০১. বন্দরসংলগ্ন এলাকা

নারাচ – দেবারতি মুখোপাধ্যায় / প্রথম প্রকাশ – আগস্ট ২০২০

.

শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেলেও
যারা ঝলসে উঠতে পারেনি
শাণিত নারাচ অস্ত্রের মতো—
শোষিত নিপীড়িত হতে হতে যারা নীরবে ঝরে গেছে
আধফোটা ফুল হয়ে—
সমাজের সেইসব প্রান্তিক অসহায় মানুষের
স্মৃতির উদ্দেশে এই গ্রন্থ নিবেদিত।

.

বন্দরসংলগ্ন এলাকা। মহাসাগরের ফেনিল জলোচ্ছ্বাস এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রতটে। পূর্ণজোয়ারের সেই স্রোত ভিজিয়ে দিচ্ছে উপকূলবর্তী ব্যস্ত মানুষদের।

তারা এইসবে অভ্যস্ত। নির্বিকার ভঙ্গিতে একবার করে পরনের কাপড়জামার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা বালিকণাগুলো ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছে। পরমুহূর্তে আবার যে যার কাজে মনোযোগ দিচ্ছে।

সূর্যদেব এখন অবস্থান করছেন বৃষ রাশিতে। মধ্যাহ্ন দ্বিপ্রহর। প্রখর রৌদ্রতাপ সঙ্গে তালমিলিয়ে হলকা বইছে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বন্দরটি লোকে লোকারণ্য। একের পর এক সুবিশাল অর্ণবপোত এসে দাঁড়াচ্ছে সেখানে। মানুষের কোলাহলে, জাহাজের ভেঁপুতে, শ্রমিকদের মালপত্র ওঠানামার কাজে, মালিকদের হাঁকডাকে মুখরিত হয়ে উঠছে অঞ্চল।

কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। তারপর আবার কিছুক্ষণের জন্য ঝিমিয়ে পড়ছে মানুষগুলো।

অপেক্ষা পরবর্তী জাহাজের জন্য।

একটি অর্ণবপোত দুলকিচালে বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার বাতাসে উড়তে থাকা পালগুলোকে দেখা যাচ্ছিল।

জাহাজটি যত তীরের কাছাকাছি এগিয়ে যাচ্ছিল, জাহাজের খোলের ভেতরের মানুষগুলোর চোখে ওপারের সম্পূর্ণ নতুন দেশটির দৃশ্যপট যেন তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। অজানা এক আশঙ্কা এসে জাঁকিয়ে বসছিল তাদের মনে।

দূরত্ব ক্রমশ হ্ৰাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছিল অচেনা কোন বাদ্যযন্ত্রের শব্দধ্বনি। শোনা যাচ্ছিল আগ্নেয়াস্ত্রের বেহিসাবি গর্জন।

কয়েকজন একটু বেশিই কৌতূহলী। গাদাগাদি করে বসে থাকা অবস্থাতেও বিকলাঙ্গ সরীসৃপের মতো তারা ঘষটে ঘষটে এগিয়ে গিয়ে চেষ্টা করছিল জাহাজের খোলের গায়ে লাগানো একফালি গবাক্ষে চোখ রাখতে।

কিন্তু সেখানেও ঘোরতর প্রতিযোগিতা। এক বর্গফুটের একটা জানালার মধ্যে নিজের দর্শনেন্দ্রিয়কে স্থান করে দেওয়ার জন্য লড়াই চালাচ্ছে অন্তত কুড়িজন নরনারী। নারীপুরুষের মধ্যে যে স্বাভাবিক লজ্জা থাকে, সেসবের পালা মিটেছে অনেক আগেই। জীবনযাপনের মৌলিক অধিকারগুলোই যখন শেষ রাত্রির কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন অচিরেই ঠুনকো হতে থাকে সামাজিক ভেদাভেদের রীতিনীতিগুলো।

চুকেছে শ্রেণীভেদাভেদের ছুঁৎমার্গও। এখানে ব্রাহ্মণ, তিলি, যবন সকলেই এক। মনু এখানে নীরব দর্শক মাত্র। এখানে শূদ্র শুধুই ‘দ্বিজোচ্ছিষ্টঞ্চ ভোজনম’ করে না, দ্বিজ অর্থাৎ ব্রাহ্মণও অবলীলায় বুভুক্ষু শরীরের খিদে নিবারণ করে শুদ্রের পাত থেকে খেয়ে।

পরকালের বিচার পরে হবে, পেটের জ্বালা বড় জ্বালা!

তবু তারই মধ্যে কিছু মানুষ এখনো কৃষ্ণসুন্দরকে সম্মান করে। শিক্ষিত পণ্ডিত বলে কথা। তার ওপর কুলীন ব্রাহ্মণ।

তাই দ্বিধাগ্রস্থ কৃষ্ণসুন্দর যখন জানালার কাছে গেলেন, তাঁকে বহির্জগতে চোখ রাখার সুযোগ করে দিল কয়েকজন।

গবাক্ষে চোখ রাখামাত্র নিজের অজান্তেই কৃষ্ণসুন্দরের সর্বাঙ্গের রোমকূপ খাঁড়া হয়ে উঠল। কেঁপে উঠল অধরোষ্ঠ। অস্ফুট উচ্চারণে শিহরিত কণ্ঠে তিনি শুধু বলতে পারলেন, ‘শিব শিব!’

পেছন থেকে তাঁর চওড়া পিঠের ওপর ক্রমাগত চাপ আসছিল।

একজন বহুদিনের অর্ধভুক্ত মানুষ তার দুর্বল কণ্ঠে সর্বোচ্চ শক্তি ঢেলে বলল, ‘কী দ্যাকতাছেন ঠাকুরমশাই? দ্যাশটা কিমুন? মানুষ গুয়ের মালসার মতো সাদা না আমাগো দ্যাশের মতো নিক্কশ কালা? দ্যাশটায় গাছ-গুছ আছে তো?’

কৃষ্ণসুন্দর উত্তর দিলেন না। প্রশ্নটা করেছে তোতারাম। পূর্ববঙ্গের লোক। নিবাস বরিশাল। কিছু কিছু মানুষ জীবনে কোনো অবস্থাতেই স্বভাব বদলাতে পারে না। তোতাও তেমনই একজন। সর্বহারা হয়েও সে একইরকম বাচাল রয়ে গিয়েছে।

কৃষ্ণসুন্দর সরু চোখে নিবিষ্ট মনে দেখে চলেছিলেন। তাঁদের জাহাজ এখন তীরের অনেকটাই কাছে চলে এসেছে। বন্দরে নোঙর পাততে বাকি আর কয়েক মুহূর্ত। উপকূলের দৃশ্য এখন আগের চেয়ে আরো বেশি স্পষ্ট।

বন্দরে যেখানে এই জাহাজটি ভিড়বে, সেই স্থানটি ফাঁকা রেখে আশপাশে গিজগিজ করছে অসংখ্য ছোটবড় নৌকো। প্রতিটি নৌকোর পাটাতনে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষ।

শীর্ণকায়, ধুঁকতে থাকা মানুষ। তাদের কৃষ্ণবর্ণ গাত্র ও কেশ সূর্যের কড়া আলোয় চকচক করছে।

জাহাজ পাড়ে ভেড়ার সময় দুলুনি একটু বেশিই হয়। কৃষ্ণসুন্দর সেই ক্রমাগত দোলায় নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখে দেখলেন, ওই হাজার হাজার নারীপুরুষ, যারা যূপকাষ্ঠে বলির জন্য অপেক্ষারত ছাগশিশুর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে নৌকোগুলোর পাটাতনে, তাদের কারোর শরীরে একটা সুতোও নেই।

প্রতিটি মানুষ যেন কঙ্কালসার, এতদূর থেকেও প্রত্যেকের পাঁজর ভেদ করে নির্ভুল গণনা করা যায় অস্থি। বহুদিনের অনাহারে অত্যাচারে শীর্ণ ক্লিষ্ট মানুষগুলো যেন প্রত্যেকেই একেকটা প্রেতলোকের বাসিন্দা।

একটা নৌকোর একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি যুবতী রমণী। সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা। তার স্তনবৃন্তটি ঠোঁট দিয়ে আঁকড়ে ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলছে তার শিশু। সম্ভবত অপুষ্টিসর্বস্ব মাতৃস্তন্যে সে আকুল হয়ে খুঁজছে অমৃতভাণ্ড।

প্রকাশ্য দিবালোকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকেও যুবতীটির কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, সে নির্লজ্জ বৃদ্ধ চর্মরুগীর মতো ঘ্যাস ঘ্যাস করে নিজের ঊরু চুলকোচ্ছে।

নৌকোর সামনের ঘাটেই চাবুক হাতে পায়চারি করছে ওলন্দাজ বেনিয়ারা। তাদের পরনে হাঁটু পর্যন্ত চামড়ার জুতো। রেশমের জামা। মাথায় জমকালো টুপি। কারোর কারোর মাথায় রাজকীয় উষ্ণীষ। কোমরে তরবারি। কিছুজনের হাতে আছে আগ্নেয়াস্ত্র।

মাঝে মাঝেই তারা বিজাতীয় ভাষায় চিৎকার করে উঠছে শ্রমিকদের লক্ষ্য করে।

শ্রমিকরা বিনা বাক্যব্যয়ে মালের বোঝা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একপাশে রাখা রয়েছে সদ্য জাহাজের খোল থেকে নামানো পিপে ভর্তি মদ। ফলের রস। ঘাটের একেবারে সামনে তৈরি করা হয়েছে একটা অস্থায়ী মঞ্চ। মঞ্চ বলতে অবশ্য আনুষ্ঠানিক কিছু নয়, একটা আধমানুষ উচ্চতার কাঠের বাক্স। তার গায়ে যে ভাষা লেখা আছে, তা অজানা থাকায় কৃষ্ণসুন্দর পড়তে পারলেন না।

একেকটা নৌকো থেকে একজন করে মানুষকে গৃহপালিত পশুর মতো নিয়ে গিয়ে তোলা হচ্ছে সেই বাক্সের ওপর। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোট প্যান্ট পরা শ্বেতাঙ্গটি উঁচু গলায় বারবার কিছু একটা বলছে। আশপাশের শ্বেতাঙ্গদের ভিড় থেকে আসছে তার প্রত্যুত্তর। এইভাবে কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ করে বাক্সের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা মানুষটিকে নামিয়ে আনা হচ্ছে। সে তখন আর নৌকোয় ফেরত যাচ্ছে না, ডাঙাতেই চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো বেনিয়ার দলে।

পুরুষ মঞ্চে উঠলে একরকম, কোনো নারী উঠলেই দৃশ্যপটে বেশ পরিবর্তন ঘটছে। প্রাচ্যের পরাধীন দেশ থেকে নামমাত্র মূল্যে কিনে আনা উলঙ্গ ক্রীতদাসীটির শরীরের বিশেষ কিছু অঙ্গ অসঙ্কোচে স্পর্শ করে তখন তার গুণকীর্তন বর্ণনা করছে নিলাম পরিচালনা করা লোকটি।

যতই চারপাশ থেকে দামের হাঁক আসছে, যুবতী ততই অধোবদনে আড়ষ্ট হয়ে পড়ছে।

হয়ত একদিন সে হিন্দু ঘরের কূলবধূ ছিল। কিংবা হয়ত ছিল কোনো স্নেহশীল পিতার আশ্রয়ে থাকা বাল্যবিধবা। এভাবে প্রকাশ্যে নিরাবরণ হওয়া তো দূর, পরপুরুষের সামনে নিজের অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করাটাও ছিল তার কল্পনাতীত। কিন্তু পরিস্থিতি তার ভেতরের সেই লজ্জাকে তিলে তিলে হত্যা করেছে।

কৃষ্ণসুন্দরের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসছিল।

তিনি চিৎকার করে বলতে যাচ্ছিলেন, ‘কেউ নেমো না জাহাজ থেকে। কেউ নেমো না। আমাদের এখানে ওরা বেচে দেবে! সারাজীবনের জন্য বেচে দেবে ওরা! পাঁচ বচ্ছরের কড়ার কথার কথা, আমি জানি। সব ভাঁওতা! জীবনভর পচে মরতে হবে এখানে!’

ঠিক এইসময়েই কৃষ্ণসুন্দরের ঘুমটা ভেঙে গেল। তিনি ধড়ফড় করে উঠে বসলেন মেঝের ওপর। অন্ধকারে অনুভব করলেন তাঁর নিজের বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। হাতড়ে হাতড়ে বুকের ওপর আলগোছে পড়ে থাকা মলিন হয়ে যাওয়া সামবেদী উপবীত স্পর্শ করে জপ করতে থাকেন তিনি।

‘হে পরমেশ্বর! সবাইকে রক্ষা করো তুমি! তুমিই আশ্রয়! তুমিই সত্য! তুমিই সুন্দর!’

‘কী হয়েচে বাবা?’ কৃষ্ণসুন্দরের পাশ থেকে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে তাঁর আটবছরের পুত্র দিব্যসুন্দর। তার চোখেমুখে এখনো গভীর ঘুম লেগে রয়েছে।

দুই সপ্তাহ আগে যখন এই ডিপোয় সে এসেছিল, তখন তার ত্বক ছিল শিশুর মতই কোমল। সেই পেলবতা এখন রুক্ষ হয়ে গেলেও সদ্য কৈশোরের স্বাভাবিক দীপ্তিটুকু শত অনাচারেও তার শরীর থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি।

কৃষ্ণসুন্দর একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের দুশ্চিন্তার বোঝা এই এতটুকু ছেলের মাথায় চাপানো অন্যায়। তিনি বললেন, ‘কিছু না রে। ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। ঘুমিয়ে পড়। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।’

দিব্যসুন্দর বাধ্য ছেলের মতো শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস করে বলে, ‘দিদিরা এখন কী করচে বাবা?’

‘কী আবার করবে?’ কৃষ্ণসুন্দর বললেন, ‘তুই যা করছিস। ঘুমুচ্ছে।’

‘তুমি যেমন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্চ, মা-ও কি তেমনি দিদিদের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্চে?’

কৃষ্ণসুন্দর চুপ করে থাকেন।

দিব্যসুন্দর আবার প্রশ্ন করে, ‘আর পিসিমা? পিসিমা কী করচে বাবা?’

কৃষ্ণসুন্দর এবার নৈঃশব্দ্য ভেঙে বলেন, ‘জানিনা দিব্য। তুই ঘুমো। কাল অনেক ভোরে উঠতে হবে।’

দিব্য আর কোনো কথা বলে না। একটু পরে ডুবে যায় গভীর ঘুমে।

অন্ধকারে যেটুকু দেখা যায়, তাতে কৃষ্ণসুন্দর পরম মমতায় ছেলের নিষ্পাপ মুখখানা দেখতে থাকেন। আজ সকালেই কুয়ো থেকে জল তোলার সময় বালতির ওজন সামলাতে না পেরে ফেলে দেওয়ার অপরাধে তাঁর সামনেই দিব্যকে নির্মম শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ডিপোর পাহারাদারেরা উত্তমমধ্যম চপেটাঘাত করেই ক্ষান্ত হয়নি, দিব্যকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বড় এজেন্ট নবকিশোর দত্তর কাছে।

সেখানে কী হয়েছে, তা বারবার জিজ্ঞেস করেও জানতে পারেননি কৃষ্ণসুন্দর। শুধু লক্ষ করেছেন, সেখান থেকে ঘরে ফিরে আসার পর ছেলের দুই কনুই আগুনের ছ্যাকায় লাল হয়ে ফুলে উঠেছে।

নবকিশোর দত্ত দিনে দু’বার তার এই ডিপো পরিদর্শনে আসে। তার এ’শহরে অনেকগুলো ব্যবসা। গন্ধতেল, মহাজনি কারবার থেকে শুরু করে চালের আড়ত, বাহারি পালঙ্ক। ছোট মেজ বড় কিংবা সাদা, কালো সবরকম ব্যবসাতেই লগ্নী রয়েছে তার। তবে সবচেয়ে চালু ব্যবসা হল মেটিয়াবুরুজের চিড়িয়াখানায় জানোয়ার রপ্তানি করা। মেটিয়াবুরুজ এখন লক্ষ্নৌ থেকে নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহর আস্তানা। সেখানেই তাঁর শখের চিড়িয়াখানা। নব দত্ত সেখানেই পশুপাখি সরবরাহ করে থাকে।

ডিপোর ব্যবসায় নবকিশোর দত্ত এসেছে বেশিদিন হয়নি। বছরপাঁচেক আগেও সে এদিকে বিশেষ উৎসাহী ছিল না। কিন্তু অন্যান্য ব্যবসাদারদের ক্রমবর্ধমান লাভের অঙ্ক তাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। এখন তার সাব-এজেন্ট অর্থাৎ আড়কাঠিরা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে। কমিশনের লোভে তাদের কোনো বাছবিচার নেই। যাকে যেভাবে হোক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তারা নিয়ে আসে ডিপোয়। তারপর পাঁচ-ছয় সপ্তাহের এই কয়েদবাস। এরই মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা। অশিক্ষিত মানুষগুলোর টিপছাপ নিয়ে চুক্তিনামা। সব সারা হয়ে গেলে সবাইকে ঠেসেঠুসে জাহাজের পেটে পুরে চালান দেওয়া হয় দূরের কোনো দেশে।

দুই সপ্তাহ আগে গ্রামের বিশ্বনাথতলায় হরিহর বলে লোকটার সঙ্গে যখন আলাপ হয়েছিল, তখন অবশ্য কৃষ্ণসুন্দর এত কথা জানতেন না। নাতিদীর্ঘ হৃষ্টপুষ্ট গড়ন হরিহরের। জাতে তিলি। হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, ঊর্ধাঙ্গে মলিন পিরান। সেদিন গোটা সময়টা সে কৃষ্ণসুন্দরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে করজোড়ে কথা বলে গিয়েছিল।

কৃষ্ণসুন্দরও সরল বিশ্বাসে প্রভাবিত হয়েছিলেন হরিহরের কথায়। ভেবেছিলেন, যে প্রচণ্ড বিপদসংকুল জীবন কাটছে গ্রামে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঈশ্বরই নিশ্চয়ই দশম অবতাররূপে হরিহরকে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে।

কিন্তু তাঁর ভ্রম ভেঙেছে অচিরেই। সত্যের নিষ্ঠুর আঘাতে তছনছ হয়ে গিয়েছে তাঁর দিবাস্বপ্ন। ধীরে ধীরে অনেক কিছুই জানতে পেরেছেন মেছুয়াবাজারের পেছন দিকে বিশাল পাঁচিলঘেরা নবকিশোর দত্তর এই ডিপোয় এসে। তখন আশপাশের হতভাগ্য মানুষগুলোর মতো তাঁরও আর কিছু করার নেই। হরিহরও ডিপোর গোমস্তার থেকে তার কমিশনটি কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নিয়ে ভাগলবা।

নিস্তব্ধ রাতে কৃষ্ণসুন্দরের অশ্রুগ্রন্থি আবার কাজ শুরু করে। কিন্তু এই পনেরোদিনের অভ্যাসে সেই অশ্রু গ্রন্থি থেকে একফোঁটাও জলও পড়ে না। শুকনো চোখে তিনি ঘুমন্ত ছেলের ক্ষতস্থানে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। যন্ত্রণায় বেদনায় তাঁর বুকটা মুচড়ে ওঠে।

প্রকাণ্ড বড় ঘরটায় পাশাপাশি ঘুমোচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ জন। সবার নিঃশ্বাসের বাতাসে একটা গুমোট পচা অস্বাস্থ্যকর হাওয়া বাসা বেঁধেছে ঘরে। অনেকটা দূরে একেবারে দরজার পাশে জ্বলছে একটা হ্যাজাক।

সেই হ্যাজাকের আলোর পাশে ঘুমে ঢুলছে আজকের রাতের প্রহরী।

দৈর্ঘ্যে প্রায় পঞ্চাশ হাত হলেও গোটা ঘরটায় সেই অর্থে কোনো জানলা নেই। আছে শুধু মাটি থেকে অনেকটা ওপরে কয়েকটা ঘুলঘুলি। এই ঘরটার সঙ্গে একই দেওয়ালে ওপাশে রয়েছে একইরকম আরেকটা ঘর। সেটা মেয়েদের জন্য। ওখানেই রয়েছে কৃষ্ণসুন্দরের স্ত্রী ব্রহ্মময়ী, ভগ্নী ভুবনমণি। এবং দুই কন্যা। অপালা ও লোপামুদ্রা।

এই দুটি বিশাল ঘর নিয়ে নবকিশোর দত্তর ডিপো। বাইরে রক্ষী। তিনমানুষ সমান উঁচু প্রাচীর।

মাঝে মাঝে কৃষ্ণসুন্দরের মনে হয়, জেলখানাতেও বোধহয় এর চেয়ে বেশি আলো বাতাস ঢোকে। সেখানেও এর চেয়ে বেশি প্রাণ থাকে। এখানে সারাদিন একভাবে গাদাগাদি করে বসে থাকো, ঘণ্টা বাজলে গিয়ে মাপ মতো খাও, তারপর এসে আবার বসে থাকো। কখনো সখনো নিজের পালা এলে ডিপো পরিষ্কার করো, রাঁধো। আবার ঘণ্টা বাজলে শুয়ে পড়ো।

এভাবেই কাটাতে হবে কয়েকদিন বা কয়েকমাস। যতদিন না নির্ধারিত জাহাজে করে সাত সমুদ্র উজানে পাড়ি দিতে হয়। যতদিন না শুরু হয় খাতায় কলমে দাসত্ব!

কৃষ্ণসুন্দরের চোখে ঘুম নেই। তিনি এখন গোটা রাত ধরে আকাশ পাতাল চিন্তা করবেন। বারবার অতীতের দিনগুলোকে মনের অতলে কাটাছেঁড়া করে অনুতাপে, অনুশোচনায় দগ্ধ হবেন। অসম্ভব জেনেও গলায় দড়ি দিয়ে সব জ্বালা মেটানোর বহুচর্চিত ক্লিশে ভাবনায় নিজেকে ডুবিয়ে দেবেন। অবশেষে ভোর রাতে কয়েক দণ্ডের জন্য হারিয়ে যাবেন নিদ্রারাজ্যে।

দরিদ্র ব্রাহ্মণ কৃষ্ণসুন্দর নেহাতই এই ডিপোয় ‘বকমধ্যে হংস যথা’। নবকিশোর দত্তের আড়কাঠি হরিহরের কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনোভাবে এসে ঢুকে পড়েছেন এই ডিপোয়।

কে এই কৃষ্ণসুন্দর? কীভাবেই বা এই ফাঁদে একজন শিক্ষিত ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সমেত পা দিলেন?

ইতিমধ্যেই অনুমেয়, এই কাহিনির সময়পট বর্তমানকাল নয়। অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ উপস্থিত রয়েছেন এই কাহিনীতে। নবাব অযোধ্যায় তাঁর নিজের সুবিশাল রাজ্য হারিয়ে কলকাতায় আসেন ১৮৫৬ সালে। দেহান্ত হয় ১৮৮৭ সালে। অতএব এই কল্পকাহিনির সময়কাল উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ।

নির্ভুল এই অনুধাবন। আরো বলতে গেলে, সময়টা ১৮৮৫-র আশেপাশে। সিপাহী বিদ্রোহের পর কেটে গিয়েছে প্রায় আড়াই দশক। সতীদাহের মতো কুৎসিত প্রথা রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আইন করে বন্ধ করা হয়েছে প্রায় অর্ধশতক আগে।

তিরিশ বছর আগে বিদ্যাসাগরের নিরলস সংগ্রামে পাশ হয়েছে বিধবা বিবাহ সম্পর্কিত বিখ্যাত ১৫ আইনও।

ভারতের অধিকাংশ শিক্ষিত মুক্তমনা জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, ব্রিটিশ শাসন এই কুসংস্কারে ডুবে থাকা দেশের ক্ষেত্রে আশীর্বাদস্বরূপ। তাই জাতীয় কংগ্রেস সবেমাত্র স্থাপিত হলেও সেখানকার নরমপন্থীরা অনুচ্চকণ্ঠে নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করে চলেছেন, কারণ তাঁরা মহারানির নিশ্চিত শাসনের অধীনে থাকারই পক্ষপাতী।

বিদ্যাসাগর, দুর্গামোহন দাসের মতো কিছু দেশীয় ব্যক্তি ও বেথুন সাহেবের মতো কিছু বিদেশীর একান্ত আগ্রহে মহিলাদের জন্য বেথুন স্কুলও স্থাপিত হয়েছে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে।

কিন্তু ‘মহিলাদের বিদ্যার্জন মানেই অকালবৈধব্য’ এই ধারণা এখনো অধিকাংশ মানুষের মনে জাঁকিয়ে বিরাজমান। ‘অষ্টবর্ষা ভবেদ গৌরী’-ও চলছে রমরমিয়ে। আটবছরের মেয়েকে গৌরীদান করে দায় ঝেড়ে ফেলা হচ্ছে কোনোরকমে। নগর কলকাতায় যদিবা কিছু উচ্চবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের কন্যারা আলোকপ্রাপ্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে তা দুরাশামাত্র।

এমনই এক সময়ে হুগলী জেলার সম্ভ্রান্ত এক গ্রাম। মশাট।

এক শতক আগেও নাম ছিল বিশ্বনাথপুর। গ্রামের মোড়ল সর্দার গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবহমান কৌশিকী নদীর পশ্চিমপাড়ে ঘন নলবনের মধ্যে আবিষ্কার করল শিবলিঙ্গ। তৈরি হল শিবমন্দির। সেই থেকেই বিশ্বনাথপুর।

পরে সেই বিশ্বনাথপুরে গজিয়ে উঠল এক বিশাল গরুমোষের হাট। সেই মোষ কালে কালে নামমাহাত্ম্যে চাপা দিয়ে দিল বাবা বিশ্বনাথকে। বিশ্বনাথপুর হয়ে গেল মশাট।

নাম বদলালেও গ্রামে বাবা বিশ্বনাথের মাহাত্ম্য কিছু কমল না। দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্তি, অসুখবিসুখ, কন্যাদায়, নানা কারণে সেই মন্দিরে ভক্তের সংখ্যা বাড়তেই লাগল। মশাট প্রধানত গয়লা অধ্যুষিত গ্রাম। এছাড়াও রয়েছে কয়েকঘর সদগোপ, তিলি, মাহিষ্য। বিশ্বনাথ মন্দিরের সেবাইত গ্রামের জমিদার চৌধুরী পরিবার।

কৃষ্ণসুন্দর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মশাট গ্রামের সেই বিশ্বনাথ মন্দিরের বংশপরম্পরায় পুরোহিত। প্রায় আটপুরুষ ধরে তাঁরা ওই মন্দিরের পুজো করে আসছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর হল নিতান্ত দৈবের দুর্বিপাকে সেই ক্ষমতাটি কৃষ্ণসুন্দরের হাতছাড়া হয়েছে।

সেই কারণটি বিচিত্র এবং বেদনাদায়ক।

কৃষ্ণসুন্দরের পিতা রামেন্দ্রসুন্দর ছিলেন বীর্যবান পুরুষ। তাঁর সহধর্মিণীর সংখ্যা ছিল পাঁচ। এই পঞ্চভার্যার গর্ভে তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করে কুড়িরও বেশি সন্তান। তাদের মধ্যে আটজন শৈশবেই মারা যায়। জীবিত বারোজনের মধ্যে দশজনই কন্যা। মাত্র দুইজন পুত্র। জ্যেষ্ঠপুত্র শুক্লসুন্দর রামেন্দ্রসুন্দরের প্রথমা পত্নীর পুত্র। আর কৃষ্ণসুন্দর চতুর্থ পত্নীর সন্তান।

শুক্লসুন্দর ছিল ছোট থেকেই একটু অন্যরকম। অবাধ্য, কিছুটা জেদি, অনমনীয় প্রকৃতির। কোনোকিছু সে করার আগেই প্রশ্ন করে। উত্তর মনঃপুত না হলে শত ধমকেও তা পালন করে না।

বংশের কুলতিলক বলে কথা, রামেন্দ্রসুন্দর অনেকভাবে পুত্রকে পথে আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু নরম, কঠিন সবরকম শাসনেই তিনি ব্যর্থ হলেন। শুক্লসুন্দর গ্রামের চতুষ্পাঠীতে কয়েক বছর পড়ে একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। কিছুদিন অনুসন্ধান চলল, তারপর কালের নিয়মে তার কথা জন্মদাত্রী ছাড়া গ্রামের প্রায় সকলেই বিস্মৃত হল।

এরপর একদিন রামেন্দ্রসুন্দর চোখ বুজলেন। শূন্য হল বিশ্বনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের পদ। এদিকে গ্রামের জমিদারবাড়ির শর্ত অনুযায়ী, তাঁদের পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্রই বিশ্বনাথ মন্দিরের কুলপুরোহিত হবেন। এক্ষেত্রে শুক্লসুন্দর বহুবছর যাবৎ নিরুদ্দেশ থাকায় সেই পদ অলংকৃত করলেন কৃষ্ণসুন্দর।

ইংরেজ শাসনে তখন কলকাতা, বোম্বাই, লক্ষ্নৌ নাগরিক সাজে সেজে উঠলেও গ্রামবাংলার জীবন ছিল অনাড়ম্বর, শস্যশ্যামলা। গ্রামবাসীদের উপার্জনও যেমন অল্প ছিল, প্রয়োজনও ছিল পরিমিত। ছিল না উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা ‘আরো আরো চাই’—এমন উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন। জমিদারগৃহিণীই হোক কিংবা সাধারণ কৃষকপত্নী, প্রত্যেকেরই একটিমাত্র প্রার্থনা ছিল, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।’

হ্যাঁ, সাধারণ দুধভাতই। না পলান্ন, না পরমান্ন।

কৃষ্ণসুন্দরের পরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়। জমিদারবাড়ির তরফে কুলপুরোহিতের পাওনাগন্ডা বেশ ভালো। এছাড়া পৈতৃক আমল থেকেই বেশ কয়েকঘর উচ্চবিত্ত যজমান বাঁধা রয়েছে।

কৃষ্ণসুন্দর পণ্ডিত মানুষ। পৌরোহিত্য ছাড়াও মন্দিরের পুজোমণ্ডপে জমিদারবাড়ির তরফে খোলা চতুষ্পাঠীতে তিনি গ্রামের ছাত্রদের বিদ্যাদানও করতেন। কুলীন ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি একপত্নীক, স্ত্রীপরিবার নিয়ে ভালোমন্দয় কেটে যাচ্ছিল তাঁর সংসার।

ঠিক এইসময়েই এল বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো এক চাঞ্চল্যকর সংবাদ। জমিদারবাড়ির নায়েব সরকারমশাই প্রৌঢ়বয়সে নিজের ষোড়শী চতুর্থপক্ষকে নিয়ে তীর্থে গিয়েছিলেন নীলাচলধাম শ্রীক্ষেত্রে। সেখান থেকেই তিনি একটি রোমহর্ষক সংবাদ আনলেন। সংবাদটি অবিশ্বাস্য হলেও পাকা। নিরুদ্দিষ্ট শুক্লসুন্দর নাকি উড়িষ্যার জাজপুরের কাছে এক গ্রামে এক মুসলমান কন্যার পাণিগ্রহণ করেছে। এবং সেই যবন রমনীর গর্ভে তাঁর একটি কন্যাও জন্মেছে।

সরকারমশাই গড়গড়িয়ে সেই মেয়ের নামও বলে দিলেন। ভালোবাসা।

মেয়ের নাম এবং বাপের কীর্তি শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলেও জমিদার সূর্যনারায়ণ চৌধুরী অবশ্য প্রথমেই কোনো পদক্ষেপ নেননি। সংবাদের সত্যাসত্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তিনি উড়িষ্যায় বিশ্বস্ত লোক পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই লোকও ফিরে এসে নায়েবের পক্ষেই মত দিল।

প্রত্যক্ষ যবনদোষে দুষ্ট বংশের কাউকে দিয়ে মন্দিরের পৌরোহিত্য করানো তখনকার দিনে হত্যাসম অপরাধ। জমিদার সূর্যনারায়ণ কৃষ্ণসুন্দরকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে তিনি কৃষ্ণসুন্দরকে পৌরোহিত্যের বংশানুক্রমিক পদ থেকে চির অব্যাহতি দিলেন। ক্ষতিপূরণস্বরূপ সামান্য কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করলেন।

সঙ্গে বললেন, ‘আপনার টোলটি তো আর ঠাকুরমণ্ডপে চালানো যাবে না পণ্ডিতমশাই, পাঁচজনে পাঁচকথা কইবে। তার চেয়ে আমি নায়েবমশাইকে বলে ওটা আপনারই ভদ্রাসনের পাশে চালু করার ব্যবস্থা করছি। আপনি ওখানে নিরুপদ্রবে পড়াতে পারবেন পণ্ডিতমশাই!’

তা নিরুপদ্রবে কি কৃষ্ণসুন্দর ফাঁকা চাতালকে পড়াবেন? নাকি ভদ্রাসনের পাশ দিয়ে শুরু হওয়া বাঁশঝাড়ের বাঁশগুলোকে সংস্কৃতের পাঠ দেবেন? সূর্যনারায়ণ যতই চতুষ্পাঠীটি যত্নসহকারে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করুন, বিশ্বনাথ মন্দিরের পুরোহিত পদ থেকে অপসারণের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর টোলও যেন রাতারাতি ছাত্রশূন্য হয়ে পড়ল।

অভিভাবকেরা অবশ্য সরাসরি কিছু বললেন না। তবে এই ইংরেজ শাসনের যুগে সংস্কৃত বা ফার্সি শিখে কোন লাভ নেই, তার চেয়ে ইংরেজি শেখা ঢের ভালো, ছোটখাটো চাকরি ঠিক জুটে যাবে, কিংবা বেশি লেখাপড়া শিখে হবে কী, সেইতো জমিজিরেত দেখভাল করতে হবে, এইসব কারণ দেখিয়ে তাঁরা স্ব-স্ব পুত্রের চতুষ্পাঠীতে আসা বন্ধ করলেন।

কৃষ্ণসুন্দরের বেশ কিছু যজমান আশপাশের গ্রামে ছিল, তারাও আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে নিল।

কৃষ্ণসুন্দর পড়লেন মহা বিপদে। তাঁর সংসার আয়তনে বেশ বড়। স্ত্রী, পুত্র, দুই কন্যা ছাড়াও এক বিধবা বোন তাঁরই সঙ্গে বাস করে।

ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তি হিসেবে বেশ কয়েক বিঘা জমি কৃষ্ণসুন্দর পৈতৃক সূত্রে পেয়েছিলেন। গ্রামের বেশ কিছু বিজ্ঞ সমাজপতি সেইগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুললেও জমিদার সূর্যনারায়ণ চৌধুরী তাঁদের মন্ত্রণায় কর্ণপাত করলেন না। কৃষ্ণসুন্দর কিছু মুনিশকে দিয়ে সেই জমি চাষ করিয়ে কোনোমতে দিনাতিপাত করতে শুরু করলেন। জমিদারের অনুগ্রহে তাঁদের ধোপা নাপিতটুকু বন্ধ হয়নি। পত্নী ব্রহ্মময়ী লক্ষ্মীস্বরূপা গৃহিণী, মুখের হাসি অমলিন রেখে পরিবারের সবাইকে যত্ন করছিলেন।

কিন্তু ভাগ্য যদি বিরূপ হয়, অক্লান্ত সংগ্রামেও কিছু হয় না। বিপদ ক্ষুধার্ত শার্দূলের মতো বারে বারে হানা দেয়। চট্টোপাধ্যায় পরিবারেও তেমনটাই হল।

রামেন্দ্রসুন্দরের দশটি কন্যার মধ্যে তিনজন ছিল বাল্যবিধবা। অন্যরা শ্বশুরালয়ে থাকলেও তাদের মধ্যে একজন বাস করত কৃষ্ণসুন্দরের সঙ্গেই। তার নাম ভুবনমণি।

তখনকার দিনে কুলীন কন্যাদের জন্য পাত্র পাওয়া ছিল সমুদ্রে মুক্তান্বেষণের চেয়ে শক্ত ব্যাপার। যে মৃত্যুপথযাত্রী ব্রাহ্মণকে অন্তর্জলি যাত্রায় গঙ্গাতীরে পা দুটো নদীজলে ছুঁইয়ে রেখে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা হয়, গোচরে করা হয় হরিনামসংকীর্তন, গীতাপাঠ, তাঁর সঙ্গেও নিজের বালিকাকন্যার বিবাহ দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য ছোটাছুটি করতেন কুলীন ব্রাহ্মণরা। কারণ তো বহুলপ্রচারিত :

অষ্টবর্ষা ভবেদ গৌরী নববর্ষা তু রোহিণী

দশবর্ষা ভবেৎ কন্যা ঊর্ধ্বং রজঃস্বলা।

পরবর্তী পংক্তিগুলি আরো ভয়ঙ্কর। বারো বছর হয়ে গেলেও যে পিতা কন্যাদান করেননা, তাঁর পূর্বপুরুষরা প্রতি মাসে অমর্ত্যলোকে সেই কন্যার ঋতুকালীন রক্তপান করেন। অবিবাহিতা কন্যাকে রজঃস্বলা দেখলে বাবা মা ও বড় ভাই নরকে যান।

তাই মেয়েরা পেট থেকে বেরোতে না বেরোতে শুরু হত খোঁজাখুঁজি। বিবাহের কয়েকদণ্ড পরেই বিধবা হয় হোক, বিবাহ দিতেই হবে। আর এই পথ অনুসরণের ফলে তখন গ্রাম এবং শহরের ঘরে ঘরে বাস করত বাল্যবিধবারা।

বিদ্যাসাগর আইনি জোরে বিধবা বিবাহ সম্পর্কিত ১৫ আইন পাশ করালেও তা গ্রামবাংলায় বলতে গেলে ছিল কল্পনাতীত।

এক একাদশীর দিনে কৃষ্ণসুন্দরের বিধবা বোন ভুবনমণি উপবাস অন্তে গ্রাম সংলগ্ন দিঘীতে স্নানকার্যে গিয়েছিল। একেই গোটা দিন নিরম্বু উপবাস, তায় প্রবল গরম। ভুবনমণি ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরছিল।

ফেরার পথে আকস্মিক নির্জনতার সুযোগ নিয়ে দু’জন দুষ্কৃতি তাকে ঝোপের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করল। দুই পাপিষ্ঠই ভিনদেশী ও বিধর্মী। ভুবনমণির ওপর নির্মম অত্যাচার করে তাকে বিবস্ত্রা ও অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে তারা পালাল।

ইংরেজ শাসনে তখন কয়েকটি গ্রাম অন্তর থানাচৌকি থাকলেও লজ্জার খাতিরে আইনের দারস্থ হওয়া তো গেলই না, উল্টে এবার আর শুধু মশাট নয়, আশপাশের জনাই, বাকসা ইত্যাদি সমস্ত গ্রামের সমাজপতিরা এককাট্টা হয়ে কৃষ্ণসুন্দরকে সপরিবারে একঘরে করার কথা ঘোষণা করলেন।

জমিদার সূর্যনারায়ণ তাঁদের নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন এই বলে যে, এতে ভুবনমণি বা কৃষ্ণসুন্দরের দোষটা কী। কিন্তু জমিদারের চেয়ে ব্রাহ্মণচূড়ামণি সমাজপতিদের প্রতিপত্তি তখন অনেক বেশি।

মশাট গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্রাহ্মণ রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ মাঝপথেই জমিদারকে থামিয়ে দিলেন, ‘এ কী অসৈরণ কতা কইচেন জমিদারমশাই! আপনি মান্যিগণ্যি ব্যক্তি, আপনি যদি এমন কথা কন, তবে অন্যরা কী বলবে? কৃষ্ণসুন্দর অ্যাদ্দিন ধরে এ গাঁয়ে বাস করচে, সে জানে না জলদীঘির ওপাশটা দিনদুপুরে কেমন নির্জন থাকে? তার বোনকে সে ওখানে পাঠালে কেন? গাঁয়ে কি পুকুর কম আচে নাকি?’

সূর্যনারায়ণের পাশেই নতমস্তকে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষ্ণসুন্দর। বিধ্বস্ত, অপমানিত, ভগ্নহৃদয়। ভুবনমণির ওই সর্বনাশের পর যে কয়েকটি রাত্রি অতিবাহিত হয়েছে, তার সিংহভাগই কেটেছে গ্রামবাসীদের নানারকম সহানুভূতিপূর্ণ কথা শুনে, যেগুলো শোকের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে মাত্র। তিনি শান্তিকামী নরম মনের মানুষ। লেখাপড়া, পূজার্চনা ও অবসরে কাব্যচর্চা নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। এই চাপ তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে।

বাড়িতে এই কয়েকদিন ভুবনমণি সামান্য কিছু পর্যন্ত দাঁতে কাটেনি। তার সারা শরীরে অত্যাচার, বলাৎকারের ছাপ স্পষ্ট। কামড়ের ফলে গলায় তৈরি হয়েছে বীভৎস ঘা। হাতে পায়ে কপালে কালশিটে। গ্রামের মেয়েবউরা একে একে আসছে, কিন্তু তাদের কৌতূহলী প্রশ্নের বাণে সহানুভূতির চেয়েও বেশি রক্তাক্ত হতে হচ্ছে ভুবনমণিকে।

কৃষ্ণসুন্দর দাদা হিসেবে বোনের কষ্ট মনেপ্রাণে অনুভব করতে পারছেন। কিন্তু তিনিও অসহায়।

রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থের প্রশ্নের উত্তরে কৃষ্ণসুন্দর মুখ না তুলে চাপাস্বরে বললেন, ‘গাঁয়ের যে পুকুরে মেয়েবউরা স্নান করে, সেই পদ্মদীঘিতে তো আপনারাই আমার বাড়ির মেয়েদের যেতে বারণ করেছিলেন ন্যায়তীর্থমশাই।’

রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে গলা চড়িয়ে বলেন, ‘কচি খোকা সেজো না কৃষ্ণসুন্দর। পদ্মদীঘি গাঁয়ের সবচেয়ে পবিত্র পুকুর। আশ্বিন মাসে মায়ের স্নান হয় ওই পুকুরে। সেই জলে যবনদোষী বাড়ির মেয়েরা নামলে তা আর শুদ্ধ থাকবে? তোমার দাদা উড়িষ্যায় যে অপকম্মটি করেচেন, তারপর যে তোমায় এই গাঁয়ে থাকতে দেওয়া হয়েচে, এই ঢের জানবে। নেহাত তোমার বাবা সাত্ত্বিক মানুষ ছিলেন তাই।’

জমিদার সূর্যনারায়ণ চৌধুরী ব্যাগ্রভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু পণ্ডিতমশাই, ওঁর কন্যাদুটি তো নিষ্পাপ। তাদের কী দোষ? বড়টি তো দশে পড়ে গিয়েছে। অন্যটিরও নয়বছর হল। এরপরও গৌরীদান না করতে পারলে তো পাপ।’

‘দোষ তাদের নয় জমিদারমশাই, দোষ পরিবারের। আর সেই শাস্তি তাদের পেতে হবে এই তো জগতের নিয়ম। একে যবনদোষী বংশ, তায় আপন পিসি ভ্রষ্টা বিধবা। অনাচারের শেষ নেই।’ ন্যায়রত্নমশাই নাসারন্ধ্রে একটিপ নস্য চালালেন, ‘দেখুন কোনো শ্রোত্রিয় বা অগ্রদানী বামুন খুঁজে যদি পার করা যায়। বরপণ যা লাগবে, তার জন্য আপনি তো আছেনই।’

সূর্যনারায়ণ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললেন, ‘অপালা ও লোপামুদ্রা আমার কন্যাসমা। দুজনেই অতি সুশীল বালিকা, পড়াশোনাও শিখছে। তাদের এইভাবে নিচু কূলে বিবাহ দেওয়া কি ঠিক হবে?’

‘তবে এক কাজ করুন, আমার পরিচিত এক নৈকষ্য কুলীন পাত্র আছে। বাড়ি নদীয়ার ওদিকে। তাকে খবর দিই, এসে বিয়ে করে রেখে দিয়ে যাবে’খন।’

কৃষ্ণসুন্দরের নাসা উঠল। তিনি নিজে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, ভাটপাড়ায় প্রখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত পঞ্চানন বেদান্তবাগীশের কাছে পাঠ নিয়েছেন প্রায় দশবছর। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করেছেন প্রকৃত বৈদিক শাস্ত্রের সঙ্গে গ্রাম্য সমাজপতিদের নিজেদের মতো করে বানানো ‘শাস্তর’-এর অনেকাংশেই আকাশপাতাল পার্থক্য।

কিন্তু সে’কথা জনসমক্ষে বলতে গেলেই একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়।

রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ যে সুপাত্রর কথা বলছেন, সেই জাতীয় পাত্র কৌলীন্যপ্রথার রমরমার দৌলতে একেবারেই বিরল নয়। এঁরা জাতে কুলীন ব্রাহ্মণ, কিন্তু পূজার্চনা বা বিদ্যাদান কিছুই করেন না। এঁদের কাজ শুধুমাত্র বিয়ে করা। গোটা বঙ্গভূমি জুড়ে এঁদের শ্বশুরবাড়ি। পরনে পিরান, ধুতি। কাঁধে উড়নি। বুকের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে উপবীত। কানে কলম আর বাহুমূলে গোঁজা খেরোর খাতা। সেই খাতায় সারি সারি দিয়ে লেখা একের পর এক শ্বশুরমশাইয়ের নাম, গৃহ, ঠিকানা। গোটা বছরই তাঁরা পূর্ববঙ্গ থেকে রাঢ়প্রদেশ চষে বেড়ান ‘ভিজিট’ দেওয়ার জন্য। প্রতিটি শ্বশুরালয়ে বছরে একবার ‘ভিজিট’, জামাই আদর, নিত্যনতুন শয্যাসঙ্গিনী। কখনো কখনো কোনো শ্বশুরালয়ে এক রাত বেড়ে তিনরাত্রিও হয়, তবে তা শ্বশুরমহাশয়ের আর্থিক সঙ্গতি সাপেক্ষে।

‘ভিজিট’ শেষে স্ত্রী-সম্বন্ধীদের কৃতার্থ করে মোটা জামাইবিদায় ‘ফি’ নিয়ে খেরোর খাতায় চোখ বুলিয়ে পরবর্তী শ্বশুরগৃহের দিকে গমন। এই হল সেই বিবাহ বিশারদ কুলীনদের কাজ। যাদের সম্পর্কে খোদ বিদ্যাসাগর লিখেছেন, ‘গত দুর্ভিক্ষের সময় এক ভঙ্গকুলীন অনেকগুলি বিবাহ করেন। তিনি লোকের নিকট আস্ফালন করিয়াছিলেন, এই দুর্ভিক্ষে কত লোক অন্নাভাবে মারা পড়িয়াছে, কিন্তু আমি কিছু টের পাই নাই, বিবাহ করিয়া স্বচ্ছন্দে দিনপাত করিয়াছি।’

একটু হিসেবের কচকচি করলে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হয়। ১৮৭১ সনে কৃষ্ণসুন্দরের আবাস হুগলী জেলায় তেত্রিশ জন কুলীন ব্রাহ্মণ বিয়ে করেছেন ২১৫১টি মেয়েকে। অর্থাৎ গড়ে একেকজন বিবাহ বিশারদের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে পঁয়ষট্টিটি কন্যাকে।

কৃষ্ণসুন্দর পড়লেন ঘোর আতান্তরে।

তিনি হলেন সেই গোত্রের মানুষ, যারা স্রোতে একেবারে অন্ধ হয়ে গা ভাসিয়ে দেন না, আবার স্রোতের একেবারে বিপরীতে হাজার ঝড়ঝঞ্ঝার প্রতিকূলতায় সাঁতার কাটার মতো দুর্জয় সাহসও তাঁদের থাকে না। তবে এঁরা মনের অন্তরালে হলেও যুক্তির দাঁড়িপাল্লায় একবার যাচাই করে নেন সামাজিক অনুশাসনগুলো। হয়ত সোচ্চারে প্রতিবাদ করেন না, কিন্তু অন্তরে অন্তরে নিজের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন।

যে সময়কালে এঁরা জন্মেছেন, তখন স্ত্রীশিক্ষা বাংলায় শুরু হয়নি বলাটা অতিশয়োক্তি হবে। প্রায় চল্লিশ বছর আগে হইহল্লা করে ১৮৫১ সালে শুরু করা হয়েছে বিখ্যাত বেথুন স্কুল। ছাত্রী মাত্র একুশজন। বেথুনসাহেব শিশুকন্যাদের যাতায়াতের জন্য ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করে দিয়েছেন। বিদ্যাসাগর সেই গাড়িতে যত্ন করে লিখে দিয়েছেন ‘কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষণীরাতিযত্নতঃ!’

কী সুন্দর কথা। পুত্রের মতো কন্যাকেও সমান যত্ন করে পালন করবে। শিক্ষা দেবে।

কিন্তু বাস্তবের চিত্র বড়ই বিপরীতধর্মী। স্ত্রীশিক্ষা মানেই অকালবৈধব্য—এই কুসংস্কার অধিকাংশ মানুষের বুকে চেপে বসে রয়েছে। এমন কথাও বাতাসে অহরহ ভেসে বেড়ায়, মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে তাদের বক্ষ সমতল হয়ে যায়, স্তনে দুগ্ধসঞ্চার হয় না, পুত্রপ্রসবযোগিনী শক্তি হ্ৰাস পায়।

যে সমাজে ‘পুত্রর্থে ক্রিয়তে ভার্যা’, যে সমাজে অপুত্রকদের মৃত্যুর পর স্থান হয় পুন্নাম নরকে, সেই সমাজে এই ভয় বড় ভয় বটে।

কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও কৃষ্ণসুন্দর কুসংস্কারের দোহাই মানেননি। তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা অপালাকে তিনি পুত্র দিব্যসুন্দরের সঙ্গেই বসে পড়াশুনো শিখিয়েছেন। দুলে দুলে ব্রতকথা বা পাঁচালি পড়তে পারার জন্য নামমাত্র অক্ষরজ্ঞান নয়, রীতিমতো ব্যকরণ, ইতিহাস, ভূগোল, গণিত। অপালার স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। একবার শুনলেই সে হুবহু মুখস্থ বলতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, তার শেখার আগ্রহ অপরিসীম। তাই, কৃষ্ণসুন্দর নিজের জ্ঞান উজাড় করে দিয়েছেন তার কাছে। লোপামুদ্রাও পিছিয়ে নেই। তার যদিও আগ্রহ সঙ্গীতচর্চার দিকে, কৃষ্ণসুন্দর তাকেও সযত্নে বিদ্যাদান করে চলেছেন।

কিন্তু পেটের চাহিদার কাছে সবকিছুই ম্লান হয়ে যায়। ভুবনমণি ধর্ষিতা হওয়ার পর কৃষ্ণসুন্দরের দিনাতিপাত করা দুরূহ হয়ে উঠল।

আর এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিলেন পাশের বর্ধিষ্ণুগ্রাম জনাইয়ের পণ্ডিত ব্রাহ্মণ পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করলেন জমিদার সূর্যনারায়ণের নায়েব অখিলবন্ধু সরকার, যিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে শুক্লসুন্দরের যবন কন্যার পাণিগ্রহণের সংবাদ গোটা তল্লাটে চাউর করেছিলেন।

পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায় জনাইয়ের বিখ্যাত মুখুজ্জে জমিদারবাড়ির শরিক। মুখুজ্জেরা জনাইয়ের সাবেক ভূম্যধিকারী। তবে কিনা সেই অশ্বত্থসম বংশ নিজের ডালপালা বিস্তার করতে করতে এত শাখাপ্রশাখার সৃষ্টি করছে যে, আর্থিক সঙ্গতি থাকুক না থাকুক জনাইয়ের অর্ধেক ভদ্রাসনের গৃহস্বামীই এখন কোনো না কোনো দিক থেকে জনাইয়ের মুখুজ্জে। পাঁচকড়িও তেমনই। জমিদারবংশের একজন হিসেবে তাঁর যত না প্রতিপত্তি, তার চেয়ে ঢের বেশি প্রভাব প্রতিপত্তি হিন্দু রক্ষণশীল সমাজের একজন কেউকেটা হিসেবে।

স্ত্রীশিক্ষার স্বপক্ষে বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, মনোমোহন ঘোষরা যখন আন্দোলন শুরু করেছেন, তখন উল্টোদিকের দলটিও নেহাত কম ভারী ছিল না। বরং আকারে আয়তনে ওজনে তারা ছিল অনেকগুণ বেশি। পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায় হলেন সেই স্ত্রীশিক্ষাবিরোধী দলের একজন নেতাস্থানীয় ব্যক্তি। ঋকবেদ, যজুর্বেদে বলা লিঙ্গসাম্য বা নারীর সমানাধিকার নয়, এঁরা বিশ্বাস করতেন শুধুই বেদপরবর্তী মনুসংহিতায়।

বিশ্বাস করতেন, নারী নরকের দ্বার। তার না আছে বিদ্যালাভের অধিকার, না আছে স্বতন্ত্র জীবনযাপনের অধিকার। নারীর কর্তব্য একটাই। পুরুষের সেবা।

পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়ের একশো বিঘার ওপর জমি, তাতে বছরভর আলুর চাষ হয়। এছাড়াও এদিক-ওদিক ছড়ানো রয়েছে পঞ্চাশ বিঘার মতো ধানি জমি। হয় আখের চাষও। সঙ্গে রয়েছে বিরাট এক তালবাগানের ইজারা। দূর-দূরান্তরে বেশ কিছু সম্ভ্রান্ত বাঁধা যজমানও আছে তাঁর। সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত স্বচ্ছল। বিশ্বস্ত সব কর্মচারী থাকায় তাঁকে ওইসব বৈষয়িক ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগও দিতে হয় না, তিনি তাই নিশ্চিন্তে সমাজের কল্যাণসাধনে ব্রতী হতে পারেন। কথায় কথায় সংস্কৃত মন্ত্র আওড়ান আর সাধারণ মানুষের ওপর বিধান জারি করেন।

পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায় মশাট গ্রামের এই ধর্ষণের কথা শুনেই কালবিলম্ব না করে থেলো হুঁকা হাতে ছুটে এসেছিলেন জনাই থেকে। সঙ্গে তাঁর সারাক্ষণের খিদমদগার লালু। গ্রামের রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ, গোপেন্দ্রনাথ লাহিড়ির মতো কিছু মান্যগণ্য লোকের সঙ্গে দীর্ঘসময় বৈঠক সেরে তাঁরা এসে বসেছিলেন কৃষ্ণসুন্দরের ভদ্রাসনে।

ভুবনমণি তখন ঘরের ভেতরে শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক বেদনায় ক্লিষ্ট বিষাদপ্রতিমা। তাকে ঘিরে বসে আছে গ্রামের মেয়েবউদের দল। বাইরের দালানে কৃষ্ণসুন্দর বিবর্ণমুখে আলোচনা করছিলেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে।

পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায় বাড়িতে প্রবেশ করতেই কৃষ্ণসুন্দর শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে আসেন, ‘আসুন। আসুন মুখুজ্জেমশাই। অপালা মা, একখানা ভালো আসন নিয়ে আয়।’

পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায় ধীরেসুস্থে বসেন। গম্ভীর মুখে হুঁকায় একটা টান দেন। তারপর চারপাশটা পরখ করে নিয়ে পশমের আসনে বসে বলেন, ‘দুঃসংবাদটা শুনলাম ভায়া। তুমি আমার ছোটভাইয়ের মতো, তাই থাকতে না পেরে সাতসকালে হাঁপাতে হাঁপাতে এলুম। দিনকাল কী পড়েছে বলো দেখি, দিনেদুপুরে বামুনের বিধবাকে…ছি ছি! ওইসব নরাধমদের নরকেও স্থান হবে না।’

কিছু কথার কোনো প্রত্যুত্তর হয় না। কৃষ্ণসুন্দর বিবর্ণমুখে নির্বাক রইলেন।

‘তা সে বেটি আছে কেমন?’

কৃষ্ণসুন্দর এবার মৃদুস্বরে বললেন, ‘জ্ঞান ফিরেছে মুখুজ্জে মশাই। গায়ে হাতপায়ে অনেক বেদনা।’

‘আহা!’ বেদনাতুর মুখে মাথা দোলালেন পাঁচকড়ি, ‘ক’জনা ছিল?’

কৃষ্ণসুন্দর অধোবদনে জবাব দিলেন, ‘আজ্ঞে, দুজন তো ছিলই। পরে আর কেউ এসেছিল কিনা জানা যায়নি। ভুবন জঙ্গলের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল, কৈবর্তদের একজন দেখতে পেয়ে …!’

পাঁচকড়ি আড়চোখে ভেতরের দিকে তাকালেন। কৃষ্ণসুন্দরের এই বিধবা বোনটি নাকি বেশ সুন্দরী। খিদমদগার লালুর সাকরেদ আছে এগাঁয়ে, সে-ই বলেছে। উন্নত নাসা, আয়তনয়না, পাকা বিল্বফলের মতো স্তনযুগল। গীতগোবিন্দের রাধার মতো তন্বী ষোড়শী ভুবনমণিও পীনপয়োধরা।

যৌবন বিদায় নিয়েছে অনেককাল, প্রৌঢ়ত্বও এসে পৌঁছেছে মধ্যাহ্নে, তবু মুখুজ্জেমশাইয়ের জৈবিক কামনাবাসনার নিবৃত্তি যেন আর হয় না। পাঁচটি ধর্মপত্নী তো রয়েছেই, শোনা যায় কলকাতা শহরে রয়েছে আরো দুটো বাঁধা মেয়েমানুষ। স্ত্রীশিক্ষাবিরোধী আন্দোলন করতে শহরে গিয়ে ওই রাঁড়েদের ঘরেই তিনি রাত কাটান।

সিক্তবসনে হেঁটে চলেছে এক সদ্যতরুণী, তার তনুলতার প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে হাঁটার তালে তালে, কলসী থেকে জলবিন্দু চুঁইয়ে পড়ছে পদ্মের মতো পা বেয়ে। গাছের আড়াল থেকে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে লালসার হাত।

চারপাশের গহীন অরণ্যমধ্যে আদিম দৃশ্যটা কল্পনা করতে করতে পাঁচকড়ি মুখুজ্জের শরীর উজ্জীবিত হয়ে উঠল। মনে পড়ে গেল সেই পুরনো কাব্য,

‘ভালো ভালো স্ত্রীলোক যত ধইরা লইয়া জাএ।

আঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাএ।।

একজন ছাড়ে তারে আর জনা ধরে।

রমণের ভরে ত্রাহি শব্দ করে।’

যৌবনকাল থেকে এই পঙক্তি পড়ে কত রোমাঞ্চিত হয়েছেন, এখন হঠাৎই সেই দুই ধর্ষকের কামতৃপ্তির কথা ভেবে পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়ের জিহ্বা রসসিক্ত হয়ে উঠল।

‘হুম।’ বাস্তবে ফিরে তিনি গম্ভীরমুখে গড়গড়ায় লম্বা টান দিলেন, ‘খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা। সাধে কি শাস্ত্রে আছে ‘পথি নারী বিবর্জিতা’? আরে আমরা তো এই নিয়েই লড়াই করে চলেছি। ওই বিদ্যেসাগর আর তর্কালঙ্কার যতই গলা ফাটাক, মেয়েছেলেরা হল ‘আপনা মাসে হরিণা বৈরি’, হরিণের মতো নিজের রূপ যৌবনই হল গিয়ে মেয়েদের কাল। এ তো আর ফিরিঙ্গি মেমসায়েব নয়, যে কেলাবে গিয়ে ফুর্তি করবে, কোমর জড়িয়ে নাচবে? আমাদের হিঁদুঘরের মেয়েবউরা ঘোমটা দিয়ে ঘরে থাকবে, পুজোআচ্চা করবে, রান্না করবে, এই হল আমাদের সনাতন সংস্কৃতি। যাই বলো কৃষ্ণ, বোনকে অতদূরের পুকুরে যেতে দেওয়া তোমার অন্যায়ই হয়েছে।’

কৃষ্ণসুন্দর কোনো উত্তর দিলেন না।

রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ এতক্ষণ প্রস্তরবৎ দালানে বসে নিজের উপবীতটিকে পাকাচ্ছিলেন। এবার উৎসাহিত হয়ে নিজের দেড়বিঘত লম্বা ব্রহ্মশিখাটি দুলিয়ে বললেন, ‘আমিও সেইটেই বলছিলুম মুখুজ্জে মশাই। কেষ্টর তো সব গেল। একে তো বাড়ির বড়ছেলে ম্লেচ্ছ বিয়ে করে কুলটাকে ডোবাল, তারপর এখন এতবড় অনাচার।’

গোপেন্দ্রনাথ লাহিড়িও সায় দিয়ে বললেন, ‘অনাচার বলে অনাচার? গীতায় শ্রীকৃষ্ণ তো বলেই গিয়েছেন, স্ত্রীষু দুষ্টাষু হলে বর্ণসঙ্কর জন্মায়। আর এখানে তো দুজন ম্লেচ্ছ মিলে…রামো রামো! গর্ভ হয়ে গেলে তো কেলেঙ্কারি।’

কৃষ্ণসুন্দরের পত্নী ব্রহ্মময়ী অনেকক্ষণ ধরে দরজার আড়াল থেকে শুনছিলেন, এবার তিনি আধহাত ঘোমটা টেনে দালানে বেরিয়ে এলেন।

তাঁর হাতে বড় রেকাবিতে মুড়ি আর ঘরে পাকানো নারকেল নাড়ু।

মান্যগণ্যদের সামনে সেই রেকাবি নিচু হয়ে রাখতে রাখতে তিনি নীচুস্বরে বললেন, ‘যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। ঠাকুরঝি’র তো কোনো দোষ নেই। এবার কী প্রয়াশ্চিত্তির করলে দোষ কাটবে সেটা বলুন ঠাকুরমশাই। এসব নিয়ে নাড়াঘাটা হলে আরো কষ্ট হয়।’

পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায় এতক্ষণ বেশ বুক ফুলিয়ে কথা বলছিলেন, আকস্মিক গম্ভীর হয়ে গেলেন। গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের মাঝে নির্বোধ স্ত্রীলোকের হস্তক্ষেপ তিনি মোটে পছন্দ করেন না। কৃষ্ণসুন্দরকে দেখলেই বোঝা যায় ব্যাটা স্ত্রৈণ, তাই ওর পরিবার জনসমক্ষে কথা বলার স্পর্ধা দেখাচ্ছে।

যতসব বাচালতা। এইবয়সে এসে কি মেয়েমানুষের বুদ্ধি নিতে হবে নাকি?

কিন্তু মুখে বললেন, ‘কার দোষ আছে আর কার নেই, তা বিচার করার আমরা কেউ নই বউমা। খোদ মনু বলে গিয়েছেন নারীদের থেকে সতর্ক থাকতে। স্বভাব এষ নারীণাং নরাণামিহ দূষণম। পুরুষদের দূষিত করাই নারীদের স্বভাব। তাই দোষগুণ বিচার করে লাভ নেই, শাস্ত্রে বলাৎকৃতা নারীর যা প্রায়শ্চিত্তের বিধান আছে, তাই করতে হবে।’

কৃষ্ণসুন্দর শশব্যস্তে করজোড়ে বলেন, ‘কী সেই প্রায়শ্চিত্ত মুখুজ্জেমশাই? আদেশ করুন। আমি শিরোধার্যে তা পালন করব।’

পাঁচকড়ি মুখুজ্জে হুঁকায় টান দিয়ে গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ মৌনব্রত পালন করেন। তারপর গোপেন্দ্রনাথ লাহিড়ীর সঙ্গে নীচুগলায় কিছু আলোচনা করতে থাকেন। গোপেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বৈষয়িক সম্পর্কও রয়েছে। মুখুজ্জেমশাইয়ের চাষের জমিতে যে সারের প্রয়োজন হয়, তা সরবরাহ করেন গোপী লাহিড়ি। তাঁর সেই ব্যবসাও দিনদিন ফুলে ফেঁপে উঠছে।

প্রায় অর্ধেক দণ্ড এভাবে চলার পর গোপী লাহিড়ী সোজা হয়ে বসেন। সামান্য গলা পরিষ্কার করে বলেন, ‘দ্যাখো কেষ্ট, মুখুজ্জেমশাই নিজের গরজে এতদূর ছুটে এসেচেন শুধুমাত্র তোমায় পাপের হাত থেকে বাঁচাতে। উনি মহাপণ্ডিত, শাস্ত্র ওঁর হাতের মুঠোয়। ভুবনমণিকে ত্যাগ করার হাত থেকে উনিই তোমাকে বাঁচাতে পারেন। নাহলে এই সোমত্থ মেয়েকে ত্যাগ করলে শ্যালকুকুরে ছিঁড়ে খাবে সে তো বুঝতেই পারছ। শেষমেশ এহাত ওহাত ঘুরে শহরে গিয়ে লাইনে নাম লেখাবে।’

কৃষ্ণসুন্দর এবার মৃদু আপত্তি তুললেন, ‘কিন্তু পণ্ডিতমশাই, আমি তো ছেলেদের কিছুদিন আগে পর্যন্তও শাস্ত্রশিক্ষা দিয়েছি। যতদূর জানি, বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে, নারী ধর্ষিতা বা দস্যুগৃহীতা হলেও স্বামী তাকে ত্যাগ করতে পারে না। আপস্তম্ব ধর্মসূত্রতেও তেমনটাই লেখা আছে।’

‘বটে? তুমি যখন এতই জানো, তখন বলো, ঋষি গৌতম শুধুমাত্র সন্দেহের বশে স্ত্রীকে ত্যাগ করেছিলেন কেন?’ পাঁচকড়ি মুখুজ্জের গৌরবর্ণ মুখ আকস্মিক রক্তাভ হয়ে উঠল।

কৃষ্ণসুন্দর কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই ধমকে উঠলেন রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ, ‘থামো হে কৃষ্ণসুন্দর! সধবা বা কুমারীর প্রায়শ্চিত্ত আলাদা আর হিঁদুঘরের বিধবার আলাদা। দু’পাতা পড়ে আর ছাত্তর ঠেঙিয়ে তুমি কি মহাপণ্ডিত হয়েছ নাকি যে মুখুজ্জেমশাইয়ের মুখে মুখে তক্কো করছ? আর স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্রও স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছিলেন সতীত্বনাশের সন্দেহেই। তুমি কি সেটাকেও শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলতে চাও?’

‘না না আমি তর্ক করিনি।’ স্বভাবজাত নম্রতায় কৃষ্ণসুন্দর কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। শ্রীরামচন্দ্র আদর্শ চরিত্র। তাঁর কোনো আচরণ শাস্ত্রবিরোধী কী করে হবে। যুক্তকর গরুড়ের মতো তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন।

‘তবে মুখ বুজে চুপ করে শোনো মুখুজ্জেমশাই কী বিধান দেন।’ গোপী লাহিড়ী আঙুল উঁচিয়ে বললেন।

পাঁচকড়ি মুখুজ্জে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘বলাৎকৃতা নারীকে কঠোর প্রায়শ্চিত্ত তো করতেই হবে। এক্ষেত্রে আবার ধর্ষণ করেছে দুই বিধর্মী। ধর্ষিতা ব্রাহ্মণী হলেও ম্লেচ্ছের ঔরসধারণে সে নিজেও এখন ম্লেচ্ছতে অধঃপতিত হয়েছে। তাই কোনো সদ্বংশজাত ব্রাহ্মণ যদি তার সেবা দুইপক্ষকাল গ্রহণ করতে সম্মত হন, তবেই সে স্বকূলে আবার ঠাই পাবে।’

কৃষ্ণসুন্দর মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারলেন না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন।

পাঁচকড়ি মুখুজ্জে নিজেই স্ববক্তব্যকে প্রাঞ্জল করতে উদ্যোগী হলেন, ‘আহা বুঝলে না? তোমার ভগ্নীর সেবা দুইপক্ষকাল কোনো উপযুক্ত ব্রাহ্মণ গ্রহণ করতে স্বীকৃত হতে হবে। তবেই সেই দ্বিজের পবিত্রতায় তোমার ভগ্নীর অশুচিতা কাটবে। অত্রিসংহিতা নিশ্চয়ই পড়েছ, ধর্ষিতা নারীকে একমাস পর থেকেই শুচি জ্ঞান করা যায়। ভুবনমণি একমাস পরেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। বুঝলে?’

‘আজ্ঞে!’ বিহ্বলচোখে কৃষ্ণসুন্দর বলেন, ‘সে আর এমনকী ব্যাপার? এই তো লাহিড়ীমশাই রয়েছেন, তাঁর গৃহে গিয়ে নাহয় ভুবনমণি একমাস পিতৃজ্ঞানে পদসেবা করে আসবে? তবেই তো হবে?’

পাঁচকড়ি মুখুজ্জের মুখের অভিব্যক্তি তৎক্ষণাৎ বদলে যায়। বিরক্তিতে তিনি হুঁকায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর খিদমদগার লালু রোষকষায়িত নয়নে তাকায় কৃষ্ণসুন্দরের দিকে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মুহূর্তের মধ্যে আসরে নামেন গোপী লাহিড়ী, ‘আহ, বোকার মতো কথা কয়ো না কেষ্ট। এ সেবা সে সেবা নয়। মুখুজ্জেমশাইয়ের কথা ভালো করে বুঝতে চেষ্টা করো। ম্লেচ্ছের ঔরসে দূষিত দেহকে শুদ্ধ করতে হবে ব্রাহ্মণ ঔরসে। শ্রীরাধা যেমন কৃষ্ণকে নিজের দেহমন দিয়ে সেবা করেছিলেন, এই সেবা সেই সেবা।’

কৃষ্ণসুন্দরের সামনে হঠাৎই পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বজ্রাহত হয়ে তিনি ভেতরের দিকে তাকান। দেখতে পাওয়া না গেলেও দরজার পাশে দণ্ডায়মান নিশ্চুপ ব্রহ্মময়ীর অস্তিত্ব তিনি অনুভব করেন।

একি অন্যায্য কথা! একবার ধর্ষিতা হওয়ার জন্য ভুবনমণিকে একমাস ধরে ধর্ষিতা হতে হবে? কী প্রচণ্ড অন্যায়! কোন শাস্ত্রে লেখা আছে একথা?

কৃষ্ণসুন্দর হলফ করে বলতে পারেন, এহেন কোথাও লেখা থাকতে পারে না। এ অসম্ভব।

পাঁচকড়ি মুখুজ্জে ঘাড় দুলিয়ে বললেন, ‘তবে মনে হয় না কোনো উপযুক্ত ব্রাহ্মণ সম্মত হবে। কারণ ম্লেচ্ছদ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার ফলে ভুবনমণি এখন নিজেও ম্লেচ্ছ। আর মনুর বিধান তো এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট,

শূদ্রাং শয়নমারোপ্য ব্রাহ্মণো যাত্যধোগতিম।

জনয়িত্বা সুতং তস্যাং ব্রাহ্মণ্যাদেব হীয়তে।।

শূদ্র কিংবা ম্লেচ্ছগমন করলে ব্রাহ্মণের অধোগতি হয়। সন্তান উৎপাদন হলে ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণত্বও নষ্ট হয়। তাই যেচে কে ভুবনমণির সেবা নিতে চাইবেন? তবে হ্যাঁ , একান্তই যদি মহৎ কোন ব্রাহ্মণ হন, সেক্ষেত্রে তাঁর অধোগমন হয় না। তেমন কাউকে পাওয়া গেলে তোমার পরম সৌভাগ্য বলে ধরতে হবে।’

‘তেমন কে আছে এ গাঁয়ে?’ গোপী লাহিড়ি দুই হাতে এক বিচিত্র মুদ্রা প্রদর্শন করে কথাটা বাতাসে ভাসিয়ে দিলেন।

‘তা তোমরা দ্যাখো। এ গ্রামে না থাকলে আশপাশের গ্রামে সন্ধান করো। তবে বেশি বিলম্ব কোরো না। আজ তো তিনদিন হয়েই গেল, প্রায়শ্চিত্ত ধর্ষণের পঞ্চরাত্রির মধ্যে শুরু করতে না পারলে সব আয়োজনই বৃথা। সেক্ষেত্রে কৃষ্ণসুন্দরের বোনকে পরিত্যাগ করা ছাড়া কোনো উপায় তো থাকবেই না, সমাজচ্যুতও হতে হবে।’ পাঁচকড়ি মুখুজ্জে আর কথা না বাড়িয়ে গাত্রোত্থান করলেন।

‘মুখুজ্জেমশাইয়ের জয় হোক! কেমন সুন্দর একটি প্রায়শ্চিত্তের রাস্তা বাতলে দিয়ে গেলেন।’ উৎফুল্ল চোখে কপালে জোড়হাত ঠেকালেন রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ, ‘কেষ্ট, মুখুজ্জেমশাইকে পেন্নাম করো। তোমাকে একঘরে করার থেকে বাঁচিয়ে দিলেন! পরকালের রাস্তাও পরিষ্কার হয়ে গেল।’

কৃষ্ণসুন্দর নড়লেন না, প্রস্তরবৎ বসে রইলেন।

লালু পাঁচকড়ি মুখুজ্জের হাতের থেলো হুঁকাটি টেনে নিয়ে প্রভুকে পথ দেখাতে দেখাতে এগিয়ে চলল।

সদলবলে সমাজপতির দল প্রস্থান করলে ব্রহ্মময়ী দ্রুতগতিতে দালানে বেরিয়ে এলেন। ক্রোধে তাঁর মুখ টকটক করছে।

ননদিনী ভুবনমণি তাঁর কন্যাসমা। বিয়ে হয়ে তিনি যখন এই শ্বশুরগৃহে এসেছিলেন, তখন ভুবনমণি মাত্র পাঁচ বছরের বালিকা। আট বছরে তার বিয়ে হল, বছর না পুরতেই শাঁখাসিঁদুর মুছে সাদা থান পরল। ব্রহ্মময়ীর শাশুড়িমাতা আগেই চোখ বুজেছিলেন। তারপর থেকে ব্রহ্মময়ী সন্তানস্নেহে ননদিনীকে লালন করেছেন। ওইটুকু একরত্তি মেয়ের একাদশীর দিন তিনি নিজেও মুখে নামমাত্র মাছ ছুঁইয়ে উপবাসে থেকেছেন।

আর আজ মেয়েটার ওপর এত বড় অত্যাচারে এমনিতেই কষ্টে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছে, তার ওপর এইসব কথায় তিনি কিছুতেই আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না।

ব্রহ্মময়ী তেজোদৃপ্ত রমণী, স্বামীর মতো শান্তশিষ্ট নন। তিনি অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে, তাঁর বাবা ছিলেন নদীয়াধিপতি কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের স্নেহধন্য ব্রাহ্মণ পুরোহিত। ধনী পরিবার। কৃষ্ণসুন্দরের পিতা রামেন্দ্রসুন্দর ছিলেন ওঁদের পালটি ঘর। বংশকৌলীন্য, সর্বোপরি পাত্রের পাণ্ডিত্যে আকৃষ্ট হয়ে কন্যাকে এই ঘরে দিয়েছিলেন।

কালের দুর্বিপাকে কৃষ্ণসুন্দরের অবস্থার অবনতি হলেও ব্রহ্মময়ীর ব্যক্তিত্ব একইরকম অবিচল রয়েছে। তিনি অক্ষরজ্ঞানহীন, কিন্তু তাঁর সাংসারিক বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা অনেক শিক্ষিত মানুষকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন, মনটাও এখনো তাঁর তেমনই বড়।

তিনি বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে গা? তুমি কিছু প্রতিবাদ করলে না?’

‘প্রতিবাদ করে কী করব?’ ভগ্নকণ্ঠে বললেন কৃষ্ণসুন্দর, ‘জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ বাতুলতা। তাছাড়া আমার এখন আছেই বা কি! ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার!’

‘আর কিছু না থাকুক, মান আছে।’ দৃঢ়কণ্ঠে জানালেন ব্রহ্মময়ী, ‘ঠাকুরঝি’র ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে, এরপর কোথায় তুমি ভালো কোবরেজ ডেকে আনবে, তা না, এঁরা শাস্তর আউড়ে গেলেন।’

‘শাস্ত্রের কথা না মানলে তো শুনলে কী হবে।’ কৃষ্ণসুন্দর বললেন, ‘সমাজচ্যুত হওয়ার ভয় আমি করি না। নিজের যেটুকু জমি আছে, চাষ করিয়ে ঠিক চালিয়ে নিতে পারব। তুমিও পারবে সে বিশ্বাস আমার আছে। ধোপা-নাপিতও নাহয় লাগবে না। কিন্তু মেয়েদুটোর বিয়ে দেব কী করে? একেই দাদার জন্য ভালো কোনো কুল জুটবে না, তার ওপর এখন এখানেই ব্যাপারটা ধামাচাপা না দিলে কোনো পাত্রই পাব না।’

‘না পেলে না পাব। তাই বলে জেনেশুনে ঠাকুরঝির এত বড় সর্বনাশ আমি করতে পারব না। তুমি বুঝতে পারলে না, ওই জনাই থেকে আসা বুড়ো মিনসে’র নজর পড়েছে ঠাকুরঝি’র ওপর? তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, এখনো নোলা যায়নি। এই তালে উনি একটা মাস ভুবনকে ভোগ করবেন।’ ব্রহ্মময়ী গনগনে স্বরে বললেন, ‘ঝাঁটা মারি অমন শাস্ত্রকারের মুখে।’

‘আস্তে। আস্তে বলো। দেওয়ালেরও কান আছে। মুখুজ্জেমশাইয়ের বিরাট লম্বা হাত। কোত্থেকে কে শুনে ফেলবে, রাতারাতি আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হতে হবে। জমিদারমশাইও তখন কিছু করতে পারবেন না।’ সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন কৃষ্ণসুন্দর, ‘আর মেয়েদের পাত্র না পেলে না পাবে মানে? অপালার বারোর মধ্যে বিয়ে দিতে না পারলে বুঝতে পারছ কী অনর্থ বাধবে?’

‘তুমি যাদের নামে মেয়েদের ঘটা করে নাম রেখেছ, তাঁদের আদর্শ করছ না কেন?’ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন ব্রহ্মময়ী।

কৃষ্ণসুন্দর বললেন, ‘তাঁদের আদর্শ মানি বলেই তো অপালাকে পড়াশুনো শেখাচ্ছি ব্রহ্মময়ী। আমার স্বপ্ন একদিন ও বিদুষী হয়ে উঠবে। বিদ্যাদান করবে ছোট ছোট শিশুদের। তাই তো কোনো মুক্তমনা পরিবারে ওকে দিতে চাই।’

‘তবে আবার কি। তুমি নিজেই আমাকে বলেছ, বৈদিক যুগে নারী-ঋষিরা অনেকেই অবিবাহিতা থাকতেন। কই, তাতে কিছু অনর্থ হয়েছে কি?’

‘সেই যুগ আর নেই ব্রহ্মময়ী।’ করুণ চোখে ম্লান হাসেন কৃষ্ণসুন্দর, ‘সেই যুগ ছিল শ্রুতির যুগ। সেই সময় নারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে। তাঁরা বেদ অধ্যয়ন করতেন, অধ্যাপনা করতেন। তখনো তাঁদের কোনো সম্পত্তি মনে করা হত না। তখন স্ত্রী প্রকৃত অর্থেই ছিল স্বামীর সহধর্মিণী, এখনকার মতো শুধু শয্যাসঙ্গিনী নয়। কিন্তু এখন সে যুগ আর নেই। পণ্ডিতদের স্বঘোষিত নিদান, মুসলমান শাসন আর পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ক্রমেই মেয়েদের ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে জড়পুত্তলি করে দিয়েছে। এসেছে মনুসংহিতার যুগ।

বাল্যে পিতুর্বশে তিষ্ঠেৎ পাণিগ্রাহস্য যৌবনে।

পুত্রাণাং ভর্তরি প্রেতে ন ভজেৎ স্ত্রী স্বতন্ত্রতাম।।

বাল্যকালে নারী পিতার অধীন থাকবে, বিবাহের পর সে স্বামীর অধীনে থাকবে এবং স্বামীর মৃত্যুর পর পুত্রের অধীনে থাকবে। নারী কখনও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে না। এই অবস্থায় তুমি কী করে নিজের মেয়েদের আইবুড়ো থাকার কথা বলছ?’

স্বামী-স্ত্রীর আলাপ আলোচনার মাঝেই আবার বাড়িতে ফিরে এলেন গোপী লাহিড়ী।

ব্রহ্মময়ীর অনুধাবন নির্ভুল। গোপী লাহিড়ী বললেন, ‘কেষ্ট, এমন সুযোগ কপালগুণে মেলে। মুখুজ্জেমশাই নিজে অনেক পীড়াপীড়িতে ভুবনমণিকে এই পাঁক থেকে উদ্ধার করতে রাজি হয়েছেন। তুমি আর দু’বার ভেবো না। অমন উঁচুদরের বামুন আশপাশের গাঁয়ে হাজার খুঁজেও পাবে না। আজকের দিনটা কেটে যাক, বেশি জানাজানি করার দরকারী নেই, কাল সন্ধে থেকে মুখুজ্জেমশাইয়ের পালকি এসে রোজ উঠোনে দাঁড়াবে, বোনকে পাঠিয়ে দিও। নেহাত তোমার ভালো চাই, তাই গেঁটে বাত নিয়ে এতটা ঠেঙিয়ে আবার বলতে এলুম।’

কৃষ্ণসুন্দর কোনো উত্তর দিলেন না।

গোপী লাহিড়ী চাপাস্বরে আবার বললেন, ‘আর যদি না পাঠাও, বুঝতেই পারছ কী হবে। নিজের মেয়েদুটো আছে, সেই কথা ভেবো। আপনি বাঁচলে বোনের নাম।’

গোপী লাহিড়ীর প্রস্থানের পর কৃষ্ণসুন্দর একাকী বসে রইলেন। বেলা গড়িয়েছে অনেক, এখনো তাঁর স্নান পর্যন্ত হয়নি। কিন্তু তাতে তাঁর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। গোপী লাহিড়ীর দন্তপাটি বিকশিত করে বলা প্রস্তাব শোনা ইস্তক তাঁর ব্রহ্মতালু জ্বলছে।

কিন্তু ওই তাঁর এক বদস্বভাব, বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না।

ষাটোর্ধ্ব পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়ের পাঁচটি পত্নী, শোনা যায় সর্বকনিষ্ঠাটি মাত্র চতুর্দশবর্ষীয়া, তার পাণিগ্রহণ করেছেন এখনো একবছর অতিক্রান্ত হয়নি। একজন শিক্ষিত মানুষের কামবোধ এইবয়সেও এত প্রবল হয় কী করে?

প্রকৃত শিক্ষিত আর পুঁথি পড়ে পণ্ডিত হওয়া সম্ভবত এক বিষয় নয়।

গোপী লাহিড়ী চলে গেলেও কৃষ্ণসুন্দর আর ঘরে ঢুকলেন না, তাঁর আগমন টের পেলেই ভুবনমণি দাদার কাছে নিদারুণ লজ্জা পাবে। ওই বেদনাতুর শরীরেও তখন প্রাণপণে নিজের মুখ ঢাকার চেষ্টা চালাবে।

এমনিতে ওর শিয়রে সর্বক্ষণ কৃষ্ণসুন্দরের দুই কন্যা আর পুত্র বসে রয়েছে। তাদের বোঝার বয়স হয়নি যে পিসিমা’র কী হয়েছে। কিন্তু বড়দের চিন্তা, উদ্বেগ থেকে শিশুরাও অনেক কিছু বুঝতে পারে। ভুবনপিসিমা’র সঙ্গে যে কেউ খুব খারাপ কোনো কাজ করেছে, তা তারা উপলব্ধি করেছে। শিশুপুত্র দিব্যসুন্দর অদৃশ্য সেই শত্রুকে কল্পনা করে বারকয়েক নিজের বাঁশের ধনুক থেকে তির ছুড়ে পিসিমাকে সান্ত্বনা দেওয়ারও প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

কৃষ্ণসুন্দর বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে কিছুক্ষণ ইতস্তত পদচারণা করলেন, কোথায় যাবেন ভেবে পেলেন না। এখন পরিচিত মানুষের সঙ্গে বাক্যালাপ মানেই ভুবনমণিকে নিয়ে আলোচনা, সহানুভূতি, একরাশ কৌতূহল। আর এইসব ভালো লাগছে না কৃষ্ণসুন্দরের। তার চেয়ে নিভৃতে কিছুক্ষণ কাটানো শ্রেয়।

কৃষ্ণসুন্দর গ্রামের বাইরের দিকে কৌশিকী নদীর তীর ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। নদী অবশ্য নামেই, হাঁটুজলও নেই, কোনোমতে গোড়ালিটুকু ভেজে। ভরদুপুর, সূর্যদেব মাথার ওপর গনগন করছেন, এদিকটা জনসমাগম নেই বললেই চলে। প্রায় ক্রোশদেড়েক হেঁটে বিশ্বনাথতলা। বিশ্বনাথতলা থেকে উত্তরদিক বরাবর সোজা হেঁটে গেলে পড়বে বাবা পঞ্চাননের মন্দির। অন্যমনস্ক কৃষ্ণসুন্দর সেদিকেই যাবার মনস্থ করেছিলেন, কিন্তু হঠাৎ তাঁর চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল অপরিচিত এক কণ্ঠস্বরে।

‘পেন্নাম হই ঠাউরমশাই!’

কৃষ্ণসুন্দর তাকিয়ে দেখলেন মোটাসোটা গড়নের বেঁটে একজন মধ্যবয়স্ক লোক। গাত্রবর্ণ কৃষ্ণাভ। পরনে খেটো ধুতি আর ফতুয়া। কোমরে আটকানো গেঁজে। কৃষ্ণসুন্দরের দিকে উদ্দেশ্য করে করজোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

‘জয়তু।’ ডান হাত আশীর্বাদের ভঙ্গিতে সামান্য তুললেন কৃষ্ণসুন্দর, ‘ঠিক চিনতে পারলাম না তো। থাকা হয় কি এই গাঁয়েই?’

‘আজ্ঞে না ঠাউরমশাই!’ লোকটা কান এঁটো করা হাসল, ‘চিনবেন কী করে। এই পেত্থমবার এয়েচি এগাঁয়ে। থাকি কলকেতায়।’

‘অ!’ কৃষ্ণসুন্দর আর বাক্যব্যয় না করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু লোকটা আবার বলল, ‘আপনার কতা অনেক শুনেচি ঠাউরমশাই। তবে চোখের দ্যাকা এই দেকলুম। আহা! এক্কেরে সাত্থকনামা, সাক্ষাৎ কেষ্টঠাউর যেন! সেই চোক, সেই নাক, সেই চ্যাহারা।’

কৃষ্ণসুন্দর ভ্রূকুঞ্চিত করে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘আমার কথা শুনেছ? কীভাবে?’

হরিহর ধুরন্ধর লোক। নবকিশোর দত্তর সবচেয়ে সরেস সাব-এজেন্ট সে। নিন্দুকেরা বলে, সাতঘাটের এঁটো হওয়া বেবুশ্যেকেও সে সতীসাধ্বী হিন্দু কূলবধূ বলে অবলীলায় বেচে দিয়েছে কতবার। সেখানে কৃষ্ণসুন্দরের মতো সহজসরল আতান্তরে পড়া ব্রাহ্মণকে নিজের জালে ফেলা তার কাছে নেহাতই ‘জলবৎ তরলম’।

বনমালিপুর, আউশবালি, শোলহরিপুর পেরিয়ে হরিহর মশাট গ্রামে পা দিয়েছে চারদিন হল। আগেও হুগলীর এইসব গ্রাম থেকে সে বেশ ভালো লাভ করেছে। তাই এবারেও বেশ সময় নিয়ে এইসব অঞ্চলে চষে বেড়াচ্ছে।

গতকাল সন্ধেবেলা যখন সে গ্রামের হাটতলায় অশ্বত্থগাছের তলায় বসেছিল, তখনই কানে এসেছিল ঘটনাটা। কুলীন ঘরের বিধবাকে বলপূর্বক ধর্ষণের মতো রগরগে সংবাদে তখন মুখরিত ছিল গোটা গাছতলা। সেসব শুনতে শুনতে কৃষ্ণসুন্দরের জীবনের সাম্প্রতিক দুর্যোগের সবই একে একে কানে এসেছিল তার। আর তখনই ঠিক করেছিল, সপরিবার এই বামুনকে বঁড়শিতে গাঁথতেই হবে।

তবে আজ এইভাবে এই জনবিরল স্থানে দেখা হওয়াটা নেহাতই কপালজোর।

হরিহর কিছুক্ষণ বিনয়ের অবতাররূপে কৃষ্ণসুন্দরের দুঃখে সমব্যথী হল। এইভাবে একটা পরিবারকে যেভাবে সমাজপতিরা এক হয়ে শেষ করতে উঠেপড়ে লেগেছে, তার যে একটা কঠোর বিহিত হওয়া প্রয়োজন, তা বারবার বলল।

কৃষ্ণসুন্দর আপনভোলা, লেখাপড়া নিয়ে থাকা মানুষ। মনের দুঃখ কারুর সঙ্গে ভাগ করলেও তো বুকের ওজন একটু কমে। কথোপকথন চলতে চলতে কৃষ্ণসুন্দর বসে পড়লেন গাছতলার বেদীতে। হরিহরও উবু হয়ে বসল তাঁর ঠিক পায়ের কাছে।

বেশ কয়েকদণ্ড পর হরিহর কৃষ্ণসুন্দরের পদধূলি নিয়ে মাথায় স্পর্শ করে বলল, ‘যদি অভয় দেন ঠাউরমশাই, ছোটমুখে একখান বড় কতা কই।’

কৃষ্ণসুন্দর তখন বোনের কষ্টের কথায় বিভোর। জনাইয়ের পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়ের লালসা থেকে কীভাবে ভুবনমণিকে রক্ষা করবেন, তাই নিয়ে চিন্তান্বিত। হরিহরের কথায় বলেন, ‘কী বলবে বলো?’

হরিহর একটু থামে। ফতুয়ার আড়ালে কোমরের গেঁজে থেকে বের করে আনে দশটা চকচকে ধাতবমুদ্রা। সেগুলো যত্নভরে রাখে বেদীর ওপরে। মুখে বলে, ‘এগুলো গ্রহণ করুন ঠাউরমশাই।’

কৃষ্ণসুন্দর চমকে ওঠেন। গ্রামের সাধারণ ব্রাহ্মণ হলেও রৌপ্যমুদ্রা চিনতে তাঁর ভুল হয় না। বলেন, ‘একি! এসব কেন?’

‘ভাববেন না আপনাকে দয়া করচি ঠাউরমশাই!’ হরিহর বলে, ‘সে আস্পদ্দা আমার নেই। ধরে নিন এটা আগাম।’

‘কীসের আগাম?’ কৃষ্ণসুন্দর হকচকিয়ে গিয়েছেন। এই প্রখর রৌদ্রতাতে গ্রামের সীমানায় বসে সদ্যপরিচিত এই বিদেশীর কথা তাঁর কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে।

হরিহর বলে, ‘আপনি সপরিবার এই গ্রাম থেকে চলুন ঠাউরমশাই। পুজোপাব্বনেরই কাজ, কিন্তু সরকারের তরফে। মাস মাইনে দশ টাকা। ছুটিছাটাও থাকবে। তারপর ইচ্ছে হলে ফিরে আসবেন’খন দেশে। বাপঠাকুরদার ভিটে তো পড়ে রইলই।’

‘কিন্তু যাবটা কোথায়?’ বিমূঢ় কৃষ্ণসুন্দর প্রশ্ন করলেন, ‘কলকাতায়? কোনো বড়বাড়ির মন্দিরে ব্রাহ্মণপুরোহিতের পদ ফাঁকা হয়েছে নাকি হে? কিন্তু আমার বংশদোষে তাঁরা যে নেবেন না।’

হরিহর মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, ‘আমি যা বলচি, তা কলকাতার কোনো বাড়ি কেন, স্বয়ং বর্ধমানের মহারাজাও আপনাকে দিতে পারবে না ঠাউরমশাই। এহল খোদ ফেরঙ্গ সরকারের কাজ। সাহেবরা পাঁচবচ্ছরের কড়ারে লোক নিচ্চেন যে। বাগবাগিচা, খেতখামারের কাজের জন্য মজুর তো বটেই, পুজো-আচ্চা ধম্মকতা শোনানোর জন্য বামুন পণ্ডিতও লাগবে তাঁদের। শাস্তর পড়া পুজোর মন্তর জানা বামুন হলেই হল, ওসব দোষ-টোস নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। যদি সম্মত থাকেন, তবে চলুন নগদ মাসমাইনে ছাড়াও খাইখরচ, বউবাচ্চা নিয়ে থাকা, সবকিচু পাবেন। এমনকী ডাক্তারবদ্যিও থাকবে।’

কৃষ্ণসুন্দর বললেন, ‘স্ত্রী-পরিবার সমেত?’

‘তা নয়ত কি ওদের একানে রেকে যাবেন নাকি?’ হরিহরের শৃগালের মতো ধূর্ত চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠেই নিভে যায়, ‘গাঁয়ে সব্বাই আপনাদের পেছনে যেভাবে লেগেচে, আপনার অবর্তমানে ওদের কী হাল হবে ভেবে দেকেচেন?’

‘তা বটে!’ কৃষ্ণসুন্দর সায় দেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছেন গ্রামে দিনদিন তাঁর বিরুদ্ধে একটা প্রতিপক্ষ জোট তৈরি হচ্ছে।

জমিদার সূর্যনারায়ণ চৌধুরী তাঁকে পছন্দ করলেও তিনি এখন অস্তমান সূর্যের মতো। তিনি স্বভাবগতভাবে তেমন বৈষয়িক নন, নিভৃতচারী অরণ্যঋষির মতো বইপত্র নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। সেই সুযোগে রামচন্দ্র ন্যায়তীর্থ, গোপী লাহিড়ীর মতো সুযোগসন্ধানীরা ক্রমেই গ্রামের দণ্ডমুণ্ডকর্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। আর কৃষ্ণসুন্দর বরাবরই তাঁদের চক্ষুশূল।

কয়েকমুহূর্ত মৌন থেকে কৃষ্ণসুন্দর অধীর আগ্রহে প্রশ্ন করেন, ‘কিন্তু আমার পরিবার সেখানে থাকতে পারবে তো?’

‘কি বলচেন ঠাউরমশাই!’ হরিহর কৃষ্ণসুন্দরের এই অর্বাচীন প্রশ্নে যেন বিস্মিত বোধ করে, ‘প্রত্যেকের জন্য আলাদা কোঠাবাড়ি। আর আপনি হলেন গিয়ে বামুন মানুষ, আপনার জন্য সবকিচুই আলাদা থাকবে। নিজেরা থাকবেন, বাজারদোকান করবেন, রেঁধে খাবেন, আর কী?’

কৃষ্ণসুন্দর এবার আতান্তরে পড়ে যান। একবার ভাবেন দ্রুত গিয়ে ব্রহ্মময়ীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করবেন।

ব্রহ্মময়ী তো শুধুমাত্র ‘পতিং বা অনুজায়া’ নন, তাঁর একটা নিজস্ব মতামত থাকে সব বিষয়ে। তিনি কৃষ্ণসুন্দরের প্রকৃত জীবনসঙ্গিনী। তাই অযাচিত এই বিস্ময়কর প্রস্তাবে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করাটাই তো স্বাভাবিক।

হরিহর ব্যাগ্রচোখে শিকারের দিকে তাকিয়ে ছিল, ‘একনই আমায় কিচু বলতে হবে না ঠাউরমশাই। আপনি বাড়ি যান, শান্ত হয়ে বসে চিন্তাভাবনা করুন। যদি যাওয়ার মনস্থির করেন, কাল সূর্য ওঠার আগে ঠিক এইখেনে বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির লোকেদের হাত ধরে চলে আসবেন। পাঁচ বচ্ছর পর যখন গাঁয়ে ফিরে আসবেন, দেকেশুনে সবার চোক টেরিয়ে যাবে, হ্যাঁ !’

‘সূর্য ওঠার আগে!’ কৃষ্ণসুন্দর ধূসরচোখে তাকান, ‘কেন? অত ভোরে সবার অলক্ষ্যে যেতে হবে কেন? যাওয়ার আগে বাড়ির গৃহদেবতাকে শান্তিস্বস্ত্যয়ন করে তারপর না-হয়…।’

হরিহর আর বেশি কথা বাড়ায় না। মাছ যে টোপ গিলেছে, সেটা বোঝা গেছে। সুতো ছাড়তে ছাড়তে লাটাই কখন টেনে ধরতে হবে, সেটা তার ভালমতো জানা।

হঠাৎ ব্যস্ততার ভান করে সে মাটি থেকে উঠে পড়ে।

মুখে হাসি টেনে বলে, ‘সবাইকে জানিয়ে আপনার বোনকে নিয়ে গাঁ ছাড়তে পারবেন তো ঠাউরমশাই? ভেবে দেকবেন। পাঁচকড়ি মুখুজ্জের চর সব জায়গায় রয়েচে। আপনি আজ রাতটা ভালো করে ভাবুন। তাছাড়া ওদিকে একন বামুন পুরুতের দরকার, তাই বলে যে আজীবন দরকার থাকবে তা তো নয়…।’

ব্রহ্মময়ী সব শোনামাত্র বললেন, ‘অবশ্যই যাব।’

কৃষ্ণসুন্দর বাইরের দাওয়ায় বসে পদপ্রক্ষালন করছিলেন। ব্রহ্মময়ীর দৃঢ়স্বর শুনে বললেন, ‘বাপঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে এইভাবে এককথায় চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?’

‘না গিয়ে কি এখানে ছেলেমেয়ে নিয়ে অনাহারে মরব নাকি? এমনিতেই তোমার কাজটাও গিয়েছে।’ ব্রহ্মময়ী বললেন, ‘তাছাড়া জনাইয়ে যদি ঠাকুরঝি’কে না পাঠাই, আমাদের তো একঘরে করবে। তখন কী করব? তার চেয়ে এই ভালো, সরকার পুরোহিত নিচ্ছে যখন সব ভালোই হবে। দেখলে না, এক কথায় তোমায় কেমন দশটা রুপোর টাকা দিয়ে দিল।’

‘তা বটে!’ কৃষ্ণসুন্দর স্ত্রীর কথায় সায় দিলেন, ‘লোকটা বড় দয়ালু গো। গরীব বামুন আতান্তরে পড়েছে দেখে এতগুলো টাকা কেমন দিয়ে দিল।’

হায়! গ্রামের সেই সহজ সরল ব্রাহ্মণ দম্পতি যদি সেই ‘ভালো’র তীব্রতাটা তখন একটুও অনুভব করতে পারতেন। যদি বুঝতে পারতেন, হরিহর টাকাটা আদৌ ‘দেয়নি’, ফিরিঙ্গি ভাষায় বলতে গেলে সে ‘ইনভেস্ট’ করেছে মাত্র।

মানবসভ্যতার একেবারে আদিযুগ থেকে না হলেও দাসব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া যায় দশহাজার বছরেরও বেশি আগে, সেই নব্যপ্রস্তর যুগে, যখন মানুষ সবে কৃষিকাজ শিখছে। যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড়হাজার বছর আগে ব্যাবিলোনীয় সভ্যতার হামুরাবি আইনেও ক্রীতদাসকে পলায়নে সহায়তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন মিশর থেকে গ্রিসই হোক আর রোমান সাম্রাজ্যের গ্ল্যাডিয়েটর, ক্রীতদাসের প্রচলন ছিল সর্বত্র। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গরা শতাব্দীর পর শতাব্দী অত্যাচারিত নিপীড়িত হয়েছে তথাকথিত সভ্য শ্বেতাঙ্গদের হাতে। সেই নির্যাতনের ভয়াবহতা অনুভবের জন্য হ্যারিয়েট বিচার স্টো’র ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ই যথেষ্ট।

পরবর্তীকালে আধুনিক যুগে ব্রিটিশরা যখন পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অংশ পরিণত করল নিজেদের উপনিবেশে, তখন অনেক ধরনের সমাজ সংস্কারের কৃতিত্ব নিজেদের কাঁধে নেওয়ার পাশাপাশি এই দাবিও করল—পৃথিবী থেকে তারাই ক্রীতদাস প্রথা সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করেছে।

তা কাগজে কলমে কথাটা সত্যি বটে। তবে সেই সত্যতার বহর কেমন তা ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে যাচাই করলেই স্পষ্ট হবে।

ভারতবাসীরা তখন এমনিতেই ইংরেজদের হাতে পরাধীন, তার ওপর ভারতীয় ক্রীতদাসদের স্বদেশের মাটিতে বসবাস করার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তো, ১৮০৭ সালের মে মাসে আইন করা হল, কোনো ব্রিটিশ জাহাজ দাসবোঝাই করে কোনো বন্দর ছাড়তে পারবে না। ভালো কথা। পরের বছর মে মাসে আরো কড়া ফতোয়া। কোনো ব্রিটিশ উপনিবেশেই কোনো দাসের অবতরণ চলবে না, যে দেশেরই জাহাজ হোক না কেন। ১৮১১ সালে এল আরো জবরদস্ত আইন। ইংরেজ শাসনাধীন কোনো দেশে বা উপনিবেশে দাস আমদানি করলে কঠিন শাস্তি, দ্বীপান্তর।

কিন্তু আইন চলেছে আইনের পথে, বাস্তবক্ষেত্রের চাহিদা যে ‘অন্য কথা কয়’। উপনিবেশগুলোয় শ্রমিকের প্রয়োজন বেড়েই চলেছে। আফ্রিকা থেকে দাস আমদানি বন্ধ। ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোয় আফ্রিকান দাসের সংখ্যা ক্রমহ্ৰাসমান। রোগে, অপুষ্টিতে, অনাহারে মারা যাচ্ছে অকালে। নারী সঙ্গীর সংখ্যা অপ্রতুল, কাজেই জন্মাচ্ছে না পর্যাপ্ত দাসশিশুও।

জামাইকা, মরিশাস, সুরিনামের মতো দেশের শ্বেতাঙ্গ খামারমালিকদের মাথায় হাত। দেশগুলোর আদিবাসিন্দাদের আর ইচ্ছেমতো খাটানো যাচ্ছে না। এভাবে চলবে কী করে। তাঁরা যে ওসব দেশে পেয়েছেন স্বর্ণখনির সন্ধান। আদিগন্তবিস্তৃত আখের খেত। চাষ তো করতেই হবে। তাঁরা ক্রমাগত তাড়া দিচ্ছেন সরকারকে, বছরে অন্তত দশহাজার শ্রমিক চাই।

শ্রমিকের চাহিদা ভারতবর্ষের মধ্যেও। অসম ও ডুয়ার্সে সেজে উঠেছে রাশি রাশি চায়ের বাগিচা। কতশত ইংরেজ সেখানে মালিকানা কিনেছেন চা-বাগানের। এদিকে ১৮৩৪ সাল থেকে বলতে গেলে গোটা পৃথিবীতেই দাস কেনাবেচা বন্ধ। অগত্যা? অগত্যা আমাদের এমনি শ্রমিকই দাও। কাজ তো করতে হবে নাকি!

তা ইংরেজ সরকার অনেক ভেবেচিন্তে একটা মাত্র ইংরেজি শব্দে এর উপায় বের করলেন। শব্দটি হল ‘ইনডেনচার’। বাংলায় প্রতিশব্দ হল চুক্তিনামা। শ্রমিক ও বাগিচামালিক একটি চুক্তিপত্রে সই করবেন। সেই চুক্তিপত্রের নাম হল ‘গিরমিট’। আর শ্রমিকদের নতুন নাম হবে গিরমিটওয়ালা। নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক নির্দিষ্ট কাজ করবে। সময়সীমা পেরিয়ে গেলে সে আবার ফিরে আসবে নিজের ঘরে।

দারুণ বন্দোবস্ত। ক্রীতদাসপ্রথার আজীবন ও বংশানুক্রমিক দাসত্বও রইল না, আবার বাগানমালিকদের চাহিদাও মেটানো গেল। এখন প্রয়োজন শুধু মানুষ। রাশি রাশি মানুষ। সাব-এজেন্ট অর্থাৎ আড়কাঠিদের ছড়িয়ে দাও গ্রাম-গ্রামান্তরে। ধরো আর চালান দাও সাগরপাড়ে।

ঠিক হল, সরকার শুধুমাত্র গোটা ব্যবস্থার তদারক করবেন। শ্রমিক সংগ্রহ করবে বাগান মালিকদের তরফে নিযুক্ত এজেন্টরা। সরকার বন্দরে বন্দরে রক্ষী নিয়োগ করবেন। সেই রক্ষীদল শ্রমিকরা জাহাজে ওঠার আগে কাগজপত্র পরীক্ষা করবে, তাদের সম্মতি আছে কিনা যাচাই করবে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও শ্রমিকদের হলফনামা দিতে হবে যে তারা স্বেচ্ছায় দেশান্তরী হতে যাচ্ছে।

হরিহর ঠিকই বলেছিল। থাকবে ডাক্তারি পরীক্ষার ব্যবস্থাও। জাহাজ পরিদর্শন, শ্রমিকদের পোশাক আশাক সবকিছুর যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এজেন্টরা যে শ্রমিক সংগ্রহ করবে, তাদের সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স সংগ্রহও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

কত নিয়মকানুন! আহা! ব্রিটিশ সরকার মহানুভব।

কিন্তু বাস্তব কি এতটাই সুমধুর? একেবারেই নয়। বরং প্রকৃত চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইংরেজ সরকার যা ব্যবস্থাই করুন না কেন, যারা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাবেন, উপনিবেশের সেই বাগিচামালিকরা তো আদি দাসপ্রথাতেই অভ্যস্ত। তাই তাঁরা ইনডেনচারড গিরমিট শ্রমিকদেরও সেই চোখেই দেখতে লাগলেন। পাঁচ বছরের কড়ার? ধুস! বাছাধনদের দেশে ফিরতেই দেব না। কে কী করবে? প্রশাসন, বিচারক, পুলিশ সবাইকে হাতে রেখে দিয়েছি।

সাগরপাড়ের দেশগুলোয় চুক্তি থাকত পাঁচবছরের। অসম, সিংহল বা ব্রহ্মদেশে কাজ করতে গেলে আরো কম, তিনবছরের কড়ার। কিন্তু সেসব নামেমাত্র। একবার গেলেই মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত চলত সেই চুক্তি। লক্ষ লক্ষ অসহায় ভারতীয়দের ভাগ্যে এভাবেই অভিশপ্ত দাসবৃত্তি ফিরে এসেছিল।

ভারতবর্ষে ইংরেজ সরকার এজেন্টদের হাতে লাইসেন্স ধরিয়ে দিলেন। বললেন, এই নাও, বিশাল একটা দেশ। গরীবগুর্বোয় ভর্তি। ইচ্ছেমতো ধরে চালান করে দাও। তবে হ্যাঁ , জোরজবরদস্তি করো না বাপু।

এজেন্টরা সব রাঘববোয়াল, তারা লোক খোঁজার বরাত দিল সাব- এজেন্টদের। সাব-এজেন্টরা আবার কাজে লাগাল আড়কাঠিদের। হরিহরের মতো আড়কাঠিরা কোমরের গেঁজেতে সাব-এজেন্টের দেওয়া টাকা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামেগঞ্জে, স্টেশনে, হাটেবাজারে, তীর্থস্থানে। যাকে যেভাবে হোক বুঝিয়ে সুঝিয়ে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা হতে লাগল কলকাতায়। কাউকে দেওয়া হতে লাগল শহরে চাকরির আশ্বাস, কাউকে সাহেব কুঠিতে বাবুর্চি বা খিদমদগার, কাউকে দারোয়ান, কাউকে আবার রসুই বামুনের কাজের আশ্বাস। মেয়েদেরও নানাধরনের কাজের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা হতে লাগল। চাকিতে গম পেষাই, মেমসাহেবের বাচ্চা দেখভাল, হাসপাতালে কাজ এইরকম আরো নানারকম মিথ্যার ফুলঝুরি। যে যা কাজ পারে, তাকে সেই কাজের লোভ।

নিজেদের কমিশনের লোভে আড়কাঠিরা এইসব মিথ্যের জালে আটকে এমন এমন লোক নিয়ে আসত, যা আপাতদৃষ্টিতে অকল্পনীয়। যেমন ১৮৯১ সালে জামাইকায় এই মজুরদের দলে মিশে পৌঁছল এক সুন্দরি নেপালি রাজকন্যা। কখনো আবার দেখা গেল দলে রয়েছে পূজারি ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে মুসলমান ফকির, জাদুকর থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ। অর্থাৎ যাদের সঙ্গে শ্রমজীবিকার কোনো সম্পর্কই নেই। তা না থাকে না থাকুক, তারা সবাই খাতায় কলমে ‘গিরমিটওয়ালা’ হয়ে চালান হয়ে যেতে লাগল।

ভারতের নানাপ্রান্ত থেকে এইভাবে লোক ফুঁসলে আড়কাঠিরা নিয়ে আসত নিজেদের ওপরওয়ালা অর্থাৎ এজেন্টের ডিপোয়। এক-দেড়মাস সেই কারাগারসম ‘ডিপো’য় গাদাগাদি করে থেকে অপেক্ষা করতে হত জাহাজের ভেঁপুর। তারপর সময় উপস্থিত হলে নাম কা ওয়াস্তে স্বাস্থ্য পরীক্ষা আর আরো হরেকরকম সইসাবুদের পর জাহাজে করে কালাপানি পার।

বলাই বাহুল্য, এইসব ষড়যন্ত্রের বিন্দুবিসর্গও চট্টোপাধ্যায় দম্পতি কল্পনা করতে পারলেন না। ভেতরের ঘরে ভুবনমণি কাতরাচ্ছে, থেকে থেকে কেঁদে উঠছে, আর বাইরের দালানে স্বামী-স্ত্রী দুজনে আলাপ-আলোচনা-উত্তেজনাতেই কাটিয়ে দিলেন গোটা রাত।

ভোররাতে যখন পতিদেব সূর্য পত্নী ঊষার অনুগমন করছেন, কৃষ্ণসুন্দরও তখন ছেলেমেয়েদের হাত ধরে ব্রহ্মময়ীর পশ্চাৎ গমন করলেন। পেছনে পড়ে রইল পূর্বপুরুষের আদি ভিটে।

ব্রহ্মময়ী ননদিনী ভুবনমণির একটা হাত চেপে ধরে চলছিলেন। রাত থাকতেই একটা ছোট পোঁটলায় তিনি সন্তর্পণে গুছিয়ে নিয়েছিলেন কিছু কাপড়। অন্য একটা পোঁটলায় নিয়েছিলেন দুদিনের মতো মুড়ি আর বাতাসা। ঘটি-বাটি।

অপালা, লোপামুদ্রা আর দিব্যসুন্দর ঘুমচোখে হেঁটে চলেছিল বাবার পাশে পাশে।

হরিহর শিকারি পাখির মতো সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল নির্জন বিশ্বনাথতলায়। সপরিবার কৃষ্ণসুন্দরকে দেখামাত্র সাষ্টাঙ্গে ব্রাহ্মণ দম্পতিকে প্রণাম করে পথ চলা শুরু করল।

যাত্রাপথের দীর্ঘ পদযাত্রার বর্ণনা বাহুল্য, তাঁরা অবশেষে এসে পৌঁছেছেন মেছুয়াবাজারের পেছন দিকে বিশাল পাঁচিলঘেরা নবকিশোর দত্তর সেই ডিপোতে।

যতদিন না ফেরিঘাট থেকে পরের জাহাজ ছাড়ছে, ততদিনের জন্য এটা ‘ইনডেনচারড গিরমিটওয়ালা’দের সাময়িক বাসস্থান। আড়কাঠিরা নিজের নিজের ‘মাল’ এই ডিপো পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজেদের পাওনাগন্ডা বুঝে নিয়ে প্রস্থান করে।

তারপর দায়িত্ব গ্রহণ করে অষ্টপ্রহর ডিপোর প্রহরায় থাকা দারোয়ানের দল। তারা খুব কড়া। নারীপুরুষ এখানে আলাদা দুটো প্রকাণ্ড ঘরে থাকে। এখানে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, তিলি, বাগদি, যবন সবাই এক। সবার এক পোশাক। এক খাবার।

ডিপোয় পৌঁছনোর একসপ্তাহের মধ্যেই কৃষ্ণসুন্দরের চোখের সামনে থেকে রঙিন পর্দা সরে গিয়েছে। বড় মাছের খাদ্য হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তিনি যে সামুদ্রিক তিমিমাছের গ্রাসের সামনে এসে পড়েছেন, তাও তিনি উপলব্ধি করেছেন। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। আসন্ন অভিশপ্ত জীবনের জন্য দিন গোনা ছাড়া।

ব্রহ্মময়ী ওদিকের ঘরে রয়েছেন। সঙ্গে ভুবনমণি, অপালা, লোপামুদ্রা। অনেক চেষ্টা করে এই কয়েকদিনে একবার মাত্র স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন কৃষ্ণসুন্দর। তাও এক দণ্ডকালের জন্য। সেইজন্য ভারপ্রাপ্ত প্রহরীর হাতে গুঁজে দিতে হয়েছে হরিহরের দেওয়া সেই রৌপ্যমুদ্রাগুলোর দুটি।

আর সেই এক দণ্ডের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে নীরবে অশ্রুপাতে। স্ব-স্ব কর্মের অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে।

ব্রহ্মময়ী বলেছেন, ‘সব আমার দোষেই হল গো! আমিই তোমাকে বললাম বেরিয়ে আসার জন্য।’

কিন্তু কৃষ্ণসুন্দর স্ত্রীর ওপর দোষ আরোপ করেননি। অস্ফুটে বলেছেন, ‘চিন্তা কোরো না। অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয় হবেই।’

‘ইংরেজিতে গার্ডেন কথার মানে হল বাগিচা। ওই যে দেখতে পাচ্ছ, নদীর ওপারের গাছগুলো? ওটা ছিল গিয়ে কিড সাহেবের বাগান। সেই থেকে গার্ডেন রিচ। কিডের বাপ ভি থা আউর এক কিড। উসকা নাম কো খিদিরপুর। খিদিরপুর থেকে নদী বরাবর দক্ষিণ দিকে কিছুদূর উজিয়ে গেলে পড়বে ওয়াটসন সাহেবের জাহাজ তৈরির কারখানা। ভূকৈলাশের জয়নারায়ণ ঘোষালের জ্বালায় কারখানাটা এখন উঠে গিয়েছে বটে, কিন্তু সেজায়গার নাম এখন ওয়াটগঞ্জ।’

অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে বুলবুল মিয়াঁ থামল। তারপর তামাক আর মিশিতে মাখামাখি লালচে কালো দাঁতের পাটি বের করে হাসল। বলল, ‘কলকাতা শহর মানেই হল গিয়ে অলিতে গলিতে ইতিহাস আর চমক। বুঝলে? এ তোমার গাঁ নয়। এখানে তুমি সাহেবসুবোর বেগম পাবে, গরুখেকো বামুন পাবে। বুঝলে কিনা?’

চন্দ্রনাথ এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল। কিন্তু, বুলবুল মিয়াঁর শেষ বাক্যে চোখ বিস্ফারিত করে তাকিয়ে রইল।

‘ক্যা?’ বুলবুল মিয়াঁ পিচ করে মুখ থেকে পানের পিক ফেলে বলল, ‘ইয়েকিন নেহি হুয়া? বেশ। একদিন তোমায় ওই কিড সাহেবের কবরে নিয়ে যাব। কেরেস্তান কবরখানার নয়, বাড়ির বাগানে সাহেব ঘুমিয়ে আছে। মোছলমান বিবি-বাচ্চা নিয়ে তিনি শুনেছি দিনে পাঁচবার নামাজও পড়তেন। আর বামুন থেকে কেরেস্তান হয়েছে, এমন গরুখেকো তো শহরে অনেক আছে। বেরাম্মি পাড়ায় চলো না, দেকতে পাবে ভুরিভুরি।’

কথা বলতে বলতে ওরা দুজন হেঁটে চলেছিল।

চন্দ্রনাথ নামক লাজুক যুবকটির বয়স তেইশ বছর। তার সঙ্গে বড় বাক্স, বিছানা। উসকোখুসকো চুল। আজ প্রত্যুষেই কলকাতা শহরে এসে পৌঁছেছে। তার বাড়ি রাঢ়বঙ্গের একটি আণুবীক্ষণিক গ্রামে।

গ্রামের নাম খাদাকুঁড়ি।

জন্ম থেকে এই তেইশ বছর বয়স পর্যন্ত চন্দ্রনাথ কোনদিনও জ্ঞানত খাদাকুঁড়ি গ্রামের বাইরে পা দেয়নি। বাইরের জগৎ তার কাছে পুরোপুরি অচেনা। তাই সে অত্যন্ত আড়ষ্ট। রাজধানী শহর কলকাতায় ধুলো ছুটিয়ে চলে যাওয়া এক্কাগাড়ি, কিংবা ফেরিঘাটে জাহাজের কানে তালা লেগে যাওয়া ভেঁপুতে সে চমকে চমকে উঠছে।

যে লোকটির পাশে পাশে ভীরু মার্জারের মতো সে হেঁটে চলেছে, তাকে চন্দ্রনাথ আজ সকালেও চিনত না। পরিচয় হল ফেরিঘাটে। নৌকো থেকে নেমে চন্দ্রনাথ যখন একে তাকে জিগ্যেস করছিল, ‘আচ্ছা, মেটিয়াবুরুজ কী করে যাব, কেউ বলতে পারেন?’

‘মেটেবুরুজ?’ তখন এই লোকটি ওকে আপাদমস্তক দেখে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এসেছিল, ‘আপকা উধার কাম ক্যা হ্যায়?’

‘আজ্ঞে, আমি সঙ্গীতচর্চা করি। অনেক দূর থেকে আসছি। নবাবের কাছে গানের সুযোগ পাওয়ার জন্য…।’ আড়ষ্ট কণ্ঠে বলেছিল চন্দ্রনাথ।

লোকটা বুঝতে আর দেরি করেনি, ডান হাতের পাঞ্জাটা শূন্যে তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘সমঝা জনাব। মেহেরবানি করকে মেরে সাথ আইয়ে। হাম লোগ সাথ জায়েঙ্গে।’

লোকটার নাম বুলবুল মিয়াঁ। যে যেমন বাংলা বলে, তেমনই উর্দু। মাথার মধ্যিখান দিয়ে সিঁথি, লম্বা তৈলাক্ত চুল দু’পাশে পাটি করে সাজানো। মাথায় বাহারি কারুকাজ করা ছুঁচলো সরু টুপি। মুখে পান, ঠোঁটে রক্তাভ লাক্ষা।

পরনে চুস্ত আংগরাখা, রেশমি ঘুটন্না। পায়ে টাটবাফি বুট।

তার এক হাতে ধরা পাখির খাঁচা। অন্য হাতে রেশমের থলে।

সঙ্গী হয়ে পথ চলতে চলতে চন্দ্রনাথ জেনেছে, বুলবুল মিয়াঁ মেটিয়াবুরুজে পাখির ব্যবসা করে। দূরদেশ থেকে পাখি ধরে এনে চালান দেয় নবাবের চিড়িয়াখানায়। তার আদি বাস কলকাতায় নয়, পরিবার থাকে উড়িষ্যায়। কিন্তু যবে থেকে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ নির্বাসিত হয়ে কলকাতায় এসে ঘাঁটি গেড়েছেন, তার মত পরিব্রাজক ভাগ্যান্বেষীদের আনাগোনা এতল্লাটে মশামাছির মতো বেড়েছে।

দুজনে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে দুজনের মধ্যে কথোপকথন সহজ হয়েছে, বয়সে অনেক বড় হওয়ায় বুলবুল মিয়াঁ কিছুক্ষণ পর নেমে এসেছে ‘তুমি’-তে। সূর্যদেবও মাথার ওপর প্রায় উঠে এসেছেন, তবু এখনো গন্তব্য এসে পৌঁছয়নি।

তবে মিউনিপ্যালিটির সদর পথে উঠে এসেছে তারা। রাস্তার দুই ধারে বড় বড় দোকান। সেইসব দোকানে পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানিরা। প্রতিটি দোকানের ওপরে পতপত করে উড়ছে জোড়া মৎস্যের পতাকা। ভূতপূর্ব অযোধ্যা বা আউধের নবাবদের প্রতীক।

বুলবুল মিয়াঁ বলল, ‘এখান থেকে শুরু হল নবাবের এলাকা। ওই যে দূরে হাঁসের পালকের মতো সফেদ প্রাসাদটা দেখছ, ওটাই হল সুলতানখানা। নবাব নিজে থাকেন ওই বাড়িতে। প্রাসাদের নহবতের ওপর দেখো পহর ঘড়ি। হর ঘণ্টায় বাজানো হয়।’

চন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। এতক্ষণ পেছনে ফেলে আসা রাস্তাঘাট বা মানুষজনের মধ্যে পুরোদস্তুর শহুরে ছাপ থাকলেও চলনে বলনে বাঙালিয়ানাটুকু ঠিকই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ও যেখানে এসে পড়েছে, এই অঞ্চলটা বাংলার মধ্যে যেন সম্পূর্ণ অচেনা একটুকরো বিদেশ।

আশপাশ দিয়ে যারা হেঁটে চলেছে, তাদের কারুরই পরনে ধুতি-ফতুয়া নয়, বুলবুল মিয়াঁর আদলে আঁটসাঁট রঙচঙে পোশাক। সবারই মুখ পানে বা মশলায় রঞ্জিত।

দূর থেকে ভেসে আসছে গান। সঙ্গে তবলার তালে যোগ্য সঙ্গত।

রাস্তার দু’পাশের অধিকাংশ দোকানের দায়িত্বে হাস্যমুখ রমণী। অনবগুণ্ঠিতা, প্রগলভা। তারা নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি কী রসিকতা করছে, এক ঝলকের জন্য অপাঙ্গে দৃষ্টিপাত করছে পথচারীদের ওপর, পরমুহূর্তে হেসে গড়িয়ে পড়ছে এ ওর গায়ের ওপর।

অনভ্যস্ত চন্দ্রনাথের কান লাল হয়ে উঠল। সে চোখ ফেরাল অন্যদিকে।

বুলবুল মিয়াঁ বলে চলেছিল, ‘সুলতানখানার আশপাশে ছোটবড় যে মহল্লাগুলো দেখছ, ওগুলোও নবাবের। তবে ওগুলোয় থাকেন তাঁর মুতআ বেগমরা। দিনরাত নাচাগানা হয়।’

‘মুতআ বেগম মানে?’ চন্দ্রনাথ এতক্ষণে মুখ খুলল। মিষ্টি এক আতরের গন্ধ ভেসে আসছে তার নাকে।

বুলবুল মিয়াঁ বলল, ‘নবাব নিজে শিয়া। হিন্দুদের মধ্যে যেমন বামুন, কায়েত, নাপিত, মুসলমানেরাও কেউ শিয়া কেউ সুন্নি। নবাব নিজে শিয়া। শিয়া ধর্মে কাউকে মনপসন্দ হলে কিছুদিনের জন্য নিকাহ করা যায়। সেটাকেই বলে মুতআ। মুতআ না করে মুখ দেখা গুনাহ হয়।’

বুলবুল মিয়াঁ এবার বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ হাসল, ‘তা আমাদের নবাব হলেন আশিক আদমি। শুনেছি লক্ষ্নৌ নগরী ছেড়ে যখন চলে এসেছিলেন, তখন ওখানে তাঁর বেশ কিছু বেগম রয়ে গিয়েছিলেন। এখানে এসে নবাব তাঁদের জন্য চোখের জল ফেলতেন আর শায়েরী লিখতেন। তারপর এই মেটিয়াবুরুজে এসে তিনি সেই দুঃখ মিটিয়েছেন। কাউকে মনে ধরলেই তাকে মুতআ করে নেন। এখানে কাম-ধান্দায় প্রায়ই আসতে হয় বলে একটা ঘর নিয়ে রেখেছি, সেই ঘরের পাশের বাড়িতে একটা লেড়কি ছিল। আমি তাকে বহেন ডাকতাম। সে সুলতানখানায় ভিশতিনির কাম করত। তো সে একদিন জল দিতে গেছে, নবাবের চোখে লেগে গেল, নবাব তাকে মুতআ করে নিলেন। সে হয়ে গেল নবাবের বেগম। এইরকম শয়ে শয়ে বেগমরা থাকে ওই আশপাশের মহল্লাগুলোয়। নবাব আবার তাদের নিয়ে নাচাগানার দল গড়েছেন। ঝুমুরওয়ালি, লটকনওয়ালি, ঘুংঘটওয়ালি, আরো অনেকরকম দল আছে। তোমাদের রাধা-কিষেণের প্যায়ার নিয়ে রাসওয়ালিও আছে। হা হা।’

চন্দ্রনাথ শুনছিল। বুলবুল মিয়াঁ থামতেই বলল, ‘আচ্ছা, এই নবাবের রাজত্ব কোথায়? মানে, ইনি কি এই গোটা তল্লাটের রাজা?’

বুলবুল মিয়াঁ সুলতানখানার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর চোখ বড় বড় করে হেসে ফেলল, ‘নবাবের রাজত্ব সারা জাহান। বুঝলে? হা-হা! যাও, সুলতান খানার গা ঘেঁষে যে মহল্লা দেখছ, ওটার নাম আসাদ মঞ্জিল। এখন বেলা দো পহর। নবাব বাহাদুর এখন ওখানেই থাকেন, খানাপিনা করেন। যাও। গিয়ে কথা বলে নাও। যদি তোমার নকরি লেগে যায়, তবে তো আবার মোলাকাত হবে। আদাব।’

চন্দ্রনাথ প্রত্যুত্তরে নমস্কার করল।

বুলবুল মিয়াঁ আর দাঁড়াল না, দ্রুত পদে হেঁটে চলে গেল বামদিকের গলি ধরে।

চন্দ্রনাথ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের পরিবেশে তার মন এখন দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। প্রতিবেশীদের নিষেধ অমান্য করে নিজের গ্রাম ছেড়ে এখানে এসে কি ও ঠিক সিদ্ধান্ত নিল? একেবারে বিদেশ বিভুঁই এই মেটিয়াবুরুজে এসে নতুন জীবন প্রারম্ভের চেয়ে কি গ্রামেই থাকা নিরাপদ ছিল না?

একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ওর হঠাৎ মনে পড়ে গেল তুলসীর ছলছলে চোখদুটো।

‘তোমাকে যেতেই হবে চাঁদদাদা? এখানে তো কতলোকে কত কিচু করচে। তুমিও করো না!’

চন্দ্রনাথ হেসে বলেছিল, ‘কে কী করছে এখানে বল?’

‘কেন?’ তুলসী তার সাদা থানের একপ্রান্ত তর্জনীতে পাকাতে পাকাতে বলেছিল, ‘গণেশদাদা চাষ করচে, বুদোদাদা তার বাপের মতোই জমিদারি সামলাচ্চে, মঙ্গলদাদা তাঁত বুনচে…।’

‘তুই যাদের কথা বলছিস, তারা সবাই পৈতৃকসূত্রে সেই কাজগুলোই শিখেছে তুলসী। তারা তাঁত বুনতে পারে। জমিজমা তদারক করতে পারে। চাষের মুনিষ খাটাতে পারে। আমি কি সেসব পারি? নিজের গানের গলাখানা ছাড়া আর কী আছে আমার?’ চন্দ্রনাথ বলেছিল, ‘তা এই অজগাঁয়ে আমার সেই গান কে শুনবে, আর কে আমায় খেতে পরতে দেবে, তুই বল।’

তুলসী ছাড়েনি। বলেছিল, ‘তুমি কি আমাকে কচি খুকি পেয়েচ যে যাহোক তাহোক কিচু একটা বোঝালেই আমি বুঝে যাব? জ্যাঠামশাইকে তাহলে কে খাওয়াত? তিনিও তো তোমার মতো শুধু গানই গাইতে পারতেন। গান গেয়েই তো তিনি এই বাড়িটা দাঁড় করিয়েচেন, তোমাকেও খাইয়ে পরিয়ে বড় করেচেন।’

চন্দ্রনাথ বলেছিল, ‘ওরে তুলসী, তুই সেই বোকাই রয়ে গেলি। আমার বাবা কি সারাজীবন গ্রামে বসে ছিলেন? তিনি তো সারাজীবনই বাইরে বাইরে ঘুরেছেন। অর্ধেক জীবন ছিলেন কলকাতায়, তারপর শুনেছি উত্তরেও গিয়েছিলেন। সারাজীবন বাইরে উপার্জন করে শেষবয়সে গ্রামে এসে থিতু হয়েছিলেন। আমিও সেটাই করব। দেখবি, বুড়ো বয়সে যখন সবকটা দাঁত পড়ে যাবে, লাঠি হাতে থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে ফিরে আসব তোদের কাছে। তখন একটু সেবাযত্ন করবি তো?’

তুলসীর মুখ একেবারে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তারপর অস্ফুটে সে বলেছিল, ‘আমার সোয়ামি বেঁচে থাকলে ঠিক সে তোমায় কিচু একটা কাজ দিত। এইভাবে গাঁয়ের বাইরে চলে যেতে দিত না।’

চন্দ্রনাথ আর কিছু বলেনি। কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে নিজের কাজে মন দিয়েছিল।

তুলসী অনেকক্ষণ চুপচাপ উঠোনে ঝোলানো টিয়াপাখির খাঁচাটার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ বলেছিল, ‘তুমি ওকানে গিয়ে কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ো না যেন চাঁদদাদা!’

চন্দ্রনাথ বিস্মিত মুখ তুলে বলেছিল, ‘হঠাৎ এই কথা কেন?’

‘তুমি জানোনা।’ তুলসী গ্রামের বয়স্কা মহিলাদের মতো গম্ভীর মুখ করে বলেছিল, ‘কলকাতার মেয়েদের হায়া-শরম কিচু নেইকো। মিনসে দেকলেই সেই মাগিরা হামলে পড়ে।’

‘তুই তো কোনোদিন এই খাদাকুঁড়ির বাইরে পা দিসনি, তুই এত কিছু করে জানলি?’

‘আমি পা দিইনি তো কী হয়েছে, আমার সোয়ামী তো দিয়েচিলেন। তিনিই বলেছিলেন আমায়।’ তুলসী গম্ভীরমুখে বলেছিল, ‘তুমি জানো, কলকাতায় লোকেরা মা গঙ্গার বুক চিরে দিয়েচে? সেই বুকের ওপর দিয়ে জুতো মসমসিয়ে এখন সাহেবরা হেঁটে যায়? মাগো! ভাবলেই পাপ হয়! হে মা গঙ্গা, আমি ভেবে ফেললুম, আমার দোষ নিও না।’

প্রায় এক সপ্তাহ আগের কথা, তবু স্মৃতি রোমন্থন করে তুলসীর সেই আর্দ্র মুখটি যেন চন্দ্রনাথের চোখে ভেসে উঠল। আত্মীয়স্বজন বলতে সেভাবে তার কোনোকালেই কেউ নেই। পিতৃবিয়োগ হয়েছে কয়েক মাস আগে। ওর পিতা হরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। এই কলকাতা শহরের বুকে কত নামীদামি ওস্তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি সঙ্গীতচর্চা করেছেন। বিপত্নীক মানুষটি জীবন সায়াহ্নে দেশের বাড়িতে ফিরে পুত্রকে শেখাতে শুরু করেছিলেন ধ্রুপদী সঙ্গীতের গূঢ় তত্ত্ব। চন্দ্রনাথের মা’কে সামান্যটুকুও মনে নেই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই সে পিতার ছত্রছায়াতে মানুষ।

কিন্তু সহসা আহ্বান এল পরপার থেকে। হরেন্দ্রনাথ চলে গেলেন। আর চন্দ্রনাথ হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ একা।

মাত্র বাইশ বছর বয়সে এতবড় অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েও চন্দ্রনাথ ভেঙে পড়ল ঠিকই। কিন্তু ঘটনার কালক্রমে সে উঠেও দাঁড়াল অনতিবিলম্বে। বলা ভালো, পরিস্থিতির চাপে তাকে উঠে দাঁড়াতে হল।

কারণ তার পিতা মৃত্যুশয্যায় তাকে একটি সংক্ষিপ্ত পত্র দিয়ে গিয়েছিলেন। পত্রটি একপৃষ্ঠার হলেও তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আশীর্বাদ, শুভকামনার শেষে তাতে ছিল সুস্পষ্ট এক নির্দেশ। চন্দ্রনাথের সঙ্গীতপ্রতিভা ঈশ্বরপ্রদত্ত। ঠিকমতো চর্চা করলে সে অনেকদূর যাবে। তাই সে যেন খাদাকুঁড়ি গ্রামে বসে থেকে নিজের প্রতি অবিচার না করে। পত্রে প্রদত্ত ঠিকানা অনুযায়ী চলে যায় কলকাতায়।

সেখানে আছেন এক সমঝদার নবাব। চন্দ্রনাথ যেন সেখানেই গিয়ে শুরু করে এই নতুন জীবন। ঠিকমতো গান গাইলে অর্থ বা সম্মান, কোনোটারই অভাব হবে না।

শুধু গিয়ে নিজের পরিচয়টুকু দিতে হবে। নবাবের অন্যতম সাকরেদ কাফি খাঁ’র কাছে। কাফি খাঁ চন্দ্রনাথের পিতার পুরোনো বন্ধু।

ভাবতে ভাবতে চন্দ্রনাথ পায়ে পায়ে এগোচ্ছিল আসাদ মঞ্জিলের দিকে। প্রথমেই নিশ্চয়ই নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভবপর হবে না। সেই প্রয়োজনও তার নেই।

কিন্তু কাফি খাঁ কোন অট্টালিকায় বাস করেন, তা সে কী করে জানবে?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *