০৬. আকবরের আমলে রাষ্ট্র ও প্রশাসন

ষষ্ঠ অধ্যায় – আকবরের আমলে রাষ্ট্র ও প্রশাসন

আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি কীভাবে চতুর্দশ শতক থেকে, মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় এক নতুন উদারনৈতিক ভাবনার উত্থান ঘটেছিল এবং কীভাবে তা তৈমুরের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়েছিল। যদিও তৈমুরের উত্তরসূরিরা নিজেদের কট্টর মুসলিম শাসক হিসাবেই তুলে ধরতে চাইতেন, তাঁরা চেঙ্গিজের ‘ইয়াসা’ ত্যাগ করতে কোনোমতেই ইচ্ছুক ছিলেন না, তবুও তাঁদের এই বিশ্বাস ছিল যে সকল সম্প্রদায়ই সমান এবং একে অপরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য করা একেবারেই উচিত নয়।তৈমুরীয়রা এটাও বিশ্বাস করতেন যে তাদের শাসন করার স্বর্গীয় এক অধিকার আছে এবং তা এতটাই সর্বজনগ্রাহ্য যে, কোনো অধস্তন বেগ সিংহাসনে বসার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এই ভাবনা প্রত্যেক তৈমুরীয় শাসককে শাসন করার ক্ষমতায় অতিরিক্ত একটা স্থায়িত্বের মনোবল জোগাত। এই সব ভাবনা ও ঐতিহ্যই বাবর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময়ে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন হুমায়ুন।

ভারতেও পঞ্চদশ শতকে উদারপন্থী সুফি সংগঠনগুলির সহনশীলতা ও ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, প্রেম প্রথাগত পূজার্চনার চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিল এবং বিভিন্ন ধর্ম ভাবনায় বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে বিদ্বেষভাবে কমে গিয়েছিল। কবীর, রায়দাস ও নানকের মতো ভক্তি সাধকেরা জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আরাধ্য প্রভুর প্রতি ভক্তির মধ্যে একটা একতার সুর নির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন। এই সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রাদেশিক সাম্রাজ্যেও রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদে হিন্দুদের নিয়োগ করা হয়েছিল, বৃহত্তর ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি সাধারণভাবে রাষ্ট্রের তরফে গ্রহণ করা শুরু হয়েছিল এবং স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্যে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল।

বৈরাম খানের শাসনের পর এই মুক্ত ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে আকবর তার রাজ্য শাসন ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন।

আকবরের রাষ্ট্র শাসনের ধারণা

আকবরের ধর্মীয় ভাবনা ও তাঁর রাষ্ট্র শাসনের ধারণা বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন তার জীবনীকার আবুল ফজল। আবুল ফজলের মতে, ‘রাজধর্ম হল পরমেশ্বরের দ্যুতি এবং সূর্যের উৎসারিত আলো।’ এই আলোকে বলা হত ফইজিদি (নৈসর্গিক আলো) এবং তা কোনোরকম মধ্যবর্তী যোগসূত্রকারীর সহায়তা ছাড়াই পরমেশ্বরের থেকে রাজার মধ্যে সঞ্চারিত হত আর সেই আলোর ছটায় রাজার সামনে সবাই অবলীলাক্রমে মাথা নত করত।

এভাবেই রাজধর্ম ও রাজকর্ম পরিণত হল স্বর্গীয় এক আশীর্বাদে। শাসককে এর জন্য উলেমার ওপর নির্ভর করতে হত না। শাসকের কাছে এই ঐশ্বরিক আশীর্বাদ থাকার ফলে সকলেই তার সামনে বশ্যতা স্বীকার করত। তবে এই শাসনের ধারণা একেবারে নতুন ছিল না। এটা আসলে প্রাক-ইসলামীয় ইরানের সাসানীয় রাজবংশের শাসনের ধারণা থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং বলবনও তার রাজত্ব পরিচালনার সময়ে এই ইরানীয় শাসনের ধারণা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কিন্তু আবুল ফজল এই পুরোনো ধারণার সঙ্গে মুসলিম ও হিন্দু রাজত্ব ভাবনার কিছু বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাই তার বর্ণনায় ফর-ই-ইজিদিতে আলোকিত শাসকের অন্তরে জাগরিত হত প্রজাদের প্রতি পিতৃসুলভ অনুরাগ, তার হৃদয় ভরে উঠত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সাহসিকতা ও দৃঢ়তায়, যা ছোটো-বড়ো সবরকম প্রত্যাশাই পূরণ করতে উগ্রীব হয়ে উঠত, ঈশ্বরের প্রতি প্রতিদিন বৃদ্ধি পেত বিশ্বাস, বাড়ত ভক্তি ও প্রার্থনা–যাতে শাসক কোনোরকম বিশৃঙ্খলায় বিচলিত না হয়ে স্বেচ্ছাচারীকে শাস্তি দিতে পারেন। এবং যুক্তি ও সংযমের শাসন করতে পারেন।

আবুল ফজলের রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে বুঝতে গেলে তার সমাজ ও ধর্মীয় আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনাগুলোকেও বুঝতে হবে। শুধু প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যই নয়, জালালুদ্দিন দাওয়ানীর মত মুসলিম চিন্তাবিদদের দ্বারাও প্রভাবিত হয়ে আবুল ফজল মানব সমাজকে চার স্তরে ভাগ করেছিলেন, যেখানে প্রথম স্তরে ছিল যোদ্ধারা, দ্বিতীয় স্তরে কারিগর ও বণিকরা, তৃতীয় স্তরে জ্ঞানীগুণী মানুষজন এবং এবং চতুর্থ স্তরে ছিল কৃষক ও শ্রমিকরা। ধর্মশাস্ত্রে যেখানে প্রথম ভাগেই জ্ঞানীগুণীদের রাখা হয়েছিল সেখানে আবুল ফজল তার সামাজিক স্তর বিন্যাসে তাদের সরিয়ে রাখলেন । তৃতীয় ভাগে। আসলে তিনি এইসব দাম্ভিক ও একগুঁয়ে শ্রেণিকে সামাজিক স্তরের নিচের দিকেই রাখতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি সে সময়কার বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করতে পারেননি। গ্রিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে আবুল ফজল গুণাগুণ অনুসারে মানবজাতিকে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন, যথা–অভিজাত, নিচু ও মধ্যবর্তী শ্রেণি। অভিজাত বলতে তিনি সেইসব মানুষকে বুঝিয়েছিলেন যাঁদের নিখুঁত জ্ঞান, বিচক্ষণতা, প্রশাসন পরিচালনা, গঠন বা বাকপটুতার ক্ষমতা এবং সামরিক কর্তব্য পালনের সাহস রয়েছে। নিচু ও মধ্যবর্তী শ্রেণির মধ্যে তিনি রেখেছিলেন বিভিন্ন ধরনের পেশায় যুক্ত মানুষদের। নিচু বলতে সেইসব মানুষদের তিনি গণ্য করেছিলেন যাদের শস্যভাণ্ডার থাকা সহ মানবজাতির সকল প্রকার সমৃদ্ধির অধিকারী হওয়া মানা, যাদের ভঁড়ামো করার মতো সকল মানবিক গুণাবলী অধিকারী হওয়া বারণ, আর বণিক ও ব্যবসাদার যেমন নাপিত, চামড়ার ব্যবসায়ী, ভেল্কিবাজ বা ঝাড়ুদার প্রভৃতি যাদের দেখে সকলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই শ্রেণির মধ্যে কসাই ও ধীবরদের মতো প্রাণ নেওয়ার জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও রেখেছিলেন তিনি। এদের জন্যে শহরের পৃথক আবাসের ব্যবস্থা থাকত এবং ভয় দেখিয়ে অন্যদের সঙ্গে। মেলামেশা করতে নিষেধ করা হত। এই শ্রেণি চিহ্নিত হত খারাপ স্বভাব ও আচরণের জন্যে।

মধ্যবর্তী শ্রেণি গঠিত হয়েছিল একাধিক ব্যাবসায়িক পেশায় যুক্ত মানুষ ও বণিকদের নিয়ে। এদের মধ্যে কয়েক জন কৃষি ও অন্যান্য জরুরি পেশার লোক যেমন থাকত তেমনি কাপড়ে রং করা, কাঠের কাজ করা, লোহার কাজ করা, স্কেল বা ছুরি বানানোর কাজ করা কারিগরাও থাকত। এছাড়াও মধ্যবর্তী শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল সেইসব মানুষদের যারা সৌন্দর্য সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞানের অধিকারী ছিল আর যারা সকলের সঙ্গে খুব উদার ভাবে কথা বলতে পারত।

মানবজাতি সম্পর্কে আবুল ফজলের এই ভাবনা, বিশেষ করে নিচুতলার মানুষ ও অবহেলিত মানুষদের যেভাবে তিনি দেখেছিলেন, তা ছিল আসলে সে সময়ের নিচুতলার মানুষের প্রতি উঁচুতলার মানুষের ধারণার প্রতিফলন। এখানে যেভাবে নিচুতলার মানুষদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হওয়া থেকে বঞ্চিত করে রাখার কথা ফুটে উঠেছে তাতে পরিষ্কার যে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কেবল সমাজের সেইসব মানুষদের জন্যেই কাজ করত যারা ছিলেন অভিজাত পরিবারের ও উঁচু জাতের সদস্য। সমাজের খারাপ ও নিচু শ্রেণির অস্তিত্ব এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার একমাত্র দায়িত্ব রাজার হাতে থাকার কথা সেখানে থাকায় এটাই প্রমাণ হয় যে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্বৈরাচার বর্তমান ছিল। দ্বিতীয়ত, ফ-ই-ইজিদিতে আলোকিত রাজার পক্ষে সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি ছিল, তাই কখনোই ‘শ্রেণি বিবাদের কলঙ্ক’ রাষ্ট্রের গায়ে মাখতে দিতে চাইতেন না রাজা। এছাড়া এই প্রত্যেক শ্রেণিকে তাদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা এবং তাদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধা অনুসারে তাদের একত্রিত করে পৃথিবীকে বিকশিত করে তোলা ছিল রাজার ‘অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তাই স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেলে, এমনকি সসম্মানে বাঁচতে পারলে তবেই জীবনে সব সময় সঠিক রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় বলে মত আবুল ফজলের। আকবর বলতেন যে, ‘দারোগা’কে সদা সতর্ক থাকতে হবে যাতে ‘কেউ লোভের বশবর্তী হয়ে তাদের পেশা না পরিবর্তন করে ফেলে।’ অন্য সূত্র থেকে জানা যায় যে আকবর এই উক্তিটি করেছিলেন শাহ তাহমাসপের একটি বক্তব্যকে অনুমোদন দিয়ে, আর সেই বক্তব্যটি ছিল এইরকম—’যদি একজন দাস লেখাপড়া শিখে ফেলে, তাহলে সে তার সেবা করার কাজ ছেড়ে দিয়ে পড়াশোনাতেই মেতে যায়।’

সমাজের শ্রেণিবিভাগের ব্যাপারে এই কড়া মনোভাব সত্ত্বেও আবুল ফজল কিন্তু রাজার জাতি বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিভা ও দক্ষতার ভিত্তিতেই শাসন পরিচালনায় দক্ষ লোকদের বেছে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাই তিনি বলছেন যে আকবর সময়ের তুলনায় অনেকখানি এগিয়ে ভেবেছিলেন এবং তিনি মানুষের প্রতিভার মূল্য বুঝতেন এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের যোগ্যতা অনুসারে তাদের সম্মান দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ও সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করেছিলেন। আর অনেককেই নিছক সাধারণ সৈনিক থেকে তুলে এনে উচ্চ পদে বসিয়েছিলেন। আকবরের শাসনের ৪২ তম বর্ষে বা ১৫৯৭-৯৮ সালে যখন আকবর যুবরাজ দানিয়ালকে এলাহাবাদে প্রেরণ করেছিলেন তখন তিনি তাকে উপদেশ দিতে গিয়ে এই ভাবনার ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন, প্রত্যেক) অভিজাতদের জাতি ও উচ্চবংশের বিচার তার ব্যক্তিত্বের নিরিখে করবে, তাদের পূর্বপুরুষের মাহাত্ম্য বা বংশের শ্রেষ্ঠত্বের নিরিখে নয়।

‘রাষ্ট্র ভাবনার ক্ষেত্রে আবুল ফজলের মূল ধারণাটা গড়ে উঠেছিল উচ্চ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণসম্পন্ন এমন এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শাসকের উদারনৈতিক সর্বেশ্বরবাদী শাসনের ওপর ভিত্তি করে যেখানে সম্রাট সরাসরি ঐশ্বরিক আদেশে পরিচালিত হতেন, আইনি বৈধতার জন্য তাকে কোনো ধর্মীয় নেতার ওপর নির্ভর করতে হত না। যদিও আবুল ফজল পুরোনো ইরানীয় ঐতিহ্যের আলোকে তার এই রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ভাবনাকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, তবুও সেখানে যেভাবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে গড়া জটিল শাসকশ্রেণি সম্বলিত এবং সেকুলার রাজনীতি ও ধর্মীয় ভাবনার মিশেলে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল, যেভাবে সেখানে বংশানুক্রমিক ধারার অবস্থান এবং জন্ম, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান বিচারের ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রজাদের । প্রতি মানবিক আচরণের তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছিল তা যে সেই সময় সমগ্র এশিয়া তথা ইউরোপে প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোর থেকে অনেক আধুনিক ও উন্নত ছিল সে ব্যাপারে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই। মজার ব্যাপার যে এখানে আবুল ফজল তার সময়ের রাষ্ট্রনীতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে কোথাও দার-উইসলাম বা দার-উহার্ব এই কথাটি ব্যবহার করেননি কারণ এই ধরনের বৈশিষ্ট্য খুব অর্থবহ ছিল তার কাছে, বিশেষ করে এই পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি যখন জিজিয়া কর রদের কথা বলেছিলেন। তিনি তাঁর এই ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আমাদের যেন বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন যে আকবরের রাজ্যজয় আসলে তার নিজ কর্তৃত্বের আস্ফালন ছিল না, বরং তা ছিল। সুবিচার ও সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করে এক সর্বভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার। বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশমাত্র; অর্থাৎ অন্যভাবে বললে এটা ছিল আকবরের সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার একটা অংশ যাকে বলা যায় দারউলসুলহ

রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা–কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক

যে মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থা আকবর উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন তা মূলত দিল্লির পূর্বতন সুলতানি রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছিল। বাবর বা হুমায়ুন–কেউই এই ব্যবস্থাকে নতুন করে পরিমার্জন ও সংশোধন করার সময়। ও সুযোগ পাননি। তবে এই ব্যবস্থায় একটা গতি এনেছিলেন শের শাহ। এই রকম পরিস্থিতিতে আকবর যখন ক্ষমতা লাভ করে এই ব্যবস্থাকে পরিচালনা করার সুযোগ পেলেন তখন তিনি অনেকটাই পরিণত ও ঝাড়া হাত-পা ছিলেন। একদিকে উজবেক ও মির্জাদের বিদ্রোহ দমন করে এবং অন্যদিকে গুজরাটের মতো এলাকা জয় করে। তিনি এমন একটা অবস্থায় চলে গিয়েছিলেন যেখান থেকে অনায়াসে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নব কলেবরে সাজিয়ে তোলার কাজ করতে পেরেছিলেন তিনি। তার রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার যে ভাবনা ছিল তার বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে বলা যাক। প্রথমত, তিনি এমন ভাবে বিভিন্ন দফতরের কাজ ও দায়িত্বকে বণ্টন করেছিলেন যাতে কোনো দফতর একে অপরের কাজে হস্তক্ষেপ না করেও সহজে প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকে ভারসাম্য ও সহযোগিতা বজায় রাখতে পারে। এভাবেই আকবর এমন একটি নিয়ন্ত্রিত ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ আমলাতন্ত্রের উদ্ভাবন করেছিলেন যা মুঘল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নব প্রাণের সঞ্চার করেছিল।

আকবর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় খুব একটা পরিবর্তন আনেননি। সরকার ও পরগনাগুলি আগের মতোই চলছিল, শুধু কিছু আধিকারিকের পদমর্যাদায় ঈষৎ বদল আনা হয়েছিল। এখানে আকবরের যে অবদানটা ছিল তা হল তিনি কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার ধাঁচে প্রদেশের প্রশাসনকেও গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রাদেশিক ও জেলা স্তরের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অভিন্ন নিয়মকানুন রচনা করা হয়েছিল। আবুল ফজলের আইনআকবরী থেকে আমরা এ ব্যাপারে কিছু ধারণা লাভ করতে পারি। এই নতুন নিয়মকানুনগুলো পরবর্তীকালে দস্তুর-উআমল বা সাধারণ নিয়ম পুস্তিকাগুলোয় (Rule Books) সংকলিত করা হয়েছিল। এভাবেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবে আমলাতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছিল, যদিও শাসনের রাশ ছিল সম্রাটের হাতেই।

ওয়াকিল

ভারতের বাইরে বিভিন্ন ইসলামীয় রাষ্ট্রে তথা দিল্লি সুলতানিতে শাসন ব্যবস্থায় একাধিক দফতরের অস্তিত্ব থাকলেও মধ্য এশীয় ও তৈমুরীয় ঐতিহ্যে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একজন মাত্র উজিরের কথা জানা যায় যিনি একা হাতে রাজস্ব ও সামরিক বিভাগ সহ শাসন ব্যবস্থার সমস্ত বিভাগের তত্ত্বাবধান করতেন। সে কারণেই বাবরের উজির নিজামুদ্দিন খাজা ছিলেন শাসন ব্যবস্থার রাজনৈতিক তথা আর্থিক প্রধান। অথচ তিনি ছিলেন নিছকই একজন সামরিক ব্যক্তি যিনি বাবরের নানা সামরিক বিষয় দেখাশোনা করতেন, এমনকি বাবরের হয়ে পানিপথ ও খানুয়ার যুদ্ধে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বও দিয়েছিলেন। হুমায়ুনের উজির ছিলেন আমির ওয়াইস ও হিন্দু বেগ। এরাও নিছক সামরিক ব্যক্তি হয়েও রাষ্ট্র শাসনের সমস্ত ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন।

মুঘল সম্রাটের ওয়াকিল তথা আতালিক (অভিভাবক) হিসাবে বৈরাম খাঁর নিয়োগের পর থেকে একটা নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তিনি নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে উচ্চপদের আধিকারিকদের নিয়োগ ও পদচ্যুত করা, এমনকি রাজস্ব ও সামরিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ সহ সাম্রাজ্যের সব ক্ষমতাই ভোগ করতেন। তাই ওয়াকিল হিসাবে বৈরাম খাঁ সে সময় একজন সর্বশক্তিমান উজিরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলা যায়।

কিন্তু আকবর সিংহাসনে আসীন হয়ে এই পরিস্থিতি যাতে আর তৈরি না হয় সেদিকে নজর রেখেছিলেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। আমরা দেখেছি কীভাবে বৈরাম খাঁর কয়েকজন উত্তরসূরি মাহাম আনাগার সঙ্গে মিলিত হয়ে বৈরাম খাঁর মতোই ক্ষমতা ভোগ করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আটকা খানকে খুন করার অপরাধে যেভাবে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে অধম খানকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল তা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আকবর কোনোমতেই ওয়াকিলিয়তকে বিচ্ছেদের রাজনীতির আঁতুড়ঘর হিসাবে গড়ে উঠতে দিতে রাজি ছিলেন না।

মুনিম খানকে এরপর ওয়াকিল পদে নিয়োগ করা হলেও তিনি সেই একই ভাবে আকবরের রাষ্ট্র ভাবনার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের প্রশাসনিক বিষয়ের সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন। অবশেষে ১৫৬৪-৬৫ সালে এক ইরানীয় অভিজাত যিনি এক সময়ে বৈরাম খাঁর দিওয়ান ছিলেন, সেই মুজফফর খান তুরবাটিকে সমগ্র সাম্রাজ্যের দিওয়ান হিসাবে নিয়োগ করা হয় এবং টোডর মলকে করা হয় তার সহকারী। কার্যত এর পর থেকেই ধীরে ধীরে রাজস্ব ও সামরিক বিভাগকে ওয়াকিলিয়ত মুক্ত করা শুরু হয়। ১৫৬৭ তে উজবেকদের বিদ্রোহ দমন করার পর মুনিম খানকে প্রথমে জৌনপুরে ও পরে বিহারের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাসক হিসাবে নিয়োগ করা হয়। এভাবেই কেন্দ্রীয় প্রশাসনে তার ভূমিকাকে প্রশমিত করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে পরবর্তী সাত বছর আর কাউকে ওয়াকিল পদে নিয়োগ করা হয়নি। পরে আকবরের শাসনের ঊনবিংশতম বর্ষে গিয়ে (১৫৭৫) মুজফফর খানকে একযোগে ওয়াকিল ও দিওয়ান পদে নিয়োগ করা হয়েছিল। তবে এবার থেকে এই পদ কেবল চারহাজারি মনসবযুক্ত সম্রাটের আর্থিক পরামর্শদাতার পদ হিসাবেই থেকে গিয়েছিল। যদিও রাজা টোডর মল ও শাহ মনসুরকে যুগ্ম দিওয়ান হিসাবে নিয়োগ করে ওয়াকিল পদকে সম্রাটের তীক্ষ্ণ নজরদারির মধ্যেই রাখা হয়েছিল। তবে সম্রাটের চব্বিশতম বর্ষে (১৫৭৯) গিয়ে মুজফফর খানকে বাংলার দায়িত্বে স্থানান্তরিত করে দেওয়ায় তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কোনো যোগাযোগই আর থাকেনি। তারপর টানা দশ বছর ধরে (১৫৭৯ থেকে ১৫৮৯) ওয়াকিল পদে আর কাউকে নিয়োগ করা হয়নি। এভাবে একের-পর-এক পদক্ষেপের মাধ্যমে আকবর বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে ওয়াকিল পদটি সম্পূর্ণভাবে সম্রাটের অধীন এবং প্রশাসনের ক্ষেত্রে এই পদের প্রয়োজন অপরিহার্য নয়।

১৫৯৫ সালে আকবরের অন্যতম প্রিয়পাত্র তথা তাঁর বাল্যবন্ধু মির্জা আজিজ কোকাকে ওয়াকিল বানানো হয় এবং আকবরের মৃত্যু পর্যন্ত তিনিই এই পদে আসীন ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত প্রভাশালী হলেও মির্জা আজিজ কোকাকে ওয়াকিল। হিসাবে আমরা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখি না। অর্থাৎ পূর্বের মুনিম খানের মতোই তাঁর এই পদ কোনো বিশেষ ক্ষমতা ভোগ বা প্রচুর দরকারি কাজের জায়গা ছিল না, বরং এটা ছিল নিছক রাজকীয় দেখনদারি ও সাম্মানিক একটা ব্যাপার। এক আধুনিক ঐতিহাসিক ইবন হাসান তাই যথার্থ বলেন : ‘(ওয়াকিলের) ক্ষমতা চলে গেলেও তাদের ক্ষমতার দেখনদারি এবং বাহ্যিক সম্মান ও পদমর্যাদা থেকে গিয়েছিল।’

মন্ত্রীমণ্ডল

ওয়াকিল বা সর্বেসর্বা উজিরদের কার্যকলাপ যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল তা আকবর অনেকটাই মোকাবিলা করেছিলেন মন্ত্রীমণ্ডলীকে নতুন করে সংগঠিত করে। চার সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রীমণ্ডলীতে ছিলেন–দিওয়ান বা উজির যাঁর দায়িত্বে ছিল রাজস্ব দফতর, মির বকশি যাঁর দায়িত্বে ছিল সামরিক দফতর, মির সমন যাঁর ওপর ছিল রাজকীয় প্রতিষ্ঠান (মূলত কারখানা) ও রাজপরিবারের দেখাশোনার ভার এবং সদর। যাঁর অধীনে ছিল বিচার ও নিষ্কর (ইনাম) জমি দানের গুরুদায়িত্ব। এই চার সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভার কথা ইবন খালদুনও বলেছিলেন। এই সব দফতরের সমান ক্ষমতা বা কাজ ছিল না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উজিরের পদটি শক্তিশালি ও প্রভাবশালি হয়ে ওঠে এবং মীর বকসি পদটি ও তার কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছেছিল।

দিওয়ান

আবুল ফজলের মতে, যে ব্যক্তি প্রশাসনের আয়ব্যয় দফতরের প্রধান তিনিই উজির বা দিওয়ান। তবে আকবরের সময়ে দিওয়ান বা দিওয়ান-ই-আলা কথাটাই বেশি প্রচলিত ছিল। এর পশ্চাতে অনেক কারণ ছিল। যাই হোক, আকবরের দিওয়ানরা সমাজের খুব নিচু স্তর থেকে উঠে এসে শুধুমাত্র রাজস্ব বিষয়ে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার জোরেই সম্রাটের নজর কেড়েছিলেন। তারা খুব প্রভাবশালী ও সম্রাটের খুব কাছের হলেও সাধারণত তাদের উচ্চ মনসব প্রমাণ করা হত না। আকবরও এ সময় প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ নিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন এবং অনেক সময়েই দুই বা তিন জনকে দিওয়ান হিসাবে নিয়োগ করে দিওয়ান পদের দায়িত্বভার হালকা করেছিলেন।

দিওয়ানের কাজকর্ম সকলেই জানত। এঁরা আর্থিক বিষয়ে সম্রাটের প্রধান সহযোগী এবং রাজকোষের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে সমস্ত হিসাবপত্র দেখাশোনা করতেন। এঁদের রাজনৈতিক ভূমিকাকে উপেক্ষা করে আবুল ফজল এঁদের ‘প্রকৃতপক্ষে হিসাবরক্ষক হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনিই আবার জানিয়েছেন–হিসাব পরীক্ষক বা মুস্তাফি এবং সেনা, রাজদরবার, অন্দরমহল, রাজকীয় কারখানা ও খালিসা জমির দিওয়ান–এরা সকলেই প্রধান দিওয়ানের ‘আদেশ মেনে চলতেন এবং কাজ করতেন।’

 সৈনিকদের থেকে দিওয়ানদের আলাদা করার জন্যে বিশেষ লিখিয়ে সম্প্রদায় বা। আহলকলম-দের থেকে তাদের নিয়োগ করা হত। তবে অনেক সময়েই বিশেষ করে মুজফফর খান যিনি আবার ওয়াকিলের পদও সামলেছিলেন বা রাজা টোডর মলের ক্ষেত্রে সামরিক ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই দিওয়ান পদে নিয়োগ করা হয়েছিল। আসলে এর মধ্যে দিয়ে এটা বোঝানো হয়েছিল যে সে সময় সামরিক ও অসামরিক বিষয়ের মধ্যে কোনো বিভাজন করা হত না।

আকবরের শাসনের নবম বছরে (১৫৬৫) মুজফফর খান তুরবাজির নিয়োগের হাত ধরে দিওয়ান দফতরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এই মুজফফর খান এক সময় বৈরাম খাঁর ওয়াকিল ছিলেন এবং তার পতনের পর মুজফফরকে কারাগারে। বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার যোগ্যতার কথা জানতে পেরে আকবর তাকে মুক্তি দেন এবং পাসরুর পরগনার আমিলহিসাবে নিয়োগ করেন। এরপর তার কাজে খুশি হয়ে আকবর তাকে বায়ুতবা রাজকীয় কারখানার দিওয়ান পদে বসান। তার দক্ষতা। ও যোগ্যতার নিরিখে এই পদ ছিল তার জন্যে একেবারে উপযুক্ত এবং তার প্রভাব দিনদিন এত বাড়তে শুরু করেছিল যে অচিরেই আকবর তাঁকে বিভিন্ন সরকারি আধিকারিক ও মন্ত্রীদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে কাজে লাগান। সাড়ে আট বছর (১৫৬৩-১৫৭২) দিওয়ান পদে থাকাকালীন তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু অফুরন্ত ক্ষমতা তার মাথা বিগড়ে দিয়েছিল এবং ক্রমেই তিনি আকবরের বিরাগভাজন হয়ে উঠেছিলেন। একবার চৌপার খেলার সময় মুজফফর খান আকবরের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। তারপর তাকে মক্কায় নির্বাসন দেওয়া হয়। যদিও মক্কা যাবার পথে তাকে পুনরায় ফিরিয়ে এনে ওয়াকিল পদে নিয়োগ করা হয়েছিল, তবে কিছু আর্থিক ও সামরিক সংস্কারের। বিরোধিতা করার জন্যে সে পদ থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় পরবর্তীকালে।

মুজফফর খান নিশ্চিতভাবে একজন সুযোগ্য দিওয়ান ছিলেন যিনি সাম্রাজ্যের আর্থিক বিভাগের সঙ্গে সাড়ে ষোলো বছর ধরে যুক্ত ছিলেন। এই সময়েই আরও কয়েকজন যোগ্য ব্যক্তিকে মন্ত্রীমণ্ডলীতে যুক্ত করা হয়েছিল যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাজা টোডর মল ও খাজা মানসুর। এঁদের সবাইকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি দক্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত, বিশ্বস্ত ও কর্মঠ আধিকারিক গোষ্ঠী যারা মিলিত ভাবে নতুন। রাজস্ব ব্যবস্থা দহসালা বা দশ বছরি ব্যবস্থা কার্যকর করেছিলেন। তবে মুজফফর খান বাংলার প্রাদেশিক শাসক হয়ে চলে গেলে এই আধিকারিক গোষ্ঠী ভেঙে যায়।

জনশ্রুতি অনুসারে দহসালা ব্যবস্থার সঙ্গে টোডর মলের নাম জড়িত। আমরা সকলেই জানি টোডর মল একজন সামরিক ইঞ্জিনিয়র হিসাবে শের শাহের আমলে দক্ষতার সঙ্গে রোটাস দুর্গ নির্মাণ করে নাম কুড়িয়েছিলেন। শের শাহের রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কারে তাঁর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে এটা জানা যায় যে তিনি ১৫৭৩ সালে গুজরাটের দিওয়ান নিযুক্ত হবার আগে পর্যন্ত অনেক বছর ধরে শের শাহের রাজস্ব দফতরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অচিরেই তাকে কেন্দ্রীয় অর্থ দফতরে আনা হয় এবং ১৫৭৫ সালে তাকে মুসরিফ-ই-দিওয়ান নিয়োগ করা হয়। আবুল ফজলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মুসরিফ-ই-দিওয়ান পদটি দিওয়ান পদের থেকে উচ্চতর ছিল কিন্তু ওয়াকিলের থেকে নিচু পদ ছিল।

টোডর মল ও শাহ মনসুরের যে আধিকারিক গোষ্ঠী ছিল তারা এক সঙ্গে আকবরের সময় মুঘল সাম্রাজ্যকে বারোটা প্রদেশে বিভক্ত করে প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে প্রাদেশিক শাসক (governor) ও দিওয়ান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু শাহ মনসুরই আগে থেকে প্রচলিত দহসালা ব্যবস্থাকে প্রদেশগুলিতে নতুন করে কার্যকর করেছিলেন। টোডর মলকে এই কাজ করতে বলা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তিনি এ সময় বাংলার দায়িত্বে চলে যাওয়ায় তা করতে পারেননি। শাহ মনসুর নতুন অধিকৃত অঞ্চল বাংলা ও বিহারে দাগ ব্যবস্থা বা ঘোড়াদের চিহ্নিতকরণের ব্যবস্থা বলবৎ করতে গিয়ে এত কঠোরতা দেখিয়েছিলেন যে তিনি ক্রমেই অপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ১৫৮১ সালে তার ওপর আকবরের সৎ ভাই মির্জা হাকিমের সঙ্গে গোপন আঁতাত করার মিথ্যা অভিযোগ চাপিয়ে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়। অনেকেই এটা মনে করেন যে শাহ মনসুরের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়ার পিছনে টোডর মলের হাত ছিল। হয় আকবর এ সব জানতেন না বা জেনেও না জানার ভান করেছিলেন। যাই হোক, এর কিছুকাল পরে টোডর মলকে দিওয়ান-ই-আলা পদে নিয়োগ করা হয়। এরপর পরবর্তী দশ বছর যতদিন টোডর মল জীবিত ছিলেন ততদিন ধরে তিনি বাকি এলাকায় দহসালা ব্যবস্থাকে কার্যকর করা ও সেই ব্যবস্থায় বাদবাকি সংস্কার করেছিলেন। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আকবর তার সময়ে এই রাজস্ব ব্যবস্থার প্রচলনে অন্য বহু মানুষের সাহচর্যও লাভ করেছিলেন। মির ফতুল্লাহ সিরাজি ছিলেন এঁদের মধ্যে একজন যিনি আকবরের খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন এবং বেশ কিছুদিন টোডর মলকেও এঁর অধীনে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আকবর।

টোডর মলের মৃত্যুর পর আমরা আর কোনো প্রভাবশালী বড়ো দিওয়ানের কথা জানতে পারি না। তবে এই দফতরের কাজ কি তা এতদিনে মোটামুটি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, ফলে এঁদের থেকে কম দক্ষতার যে-কেউ অনায়াসে এই দফতরের কাজ সামলে নিতে পরতেন।

মোটকথা, আকবর অত্যন্ত দক্ষ ও আর্থিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একটা দল গড়ে ফেলেছিলেন যাঁদের সব রকম সাহায্য ও সহযোগিতা তিনি প্রদান করতেন। তিনি তাদের কাউকে কখনও এটা ভাবার সুযোগ দেননি যে তারা অপরিহার্য। বিশ্বাসের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ সমান্তরাল ভাবে প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। তিনি এই আর্থিক বিশেষজ্ঞদের বরাবরই সামরিক তথা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কাজকর্ম থেকে দূরে। রেখেছিলেন, তাই সম্রাটের সার্বভৌমত্বের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা এবং ষড়যন্ত্রের আঁতুড়ঘরে পরিণত হওয়া উজির পদাধিকারী মন্ত্রীরাও তাদের কাজে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা দেখাতে বাধ্য হতেন। আকবর দিওয়ানদের কাজ ও আনুগত্যের জন্য তাদের সম্মান করতেন ঠিকই কিন্তু কখনও তিনি নিজের আদর্শের সঙ্গে আপস করে এঁদের মাথায় তুলে নেননি, বরং যখনই প্রয়োজন হয়েছে তখনই তিনি এঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। সরকারি উচ্চপদ দখল করা নিয়ে সব সময় ব্যক্তিগত শত্রুতা ও বিবাদ থেকে থাকে, এই সময়েও ছিল–কিন্তু আকবরের সজাগ নজরদারি এসব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি কখনোই এসবের জন্য তার প্রশাসনের কোনো ক্ষতি হতে দেননি।

মির বকশি

মির বকশির পদ সুলতানি আমল থেকে দিল্লিতে কার্যকরী ছিল। বলবনের আমলে এই পদকে বলা হত দিওয়ানি-আর্জ। এ কথা সকলেই স্বীকার করেছেন যে উজিরদের ক্ষমতা সংকুচিত করার জন্য একটি পৃথক সামরিক দফতর গড়ে তোলা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই সৈনিকদের নিয়োগ, ঘোড়াদের তদারকি, নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে বাহিনী পরিদর্শন ইত্যাদি একাধিক কাজের দায়িত্ব সামলানোর জন্য পৃথক সামরিক দফতর চালু করা হয়েছিল। এই দফতরের প্রধান পদ ছিল মির বকশি। মুঘল আমলের মির বকশিরা দিওয়ানি-ই-আর্জ পদের সব ক্ষমতাই ভোগ করতেন, কিন্তু এঁদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি আরও বেশি ছিল কারণ এঁরা আর পাঁচটা অভিজাতের মত কেবল সামরিক পদ বা মনসব পেয়েই ক্ষান্ত থাকতেন না, সেই সঙ্গে বাহিনীতে নিয়োগের জন্য যোগ্য লোকের তালিকা তৈরি করে সম্রাটের কাছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানোর অধিকারীও ছিলেন। এঁরা সামরিক ও অসামরিক কাজে নিযুক্ত সকল মনসবদারদের নথিপত্র জমা রাখতেন। ওয়াকিল, উজির, সদর সহ রাষ্ট্রের সকল উচ্চপদের পদোন্নতির নির্দেশ কার্যকর হত প্রধান বকশির হাত দিয়েই। এঁরা শুধু সামরিক দফতরের প্রধান ছিলেন না, সেই সঙ্গে এঁদের হাতে যুদ্ধের সময় বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বও অর্পিত হত। ঘোড়াদের চিহ্নিতকরণ ও সৈনিকদের নিরীক্ষণের পরে তাদের যথাযথ মনসবদারের হাতে তুলে দেবার কাজও করতে হত বকশিদের। একই ভাবে মনসবদারদেরও যথা সময়ে বকশিদের কাছে এসে তাদের অধীনস্থ সেনা ও ঘোড়াদের পরীক্ষা করাতে হত।

মির বকশিদের কাজ ছিল বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আগত রাষ্ট্রের সকল উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের কাজকর্ম খতিয়ে দেখার জন্য বা তাদের অন্য প্রদেশে বদলি করার জন্য দরবারে হাজির করা। বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত ও বিদেশ থেকে আগত সম্মানীয় পর্যটকদের রাজসভায় আনা ও সকলের সামনে হাজির করানোর দায়িত্ব সামলাতে হত প্রধান বকশিকে।

রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন মির বকশি এবং বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ওয়াকিয়া নবিশরা যে খবরাখবর প্রেরণ করত তা সম্রাটের কাছে এঁরাই পৌঁছে দিতেন।

মির বকশিদের ক্ষমতা আরও বেড়েছিল যখন রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের পরিচালনা তথা তাদের পুরস্কৃত করার সুপারিশ জানানোর অধিকার তুলে দেওয়া হয়েছিল এঁদের হাতে। এঁরা সম্রাটের সফরসঙ্গী হতেন এবং সফরকালে রাজকীয় শিবিরের যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সামলাতেন, বিশেষ করে শিবিরে মনসবদারদের আসন আবণ্টনের কাজ করতে হত এঁদের।

তাই ইবন হাসানের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মির বকশিদের প্রভাব প্রতিপত্তি দফতরের আয়তন ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল এবং দরবারে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ থাকার সুবাদে এঁদের মর্যাদা আরও বেড়েছিল। মুঘল প্রশাসনে উজির ও মির বকশি–এই দুই দফতরই ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ যাদের একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজ করাটা ছিল অত্যন্ত জরুরি। কারণ সকল উচ্চপদে নিয়োগ তথা পদোন্নতি এবং সেই নিরিখে জায়গির প্রদান প্রক্রিয়া এই দুই দফতরের মাধ্যমেই চূড়ান্ত হত।

মির সমন

মুঘলদের মতো পৃথক ঘরোয়া একট দফতর (household deparment) পূর্বতন দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্য বা পশ্চিম এশিয়ার ইসলামীয় দেশগুলির প্রশাসনে দেখতে পাওয়া যায় না। মির সমনদের ওপর রাজপরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল, এঁদেরকেই উজির বা মির বকশির মতো স্বতন্ত্র দফতর হিসাবে বিবেচনা করা হত। আকবরের সময়ে ‘মির সমন’ বা ‘খান-ই-সমন’–এমন কোনো কথা ব্যবহার হত বলে শোনা যায় না। এগুলির কথা জাহাঙ্গির ও শাহজানের আমল থেকেই জানতে পারা যায়। তাই মনে হয় আকবরের আমলে মির সমন পদে কাউকে নিয়োগ করা হত না। বরং সে সময় দিওয়ানবায়ুতাত-দের কথা জানা যায় যাদের ওপর রাজকীয় কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব থাকত। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীন যাবতীয় কারিগরি উৎপাদন কেন্দ্র এবং মজুত কক্ষগুলো একযোগে কারখানা হিসাবে পরিচিত ছিল। এখানে মূল্যবান মণিমাণিক্য, মুক্তো থেকে শুরু করে তরবারি, বন্দুক, কামান পর্যন্ত প্রত্যেকটা জিনিস উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকত দিওয়ানই বায়ুতাত-দের ওপর। এরা সামরিক বাহিনীর জন্য রাখা ঘোড়া ও হাতি, স্থলপথে পণ্য পরিবহণের জন্য রাখা উট, খচ্চর প্রভৃতি পশুদের এবং রাজকীয় শিকারের জন্য রাখা। অন্য পশুদের (মূলত ঘোড়া ও হাতি) দেখাশোনা করতেন। এইভাবে দিওয়ান-ইবায়ুতাত-রা এমন এক শ্রেণির কর্মচারী হয়ে উঠেছিলেন যাদের সম্রাটের ঘরোয়া বিষয়, দরবার ও সেনাবাহিনীর নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তত্ত্বাবধানের কাজ। করতে হত। এরা সম্রাটের খুব কাছের লোক হয়ে উঠেছিল। এখান থেকেই এদের মির সমনের মতো পৃথক দফতর হিসাবে এদের উত্থান ঘটেছিল।

এই দফতর যে কেবল সম্রাট ও হারেমের মহিলাদের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে আনা এবং তা মজুত করে রাখার কাজ করত তাই নয়, যুদ্ধাস্ত্র ও বিলাসদ্রব্য নির্মাণের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর যাবতীয় দেখাশোনার কাজও করত। এই কাজ করার জন্য তাই মির সমনকে মির বকশির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলতে হত। প্রত্যেক কারখানাতে একজন করে দারোগা রাখা হত যারা সেখানকার উৎপাদিত সমাগ্রী ও হিসাবপত্র সম্পর্কে অবগত থাকত, আর থাকত কারখানার প্রশাসনিক বিষয়াদি দেখাশোনা করার জন্যে একজন করে মুসরিফ। শোনা যায় যে আকবর নাকি এখানে নিয়মিত পরিদর্শন করতে আসতেন এবং তিনি কখনোই সাধারণ মানের কোনো কারিগরকে দিয়ে রাজকীয় বিলাসদ্রব্য প্রস্তুত যাতে না করা হয় সে ব্যাপারে সজাগ নজর রাখতেন’ (মনসেরেট)

সদর

সদর বা সদর-উসদুর-রা ছিলেন উলেমা-দের প্রধান এবং ইসলামীয় পবিত্র আইন বা শরিয়া প্রচলন ও প্রয়োগ করার ব্যাপারে সম্রাটের প্রধান উপদেষ্টা। এঁরা বিচারব্যবস্থার প্রধান হিসাবে কাজি-উকুজাত নামেও পরিচিত ছিলেন এবং সারা রাষ্ট্র জুড়ে কাজিদের নিয়োগ করার অধিকার তাদের হাতে থাকত। যদিও বিচারের সর্বোচ্চ স্তরে থাকতেন সম্রাট স্বয়ং এবং মুফতিদের সাহায্যে তিনি বিবাদের নিষ্পত্তি করতেন। ইসলামের সবথেকে সম্মানীয় পণ্ডিত তথা ধর্মীয় প্রধান হিসাবে সদর দেশের মানুষের শিক্ষা, ভাবনা ও নৈতিকতার ওপর একপ্রকার নিয়ন্ত্রকের (censor ship) ভূমিকা পালন করতেন। ইবন হাসানের মতে, এই ক্ষমতা থাকার ফলেই তিনি (সদর) অসম্ভব প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন এবং রাষ্ট্রের সবার ওপর তার হাত পৌঁছে গিয়েছিল।

সদর-দের একটা বড় দায়িত্ব ছিল যোগ্য পণ্ডিত, ধার্মিক ব্যক্তি ও অভিজাত পরিবারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্যদের (যেমন মহিলাদের জন্য ভরণপোষণের। ভাতা (মদদ-ই-মাশ) প্রদান করা। ভরণপোষণের ভাতা নগদেও দেওয়া হত আবার জমি দানের মাধ্যমেও দেওয়া হত। বস্তুত এই অধিকার থাকার ফলে বহু সদর স্বজনপোষণ করে নিজের ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নিয়েছিলেন। আকবরের আমলে সদর-দের মধ্যে সবথেকে বেশি ক্ষমতাবান ছিলেন শেখ আবদুন নবি। বদায়ুনি জানিয়েছেন যে শেখ আবদুন নবি মদদ-ই-মাশ রূপে বহু মানুষকে প্রচুর পরিমাণে জমি অবৈধ ভাবে বণ্টন করেছিলেন।

যথেষ্ট শিক্ষিত ও ধর্মপ্রাণ পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে অত্যন্ত জ্ঞানী পুরুষ শেখ আবদুন নবিকে খুব সম্মান করতেন আকবর। তিনি অনেকবার আবদুন নবির বক্তৃতা শুনতে এসেছিলেন। এমনকি এক দু’বার নিজের হাতে তার পাদুকা তুলে পায়ের কাছে এগিয়েও দিয়েছিলেন আকবর। কিন্তু যখন আবদুন নবির সময়ে ভূমি বণ্টনের তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ, উৎকোচ গ্রহণ, দুর্নীতি ও সম্পত্তি আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেল, তখন আকবর তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি যথেষ্ট সংকীর্ণমনা ও গোঁড়াও ছিলেন। তিনি মথুরার এক সুযোগ্য ব্রাহ্মণকে বিধর্মী আচরণ করার দায়ে প্রাণদণ্ড দিলে তার ওপর থেকে আকবর সকল প্রকার শ্রদ্ধা ও সম্মান হারিয়ে ফেলেন। ১৫৭৯ সালে তাকে মক্কায় নির্বাসিত করা হয়। এরপর আকবর এই ব্যবস্থার সংস্কারসাধন করে নিষ্কর প্রদত্ত জমি বা আইমার থেকে খালিসা জমিকে পৃথক করে সেগুলিকে এমন ভাবে বণ্টন করেন যাতে গ্রাহককে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে জমি পেয়ে বিব্রত হতে না হয়। পরে এই দানযোগ্য জমিগুলিকে ছয়টি ক্ষেত্রে বিভক্ত করে প্রত্যেক জমি দান করার দায়িত্ব একজন করে। সদর-এর হাতে অর্পণ করা হয়। ভরণপোষণের ভাতা হিসাবে জমি দানের যে ক্ষমতা। সদর-রা একচেটিয়া ভাবে ভোগ করতেন তা অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল; এবার থেকে তারা কেবল সম্রাটের কাছে এই জমি দানের ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারতেন, সরাসরি দান করতে পারতেন না।

আকবর ভীষণভাবে চাইতেন সুযোগ্য হিন্দু পণ্ডিত ও ধর্মীয় মানুষরাও যেন এই ভূমি দান ব্যবস্থা থেকে লাভবান হতে পারেন। তাই তিনি সেই সকল মানুষদের প্রধান সদর পদে নিয়োগ করতেন যারা যথেষ্ট সহনশীল মানসিকতার অধিকারী এবং সবপক্ষের সঙ্গে শান্তি পূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী’ (আকবরনামা) ছিলেন। আগেও হিন্দুদের ভূমি দান করা হত কিন্তু আকবরের আমলে এই নীতির ফলে হিন্দুদের ভূমি দানের পরিমাণ আরও বেড়ে গিয়েছিল। অধীনস্থ হিন্দু রাজা ও জমিদারদের ও ধর্মপ্রাণ হিন্দু ব্যক্তি ও মন্দির কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের ভূমি দান করার ব্যাপারে বাধ্য করা হত।

প্রাদেশিক প্রশাসন

আমরা জানি দিল্লির সুলতানি আমলে সাম্রাজ্যকে নির্দিষ্ট সীমানা সহযোগে বিভিন্ন প্রদেশে স্পষ্টভাবে ভাগ করা হয়নি। বিভিন্ন ইক্তার অধিকারী যাদের বলা হত মুকতি, তারাই কার্যকারী ও সামরিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজস্ব আদায় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করতেন। কয়েকজন মুকতির ওপর যখন কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রচুর এলাকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকত তখন তাদের বলা হত ওয়ালি বা আমির। প্রত্যেক সরকারের আওতায় তখন একটি স্থায়ী প্রশাসন পরিচালিত হত।

আকবর এই ব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন এবং এই ব্যবস্থা তিনি। অব্যাহত রেখেছিলেন ১৫৮০ সাল পর্যন্ত। ১৫৮০ সালে মুঘল সাম্রাজ্য গুজরাট, বিহার ও বাংলা সহ আরও অনেক জায়গায় প্রসারিত হয়েছিল এবং সমগ্র সাম্রাজ্যকে বারোটি সুবা বা প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল। প্রত্যেক সুবায় নিযুক্ত প্রশাসনিক প্রধানকে বলা হত সিপাহসালার, যদিও পরে এরা সুবাদার হিসাবেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছিলেন। সুবার শাসককে সহযোগিতা করার জন্য থাকতেন একজন দিওয়ান, একজন সদর তথা কাজি, বিচারব্যবস্থার জন্য একজন মির আদল, একজন কোতোয়াল, একজন মির বাহার বা নদী ও বন্দরের তত্বাবধায়ক আর একজন ওয়াকিয়া নবিশ বা খবর লিখিয়ে। এই সকল আধিকারিক সুবার শাসক দ্বারা নিযুক্ত না হলেও তার প্রতি অনুগত থাকতেন। এদের সরাসরি সম্রাট কর্তৃক নিয়োগ করা হত। এরা এদের কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকতেন সরাসরি সম্রাট তথা নিজ নিজ কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের প্রধানের কাছে। এভাবেই কেন্দ্র থেকে প্রাদেশিক প্রশাসনে নজরদারি ও ভারসাম্য রাখা হত।

আকবরের আমলে পরবর্তীকালে জয় করা উড়িষ্যাকে বাংলা সুবার সঙ্গে এবং কাশ্মীরকে কাবুল সুবার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। আধুনিক উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানায় ছিল মুঘলদের চারটি সুবা–যথা এলাহাবাদ, অযোধ্যা, আগ্রা এবং দিল্লি। পরে দাক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্যের প্রসার ঘটলে আরও তিনটি নতুন সুবা গঠন করা। হয়েছিল, এগুলি ছিল–খান্দেশ, বেরার ও আহমেদনগর। এই সুবাগুলির প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সম্রাটের এক নিজ আত্মীয়কে।

১৫৮৬ সালে পরীক্ষামূলক ভাবে আকবর প্রত্যেক সুবায় দু’জন করে প্রশাসনিক শাসক নিয়োগ করেছিলেন। আবুল ফজলের মতে, এই পদক্ষেপ নেওয়ার পিছনে যে ভাবনাটা কাজ করেছিল তা হল যদি একজন শাসক কোনো কারণে দরবারের কাজে। ব্যস্ত থাকেন বা অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে অন্যজন প্রশাসনিক কাজকর্মকে অব্যাহত রাখতে পারবেন। তবে মনে হয় এই পদক্ষেপের পশ্চাতে আসল উদ্দেশ্য ছিল প্রাদেশিক শাসকের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। তবে এই পদক্ষেপ সম্রাটের কোনো অহেতুক খামখেয়ালিপনা ছিল না, কারণ যে পরিস্থিতিতে কাবুল ও আগ্রায় একজন মুসলিম ও একজন রাজপুতকে যুগ্ম শাসক হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল ও একই সঙ্গে লাহোর ও আজমেরে একজন করে রাজপুত রাজার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাতে এই পদক্ষেপকে একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো কাজ বলা যাবে না।

আইনআকবরীতে সে-সময়ের মুঘল সুবাগুলির ভৌগোলিক সীমানার বর্ণনা সহ সংক্ষিপ্ত আকারে প্রত্যেক সুবার জলবায়ু, সাধারণ অবস্থা, কৃষি উৎপাদন, ইতিহাস ইত্যাদির কথা লেখা আছে। প্রদেশগুলো সরকার ও পরগণা–এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল আর আইন-এ প্রত্যেক সরকারে কত রাজস্ব আয় হত, জমিদারদের কত রকম জাত ছিল, তাদের অধীনে কত পদাতিক, অশ্বারোহী ও হস্তীবাহিনী ছিল–এ সবের হিসাব দেওয়া আছে। এই হিসেব করা হত কারণ এমন অনেক স্বশাসিত রাজা ছিলেন যাদের অধীন এলাকাকে আলাদা করে রাষ্ট্র হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হত না, বরং কোনো সুবার আওতায় পৃথক সরকার বা পরগনা হিসাবে বিবেচনা করা হত। এইভাবে মেবারকে চিতোর সরকারের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছিল, কোটাকে রনথম্বর সরকারের অন্তর্ভুক্ত একটি পরগনা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং জয়পুরকে (আম্বের) তালিকায় রাখা হয়েছিল আজমের সরকারের একটা পরগনা হিসাবে। সুবাগুলির আয়তন, নির্ধারিত রাজস্ব আয় ইত্যাদির পরিমাণ বিশাল ছিল। বাংলায় ছিল চব্বিণ্টা সরকার এবং এখানে রাজস্ব আয় জমা ধার্য হয়েছিল প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো, আবার অন্যদিকে মাত্র তিনটি সরকার নিয়ে মুলতানের মতো সুবার। রাজস্ব আয় নির্ধারিত হয়েছিল প্রায় সাঁইত্রিশ লক্ষ টাকা। বাকি সুবাগুলির পরিমাণ এই দুইয়ের মাঝে ঘোরাফেরা করছিল।

প্রাদেশিক শাসকদের সম্রাটের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতে হত। এরা একযোগে প্রদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান, প্রাদেশিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী, প্রশাসনিক তত্ত্বাবধায়ক ও সুবার মানুষের ভালোমন্দের দেখাশোনা করার অতন্দ্র প্রহরী। ঠিক এই কথাগুলোই লেখা থাকত সুবার শাসকের নিয়োগপত্রে। তিনি, নাছোড়বান্দা ও বিদ্রোহী জমিদারদের বাগে এনে বা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দিওয়ানকে সাহায্য করতেন। এছাড়াও দিওয়ানকে প্রদেশে কৃষির সম্প্রসারণ, বাঁধ, কূপ, জলাধার, বাগান, সরাই ইত্যাদি নির্মাণ, সেগুলি যথাসময়ে মেরামত করা ও অন্যান্য নাগরিক প্রয়োজন মেটানোর কাজে সহযোগিতা করতে হত সুবাদারদের। ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকতেন ঠিকই কিন্তু বিচারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করতে হত। তাদের কাজ ছিল নিয়মিত প্রদেশ পরিদর্শন করা এবং খবর লিখিয়ে ও অনুচরদের মারফত প্রদেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার খবর রাখা। তাদের আরও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হত, আর তা হল অন্য ধর্মমতের মানুষদের কাজে হস্তক্ষেপ না করা। স্থলপথে বাণিজ্য করা বণিক প্রধানদের কাছ থেকে শুল্ক আদায়ের দায়িত্বও ছিল প্রাদেশিক শাসকদের ওপর। যদিও এদের কার্যকালের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ ছিল না, তবুও অন্তরালে এদের এক সুবা থেকে আর-এক সুবায় নিয়মিত বদলি করা হত।

সুবার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক আধিকারিক ছিলেন দিওয়ান। যদিও প্রথম দিকে সুবার শাসকই দিওয়ানদের নিয়োগ করতেন, কিন্তু ১৫৯৫ সাল থেকে সরাসরি কেন্দ্র থেকে এদের নিয়োগ করা শুরু হয়েছিল। সম্ভবত সেখানে প্রধান দিওয়ানের সুপারিশক্রমেই এদের নিয়োগ করা হত বলে মনে হয়। তাই এরা প্রাদেশিক শাসকের অধীনস্থ হয়েও পদাধিকার বলে তাদের সহকর্মী। তবে সুবার প্রশাসনের প্রধান হিসাবে সুবাদারদের কথাই শুনতে বাধ্য হতেন দিওয়ানরা। আকবরের সময়ে এদের কাজ সম্পর্কে সবথেকে বেশি জানা যায় আবুল ফজলের বিবরণ থেকে, পরবর্তী সময়ের কথা এখান থেকেই আমাদের বুঝে নিতে হবে। প্রদেশের আর্থিক বিষয়-আশয় তথা হিসাবপত্র সম্পর্কে প্রদেশের দিওয়ান পাক্ষিক ভাবে কেন্দ্রীয় প্রধান দিওয়ানকে অবগত করতেন। এরা প্রদেশের ভূমি রাজস্ব সহ অন্যান্য কর আদায় এবং তার হিসাব রক্ষা থেকে পরীক্ষা করার কাজ–সবটাই করতেন। বিভিন্ন সরকারে আমিলদের সাহায্য নিয়ে কৃষিকাজ সম্প্রসারণের গুরুদায়িত্ব ছিল এদের ওপর। সেই সঙ্গে আমিলরা যাতে জোরজুলুম করে কর আদায় না করে এবং অন্যান্য দুর্নীতিমুলক কাজকর্মে জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে নজর রাখতে হত দিওয়ানদের। এছাড়া দান করা জমিগুলোর ওপর তদারকি করার কাজও করতে হত এদের।

সুবায় আলাদা করে বকশি ও সদরদের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা যে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাজের ছক মেনেই প্রদেশে কাজ করত সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। বকশিরা অনেক সময় প্রদেশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হিসাবে কাজ করতেন আর যখন তারা প্রদেশের শাসকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কেন্দ্রে পাঠাত তখন তাদের সঙ্গে প্রদেশের শাসকের ঝামেলা বাঁধত। সদর-রা ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভাতা দানের জন্য সুপারিশ করতেন এবং বিচার বিভাগের প্রধান হিসাবেও কাজ করতেন। কাজিদের কাজ নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না আকবর, তাই তিনি প্রদেশের বিচার-বিভাগীয় আধিকারিক হিসাবে মির আদলদের নিয়োগ করেছিলেন। এদের সহকারী হিসাবে কাজ করতেন কাজিরা।

নগরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল কোতয়ালদের ওপর। সেই সঙ্গে নগরের অন্যান্য বিষয় যেমন বাজারের ওজন ঠিকঠাক রাখা, জুয়ার ঠেক ও পতিতালয়গুলির ওপর নজর রাখা ইত্যাদিও কাজ করতে হত কোতয়ালদের।’

মোটকথা, প্রদেশের এই সকল আধিকারিকদের নেতা ছিলেন যে সুবাদার বা প্রাদেশিক শাসক, তাকেই অত্যন্ত দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এই সকল স্তরের কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করতে হত, কেউ তার ক্ষমতা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লে তার কাজ ছিল তড়িঘড়ি কেন্দ্রের সাহায্য নিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করা। অর্থাৎ শুধু প্রদেশে নয়, কেন্দ্রের সঙ্গেও নিরন্তর সমন্বয় রাখতে হত প্রদেশের শাসকদের। কিন্তু এই ব্যবস্থা তখনই সুচারুভাবে পরিচালিত হত যখন কেন্দ্রে শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ থাকত। আকবরের নীতি ছিল প্রতিনিয়ত নানা সূত্রের মাধ্যমে প্রদেশগুলির ওপর নজর রাখা, কোথাও কোনো সমস্যা বা মানুষের ক্ষোভ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ সেখানে চলে যাওয়া এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। এইভাবে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে প্রতিহত করার একটা পথ তিনি খুঁজে বের করেছিলেন। এছাড়া প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা অনুসন্ধান করার জন্য সম্রাট উচ্চপদস্থ কর্মচারীও নিয়োগ করতেন।

সুতরাং আকবর চেয়েছিলেন এমন একটি প্রাদেশিক প্রশাসন গড়ে তুলতে যা একদিকে আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করবে এবং অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রে প্রেরণের একটা সহজ মাধ্যম হিসাবে কাজ করবে।

জেলা ও আঞ্চলিক প্রশাসন

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি শাসনকার্যের সুবিধার্থে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক প্রশাসনকে সরকার ও পরগনা–এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। প্রত্যেক সরকার-এর প্রধান ছিলেন ফৌজদার যারা মূলত ওই অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয় তথা পথ নিরাপত্তা সহ সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলার দিকটি নজর রাখতেন। রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়ের কাজে সহযোগিতা করত যারা, সেই অমলগুজার-দেরও সহকারী হিসাবে কাজ করতেন ফৌজদাররা। প্রাত্যহিক প্রশাসনের কাজকর্ম পরিচালনা করার গুরুদায়িত্ব ছিল মূলত ফৌজদারদের কাঁধে। কাজের নিরিখে তাদের সঙ্গে ব্রিটিশ আমলের জেলা কালেক্টরের অনেক মিল ছিল বলা যায়, যদিও কাজের চরিত্রের দিক দিয়ে এদের মধ্যে বিস্তর তফাত ছিল। ফৌজদাররা স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনীকে নেতৃত্ব। দিতে পারতেন কিন্তু ভূমি রাজস্ব নির্ধারণ ও সংগ্রহ করার ব্যাপারে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারতেন না। এদিক দিয়ে এরা ব্রিটিশ কালেক্টরদের থেকে আলাদা ছিল। কাজিরা আঞ্চলিক ফৌজদারি মামলা এবং মুসলিমদের নানা ধর্মীয় বিধান ও দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি করতেন।

প্রত্যেক সরকারকে আবার একাধিক পরগনায় ভাগ করা হয়েছিল। প্রত্যেক পরগনার সাধারণ প্রশাসন দেখাশোনা করার দায়িত্ব ছিল শিকদারদের ওপর, রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়ের দায়িত্ব সামলাতে হত আমিল-দের। এছাড়াও একজন করে কোষাধ্যক্ষ ও একজন কানুনগোর থাকতেন যারা পরগনা ও গ্রামের সীমানা পুনর্বিন্যাস করে নিয়মিত রাজস্ব সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করে রাখতেন। আর ছিল করণিক বা কারকুন-রা।

প্রশাসনের কাজকর্ম

শাসক

যেহেতু প্রশাসনের কেন্দ্রে অবস্থান করতেন শাসক, সেহেতু জনগণের প্রতি তার মনোভাব একটি নিয়ম ও গুণগত মান অনুসারে পরিচালিত হবে এমনটাই মনে করা হত। কিন্তু অভিজাতদের মধ্যে এই নিয়ম ও মান মেনে চলার প্রবণতা প্রায় ছিল না। আকবর নিজে প্রত্যহ তিন বার করে জনগণের দরবারে দর্শন দেবার প্রথা চালু করছিলেন। তিনি প্রথমে দর্শন দিতেন সূর্যোদয়ের পরে সকালে যাকে বলা হত ঝরোকা দর্শনএই প্রথা আকবরই উদ্ভাবন করেছিলেন শাসক ও প্রজার মধ্যে ব্যক্তিগত একাত্মতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। এটা একটা উৎসবে পরিণত হয়েছিল যেখানে জনগণ বিনা বাধায় তাদের অভাব অভিযোগ নিয়ে সরাসরি সম্রাটের কাছে দরবার করতে পারত। সম্রাটও সেখানে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিতেন। যেমন শাহজাহানের আমলে বিচার বিভাগের করণিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় তাদের সরাসরি জনগণের দরবারে বা গোপনে জনগণের সভায় হাজির করানো হয়েছিল বলে জানা যায়। অনেক সময় নিছক পশুর লড়াই কিংবা অভিজাতদের অধীনে থাকা সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ দেখার জন্যেও ঝরোকা দর্শন-এর আয়োজন করা হত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকবরের ক্ষমতা ও মর্যাদা যত বৃদ্ধি পেয়েছে ততই মানুষের এই প্রথার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, অনেকে তো সম্রাটের দর্শন না করে অন্ন-জল স্পর্শও করতেন না। বলা যায় সম্রাটের অস্তিত্বের সঙ্গে এই ভাবে এক স্বর্গীয় সত্তার যোগ তৈরির প্রচেষ্টা ভারতের রাজতন্ত্রের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক সফল ব্যবহারিক প্রকাশ।

ঝরোকা দর্শনএর পর আকবর গিয়ে বসতেন জনগণের দরবারে যাকে বলা হত দেওয়ানখাস-আ। এখানে উচ্চ-নীচ সকল মানুষই এসে তাদের অভাব অভিযোগ জানাতে পারত সম্রাটের কাছে। বায়ুনির মতে, সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হত এবং চারপাশ হইহই করত। বিভিন্ন অভিযানে ও কাজে পাঠানো আধিকারিকদের এই সভায় অভ্যর্থনা জানানো হত এবং বিভিন্ন প্রদেশের খবরাখবর পড়ে শোনানো হত। রাজধানীর সকল অভিজাতকে এই সময় দরবারে উপস্থিত থাকতে হত। জনগণের এই দরবারে আকবর প্রত্যেক দিন প্রায় দেড় প্রহর বা সাড়ে চার ঘণ্টা সময় কাটাতেন।

আকবর দ্বিতীয়বার দর্শন দিতেন অপরাহ্।ে এই সময় তিনি রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকা ঘোড়া, হাতি ও বাণিজ্য পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত পশুদের নিরীক্ষণ করতেন। এ সময় সম্রাটের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল রাষ্ট্র পরিচালিত বিভিন্ন কারখানাগুলি পরিদর্শন করা এবং সেখানকার নিত্যদিনের কাজগুলি তত্ত্বাবধান করা। মনসেরেটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আকবর একজন খ্রিস্টীয় যাজককে গোয়া থেকে নিয়ে এসে প্রাসাদের সামনে একটা কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন যেখানে সূক্ষ্ম ও সুখ্যাত কাজকর্ম যেমন চিত্রকলা, অলংকার, পশমের বস্ত্র ও কার্পেট তৈরি হত, এমনকি সেখানে অস্ত্র তৈরির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। মনসেরেট বলেছেন, এখানে তিনি যখন-তখন আসতেন এবং কারিগরদের কাজ করা মন ভরে দেখতেন। এই দুই প্রকার দর্শনের মাঝে আকবর কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে ও খাওয়া-দাওয়া করতে রাজগৃহে আসতেন এবং সেখানে হারেম-এর মহিলাদের অভাব অভিযোগ শুনতেন।

রাষ্ট্রের গোপনীয় আলাপ-আলোচনা চলত সন্ধ্যাবেলা একটি বিশেষ গৃহে যাকে বলা হত গোসলখানা (স্নানাগার)। এরকম বলা হত কারণ দেওয়ানআম মহিলাদের কক্ষের মাঝে একটা বিশেষ ঘর থাকত যেখানে আকবর স্নান করতেন আর তারপর কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি তার সঙ্গে সেখানে দেখা করতে আসতেন। পরের দিকে দিওয়ান, বকশি ও অন্য কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ অভিজাতও এই জায়গায় আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে শাহজাহান এই কক্ষের নাম রাখেন দৌলত খানাখাস, কিন্তু গোসলখানা নামটা থেকেই যায়। এখানে যে দারোগা তত্ত্বাবধানের কাজ করতেন তিনি খুব প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন কারণ এই কক্ষে কারা আসত ও কারা যেত, তার সব খোঁজখবর তিনি রাখতেন।

দেওয়ানখাসএ একই সঙ্গে ‘জ্ঞানীগুণী, বিচক্ষণ ও সত্যসন্ধানী ব্যক্তিদের’এক জায়গায় জড়ো করা হত এবং তারা নানা রকম বিষয়ে আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন (আইনআকবরী)। আকবর এখান থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সংগীতের আনন্দ নিয়ে তবে শয়ন করতে যেতেন।

আকবর দরবারে নানা সময় নানা মানুষকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে পছন্দ করতেন এবং তাদের কাছে তিনি নিজেকে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে চাইতেন বারবার। খ্রিস্টান যাজকরা আকবরের অভিজাত ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুন্দর ধরন ও সৌহার্দ্য দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তাই যারা তার (আকবরের) কথা শুনতে আসতেন তাদের কাছে যে তিনি কতটা নিজেকে আন্তরিক ভাবে হাজির করতেন সে কথা বড়ো করে বলবার প্রয়োজন নেই খুব একটা। এমনকি এই ব্যবহার তাদের জন্যেও অপেক্ষা করে থাকত যারা আকবরের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে মিশতে চাইতেন না। তাই ১৫৬০-৬১ সালে লেখা আবুল ফজলের একটা কথা উল্লেখ করতে হয়–যখন আগ্রার কাছে বাহারাইথের (আধুনিক উত্তরপ্রদেশের পশ্চিম দিকে) জনপ্রিয় সন্ত সালার মাসুদ গাজির সমাধিতে উৎসব করার জন্য অসংখ্য মানুষের সমাগম ঘটেছিল, তখন আকবর স্বভাববশত ছদ্মবেশে সেখানে গিয়ে মানবিকতার নানান রূপ ও লাবণ্যে নিজেকে পরিপূর্ণ করে নিয়েছিলেন, যদিও কিছু দুষ্টু লোক তাকে চিনে ফেলেছিলেন। তবে তাদের চোখে ধুলো দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন আকবর। পূর্বের কোনো মুসলিম শাসকের এভাবে একা জনসাধারণের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর আত্মবিশ্বাস ছিল বলে জানা যায় না।

প্রশাসনিক গঠনতন্ত্রে আকবরের তাৎপর্যপূর্ণ অবদান এই ছিল যে তিনি এমন একটা নিয়মিত পালনীয় ধারার সূত্রপাত করেছিলেন যা তার উত্তরসূরিরা একেবারে প্রথম বাহাদুর শাহের সময় পর্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলেছিলেন এবং রাজতন্ত্রকে নানাভাবে মানুষের আরও কাছে আনা ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলার ব্যাপারে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিলেন। –১২।

ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা

আকবরের আমলে যে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছিল তা আসলে সুলতানি আমলের আগে থেকে এ দেশে গড়ে ওঠা ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার একটি পরিণত রূপ। এ ব্যাপারে আমরা আলোচনা করেছি প্রথম খণ্ডে। সেখানে দেখেছি কীভাবে এ দেশে তুর্কি শাসকদের আগমনের আগে থেকেই ভূমি রাজস্ব ফসলের বদলে নগদে আদায় করার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এমন একটা জরিপ পদ্ধতি প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল যেখানে শাসকদের বিশাল সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের খরচ মেটাতে জমির ফসল কাটার সময় উৎপাদনের একটা অংশ রাষ্ট্রের ভাগ হিসাবে দাবি। করা হত সহজে। তবে এই ধরনের উদ্যোগের ব্যাপারে বিস্তারিত ভাবে কিছু জানা যায় না।

আলাউদ্দিন খলজির সময়ে উচ্চ দোয়াব অঞ্চলে প্রত্যেক কৃষকের সঙ্গে পৃথক পৃথক ভাবে ভূমি রাজস্ব বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল যাতে শক্তিশালী কৃষকের রাজস্বের ভার অপেক্ষাকৃত দুর্বল কৃষকের ওপর না চাপতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা কতদূর সফল হয়েছিল সে নিয়ে সন্দেহ আছে। এছাড়া আলাউদ্দিন খলজি কৃষিজ জমি জরিপের একটা ধরন প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু পরের দিকে শের শাহ বা আকবর যে ধরনের জরিপের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব নির্ধারণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছিলেন তার সঙ্গে এই জরিপ পদ্ধতির কোনো মিল ছিল না।

আমরা মুঘল আমলে আর্থিক কার্যকলাপের মুল ভিত্তি হিসাবে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাকে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করার পূর্বে শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রের এই বিষয়ে কী মনোভাব ছিল তা জেনে নেবার চেষ্টা করব। এই মনোভাবের কথাই স্পষ্ট করে বলেছিলেন জিয়াউদ্দিন বারানি-যখন তিনি লিখেছিলেন যে গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের নীতি ছিল হিন্দুদের (অর্থাৎ কৃষকদের) ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যাতে তাদের কাছে সম্পদ না জমতে পারে এবং অসন্তোষ ও বিদ্রোহ সংগঠিত করার শক্তি না থাকে, অন্যদিকে তাদের দারিদ্র ও দুর্গতির দিকে এমন ভাবে ঠেলে দেওয়া যাতে তারা তাদের কৃষিকাজ না চালাতে পারে। কয়েকজন আধুনিক ঐতিহাসিক একে কৃষকদের ন্যূনতম জীবনধারণের অবস্থায় সীমাবদ্ধ করে রাখার নীতি হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর এ কথা তো লুকিয়ে রাখার কোনো জায়গা নেই যে সেই সময়ে গ্রামীণ এলাকায় জমির অধিকার, কৃষিজ সম্পদ (যেমন লাঙল, বলদ ইত্যাদি) এবং আর্থিক অবস্থার দিক থেকে যথেষ্ট বৈষম্য ছিল। আমাদের দেখতে হবে এই বৈষম্যমূলক সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে কীভাবে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রভাব ফেলেছিল।

আমাদের এটা মাথায় রাখতে হবে যে মধ্যযুগের সকল শাসকই সর্বোচ্চ পরিমাণে রাজস্ব আদায় করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর তার ফলে রাষ্ট্রের তরফ থেকে কৃষকদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হতে থাকে। মহম্মদ বিন তুঘলকের সময় থেকে এই বিষয়ে সরাসরি জোর দেওয়া শুরু হয়েছিল যাতে সর্বোচ্চ পরিমাণে রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবি পূরণ করা যায়। সালাজ্যের পরিধি প্রসারণ ও কৃষির সম্প্রসারণের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে রাজস্বের পরিমাণও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা হত। এই পর্বে এমন সব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল যেখানে কৃষকদের জীবন হয়ে উঠেছিল অসহনীয় ও অবক্ষয়ের পথগামী। এই পরিস্থিতির সঠিক ভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আকবরের আমলে যে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা বিকশিত হয়েছিল তার প্রচলন ঘটে আকবরের রাজস্বকালের ২৪ তম বর্ষে (১৫৭৯) এবং তা পরিচিত হয় দশ বছর মেয়াদি রাজস্ব ব্যবস্থা বা দহসালা ব্যবস্থা নামে। এই ব্যবস্থা আসলে শের শাহের। আমলে গ্রহণ করা জরিপ ব্যবস্থা (জবত) যা আকবরের সময়ের প্রথম দিক পর্যন্ত লাহোর থেকে ইলাহাবাস (এলাহাবাদ) পুরো হিন্দুস্থানেই প্রচলিত ছিল, তারই এক যুক্তিসম্মত (logical) রূপ। বৈরাম খাঁয়ের অন্তর্বর্তী শাসনের সময় দাবিদারের চাহিদা এত বেশি ছিল যে রাষ্ট্রের নির্ধারিত রাজস্ব দাবি বা জমার পরিমাণ প্রচণ্ড হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল আর তার সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছিল সেই রাজস্ব ভাগ বাটোয়ারা করার জন্য, বিভিন্ন অভিজাতদের মধ্যে ষড়যন্ত্র ও বিবাদ, এই ইতিহাস তো আমরা আগেই তুলে। ধরেছি। ১৫৬২ সালে আকবর যখন মুঘল প্রশাসনের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন তখন থেকেই তিনি এই ব্যবস্থার সংস্কার সাধনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। উজির হিসাবে নিযুক্ত ইরানি অভিজাত আসফ খানকে দিয়ে কিছুমাত্র সুবিধে না হওয়ায় তাকে সরিয়ে একজন বিশ্বস্ত খোঁজা এইমাদ খানকে সাম্রাজ্যের খালিসা জমিগুলির দিওয়ান পদে নিয়োগ করা হয়। মূলত এর উদ্যোগেই রাজস্ব ব্যবস্থায় কিছু কার্যকরী সংস্কার সাধন করে আকবর তাৎক্ষণিক আর্থিক সঙ্কট থেকে রেহাই পান। বিভিন্ন রকম জমি থেকে হওয়া আয়ের হিসেব পর্যালোচনা করে তিনি খালিসা জমিকে জায়গির জমি থেকে আলাদা করে দিয়েছিলেন। খালিসা জমির মধ্যেই রাষ্ট্রের সবথেকে ফসলি জমিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বায়ুনি তাই হয়তো বলেছিলেন যে এই অভূতপূর্ব অর্থনীতি রাষ্ট্রের খরচের ওপর অবাক করা প্রভাব ফেলেছিল।

আকবরের শাসনের দশম বছর (১৫৬৬) পর্যন্ত রাজস্ব পরিমাণ ধার্যের ক্ষেত্রে শের শাহের আমলে নির্ধারিত শস্যহারকেই (রায়) একটি একক মূল্য তালিকা (Price + list) মেনে নগদ হারে (Cash-rate) রূপান্তরিত করা হত, যাকে বলা হত দস্তুর-উআমল বা দস্তুর। কিন্তু এই মূল্য তালিকা যেহেতু শাসক শিবির কর্তৃক নির্ধারিত ছিল সেহেতু সেই হারে রাজস্ব প্রদান করতে গিয়ে কৃষকের অবস্থা শোচনীয়। হয়ে উঠেছিল। শাসক শিবিরের নির্ধারিত মূল্য গ্রাম-গঞ্জ ও দূরবর্তী এলাকায় প্রচলিত মূল্য তালিকার থেকে অনেক বেশি ছিল, তাই কৃষকদের অনেক বেশি রাজস্ব দিতে হত। কিন্তু এর থেকেও বড়ো সমস্যা যেটা ছিল তা হল রাষ্ট্রের কৃষি উৎপাদন, চাষযোগ্য জমি ইত্যাদি সামগ্রিক কৃষিকাজের অবস্থা সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কোনো ধারণাই ছিল না। আর এই সকল বিষয়ে কোনো তথ্য না থাকার কারণে যথাযথ ভুমি রাজস্ব নির্ধারণ করাও সম্ভব হত না।

আকবরের শাসনের একাদশ বছরে (১৫৬৭) মুজফফর খান ও রাজা টোডর মল এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটান। কানুনগোদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার চাষযোগ্য ও চাষযোগ্য নয় এমন জমির খতিয়ান, জমির উৎপাদনের হার ও পূর্বর্তন রাজস্ব হারের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য ও পরিসংখ্যান (তাকসিমৎ) চেয়ে পাঠান তাঁরা। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ শাসন বলবৎ থাকা এলাকার (খালিসা) দশ বছরের (১৫৬৭-৭৭) ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত পরিসংখ্যান দশ প্রধান কানুনগো কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেই অনুপাতে রাজস্ব নির্ধারিত হয় যা মুঘল আমলে একটি নতুন রাজস্ব হার হিসাবে প্রচলিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে কানুনগোদের দেওয়া তথ্য অনুসারে এবার থেকে একটি অখণ্ড মূল্য তালিকার বদলে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন মূল্য তালিকার ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব নির্ধারণ করা শুরু হয়।

আবুল ফজল আইন-এ বিভিন্ন প্রদেশের ১৫৬২ থেকে ১৫৭৯ সাল পর্যন্ত উনিশ বছরের যে মূল্য তালিকা অনুসারে রাজস্ব হার বা দস্তুর-এর হিসাব দিয়েছেন তা আসলে এই নতুন গৃহীত পদক্ষেপেরই প্রতিফলন ছিল। এই হার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন–এই হিসাবে দেওয়া হয়েছিল। তাই আগ্রা প্রদেশে গমের উৎপাদনের রাজস্বের নগদ হার আকবরের রাজত্বকালের একাদশ বছরে ছিল বিঘা প্রতি ৫৬ থেকে ৬০ দাম, তা পরিবর্তিত হয়ে সপ্তদশ বছরে ৩৬ থেকে ৭৪ দাম হয়ে গিয়েছিল। নগদ অর্থে রাজস্ব হার বা দস্তুর কেবল মূল্যমানের নিরিখেই পরিবর্তিত হত না, উৎপাদনশীলতার বিষয়টি সেখানে প্রযুক্ত হত সে ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। প্রথম দিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবি প্রত্যেক বছরে সংগঠিত জরিপের নিরিখেই নির্ধারিত হত, কিন্তু পরের দিকে একবার জরিপ হয়ে যাওয়ার পর প্রতি বছর সেই অনুপাতে একটি আনুমানিক হিসাব করে (কানকুত) তার ভিত্তিতে রাজস্ব দাবি নির্ধারণ করা শুরু হয়।

এই ব্যবস্থা পূর্বের ব্যবস্থার থেকে ভালো হলেও একাধিক কারণে ঠিক যথাযথ ছিল না। কানুনগোরা যেহেতু বেশিরভাগই স্থানীয় জমিদার ছিল সেহেতু তারা কখনোই তাদের এলাকার কৃষিকাজের অবস্থা সম্পর্কে সব তথ্য কেন্দ্রে পাঠাত না। তাই উৎপাদনের নিরিখে নির্ধারিত জমা বা শস্য হার কোনো কিছুই সঠিক হত না। সেই সঙ্গে কানকুত বা অনুমানের হিসাব পদ্ধতির চোরাপথে জমা হয়েছিল কর্মচারীদের দুর্নীতির সম্ভাবনা। আর সব শেষে বলা যায় যেভাবে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মূল্য তালিকা সংগ্রহ করে এনে কেন্দ্রীয় আধিকারিকগণ তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রাজস্ব হার নির্ধারণ করতেন তাতে সময় লাগত বিস্তর, কারণ সাম্রাজ্যের পরিধি ছিল বিশাল। তাই এই সকল সীমাবদ্ধতার কারণেই আবুল ফজলের ভাষায় ‘নেমে এসেছিল সীমাহীন দুর্দশা।’

দহসালা ব্যবস্থা

এইভাবে একদিকে প্রাপ্ত তথ্যের অসম্পূর্ণতা ও অন্যদিকে সাম্রাজ্যের দ্রুত প্রসার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আকবরের শাসনের চব্বিশতম বর্ষে (১৫৭৯) দশ বছরি রাজস্ব ব্যবস্থা বা দহসালা ব্যবস্থা চালু করা হয় যেখানে স্থানীয় কৃষির উৎপাদনশীলতা ও স্থানীয় বাজারদরের নিরিখে নগদ হারের উপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবি নির্ধারিত হত। তবে এই ব্যবস্থা চালু করার আগে প্রাথমিকভাবে দুটি পদক্ষেপ প্রহণ করা হয়েছিল। প্রথমত, আকবরের রাজত্বকালের ঊনবিংশতম বর্ষে (১৫৭৪) সাম্রাজ্যের যে যে এলাকা থেকে রাষ্ট্রের কোটি টঙ্কা বা আড়াই লক্ষ টাকা রাজস্ব আয় হত সেখানে সরকারি আধিকারিক (আমিল) যারা বেশি পরিচিত ছিল কড়ারি নামে তাদের নিয়োগ করা হয়েছিল। এদের কাজ ছিল সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ এলাকার কৃষিজ জমি জরিপ করে রাষ্ট্রকে তথ্য দেওয়া। এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করত একজন কোষাধ্যক্ষ, একজন ক্ষেত্র পরিমাপক ও অন্যান্য কলাকুশলী কর্মচারী। কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে, কড়োরিদের বঞ্জর বা পতিত জমিও মাপজোক করতে হত এবং কৃষকদের উৎসাহ দিতে হত মোটামুটি তিন বছরের মধ্যে ওই পতিত জমিগুলিকে কৃষির আওতায় নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু এই কাজ ছিল কার্যত অসম্ভব, আর তাই অনেক কড়ারিকেই পরে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরে যেতে হয়েছিল বলে শোনা যায়। তবে এই কড়োরিদের মূলত যে কাজটা করার। জন্যে আনা হয়েছিল তা হল আগেকার জরিপ বা শনের দড়ি দিয়ে মাপজোক করার পদ্ধতির বদলে নতুন জরির ব্যবস্থা বা লৌহ বলয়ে আটকানো বাঁশের দণ্ড দিয়ে জমি জরিপের যে ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল তা ব্যবহার করে ঠিকঠাক রাজস্ব পরিমাপ করা, কারণ আগের জরিপ পদ্ধতিতে অনেক অনিয়ম থেকে যাচ্ছিল। এই কড়োরি ব্যবস্থা লাহোর থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত সমস্ত প্রদেশে চালু করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় পদক্ষেপটা নেওয়া হয় ১৫৭৬ সালে যখন সমগ্র হিন্দুস্থানকে (লাহোর থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত অঞ্চল) খালিসা বা সরাসরি রাজ শাসনের অধীনে থাকা জমির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। এর সঙ্গে প্রচলন করা হয়েছিল ঘোড়া চিহ্নিতকরণ প্রথা বা দাগব্যবস্থা–আর তার ফলে অভিজাত গোষ্ঠীর একটা অংশের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল যা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন যে এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে আসলে জায়গির ব্যবস্থার থেকে আলাদা কিছু করার বদলে সাম্রাজ্যের কৃষি সংক্রান্ত পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করাই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে জায়গির ব্যবস্থাকে তাই এরপর ঢেলে সাজানো হয়েছিল।

১৫৭৯ সালে এভাবেই জমির উৎপাদন, স্থানীয় বাজারদর ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে তার ওপর ভিত্তি করে জরিপ করার জন্য জমিকে বিভিন্ন ভাগে (দস্তুর) ভাগ করা শুরু হয়। আবুল ফজলের মতে, প্রত্যেক পরগনার দশ বছরের উৎপাদিত ফসল, চাষের জমি ও ফসলের বাজারদর ভালো করে নির্ণয় করে তার এক দশমাংশ বাৎসরিক রাজস্ব হিসাবে ধার্য করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবি একটি মাত্র নির্দিষ্ট ফসল দরের নিরিখে তাকে নগদে রূপান্তরিত করে নির্ধারিত হয়নি, বরং চাষের জমি ও উৎপাদিত ফসলের দামের ওপর নির্ভর করে ক্রমাগত যে নগদ হার। বলবৎ হয়েছিল তাকে মাথায় রেখেই এই রাজস্ব দাবি নির্ধারিত হয়েছিল। এতে রাষ্ট্রের যে সুবিধাটা হয়েছিল তা হল যতদিন ফসল কাটা ও সেই ফসলের নিরিখে। জমির জরিপ (জবত) প্রক্রিয়া চলত ততদিনে সেখান থেকে রাষ্ট্রের আয় কত হবে তার একটা আনুমানিক আন্দাজ পাওয়া যেত। এর ফলে কৃষকদেরও কিছুটা লাভ হয়েছিল বলা যায়। কিন্তু এর অর্থ এই যে যদি চাষ ভালো না হত তাহলে তার বোঝাও বহন করতে করতে হত কৃষকদের।

এই ব্যবস্থার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করার পূর্বে একটা জিনিস পরিষ্কার করে বুঝে নেওয়া দরকার আর তা হল দহসালা ব্যবস্থা মানে দশ বছরের বন্দোবস্ত কিন্তু নয় বরং এই ব্যবস্থা বিগত দশ বছরের উৎপাদন ও দামের একটা গড়ের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়েছিল।

যেভাবে বিভিন্ন ফসলের গড় মূল্য ধার্য করা হত তা ছিল এক জটিল প্রক্রিয়া। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে শেষ দশ বছরের গড় বাজারদরের নিরিখে ফসলের দামকে নগদ মূল্যে রূপান্তরিত করা হত না, বরং বিগত দশ বছরের উৎপাদনশীলতা ও স্থানীয় বাজারদরের হিসাব আগে প্রাপ্ত তথ্যের নিরিখে নির্ণয় করা হত, তারপর তাকে গড় করা হত। কিন্তু এই পদ্ধতি আবার কার্পাস, নীল, ইক্ষু, তৈলবীজ, আফিম, আনাজ ইত্যাদি বাণিজ্যিক ফসলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ। করা হত না, কারণ এগুলোর মূল্য সর্বদা নগদেই হিসাব করা হত। যেহেতু এমন অনেক ফসল ছিল যার দাম বিগত দশ বছরে প্রচণ্ড রকম ওঠানামা করেছে, সেহেতু একটা ভালো মরশুমকে বেছে নিয়ে সেই সময়ের দামকেই ওই ফসলের দশ বছরের। গড় তুল্য ধরে রাজস্ব হার ধার্য করা হত।

রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবি ধার্য করার ক্ষেত্রে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও নিয়মিত চাষবাস। হওয়া–এই দুটো বিষয়ই মাথায় রাখা হত। যে সমস্ত জমিতে নিয়মিত ভাবে চাষাবাদ। হত তাকে বলা হত পোলাজ। যে সমস্ত জমি এক বছর ধরে চাষবাস ছাড়াই পতিত অবস্থায় (পরাউতি) পড়ে থাকত সেই সকল জমি থেকে চাষ শুরু হবার পর পূর্ণ হারেই রাজস্ব আদায় করা হত। যে সকল জমি বন্যা ও ওই-জাতীয় কোনো কারণে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত পতিত অবস্থায় পড়ে থাকত তাকে বলা হত ছাছড়। এই সমস্ত জমিকে চাষের আওতায় এনে ধীরে ধীরে রাজস্ব বৃদ্ধি করা হত এবং তিন বছর পর পূর্ণ হারে রাজস্ব দাবি করত রাষ্ট্র। বঞ্জর ছিল চাষযোগ্য পতিত জমি। এখানে কৃষির বিস্তারকে উৎসাহ প্রদানের জন্য চাষ শুরু হবার পাঁচ বছর পর থেকে পূর্ণ রাজস্ব দাবি করা হত।

জমিকে এরপর ভালো, খারাপ ও মাঝামাঝি–এই তিন ভাগে ভাগ করা হত। গড় উৎপাদিত ফসলের এক তৃতীয়াংশ ছিল রাষ্ট্রের অংশ। যদিও মুলতান ও রাজস্থানের মতো এলাকায় রাষ্ট্রের অংশ ছিল এক চতুর্থাংশ। কাশ্মীরে যেখানে জাফরান চাষ করা হত সেখানে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রকে দিতে হত।

প্রথাগত ভাবে কৃষকদের থেকে রাষ্ট্র যেসব কর আদায় করত সেগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না কিন্তু। তাদের ওপর যে অন্য করগুলো চাপানো হত যেমন গবাদি পশু কর, বৃক্ষ কর ইত্যাদি, সেগুলো রাজস্ব। দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এছাড়া কৃষকদের জমিদার বা অন্যান্য স্থানীয় কর্মচারীদের (যেমন কানুনগো, মুকাদ্দম, পাটোয়ারি প্রমুখদের) ফসলের একটা ভাগ দিতে হত এবং গ্রামের পরিচর্যা হেতু কিছু অংশ রেখে দিতে হত। আমরা যখন গ্রামীণ জীবন ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে আলোচনা করব তখন এই ব্যাপারে। বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে। বলাই বাহুল্য, রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে ভূমি রাজস্ব দাবি করা হত তার পরিমাণ নিঃসন্দেহে ছিল সর্বাত্মক ভাবে বেশি আর এই দাবি পূরণ করতে না পারলে কৃষকদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হত, এমনকি জমি থেকে উৎখাত ও মেরেও ফেলা হত।

দহসালা ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি

জরিপ পদ্ধতি ব্যবস্থা বা জবত-এর ওপর নির্ভর করে দহসালা বন্দোবস্ত চালু করা হয়েছিল লাহোর থেকে শুরু করে এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে-যার মধ্যে ছিল গুজরাট, মালব এবং বিহার ও মুলতানের কিছু অংশ। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব বলেছেন, ‘জবত ব্যবস্থা কোনো প্রদেশের সর্বত্র প্রচলিত ছিল এটা মনে হয় না। আইনই-আকবরী অনুসারে, অমুলগুজারদের এরকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে কোনো অঞ্চলের কৃষকরা ভূমি রাজস্ব পরিমাপের যে পদ্ধতিতে সায় দেবে সেই পদ্ধতিকেই যেন গ্রহণ করা হয়। জবত ছাড়া যে পদ্ধতিগুলো প্রচলিত ছিল সে সময় সেগুলি হল অনুমান নির্ভর পরিমাপ পদ্ধতি বা কানকুত এবং ফসল ভাগ করার পদ্ধতি বা বাঁটাই। কানকুত-পদ্ধতিতে সমস্ত জমিকে আগে জরিব বা পায়ে গুনে ভালো করে মেপে নেওয়া হত এবং তারপর বিচার বিবেচনা করে ফসলের পরিমাণ হিসাব করা হত। যদি সেখানে কোনো সন্দেহ তৈরি হত, তাহলে ফসল কেটে তাকে ভালো, মাঝারি ও নিকৃষ্ট–এই তিন ভাগে ভাগ করে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ফসলের দাম আন্দাজ করা হত। আবুল ফজল বলেছেন, ‘অনুমান করা (ফসলের) জমি থেকেও অনেক সময় সঠিক লাভ এসে যেত।’

দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল ফসল ভাগ বাটোয়ারা করা। এক্ষেত্রেও ফসলকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হত। প্রথমটা ছিল ভালোইফসল যাকে ঝাড়াই মাড়াই করে চুক্তি অনুসারে দাবিদারদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হত। দ্বিতীয়টি ছিল খেত বাঁটাই যেখানে ফসল কাটার পর তাকে গোলাবদ্ধ করে ভাগ করা হত। তৃতীয়টি ছিল ‘লাংবাটাই যেখানে শস্য কাটার পর এক জায়গায় জমা করে ভাগ বাটোয়ারা করা হত। এই পদ্ধতিতে তুখোড় নজিরদারির প্রয়োজন হত না হলে দুর্নীতি করার সুযোগ ছিল অনেক।

কাশ্মীর অঞ্চলে প্রচলিত ছিল আর-এক ধরনের ভাগ বাটোয়ারার পদ্ধতি যা মধ্য এশিয়ার কিছু অংশেও চালু ছিল বলে জানা যায়, তা হল গাধা বোঝাই (খরওয়ার) করে ফসলের গুনতি করা ও তারপর তা ভাগ করা।

তৎকালীন সূত্র থেকে আর এক ধরনের রাজস্ব নির্ধারণ পদ্ধতির কথা জানা যান, তা হল নসক। তবে এই পদ্ধতি ঠিক কি ছিল তা নিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্কের শেষ নেই। মোরল্যান্ড একে বলেছেন সমূহ রাজস্ব নির্ধারণ পদ্ধতি। আর. পি, ত্রিপাঠী এই মত না মানলেও এর প্রকৃত চরিত্র কি সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন। ইরফান হাবিব একে বলেছেন পূর্বের নির্ধারিত হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন পরিমাপ। অর্থাৎ পূর্বের কোনো রাজস্ব নির্ধারণ পদ্ধতি তা সে জবত হোক বা বাঁটাই কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ধার্য রাজস্ব দাবির ওপর ভিত্তি করে কৃষকদের কাছে একটি নতুন রাজস্ব দাবি রাখা হত। যদি তারা সে দাবি গ্রহণ করতে না চাইত তাহলে তখন নতুন রাজস্ব নির্ধারণ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হত। এই ভাবে যতটা পারা যেত প্রতি বছরের জরিপ ও রাজস্ব নির্ধারণের ঝুট-ঝামেলা এড়ানোর চেষ্টা করা হত। মনে করা হয় যে ক্রমে জবত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে নকনির্ধারণই হয়ে উঠেছিল মুঘল রাষ্ট্রের আদর্শ রাজস্ব নির্ধারণ ব্যবস্থা, কিন্তু বাঁটাই পদ্ধতির ওপর মানুষের আস্থা তখনও উঠে যায়নি, বিশেষ করে যখন শস্যহানির ঘটনা পর পর ঘটে যাচ্ছিল তখন। বাঁটাই পদ্ধতিই ছিল কৃষকদের একমাত্র বাঁচার পথ।

একই ভাবে রাষ্ট্র সব সময় নগদে রাজস্ব আদায়ের ওপর অগ্রাধিকার দিত, কিন্তু কৃষকদের কাছে নগদ অথবা ফসল ভাগ বাটোয়ারার ওপর ভিত্তি করে ফসলেই রাজস্ব প্রদানের বিকল্প পথ খোলা থাকত। অনেক সময় একটি মরশুমে (শীত কিংবা গ্রীষ্মে) নগদে ও অন্য মরশুমে ফসলে তারা রাজস্ব দিত। রাজস্থানে প্রাপ্ত সপ্তদশ শতকের একটি রাজস্ব দলিল থেকে জানা যায় যখন রাষ্ট্র ফসলে রাজস্ব পেত তখন তড়িঘড়ি তা বিক্রি করে নগদ অর্থে রূপান্তরিত করে নেওয়া হত। তাই সরকারি হিসাবপত্রে যতটা এই ব্যবস্থাকে জটিল করে দেখানো হয়েছে ততটা বোধ হয় জটিল ছিল না।

রাষ্ট্র কৃষকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে রাজস্ব বন্দোবস্ত করত না সামগ্রিক ভাবে গোটা গ্রামের সঙ্গে করত সে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আগে আলাউদ্দিন খলজির সময়ে যে ব্যবস্থা ছিল তা মাথায় রেখে মুঘল কর্তৃপক্ষের এটা মনে হয়েছিল যে গোষ্ঠীসমূহের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করার অর্থ হল ধনীর ভাগের রাজস্ব ভার গরিবের কাঁধে চাপানো। যদিও এই ধরনের ভাবনার পিছনে কৃষকদের স্বার্থে রাষ্ট্রের সাম্যবাদী কোনো সদিচ্ছা ছিল বলা যাবে না। মধ্যযুগের সমাজ তা সে গ্রামীণ হোক বা নাগরিক, মূলত ছিল শ্রেণিবিভক্ত এবং সেখানে মুসলিম সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বা আসরফ ও সুবিধাহীন গোষ্ঠী বা আজলফ-দের মধ্যে ছিল বিস্তর বৈষম্য। আসলে গোষ্ঠীসমূহের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করলে যে সমস্যাটা হত তা হল বিভিন্ন শ্রেণি গ্রামের কৃষির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্য গোপন করায় রাষ্ট্রের পক্ষে যথাযথ রাজস্ব নির্ধারণ করা সম্ভব হত না। এ কথা সত্য যে এই রাজস্ব নির্ধারণের সমগ্র বিষয়টাই নির্ভর করত একটি গ্রামের কৃষির প্রকৃত অবস্থা কী ছিল, সেখানে কত পরিমাণ ফসল ফলত ও কত পরিমাণে ফসল ফলার সম্ভাবনা ছিল তার ওপর। তাই একজন। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কৃষির তথ্য সংগ্রহ করে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে রাজস্ব বন্দোবস্ত করার ওপর জোর দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তীকালে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়া হয় যাতে তারা সরাসরি রাষ্ট্রের কাছে রাজস্ব প্রদান করে, আর এর জন্যে খালিসা জমির কৃষকদের সরাসরি রাষ্ট্রের কোষাগারে এবং জায়গির জমির কৃষকদের সরাসরি জায়গিরদারদের প্রতিনিধির কাছে রাজস্ব জমা করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এখানেই গ্রামীণ সমাজের প্রকৃত খেলা শুরু হয়। বেশিরভাগ গ্রামের নিয়ন্ত্রণ কোনো-না কোনো জমিদার বা গ্রাম প্রধানের হাতে ছিল। এরা পেশকাশ-এর অছিলায় একটা সীমিত অর্থ রাজস্ব হিসাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিত। আলাউদ্দিন খলজির সময় থেকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রকৃত কৃষির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারণ করার জন্য গ্রামে গ্রামে সমীক্ষা চালানোর চেষ্টা করা হত। গ্রামের কৃষির প্রকৃত অবস্থা জানার সবথেকে ভালো পদ্ধতি ছিল জরিপ ব্যবস্থা বা জবত। এই ব্যবস্থা চালাতে গিয়ে একবার কিন্তু একটা বড়ো সংখ্যায় জমিদার ও তাদের প্রতিনিধি কানুনগোদের সাহায্য পেয়েছিলেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়েছিল লাহোর থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত অঞ্চলেই। তাও সেখানে জমিদাররা সহযোগিতা করার প্রতিদানে নিজ নিজ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব কর আদায় করত সেগুলো অব্যাহত রেখেছিল এবং রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রেও কিছু অংশ গোপনে আত্মসাৎ করার মতো কাজও যে করত তারা সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও রাষ্ট্রের তরফ থেকে কৃষকদের একটি পাট্টা বা কবুলিয়ত (গ্রহণ-পত্র বা রাজস্ব বন্দোবস্তের চুক্তিপত্র) দেওয়া হত ঠিকই, যেখানে লেখা থাকত কত পরিমাণ জমি চাষ করা হয়েছে, কত ফসল ফলেছে, ফলন ও রাজস্বের সময়সীমা কতদিন এবং বকেয়া রাজস্ব কত পড়ে রয়েছে; কিন্তু কৃষকরা অশিক্ষিত হওয়ায় তাদের কাছে সেই পাট্টার কোনো মুল্যই ছিল না। তবে এটা ঠিক যে এই দলিলের সাহায্যে রাষ্ট্র গ্রামে কত পরিমাণ রাজস্ব ধার্য করেছে এবং গ্রাম প্রধান বা জমিদারদের কাছ থেকে কত পরিমাণ রাজস্ব আদপে লাভ করছে তার একটা মূল্যায়ন করার সুযোগ থাকত।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে রাজস্ব বন্দোবস্ত একক ভাবে কৃষকদের সঙ্গে সম্পাদন করা হলেও রাজস্ব আদায়ের দায়দায়িত্ব যেহেতু প্রবলভাবে বর্তেছিল গ্রাম প্রধান বা জমিদারদের ওপরে, সেহেতু কার্যক্ষেত্রে বহু জমিদার ও সম্ভ্রান্ত কৃষকশ্রেণি এর ফলে রাষ্ট্রকে বোকা বানিয়ে নিজের আখের খুব ভালোভাবেই গুছিয়ে নিতে পেরেছিল। সেই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় স্থানীয় জমিদারদের প্রবল প্রভাব প্রতিপত্তি থাকায় রাষ্ট্রকে নির্দয়ভাবে রাজস্ব বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। তবে এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থায় গ্রামের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল নিঃসন্দেহে।

একটা প্রশ্ন ওঠে যে এই দহসালা ব্যবস্থায় রাজস্ব দাবি কি চিরস্থায়ী ভাবেই ধার্য করা হত না সময়ে সময়ে তা সংশোধন করা হত? এ ব্যাপারে এটা বলা যায় যে আকবর বা তার উত্তরসূরিদের আমলে কিন্তু আর নতুন করে কোনো ভূমি রাজস্ব বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হয়নি, ফলে ব্যবহারিক দিক দিয়ে ধরে নিতে হবে যে এটা চিরস্থায়ী একটা বন্দোবস্ত ছিল। কিন্তু তাই বলে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে কৃষির উন্নতি ও বিস্তার ঘটলে রাষ্ট্র তার ভাগ নিতে ভুলে যেত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ফসলের দাম কমে গেলে রাষ্ট্র রাজস্বে ছাড় দিত। বস্তুত কৃষির উন্নতি ও বিস্তার ঘটিয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করাই ছিল মুঘল প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। আমরা আগে দেখেছি কীভাবে বঞ্জর বা পতিত জমিকে কৃষিকর আওতায় এলে তা থেকে প্রথম দিকে ছাড় দিয়ে চার বছর ছাড়া রাজস্ব আদায় করা হত। আইন অনুসারে, আমলগুজার বা রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের ‘পতিত জমিগুলিকে কৃষির আওতায় আনা ও কৃষিজ জমি যাতে কোনোভাবেই পতিত জমিতে পরিণত না হয় সে ব্যাপারে যত্নবান’ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এদেরকে আরও বলা হয়েছিল যে ‘কোনো গ্রামে যেন পতিত জমি পড়ে না থাকে আর যে কৃষক তার কৃষির সম্প্রসারণ করতে সক্ষম তাকে ভিন গ্রামে হলেও যেন পর্যাপ্ত জমির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।’ আমলগুজারদের এই নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল যে খরা বা পতিত জমিকে কৃষির আওতায় আনার ক্ষেত্রে কৃষকদের বীজ ও কৃষিজ অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয় করার জন্য পর্যাপ্ত ঋণ বা তাকাভি দেওয়ার ব্যবস্থা যেন করা হয়। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় সহায়তা সেচের জন্য কূপ খনন ও মেরামতির ক্ষেত্রেও দেওয়ার কথা বলা হয়। মুখ্য শস্য বা অর্থকরী ফসলের চাষ বাড়ানোর জন্যেও নানা ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

এই ভাবে রাষ্ট্র কৃষির উন্নতিসাধন ও সম্প্রসারণ ঘটিয়ে নিজ রাজস্ব আয় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। এর একটা প্রভাব ফসলের বাজারদরের ওপরেও পড়েছিল। আকবর নামাতে বলা হয়েছিল যে আকবরের রাজত্বের ৪৩তম বর্ষে (১৫৯৮) সম্রাটের দীর্ঘদিন লাহোরে অধিষ্ঠান ও স্থানীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চলের রাজস্ব দাবি ২০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল আর সেখান থেকে তার চলে যাবার পরে মূল্যমান কমে গেলে রাজস্ব দাবিও কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আকবরের শাসনের ৩০ ও ৩১তম বর্ষে (১৫৮৫, ১৫৮৬) যখন দারুণ ফলন হওয়ায় বাজারদর অনেকটাই কমে গিয়েছিল তখন দিল্লি, এলাহাবাদ ও অযোধ্যায় দাম কমার অনুপাতে রাজস্ব দাবিও কম করা হয়েছিল। খরার ফলে ক্ষতিপূরণ হিসাবে অনেক সময়ে কৃষি জমির একটা বিশেষ অংশকে ‘চাষ হয়নি’ (নাবুদ) বলে ঘোষণা করে তা থেকে রাজস্ব নির্ধারণে ছাড় দেওয়া হত।

 এসব পদক্ষেপ হয়তো কৃষকদের চাষ করার ঝুঁকি থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত করেছিল কিন্তু তাদের সমস্যার সুরাহা করতে পারেনি। রাষ্ট্রের তরফে দেওয়া ছাড় ও ভর্তুকি কৃষকদের বকেয়া রাজস্বভার কমাতে পারেনি। এর সঙ্গে ছিল উচ্চহারে রাজস্ব বৃদ্ধি যা বকেয়ার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। মনে করা হয় যে টোডর মলের নেতৃত্বে মুঘল রাষ্ট্র আমিলদের সঙ্গে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে বকেয়া আদায় করেছিল। এবং সেই নিষ্ঠুরতা রীতিমতো পরিণত হয়েছিল কৃষক নিপীড়নে। পরিস্থিতি এতটাই ঘোরতর হয়ে উঠেছিল যে আকবর তা বুঝতে পেরে ১৫৮৫ সালে একটি তদন্ত আয়োগ গঠন করেছিলেন। সেই আয়োগের সুপারিশ থেকে দেখা গিয়েছিল যে কীভাবে রাষ্ট্রের নিয়ম নীতিগুলি লঙ্ঘন করে আধিকারিকরা ইচ্ছেমতো বকেয়া আদায়ের নির্মম খেলায় মেতে উঠেছিলেন, কীভাবে চাষ করা জমির হিসাবের বদলে আন্দাজে হিসাব করে বকেয়া রূপে যা ইচ্ছে তাই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল কৃষকদের থেকে। অনেক সময় চাষ হয়নি এমন জমিকেও পরিমাপ করে তার ভিত্তিতে ভুয়ো রাজস্ব ধার্য করা হয়েছিল। তদন্ত আয়োগের সুপারিশে অভিযুক্ত আমিলদের বিচার করে গ্রেফতার করা বা বেতনের একটা অংশ কেটে নেওয়া অথবা তাদের কাজে সহায়তা করার জন্যে যে অতিরিক্ত লোকজন ও সেনা বরাদ্দ করা হত তা বন্ধ করে দেবার পরামর্শ দেওয়া হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত আমিলদের আদেশ দেওয়া হয় অবৈধভাবে আদায় করা রাজস্বের অর্থ কৃষকদের ফিরিতে দিতে। আংশিক ভাবে আয়োগের সুপারিশে জমি জরিপের কর্মচারীদের কৃষকদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব এমন একটি পারিশ্রমিক বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

এই সময়ে পরিমাপের জন্যে আগেকার গজকাঠি গসিকান্দারি বদলে নতুন গজকাঠি গজ-ই-ইলাহি চালু করা হয়েছিল। এই নতুন গজকাঠিতে ৪১টা দাগ ছিল, দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৩ ইঞ্চি এবং আগের গজকাঠির থেকে ১৪ শতাংশ লম্বা। তাই এক বিঘার মাপ আগে যা ৬০x৬০ গজ ছিল তা নতুন গজকাঠি চালুর ফলে ১০.৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। এর ফলে রবি ও খারিফ ফসলের দস্তুর নির্ধারণের হিসাব সংশোধন করার দরকার হয়ে পড়েছিল।কিন্তু সে সংশোধন আদৌ করা হয়েছিল কিনা তা নিয়ে পঞ্চাশ বছর আগে এই বিষয় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মোরল্যান্ড সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগত কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে আইন-এ যে রাজস্ব হারের উল্লেখ আছে তা আসলে এই পরিবর্তিত বিঘার মাপ অনুসারে সংশোধিত রাজস্ব হার।

সুতরাং আলোচনা থেকে যে ছবি উঠে এল তা হল এই সময় এমন একটি রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল যেখানে প্রথমে বিঘা প্রতি ফসলের পরিমাপ করে একটি অখণ্ড শস্য হার ধার্য করা হত এবং পরে তাকে স্থানীয় বাজারদরের নিরিখে স্থানীয় স্তরের শস্য হারে রূপান্তরিত করা হত। সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে যখন এই হিসেব ওলটপালট হয়ে যেত তখন পূর্বের অভিজ্ঞতা, উৎপাদিত ফসল ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে নগদ হারে রাজস্ব ধার্য করা হত। সময়ে সময়ে কিছু কাটাছেঁড়া করে মোটামুটি এই ব্যবস্থাই অব্যাহত ছিল মুঘল শাসন। জুড়ে। জরিপ পদ্ধতিকেই (জবত) আদর্শ পদ্ধতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল যদিও এর পাশাপাশি অন্য পদ্ধতিগুলোও ব্যবহার করা হত প্রয়োজন মতো। রাজস্ব। ব্যবস্থা স্থিতিশীল হয়ে গেলে নসক পদ্ধতির মাধ্যমে বাৎসরিক ভাবে রাজস্ব পরিমাপ করার নিয়ম চালু করা হয়েছিল। রাজস্ব ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা কৃষির উন্নতি সাধন ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল। যদিও পরে আমরা দেখব কৃষির এই উন্নতি ও বিস্তার অঞ্চলভেদ কীভাবে ভিন্ন রূপে ধরা দিয়েছিল।

মনসবদারি ব্যবস্থা ও সেনাবাহিনী

ভারতে মুঘলরা এক অভিনব ব্যবস্থা চালু করেছিল, তা হল মনসবদারি ব্যবস্থা। বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতে একজনকে মনসব বা পদ প্রধান করে তার সরকারি পদবিন্যাসে স্থান ও বেতন স্থির করা হত। আবার এই মনসব দান করে একজন অভিজাতর অধীনে কত সেনা থাকবে তাও স্থির করে দেওয়া হত। এই মনসব গ্রহণকারীকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রশাসনিক অথবা সামরিক বিভাগে নিয়োগ করা হত, না হলে দরবারের কাজে লাগানো হত। সব মিলিয়ে মনসবদারির মাধ্যমে একই সঙ্গে সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে দায়িত্বের একটা আকার দেওয়া হত। এদের যে বেতন দেওয়া হত নগদে প্রদান করা হত না হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জায়গিরের মাধ্যমে দেওয়া হত। জায়গির দানের মাধ্যমে বেতন দান তখনই করা হত যখন রাষ্ট্রের বকেয়া রাজস্ব আদায়ে সর্বাত্মক ভাবে মনসবদাররা সাহায্য করত।

অভিজাতদের ১০ থেকে ৫০০০ পর্যন্ত মনসব প্রদান করা হত যেগুলিকে ছেষট্টিটি ভাগে ভাগ করে প্রথমে ১০ থেকে ১০০ ও পরে ৫০ থেকে ১০০ এই হিসাবে অভিজাত-প্রতি বরাদ্দ করা হত। তবে এই ছেষট্টিটি ভাগে মনসব প্রদান করা হত কিনা সন্দেহ আছে, আসলে এই ছেষট্টি সংখ্যাটা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট মনসব বা পদের সূচক। যদিও মনসবদার কথাটা সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত একটি শব্দ, তবুও বিশেষ ভাবে যারা ৫০০ পর্যন্ত পদ লাভ করতেন তারাই মনসবদার হিসাবে পরিচিত হতেন; ৫০০ থেকে ২৫০০ পদাধিকারীরা আমির ও ২৫০০ এর উর্ধ্বে যারা পদ পেতেন তারা আমির-ই-উমদা বা আমির-ই-আজম নামে পরিচিত হতেন। পরবর্তীকালে যারা ১০০০-এর নিচে পদ দখল করে থাকতেন তাদেরকেই মনসবদার বলা হত। প্রথম দিকে মনসবদারদের একেবারে নিচু তলা থেকে কাজ করে উপরে উঠতে হত এবং মনসব পেতে হত। কিন্তু সম্রাট সম্মানীয় ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ করে উচ্চ মনসব প্রদান করতে পারতেন। বংশানুক্রমিকভাবে রাজা ও প্রধানদেরও সম্রাট অনেক সময়। এই সুযোগ দিতে পারতেন।

সম্রাটের রক্তের সম্পর্কের রাজপুরুষদের জন্য ৫০০০ থেকে ১০,০০০ পর্যন্ত মনসব সংরক্ষিত থাকত। যদিও আকবরের শাসনের অন্তিম লগ্নে আকবরের সৎ ভাই মির্জা আজিজ কোকা ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়ে পরিণত হওয়া রাজা মান সিংহকে ৭০০০ মনসবে উন্নীত করা হয়েছিল। এর পর থেকে ঔরঙ্গজেবের শাসনের শেষ। পর্যন্ত মুঘল প্রশাসনে অভিজাতদের মনসবের ঊর্ধ্বসীমা ৭০০০ পর্যন্তই ছিল। তবে এই সময় রাজপুত্রদের জন্যে পদের পরিমাণ পাগলের মতো ৪০,০০০ জাটে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মনসবদারি ব্যবস্থার বিবর্তন

মনসব বা পদের এভাবে শ্রেণিবিভাগ করার ধারা নতুন ছিল না। চেঙ্গিজ খানের আমলে তার সেনাবাহিনীকে ১০ থেকে ১০,০০০-এ ভাগ করা হয়েছিল। মোঙ্গলদের প্রভাবে এসে এদেশের অভিজাতরাও নাকি ১০০ (উজবাশি) বা ১০০০ (হাজারা) পদ ধারণ করা শুরু করেছিলেন বলে শোনা যায়। তবে এই ধরনের সংখ্যাগত পদ সর্বত্র প্রচলিত ছিল না। কোনো কোনো অভিজাতদের বলা হত তুমান বা দশ হাজারি সেনাধিনায়ক, কিন্তু এর মানে এই নয় যে উক্ত অভিজাত দশ হাজার সেনার নেতৃত্ব দিতেন, প্রকৃতপক্ষে দেখা যেত হয়তো এর দশ ভাগের এক ভাগও সেনা এদের কাছে থাকত না। আসলে এটা সর্বোচ্চ পদাধিকারীর মর্যাদাকে সূচিত করত, অধীনস্থ সেনার সংখ্যাকে নয়। লোদি ও শূর আমলে আমরা ২০,০০০ বা ১০,০০০ কিংবা ৫,০০০ সাওয়ারধারী অভিজাতদের কথা শুনতে পাই। কিন্তু আমরা সেক্ষেত্রেও জানি না যে। এই সকল অভিজাতদের অধীনে ঠিক কত জন অশ্বারোহী বাহিনী থাকত। সুতরাং ১০। থেকে ৫০০০ পর্যন্ত নিয়মিত বিভিন্ন ভাগে অভিজাতদের পদ বিন্যাস করার ঘটনা একেবারে অভিনব ছিল আর সেক্ষেত্রে আকবরের অবদান অনস্বীকার্য।

এ বিষয়ে সকলে একমত যে আকবর তাঁর শাসনের একাদশ বর্ষে (১৫৬৭) মনসব ব্যবস্থার এই সংখ্যাগত বিন্যাস চালু করেছিলেন। যদিও আবুল ফজল বৈরাম খায়ের মতো একজন অভিজাত যিনি আগেই মারা গিয়েছিলেন, তাঁকে মরণোত্তর মনসব পদ প্রদান করে এটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে এই মনসব প্রদান আসলে শ্রেণি-ভিত্তিক প্রশাসনে একজন অভিজাতের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এই সময়ে আবুল ফজল ছাড়া অন্য কোনো ঐতিহাসিক, বিশেষ করে নিজামুদ্দিন যিনি নিজে একজন বকশি ছিলেন এবং সামরিক সংগঠন দেখাশোনা করতেন, তিনিও ১৫৬৭ সালের পূর্বে মারা যাওয়া কোনো অভিজাতকে কোনোরকম সাম্মানিক পদ দান করেছিলেন বলে জানা যায় না।

এটা নিশ্চিত করে বলা খুব কঠিন যে এই সময় একজন মনসবদারের অধীনে ঠিক কতজন অশ্বারোহী সৈনিক থাকত, কারণ এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের কাছে তেমন কোনো সন্তোষজনক তথ্য ছিল না। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে কৃষির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে যথার্থ তথ্য পেতে শুরু করায় এবং ভালো মতো রাজস্ব আদায়ের (হাসিল) কাজ পরিচালিত হওয়ায়, আকবর অভিজাতদের জন্যে বরাদ্দ অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যার মধ্যে কাগজে-কলমে ও বাস্তবে সামঞ্জস্য আনার একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আর এই জন্যই মূলত আকবরের রাজত্বের অষ্টাদশ বছরে (১৫৭৩-৭৪) প্রচলন করা হয়েছিল দাগ ব্যবস্থা। দাগ ব্যবস্থায় প্রত্যেক মনসবদারের অধীনে থাকা সেনাবাহিনীর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এবং কত সংখ্যায় ঘোড়াকে নিরীক্ষণ করা হয়েছে তার হিসাব লিপিবদ্ধ করে রাখা হত। এই কাজে যারা বাধা দিতেন তাদের শাস্তি দেওয়া হত। ঐতিহাসিক বায়ুনি যিনি নিজেও একজন কুড়ির মনসবদার ছিলেন, তিনি বলেছিলেন যে প্রথমে একজন মনসবদারকে কুড়ির মনসব (কুড়ি জন সৈনিক) দেওয়া উচিত যাতে সে সামরিক ভবন, প্রাসাদ বা দুর্গে প্রয়োজন মতো কাজ করতে পারে। যদি তিনি এই কুড়ি জন অশ্বারোহী সৈনিককে দাগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যথাযথ ভাবে ভরণপোষণ করতে সক্ষম হন তাহলে তাকে ১০০-র মনসব দেওয়া উচিত। এই ভাবে নিজ দক্ষতা ও সাম্রাজ্যের আনুকূল্যের সহায়তায় ১০০ জন সৈনিককে সন্তোষজনক ভাবে সামলে নিতে পারলে অভিজাতদের পর পর ১০০০, ২০০০, এমনকি ৫০০০ মনসবও দেওয়া যেতে পারে।

কিন্তু অভিজাতকুল এই দাগ ব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারেননি এবং এর প্রতিবাদ করেছিলেন। মুনিম খান ও মুজফফর খান সহ বেশ কয়েক জন বরিষ্ঠ অভিজাত তাদের সেনাবাহিনীকে দাগ দেবার জন্যে হাজির করতে সম্মত ছিলেন না। মির্জা আজিজ কোকা এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করায় তার ওপর সরকারি নজরদারি শুরু হয়েছিল। এই দাগ ব্যবস্থা অনেক নিচু তলার কর্মচারীর হাতে অনেক ক্ষমতা এনে দিয়েছিল যা দুর্ব্যবহার করে তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মচারী ও সম্মানীয় অভিজাতদের অনেক সময় হয়রান করতেন। কয়েকজন দিওয়ান এইভাবে বাজে ব্যবহার করেছিলেন যা কিছুটা হলেও ১৫৮০ সালের বাংলা ও বিহারে ব্যাপক বিদ্রোহের জন্য দায়ি ছিল। আকবর এই পরিস্থিতি সমাধানের কীভাবে চেষ্টা করেছিলেন তা আমরা আগেই আলোচনা করেছি।

দাগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ছাড়া আরও কিছু সমস্যা ছিল। মনসবদাররা তাদের প্রয়োজনীয় সাওয়ারগুলো ঠিকঠাক ভাবে সামলাতে পারতেন না অনেক সময়। বায়ুনি জানাচ্ছেন, শুধু যে তিনি নিজে তার অধীনে থাকা অশ্বারোহী বাহিনীকে দাগ দেবার জন্যে হাজির করতে পারেননি তাই নয়, সেই সঙ্গে তার সহ মনসবদারদেরও কালঘাম ছুটে গিয়েছিল নিজ নিজ অধীনস্থ অশ্বারোহী বাহিনীর ঘোড়াদের দাগ দেবার জন্য জড়ো করতে। অবশেষে তারা তিরন্দাজ বাহিনীকে এনে তাদের ঘোড়াগুলো কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করেছিল। কিন্তু এই চালাকি ধরা পড়ে যায় এবং তাদের নিজস্ব খরচ ও সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দ জায়গির কেড়ে নেওয়া হয়।

জাট ও সাওয়ার পদ

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আবরের শাসনের ৪০তম বর্ষে (১৫৯৫-৯৬) প্রচলন করা হয়। দুটি বিশেষ পদ–জাট ও সাওয়ার। আবুল ফজলের মতে, মনসবদারদের তিনটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হত। যারা তাদের বরাদ্দ সংখ্যক মনসবের সঙ্গে সমান সংখ্যক সাওয়ার পদ সামলাতে পারতেন তাদের প্রথম গোষ্ঠীতে রাখা হত। দ্বিতীয় গোষ্ঠীতে থাকতেন তারাই যারা বরাদ্দ সংখ্যক মনসবের সঙ্গে তার অর্ধেক বা একটু বেশি সংখ্যক সাওয়ার পদ লাভ করতেন আর তৃতীয় গোষ্ঠীর মনসবদারদের মনসবের সংখ্যার তুলনায় সাওয়ার পদের সংখ্যা হত অর্ধেকের কম। এখানেই ব্যক্তিগত পদমর্যাদা বোঝাতে জাট কথাটা ব্যবহার করা শুরু হয়। আবুল ফজল বলেন, আকবরের রাজত্বের ৪১তম বর্ষে মির্জা শাহরুখের পদমর্যাদা বৃদ্ধি করে তাকে ৫০০০ জাট ও অর্থ সংখ্যক সাওয়ার পদ দান করা হয়েছিল।

এই জাট ও সাওয়ার কথার অর্থ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে ঐতিহাসিক মহলে। এই বিতর্ক তৈরি হওয়ার কারণ হল আকবরের আমলে ধীরে ধীরে মনসবদারি ব্যবস্থা বিকশিত হওয়ার ফলে এই পদগুলির স্বরূপ নির্ধারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া। প্রথম দিক ১৫৯৪-৯৫ সাল পর্যন্ত একটি মাত্র পদ ছিল। প্রথম দিকের বিতর্কগুলো আমাদের আলোচনার স্বার্থে নিষ্প্রয়োজন, তাই সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হল না। আমরা মূলত ১৫৯৫-৯৬-এর পর যে জাট সাওয়ার পদের দ্বৈত ব্যবস্থা চালু হয়েছিল সে দিকে নজর দেব। সেখানে জাট বলতে একজন অভিজাতের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও বেতনকে বোঝাত, আর সাওয়ার বলতে সেই অভিজাত প্রকৃতপক্ষে ঠিক কত পরিমাণ অশ্বারোহী সৈন্য ধারণের যোগ্য তা বোঝাত। তাই একজন মনসবদার যিনি ৪০০০ জাট ও কেবল ২০০০ সাওয়ার পদ ধারণ করতেন তিনি কিন্তু একজন ৩০০০ জাট ও ৩০০০ সাওয়ার পদধারী অভিজাতের তুলনায় অধিক উচ্চপদাধিকারী হিসাবে বিবেচিত হতেন। জাট পদ বলতে একজন মনসবদারের কত পরিমাণ যুদ্ধবাজ ঘোড়া, হাতি, ভারবাহী গাধা ও ঘোড়া রয়েছে। সেটিকেও বোঝাত। আর এই হিসেবে একজন ৫০০০ জাটধারী মনসবদারের অবশ্যই ৩৫০টি যুদ্ধবাজ ঘোড়া, ১০০টি হাতি, ১৪০টি উট, ১০০টি খচ্চর ও ১৬০টি ভারবাহী ঘোড়া থাকা আবশ্যিক ছিল। ৪০০ বা তার কম পদের মনসবদারদের এই নিয়ম মানতে হত না। জাটধারী মনসবদারদের নিখুঁতভাবে উল্লেখ করতে হত তাদের কাছে থাকা ঘোড়ার মান কেমন, সেগুলি কি ইরাকি, তুর্কি, ইয়াবু (কাবুলি) নাকি জংলা (ভারতীয়)-সব পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে জানাতে হত। একই ভাবে জানাতে হত হাতিদের গুণগত মান। এ ব্যাপারে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে যে এই বিশাল সংখ্যক পশুর ভরণপোষণের খরচ কীভাবে চালানো হত। আধুনিক ঐতিহাসিক আবুল আজিজের যুক্তি অনুসারে মনসবদারদের দেওয়া জাট বেতন থেকেই চালাতে হত না। শিরিন মুসভির মতানুসারে এদের পৃথক ভাতা দেওয়া হত যাতে এই ব্যয়ভার চালানোর জন্য তাদের ওপর খরচের কোনো চাপ পড়ে না। তাছাড়া মুঘল বাহিনীকে যেভাবে অত্যন্ত গতিশীল শক্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেভাবে অভিজাতদের সব। সময় তাদের অধীনস্থ বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও বদলির জন্য তৎপর থাকতে হত বলে : বর্ণনা করা হয় তাতে পরিবহণের জন্য এই ধরনের বিশাল সংখ্যক ভারবাহী পশুদের। ভরণপোষণ করা একজন অভিজাতদের পক্ষে খুব কঠিন কাজ ছিল বলে মনে হয়। তাই আবুল ফজল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে শুধু কি সাওয়ার বা যুদ্ধঘোড়া? রীতিমতো ভারবাহী গাধাদেরও দাগ দেওয়ার জন্যে হাজির করতে হত।

জাট ও সাওয়ার বেতন

রাষ্ট্র খুব সাবধানে সাওয়ারের ঘোড়াগুলির গুণগত মান ও সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করত। সাধারণত যে নিয়মটা ছিল তা হল ১০ সাওয়ারের মনসবদারের জন্য বরাদ্দ হত ২০টা ঘোড়া, একে বলা হত দহবিশতি বা দশ-কুড়ি ব্যবস্থা (৩x৩=৯টি ঘোড়া, ৪×২=৮টি ঘোড়া, ৩x১=৩টি ঘোড়া মোট ২০ টি ঘোড়া)। ঘোড়ার বিন্যাসটা এভাবে করা হয়েছিল মুঘল শক্তির প্রাণকেন্দ্র রূপে পরিচিত অশ্বরোহী বাহিনীকে একটা গতি দান করার জন্যে। তাছাড়া ভারবাহী ঘোড়াগুলো ক্লান্ত, আহত বা মারা গেলে যাতে সব সময় বিকল্প থাকে সে কারণে একাধিক ঘোড়া বরাদ্দ করা হত। এই ঘোড়াদের গুণগত মান ও সংখ্যার (যেমন এক, দুই, তিন, চার) ওপর নির্ভর করে সাওয়ার পদের বেতন নির্ধারিত হত। তাই একজন সৈনিকের একটি ইরাকি, ঘোড়া থাকলে বেতন হত মাসিক ৩০টাকা, মুজান্নাস (ইরানি-তুর্কি সংকর) ঘোড়া থাকলে বেতন হত ২৫ টাকা, শুধু তুর্কি ঘোড়া থাকলে বেতন হত ২০ টাকা, ইয়াবু ঘোড়া থাকলে হত ১৮ টাকা, এই ভাবে চলত।

দাগ ব্যবস্থা বলবৎ হওয়ার আগে পর্যন্ত আকবরের আমলে সওয়ারের বেতন ছিল এইরূপ : মুঘল, আফগান ও ভারতীয় মুসলিমরা তিনটি ঘোড়া রাখলে বেতন হত মাসিক ২৫ টাকা, দুটো ঘোড়া রাখলে হত মাসিক ২০ টাকা আর একটা ঘোড়া থাকলে পেতেন মাসিক ১৫ টাকা। একজন রাজপুত তিনটি ঘোড়া রাখলে বেতন পেতেন মাসিক ২০ টাকা, দুটো ঘোড়া রাখলে পেতেন মাসিক ১৫ টাকা। একটা ঘোড়া রাখলে একজন রাজপুত ঠিক কত টাকা বেতন পেতেন সে কথা উল্লেখ করেননি আবুল ফজল, তবে এটা মনে হয় যে তিনি মাসিক ১২ টাকা বেতন পেতেন। নিচুতলার রাজপুতদের বেতন মুসলমানদের তুলনায় সত্যিই কম ছিল, কিন্তু এটা হয়তো রাজপুতদের কাজ দেবার জন্যে অ-রাজপুত অভিজাতদের উৎসাহ দিতে করা হয়েছিল। যদিও মুঘল ও রাজপুত অভিজাতদের কেবল তাদের জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত লোকজনদেরই কাজে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাকি সব অভিজাতদের সকল জাতের সৈন্য নিয়োগ করার নির্দেশ ছিল। তবে দাগ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর ঘোড়ার সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার অবস্থা দেখে তবেই বেতন দেওয়া হত।

দাগ ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগে আকবরের আমলে যে দশ-কুড়ি ব্যবস্থার আওতায় সাওয়ারের বেতন চালু ছিল তার পরিমাণ আধুনিক ঐতিহাসিক মোরল্যান্ড হিসেব করে দেখেছেন বার্ষিক ২৪০ টাকা ছিল। মনসবদাররা এই বেতন থেকে কেবল ৫ শতাংশ অংশ নিতে পারতেন তাদের সাধারণ খরচ চালানোর জন্য।

মনসবদারদের যে জায়গির বরাদ্দ করা হত সেটা ছিল তাদের মোট জাট বেতন। এবং তার অধীনস্থ সেনাবাহিনীর জন্যে যে বেতন বরাদ্দ করা হত তা ছিল তার সাওয়ার বেতন, যা তার সাওয়ার পদের হিসেব অনুযায়ী বরাদ্দ হত।

অভিজাতদের জাট ও সাওয়ার পদের নিরিখে যে তিনটি ভাগে ভাগ করা হত, তার ওপর নির্ভর করেই তাদের জন্য জাট বেতন বরাদ্দ হত। উল্লেখ্য যে এই সময় মনসবদার ও সৈনিকদের যে নগদে বেতন দেওয়া হত তার পরিমাণ দাম’-এ (এই টাকা সমান ৪০ দাম) হিসাব করা হত। সমস্ত জায়গিরের মূল্যও দামের মাধ্যমে হিসাব করা হত। সে জন্যেই জায়গির দানের উদ্দেশ্যে যে রাজস্ব ধার্য হত তাকে বলা হত জমাদামি। প্রথম ভাগের অন্তর্ভুক্ত ৫০০০ পদের অভিজাতের জাট বেতন যদি মাসিক ৩০,০০০ টাকা বা বার্ষিক ৩,৬০,০০০ টাকা হত তাহলে দ্বিতীয় ভাগের অভিজাতের বেতন হত মাসিক ২৯,০০০ টাকা এবং তৃতীয় ভাগের অভিজাতের বেতন হত মাসিক ২৮,০০০ টাকা। এই হিসাবে নিচুতলার মানসবদারদের বেতন দেওয়া হত। তাই এক হাজারি মনসবদারদের দ্বিতীয় ভাগের মাসিক বেতন হত ৮১০০ টাকা আর তৃতীয় ভাগের বেতন হত মাসিক ৮০০০ টাকা।

যদিও সাওয়ারের বেতন আলাদা আলাদা ভাবে দেওয়া হত, কিন্তু অভিজাতরা যদি বিশাল সংখ্যক সেনাবাহিনী ভরণপোষণের কাজ খুব ভালো ভাবে করতেন তাহলে তাদের সমস্ত জাট বেতন একেবারে দিয়ে দেওয়া হত। তবে এই বেতন পেতে হলে অভিজাতদের ব্যক্তিগতভাবে সম্রাটের সামনে হাজির হতে হত। এই বেতনের অর্থ থেকেই অভিজাতদের জায়গির এলাকা থেকে রাজস্ব আদায়ের সমস্ত খরচ বহন। করতে হত। মিেরল্যান্ডের হিসাব অনুযায়ী জায়গির এলাকা থেকে রাজস্ব আদায়ের খরচ কখনোই মোট বেতনের এক চতুর্থাংশের বেশি হত না।

এছাড়া এই বেতন সবদিক দিয়ে খুব আকর্ষণীয় ছিল এবং বহু যোগ্য মানুষকে এই কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ঐতিহাসিক বায়ুনি জানাচ্ছেন, এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন সুযোগ্য ও আন্তরিক মানুষদের মনসব প্রদান বা উচ্চপদে উন্নীত করা হয়নি। বহু আরবি ও ফারসি মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে এসে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছে যেখানে তারা তাদের স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। আকবরের সমগ্র রাজত্বে সর্বমোট কতজন মনসবদার ছিলেন তা হিসেব করা খুব কঠিন। তবে আবুল ফজল আকবরের রাজত্বকালের ৪০তম বর্ষে সব ধরনের মৃত কিংবা জীবিত অভিজাতদের একটা তালিকা দিয়েছেন যারা বিগত চল্লিশ বছর ধরে মুঘল সাম্রাজ্যের হয়ে কাজ করেছেন। মোটামুটি ভাবে তিনি ও নিজামুদ্দিন আহমেদ মূলত ৫০০ বা তার বেশি মনসব প্রাপ্ত অভিজাতদেরই তালিকা দিয়েছিলেন। জাহাঙ্গিরের আমলের প্রথম দিকের কথা লিখতে গিয়ে দু জারিক (Du Jarric) ১০ থেকে ৫০০০ পদের মোট ২৯৪১ জন মনসবদারের একটি তালিকা দিয়েছিলেন। যদিও মান সিংহ ও আজিজ কোকা দুজনেই ৭,০০০ মনসব ভোগ করতেন তবুও দু জারিকের দেওয়া তালিকা অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে যে মোট ১৫০ জন বা ৫.১ শতাংশ অভিজাত ২৫০০ বা তার বেশি মনসব ভোগ করতেন।

এই সেই ১৫০ জন অভিজাত যারা মুঘল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সব সামরিক ও অসামরিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এদেরকে খুব সাবধানে নির্বাচন করে আমলাতন্ত্রের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল, এরা সম্পূর্ণভাবে শাসকের প্রতি নির্ভরশীল থাকতেন এবং এদের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতার জোরেই মুঘল সাম্রাজ্যের। সামগ্রিক প্রশাসনযন্ত্র সুচারুরূপে পরিচালিত হত। অনেকে বলে থাকেন, যদি এইসব কর্মচারীদের আকবর নগদ অর্থে বেতন দিতেন তাহলে সাম্রাজ্য আরও বেশি স্থিতিশীল হতে পারত। আসলে এই ধরনের যুক্তির পিছনে মূল কারণটা ছিল সে সময়কার জটিল সামাজিক বাস্তবতা। যে সমাজে স্থানীয় মানুষদের সামরিক ও সামাজিকভাবে একজন ভূম্যধিকারী প্রধান বা জমিদারের অধীনে থাকতে হত, যাদের সঙ্গে কৃষক সম্প্রদায়ের জাতিগত গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল, সেখান থেকে ঠিকঠাক রাজস্ব আদায় করে আনা রাষ্ট্রের কাছে খুব সহজ কাজ ছিল না। অভিজাতদের জায়গির প্রদান করে সেখান থেকে রাষ্ট্রের তরফে রাজস্ব আদায় করার তাগিদ তৈরি করার চেষ্টা করা হত ঠিকই কিন্তু তারা তা করতে গেলেই স্থানীয় বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হত। এভাবে সরাসরি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করার রাস্তা ছেড়ে যদি সরাসরি ওই অঞ্চলের জমিদার বা প্রধানদের সঙ্গে সমঝোতা করা হত তাহলে কাজটা অনেক সহজ হলেও হতে পারত। আকবর ১৫৭৬ সালে কিছু সময়ের জন্য লাহোর থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল খালিসা বা সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। তবে এটা করেছিলেন মূলত ওই অঞ্চল থেকে কৃষির যতটা সম্ভব নিখুঁত তথ্য জোগাড় করার জন্যে। তারপর অভিজাতদের ওই অঞ্চলে জায়গির প্রদান কয়েক বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে জমির ওপর অধিকার থাকলে সামাজিক প্রতিপত্তি ও সম্মান এবং উপার্জনের নিশ্চয়তার কোনো অভাব থাকত না। তাই পরের দিকে এক অভিজাত তার সন্তানকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, জায়গিরের মধ্যেই কাজের মূল আকর্ষণটা লুকিয়ে আছে, একজন জায়গিরহীন কর্মচারী কর্মহীন কর্মচারীরই সমতুল্য।

সেনাবাহিনী

মুঘল সেনবাহিনীতে থাকত অশ্বারোহী, পদাতিক, গোলন্দাজ, হস্তী ও উট বাহিনী। আধুনিক অর্থে কোনো নৌবাহিনীর কথা জানা যায় না, তবে একটি ক্ষুদ্র নৌবহর ছিল যার নেতৃত্ব দিতেন আমির-উল-বহর (সাগরের অধিপতি বা প্রধান নৌ সেনাপতি)। মুঘল বাহিনীর শক্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। আকবরের সময়ে মুঘল বাহিনীর সাফল্য কেবল ভাগ্যবলে আসেনি, ভাগ্য অবশ্যই একটা জায়গায় সঙ্গে ছিল ঠিকই কিন্তু তাই বলে নেতৃত্বের দক্ষতা ও মনোবলের উচ্ছ্বাসকে একেবারেই এড়িয়ে গেলে চলবে না। তবে সবথেকে আগে এই সাফল্যের জন্য কৃতিত্ব দেওয়া উচিত অশ্বারোহী, গোলন্দাজ ও হস্তীবাহিনীর মিলিত প্রচেষ্টাকে, আর কিছুটা হলেও পদাতিক বাহিনীকে যারা আগাগোড়া সাহায্য করে গিয়েছিল। মনসারেটের মতে, অশ্বারোহী বাহিনীকে বলা যায়–সবদিক দিয়ে সেনাবাহিনীর ফুল’, সম্রাটকে এই সংগঠিত, অস্ত্রসজ্জিত ও সুযোগ্য অশ্বারোহী বাহিনীকে চালাতে গিয়ে খুব বেশি খরচ করতে হত না। আর এ জন্যে দাগব্যবস্থাকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। ইরাক, ইরান ও আরব থেকে উচ্চমানের যুদ্ধঘোড়া আনার পাশাপাশি অশ্বারোহী সৈনিকদের লৌহ শিরস্ত্রাণ ও অন্যান্য নিরাপত্তাজনিত সমরাস্ত্রের সুবিধা প্রদান করা হত এবং তাদের ঘোড়াগুলির গলায়, বুকে ও পিঠে শক্ত আবরণ দিয়ে পুরো ঢেকে দেওয়া হত। সাওয়ারদের হাতে থাকত তরবারি, ছুরি ও বল্লম।

রাষ্ট্র কিন্তু অশ্ব প্রতিপালন বা যুদ্ধাস্ত্র কেনার খরচ বহন করত না। সৈনিককে নিজেই নিজের অশ্ব কিনে আনতে হত এবং নিরীক্ষণের সময় হাজির করলে তবেই কেনার অর্থ পাওয়া যেত। এই ব্যবস্থায় বিস্তর জটিলতা ও দুর্নীতি হত। আর তাই একটি নিয়ম তৈরি করে সকল মনসবদারকে নিয়োগের সময় তাদের অধীনস্থ সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের জন্য আগাম এককালীন অর্থ দান করা শুরু হয় যাকে বলা হত বারাওয়ারদি। সেনাবাহিনীর নিরীক্ষণের পর যখন সমগ্র বরাদ্দ অর্থ প্রদান করা হত তখন তার সঙ্গে এই অর্থের উপযোজন করে নেওয়া হত। কিন্তু এখানেও দুর্নীতির জায়গা ছিল : অভিজাতরা সেনাবাহিনীকে সরকারি নিরীক্ষণে হাজির করতে দেরি করতেন এবং নামমাত্র বাহিনী রেখে পূর্ণ বাহিনীর ভরণপোষণের খরচ বা বারাওয়ারদি আদায় করে নিতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সরাসরি সেনা নিয়োগ করত এবং তাদের উচ্চ মনসবদারদের সেবায় পাঠাত। এই বাহিনীকে বলা হত দাখিলী

উপরিউক্ত ব্যবস্থা ছাড়াও এক আলাদা ধরনের সৈন্য ছিল যাদের আহদি বলা হত। প্রত্যেক আহদিদের কাছে পাঁচ বা তার বেশি ঘোড়া থাকত এবং তাদের মোটা মাইনে দেওয়া হত। তাদের আলাদা প্রশিক্ষক বা দেওয়ান ছিল। আহদিদের সৈন্যবাহিনীর যে কোনো পদে বা দৃত হিসাবে নিয়োগ করা হত। এমনকি কোনো কোনো সময় তাদের মনসবদার হিসাবে নিয়োগ করা হত।

বাবরের আগমনের পর থেকে ভারতে সেনাবাহিনীতে গোলন্দাজ বাহিনীর বিকাশ দ্রুত গতিতে ঘটতে শুরু করেছিল। দুর্গ ধ্বংস করার বিশেষ বন্দুক ছাড়াও প্রচুর বিশালাকার বন্দুক আনা হত দুর্গ আক্রমণ করার সময়। দুর্গ ভাঙার বন্দুকগুলো সহজেই ব্যবহার করা যেত না এবং অনেক সময়ে হাতি ও হাজার হাজার বলদের পিঠে চাপিয়ে সেগুলোকে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় বহন করে নিয়ে যেতে হত। এগুলো গুলি ছোঁড়ার ক্ষেত্রে খুব ধীরগতিসম্পন্ন ছিল তবুও নিছক মর্যাদার খাতিরেই এগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হত এবং খুব একটা ব্যবহার না করেই ফেলে রাখতে হত। দুর্গ ভাঙার ক্ষেত্রে এই বন্দুকগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে কারণ চিতোর দুর্গ ভাঙা যায়নি এই বন্দুক নিয়ে। দুর্গের দেওয়ালে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ব্যবহৃত বারুদ বরং এক্ষেত্রে বেশি কার্যকরী ছিল।

বিশালাকার ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও নানা রকমের হালকা ও ছোটো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল মুঘল সামরিক শিবিরে। এগুলো যদি কোনো সৈনিক পিঠে করে বয়ে নিয়ে যেত তাহলে এগুলোকে বলা হত নরনল আর যদি সেগুলিকে হাতির পিঠে করে নিয়ে যাওয়া হত তাহলে বলা হত গজনল, উটের পিঠে করে নিয়ে গেলে বলা হত। শুত্ৰনল। সেখানে হালকা আংটা দেওয়া বন্দুকও ছিল। উটগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত কীভাবে তাদের কাঁধে রাখা বন্দুক থেকে গুলি ছোঁড়ার সময় তাদের গলা নামিয়ে রাখতে হবে।

পানিপথ ও খানুয়ার যুদ্ধের সময় যেরকম স্থল কামান বা চাকার গাড়িতে বোঝাই কামান (আরাবা) ব্যবহৃত হয়েছিল তেমন কোনো কামান আকবরের আমলে ছিল কিনা সে ব্যাপারে কিছুই জানতে পারা যায় না। কিন্তু এই দুই যুদ্ধের পর এই ধরনের কামানের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়।

বন্দুকের নির্মাণ ও সহজ বহনযোগ্যতার উন্নতির দিকে আকবরের সজাগ দৃষ্টি ছিল। তাই তিনি এমন সব বন্দুক নির্মাণে উৎসাহ দিয়েছিলেন যেগুলি নানা অংশে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া যেত এবং প্রয়োজন পড়লে সেই অংশগুলো জোড়া লাগিয়ে কাজে লাগানো যেত। চাকার গাড়িতে বোঝাই কামানের উন্নতি ঘটিয়েছিলেন তিনি। বলা হয় যে এই সময় ১৭টি কামানকে জুড়ে এমন একটি আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করা হয়েছিল যার একটি জায়গায় আগুন দিলে ১৭টি মুখ দিয়ে গোলা ছুটত। ইরফান হাবিব মনে করেন যে এই কামানগুলোকে এক জায়গায় এমনভাবে রাখা হত যাতে এক জায়গায় আগুন দিলে তার তাপে একের-পর-এক কামানে আগুন লেগে যেত। হাতে ধরা গাদা বন্দুক নির্মাণ ও তার উন্নতি সাধনেও আকবর প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলেন। এই বন্দুকগুলি আয়তনে ছিল তিন ফুট বা দুই গজের মতো। এগুলি ঠিকঠাক ভাবে পরিষ্কার করার জন্যে একটি বিশেষ যন্ত্রেরও উদ্ভাবন করা হয়েছিল এই সময়।

আকবরের আমলে হাজার হাজার হাতিকে ব্যবহার করা হয়েছিল যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। তাদেরকে খুব যত্নসহকারে নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত করা হত। যুদ্ধের সরঞ্জাম বহন ছাড়াও রাজপুরুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অভিজাতদের বহন করার মধ্য দিয়ে মুঘল বাহিনীতে হাতি অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একপ্রকার দুরমুশ বা আত্মরক্ষার্থে ভারী ঢাল হিসাবে কাজ করত। তবে বিপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনী এসে ঘিরে ফেললে তখন হাতিগুলির কিছু করার থাকত না।

মুঘল বাহিনীতে বিশাল সংখ্যায় পদাতিক সৈন্য নিয়োগ করা হয়েছিল সামরিক ও অসমারিক উভয় কারণেই। সামরিক সৈন্যরা মুলত বন্দুকধারী যোদ্ধা ছিল, যাদের বলা হত বন্দুকচি। এদের আবার পৃথক সংগঠন ছিল যেখানে থাকত একজন করণিক, একজন কোষাধ্যক্ষ ও একজন দারোগা। এরা একাধিক শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, এদের বেতন ছিল মাসিক ১১০ দাম থেকে ৩০০ দাম। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরাসরি দাখিলী সৈনিকদের নিয়োগ করা হত এবং বেতন দেওয়া হত মূলত মনসবদারদের সেবার জন্য এবং এরা হয় পদাতিক না হলে বন্দুকধারী সৈন্য হত। যোদ্ধা সৈনিকদের এক চতুর্থাংশ ছিল বন্দুক বহনকারী, ছুতোর, কামার, পানীয় জল বহনকারী ও রাস্তা পরিষ্কার করে পথ দেখানো কর্মচারী। প্রথম পানিপথের যুদ্ধে যেসব বন্দুকধারী পদাতিক সৈনিক (বন্দুকচি) তাদের দক্ষতা ও বীরত্বের প্রদর্শন করেছিল, বাবর ও তার পরবর্তী মুঘল সম্রাটের আমলে তাদের অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটতে শুরু করে। আইন। অনুসারে পদাতিক বাহিনীর অধিকারী মনসবদারদের কাছে মোট যে বাহিনী ছিল তার মধ্যে অর্ধেক বা ১২ শতাংশ ছিল গাদা বন্দুকধারী সৈন্য। সপ্তদশ শতকে এই বন্দুকধারী সৈনিকদের অনুপাত বেড়ে হয়েছিল ২০ শতাংশ। গাদা বন্দুকগুলোকে এত আধুনিক করে তোলা হয়েছিল যে আগুন ছাড়াই সেগুলো থেকে গুলি ছোঁড়া যেত। এই বন্দুকগুলোকে বলা হত চাকা কলের বন্দুক (wheel-lock gun) বা চকমকি বন্দুক (flint gun)। এযুগের একজন ঐতিহাসিক ইকতিদার আলম খানের মতে যদিও অশ্বারোহী সৈনিকদের তুলনায় গাদা বন্দুকধারী সৈনিকদের অনেক কম বেতন ছিল, তবুও এই গাদা বন্দুকধারী সৈনিকরাই মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসাবে বিবেচিত হত। এই কারণে একজন বরিষ্ঠ প্রশাসককে যে তিনটি প্রয়োজনীয় সামরিক কৌশল শিখে রাখতে বলা হত তার মধ্যে ঘোড়ায় চড়া ও তির ছোঁড়ার পাশাপাশি গাদা বন্দুক চালানোও ছিল অন্যতম।

চকমকি বন্দুকগুলো অনেক হালকা ছিল এবং এ থেকে গুলি ছোঁড়া যেত খুব। সহজে। এই বন্দুক অশ্বারোহী ও পদাতিক উভয় সৈনিকই ব্যবহার করতে পারত। সপ্তদশ শতকে এই বন্দুকের কথা ভারতে প্রথম শোনা গেলেও অষ্টাদশ শতকেই এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছিল।

এছাড়াও সামরিক বাহিনীর আনুষঙ্গিক হিসাবে ছিল খবর আনার জন্যে দূত, পালকিবাহক, কুস্তিগির, দাস প্রমুখ পরিসেবকগণ। সৈন্যবাহিনীকে কার্যকরী করে তোলার জন্যে এই পরিসেবকদের ভূমিকা ছিল মারাত্মক। কিন্তু অনেক সময়েই এদের পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হত, ফলে এদের প্রকৃত সংখ্যা কত ছিল তা বোঝা খুব মুশকিল। এর সঙ্গে প্রাসাদ ও শিবির রক্ষী এবং অনুচর তো ছিলই।

আকবরের সামরিক বাহিনীর শক্তি ঠিক কত ছিল তা বিচার করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। ১৫৮১সালে লেখা মনসেরেটের বক্তব্য অনুসারে, রাজকোষ থেকে সরাসরি পঁয়তাল্লিশ হাজার অশ্বারোহী, পাঁচ হাজার হস্তী বাহিনী ও হাজার হাজার পদাতিক বাহিনীকে বেতন দেওয়া হত। এই সময়ে মনসবদারদের অধীনে থাকা অশ্বারোহী বাহিনীর শক্তি যাচাই করা খুব কঠিন ছিল কারণ তখনও পর্যন্ত একজন মনসবদার ঠিকঠাক ভাবে তার অধীনে থাকা সাওয়ারের উল্লেখ নথিভুক্তির সময় করতেন না। পরে যখন সাওয়ার পদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হল, তখন আবার সব মনসবদারকে সাওয়ার পদ দেওয়া হয়নি। ফলে সব মনসবদারদের অধীনে কত সাওয়ার ছিল তার হিসাব বার করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু তার সংখ্যা যে সাওয়ার পদ সৃষ্টির পর নথিভুক্ত সংখ্যার থেকে অনেক বেশি ছিল সে ব্যাপারে নিশ্চিত করেই বলা যায়।

এভাবে কেন্দ্র পরিচালিত ও অভিজাতদের অধীনস্থ অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা ১০০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলা যায়। কিন্তু গোলন্দাজ ও পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা ঠিক কত ছিল সে ব্যাপারে কোনো আন্দাজ করা যায় না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *