3 of 8

আত্মনেপদী

আত্মনেপদী

বড় কঠিন নামকরণ হয়ে গেল সরস রচনার পক্ষে। শব্দটি চট করে কোনও অভিধানে পাওয়া যাবে না।

এমনকী চলন্তিকায় পর্যন্ত নেই। সংসদ এবং সুবল মিত্রে আছে, তবে আত্মনেপদী নয়, আত্মনেপদ, অর্থ দেওয়া আছে। আত্মফল ভাগিত্ব প্রকাশক তিঙন্ত পদ।

বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। ব্যাপারটা সরাসরি সংস্কৃত ব্যাকরণ থেকে এসেছে।

আমার সমস্যা অন্য। এতকাল ধরে এত লোকের আমি প্রশংসা করে আসছি কিন্তু কখনও কোথাও কাউকে আমার প্রশংসা করতে দেখিনি। তাই অবশেষে নিজের প্রশংসায় নিজেই রত হয়েছি। তাই এই আত্মনেপদী।

একটি সর্বজন পরিচিত কাহিনী নিজের নামে চালিয়ে আমি এখন খেলাচ্ছলে নিজের গুণকীর্তন করছি।

অথচ এই ব্যাপারে নিজেকে খুব একটা দোষী বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এর আগে আরও অনেকেই আত্মপ্রচারের প্রয়োজনে সময় সুযোগ মতো অনেকরকম অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। গল্পটা রোগী ডাক্তারের।

এই গল্পটার মধ্যে একটা মজার মারপ্যাচ আছে।

বিষন্নবদন স্থূলদেহ, স্ফীতোদের, সদাসর্বদা ঘর্মাক্ত অশক্ত কলেবর এক রোগী গেছেন এক বড় ডাক্তারের কাছে।

ডাক্তারবাবু রোগীকে চেনেন না, এই প্রথম দেখছেন তাঁকে। সুতরাং যা-যা করার সবই করলেন। নাড়ি টিপলেন, জিব দেখলেন, বুকে স্টেথস্কোপ যন্ত্র লাগিয়ে মনোযোগ দিয়ে অন্তর্নিহিত আওয়াজ শুনলেন।

তারপর প্রেসারের যন্ত্র দিয়ে রক্তচাপ যত্ন করে মাপলেন। খুব চেপে ধরে পেট টিপলেন। ছোট টর্চলাইটের সূচিমুখ আলোকলিসা দিয়ে নাক, কান এবং গলার ভিতর, যতটা দেখা যায়, দেখলেন।

রোগী এদিকে বলছে, “ডাক্তারবাবু, আমার শরীর খুবই খারাপ। কিন্তু কী হয়েছে কিছুই ধরতে পারছি না।”

ডাক্তারবাবু খুবই যত্নশীল, খুবই সাবধান। তিনি কোথাও খারাপ কিছু না পেয়ে আবার রোগীর পিঠে স্টেথস্কোপ লাগালেন। ড্রয়ারের দেরাজ খুলে একটা কালো রবারের হাতুড়ি বার করে রোগীর দুটো হাঁটুতে মারলেন, রোগীর স্নায়ুচেতনা পরীক্ষার জন্য।

কিন্তু ডাক্তারবাবু খারাপ কিছু পেলেন না।

অতঃপর চিন্তিত ডাক্তারবাবু রোগীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা, ঠিক বুঝিয়ে বলুন তো আপনার কী হয়েছে? কী শরীর খারাপ লাগে আপনার?”

শুকনো মুখে, করুণ কন্ঠে রোগী বললেন, “কী বলব ডাক্তারবাবু। মনে কোনও আনন্দ পাই না। সুখ নেই। সবসময় কেমন মন খারাপ, বিষন্নতা। কিছু ভাল লাগে না। মাথা সবসময় টিনটিন করে। শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে। কোনও কাজে আনন্দ পাই না।”

ডাক্তারবাবু চিন্তিত মুখে ভ্রূকুঞ্চন করে রোগীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। এ তো একেবারে মানসিক কেস। শরীরে আধিব্যাধি কিছু নেই, সব মনে। এর কী প্রতিকার করবেন তিনি? কী প্রতিকার করতে পারেন?

রোগীর স্বাস্থ্য যেমন মারাত্মক, গলার স্বরও তেমন মারাত্মক।

সেই মারাত্মক গলায় যথাসম্ভব খ্যান খ্যান করতে করতে রোগী তখনও বলে চলেছেন, “কোনও কাজে আনন্দ পাই না। মনে আনন্দ নেই, কোনও ফুর্তি নেই। কতকাল ভাল করে প্রাণ খুলে হাসিনি।”

“হাসিনি” কথাটা শুনে ডাক্তারবাবুর কেমন সম্বিত ফিরে এল। ডাক্তারবাবু রোগীকে বললেন, “আপনার অসুখের ঠিক কোনও চিকিৎসা নেই। কোনও ওষুধ-বিষুধ দরকার হবে না। একটা ভাল পরামর্শ দিচ্ছি।”

এরপর একটু থেমে ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা আপনি তারাপদ রায়ের নাম জানেন?”

রোগী বিষন্ন চোখে তাঁর গোলমেলে কণ্ঠকে যতটা অস্ফুট করা যায় তাই করে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, “তা জানি।”

ডাক্তারবাবু বললেন, “তা হলে তো ভালই হল। শুনুন আপনাকে একটা সুপরামর্শ দিচ্ছি।”

রোগী আকুল হয়ে জানতে চাইলেন, “কী সুপরামর্শ?”

ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, “খুব সোজা পরামর্শ।”

“এই পরামর্শ পালন করলে মুখে হাসি ফুটবে। মনে আনন্দ হবে। জীবনে ফুর্তি আসবে। তা ছাড়া…”

ডাক্তারের মুখের কথা শুনে নিয়ে উত্তেজিত রোগী প্রশ্ন করলেন, “তা ছাড়া?”।

রোগীর প্রশ্নে অনাবিল হেসে সহৃদয় চিকিৎসক মহোদয় বললেন, “এতে ওষুধ-বিষুধ, ডাক্তারের ভিজিটের চেয়ে কম খরচ লাগবে।”

রোগী এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কৌচ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ডাক্তারবাবু বলুন, এর জন্য আমাকে কী করতে হবে?”

ডাক্তারবাবু বললেন, “প্রায় কিছুই না। একটু আগে তো বললেন, তারাপদ রায়ের নাম জানেন, সেই তারাপদ রায়ের কথা বলছি।”

রোগী করুণতর নয়নে বিষণ্ণতর ফ্যাঁসফেঁসে গলায় প্রায় যাত্রার বিবেকের স্বগতোক্তির মতো মিনমিন করে বললেন, “তারাপদ রায়?” ডাক্তারবাবু বললেন, “হ্যাঁ। তিনিই আপনার একমাত্র ওষুধ। আপনি তারাপদবাবুর লেখা পড়ুন, তারাপদবাবুর লেখা কাণ্ডজ্ঞান, জ্ঞানগম্যি এইসব বই পড়ুন। আপনার বিদ্বান, বুদ্ধিমান, লেখাপড়া জানা আত্মীয়বন্ধু প্রতিবেশী যদি এতে হাসাহাসি করে, লুকিয়ে পড়ুন।”

এই সুপরামর্শ শুনে তখন রোগী একদম চুপসিয়ে গেছেন, শুধু মিয়োনো গলায় বললেন, “তারপর।”

ডাক্তারবাবু বললেন, “তারপর আর কী? তারাপদ রায়ের রচনা পড়ে আপনার মনে আনন্দ, মুখে হাসি, জীবনে ফুর্তি সব ফিরে আসবে।”

সেই স্থূলোদর, স্ফীতদেহ, ভারীকণ্ঠ রোগী বললেন, “ডাক্তারবাবু, এটা সম্ভব নয়, হতে পারে না।”

অবাকিত ডাক্তারবাবু মুখে আর কোনও কথা না খুঁজে পেয়ে বললেন, “কেন?”

ম্লানতম কণ্ঠে, বিষণ্ণতম মুখে স্থূলদেহ ঘর্মাক্ত কলেবর রোগী বললেন, “ডাক্তারবাবু। আমিই তারাপদ রায়।”

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *