২. শিক্ষা

শিক্ষা

বকের নেমন্তন্ন

ক্লাস সেভেনে পড়াশোনা ছেড়েছে বাবাই দাস। মুকুন্দপুর বাজারে বাবার দোকানে বসে চানাচুর-বিস্কুট বিক্রি করছিল। চানাচুর প্যাকেট কত করে, প্রশ্ন করতেই একটা তুলে পিছনের ঝাপসা বেগুনি কালির ছাপা লেখা পড়ে বলে দিল, ‘আড়াইশো ৩০ টাকা।’ এক কিলোগ্রাম কত হল তা হলে? ‘কেন, ১২০ টাকা?’ তখন পাশে একজন ২৮ টাকার জিনিস কিনে ৫০ টাকার নোট দিলেন, বাবাই ফেরত দিল ১৬ টাকা। ‘গতবারের ছ’টাকা বাকি ছিল না?’

রবি পড়ুয়ার বয়স ১৩, রিকশা চালায় পূর্বালোক কালীবাড়ি থেকে সিংহবাড়ি বাসস্টপ। পড়া ছেড়েছিস কবে? ‘অনেক দিন, সে-ই ক্লাস ফাইভ।’ ভাড়া আট টাকা, সকালটা স্ট্যান্ডে দাঁড়ালে সওয়ারি হয় গোটা বারো, নিজেদের রিকশা বলে ৯৬ টাকাই ঘরে নিয়ে যেতে পারে, প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে বলে দিল রবি।

স্কুলের বাইরে এই ছেলেরা কী সুন্দর মুখে-মুখে অঙ্ক কষে। স্কুলে থাকলে আরও কত শিখত, তাই না?

না, শিখত না, সেই সম্ভাবনাই বেশি। ভারতে যে ছেলেরা যায় স্কুলে, তাদের দশজনে চারজন চতুর্থ শ্রেণি পেরিয়েও সরল বিয়োগ কষতে পারে না, মাতৃভাষায় লেখা সরল বাক্য পড়তে পারে না। এমনকী অষ্টম শ্রেণি পাশ করে গিয়েও অন্তত ১৫ শতাংশ ছেলেমেয়ে এগুলো পারে না। পরপর কয়েক বছর একটি সর্বভারতীয় সমীক্ষা থেকে (ASER) এই ছবিটা বেরিয়ে আসছে।

আরও দেখা যাচ্ছে, ছেলেমেয়েরা যত উঁচু ক্লাসে উঠতে থাকে, তত তাদের শেখার সম্ভাবনা কমতে থাকে। দ্বিতীয় শ্রেণির উপযোগী লিখতে-কষতে না-পেরেই যত ছেলেমেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছিল, তাদের চারজনে মাত্র একজন তৃতীয় শ্রেণিতে সেই ক্ষমতা তৈরি করতে পারছে। শিশুটি যখন রয়েছে চতুর্থ শ্রেণিতে, তখনও হয়তো তার আশা আছে, কেউ খেয়াল করবে সে লিখতে-পড়তে পারছে না, তাকে শিখিয়ে দেবে। কিন্তু আবারও পিছিয়ে-পড়া ছাত্রদের চার জনে মাত্র একজন বিয়োগ কষতে, পড়তে-লিখতে শিখছে চতুর্থ শ্রেণিতে। শেষ অবধি দেখা যাচ্ছে, তিনজনে একজন শিশু প্রাথমিকে প্রায় পাঁচ হাজার ঘণ্টা স্কুলে বসে থেকেও পড়তে-লিখতে, অঙ্ক কষতে শিখছে না।

লজ্জায়, বিরক্তিতে যারা স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে, তাদের অনেকেই কিন্তু কাজ করতে গিয়ে হিসেব করছে দিব্যি, কাজ-চালানোর মতো পড়তে-লিখতেও পারে। যার কথাবার্তায় জড়তা নেই, মুখে-মুখে অঙ্ক করায় ভয় নেই, পাঁচজনের সঙ্গে মিশে নিজের কাজ হাসিল করার মতো জটিল কাজও যে করতে পারে, তার খাতায় বছর বছর কেন পড়ত লাল কালির দাগ? ওই খোকা-খুকুরা ফেল করছে, নাকি ফেল করছে শিক্ষা দফতরের বুড়ো খোকারা?

শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে বোঝা যায়, ‘কী পড়ানো হবে,’ সেই প্রশ্নটা আলোচনার জমির প্রায় সবটা দখল করে বসে রয়েছে। এ রাজ্যে নতুন সরকার এসেই প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠক্রমে কী কী পড়ানো হবে তাই নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করেছিল। তার নানা প্রস্তাবের মধ্যে কতগুলো সরকার গ্রহণ করেছে, কতগুলো করেনি, কমিটি থেকে কাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, কারা ঢুকেছে তা নিয়ে মিডিয়াতে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে। কিন্তু যেটা শিক্ষার একেবারে গোড়ার কথা— ছেলেমেয়েরা স্কুলে গিয়েও কেন বই পড়তে, অঙ্ক কষতে শিখছে না, সে-প্রশ্নটা প্রায় না-ছোঁয়া রয়ে যাচ্ছে। দেখেশুনে শেয়ালকে সূপ খাওয়াতে বকের নেমন্তন্ন করার গল্প মনে পড়ে যায়। কুঁজোর ভিতরের বস্তুটি অতিশয় পুষ্টিকর হতে পারে, কিন্তু পাত্রটি এমনই যে শেয়াল বেচারিকে পাত্রের গা চেটে খিদে-পেটে ফিরতে হয়। আমাদের ছেলেমেয়েরাও তেমনি পাঁচ-আট-দশ বছর স্কুলে বসেও অঙ্ক-বাংলা-ইংরেজির নাগাল না পেয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

এ বার ‘কী পড়ানো উচিত’ তা নিয়ে অকারণ কচকচি বন্ধ করে ‘কী করে পড়ানো উচিত’ সেই প্রশ্নে আসতে হবে। অক্ষর চিনে শব্দ, শব্দ জুড়ে বাক্য পড়তে শেখাটাই যদি প্রথম দরকার হয়, তা হলে কোন বই পড়ে শিশু তা শিখছে, সেটা অত কিছু জরুরি নয়। যদি ‘হাঁদা-ভোদা’ কমিকস পড়তে শিশুরা ভালবাসে, তা হলে তা থেকেই শিক্ষক প্রশ্ন করবেন না কেন? সব শিশুকে একই পাঠ্যবই থেকে পড়তে শিখতে হবে, এটাও জুলুম ছাড়া কিছু নয়। যা ভাল লাগবে, তা-ই পড়বে। ‘সহজ পাঠ’ যে সফল, তার কারণ রবীন্দ্রনাথের অসামান্য শব্দচয়ন শিশুদের কান, মন টেনে আনে অক্ষরগুলোর দিকে। তবু আজকের শিশুর কাছে যদি ‘বড় বৌ মেজ বৌ মিলে, ঘুঁটে দেয় ঘরের পাঁচিলে’ তেমন ইন্টারেস্টিং ছবি তৈরি না করে, তা হলে তাকে অন্য বই পড়াতে হবে। বাঁকুড়ায় যা পড়ানো হবে, জলপাইগুড়িতে তা পড়ানো না-ও হতে পারে। ‘কী পড়ল’ সেই ছুতমার্গে না গিয়ে, কতটা শিখল, সেটাই দেখার দরকার শিক্ষা দফতরের। পড়তে যদি সে শেখে, পড়ার আগ্রহ যদি তার জন্মায়, তবে আখেরে সে পড়বে এবং জানবে অনেক বেশি। স্কুলের গোড়াতেই তার মগজে বিগ ব্যাং থেকে শ্রেণি সংগ্রাম পর্যন্ত সব গুঁজে দেওয়া অর্থহীন। অন্তত প্রাথমিকের ক্ষেত্রে শিক্ষা দফতর কেবল দক্ষতার ন্যূনতম মাপকাঠি স্থির করে দিলেই যথেষ্ট— দ্বিতীয় শ্রেণিতে একটি ছাত্রকে কী কী পারতে হবে, তৃতীয় বা চতুর্থতে আরও কী কী তার করতে পারা দরকার। কোন কোন বই পড়ে, কতগুলো অনুশীলনী কষে সে ওইসব দক্ষতা আয়ত্ত করবে, সেটা শিক্ষক বুঝবেন। ‘কী কী জানল’ সেটা শিক্ষার মাপকাঠি নয়, ‘কী কী পারে,’ সেটাই মাপকাঠি।

কী পারছে, তা বুঝতে পরীক্ষা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেই পরীক্ষার দরকার শিক্ষাপদ্ধতির মূল্যায়ন করতে। ছাত্ররা কে কত পেল, সে-তালিকা প্রকাশেরই দরকার নেই। দরকার শ্রেণির সাফল্য-ব্যর্থতার মোট ছবিটা তুলে ধরা। দ্বিতীয় শ্রেণির ৭০ শতাংশ ছেলেমেয়ে যদি ৬৪ থেকে ৩১ বিয়োগ করতে ভুল করে, কিংবা ৬০ শতাংশ ‘কাল ছিল ডাল খালি’ ছড়াটা গড়গড় করে পড়তে না পারে, তা হলে বাপ-মায়ের ‘চেতনার অভাব’ কিংবা শিশুর বেয়াড়াপনার উপর দায় চাপানো চলবে না আর। স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ক্লাসের পড়ানোয় গলদ আছে।

কেন পড়াশোনা হচ্ছে না, সেটা শিক্ষক ক্লাসে আসছেন না বলে, নাকি ক্লাস ঘর নেই বলে, সে-খবর শিক্ষা দফতরের রাখা চাই। ‘স্কুল ইনস্পেকটর’ স্কুলগুলিতে গিয়ে নিয়মিত পরিদর্শন করার যে রীতি আগে প্রচলিত ছিল (যার জন্য স্কুলগুলোকে কত সাজগোজ করে তৈরি থাকতে হত তার বিবরণ বহু গল্পে পাওয়া যায়) এখন তা প্রায় উঠে গিয়েছে। অথচ নিয়মিত স্কুল পরিদর্শনের কোনও বিকল্প নেই। কী পড়া হবে, তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, কেমন পড়ানো হচ্ছে তার খোঁজ রাখা শিক্ষা দফতরের কাছে অনেক জরুরি কাজ।

অন্য কাজটি হল, শেখার তাগিদ, শেখানোর তাগিদ কী করে বাড়ে, তার উপায় খোঁজা। সত্তর-আশির দশকে মনে করা হয়েছিল, যত বেশি স্কুল খোলা হবে, যত শিক্ষক রাখা হবে, যত বেশি শিশুদের আনা যাবে স্কুলে, তত প্রসার হবে শিক্ষার। গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকায় প্রচুর স্কুল খোলা হয়েছে, বহু দরিদ্র দেশে প্রায় ৯০ শতাংশ ছোট ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। অথচ নানা সমীক্ষায় ধরা পড়ছে যে, ছেলেমেয়েরা শিখছে সামান্যই। কেবল স্কুল খুলে রাখলেই শিশুরা যথেষ্ট লেখাপড়া শিখবে না, সেটা এতদিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।

তাই নানা দেশে-প্রদেশে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে, কীভাবে শেখালে কাজ হয়। শিক্ষক-অভিভাবক-ছাত্রদের কী ধরনের পুরস্কার দিলে (বা শাস্তি দিলে) তারা পড়ায় আগ্রহী হবে। কীসে বিনিয়োগ করলে লাভ হবে বেশি— স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ, নাকি পার্শ্বশিক্ষক নিয়োগ, নাকি শিক্ষকদের বাড়তি অনুদান? ছেলেমেয়েরা কত সামান্য শিখছে সে-বিষয়ে বাবা-মাকে জানালে কি তাঁরা স্কুলের উপর চাপ তৈরি করেন? নাকি ভাল নম্বর-পাওয়া ছাত্রদের স্কলারশিপ দিলে বাবা-মা বেশি যত্ন নেবেন সন্তানের পড়াশোনায়? এ সব প্রশ্নের নানা উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। ভাল পড়াশোনা শেখার সূত্র যদি বার করতে হয়, তবে হাতে-কলমে এমন সব কাজের থেকেই তা বেরোবে। রবীন্দ্রনাথ, মার্ক্স, বিবেকানন্দ কী বলে গিয়েছেন সেই ‘শিক্ষার আদর্শ’ থেকে নয়, কেরল মডেল বা ব্রিটিশ মডেল থেকে নয়, ‘আমরা তো এমন করেই শিখেছি’ গোছের আলগা বিশ্বাস থেকে নয়। কীসে কাজ হয়, তার সাক্ষ্য-প্রমাণ খুঁটিয়ে দেখে নীতি তৈরি করতে হবে।

সে-কাজ হচ্ছেও। আফ্রিকার কিনিয়াতে দেখা গিয়েছে, অসুস্থতা শিশুদের স্কুল কামাই করার একটি বড় কারণ। বছরে দু’বার কৃমির ওষুধ খাওয়ালে স্কুল-কামাই কমে অন্তত ২৫ শতাংশ। এই তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বের নানা দেশে স্কুলছাত্রদের কৃমির ওষুধ দেওয়ার কাজ চলছে, ভারতে প্রকল্প চলছে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং বিহারে। ছাত্রদের ফল অনুসারে শিক্ষকদের উৎসাহ ভাতা দেওয়ার পরীক্ষা হয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশে, তাতেও সুনির্দিষ্ট ফল পাওয়া গিয়েছে (বক্স দেখুন)।

নীতি যদি ক্লাসঘরের বাস্তব সমস্যাগুলোর দিকে না তাকায়, তা হলে শিক্ষা দফতরের কর্তাদের সদিচ্ছা জমে পাথর হবে কেবল। তাতে চাপা পড়বে বাবাই, রবির মতো শিশুদের লেখাপড়া শিখে গাড়িঘোড়া চড়ার স্বপ্ন।

কেমন করে নম্বর বাড়ে: অন্ধ্রপ্রদেশের একটি পরীক্ষা

ছাত্রদের ফল ভাল হলে যদি শিক্ষকদের বাড়তি টাকা মেলে, তা হলে কি ছাত্ররা আরও ভাল শেখে? তা বুঝতে পাঁচ বছর ধরে অন্ধ্রপ্রদেশের তিনশোটি গ্রামীণ প্রাথমিক স্কুলে (প্রথম-পঞ্চম শ্রেণি) চলে একটি পরীক্ষা। নিয়ম হয়, ছাত্রদের গড় নম্বর এক শতাংশ বিন্দু বাড়লে শিক্ষকরা পাবেন ‘বোনাস’ ৫০০ টাকা। একশোটি স্কুলে দেওয়া হয় ‘গ্রুপ বোনাস’— স্কুলের গড় নম্বর বাড়লে সব শিক্ষক সমান বোনাস পাবেন। অন্য একশোটি স্কুলে দেওয়া হয় ‘ব্যক্তিগত বোনাস’-যে ছাত্রদের একজন শিক্ষক পড়াচ্ছেন, তাদের গড় নম্বর বাড়লে সেই শিক্ষক বোনাস পাবেন। শেষ একশোটি স্কুলে (‘কন্ট্রোল গ্রুপ’) কোনও বোনাস দেওয়া হয়নি।

• ব্যক্তিগত উৎসাহ ভাতা কাজ দিয়েছে সবচেয়ে ভাল। পাঁচ বছর পরে এইসব স্কুলের ছাত্ররা অন্য ছাত্রদের চেয়ে অঙ্ক এবং ভাষায় বেশি নম্বর পেয়েছে।

• ‘গ্রুপ বোনাস’ স্কুলের ছাত্ররা প্রথম বছর উন্নতি করলেও, পাঁচ বছর পর ‘কন্ট্রোল গ্রুপ’-এর ছাত্রদের মতোই নম্বর পেয়েছে।

• ব্যক্তিগত বোনাস কেবল অঙ্ক আর ভাষার নম্বরের জন্য দেওয়া হলেও, ওই স্কুলগুলোতে ছাত্রদের বিজ্ঞান এবং সমাজ বিজ্ঞানের নম্বরেও উন্নতি হয়েছে।

এই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত, ছাত্রদের ফল অনুসারে শিক্ষকদের বেতনের কিছু অংশ দিলে স্কুলে ছাত্রদের আরও ভাল শেখার সম্ভাবনা বেশি। দুর্বল ছাত্ররাও বেশি শিখছে এই ব্যবস্থায়।

আবদুল লতিফ জামিল পভার্টি অ্যাকশন ল্যাব-এর তরফে এই পরীক্ষাটি করেন কার্তিক মুরলীধরন।

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্বাতী ভট্টাচার্য,

আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ এপ্রিল ২০১২

যাচ্ছে কিন্তু শিখছে না

গরিবের ছেলেকে কত কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হয়, তার গল্প কে না শুনেছে। বালক ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতায় রাস্তার গ্যাসের আলোর নীচে বসে পড়া মুখস্থ করেছেন। মেঘনাদ সাহা সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হতে দূরের গ্রামে আশ্রয়দাতার পরিবারের বাসন মেজেছেন পুকুরের ঘাটে। ঘরে-ঘরে অমন গল্পও কম নয়। ‘আমরা সাত ভাই-বোন একটা হ্যারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করেছি। আজ তোমাদের পড়ার টেবিল, টিউটর, লোডশেডিঙে ইমার্জেন্সি ল্যাম্প, তা-ও পড়াশোনা হয় না’, শুনে শুনে কত কান পচে গিয়েছে, ঠিক নেই।

এখন দেখা যাচ্ছে, কথাটা খুব ভুল নয়। দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে স্কুল শিক্ষা খতিয়ে দেখে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সরকার এবং পরিবার আগের চাইতে ঢের বেশি খরচ করছে স্কুলের পড়াশোনার জন্য। হয়তো উন্নত দেশগুলোর মতো অতটা নয়। কিন্তু যত স্কুল তৈরি হয়েছে, যত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে গত দশ বছরে, আগে কখনও হয়নি। ভারতের কথাই ধরা যাক। প্রথমে সর্বশিক্ষা মিশন (২০০১), পরে শিক্ষার অধিকার আইন (২০০৯) কার্যকর হওয়ার পরে গ্রামেও এখন এক কিলোমিটারের মধ্যে প্রাথমিক স্কুল। স্কুলে বাড়তি ক্লাসঘর, বাড়তি শিক্ষক, বিনা পয়সায় পাঠ্যবই, শৌচাগার, মিড-ডে মিল, সব জোগানো হচ্ছে। ইস্কুলে যাওয়া আজও সহজ নয় অনেকের কাছে, কিন্তু আগের মতো কঠিনও নয়।

অথচ ছেলেমেয়েরা শিখছে অতি সামান্য। এক শ্রীলঙ্কা ছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে স্কুলপড়ুয়ারা আন্তর্জাতিক গড়ের চাইতে অনেক পিছিয়ে। প্রাথমিক স্কুল থেকে যারা বেরোচ্ছে, তাদের এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ লেখা, পড়া, অঙ্ক কষার গোড়ার কাজগুলো পারছে না।

কথাগুলো খুব নতুন নয়। তবে তার ব্যাখ্যাটা সাধারণত হয় এ রকম, ‘ওরা গ্রামের গরিব ছেলেমেয়ে। বাপ-মা কোনও দিন পড়াশোনা করেনি। স্কুলে নাম লেখাতে পেরেছে, তা বলে পড়াশোনা কি আর করতে পারবে? অতই সোজা?’ তাই না-শেখার সংকট নিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত বিশেষ মাথা ঘামায় না। এই রিপোর্টে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, চিন্তার কারণ আছে।

শিক্ষকরা যখন তাঁদের পড়ানোর বিষয়টি সম্পর্কে জানেন (অনেকেই জানেন না— বিহার এবং উত্তরপ্রদেশের মাত্র ৪৭ শতাংশ প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক প্রাথমিকের অঙ্ক ঠিক কষতে পেরেছেন), তখন তাঁরা অনেকেই বিষয়টি ছাত্রদের বোঝাতে পারছেন না।

একটি সমীক্ষায় পাকিস্তানের মাত্র ৩৬ শতাংশ শিক্ষক দু’সংখ্যার যোগ বোঝাতে পেরেছেন ছাত্রদের। নামীদামি স্কুলের শিক্ষকরাও কিন্তু একই প্রশিক্ষণ পেয়ে এসেছেন। ফলে নামী স্কুলের পড়ুয়াও ক্লাসের পড়া বুঝতে পারছে না। আমরা বলছি, ছেলেমেয়ের মন নেই, মাথা নেই। কিন্তু পাঠদানেই দক্ষিণ এশিয়ায় খামতি রয়ে গিয়েছে, বলছে রিপোর্ট। চিনের সাংহাইয়ের উদাহরণ দিয়ে বলা হচ্ছে, সেখানে নতুন শিক্ষকরা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাসে উপস্থিত থাকেন। পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানবিশি চলতে থাকে। একই বিষয়ের শিক্ষকরা একসঙ্গে বসে পাঠ-পরিকল্পনা করেন। ফলে পড়ানো ভাল করার দিকে সহায়তা, সচেষ্টতা থাকছে শিক্ষকদের। যেটা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে না, বলছে রিপোর্ট।

কিন্তু শিক্ষকরা বোঝাতে পারছেন না কেন, সেই মৌলিক প্রশ্নটা কেউ তেমন করছে না। তার কারণ, ক্লাসে কে কতটা বুঝল তা নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামায় না। আমাদের স্কুলে গোটা পড়াশোনাটাই সিলেবাস-মুখী। ছাত্রমুখী নয়। বিশ্বব্যাঙ্কের রিপোর্ট এই বিষয়টিকে ছুঁয়ে গিয়েছে কেবল, কিন্তু এটা সম্ভবত ছাত্রদের না-শেখার প্রথম এবং প্রধান কারণ। এ বিষয়ে শিক্ষক এবং বাবা-মা, দু’তরফেই একটা মোহান্ধতা কাজ করে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যতটা পারা যায় শিখিয়ে দিতে হবে, এই তাগিদ থেকে সরকারি স্কুল, বেসরকারি স্কুল, সকলেই সিলেবাসে যত পারে বিষয় ঠাসে। এ রাজ্যে যেমন প্রাথমিকেই ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান ঠুসে দেওয়া হয়। বেসরকারি ইংরেজি স্কুলগুলোতে সেই সঙ্গে মরাল সায়েন্স বা সিভিক্সও বাদ যায় না। পারলে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বা শেক্সপিয়ারের নাটকও আমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়িয়ে দিই। আমাদের দৃষ্টিতে দেখলে, পাশ্চাত্যে স্কুলে কিছুই শেখায় না। তিন-চারটে বই, হোমওয়ার্ক নেই, পরীক্ষাও নামমাত্র।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট ‘স্কুল লার্নিং ইন সাউথ এশিয়া’ যা বলছে শেখার মান বাড়াতে যা করতে হবে
• দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ২০০১ সালে প্রাথমিক স্কুলে নাম লেখাত ৭৫ শতাংশ শিশু। সেকেন্ডারি স্কুলে ৪৪ শতাংশ। ২০১০ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮৯ শতাংশ এবং ৫৮ শতাংশ। ওই সময়ে স্কুলছুট পড়ুয়াদের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি থেকে কমে হয়েছে ১ কোটি ৩০ লক্ষ।কিন্তু প্রাথমিকের পড়ুয়াদেরএক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ পড়তে-লিখতে, অঙ্ক কষতে শিখছে না। এতে আর্থিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে, কারণ দক্ষ কর্মী না থাকলে শিল্পোদ্যোগীরা বিনিয়োগ করতে চান না।প্রাক্-প্রাথমিক বয়সের শিশুদের যথাযথ পুষ্টি জোগানো।
• শিক্ষকদের বোঝানোর দক্ষতা এবং দায়বদ্ধতা বাড়াতে ‘পারফর্ম্যান্স’-ভিত্তিক পারিশ্রমিক।
• স্কুলের আর্থিক বরাদ্দকে প্রয়োজন এবং ‘পারফর্ম্যান্স’-এর সঙ্গে যুক্ত করা। সরকারি এবং বেসরকারি স্কুলে ছাত্রদের উন্নতির মূল্যায়নের ব্যবস্থা তৈরি করা এবং ক্রমাগত তার পরিমার্জনা করা।

কিন্তু সে সব দেশে পুরো জোরটা দেওয়া হয় পড়ুয়ার লেখার ক্ষমতা, নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে পারার ক্ষমতার উপরে। গরমের ছুটিতে কী করেছ, লিখে এনে পড়ে শোনাও— এমনই স্কুলের কাজ দেওয়া হয়। সেখানে যেমন ইচ্ছে, যা ইচ্ছে লিখতে বাধা নেই। এখানকার বহু স্কুলে দাবি, ক্লাসে দিদিমণি যা পড়ান তা-ই লিখতে হবে। এমনকী উচ্চশিক্ষিত বাবা-মাও বলেন, ‘আন্টি যা লেখাবেন, ক্লাসে সেটাই লেখো।’ স্কুল এখানে শিশুদের বাধ্যতার পরীক্ষা, দক্ষতার পরীক্ষা নয়। এক স্কুলছাত্রী ক্লাসে তার শিক্ষিকার পড়ানো তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলায় শিক্ষিকা পালটা প্রশ্ন করেন, ‘তুই দিদিমণি, না আমি?’ প্রশ্ন করার ইচ্ছেটাই দমিয়ে দেওয়া হয় স্কুলে। কোনও সমস্যার সমাধান করা, যুক্তি দিয়ে মত প্রতিষ্ঠা, ভাষায় আবেগের প্রকাশ, এগুলো শিশুরা পারছে কি না, তা নিয়ে আমাদের স্কুল মাথাই ঘামায় না। রাতদিন পড়াশোনা করেও যে পড়ুয়াদের দক্ষতা বা ‘স্কিল’ তৈরি হয় না, এতে মধ্যবিত্ত-গরিব, সব ছেলেমেয়েই কর্মক্ষেত্রে মুশকিলে পড়ছে।

কী করলে ছেলেমেয়েরা ক্লাসে আরও ভাল শিখতে পারে, তা নিয়েও চিন্তা দরকার। ফিনল্যান্ডে প্রতি ৪৫ মিনিট ক্লাসের পর ১৫ মিনিট ‘ফ্রি টাইম’ দেওয়া হয় ছাত্রদের। দেখা গিয়েছে, তার ফলে তারা ক্লাসে আরও বেশি মন দিতে পারে। জাতীয় স্তরে শুধু দক্ষতার প্রত্যাশিত পরিমাপ (ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড) দেওয়া থাকে। কী ভাবে সেই পরিমাপে ছাত্রদের পৌঁছনো যাবে, ঠিক করেন শিক্ষকরা। কী বই পড়া হবে, তা-ও তাঁরাই ঠিক করেন। ‘এখানে ও সব সম্ভব নয়’ বলে কথাটা উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু কী করলে পড়ুয়ারা আরও সহজে আরও ভাল শিখতে পারবে, সে-প্রশ্ন এড়ানো চলে না। যদি দেখা যায়, কম পড়ালে শিশুরা বেশি শেখে, তবে বেশি পড়াতে যাব কেন?

এ দেশে এই কথাগুলো শুরু করলেই কোরাস ওঠে— এখানে ক্লাসে ঠাসাঠাসি ছাত্র, ব্ল্যাকবোর্ড অবধি নেই, বাথরুম নেই। চারটে ক্লাসে তিন জন কি দু’জন শিক্ষক। এখানে ও সব বড় বড় বুলি কপচে কী লাভ? যেমন চলছে, তেমনই চলবে। এ কথাটা মানতে গেলে অনেকগুলো হোঁচট খেতে হয়। এক, এর মানে দাঁড়ায়, আজও শিশুরা কিছু শিখছে না, কালও শিখবে না। এটা মেনে নেওয়া কেবল অন্যায় নয়, অপরাধ। দুই, যেখানে বাবা-মা মোটা টাকা খরচ করছেন পড়াশোনার জন্য, সেই সব স্কুলেও ‘কী করলে পড়ুয়ারা আরও ভাল শেখে,’ সে-চিন্তা থেকে পড়ানো হয় না। বরং ‘পড়ার চাপ’ বাড়ানো ভাল স্কুলের লক্ষণ বলে মনে করা হয়। তিন, সরকারি স্কুলের অবস্থা খুব কিছু না বদলেও দেখা যাচ্ছে, পড়ুয়াদের শেখার মান অনেকটা বাড়ানো সম্ভব। যেমন, ছাত্রদের শেখায় (লার্নিং আউটকাম) উন্নতি আনতে অন্ধ্রপ্রদেশের ৫০০টি সরকারি প্রাথমিক স্কুলে চারটি পদ্ধতি আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা করা হয়েছিল। কোনও শিক্ষকের অধীনে শেখার উন্নতি হলে শিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে বোনাস দেওয়া, স্কুলের সব ছাত্রছাত্রীর উন্নতি হলে সব শিক্ষককে বোনাস দেওয়া, স্কুলে একজন বাড়তি চুক্তি-শিক্ষক নিয়োগ, এবং স্কুলকে এককালীন একটি অনুদান। খতিয়ে দেখা যাচ্ছে, দু’বছর পরে (’০৯-’১১) সব ক’টি পদ্ধতিতেই পড়ুয়াদের উন্নতি হয়েছে, সবচেয়ে কাজ দিয়েছে শিক্ষককে ব্যক্তিগতভাবে বাড়তি টাকা দেওয়া। অল্প বোনাসও (বার্ষিক বেতনের ৩ শতাংশ) ছাত্রদের দক্ষতা যথেষ্ট বাড়িয়েছে। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, ঠাসা ছাত্র, নড়বড়ে ঘরদোর সত্ত্বেও শিক্ষকের বাড়তি উদ্যোগ ছাত্রদের লিখতে পড়তে শেখায় উন্নতি আনতে পারে।

আর একটা পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে হরিয়ানা, গুজরাত, বিহারের জেহানাবাদে। স্কুলের গোটা সময়ের থেকে নির্দিষ্ট কিছু মিনিট রেখে দেওয়া হচ্ছে কেবল লেখা আর পড়ার দক্ষতা তৈরির জন্য। ওই সময়ে প্রতিটা ছাত্রকে লিখতে আর পড়তে অভ্যাস করানো হচ্ছে। এর ফলে খামতি থাকার জন্য যারা পিছিয়ে যাচ্ছিল, তারাও দ্রুত উঠে আসছে। অর্থাৎ স্কুলের পঠনপাঠনে খুব বড় বদল না এনেও শেখানোয় উন্নতি করা যাচ্ছে। লিখতে-পড়তে শেখানোকে স্কুলের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে গেঁথে দেওয়ায় খুব বাড়তি কোনও বোঝা চাপছে না, কিন্তু কাজ অনেক ভাল হচ্ছে। এমন ছোট ছোট পরিবর্তন করা খুব কঠিন নয়।

বড় পরিবর্তনও যে আসেনি, তা তো নয়। স্বাধীনতার সময়ে অক্ষরপরিচয় ছিল দশ জনে এক জনের। সত্তরের দশকেও দশ জনে তিন জনের। গত বছর দশ-পনেরোয় সে-ছবি আমূল বদলে গিয়েছে। এখন কার্যত ১০০ শতাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে নাম লেখায়, প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ সাক্ষর। আজকের দুর্গা স্কুলে গিয়ে গরম খিচুড়ি-সবজি খেয়ে অপুর পাশে বসে বই খুলে পড়ছে। আপার প্রাইমারি স্কুল দূরে হলে আজকের মেঘনাদের জন্য বাড়ির কাছে তৈরি হচ্ছে মধ্যশিক্ষা কেন্দ্র। বদল তো হচ্ছেই। প্রশ্ন হল, যাঁরা সেই বদলকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারছেন, স্কুল, শিক্ষক, শিক্ষা দফতর, অভিভাবক, সবাই তাঁদের থেকে পাঠ নিতে রাজি কি না। ছেলেমেয়েরা না-ই যদি শিখল, তবে ‘শিক্ষা’ কীসের?

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্বাতী ভট্টাচার্য,
আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ অগস্ট ২০১৪

বেঞ্চে বসার অধিকার

শিক্ষার জন্য জওহরলাল নেহরু কম করেননি। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি), ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম), ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই), এবং এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের তিনিই রূপকার। অথচ যাঁর জন্মদিনে শিশু দিবস পালন করা হয়, সেই মানুষটি প্রাথমিক স্কুলের প্রসারের জন্য সামান্যই করেছেন। দু’হাজার কোটিরও বেশি টাকার প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা মাত্র ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল প্রাথমিক শিক্ষার জন্য। সেটা এই জন্য নয় যে নেহরু শিশুদের নিয়ে মাথা ঘামাতেন না— উলটোটাই সত্যি— কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাকে তাঁর এমন কোনও বড় সমস্যা বলে মনে হয়নি, যা নিয়ে তক্ষুনি কিছু করা দরকার।

মুক্ত বাজারে বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতিবিদরা, তাঁদের সঙ্গে নেহরুর খুব বেশি মতের মিল ছিল না। কিন্তু তাঁদের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন, লোকে কোনও-না-কোনও ভাবে সন্তানদের ঠিক লেখাপড়া শেখাবে। মুক্ত বাজারের প্রবক্তারা বলেন, বাজারই স্কুল জোগাবে। তবে নেহরুর মাথায় সম্ভবত ছিল স্থানীয় মানুষ পরিচালিত স্কুল, বা অসরকারি সংস্থার স্কুলের কথা। কিন্তু দুটো ক্ষেত্রেই মূল কথা এক— বাবা-মা জানেন তাঁর সন্তানের জন্য কোনটা ভাল, আর সেটাই তাঁরা করতে চান।

এক অর্থে বলা চলে, কথাটা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। দেশের বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে এখন স্কুলে যাচ্ছে। দেশ জুড়ে গজিয়ে-ওঠা স্বল্প মাইনের বেসরকারি স্কুলে শিশুকে পাঠাচ্ছেন গরিব বাবা-মায়েরাও। বেসরকারি স্কুলে যাঁদের ভরসা, গরিবদের মধ্যেও তেমন বাবা-মায়েদের অনুপাত বাড়ছে। ছেলেমেয়ের জন্য বাবা-মায়ের সক্রিয়তার এর চাইতে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?

এই আশা-জাগানো ছবিটা আঁকতে গিয়ে একটা জায়গাতেই হোঁচট খেতে হয়— ছেলেমেয়েরা কিছু শিখছে না। শিশুদের পড়তে-অঙ্ক কষতে পারার মূল্যায়ন করে অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট (অসর)। ‘প্রথম’ নামে একটি অসরকারি সংস্থা এই রিপোর্ট বার করে। পরপর বেশ কয়েক বছর ধরে ‘অসর’ রিপোর্টের ফল দেখাচ্ছে, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় অর্ধেক শিশু দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্য পড়তে পারছে না। অঙ্কের ফল তো আরও খারাপ।

কেন শিখছে না শিশুরা, তা নিয়ে নানা কথাবার্তা চলছে। আজকাল সরকারি স্কুলের ব্যর্থতার নানা ব্যাখ্যা কান পাতলেই শোনা যায়। একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যত ঘণ্টা পড়ানোর কথা, সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা পড়াচ্ছেন স্রেফ তার অর্ধেক। বেসরকারি স্কুলে অবশ্য শিক্ষকদের উপস্থিতির হার অনেক ভাল। বাবা-মায়েরাও বলছেন, সেই কারণেই বেসরকারি স্কুল তাঁদের বেশি পছন্দ।

কিন্তু শিশুদের শেখানোর প্রশ্নে সরকারি স্কুলের চাইতে খুব কিছু এগিয়ে নেই বেসরকারি স্কুলগুলো। এটা ঠিকই যে, গড়পড়তা ফল বেসরকারি স্কুলে ভাল হয়। কিন্তু তা থেকে ধরে নেওয়া চলে না, সেখানে শিক্ষকরা আরও ভাল শেখাচ্ছেন। কারণ, এ-ও মাথায় রাখতে হবে যে বেসরকারি স্কুলে যাঁরা পাঠান সন্তানকে, সেই বাবা-মা তুলনায় বিত্তবান, কিংবা সন্তানের পড়াশোনার প্রতি অধিক মনোযোগী। অনেক ক্ষেত্রে দুটোই সত্যি। তাই বেসরকারি স্কুল আর সরকারি স্কুলে ছাত্রদের লেখাপড়ার মানের আসল ছবিটা কী, বোঝার জন্য ‘প্রথম’-এর পক্ষ থেকে রুক্মিণী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সহযোগীরা একই লিঙ্গের সহোদরদের পরীক্ষার ফলের তুলনা করেন। অর্থাৎ দুই ভাইয়ের একজন যখন সরকারি, আর একজন বেসরকারি স্কুলে যাচ্ছে, তখন তাদের লেখাপড়ার ক্ষমতায় কতটা তফাত হচ্ছে, সেটা তুলনা করে দেখেন। স্কুলের পড়ানোর মানের তফাত বোঝার আদর্শ উপায় অবশ্য একে বলা চলে না। কারণ, বেসরকারি স্কুলে যে ভাই যাচ্ছে, সে আরও নানা বাড়তি সুবিধে হয়তো পাচ্ছে (যেমন পড়াশোনার সময় বেশি পেতে পারে)। কিন্তু এমন ঢিলেঢালা পরিমাপে পরীক্ষা করেও দেখা যাচ্ছে, লিখতে-পড়তে পারার নিরিখে বেসরকারি স্কুলে গিয়ে শিশুদের বাড়তি লাভ হচ্ছে সামান্যই। গরমের ছুটির সময়ে বিহারে কোনও কোনও স্কুলে সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা পাঠ-শিবির করেন। সেখানে যোগ দিলে সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের লেখাপড়ার ক্ষমতায় কিছুটা উন্নতি হয়। ওই সব স্কুলে শিবিরের আগে-পরে পড়ুয়াদের লেখাপড়ার ক্ষমতায় যে ফারাক দেখা গিয়েছে, সেটা বরং সরকারি স্কুল-বেসরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের লেখাপড়ার ক্ষমতায় ফারাকের চাইতে বেশি।

কেন গড়পড়তা ছাত্রদের আর একটু বেশি শেখাতে পারছে না বেসরকারি স্কুলগুলো? এর সম্পূর্ণ উত্তর সহজ নয়। তবে আমি যেটুকু যা জানি, তার ভিত্তিতে বলতে পারি, এর অন্তত একটা ব্যাখ্যা খুব সোজা। তা হল, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, সেই শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসক, সকলেই বিশ্বাস করেন যে শিক্ষা গড়পড়তা স্কুলের গড়পড়তা পড়ুয়ার জন্য নয়। তাঁদের দৃষ্টিতে স্কুলশিক্ষার উদ্দেশ্য হল সব চাইতে সফল ছাত্রছাত্রীদের সব চাইতে কঠিন পরীক্ষার জন্য তৈরি করা, যাতে তারা তাদের পরম অভীষ্ট— সরকারি চাকরি, কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে আসন— লাভ করতে পারে। বাদবাকি পড়ুয়ারা যে খরচের খাতায়, সে এক রকম ধরেই নেওয়া হয়।

তাই স্কুল সরকারি হোক বা বেসরকারি, শিক্ষক তাঁর ক্লাসের অধিকাংশ মুখের দিকে তাকানোর সুযোগ পান না। তিনি জানেন, পড়ুয়াদের একটা বড় অংশ লিখতে-পড়তে না শেখা সত্ত্বেও বিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের ক্লাসে বসে থাকছে। কিন্তু তাদের কথা ভাবার সময় তাঁর নেই। তাঁকে পড়িমরি করে সিলেবাস শেষ করতে হবে, যাতে যে ক’জন পড়ুয়া এগোতে পারছে তারা নিশ্চিতভাবে সাফল্যের চৌকাঠে পা রাখতে পারে। অভিভাবকরা শিক্ষকের কাছে সেটাই প্রত্যাশা করেন, ঊর্ধ্বতন কর্তারাও তাতেই খুশি।

অথচ যারা শেষ ধাপ পার করতে পেরেছে, স্কুলশিক্ষা কেবল তাদেরই কাজে লাগে, এমন কিন্তু নয়। এ বিষয়ে যেটুকু তথ্য-পরিসংখ্যান আছে, তা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে স্কুলে কয়েক বছরের শিক্ষাও লাভজনক। দেখা যাচ্ছে, যে কখনও স্কুলে যায়নি, তার চাইতে চতুর্থ শ্রেণি অবধি পৌঁছনো পড়ুয়া যতটা লাভবান হচ্ছে, একই অনুপাতে অষ্টম-উত্তীর্ণর চাইতে দ্বাদশ-উত্তীর্ণ লাভবান হচ্ছে। সাধারণত অভিভাবকরা এই লাভকে তেমন পাত্তা দেন না। চতুর্থ শ্রেণি শেষ করার পর তো আর কোনও লোক-দেখানো কাগজ মেলে না। কিন্তু চাষবাস, দোকানদারি, যে কাজই কেউ করুক না কেন, লিখতে-পড়তে পারা, অঙ্ক কষতে পারা তাতে অনেকটা সাহায্য করে।

শিক্ষার অধিকার নিয়ে যখন কথা উঠল, তখন আশা জেগেছিল যে স্কুলে লেখাপড়া শেখার প্রয়োজনীয়তা এবার গুরুত্ব পাবে। সাফল্যের চাবি বলে শিক্ষাকে দেখার যে অযৌক্তিক উন্নাসিকতা, তা বন্ধ হবে। দুঃখের কথা, আইন তৈরি হতে দেখা গেল সেই পুরনো মানসিকতা আরও গভীর হয়েছে। কেউ কিছু শিখুক আর না-শিখুক, সিলেবাস শেষ করা এখন আইন। স্কুলের বিল্ডিং-এর চেহারা কেমন হওয়া দরকার, তা নিয়ে আইনে অনেক কথা রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি শিশুর কয়েকটি ন্যূনতম দক্ষতা তৈরি করার জন্য স্কুলকে কী কী করতে হবে, সে-বিষয়ে একটা কথাও নেই। অথচ আইনটা স্কুলের বেঞ্চে বসে থাকার অধিকারের নয়, শিক্ষা পাওয়ার অধিকার আইন।

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, হিন্দুস্থান টাইমস, ১৩ নভেম্বর ২০১১

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *