৪. স্মৃতি/ যমজ

স্মৃতি/ যমজ

আমার একজন ক্লাসমেট আছে যার বংশের পদবি মোরিনো। আমাদের মধ্যে মাঝে মাঝে কথা হয়। ওর আসল নাম ইয়োরু। পুরো নাম-মোরিনো ইয়োরু, যার অর্থ “রাতের অরণ্য।” ওর চোখ চুল সব ঘন কালো। আমাদের স্কুলের ইউনিফর্মও কালো, আর মোরিনো সবসময় কালো জুতা পড়ত। কালোর বাইরে একমাত্র অন্য রং বলতে ওর পোষাকে যেটা ছিল সেটা হল ইউনিফর্মের লাল স্কার্ফ।

মোরিনোর কালো পোশাক-পরিচ্ছদের সাথে ইয়োৰু নামটা ভালো যায়। কালোর প্রতি ওর ভালবাসা এত বেশি যে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যদি রাতের আঁধারকে মানুষের রূপ দেয়া হয় তাহলে সেটা দেখতে ওর মতই লাগবে।

এত সব কালোর বিপরীতে ওর ত্বকের রং ছিল চাঁদের মত ফ্যাকাসে সাদা। মনে হত জীবনে কোনদিন সূর্যের মুখ দেখেনি। ওকে রক্ত মাংসের মানুষও মনে হত না, যেন পোরসেলিন দিয়ে বানানো। ওর বাম চোখের নিচে ছোট্ট একটা তিল ছিল, যে কারনে ওকে আরো রহস্যময়ি লাগত। মনে হত যেন একজন ভবিষ্যৎ বক্তা।

এরকম একটা মেয়েকে আমি একবার একটা সিনেমাতে দেখেছিলাম। সিনেমার শুরুতে এক দম্পতিকে পানিতে ডুবে মরতে দেখিয়েছিল। পুরো সিনেমার বাকিটা ছিল মৃত্যুর পর তাদের জীবন নিয়ে। মূল চরিত্রগুলো ভূত ছিল, সাধারণ মানুষরা তাদের চোখে দেখতে পারত না। কিন্তু একজন মেয়েকে পাওয়া গেল যে তাদের দেখতে পেত। সেই মেয়েটাই সিনেমাটার নায়িকা, নাম ছিল নিডিয়া।

“আমাকে আসলে অর্ধমৃত বলা যায়,” নিডিয়া ব্যাখ্যা করেছিল কেন সে ভূত দেখতে পায়। “আমার হৃদয় আঁধারে পরিপূর্ণ।”

নিডিয়ারও সব পোশাক ছিল কালো আর তুকের রং ছিল ফ্যাকাসে। সে ঘরের বাইরে বের হত না। বাইরে যাওয়ার বদলে বাসায় বসে বই পড়তে পছন্দ করত। আর ওকে দেখে মনে হত পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

লোকজন ওর মত মানুষদেরকে “গ” বলে ডাকত। গথ বলতে আসলে একটা সংস্কৃতি, একটা ফ্যাশন, আর একটা স্টাইলকে বুঝায়। অনলাইনে ‘গথ’ কিংবা ‘গসু সার্চ দিলে হাজার হাজার পেইজ পাওয়া যাবে। ‘গথিক’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ‘গথ’, কিন্তু এই নামের ইউরোপিয়ান স্থাপত্য স্টাইলের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বরং ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের জনপ্রিয় গথিক হরর উপন্যাসের সাথেই এর মূল সম্পর্ক। যেমন ‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’ কিংবা ‘ড্রাকুলা।’

মোরিনোকে চোখ বন্ধ করে গথ বলা চলে। অত্যাচারের প্রক্রিয়া কিংবা হত্যা করার যন্ত্রপাতির প্রতি ওর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। মানুষের অন্ধকার দিক নিয়েও ওর আগ্রহ প্রচুর যা গথদের মধ্যে কমন।

মোরিনো প্রায় কখনোই কারো সাথে কথা বলে না। আমাদের স্বাস্থ্যবান, হাউকাউ করা ক্লাসমেটদের সাথে ওর বিন্দুমাত্র কোন মিল নেই। কোন ক্লাসমেট যদি হেসে ওর সাথে কথা বলে তাহলে মোরিনো সেফ ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে, ওর শূন্য অভিব্যক্তি অপরিবর্তিত রেখে শুধু বলবে “ওহ আচ্ছা।” তারপরেও কেউ যদি ওর কাছ থেকে কোন উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে তাহলে তাকে ব্যর্থ মনে ফেরত যেতে হবে কারণ মোরিনো আর কিছুই বলবে না।

বশির ভাগ মানুষই ওর সাথে কথা বলতে এলে এরকম উপেক্ষার শিকার হয়। ক্লাসের মেয়েরা কথা বলার অনেক চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

ওর এই হাবভাব ওর চারপাশে একটা দেয়াল তৈরি করে, সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখে। সবাই যখন গল্প করছে কিংবা হাসাহাসি করছে, তখন দেখা যায় মোরিনো কোথাও চুপচাপ একাকি বসে আছে। তখন ওকে দেখে মনে হয় যেন অন্য কোন জগতে চলে গিয়েছে, কিংবা ও যেখানে বসে আছে সেখানে কোন কিছুর ছায়া পড়েছে।

কিন্তু মোরিনো আসলে ইচ্ছা করে কাউকে উপেক্ষা করত না। ওর সাথে কিছুদিন কথা বলার পর আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি। ও আসলে হাসিখুশিভাবে কথা বলতে পারত না, মানুষটাই ওরকম ছিল। অন্যদের সাথে ওর কোন সমস্যা নেই। ও সবার থেকেই সমান দূরত্ব বজায় রেখে চলত।

ভালোভাবে ওকে পর্যবেক্ষণ করার পর আমি সমস্যাটা বুঝতে পারলাম। মোরিনো যখন কারো সাথে কথা বলত তখন সে আসলে বুঝতে পারত না কি প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, উত্তর দেয়ার মত কিছু সে খুঁজে পেত না। কিন্তু এর পুরোটাই স্রেফ আমার অনুমান ছিল, সত্যি সত্যি সে কী ভাবত তা আসলে আমি জানতাম না। বেশিরভাগ সময়ে তার কোন অভিব্যক্তি দেখা যেত না। যে কারনে ও কী ভাবছে তা কল্পনা করা দুরূহ ছিল।

আমাদের প্রথম আলাপ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হয়েছিল ও হয়তো কোন ধরনের পুতুল-টুতুল হবে। ওর প্রতিক্রিয়া মানুষের চেয়ে কোন জড়বস্তুর সাথেই বেশি মিলে।

***

অক্টোবরের এক বুধবার। গাছের পাতাগুলো তখন সবুজ থেকে লাল হতে শুরু করেছে। মোরিনো মাথা নিচু করে এসে ক্লাসে ঢুকল। ক্লাসের উপস্থিত সবাই সাথে সাথে থেমে গেল। ওর লম্বা ঘন কালো চুলগুলো মুখ ঢেকে রেখেছিল। ওর ধীর গতির পা টেনে টেনে হাঁটা দেখতে কেমন জানি ভূতুড়ে লাগত। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই হয়তো ভাবত ওকে দেখতে ভুতের মত লাগে-কিন্তু ওর আশেপাশের পরিবেশ অন্য রকম, আরো বিপজ্জনক কিছু মনে হয়। যেন কোন বন্য প্রাণী।

ওর চারপাশের দেয়াল যেন স্বচ্ছ কোন গোলক যেটায় সুচালো পেরেক লাগানো আছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ ওর কাছাকাছি এলে ও তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। বরাবরের মতই ও নির্বাক ছিল, আর কেউই ওর সাথে যেচে পড়ে কথাও বলতে গেল না। কিন্তু তারপরেও ওর মুড সেদিন অন্যরকম লাগছিল। ওর কাছাকাছি যারা বসে ছিল তাদের মুখেও টেনশনের ছায়া দেখা যাচ্ছিল।

আমার অতটা কৌতূহল হচ্ছিল না। আমি ধরে নিয়েছিলাম কোন কারনে হয়তো ওর মেজাজ খারাপ। সেদিন আর পরে আমাদের কথা বলার সুযোগ হয়নি। সুতরাং কারনটাও আর জানা সম্ভব হয়নি (আমি যখন আমার ক্লাসমেটদের সাথে কথা বলি তখন মোরিনো আমার সাথে কথা বলে না। কারণটা জানা গেল পরেরদিন, স্কুল ছুটির পর।

হোমরুম শেষ হওয়ার পর সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। ক্লাস এত নিরব হয়ে গেল যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না একটু আগে এখানে কি রকম হাউকাউ হচ্ছিল। শুধু খালি ডেস্কগুলো, মোরিনো আর আমি রুমে থেকে গিয়েছিলাম।

জানালা দিয়ে আরামদায়ক ঠান্ডা বাতাস এসে ঢুকল। আমাদের পাশের ক্লাস তখনো ছুটি হয়নি। হলের অন্য মাথা থেকে টিচারের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল।

মোরিনো ওর সিটে বসা, হাতগুলো পাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঝুলছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ ক্লান্ত।

“আমার ঘুম হচ্ছে না,” হাই তুলতে তুলতে বলল সে। ওর চোখের নিচে কালি জমেছিল। চোখগুলো আধবোজা হয়ে ছিল, এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন দূরে কিছু একটা দেখছে।

আমি আমার সিটে বসে ছিলাম, বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। ওর সিট রুমের একদম অন্য কোণায়। রুমে আর কেউ ছিল না বলে ওর কথা ভালো মতই শুনতে পেলাম, কাছাকাছি যেতে হলো না।

“এ কারনেই কি তুমি কালকে অদ্ভুত আচরণ করছিলে?”

“এরকম হয় মাঝে মাঝে। যত চেষ্টা করি না কেন ঘুম আসে না। ইনসমনিয়া হয়তো।”

সে উঠে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল ঘুমে পড়ে যাচ্ছে, টলতে টলতে ব্ল্যাক বোর্ডের দিকে এগুলো।

রুমের সামনে একটা আউটলেট ছিল। একটা কর্ড দিয়ে সেটার সাথে ইরেজার ক্লিনার লাগানো। মোরিনো সেই কর্ডটা নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

“নাহ ঠিক লাগছে না,” সে মাথা নাড়তে নাড়তে কর্ডটা খুলে রাখল। “আমি যখন ঘুমাতে পারি না তখন গলায় কিছু একটা পেঁচিয়ে চোখ বন্ধ করি। কল্পনা করি গলায় ফাঁস দিয়ে আমাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। তখন ঘুম আসে-গভীর পানিতে ডুবে যাওয়ার মত অনুভূতি হয়।”

আমার বিরক্ত লাগছিল। ও কি অনিদ্রার চোটে পাগল হয়ে গেল নাকি? “এতে যদি উপকার হয় তাহলে করছো না কেন?”

“যেকোন দড়ি পেঁচালেই হবে না।”

মোরিনো একটা বিশেষ ধরনের দড়ি খুঁজছিল, ইরেজার ক্লিনারের সাথের কর্ডটা দিয়ে সে কাজ হবে না।

“আমি যেটা ব্যবহার করতাম সেটা হারিয়ে ফেলেছি। নতুন একটা খুঁজছি কিন্তু..” সে হাই তুলল। “আমি জানি না আসলে কি খুঁজছি। খুঁজে পেলে ইনসমনিয়াকে গুডবাই দিতাম।”

“আগে কি ব্যবহার করতে?”

“জানি না। এমনি খুঁজে পেয়েছিলাম। ওটা ছাড়া ঘুমাতে পারার পর কোথায় রেখেছিলাম ভুলে গিয়েছি।”

চোখ বন্ধ করে গলায় হাত বুলালো। “আমার শুধু মনে আছে জিনিসটা কেমন লাগত..” ঝট করে চোখ খুলল যেন হঠাৎ কোন আইডিয়া এসেছে মাথায়। “চল দড়ি কিনতে যাই। তুমিও কিছু দড়ি কিংবা কর্ড কিনে রাখতে পার, কোন একদিন কাজে লাগতে পারে। কোনদিন আত্মহত্যা করতে চাইলে ব্যবহার করতে পারবে।”

অন্য ক্লাসটার ছুটি হলো। চেয়ার সরানোর শব্দ কানে আসছিল আমার।

***

স্কুল থেকে বেরিয়ে শহরের শেষ মাথার এক জেনারেল স্টোরের দিকে পা বাড়ালাম আমরা। জায়গাটা বেশ দূরে। কিন্তু বড় রাস্তায় অনেক বাস থাকায় সেখানে যেতে আমাদের খুব একটা সময় লাগল না। বাসটা অর্ধেকের মত খালিই ছিল। মোরিনো সিটে বসল আর আমি দাঁড়িয়ে স্ট্র্যাপে ঝুলতে ঝুলতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও মাথা নিচু করে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু বাসের দুলুনিতে ঘুমানো সম্ভব ছিল না। এক ফোঁটা ঘুমও আসার আগে আমরা জায়গা মত পৌঁছে গেলাম।

বিশাল দোকানটা কন্সট্রাকশনের কাঠ আর ধাতব উপাদান, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি ছিল। আমরা সারি সারি সেলফের ভেতরের পথগুলো দিয়ে ঘোরাফেরা করলাম, দড়ির মত কিছু দেখলেই থেমে পরীক্ষা করলাম। টিভি কিংবা ভিডিও প্লেয়ার কানেক্ট করার এভি কেবল, কাপড় ঝুলানোর দড়ি, ঘুরি উড়ানোর সুতা…সব কিছু ওখানে ছিল।

মোরিনো সেগুলো একটা একটা করে তুলে প্রথমে আঙুল বুলিয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করল-যেন সাবধানতার সাথে কোন পোশাক পরীক্ষা করে দেখছে।

ওর মতামতগুলো শুনে মনে হল আত্মহত্যার জন্য আদর্শ দড়ি কিরকম হওয়া উচিত সে ব্যাপারে ও একজন বিশেষজ্ঞ। “এরকম চিকন তার হলে গলা কেটে যাবে। ইলেকট্রিক কর্ড বেশ শক্ত, কিন্তু দেখতে ভালো না।”

“প্লাস্টিকেরগুলো কেমন?” নিচের সেলফে রাখা প্লাস্টিকের তারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলাম, শুধু ও কী বলে তা দেখতে।

অভিব্যক্তিহীন চেহারা নিয়ে ও মাথা নাড়ল। “ওগুলো প্রসারিত হয়। সমস্যা সৃষ্টি করে। এখানে আর কিছু দেখার নেই।”

দোকানের অন্য অংশে বিভিন্ন ধরনের চেইন পাওয়া গেল। একদম দুই সেন্টিমিটার পুরু মোটা ভারি চেইন থেকে এক কি দুই মিলিমিটারের সুক্ষ্ম চেইন পর্যন্ত সব। টয়লেট পেপারের মত রোল করে সেলফে রাখা ছিল। কাছাকাছি একটা মেশিন ছিল যেখান থেকে প্রয়োজন মত চেইন কেটে নেয়া যেত।

“এটা দেখ-খুবই পাতলা, কিন্তু এখানে লেখা এটা নাকি একশ পাউন্ড পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে, সে বলল, আঙুলের ফাঁকে একটা চিকন রুপার চেইন ধরে রেখেছে। গলায় পেঁচিয়ে দেখল। ধাতব চেইনটা আলো পড়ে চকমক করে উঠল। “দারুন দেখতে, এটা পড়লে একটা লাশকেও দেখতে ভালো লাগবে…কিন্তু এটা দিয়ে আত্মহত্যা করতে গেলে গলা কেটে মাংসে ঢুকে যাবে।”

চেইনটা আগের জায়গায় রেখে দিল। ওর প্রয়োজনের সাথে সেটা যায় না।

আত্মহত্যা করতে গেলে কিরকম দড়ি লাগবে সেই চিন্তা ভাবনার পেছনে সে অনেকটা সময় ব্যয় করল।

আমি যদি কাউকে গলায় পেঁচিয়ে মারতে চাই তাহলে কিরকম দড়ি খুঁজব? দোকানের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে আমিও এই চিন্তা করতে লাগলাম।

“গলায় সুড়সুড়ি লাগুক তা আমি চাই না,” আমি যখন ওকে হাতে বোনা খসখসে দড়ি দেখালাম তখন সে বলল। “পুরনো ফ্যাশনের দড়িগুলো দরকার, যেগুলো গ্রামের ফার্মগুলোতে ব্যবহার করে।”

ও যখন ফোর্থ গ্রেডে পড়ত তখন শহরের বাইরে এক জায়গায় থাকত, পাহাড়ি এলাকায়। এখান থেকে দুই ঘণ্টার ড্রাইভ।

“আমার মা যেখানে জন্মেছিল আর বড় হয়েছে, সেখানে আমার নানা নানির একটা ছোট ফার্ম আছে। আমার বাবা প্রতিদিন দু-ঘন্টা ড্রইভ করে কাজে যেত আর দুই ঘন্টা ড্রাইভ করে ফিরত।”

পরে ওরা সেখান থেকে চলে আসে ওর বাবার এই ডাইভিঙের ঝামেলা এড়াতে। এসব আমার কাছে নতুন খবর।

“আমি সবসময় ভেবেছি আত্মহত্যা করতে হলে তুমি হাতের রগ কাটবে, দড়িতে যে ঝুলতে চাইবে তা ভাবিনি,” আমি বললাম।

ও ওর হাত দুটো তুলে ধরল। এগুলোর কথা বলছ?”

ওর হাতগুলো একদম সাদা লাইনের মত দেখতে। একটা পরিস্কার কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। আমি কখনো এই দাগুগুলো সম্পর্কে জানতে চাইনি তাই জানি না কেন সে হাত কাটতে গিয়েছিল।

“এগুলো আত্মহত্যা করতে গিয়ে হয়নি, সেফ হঠাৎ ইচ্ছা হলো…”

ওর জীবন অনুভূতিহীন মনে হলেও আসলে কিছু অনুভূতি অবশিষ্ট ছিল। আর সেগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এরকম ভয়াবহ কিছু ঘটাতে পারে। ওর বাইরের অভিব্যক্তিহিন অবস্থাটা অনেকটা থারমোফ্লাস্কের মত, বাইরে থেকে স্পর্শ করলে ভেতরের তাপ বোঝা যায় না। ভেতরে যাই ঘটুক ্না কেন তা বাইরের পৃষ্ঠ পর্যন্ত আসে না।

কিন্তু এরকম অনুভূতি যখন খুব শক্তিশালী হয়ে পড়ে তখন কিছু একটা করতে হয়। কেউ কেউ খেলাধুলা কিংবা ব্যায়াম করে, অন্যরা নিজেদের শান্ত করতে জিনিসপত্র ভাঙে। কিন্তু মোরিনো এই দুই দলের কোনটাতেই পড়ে না, সে তার নিজের উপরই নিজের অনুভূতিগুলোর প্রয়োগ ঘটায়।

হঠাৎ একটা পরিচিত গলায় আমার নাম শুনলাম।

ঘুরে দেখি আমার বোন, সাকুরা, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে অবাক দৃষ্টি। ওর হাতে ডগ ফুডের ব্যাগ। শপিঙে বেরিয়েছে।

মোরিনো ঘুম ঘুম চোখ করে ছিল। ব্যাগের উপর কুকুরের ছবি দেখে সে কেঁপে উঠল।

সাকুরা আমাকে জানাল সে আমাকে এখানে দেখে কতটা অবাক হয়েছে, তারপর মোরিনোর দিকে তাকাল।

মোরিনো অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। সে যে সাকুরাকে এড়াতে চাইছিল তা নয়। ব্যাগের উপর কুকুরের ছবি এড়াতে অন্যদিকে তাকিয়েছিল। কোন সেলফে “কুকুর” লেখা থাকলে সেটার ধারে কাছেও ওকে টেনে নেয়া যাবে না।

“আর তোমার সুন্দরি বন্ধুটি কে?” সাকুরা জিজ্ঞেস করল, কৌতূহলি। আমি দ্রভাবে ওকে বুঝিয়ে বললাম সাকুরা ওকে যা ভাবছে সে সেরকম কেউ নয়। সে আমার কথা বিশ্বাস করল বলে মনে হলো না।

“ওকে। আম্মু আমাকে এখানে পাঠিয়েছে। কুকুরের খাবার কিনলাম আর যাওয়ার সময় ড্রাই ক্লিনারস থেকে কাপড় তুলতে হবে।”

সাকুরা ওর পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে পড়ল। ওর হাতের লেখা আমার চেয়ে হাজার গুণ ভাল। ওর সামনে পরীক্ষা, পড়াশোনা নিয়ে দৌড়ের উপর থাকার কথা, কিন্তু তারপরেও কেউ কোন কাজের অনুরোধ করলে সেটা ফেলতে পারে না।

“তারপর পাশের বাসা থেকে কিছু টোফু আর পিচ্চি কমলা নিতে হবে। আর বাসায় ফেরার পর কুকুরটাকে হাটাতে নিয়ে যেতে হবে।”

সে মোরিনোর দিকে হাসিমুখ করে হাত নাড়ল।

মোরিনো ব্যস্ত ছিল কুকুরের ছবি যাতে চোখে না পড়ে সেই নিয়ে। এক হাতে সেলফে ভর দিয়ে নিজের চোখ ঢেকে রেখেছিল।

সাকুরা চলে যাওয়ার পর আমি বললাম, “এখন তাকাতে পার।”

মোরিনো সোজা হয়ে দাঁড়াল, তারপর যেন কিছুই হয়নি ভাব করে সেলফের ভেতর এক রোল তার পরীক্ষা করতে লাগল।

“তোমার বোন ছিল নাকি মেয়েটা?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

“আমারো একটা বোন ছিল। যমজ বোন। অনেক আগে মারা গিয়েছে।”

এই কাহিনীও আমার জানা ছিল না।

“ওর নাম ছিল ইয়ু। ইয়ু…”

যখন ও এই কথাগুলো বলছিল তখন একই সাথে রুপালি তারের উপর আঙুল বোলাচ্ছিল। ওর নীলচে ঠোঁটগুলোর ফাঁক দিয়ে সুন্দর সাদা দাঁত চোখে পড়ছিল। নিচু স্বরে উচ্চারিত কথাগুলো যেন ঠোঁট আর দাঁত দুই জায়গা থেকে বের হচ্ছিল।

ইয়ু গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, মোরিনো ইয়োরু আমাকে বলল।

একগাদা তার-দড়ি গলায় পেঁচিয়ে দেখার পরেও মোরিনো ওর অনিদ্রার সমস্যা দূর করার মত কোন কিছু খুঁজে পেল না। আমিও কিছু কিনলাম না।

সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা পার্কিং লট পার হয়ে রাস্তার দিকে গেলাম। চোখের নিচের গভীর কালো দাগসহ মোরিনোকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন জোরে বাতাস শুরু হলেই ও উড়ে যাবে।

বিশাল জেনারেল স্টোরের আশেপাশে একদমই কিছু ছিল না। শুধু খোলা মাঠ আর শুকনো ঘাসে ঢাকা খালি জায়গা। সেগুলোর মাঝ দিয়ে নতুন পিচ ঢালা পথ এগিয়ে গিয়েছে। একসময় হয়তো এখানে অনেক কিছু হবে, সময় লাগবে তার জন্য।

রাস্তার এক পাশে বেঞ্চ বসানো বাসস্টপ ছিল, মোরিনো গিয়ে সেখানে বসল। যেসব বাস এখানে থামে তার একটা ওর বাসার দিকে যায়।

সূর্য নিচের দিকে নামছিল। আকাশ তখনো নীল। খালি মেঘগুলো গোলাপি রং ধারন করেছে।”তোমার বোন সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?” আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম। সে চুপচাপ বসে থাকল। কোন উত্তর দিল না।

রাস্তায় খুব একটা গাড়ি ছিল না। মাঝে মধ্যে দু-একটা শশা শো করে চলে যাচ্ছিল। বেশিরভাগ সময়ই খালি চওড়া পিচঢালা রাস্তা আর গার্ড রেইলের পরে শুকনো মরা ঘাসসহ ধুধু প্রান্তর। অনেক দূরে একটা আয়রন টাওয়ার, দিগন্তে বিন্দুর মত ফুটে আছে।

“কী জানতে চাও?” সে একসময় বলল।

“ইয়ু মারা গিয়েছিল যখন আমরা সেকেন্ড গ্রেডে পড়ি। তাই আমার খালি ওকে ছোট অবস্থাতেই মনে আছে। এমনকি যখন ওর বয়স আট বছরও নয়…সে সময় আমরা গ্রামে থাকতাম। সেখানে চারপাশে খামারের পর খামার ছাড়া আর কিছু ছিল না।”

ওদের বাড়ি ছিল এক পর্বতের ঢালে। পেছন দিকে বন, বাড়ি থেকে বনে পাখিদের ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যেত।

“ইয়ু আর আমি একই রুমে এক বিছানায় ঘুমাতাম। যখন রাত হত আর আমরা ঘুমাতে যেতাম তখন বিছানায় শুয়ে বাইরে অন্ধকারে প্যাঁচার ডাক শুনতে পেতাম।”

বাড়িটা ছিল পুরনো, কাঠের তৈরি। মেঝে, পিলার সব কিছু বয়সের ভারে কালো হয়ে গিয়েছিল। আগাছা জন্মেছিল ছাদের টাইলসের ফাঁকে। বাড়ির আশেপাশে ভাঙা টাইল্স পড়ে থাকত। অবশ্য বাড়িটা বেশ বড় আর আরামদায়ক ছিল। তাতামি ফ্লোর ছিল-সব রুমে, শুধু কিচেন বাদে। কিচেনে পরে লাগানো হয়েছিল। যমজ মেয়ে দুটো, ইয়োরু আর ইয়ু ঐ বাড়িতে তাদের বাবা-মা আর নানা-নানির সাথে বাস করত।

মোরিনোর বাবা প্রতিদিন দুই ঘন্টা ড্রইভ করে শহরে যেতেন কাজের জন্য। ওর নানা-নানিও বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকতেন। ধানক্ষেতে পানি দিতেন কিংবা ছাউনি থেকে কৃষিকাজের জিনিসপত্র আনা-নেয়া করতেন। মাঠ আর ধানক্ষেতগুলো বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের মত হাঁটা দূরত্বে ছিল। ওরা যেসব ডায়কন আর বাঁধাকপি খেত সেগুলো এই ক্ষেতেই চাষ হতো।

“কিন্তু আমাদের ক্ষেতের ডায়কন দোকানের ডায়কনের মত দেখতে এত সুন্দর হত না। আর একটু হলদেটে ধরনের ছিল।”

উঠোনে অনেক গাছ ছিল। উঠোনের খোলা মাটি বৃষ্টি হলে কাদার পুকুরে পরিণত হতো। বৃষ্টির সময় বাইরে গেলে মনে হত মাটি জোর করে টেনে আছাড় খাওয়াতে চায়।

বাড়ির বামদিকে ছিল ছোট্ট একটা ছাউনি, বাড়ির দেয়াল ঘেঁসে দাঁড় করানো। কৃষিকাজের সব যন্ত্রপাতি ওখানে রাখা হতো। ছাউনির ছাদটা এক টাইফুনের সময় উড়ে গিয়েছিল। সেটা ঠিক না করে বরং উপরে শ্রেফ একটা নীল রঙের তারপুলিন বিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটার ফুটো দিয়ে পানি পড়ত কিন্তু ছাউনির ভেতর যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কিছু না থাকায় কোন সমস্যা হয়নি।

“আমি আর আমার বোন সারাক্ষণ খেলাধুলা করতাম।”

যখন ওরা এলিমেন্টারি স্কুলে ঢুকল তখন হাত ধরাধরি করে পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেত। পাহাড়ি পথটা ছিল সরু আর প্রচুর বাতাস। পথের একধারে ঢাল খাড়া উপরে উঠে গিয়েছিল, সেইসাথে গাছপালায় ভর্তি। অন্য দিকেও গাছপালা ছিল কিন্তু সেগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে দূরের দৃশ্য দেখা যেত। পথের উপর মরা বাদামি পাতা পড়ে থাকত, বৃষ্টির সময় পেছল করে তুলত। লম্বা গাছগুলোর ডালপালা সূর্যের আলো আসতে বাঁধা দিত। যে কারনে পথটা সবসময়ই কেমন ভ্যাপসা আর গুমোট হয়ে থাকত।

“পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে স্কুলে যেতে হতো, সেটা আমাদের জন্য সহজই ছিল। কিন্তু বাসায় ফেরার সময় আমরা হাঁপিয়ে কাহিল হয়ে যেতাম।”

ইয়োরু আর ইয়ুর চেহারা ছিল হুবহু একইরকম। চোখের নিচের তিল পর্যন্ত একই জায়গায়, দু-জনেরই একইরকম কোমর পর্যন্ত লম্বা ঘন চুল। আর ওরা প্রায় সময়ই একইরকম পোশাক পড়ত। আমার কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছিল না যে, একই রকম দেখতে দুটো মেয়ে হাত ধরাধরি করে সবুজে ঢাকা পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

“আমরা দেখতে একইরকম ছিলাম। এমনকি আমাদের মা পর্যন্ত আমাদেরকে আলাদা করে চিনতে পারত না। মাঝে মাঝে গোসল করার সময় আমরা পোশাক খুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম।”

সেসময় ওদের মা ঠাহর করতে পারতেন না কে বড় আর কে ছোট।

“কিন্তু আমাদের অভিব্যক্তি আর স্বভাবে পার্থক্য ছিল। তাই আমরা কথা বললেই সবাই বুঝে ফেলত।”

ছোটবেলায় ওদের মা ওদেরকে আলাদা করে চিনতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকলে ইয়ুর খুব মজা লাগত। আর ঠিক যখনই বোঝা যেত ইয়ু মজা পাচ্ছে তখনই ওদের মা ধরে ফেলে বলতেন, “এই যে এটা ইয়োর, আর ওটা ইয়ু।”

ইয়ু সবসময়ই তার বড় বোনের চেয়ে সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করত। ও যখন ওর বাবা-মায়ের সাথে কথা বলত, সবসময় হাসিমুখ করে রাখত।

“সেসময় আমাদের প্রিয় খেলা ছিল ছবি আঁকা আর মরার ভান করা।”

গ্রীষ্মের ছুটিতে এলিমেন্টারি স্কুলের সুইমিং পুল খোলা ছিল আর ওরা সেখানে যতক্ষণ চাইত সাঁতার কাটতে পারত।

“একদম ছোট একটা স্কুল, সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল একশ জনের মত। প্রত্যেক গ্রেডে বিশ জনেরও কম। কিন্তু গ্রীষ্মের ছুটিতে পুলে সবসময় ভিড় থাকত।”

সূর্যের সাদা আলোকরশ্মির ভেতর বাচ্চারা সারাক্ষণ পুলে দাপাদাপি করত। পুলে শুয়ে কান পানির নিচে দিয়ে রাখলে পাহাড় থেকে ভেসে আসা পোকামাকড়ের ঝিঁঝি শব্দ শুনে মনে হত যেন দেয়াল টেয়াল ভেঙে পড়ছে।

“পুলের আশেপাশে সবসময় দুই-চারজন বয়স্ক মানুষ থাকত যারা খেয়াল রাখত যেন কোন বিপদ না ঘটে। কখনো শিক্ষকেরা, কখনো কখনো অভিভাবকেরা এই দায়িত্ব পালন করত। বেশিরভাগ সময়ই কিছু ঘটত না। তারা স্রেফ পাশের ছাউনির বেঞ্চে বসে একজন আরেকজনের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে থাকত।

একদিন দুই বোন ঠিক করল পানিতে ডোবার ভান করে বড়দের চমকে দেবে। তারা উপুড় হয়ে দমবন্ধ করে পানিতে ভেসে থাকল, দেখে যেন মনে হয় মরে ভেসে আছে।

আশেপাশের হৈচৈ করা ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিশ্চয়ই ওদেরকে আলাদা করে চোখে পড়ছিল। দুটো মেয়ে উপুড় হয়ে পানিতে ভাসছে, তাদের লম্বা কালো চুল সামুদ্রিক আগাছার মত চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কোন নড়াচড়া নেই। দম শেষ হয়ে এলে ওরা মাথাটা অল্প তুলে দম নিয়ে আবার মরে যেত।

“আমরা যা আশা করেছিলাম তারচেয়ে প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ছিল।”

পাহারায় ছিল ওদের কয়েকজন ক্লাসমেটদের মা। ওনারা যখন ওদেরকে অনড় ভাসতে দেখলেন তখন একজন লাফিয়ে উঠে চিৎকার শুরু করলেন। সব ছেলেমেয়ে চমকে বেঞ্চের দিকে তাকাল। ছোট বাচ্চারা যারা দাপাদাপি করছিল, একটু বড়রা যারা সাঁতার প্র্যাকটিস করছিল সবাই বুঝতে পারল কোন অঘটন ঘটেছে। আরেকজন মহিলা যিনি চিৎকার করেননি তিনি ওদের বাঁচাতে দৌড় দিলেন। কিন্তু পুলের পাশে দৌড়ানো বিপজ্জনক।

“মহিলা পিছলে পড়ে মাথায় বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যে মহিলা চিৎকার করেছিলেন তিনি গেলেন এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে। ইয়ু আর আমি দম শেষে উঠে দেখি আশেপাশের সবাই আতঙ্কে আছে। মনে হচ্ছিল যেন নরক নেমে এসেছে। ছোট বাচ্চারা ভয় পেয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। অজ্ঞান মহিলার পাশে একটা ছেলে তার মায়ের কাঁধ ধরে মা মা করে ঝাঁকাচ্ছিল। ছেলেটা আমাদেরই একজন ক্লাসমেট ছিল।”

যমজ দু-জন একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারপর টু শব্দ না করে তাড়াতাড়ি পুল থেকে উঠে পালিয়ে গেল। পরনের ভেজা পোশাকও বদলালো না।

“আমরা পেছনের দরজা দিয়ে বের হলাম। আমাদের এক হাতে ব্যাগ, ভেতরে কাপড় আর ভোয়ালে। আরেক হাতে জুতো। সুইমস্যুট পরা অবস্থায় ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড় লাগালাম আমরা। দূর থেকে শুনতে পেলাম এ্যাম্বুলেন্সের পর এ্যাম্বুলেন্স আসছে। ঐ মহিলা কয়জনকে ডুবতে দেখেছিল কে জানে? অন্তত পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স এসেছিল সেদিন।”

স্কুলটা ছিল পর্বতের গোড়ায়, পাশ দিয়ে যতদূর চোখ যায় খালি ধান ক্ষেত। সবুজ চারাগুলো পুরো এলাকার উঁচু নিচু মাটি ঢেকে রেখেছিল। মনে হত যেন সমতল ভুমি। যমজ মেয়ে দুটো সেই ধানক্ষেতের পাশের পথ ধরে হেঁটে গেল।

“ধারালো ঘাসে আমাদের পা কেটে গিয়েছিল।”

অ্যাম্বুলেন্স স্কুলে পৌঁছানোর পরে কি হয়েছিল সে ব্যাপারে ওদের কোন ধারণা ছিল না। ওরা সেটা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাও করেনি। বাড়ি ফিরে খেয়ে ঘুম দিয়েছিল।

“সেবারই যে শুধু আমরা মরা মরা খেলেছিলাম তা নয়। আমরা একজন আরেকজনের মুখে কেচাপ ছিটিয়ে ভান করতাম যেন সেটা রক্ত।”

ওরা রেফ্রিজারেটরের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুলে কেচাপ নিয়ে একজন আরেকজনের মুখে মাখিয়ে দিত। ওদের ফ্যাকাসে সাদা ত্বক কেচাপে লাল হয়ে যেত।

“কেচাপ গড়িয়ে পড়তে লাগলে আমরা তা চেটে চেটে খেতাম। তারপর এক সময় বিরক্ত হয়ে গেলে সসেজ দিয়ে মাখিয়ে খেয়ে ফেলতাম।”

আরেকবার তারা ঘর থেকে একটা মিট সসের ক্যান নিয়ে এসেছিল।

ওদের বাড়ি থেকে অল্প খানিকটা দূরে একবার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। কিন্ডারগার্টেন পড়ুয়া একটা ছেলে গাড়ি চাপা পড়ে সেখানে মারা যায়। ইয়ু সেই জায়গায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

‘শুরু কর,” সে বলল। আর আমি ওর মুখের উপর ক্যানের পুরো মিট সস ঢেলে দিলাম। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে এসেছে। আমি ইয়কে বললাম যাই ঘটুক না কেন ও যেন একদম নড়াচড়া করে। ও আস্তে করে মাথা নেড়ে সায় দিল। চোখ বন্ধ করে ছিল যেন সস চোখে না ঢোকে।”

ইয়োরু গিয়ে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে থাকল। কখন কে এসে দেখে চিৎকার করে উঠে সে অপেক্ষায় থাকল। বাচ্চারা যখন দেখল, বড়দের মত অতটা অবাক হলো না। তারা কাছে এসে দেখে ধরে নিয়েছিল কোন ধরনের খেলা হবে বা কিছু।

“এমনকি বড়রাও দেখে প্রথমে চিৎকার করলেও একটু পরেই ধরে ফেলেছিল যে জিনিসটা মিট সস। তারপর তারা হেসে ফেলত। আমরা এরকম কান্ডকারখানা অনেক করেছি আগে, প্রতিবেশিরা সবাই জানত আমাদের শয়তানি।”

“কোন গাড়ি যায়নি?”

যেহেতু ওখানে আগে ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তার মানে কোন না কোন সময় তো সেখান দিয়ে গাড়ি যাওয়ার কথা। আর ইয়ু রাস্তায় পড়েছিল, বিপদ হতে পারত।

আমি যখন প্রশ্নটা করলাম, মোরিনো কোন অনুভূতি না প্রকাশ করে বলল, “একটা গাড়ি এসেছিল। ইয়ু চোখ বন্ধ করে ছিল তাই টের পায়নি। গাড়িটা ওর সামনে এসে কষে ব্রেক করে থেমেছিল। গাড়ি থামার শব্দে ইয়ু উঠে বসেছিল। মুখ থেকে সস মুছে তাকিয়ে দেখে মুখের সামনে গাড়ির বাম্পার। বাম্পারটা সিলভার পলিস করা ছিল, ওর চেহারার প্রতিফলন সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল..”

“তুমি ওকে ডেকে সাবধান করে দাওনি?”

“না। দেখতে চাইছিলাম কি হয়।” আমি ওর কথার সুরে অপরাধবোধের চিহ্ন খুঁজলাম, কোন চিহ্ন পেলাম। ওর এরকম কোন বৈশিষ্ট্য নেই। একদিক থেকে বললে সে এই ক্ষেত্রেও আমার মতই অনেকটা।

“আমরা যমজ, তাই দেখতে একইরকম ছিলাম। আমাদের চিন্তাভাবনায়ও অনেক মিল ছিল। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল। আমার বোন ছিল দূর্বল প্রকৃতির।”

আমরা যেখানে বসে ছিলাম তার সামনে একটা বাস এসে থামল। আমাদের জন্য অপেক্ষা করে চলে গেল আর পেছনে ফেলে গেল ধোঁয়ার একটা গন্ধ।

সূর্য দিগন্তের কাছে নেমে গেলে পুব আকাশ অন্ধকার হতে শুরু করেছিল। বাতাসে গার্ডরেইলের ওপারের শুকনো ঘাসগুলো কাঁপছিল।

মোরিনো বেঞ্চে নিচু হয়ে বসেছিল। ওহ হাতগুলো হাঁটুর উপর রাখা।

“আমরা অনেকটা সময় ধরে মৃত্যুর কথা চিন্তা করতাম। মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব? তখন কি হবে আমাদের? এইসব চিন্তা-ভাবনা আমাদের কাছে খুব আকর্ষণীয় লাগত তখন। কিন্তু আমার মনে হয় ইয়ুর চেয়ে আমি মৃত্যু সম্পর্কে বেশি জানতাম। আর আমি ওরচেয়ে একটু বেশি নিষ্ঠুর ছিলাম।”

কোন অনুভূতি প্রকাশ না করে মোরিনো আমাকে বলল কিভাবে সে ইয়ুকে বিভিন্ন কাজ করতে আদেশ করত।

“সে সময় আমাদের ছাউনিতে একটা প্রাণী ছিল। চারপেয়ে, মুখ দিয়ে লালা ঝরত, দুর্গন্ধওয়ালা-বুঝতেই পারছ কিসের কথা বলছি।”

আমি ধরে নিলাম ও কুকুরের কথা বলছে। ওর একটা পোষা কুকুর ছিল শুনে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।

“আমি ইয়ুকে আদেশ করলাম ওটার খাবারে ব্লিচ মিশিয়ে দিতে। এমন যে আমি ভাবছিলাম ওটার গায়ের রং সাদা হয়ে যাবে বা সেরকম বোকা ধরনের কিছু। আমি স্রেফ ওটাকে কষ্ট পেতে দেখতে চাইছিলাম।”

ইয়ু ইয়োরুকে থামতে অনুরোধ করেছে।

“কিন্তু আমি শুনিনি, আমি ওকে দিয়ে জোর করে কুকুরের খাবারে ব্লিচ মেশালাম। সে চায়নি কিন্তু আমি ওকে এড়িয়ে যেতে দেইনি।”

ব্লিচ খেয়ে কুকুরটা মরল না। কিন্তু দুদিন সাতিক অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকল। মোরিণোর বাবা-মা আর নানা-নানি কুকুরটার যত্ন নিল। সারাটা দিন আর সারারাত কুকুরটা যন্ত্রণায় মোচড়াল আর আর্তনাদ করল। ওর চিৎকার পর্বতে প্রতিধ্বনি তুলত।

ইয়োরু পুরো ব্যাপারটা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করল। কিন্তু ইয়ু খুব ভয় পেয়েছিল। সে সারাদিন ঘরের ভেতর থাকল, দু-হাত দিয়ে কান চেপে।

“ইয়ু অনেক কেঁদেছিল।”

ইয়োরু কুকুরের সাথে সাথে তার বোনকেও ভালোমত লক্ষ্য করল। নিজে সরাসরি কুকুরটাকে ব্লিচ না খাইয়ে সে সমস্ত অপরাধবোধ তার বোনের উপর চাপিয়েছিল। ইয়োরুর পরীক্ষায় কুকুর আর তার বোন দু জনেই যন্ত্রণা পেয়েছিল।

ইয়োরু আর ইয়ু নিজেরাও গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলত, একবারই খেলেছিল।

“ঠিক করে বললে, এক কদমের জন্য আমাদের আত্মহত্যা আটকে গিয়েছিল। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। যে কারনে বাইরে খেলতে যেতে পারিনি, ছাউনিতে খেলছিলাম। ইয়ু মারা যাওয়ার এক কি দুই মাস আগের ঘটনা এটা।”

যমজ বোন দু-জন প্রত্যেকে মেঝের উপর একটা করে কাঠের বাক্স রেখে তার উপর দ্বিতীয় আরেকটা বাক্স রেখে দাঁড়াল। ছাউনির বিম থেকে ঝুলানো দড়ি গলায় দিল। এরপর স্রেফ বাক্স থেকে লাফ দিয়ে ফাঁস খেয়ে মরা বাকি।

“আমি বললাম তিন পর্যন্ত গুনে আমরা লাফ দিব। মিথ্যে বলেছিলাম আমি, লাফ দিতাম না। ইয়ু ফাঁস খেয়ে মরত আর আমি দেখতাম।”

এক…দুই…তিন। তিন গোনার পর দু-জনের কেউই লাফ দিল না। দু জনেই চুপ করে ছিল।

“ইয়ু বুঝতে পেরেছিল আমি কি ভাবছিলাম, যে কারনে সে লাফ দেয়নি। আমি যখন ওকে জজ্ঞেস করলাম কেন লাফ দেয়নি, ও স্রেফ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ভয়ে কাঁপছিল।”

ইয়ু মুখ খুলে বলতে পারেনি কেন পুরো ব্যাপারটা অন্যায় ছিল, সে শুধু দাঁড়িয়ে থেকে ইয়োরুর অপমানের বন্যায় ভেসে গেল।

“তুমি ইয়ুকে বুলি করতে?”

“সেটা বলা যেতে পারে। কিন্তু সে সময় আমার কোন হুশ ছিল না। বেশিরভাগ সময়ই আমাদের মধ্যে কোন সমস্যা হত না। আর ইয়ু ওর ভাগের খারাপ কাজগুলোও ঠিকমত করত। আমার চেয়ে ও আরো ভালো মত মরার অভিনয় করে লোকজনকে আতংকিত করতে পারত।”

“তোমার পরিবারের অন্যরা জানত তোমাদের দুই বোনের মধ্যে সম্পর্ক যে এরকম ছিল?”

“না।”

মোরিনো নিরব হয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল। শাঁ করে একটা গাড়ি ছুটে গেল। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসায় গাড়িটার হেড লাইট জ্বালানো ছিল। বাতাসে মোরিনোর চুল উড়ছে, কয়েকটা চুল আবার গালের সাথে লেপ্টে আছে।

“ইয়ু মারা গিয়েছিল গ্রীষ্মের ছুটির সময়। আমরা তখন সেকেন্ড গ্রেডে পড়তাম। সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল একটা সকাল ছিল। কিন্তু শিগগিরি আকাশ কালো হয়ে গেল। আর দুপুরের দিকে শুরু হল বৃষ্টি..”

দুপুরের কিছু পর ওদের মা শপিঙে গেলেন। বাবা বাসায় ছিলেন না। নানা-নানিও বাইরে। শুধু যমজ দুই বোন বাসায় একা।

প্রথমে কুয়াশার মত ঝিরঝির বৃষ্টি ছিল। টুপটাপ ফোঁটা পড়ছিল জানালায়। আস্তে আস্তে বৃষ্টি বাড়তে লাগল।

“সাড়ে বারোটার দিকে আমি দেখলাম ইয়ু ছাউনির দিকে যাচ্ছে। আমাকে কিছু বলেনি, তাই আমি ধরে নিলাম সে হয়তো একা কিছু সময় কাটাতে চাইছে। আমিও আর ওর পিছু পিছু গেলাম না।”

ইয়োরু একা বসে বই পড়তে লাগল।

প্রায় ঘন্টা খানেক পর, সে সামনের দরজা খোলার শব্দ পেল। গিয়ে। দেখে ওর নানি ফিরেছেন, হাতে এক ব্যাগ নাশপাতি।

ওর নানি ছাতি বন্ধ করতে করতে বললেন, “পাশের বাসা থেকে এগুলো দিয়েছে। তোমাকে একটা ছিলে দেব?”

“আমি বললাম, ইয়ুকে ডেকে আনি। নানিকে দরজার ওখানে রেখে দৌড়ে ছাউনিতে গেলাম।”

ইয়োক ছাউনির দরজা খুলল-আর দৃশ্যটা দেখল। সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল।

“ইয়ু সিলিং থেকে ঝুলছিল। গলায় দড়ি পেঁচানো ছিল। আমি সামনের দরজায় ফিরে গেলাম, যেখানে নানি নাশপাতি হাতে দাঁড়ানো ছিলেন। আমাকে ভয়ে কাঁপতে দেখে অবাক হলেন।”

সে নানিকে বলল ইয়ু বেঁচে নেই।

ইয়ু নিজের গলায় ফাঁস নিয়েছে। আত্মহত্যা ছিল না, অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। শুধু যে ওর গলায় দড়ি ছিল তা নয়, ওর বগলের নিচে বুকে দ্বিতীয় আরেকটা দড়ি বাঁধা ছিল-একটা খসখসে ভারি দড়ি, খামারে যে ধরনের দড়ি ব্যবহার করা হয়। একদিক ওর বুকে বাঁধা ছিল, আরেক দিক লেজের মত ঝুলছিল। গলার দড়িটাও একই ধরনেরই ছিল। পুরোটাই একটা দড়ি ছিল কিন্তু ছিঁড়ে গিয়েছিল।

“আমার বোনের মরার কোন ইচ্ছা ছিল না। ও চেয়েছিল বুকের দড়িটা দিয়ে ঝুলবে আর আত্মহত্যার ভান করে সবাইকে ভয় দেখাবে। কিন্তু যে

মুহূর্তে ও লাফ দিয়েছিল, ওজন নিতে না পেরে দড়িটা ছিঁড়ে যায়।”

খুব কম লোকজনের মধ্যে ইয়ুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। আর এই গল্পের শেষ এখানেই।

আমার একটা প্রশ্ন ছিল কিন্তু জিজ্ঞেস করলাম না। মোরিনোর ক্লান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস শুনলাম।

সূর্য ততক্ষণে পুরোপুরি ডুবে গেছে। রাস্তার ধারের বাতিগুলো জ্বলছিল। বাসস্টপের সাথের বাতির আলোয় বাসের শিডিউল জ্বলজ্বল করছিল। আমরা বাস-স্টপের উজ্জ্বল সাদা আলোর মধ্যে বেঞ্চে বসে রইলাম।

দূরে এক জোড়া হেড লাইট দেখা যাচ্ছে। সাথের চারকোনা ছায়ার পেছনে নিশ্চয়ই একটা বাস আছে। কিছুক্ষণ পরেই ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল। আর বাসটা আমাদের সামনে এসে থামল।

মোরিনো উঠে খোলা দরজা দিয়ে বাসে ঢুকে গেল। আমিও বেঞ্চ ছেড়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

কেউ কাউকে গুডবাই বললাম না আমরা। একজন আরেকজনের দিকে তাকালামও না।

দিনটা ছিল শনিবার। মোরিনো ইয়োৰু ওর বোনের মৃত্যুর কাহিনী বলার দু দিন পর। আকাশে মেঘ করেছিল।

স্কুল ছিল না বলে আমি বেশ সকালে উঠে ট্রেনে চড়লাম। ট্রেনটা আমাকে নিয়ে গেল শহরের বাইরে, গ্রাম এলাকার দিকে যেখানে লোকজন কম। যতদূর যেতে থাকলাম ট্রেনের যাত্রি তত কমতে লাগল। ট্রেনে একসময় আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। মেঘের কারনে সূর্য নেই। গাঢ় সবুজ ক্ষেতগুলো শাঁ করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।

একদম জনমানবহীন ক্ষেত খামারের কাছে এক স্টেশনে পৌঁছে আমি ট্রেন থেকে নামলাম। স্টেশনের বাইরে একটা বাস দাঁড়িয়ে ছিল। সেটায় চড়ে কিছুদূর গেলাম, যতক্ষণ না উঁচু এলাকা শুরু হলো আর গাছপালাও ঘন হতে শুরু করেছে। উপর থেকে আমরা নিচের গ্রাম দেখতে পাচ্ছিলাম। রাস্তাটা তেমন একটা চওড়া ছিল না। কোনভাবে একটা বাস যাওয়ার মত জায়গা ছিল। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, বাসের জানালায় টোকা দিচ্ছিল।

বনের মাঝে এক স্টপে গিয়ে বাস থেকে নামলাম। রাস্তায় আর কোন যানবাহন ছিল না। শিডিউল দেখলাম। এক ঘন্টা পর একটা বাস আছে শুধু। সন্ধ্যায় কোন বাস নেই। তার মানে এক ঘন্টা পরের বাসেই আমাকে চড়তে হবে। চারপাশে গাছপালা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিছুদূর হাঁটার পর কয়েকটা বাড়ি দেখতে পেলাম।

এই বাড়িতে মোরিনের জন্ম হয়েছিল, এখানেই সে তার ছোটবেলা কাটিয়েছে।

আমি বাড়ির সামনে থেমে একবার চারপাশ ভালো করে দেখলাম। রোদ থাকলে হেমন্তকালে পুরো এলাকা লাল দেখানোর কথা। কিন্তু মেঘের জন্য সবকিছু কেমন ম্যাড়মেড়ে দেখাচ্ছিল।

বাড়িটার দিকে এগুনোর সময় গতকাল স্কুলে মোরিনোর সাথে হওয়া আলাপের কথা মনে করলাম।

শুক্রবার লাঞ্চের সময়, লাইব্রেরি প্রায় জনশূন্য ছিল। দেয়াল ধরে বইয়ের সেলফ লাগানো। বাকি অংশে ডেস্ক আর চেয়ার রাখা পড়াশোনা করার জন্য। রুমের সবচেয়ে নির্জন কোনায় মোরিনো বসেছিল। ওর সাথে গিয়ে কথা বললাম।

“গ্রামে তুমি যে বাড়িতে থাকতে সেটা আমি দেখতে চাই।”

সে বই পড়ছিল। মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

“তুমি কি ভুলে গিয়েছ নাকি যে লোকজন যেসব জায়গায় মারা যায় সেসব জায়গা পরিদর্শন করতে আমার ভালো লাগে?”

মোরিনো অন্যদিকে তাকাল তারপর বই পড়ায় ফিরে গেল। আমি ওর পাশে বসে পড়লাম। ওর গলার অংশবিশেষ দেখতে পাচ্ছিলাম খালি। ও আমাকে উপেক্ষা করে বই পড়ার চেষ্টা করছিল।

আমি উঁকি দিয়ে বইয়ের নামটা দেখার চেষ্টা করলাম। পৃষ্ঠার কোণায় লেখা, “চ্যাপ্টার তিনঃ তুমি একা নও…কিভাবে পজিটিভ জীবন যাপন করা যায়।” দেখে ধাক্কা খেলাম।

মোরিনোর মাথা তখনো নিচু করা। আমাকে বলল, “আমি ভেবেছিলাম বইটা পড়তে গেলে ঘুম পাবে।”

তারপর লম্বা একটা নিরবতা। একসময় সে মুখ তুলল। “তোমাকে ইয়র কথা বলার জন্য আমার আফসোস হচ্ছে। তুমি যদি যেতেই চাও, তাহলে একলা যেতে হবে।”

বাড়িটা আর ছাউনিটা তখনো আছে। ওর নানা-নানি তখনো সেখানে বসবাস করে। কৃষিকাজ করে।

আমি জানতে চাইলাম কেন সে যেতে চায় না। সে বলল ঘুম না হওয়ার কারনে সে খুবই ক্লান্ত।

পরদিন শনিবার, স্কুল ছুটি। তাই আমি ঠিক করলাম সেদিনই গ্রামে যাব। মোরিনো আমাকে ঠিকানা আর যাওয়ার রাস্তা বাতলে দিল। দেখে মনে হচ্ছিল দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আশা যাবে। মোরিনো আমার নোটবুকে একটা ম্যাপ একে দিয়েছিল।

“কথা নাই বার্তা নাই একজন স্কুল ছাত্র যদি হঠাৎ সেখানে হাজির হয় তাহলে সবাই অবাক হবে।” আমি বললাম। সে মাথা ঝাঁকাল। বলল ফোন করে নানা-নানিকে জানিয়ে রাখবে। তাদেরকে বলা হলো গ্রামের প্রকৃতির ছবি তুলতে আমি সেখানে যাচ্ছি।

“আর কিছু?” মোরিনো বরাবরের মত অনুভূতিহীন সুরে বলল।

আমি ওর আঁকা ম্যাপের দিকে তাকালাম। “তোমার ম্যাপ দেখলেই আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।” বলে আমি উলটো ঘুরে চলে আসলাম। লাইব্রেরির দরজায় পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো রাস্তা আমার পিঠে ওর দৃষ্টি অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল ও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু কথাগুলো গলা পর্যন্ত এসে আটকে গিয়েছে।

ধূসর মেঘ, একঝাঁক কালো পাখি নিচু দিয়ে উড়ে গেল। আমি নোটবুকে আঁকা মোরিনোর ম্যাপটার দিকে তাকালাম। ম্যাপের বক্তব্য অনুসারে রাস্তাটা কিন্ডারগার্টেনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কথা। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল পৃথিবীর কোন বাবা-মা কিভাবে তাদের সন্তানদের এরকম একটা স্কুলে পাঠাতে পারেন।

অর্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করতে করতে আমি মোরিনোদের পুরনো খামার বাড়ির দিকে এগুলাম। বাড়ির নাম্বার আর ল্যান্ডমার্ক জানা ছিল, সুতরাং ম্যাপ না বুঝলেও খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না বলেই আমার ধারণা।

হাঁটতে হাঁটতে বাসস্টপের বেঞ্চে বসে মোরিনোর বলা কাহিনী আবার চিন্তা করলাম, এক নিষ্ঠুর মেয়ে আর তার যমজ বোনের কাহিনী।

ইয়ুকে দড়িতে ঝোলা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

কিন্তু মোরিনোর গল্পে একটা অংশ ছিল যার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলাম না–যে অংশে সে তার বোনের মৃত দেহ খুঁজে পায়।

ইয়োরু ছাউনির দরজা খুলে দৃশ্যটা দেখে চিৎকার দেয়। তারপর দৌড়ে তার নানিকে গিয়ে জানায় যে ইয়ু মৃত।

মোরিনো কি করে দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে জানল যে ইয়ু মৃত? তারা তো সবসময় মৃত সাজার ভান করত আর লোকজনকে চমকে দিত তাই না? তাহলে সে কেন ভাবেনি যে ওর বোন স্রেফ অভিনয় করছে?

হতে পারে যে সাধারণ মৃতদেহ হয়তো দেখতে অভিনয়ের চেয়ে অনেক আলাদা, অনেক ভয়ঙ্কর কিছু…কিন্তু ব্যাপারটা হল যে সে কখনো ভাবেনি যে এটা অভিনয়, সে সাথে সাথে দৌড়ে তার নানিকে বলতে গিয়েছিল…ব্যাপারটা আমার কাছে গোলমেলে লাগছে।

আমি ম্যাপ আর রাস্তা অবার মিলিয়ে দেখলাম। সামনে দিয়ে গভীর একটা পাহাড়ি নদী চলে গিয়েছে। ম্যাপ অনুযায়ি এখানে একটা ড্রাই ক্লিনার থাকার কথা। কাপড় চোপড় তো পরিস্কার করার পর আর শুকাতে পারবে না, আমি ভাবলাম।

ব্রিজ পার হওয়ার সময় আকাশের দিকে তাকালাম। মেঘগুলো নিচু হয়ে পর্বত চূড়ার কাছে ঝুলে আছে। আশেপাশের গাছগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে।

আরো কিছুক্ষণ হাটার পর আমি মোরিনোদের খামার বাড়ি খুঁজে পেলাম। পর্বত ঘেঁসে পুরোনো একটা বিল্ডিং। মস জাতীয় আগাছায় ঢেকে আছে ছাদটা, যে রকমটা মোরিনো বলেছিল। আশেপাশে গাছপালা আর ক্ষেত ছাড়া কিছু নেই, রাতে নিশ্চয়ই কালিঘোলা অন্ধকারে ঢেকে যায় সবকিছু। কোন গেট কিংবা দেয়াল নেই, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি হঠাৎ আবিস্কার করলাম ওদের উঠোনে পৌঁছে গিয়েছি।

সামনের দরজার দিকে যাওয়ার সময় বামদিকের ছাউনিটা চোখে পড়ল। এই ছাউনিতেই নিশ্চয় ইয়ুর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল? ছাউনির দেয়াল শুষ্ক সাদা কাঠ দিয়ে তৈরি। উপরে নীল রঙের তারপুলিন দেয়া, প্লাস্টিকের তার দিয়ে বাঁধা। অনেক পুরনো, একদিকে কাত হয়ে আছে।

সামনের দরজাটা কাঠ আর কাঁচ দিয়ে তৈরি, খোলা ছিল। আমি ডোরবেল বাজালাম। পেছন থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডাকল।

ঘুরে তাকিয়ে দেখি একজন বুড়ি মহিলা নিড়ানি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

তার পিঠ বাঁকানো, পরনে ঢোলা ওয়ার্ক ট্রাউজার, গলায় একটা গামছা পেঁচানো। আমি ধরে নিলাম বুড়ি নিশ্চয়ই মোরিনোর নানি হবেন।

“ইয়োক গত রাতে ফোন করেছিল। আমি তো দুশ্চিন্তা শুরু করে দিয়েছিলাম যে তুমি বোধহয় আসছ না।” তিনি বললেন। তার ঝুলে যাওয়া কুঁচকানো মুখের সাথে মোরিনোর চেহারার কোন মিল পেলাম না। মোরিনোর চেহারা দেখলে মনে হয় ইতিমধ্যে মৃত, ওর নানির রোদে পোড়া চেহারার কিছুই ওর মধ্যে নেই।

আমি মাথা বো করে বললাম কয়েকটা ভালো ছবি তোলা হলেই আমি চলে যাব। কিন্তু মোরিনোর নানি আমার কথা উপেক্ষা করে আমাকে ধাক্কিয়ে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলেন।

দরজা দিয়ে ঢুকতেই শু বক্স রাখা। উপরে কিছু জিনিস রাখা যা দেখে মনে হল সুভিনর ধরনের কিছু হবে। তারপর হলওয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গিয়েছে। এয়ার ফ্রেসনার আর অপরিচিত মানুষের গন্ধ ভেসে আছে বাতাসে।

“তোমার নিশ্চয়ই ক্ষুধা পেয়েছে?”

“তেমন একটা না।”

উনি আমার কথা পাত্তা দিলেন না, ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে ডিশ ভর্তি খাবার সামনে এনে রাখলেন। মোরিনোর নান এলেন একটু পর। লম্বা, সাদা চুল ওয়ালা এক বুড়ো।

উনাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো আমাকে মোরিনোর বয়ফ্রেন্ড ধরে নিয়েছেন।

“তোমাকে তো একদিন ইয়োরুকে বিয়ে করতে হবে,” আমি খাব না বলাতে, নানা মাথা ঝাঁকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। ছাউনিটা দেখে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই বাসের কাছে পৌঁছাতে পারব কিনা ভাবছিলাম।

কিচেন কেবিনেটের এক পাশে একটা ছবি ছিল। ছবিতে পুতুলের মত দেখতে দুটো বাচ্চা মেয়ে। দু-জনেরই লম্বা কালো চুল। দু-জনেই সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে কোন হাসি নেই। দু-জনেরই পরনে কালো পোশাক। একজন আরেকজনের হাত ধরে রেখেছে। দেখে মনে হচ্ছে সামনের উঠানে ভোলা, কারণ ওদের পেছনে বাড়িটার সামনের দরজা দেখা যাচ্ছে।

“ইয়োরু আর ইয়ু,” আমার দৃষ্টি খেয়াল করে নানি বললেন। “তুমি কি ওর যমজ বোনের কথা শুনেছ?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

“এটা ওদের ছয় বছর বয়সের সময়ে ভোলা, নানা বললেন। দু জনের কেউই ছবিটা সম্পর্কে আর কিছু বললেন না।

খাওয়ার পর বাড়ির প্রার্থনা বেদীর সামনে যেতে দেয়া হলো আমাকে। আমি জানতাম সামনে এগুতে হলে আমাকে এসব ভদ্রতা দেখানো ছাড়া উপায় নেই।

প্রার্থনা বেদীর সামনে রাখা ইয়ুর ছবি দেখে আমার মনে হল ওর মৃত্যু হয়তো ওর নানা-নানির কাছে মাত্র গতকালকের কোন ঘটনা মনে হয়। যদিও ঘটনাটা ঘটেছে নয় বছর আগে। আমার কিংবা মোরিনোর কাছে নয় বছর হল আমাদের অর্ধেক জীবনের চেয়েও বেশি–কিন্তু ওর নানা-নানির বয়সের কাছে নয় বছর কোন বছরই নয় হয়তো।

হাত জোর করে শ্রদ্ধা জানানোর পর মোরিনোর নানা-নানি আমাকে লিভিং রুমে নিয়ে বসালেন আর তাদের নাতনি স্কুলে কিরকম করছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলেন। আমি উত্তর শুরু করার আগেই তারা নিজেরাই মোরিনো ছোটবেলায় কিরকম ছিল সে নিয়ে গল্প জুড়ে দিলেন। আমি ধরে নিলাম আমার বক্তব্য নিয়ে তাদের আসলে কোন আগ্রহ নেই।

“ওই তাই তো, ওর এলিমেন্টারি স্কুলে আঁকা কিছু ছবি আমাদের কাছে আছে!” নানি আনন্দে লাফিয়ে উঠে উধাও হয়ে গেলেন কোথাও।

নানা তার স্ত্রী যাওয়ার পর ক্ষমা প্রার্থনার সুরে আমাকে বললেন “ইদানিং আমার স্ত্রীর মাথায় অল্প একটু সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে আমার।”

উত্তরে আমি শুধু মাথা ঝাঁকালাম। কিছু বলার চেয়ে মাথা ঝাঁকানোই আমার কাছে সঠিক প্রতিক্রিয়া হবে বলে মনে হলো।

“আসলে ইয়োরু কখনো ওর কোন বন্ধুকে বাসায় নিয়ে আসেনি, বুঝেছ? তাই তুমি আসছ শুনে ওর নানি আজকে একটু বেশিই উত্তেজিত।”

মোরিনোর নানি একটা কাগজের ব্যাগ নিয়ে ফিরে এলেন। ব্যাগের ভেতর থেকে এক গাদা পুরোনো ড্রয়িং পেপার বের হলো, মোরিনো ওর এলিমেন্টারি স্কুলে থাকার সময়ে রং আর ক্রেয়ন দিয়ে ওগুলো এঁকেছিল। মোরিনোর ম্যাপ আঁকা দেখে আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, এখন নিশ্চিত হওয়া গেল ওর মধ্যে আর্টের মেধা বলতে কিছু নেই।

কাগজগুলোর পিছে নাম আর গ্রেড লেখা ছিল।

এর মধ্যে কয়েকটা ইয়ুর আঁকা ছিল। দু-জনের ড্রইংই একসাথে রাখা ছিল। ইয়োরুর ড্রয়িং ছিল একদম ফার্স্ট গ্রেড থেকে সিক্সথ গ্রেড পর্যন্ত। কিন্তু ইয়ুরগুলো খালি ফার্স্ট আর সেকেন্ড গ্রেডের। ব্যাপারটা যেন বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে তুলছিল যে ইয়ু নামের মেয়েটা আর নেই।

আমি দু-জনের সেকেন্ড গ্রেডের ড্রয়িং পাশাপাশি রেখে তুলনা করলাম।

“কারো পক্ষে আসলে বলা মুশকিল ওরা কি আঁকতে চাইছিল, তাইনা?” নানি উজ্জ্বল মুখ করে বললেন। যমজ দু-জনের আঁকার ক্ষমতার মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। কিন্তু দু-জনেই একই বিষয় নিয়ে এঁকেছে আর একইরকম ড্রয়িং করেছে।

দুটো ছবিতেই বাড়ির একটা অংশ দেখা যাচ্ছে আর মাঝের অংশে লম্বা চুলের দু-জন মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে মেয়ে দুটো আসলে ওরাই।

“খোদাই জানেন ওরা কি করছে,” নানি বললেন।

“বাড়ির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে?” নানা উত্তর দিলেন।

“তাই তো মনে হচ্ছে, নানি উত্তর শুনে হাসলেন।

আমি কিছু বললাম না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম ওরা কি এঁকেছে। মেয়ে দুজনেরই গলার উপর লাল দাগ টানা যেটা সিলিঙের সাথে লাগানো। তারা ছাউনিতে আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলার ছবি এঁকেছিল।

“ওরা এই ছবিগুলো গ্রীষ্মের ছুটিতে এঁকেছিল, স্কুলের হোমওয়ার্ক ছিল। ছুটির পর ইয়ুর ড্রয়িংটা স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু…ইয়ু মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে আঁকা এটা।” পুরনো স্মৃতি মনে করে নানি মলিনভাবে হাসলেন।

দুটো ছবির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। ইয়ুর আঁকা ছবিটায় ডিটেইলিং একটু ভালো ছিল। ওরটায় লাল দাগ ছাদের বিমের সাথে লাগানো ছিল, আর বাক্সগুলো একটার উপর একটা সাজানো ছিল। বাড়ির উপরে আকাশে সূর্য ছিল। আর মেয়েদের জুতাগুলো পাশে রাখা ছিল।

আর ইয়োরুর ছবিতে এইসব ডিটেইলিং কিছু ছিল না, খুব সাধারনভাবে রং করা। পুরো পা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত রং করা, জুতার জন্য আলাদা কোন রং করা হয়নি! ব্যাকগ্রাউন্ড পুরোটা ছাই রং করা।

ইয়ুর ছবির জুতাগুলো আমার মনোযোগ কাড়ল। একটা মেয়ের জুতা কালো, আরেকজনটায় কোন রঙ নেই। এর অর্থ কি হতে পারে আমি নিশ্চিত ছিলাম না কিন্তু নোট করে রাখা প্রয়োজন মনে করলাম।

ছবিগুলো টেবিলের উপর রেখে দিলাম।

“আমার মনে হয় ছবিগুলো তুলে ফেলা উচিত,” বলে আমার ক্যামেরা নিয়ে বাইরে গেলাম।

দরজা খুলতেই বাইরে সবকিছু সাদা দেখাল। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল কুয়াশা, কিন্তু আসলে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন বৃষ্টি যেটায় ছাতা ব্যবহার করার কোন মানে হয় না। সুতরাং আমি চারপাশে ঘুরে ইচ্ছামত ছবি তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ পর জোরে বৃষ্টি শুরু হলো।

আমি ভাব করলাম যেন হঠাৎ কোনভাবে ছাউনির সামনে পড়ে গিয়েছি।

ছাউনির দরজা কাঠের তৈরি ছিল। বন্ধ ছিল কিন্তু হাতল ধরে টান দিতে খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার, প্রথমে কিছু দেখা যাচ্ছিল না।

দরজা দিয়ে যতটুকু আলো ঢুকছিল তাতে হালকাভাবে কিছু দেখা গেল। ভেতরে শুকনো গাছের গন্ধ।

ছাউনিটা ছিল প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের মত উঁচু আর দশ বাই তের ফুট সাইজের। মেঝে কাদা দিয়ে নোংরা হয়ে ছিল।

আধ ভাঙা সিলিঙের নিচে একটা বিল দেয়া। অনেকগুলো ফুটো ছিল, নিল তারপুলিন দেখা যাচ্ছে। একটা বাতি ঝুলে আছে।

মোরিনোর কাহিনী অনুযায়ি এখানে একটা কুকুর রাখা হতো। এখন আর নেই যেহেতু তার মানে হয়তো বেঁচে নেই। দরজার পাশে ছোট করে আরেকটা গর্ত কাটা, সম্ভবত কুকুরটার জন্যই। কুকুরটাকে নিশ্চয়ই ওটার আশেপাশেই কোথাও বেঁধে রাখা হতো।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরটা ঠান্ডা আর খানিকটা ভ্যাপসা।

একসময় ইয়ু এখানে ছিল, সিলিঙের বিম থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছিল। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল মৃত মেয়েটা এখনো সেখানে ঝুলছে।

দরজার পাশেই একটা সুইচ ছিল। সুইচ চাপতেই বাতি জ্বলে উঠল। খুবই কম পাওয়ারের বাতি, খুব অল্পই আলোকিত হলো।

ইয়োর বলা কাহিনী মনে পড়ল আমার-দুইটা বাক্স মেঝেতে রেখে ওরা উপরে উঠে দাঁড়িয়েছিল, গলায় দড়ি দিয়ে ঝাঁপ দেয়ার জন্য তৈরি…এখানে রাখা কুকুরটার খাবারে ব্লিচ মিশিয়ে দেয়া।

ইয়ুর মারা যাওয়া নিয়ে ইয়োরুর কাহিনীর উপর আমার সন্দেহ হচ্ছিল।

ইয়োৰু ছাউনির দরজা খোলার আগেই জানত ওর বোন মৃত। ও শুধু অভিনয় করেছিল যে ঐ মুহূর্তে সে সেটা আবিস্কার করেছে।

কেন সে ওরকম করতে গেল? সে কি লুকাতে চাইছিল? ব্যাপারটা নিয়ে আমি যতই চিন্তা করছিলাম ততই মনে হচ্ছিল ওর বোনের মৃত্যুর পেছনে নিশ্চয়ই ওর কোন হাত আছে।

“আমরা এখানেই ইয়ুকে খুঁজে পেয়েছিলাম।”

ঘুরে দেখি দরজার কাছে মোরিনোর নানি দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি সিলিঙের দিকে।

“আমি শুনেছি সবাইকে চমকে দিতে গিয়ে ও মারা গিয়েছিল।”

উনি যেখানে তাকিয়ে ছিলেন সেদিকে তাকালাম। ওখানেই নিশ্চয়ই ইয়ুকে পাওয়া গিয়েছিল।

বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। উঠোনে ছিটকে পড়ার শব্দ শুনতে পারছিলাম। কিন্তু ছাউনির ভেতর বাইরের সব শব্দ যেন মিইয়ে গিয়েছিল। এমন কি তারপুলিনের উপর পড়া বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দও।

ছাদের ফুটো দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছিল, ঝড়ে যেটা ভেঙে গিয়েছিল কিন্তু ঠিক করা হয়নি। তাতে কোন সমস্যা হয়নি কারণ ছাউনির ভেতর তেমন কিছু ছিল না।

ছাউনির এক পাশে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে নারানি, কোদাল, কাস্তে ইত্যাদি রাখা ছিল। পাশে কাঁচি আর মোটা দড়ি রাখা।

কুকুরের দরজার পাশে অনেকরকমের দড়ি রাখা ছিল, যদিও কুকুর আর নেই। দড়িগুলো বিভিন্ন রঙের ছিল কিন্তু লাল রঙের একটা দড়ি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

“আমার সবকিছু একদম পরিস্কার মনে আছে,” মোরিনোর নানি আস্তে করে বললেন। আমি প্রতিবেশির বাসা থেকে এসে ছাতা ঠিক করে রাখছিলাম। ইয়োরু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল..”

ইয়োক ওর কাহিনী যেরকম বলেছিল তার সাথে ওর নানির কাহিনীর কোন পার্থক্য নেই। ইয়োরু নাশপাতির ব্যাগ দেখে ওর বোনকে ডাকতে ছুটে গেল। তারপর ছাউনির দরজা খুলে চিৎকার করল। পুরো গল্পে একটা মাত্র জিনিস আমার মনে খটকা লাগাচ্ছিল, সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার আগেই পায়ের নিচে অদ্ভুত কিছু একটা অনুভব করলাম।

পা মাটির সাথে আটকে যাচ্ছিল। মাটির মেঝে, ছাদের ফুটো দিয়ে আসা বৃষ্টিতে ভিজে নরম আর আঠালো হয়ে গিয়েছিল।

পা তুলতেই মাটিতে আমার জুতোর ছাপ দেখা গেল।

ইয়ু যেদিন মারা গেল সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। সেদিনও ছাউনির মেঝের অবস্থা নিশ্চয়ই এরকমই ছিল। কিন্তু আমার পায়ের ছাপ তেমন একটা গভীর ছিল না, আর যমজেরা তত বাচ্চা ছিল। ওদের ওজন আমার চেয়ে অনেক কম ছিল। ওদের কি এরকম পায়ের ছাপ পড়েছিল?

খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকালাম, কঠিন বৃষ্টি হচ্ছে। আজকের চেয়ে ঐদিন যদি বেশি বৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে মেঝেও অনেক ভেজা থাকার কথা, আর মেয়েদের পায়ের ছাপ পড়ার কথা।

ইয়ুর মারা যাওয়ার দিন দুপুরের দিকে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। বৃষ্টি শুরু হওয়ার একটু পরই ইয়ু ছাউনিতে গিয়েছিল। আর ইয়োরু বলেছিল ও বাড়ির ভেতরই ছিল। মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার সময় ইয়োৰু দরজার কাছে ছিল।

যদি মোরিনোর নানি ছাউনির ভেতর ইয়োরুর পায়ের ছাপ দেখে থাকেন তাহলে আমাকে যে গল্প শোনানো হয়েছে তা পুরোপুরি মিথ্যা। যদি ইয়োরুর পায়ের ছাপ ছাউনির ভেতর দেখা গিয়ে থাকে তার অর্থ ও আগেই সেখানে গিয়েছিল আর মৃতদেহ তখন আবিস্কার করেছিল।

“আপনি যখন ইয়ুকে পেলেন, তখন কি মেঝেতে কোন পায়ের ছাপ ছিল?”

যদিও আমার মনে হচ্ছিল না মোরিনোর নানি এরকম সূক্ষ্ম কোন কিছু মনে রাখবেন কিন্তু তারপরেও জিজ্ঞেস করার জন্য করলাম।

“হ্যাঁ, ইয়ুর পায়ের ছাপ ছিল,” মোরিনোর নানি বললেন। যে বাক্সর উপর ইয়ু দাঁড়িয়েছিল সেটা উলটে একদিকে পড়েছিল। নানি যখন সেটা ঠিক করতে গেলেন তখন ছোট পায়ের ছাপ দেখেছিলেন মেঝেতে।

যাক ভালো,আমি ভাবলাম। মাটিতে ইয়ুর পায়ের ছাপ পাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।

“আপনি দেখেই বুঝতে পারলেন যে ওগুলো ইয়ুর পায়ের ছাপ?”

“মেয়ে দুটো দেখতে একই রকম, তাই আমরা ওদের আলাদা রকমের জুতো পরাতাম। ইয়োরু পড়ত কালো জুতো, ইয়ু পরত সাদা জুতো। ওদের জুতোর সোলও ভিন্ন ছিল, আর মেঝেতে যে ছাপ ছিল তা যে ইয়ুর জুতোর ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।”

ইয়ুর আঁকা ছবিটা মনে পড়ল আমার। এখন রঙহীন জুতোর অর্থ বুঝতে পারলাম। তার মানে ওগুলো ইয়ুর জুতো ছিল। ইয়ু সিলিং থেকে ঝুলছিল। ওর পা ছিল খালি, ওর সাদা জুতোগুলো মেঝেতে রাখা ছিল। অন্য অনেক আত্মহত্যাকারীদের মত জুতোগুলো পাশে গুছিয়ে রাখা ছিল।

“ইয়োরুর পায়ের কোন ছাপ ছিল না?” আমি জানতে চাইলাম, সেফ নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

মোরিনোর নানি মাথা নাড়লেন, আমি নিজেকেই লাখি লাগালাম মনে মনে, কেন প্রশ্নটা করতে গেলাম। ইয়োর মৃতদেহ দেখার সময় ভেতরে ঢোকেনি। ওর পায়ের ছাপ না পাওয়া যাওয়ারই কথা। ছাউনিতে একজনেরই পায়ের ছাপ থাকার কথা।

“ইয়ুর বুকে বাঁধা দড়িটা কি এখনো আছে?”

মোরিনোর নানি মাথা নাড়লেন। দেখে মনে হলো তার মনে নেই। “যাইহোক, তোমার মনে হয় আজকে রাতে এখানে থেকে যাওয়াই ভালো হবে, বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে।”

আমি একটু চিন্তা করে রাজি হয়ে গেলাম।

ছাউনি থেকে বেরিয়ে আমরা বাড়িতে ফিরে গেলাম। মোরিনোর নানি আমাকে কয়েকটা জায়গার কথা বললেন যেখানে ভোলার জন্য ভালো ছবি পাওয়া যাবে।

“আসা করছি কালকে আবহাওয়া ভালো থাকবে,” তিনি বললেন।

জুতো খোলার সময় জুতার বাক্সের উপর রাখা জিনিসগুলোর মধ্যে ছোট একটা প্লাস্টিকের খেলনা আমার নজর কাড়ল। হাতে নিয়ে দেখলাম। একটা ছোট ফ্লাওয়ার ব্ৰচ। চকলেটের প্যাকেটে উপহার হিসেবে যেমন থাকে, সস্তা রঙ আর ডিজাইনের।

যমজ দু-জনের কার ছিল এটা? জিনিসটা দেখে আমার আবার মনে হলো ওরা যখন ছোট ছিল তখন এখানে থাকত।

ব্রুচটা হাতে নিয়ে হলওয়ের দিকে তাকালাম। মোরিনোর নানি ততক্ষণে লিভিং রুমে চলে গিয়েছেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম।

মনে মনে কল্পনা করছিলাম পুতুলের মত দেখতে দুটো যমজ বাচ্চা মেয়ে হলওয়ে দিয়ে হেঁটে আমার দিকে আসছে। ফিসফিস করে একজন আরেকজনের কানে কিছু বলছে, কি করে মৃত সাজা যায় সে নিয়ে নতুন কোন পরিকল্পনা করছে। আমার কল্পনায় ওরা হলের শেষ মাথায় গিয়ে বাঁকে হারিয়ে গেল। জুতো খুলে রেখে আমি তাদের ফলো করার চেষ্টা করলাম। যে বাঁকে তারা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেখানে গেলাম, অবশ্যই কেউ ছিল না সেখানে নিরব একটা অন্ধকার জায়গা, করিডোরের মলিন আলো জায়গাটা আলোকিত করতে পারেনি।

সোমবারে মোরিনো পাশ থেকে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। সে নিশ্চয়ই কৌতূহলবোধ করছিল, গ্রামে গিয়ে আমি কি কি করলাম তা জানতে চাইছিল। কিন্তু পুরো দিন আমি ওর দৃষ্টি উপেক্ষা করে গেলাম, ভান করলাম যেন খেয়ালই করিনি।

সেদিন শেষ ক্লাসের পর সব ছাত্রছাত্রি চলে না যাওয়া পর্যন্ত ওর সাথে কথা বললাম না। কয়েকজন আমাকে তাদের সাথে বাসায় যেতে বলেছিল, কিন্তু পাত্তা দেইনি-তার মানে এই না যে আমি কোন উত্তর দেইনি। আমার মন কোন কিছু চিন্তা না করেই বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত তৈরি করতে সক্ষম। আমার কোন ধারণা নেই কি অজুহাত বানিয়েছিলাম, ওগুলো নিজে নিজে তৈরি হয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যায়, আমাকে স্পর্শ করে না।

অবশেষে আমার ক্লাসমেটদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল, রুমের বাইরের হলে নিরবতা নেমে এল। ক্লাসে শুধু আমি আর মোরিনো ছিলাম। সে ওর সিটে কাত হয়ে বসেছিল, জাহাজ ডুবতে থাকলে যেমন দেখায়। আর পাশ থেকে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।

ধীরে-সুস্থে ওর সিটের দিকে গেলাম। জানালা থেকে তিন সারি দুরে সে বসে ছিল, পেছন থেকেও তিন সারি।

“শুনলাম তুমি নাকি গ্রামে রাতটা কাটিয়েছ। নানি ফোন করে বলল আমাকে।” ঘুমন্ত সুরে বলল মোরিনো। ওর চোখের নিচের দাগগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে।

“উনি ভালো রাঁধুনি।”

আমি ওর সামনের সিটে বসলাম, জানালার পাশের সারিতে। বাইরে তখনো আলো ছিল। আকাশের রঙ খানিকটা হলদেটে বর্ণ ধারন করেছে। দূরে স্পোর্টস টিমের হৈচৈ এর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। রুমের আলো নেভানো ছিল, আলো যা ছিল তার পুরোটাই জানালা দিয়ে আসছে।

“তুমি এক সময় যে বাড়িতে থাকতে সেখানের কিছু কাহিনী শুনলাম।”

“যেমন?”

“যেমন তুমি আর তোমার বোন ছোট থাকতে যেসব মজা করতে। তারপর ইয়োরুকে যত বকা দেয়া হোক সে কখনোই কাঁদত না, কিন্তু ইয়ু সাথে সাথে কেঁদে ফেলত, বোনের পেছনে গিয়ে লুকাত।”

“ও সব সময় আমার উপর নির্ভর করত।”

আমরা লম্বা এক মুহূর্ত চুপ করে বসে থাকলাম। বাতাসে অদ্ভুত একটা টানটান ব্যাপার ছিল। আমি আবার ওর দিকে তাকালাম।

“মোরিনো ইয়ুর ব্যাপারে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আমি সব খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে নিশ্চিত নই কিন্তু..”

মোরিনো আমার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে দূরে তাকাল, তারপর চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওর চোখের গাঢ় দাগগুলোর উপর চোখের পাতাগুলো কাঁপছিল।

“আমি ধরে নিয়েছিলাম তুমি জানবে,” সে কর্কশ কন্ঠে বলল। সে জানতে চাইল কি কি জেনেছি আমি।

“ইয়ু মারা গিয়েছিল আট বছর বয়সে, এখন থেকে নয় বছর আগে, আমি বললাম। মোরিনো ওর চোখ খুলল না। “নয় বছর আগে সেই দিনে, ছাউনির ভেতর তুমি ওর দেহ ঝুলতে থাকা অবস্থায় পেয়েছিলে তারপর তোমার নানিকে গিয়ে বলেছিলে। কিন্তু তুমি আগেই জানতে যে মৃতদেহটা সেখানে ছিল। তুমি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কারো আসার অপেক্ষায় ছিলে যাতে তুমি অভিনয় করতে পার যে তার চোখের সামনেই তুমি মৃতদেহটা আবিস্কার করেছ।”

আমি চুপ করলাম, ওর প্রতিক্রিয়া খেয়াল করছিলাম। সে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল তারপর বলল আর কিছু বলার আছে কিনা।

“তুমি এর আগেই জানতে যে তোমার বোন মৃত। কিন্তু তুমি অভিনয় করছিলে, সত্য লুকাতে চাইছিলে। আমি চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করছিলাম কেন তুমি এরকম কিছু একটা করতে পার। তারপর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, তোমার বোনের মৃত্যুর সাথে তোমার কোনভাবে সম্পর্ক ছিল।”

মোরিনো মাথা ঝাঁকাল।

আমি বলে চললাম, “ইয়ু সিলিঙের বিম থেকে দুটো দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। একটা ছিল ওর গলায় প্যাঁচানো, আরেকটা বুকে, যাতে শরীরের ভার নিতে পারে।”

আট বছর বয়সি মেয়েটা কাঠের বাক্সের উপর থেকে লাফ দিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য হয়তো মনে হচ্ছিল যে ও গলার দড়িটা দিয়ে ঝুলছে। কিন্তু আসলে সে তার বুকের দড়িটা দিয়ে ঝুলছিল যাতে পড়ে না যায়।

এরপর আরেকজন মেয়ে এল, যার চেহারাও একই রকম। সেই মেয়েটা দেয়ালের পাশ থেকে একটা কাঁচি তুলে নিল। তারপর ঝুলতে থাকা মেয়েটার কাছে গিয়ে বুকের সাথে দড়িটা কেটে দিল।

দড়িটা কেটে ফেলায়, মেয়েটা শুধু গলার দড়িটা দিয়ে ঝুলছিল।

“তুমি ওকে খুন করেছিলে।”

মোরিনো অল্প খানিকটা চোখ খুলল, আমার দিকে তাকাচ্ছিল না কোন কিছুর দিকেই তাকাচ্ছিল না।

“পায়ের ছাপের কথা কিছু শুনোনি? ছাউনির কোথাও আমার পায়ের ছাপ ছিল না।”

আমি কল্পনা করলাম মেয়েটা খালি পায়ে ঝুলে আছে। বৃষ্টিতে মাটি ভিজে নরম হয়ে ছিল।

“না, ছাউনির সবখানে তোমার পায়ের ছাপ ছিল। কিন্তু কেউ সত্যটা বুঝতে পারেনি। দড়ি কেটে ওকে খুন করার পর তুমি মাটিতে সবখানে তোমার পায়ের ছাপ দেখতে পেলে। আর তুমি বুঝতে পারলে যে কেউ ওগুলো দেখলে সন্দেহ জাগবেই। সুতরাং তোমাকে কিছু একটা করতেহবে..”

মোরিনো ঝুলন্ত লাশ আর মাটিতে পায়ের ছাপ দেখে বুঝল ঝামেলায় পড়ে গিয়েছে। তারপর সে দেখল জুতোগুলো মাটিতে সাজিয়ে রাখা। তখন সে একটা বুদ্ধি বের করল।

সে নিজের জুতো জোড়া খুলে, একটা বাক্সর উপর উঠে গেল। খেয়াল রাখল যেন নতুন করে কোন পায়ের ছাপ পড়ে। তারপর ঝুলন্ত লাশের নিচে রাখা জুতোজোড়া নিয়ে পড়ল, আর নিজেরগুলো সে জায়গায় রেখে দিল।

এখন পায়ের ছাপগুলো মৃত মেয়েটার হয়ে গেল।

“তারপর তোমার একমাত্র কাজ ছিল কুকুরের দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। ঐ জায়গার মাটি তখনো শুকনো ছিল, তাই কোন ছাপ পড়েনি মাটিতে।”

অবশেষে মোরিনো ওর চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল। “কিন্তু আমার মোটিভ কি?”

“ঘৃণা।” আমি বললাম।

মোরিনোকে খুবই দুঃখি দেখাল। “তুমি যখন বললে ‘মোরিনো ইয়ুর ব্যাপারে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি,’ আমি বুঝতে পেরেছিলাম ধরা পড়ে গিয়েছি।”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

ব্যাপারটা আমাকে হতবাক করেছিল-কেন ওর নানি এত নিশ্চিত ছিলেন যে সামনে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা ইয়োরু ছিল? ওরা তো যমজ, একদম একইরকম দেখতে-কেউ আলাদা করে চিনতে পারত না ওদেরকে।

কিন্তু ও যদি কালো জুতা পড়ে থাকে তাহলে সন্দেহ করার কোন সুযোগ ছিল না।

“এই নয় বছর নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট করে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে যে তুমি আসলে মোরিনো ইয়ু।”

মোরিনো আসলে মোরিনো ইয়োরু না, ও হল মোরিনো ইয়ু।

***

একদল মেয়ে হল দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।

মোরিনো ইয় চুপ করে তাদের হাসাহাসি শুনল কিছুক্ষনের জন্য, ওদের কণ্ঠস্বর কমে কমে আবার নিরব হয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

“তুমি ঠিকই ধরেছ,” সে বলল। “আমিই ছোট বোনটা। আমিই সবসময় কান্নাকাটি করতাম, আমার উপরই সব আদেশ করা হতো।” তারপর ভুরু কুঁচকে আমাকে প্রশ্ন করল। কিন্তু তুমি কিভাবে জানলে?”

“ইয়ু জানত না, লোকজন আত্মহত্যা করার আগে জুতো খুলে নেয়। ঐ ব্যাপারটাই সবকিছু পরিস্কার করে দিয়েছে। তোমরা যখন আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলতে তখন হয়তো ইয়োরু তোমাকে বলেছিল কিন্তু আমার ধারণা তুমি ভুলে গিয়েছিলে।”

আমি ওকে বললাম ওদের বাড়িতে যেসব ড্রয়িং দেখেছি। যে ড্রয়িংগুলোতে তারা নিজেদের আত্মহত্যা খেলার ছবি এঁকেছিল।

“ঐ ডুয়িংগুলো করা হয়েছিল নয় বছর আগের গ্রীষ্মের ছুটির সময়, ইয়োরুর মৃত্যুর ঠিক আগে আগে। তার মানে হলো ড্রয়িংগুলো ঐ সময়ে, মৃত্যুর আগে ইয়োরুর ব্যক্তিত্ব কেমন ছিল তাও তুলে ধরে।”

ইয়োরু আর ইয়ু একই জিনিস এঁকেছিল, কিন্তু তারপরেও ওদের আঁকার মধ্যে কিছু পার্থক্য ছিল। ইয়ুর আঁকা ছবিতে, দুই মেয়েই জুতো পড়েছিল। কিন্তু ইয়োরুর ছবিতে দুই মেয়েরই পুরো পা রঙ করা ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম ইয়ু বোধহয় ডিটেইলিং বেশি করেছে, কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত বদলেছি।

আমার মনে হতে লাগল ইয়োরুই আসলে ঠিক মত এঁকেছে, তার স্মৃতি থেকে। ইয়ুর ছবিতে সূর্য ছিল, কিন্তু ইয়োরুর ছবিতে ছিল ধূসর ব্যাকগ্রাউন্ড-আরেকটা সূত্র। বাস স্টপে বসে সেদিন মোরিনো আমাকে তাদের আত্মহত্যা খেলার কথা যখন বলেছিল, তখন বলেছিল দিনটা ছিল বৃষ্টির দিন। ব্যাপারটা এমন না যে ইয়োৰু জুতো আঁকতে ভুলে গিয়েছিল-আসলে তারা দুজনেই খালি পায়ে ছিল।

“তুমি নিজেই বাস স্টপে বলেছিলে যে তুমি মৃত্যু সম্পর্কে ইয়ুর চেয়ে বেশি জানো, তুমি ওর চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর ছিলে। তুমি ইয়োরু হিসেবে বলেছিলে কথাটা, তার মানে একজন শিশু হলেও ইয়োৰু নিশ্চয়ই এই অদ্ভুত নিয়ম জানত যে লোকজন আত্মহত্যা করার আগে তাদের জুতো খুলে নেয়।”

যমজ দু-জন যখন আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলেছিল তখন নিশ্চয়ই তাদের জুতো খুলে পাশে রেখে দিয়েছিল। ইয়োরু জানত তাই তোমাকে তাই করতে বলেছিল। ওর জ্ঞান ওর ড্রয়িঙে প্রতিফলিত হয়েছিল।

কিন্তু ইয়ুর ক্ষেত্রে তা হয়নি। খেলার সময় ইয়ু জুতো খুললেও পরে ভুলে গিয়েছিল। কারণ ও এই অদ্ভুত নিয়মের কথা জানত না। যে কারনে ওর ড্রয়িঙে জুতো পরে আত্মহত্যা আঁকা ছিল।

অথচ ছাউনির লাশটা খালি পায়ে ছিল। ইয়ু যদি খেলতে খেলতে দুর্ঘটনাবশত আত্মহত্যা করে ফেলে তাহলে তার পায়ে জুতো থাকার কথা।

ইয়ু চুপ করে শুনছিল, তারপর ওর ঠোঁটজোড়া অল্প খানিকটা ফাঁকা হলো কথা বলার জন্য। আমার কালো জুতো পরা বোন মারা গিয়েছিল। হয়তো আমি ওকে একটু আধটু ঘৃণা করতাম ঠিকই। কিন্তু তোমার অনুমান পুরোপুরি সঠিক নয়।” ওর স্বর একদম শান্ত ছিল। “তুমি ওর বুকে জড়ানো দড়িটা দেখনি তাই না? আমি কাটিনি, ওটা নিজেই ছিঁড়ে গিয়েছিল।”

সেদিন দুপুরে, ওর বড় বোন ইয়োরু প্রস্তাব দিল তারা আত্মহত্যা করার ভান করে সবাইকে চমকে দেবে।

ইয়ু রাজি হলো। তারা যেই ছাউনিতে কাজ শুরু করল তখনই বৃষ্টি শুরু হলো।

কুকুরটা তখনো বেঁচে ছিল। অবাক হয়ে ওদের কাজ কারবার দেখছিল।

“আমার বোন বাক্সগুলো জড়ো করল, বিম থেকে দড়ি লাগাল। আমি নিচে ছিলাম, খেয়াল রাখছিলাম বাক্সগুলো যাতে নড়াচড়া করে পড়ে না যায়।”

বৃষ্টিতে মেঝে নরম হওয়ার আগেই ইয়োৰু বাক্সগুলোর উপরে ছিল, তাই মাটিতে ওর পায়ের কোন ছাপ ছিল না।

ইয়োৰু একা আত্মহত্যার ভান করবে, আর ইয়ুর কাজ ছিল কাউকে সেখানে দেখাতে নিয়ে যাওয়া। ওদের প্রস্তুতি চলছিল, ইয়োরু দুটো দড়িই জায়গামত বেঁধে ফেলল।

“তারপর আমার বোন লাফ দিল।

ইয়োরু লাথি দিয়ে বাক্সগুলো সরিয়ে দিয়ে পড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য দেখে মনে হচ্ছিল যে ও গলা থেকেই ঝুলছে, যদিও ও আসলে বুকের সাথে লাগানো দড়ি থেকে ঝুলছিল।

সে নিচে ইয়ুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল। “লোকজনকে বোকা বানানোর সময় ও সবসময় একটু মুচকি দিয়ে হাসত। বাসার কারো সাথে কথা বলার সময় কোন অভিব্যক্তি দেখাত না, শুধু কাউকে বোকা বানানোর সময় মনে হত ও আনন্দ পেত।”

কিন্তু এক মুহূর্ত পর ওর বুকের দড়িটা ছিঁড়ে গেল।

“আমি কিছুই করিনি। দড়িটা আমার বোনের ভার সহ্য করার মত শক্ত ছিল না। সিলিঙের কাছ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল। তুমি যদি দড়িটা দেখতে তাহলে ঠিকভাবে অনুমানটা করতে পারতে। ওটা এত উঁচুতে ছিঁড়েছিল যেখানে আমার পক্ষে কাটা সম্ভব ছিল না।”

ইয়োরু এক মুহূর্ত সেখানে ঝুলে থাকল।

“আমি দ্রুত সাহায্য করতে চেষ্টা করলাম। আমি আমার হাত দিয়ে ওর শরীর জড়িয়ে ওকে উঁচু করে ধরার চেষ্টা করলাম। ওকে শূন্যে ধরে রেখেছিলাম, চেষ্টা করছিলাম যেন ঝুলে না পড়ে।”

ছাউনির ভেতর একটা মেয়ে সিলিং থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে, আরেকজন হুবহু একইরকম দেখতে একটা মেয়ে তাকে ধরে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। ঝুলন্ত মেয়েটা ধস্তাধস্তি করছিল, ওর পা বাতাসে লাখি ছুঁড়ছিল। পাশে বাঁধা কুকুরটা ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করছিল। মেয়েটার সংগ্রাম আর কুকুরের চিৎকার একসাথে ছোট ঘরটায় কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সময় অনন্তকালের জন্য এক জায়গায় এসে থেমে গিয়েছে।

“আমি আমার বোনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করেছিলাম। আমার গায়ে তেমন একটা শক্তি ছিল না কিন্তু তারপরেও আমি ওকে তুলে ধরে রেখেছিলাম। ও চিৎকার করছিল, ওর লাথি ছুটে এসে আমার গায়ে লাগছিল।”

মোরিনো ওর চেয়ারে বাঁকা হয়ে বসল। রুমের অন্যপাশের দেয়ালের দিকে তাকিয়েছিল, যেন সেদিনের সব দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। স্মৃতিগুলো ওর কাছে এখন দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।

ইয়ু ছেড়ে দিলে ওর বোন পড়ে যাবে আর গলায় দড়ি শক্ত করে বসে যাবে।

ইয়োরুর চোখ আতংকে বেরিয়ে আসছিল, বোনকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছিল-কিন্তু ওর চিৎকারে কোন উৎসাহ ছিল না।

“ও বলছিল, ‘ভাল করে ধর, শক্ত করে ধর গাধা কোথাকার..” মোরিনো চোখ চেপে বন্ধ করে ছিল, আবেগ আটকানোর চেষ্টা করছিল। “এটা যখন আমার কানে গেল আমি ওকে ছেড়ে দিলাম, আর বাঁচানোর চেষ্টা করলাম না।”

ইয়োরুর দেহ ঝুলে পড়ল।

মাটি থেকে একটু উপরে ওর পা থেমে গেল। ইয়োক জুতো পড়ে ছিল না, খালি পায়ে ছিল। ওর পায়ের আঙুলগুলো ছড়িয়ে গিয়ে পেশিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। কুকুরটা গলা ছেড়ে চিৎকার করতে থাকলে সেই শব্দে ইয়ুর কান ব্যথা করছিল। এই খিচুনির দৃশ্য আর কুকুরের চিৎকার ওর মনের গভীরে গেঁথে যায়।

“অবশেষে এক সময় ওর দেহ নিস্তেজ হয়ে আসে, পা নড়াচড়া থামিয়ে দিল।”

ইয়ু পেছনে যেতে গিয়ে টের পেল মাটি ওর জুতো টেনে ধরেছে। পায়ের ছাপ পড়ল মেঝেতে।

“শুধু আমার একার ওজন হলে হয়তো কোন ছাপ পড়ত না।” ওর বোনের জুতো জোড়া পাশেই মাটিতে রাখা ছিল।

“ওগুলো চোখে পড়তেই আমি ঠিক করলাম সবার কাছে মিথ্যা বলব। আমার সব স্পষ্ট মনে আছে…ছোট ছাউনিটাতে…আমার বোনের মৃতদেহ হালকা দুলছিল, ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত।”

ছোট মেয়েটার ছোট মাথাটা দ্রুত চিন্তা করল আর নিজের সামনে একটা রাস্তা দেখতে পেল। নিজের সাদা জুতো খুলে কালো জুতো জোড়া পড়ল। তারপর জায়গা মত রেখে দিল। তারপর শুকনো মাটির উপর দিয়ে হেঁটে কুকুরের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে গেল। কালো জুতোর কারনে সবাই ওকে ইয়োরু বলে ধরে নিল। যে কারনে ও নিজেকে ইয়োৰু পরিচয় দিতে লাগল আর ইয়োরুর মত ব্যবহার করতে লাগল।

“আমি আগের মত আর হাসতে পারতাম না। আমার বোনের মত শ্য মুখ করে রাখতে হত আমাকে। আমরা সবসময় একসাথে থাকতাম বলে ও কেমন ছিল তা আমার ভালো মত জানা ছিল। সহজেই ওর মত অভিনয় করতে পারতাম। গত নয় বছরে কেউ সন্দেহ করেনি যে আমি ইয়।”

সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

আট বছর বয়সে সে নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখল। জীবনের বেশিরভাগ সময় ওর নিজের আসল নাম ছাড়াই পার হয়ে গেল। কেউ জানতে পারল না ওর ভেতরে কি চলছিল, অনুভূতিগুলো পুঞ্জিভুত হয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে এল। ও নিজের হাত কেটে ফেলল…আর এ সবকিছু ঘটল ওর বোনের কারনে, আর বোনের সাথে চাপা দেয়া ওর নামটার কারনে। বাচ্চা মেয়েটা যে পথ বেছে নিয়েছিল, যার উপর ওর জীবন নির্ভর করছিল, তা ছিল কষ্ট আর একাকিত্বে ভরপুর।

জানালা দিয়ে আসা আলো কমে আসছে, সোনালি দেখাচ্ছে। মলিন হলুদ পর্দাগুলো অর্ধেক টানা থাকায় সূর্যের আলো কমে গিয়েছে। মাঠ থেকে আসা বেজবল প্র্যাকটিসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি, বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলছে। শূন্য ক্লাসরুমের ঘড়িটা নিরবে টিকটিক করে যাচ্ছে।

একসময় মোরিনো ওর মুখ খুলল, যদিও নিশ্চিত ছিল না কি বলবে। “তোমার কি মনে আছে আমাদের কোথায় আর কিভাবে প্রথম দেখা হয়েছিল?”

আমার বিশ্বাস সেটা এই ক্লাসরুমেই হয়েছিল, হাই স্কুলের সেকেন্ড ইয়ারের শুরুতে। শুনে ও একটু আশাহত হলো মনে হয়।

“হয়নি, জুনিয়র হাই তে থাকতে। তোমাকে মিউজিয়ামে দেখেছিলাম আমি, একটা মানবদেহের টুকরো অংশগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছিলে। তারপরের বসন্তে যখন আমরা হাই স্কুলে উঠলাম তখন তোমাকে দেখলাম লাইব্রেরিতে বসে ময়নাতদন্তের উপর একটা মেডিক্যাল বই পড়ছ। দেখা মাত্র তোমাকে চিনেছিলাম আমি।”

সেকারনেই সে জানত আমি ক্লাসে অভিনয় করছি সবার সাথে। এখন বুঝতে পারলাম। আমরা একজন আরেকজনের লুকিয়ে রাখা রূপ ঠিকই ধরতে পেরেছি, আর কেউ না পারলেও।

“আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তুমি যখন ইয়ু ছিলে তখন আসলেই হাসতে।”

“আসলেই। একসময় আমি ওরকম ছিলাম। কিন্তু ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসার পর ভাবলাম যদি আমি হেসে ফেলি তাহলে লোকজন বুঝে ফেলবে আমি ইয়। নয় বছর আমি চেষ্টা করেছি কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করতে, আমার বোনে পরিণত হতে। আর এখন আমি হাসতে পারি না, চেষ্টা করলেও পারব না।”

ওকে খানিকটা হতাশ দেখাল। আমার থেকে অন্যদিকে তাকিয়ে সে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমিই প্রথম আমাকে আমার নাম ধরে ডাকবে।”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। “তোমার জন্য আমার কাছে একটা জিনিস আছে, গ্রাম থেকে ফেরার সময় আমি এটা তোমার বাড়ি থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছি।”

ডেস্কের উপর রাখা আমার ব্যাগ থেকে জিনিসটা বের করলাম। “কি জিনিস?” না দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল সে

“যে দড়িটা তুমি খুঁজছিলে। আমার ধারণা এটা নিখুঁতভাবে মিলে যাবে, চোখ বন্ধ কর-আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।”

মোরিনো তখনও বসে ছিল, চোখ বন্ধ করল। আমি ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর ছোট কাঁধগুলো শক্ত হয়ে গেল, টেনশনে।

আমি লাল দড়িটা ওর গলায় পেচালাম। দড়িটা নোংরা হয়ে ছিল। ছাউনির ভেতর ছিল এটা, যেখানে কুকুরটা বাঁধা থাকত।

“আমি এখন এও জানি কেন তুমি এত কুকুর ঘৃণা কর।”

আমি আস্তে করে দড়িটা টাইট করলাম।

চাপ বাড়তে ওর কাঁধ কেঁপে উঠল। এক মুহূর্ত আমি থেমে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর গেরোটা দিয়ে ছেড়ে দিলাম। দড়ির বাকি অংশ ওর কাঁধে ঝুলতে থাকল।

“হ্যাঁ…এটাই দরকার ছিল..” সে শ্বাস ছাড়ল। সেই সাথে সমস্ত টেনশন যেন ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর ভেতরটা যেন হালকা হয়ে গেল।

কুকুরের দড়িটা থেকে ইয়োরু মারা গিয়েছিল, মোরিনোর স্মৃতির গভীরে সেই তথ্য কোথাও লুকিয়ে ছিল। সে কখনো বুঝতে পারেনি যেই দড়িটা সে খুঁজছিল তা ওর বোনকে খুন করার জন্য দায়ি ছিল।

“আমি কখনো আমার বোনকে ঘণা করিনি। সে অনেক সময়ই অনেক জঘন্য কাজ করেছে, কিন্তু ওর জায়গা কখনো আর কেউ নিতে পারবে না…”

আমি আমার ব্যাগটা তুলে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওর সিটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবারের জন্য ঘুরে ওর দিকে তাকালাম। ও ওর চেয়ারে বসেছে। পা সামনে ছড়ানো। হাত দুটো বুকের উপর রাখা। লাল দড়িটা গলা থেকে পিঠের উপর ঝুলছে।

ওর চোখ বন্ধ। ওর গাল সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করছে, মনে হচ্ছে যেন আলো দিয়ে তৈরি।

এক বিন্দু অশ্রু ওর গাল বেয়ে নেমে ইউনিফর্মের উপর পড়ল।

ওকে সেখানে একা রেখে ক্লাসরুমের দরজা নিঃশব্দে বন্ধ করে বেরিয়ে গেলাম আমি।

স্মৃতি/ যমজ

আমার একজন ক্লাসমেট আছে যার বংশের পদবি মোরিনো। আমাদের মধ্যে মাঝে মাঝে কথা হয়। ওর আসল নাম ইয়োরু। পুরো নাম-মোরিনো ইয়োরু, যার অর্থ “রাতের অরণ্য।” ওর চোখ চুল সব ঘন কালো। আমাদের স্কুলের ইউনিফর্মও কালো, আর মোরিনো সবসময় কালো জুতা পড়ত। কালোর বাইরে একমাত্র অন্য রং বলতে ওর পোষাকে যেটা ছিল সেটা হল ইউনিফর্মের লাল স্কার্ফ।

মোরিনোর কালো পোশাক-পরিচ্ছদের সাথে ইয়োৰু নামটা ভালো যায়। কালোর প্রতি ওর ভালবাসা এত বেশি যে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যদি রাতের আঁধারকে মানুষের রূপ দেয়া হয় তাহলে সেটা দেখতে ওর মতই লাগবে।

এত সব কালোর বিপরীতে ওর ত্বকের রং ছিল চাঁদের মত ফ্যাকাসে সাদা। মনে হত জীবনে কোনদিন সূর্যের মুখ দেখেনি। ওকে রক্ত মাংসের মানুষও মনে হত না, যেন পোরসেলিন দিয়ে বানানো। ওর বাম চোখের নিচে ছোট্ট একটা তিল ছিল, যে কারনে ওকে আরো রহস্যময়ি লাগত। মনে হত যেন একজন ভবিষ্যৎ বক্তা।

এরকম একটা মেয়েকে আমি একবার একটা সিনেমাতে দেখেছিলাম। সিনেমার শুরুতে এক দম্পতিকে পানিতে ডুবে মরতে দেখিয়েছিল। পুরো সিনেমার বাকিটা ছিল মৃত্যুর পর তাদের জীবন নিয়ে। মূল চরিত্রগুলো ভূত ছিল, সাধারণ মানুষরা তাদের চোখে দেখতে পারত না। কিন্তু একজন মেয়েকে পাওয়া গেল যে তাদের দেখতে পেত। সেই মেয়েটাই সিনেমাটার নায়িকা, নাম ছিল নিডিয়া।

“আমাকে আসলে অর্ধমৃত বলা যায়,” নিডিয়া ব্যাখ্যা করেছিল কেন সে ভূত দেখতে পায়। “আমার হৃদয় আঁধারে পরিপূর্ণ।”

নিডিয়ারও সব পোশাক ছিল কালো আর তুকের রং ছিল ফ্যাকাসে। সে ঘরের বাইরে বের হত না। বাইরে যাওয়ার বদলে বাসায় বসে বই পড়তে পছন্দ করত। আর ওকে দেখে মনে হত পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

লোকজন ওর মত মানুষদেরকে “গ” বলে ডাকত। গথ বলতে আসলে একটা সংস্কৃতি, একটা ফ্যাশন, আর একটা স্টাইলকে বুঝায়। অনলাইনে ‘গথ’ কিংবা ‘গসু সার্চ দিলে হাজার হাজার পেইজ পাওয়া যাবে। ‘গথিক’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ‘গথ’, কিন্তু এই নামের ইউরোপিয়ান স্থাপত্য স্টাইলের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বরং ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের জনপ্রিয় গথিক হরর উপন্যাসের সাথেই এর মূল সম্পর্ক। যেমন ‘ফ্রাঙ্কেন্সটাইন’ কিংবা ‘ড্রাকুলা।’

মোরিনোকে চোখ বন্ধ করে গথ বলা চলে। অত্যাচারের প্রক্রিয়া কিংবা হত্যা করার যন্ত্রপাতির প্রতি ওর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। মানুষের অন্ধকার দিক নিয়েও ওর আগ্রহ প্রচুর যা গথদের মধ্যে কমন।

মোরিনো প্রায় কখনোই কারো সাথে কথা বলে না। আমাদের স্বাস্থ্যবান, হাউকাউ করা ক্লাসমেটদের সাথে ওর বিন্দুমাত্র কোন মিল নেই। কোন ক্লাসমেট যদি হেসে ওর সাথে কথা বলে তাহলে মোরিনো সেফ ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে, ওর শূন্য অভিব্যক্তি অপরিবর্তিত রেখে শুধু বলবে “ওহ আচ্ছা।” তারপরেও কেউ যদি ওর কাছ থেকে কোন উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে তাহলে তাকে ব্যর্থ মনে ফেরত যেতে হবে কারণ মোরিনো আর কিছুই বলবে না।

বশির ভাগ মানুষই ওর সাথে কথা বলতে এলে এরকম উপেক্ষার শিকার হয়। ক্লাসের মেয়েরা কথা বলার অনেক চেষ্টা করে শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

ওর এই হাবভাব ওর চারপাশে একটা দেয়াল তৈরি করে, সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখে। সবাই যখন গল্প করছে কিংবা হাসাহাসি করছে, তখন দেখা যায় মোরিনো কোথাও চুপচাপ একাকি বসে আছে। তখন ওকে দেখে মনে হয় যেন অন্য কোন জগতে চলে গিয়েছে, কিংবা ও যেখানে বসে আছে সেখানে কোন কিছুর ছায়া পড়েছে।

কিন্তু মোরিনো আসলে ইচ্ছা করে কাউকে উপেক্ষা করত না। ওর সাথে কিছুদিন কথা বলার পর আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি। ও আসলে হাসিখুশিভাবে কথা বলতে পারত না, মানুষটাই ওরকম ছিল। অন্যদের সাথে ওর কোন সমস্যা নেই। ও সবার থেকেই সমান দূরত্ব বজায় রেখে চলত।

ভালোভাবে ওকে পর্যবেক্ষণ করার পর আমি সমস্যাটা বুঝতে পারলাম। মোরিনো যখন কারো সাথে কথা বলত তখন সে আসলে বুঝতে পারত না কি প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে, উত্তর দেয়ার মত কিছু সে খুঁজে পেত না। কিন্তু এর পুরোটাই স্রেফ আমার অনুমান ছিল, সত্যি সত্যি সে কী ভাবত তা আসলে আমি জানতাম না। বেশিরভাগ সময়ে তার কোন অভিব্যক্তি দেখা যেত না। যে কারনে ও কী ভাবছে তা কল্পনা করা দুরূহ ছিল।

আমাদের প্রথম আলাপ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হয়েছিল ও হয়তো কোন ধরনের পুতুল-টুতুল হবে। ওর প্রতিক্রিয়া মানুষের চেয়ে কোন জড়বস্তুর সাথেই বেশি মিলে।

***

অক্টোবরের এক বুধবার। গাছের পাতাগুলো তখন সবুজ থেকে লাল হতে শুরু করেছে। মোরিনো মাথা নিচু করে এসে ক্লাসে ঢুকল। ক্লাসের উপস্থিত সবাই সাথে সাথে থেমে গেল। ওর লম্বা ঘন কালো চুলগুলো মুখ ঢেকে রেখেছিল। ওর ধীর গতির পা টেনে টেনে হাঁটা দেখতে কেমন জানি ভূতুড়ে লাগত। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই হয়তো ভাবত ওকে দেখতে ভুতের মত লাগে-কিন্তু ওর আশেপাশের পরিবেশ অন্য রকম, আরো বিপজ্জনক কিছু মনে হয়। যেন কোন বন্য প্রাণী।

ওর চারপাশের দেয়াল যেন স্বচ্ছ কোন গোলক যেটায় সুচালো পেরেক লাগানো আছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ ওর কাছাকাছি এলে ও তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। বরাবরের মতই ও নির্বাক ছিল, আর কেউই ওর সাথে যেচে পড়ে কথাও বলতে গেল না। কিন্তু তারপরেও ওর মুড সেদিন অন্যরকম লাগছিল। ওর কাছাকাছি যারা বসে ছিল তাদের মুখেও টেনশনের ছায়া দেখা যাচ্ছিল।

আমার অতটা কৌতূহল হচ্ছিল না। আমি ধরে নিয়েছিলাম কোন কারনে হয়তো ওর মেজাজ খারাপ। সেদিন আর পরে আমাদের কথা বলার সুযোগ হয়নি। সুতরাং কারনটাও আর জানা সম্ভব হয়নি (আমি যখন আমার ক্লাসমেটদের সাথে কথা বলি তখন মোরিনো আমার সাথে কথা বলে না। কারণটা জানা গেল পরেরদিন, স্কুল ছুটির পর।

হোমরুম শেষ হওয়ার পর সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল। ক্লাস এত নিরব হয়ে গেল যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না একটু আগে এখানে কি রকম হাউকাউ হচ্ছিল। শুধু খালি ডেস্কগুলো, মোরিনো আর আমি রুমে থেকে গিয়েছিলাম।

জানালা দিয়ে আরামদায়ক ঠান্ডা বাতাস এসে ঢুকল। আমাদের পাশের ক্লাস তখনো ছুটি হয়নি। হলের অন্য মাথা থেকে টিচারের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল।

মোরিনো ওর সিটে বসা, হাতগুলো পাশে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঝুলছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ ক্লান্ত।

“আমার ঘুম হচ্ছে না,” হাই তুলতে তুলতে বলল সে। ওর চোখের নিচে কালি জমেছিল। চোখগুলো আধবোজা হয়ে ছিল, এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন দূরে কিছু একটা দেখছে।

আমি আমার সিটে বসে ছিলাম, বাসায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। ওর সিট রুমের একদম অন্য কোণায়। রুমে আর কেউ ছিল না বলে ওর কথা ভালো মতই শুনতে পেলাম, কাছাকাছি যেতে হলো না।

“এ কারনেই কি তুমি কালকে অদ্ভুত আচরণ করছিলে?”

“এরকম হয় মাঝে মাঝে। যত চেষ্টা করি না কেন ঘুম আসে না। ইনসমনিয়া হয়তো।”

সে উঠে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল ঘুমে পড়ে যাচ্ছে, টলতে টলতে ব্ল্যাক বোর্ডের দিকে এগুলো।

রুমের সামনে একটা আউটলেট ছিল। একটা কর্ড দিয়ে সেটার সাথে ইরেজার ক্লিনার লাগানো। মোরিনো সেই কর্ডটা নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।

“নাহ ঠিক লাগছে না,” সে মাথা নাড়তে নাড়তে কর্ডটা খুলে রাখল। “আমি যখন ঘুমাতে পারি না তখন গলায় কিছু একটা পেঁচিয়ে চোখ বন্ধ করি। কল্পনা করি গলায় ফাঁস দিয়ে আমাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। তখন ঘুম আসে-গভীর পানিতে ডুবে যাওয়ার মত অনুভূতি হয়।”

আমার বিরক্ত লাগছিল। ও কি অনিদ্রার চোটে পাগল হয়ে গেল নাকি? “এতে যদি উপকার হয় তাহলে করছো না কেন?”

“যেকোন দড়ি পেঁচালেই হবে না।”

মোরিনো একটা বিশেষ ধরনের দড়ি খুঁজছিল, ইরেজার ক্লিনারের সাথের কর্ডটা দিয়ে সে কাজ হবে না।

“আমি যেটা ব্যবহার করতাম সেটা হারিয়ে ফেলেছি। নতুন একটা খুঁজছি কিন্তু..” সে হাই তুলল। “আমি জানি না আসলে কি খুঁজছি। খুঁজে পেলে ইনসমনিয়াকে গুডবাই দিতাম।”

“আগে কি ব্যবহার করতে?”

“জানি না। এমনি খুঁজে পেয়েছিলাম। ওটা ছাড়া ঘুমাতে পারার পর কোথায় রেখেছিলাম ভুলে গিয়েছি।”

চোখ বন্ধ করে গলায় হাত বুলালো। “আমার শুধু মনে আছে জিনিসটা কেমন লাগত..” ঝট করে চোখ খুলল যেন হঠাৎ কোন আইডিয়া এসেছে মাথায়। “চল দড়ি কিনতে যাই। তুমিও কিছু দড়ি কিংবা কর্ড কিনে রাখতে পার, কোন একদিন কাজে লাগতে পারে। কোনদিন আত্মহত্যা করতে চাইলে ব্যবহার করতে পারবে।”

অন্য ক্লাসটার ছুটি হলো। চেয়ার সরানোর শব্দ কানে আসছিল আমার।

***

স্কুল থেকে বেরিয়ে শহরের শেষ মাথার এক জেনারেল স্টোরের দিকে পা বাড়ালাম আমরা। জায়গাটা বেশ দূরে। কিন্তু বড় রাস্তায় অনেক বাস থাকায় সেখানে যেতে আমাদের খুব একটা সময় লাগল না। বাসটা অর্ধেকের মত খালিই ছিল। মোরিনো সিটে বসল আর আমি দাঁড়িয়ে স্ট্র্যাপে ঝুলতে ঝুলতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ও মাথা নিচু করে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু বাসের দুলুনিতে ঘুমানো সম্ভব ছিল না। এক ফোঁটা ঘুমও আসার আগে আমরা জায়গা মত পৌঁছে গেলাম।

বিশাল দোকানটা কন্সট্রাকশনের কাঠ আর ধাতব উপাদান, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে ভর্তি ছিল। আমরা সারি সারি সেলফের ভেতরের পথগুলো দিয়ে ঘোরাফেরা করলাম, দড়ির মত কিছু দেখলেই থেমে পরীক্ষা করলাম। টিভি কিংবা ভিডিও প্লেয়ার কানেক্ট করার এভি কেবল, কাপড় ঝুলানোর দড়ি, ঘুরি উড়ানোর সুতা…সব কিছু ওখানে ছিল।

মোরিনো সেগুলো একটা একটা করে তুলে প্রথমে আঙুল বুলিয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করল-যেন সাবধানতার সাথে কোন পোশাক পরীক্ষা করে দেখছে।

ওর মতামতগুলো শুনে মনে হল আত্মহত্যার জন্য আদর্শ দড়ি কিরকম হওয়া উচিত সে ব্যাপারে ও একজন বিশেষজ্ঞ। “এরকম চিকন তার হলে গলা কেটে যাবে। ইলেকট্রিক কর্ড বেশ শক্ত, কিন্তু দেখতে ভালো না।”

“প্লাস্টিকেরগুলো কেমন?” নিচের সেলফে রাখা প্লাস্টিকের তারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলাম, শুধু ও কী বলে তা দেখতে।

অভিব্যক্তিহীন চেহারা নিয়ে ও মাথা নাড়ল। “ওগুলো প্রসারিত হয়। সমস্যা সৃষ্টি করে। এখানে আর কিছু দেখার নেই।”

দোকানের অন্য অংশে বিভিন্ন ধরনের চেইন পাওয়া গেল। একদম দুই সেন্টিমিটার পুরু মোটা ভারি চেইন থেকে এক কি দুই মিলিমিটারের সুক্ষ্ম চেইন পর্যন্ত সব। টয়লেট পেপারের মত রোল করে সেলফে রাখা ছিল। কাছাকাছি একটা মেশিন ছিল যেখান থেকে প্রয়োজন মত চেইন কেটে নেয়া যেত।

“এটা দেখ-খুবই পাতলা, কিন্তু এখানে লেখা এটা নাকি একশ পাউন্ড পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে, সে বলল, আঙুলের ফাঁকে একটা চিকন রুপার চেইন ধরে রেখেছে। গলায় পেঁচিয়ে দেখল। ধাতব চেইনটা আলো পড়ে চকমক করে উঠল। “দারুন দেখতে, এটা পড়লে একটা লাশকেও দেখতে ভালো লাগবে…কিন্তু এটা দিয়ে আত্মহত্যা করতে গেলে গলা কেটে মাংসে ঢুকে যাবে।”

চেইনটা আগের জায়গায় রেখে দিল। ওর প্রয়োজনের সাথে সেটা যায় না।

আত্মহত্যা করতে গেলে কিরকম দড়ি লাগবে সেই চিন্তা ভাবনার পেছনে সে অনেকটা সময় ব্যয় করল।

আমি যদি কাউকে গলায় পেঁচিয়ে মারতে চাই তাহলে কিরকম দড়ি খুঁজব? দোকানের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে আমিও এই চিন্তা করতে লাগলাম।

“গলায় সুড়সুড়ি লাগুক তা আমি চাই না,” আমি যখন ওকে হাতে বোনা খসখসে দড়ি দেখালাম তখন সে বলল। “পুরনো ফ্যাশনের দড়িগুলো দরকার, যেগুলো গ্রামের ফার্মগুলোতে ব্যবহার করে।”

ও যখন ফোর্থ গ্রেডে পড়ত তখন শহরের বাইরে এক জায়গায় থাকত, পাহাড়ি এলাকায়। এখান থেকে দুই ঘণ্টার ড্রাইভ।

“আমার মা যেখানে জন্মেছিল আর বড় হয়েছে, সেখানে আমার নানা নানির একটা ছোট ফার্ম আছে। আমার বাবা প্রতিদিন দু-ঘন্টা ড্রইভ করে কাজে যেত আর দুই ঘন্টা ড্রাইভ করে ফিরত।”

পরে ওরা সেখান থেকে চলে আসে ওর বাবার এই ডাইভিঙের ঝামেলা এড়াতে। এসব আমার কাছে নতুন খবর।

“আমি সবসময় ভেবেছি আত্মহত্যা করতে হলে তুমি হাতের রগ কাটবে, দড়িতে যে ঝুলতে চাইবে তা ভাবিনি,” আমি বললাম।

ও ওর হাত দুটো তুলে ধরল। এগুলোর কথা বলছ?”

ওর হাতগুলো একদম সাদা লাইনের মত দেখতে। একটা পরিস্কার কাটা দাগ দেখা যাচ্ছে। আমি কখনো এই দাগুগুলো সম্পর্কে জানতে চাইনি তাই জানি না কেন সে হাত কাটতে গিয়েছিল।

“এগুলো আত্মহত্যা করতে গিয়ে হয়নি, সেফ হঠাৎ ইচ্ছা হলো…”

ওর জীবন অনুভূতিহীন মনে হলেও আসলে কিছু অনুভূতি অবশিষ্ট ছিল। আর সেগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এরকম ভয়াবহ কিছু ঘটাতে পারে। ওর বাইরের অভিব্যক্তিহিন অবস্থাটা অনেকটা থারমোফ্লাস্কের মত, বাইরে থেকে স্পর্শ করলে ভেতরের তাপ বোঝা যায় না। ভেতরে যাই ঘটুক ্না কেন তা বাইরের পৃষ্ঠ পর্যন্ত আসে না।

কিন্তু এরকম অনুভূতি যখন খুব শক্তিশালী হয়ে পড়ে তখন কিছু একটা করতে হয়। কেউ কেউ খেলাধুলা কিংবা ব্যায়াম করে, অন্যরা নিজেদের শান্ত করতে জিনিসপত্র ভাঙে। কিন্তু মোরিনো এই দুই দলের কোনটাতেই পড়ে না, সে তার নিজের উপরই নিজের অনুভূতিগুলোর প্রয়োগ ঘটায়।

হঠাৎ একটা পরিচিত গলায় আমার নাম শুনলাম।

ঘুরে দেখি আমার বোন, সাকুরা, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে অবাক দৃষ্টি। ওর হাতে ডগ ফুডের ব্যাগ। শপিঙে বেরিয়েছে।

মোরিনো ঘুম ঘুম চোখ করে ছিল। ব্যাগের উপর কুকুরের ছবি দেখে সে কেঁপে উঠল।

সাকুরা আমাকে জানাল সে আমাকে এখানে দেখে কতটা অবাক হয়েছে, তারপর মোরিনোর দিকে তাকাল।

মোরিনো অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। সে যে সাকুরাকে এড়াতে চাইছিল তা নয়। ব্যাগের উপর কুকুরের ছবি এড়াতে অন্যদিকে তাকিয়েছিল। কোন সেলফে “কুকুর” লেখা থাকলে সেটার ধারে কাছেও ওকে টেনে নেয়া যাবে না।

“আর তোমার সুন্দরি বন্ধুটি কে?” সাকুরা জিজ্ঞেস করল, কৌতূহলি। আমি দ্রভাবে ওকে বুঝিয়ে বললাম সাকুরা ওকে যা ভাবছে সে সেরকম কেউ নয়। সে আমার কথা বিশ্বাস করল বলে মনে হলো না।

“ওকে। আম্মু আমাকে এখানে পাঠিয়েছে। কুকুরের খাবার কিনলাম আর যাওয়ার সময় ড্রাই ক্লিনারস থেকে কাপড় তুলতে হবে।”

সাকুরা ওর পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে পড়ল। ওর হাতের লেখা আমার চেয়ে হাজার গুণ ভাল। ওর সামনে পরীক্ষা, পড়াশোনা নিয়ে দৌড়ের উপর থাকার কথা, কিন্তু তারপরেও কেউ কোন কাজের অনুরোধ করলে সেটা ফেলতে পারে না।

“তারপর পাশের বাসা থেকে কিছু টোফু আর পিচ্চি কমলা নিতে হবে। আর বাসায় ফেরার পর কুকুরটাকে হাটাতে নিয়ে যেতে হবে।”

সে মোরিনোর দিকে হাসিমুখ করে হাত নাড়ল।

মোরিনো ব্যস্ত ছিল কুকুরের ছবি যাতে চোখে না পড়ে সেই নিয়ে। এক হাতে সেলফে ভর দিয়ে নিজের চোখ ঢেকে রেখেছিল।

সাকুরা চলে যাওয়ার পর আমি বললাম, “এখন তাকাতে পার।”

মোরিনো সোজা হয়ে দাঁড়াল, তারপর যেন কিছুই হয়নি ভাব করে সেলফের ভেতর এক রোল তার পরীক্ষা করতে লাগল।

“তোমার বোন ছিল নাকি মেয়েটা?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

“আমারো একটা বোন ছিল। যমজ বোন। অনেক আগে মারা গিয়েছে।”

এই কাহিনীও আমার জানা ছিল না।

“ওর নাম ছিল ইয়ু। ইয়ু…”

যখন ও এই কথাগুলো বলছিল তখন একই সাথে রুপালি তারের উপর আঙুল বোলাচ্ছিল। ওর নীলচে ঠোঁটগুলোর ফাঁক দিয়ে সুন্দর সাদা দাঁত চোখে পড়ছিল। নিচু স্বরে উচ্চারিত কথাগুলো যেন ঠোঁট আর দাঁত দুই জায়গা থেকে বের হচ্ছিল।

ইয়ু গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, মোরিনো ইয়োরু আমাকে বলল।

একগাদা তার-দড়ি গলায় পেঁচিয়ে দেখার পরেও মোরিনো ওর অনিদ্রার সমস্যা দূর করার মত কোন কিছু খুঁজে পেল না। আমিও কিছু কিনলাম না।

সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা পার্কিং লট পার হয়ে রাস্তার দিকে গেলাম। চোখের নিচের গভীর কালো দাগসহ মোরিনোকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন জোরে বাতাস শুরু হলেই ও উড়ে যাবে।

বিশাল জেনারেল স্টোরের আশেপাশে একদমই কিছু ছিল না। শুধু খোলা মাঠ আর শুকনো ঘাসে ঢাকা খালি জায়গা। সেগুলোর মাঝ দিয়ে নতুন পিচ ঢালা পথ এগিয়ে গিয়েছে। একসময় হয়তো এখানে অনেক কিছু হবে, সময় লাগবে তার জন্য।

রাস্তার এক পাশে বেঞ্চ বসানো বাসস্টপ ছিল, মোরিনো গিয়ে সেখানে বসল। যেসব বাস এখানে থামে তার একটা ওর বাসার দিকে যায়।

সূর্য নিচের দিকে নামছিল। আকাশ তখনো নীল। খালি মেঘগুলো গোলাপি রং ধারন করেছে।”তোমার বোন সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?” আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম। সে চুপচাপ বসে থাকল। কোন উত্তর দিল না।

রাস্তায় খুব একটা গাড়ি ছিল না। মাঝে মধ্যে দু-একটা শশা শো করে চলে যাচ্ছিল। বেশিরভাগ সময়ই খালি চওড়া পিচঢালা রাস্তা আর গার্ড রেইলের পরে শুকনো মরা ঘাসসহ ধুধু প্রান্তর। অনেক দূরে একটা আয়রন টাওয়ার, দিগন্তে বিন্দুর মত ফুটে আছে।

“কী জানতে চাও?” সে একসময় বলল।

“ইয়ু মারা গিয়েছিল যখন আমরা সেকেন্ড গ্রেডে পড়ি। তাই আমার খালি ওকে ছোট অবস্থাতেই মনে আছে। এমনকি যখন ওর বয়স আট বছরও নয়…সে সময় আমরা গ্রামে থাকতাম। সেখানে চারপাশে খামারের পর খামার ছাড়া আর কিছু ছিল না।”

ওদের বাড়ি ছিল এক পর্বতের ঢালে। পেছন দিকে বন, বাড়ি থেকে বনে পাখিদের ডানা ঝাঁপটানোর আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যেত।

“ইয়ু আর আমি একই রুমে এক বিছানায় ঘুমাতাম। যখন রাত হত আর আমরা ঘুমাতে যেতাম তখন বিছানায় শুয়ে বাইরে অন্ধকারে প্যাঁচার ডাক শুনতে পেতাম।”

বাড়িটা ছিল পুরনো, কাঠের তৈরি। মেঝে, পিলার সব কিছু বয়সের ভারে কালো হয়ে গিয়েছিল। আগাছা জন্মেছিল ছাদের টাইলসের ফাঁকে। বাড়ির আশেপাশে ভাঙা টাইল্স পড়ে থাকত। অবশ্য বাড়িটা বেশ বড় আর আরামদায়ক ছিল। তাতামি ফ্লোর ছিল-সব রুমে, শুধু কিচেন বাদে। কিচেনে পরে লাগানো হয়েছিল। যমজ মেয়ে দুটো, ইয়োরু আর ইয়ু ঐ বাড়িতে তাদের বাবা-মা আর নানা-নানির সাথে বাস করত।

মোরিনোর বাবা প্রতিদিন দুই ঘন্টা ড্রইভ করে শহরে যেতেন কাজের জন্য। ওর নানা-নানিও বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকতেন। ধানক্ষেতে পানি দিতেন কিংবা ছাউনি থেকে কৃষিকাজের জিনিসপত্র আনা-নেয়া করতেন। মাঠ আর ধানক্ষেতগুলো বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের মত হাঁটা দূরত্বে ছিল। ওরা যেসব ডায়কন আর বাঁধাকপি খেত সেগুলো এই ক্ষেতেই চাষ হতো।

“কিন্তু আমাদের ক্ষেতের ডায়কন দোকানের ডায়কনের মত দেখতে এত সুন্দর হত না। আর একটু হলদেটে ধরনের ছিল।”

উঠোনে অনেক গাছ ছিল। উঠোনের খোলা মাটি বৃষ্টি হলে কাদার পুকুরে পরিণত হতো। বৃষ্টির সময় বাইরে গেলে মনে হত মাটি জোর করে টেনে আছাড় খাওয়াতে চায়।

বাড়ির বামদিকে ছিল ছোট্ট একটা ছাউনি, বাড়ির দেয়াল ঘেঁসে দাঁড় করানো। কৃষিকাজের সব যন্ত্রপাতি ওখানে রাখা হতো। ছাউনির ছাদটা এক টাইফুনের সময় উড়ে গিয়েছিল। সেটা ঠিক না করে বরং উপরে শ্রেফ একটা নীল রঙের তারপুলিন বিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটার ফুটো দিয়ে পানি পড়ত কিন্তু ছাউনির ভেতর যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কিছু না থাকায় কোন সমস্যা হয়নি।

“আমি আর আমার বোন সারাক্ষণ খেলাধুলা করতাম।”

যখন ওরা এলিমেন্টারি স্কুলে ঢুকল তখন হাত ধরাধরি করে পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেত। পাহাড়ি পথটা ছিল সরু আর প্রচুর বাতাস। পথের একধারে ঢাল খাড়া উপরে উঠে গিয়েছিল, সেইসাথে গাছপালায় ভর্তি। অন্য দিকেও গাছপালা ছিল কিন্তু সেগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে দূরের দৃশ্য দেখা যেত। পথের উপর মরা বাদামি পাতা পড়ে থাকত, বৃষ্টির সময় পেছল করে তুলত। লম্বা গাছগুলোর ডালপালা সূর্যের আলো আসতে বাঁধা দিত। যে কারনে পথটা সবসময়ই কেমন ভ্যাপসা আর গুমোট হয়ে থাকত।

“পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে স্কুলে যেতে হতো, সেটা আমাদের জন্য সহজই ছিল। কিন্তু বাসায় ফেরার সময় আমরা হাঁপিয়ে কাহিল হয়ে যেতাম।”

ইয়োরু আর ইয়ুর চেহারা ছিল হুবহু একইরকম। চোখের নিচের তিল পর্যন্ত একই জায়গায়, দু-জনেরই একইরকম কোমর পর্যন্ত লম্বা ঘন চুল। আর ওরা প্রায় সময়ই একইরকম পোশাক পড়ত। আমার কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছিল না যে, একই রকম দেখতে দুটো মেয়ে হাত ধরাধরি করে সবুজে ঢাকা পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

“আমরা দেখতে একইরকম ছিলাম। এমনকি আমাদের মা পর্যন্ত আমাদেরকে আলাদা করে চিনতে পারত না। মাঝে মাঝে গোসল করার সময় আমরা পোশাক খুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম।”

সেসময় ওদের মা ঠাহর করতে পারতেন না কে বড় আর কে ছোট।

“কিন্তু আমাদের অভিব্যক্তি আর স্বভাবে পার্থক্য ছিল। তাই আমরা কথা বললেই সবাই বুঝে ফেলত।”

ছোটবেলায় ওদের মা ওদেরকে আলাদা করে চিনতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকলে ইয়ুর খুব মজা লাগত। আর ঠিক যখনই বোঝা যেত ইয়ু মজা পাচ্ছে তখনই ওদের মা ধরে ফেলে বলতেন, “এই যে এটা ইয়োর, আর ওটা ইয়ু।”

ইয়ু সবসময়ই তার বড় বোনের চেয়ে সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করত। ও যখন ওর বাবা-মায়ের সাথে কথা বলত, সবসময় হাসিমুখ করে রাখত।

“সেসময় আমাদের প্রিয় খেলা ছিল ছবি আঁকা আর মরার ভান করা।”

গ্রীষ্মের ছুটিতে এলিমেন্টারি স্কুলের সুইমিং পুল খোলা ছিল আর ওরা সেখানে যতক্ষণ চাইত সাঁতার কাটতে পারত।

“একদম ছোট একটা স্কুল, সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল একশ জনের মত। প্রত্যেক গ্রেডে বিশ জনেরও কম। কিন্তু গ্রীষ্মের ছুটিতে পুলে সবসময় ভিড় থাকত।”

সূর্যের সাদা আলোকরশ্মির ভেতর বাচ্চারা সারাক্ষণ পুলে দাপাদাপি করত। পুলে শুয়ে কান পানির নিচে দিয়ে রাখলে পাহাড় থেকে ভেসে আসা পোকামাকড়ের ঝিঁঝি শব্দ শুনে মনে হত যেন দেয়াল টেয়াল ভেঙে পড়ছে।

“পুলের আশেপাশে সবসময় দুই-চারজন বয়স্ক মানুষ থাকত যারা খেয়াল রাখত যেন কোন বিপদ না ঘটে। কখনো শিক্ষকেরা, কখনো কখনো অভিভাবকেরা এই দায়িত্ব পালন করত। বেশিরভাগ সময়ই কিছু ঘটত না। তারা স্রেফ পাশের ছাউনির বেঞ্চে বসে একজন আরেকজনের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে থাকত।

একদিন দুই বোন ঠিক করল পানিতে ডোবার ভান করে বড়দের চমকে দেবে। তারা উপুড় হয়ে দমবন্ধ করে পানিতে ভেসে থাকল, দেখে যেন মনে হয় মরে ভেসে আছে।

আশেপাশের হৈচৈ করা ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিশ্চয়ই ওদেরকে আলাদা করে চোখে পড়ছিল। দুটো মেয়ে উপুড় হয়ে পানিতে ভাসছে, তাদের লম্বা কালো চুল সামুদ্রিক আগাছার মত চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কোন নড়াচড়া নেই। দম শেষ হয়ে এলে ওরা মাথাটা অল্প তুলে দম নিয়ে আবার মরে যেত।

“আমরা যা আশা করেছিলাম তারচেয়ে প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ছিল।”

পাহারায় ছিল ওদের কয়েকজন ক্লাসমেটদের মা। ওনারা যখন ওদেরকে অনড় ভাসতে দেখলেন তখন একজন লাফিয়ে উঠে চিৎকার শুরু করলেন। সব ছেলেমেয়ে চমকে বেঞ্চের দিকে তাকাল। ছোট বাচ্চারা যারা দাপাদাপি করছিল, একটু বড়রা যারা সাঁতার প্র্যাকটিস করছিল সবাই বুঝতে পারল কোন অঘটন ঘটেছে। আরেকজন মহিলা যিনি চিৎকার করেননি তিনি ওদের বাঁচাতে দৌড় দিলেন। কিন্তু পুলের পাশে দৌড়ানো বিপজ্জনক।

“মহিলা পিছলে পড়ে মাথায় বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। যে মহিলা চিৎকার করেছিলেন তিনি গেলেন এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে। ইয়ু আর আমি দম শেষে উঠে দেখি আশেপাশের সবাই আতঙ্কে আছে। মনে হচ্ছিল যেন নরক নেমে এসেছে। ছোট বাচ্চারা ভয় পেয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। অজ্ঞান মহিলার পাশে একটা ছেলে তার মায়ের কাঁধ ধরে মা মা করে ঝাঁকাচ্ছিল। ছেলেটা আমাদেরই একজন ক্লাসমেট ছিল।”

যমজ দু-জন একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারপর টু শব্দ না করে তাড়াতাড়ি পুল থেকে উঠে পালিয়ে গেল। পরনের ভেজা পোশাকও বদলালো না।

“আমরা পেছনের দরজা দিয়ে বের হলাম। আমাদের এক হাতে ব্যাগ, ভেতরে কাপড় আর ভোয়ালে। আরেক হাতে জুতো। সুইমস্যুট পরা অবস্থায় ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড় লাগালাম আমরা। দূর থেকে শুনতে পেলাম এ্যাম্বুলেন্সের পর এ্যাম্বুলেন্স আসছে। ঐ মহিলা কয়জনকে ডুবতে দেখেছিল কে জানে? অন্তত পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স এসেছিল সেদিন।”

স্কুলটা ছিল পর্বতের গোড়ায়, পাশ দিয়ে যতদূর চোখ যায় খালি ধান ক্ষেত। সবুজ চারাগুলো পুরো এলাকার উঁচু নিচু মাটি ঢেকে রেখেছিল। মনে হত যেন সমতল ভুমি। যমজ মেয়ে দুটো সেই ধানক্ষেতের পাশের পথ ধরে হেঁটে গেল।

“ধারালো ঘাসে আমাদের পা কেটে গিয়েছিল।”

অ্যাম্বুলেন্স স্কুলে পৌঁছানোর পরে কি হয়েছিল সে ব্যাপারে ওদের কোন ধারণা ছিল না। ওরা সেটা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাও করেনি। বাড়ি ফিরে খেয়ে ঘুম দিয়েছিল।

“সেবারই যে শুধু আমরা মরা মরা খেলেছিলাম তা নয়। আমরা একজন আরেকজনের মুখে কেচাপ ছিটিয়ে ভান করতাম যেন সেটা রক্ত।”

ওরা রেফ্রিজারেটরের সামনে দাঁড়িয়ে আঙুলে কেচাপ নিয়ে একজন আরেকজনের মুখে মাখিয়ে দিত। ওদের ফ্যাকাসে সাদা ত্বক কেচাপে লাল হয়ে যেত।

“কেচাপ গড়িয়ে পড়তে লাগলে আমরা তা চেটে চেটে খেতাম। তারপর এক সময় বিরক্ত হয়ে গেলে সসেজ দিয়ে মাখিয়ে খেয়ে ফেলতাম।”

আরেকবার তারা ঘর থেকে একটা মিট সসের ক্যান নিয়ে এসেছিল।

ওদের বাড়ি থেকে অল্প খানিকটা দূরে একবার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। কিন্ডারগার্টেন পড়ুয়া একটা ছেলে গাড়ি চাপা পড়ে সেখানে মারা যায়। ইয়ু সেই জায়গায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

‘শুরু কর,” সে বলল। আর আমি ওর মুখের উপর ক্যানের পুরো মিট সস ঢেলে দিলাম। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে এসেছে। আমি ইয়কে বললাম যাই ঘটুক না কেন ও যেন একদম নড়াচড়া করে। ও আস্তে করে মাথা নেড়ে সায় দিল। চোখ বন্ধ করে ছিল যেন সস চোখে না ঢোকে।”

ইয়োরু গিয়ে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে থাকল। কখন কে এসে দেখে চিৎকার করে উঠে সে অপেক্ষায় থাকল। বাচ্চারা যখন দেখল, বড়দের মত অতটা অবাক হলো না। তারা কাছে এসে দেখে ধরে নিয়েছিল কোন ধরনের খেলা হবে বা কিছু।

“এমনকি বড়রাও দেখে প্রথমে চিৎকার করলেও একটু পরেই ধরে ফেলেছিল যে জিনিসটা মিট সস। তারপর তারা হেসে ফেলত। আমরা এরকম কান্ডকারখানা অনেক করেছি আগে, প্রতিবেশিরা সবাই জানত আমাদের শয়তানি।”

“কোন গাড়ি যায়নি?”

যেহেতু ওখানে আগে ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তার মানে কোন না কোন সময় তো সেখান দিয়ে গাড়ি যাওয়ার কথা। আর ইয়ু রাস্তায় পড়েছিল, বিপদ হতে পারত।

আমি যখন প্রশ্নটা করলাম, মোরিনো কোন অনুভূতি না প্রকাশ করে বলল, “একটা গাড়ি এসেছিল। ইয়ু চোখ বন্ধ করে ছিল তাই টের পায়নি। গাড়িটা ওর সামনে এসে কষে ব্রেক করে থেমেছিল। গাড়ি থামার শব্দে ইয়ু উঠে বসেছিল। মুখ থেকে সস মুছে তাকিয়ে দেখে মুখের সামনে গাড়ির বাম্পার। বাম্পারটা সিলভার পলিস করা ছিল, ওর চেহারার প্রতিফলন সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল..”

“তুমি ওকে ডেকে সাবধান করে দাওনি?”

“না। দেখতে চাইছিলাম কি হয়।” আমি ওর কথার সুরে অপরাধবোধের চিহ্ন খুঁজলাম, কোন চিহ্ন পেলাম। ওর এরকম কোন বৈশিষ্ট্য নেই। একদিক থেকে বললে সে এই ক্ষেত্রেও আমার মতই অনেকটা।

“আমরা যমজ, তাই দেখতে একইরকম ছিলাম। আমাদের চিন্তাভাবনায়ও অনেক মিল ছিল। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল। আমার বোন ছিল দূর্বল প্রকৃতির।”

আমরা যেখানে বসে ছিলাম তার সামনে একটা বাস এসে থামল। আমাদের জন্য অপেক্ষা করে চলে গেল আর পেছনে ফেলে গেল ধোঁয়ার একটা গন্ধ।

সূর্য দিগন্তের কাছে নেমে গেলে পুব আকাশ অন্ধকার হতে শুরু করেছিল। বাতাসে গার্ডরেইলের ওপারের শুকনো ঘাসগুলো কাঁপছিল।

মোরিনো বেঞ্চে নিচু হয়ে বসেছিল। ওহ হাতগুলো হাঁটুর উপর রাখা।

“আমরা অনেকটা সময় ধরে মৃত্যুর কথা চিন্তা করতাম। মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব? তখন কি হবে আমাদের? এইসব চিন্তা-ভাবনা আমাদের কাছে খুব আকর্ষণীয় লাগত তখন। কিন্তু আমার মনে হয় ইয়ুর চেয়ে আমি মৃত্যু সম্পর্কে বেশি জানতাম। আর আমি ওরচেয়ে একটু বেশি নিষ্ঠুর ছিলাম।”

কোন অনুভূতি প্রকাশ না করে মোরিনো আমাকে বলল কিভাবে সে ইয়ুকে বিভিন্ন কাজ করতে আদেশ করত।

“সে সময় আমাদের ছাউনিতে একটা প্রাণী ছিল। চারপেয়ে, মুখ দিয়ে লালা ঝরত, দুর্গন্ধওয়ালা-বুঝতেই পারছ কিসের কথা বলছি।”

আমি ধরে নিলাম ও কুকুরের কথা বলছে। ওর একটা পোষা কুকুর ছিল শুনে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।

“আমি ইয়ুকে আদেশ করলাম ওটার খাবারে ব্লিচ মিশিয়ে দিতে। এমন যে আমি ভাবছিলাম ওটার গায়ের রং সাদা হয়ে যাবে বা সেরকম বোকা ধরনের কিছু। আমি স্রেফ ওটাকে কষ্ট পেতে দেখতে চাইছিলাম।”

ইয়ু ইয়োরুকে থামতে অনুরোধ করেছে।

“কিন্তু আমি শুনিনি, আমি ওকে দিয়ে জোর করে কুকুরের খাবারে ব্লিচ মেশালাম। সে চায়নি কিন্তু আমি ওকে এড়িয়ে যেতে দেইনি।”

ব্লিচ খেয়ে কুকুরটা মরল না। কিন্তু দুদিন সাতিক অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকল। মোরিণোর বাবা-মা আর নানা-নানি কুকুরটার যত্ন নিল। সারাটা দিন আর সারারাত কুকুরটা যন্ত্রণায় মোচড়াল আর আর্তনাদ করল। ওর চিৎকার পর্বতে প্রতিধ্বনি তুলত।

ইয়োরু পুরো ব্যাপারটা মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করল। কিন্তু ইয়ু খুব ভয় পেয়েছিল। সে সারাদিন ঘরের ভেতর থাকল, দু-হাত দিয়ে কান চেপে।

“ইয়ু অনেক কেঁদেছিল।”

ইয়োরু কুকুরের সাথে সাথে তার বোনকেও ভালোমত লক্ষ্য করল। নিজে সরাসরি কুকুরটাকে ব্লিচ না খাইয়ে সে সমস্ত অপরাধবোধ তার বোনের উপর চাপিয়েছিল। ইয়োরুর পরীক্ষায় কুকুর আর তার বোন দু জনেই যন্ত্রণা পেয়েছিল।

ইয়োরু আর ইয়ু নিজেরাও গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলত, একবারই খেলেছিল।

“ঠিক করে বললে, এক কদমের জন্য আমাদের আত্মহত্যা আটকে গিয়েছিল। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। যে কারনে বাইরে খেলতে যেতে পারিনি, ছাউনিতে খেলছিলাম। ইয়ু মারা যাওয়ার এক কি দুই মাস আগের ঘটনা এটা।”

যমজ বোন দু-জন প্রত্যেকে মেঝের উপর একটা করে কাঠের বাক্স রেখে তার উপর দ্বিতীয় আরেকটা বাক্স রেখে দাঁড়াল। ছাউনির বিম থেকে ঝুলানো দড়ি গলায় দিল। এরপর স্রেফ বাক্স থেকে লাফ দিয়ে ফাঁস খেয়ে মরা বাকি।

“আমি বললাম তিন পর্যন্ত গুনে আমরা লাফ দিব। মিথ্যে বলেছিলাম আমি, লাফ দিতাম না। ইয়ু ফাঁস খেয়ে মরত আর আমি দেখতাম।”

এক…দুই…তিন। তিন গোনার পর দু-জনের কেউই লাফ দিল না। দু জনেই চুপ করে ছিল।

“ইয়ু বুঝতে পেরেছিল আমি কি ভাবছিলাম, যে কারনে সে লাফ দেয়নি। আমি যখন ওকে জজ্ঞেস করলাম কেন লাফ দেয়নি, ও স্রেফ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ভয়ে কাঁপছিল।”

ইয়ু মুখ খুলে বলতে পারেনি কেন পুরো ব্যাপারটা অন্যায় ছিল, সে শুধু দাঁড়িয়ে থেকে ইয়োরুর অপমানের বন্যায় ভেসে গেল।

“তুমি ইয়ুকে বুলি করতে?”

“সেটা বলা যেতে পারে। কিন্তু সে সময় আমার কোন হুশ ছিল না। বেশিরভাগ সময়ই আমাদের মধ্যে কোন সমস্যা হত না। আর ইয়ু ওর ভাগের খারাপ কাজগুলোও ঠিকমত করত। আমার চেয়ে ও আরো ভালো মত মরার অভিনয় করে লোকজনকে আতংকিত করতে পারত।”

“তোমার পরিবারের অন্যরা জানত তোমাদের দুই বোনের মধ্যে সম্পর্ক যে এরকম ছিল?”

“না।”

মোরিনো নিরব হয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল। শাঁ করে একটা গাড়ি ছুটে গেল। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসায় গাড়িটার হেড লাইট জ্বালানো ছিল। বাতাসে মোরিনোর চুল উড়ছে, কয়েকটা চুল আবার গালের সাথে লেপ্টে আছে।

“ইয়ু মারা গিয়েছিল গ্রীষ্মের ছুটির সময়। আমরা তখন সেকেন্ড গ্রেডে পড়তাম। সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল একটা সকাল ছিল। কিন্তু শিগগিরি আকাশ কালো হয়ে গেল। আর দুপুরের দিকে শুরু হল বৃষ্টি..”

দুপুরের কিছু পর ওদের মা শপিঙে গেলেন। বাবা বাসায় ছিলেন না। নানা-নানিও বাইরে। শুধু যমজ দুই বোন বাসায় একা।

প্রথমে কুয়াশার মত ঝিরঝির বৃষ্টি ছিল। টুপটাপ ফোঁটা পড়ছিল জানালায়। আস্তে আস্তে বৃষ্টি বাড়তে লাগল।

“সাড়ে বারোটার দিকে আমি দেখলাম ইয়ু ছাউনির দিকে যাচ্ছে। আমাকে কিছু বলেনি, তাই আমি ধরে নিলাম সে হয়তো একা কিছু সময় কাটাতে চাইছে। আমিও আর ওর পিছু পিছু গেলাম না।”

ইয়োরু একা বসে বই পড়তে লাগল।

প্রায় ঘন্টা খানেক পর, সে সামনের দরজা খোলার শব্দ পেল। গিয়ে। দেখে ওর নানি ফিরেছেন, হাতে এক ব্যাগ নাশপাতি।

ওর নানি ছাতি বন্ধ করতে করতে বললেন, “পাশের বাসা থেকে এগুলো দিয়েছে। তোমাকে একটা ছিলে দেব?”

“আমি বললাম, ইয়ুকে ডেকে আনি। নানিকে দরজার ওখানে রেখে দৌড়ে ছাউনিতে গেলাম।”

ইয়োক ছাউনির দরজা খুলল-আর দৃশ্যটা দেখল। সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল।

“ইয়ু সিলিং থেকে ঝুলছিল। গলায় দড়ি পেঁচানো ছিল। আমি সামনের দরজায় ফিরে গেলাম, যেখানে নানি নাশপাতি হাতে দাঁড়ানো ছিলেন। আমাকে ভয়ে কাঁপতে দেখে অবাক হলেন।”

সে নানিকে বলল ইয়ু বেঁচে নেই।

ইয়ু নিজের গলায় ফাঁস নিয়েছে। আত্মহত্যা ছিল না, অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। শুধু যে ওর গলায় দড়ি ছিল তা নয়, ওর বগলের নিচে বুকে দ্বিতীয় আরেকটা দড়ি বাঁধা ছিল-একটা খসখসে ভারি দড়ি, খামারে যে ধরনের দড়ি ব্যবহার করা হয়। একদিক ওর বুকে বাঁধা ছিল, আরেক দিক লেজের মত ঝুলছিল। গলার দড়িটাও একই ধরনেরই ছিল। পুরোটাই একটা দড়ি ছিল কিন্তু ছিঁড়ে গিয়েছিল।

“আমার বোনের মরার কোন ইচ্ছা ছিল না। ও চেয়েছিল বুকের দড়িটা দিয়ে ঝুলবে আর আত্মহত্যার ভান করে সবাইকে ভয় দেখাবে। কিন্তু যে

মুহূর্তে ও লাফ দিয়েছিল, ওজন নিতে না পেরে দড়িটা ছিঁড়ে যায়।”

খুব কম লোকজনের মধ্যে ইয়ুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। আর এই গল্পের শেষ এখানেই।

আমার একটা প্রশ্ন ছিল কিন্তু জিজ্ঞেস করলাম না। মোরিনোর ক্লান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস শুনলাম।

সূর্য ততক্ষণে পুরোপুরি ডুবে গেছে। রাস্তার ধারের বাতিগুলো জ্বলছিল। বাসস্টপের সাথের বাতির আলোয় বাসের শিডিউল জ্বলজ্বল করছিল। আমরা বাস-স্টপের উজ্জ্বল সাদা আলোর মধ্যে বেঞ্চে বসে রইলাম।

দূরে এক জোড়া হেড লাইট দেখা যাচ্ছে। সাথের চারকোনা ছায়ার পেছনে নিশ্চয়ই একটা বাস আছে। কিছুক্ষণ পরেই ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল। আর বাসটা আমাদের সামনে এসে থামল।

মোরিনো উঠে খোলা দরজা দিয়ে বাসে ঢুকে গেল। আমিও বেঞ্চ ছেড়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

কেউ কাউকে গুডবাই বললাম না আমরা। একজন আরেকজনের দিকে তাকালামও না।

দিনটা ছিল শনিবার। মোরিনো ইয়োৰু ওর বোনের মৃত্যুর কাহিনী বলার দু দিন পর। আকাশে মেঘ করেছিল।

স্কুল ছিল না বলে আমি বেশ সকালে উঠে ট্রেনে চড়লাম। ট্রেনটা আমাকে নিয়ে গেল শহরের বাইরে, গ্রাম এলাকার দিকে যেখানে লোকজন কম। যতদূর যেতে থাকলাম ট্রেনের যাত্রি তত কমতে লাগল। ট্রেনে একসময় আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। মেঘের কারনে সূর্য নেই। গাঢ় সবুজ ক্ষেতগুলো শাঁ করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।

একদম জনমানবহীন ক্ষেত খামারের কাছে এক স্টেশনে পৌঁছে আমি ট্রেন থেকে নামলাম। স্টেশনের বাইরে একটা বাস দাঁড়িয়ে ছিল। সেটায় চড়ে কিছুদূর গেলাম, যতক্ষণ না উঁচু এলাকা শুরু হলো আর গাছপালাও ঘন হতে শুরু করেছে। উপর থেকে আমরা নিচের গ্রাম দেখতে পাচ্ছিলাম। রাস্তাটা তেমন একটা চওড়া ছিল না। কোনভাবে একটা বাস যাওয়ার মত জায়গা ছিল। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, বাসের জানালায় টোকা দিচ্ছিল।

বনের মাঝে এক স্টপে গিয়ে বাস থেকে নামলাম। রাস্তায় আর কোন যানবাহন ছিল না। শিডিউল দেখলাম। এক ঘন্টা পর একটা বাস আছে শুধু। সন্ধ্যায় কোন বাস নেই। তার মানে এক ঘন্টা পরের বাসেই আমাকে চড়তে হবে। চারপাশে গাছপালা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিছুদূর হাঁটার পর কয়েকটা বাড়ি দেখতে পেলাম।

এই বাড়িতে মোরিনের জন্ম হয়েছিল, এখানেই সে তার ছোটবেলা কাটিয়েছে।

আমি বাড়ির সামনে থেমে একবার চারপাশ ভালো করে দেখলাম। রোদ থাকলে হেমন্তকালে পুরো এলাকা লাল দেখানোর কথা। কিন্তু মেঘের জন্য সবকিছু কেমন ম্যাড়মেড়ে দেখাচ্ছিল।

বাড়িটার দিকে এগুনোর সময় গতকাল স্কুলে মোরিনোর সাথে হওয়া আলাপের কথা মনে করলাম।

শুক্রবার লাঞ্চের সময়, লাইব্রেরি প্রায় জনশূন্য ছিল। দেয়াল ধরে বইয়ের সেলফ লাগানো। বাকি অংশে ডেস্ক আর চেয়ার রাখা পড়াশোনা করার জন্য। রুমের সবচেয়ে নির্জন কোনায় মোরিনো বসেছিল। ওর সাথে গিয়ে কথা বললাম।

“গ্রামে তুমি যে বাড়িতে থাকতে সেটা আমি দেখতে চাই।”

সে বই পড়ছিল। মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

“তুমি কি ভুলে গিয়েছ নাকি যে লোকজন যেসব জায়গায় মারা যায় সেসব জায়গা পরিদর্শন করতে আমার ভালো লাগে?”

মোরিনো অন্যদিকে তাকাল তারপর বই পড়ায় ফিরে গেল। আমি ওর পাশে বসে পড়লাম। ওর গলার অংশবিশেষ দেখতে পাচ্ছিলাম খালি। ও আমাকে উপেক্ষা করে বই পড়ার চেষ্টা করছিল।

আমি উঁকি দিয়ে বইয়ের নামটা দেখার চেষ্টা করলাম। পৃষ্ঠার কোণায় লেখা, “চ্যাপ্টার তিনঃ তুমি একা নও…কিভাবে পজিটিভ জীবন যাপন করা যায়।” দেখে ধাক্কা খেলাম।

মোরিনোর মাথা তখনো নিচু করা। আমাকে বলল, “আমি ভেবেছিলাম বইটা পড়তে গেলে ঘুম পাবে।”

তারপর লম্বা একটা নিরবতা। একসময় সে মুখ তুলল। “তোমাকে ইয়র কথা বলার জন্য আমার আফসোস হচ্ছে। তুমি যদি যেতেই চাও, তাহলে একলা যেতে হবে।”

বাড়িটা আর ছাউনিটা তখনো আছে। ওর নানা-নানি তখনো সেখানে বসবাস করে। কৃষিকাজ করে।

আমি জানতে চাইলাম কেন সে যেতে চায় না। সে বলল ঘুম না হওয়ার কারনে সে খুবই ক্লান্ত।

পরদিন শনিবার, স্কুল ছুটি। তাই আমি ঠিক করলাম সেদিনই গ্রামে যাব। মোরিনো আমাকে ঠিকানা আর যাওয়ার রাস্তা বাতলে দিল। দেখে মনে হচ্ছিল দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আশা যাবে। মোরিনো আমার নোটবুকে একটা ম্যাপ একে দিয়েছিল।

“কথা নাই বার্তা নাই একজন স্কুল ছাত্র যদি হঠাৎ সেখানে হাজির হয় তাহলে সবাই অবাক হবে।” আমি বললাম। সে মাথা ঝাঁকাল। বলল ফোন করে নানা-নানিকে জানিয়ে রাখবে। তাদেরকে বলা হলো গ্রামের প্রকৃতির ছবি তুলতে আমি সেখানে যাচ্ছি।

“আর কিছু?” মোরিনো বরাবরের মত অনুভূতিহীন সুরে বলল।

আমি ওর আঁকা ম্যাপের দিকে তাকালাম। “তোমার ম্যাপ দেখলেই আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।” বলে আমি উলটো ঘুরে চলে আসলাম। লাইব্রেরির দরজায় পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো রাস্তা আমার পিঠে ওর দৃষ্টি অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল ও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু কথাগুলো গলা পর্যন্ত এসে আটকে গিয়েছে।

ধূসর মেঘ, একঝাঁক কালো পাখি নিচু দিয়ে উড়ে গেল। আমি নোটবুকে আঁকা মোরিনোর ম্যাপটার দিকে তাকালাম। ম্যাপের বক্তব্য অনুসারে রাস্তাটা কিন্ডারগার্টেনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কথা। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল পৃথিবীর কোন বাবা-মা কিভাবে তাদের সন্তানদের এরকম একটা স্কুলে পাঠাতে পারেন।

অর্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করতে করতে আমি মোরিনোদের পুরনো খামার বাড়ির দিকে এগুলাম। বাড়ির নাম্বার আর ল্যান্ডমার্ক জানা ছিল, সুতরাং ম্যাপ না বুঝলেও খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না বলেই আমার ধারণা।

হাঁটতে হাঁটতে বাসস্টপের বেঞ্চে বসে মোরিনোর বলা কাহিনী আবার চিন্তা করলাম, এক নিষ্ঠুর মেয়ে আর তার যমজ বোনের কাহিনী।

ইয়ুকে দড়িতে ঝোলা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

কিন্তু মোরিনোর গল্পে একটা অংশ ছিল যার কোন অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলাম না–যে অংশে সে তার বোনের মৃত দেহ খুঁজে পায়।

ইয়োরু ছাউনির দরজা খুলে দৃশ্যটা দেখে চিৎকার দেয়। তারপর দৌড়ে তার নানিকে গিয়ে জানায় যে ইয়ু মৃত।

মোরিনো কি করে দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে জানল যে ইয়ু মৃত? তারা তো সবসময় মৃত সাজার ভান করত আর লোকজনকে চমকে দিত তাই না? তাহলে সে কেন ভাবেনি যে ওর বোন স্রেফ অভিনয় করছে?

হতে পারে যে সাধারণ মৃতদেহ হয়তো দেখতে অভিনয়ের চেয়ে অনেক আলাদা, অনেক ভয়ঙ্কর কিছু…কিন্তু ব্যাপারটা হল যে সে কখনো ভাবেনি যে এটা অভিনয়, সে সাথে সাথে দৌড়ে তার নানিকে বলতে গিয়েছিল…ব্যাপারটা আমার কাছে গোলমেলে লাগছে।

আমি ম্যাপ আর রাস্তা অবার মিলিয়ে দেখলাম। সামনে দিয়ে গভীর একটা পাহাড়ি নদী চলে গিয়েছে। ম্যাপ অনুযায়ি এখানে একটা ড্রাই ক্লিনার থাকার কথা। কাপড় চোপড় তো পরিস্কার করার পর আর শুকাতে পারবে না, আমি ভাবলাম।

ব্রিজ পার হওয়ার সময় আকাশের দিকে তাকালাম। মেঘগুলো নিচু হয়ে পর্বত চূড়ার কাছে ঝুলে আছে। আশেপাশের গাছগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে।

আরো কিছুক্ষণ হাটার পর আমি মোরিনোদের খামার বাড়ি খুঁজে পেলাম। পর্বত ঘেঁসে পুরোনো একটা বিল্ডিং। মস জাতীয় আগাছায় ঢেকে আছে ছাদটা, যে রকমটা মোরিনো বলেছিল। আশেপাশে গাছপালা আর ক্ষেত ছাড়া কিছু নেই, রাতে নিশ্চয়ই কালিঘোলা অন্ধকারে ঢেকে যায় সবকিছু। কোন গেট কিংবা দেয়াল নেই, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি হঠাৎ আবিস্কার করলাম ওদের উঠোনে পৌঁছে গিয়েছি।

সামনের দরজার দিকে যাওয়ার সময় বামদিকের ছাউনিটা চোখে পড়ল। এই ছাউনিতেই নিশ্চয় ইয়ুর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল? ছাউনির দেয়াল শুষ্ক সাদা কাঠ দিয়ে তৈরি। উপরে নীল রঙের তারপুলিন দেয়া, প্লাস্টিকের তার দিয়ে বাঁধা। অনেক পুরনো, একদিকে কাত হয়ে আছে।

সামনের দরজাটা কাঠ আর কাঁচ দিয়ে তৈরি, খোলা ছিল। আমি ডোরবেল বাজালাম। পেছন থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডাকল।

ঘুরে তাকিয়ে দেখি একজন বুড়ি মহিলা নিড়ানি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

তার পিঠ বাঁকানো, পরনে ঢোলা ওয়ার্ক ট্রাউজার, গলায় একটা গামছা পেঁচানো। আমি ধরে নিলাম বুড়ি নিশ্চয়ই মোরিনোর নানি হবেন।

“ইয়োক গত রাতে ফোন করেছিল। আমি তো দুশ্চিন্তা শুরু করে দিয়েছিলাম যে তুমি বোধহয় আসছ না।” তিনি বললেন। তার ঝুলে যাওয়া কুঁচকানো মুখের সাথে মোরিনোর চেহারার কোন মিল পেলাম না। মোরিনোর চেহারা দেখলে মনে হয় ইতিমধ্যে মৃত, ওর নানির রোদে পোড়া চেহারার কিছুই ওর মধ্যে নেই।

আমি মাথা বো করে বললাম কয়েকটা ভালো ছবি তোলা হলেই আমি চলে যাব। কিন্তু মোরিনোর নানি আমার কথা উপেক্ষা করে আমাকে ধাক্কিয়ে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলেন।

দরজা দিয়ে ঢুকতেই শু বক্স রাখা। উপরে কিছু জিনিস রাখা যা দেখে মনে হল সুভিনর ধরনের কিছু হবে। তারপর হলওয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গিয়েছে। এয়ার ফ্রেসনার আর অপরিচিত মানুষের গন্ধ ভেসে আছে বাতাসে।

“তোমার নিশ্চয়ই ক্ষুধা পেয়েছে?”

“তেমন একটা না।”

উনি আমার কথা পাত্তা দিলেন না, ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে ডিশ ভর্তি খাবার সামনে এনে রাখলেন। মোরিনোর নান এলেন একটু পর। লম্বা, সাদা চুল ওয়ালা এক বুড়ো।

উনাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো আমাকে মোরিনোর বয়ফ্রেন্ড ধরে নিয়েছেন।

“তোমাকে তো একদিন ইয়োরুকে বিয়ে করতে হবে,” আমি খাব না বলাতে, নানা মাথা ঝাঁকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। ছাউনিটা দেখে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই বাসের কাছে পৌঁছাতে পারব কিনা ভাবছিলাম।

কিচেন কেবিনেটের এক পাশে একটা ছবি ছিল। ছবিতে পুতুলের মত দেখতে দুটো বাচ্চা মেয়ে। দু-জনেরই লম্বা কালো চুল। দু-জনেই সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে কোন হাসি নেই। দু-জনেরই পরনে কালো পোশাক। একজন আরেকজনের হাত ধরে রেখেছে। দেখে মনে হচ্ছে সামনের উঠানে ভোলা, কারণ ওদের পেছনে বাড়িটার সামনের দরজা দেখা যাচ্ছে।

“ইয়োরু আর ইয়ু,” আমার দৃষ্টি খেয়াল করে নানি বললেন। “তুমি কি ওর যমজ বোনের কথা শুনেছ?”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

“এটা ওদের ছয় বছর বয়সের সময়ে ভোলা, নানা বললেন। দু জনের কেউই ছবিটা সম্পর্কে আর কিছু বললেন না।

খাওয়ার পর বাড়ির প্রার্থনা বেদীর সামনে যেতে দেয়া হলো আমাকে। আমি জানতাম সামনে এগুতে হলে আমাকে এসব ভদ্রতা দেখানো ছাড়া উপায় নেই।

প্রার্থনা বেদীর সামনে রাখা ইয়ুর ছবি দেখে আমার মনে হল ওর মৃত্যু হয়তো ওর নানা-নানির কাছে মাত্র গতকালকের কোন ঘটনা মনে হয়। যদিও ঘটনাটা ঘটেছে নয় বছর আগে। আমার কিংবা মোরিনোর কাছে নয় বছর হল আমাদের অর্ধেক জীবনের চেয়েও বেশি–কিন্তু ওর নানা-নানির বয়সের কাছে নয় বছর কোন বছরই নয় হয়তো।

হাত জোর করে শ্রদ্ধা জানানোর পর মোরিনোর নানা-নানি আমাকে লিভিং রুমে নিয়ে বসালেন আর তাদের নাতনি স্কুলে কিরকম করছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলেন। আমি উত্তর শুরু করার আগেই তারা নিজেরাই মোরিনো ছোটবেলায় কিরকম ছিল সে নিয়ে গল্প জুড়ে দিলেন। আমি ধরে নিলাম আমার বক্তব্য নিয়ে তাদের আসলে কোন আগ্রহ নেই।

“ওই তাই তো, ওর এলিমেন্টারি স্কুলে আঁকা কিছু ছবি আমাদের কাছে আছে!” নানি আনন্দে লাফিয়ে উঠে উধাও হয়ে গেলেন কোথাও।

নানা তার স্ত্রী যাওয়ার পর ক্ষমা প্রার্থনার সুরে আমাকে বললেন “ইদানিং আমার স্ত্রীর মাথায় অল্প একটু সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে আমার।”

উত্তরে আমি শুধু মাথা ঝাঁকালাম। কিছু বলার চেয়ে মাথা ঝাঁকানোই আমার কাছে সঠিক প্রতিক্রিয়া হবে বলে মনে হলো।

“আসলে ইয়োরু কখনো ওর কোন বন্ধুকে বাসায় নিয়ে আসেনি, বুঝেছ? তাই তুমি আসছ শুনে ওর নানি আজকে একটু বেশিই উত্তেজিত।”

মোরিনোর নানি একটা কাগজের ব্যাগ নিয়ে ফিরে এলেন। ব্যাগের ভেতর থেকে এক গাদা পুরোনো ড্রয়িং পেপার বের হলো, মোরিনো ওর এলিমেন্টারি স্কুলে থাকার সময়ে রং আর ক্রেয়ন দিয়ে ওগুলো এঁকেছিল। মোরিনোর ম্যাপ আঁকা দেখে আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, এখন নিশ্চিত হওয়া গেল ওর মধ্যে আর্টের মেধা বলতে কিছু নেই।

কাগজগুলোর পিছে নাম আর গ্রেড লেখা ছিল।

এর মধ্যে কয়েকটা ইয়ুর আঁকা ছিল। দু-জনের ড্রইংই একসাথে রাখা ছিল। ইয়োরুর ড্রয়িং ছিল একদম ফার্স্ট গ্রেড থেকে সিক্সথ গ্রেড পর্যন্ত। কিন্তু ইয়ুরগুলো খালি ফার্স্ট আর সেকেন্ড গ্রেডের। ব্যাপারটা যেন বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে তুলছিল যে ইয়ু নামের মেয়েটা আর নেই।

আমি দু-জনের সেকেন্ড গ্রেডের ড্রয়িং পাশাপাশি রেখে তুলনা করলাম।

“কারো পক্ষে আসলে বলা মুশকিল ওরা কি আঁকতে চাইছিল, তাইনা?” নানি উজ্জ্বল মুখ করে বললেন। যমজ দু-জনের আঁকার ক্ষমতার মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। কিন্তু দু-জনেই একই বিষয় নিয়ে এঁকেছে আর একইরকম ড্রয়িং করেছে।

দুটো ছবিতেই বাড়ির একটা অংশ দেখা যাচ্ছে আর মাঝের অংশে লম্বা চুলের দু-জন মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে মেয়ে দুটো আসলে ওরাই।

“খোদাই জানেন ওরা কি করছে,” নানি বললেন।

“বাড়ির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে?” নানা উত্তর দিলেন।

“তাই তো মনে হচ্ছে, নানি উত্তর শুনে হাসলেন।

আমি কিছু বললাম না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম ওরা কি এঁকেছে। মেয়ে দুজনেরই গলার উপর লাল দাগ টানা যেটা সিলিঙের সাথে লাগানো। তারা ছাউনিতে আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলার ছবি এঁকেছিল।

“ওরা এই ছবিগুলো গ্রীষ্মের ছুটিতে এঁকেছিল, স্কুলের হোমওয়ার্ক ছিল। ছুটির পর ইয়ুর ড্রয়িংটা স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু…ইয়ু মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে আঁকা এটা।” পুরনো স্মৃতি মনে করে নানি মলিনভাবে হাসলেন।

দুটো ছবির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য ছিল না। ইয়ুর আঁকা ছবিটায় ডিটেইলিং একটু ভালো ছিল। ওরটায় লাল দাগ ছাদের বিমের সাথে লাগানো ছিল, আর বাক্সগুলো একটার উপর একটা সাজানো ছিল। বাড়ির উপরে আকাশে সূর্য ছিল। আর মেয়েদের জুতাগুলো পাশে রাখা ছিল।

আর ইয়োরুর ছবিতে এইসব ডিটেইলিং কিছু ছিল না, খুব সাধারনভাবে রং করা। পুরো পা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত রং করা, জুতার জন্য আলাদা কোন রং করা হয়নি! ব্যাকগ্রাউন্ড পুরোটা ছাই রং করা।

ইয়ুর ছবির জুতাগুলো আমার মনোযোগ কাড়ল। একটা মেয়ের জুতা কালো, আরেকজনটায় কোন রঙ নেই। এর অর্থ কি হতে পারে আমি নিশ্চিত ছিলাম না কিন্তু নোট করে রাখা প্রয়োজন মনে করলাম।

ছবিগুলো টেবিলের উপর রেখে দিলাম।

“আমার মনে হয় ছবিগুলো তুলে ফেলা উচিত,” বলে আমার ক্যামেরা নিয়ে বাইরে গেলাম।

দরজা খুলতেই বাইরে সবকিছু সাদা দেখাল। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল কুয়াশা, কিন্তু আসলে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন বৃষ্টি যেটায় ছাতা ব্যবহার করার কোন মানে হয় না। সুতরাং আমি চারপাশে ঘুরে ইচ্ছামত ছবি তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ পর জোরে বৃষ্টি শুরু হলো।

আমি ভাব করলাম যেন হঠাৎ কোনভাবে ছাউনির সামনে পড়ে গিয়েছি।

ছাউনির দরজা কাঠের তৈরি ছিল। বন্ধ ছিল কিন্তু হাতল ধরে টান দিতে খুলে গেল। ভেতরে অন্ধকার, প্রথমে কিছু দেখা যাচ্ছিল না।

দরজা দিয়ে যতটুকু আলো ঢুকছিল তাতে হালকাভাবে কিছু দেখা গেল। ভেতরে শুকনো গাছের গন্ধ।

ছাউনিটা ছিল প্রায় সাড়ে ছয় ফুটের মত উঁচু আর দশ বাই তের ফুট সাইজের। মেঝে কাদা দিয়ে নোংরা হয়ে ছিল।

আধ ভাঙা সিলিঙের নিচে একটা বিল দেয়া। অনেকগুলো ফুটো ছিল, নিল তারপুলিন দেখা যাচ্ছে। একটা বাতি ঝুলে আছে।

মোরিনোর কাহিনী অনুযায়ি এখানে একটা কুকুর রাখা হতো। এখন আর নেই যেহেতু তার মানে হয়তো বেঁচে নেই। দরজার পাশে ছোট করে আরেকটা গর্ত কাটা, সম্ভবত কুকুরটার জন্যই। কুকুরটাকে নিশ্চয়ই ওটার আশেপাশেই কোথাও বেঁধে রাখা হতো।

আমি ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরটা ঠান্ডা আর খানিকটা ভ্যাপসা।

একসময় ইয়ু এখানে ছিল, সিলিঙের বিম থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছিল। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল মৃত মেয়েটা এখনো সেখানে ঝুলছে।

দরজার পাশেই একটা সুইচ ছিল। সুইচ চাপতেই বাতি জ্বলে উঠল। খুবই কম পাওয়ারের বাতি, খুব অল্পই আলোকিত হলো।

ইয়োর বলা কাহিনী মনে পড়ল আমার-দুইটা বাক্স মেঝেতে রেখে ওরা উপরে উঠে দাঁড়িয়েছিল, গলায় দড়ি দিয়ে ঝাঁপ দেয়ার জন্য তৈরি…এখানে রাখা কুকুরটার খাবারে ব্লিচ মিশিয়ে দেয়া।

ইয়ুর মারা যাওয়া নিয়ে ইয়োরুর কাহিনীর উপর আমার সন্দেহ হচ্ছিল।

ইয়োৰু ছাউনির দরজা খোলার আগেই জানত ওর বোন মৃত। ও শুধু অভিনয় করেছিল যে ঐ মুহূর্তে সে সেটা আবিস্কার করেছে।

কেন সে ওরকম করতে গেল? সে কি লুকাতে চাইছিল? ব্যাপারটা নিয়ে আমি যতই চিন্তা করছিলাম ততই মনে হচ্ছিল ওর বোনের মৃত্যুর পেছনে নিশ্চয়ই ওর কোন হাত আছে।

“আমরা এখানেই ইয়ুকে খুঁজে পেয়েছিলাম।”

ঘুরে দেখি দরজার কাছে মোরিনোর নানি দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি সিলিঙের দিকে।

“আমি শুনেছি সবাইকে চমকে দিতে গিয়ে ও মারা গিয়েছিল।”

উনি যেখানে তাকিয়ে ছিলেন সেদিকে তাকালাম। ওখানেই নিশ্চয়ই ইয়ুকে পাওয়া গিয়েছিল।

বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। উঠোনে ছিটকে পড়ার শব্দ শুনতে পারছিলাম। কিন্তু ছাউনির ভেতর বাইরের সব শব্দ যেন মিইয়ে গিয়েছিল। এমন কি তারপুলিনের উপর পড়া বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দও।

ছাদের ফুটো দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছিল, ঝড়ে যেটা ভেঙে গিয়েছিল কিন্তু ঠিক করা হয়নি। তাতে কোন সমস্যা হয়নি কারণ ছাউনির ভেতর তেমন কিছু ছিল না।

ছাউনির এক পাশে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে নারানি, কোদাল, কাস্তে ইত্যাদি রাখা ছিল। পাশে কাঁচি আর মোটা দড়ি রাখা।

কুকুরের দরজার পাশে অনেকরকমের দড়ি রাখা ছিল, যদিও কুকুর আর নেই। দড়িগুলো বিভিন্ন রঙের ছিল কিন্তু লাল রঙের একটা দড়ি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

“আমার সবকিছু একদম পরিস্কার মনে আছে,” মোরিনোর নানি আস্তে করে বললেন। আমি প্রতিবেশির বাসা থেকে এসে ছাতা ঠিক করে রাখছিলাম। ইয়োরু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল..”

ইয়োক ওর কাহিনী যেরকম বলেছিল তার সাথে ওর নানির কাহিনীর কোন পার্থক্য নেই। ইয়োরু নাশপাতির ব্যাগ দেখে ওর বোনকে ডাকতে ছুটে গেল। তারপর ছাউনির দরজা খুলে চিৎকার করল। পুরো গল্পে একটা মাত্র জিনিস আমার মনে খটকা লাগাচ্ছিল, সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার আগেই পায়ের নিচে অদ্ভুত কিছু একটা অনুভব করলাম।

পা মাটির সাথে আটকে যাচ্ছিল। মাটির মেঝে, ছাদের ফুটো দিয়ে আসা বৃষ্টিতে ভিজে নরম আর আঠালো হয়ে গিয়েছিল।

পা তুলতেই মাটিতে আমার জুতোর ছাপ দেখা গেল।

ইয়ু যেদিন মারা গেল সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। সেদিনও ছাউনির মেঝের অবস্থা নিশ্চয়ই এরকমই ছিল। কিন্তু আমার পায়ের ছাপ তেমন একটা গভীর ছিল না, আর যমজেরা তত বাচ্চা ছিল। ওদের ওজন আমার চেয়ে অনেক কম ছিল। ওদের কি এরকম পায়ের ছাপ পড়েছিল?

খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকালাম, কঠিন বৃষ্টি হচ্ছে। আজকের চেয়ে ঐদিন যদি বেশি বৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে মেঝেও অনেক ভেজা থাকার কথা, আর মেয়েদের পায়ের ছাপ পড়ার কথা।

ইয়ুর মারা যাওয়ার দিন দুপুরের দিকে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। বৃষ্টি শুরু হওয়ার একটু পরই ইয়ু ছাউনিতে গিয়েছিল। আর ইয়োরু বলেছিল ও বাড়ির ভেতরই ছিল। মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার সময় ইয়োৰু দরজার কাছে ছিল।

যদি মোরিনোর নানি ছাউনির ভেতর ইয়োরুর পায়ের ছাপ দেখে থাকেন তাহলে আমাকে যে গল্প শোনানো হয়েছে তা পুরোপুরি মিথ্যা। যদি ইয়োরুর পায়ের ছাপ ছাউনির ভেতর দেখা গিয়ে থাকে তার অর্থ ও আগেই সেখানে গিয়েছিল আর মৃতদেহ তখন আবিস্কার করেছিল।

“আপনি যখন ইয়ুকে পেলেন, তখন কি মেঝেতে কোন পায়ের ছাপ ছিল?”

যদিও আমার মনে হচ্ছিল না মোরিনোর নানি এরকম সূক্ষ্ম কোন কিছু মনে রাখবেন কিন্তু তারপরেও জিজ্ঞেস করার জন্য করলাম।

“হ্যাঁ, ইয়ুর পায়ের ছাপ ছিল,” মোরিনোর নানি বললেন। যে বাক্সর উপর ইয়ু দাঁড়িয়েছিল সেটা উলটে একদিকে পড়েছিল। নানি যখন সেটা ঠিক করতে গেলেন তখন ছোট পায়ের ছাপ দেখেছিলেন মেঝেতে।

যাক ভালো,আমি ভাবলাম। মাটিতে ইয়ুর পায়ের ছাপ পাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।

“আপনি দেখেই বুঝতে পারলেন যে ওগুলো ইয়ুর পায়ের ছাপ?”

“মেয়ে দুটো দেখতে একই রকম, তাই আমরা ওদের আলাদা রকমের জুতো পরাতাম। ইয়োরু পড়ত কালো জুতো, ইয়ু পরত সাদা জুতো। ওদের জুতোর সোলও ভিন্ন ছিল, আর মেঝেতে যে ছাপ ছিল তা যে ইয়ুর জুতোর ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।”

ইয়ুর আঁকা ছবিটা মনে পড়ল আমার। এখন রঙহীন জুতোর অর্থ বুঝতে পারলাম। তার মানে ওগুলো ইয়ুর জুতো ছিল। ইয়ু সিলিং থেকে ঝুলছিল। ওর পা ছিল খালি, ওর সাদা জুতোগুলো মেঝেতে রাখা ছিল। অন্য অনেক আত্মহত্যাকারীদের মত জুতোগুলো পাশে গুছিয়ে রাখা ছিল।

“ইয়োরুর পায়ের কোন ছাপ ছিল না?” আমি জানতে চাইলাম, সেফ নিশ্চিত হওয়ার জন্য।

মোরিনোর নানি মাথা নাড়লেন, আমি নিজেকেই লাখি লাগালাম মনে মনে, কেন প্রশ্নটা করতে গেলাম। ইয়োর মৃতদেহ দেখার সময় ভেতরে ঢোকেনি। ওর পায়ের ছাপ না পাওয়া যাওয়ারই কথা। ছাউনিতে একজনেরই পায়ের ছাপ থাকার কথা।

“ইয়ুর বুকে বাঁধা দড়িটা কি এখনো আছে?”

মোরিনোর নানি মাথা নাড়লেন। দেখে মনে হলো তার মনে নেই। “যাইহোক, তোমার মনে হয় আজকে রাতে এখানে থেকে যাওয়াই ভালো হবে, বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে।”

আমি একটু চিন্তা করে রাজি হয়ে গেলাম।

ছাউনি থেকে বেরিয়ে আমরা বাড়িতে ফিরে গেলাম। মোরিনোর নানি আমাকে কয়েকটা জায়গার কথা বললেন যেখানে ভোলার জন্য ভালো ছবি পাওয়া যাবে।

“আসা করছি কালকে আবহাওয়া ভালো থাকবে,” তিনি বললেন।

জুতো খোলার সময় জুতার বাক্সের উপর রাখা জিনিসগুলোর মধ্যে ছোট একটা প্লাস্টিকের খেলনা আমার নজর কাড়ল। হাতে নিয়ে দেখলাম। একটা ছোট ফ্লাওয়ার ব্ৰচ। চকলেটের প্যাকেটে উপহার হিসেবে যেমন থাকে, সস্তা রঙ আর ডিজাইনের।

যমজ দু-জনের কার ছিল এটা? জিনিসটা দেখে আমার আবার মনে হলো ওরা যখন ছোট ছিল তখন এখানে থাকত।

ব্রুচটা হাতে নিয়ে হলওয়ের দিকে তাকালাম। মোরিনোর নানি ততক্ষণে লিভিং রুমে চলে গিয়েছেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম।

মনে মনে কল্পনা করছিলাম পুতুলের মত দেখতে দুটো যমজ বাচ্চা মেয়ে হলওয়ে দিয়ে হেঁটে আমার দিকে আসছে। ফিসফিস করে একজন আরেকজনের কানে কিছু বলছে, কি করে মৃত সাজা যায় সে নিয়ে নতুন কোন পরিকল্পনা করছে। আমার কল্পনায় ওরা হলের শেষ মাথায় গিয়ে বাঁকে হারিয়ে গেল। জুতো খুলে রেখে আমি তাদের ফলো করার চেষ্টা করলাম। যে বাঁকে তারা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেখানে গেলাম, অবশ্যই কেউ ছিল না সেখানে নিরব একটা অন্ধকার জায়গা, করিডোরের মলিন আলো জায়গাটা আলোকিত করতে পারেনি।

সোমবারে মোরিনো পাশ থেকে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। সে নিশ্চয়ই কৌতূহলবোধ করছিল, গ্রামে গিয়ে আমি কি কি করলাম তা জানতে চাইছিল। কিন্তু পুরো দিন আমি ওর দৃষ্টি উপেক্ষা করে গেলাম, ভান করলাম যেন খেয়ালই করিনি।

সেদিন শেষ ক্লাসের পর সব ছাত্রছাত্রি চলে না যাওয়া পর্যন্ত ওর সাথে কথা বললাম না। কয়েকজন আমাকে তাদের সাথে বাসায় যেতে বলেছিল, কিন্তু পাত্তা দেইনি-তার মানে এই না যে আমি কোন উত্তর দেইনি। আমার মন কোন কিছু চিন্তা না করেই বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত তৈরি করতে সক্ষম। আমার কোন ধারণা নেই কি অজুহাত বানিয়েছিলাম, ওগুলো নিজে নিজে তৈরি হয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যায়, আমাকে স্পর্শ করে না।

অবশেষে আমার ক্লাসমেটদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল, রুমের বাইরের হলে নিরবতা নেমে এল। ক্লাসে শুধু আমি আর মোরিনো ছিলাম। সে ওর সিটে কাত হয়ে বসেছিল, জাহাজ ডুবতে থাকলে যেমন দেখায়। আর পাশ থেকে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।

ধীরে-সুস্থে ওর সিটের দিকে গেলাম। জানালা থেকে তিন সারি দুরে সে বসে ছিল, পেছন থেকেও তিন সারি।

“শুনলাম তুমি নাকি গ্রামে রাতটা কাটিয়েছ। নানি ফোন করে বলল আমাকে।” ঘুমন্ত সুরে বলল মোরিনো। ওর চোখের নিচের দাগগুলোর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে।

“উনি ভালো রাঁধুনি।”

আমি ওর সামনের সিটে বসলাম, জানালার পাশের সারিতে। বাইরে তখনো আলো ছিল। আকাশের রঙ খানিকটা হলদেটে বর্ণ ধারন করেছে। দূরে স্পোর্টস টিমের হৈচৈ এর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। রুমের আলো নেভানো ছিল, আলো যা ছিল তার পুরোটাই জানালা দিয়ে আসছে।

“তুমি এক সময় যে বাড়িতে থাকতে সেখানের কিছু কাহিনী শুনলাম।”

“যেমন?”

“যেমন তুমি আর তোমার বোন ছোট থাকতে যেসব মজা করতে। তারপর ইয়োরুকে যত বকা দেয়া হোক সে কখনোই কাঁদত না, কিন্তু ইয়ু সাথে সাথে কেঁদে ফেলত, বোনের পেছনে গিয়ে লুকাত।”

“ও সব সময় আমার উপর নির্ভর করত।”

আমরা লম্বা এক মুহূর্ত চুপ করে বসে থাকলাম। বাতাসে অদ্ভুত একটা টানটান ব্যাপার ছিল। আমি আবার ওর দিকে তাকালাম।

“মোরিনো ইয়ুর ব্যাপারে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আমি সব খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে নিশ্চিত নই কিন্তু..”

মোরিনো আমার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে দূরে তাকাল, তারপর চোখ বন্ধ করে ফেলল। ওর চোখের গাঢ় দাগগুলোর উপর চোখের পাতাগুলো কাঁপছিল।

“আমি ধরে নিয়েছিলাম তুমি জানবে,” সে কর্কশ কন্ঠে বলল। সে জানতে চাইল কি কি জেনেছি আমি।

“ইয়ু মারা গিয়েছিল আট বছর বয়সে, এখন থেকে নয় বছর আগে, আমি বললাম। মোরিনো ওর চোখ খুলল না। “নয় বছর আগে সেই দিনে, ছাউনির ভেতর তুমি ওর দেহ ঝুলতে থাকা অবস্থায় পেয়েছিলে তারপর তোমার নানিকে গিয়ে বলেছিলে। কিন্তু তুমি আগেই জানতে যে মৃতদেহটা সেখানে ছিল। তুমি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কারো আসার অপেক্ষায় ছিলে যাতে তুমি অভিনয় করতে পার যে তার চোখের সামনেই তুমি মৃতদেহটা আবিস্কার করেছ।”

আমি চুপ করলাম, ওর প্রতিক্রিয়া খেয়াল করছিলাম। সে এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল তারপর বলল আর কিছু বলার আছে কিনা।

“তুমি এর আগেই জানতে যে তোমার বোন মৃত। কিন্তু তুমি অভিনয় করছিলে, সত্য লুকাতে চাইছিলে। আমি চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করছিলাম কেন তুমি এরকম কিছু একটা করতে পার। তারপর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, তোমার বোনের মৃত্যুর সাথে তোমার কোনভাবে সম্পর্ক ছিল।”

মোরিনো মাথা ঝাঁকাল।

আমি বলে চললাম, “ইয়ু সিলিঙের বিম থেকে দুটো দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। একটা ছিল ওর গলায় প্যাঁচানো, আরেকটা বুকে, যাতে শরীরের ভার নিতে পারে।”

আট বছর বয়সি মেয়েটা কাঠের বাক্সের উপর থেকে লাফ দিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য হয়তো মনে হচ্ছিল যে ও গলার দড়িটা দিয়ে ঝুলছে। কিন্তু আসলে সে তার বুকের দড়িটা দিয়ে ঝুলছিল যাতে পড়ে না যায়।

এরপর আরেকজন মেয়ে এল, যার চেহারাও একই রকম। সেই মেয়েটা দেয়ালের পাশ থেকে একটা কাঁচি তুলে নিল। তারপর ঝুলতে থাকা মেয়েটার কাছে গিয়ে বুকের সাথে দড়িটা কেটে দিল।

দড়িটা কেটে ফেলায়, মেয়েটা শুধু গলার দড়িটা দিয়ে ঝুলছিল।

“তুমি ওকে খুন করেছিলে।”

মোরিনো অল্প খানিকটা চোখ খুলল, আমার দিকে তাকাচ্ছিল না কোন কিছুর দিকেই তাকাচ্ছিল না।

“পায়ের ছাপের কথা কিছু শুনোনি? ছাউনির কোথাও আমার পায়ের ছাপ ছিল না।”

আমি কল্পনা করলাম মেয়েটা খালি পায়ে ঝুলে আছে। বৃষ্টিতে মাটি ভিজে নরম হয়ে ছিল।

“না, ছাউনির সবখানে তোমার পায়ের ছাপ ছিল। কিন্তু কেউ সত্যটা বুঝতে পারেনি। দড়ি কেটে ওকে খুন করার পর তুমি মাটিতে সবখানে তোমার পায়ের ছাপ দেখতে পেলে। আর তুমি বুঝতে পারলে যে কেউ ওগুলো দেখলে সন্দেহ জাগবেই। সুতরাং তোমাকে কিছু একটা করতেহবে..”

মোরিনো ঝুলন্ত লাশ আর মাটিতে পায়ের ছাপ দেখে বুঝল ঝামেলায় পড়ে গিয়েছে। তারপর সে দেখল জুতোগুলো মাটিতে সাজিয়ে রাখা। তখন সে একটা বুদ্ধি বের করল।

সে নিজের জুতো জোড়া খুলে, একটা বাক্সর উপর উঠে গেল। খেয়াল রাখল যেন নতুন করে কোন পায়ের ছাপ পড়ে। তারপর ঝুলন্ত লাশের নিচে রাখা জুতোজোড়া নিয়ে পড়ল, আর নিজেরগুলো সে জায়গায় রেখে দিল।

এখন পায়ের ছাপগুলো মৃত মেয়েটার হয়ে গেল।

“তারপর তোমার একমাত্র কাজ ছিল কুকুরের দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। ঐ জায়গার মাটি তখনো শুকনো ছিল, তাই কোন ছাপ পড়েনি মাটিতে।”

অবশেষে মোরিনো ওর চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল। “কিন্তু আমার মোটিভ কি?”

“ঘৃণা।” আমি বললাম।

মোরিনোকে খুবই দুঃখি দেখাল। “তুমি যখন বললে ‘মোরিনো ইয়ুর ব্যাপারে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি,’ আমি বুঝতে পেরেছিলাম ধরা পড়ে গিয়েছি।”

আমি মাথা ঝাঁকালাম।

ব্যাপারটা আমাকে হতবাক করেছিল-কেন ওর নানি এত নিশ্চিত ছিলেন যে সামনে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা ইয়োরু ছিল? ওরা তো যমজ, একদম একইরকম দেখতে-কেউ আলাদা করে চিনতে পারত না ওদেরকে।

কিন্তু ও যদি কালো জুতা পড়ে থাকে তাহলে সন্দেহ করার কোন সুযোগ ছিল না।

“এই নয় বছর নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট করে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে যে তুমি আসলে মোরিনো ইয়ু।”

মোরিনো আসলে মোরিনো ইয়োরু না, ও হল মোরিনো ইয়ু।

***

একদল মেয়ে হল দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল।

মোরিনো ইয় চুপ করে তাদের হাসাহাসি শুনল কিছুক্ষনের জন্য, ওদের কণ্ঠস্বর কমে কমে আবার নিরব হয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

“তুমি ঠিকই ধরেছ,” সে বলল। “আমিই ছোট বোনটা। আমিই সবসময় কান্নাকাটি করতাম, আমার উপরই সব আদেশ করা হতো।” তারপর ভুরু কুঁচকে আমাকে প্রশ্ন করল। কিন্তু তুমি কিভাবে জানলে?”

“ইয়ু জানত না, লোকজন আত্মহত্যা করার আগে জুতো খুলে নেয়। ঐ ব্যাপারটাই সবকিছু পরিস্কার করে দিয়েছে। তোমরা যখন আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলতে তখন হয়তো ইয়োরু তোমাকে বলেছিল কিন্তু আমার ধারণা তুমি ভুলে গিয়েছিলে।”

আমি ওকে বললাম ওদের বাড়িতে যেসব ড্রয়িং দেখেছি। যে ড্রয়িংগুলোতে তারা নিজেদের আত্মহত্যা খেলার ছবি এঁকেছিল।

“ঐ ডুয়িংগুলো করা হয়েছিল নয় বছর আগের গ্রীষ্মের ছুটির সময়, ইয়োরুর মৃত্যুর ঠিক আগে আগে। তার মানে হলো ড্রয়িংগুলো ঐ সময়ে, মৃত্যুর আগে ইয়োরুর ব্যক্তিত্ব কেমন ছিল তাও তুলে ধরে।”

ইয়োরু আর ইয়ু একই জিনিস এঁকেছিল, কিন্তু তারপরেও ওদের আঁকার মধ্যে কিছু পার্থক্য ছিল। ইয়ুর আঁকা ছবিতে, দুই মেয়েই জুতো পড়েছিল। কিন্তু ইয়োরুর ছবিতে দুই মেয়েরই পুরো পা রঙ করা ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম ইয়ু বোধহয় ডিটেইলিং বেশি করেছে, কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত বদলেছি।

আমার মনে হতে লাগল ইয়োরুই আসলে ঠিক মত এঁকেছে, তার স্মৃতি থেকে। ইয়ুর ছবিতে সূর্য ছিল, কিন্তু ইয়োরুর ছবিতে ছিল ধূসর ব্যাকগ্রাউন্ড-আরেকটা সূত্র। বাস স্টপে বসে সেদিন মোরিনো আমাকে তাদের আত্মহত্যা খেলার কথা যখন বলেছিল, তখন বলেছিল দিনটা ছিল বৃষ্টির দিন। ব্যাপারটা এমন না যে ইয়োৰু জুতো আঁকতে ভুলে গিয়েছিল-আসলে তারা দুজনেই খালি পায়ে ছিল।

“তুমি নিজেই বাস স্টপে বলেছিলে যে তুমি মৃত্যু সম্পর্কে ইয়ুর চেয়ে বেশি জানো, তুমি ওর চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর ছিলে। তুমি ইয়োরু হিসেবে বলেছিলে কথাটা, তার মানে একজন শিশু হলেও ইয়োৰু নিশ্চয়ই এই অদ্ভুত নিয়ম জানত যে লোকজন আত্মহত্যা করার আগে তাদের জুতো খুলে নেয়।”

যমজ দু-জন যখন আত্মহত্যা আত্মহত্যা খেলেছিল তখন নিশ্চয়ই তাদের জুতো খুলে পাশে রেখে দিয়েছিল। ইয়োরু জানত তাই তোমাকে তাই করতে বলেছিল। ওর জ্ঞান ওর ড্রয়িঙে প্রতিফলিত হয়েছিল।

কিন্তু ইয়ুর ক্ষেত্রে তা হয়নি। খেলার সময় ইয়ু জুতো খুললেও পরে ভুলে গিয়েছিল। কারণ ও এই অদ্ভুত নিয়মের কথা জানত না। যে কারনে ওর ড্রয়িঙে জুতো পরে আত্মহত্যা আঁকা ছিল।

অথচ ছাউনির লাশটা খালি পায়ে ছিল। ইয়ু যদি খেলতে খেলতে দুর্ঘটনাবশত আত্মহত্যা করে ফেলে তাহলে তার পায়ে জুতো থাকার কথা।

ইয়ু চুপ করে শুনছিল, তারপর ওর ঠোঁটজোড়া অল্প খানিকটা ফাঁকা হলো কথা বলার জন্য। আমার কালো জুতো পরা বোন মারা গিয়েছিল। হয়তো আমি ওকে একটু আধটু ঘৃণা করতাম ঠিকই। কিন্তু তোমার অনুমান পুরোপুরি সঠিক নয়।” ওর স্বর একদম শান্ত ছিল। “তুমি ওর বুকে জড়ানো দড়িটা দেখনি তাই না? আমি কাটিনি, ওটা নিজেই ছিঁড়ে গিয়েছিল।”

সেদিন দুপুরে, ওর বড় বোন ইয়োরু প্রস্তাব দিল তারা আত্মহত্যা করার ভান করে সবাইকে চমকে দেবে।

ইয়ু রাজি হলো। তারা যেই ছাউনিতে কাজ শুরু করল তখনই বৃষ্টি শুরু হলো।

কুকুরটা তখনো বেঁচে ছিল। অবাক হয়ে ওদের কাজ কারবার দেখছিল।

“আমার বোন বাক্সগুলো জড়ো করল, বিম থেকে দড়ি লাগাল। আমি নিচে ছিলাম, খেয়াল রাখছিলাম বাক্সগুলো যাতে নড়াচড়া করে পড়ে না যায়।”

বৃষ্টিতে মেঝে নরম হওয়ার আগেই ইয়োৰু বাক্সগুলোর উপরে ছিল, তাই মাটিতে ওর পায়ের কোন ছাপ ছিল না।

ইয়োৰু একা আত্মহত্যার ভান করবে, আর ইয়ুর কাজ ছিল কাউকে সেখানে দেখাতে নিয়ে যাওয়া। ওদের প্রস্তুতি চলছিল, ইয়োরু দুটো দড়িই জায়গামত বেঁধে ফেলল।

“তারপর আমার বোন লাফ দিল।

ইয়োরু লাথি দিয়ে বাক্সগুলো সরিয়ে দিয়ে পড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য দেখে মনে হচ্ছিল যে ও গলা থেকেই ঝুলছে, যদিও ও আসলে বুকের সাথে লাগানো দড়ি থেকে ঝুলছিল।

সে নিচে ইয়ুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল। “লোকজনকে বোকা বানানোর সময় ও সবসময় একটু মুচকি দিয়ে হাসত। বাসার কারো সাথে কথা বলার সময় কোন অভিব্যক্তি দেখাত না, শুধু কাউকে বোকা বানানোর সময় মনে হত ও আনন্দ পেত।”

কিন্তু এক মুহূর্ত পর ওর বুকের দড়িটা ছিঁড়ে গেল।

“আমি কিছুই করিনি। দড়িটা আমার বোনের ভার সহ্য করার মত শক্ত ছিল না। সিলিঙের কাছ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল। তুমি যদি দড়িটা দেখতে তাহলে ঠিকভাবে অনুমানটা করতে পারতে। ওটা এত উঁচুতে ছিঁড়েছিল যেখানে আমার পক্ষে কাটা সম্ভব ছিল না।”

ইয়োরু এক মুহূর্ত সেখানে ঝুলে থাকল।

“আমি দ্রুত সাহায্য করতে চেষ্টা করলাম। আমি আমার হাত দিয়ে ওর শরীর জড়িয়ে ওকে উঁচু করে ধরার চেষ্টা করলাম। ওকে শূন্যে ধরে রেখেছিলাম, চেষ্টা করছিলাম যেন ঝুলে না পড়ে।”

ছাউনির ভেতর একটা মেয়ে সিলিং থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে, আরেকজন হুবহু একইরকম দেখতে একটা মেয়ে তাকে ধরে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। ঝুলন্ত মেয়েটা ধস্তাধস্তি করছিল, ওর পা বাতাসে লাখি ছুঁড়ছিল। পাশে বাঁধা কুকুরটা ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করছিল। মেয়েটার সংগ্রাম আর কুকুরের চিৎকার একসাথে ছোট ঘরটায় কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সময় অনন্তকালের জন্য এক জায়গায় এসে থেমে গিয়েছে।

“আমি আমার বোনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করেছিলাম। আমার গায়ে তেমন একটা শক্তি ছিল না কিন্তু তারপরেও আমি ওকে তুলে ধরে রেখেছিলাম। ও চিৎকার করছিল, ওর লাথি ছুটে এসে আমার গায়ে লাগছিল।”

মোরিনো ওর চেয়ারে বাঁকা হয়ে বসল। রুমের অন্যপাশের দেয়ালের দিকে তাকিয়েছিল, যেন সেদিনের সব দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। স্মৃতিগুলো ওর কাছে এখন দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।

ইয়ু ছেড়ে দিলে ওর বোন পড়ে যাবে আর গলায় দড়ি শক্ত করে বসে যাবে।

ইয়োরুর চোখ আতংকে বেরিয়ে আসছিল, বোনকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছিল-কিন্তু ওর চিৎকারে কোন উৎসাহ ছিল না।

“ও বলছিল, ‘ভাল করে ধর, শক্ত করে ধর গাধা কোথাকার..” মোরিনো চোখ চেপে বন্ধ করে ছিল, আবেগ আটকানোর চেষ্টা করছিল। “এটা যখন আমার কানে গেল আমি ওকে ছেড়ে দিলাম, আর বাঁচানোর চেষ্টা করলাম না।”

ইয়োরুর দেহ ঝুলে পড়ল।

মাটি থেকে একটু উপরে ওর পা থেমে গেল। ইয়োক জুতো পড়ে ছিল না, খালি পায়ে ছিল। ওর পায়ের আঙুলগুলো ছড়িয়ে গিয়ে পেশিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। কুকুরটা গলা ছেড়ে চিৎকার করতে থাকলে সেই শব্দে ইয়ুর কান ব্যথা করছিল। এই খিচুনির দৃশ্য আর কুকুরের চিৎকার ওর মনের গভীরে গেঁথে যায়।

“অবশেষে এক সময় ওর দেহ নিস্তেজ হয়ে আসে, পা নড়াচড়া থামিয়ে দিল।”

ইয়ু পেছনে যেতে গিয়ে টের পেল মাটি ওর জুতো টেনে ধরেছে। পায়ের ছাপ পড়ল মেঝেতে।

“শুধু আমার একার ওজন হলে হয়তো কোন ছাপ পড়ত না।” ওর বোনের জুতো জোড়া পাশেই মাটিতে রাখা ছিল।

“ওগুলো চোখে পড়তেই আমি ঠিক করলাম সবার কাছে মিথ্যা বলব। আমার সব স্পষ্ট মনে আছে…ছোট ছাউনিটাতে…আমার বোনের মৃতদেহ হালকা দুলছিল, ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত।”

ছোট মেয়েটার ছোট মাথাটা দ্রুত চিন্তা করল আর নিজের সামনে একটা রাস্তা দেখতে পেল। নিজের সাদা জুতো খুলে কালো জুতো জোড়া পড়ল। তারপর জায়গা মত রেখে দিল। তারপর শুকনো মাটির উপর দিয়ে হেঁটে কুকুরের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে গেল। কালো জুতোর কারনে সবাই ওকে ইয়োরু বলে ধরে নিল। যে কারনে ও নিজেকে ইয়োৰু পরিচয় দিতে লাগল আর ইয়োরুর মত ব্যবহার করতে লাগল।

“আমি আগের মত আর হাসতে পারতাম না। আমার বোনের মত শ্য মুখ করে রাখতে হত আমাকে। আমরা সবসময় একসাথে থাকতাম বলে ও কেমন ছিল তা আমার ভালো মত জানা ছিল। সহজেই ওর মত অভিনয় করতে পারতাম। গত নয় বছরে কেউ সন্দেহ করেনি যে আমি ইয়।”

সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

আট বছর বয়সে সে নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখল। জীবনের বেশিরভাগ সময় ওর নিজের আসল নাম ছাড়াই পার হয়ে গেল। কেউ জানতে পারল না ওর ভেতরে কি চলছিল, অনুভূতিগুলো পুঞ্জিভুত হয়ে একসময় ফেটে বেরিয়ে এল। ও নিজের হাত কেটে ফেলল…আর এ সবকিছু ঘটল ওর বোনের কারনে, আর বোনের সাথে চাপা দেয়া ওর নামটার কারনে। বাচ্চা মেয়েটা যে পথ বেছে নিয়েছিল, যার উপর ওর জীবন নির্ভর করছিল, তা ছিল কষ্ট আর একাকিত্বে ভরপুর।

জানালা দিয়ে আসা আলো কমে আসছে, সোনালি দেখাচ্ছে। মলিন হলুদ পর্দাগুলো অর্ধেক টানা থাকায় সূর্যের আলো কমে গিয়েছে। মাঠ থেকে আসা বেজবল প্র্যাকটিসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি, বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলছে। শূন্য ক্লাসরুমের ঘড়িটা নিরবে টিকটিক করে যাচ্ছে।

একসময় মোরিনো ওর মুখ খুলল, যদিও নিশ্চিত ছিল না কি বলবে। “তোমার কি মনে আছে আমাদের কোথায় আর কিভাবে প্রথম দেখা হয়েছিল?”

আমার বিশ্বাস সেটা এই ক্লাসরুমেই হয়েছিল, হাই স্কুলের সেকেন্ড ইয়ারের শুরুতে। শুনে ও একটু আশাহত হলো মনে হয়।

“হয়নি, জুনিয়র হাই তে থাকতে। তোমাকে মিউজিয়ামে দেখেছিলাম আমি, একটা মানবদেহের টুকরো অংশগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছিলে। তারপরের বসন্তে যখন আমরা হাই স্কুলে উঠলাম তখন তোমাকে দেখলাম লাইব্রেরিতে বসে ময়নাতদন্তের উপর একটা মেডিক্যাল বই পড়ছ। দেখা মাত্র তোমাকে চিনেছিলাম আমি।”

সেকারনেই সে জানত আমি ক্লাসে অভিনয় করছি সবার সাথে। এখন বুঝতে পারলাম। আমরা একজন আরেকজনের লুকিয়ে রাখা রূপ ঠিকই ধরতে পেরেছি, আর কেউ না পারলেও।

“আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তুমি যখন ইয়ু ছিলে তখন আসলেই হাসতে।”

“আসলেই। একসময় আমি ওরকম ছিলাম। কিন্তু ছাউনি থেকে বেরিয়ে আসার পর ভাবলাম যদি আমি হেসে ফেলি তাহলে লোকজন বুঝে ফেলবে আমি ইয়। নয় বছর আমি চেষ্টা করেছি কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ না করতে, আমার বোনে পরিণত হতে। আর এখন আমি হাসতে পারি না, চেষ্টা করলেও পারব না।”

ওকে খানিকটা হতাশ দেখাল। আমার থেকে অন্যদিকে তাকিয়ে সে বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমিই প্রথম আমাকে আমার নাম ধরে ডাকবে।”

আমি উঠে দাঁড়ালাম। “তোমার জন্য আমার কাছে একটা জিনিস আছে, গ্রাম থেকে ফেরার সময় আমি এটা তোমার বাড়ি থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছি।”

ডেস্কের উপর রাখা আমার ব্যাগ থেকে জিনিসটা বের করলাম। “কি জিনিস?” না দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল সে

“যে দড়িটা তুমি খুঁজছিলে। আমার ধারণা এটা নিখুঁতভাবে মিলে যাবে, চোখ বন্ধ কর-আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।”

মোরিনো তখনও বসে ছিল, চোখ বন্ধ করল। আমি ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর ছোট কাঁধগুলো শক্ত হয়ে গেল, টেনশনে।

আমি লাল দড়িটা ওর গলায় পেচালাম। দড়িটা নোংরা হয়ে ছিল। ছাউনির ভেতর ছিল এটা, যেখানে কুকুরটা বাঁধা থাকত।

“আমি এখন এও জানি কেন তুমি এত কুকুর ঘৃণা কর।”

আমি আস্তে করে দড়িটা টাইট করলাম।

চাপ বাড়তে ওর কাঁধ কেঁপে উঠল। এক মুহূর্ত আমি থেমে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর গেরোটা দিয়ে ছেড়ে দিলাম। দড়ির বাকি অংশ ওর কাঁধে ঝুলতে থাকল।

“হ্যাঁ…এটাই দরকার ছিল..” সে শ্বাস ছাড়ল। সেই সাথে সমস্ত টেনশন যেন ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর ভেতরটা যেন হালকা হয়ে গেল।

কুকুরের দড়িটা থেকে ইয়োরু মারা গিয়েছিল, মোরিনোর স্মৃতির গভীরে সেই তথ্য কোথাও লুকিয়ে ছিল। সে কখনো বুঝতে পারেনি যেই দড়িটা সে খুঁজছিল তা ওর বোনকে খুন করার জন্য দায়ি ছিল।

“আমি কখনো আমার বোনকে ঘণা করিনি। সে অনেক সময়ই অনেক জঘন্য কাজ করেছে, কিন্তু ওর জায়গা কখনো আর কেউ নিতে পারবে না…”

আমি আমার ব্যাগটা তুলে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওর সিটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবারের জন্য ঘুরে ওর দিকে তাকালাম। ও ওর চেয়ারে বসেছে। পা সামনে ছড়ানো। হাত দুটো বুকের উপর রাখা। লাল দড়িটা গলা থেকে পিঠের উপর ঝুলছে।

ওর চোখ বন্ধ। ওর গাল সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করছে, মনে হচ্ছে যেন আলো দিয়ে তৈরি।

এক বিন্দু অশ্রু ওর গাল বেয়ে নেমে ইউনিফর্মের উপর পড়ল।

ওকে সেখানে একা রেখে ক্লাসরুমের দরজা নিঃশব্দে বন্ধ করে বেরিয়ে গেলাম আমি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *