মেয়েটা

মেয়েটা

সুমিত্রা মেয়েটাকে প্রথম দেখতে পায় বারান্দায়। বারান্দা দিয়ে শান্তভাবে হেঁটে রান্নাঘরে ঢুকল। রাত তখন ক’টা? ঠিক ক’টা বলা কঠিন, দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে যে-কোনও একটা সময় হবে। প্রতিদিন এইসময়ে একটা মালগাড়ি যায়। অনেকক্ষণ ধরে যায়। ঘটাং ঘটাং ঘটাং….। একটানা, ভোঁতা একটা আওয়াজ। কোনও কোনওদিন মনে হয়, এই আওয়াজ কোনওদিনই শেষ হবে না। চলতেই থাকবে।

তখনও মালগাড়ি যাচ্ছিল। তার মানে দুটোর পর কোনও একটা সময়। অবশ্য কোনও কোনও সময় লেটও হয়। রাতের গাড়ি কাকভোরে পাস করে।

পাঁচিলের ঠিক ওপাশেই রেললাইন। প্রথম প্রথম ভয় করত। মনে হত গায়ের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাচ্ছে। এখন আর হয় না। তিন মাসে অভ্যেস হয়ে গেছে। রেললাইনের কাছে বাড়ি হলে যেমন আওয়াজের অসুবিধে, তেমনি আবার সময় জানার সুবিধে। ঘড়ি লাগে না। গাড়ির আওয়াজই বলে দেয়, আটটা ছাব্বিশ, দশটা আঠাশ না একটা তেত্রিশ।

সময়ের সমস্যা না থাকলেও এ বাড়িটায় বাথরুমের সমস্যা আছে। লম্বা বারান্দা পার হয়ে এসে উঠোনে নেমে বাঁদিকে কয়েক পা যেতে হয়। বারান্দা আর উঠোনের মাঝখানে গ্রিলের দরজা। তাতে সর্বক্ষণ তালা। সেই তালা খুলে যেতে হয়। দিনে চলে যায়, রাতের বেলা অসুবিধে। বারান্দার আলোটা জ্বালতে হবে। কিছুদিন হল, সেই আলো আবার ঠিকমতো জ্বলছে না। কোনও কোনও দিন জ্বলে, কোনও কোনও দিন সুইচ ধরে হাজার খটর খটর করলেও জ্বলে না। নিজের মর্জি মাফিক চলে। বাল্‌ব পালটেও লাভ হয়নি। মনে হয়, সুইচে গোলমাল। প্রদীপ বাড়িওয়ালাকে বলেছে। লাভ হয়নি কোনও। বাড়িওয়ালা লোকটা কিপটে। গত এক সপ্তাহ ধরে মুখেই শুধু ‘করছি করব’ বলছে।

সুমিত্রা প্রদীপকে তাড়া দিলে সে ধমক লাগায়। বলে, ‘থামো তো। যখন সময় হবে করবে। সামান্য একটা আলোর জন্য এবার বলবার কী আছে? বাড়িওয়ালার সঙ্গে অত টিকটিক করলে দেবে দূর করে। এত কম টাকায় বাস জুটবে আর? সুন্দরবনে গিয়ে থাকতে হবে। তা ছাড়া আমি আর বাড়ির জন্য ছুটব না। অনেক হয়েছে।’

সুমিত্রা গজগজ করে, ‘কী এমন কম টাকা? একটা তো মোটে ঘর। তার ওপর ইলেকট্রিক বিল আলাদা। তাও ঘর দুটো হলে কথা ছিল।’

প্রদীপ বিরক্ত হয়। তার কাজকর্মের যা অবস্থা তাতে এই মুহূর্তে একটা ঘরের ভাড়া দিতেই প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। দু’দিন আগেও অবস্থাটা এরকম ছিল না। দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এ মাসে পুরো মাইনে হয়নি। হবেও না। সুমিত্রাকে মিথ্যে বলেছে। বলছে, খেপে খেপে পাওয়া যাবে। এই অবস্থায় বাথরুম, আলো-ফালোর কথা শুনলে মাথা গরম হয়ে যায়। চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, ‘ইস, দুটো ঘর। এইটুকু টাকায় অত ফুটানি চলে না। এমন ভান করছ যেন বিয়ের আগে রাজপ্রাসাদে ধাকতে। দাসী-বাঁদিরা সব সামনে আলো ধরে ধরে চলত।’

‘এর মধ্যে রাজপ্রাসাদের কী দেখলে? রাত-বিরেতে বাথরুমে যেতে হয় তাই বললাম।’

‘ঠিক আছে অনেক বলেছ। এবার চুপ করো। রোজ রোজ তোমার জন্য বাড়ি বদলাব নাকি? প্রতিটা জায়গায় তোমার একটা না একটা অসুবিধে লেগে আছে। একটু মানিয়ে চলতে শেখো সুমিত্রা।’

‘আমি তো বাড়ি ছাড়তে বলছি না। শুধু সুইচটা বদলাতে বললাম। এর মধ্যে মানামানির কী আছে?’

‘ঠিক আছে ঠিক আছে, অনেক হয়েছে। লেকচার বন্ধ করে এবার ভাত দাও। লেট হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই অফিসের অবস্থা খারাপ। উঠি উঠি করছে। শুনছি ছাঁটাই হবে। এরপর দেরি করলে আর রক্ষে নেই। অফিস উঠলে তোমার অবশ্য সুবিধে। ফুটপাতে গিয়ে থাকতে পারবে। ল্যাম্পপোস্টের তলায় জায়গা বেছো, অন্ধকার থাকবে না।’

সুমিত্রার খারাপ লাগে। খুব দ্রুত মানুষটা কেমন যেন হয়ে গেল। চট করে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। একটা কথা বললেই রেগে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? টাকা-পয়সার টানাটানি তো অনেক সংসারেই আছে। তা ছাড়া অভাবটা তো আর তার একার নয়, সুমিত্রারও। তাকেও তো বইতে হচ্ছে।

‘এরকম করে বলছ কেন?’

প্রদীপ প্রায় চিৎকার করে ওঠে। বলে, ‘কীরকম করে বলব? ছড়া কেটে? সুর করে? মাত্র ক’টা দিনের মধ্যে দু’-দুটো বাড়ি ছাড়তে হল। তোমার জন্যই হল। এইটা চলছে তিন নম্বর। এখানেও তুমি গোলমাল পাকাচ্ছ। এরপরও কীভাবে বলব? বলো। বলে দাও। এভাবে চলতে থাকলে, ফুটপাত ছাড়া গতি থাকবে ভেবেছ?’

ঘটনা সত্য। আগের বাড়ি দুটো সুমিত্রার কারণেই ছাড়তে হয়েছে। প্রথমটা তো তিনটে স্টেশন আগে ছিল। কলকাতা যাতায়াতে প্রদীপের সুবিধে হত। সময় কষ্ট দুটোই কম হত। বাড়িটাও মন্দ ছিল না। দুটো ঘর। একটা আবার একটু বড়। শুধু জলের একটা সমস্যা ছিল। বাড়ির সামনে টাইমের কল। সকালেই ক’টা বালতি তুলে চৌবাচ্চা ভরে নিলে দিব্যি চলে যেত। দুটো মানুষের সংসারে কী আর এমন জল খরচ?

তবু বাড়িটা ছাড়তে হল। শুধু ছাড়তে হল না, ছাড়তে হল এক মাসের মধ্যেই। অ্যাডভান্সের টাকাটাও নষ্ট হল।

সেই সময় টাকাপয়সার অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। জল তোলা, কাচাকুচির জন্য একটা ঠিকে লোক রেখেছিল সুমিত্রা। রাধার মা। মোটাসোটা ভালমানুষ গোছের মহিলা। ফাঁক পেলেই টুক টুক করে পান সেজে মুখে পোরে।

এইরকম একদিন পান সাজতে সাজতে বলল, ‘পাড়াটা ভাল না বউদি।’

‘ভাল না! কেন ভাল না কেন? বেশ শান্তই তো মনে হয়। ঝুট ঝামেলা নেই। চব্বিশ ঘণ্টা মাইক বাজে না, চাঁদার হুজ্জুতি নেই। আমার বাবা শান্ত জায়গাই পছন্দ।’

রাধার মা আঙুলের ডগায় রাখা চুন জিবে দিয়ে বলে, ‘না ভাল না। ওপরে ওপরে ঠিক আছে। তলে তলে ভাল না।’

‘কী বলছ বুঝতে পারছি না রাধার মা। ঠিক করে বলো।’ সুমিত্রার খানিকটা কৌতূহল হয়।

রাধার মা গলা নামিয়ে বলে, ‘কী বলব? এখানে পকেটে টাকার গোছা নিয়ে লোক ঘোরে। সব বাইরের লোক। পার করে দেওয়ার ব্যবস্থা ওদের।’

সুমিত্রা ভয় পেয়ে বলে, ‘কী যা-তা বলছ। কীসের পার? কোথায় পার?’

রাধার মা মুখ নামিয়ে হাসল। বলল, ‘অত কথা জেনে কাজ নাই। আপনের বয়স অল্প, দেখতে শুনতেও ভাল। আমার বলার কথা বলে রাখলাম।’

সুমিত্রা কথাটা প্রদীপকে জানায়। প্রদীপ হেসে বলল, ‘আমার বউটাকে যে দেখতে সুন্দর আমি জানি। শুধু সুন্দর নয়, একটু বেশি সুন্দর। ফরসা রং, পান পাতার মতো মুখ। নাকটা টিকালো। এ আর নতুন খবর কী সুমিত্রা?’

সুমিত্রা স্বামীর গায়ে চাপড় দিয়ে বলল, ‘আঃ, ইয়ারকি কোরো না। রাধার মা বলে গেল, তলে তলে খারাপ।’

প্রদীপ এবার বিরক্ত হল। বলল, ‘তোমার অত তলে যাওয়ার দরকার কী? পাড়া খারাপ না পাড়া ভাল আমাদের কী? আমরা পাড়ায় থাকি না বাড়িতে থাকি?’

সুমিত্রা চুপ করে যায়।

সপ্তাহখানেকের মাথায় সুমিত্রা বুঝল, পিছনে লোক লেগেছে। সেই লোক প্রদীপ অফিসে বেরিয়ে গেলেই চলে আসে বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সাইকেলে ঘণ্টি মারে। মোটরবাইকে বসে পা নাড়ে। মোবাইলে কথা বলে। সুমিত্রা বাড়ি থেকে দোকান-বাজারে বেরোলে পিছু নেয়।

প্রদীপকে বললে সে এবারও হেসে উড়িয়ে দিল। বলল, ‘ও তোমার মনের ভুল। রাধার মা বলেছে। এখন মনের মধ্যে এসব কত কিছু হবে। মোটরবাইক, মোবাইল, পিছু নেওয়া… যত্তসব গল্প। অফিসে গোলমাল শুরু হয়েছে। এখন গল্প নিয়ে মাথা ঘামালে আমার চলবে না। একটা অন্য রোজগারের ধান্দা করতে হবে মনে হচ্ছে। সাইড ইনকাম।’

সুমিত্রা প্রথমে বাড়ি থেকে বেরোনো কমিয়ে দিল। তারপর একেবারে বন্ধ করল। লাভ হল না। ক’দিনের মধ্যেই দুপুরে দরজায় টোকা পড়ল। এক দিন নয়, পরপর তিন দিন। সুমিত্রা আবার প্রদীপকে জানায়। প্রদীপ এবার রেগে গেল। বলল,‘কী শুনতে কী শুনেছ তার ঠিক নেই। দুপুরে কে দরজায় ধাক্কাবে? হয় ভুল শুনেছ, নয় ফিরিওলা। ইচ্ছে হলে খুলবে, না হলে খুলবে না। আমি তো অফিস কামাই করে তোমাকে পাহারা দিতে পারব না। সুমিত্রা, একটা জিনিস নিয়ে এত বাড়াবাড়ি কোরো না। আমার হাজারটা সমস্যা। কাজকর্ম নিয়ে পাগল হয়ে আছি। কেন বুঝতে চাইছ না?’

মুখে একথা বললেও প্রদীপ একটা রবিবার ছুতোর মিস্ত্রি ডেকে সদরে আর একটা ছিটকিনি লাগাল। সুমিত্রার দিকে হেসে বললে, ‘ব্যস, এবার হল তো? আমার সুন্দরী বউকে আর কেউ চুরি করে নিয়ে যেতে পারবে না।’

এরপর তিন দিন আর কিছু হল না। হল চতুর্থ দিন। কে যেন জানলায় ঢিল ছুড়ল। একটা নয়, পরপর অনেকগুলো। লোহার শিকে সেই ঢিল লেগে আওয়াজ হল। ঠং ঠং ঠং…।

গোটা দুপুর রক্তশূন্য মুখে খাটে সোজা হয়ে বসে রইল সুমিত্রা। বিকেলে রাধার মাকে বলতে, সে মুখে আঁচল দিয়ে হাসে। সুমিত্রা রেগে বলে, ‘হাসছ কেন? তুমিও কি তোমার দাদাবাবুর মতো বলছ আমি ভুল শুনেছি?’

রাধার মা চকিতে মুখ ঘুরিয়ে সুমিত্রার দিকে তাকায়। চোখে ঝিলিক মেরে বলে, ‘ভুল না ঠিক দরজা খুলে দেখলেই পারেন। অসুবিধে কী? দাদাবাবু তো থাকেন না।’

প্রদীপ বাড়ি ফিরে দেখল, সুমিত্রা জিনিসপত্র অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছে। মরে গেলেও সে আর এখানে এক মুহূর্ত থাকবে না। রাধার মাকে টাকা হিসেব করে ছাড়িয়ে দিয়েছে বিকেলেই।

প্রদীপ তার কাছ থেকে একটা দিন সময় নিল।

তাড়াহুড়োর মধ্যে বাড়ি খুঁজলে যা ঘটার তাই ঘটল। ভাড়া বেশি পড়ল। তবে বাড়িটা ভাল। ঘর একটা হলে কী হবে, বড় বড় দুটো জানলা। সামনে এক চিলতে বারান্দাও আছে। বারান্দায় দাঁড়ালে দূরে একটা ঝিলের মতো দেখা যায়। বিকেলের পর সেখান থেকে হাওয়া আসে। সন্ধেবেলায় গা ধুয়ে সুমিত্রা কোনও কোনও দিন সেই বারান্দায় দাঁড়াত। তার ওপর বাড়িউলি মহিলাটি মুখে খিটখিটে হলেও, মনটা খারাপ নয়। সুমিত্রার খবর রাখত। মাঝেমধ্যে এসে দু’-একটা কথা বলে যেত। কতদিন বিয়ে, বাচ্চাকাচ্চা নেই কেন, একজন ভাল ডাক্তার চেনা আছে, একদিন যাবে কিনা— এইসব কথা।

বৃদ্ধা বাড়িউলি একা মানুষ। স্বামী মারা গেছেন অল্প বয়েসে। নিজেও নিঃসন্তান। দূর সম্পর্কের এক বোনপোকে এনে মানুষ করেছেন। সে ছেলেটিও ভাল। দেখতে শুনতেও ভাল। শক্তপোক্ত চেহারা। তবে চোখ দুটো খারাপ। বাইরে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করেও কাজ হয়নি। মোটা ঘষা কাচের চশমা পরে। কলেজে ঢুকেও চোখের কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি বেচারি। সুমিত্রার সামনাসামনি হলে মুখ নামিয়ে সুন্দর হাসে। হেসে বলে, ‘দিদি, ভাল আছেন?’

শিষ্টাচারের জন্য ভুলে যায়, ও মুখ তুললেও কিছু নয়। ভাল করে যে দেখতে পায় না তার এত লজ্জার কী আছে?

ছেলেটাকে সুমিত্রার ভাল লাগে। সে প্রদীপকে বলে, ‘ভাগ্যিস ওই নোংরা পাড়াটা ছেড়ে চলে এসেছি। ভাড়াটা একটু বেশি পড়ছে ঠিকই, কিন্তু বাড়িটা ভাল। মানুষগুলোও ভাল। আহা, ছেলেটা চোখে ভাল দেখে না।’

প্রদীপ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, ‘পুরুষমানুষগুলো সব অন্ধ হলে সুন্দরী মহিলাদের কোনও অসুবিধে হত না।’

‘ছিঃ, এরকম বলতে নেই।’

‘আচ্ছা বলব না। তোমার পছন্দ হলেই হল। তবে মনে রেখো সুমিত্রা, আর কিন্তু আমি ছুটতে পারব না। বাড়ি বদলেরও একটা খরচ আছে। অ্যাডভান্স, সেলামি ছাড়াও ঠেলা, টেম্পো ভাড়া করতে হয়। তোমার স্বামীর যা অবস্থা তাতে মাসে মাসে সে এই খরচ সামলাতে পারবে না। আমি যেন বাড়ি বদলানোর কথা আর না শুনি।’

শুনতে হল। শুধু শুনতে হল না, এই কথার দু’দিন পরেই আবার বাড়ি বদলাতে হল প্রদীপকে।

দু’নম্বর বাড়ির সবথেকে ভাল ছিল বাথরুমটা। দেখলে চমকে যেতে হয়। অনেকটা জায়গা। সাধারণত ভাড়া বাড়ির বাথরুম এত বড় হয় না। চৌবাচ্চাটাও বড়। আগেরটার মতো জলের সমস্যা নেই। সুমিত্রার লোভ হয়। প্রদীপ অফিস চলে যাওয়ার পর ঘরের কাজ সেরে সুমিত্রা অনেকটা সময় ধরে স্নান করে। কোনও কোনও দিন রেডিয়ো নিয়েই বাথরুমে ঢোকে। ডিঙি দিয়ে উঁচু তাকে তুলে দেয়। গান চলে।

সেদিনও রেডিয়ো নিয়ে ঢুকেছিল সুমিত্রা। কিন্তু চালাতে পারেনি। চালাতে গিয়ে দেখল, ব্যাটারি ফুরিয়ে গেছে। আওয়াজ হচ্ছে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস…। সস্তার রেডিয়োগুলোর এই দোষ। হুট করে ব্যাটারি ফুরোয়। খানিকটা বিরক্ত হয়ে চৌবাচ্চার দিকে সরে আসে সুমিত্রা আর তখনই দেখতে পায় সে।

উলটোদিকের দেওয়ালে, উঁচুতে, সবসময় বন্ধ থাকা জানলার কোণে একটা ফুটো। ছোট্ট ফুটো। সেই ফুটোতে একটা চোখ। চোখ নয়, চশমা। ঘষা কাচের চশমা। সেই চশমা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। আবছা, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সুমিত্রার দিকে তাকিয়ে আছে।

সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে ঘটনা শুনল প্রদীপ। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ঠিক দেখছ সুমিত্রা? মনের ভুল নয় তো? আমার কিন্তু এখনও মনে হয় আগেরবারেও তোমার ভুল হয়েছিল। দরজায় কার না কার টোকা শুনেই আমরা পালিয়ে এলাম। এটাও সেরকম কিছু নয় তো। একটা প্রায় অন্ধ মানুষ…?’

‘আমি ঠিক দেখেছি। এই চশমা আমার ভুল হবে না।’

‘কই আমি তো বাথরুমে কোনও ফুটোটুটো দেখতে পেলাম না!’

‘নিশ্চয় বাইরে থেকে ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।’ শাড়ির আঁচলটা পিঠে ফেলে মুখ নামিয়ে বলল সুমিত্রা।

প্রদীপ উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘সরো সুমিত্রা। আমাকে যেতে দাও। ওপরে গিয়ে হারামজাদার চোখ উপড়ে দিয়ে আসছি।’

সুমিত্রা স্বামীর হাত চেপে ধরল। ফ্যাকাশে মুখে ফিসফিস করে বলল, ‘কোনও লাভ নেই। যারা ওই চোখে দেখতে চায় তারা চোখ না থাকলেও দেখবে। তা ছাড়া প্রমাণ করা যাবে না। তোমার মতোই লোকে শুনলে হাসবে। বিশ্বাস করতে চাইবে না। তার থেকে চলো বাড়িটা ছেড়ে চলে যাই।’

প্রদীপ প্রথমে অবাক হয়, তারপর রেগে ওঠে।

‘আবার বাড়ি ছেড়ে দেব! তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? আর কতবার পালাব বলো তো সুমিত্রা? তোমার জন্য কি সারাজীবন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে?’

সুমিত্রা নিচু গলায় বলে, ‘এটা আমার দোষ? একটা কদর্য মানুষ বাথরুম ফুটো করে… ছি ছি।’

প্ৰদীপ হাত ছুড়ে বলে, ‘না তোমার দোষ নয়। তোমার দোষ হবে কেন? দোষ আমার। গরিবের ঘরে সুন্দর দেখতে মেয়ে বিয়ে করে আনা যে কত বড় দোষ আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। পৃথিবীর সব পুরুষমানুষ শুধু তোমার সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে?’

বকাঝকার পরেও প্রদীপ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হল। কারণ না ছেড়ে তার কোনও উপায় ছিল না। গোটা একটা দিন সুমিত্রা বাথরুমে ঢোকেনি। সে জানিয়েছে, ওই বাথরুমে সে আর কখনওই ঢুকবে না।

বারান্দার আলোটা আজ জ্বলেছে। বাথরুম থেকে ফিরে সুইচ নেবানোর ঠিক আগের মুহূর্তে সুমিত্রা মেয়েটাকে দেখতে পায়। পিছন থেকে দেখতে পায়। লম্বায় অনেকটা তার মতোই।

সুমিত্রা বুঝতে পারল ভুল দেখেছে। এত রাতে একটা মেয়ে বাড়িতে কীভাবে ঢুকবে? ভাড়া বেশি হলেও এই তিন নম্বর বাড়ির দরজাটরজাগুলো শক্তপোক্ত। সদরে কাঠের পাল্লার পরও লোহার কোলাপসিবল আছে। বারান্দা থেকে উঠোনে নামার মাঝখানে গ্রিলের দরজায় তো সবসময় তালা। তা হলে? এ মেয়ে ঢুকবে কী করে? আর ঢুকলেও অমন শান্ত ভঙ্গিতে বারান্দা দিয়ে হেঁটে রান্নাঘরের দিকে যাবেই বা কেন? ভুল দেখেছে। নিশ্চয় ভুল দেখেছে। এ বাড়িতে চোর-ডাকাত, ভুতটুতের কোনও বদনাম নেই। তিন মাস তো কেটে গেল। কই এতদিন তো কোনও অসুবিধে হয়নি!

পুরো এক গেলাস জল খেয়ে সুমিত্রা ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। মালগাড়িটা কি যাওয়া শেষ করেছে? অনেকক্ষণ একটানা কোনও শব্দ হলে এটাই মুশকিল। থামলেও মনে হয় থামেনি। প্রদীপ হাত-পা ছড়িয়ে মরার মতো ঘুমোচ্ছে। বালিশটা সরে মাথাটা কাত হয়ে আছে। সুমিত্রা সাবধানে মাথার তলায় বালিশটা গুঁজে দিল। আহা রে, মানুষটার খুব ধকল যাচ্ছে। সংসারের চাপ, অফিসের চাপ সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা। আজকাল কোনও সময়েই মেজাজ ঠিক রাখতে পারে না। অফিসে খুব গোলমাল চলছে। এ মাসে পুরো মাইনে হয়নি। বলছে খেপে খেপে দেবে। প্রথমটার পর তাও তো দেয়নি। রাগারাগি কি আর এমনি করে? তবে একটা ভাল কথা, চাকরির পাশে কী যেন একটা কাজের চেষ্টা করছে। ছোটখাটো ব্যাবসামতো। যদিও তাতেও টাকা দরকার। কোন একটা বন্ধু কিছুটা দেবে বলেছে। বাকিটা নিয়ে চিন্তায় আছে। সন্ধেবেলাতেও বলছিল।

‘টাকার জন্য আটকে যাচ্ছে সুমিত্রা। ব্যাবসাটা শুরু করতে পারলে আর কোনও চিন্তা থাকবে না। এক বছরের মধ্যে দাঁড়িয়ে যাবে। তখন শালার চাকরির মুখে লাথি। শুধু টাকাটা যদি পাই…।’

‘কেন তোমার ওই বন্ধু না কে, সে দেবে না?’

‘আরে বাবা, আগে যেটুকু বলেছে সেটুকু দিক। বাকিটা দেখা যাবে। অ্যাই শোনো, বর্ধনকে একদিন ডাকব বলেছি। খাওয়াব। রোববার-টোববার দেখে দুপুরে ডাক’খন।’

সুমিত্রা অবাক হয়ে বলে, ‘বর্ধন কে?’

‘সে তুমি চিনবে না। ওই লোকটার হাতেই অর্ডার। আমার ব্যাবসার ফিউচার। পরে ঘুস-টুস নেবে। তবে আগে থেকে একটু ইন্টিমেসি দেখিয়ে নিই। বলেছি, একদিন এসে আমার বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে যান। ব্যাবসায় এসব আছে। খাওয়াতে হয়। বাইরে খাওয়ালেও চলত। কিন্তু তাতে ইন্টিমেসি থাকত না। সেই কারণে প্রথমবার বাড়িতে ডাকা। প্ল্যান কীরকম?’

সুমিত্রা হেসে বলল, ‘প্ল্যান ভাল। তবে দেখো তোমার বউয়ের হাতে রান্না খেয়ে আবার না পালায়।’

প্রদীপ খানিকটা অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘না না, পালাতে দিলে চলবে না। অর্ডার চাই। পালাতে দিয়ো না সুমিত্রা।’

সুমিত্রা হেসে বলল, ‘আমি পালাতে না দেওয়ার কে? আমি ওসব কী বুঝি। সংসারে দুটো সাশ্রয় হলেই হল।’

সুমিত্রা ঠিকই করে রেখেছে, সেরকম হলে হাতের একটা বালা বিক্রি করে দেবে। প্রদীপকে এখন কিছু বলেনি। এত রাতে মনে হচ্ছে, বললে ভাল হত। মানুষটা কিছুটা চিন্তার হাত থেকে হয়তো রেহাই পেত।

ঘুম আসতে আরও রাত হল সুমিত্রার। ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে আগে সে সিদ্ধান্ত নিল, প্রদীপকে কালকেই বালা বিক্রির কথাটা বলবে, কিন্তু মেয়েটার কথা বলবে না। মজা করেও বলবে না।

ঠিক দু’দিন পর মেয়েটাকে দ্বিতীয়বার দেখা গেল। দু’দিন পরে মানে শুক্রবার। এবার আর রাতে নয়, দেখা গেল দুপুরবেলা। একটা সাতান্ন বেরিয়ে যাওয়ার পর।

খেয়েদেয়ে একটু গড়িয়ে নেওয়া সুমিত্রার বিয়ের আগের স্বভাব। দুপুরবেলা এ বাড়িটা কেমন একটা ঝিম ধরে পড়ে থাকে। সুমিত্রার বেশ লাগে। চোখ বুজে আসে। আজও আসছিল, আর ঠিক তখনই শব্দটা হল।

খসখস, খসখস…।

শাড়ির শব্দ। মাড় ভাঙা শাড়ি পরে কেউ নড়াচড়া করলে যেমন শব্দ হয়, তেমন। সুমিত্রা খাটের ওপর সোজা হয়ে বসল। ভুল শুনছে?

শব্দটা আবার এল। এবার আর শাড়ির শব্দ নয়, চুড়ির শব্দ। বেশি চুড়ি নয়, অল্প চুড়ির শব্দ। হাতে চুড়ি পরে কেউ কিছু করছে। কান পেতে শুনল সুমিত্রা। শব্দটা আসছে ভেজানো দরজার ওপাশ থেকে। এর মানে বারান্দায় কেউ আছে। কে আছে? কেউ কি আছে?

পা টিপে টিপে উঠে গিয়ে দরজা ফাঁক করতেই মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল সুমিত্রা।

শাড়ি পরে বসে আছে বারান্দায়। মেঝেতেই বসে আছে। সেই শাড়ির রং তুঁতে। মাথা নামিয়ে কিছু একটা করছে। চুল ঝুঁকে পড়েছে সামনে। হাতে ঘল্প ক’টা চুড়ি। ডান হাতে একটা সোনার বালার মতো। এত সব দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মুখ দেখা গেল না। কারণ এবারও মেয়েটা উলটোদিকে ফিরে আছে।

শরীরের সব শক্তি দিয়ে সুমিত্রা চিৎকার করে উঠল। কে? কে? একবার, দু’বার, তিনবার। কোনওবারই আওয়াজ বেরোল না। সামান্য আওয়াজও নয়।

সুমিত্রাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে মেয়েটা এবার উঠে দাঁড়ায়। শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। মাটির ওপর পড়ে যাওয়া আঁচলটা তুলে কাঁধের ওপর ফেলে। তারপর কোনও দিকে না তাকিয়ে ধীরপায়ে বারান্দা ছেড়ে নেমে যায় উঠোনে। বাঁদিকে বাঁক নিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল সুমিত্রার।

যেন কিছুই হয়নি! যেন সে এ বাড়িই মেয়ে!

সুমিত্রা যখন দরজা ধরে মেঝের ওপর বসে পড়েছে তখন সে ঘামছে। শুধুই ঘামছে।

প্রদীপ ফিরে জামাকাপড় বদলাতে বদলাতে বলল, ‘বুঝলে সুমিত্র, বর্ধনকে ডেকে ফেলেছি। কালই আসতে বলেছি। আর দেরি করাটা ঠিক হবে না। জিনিসটা প্রায় পেকে এসেছে। এবার একটা ছোট্ট ঢিল দিলেই ব্যস, টুপ করে নীচে পড়বে।’ বলতে বলতে প্রদীপ ঢিল ছোড়ার অভিনয় করল। বাঁকাভাবে একটু হাসল। মানুষটাকে আজ খুশি খুশি লাগছে। খানিকটা যেন নিশ্চিন্ত। প্রদীপ খাটে বসে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি তো ভেবেছিলাম, দুপুরে খাওয়াব। ব্যাটা বলল, না রাতে। তখন বুঝলাম, শুধু খাওয়া নয়, শালা একটু ইয়েও চায়। ইয়ে বোঝো তো? আরে ইয়ে গো।’ প্রদীপ দুটো হাত সামনে এনে বোতলের ইঙ্গিত করল। হেসে বলল, ‘বেশ, রাতে খাবি তো তাই খা শালা। ওর অর্ডার শিয়ার করতে পারলে বাকিটা কোনও অসুবিধে হবেই না। টাকা আপসে চলে আসবে। এ মাসের শেষ থেকেই কাজ শুরু করে দেব। কথা ফাইনাল হয়ে গেছে।’

থেমে সিগারেটে লম্বা টান দিল প্রদীপ। তৃপ্তির টান। পা নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘খাবার বেশি কিছু করতে হবে না। মেনু ছোট রাখবে। মাংসের সঙ্গে কোনটা মানাবে বলো তো সুমিত্রা? ফ্রায়েড রাইস নাকি রুমালি রুটি? সে তুমি যেটা ভাল বোঝো। পারলে একটু চাটনি দিয়ো। কালই টম্যাটো এনে দেব। ঘরে চিনি কতটা আছে?’

এতটা বলার পর প্রদীপ বুঝল, সুমিত্রা কিছু বলছে না। একমনে চুপ করে আলনার কাপড় গুছিয়ে যাচ্ছে। সে বউয়ের দিকে তাকাল। তাকিয়ে চমকে উঠল।

‘এ কী তোমার কী হয়েছে? মুখটা এরকম ফাকাশে কেন? জ্বরটর বাধালে নাকি?’

সুমিত্রা মুখ নামিয়ে বলে, ‘কিছু হয়নি, কী আবার হবে? কাল রাতে ঘুম হয়নি বোধহয়।’

প্রদীপ নিশ্চিন্ত হল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তাই বলো। দেখো বাপু এখন আবার জ্বর-ফর বাধিয়ে শুয়ে পোড়ো না। অন্তত কাল রাতের আগে তো নয়ই। একটা মানুষকে খেতে বলেছি। আর শোনো…।’

‘কী?’

‘না, থাক পরে বলব।’ স্ত্রীর দিকে অল্পক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল প্রদীপ।

সুমিত্রার একবার মনে হল, মেয়েটার কথাটা বলে ফেলে। পরক্ষণেই মনকে শক্ত করল। একটা মিথ্যে জিনিস নিয়ে প্রদীপকে বিরক্ত করাটা অন্যায় হবে। বিশেষ করে এই সময় তো একেবারেই নয়। মনে হচ্ছে, অনেকদিন পরে একটু ঘুরে দাঁড়ানোর আশা পেয়েছে মানুষটা। এখন এসব হাবিজাবি শুনলে রেগে যাবে, চেঁচাবে। ভাববে এবার এ বাড়িটারও দোষ দেখতে শুরু করেছে সে। বাড়ি বদলাতে চাইছে। প্রদীপ তো আগের ঘটনাগুলোও বিশ্বাস করেনি। এটা তো একেবারেই করবে না। করবার মতো নয়। সে হলেও করত না। আজকালকার দিনে ভূত কে বিশ্বাস করে? কেউ করে না। সে কি করে? করে না।

রাতে সত্যি সত্যি জ্বর এল সুমিত্রার। খেতে বসে বুঝল। বেশি জ্বর নয়, শরীরে হালকা একটা গরম ভাব। রুটিগুলো নেড়ে-চেড়ে তুলে রাখল।

প্রদীপ ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কী হল, খাবে না?’

‘না, ইচ্ছে করছে না। গা-টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। রাতে উপোস দিলে ঠিক হয়ে যাবে।’

প্রদীপ বিরক্ত হল। মুখ নামিয়ে খেতে খেতে বলল, ‘কালই ওষুধ-টষুধ খেয়ে ফিট হয়ে যাও। বাড়িতে একজন গেস্ট আসবে আর তুমি জ্বর নিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকলে… আর শোনো।’ প্রদীপ মুখ তুলল।

চলে যেতে গিয়েও সুমিত্রা থমকে দাঁড়ায়। মানুষটা যেন কেমন করে কথা বলছে আজ। গলার স্বর কঠিন। চোখগুলোও কঠিন।

প্রদীপ বলল, ‘দয়া করে বর্ধনটার সামনে একটু ফিটফাট হয়ে থেকো।’

‘মানে?’

‘মানে আর কী? একটু সেজেগুজে থাকবে। একটা ভাল শাড়ি, একটু গয়না। মুখে পাউডার, লিপস্টিক দেবে। বোঝোই তো একটা লোক অর্ডার দেবে। বড় অর্ডার। ব্যাবসার শুরুতে এরকম একটা অর্ডার মানে অনেক। শুরুটা ঠিক হলে বাকিটা ভাবতে হয় না। কিন্তু অর্ডারটা যে দিচ্ছে লোকটা তো দেখবে কাকে দিচ্ছে। দেখবে না?’

প্রদীপ উঠে পড়ল। বারান্দায় হাত ধুয়ে এসে খাটে বসল। একটা সিগারেট ধরাল। আড়চোখে সুমিত্রার দিকে তাকাল। বলল, ‘আসলে সকলেই চায় যাকে এত টাকার কাজ দিচ্ছে সেই লোকটা কেমন? ঘরটা দেখবে। ঘরের মানুষগুলোকে দেখবে। একটা ভরসা তো দিতে হবে। বোঝাতে তো হবে প্রদীপ লোকটা হেঁজিপেঁজি নয়। সুন্দর ঘর না থাক, সুন্দর বউ আছে। দরকার হলে তাকেই দেখাতে হবে। হবে না? তা ছাড়া…।’

সুমিত্রা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘তা ছাড়া কী?’

প্রদীপ উঠে এসে বউয়ের সামনে দাঁড়াল। কাঁধে হাত রাখল, তারপর গলা নামিয়ে বলল, ‘এই প্রথম তোমার স্বামীর একটা চান্স এসেছে। ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। এই সময় বর্ধনটা ফসকে না যায়। তুমি একটু লোকটাকে ম্যানেজ করতে পারবে না সুমিত্রা’

প্রদীপের চোখ চকচক করছে। সুমিত্রা তার হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, ‘পারব। কী করতে হবে বলে দিয়ে।’

প্রদীপ হাসল। ‘বলল, গুড। ভেরি গুড।’

রাতে সুমিত্রার ঘুম ভাঙল জ্বরের দাপটে। গা পুড়ে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল বিছানায়। পাশেই হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে প্রদীপ। জানলা-দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে আসা ছিটে-ফোঁটা আলো এসে পড়েছে ঘুমন্ত মুখে। সুমিত্রা বুঝতে পারছে শরীরটা খারাপ লাগছে। প্রদীপকে ডাকবে। ডেকে জ্বরের কথা বলবে? মনে হচ্ছে বলা উচিত।

‘অ্যাই শোনো, শুনছ?’

প্রদীপের গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিল সুমিত্রা।

প্রদীপ প্রথমে বিরক্তিতে বলল, ‘আঃ।’ তারপর উঠে বসল। নাক-মুখ কুঁচকে বলল, ‘কী হয়েছে?’

সুমিত্রা ভেবেছিল স্বামীকে জ্বরের কথা বলবে। কিন্তু বলল অন্য কথা। গায়ে হাত রেখে বলল, ‘আমার ভয় করছে।’

‘ভয় করছে! রাতদুপুরে ঘুম ভাঙিয়ে কী পাগলামি করছ সুমিত্রা?’

‘একটা মেয়ে… জানো একটা মেয়ে এই বাড়িতে ঘোরে…।’

প্রদীপ রাগে হিসহিস করে ওঠে, ‘কী? একটা মেয়ে বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ায়? ঢুকতে দাও কেন?’

‘আমি দিই না। সে নিজেই ঢোকে। দরজা-জানলা বন্ধ থাকে, তাও ঢোকে।’ সুমিত্রা যেন খানিকটা ঘোরের মধ্যে বলে।

প্রদীপ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। চাদর টেনে শুতে শুতে বলে, ‘ও তাই বলো। ভূত। এবার তুমি কী বলবে আমি জানি সুমিত্রা। তুমি বলবে, চলো বাড়িটা ছেড়ে চলে যাই। তাই তো? সুমিত্রা, আমার মনে হচ্ছে, তোমার মাথার কোনও সমস্যা হচ্ছে। কাল বর্ধনের ব্যাপারটা ভালয় ভালয় মিটে গেলে আমি তোমাকে কলকাতায় নিয়ে যাব। ডাক্তার দেখাব। তাও ভাল, এবার মেয়ে-ভুত দেখেছ। পুরুষ নয়। যাই হোক, প্লিজ আর বিরক্ত না করে আমায় ঘুমোতে দাও। তুমিও ঘুমোও।’

সুমিত্রার ঘুম হল না। সারারাত গা পোড়া জ্বর ছিল। শেষরাতে নিজে থেকেই সেই জ্বর খানিকটা কমে এল। চারটে সাতান্নর গাড়িটা চলে যাওয়ার পর খাট থেকে সাবধানে নামল সুমিত্রা। আর শুয়ে থাকা যাবে না। অনেক কাজ। বাড়িতে অতিথি আসবে।

পা টিপে গিয়ে দরজা খুলল সুমিত্রা।

এই সময়টা আলো ফোটে, আবার ফোটেও না। সবকিছু একই সঙ্গে স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট। আঁধার বুঝি শেষ কথা বলে যায় আলোর সঙ্গে। এক আশ্চর্য সময় এটা। সেই আশ্চর্য সময়ে আবার মেয়েটাকে দেখতে পেল সুমিত্রা। বসে আছে সে। বসে আছে বারান্দার শেষে। উঠোনে নামার সিঁড়ির ধাপে। সেই তুঁতে শাড়ি। সেই পিঠের ওপর আঁচল ফেলা।

আগের দিনগুলোতে সুমিত্রার সাড়া পেয়ে এই মেয়ে হেঁটে চলে গেছে। সরে গেছে। মিলিয়ে গেছে চোখের আড়ালে। আজ গেল না। ঘুরে তাকাল।

চমকে উঠল সুমিত্রা। এই মুখ তো তার চেনা! বহু, বহুদিনের চেনা! আয়নার সামনে দাঁড়ালেই সে দেখতে পায়। ফরসা রং, পান পাতার মতো মুখ। নাক টিকালো।

জ্বরের দুবর্লতায় মাথা ঘুরে গেল সুমিত্রার। চোখ বোজার আগে তার মনে হল, মেয়েটা যেন তার দিকে চেয়ে হাসল। সামান্য হাসল।

লাইনের ধারে মেয়েটার মৃতদেহ পাওয়া গেল সন্ধের ঠিক পরে পরে। গায়ে তুঁতে শাড়ি। হাতে অল্প ক’টা চুড়ি। মুখে পাউডার আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক মেখে মরা মেয়েটা যেন হাসছে। সামান্য হাসছে।

প্রদীপ বিকেলেই কলকাতায় চলে গেছে বর্ধনকে আনতে। তার বউয়ের আত্মহত্যার খবর সে এখনও জানে না।

সাপ্তাহিক বর্তমান ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০৬

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *