প্যারিসে নিশিবাসরে

প্যারিসে নিশিবাসরে

দোকানটাকে দেখে আমি বা আনন্দ ঠাকুর, আমরা কেউই প্রথমে কিছু বুঝিনি। এমনিতেই ভোরের আঁধার, তার ওপর তখনো খোঁয়াড়ি কাটার কোন লক্ষণই নেই। শুধু নেশাতুর চোখে দেখলুম দরজার ওপরে কোকা কোলার সাইনবোর্ড, ভাবলুম নিশ্চয়ই কোন সালঁ হবে,আর কিছু হোক না হোক, নিদেনপক্ষে কফি তো পাওয়া যাবেই। ফলে ঢুকে পড়তে দুবারের বেশি ভাবিনি।

তখনো পকেটে কিছু ইউরো রয়ে গেছিলো, জিগরে কিছু হিম্মতও বটে। নইলে প্যারিস এসেই, শুধু হোটেল অ্যাড্রেস আর টিউবের ম্যাপ হাতে কেউ রাত বারোটার সময় ‘নাইটলাইফ’ দেখতে বেরোয় না।

ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলি।

২০১০ সালের এপ্রিল মাস। কম্পানির কনফারেন্সের নামে আট দিনের স্যুইজারল্যাণ্ড কাম প্যারিস ভ্রমণে এসে দিল তখন পরিপূর্ণ রূপে গার্ডেন গার্ডেন। চারদিনের স্যুইজারল্যাণ্ড ভ্রমণ শেষে জুরিখ থেকে বাসে করে প্যারিস আসছি আল্পসের পাশ দিয়ে। প্রকৃতির সেই স্নিগ্ধ রূপ দেখে শুধু আমি কেন, বাহান্ন জনের পুরো টিম মোহিত। আমার অবিশ্যি ধান্দা অন্য ছিল, আসার সময়েই আমি আর আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু, বিহারনন্দন আনন্দ ঠাকুর, দুজনে মিলে ঠিক করেছিলাম স্যেন নদীতে ক্রুজ দেখে বাকিদের সঙ্গে লক্ষ্মী ছেলের মতো হোটেলে ঢুকবো বটে। কিন্তু একটু ”ফ্রেশ টেশ” হয়েই দুজনে প্যারিসের বিখ্যাত নাইটলাইফ চাক্ষুষ করতে না বেরোলেই নয়। অ্যাদ্দুর এলুম, প্যারিসের বিখ্যাত নিশিবাসরের মৌতাত একটু মেখে না গেলে দেশে ফিরে বন্ধুবান্ধবদের মুখ দেখাবো কি করে, অ্যাঁ? নতুন দেশে হারিয়ে যাওয়ার ভয়? আরে মহাই, সেলসের লোক প্রায় বিড়ালের মতই, যত দূরেই ফেলে আসুন না কেন, মান্থ এন্ডের আগে ঠিক রাস্তা চিনে ডিস্ট্রিবিউটর পয়েন্টে পৌঁছে যায়। আমরাও একটু গভীর রাত হলেও হোটেলে ঠিক পৌঁছে যাবই।

প্রথম বাওয়াল হলো ”ফ্রেশ” হবার পর। কর্মসমাপান্তে দেখি জলটলের কোন ব্যাবস্থাই নেই যে! জুরিখে তাও হ্যাণ্ড শাওয়ার বলে একটা বস্তু ছিল। এখানে যে সবই নিকষ্যি শুকনো কাজকারবার!

যাই হোক, বাঙালের ব্রেইন, টক করে নজরে এলো যে বেসিনের ওপর দুটো গ্লাস রাখা আছে। অতঃপর..

তা আমি বেরিয়ে আসার পর সেই মহাপুরুষটি সৎকর্মসমাপনমানসে ভেতরে গেলেন। খানিকক্ষণ বাদে সেই বিহারানন্দের তত-আনন্দিত-নয় মার্কা আর্তনাদ ‘দাদা, ধোঁয়ু ক্যাইসে?’

সেই ”ধোঁয়ু” পিপাসীকে সৎকর্মের সহিহ রাস্তা বাতলাতে তিনি কর্মসমাপান্তে বাইরে এসে জ্ঞানসমৃদ্ধ সুচিন্তিত মতামতটি ব্যক্ত করলেন, ‘সালেঁ গন্দে লোগ, কাগজ সে ধোতে হ্যায়’।

সে যাক, তখন রাত এগারোটা বাজে সবে, আমাদের নৈশঅভিসারের প্রথম রজনী। তা সেই রজনীতে পুরো রজনীকান্ত সেজে, জলটল খেয়ে বেরোব, এমন সময় তন্নতন্ন করে সারা রুম খুঁজে দেখি, যাঃ, খাবার জল নেই যে!

তৎক্ষণাৎ রিসেপশনে ফোনালুম জলের খোঁজে। ওপার থেকে ফরাসী রিসেপশনিষ্ট সুললিত ইংরেজিতে জবাব দিলেন যে আলাদা করে জলের কোন ব্যবস্থা নেই। সুসভ্য ফরাসীজাতি বেসিনের নল থেকেই পেয় জল সংগ্রহ করে থাকে।

অ। তা বুঝলুম। তা সংগ্রহটা করে কিসে? ড্যাকরা মিনসেগুলো তো জলের জাগ অবধি দিয়ে যায় নি।

উত্তর এলো, কেন? টয়লেটে বেসিনের ওপর দু’দুটো জলের গ্লাস আছে যে!

শুনেই তো আমরা স্তম্ভিত! সেই গ্লাস দুটোই, অ্যাঁ? তা সেটা আগে খোলসা করে বলতে কি হয়েছিল অলপ্পেয়ে অনড্বানের দল? প্রাথমিক স্তম্ভিত ভাব কেটে গেলে অতঃপর দুইজনের বিনম্র এবং অস্বস্তিকর চোখ তাকাতাকি, হ্যাঁ ভাই, তুই কোন গ্লাসটা ইউজ করেছিলিস রে?

ইত্যকার ঝামেলা মিটিয়ে নিচে এসে রিসেপশনের সেই সুন্দরীশ্রেষ্ঠাকে সটান প্রশ্ন, অয়ি বরবর্ণিনী, প্যারিসের নাইটলাইফ, আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে, স্ট্রিপটিজ দেখতে গেলে কোথায় যেতে হবে আমাদের?

ভদ্রমহিলা বোধহয় আমাদের মতন ইতর লোক হ্যাণ্ডেল করে করে অভ্যস্ত,তাবৎ পারভার্ট ভারতীয়রা এসে নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ নিশিনিলয়ের সন্ধান চায় আগে। প্যারিসের টিউবের একটা ম্যাপ আর হোটেল অ্যাড্রেস সামনে ঝড়াকসে ফেলে দিয়ে বললেন’ জায়গাটার নাম পিগাল। হোটেল থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে দুমিনিট হাঁটলেই টিউবস্টেশন। ফিরতে হলে রাত দুটোর আগে ফিরবেন, তারপর টিউব বন্ধ থাকে। নইলে সেই ভোরে, ছ”টার পর’। বুঝলাম, ফরাসীজাতির বানিয়াকরণ ইজ ইন প্রোগ্রেস।

পিগাল স্টেশন থেকে বেরিয়েই, আইসসালা, এই লাল রঙের উইন্ডমিল মার্কা বাড়িটা চেনা চেনা লাগে যে! আনন্দ তার গভীর মননের ফল আমাকে উপহার দিলো, ‘দাদা, পার্ক স্ট্রিট মে অ্যায়সা এক বার হ্যায় না? সালোঁনে পুরা কা পুরা কপি উতার দিয়া লাগতা হ্যায়, নেহি?’

বাজে কথায় আমি কোনদিনই কান দিই নি, এবারেও দেওয়ার কোন মানে ছিল না, স্পেশালি চোখের সামনে যখন মহিমান্বিত প্রতাপে বিরাজমান দ্য গ্রেট মুল্যাঁ রুজ!

মুল্যাঁ রুজের সামনেকার দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে রাস্তার ধারে আসতেই, একটার পর একটা স্ট্রিপটিজ বার, রাস্তার দুপাশেই। আলোঝলমলে সুন্দরী প্যারিস তার মোহময়ী রাতের পশরা সাজিয়ে বসেছে। বিশাল বিশাল নিওন সাইন প্রতিটি দোকানের সামনে। পরিষ্কার ঝকঝকে রাস্তা,তার মধ্যে বয়ে চলেছে উদ্দাম জনস্রোত, লাস্যে, হাস্যে, লালিত্যে, বিভঙ্গে,কটাক্ষে, কলকাকলিতে মুখর লা পারি। স্ট্রিপটিজ বারের মাঝে মাঝে মদিরাশালা। সেখানেও উচ্ছল হাসি কলরোলের আনন্দলহরী। আহা, হাসি গান আনন্দে মুখরিত সেই সন্ধ্যাটি ছিল ফরাসী সুরার মতই মদির, ফরাসী তন্বীটির মতই উচ্ছল, ফরাসী তরুণটির মতই প্রাণবন্ত।

প্রতিটি স্ট্রিপটিজ বারের সামনে দালালের দল রীতিমতো হইহই করে বিচিত্র বিভঙ্গে কাস্টমার ডেকে আনার চেষ্টা করছে, শিয়ালদার হোটেলগুলোর সামনে যেভাবে ‘ও দাদা এদিকে, ওও বৌদি এখানে’ বলে খদ্দের ডাকে, অবিকল সেই তরিকা। দুএকটা হাতছানি এড়িয়ে বেশ বড়ো গোছের একটা স্ট্রিপটিজ বারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি কি দাঁড়াইনি, বৃষস্কন্ধ ব্যঢ়োরস্ক মহিলা দালালটি তেনার শালপ্রাংশু মহাভুজদুটি দিয়ে আমাদের দুইজনের নড়া ধরে নেংটি ইঁদুরের মতই ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে দুটো সীটে ফেলে গেলেন। যাবার আগে অবশ্য দশ দশ কুড়ি ইউরো খামচেই নিয়ে গেলেন। সে কি হাতের পাঞ্জা, মনে মনে মেপে দেখলুম ভদ্রমহোদয়া কোন কারণে রুষ্ট হয়ে যদি আমাকে একটা থাপ্পড় কষান, মোটামুটি ব্রহ্মতালু থেকে থুতনি অবধি ওতে কভার হয়ে যাবে!

এখন আপনি কিসের জন্যে নড়েচড়ে বসলেন স্পষ্ট বুইতে পাচ্চি, হেঁ হেঁ, কিন্তু কত্তা,স্ট্রিপটিজের বর্ণনা দিয়ে আমি কিছুতেই সুকোমলহৃদয় তরলমতি পাঠকপাঠিকাদের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাতে পারবো না, না, না। তাছাড়া অনেক গুরুজনেরাও আছেন,এমনিতেও আমার ছ্যাবলামি দেখে আর ফাজলামিগুলো পড়ে এঁরা আমার অন্ধকার ভবিষ্যতের ব্যপারে সাতিশয় উদ্বিগ্ন। এরপর স্ট্রিপটিজের রগরগে বর্ণনা শুনলে সরবিট্রেট, মোহমুদগর, রবীন্দ্রসংগীত, কিছুতেই শানাবে না যে!! শুধু জানিয়ে রাখি কুন্দশুভ্র নগ্নকান্তি সেই সুরেন্দ্রবন্দিতাদের বিলোল কটাক্ষমদির লাস্যনৃত্য আজও চোখ বুঝলেই দেখতে পাই। আহা, শুধু শরীর দিয়েও এমন স্বর্গীয় জাদুর দুনিয়া গড়তে শুধু ফরাসীরাই পারে!

তা নাচটাচ দেখে, ঘন্টাদুয়েক বাদে ঠোঁটের কোণে একটা বিস্ময়,প্রশংসা, উত্তেজনা মেশানো হাসি নিয়ে বেরিয়েছি, আনন্দবাবু ঘোষণা করলেন যে ওনার পেটে বিলক্ষণ কিছু পোস্তা স্পেশাল চুহা দৌড়চ্ছে, এবং সামান্য ক্ষুন্নিবৃত্তি না করে উনি সেখান থেকে নড়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না!

তা কথাটা আমারও দিব্যি মনে ধরলো। ইতিউতি খুঁজেই দেখি একটি ছোট্ট লেবানিজ রেস্তরাঁ। ভেতরে ঢুকে দু’দুখানা চেয়ার দখল করে বসতেই মধ্যবয়সী মালিক ভদ্রলোকটি এগিয়ে এলেন, মুখে একটা অমায়িক ‘কি খাবেন স্যার’ মার্কা হাসি। বলতেই হলো যে আমরা এপাড়ার লোক নই, একটু দেখেশুনে কিছু খাওয়ালেই হলো, শুধু সঙ্গে যেন ভালো হুইস্কি থাকে, আর হ্যাঁ, আমরা বিফ খাই না।

মুখের হাসিটি অমলিন রেখে ভদ্রলোক শুধোলেন, কোন পাড়া? বলতেই হলো ইণ্ডিয়া। ভদ্রলোক স্মিত হেসে জানালেন উনি দেখেই বুঝেছেন ক্যাবলা দুইটি ইণ্ডিয়ান, প্রশ্ন আরো গভীর, ইণ্ডিয়ার কোথায়? আমরা তো মাইরি হেব্বি ইম্প্রেসড। আমি কিছু বলার আগেই আনন্দ ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর অনিন্দ্যসুন্দর বিহারি ইংরেজিতে গুছিয়ে জানালো এক মক্কেল বেঙ্গলের, আরেকজন বিহারের, উনি কি চেনেন? না না, মক্কেলদের নয়, জায়গাদুটিকে?

ভদ্রলোকের স্মিত হাসিটি চওড়া হলো, জানেন বৈ কি। জানা গেলো ইনি পাকিস্তানের, বছর ত্রিশেক আগে দেশান্তরী হয়ে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছেন, আর কোনদিনই ফিরে যান নি। তবুও প্রায়-দেশোয়ালি লোক দেখলেই এখনো দিব্যি আনন্দ পান,সোয়াত উপত্যকার হিমেল হাওয়ার স্রোত এখনো বুকের মধ্যে খেলে যায় নিরন্তর।

জীবনে সুখাদ্য কম খাইনি। কিন্তু সেদিন সেই পাকিস্তানি রেস্তরাঁতে বসে হুইস্কি আর আড্ডা সহযোগে খাওয়া একটি লেবানিজ ডিশ, শোওয়ারমা সেই সুতনুকার নাম, আমার কাছে এখনো সুজাতার পায়েস হয়ে আছে। শুধু কি রান্না? নাকি ফেলে আসা সোয়াত উপত্যকার হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসা কিছু স্মৃতি, প্রায়-দেশোয়ালি ভাইদের জন্যে কিছু ভালোবাসাও মিশে গেছিল তার সঙ্গে?

তা খেয়েদেয়ে ভদ্রলোককে যারপরনাই ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে হেঁটে আসছি, আনন্দ ভারি হাসিমুখে জিগাইলো, স্টেশনে যাচ্ছি কেন? বোকা বোকা প্রশ্ন শুনলে রাগ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, খেঁকিয়ে বল্লুম হোটেলে ফিরবি না? আনন্দের মুখে হাসিটি কিন্তু প্রায় তুরীয়মার্গের, আমাকে মিষ্টি করে শুধলো, আমার হাতে কি ঘড়ি নেই? আমিও ততোধিক মিষ্টি করে ঘড়ির সঙ্গে স্টেশনের কি সম্পর্ক শুধোতে যাবো, এমন সময়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি,

সর্বনাশ!!! রাত আড়াইটে!! টিউব বন্ধ। এখন উপায়???

রাস্তাঘাটে ট্যাক্সি চলছিল বটে, কিন্তু আনন্দের নিজের বয়ানে, ও একবার এরকমই এক অভিশপ্ত রাতে সোনাগাছি থেকে মদনাভিসার সমাপ্ত করে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরেছিল সল্ট লেক যাবে বলে। সে ট্যাক্সি তাকে ধর্মতলা হয়ে, রেড রোড ধরে, দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়ে, সাঁতরাগাছি হয়ে, বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে সল্ট লেকে নিয়ে এসেছিল, সাড়ে আটশো টাকা ভাড়া দিয়ে। আনন্দ একটু বোকা বটে, কিন্তু প্যারিসে এসে উল্লু হবার কোন সদিচ্ছেই ওর নেই,তাতে লোকে ওকে কায়ের বা ডরপোক যা খুশি বলুক। আর সাড়ে আটশো ইউরো ট্যাক্সিভাড়া উঠলে কি কি বেচলে সেই টাকাটা জোগাড় হবে সেটা যেন আমি আগে থাকতে ভেবে রাখি। রাজপুতের ছেলে সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু বিদেশবিভূঁইতে এসে বেকার হ্যাঙ্গামে কিছুতেই জড়িয়ে পড়তে রাজি নয় ইত্যাদি ইত্যাদি…

অতএব,তিন সাড়ে তিনঘণ্টা ঘন্টা ওখানেই কাটানো ছাড়া আর কি উপায় থাকতে পারে? তবে ভরসা একটাই পিগালে রাত তখনো, যাকে বলে স্টিল ইয়াং। এদিকওদিক চাইতে চাইতে দেখি,

উরিত্তারা, তিনতলা একটি সেক্স শপ!!

এখন সেক্সহিপোক্রিট দেশের বুভুক্ষু মানুষ আমরা, এসব দেখলে চাপা দেওয়া লিবিডোর তাড়নায় ঢুকতেই হয়, এবং ঢুকে পড়েই হাঁ হয়ে যেতেই হয়। যেসব জিনিস আজ অবধি শুধু বিচিত্র সব পর্নো মুভিতে দেখেছি, সেইসব নিষিদ্ধ বস্তু দেখি থরেথরে সাজানো। শারীরিক আনন্দের জন্যে মানুষের ক্রিয়েটিভিটি কি পর্যায়ে যেতে পারে ভেবেই মাথাটা শ্রদ্ধায় ও রোমাঞ্চে নত হয়ে এসেছে, চোখে জল আসি আসি, এমন সময় তাকিয়ে দেখি আমাদের ঠাকুর সাহেব যাকে বলে ভেরি ভেরি বিজি! তিনি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে অভিনিবেশ সহকারে প্রতিটি বস্তু দেখে, ধরে, টিপেটুপে, নাড়িয়ে, শুঁকে একেবারে যাকে বলে রীতিমতো পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন। একবার তো দুই বিদেশিনীর প্রতি উতলা হয়ে ছুটেই যাচ্ছিলেন, ওনাদের সদ্য কেনা বস্তুগুলির দ্রব্যগুণ ও ব্যবহারবিধি সম্যকরূপে বুঝে নেবেন বলে! সেযাত্রা পাবলিক প্যাদানির ভয় দেখিয়ে সেই বিহারনন্দনকে তার বিপুল জ্ঞানান্বেষণের পথ থেকে টেনে আনতে বাধ্য হই!!

ঘন্টাদুয়েক বাদে বেরিয়ে এদিকওদিক হাঁটতে লাগলুম। তখন রাত অনেকটাই ঘন হয়ে এসেছে, লোক চলাচলও কম। এমন সময় দুটি বারের মাঝে একটা অন্ধকার গলিপথ দেখে ভাবলাম দেখাই যাক কি আছে। টাইম তো হ্যাজ!

ঢুকেই বুঝলাম জায়গাটা খুব সুবিধের নয়। গলিটা শুধু আঁধারই নয়, নোংরাও বটে। আর গলিপথবাসী বা বাসিনীদের রকমসকমও খুব সুবিধের নয়। ছোটখাটো পোষাক পরা, উগ্র মেকআপ করা এই মুখগুলো বোধহয় হাড়কাটা গলি থেকে প্যারিসের রাজপথ, সর্বত্র একইরকম দেখায়। যথারীতি তেনারা নতুন শিকারের খোঁজে এগিয়ে এলেন। আনন্দবাবুর বোধহয় ভূমানন্দের সুখ নিতে বিশেষ আপত্তি ছিল না, কিন্তু আমার নজর পড়েছে তখন আরেকটু এগিয়ে, দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি একটা ছোট আগুন ঘিরে বসে কয়েকজন বেশ উদাত্তস্বরে গান ধরেছে।

ছোট আগুনের কুণ্ডলী, ঘিরে বসে কয়েকজন ছেলেমেয়ে। সবার হাতেই ঘুরছে বিয়ারের ক্যান আর সিগারেট। পিছনে একজনকে একটা রাংতা থেকে সাদা সাদা কিছু গুঁড়ো নাকে টেনে নিতেও দেখলাম। শুধু একজনের হাতে ছিল অন্যকিছু, একটা গিটার। সোনালী চুলের রোগাসোগা সেই ছেলেটি গাইছে একটি ফরাসী গান, উত্তাল তার ছন্দ, বলিষ্ঠ তার গায়কী। আশেপাশের সবাই দেখলাম জোরসে মাথা ঝাঁকাচ্ছে আর সমে এলেই সমস্বরে চিৎকার করে উঠছে তাল মিলিয়ে, অনেকটা সেই ”পেয়ার হামে কিস মোড় পে লে আয়া” র মতন, ”ইয়ে দিল করে হায়” এর পরের হায়’টাতে না চেঁচিয়ে এই গান কাউকে উপভোগ করতে দেখিনি। এও প্রায় তার কাছাকাছিই। সবাই নেশায় বুঁদ। আমরাও দুখানা বিয়ার চেয়েচিন্তে নিয়ে বসে গেলাম। আশেপাশের বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে ফরাসী বেশ্যাদের দল, আগের কাস্টমারকে ছাড়তে বা পরের কাস্টমারকে নিতে। এসে মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে শুনেও যাচ্ছে দুকলি, কারো কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছে সিগারেট, কারো বিয়ারের ক্যানে একঢোঁক চুমুকই দিয়ে গেলো হয়তো। শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই দেখলাম দালাল, কাস্টমার বেরিয়ে এলেই টুক করে গিয়ে দালালিটুকু নিয়ে আসছে বাঁধা মেয়েমানুষটির থেকে।

প্যারিসের মধ্যে এ এক অন্য প্যারিস!

খানিকটা ভোর ভোর হয়ে আসার সময় ”হরি হরি বলো মুখে মিলি বন্ধুগন, শনির পাঁচালি কথা হোক সমাপন” টাইপের সমবেত জয়ধ্বনি দিয়ে আসর ভাঙলো। আমরাও উল্টোপথে হেঁটে পিগালের বড় রাস্তাটা ধরবো, তার দুইপ্রান্তে দুটি টিউবস্টেশন, এমন সময় মিনিট পাঁচেক হাঁটাহাঁটি করে বুঝলাম, কেলো করেছে, রাস্তা হারালুম কি করে?

ছ’টা প্রায় বাজে প্রায়। সকাল সাড়ে দশটা থেকে কনফারেন্স শুরু। আসার সময় আধঘণ্টার বেশি লাগেনি, যেতেও তাইই লাগবে, কিন্তু রাস্তাটা তো পেতে হবে!!

এমন সময় সেই দোকানটা চোখে পড়লো, যেটা দেখে আমি বা আনন্দ ঠাকুর, আমরা কেউই প্রথমে কিছু বুঝিনি।

কোকাকোলার সাইনবোর্ডের নিচেই এন্ট্রান্স ছিল দোকানটার, দরজাও ছিল খোলা। দেখে বিস্মিতই হলাম, এত সকালে ফরাসীরা দোকান খুলে রেখেছে? শুনেছিলাম তো এরা কুঁড়ের জাত, বাঙালিদের মতই। যাগগে,বিশ্বায়নের বাবাজি যদি সব জায়গায় ঠুল্লু দেখাতে থাকেন, ফ্রান্সই দোষ করলো কিসে? ইত্যাদি উচ্চাঙ্গের ভাবনাচিন্তা করে ঢুকে দেখি, বাহ, এতো ব্যুটিক সালোঁ হে!! চমৎকার সাজানো ইন্টিরিয়র। ব্যবস্থা অবিশ্যি ছোটই, নিচু কয়েকটা চেয়ার,আর একটা কাঁচঢাকা টেবিল। দোকানের কোনে একটা চিনেমাটির ফুলদানি। দেওয়ালে ঝুলছে মুঙখের স্ক্রিম আর গঘের স্টারি নাইটসের কপি,সব মিলিয়ে একটা দিব্যি পরিচ্ছন্ন রুচির ছাপ স্পষ্ট।

তা রেস্তরাঁর তারিফ টারিফ করছি, এমন সময়ে পেছনে একটা ”হেললো” শুনে তাকিয়ে দেখি মধ্যবয়সী ওয়েট্রেস এসে হাজির, চোখে সামান্য বিস্ময়। খুবই স্বাভাবিক, দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গেই কাস্টমারের ভীড় লেগে গেলে তো…. সে যাগগে, আমি তো স্মিত মুখে ‘বঁজু মাদাম, দুকাপ কড়া করে কফি পাওয়া যাবে? আর সিগারেট? একটু হাত চালিয়ে দেবেন প্লিজ, তাড়া ছিল’ বলে অর্ডার প্লেস করে দিলুম। মহিলাটি কি ভেবে ভেতরে চলে গেলেন।

বসে বসে আমরা দুইজনে গজল্লা করছি, এমন সময়ে সেই ওয়েট্রেস ভদ্রমহিলা একটা ট্রেতে ধুমায়িত দু কাপ কফি এনে হাজির। সঙ্গে এক প্যাকেট উৎকৃষ্ট সিগারেট। নাম মনে নেই, পরে খেয়ে বুঝেছিলুম এ রীতিমতো উচ্চাঙ্গের জিনিস। তা মহিলাটির পরে পরেই বিশালদেহী গুঁফো যে ভদ্রলোক ঢুকলেন, অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে ইনিই এই সালঁর মালিক। তিনিও বঁজু বলে অভিবাদন করলেন, আমরাও মাথা নেড়ে বঁজু বলে উত্তর দিলুম। ভদ্রলোকটি তাঁর বিশাল শরীর নিয়ে এক কাঠের চেয়ারে বহু কষ্টে অধিষ্ঠান হলেন, তারপর পকেট থেকে একটা পাইপ ধরালেন,তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে ভাঙাচোরা ইংরেজিতে জানতে চাইলেন কোথা থেকে এসেছি, কি কাজ, কদ্দিন আছি, কি করে এই সালঁর খোঁজ পেলাম ইত্যাদি। আমরাও গড়গড় করে আমাদের জাত কুল ঠিকুজি, মায় গতরাতের নৈশসফরের কথা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলুম। ভদ্রলোক দেখলুম বেশ রসিক লোক। থেকে থেকেই অট্টহাসিতে ঘর কাঁপিয়ে তুলতে লাগলেন। আর মধ্যে মধ্যে কিছু আদিরসাত্মক ফোড়ন। সকাল সাড়ে ছটার পক্ষে আদিরস একটু আর্লিরস বুঝি, তবে আড্ডাটা দিব্য উপভোগ্য হচ্ছিল বলে আমরাও বেশ তালেতাল দিয়ে চলছিলুম। ওয়েট্রেস মহিলাও দেখলাম মালিকের কথা শুনে বেশ মিটিমিটি হাসছেন।

তা সেই দুর্দান্ত ভালো কফি শেষ হতে আমরা আরও দুকাপ অর্ডার করলুম। ভদ্রমহিলাও বেশ শশব্যস্ত হয়ে ভেতরে চলে গেলেন। ততক্ষণে দুজনেই বেশ চনমনে হয়ে উঠেছি। ভদ্রলোক আমাদের নাম, বয়েস ইত্যাদিতে জিজ্ঞেস করা অবধি নেমে এসেছেন দেখে ভারি আপন আপন ফিল করতে লাগলুম। দেশে তো এইরকমই হয়, সামান্য আলাপেই লোকজন মাইনে, বাবার প্রস্টেট, শ্বশুরমশাই মারা গেলে সম্পত্তির কত অংশ পাবো, মেয়ের বিয়ের জন্যে কত ভরি সোনার গয়না জমিয়েছি, মায় অ্যাপেন্ডিক্সের সাইজ অব্ধি জিজ্ঞেস করে নেয়! ইওরোপীয়রা সেদিক দিয়ে অনেক সভ্য। তার পরেও যখন ইনি বয়েস, নাম ইত্যাদি অবধি নেমেছেন, এবং মেয়ের বিয়ে দেবার চক্কর নেই, নিশ্চয়ই সেটা নিজের বলে ভেবেছেন বলেই।

তা ইতিমধ্যে দ্বিতীয় কাপও এসে গেছে। আমরাও সেই দুরন্ত ভালো কফি শেষ করতে করতে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় দেওয়াল ঘড়ির দিকে চোখ গেলো।

আটটা বাজে, কি সর্বনাশ!!!

চকিতে বাকি কফিটা গলায় ঢেলে ভদ্রমহিলাকে বললাম, ‘খুব ভালো কফি খেলাম মাদাম, বিলটা আনুন প্লিজ, উঠতে হবে’।

এবার মাদাম আর মঁসিয়ে দুজনেই একে অন্যের দিকে তাকালেন, তারপর দুজনেই মৃদু হেসে জানালেন আমাদের পেমেন্ট করার দরকার নেই!!

অ্যাঁ, সে আবার কি?

এবার আমাদের বিব্রত হবার পালা। তা কি করে হয় মঁসিয়ে, আপনাদের সেবাযত্ন, যাকে বলে, হৃদয়ে রহিল গাঁথা, কিন্তু এত্ত উদার হলে আপনাদের রেস্তরাঁই বা চলবে কি করে, অ্যাঁ?

এবার দুজনেরই মুখের হাসি আরও চওড়া হলো, মহিলাটি স্মিত হেসে জানালেন, মঁসিয়ে স্যারক্যার, এটা রেস্তরাঁ নয়।

তখন আমাদের মনের অবস্থা, সংস্কৃতে যাকে বলে, অবর্ণনীয়!! রেস্তরাঁ নয়? মানে? সক্কালবেলা এসবের মানে কি, অ্যাঁ?

এবার বিপুলদেহী ভদ্রলোকটির হা হা অট্টহাসিতে চারিদিক সচকিত হয়ে উঠল, ওঁরা প্রথম থেকেই বুঝতেই পেরেছিলেন যে দুটি বিদেশী ভুল করে রেস্তরাঁ ভেবে ঢুকে পড়েছে। ওঁরাও এতক্ষণ তেড়ে কৌতুক উপভোগ করছিলেন, আমরা যে বুঝতেই পারিনি তাতে ভারি আমোদ পেয়েছেন। তবে সত্যিই এটি কোন রেস্তরাঁ নয়, রীতিমতো ভদ্রাসন!

আমাদের মনের অবস্থা বলে আর আপনাদের আর বিব্রত করবো না। শুধু পুরো ঘেঁটে যাওয়া মুখে একবার শুধোলাম, সব জেনেও আমাদের অ্যামন মুরগি করার কারনটা জানালে একটু সুস্থ হৃদয়ে দেশে ফিরে যেতে পারতুম আর কি!

ভদ্রমহিলা দেখলাম মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন। পরিস্থিতি আচমকা বেদম গম্ভীর। গলা খাঁকারি দিয়ে সেই বিশালবপু ভদ্রলোকটি জানালেন, ঠিক আমাদের বয়েসী দুটি ছেলে ছিলো ওঁদের। বছর পাঁচেক আগে আল্পসে স্কিইং করতে গিয়ে হারিয়ে যায়, আর ফিরে আসেনি। বুড়োবুড়ি এখনো আশা করেন কোথাও না কোথাও ওরা সুস্থ শরীরে বেঁচেবর্তে আছে, হয়তো স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে। একদিন নিশ্চয়ই, রাস্তা খুঁজে ফিরে আসবে তারা, শীতের শেষে যেমন ফিরে আসে পরিযায়ী পাখিরা।

আশায় বেঁচে আছেন ওঁরা, এখনো।

বেরিয়ে এসে দেখি প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনেই কোকা কোলার বিজ্ঞাপন।

টিউবে করে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম চুরি করে যশোদার মাখন খেয়ে যাওয়া নিয়ে এত কানুগীত লেখা হয়েছে, মাখন খাইয়ে যশোদামায়ের আনন্দ নিয়ে কেউ কিছু গান লেখেনি কেন?

প্যারিস হোক বা বৃন্দাবন…. মায়েরা তো…

আনন্দের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালাম, একটা দুর্দান্ত সফরের জন্যে এসেছিল বেচারি।

কে জানতো, সব সফর শেষে তেমন সুহানা হয় না মঁসিয়ে!
Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *