প্রথম খণ্ড
দ্বিতীয় খণ্ড
তৃতীয় খণ্ড
চতুর্থ খণ্ড
পঞ্চম খণ্ড

৪.০২ গর্বোর বাড়ি থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

.

গর্বোর বাড়ি থেকে জেভাৰ্ত তার বন্দিদের নিয়ে বেরিয়ে যাবার পর মেরিয়াসও যখন তার ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল তখন রাত্রি নটা। সে সোজা কুরফেরাকের কাছে চলে গেল। কুরফেরাক তখন আর লাতিন কোয়ার্টারে থাকত না। রাজনৈতিক কারণে সে তখন থাকত র‍্যু দ্য লা ভেরেরিতে। কারণ বিপ্লবীরা এই জায়গাটাকেই পছন্দ করত।

মেরিয়াস কুরফেরাকের কাছে গিয়ে বলল, আমি তোমার কাছে থাকার জন্য এসেছি। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কুরফেরাক তার বিছানার তলা থেকে দুটো তোষক বার করে মেঝের উপর বিছিয়ে দিয়ে বলল, তোমাকে স্বাগত জানাই।

পরদিন সকাল সাতটায় মেরিয়াস গর্বোর বাসায় গিয়ে সব ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তার সব জিনিসপত্র একটা ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে এল। আসার সময় সে বর্তমান বাসার ঠিকানা দিয়ে এল না। পরে সেই দিনই জেভার্ত তাকে গতকালকার ঘটনা সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য এলে মাদাম বুগনল বলল, সে চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে।

মাদাম বুগনল ভাবল, অপরাধীদের সঙ্গে মেরিয়াসের কিছুটা যোগসাজশ ছিল। সে নিজের মনে বলতে লাগল, কে ভাবতে পেরেছিল? ছেলেটাকে দেখে তো নবজাত শিশুর মতো নির্দোষ মনে হচ্ছিল।

এত তাড়াতাড়ি মেরিয়াসের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পেছনে দুটো কারণ ছিল। প্রথমত খুব কাছে থেকে গতরাতে যেসব ঘটনা ঘটতে দেখেছে তাতে সমস্ত বাড়িটা এক বিভীষিকার বস্তু হয়ে উঠেছে তার কাছে। সে বুঝতে পেরেছে দুবৃত্ত ধনীর থেকে দুবৃত্ত গরিব আরও ভয়ঙ্কর। দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা থেকে যে ফৌজদারি মামলা শুরু হতে হবে তার মধ্যে নিজেকে জড়াতে চাইছিল না সে। কারণ তা হলে তাকে থেনার্দিয়েরদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাক্ষ্য দিতে হবে।

গতরাতে মেরিয়াস পিস্তলের গুলি করে সময়মতো তাকে সংকেত না দেওয়ায় জেভার্ত ভেবেছিল, যুবকটি হয়তো ভয়ে দরজায় খিল দিয়ে ঘরে ঢুকে আছে অথবা তখনও বাইরে থেকে ফেরেনি।

তবু পরের দিন একবার খোঁজ করল তার। কিন্তু পেল না।

দু মাস কেটে গেল। মেরিয়াস তখনও কুরফেরাকের বাসাতেই ছিল। সে তার কোর্টের এক বন্ধুর কাছ থেকে জানল, থেনার্দিয়ের জেলের এক নির্জন ঘরে বন্দি আছে। মেরিয়াস তার পর থেকে প্রতি সোমবার জেলখানার কেরানির কাছে পাঁচ ফ্রাঁ করে পাঠিয়ে দিত। মেরিয়াসের কাছে বাড়তি টাকা একেবারেই ছিল না। তাকে তাই কুরফেরাকের কাছ থেকে প্রতি সপ্তায় টাকাটা ধার করতে হত। কিন্তু এতে কুরফেরাক আর থেনার্দিয়ের দু জনেই বিস্মিত হয়ে যায়। কুরফেরাক ভাবে টাকাটা প্রতি সপ্তায় যায় কোথায় আর থেনার্দিয়ের ভাবে টাকাটা নিয়মিত আসে কোথা থেকে।

মেরিয়াস অত্যন্ত দুঃখিত হল। যে রহস্যজাল তার মনটাকে শতপাকে জড়িয়ে ধরেছে। সে জাল থেকে মুক্ত হবার কোনও পথ খুঁজে পেল না সে। যে মেয়েটিকে সে গভীরভাবে ভালোবাসে সেই মেয়েটি আর তার পিতার যে ছায়াচ্ছন্ন মূর্তি দুটি ঘটনাক্রমে তার খুব কাছে এসে পড়েছিল, অকস্মাৎ এক প্রতিকূল বাতাসের ফুঙ্কার সেই মূর্তি দুটিকে ছায়ার মতো ছিন্নভিন্ন করে দিল। যে আঘাত তাকে অভিভূত করে দিয়েছে সে আঘাতের জ্বালাময়ী উত্তাপ থেকে কোনও নিশ্চয়তা বা সত্যের একটি স্ফুলিঙ্গও দেখা দিল না। সে মেয়েটির নামও জানতে পারল না। শুধু জানল তার নাম আরসুলা নয়। তাদের ফেলে যাওয়া রুমালে যে একটি নামের আদি অক্ষর দুটি লেখা ছিল তার অর্থ হল আর্বেন ফেবার। আর মেয়েটির পিতা বলে যে লোকটিকে জানে সে-ই বা কে? সে কি সত্যি সত্যিই পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছে? তার মনে পড়ে গেল এই লোকটিকেই একদিন ইনভ্যালিদের কাছে শ্রমিকের বেশে দেখে সে। তবে কি ছদ্মবেশ ধারণ করে বেড়ানোই তার কাজ? লোকটা সেই বিপদের মধ্যে পড়ে সাহায্যের জন্য চিৎকারই-বা করল না কেন? লোকটার আচরণ একই সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ এবং দু মুখো অর্থাৎ ছলনাময়। এই লোকটিকে কি সত্যি সত্যিই চেনে? ওই ধরনের কয়েকটি প্রশ্নগাঁথা একটি জটিল সুতো বিব্রত করে তুলঁল তাকে। তবু লুক্সেমবুর্গের সেই বাগানে দেখা মেয়েটির সৌন্দর্যের মহিমা ম্লান হল না কিছুমাত্র। এক গম্ভীর হতাশার মধ্যে ডুবে গেল মেরিয়াস। তার অন্তরে আগুন, চোখে অন্ধকার। একমাত্র প্রেম ছাড়া আর সবই হারিয়ে গেছে তার জীবনে। সাধারণত অতৃপ্ত প্রেমের যে দাহ সঙ্গে এক স্বর্গীয় দ্যুতি নিয়ে আসে, সে দ্যুতি দেখতে পেল না মেরিয়াস। পরম অনিশ্চয়তার এক দুর্ভেদ্য কুয়াশা ঘিরে রেখেছে তাকে। মেয়েটিকে দেখতে তার দারুণ ইচ্ছা করছে, কিন্তু তার কোনও আশা করতে পারল না।

বিপদের ওপর বিপদ। এখন সে আবার দারুণ অভাবে পড়েছে। দারুণ দারিদ্র্যের হিমশীতল স্পর্শ অনুভব করতে লাগল সে। যত সব উদ্বেগ আর চিন্তাভাবনার চাপে পড়ে সব কাজ ছেড়ে দেয় সে। কাজ ছেড়ে দিবাস্বপ্নের মধ্যে দিন কাটানোর ফলে কাজের অভ্যাসটা নষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য দিবাস্বপ্নের কিছুটা উপকারও আছে; দিবাস্বপ্ন চিন্তার উত্তাপটাকে অনেক শীতল করে তোলে। এক ঝলক শীতল বাতাসের মতো দিবাস্বপ্নের স্নিগ্ধতা অতিচিন্তার সব উত্তাপ আর মনের সব জ্বালা জুড়িয়ে দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত দিবাস্বপ্ন আবার খুবই খারাপ, তা সব চিন্তাকে ডুবিয়ে দেয়। যারা দিবাস্বপ্নকে প্রশ্রয় দেয় বেশি মাত্রায় তারা ভাবে দিবাস্বপ্নের থেকে তরা ইচ্ছা করলেই চিন্তার মাঝে ফিরে আসতে পারবে। দুই-এর মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। কিন্তু এটা তাদের ভুল ধারণা। চিন্তা হল বুদ্ধির ক্রিয়া; কিন্তু দিবাস্বপ্ন মানসিক আলস্য আর এক অর্থহীন নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মেরিয়াসের অবস্থাও তাই হয়েছিল। তার জীবনে প্রেম তাকে অলস অর্থহীন দিবাস্বপ্নের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। দিবাস্বপ্নের মধ্য দিয়ে সে এক বিক্ষুব্ধ শূন্যতার মাঝে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কোনও জীবিকা বা রুজি-রোজগারের দিকে কোনও নজর দেয়নি। তার ফলে তার অভাব-অনটন বেড়ে যায়। বাস্তবজ্ঞান হারিয়ে ফেলায় খরচের দিকে অমিতব্যয়ী হয়ে ওঠে তার ওপর। আত্মার মধ্যে শৈথিল্য দেখা দেওয়ায় জীবনের ওপর সংযম হারিয়ে ফেলে। এই আত্মগত শৈথিল্যের মধ্যে কিছুটা উদারতা থাকলেও একজন দরিদ্র মানুষের কাছে সে উদারতার কোনও অর্থ থাকে না। তার নিঃস্বতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভাব বেড়ে যায়।

জীবনের পথ যখন এইভাবে পিচ্ছিল আর ঢালু হয়ে যায় তখন অনেক দৃঢ়চেতা মানুষও দুর্বার বেগে পতনের শেষ ধাপে নেমে যায়। এ পথ মানুষকে অপরাধ অথবা আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। এ পথে মেরিয়াসও নেমে যাচ্ছিল। তার আত্মার সেই অন্ধকার তলদেশে যাকে সে জীবনে দেখতে পাবে না কোনওদিন শুধু তারই মূর্তির উজ্জ্বল স্মৃতিটা আলোর মতো জ্বলজ্বল করছিল তার সামনে। তার মনের অন্ধকার দিগন্তে ধ্রুবতারার মতো সেটা জ্বলছিল। আর কিছু সে দেখতে পাচ্ছিল না। সে বেশ বুঝতে পারছিল তার পুরনো পোশাকগুলো অচল ও পরিধানের অযোগ্য হয়ে গেছে। নতুন পোশাকগুলোও পুরনো হয়ে গেছে। তার মনে হল তার জীবনও ক্ষয় হয়ে আসছে, তার জীবনের দীপও নিবে আসছে। সে শুধু মনে মনে বলতে লাগল, মরার আগে একবার যদি তাকে দেখতে পেতাম!

এই দুঃসহ অবস্থার মাঝে তার মনে শুধু একটা সান্ত্বনা ছিল। সে তখনও মেয়েটিকে ভালোবাসে এবং তার মনে হচ্ছিল মেয়েটি তাকে না চিনলেও তাকে ভালোবাসে। সে যেমন তার কথা ভাবে তেমনি সে-ও হয়তো তার কথা ভাবে। তার চিন্তার এই দুর্বার তরঙ্গমালা তার মনের তটে গিয়ে আঘাত হানে। রাত্রির নির্জনতায় যখন স্বপ্ন সবচেয়ে বিষণ্ণ হয়ে ওঠে তখন তার মনটা যেন স্বচ্ছ হয়ে ওঠে আরও। তখন সে তার মনের আবেগ ও অনুভূতিগুলো লিখতে থাকে। অতৃপ্ত প্রেমের যন্ত্রণায় তার আত্মা স্বচ্ছ সুন্দর হয়ে উঠে যেন এক বিরল মহত্ত্ব ও ভাব সমুন্নতি লাভ করে। আত্মার সেই সুন্দর স্বচ্ছতায় সে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে অনেক কিছু ভাবতে থাকে। তার মনে হয় আত্মার অতলান্তিক গভীরে নামতে নামতে সে শেষ তলদেশে এসে পড়েছে। সে ভাবল সেখানে গিয়ে পৌঁছানোর আগে যদি একবার তাকে দেখতে পেতাম!

একদিন মেরিয়াস র‍্যু সেন্ট জ্যাক দিয়ে বেড়াতে বেড়াতে র‍্যু দ্য লা সেন্ট ব্যারিয়েরের মধ্য দিয়ে গ্লাসিয়ের পার হয়ে লে গবলিন নদীর ধারে সবুজ ঘাসে ভরা মাঠটায় গিয়ে হাজির হল। জায়গাটা ফাঁকা আর নির্জন। মাঠের মধ্যে ত্রয়োদশ লুই-এর আমলে নির্মিত বাগানসহ পাকা খামারবাড়িটা আজও দাঁড়িয়ে আছে। তার অদূরেই ছিল প্যানসিয়ল। মেরিয়াস সেই মাঠে বেড়াতে বেড়াতে একজন পথচারীকে দেখে সেই মাঠটার নাম জিজ্ঞাসা করল। পথচারী বলল, জায়গাটার নাম লার্কের মাঠ যেখানে একদিন উলবাক এক রাখালকন্যাকে হত্যা করে।

লার্কের নামটা শুনেই মেরিয়াসের তার প্রেমাস্পদের নামটা মনে পড়ল। তার মনে হল তার প্রেমাস্পদ নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও থাকে। সে তাকে খুঁজে বার করবেই।

তার এ ধারণা যুক্তিহীন। কিন্তু অবুঝ আর দুর্বার সে ধারণাটা আচ্ছন্ন করে ফেলল তার মনটাকে। তার পর থেকে সেই লার্কের মাঠটায় প্রায়ই বেড়াতে যেত মেরিয়াস।

.

২.

গর্বোর সেই বাড়িটাতে হানা দিয়ে জেভার্ত অপরাধীদের ধরে যে কৃতিত্ব লাভ করে তা সম্পূর্ণ হয়নি। সে পুরোপুরিভাবে সাফল্য লাভ করতে পারেনি। প্রথমত, এই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা যে করে সেই নায়কের গাঁয়ে এখনও হাত দিতে পারেনি সে। সে বুঝতে পারল খুনের শিকার যে ব্যক্তিটি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যায়, কর্তৃপক্ষের চোখে তার অপরাধের গুরুত্ব খুনি আসামিদের অপরাধের থেকে অনেক বেশি এবং তাকে ধরতেই হবে।

মঁতপার্নেসিও পালিয়ে গেছে। মঁতপার্নেসি প্রথমে পাহারা দিতে থাকা এপোনিনের কাছে গিয়ে গল্প করতে থাকে। বাবাকে সাহায্য করতে যাওয়ার থেকে তার মেয়ের সঙ্গে ভাব করাটাকেই বড় বলে মনে করে সে। পুলিশ গর্বের বাড়িতে হানা দেবার সময় তারা সরে পড়ে। কিন্তু পরে জেভার্ত এপোনিনেকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়ে দেয় তার বোনের কাছে। কিন্তু মঁতপার্নেসি এখনও ধরা পড়েনি।

তার ওপর জেতার্ত যখন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার পর তাদের লা ফোর্স জেলখানায় পাঠাচ্ছিল তখন অন্যতম প্রধান আসামি ক্লাকেসাস পথে পালিয়ে যায়। পুলিশ পাহারার মাঝখান থেকে কী করে ঐন্দ্রজালিকভাবে পালিয়ে যায়, সে তা বুঝতে পারেনি জেভার্ত। তবে কি পুলিশরা তাকে সাহায্য করেছে এ ব্যাপারে? লোকটা একজন পাকা অপরাধী হলেও তাকে পুলিশের গুপ্তচর এবং সাক্ষী হিসেবে ব্যবহার করা চলত। কিন্তু সে পালিয়ে গেছে এবং এতে বিস্ময়ের থেকে রাগ হল জেভার্তের বেশি।

এরপর মেরিয়াস। এই ব্যাপারে তার গুরুত্ব কম থাকায় তার নামটা ভুলে গিয়েছিল জেভার্ত। তার মনে হল উকিল হিসেবে যুবকটা অপদার্থ, একটা কাপুরুষ। সে হয়তো ঘটনার ভয়াবহতায় তার স্বাভাবিক বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। তবে সে যদি সত্যি সত্যিই ওকালতি পাস করে থাকে তা হলে তাকে খুঁজে বার করা খুব একটা কঠিন হবে না।

অবশেষে তদন্তকার্য শুরু হল। কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিচারপতি ম্যাজিস্ট্রেট ব্রুজোঁ নামে এক আসামিকে লা ফোর্স জেলখানার নির্জন কারাকক্ষ থেকে কুর শার্লেমেন জেলে পাঠিয়ে দেন। মাথায় লম্বা চুলওয়ালা এই ব্রুজোঁকেই ঘটনার দিন মেরিয়াস একটা বুড়ো লোকের সঙ্গে কথা বলতে দেখে এবং তাদের কথাবার্তা শুনে ওত পেতে।

এই ব্রুজের বাবার নাম লা ফোর্স জেলখানার একটি দেয়ালে লেখা ছিল। তার নাম ছিল ব্রুজোঁ। আমাদের বর্তমান আসামি ক্রুজো ছিল ১৮১১ সালের জোর পুত্র।

জেলখানার ভেতরেও বন্দি অপরাধীদের কর্মচঞ্চলতা স্তব্ধ হয় না একেবারে। আইনের হাতে পড়েও তারা প্রতিহত হয় না একেবারে। এক অপরাধের জন্য কারারুদ্ধ হয়েও আর এক অপরাধের পরিকল্পনা করে তারা কারাবাসের মধ্যেই। শিল্পীরা যেমন তাদের স্টুডিওতে একটা ছবির কাজ শেষ করে আর একটা ছবির কাজে হাত দেয়।

১৮৩২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে দেখা গেল কুঁজো তিনটে চিঠি বাইরে পাঠাবার জন্য জেল-অধ্যক্ষের কাছে জমা দিয়েছে। চিঠি তিনখানাতেই তার নাম না দিয়ে সে অন্য বন্দিদের নাম দিয়েছে। এই চিঠি তিনটিতে ডাকটিকিটের জন্য খরচ হয়েছে মোট পঞ্চাশ স্যু। খরচের বহরটা দেখে জেল-অধ্যক্ষের নজর পড়ে ব্যাপারটার ওপর।

তদন্ত করে দেখা গেল চিঠিগুলোর উপর তিনটে ঠিকানা লেখা আছে। একটা চিঠি যাবে প্যান্থিয়নে, যার জন্য টিকিট লেগেছে দশ স্য, আর একটা চিঠি যাবে ভাল-দ্য-গ্রেস, যার জন্য টিকিট লেগেছে পনেরো এবং আর একটা চিঠি যাবে ব্যারিয়ের দ্য গ্রেনেলে, যার জন্য টিকিট লেগেছে পঁচিশ ফাঁ। জেল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানাতেই পুলিশ দেখল

চিঠি তিনটেয় যে তিনটে ঠিকানা লেখা হয়েছে সেই ঠিকানায় বাইজারোতে, গ্লোরিও আর রারেকারোসে নামে তিনজন নামকরা দুবৃত্ত থাকে। পুলিশ আরও বুঝতে পারল এই তিনজন দুবৃত্ত পেত্র মিনেত্তে দলের সঙ্গে জড়িত আছে যে দলের দু জন নেতা বাবেত আর গুয়েলমার এখন জেলে আটক আছে। চিঠিগুলো নির্দিষ্ট ঠিকানাগুলোয় বিলি করা হল না। যে তিনজন লোক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে এই চিঠিগুলোর জন্য অপেক্ষা করছিল তাদের হাতে হাতে দেওয়া হয়। পুলিশ ভাবল চিঠিগুলোর মধ্যে নিশ্চয় নতুন কোনও অপরাধের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা আছে। সেই মতো তাদের গ্রেপ্তার করা হল। এবার পুলিশ ভাবল ব্রুজোঁর উদ্দেশ্য অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল। একদিন কুর শার্লেমেনের জেলখানার ভেতর কয়েদিরা যেখানে থাকত সেখানে একটা ঢেলার সঙ্গে বাঁধা একটা কাগজ এসে পড়ে। কাগজটাতে লেখা ছিল, বাবেত, র‍্যু প্লমেতে একটা কাজ আছে। লোহার গেটওয়ালা একটা বাগান। ব্রুজোঁই এই কাগজটা বাবেতকে পাঠায়। পুলিশের কড়া নজরে থাকলেও বাবেতের হাতে ঠিক কাগজটা এসে পড়ে এবং সে-ও সেটা খুলে দেখে।

এদিকে থেনার্দিয়েরদের মেয়েদের বিরুদ্ধে বিশেষ কোনও অভিযোগ বা সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এপোনিনে জেল থেকে বেরিয়ে এসেই ম্যাগননের সঙ্গে দেখা করে। ম্যাগনন তখন থাকত র‍্যু ক্লোশেপার্শতে। জেল গেট থেকে এপোনিনে বেরোতেই তার হাতে ব্রুজোঁর একটা চিরকুট দেয়। সেই মতো সে র‍্যু প্লামেতের লোহার গেটওয়ালা বাগানবাড়িতে চলে যায়।

.

৩.

মেরিয়াস তখন একমাত্র পিয়ের মেবুফ ছাড়া আর কারও কাছে যেত না। সে নিজে যেমন অন্ধকারে সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে পতনের প্রান্তে নেমে যাচ্ছিল, পিয়ের মেবুফও তেমনি পতনের সিঁড়ি বেয়েই নেমে যাচ্ছিল।

মঁসিয়ে মেবুফে’র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার আয় অত্যন্ত কমে যায়। সে মাত্র একটা ডিম দিয়ে প্রাতরাশ করত এবং প্রায় দিন সারাদিন আর কিছু খাওয়া হত না। যে বৃদ্ধা মহিলাটি তার ঘরের কাজকর্ম করত তাকে একটা ডিম দিত। তার পনেরো মাসের বেতন দিতে পারেনি। মেরিয়াস সব কিছু বুঝে তার বাসায় যেত না। পথে মাঝে মাঝে দেখা হত কিন্তু কথা হত না। মেবুফে’র মুখে আর সেই শিশুসুলভ হাসি নেই। সে সব সময় বিষণ্ণ ও গম্ভীর হয়ে থাকে। মেরিয়াসের সঙ্গে দেখা হলেই সে মাথাটা একবার নেড়ে চলে যেত। অথচ একদিন তারা পরস্পরের বন্ধু ছিল। দারিদ্র মানুষে মানুষে সব সম্পর্ককে ধ্বংস করে এইভাবে।

জার্দিন দে প্যান্তেতে একখণ্ড জমি পেয়েছিল মঁসিয়ে মেবুফ। সেখানে সে কিছু নীলের চারা লাগিয়েছিল। সারাদিন সেখানেই কাজ করত। সন্ধের সময় সে বাসায় ফিরে তার বাগানে কাজ করত। গাছপালার সামান্য কিছু আয় আর বই বিক্রি করে যা পেত তাতেই কোনওরকমে দিন চলত তার। তার আশা ছিল ভবিষ্যতে সে নীল চাষ করে অনেক লাভবান হবে। সন্ধের পর বাগানে বসে সে বই পড়ত।

সেদিন সন্ধ্যার কিছু আগেই কাজ থেকে চলে এল মঁসিয়ে মেবুফ। তার বয়স তখন আশি। মেরে পুর্কের শরীরটা তখন ভালো যাচ্ছিল না। সে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে ছিল। মেবুফ এক পিস রুটি আর কিছু মাংস দিয়ে রাতের খাওয়া সারল। তার পর বাগানে গিয়ে একটা পাথরের উপর বসে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগল। তার হাতে তখন দুটো বই ছিল। একখানা বই দৈত্য-দানবদের নিয়ে লেখা আর একখানা বই প্রেতাত্মাদের নিয়ে লেখা। দ্বিতীয় বইটার প্রতিই তার আগ্রহ ছিল বেশি। তার কারণ সে শুনেছিল এই বাগানে একদিন ভূত-প্রেত আসত।

তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। অন্ধকার নেমে আসছিল ধীরে ধীরে। চার দিন বৃষ্টি হয়নি বলে গাছপালা সব শুকিয়ে গিয়েছিল। শুকনো গাছপালার অবস্থা দেখে কষ্ট হচ্ছিল মেবুফে’র। কারণ সে মনে করে গাছপালারও প্রাণ আছে। সে কুয়ো থেকে বালতি করে জল তুলে গাছে দেবার জন্য উঠে গেল। কিন্তু সে দেখল সারাদিন নীল চাষের জমিতে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে এবং কুয়ো থেকে বালতি করে জল তোলার ক্ষমতা তার নেই। সে তাই তারাভরা আকাশের পানে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল হতবুদ্ধি হয়ে। বিশেষ করে একটি রডোডেনড্রেন ফুলগাছের জন্য তার বড় কষ্ট হচ্ছিল। কারণ এই ফুল দেখে দুঃখের মাঝে সান্ত্বনা পেত সে।

সন্ধ্যাকাল এমনই একটা সময় যা মানুষের সব দুঃখকষ্টের ওপর যেন একই সঙ্গে বিষাদ আর অকারণ আনন্দের একটা প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। মেবুফ আবার বালতি তুলে নিয়ে জল তুলঁতে গেল। কিন্তু পারল না।

এমন সময় কোথা থেকে এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, পিয়ের মেবুফ, আমি তোমার বাগানে জল দিয়ে দেব?

সঙ্গে সঙ্গে বাগানের ঝোঁপঝাড়ের ভেতর থেকে রোগা লম্বা একটি মেয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

মঁসিয়ে মেবুক ভীরু প্রকৃতির লোক ছিল বলে ভয়ে সে কথা বলতে পারল না। এদিকে সেই স্কার্টপরা মেয়েটি নীরবে বালতি দিয়ে জল তুলে বাগানের গাছগুলোর গোড়ায় দিতে লাগল। শুকনো গাছগুলোর পাতার উপর জল পড়ার শব্দটা বড় মিষ্টি শোনাচ্ছিল মেবুফে’র কানে।

একের পর এক করে অনেক বালতি জল তুলে গোটা বাগানের সব গাছগুলোকে জল দিল মেয়েটি। জল দেওয়ার কাজ হয়ে গেলে তার কাঁধের উপর একটা হাত রেখে মেবুফ বলল, তুমি মানুষ নও, দেবদূত।

মেয়েটি বলল, না, আমি শয়তান। অবশ্য আমার কাছে শয়তান আর দেবদূতের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

মঁসিয়ে মেবুফ বলল, আমি কী হতভাগ্য! তোমাকে দেবার মতো আমার কিছুই নেই।

মেয়েটি বলল, কিন্তু আমায় দেবার মতো একটা জিনিস তোমার আছে।

কী সেটা?

তুমি আমাকে মঁসিয়ে মেরিয়াস কোথায় থাকে তার ঠিকানাটা বলতে পার?

মঁসিয়ে মেবুফ প্রথমে কথাটা বুঝতে না পেরে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।

তার পর মনে করে বলল, হা হা, মঁসিয়ে মেরিয়াস সে এখন আর সেখানে থাকে না। কিন্তু তার বাসার ঠিকানাটা আমি জানি না। তবে মাঝে মাঝে পথে দেখা হয়। তুমি যদি তার সঙ্গে দেখা করতে চাও তা হলে লার্কের মাঠে যাবে। বিকালের দিকে সেখানে সে প্রায়ই বেড়াতে যায়।

মঁসিয়ে মেবুফ এবার খাড়া হয়ে ভালো করে দাঁড়িয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটি কোথায় চলে গেছে। সে তখন কিছুটা ভয় পেয়ে গেছে। আপন মনে বিড় বিড় করে সে বলল, যদি আমার বাগানের গাছগুলোতে জল দেওয়া না হয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে ও প্রেতাত্মা।

সে রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করছিল মঁসিয়ে মেবুফ যখন তার সমস্ত চিন্তা সমুদ্র পার হবার জন্য হঠাৎ মাছ হয়ে যাওয়া এক আশ্চর্য পাখির মতো ঘুমের নদী পার হওয়ার জন্য স্বপ্নের রূপ ধারণ করল তখন আবার সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ল তার। সে ভাবতে লাগল, মেয়েটি কি সত্যি সত্যিই প্রেতাত্মা না কোনও জীবন্ত নারী।

.

৪.

মঁসিয়ে মেবুফে’র বাগানে সেই ঘটনাটি ঘটার কয়েকদিন পর একদিন সকালবেলায় মেরিয়াস কুরফেরাকের কাছ থেকে থেনার্দিয়েরকে দেবার জন্য পাঁচ ফ্রাঁ ধার করার পর ঠিক করল সে কিছুক্ষণের জন্য বেড়িয়ে আসবে। তার আগে কাগজ-কলম নিয়ে কিছু অনুবাদের কাজ করার চেষ্টা করছিল। যে বিষয়টি সে এখন অনুবাদ করছিল সেটা হল গালস ও স্যাভিগনে নামে দুই জার্মান আইনবিদের উত্তরাধিকার সম্পর্কিত এক বিখ্যাত বিতর্ক। কিন্তু তখন লেখায় মন বসছিল না মেরিয়াসের। তাই সে ভাবল লার্কের মাঠ দিয়ে বেড়িয়ে আসবে।

সেখান থেকে ফিরে এসে লেখায় যদি মন বসাতে না পারে তাহলে নিজের মনে সে বলবে কাল আর বেড়াতে যাব না, তাহলে লেখার ক্ষতি হবে। কিন্তু তার পরদিন আবার সে আগের মতোই বেড়াতে যাবে।

সেদিন সকালে লার্কের মাঠে রিভেয়ার দে পবলিন নদীর ধারে বসে ছিল।

তখন উজ্জ্বল সূর্যালোক গাছের পাতাগুলোর উপর পড়ার পর মেরিয়াসের গায়ের উপর পড়ছিল। সে তখন ভাবছিল সেই মেয়েটির কথা, তার প্রেমাস্পদের কথা। কিন্তু তার ভাবনাটা তিরস্কারের রূপ ধারণ করে তার মনের ওপর ঘুরে ঘুরে আসছিল। যে অসাম্য আর আত্মিক অসাড়তা তাকে তখন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তার জন্য নিজেকে তিরস্কার করছিল। তার মনের চারদিকে অন্ধকার এমন ঘন হয়ে উঠেছিল যে সে উজ্জ্বল সূর্যকে পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিল না।

সেই অসংলগ্ন চিন্তার মধ্যে যখন সে কাজের স্পৃহা হারিয়ে ফেলেছিল একেবারে তখন সেই বিষণ্ণ আত্মচিন্তার মধ্যে বাইরের জগতের অনেক শব্দ কানে আসছিল তার। তার চারপাশে তখন ধোবানিরা কাপড় কাঁচছিল। আর তার মাথার উপর গান করতে করতে পতপত শব্দে পাখা নেড়ে পাখিরা উড়ে যাচ্ছিল। তার মাথার উপর অবাধ মুক্তির সুললিত ধ্বনি, অকারণ আনন্দ আর আলস্যের ডানা ঝাঁপটানি আর তার চারদিকে দৈনন্দিন কাজ আর শ্রমশীলতার শব্দ, সে শব্দ তাকে বাস্তব অবস্থার প্রতি সচেতন করে তোলে।

সহসা এক পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে বাজল তার। কে বলল, ও, উনি এখানেই রয়েছেন।

মুখ তুলে তাকিয়ে সে দেখল যে মেয়েটি একদিন সকালে তার বাসায় গিয়েছিল সেই হতভাগ্য মেয়েটি–যে হল থেনার্দিয়েরের বড় মেয়ে এপোনিনে। তাকে দেখে তখন মনে হচ্ছিল তার দারিদ্র্য আর দেহসৌন্দর্য দুটোই বেড়েছিল। তার পায়ে তখনও কোনও জুতো ছিল না। তার গায়ের জামা আরও ময়লা এবং আরও ছেঁড়া। তার মাথার চুলের সঙ্গে খড়ের কুটো জড়িয়ে ছিল। তার মানে সে ওফেলিয়ার মতো পাগল হয়ে যায়নি, তার মানে তাকে কোনও আস্তাবলে শুয়ে রাত কাটাতে হয়েছিল। কারাবাসের ফলে দরিদ্র মানুষদের মুখে যেমন বিষাদকরুণ এক আতঙ্কের ভাব ফুটে ওঠে এপোনিনের মুখেও ছিল সেই ভাব।

শুধু মেরিয়াসকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল তার ম্লান মুখে। কিছুক্ষণ সে কোনও কথাই বলতে পারল না।

অবশেষে সে বলল, এতদিনে তোমাকে খুঁজে পেলাম। পিয়ের মেবুফ তা হলে ঠিকই বলেছিল। তুমি জান না কত খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমাকে। তুমি জান আমি একপক্ষকাল জেলে ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে কিছু না পেয়ে ওরা ছেড়ে দেয় আমাকে। তাছাড়া পরিণত বয়সের থেকে দু মাস কম আমার বয়স। দু সপ্তাহ ধরে তোমাকে খুঁজছি। তুমি এখন আর গর্বের বাড়িটাতে থাক না?

মেরিয়াস বলল, না।

কেন তা বুঝতে পারছি। যা ঘটে গেছে তা মোটেই ভালো নয়। তাই তুমি সরে গেছ, কিন্তু তুমি এমন পোশাক পরে আছ কেন? মাথার টুপিটা কেমন পুরনো আর খারাপ। তোমাদের মতো যুবকদের আরও ভালো পোশাক পরা উচিত। মেবুফ তো তোমার নাম ব্যারন মেরিয়াস আর যেন কী বলছিল। কিন্তু ব্যারনরা তো বুড়ো হয়। তারা লুক্সেমবুর্গের বাগানে বেড়াতে যায়। একবার এক ব্যারনের কাছে আমি চিঠি দিতে গিয়েছিলাম। তার বয়স তো প্রায় একশো হবে।

মেরিয়াস কোনও উত্তর দিল না।

এপোনিনে বলল, তোমার জামাতে একটা ফুটো দেখা যাচ্ছে। আমি সেলাই করে দেব।

হঠাৎ মুখের ভাবটা আবার বদলে যেতে লাগল তার। বলল, আমাকে দেখে তুমি খুশি হয়েছ বলে মনে হচ্ছে না।

তবু কোনও কথা বলল না মেরিয়াস।

কিছুক্ষণ কী ভেবে নিয়ে এপোনিনে বলল, আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে খুশি করতে পারি।

মেরিয়াস বলল, তার মানে কী বলতে চাইছ তুমি।

কিন্তু তার আগে কথা দাও তুমি শুনবে? তুমি যখন একটা কাজের ভার দাও আমাকে তখন বলেছিল, আমি যা চাইব তাই দেবে।

হ্যাঁ, বলেছিলাম।

কিছুটা ইতস্তত করার পর এপোনিনে বলল, সেই ঠিকানাটা আমি পেয়েছি।

মেরিয়াসের মনে হল তার হৃৎপিণ্ডটা যেন থেমে গেছে।

যে ঠিকানাটা তুমি আমাকে খুঁজে বার করতে বলেছিলে। অর্থাৎ সেই মেয়েটির ঠিকানা।

এই বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

ঘাসের উপর যেখানে বসেছিল মেরিয়াস সেখান থেকে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল সে। বলল, আমাকে এখনি সেখানে নিয়ে চল। তুমি যা চাইবে তাই দেব।

আবেগের বশে এপোনিনের দুটো হাত ধরে ফেলল মেরিয়াস। হাত দুটো ছাড়িয়ে এপোনিনে বলল, আমি বাড়ির নম্বর জানি না। তবে তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বাড়িটা দেখিয়ে দিতে পারি। ডান দিকে শহরের শেষ প্রান্তে।

কথাটা এপোনিনে এমন দুঃখের সঙ্গে বলল যাতে যে কোনও মানুষ তা শুনলে তার অন্তরটা মোচড় দিয়ে উঠবে নিবিড় ব্যথায়। মেরিয়াস কিন্তু সেটা লক্ষ করল না। এপোনিনে বলল, কত উত্তেজিত হয়ে পড়েছ তুমি?

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল মেরিয়াসের। সে এপোনিনের একটা হাত ধরে বলল, একটা বিষয়ে শপথ করে তোমায় কথা দিতে হবে।

শপথ করতে হবে?

এপোনিনে হাসতে লাগল।

তোমায় শপথ করে বলতে হবে এপোনিনে, এ ঠিকানাটা তুমি তোমার বাবাকে কখনও জানাবে না।

আমার নাম এপোনিনে–এ কথা জানলে কেমন করে? যাই হোক, তোমার মুখে আমার নামটা শুনে বড় ভালো লাগল।

মেরিয়াস বলল, বল শপথ করবে?

এবার সে এপোনিনের দুটো হাত ধরল।

আমার বাবা? এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে না তোমায়। আমার বাবা এখন জেলে।

যাই হোক, আমার বাবার কথা ভাবি না।

কিন্তু তুমি এখনও শপথ করনি।

ঠিক আছে, আমার হাত ছেড়ে দাও। আমি শপথ করছি। শপথ করে বলছি আমার বাবাকে এ ঠিকানা জানাব না। হয়েছে?

অন্য কোনও কথা।

হ্যাঁ অন্য কোনও কথা।

ঠিক আছে। এবার আমাকে নিয়ে চল সেখানে।

এখনি?

হ্যাঁ, এখনি।

ঠিক আছে, এস আমার সঙ্গে। তোমাকে কত খুশি দেখাচ্ছে।

কিছুটা যাওয়ার পর এপোনিনে থামল। বলল, আমার পাশে খুব ঘন হয়ে যাবে না। আমি আগে আগে যাই, তুমি আমার পিছু পিছু এস। আমার মতো একজন মেয়ের সঙ্গে তোমার মতো এক যুবকের এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না।

তার কথাটার মধ্যে একটা করুণ সুর ছিল, যা মেরিয়াসের মনটাকে স্পর্শ করল।

আবার কিছুটা যাওয়ার পর এপোনিনে থেমে বলল, তোমার মনে আছে, তুমি বলেছিলে এই ঠিকানার জন্য তুমি কিছু একটা দেবে?

মেরিয়াস তার পকেট থেকে পাঁচ ফ্রাঁ বার করে এপোনিনের হাতে সেটা দিল। এই টাকাটা সে কুফেরাকের কাছ থেকে ধার করেছিল। থেনার্দিয়েরকে দেবার জন্য রেখেছিল।

এপোনিনে সেটা মাটিতে ফেলে দিয়ে গম্ভীরভাবে মেরিয়াসের দিকে তাকাল। সে বলল, আমি তোমার টাকা চাই না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *