১৫. নিশান

১৫. নিশান

ট্রেন থেকে নেমে ঘড়িটা দেখল নিশান। সাড়ে ছ’টা বাজে। রাতে স্টেশনে যতটা আলো থাকার কথা ততটা আলো নেই। তার ওপর মানুষ নামলেও তার গায়ের জামাকাপড় নামতে পারবে না ধরনের ভিড় এই ট্রেনটায়! এইভাবে কি কাগজ কিনে আনা যায়? কেয়াদিকে বলেছিল, “এমন করে কেন জেদ করছ! কলেজ স্ট্রিটে ডিটিপি করে সেখানেই ছাপতে দিয়ে দাও না। কেন শুধু-শুধু গাধার খাটনি খাটাচ্ছ?”

কেয়াদি কানের বড়-বড় ঝোলা দুল নাড়িয়ে উত্তর দিয়েছিল, “গাধাকে মানুষের মতো খাটাব নাকি? যা বলছি, কর। খালি তর্ক! পার্টি করা মানুষগুলোকে এই জন্য দু’চক্ষে দেখতে পারি না আমি। আর হবি নাই-বা কেন! ওই দেড়েলটার সঙ্গে মিশে-মিশে তুই গেছিস!”

কেয়াদির পত্রিকার নাম ‘সন্দর্ভ’। বছরে তিনটে করে বের করে। এটা বর্ষা সংখ্যা। কেয়াদি পত্রিকাটা সোনাঝুরি থেকেই ছাপাতে চায়। এখানে কম্পোজ় করে, এখানেই ছাপিয়ে, বাঁধাই করে বের করতে চায়।

ডবল ডিমাই সাইজ়ের কাগজ। সঙ্গে কভারের জন্যও মোটা ধরনের কাগজ। এই সব বয়ে আনা চাট্টিখানি কথা নাকি? পথ বেশ অনেকটা। কলেজ স্ট্রিট থেকে শিয়ালদা স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে এই সোনাঝুরি। অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে নিশানের।

সোনাঝুরিকে কলকাতার সঙ্গে আরও দ্রুত মেলানোর জন্য একটা ফ্লাইওভার করা হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাটের হাল খুব খারাপ, তাই ইচ্ছে থাকলেও ট্যাক্সি করে নিয়ে আসা যায়নি কাগজগুলো।

নিশান একা যায়নি। কারণ, এত কাগজ আনা ওর একার পক্ষে সম্ভব নয়। মণীশকে নিয়ে গিয়েছিল সঙ্গে করে। মণীশের এসব কাজ করা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু কেয়াদির সঙ্গে বেশ ঝগড়া করে ছেলেটা।

নিশান কাগজের বান্ডিলগুলো একপাশে রেখে দাঁড়াল। স্টেশনে খুব ভিড়। রাস্তার অবস্থা খারাপ বলে প্রায় সকলেই ট্রেনেই যাতায়াত করে আজকাল। সারাটা পথ এই মালপত্তর নিয়ে ট্রেনে ওঠায় লোকের বিরক্তি আর গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে নিশানকে। এখনও কাগজ নিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখতে গিয়ে নিশান গালাগালি খেয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। ও এদিক-ওদিক তাকাল। ভিড়টা কমে গেলে বেরোবে। মণীশ ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে।

সাতটার সময় ওর একটা কাজ আছে। ও ঠিক করছে কাগজগুলো দিয়ে মণীশকে রিকশা করে কেয়াদির বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। স্টেশনে ওর সাইকেল রাখা আছে। তাই ও আর রিকশায় যাবে না।

সোনাঝুরি আর মফস্‌সল নেই। কলকাতার কাছে বলে শহরের ভাবভঙ্গি খুব দ্রুত এসে ছুঁয়ে দিয়েছে ওদের ছোট শহরটাকে।

নিশান ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দেখল। হা-ক্লান্ত মানুষজন কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। পাখি আর মানুষে কী মিল!

“কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?” মণীশের গলায় বিরক্তি।

নিশান বলল, “ভিড়টা বেরিয়ে যাক। এত পেপার নিয়ে যাওয়া যায় নাকি?”

মণীশ নাক দিয়ে একটা বিরক্তির শব্দ করল, “শালা, ঘরের খেয়ে যতসব বনের মোষের পেছনে হাওয়া দেওয়া!”

নিশান হাসল, “কেন? কী হল?”

“লিটল ম্যাগ। সব ব্যাঙের জিনিসপত্র! কেয়াদিদার এত টাকা যখন, তখন গরিবদের বিলিয়ে দিলেই তো পারে! বেকার এসব করার কী মানে?”

নিশান হাসল আবার, “আরে, আবার দিদা বলছিস? কেয়াদি শুনলে হেভি খচে যাবে।”

“তো, তাতে আমার বয়ে গেল! অত বুড়ি একজন, দিদা বলব না তো কি দিদি বলব?”

নিশান বলল, “তুই এমন রেগে থাকিস কেন সারাক্ষণ? কীসের এত রাগ বল তো তোর?”

মণীশ আবার নাক দিয়ে বিরক্তির শব্দ করল, “এ পৃথিবীতে না রেগে মানুষ থাকে কেমন করে সেটাই তো আমি বুঝি না! কী আছে যাতে মাথা ঠান্ডা থাকবে? ট্রেনে করে আসতে গিয়ে দেখলে তো মানুষজন কেমন হয়ে গিয়েছে? সব শালা খেঁকি কুত্তা!”

“কিন্তু এর মধ্যেই তো বাঁচতে হবে। রাগ করলে হবে? কুল থাক। অত রেগে যাস না। চল এগোই…” নিশান হেসে পিঠে হাত রাখল ওর।

ভিড়টা কমে গিয়েছে। টিকিট-ঘরের পাশ দিয়ে নেমে গিয়েছে রাস্তা। একটা পাড়ার ভেতর দিয়ে গিয়েছে, আর অন্যটা চলে গিয়েছে বড়রাস্তার দিকে। ওই বড়রাস্তার মোড়েই রিকশা-স্ট্যান্ড। আর স্টেশনের পাশে সাইকেলের গ্যারেজ।

নিশানকে দেখে সাইকেল-গ্যারেজের পিন্টু বলল, “কী দাদা, ওই দিকে যাচ্ছ? সাইকেল নেবে না?”

নিশান হেসে বলল, “আসছি দাঁড়া।”

পথটা খুবই এবড়োখেবড়ো। আলো নেই। রাস্তার একদিকে রেলের পুরনো কিছু কোয়ার্টার আর অন্যদিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা দরমার বেড়ার দোকান। ওই দোকানের আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে পথ। সামান্য অন্যমনস্ক হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে!

নিশান ছোট থেকেই এই রাস্তাটাকে এমন দেখছে। কখনও ঠিক করা হয় না। কেন হয় না কে জানে! মানুষজন এই নিয়ে কিছু বলেও না। নিশান বোঝে আসলে ওরা সবাই আজকাল সেফ খেলতে শিখে গিয়েছে। আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নামক ঘরে বসে বিপ্লব করার মতো একটা মাধ্যম এসে যাওয়ায় ড্রয়িংরুম-বিপ্লবীর সংখ্যা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, আসল কাজের কাজ কিছু হয় না। আর এমন চললে আর হবেও না।

ট্রেনের যাত্রীরা চলে যাওয়ায়, মাত্র একটাই রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তার ওই পারে অটো স্ট্যান্ডও রয়েছে। সেখানে ঠেসাঠেসি করে লোক নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নেওয়ার নিয়মের কেউ তোয়াক্কা করে না!

কেয়াদির বাড়ি চ্যাটার্জিপাড়ার ভেতরে। অটো নামিয়ে দেবে বড়রাস্তায়। সেখান থেকে হেঁটে প্রায় পনেরো মিনিট লাগবে। তাই রিকশাই ভাল। একদম বাড়ির দরজায় গিয়ে নামবে।

মণীশ রিকশায় উঠে বলল, “কেয়াদিদার কাছ থেকে কি আমি টাকা নিয়ে নেব? মানে রিকশা ভাড়া থেকে আজকের যাতায়াতের খরচ? তুমি চাইবে বলে তো মনে হয় না!”

“আরে, একদম ওসব বলবি না,” নিশান তাড়াতাড়ি বলল, “আমি সেটা ঠিক কথা বলে নেব। আর ক’টাই-বা টাকা! ওসব নিয়ে ভাববি না তুই একদম। আর শোন, লক্ষ্মীভাইটি আমার, সামনে দিদা বলিস না। জানিস তো কেমন রাগী।”

মণীশ ভুরু কুঁচকে বলল, “আশ্চর্য তো! এসব কমপ্লেক্স কেন বলো তো? ডাক্তার দেখায় না কেন? দিদার বয়সি মহিলাকে দিদি বলব কেন? বয়স তো হবেই। সেটা লুকোনোর কী আছে? ডেবিট কার্ডের পিন নাম্বার নাকি?”

“ওরে ভাই রে, একটা কথা অনন্ত তর্ক না করে মেনে নে বাবু!” নিশান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে রিকশাওয়ালাকে ভাড়াটা দিয়ে মণীশকে বলল, “কাল একবার আসিস বিজনদার ওখানে। কথা হবে।”

“আবার?” মণীশ মালপত্তর পায়ের কাছে রাখল। তারপর ভুরু কুঁচকে বলল, “আবার ছেলে ধরা শুরু করেছ? তোমায় বলেছি না এসব বলবে না আমায়! তোমাদের পার্টিতে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই!”

নিশান রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, তুমি দাঁড়িয়ে কেন? প্যাডেল মারো। যাও।”

রিকশাটা চলতে শুরু করল। মণীশ পেছন ঘুরে রিকশার পাশ দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “এভাবে কিছু হবে না। এভাবে র‍্যানডাম ছেলে ধরে লাভ নেই। এই সমাজের একটা টোটাল ওভারহলিং দরকার। সেটা তোমার ওই বিজনদাদুকে দিয়ে হবে না। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হওয়ার দিন গেছে নিশানদা। বিপ্লব এখন ব্যাবসাজীবী, পরজীবী, বুদ্ধিজীবী আর সেলফিজীবীদের বাপের মাল। বুঝলে?”

নিশান হাসল। আশপাশের লোকজন দেখছে। পাশের পানের দোকানের বিহারি লোকটি নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল, “পাগলা গয়া ক্যা ছোঁড়া?”

নিশান মাথা নাড়ল। মণীশ ভুল কিছু বলছে না। কিন্তু চারিদিকে সব দেখেশুনে খুব মনখারাপ লাগে নিশানের। মানুষের মূল্যবোধ বলে ব্যাপারটাই আর নেই। অবশ্য থাকবেই-বা কী করে? বোধেরই কোনও মুল্য নেই আর! কী করে যে সবটাই এমন টাকা আর শো অফ-এর পৃথিবী হয়ে গেল কে জানে!

নিশান পেছনে ফিরল। সাইকেলটা নিতে হবে। সাতটায় দেখা করতে বলা হয়েছে ওকে। তারক চক্রবর্তীর অফিসে যেতে হবে। কেন ডেকেছে কে জানে!

“নিশান!” আচমকা পেছন থেকে ডাকে থমকে দাঁড়াল ও। চেনা লাগছে গলাটা। ও ঘুরল। আরে, বাদল!

নিশান দেখল মেঘলা আর কাকিমাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছে বাদল।

নিশান হেসে এগিয়ে গেল, “তুই! কেমন আছিস?”

বাদল কিছু বলার আগেই মেঘলা বলল, “তুমি কে? কে অধিকার দিয়েছে এসব জিজ্ঞেস করার? আমরা কেমন আছি জেনে কী করবে তুমি?”

নিশান হাসল। মেঘলাটা খুব অভিমানী। আসলে বেশ কিছুদিন ওদের বাড়ি যাওয়া হয়নি। নানা কাজে আটকে গেছে। তাই মেয়েটা রেগে গেছে খুব!

ও মেঘলার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে একটা কালো সানগ্লাস। চিনতে পারল নিশান। এটা ওরই কিনে দেওয়া। বাইরে বেরোলে এটা চোখে দেয় মেঘলা।

নিশান হেসে মেঘলার মাথায় হাত দিল, “তুই জানিস না, আমি কে?”

“না জানি না,” মেঘলা রেগে গিয়ে মাথা সরিয়ে নিল, “কে তুমি? অচেনা মেয়ের গায়ে হাত দিচ্ছ? লম্পট! মলেস্টেশানের চার্জ আনব তোমার নামে।”

“কীসব বলছিস তুই পাগলের মতো?” বাদল মৃদু স্বরে ধমক দিল মেঘলাকে।

নিশান হেসে বলল, “আরে বলুক না ও, পাগলি তো! আমার আসলে কাজ ছিল রে মেঘলা। খুব কাজ। জানিস তো সোনাঝুরিতে কী হচ্ছে! সেই নিয়ে ব্যস্ত আছি।”

মেঘলা মাথা নেড়ে বলল, “আমি কিচ্ছু জানি না, জানতেও চাই না। তুমি বাজে ছেলে। দাদা যে বাড়িতে ফিরল, সেটাও কি জানো? আমরা কে হই তোমার? দয়ার পাত্র তো শুধু!”

নিশান চুপ করে গেল। আসলে বাদল যে জেল থেকে ছাড়া পাবে সেটা শুনেছিল, কিন্তু সত্যি বলতে কী ভুলে গিয়েছিল একদম। সোনাঝুরিতে ওই জোনাক-বাড়িসহ জুট মিলের বিক্রির ব্যাপারে একটা ঝামেলা পেকে উঠেছে। সেটা নিয়ে বেশ কিছুদিন হল বেশ ব্যস্ততা বেড়েছে ওর। সেই নিয়ে নানা জায়গায় যেতে হচ্ছে!

কথাটা মনে পড়তেই নিশানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল! সামনে ভেসে উঠল একটা দোলনা। শূন্য একটা দোলনা। বারান্দায় একা একা দুলছে।

বাদল এগিয়ে এসে বলল, “তুই বেশ রোগা হয়ে গেছিস নিশান। খাওয়া-দাওয়া করছিস না?”

নিশান হাসল। বাদল ওর চেয়ে সামান্য বড়। তাই দাদা-টাদা বলে না কখনও। বাদলের চেহারাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে বেশ। চুল উঠে গিয়েছে। পেকেও গিয়েছে। মুখটা পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছে একদম। দেখে মনে হচ্ছে এই ক’দিনে দশ বছর বয়স বেড়ে গিয়েছে ওর!

নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। বাদলকে তো আর ওর শরীর নিয়ে কিছু বলা যায় না। কারণ, তা হলেই জেলের অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ এসে পড়বে।

ও বলল, “আমার কথা বাদ দে। তোরা গেছিলি কোথায়?”

বাদল মাথার চুলে হাত বুলিয়ে এলোমেলো চুলগুলোকে ঠিক করে নিল একটু। তারপর বলল, “মেঘলাকে নিয়ে গেছিলাম ডাক্তারের কাছে। ওই চোখটা দেখানোর ছিল।”

“তো পজ়িটিভ কিছু হল?” নিশান জিজ্ঞেস করল।

“পজ়িটিভ মানে,” বাদল দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “সাউথে নিয়ে যেতে বলছে। অনেক টাকার ব্যাপার। আমার এখন যা পরিস্থিতি…”

নিশান মাথা নামিয়ে নিল। সত্যি, টাকাটা কোথায় পাবে ওরা?

বাদল এগিয়ে এসে হাত ধরল নিশানের, “তুই কিছু করতে পারবি আমার জন্য? কোনও কাজকম্ম দেখে দিতে পারিস? আমি জানি ব্যাপারটা সোজা নয়। জেল থেকে এসেছি শুনলে কেউ বিশেষ কাজ দেবে না। তাও তুই দেখিস একটু। আমি যা করেছি আগে করেছি। আর কোনও খারাপ কাজে যাব না রে। একটা কাজ দেখে দিস ভাই। খুব অসুবিধেয় আছি।”

কথা বলতে-বলতে বাদলের গলা ধরে এল। চোখে জলও এসে গেল যেন। খারাপ লাগল নিশানের। একসময় ওর কাছের বন্ধু ছিল বাদল। ওকে এই অবস্থায় দেখতে ভাল লাগছে না। তা ছাড়া মানুষ তো ভুল করেই। কিন্তু আসল ব্যাপারটা হল ভুলটা রিপিট না করা। বাদলকে দেখেই বুঝতে পারছে, অতীত নিয়ে বাদল খুব অনুতপ্ত। কিন্তু নিশান কাজ দেবে কী করে? ও নিজেই কাজ করে না। বাবাকে বলতে পারে, কিন্তু তাতে লাভের চেয়ে গালাগালি খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাবার সঙ্গে ওর পটে না একদম। নিশান বুঝতে পারল না কী বলবে।

কাকিমা মেঘলার হাত ধরে এগিয়ে এল এবার, “নিশান, তুই এসব ভাবিস না তো আর। আমার ছেলে, মেয়ে দুটোই তোকে দেখলে খালি মাগুনে মানুষের মতো কথা বলে। অবশ্য আমিও আগে এমন বলতাম! ভাল কথা, তোকে বলা হয়নি, রহিম আমার অর্ডার বাড়িয়ে দিয়েছে। ও লোক দিয়ে মাল নিয়ে যায়। শুনলাম তুই নাকি বলে দিয়েছিস!”

নিশান হাসল। যাক, কাকিমা অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছে। মেঘলার রাগ, বাদলের হাহাকার, ওকে কেমন যেন কোণঠাসা করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ও শ্বাস নিতে পারছে না!

নিশান বলল, “হ্যাঁ, রহিমদাকে বলেছিলাম যেন ব্যাপারটা একটু দেখে নেয়।”

বাদল আবার বলল, “তুই খুব হেল্‌প করেছিস আমি জানি। তোর ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। শুধু দেখিস ভাই, যদি কোনও কাজ দেখে দিতে পারিস।”

নিশান হেসে বলল, “তুই এভাবে বলছিস কেন? আমি চেষ্টা করব নিশ্চয়ই।”

“আমরা তা হলে আসি। কেমন?” বাদল হাসল।

“আয়।”

“তুইও আসিস বাড়িতে। জানি তুই ব্যস্ত, কিন্তু তার মধ্যেও আসিস প্লিজ়!” বাদলের গলা ধরে এল আবার।

নিশান হেসে মাথা নাড়ল। দেখল, যাওয়ার আগে মেঘলা আন্দাজে ওর দিকে হাত নাড়ল।

রাস্তা পার করে বাদলরা অটোয় উঠল এবার। নিশান ঘড়ি দেখল, পৌনে সাতটা বেজে গিয়েছে। আর দেরি করলে তারকদা রাগ করবে খুব।

আবার স্টেশনের টিকিট-ঘরের দিকে হাঁটা দিল নিশান। সাইকেলটা নিতে হবে গ্যারেজ থেকে। আকাশের দিকে তাকাল ও। মেঘ করে আছে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ভাল লাগছে নিশানের। যা গরম পড়েছে! আর পারছে না!

আর-একটা ট্রেন আসবে। গেট পড়ছে, শুনতে পেল নিশান। তাড়াতাড়ি এবার বেরোতে হবে। না হলে খুব মুশকিল আছে। রাস্তায় সাইকেল চালানো দায় হয়ে যাবে ভিড়ের চোটে।

পিন্টুকে সাইকেল রাখার ভাড়া মিটিয়ে পাড়ার ভেতরের পথ ধরল নিশান। আগে এই রাস্তাগুলোয় ইট পাতা ছিল। বর্ষাকালে পিচিক পিচিক করে কাদা উঠত। খুব অসুবিধে হত। এখন সব রাস্তাগুলো কংক্রিটের হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে কোথাও চলটা উঠে গিয়েছে বটে, কিন্তু তাতেও খুব কিছু অসুবিধে হয় না।

আগে যখন ওরা স্টেশনের ওই পারে থাকত, এই পথ দিয়ে নিশান স্কুলে যেত। এখনও চোখ বন্ধ করে সব বলে দিতে পারে ও। একটা বড় কাঁঠাল গাছের পাশের ভাঙাচোরা বাড়িতে একটা বুড়ো পাগল থাকত। জানলা দিয়ে মুখ বের করে বসে থাকত থুত্থুড়ে বুড়োটা। মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকদের দিকে তাকিয়ে পুঁচকি একটা হাসি দিয়ে বলত, “বিলকিস!”

তখন ওই ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ত নিশান। ওর খুব কষ্ট লাগত বুড়োটাকে দেখে। এখনও মনে আছে, শনিবার দিন হাফছুটি হত বলে টিফিন খেত না ও। বুড়োটার জন্য বাঁচিয়ে নিয়ে আসত। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আলতো গলায় ডাকত, “বিলকিসদাদু, ও বিলকিসদাদু।”

বুড়োটা আসত। ফোকলা জানলা দিয়ে হাত বের করে বলত, “দে, বিলকিস দে।”

নিশান টিফিনটা বাড়িয়ে দিত। বুড়োটা টিফিনবাক্স থেকেই খাবার খেত। তারপর বাক্সটা ফেরত দিত নিশানকে।

খাবার খাওয়ার সময় বুড়ো কত কী যে বলত! এখনও কিছু কিছু মনে আছে নিশানের। বুড়ো বলত, “শালা, বিলকিস করেছ কী বিলকিস করে দেবে।” বলত, “শালা লাইফটা পুরো বিলকিস হয়ে গেল!” বলত, “কত বারণ করলাম, কিন্তু শুনলে তো আর মালটার অমন বিলকিসের হাল হত না!”

নিশানের সঙ্গে ওর স্কুলের দু’-তিনজন বন্ধুবান্ধবও থাকত। ওরাও নিশানের দেখাদেখি খাবার দিত। হাসত। মজা করত।

সেই বুড়ো একদিন ট্রেনে কাটা পড়ল। স্কুল যাওয়ার পথে তারপর থেকে ওই ফোকলা জানলাটা দেখলে কেমন একটা মনখারাপ করত নিশানের।

আজ সন্ধের অন্ধকারে ওই জায়গাটা পার হতে-হতে বাড়িটার দিকে তাকাল নিশান। বাড়িটা প্রায় ধসে পড়ার মতো অবস্থায়! সারা গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বট আর অশ্বত্থ জড়িয়ে ধরেছে বাড়িটাকে। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে ছিটকে আসা আলোয় এই বাড়িটাকে রুগ্ণ রাক্ষসের মাথার মতো মনে হচ্ছে।

নিশান ভাবল, সময় কেমন দ্রুত চলে যায়! চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় এই তো সেদিন স্কুল যাওয়ার আগে কেমন মায়ের সঙ্গে খেলা করত নিশান! দৌড়ে বেড়াত পেয়ারা গাছের চারপাশে। রোদ এসে গাছের ডালে লেগে ছিটকে কুচি কুচি হয়ে ছড়িয়ে পড়ত উঠোনে। বাবা বাজার নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই ‘বাবু’ বলে ডাকত ওকে। হাতে দিত খেলনা জিপগাড়ি। নিবেদনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিহিদানা। সকাল দুপুরের দিকে গড়ালে ভীষণ ট্যারা ভগবান নাপিত আসত তার অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস নিয়ে। উঠোনে বসে ঠাকুরদার চুলে কাটত। কুচকুচ শব্দ ছড়িয়ে যেত পাড়ার হাওয়ায়। ওর মনে হল, এই তো সেদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকত এগারো-বারো বছরের নিশান। স্কুলফেরতা পুকুর-বাগানের ঝোপ থেকে রঙ্গন ফুল তুলে মধু খেত। দেখত, একলা টুনটুনি পাখি অস্থিরভাবে লাফিয়ে চলেছে। দামুদার আচারের জন্য অপেক্ষা করে থাকত সারাটা সপ্তাহ। আর তারপর সৌমিদি, লালিদিদের বাড়ির ওদিকে সূর্য নেমে গেলে বুঝত, আজ আর রোগা বৈষ্ণবদাদু আসবে না এ পাড়ায়। তখন কী সুন্দর হাওয়া আসত। আর তাতে ডুবে, ভেসে এই সব দেখতে দেখতে নিশান ভাবত কী মজারই না এই জীবন! ভাবত, হে ভগবান, এ জীবন যেন শেষ না হয়! আর আজ দ্যাখো, সবটাই কেমন ওই বাড়িটার মতো বাতিল হয়ে গিয়েছে! ইরেজ়ার দিয়ে ঘষে কে যেন মুছে দিয়েছে সব ছবি! শুধু খাতার পাতায় পড়ে আছে পেনসিলের মনমরা গভীর দাগ!

রাস্তাটা এখান থেকে ডান দিকে বেঁকে গিয়েছে। সামনে জামতলা আছে একটা। চারটে বিরাট বড় জাম গাছ। আগে জায়গাটা খোলা থাকত। কিন্তু এখন একটা মন্দির হওয়ায় চাতালের মতো জায়গাটাকে করোগেটেড টিনের শেড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আগে, গরমকালে রাস্তাটা জাম পড়ে বেগুনি হয়ে থাকত।

এইসব জায়গা দিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে হারিয়ে যাওয়া সোনাঝুরির কথা খুব মনে পড়ে নিশানের। সেখানে এই যে চটকল বিক্রি করে দেওয়া হবে, জোনাক-বাড়িসহ বিশাল জায়গাটা বিক্রি করে বড় ফ্ল্যাট উঠবে, গলফ কোর্স হবে, আরও কত কী হবে! কিন্তু এটা ঠিক মানতে পারে না ও। কষ্ট হয়।

সেই কারণেই তো সেদিন কলকাতায় গিয়েছিল নিশান। বিজনদার সঙ্গে পরামর্শ করেই গিয়েছিল!

আসলে ওদের পার্টির হয়ে বিজনদা যতই আত্মত্যাগ করুক না কেন, এখন তারক চক্রবর্তীই সোনাঝুরির শেষ কথা। কলকাতায় পার্টির হাইকম্যান্ডের সঙ্গে তারকদার নাকি খুব দহরম-মহরম। সেই তারক চক্রবর্তী নাকি চায় এসব কর্মকাণ্ড এখানে হোক। শুনছে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জুট মিলটাতেও খুব গোলমাল বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে!

পার্টির ভেতরে থেকে কিছু করা যাবে না সেটা ওরা বুঝেছে। বিজনদাকে কেউ সামনে অসম্মান না করলেও পাত্তাও খুব একটা দেয় না।

বিজনদার পরামর্শেই নিশান আর কেয়াদি মিলে ‘সেভ সোনাঝুরি’ নামে একটা মঞ্চ করেছে। আর নিশান দেখেছে, বেশ কয়েকজন মানুষ এসে যোগ দিয়েছে ইতিমধ্যে।

প্রতিসপ্তাহে একটা করে মিটিং আয়োজন করছে ওরা। বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছে। একটা পিটিশন তৈরি করেছে। সকলের সই নিয়ে সরকারের কাছে যাওয়ার ইচ্ছেও আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, কতদূর কী হবে সেটা জানে না ও। এখনকার অর্গানাইজ়ড ওয়েলথের কাছে এসব প্রতিরোধ-টোধ তেমন কাজে দেয় না। তাও নিশান চেষ্টা করছে। আর সেই চেষ্টার ফলশ্রুতি হিসেবেই জুনের প্রথম দিকে সেদিন কলকাতায় গিয়েছিল নিশান।

যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিজনদা বলেছিল, “মিলের আর জোনাক-বাড়ির যারা মালিক, একবার তাদের বাড়িতে যা। অফিস-টফিস নয়। সোজা বাড়িতে একদম। নিজেদের কথাটা বল।”

“বাবা! একদম সোজা বাড়িতে?” নিশান একটু অবাক হয়েছিল।

“হ্যাঁ, তাতে কী? আমি ঠিকানা দিচ্ছি। সকলের ওপরে যিনি আছেন, উনি একজন ভদ্রমহিলা, দীপমালা দেবী। গিয়ে কথা বল। দেখ কী হয়, আমার মনে হয় উনি আর-পাঁচজনের মতো নন।”

“কী করে তুমি সেটা বুঝলে? আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। সে না হয় যাব। কিন্তু তুমি যাবে না?” নিশান তাকিয়েছিল বিজনদার দিকে।

বিজনদা চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল জানলায়। ধু ধু দুপুরের দিকে চোখ রেখে বলেছিল, “না, আমি যাব না।”

“কেন? তুমি চলো। জোর হবে। বয়সের তো একটা ওয়েট আছে না কি?”

বিজনদা সময় নিয়েছিল একটু। তারপর ওর দিকে ঘুরে বলেছিল, “সব কিছু তোকে জানতে হবে না। যা বলছি কর। আর-একটা কথা। আমার নাম বলবি না কিন্তু। এটা মনে থাকে যেন। বিজন সরখেল নামটা উচ্চারণ করবি না।”

গিয়েছিল নিশান। সঙ্গে বুচা বলে একটা ছেলেও ছিল। বুচা ওদের পাড়ায় থাকে। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে যায়। তা ছাড়া ‘সেভ সোনাঝুরি’ প্রোজেক্টেও ওর সঙ্গে আছে।

আলিপুরে বিশাল বাড়ি দীপমালা দেবীর। উঁচু পাঁচিল। পেল্লায় লোহার দরজা। বাড়ির ভেতরে বিশাল লন। একপাশে সুইমিং পুল। দেখে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল নিশানের!

প্রথমে দরোয়ান ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। কিন্তু সোনাঝুরি থেকে এসেছে, খুব জরুরি দরকার বলায় ভেতর থেকে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল।

বসার ঘরটায় ঢুকেই তাক লেগে গিয়েছিল নিশানের! একটা ছোটখাটো ফুটবল মাঠ যেন! ঘরের একপাশ দিয়ে শ্বেতপাথরের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরে। ঠিক হিন্দি সিনেমায় এমন দেখা যায়।

একজন মহিলা ওদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসেছিল। তারপর সোফা দেখিয়ে বলেছিল বসতে।

বুচা তো চোখ গোলগোল করে এদিক-ওদিক দেখছিল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলেছিল, “এ কোথায় আনলে গুরু? আমি যা জামাকাপড় পরে এসেছি, মাটিতে বসব কি?”

নিশান বলেছিল, “চুপ কর। কীসব হাবিজাবি বলছিস?”

বুচা বলেছিল, “আমায় এরা দত্তক নেবে? শালা ডাল, রুটি আর চারাপোনা গিলে-গিলে পেট যোগেন সর্দারের পুকুর হয়ে গিয়েছে! এরা এত টাকা কী করে রোজগার করে গো?”

“তোর কি টাকার দরকার?”

হেসেছিল বুচা, “মাইরি নিশানদা। যা কমিক করো না তুমি! শাহরুখ খানকে জিজ্ঞেস করো, দেখবে ওরও টাকার দরকার। আমার শালা বিড়ি চুষে-চুষে গালে পাঁচশো চাল ধরার মতো গর্ত হয়ে গেল! আর বলে কিনা, টাকার দরকার আছে!”

নিশান কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারেনি। আচমকা সিঁড়ির কাছে একটা গলা পেয়েছিল। যে-মহিলাটি ওদের বসতে বলেছিল, সে কথা বলছিল আর-একজনের সঙ্গে। সেখানে নিশান নিজের নামটাও শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু অন্যজন কিছু না শুনে তরতর করে উঠে গিয়েছিল সিঁড়ি বেয়ে।

আর পেছন থেকে হলেও মেয়েটাকে দেখে চমকে গিয়েছিল নিশান। রাধিয়া!

নিশানের বুকের রক্ত যেন চলকে উঠেছিল মাথা পর্যন্ত! ও ভূতে পাওয়া মানুষের মতো উঠে এগিয়ে গিয়েছিল সিঁড়ির দিকে। দেখেছিল, মেয়েটা ক্ষণিকের জন্য যেন থমকে দাঁড়াল। কিন্তু তারপরেই আবার উঠে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বাড়ির ভেতরে।

সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল নিশান। জিজ্ঞেস করেছিল, “রাধিয়া না?”

মহিলাটি বলেছিল, “হ্যাঁ। আপনি চেনেন?”

নিশান বলেছিল, “হ্যাঁ তো। খুব ভাল করে চিনি।”

কিন্তু আর কথা হওয়ার আগেই ওপর থেকে একজন বয়স্ক ভৃত্যস্থানীয় মানুষ খবর নিয়ে এসেছিল, আজ দেখা হবে না দীপমালাদেবীর সঙ্গে। হঠাৎ খুব জরুরি কাজ এসে পড়েছে। ম্যাডাম দুঃখিত।

নিশান কিছু মনে করেনি। সত্যিই তো, ও তো আর আগে থেকে সময় নিয়ে আসেনি। এমন করে এলে দেখা হওয়া মুশকিল।

তবে আসার আগে মহিলার হাতে একটা চিরকুটে নিজের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে এসেছিল। বলেছিল, “এটা রাধিয়াকে দেবেন প্লিজ়। আমি নিশান, বললেই হবে।”

মোবাইল নাম্বার দিয়ে এসেছে নিশান। কিন্তু রাধিয়ার ফোন আসেনি।

তারক চক্রবর্তীর বাড়ির নীচের তলাতেই অফিস। বাইরে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে গুজগুজ করছে। একটা বড় আলো জ্বলছে গেটের কাছে। বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে ঢুকলে একটা উঠোনমতো। সেখানেও কয়েকজন লোক প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে বসে আছে আর কয়েকজন বসে পাশের বারান্দায় ওঠার সিঁড়ির মুখে।

এই লোকগুলোর আসলে কী কাজ কে জানে! সিনেমার এক্সট্রার মতো সারাক্ষণ তারকের পেছন-পেছন ঘুরে বেড়ায়। অনেকটা সেই পুরনো দিনের হিন্দি ছবির গাঁও-ওয়ালোর মতো। এমন ‘নন-প্রোডাক্টিভ মাস’ বোধহয় এই তৃতীয় বিশ্বেই সম্ভব!

নিশান দেখল ওদের। অনেককেই চেনে ও। কিন্তু আজ কেমন যেন সবাইকে একরকম লাগল ওর। সেই ছুঁচোর মতো মুখ করে বসে থাকা মানুষ! তারক চক্রবর্তী কখন কী ছুড়ে দেবে সেটা কুড়োবে বলে যেন বসে আছে!

বাড়িতে ঢোকার কোলাপসিব্‌ল গেটের কাছে মোতি দাঁড়িয়ে ছিল। মোতিলাল শর্মা তারকের ডান হাত। অবশ্য শুধু ডান হাত নয়— নাক, কান, চোখ, পা সবই বলা যায়!

লোকটাকে দেখলে আচমকা নানা পটেকরের কথা মনে পড়ে যায়। নিশান মাঝে মাঝে ওকে মজা করে ‘নানা’ বলেও ডাকে।

মোতি পান খায় খুব। কথা বলার সময় মুখটাকে সামান্য আকাশের দিকে তুলে বাটির মতো হাঁ করে কথা বলে। স্বরের ভেতরে কেমন একটা সামান্য তরল শব্দের মতো আওয়াজ পাওয়া যায়!

নিশান মোতিকে দেখে হাসল।

মোতি মুখটা তুলে সামান্য কলকল শব্দ মিশিয়ে বলল, “এত দেরি করলি? দাদা বসে আছে। তাড়াতাড়ি যা।”

দেরি? ঘড়ি দেখল নিশান। সাতটা পাঁচ বাজে। আশ্চর্য! ও কথা না বাড়িয়ে ঢুকে গেল ঘরে।

তারকের বাড়িটা আগে একতলা ছিল। কিন্তু পরপর দু’বার ভোটে জিতে সোনাঝুরির কিছু হোক না হোক, তারকের বাড়িটা তিনতলা হয়েছে। বাড়ির পেছনে বসবাস করা পুরনো মানুষদের হটিয়ে তাদের জমি কিনে নিয়েছে। সেখানেও একটা মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং বানানো হচ্ছে। সবাই সব জানে, কিন্তু কারও কিছু করার নেই! নিশান মাঝে মাঝে ভাবে, আজকাল মানুষ বোধহয় এইসব কারণেই ইনসেনসিটিভ হয়ে গেছে! সব জায়গায় দুর্নীতি আর নোংরামো দেখে দেখে মানুষের মন আর বোধ দুটোই ভোঁতা হয়ে গেছে। এমন একটা মেনে নেওয়া, হচ্ছে-হবে ধরনের সমাজ তৈরি হয়েছে যে, মানুষ আজকাল রাস্তায় পড়ে মরে যাচ্ছে দেখলেও কেউ এসে দাঁড়ায় না তার পাশে! যারা এইসব ছবি খবরের কাগজে দেখে হা-হুতাশ করে, নিশান জানে, তারাও এমন অবস্থায় পড়লে পাশ কাটিয়ে, গা বাঁচিয়েই পালাবে!

তারকের অফিসরুমটা বেশ বড়। কাচের দরজা দিয়ে সামনেটা ঢাকা। ভেতরে এসি চলছে।

তারক দু’হাত দিয়ে ধরে ট্যাবটা নিয়ে কী একটা দেখছিল। ওকে দেখে সেটা রেখে হাসল। তারকের বয়স পঞ্চাশের মতো। মাথায় বড় টাক। মোটা কাঁচাপাকা গোঁফ। কপালে সব সময় কমলা তিলক কাটা থাকে।

নিশান বসে তাকাল তারকের দিকে। তারক সময় নিয়ে পাশের ড্রয়ার খুলে একটা বইয়ের মতো দেখতে স্টিলের কৌটো বের করল। সেটা খুলে একচিমটে জরদা মুখে পুরে চিবোল চোখ বন্ধ করে। তারপর চোখ খুলে শান্ত গলায় বলল, “শুয়োরের বাচ্চা, সোনাঝুরিতে বিপ্লব মারাচ্ছ? আলিপুর অবধি গিয়ে দরবার করার তাল ছিল? কী ভেবেছিস আমি জানব না? তোদের খেদিয়ে দিয়েছে কেন জানিস? আমি ফোন করে বলেছিলাম তোদের যেন পাত্তা না দেয়। কী ভেবেছিস? আমি ঘাস কেটে বেড়াই! তোকে আর তোর ওই বিজনকে না পোঁদে বাঁশ দিয়ে গঙ্গার পাড়ে টাঙিয়ে রাখব! এই প্রোজেক্ট হবে। যে-কোনও মূল্যে হবে। দেখি তোর কোন বাপ আটকায়! বেশি পেঁয়াজি করলে জোনাক-বাড়ির পেছনে পুঁতে দিয়ে কংক্রিট করে দেব। কেমন! এবার ফোট শুয়োর! শালা বিপ্লবী! বোকা…”

নিশানকে কেউ যেন পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে চেয়ারের সঙ্গে। এসির মধ্যে বসেও কুলকুল করে ঘামছে ও! কান লাল হয়ে গিয়েছে! এসব কী শুনল ও! চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে যেন! তারকের চেহারাটা কেমন যেন কাঁপছে। শান্ত গলায় কেউ এমন করে বলতে পারে?

নিশান কোনওমতে উঠল। পা টলছে ওর! হাত কাঁপছে! একটা রাগ লাভার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা শরীরে! নিশানের মনে হচ্ছে এই সময়ই হয়তো মানুষ বোমার মতো ফেটে পড়ে!

ও আর-একবার তাকাল তারকের দিকে। তারক নির্লিপ্তভাবে জরদা চিবোচ্ছে। নিশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে। ও জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। শুনল কড়কড় করে বাজ পড়ল একটা। নিশান সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে সেই তীব্র বিদ্যুৎ টেনে নিল নিজের ভেতরে। তারপর টলতে-টলতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

.

১৬. পুশকিন

বাথরুম থেকেই ফোনের রিংটা শুনতে পাচ্ছিল পুশকিন। কিন্তু জল গায়ে বেরোতে পারেনি তখন। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে শুনছিল ক্রিরিরিরিং ক্রিরিরিরিং শব্দ। পুরনো দিনের টেলিফোন। বড়, কালো রিসিভার। গোল ডায়াল। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে নাম্বার ডায়াল করতে হয়। বাবা এটাকে রেখে দিয়েছে। বাবার পুরনো জিনিসের প্রতি কীসের এত মায়া কে জানে! নিজে ইঞ্জিনিয়ার হয়েও টেকনোলজির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ওদের মাইক্রোওয়েভ পর্যন্ত কিনতে দেয়নি। শেষে ভাইয়ের বউ এসে কিনেছে। বাবা যে তাতে খুশি হয়েছে তা নয়। কিন্তু কিছু বলেনি।

মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা অনেক চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। বাড়ির দোতলাতেই থাকে বেশির ভাগ সময়। খুব দরকার না পড়লে নীচে নামে না।

স্মিতাকে বাড়ির অমতে বিয়ে করার জন্য সবাই বয়কট করেছিল পুশকিনকে। ভাই তো ওকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছিল বাড়ি থেকে! কিন্তু এখন যেহেতু স্মিতা আর নেই এই পৃথিবীতে, তাই আবার পুশকিনকে নিজের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে বাবা আর ভাই। পুরনো কথা সবাই ভুলে যেতে চাইছে। চাইছে পুশকিনও ভুলে যাক!

পুশকিন সবটাই বোঝে। ও নিজেও বাবার কাছে আসতে চায়। কিন্তু কোথায় যেন আটকায়। কিছুতেই ভুলতে পারে না মায়ের মৃত্যুর জন্য ওকেই দায়ী করেছিল বাবা! ভুলতে পারে না মায়ের দাহকার্যের সময় ওকে দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল! পুশকিনের সবটাই তো ছিল মা। সেখান থেকেই ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হল!

তবে ভেতরে-ভেতরে যাই মনে হোক না কেন, পুশকিন বাইরে কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। ও নিয়মিত বাবার খবর নেয়। এই বাড়িতে আসে। এমনকী, ওর খুড়তুতো ভাই দীনবন্ধু যখন এসেছিল, তখনও পুশকিন ওর সম্বন্ধ দেখতে গিয়েছিল কয়েক জায়গায়।

গতকাল বাবার জ্বরের খবর পেয়ে এই বাড়িতে এসেছিল ও। জুলাইয়ের প্রথম এখন। কলকাতা জুড়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। গতকাল সন্ধে থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি আজ এই সকালবেলাতেও হচ্ছে। কমেনি একটুও। জানলা দিয়ে পুশকিন দেখছে, সারা আকাশে গোলা পায়রার ডানার রঙের মেঘ। পাড়ার রাস্তা ডুবে গিয়েছে জলের তলায়। উলটোদিকের রাজাদের বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকা পরিবারের দুটো বাচ্চা নীল-হলুদ রেনকোট পরে প্লাস্টিকের খেলনা-নৌকো ভাসাচ্ছে রাস্তার জমে থাকা জলে। পুশকিনের দেখে মজা লেগেছে। ওদের সময় ওরা কাগজের নৌকা ভাসাত।

ওদের এই রাসবিহারীর বাড়িটা বেশ পুরনো। উঁচু সিলিং। লাল মেঝে। বাথরুমে পাথরের বাথটব। বাবা পুরনো দোতলা বাড়িই কিনেছিল। পরে ভাল করে সারিয়ে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই বাড়িতে এলে ভাল লাগে পুশকিনের। বাইরে যতই গরম হোক না কেন, মোটা দেওয়ালের জন্য সব সময় ঠান্ডা থাকে বাড়ির ভেতরটা।

আজ ভাইরা গিয়েছে মধ্যমগ্রাম। ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। কী একটা নেমন্তন্ন আছে। পুশকিনকেও বলেছিল যেতে। কিন্তু একটাই ছুটির দিন, তার ওপর এমন ওয়েদার। কার ভাল লাগে! তাই ও পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া বাবার কাল জ্বর ছিল। এমন মানুষকে শুধু কাজের লোকেদের ভরসায় রেখে ও যায় কী করে?

গতকাল রাত প্রায় দশটায় এ বাড়িতে এসেছিল পুশকিন। আজকাল অফিসে কাজের চাপ খুব বেড়ে গিয়েছে। সোনাঝুরির প্রজেক্টই শুধু নয়, আপনকে দেওয়া সেই ‘সি ফুড’ কোম্পানির কাজটাতেও ওকে মাথা দিতে হচ্ছে। আপন যদিও গোটা ব্যাপারটা দেখছে, তাও যেহেতু ডিলটা হয়েছিল পুশকিনের হাত দিয়ে, তাই এখনও আপনকে কিছু-কিছু জায়গায় দেখিয়ে দিতে হচ্ছে পুশকিনকে।

ওদের অফিস দু’দিন ছুটি থাকার কথা, কিন্তু পুশকিন শনিবারেও কাজ করে। আসলে ওর মনে হয়, বাড়িতে বসে থেকে কী করবে ও! কে আছে ওর জীবনে? তার চেয়ে অফিসে গেলে, কাজের মধ্যে থাকলে পুরনো কথা ওকে আর চেপে ধরবে না। আসলে ভাল করে ভেবে দেখলে পুশকিনই কোথায় যেন পুরনো কথাদের ছাড়তে পারে না! ও বোঝে, যতদিন ও নিজেকে সরিয়ে নেবে না অতীত থেকে অতীতও ওকে ছাড়বে না!

কিন্তু বললেই তো আর সরে আসা যায় না! মনের মধ্যে তো আর অন-অফ সুইচ নেই! কী করে ও ভুলবে সেই রাতটার কথা! নিজের ঘরের বাইরে এসে দেখা সেই দৃশ্যটির কথা! যাই করুক না কেন, ওটা জীবনেও ভুলতে পারবে না পুশকিন। শুধু প্রতিদিন নানা কাজের মধ্যে ডুবে ভুলে থাকার ভান করে যাবে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে এসে দাঁড়াল পুশকিন। টানা বৃষ্টির জন্য গরমটা আর নেই। বরং ওদের বাড়ির ভেতরে তো বেশ ঠান্ডাই লাগছে।

এই ঘরটা পুশকিনের। ও চলে যাওয়ার পরেও এমনই করে রাখা হয়েছিল। ভাইয়ের কাছে শুনেছে, মা এই ঘরে কাউকে শুতে দিত না।

ঘরটা বেশ বড়। একপাশে ওর বিছানা। আলমারি। অন্যপাশে বড় আয়না আর তার পাশে চেয়ার টেবিল। ঘরের মাঝে বেশ বড় ফাঁকা লাল মেঝে রয়ে গিয়েছে। পুশকিনের এমন ফাঁকা মেঝে খুব ভাল লাগে। মাটিতে বসার মতো, শোওয়ার মতো আরাম ও আর কিছুতে পায় না।

পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে তোয়ালেটা বাথরুমে মেলে দিয়ে এল পুশকিন। তারপর চুলটা আঁচড়ে নিল। কানের পাশে দুটো, তিনটে করে চুল সাদা হয়েছে। এই ছত্রিশেই বয়স গুটিগুটি এসে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। ও চোখ বন্ধ করল। ক্লান্ত লাগছে পুশকিনের। কেন ক্লান্ত লাগছে কে জানে। কাল রাতে তো বেশিক্ষণ জাগেনি! তা হলে? ঘুমের মধ্যে যদিও বেশ আজেবাজে স্বপ্ন দেখছে। তাই কি ভাল ঘুম হয়নি?

টেবিলে মোবাইলটা রাখা আছে উলটো করে। ও সেটাকে তুলে নিল। দেখল একটা মিস্‌ড কল। স্মরণ কল করেছিল। কেন কে জানে! আজ আর ভাল লাগছে না কথা বলতে।

ওদের বাড়িতে টুকুদি রান্না করে। আজ পুশকিন বলেছে খিচুড়ি করতে। সঙ্গে বেগুনি, আলুভাজা আর ইলিশমাছ ভাজা।

ও ঘড়ি দেখল। বারোটা বাজে। সকালে পাঁউরুটি খেয়েছে দু’পিস। এখনও খুব একটা খিদে পায়নি ওর। আর-একটু পরে খাবে!

ও ভাবল একবার দোতলায় যাবে। বাবা কী করছে দেখবে। সকালে দেখেছে বাবার জ্বর নেই। ইজ়িচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল বাবা। বাড়িতে ছ’টা কাগজ রাখা হয়। বাবা খবরের কাগজ পড়তে খুব ভালবাসে। আর ভালবাসে ফুটবল। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ইউনিভার্সিটি ব্লু ছিল। পরে কয়েকবছর কলকাতার বড় দলেও খেলেছে। এখনও লেকে হাঁটতে গিয়ে বাচ্চারা ফুটবল খেলছে দেখলে বাবা দাঁড়িয়ে পড়ে।

ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল পুশকিন। আর ঠিক তখনই টেলিফোনটা বেজে উঠল আবার। সেই ঝনঝন শব্দ। অবাক হল পুশকিন, কেন ফোন ধরছে না কেউ! কানুদা বাবার সব কাজ করে দেয়। কানুদা কি নেই? কিংবা সকালবেলায় বাড়ির ঠিকে কাজ করে যে মনুদি? আর টুকুদিই-বা কই? কেউ ফোনটা ধরছে না কেন?

পুশকিন এগিয়ে এসে ফোনটা ধরল, “হ্যালো…”

“পরিতোষ আছে?” ওপারের গলাটা বেশ বয়স্ক লাগল।

চট করে চিন্তা করে নিল পুশকিন। বাবা আজকাল খুব বিরক্ত হয় ফোনটোন এলে। বলে, “আর আমার এসব ভাল লাগে না। সারা জীবন অনেক কাজ করেছি। আর পারছি না আমি।”

পুশকিন একবার ভাবল কাটিয়ে দেয় মিথ্যে বলে। এমনিতেই বাবার শরীরটা ভাল নেই। ফোন এসেছে শুনলে আবার রাগ করবে। কিন্তু লোকটার গলার ভেতরে এমন একটা ব্যাপার আছে যে, লোকটাকে মিথ্যে বলতে পারল না পুশকিন।

ও জিজ্ঞেস করল, “কে বলছেন কাইন্ডলি বলবেন? বাবা ওপরে আছে।”

“আমি বিজন সরখেল,” লোকটা সময় নিল একটু, “ও ওপরে? ওকে কি নীচে নামতে হবে? মানে, তেমন হলে না হয়…”

“আপনি একটু ধরুন, আমি বলে দিচ্ছি।”

পুশকিন রিসিভারটা টেবিলের ওপরে রেখে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে গেল। দোতলাটাও বেশ বড়। একপাশে টানা একটা বারান্দা আছে। বাবাকে ঘরে দেখতে পেল না পুশকিন! আরে, গেল কোথায় সবাই! তারপরেই কী একটা মনে হওয়ায় বারান্দার দিকে গেল ও। দেখল হ্যাঁ, যা ভেবেছে ঠিক তাই। বাড়ির তিনজন কাজের লোককে নিয়ে বাবা ওখানে দাঁড়িয়ে। আর শুধু দাঁড়িয়েই নেই, তিনজনকেই বকছে বাবা!

পুশকিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনল ব্যাপারটা। বারান্দার একদিকে পাখির খাঁচা করেছে বাবা। নানারকম পাখি আছে সেখানে। বাবা সবাইকে বকছে, কারণ বৃষ্টির জল লেগে পাখিদের নাকি জ্বর হবে! কেন ঠিকমতো খাঁচাটা ঢাকা দেওয়া হয়নি!

পুশকিনের হাসি পেল। পাখিরা কি বর্ষাকালে ছাতা নিয়ে উড়ে বেড়ায়! নাকি রেনকোট পরে? বাবা মাঝে মাঝে এমন ছেলেমানুষি কাণ্ড করে না!

“বাবা,” পুশকিন ডাকল এবার।

বাবা মাঝপথে কথা থামিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল পুশকিনের দিকে, “কী হল? দেখছিস না আমি কাজ করছি?”

পুশকিন হাসল, “তোমার ফোন এসেছে।”

“আমার?” বাবা অবাক হল।

“হ্যাঁ, ঘরে এসো। আর তোমার না জ্বর! এখানে বৃষ্টির মধ্যে কী করছ? আবার যদি জ্বরটা বাড়ে?”

বাবা বিরক্ত হয়ে বলল, “কে আবার ফোন করল এখন! আর আমার জ্বরটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। ওদের জ্বর হলে কী হবে?”

“তুমি এসো, ফোনটা ধরো…” পুশকিন পাখিদের নিয়ে আর কথা বাড়াল না।

“বলে দে আমি নেই, আমি এখন যেতে পারব না!” বাবা বিরক্ত হল।

পুশকিন তাও বলল, “বিজন সরখেল নামে একজন।”

বাবা এবার ঘুরে দাঁড়াল, “কে?”

পুশকিন নামটা বলল আবার। দেখল, বাবার মুখটা পালটে গেল যেন। সেই বিরক্তি আর নেই।

বাবা আর কথা বাড়াল না। দ্রুতপায়ে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে গেল। নীচের ফোনের সঙ্গে ওপরের ফোনের একটা প্যারালাল লাইন করা আছে। ফলে নীচে ফোন এলে ওপর থেকেও ধরা যায়।

পুশকিন বাবার পেছন-পেছন গেল ঘরের দিকে। দেখল, বাবা ফোনটা তুলে কেমন একটা বিহ্বল গলায় বলল, “বিজন! এতদিন পরে!”

পুশকিন আর দাঁড়াল না। বাবার ব্যক্তিগত ফোন। ও কেন থাকবে!

সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল পুশকিন। রিসিভারটা ক্রেডেলে তুলে রাখল। কানুদারা এখনও ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পাখিদের কিছুতেই জ্বর আসা চলবে না!

পুশকিন নিজের মনেই হাসল। বাবা এমনিতে গম্ভীর খুব। কিন্তু বাবার ভেতরে একটা বাচ্চা ছেলে আছে। সে মাঝে মাঝে মানুষটার দখল নেয়!

সামনের গোটা দিনটার দিকে তাকাল পুশকিন। কিছু না করার ফাঁকা একটা দিন। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় কলকাতায় চলে এসেছিল ওরা। তখন এই পাড়ায় আরও অনেক পুরনো বাড়ি ছিল। কলকাতায় নতুন বলে তখনও তেমন বন্ধুবান্ধব হয়নি ওর! এমন বৃষ্টির দিনে ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত ও আর ভাই। চুপচাপ বৃষ্টি দেখত। ওদের পাড়ায় কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে অনেক। বৃষ্টির জলে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে আরও বেশি সবুজ মনে হত ওর। দেখত, কয়েকটা বাড়ি পরে শাক্য বলে যে শান্ত ছেলেটা থাকত, সে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ফুটবল খেলছে বৃষ্টিতে।

পুশকিনের ইচ্ছে হত খেলতে। কিন্তু নিজে থেকে যেতে পারত না। পরে অবশ্য শাক্যর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল ওর। আর শুধু শাক্যই নয়, ওর অন্য বন্ধুরা, পুষ্পল, আয়ানের সঙ্গেও খুব ভাল আলাপ হয়ে গিয়েছিল। আর-একটা ছেলেও আসত। সামান্য চুপচাপ। মনমরা। কিন্তু ফুটবলটা খারাপ খেলত না। ওই ছেলেটার সঙ্গেই পরে সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল পুশকিনের। ছেলেটার নামটা একটু অদ্ভুত। অন্তরীপ। অন্তরীপ মুখার্জি। ওরা সবাই রীপ বলে ডাকত ওকে!

সব ছিঁড়ে, ছিটিয়ে গিয়েছে! মুক্তোর মালা হাত থেকে পড়ে গড়িয়ে চলে গিয়েছে চতুর্দিকে! পুশকিন নিজে পড়াশোনা করতে কলকাতার বাইরে চলে যাওয়ার পরে আর যোগাযোগ থাকেনি কারও সঙ্গে। তবে এই বাড়িতে এলেই ওদের কথা মনে পড়ে পুশকিনের। মনে পড়ে দূরের ওই নীলাঞ্জনাদির বাড়ির কথা। এক ড্রপে যার বাড়ির দেওয়ালে লাগলে চার রান হত। আর সোজা বাড়ির মধ্যে বল মারলে ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যেত।

পুশকিন কোনওদিন ওভাবে বল মারেনি। তাও নিজের জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, ও আউট হয়ে গিয়েছে! স্মিতা ওকে আউট করে দিয়ে চলে গিয়েছে। যে মেয়েটা ওকে বলত, “আমি তো আছি সোনা।” সে কী করে এমনটা হয়ে গিয়েছিল? তবে কি অভিনয় করত? তা হলে কেন ওকে বিয়ে করতে রাজি হল? পুশকিন তো জোর করেনি। ভালবেসেছিল বলে বিয়ে করতে চেয়েছিল। তখন কেন ‘না’ করল না!

স্মিতা মারা গিয়ে ওর বুকের মধ্যে একটা বৃশ্চিক ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে। পুশকিন জানে এর হুল থেকে কিছুতেই নিস্তার নেই ওর। সারা জীবন শিরায় এই বিষ বয়ে বেড়াতে হবে ওকে।

পুশকিন নিজের ঘরের দিকে এগোল। রান্না হয়নি এখনও। কাজও নেই। কিছু পড়া যায় কি না দেখবে। ওর সব বই এখনও টেবিলের ওপর রাখা আছে। ভাইরা চলে আসবে বিকেলের মধ্যে। তারপর পুশকিন বেরিয়ে যাবে।

কিন্তু নিজের ঘরে যাওয়ার আগেই বেলটা বাজল হঠাৎ। কে এল আবার এখন? সবাই ওপরে আছে। তাই পুশকিন নিজেই সদর দরজার দিকে গেল।

পুরনো কাঠের দরজা। মাথার ওপর লম্বা পেতলের ছিটকিনি। পুশকিন ছিটকিনি নামিয়ে দরজাটা খুলল। আর খুলেই অবাক হয়ে গেল। আরে, নোঈ! ও কী করছে এখানে?

মাথায় নীল-গোলাপি ছাতা। পরনে নীল-সাদার ফুলছাপ চুড়িদার। কপালে সেই অনুস্বর টিপ। পুশকিন নিজের অজান্তেই দু’মুহূর্ত বেশি তাকিয়ে ফেলল। বুকের মধ্যে আচমকা একটা কষ্ট হল পুশকিনের। এমন একটা বৃষ্টি দিয়ে তৈরি মেয়েকে দেখেই কি কষ্টটা হল? কেন হল?

জোর করে নিজের দৃষ্টি নোঈর থেকে সরিয়ে পুশকিন জিজ্ঞেস করল, “তুমি? এখানে?”

নোঈ লজ্জা পেয়ে গেল। নিমেষে রাঙা হয়ে উঠল ওর মুখ। সেটা কি পুশকিনের প্রশ্নে, না ওর তাকিয়ে থাকার জন্য ঠিক বুঝতে পারল না পুশকিন।

নোঈ বলল, “সরি স্যার। আমি আসতে চাইনি। কিন্তু স্মরণ ফোন করে এমন করে বলল যে, আসতে বাধ্য হলাম!”

এই রে! স্মরণ আবার কী বলল? এই ছেলেটাকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল! কর্পোরেটে চাকরি করে, কিন্তু কোনও প্রোটোকল মানে না! স্মরণের অনুরোধেই সোনাঝুরির কাজে ওকে নিজের সঙ্গে রেখেছে পুশকিন। কিন্তু ছেলেটার এত উৎসাহ বেশি! পুশকিন ওর অনেক ওপরের বস। তার বাড়িতে এভাবে আসা যায় নাকি? এটা তো ঠিক নয়!

নোঈ বলল, “ও সকাল থেকে নাকি আপনাকে ফোন করছে। আপনি ধরেননি। ও নিজে সোনাঝুরি গিয়েছে। সেখানে কীসব দরকার আছে নাকি ওর। আমায় বলল আপনার কাছে আসতে। আমি স্যার আপনার বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। কিন্তু স্মরণ…”

“আচ্ছা আচ্ছা,” পুশকিন সরে দাঁড়িয়ে বলল, “ভেতরে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে সব কথা বলে দেবে নাকি?”

নোঈ ইতস্তত করল একটু। ছাতাটা বন্ধ করে এদিক-ওদিক তাকাল। পুশকিন হেসে নিজেই হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিল ছাতাটা। বলল, “এসো ভেতরে।”

দরজা দিয়ে ঢুকে একটা বড় জায়গা। একপাশে মিটার-বক্স। তার পাশে বড় একটা শু-র‍্যাক। লম্বা দেওয়ালে কয়েকটা হুক লাগানো। ছাতাটার হাতল থেকে ঝোলা দড়িটা একটা হুকে ঝুলিয়ে দিল পুশকিন। ছাতা ঝোলানোর জন্যই এমন ব্যবস্থা। আর ছাতার তলায় জল ঝরে পড়ার জন্য বালতিও রাখা। বাবার সব দিকে দৃষ্টি।

নোঈ জুতোর র‍্যাকের পাশে জুতোটা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। পুশকিন বুঝতে পারছে মেয়েটা খুব সংকোচ করছে!

পুশকিন বলল, “এসো আমার সঙ্গে। এই বৃষ্টির মধ্যে এমন করে এলে! খুব সাংঘাতিক কিছু দরকার নাকি? আর স্মরণকে আজ কে বলেছে সোনাঝুরি যেতে। ওকে তো আমি কাল যেতে বললাম।”

“আমি সরি স্যার,” নোঈ বলল, “আমি নিজেও জানি না। ও কী যেন বলছিল, গঙ্গায় নাকি বৃষ্টি দেখবে। কোনওদিন দেখেনি। তাই নাকি গিয়েছিল। কিন্তু গিয়ে কীসব কাজও করেছে!”

কথা বলতে-বলতে ওরা বসার ঘরে এল। বসার ঘরটাও বড়। একটা সোফা সেট ছাড়াও ডিভান আছে। কাচের দুটো আলমারিতে নানারকমের ডাই কাস্ট গাড়ি রাখা। মাথার ওপর একটা ঝাড়ও আছে!

নিজে একটা সিঙ্গল সোফায় বসে পুশকিন নোঈকে সামনের একটা সোফা দেখিয়ে বলল, “এটা অফিস নয়, বাড়ি। পুশকিনদা বলতে পারো আমায়। আমার সারাক্ষণ অত প্রোটোকল ভাল লাগে না।”

নোঈ সোফায় বসে হাসল। মেয়েটা এখনও জড়সড় হয়ে আছে!

পুশকিন আবার বলল, “আমার এই বাড়িতে এলে কী করে?”

নোঈ বলল, “বাসে। ভবানীপুর থেকে তো বেশি দূর নয়।”

“না, না, মানে,” পুশকিন হাসল, “মানে, ঠিকানা পেলে কী করে?”

“আমি জানতাম না। স্মরণ নাকি এইচ আর থেকে নিয়ে নিয়েছিল। ইমার্জেন্সিতে লাগতে পারে বলে!” নোঈ হাতের রুমাল দিয়ে আলতো করে মুখ আর মাথাটা মোছার চেষ্টা করল। যতই ছাতা থাক, জলের ছাট লেগেছে!

পুশকিন বলল, “একটা তোয়ালে দেব?”

“না স্যার, মানে…” হেসে ফেলল নোঈ, “না লাগবে না, খুব কিছু লাগেনি।”

পুশকিন হাসল। আর কী বলবে বুঝতে পারল না। মেয়েটাকে স্মরণ এখানে আসতে বলেছে কেন? কী এমন কথা যে, এক্ষুনি বলতে হবে?

পুশকিন কিছু বলার আগেই দরজার কাছ থেকে “বাবু,” বলে ডাক শুনল একটা। পুশকিন তাকাল। বাবা এসেছে! আরে, বাবা নীচে এসেছে? কী ব্যাপার?

পুশকিন উঠে দাঁড়াল। বাবা ঘরে এসে তাকাল নোঈর দিকে। নোঈও উঠে দাঁড়িয়েছে।

পুশকিনি বলল, “বাবা, ও নোঈ। আমাদের কোম্পানিতে নতুন জয়েন করেছে।”

নোঈ কী করবে বুঝতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে গেল! বাবা নোঈর হাত ধরে বলল, “আরে আরে, করো কী? এখনকার ছেলে-মেয়েরা কেউ নমস্কার করে নাকি?”

নোঈ বলল, “আমি করি।”

বাবা হাসল, নোঈকে বসতে বলে পাশে বসল। বলল, “তোমার নামটা আনইউজ়ুয়াল! ভাল বেশ। নোঈ! এই যে সেলফ নিগেশান। এটা খুব ভাল। আমি নোঈ। সাউন্ডস লাইক আমি নই। আমরা যে কেউ নই সেটা আমরা ভুলে যাই! চারিদিকে যা হচ্ছে! সবাই নিজেকে এত বেশি ইমপর্ট্যান্ট ভাবছে যে, গোটা পৃথিবীটাই কেমন যেন হয়ে গিয়েছে! সবাই ভাবছে সেই এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র! আরে বাবা, মহাবিশ্বের কোনও কেন্দ্রই তো নেই!”

পুশকিন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। বাবা তো এত কথা বলে না। তা হলে আজ কী হল? আচ্ছা, বাবার কি মনে আছে যে, দীনবন্ধুর সঙ্গে এই মেয়েটার বিয়ের কথা হয়েছিল? নিশ্চয় মনে নেই!

নোঈ হাসি-হাসি মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।

বাবা বলল, “আমাদের ছোটবেলায় এমনটা ছিল না কিন্তু।”

পুশকিনের এই ব্যাপারটা ভাল লাগে না। সব বয়স্ক মানুষ এই একটা কথাই বলে! আমাদের সময়! ওদের সময়ে যেন সব ভাল ছিল আর এখন সব খারাপ হয়ে গিয়েছে! আরে বাবা এই খারাপ সময়টা তো এসেছে আগেকার মানুষগুলোর বদান্যতাতেই। কিন্তু পুশকিন কারও সঙ্গে কোনও বিষয় নিয়ে তর্ক করে না। ও জানে তর্ক করে কিছু হবে না। মনখারাপ হবে শুধু।

বাবা বলল, “আমাদের সময়ে সব ভাল ছিল তা নয়, কিন্তু মানুষের মনে ভাল কিছু করার একটা চেষ্টা কিন্তু ছিল। নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা ছিল। এখন সেই ইচ্ছেটাই নেই। সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো এত বেশি জীবনে ঢুকে পড়েছে যে, মানুষ নিজেকে বিশাল হনু ভেবে ফেলেছে। আমাদের সময়ে একটা ঘড়ি পেলে আমরা বর্তে যেতাম। আর আজ দেখি কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকার ফোন কোনও ব্যাপার নয়। আর প্রায় সবার গলায় একটা করে ডিজিটাল ক্যামেরা ঝুলছে! সবাই রঘু রাই! অল ফ্যাশন, নো সাবস্ট্যান্স!”

নোঈ বলল, “আসলে জিনিসের দাম কমেছে। মানুষ রোজগারও বেশি করছে। আর…”

“কনজ়িউমারিজ়ম!” বাবা মাথা নাড়াল, “আমার এক পুরনো বন্ধু একটু আগে ফোন করেছিল। অনেক পুরনো বন্ধু! বহুকাল যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু আজ হঠাৎ ফোন করল। বিজন সরখেল। সোনাঝুরিতে থাকে।”

সোনাঝুরি? নামটা শুনে পুশকিন নড়ে বসল। আরে, ভদ্রলোক সোনাঝুরি থেকে ফোন করেছিলেন? ও চট করে একবার নোঈর দিকে তাকাল। দেখল, নোঈও ওকে দেখে নিল একবার।

বাবা বলল, “বিজন সোনাঝুরিতেই আছে এখনও। পার্টি করে। বিয়ে-শাদি করেনি! অনেক কথা হল। সেই সূত্র ধরেই মনে পড়ল সব কথা।”

“পার্টি করে?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল বাবার দিকে, “আগে বলোনি তো!”

“বললে কী করতিস?” বাবা ভুরু কুঁচকে বলল, “বিজন আমাদের সময়ের সোনাঝুরি আর এখনকার সোনাঝুরি নিয়ে কথা বলছিল। শুনলাম, জোনাক-বাড়ি নাকি বিক্রি হয়ে যাবে! বাবু, তোর জোনাক-বাড়ি মনে আছে?”

পুশকিন মাথা নাড়ল, “আছে! আর, কথাটা সত্যি। ওই বাড়ি, জুটমিল সব বিক্রি হয়ে যাবে। কয়েকজন চেষ্টা করছে কেনার। আমাদের কোম্পানিও আছে সেই দলে!”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে নিল। তারপর বলল, “জোনাক- বাড়ি সোনাঝুরির একটা বিশেষ জায়গা ছিল। অত বড় কম্পাউন্ড! চারটে বিরাট-বিরাট বাড়ি! কত গাছ! দেবদারু, শিরীষ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া আরও কত কী। আর রাতে জানিস কী দেখা যেত? জোনাকি। কত যে জোনাকি ছিল ওই বাড়িটার পেছনের ওই গাছপালায়, ঝোপঝাড়ে! আমরা যেতাম মাঝে মাঝে ওই জোনাকি দেখতে। হলদেটে সবুজ আলো। কী অদ্ভুত পোকা! আমাদের দেখতে কী যে ভাল লাগত! আমরা মানে আমি আর বিজন। জোনাকি থেকেই তো বাড়িটার নাম জোনাক-বাড়ি। আসলে কাজুদার কাছে মাঝে মাঝে যেত বিজন, আমিও যেতাম। তবে কাজুদা কখনও কখনও অল্পস্বল্প ধমক দিত আমায়। বিজনের সঙ্গে মিশতে বারণ করত। তাও যেতাম। কাজুদার কাছে যেতে খুব ভাল লাগত। ওদের বাড়ির ছাদে বসে আমরা দেখতাম ওই জোনাকিদের। কাজুদা বলত, ওদের বাড়িটা আসলে জোনাকিদের বাড়ি। নোঈ, তুমি কি জোনাকি দেখেছ?”

নোঈ মাথা নাড়ল, “আমার মামার বাড়ি বর্ধমানে। সেখানে দেখেছি। কলকাতার দেখিনি!”

বাবা বলল, “Although the night is damp, / The little firefly ventures out, / And slowly lights his lamp.”

নোঈ বলল, “এটা কার লেখা? দারুণ তো!”

বাবা মাথা নাড়ল, “কার লেখা আর মনে নেই। পড়েছিলাম। ভুলে গেছি। আসলে বিজন এমন আচমকা ফোন করল যে, হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল সব। কাজুদার মতো মানুষ তো আর দেখলাম না!”

“কাজুদা কে?” নোঈ জিজ্ঞেস করল।

বাবা হাসল। কেমন একটা ম্রিয়মাণ হাসি। তারপর বলল, “বেঞ্জামিন কূজন সরকার। সোনাঝুরির কাজুদা!”

“তিনি এখন কোথায়?” নোঈ তাকাল বাবার দিকে। বাবার নাম বলাটা শুনেই বোঝা যাচ্ছে মানুষটা যেমন-তেমন কেউ ছিল না!

বাবা হাসল। তারপর উঠে দাঁড়াল। এমন ভাব করল যেন শুনতেই পায়নি প্রশ্নটা। বাবা বলল, “দুপুরে এসেছ, না খেয়ে যাবে না বলে দিলাম। আমি ওপরে গেলাম। দেখি, পাখিগুলোকে কী করল ওরা!”

নোঈ তাড়াতাড়ি বলল, “আমি কিন্তু বাড়ি গিয়ে খাব। মানে…”

বাবা ঘুরে তাকাল। এবার গলাটা সামান্য শক্ত করে বলল, “আমি কিন্তু রাগী মানুষ নোঈ। আমার কথা কেউ না শুনলে খুব রেগে যাই। বাড়িতে ফোন করে বলে দাও, তুমি আজ এখানে খাবে দুপুরে। খিচুড়ি, ইলিশভাজা। তোমরা কি বাঙাল না ঘটি?”

নোঈ সামান্য অপ্রস্তুত হল। পুশকিন ব্যাপারটা দেখেও কিছু বলল না। মজাই লাগছে ওর। আর সত্যি বলতে কী, ভালও লাগছে। বাবাকে কারও সঙ্গে এমন করে কথা বলতে দেখেনি কোনওদিন। আর নোঈ সামনে থাকলে কেন কে জানে ওর মন ভাল থাকে। অন্ধকারগুলো ওকে ঘিরে রাখে না। নোঈ যেন আস্তে-আস্তে ওর জীবনের স্কাইলাইট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা তো ঠিক হচ্ছে না। ওর চেয়ে অনেক ছোট মেয়েটা। এখনও নোঈর গোটা জীবন পড়ে। আর সেখানে পুশকিনের একটা অতীত আছে। দম বন্ধ করে দেওয়া অতীত। তাই বেশি কিছু ভাবে না পুশকিন। আসলে ভাবনা এলেও এড়িয়ে যায়। মনে বসতে দেয় না।

কিন্তু আজ এই বৃষ্টির শহরে, আচমকা নোঈকে দেখে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। নোঈর বড় চোখ, অদ্ভুত সুন্দর হাসি, নাকের ভাঁজ, সামান্য টোলপড়া থুতনি… পুশকিনকে নরম মাটির মধ্যে বসিয়ে দিচ্ছে। ভাললাগা চোরাবালির মতো নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে ওকে। মনে হচ্ছে আজ তো ডুবে যাওয়ারই দিন।

“কী হল বলো…” বাবা আবার বলল।

কিন্তু এবার নোঈ কিছু বলার আগেই পেছন থেকে একটা গলা পেল পুশকিন।

“আমরা উডেন বাঙাল স্যার। বাবা কুমিল্লা। মা ঢাকা।”

পুশকিন কিছু বলতে গিয়েও হেসে ফেলল। স্মরণ এসে গিয়েছে। কিন্তু ঘরে ঢুকল কী করে?

বাবা সামান্য চমকে গিয়ে পেছনে তাকাল, “তুমি কে? কী করে ঢুকে পড়লে?”

স্মরণ বলল, “স্যার, আমি স্মরণ। পুশকিনস্যারের কোম্পানিতেই কাজ করি। মেন গেট খুলে একজন বাইরে কিছু জিনিস ফেলছিলেন। সেই ফাঁকে ঢুকে পড়েছি।”

পুশকিন বলল, “এসো এই ঘরে।”

স্মরণ বাবাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকল। বলল, “আমি ছাতাটা ওই বাইরে রেখে এসেছি!”

বাবা হাসল স্মরণের কথা বলার ভঙ্গিতে। তারপর বলল, “তুমিও খেয়ে যাবে। তোমরা কথা বলো, আমি উপরে যাই।”

নোঈ আচমকা এগিয়ে গেল বাবার দিকে তারপর বলল, “আমি একটা শর্তে খেতে পারি।”

“শর্ত?” বাবা অবাক হল।

নোঈ বলল, “হ্যাঁ, আপনাকে আমাদের সঙ্গে বসে খেতে হবে!”

বাবা অবাক হল, “কিন্তু আমি তো একা খাই… মানে…”

নোঈ সামান্য হেসে বলল, “না হলে আমি খাব না। আমি কিন্তু বাঙালবাড়ির মেয়ে। গোঁ খুব বেশি! আর মুখরাও!”

বাবা এবার হেসে ফেলল, নোঈর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কখন খাবে আমায় বোলো, আমি তোমার সঙ্গেই বসে খাব!”

বাবা চলে যাওয়ার পরে পুশকিন তাকাল স্মরণের দিকে। স্মরণ নোঈর পাশে বসে পড়েছে।

পুশকিন জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার তোমার? আজ এভাবে হঠাৎ?”

স্মরণ বলল, “স্যার, এমন ওয়েদারে প্যাঁও চাইল নদীর ধারে বৃষ্টি দেখবে! তাই ওকে নিয়ে সোনাঝুরি গিয়েছিলাম। তো, গিয়েছি যখন একবার দেখা করলাম স্থানীয় পলিটিকাল পার্টির লোকজনের সঙ্গে। সেখানে কথায়-কথায় জানতে পারলাম উনি আপনার বাবাকে চেনেন। বিজন সরখেল লোকটির নাম। আমি তখন আপনার এই বাড়ির নাম্বার ওঁকে দিলাম আর কী। বললেন আপনার বাবাকে ফোন করবেন। বহুদিন নাকি যোগাযোগ নেই।”

পুশকিনের এবার পরিষ্কার হল ব্যাপারটা। ও জিজ্ঞেস করল, “তুমি এই বাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বার পেলে কী করে?”

“অফিস থেকে স্যার। এইচআর থেকে। আপনার টিমে আছি, এটা না জানলে ইমার্জেন্সিতে কী করে আপনাকে পাব?” স্মরণ এমন করে বলল যেন এটাই স্বাভাবিক। তারপর একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। দেখলাম তুলছেন না। তখন নোঈকে বললাম আপনার কাছে আসতে। ও আপনার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল প্রথমে। তারপর এখানে এসেছে!”

নোঈ বলল, “পুশকিনদা, আপনাকে একটা কথা আমার বলা হয়নি।”

পুশকিন দেখল নোঈ ওকে এভাবে ডাকায় স্মরণ সামান্য চোখ গোল করেও আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল!

পুশকিন পাত্তা দিল না। ও নোঈকে জিজ্ঞেস করল, “কী?”

“আমার এক কাজ়িন থাকে সোনাঝুরিতে। এটা আপনাকে জানানো হয়নি।”

“তো কী হয়েছে! সোনাঝুরিতে অনেকেই থাকে!” পুশকিন এবার স্মরণের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী বলতে চাও?”

“স্যার, আর-একটা পার্টি কিন্তু ওই প্রজেক্টের জন্য খুব উঠে পড়ে লেগেছে! আমি খবর পেলাম। বিজনবাবুর ওখান থেকে আমি তারক চক্রবর্তীর কাছে গিয়েছিলাম। তারকবাবু ছিলেন না। মোতিবাবু বলে একজনের সঙ্গে কথা হল। তাকে লাইন করে এসেছি। সে-ই বলল, আর-একটা কোম্পানি থেকে একজন এর মধ্যে একবার মিটিং করে এসেছে তারকবাবুর সঙ্গে।”

নোঈ মাঝপথে বলল, “আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, গোটা সম্পত্তিটা মালিক গ্রুপের। আমরা তাদের চেয়ে কেন বেশি লোকাল পলিটিকাল পার্টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি?”

পুশকিন হাসল। মেঘলা দিনের আলো ঘরের পরদা ছুঁয়ে আলতো ভাবে এসে পড়েছে নোঈর গালে। ফ্যানের হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছে ওর। কথা বলতে-বলতে নোঈ হাত দিয়ে চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে কানের পেছনে।

“কারণ চটকল, তাদের ইউনিয়ন। লোকাল ঝামেলা। এসব কে সামলাবে?” স্মরণ যেন সামান্য বিরক্ত হল নোঈর এমন বাচ্চাদের মতো প্রশ্নে!

পুশকিন বলল, “ব্যাপারটা কী? কে যোগাযোগ করছে ওদের সঙ্গে?”

“যোগাযোগ শুধু নয় স্যার। সঙ্গে নানা কিছু দেওয়ার কথাও সে গিয়ে বলে এসেছে। আমাদেরও তাড়াতাড়ি যেতে হবে ওঁর ওখানে।”

পুশকিন এবার সামান্য অধৈর্য হল, “আরে, কে গিয়েছে বলবে তো!”

স্মরণ থমকাল একটু। তারপর বলল, “হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিয়েলটরস-এর রিপ্রেজ়েন্টেটিভ। আইকা বাসু।”

.

১৭. পেখম

মেয়ে দেখতে আসবে বলে তার জন্য কেউ কোনওদিন মার্কেটিং করেছে বলে তো পেখম শোনেনি! এটা কী রে বাবা! বিয়ে যে হবে তারই তো নিশ্চয়তা নেই। সেখানে মার্কেটিং!

পেখমের অদ্ভুত লাগে। মিতুকাকিমার যে কীসের এত উৎসাহ কে জানে! পেখমের তো মনে হচ্ছে মরে যায়! সারাক্ষণ মনে হয় শরীরে ঝিঁঝি ডাকছে! হাত-পা কেমন যেন অবশ লাগে। খেতে ইচ্ছে করে না। ঘুমোতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় এভাবে কেন বাঁচতে হবে ওকে? কী দোষ করেছে ও?

আকাশের দিকে তাকাল পেখম। রাতের আকাশে ঝকঝক করছে তারা। মনে হচ্ছে মাথার ওপরের অসংখ্য ফুটো দিয়ে অন্য কোনও এক জগৎ থেকে ছিটকে আসছে আলো! আকাশের দিকে তাকিয়ে পেখমের মনে হচ্ছে আকাশের ওপারের যে পৃথিবী, সেখানকার জোনাকিদের আলো কি নীল রঙের!

“কী রে, কী দেখছিস বাইরে দাঁড়িয়ে? দোকানে আয়।”

মিতুকাকিমার ডাকে পেছনে ফিরল পেখম। মিতুকাকিমার চোখেমুখে কেমন একটা তাড়াহুড়ো! যেন খুব দরকারি কোনও কাজে দেরি হয়ে গিয়েছে পেখমের জন্য।

এই জায়গাটার নাম সারেংনগর। সোনাঝুরি থেকে পাঁচ-ছ’ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু দোকানবাজার বেশ জমজমাট। পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরো বাজার সবটাই এখানে। তা ছাড়া জামাকাপড়ের বড় দোকানও এখানেই আছে।

পেখম কলকাতার কলেজে পড়তে যায়। সেখানে কিন্তু কেউ মার্কেটিং বলে না, বলে শপিং! আরও অনেক কিছু বলে না, যা মফস্‌সলের লোকজন অনায়াসে বলে দেয়। কলকাতাকে দেখতে ভাল লাগে পেখমের, কিন্তু থাকতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় কোথায় যেন কী একটা কম আছে। কী যে কম আছে সেটা নিজেও বুঝতে পারে না। কিন্তু মনে হয় যে কিছু কম আছে, কী একটা যেন মিলছে না।

জামাকাপড়ের দিকে খুব একটা মন নেই পেখমের। যেমন-তেমন শাড়িতেও চলে যায় ওর। শুধু একটা ব্যাপার খুব টানে ওকে। পারফিউম। সুন্দর গন্ধের মতো ভাল ওর অন্য কিছু লাগে না।

ঠাকুরদা কলকাতা থেকে যখন দোকানের মাল আনতে যায়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট বোতলে সুগন্ধী কিনে আনে পেখমের জন্য। কাজুরও গন্ধ কী পছন্দ! ওদের দু’জনের মধ্যে যে কী মিল!

“কী রে! হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস?” মিতুকাকিমা বিরক্ত হল আবার, “দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

পেখম বলল, “তোমরা দ্যাখো না। আমায় ডাকছ কেন? তোমরা যেটা পছন্দ করবে সেটাই তো হবে!”

মিতুকাকিমা হাসল, “কেন, তোর পছন্দ নেই বুঝি!”

পেখম চোয়াল শক্ত করল সামান্য। তারপর বলল, “আমার আবার পছন্দ!”

“এভাবে বলছিস কেন? এই বয়সেই সাত বুড়ির এক বুড়ির মতো কথা!” মিতুকাকিমা রাগ করল সামান্য।

পেখম নির্লিপ্তভাবে তাকাল মিতুকাকিমার দিকে। মানুষ নিজের মতোই ভাবে অন্যদের। ভাবে, তার যাতে খুশি অন্যরাও তাতেই খুশি হবে। তার যা চাই অন্যরাও সেটা পেতে চাইবে। তার যা পছন্দ, অন্য মানুষজনের পছন্দও একইরকম হবে। মিতুকাকিমাদের মতো হতে পারলে বেঁচে যেত পেখম। মনের মধ্যে এত কিছু ‘ফিলিং’ এসেই যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সেদিনের পর থেকে তো ভাল করে খেতেই পারছে না পেখম। খালি কান্না পেয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ লাগছে, বাবাও কিছু বলছে না। মা যেমন খুশি বলছে, করছে। এমনকী, বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্যও অস্থির হয়ে উঠেছে। পেখমের বিয়ের কথা হচ্ছে, কিন্তু ওকে কেউ কিছু বলছে না। এ কি পুতুলখেলা নাকি? আর বাবা! বাবাই-বা এমন করে কী করে!

সেই রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারেনি পেখম। খালি জল এসে যাচ্ছিল চোখে। শেষরাতের দিকে নিজের বিছানায় উঠে বসেছিল ও। কী করবে বুঝতে পারছিল না। চোখ বন্ধ করলেই কাজুর মুখটা মনে পড়ছিল। চোখ দুটো মনে পড়ছিল। খালি মনে হচ্ছিল, কাজু তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কিছু যেন বলতে চাইছে!

পেখমের মনে হয়, ও কেন আর পাঁচজনের মতো হতে পারে না! কেন এত কিছু অনুভব করে! ও বোঝে, যে যত বেশি ফিল করে তার জীবনে কষ্ট তত বেশি। ও ভাবে এত বড়লোকের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে, তাও ও খুশি হতে পারছে না কেন? খুশি হতে পারলে তো জীবন সহজ হয়ে যেত। আমাদের অনুভুতিগুলো কি আসলে আমাদের জীবনকে জটিল করে দেয়?

ভোরের দিকে বাইরের ঘরে শব্দ হয়েছিল। পেখম বুঝতে পেরেছিল ঠাকুরদা উঠে পড়েছেন ঘুম থেকে। ও বিছানা থেকে উঠে পায়ে-পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের সামনে। দেখেছিল, ঘরের কোনায় রাখা হিটার জ্বালিয়ে ঠাকুরদা চা চাপিয়েছেন। পাশে পটল বিস্কিটের টিনটা খোলা।

সারা রাত না আসা কান্নাটা আচমকা বুকের মাটি ফুঁড়ে যেন উঠে এসেছিল এবার! দরজার কাঠে মাথা রেখে সামান্য ফুঁপিয়ে উঠেছিল পেখম।

ঠাকুরদা ঘুরে তাকিয়েছিলেন। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন খুব, “কী রে! ঘুমোসনি?”

ঠাকুরদার প্রশ্ন শুনে আরওই যেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি পেখম। এবার মাটিতে বসে পড়ে কান্নায় টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ও।

“কী হয়েছে পেখম? কী হয়েছে মা?” ঠাকুরদা এসে নিজেও বসে পড়েছিলেন মাটিতে। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হল তোর পাগলি? কাঁদছিস কেন?”

পেখম ঠাকুরদার কোলে মাথা রেখে ঝুঁকে পড়েছিল সামনে।

ঠাকুরদা ওকে ধরে তুলেছিলেন মাটি থেকে। বলেছিলেন, “ঠান্ডা লেগে যাবে। এখানে বোস।”

ঠাকুরদার চৌকিটা বেশ বড়। তার এক পাশে জড়সড় হয়ে বসেছিল পেখম। সামান্য দূরে রাগী বাচ্চা সাপের মতো হিসহিস করছিল হিটারের ওপরে বসানো জলের বাটিটা।

পেখম কিছুতেই যেন নিজেকে আটকাতে পারছিল না।

ঠাকুরদা আবার মাথায় হাত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “সামলা নিজেকে। এভাবে কাঁদতে নেই। কান্নাকাটি করে কার কোন সমস্যার সমাধান হয়েছে? এভাবে হয় না।”

পেখম নিজেকে সামলেছিল অনেক কষ্টে। তারপর কোনওমতে বলেছিল, “মা আমায় বিয়ে দিয়ে দিতে চায় জোর করে! বাবাও বলল না কিছু। এখন আমি…”

ঠাকুরদা চুপ করে তাকিয়েছিলেন পেখমের দিকে। ওর অসমাপ্ত কথা সামান্য তুলোবীজের মতো ঘুরছিল ভোররাতের শহরতলির হাওয়ায়, ওদের মধ্যবিত্ত বাড়ির শেষ শীতের নিস্তব্ধতায়। আর-একটা অদ্ভুত বোঝা-না-বোঝার মতো না-বলা কুয়াশা এসে ধীরে-ধীরে ঘিরে ধরছিল পেখমকে। এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা আসছিল ওর।

ঠাকুরদা বলেছিলেন, “জানিস পেখম, আমার ছোটবেলা কেটেছে কুমিল্লায়। বহরিয়া গ্রামে। ছোট ঠাকুরবাড়ি বলা হত আমাদের বাড়িটাকে। বাড়ি থেকে স্কুল ছিল বেশ কিছুটা দূরে। আমরা সবাই মিলে হেঁটে যেতাম সেখানে। শুকনার মাঠ পেরিয়ে, ঢালিবাবুদের পুকুর পার করে, রহিমসাহেবের বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে আমরা যেতাম। আর বাঁশবাগানের পরেই ছিল কটন মিল। সাহেবদের কটন মিল! মিলের পাশেই ছিল বিশাল বড় বাংলো। ফ্লেচারসাহেবের বাংলো। ফ্লেচারসাহেব ছিলেন কটন মিলের বড়সাহেব। আর বাংলোটাও ছিল দারুণ সুন্দর! সাহেবের চার ছেলেমেয়ে ছিল। বড় তিনটে ছেলে আর ছোটটা মেয়ে। মেয়েটা ছোট হলেও কিন্তু খুব কিছু ছোট ছিল না। এই ধর চোদ্দো-পনেরোর মতো। হালকা গোলাপি ফ্রক, আর নীল রিবন দিয়ে চুল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকত বারান্দায়। কখনও-বা ওদের বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে বিশাল-বিশাল ঝাউগাছের তলায় পোষা কুকুরের সঙ্গে ছুটোছুটি করত। আমি আর বলাই যেতাম ওই পথ দিয়ে। আমাদের তখন পনেরো-ষোলো বছর বয়স। বলাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত মেয়েটার দিকে। ওদের বাড়ির এক বেয়ারার কাছ থেকে বলাই জেনেছিল মেয়েটার নাম। এলিজ়াবেথ। লিজ়ি বলেই ডাকত সবাই।

“বলাই ভালবেসে ফেলেছিল মেয়েটাকে। কিছুই না, এমনি মনে মনে ভালবেসে ফেলেছিল। বলতে যায়নি কিছু। চিঠি দেয়নি। খবর পাঠায়নি। কিছুই না। শুধু ওই পথ দিয়ে যেতে-যেতে বলাই তাকিয়ে থাকত ওই বড় বাংলোটার দিকে। রোজ যে লিজ়ি বাইরে আসত, তা নয় কিন্তু। তবু বলাই তাকিয়ে থাকত। এমনকী, ব্যাপারটা এমন জায়গায় গেল, যে বিকেলবেলাও বলাই চলে যেত ফ্লেচারসাহেবের বাংলোর সামনে। একটা বড় শিরীষ গাছ ছিল রাস্তার উলটোদিকে। তার ছায়ায় বসে থাকত। পরে সন্ধেবেলা আমায় এসে বলত লিজ়ি নাকি ওর দিকে তাকায়। হাসে।

“শেষে ফ্লেচারসাহেবদের চলে যাওয়ার সময় হল। সেই খবর পেয়ে তো একদম খেপে গেল বলাই! ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল ও। কিন্তু লেখাপড়া গোল্লায় গেল। সারাক্ষণ খ্যাপার মতো ঘুরে বেড়াত। খেত না, স্কুলে যেত না। এমনকী, শুনলাম সাহেবের বাংলোতেও ঢোকার চেষ্টা করেছে কয়েকবার!

“তারপর এল সেই দিন। আমরা দেখলাম কটন মিলের নতুন সাহেব এসে গিয়েছে। ফ্লেচারদের সব বাক্স-প্যাঁটরা গোছানো শেষ। পরের দিন ভোরে বেরিয়ে যাবে। আর সেই রাতেই ঘটল ঘটনাটা। বলাই লুকিয়ে ঢুকে পড়ল ওদের বাড়ি। আর শুধু বাড়ি নয়, একদম লিজ়ির ঘরের ভেতর! আর বলাই তো চোর নয়, সাবধানও হয়নি। তাই ধরাও পড়ে গেল। কী মারটাই না মেরেছিল! থানা-পুলিশ, নানা খারাপ অভিযোগ, সব কিছু দেওয়া হল। আমাদের সকলের চোখের সামনে ছেলেটা শেষ হয়ে গেল! শুনেছিলাম, বলাই নাকি বলেছিল, ‘লিজ়িকে জিজ্ঞেস করুন, ও আমায় চেনে। আমায় দেখে ও হাসে।’ কিন্তু লিজ়ি অস্বীকার করেছিল সব!”

ঠাকুরদা বলে যাচ্ছিলেন, “জেল থেকে বেরিয়ে কেমন পাগলাটে হয়ে গিয়েছিল বলাই। ওই শিরীষ গাছের তলায় বসে থাকত। ওর মা ছিল না ছোট থেকেই। এই সবের পর-পরই বাবাও মারা যায়। দাদারা এই সুযোগটাই নিয়েছিল। পাগল ভাইকে বের করে দিয়েছিল বাসা থেকে। আমাদের ছোট্ট বহরিয়া গ্রামে ঘুরে বেড়াত বলাই। রাতের জ্যোৎস্নায় একা-একা চিৎকার করত। আর বলত, ‘প্রেম করিস না, ভালবাসিস না। ভালবাসা নরক! আমি সেই নরকের শয়তান!”’

ঠাকুরদা টানা গল্পটা বলে থেমেছিলেন। তারপর তাকিয়েছিলেন পেখমের দিকে।

পেখম কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে ছিল পালটা! ভাবছিল, কেন এই গল্পটা ওকে বললেন ঠাকুরদা! ঠাকুরদা যেন ওর মনের কথাই বুঝতে পেরেছিলেন। বলেছিলেন, “আমি যেটুকু জীবন দেখেছি, তাতে প্রেম খুব কিছু কাজের জিনিস নয় রে মা! কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেয় না। তা ছাড়া সমাজের নিজস্ব একটা রেল লাইন আছে। জীবনে সুরক্ষার একটা ব্যাপার আছে। প্রেম কিন্তু সব কিছু সামলে দিতে পারবে না পেখম!”

পেখমের চোখে জল এসে গিয়েছিল আবার। ঠাকুরদা এমন বলছেন! ও এত ভরসা নিয়ে এল ঠাকুরদার কাছে, সেখানে ঠাকুরদা ওকে এমন করে ফিরিয়ে দিচ্ছেন!

ঠাকুরদা বলেছিলেন, “আমি বলাইকে দেখেছি। ঝিকুকে দেখেছি। তুই পাগলি এসবে ঢুকিস না।”

পেখম কাঁপা গলায় বলেছিল, “আমি পারছি না ঠাকুরদা। আমি কাজুকে ছাড়া…”

ঠাকুরদা উঠে গিয়ে হিটারটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “একদিন আজকের কথা ভাবলে হাসি পাবে তোর। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পেখম। উদ্বাস্তু বলে আরও জানি টাকাপয়সার মূল্য। তোর মাকে আমি এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না রে। জীবনের সব কিছুর একটা মাত্রা আছে। এই ব্যাপারটা আমার মাত্রার বাইরে। আমায় তুই ক্ষমা করে দিস মা!”

পেখম যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল শুধু।

ঠাকুরদা বলেছিলেন, “আমার প্রথমেই ভুল হয়েছিল কাজুকে এই বাড়িতে পড়ানোর জন্য বলা। স্নেহ নিম্নগামী। তোর প্রতি সেই স্নেহের বশবর্তী হয়ে আমি যা করার করেছিলাম। বুঝিনি তুই ক্রমশ এতটা মায়ায় জড়িয়ে যাবি! আমার ভুল হয়ে গিয়েছে মা। আমায় ক্ষমা করিস!”

পেখম ধীরে-ধীরে ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। ঠাকুরদাকে তো ও স্পষ্ট করে কিছুই বলল না, তার আগেই ঠাকুরদা ওকে এসব বলে দিলেন! কেন? কী করে বুঝলেন সব ঠাকুরদা? মা কি কিছু বলে রেখেছে?

নিজের ঘরে ফিরে এসে পাথরের মূর্তির মতো জানলার দিকে তাকিয়ে বসেছিল পেখম। সারা শরীরে কেমন একটা অসাড় ভাব আসছিল। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেও আসলে দেখছিল না কিছু। শুধু বুঝতে পারছিল খুব ধীরে একটা মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে ওর। বুঝতে পারছিল প্রেম আসলে স্বপ্ন দেখার মতো একটা ব্যাপার। যে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সে-ই জানে। যারা এর মধ্যে থাকে তারাই জানে। সেই দু’জন জানে। মাত্র দু’জন জানে।

“তোর কী হয়েছে বল তো?” মিতুকাকিমা পেখমের থুতনি ধরে ওর দিকে ফেরাল।

পেখম কষ্ট করে একটু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না কিছুতেই।

মিতুকাকিমা বলল, “তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর মা, কাকিমা তোকে ডাকছে।”

আচমকা মাথাটা গরম হয়ে গেল পেখমের। আচ্ছা নাছোড়বান্দা মহিলা তো! বলছে যে, ওর ভাল লাগছে না! সেখানে এভাবে টানাটানি কেন? সব বিষয়ে কি এমন করে ওকে বাধ্য করা হবে? একটু দোকানের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানেও মায়ের আপত্তি! কী করবে ও দোকানে ঢুকে! যে-পাত্রের সামনে ওর বসারই ইচ্ছে নেই, সেখানে শাড়ি দেখে কী করবে? তা ছাড়া যদি ও দেখেও শাড়ি, কিছু পছন্দও করে, তা হলেও কি মা সেটা কিনে দেবে ওকে? এই যে বাবা-মায়েদের একটা ভাব থাকে, আমরা তোমায় স্বাধীনতা দিচ্ছি, কিন্তু সবটাই তো আসলে মিথ্যে! বাবা-মায়েরা সবটাই নিজেদের মর্জিমতো করিয়ে নেয়। সেটা ভাল লাগে না পেখমের। কাজু বলে জীবনের সব কিছুতে রাজনীতি আছে। পাওয়ার স্ট্রাগ্‌ল আছে। দিন কে দিন সেটাই সত্যি মনে হচ্ছে ওর। বুঝতে পারছে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের ভেতরেও একটা ক্ষমতার, অন্যকে বশ্যতা স্বীকার করানোর দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে!

“কী রে?” মিতুকাকিমা আবার বলল।

পেখম আচমকা এবার ঘুরে দাঁড়াল মিতুকাকিমার মুখোমুখি। তারপর শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, “আমি কি অন্য ভাষায় কথা বলছি কাকিমা? যাব না আমি। ভাল লাগছে না। তুমি মাকে বলো, আমি যাব না ভেতরে।”

কাকিমা থতমত খেয়ে গেল একদম। কী বলবে যেন বুঝতে পারল না। মুখ লাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঠোঁট নাড়াল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরিয়ে এল না। তারপর নিজের মনে মাথা নেড়ে ঢুকে গেল দোকানে।

পেখমের খারাপ লাগল। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। মা যা শুরু করেছে, আর কিছু সহ্য করতে পারছে না। ও জানে এই যে মিতুকাকিমাকে এরকম বলল, এতে ওর বিপদ বাড়বে বাড়িতে। কিন্তু আর নিতে পারছে না ও। মানতে পারছে না কিছু। বাড়িতে ওকে খেতে-পরতে দেয় বলে কি ওর ওপর বাবা-মা এমন জুলুম করতে পারে! আর বাবা! বাবা এটা মানছে কী করে? পেখম বাবার সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাবা কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে। কিছুতেই সামনে আসছে না, কথা বলছে না। পেখম বুঝতে পারছে না, কী হতে যাচ্ছে সামনে। এমনকী, গত এক সপ্তাহ কলেজেও যেতে দেয়নি মা। মায়ের কথা হল ছেলের বাড়ি থেকে এসে কথা বলে যাক, তারপর সব হবে।

এই ব্যাপারটাতেই আপত্তি আছে পেখমের। এত বছরের ওর জীবন, ওর পড়াশোনা, সবটা আটকে যাবে কোথাকার কে এক হরিদাস পালের জন্য। এটা কি হতে পারে। আর বাবাই-বা এমন করে এইসব অন্যায় কথা মেনে নিচ্ছে কেন?

পাগল-পাগল লাগছে পেখমের। মাথার ভেতর ঘিলু ফুটছে! মনে হচ্ছে এমন করে তো চলতে পারে না! বাড়ি থেকে একা বেরোতে দেওয়াই হচ্ছে না ওকে। কাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না কিছুতেই। কাজুকে যে এসব বলবে তারও উপায় নেই। নয়নাও আসছে না কেন বুঝতে পারছে না। পেখমের মনে হচ্ছে সবাই মিলে ওকে চারিদিক থেকে বেঁধে রেখেছে!

“পেখমদি, তুমি এখানে?” আচমকা একটা চেনা গলা পেয়ে ঘুরে তাকাল ও। আরে, বিজন এখানে কী করছে এই সন্ধেবেলা?

গত ক’দিনের ভেতর পেখমের এই প্রথম ভাল লাগল। মনে হল যেন বন্ধুর মুখ দেখল শ্মশানের মধ্যে! একরত্তি একটা ছেলে, যাকে সেভাবে কোনওদিন পাত্তা দেয়নি, আজ তাকে দেখেই মনে হল সমুদ্রে ভাসমান একখণ্ড কাঠ!

পেখম বলল, “এই দোকানে এসেছি। তুই এখানে বিজু? কী ব্যাপার?”

“আরে, বোলো না, আমাদের একটা পার্টির মিটিং আছে। তাই এসেছি কাজুদার সঙ্গে।”

“কাজুদা এসেছে!” পেখম না চাইতেও কথাটা বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে! সারা গায়ে কদম ফুটে উঠল যেন!

“হ্যাঁ তো,” বিজন বলল, “আমায় তো আসতে দিতেই চায় না। শেষে আমি জোর করে এলাম। আসলে আমাদের পার্টির ব্যাপার তো। আমি দূরে থাকি কেমন করে! বিমলদা বলেছেন আমাদের আরও তৈরি হতে হবে! না হলে…”

“কাজুদা কই রে?” পেখম এদিক-ওদিক তাকাল।

এই জায়গাটায় বেশ ভিড়। তা ছাড়া আজ শুক্রবার। আশপাশের কারখানাগুলোর উইকলি পেমেন্টের দিন। মানুষজন বাজারহাট করে আজ। তাই ভিড়ে জায়গাটা গিঁট পাকিয়ে আছে সামনে। সন্ধে ঘন হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে লোকজন আরও বাড়ছে!

“এইখানেই তো কোথায় ছিল!” বিজন ঘুরে ভিড়ের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।

পেখম সামান্য এগিয়ে গেল রাস্তার দিকে। এত লোক! তার মধ্যে কোথায় আছে কাজু! ও দ্রুত পৃষ্ঠা ওলটানোর মতো করে মানুষের মুখগুলোকে পালটে দেখতে লাগল। কাজু কই? দেখা পেলে দ্রুত যাবে ওর কাছে। কাজুকে যে বলতে হবে সব কিছু। ওর সঙ্গে কী হচ্ছে, সেটা যে জানাতেই হবে।

বিজন আরও কিছু বলত, কিন্তু কিছু একটা দেখে থমকে গেল। পেখম বুঝল ওর পেছনে কাউকে দেখেছে বিজন। ও মুখ ঘোরাল। দেখল মা বেরিয়ে এসেছে দোকান থেকে। মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে রাগে।

“তুই… তুই… মিতুকে কী বলেছিস?” মা যেন কাঁপছে! যেন ভুলে গিয়েছে ওরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে!

মা আবার বলল, “এত বাড় বেড়েছিস? এতটা বাড়? ভেতরে চল। চল ভেতরে। মিতুর কাছে ক্ষমা চাইবি চল!” মা এগিয়ে এসে পেখমের হাতটা ধরতে গেল। আর ঠিক তখনই পেখম শুনতে পেল বিজন যেন অস্ফুটে বলল, “কাজুদা!”

পেখম কথাটা শোনামাত্রই মায়ের বাড়ানো হাত থেকে সরিয়ে নিল নিজের হাত। তারপর এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল রাস্তার ওই পারের দিকে। দেখল ভিড়ের ভেতর সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কাজু।

পেখমের যে কী হল, ও নিজেও যেন বুঝতে পারল না। মায়ের রাগ, মানুষের ভিড়, সব কিছু যেন নিমেষে মুছে গেল ওর সামনে থেকে! ওপাশ দিয়ে আসা রিকশার সারিকে তুচ্ছ করে দৌড়ে গেল অন্য পারে।

“কাজুদা!” পেখম আর্তনাদের মতো করে ডাকল।

কাজু সামান্য চমকে তাকাল ওর দিকে।

“কাজুদা আমি… আমি তোমায়…”

পেখমের সমস্ত কথা একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল যেন। কিন্তু কোনও কিছু ঠিকমতো বলার আগেই দেখল কাজু কেমন যেন শক্ত হয়ে গিয়েছে।

কাজু স্থির চোখে একবার পেখমকে দেখল। তারপর দ্রুত সাইকেলে উঠে পড়ল। পেখমকে কিছু বলতে না দিয়ে ভিড়ের ভেতর সাইকেলের বেল বাজাতে-বাজাতে যতটা দ্রুত সম্ভব অদৃশ্য হয়ে গেল।

পেখম তাকিয়ে রইল ভিড়ের দিকে। কাজু কথা বলল না ওর সঙ্গে! এভাবে চলে গেল! কেন গেল? কী চায় কাজু? কী শুনেছে ও যে, এমন করে চলে গেল?

চারদিকের ভিড় আর হট্টগোলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল পেখম। আর অবাক হয়ে দেখল, ওর সামনে থেকে আস্তে-আস্তে ঝাপসা হয়ে মুছে যেতে শুরু করেছে মানুষজন, গাড়িঘোড়া, দোকান-বাজারসমেত সকল দৃশ্যপট!

এক নির্জন, জনহীন প্রান্তরে যেন দাঁড়িয়ে রইল পেখম। যেন দেখতে পেল বহু বছর আগের এক গ্রামে উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এক তরুণ। বলছে প্রেম নেই! আর প্রেম নেই কোথাও!

.

১৮. মাহির

“আমি আজ আপনাদের সামনে ইতিহাস থেকে উঠে আসা এমন এক জিনিস বিক্রি করতে এসেছি, যার বয়স চার হাজার বছরের বেশি! রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সিন্ধুসভ্যতার খননকার্যে উঠে এসেছিল অসাধারণ এই বস্তুটি। আর কী তার ইতিহাস! মহামতি সম্রাট অশোক থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার হয়ে তৈমুর লং, তারপর সেই বংশের জাহাঙ্গির হয়ে টিপু সুলতান থেকে নেপোলিয়নের হাত ঘুরে সেটি এসেছে বাচ্চা হিটলারের হাতে। আর সেখানেই থেমে থাকেনি, বড় বড় রাষ্ট্রনায়ক ও নেত্রীর ছোট বয়সের একমাত্র সঙ্গী ছিল বস্তুটি। তাদের সেই শিশু অবস্থার মনন নির্মাণের সঙ্গী ছিল এটি। মাটি, পাথর, কাঠ, ব্রোঞ্জ পেরিয়ে কাচ হয়ে এখন প্লাস্টিক ও পলিমারে এসে থেমেছে বস্তুটি। ইতিহাসের ছোট্ট এটিল্লার মতো আপনার বাচ্চারও মনখারাপের, একাকিত্বের আর ভালবাসার সঙ্গী এই বস্তু। চিলেকোঠায় আটকে থাকা অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের সেইসব দিনগুলোয় তার পাশে এই বস্তুটি যেমন ছিল, তেমনই আপনার সন্তানেরও নিভৃত সময়ের সঙ্গী হওয়ার সমস্ত যোগ্যতাই আছে তার। প্রাচীন সময় থেকে বর্তমান সময়ে আসার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে জাতিধর্ম নির্বিশেষে শিশু-কিশোরদের একমাত্র সঙ্গী এই বস্তুটিকে আজ এই বনগাঁ লোকালে আমি আপনাদের সামনে এনে হাজির করেছি। এর মাধ্যমে আপনি আপনার স্নেহের সন্তানের হাতে শুধু মনোরঞ্জনের বস্তুই তুলে দিচ্ছেন না, তুলে দিচ্ছেন হামুরাবি থেকে বর্তমান সময় অবধি বয়ে আসা এক ঐতিহ্যের অংশকে। তাই আমার ঝোলার স্টক থাকতে-থাকতে আপনারা সংগ্রহ করে নিন ‘ডায়মন্ড টয়েজ়’-এর একমাত্র খেলনা ব্যাঙে বাজায় কত্তাল! সম্রাট আকবর যেমন তাঁর প্রিয় সেখুবাবার হাতে তুলে দিতেন, তেমন আপনিও আপনার সন্তানের হাতে তুলে দিন সিন্ধু নদ থেকে টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়া এক ইতিহাসের টুকরো! এই ব্যাঙ, যা বিজ্ঞানের বইয়ে বুফো মেলানোস্টিকটাস নামে আপনাদের জ্বালিয়ে এসেছে, তাকে একবার আপন করে নিয়ে নিজেকে ও নিজের প্রিয় সন্তানকে করে তুলুন ইতিহাসের অংশ! আর কেউ আপনাকে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে এমন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেবে না। তাই দেরি না করে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে ইতিহাসে নাম ওঠাতে তৎপর হন।”

মাহির হাঁ হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। দুপুরের বনগাঁ লোকাল। গাড়ি দুর্গানগর ছেড়ে গিয়েছে। ভিড় যা ছিল মোটামুটি নেমে গিয়েছে মধ্যমগ্রাম স্টেশনে। এখন যারা আছে, সব বসেই আছে। সেখানে এই লোকটি সুর করে একটানা বলে গেল এসব! এসব কী?

লোকটাকে দেখল মাহির। বেঁটে, শুকনো চেহারা। সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে। জামাকাপড়ও ময়লা। কাঁধে একটা ঝোলা। তাপ্পিমারা। আর হাতে প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা। একটা সবুজ রঙের ব্যাঙ। ব্যাঙের সামনের পা দুটোতে করতাল লাগানো। খেলনার নীচের একটা ‘ইউ’-আকৃতির লিভারে চাপ দিলে ব্যাঙের পা দুটো তালির মতো করে কর্তালটা বাজায়!

খুবই সাধারণ খেলনা। মাহির বহুবার দেখেছে। কিন্তু সেটাকে যে কেউ এভাবে বিক্রি করতে পারে, সেটা ওর চিন্তাতেও ছিল না!

মাহির দেখল সবাই লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ-কেউ হাসছেও। কিন্তু লোকটার তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সে বলেই চলেছে এসব জড়ানো-প্যাঁচানো কথা!

মাহির শুনল একজন তো বেশ চেঁচিয়েই বলল, “মালটাকে ট্রেন কাত করে ফেলে দে তো!”

কিন্তু লোকটা পাত্তাও দিল না! সে কর্তাল বাজাতে-বাজাতে এসব বলে চলেছে!

“মালটা এখানেও এসে জুটেছে?” পাশ থেকে টিটি চাপা গলায় বলল।

“মানে?” মাহির তাকাল টিটির দিকে।

“আরে, নকুর সেই পাগলা দাদাটা! বলেছিলাম না, লেক মার্কেটে একজনকে কেলিয়েছে বলে পুলিশ ধরেছিল! রিতুদা তারপর ছাড়ায়। সে মাল দেখছি বই ছেড়ে এখন খেলনা ধরেছে।”

মাহির অবাক হল। লোকটা যা বলছে সেটা কতদূর সত্যি তা জানার মতো বিদ্যে ওর নেই, কিন্তু লোকটা নিজে এত কিছু জানল কী করে? আর সামান্য একটা খেলনা কেউ যে এমন করে বিক্রি করতে পারে, সেটাই তো ভাবতে পারে না ও!

লোকজন হাসাহাসি করলেও মাহির দেখল চারজন কিনল খেলনাটা!

“এই যে ভাই, এদিকে আসবেন তো!” পাশ থেকে তুয়াদি হাত তুলে ডাকল খেলনাওয়ালাটাকে।

মাহির ঘাবড়ে গেল। তুয়াদির আবার কী হল? ও এসব কিনছে কেন?

মাহির চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হল তুয়াদি? তুমি কী করছ?”

তুয়াদি বিরক্ত হয়ে তাকাল, “খেলনা কিনব। কেন? তোর আপত্তি আছে?”

মাহির চুপ করে গেল। ও কেন আপত্তি করবে! ও আপত্তি করার কে! কিন্তু তুয়াদি নিজে বিয়ে করেনি। ভাইদের সংসারে থাকলেও আলাদাই খায়। তা হলে কার জন্য কিনবে এসব? তুয়াদি সেলাই করে ভালই রোজগার করছে এখন! কে এক লোক নাকি জামাকাপড় এক্সপোর্ট করে এমন কিছু ছোট কোম্পানির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। তারা ভালই কাজ দিচ্ছে। এমনকী, সেদিন তো মাহিরকে বলছিল রিতুদাকে বলে একটা ঘর দেখে দিতে। গেঞ্জির ফ্যাক্টরি দেবে।

“গেঞ্জি!” মাহির খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল, “তুমি ফ্যাক্টরি দেবে? বিক্রি করবে কোথায়?”

“তোর জেনে কাজ কী! আমার নিশ্চয় কানেকশন আছে! আমি তো ছাগল নই যে, এমনি-এমনি জায়গা দেখছি!”

মাহির আর কথা বাড়ায়নি। আসলে আজকাল কী হয়েছে তুয়াদির কে জানে! আগে তো এমন করত না! কয়েকমাস যাবৎ ওর সঙ্গে দেখা হলেই কেমন একটা ঝাঁজি মেরে কথা বলে। চিমটি কেটে উত্তর দেয়। যেন পছন্দ করছে না। আবার নিজের যা কাজ ওকেই ডেকে করায়। মাহির কথা না বললে রাগ করে। ওর গায়ে আচমকা হাত দেয়। এসব কী করছে তুয়াদি? কিছুই বোঝে না মাহির। ও যথাসম্ভব এড়িয়ে থাকে।

কিন্তু মা রাগ করে। বলে, “তুয়া আছে, তাই তোর ভাইটা বেঁচে আছে। আমি কাজে বেরোই। তুইও টইটই করে বেড়াস। তুয়া না থাকলে তোর ভাইকে কে দেখবে? ও যা বলে করে দিবি। আমায় যেন আর বলতে না হয়!”

মা আজকাল সারাক্ষণ রেগে থাকে। ভাইয়ের জন্য যে মায়ের দুশ্চিন্তা হয় সেটা ও বোঝে। কিন্তু তার সঙ্গে ও যে রিতুদার হয়ে এটা-ওটা কাজ করছে সেটা মা মানতে পারে না। ভাইয়ের ডায়ালিসিস শুরু হয়েছে। রিতুদাই বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। তাই মা খুলে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে মায়ের একটা আশঙ্কা আছে যে, মাহির খারাপ পথে চলে যাচ্ছে!

রিতুদা কিন্তু মাহিরকে কোনও খারাপ কাজে পাঠায় না। নানা ব্যাবসা আছে রিতুদার। সে সব জায়গায় টাকা কালেকশনের কাজটা করতে হয় ওকে। কেউ দিতে দেরি করলে একটু কড়াভাবে বলতে হয়। সেটা অবশ্য পারে না ও। মাহির কাউকেই কড়াভাবে কিছু বলতে পারে না। সেই কাজটা করে দেয় টিটি।

মাঝখানে টিটি যে নিজের অটোটা চালাত, সেটা আর চালায় না। ভাড়ায় একটা লোক চালায় এখন। মাস গেলে একটা টাকা নেয় টিটি। ওরা বলে বাতচিৎ। টিটি নিজে এখন রিতুদার কাছেই সারাক্ষণ কাজ করছে।

টিটি ওকে বলেছে, “দ্যাখো কাকা, তুমি হলে হাওয়া-ভরা মাল! শরীরটাই বড়। মুখ খুললে একদম ন্যাদাবোদা, চার অক্ষরের বোকা! কেউ টাকা না দিলে বা লেবাররা ট্রাবল করলে তোকে কিছু বলতে হবে না। আমি যা ফাটাবার ফাটাব। তুই শুধু বিশাল চেহারাটা নিয়ে ভুরু কুঁচকে, রাগী মুখ করে তাকিয়ে থাকবি! সাইলেন্ট সিনেমা হয়ে থাকবি কিন্তু। বুঝলি! একদম দাতা কর্ণের মতো মুখ খুলবি না! বুঝেছিস?”

মাহির কথা শোনে টিটির। মুখ খোলে না। চোখমুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে!

“ক’টা দেব দিদি?” লোকটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!

“দুটো,” তুয়াদি কুড়ি টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিল সামনে।

লোকটা দুটো খেলনা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে দিল। তারপর এগিয়ে গেল দরজার দিকে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট আসছে সামনে।

“নে ঢুকিয়ে রাখ,” তুয়াদি মাহিরের দিকে বাড়িয়ে দিল প্যাকেটটা।

হাতের ব্যাগটায় খেলনাটা ঢুকিয়ে ব্যাগটা কোলের ওপর নিল মাহির। এতে সাড়ে ছ’লাখ টাকা আছে। বারাসতের একটা পার্টির কাছ থেকে কালেকশন। কীসের কালেকশন সেটা জানে না মাহির।

রিতুদা গতকাল ডেকেছিল মাহিরকে। বলেছিল, “কাল সকালে বারাসত চলে যাবি। টিটি আর তুই। পেমেন্ট আছে একটা। নিয়ে আসবি। ক্যাশে দেবে। ফলে সেভাবে আনবি। মনে থাকে যেন!”

“ঠিক আছে রিতুদা,” মাথা নেড়েছিল মাহির।

“আর শোন,” রিতুদা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, “ব্যাগটা তোর কাছে রাখবি, টিটির হাতে দিবি না। গাড়ি করে চলে আসিস।”

কিন্তু গাড়ি করতে পারেনি মাহির। বারাসতে কী একটা ঝামেলা হয়েছে। রাস্তা অবরোধ। তাই গাড়ি করা যায়নি। তার ওপর আবার তুয়াদি এসে জুড়ে বসেছে! কী যে জ্বালা!

টাকা কালেকশন করে কোনও গাড়ি না পেয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বারাসত স্টেশনে এসেছিল মাহিররা। ভয় লাগছিল ওর। সঙ্গে এতগুলো টাকা। কিছু হয়ে গেলে রিতুদা আস্ত রাখবে না।

টিটি বলেছিল, “রিতুদাকে একটা ফোন করে জানাবি যে, এখানে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না?”

“না!” মাহির মাথা নেড়ে বলেছিল, “রিতুদা টেনশন করবে। তার চেয়ে ট্রেনে বেরিয়ে যাই চল।”

স্টেশনে লোকের মাথা লোকে খাচ্ছিল! মাহিরের আরও ভয় লাগছিল দেখে। এত লোক! কী যে ভিড় হবে ট্রেনে! আর ব্যাগটা যদি ছিনতাই হয়ে যায়!

আকাশের দিকে তাকিয়েছিল মাহির! মেঘ করছে আবার। জুলাই মাস। ভরা বর্ষা চলছে। এখন বৃষ্টি এলেই মুশকিল হবে, ভেবেছিল মাহির।

“এত ভিড়ে ট্রেনে ওঠা খতরনাক হয়ে যাবে কাকা!” টিটি বলেছিল, “তার চেয়ে কয়েকটা ট্রেন ছেড়ে দিই চল। খিদেও লেগেছে। কিছু সাঁটিয়ে নিই চল।”

চারটে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল ওরা। স্টেশনেই একটা দোকান থেকে পরোটা আর আলুর তরকারি খেয়েছে এর ফাঁকে। মাহির খেলাধুলো করে, তাই এমন তেলজবজবে খাবার ও খেতে চায় না। কিন্তু উপায় নেই। খিদে বড় বালাই। তা ছাড়া আজকাল খেলাটা কেমন যেন জীবন থেকে আস্তে-আস্তে সরে যাচ্ছে ওর। সাতাশ হতে চলল, এখনও সেকেন্ড ডিভিশনে পড়ে আছে। বড় ক্লাবে ডাকে না। ট্রায়াল হয় না। পতাদার ঢপবাজি শুনে-শুনে কান পচে গেছে। মাহির ক্রমশ বুঝতে পারছে যে, আমাদের দেশে লোকে বিদেশি ফুটবল দেখে আর ক্রিকেট খেলে। এখানে কিছু হওয়া যায় না ফুটবল খেলে।

খাবার খেতে-খেতে এ সবই সাতপাঁচ ভাবছিল আর ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ একটা আলতো করে থাপ্পড় মেরেছিল পিঠে! ও খাবারের প্লেট হাতে ঘুরে দেখেছিল, তুয়াদি!

“কী রে, ব্যাগটাকে ওরকম প্রেমিকার মতো জড়িয়ে বসে আছিস কেন?” তুয়াদি জিজ্ঞেস করল।

এই কামরার শেষ সিট এটা। টানা লম্বা। সাতজন বসতে পারে। কিন্তু ন’জন বসেছে! সব জায়গাতেই এমন অবস্থা! অটোয় কলকাতার একটু কোণের দিকে গেলেই উপচে পড়া মানুষ তুলে নেওয়া হয়। জেলাগুলোয় ট্রেকার চলে, নাকি আঠার বিজ্ঞাপনের সেই মানুষঠাসা গাড়ি চলে কে জানে! বাসে লোক ঝুলছে! মেট্রোতেও মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ করা যায় না! দূরপাল্লার ট্রেনে পর্যন্ত রিজ়ার্ভ সিটকে বাপের সম্পত্তি ভেবে ঠেসে বসে যায় সব। ভাগ্যিস প্লেনে ঝুলে যাওয়া যায় না! গেলে পাইলটকে যে ক’জন মানুষকে কোলে বসিয়ে নিয়ে যেতে হত কে জানে! মাহির বোঝে, গোটা দেশ তেঁতুল পাতার কনসেপ্টে চলছে!

তুয়াদি একদম লেপটে বসেছে মাহিরের সঙ্গে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে ওর। আজকাল তুয়াদির যে কী হয়েছে! নানা অছিলায় মাহিরের গায়ে হাত দেয়! এত বিরক্ত লাগে ওর! কিন্তু কিছু বলতে পারে না। ও জানে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু-শুধু ওকেই ভুল বুঝবে!

এখনও ভাল লাগছে না মাহিরের। তুয়াদির বুকটা ওর ডান দিকের কনুইতে লাগছে। ও টিটির দিকে সরে যেতে চাইছে, কিন্তু জায়গা নেই বলে পারছে না। আর ওর মনে হচ্ছে, তুয়াদি যেন ইচ্ছে করে ওর কনুইতে নিজের শরীরটা ঘষছে!

“কী রে বল, কী আছে তোর ব্যাগে? এখানে কী করতে এসেছিলি?” তুয়াদি জিজ্ঞেস করল।

টিটি অন্য সময় ফটফট করে, কিন্তু আজ চুপ। তুয়াদিকে খুব ভাল করে চেনে টিটি। আর ভয় পায়। সেই প্রপোজ় করতে গিয়ে মার খেতে-খেতে বেঁচে যাওয়ার ব্যাপারটা এখনও ভোলেনি! তুয়াদি টিটিকে দেখলেই নানাভাবে কথা শোনায়! আজও স্টেশনে বলেছিল, “এই মর্কটটার সঙ্গে এসব গিলছিস? ওর সাপের বিষও হজম হয়ে যায়। কিন্তু তুই? ভাইটা অসুস্থ হয়েছে, এবার কি তুই হবি?”

তাই টিটি একটু সরে-সরে থাকছে। তুয়াদির সঙ্গে যাতে কথা না হয় এমন করে মুখ ঘুরিয়ে রাখছে।

মাহির বলল, “না, আমার কিছু সার্টিফিকেট আছে। সেই কাজেই এসেছিলাম এখানে…”

“সেই কাজে মানে? কী কাজে?” তুয়াদি আরও চেপে এল মাহিরের কাছে।

হালকা সেন্ট আর পাউডার মেশানো একটা গন্ধ পাচ্ছে মাহির। কানের পেছনে দেখছে পাউডার লেগে আছে একটু। কেন জানে না, মাহিরের ইচ্ছে করছে উঠে চলে যেতে!

“কী কাজে এসেছিস বল। আজ রবিবার, আজও কাজ!” তুয়াদি মাহিরের থাইতে হাত দিয়ে ঠেলল।

মাহির কুঁকড়ে গেল একদম। বলল, “হ্যাঁ, ওই একটা চাকরির জন্য। এখন আর রবিবার মানেই সব ছুটি এমন নয়। ইন্টারভিউ ছিল একটা তাই…”

“কীসের কাজ?” তুয়াদি ভুরু কুঁচকে তাকাল।

“এমনি ইয়ে…” মাহির দ্রুত মনে মনে কথা বানাতে শুরু করল। কী বলা যায়! রিতুদার কাজে এসেছে সেটা বলা যাবে না। তা হলে আরও নানা প্রশ্ন করবে তুয়াদি। রিতুদাকে সবাই ভয় করে, তেলিয়ে চলে! কিন্তু পেছন ঘুরলেই গুন্ডা বলে। তুয়াদিও সেই দলেই। তাই সবারই রিতুদার কাজকর্ম নিয়ে কৌতূহল আছে!

মাহির বলল, “ওই ওরা বাংলাদেশে কিছু জিনিস এক্সপোর্ট করে। তাই মানে…”

“তো নিজে আসতিস, এই মর্কটটাকে আনলি কেন?” তুয়াদি টিটিকে দেখিয়ে জোরে-জোরেই বলল।

অন্য কেউ হলে টিটি এসব কথার বিনিময়ে গালাগালি দিয়ে তার বাপের শ্রাদ্ধ করে দিত। কিন্তু তুয়াদিকে যমের মতো ভয় করে ও। টিটি তুয়াদির কথায় হি হি করে একটা হাসি দিল। পরিস্থিতি ম্যানেজ করার হাসি।

তুয়াদি বলল, “আর দাঁত দেখাতে হবে না। ওগুলো এমনিতেই দেখা যায়!”

মাহির দেখল ব্যাপারটা অন্যদিকে যাচ্ছে। ও বলল, “তুমি এখানে… মানে…”

“কেন তুই জানিস না? বারাসতে আমার মাসির বাড়ি। তাই এসেছিলাম। কাকিমাকে তো বলে এসেছি। তোকেও তো বলেছিলাম।”

“ও হ্যাঁ তা ঠিক। আসলে ভুলে গিয়েছি আর কী!”

মাহির দেখল দমদম জংশন ঢুকছে। ও তাকাল টিটির দিকে। কী করবে বুঝতে পারল না। মেট্রোয় গেলে তো গেটে চেক করে আজকাল। সেখানে যদি ধরা পড়ে যায়! এই নিয়ে টিটিকে বলেওছিল আগে। ও ভেবেছিল শিয়ালদায় নেমে সাউথ সেকশনের ট্রেন ধরবে বা ট্যাক্সি করে নেবে!

টিটিও ওর দিকে তাকাল। মানে কী করবি?

তুয়াদি উঠে দাঁড়াল এবার, “চল নামবি। এখান থেকে মেট্রো করে রবীন্দ্র সরোবর চলে যাব। তাড়াতাড়ি হবে।”

“আমরা ভাবছিলাম,” মাহির তোতলাতে লাগল, “মানে… শিয়ালদা গিয়ে…”

“চল!” তুয়াদি মাহিরের হাত ধরে টানাটানি শুরু করল।

মাহির বাধ্য হয়ে উঠল সিট থেকে। তুয়াদিকে বিশ্বাস নেই। সিন ক্রিয়েট করতে লজ্জা পায় না!

মেট্রোর টিকিট কাউন্টারের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল মাহির। কী সুন্দর বাঁশি বাজছে! ও দেখল একজন বৃদ্ধ বাঁশিওয়ালা সাইডব্যাগে অনেকগুলো বাঁশি নিয়ে বড় গেটের এক পাশে দাঁড়িয়ে। কী অদ্ভুত বাঁশি বাজান মানুষটি!

তুয়াদিও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর এগিয়ে গেল বাঁশিওয়ালার দিকে। মাহির আর গেল না। তুয়াদির এই এক অভ্যেস। সারাক্ষণ কিছু না-কিছু কিনতেই থাকে! ও দেখল তুয়াদি বাঁশি কিনল একটা। মানুষটার সঙ্গে কথাও বলল একটু।

টিটি পাশে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, “শালা, এই মালটা জুটে ঝাড় হয়ে গেল তো! এখন মেট্রোয় যদি আটকায়! আমার যা চেহারা, ক্রিমিনাল বলে ধরে নিয়ে কেলিয়ে লাট করে দেবে! তোকেও হাম্পু কম দেবে না! তুই শালা উঠলি কেন?”

মাহির কিছু বলার আগেই তুয়াদি ফিরে এল, “তোরা কি ক্যালানে? টিকিটের লাইনে দাঁড়াসনি কেন? যা টিকিট কাট আগে!” বলেই একটা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল টিটির দিকে।

টিটি আর কথা বাড়াল না। টিকিটের লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

তুয়াদি তাকাল মাহিরের দিকে। তারপর আলতো করে ওর কনুইয়ের ওপরটা ধরে বলল, “এত ভাল চেহারা তোর। পুলিশে যাস না কেন?”

মাহির কী বলবে ভেবে পেল না।

তুয়াদি আবার বলল, “ফুটবলে কিছু হবে না। আমি যে-কারখানাটা করব সেখানে আমার সঙ্গে কাজ করবি? আমার তো লোক লাগবেই! তুই বেশ ম্যানেজারি করবি। আমার লোক তুই। তোকে তো বিশ্বাস করি আমি।”

মাহির কথাটা শুনে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল! সেদিন পলিও এমন একটা কথা বলেছিল না ওকে!

পলি! নামটা মনে পড়লেই ওর মনে হয় নিউ মার্কেটের ফুলের বাজারে দাঁড়িয়ে আছে ও! এমন একটা মেয়ে এই কলকাতায় ছিল! পলির কথা মনে পড়লে ভেতরে-ভেতরে গলে যায় মাহির। বড়-বড় বাদামি চোখ। অমন টিকালো নাক! এসব মেয়েকে ভগবান কেন পাঠায় ওর সামনে! ও নিজেদের ওই ছোট্ট নোনাধরা ঘরে, চৌকির ওপর শুয়ে রাতে পলির কথা ভাবে। কোলবালিশ জড়িয়ে মনে মনে আদর করে পলিকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বোঝে পলির কথাই মনে পড়ছে। বোঝে এখন উঠে দাঁড়ানো যাবে না সবার সামনে!

ওল্ড এজ হোমটার নাম ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছের গ্রিক চার্চের পাশের গলি দিয়ে কিছুটা গেলে বাঁ দিকে একটা রাস্তা ঢুকেছে। সেই রাস্তার ওপর একটা দোতলা বাড়িতে এই ওল্ড এজ হোমটা বানানো হয়েছে।

রিতুদা বলেছিল ওকে যেতে। পলির সঙ্গে কথা বলে এক শনিবার বিকেলে গিয়েছিল মাহির। টিটি যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মাহির যেতে দেয়নি।

টিটি বলেছিল, “কেন, আমায় নিবি না কেন?”

মাহির গম্ভীরভাবে বলেছিল, “রিতুদা আমায় একাই যেতে বলেছে। তোকে নিলে রাগ করবে!”

টিটি সরু চোখে তাকিয়ে গাঁজার পুরিয়া বানাতে-বানাতে বলেছিল, “ফরসা মেয়েছেলে বলে আমায় কাটিয়ে দিচ্ছ! আমি কি দেখিনি ভেবেছ? সেদিন এসেছিল রিতুদার অফিসে। শালা কারেন্ট অফ-এ মনে হচ্ছিল পাড়ায় সার্চলাইট ঘুরছে! এমন জিনিসের কাছে এক-একা যেতে চাও! আচ্ছা যাও। আমার শালা ব্রিজের পাশের লতুবউদিই ঠিক আছে।”

হোমটার দুটো তলায় তিরিশ জনের মতো থাকেন। সবারই বেশ বয়স হয়েছে। এটা মহিলাদের হোম। পলির সঙ্গে সব ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল মাহির। কীভাবে সবাই থাকেন, কী খান, কোথায় বসে গল্প করেন সবাই, কোথায় রান্না হয়— সবটা দেখছিল।

পলি বুঝিয়ে-বুঝিয়ে দিচ্ছিল নানা জিনিস। আর মাহির মাথা নাড়ছিল খুব। মানে খুব বুঝতে পারছে আর কী, এমন একটা ভাব। কিন্তু আসলে তেমন কিছুই মাথায় ঢুকছিল না! পলির মতো মেয়েদের এত কাছে কোনওদিন আসেনি মাহির।

ওর তো বয়েজ় স্কুল ছিল। তাও সব তেমনই ছাত্র! যেমন তাদের আচার-ব্যবহার তেমন মুখের ভাষা! মেয়েরা চিরকাল ছিল নেপচুন-প্লুটোর বাসিন্দা! তার ওপর মাহির ছিল লাজুক। তাই আরওই কিছু হয়নি!

শুধু স্কুল যাতায়াতের পথে ও বড়-বড় স্কুলের নীল বর্ডার দেওয়া হলুদ বাসগুলো দেখত, দেখত সেই বাসের জানলায় নেপচুন আর প্লুটোর মেয়েরা বসে আছে। দেখলেই যেন মনে হত, এদের কাছে যাওয়া মানা। এদের ভাষা, খাবার, পোশাক সব আলাদা। একদমই ওদের পৃথিবীর মতো নয়।

সেই নেপচুন থেকে পলি যেন নেমে এসেছিল মাহিরের পাশে! হাসলেও যেন ঝকঝকে দাঁতে বিজ্ঞাপনের তিরিশ সেকেন্ড ঝলসে উঠছে! পাশে দাঁড়ালে কী দারুণ সেন্টের… মানে ইয়ে, পারফিউমের গন্ধ! হাত নেড়ে কথা বলার সময় আঙুলগুলো দেখছিল মাহির। নখটাও কি স্কেল দিয়ে মেপে কেটেছে! নেলপলিশ না পরেও কী করে এমন হালকা গোলাপি হয় নখগুলো? সাজেনি একটুও, কিন্তু তাও কেমন যেন ইন্টিরিয়ার ডিজ়াইনার দিয়ে সাজানো একটা মেয়ে! মাহিরের মাথা সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। ও শুধু স্প্রিং-এর ঘাড়ওয়ালা পুতুলের মতো মাথা নাড়ছিল! বুঝতে পারছিল, ওর বারোটা বেজে গিয়েছে! ওই মেঘের ওপারের লোকটা কাঙালকে শুধু শাকের খেতের সামনে দাঁড় করায়নি, গড়িয়াহাট বাজারের রমরমে সবজির দোকানগুলোর সামনে মাটির সঙ্গে পুঁতে দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে!

সব ঘুরে দেখার পরে গেটের কাছে এসে ওরা দাঁড়িয়েছিল। পলি বলেছিল, “ওই সামনে যে-মাঠটা দেখলেন, ওটা আমাদের ছিল। একটা ক্লাব ইদানীং দখল করে নিয়েছে। ওটা যদি খালি করিয়ে দিতেন একটু, তা হলে বাড়ি আর মাঠটা নিয়ে পাঁচিল তুলে দিতাম আমরা। বয়স্ক মানুষগুলোর একটু হাঁটার জায়গা হত। আর-একটা উইংও খুলতে পারতাম। বেশির ভাগ মানুষ তো এই বয়স্কদের ফুরিয়ে যাওয়া, বাতিল হয়ে যাওয়া ব্যাটারি মনে করে! জীবনে মানুষ তো গুডনেসের পেনশন পায় না!”

মাহির যত না কথা শুনছিল, তার চেয়ে বেশি দেখছিল পলিকে। এমন একটা মেয়ে এসব করে! শুনেছে মাস্টার ডিগ্রিও করছে! এত কিছু সামলায় কী করে? ওর তো একটুতেই সব কিছু জড়িয়ে, গিঁট পাকিয়ে যায়!

পলি কথা বলতে-বলতে নিজের অজান্তেই আলতো করে ছুঁয়েছিল মাহিরের হাতটা। বলেছিল, “আমরা নিজেরা টাকাপয়সা নিই না। তাই যদি রিতুদাকে একটু বলেন ব্যাপারটা। প্লিজ়!”

মাহিরের মনে হয়েছিল, ওর হাতে থাকলে সারা ভারতবর্ষের বাজেট এই হোমের পেছনে দিয়ে দেয়! কিন্তু ওর হাতে তো কুড়ি টাকার মিষ্টি কিনে দেওয়ারও ক্ষমতা নেই!

মাহির বলেছিল, “আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব, কথা দিলাম।”

কথা দিল? শেষের দুটো শব্দ বলেই মনে হয়েছিল, এই রে! বেশি বলে ফেললাম কী? মেয়েটা কি ওর হ্যাংলামো বুঝে ফেলল? শুনেছে মেয়েরা নাকি খুব বুঝতে পারে এসব জিনিস। মাহির মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। নিজের সস্তার জামা, রং নিভে আসা প্যান্ট, চল্‌টা ওঠা স্নিকার্স দেখে মনে হচ্ছিল, ওর নিজেরই তো ত্রাণ আর সাহায্য দরকার। এখানে ও কিনা এসব নিয়ে আর্জি শুনছে!

“আপনি চেষ্টা করলেই হবে, আমি জানি আপনি চেষ্টা করবেন, আমি ভরসা করছি আপনার ওপর… বিশ্বাস করছি,” পলি কথাটা বলে আকাশজোড়া বড়-বড় চোখ তুলে তাকিয়েছিল মাহিরের দিকে। আর মাহির বুঝেছিল এমন আকাশ আছে বলেই মানুষের মাঝে মাঝে পাখি হতে ইচ্ছে করে!

রিতুদা ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছিল পঁচিশ সেকেন্ডে। বলেছিল, “আরে, মেয়েটা মাথা খেয়ে নেয় একদম! তাই তোকে পাঠিয়েছিলাম। ও পরে দেখব। এখন সোনাঝুরির দিকে মন দে। শালা ওখানে টাকার বৃষ্টি শুরু হল বলে! শোন, আমাদের দেশে আসল রেন ওয়াটার হারভেস্টিং হোক আর নাই হোক, টাকার বৃষ্টি হলে সেই হারভেস্টিং-এর জন্য লোক সবসময় রেডি থাকে!”

“আমি কিন্তু দেখলাম রিতুদা, ওদের ফান্ডের দরকার। কত বয়স্ক মহিলারা থাকেন! প্লাস ওদের ওখানে একটা ক্লাব জবরদখল করে…” মাহির উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল একটু।

রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর হেসে বলেছিল, “ফরসা মেয়েছেলে দেখলে অনেকেই পিছলে যায় খোকা। কিন্তু কাজের সময় আলুবাজি নয়! প্রফেশনাল ফিল্ডে আলুবাজি করেছ কি গেছ! এখন আমাদের সোনাঝুরিতে মন দিতে হবে, কেমন?”

মেট্রো থেকে রবীন্দ্র সরোবরে নেমে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মাহির। রবিবার বলেই কি না কে জানে, ট্রেনে কী ভিড়! দমদমে এত ভিড় যে, গেটে কোনও চেকিং হয়নি আজ। ট্রেনটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা কোনওমতে দৌড়ে উঠেছিল কামরায়। এসি রেক পায়নি, তাই সারাক্ষণ বিকট শব্দ আর গরমে সেদ্ধ হতে হতে এসেছে। তুয়াদি লেডিজ় সিটে জায়গা পেয়ে গিয়েছিল বলে আর সারাটা রাস্তা গায়ের ওপর পড়েনি ওর।

ট্রেন থেকে নামার সময় একদম ওর পেছনে এসে লেপটে ছিল গায়ের সঙ্গে। কিন্তু সেটা ভিড়ের ঠেলায় না ইচ্ছে করে, তা জানে না মাহির। আর সত্যি বলতে কী, জানতেও চায় না। বেকার এসব জিনিস নিয়ে মাথা ভরতি করে নিলে আর বাঁচা যাবে না।

টিটি যতীন দাস পার্কেই নেমে গিয়েছে। কী একটা কাজ আছে নাকি ওর! তাই এখন স্টেশন থেকে তুয়াদি আর মাহির বেরোল।

রবীন্দ্র সরোবর স্টেশন থেকে ওর বাড়ি হেঁটে দশ মিনিট। কিন্তু রাস্তায় বেরোতে গিয়ে থমকে গেল মাহির। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এদিকে ও ছাতা আনেনি। ভাগ্যিস টাকাগুলো প্লাস্টিকে মোড়া আছে! আর দু’হাজার টাকার নোট বলে বিশাল কিছু জায়গাও নিচ্ছে না।

পাশে একটা লোক এসে দাঁড়াল এবার। না, ঠিক লোক নয়। একটা ছেলে। সামান্য এলোমেলো চুল। চোখে চশমা। জামাটা অর্ধেক গোঁজা। এক হাত দিয়ে বোতাম টিপে ছাতা খুলে কানে ধরা ফোনে বলল, “আরে, কাল আমি অফিসে গিয়ে বলব। এখন সময় নেই। প্যাঁও ওয়েট করছে। আমি রাখি। কেমন?”

প্যাঁও! মাহিরের হাসি পেল। দেখল, ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে সামনে এসে দাঁড়ানো একটা বাসে উঠে পড়ল। মাহির ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছ’টা বাজে। ভাবল, টাকাগুলো যখন প্লাস্টিকে মোড়া আছে, ও হেঁটেই বেরিয়ে যাবে। একবার বাড়ি হয়ে তারপর রিতুদার অফিসে যাবে। টাকাগুলো দিতে হবে যে।

কথাটা তুয়াদিকে বলতে, তুয়াদি ওকে ছাড়ল না। বলল, “একই জায়গায় যাব যখন, অমন নাটক করার কী আছে? দিন কে দিন ঢ্যামনা হয়ে যাচ্ছিস তুই!”

সামনেই সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখান থেকে রিকশা পেয়ে গেল ওরা। নিজের ব্যাগের সঙ্গে তুয়াদির ব্যাগটাও ধরেছে মাহির। সামনে প্লাস্টিক ফেলা। তুয়াদি যেন কোলের ওপর উঠে আসছে ক্রমে!

মাহিরের দম আটকে আসছে! ও রাস্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করল। তুয়াদি আজকাল এমন করছে কেন! ছোট থেকে চেনে তুয়াদিকে। এমন তো করে না!

পাশ দিয়ে হুস-হুস শব্দে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে! রবিবার কলকাতার দোকানপাট বেশির ভাগই বন্ধ থাকে। রাস্তায় লোকজনও কম।

তুয়াদি বলল, “তুই অমন করে মুখ ফিরিয়ে আছিস কেন?”

“না, এমনি,” মাহির বিরক্তিটা আর লুকোতে পারল না।

“খুব তেজ হয়েছে, না? রাগ দেখাচ্ছিস কেন?” বলেই মাহিরের থাইয়ের ওপরের দিকটায় একটা চিমটি কাটল জোরে।

মাহির দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করল। চোয়াল শক্ত করে বলল, “কী করছ তুমি?”

তুয়াদি দাঁত ঘষে বলল, “বুঝতে পারছিস না?”

মাহির হতভম্ব হয়ে গেল একদম। কী বলবে বুঝতে পারল না।

তুয়াদি বলল, “আমি মানুষ নই! আমার ইচ্ছে করে না! অনেকদিন ভাল হয়ে থেকেছি, আর নয়। তোর ভাইকে কেন দেখি আমি? বুঝিস না? আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই আর!”

“তুমি তো ভাইকে ভালবাসো নিজের সন্তানের মতো,” মাহির কোনওমতে বলল কথাগুলো!

“শুধু কি সেটাই কারণ ভেবেছিস! আমার বুঝি ইচ্ছে নেই! বিয়ে হয়নি বলে তো আর শরীর মরে যায়নি!” তুয়াদি যেন ফুঁসছে! মাহিরের পা খামচে ধরেছে! তুয়াদি বলল, “আমায় যদি না দিস, আর তোর ভাইকে দেখব না।”

“রিকশাওয়ালা শুনছে! প্লিজ়!” মাহির কাতর গলায় বলল।

তুয়াদি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সংযত করল। বলল, “দাদাদের কাছে আমি বেগার খাটব! তোর ভাইকে দেখব! সারাক্ষণ সেলাইয়ের কাজ করব! কেন রে? আমার আহ্লাদ নেই? আমার প্রেম-টেম দরকার নেই, কিন্তু ওইটা আমি চাই! তুই ওটা দিবি। ব্যস! আর কিছু শুনব না আমি।”

রিকশা এসে গিয়েছে ওদের বাড়ির সামনে। তুয়াদি নিজের ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দুড়দাড় করে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে!

মাহির কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছে। এই তো সব ঠিক ছিল। সেখানে তুয়াদির কী হল হঠাৎ! এমন করে এসব কী বলল! তুয়াদি ওর চেয়ে অনেক বড়। সে এমন কথা ওকে বলল কী করে?

মাথা কাজ করছে না মাহিরের। ও কোনওমতে বাড়ির দিকে এগোল।

বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট ঢাকা দেওয়া বারান্দা। তার এক কোণে জুতো খুলল ও। তারপর অন্যমনস্কভাবে ঘরে ঢুকল। সামনের দরজা খোলাই থাকে মা ঘরে থাকলে। তাই ভাবল ঢুকে হয়তো মাকে দেখবে।

কিন্তু ঘরে পা দিয়েই চমকে উঠল মাহির।

“এই যে! কোথায় থাকেন আপনি? ফোন করে করে আঙুল ব্যথা হয়ে গেল! নট রিচেব‌্‌ল, নট রিচেব‌্‌ল বলছে! রিচের বাইরে কী করেন সারাক্ষণ! আপনার টিকির দেখা নেই কেন? সেই যে কথা দিলেন, তার কী হল?”

মাহির দেখল ওর মা আর ভাই বসে আছে বিছানায়। আর ওদের পাশে একটা দামি লেডিজ় ব্যাগ রাখা। আর ব্যাগের মালকিন সামনে দাঁড়িয়ে ধমক দিয়ে চলেছে ওকে।

ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বাইরে কোনও মহাকাশযান দেখল না তো! তা হলে নেপচুন থেকে মেয়েটা এল কী করে ওর এই লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া, নোনাধরা ঘরে!

মেয়েটা এখনও রাগত স্বরে কিছু বলে যাচ্ছে। মা আর ভাই বসে অবাক হয়ে শুনছে মেয়েটার কথা। কিন্তু মাহির কিচ্ছু শুনছে না। কোনও কথাই ঢুকছে না ওর কানে।

ওর শুধু মনে হচ্ছে, মেয়েটা কি একটা সরল সত্যি বুঝতে পারছে না? নেপচুনের নেটওয়ার্ক থেকে এই নোনাধরা পৃথিবীর নেটওয়ার্ক কি কেউ ধরতে পারে?

.

১৯. রাধিয়া

কাল রাধিয়ার জন্মদিন। বাড়িতে বেশ বড় পার্টির আয়োজন হয়েছে। এসব ভাল লাগে না ওর। কিন্তু ওর কোন ভাল লাগাটার মূল্য আছে যে, এটারও মূল্য থাকবে? মা এসব পছন্দ করে, তাই হবে! কী হয় এসব করে ও জানে না। একটা রেস্তরাঁ ভাড়া করা হয়েছে পার্ক স্ট্রিটে। বেশ কয়েকজন নামী মানুষকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে। ওকেও মা বলেছে ওর বান্ধবীদের নেমন্তন্ন করতে। অবাক হয়ে যায় রাধিয়া। মা কী করে এমন বোকা হয়ে থাকতে পারে? বাবা কী করে চলেছে, সেটা কি মা জানে না?

সেই বিকেলটার পর থেকে রাধিয়ার আজকাল আর কিছু ভাল লাগছে না। কথাটা কাউকে বলতেও পারছে না। আসলে কাকে বলবে বুঝতে পারছে না। এই বিষয়ে ওকে কে সাহায্য করতে পারে? মাকে বললে বিশাল একটা গোলমাল হবে ও জানে। ঠাকুরমার বয়স হয়েছে। তা ছাড়া ঠাকুরমা খুব গম্ভীর। বিশেষ কথাবার্তা বলে না কারও সঙ্গে। তা হলে বাকি কে রইল? বুদা? পলি? জয়তী? এদের কি বলা যায়? কিন্তু একটা ব্যাপার মনে মনে জানে রাধিয়া। ওর আসলে বন্ধু বলে কেউ নেই সেভাবে। একটা গ্রুপে থাকে বটে, কিন্তু সেখানেও কাউকেই ঠিক নিজের করে ভাবতে পারে না রাধিয়া। কেউ ওকে ঠিক বোঝে না। তবে এই না-বোঝার ব্যাপারটা বোধহয় পৃথিবীর সব মানুষেরই সমস্যা।

আসলে পলি, জয়তী বা বুদা এরা সকলে ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বললেও, একটা জিনিস রাধিয়া বোঝে, ওদের যে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটা ভাল, এটা নিয়ে অনেকেরই একটা প্রচ্ছন্ন হিংসে বা বিরক্তি আছে!

সোনাঝুরিতে একবার লোকাল ট্রেনে করে গিয়েছিল রাধিয়া। সেটা নিয়েও বান্ধবীদের মধ্যে ওকে নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছিল! যেন এটা একটা খেয়াল ওর! একটা শখ! যেন নতুন কিছু খেলনা! আসলে রাধিয়ারও যে নিজের মতো থাকতে ইচ্ছে করে, এই পৃথিবীটাকে ওর নিজের মতো করে দেখতে ইচ্ছে করে, সেটার যেন কোনও মূল্য নেই! সবটাই ওকে অন্যের ঠিক করে দেওয়া প্যারামিটার অনুযায়ী করতে হবে।

বান্ধবীদের খ্যাপানোতে ও তেমন কিছু মনে করে না। কিন্তু একটা জিনিস বোঝে, ওকে সিরিয়াসলি কেউ নেয় না।

এই যে বাবার ব্যাপারটার পর প্রায় সপ্তাহদুয়েক ও কোলাপস করে গিয়েছিল, সেটা নিয়ে এখন ভাল করে ভাবলে রাধিয়া বুঝতে পারে, আসলে বিশ্বাস ভাঙার সঙ্গে-সঙ্গে ওর মনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করছিল। ঠাকুরমা আর বাবার নামেই ওদের এত সম্পত্তি ও ব্যাবসা। তাই বাবা উলটোপালটা কোনও সম্পর্কে আটকে পড়লে তার প্রভাব পড়বে ওদের জীবনেও। যেটাকে খুব নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ মনে হচ্ছে, আসলে সেটা খুব একটা নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ থাকবে না। এখনও কাউকে কিছু বলেনি, কিন্তু ও ক্রমশ বুঝতে পারছে, জীবনে বারবার যখনই নিরাপত্তার ওপর কোনও অনিশ্চয়তা আসবে, তখনই এমন করে ভেঙে পড়বে ও। তাই নিজের নিরাপত্তার দিকটা নিজেকেই দেখতে হবে। ও জানে শেষমেশ সবটাই হয়তো ওরই হবে! কিন্তু ভবিষ্যৎ কে দেখেছে?

“কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোকে আমরা খুঁজছি!”

পলির ডাকে মুখ তুলে তাকাল রাধিয়া। সারা দুপুর বৃষ্টির পরে এখন আকাশ কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যেন। তার ঢাল বেয়ে সূর্য ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে পশ্চিমে! মেঘে মেঘে ছিন্নভিন্ন আকাশে এক বাক্স ক্রেয়ন কে যেন ইচ্ছেমতো ঘষে দিয়েছে! কলেজ স্ট্রিটের এই জায়গাটায় দাঁড়ালে এটুকুই আকাশ দেখা যায়। বাকিটা তো, রাধিয়ার মনে হয়, যেন অগোছালো একটা ঘর! মনখারাপ থাকলেই রাস্তার এই জায়গায় এসে দাঁড়ায় ও। পাশেই ফিরোজভাইয়ের বইয়ের দোকান। ফিরোজ চেনে রাধিয়াকে। নিজের টুলটাকে এগিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। কিন্তু রাধিয়া বসতে চায় না। বসে পড়লে আকাশটাকে এই কোণ থেকে দেখা যায় না!

পলি আজ জিন্‌স আর হাতকাটা কুর্তি পরে এসেছে। ঢেউ খেলানো চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে মাথার ওপর টেনে আটকানো। মুখে একটা হন্তদন্ত ভাব।

“কেন?” নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল রাধিয়া।

“আশ্চর্য!” পলি বিরক্ত হল, “আজকাল এত আতা হয়ে গিয়েছিস! বাংলা অ্যাকাডেমিতে যাবি না? ভুলে গেলি?”

ও তাই তো! রাধিয়ার মনে পড়ে গেল। সুম্পার দাদাদের কীসব অনুষ্ঠান আছে। সেখানে আবার পলিদের ওই ওল্ড এজ হোমের নামটাও জড়িয়ে আছে! সে জন্য সুম্পা আর পলি দু’জনেই ওকে যেতে বলেছে। রাধিয়া প্রথমে ভেবেছিল যাবে না। কিন্তু এখন মন পালটেছে। বাড়ি গিয়েই-বা কী করবে? মা কালকের অনুষ্ঠান নিয়ে মেতে আছে। আর বাবার আজকেও কী এক কাজ আছে, আমদাবাদ যেতে হবে বলে সকালে বেরিয়ে গিয়েছে। গতকাল রাতে বাবার সঙ্গে মায়ের চাপা ঝগড়া শুনেছিল রাধিয়া। আসলে ওর ঘরটা দোতলার কোণে। ঘর থেকে বেরিয়ে একটা লম্বা করিডর পেরিয়ে দোতলার টেরাসে যাওয়া যায়। রাতে মাঝে মাঝে সেই টেরাসে গিয়ে একা-একা হাঁটে রাধিয়া। ভাল লাগে ওর।

গতকাল রাতের বৃষ্টির পরে মেঘ কেটে চাঁদ বেরিয়েছিল আকাশে। সারাক্ষণ এসি-তে থাকতে-থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল রাধিয়া। এমনিতেই ওই ঘটনাটার পরে আজকাল ঘুম আসতে চায় না ওর। গতকালও তাই হয়েছিল। ও ভেবেছিল টেরাসে গিয়ে একা-একা হাঁটবে একটু। বৃষ্টির পরে চাঁদ উঠলে আকাশটা একদম অন্যরকম লাগে।

টেরাসে যাওয়ার বড় কাচের দরজাটা বাবা-মায়ের ঘরের সামনেই। রাধিয়া দরজার হাতলে হাত দিয়ে পাল্লাটা খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মায়ের চাপা গলার চিৎকারটা শুনতে পেয়েছিল ও! একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিল রাধিয়া। মা খুব সচেতন থাকে এমন চিৎকার-চেঁচামেচি করার ব্যাপার নিয়ে। কারণ, ওদের বাড়িতে কাজের লোকজন আছে অনেক। মা চায় না ব্যক্তিগত কোনও ব্যাপার সেই সব লোকের আলোচনার বিষয় হোক!

তাই রাধিয়া অবাক হয়ে গিয়েছিল! মায়ের এমন গলা তো আগে শোনেনি! যদিও রাত একটা বেজে গিয়েছিল। পুরো বাড়ি শুনশান ছিল, কিন্তু তাও মায়ের এমন গলা শুনে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল রাধিয়া। ওর নিমেষের জন্য মনে হয়েছিল, তবে কি মা জেনে গেল সবটা! তা হলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! ও জানে এমনভাবে আড়ি পাতা খুবই অনুচিত কাজ, কিন্তু জীবন নিজে তো সবসময় উচিত আর অনুচিত ভেবে চলে না! তাই তাকে সামলাতে মাঝে মাঝে মানুষই এমন অনুচিত কাজ করে ফেলে। রাধিয়াও তেমনই ঠিক হচ্ছে না জেনেও দাঁড়িয়ে পড়েছিল দরজার সামনে। খুব লজ্জা করছিল আর খারাপও লাগছিল। কিন্তু কেমন একটা জান্তব প্রবৃত্তি যেন তাড়া করছিল ওকে! ক্রেভিং হচ্ছিল, কী কথা হয় জানার জন্য। ভয়ের মধ্যেও যে একরকমের থ্রিল থাকে সেটা বেশ বুঝতে পারছিল!

মা বলেছিল, “এটা এখন বলছ? এই মাঝরাতে বলছ? পরশু মেয়ের জন্মদিন আর আজ বলছ?”

বাবার গলাটা আস্তে ভেসে আসছিল। রাধিয়া শুনেছিল, বাবা বলছে, “আমি কি জানতাম যে, এমন এমার্জেন্সি হবে! আর তেইশ বছর হচ্ছে মেয়ের। খুকি নয়। তোমার কী দরকার আছে, এমনভাবে পার্টি দেওয়ার? কোনও মানে হয়!”

“আমার একমাত্র মেয়ে না? আর টাকার তো অভাব আছে বলে জানি না আমাদের। তা হলে মেয়েটার জন্য যদি একটু খরচ করি আপত্তি কোথায়?”

“আমি কি টাকার কথা বললাম?” বাবার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট টের পেয়েছিল রাধিয়া।

বাবা বলেছিল, “আমি কি সেটা বলেছি? বলছি এমন শো অফ করার কী আছে?”

“কথা ঘুরিয়ো না,” মায়ের গলা শুনেই রাধিয়া বুঝতে পারছিল, মা খুব কষ্ট করে নিজেকে সংযত রাখছে! মা বলেছিল, “তুমি কেন থাকবে না পার্টিতে? কী এমন রাজকার্য পড়ে গেল?”

“রাজকার্য?” বাবা হেসেছিল। ব্যঙ্গের হাসি। বলেছিল, “তোমায় বললেই বুঝবে? বাজে প্রশ্ন করছ কেন? কী মনে হয়, এত বড় বিজ়নেস এমনি চলছে? মা-তো তিনতলায় নিজের ঘরে বসে থাকে। বোর্ডের ডাইরেক্টরদের কে ফেস করে? এত সব কাজ কে সামলাবে? বাড়িতে বসে মেয়ের সঙ্গে কেক কাটলে কি আমার চলবে?”

মা বলেছিল, “আজকাল খুব ট্যুর বেড়ে গেছে তোমার! কী এমন কাজ যে, একদিন দেরি করে গেলে হবে না?”

“জার্মানি থেকে ডেলিগেটসরা আসবে। তাদের তুমি বোলো যে, মেয়ের জন্মদিন, আপনারা পরে আসবেন! কথা বলো এমন!”

“তাও এটা তুমি ঠিক করোনি!” মা কোথাও হেরে যাচ্ছিল যেন। যেন বুঝতে পারছিল বাবা যা বলছে, তা সত্যি হয়েও কোথায় যেন সত্যি নয়! কিছু যে একটা গোলমাল আছে, মায়ের মন যেন বুঝতে পারছিল! রাধিয়ার খালি মনে হচ্ছিল দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বলে দেয়, ও কী দেখেছে! বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ওদের মিথ্যে কথা বলে কার কাছে যায়? জিজ্ঞেস করে, কার জন্য কাজকর্ম আর মেয়ের জন্মদিন সব উপেক্ষা করে থাকে! কতদিন ধরে চলছে এসব? কত দিন ধরে সবাইকে এমন করে বোকা বানাচ্ছে বাবা?

কিন্তু রাধিয়া পারে না। কিছুতেই কঠিন কথা কাউকে বলতে পারে না। ঠাকুরমা ওকে বলে, “মনের কথাটা বলতে হয় রাধি। তোর ইচ্ছেটা স্পষ্ট করে বলবি। যা মনে হয় কাউকে অপমান না করে সহজভাবে বলবি। জানবি কেউ তোর মনের মধ্যে ঢুকে কিছু জেনে নেবে না!”

টেরাসে আর যেতে পারেনি রাধিয়া। ঘরেই ফিরে এসেছিল। কেমন একটা খালি-খালি লাগছিল শরীরটা। মনে হচ্ছিল, কয়েক লক্ষ ঝিঁঝিপোকা এসে ঢুকে পড়েছিল ওর শরীরে! বাবা আবার যাবে? কার কাছে যায় বাবা? কী করে সেখানে? ওর মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। খালি মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সব ভেঙে গেল! সব নষ্ট হয়ে গেল! আর খুব বেশি করে যেন মনে হচ্ছিল, ওর নিজের কোনও দাঁড়ানোর জায়গা নেই। এত সম্পত্তি, এত ব্যাবসা, এত কিছু আসলে যেন তাসের ঘর! বুঝতে পারছিল মানুষের নিজের অর্জন করা জিনিস ছাড়া তাকে আর কেউ সঙ্গ দেয় না, সাহস দেয় না, ভরসা দেয় না।

“তুই যাবি, না যাবি না? তখন থেকে খুব পাঁয়তারা করছিস!” পলি বিরক্ত হল।

রাধিয়া হাসল জোর করে। আসলে একটুও হাসি পাচ্ছে না। খালি মনে হচ্ছে বাবা কী করছে? কোথায় গিয়েছে? কার সঙ্গে আছে এখন?

“হাসলে হবে?” পলি বিরক্ত হল, “আরে চল। এখানে দাঁড়িয়ে কীসের শোভা দেখছিস? ওই দেখ মেঘ করছে আবার। চল।”

সূর্য সেন স্ট্রিটের পাশে গাড়িটা রাখা আছে। এদিকটা এখন ওয়ান ওয়ে। সব গাড়ি উত্তর দিকে চলেছে। মধুদাকে ফোন করে গাড়ি নিয়ে আসতে বললে দেরি হয়ে যাবে। তার চেয়ে হেঁটে চলে যাওয়া অনেক সুবিধেজনক।

“চল,” বাকিদের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় নামল রাধিয়া।

গাড়ি আসছে হু হু করে। রাস্তা পার হওয়াই সমস্যা। একটা হাওয়া দিচ্ছে আজ। বেশ সুন্দর হাওয়া। গাছ থেকে পাতা আর হলুদ-হলুদ ফুল উড়ে আসছে! আশপাশের দোকানদাররা চিৎকার করছে। লোকজন কেউ ব্যস্ত হয়ে হাঁটছে, আবার কেউ দাঁড়িয়ে অলসভাবে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। কেউ হাসছে, আবার কেউ মনমরা! অদ্ভুত এক শেড কার্ড এই শহর!

সূর্য সেন স্ট্রিটে রোদ নেই। বাঁ দিকে সার-সার দোকান। ডান দিকেও তাই। ওই বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে বেশ জটলা। ওখানে মাঝে মাঝে ওরা কচুরি খেতে আসে। কী ভিড়, কী ভিড়! বুদা তো বলে, “শালা, এভাবে টেনশন নিয়ে লেখাপড়া করে কী হয়! ইংরেজি নিয়ে ঘষে যাচ্ছি! তার চেয়ে এমন একটা কচুরির দোকান করলে তো কাজ হয়!”

আজও দোকানটায় বেশ ভিড়। বসার জায়গা নেই। একটু পাশে আর-একটা দোকান। পরোটা, কাবাব আর রোলের। এসব জিনিস খুব একটা খায় না রাধিয়া। এই নিয়েও ওকে বান্ধবীরা খ্যাপায়।

রাধিয়া পেছন দিকে তাকাল। পলি, বুদা আর জয়তী আসছে পেছনে। সবাই ওর গাড়ি করেই যাবে।

কবিতা পাঠ, গান, গল্প পাঠ এসব হবে। রাধিয়ার যেতে ইচ্ছে করছে না একদম! কিন্তু সবসময় তো আর নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করা যায় না! সকলের মধ্যে থাকতে হলে সকলের মতো করেও থাকতে হয়!

“এই রাধি,” পেছন থেকে বুদা এসে কাঁধটা জড়িয়ে ধরল, “কী হয়েছে?”

“কী হবে?” বুদার হাতটা সরিয়ে দিল রাধিয়া।

“আজকাল কেমন যেন হয়ে থাকিস! কেসটা কী তোর?”

“কিছু না তো!” রাধিয়া হাসার চেষ্টা করল!

বুদা বলল, “আরে, কিছু তো হয়েইছে। তোকে কি আজ থেকে দেখছি নাকি? কী হয়েছে? প্রেমে পড়েছিস?”

“কী?” রাধিয়া বিরক্ত হল, “হঠাৎ এমন মনে হওয়ার মানে?”

“আরে, প্রেমে পড়লেই মানুষ এমন করে। দেখিস না? কেমন একটা ক্যালানে টাইপ হয়ে যায়! শালা, প্রেম হল ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো! বহুত ভোগায়!”

রাধিয়া বলল, “না, প্রেমে পড়িনি। কেউ চুপচাপ হয়ে গেলেই কি তাকে প্রেমে পড়তে হবে? তার কি আর কিছু চিন্তা থাকতে পারে না? জানবি সবার জীবনে তার-তার মতো করে ক্রাইসিস থাকে। সে সব নিয়ে কথা না বলাই ভাল।”

“রাগছিস কেন?” বুদা হেসে সামান্য ধাক্কা মারল রাধিয়াকে। বলল, “কাল তো বার্থ ডে। কী নিবি বল?”

“কী আবার নেব?” রাধিয়া ভুরু কুঁচকে তাকাল, “জানিস না আমরা কোনও গিফট অ্যাকসেপ্ট করি না! জাস্ট চলে আসবি সন্ধে ছ’টার মধ্যে!”

“দূর, সে তো এমনি লোকেদের জন্য,” বুদা নাছোড় গলায় বলল, “আমরা সেসব শুনব কেন? আমরা তো কিছু দেবই!”

“মার খাবি,” রাধিয়া হাসল, “কিছু আনবি না।”

বুদা এদিক-ওদিক দেখে চট করে কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “ওই সব নিবি?”

“মানে? কীসব?”

“আরে, অ্যাডাল্ট টয়! নিবি?” বুদা তাকাল।

“কী?” অবাক হয়ে গেল রাধিয়া।

“ভাইব্রেটর, ডিলডো। বুঝিস না! আজকাল এখানেও পাওয়া যায়। আমার একটা আছে। তোর শিয়োর নেই। নিবি?”

“কীসব বাজে কথা বলছিস?” নিমেষে কান লাল হয়ে গেল রাধিয়ার।

“লজ্জা পাচ্ছিস কেন?” বুদা ঠোঁট কামড়ে তাকাল ওর দিকে, “উই অলসো হ্যাভ নিডস। ডোন্ট ইউ? আর এসব বানানো হয় কেন? মেয়েদের সেক্সুয়ালিটি বহু-বহু শতক ডিপ্রেসড ছিল। আর কতদিন? আর এটা তো ন্যাচারাল ব্যাপার। এটাকে নিয়ে এমন একটা ট্যাবু বানানোর কী আছে কে জানে! আমাদের দেশে শালা জাত-পাত-ধর্ম নিয়ে সারাক্ষণ মারামারি চলছে আর যৌনতা নিয়ে ছুঁতমার্গ এখনও গেল না। ডিজিটাল ইন্ডিয়া স্লোগানেই হয়েছে। আসলে মধ্যযুগ কাটেনি।”

“বাপ রে!” রাধিয়া বলল, “এমন বড় বক্তৃতা শিখলি কোথা থেকে? পলিটিক্স তো করিস না!”

বুদা বলল, “শিখতে হয় না। যা চলছে চারদিকে, সেই দেখে আপনা থেকেই বুকের ভেতর সব গজিয়ে ওঠে!”

রাধিয়া বাঁ দিকে ঘুরল এবার। সামনেই বিখ্যাত শরবতের দোকান। সামনেই ওদের গাড়িটা দেখতে পাচ্ছে। মধুদা গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। রাধিয়াকে দেখেই মধুদা মোবাইলটা বুকপকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘুরে ড্রাইভার ওঠার দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

বুদা গিয়ে উঠল সামনে। পেছনে জয়তী, পলি আর রাধিয়া বসল। মধুদা জানত ওরা কোথায় যাবে। সকালে ইউনিভার্সিটি আসার সময়ই বলে রেখেছিল রাধিয়া।

রাস্তায় সাংঘাতিক জ্যাম। এই গলিটা সরু। তার মধ্যে রাজ্যের গাড়ি এসে পার্ক করে। বাঁ দিকে ফুটপাথ বলে কিছু নেই আর। সব দোকানে ভরতি। অবশ্য কলকাতায় ফুটপাথ জিনিসটা আর আছেই-বা কোথায়! কেনার চেয়ে বিক্রি করার লোক এখন বেশি!

মিনিট দশেকের চেষ্টায় গাড়িটা বড়রাস্তায় বের করতে পারল মধুদা। এবার বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের দিকে এগোচ্ছে গাড়ি। রাস্তার ভিড় থাকলেও খুব একটা আটকাচ্ছে না।

রাধিয়া দেখল মেঘ ঘনাচ্ছে আবার। আকাশ কালো হতে শুরু করেছে। হতেই পারে। বর্ষাকাল। আগস্টের শুরু সবে। তা ছাড়া এবার নাকি বৃষ্টি কম হয়েছে। আবহাওয়ার যা অবস্থা, তাতে আর কী-ই বা হতে পারে! রাধিয়ার মনে হয় মানুষ নিজেই নিজের ঘরে আগুন লাগাচ্ছে আর নিজেই বলছে কী গরম!

“তা তুই কি রেজ়াল্ট বেরোনোর পরেই বেরিয়ে যাবি?” জয়তী অন্যপাশ থেকে ঝুঁকে তাকাল রাধিয়ার দিকে।

“মানে?” পলি অবাক হল।

রাধিয়া দেখল বুদাও সামনের সিট থেকে পেছনে ফিরে তাকিয়েছে।

রাধিয়া সময় নিল। কিছুদিন আগে ক্যান্টিনে বসে এই কথাটা জয়তীকে বলেছিল রাধিয়া। বলেছিল, কথাটা যেন গোপন রাখে। এখনই কাউকে বলার দরকার নেই। আসলে, পলি আর বুদা সব কিছু নিয়েই বড্ড হইচই করে!

“কী রে? কেসটা কী?” পলি খোঁচা দিল।

রাধিয়া হাসল, “তেমন কিছু না। ওই জাস্ট একটা ব্যাপার। বাবা বলেছিল। তাই…”

“আশ্চর্য! এত ধানাইপানাই করছিস কেন? বিয়ে করবি নাকি?” বুদা সামনের সিটে বসে ছটফট করল, “বেরিয়ে যাবি মানে? স্যাটেলাইট তো নোস যে, ইসরো তোকে লঞ্চ করে পৃথিবী থেকে বের করে দেবে! যাবিটা কোথায়?”

“ওই বাবা বলছিল আমেরিকায় পাঠাবে। ম্যানেজমেন্ট পড়তে! তাই…”

“ও বাবা!” পলি বলল, “এটা বলিসনি কেন?”

“আমি যাব কি না, তার ঠিক নেই। তাই…” রাধিয়া কথা শেষ না করে চুপ করে গেল।

বুদা বলল, “যাবি না কেন? তোদের যা পয়সা তাতে তো সারা জীবন তোকে ওখানে রেখেই পড়ানো উচিত ছিল!”

রাধিয়া চুপ করে গেল। এইসব নিয়ে কী আর কথা বলবে! এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। সেই এইচএস-এর পর থেকে বাড়িতে এই নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরমার সমর্থন পেয়েছে বলে এখনও ও এই শহরে রয়ে গিয়েছে। মা এই নিয়ে মাঝে মাঝেই ওকে খোঁটা দেয়। বলে, “ঠাকুমার রক্ত গায়ে আছে তো, তাই এমন হয়েছিস! মিডলক্লাসনেস একটা ডিজ়িজ়! এখানে ইংলিশ নিয়ে না পড়ে বাইরে গিয়ে পড়তিস! তা নয়, এখানে টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে।”

বাবাও সেদিন খেতে বসে আচমকা এই প্রসঙ্গটা তুলেছিল। এমনিতেই আজকাল বাবার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না রাধিয়ার। আসলে বড় হওয়ার পর বাবাকে খুব একটা কোনওদিনই পায়নি রাধিয়া। ছোটবেলার সেই “আমার পরি!” বলে ওকে জড়িয়ে ধরা মানুষটা যেন আর নেই! তাই সেভাবে খুব একটা সহজ নয় ও বাবার কাছে। আর এখন তো বাবাকে দেখলে ওর রীতিমতো বিকর্ষণ হয়। কেবলই মনে হয় বাবা ওদের ঠকাচ্ছে।

বাবা বলেছিল, “রাধি, তোকে স্টেটসে পাঠিয়ে দেব মাস্টার্স কমপ্লিট হলে। আমি কথা বলে রেখেছি। সামনের অক্টোবরে যাব যখন, সব দেখে-শুনে আসব। আর এখানে নয়। আমাদের বিজ়নেসে তোকে তো জয়েন করতে হবে। সো ইউ নিড টু লার্ন ফ্রম দ্য বেস্ট। আমাদের ইচ্ছে আছে দুবাইতেও কিছু এক্সপ্যানশনের। ফলে উই নিড অ্যান এব্‌ল ম্যানেজমেন্ট! সো গিয়ার আপ। প্রিপেয়ার ফর কামিং ব্যাটল্স।”

রাধিয়া কিছু বলেনি। ও জানে বাবার মুখের ওপর হ্যাঁ বা না বলে কোনও লাভ নেই। ঠাকুরমা থাকলে তাও কিছুটা বাফার পাওয়া যেত। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ঠাকুরমা কেমন যেন আরও চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে কী যে হচ্ছে বুঝতে পারছে না রাধিয়া। রহস্যকাহিনি পড়তে ভাল, কিন্তু জীবনে রহস্য এসে ঢুকলে খুব সমস্যা হয়। বিশ্বাসটা নড়ে গেলে মানুষের সব বিষয়েই সন্দেহ হয়। এখন যেমন ওর মনে হচ্ছে। ওর কোথাও মনে হচ্ছে, বাবা ওকে কলকাতা থেকে বের করে দিতে চাইছে! ও আছে বলে বোধহয় বাবার কিছু ব্যাপারে অসুবিধে হচ্ছে!

রাধিয়া সোজা হয়ে বসল। বাবার ব্যাপারটা মাথার ভেতর ঘুণপোকার মতো কাটছে ওকে। কাউকে না বলতে পারলে মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাবে! কিন্তু বলার মতো কাউকে পাচ্ছে না। কাকে বলা যায়। ও বান্ধবীদের দেখল আর-একবার। নাঃ, এদের বলা যাবে না!

জয়তী বলল, “তোর কত সুবিধে রাধি। আমাদের মতো নয়। আমার মা তো এখনই বিয়ে দেবে বলে পাগল করে দিচ্ছে! রৌদ্রকে কতবার বলছি তাড়াতাড়ি কিছু করো! কিন্তু ও পাত্তাই দিচ্ছে না! আমিও যদি কিছু পড়তে চলে যেতে পারতাম!”

“তা বারণ করছে কে?” বুদা বিরক্ত গলায় বলল, “এমন করছিস! যা না কম্পিটিটিভ একজ়ামে বোস। চান্স নে। আমাদের তো বাপের জোর নেই! নিজের জোরেই যা করার করতে হবে!”

কথাটা আচমকা থাপ্পড়ের মতো এসে লাগল রাধিয়ার গালে! ও চমকে উঠে তাকাল বুদার দিকে! এটা কী বলল বুদা? ইচ্ছে করে বলল? মানে এসব কথা তা হলে ওর মনের মধ্যে ঘোরে! পড়াশোনায় রাধিয়া ওদের সবার চেয়ে ভাল! ইউনিভার্সিটিতে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে থাকে। সেখানে বুদা এটা বলতে পারল! রাধিয়া পালটা কিছু বলতে পারে না বলেই কি সবাই ওকে এমন করে বলে?

আচমকা রাধিয়ার চোখে জল এসে গেল! ও ঠোঁট কামড়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। ভিক্টোরিয়ার ইস্ট গেটের সামনে দিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে গাড়ি। পরির মাথায় যেন মেঘ নেমে এসেছে! বাইরে গাছপালা দেখে বোঝা যাচ্ছে হাওয়া দিচ্ছে খুব। রাধিয়ার মনে হল, এত হাওয়া, পরিটা যদি ডানা মেলে উড়ে যায়!

জয়তী বলল, “বুদা, এটা ঠিক বলছিস না।”

“কেন?” বুদা হাসল, “সত্যি কথা বললাম তো! তোদেরও মনে হয় এটা, কিন্তু ভালমানুষির প্রিটেনশন নিয়ে থাকিস। আমি সোজা মেয়ে, যা ভাবি বলে দিই!”

“ও পরীক্ষা দিলেও চান্স পেয়ে যেত,” পলি কথাটা বলে আলতো করে রাধিয়ার হাতে চাপ দিল!

“কিন্তু সেটা কি দেবে? নিজে কি ওকে কিছু করতে হবে? আমার বাবা ব্যাঙ্কে আছে! পলি তোর বাবার শাড়ির ব্যাবসা। জয়তীর বাবা অলরেডি রিটায়ার্ড! আমাদের সবাইকে নিজের দমে কিছু করতে হবে! আমাদের মুখে তো সোনার চামচ নেই!”

রাধিয়া ভাবল কিছু বলে। বুদা সব ঠিক বলছে না। পলিদের অবস্থাও খুব ভাল। হ্যাঁ, ওদের মতো নয়, কিন্তু শাড়ির ব্যাবসাটা বেশ বড়! জয়তীরাও উচ্চ-মধ্যবিত্ত। কিন্তু তারপর মত বদলাল। এই পৃথিবীতে যারা এমন ঋণাত্মক কথা ভাবে আর বলে তাদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই! একটা বয়সের পর কারও মত ঝগড়া করে পালটানো যায় না। নিজে তো রাধিয়া জানে ও কেমন! ও কী চায়! সেটাই আসল। বাকি পৃথিবী যা বলে বলুক! ও আর-একবার পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে পরিটাকে দেখল। উড়ে যাবে কি?

অ্যাকাডেমির সামনে ওদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে গেল মধুদা। পার্কিং-এর জায়গা খুঁজতে হবে।

জায়গাটায় ভিড় হয়ে আছে। নানা খাবারের দোকান ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। ওরা হাঁটতে-হাঁটতে সামনের দিকে এগোল। রাধিয়া দেখল বুদা আর পলি এখনও তর্ক করে যাচ্ছে।

জয়তী ওর পাশে এসে চাপা গলায় বলল, “সরি রাধি, স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে! ইচ্ছে করে বলিনি! বুঝতে পারিনি এটা বুদা ইসু করে তুলবে! বুদার মনে এই ছিল আমি জানতাম না! আজকাল সারাক্ষণ ওর মুড শিফট করে!”

নন্দন চত্বরে ঢুকে ওরা এগিয়ে গেল বাংলা অ্যাকাডেমির গেটের দিকে। এখানেও বেশ ভিড়। বুদারা বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে, দু’জনেই বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে! আশ্চর্য লাগল রাধিয়ার! দু’জনে এই বিষয়টা নিয়ে এভাবে ঝগড়া করছে কেন?

রাধিয়াও এবার এগিয়ে গেল। অ্যাকাডেমির গেটের সামনে বড় করে ফ্লেক্স লাগানো আছে। এই অনুষ্ঠানেই এসেছে ওরা। কিন্তু সেদিকে দু’জনের কারওই হুঁশ নেই! গেটের সামনে দাঁড়িয়েই পলি আর বুদা উত্তেজিত হয়ে কথা বলে চলেছে!

রাধিয়া গিয়ে এবার দাঁড়াল দু’জনের মাঝখানে। আশপাশের লোকজন তাকাচ্ছে! লোকজন বিনে পয়সায় সার্কাস দেখতে পারলে আর কিছু চায় না!

“তোরা থামবি?” রাধিয়া পলির দিকে তাকাল প্রথমে, “বুদা আমায় বলেছে! ওর নিশ্চয় কিছু খারাপ লেগেছে তাই এমন বলেছে! তুই চুপ কর।”

পলি কিছু বলতে গেল, কিন্তু রাধিয়া ওর কথা পাত্তা না দিয়ে এবার বুদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো! কেমন? তোরা চুপ কর।”

বুদা উত্তেজিত মুখ নিয়ে একবার পলির দিকে তাকাল আর-একবার রাধিয়াকে দেখল। তারপর আচমকা কিছু না বলে দুমদাম করে চলে গেল বড় রাস্তার দিকে।

“আরে!” রাধিয়া আটকাতে গেল। কিন্তু এবার জয়তী হাত টেনে ধরল ওর। বলল, “ছাড়! জানিস তো বুদাটা খেপি। মাথা ঠান্ডা হলে নিজেই আসবে!”

রাধিয়ার মনমেজাজ এমনিতেই ভাল নেই। বুদার এভাবে চলে যাওয়াতে ওর মন আরও খারাপ হয়ে গেল। মানুষ কেন এমন করে কে জানে! ও তাকিয়ে দেখল বুদা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল!

“আরে, বুদা চলে গেল দেখলাম!” সুম্পা হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল এবার, “পলি তোর হোমের টাকা তোলারও ব্যাপার আছে কিন্তু। সেখানে এখন আসছিস তুই?”

জয়তী বলল, “ও বুদার রাগ হয়েছে! ছাড়!”

সুম্পা পলির হাত ধরে বলল, “আয় তোরা। লোকজন অল্প-অল্প করে আসছে! আর রাধিয়া তোর সঙ্গে একজন একটু কথা বলতে চায়!”

ওরা অ্যাকাডেমির সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল সবাই।

রাধিয়া অবাক হয়ে বলল, “আমার সঙ্গে?”

“হ্যাঁ, ও…” সুম্পা হাত দিয়ে সামনে দেখাল!

রাধিয়া চোখ তুলে তাকাল! আর সঙ্গে-সঙ্গে চমকে স্থির হয়ে গেল একদম! নিশান! তাই তো! ও তো সুম্পার দাদার বন্ধু!

“তুই কথা বলে ওপরে আয়!” সুম্পা বাকিদের টানতে-টানতে সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল!

নিশান সামান্য হাসিমুখে এসে দাঁড়াল ওর সামনে। রাধিয়ার কেমন যেন অস্বস্তি হল! কিন্তু আবার কেমন একটা ভালও লাগল! হাওয়ায় নিশানের চুলগুলো উড়ছে। মেরুন পাঞ্জাবিটাও হেমন্তের জং-ধরা প্রজাপতির মতো উড়ছে!

নিজের শাড়ির আঁচলটা সামলে রাখল রাধিয়া। কেন এমন নার্ভাস লাগছে ওর! কান কেন গরম হয়ে যাচ্ছে! নিশানের খয়েরি চোখের মণির দিকে তাকাতে পারছে না কেন? এত হাওয়াতেও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াটা কি স্বাভাবিক!

নিশান হাসল সামান্য। সময় নিল একটু। তারপর নরম গলায় বলল, “আমার একটু দরকার ছিল আপনার সঙ্গে! জরুরি দরকার!”

রাধিয়া কিছু বলার আগেই হাওয়ার বেগ বাড়ল হঠাৎ! গাছের পাতার সঙ্গে ফুলের পাপড়ি উড়ে এল দিগ্বিদিক থেকে! মানুষজন সামান্য থমকে গেল যেন! তাদের কথা যেন থেমে গেল সামান্য সময়ের জন্য। কলকাতা যেন জামার ওপরের বোতামটা খুলে একটু হেলিয়ে বসল! আর কোথা থেকে একটা ঝড়ের কুটো উড়ে এসে আটকে গেল রাধিয়ার গালে! রাধিয়া বিহ্বল হয়ে দেখল নিশান সামান্য ঝুঁকে ওর গালের ওপর থেকে সরিয়ে দিল ঝড়ের কুটোটা! ওই সামান্য স্পর্শ! ওই সামান্যতম কাছে আসা! সামান্য ঝড়ের অছিলায় ওইটুকু নিভৃত মুহূর্ত আচমকা কী যে ওলটপালট করে দিল বুকের ভেতর, বুঝতে পারল না রাধিয়া! ও থমকে গেল এক মুহূর্ত! তারপর মাথা নিচু করে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে!

“আরে, কী হল?” নিশান এগিয়ে এল আরও কাছে! হাওয়ার জোর বাড়ল হঠাৎ! গাছের পাতা পাক খেয়ে উঠল রাধিয়ার মনের শূন্যতায়! ফুলের পাপড়ি আর ধুলোর ইশারা এসে জড়িয়ে গেল ঘাড়ে, গলায়! শেষ আলোর আবির এসে গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ওর গালে! রাধিয়া বুঝতে পারল না কিছু। শুধু হু হু করে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে লাগল ওর! যেন আবছা শুনতে পেল একটা উদ্বিগ্ন গলা বলছে, “কী হল? রাধিয়া, কী হল আপনার?”

রাধিয়া মাথা নামিয়ে মুখ ঢাকল হাতে। পাতায় জমে উঠতে লাগল ফোঁটা ফোঁটা হীরকখণ্ড। ও কথা বলতে পারল না কোনও। ওর মনে হল, কথা তো পরিমিত! তার সাধ্য সামান্য! সে কী করে বলবে কেন আচমকা পাহাড় ফাটিয়ে ঝরনা বেরিয়ে আসে! কী করে বলবে, কোন মুহূর্তে গুটি কেটে উড়ে যায় প্রজাপতি! কেন অমন সূর্য লেগে বরফ থেকে ছিটকে ওঠে আলোর ক্রেয়ন!

রাধিয়া মাথা নামিয়ে, চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল শুধু। আর দেখল এতদিন পরে পাগল হাওয়ার টানে, নিচু হয়ে আসা মেঘ কেটে কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে বহু-বহু বছর স্তব্ধ হয়ে থাকা ব্রোঞ্জের পরি!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *