1 of 2

৪৯. শাস্তি হইতে অপরাধীর নিস্কৃতিলাভ

অধ্যায় : ৪৯ শাস্তি হইতে অপরাধীর নিস্কৃতিলাভ

ধারা-১১৩৫ শাস্তি হইতে রেহাইদানের কারণসমূহ অপরাধী চার অবস্থায় শাস্তি হইতে রেহাই পায় – (ক) নাবালকত্ব; (খ) উন্মাদনা; (গ) মাদক জনিত চেতনাহীনতা এবং (ঘ) অবৈধ বল প্রয়োগ।

বিশ্লেষণ

উপরোক্ত চার ধরনের বিশেষ অবস্থায় অপরাধীর কর্মটি অপরাধ হিসাবে গণ্য হওয়া সত্বেও সে শাস্তি হইতে রেহাই পায়। এই ক্ষমাকৃত কর্মটির মধ্যে বিদ্যমান কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে নয়; বরং অপরাধীর মধ্যে বিদ্যমান বা তাহার সহিত সংশ্লিষ্ট বিশেষ অবস্থাই শাস্তি মওকুফের ভিত্তি। কোন কর্মের বৈধ হওয়ার বিষয়টি ঠিক ইহার উল্টা অর্থাৎ কর্মের মধ্যে বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যই কর্মটিকে বৈধ (মুবাহ) গণ্য করে।

ধারা-১১৩৬

নাবালকত্ব (ক) নাবালকত্ব বলিতে কোন শিশুর জন্ম হইতে পনর (১৫) বত্সর পর্যন্ত বয়স সীমাকে বুঝায়।

(খ) কোন নাবালেগ –

৬০৪

(১) সাত বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যাবতীয় অপরাধ কর্মের শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে কিন্তু জান-মালের ক্ষতির ক্ষেত্রে তাহার মাল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যকের হইবে;

(২) সাত বৎসর বয়স হইতে বালেগ হওয়ার মধ্যবর্তী বয়স পর্যন্ত হদ্দ হইতে রেহাই পাইলেও তাযীর ও সংশোধনমূলক শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে না এবং জান-মালের ক্ষতির ক্ষেত্রে তাহার মাল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ বাধ্যকর হইবে।

বিশ্লেষণ

ইসলামী আইনে কোন কর্মের জন্য দায়ী করার ভিত্তি হইল দুইটিঃ বােধশক্তি ও স্বাধীন এখতিয়ার। এই দিকে লক্ষ্য রাখিয়া ইসলামী শরীআত শিশুর জন্ম হইতে বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বােধশক্তি ও স্বাধীন এখতিয়ারের ক্রমোন্নতি ও পরিপূর্ণতার পর্যায়সমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া আইন প্রণয়ন করিয়াছে। বােধশক্তিহীন অবস্থার কার্য জবাবদিহিতা হইতে মুক্ত। দুর্বল বােধশক্তি স্তরে শিশু সংশোধনমূলক শাস্তির আওতায় আসে। পূর্ণ বােধশক্তি সম্পন্ন শিশু সংশোধনমূলক শাস্তি ও তাযীরের আওতায় আসে।

শিশুর প্রথম স্তর ফকীহগণের ঐক্যমত অনুযায়ী সাত বৎসর নির্ধারণ করা হইয়াছে। এই পর্যায়ে শিশুকে সগীর গায়র মুমায়্যিয’ (অবিজ্ঞ, অপরিণামদর্শী) বলা হয়। বােধশক্তির উন্মেষ ঘটার মূলত সুনির্দিষ্ট কোন বয়স সীমা নাই। পরিবেশের পার্থক্য, দৈহিক বর্ধন ও মানসিক যোগ্যতার বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্যের কারণে সাত বৎসরের পূর্বে বা পরেও বােধশক্তি সৃষ্টি হইতে পারে। কিন্তু ফকীহগণ অধিকাংশ শিশুর দৈহিক ও মানসিক গড়নের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া এই সীমা সাত বৎস নির্ধারণ করিয়াছেন, যাহাতে ফয়সালাদানের ক্ষেত্রে একটি ঐক্য বজায় থাকিতে পারে। মোটকথা যে শিশু সাত বৎসরে পদার্পণ করে নাই তাহাকে সগীর গায়র মুমায়্যিযই বলা হইবে যদিও তাহার চেতনাশক্তি উক্ত বয়সের শিশুর অধিকও হয়। সুতরাং এই বয়সসীমার মধ্যকার কোন শিশু অপরাধ করিলে তাহাকে সংশোধনমূলক শাস্তিও প্রদান করা যাইবে না এবং তাযীরের আওতাও নয়। উদাহরণস্বরূপ সে যদি হদ্দের আওতাভুক্ত কোন অপরাধ করে, যেমন অপরের মাল চুরি করে, তবে তাহার উপর চুরির শাস্তি কার্যকর হইবে না। যদি সে কাহাকেও যখম বা হত্যা করে তবে ইহার জন্যও সে কিসাসের দণ্ডে দণ্ডিত হইবে এবং তাযীরের আওতায়ও তাহাকে দৈহিক শাস্তি প্রদান করা যাইবে না। তবে

৬০৫

তাহার মাল হইতে ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যকর হইবে। কারণ শরীআ আইনে মানবদেহ, মানব জীবন ও তাহার সম্পদ সর্বাবস্থায় নিরাপদ। তাই ইহার ক্ষতিপূরণও বাধ্যকর। নাবালেগের বয়সের দ্বিতীয় স্তর হইল সাত বৎসর হইতে বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এই শিশু সগীর মুমায়্যিয (পরিণামদর্শী, বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন) হিসাবে গণ্য হয়। এই পর্যায়ে সে হদ্দ, কিসাস বা তাযীরাধীন ‘কোন অপরাধকর্ম করিলে তাহার উপর অপরাধ কর্মের শ্রেণী অনুসারে হদ্দ বা কিসাসের শাস্তি প্রদান করা যাইবে না, তবে সংশোধনমূলক শাস্তি (তাদীব) এবং উপদেশ, সতর্কীকরণ ও তিরস্কার পর্যায়ের তাযীরাধীন শাস্তি প্রদান করা যাইবে। এই স্তরে কোন শিশু মানবদেহ, মানব জীবন ও মাল সম্পর্কিত কোন অপরাধ করিলে তাহার মাল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যকর হইবে।

ধারা-১১৩৭

উন্মাদনা (Insanity) (ক) বুদ্ধিশূন্যতা, বুদ্ধিবৈকল্য ও বুদ্ধির দুর্বলতাকে উন্মাদনা বলে।

(খ) কোন ব্যক্তির বুদ্ধিশূন্যতা, বুদ্ধিবৈকল্য ও বুদ্ধির দুর্বলতা স্থায়ী প্রকৃতির হইলে, তাহা জন্মগত হউক অথবা কোন স্তরে সৃষ্টি হউক, তাহাকে বদ্ধপাগল (মাজনূন মুতবাক) বলে।

(গ) যে ব্যক্তি কখনও বদ্ধপাগল অবস্থায় থাকে এবং কখনও সুস্থ থাকে তাহাকে অর্ধ-পাগল (মাজনূন মুনকাতি) বলে।

(ঘ) কোন ব্যক্তির কোন বিষয়ে বুদ্ধিশূন্যতা এবং কোন বিষয়ে সঠিক উপলব্ধি বিদ্যমান থাকিলে তাহাকে আংশিক পাগল (মাজনূন জুযী) বলে।

(ঙ) যাহার বুদ্ধিজ্ঞান ক্রটিপূর্ণ, কথাবার্তা অসংলগ্ন এবং কাজকর্ম অপরিণামদর্শী, তাহা জন্মগত হউক অথবা বয়সের যে কোন স্তরে সৃষ্টি হউক, তাহাকে নির্বোধ (সাফী) বলে।

(চ) উপধার (খ) ও (ঙ)-এ বর্ণিত ব্যক্তি হদ্দ বা তাযীরের আওতাভুক্ত কোন অপরাধকর্ম করিলে তাহার উপর শাস্তি প্রযোজ্য হইবে না।

(ছ) উপধারা (গ)-এ বর্ণিত ব্যক্তি সুস্থ থাকা অবস্থায় হদ্দ, কিসাস বা তাযীরের আওতাভুক্ত বা মাল সংক্রান্ত কোন অপরাধকর্ম করিলে তাহার উপর শাস্তি কার্যকর হইবে।

৬০৬

(জ) উপধারা (ঘ)-এ বর্ণিত ব্যক্তির যে বিষয়ে উপলব্ধি বিদ্যমান থাকে সেই বিষয় সম্পর্কিত কর্মের জন্য সে দায়ী হইবে।

(ঝ) উন্মাদ কর্তৃক মানবহত্যা বা তাহাকে আহত করার ঘটনা সংঘটিত হইলে সেই ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ভুলবশত হত্যা বা ভুলবশত আহত করার বিধান প্রযোজ্য হইবে। ( () উপধারা (খ), (ঘ) ও (ঙ)-এ বর্ণিত ব্যক্তিগণ কর্তৃক কিসাসের আওতাভুক্ত বা মাল সংক্রান্ত কোন অপরাধ সংঘটিত হইলে তাহাদের নিজ নিজ মাল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যকর হইবে।

বিশ্লেষণ

শিশুর জন্মের পর হইতে তাহার দৈহিক পরিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিগত পরিবৃদ্ধিও ঘটিতে থাকে। কিন্তু কোন কোন শিশু জন্মগতভাবেই বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি বঞ্চিত থাকে। আবার কোন জটিল রোগের কারণে জীবনের কোন পর্যায়ে বুদ্ধিগত শক্তির বিলুপ্তি ঘটিতে পারে। যে ব্যক্তি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি কাজে লাগাইতে সক্ষম নহে তাহার এই বুদ্ধিশূন্যতা বা বুদ্ধিবৈকল্যই তাহাকে উন্মাদ হিসাবে আখ্যায়িত করে। আইনের দৃষ্টিতে এইরূপ ব্যক্তির কোন দায়দায়িত্ব নাই।’

অবশ্য এই উন্মাদনা স্থায়ীও হইতে পারে, সাময়িকও হইতে পারে, আবার আংশিকও হইতে পারে। যাহার উন্মাদনা সাময়িক প্রকৃতির অর্থাৎ যে ব্যক্তি কখনও সুস্থ থাকে আবার কখনও উন্মাদ অবস্থায় থাকে তাহার দায়দায়িত্ব স্থায়ী প্রকৃতির উন্মাদের তুলনায় কিছুটা স্বতন্ত্র। অর্থাৎ এই অর্ধ-পাগল ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় কোন অপরাধকর্ম করিলে বা কাহারও সহিত চুক্তিবদ্ধ হইলে উহার দায় তাহাকে বহন করিতে হইবে। এই অবস্থায় সে হদ্দ, কিসাস বা তাযীরের আওতাভুক্ত কোন অপরাধ করিলে উহার প্রকৃতি অনুযায়ী তাহাকে শাস্তিভোগ করিতে হইবে। কিন্তু সে উন্মাদ অবস্থায় হদ্দ ও তাযীরের আওতাভুক্ত কোন অপরাধ করিলে তাহাকে উহার শাস্তি ভোগ করিতে হইবে না, তবে কিসাস ও মাল সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণের সম্মুখীন হইতে হইবে।

ইমাম আবু হানীফা, মালেক ও আহমাদ (র) উন্মাদের অপরাধকর্মকে ভুলবশত অপরাধ কর্মের আওতাভুক্ত করিয়াছেন এবং এই ক্ষেত্রে ভুলবশত কৃত অপরাধের শাস্তি প্রয়োগের বিধান রাখিয়াছেন। কেননা উন্মাদ সঠিকভাবে তাহার ইচ্ছার প্রয়োগ করিতে অপারগ। তাই কিসাসের আওতাভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে উন্মাদের উপর

৬০৭

ভুলবশত কৃত হত্যা বা আহত করার দিয়াত (আকিলা কর্তৃক) প্রদান বাধ্যকর হইবে। কিন্তু ইমাম শাফিঈর মতে উন্মাদের কর্মটি ইচ্ছাকৃত অপরাধ হিসাবে গণ্য, যদিও উন্মাদনার কারণে সে দৈহিক শাস্তি হইতে রেহাই পাইয়া থাকে।

আবার দেখা যায়, কোন ব্যক্তি একটি বিশেষ বিষয়ে সম্পূর্ণ বুদ্ধিশূন্য এবং অন্য বিষয়ে তাহার ববাবুদ্ধি সম্পূর্ণ সুস্থ। এই জাতীয় উন্মাদ তাহার বাবুদ্ধিযুক্ত কাজের জন্য দায়ী এবং বিপরীত ক্ষেত্রের জন্য উন্মাদের বিধান তাহার প্রতিও প্রযোজ্য।

অধিকাংশ ফকীহর মতে নির্বুদ্ধিতাও উন্মাদনার অন্তর্ভুক্ত, যদিও সে রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারের উন্মাদের মতে আচরণ করে না। কোন কোন ফকীহ্র মতে নির্বোধ ব্যক্তি সগীর গায়র মুমায়্যিয অথবা সগীর মুমায়্যিয-এর পর্যায়ভুক্ত হইবে। তাহাদের মতে উন্মাদের মধ্যে উত্তেজনাকর শারীরিক ও মানসিক বিশৃংখলা বিদ্যমান থাকে, কিন্তু নির্বোধের মধ্যে শান্ত ভাব বিরাজ করে। এখানে মূলত বুদ্ধিশূন্যতাই শাস্তি মওকুফের কারণ। সুতরাং এই ক্ষেত্রেও উন্মাদের বিধান প্রযোজ্য।

ধারা-১১৩৮

উন্মাদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম ও শাস্তি কার্যকরকরণ (ক) কোন ব্যক্তি অপরাধকর্ম করার পর এবং রায় প্রদানের –

(১) পূর্বে উন্মাদ হইয়া গেলে সে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রায় প্রদান স্থগিত থাকিবে;

(২) পর উন্মাদ হইয়া গেলে সে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি কার্যকর করা স্থগিত থাকিবে।

(খ) কোন ব্যক্তি শাস্তি কার্যকর করাকালে উন্মাদ হইয়া গেলে উহা স্থগিত হইবে না।

(গ) উপধারা (ক) (২)-এ বর্ণিত শাস্তি কিসাস হইলে তাহা দিয়াত-এ পরিবর্তিত হইবে।

বিশ্লেষণ

হানাফী ও মালিকী ফকীহগণের মত এই যে, কোন ব্যক্তি অপরাধ করার পর এবং আদালতের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পূর্বে উন্মাদ হইয়া গেলে অপরাধী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রায় প্রদান স্থগিত থাকিবে। কারণ আদালতের কার্যক্রম চলাকালে

৬০৮

অপরাধীর বালেগ ও সুস্থ বােধবুদ্ধি সম্পন্ন অবস্থায় থাকা জরুরী। কোন ব্যক্তিকে কোন ব্যাপারে দায়ী করিতে হইলে তাহার বালেগ হওয়ার সংগে সংগে যুগপভাবে সুস্থ বােধবুদ্ধি সম্পন্ন (মুকাল্লাফ) হওয়াও জরুরী। অপরাধীর মধ্যে যেহেতু একটি গুণ বিদ্যমান নাই তাই তাহার বিরুদ্ধে আদালতী কার্যক্রম স্থগিত থাকিবে।

শাফিঈ ও হাম্বলী ফকীহগণের মত এই যে, আম্‌দলতী কার্যক্রম সমাপ্ত হওয়ার পূর্বে সৃষ্ট উন্মাদনার কারণে আদালতের কার্যক্রম স্থগিত থাকিতে পারে না। কারণ অপরাধ সংঘটনের সময়ই অপরাধীর রালেগ ও সুস্থ্য বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন (মুকাল্লাফ) হওয়া জরুরী, আদালতী কার্যক্রম চলাকালে তাহার মধ্যে ঐ গুণ বিদ্যমান থাকা জরুরী নয়। শরীআতে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর তাকিদ আছে। অপরাধী অপরাধ কর্ম করার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তিযোগ্য হইয়া গিয়াছে। অতএব বিচারকার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ বিদ্যমান থাকিলে উক্ত উন্মাদনা আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার প্রতিবন্ধক হইবে না। ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি এই যে, “অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের অপারগতা বিচারিক কার্যক্রমের প্রতিবন্ধক নয়”।৩ যেমন বােবা সুস্পষ্ট ভাষায় আত্মপক্ষ সমর্থনে অপরাগ হওয়া সত্ত্বেও তাহার বিরুদ্ধে আদালতে রায় প্রদান স্থগিত থাকে না।

আদালতের রায় প্রদানের পর অপরাধী উন্মাদ হইয়া গেলে সেই ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা (র)-এর অভিমত এই যে, সে সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রায় কার্যকর করা স্থগিত থাকিবে। তবে রায় কার্যকর করা অবস্থায় অপরাধী উন্মাদ হইয়া গেলে উহা মওকুফ না হইয়া বরং কার্যকর হইবে। যদি অপরাধীর শাস্তি কিসাস হইয়া থাকে এবং রায় প্রদানের পর, কিন্তু শাস্তি কার্যকর করার পূর্বে, সে উন্মাদ হইয়া যায়, তবে এই অবস্থায় (ইসতিহসানের ভিত্তিতে) কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে।৪

এই ক্ষেত্রে ইমাম মালেক (র)-এর মত এই যে, উন্মাদনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত রায় কার্যকর করা স্থগিত থাকিবে। কিসাসের ক্ষেত্রে একদল মালিকী ফকীহর মত এই যে, উন্মাদনা দূরীভূত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকিলে দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে এবং অপর দলের মতে নিহতের ওয়ারিসগণ তাহাকে হত্যাও করিতে পারে অথবা দিয়াতও গ্রহণ করিতে পারে।

এই ক্ষেত্রে ইমাম শাফিঈ ও আহমাদ ইবন হাম্বল (র)-এর মত এই যে, উন্মাদনার কারণে আদালতের রায় কার্যকর করা স্থগিত থাকিবে না। তবে অপরাধ কর্মটি হদ্দের আওতাভুক্ত হইয়া থাকিলে এবং অপরাধীর স্বীকারোক্তি দ্বারা তাহা প্রমাণিত হইলে সেই ক্ষেত্রে অপরাধী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আদালতের রায় কার্যকর করা স্থগিত থাকিবে।

৬০৯

ধারা-১১৩৯ আবেগ-উত্তেজনাবশে কৃত অপরাধ কোন ব্যক্তি আবেগ, উত্তেজনা, ঘৃণা অথবা ক্রোধের বশবর্তী হইয়া – (১) হদ্দ অথবা কিসাস-এর আওতাভুক্ত অপরাধ কর্ম করিলে সে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হইবে;

(২) তাযীর-এর আওতাভুক্ত অপরাধ কর্ম করিলে সে আদালতের সুবিবেচনা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হইবে।

বিশ্লেষণ

বালেগ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি স্বেচ্ছায় যে অপরাধই করুক উহার জন্য তাহাকে দায়ী হইতে হইবে, সে তাহা ঘৃণা বা ক্রোধের বশবর্তী হইয়াই করুক অথবা আবেগ উত্তেজনার (Els_ll ce) বশেই করুক বা স্বাভাবিক অবস্থায়ই করুক। যেমন কোন ব্যক্তি প্রতিশোধের আবেগে উত্তেজিত হইয়া অপর ব্যক্তিকে হত্যা করিল অথবা একান্ত প্রিয়জনের রোগ যাতনায় আবেগের বশবর্তী হইয়া তাহাকে রোগ যাতনা হইতে মুক্তি দেওয়ার জন্য হত্যা করিল। এই ক্ষেত্রে সে যেইরূপ মানসিক অবস্থায়ই হত্যাকাণ্ড ঘটাইয়া থাকুক, ইহার জন্য তাহাকে দায়ী হইতে হইবে। উক্তরূপ মানসিক অবস্থা কোন অবৈধ কাজ বৈধ হওয়ার কারণ হইতে পারে না। হদ্দ ও কিসাসের আওতাভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে তাহার উক্তরূপ মানসিক অবস্থা বিচারের ক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য নহে, তবে তাযীরের আওতাভুক্ত অরাধের ক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য হইতে পারে। অর্থাৎ অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী বিচারক লঘু বা গুরুদণ্ড প্রদান করিতে পারেন, এমনকি ক্ষমাও করিতে পারেন।

ধারা-১১৪০

অনুভূতির দুর্বলতাজনিত অপরাধ (

51]। L.) অনুভূতির দুর্বলতার শিকার হইয়া কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের শ্ৰেণী অনুযায়ী ধারা (১১০)-এর বিধান প্রযোজ্য হইবে।

৬১০

বিশ্লেষণ

এমন কতক লোকও দেখা যায় যাহারা উন্মাদ ও নির্বোধের তুলনায় অধিক হইলেও একজন স্বাভাবিক বােধবুদ্ধি সম্পন্ন লোকের তুলনায় কম সচেতন। চেতনা বা অনুভূতির এই দুর্বলতার শিকার হইয়া সে ক্ষিপ্র গতিতে কোন কাজ করিয়া বসে, কিন্তু উক্ত কর্মের পরিণতি সম্পর্কে তাহার চেতনা বিদ্যমান থাকে। এইরূপ মানসিক দুর্বলতার অজুহাতে সে তাহার কৃত অপরাধ কর্মের দায় হইতে রেহাই পাইবে না। অপরাধের শ্ৰেণী অনুযায়ী ধারা (১১০)-এ বর্ণিত বিধান তাহার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে।

ধারা-১১৪১ রোগ-ব্যাধি, স্নায়বিক দুর্বলতা, যাদু ও স্বপ্নবিষ্ট অবস্থা (ক) রোগ-ব্যাধির কারণে কোন ব্যক্তির চেতনা ও স্বাভাবিক বােধশক্তি লোপ পাইলে এবং সেই অবস্থায় তাহার দ্বারা অপরাধ কর্ম ঘটিলে; এবং

(খ) স্নায়বিক দুর্বলতা অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কোন মানসিক দুর্বলতার শিকার হইয়া কোন ব্যক্তি অপরাধকর্ম করিলে;

বিষয়টি উন্মাদ সংক্রান্ত বিধানের আওতাভুক্ত হইবে

(গ) যাদুক্রিয়া অথবা সম্মােহনী ক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত হইয়া কৃত অপরাধ কর্মটি; এবং

(ঘ) ঘুমের ঘোরে স্বপ্নবিষ্ট হইয়া কৃত অপরাধ কর্মটি;

বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধানের আওতাভুক্ত হইবে।

বিশ্লেষণ

কোন কোন স্নায়বিক রোগের কারণে রোগীর চিন্তা, অনুভূতি ও স্বাধীন কর্মক্ষমতা রহিত হইয়া যায়। যেমন মূৰ্ছারোগ -(hysteriod) বা মানসিক রোগ (Schizophrenia) দ্বারা কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাহার চিন্তাশক্তি, অনুভূতিশক্তি ও বােধশক্তি হারাইয়া ফেলে এবং উক্ত অবস্থায় সে যে কর্ম করে তাহার সহিত তাহার বােধশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির কোন সম্পর্ক থাকে না। সে যাহা করে তাহা সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় করে। তাই এইরূপ পরিস্থিতিতে তাহার দ্বারা কোন অপরাধ কর্ম ঘটিলে তাহা উন্মাদনাবশে কৃত অপরাধ কর্মের আওতাভুক্ত হইবে।

৬১১

অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি স্নায়বিক দুর্বলতা অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কোন মানসিক দুর্বলতার ( ২। A L.;) দ্বারা প্রভাবিত হইয়া অপরাধ কর্ম করিতে পারে। ইহাও এক ধরনের ব্যাধি। এই রোগের প্রভাবে রোগী কোন বিশেষ ধরনের কাজ করিতে বাধ্য হয়। যেমন উপরোক্ত অবস্থায় কোন ব্যক্তির মাথায় ধারণা চাপিয়া বসে যে, কেহ তাহাকে হত্যা করিতে চায়। সে এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হইয়া উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করে। তাহার এই কর্ম উন্মাদের কর্মের আওতাভুক্ত হইবে।১০

যাদুক্রিয়া বা সন্মােহনী ক্রিয়া দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হইতে পারে। যাদু বা সন্মােহনী বিদ্যা (Mesmerism) – +15.JI) চর্চা শরীআতে নিষিদ্ধ ও দণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসাবে স্বীকৃত এবং উহার যে ক্ষতিকর অদৃশ প্রভাব বা শক্তি আছে তাহাও স্বীকৃত। অতএব কোন ব্যক্তি যাদুগ্রস্ত বা সম্মােহিত হইয়া নিজের স্বাধীন এখতিয়ার ও বােধবুদ্ধি হারাইয়া যাদুকরের বা সম্মােহনকারীর ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে। তাই যাদুগ্রস্ত বা সম্মােহিত ব্যক্তির কাজ অন্যের দ্বারা বলপ্রয়োগে বাধ্য হইয়া কৃত কর্মের অনুরূপ। এই অবস্থায় তাহার অপরাধকর্ম ও বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া কৃত অপরাধকর্মের আওতাভুক্ত। ঘুমের ঘোরে স্বপ্নবিষ্ট অবস্থায় কৃত অপরাধ কর্মও বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া কৃত অপরাধ কর্মের আওতাভুক্ত। ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি এই যে, “ঘুমন্ত ব্যক্তি শাস্তিযুক্ত হইবে না” (A sleeping man does nofi ncur punishment)।১২ মহানবী (স) বলেনঃ

رفع القلم عن الثلاثة عن النائم حتى يستيقظ ……………………..

“তিন ব্যক্তির কৃতকর্ম লিপিবদ্ধ করা হয় না। ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত ……”।১৩।

ঘুমের ঘোরে স্বপ্নবিষ্ট অবস্থায় মানুষের বােধশক্তি জাগ্রত থাকিলেও তাহার স্বাধীন এখতিয়ার বহাল থাকে না। তাই স্বপ্নবিষ্ট অবস্থায় সে যাহা করে তাহা বাধ্য হইয়াই করে। এইজন্য তাহার উক্ত কর্মকে বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া কৃত কর্মের মধ্যে গণ্য করা হইয়াছে। কারণ কোন ব্যক্তি বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া যাহা করে উহার সহিত তাহার বােধশক্তি যুক্ত থাকিলেও তাহার স্বাধীন এখতিয়ার যুক্ত থাকে না। অপরদিকে পাগলের কর্মের সহিত তাহার বােধশক্তি ও স্বাধীন এখতিয়ার কোনটিই যুক্ত থাকে না, সে কাজ করে উন্মাদনার বশবর্তী হইয়া।১৪

৬১২

ধারা-১১৪২

অন্ধ, মূক ও বধির-এর অপরাধ (ক) মূক, বধির ও অন্ধ ব্যক্তি

(১) হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধ কর্ম করিলে তাহারা হদ্দের শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে বটে, কিন্তু উহার জন্য তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে;

(২) কিসাসের আওতাভুক্ত অপরাধ কর্ম করিলে কিসাস ভিন্ন তাযীর বা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে;

(৩) তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ কর্ম করিলে আদালতের সুবিবেচনা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হইবে।

(খ) কোন ব্যক্তি বাকশক্তিহীনতা, বধিরতা বা অন্ধত্বের প্রভাবে উন্মাদ বা নির্বোধ হইয়া সেই অবস্থায় কোন অপরাধ কর্ম করিলে সে উন্মাদের বিধানাধীন হইবে।

বিশ্লেষণ

অন্ধ, মূক ও বধির নিজ অপরাধ কর্মের জন্য দায়ী হইবে যদি অপরাধ কর্ম করাকালে তাহার বােধশক্তি ও স্বাধীন এখতিয়ার বিদ্যমান থাকে। ইমাম আবু হানীফা (র) ও তাঁহার সহচরগণের মতে এসব লোক হদ্দের আওতাভুক্ত কোন অপরাধকর্ম করিলে তাহাদের উপর হইতে হদ্দ রহিত হইয়া যাইবে, এমনকি তাহারা অপরাধের স্বীকারোক্তি করিলেও। কেননা অন্ধত্ব, বধিরতা ও বাকশক্তিহীনতা সন্দেহ সৃষ্টির কারণ হিসাবে গণ্য। কিন্তু তাহারা তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে। ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদ (র)-এর মতে তাহাদের উপর হইতে হদ্দ রহিত হইবে না।১৫।

তাহারা কিসাসের আওতাভুক্ত কোন অপরাধ করিলে কিসাস না হইয়া দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে। তাহারা তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ করিলে আদালতের সুবিবেচনা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য বা ক্ষমাযোগ্য হইতে পারে।

কোন ব্যক্তি বাকশক্তিহীন, অন্ধত্ব বা বধিরতার কারণে উন্মাদ বা নির্বোধ হইয়া গেলে এবং এই অবস্থায় কোন অপরাধ কর্ম করিলে বিষয়টি উন্মাদের বিধানের আওতাভুক্ত হইবে।১৬।

ধারা-১১৪৩ :

মাদক জনিত চেতনাহীনতা (ক) কোন ব্যক্তি বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া অথবা অজ্ঞাতসারে অথবা রোগের প্রতিষেধক হিসাবে অথবা অনন্যোপায় অবস্থায় ক্ষুৎপিপাসা নিবারণের জন্য মাদক দ্রব্য সেবন করিলে এবং ইহার প্রতিক্রিয়ায় চেতনাহীন বা বুদ্ধিশূন্য হইয়া –

(১) হদ্দ বা তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ কর্ম করিলে দণ্ডযোগ্য হইবে

(২) কিসাস-এর আওতাভুক্ত অপরাধ করিলে সেই ক্ষেত্রে অপরাধ কর্মটি ভুলবশত অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং দিয়াত (আকিলা) প্রদান বাধ্যকর হইবে;

(৩) মাল সংশ্লিষ্ট অপরাধ কর্ম হইলে মাল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যকর হইবে।

বিশ্লেষণ

চার মাযহাবের ইমামগণের গৃহীত মত এই যে, কোন ব্যক্তিকে দুষ্কৃতিকারীরা আটক করিয়া জীবন নাশের হুমকি দিয়া জোরপূর্বক মাদ্রক দ্রব্য গ্রহণ করাইলে এবং ইহার প্রতিক্রিয়ায় মাতাল হইয়া হদ্দ বা তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ করিলে সে ক্ষমাযোগ্য। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে পানীয় মনে করিয়া মাদক দ্রব্য গ্রহণ করিলে অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধের বিকল্প হিসাবে মাদক গ্রহণ করিলে এবং ইহার প্রতিক্রিয়ায় মাতাল হইয়া হদ্দ বা তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ করিলে সেও ক্ষমাযোগ্য। শেষোক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের অবস্থাকে উন্মাদ ও ঘুমন্ত ব্যক্তির সহিত তুলনা করা হইয়াছে।

কোন ব্যক্তি নিরূপায় অবস্থার সম্মুখীন হইয়া ক্ষুধা অথবা পিপাসা দূরীভূত করার জন্য সজ্ঞানে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করিয়া ইহার প্রতিক্রিয়ায় চেতনাহীন হইয়া হদ্দ বা তাযীরের আওতাভুক্ত অপরাধ করিলে সেও ক্ষমাযোগ্য। তাহার অবস্থাকে বলপ্রয়োগকৃত (মুক্রাহ) ব্যক্তির অবস্থার সহিত তুলনা করা হইয়াছে।

উক্ত ব্যক্তিগণ কিসাসের আওতাভুক্ত অপরাধ করিলে অর্থাৎ মনুষ্য হত্যা বা তাহার দৈহিক ক্ষতিসাধনের অপরাধ করিলে তাহা ভুলবশত কৃত অপরাধ হিসাবে

৬১৪

গণ্য হইবে এবং দিয়াত আকিলা প্রদান তাহাদের উপর বাধ্যকর হইবে। তাহারা মাল সংক্রান্ত অপরাধ করিলে অর্থাৎ অন্যের মাল ক্ষতিগ্রস্ত করিলে, গসব করিলে বা চুরি করিলে সেই ক্ষেত্রে নিজ মাল দ্বারা উহার ক্ষতিপূরণ বাধ্যকর হইবে।১৭

ধারা-১১৪৪

বল প্রয়োগ ভীতি প্রদর্শন করিয়া কোন ব্যক্তিকে তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করিতে” অথবা “করা হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য করাকে বল প্রয়োগ বলে।

বিশ্লেষণ

বল প্রয়োগ-এর আরবী প্রতিশব্দ ইকরাহ (syI), যাহার অর্থ অপছন্দ, অমনোপুত ইত্যাদি। ইহা ইসলামী আইনের একটি পরিভাষা। আল-কাসানী বলেন, “ভীতি প্রদর্শন করিয়া কোন ব্যক্তিকে কোন কাজ করিতে বাধ্য করাকে বল প্রয়োগ বলে”।১৮

আল-বাহরুর রাইক গ্রন্থে বলা হইয়াছে : “অসন্তোষজনক কিছুর ভীতি প্রদর্শন করিয়া কোন ব্যক্তির দ্বারা তাহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করাননাকে বল প্রয়োগ বলে”।১৯

মালিকী মাযহাবের ফিক্‌হ গ্রন্থে বলা হইয়াছে : “মানবসত্তার জন্য ক্ষতিকর ও কষ্টদায়ক এমন কিছুর ভীতি প্রদর্শনকে বল প্রয়োগ বলে”।২০

হাম্বলী মাযহাবের ফিক্‌হ গ্রন্থে বলা হইয়াছে : “বল প্রয়োগে সক্ষম ব্যক্তি বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক শাস্তির ভয় প্রদর্শন করিয়া তাহার উদ্দীষ্ট কাজ করাইতে বাধ্য করিলে এবং কর্তার প্রবল ধারণা সৃষ্টি হয় যে, সে উক্ত কাজ না করিলে বলপ্রয়োগকারী তাহার ভীতি প্রদর্শন তাহার উপর কার্যকর করিবে, এইরূপ অবস্থাকে বলপ্রয়োগ বলে”।২১

মুজামু লুগাতিল ফুকাহা গ্রন্থে বলা হইয়াছে : “কোন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে তাহার ইচ্ছা বহির্ভূত কোন কাজ করিতে অথবা না করিতে বাধ্য করাকে বলপ্রয়োগ বলে”।২২

৬১৫

আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা শীর্ষক ফি-এর বিশ্বকোষে বলা হইয়াছে? “কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তি কর্তৃক তাহার এখতিয়ার ও স্বেচ্ছাসম্মতি রহিতকৃত অবস্থায় শেষোক্ত ব্যক্তির জন্য যাহা করিতে বাধ্য হয় তাহাকে বলপ্রয়োগ বলে”।২৩

ধারা-১১৪৫

বল প্রয়োগের শ্রেণীবিভাগ ভীতি প্রদর্শনের মাত্রা অনুযায়ী বল প্রয়োগ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত

(ক) পূর্ণ বল প্রয়োগ? অর্থাৎ এমনভাবে বল প্রয়োগ যাহার ফলে বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তি অনন্যোপায় হইয়া পড়ে এবং তাহার স্বাধীন এখতিয়ার ও স্বেচ্ছাসম্মতি রহিত হইয়া যায়;

(খ) অপূর্ণ বল প্রয়োগ ও অর্থাৎ এমনভাবে বলপ্রয়োগ যাহাতে বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তি অনন্যোপায় হইয়া পড়ে না এবং তাহার এখতিয়ারও খতম হয় না বটে, কিন্তু তাহার স্বেচ্ছাসম্মতি ব্যাহত হয়।

ধারা-১১৪৬

মাল ধ্বংসের ভীতি প্রদর্শন বল প্রয়োগকারী কর্তৃক বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তির মাল ধ্বংসের ভীতি প্রদর্শন বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য নহে।

বিশ্লেষণ

বল প্রয়োগকারী কাহারো মাল ধ্বংস বা বিনষ্ট করার হুমকি দিলে এবং মালের মালিক বল প্রয়োগকারীর উক্ত হুমকিতে ভীত হইয়া কোন অপরাধ কর্ম করিলে তাহা বল প্রয়োগে কৃত অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে না। হানাফী মাযহাবের মূলনীতি, এই যে, “মাল ধ্বংসের হুমকি ইক্ৰাহ (বল প্রয়োগ) নহে” GL #ll

ASI) (1JJ। অবশ্য উক্ত মাযহাবের কিছু সংখ্যক বিশেষজ্ঞের মতে মাল ধ্বংসের হুমকিও বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য। শেষোক্তরা আবার দুই দলে বিভক্ত হইয়া তাহাদের একদল বলেন, সমস্ত মাল ধ্বংসের হুমকি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে এবং অপর দল বলেন, প্রচুর ক্ষতি হইতে পারে এইরূপ পরিমাণ মাল ধ্বংসের হুমকি প্রদান বল প্রয়োগ প্রমাণিত হইবার জন্য যথেষ্ট। ২৪

৬১৬

ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদ ইবন হাম্বল (র)-এর মতে অধিক পরিমাণ মাল ধ্বংসের হুমকি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে। বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার উপর ভিত্তি করিয়া মালের অধিক বা অল্প পরিমাণ নির্ধারিত হইবে। আর্থিক অবস্থার তারতম্যের কারণে একজনের নিকট যেই পরিমাণ স্বল্প মাল, অপরের নিকট সেই পরিমাণ অধিক মাল হিসাবে গণ্য হইতে পারে।২৫

ধারা-১১৪৭ অপর ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ভীতি প্রদর্শন কোন ব্যক্তির পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা বা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের ক্ষতিসাধনের হুমকি তাহার প্রতি বল প্রয়োগ’ হিসাবে গণ্য হইবে।

বিশ্লেষণ

ভীতি প্রদর্শনের বিষয়টি বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট হইলে তাহা অবশ্যই বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে। এই বিষয়ে ফকীহগণ একমত। কিন্তু ইহা বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তির সহিত সংশ্লিষ্ট না হইলে তাহা বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে কি না এই বিষয়ে ভিন্নমত আছে। হানাফী মাযহাব মতে কোন ব্যক্তির পিতা-মাতা স্ত্রী,সন্তান ও অত্যন্ত ঘনিষ্ট আত্মীয়ের ক্ষতি সাধনের হুমকি তাহার প্রতি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য। শাফিঈ মাযহাবেরও এই মত। অবশ্য কিছু সংখ্যক হানাফী ফকীহর মতে কেবল বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তির সহিত সংশ্লিষ্ট হুমকি ব্যতীত অপর কাহারো সহিত সংশ্লিষ্ট হুমকি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে না। ২৬ মালিকী মাযহাবের ফকীহগণের মতে যে কোন ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের হুমকি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে।২৭

হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের মতে কেবল পিতা-মাতা ও সন্তানের ক্ষতি সাধনের হুমকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভীতিপ্রদর্শন হিসাবে গণ্য হইবে।২৮

ধারা-১১৪৮ কর্তৃপক্ষীয় নির্দেশ বল প্রয়োগ কিনা (ক) যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশ সরাসরি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে, উক্ত নির্দেশ ভীতি প্রদর্শনযুক্ত হউক বা না হউক।

তবে শর্ত থাকে যে, নির্দেশ লংঘন করার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড, কঠোর আঘাত বা দীর্ঘ কারাদণ্ডের প্রবল ধারণা বিদ্যমান থাকিতে হইবে।

৬১৭

(খ) যে কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা অর্পণ করা হয় নাই, তাহার নির্দেশ বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে – যদি প্রবল ধারণা হয় যে, নির্দেশ লংঘন করিলে বল প্রয়োগের উপকরণ ব্যবহার করা হইবে অথবা উক্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশ লংঘন করিলে স্বভাবতই বল প্রয়োগের উপকরণ ব্যবহার করা হইয়া থাকে।

বিশ্লেষণ

যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি কোন ব্যক্তিকে অন্যায় কাজ করার আদেশ দেয় এবং তাহা লংঘন করিলে শাস্তির হুমকি না দেয়, তবে সেই ক্ষেত্রে আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রবল ধারণা হয় যে, সে উক্ত আদেশ অমান্য করিলে তাহাকে হত্যা করা হইবে অথবা তাহর দৈহিক ক্ষতি করা হইবে অথবা তাহাকে দীর্ঘ মেয়াদের কারাবাস ভোগ করিতে হইবে, তাহা হইলে উক্ত আদেশ সরাসরি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কতৃত্বহীন কর্তৃপক্ষের উক্তরূপ আদেশ সরাসরি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে না। আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তির যদি প্রবল ধারণা হয় যে, উক্ত আদেশ লংঘন করা হইলে শাস্তি প্রদান করা হইবে অথবা কর্তৃপক্ষের আদেশ লংঘন করিলে স্বভাবতই শাস্তি প্রদান করা হইয়া থাকে, এইরূপ অবস্থায় উক্ত নির্দেশ বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে।

ধারা-১১৪৯।

স্বামীর অবৈধ নির্দেশ স্বামীর অবৈধ আদেশ স্ত্রীর জন্য বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবেদি স্ত্রীর ধারণা হয় যে, আদেশ অমান্য করার ক্ষেত্রে তাহার উপর জুলুম করা হইবে। এই ধারা (১১৫১) ধারা সাপেক্ষ।

বিশ্লেষণ

স্বামী যদি স্ত্রীকে কোন অন্যায় কাজ করার নির্দেশ দেয় এবং স্ত্রী তাহার অভিজ্ঞতা বা প্রবল ধারণার ভিত্তিতে উপলব্ধি করে যে, উক্ত নির্দেশ অমান্য করা হইলে তাহাকে কঠোর নির্যাতন করা হইবে, এইরূপ অবস্থায় স্বামীর নির্দেশ স্ত্রীর ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে, নির্দেশের সহিত ভীতি প্রদর্শনের উপাদান যুক্ত থাকুক বা না থাকুন। কিন্তু নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রবল ধারণা বিদ্যমান

থাকা অবস্থায় উক্ত নির্দেশ পালন করা হইলে তাহা বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে না। ৩০

৬১৮

ধারা-১১৫০

মানহানির ভীতি প্রদর্শন মানহানির ভীতি প্রদর্শন, যেমন অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, যেনার অপবাদ (কাযাফ) আরোপ ইত্যাদির হুমকি বল প্রয়োগ হিসাবে গণ্য হইবে

বিশ্লেষণ

কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে তাহার নির্দেশমত অবৈধ কাজ করিতে বাধ্য করার জন্য গালমন্দ করার, এমনকি যেনার মত জঘন্য অপরাধের মিথ্যা অপবাদ (কাফ) আরোপের হুমকি প্রদান করিলে এবং সে ভীত হইয়া তাহার নির্দেশিত কাজ করিলে তাহা বল প্রয়োগে কৃত কর্ম হিসাবে গণ্য হইবে না। এই বিষয়ে চার মাযহাবের ফকীগহণ ঐক্যমত পোষণ করেন।

ধারা-১১৫১ বল প্রয়োগে কৃত অপরাধের বিধান (২) বিধানগতভাবে বল প্রয়োগে কৃত অপরাধ তিন পর্যায়ে বিভক্ত – ‘

(ক) যেই অবস্থায় অপরাধের শাস্তি হইতে রেহাই পাওয়া যায় না, কিন্তু শাস্তির ধরন ও মাত্রা পরিবর্তিত হইয়া যায়; যেমন নরহত্যা;

(খ) যেই অবস্থায় অপরাধ কর্মটি বৈধ হইয়া যায় এবং শাস্তিও মওকুফ হইয়া যায়; যেমন অনন্যোপায় অবস্থায় হারাম বস্তু গ্রহণ;

(গ) যেই অবস্থায় অপরাধ কর্মটি অপরাধ কর্ম হিসাবেই গণ্য হয় কিন্তু শাস্তি মওকুফ হইয়া যায়।

বিশ্লেষণ

বল প্রয়োগে কৃত অপরাধ কর্মটি মানবজীবন অথবা মানবদেহ সংশ্লিষ্ট হইলে অর্থাৎ বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তি বাধ্য হইয়া অপর ব্যক্তিকে হত্যা করিলে বা তাহার কোন অঙ্গ কর্তন করিলে বা আঘাত করিয়া অঙ্গহানি ঘটাইলে এইসব ক্ষেত্রে সে তাহার কৃত অপরাধের শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে না। এই বিষয়ে ফকীহগণ একমত।৩২ মহান আল্লাহ বলেন :

৬১৯

ولا تقتلوا النفس التي حرم الله الأ بالحق .

“আল্লাহ যাহার হত্যা নিষিদ্ধ করিয়াছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তোমরা তাহাকে হত্যা করিবে না” (সূরা আনআমঃ ১৫১; সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৩)।

والذين يؤون المؤمنين والمؤمنت بيرما اكتسبوا فقد

احتملوا بهتانا واثما مبينا.

“যাহারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে পীড়া দেয় এমন কোন অপরাধের জন্য যাহা তাহারা করে নাই, তাহারা অপবাদের এবং স্পষ্ট পাপের বােঝা বহন করে” (সূরা আহাব : ৫৮)।

ফকীহগণ বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানের কারণ বর্ণনা করিতে গিয়া বলেন, সে নিজের জান বাঁচাইবার এবং বল প্রয়োগকারীর নির্যাতন হইতে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাইয়াছে। অতএব তাহাদের মতে মানবজীবন ও মানবদেহ সংশ্লিষ্ট অপরাধ কর্মটি বল প্রয়োগে বাধ্য হইয়া করা হইলে বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তি শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে না। অবশ্য এই ক্ষেত্রে শাস্তির ধরন ও মাত্রার মধ্যে পার্থক্য হইবে অর্থাৎ গুরুদণ্ডের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত লঘুদণ্ড প্রদান করা হইবে। ইমাম মালেক ও আহমাদ (র)-এর মতে এই ক্ষেত্রে কিসাসই কার্যকর হইবে।৩৩ শাফিঈ মাযহাবের দুইটি ভিন্নমত লক্ষ্য করা যায়, যাহার একটি পূর্বোক্ত মতের অনুরূপ এবং অগ্রগণ্য মত অনুযায়ী এই ক্ষেত্রে দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে। কারণ বল প্রয়োগ সন্দেহের সৃষ্টি করে, যাহার ফলে কিসাস রহিত হইয়া যায়।৩৪ হানাফী মাযহাবে তিনটি মত লক্ষ্য করা যায়। ইমাম যুফার (র)-এর মতে কিসাস কার্যকর হইবে, ইমাম আবু হানীফা ও মুহাম্মাদ (র)-এর মতে তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে এবং আবু ইউসুফ (র)-এর মতে দিয়াত আরোপিত হইবে।৩৫।

বল প্রয়োগের আওতার মধ্যে এমন একটি অবস্থাও আছে যখন বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তির জন্য অপরাধ কর্মটির সংঘটন বৈধ হইয়া যায় এবং একই সংগে শাস্তিও রহিত হইয়া যায়। যেমন কোন ব্যক্তি ক্ষুৎপিপাসায় নিরুপায় হইয়া মৃত হারাম জীবের গোশত ভক্ষণ করিল। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে?

وقد فصل لكم ماحرم عليكم الا ما أضطررتم اليه .

৬২০

“তিনি যাহা তোমাদের জন্য হারাম করিয়াছেন তাহা বিশদভাবেই তোমাদের নিকট বিবৃত করিয়াছেন, তবে তোমরা নিরুপায় হইলে তাহা স্বতন্ত্র” (সূরা

আনআমঃ ১১৯)।

اما حرم عليگم الميتة والدم ولحم الخنزير وما أهل به لقير

الله ج فمن اضطر غير باغ ولا عاد قائم عليه.

“নিশ্চয় আল্লাহ মৃত জীব, রক্ত, শূকর মাংস এবং যাহার উপর আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হইয়াছে তাহা তোমাদের জন্য হারাম করিয়াছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি অনন্যোপায় অথচ অবাধ্যাচারী বা সীমালংঘনকারী নয়, তাহার জন্য পাপ হইবে না” (সূরা বাকারা : ১৭৩)।৬

মৃতজীব, রক্ত ও শূকর মাংস ভক্ষণ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হারাম, কিন্তু কোন ব্যক্তি একান্ত নিরূপায় হইয়া তাহা ভক্ষণ করিলে বা তাহাকে বল প্রয়োগে তাহা ভক্ষণে বাধ্য করা হইলে তাহা গ্রহণ তাহার জন্য বৈধ হইয়া যায় এবং ইহার জন্য তাহাকে আইনত দায়ী করা হইবে না, যদিও উপরোক্ত বস্তুগুলি মূলতই হারাম। বরং সর্বাগ্রগণ্য মত এই যে, কোন ব্যক্তি নিরূপায় অবস্থায় হারাম বস্তু গ্রহণ না করিয়া নিজের জীবন ধ্বংস করিলে ইহার জন্য সে গুনাহগার হইবে।৩৭ কেননা কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে?

G

ولا تلقوا بأيديكم إلى المملكة .

“তোমরা নিজেদের হাতে নিজদিগকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করিও না” (সূরা বাকারা : ১৯৫)।

ولا تقتلوا أنفسكم إن الله كان بكم رحيما .

১০

“তোমরা নিজদিগকে হত্যা করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু” (সূরা নিসা : ২৯)।

অতএব অনন্যোপায় অবস্থায় হারাম বস্তু গ্রহণ করিয়া হইলেও জান বাঁচানো ফরয়।৩৮

উল্লেখ্য যে, কেবল পূর্ণ বল প্রয়োগের 5 Jsi) ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য, অপূর্ণ বল প্রয়োগের (GAS SI) ক্ষেত্রে নয়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে হারাম কর্মটি হারামই থাকিবে এবং শাস্তিযোগ্য হইবে।

পূর্বোক্ত দুই শ্রেণীতে উল্লেখিত অপরাধ কর্ম ব্যতীত অপর সকল ক্ষেত্রে অপরাধ কর্মটি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ বল প্রয়োগের আওতাধীনে শাস্তি মওকুফ হইয়া যায়। যেমন যেনার অপবাদ আরোপ, গালি দেওয়া, চুরি করা ইত্যাদি।

ধারা-১১৫২ অনন্যোপায় অবস্থা ও তাহার শর্তাবলী (ক) যে অবস্থায় বা পরিস্থিতিতে কোন ব্যক্তি নিজের অথবা অপরের জীবন অথবা দেহের কোন অঙ্গকে ধ্বংস হইতে রক্ষা করার জন্য স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে অপরাধ কর্ম করিতে বাধ্য হয় সেই অবস্থা বা পরিস্থিতিকে

“অনন্যোপায় অবস্থা” বলে?

তবে শর্ত থাকে যে, ঐ কর্ম যাহা অপরাধ বলিয়া চিহ্নিত হইবার দাবি রাখে, এমন কর্ম ব্যতীত অন্য কোনভাবে যাহা করা উচিৎ তাহা করা যাইত

(খ) নিম্নবর্ণিত চারটি শর্ত বিদ্যমান পাওয়া গেলে কোন অবস্থা বা পরিস্থিতিকে অনন্যোপায় অবস্থা হিসাবে গণ্য করা যাইবে

(১) সংশ্লিষ্ট অবস্থা বা পরিস্থিতি এতখানি গুরুতর হইবে যে, কোন ব্যক্তি নিজের অথবা অপরের জীবন অথবা দেহের কোন অঙ্গ ধ্বংস হওয়ার আশংকা করে;

(২) অনন্যোপায় অবস্থা বাস্তবে বিদ্যমান থাকিতে হইবে;

(৩) অপরাধ কর্মে লিপ্ত হওয়া ব্যতীত অনন্যোপায় অবস্থা দূরীভূত করার বিকল্প কোন বৈধ উপায় অনুপস্থিত থাকিতে হইবে;

(৪) অনন্যোপায় অবস্থায় যতখানি অপরাধ করা অপরিহার্য, কেবল ততখানি অপরাধ সংঘটিত হইতে হইবে।

বিশ্লেষণ

আইনগত দিক হইতে বিবেচনা করিলে অনন্যোপায় অবস্থার হুকুম বল প্রয়োগের হুকুমের অনুরূপ, যদিও উভয়ের বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য আছে। কারণ বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগকৃত ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তি কোন কাজ করিতে বাধ্য করে। আর অনন্যোপায় অবস্থায় কর্তাকে সংশ্লিষ্ট কাজ করিতে অপর কেহ জোরপূর্বক বাধ্য করে না, বরং সে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পতিত হয় যাহা হইতে পরিত্রাণের জন্য নিষিদ্ধ কর্মটি করিতে বাধ্য হয়। যেমন কিছু সংখ্যক লোক গন্তব্যে পৌছার জন্য নৌযানে আরোহণ করিল। পথিমধ্যে মাল ও যাত্রীর ভারে নৌযান ডুবুডুবু প্রায়। কিছু পরিমাণ মাল নদীতে নিক্ষেপ না করা হইলে যাত্রীদের

৬২২

বাঁচানো সম্ভব নহে। এই অবস্থায় যাত্রীগণ অপরের মালিকানাধীন মাল নদীতে নিক্ষেপ করিয়া নৌযানকে ডুবিয়া যাওয়া হইতে রক্ষা করিল। মাল ধ্বংস করা যদিও একটি অপরাধ, কিন্তু যাত্রীগণের জীবন রক্ষার জন্য এই অবস্থায় প্রয়োজন পরিমাণ মাল ধ্বংস করা অপরাধ নহে। আরবী পরিভাষায় অনন্যোপায় অবস্থাকে “আল-হালাতুল ইদতিরারী” (sh_AT JLI) বলে। কেহ কেহ ইহার অর্থ করিয়াছেন “জরুরী অবস্থা”।

কোন অবস্থা বা পরিস্থিতিকে আইনগতভাবে “অনন্যোপায় অবস্থা” হিসাবে গণ্য করার জন্য চারটি শর্ত বিদ্যমান থাকিতে হইবে। ইহার কোন একটি শর্ত বিদ্যমান

থাকিলে সংশ্লিষ্ট অবস্থা বা পরিস্থিতিকে অনন্যোপায় অবস্থা’ বলা যাইবে না। ইহার প্রথম শর্ত হইতেছে পরিস্থিতি এতটা গুরুতর হইবে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের অথবা অপরের জীবন বা দেহের কোন অঙ্গ ধ্বংস হওয়ার আশংকা করে। এইরূপ আশংকা বিদ্যমান না থাকিলে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিকে অনন্যোপায় অবস্থা বলা যায় না।

দ্বিতীয়ত, অনন্যোপায় অবস্থা বাস্তবে বিদ্যমান থাকিতে হইবে, অনন্যোপায় অবস্থার আশংকা বা সম্ভাবনা যথেষ্ট নহে। অর্থাৎ কোন ব্যক্তি অনন্যোপায় অবস্থায় পতিত না হইয়া বরং উক্ত অবস্থায় পতিত হওয়ার আশংকা করিয়াই অপরাধ কর্মে লিপ্ত হইলে সে উহার দায় হইতে রেহাই পাইবে না।

তৃতীয়ত, অপরাধ কর্মের সংঘটন ব্যতীত উক্ত অবস্থা হইতে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব হইতে হইবে। পরিত্রাণের বৈধ কোন উপায় বিদ্যমান থাকিলে সংশ্লিষ্ট অনন্যোপায় অবস্থা হিসাবে গণ্য হইবে না এবং সেই অবস্থায় অপরাধ কর্ম করিলে ইহার দায় হইতে রেহাই পাওয়া যাইবে না।

চতুর্থত, অনন্যোপায় অবস্থা হইতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ন্যূনতম যতখানি অপরাধ সংঘটন একান্ত অপরিহার্য, তাহার অধিক অপরাধ কর্ম করা যাইবে না। সীমা লংঘন করিলে উহার জন্য দায়ী হইতে হইবে।

এই চারটি শর্তের উপস্থিতি যুগপভাবে নৌযানের উদাহরণের মধ্যে পাওয়া যাইতে পারে। যেমন নৌযান উহার বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত বােঝাই করার কারণে অথবা সমুদ্রে ঝড় উঠার কারণে অথবা হঠাৎ নৌযানের তলা ফাটিয়া যাওয়ার কারণে জীবন রক্ষার্থে যাত্রীগণের গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হইলে কেবল সমুদ্রে মাল নিক্ষেপ করা যাইবে, ঝড়ের আশংকায় বা নৌযানের তলা ফাটিবার আশংকায় উক্ত কাজ করা যাইবে না। কিছু মাল সমুদ্র তীরে স্থলভাগে অপসারণের সুযোগ থাকা

৬২৩

সত্ত্বেও উহা সমুদ্রে নিক্ষেপ করিলে দায়ী হইতে হইবে। আবার যে পরিমাণ মাল নিক্ষেপ করিলে বিপদমুক্ত হওয়া যায় তাহার অধিক নিক্ষেপ করা অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে। ৯

ধারা-১১৫৩ অনন্যোপায় অবস্থায় কৃত অপরাধের বিধান () অনন্যোপায় অবস্থায় কৃত অপরাধের বিধান ধারা (১১৫২)-এ বর্ণিত বল প্রয়োগে কৃত অপরাধের বিধানের অনুরূপ।

ধারা-১১৫৪ অনন্যোপায় অবস্থায় মৃত মানুষ ভক্ষণ অননন্যাপায় অবস্থায় মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ বৈধ, যদি পানাহারের জন্য বিকল্প কিছু না পাওয়া যায়।

বিশ্লেষণ

ইমাম মালেক (র)-এর মতে অনন্যোপায় অবস্থায় মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ হারাম। হানাফী মাযহাবের ইহাই অগ্রগণ্য মত।৪০ ইমাম শাফিঈ ও কোন কোন হানাফী ফকীহ উক্ত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ বৈধ মনে করেন।৪১ ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতে অন্যন্যোপায় ব্যক্তির নিজ দেহের কোন অংশের গোশত কাটিয়া ভক্ষণ করা বৈধ, যদি তাহার প্রবল ধারণা হয় যে, ইহাতে তাহার মৃত্যু হওয়ার আশংকা নাই।৪২ অপর সকল ইমামের মতে ইহা বৈধ নহে।

ধারা-১১৫৫ অনন্যোপায় অবস্থায় অপরের ক্ষতিসাধন কোন ব্যক্তি অনন্যোপায় অবস্থায় মানব জীবন, মানবদেহ এবং অপরের মালের ক্ষতিসাধন করিলে তাহা শাস্তিযোগ্য হইবে।

বিশ্লেষণ

যেমন কোন ব্যক্তি নিরুপায় অবস্থায় পতিত হইয়া অপরের মাল আত্মসাৎ, জবরদখল বা চুরি করিয়া নিজের ক্ষুৎপিপাসা মিটাইল। এই অবস্থায় তাহাকে উক্ত

৬২৪

মালের ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। উপরোক্ত অবস্থায় সে কোন ব্যক্তিকে হত্যা করিলে বা তাহার দৈহিক ক্ষতিসাধন করিলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাহাকে

দিয়াত বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ করিতে হইবে। কারণ ইসলামী আইনে জান-মাল

সর্বাবস্থায় নিরাপদ।

ধারা-১১৫৬ অনন্যোপায় ব্যক্তি কর্তৃক খাদ্যদ্রব্য অপহরণ (ক) এক অনন্যোপায় ব্যক্তি জোরপূর্বক অপর অনন্যোপায় ব্যক্তির খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণ করিয়া ফেলিলে এবং ফলে শেষোক্ত ব্যক্তি মারা গেলে ইহার জন্য প্রথমোক্ত ব্যক্তি দায়ী হইবে।

(খ) যাহার নিকট পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য আছে, অনন্যোপায় ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষার পরিমাণ দ্রব্য তাহার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইতে

পারিবে, যদি সে স্বেচ্ছায় তাহা প্রদানে সম্মত না হয়।

বিশ্লেষণ

যেমন এক অনন্যোপায় ব্যক্তির নিকট যৎসামান্য খাদ্যদ্রব্য ছিল। অপর অনন্যোপায় ব্যক্তি জোরপূর্বক তাহা দখল করিয়া খাইয়া ফেলিল এবং খাদ্যের মালিক অভুক্ত মারা গেল। এই অবস্থায় খাদ্য ছিনতাইকারী অনন্যোপায় ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যাকারী হিসাবে গণ্য হইবে।৪৩

কাহারও নিকট প্রয়োজনাতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য থাকা সত্ত্বেও সে তাহা হইতে অনন্যোপায় ব্যক্তিকে প্রদান না করিলে শেষোক্ত ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন পরিমাণ দ্রব্য তাহার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইতে পারিবে। ছিনতাই করিতে গিয়া অনন্যোপায় ব্যক্তি নিহত হইলে ইহার জন্য খাদ্যের মালিক দায়ী হইবে। অনন্যোপায় ব্যক্তি কর্তৃক খাদ্যের মালিক নিহত হইলে তাহার রক্ত বৃথা যাইবে। কারণ সে খাদ্যদ্রব্য প্রদান না করিয়া অন্যায় করিয়াছে এবং অনন্যোপায় ব্যক্তি মোকাবিলায় অবতীর্ণ হইয়া হামলাকারী সাজিয়াছে। ইহা ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদ (র)-এর অভিমত।৪৪

ইমাম আবু হানীফা (র)-এর অভিমতও তাই। তবে তিনি খাদ্যদ্রব্যের মালিকের বিরুদ্ধে অস্ত্রের পরিবর্তে দৈহিক শক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করিয়াছেন।৪৫ পক্ষান্তরে ইমাময় প্রয়োজনবােধে অস্ত্র ব্যবহারেরও অনুমতি দিয়াছেন।

ধারা-১১৫৭ আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (১৪) (ক) নও মুসলিমের কাফের অবস্থায় কৃত হদ্দ ও কিসাস-এর সংজ্ঞাধীন কোন অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ নাই।

তবে শর্ত থাকে যে, কাযাফ-এর ক্ষেত্রে বিদ্যমানতা রহিয়াছে।

(খ) হদ্দ ও কিসাস-এর সংজ্ঞা বহির্ভূত অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা রহিয়াছে।

বিশ্লেষণ

ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি এই যে, “নস ব্যতীত বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তির তাহার কোন কর্মের জন্য দণ্ডাজ্ঞা প্রদান করা যায় না”।৪৬ অর্থাৎ কোন ব্যক্তির কর্মের জন্য তাহাকে দোষী সাব্যস্ত করিতে হইলে ইহার সমর্থনে নস বিদ্যমান থাকিতে হইবে, যাহা কর্মটি ঘটিবার পূর্বেই উহাকে অপরাধ কর্ম ঘোষণা করিয়াছে। কারণ কোন কার্য যতক্ষণ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষিত না হইবে ততক্ষণ উহা করা অপরাধ হইতে পারে না। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী :

وما كنا معذبين حتى نبعث رسو .

“আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাহাকেও শাস্তি দেই না” (সূরা বনী

ইসরাঈলঃ১৫)।

وما أهلنا من قرية الأ لها منذرون .

“আমি এমন কোন জনপদ ধ্বংস করি নাই যাহার জন্য সতর্ককারী ছিল না” (সূরা শুআরা : ২০৮)।

وما كان ربك هيك القرى حتى يبعث فى أمها ولا يثلوا

عليهم أيتنا ج وماگنا مهلكى القرى الأ واهلها ظلمون .

“তোমার প্রতিপালক জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না উহার কেন্দ্রে তাঁহার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করি তার জন্য রাসূল প্রেরণ না করিয়া এবং আমি জনপদসমূহকে তখুনই ধ্বংস করি যখন ইহার বাসিন্দারা যুলুম করে” (সূরা কাসাস : ৫৯)।

এসব আয়াত হইতে পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী আইনের সাধারণ মূলনীতি অনুযায়ী উক্ত আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা থাকিতে পারে না। বিশেষত

৬২৬

হদ্দ ও কিসাস সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে এই কথা সর্বজন স্বীকৃত। কারণ কুরআন মজীদের এই সংক্রান্ত আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ

করিলে দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট অপরাধ সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর উহার ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ করা হয় নাই।

কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট হইবে। ইসলামী শরীআর সূচনা হইতেই যেনা একটি হারাম কার্য ও অপরাধ হিসাবে গণ্য ছিল এবং উক্ত অপরাধের জন্য হালকা শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে?

والتي ياتين الفاحشة من سائكم فاستشهدوا عليه أربعة منم فان شهدوا فأمسكوه في البيوت حتى يتوقه الموت أو يجعل الله له سبيلا. والذين ياتينها منكم قاوهما فان تابا واصلا فأعرضوا عنهما.

“তোমাদের নারীদের মধ্যে যাহারা যেনা করে তাহাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হইতে চারজন সাক্ষী তলব করিবে। যদি তাহারা সাক্ষ্য দেয় তবে উহাদিগকে গৃহে অবরুদ্ধ করিবে, যে পর্যন্ত না তাহাদের মৃত্যু হয় অথবা আল্লাহ তাহাদের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা করেন। তোমাদের মধ্যে যে দুইজন ইহাতে লিপ্ত হইবে তোমরা তাহাদেরকে শাস্তি দিবে। যদি তাহারা তওবা করে এবং নিজদিগকে সংশোধন করিয়া লয় তবে তোমরা তাহা হইতে নিবৃত্ত থাকিবে” (সূরা নিসা : ১৫, ১৬)।

ইহার পর যেনার অপরাধে কঠোর শাস্তি (ক্ষেত্রভেদে এক শত বেত্রাঘাত অথবা রজম অর্থাৎ পাথর বর্ষণে মৃত্যুদণ্ড) বিধান দেওয়া হয়। অপরাধী ‘গায়র মুহসান’ হইলে এক শত বেদণ্ড (দ্র. সূরা নূর ও ২) এবং মুহসান হইলে রজম (দ্র. মহানবী (সা)-এর হাদীস) নির্দিষ্ট করা হয়। এই বিধান কার্যকর হওয়ার পূর্বেকার অপরাধের ক্ষেত্রে তাহা প্রযোজ্য হওয়ার কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অতএব এই বিধানের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ বৈধ নহে।

অনুরূপভাবে ইসলামী শরীআতে পর্যায়ক্রমে মদ্যপান হারাম করা হইয়াছে। এই সম্পর্কিত সর্বশেষে নাযিলকৃত আয়াতে বলা হইয়াছে?

اما الخمر والميسر والأنصاب والأزلام رجس من عمل

الشيطان فاجتنبوه لعلكم تفلون .

“মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কার্য। সুতরাং তোমরা উহা বর্জন কর, যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার” (সূরা মাইদা : ৯০)।

৬২৭

উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী (সা) মাদক গ্রহণের শাস্তি বেত্ৰদণ্ড নির্ধারণ করেন, কিন্তু যাহারা উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে মাদক গ্রহণ করিয়াছিল তাহাদের উপর শাস্তি কার্যকর করিয়াছেন বলিয়া কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অতএব মাদক গ্রহণের অপরাধের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা নাই।

ইসলামী আইনে চুরির শাস্তি নির্ধারণ করা হইয়াছে “হস্ত কর্তন”। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে?

والسارق والسارقة فاقتموا أيهما جزاء بما كسبا نكا من الله.

“পুরুষ চোর এবং নারী চোর- তোমরা তাহাদের হস্তচ্ছেদন কর। ইহা তাহাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহ্র পক্ষ হইতে আম্‌দর্শ দণ্ড” (সূরা মাইদা : ৩৮)।

উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বেকার কোন চুরির ঘটনায় হস্ত কর্তনের দণ্ড কার্যকর করার কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অতএব এই ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ বৈধ নহে।

ইসলামী শরীআতে কতলে আম্‌দ (ইচ্ছাকৃত নরহত্যা)-এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে?

يأيها الذين آمنوا كتب عليكم القصاص في القتلى .

“হে মুমিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেওয়া হইয়াছে” (সূরা বাকারা : ১৭৮)।

উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়াছে সেইসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আয়াতের বিধান প্রয়োগ করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অতএব এই ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ বৈধ নহে।

আবার এমন কতগুলি ক্ষেত্র আছে যেখানে ইসলামী আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ বৈধ, বরং অতি জরুরী। যেমন ইসলামী আইনে পিতার স্ত্রীকে (সৎ মা) ও মাহরাম আত্মীয়কে বিবাহ করা হারাম। কোন ব্যক্তি এই জাতীয় কোন অপরাধ করিলে সে দোষী সাব্যস্ত হইবে এবং দণ্ড ভোগ করিবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে সংঘটিত অনুরূপ ঘটনার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় নাই, তবে স্বামী-স্ত্রীকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া হইয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে?

أباؤكم من النساء الأ ما قد سلف .

ولا تنكحوا مان

৬২৮

“তোমাদের পিতৃপুরুষগণ যেসব নারীকে বিবাহ করিয়াছে, তোমরা তাহাদেরকে বিবাহ করিও না; পূর্বে যাহা হইয়াছে তো হইয়াছে” (সূরা নিসাঃ২২)।

ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবদের মধ্যে সত্মাকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। উক্ত বিধান নাযিল হওয়ার পর কোন ব্যক্তির সম্মা তাহার বিবাহাধীন থাকায় অথবা অনুরূপ কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর তাহাকে শাস্তি প্রদান করা হয় নাই বটে, কিন্তু তাহার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া দেওয়া হইয়াছে। অতএব এই ক্ষেত্রে ইসলামী আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা বৈধ, বরং আবশ্যকীয়।

অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তির বিবাহধীনে দুই বােন (সহােদর, বৈমাত্রেয়, বৈপিত্রেয় যাহাই হউক) থাকা অবস্থায় তাহারা ইসলাম গ্রহণ করিলে উক্ত বিবাহের জন্য কোনরূপ শাস্তি প্রদান করা হয় নাই বটে, কিন্তু এক বােনের বিবাহ রদ করা হইয়াছে। কেননা কুরআন মজীদে একত্রে দুই বােনকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে (দ্র. সূরা নিসা, ২৩ আয়াত)। দাহ্হাক ইন ফায়রা আম্‌দ-দায়লামী (রা) নবী (সা)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলেন, ইহা রাসূলাল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি এবং আমার বিবাহাধীনে দুই সহােদর বােন আছে। নবী (স) বলেন : তোমার ইচ্ছামত তাহাদের যে কোন একজনকে বাছিয়া নাও।৪৭ এই ক্ষেত্রেও আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা স্বীকৃত।

আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, গায়লান ইবন সালামা আস-সাকাফী যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাহার দশজন স্ত্রী ছিল, যাহাদেরকে তিনি জাহিলী যুগে বিবাহ করিয়াছিলেন। তাহারাও তাহার সহিত ইসলাম গ্রহণ করে। মহানবী (সা) তাহাকে উক্ত স্ত্রীগণের মধ্য হইতে যে কোন চারজনকে বাছিয়া লওয়ার নির্দেশ দেন। এই ক্ষেত্রেও ইসলামী আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা।

আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা স্বীকৃত। যেমন কুরআন মজীদে সূদ ভিত্তিক লেনদেন হারাম ঘোষণা করিয়া বলা হইয়াছে?

ايها الذين أموا اتقوا الله وذروا ما بقي من التربوا ان گنتم مؤمنين . فان لم تفعلوا فأنتموا بحرب من الله ورسوله ج وان بم فلم روس أموالكم لا تظلمون ولا تظلمون .

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যাহা বকেয়া আছে তাহা ছাড়িয়া দাও যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমরা না ছাড় তবে আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সহিত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর তবে

৬২৯

তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। ইহাতে তোমরা অত্যাচার করিবে না এবং অত্যাচারিত হইবে না” (সূরা বাকারা : ২৭৮-৯)।

উক্ত আয়াতদ্বয়ে এবং আরও কতিপয় আয়াতে সূদ ভিত্তিক লেনদেন হারাম করা হইয়াছে, এমনকি এইসব আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বেকার প্রাপ্য সূদও আদায় করিতে নিষেধ করা হইয়াছে, কিন্তু মূলধন ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। মহানবী (স) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন :

“জাহিলী যুগের সকল প্রকার সূদের পাওনা বাতিল ঘোষণা করা হইল। কিন্তু মূলধন ফেরত প্রদান করিতে হইবে।”

সূদের আদান-প্রদান শরীআ আইনে একটি দণ্ডযোগ্য অপরাধ হইলেও সূদ হারাম হওয়ার নির্দেশ নাযিল হওয়ার পূর্বেকার এই জাতীয় লেনদেনের অপরাধে কাহাকেও শাস্তি প্রদান করা হয় নাই। অপরদিকে নির্দেশ নাযিল হওয়ার আগে অনুষ্ঠিত ঋণের এই লেনদেনের বেলায় মূলধন ফেরত প্রদান বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হইয়াছে। অতএব এই ক্ষেত্রেও ইসলামী আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা স্বীকৃত।

সামাজিক ঐক্য, সংহতি ও শান্তি-শৃংখলা বিনষ্টকারী অপরাধের ক্ষেত্রেও আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা থাকিতে পারে। কাযাফ’ (যেনার মিথ্যা অপবাদ) সম্পর্কিত বিধান ইহার উদাহরণ। উম্মুল মুমিনীন হযরত আইশা সিদ্দীকা (র)-র প্রতি মোনাফিক গোষ্ঠী কাযাফ-এর অপবাদ আরোপ করিলে ইহাকে কেন্দ্র করিয়া মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও শত্রুতার সূত্রপাত হয় এবং তাহারা প্রায় দুই দলে বিভক্ত হইয়া পরস্পর সশস্ত্র বিবাদে লিপ্ত হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা উম্মুল মুমিনীন হযরত আইশা (রা)-র পবিত্রতা ও নির্দোষিতা বর্ণনা করিয়া এবং অপবাদ রটনাকারীদের শাস্তি বিধান করিয়া আয়াত নাযিল করেন?

والذين يرون المحصنت ثم لم يأتوا بأربعة شهداء فأجل

وهم منين جلد و تقبلوا تهم شهادة أبدا .

“যাহারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরো করে এবং চারিজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাহাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করিবে এবং কখনও তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করিবে না” (সূরা নূর : ৪)।

উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা) ঘটনার সহিত জড়িত ব্যক্তিদের উপর দণ্ড কার্যকর করেন। অথচ ঘটনাটি ছিল আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বেকার।

৬৩০

যিহার (ধারা-৩৭১ দ্র.) সম্পর্কিত আয়াত দ্বারাও ক্ষেত্রবিশেষে ইসলামী আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়। আওস ইবনুস সামিত (রা) নিজ স্ত্রী খাওলা (রা)-র সহিত যিহার করিলে তিনি নবী (সা)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া ঘটনার বিবরণ দেন। নবী (সা) বলেন, তুমি তাহার জন্য হারাম। মহিলা বারবার তাহার কথার পুনরাবৃত্তি করিলে রাসূলুল্লাহ (সা)-ও পুনপুন একই কথা বলিতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা যিহার সম্পর্কিত বিধান নাযিল করেন (সূরা মুজাদালার ১-৪ আয়াত দেখা যাইতে পারে)। এই ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (সা) সংশ্লিষ্ট বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বেকার একটি বিষয়ের মীমাংসা করেন উক্ত বিধান অনুযায়ী। আইয়ামে জাহিলিয়াতের প্রথা অনুযায়ী যিহার -এর মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হইয়া যাইত এবং মহানবী (সা) প্রথমে তদনুযায়ী বলিয়াছেন যে, স্ত্রীলোকটি পুরুষ লোকটির জন্য হারাম হইয়া গিয়াছে।

ধারা-১১৫৮ নিজ সত্তা ও মালের উপর অপরাধ সংঘটনের অনুমতি প্রদান

কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে নিজের – (১) জীবন সংহারের সম্মতি বা নির্দেশ প্রদান করিলে এবং শেষোক্ত ব্যক্তি তদনুযায়ী প্রথমোজ ব্যক্তির

জীবন সংহার করিলে হত্যাকারীর উপর দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে;

(২) আহত করার অথবা অঙ্গহানির নির্দেশ প্রদান করিলে এবং শেষোক্ত ব্যক্তি তদনুযায়ী প্রথমোক্ত ব্যক্তির অঙ্গহানি ঘটাইলে বা তাহাকে আহত করিলে এবং তাহার ফলে তাহার মৃত্যু হইলে দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে এবং মৃত্যু না হইলে অপরাধীর কোন শাস্তি হইবে না; তবে তাযীরের আওতায় আদালতের বিবেচনায় শাস্তি হইতে পারে;

(৩) মাল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করার নির্দেশ প্রদান করিলে এবং শেষোক্ত ব্যক্তি তদনুযায়ী প্রথমোক্ত ব্যক্তির মাল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করিলে উভয়ের শাস্তি হইবে না, তবে আদালতের বিবেচনায় তাহারা তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইতে পারে।

বিশ্লেষণ

ইমাম আবু হানীফা (র) ও তাঁহার সহচরগণের মতে কোন ব্যক্তি নিজের জীবন সংহারের জন্য অপর ব্যক্তিকে নির্দেশ প্রদান করিলেও শেষোক্ত ব্যক্তির জন্য

৬৩১

প্রথমোক্ত ব্যক্তির জীবন সংহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যতীত জীবনের নিরাপত্তা নিঃশেষ হয় না। নিজের জীবন সংহারের জন্য অপর ব্যক্তিকে সম্মতি বা নির্দেশ প্রদানের অনুকূলে কোন নস’ বিদ্যমান নাই। অতএব অনুরূপ নির্দেশ বা সম্মতির কোন আইনগত বৈধতা নাই। তাই কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে তাহার নির্দেশে হত্যা করিলে দিয়াত প্রদান তাহার জন্য বাধ্যকর হইবে। ইহা ইমাম আবু হানীফা, মুহাম্মাদ ও আবু ইউসুফ (র)-এর অভিমত। যদিও ইহা কতলে আম্‌দ (ইচ্ছাকৃত হত্যা), কিন্তু নিহত ব্যক্তির নির্দেশ বা সম্মতি থাকায় তাহারা ইহাকে কতলে শিব্‌হে আম্‌দ-এর অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন।

ইমাম যুফার (র)-এর মতে নির্দেশ বা সম্মতির কারণে হত্যকাণ্ডটি কতলে শিব্‌হে আম্‌দ-এর মধ্যে গণ্য হইবে না, বরং ইহা কতলে আম্‌দ হিসাবেই গণ্য হইবে এবং হত্যাকারী কিসাসের দণ্ড ভোগ করিবে। তাহার মতে অনুমতি বা নির্দেশ “সন্দেহ সৃষ্টির উপাদান হিসাবে গণ্য হইতে পারে না। ৪৯ মালিকী মাযহাবের অগ্রগণ্য মতও তাই। এই মাযহাবের অপর মত প্রথমোক্ত মতের

অনুরূপ।৫০

শাফিঈ মাযহাবেও অনুরূপ দুইটি মত লক্ষ্য করা যায়।৫১ হাম্বলী মাযহাবমতে এই ক্ষেত্রে অপরাধীর কোন শাস্তি হইবে না। কারণ ইহা এমন একটি অপরাধ যাহা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ক্ষমা করিয়া দিতে পারে। অতএব নিহতের অনুমতি বা নির্দেশ ক্ষমার সমতুল্য।৫২

অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি নিজেকে আহত করার জন্য বা নিজের কোন অঙ্গ কর্তন বা বিনষ্ট করার জন্য অপর ব্যক্তিকে নির্দেশ বা সম্মতি প্রদান করিলে এবং নির্দেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি তদনুযায়ী নির্দেশদাতাকে আহত করিলে বা তাহার অঙ্গহানি করিলে এবং ইহার ফলে সে মারা গেলে দিয়াত প্রদান বাধ্যকর হইবে এবং জীবিত থাকিলে অপরাধী দোষী সাব্যস্ত হইবে না। ইহা হানাফী মাযহাবের অভিমত। তথাপি আদালত ইচ্ছা করিলে উভয়কে তাযীরের আওতায় শাস্তি প্রদান করিতে পারে। কারণ প্রথমোক্ত ব্যক্তি একটি নিষিদ্ধ কাজের নির্দেশ প্রদান করায় তাহার নির্দেশ বাতিল গণ্য হয় এবং শেষোক্ত ব্যক্তি অবৈধ নির্দেশ অনুযায়ী একটি অবৈধ কর্ম করিয়াছে। কেননা কোন সুস্পষ্ট কারণ ব্যতীত মানবজীবনের মত মানবদেহের ক্ষতিসাধনও নিষিদ্ধ।

কোন ব্যক্তি নিজের মাল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অপর ব্যক্তিকে নির্দেশ প্রদান করিলে এবং নির্দেশিত ব্যক্তি তদনুযায়ী কাজ করিলে দোষী সাব্যস্ত হইবে না।

৬৩২

কারণ মালের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করা মালিকের দায়িত্ব। কিন্তু মাল জীবনের একটি অপরিহার্য উপকরণ এবং আল্লাহ তাআলা ও তাঁহার রাসূল (স) অযথা মাল ধ্বংস করিতে নিষেধ করিয়াছেন। এই অবস্থায় মালের মালিক যেহেতু একটি অবৈধ নির্দেশ প্রদান করিয়া এবং অপর ব্যক্তি অবৈধ নির্দেশ পালন করিয়া অন্যায় করিয়াছে, সেহেতু আদালত তাযীরের আওতায় তাহাদের উভয়কে শাস্তি প্রদান করিতে পারে।

ধারা-১১৫৯

আত্মহত্যা কোন ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করার পরও বাঁচিয়া গেলে সে এবং উক্ত কর্মে তাহাকে সহায়তাকারী উভয়ে তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে।

বিশ্লেষণ

ইসলামী আইনে মানবহত্যা যেমন হারাম, আত্মহত্যাও দ্রুপ হারাম। মহান আল্লাহর বাণী :

ولا تقتلوا النفس التي حم الله الأ بالحق .

১০

“আল্লাহ যাহার হত্যা নিষিদ্ধ করিয়াছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাহাকে হত্যা করিও না” (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৩)।

ولا تقتتوا أنفسكم إن الله كان بكم رحيما .

০০

“তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করিও না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু” (সূরা আন-নিসা : ২৯)।

মহানবী (সা) বলেনঃ

من قتل نفسه بحديدة فحديثه في يده يجاء بها في بطنه في نار جهنم خالدا مخلدا فيها أبدا . ومن قتل نفسه بسم قسمه في يده ينحساه في نار جهنم خالدا مخلدا فيها أبدا ومن تردى من جبل فقتل نفسه فهو ممتد في نار جهنم خالدا مخلدا فيها أبدا .

“যে ব্যক্তি লৌহ (ধারালো অস্ত্র) দ্বারা আত্মহত্যা করিল, জাহান্নামে উক্ত লৌহ তাহার হস্তে থাকিবে এবং সে উহা দ্বারা অনবরত নিজের পেটে আঘাত করিতে

থাকিবে। যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করিল, জাহান্নামে উক্ত বিষ তাহার হাতে থাকিবে এবং অনবরত সে তাহা দ্বারা নিজেকে ধ্বংস করিতে থাকিবে। যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের উপর হইতে নিক্ষেপ করিয়া আত্মহত্যা করিল, সে চিরকাল জাহান্নামে নিজেকে পাহাড় হইতে নিক্ষেপ করিয়া আত্মহত্যা করিতে থাকিবে (বুখারী, তিব্ব, বাব ৫৬, নং ৫৭৭৮; তিরমিযী, তিব্ব, বাব ৭; নাসাঈ, জানাই, বাব ৬৮)।

অতএব ইসলামী আইনে ইচ্ছাকৃতভাবেই হউক অথবা ভুলবশতই হউক, উভয় অবস্থায় আত্মহত্যা হারাম বিধায় ইহা একটি অপরাধ হিসাবে গণ্য। আত্মহত্যা কর্মটি সম্পন্ন হইলে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে পার্থিব শাস্তির ঊর্ধ্বে চলিয়া যায়। কারণ মৃত্যুর দ্বারা শাস্তি রহিত হইয়া যায়। অবশ্য কাফফারা প্রদানের ব্যাপারে ফকীহগণের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম আবু হানীফা, মালেক ও আহমাদ (র)-এর (একটি) মত অনুযায়ী আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কাফফারা ধার্য হইবে না। ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতে আত্মহত্যা ইচ্ছাকৃতই হউক বা ভুলবশতই হউক, উভয় অবস্থায় আত্মহত্যাকারীর মাল দ্বারা কাফফারা আদায় বাধ্যতামূলক। ইহার সমর্থনে হাম্বলী মাযহাবেরও একটি মত আছে। তবে তাহা ভুলবশত হত্যকারীর মাল দ্বারা পরিশোধযোগ্য হইবে।৫৩।

আত্মহত্যা কর্মটি সম্পূর্ণ না হইলে এবং আত্মহত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হইলে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জীবিত থাকিলে সে তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে। কারণ সে আত্মহত্যার মত একটি ধ্বংসাত্মক অপরাধ কর্মে লিপ্ত হইয়াছে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আত্মহত্যার জন্য প্ররোচনা দেয় বা উক্ত কর্মে সহায়তা করে সেও তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে। কারণ সে অপর ব্যক্তিকে একটি অপরাধকর্মে লিপ্ত হইতে প্ররোচনা দিয়াছে বা সহায়তা করিয়াছে। অপরাধ কর্মের ধ্বংসাত্মক প্ররোচনা দান বা সহায়তাদানও একটি অপরাধ।

ধারা-১১৬০

নিজেকে আহত করা

কোন ব্যক্তি নিজ সত্তাকে কোনও প্রকারে শাস্তি দিলে, আহত করিলে অথবা দেহের কোন অঙ্গ কর্তন বা বিনষ্ট করিলে সে তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে।

৬৩৪

বিশ্লেষণ

অযথা নিজেকে কষ্ট দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া একটি নিষিদ্ধ কাজ। “একদা মহানবী (সা) এক ব্যক্তিকে রৌদ্রের মধ্যে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করেন যে, সে কেন রৌদ্রের মধ্যে দাঁড়াইয়া আছে? তাঁহাকে বলা হইল, সে রৌদ্রে দাঁড়াইয়া থাকিবার এবং কাহারও সহিত কথা না বলিবার মানত করিয়াছে। মহানবী (সা) বলেন : আল্লাহ তাহার কষ্টের মুখাপেক্ষী নহেন। তোমরা তাহাকে ছায়া গ্রহণ করিতে ও কথা বলিতে নির্দেশ দাও”।

অপরের দৈহিক ক্ষতিসাধন যেমন শরীআতে নিষিদ্ধ, দ্রুপ নিজ দেহের ক্ষতিসাধনও নিষিদ্ধ। যে ব্যক্তি নিজ দেহের ক্ষতিসাধন করিবে সে তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে।৫৪

ধারা-১১৬১

দুই ব্যক্তির পরস্পরকে আক্রমণ দুই ব্যক্তি হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া অস্ত্রসহ বা অস্ত্র ব্যতীত পরস্পরের উপর ঝাপাইয়া পড়িলে এবং একজন অপরজনকে আহত বা হত্যা করিলে, আহতাকারী বা হত্যকারী দোষী সাব্যস্ত হইবে এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হইবে।

বিশ্লেষণ

তর্ক-বিতর্ক, কথা কাটাকাটি বা বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কোন পর্যায়ে পক্ষদ্বয় ‘পরস্পরের উপর হঠাৎ ঝাপাইয়া পড়িল এবং পরস্পরকে আহত করিল। এই অবস্থায় উভয়ে দোষী সাব্যস্ত হইবে। একজন অপরজনকে হত্যা করিলে হত্যাকারী কতলে আম্‌দ-এর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইবে এবং তদনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হইবে। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা) বলেন :

اذا التقى المسلمان بسيفهما فالقاتل والمقتول في الثار قلت یا رسول الله هذا القاتل فما بال المقتول قال انه كان حريصا على

• ১L “দুই মুসলিম ব্যক্তি নিজ নিজ তরবারিসহ পরস্পরের উপর ঝাপাইয়া পড়িলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ে দোযখী। আবূ বাক্ৰাহ (রা) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হত্যাকারীর ক্ষেত্রে তো ঠিকই, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন দোযখী? তিনি বলেনঃ কারণ সেও সুযোগ পাইলে তাহার প্রতিপক্ষকে হত্যা কৱিত।”

ধারা-১১৬২ অজ্ঞতা, ভ্রম বা বিস্মৃতি জনিত অপরাধ

(ক) শরীআত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ বা সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় কোন ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত (১) অপরাধ কর্ম করিলে তাহার এই অজ্ঞতা ওজর হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং সে ইহার জন্য দোষী সাব্যস্ত হইবে।

(খ) কোন ব্যক্তি ভুলবশত (;) অপরাধ কর্ম করিলে সে ইহার জন্য দোষী সাব্যস্ত হইবে- যদি উক্ত ভুলের বা ভুল কর্মের শাস্তি নস দ্বারা নির্দিষ্ট হইয়া থাকে।

(গ) কোন ব্যক্তি বিস্মৃতিবশত (

5 3) অপরাধ কর্ম করিলে সে ইহার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দোষী সাব্যস্ত হইবে।

বিশ্লেষণ

ইসলামী শরীআর মূলনীতি অনুযায়ী কোন কাজ অপরাধ কর্ম হওয়া সম্পর্কে অপরাধীর জ্ঞান থাকিলেই সে দোষী সাব্যস্ত হইবে, অন্যথায় নহে। কোন কর্ম নিষিদ্ধ হওয়ার জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বিদ্যমান থাকাই দোষী সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট, অপরাধী জ্ঞানার্জন করিয়াছে কিনা তাহা ধর্তব্য নহে। ইসলামী আইনের একটি সাধারণ মূলনীতি এই যে, “ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতার ওজর গ্রহণযোগ্য নয়”।৫৫।

ইসলামী শরীআত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ বিদ্যমান থাকার ভিত্তিতে মুসলিম সমাজে লালিত-পালিত যে কোন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ইসলামী বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত বলিয়া বিবেচিত হইবে, কার্যত জ্ঞাত হউক বা না হউক। মোটকথা ইসলামী শরীআতে আইন সম্পর্কে কার্যত অবহিত থাকার শর্ত আরোপ করা হয় নাই। কারণ ইহাতে প্রত্যেক অপরাধীই আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার অজুহাত তুলিয়া খালাস পাইয়া যাইত এবং আইন অকার্যকর প্রমাণিত হইত।, অবশ্য ইসলামী আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার সংগত কারণ থাকিলে তাহা গ্রহণযোগ্য হইবে। যেমন নও-মুসলিমের ওজর গ্রহণযোগ্য। ইহা উক্ত আইনের ব্যতিক্রম নহে, বরং সে ইসলামী শরীআ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায় নাই। অনুরূপভাবে নস-এর ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করিয়া অপরাধ কর্মে লিপ্ত হইলে সেই ক্ষেত্রেও

৬৩৬

অপরাধী শাস্তিযোগ্য হইবে। যেমন সিরিয়ার কিছু সংখ্যক মুসলমান কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করিয়া মাদক গ্রহণ করে।

ليس على الذين أمنوا وعملوا الصلحت جناح فيما طعموا إذا

ما اقوا وامنوا وعملوا الصلخت .

“যাহারা ঈমান আনিয়াছে ও সৎকর্ম করিয়াছে তাহারা যাহা ভক্ষণ করিয়াছে তজ্জন্য তাহাদের কোন গুনাহ নাই, যদি তাহারা সাবধান হয় এবং ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে” (সূরা মাইদা : ৯৩)।

তাহাদের উপর মাদক গ্রহণের হদ্দ কার্যকর করা হয়। ৬ “কর্তার সংকল্প ব্যতীতই অপরাধ কর্ম সংঘটিত হইলে তাহা ভ্রম (

15) হিসাবে গণ্য।৫৭ অর্থাৎ ভুলবশত যেসব অপরাধ কর্ম সংঘটিত হয় উহার পিছনে কর্তার কোন সংকল্প বা ইচ্ছা বিদ্যমান থাকে না। কর্তার অসাবধানতা ও অসতর্কতার কারণেই অপরাধ কর্মটি সংঘটিত হয়। শরীআতে ভ্রম (as) ও বিস্মৃতি (3) ক্ষমাযোগ্য। মহান আল্লাহর বাণী।

وليس عليكم جناح فيما أخطائم به ولكن ما تعمدت قلوبگم .

“তোমরা কোন ভুল করিলে তোমাদের কোন অপরাধ নাই; কিন্তু তোমাদের অন্তরে সংকল্প থাকিলে অপরাধ হইবে” (সূরা আহযাব : ৫)।

ربنا لا تؤاخذنا إن نسينا أو أخطأنا .

“হে আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে তুমি আমাদেরকে পাকড়াও করিও না” (সূরা বাকারা : ২৮৬)।

কিন্তু মানবজীবন ও দেহ এবং সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অপরাধ ভুলবশত সংঘটিত হইলেও উহার জন্য শাস্তির বিধান রহিয়াছে। তবে এই ক্ষেত্রে ভুলবশত অপরাধকারীর শাস্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধকারীর শাস্তির তুলনায় নমনীয়। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে।

وما كان لمؤمن أن يقتل مؤمنا الأخطأ ومن قتل مؤمنا خط

لم اللى أهلها .

فتحرير رقبة مؤمنة ودية

“কোন মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করা কোন মুমিনের কাজ নহে, তবে ভ্রমবশত করিলে উহা স্বতন্ত্র। এবং কেহ কোন মুমিন ব্যক্তিকে ভ্রমবশত হত্যা করিলে একটি মুমিন দাসকে দাসত্বমুক্ত করা এবং নিহতের পরিবারবর্গকে দিয়াত অর্পণ করা বিধেয়” (সূরা নিসা : ৯২)।

মহানবী (সা) বলেনঃ

رفع عن أمتي الخطأ والنسيان وما استكرهوا عليه.

“আমার উম্মতকে তাহাদের ভ্রম, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক করানো কাজের অপরাধ হইতে অব্যাহতি দেওয়া হইয়াছে”।৫৮

অপরের মাল চুরি হদ্দের আওতাভুক্ত একটি অপরাধ। কিন্তু কোন ব্যক্তি ভুলবশত নিজের মালের সহিত অপরের মাল লইয়া গেলে উক্ত মাল ফেরত প্রদান বাধ্যকর হইলেও এই ভুলের জন্য কোন শাস্তি নাই। অনুরূপভাবে মাদক গ্রহণও হদ্দের আওতাভুক্ত একটি অপরাধ। কিন্তু কোন ব্যক্তি ভুলবশত পানি মনে করিয়া মদ্যপান করিলে এই ভুলের জন্য তাহার কোনরূপ দণ্ড হইবে না।

ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি এই যে, “মানবজীবন ও তাহার মাল নিরাপদ, কোন ওজরই ইহার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করিবে না।”৬৯ এই মূলনীতির আলোকে মানবজীবন ও তাহার মাল সর্বাবস্থায় নিরাপদ, এমনকি অনিচ্ছাকৃত অর্থাৎ ভুলের ওজরও এই ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নহে। উল্লেখ্য যে, ভুল যে প্রকারেরই হউক উহার ফলাফল একই।

অনুরূপভাবে বিস্মৃতিও ক্ষমাযোগ্য। “প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রয়োজনীয় বিষয় স্মরণ না থাকাকে বিস্মৃতি বলে”।৬০ ইসলামী আইনের একটি সাধারণ মূলনীতি এই যে, “কোন ব্যক্তি বিস্মৃত হইয়া কোন অপরাধ কর্ম করিলে সে অপরাধী সাব্যস্ত হইবে না এবং শাস্তিযোগ্যও হইবে না”।৬১

কিন্তু বিস্মৃতির জন্য তাযীরের আওতায় শাস্তি হইতে পারে। হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে বিস্মৃতি ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু মানবজীবন ও সম্পদের ক্ষেত্রে ক্ষমাযোগ্য নয়। কিছু সংখ্যক ফকীহর মতে বিস্মৃতি আখেরাতে ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু পার্থিব জগতে ক্ষমাযোগ্য নয়। কারণ আখেরাতের শাস্তি অপরাধীর ইচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য নির্ধারিত। তবে পার্থিব জগতে অপরাধ কর্মটি আল্লাহর অধিকার সংশ্লিষ্ট হইলে, উক্ত কর্মের পিছনে মানবীয় স্বভাবের চাহিদা বিদ্যমান থাকিলে এবং অপরাধ কর্মটি সংঘটিত হইবার কালে স্মরণ করাইয়া দেওয়ার মত কোন উপাদান বিদ্যমান না থাকিলে সেই ক্ষেত্রে অপরাধ ক্ষমাযোগ্য। যেমন কোন রোযাদার বিস্মৃত হইয়া পানাহার করিয়াছে এবং সে যে রোযাদার তাহা কেহ স্মরণও করাইয়া দেয় নাই, এই ক্ষেত্রে উক্ত অপরাধকর্মটি (পানাহার) ক্ষমাযোগ্য। কারণ রোযা হইল আল্লাহর অধিকারভুক্ত বিষয়, পানাহার মানুষের স্বভাবগত চাহিদা এবং

পানাহারকালে স্মরণ করাইয়া দেওয়ার মত কোন উপাদান বিদ্যমান পাওয়া যায় নাই। কিন্তু মানুষের অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্মৃতি ওজর হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

অবশ্য অপরাধী বিস্মৃত হইয়া অপরাধ কর্ম করার দাবি করিলেই রেহাই পাইয়া যাইবে না। রেহাই পাওয়ার জন্য তাহাকে প্রমাণ করিতে হইবে যে, সত্যিই সে বিস্মৃত হইয়া অপরাধ কর্মটি করিয়াছে। আর ইহা প্রমাণ করা বড়ই কঠিন।

ধারা-১১৬৩

সন্দেহ ( 1) (ক) কোনও কিছু, কোনও বিষয় বা কোন বস্তু সম্পর্কে সেই ধারণাকে সন্দেহ বলে, যাহা উহাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে যথার্থতার অনুভূতি জাগ্রত করে না।

(খ) সন্দেহের নিম্নবর্ণিত তিনটি অবস্থার যে কোন একটি বিদ্যমান থাকিলে অপরাধী হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধের দণ্ড হইতে রেহাই পাইবে

(১) কৃত অপরাধের কোন উপাদানের মধ্যে সন্দেহ বিদ্যমান থাকিলে;

(২) অপরাধীর সহিত সংশ্লিষ্ট কর্মটি নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ বিদ্যমান থাকিলে;

(৩) অপরাধের প্রমাণসমূহ সন্দেহযুক্ত হইলে। (গ) সন্দেহের কারণে হদ্দ রহিত হইলেও তাযীর প্রযোজ্য হইতে পারে?

তবে শর্ত থাকে যে, সাক্ষ্য প্রত্যাহারের কারণে সন্দেহ সৃষ্টি হইলে তাযীরও মওকুফ হইয়া যাইবে।

(ঘ) উপধারা (খ)-এ বর্ণিত অবস্থাসমূহ তাযীরাধীন অপরাধের ক্ষেত্রেও বিবেচনা করিতে হইবে।

বিশ্লেষণ

ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি এই যে, “সন্দেহের দ্বারা হদ্দ রহিত হইয়া যায়”। এই মূলনীতির ভিত্তি হইল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীস ও

آدرء وا الحدود بالشبهات .

“সন্দেহের ক্ষেত্রে তোমরা হদ্দ রহিত কর”।৩  

অপরাধকর্মটি সন্দেহযুক্ত হইলে হদ্দ রহিত হওয়ার ব্যাপারে চার মাযহাবের ফকীহগণ একমত। কেবল আসহাবে জাওয়াহির এই অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সন্দেহের ভিত্তিতে হদ্দ রহিত করা বৈধ নহে।

কোন কিছু যথার্থ বা প্রমাণিত বিষয়ের অনুরূপ মনে হইলেও তাহা যথার্থ বা প্রমাণিত নহে- এইরূপ অবস্থাকে সন্দেহ বলে। প্রমাণিত বলিতে শুধু কাজের প্রমাণ বুঝায় না, বরং ব্যাপকার্থে কাজের প্রমাণ এবং নির্দেশের প্রমাণ উভয়ই বুঝায়।৬৫

ফকীহগণ সন্দেহকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন। হানাফী ফকীহগণ সন্দেহকে নিম্নোক্ত দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন। (১) কর্মের মধ্যে সন্দেহ Li ) (44. অর্থাৎ কর্মটি হালাল না হারাম এই বিষয়ে কর্তা সন্দেহে পতিত হইয়াছে। কর্মটি হালাল হওয়ার ব্যাপারে কোন নস বিদ্যমান নাই, বরং কর্তা নিজ হইতে এমন জিনিসকে বৈধতার প্রমাণ বানাইয়াছে যাহা মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মের বৈধতার প্রমাণ হইতে পারে না।

(২) পাত্র বা স্থানের মধ্যে সন্দেহ ( 413) ইহাকে আদেশসূচক (অনলভর্ডধশণ) সন্দেহ বা মালিকানা সংশ্লিষ্ট সন্দেহও বলা হয়। এই সন্দেহ শরীআতের কোন নির্দেশ হইতে উদ্ভূত। যেমন কুরআন মজীদে চুরির শাস্তি হস্ত কর্তন নির্ধারণ করা হইয়াছে, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : “তুমি এবং তোমার মাল উভয়ই তোমার পিতার”। অতএব পিতা পুত্রের মাল চুরি করিলে তাহা শরীআতের হুকুম (Injunction) অনুযায়ী চুরি নহে, যদিও আইনত তাহা চুরি হিসাবে বিবেচিত। এই ক্ষেত্রে নিষিদ্ধতার বিপরীত দলীলের বিদ্যমানতাই বিবেচ্য কর্তার ধারণা বিবেচ্য নহে। যেমন পিতার ক্ষেত্রে হস্ত কর্তনের শাস্তি হাদীসের ভিত্তিতে সন্দেহযুক্ত হইয়া গিয়াছে।৬৬

শাফিঈ ফকীহগণের মতে সন্দেহ তিন শ্রেণীভুক্ত?

(১) পাত্র বা স্থানের সহিত সংশ্লিষ্ট সন্দেহ। যেমন রমযানের রোযা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস। স্ত্রীর সহিত সহবাস আইনত অনুমোদিত এবং স্বামীর একটি অধিকার হিসাবে স্বীকৃত। কিন্তু রোযার বাধ্যবাধকতা এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হইয়াছে।

(২) কর্তার সহিত সংশ্লিষ্ট সন্দেহ (Lal! :)। কোন ব্যক্তি নিজের মাল মনে করিয়া অপরের মালিকানাভুক্ত মাল নিয়া গেলে। সে এই কাজ হালাল মনে করিয়াই করিয়াছে, যদিও উহা হারাম।

৬৪০

(৩) রীতিসিদ্ধ সন্দেহ (

4 4 ) অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট কাজটি হারাম অথবা হালাল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ বিদ্যমান আছে। এই সন্দেহের ভিত্তি হইল ফকীহগণের মতভেদ। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট কাজটি একদল ফকীহ নিষিদ্ধ বলিয়াছেন এবং অপর দল বৈধ বলিয়াছেন। যেমন সাক্ষীবিহীন বিবাহকে মালিকী ফকীহগণ বৈধ এবং হানাফী ফকীহগণ অবৈধ বলিয়াছেন।

উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগের ভিত্তিতে সন্দেহের তিনটি অবস্থা লক্ষণীয় এবং উক্ত তিন অবস্থার যে কোন একটি অবস্থায় অপরাধী হদ্দের শাস্তি হইতে রেহাই পাইবে। (১) অপরাধী যে অপরাধ কর্মটি করিয়াছে উহার কোন উপাদানের (১২) মধ্যে সন্দেহ বিদ্যমান থাকিলে। যেমন কোন ব্যক্তি অপরের মাল ধারণা করিয়া নিজের মাল গোপনে স্থানচ্যুত করিয়াছে। এই অবস্থায় অপরাধীর উপর চুরির শাস্তি কার্যকর হইবে না এবং তাযীরও হইবে না। কারণ চুরির একটি উপাদান (অপরের মাল হওয়া) এখানে বিদ্যমান নাই।

অপরাধী যে কর্মটি করিয়াছে তাহা অবৈধ হওয়ার বিষয়ে ফকীহগণের তৎসংশ্লিষ্ট নস-এর ব্যাখ্যায় মতভেদ বিদ্যমান রহিয়াছে। যেমন ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মতে বালেগা নারী অভিভাবকের সম্মতি ব্যতীত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারে এবং উক্ত বিবাহ আইনত বৈধ গণ্য হইবে। কিন্তু অন্যান্য মাযহাবের মত অনুযায়ী উক্ত বিবাহ বৈধ নহে। এই অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী যেনার অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হইবে না। সাক্ষীবিহীন বিবাহের অবস্থাও দ্রুপ।

সাক্ষীগণের সাক্ষ্য অথবা অপরাধীর স্বীকারোক্তি অথবা আলামতের দ্বারা অপরাধীর অপরাধ প্রমাণিত হইতে পারে। উক্ত প্রমাণসমূহ সন্দেহযুক্ত হইয়া গেলে অপরাধীর উপর হদ্দ কার্যকর হইবে না। যেমন দুই ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করিল যে, অপরাধী মাদক গ্রহণ করিয়াছে। পরে সাক্ষীগণ তাহাদের সাক্ষ্য প্রত্যাহার করিল এবং উক্ত অপরাধ প্রমাণের অন্য কোন আলামতও বিদ্যমান নাই। এই অবস্থায় অপরাধীর উপর হদ্দ কার্যকর হইবে না।

সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার কারণে অপরাধী হদ্দ-এর দণ্ড হইতে রেহাই পাইলেও বিচারকের সুবিবেচনা অনুযায়ী তাযীরের আওতায় দণ্ডযোগ্য হইতে পারে। যেমন পিতা কর্তৃক পুত্রের মাল চুরির ক্ষেত্রে হদ্দ রহিত হইলেও সে তাযীরের আওতায় শাস্তিযোগ্য হইবে। অথবা কোন ব্যক্তি চুরির অপরাধে ধৃত হইয়াছে কিন্তু চুরি করাকালে সে নাবালেগ ছিল না বালেগ ছিল এই সন্দেহের সৃষ্টি হইল। এই সন্দেহের কারণে অপরাধী হদ্দ-এর দণ্ড হইতে রেহাই পাইলেও তাযীরের দণ্ড হইতে রেহাই পাইবে না।

৬৪১

ধারা-১১৬৪

চিকিৎসকের কার্যক্রম (ক) চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করা ফরযে কিফায়া।

(খ) চিকিৎসকের কার্যক্রম রোগীর জন্য ক্ষতিকর হইলে নিম্নবর্ণিত শর্তসাপেক্ষে তিনি উক্ত ক্ষতির জন্য দায়ী নহেন –

(১) তাহার চিকিৎসাবিদ্যার সরকার অনুমোদিত সনদপত্র থাকিতে হইবে;

(২) চিকিৎসকের কর্ম সদুদ্দেশ্য প্রণােদিত হইতে হইবে;

(৩) তাহার কার্যক্রম চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হইতে হইবে;

(৪) রোগী অথবা তাহার অভিভাবকের সম্মতি সাপেক্ষে তাহার চিকিৎসা করিতে হইবে।

(গ) চিকিৎসকের ভুল কর্ম চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্তৃক অনুমোদনযোগ্য না হইলে তিনি তাহার কর্মের জন্য দায়ী হইবেন।

বিশ্লেষণ

ফকীহগণের ঐক্যমত অনুযায়ী চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করা মুসলিম ব্যক্তির জন্য ফরযে কিফায়া এবং সমাজে চিকিৎসা কর্ম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক থাকিলে অবশিষ্ট সকলে উক্ত ফরযের দায় হইতে অব্যাহতি পাইবে, অন্যথায় উক্ত জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে ফরযে আইন হইয়া দাঁড়ায়। কারণ সমাজ চিকিৎসার সেবার প্রতি মুখাপেক্ষী। অতএব চিকিৎসকের পেশা শরীআতের বিধান অনুযায়ী একটি বাধ্যতামূলক পেশা। কোন জনপদে একজন মাত্র চিকিৎসক থাকিলে তাহার জন্য চিকিৎসা সেবা প্রদান ফরযে আইন। হইয়া দাঁড়ায়। মহানবী (সা) বলেন :

ياعباد الله تداووا فان الله لم يضع داء الأ وضع له شفاء الأداء

واحدا فقالوا يارسول الله وما هو قال الهرم .

– “হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। আল্লাহ তাআলা একটি ব্যতীত সব রোগেরই প্রতিশেধক সৃষ্টি করিয়াছেন। সাহাবীগণ বলেন, ইয়া

৬৪২

রাসূলাল্লাহ! ঐ রোগটি কি? তিনি বলেন : বার্ধক্য” (তিরমিযী, আবওয়াবুত তিব্ব, বাব ২; আবু দাউদ, তিব্ব, বাব ১)।

অতএব চিকিৎসকের ফরয দায়িত্ব পালনের পরিপ্রেক্ষিতে যে ফল প্রকাশ পাইবে তাহার জন্য তিনি দায়ী হইবেন না। ইসলামী আইনের একটি মূলনীতি (উসূল) এই যে, “ফরয দায়িত্ব পালন শান্তির সহিত শর্তযুক্ত নহে”। কিন্তু এই ফরয দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কোন্ পন্থা অবলম্বন করিবেন তাহা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে চিকিৎসকের সুবিবেচনা, তাহার বুদ্ধিগত ও বাস্তব ইজতিহাদের উপর। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, তাহার কর্মের দ্বারা রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হইলে তিনি উহার জন্য দায়ী হইবেন কি না? ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফিঈ ও আহমাদ ইবন হাম্বল (র) কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে চিকিৎসককে দায়মুক্ত ঘোষণা করিয়াছেন।

প্রথমত, তাহার চিকিৎসা বিদ্যার জ্ঞান থাকিতে হইবে এবং তাহার পেশাগত কর্ম পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের অনুমোদন থাকিতে হইবে।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসক সদুদ্দেশ্য প্রণােদিত হইয়া রোগীর উপকারার্থেই তাহার চিকিৎসা সেবা প্রদান করিবেন। কিন্তু তিনি অসদুদ্দেশ্য প্রণােদিত হইয়া চিকিৎসা করিলে এবং রোগীর ক্ষতি হইলে তিনি উহার জন্য দায়ী হইবেন। এই ক্ষেত্রে রোগীর কোন ক্ষতি না হইলেও অসদুদ্দেশ্যের জন্য তিনি দায়ী হইবেন।৬৭।

তৃতীয়ত, চিকিৎসক চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালার আওতায় থাকিয়া তাহার চিকিৎসা সেবা প্রদান করিবেন। তাহার রোগ নির্ণয়, উহার উপযুক্ত চিকিৎসা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকিতে হইবে। আনাড়ি ডাক্তার তাহার কর্মের জন্য দায়ী, এমনকি কোন এলাকায় চিকিৎসক না থাকা অবস্থায়ও সে তাহার কর্মের জন্য দায়ী। মহানবী (সা) বলেন।

من تطيب ولم يعرف الطب فهو ضامن .

“যে ব্যক্তি চিকিৎসক নহে সে চিকিৎসা পেশা গ্রহণ করিলে তাহার কর্মের জন্য সে দায়ী হইবে।”৬৮

চতুর্থত, চিকিৎসক রোগী অথবা তাহার অভিভাবকের সম্মতি গ্রহণ করিয়াই তাহার চিকিৎসা করিবেন। যাহার অভিভাবক নাই শাসক তাহার অভিভাবক (বৈধ প্রতিনিধিও ইহার অন্তর্ভুক্ত)।

উপরোক্ত শর্ত চতুষ্টয়ের কোন একটি শর্তের অনুপস্থিতিতে চিকিৎসক তাহার কর্মের জন্য দায়ী হইবেন। কিন্তু উক্ত শর্তসমূহ পূরণ করিয়া চিকিৎসক রোগীর

৬৪৩

অস্ত্রপচার করিলে এবং ইহার ফলে রোগী মারা গেলে অথবা তাহাকে যে ঔষধ সেবন করিতে দেওয়া হইয়াছে, উহার বিরূপ ফল প্রকাশ পাইলে এবং রোগী মারা গেলে বা তাহার কোন ক্ষতি হইলে ইহার জন্য তিনি দায়ী হইবেন না।

চিকিৎসকের ভুল কর্মকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে। মারাত্মক ভুল (Gloving Mistake) যাহা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালা অনুযায়ী সমর্থনযোগ্য নহে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণও যাহা অনুমোদনযোগ্য মনে করেন না। সেই ধরনের ভুল কর্মের জন্য চিকিৎসক দায়ী হইবেন। কিন্তু সাধারণ ভুল যাহা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালা অনুযায়ী সমর্থনযোগ্য, উহার জন্য তিনি দায়ী হইবেন না।

যেমন একটি বালক ছাদের উপর হইতে পতিত হওয়ায় তাহার মাথা থেতলাইয়া যায়। কিছু সংখ্যক চিকিৎসক বলিলেন যে, অস্ত্রপচার করিয়া তাহার মাথা ঠিক করিতে গেলে সে মারা যাইবে। অপর একজন চিকিৎসক বলিলেন, অদ্যকার মধ্যে তাহার মাথায় অস্ত্রপচার না করিলে অচিরেই সে মারা যাইবে। এই অবস্থায় তিনি অস্ত্রপচার করার পর রোগী মারা গেলে তিনি উহার জন্য দায়ী হইবেন না, এমনকি তিনি তাহার বাঁচিয়া যাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করিলেও দায়ী হইবেন

। কারণ এই ক্ষেত্রে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের নীতিমালা লংঘিত হওয়ার মত কোন ভুল করেন নাই। তিনি অসমর্থনযোগ্য ভুলের জন্য দায়ী হইলেও সফল অস্ত্রপচারের প্রতিশ্রুতি প্রদানের জন্য দায়ী হইবেন না।৬৯

আমরা মনে করি মুকাররম ফকীহবৃন্দ প্রয়োজনের অপরিহার্যতার খাতিরে এই ধারার বিধানসমূহ নির্ধারণ করিয়াছেন। আল্লাহ লা শারীকা লাহু কুরআন মজীদে (ইম) শব্দের মধ্যে সর্বপ্রকার জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। ইলম শিক্ষা ফরয হইলে ইলমুত তিব্বও ফরয হইয়া যায়।

ধারা-১১৬৫

সংশোধনমূলক শাস্তি (ক) হদ্দের আওতা বহির্ভূত অপরাধসমূহের ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক শাস্তি প্রযোজ্য।

(খ) শিশুর বেলায় সে বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সংশোধনমূলক শাস্তি প্রযোজ্য।

৬৪৪

(গ) প্রথম পর্যায়ে স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসার সহিত উত্তম আচরণ ও সদুপদেশদানের মাধ্যমে, দ্বিতীয় পর্যায়ে একই ঘরের মধ্যে পৃথক বিছানায় শয়ন করিতে বাধ্য করার মাধ্যমে এবং তৃতীয় পর্যায়ে হালকা দৈহিক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সংশোধন প্রচেষ্টা চালাইতে হইবে।

(ঘ) মুখমণ্ডলে ও শরীরের স্পর্শকাতর স্থানসমূহে আঘাত করা যাইবে, আঘাত এমন গুরুতর হইবে না যাহা আহত ব্যক্তির শরীরে স্থায়ী দাগ সৃষ্টি করে, অশ্লীল ভাষায় গালি দেওয়া যাইবে না এবং শাস্তি প্রদানকালে শারীরিক অবস্থার প্রতিও লক্ষ্য রাখিতে হইবে।

(ঙ) সংশোধনমূলক শাস্তিতে কোন ফল না হইলে কঠোর শাস্তি প্রদান করা যাইবে না।

(ছ) পিতা-মাতা, স্বামী, অভিভাবক, ওসী বা শিক্ষক সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদান করিতে পারেন।

(জ) স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের বিরুদ্ধে অথবা অন্য কেহ তাহার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের করিলে উহার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদানের অধিকার মওকুফ থাকিবে।

(ঝ) স্বামীর বাড়াবাড়ি এবং তাহার গর্হিত কর্মের বিরুদ্ধে স্ত্রী অভিযোগ উত্থাপন করিতে পারিবে।

(ঞ) শাস্তি প্রদানের ফলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির দৈহিক অঙ্গহানি হইলে অথবা সে নিহত হইলে উহার জন্য শাস্তিদাতা দণ্ডযোগ্য হইবে।

বিশ্লেষণ

অধীনস্তদেরকে সভ্য, ভদ্র ও সুশিক্ষিত হিসাবে গড়িয়া তোলার জন্য পারিবারিক পরিমণ্ডলে পরিবারের প্রধানকে যে শাসন ক্ষমতা প্রদান করা হইয়াছে, শরীআ আইনে তাহা তাদীব (সংশোধনমূলক শাসন) হিসাবে অভিহিত। এই তাদীবের আওতায় তিনি প্রয়োজনবােধে অধীনস্থদেরকে কিছু শাস্তিও দিতে পারেন। শাস্তি নির্ধারণ ও তাহা কার্যকর করার অধিকার যদিও আদালতের এখতিয়ারাধীন, তথাপি ব্যক্তিবিশেষকে এই পর্যায়ে কিছু হালকা প্রকৃতির শাস্তি প্রদানের অধিকার দেওয়া হইয়াছে। ইহা ইসলামী আইনের একটি ব্যতিক্রম। বিশেষত স্ত্রীর অবাধ্যতর, বিষয়ে এই পর্যায়ে কুরআন মজীদে যে বিধান বিবৃত হইয়াছে তাহাই তাদীবের

অনুকূলে দলীল হিসাবে গণ্য। মহান আল্লাহ বলেন :

৬৪৫

والتى تخافون شوزه فعظوه واهجروهن في المضاجع

واضربوهن فان أطعم فلا تبغوا عليه سبيلا .

“তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে যাহাদের অবাধ্যতার আশংকা কর তাহাদেরকে সদুপদেশ দাও, তাহাদের শয্যা বর্জন কর এবং তাহাদেরকে প্রহার কর। যদি তাহারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তোমরা তাহাদের উপর চড়াও হওয়ার কোন পথ অন্বেষণ করিও না” (সূরা নিসা : ৩৪)।

উক্ত আয়াতে স্ত্রীকে সংশোধন করার যে পর্যায়ক্রমিক পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছে, অধীনস্ত অন্যান্যদের বেলায়ও সংশোধনের উক্ত ক্রমিক পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে। আয়াতে উল্লেখিত নুশূ’ শব্দের ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস (রা), আতা ও সুদ্দী (র) বলেন, স্বামীর যেসব কথা মান্য করা ও যেসব বিষয়ে তাহার আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য উহাতে তাহার আনুগত্য না করা, তাহার আদেশ অমান্য করা হইল নুশূয’। কারণ স্বামীর আনুগত্য করা, তাহার আদেশ মান্য করা স্ত্রীর কতর্ব্য, যতক্ষণ পর্যন্ত তাহা আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যাচারমূলক আদেশ বা গুনাহ্ কাজ বা স্ত্রীর কোন অধিকার খর্বকারী আচরণ না হয়।

যেসব অপরাধ হদ্দের আওতাভুক্ত নহে, কেবল সেইসব ক্ষেত্রে স্বামী বা অভিভাবক সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে। ফকীহগণ এই বিষয়ে একমত। উল্লেখ্য যে, নামায-রোযা ত্যাগের অপরাধের জন্যও শাস্তির পদক্ষেপ গ্রহণ বৈধ। হদ্দের আওতাভুক্ত অপরাধের শাস্তি বিধানকারী কর্তৃপক্ষ হইল আদালত। ফকীহগণ এই বিষয়েও একমত যে, স্ত্রীর অবাধচারী হওয়ার আশংকা হইলেও সর্বশেষ সংশোধনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না। বাস্তবে অবাধ্যাচার সংঘটিত হইলেই কেবল উক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে।

৭ ১ ইমাম আবু হানীফা ও মালেক (র)-এর মতে প্রথমবার অবাধ্যাচার প্রকাশ পাইলেই প্রহার করা যাইবে না; বরং তাহা বারবার ঘটিলেই প্রহার করা যাইবে। উপরোক্ত আয়াত তাহারা নিজেদের মতের সমর্থনে পেশ করিয়াছেন। সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্য হইল ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করিয়া দেওয়া। তাই আয়াতে উল্লেখিত পর্যায়ক্রমিক সংশোধন পন্থা অনুসরণ করিতে হইবে।৭২

স্বামী-স্ত্রী একই ঘরে পৃথক পৃথক বিছানা গ্রহণ করিবে। স্ত্রীকে পৃথক ঘরে নিঃসংগভাবে ফেলিয়া রাখা যাইবে না। অতএব কোন স্বামী স্ত্রীর প্রথম অথবা

৬৪৬

দ্বিতীয় বারের অপরাধে অথবা সদুপদেশ ও বিছানা পৃথক করার কার্যক্রম গ্রহণ না করিয়া স্ত্রীকে তাহার তৃতীয়বারের অবাধ্যাচারের জন্য শাস্তি প্রদান করিলে সে অপরাধী সাব্যস্ত হইবে। এই শাস্তি হইতে রেহাই পাইতে হইলে স্বামীকে প্রমাণ করিতে হইবে যে, সে ইতিপূর্বে সংশোধনের প্রথমোক্ত পন্থদ্বয় অবলম্বন করিয়াছিল। কতক ফকীহ স্বামীর নুশূয-এর ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে তাহার শাস্তির সুপারিশ করিয়াছেন। অধীনস্ত শিশুর বেলায় সে বালেগ না হওয়া পর্যন্তই অভিভাবক তাহার বিরুদ্ধে সংশোধনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করিতে পারিবে। কারণ শিশুদেরকে আম্‌দব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া অভিভাবকের দায়িত্ব। মহানবী (সা) বলেন :

أكرموا أولادكم واحسنوا أدبهم .

“তোমরা স্বীয় সন্তানদের সহিত সদ্ব্যবহার কর এবং তাহাদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দাও”। ৩

অপর এক হাদীসে বলা হইয়াছে, “অধীনস্তদেরকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে ঘরে লাঠি ঝুলাইয়া রাখা হয় সেই ঘরে বরকত নাযিল হয় (আদাবুল মুফরাদ)।”

তবে শিশু বালেগ হওয়ার পর তাহার উপর অভিভাবকের কর্তৃত্ব শেষ হইয়া যায়। তখন তাহার কৃত অপরাধ আইনের আওতায় আসিয়া যায়।

স্ত্রীসহ অন্যান্যদের সংশোধনের জন্য আয়াতে উল্লেখিত ক্রমিক পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে দৈহিক শাস্তি কিভাবে দেওয়া যায় এই প্রসংগে হাসান বসরী (র) বলেন, আঘাত হইতে হইবে যখমহীন ও চিহ্নহীন। আতা (র) বলেন, অনুরূপ আঘাত মিসওয়াক (দাতন) বা অনুরূপ কাঠি দ্বারা হইতে পারে। মহানবী (স) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন :

فان فعلن فاضربوهن ضربا غير مبرح .

“যদি তাহারা অনুরূপ (অপরাধ) করে তবে তাহাদেরকে হালকাভাবে প্রহার কর।”৭৪

تضربوا اماء الله .

“তোমরা আল্লাহ্র বাঁদীদেরকে মারিও না।”৭৫

ن لقيط بن صبرة قال قلت يارسول الله ان لي امراه في لسانها شيئ يعني البداء قال طلقها قلت ان لي منها ولدا ولها

৬৪৭

صحبة قال قمرها يقول عظها فان يك فيها خير قستقبل ولا تضربن ضعيئتك ضربك أمنيتك .

“লাকীত ইব্‌ন সাবুরা (রা) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার একটি মুখরা স্ত্রী আছে। তিনি বলেন : তাহাকে তালাক দাও। আমি বলিলাম, তাহার গর্ভজাত আমার একটি সন্তান আছে এবং সে আমার দীর্ঘ দিনের সঙ্গিনী। তিনি বলেন : তুমি তাহাকে (আরও) সদুপদেশ দাও। যদি তাহার মধ্য কল্যাণকর কিছু থাকে তবে সে উহা সহজে গ্রহণ করিবে। কিন্তু তুমি তোমার বিছানার

সঙ্গিনীকে দাসী-বাদীর মত প্রহার করিও না।” ৭৬

“হালকাভাবে প্রহারের ব্যাখ্যায় বলা হইয়াছে যে, তাহা অকঠোর আঘাত। যে আঘাতে ব্যথা অনুভূত হয় কিন্তু যখমও হয় না, রক্তপাতও হয় না, দেহের চামড়ার উপর দাগও পড়ে না এবং বেশীক্ষণ ব্যথা বিদ্যমান থাকে না। যেমন মিসওয়াক বা অনুরূপ দৈর্ঘ্যের লাঠির আঘাত।

অপরাধীর মুখমণ্ডল ও দেহের স্পর্শকাতর স্থানসমূহে আঘাত করা এবং তাহাকে ঘর হইতে বহিষ্কার করা নিষেধ। মহানবী (সা) বলেন :

ولا تضرب الوجه ولا تقبح ولا تهجر الا في البيت .

“তুমি তাহার মুখমণ্ডলে প্রহার করিবে না, তাহাকে অশ্লীল গালি দিবে না এবং ঘরের মধ্যেই তাহার সঙ্গ ত্যাগ করিবে।” ৭৭

সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদানকালে অপরাধীর দৈহিক অবস্থার প্রতিও লক্ষ্য রাখিতে হইবে। যেমন অপরাধীর অসুস্থ অবস্থায় তাহাকে সদুপদেশ দিলে তাহাতে ফল নাও হইতে পারে অথবা ঐ অবস্থায় বেত্রাঘাত করিলে উপকারের পরিবর্তে অপকার হইতে পারে।

সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদান করিয়াও যদি দেখা যায় যে, উহাতে কোন ফল হইতেছে না, তবে সেই অবস্থায় কঠোর শাস্তিও দেওয়া যাইবে না। কঠোর শাস্তি প্রদান করিলে সে উহার জন্য দায়ী হইবে। কারণ আইনানুগ কর্তৃপক্ষই কেবল কঠোর শাস্তি প্রদানের এখতিয়ার রাখে।

পিতা-মাতা, স্বামী, ওয়ালী (অভিভাবক), ওসী এবং শিক্ষক সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদান করিতে পারেন। ৯ শিক্ষক, যে পেশারই হউন, ছাত্রকে সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদান করিতে পারিবেন, অভিভাবকের অনুমতির প্রয়োজন নাই।

৬৪৮

স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করিলে স্বামীর সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদানের অধিকার মওকুফ থাকিবে। কারণ তাহাদের পরস্পরের বিবাদের বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন আছে।

স্বামী স্ত্রীকে অযথা হয়রানি করিলে, সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদানে বাড়াবাড়ি করিলে এবং শরীআত পরিপন্থী কোন কাজে লিপ্ত থাকিলে, যেমন নামায-রোযা ত্যাগ, মদ্যপান, জুয়া খেলা ইত্যাদি, স্ত্রীও স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবে।

عن ایاس بن عبد الله قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم

رن

فقال

تضربوا اماء الله فجاء عمر الى رسول الله النساء على أزواجهن فرص في ضربهن فطاف بال رسول الله

نساء گثير يشكون أزواجهن فقال رسول الله لقد طاف

بال محمد نساء كثير يشكون أزواجهن ليس أولئك بخيار .

“ইয়াস ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলিল : তোমরা আল্লাহর বাদীদেরকে প্রহার করিও না। অতঃপর উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আসিয়া বলেন, নারীরা তাহাদের স্বামীদের উপর দৌরাত্ব আরম্ভ করিয়াছে। তখন তিনি তাহাদেরকে প্রহারের অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর বহু সংখ্যক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরিবারের নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : বহু সংখ্যক নারী মুহাম্মাদের পরিবারের নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করিতেছে। এই সকল স্বামী মোটেই ভালো লোক নহে”।৮০

তবে এই অবস্থায় স্ত্রী প্রেম-ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সহিত সদুপদেশ প্রদানের দ্বারা প্রথমে স্বামীকে সংশোধন করার চেষ্টা করিবে। মহান আল্লাহ বলেন :

المؤمنون والمؤمنت بعضهم أولياء بعض يأمرون بالمعروف

وينهون عن المنكر .

“মুমিন পুরুষগণ ও মুমিন নারীগণ পরস্পরের সহযোগী। তাহারা সকার্যের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কার্য নিষেধ করে” (সূরা তওবা : ৭১)।

সংশোধনমূলক শাস্তি প্রদানের ফলে স্ত্রীর অঙ্গহানি বা দৈহিক ক্ষতি হইলে অথবা সে নিহত হইলে, আঘাত হালকা বা ভারী যাহাই হউক, ইহার জন্য স্বামী

৬৪৯

দায়ী হইবে। ইহা ইমাম আবু হানীফা ও শাফিঈর অভিমত। ইমাম আবু হানীফা (র) বলেন, যে শাস্তির দ্বারা শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির অঙ্গহানি বা মৃত্যু ঘটে তাহা সংশোধনমূলক শাস্তি হিসাবে গণ্য হইতে পারে না। সংশোধনমূলক শাস্তি ভোগকারীর জীবিত থাকা আবশ্যক।

ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, সংশোধনমূলক শাস্তি কার্যকর করা স্বামীর উপর ফরয নহে, বরং তাহার একটি অধিকার এবং ইহা তাহার ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল। ইহা তাহার ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করিয়াই কেবল অধিকার ভোগ করা যাইতে পারে। নিজ অধিকার ভোগ করিতে গিয়া অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করিলে ইহার জন্য অধিকার ভোগকারীকে দায়ী হইতে হয়। অনন্তর ঐচ্ছিক বিষয় কার্যকর করার ক্ষেত্রেও অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অবকাশ নাই।

ইমাম মালেক ও আহমাদ ইবনে হাম্বল (র)-এর মতে স্বামীর কার্যক্রম সংশোধনমূলক শাস্তির গণ্ডিভুক্ত হইলে এবং প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী উহা সংশোধনমূলক শাস্তি গণ্য হইলে ক্ষতির জন্য স্বামী দায়ী হইবে না।

নাবালেগের সংশোধনমূলক শাস্তির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া ও একই শর্তাবলী প্রযোজ্য। শিশুর অংগহানি বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ইমাম মালেক, শাফিঈ ও আহমাদ (র)-এর মত তাহাদের উপরে বর্ণিত মতের অনুরূপ। ইমাম আবু হানীফা (র)-এর ব্যক্তিগত মতও উপরে বর্ণিত মতের অনুরূপ। কিন্তু কেহ কেহ বলেন যে, তিনি নাবালেগদের ক্ষেত্রে তাহার এই মত প্রত্যাহার করিয়াছেন।

ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (র)-এর মত এই যে, পিতা, দাদা ও ওসী নাবালেগকে প্রহার করিতে পারে এবং ইহার ফলাফলের জন্য তাহারা দায়ী হইবে

। ইহাই হানাফী মাযহাবের গৃহীত মত।

শিক্ষক অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত ছাত্রকে প্রহার করিলে তিনি ইহার জন্য দায়ী হইবেন। কেননা তিনি প্রহার করিতে গিয়া সীমা লংঘন করিয়াছেন এবং যাহাকে প্রহারের অনুমতি দেওয়া হয় নাই তাহাকে প্রহার করিয়াছেন, কিন্তু অভিভাবকের অনুমতি থাকিলে দায়ী হইবেন না। ইহা ইমাম আবু হানীফা ও তাঁহার সহচরবৃন্দের অভিমত।৮২,

, কোন কোন হানাফী ফকীহ ভদ্র ও সভ্য বানানোর জন্য সংশোধনমূলক শাস্তিকে ক্ষতি না হওয়ার শর্তে শিক্ষকের অধিকার মনে করেন এবং শিক্ষিত করিয়া গড়িয়া তোলার জন্য প্রদত্ত শাস্তি প্রদানকে অপরিহার্য বিবেচনা করেন। অবশ্য যে কোন প্রকারের অস্বাভাবিক শাস্তির জন্য শিক্ষককে দায়ী হইতে হইবে।৮৩

৬৫০

ধারা-১১৬৬ খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও প্রতিযোগিতা (ক) শারীরিক ও মানসিক শক্তিবর্ধক এবং দক্ষতা, সাহস, বীরত্ব ও সামরিক শক্তি বর্ধনে সহায়ক খেলাধুলা ও ইহার প্রতিযোগিতা বৈধ :

তবে শর্ত থাকে যে, যেসব খেলাধুলায় শরীআতের সীমারেখা লংঘিত হয় তাহা বৈধ নহে।

(খ) প্রতিযোগিতায় বিজয়ীকে পুরস্কৃত করা যাইবে।

(গ) যেসব খেলাধুলায় প্রতিপক্ষের দেহের উপর দৈহিক শক্তি প্রয়োগ অপ্রয়োজনীয় সেইসব ক্ষেত্রে এক পক্ষ অপর পক্ষ কর্তৃক উদ্দেশ্যমূলকভাবে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হইলে আহতকারী বা ক্ষতিগ্রস্তকারী দায়ী হইবে এবং অসতর্কতা ও তীব্র প্রতিযোগিতার ফলে আহত বা ক্ষতি হইলে দায়ী হইবে

। কারণ তীব্র প্রতিযোগিতার মানসিকতার সহিত হিংসাপ্রবণতার আবেগ আসিতে পারে।

(ঘ) যেসব খেলাধুলায় প্রতিপক্ষের দেহের উপর দৈহিক শক্তি প্রয়োগ বা আঘাত হানা অপরিহার্য সেইসব খেলাধুলায় অনুমোদিত সীমা লংঘন করিয়া এক পক্ষ অপর পক্ষকে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করিলে ইহা ইচ্ছাকৃত অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং ভুল বা অসতর্কতাবশত আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করিলে ভুলবশত অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং উভয় ক্ষেত্রে তদনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হইবে।

বিশ্লেষণ

শরীআত সামাজিক প্রয়োজন, স্বাস্থ্যগত উন্নতি, নৈতিকতা, যুদ্ধ ও সামগ্রিক উপকার ইত্যাদি বিষয়সমূহ বিবেচনা করিয়া খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। বিশেষত যেসব খেলাধুলা ও ইহার প্রতিযোগিতা ব্যক্তির দৈহিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে, তাহার মধ্যে দক্ষতা, সাহস ও বীরত্ব সৃষ্টি করে এবং সামরিক প্রশিক্ষণের সহায়ক সেইসব খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা শরীআতে স্বীকৃত। যেমন ঘোড়দৌড়, দৌড়, মল্লযুদ্ধ, সাঁতার, নৌকাবাইচ, লম্ফঝম্প, বর্শা ও চাকতি নিক্ষেপ, ভারোত্তলন, ধনুর্বিদ্যা, তরবারি চালনা, লাঠিখেলা, গুলি ছোঁড়া এবং অন্যান্য খেলাধুলা ও ইহার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান বৈধ। বিশেষ করিয়া যেসব খেলাধুলা

৬৫১

সামরিক প্রশিক্ষণের সহায়ক সেইসব খেলাধুলার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হইয়াছে। মহানবী (সা) বলেন

الا ان القوة المئ الا ان القوة المئ.

“শোন! ধনুবির্দার মধ্যেই শক্তি নিহিত, শোন! ধনুর্বিদ্যার মধ্যেই শক্তি নিহিত” ৮৪

المسلم القوي خير من المسلم الضعيف .

“শক্তিশালী মুসলিম ব্যক্তি দুর্বল মুসলিমের তুলনায় উত্তম”।৮৫

إن الله يدخل بالسهم الواحد تلاته في الجنة صانعه يحتسب في صنعه خيرا والرامی به ومنبله اروا واركبوا وأن ترموا أحب الى من أن تربوا وليس من اللهو الأ ثلاثا تاديب الرجل فرسه وملاعبته أهله ورميه بقوسه ونبله ومن ترك الرمى بعد ما علمه رغبة منه فائها نعمة تركه .

“আল্লাহ তাআলা একটি তীরের উসীলায় তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন। তীর নির্মাণকারী যে উহা কল্যাণের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করে, তীর চালনাকারী ও তীর বহনকারী। তোমরা ধনুবিদ্যা ও ঘোড়সোয়ারী শিক্ষা কর। আমার নিকট ঘোড়সোয়ারীর তুলনায় ধনুবিদ্যা শিক্ষা করা অধিকতর প্রিয়। তিন প্রকারের খেলাধুলাই বৈধ। নিজ ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, নিজ পরিবার-পরিজনের সহিত খেলাধুলা এবং ধনুর্বিদ্যা চর্চা। কোন ব্যক্তি ধনুবিদ্যা অর্জনের পর উহা ত্যাগ করিলে সে একটি নিআমতকে ত্যাগ করিল”।৮৬

মহানবী (সা) সম্পর্কে একথা প্রমাণিত যে, তিনি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিয়াছেন, উটদৌড়ে অংশগ্রহণ করিয়াছেন, ঘৌড়দৌড় করিয়াছেন, তীর চালনা করিয়াছেন, রুকানা নামক মল্লাযযাদ্ধার সহিত মল্লযুদ্ধ করিয়া বিজয়ী হইয়াছেন।৮৭ সাহাবায়ে কিরাম (রা)-ও মহানবী (সা)-এর এই নীতি অনুসরণ করেন।

সাদ (রা) তাঁহার পুত্র মুসআবকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, বৎস! ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা কর, ইহা একটি উন্নত মানের খেলা। ৮৮ উমার ফারূক (রা) আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে লিখিয়া পাঠান :

العوم ومقاتلتكم الرمى .

آن علموا غلمان

“তোমাদের বালকদেরকে সাঁতার ও তীর নিক্ষেপ শিক্ষা দাও”।

৬৫২

তিনি আযারবাইয়ানের গভর্ণরকে লিখিয়া পাঠান : “শক্তিমান হও, দক্ষতা অর্জন কর, ঘোড়ার জিনপোষ কাটিয়া ফেল, উহার পিঠে লম্ফ দিয়া সওয়ার হওয়ার চর্চা কর এবং তীর দ্বারা চাঁদমারি কর”।

অবশ্য যেসব খেলাধুলা শরীআতে নিষিদ্ধ অথবা যেসব খেলাধুলায় শরীআতের সীমা লংঘতি হয় সেইসব খেলাধুলা নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন :

ابنها الذين أموا انما الخمر والميسر وأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه لعلكم تفلون. انما يريد الشيطن أن يوقع بين العداوة والفضاء في الخمر والميسر ويصم عن ذكر الله وعن الصلوة ج هل أنتم منتهون .

“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কার্য। সুতরাং তোমরা উহা বর্জন কর, যাহাতে তোমরা সফলকাম হইতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ছড়াইতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাযে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হইবে না?”৯১

উক্ত আয়াতে পরিষ্কার ভাষায় জুয়া খেলা ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর নিক্ষেপকে হারাম ঘোষণা করা হইয়াছে।

খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং বিজয়ীদেরকে পুরস্কৃত করা বৈধ। অবশ্য কোন কোন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান বৈধ এবং কোনটি বৈধ নহে এই বিষয়ে ফকীহগণের মতভেদ আছে। মালিকী ও হাম্বলী ফকীহগণের মতে, কেবল তীরন্দাজি, ঘোড়দৌড় ও উটদৌড়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান ও বিজয়ীদেরকে পুরস্কৃত করা বৈধ। হানাফী ও শাফিঈ ফকীহগণের মতে দৌড়, মল্লযুদ্ধ (কুস্তি), তীরন্দাজি, ভারোত্তলন, সাঁতার, খচ্চর, গর্ধভ, গরু ও হস্তীদৌড়ের প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদেরকে পুরস্কৃত করা বৈধ ৯২

ইমাম মালেক (র)-এর মতে বাইতুল মাল পুরস্কারের খরচ বহন করিবে এবং ইমাম আবু হানীফা, শাফিঈ ও আহমাদ (র)-এর মতে, তাহা বাইতুল মাল হইতেও প্রদান করা যায়, কোন ব্যক্তিবিশেষের পক্ষ হইতেও প্রদান করা যায়, এমনকি খােদ প্রতিযোগীদের কাহারও পক্ষ হইতেও প্রদান করা যায়।৯৩

খেলাধুলা ব্যপদেশে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের দৈহিকভাবে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিচিত্র নহে। যেমন দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড় পা ফসকাইয়া একে অপরের উপর পতিত হইল এবং একজন বা উভয়ে আহত হইল। এই অবস্থায় আহত হওয়ার জন্য কাহাকেও দায়ী করা যায় না। কিন্তু একজন অপরজনের উপর উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঝাপাইয়া পড়ার কারণে আহত হইলে অবশ্যই ইহার জন্য একজন দায়ী হইবে। অসতর্কতাবশত, ভুলবশত বা খেলার তীব্র মুহুর্তে মারমুখী আক্রমণ প্রতিহত করিতে গিয়া আহত হওয়ার ঘটনা ঘটিলে উহার জন্য কোন পক্ষ দায়ী হইবে না। যেমন নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা চলাকালে একটি নৌকার বৈঠা ভাঙ্গিয়া যাওয়ার ফলে নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া পার্শ্ববর্তী নৌকাকে আঘাত হানিল এবং এক বা একাধিক নৌকার প্রতিযোগীগণের সকলে বা কিছু সংখ্যক আহত হইল। এই অবস্থায় কাহাকেও দায়ী করা যায় না।

কিন্তু যেসব খেলাধুলায় প্রতিপক্ষের দেহের উপর দৈহিক শক্তি প্রয়োগ অপরিহার্য, যেমন মল্লযুদ্ধ, অথবা আঘাত হানা জরুরী, যেমন বক্সিং, পোললা খেলা ইত্যাদি, সেইসব খেলায় সংশ্লিষ্ট খেলার নিয়ম-কানুনের সীমার মধ্যে থাকিয়া প্রতিপক্ষকে আহত করিলে আহতকারী দায়ী হইবে না। দৈহিক শক্তি প্রয়োগ বা আঘাত হানাই ঐসব খেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সংশ্লিষ্ট খেলার নিয়ম ভংগ করিয়া আহত করা হইলে উহার জন্য অবশ্যই দায়ী হইতে হইবে। কারণ ইহা ইচ্ছাকৃত অপরাধ হিসাবে গণ্য। কিন্তু এসব খেলাধুলায় ভুল বা অসতর্কতাবশত আহত হওয়ার ঘটনা ঘটিলে উহা ভুলবশত অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে এবং তদনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হইবে।৯৪

তথ্য নির্দেশিকা ১. বাদাই, ৭ খণ্ড, পৃ. ২৩৬; মাওয়াহিবুল জালী খণ্ড, ৬ খণ্ড, পৃ. ২৪২; আল-মুগনী, ৯ খণ্ড, পৃ.

৩৭৫। ২. কিতাবুল উম্ম, ৬ খণ্ড, পৃ. ৩৪। ৩. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৯৬, ধারা ৪২৮৪

ان العجز عن الدفاع لا يوقف المحاكمة ولا يمنعها .

৪. হাশিয়া ইবন আবিদীন, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৪৭০। ৫. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৩২। ৬. তুহফাতুল মুহতাজ, ৪ খণ্ড, পৃ. ১৯; আল-মুগনী, ৯ খণ্ড, পৃ. ৩৭৭; আল-ইকনা, ৪র্থ খণ্ড,

পৃ. ২৪৪। ৭. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৯২-৩, ধারা ৪২৪।

৬৫৪

৮. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১খণ্ড, পৃ. ৫৮৯, ধারা ৪২০। ৯. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১খণ্ড, পৃ. ৫৮৭, ৫৮৯, ধারা ৪১৭ ও ৪১৯। ১০. ঐ গ্রন্থ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৮৮, ধারা ৪১৭। ১১. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী ১ খণ্ড, পৃ. ৫৯১-২, ধারা ৪২৩। ১২. ঐ গ্রন্থ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৯০ঃ! • Sad} ১৩. ঐ গ্রন্থ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৯০। ১৪. ঐ গ্রন্থ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৯০-৯১, ধারা ৪২২। ১৫. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৮৯-৯০, ধারা ৪২১। ১৬. আত-তাশরীউল জানাই, ১ খণ্ড, ৫৮৯, ধারা ৪২১। ১৭. ঐ গ্রন্থ, ১ম খণ্ড। ১৮. বাদাইউস সানাই, কিতাবুল ইকরাহ্, ৭ খণ্ড, পৃ. ১৭৫ :

وفي الشرع عبارة عن الدعاء الى الفعل بالأبعاد والتهديد مع وجود شرائطها.

১৯. আল-বাহরুর রাইক, ৮ খণ্ড, পৃ. ১৭৯ ও

وبانه عبارة عن تهديد الغير على هدد بمكروه على أمر بحيث ينتفى به الرضا .

Jai L36

২০. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৪ খণ্ড, পৃ. ৪৫ঃ Lal ylor, La Lai ২১. আসনাল মাতালিব ওয়া হাশিয়াতুশ শিহাব আর-রামলী, ৩ খণ্ড, পৃ. ২৮২। ২২. মুজামু লুগাতিল ফুকাহা, পৃ. ৮৫ : .

حمل الانسان على فعل او على امتناع عن فعل بغير رضاه بغير حق .

২৩. আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা, ৬ খণ্ড, পৃ. ৯৮।

اما الاكراه فهو فعل يفعله المرء بغيره فينفي به رضاه او يفسد به اختياره

২৪. আল-বাহরুর রাইক, ৮ খণ্ড, পৃ. ৮২। ২৫. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৪ খণ্ড, পৃ. ৪৫; আসনাল মাতালিব, ৩ খণ্ড, পৃ. ২৮৩; আল-ইকনা,

৪খণ্ড, পৃ. ৪; আল-মুগনী, ৮ খণ্ড, পৃ. ২৬১। ২৬. হাশিয়া ইবন আবিদীন, ৫ খণ্ড, পৃ. ১১০; আসনাল মাতালিব ওয়া হাশিয়াতুশ শিহাব

আর-রামলী, ৩ খণ্ড, পৃ. ২৮৩। ২৭. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৪ খণ্ড, পৃ. ৪৫। ২৮. আল-ইকনা, ৪ খণ্ড, পৃ. ৪। ২৯. হাশিয়া ইবন আবিদীন, ৫খণ্ড, পৃ. ১১২। ৩০. হাশিয়া ইব্‌ন আবিদীন, ৫ খণ্ড, পৃ. ১২০। ৩১. আল-মুগনী, ৮ খণ্ড, পৃ. ২৬১; মাওয়াহিবুল জালী খণ্ড, ৪ খণ্ড, ৪৫। ৩২. আল-বাহরুর রাইক, ৮ খণ্ড, পৃ. ৭৪, ৭৭। ৩৩. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৬ খণ্ড, পৃ. ২৪২; আল-মুগনী, ৯ খণ্ড, পৃ. ৩৩১; আল-ইকনা, ৪খণ্ড,

পৃ. ১৭১।

৩৪. তুহফাতুল মুহতাজ, ৪ খণ্ড, পৃ. ৭; আল-মুহাযাব, ২ খণ্ড, পৃ. ১৮৯। ৩৫. বাদাইউস সানাই, ৭ খণ্ড, পৃ. ১৭৯। ৩৬. আরও দ্র. সূরা আনআম, ১৪৫ নং আয়াত। ৩৭. বাদাইউস সানাই, ৭খণ্ড, পৃ. ১৭৬; আল-মুহাযযাব, ২ খণ্ড, পৃ. ২৪৫ প.; মাওয়াহিবুল

জালীখণ্ড, ৩ খণ্ড, পৃ. ২২৯। ৩৮. আবু বা আল-জাসসাস, আহকামুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৮। ৩৯. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৮৭। ৪০. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৩ খণ্ড, পৃ. ২৩৩; হাশিয়া ইবন আবিদীন, ৫ খণ্ড, পৃ. ২৯৬। ৪১. আল-মুগনী, ১১ খণ্ড, পৃ. ৭৯; আসনাল মাতালিব, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৭১। ৪২. আসনাল মাতালিব, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৭১। ৪৩. আল-মুগনী, ১১ খণ্ড, পৃ. ৮০; মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৬ খণ্ড, ২৪০। ৪৪. আল-মুগনী, ১১ খণ্ড, পৃ. ৮০; আসনাল মাতালিব, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৭২; মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড,

৩খণ্ড, পৃ. ২৩৪-এর বরাতে আত-তাশরীউল জানাঈ, ১খণ্ড, পৃ. ৫৭৯। ৪৫. হাশিয়া ইবন আবিদীন, ৫ খণ্ড, পৃ. ২৯৬। ৪৬. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১১৫

لاكم لافعال العقلاء قبل ورود الص.

(Unless relevant provision exists, no judgement can passed

on the action of a sensible person)Ç ৪৭. তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবন মাজা, মুসনাদ আহমাদ। এখানে তিরমিযী হইতে উদ্ধৃত, বাংলা

অনু, নিকাহ, অনুচ্ছেদ ৩৩, নং ১০৬৭, ১০৬৮। ৪৮. তিরমিযী, মুসনাদ আহমাদ ও মুওয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ। এখানে তিরমিযী হইতে উদ্ধৃত,

নিকাহ, বাব ৩২, নং ১০৬৬ (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত বাংলা অনু., ২য়

খণ্ড)। ৪৯. বাদাইউস সানাই, ৭ খণ্ড, পৃ. ৩৩৬। ৫০. মাওয়াহিবুল জালীল, ৬ খণ্ড, পৃ. ২৩৫-৬; আশ-শারহুল কাবীর, ৪ খণ্ড, পৃ. ২১৩। ৫১. নিহায়াতুল মুহতাজ, ৭ খণ্ড, পৃ. ৪২৮। ৫২. আল-ইকনা, ৪খণ্ড, ১৭১। ৫৩. আসনাল মাতালিব, ৪ খণ্ড, পৃ. ৯৫; নিহায়াতুল মুহতাজ, ৭ খণ্ড, পৃ. ৩৬৫-৬; আল-মুগনী,

১০ খণ্ড, পৃ. ৩৮-৯; বাদাইউস সানাই, ৭ খণ্ড, পৃ. ২৫২; শারহু লিদ-দিরদীর, ৪ খণ্ড, পৃ.

(২৫৪; মাওয়াহিবুল জালী খণ্ড, ৬ খণ্ড, পৃ. ২৬৮। ৫৪. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৪৭-৮। ৫৫. আত-তাশরীউল জানাই, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৩০, ধারা ২৯৭ঃ

لا يقبل في دار الإسلام العذر بجهل الأحكام

৬৫৬

৫৬. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১খণ্ড, পৃ. ৪৩১। ৫৭. Leu 11, ferr:JJ 99 99 k: ৫৮. ফাতহুল কাদীর, ৫ খণ্ড, পৃ. ৩৯; আত-তাশরীউল জানাই, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৩৩; ২ খণ্ড, পৃ.

৩৬৬। ৫৯. ইলামুল মুওয়াক্কিঈন, ২ খণ্ড, পৃ. ১৪০; আল-মুসতাসফা, ১খণ্ড, পৃ. ৮৪; আল-ইহকাম ফী

উসূলিল আহকাম (আমিদী), ১ খণ্ড, পৃ. ২১৭; (ইবন হাযম) ৫খ, ১৪৯ প.-এর বরাতে আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৩৩ :

ان الدماء والأموال معصومة وان الاعتذار الشرعية لا تنافي عصمة المحل .

৬০. ঐ গ্রন্থ, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৩৮, ধারা ৩০৫ :

النسيان هو عدم استحضار الشيئ في وقت الحاجة اليه.

৬১. ঐ গ্রন্থ, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৩৮. Lac 1 1 x 6Tk. Li ৬২. আল-খিদরী, উসূলুল ফিকহ, পৃ. ১৯৯; আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, পৃ. ১৬৬-৭-এর বরাতে

আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৪৩৯, ধারা ৩০৫। ৬৩. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১খ পৃ. ২০৭; ধারা ১৭৮ : . s4u 1, ১৪২১ ৬৪. শারহু ফাতহিল কাদীর, ৪ খণ্ড, ১৩৯-এর বরাতে আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড পৃ. ২০৮,

ধারা ১৭৮। ৬৫. শারহু ফাতহিল কাদীর, ৪ খণ্ড, পৃ. ১৪০

لا يقصد بالثبوت ثبوت الفعل فقط وانما يقصد بالثبوت معناه العام فيشتمل ثبوت الفعل وثبوت الحكم.

৬৬. শারহু ফাতহিল কাদীর, ৪ খণ্ড, পৃ. ১৪১-২। ৬৭. শারহুয যারকানী আলা মুখতাসারিল খালীখণ্ড, ৮ম খণ্ড, ১১৬-৭; নিহায়াতুল মুহতাজ, ৮ খণ্ড,

পৃ. ৩২। ৬৮. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫২৩, ধারা ৩৬৬। ৬৯, হাশিয়াতুত তাহতাবী, ৪ খণ্ড, ২৭৬। পূর্ণ আলোচনাটি শহীদ আবদুল কাদের আওদাহ

(র)-এর আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী গ্রন্থ, ১ খণ্ড, হইতে গৃহীত (ধারা ৩৬২-৩৬৮)। ৭০. আল-বাহরুর রাইক, ৫ খণ্ড, পৃ. ৫৩; আসনাল মাতালিব, ৪ খণ্ড, পৃ. ১৬২; আশ-শারহুল

কাবীর, ৮ খণ্ড, পৃ. ১৬৯। ৭১. আশ-শারহুল কাবীর, ৯ খণ্ড, পৃ. ১৬৮। ৭২. বাদাইউস সানাই, ২খণ্ড, পৃ. ৩৩৪; মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৪ খণ্ড, পৃ. ১৫-৬; মুকাদ্দামাত

ইন রুশদ, ২ খণ্ড, পৃ. ১০৪। ৭৩. ইবন মাজা, কিতাবুল আদাব। ৭৪. আহকামুল কুরআন (জাসসাস), বাংলা অনু, ২ খণ্ড, পৃ. ৭০৯। ৭৫. আবু দাউদ, ইবন মাজা ও দারিমীর বরাতে মিশকাত (বাংলা অন.), ৬ খণ্ড, পৃ. ২৯৩, নং

৪০২২।

৬৫৭

৭৬. আবু দাউদের বরাতে মিশকাতুল মাসাবীহ, ৬ খণ্ড, পৃ. ২৯২-৩, নং ৪০২১। ৭৭. আহমাদ, আবু দাউদ ও ইব্‌ন মাজার বরাতে মিশাকত, ৬ খণ্ড, পৃ. ২৯২, নং ৪০২০। ৭৮. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৪ খণ্ড, পৃ. ১৬; আসনাল মাতালিব, ৩ খণ্ড, পৃ. ২৩৯। ৭৯. আহকামূল কুরআন (জাসাস), ২ খণ্ড, পৃ. ১১; হাশিয়াতুত তাহতাবী, ৪ খণ্ড, পৃ. ২৭৫। ৮০, আবু দাউদ, ইবন মাজা ও দারিমীর বরাতে মিশকাতুল মাসাবীহ (বাংলা অনু.), ৬ খণ্ড, পৃ.

২৯৩, নং ৪০২২। ৮১. আল-মুগনী, ১০ খণ্ড, ৩৪৯; হাশিয়াতুত তাহতাবী, ৪ খণ্ড, পৃ.২৭৫; কিতাবুল উম্ম, ৬ খণ্ড, পৃ.

১৩১, ১৬৬ প.। ৮২. বাদাই, ৭ খণ্ড, পৃ. ৩০৫; হাশিয়াতুত তাহ্তাবী, ৪ খণ্ড, পৃ. ২৭৫। ৮৩. হাশিয়াতুত তাহতাবী, ৪ খণ্ড, পৃ. ২৭৫। ৮৪. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫২৫। ৮৫. পূর্বোক্ত বরাত, পৃ. ৫২৬। ৮৬. আত-তাশরীউল জানাঈ, ১ খণ্ড, পৃ. ৫২৬। ৯৭. ঐ, পৃ. ৫২৬। ৮৮,৮৯ ও ৯০. পূর্বোক্ত বরাত, ১ খণ্ড, পৃ. ৫২৬। ৯১. সূরা মাইদা, ৯০ ও ৯১ নং আয়াত। ৯২. আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী, ১ খণ্ড, পৃ. ৫২৭। ৯৩. মাওয়াহিবুল জালীখণ্ড, ৩ খণ্ড, পৃ. ৩৯০ প; হাশিয়া ইবন আবিদীন, ৫খণ্ড, পৃ. ৬৫৭;

মাজমাউল আনহুর, ২খণ্ড, পৃ. ৫২৬; তুহফাতুল মুহতাজ, ৪ খণ্ড, পৃ. ২১৫ প; আল-মুগনী, ১১ খণ্ড, পৃ. ১২৮ প; আল-ফুরূসিয়্যা, পৃ. ৬৯ প.-এর বরাতে আত-তাশরীউল জানাঈ, ১

খণ্ড, পৃ. ৫২৭। ৯৪. পূর্ণ আলোচনাটি আত-তাশরীউল জানাইল ইসলামী হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *