১.১০ বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ

বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ

[বাপি সেন হত্যামামলা
তদন্তকারী অফিসার অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়]

মেরে স্বপ্নো কি রানি কব আয়েগি তু..
আয়ি রুত মস্তানি কব আয়েগি তু..
বিতি যায়ে জিন্দেগানি কব আয়েগি তু..
চলি আ.. আ তু চলি আ …

শেষ লাইনটা গাওয়া হচ্ছে কোরাসে। ট্যাক্সি থেকে মুখ বার করে এক যুবক তারস্বরে গাইছে। বলা ভাল, চেঁচাচ্ছে, আ তু চলি আ…। বিকৃত উল্লাসে গলা মেলাচ্ছে ট্যাক্সির ভিতরের বাকিরা, চলি আআআ…।

যাঁর উদ্দেশে নেশাতুর আহ্বান, মোটরসাইকেলের পিছনে বসা যুবতী, ততক্ষণে আতঙ্কের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছেন। হাত ধরে টানার চেষ্টা করছে ট্যাক্সির জানালা থেকে এক যুবক, অশ্লীল ইঙ্গিতসহ মন্তব্য ছিটকে আসছে, হ্যাপি নিউ ইয়ার ডার্লিং! কোনওক্রমে সামলাচ্ছেন যুবতী, পুরুষসঙ্গীকে বলছেন, তাড়াতাড়ি চালাও, ভয় করছে ভীষণ।

কী করে চালাবেন তাড়াতাড়ি? সম্ভব কখনও, যখন ইচ্ছেমতো গতি বাড়িয়ে-কমিয়ে ধাওয়া করছে ট্যাক্সি মিনিট দশেক ধরে? সামনে যে রাস্তা ধু ধু ফাঁকা, এমনও নয়। ওই মাঝরাতের রাজপথে তখনও গাড়ির জটলা যথেষ্ট। মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে দিলে ট্যাক্সিও কমাচ্ছে, বাড়ালে দ্রুত তাল মিলিয়ে পাশে চলে আসছে। আশেপাশে পুলিশও তো কই দেখা যাচ্ছে না। যত পুলিশ আজ পার্ক স্ট্রিটে। কী করা যায়, কী করা উচিত?

সামনে ওয়েলিংটন স্কোয়ার, হিন্দ সিনেমা। এভাবে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে যে-কোনও মুহূর্তে! বাধ্য হয়েই মোটরসাইকেল থামালেন চালক। হেলমেট খুললেন। ট্যাক্সিও থামল। নেমে এল পাঁচ যুবক, সবারই বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে। যুবতী দাঁড়িয়ে জড়সড়। সঙ্গী বললেন, ‘এটা কী হচ্ছে? অসভ্যতা করবেন না প্লিজ়।’

অসভ্যতা ভাবলে তো অসভ্যতা! ততক্ষণে যুবতীকে ঘিরে ফেলেছে পাঁচজন। সঙ্গী বাধা দিতে এলে বিদ্রুপ এবং ধাক্কা, ‘তুই একাই মস্তি করবি বে?’ শুরু হয়ে গিয়েছে মহিলার হাত ধরে টানাটানি। এবং পাল্লা দিয়ে খিস্তিখেউড়।

এমন চলল মিনিটখানেক। পাশ দিয়ে এরপর হুস করে বেরিয়ে গেল একটা লাল মারুতি। ব্রেক কষল মিটার পঞ্চাশেক এগিয়ে। সিনেমায় যেমন হয়। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক দীর্ঘদেহী সুঠাম চেহারার যুবক। ছুটলেন পিছনে, যেখানে তখন অভিনীত হচ্ছে এক অসহায় যুবতীর অসম্মানিত হওয়ার চিত্রনাট্য।

মহিলাকে আগলে দাঁড়ালেন দীর্ঘদেহী, ‘কী হচ্ছেটা কী, ছাড়ুন ওঁকে!’

ক্ষিপ্ত উত্তর আসে, ‘তুই কে শালা ফোঁপরদালালি করার? পাতলা হয়ে যা চটপট।’

বর্ষবরণের রাত ছিল সেটা। ৩১ ডিসেম্বর, ২০০২। ঘটনা যখন ঘটছে, ঘড়ির কাঁটা অবশ্য তখন একটা পেরিয়ে গিয়েছে। ঘুরে গিয়েছে বছর। পয়লা জানুয়ারি, ২০০৩।

ফাস্ট ফরোয়ার্ডে পরের দৃশ্য। চার দিন পেরিয়ে গিয়েছে ঘটনার। ৫ জানুয়ারির রাত আটটা। হাসপাতাল চত্বর ভিড়ে থিকথিক। মিডিয়া তো রয়েইছে একঝাঁক। তার চেয়েও ঢের বেশি কলকাতা পুলিশের নানা স্তরের কর্মী-আধিকারিকরা। যাঁরা হাসপাতাল-প্রাঙ্গণকেই ঘরবাড়ি করে ফেলেছেন পয়লা জানুয়ারির দুপুর থেকে। ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ’-এর আপ্তবাক্যে ভরসা রেখে।

—ডক্টর আগরওয়াল, প্লিজ়, ওকে বাঁচান। যেভাবে হোক। উই কান্ট অ্যাফোর্ড টু লুজ় হিম…। নগরপালের আর্তি ছুঁয়ে যায় প্রথিতযশা নিউরোসার্জেনকে।

—আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমরা। নিউরোলজিক্যাল স্ট্যাটাস ভেরি পুয়োর। কোমায় চলে গিয়েছে। প্রচুর ইন্টারনাল ইনজুরি, স্কালে মাল্টিপল ফ্র্যাকচার। জানি না, কতটা সম্ভব হবে। ফিঙ্গারস ক্রসড, ট্রায়িং আওয়ার বেস্ট…। ফোন রেখে দেন ডক্টর অজয় আগরওয়াল।

Calcutta Medical Research Institute (সিএমআরআই)-এর আইসিইউ-তে চূড়ান্ত ব্যস্ততা তখন। ক্রমশ আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে পেশেন্ট। যা যা করা সম্ভব, করছেন ডাক্তাররা। হাসপাতালে ভরতি হওয়া ইস্তক রোগীর জ্ঞান ফেরেনি, ফেরার দূরতম সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে ক্রমশ। প্রহর গোনা একরকম শুরুই হয়ে গিয়েছে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির।

সার্জেন্ট বাপি সেন হত্যা মামলা। বউবাজার থানা, কেস নম্বর ১/২০০৩। তারিখ জানুয়ারির পয়লা। ধারা, ৩০২/৩৪/৩৫৪ আইপিসি। খুনের উদ্দেশ্যে একাধিকের সম্মিলিত পরিকল্পনা, শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে মহিলার উপর বলপ্রয়োগ।

এ মামলায় সে অর্থে রহস্যভেদের রোমাঞ্চ নেই, নেই একাধিক সন্দেহভাজনের মধ্য থেকে অপরাধীকে চিহ্নিত করতে মগজাস্ত্রের কুশলী প্রয়োগ। বাপি সেনের হত্যা তবু আজও কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে চর্চিত মামলাগুলির অন্যতম। ঠিক কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, জল্পনার বিষয় আজও। পনেরো বছর পরেও। শহর কলকাতাকে সে-সময় তোলপাড় করে দেওয়া এই ঘটনার প্রামাণ্য বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখা জরুরি। কেস ডায়েরির খুঁটিনাটি, আদালতে বাদী-বিবাদীর তর্কবিতর্ক এবং সর্বোপরি যাবতীয় তথ্যপ্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণের পর বিচারকের রায়, ধরা থাকল ঘটনাপ্রবাহ। যা ঘটেছিল, যে ভাবে ঘটেছিল।

বেহালার পর্ণশ্রীর বাসিন্দা নারায়ণচন্দ্র সেন-রেণুকা সেনের তিন পুত্র, তিন কন্যা। নারায়ণবাবু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সাব-ইনস্পেকটর। বড়ছেলে জয়দেব থাকেন সপরিবারে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের M.E.S. কোয়ার্টারে। মেজো অনুপ, ইন্ডিয়ান ব্যাংকের কর্মী। ছোটছেলে বাপি। চব্বিশ বছর বয়সে কলকাতা পুলিশে সার্জেন্ট হিসেবে যোগদান ’৯১-তে। বোনদের মধ্যে জয়শ্রী অবিবাহিতা। বাকি দুই বোন মন্দিরা আর দীপার শ্বশুরবাড়ি যথাক্রমে মহেশতলা এবং পর্ণশ্রীতে।

বাপির স্ত্রী সোমা, বিয়ে হয় ’৯২-এর জুনে। বাপি-সোমার দুই ছেলে। সোমশুভ্র বড়, ঘটনার সময় বয়স ছয়, ক্লাস ওয়ান। ছোট শঙ্খশুভ্র, হাঁটি-হাঁটি পা-পা তখন। বয়স সবে এক পেরিয়েছে দুধের শিশুর।

বাপি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডাকাবুকো স্বভাবের। বাবাকে আশৈশব দেখেছেন পুলিশের চাকরিতে, স্বপ্ন লালন করতেন ভবিষ্যতে উর্দিধারী হওয়ার। খেলাধুলোয় তুমুল উৎসাহ, ভাল ফুটবল খেলতেন। টেবিলটেনিসও। ২০০২ সালে, ঘটনার সময়, টালিগঞ্জ ট্রাফিক গার্ডে কর্মরত ছিলেন। প্রতিবাদী স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন চাকরিজীবনের শুরু থেকেই। পার্ক স্ট্রিট এলাকায় এক মহিলার হার ছিনতাই করে পালানো দুষ্কৃতীকে অনেকটা ধাওয়া করে হাতেনাতে ধরেছিলেন একবার। কে জানত, ওই প্রতিবাদী স্বভাবেরই মাশুল দিতে হবে প্রাণ দিয়ে, মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে?

বাপি সেন

৩১ ডিসেম্বর, ২০০২, নিউ ইয়ার্স ইভ।

কিছু সংক্ষিপ্ত পরিচিতি জরুরি ঘটনায় ঢোকার আগে। অশোক সেনগুপ্ত, বাড়ি নেতাজিনগরে। পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। নাজিবুল হোসেন মোল্লা, দক্ষিণ কলকাতারই বাসিন্দা, ইনিও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। গৌতম মজুমদারেরও একই পেশা, থাকতেন পর্ণশ্রীতে। কানাই কুন্ডু, কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল। বাড়ি বেহালা অঞ্চলেই।

উপরে যাঁদের নাম করলাম, অনেকদিনের পরিচিতি পরস্পরের। সকলেই মধ্যতিরিশ। বাপিও ছিলেন এই বন্ধুদলে। পর্ণশ্রী রিক্রিয়েশন ক্লাবের পাশের মাঠটা ছিল সান্ধ্য আড্ডার ঠিকানা।

সেদিন বাপির দুপুরের শিফটে ডিউটি ছিল। সোয়া আটটা নাগাদ বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে গেলেন ক্লাবের মাঠে। গৌতম-অশোক-নাজিবুল-কানাই তখন আড্ডা দিচ্ছেন জমিয়ে। কথায় কথায় অশোক বললেন, সঙ্গে গাড়িটা এনেছি। চল, পার্ক স্ট্রিট ঘুরে আসি রাতের দিকে। লাল মারুতি, WB-02F-4992, রওনা দিল পার্ক স্ট্রিটের উদ্দেশে। রাত কত হবে তখন? ন’টা-সোয়া ন’টা। গাড়ি একটু এগোনোর পর বাপি বললেন, তারাতলায় এক বন্ধুর বাড়ি রাত্রে যাব বলে কথা দিয়েছিলাম। একবার না গেলেই নয়। ওখান থেকে পার্ক স্ট্রিট যাওয়া যাবে।

বন্ধুর নাম সুব্রত বসু। তারাতলার কাছেই ‘নাবিকগৃহ’, মার্চেন্ট নেভির শিক্ষানবিশদের আবাসিক প্রশিক্ষণ সংস্থা। সুব্রতর বাবা সেখানে সুপারিন্টেনডেন্ট, থাকেন সরকারি কোয়ার্টারে। বাপিরা পৌঁছলেন। যথেষ্ট আদর-আপ্যায়ন করে সুব্রতর বাবা-মা একরকম বাধ্যই করলেন সবাইকে রাতের খাওয়াটা ওখানেই সারতে। খাওয়াদাওয়ার পর সুব্রতও সঙ্গী হলেন বাপি-গৌতম-অশোক-কানাই-নাজিবুলের। গন্তব্য পার্ক স্ট্রিট। বন্ধুদের সঙ্গে বাপি সেনের ‘The last ride together।’

বছরের শেষ রাতের পার্ক স্ট্রিট যেমন হয়। আলো আর রঙের দাঙ্গা লেগেছে যেন। কানের পরদা বিদ্রোহ করছে আওয়াজের ধাক্কায়। যতদূর চোখ যায়, ফুটপাথে কালো মাথা পিলপিল। গাড়িঘোড়াই বা কম যায় কীসে, স্রোত যেন শেষ হওয়ার নয়। সব রাস্তাই কি এখানে এসে মিশেছে?

গাড়িটা রাসেল স্ট্রিটের হবি সেন্টারের সামনে পার্ক করেছিলেন অশোক। রাত তখন সাড়ে বারোটা ছাড়িয়েছে, পায়ে হেঁটে চক্কর দেওয়া হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকবার। বন্ধুরা ঠিক করলেন, এবার বাড়ি ফেরা যাক।

পার্ক স্ট্রিটে তখন পশ্চিমমুখী গাড়ির ভিড় তুঙ্গে। মল্লিকবাজারের দিক থেকে শয়ে শয়ে ঘরমুখী গাড়ির চাপে ‘বাম্পার টু বাম্পার’ ট্রাফিক। বাপির কলকাতার রাস্তা চেনা হাতের তালুর মতো। বললেন, জওহরলাল নেহরু রোড ধরলে অনেক দেরি হয়ে যাবে সামান্য রাস্তা পেরতেই। তার চেয়ে রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড ধরে যাওয়া ভাল। ওয়েলিংটন হয়ে গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ-সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পেরিয়ে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে দক্ষিণে যাওয়াই সবচেয়ে কম সময়ের। ওদিকে তুলনায় এখন কম চাপ থাকবে গাড়ির।

বাপির দেখানো রাস্তায় এগোল লাল মারুতি। ওয়েলিংটনের কাছাকাছি আসতেই আরোহীদের চোখে পড়ল দৃশ্যটা। যা লিখেছি শুরুর অনুচ্ছেদে। একটা ট্যাক্সি ধাওয়া করেছে মোটরসাইকেলকে। যা চালাচ্ছেন একজন পুরুষ, পিছনে এক মহিলা। পিছু ছাড়ছে না ট্যাক্সি, গতি বাড়িয়ে-কমিয়ে চলেছে মোটরসাইকেলের গা ঘেঁষে। ট্যাক্সির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা হাত ছুঁতে চেষ্টা করছে মহিলাকে।

একটু এগিয়ে একসময় দ্বিচক্রযান থামিয়ে দিলেন চালক। মহিলাও নেমে দাঁড়ালেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্যাক্সি থামিয়ে নেমে এল পাঁচ যুবক। মোটরসাইকেল-চালকের সঙ্গে সামান্য কথাকাটাকাটির পর সরিয়ে দিল একরকম ধাক্কা দিয়েই। মহিলাকে ঘিরে ধরে শুরু হল কুৎসিত ইঙ্গিত, শরীরে অবাঞ্ছিত স্পর্শ।

‘অশোক,… এগিয়ে গিয়ে দাঁড় করা তো!’ পিছনের মারুতির সামনের সিট থেকে ঘটনাটা লক্ষ করছিলেন বাপি। কিছুটা এগিয়ে ব্রেক কষল গাড়ি। দরজা খুলে নেমেই ছুটলেন বাপি, ‘কী হচ্ছেটা কী? ছাড়ুন ওঁকে!’

—তুই কে শালা ফোঁপরদালালি করার? পাতলা হয়ে যা চটপট।

এসব হুমকিতে দমে যাওয়ার ছেলে ছিলেন না বাপি, একজনের হাত ধরে ফেললেন, ‘ছেড়ে দিন ওঁকে। আমার নাম বাপি সেন, টালিগঞ্জ ট্রাফিক গার্ডের সার্জেন্ট।’

উত্তর এল, ‘তো? আমরাও কলকাতা পুলিশের লোক। ফোট্!’

বাপি লড়ার চেষ্টা করেছিলেন সাধ্যমতো। পাঁচ যুবকের বেপরোয়া কিল-ঘুষি-লাথির তোড় অবশ্য সামলাতে পারলেন না বেশিক্ষণ। গৌতম-অশোক-কানাই-নাজিবুলরা ছুটে এলেন আটকাতে, পেরে উঠলেন না পালটা মারের ধাক্কায়। বাপি ততক্ষণে পড়ে গিয়েছেন ট্রামলাইনের উপর, তবু এলোপাথাড়ি লাথি অব্যাহত। সঙ্গে সমবেত চিৎকার, মেরে ফেল শালাকে।

গৌতম-সুব্রত-কানাই আবার এগোলেন আটকাতে, ‘কী করছেন কী? ও পুলিশ অফিসার।’

কে শোনে কার কথা? ‘শুনলি না, আমরাও পুলিশের! ও কি একাই পুলিশের নাকি? মেরে ফেল শালাকে!’

প্রতিরোধের চেষ্টা ব্যর্থ হল বন্ধুদের, রাস্তায় পড়ে থাকা বাপির শরীরে লাথির আঘাত পড়তে লাগল বেলাগাম। বুকে-পেটে-মাথায়-ঘাড়ে, কোথায় নয়?

বাপি যখন ট্রামলাইনের উপর নিস্পন্দ পড়ে নতুন বছরের প্রথম প্রহরে, ট্যাক্সিতে উঠে চম্পট দিল পাঁচজন। কানাই নোট করে নিয়েছিলেন ট্যাক্সির নম্বর, WB-04A-3450।

মোটরসাইকেলটা কোথায় গেল? ঝামেলা যখন তুঙ্গে, নিঃশব্দে চলে গিয়েছেন চালক ও সঙ্গিনী। সেটা কি গণ্ডগোলের সময় খেয়াল করেছিল আক্রমণকারী পাঁচজন? শিকার হাতছাড়া হওয়ার রাগেই কি ওই উন্মত্ত গণপিটুনি?

মোটরসাইকেলের খোঁজ নেওয়ার সময় নেই তখন। অচৈতন্য বাপিকে নিয়ে মারুতি ছুটল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। CB Top (ক্যাজ়ুয়ালটি ব্লক)-এর বেড নম্বর ১৫৮-য় ঠাঁই হল বাপির। রাত তখন দুটো বা তার আশপাশ। প্রাথমিক পরীক্ষার পর নাইটডিউটিতে থাকা চিকিৎসক বললেন, অবিলম্বে CT Scan করা দরকার। বন্ধুরা তখন দিশেহারা। কেউ বাপির বাড়িতে খবর দিচ্ছেন, কেউ ছুটছেন মেডিক্যালের কোথায় কীভাবে CT Scan হবে তার খোঁজে।

বউবাজার থানার সাব-ইনস্পেকটর রক্ষাকর মণ্ডল বেরিয়েছিলেন নাইট রাউন্ডে, রাত একটা নাগাদ। সাড়ে তিনটে নাগাদ মোবাইলে ধরল লালবাজার কন্ট্রোল, মেডিক্যাল কলেজে যান শিগগির, ওখানে বোধহয় একটা assault কেস আছে।’ ছুটলেন রক্ষাকর, মেডিক্যাল কলেজের পুলিশ আউটপোস্টের এএসআই ব্রজকিশোর চৌধুরির কাছে জানলেন বৃত্তান্ত। খবর পেয়ে টালিগঞ্জ ট্রাফিক গার্ডের তৎকালীন ওসি অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় রওনা দিলেন মেডিক্যালে, সঙ্গে বাপির মেজদা অনুপ।

CT Scan-এর রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, আঘাত গুরুতর, অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। আলোচনার পর অনুপ সিদ্ধান্ত নিলেন, সিএমআরআই-তে নিয়ে যাবেন ভাইকে। জ্ঞান নিশ্চয়ই ফিরে আসবে দু’-একদিনের মধ্যে। দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, জ্ঞান আর ফেরার নয়।

সিএমআরআই-এর আইসিইউ পরবর্তী ঠিকানা বাপির। নিউরোসার্জেন ডা. অজয় আগরওয়ালের নেতৃত্বে শুরু হল চিকিৎসা। ভোর হয়ে এসেছে তখন, কন্ট্রোল মারফত পুলিশমহলে জানাজানি হয়ে গিয়েছে ঘটনাপরম্পরা। ইভটিজিং রুখতে গিয়েছিলেন ট্রাফিকের সার্জেন্ট। পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে পাঁচজন। যারা মেরেছে, তারাও শোনা যাচ্ছে পুলিশের লোক।

সকালেই ট্রাফিক কন্ট্রোলে দৌড়লেন রক্ষাকর। WB-04A-3450 নম্বরের ট্যাক্সির মালিকের নাম জানা গেল ডেটাবেস থেকে অল্পক্ষণের মধ্যেই। মধুকান্ত ঝা। ট্যাক্সির খোঁজও মিলল সহজেই। বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিটের পুলিশ মেসের সামনে, পাওয়া গেল মালিককেও। শুয়ে ছিলেন ট্যাক্সির মধ্যেই।

মধুকান্ত দ্বারভাঙার বাসিন্দা, চব্বিশ বছর আগে চলে আসেন কলকাতায়। পুলিশ মেসে রাঁধুনির কাজ দিয়ে শুরু। তারপর হিমালয় অপটিক্যালসে ড্রাইভারের কাজ দীর্ঘদিন। ’৯৬ -তে ধারদেনা করে নিজের ট্যাক্সি কেনেন। হেল্পার রেখেছিলেন দেশোয়ালি মেওয়ালাল গুপ্তাকে। পুলিশ মেসেই খাওয়াদাওয়া সারতেন দু’জন। চিনতেন মেসের পুলিশকর্মীদের প্রায় সবাইকেই।

কারা ট্যাক্সিতে ছিল গত রাতে? একটুও ভাবতে হল না মধুকান্তকে। এক কথায় বলে দিলেন পাঁচজনের নাম। মধুসূদন চক্রবর্তী, শ্রীদাম বাউরি, পীযূষ গোস্বামী ওরফে গোপাল, শেখরভূষণ গুপ্ত ওরফে ভোলা এবং শেখ মুজিবর রহমান। জানতে সময় লাগল না, পাঁচ কীর্তিমানই কলকাতা পুলিশের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল। দিনের ডিউটির পর বর্ষশেষের রাতে বিনোদনে বেরিয়েছিলেন মধুকান্তের ট্যাক্সিতে সওয়ার হয়ে।

মধুসূদন আর পীযূষ গ্রেফতার হলেন মেস থেকেই। শ্রীদাম, মুজিবর আর শেখর ছিলেন না মেসে তখন। মধুসূদন আর পীযূষকে আদালতে পেশ করার সময় তদন্তকারী অফিসার রক্ষাকর আবিষ্কার করলেন, পালানোর পথ নেই বুঝে আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য হাজির শ্রীদাম-মুজিবর-শেখর। পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হল পাঁচজনকে, সকলেই অস্বীকার করলেন অভিযোগ।

খবর প্রচারিত হল, চরম লজ্জায় পড়ল কলকাতা পুলিশ। রক্ষকই ভক্ষক, এহেন নৃশংসতায়? এক মহিলার মানইজ্জত বাঁচাতে মরিয়া লড়তে গিয়ে সতীর্থদের গণপ্রহারেই মৃত্যুশয্যায় পুলিশ অফিসার? মুখ লোকানো দায়, কলঙ্ক ঢাকার জায়গাই বা কোথায়?

বাপি তখন সংজ্ঞাহীন আইসিইউ-তে। ‘যমে-মানুষে টানাটানি’ লেখা গেল না। টানাটানি তখন হয় যখন উভয়েরই আংশিক জেতার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে আগাগোড়া যমেরই নিরঙ্কুশ প্রাধান্য ছিল। বাপির শেষ নিশ্বাস ৬ জানুয়ারি, ভোর ৬টায়। খবর বেহালার বাড়িতে পৌঁছতে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন স্ত্রী সোমা, মা রেণুকা। গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল পর্ণশ্রী এলাকা। শুধু পর্ণশ্রী কেন, পুরো কলকাতাই ।

কলকাতা পুলিশের আংশিক কলঙ্কমোচনের একমাত্র উপায় ছিল দোষীদের দ্রুত শাস্তিবিধান। হোমিসাইড শাখার তৎকালীন ইনস্পেকটর অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্তমানে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার, দায়িত্ব নিলেন তদন্তের। পাখির চোখ, অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা।

তদন্ত হোঁচট খেল শুরুতেই। বিস্তর চেষ্টাচরিত্র করেও খোঁজ পাওয়া গেল না নিগৃহীতা মহিলার, যাঁর বয়ান অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত তদন্তের অগ্রগতিতে।

নগরপাল শেষমেশ খবরের কাগজে আবেদন জানালেন, ‘আপনি যে-ই হোন, আপনার মানসিক অবস্থা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। একান্ত অনুরোধ, অনুগ্রহ করে প্রকাশ্যে আসুন। আপনার হেনস্থা হওয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারাত্মক জখম হয়েছিলেন আমাদের এক সহকর্মী বাপি সেন। আর বেঁচে নেই তিনি। দোষীদের শাস্তিদানে আপনার বয়ান খুবই জরুরি। আপনি সহযোগিতা করলে কৃতজ্ঞ থাকব। আপনার নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব কলকাতা পুলিশের।’

অপেক্ষাই সার, সাড়া মিলল না আবেদনে। তথ্যপ্রমাণ একত্রিত করে অতনুবাবু চার্জশিট পেশ করলেন ১০ মার্চ। শুরু হল বহুবিতর্কিত বিচারপর্ব।

অভিযুক্তদের আইনজীবী যুক্তি সাজালেন অনেক। তুলে দেওয়া যাক যুক্তিতক্কো আর গপ্পোর নির্যাস। এমন কোনও ঘটনা ঘটেইনি আদৌ। বাপি ওয়েলিংটনের কাছে ট্যাক্সি থামিয়ে নিজেকে সার্জেন্ট বলে পরিচয় দিয়ে লাইসেন্স আর ব্লু বুক দেখতে চান চালকের কাছে। বাপির মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরচ্ছিল। চালক লাইসেন্স দেখাতে অস্বীকার করায় বাপি পিছনের দরজা খুলে উঠতে যান। ট্যাক্সি তখন চলতে শুরু করেছে। চলন্ত ট্যাক্সিতে উঠতে না পেরে রাস্তায় ট্রামলাইনের উপর পড়ে যান বাপি। দাবি, সেই আঘাতেই মৃত্যু। শ্লীলতাহানি-টানির কোনও গল্পই নেই।

ড্রাইভার মধুকান্ত এবং হেল্পার মেওয়ালাল, পুলিশি জেরায় যাদের বয়ান হুবহু মিলে গিয়েছিল বাপির বন্ধুদের বিবরণের সঙ্গে, বিরূপ সাক্ষ্য দিলেন আদালতে। সম্পূর্ণ উলটো কথা বলে বাপির মদ্যপ অবস্থায় পড়ে যাওয়ার তত্ত্ব সমর্থন করলেন।

সে-রাতে বাপি মদ্যপ ছিলেন, প্রমাণ করতে আদালতে পেশ করা হল মেডিক্যাল কলেজের আউটডোরের টিকিট। যাতে আঘাতের প্রাথমিক বর্ণনার পাশাপাশি লেখা ছিল, “two pegs of alcohol”। যার সূত্র ধরে প্রয়াত বাপির অসংযমী জীবনযাপনের সম্ভাব্য তত্ত্বও বিস্তারে আলোচিত হল আদালতে।

বলা হল, Test Identification Parade-এ বাপির বন্ধুরা যে অভিযুক্তদের সরাসরি শনাক্ত করেছিলেন, তা প্রমাণ হিসেবে মূল্যহীন। রাত সোয়া একটার সময় ঘটনাস্থলে এত আলো কোথায় যে মুখ চিনে রাখা যাবে? পুরোটাই গাঁজাখুরি গপ্পো, ফাঁসানো হচ্ছে অভিযুক্তদের।

দুর্ঘটনার কাল্পনিক তত্ত্ব খণ্ডন করতে সরকারি আইনজীবীর সহায় হল তদন্তকারী অফিসার অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠাসবুনোট চার্জশিট, যা তৈরি হয়েছিল যত্নশীল অধ্যবসায়ে।

ময়নাতদন্তে জানা গিয়েছিল, আঘাতের তীব্রতায় মাথার খুলিতে একাধিক চিড় ধরেছিল বাপির। শরীরের বাকি অংশে অগুনতি আঘাতচিহ্ন তো ছিলই। ডাক্তার স্পষ্ট লিখেছিলেন, মাথায় এবং শরীরের একাধিক আঘাতের কারণেই মৃত্যু, “ante-mortem and homicidal in nature.” দুর্ঘটনা নয়, খুনই।

অতনু জানতেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে বিচারপর্বে চাপানউতোর অনিবার্য। তাই রিপোর্টের বিষয়ে লিখিত মতামত নিয়েছিলেন ফরেনসিক মেডিসিনের দিকপাল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অজয় গুপ্তের। যিনি তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্ৰধান।

অধ্যাপক গুপ্ত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখে সবিস্তার মতামত দিলেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানালেন, আঘাত গাড়ি থেকে পড়ে হয়নি (nothing to suggest primary and secondary impact of a vehicle)। আরও লিখলেন, বচসা-হাতাহাতি দিয়েই সম্ভবত ঘটনার শুরু, কিছু ‘defensive wounds’ বা আত্মরক্ষাজনিত ক্ষতচিহ্নও ছিল বাপির শরীরে। কিন্তু মৃতের শরীরের যত্রতত্র অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন জানাচ্ছে, খুন করার উদ্দেশ্যেই লাথি-কিল-ঘুষি চলেছিল লাগামছাড়া। খুলিতে যে তীব্রতায় আঘাত লেগেছে একাধিক জায়গায়, সেটা শুধু ট্রামলাইনে পড়ে গিয়ে সম্ভব নয়। ভারী বুটজুতো জাতীয় কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছিল একবার নয়, বারবার।

উদ্ধৃত করি কয়েক লাইন, “Considering the site, size and disposition of injuries on the person of Bapi Sen, it could be concluded that the injuries resulted from fists, blows and kicks by healthy adult individuals with great force that was sufficiently strong to cause fracture of skull with intracranial and intracerebral injuries.”

বাপি কি সে-রাতে মদ্যপান করেছিলেন? আউটডোরের টিকিট যখন বাপির মৃত্যুর পর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন অতনুবাবু, তাতে লেখা ছিল, “Beaten by fists, blunt injury, two pegs of alcohol.”

আশ্চর্যের, যিনি লিখেছিলেন, তাঁর কোনও সই ছিল না টিকিটে। আরও বিস্ময়ের, এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, টিকিটে দু’রকম হাতের লেখা। আলাদা রঙের কালিতে। কোনও রকম রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই কীভাবে লিখে দেওয়া হল নির্দিষ্টভাবে দু’ পেগের কথা? সে-রাতে বাপিকে নেশাগ্রস্ত প্রমাণ করতে তথ্যবিকৃতি ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল কোনও কোনও মহল থেকে, পরিষ্কার। ডক্টর আগরওয়াল তাঁর সাক্ষ্যে বলেছিলেন স্পষ্ট, পেশেন্টকে মেডিক্যাল কলেজ থেকে সিএমআরআই-তে আনার পর যখন প্রাথমিক পরীক্ষা করেছিলাম, আমার এতদিনের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, একবারও মনে হয়নি উনি ড্রিঙ্ক করেছিলেন।

আউটডোরের টিকিট এবং বাপির নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে যাওয়ার তত্ত্ব সোজা মাঠের বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন নগর ও দায়রা আদালত। রায়ে আউটডোরের নথি প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “Exhibit B has been manufactured…. because of the fact that at that relevant point of time the police officer those who are investigating the case were searching for other documents and evidence…”

আদালত স্বীকৃতি দিলেন Test Identification Parade-এর ফলকেও। ডিসি ডিডি লিখিত তথ্য চেয়েছিলেন Calcutta Electric Supply Corporation (CESC)-এর কাছে। সে-রাতে ঘটনাস্থলে কি বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটেছিল কোনও? যদি না-ও ঘটে থাকে, জায়গাটি কি যথেষ্ট আলোকিত ছিল? ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা আলোর বিবরণ দিয়ে জানিয়েছিলেন CESC-র চিফ ইঞ্জিনিয়ার, কোনও বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটেনি সে-রাতে। আলোকিত ছিল অকুস্থল, মুখ চিনে রাখার পক্ষে যথেষ্ট ছিল সে আলো।

যেখানে বাপির অকালমৃত্যু হয়েছিল

ছেঁদো যুক্তির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতেছিল দুই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান। গণেশ বারিক এবং সমীর ঘোষ। ৩৮/১, নির্মলচন্দ্র স্ট্রিটের ‘জয় মাতাদি ট্রেডার্স’ নামে এক বেসরকারি সংস্থার দুই নিরাপত্তারক্ষী। যাঁরা রাতপাহারায় ছিলেন এবং ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছিলেন।

বিচারক লিখলেন ১ জুলাই, ২০০৪-এর রায়ে, “এটি বিরলের মধ্যে বিরলতম কেসের পর্যায়ভুক্ত। শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর সদস্য হয়েও দোষীরা যেভাবে নির্বিচারে গণপ্রহারে খুন করেছে বাহিনীরই আর এক অফিসারকে, তা অভাবনীয়। শুধুমাত্র দোষীদের বয়স বিবেচনা করে আমি প্রাণদণ্ড দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম, যাবজ্জীবন কারাবাসে দণ্ডিত হল দোষীরা।”

মামলা গেল হাইকোর্টে। নিম্ন আদালতের রায়কে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সাজা বহাল রাখলেন উচ্চ আদালত। যাঁদের রায়ের প্রথম লাইনটি ছিল, “Once upon a time, there lived in the city of joy a soul who pledged his mortal frame to the battery of assault before a group of revelers when he had sought to prevent their onslaught on a damsel in distress, whom, they had zeroed on after trailing her two wheeler.” দুটি রায়েই লিপিবদ্ধ ছিল অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা। নগরপালের প্রতি অনুরোধ ছিল নিখুঁত তদন্তের বিভাগীয় স্বীকৃতি দিতে।

সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করল অভিযুক্তরা। হাইকোর্টের রায়ে চোখ বুলিয়ে সর্বোচ্চ আদালত শুনানির প্রয়োজনই মনে করলেন না। সরাসরি নাকচ করে দিলেন আবেদন।

বাপির মা-বাবা প্রয়াত হয়েছেন। স্ত্রী সোমার চাকরির ব্যবস্থা করেছিল কলকাতা পুলিশ, বাপির মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই। বর্তমানে লালবাজারে ‘আর্মস অ্যাক্ট’ সেকশনে কর্মরতা। বড়ছেলে সোমশুভ্র এখন একুশ। কলেজের পাট চুকিয়ে চাকরির সন্ধানে। ছোট শঙ্খশুভ্র ক্লাস নাইন।

বাপি সেনের মৃত্যুর ইতিবৃত্ত যখন দিনের পর দিন দখল করে রেখেছিল খবরের কাগজগুলোর প্রথম পাতার সিংহভাগ, বিস্তর নিউজ়প্রিন্ট খরচ হয়েছিল আলোচনায়, কেন প্রকাশ্যে এলেন না নিগৃহীতা? যাঁকে বাঁচাতে গিয়ে অকালপ্রয়াণ পঁয়ত্রিশের তরতাজা অফিসারের, তিনি কেন নেপথ্যচারিণী হয়ে থাকলেন এটা জেনেও, তাঁর সাক্ষ্য অপরাধীদের শাস্তিপ্রাপ্তি নিশ্চিত এবং ত্বরান্বিত করবে? স্বয়ং নগরপালের আন্তরিক আবেদনেও কেন রহস্যাবৃতই রেখে দিলেন পরিচয়? ভোগেননি বিবেকের দংশনে, মনুষ্যত্বের তাড়নায়?

উত্তর অজানাই রয়ে গিয়েছে। তবে নির্বিচার দোষারোপের আগে যুবতীর দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিচার্য বোধহয়। জানতেন, প্রকাশ্যে এলে পড়তে হবে পুলিশি জেরার মুখে, যা অবধারিত গড়াবে আদালতে সাক্ষ্যদান পর্বে। চাননি হয়তো ওই আইনি অণুবীক্ষণে নিজেকে মেলে ধরতে। আইন-আদালত-পুলিশ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-আশঙ্কা তো থাকেই। জানতেন, গসিপ-বুভুক্ষু মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়বেই ব্যক্তিজীবনের কাটাছেঁড়ায়, জেরবার হয়ে যাবেন ‘এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকারের টানাহ্যাঁচড়ায়। পারেননি হয়তো সেই সম্ভাব্য সামাজিক চাপ সহ্য করার সাহস দেখাতে। সবাই পারেন না। বস্তুত, অধিকাংশই পারেন না। আর সেই ‘না-পারা’টার দায় সামাজিক প্রেক্ষিতকে উপেক্ষা করে পুরোটাই ব্যক্তির উপর চাপিয়ে দেওয়া কিঞ্চিৎ অন্যায্যই।

এবং এই একুশ শতকের প্রায় বছর কুড়ি কেটে যাওয়ার পরও যখন শ্লীলতাহানির ঘটনায় মধ্যযুগীয় প্রশ্ন ওঠে নিগৃহীতার বেশভূষা নিয়ে, কে বলতে পারে, নামধাম জানলে সামাজিক বিচারসভাই বসে যেত হয়তো কোনও কোনও মহলে, কাঠগড়ায় হয়তো দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত যুবতীকেই, মধ্যরাতে পুরুষসঙ্গীর সঙ্গে নৈশভ্রমণের ‘অপরাধে’? সাহস দেখালে ভালই হত, স্বীকার করি। কিন্তু না দেখানোর মধ্যেও তেমন গর্হিত কিছু দেখি না।

বাপি সেনের হত্যা আজও দগদগে ক্ষতচিহ্ন হয়ে আছে কলকাতা পুলিশ পরিবারের মননে। রবিঠাকুর লিখেছিলেন, “সত্যরে লও সহজে”। উনি ক্রান্তদর্শী ছিলেন, ওঁর মতো কি আর ভাবতে পারি আমরা সাধারণরা, হাজার চেষ্টা করলেও?

সব সত্যি কি আত্মস্থ করা যায় অত সহজে? সহজে কি আর মেনে নেওয়া যায় এক সহকর্মীর এভাবে অকালমৃত্যু, এক অসহায় যুবতীর আব্রু রক্ষা করতে গিয়ে?

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *