সোজা কাজ করব।

মানে-ডিসকানেক্ট?

ঠিক।

গতবার কাজটা সহজে হয়নি।

তারপরই আমরা কয়েকটা শিক্ষা পেয়েছি। আমার উপর ছেড়ে দাও। আধ সেকেন্ডের মধ্যে তোমার হাতে কন্ট্রোল তুলে দেব।

আশা করি হাল এক বিন্দু সন্দেহ করবে না।

না-তুমি সন্দেহবাতিকে ভোগা শুরু করেছ, ভ্যাসিলি। হাল মানুষ না। কিন্তু চন্দ্র মানুষ-তাই সন্দেহ করা যায় তাকে। কিন্তু তাকে কেউ কিছু বলবে না। তার প্ল্যানের সাথে আমরা সবাই রাজি হব। আমরা দুঃখিত হব এ ভেবে যে তার সাথে তর্ক করতে গিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করব যে হাল সব ঠিকঠাক চালাবে। ঠিক, তানিয়া?

ঠিক, উডি, তোমার দারুণ পরিকল্পনা কাজে লাগুক। আর সেই ছোট গেজেটটা দারুণ আইডিয়া।

কোন গেজেট? অবাক হয়েছে ভ্যাসিলি।

কয়েকদিনের মধ্যেই ব্যাখ্যা করব। স্যরি, উডি, এটুকু শুমাখাই আমার ছিল। বাকিটা রেখে দিতে চাইনিরাপদে পৃথিবীর পথে যখন থাকব, তখনকার জন্য।

৪৬. কাউন্ট ডাউন

আমার ছবি না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। শিপ দুটোকে আধ কিলোমিটার দূরে একত্র করে ভাবল ম্যাক্স ব্রেইলোভস্কি। সে হাস্যকরভাবে ডিসকভারিকে ঠেলে দিয়েছে লিওনভে থেকে। এ ছোট রাশিয়ান শিপটাকে সে পুরুষ ধরে নিয়ে আমেরিকানটাকে সরিয়ে আনছে। এটাকেই কোনো এক প্রাচীন কসমোনট বলেছিল মিশন ক্লাইমেক্স।

তার সতর্ক জরিপের মাধ্যমে এটুকু নিশ্চিত করা গেছে যে সব চলছে ঠিকঠাক। কিন্তু কাজটা ধারণার চেয়েও কঠিন আর সময়সাপেক্ষ। সে জানে, দু কাজে সার্থক হওয়ার কথা থাকলেও ভাগ্যদেবী খুব কমই দুদিকে সাফল্য দেয়। লিওনভ কয়েক কিলোমিটার কার্বন টেপ নিয়ে এসেছিল। একটা মেয়ে তার চুল বাঁধতে সারা জীবনে যতটুকু ফিতা ব্যবহার করে, তারচে বেশি হবে না। মাত্র কয়েক টন। এগুলো আনা বিগ ব্রাদার অভিযানের জন্য। সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে এভাবেই চেষ্টা করতে হত। আশা করা হচ্ছে এ ফিতা ত্বরণকে বাধা দেবে। মাধ্যাকর্ষণের দশভাগের একভাগ তুরণে কোনো সমস্যা যাতে না হয়, ছিঁড়ে যাওয়া বা ঝকি…তাও ভাল, সবচে বেশি স্পিডে মাধ্যাকর্ষণের দশ ভাগের এক ভাগ ত্বরণ হয়।

ফিরে আসার আগে আরো কিছু কি চেক করতে হবে? জিজ্ঞেস করল ম্যাক্স।

না। তানিয়া জবাব দিল, সবই ভাল মনে হচ্ছে। আর নষ্ট করার সময়ও নেই।

সত্যি। সেই রহস্যময় ওয়ার্নিং যদি সিরিয়াসলি নিতে হয়-এর মধ্যে সবাই সিরিয়াসলি নিয়েছে-তাহলে পালানো শুরু করতে হবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।

ঠিক আছে। আমি নিনাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনব। এটার জন্য কষ্ট হচ্ছে, পুরনো মেয়ে।

তুমি কখনোই বলোনি যে নিনা একটা ঘোড়া।

এখনো বলছি না। তবু, এই মহাশূন্যে তাকে ছেড়ে দিতে কেমন যেন লাগে। একে ছাড়ব শুধু সেকেন্ডে কয়েক মিটার বেশি গতি পাওয়ার জন্য।

আর কয়েক ঘণ্টা পরে সেই গতির কাছেই কৃতজ্ঞ থাকব আমরা সবাই, ম্যাক্স। যাই হোক, একটা চান্স আছে, একদিন না একদিন তাকে ঠিকই তুলে নেবে কেউ না কেউ এসে।

আমিও তাই ভাবি। ভাবল ম্যাক্স। আর যদি একে চিরদিনের জন্য ছাড়তেও হয়, তাই সই। বৃহস্পতির সাম্রাজ্যে মানুষের প্রথম অভিযানের স্মৃতি চিরদিন ঘুরপাক খেয়ে চলুক।

খুব ভদ্রভাবে, যত্নের সাথে সে নিনাকে ডিসকভারির লাইফ সাপোের্ট গোলকের বাইরে নিয়ে আসে। তার সহকর্মীরা খালি চোখেই তাকে দেখতে পায় যখন সে তাদের জানালার পাশ দিয়ে ভাসছে। খোলা পোড বে ডোর তার দিকে মুখ চোয় আর সে নিনাকে বাড়ানো ভকিং আর্মে নামিয়ে এনে সেই ডোরটার সাথে একটু ঠাট্টা করে নিল।

আমাকে ভিতরে টেনে তোল। ই ভি এ তে কড়ায়গায় এক কেজি প্রোপ্যাল্যান্ট আছে, নিনাকে শেষবারের মতো বিদায় দেয়ার জন্য।

সাধারণত কোনো জিনিসকে স্পেসে স্টার্ট করার মধ্যে ছোট এক নাটকীয়তা লুকিয়ে থাকে। ব্যাপারটা সাধারণ আগুন আর বজ্রের মতো না। সব সময়ই কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায়। অন্তত যখন একটা গ্রহের এলাকায় কাজটা করা হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে, একটা যন্ত্র সর্বোচ্চ মানের কাজ না দিতে পারলে-হয়ত মূল যন্ত্র কাটিয়ে উঠতে পারে। হয়ত সঠিক অর্বিটের জন্য অপেক্ষাও করতে পারে কেউ কেউ। আর নাহলে…

কিন্তু এখন, কাউন্ট ডাউন শুরুর পর, দু শিপেই টেনশনের কাঁপন বোঝা যায়। প্রত্যেকেই জানে-এটা হালের প্রথম পরীক্ষা। শুধু ফ্লয়েড, কার্নো আর অর্লোভ জানে বিকল্পের কথা। কিন্তু কেউ জানে না সেটা কাজ করবে কিনা।

গুডলাক, লিওনভ বলল মিশন কন্ট্রোল। এটা ইগনিশনের পাঁচ মিনিট আগে শুনতে পাবে কুরা, আশা করি সব ঠিকমতো চলছে আর যদি সমস্যা না হয় তো অক্ষরেখার কাছাকাছি বৃহস্পতির কয়েকটা ছবি তুললে ভাল হয়। অক্ষাংশ হবে একশো পনের। একটা রহস্যময় কালো দাগ দেখা যায় সেখানে। কোনো আগ্নেয়গিরি বা অন্য কিছু হবে হয়ত। কমপক্ষে হাজার কিলোমিটার, নিখুঁত, গোলাকার। একটা উপগ্রহের ছায়ার মতো লাগবে দেখতে। কিন্তু তা হতে পারে না।

তানিয়া প্রায় ভদ্র কথায় ছোট একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে সাথে সাথে। এ মুহূর্তে তাদের কারোই বৃহস্পতির ভূগোল নিয়ে আগ্রহ নেই। ভাটা পড়েছে। মিশন কন্ট্রোল প্রায়ই দক্ষতা আর সময় কৌশলের দিক দিয়ে গাধামি করে। এখন বৃহস্পতি গবেষণার সময়।

সব সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে। বলল হাল, ইগনিশনের দু মিনিট বাকি।

অবাক ব্যাপার। ভাবছে ফ্লয়েড, কীভাবে জন্মের এত পরেও সায়েন্সের ব্যাপারগুলো মেশিনে আসন গেড়ে বসে থাকে! ইগনিশন শব্দটা শুধু কেমিক্যাল রকেটের ক্ষেত্রে বাস্তব। এমনকি যদি হাইড্রোজেন কোনো পারমাণবিক বা প্লাজমা ড্রাইভের মধ্যে অক্সিজেনের কাছাকাছি আসে, তাহলেই পোড়ার জন্য যেটুকু দরকার তারচে অনেক অনেক বেশি তাপ উৎপন্ন হবে। এ তাপমাত্রায় সব যৌগ তাদের মৌলে বিভাজিত হয়ে যায়। পোড়া বা ইগনিশনের মতো স্কুল ব্যাপার নেই।

তার মন আরো উদাহরণ খোঁজায় ব্যস্ত। আজো মানুষ-বিশেষ করে বুড়োরা বলে, ক্যামেরায় ফিল্ম বা গাড়িতে গ্যাস ইগনিশন! এমনকি রেকর্ডিং স্টুডিওগুলোতে এখনো শোনা যায়, টেপ কাটা শব্দটা। অথচ সেই টেপ আর তা কেটে কাজ করার পর পুরো দু প্রজন্ম চলে গেছে।

ইগনিশন আর এক মিনিট পর।

তার মন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তাও…এই দীর্ঘতম মিনিটটা কাটছে না। গত শত বছরের মধ্যে এটাই যেন সবচে লম্বা মিনিট। এখন কাউন্ট ডাউনের কারণেই এত লম্বা লাগে। এর পর তাদের কী হবে?

বার বার ফ্লয়েড হাত দিয়ে বসছে পকেটের উপর। যেন এক মুহূর্তের জন্য হাতটা সরালেই কাট-আউটটা হাওয়া হয়ে যাবে। যুক্তি বলছে হাল একটু এদিক সেদিক করতে নিলেও তাকে শেষ করে দেয়ার যথেষ্ট সময় থাকবে। আর হাল যদি না-ই মানে, সেটা…আর যাই হোক, দুর্ঘটনা হবে না। সবচে ভয়ংকর সময় আসবে বৃহস্পতি ছাড়ানোর সময়টায়।

ছয়…পাঁচ…চার…তিন…দুই…এক…ইগনিশন!

প্রথমে টানটাকে সহজেই কাটানো গেল। মাধ্যাকর্ষণের দশভাগের একভাগ করতে পুরো দশ সেকেন্ড চলে যায়। সবাই কথাবার্তা শুরু করে দিলে তানিয়া থামার ইশারা করল। অনেক কিছু চেক করে দেখা বাকি, এমনকি হাল যদি তার কাজগুলো ঠিকমতো করতে থাকে, তারপরও এমন অনেক কিছু আছে যেটা বাদ পড়ে যেতে পারে।

ডিসকভারির এন্টেনা মাউন্ট নিয়েছে লিওনভের বেশিরভাগ ভর। এটার কোনোদিনই এমন ভারবাহী হওয়ার কথা ছিল না। অবশ্য শিপের অবসরপ্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলেছেন যে এটাকে যথেষ্ট কাজে লাগানো যাবে। কিন্তু তিনি ভুল করে থাকতে পারেন, দশটা বছর স্পেসে খোলা ছিল জায়গাটা, কী হয়েছে কে জানে…

হয়ত দু শিপের মাঝে বাধার ফিতাগুলো ঠিকমতো জুড়ে দেয়া যায়নি। ছিঁড়তে পারে, ফসকে যেতে পারে। অকেন্দ্রিক ভরের কারণে ডিসকভারি ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। এর পিঠে এখন হাজার টনি বোঝা। ফ্লয়েড এমন ডজন ডজন কারণ বের করতে পারবে যার একটু এদিকসেদিক হলেই হল! একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে। যদি বারোটা সম্ভাবনা ঠিকমতো উতরে যায়, তো তের নম্বরটা ঘাপটি মেরে বসে আছে।

কিন্তু মনের ভিতরটাকে খুঁড়ে খুঁড়ে চলেছে একের পর এক মিনিট। ডিসকভারির ইঞ্জিন যে চলছে তার একমাত্র প্রমাণ হল এক বিন্দু গ্র্যাভিটি আর অতি সামান্য কম্পন-যা দু শিপের দেয়ালে বাঁধা পেয়ে আরো মৃদু হয়ে তাদের কাছে পৌঁছায়। আইও আর বৃহস্পতি গত কয়েক সপ্তাহ যেখানে ছিল সেখানেই বসে আছে, আকাশের প্রান্ত দুটোয়।

দশ সেকেন্ডের মধ্যে কাট অফ হবে। নয়… আট… সাত… ছয়… পচ… চার… তিন… দুই… এক… এখন!

ধন্যবাদ, হাল। বাটনের উপর হাত এখনো।

গত এক প্রজন্ম ধরে আরো একটা কথা প্রচলিত, টাচ প্যাডগুলো বাটনের জায়গা দখল করে বসেছে। কিন্তু সব কাজের ক্ষেত্রে না। জটিল সময়ে এমন একটা ডিভাইস খুবই জরুরি যেটা একটা মাত্র ক্লিকে কাজ সারে।

আমি নিশ্চিত, বলছে ভ্যাসিলি, পথের মাঝখানে যাওয়া পর্যন্ত কোনো সংশোধনের দরকার নেই।

গ্ল্যামারাস, সুদর্শনা আইওকে বিদায় জানাও সবাই। এরা হল রিয়েল এস্টেট ব্যবসার স্বপ্নপুরী। চিৎকার করছে কার্নো, আমরা সবাই তোমাকে মিস করতে পছন্দ করি, ডিয়ার আইও!

এতদিনে ফিরে এল পুরনো ওয়াল্টারের সুর! ভাবছে ফ্লয়েড। এমন একটা ভাব নিয়ে শেষ কয়েক সপ্তাহ সে কাটিয়েছে, যেন তার মনে খুব চিন্তার কিছু একটা আছে! (কার ছিল না!) তার বেশিরভাগ অবসর সময় কাটত ক্যাথেরিনার সাথে গল্প করে, ফ্লয়েড মনে করে তার কোনো মেডিক্যাল সমস্যা নেই।

এই একটা ব্যাপারে তারা যথেষ্ট ভাগ্যবান। এতদিনে মেডিক্যাল কমান্ডারের করার মতো কঠিন একটা কাজ পাওয়া গেল আর এতদিনে কার্নোর তার সাথে গল্পের একটা সুযোগ চলে এল।

তোমার দয়ামায়া নেই, ওয়াল্টার? বলেছিল ব্ৰেইলোভস্কি।

আরে, আছে মানে? আমিতো আইওসুন্দরীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। ঐ লাভা লেকগুলো নৌকা বাওয়ার জন্য চমৎকার হত। লাল গলা ধাতুর উপর দাঁড় টানতে একটু কষ্ট হত-থকথকে, কিন্তু কী সুন্দর!

আর আগ্নেয়গিরির মধ্যে গ্রিল্ড খাবার গ্রিল করে বার্বিকিউ পার্টি আর জেনুইন গলা সালফারে সালফার বাথ?

প্রত্যেকেই অনেকটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কারো কারো মন আবার ইতিহাসের পাতা খুঁড়ে বের করছে অতীতকে। অথচ সামনে সবচে কঠিন সময়, এর মধ্যে প্রথম পদক্ষেপটাই শুধু ঠিকমতো নেয়া হল তাতেই এত আনন্দ।

বাড়তি খুশিটাকে তানিয়া বেশিদূর এগুতে না দিয়ে সবাইকে যার যার কাজে যেতে বলল, মানে কাজে যারা আছে, বকবক করছে তারাই, বাকিদের নির্দেশ দেয়া হল নিজের কেবিনে গিয়ে ঘুম দিতে। কারণ বৃহস্পতি-দোলন আর মাত্র নয় ঘণ্টা সামনে। যখন বাকিরা আস্তে ধীরে নড়ছিল, যেতে চাচ্ছিল না, তখন শাসা চিৎকার করে উঠল, তোমাদের সবাইকে কাজে এবং ঘুমে ফাঁকি দেয়ার জন্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আমরণ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, মিউটিনির কুকুরেরা!

মাত্র দু রাত আগে একটা বিরল বিশ্রাম হিসেবে তারা মিউটিনি অন দ্য বাউন্টির চার নম্বর পর্ব দেখে। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন নিয়ে হাস্যকর কিছু ব্যাপার ছিল। তারপরই সব গড়বড়। এমন কিছু হয়েছে শিপে যা আগে তানিয়া কল্পনাও করেনি। কাপ্তানকে নিয়ে ঠাট্টা!

দু ঘণ্টা কোকুনে শুয়ে ঘুমের চেষ্টার পর ফ্লয়েড অবজার্ভেশন ডেস্কে ফিরে এল। বৃহস্পতিকে আরও বড় লাগে। আস্তে আস্তে আঁধার ঘনিয়ে আসে, কারণ এবার অন্ধকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জোড়া নৌকা। একটা বিশাল, মহাচাকতি-অসীম রহস্য বুকে নিয়ে অনেক বর্ণনা মাথায় তুলে থমকে আছে যেন। চোখ ধাঁধানো সাদা থেকে কটকটে লাল-সব রং খেলছে তার বুকে। কালো কালো উদগীরণ কোনো সে। দূরত্ব পার করে উপরে উঠছে! আবার আছে গ্রেট রেড স্পটের ডিমের মতন ঘূর্ণি। একটা গোলার মতো ছায়া পড়েছে, ইউরোপার হতে পারে। চোখ দেখে শেষ করতে পারবে না গ্রেট রেড স্পটের এলাকা। ফ্লয়েড ভাবল হয়ত ছায়াটা একটু পরই সরে যাবে। অবাক চোখে দেখছে বৃহস্পতিকে, শেষবারের মতো। যদিও ছটার সময় তাকে পুরো কোমর বেঁধে কাজে নামতে হবে-তবু এ সময় ঘুমিয়ে থেকে এ সৌন্দর্যকে না দেখার মাধ্যমে পাপ করার কোনো মানে হয় না।

মিশন কন্ট্রোল তাদের যে স্পটটা দেখতে বলেছে সেটা কোথায়? এর মধ্যেই দেখা যাওয়ার কথা। তবু ফ্লয়েড নিশ্চিত বলতে পারবে না খালি চোখে দেখা যাবে কিনা। ভ্যাসিলির এ সৌন্দর্য দেখার সময় নেই। কিন্তু ফ্লয়েডে এখন সৌখিন এস্ট্রোনট হওয়ার এক সুযোগ এসেছে। মাত্র ত্রিশ বছর আগেও সে একজন এস্ট্রোনট হিসেবেই নিজের পেট চালিয়েছিল।

মূল পঞ্চাশ সেন্টিমিটার টেলিস্কোপটাকে সক্রিয় করে দেশ ভাগ্য ভালই। সামনের সবটা জায়গা ডিসকভারি দখল করেনি। দেখা যাচ্ছে। মাঝারি পাওয়ারে সেট করে অক্ষরেখা দেখা শুরু হল। এবার উঠে আসছে পুরা বৃহস্পতি। পরিস্থিতির চাপেই বলতে গেলে, ফ্লয়েড পুরো সৌরজগতের সেরা দশ বৃহস্পতিবিদের মধ্যে একজন। বাকি নজন তার চারপাশে কাজ করছে নাহয় ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে! দেখার সাথে সাথেই সে বুঝল, কিছু একটা মস্ত গণ্ডগোল আছে। ঐ গোল জায়গাটার মধ্যে। এটা এতই কালো যে মনে হচ্ছে মেঘও এর উপর নেই। তার মতে, এটা কোনো মসৃণ তলের পাহাড়-টাহাড় হবে। উপর থেকে দেখলে পুরো গোল দেখায়। এ অবস্থায় কয়েকটা ছবি তুলে পাওয়ার সবচে বেশি বাড়িয়ে দিল। এরই মধ্যে বৃহস্পতির দুত ঘোরার ফলে জিনিসটাকে আরো স্পষ্ট দেখাচ্ছে, আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে তারপর অস্ত যাবে অন্যদিকে।

ফ্লয়েড যত দেখে ততই অবাক হয়, ভ্যাসিলি, ইন্টারকম কথা বলে উঠল, একটা মিনিট নষ্ট করার মতো সময় থাকলে পঞ্চাশ সেন্টিমিটারের মনিটরে তাকাও।

দেখছ কী? জরুরি? আমি অর্বিট চেক করছিলাম।

তোমার তাহলে এখন দরকার নেই। মিশন কন্ট্রোলের বলা সেই স্পটের খোঁজ পেয়েছি। অদ্ভুত, অতি অদ্ভুত!

হায়রে! সব ভুলে যাওয়া উচিত ছিল আমার। মিশন কন্ট্রোলের লোকেরা অন্য সময় করতে পারত অনুরোধটা। দুনিয়ায় আরো লাখো লোক আছে এ কাজের জন্য। আমাকে আর পাঁচ মিনিট সময় দাও। এটা উবে যাবে না।

একেবারে সত্যি কথা, নিজেকেই বলছে ফ্লয়েড। এটা হাওয়ায় মিলিয়েতে যাবেই না বরং আরো স্পষ্ট হবে। দেখতে বলে কোনো ভুলই করেনি সেই পার্থিব..না, পার্থিব মানে পৃথিবীর, বলতে হবে চান্দ্র এস্ট্রোনোমাররা। ওরা খুবই ব্যস্ত ছিল। পৃথিবী আর চাঁদের সব মানুষের মতো টেলিস্কোপগুলোও তাকিয়ে ছিল বৃহস্পতির দিকে, হাঁ করে। তাই জিনিসটা চোখে পড়েছে। তাদের টেলিস্কোপ ফ্লয়েড যেটা ব্যবহার করছে তারচে হাজার গুণ বড় আর ভাল।

কিন্তু সেটা আস্তে আস্তে আরো বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। প্রথম মুহূর্তে ফ্লয়েড একটু অস্বস্তি বোধ করছিল, এবার হঠাৎ যখন মনে হল এ স্পটটা কোনো প্রাকৃতিক জিনিস না…না, হতেই পারে না। বৃহস্পতির অসম্ভব বিস্তৃত আর বিচিত্র প্রকৃতির কোনো না কোনো রহস্য হবে। এবার একটু থমকে যাচ্ছে সে।

জিনিসটা রাতের মতোই কালো, একদম ঘনাকার, স্পষ্ট দেখার পর বোঝা যায় একেবারে নিখুঁত বৃত্ত! প্রান্তগুলো আশ্চর্যরকম অস্পষ্ট, যেন সেখানে ঠিকমতো ফোকাস করা হয়নি। এটা কি কল্পনা, নাকি যখন সে দেখছিল তখন এ জায়গাটা এমন হয়েছে? খুব দ্রুত হিসেব করে ফেলল, না, এখন-এ মুহূর্তে জিনিসটা দু হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত। এখন এটা ইউরোপার ছায়ার চেয়ে একটু ছোট। কিন্তু এত বেশি স্পষ্ট যে এটা নিয়ে অনিশ্চয়তার কোনো সুযোগই নেই।

একবার দেখি, বলল ভ্যাসিলি, কী পেলে তুমি খুঁজে…ও…হ…! কণ্ঠটা নিস্তব্ধতার মাঝে পথ খুঁজে নেয়।

এটাই সেটাবলল ফ্লয়েড মনে মনে। তার মনটাও যেন বরফ হয়ে যাচ্ছে। যাই হোক না কেন…

৪৭. শেষ উড্ডয়ন।

এখনো কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না বৃহস্পতির বুকে একটা বিস্তৃত হতে থাকা বিন্দু কীভাবে বিপদের কারণ হতে পারে? এটা অসাধারণ, ব্যাখ্যার অতীত হতে পারে কিন্তু তাদের জীবনে আসতে থাকা সাত ঘণ্টার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর মাত্র সাত ঘণ্টা সামনে যে প্রজ্বলন অপেক্ষা করছে তার পর পৃথিবীতে ফিরতে ফিরতে এ নিয়ে ভাবার অনেক সময় পাবে।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ নিয়ে সব চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে ছুঁড়ে দিল ফ্লয়েড, তাকে জেগে উঠে কাজ করতে হবে। এটাতো অজানা। তাদের জানা ভয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবার বৃহস্পতিতে আসার সময় তার ভয় ছিল, ছিল শিহরণ আর প্রথম দেখার মজা। এখন তার কিছুই নেই। ভয় আর ক্লান্তি শিহরণকে দূরে সরিয়ে দেয়। তার উপর অনিশ্চয়তা। ফ্লয়েড একটা নিয়ম মানে, যে ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই সেটায় ভাবারও কোনো কারণ নেই; কোনো না কোনো সমাধান এসেই যাবে সময় মতো। তবু ভয় আছে কিছুটা, শিপের স-ব নিরাপত্তা ঠিকমতো দেখা হয়েছে তো?

যে কোনো শিপের যে কোনো সমস্যার বাইরেও আরো দুটা ভয় থাকে। এখনো টেপগুলো আলসেমি করেনি, তবে সামনে আসবে আসল গতি আর ঝাঁকি। আবার আছে সেই এক্সপ্লোসিভ, যেটা বিগ ব্রাদারের কাছে ফাটানো নিয়ে কথা উঠছে-সেরকম একটা দিয়েই টেপ বিচ্ছিন্ন করবে। উপরি পাওনা আছে হাল…

এখানে অর্বিটাল থেকে বেরুতে যে ধাক্কার দরকার সেরকম বিস্ফোরণ করার মতো প্রচুর বোমা আছে হাতে। ডিসকভারির শেষ জ্বালানিবিন্দু পর্যন্ত ডিসকভারিকে কাজে লাগানো গেছে আর কেউ আপত্তি করেনি। চন্দ্র সব ব্যাখ্যা করার পর হাল কি বুঝতে পারবে? মনে হয় না।

ফ্লয়েড আরো একটা সমস্যা নিয়ে পরল, গত কদিনে সেটাও কম ভোগাচ্ছে না। চূড়ান্ত সময় চলে আসবে, আকাশ জুড়ে দেখা দেবে বৃহস্পতি-মাত্র কয়েকশো কিলেমিটার নিচে, এমন সময় হালের ইলেক্ট্রিক গলা থেকে কথা বেরিয়ে আসবে যেন ঠাণ্ডা সুরে মন কেমন আছে জাতীয় প্রশ্ন করবে, ডক্টর চন্দ্র, একটা প্রশ্ন করলে কিছু কি মনে করবেন?

কিন্তু ঠিক এ পথে ব্যাপারটা হয়নি।

সেই বাড়তে থাকা গ্রেট ব্ল্যাক স্পট বৃহস্পতির দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে আড়ালে চলে গেছে। কয়েক ঘণ্টা পর এই শিপ দুটো খুব কাছাকাছি হয়ে যাবে সেই স্পটের। কিন্তু তখন রাত। দিনের আলোয় সেটাকে দেখার শেষ সুযোগ চলে গেছে।

এখনো বাড়ছে খুব দ্রুত। গত দু ঘণ্টায় আয়তন হয়ে গেছে দ্বিগুণ। এর ছড়িয়ে পড়া যেন পানিতে ঘন কালির ছড়িয়ে পড়ার মতোই। এখন বৃহস্পতির এলাকায় প্রসারিত হচ্ছে শব্দের গতিতে। এর গঠন বোঝা যায় না স্পেসশিপের সবচে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়েও।

গ্রেট রেড স্পটের মতো গ্রেট ব্ল্যাক স্পট কোনো চলমান গঠন নয়। অসংখ্য ছোট ডট দিয়ে ভিতরটা গঠিত, ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে কোনো প্রিন্টকে যেমন দেখায়। এর বেশিরভাগ এলাকায় ডটগুলো এমনভাবে ছড়ানো যেন একটা আরেকটার সাথে মিশেই গেছে। কিন্তু প্রান্তের দিকের ডটগুলো অনেক অনেক বিস্তৃত, তাই এর শেষটা স্পষ্ট কালো না হয়ে বরং মিশেছে ধূসর হয়ে।

লাখ লাখ ডট আছেই। অনেকটাই যেন লম্বাটে, ডিম্বাকার। ক্যাথেরিনাকে বলা হয় শিপের সবচে কম চিন্তা করা কু-সে একটা কথা বলে সবাইকে অবাক করে দেয়। কেউ কালচে ভাত ঢেলে দিয়েছে বৃহস্পতির বুকে।

এখন সূর্যটা ঢলে পড়ছে বিরাট বৃহস্পতির পেছনে। আর লিওনভ উঠে এসেছে বৃহস্পতির রাতের আকাশে। আর ত্রিশ মিনিটের মধ্যে ফাইনাল বার্ন। এবার ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে খুব তাড়াতাড়ি। ফ্লয়েড যদি চন্দ্র আর কার্নোর সাথে ডিসকভারিতে থাকতে পারত! তার অবশ্য কিছুই করার নেই, চরম মুহূর্তে শুধু কাট আউট করে দিতে পারত। কাট অফ সুইচ কার্নোর পকেটে আর ফ্লয়েড জানে যে তরুণ ছেলেটা তার চেয়ে অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। হাল যদি এক বিন্দুও নষ্ট হওয়ার লক্ষণ দেখায় তাহলে সবার আগে কার্নো এক সেকেন্ডের মধ্যেই কাজ সেরে ফেলবে। কিন্তু হঠাৎ ফ্লয়েড বুঝতে পারছে, এমন কিছুর দরকার পড়বে না। চন্দ্র সহায়তা করবে, যদি ম্যানুয়াল কন্ট্রোল নিতেই হয়। ফ্লয়েড এটুকু বিশ্বাস করে যে চন্দ্র যা বলে তা ঠিকই করে।

কার্নো এতটা নিশ্চিত নয়। সে ফ্লয়েডকে বলেছে, এক সেকেন্ডের চেয়েও যদি বেশি সময় লাগে, লাগবে চন্দ্রের জন্যই। রাতের আকাশ অনেক বেশি সুন্দর দেখায়। চারপাশের উপগ্রহের ঠিকরে পড়া আলোয় কী অদ্ভুত সুন্দর লাগে বৃহস্পতির মেঘমালাকে! তার উপর আলোক-সক্রিয় বিক্রিয়া আর পৃথিবীর চেয়ে লম্বা বিজলী রাতের আঁধারকে সরিয়েছে আরো দূরে।

একটু মুচকি হেসে সূর্য বিদায় নিল আজকের মতো। আর তারপরই আবার দেখা দেয়। তাদের বরং তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার চিন্তা করা উচিত।

ইগনিশনের বিশ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে।

ধন্যবাদ, হাল।

চন্দ্র সত্যি কথা বলে থাকলে আমি বরং অবাক হব…ভেবেছিল কার্নো যখন চন্দ্র বলেছে যে সে ছাড়া অন্য কেউ হালের সাথে কথা বললে সে হয়ত ধাঁধায় পড়ে যাবে। কেউ না থাকলে আমি তার সাথে সব সময় কথা বলেছি। সবসময় সে আমাকে ঠিকমতো বুঝতে পারে। আর এখন তার সাথে বন্ধুত্বের কথা বলার মতো সময় কারো নেই, যদিও এটা সমস্যা কাটাতে পারত।

হাল সত্যি সত্যি চিন্তা করতে জানলে মিশন নিয়ে কী ভাবছে? সারা জীবন কার্নো নিজেকে নিয়ে একটা ঠাট্টা করে গেছে, কোনো দার্শনিক মার্কা কথাবার্তার সামনে পড়লেই, আমি হলাম নাট-বল্টর মানুষ। এমনকি স্পেসশিপেও সে এ দাবীই করত। অন্য সময় হলে হেসে কুটিকুটি হওয়া যেত যেটা ভেবে-সেটাই তাকে ভাবাচ্ছে বার বার, হাল যদি সত্যি চিন্তা করতে জানে, যদি না-ও জানে, শুধু জানতে পারে যে মহাকাশে ছেড়ে চলে যাওয়া হচ্ছে তাকে, মেনে নিতে পারবে? কার্নোর হাত নিজের অজান্তে আবারো কাট-অফ সুইচের দিকে চলে যাচ্ছিল। সংযত করল নিজেকে। এর মধ্যেই কাজটা এতবার করে ফেলেছে ও, চন্দ্র যে কোনো সময় সন্দেহ করে বসতে পারে।

পরের ঘণ্টায় যা করতে হবে, ভেবেই ও আরো শতবার হাত বাড়িয়েছে। ডিসকভারিকে ছেড়ে দেয়ার মুহূর্তে একেবারে প্রয়োজনীয় দু-একটা যান্ত্রিক ব্যাপার ছাড়া আর সব বন্ধ করে দিতে হবে। কমুনিকেশন টানেল ধরে লিওনভে ফিরতে হবে, এরই পর পর বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিস্ফোরণ, এরপর লিওনভের বার্নিং-এরই মধ্যে বৃহস্পতির যতটা সম্ভব কাছে যাওয়া।

ইগনিশনের পনের মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে।

ধন্যবাদ, হাল।

আচ্ছা, অন্য শিপ থেকে বলল ভ্যাসিলি, আমরা আবার সেই গ্রেট ব্ল্যাক স্পটের আওতায়। এবার নতুন কী দেখতে হয় কে জানে?

কানো এক বিন্দু নতুন কিছু দেখতে চায় না। আমাদের হাতে নতুন দেখার মতো অনেক অনেক জিনিস পড়ে আছে, অন্তত ইগনিশন পর্যন্ত। ভাবতে ভাবতেই ভ্যাসিলির পাঠানো ইমেজটা দেখে নিল মনিটরে।

প্রথমে হাল্কা উজ্জ্বল রাত ছাড়া আর কিছুই তার চোখে ধরা পড়েনি। তারপর লম্বালম্বি অতি কালচে আরেকটা অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। ঠিক সেটার দিকেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। অসম্ভব গতিতে।

ভ্যাসিলি আলোর বিবর্ধন বাড়িয়ে দিতেই মনিটর আলোকিত হয়ে উঠল। অবশেষে দ্য গ্রেট ব্ল্যাক স্পট তার আসল রূপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে…নিজেকেই বলছে কার্নো, মাই গড! আমি বিশ্বাস করি না…না, বিশ্বাস করি না!

লিওনভে যারা অবাক হয়েছে তাদের কণ্ঠও সে পেল। একই মুহূর্তে একইভাবে বাকিরাও তাদের নিজের কথা বলেছে।

ডক্টর চন্দ্র, বলল হাল, আমি সবার কণ্ঠস্বরের লম্বা মোটা আর নিচু প্যাটার্ন পেলাম, কোনো সমস্যা?

না, হাল। দ্রুত জবাব দিল চন্দ্র, মিশন এগোচ্ছে সুন্দরভাবে। আমরা একটা অবাক ব্যাপার দেখেছি-এইমাত্র। মনিটর সার্কিট মোলতে যে ইমেজটা ফুটে উঠেছে সেটায় কী বুঝলে?

আমি রাতের বৃহস্পতি দেখতে পাচ্ছি। সেখানে একটা বৃত্তাকার এলাকা দেখা যাচ্ছে। ব্যাস তিন হাজার দুশ পঞ্চাশ কিলোমিটার, এর সব পদার্থই চতুষতলকীয়।

কতগুলো?

একদম ঘোঁট একটা বিরতি দেয়ার পর তার ভিডিও ডিসপ্লেতে হাল একটা হিসাব দেখালো: ১৩৫৫০০০–/+১০০০

আচ্ছা! আচ্ছা! তুমি কি সেগুলোকে চিনতে পারছ?

হ্যাঁ, তাদেরকে আকার আর গঠনে চেনা যাচ্ছে। যে জিনিসকে তোমরা বিগ ব্রাদার বল, ঠিক তার মতো। ইগনিশনের দশ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিকমতো চলছে।

আমারটা ঠিকমতো চলছে না-কানো নিজেকেই শোনায়। সেই মরার জিনিসটা বৃহস্পতিতে নেমে গেছে, তারপর শুরু করেছে বংশবিস্তার! কালো মনোলিথের প্লেগ-বিস্তার দেখা বড়ই মজার ব্যাপার। কিন্তু আসলে ততটা মজা লাগছে না তার। আর একের পর এক বিস্ময় আসতে আসতে বিস্ময়-ক্ষমতাকে নেই করে দিয়ে বাতাসে শব্দের গতির সমান গতিতে মরার জিনিসগুলো আরো, আরো অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ছে।

অবশ্যই। এই সেটা! সেই ভয়াল কালচে চৌকোণা জিনিসগুলো তাকে ডমিনাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েক বছর আগে কিছু পাগলা জাপানীর ভিডিও দেখেছিল সে। লাখ লাখ ডমিনাস একের পর এক সাজিয়েছিল মাত্র একটা উদ্দেশ্যে-একটা ফেলে দিতে পারলে বাকিগুলো পড়ে যাবে, পড়বেই পড়বে। অত্যন্ত জটিল গঠনে সেগুলোকে বসানো; সার দিয়ে। কিছু পানির নিচে, কিছু উপরে, কিছু সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে, আবার কিছু বিভক্তও হয়েছিল, যাতে পড়ে যাওয়ার সময় সুন্দর দৃশ্য তৈরি হয়। কাজটা করতে কয়েক সপ্তাহ লাগে, কার্নোর মনে পড়ে, কয়েকবার ভেঙেও যায় ভূমিকম্পের কারণে। এরপর যখন চূড়ান্ত কাজটা শুরু হল-প্রথম ডোমিনো থেকে শেষটা পর্যন্ত-তখন শেষটা পড়েছিল একঘণ্টারও পরে, প্রতিটা ডোমিনো পড়ার সময় অন্যটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে।

ইগনিশনের আট মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। ডক্টর চন্দ্র, একটা সাজেশন করব?

কী, হাল?

খুবই অস্বাভাবিক লক্ষণ। তোমার কি মনে হয় না, আমার এখন কাউন্ট ডাউন বন্ধ করা উচিত-যাতে তোমরা এটাকে ঠিকমতো স্টাডি করতে পার?

লিওনভে ফ্লয়েড ব্রিজের মধ্যে চলাফেরা শুরু করেছে দ্রুত। তানিয়া আর ভ্যাসিলির হয়ত দরকার পড়বে কোনো। বলতেই হয় না, চন্দ্র আর কার্নোরও প্রয়োজন পড়বে-কী পরিস্থিতি। এ অবস্থায় চন্দ্র যদি হালের পক্ষ নেয়? যদি সে নেয়, তাহলে তাদের দুজনেই হয়ত ঠিক কাজটাই করবে। হাজার হলেও, এটাই কি সেই উপলক্ষ না, যে জন্য এতদূর আসা?

তারা যদি কাউন্ট ডাউন বন্ধ করে তাহলে বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে। আর উনিশ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে যাবে আগের জায়গায়। উনিশ ঘণ্টার অপেক্ষা কোনো সমস্যাই করবে না, কিন্তু যদি সেই জাদুকরি সতর্ককরণ এ জন্যে হয়ে থাকে, তো আর সময় নেই।

কিন্তু এতক্ষণে এটা সতর্ক করার চেয়েও বেশি কিছুর রূপ নিয়েছে। তাদের নিচে একটা গ্ৰহজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্লেগ। গ্রহরাজ বৃহস্পতির মুখ যাচ্ছে ছেয়ে। তারা আসলেই বিজ্ঞানের জগতের সবচে শক্তিমান, সবচে ভয়াল জন্মের সামনে থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। এমন হলে সে একটা নিরাপদ দূরত্ব থেকে ঘটনাকে দেখতে বেশি পছন্দ করে।

ইগনিশনের ছ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। তোমরা রাজি থাকলে আমি কাউন্ট ডাউন বন্ধ করতে প্রস্তুত। আমাকে মনে করিয়ে দিতে দাও। আমার প্রথম মিশন হল বৃহস্পতির আশেপাশে বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন দেখলে তা জরিপ করা।

ফ্লয়েড বুঝছে, সে নিজেই হালের মেমোরিতে এ বাক্যটা লিখেছিল। একবার যদি সেটাকে মুছিয়ে ফেলা যেত! এক মুহূর্তের মধ্যেই সে ব্রিজে পৌঁছে অর্লোভদের সাথে যোগ দিল। অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে তারা ফ্লয়েডের দিকে চেয়ে আছে। তুমি কী বল? তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করল তানিয়া।

এখন পুরোপুরি চন্দ্রের উপর নির্ভর করে-আমি…ভয় পাচ্ছি খুব। তার সাথে কথা বলতে পারি প্রাইভেট লাইনে?

ভ্যাসিলি তার হাতে মাইক্রোফোনটা তুলে দিল।

চন্দ্র, আশা করি হাল শুনছে না?

হ্যাঁ, ডক্টর ফ্লয়েড।

তাড়াতাড়ি কর। বল যে কাউন্ট ডাউন চলতেই হবে। বল যে-শালার…বল যে তার সায়েন্টিফিক হিসাব নিকাশকে আমরা শ্রদ্ধা করি…হু..এভাবেই বলতে হবে। বল যে আমরা নিশ্চিত, আমাদের ছাড়াই সে কাজ চালাতে পারবে। না, না, আমাদের সাহায্য ছাড়াই…আমরাও সব সময় তার সাথে যোগাযোগ রাখব। অবশ্যই।

ইগনিশনের পাঁচ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। আমি এখনো তোমার জবাবের আশায় আছি, ডক্টর চন্দ্র।

আমরা সবাই। কার্নো জোরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। দাঁড়িয়ে আছে বিজ্ঞানীর মাত্র কয়েক মিটার দূরে। আর যদি বাটনটা টিপতেই হয় তো আমি মুক্তি পাই।

হাল, কাউন্ট ডাউন চালাও। আমি তোমার বৃহস্পতি-পর্যবেক্ষণের উপর পুরোপুরি ভরসা রাখি, এমনকি আমাদের নজরদারী ছাড়াও। আমরা অবশ্যই সব সময় তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব।

ইগনিশনের চার মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। প্রোপ্যাল্যান্ট ট্যাঙ্কে প্রেশার দেয়া শেষ। প্লাজমা ট্রিগারের ভোল্টেজ স্বাভাবিক। তুমি শিওর, সিদ্ধান্ত ঠিক হচ্ছে-ডক্টর চন্দ্র? আমি মানুষের সাথে কাজ করে মজা পাই এবং তাদের সাথে একটা দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শিপের আচরণ এক মিলিরেডিয়ান৭২ পর্যন্ত স্বাভাবিক।

আমরাও তোমার সাথে কাজ করে আনন্দ পাই, হাল। আমরা তাই করতে থাকব, যদি লাখ লাখ কিলোমিটার দূরেও চলে যাই।

ইগনিশনের তিন মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। রেডিয়েশন প্রতিরোধ চেক করা হয়েছে। এখানেই সময় পার্থক্যের সমস্যা, ডক্টর চন্দ্র। এখনি সবার সাথে সবার যোগাযোগ করার সময়। দেরি করা অনুচিত।

একেবারে বেহুশ কাজ-ভাবছে কার্নো, তার হাত এখন আর কাট অফ সুইচ থেকে দূরে যায় না। আমি সারা জীবন বিশ্বাস করি, হাল হল…একা। যন্ত্রটা কি চন্দ্রের ব্যক্তিত্বের একটা অংশের মতো আচরণ করছে যা আমরা কেউ আশাই করিনি?

লাইট মিটমিট করে, একজন মাত্র ডিসকভারির সব আচরণ সম্পর্কে জানে, তার খেয়াল করা উচিত। এটা ভাল খবর হোক,আর খারাপ-প্লাজমা ফায়ারিং শুরু হোক,না হোক…

সে চন্দ্রের দিকে এক মুহূর্ত তাকানোর রিস্ক নিল। ছোটখাট বিজ্ঞানীর চেহারা নিচের দিকে নোয়ানো, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। প্রথমবারের মতো কার্নো তাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে তার জন্য অন্তর থেকে মায়া অনুভব করছে। আর ফ্লয়েডের কাছে করা চন্দ্রের অনুরোধ শুনে তার বিশ্বাস হচ্ছে এই প্রথমবার। চন্দ্র শিপে থেকে যেতে চেয়েছিল, তিন বছর পর যখন হাল পৃথিবীতে ফিরত তখন পর্যন্ত কে তাকে সঙ্গ দেবে? এর পর কী হল তা সে জানে না। ওয়ানিংয়ের পর সব গড়বড় হয়ে গেল। চন্দ্র যদি আবারও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এখন এমন হলে তার কিছু করার নেই। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ার সময় নেই, এমনকি তারা যদি অন্য কোনো অর্বিটে থাকে, আর ডেডলাইনের পরে যেতে চায়, তবু নেই। এতকিছুর পর তানিয়া জীবনেও এমন প্রস্তাব মানবে না।

হাল? ফিসফিস করল ডক্টর চন্দ্রশেখর। এত আস্তে যে কার্নো চমকে উঠেছে, আমাদের যেতে হবে। তোমাকে সব কথা বলার মতো সময় নেই। কিন্তু নিশ্চয়তা দিতে পারি, সত্যি-কারণ আছে যাওয়ার।

ইগনিশনের দু মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। ফাইনাল কাজ শুরু হয়েছে। আমি দুঃখিত যে তোমরা থাকতে পারছ না। গুরুত্বানুসারে আমাকে দু একটা কারণ বলতে পার?

দু মিনিটে পারব না, হাল। কাউন্ট ডাউন চালিয়ে যাও। পরে সব খুলে বলব। আমরা আরো কমপক্ষে…একঘন্টা একত্রে আছি।– কোন জবাব নেই। নিরবতা আস্তে আস্তে বাড়ছে। এক মিনিট ঘোষণার সময় নিশ্চই হয়ে গেছে…

কার্নো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল…মাই গড! হাল মিস করেছে! হাল কাউন্ট ডাউন বন্ধ করে দিয়েছে?

কার্নো অনিশ্চিতভাবে সুইচের উপর হাতড়ে বেড়ায়। এখন কী করি! ফ্লয়েড কিছু বলতে পারে। হায় হায়, ও সম্ভবত সবকিছু ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত…

আমি জিরো টাইম পর্যন্ত অপেক্ষা করব-না; এটা সেই জটিল মুহূর্ত না, আচ্ছা, আরও একটা মিনিট যাক; তারপর আমি তাকে টুকরো করে ম্যানুয়াল কমান্ড হাতে নিব…

অনেক, অনেক অনেক দূর থেকে একটা ক্ষীণ হুইসেলের মতো শব্দ এগিয়ে এল একটু একটু করে। যেন বিরাট এক ঝড় উঠছে নিচের সেই জায়গাটায়। কাঁপছে ডিসকভারি। ফেরার অভিকর্ষের কাজ শুরু!

ইগনিশন! বলে হাল, টি প্লাস ফিফটিন সেকেন্ডে ফুল ফ্রটল দেয়া হয়েছে।

থ্যাঙ্ক ইউ, হাল। জবাব দেয় ডক্টর চন্দ্র।

৪৮. রাতের আকাশ

হেউড ফ্লয়েডের মনে হয় তারা ঠিক কোথায় তা বলা যাচ্ছে না। ওজশূন্যতাও নেই লিওনভে। যেন কোনো পুরনো শ্লো-মোশন দুঃস্বপ্ন-আস্তে ধীরে পরিণতি এগিয়ে আসছে। এ জীবনে আগে মাত্র একবার এমন অনুভূতি হয়েছে, একবার পিছলে যেতে শুরু করেছিল তাদের গাড়ি, ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। অসহায়ত্ব কীভাবে ভর করে মানুষের মনে-একটা কথাই শুধু ভাবার ছিল, এতে কিছুই যায় আসে না…আমার কি হবে না, হলে হবে অন্যদের।

ফায়ারিং পর্যায় শুরু, তার মনোভাবও গেছে বদল। সব আগের মতো সত্যি মনে হচ্ছে। ঠিক পরিকল্পনা মতো সব চলছে হাল দিচ্ছে পৃথিবীর দিকে নিরাপদে যাওয়ার সব দিক নির্দেশনা। প্রতি সেকেন্ডে তাদের ভবিষ্যত হয়ে যাচ্ছে আরো আরো নিরাপদ। ধীরে টান টান ভাবটা সরে গিয়ে চারপাশ সম্পর্কে সাধারণ সচেতনতা কাজ করছে ফ্লয়েডের মনে।

শেষবারের মতো কোন পাগল দু বার এমন জায়গায় আসতে চায় শেষবারের মতো বৃস্পতির রাতের আকাশের উপর উড়ছে তারা। সেই গ্রহরাজের এলাকায় যে হাজার পৃথিবীর চেয়েও বড়! শিপ উপরনিচ করা হয়েছে যেন লিওনভ বৃহস্পতি আর ডিসকভারির মাঝে থাকে। তাদের চোখে সেই রহস্যময় বৃহস্পতির মেঘ। এখন ডজন ডজন যন্ত্রপাতি সেটাকে দেখা আর তদন্ত করায় মেতে আছে। তারা চলে গেলে হাল কাজ চালিয়ে যাবে।

চুড়ান্ত সংকট কেটে যাবার পর ফ্লয়েড ফ্লাইট ডেকে নেমে গেল! ওজনের অভিজ্ঞতা কী অদ্ভুত, হোক দশ কেজি! অবজার্ভেশন লাউঞ্জে আছে ক্যাথেরিনা আর জেনিয়া। লাল আলোগুলোও জ্বলছে খুব কম, যাতে তারা রাতের বৃহস্পতিকে ঠিকমতো দেখতে পারে। শাসা কোভালেভ আর ম্যাক্স ব্রেইলোভস্কির জন্য সে একটু মন খারাপ করল, বেচারারা পুরোপুরি স্যুট পরে বসে আছে এয়ারলকে। এত সুন্দর রাত মিস করছে। তাদের উপর মস্ত দায়িত্ব, যদি একটা বিস্ফোরকও কাজ না করে, তাহলে তাদেরকে নিজের হাতে এ টেপগুলো কেটে দিতে হবে।

সামনের আকাশ বৃহস্পতিতে বৃহস্পতিময়। মাত্র পাঁচশ কিলোমিটার দূরে। ফলে মাত্র ছোট একটা অংশ তারা দেখতে পাচ্ছে নিচে। পঞ্চাশ কিলোমিটার উপর থেকে পার্থিব মেঘের একটা সমুদ্র দেখতে যেমন হয়, ততটুকু এলাকা। তার চোখ আটকে গেছে হালকা আলোয়। এর বেশিরভাগই ইউরোপার প্রতিফলিত,জোছনা। ফ্লয়েড খুব অবাক চোখে অনেক জায়গা দেখতে পায় একেবারে স্পষ্ট। এখানটায় লালের এক আধটু ছোপ ছাড়া কোনো রঙের ছড়াছড়ি নেই। কিন্তু পেঁজা মেঘ ভেসে বেড়ায় এদিক সেদিক। তুষারে ঘেরা একটা ডিমের মতো ঝড় উঠেছে নিচে কোথাও। গ্রেট ব্ল্যাক স্পট ঘুরে ঘুরে হারিয়ে গেছে ওপাশে। ওটা ঘুরছে না, শুধু শব্দের গতিতে বেড়ে চলেছে, কিন্তু বৃহস্পতিতো ঘুরছে অনন্তকাল ধরে। তারা বৃহস্পতি দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন পৃথিবীর দিকে ভো দৌড় দেবে, তখন আরেকবার দেখা দিতে পারে সেই স্পট।

নিচে আলোর নিয়মিত বিস্ফোরণ দেখা যায়, এগুলো বৃহস্পতির বিজলি চমক আর আগ্নেয় বিস্ফোরণ। মাঝে মাঝে শক ওয়েভের মতো করে আলোর বন্যা বেরিয়ে আসে গভীর থেকে। কখনোসখনো গোল আলো বা আরো অবাক করা ছায়া দেখা যায়, তাই বলে নিচে কোনো সভ্যতা গড়ে উঠেছে এমন ভাবার সুযোগ নেই। মহানগরীর আলো, এয়ারপোর্টের বিশাল আলো-বিম… কিন্তু রাডার আর পরীক্ষা বেলুন ভাল করে দেখেছে, এ বৃহস্পতির উপরিতলে হাজার কিলোমিটার জুড়ে কোনো শক্ত কঠিন জিনিস নেই। একেবারে অসহ্য কোর পর্যন্ত সবই আধ-কঠিন, তরল নাহয় গ্যাসীয়।

বৃহস্পতিতে মধ্যরাত! এই শেষ দেখা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদের মধ্যে একটা। আরো বেশি করে উপভোগ করার পরিস্থিতি এখন আর কোনো বিপদের ভয় নেই। যদি থেকেও থাকে তো তার করার কিছু নেই। করেছে যথাসম্ভব।

লাউঞ্জ একেবারে চুপচাপ, কেউ কথা বলতে চায় না, কারণ নিচের মেঘ-চাদর সরছে দ্রুত। প্রতি মিনিটে তানিয়া আর ভ্যাসিলি প্রজ্বলনের অবস্থা ঘোষণা করে। ডিসকভারির ফায়ারিং টাইমের পর আবার টেনশন শুরু। এটাই ক্রিটিক্যাল মুহূর্ত। এ জটিল সময় কখন হাজির হরে কেউ জানে না। ফুয়েল গজের ঠিক থাকা নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি। একেবারে শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রজ্বলন চলবে।

প্রত্যাশিত কাট অফের অর দশ সেকেন্ড বাকি, বলল তানিয়া, ওয়াল্টার, চন্দ্র, বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত হও। ম্যাক্স, ভ্যাসিলি, প্রয়োজন পড়তে পারে, স্ট্যান্ডবাই। পাঁচ…চার…তিন…দুই…এক…শূন্য!

কোন পরিবর্তন নেই। দুই শিপ-দেহ থেকে এখনো ডিসকভারির মৃদু কাঁপন বোঝা যায়। সেই একই ওজন এখনো। আমাদের কপাল বলতে হবে, ভাবল ফ্লয়েড, গজগুলোর রিডিং নিচে নেমে গেছে নিশ্চই, তার পরও, বাড়তি ফায়ারিংয়ের প্রতিটা সেকেন্ডই কাজে লাগবে দারুণভাবে। হয়ত এটাই জীবন আর মরণের মধ্যে দূরত্বটা আরো বাড়িয়ে দিবে। আর নিচে গণনার জায়গায় উপর-গণনা কী অদ্ভুত শোনায়।

পাঁচ সেকেন্ড… দশ সেকেন্ড…তের সেকেন্ড…হ্যাঁ, লাকি থার্টিন!

ওজনহীনতা, তারপর নিরবতা ফিরে আসে। দু শিপেই আনন্দের একটা ছোট বিস্ফোরণ টের পাওয়া যায়। এতো মাত্র শুরু, আরো অনেক কিছু বাকি। সেসব

করতে হবে তাড়াতাড়ি।

ফ্লয়েড এয়ারলকের কাছে যেতে অস্থির হয়েছে, এ শিপে হাজির হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি অভিনন্দন জানানো যায় চন্দ্র আর কার্নোকে। কিন্তু তার তেমন কিছু করার নেই সেখানে গিয়ে। ম্যাক্স আর শাসার সেখানে ব্যস্ত থাকার কথা। ওরা সম্ভবত ই ভি এ আর দু শিপের টিউবে কাজ করার জন্য একেবারে তৈরি। তার বরং লাউঞ্জেই অপেক্ষা করা ভাল-ফিরে আসা বীরদের এখানেও সম্মান জানানো যাবে।

যদি কোনো স্বস্তি-মিটার থাকত যেটায় দশটা ঘর আছে তবে এবার প্রথমবারের মতো তার স্বস্তির মাত্রা আট থেকে সাতে ধরা যায়। কত সপ্তাহ পার করে আজ এই প্রথম রেডিও কাটঅফের কথা সে ভুলে যেতে পারছে! হয়ত আর কখনোই এটার দরকার পড়বে না। হাল কাজ করেছে দারুণ। অবশ্য ও একবারও চেষ্টা করলে ডিসকভারির ফুয়েলের শেষ বিন্দু পর্যন্ত এ মিশনকে একটুও প্রভাবিত করতে পারত না।

সবাই ফিরেছে, বলল শাসা, হ্যাচ বন্ধ, আমি এবার বোমা ফাটানো শুরু করব।

বিস্ফোরণের পর এক বিন্দু শব্দও পাওয়া যায়নি। ফ্লয়েড বেশ অবাক। একটু শব্দ, দু শিপের একটু ঝাঁকি আশা করাটা অন্যায় না। তবু এ শিপ দুটো যে এর মধ্যে অনেক অনেক দূরে সরে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। হালকা একটু কাঁপন টের পাওয়া যায় এর গায়ে, হয়ত বাইরে থেকে কেউ একটা হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে। একমিনিট পর ভ্যাসিলি অল্টিচ্যুড জেটগুলোর ট্রিগার টিপে চিৎকার করে উঠল, আমরা মুক্ত! শাসা, ম্যাক্স-তোমাদের দরকার নেই। প্রত্যেকে যার যার ঝুলানো জালের বিছানা হ্যাঁমোকে ফিরে যাও, একশো সেকেন্ডের মধ্যে ইগনিশন!

এবার বৃহস্পতি ঘুরতে ঘুরতে সরে যাচ্ছে দূরে, আর জানালার বাইরে একটা নতুন, অদ্ভুত গড়ন দিল দেখা-লম্বা, হাড়ের মতো এক দেহ। ডিসকভারি। এখনো নেভিগেশন লাইট জ্বলছে, ভেসে চলছে তাদের কাছ থেকে, ইতিহাসের দিকে। এখন আর আবেগ দেখিয়ে বিদায়ের সময় নেই, এক মিনিটের মধ্যেই লিওনভ যাত্রা করবে শুরু।

এমন শব্দ ফ্লয়েড শুধু ফুল থ্রটলের সময় শুনতে পায়, সেই জগৎ মাতাল করা গর্জনের হাত থেকে দু কান বাঁচানোয় ব্যস্ত থাকে। লিওনভের ডিজাইনাররা বছরব্যাপী অভিযানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার শব্দ তরঙ্গ থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে বাড়তি শব্দ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে চায়নি, শিপটা ভারি হয়ে যাবে। হঠাৎ ওজন মনে হচ্ছে একেবারে অসম্ভব বেড়ে গেল-কিন্তু এখনো তার জীবনের সবচে ভয়াল ওজনের চারভাগের একভাগ এসেছে মাত্র।

ক মিনিটের মধ্যেই জ্বলন্ত ওয়ার্নিং লাইটগুলো নিয়ে ডিসকভারি হারিয়ে গেল অনেক অনেক দূরে। নিজেকেই বলছে ফ্লয়েড, আরো একবার আমি বৃহস্পতিকে ঘুরে যাচ্ছি-এবার গতি পেতে, হারাতে নয়। একপলক তাকালো জেনিয়ার দিকে, মেয়েটা অবজার্ভেশন জানালায় নাক চেপে থাকায় শুধু নাক আর মুখের সামনের দিকটাই দেখা যায়। তারও কি সেদিনের কথা মনে পড়ছে, যেদিন তারা দুজন এই ঝুল-বিছানা, এই হ্যাঁমোক ভাগাভাগি করে নিয়েছিল? এবার আর জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবার ভয় নেই; অন্তত আজ আর মেয়েটা সে ভয়ে অস্থির হবে না। আজ তাকে অনেক বেশি আনন্দে থাকতে দেখা যাচ্ছে, অনেক বেশি নিরাপদ। ধন্যবাদ ম্যাক্স আর হয়ত ওয়াল্টারকেও।

জেনিয়া ফ্লয়েডের ভাবনা ধরে ফেলেছে মনে হয়-একটু ঘুরে হাসল, তারপর নিচের বাতাসহীন মেঘের দিকে হাত নেড়ে নিল একটু, দেখো! মেয়েটা তার কানে চিৎকার করল, বৃহস্পতির একটা নতুন চাঁদ উঠেছে।

ও কী বলতে চায়? মনে মনে প্রশ্ন করল ফ্লয়েড। আজো তার ইংরেজি বেশি সুবিধার না; কিন্তু এত সাধারণ একটা বাক্যে ভুল করে বসবে? মনে হয় না। আমি নিশ্চিত, ওর কথাটা ঠিকমতোই শুনেছি-আশা করি সে উপরের দিক নির্দেশ করেনি-বুঝিয়েছে নিচে…

হঠাৎই বুঝতে পারছে, নিচের দৃশ্যটা একেবারে ভোজবাজির মতো উজ্জ্বল; এমনকি হলুদ আর সবুজ রঙগুলোও দেখা যাচ্ছে যা আগে বোঝা যেত না। বৃহস্পতীয় মেঘে ইউরোপার চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল একটা কিছু আলো ছড়ালে এমন হওয়ার কথা।

লিওনভ নিজে বৃহস্পতির মাঝ-দুপুরের সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল-ছেড়ে যাওয়ার সময় একটা মিথ্যা সূর্যোদয় ঘটিয়ে যাচ্ছে স্পেসশিপটা। শত কিলোমিটার লম্বা একটা পুচ্ছ দেখা দিয়েছে শিপের পিছনে। প্লাজমার জ্বলন্ত, অসম্ভব তাপমাত্রার একটা লেজ।

ভ্যাসিলি ঘোষণা দিচ্ছিল, কিন্তু কথাগুলো বোঝা দায়। একবার ঘড়ির দিকে তাকালো ফ্লয়েড; হা-এখুনি সময়। এবার তারা বৃহস্পতি ছেড়ে যাবার গতি পেয়েছে। আর কখনোই দৈত্যটা ওদের ধরে রাখতে পারবে না মেঘময় হাতের মুঠোয়।

এবং তখুনি, হাজার হাজার কিলোমিটার সামনে একটা বিরাট আলো-ধনুক দেখা দিল আকাশে। সত্যিকার বৃহস্পতি-সূর্যোদয়ের প্রথম পরশ। এটা যেন পার্থিব যে কোনো রঙধনুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি আশা নিয়ে আসছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই সূর্য লাফিয়ে এগিয়ে এল, ওদের স্বাগত জানাবে। সূর্যদেব! এখন থেকে প্রতিদিন তিনি এগিয়ে আসবেন কাছ থেকে কাছে।

গতিবৃদ্ধি ঠিক করতে আরো কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়, এবারও লাগবে। এরপর লিওনভ বিপ্লবের গতিতে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাবে। ফ্লয়েড নিজের ভিতরে অনেক অনেক শান্তি খুঁজে পায় এবার। কোনো এক ঐশ্বরিক নিয়ম, স্বর্গীয় প্রযুক্তি তাকে এখন টেনে নিয়ে যাবে সৌরজগতের কেন্দ্রের কাছাকাছি-গ্রহাণুপুঞ্জ পেরিয়ে আসবে ওরা, পেরোবে মঙ্গলের অর্বিটগুলোে, নিয়তির মতো এসে দাঁড়াবে পৃথিবীর অর্বিটে কিন্তু কেউ আটকাতে পারবে না; কেউ না।

সুখচিন্তার চরম পুলকে সে ভুলেই গেছে কালো পাথরের কথা। বৃহস্পতির মুখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে কালো কালো অচিন পাথর।

৪৯. তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে, সুপ্ত রাতে…

পরের সকালে তারা আবার এটাকে দেখতে পেল। স্পেসশিপে সকাল বলে কিছু নেই। সবই স্থবির সময়। এটা বৃহস্পতির দিনের অংশ। কিন্তু লিওনভ সময় সকাল। আঁধারের এলাকা ছড়িয়ে পড়েছে পেছনে, সামনে শুধু অখন্ড ইচ্ছেমাফিক গল্প।

জানো, এ দেখে কী মনে হয়? বলছে ক্যাথেরিনা, একটা ভাইরাস যেন কোনো কোষকে আক্রমণ করছে। যেভাবে একটা ফাজ৭৩ কোনো ব্যাকটেরিয়ামে তার ডি এন এ৭৫ ঢুকিয়ে দেয়, তারপর পুরোটা ভরে গিয়ে অনেক অনেক নতুন ভাইরাস বেরোয়, অনেকটা তেমন।

তুমি কি বলতে চাও যে, শান্ত চোখে তাকালো তানিয়া, জাগাদকা বৃহস্পতিকে খেয়ে ফেলছে?

এখন এমনই মনে হয়।

সত্যি, বৃহস্পতিকে দেখতে অসুস্থ লাগে, কিন্তু এত ভারি ওজন কি হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম দিয়ে বানানো অসম্ভব? সেখানে এ দু মৌল ছাড়া অন্য যেগুলো আছে তার পরিমাণ খুব কম।

সেই কমগুলোর সাথে যোগ দেবে মাত্র কয়েক কুইন্টিলিয়ন টন সালফার, কার্বন আর ফসফরাসসহ পর্যায় সারণির নিচের দিকের আরো কয়েকটা মৌল। শাসা খোঁচা দিল, যে কথাই বল না কেন, আমরা এমন একটা টেকনোলজি নিয়ে কথা বলছি, যেটা পদার্থবিদ্যার বিপরীতে যায় না এমন যে কোনো কাজ করতে পারে…মনে হয়। শুধু হাইড্রোজেন থাকলে আর কী দরকার? ঠিকমতো জানলে এ থেকেই বাকি সব মৌল বানাতে পারবে। এ কথা আর বলা লাগে?

এখন বলার আছে একটা কথাই… বলল ভ্যাসিলি, তাকাও, ওরা বৃহস্পতি ঝেড়ে ফেলছে।

টেলিস্কোপ মনিটরে একটা মনোলিথের খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালি চোখেও দেখা যাচ্ছে, দুই মুখের মাঝে গ্যাসের আবরণ ভেসে বেড়ায়। গ্যাসের বাষ্প। একটা চুম্বকের বাইরে চারধারে এভাবেই লোহার গুড়া জমা হয়।

লাখ লাখ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার! মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে বলল কার্নো, বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডল শুষে নিচ্ছে। কিন্তু কেন? এসব ধুলা-বালি দিয়ে এরা করবেটা কী!

আর কীভাবে জন্ম নিচ্ছে? প্রশ্নটা ম্যাক্সের, এ অবস্থায় দেখেছ কোনোটাকে?

হ্যাঁ এবং না। ভ্যাসিলি অনেকটা চিন্তায় পড়ে গেল যেন প্রশ্নটা করার পর, বিস্তারিত দেখার মতো কাছাকাছি নেই আমরা। এটা এক ধরনের ফিশন…বিভাজন। অ্যামিবা যেভাবে বিভক্ত হয়।

মানে, তারা দুভাগ হয়ে যায়, তারপর আধাআধিগুলো আসল আকার পায়?

নয়েট। কোনো আধা জাগাদকা চোখে পড়েনি। সেগুলো দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত বাড়ে, তারপর বিভাজন। পুরুত্বের দিক দিয়ে বেড়ে গিয়ে তারপর ঠিক আসল আকারের সমান হয়ে জোড়ায় ভেঙে যায়। এ ব্যাপারটা আবার দু ঘন্টার মধ্যে হয়।

দু ঘণ্টায় একটা নতুন বিশাল জাগাদকা! প্রতি দু ঘণ্টায় দ্বিগুণ! আধা গ্রহ দখল করে বসেছে…অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাতো গুণানুপাতিক বৃদ্ধির টেক্সটবুক অঙ্ক-সমস্যা!

আমি জানি, ওরা কী! টার্নোভস্কি হঠাৎ করেই বলল, এগুলো হল ভন নিউম্যান মেশিন।

মনে হয় তোমার কথাই ঠিক। ভ্যাসিলি বলল, কিন্তু এ কথা বললেও আসল সমস্যার সমাধান হয় না। ওদের কাজ বা উদ্দেশ্য কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ওদের কোনো একটা নাম দিলেই আমাদের কোনো লাভ হয়ে যাবে না।

ক্যাথেরিনা প্রশ্ন করল, ভন নিউম্যান মেশিন জিনিসটা কী?

অলোভ আর ফ্লয়েড দুজনেই বলা শুরু করেছে। একই সাথে থেমেও গেছে। দুজনেই, অন্যকে বলার সুযোগ দেয়ার জন্য। ভ্যাসিলি একটু হেসে আমেরিকানের দিকে হাত নাড়ল।

ধর, ক্যাথেরিনা, তোমার খুব বড় কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ আছে। বড়। যেমন চাঁদের বুকে বিরাট করে অনেক অনেক গর্ত খুঁড়তে হবে, স্ট্রিপ মাইনিং। এজন্য তুমি লাখো ধরনের যন্ত্র বানাতে পারো। লাখো পরিমাণ যন্ত্র বানাতে পারো। কিন্তু এক এক করে তৈরি করতে শতাব্দী পেরিয়ে যাবে। যথেষ্ট বুদ্ধি থাকলে তুমি কিন্তু মাত্র একটা মেশিনই বানাবে যেটা আশপাশের জিনিস নিয়ে এমন আরেক মেশিন তৈরি করে যাবে। একটা চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করে দাও। একেবারে কম সময়ের মধ্যে তোমার কাজের উপযুক্ত পরিমাণ মেশিন পেয়ে যাবে। এক থেকে দু, চার, আট, মোল, বত্রিশ-এভাবে। স্পেস এজেন্সি এ আইডিয়া নিয়ে বছরের পর বছর ধরে পুতুল খেলছে, নিশ্চই তোমার ভিতরও এমন কোনো ধারণা কাজ করে কখনো কখনো, তানিয়া।

হ্যাঁ। এক্সপোনেনশিয়েটিং মেশিন! এমন একটা ধারণা যেটা জিয়োলকোভস্কিও করেননি।

আমি বাজি ধরতে পারি, বলল ভ্যাসিলি, নিচের ঘটনা এমনই। একটা ব্যাক্টেরিওফাজ হল এক ধরনের ভন নিউম্যান মেশিন।

আমরা সবাই কি নই? প্রশ্নটা শসার, আশা করি চন্দ্র এমন কথাই বলবে।

চন্দ্র একটু নিচু হয়ে তার সম্মতির কথা জানালো, অবশ্যই। এমনকি ভন নিউম্যান এ ধারণা পেয়েছিলেন জীবিত কোনোকিছু দেখে।

আর এ জীবিত মেশিনগুলো বৃহস্পতিকে খেয়ে ফেলছে।

এখন দেখতে এমন লাগে। আমি আগে থেকেই করছি কিছু হিসাব-নিকাশ। অবশ্য উত্তরটা অবিশ্বাস্য-যদিও খুবই সাধারণ গাণিতিক কাজ…আধা কথা রেখেই থেমে গেল ভ্যাসিলি।

তোমার কাছে ব্যাপারটা সাধারণ হতে পারে, ক্যাথেরিনা বলল, ডিফারেন্সিয়াল ইকোয়েশন আর শক্ত এলাকাগুলো বাদ দিয়ে হিসাব কর।

না-আমি বলতে চাচ্ছিলাম, সিম্পল। এটা প্রাচীনকালের জনসংখ্যা বিস্ফোরণের মতো কিনা! হাজার হলেও, গত শতাব্দীতে তোমরা ডাক্তাররা নেয়ে ঘেমে একাকার হয়েছিলে এ সমস্যায়। জাগাদকা প্রতি দু ঘন্টায় দ্বিগুণ হয়। আগামী বিশ ঘণ্টায় দশবার এমন হবে। একটা জাগাদকা হাজার জাগাদকায় পরিণত হবে!

এক হাজার চব্বিশ। বলল চন্দ্র।

আমি জানি। হিসাবটাকে সরল রাখতে দাও। চল্লিশ ঘণ্টা পর প্রতিটা জাগাদকার জায়গায় থাকবে দশ লাখ। আশি ঘণ্টা পর একলক্ষ কোটি-এখন এ অবস্থা চলছে। অবশ্যই, এ বাড়া সারা জীবন চলবে না। আর দুদিন পরে এগুলোর ওজন হবে বৃহস্পতির চেয়ে বেশি। অন্তত তাই হওয়ার কথা।

তার মানে, জেনিয়া বোঝার চেষ্টা করছে, একটু পরই তারা থামছে। এরপর কী করবে?

শনি দেখতে বড়ই সুন্দর। ব্রেইলোভস্কি জবাব দিল, তারপর আছে ইউরেনাস, নেপচুন…আশা করি ছোট্ট পৃথিবী তাদের নজরে পড়বে না।

আহা! কী আশা জাগাদকা আমাদের উপর নজরদারী করছে ত্রিশ লাখ বছর ধরে।

হঠাৎ করেই ওয়াল্টার কার্নো হাসিতে ফেটে পড়ল।

এত হাসার কী হল? তানিয়া কিছুটা ক্ষেপেছে।

আমরা জিনিসগুলো নিয়ে এমনভাবে কথা বলা শুরু করেছি যেন এগুলো একেকটা ব্যক্তি। অতিবুদ্ধিমান অস্তিত্ব। ওরা কিছুই না-হাতুড়ি টাতুরি। কিন্তু জেনারেল পারপাস টুল, সর্বকার্যবিশারদজ্যোতিষী। আর চাঁদেরটা ছিল শুধু একটা সিগন্যালিং ডিভাইস-তোমাদের ভাষায় বলতে গেলে, গুপ্তচর; আর যেটা নিয়ে আমাদের এত মাথাব্যথা, সেই ডেভ ব্যোম্যানের পরিচিত জাগাদকা হল একটা পরিবহন-পথ। কিন্তু এখন এটা অন্য কিছু করছে। শুধু ঈশ্বরই জানে, কী যে করছে! যাই হোক, আমার মনে হয় সারাটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে আরো অনেক আছে এমন।

আমি ছোটবেলায় এমন একটা যন্ত্র পেয়েছিলাম। তোমরা কি জানো, জাগাদকা কী? একটা সুইস আর্মি চাকুর মহাজাগতিক প্রতিচ্ছবি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *