১৫. দিন আসে, দিন যায়

পনেরো

দিন আসে, দিন যায়………….।

এমনি করে কতো মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মিশে যায় অতীতের কোলে। নয়ীম দক্ষিণ পর্তুগালের শাসনকর্তার পদ গ্রহণের পর কেটে যায় আঠারো বছর। তার যৌবন চলে গিয়ে আসে বার্থক্য। কালো দাড়ি সাদা হয়ে আসে। নার্গিসের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু তাঁর দেহ-সৌন্দর্যে নেই।

তাদের বড় ছেলে আব্দুল্লাহ বিন নয়ীম পনেরো বছরে পা দিয়ে ভর্তি হয়েছেন স্পেনের ফউজে। তিন বছরে মধ্যেই তাঁর খ্যাতি এমন করে ছড়িয়ে পড়েছে যে, বাহাদুর পুত্ররত্নের গর্বে ফুলে ওঠে নার্গিস ও নয়ীমের বুক। দ্বিতীয় পুত্র হোসেন বড়ো ভাইয়ের চাইতে আট বছরের ছোট।

একদিন হোসেন বিন নয়ীম বাড়ির আঙিনায় এক কাঠের ফলককে লক্ষ্যস্থল বানিয়ে তীরন্দাযীর অভ্যাস করছে। নার্গিস ও নয়ীম বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন তাদের জিগরের টুকরার দিকে। হোসেনের কয়েকটি তীর নিশানায় লাগলো না। নয়ীম হাসিমুখে হোসেনের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হোসেন লক্ষ্য স্থির করে বাপের দিকে তাকিয়ে নিশানা করলো।

‘বেটা, তোমার হাত কাঁপছে আর তোমার গদান উঁচু করে রেখেছে।

আব্বাজান, আপনি যখন আমার মতো ছিলেন আপনার হাত কাঁপতো না?

‘তোমার বয়সে আমি উড়ন্ত পাখীকে যমিনে ফেলে দিয়েছি, আর যখন আমি এর চাইতে চার বছরের বড় ছিলাম তখন আমি বসরার ছেলেদের মধ্যে সব চাইতে বড়ো তীরন্দাষ বলে নাম করেছিলাম।’

আব্বাজান, আপনি নিশানা লাগিয়ে দেখুন না।’

নয়ীম তার হাত থেকে ধনুক নিয়ে তীর চালালে তীরটি গিয়ে লাগলো লক্ষ্যের ঠিক মাঝখানে। তারপর তিনি পুত্রকে নিশানা লাগাবার তরিকা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। নার্গিসও এসে দাঁড়ালেন তাঁদের কাছে।

এক নওজোয়ান ঘোড়া ছুটিয়ে এসে দাঁড়ালেন বাড়ির ফটকে। নওকর ফটক খুললো। সওয়ার ঘোড়ার বাগ নওকরের হাতে দিয়ে ছুটে গিয়ে ঢুকলেন বাড়ির আঙিনায়।

নয়ীম পুত্র আব্দুল্লাহকে দেখে তাকে বুকে চেপে ধরলেন। নার্গিস হাজারো দোআ-ভরা দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে কাছে এসে বললেন, বেটা, তুমি এসেছো? আলহামদুলিল্লাহ।’

নয়ীম জিজ্ঞেস করলেন, “কি খবর নিয়ে এলে বেটা?

আব্দুল্লাহ বিন নয়ীম মাথা নত করে বিষণ্ণ মুখে বললেন, ‘আব্বাজান, কোনো . ভালো খবর নেই। ফ্রান্সের লড়াইয়ে কঠিন ক্ষতির স্বীকার করে ফিরে এসেছি আমরা ফ্রান্সের অনেকগুলো এলাকা আমরা জয় করে প্যারীস নগরীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন খবর পেলাম, ফ্রান্সের রাজা একলাখ ফউজ নিয়ে মোকাবেলা করতে আসছেন আমাদের। আমাদের ফউজ আঠারো হাজারের বেশী ছিলো না। আমাদের সিপাহসালার ওকবা কর্ডোভা থেকে সাহায্য চেয়ে পাঠালেন, কিন্তু সেখান থেকে খবর এলো যে, মারাকেশে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে এবং ফ্রান্সের দিকে বেশি সংখ্যক ফউজ পাঠানো যাবে না। নিরুপায় হয়ে আমরা ফ্রান্সের রাজকীয় বাহিনীর মোকাবিলা করলাম এবং আমাদের অর্ধেকের বেশী সিপাহী ময়দানে ভূপাতিত হলো।’

আর ওকবা এখন কোথায়?’ নয়ীম প্রশ্ন হলো।’. :

‘তিনি কডোভায় পৌঁছে গেছেন এবং শিগগীরই মারাকেশের দিকে অগ্রসর হবেন। বিদ্রোহের আগুন মারাকেশ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে তিউনিসের দিকে। বাবার বাহিনী তামাম মুসলমান হাকীমকে কতল করে ফেলেছে। জানা গেছে যে, এ বিদ্রোহের খারেজী ও রোমীয়দের হাত আছে।’

নয়ীম বললেন, ওকাবা এক বাহাদুর সিপাহী বটে, কিন্তু যোগ্য সিপাহসালার নয়। আমায় ফউজের নেবার জন্য আমি স্পেনের ওয়ালীকে লিখেছিলাম, কিন্তু তিনি মানলেন না।’

আচ্ছা আব্বাজান, আমায় এযত দিন।’

‘এযায়ত! কোথায় যাবে তুমি’? নার্গিস প্রশ্ন করলেন।

‘আম্মিজান, আপনাকে ও আব্বজানকে দেখে যেতেই শুধু এসেছিলাম। ফউজের সাথে আমায় যেতে হবে মারাকাশের দিকে।

আচ্ছা খোদা তোমায় হেফাযত করুন। নয়ীম বললেন।

‘আচ্ছা আম্মি, খোদা হাফিয!’ বলে আব্দুল্লাহ হোসেনকে একবার বুকের সাথে লাগিয়ে তেমনি দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে চলে গেলেন। বার্বারদের বিদ্রোহের হাজার হাজার মুসলমানের প্রাণহানি হলো। তারা মুসলমান হাকীমদের হত্যা করে স্বাতীনতা ঘোষণা করলো।

ওকবা মারাকেশের উপকূলে অবতরণ করলেন এবং ১২৩ হিজরীতে শাম থেকে কিছুসংখ্যক ফউজ পৌঁছলো তাঁর সাহায্যের জন্য। মারাকাশে ঘোরতর লড়াই হলো। বাবার সেনাবাহিনী চারদিক থেকে বেরিয়ে এলো সয়লাভের মতো। হিস্পানিয়া ও শামের সেনাবাহিনী ভীষণভাবে তাদের মোকাবিল করলো, কিন্তু অগণিত প্রতিদ্বন্দ্বী ফউজের সামনে তারা টিকতে পারলেন না। ওকবা লড়াইয়ের ময়দানে শহীদ হলেন এবং মুসলিম ফউজের মধ্যে দেখা দিলো বিশৃংখলা। বার্বারবা চারদিক থেকে বেষ্টন করে তাদেরকে কতল করতে লাগলো।

নয়মের বেটা আব্দুল্লাহ দুশমনদের সারি ভেদ করে এগিয়ে গেলেন বহুত দুরে এবং যখমী হয়ে যখন তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক আরবী সালার তার কোমরে হাত দিয়ে তাঁকে তুলে বসালেন ঘোড়ার উপর এবং তাকে নিয়ে পৌঁছে দিলেন ময়দানের বাইরে এক নিরাপদ জায়গায়।

হিস্পানিয়া ও শামের সেনাবাহিনী প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিহত হলো। বাকী সিপাহীরা সরে যেতে লাগলো এক দিকে। বার্বাররা তাদেরকে পিছপা হাতে দেখে অনুসরণ করলে কয়েক মাইল। পরাজিত ফউজ আলজাযায়ের গিয়ে দম ফেললো।

স্পেনের ওয়ালীর কাছে এ পরাজয়ের খবর পৌঁছলে তিনি হিস্পানিয়া সব প্রদেশ থেকে নয়া ফউজ সংগ্রহের চেষ্টা করলেন এবং এই নয়া লশকরের নেতৃত্ব নেবার জন্য নির্বাচন করলেন নয়ীমকে। নয়ীম তাঁর বেটার চিঠিতে তার যখমী হবার ও এক আরব সালারের ত্যাগ স্বীকারের ফলে জানে বেঁচে যাবার খবর পেয়েছেন আগেই। ১২৫ হিজরীতে যখন বাবার বাহিনী তামাম উত্তর আফ্রিকায় যুলুমের তান্ডব-নত্য চালিয়ে যাচ্ছিলো, তখন নয়ীম আচানক দশ হাজার সিপাহী নিয়ে অবতরণ করলেন আফ্রিকার উপকুলে। বার্বাররা তাদের আগমন সম্পর্ক ছিলো। বেখবর! নয়ীম তাদেকে বারংবার পরাজিত করে এগিয়ে চললেন পূর্ব দিকে!

ওদিকে আজাযায়ের থেকে পরাজিত সৈনিকরাও শুরু করলো অগ্রগতি। বার্বারদের দমন করা হতে লাগলো দুদিক থেকে। এক মাসের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে গেলো মারাকাশের বিদ্রোহের আগুন, কিন্তু আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব এলাকার কোথাও কোথাও তখনো পাওয়া যাচ্ছে এ বিপদের আভাস। খারেজী ও বার্বাররা মারাকেশ থেকে সরে গিয়ে তিউনিসকে করলো তাদের কর্মকেন্দ্র। নয়ীম তখন মারাকেশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যস্ত। তাই তিনি তিউনিসের দিকে যেতে পারলেন না। তিনি ফউজের বাছাই করা অফিসারদের নিজের খিমায় একত্র করে এক তেজোব্যঞ্জক বক্তৃতা করে বললেন,

তিউনিসের উপর হামলা করবার জন্য একজন জীবন পণকারী সালারের প্রয়োজন। আপনাদের মধ্যে কে আছেন এ খেদমতের যিম্মা নিতে তৈরী?’

নয়মের কথা শেষ না হতেই তিনজন মুজাহিদ উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁদের মধ্যে একজন তাঁর পুরানো দোস্ত ইউসুফ, দ্বিতীয় তাঁর নওজোয়ান বেটা আব্দুল্লাহ, আর তৃতীয় নওজোয়ানের চেহারা-আকৃতি আব্দুল্লাহর সাথে অনেকটা মেলে, কিন্তু নয়ীম তাকে চেনন না।

তোমার নাম কি?’ নয়ীম প্রশ্ন করলেন।

আমার নাম নয়ীম। নওজোয়ান জওয়াব দিলেন।

নয়ীম বিন?

নয়ীম বিন আব্দুল্লাহ। নওজোয়ান জওয়াব দিলেন।

‘আব্দুল্লাহ? আব্দুল্লাহ বিন আবদুর রহমান?’ নয়ীম প্রশ্ন করলেন।

‘জি হ্যাঁ।

নয়ীম এগিয়ে এসে নওজোয়ানকে বুকে চেপে ধরলেন। তারপর বললেন, ‘আমায় চেনো তুমি?

“জি হ্যাঁ, আপনি আমদের সিপাহসালার।

তাছাড়া আমি আরো কিছু।’ নওজোয়ানের দিকে সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নয়ীম বললেন, “আমি তোমার চাচা। আব্দুল্লাহ, এ তোমার ভাই।

আব্বাজান! ইনিই আমর জান বাঁচিয়েছিলেন মারাকেশের লড়াইয়ের সময় ‘ভাইজান কেমন আছেন? নয়ীম প্রশ্ন করলেন।

‘দু বছর হলো, তিনি শহীদ হয়েছেন। এক খারেজী তাঁকে কতল করেছিলো।

নয়ীমের দীল ধড় ফড় করে উঠলো। খানিকক্ষণ তিনি নীরব রইলেন। হাত তুলে তিনি মাগফেরাতের জন্য দোআ করে প্রশ্ন করলেন, তোমার ওয়ালিদা?’

তিনি ভালো আছেন।’

‘তোমার ভাই কটি?

‘এক ভাই আর একটি ছোট বোন?

নয়ীম বাকি অফিসারদের বিদায় করে তাদের যাবার পর নিজের কোমর থেকে তলোয়ার খুলে নয়ীম বিন আব্দুল্লাহকে দিতে দিতে বললেন, তুমি এ আমানতের হকদার, আর তুমি এখানেই থাক। আমি নিজেই যাব তিউনিসের দিকে।

‘চাচাজান, আমায় কেন পাঠাচ্ছেন না?’

‘বেটা, তুমি জোয়ান। তোমরা দুনিয়ার প্রয়োজনে আসবে। আজ থেকে তুমি এখানকার সেনাবাহিনীর সিপাহসালার।……..আব্দুল্লাহ ইনি তোমার বড় ভাই। এঁর হুকুম দীল-জান দিয়ে মেনে নেবে।’

নয়ীম বিন আব্দুল্লাহ বললেন, ‘চাচাজান, আপনার কাছে কিছু বলবার আছে আমার।’

বলো বেটা।

‘আপনি ঘরে যাবেন না?

‘বেটা, তিউনিস অভিযানের পর আমি শিগগীরই যাবো।

চাচাজান, আপনি অবশ্যি যাবেন। আম্মিজান প্রায়ই আপনাকে মনে করেন। আমার ছোট বোন আর ভাইও আপনার কথা বলে বারবার।

তিনি কি জানেন যে আমি যিন্দাহ রয়েছি।

আম্মিজান বিশ্বাস ছিলো যে, আপনি যিন্দহ রয়েছেন। তিনি আমায় মারাকেশ অভিযানের পর স্পেনে গিয়ে আপনাকে তালাশ করবার তাকিদ করেছেন এবং চাচীজানকে নিয়ে আপনাকে ঘরে তশরীফ নিতে বলেছেন।’

আমি খুব শিগগীরই ওখানে পৌঁছে যাবো। আব্দুল্লাহ তুমি আলুস চলে যাও। ওখান থেকে তোমার মাকে নিয়ে খুব শিগগীরই ঘরে পৌঁছে যাবে। তিউনিস থেকে কর্তব্য শেষ করে আমি আসবো। আমি আন্দালুসের ওয়ালীকে চিঠি লিখছি। তিনি তোমাদের সাগর-পথে সফরের ইনতেযাম করে দেবেন।

*

তিউনিসে বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে গিয়ে নয়ীমকে বহুবিধ অপ্রত্যাশিত অসুবিধার সম্মুখীন হতে হলো। বারবার বিদ্রোহীরা এক জায়গায় পরাজয় স্বীকার করে অপর জায়গায় গিয়ে লুটপাট করতে লাগলো। কয়েক মাসের মধ্যে কয়েকটি সংঘর্ষের পর তিনি তিউনিসের বিদ্রোহ দমন করলেন। তিউনিস থেকে বিদ্রোহী দল পিছপা হয়ে ছড়িয়ে পড়লো পূর্ব দিকে। নয়ীম বিদ্রোহীদের দমন করবার সিন্ধান্ত স্থির করে এগিয়ে চললেন সামনের দিকে। তিউনিস ও কায়রোয়ানদের মাঝখানে বিদ্রোহীরা কয়েকবার মোকাবিলা করলো নয়ীমের ফউজের সাথে কিন্তু তাদেরকে পরাজয় বরণ করতে হলো। কায়রোয়ানের কাছে যে শেষ লড়াই হলো, তাতে নয়ীম যখমী হলেন গুরুতররূপে। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে নেয়া হলো কায়রোয়ানে। সেখানকার শাসনকর্তা তাকে নিজের কাছে রেখে তার এলাজ করার জন্য ডাকলেন এক অভিজ্ঞ চিকিৎসককে। বহুক্ষণ পর নয়ীমের হুঁশ ফিরে এলো, কিন্তু বহু পরিমাণ রক্ত ক্ষয় হবার ফলে তিনি এতটা কমজোর হয়ে পড়লেন যে, তিনি দিনের মধ্যে কয়েকবার মছা যেতে লাগলেন। এক হফতা কাল নয়ীম জীবন-মৃত্যুর সংঘাতের ভিতরে বিছানায় পড়ে রইলেন। তাঁর অবস্থা দেখে কায়রোয়ানদের ওয়ালী ফুসতাত থেকে এক মশহুর হাকীমকে ডেকে পাঠালেন। হাকীম নয়ীমের যখম পরীক্ষা করে তাঁকে আশ্বাস দিলেন, কিন্তু এও বললেন যে, তাঁকে দীর্ঘকাল শুয়ে শুয়ে কাটাতে হবে।

তিনি হফতা পর নয়ীমের অবস্থা কিছুটা ভালো হলে তিনি ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, কিন্তু হাকীম বললেন, যখম এখনো সারেনি। সফরে ওগুলো ফেটে যাবার আশংকা রয়েছে। তাই আপনাকে কম-সে-কম আরো এক মাস এলাজ করাতে হবে। আমার ভয় হচ্ছে, কোন বিষাক্ত হাতিয়ার থেকে এসব আঘাত লেগেছে, হয়তো রক্ত বিষাক্ত হয়ে আবার খারাপ কিছু হতে পার।’

*

নয়ীম আর এক হফতা দেরী করলেন, কিন্তু ঘরে ফিরে যাবার জন্য তাঁর বেকারারী বেড়ে চললো প্রতি মুহূর্তে। বিচানায় পড়ে এপাশ ওপাশ করে তিনি কাটিয়ে দেন সারা রাত। মন চায়, আর একবার তিনি উড়ে যান তার দুনিয়ার বেহেশতে।

তাঁর বিশ্বাস, নার্গিস পৌঁছে গেছেন সেখানে। উযরার সাথে বালুর টিবির উপর দাঁড়িয়ে তিনি দেখছেন তাঁর পথ চেয়ে।

আরো বিশ দিন চলে গেলো। যে যখম কতকটা সেরে এসেছিলো, তা আবার খারাপ হতে লাগলো। আর হালকা হালকা জ্বর হতে লাগলো। হাকীম তাঁকে বললেন যে, এসব বিষাক্ত হাতিয়ারের যখমের ফল। তার শিরা-উপশিরায় বিষক্রিয়া হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন সেখানে থেকে এলাজ করাতে হবে।

একদিন মধ্যরাত্রের কাছাকাছি সময়ে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করছেন, ঘরে ফিরে তিনি উযরাকে কি অবস্থায় দেখবেন। সময় তাঁর নিষ্পাপ মুখে কতোটা পরিবর্তন এনেছে। তার বিষাদক্লিষ্ট রূপ দেখে কি ভাবের উদয় হবে তার মনে। তার মানে আরো খেয়াল জাগে, হয়তো এখনো তার ঘরে ফিরে যাওয়া কুদরতের মনযুর নয়। তিনি আগেও কত বার যখমী হয়েছেন। কিন্তু এবারকার যখমের অবস্থা অন্য রকম। তিনি মনে মনে বলেন, এই যখমের ফলেই হয়তো আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বো, কিন্তু নার্গিস ও উযরার কাছে কত কথা আছে বলবার, নিজের ছেলে ও ভাতিজাদেরকে কত উপদেশ দেওয়া দরকার। মৃত্যুর ভয় নেই আমার। মৃত্যুকে নিয়ে তো হামেশা আমি খেলছি, কিন্তু এখানে শুয়ে শুয়ে মওতের ইনতেযার আমি করবো না। উষরা আমায় ঘরে ফিরে যাবার পয়গাম পঠিয়েছে।…..সেই ‘উযরা যাঁর মামুলী ইচ্ছার জন্য আমি জীবন বাজি রাখা সহজ মনে করেছি। তাছড়া নার্গিসের অবস্থাই বা কি হবে? আমি অবশ্যি চলে যাবো কেউ আমায় ফিরাতে পাবে না।’

.

বলতে বলতে নয়ীম বিছানা উঠে বসলেন। মুজাহিদের দৃঢ় সংকল্প শাররিক কমঘোরীর উপর হলো জয়ী। মানসিক প্রেরণার বলে তিনি উঠে টহল দিতে লাগলেন কামরার মধ্যে। তিনি যখমী, তা তার মনে নেই। তার শাররিক অবস্থা দীর্ঘ সফরের উপযোগী নয়, তা তিনি ভুলে গেছেন বিলকুল। তখন তার কল্পনায় ভেসে বেড়াচ্ছে শুধু নার্গিস, উযরা, আব্দুল্লাহর ছোট বাচ্চা আর বস্তির সুদৃশ্য বাগ-বাগিচার রূপ। ‘আমি নিশ্চয়ই চলে যাবো এই হলো তাঁর শেষ সিদ্ধান্ত।

তিনি কামরার ভিতর টহল দিতে দিতে আচানক থেমে গেলেন। মেযবানের নওকরকে তিনি আওয়ায দিলেন। নওকর ছুটে এসে কামরায় ঢুকে নয়ীমকে শুয়ে থেকে পায়চারী করতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো।

হাকীম সাহেবের হুকুম, আপনি চলা-ফেরা করবেন না।’ সে বললো “তুমি আমার ঘোড়া তৈরী করে দাও।’

‘আপনি কোথায় যাবেন?

‘তুমি ঘোড়া তৈরী করোগে।

‘কিন্তু এখন?

‘এখখুনি। নয়ীম কঠোর স্বরে বরলেন।

‘রাতের বেলা আপনি কোথায় যাবেন?

যা তোমায় বলেছি তাই করো। কোনো বাজে প্রশে জওয়াব নেই আমার কাছে।

নওকর ঘাবড়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো।

নয়ীম আবার বিছানার উপর বসে ভাবনার দুনিয়ায় হারিয়ে ফেললেন আপনাকে। খানিক্ষণ পর নওকর ফিরে এসে বললো ঘোড়া তৈরী, কিন্তু……।

নয়ীম তার কথার মাঝখানে জওয়াব দিলেন, তুমি কি করতে চাও, তা আমি জানি। আমার একটা করুরী কাজ রয়েছে। তোমার মালিককে বলবে, তাঁর এযাবত হাসিল করবার জন্য এত রাত্রে তাকে জাগানো আমি ঠিক মনে করিনি।’

ভোর হবার আগেই নয়ীম, কায়রোয়ান থেকে দুই মনযিল আগে চলে গেছেন। এতটা পথ তিনি বেশ হুঁশিয়ার হয়ে চলেছেন। ঘোড়া তিনি জোরে হাঁকান নি। এক এক মনযিলের পর খানিকটা বিশ্রাম করেছেন। ফুসতাতে গিয়ে তিনি দুদিন সেখানে থাকলেন। এখানকার শাসনকর্তা নয়ীমকে তার কাছে থাকতে অনুরোধ করলেন, কিন্তু নয়ীম যখন কিছুতেই রাযী হলেন না, তখন তিনি পথের সব চৌকিকে জানিয়ে দিলেন তাঁর আগমন-সংবাদ। তাঁর সফরে যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তিনি হুকুম জারি করলেন।

নয়ীম যতোই এগিয়ে যান মনযিলে মুকসুদের দিকে, ততোই ভালো বোধ করেন তাঁর শীরের অবস্থা। কয়েকদিন পর তিনি এক মরু-প্রান্তর অতিক্রম করে চলেছেন। কয়েক ক্রোশ পরেই তাঁর বস্তি। প্রতি পদক্ষেপে তার মনে জাগে নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা। আনন্দ-সাগরে ভেসে চলে তার মন। আচানক ধুলি-রাশি দেখা গেলো। পূর্ব-দিগন্তে খানিক্ষণ পর অন্ধাকার দুলিঝড় ছেয়ে ফেললো চারদিকে। চারদিক ধূলোর অন্ধকার মরুভূমির তুফানের খবর নয়ীম জানেন ভালো করে। তিনি চাইলেন মরুঝড়ের সুসীবতে পড়বার আগেই ঘরে পৌঁছতে। ঘোড়ার গতি দ্রুতত হয়ে উঠলো। প্রথম ঝাঁপটা তিনি ঘোড়া ছুটিয়েছেন পূর্ণ গতিতে। হাওয়ার তে আর চারদিকের অন্ধকার বেড়ে চলেছে। ঘোড়া ছুটানোর ফলে নয়ীমের সিনার যখম ফেটে রক্তধারা গড়িগয়ে পড়ছে। সেই অবস্থায় তিনি অতিক্রম করেছেন দুই ক্রোশ। তুফানের হামলা চলছে পূর্ণবিক্রমে, ঝলসে-ওঠা বালু ছুটে আসছে তার দিকে। ঘোড়া চলবার পথ না পেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। নিরুপায় হয়ে নয়ীম ঘোড়া থেকে নেমে ঝড়ের দিকে পিছ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। ঘোড়াও মালিকরেই মতো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নয়ীম তাঁর মুখছুটে আসা বালু থেকে বাঁচাবার জন্য মুখ-ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ছেন। বাবলা কাঁটা আর ডালপালা হাওয়ার বেগে ছুটে এসে তাঁর গায়ে লেগে চলে যাচ্ছে। নয়ীম এক হাতে ঘোড়রার বাগ ধরে অপর হাতে নিজের কাপড় চোপড় থেকে কাঁটা-ডাল ছাড়াচ্ছিলেন। ঘোড়ার বাগের উপর তার হাতের চাপ ঢিলা হয়ে এসেছে। হঠাৎ বাবলার একটা শুকনো ডাল উড়ে এসে ঘোড়ার পিঠে লাগলো বেশ জোরে। ঘোড়াটা এক লাফে নয়ীমের হাত ছাড়িয়ে গেয়ে দাঁড়ালো কিছুটা দুরে। আর একটা কাঁটার ডাল এসে ঘোড়ার কানে কাঁটা ফুটিয়ে চলে গেলে ঘোড়াটা একদিকে ছুটে পালালো। নয়ীম বেশ কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন অসহায় অবস্থায়। সিনার যখম ফেটে তার কামিয রক্তধারায় প্লাবিত হয়ে গেছে আর মুহূর্তে মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে আসছে তার দেহের শক্তি। ভয়ে তিনি উঠে কাপড় ঝাড়েন, আবার বসে পড়েন। কিছুক্ষণ পর রাত্রির নিকষ কালো আবরণ আরো বাড়িয়ে তুললো ঝড়ের অন্ধকার। রাত্রি এক প্রহর কেটে যাবার পর হাওয়ার বেগ হলো শেষ। ধীরে ধীরে আসমান সাফ হলে হেসে উঠলো দীপ্তিমান সিতারারাজি।

নয়ীমের বস্তি আট ক্রোশ দূরে। ঘোড়াটি কোথায় চলে গেছে। পায়ে নেই চলবার তাকৎ। পিপাসায় তার গলা শুকিয়ে এসেছে। তার মনে খেয়াল এলো, ভোর হবার আগে এ বালুর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কোন নিরাপদ জায়গায় না পৌঁছলে দিনের প্রখর রৌদ্রে তাঁকে মরতে হবে ধুকে ধুকে।

নক্ষত্রের স্তিমিত আলোয় পথ দেখে নিয়ে তিনি চলতে লাগলেন পায়ে হেঁটে। এক ক্রোশ গিয়ে তার পা আর চলে না। হতাশ হয়ে তিনি শুয়ে পড়লেন বালুর উপর। মনযিলের এতো কাছে এসে হিম্মৎ হারানো মুজাহিদের সংকল্প ও সহিষ্ণুতার খেলাফ। তিনি আর একবার কাঁপতে কাঁপতে উঠে পা বাড়ালেন মনজিলে মকসুদরে দিকে। বালুর মধ্যে পা বসে যায়। চলতে চলতে তিনবার তিনি পড়ে গেলেন। আবার সংকল্প দৃঢ় করে উঠে তিনি এগিয়ে চলবার চেষ্ট করলেন। পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসছে আর কমযোরী দরুন তাঁর চোখে ছেয়ে আসছে অন্ধকার। মাথা ঘুরছে ভীষণভাবে। বস্তি এখনো চারক্রোশ দূরে। তিনি জানেন, বস্তির দিকে প্রবহমান নদীটি এখান থেকে কাছে। তিনি কাঁপতে কাঁপতে একবার পড়ে আবার উঠে আরো এক ক্রোশ গেলে তার নযরে পড়লো তার বহু পরিচিত নদীটি।

নদীর পানি ঝড়ের ধুলোবালুতে ময়লা হয়ে গেছে। নদীর পানিতে ভাসছে বেশুমার ডালপালা। নয়ীম সাধ মিটিয়ে পান করলেন নদীর পানি। নদীর কিনারে খানিকক্ষণ শুয়ে থেকে তাঁর দীলে এসেছে কিছুটা শান্তি। তাই তিনি আবার শুরু করলেন পথ চলা।

নদী পার হলে তাঁর নযরে পড়লো বস্তির পাশের বাগ-বাগিচা। ক্লান্তি ও দৈহিক কমযোরীর অনুভূতি কমে এলো কনেক খানি। প্রতি পদক্ষেপে বেড়ে যাচ্ছে তাঁর চলার বেগ। খানিক্ষণ পরেই তিনি পার হতে লাগলেন বালুর টিবি-যেখানে ছেলেবেলায় তিনি খেলা করতেন উযরাকে নিয়ে, গড়ে তুলতেন ছোট ছোট বালুর ঘর। তারপর উঁচু খেজুর গাছগুলোর ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলেন নিজের ঘরের দিকে। কম্পিত বুক চেপে দরে কিছুক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন দরযায়। তারপর সাহস করে দরযায় করাঘাত করলেন। ঘরের বাসিন্দারা একে অন্যকে জাগাতে লাগলেন। এক যুবতী এসে দা খুললো। নয়ীম হয়রান হয়ে যুবতীর দিকে, তাকালেন। এযে হুবহু উযরারই চেহারা। নয়ীমকে দেখে মেয়েটি ফিরে গেলো ঘরের ভিতরে। একটু পরেই তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ ও নার্গিস এসে হাযির হলেন অভ্যর্থনা জানাতে। আব্দুল্লাহ ও নার্গিসের পিছনে কম্পিত পদে এসে দাঁড়ালেন উযরা।

চাঁদের রোশনীতে নয়ীম দেখলেন, সৃষ্টির সৌন্দর্য-রাণীর যৌবনের দীপ্তিতে ভাটা এলেও তার মুখের যে মোহময় আকর্ষণ, আজো তা অব্যাহত রয়েছে।

‘বোন!’ নয়ীম বেদনার্ত আওয়াজে ডাকলেন।

‘ভাই! উযরা অশ্রুসজল চোখে জওয়াব দিলেন।

নার্গিস এগিয়ে ভালো করে তাকালেন নয়ীমের দিকে। তার কামিযে রক্তের দাগ দেখে ঘাবড়ে বললেন “আপনি যখমী!

যখমী! উযরা সন্ত্রস্ত মুখে বললেন।

এতক্ষণ যে দৃঢ় সংকল্প তার দৈহিক শক্তিকে অটুট রেখেছিলো, তা মুহূর্তে ভেঙে পড়লো।

তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ-বেটা, আমায় ধরো।’

আব্দুল্লাহ তাকে ধরে ভিতরে নিয়ে গেলেন।

ভোর বেলায় নয়ীম বিছানায় শুয়ে রয়েছেন। নার্গিস, উযরা, আব্দুল্লাহ, বিন নয়ীম, হোসেন বিন নয়ীম, উযরার ছোট ছেলে খালেদ ও মেয়ে আমিনা তাঁর শয্যাপার্শ্বে দাঁড়িয়ে। নয়ীম চোখ খুলে সবার দিকে তাকালেন। ইশারায় খালেদ ও আমিনাকে ডেকে তিনি কাছে বসালেন।

‘বেটা, তোমার নাম কি?

‘খালেদ।

“আর তোমার? মেয়েটিকে লক্ষ্য করে নয়ীম প্রশ্ন করলেন।

‘আমিনা। সে জওয়াব দিলো। খালেদের বয়স সতেরো বছরের কাছাকাছি। মনে হয়। আমিনার চেহারা দেখে বয়স চৌদ্দ পনেরো অনুমান করা যায়।

নয়ীম খালেদকে লক্ষ্য করে বললেন, বেটা, আমায় কোরআন পাক পড়ে শোনাও।’

খালেদ শিরীণ আওয়াযে সুরায়ে ইয়াসীন তেলাওয়াত শুরু করলেন।

পরদিন ফেটে যাওয়া যখম আরো বেশী কষ্টদায়ক হয়ে উঠলো। নয়ীমের ভীষণ জ্বর দেখা দিলো। সিনার যখম থেকে ক্রমাগত রক্ত ঝরছে। রক্ত কমে যাওয়ায় তিনি মুছা যাচ্ছেন বারংবার। এমনি করে এক হর্তা কেটে গেলো। আব্দুল্লাহ, বসরা থেকে এক হাকীম নিয়ে এলেন। তিনি প্রলেপ পট্টি বেঁধে দিয়ে চলে গেলেন, কিন্তু তাতে কোনো ফায়দা হলো না।

নয়ীম একদিন খালেদকে প্রশ্ন করলেন, “বেটা, তুমি এখনো জিহাদে যাওনি?’

চাচাজান, আমি ছুটি নিয়ে এসেছি।’ খালেদ জওয়াব দিলেন, ‘আমার চলে যাবার কথা ছিলো কিন্তু…….।

তুমি চলে যাবে তো গেলে না কেন?

‘চাচাজান, আপনাকে এই অবস্থায় ফেলে…..।

‘বেটা, জিহাদের জন্য মুসলমানকে ছেড়ে যেতে হয় দুনিয়ার সব চাইতে প্রিয় বস্তুকে। আমার জন্য চিন্তা করো না তুমি। তোমার ফরয তুমি পূর্ণ করো। তোমার ওয়ালেদা কি তোমায় শেখাননি যে, মুসলমানের সব চাইতে বড়ো ফরয হচ্ছে জিহাদ।

‘চাচাজান, আম্মিজান আমাদেরকে ছেলেবেলা থেকেই শিখিয়েছেন এ সবক। আমি একটা দিন শুধু আপনার শুশ্রূষার জন্য থেকে গেছি। আমার ভয় ছিলো, যদি আমি আপনাকে এই অবস্থায় ফেলে যাই, তাতে আপনি হয়তো রাগ করবেন।

‘আমার মাওলার খুশীতেই আমারও খুশী। যাও, আব্দুল্লাহকে ডেকে নিয়ে এসো।

খালেদ আর এক কামরা থেকে আব্দুল্লাহকে ডেকে আনলেন। নয়ীম প্রশ্ন করলেন, ‘বেটা তোমার ছুটি এখনো শেষ হয়নি?

আব্বাজান, পাঁচ দিন আগে আমার ছুটি শেষ হয়ে গেছে।’

তুমি কেন গেলে না বেটা?

আব্বাজান, আমি আপনার হুকুমের ইন্‌তের করছিলাম।’ নয়ীম বললেন, ‘বেটা খোদা ও রসূলের হুকুমের পর আর কারুর হুকুমের প্রয়োজন নেই। যাও বেটা, যাও।’

‘আব্বাজান! আপনার তবিয়ৎ কেমন?

আমি ভালোই আছি, বেটা! নয়ীম মুখের উপর আনন্দের দীপ্তি টেনে আনবার চেষ্ট করে বললেন, তুমি যাও।’

আব্বাজান, আমরা তৈরী।

খালেদ ও আব্দুল্লাহ্ নিজ নিজ ঘোড়ায় যিন লাগাচ্ছেন। তাঁদের মায়েরা দু’জন কাছে দাঁড়ানো। নয়ীম তাঁদের চলে যাবার দৃশ্য চোখে দেখবার জন্য তার কামরার দরজা খুলে রাখবার হুকুম দিলেন। তিনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে আঙিনার দিকে তাকিয়ে দেখছেন। আমিনা প্রথমে তলোয়ার বেঁধে দিলো তার ভাই খালেদের কোমরে, তারপর লাজকুণ্ঠিতভাবে আব্দুল্লাহর কোমরে। নয়ীম উঠে কামরার বাইরে যেতে চাইলেন, কিন্তু দুতিন কদম গিয়েই মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। আব্দুল্লাহ ও খালেদ তাঁকে তুলবার জন্য ছুটে এলেন। কিন্তু তাদের আসার আগেই নয়ীম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, ‘আমি বিলকুল ঠিকই আছি। একটু পানি দাও।

আমিনা পানির পিয়ালা এনে দিলো। নয়ীম পানি পান করে আঙিনায় এসে দাঁড়ালেন।

বেটা, তোমরা ঘোড়া ছুটিয়ে যাবে, তাই আমি দেখবো এখানে দাঁড়িয়ে। তোমরা জলদী সওয়ার হও।’

খালেদ ও আব্দুল্লাহ্ সওয়ার হয়ে বাড়ির বাইরে বেরুলেন। নয়ীমও ধীরে ধীরে পা ফেলে গেলেন বাড়ির বাইরে।

নার্গিস বললেন, ‘আপনি আরাম করুন। বিছানা ছেড়ে ওঠা আপনার ঠিক নয়।

নয়ীম তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, নার্গিস! আমি ভালো আছি। তুমি চিন্তা করো না।’

বাগিচার বাইরে গিয়ে খালেদ ও আব্দুল্লাহ খোদা হাফি’ বলে ঘোড়া ছুটালেন দ্রুতগতিতে। নয়ীম দূর পর্যন্ত তাদেরকে দেখবার জন্য চড়লেন বালুর ঢিবির উপর। নার্গিস ও উযরা তাঁকে মানা করলেন, কিন্তু নয়ীম পরোয়া করলেন না। তাই তাঁরাও ঢিবির উপর চড়লেন নয়ীমের সাথে। দুই তরুণ মুজাহিদ ঘোড়া ছুটিয়ে যথক্ষণ না মিলিয়ে গেলেন বহু দূর দিগন্তে, ততোক্ষণ নয়ীম সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁরা অদৃশ্য হয়ে গেলে তিনি যমিনের উপর বসে সিজদায় মাথা নত করলেন।

নয়ীমকে দীর্ঘ সময় সেজদায় পড়ে থাকতে দেখে উ ঘাবড়ে গিয়ে কাছে এসে ভাই বলে তাঁকে ডাকলেন ধরা গলায়, কিন্তু নয়ীম মাথা তুললেন না। নার্গিস ভয় পেয়ে নয়ীমের বায়ু ধরে নাড়া দিলেন। নয়ীমের দেহ নড়ছে না। নার্গিস তার মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে অলক্ষ্যে বলে উঠলেন, ‘আমার স্বামি! স্বামি আমার!

‘উযরা তার নাড়ির উপর হাত রেখে আমিনাকে বললেন, বেটি, উনি বেঁহুশ হয়ে পড়েছেন। যাও জলদী পানি নিয়ে এসো।’

আমিনা ছুটে গিয়ে ঘরে থেকে পিয়ালা ভরে পানি আনলো। উযরা নয়ীমের মুখে পানির ঝাঁপটা দিলেন। নয়ীমের হুঁশ হলে তিনি.চোখ খুলে পিয়ালা মুখে, নিলেন।

‘উযরা বললেন, ‘হোসেন, যাও, বস্তি থেকে কয়েকটি লোক ডেকে আন। তারা ওঁকে ধরে ঘরে নিয়ে যাবে।’

নয়ীম বললেন, ‘না, না, থাম। আমি নিজেই যেতে পারবো।’

নয়ীম উঠতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। বুকে হাত রেখে তিনি আবার শুয়ে পড়লেন।

‘আমার স্বামি! আমার মালিক!!’ নার্গিস চোখ মুছতে মুছতে বললেন। নয়ীম নার্গিসের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে, উযরা, আমিনা ও হোসেনের দিকে তাকালেন। সবারই চোখে পানি ছলছল করছে। ক্ষীণস্বরে তিনি বললেন, ‘হোসেন-বেটা, তোমার চোখে আঁসু দেখে বড়োই তীফ হচ্ছে আমার। মুজাহিদের বেটা যমিনের উপর চোখের আঁসু ফেলে না, ফেলে বুকের রক্ত। নার্গিস, তুমিও সংযত হও। উা, দোয়া করো আমার জন্য।’

যিন্দেগীর তরুণী মৃত্যুর তুফানের আঘাতে টম করছে। নয়ীম কলেমায়ে শাহযাদাত পড়বার পর অস্পষ্ট আওয়াযে কয়েকটি কথা বলে নীরব হয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *