১৭. বাংলা বইয়ের সন্ধানে

বাংলা বইয়ের সন্ধানে

মধ্যে মধ্যে অবসর সময় কাটানো সমস্যা হয়ে ওঠে। কোথায় যাই, কী করি, কিছুই ভেবে ঠিক করা যায় না। এরকম অবসর সময়ে বইয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ালে, শিকারির শিকার—সন্ধানের মতন থ্রিল অনুভব করা যায়। অবশ্য বইয়ের বদলে দেশ—বিদেশের ডাকটিকিটের সন্ধানেও ঘোরা যায়, টুকিটাকি দুর্লভ কিউরিও খুঁজে বেড়ানো যায়। কাঠকুড়ুনির কাঠের মতন জীবনের কুড়িয়ে পাওয়া কোনো ধনই ফেলা যায় না, কোনো কাজে বা কারও কাজে একদিন—না—একদিন তা লাগেই লাগে। বই তো নিশ্চয়ই লাগে, তা সে শ্রীরামপুরে ছাপা হোক, আর বটতলায় বা মেছোবাজারে ছাপা হোক। অতএব বইয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানোই ভাল মনে হয়, বাংলা বইয়ের সন্ধানে।

বাংলা ছাপাখানার ইতিহাস, বাংলা বই প্রকাশের ইতিহাস, বাংলা ছাপা অক্ষরের ইতিহাস, ছাপা ছবির ইতিহাস, বাংলা বই প্রকাশের ইতিহাস আজও লেখা হয়নি। যদি লিখতে হয় কোনোদিন। (একদিন লিখতেই হবে), তাহলে বাংলা বইয়ের সন্ধানে বেরুতেই হবে। আজও পর্যন্ত যত বাংলা বই ছাপা হয়েছে, খুঁজে খুঁজে সেগুলি সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন থাকলে অবশ্য সব বই সংগ্রহ করার কোনো দরকার হবে না। একজনের পক্ষে সব বই সংগ্রহ করাও সম্ভব নয়। সকলে মিলে কিছু কিছু বই সংগ্রহ করা সম্ভব নিশ্চয়ই। কিন্তু সকলে মিলে সে কাজ করবেনই বা কেন? সাধারণত সকলে মিলে কোনো কাজ করা আমাদের স্বভাববিরুদ্ধ। যে যার স্বার্থ ও উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য কাজ করতে চাই। সুতরাং যাঁরা শুধু বই সংগ্রহ করেন না—’বুক কলেক্টর’, তাঁদের কথাই আমি বলছি। কলকাতা শহরে ‘বুক কলেক্টর’ বলতে ঠিক যা বোঝায় তাঁদের সংখ্যা আঙুলে গোনা যায়, তা—ও সব আঙুলে নয়, খুব বেশি হলে দু’একটি আঙুলে। তা—ও দেখেছি, যাঁরা বই সংগ্রহ করেন, তাঁদের সংগ্রহের মধ্যে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নেই, অনেকটা নেশাখোরের মতন তাঁরা পথেঘাটে বই কুড়িয়ে বেড়ান। এই ধরনের সংগ্রহ মূল্যবান হলেও, সহজে তাকে কোনো কাজে লাগানো যায় না। সুতরাং বই সংগ্রহ করলেই চলবে না শুধু, একটা নির্দিষ্ট পথ বেছে নিয়ে সংগ্রহ করতে হবে। তাতে সংগ্রহের নেশা আরও চতুর্গুণ বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের সংগৃহীত বইয়ের মূল্যও বাড়ে যথেষ্ট। তাতে কাজও হয় অনেক।

বই যাঁরা সংগ্রহ করেন, যাঁরা বই ‘কলেকশন’ জীবনের অবসর সময়ের অন্যতম নেশা বা বাতিক হিসেবে গ্রহণ করতে চান, তাঁদের উদ্দেশে দু’একটি কথা বলতে চাই। উদ্দেশ্য হল, আরও বেশি লোক দলে ভেড়ানো এবং দলে যাঁরা ভিড়েছেন তাঁদের বই সংগ্রহের আসল মজা কোথায়, সেই খবর দেওয়া। যদি আমার কথা শুনে কলকাতা শহরে তথা বাংলা দেশে (পুবে ও পশ্চিমে) আরও একজন মাত্র বই কলেক্টরের সংখ্যা বাড়ে, তাহলেও আমি মনে করব আমার এই প্রপাগ্যান্ডা যথেষ্ট সার্থক হয়েছে। কিন্তু সবার আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এত জিনিস সংগ্রহ করার থাকতে, বই সংগ্রহ করবেন কেন? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, অন্তত আমার জানা নেই। কাঠকুড়ুনিকে যদি ঘুঁটে কুড়াবার কথা বলা যায়, তাহলে সে মোটেই অবাক না হয়ে রাজি হতে পারে। কিন্তু কাঠকুড়ুনিকে যদি দেশ—বিদেশের ডাকটিকিট কুড়ুতে বলা যায়, তাহলে সে ফ্যালফ্যাল করে মুখের দিকে চেয়ে থাকবে, কিছুই বুঝতে পারবে না। কোনো কাঠকুড়ুনিকে আমি স্ট্যাম্প—কলেক্টর বা বুক—কলেক্টর হতে বলছি না। তবে স্ট্যাম্প—কলেক্টর বা কিউরিওহান্টাররা যদি কেউ বুক—কলেক্টর হন, স্বচ্ছন্দে হতে পারেন। জীবনে পেশা বদলানো যায়, কিন্তু নেশা বদলানো যায় না, ছাড়া তো যায়ই না। অবশ্য বৈরাগীদের কথা স্বতন্ত্র, তাঁদের কথা বলছিও না। তবু নেশার ঘোরটা যদি ঠিক থাকে তাহলে নেশার বস্তুটা বদলানো খুব কঠিন ব্যাপার নয়। এরকম বদলাতে অনেককে দেখা যায়। হুঁকো ছেড়ে বিড়ি ধরেছেন, বিড়ি ছেড়ে চুরুট, চুরুট ছেড়ে পাইপ, পাইপ ছেড়ে গ্লাস, গ্লাস ছেড়ে কলকে এবং শেষে সব ছেড়ে কোনো ‘গুরুদেব’ ধরেছেন, এরকম লোকের অভাব সেই সমাজে। হুঁকো পাইপ গ্লাস কলকে থেকে লাফ দিয়ে যদি গুরুদেব পর্যন্ত আসা যায়, তাহলে ডাকটিকিট ও কিউরিও ছেড়ে বই পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে আসা যেতে পারে। ‘কলেকশন’টা একটা নেশা বা বাতিক ছাড়া কিছু নয়, ডাকটিকিট হোক, টেক্সটাইল—টেরাকোটা হোক, আর বইই হোক। বস্তুটা গৌণ, মুখ্য হল নেশার ঘোর, বাতিকের বুঁদাবস্থা। সেটা যদি ঠিক থাকে, তাহলে ডাকটিকিটের বদলে বই বা টেরাকোটার সঙ্গে বই সংগ্রহ করা কষ্টকর নয়। যেমন, নিজের কথাই বলি। ছেলেবেলায় সিগারেটের খোল সংগ্রহ করেছি। প্রথমে যখন বাস চলল, কলকাতার রাস্তায়, তখন স্কুল পালিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাসের টিকিট সংগ্রহ করেছি। তখন বাসের কতরকম নাম সব টিকিটের উপর ছাপানো—’সুখতারা’, ‘নয়নতারা’, ‘পংখীরাজ’ ইত্যাদি। তারপর দেশলাইয়ের খোল, বোতলের ছাপ—মারা টিনের ছিপি, দেশ—বিদেশের ডাকটিকিট ইত্যাদি একে—একে ছেড়ে, এখন বই সংগ্রহ করি। অর্থাৎ বই কিনি, আবার বই ‘কলেক্ট’ও করি।

বই কেনা এবং কলেক্ট করা এক জিনিস নয়। বই কলেকশন সম্বন্ধে সর্বপ্রথম এই কথাটা মনে রাখা দরকার। বই যাঁরা কেনেন তাঁদের মধ্যে শতকরা একজন তো নয়ই, হাজারকরা একজনও বই ‘কলেক্ট’ করেন কি না সন্দেহ। বই অনেকে অনেক কারণে কেনেন, অধ্যাপনা, ওকালতি, ডাক্তারি, ব্যবসা ইত্যাদির জন্য, নিছক জ্ঞানার্জন বা গবেষণার জন্য, আবার শৌখিন আসবাবের মতন ঘর সাজানোর জন্যও। তাঁরা কেউ ‘কলেক্টর’ নন। বই যাঁরা ‘কলেক্ট’ করেন তাঁরা এসব কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই করেন না। ছাপা বইটাই তাদের কাছে ইতিহাসের একটা লুপ্ত উপকরণমাত্র—ছাপার ইতিহাসের, বইয়ের ইতিহাসের এবং আনুষঙ্গিক আরও অনেক বিষয়ের। এইদিক থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকের সঙ্গে তাঁদের অনেকটা সাদৃশ্য আছে। মাটি খুঁড়ে, পাথর ভেঙে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যেমন মাটির হাঁড়িকুড়ি, পুতুল, খেলনা শিলালিপি, মুদ্রা ইত্যাদি আবিষ্কার করে তা—ই দিয়ে অরচিত ইতিহাস রচনা করেন, তেমনি বই—কলেক্টররাও পথঘাট, আনাচকানাচ তল্লাশ করে লুপ্ত বই পুনরুদ্ধার করেন এবং তা—ই দিয়ে বইয়ের ইতিহাস, ছাপাখানার ইতিহাস রচনা করেন। কী করে করেন? সেইটাই হল বই কলেকশন সম্বন্ধে সবচেয়ে বড় কথা এবং যাঁরা এই ধরনের কোনো লক্ষ্য নিয়ে বই কলেক্ট করেন তাঁরাই হলেন প্রকৃত ‘বুক—কলেক্টর’।

কলকাতা শহরে আমি একজন ‘ফার্স্ট এডিশন’ বা ‘প্রথম সংস্করণ’ বাতিকগ্রস্ত কলেক্টরকে জানি। শহরের নানা জায়গায় তিনি পাগলের মতন ঘুরে বেড়ান, বাংলা বইয়ের সন্ধানে, কিন্তু ‘প্রথম সংস্করণ’ ছাড়া অন্য বই তিনি সংগ্রহ করেন না। আমি তাঁর নাম দিয়েছি ‘ফার্স্ট এডিশন’ এবং ওই নামেই তিনি দীক্ষিত মহলে পরিচিত। অদ্ভুত নেশা ভদ্রলোকের, প্রথম সংস্করণের নেশা। নিছক নেশা হিসেবে খুব ভাল, কিন্তু কলেকশন হিসেব তেমন ভাল নয়। নেশা বা বাতিকের দিক থেকে আরও ভাল যদি কোনো খ্যাতনামা সাহিত্যিকের সমস্ত বইয়ের ‘প্রথম সংস্করণ সংগ্রহ’ করা যায়—যেমন মনে করুন, বঙ্কিমচন্দ্রর, দীনবন্ধুর, মাইকেল মধুসূদনের বা বিদ্যাসাগর ও রামমোহনের। আরও এগিয়ে গেলে রবীন্দ্রনাথেরও সমস্ত বইয়ের ‘প্রথম সংস্করণ’ সংগ্রহ করা যেতে পারে, অথবা শরৎচন্দ্রর। নিছক কলেকশানের নেশা হিসেবে এর চেয়ে আকর্ষণীয় আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের এই ‘কালেকশন’ বিশেষ কোনো কাজে লাগে না। সেইজন্য সংগ্রহটা যদি কোনো একটা বিষয়ের ধারাবাহিক ইতিহাসের দিকে লক্ষ রেখে করা যায় তাহলে সবচেয়ে ভাল হয়। তাতে আগ্রহ ও আকর্ষণ বাড়ে এবং সংগ্রহের মূল্যও বাড়ে যথেষ্ট।

কয়েকটা ‘টিপস’ দিচ্ছি কলেক্টরদের। ‘গ্রন্থনগরী কলকাতা’ যাঁরা পড়েছেন তাঁরা বাংলা দেশে ছাপাখানা ও ছাপা বইয়ের গোড়ার ইতিহাস মোটামুটি জেনেছেন। কলেকশনের আলোচনা ওই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। ১৭৭৮ সালে হুগলি শহরে প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানায় হলহেডের যে ব্যাকরণ ছাপা হয় তাতে বাংলা অক্ষরে মহাভারত, রামায়ণ, বিদ্যাসুন্দর ইত্যাদি থেকে অনেক দৃষ্টান্ত ছাপা হয়। সুতরাং ১৭৭৮ সালে ছাপা হলহেড সাহেবের এই বই থেকে আরম্ভ করে একেবারে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ছাপা বাংলা বই বা ইংরেজি—বাংলা বই (যার মধ্যে বাংলা অক্ষরে ছাপা আছে), যদি প্রত্যেক বছরের একখানা করে নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা যায়, তাহলে সেটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংগ্রহ হতে পারে। একখানা করে বই সংগ্রহ করলেই চলে, বিষয়বস্তু বা সংস্করণের দিকে নজর দেবার কোনো প্রয়োজন নেই, কেবল যে বছরে ছাপা হয়েছে সেই বছরের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। অর্থাৎ হলহেডের বই পেলে ১৭৭৮ সালের আর কোনো বই ছাপা থাকলেও দরকার নেই সংগ্রহ করার। তেমনি ১৮১৬ সালে গঙ্গাকিশোরের ছাপা বাংলা ‘অন্নদামঙ্গল’ গ্রন্থ পেলে, ওই সালের ছাপা আর কোনো বই সংগ্রহ করতে হবে না। এইভাবে ১৭৭৮ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত ১২৩ বছরের জন্য মাত্র ১২৩খানা বাংলা হরফে ছাপা বই সংগ্রহ করতে পারলে অনেক কাজ করা যায়। হাজার হাজার বই কেনার বা সংগ্রহ করার কোনো দরকার হয় না। যদি আদর্শ ‘বুক কলেক্টর’ হতে চান, বিশেষ করে বাংলা বইয়ের, তাহলে এই ১২৩খানা বই, বা দু’খানা করে প্রতি বছরে যদি করেন তাহলে ২৪৬খানা বই সংগ্রহ করুন। মোটামুটি আড়াইশোখানা বই সারাজীবনে সংগ্রহ করুন। বই সংগ্রহের যদি বাতিক থাকে, তাহলে বাতিকটাকে এই ধরনের একটা নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করুন। তাতে বাতিকের গুরুত্ব বাড়বে, এবং বাতিক মিটলে আমাদের সকলের অনেক উপকার হবে, অনেক কাজ হবে। কী কাজ হবে?

প্রথমত যদি কেউ এইভাবে এই বইগুলি সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে তিনি অন্তত তিন—চারটি বিষয়ের ইতিহাস রচনা করতে পারবেন তা—ই থেকে। বাংলা ছাপাখানার ইতিহাস, বাংলা ছাপার হরফের ক্রমবিকাশের ইতিহাস, বাংলা বই বাঁধাইয়ের ইতিহাস এবং সচিত্র বাংলা বইয়ে ছবি ছাপার ও ছবি আঁকার পদ্ধতির ইতিহাস। এর মধ্যে কোনো বিষয়েই ইতিহাস আজও লেখা হয়নি, অথচ প্রায় পৌনে দু’শো বছর হল বাংলা দেশে বই ছাপা হচ্ছে, উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকারের পর থেকে বাংলা ছাপার হরফের বিকাশ ও প্রকরণভেদ হচ্ছে, গ্রন্থ—চিত্রণের টেকনিক বদলাচ্ছে, ছবি ছাপার পদ্ধতি বদলাচ্ছে, বই বাঁধাইও বদলাচ্ছে। এই ইতিহাস লেখার আজ বিশেষ দরকার আছে। লিখতে হলে এই বইগুলি চাই। বইয়ের মধ্যে ছাপাখানার নাম থাকে, ঠিকানাও প্রায় থাকে। তা—ই থেকে ছাপাখানার ইতিহাস এবং তার আঞ্চলিক অবস্থানের ইতিহাস রচনা করা যায়। ছাপার হরফ তুলনা করে তার ক্রমোন্নতির ধারা জানা যায়। বাঁধানোর নমুনা দেখে, তারও একটা চমৎকার ধারাবাহিক ইতিহাস লেখা যেতে পারে। গঙ্গাকিশোরের সচিত্র ‘অন্নদামঙ্গল’ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ছাপা সচিত্র বাংলা বইয়ের সংগ্রহ পেলে বাংলায় চিত্র—প্রতিলিপি মুদ্রণের অত্যাবশ্যক ইতিহাস রচনা করা যায়। স্টিল বা কপারপ্লেট এনগ্রেভিং ইয়োরোপে যেমন সেকালে খুব চালু ছিল, তেমনি আমাদের দেশেও কাঠখোদাই ও ধাতুখোদাই শিল্পের অভাব ছিল না। প্রথম ছাপা সচিত্র বাংলা বইয়ের ধাতুখোদাই ও কাঠখোদাই চিত্রগুলি এঁকেছিলেন রামচাঁদ রায়। কেউ তাঁর নাম জানেন না। এরকম আরও অনেক শিল্পী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিশ্বম্ভর আচার্য, রামধন স্বর্ণকার, মাধবচন্দ্র দাস, রূপচাঁদ আচার্য, রামসাগর চক্রবর্তী, বীরচন্দ্র দত্ত, কাশীনাথ মিস্ত্রী, জোড়াসাঁকো নিবাসী বিখ্যাত খোদাইশিল্পী হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। বাংলা বইয়ের ইতিহাসে যেমন হরফনির্মাতার দান আছে, তেমনি এই খোদাইশিল্পীদেরও যথেষ্ট মূল্যবান দান আছে। অথচ তার কোনো ইতিহাস নেই। একমাত্র ‘বুক—কলেক্টর’রাই এই ইতিহাস রচনার উপকরণ জোগাতে পারেন।

ইয়োরোপ—আমেরিকায় এইরকম বড় বড় বুক—কলেক্টর আছেন, তাঁদের মুখপত্র আছে এবং পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগও আছে। তাঁরাই অনেকে এই ছাপাখানার ইতিহাস, ছাপা বই, বাইন্ডিং ইত্যাদির ইতিহাস রচনা করেছেন। আমাদের দেশে সেরকম কলেক্টর কোথায়? অথচ অবসর সময়ের নেশা হিসেবে কী চমৎকার নেশাই না ‘বুক কলেকশন’ হতে পারে। এমন অনেককে দেখেছি যাঁরা ছুটির দিনে অবসর সময়ে কোনো একটা বিশেষ ধান্ধা নেই বলে আপশোস করেন। এখানে—সেখানে অকারণে তাঁরা ঘুরে বেড়ান, সময় কাটানোর জন্য। তা না করে বইয়ের ধান্ধায় ঘুরে বেড়ান। কোথায় বেড়াবেন বইয়ের সন্ধানে? কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়—বউবাজারে, কলেজ স্ট্রিটে, ওয়েলেসলি, পার্ক—সার্কাসে, বটতলায়, চিৎপুরে। তাতেও হবে না। কলকাতার কাছাকাছি জায়গায় সেকালের লোকদের খোঁজ নিয়ে যোগাযোগ করুন—হুগলি শ্রীরামপুরের, চুঁচুড়া, চন্দননগর, জয়নগর, সোনারপুর, চাংড়িপোতা, বোড়াল ইত্যাদি জায়গায়। কাজে হাত দিলেই দেখবেন আরও অনেক পথের সন্ধান মিলে যাবে। নিলামঘরের নিলাম, পুরনো জিনিস ‘বিক্রিওয়ালাদের’ আড্ডা তো আছেই, অনেক অজানা লোকের ছোট ছোট বইয়ের সংগ্রহও আছে। একটা নেশার ঝোঁকে তাঁরা হয়তো কিছু বইপত্র সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু তাঁর বংশধরদের নেশা ভিন্ন জাতের। সুতরাং, তাঁদের মৃত্যুতে সেই বংশধররা বইগুলি প্রথমে ঘরছাড়া করে দেন। কলকাতা শহরে একদল লোক আছেন যাঁরা এইসব বংশ ও বংশধরদের খোঁজ রাখেন। কলেক্ট করতে করতে তাঁদের সঙ্গেও আপনার সুযোগমতন পরিচয় হবে, এবং এইরকম নানা সূত্রে আপনি বই কলেক্ট করতে পারেন। দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ব্যবসা যাঁরা করেন তাঁদের সঙ্গেও আপনার বিরোধ হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ আপনি যে বইয়ের সন্ধানে বেরিয়েছেন তার এমনিতে একখানা বই হিসেবে (যত দুষ্প্রাপ্যই হোক) কোনো মূল্য নেই, একটা ধারাবাহিক সংগ্রহের মধ্যেই তার বিশেষ মূল্য। কিন্তু একবার যদি সংগ্রহের কাজে নেমে পড়া যায়, দেখা যায় যে পণ্ডিত ও ব্যবসায়ীদের চেয়ে বই সংগ্রহের কাজ অনেক বেশি আনন্দদায়ক! জ্ঞানের নেশা আছে। মুনাফার মারাত্মক নেশা তো আছেই। কিন্তু কেবল কুড়িয়ে বেড়ানোর নেশা মানুষের সনাতন নেশা। সেই ফলমূল—কাঠ কুড়িয়ে বেড়ানোর অসভ্য যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই সভ্য যুগেও এই নেশার আকর্ষণ কমেনি। বই—সংগ্রহের নেশা এই ধরনেরই একটি কুড়িয়ে বেড়ানোর নেশা। পেশা ছাড়া যায়, কিন্তু এ নেশা কখনও ছাড়া যায় না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *