পর্বতো বহ্নিমান

পর্বতো বহ্নিমান

প্রায় ঘণ্টাখানেক হল রোদ উঠেছে। কুয়াশা অনেকটাই কেটে গেছে, কেবল নীচে খাদের মধ্যে তার কিছুটা দুষ্টু ছেলের মতো ঘাপটি মেরে রয়েছে। সুয্যিমাস্টারের দৃষ্টি এড়ানোর মতলবে। কাছের পাহাড়গুলো এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দূরের পাহাড়গুলো স্পষ্টতর হবার প্রত্যাশায় অ্যাটেনশন হয়ে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে।

সামনেই সর্পিল মাউন্ট ভিউ রোড এঁকেবেঁকে ওপরে উঠে সামনের কালো পাহাড়টার গলায় একটা পাক দিয়ে তার পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেই শান্ত, নির্জন, মহিমময় বিরাটত্বের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে মুগ্ধ দময়ন্তী স্থির হয়ে বসে ছিল। হঠাৎ দূরে দুটি চলমান বস্তু ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

বাঁকের মুখে দু-জন প্রাতঃভ্রমণকারী উদয় হয়েছেন। তাঁদের বয়েস এত দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না বটে, তবে দু-জনেই যে দীর্ঘদেহী ও স্বাস্থ্যবান তা বোঝা যাচ্ছে। দু-জনেরই পরনে হাফপ্যান্ট, রংচঙা পুলওভার, তদ্রূপ মাফলার, হাতে ওয়াকিং স্টিক। তফাতের মধ্যে একজনের চোখে চশমা ও মাথায় বেরে, অন্যজনের এসব বালাই নেই।

পাশের চেয়ারের ওপরের একটি কম্বলের স্তূপকে সম্বোধন করে দময়ন্তী বলল, ‘ওই দু-জন ভদ্রলোকের দিকে একবার তাকিয়ে দেখো দেখি। কী সুন্দর, সকাল হতে-না-হতেই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছেন। আর তুমি কিনা…’

কম্বলের স্তূপ ফ্যাসফেসে গলায় বলল, ‘এই শীতে মর্নিং ওয়াক? বাপ! ও যারা করে তারা মানুষ নয়, কোনো পাহাড়বাসী অপদেবতা। এই কম্বলের ভেতরেই বলে আমার পেটের নাড়িগুলো পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে!’

দময়ন্তী আপত্তি করতে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা চাপা আর্তনাদ শুনে চোখ তুলে তাকাল। দরজার কাছে কখন যেন আর একটি কম্বলের স্তূপ এসে দাঁড়িয়েছে। আর্তনাদটা এল তার ভেতর থেকেই।

‘আপনার আবার কী হল?’ দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল।

‘ওই লোক দুটোকে দেখেছেন? পাগল নাকি? এই শীতে প্রায় উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে?’

রমলা চা বানাচ্ছিল, চেঁচিয়ে বলল, ‘অসভ্যতা কোরো না। ওরা পাগল না, পাগল তোমরা। পাহাড়ে বেড়াতে এসে পর্যন্ত সেই যে দুই মূর্তিমান কম্বলের ভেতরে ঢুকেছ, আর বেরোবার নামটি নেই। তাহলে আর পাহাড়ে বেড়াতে আসা কেন!’

দরজার স্তূপ বলল, ‘বেশক! এ প্রশ্নের জবাব নকুড়মামাই বের করতে পারেননি, আমি তো নস্যি। লাখ কথার এক কথা বলেছিলেন নকুড়মামা, থামলে কাঁপুনি, চললে হাঁপানি, কেন রে বাপু! এই মরেছে, ওই উন্মাদ উলঙ্গ লোক দুটো দেখছি এইদিকেই আসছে! জ্বালিয়ে মারলে!’ বলে বিদ্যুদবেগে ঘরের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। চেয়ারের স্তূপটি অবশ্য যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেল। তার মধ্যে এতটুকুও চাঞ্চল্য দেখা গেল না।

ইতিমধ্যে প্রাতঃভ্রমণকারী দু-জন গেটের কাছে চলে এসেছেন। এখন এঁদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একজন বয়স্ক, বূঢ়োরস্ক বৃষস্কন্ধ বিশালকায় পুরুষ, কানের দু-পাশে পাকা চুলের গুচ্ছ ছাড়া শরীরে আর কোথাও জরার চিহ্নমাত্র নেই। এঁরই মাথায় বেরে, চোখে চশমা, মুখে শান্ত, সৌম্য হাসি। অপরজন যুবক। ইনিও তাঁর বয়স্ক সঙ্গীর মতোই স্বাস্থ্যবান, যদিও প্রস্থে বোধ হয় একটু কমই হবেন। মাথার চুল ছোটো ছোটো করে ছাঁটা, মুখে একটা শিষ্ট গাম্ভীর্য।

দময়ন্তী উঠে দাঁড়িয়েছিল। ওকে দেখে বয়স্ক ভদ্রলোক তাঁর হাসিটি আরও প্রসারিত করে ইংরেজিতে বললেন, ‘ভেতরে আসতে পারি?’

দময়ন্তী বলল, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।’

গেট খুলে বাঘের মতো পা ফেলে লন পেরোতে পেরোতে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি কাল বিকেলে লক্ষ করলুম যে, এ বাড়িতে অতিথির আগমন হয়েছে। আমার বাড়ি এই মাউন্ট ভিউ রোডের শেষে ওই পাহাড়োর চুড়োয়। মাঝখানে কোনো বাড়ি-ঘর নেই, কাজেই আপনারা হলেন আমার প্রতিবেশী। সে-হিসেবে আপনার সঙ্গে আলাপ করা কর্তব্য মনে করে চলে এলুম।’ বলতে বলতে ভদ্রলোক লন থেকে বারান্দায় উঠে এলেন। হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, ‘আমার নাম বি এস রায় আর ইনি আমার বন্ধুর ছেলে।’

দময়ন্তী প্রতিনমস্কার করে কম্বলের স্তূপের দিকে চেয়ে দেখল, তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে নমস্কারের ভঙ্গিতে একজোড়া কম্পিত হাত আর সেইসঙ্গে ফ্যাসফেসে গলা, ‘আমার নাম সমরেশ দত্তগুপ্ত, ইনি আমার স্ত্রী দময়ন্তী, আর ইনি আমার বন্ধুর স্ত্রী রমলা সেন।’

ভদ্রলোক হো হো করে খুশির হাসি হেসে উঠলেন। বললেন, ‘ঠিকই ধরেছি যে আপনারা বাঙালি। বাঙালি ছাড়া এমন ভবঘুরে জাত আর কে আছে যে, এমন পাণ্ডববর্জিত জায়গায় বেড়াতে আসবে? কিন্তু বেড়াতে এসে এমন শীতে কাতর হয়ে পড়লে কী করে চলবে? উঠুন, হাত-পা খেলান, রাস্তা দিয়ে একচক্কর দৌড়ে আসুন। দেখবেন, শীত বাপ বাপ বলে পালিয়ে গেছে।’

সমরেশ বলল, ‘সে আপনি এখানে থাকেন, তাই অমন কথা বলতে পারেন। আমার জীবনে তো এরকম শীত এর আগে কখনো আসেনি। হাত-পা সব পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে, দৌড়ুব কী দিয়ে?’

শিবেন এই সময় পর্দা ঠেলে বারান্দায় প্রবেশ করল। ওর পুলিশ য়ুনিফর্মের ওভারকোট, হাতে গ্লাভস আর মাঙ্কি ক্যাপ পরিহিত চেহারার দিকে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শিবেন নির্বিকারভাবে নমস্কার করে বলল, ‘আমার নাম শিবেন সেন।’

রায়সাহেব এবার বিশদভাবে তাঁদের পরিচয় দিলেন, ‘আমার নাম ব্রতীশেখর রায় আর ইনি উজ্জ্বল, উজ্জ্বল মজুমদার। সার্থকনামা ছেলে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে।’

সবাই সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে উনি বললেন, ‘উজ্জ্বল বীরচক্র পেয়েছে। ছাম্ব সেক্টরে…’

উজ্জ্বল বিনীত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বাধা দিয়ে বলল, ‘ওকথা থাক না কাকাবাবু। বরং আপনার কথা বলুন। আপনিও তো সার্থকনামা। গত বিশ বছর এই দুর্গম জায়গায় পড়ে থেকে ব্রতপালন করছেন। দেশের দশের উপকার করছেন!’

ব্রতীশেখর সলজ্জ হাসলেন। বললেন, ‘দুর, এ আবার ব্রত নাকি? আমি বৈজ্ঞানিক, এ তো আমার কর্তব্য। আমার গবেষণায় যদি দেশের উপকার হয়, তো সেটা আমার সৌভাগ্য।’

রমলা দু-জনকে চা এগিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কী নিয়ে গবেষণা করছেন ব্রতীশেখরবাবু?’

‘আমি সার এবং কীটনাশক ওষুধ নিয়ে গবেষণা করি। আপনারা চাষবাস সম্পর্কে খোঁজ রাখেন কি না আমি জানি না, রাখলে নিশ্চয়ই বি ওয়াই ৩১০ অথবা বি এক্স ৫০০ কীটনাশকের নাম শুনেছেন। এ ছাড়া, ফলবতী নামে একটা রাসায়নিক সারও আমার আবিষ্কার। একটি বিদেশি সংস্থা আমার ফর্মূলায় এগুলো ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে তৈরি করে বাজারে ছাড়ে। আমাকে যা দেয় তাতে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া চলে।’

দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু আপনার গবেষণা কি কলকাতায় হতে পারে না? আপনি বছরের পর বছর এখানে পড়ে না থেকে কলকাতায় গবেষণা করলে আপনার পরিচয়ের গণ্ডিও তো কত বেড়ে যাবে।’

ব্রতীশেখর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘পরিচয়ের গণ্ডি যাতে না বাড়ে সেইজন্যেই তো এখানে থাকা। যাদের প্রয়োজন তারা নিজেরাই আমার কাছে আসে। তা ছাড়া, এখানকার আবহাওয়াও আমার গবেষণার পক্ষে অনুকূল।’

সমরেশ বলল, ‘আচ্ছা, এ বছর সায়েন্স কংগ্রেসের ফলিত রসায়ন বিভাগের সভাপতি ডক্টর বি এস রায় কি আপনি নাকি?’

আবার সলজ্জভাবে মাথা নাড়লেন ব্রতীশেখর। তারপর যেন কথাটা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যেই বললেন, ‘আপনি এবার উঠুন সমরেশবাবু। এত বেলা হল, একটু ঘুরে-টুরে দেখে আসুন জায়গাটা।’

সমরেশ কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘হ্যাঁ, এই যে যাই।’ বলে ভেতরে চলে গেল।

শিবেন এতক্ষণ স্থাণুবৎ বসে ছিল। সমরেশের নড়াচড়া দেখে যেন উৎসাহিত হয়ে উঠে হঠাৎ উজ্জ্বলকে বলল, ‘চলুন, বাগানটা একটু ঘুরে আসি। কী সুন্দর রোদ উঠেছে।’

উজ্জ্বল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চলুন।’ তারপর দু-জনে বাগানে নেমে গেল।

ব্রতীশেখর কিছুক্ষণ পেছন থেকে দু-জনকে দেখলেন, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

দময়ন্তী মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘উজ্জ্বলবাবু কোনো একটা অসুবিধেয় পড়েছেন, নয়?’

ব্রতীশেখর চমকে ফিরে তাকালেন। বললেন, ‘ঠিক বলেছেন আপনি। কী করে বুঝলেন?’

‘ওঁর চোখের দৃষ্টি দেখে। সৈন্যবাহিনীর বীরচক্র পাওয়া তরুণ অফিসার— আমি ওঁর চোখে আশা করেছিলুম উল্লাস, কাউকে কেয়ার করিনে ভাব, নিজেকে জাহির করার ইচ্ছে এবং হয়তো-বা দাম্ভিকতা। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি সেখানে একটা ক্লান্ত, বিষণ্ণ, চিন্তিত ভঙ্গি। সেটা স্বাভাবিক নয়।’

ব্রতীশেখর বিস্মিত চোখে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘বাঃ বাঃ, অসাধারণ পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা তো আপনার।’

দময়ন্তী বলল, ‘আপনি আমাদের সকলকেই তুমি করে বলবেন। সেটাই বোধ হয় ভালো শোনাবে।’

‘বেশ, বেশ। তাই না হয় বলা যাবে। তুমি শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী, তোমার সঙ্গে কথা কয়ে সুখ আছে। তা তুমি যা সন্দেহ করেছ, সেটা নেহাত ভুল নয়। ব্যাপারটা আমারও নজরে পড়েছে এবং তার ফলে বেশ অশান্তিতে আছি।’

‘আমরা কি কোনোরকম সাহায্য করতে পারি?’

‘নাঃ, আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে সাহায্য করার কিছু আছে। স্ত্রীয়াশ্চরিত্রং, এর মর্ম কে বুঝবে? ব্যাপারটা কী জানো? উজ্জ্বল আমাদের হবু জামাই, মানে আমার এবং আমার স্ত্রীর সেটাই বড়ো ইচ্ছে ছিল। তুমিই বলো, এরকম আদর্শ ছেলে আজকালকার দিনে কোথাও পাওয়া যায়? আমার ওই একটিই মেয়ে, ভেবেছিলুম এ বিয়েতে সে খুশিই হবে।’ বলে ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘মেয়ে রাজি হচ্ছে না?’ দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল।

‘ঠিক রাজি হচ্ছে না, তা নয়। মানে, মেয়েদের ব্যাপার আমি ভালো বুঝিনে। এতদিন তো জানতুম রাজি, ইদানীং মনে হচ্ছে অন্যরকম। ব্যাপার হল, ছেলেটি অনেকদিনই আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। ওরা দু-জনে বাল্যবন্ধু বলতে পারো। ছুটিছাটাতে যখন আমরা দুই পরিবার একত্র হতুম, তখন তো মনে হত ওরা যেন পরস্পরকে দেখবার জন্যে ব্যাকুল হয়ে আছে। বিএসসি পাশ করে উজ্জ্বল যখন সৈন্যবাহিনীতে ঢুকল তখন দেখেছি শমি, মানে আমার মেয়ে শর্মিষ্ঠার কী আনন্দ। প্রায়ই চিঠি লিখত। উজ্জ্বল কমিশন পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে যুদ্ধ বাধল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পোস্টিং পেল উত্তর-পূর্ব সীমান্তে। কাজেই ও বেশ কিছুদিন আসতে পারেনি। তারপর, পর পর ওর বাবা আর মা মারা গেলেন, আবার যুদ্ধ বাধল। এসব কারণে ও মাঝে মাঝে দু-একদিনের ছোটো ছোটো ভিজিট ছাড়া এদিক মাড়াতেই পারেনি। এবার লম্বা ছুটি নিয়ে এসেছে। বুঝতে পারছি, মনস্থির করেই এসেছে। অথচ শমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’

‘সেটা এতদিনের অদর্শনে অভিমান নিশ্চয়ই। দেখুন না, কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।’

‘এটা বোধ হয় ঠিক অভিমানের ব্যাপার নয়। শমিকে দেখলে বুঝতে পারতে, যেন কী-একটা হয়েছে ওর। যেদিন থেকে উজ্জ্বল এসেছে, সেদিন থেকে ও কেমন গম্ভীর, রুক্ষ, বদমেজাজি, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। কারোর সঙ্গে কথা বলে না, হাসে না, এমনকী আমাকে দেখলে পর্যন্ত সরে যায়, ডাকলে সাড়া দেয় না। অথচ, শমি কিন্তু আসলে অত্যন্ত ফুর্তিবাজ মেয়ে, যতক্ষণ বাড়ি থাকে ততক্ষণ হইচই-এর শেষ থাকে না। নয়তো, ভেবে দেখো, এখান থেকে প্রায় কুড়ি মাইল দূরে শহরের কলেজে গিয়ে চার বছর পড়াশুনো করেছে, কিন্তু তার জন্যে কোনোদিন বলেনি, বাবা, আমার শরীর খারাপ লাগছে, কী কষ্ট হচ্ছে। কলেজ থেকে ফিরত নাচতে নাচতে। সেই মেয়ে ঠিক উজ্জ্বল আসার পর থেকেই কেমন শক্ত কাঠের মতো হয়ে গিয়েছে।’

দময়ন্তী চিন্তিতভাবে বলল, ‘দু-জনের মধ্যে চিঠিপত্র লেখালেখি হত না?’

‘না। উজ্জ্বল একেবারেই চিঠি লিখতে পারে না। শমিও কখনোই পাতার পর পাতা চিঠি লেখার টাইপ নয়। কিন্তু সেটা কিছুই ইঙ্গিত করে না। গত যুদ্ধের সময় দেখেছি, শমি সারাক্ষণ রেডিয়োর সামনে বসে আছে। ছাম্ব সেক্টরে উজ্জ্বল যখন বীরত্বের জন্য বীরচক্র পেল, তখন ও-ই আমাকে প্রথম কাগজটা এনে দেখাল এবং তার পরদিনই একটা বিরাট টেলিগ্রাম পাঠাল। এসব যে কী ব্যাপার, আমি তো কিছুই বুঝছি নে। এদিকে উজ্জ্বলের ছুটি ফুরিয়ে আসছে। সংগত কারণেই ও একটা স্পষ্ট কথা জেনে যেতে চায়, অথচ পারছে না। সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।’

রমলা বলল, ‘আমার মনে হয়, নিশ্চয়ই অন্য একটি ছেলে…’

সজোরে মাথা নাড়লেন ব্রতীশেখর, রমলার কথাটা শেষই করতে দিলেন না। বললেন, ‘না, না, তা নয়, একেবারেই তা নয়। সন্দেহটা স্বাভাবিক বটে, তবে একদম অমূলক। অন্য কোনো ছেলে হলে তার চিঠিপত্র নিশ্চয়ই আসত? তা আসে না। সেক্ষেত্রে হতে পারত কোনো স্থানীয় ছেলে। সেরকম কারোর অস্তিত্ব আমার জানা নেই। তা ছাড়া, শমি যে ধরনের মেয়ে তাতে সে লুকোচুরি খেলবে, তা আমার মনে হয় না। যদি সেরকম কিছু হত, তাহলে ও নিশ্চয়ই উজ্জ্বলকে সোজাসুজি বলে দিত এবং আমাকেও বলত। ও আমাকে জানে, আমি কনজারভেটিভ নই, কোনো লোকাল রিকশাওয়ালাকে বিয়ে করতে চাইলেও আমি বাধা দেব না। তা ছাড়া, ও যথেষ্ট রোজগার করে, কারোর তোয়াক্কা করার ওর কথা নয়! কাজেই, উজ্জ্বলকে স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দেওয়াতে কোনো অসুবিধে তো দেখছি নে। আমার মনে হয়, উজ্জ্বলকে বোধ হয় ও সেরকম কিছু বলেনি। কেন বলেনি, কে জানে! নিজেও কষ্ট পাচ্ছে, সবাইকে কষ্ট দিচ্ছে।’

দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি বললেন, শর্মিষ্ঠা যথেষ্ট রোজগার করে। এখানে কি ও চাকরি-বাকরি করে?’

‘না, চাকরি করে না। তিন বছর আগে এম এ পাশ করেছে, তারপর থেকে ঘরে বসেই রোজগার করে। নানান ইংরেজি পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ লেখে সাহিত্য বা শিল্পের ওপর। ওই বড়ো শহরের একটা কাগজে নিয়মিত বইয়ের সমালোচনা লেখে। যা পায় তা একজনের পক্ষে যথেষ্টরও বেশি।

দময়ন্তী অত্যন্ত গম্ভীর আর চিন্তিত হয়ে বলল, ‘আশ্চর্য, ভারি আশ্চর্য!’

.

শিবেন বলল, ‘উজ্জ্বল মজুমদার সত্যিই উজ্জ্বল ছেলে। কেন যে শর্মিষ্ঠা ওকে বিয়ে করতে চাইছে না, ঈশ্বর জানেন। ভদ্রলোকের দেখলুম, সেনাবাহিনীতে থেকেও কুচকাওয়াজ ছাড়াও অন্যান্য অনেক বিষয়ে জ্ঞান এবং কৌতূহল আছে। কেবল একটিই দোষ, কথা বলতে বলতে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন বা খেই হারিয়ে ফেলেন। বোধ হয় যুদ্ধে কোনরকম শক-টক লেগে এমনি ধারা হয়ে গেছেন।’

দময়ন্তী মাথা নেড়ে বলল, ‘তা নয়। ওঁর মনের অশান্তিই এর কারণ।’

সমরেশ বলল, ‘বিয়ের ব্যাপারে গণ্ডগোলটা? আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আরে, উজ্জ্বল মজুমদার লড়াকু লোক, ওদের কি আর ওসব অন্যমনস্ক-ফন্যমনস্ক হলে চলে? প্রিয়া নেহি আয়েগি? কোই বাত নেই। একটা স্টেনগান নিয়ে ধড়াধ্বড় ধড়াধ্বড় গুলি চালিয়ে প্রিয়াকে জিপে তুলে ভাগলবা— সেই হল বীরোচিত কাজ।’

দময়ন্তী বলল, ‘সেসব ছোটোলোক বীরদের কাজ। মজুমদার ভদ্রলোক, সেকথা ভুলে গেলে চলবে কেন? তবে তুমি যা বললে, সেটা অদূর ভবিষ্যতে হওয়া অসম্ভব নয়। আমার কীরকম মনে হচ্ছে, কোথায় একটা আগুন লেগেছে। পর্বতো বহ্নিমান ধূমাৎ।’

সমরেশ বলল, ‘তোমার যত বাড়াবাড়ি! কোথাও কিছু নেই, ধূম আবিষ্কার করে বসে আছ।’

শিবেন ভ্রূকুটি করে বলল, ‘সত্যি, ধূম আবার আপনি কোথায় দেখলেন? ব্রতীশেখরবাবুর মেয়ে তাঁর পছন্দ করা জামাইকে পছন্দ করছে না। এ তো নিত্যি ঘটছে। এতে অস্বাভাবিক কী আছে?’

দময়ন্তী সহাস্যে বলল, ‘ঘটনাটা অস্বাভাবিক হয়তো নয়, কিন্তু এর ডিটেলগুলো অস্বাভাবিক। দেখুন, মেয়ে আর হবু জামাই বাল্যবন্ধু, সে-বন্ধুত্ব কালক্রমে ভালোবাসাতেই পরিণত হয়েছে। হবু জামাইয়ের কল্যাণ অকল্যাণ নিয়ে মেয়ে চিরদিনই উদবিগ্ন, তার সম্মানে উল্লসিত, অথচ, তাকে বিয়ে করার নামে মেয়ের তরফে পাওয়া যাচ্ছে কঠিন নীরবতা। এটা স্বাভাবিক নয়। এটাও স্বাভাবিক হত যদি জানা যেত যে, মেয়েটির জীবনে দ্বিতীয় কোনো পুরুষের আবির্ভাব হয়েছে। তাও হয়নি। তাহলে কী কারণে মেয়েটি শিক্ষিত, মার্জিত রুচি অথচ দেশবরেণ্য বীর তার বাল্যবন্ধুর প্রতি অনুদার হল? লক্ষ করে দেখুন, মেয়েটি কিন্তু স্পষ্ট করে ‘না’ বলে ছেলেটিকে ভাগিয়েও দিচ্ছে না, যদিও তার ‘না’ বলায় কোনোই বাধা নেই। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটি কোনো একটি মানসিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যার জন্যে সে তার বাল্যবন্ধুকে জীবনসঙ্গী বলে গ্রহণ করতে দ্বিধা বোধ করছে, অথচ বিবাহিত জীবনের প্রতি আসক্তিও ত্যাগ করতে পারছে না। কী সেই মানসিক বিপ্লব যা তাকে এই ডিলেমার মধ্যে ফেলে কষ্ট দিচ্ছে, স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাকে কাঠিন্যের আবরণে ঘিরে রেখেছে?’

শিবেন বলল, ‘আপনিই বলুন।’

‘একটা কারণ হতে পারে— ভগবদ্ভক্তি। এক্ষেত্রে ঈশ্বর আস্তে আস্তে মানুষী দয়িতকে মন থেকে সরিয়ে নিজে তার স্থান গ্রহণ করেন। অনেকটা মীরাবাঈ-এর মতো। তাঁর কাছে স্বামী আর শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণই বড়ো ছিলেন, যদিও স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসার অভাব ছিল না।’

সমরেশ বলল, ‘হ্যাঁ, আর তাই নিয়ে পরে বিষম হাঙ্গামা হয়েছিল। তাইতেই ধূমের কথা মনে হল বুঝি?’

‘হ্যাঁ, সম্ভাবনাটা তো অসম্ভব নয়। তবে অন্য কারণও থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে ধূমটা গাঢ়তর হবারই কথা।’

‘আর কী কারণ থাকতে পারে?’ শিবেন জিজ্ঞেস করল।

‘সেটা আর একটু বিশদভাবে পরিবারটাকে না জানলে, বলা সম্ভব নয়।’

.

দুপুর বেলা খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই রোদে পিঠ দিয়ে লনে বসে ছিল। দময়ন্তী কিন্তু স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিল না, কেবল উশখুশ করছিল।

শিবেন নিবিষ্টচিত্তে একটা সিগারেট ধ্বংস করে তার দগ্ধাবিশিষ্টটা নীচে খাদের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘কী, রায়-কটেজে যেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে তো? চলুন, যাওয়া যাক। এখন দুপুর বেলা হয়তো কাউকে পাবেন না, তবু বাড়িটা তো একবার দেখে আসা যাবে।’

ধরা পড়ে লজ্জিত দময়ন্তী হেসে ফেলল। সমরেশ হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলল, ‘সেই ভালো। বড়ো গুরুভোজন হয়ে গেছে, একটু হাঁটা-চলা না করলে বিপদ।’

.

মাউন্ট ভিউ রোডের একদম শেষে রায়-কটেজ। ওদের বাড়ি ক্রিস্টাল ভিলা থেকে প্রায় দেড় মাইল রাস্তা, আগাগোড়া চড়াই। মাঝখানে দ্বিতীয় কোনো বাড়ি নেই, এমনকী কোনো পাহাড়ি বস্তি পর্যন্ত নেই। সমস্ত পথের একপাশে শ্যাওলা পড়া আর আগাছায় ঢাকা রুক্ষ পাহাড় আর অন্যপাশে পাইনের জঙ্গলে আচ্ছন্ন সুগভীর খাদ। মাঝে মাঝে দু-একটা তিরতিরে ঝরনা পাহাড়ের গায়ে আরও বেশি শ্যাওলা ধরিয়ে নেমে গেছে রাস্তা পার হয়ে নীচের খাদে। সরল, ঋজু পাইনগাছগুলো নীচ থেকে উঠে রাস্তা ছাড়িয়েও ওপরে উঠে গেছে। তাদের ফাঁক দিয়ে গলে পড়া তরল সূর্যালোক আলো-আঁধারির নকশা কেটেছে রাস্তার ওপরে।

চারিদিক সিকাডার নিরবচ্ছিন্ন ধাতব গুঞ্জন ছাড়া শব্দহীন। সেই নিরলম্ব মৌনতার মধ্যে ওরা চারজনে একটু ঘন হয়ে হাঁটছিল। ওদের গা শিরশির করছিল, কিন্তু সেটা ঠিক ভয়ে নয়। হিংস্র জানোয়ার এখানে নেই। ওদের মনে হচ্ছিল, ওদের পায়ের শব্দে এই যুগযুগান্তের মৌনতাকে ভেঙে ফেলার অপরাধে হয়তো এখুনি ওই পাহাড় ওদের শাসন করবে।

নির্বাক চারজনে এসে রায়-কটেজের গেটের সামনে দাঁড়াল। তারপর চারদিকে তাকাতেই যেন ওদের সমস্ত ক্লান্তি চলে গিয়ে মন খুশিতে ভরে উঠল। বাঁ-দিকে আকাশের পটে তুষারমৌলি নীলকণ্ঠ, নন্দাদেবী আর নাঙ্গা পর্বত, আর ডান দিকে বহু নীচে পবিত্র পাওন নদী রৌদ্রকিরণে উজ্জ্বল রজতস্রোত ঢেলে দিচ্ছে সোমগঙ্গার বুকে।

সামনে প্রকাণ্ড গেটের ওপাশে রায়-কটেজ— প্রকৃতির অকৃপণ, অনুপম সৌন্দর্যের মাঝখানে মানুষের তৈরি ইমারত। আশ্চর্য দক্ষতায় তাকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে, কোথাও কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। পাহাড়ের মাথায় চৌরস করে প্রায় দু-বিঘে প্রমাণ জমি সমান করা হয়েছে, তার মাঝখানে ইংরেজি কটেজের ধাঁচে পাথরের বাড়ি। রাফ কাট পাথরের অসমতল দেওয়ালগুলো যেন চারদিকের রুক্ষ পাথরগুলোর সঙ্গে তাল মেলানোর জন্যেই করা। বাড়ি ঘিরে বাগান, অজস্র ফুলে আলো হয়ে আছে। প্রকৃত শীত আসতে এখনও মাস দুয়েক দেরি। তখন বরফের চাদর পরার আগে বাগানটি যেন সাধ মিটিয়ে তার রঙের খেলা দেখিয়ে নিচ্ছে। পেছনের পাহাড়, বাড়িটা, রঙিন বাগান সমস্ত মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন আকাশের পটে আঁকা একটা অসাধারণ ছবি। চারজনে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখছিল।

কিন্তু ওদের জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ সেই মুগ্ধ নীরবতাকে ভেঙে একটি গম্ভীর নারীকণ্ঠ জি শার্পে প্রশ্ন করল, ‘আপনারাই বোধ হয় ক্রিস্টাল ভিলার নতুন অতিথি, তাই না? আসুন, ভেতরে আসুন।’ পরিশুদ্ধ ইংরেজি কিন্তু অপরিচিত উচ্চারণ।

চারজনে চমকে বক্তার দিকে তাকাল। ভদ্রমহিলা যেকোনো সাধারণ ভারতীয় মেয়ের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা, কাঁচা সোনার মতো গায়ের রং, চওড়া কাঁধ, চওড়া কবজি এবং একটা হলুদ রঙের জাম্পার ও লাল রঙের বেলবটম ট্রাউজার্স যে অঙ্গটাকে ঘিরে রেছে, তাকে অসাধারণ ফিগার বলা যেতে পারে। কৃষ্ণপক্ষ্ম, কৃষ্ণকেশ আর মুখে ভারতীয়ত্বর ছাপ মারা যদি না হত, তাহলে অনায়াসে এঁকে মেমসাহেব বলা যেতে পারত। এঁর মুখটি যদিও ঠিক রূপসি বলা যায় না, তাহলেও কোথায় যেন একটা দারুণ আকর্ষণী শক্তি রয়েছে, যা পুরুষের বুকের রক্ত উদবেল করে তোলে, অন্য মেয়েদের মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে।

চারজনের মধ্যে সংবিৎ ফিরে পেয়ে প্রথম কথা বলল দময়ন্তী। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনিই বোধ হয় মিস শর্মিষ্ঠা রয়, তাই না?’

মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে উঠলেন মহিলা, ‘ও, নো, নো, নো। আমি শর্মিষ্ঠার মা। আমার নাম মুনিয়া, মুনিয়া রয়।’ বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়! ইনি এম এ পাশ মেয়ের মা? তাহলে এই কি সেই চিরযৌবনের উপত্যকা শ্যা*ংগ্রি-লা, যেখানে মানুষের বয়েস বাড়ে না?

স্তম্ভিত দময়ন্তী কোনোরকমে হাতটি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি দুঃখিত মিসেস রয়। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।’

.

হালকা গোলাপি পাথরে বাঁধানো পোর্টিকোর নীচে একটা রট আয়রনের টেবিল ঘিরে কয়েকটা গার্ডেন চেয়ারে ওরা বসেছিল। বাইরে ঝলমল করছে রোদ, তার মধ্যে হালকা হাওয়ায় থিরথির করে কাঁপছে হলিহক, গ্ল্যাডিওলাই আর অ্যাস্টরের সম্ভার, বার্চ আর পাইনের সমারোহ। সব মিলিয়ে একটা তরল, মধুর মাদকতা।

কথা বলে যাচ্ছিলেন মুনিয়া রয়। তাঁর চোখের দৃষ্টি অর্ধনিমীলিত, পিচ্ছিল, হয়তো একটু সতর্ক, কণ্ঠস্বর ঘুমজড়িত, কান পেতে শুনতে হয়। তাঁরও কথা বলা, বসার ভঙ্গি আর চোখের দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত নেশা ধরানো আবেশ।

মুনিয়া বলছিলেন, ‘আপাতত বাড়িতে আমরা দু-জনই আছি, আমি আর শমি। ডক্টর রয় তাঁর বীরচক্রটিকে নিয়ে যে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরে সোজা চলে গেছেন তাঁর ল্যাবরেটরিতে। আমার চাকর বিদ্যা ওঁদের লাঞ্চ নিয়ে গেছে ওখানে। তবে ওঁদের ফেরবার সময় হয়ে এল। এখানে এসে চা খাবেন বলে গেছেন।’

দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল, ‘শমি কোথায়?’ ওর কণ্ঠস্বর চাপা, সতর্ক।

মুনিয়া সস্নেহে বাগানের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘ওই বাগানের মধ্যে কোথাও আছে। আমার মেয়ে তো ফুলের জন্যে পাগল। এ বাগান ওরই তৈরি বলতে পারেন। ডক্টর রয় তাঁর সার আর ওষুধের এক্সপেরিমেন্ট চালানো সত্ত্বেও যে বাগানটা টিকে আছে, তা শমিরই জন্যে।’ বলে হেসে উঠলেন।

হঠাৎ সেই ভয়ানক অবাঙালি পরিবেশে সমস্ত আকাশ বাতাসকে চমকে দিয়ে উদাত্ত গলায় রবীন্দ্রসংগীত সেই ফুলের বনের ভেতর থেকে উৎসারিত হয়ে উঠল

হারে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে, দে রে,

যেমন ছাড়া বনের পাখি মনের আনন্দেরে…

মুনিয়া ঘুমজড়িত গলায় বললেন, ‘শমি গাইছে, বাংলা গান।’

সবাই উদগ্রীব হয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রায় মানুষসমান উঁচু পুষ্পাকীর্ণ লুপাইন গাছের সারির মধ্যে দিয়ে গানের ছন্দে ছন্দে নাচতে নাচতে একটি মেয়ে খোলা লনের ওপর এসে পড়ল। তার পরনে ব্লু জিনস, নানা রঙের ছোপ ধরানো উঁচু গলা সোয়েটার, চোখে চৌকোনা চশমা, হাতে রক্তের মতো লাল একটা বড়ো ফুল। মেয়েটি খোলা লনে পড়েই দু-হাত শূন্যে তুলে চারদিকে হাসির জলতরঙ্গ ছড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘মাম্মি, দেখো তোমার জন্যে কী এনেছি!’

সিনেমায় সাধারণত এ জায়গাটায় একটা ফ্রিজ শট হয়। এক্ষেত্রে সেটা না হলেও দৃশ্যটা সমরেশের মনে গাঁথা হয়ে রইল। মনে মনে বলল, ‘ইয়মধিকমনোজ্ঞা ব্লু জীনসেনাপি তন্বী!’

মেয়েটি তন্বী সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। অপূর্ব স্বাস্থ্য, শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা… যাক, সেকথা। শ্যামলা গায়ের রং, চঞ্চল আয়ত চোখ, মুখে শিক্ষার ছাপ আর ছেলেমানুষি দুটো মিলেমিশে রয়েছে। মুখের রেখাগুলি তরল, দেখলে মনে হয়, মনের কোনো ভাবই মেয়েটি গোপন করতে পারে না, সবই মুখের রেখায় ফুটে ওঠে। মোট কথা, ওকে দেখে সকলেই খুশি হয়ে উঠল।

মুনিয়া হাত নেড়ে ডাকলেন, ‘শমি, এদিকে এসো। আমাদের কয়েকজন অতিথি এসেছেন।’

শমি একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে নাচতে নাচতে লনটা পার হয়ে এল। মুনিয়ার চেয়ারের হাতলের ওপর শ্রোণিভারটি স্থাপন করে ফুলটা তাঁর নাকের সামনে ধরে বলল, ‘মাম্মি, হংকং অর্কিড! অবিশ্বাস্য, নয়? ধরো, তোমার জন্যেই এনেছি।’

মুনিয়া তাঁর চেয়ারের হাতলের ওপর ন্যস্ত শমির দেহাংশটিকে সস্নেহে একটি চপেটাঘাত করে বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন যাও তো, ওই চেয়ারটাতে বোসো গিয়ে।’ বলে ফুলটি টেবিলের ওপর রাখলেন।

শমি হাসতে হাসতে লাফিয়ে উঠল। তারপর শিবেনের পাশের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ে দময়ন্তীদের পেছনে দৃষ্টি চালিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওই তো, বাপিও এসে গেছে।’

ড রায় ক্লান্ত ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পোর্টিকোর ভেতরে এলেন। এখন তাঁর পরনে হাফপ্যান্ট নয়, টুইডের পাক্কা সাহেবি কায়দায় সুট। একটা চেয়ারে বসে বললেন, ‘আপনারা কতক্ষণ এলেন? আলাপ-পরিচয় হয়ে গেছে নিশ্চয়ই? খুব ভালো, খুব ভালো। মুনিয়া তোমার বিদ্যাকে বলো না, একটু কড়া করে কফি বানাতে। আমি আজ বড়ো ক্লান্ত।’

বিদ্যা নামক গাড়োয়ালি ছেলেটি কাছেই ছিল। নিজের নাম শুনে এগিয়ে এল। মুনিয়া তাকে যথাবিধি কফির নির্দেশ দিলেন।

দময়ন্তী বলল, ‘ক্লান্তি দূর করার প্রকৃষ্ট উপায় গান শোনা।’

সহাস্যে ড রায় বললেন, ‘তা যা বলেছ। কিন্তু কে গান গাইবে? তুমি?’

‘না, না, আমি কেন? মিস রায় গাইবেন। ওঁর এক ঝলক গান শুনেছি। ভারি চমৎকার।’

শমির উচ্ছ্বাসটা একটু কমে এসেছিল। দময়ন্তীর কথাটা যেন কানে যায়নি, এমনিভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘উজ্জ্বল কোথায়?’

ড রায় বললেন, ‘ও একটু নীচে ক্যান্টনমেন্টে যাবে বলছিল। বোধ হয় ধড়াচুড়ো পরতে গেছে। ও আসবে’খন, তুই গানটা শুরু কর। দময়ন্তী ঠিক কথা বলেছে। এই সময় চাই গরম কফি আর গান।’

শমি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, তারপর গান ধরল, ‘আমি কান পেতে রই…’

.

গান শেষ করে শমি বলল, ‘কেমন হল?’

‘অপূর্ব! অপূর্ব!’ সবাই সমস্বরে কোলাহল করে উঠল। কেবল মুনিয়া রয় চুপ করে রইলেন। তাঁকে একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল।

ড রায় বললেন, ‘আমাদের গান তো শুনলে, এবার তোমরা শোনাও।’

দময়ন্তী রমলার কানে কানে কী যেন বলল। রমলা একবার মাথা নেড়ে চোখ বুজে গান ধরল, ‘জীবনে পরম লগন কোরো না হেলা, হে গরবিনী। বৃথাই কাটিবে বেলা, সাঙ্গ হবে যে খেলা, সুধার হাটে ফুরাবে বিকিকিনি…’

রমলার গলাটি সুরেলা, গাইবার ঢংটিও চমৎকার। সবাই তন্ময় হয়ে শুনছিল। কেবল দময়ন্তী তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শর্মিষ্ঠার মুখের দিকে, দেখছিল এই গানের কীরকম প্রভাব ওর ওপরে পড়ে। যদি কিছুই না পড়ত, তবে সেটা অবশ্যই খুব হতাশাব্যঞ্জক হত। কিন্তু তা হল না। শমির মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে গিয়ে সেখানে একটা কালো ছায়া ধীরে ধীরে নেমে এল। সে-ছায়ায় যেন ভয়, সংশয়, দ্বিধা, অসহায়তা সমস্ত মিলেমিশে রয়েছে। গান যত শেষ হয়ে আসতে লাগল, শমির শরীর ততই কঠিন হয়ে উঠতে লাগল। মনে হচ্ছিল, যদি সম্ভব হত, তাহলে নিশ্চয়ই এই গানের সামনে থেকে ও উঠে পালিয়ে চলে যেত।

ব্যাপারটা প্রায় সেরকমই হল। গান শেষ হওয়া মাত্রই শর্মিষ্ঠা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আপনারা গল্প করুন, আমি যাই। বাগানে আমার কিছু কাজ পড়ে আছে।’

দময়ন্তী বলল, ‘আমরা কি আপনার সঙ্গে আসতে পারি? আপনার এই চমৎকার বাগানটা একটু ঘুরিয়ে দেখাতেন।’

সামান্য ইতস্তত করে শর্মিষ্ঠা বলল, ‘বেশ তো, আসুন।’

দময়ন্তী রমলাকে নিয়ে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে চলে গেল। তখন মুনিয়া তাঁর আধো ঘুমন্ত শরীরটা চেয়ারের ওপর লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমিও যাই। আপনারা এঁর সঙ্গে গল্প করুন। আমাকে একটু শহরে যেতে হবে।’ বলে শরীরটা সাপের মতো একটা ঢেউ খেলিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

ব্রতীশেখর মুখ তুলে বললেন, ‘আজকেও শহরে যেতে হবে?’

‘ইয়েস।’ মাথা নেড়ে মুনিয়া ভেতরে রওনা হতে উদ্যত হলেন।

ব্রতীশেখর মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ল্যাবরেটরি থেকে নিউ তাজমহল হোটেলে ফোন করেছিলুম। শুনলুম, মীরচান্দানি নাকি আজ সকালে বোম্বে চলে গেছে।’

খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো বিদ্যুদবেগে ফিরে দাঁড়ালেন মুনিয়া রয়। তাঁর অলস, লতা ইব শরীর সহসা ফণা তোলা সাপের মতো ঋজু, কঠিন হয়ে উঠল। আধো ঘুমন্ত চোখ বিস্ফারিত হয়ে ত্রূ«র জিঘাংসায় ধকধক করে জ্বলে উঠল। সমরেশ সভয়ে ভাবল, এইবার একটা ভয়ংকর কিছু ঘটে যায় বুঝি। খেপচুরিয়াস মেয়েদের যমের মতো ভয় করে চলে সমরেশ।

কিন্তু না, ভয়ংকর কিছু ঘটল না। মুনিয়া হিসহিস করে বললেন, ‘সংবাদটির জন্য ধন্যবাদ। আর কিছু বলবার আছে তোমার?’

ব্রতীশেখর মাথা নেড়ে বললেন, ‘না। তুমি যেতে পারো। তবে বেশি রাত কোরো না। এই ঠান্ডায় হাঁপানির টান ধরলে কষ্টটা তোমারই হবে, আমার নয়।’

মুনিয়া এর আর কোনো জবাব দিলেন না। উদ্ধত অহংকারে গটগট করে চলে গেলেন।

প্রায় তখুনি বাড়ির অন্যদিক থেকে সুটেড বুটেড উজ্জ্বল দেখা দিল। পোর্টিকোর নীচে এসে একটা চেয়ারে বসে বলল, ‘আপনারা কতক্ষণ? মিসেসরা আসেননি?’

সমরেশ বলল, ‘এই কিছুক্ষণ হল এসেছি আমরা। গিন্নিরা মিস রায়ের সঙ্গে বাগান দেখতে গেছেন। তা, সেজেগুজে কোথাও চললেন নাকি?’

উজ্জ্বল বলল, ‘হ্যাঁ। ভাবছি, একটু ক্যান্টনমেন্টে যাব। বাড়ি থেকে একটা পার্সেল আসবার কথা আছে।’

সমরেশ আবার কী যেন বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা যান্ত্রিক গর্জনে ওর কথা চাপা পড়ে গেল। সকলে মুখ তুলে দেখল, একটা টুকটুকে লাল স্পোর্টস কার বাড়ির পেছন থেকে হুস করে বেরিয়ে এসে গেটের মধ্যে দিয়ে উল্কার মতো বেরিয়ে গেল। চালক মুনিয়া।

ব্রতীশেখর বিষাক্ত দৃষ্টিতে স্ত্রীর অপস্রিয়মাণ গাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। গাড়ি অদৃশ্য হলে বললেন, ‘তোমরা গল্প করো। আমি ভেতরে গিয়ে চান করে আসি। বড্ড ক্লান্ত লাগছে।’

ব্রতীশেখর চলে গেলে শিবেন হাত নেড়ে বলল, ‘কী মশায়, শহরে যাবেন তো ওঁর সঙ্গে গেলেন না কেন? এখন তো ট্যাঙশ ট্যাঙশ করে হেঁটে যেতে হবে।’

দাঁতে দাঁত চেপে উজ্জ্বল বলল, ‘গেলুম না পারস্পরিক নিরাপত্তার জন্য। আমরা দু-জনেই জানি যে, একজন সুযোগ পেলেই অপরজনকে খুন করবে।’

চোখ কপালে তুলে সমরেশ বলল, ‘সে কী? এ তো ভালো কথা নয়!’

হঠাৎ হেসে উঠল উজ্জ্বল। বলল, ‘তা তো নয়ই। তবে এটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয়? আমি ওঁর মেয়েকে বিয়ে করতে চাই, অথচ ওঁর জামাই পছন্দ নয়। এদিকে মেয়ে আবার মাকে দুঃখ দিতে চায় না। সেক্ষেত্রে…’

সমরেশ বলল, ‘মিস রায় ওঁর মেয়ে, কেমন বিশ্বাস হয় না। ওঁকে দেখলে খুব কম বয়েস বলে মনে হয়, তাই না?’

উজ্জ্বল বলল, ‘বিশ্বাস না হওয়াই স্বাভাবিক। উনি শমির বিমাতা। বছর চারেক আগে কাকাবাবু ওঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের আগে উনি ছিলেন মুনিয়া গিদোয়ানি, অতীতের বিখ্যাত তারকা চামেলি গিদোয়ানি ওরফে উর্বশীর মেয়ে।’

.

ক্রিস্টাল ভিলার গেট থেকে বিদায় নিয়ে উজ্জ্বল মজুমদার চলে গেল নীচে। ওর হাতে একটা বড়ো লাল ফুল, টেবিলের তলায় ধুলোমাখা অবস্থায় পড়ে ছিল দেখে কুড়িয়ে তুলে নিয়েছিল। যতক্ষণ সেই ফুলটা দেখা গেল, ওরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

বাড়িতে ঢুকে শিবেন বলল, ‘উজ্জ্বল মজুমদারকে যত দেখছি, ততই ভালো লাগছে। তবে বউদি, আপনি যে পর্বতো বহ্নিমান ধূমাৎ বলেছিলেন, সেটা দেখছি সেন্ট পার সেন্ট খাঁটি কথা। বাপ, মনে হল যেন ভিসুভিয়াসের পেটের মধ্যে থেকে ঘুরে এলাম। একেবারে আগাপাশতলা আগ্নেয়গিরি।’

.

সেদিন রাত্রি থেকেই অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়ে গেল।

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। বাইরের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঠেকানোর জন্যে বাড়ির সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ করে বসবার ঘরে লাল টকটকে ইলেকট্রিক চুল্লি ঘিরে বসে চারজনে মিলে তাস খেলছিল।

সমরেশ বলল, ‘দেখ তো শিবেন, বাইরে কে যেন প্যাঁকপ্যাঁক করছে। এত রাতে এখানে গাড়ি নিয়ে কে এল রে বাবা!’

শিবেন উঠে গিয়ে কাচের জানলায় নাক ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘একটা জিপ বলে মনে হচ্ছে যেন। আরে, নীলকান্ত যে!’ বলে তাড়াতাড়ি ম্যান্টলপিসের ওপর থেকে একগোছা চাবি নিয়ে একটা প্রকাণ্ড কম্বল মুড়ি দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল বাইরের গেটটা খোলবার জন্য।

শিবেনের সঙ্গে ঘরে এসে ঢুকলেন ওভারকোট আবৃত পুলিশের টুপি পরিহিত একজন অফিসার। ইনি স্থানীয় এস পি নীলকান্ত রাঘব রাও। শিবেনের বহুদিনের বন্ধু, শান্তিনিকেতনের ছাত্র ছিলেন বলে বাংলা বলেন পরিষ্কার। ক্রিস্টাল ভিলার ব্যবস্থাটা ইনিই করে দিয়েছিলেন।

দু-জনে ঘরে ঢুকতে দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার নীলকান্তবাবু? এত রাতে আপনি কোত্থেকে? রায়-কটেজ থেকে নাকি?’

বিস্মিত নীলকান্ত কোনো কথা বলবার আগেই শিবেন বলল, ‘তা ছাড়া কী? খেল শুরু হয়ে গেছে আর বাবুর ডাক পড়েছে। তা না হলে কি আর এদিক মাড়ায়? কাল রাত্রে পৌঁছে দিয়ে গেছে, সেই আমাদের ভাগ্যি।’

নীলকান্ত বলল, ‘বাজে বকিসনি শিবেন। আজ সারাদিন ভয়ানক ব্যস্ত ছিলুম, তাই আসতে পারিনি। তবে খেল শুরু হয়ে গেছে যে বললি, তার মানে কী? তোরা কি আজকের ঘটনাটা আঁচ করেছিলি নাকি? আমি শালা এতদিন, আই বেগ ইয়োর পার্ডন লেডিজ, এখানে বসে কিছু টের পেলুম না, আর তোরা খেলের কথা বুঝে গেছিস?’

সমরেশ বলল, ‘ধৈর্যং রহু, ধৈর্যং! ঘটনাটা কী হয়েছে? আমরা কিছু একটা ঘটবে আঁচ করেছিলুম ঠিকই, কিন্তু সঠিক ব্যাপারটা জানা দরকার।’

মাথার টুপিটা খুলে একটা চেয়ারে বসে নীলকান্ত বলল, ‘একদল গুন্ডা মেজর উজ্জ্বল মজুমদারকে খুন করবার চেষ্টা করেছিল, পারেনি।’

দময়ন্তী ভ্রূকুঞ্চিত করে জিজ্ঞেস করল, ‘একটু খুলে বলবেন?’

‘আজ দুপুরের দিকে শহরের কাছে ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলেন মেজর মজুমদার। সেখানে রাত্রের খাওয়া সেরে রাত ন-টা নাগাদ রায়-কটেজে ফিরছিলেন। একটা আর্মি জিপ ওঁকে পৌঁছে দিতে আসছিল। রাস্তা একেবারে জনমানবহীন, কাজেই বেশ জোরেই যাচ্ছিল জিপটা। এখান থেকে আধ মাইলটাক ওপরে যে হেয়ারপিন বেন্ডটা আছে, সেটা ঘুরতেই দেখে যে সামনে কতগুলো বড়ো বড়ো পাথর রাস্তার ওপর সাজানো। জিপটা থামানো যায়নি, একটা পাথরে ধাক্কা লেগে সেটা লাফিয়ে উঠে একধারের পাহাড়ে ধাক্কা মারে। মেজর মজুমদার ছিটকে অন্যদিকে খাদের মধ্যে পড়ে যান। ভাগ্যক্রমে খাদের সেখানটা ছিল পাইনের বন। পাইন বনের তলাটা নিডল পড়ে পড়ে কেমন মসৃণ হয়ে থাকে, দেখেছেন তো? তার ওপরে একটা নালার জল এসে ও জায়গাটায় পড়ায় খুব নরম হয়ে ছিল সেখানটা। কাজেই মজুমদারের আঘাত একেবারেই লাগেনি, যদিও শ-খানেক ফুট নীচে পড়ে গিয়েছিলেন।’

‘পাথরগুলো যে গুন্ডাদের সাজানো, কী করে বুঝলেন?’

‘জিপটায় আগুন লেগে গিয়েছিল। সেই আগুনের আভায় নীচে পড়ার অব্যবহিত পরে মেজর মজুমদার চার-পাঁচজন লোককে রাস্তার ওপরে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। ওরা বোধ হয় দেখবার চেষ্টা করছিল মজুমদারের অবস্থাটা।’

‘জিপ চালাচ্ছিলেন কে?’

‘সেনাবাহিনীর একজন ড্রাইভার, নাম কুন্দনলাল। সে সঙ্গেসঙ্গেই মারা যায়।’

‘আপনাদের খবর দিল কে?’

‘জিপের আগুন নীচের বস্তির লোকেরা দেখতে পায়। ওরা অবশ্য ভেবেছিল, কোনো বাড়িতে আগুন লেগেছে। সেজন্য তারা পুলিশে খবর দেয়। আর্মি খবর পেয়ে আমাকে ঠেলে তোলে। ওদের ধারণা, এটা সাবোটাজ। এর পেছনে কোনো বিদেশি ষড়যন্ত্র কাজ করছে।’

‘উজ্জ্বলবাবুকে কি আপনারা তুললেন?’

‘না, না, উনি নিজেই উঠে এসেছেন। যতক্ষণ পুলিশ আসেনি, ততক্ষণ নীচে ঘাপটি মেরে ছিলেন, আমরা আসতেই উঠে আসেন। আরে, ওঁর কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়া আছে, জাঙ্গল ওয়রফেয়ারে একজন বিশেষজ্ঞ, উনি কি আর ওই অবস্থা থেকে ওপরে ওঠার জন্য আমাদের তোয়াক্কা করেন?’

‘কমান্ডো ট্রেনিং কী?’

‘ওটা একরকম গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং বলতে পারেন। শত্রুসৈন্যবাহিনীকে পেছন থেকে ছোবল মারার কায়দা। সর্বরকম অসুবিধের মধ্যে, সম্পূর্ণ একা, এরকম অবস্থায় বেঁচে থাকা আর লড়াই করা।’

‘একা একটা সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করবে কীরকম?’

‘মুখোমুখি নয়। এই, গোপন ছাউনির ভেতরে ঢুকে অস্ত্রাগার উড়িয়ে দিয়ে এল, কি পানীয় জলে বিষ মিশিয়ে দিয়ে এল, কি দলছুট কোনো শত্রুসৈন্যকে মেরে ফেলল— এইরকম আর কি। খালি হাতে মানুষ মারার নানারকম কৌশলও শিখতে হয়। এসব করে কিন্তু বিপক্ষের ক্ষতি বড়ো কম হয় না।’

‘আচ্ছা, মিসেস মুনিয়া রয় তখন কোথায়?’

‘মিসেস রয় তখন শহরে ছিলেন। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ফিরে আসেন। তা, আপনি দেখছি এঁদের সবাইকেই দিব্যি চিনে গেছেন? বাঃ, বাঃ!’

শিবেন সারা দিনের ঘটনাবলি বিবৃত করে বলল, ‘এখন এঁদের সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত কর। বিদেশি ষড়যন্ত্র না কচু, ষড়যন্ত্র যা কিছু সবই নিতান্ত নেটিব। আপাতত, রায়-কটেজের অধিবাসীদের সম্বন্ধে আমাদের একটু অবহিত হওয়া প্রয়োজন।’

নীলকান্ত বলল, ‘রায়-কটেজের অধিবাসীরা প্রত্যেকেই এক একটি বিচিত্র চরিত্র।’

‘প্রথমত, ধর, ডক্টর ব্রতীশেখর রায়। ভদ্রলোক প্রচণ্ড জ্ঞানী, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট, বৈজ্ঞানিক হিসেবে সারা ভারতে ওঁর যথেষ্ট সুনাম আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভদ্রলোক এইরকম একটা জায়গায় পড়ে আছেন, কারণ তিনি নাকি তাঁর প্রথমা স্ত্রী-র অকালমৃত্যুর প্রায়শ্চিত্ত করছেন। আজ থেকে প্রায় একুশ বছর আগে সেই মহিলা আত্মহত্যা করেছিলেন। উনি নাকি একটু পাগলাটে ছিলেন, মাঝে মাঝে মানসিক রোগের ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা করানো হত। তিনি যখন আত্মহত্যা করেন, তখন ডক্টর রায় ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিলেন একটা সেমিনারে বক্তৃতা দিতে। ফিরে এসে দেখেন তাঁর ল্যাবরেটরি থেকে পটাশিয়াম সায়ানাইড নিয়ে স্ত্রী আত্মহত্যা করে বসে আছেন। তাইতে উনি এমন শক পান যে, কলকাতার পাট তুলে এখানে অজ্ঞাতবাস করতে চলে আসেন। এতে অবশ্য পুলিশ অন্যরকম সন্দেহ করেছিল, তবে তাঁর বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রমাণও পাওয়া যায়নি। সন্দেহটা অমূলক, ভদ্রলোক নির্দোষ ছিলেন।’

‘মিসেস মুনিয়া রয় এর মধ্যে এলেন কোত্থেকে?’ শিবেন জিজ্ঞেস করল।

‘আজ থেকে বছর চার-পাঁচ আগে ডক্টর রায় মুনিয়াকে বিয়ে করেন। মিসেস রয়ের চেহারাটা দেখেছিস তো? তখন তো নিশ্চয়ই আরও চটকদার ছিল। ডক্টর রায় বোম্বে গিয়েছিলেন কী-একটা কনভেনশন অ্যাটেন্ড করতে, সেখানেই আলাপ এবং পরে বিবাহ। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন, মুনিগণ ধ্যান ভাঙি দেয় পায়ে তপস্যার ফল, ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে তাই। ডক্টর রায় তাঁর তপস্যার ফলে যে রোজগার আজ করে থাকেন, তার সবটাই যায় এখন মুনিয়ার খরচ মেটাতে। প্রায়শ্চিত্ত করছিলেন, বেশ করছিলেন। হঠাৎ এই মতিভ্রমটা হয়ে ভদ্রলোক এখন পস্তাচ্ছেন, সন্দেহ নেই।’

‘মুনিয়া মোটেই সুবিধের লোক নন, নয়?’

‘সুবিধের লোক কী বলছিস? রীতিমতো অসভ্য। ডক্টর রায়কে বিয়ে করেছিলেন তো স্রেফ টাকার জন্য। ডক্টর রায় বিরাট বড়োলোক বটে, কিন্তু একেবারে অশক্ত, অথর্ব, বৃদ্ধ নন। মানে, কাউকে বিয়ে করতে টাকাটাই তাঁর একমাত্র কোয়ালিফিকেশন নয়। তাহলে, মুনিয়া ইচ্ছে করলে, তাঁর সম্পত্তির সদব্যবহার করেও তাঁকে একটি ভালোবাসাপূর্ণ সংসার উপহার দিতে পারতেন। কিন্তু মুনিয়া সে-পাত্রীই নন। এই বনবাসে থাকতে তাঁর বয়ে গেছে। মাসের মধ্যে দু-তিন হপ্তা কাটান বোম্বেতে। ডক্টর রায়ের টাকায় সেখানে ফুর্তি হয়। তার ওপরে আবার আছে মীরচান্দানি।’

‘ইনি কে?’

‘ইনি একজন নমস্য ব্যক্তি। বোম্বেতে স্বনামে, বেনামে, লাখ লাখ টাকার মালিক, যদিও কোনো সৎ রোজগারের প্রমাণ ইনি বোধ হয় দাখিল করতে পারবেন না। সম্ভবত ইনি একজন শীর্ষস্থানীয় স্মাগলার, বুটলেগার, চোরাই মালের কারবারি। ইনি মাঝে মাঝেই এসে নিউ তাজমহল হোটেলে ওঠেন, তখন মুনিয়াও সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। ওঁরা বলেন, ওঁরা নাকি কাজিনস, জ্ঞাতি ভাইবোন। ওখানে ভাইবোনে যে কী করেন, তা অবশ্য আমরা জানি না।’

দময়ন্তী বলল, ‘সেকথা যাক। উজ্জ্বলবাবু কেমন লোক, সেকথা বলুন।’

‘উজ্জ্বল মজুমদার বীরচক্র পেয়েছেন, কাজেই তিনি যে বীর সে-বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু একটা বিষয়ে ওঁর সৈন্যবাহিনীতে একটু বদনাম আছে। না, না, নারীঘটিত কোনো ব্যাপারে নয়। মেজর মজুমদার সেদিক দিয়ে নির্মল চরিত্র। তাঁর বদনামের কারণ, তিনি নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ানক নিষ্ঠুর। শত্রুপক্ষের প্রতি কোনোরকম দয়ামায়া বা মমতা দেখানো তাঁর ধাতে নেই। যেখানে রক্তপাত না করলেও চলে, সেখানেও তিনি নিবৃত্ত হন না। দুরন্ত অন্ধ আবেগে চলেন। ওঁকে সামলে রাখা কঠিন। এটা এক ধরনের পাগলামি বলতে পারেন বা এক ধরনের সেডিজম।’

রমলা বলল, ‘হ্যাঁ, ফেরার পথে মুনিয়ার কথা বলতে গিয়ে ওঁর দাঁত কিড়মিড় করা দেখে আমারও সেইরকম সন্দেহ হয়েছিল। আচ্ছা, ও বাড়িতে একমাত্র ভালো লোক বোধ হয় শর্মিষ্ঠা, তাই না? কী চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গায়।’

নীলকান্ত মাথা নাড়ল। বলল, ‘ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারে, কিন্তু ভালো লোক কি না বলতে পারব না। বয়েস তো প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ হল, অথচ এমন নেচে-কুঁদে বেড়ায়, যেন কচি খুকি। শুনেছি, নাকি ছেলেবেলা থেকেই এরকম। কাজেই, স্থানীয় লোকেদের কাছে অদ্ভুত না ঠেকলেও, আমার কাছে কেমন যেন লাগে। ওইরকম একটা ভরন্ত শরীরের মেয়ে যদি লাফিয়ে বেড়ায় তো কেমন অস্বস্তি হয় না? আমার ধারণা, এটাও এক ধরনের পাগলামি। আপনারা কি বলেন?’

সকলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

নীলকান্ত বলে চলল, ‘তবেই দেখুন, ও বাড়ির সকলেই বিচিত্র চরিত্র যে বলেছিলুম, কথাটা নেহাত মিথ্যে বলিনি। যা হোক, আজ তাহলে চলি, অনেক রাত হল। না রমলা, এখন কফি খাওয়ার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। আজ সারাদিন আসতে পারিনি, তাই ভাবলুম, আলো যখন জ্বলছেই, তখন একটু বিরক্ত করে যাই। তা ছাড়া, আজ যে ঘটনাটা ঘটল, সেটাও জানিয়ে দিয়ে যাই, হয়তো মিসেস দত্তগুপ্তর ইন্টারেস্টিং লাগবে। অবশ্য, এ ঘটনায় আপনার সাহায্য নেবার দরকার হবে না। আজ হোক, কাল হোক, গুন্ডাদের ঠিক পত্তা চলে যাবে। তবে, যদি আরও কোনো জটিলতার সৃষ্টি হয় ও বাড়িতে, তাহলে আপনাকে ধরে নিয়ে যাব, কেমন? শিবেনের কাছে আপনার গল্প যা শুনেছি, তার একটা হাতেনাতে পরীক্ষাও হয়ে যাবে। শুভরাত্রি।’

নীলকণ্ঠ চলে গেলে দময়ন্তী চিন্তিত, গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের ব্রোশারে বলেছে যে, এ অঞ্চলে নাকি একটিও হিংস্র জন্তু নেই। ওরা কিছুই জানে না। অন্তত, মিসেস মুনিয়া রয় সম্পর্কে অনভিজ্ঞ টুরিস্টদের সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিল।’

সমরেশ প্রশ্ন করল, ‘মুনিয়াকে তোমার এতই বিপজ্জনক মনে হয়?’

দময়ন্তী বলল, ‘মুনিয়া যে কতদূর বিপজ্জনক, তা ধারণা করার ক্ষমতা আমারও নেই। দুনিয়ার আর কোনো প্রাণী তার চেয়ে বেশি বিষাক্ত, হিংস্র বা বিবেকহীন খল হতে পারে না। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে সে করতে পারে না, এমন কোনো অপকর্ম নেই। মুনিয়া এবার কাকে ছোবল দেয়, সেটাই দর্শনীয়।’

শিবেন বলল, ‘আপনি স্থির নিশ্চিত যে সে ছোবল দেবে?’

‘হ্যাঁ। এবং শিগগিরই।’

.

সকাল ন-টার সময় নীলকান্ত এসে উপস্থিত। বলল, ‘চলুন, মিসেস দত্তগুপ্ত। আপনাকে এবার যেতে হবে। বেশি দেরি করিয়ে রাখিনি, কি বলেন?’

দময়ন্তী বলল, ‘ওখানে কিছু একটা হয়েছে, বুঝতে পেরেছিলুম। ঘণ্টাখানেক আগে ডাক্তারের লাল ক্রস লাগানো গাড়ি ওপরে যেতে দেখেছি। কেউ মারা যাননি তো?’

নীলকান্ত বলল, ‘চলুন না। গেলেই দেখতে পাবেন।’

.

১০

রায়-কটেজের গেটে দু-জন বন্দুকধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে। তারা স্যালুট করে পথ ছেড়ে দিল। নীলকান্তর জিপ ভেতরে ঢুকে পোর্টিকোর পাশে দাঁড়াল।

কালকের মতোই গার্ডেন চেয়ারগুলো পাতা রয়েছে পোর্টিকোর নীচে। তাদের একটায় জনৈক স্থূলকায় পুলিশ অফিসার, বোধ হয় স্থানীয় থানার সাবইনস্পেকটর, বসে আছেন গম্ভীর মুখে। অন্য একটায় শর্মিষ্ঠা বসে, মুখ নির্লিপ্ত, ভাবলেশহীন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে প্রস্তরমূর্তিবৎ উজ্জ্বল। বাড়ির ভেতরে যাওয়ার সিঁড়ির ওপরে বসে আছেন উদ্ভ্রান্তদৃষ্টি ড রায়, পাশে একজন চশমা চোখে অপরিচিত ভদ্রলোক, গলায় স্টেথোস্কোপ।

দময়ন্তী চারদিকে একবার তাকিয়ে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মুনিয়া?’

নীলকান্ত মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’

.

১১

অত্যন্ত বিস্মিত এবং হয়তো কিঞ্চিৎ পুলকিত ডাক্তার ব্রিজমোহন খান্না মহা সমাদরে দময়ন্তীকে মুনিয়ার শোয়ার ঘরে ঢোকালেন। পেছনে পেছনে এল শিবেন, সমরেশ, নীলকান্ত এবং আপাতত বাকশক্তিরহিত সাবইনস্পেকটর কিষণলাল কাপুর।

লাল কার্পেটে মোড়া মুনিয়ার শোয়ার ঘর। ঘরটি বেশ বড়ো। একপাশে সোনালি বেডকভারে ঢাকা মস্ত জোড়া খাট, তার পাশে লাগোয়া বাথরুমে যাওয়ার রাস্তা। অন্যপাশে ড্রেসিং টেবিল, তার ওপরে সারি সারি অসংখ্য প্রসাধন সামগ্রী। ড্রেসিং টেবিলের সামনে তিনটে কৌচ এবং একটা সেন্টার টেবিল। কৌচগুলোর পাশে দেওয়ালের মধ্যে নকল ফায়ার প্লেস, তার ভেতরে ইলেকট্রিক চুল্লি বসানো যায়। আপাতত, চুল্লিটি সেখান থেকে বের করে এনে খাটের পাশে একটা রাইটিং টেবিলের ওপর রাখা আছে বিছানার দিকে ফোকাস করে। কৌচগুলোর ওপরে মুনিয়ার কালকের দেখা পোশাক এবং কিছু অন্তর্বাস এলোমেলোভাবে ছড়ানো রয়েছে। একজোড়া উঁচু প্ল্যাটফর্ম শু ড্রেসিং টেবিলের সামনে পড়ে আছে। চারদিকের দেওয়ালে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত লম্বমান লাল রঙের পর্দা। দিনের বেলাতেও ঘরটা আবছা অন্ধকার।

ঘরের চারদিকে একনজর দেখে দময়ন্তী তাকাল খাটের দিকে। সোনালি বেডকভারের ওপর মুনিয়ার গতপ্রাণ শরীরটা চিত হয়ে পড়ে আছে। পা দুটো খাটের বাইরে, কার্পেটের ওপর রাখা। মনে হচ্ছে, যেন খাটের প্রান্তে বসেছিলেন মুনিয়া, অকস্মাৎ মৃত্যুর আঘাতে পড়ে গেছেন, ওঠবার সুযোগও পাননি। মুনিয়ার পরনে গাঢ় সবুজ রঙের ড্রেসিং গাউন, গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। দু-হাত দু-পাশে ছড়ানো, সামান্য হাঁ করা মুখে একটা ক্লিষ্ট যন্ত্রণার ছাপ।

দময়ন্তী নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে ড্রেসিং গাউনের গলার কাছে কয়েকটা বোতাম খুলল। তলায় দেখা গেল সবুজ নাইলনের পাতলা নাইটি। এবার পায়ের দিকে গাউনটা একটু তুলে ধরল। মুনিয়ার পায়ে একজোড়া মোটা কালো রঙের পশমের মোজা।

শিবেন বলল, ‘গলার কাছে এই দাগটা দেখেছেন? মনে হয় যেন চা পড়েছিল, তাই না?’

দময়ন্তী মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘হতে পারে।’

.

১২

কথা হচ্ছিল ড রায়ের লাইব্রেরি ঘরে বসে।

দময়ন্তী বলল, ‘বলুন ডাক্তার খান্না, আপনার দেখে কী মনে হয়?’

ডাক্তার খান্না একটু কেশে গলা সাফ করে বললেন, ‘দেখুন, মৃত্যুর সমস্ত লক্ষণই কিন্তু সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাকের। শ্বাসরুদ্ধ করে মারা হয়নি, বিষক্রিয়ারও কোনো চিহ্ন নেই। আমি, হয়তো স্বাভাবিক মৃত্যুরই সার্টিফিকেট দিয়ে দিতুম, যদি না একটা অস্বাভাবিক জিনিস আমার নজরে পড়ত।’

শিবেন বলল, ‘ডান হাতের আঙুলগুলো ভাঙা?’

‘ঠিক তাই। বিষক্রিয়ার লক্ষণ আছে কি না দেখতে গিয়ে লক্ষ করি, ডান হাতের পাঁচটা আঙুলই ভাঙা। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগল না, তাই মিস্টার রাওকে খবর দিলুম।’

নীলকান্ত জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কি মনে হয়, কারোর আঙুল একটা একটা করে ভাঙলে, তার মৃত্যু হতে পারে?’

‘যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। মৃত্যুও যে হতে পারে না, তা নয়। ভূতের ভয়েও তো অনেক সময় লোকে হার্টফেল করে— মারা যায়।’

শিবেন জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু পর পর পাঁচটা আঙুল ভাঙা হলে মৃতের মুখ কি যন্ত্রণায় আরও বিকৃত হত না?’

নীলকান্ত বলল, ‘তা না হতেও পারে। হয়তো প্রথম আঙুলটা ভাঙাতেই আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে। তারপর খুনি অন্ধ আক্রোশে বাকিগুলোও ভেঙেছে। আপনি কি বলেন, মিসেস দত্তগুপ্ত?’

দময়ন্তী বলল, ‘সেটা অসম্ভব নয়। আচ্ছা ডাক্তার খান্না, ঠিক কখন মৃত্যু হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?’

খান্না বললেন, ‘সেটা তো সঠিক বলা যায় না। তবে আমার ধারণা রাত এগারোটা থেকে একটার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে। বারোটা বললে, ঠিক সময়টা থেকে হয়তো খুব বেশি ভুল বলা হবে না।’

নীলকান্ত বলল, ‘বলেন কী? তার মানে, আমি রওনা হবার ঘণ্টাখানেক পরেই? আমি তো এখান থেকে রওনা হয়েছি এগারোটা বেজে কুড়ি কি পঁচিশে। ওই গেট থেকে শ-খানেক গজ দূরেই তো তখনও আর্মির লোকেরা ভাঙা জিপটা নিয়ে হেঁইয়ো হেঁইয়ো করছে। ওরা নাকি ফিরেছে রাত দুটো নাগাদ।’

সমরেশ বলল, ‘আমার তো মনে হচ্ছে, আপনারা চলে আসামাত্র মুনিয়াকে জোর করে ধরে মুখে রুমাল গুঁজে, তার আঙুল ভাঙতে শুরু করে খুনি। মুনিয়া যন্ত্রণায় মারা যায়। তখন তার মৃতদেহ সাজিয়ে-গুজিয়ে অমনভাবে খাটের ওপর রেখে আসা হয়।’

শিবেন বলল, ‘তুই যা বললি, প্রথম দর্শনে সকলেরই তাই মনে হবে বটে। কিন্তু কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে, ঠিক ধরতে পারছি না।’

নীলকান্ত বলল, ‘আমি কিন্তু সমরেশবাবুর সঙ্গে একমত। খুনি যে ভীষণ নৃশংস আর অত্যন্ত শক্তিমান, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ অন্তত নেই। যাক, আগে সকলকে জেরা তো করি। দেখি, কিছু বের করা যায় কি না। মিসেস দত্তগুপ্ত, আপনি কি সকলকেই জেরা করতে চান?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে আগে কাকে জেরা করবেন?’

‘আপনাকে।’

.

১৩

হাসি থামিয়ে নীলকান্ত বলল, ‘বলুন, আপনার কী জানবার আছে আমার কাছে?’

দময়ন্তী বলল, ‘আপনি কাল এখানে এসে কী কী লক্ষ করেছেন, তার পর্যায়পরম্পরা বলুন।’

‘জিপটা অ্যাক্সিডেন্ট করে রাত ন-টা নাগাদ। আমি যখন এসে পৌঁছোই, তখন রাত সাড়ে ন-টা। তার পাঁচ দশ মিনিট পরেই মেজর মজুমদার খাদ থেকে উঠে আসেন। তিনি আহত হননি বটে, কিন্তু বেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর শরীর কাঁপছিল, সেটা সর্বাঙ্গ ভিজে যাওয়ার জন্য শীতে হতে পারে, আবার সুস্থ ছিলেন না সেজন্যও হতে পারে। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে সকন্যা ডক্টর রায়ও ঘটনাস্থলে এসে পড়েছিলেন। মেজর মজুমদার খাদ থেকে উঠে আসতেই মিস রায় দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং আমার জিপে বাড়ি পৌঁছোনো পর্যন্ত উনি মজুমদারের সঙ্গে সঙ্গেই ছিলেন। এখানে এসে আমরা মজুমদারকে তাঁর শোবার ঘরে নিয়ে যাই এবং বাকি সকলকে বের করে দিয়ে তাঁকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করি। ভদ্রলোক ছাড়া ছাড়া ভাবে আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন এবং অত্যন্ত অন্যমনস্ক বলে মনে হচ্ছিল তাঁকে। উনি বললেন, উনি কাউকেই দেখেননি, এমনকী কাউকে সন্দেহ পর্যন্ত করেন না।’

দময়ন্তী বলল, ‘দাঁড়ান। এসময় তাঁকে ক্রুদ্ধ বা উত্তেজিত বলে মনে হয়নি আপনার?’

‘না। বরং কেমন যেন চিন্তিত বলে মনে হচ্ছিল। আমার ধারণা, উনি তখনও বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি অথবা দোষী কারা হতে পারে, সেটাই বোধ হয় চিন্তা করছিলেন।’

‘আপনি কতক্ষণ ওঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন?’

‘তা, মিনিট পনেরো হবে। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে ডক্টর রায়ের সঙ্গে ঘটনা সম্পর্কে কথাবার্তা বলি। সেগুলো এমন কিছু জরুরি নয়, এমনি মামুলি আলোচনা।’

‘ডক্টর রায় তখন কী করছিলেন?’

‘পোর্টিকোর নীচে দাঁড়িয়ে কিষণলাল আর ক-জন সেপাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা মিনিট পাঁচেক কথা বলতে-না-বলতেই ডাক্তার খান্না এলেন। তখন আমি ডক্টর রায় আর খান্নাসাহেবকে নিয়ে আবার মেজর মজুমদারের ঘরে ফিরে গেলুম।’

‘ডক্টর খান্নার বাড়ি থেকে এখানে আসতে কতক্ষণ লাগে?’

‘উনি তো আপনাদের বাড়ির কাছেই থাকেন। কতক্ষণ আর, বড়োজোর দশ মিনিট লাগে।’

‘বেশ, তারপরে কী হল?’

‘ডাক্তার খান্না মজুমদারকে পরীক্ষা করলেন। বললেন, আঘাত তেমন লাগেনি, ভয়ের কিছু নেই।’

‘আচ্ছা, কিষণলাল কি ডক্টর রায়ের ব্যবহারে কোনোরকম চঞ্চলতা বা উত্তেজনার ভাব লক্ষ করেছিল?’

‘না, বরং উলটোটাই। দেশে যে আইনশৃঙ্খলা নষ্ট হতে বসেছে, সে-বিষয়েই লেকচার দিচ্ছিলেন ভদ্রলোক। কিষণলাল যে বোরড হয়ে গিয়েছিল, সে তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলুম। কিষণলালও আমাকে সেকথাই বলে। জানেন তো, যে বোর করে সে কখনো চঞ্চল বা উত্তেজিত হয় না। শান্ত, স্নিগ্ধভাবে বোর করতে হয়।’

‘কিষণলাল তাহলে বোরড হয়ে গিয়েছিল? ভারি আশ্চর্য তো! সে যাকগে, তারপর বলুন।’

কিষণলালের বোরড হওয়ার মধ্যে আশ্চর্য কী আছে, সেটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না নীলকান্ত। বলল, ‘তারপর মুনিয়া আর শর্মিষ্ঠা এসে হাজির হল ঘরে। তখন রাত সাড়ে দশটা। মুনিয়া কীরকম ঘুম জড়ানো গলায় কথা বলত, দেখেছেন তো? অমনিভাবে কুন্দনলালের মৃত্যুর জন্য দুঃখপ্রকাশ করল, মজুমদার কেমন আছে জানতে চাইল, তারপর মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।’

‘মুনিয়াকে দেখে উজ্জ্বলবাবু বা ডক্টর রায় কোনোরকম উত্তেজনা প্রকাশ করেননি?’

‘সেকথাই বলতে যাচ্ছিলুম। মুনিয়াকে দেখেই ডক্টর রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ঘরের এককোণে স্ত্রীর দিকে পেছন করে দাঁড়িয়ে রইলেন। দু-হাত পেছনে মুঠি করছেন আর খুলছেন। এটা উত্তেজনার লক্ষণ সন্দেহ নেই। উজ্জ্বল স্থির দৃষ্টিতে মুনিয়ার দিকে চেয়ে ছিলেন, বাহ্যত কোনো উত্তেজনা প্রকাশ করেননি। কিন্তু যেই ভদ্রমহিলা বেরিয়ে গেলেন, তক্ষুনি আমার দিকে ফিরে চাপা গলায় বললেন, ওই মেয়েছেলেটিকে এক্ষুনি গ্রেপ্তার করতে পারেন? আমি বললুম, সেটা সম্ভব নয়, তদন্ত শেষ হলে দেখা যাবে। স্পষ্টত, উজ্জ্বলবাবুর ধারণা যে, মুনিয়াই ওঁর পেছনে গুন্ডা লেলিয়ে দিয়েছিল।’

‘হুঁ, তাই হবে। তারপর আপনারা সবাই মিলে চলে এলেন? রাত তখন ক-টা?’

‘এগারোটা হবে।’

দময়ন্তী চিন্তিত, গম্ভীর মুখে চুপ করে আছে দেখে নীলকান্ত বলল, ‘আমাকে জেরা করা শেষ?’

‘হ্যাঁ।’ দময়ন্তী ঘাড় নাড়ল।

বাঁকা হেসে নীলকান্ত বলল, ‘আমাকে জেরা করে কিছু লাভ হল?’

হেসে উঠল দময়ন্তী। বলল, ‘নিশ্চয়ই। অনেক কিছু জানতে পারলুম।’

‘যেমন?’

‘যেমন ধরুন, কিষণলাল বোরড হয়ে গিয়েছিল।’

নীলকান্ত তৎক্ষণাৎ ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘তাতে কী প্রমাণ হয়?’

‘কিছুই নয়। তবে এটা একটা সংবাদ। তারপর, ধরুন, মুনিয়াকে দেখে ডক্টর রায় উত্তেজনা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু উজ্জ্বলবাবু করেননি।’

‘তাতেই-বা কী প্রমাণ হয়? ডক্টর রায়ই খুনি?’

আবার হেসে উঠল দময়ন্তী। বলল, ‘না, না, তা কেন? তবে মনে হয়, খুনি যে-ই হোক, ওঁদের দু-জনের একজন জানতেন যে হত্যাকাণ্ডটা হতে চলেছে?’

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল নীলকান্ত। বলল, ‘তা তো নিশ্চয়ই। যে খুন করেছে, সে আর জানবে না যে হত্যাকাণ্ডটা হতে চলেছে? যাক, এবার তাহলে কাকে ডাকব?’

দময়ন্তী বলল, ‘বিদ্যাকে।’

.

১৪

বিদ্যাকে দূর থেকে দেখতে যতটা অল্পবয়স্ক বলে মনে হয়, কাছে এলে দেখা গেল ততটা তো নয়ই, বরং বেশ বয়স্কই বলা চলে। কালো পশমের টুপির নীচে চুলে পাক ধরেছে। দোভাষী নীলকান্তর মাধ্যমে দময়ন্তী বাক্যালাপ শুরু করল।

‘তুমি মেমসাহেবের কাছে কতদিন আছ?’

‘বহুদিন। আগে ওঁর মা-র কাছে ছিলুম। ওঁর বিয়ে হয়ে গেলে ওঁর সঙ্গে চলে এলুম। ওঁর মা আমাকে দেখাশুনো করতে বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু, কী আমার ভাগ্য! আমি নিমকের মর্যাদা রাখতে পারলুম না। আমি যদি…’

‘আচ্ছা, আচ্ছা। এবার বলো তো, মেমসাহেব কাল শহর থেকে ফিরে আসবার পর কী কী হয়েছিল।’

‘কাল মেমসাহেব যখন ফিরলেন, তখন অনেক রাত। উনি শহর থেকে ফিরলে সাধারণত সঙ্গে অনেক মাল থাকে, সেজন্য আমি গাড়ির কাছে যাই। কিন্তু কাল কিছু ছিল না। শমিবাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেমসাহেব গাড়ি থেকে নেমে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে মেজর সাহেবের কামরায় গেলেন। সেখান থেকে দু-জনে বেরিয়ে মেমসাহেবের কামরায় গিয়ে কথা বলতে লাগলেন। তার একটু পরেই পুলিশসাহেব চলে গেলেন। তখন সাহেব মেমসাহেবের কামরায় গিয়ে ঢুকলেন, শমিবাবা বেরিয়ে চলে এলেন। কামরার ভেতরে তখন দু-জনে জোর জোর কথা হতে লাগল। মেমসাহেব সাহেবকে খুব ডাঁটলেন। সাহেব চুপচাপ গিয়ে মেজরসাহেবের কামরায় ঢুকলেন। সেখানে শমিবাবাও ছিলেন। তিনজনে বাতচিত হতে লাগল। একটু বাদে শমিবাবা বেরিয়ে এসে বারান্দায় আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমি জেগে বসে আছি কেন। আমি বললুম, মেজরসাহেবের পেছনে গুন্ডা লেগেছে, এটা আমার ভালো লাগছে না। আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেছে, তাই ঘুম আসছে না। যতক্ষণ ঘুম না আসে, আমি এখানে বসে বসে আপনাদের পাহারা দেব। শমিবাবা হেসে বললেন, বহুত আচ্ছা, তুমি বসে বসে পাহারা দাও। বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন। তার বেশ কিছুক্ষণ পরে সাহেবও বেরিয়ে এসে নিজের ঘরে চলে গেলেন। তখন ঠান্ডায় বসে থাকতে থাকতে আমার ঘুম পেতে লাগল। মেজর সাহেবের ঘরের আলো নিভে যাওয়ার একঘণ্টা বাদে আমি উঠে শুতে চলে গেলুম। তখন সাহেবের কামরার ঘড়িতে দু-বার ঘণ্টা বেজেছিল।’

এতক্ষণ সবাই চুপচাপ বিদ্যার বক্তব্য শুনে যাচ্ছিল, শেষ বাক্যটি শুনে চমকে উঠে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। নীলকান্ত তো প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘দু-বার বাজল? তুমি ঠিক শুনেছ? দু-বার?’

‘হ্যাঁ, হুজুর। আমার ভুল হয়নি।’

‘তার মধ্যে আর কোনো গণ্ডগোল শোননি? কেউ মেমসাহেবের ঘরে ঢোকেনি?’

‘না, হুজুর।’

নীলকান্ত ভয়ানক চিন্তিত, বিমর্ষ হয়ে পড়ল। দময়ন্তী সহজভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার মেমসাহেব কি দরজায় খিল না দিয়ে শুতেন?’

‘কখনো দিতেন, কখনো দিতেন না। তা ছাড়া ওঁর নিশ্বাসের অসুখ ছিল, সেজন্য কষ্ট হলে দরজা খুলে রাখতেন। খাটের মাথার কাছে বেল বাজানোর সুইচ আছে, বেল বাজালে সবাই দৌড়ে যেত।’

‘ওঘরে ঢোকবার বা বেরোবার অন্য কোনো দরজা আছে?’

‘আছে। বাথরুমের দরজা।’

‘তুমি আজ সকাল আটটায় চা দিতে এসে যখন মৃতদেহ আবিষ্কার কর, তখন কি বাথরুমের দরজা খোলা ছিল?’

‘হ্যাঁ, ছিল। বাইরের আর ভেতরের দুটো দরজাই খোলা ছিল।’

‘মেমসাহেবের জামাকাপড় কে ঠিক করে রাখত?’

‘আমি।’

‘মেমসাহেব যে ড্রেসিং গাউনটা পরে আছেন, তার বুকের কাছে একটা শুকনো দাগ। মনে হয় যেন চা পড়েছিল। ও দাগটা কি কাল ছিল?’

‘আমি বলতে পারব না। অত লক্ষ করিনি। তবে মেমসাহেব খাটে শুয়ে শুয়ে চা খেতেন। বুকের ওপর চা পড়া অসম্ভব নয়।’

দময়ন্তীর প্রশ্ন শুনে নীলকান্ত হতাশ চোখে শিবেনের দিকে তাকিয়ে হাসল। পরবর্তী প্রশ্নটায় তো আরও হতাশ হয়ে পড়ল।

‘তোমাদের বাড়ির টেলিফোনটা কোথায় থাকে? কোথাও তো দেখছি না?’

‘সাহেবের ল্যাবরেটরিতে।’

‘কেন, ল্যাবরেটরিতে কেন?’

‘আগে তো ওটাই সাহেবের বাড়ি ছিল। মেমসাহেবকে বিয়ে করে তারপরে এই বাড়ি বানালেন। কিন্তু, অনেকদিন হয়ে গেল, টেলিফোন এ বাড়িতে বদল হয়ে এল না।’

‘সেই পুরোনো বাড়িটা এখান থেকে কত দূরে?’

‘গেট দিয়ে ঢুকে আপনারা তো এলেন বাঁ-দিকে। তা না এসে ডান দিকে যেতে হবে। খেতের মধ্যে দিয়ে গেলে দশ মিনিটে ঘুরে আসা যায়।’

‘বেশ। আমার আর প্রশ্ন করবার নেই। তুমি যেতে পারো।’

.

১৫

নীলকান্ত সহাস্যে বলল, ‘আপনার প্রশ্নগুলি বেশ। বিদ্যার কাছ থেকে কোন সংবাদটি জানতে পারলেন যা আপনার সবচেয়ে জরুরি বলে মনে হয়?’

দময়ন্তী বলল, ‘আপনাদের একটা অনুমান ভুল। ডাক্তারকে খবর কে দিয়েছিল বলে আপনার ধারণা?’

নীলকান্ত গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ‘দেখুন, আপনার কাছে হয়তো ডাক্তারকে কে খবর দিয়েছিল সেটাই সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার, কিন্তু আমাদের কাছে তা একেবারেই মনে হয় না। আসলে, সমস্ত ব্যাপারটার গুরুত্বই আপনার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। শিবেন, বিদ্যা কি সত্যি কথা বলছে বলে তোর মনে হয়?’

শিবেন চট করে দময়ন্তীর দিকে চেয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, আমার তো তাই মনে হয়।’

‘তাহলে ব্যাপারটা কী? হত্যাকাণ্ড হয়েছে রাত বারোটায় অথচ তার আগে একমাত্র ডক্টর রায়ই ওঘরে একবার ঢুকেছিলেন, যদিও গালাগাল খেয়ে পালিয়ে আসেন। তাঁর পক্ষে ওইটুকু সময়ের মধ্যে আঙুল ভাঙার প্রশ্নই ওঠে না। আর ছিল শর্মিষ্ঠা। কিন্তু, আঙুল যে ভেঙেছে, তার গায়ে অসম্ভব জোর, সে একটা মেয়েছেলে হতেই পারে না। উঁহু! আমার মনে হয়, বিদ্যা কোথাও একটা মিথ্যে কথা বলছে। ওকে অ্যারেস্ট করলে কেমন হয়?’

দময়ন্তী বলল, ‘কিছুদিন আগে কোথায় যেন পড়েছিলুম যে, আমেরিকায় মাফিয়াদের মানুষ মারার একটা প্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে, শিকারের মুখের ওপর প্রূসিক অ্যাসিড ছুড়ে মারা। প্রূসিক অ্যাসিড মারাত্মক বিষ, তার প্রভাবে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘণ্টাখানেক বাদে শরীরে প্রূসিক অ্যাসিডের আর চিহ্নমাত্র থাকে না। অটোপসির রিপোর্ট বলে হার্টফেলজনিত মৃত্যু।’

নীলকান্ত বলল, ‘আপনি যদি বলেন যে এই হত্যাকাণ্ডটি ওই মাফিয়া-পদ্ধতিতেই হয়েছে, তাহলে আঙুল ভাঙাটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আসলে, কল্পনাটা অতদূর টেনে লম্বা করবার কী দরকার? আপনি যেসব বিচিত্র সংবাদ সংগ্রহ করছেন, তাতে করে লাভ কী হবে জানি না, আমরা আপাতত ডক্টর ব্রতীশেখর রায়কে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখতে চাই। কি বলেন আপনি?’ ওর গলায় সুস্পষ্ট বিরক্তি।

দময়ন্তী নীলকান্তর বিরক্তিতে কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমিও তো তাই চাই।’

.

১৬

ড ব্রতীশেখর রায় ঘরে ঢুকে ভাবলেশহীন মুখে একটা চেয়ারে বসলেন।

নীলকান্ত প্রশ্ন শুরু করল, ‘আপনার কী ধারণা ডক্টর রায় যে আপনার স্ত্রী স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন, না তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, না তিনি আত্মহত্যা করেছেন?’

‘অর্থহীন প্রশ্ন।’ ড রায় বললেন, ‘আমি যদি স্বাভাবিক মৃত্যুই মনে করব, তাহলে নিজেকে হত্যাকারী বলতে যাব কেন?’

ড রায়ের কথা শুনে ঘরসুদ্ধ লোক চমকে উঠল। দময়ন্তী বলল, ‘আপনি নিজেকে হত্যাকারী বলেছেন নাকি? কাকে?’

‘ওই তোমাদের কিষণলালকে। আহা, লোকটি বড়ো ভালো। আমাকে এতক্ষণ বোঝাচ্ছিল যে, আমি যেন উকিলের পরামর্শ নিয়ে কথা বলি।’

নীলকান্ত গম্ভীর হয়ে গেল। শিবেনের দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি এটাই আশা করছিলাম বটে, কিন্তু এত শিগগিরি নয়। যা হোক, ডক্টর রায়, আপনার প্রথমা স্ত্রীও বিয়ের চার বছরের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুও কি এইরকম একটা ব্যাপারই ছিল?’

ড রায়ের প্রকাণ্ড শরীরটা ক্রুদ্ধ ভল্লুকের মতো ফুলে উঠল, মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল। কম্পিত গলায় বললেন, ‘প্রশ্নটা অবান্তর এবং অপমানজনক। আমি এর উত্তর দিতে প্রস্তুত নই।’

নীলকান্ত শুকনো গলায় হাসল। বলল, ‘ঠিক হ্যায়। কিন্তু কেন আপনি আপনার বর্তমান স্ত্রীকে খুন করেছেন, সেটা বলতেও কি কোনো আপত্তি আছে?’

একটা বিষণ্ণ হাসিতে ব্রতীশেখরের মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। বললেন, ‘কেন করলুম? আপনারা আমার অতীত জীবন সম্পর্কে যখন খবর রাখেন, তখন এ খবরটিও নিশ্চয়ই রাখেন যে, আমার বর্তমান স্ত্রী খুব একটা নির্মল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন না। আগে বুঝিনি, বিয়ের পর সেটা আমার নজরে আসে।’

‘আপনি তাঁকে ডিভোর্স করতে পারতেন।’

‘সেটা আমার আত্মসম্মানে লাগছিল।’

দময়ন্তী হেসে ফেলল। বলল, ‘আজ খুব ভোরে উঠেছিলেন কি রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে, না কোনো শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন?’

ব্রতীশেখরের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। কোনোক্রমে বললেন, ‘কে, কে বলেছে তোমাকে যে আমি উঠেছিলুম? কই, আ-আ-আমি তো উঠিনি।’

‘ঠিক আছে, ব্রতীশেখরবাবু। আপনি আজ বিশ্রাম করুন গিয়ে।’

‘তোমরা আমাকে গ্রেপ্তার করবে না?’

‘করব, যদি আপনি বলতে পারেন, আপনি কীভাবে খুন করেছেন।’

ব্রতীশেখরের চোখের ভেতর অসহায় ভাব ফুটে উঠল। কিন্তু তখন থামবার উপায় নেই। বললেন, ‘কীভাবে? কেন, গলা টিপে!’

শিবেন বলল, ‘আপনি ভেতরে যান, আপনাকে যথাসময়ে গ্রেপ্তার করা হবে।’

.

১৭

উজ্জ্বল মজুমদার রক্তবর্ণ চোখে একবার সকলের দিকে তাকাল। বলল, ‘আমাকে আপনারা কি জেরা করবেন? আমি খুন করেছি, কারণ মিসেস রয় আমাকে খুন করাবার জন্য গুন্ডা লাগিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল না যে আমি শমিকে বিয়ে করি।’

শিবেন বলল, ‘কিন্তু ডক্টর রায় বলেছিলেন যে, তাঁদের দু-জনেরই ইচ্ছে ছিল এ বিয়ে হয়।’

‘ডক্টর রায়ের হয়তো ছিল, কিন্তু মিসেস রয়ের ছিল না। তিনি অতি নোংরা চরিত্রের মেয়েমানুষ ছিলেন। তিনি মনে মুখে এক ছিলেন, একথা তাঁর শত্রুও বলবে না।’

‘আপনার সঙ্গে শর্মিষ্ঠা দেবীর বিয়েতে তাঁর আপত্তির কারণ অনুমান করতে পারেন?’

‘পারি। স্ত্রীর স্বভাবচরিত্রের পরিচয় পেতে কাকাবাবুর বেশিদিন লাগেনি। তিনি নিরীহ হতে পারেন, কিন্তু নির্বোধ নন। এইজন্য উনি একটি অদ্ভুত উইল করেছেন। তাতে বলা আছে যে, ওঁর অবর্তমানে ওঁর সমস্ত সম্পত্তির অছি হবেন মিসেস রয় এবং বেনিফিশিয়ারি হবে শমি। মিসেস রয় মাসে হাজার টাকা ভাতা পাবেন। এটা হবে যদি শমি অবিবাহিত থাকে তাহলে। বিয়ে করলে সমস্ত সম্পত্তি পাবে শমি অথবা তার অবর্তমানে পাবে রামকৃষ্ণ মিশন কেবল একটি অংশ ছাড়া, যার মাসিক আয় হাজার টাকা। সেটি পাবেন মিসেস রয়। কাজেই বুঝতে পারছেন, শমির বিয়ে না দেওয়াই মিসেস রয়ের পক্ষে লাভজনক। মাসে হাজার টাকা তাঁর হাতের ময়লা।’

‘আমরা তো শুনেছি, ইদানীং মিস রায়ও নাকি আপনাকে বিয়ে করতে চাইছিলেন না?’

উজ্জ্বল আরক্ত মুখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘কথাটা সর্বা*ংশে সত্যি নয়। মিসেস রয় শমির চারদিকে আগুনের বেড়াজাল দিয়েছিলেন। শমি তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিল না।’

‘আপনার কথাটা আরও একটু পরিষ্কার করে বলুন।’

‘আমি এ বিষয়ে আর একটি কথাও বলব না।’

দময়ন্তী বলল, ‘বেশ, তা না হয় না-ই বললেন। কিন্তু আজ শেষরাতে উঠে কোনদিকে গিয়েছিলেন, সেটা বলতেও কি আপনার আপত্তি আছে?’

উজ্জ্বল বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে দময়ন্তীর দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। কোনোক্রমে বলল, ‘হ্যাঁ, আছে।’

‘আচ্ছা, তাহলে আর একটি প্রশ্ন। আপনি যে মিসেস রয়কে হত্যা করেছেন বলে দাবি করছেন, সেটা কীভাবে করেছেন তা বলতে পারেন?’

‘আমি সৈন্যবাহিনীর লোক। আমাদের নানারকমভাবে মানুষ মারার কৌশল শেখানো হয়।’

দময়ন্তীর চোখ দুটো হেসে উঠল। মুখটা যথাসাধ্য গম্ভীর করে বলল, ‘অর্থাৎ খুনটা কীভাবে করেছেন এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। অথচ বোঝা উচিত ছিল। যাক, আপনি এবার ভেতরে যেতে পারেন।’

.

১৮

দময়ন্তী মাথা নীচু করে বসে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছিল। আপন মনে বলল, ‘বাব্বাঃ, মেজর মজুমদারের গায়ে প্রচণ্ড শক্তি!’

নীলকান্ত সপ্রশংস দৃষ্টিতে দময়ন্তীর দিকে চেয়ে ছিল, ওর মুখে তখন বিরক্তির বাষ্পও আর নেই। বলল, ‘আপনার মুখে চাপা হাসিতে ফুসকায়িত কেন? সমস্ত রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?’

দময়ন্তী মুখ তুলে হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’

‘বাঃ, বাঃ। তাহলে এ সম্বন্ধে কিছু বলতে আজ্ঞে হয়।’

‘দেখুন, এটা খুন ঠিকই, কিন্তু আমার ধারণা, আমেরিকান আইনের ভাষায় যাকে ম্যানস্লটার বলে, এটা তা নয়। আপনি তো বুঝতেই পারছেন, ৩০২ ধারায় এ কেস খাড়া করতে পারবেন না। বড়োজোর চার্জ তৈরি করতে পারেন ৩০৪ ধারায়। কিন্তু যদি ঘটনার গভীরে প্রবেশ করেন তো দেখবেন, এটা আত্মরক্ষার্থে হত্যাকাণ্ড। যে খুন করেছে সে যাকে বলে আন্ডার একস্ট্রিম প্রোভোকেশন এবং আপন জীবনের জন্যই করেছে। এই জীবন বলতে আমি শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলে বেঁচে থাকার কথা বলছি না, সাধারণভাবে জীবনধারণের কথা বলছি। জানি না, আপনি সেটা প্রমাণ করতে পারবেন কি না বা আইন সেকথা মানবে কি না, কিন্তু আইনের ওপরে মনুষ্যত্ব বলে যে একটা জিনিস আছে তার বিচারে হত্যাকারী হয়তো পূর্ণপাপী বলে গণ্য হবে না। যুদ্ধক্ষেত্রে অজানা অচেনা শত্রুসৈন্যকে মারা যদি পাপ না হয়, তাহলে এই হত্যাকাণ্ড তো কোনোমতেই পাপ হতে পারে না।’

সমরেশ বলল, ‘যুদ্ধক্ষেত্রের আইন আর সমাজজীবনের আইন তো এক নয়। অবশ্য তুমি সাধারণভাবে মনুষ্যত্বের দরবারে বিচার আশা করছ। সেটা আলাদা ব্যাপার।’

শিবেন ধ্যানস্থ হয়ে বসে ছিল। বিড়বিড় করে বলল, ‘আপনার জেরায় বোঝা যাচ্ছে, শ্বশুর-জামাই দু-জনেই ভোররাত্রে উঠে ঘোরাঘুরি করেছেন। কেন? আপনি সেটা বুঝলেন কী করে? এবং এই ঘোরাঘুরির তাৎপর্য কী?’

শিবেনের প্রশ্নমালা শেষ হওয়ার আগেই কিষণলাল এসে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, ‘মিস রায় আসতে চাইছেন না। উনি বলছেন, আমি খুন করেছি বলে তো স্বীকারই করছি, এর ওপর আবার কীসের জেরা হবে?’

সমরেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘কেবা আগে প্রাণ করিবেক দান, তারি লাগি কাড়াকাড়ি।’

দময়ন্তী কিষণলালকে বলল, ‘স্বীকার করলেই সব প্রশ্নের ফয়সালা হয়ে যায় না। আপনি গিয়ে বলুন, একবার ওঁকে আসতেই হবে।’

কিষণলাল চলে গেলে সমরেশ বলল, ‘তোমরা সব ভয়ংকর হাই লেভেলে কথাবার্তা বলছ। আমার কিন্তু ধারণা খুনি হল গে বিদ্যা। কাল রাত এগারোটা থেকে রাত দুটো পর্যন্ত সে একা মুনিয়া রয়ের ঘরের সামনে বসে ছিল। আর মুনিয়া নিহত হন রাত বারোটায়।’

নীলকান্ত বলল, ‘আপনার কথাটা ফেলনা নয়। কিন্তু তাতে কতগুলো প্রশ্ন থাকে। প্রথমত, মোটিভ কী? সে অত্যন্ত পুরোনো লোক আর গাড়োয়ালিরা বেজায় বিশ্বস্ত। সেক্ষেত্রে কোনো পুরোনো ঝগড়া খুব জোরদার কারণ হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, সে পালিয়ে গেল না কেন? তৃতীয়ত, তাকে বাঁচাবার এমন কী ভয়ানক তাগিদ থাকতে পারে, যাতে আর তিনজন মনিবই সমস্ত দোষ নিজেদের ঘাড়ে নিচ্ছেন? চতুর্থত, যেক্ষেত্রে তার দুটো পর্যন্ত বসে থাকার কোনো সাক্ষী নেই, সেক্ষেত্রে সে মিথ্যে কথা বলল না কেন?’

সমরেশ অসহায়ভাবে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘অতশত বলতে পারব না মশায়। কথাটা মনে এসেছিল তাই বলে দিলুম, এই আর কি।’

শিবেন বলল, ‘আর বলিসনি। কোনো জিনিস ষোলো আনা না জেনে ফোড়ন কাটতে নেই। আচ্ছা বউদি, আপনি যখন রহস্যের সমাধান করেই ফেলেছেন, তখন মিস রায়কে ডাকার কি কোনো দরকার আছে?’

দময়ন্তী বলল, ‘আছে।’

.

১৯

ঘরে ঢুকল শর্মিষ্ঠা, পেছনে উজ্জ্বল। সকলের মুখের দিকে কটমট করে চেয়ে উজ্জ্বল বলল, ‘শমিকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? এই তামাশার মধ্যে ওকে ডেকে আনার কী অর্থ হয়?’

নীলকান্ত বলল, ‘দেখুন মেজর মজুমদার, একজন মহিলা নিহত হয়েছেন। এ ব্যাপারটা তামাশা নয়। আমরা মিস রায়কে বেশিক্ষণ ধরে রাখব না, একটু বাদেই ছেড়ে দেব।’

উজ্জ্বল ঘাড় গোঁজ করে বলল, ‘আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমি ওর সঙ্গে থাকতে চাই। শমি এসব ব্যাপারে অনভিজ্ঞ, ওকে দিয়ে অনায়াসে আপনারা অনেক উলটোপালটা কথা কবুল করিয়ে নিতে পারেন!’

শিবেন বলল, ‘আপনি থাকুন মেজর, আমাদের তাতে কোনো আপত্তি নেই।’

এই কথোপকথনের সময় শর্মিষ্ঠা স্থির, উজ্জ্বল দৃষ্টিতে দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ ফিক করে হেসে বলল, ‘আপনি ডিটেকটিভ?’

দময়ন্তী মৃদু হেসে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। ডিটেকটিভ শব্দটা অপছন্দ করলেও সে-বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করল না।

দময়ন্তীর ঘাড় নাড়া দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল শর্মিষ্ঠা, হাসতে হাসতে চোখে জল এসে গেল। কোনোরকমে বলল, ‘মেয়েমানুষ কখনো ডিটেকটিভ হয়? হলে ছাই ডিটেকটিভ হয়। আর হয়েছেনই যদি তো কেন বিশ্বাস করছেন না যে, আমি আমার বিমাতাকে খুন করেছি? কেন বিশ্বাস করছেন না? মেয়েরা যদি মেয়েদের বিশ্বাস না করে, তাহলে আর কে করবে?’

দময়ন্তী স্থির, অকম্পিত গলায় বলল, ‘আমি বিশ্বাস করি, মিস রায়। আমি জানি, মিসেস মুনিয়া রয়ের মৃত্যু ঘটানোর জন্যে দায়ী আপনি।’

তৎক্ষণাৎ শর্মিষ্ঠার হাসি বন্ধ হয়ে গেল, সারা ঘরে নেমে এল শ্মশানের নীরবতা। সেই স্তম্ভিত নৈঃশব্দ্য ভেঙে উজ্জ্বল চাপা গলায় গর্জন করে উঠল, ‘কী বকছেন, পাগলের মতো আবোল-তাবোল? শমি খুন করতে পারে, একথা আপনি বলতে পারলেন? আপনার এতদূর স্পর্ধা!’

‘শমি খুন করেছে, একথা আমি বলিনি উজ্জ্বলবাবু। আমি বলেছি মুনিয়া রয়ের মৃত্যু ঘটানোর জন্য উনি দায়ী। কথা দুটো এক নয়। শর্মিষ্ঠা যা করেছেন, তা হয়তো আইনের চোখে সিদ্ধ নয়, কিন্তু আমার বিশ্বাস, এ ছাড়া ওঁর আর অন্য উপায়ও ছিল না।’

‘বাজে বকবেন না। আপনি যদি মহিলা না হতেন, তাহলে আমি আপনাকে গলা টিপে মেরে ফেলতুম, জানেন?’

‘তা হয়তো ফেলতেন এবং খুব সহজেই। কারণ, আপনার মতো গায়ের জোর তো বেশি লোকের থাকে না। অসাধারণ শক্তি না থাকলে, যে মৃতদেহ রাইগার মর্টিসের ফলে শক্ত হয়ে গেছে, তার হাতের আঙুল ভেঙে মুঠোর মধ্যে থেকে যন্ত্রটা বের করে নিতে পারতেন না।’

উজ্জ্বল কম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘যন্ত্র? কী যন্ত্র? কীসের যন্ত্র?’

‘সেটা আপনার ভালোই জানা আছে উজ্জ্বলবাবু। খুব সম্ভব কাচের কারুকার্য করা স্প্রেয়ার, তাই না?’

উজ্জ্বল মজুমদার তখন লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বলল, ‘কী? কী ছিল ওতে?’

‘উত্তেজনার মাথায় সেটা আপনি পরীক্ষা করতে পারেননি, তবে বোধ হয় ছিল প্রূসিক অ্যাসিড বা পিকরিক অ্যাসিড। তাই না, মিস রায়? এটা ভয়ংকর বিষ, কীটনাশক বানাতে দরকার হয়। এর মারাত্মক গুণের কথা এবং এই অ্যাসিড মুখের ওপর স্প্রে করলে কিছুক্ষণ বাদে যে তার কোনো চিহ্ন থাকে না, একথা আপনাকে কে বলেছিলেন, মিস রায়? উজ্জ্বলবাবু?’

ঘষা কাচের মতো ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে ছিল শর্মিষ্ঠা। তেমনি ভাবলেশহীন গলায় বলল, ‘বইয়ে পড়েছিলুম, মাফিয়াদের সম্পর্কে একটা পেপারব্যাকে। এখন, বলুন মিসেস দত্তগুপ্ত, আমার ফাঁসি হবে তো?’

‘না, ফাঁসি হবে না। এবং আপনি যে কেন এই মৃত্যু ঘটিয়েছেন, কী ভয়ানক মানসিক যন্ত্রণা আপনাকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে, তা আমরা…’

দময়ন্তীর কথা শেষ হল না, তার আগেই হেসে উঠল শর্মিষ্ঠা। তীক্ষ্ন, উচ্চ, অস্বাভাবিক সেই হাসি, যেন শ্মশানচারী নিঃসঙ্গ প্রেতিনীর অট্টরব। সকলে বিমূঢ় বিস্ময়ে শর্মিষ্ঠার মুখের দিকে চেয়েছিল। সেই হাসির মধ্যেই হাহাকার করে উঠল সে, ‘আমার ফাঁসি হবে না, উজ্জ্বল। শুনেছ, কী বলছেন মিসেস দত্তগুপ্ত, আমার নাকি ফাঁসি হবে না? আমি তাহলে বেঁচে থাকব, তোমার কাছে বেঁচে থাকব, উজ্জ্বল! আর কেউ আমাদের মধ্যে রাক্ষুসির মতো এসে দাঁড়াবে না। দুধের যেমন সাদা রং, পৃথিবীর যেমন গন্ধ, তেমনি আমি তোমার হব, অবিচ্ছেদ্য, চিরকালের।’ বলতে বলতে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল শর্মিষ্ঠা।

দু-হাতে শর্মিষ্ঠাকে বুকের মধ্যে সজোরে জড়িয়ে ধরল উজ্জ্বল। ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল দময়ন্তীকে, ‘শমি কি পাগল হয়ে গেল, মিসেস দত্তগুপ্ত?’

করুণ কণ্ঠে দময়ন্তী বলল, ‘একটা প্রাণ নিয়ে নেওয়া বড়ো সহজ কথা নয়, মেজর মজুমদার। সব মানুষের স্নায়ু সেই প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করতে পারে না। ওঁর স্নায়ুও পারেনি। ওঁকে চিকিৎসা করান, অপনার স্নেহ-ভালোবাসায় ঘিরে রাখুন, উনি নিশ্চয়ই আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন, যে স্বপ্নের জন্য উনি ব্যাকুল হয়েছিলেন তাকে সার্থক করে তুলতে পারবেন। উনি যা কিছু করেছেন, আপনার জন্যে করেছেন। দয়া করে একথাটা ভুলে যাবেন না।’

উজ্জ্বল দৃঢ় অথচ শান্ত গলায় বলল, ‘না, মিসেস দত্তগুপ্ত, আমার তো ভোলা সম্ভব নয়। আমি ওকে সুস্থ করে তুলবই। যেদিন ও ভালো হয়ে যাবে, সেদিন সকলের আগে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। আপনার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই, মিসেস দত্তগুপ্ত। শমি আগুনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। ওর এ জ্বালার জন্যে দায়ী সেই আগুন, আপনি নন।’

.

২০

নীলকান্ত বলল, ‘আপনার ভক্তদের তালিকায় আর একটি নাম যোগ করে নেবেন, শ্রীনীলকান্ত রাঘব রাও।’

শিবেন বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে হবে’খন। এখন বলুন তো বউদি, শর্মিষ্ঠা তার বিমাতাকে খুন করল কেন? এই আগুনের বেড়াজাল, তার ফলে শর্মিষ্ঠার ভয়ানক মানসিক যন্ত্রণা, এসব কী? আপনি তো দিব্যি সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। তা, আমাদের কাছে একটু খোলসা করুন। আপনি গতকাল বলেছিলেন যে শর্মিষ্ঠা একটা মানসিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যার অন্যতম কারণ হতে পারে দেবভক্তি। দেবভক্তি এই ঘটনার কোনো ফ্যাক্টর বলে আমার তো মনে হয় না। তাহলে অন্য কারণটা কী এবং সেটাই এই হত্যাকাণ্ডের মূল কি?’

দময়ন্তী মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ। অন্য কারণটা অর্থাৎ শর্মিষ্ঠা আর তার বিমাতার মধ্যে সম্পর্কটা আপনি বুঝে উঠতে পারেননি?’

বাকি তিনজন শ্রোতা একসঙ্গে সজোরে ডাইনে বাঁয়ে মাথা নাড়ল। সমস্বরে বলল, ‘একদম না। সম্পর্কটা কী?’

‘সেটা আমি বলতে পারব না। অত্যন্ত নোংরা, অস্বাভাবিক ব্যাপার।’

শিবেন বিস্ফারিত চোখে বিড়বিড় করে বলল, ‘লেসবিয়ান রিলেশনশিপ, যাকে বলে, সমকামী সম্পর্ক! তাই কি?’

আরক্ত মুখে দময়ন্তী সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল।

সমরেশ হাঁসফাঁস করে উঠল, ‘ইয়া আল্লা! এ যে অসম্ভব ব্যাপার!’

দময়ন্তী বলল, ‘ব্যাপারটা অস্বাভাবিক হতে পারে, অসম্ভব নয়। আর মুনিয়ার কাছে তো অস্বাভাবিকও নয়, একেবারে জীবনমরণের ব্যাপার। শূন্য হৃদয়ে শর্মিষ্ঠা বাড়িতে ছিল একা আর ত্রূ«র ডাইনি মুনিয়া আস্তে আস্তে তার বিষাক্ত জাল ছড়িয়ে তাকে অধিকার করেছিল। ব্রতীশেখরের উইলের বয়ানটা তার নিশ্চয়ই জানা ছিল, কাজেই লক্ষ টাকা দামের শর্মিষ্ঠাকে কুক্ষিগত রাখার এটাই ছিল তার কাছে প্রশস্ততম রাস্তা। তবে তার একটা জায়গায় ভুল হয়েছিল। ওর ধারণা হয়েছিল যে জয় সম্পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু শর্মিষ্ঠার যে একটা নিজস্ব মন ছিল, বিবেক ছিল, সেটা সে ধারণা করতে পারেনি। অনভিজ্ঞ শর্মিষ্ঠা তার জালে জড়িয়ে পড়ে যে কী অন্তর্জ্বালায় জ্বলছে, তা সে অনুভব করতে পারেনি।’

‘আপনি কি ব্রতীশেখরবাবুর সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর মেয়ে এমনি একটা নোংরা ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছে?’ নীলকান্ত জিজ্ঞেস করল।

‘না, না। আমার মনে কেবল একটা সন্দেহ জেগেছিল যে, ব্যাপারটা ঈশ্বরভক্তি না অন্য কিছু। ব্যাপারটা যে কী সেটা বুঝতে পারলুম মুনিয়া আর শর্মিষ্ঠাকে দেখে। দেখলুম, বাপ অথবা বন্ধুর সামনে শর্মিষ্ঠা চিন্তাকাতর, সংশয়ে আচ্ছন্ন একটি চরিত্র, একলা মুনিয়ার সামনে উজ্জ্বল। সঙ্গেসঙ্গে আমার চোখের সামনে মুনিয়ার সুন্দর মুখের মুখোশটা সরে গিয়ে বেরিয়ে এল একটা হিংস্র পিশাচীর রূপ। রমলার গানের সামনে শর্মিষ্ঠার অসহায় আর্ত চেহারা দেখে ব্যাপারটা খানিকটা আঁচ করা গেল।’

সমরেশ জিজ্ঞেস করল, ‘মুনিয়া তো স্বভাবত সমকামীও হতে পারে? সেক্ষেত্রে কি তাকে পিশাচী বলা ঠিক হবে?’

‘না। তবে আমি প্রথম দর্শনেই বুঝেছিলুম মুনিয়া যাকে বলে বিকীর্ণমন্মথা, সমকামী কখনোই নয়। এটা আমার মেয়েলি সহজাত প্রবৃত্তিতে বুঝেছিলুম, তোমরা কী বুঝেছিলে আমি জানি না। তা ছাড়া, তোমাদের সামনে স্বামীর সঙ্গে তার বাক্যালাপের বিবরণ শুনে তো আর কোনো সন্দেহই থাকে না। কাজেই যদিও তখনও আমি উইলের কথা জানতুম না, তাহলেও মুনিয়ার স্বরূপ বুঝতে কোনো অসুবিধে হয়নি।

‘এখন কাল রাত্রে উজ্জ্বলবাবুর ওপরে আক্রমণের কথা নীলকান্তবাবু যখন বললেন, তখন বুঝলুম মুনিয়া পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। মীরচন্দানী হোটেল না থাকা সত্ত্বেও সে বাইরে গিয়েছিল এই আক্রমণটা অর্গানাইজ করতে। অর্থাৎ, একবার উজ্জ্বলবাবু বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসায় শর্মিষ্ঠা তার অন্ধকারময় অস্বাভাবিক অস্তিত্ব থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক, সুস্থ ভবিষ্যতে প্রবেশ করার প্রেরণা পেয়েছে। তাই মুনিয়া হন্যে হয়ে উঠেছে। সে উজ্জ্বলবাবুকে মেরে ফেলতে সক্ষম হলে কী হত বলা কঠিন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে নিজের মৃত্যু ডেকে আনল। কারণ, শর্মিষ্ঠার সামনে তার স্বরূপ তখন সম্পূর্ণ উৎঘাটিত।’

‘তাহলে, মুনিয়াকে নিহত দেখেই তুমি বুঝতে পেরেছিলে যে শর্মিষ্ঠাই হত্যাকারী?’

‘না, না। আমার সামনে তো তখন তিনজন সম্ভাব্য হত্যাকারী, ডক্টর রায়, উজ্জ্বলবাবু এবং শর্মিষ্ঠা। তিনজনেরই মোটিভ আছে এবং প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই সেটা অত্যন্ত জোরালো। এখন, এঁদের মধ্যে প্রকৃত হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে হলে প্রথমে দরকার খুনটা বিশ্লেষণ করা।

‘প্রথমে দেখতে পাচ্ছি, মৃতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, কিন্তু বিষক্রিয়ার লক্ষণ নেই। তাহলে, এক্ষেত্রে এটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, আঙুল ভাঙাই মৃত্যুর কারণ। একটার পর একটা আঙুল মটকে মটকে ভাঙলে যন্ত্রণায় যে একটি মেয়ের মৃত্যু হতে পারে না, তা নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে একটা ধস্তাধস্তির চিহ্ন থাকত, বিদ্যা একটা গোলমালের উল্লেখ করত, অন্তত মৃতের মুখে ভয়ানক যন্ত্রণার ছাপ থাকত। সেসব অনুপস্থিত। মৃত্যুর পর মৃতের মুখ স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়েছে হয়তো। কিন্তু তাও নয়। লক্ষ করেছেন নিশ্চয়ই, মৃতের মুখে একটা ক্লিষ্ট যন্ত্রণার ছাপ। তাহলে সেটাও থাকত না। তা ছাড়া, মৃতদেহের পজিশন দেখে একটা কথাই মনে হয়— মৃত্যু হঠাৎ এসেছে। এবং যখন এসেছে তখন সম্ভবত ঘরে কেউ ছিল না। তাহলে, নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সে-মৃত্যু কোনো এক ধরনের বিষক্রিয়ার ফল। এমন কি কোনো বিষ আছে যা কোনো চিহ্ন না রেখে মানুষের প্রাণহরণ করে? তখন আমার প্রূসিক অ্যাসিডের কথা মনে পড়ল। আমি আপনাদের সেকথা বলেছিলুম।’

শিবেন সহাস্যে বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু তখন আমরা আঙুল ভাঙা নিয়েই ভয়ানক ব্যস্ত ছিলুম।’

‘সে যাই হোক। প্রূসিক অ্যাসিড কীটনাশক বানাতে কাজে লাগে। ডক্টর রায়ের ল্যাবরেটরি ঘরে সে-বস্তু থাকার সম্ভাবনা। অতএব, কোন বিষে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে সে-বিষয়ে প্রায় নিঃসন্দেহ হওয়া গেল।

‘এরপর, দেখা যাচ্ছে, মুনিয়া খাটের ওপর চিত হয়ে পড়ে আছে, পরনে ফ্লানেলের ড্রেসিং গাউন, পায়ে গরম মোজা। এর সঙ্গে দেখছি, টেবিলের ওপর রাখা ইলেকট্রিক চুল্লি আর ড্রেসিং গাউনের গলার কাছে তরল একটা কিছু পড়ার দাগ। এই সবকটি একসঙ্গে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে বিষটি প্রযুক্ত হয়েছে এবং আঙুল ভাঙার কারণ কী।’

‘কীভাবে?’ সমরেশ জিজ্ঞেস করল।

‘মুনিয়ার মতো ফ্যাশনেবল মেয়ের পায়ে মোটা, কালো পশমের মোজা আর ইলেকট্রিক হিটার ইত্যাদি একটি বিষয়ে নিঃসন্দেহ করে যে সে শীতে ভয়ানক কাবু হয়ে পড়েছিল। মুনিয়া পাহাড় অঞ্চলের লোক ছিল না, ছিল বোম্বের অধিবাসী, কাজেই কালকের শীতে রাত দশটায় বাড়ি ফিরে যে সে কাতর হয়ে পড়বে, তাতে সন্দেহ থাকে না। তোমাকে আর শিবেনবাবুকে কম্বলের স্তূপ বলে যতই ঠাট্টা করি না কেন, শীতটা যে সত্যিই মারাত্মক রকমের পড়েছে তাতে তো সত্যি কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

‘এখন ডক্টর রায়ের কথায় আমরা জানি যে মুনিয়া ছিল হাঁপানির রুগি। এটা সম্ভব যে নিশ্বাসের কষ্ট হলে সে গলায় ওষুধ স্প্রে করত যা সাধারণত এই রোগের রুগিরা করে থাকে। সেই ওষুধের সঙ্গে যদি বিষ মিশিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে স্প্রে করার সঙ্গেসঙ্গে মৃত্যু হতে পারে। ব্যাপারটা যে সেইরকমই কিছু হয়েছিল তার প্রমাণ গলার কাছে দাগটা। মুনিয়া যে ওরকম দাগি ড্রেসিং গাউন পরবে, সেটা অসম্ভব। তাহলে নিশ্চয়ই তার মৃত্যুর পর হাত থেকে পড়ে যাওয়া স্প্রে করার যন্ত্রটা থেকে ওষুধ চলকে বেরিয়ে গলার কাছে দাগ ধরিয়ে দিয়েছিল।

‘এ পর্যন্ত যখন যুক্তিতে কোনো বাধা পাচ্ছি না, তাহলে এটা সত্যি বলে মেনে নিলে হাতের আঙুল ভাঙার কারণটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্প্রে করার যন্ত্রটা যখন নেই তখন সেটা নিশ্চয়ই হত্যাকারী বা তার শাগরেদ বা অন্য কেউ পরে সরিয়ে নিয়েছিল এবং এত পরে যখন মৃতদেহ শক্ত হতে আরম্ভ করেছে, যেজন্য আঙুলগুলো ভাঙার দরকার পড়েছিল। এই আঙুল ভাঙার মতো ক্ষমতা এ বাড়িতে দু-জনের আছে। এক, ডক্টর রায়; দুই, উজ্জ্বল।

‘এই দু-জনের সম্পর্কে কতকগুলো আশ্চর্যজনক খবর পাওয়া গেল নীলকান্তবাবুর কথায়।

‘প্রথমত, উজ্জ্বলবাবুকে নিয়ে আসার পর, মুনিয়াকে দেখে পুলিশের সামনে ডক্টর রায় উত্তেজনা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু উজ্জ্বলবাবু করেননি। ডক্টর রায় যদি এই হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র করে থাকতেন, তাহলে তিনি কখনোই পুলিশের সামনে উত্তেজনা প্রকাশ করতেন না। তাঁর প্রথমা স্ত্রী বিয়ের চার বছরের মধ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন, দ্বিতীয়া স্ত্রীও যদি সেই চার বছরের মাথাতেই মারা যায় তাহলে যে পুলিশ তাঁর প্রতি ভয়ানকভাবে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়বে, তাতে তাঁর সন্দেহ থাকার কথা নয়। তার ওপর যদি তিনি উত্তেজনা প্রকাশ করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স ভয়ানক জোরালো হয়ে পড়ে। মুনিয়ার হাত থেকে উদ্ধার পেয়ে তিনি নিশ্চয়ই জেলে পচে বা ফাঁসিকাঠে ঝুলে নিজের জীবনটা শেষ করতে চাননি। কাজেই, তাঁর পক্ষে এবম্বিধ আচরণ, হত্যাকারী হিসেবে, খুবই আশ্চর্য হত।

‘দ্বিতীয়ত, তিনি যখন নিজেকে হত্যাকারী বলে ঘোষণা করলেন, তখন তো সব সন্দেহই চলে গেল। হত্যাকাণ্ডটা বাহ্যত পূর্বপরিকল্পিত। কেন বাহ্যত বললুম সেটা পরে বলছি। এই পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের নায়ক কখনোই নিজেকে এইভাবে ধরিয়ে দিতে পারে না।

‘এরপর উজ্জ্বলবাবুর কথা ধরা যাক। এই ক্রোধী, নিষ্ঠুর, নৃশংস লোকটি মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেও তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীকে দেখে কোনোরকম উত্তেজনা প্রকাশ করছেন না, এটা কি অবিশ্বাস্য নয়? কেন করছেন না? নিশ্চয়ই এমন কোনো অনাগত ঘটনার সম্ভাবনা তাঁর মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যা তাঁর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার চেয়েও ভয়ংকর। এই সম্ভাবনাটারই একটা ইঙ্গিত পাচ্ছি উজ্জ্বলবাবুর নীলকান্তবাবুকে মুনিয়াকে গ্রেপ্তার করার অনুরোধের মধ্যে। নীলকান্তবাবু ভেবেছিলেন, উজ্জ্বলবাবুর ইচ্ছে যে মুনিয়া শাস্তি পাক। কিন্তু তিনি খেয়াল করেননি যে উজ্জ্বল এই ধরনের শাস্তিতে বিশ্বাসই করেন না। তাহলে যে গ্রেপ্তারের জন্য এই অনুরোধ তা একমাত্র প্রোটেকটিভ কাস্টডি হতে পারে। অর্থাৎ, উজ্জ্বল জানতেন যে মুনিয়া নিহত হতে যাচ্ছে। এবং তাতে তাঁর এত ব্যাকুলতার কারণ এই হতে পারে যে নিশ্চয়ই তাঁর কোনো প্রিয়জন এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়তে যাচ্ছে। তাঁর শ্বশুর যদি শাশুড়ির সম্ভাব্য খুনি হতেন, তাহলে তাঁর বিশেষ বিচলিত হবার কারণ ছিল না। তাহলে অপরজন কে? এখানেই আমাদের সন্দেহ গিয়ে পড়ল শর্মিষ্ঠার ওপর।

‘বিদ্যার সাক্ষ্যটা এবার এই সন্দেহের আলোয় বিচার করলে দেখা যাচ্ছে যে মুনিয়ার স্প্রে করার যন্ত্রে বিষ মেশানোর সুযোগ এবং সময় দুইই শর্মিষ্ঠার ছিল। সে অনেকক্ষণই সকলের দৃষ্টির আড়ালে ছিল। মজুমদারকে মিনিট পনেরো জিজ্ঞাসাবাদ করার পর নীলকান্তবাবু বাইরে বেরিয়ে দেখলেন বক্তৃতারত ডক্টর রায় আর বোরড কিষণলালকে। ইতিমধ্যে ডাক্তারকে ফোন করা হয়ে গেছে, কারণ তার পাঁচ মিনিট বাদেই ডাক্তার এসে পৌঁছেছেন। যদি ধরে নিই, ডাক্তারকে ফোন করতে পাঁচ মিনিটও সময় লেগেছে ডক্টর রায়ের, তাহলে তাঁর মাত্র মিনিট দশেকের বক্তৃতাতেই কিষণলাল বোরড হয়ে যাবে এতটা ইন্টেলেকচুয়াল সে নয়। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ডক্টর রায় আগাগোড়া কিষণলালের কাছেই ছিলেন। তখন শর্মিষ্ঠা কোথায় ছিল? তারও পরে মুনিয়ার সঙ্গে সে তার ঘরে ঢুকেছে। ডক্টর রায়ও একবার ঢুকেছিলেন, কিন্তু গালাগাল খেয়ে পালিয়ে আসেন। অতএব, শর্মিষ্ঠার ওপর সন্দেহ গাঢ়তর হল।’

‘আচ্ছা, শর্মিষ্ঠা বিষটা সংগ্রহ করল কখন? সে কি আগে থেকেই সেটা জোগাড় করে নিজের কাছে রেখেছিল? তাহলে কিন্তু, শর্মিষ্ঠা যতই না কেন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে থাক, বাহ্যত নয়, এটা পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই মেনে নিতে হয়। আর সেক্ষেত্রে, সামাজিক, মানবিক, নৈতিক কোনো আইনই একে সমর্থন করতে পারে না।’ নীলকান্ত চিন্তিত, গম্ভীর গলায় বলল।

‘শর্মিষ্ঠা বিষটা আগে সংগ্রহ করে রাখেনি। কখন করেছে সেটা বিদ্যার সাক্ষ্যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দেখুন, ডাক্তার খান্না উজ্জ্বল আসার বিশ মিনিট বাদে এ বাড়িতে আসেন। খবর পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে রওনা না হলেও তাঁর আসতে লাগে দশ মিনিট। তাহলে, উজ্জ্বল আসার দশ মিনিট বাদে তিনি খবর পেয়েছেন। অথচ বিদ্যা বলছে, ল্যাবরেটরি ঘরে যেতে এখান থেকে লাগে পাঁচ মিনিট। লাফিয়ে চলা মেয়ে শর্মিষ্ঠার আরও কম লাগবার কথা। তাহলে, শর্মিষ্ঠা নিশ্চয়ই বাকি সময়টার মধ্যে ল্যাবরেটরি থেকে বিষটা সংগ্রহ করেছে।

‘তাহলেও, প্রশ্ন থাকেই যে এই হত্যাকাণ্ড কি পূর্বপরিকল্পিত? এর সমাধানের জন্য একটু জটিল বিবেচনা করা দরকার।

‘দেখুন, ফ্রয়েডীয় স্বপ্নতত্ত্বে দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সহজাত আদিম প্রবৃত্তিগুলো অনেক সময়েই আমাদের মনে কুৎসিত, নিষ্ঠুর, সমাজবিরোধী বা পাশবিক কোনো কোনো বাসনা বা অভীপ্সা জাগিয়ে তোলে। সেগুলোর কোনো কোনোটা এতই বীভৎস যে আমাদের সভ্যতার আবরণে ঢাকা, শিক্ষিত মনের সামনে যদি তাদের আলাদা আলাদা করে এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় তাহলে আমরা বিশ্বাসই করতে পারব না হয়তো যে আমাদের মনে তাদের জন্ম হতে পারে। সেজন্য, আমরা তাদের চাপা দিয়ে রেখে দিই আমাদের অবচেতন মনেরও একদম নীচের স্তরে, যেরকম অপরাধী বা উন্মাদদের আমরা গরাদের পেছনে পাঠিয়ে দিই। আমাদের শিক্ষিত, সভ্য, ভদ্র চেতনায় তাদের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ। কিন্তু তাদের আমরা একেবারে ঠেকিয়ে রাখতে পারি না। আমাদের মনের গভীরতম প্রদেশ থেকে মাঝে মাঝে তারা বেরিয়ে আসে যখন তাদের পাহারাদার স্নায়ুরা থাকে শিথিল, অসতর্ক। যেমন, আমাদের ঘুমের মধ্যে বা জাগর-স্বপ্নে। তখন তারা আমাদের তাদের কদাকার চেহারাগুলো দেখিয়ে দিয়ে যায়।

‘এখন বিমাতার সঙ্গে অস্বাভাবিক সম্পর্কের জন্য শর্মিষ্ঠার মনে জমে উঠেছিল দুঃসহ গ্লানির বোঝা। তার সমস্ত সত্তা, অহংকার এবং বিবেক পদে পদে লাঞ্ছিত, অপমানিত হচ্ছিল। কিন্তু সমকামিতার নোংরা জাল খুবই শক্ত, তাকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা কঠিন। কাজেই, স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে তার অবচেতন মনের অন্ধকারে জন্ম নিয়েছে জিঘাংসা, পেপারব্যাকে পড়া মাফিয়াদের কীর্তিকলাপের কথা সেই জিঘাংসাকে পরিপুষ্ট করেছে, বাড়িয়ে তুলেছে। তারপর, কাল যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা উজ্জ্বলকে খাদের তলা থেকে উঠে আসতে দেখেছে, তখনই তার সমস্ত পাহারাদার স্নায়ুর জাল ছিঁড়ে সেই দানব বেরিয়ে এসেছে। তাকে ঠেকাবার ক্ষমতা তার তখন নেই। কাজেই হত্যাকাণ্ডটা পূর্বপরিকল্পিত কি পূর্বপরিকল্পিত নয়, সেটা বোধ হয় বড়ো কথা নয়। এর আগে বোধ হয় বিচার করা দরকার যে খুনটা ঠান্ডা মাথায় সব দিক ভেবেচিন্তে করা হয়েছে না প্রচণ্ড স্নায়বিক আঘাতে দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে করা হয়েছে।’

নীলকান্ত বলল, ‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, কাল রাত্রি থেকেই শর্মিষ্ঠা মনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল?’ তারপর দময়ন্তী কিছু বলবার আগে নিজেই যোগ করল, ‘হ্যাঁ, তাই হবে। আমার বোধ হয়, আপনার কথাই ঠিক। উজ্জ্বল উঠে আসবার পরেই যেভাবে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল আর তারপর বাড়ি আসা পর্যন্ত গায়ের সঙ্গে আঠার মতো সেঁটে ছিল সেটা বেশ অস্বাভাবিক। জিপেও তো পাশে বসে ক্রমাগত উজ্জ্বলের কানে কানে ফুসুর ফুসুর করে কী সব বলে যাচ্ছিল।’

শিবেন বলল, ‘কী বলছিল, তুই বুঝতে পারিসনি?’

‘তখন বুঝিনি। ভেবেছিলুম, ইংরেজিতে যাকে বলে, সুইট নাথিংস হবে বোধ হয়। এখন বুঝতে পারছি, উজ্জ্বলবাবুকে তখনই শ্রীমতী তাঁর পরিকল্পনার কথা বলেন। আর সেইজন্যই উজ্জ্বলবাবু অত চিন্তিত আর অন্যমনস্ক হয়েছিলেন। বোধ হয় শর্মিষ্ঠাকে ফিজিক্যালি কীভাবে ঠেকানো যায় তারই চিন্তা করছিলেন। এদিকে বিদ্যা বারান্দায় বসে আছে, তাকে এড়িয়ে শাশুড়ির ঘরে ঢোকা যাচ্ছে না তাঁকে চেক করার জন্য। রাত দুটো পর্যন্ত বিদ্যা বসে রইল। ইতিমধ্যে বোধ হয় উজ্জ্বল ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ভোররাত্রে ঘুম ভাঙতেই দৌড়োলেন শাশুড়ির ঘরে। ঢুকেই বুঝলেন তিনি গত হয়েছেন। শরীরের অবস্থান দেখে আন্দাজ করেছিলেন যে স্প্রে করার যন্ত্রটাই গোলমালের মূল, কিন্তু কীভাবে সেটা ভালোভাবে বুঝতে পারেননি। বোধ হয়, বেশি উত্তেজিত হয়েছিলেন সেইজন্য! কিন্তু বুঝতে না পারলেও যন্ত্রটাকে বিদায় করার জন্য আঙুল ভেঙে সেটা বের করতে হল।’

শিবেন বলল, ‘তা তো হল। আঙুল ভাঙা দেখে আপনি আন্দাজ করলেন যে জামাই ভোররাতে উঠেছিলেন, কিন্তু শ্বশুরও উঠেছিলেন বুঝলেন কী করে?’

দময়ন্তী বলল, ‘মুনিয়া খুন হয়েছে কি হয়নি বা কীভাবে খুন হয়েছে, সেটা বিশদভাবে জানার আগেই তিনি নিজেকে হত্যাকারী ঘোষণা করে দিলেন। অথচ তিনি যে হত্যাকারী হতে পারেন না, সেটা গোড়াতেই বোঝা গিয়েছিল। তাহলে তিনি নিশ্চয়ই কাউকে বাঁচাতে চাইছেন। কাকে? শমিকে নয়, কারণ শমি যে খুন করেছে তা বোধ হয় তিনি এখনও জানেন না। এদিকে আমরা জানি যে উজ্জ্বলবাবু ভোররাত্রে মুনিয়ার ঘরে ঢুকেছিলেন। তাহলে, এটা সম্ভব যে ডক্টর রায় তাঁকে দেখতে পান এবং শমির ভবিষ্যৎ ভেবে তার জায়গায় নিজেকে বলি দিতে উদ্যত হয়েছেন। ওই যে বললেন, গলা টিপে, সেটাও আমার অনুমানকেই সমর্থন করে। ভদ্রলোক জানেন তো যে হবু জামাইটি কী গোঁয়ার গোবিন্দ।’

শিবেন বলল, ‘ডক্টর রায় যত শিক্ষিত ততই দেখছি প্রশস্ত হৃদয়। আচ্ছা বউদি, শর্মিষ্ঠা ভালো হয়ে উঠবে তো?’

দময়ন্তীর মুখটা আস্তে আস্তে করুণ হয়ে এল। বলল, ‘নিজের মায়ের মস্তিষ্ক বিকৃতি আর বিমাতার অসুস্থ মনোবৃত্তি, এই দুই দুষ্টগ্রহের ফেরে পড়ে বেচারি জীবনের স্বাভাবিক রাস্তা থেকে সরে গেল। অথচ, নিজে চেয়েছিল একটি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন। আজ যদি আমরা ওকে সুস্থ করে তুলতে না পারি, তাহলে বলব আমাদের চিকিৎসাশাস্ত্র অর্থহীন। তবে একটা ভরসার কথা। আমি বিশ্বাস করি, উজ্জ্বলবাবু ওর কাছেই থাকবেন। ভদ্রলোক সত্যিই ভালোবেসেছেন শর্মিষ্ঠাকে। আমি ওঁকে যতটুকু চিনেছি, বুঝেছি উনি শত্রুকে ঘৃণা করেন দয়াহীনভাবে, আর শর্তহীনভাবে ভালোবাসেন প্রিয়জনকে। ওঁর কাছ থেকে শর্মিষ্ঠা এমন একটা জিনিস পাবে যা বোধ করি সমস্ত অসুখ থেকেই মানুষকে মুক্ত করতে পারে এবং কোনো চিকিৎসাশাস্ত্রই যা কখনো দিতে পারে না।’

সমরেশ ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক, ঠিক।’ তারপর ভাঙা বেসুরো গলায় গান জুড়ে দিল—

‘বাহির আকাশে মেঘ ঘিরে আসে

এল সব তারা ঢাকিতে,

হারানো সে আলো আসন বিছালো

শুধু দুজনার আঁখিতে…’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *