০১. শ্রান্ত পায়ে হাঁটছিল অহনা

দমকা হাওয়া – সুচিত্রা ভট্টাচার্য      

.

অরূপ আচার্য-কে

.

ট্রেন থেকে নেমে শ্রান্ত পায়ে হাঁটছিল অহনা। কলকাতা গেলে সারাদিন এত ধকল যায়, ফিরতিপথে শরীর যেন আর চলতেই চায় না। বিশ্রী একটা হাঁপ ধরে বুকে, মাত্র এই আটত্রিশ বছর বয়সেই। তারপর ক’দিন ধরে যা গরম! জৈষ্ঠ্যের এই রুটিসেঁকা তাতে প্রাণশক্তি তো এমনিই নিঃশেষ।

কলকাতার কাজটাজগুলো ঠিকঠাক মতো হলে তাও সান্ত্বনা থাকত খানিকটা। তা সে গুড়েও তো বালি। রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্কের সদর দপ্তরের যে অফিসারটির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া, তিনি আজ ডুব। অফিসের অন্য কোনও কর্মচারীও হয়তো সমস্যাটার সমাধান করতে পারত, কেউই তেমন গা দেখাল না। এ ওকে আঙুল দেখায়, ও একে। সরকারি অফিসের তো এটাই রেওয়াজ। অগত্যা চলো অন্য কাজে, অফিসপাড়া ছেড়ে থিয়েটার রোডে। পুনের সোলারিস কোম্পানির পূর্বাঞ্চল শাখায়। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কয়েকটা নতুন ডিজাইনের প্যানেল দেখানোর কথা ছিল আজ। কপাল খারাপ থাকলে যা হয়, এখনও নাকি নমুনাই এসে পৌঁছোয়নি। মিলল খালি একটি তথ্যজ্ঞাপক পুস্তিকা যা নাকি ইন্টারনেট থেকেই ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। অর্থাৎ পুরো পরিশ্রমটাই বৃথা, অহনার আজ দিনটাই বরবাদ। কোনও মানে হয়?

অহনার ঠোঁটে একচিলতে কষ্টের হাসি ফুটে উঠেও মিলিয়ে গেল। প্রতিটি পরিশ্রমই যার কাছে পণ্ডশ্রম, বেঁচে থাকাটাই যার নিছক সময়ের অপব্যবহার বলে মনে হয়, একটা নিষ্ফলা দিনে তার কীই বা যায় আসে?

প্ল্যাটফর্মে সার সার সেলুন। সবে বৈকালিক ঝাঁপ খুলছে একে একে। মফস্‌সলের এক স্টেশন চত্বরে কেন যে এত চুল কাটার জায়গা কে জানে! টিয়াডাঙায় ডেরা বাঁধার পর প্রথম প্রথম উঁকি দিত প্রশ্নটা, এখন অহনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। জীবনের বড় বড় প্রশ্নগুলোরই তো উত্তর মেলেনি, এই অকিঞ্চিত্কর কৌতূহলের জবাব খোঁজার কী প্রয়োজন। বরং মনটাকে প্রশ্নবিহীন করে রাখতে পারলে বোদা বোদা ভাবটায় স্বস্তি তো মেলে যা হোক।

সেলুনের সারি পেরিয়ে, টিকিট কাউন্টারের পাশ কাটিয়ে অহনা প্ল্যাটফর্মের বাইরে এল। স্টেশনের লাগোয়া রামুর গ্যারেজ, নিত্যযাত্রীদের দ্বিচক্রযানে বোঝাই। পয়সা মিটিয়ে নিজের মোপেডখানা সেখান থেকে নিল অহনা। অন্য দিন পাহারাদার ছেলেটার সঙ্গে হাবিজাবি কথা বলে দু’-চারটে, আজ ইচ্ছে করছে না। ব্যাটারিচালিত বাহনটি নিয়ে সটান রাস্তায়। স্টার্ট দিয়েছে।

সামনেই টিয়াডাঙার পাইকারি বাজার। মরশুমি সবজির। হরেনবাবুর আড়তে প্রকাণ্ড পাল্লায় ঝিঙে-পটল ঢেঁড়শের স্তূপ। উঠছে, নামছে, ঝপাঝপ বস্তাবন্দি হচ্ছে খেতের ফসল, ট্রেনে-ট্রাকে-ভ্যানে-অটোয় বোঝাই হয়ে পাড়ি দেবে কাছাকাছি বাজারে। দূর-দূরান্তরেও। টিয়াডাঙার ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চিরে ধীর গতিতে এগোচ্ছে অহনার দুধসাদা মোপেড। দু’পাশে দোকানের পর দোকান, কেউ বা নিজের নিয়মে ব্যস্ত, কেউ বা অলস আড়মোড়া ভাঙছে। এখনও শিবানী ফার্মেসি খোলেনি, আজ শুক্রবার বোধহয় একবেলা বন্ধ, বাইরেটায় চাটাই পেতে তাসে মগ্ন প্রবীণের দল। অল্পবয়সি ছেলে-ছোকরারা আড্ডা মারছে উচ্চকিতে, ছোট ছোট জটলায়। বড্ড পরিচিত দৃশ্য, বড় একঘেয়ে।

জমজমাট জনপদটা অতিক্রম করে এসে অহনা একটা আলগা শ্বাস ফেলল। তার নিজের জীবনই বা কী এমন বৈচিত্র্যময়। ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে শুতে যাওয়া, সবটাই কি ছকে বাঁধা নয়? শুধুই তো গোটাকতক রুটিনমাফিক কাজ, যা সে করে চলেছে গত সাড়ে পাঁচ বছর। মাঝেমধ্যে কোনও উত্তেজনার কারণ ঘটে হয়তো, তবে সেও তো ছকেরই অঙ্গ। সমিতির মেয়েদের সমস্যার অন্ত নেই, নানান ঝঞ্ঝাটের সাতকাহন তারা শোনায় বটে, কিন্তু তার মধ্যেও কোনও বৈচিত্র্য আছে কি? একই কাহিনি যেন আলাদা আলাদা মুখ থেকে শোনা! আচমকা চিন্তায় ছেদ। সর্বনাশ, শেফালিদেবীর প্রেশারের ট্যাবলেটটা তো ভুলে মেরে দিচ্ছিল প্রায়! একবার শুধু জানিয়ে দিয়েছে ওষুধ শেষ, এখন সারাক্ষণ শুধু তক্কে তক্কে থাকবে মা। অহনা না নিয়ে গেলে খুশিই হবে সম্ভবত। উদাস মুখে বাক্যবাণ ভাসিয়ে দেওয়ার অপ্রাকৃত সুখটুকু মিলবে যে!

কী আশ্চর্য মানসিকতা! যে মেয়েকে ছাড়া শেফালিদেবীর চলবে না, সেই মেয়েকেই কিনা হেনস্তা করবেন প্রতি পদে? চটেমটে অহনা যদি দুটো কড়া কথা শুনিয়েই ফেলে, আর রক্ষে আছে? এমন একটা আচরণ করবেন, যেন টিয়াডাঙায় এনে তাঁর উপরে চরম অত্যাচার চালাচ্ছে অহনা! শুধু তাই নয়, মেয়ের সঙ্গী হয়ে টিয়াডাঙায় বসবাস করে তিনি যে হতভাগিনী দুঃখিনী অহনার লাগাতার উপকার করে চলেছেন এবং করতেই থাকবেন, এটিও স্মরণ করাতে ভোলেন না কখনও।

অথচ সত্যিটা হল এই যে, অহনা খুব একটা চায়নি মা তার লেজে লেজে টিয়াডাঙায় আসুক। ভেবেছিল, এখানে সে একা থাকবে, একা একাই নাড়াচাড়া করবে তার ঘেঁটে যাওয়া অতীত, একা একাই সাজাবে ধূসর ভবিষ্যৎ। এবং যে কাজটা সবচেয়ে বেশি জরুরি, মুখোমুখি হবে নিজের। কোনওটাই যে সে ঠিকমতো করে উঠতে পারল না, সে তো ওই শেফালিদেবীর কারণেই।

ব্রেক চেপে থামল অহনা। মোপেড সাইড করে ঢুকেছে পপুলার ড্রাগ হাউসে। দোকানটার স্টক ভাল, পাঁচ থেকে দশ পারসেন্ট ডিসকাউন্ট দেয়, এখান থেকেই সে ওষুধ নেয় সাধারণত।

“কাউন্টারের টাকমাথা লোকটি একগাল হেসে বলল, দিদি বুঝি ফিরছেন?”

“হুঁ।…প্রেশারের ওষুধটা দেবেন তো। তিন পাতা।”

তাক থেকে বাক্স নামাল লোকটা। ডালা খুলে হাতড়াতে হাতড়াতে বলল, “এ মাসে ঘুমের ট্যাবলেট তো নিলেন না দিদি?”

অহনা বলতে পারত গত মাসে বেশি করে নিয়েছিল, এখনও ফুরোয়নি। জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। ঢাউস ব্যাগ খুলে টাকা বের করছে।

লোকটা ফের বলল, “কলকাতা গিয়েছিলেন বুঝি?’’

অহেতুক কৌতূহল। অহনা তো এখানে নতুন নয়, সে কী করে, না করে তাও জানে সব্বাই, নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াতও লোকচক্ষুর অগোচরে ঘটে না, তবু যে কেন এই গায়ে পড়ে খাজুরা? নাকি তাদের মা-মেয়ের টিয়াডাঙায় এসে বসবাসের মধ্যে এখনও রহস্যের গন্ধ রয়ে গেছে?

লোকটার প্রশ্নমালা শেষ হয়নি, আবার বলল, “আজ নাকি শিয়ালদার কাছে কী সব গোলমাল হয়েছে? দুপুরে টিভিতে দেখাচ্ছিল… পুলিশ নাকি লাঠি চালিয়েছে…?’’

তাই কি মৌলালির মোড়টায় একটা ভিড়মতো ছিল। রাজনৈতিক কোনও বখেড়া? হবে বা। রাজনীতির যা চেহারা হয়েছে এখন, ও নিয়ে ভাবতেও গা গুলোয়।

প্রসঙ্গটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে দু’খানা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল অহনা। নীরস স্বরে বলল, “কত হল দেখুন।’’

“হ্যাঁ, এই তো…।’’ টাকাটা নিল লোকটা। হিসেব করে বাকি পয়সা ফেরত দিতে দিতে বলল, “আপনার গাড়িখানা কিন্তু খাসা হয়েছে দিদি। ধোঁয়া নেই, ভটভট শব্দ করে না, শাঁ শাঁ নাই ছুটুক, দিব্যি ফুরফুর যাচ্ছে…”

অহনা ব্যাগের চেন লাগাচ্ছিল। অস্ফুটে বলল, “হুঁ।’’

“একটা কথা বলি দিদি?”

ওফ, এখনও একটা কথা ফুরোয়নি! মানুষ কেন যে বোঝে না, কখন থামতে হয়?

অহনা চোখ তুলে তাকাতেই লোকটা বলল, “আপনি মাঝে একটা সাইকেল নিয়ে ঘুরতেন, কেমন চোখে লাগত। এই বাহনটি কিন্তু বেশ, আপনাকে ভারী মানাচ্ছে।”

শুনতে মন্দ লাগল না অহনার। মনে মনে হাসলও একটু। সাইকেল কি সে অকারণে চাপত? মোপেড না কিনলে আর চলছিল না বলেই তো সেই আসানসোলের বালিকা বয়সে সাইকেল চালানোর অভ্যেসটা ক’দিন ঝালিয়ে নিচ্ছিল অহনা। তবে এই আধবুড়ি বয়সে সাইকেল আরোহিণী হিসাবে সে মোটেই তেমন দৃষ্টিলোভন নয়, এটা শুনে মোটেই প্রীত হল না।

অহনা কেঠো স্বরে বলল, “মানাক, না মানাক, আমার তো কাজের জন্য কেনা।”

“সে তো বটেই দিদি। আপনার তো আমাদের মতো এক জায়গায় বসে দাঁড়িয়ে কাজ নয়। অবিরাম চক্কর কাটছেন। আজ সাঁঝের হাট ছুটছেন, তো কাল মাজুলি…।” লোকটার কপালে এবার মৃদু কুঞ্চন, “তা ব্যাটারি কেমন খাচ্ছে দিদি?”

“কোম্পানি তো বলেছে তিন বছর যাবে। তার বেশি চললে কপাল।”

“ওইটাই আসল কথা দিদি। কপাল। কার যে কী আয়ু নির্দিষ্ট করা আছে কে জানে।”

লোকটা বড্ড বেশি বকছে তো? এক্ষুনি হয়তো গেঁয়ো দার্শনিক বুলি আওড়ানো শুরু করে দেবে। অহনারই বা কী আক্কেল, তালে তাল দিয়ে সে বকবক করছে কেন?

তাড়াতাড়ি দোকান ছেড়ে মোপেডে ফিরল অহনা। পুচকে খোপ থেকে বের করেছে হেলমেট। স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা রাস্তা মোটামুটি মসৃণ, তবে রাজ্য সড়কে পড়লে শিরস্ত্রাণের প্রয়োজন হবে।

অহনা সওয়ার হয়েছে মোপেডে, হঠাৎ লোকটা বেরিয়ে এল দোকান ছেড়ে। লজ্জা লজ্জা মুখে বলল, “দিদি, একটা দরকারি কথা আপনাকে জানাতে ভুলে গেছি।”

অহনা বিরক্তি চেপে বলল, “আবার কী হল?”

“আপনাকে একজন খুঁজছিল।”

“আমাকে?” অহনা ভুরু কোঁচকাল, “কে? কেন?”

“তা তো জানি না। দীপু-বাপি-সান্টুরা দাঁড়িয়েছিল… ওদের জিজ্ঞেস করছিল আপনার বাড়িটা কোথায়… কতদূরে… কীভাবে যেতে হয়…”

“অ। কখন?”

“এই তো…পাঁচটা নাগাদ। আমি সবে তখন দোকান খুলছি।”

“কোনও মেয়ে?”

“না দিদি। ইয়ং ম্যান। হাট্টাকাট্টা। পিঠে মোটা ব্যাগ। ওই যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা যেমনটা নিয়ে ঘোরে…”

কিঞ্চিৎ অবাকই হল অহনা। সমিতির কাজে তার কাছে হরবখত লোক আসে বটে, কিন্তু পিঠে রুকস্যাক চাপিয়ে…? সুশোভন স্যার পরশু বলছিলেন, কোনও একটা খবরের কাগজ নাকি অহনার সমিতির কাজকর্ম নিয়ে স্টোরি করতে চায়। আপত্তি ছিল অহনার, তার ছোট্ট সমিতির অতি সামান্য কাজকম্মো নিয়ে গপ্পো ফাঁদায় সে বরাবরই অনাগ্রহী, কিন্তু সুশোভন স্যারের নিশ্ছিদ্র যুক্তিজালের সামনে পড়লে অহনার অনিচ্ছে যে কুটোর মতো ভেসে যাবে এও তো অবধারিত। পরে অবশ্য অহনার মনে হয়েছে, তার আশাবরীর একটু-আধটু প্রচার হওয়া মন্দ নয়, প্রচারের আলো থাকলে সরকারি দফতরে অপরিচিতির লক্ষণরেখা পেরোতে তো সুবিধা হয়।

তা তারাই কেউ হানা দিল নাকি? ক্যামেরা ট্যামেরা সহ? কিন্তু তারা বিকেলে আসবে কেন? সদা ব্যস্তবাগীশ সুশোভন স্যার যতই বেখেয়ালি মানুষ হন না কেন, নিশ্চয় অহনার মোবাইল নম্বর তাদের দেবেন এবং তারাও আগে অ্যাপয়ন্টমেন্ট করে তবেই না লোক পাঠাবে?

তা হলে আর কে হতে পারে? স্যারের ছাত্রটাত্র কেউ? ডাটা কালেকশনে এসেছে? উঁহু, তা হলেও তো স্যার একটা ফোন করতেন। তা ছাড়া, তারাই বা এই অবেলায়, বিনা নোটিশে, কেন হাজির হবে? একমাত্র সেই মানুষটাই আচমকা এভাবে আসে…

ভাবনাকে বেশি গড়াতে দিলেই মুশকিল। চলতে থাকবে, বইতে থাকবে, অনন্ত ধারায় বিভাজিত হয়ে ঢুকে পড়বে অচেনা অপ্রিয় খাতে। বালি সরিয়ে তুলে আনবে এমন সব স্মৃতি, যেগুলো মগজের খোপে মরে গেলেই স্বস্তি পায় অহনা।

সুইচ টিপে অহনা চালু করল মোপেড। এবার ধীরে ধীরে ক্ষীণ হচ্ছে লোকালয়। ঈশানবাবুর বড় কাঠগোলা ছাড়িয়ে সামান্য বাঁয়ে হেলেছে পিচঢালা পথ, বটতলার তেমাথায় পৌঁছে ঘুরতে হবে ডাইনে। রাস্তা বলে আর প্রায় কিছুই থাকবে না তখন। এককালে হয়তো ইট পড়েছিল, এখন ভেঙেচুরে একশা। এমন এবড়োখেবড়ো ভাবেই চলে গেছে সেই গঙ্গায়। আলাইপুর ঘাটে।

বিকেল মরে আসছে ক্রমশ। দেখেশুনে সামনে-সুমলে এগোচ্ছিল অহনা। টাল খেতে খেতে। তবে নিয়মিত সাইকেল মোপেড চালিয়ে চালিয়ে তার হাত এখন মোটামুটি পোক্ত। একটু সমতল পেলেই তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে সামনের আকাশে, প্রায় অভ্যাসের মতোই দেখছে বিশ্বচরাচর। পশ্চিম দিগন্তে আজ অল্প অল্প মেঘ। জলহীন। শেষ সূর্যের রশ্মি মেখে গাঢ় রক্তিম। বিষণ্ণ এক আলো ছড়িয়ে আছে দু’ধারের মাঠে, ছুঁয়েছে দূরের গাছ-গাছালিকে। দেখে মনে হয়, পাতলা রংজ্বলা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কেউ। বিস্তীর্ণ ভূমি বিচ্ছিরি রকমের ন্যাড়া এখন। বোরো ধান শেষ, আউশ রোয়া হয়নি, এ যেন এক বিচিত্র বন্ধ্যা সময়। তৃষ্ণার্ত মাটি এখন বর্ষণের প্রতীক্ষায়।

ছোট্ট একটা কালভার্ট পার হল অহনার মোপেড। খানিকটা ঢাল বেয়ে নেমে অল্প একটু চড়াই। তার পরেই আলাইপুর মৌজা শুরু। বেশ বড় গ্রাম, স্থানীয় লোকরা এদিকটাকে বলে পূর্ব আলাইপুর। গোড়াতেই ডাইনে পর পর কয়েকটা দোকান। মুদিখানা, চা-তেলেভাজার ঠেক, জীবনবাবুর স্টেশনারি শপ। মোবাইল কোম্পানির ঝকঝকে সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে দোকান আর মালিকের নাম। বাড়িঘরও চলছে দু’পাশে। পাকা বাড়িই বেশি, কাঁচাও আছে মাঝে মাঝে। একটা দোতলা বাড়ির দেওয়ালে শ্যামাঙ্গিনী ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের অতিকায় সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপিত হচ্ছে সততা, নির্ভরতা। বাড়িগুলোর পেছন ভাগে ছোট বড় সবজির খেত। পটল, ঝিঙে, শসা, কাঁচালঙ্কা…। নদীর ধারের ইটভাটায় দিনের কাজ ফুরোল, দলবেঁধে ফিরছে মেয়েরা। কলকল করতে করতে লুটিয়ে পড়ছে অকারণ হাসিতে। নিম-শিমুল-আম-কাঁঠালের ডালে আঁধার ঘনিয়ে এল।

এইসব মেয়ে বউদের দেখে অহনার ভারী অদ্ভুত লাগে। এদের প্রত্যেকের জীবনকাহিনি প্রায় এক, সেখানে আনন্দের খোরাক নেই বললেই চলে। ঘরে অকম্মা বর, গাদাখানেক এন্ডিগেন্ডি, ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই জুতে যায় হাড়ভাঙা খাটুনিতে, ইটভাটার মালিকও মজুরিতে দেদার ঠকায়, বাড়তি কিছু লোভের ইশারাও চলে অবিরাম। এক্ষুনি বাড়ি ঢোকামাত্র সংসারের ফাঁসকল চেপে বসবে গলায়, তবু যে এত পুলক আসে কোত্থেকে? অশিক্ষা, অজ্ঞতা কি দুঃখবোধকে ভোঁতা করে দেয়?

কিন্তু অহনার শিক্ষাদীক্ষা কি তীক্ষ্নতর বিষাদ সঞ্চার করে কোনও মুক্তি দিতে পেরেছে? অহর্নিশ জ্বালাপোড়া আর সেভাবে নেই হয়তো, কিন্তু আনন্দের জন্মদাতা কোষগুলো যে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে, এতে তো কোনও সন্দেহ নেই? সুতরাং নিজেকে ওই সরল মেয়েগুলোর তুলনায় উচ্চতর কিছু ভাবাটা কি নেহাতই মনকে চোখ ঠারা নয়?

অহনার মোপেডকে ভারী সম্মান করে মেয়েগুলো। আরোহিণীকেও। রঙ্গ তামাশা থামিয়ে সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দাঁড়িয়েছে। আবছা হাসি বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে দলটাকে পেরোল অহনা। বাহনের গতি সামান্য বাড়িয়েছে। শ’খানেক মিটারও এগোতে পারল না, থামতে হয়েছে অচিরেই। গোটা রাস্তা জুড়ে ইট বোঝাই লরি আসছে। পাশ দেওয়ার জায়গা নেই, মোপেড টেনে নামাতে হল প্রান্তে। লরি চলে যেতেই চতুর্দিকে ধুলোর ঝড়। অহনাও ধুলোয় মাখামাখি।

বিরক্ত মুখে হেলমেট খুলল অহনা। আঁটোসাঁটো জড়ানো দোপাট্টার খুঁটে মুছল ঘাড়গলা। কামিজ থেকে ঝাড়ছে ধুলোর আস্তরণ।

তখনই সামনে এক সাইকেল। চেনা মুখ, বিশ্বজিৎ। আলাইপুরেই বাড়ি, বছর কুড়ি-বাইশ বয়স, রানাঘাট কলেজে বি এ পড়ছে। কথাবার্তায় উদ্ধত নয়, বরং বেশ নম্রই। সম্ভবত রাজনীতির সঙ্গে সংশ্রব নেই বলেই সভ্যতা ভব্যতার সাধারণ বোধগুলো হারায়নি এখনও।

সিট থেকে নামল বিশ্বজিৎ। ঈষৎ কুণ্ঠিত স্বরে বলল, “লরির জ্বালায় রাস্তা চলা দায়।”

“কী আর করা।” অহনা হালকা ভাবে বলল, “তোমরা তো রাস্তাঘাট সারাবে না।”

“আমরা কি রাস্তা সারানোর মালিক, দিদি? যারা কাজকর্ম করায়, তারা নিজেদের সময় মতো লোক লাগাবে। ক’টা দিন যাক… এই বর্ষার মুখে আবার ইট ফেলবে।”

“যাতে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়?”

“সবই তো বোঝেন দিদি। ধুয়ে না গেলে সামনের বছর ঠিকাদার বরাত পাবে কোত্থেকে?”

আর সে বরাত না পেলে পার্টির দাদাদের পেট ভরাবে কে? বলতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করল অহনা। বিশ্বজিৎ ছেলে যেমনই হোক, তার সামনে বেশি প্রগল্‌ভ হওয়া কি অহনার সাজে? বিশেষত রাজনীতির লোকজনদের সম্পর্কে মন্তব্য না করাই ভাল। অনেক কাল পরে সরকার বদলেছে, কিন্তু যারা এসেছে তারাও আগের দাদাদের থেকে আলাদা কিছু নয়। আগে একাধিকবার তার সঙ্গে স্থানীয় নেতার আমচা-চামচাদের ঠোকাঠুকি লাগার উপক্রম হয়েছে, কোনওভাবে সামাল দিয়েছে অহনা, নতুন করে ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে পড়ার তার কোনও বাসনা নেই। নিজের কাজটুকু তার গড়িয়ে গড়িয়ে চলুক, তা হলেই যথেষ্ট।

অহনা আলগা ভাবে বলল, “তোমার পরীক্ষা চুকল?”

“এই তো সবে…।” বিশ্বজিৎ সাইকেল টেনে রাস্তার পাশটিতে এল। খানিক সংকুচিত স্বরে বলল, “আপনার সঙ্গে একটা দরকার ছিল দিদি। বাবাও হয়তো আপনাকে বলবে…।”

অহনার ভুরুতে প্রশ্নচিহ্ন।

আমতা আমতা করে বিশ্বজিৎ বলল, “শুনেছেন নিশ্চয়ই মেজদি শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছে?”

আশাবরীতে কাজ করতে আসা মেয়েদের কল্যাণে আলাইপুরের কোনও গৃহেরই ভালমন্দ সমাচার অহনার অবিদিত থাকে না। কাল না পরশু কবে যেন পুব পাড়ার নীতা বলছিল খবরটা। অভ্যাস মতোই সেভাবে কানে তোলেনি অহনা। আজও খুব একটা উত্সাহ দেখাল না। দায়সারা ভঙ্গিতে বলল, “তাই বুঝি। কেন?”

“সে অনেক ব্যাপার দিদি। বিয়ের পর থেকেই টাকার জন্য মেজদির ওপর খুব চাপ দিচ্ছিল জামাইবাবু। বাবা দফায় দফায় কিছু জুগিয়েছে। এখন জামাইবাবু টু হুইলারের ডিলারশিপ নেবে বলে খেপেছে। বেশ কয়েক লাখ টাকার ধাক্কা। ওই খাঁই মেটানো কি আমার বাবার পক্ষে সম্ভব, বলুন? মেজদির ওপর তাই ওরা ভীষণ টর্চার শুরু করেছিল। বাধ্য হয়ে মেজদি…”

“তোমার মেজদির তো দুটো বাচ্চা, তাই না?”

“দুটোই মেয়ে। ওই কারণেই তো শাশুড়িটা মেজদির ওপর আরও চটা। ছোটটা এবার ক্লাস ফোরে উঠেছে, আর বড়টা নাইন। তাদের পড়াশুনোরও তো এখন দফারফা হওয়ার জোগাড়। কীভাবে ওদের মানুষ করবে সেই চিন্তাতেই তো মেজদির পাগল পাগল দশা।”

“শ্বশুরবাড়ি আর ফিরবে না?”

“এবার গেলে মেজদিকে ওরা মেরে ফেলবে। যা একখানা চশমখোর ফ্যামিলি, বাব্বাহ্। মা বাপ ছেলে সকলেই টাকার পিশাচ।”

বিয়ে দেওয়ার আগে কি কিছুই টের পাওনি? প্রশ্নটা জিভে এলেও গিলে নিল অহনা। নিশ্চিত নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে ভেবেই তো বাবা মা সর্বস্ব পণ করে বিয়ে দেয় মেয়ের। পরে কী ঘটবে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি কী রূপ দেখাবে, তা কি অগ্রিম অনুমান করা সম্ভব? উচ্চশিক্ষিত, সজ্জন বলে পরিচিত পরিবারের মানুষরাও একেক সময়ে যা ভেলকি দেখান! আপাদমস্তক সভ্য মানুষটাই কেমন যেন আজব একখানা মূর্তিতে পরিণত হয় তখন। অচেনা সেই রূপ তো এখনও অহনার দুঃস্বপ্ন।

ফুসফুসে অনেকটা বাতাস টেনে অহনা বলল, “বুঝলাম। তা আমাকে কী করতে হবে?”

“আপনার তো অনেক চেনাজানা। দেখুন না মেজদিটার যদি একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন।”

“কীভাবে?”

“বাবা বলছিল, আশপাশের কয়েকটা ব্লকে নাকি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী নেওয়া হবে। মেজদি তো হায়ার সেকেন্ডারি পাশ, যদি কোনওভাবে মেজদিকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়…”

অহনা অস্বস্তিবোধ করল। টুকুন থেমে থেকে কেজো সুরে বলল, “দ্যাখো বিশ্বজিৎ, এইসব চাকরি কীভাবে হয় তুমি ভাল মতোই জানো। এও জানো, আমি কোনও দলবাজিতে নেই। সুতরাং আমার রিকোয়েস্ট কেউ রাখবেও না, আমিও কাউকে বলে মুখ নষ্ট করতে পারব না।”

চুপ হয়ে একটু ভাবল বিশ্বজিৎ। তারপর বলল, “আপনার আশাবরীতেও তো অনেক মেয়ে কাজ করে দিদি। যদি সেখানেও কিছু হয়…”

“তুমি তো দেখেছ, আমরা কী তৈরি করি। সোলার টর্চ, এমার্জেন্সি লাইট… এসব বানানো তো জানতে হয়, শিখতে হয়…। তা ছাড়া এক্ষুনি নতুন মেয়ে নেওয়ার মতো আমার অবস্থাও নেই। বুঝতেই তো পারো, আশাবরী আর পাঁচটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়… আমাদের রিসোর্স লিমিটেড…” বলতে বলতে অহনা থমকাল। বেশ টের পেল ভাষণটা বৃথা যাচ্ছে, মোটেই প্রীত হচ্ছে না ছেলেটা। পাছে ফের ঘ্যানঘ্যানানি শুরু করে, অহনা গলা নামিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তোমার মেজদিকে পাঠিয়ে দিয়ো। দেখি কী করতে পারি।”

বিশ্বজিতের মুখখানা বেশ উজ্জ্বল দেখাল, “কবে যেতে বলব?”

“যেদিন খুশি। তবে সকালে নয়, দুপুরের দিকে।”

“থ্যাঙ্ক ইউ দিদি। মেজদিটার একটা হিল্লে হলে মা বাবার একটু টেনশন কমে।” বিশ্বজিৎ সাইকেলের প্যাডেলে পা ছোঁয়াল।

হঠাৎ কী মনে পড়ে গেছে বিশ্বজিতের। বলে উঠল, “ও হ্যাঁ দিদি, আপনার বাড়িতে কে যেন এসেছে।”

“শুনছিলাম বটে।” অহনার ভুরুতে ভাঁজ, “কে বলো তো?”

“চিনি না দিদি। আগে কখনও দেখিনি। জিন্‌স টি-শার্ট পরা, মাথাভরতি কোঁকড়া চুল, পায়ে স্নিকার। বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে ঘাট অবধি চলে গিয়েছিল। আমিই ডেকে দেখিয়ে দিলাম।”

পলকের জন্য অহনার মনে হল, জয় নয় তো? সুগতর মামাতো ভাই? মাঝে একদিন দেখা হয়েছিল জয়ের সঙ্গে। মাল ডেলিভারি দিতে গিয়ে। কলকাতার বাগড়ি মার্কেটে। অহনা এখন থাকে কোথায়, কী করছে, জিজ্ঞেস করছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। যা খ্যাপা ধরনের ছেলে, দুম করে চলেও আসতে পারে। কিন্তু জয়ের চুল তো কোঁকড়া নয়। তবে? যাক গে যাক, পৌঁছে বোঝা যাবে।

ছায়া ছায়া অন্ধকারে বাকি পথটুকু পেরোল অহনা। বেঁটে পাঁচিল ঘেরা কম্পাউন্ডটার কাছে এসে মোপেড থামাতেই কানে এল এক অপরিচিত কণ্ঠস্বর। গলাটা বেশ গমগমে, বাড়ি কাঁপিয়ে হেসেও উঠল আচমকা।

বিস্ময় বাড়ছিল অহনার। বিস্ময়বোধ ভোঁতা হয়ে গেছে বহুকাল, তবুও।

.

॥ ২ ॥

জমিটা নেহাত ছোট নয়, প্রায় বিঘা দেড়েক। বেশির ভাগটাই অবশ্য ফাঁকা পড়ে। নির্মাণ বলতে আছে শুধু জমির মাঝ বরাবর একখানা সাদামাটা একতলা বসতবাড়ি, আর চৌহদ্দির নিশান বেঁটে পাঁচিলখানা ঘেঁষে আশাবরীর অর্ধসমাপ্ত কর্মশালা। বাড়ির সামনে অল্প একটুখানি বাগান মতো করেছে শেফালি। ওই বাগান চিরে সারিবদ্ধ কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার গেট থেকে সেই গ্রিলঘেরা বারান্দা পর্যন্ত।

অহনা প্রায় নিঃশব্দে গেট খুলে ঢুকল কম্পাউন্ডে। বেল-কামিনীর সুবাসে বাগান এখন ম ম। মোপেড ঠেলে বারান্দার কাছে পৌঁছোতেই আবার সেই অচেনা স্বর। কী যেন একটা বলল, অমনি বেশ আওয়াজ করে হেসে উঠল শেফালি। মা এমনধারা হাসে না তো বড় একটা। মা’র বাপের বাড়ির কেউ এল নাকি? কোনও দূর সম্পর্কের আত্মীয়?

ব্যাগ থেকে চাবি বার করে অহনা নিজেই হাত গলিয়ে খুলে নিল গ্রিলবারান্দার তালা। সামান্য শব্দ পেয়েই শেফালি বেরিয়ে এসেছে। উচ্ছ্বাসভরা গলায় বলে উঠল, “এত দেরি করলি যে বড়! দেখবি আয়, তোর জন্য কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে?”

ভ্রূকুঞ্চনে কৌতূহল ঢাকল অহনা। মোপেড বারান্দায় তুলে ইচ্ছে করে ধীরেসুস্থে পা রাখল অন্দরে। বেতের সোফায় উপবিষ্ট এক তরুণ। মুখখানা চেনাচেনা লাগে যেন? কোথায় দেখেছে… কোথায়…?

উঠে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা। মিটিমিটি হাসছে, “কী মনে পড়ছে না তো?”

ঈষৎ অপ্রতিভ স্বরে অহনা বলল, “হ্যাঁ,… না… মানে ঠিক প্লেস করতে…”

“আরে, ও তো আমাদের অর্ঘ্য।” শেফালির আর তর সইল না, লঘু ধমকের সুরে বলল, “দ্যাখ ভাল করে, আসানসোলের অরবিন্দবাবুর ছেলে…”

মানে পূজার ভাই! ধাতস্থ হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল অহনার।

চমকিত স্বরে বলল, “তুমি এত বড় হয়ে গেছ?”

“বড় কী বলছ, বুড়ো হয়ে গেছি।” অর্ঘ্য হা হা হেসে উঠল। কোঁকড়া চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, “খুঁজলে দু’-চার পিস পক্ককেশও মিলবে।”

“যাহ, তুই তো পুচকে।” রশিবাঁধা মন ছাপিয়ে হঠাৎ পুরনো দিনের সুবাস উপচে এল অহনার গলায়, “আমার চেয়ে তুই ঢের ছোট। কম করে সাত-আট বছর।”

“উঁহু, মেরেকেটে ছয়। অবশ্য দিদি আর তুমি যদি সেম এজ হও।” অর্ঘ্য গলা খাঁকারি দিয়ে চোখ ঘোরাল, “তোমরা একই ক্লাসে পড়তে নয় কি?”

শেফালি গদগদ স্বরে বলল, “তোর চেহারা কিন্তু একদম পালটে গেছে রে। কোথায় সেই ফোলা ফোলা গাল সাইকেল নিয়ে আসানসোলময় টো টো করে বেড়ানো বিচ্ছু ছেলে, আর কোথায় এই মুশকো জোয়ান! পরিচয় দেওয়ার পরেও তো ওকে দরজা খুলছিলাম না। ওর হাসিটা দেখে তবে মনে পড়ল।”

অর্ঘ্যকে দেখতে দেখতে অহনা বলল, “হ্যাঁ, ওর হাসিটা এখনও একই রকম আছে।”

“ভাগ্যিস আছে। নইলে তো আমার কপালে আজ দুঃখ ছিল। এখানে অনুদির যা ফিল্ড দেখলাম… মাসি একবার চেঁচালে আমি আর জ্যান্ত থাকতাম কিনা সন্দেহ।”

“ফালতু বকিস না।” অহনা ব্যাগ রেখে সোফায় বসল। এককালের ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর ভাইকে দেখে কোথায় সে উচ্ছলই থাকবে, কিংবা, নিদেনপক্ষে স্মৃতিমেদুর, তার বদলে কেন যে বুকে ফের শুঁয়োপোকা নড়াচড়ার অনুভূতি? কেন যে পুরনো পরিচিতদের সান্নিধ্যে স্বস্তি পায় না অহনা? তবুও স্বরে একটু হালকা ভাব রাখল, “প্রভাব প্রতিপত্তি কিস্যু নেই রে ভাই। এ তল্লাটে বছর কয়েক আছি, একটা সমিতি মতো চালাই, সেই সুবাদে দু’-পাঁচজন চেনে, এই যা।”

“বটে? আমার কিন্তু তা মনে হল না। যেভাবে কোলে করে এখানে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল!”

অর্ঘ্যর বলার ঢঙে হেসে ফেলল অহনা। আজকাল স্বতঃস্ফূর্ত হাসি তার আসে না বড় একটা, তবুও। ঠোঁট টিপে বলল, “তা আমার হদিশ পেলি কোত্থেকে?’’

“স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছ নাকি? কেউ তোমার ঠিকানা জানে না?”

“তা নয়। কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে আছি, কারও সঙ্গেই তো তেমন একটা যোগাযোগ নেই…” অহনা একটু থেমে থেকে বলল, “কে? কে দিল আমার অ্যাড্রেস?”

একটুক্ষণ অহনার দিকে তাকিয়ে রইল অর্ঘ্য, যেন পড়তে চাইছে দিদির বান্ধবীটিকে। তারপর সহজ সুরেই বলল, “সে এক গল্প। পরশু বিকেলে কলেজ স্ট্রিটের এক বুকস্টলে পত্রিকা ঘাঁটছি, হঠাৎ দোকানের ছেলেটার সঙ্গে এক ভদ্রলোকের জোর তর্ক বাধল। ভদ্রলোক একটা ম্যাগাজিন কিনেছিলেন, মাঝের কয়েকটা পাতা মিসিং, উনি বদলাতে চাইছেন, ছেলেটা রাজি নয়। ভাল করে লক্ষ করতেই দেখি, আরে এ যে লাল্টুদা।”

“ও, তাই বল। দাদার কাছ থেকে…”

“লাল্টুদাও কিন্তু আমায় প্রথমটা চিনতে পারেনি।” অহনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে অর্ঘ্য বলল, “তবে পরিচয় পেয়ে খুব খুশি। চা-টা খাওয়াল। কথায় কথায় তখনই তো বলল, তুমি এখন খুব হাই-ফাই হয়ে গেছ, বিশাল কর্মকাণ্ড চালাচ্ছ…। শুনে ভাবলাম, যাই, একটু সরেজমিন করে আসি।” তড়বড় করে কথা বলতে বলতে অর্ঘ্য থামল ক্ষণিক। চোখে রহস্যের ভাব ফুটিয়ে বলল, “আমার অবশ্য অন্য ইন্টারেস্টও আছে।”

“কী রে?”

“বলব, বলব। তাড়া কীসের। তুমি নিশ্চয়ই এক্ষুনি আমায় ভাগিয়ে দিচ্ছ না? শুধু চা খেয়েছি, এবার বোধহয় একটু জলখাবারও পাব…। তুমি ততক্ষণে ফ্রেশটেশ হয়ে নাও।”

অহনা অপ্রস্তুত মুখে ঘুরে তাকাল। শেফালিকে বলল, “ওকে এখনও কিছু খাওয়াওনি?”

“আহা, এই তো খানিক আগে এল। চায়ের সঙ্গে ওমলেট দিচ্ছিলাম, ও নিজেই বারণ করল। বলল, তুই ফিরলে একসঙ্গে খাবে।”

“এবার তা হলে বডিটা নাড়াও।”

“লুচি ভাজব? কৃষ্ণা আছে এখনও, মেখে বেলে দেবে।”

“স্ট্রেঞ্জ, জিজ্ঞেস করছ?” ভেতরের শুঁয়োপোকাটা আবার নাড়াচড়া করছে, তাকে দাবিয়ে স্বরে স্নেহশীলা দিদি দিদি ভাব ফোটাল অহনা, “ছেলেটা কতদূর থেকে তেতেপুড়ে এসেছে… এদিকে তুমি এখনও হাত গুটিয়ে…”

“যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি।” শেফালি উঠে দাঁড়াল, “তা তুমিও খাবে নিশ্চয়?”

“রোজ তোমায় এক কথা বলতে হবে? এই গরমে সন্ধেবেলায় স্নান না করে আমি কিছু মুখে তুলি?” অভ্যাসমতোই স্বর রুঢ় হয়েছিল অহনার, সামলে নিয়ে বলল, “আমার শুধু চা।”

“যা তোমার মর্জি।”

পালটা ঝাঁঝ ছুড়ে দিয়ে শেফালি রান্নাঘরে। অহনা আমল দিল না, হেলান দিয়ে বসেছে। মেঝেয় অর্ঘ্যর রুকস্যাক, সেদিকে পলক দৃষ্টি ফেলে বলল, “পূজা এখন কী করছে রে?”

“গড়পড়তা মেয়েরা যা করে। চুটিয়ে সংসার। পিটিয়ে পিটিয়ে ছেলেটাকে গাধা বানাচ্ছে।”

“ওর জামশেদপুরে বিয়ে হয়েছিল না?”

“হ্যাঁ।”

“এখনও কি সেখানেই?”

“ছিল। কিছুদিন আগে পর্যন্ত।” অর্ঘ্য গলা ঝাড়ল, “লাস্ট ডিসেম্বর থেকে সিঙ্গাপুরে।”

“তাই বুঝি?”

“হ্যাঁ গো, ওর বর একটা ভাল অফার পেল…।” অর্ঘ্য একটু থমকে বলল, “বাবা তো দিদির বিয়ের চিঠি পাঠিয়েছিল, তোমরা কেউ এলেই না।”

সে তো আমার বিয়েতেও তোরা… বলতে গিয়েও ঢোঁক গিলল অহনা। অপ্রিয় প্রসঙ্গটা নাড়াঘাঁটা না করাই তো ভাল। আলগোছে বলল, “হয়ে ওঠেনি রে। তা মাসি-মেসোর কী খবর? আছেন কেমন?”

“এই বয়সে যেমন থাকে।” অর্ঘ্য কাঁধ ঝাঁকাল, “ফুটবল খেলা বা নাচার মতো ফিটও নয়, আবার শয্যাশায়ীও নয়। বাত, প্রেশার, থাইরয়েড নিয়ে ভালই আছে দুটিতে।”

“আমার বাবা তো চলেই গেল।” অহনা সামান্য আনমনা, “কীই বা এমন বয়স হয়েছিল? মাত্র চৌষট্টি। কোনও অসুখ নেই বিসুখ নেই, হঠাৎ কোত্থেকে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। এবং এক ধাক্কাতেই শেষ।”

“হ্যাঁ লাল্টুদা বলছিল।… তোমরা নাকি ট্রিটমেন্টেরও সময় পাওনি।”

অহনা সামান্য কুঁকড়ে গেল। আর কী কী গল্প করেছে দাদা? অহনা কেন মাকে নিয়ে আলাইপুর চলে এল জানিয়েছে কি? আশা করা যায় অহনা-সুগতর বৃত্তান্তও ঘটা করে শোনায়নি? অবশ্য জানলেই বা কী ক্ষতি, না জানলেই বা অহনার কী এমন মোক্ষপ্রাপ্তি? চামড়া অনেক পুরু হয়ে গেছে অহনার, লোকলজ্জা আর তেমন গায়ে বেঁধে না। একমাত্র সমবেদনার ভারী ভারী নিশ্বাসই যা গোল পাকায়, বড্ড তেতো করে দেয় মেজাজটা।

কথা ঘোরাতে চাইল অহনা। সোজা হয়ে বসে বলল, “যাক গে, এবার তোর কথা বল? কী করছিস এখন?”

“আমি?” অর্ঘ্য ঘাড় চুলকোচ্ছে, “ধরে নাও, এক ধরনের ভ্যারেন্ডা ভাজছি।’’

“মানে?’’

“ইকনমিক্সে মাস্টার ডিগ্রি করেছিলাম। তারপর একটা চাকরিও জুটেছিল। মাস্টারি। এখন সব ছেড়েছুড়ে একটা প্রোজেক্ট করছি।”

“কী প্রোজেক্ট?”

“ওই একটা…রুরাল ভারতবর্ষ নিয়ে…।”

“তাই বল। কোনও ফেলোশিপ পেয়েছিলি বুঝি?”

“ওই আর কী। মিলে গেছে কপালজোরে।”

“কোন ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপ? কলকাতা? যাদবপুর?”

“না না, একটা বিদেশি অর্গানাইজেশন… নানান ধরনের গ্লোবাল স্ট্যাটিসটিক্স তৈরি করে ওরা… গবেষণার কাজে লাগে তো।”

“তা কদ্দিনের প্রোজেক্ট?”

“ধরা বাঁধা কোনও টাইম লিমিট নেই। তবু মোটামুটি দু’-আড়াই বছর।”

“তারপর কী করবি?”

“অত ভাবাভাবি আমার আসে না অণুদি। কে বলতে পারে, তখন হয়তো আমি রইলামই না।”

“কেন? কোথাও যাওয়ার প্ল্যান আছে নাকি?”

“আরে না।…তবে বলা কি যায়, হয়তো দুম করে অক্কাই পেলাম।”

“ও কী ধরনের অলুক্ষুনে কথা।” দরজা থেকেই চেঁচিয়ে উঠল শেফালি। হাতে লুচি-তরকারির থালা, চোখে কঠোর ভর্ত্সনা। গোল সেন্টার টেবিলে প্লেট রাখতে রাখতে বলল, “বাবা-মা বেঁচে থাকতে এমন কথা উচ্চারণ করে কেউ?”

“আরে রেগে যাচ্ছ কেন?” অর্ঘ্য হাসছে, “আমি জাস্ট একটা কথার কথা বলছিলাম।”

“সব কথা মুখে আনতে নেই রে।” কৃষ্ণা চা এনেছে, মেয়েকে কাপ বাড়িয়ে দিয়ে শেফালি অর্ঘ্যকে ফের বলল, “মুখের ভাল ভাল কথা কক্ষনও ফলে না রে ছেলে, কিন্তু খারাপ কথাই আচমকা সত্যি হয়ে যায়।”

অহনার মুখমণ্ডল পলকে ম্লান। মা কেন যে বলল কথাটা বুঝতে অসুবিধে নেই। মাঝেসাঝেই বলে কিনা। সুগতকে বিয়ে করার জন্য যখন খেপে উঠেছিল অহনা, বাবার আপত্তি ছিল খুব। ভয় দেখিয়েছিল, তাড়িয়ে দেবে মেয়েকে। সেদিন জেদাজেদির লড়াইয়ে মেয়েরই পক্ষ নিয়েছিল শেফালি। মা-মেয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে হার মানতে হয়েছিল বাবাকে। কিন্তু সেই সঙ্গে বলেও ছিল, ‘‘এত কাণ্ড করে বিয়ে করছিস, শেষমেশ টিকবে তো?” বাবা হয়তো সুগতর আসল রূপটা আন্দাজ করতে পেরেছিল, কিংবা অনুমান করেছিল মেয়ে-জামাইয়ের স্বভাবের অমিলটা ক্রমশ প্রকট হয়ে একদিন না একদিন চুরমার হয়ে যাবে সম্পর্কটা।

মা কিন্তু এখনও, এত বছর পরেও, বাবার সেই মুখের কথাটাকেই ধরে বসে আছে। যেন ওই বাক্যটি উচ্চারণ না করলে আজও সুখে শান্তিতে সুগতর ঘর করত অহনা। এমন একটা হাস্যকর ধারণায় অহনা একসময় মজা পেত, ইদানীং বিরক্তিবোধ করে। একটা জ্বালাও টের পায় যেন। মনে হয়, ঘর ভাঙার জন্য পরোক্ষে তার দিকেও আঙুল তুলছে মা।

ভার মুখে চায়ে চুমুক দিল অহনা। মেয়ের ভাবান্তর নজরে পড়েনি শেফালির, আবার ফিরে গেছে ঘরোয়া আলাপচারিতায়। সহজ স্বরেই বলল, “তা তোর বাবা মা কি এখনও আসানসোলেই?”

“কোথায় আর যাবে?” আলুচচ্চড়িতে আস্ত লুচি পাকিয়ে মুখে পুরল অর্ঘ্য। চিবোতে চিবোতে বলল, “রিটায়ারমেন্টের মুখে মুখে চেলিয়াডাঙায় একটা ফ্ল্যাট কিনেছিল। ব্যস, ওখানেই থিতু।”

“ফ্ল্যাট কেন? ওঁর না বাড়ি করার খুব শখ ছিল?”

“হয়ে উঠল না মাসি। দিদির বিয়েতে বড্ড বেশি খরচা করেছিল বাবা। পিএফ থেকেও অনেক টাকা লোন তুলেছিল। ফলে যা হয়, প্রপার আসানসোলে জমিই কিনতে পারল না। ওদিকে মা তো কিছুতেই টাউন ছেড়ে নড়বে না। অগত্যা কোনওক্রমে একটা ছোটখাটো ফ্ল্যাট। সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিটের মতো।”

“বুড়ো বয়সে ছোট আস্তানাই ভাল। এই তো দ্যাখ না, এত বড় একটা জায়গা সামলাতে আমার কী হিমসিম দশা! যেদিকে দুটো দিন না তাকাব, অমনি সেদিকে আগাছা-টাগাছা হয়ে… পুরো জঙ্গলের চেহারা নেয়…। সব দায় আমার, অণু, তো ভুলেও কোনও দিকে তাকায় না…।”

“কাঁদুনি গাওয়ার অভ্যেসটা এবার ছাড়ো তো।” অহনা আচমকা ঝেঁঝে উঠল, “কে তোমায় দায় নিতে মাথার দিব্যি দিয়েছে, অ্যাঁ?”

“মানুষের মাঝে থাকলে বাড়িঘরকে একটু ভদ্রস্থ রাখতে হয়।”

“তো রাখো না, ঘ্যানঘ্যান করছ কেন? আমি কি শুয়ে বসে থাকি সারাদিন? ঘরদোরের কাজকর্ম করলে তো তোমারই ভাল, এক্ষুনি অথর্ব হয়ে পড়বে না।” অহনা ভুরু নাচাল, “কী রে অর্ঘ্য, ভুল বলেছি।”

“নেহি। বিলকুল সহি বাত কহি আপ নে।” অর্ঘ্যর গলায় মজার সুর, “কিন্তু একটা কথা বলো তো। তোমরা এখানে জমিবাড়ি কিনতে গেলে কেন? অণুদিই কি পরামর্শ দিয়েছিল মেসোকে?”

“আরে না না।” আবার শেফালির গলাই বেজে উঠল, “এটা তো পাকেচক্রে কেনা। সত্যি বলতে কী, আমরা তখন বেহালার ফ্ল্যাটের পজেশন পেয়ে গেছি। হঠাৎ একদিন অণুর বাবা তার এক সাব-অর্ডিনেটের কাছে খবর পেল, এখানে জলের দরে বাড়িসুদ্ধু জমি বিক্রি আছে। দেখতে এসে জায়গাটা তার এতই পছন্দ হয়ে গেল, ফিরেই বলে, নগরবাস তো অনেক দিন হল, এবার বাকি জীবনটা প্রকৃতির মাঝে কাটাব। সাড়ে তিন লাখ টাকায় এতটা জমিসুদ্ধু বাড়ি… তাও খুব বেশি দিন আগে নয়, মাত্র দশ বছর… ভাবতে পারিস!”

“হুম, খুবই সস্তা।… তা মেসোমশাই এখানে এসে থেকেছেন?”

“কই আর।…প্রথম প্রথম অবশ্য খুব উত্সাহ ছিল। ঘরদোর সারাল, রং করাল, শনি-রোববার ছুটি ছাটায় চলেও আসত। লাল্টু-ঝুমাও তখন এসে থেকে গেছে দু’-চার বার। দেড়-দু’বছর যেতে না যেতেই সকলের এনার্জি খতম। এমনকী তোর মেসোমশাইয়েরও। বলে, ওরে বাবা বড্ড দূর। শেয়ালদা থেকে ট্রেনে লাগে পাক্কা দু’ঘণ্টা, তার পরেও চার-পাঁচ কিলোমিটার ঠেঙিয়ে তবে এই আলাইপুর গ্রাম। তা শখ করতে এত খাটুনি কি শহুরে বাবুদের পোষায়? ব্যস, যে লোকটা পাহারায় থাকত, তার হল পোয়াবারো। লোকাল পিকনিক পার্টিদের ভাড়া দিয়ে শীতের মরশুমে দেদার পয়সা কামাত। অণুর বাবা আর দাদা তো বেচে দেওয়ার কথাও ভাবছিল তখন।” শেফালি ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল, “তা সেও তো আর হল না, তার আগেই উনি পরপারে।”

“মেসোমশাইয়ের কেনাটা বৃথা যায়নি, এটা কিন্তু একটা প্লাস পয়েন্ট। জায়গাটা ছিল বলেই না অণুদি এখানে একটা কাজ করতে পারছে।”

“হুঁহ, তাতে যে কার কী মোক্ষ লাভ হচ্ছে, সে তোমার অণুদিই জানে। এসব কি মেয়েমানুষের কাজ?”

“কী বলছ মাসি? আজকাল মেয়েদের কাজ ছেলেদের কাজ বলে আলাদা কিছু আছে নাকি?”

“খুব আছে। সে তোমরা মানো, ছাই না মানো। তফাত যদি নাই থাকবে, বিধাতা তা হলে দু’ কিসিমের জীব বানালেন কেন?”

মোক্ষম যুক্তি! বাবাও এই কথাটাই বলত না কথায় কথায়! সৃষ্টি টিকে থাকার নিছক জৈবিক নিয়মটা কি সুচতুর ভাবেই না ব্যবহার হচ্ছে, হয়েই চলেছে। আজও। কী আশ্চর্য, মেয়েরাও কথাটা অন্ধের মতোই বিশ্বাস করে। হয়তো ছেলেদের চেয়েও বেশি। নইলে তার আর সুগতর বাদ-বিবাদের সময় মা কি চোখ-কান বুজে সুগতর পক্ষ নিতে পারত?

স্মৃতির ঢেউয়ে দোলা উঠতে দিল না অহনা। মা যেভাবে এগোচ্ছে, থামানো দরকার। নয়তো ঢুকে পড়বে অহনার অপছন্দের সড়কে।

অহনা তাড়াতাড়ি বলল, “মা এখনও ঠাকুমা দিদিমাদের যুগেই পড়ে আছে। দুনিয়া কোথায় পৌঁছে গেছে মা তার খবরই রাখে না।”

শেফালি অপ্রসন্ন গলায় বলল, “অ। আমি বুঝি নিউজ দেখি না?”

“ওফ্, কী কথার কী যে মানে করো? তেষট্টিতেই বাহাত্তরে ধরে গেল!”

অর্ঘ্য লুচি শেষ করে চুমুক দিচ্ছে চায়ে। দাড়িগোঁফহীন চৌকো মুখখানায় পলকা হাসির আভাস। চোখ ঘুরছে ঘরের এদিক সেদিক। কোণের টেবিলে রাখা টিভিটা দেখিয়ে বলল, “ওটা চলে নিশ্চয়ই?”

“খুব চলে।”

“কেব্‌ল কানেকশনও তো আছে দেখছি? তা শেফালিমাসির টিভির নেশা নেই?”

“ওরে বাবা, নেই আবার…! সাধে কি মগজে জং পড়েছে?” অহনা মুখ বেঁকাল, “অন্তত ছ’-ছ’খানা সিরিয়াল সিন টু সিন মুখস্ত। আজ তোর অনারে বন্ধ রেখেছে মা।”

“এহে, আমি তো তা হলে মাসির সন্ধেটা নষ্ট করে দিলাম।”

বুঝতেই যখন পারছ, এবার কেটে পড়ো না বাপু। স্নান করে শীতল হয়ে শান্তিতে একটু গড়াগড়ি খাই বিছানায়। মনে মনে বলল বটে অহনা, কিন্তু মুখে তো ভদ্রতা বজায় রাখতেই হয়। সভ্য হওয়ার জ্বালা কম! ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখে অহনাকে বলতেই হল, “আরে না। ঠিক সময় করে রিপিট টেলিকাস্ট দেখে নেবে মা। নয় তো কাল থেকেই অম্লশূল-পিত্তশুল-আর্থারাইটিস-স্পন্ডেলোসিস সমস্ত রোগ একসঙ্গে স্টার্ট করে যাবে না!”

“না রে অর্ঘ্য, আমার অত নেশা নেই। সময় কাটে না বলে দেখি একটু-আধটু।” উষ্মা নয়, সহজ স্বরেই বলল শেফালি, “আমাকেও তো কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে, ঠিক কিনা?”

অহনাকে তেরচা চোখে দেখে নিয়ে অর্ঘ্য ঘাড় নাড়ল, “সে তো বটেই।”

সায় পাওয়ামাত্র শেফালি খুশিখুশি মুখে বলল, “তোকে দেখে আমার আজ কী ভাল যে লাগছে।… তুই এখন আছিস কোথায়?”

“আমি?” একটু বিচিত্র ভঙ্গিতে তর্জনী তুলে নিজেকে দেখাল অর্ঘ্য। অল্প কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কেন…। কলকাতাতেই আছি…।”

“কোনও আত্মীয়ের বাড়ি?”

“না না। একটু যেন অনাবশ্যক জোরে মাথা দোলাল অর্ঘ্য, পেয়িং গেস্ট। বউবাজারের দিকটায়।”

“তা হলে তো তোর ফেরার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। আজ রাত্তিরটা এখানেই রয়ে যা। তোর মুখে একটু আসানসোলের লোকজনের গল্প শুনি।”

এই ভয়টাই তো এতক্ষণ পাচ্ছিল অহনা। মা’র এই এক বিচ্ছিরি অভ্যেস, কেউ এলেই তাকে থেকে যেতে বলবে। কিছুদিন আগেই তো মা’র আহ্লাদ পেয়ে বড়মামার ছেলে টানা এক সপ্তাহ গেঁড়ে বসে রইল। যখন তখন আশাবরীর অফিসে ঢুকে পড়ছে, উপদেশ বর্ষণ করছে মেয়েগুলোকে…। পছন্দ হয় না অহনার, একদম সহ্য হয় না। আত্মীয়স্বজন চেনাপরিচিতের গণ্ডি থেকে দূরে থাকবে বলেই না তার এই টিয়াডাঙায় বাস। আশ্চর্য, মা একবার ভেবেও দেখে না মেয়ের প্রাইভেসি বলেও তো একটা বস্তু আছে। তার এই পুরুষবর্জিত সংসারে সে একটু নিজস্ব ঢঙে খোলামেলাভাবে থাকে, সেখানে সারাক্ষণ একটা দামড়া ছেলে, হোক না সে ভাই, ঘাড়ের পাশে ঘুরঘুর করছে… অসহ্য।

শেফালিদেবীর যদি আলাইপুরে এতই নিঃসঙ্গ লাগে, ফিরে যাক না ছেলের সংসারে। উঁহু, তা তিনি করবেন না। কত ধানে কত চাল হয়, দাদা-বউদি সেখানে বুঝিয়ে দেবে না প্রতি পদে। এখানে এত অঢেল স্বাধীনতা, আছেও রানির হালে, তবু কিছুতেই মেয়ের সুবিধে-অসুবিধে বুঝবে না? যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাতৃদেবী এখানে এসেছিলেন, সে তো কবেই চুকেবুকে গেছে। অহনা দিব্যি নিজেকে রপ্ত করে নিয়েছে আলাইপুরে। তার আর কারওকে প্রয়োজন নেই। মাকেও না।

ক্ষোভ চেপে অহনা সতর্ক স্বরে বলল, “দুম করে এমন এক একটা রিকোয়েস্ট করো না লোককে? ছেলেটা আমাদের দেখতে কদ্দুর থেকে ছুটে এসেছে, অমনি তাকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছ?”

“কেন? এক রাত নয় পুরনো মাসির কাছে রয়েই গেল…”

“ও তো আর বাচ্চা নেই। এখানে ওর আনইজি লাগতে পারে…”

“আমার কোনও প্রবলেম নেই।” অর্ঘ্য হেলান দিয়েছে সোফায়, ঠোঁট উলটে বলল, “থেকে গেলেই হয়।”

আর কী বলার থাকতে পারে অহনার। নিভে যাওয়া মুখে উঠে গেল ঘরে। ব্যাগ ট্যাগ রেখে নাইটি কাঁধে বাথরুম যেতে গিয়েও থমকাল। পলক ভেবে হাউসকোটখানাও নিল সঙ্গে। প্রবল অপ্রসন্নতা দূর করতেই বুঝি জোরে চালিয়ে দিয়েছে শাওয়ার। এই ধারাস্নানটুকুই অহনার একমাত্র বিলাসিতা। অবশ্য পিছনে মেহনতও আছে। খুদে একটি জলাধার বানাতে হয়েছে মাটির নীচে, টিউবওয়েলে পাইপ লাগিয়ে সেটিকে ভরা হয় নিয়মিত, পরে টুলু পাম্প ছাদের ট্যাঙ্কে তুলে দেয় সেই জল। বাড়তি লাভ, শেফালির হাঁটুভাঁজ সমস্যার সমাধান, কমোড বসেছে বাথরুমে।

আজ জল বেশ গরম এখনও। শরীর জুড়োচ্ছে না, তবে রোমকূপগুলো খুলে যাচ্ছে যেন। দেহের চ্যাটচেটে ভাব কমছে আস্তে আস্তে। অর্ঘ্যকে কোথায় শুতে দেবে আজ? বাইরের ঘর বাদে তিনটে তো মোটে কামরা, তার মধ্যে ছোটটি তো জিনিসে জিনিসে ঠাসা। সমিতির মাল, অহনার বইপত্র, এ ছাড়া বাড়িতে যা যা বাতিল হয়, সবই তো ওখানে ডাঁই। বাবলা টাবলা এলে এই ব্যাপারটায় মাথা ঘামাতে হয় না, বাইরের ঘরের মেঝেয় তোশক পেতে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অর্ঘ্যকে তো ওইভাবে…। তুৎ, মা যে কী এক একটা ঝামেলা ডেকে আনে!

ছেলেটা এখানে এসেছেই বা কেন? বলল তো শুধু দেখা করতে নয়, অন্য উদ্দেশ্য আছে…। আশ্চর্য, যার সঙ্গে ষোলো-সতেরো বছর যোগাযোগ নেই, তাকে কোন দরকারে লাগতে পারে অর্ঘ্যর। গ্রাম নিয়ে কী পেপার করছে, তার জন্য ডাটা চাইবে? আবার তা হলে অফিস খুলে কম্পিউটার নিয়ে বসতে হবে এখন?

ছোকরা বোধহয় রাতটা থাকার ধান্ধা নিয়েই এসেছিল! ইচ্ছে করে দেরি করছিল, যাতে অহনারা চাপে পড়ে? বহুত মতলবি তো, ঠিক ফাঁদে ফেলল!

ধুস, ভাল্লাগে না। গোটা দিনটাই কেমন উলটোপালটা যাচ্ছে!

সকালে ঘুম থেকে উঠে অহনা কি নিজের মুখটাই প্রথমে দেখেছিল আজ? আয়নায়? হবে হয়তো!

.

॥ ৩ ॥

…পাহাড়ি এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে হাঁটছে এক সৈনিক। গায়ে জলপাই রং উর্দি। রাস্তার দু’ধারে হালকা হালকা জঙ্গল। যতই এগোচ্ছে সৈনিক, ঘন হচ্ছে অরণ্য। পথের দু’ধারের গাছগুলো যেন জ্যান্ত মানুষ, ড্যাবড্যাব চোখে দেখছে হেঁটে চলা সৈনিককে। হঠাৎ সৈনিক চমকে তাকাচ্ছে চারপাশে। অজস্র বুটের আওয়াজ শোনা যায়, অথচ কেউ কোথাও দৃশ্যমান নয়। আচমকা রাশি রাশি গুলি ধেয়ে এল ডান দিকের জঙ্গল থেকে। বাঁদিক থেকে পালটা গুলি ছুটে গেল ডাইনে। গাছেরা কাঁপছে ঠকঠক, কুঁইকুঁই একটা গোঙানিও ফুটে বেরোচ্ছে তাদের গা দিয়ে। সৈনিক হঠাৎ ছুটতে শুরু করল, ডান-বাঁ কোনও দিকে না তাকিয়ে দৌড়োচ্ছে প্রাণপণ। কোত্থেকে সামনে সাইরেনের শব্দ, পরক্ষণেই কান ফাটানো বিস্ফোরণ। সর্বাঙ্গে আগুন নিয়ে একটা সাদা গাড়ি লাফিয়ে উঠল শূন্যে। সাঁইসাঁই ঝোড়ো হাওয়ায় গাছেরা উথালপাতাল দুলছে, তাদের গোঙানি ক্রমশ বাড়ছে যেন। বাড়ছে বুটের ধ্বনি, গুলি, পালটা গুলি, আগুনে ঝলসে যাওয়া সাদা গাড়িটা ঢেকে যাচ্ছে ধোঁয়ায়। মানুষ পোড়া গন্ধে ভরে গেছে জঙ্গল, সৈনিক দৌড়োতে দৌড়োতেই দু’হাতে টিপে ধরেছে নাক। শ্বাস বন্ধ হয়ে এল সৈনিকের, মুখ থুবড়ে পড়ল রাস্তায়। একটা পাখি দূর থেকে ডেকে উঠল, সৈনিক মুখ তুলে দেখার চেষ্টা করল পাখিটাকে। সঙ্গে সঙ্গে জলপাই রং উর্দির মুখ চেপে ধরল কেউ। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাচ্ছে সৈনিক, মুক্তি পেতে চাইছে, পারছে না, ছটফট করছে…

অর্ঘ্য ধড়মড়িয়ে উঠে বসল বিছানায়। কী বাজে স্বপ্ন! এখনও যেন শ্বাস আটকে আছে গলায়। ওই সাদা গাড়িটাই তো অ্যাম্বুলেন্স, মাইন বিস্ফোরণে যেটা উড়ে গেল? উফ্‌ফ ওই অ্যাম্বুলেন্সটা কি অর্ঘ্যর পিছু ছাড়বে না?

দু’চোখ রগড়ে দীর্ঘ স্বপ্নটা মনের আড়ালে সরাল অর্ঘ্য। অমনি পলকা ঝাঁকুনি। একটা অচেনা ঘরে নেয়ারের খাটিয়ায় পাতলা চাদরে উপবিষ্ট অর্ঘ্য এখন ঠিক কোথায়?

ছোট্ট একটা জানলা দিয়ে আলো ঢুকছে ঘরটায়। বইয়ের এলোমেলো স্তূপ, ভাঙা টেবিল, কম্পিউটারের মনিটর, গোছাখানেক ইলেকট্রিক তার, কী না রয়েছে ঘরটায়। কাশীপুরের ডেরাটা এমন বদলে গেল কী করে?

হ্যাঁ মনে পড়ে গেছে। এটা তো শেফালিমাসির বাড়ি। কাল রাতে এই ঘরটাতেই তো ঢুকিয়ে দিয়ে গেল অণুদি। হাবিজাবি জিনিসে ঠাসা বলে অণুদি খুব লজ্জা পাচ্ছিল। জানে না তো, অর্ঘ্যকে যেসব জায়গায় রাত কাটাতে হয়, তার তুলনায় এটা স্বর্গ।

নেয়ারের খাটিয়া ছেড়ে অর্ঘ্য জানলায় এল। সূর্য উঠে গেছে অনেকক্ষণ। সামনেটা বোধহয় দক্ষিণ। পাঁচিলের ওপারে ইটভাটায় ঝকমক করছে রোদ্দুর। বাড়িতে সাড়াশব্দ নেই কেন? এখনও কেউ ওঠেনি নাকি? মা মেয়ে জাগার আগে নদীর ধার থেকে একবার চক্কর মেরে এলে হয়। অর্ঘ্যর পরনে শর্টস, খালি গা। এই পোশাকেই অর্ঘ্য দিব্যি বেরিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু অহনা যদি কিছু মনে করে? আশাবরীর কর্ত্রীর অতিথি যেমন তেমন পোশাকে গাঁয়ে চরে বেড়ালে অহনা চৌধুরীর মানে লাগবে না তো? এবং এই মুহূর্তে অহনাকে চটানোর ঝুঁকি নিতে অর্ঘ্য রাজি নয়।

রুকস্যাকখানা খাটিয়ায় তুলল অর্ঘ্য। এখন এই রুকস্যাকই তার সংসার। চেন খুলে একটা টি-শার্ট বার করেছে। সঙ্গে কালো ট্র্যাকপ্যান্ট। দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম রাখল খাটিয়ায়। দাঁত মাজার ব্রাশখানাও। হাত ঢুকিয়ে পরখ করে নিল সব ঠিকঠাক আছে কিনা। সযত্নে বন্ধ করল চেন। ঠেলে পাঠিয়ে দিল খাটের নীচটায়।

প্যান্ট টি-শার্ট গলিয়ে সবে দরজা খুলে বেরিয়েছে, সামনে শেফালি।

কাল প্রচুর বকবক করেছে মহিলা। আসানসোলের এমন এমন লোকদের কথা জিজ্ঞেস করছিল যাদের অর্ধেককে অর্ঘ্য চেনেই না। সে তো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে প্রায় ঘরছাড়া। তার ওপর গত দু’-তিন বছর সে আসানসোলের ত্রিসীমানা মাড়ায়নি…। এমত পরিস্থিতিতে কাঁহাতক মহিলার সঙ্গে সংগত করা যায়! ভাগ্যিস মেয়ে ধমকে-ধামকে চুপ করাচ্ছিল মাকে, তাই না খানিক রক্ষে পেয়েছে অর্ঘ্য। অবিরাম বানিয়ে বানিয়ে বলে যাওয়াটা কি কম ঝকমারি! এখন সাতসকালে কী জিজ্ঞেস করে বসবে কে জানে!

তবু প্রভাতের প্রথম সাক্ষাতে এক টুকরো অমলিন হাসি উপহার দিতেই হয় মহিলাকে। অর্ঘ্য চোয়াল নাড়িয়ে বলল, “গুড মর্নিং মাসি।”

“উঠে পড়েছিস? রাতে ভাল ঘুম হয়েছিল তো?”

“ফার্স্ট ক্লাস।”

“ইঁদুরে কোনও উৎপাত করেনি?”

“আছে বুঝি ইঁদুর? টের পাইনি। একঘুমে রাত কাবার হয়ে গেল কিনা।”

“খুব ভাল। চা খাবি তো? মুখ ধুয়ে নে, জল বসাচ্ছি।”

“ভাবছিলাম…গ্রামটা একটু ঘুরে আসি…”

“চা খেয়ে বেরো। তোর অণুদিও চায়ের জন্য ওয়েট করছে।”

ব্যস, আটকে গেল অর্ঘ্য। গুটিগুটি পায়ে এল বসার ঘরে। দেখল অহনা ম্যাগাজিন গোছের কী যেন একটা পড়ছে মন দিয়ে।

অর্ঘ্য গলা ঝাড়ল, “সুপ্রভাত অণুদি।”

দৃষ্টি ওঠাল অহনা। সামান্য নোয়াল মাথা। মৃদু গলাতেই জিজ্ঞেস করল, “তুই লাঞ্চ করে যাবি তো?”

সরাসরি এমন একটা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না অর্ঘ্য। অণুদির প্রশ্ন করার ভঙ্গিটা যেন কেমন কেমন। রাত্রেই ভাবে-আচরণে মনে হচ্ছিল, তার থাকাটা যেন অণুদির পছন্দ নয়। কিন্তু অর্ঘ্যর তো নড়ার উপায় নেই।

অর্ঘ্য গলা ঝাড়ল, “না মানে… ভাবছিলাম…”

“বিকেল সন্ধেতেও যেতে পারিস। ট্রেন মোটামুটি ফাঁকা পাবি।”

আর তো ধানাইপানাই চলবে না, সোজাসুজি কথাটা পাড়তেই হয়। একটু সময় নিয়ে অর্ঘ্য বলল, “আসলে কী হয়েছে জানো, আমি যে প্রোজেক্টটা হাতে নিয়েছি, তার জন্য গ্রামের মানুষদের বিস্তর ডাটা লাগবে। স্যোশাল ইকনমিক। শুরু করেছিলাম সেই অন্ধ্র থেকে। তারপর মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ডেও প্রচুর তথ্য নিয়েছি, এবার আমার টার্গেট ওয়েস্ট বেঙ্গল। লাল্টুদার মুখে যখন তোমার কথা শুনলাম… তুমি বিশাল কাজকর্ম করছ… এবং সেটা গ্রামের মেয়েদের নিয়ে… তখনই আমার মাথায় প্ল্যানটা আসে।”

“কী প্ল্যান?”

“ওই…মানে…তুমি যখন আছ… মিছিমিছি ডাটার সন্ধানে কেন অন্ধের মতো ঘুরে মরি…”

অহনা গম্ভীর মুখে বলল, “বুঝেছি। ওমনি ভাবলি এখান থেকে কিছু মালমেটিরিয়াল নিয়ে যাবি, তাই তো?”

“উঁহু। আমি নিজেই তথ্য সংগ্রহ করতে চাই। ধরো তোমার কাছ থেকে কিছু ডিরেকশন আর রেফারেন্স নিয়ে নিলাম, তারপর নিজেই গ্রামে গ্রামে ঘুরব।”

“যাহ, তা কী করে সম্ভব? কলকাতা থেকে রোজ অ্যাদ্দুর উজিয়ে এসে…”

“যদি আমি আলাইপুরে থেকে যাই?” অর্ঘ্য ঢিলটা ছুড়েই দিল, “তোমাদের এখানে?”

“মানে?”

“যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে…।” অর্ঘ্য তার পেটেন্ট নির্মল হাসিটা বিস্তার করল, “বেশিদিন জ্বালাব না। প্রমিস। বড়জোর মাস খানেক। যদি খ্যামাঘেন্না করে আশ্রয় দাও, কাজটা তুলে ফেলি।”

অহনা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। বোঝাই যায় এমন একটা প্রস্তাবের জন্য আদৌ তৈরি ছিল না। কী ভাবছে? সন্দেহ করছে না তো অর্ঘ্যকে?

অহনা বিড়বিড় করে বলল, “আমি আর মা এখানে কত কষ্ট করে আছি…”

“আমিও কষ্ট করে থেকে যাব।” গলায় একটা তরল তরল ভাব ফোটাল অর্ঘ্য, “জাস্ট দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন দিয়ো, ব্যস।”

“আর থাকবি কোথায়? ওই গুদামঘরে?” অহনা মাথা দোলাচ্ছে, “এক রাত্তিরের জন্য নয় চলে যায়, কিন্তু টানা এক মাস…!”

“পারব অণুদি। যদি চাও তো তোমাদের দুয়ারের কোণে পাপোশের মতো পড়ে থাকতে পারি।”

থমথমে হয়ে গেছে অহনার মুখখানা। আস্তে আস্তে মেঘ সরে হাসি ফুটল। অর্ঘ্যরও ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল যেন। অণুদি বোধহয় বুঝে গেছে এর সঙ্গে এঁটে ওঠা মুশকিল। হয় চূড়ান্ত অভদ্র হতে হয়, নইলে ঘাড় পেতে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

নিশ্চিন্ততায় পলকা চিড়। ফের অহনার গলা বাজছে, “মাকে বলেছিস?”

“না গো। আমি তো জানি তুমিই হাই কম্যান্ড।” অর্ঘ্যর স্বর মাখন, “তুমি রাজি হলে শেফালিমাসি কখনও না বলবে না।”

ব্যস, পটে গেছে অণুদি। শেফালি চা নিয়ে ঢুকছিল, তাকে জানাল কথাটা। সে তো শুনে মহা আহ্লাদিত। খুশিখুশি গলায় বলল, “থাক না যদ্দিন ইচ্ছে। বয়স হয়েছে তো, আদর-যত্নের ত্রুটি হলে মনে কিছু করিস না বাবা।”

“বেশি যত্নআত্তি আমার সয় না মাসি। বরং থাকার ট্যাক্স হিসেবে আমায় দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নিতে পারো।”

শেফালির বেশ মজা লেগেছে। ভুরু নাচিয়ে বলল, “কী কী পারবি করতে?”

“এনিথিং। শুধু কুটনো কোটা আর রান্নাবান্নাটা বাদে।” বস্তারের জঙ্গলে ক্যাম্প করে থাকার দিনগুলো মনে পড়ল অর্ঘ্যর। তাড়াতাড়ি বলল, “তবে ভাতে-ভাত ফুটিয়ে নিতে পারব। ডিম-আলু দিয়ে।”

“থাক। রাঁধাবাড়ার জন্য আমার কৃষ্ণা আছে।… আর কিছু?”

“এই ধরো, যে ঘরখানা আমায় অ্যালট করেছ, ওটা সাফসুফ করে দিতে পারি। তারপর…” অর্ঘ্য তিলেক ভাবল, “তোমার বাগানে নিড়েন দিয়ে দিতে পারি। মাটি এমন ঝুরো ঝুরো করে দেব, তোমার বেলি ফুল সংখ্যায় ডবল হয়ে যাবে। রঙ্গনের ঝাড় বড্ড ঝাঁকড়া হয়েছে, ওগুলোও একটু ছাঁটাছাঁটি দরকার। আই ক্যান ডু ইট।”

“বাবার কাছে ট্রেনিং নিয়েছিস বুঝি?” শেফালির চোখে যেন স্মৃতির ঝাপটা লেগেছে, দূরমনা স্বরে বলল, “কী দারুণ গোলাপ ফোটাতেন অরবিন্দবাবু। অমন প্রকাণ্ড ডালিয়া আমি আর কোনও বাগানে দেখিনি। কী কী সার লাগবে, সব আমাদের বলে দিতেন, কিন্তু আমাদের হাতে অমনটা হতই না।”

“হুম। বাবার হাতে ম্যাজিক ছিল।”

“এখন তো ফ্ল্যাটে থাকছেন, সেখানেও নিশ্চয়ই টবে বাগান করেছেন?”

“অত স্পেস নেই ফ্ল্যাটে। ওই নিয়মরক্ষের মতো দু’-একটা…”

“এ বছর গোলাপ আমি লাগাবই। গোলাপ না ফুটলে বাগানে শোভা আসে না।” পলক কী যেন ভাবল শেফালি, তারপর রীতিমতো উত্সাহিত স্বরে বলল, “অরবিন্দবাবুর ফোন নম্বরটা দে তো। পুরনো আলাপটাও ঝালানো হবে, তখন গোলাপ ফোটানোর গুপ্ত রহস্যও আর একবার জেনে নেব।”

অর্ঘ্য প্রমাদ গুনল। এমন অজানা অচেনা কোণ থেকে শর এসে যায়, ঠেকানো মুশকিল। অস্বস্তি চাপা দিতে মুখে একটা হাসি টেনে বলল, “আচ্ছা, নিয়োখন।”

“বয়স হচ্ছে, সাত কাজে শেষে ভুলেই যাব হয়তো।” শেফালি ফের আবদার জুড়লেন, “এখনই দে না বাবা। …অণু, নম্বরটা তোর মোবাইলে তুলে রাখ।”

“এক্ষুনি নিয়ে তো লাভ হবে না মাসি।” অর্ঘ্য ফস করে বলে দিল, “বাবা মা তো এখন আসানসোলে নেই।”

“কোথায় গেছেন?”

“দিদির কাছে। মানে সিঙ্গাপুরে।”

“বেড়াতে?”

“হ্যাঁ। দিদিই প্রায় জোর করে দু’জনকে…” অর্ঘ্য একটা বড় সাইজের দম নিল, কথাটাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বলল, “বাবা মা তো আগে বিদেশ যায়নি, বুড়ো বয়েসে দিদির দৌলতে এবার একটু ঘুরে নিচ্ছে। সেই পুজো অবধি নাকি থাকবে ওখানে।”

“খুব ভাল। ছেলেমেয়েদের কাছে বাবা-মা তো এইটুকুই চায়। শেষ বয়সে একটু শান্তি, একটু হাত পা ছড়িয়ে নাতি-নাতনি সব্বাইয়ের মাঝে হইহই করে অবসর জীবনটা কাটানো…।” শেফালি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তা দুনিয়ায় সবার কপালে কি সব সুখ জোটে? কাউকে কাউকে তো মরণ অবধি জোয়াল টেনে যেতে হয়…”

অর্ঘ্যর নজরে পড়ল, অহনার মুখমণ্ডলে ছায়া ঘনাচ্ছে ক্রমশ। অর্থাৎ, মহিলার আফশোসের লক্ষ তার মেয়েই। অণুদির জীবনটা যে প্রচলিত ছকের একটু বাইরে, এ বুঝতে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু মেয়ে যে মাকেও দুঃখী করে তুলেছে, ভাবতে খারাপ লাগে বই কী। নিজের জীবন-যাপনের ধারা থেকেই তো এই সত্যিটা প্রতিনিয়ত টের পায় অর্ঘ্য। মা কি অর্ঘ্যর চিন্তায় আকুল হয়ে থাকে না দিন রাত? কিন্তু অর্ঘ্য তো নিরুপায়। একটা আদর্শ তাকে ঠেলে বের করে দিয়েছে ঘর থেকে? অণুদিরও কি তাই? লাল্টুদা কি একটা প্রসঙ্গে যেন অণুদির বিয়ের কথা একবার তুলেছিল সেদিন, তারপর ব্যাপারটা এড়িয়েও গেল…। বরের সঙ্গে থাকতে না পারা, বিয়ে ভেঙে যাওয়া, এসব তো আজকের দিনে কোনও ঘটনাই নয়… অণুদির সমস্যা কি তার চেয়েও গভীর কিছু? যা শুধু মেয়েকে নয়, মাকেও পীড়িত করে চলেছে, বিদ্ধ করছে দু’জনকেই?

ঘরের পলকা গুমোট কাটাতে অর্ঘ্য বলল, “আমার কাজের পুরো লিস্ট কিন্তু এখনও পাইনি মাসি।”

“আমার কোনও সাহায্য লাগবে না। তুমি খাও, দাও, ঘোরো, নিজের কাজ করো…”

“সে তো অতিথির মতো থাকা। ও আমার পোষাবে না।” অর্ঘ্য অহনার দিকে ফিরল, “আমি তোমাকেও সার্ভিস দিতে পারি, অণুদি।”

অহনা সামান্য হাসল। প্রায় না হাসার মতোই। নীরস গলায় বলল, “আমি চাই না, কেউ আমার জন্য খাটুক।”

জবাবটা যেন শুধু অর্ঘ্যকে নয়, শেফালিকেও শোনাল অহনা। চায়ের কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে, মেয়েকে একটা অসন্তোষমাখা ভ্রূকুটি হেনে অন্দরের পানে হাঁটা দিয়েছে।

অপসৃয়মাণ শেফালিকে দেখতে দেখতে অর্ঘ্য গলা একেবারে খাদে নামিয়ে বলল, “তোমাদের মা-মেয়ের মধ্যে সারাক্ষণ একটা লড়ালড়ি চলে মনে হয়?”

অহনার কপালে ঢেউ। খানিক যেন কেঠো স্বরে বলল, “এখন ঘরে থাকছিস? না বেরোবি?”

অর্ঘ্যর সরল কৌতূহল এড়াতে চাইছে অণুদি? প্রসঙ্গটা আর খোঁচাল না অর্ঘ্য, আলগা ভাবে বলল, “রোদ চড়া হওয়ার আগে তোমাদের আলাইপুরটা একটু সফর করে আসি।”

“কাজে বেরোবি কখন?”

“দেখি। আজ ভাবছি বাড়িতে বসে কোশ্চেনেয়ারগুলো রেডি করি।”

“তোদের তো তৈরিই থাকে।”

“তা থাকে। তবে কিনা…।” অর্ঘ্য ঢোঁক গিলল, “আসলে আমাদের একটা ব্রড আউটলাইন দেওয়া হয়। তবে এক এক রাজ্য তো এক এক রকম, রীতিনীতি-কাস্টম-কালচার ফুড-হ্যাবিট, চাষবাসের পদ্ধতি সব আলাদা। এমনকী পারিবারিক কাঠামোও স্টেট টু স্টেট ডিফার করে। সেইজন্য প্রশ্নগুলোও বদলে বদলে যায়।”

“হুম। তা এখানে কতগুলো গ্রাম সার্ভে করবি ভাবছিস?”

“অন্তত গোটা দশেক গ্রাম তো বটেই। তবে এগজ্যাক্টলি কোথায় কোথায় যাব সেটা তুমি আমায় সাজেস্ট করবে।”

“আমার তো মনে হয়…”

অহনা থেমে গেল। বাইরে একটা মেয়ের গলা। ‘ম্যাডাম, ম্যাডাম’ বলে ডাকছে। উঠে গেল অহনা। অর্ঘ্য একটু স্বস্তিবোধ করল। এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করছিল অণুদি, বাপস! বোঝাই যায়, এইসব সমীক্ষার ব্যাপারে অণুদি যথেষ্ট পরিমাণে ওয়াকিবহাল। সুতরাং ভাঁওতাবাজি চলবে না, সত্যি সত্যি কিছু প্রশ্ন বানাতে হবে। এবং ঘুরতেও হবে গ্রামে গ্রামে। মোদ্দা কথা, এমন কিছু করা চলবে না যাতে কণামাত্র সন্দেহ জাগে অণুদির মনে।

বাইরে একটা চেঁচামিচি হচ্ছে না? হ্যাঁ, অণুদি কড়া গলায় ধমকাচ্ছে! অর্ঘ্য সোফা ছেড়ে বাইরের দরজাটায় এল। দেখল গ্রিলগেট খুলে নেমে গেছে অহনা। তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাচ্ছে এক বছর তিরিশের মহিলা। শ্যামলা শ্যামলা রং, গ্রাম্য চেহারা, মুখখানা তেমন সুশ্রী না হলেো চোয়াড়ে মার্কা নয়, সিঁথিতে মোটা সিঁদুর।

অহনা তর্জনী উঁচিয়ে বলছে, “আমি কোনও অজুহাত শুনতে চাই না। কালই তোমার হরিণবাড়ির টাকাটা তুলে ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার কথা ছিল, কি ছিল না?”

“বললাম তো ম্যাডাম, ছিল।” মহিলা মিনমিন করছে, “কাল আমার মেয়েটা এমন…”

“জাহান্নমে যাক তোমার মেয়ে। আমার দিনের কাজ দিনে হবে না কেন? দেরির জন্য ব্যাঙ্ক যদি বাড়তি সুদ দাবি করে সেটা কে দেবে? তুমি? না তোমার মেয়ে?”

“আমার অন্যায় হয়ে গেছে ম্যাডাম। তাই তো মেয়েটাকে জ্বর গায়ে ফেলেও ছুটতে ছুটতে এসেছি। যদি মায়া আজ হরিণবাড়ি গিয়ে টাকাটা তুলে নেয়… শুধু এবারকার মতো…”

“না। যার কাজ সে করবে। মাইনে নেবে তুমি, কমিশন পাবে তুমি, আর কাজটা চাপাবে অন্যের ঘাড়ে, এ আমি অ্যালাউ করব না। আজ চারটের মধ্যে টাকা ডিপোজিট করে ব্যাঙ্ক থেকেই আমায় ফোন করবে। যদি না পারো তো বলো, আজই আমি অন্য মেয়ে খুঁজব।”

শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে মহিলা। আটপৌরে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে সাইকেলে উঠে বসল। বেঁটে পাঁচিল পেরিয়ে ইটভাটার আড়ালে মিলিয়ে গেল সাইকেল।

অর্ঘ্য রীতিমতো বিস্মিত। তার দিদির বন্ধু, আসানসোলের সেই হাসিখুশি তরুণীর যে এমন একটা চণ্ডমূর্তি থাকতে পারে, এ যেন চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না। মাঝে অবশ্য অনেকগুলো বছর কেটেছে, হয়তো সময়ের আঁচে বদল ঘটেছে অণুদির। সে নিজেও কি আর সেই বিন্দাস ছেলেটি আছে এখনও?

অহনা ঘরে ফিরতেই অর্ঘ্য লঘু সুরে বলল, “তোমাকে তো সমঝে চলতে হবে, অণুদি। তুমি তো বহুত রাগী আছ!”

জবাব দিল না অহনা, আবার উলটোচ্ছে ম্যাগাজিন।

অর্ঘ্য ঈষৎ কৌতূহলী স্বরে বলল, “টাকাপয়সা জমা দেওয়ার ব্যাপারটা কী? আশাবরী কি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড?”

“কক্ষনও না। অহনা চিটিংবাজির ব্যাবসা করে না।” অর্ঘ্যকে চমকে দিয়ে অহনার স্বর রুক্ষ সহসা। পরক্ষণেই স্বর নামিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আশাবরী মেনলি একটা মাইক্রোফিনান্স কোম্পানি। আমরা গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তার মেম্বারদের নানান ছোটখাটো কারবারে লোন দিই।”

“তাই বলো।” অহনার আকস্মিক ভাবান্তরে সামান্য থতমত খেয়েও সামলে নিয়েছে অর্ঘ্য। হালকা ভাবে বলল, “তুমি এখন গ্রামের মহাজন। স্মল অ্যামাউন্ট ধার দিয়ে চড়া সুদে পয়সা উসুল করো।”

“হ্যাঁ, সুদটা একটু বেশিই নিই। কারণ, গ্রামের লোককে তো ব্যাঙ্ক সহজে উপুড়হস্ত করে না, করলেও তার ফ্যাকড়া সামলাতে গরিবগুরবোদের যথেষ্ট নাস্তানাবুদ হতে হয়। তাই আশাবরীই ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে গাঁয়ের লোকদের দরকারগুলো মেটায়। তার জন্য মূল্য নেব না?” অহনা টেরিয়ে তাকাল, “ফর ইয়োর ইনফর্মেশন, আমার প্রতিটি দেনাদারই মেয়ে। ফিমেল জেন্ডার। এবং তারা কেউ শহুরে বেওয়াসিদের মতো টাকা মারে না।”

মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসা অর্ঘ্যর মোটেই অজানা নয়, অন্ধ্রে আর ঝাড়খণ্ডে অজ গাঁয়েও দেখেছে এদের কাজ-কারবার। তবে তারাও সেখানে শোষণের যন্ত্র, গরিবদের প্রাণভরে চোষে। অণুদির কারবার কি একটু ভিন্নগোত্রের? কিন্তু অণুদি মেয়েটার সঙ্গে যে আচরণ করল, তাকে তো আসানসোলের এমোড়ে-ওমোড়ে চরে বেড়ানো সুদখোরদের চেয়ে আলাদা কিছু মনে হল না।

অর্ঘ্য কৌতুকের সুরে বলল, “তা হলে লাভ তো তোমার ভালই হয়।”

“তো?”

“বউটাকে অত ঝাড় না দিলেও পারতে। যার বাচ্চা অসুস্থ…”

“আমার দয়ামায়া কম।… আর কিছু বলার আছে?”

ফের পালটা ঠাট্টা জুড়তে যাচ্ছিল অর্ঘ্য, তখনই টের পেল, কম্পন চালে রাখা মোবাইলটা বাজছে পকেটে। প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় হাত চলে গেছে মোবাইলে, বের করে নম্বরটা দেখেই আবার ঢুকিয়ে রাখল পকেটে।

অহনা জিজ্ঞেস করল, “কে রে? ধরলি না যে বড়?”

ভিতরের চোরা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্ঘ্য তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, “সার্ভিস প্রোভাইডারের ফোন। নানান স্কিম শোনায়। বড্ড বিরক্ত করে।”

“ও।”

“আমি তা হলে একটু চরে আসি।”

অনুমতির অপেক্ষায় না থেকে বেরিয়ে এল অর্ঘ্য। হনহন পা চালিয়ে নদীর পাড়ে। ঘোলাটে গঙ্গা, সামনে ডিঙিনৌকোর সার, অদূরে নদীর মধ্যিখানে গজিয়ে ওঠা চমত্কার একটা দ্বীপ… কিছুই চোখে পড়ল না অর্ঘ্যর। কাছাকাছি লোকজন নেই দেখে মোবাইল বার করে অস্থির আঙুলে বোতাম টিপছে। রিং হচ্ছে ওপ্রান্তে। থামল ধরেছে।

“কমরেড, সাড়া পাচ্ছি না কেন? হাইড-অ্যান্ড-সিক গেমটা এবার বন্ধ করা যায় না?”

দেহাতি হিন্দি। তেজসের গলা! সর্বনাশ, তেজস এই নম্বরে কেন! তার নম্বরই বা পেল কী করে তেজস?

.

॥ ৪ ॥

সকালে আজ জলখাবার খেয়েই জরুরি কাজে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল অহনাকে। গিয়েছিল সেই বিলাসডাঙা। মোপেডেই আলাইপুর থেকে প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ। বিলাসডাঙা ছোট গ্রাম, মেরে কেটে পঞ্চান্ন-ষাট ঘর মানুষের বাস, সমস্ত পরিবারই মুসলমান। বছর খানেক হল, গ্রামের মেয়ে বউরা নিজেদের উদ্যোগে একটা স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়েছে, তাদের সদস্যরা আশাবরী থেকে ধার নিচ্ছে নিয়মিত, ঋণশোধেও তাদের কোনও গাফিলতি নেই। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাজিয়া আহমেদ নামের এক বউ আশাবরীর টাকায় বেশ কিছু হাঁস-মুরগি কিনে পুষেছিল, দিব্যি ডিম বেচছিল, মিনি পোলট্রিও বাড়ছিল ধাপে ধাপে। হঠাৎ ধসা রোগে তিন দিনে হাঁস-মুরগি খতম। সেই শোক ছাপিয়ে রাজিয়ার এখন চিন্তা, আশাবরীর দেনা শুধবে কী করে।

এমন ধারার বিপত্তি অহনার কাছে নতুন কিছু নয়। আগাম সতর্কতাও নেওয়া থাকে কিছু। রাজিয়াদের দলটার সঙ্গে কারবার শুরু করার সময়েই বলে দিয়েছিল, গোষ্ঠীর মেয়েরা নিজেরাই যেন মাস মাস টাকা জমিয়ে একটা ফান্ড তৈরি করে। বেশি নয়, বিশ-পঁচিশ টাকা দিলেই যথেষ্ট। আজ গিয়ে অহনা দেখল সেই টাকাই জমে এখন প্রায় ছ’হাজারে দাঁড়িয়েছে। মেয়েদের জড়ো করে অহনা বুঝিয়ে এল, ওই টাকা থেকেই একলপ্তে শোধ করে দিক অহনার প্রাপ্য, তা হলেই আবার নতুন করে ধার মিলবে, আবার রাজিয়া শুরু করতে পারবে পোলট্রির ব্যাবসা। অবশ্য নিজেদের ফান্ড থেকে নেওয়া টাকাও তাকে শুধতে হবে মাসে মাসে। বিশ-পঁচিশের জায়গায় দিতে হবে চল্লিশ-পঞ্চাশ।

এত সহজ সমাধান পেয়ে রাজিয়ার দুঃখ উবে গেছে। বাকি মেয়েরাও বেশ পুলকিত। ঘর থেকে মিষ্টিমাষ্টা এনে অহনাকে আপ্যায়ন করতে যাচ্ছিল, তবে আশাবরীর ম্যাডাম সে সুযোগ দিলে তো। মুখে মেয়েগুলো যতই গদগদ ভাব দেখাক, আসলে তো এরা আশাবরীর ক্লায়েন্ট। যাদের সঙ্গে সম্পর্কটাই কেজো, তারা হঠাৎ আশাবরীর ম্যাডামকে ঘরের লোক ঠাউরে বসবে, এমনটা অহনা হতেই দেবে না। দুনিয়াটাকে চিনে গেছে অহনা, তার আপনজন বাড়ানোর কোনও সাধ নেই।

সুতরাং কাজ ফুরোতেই ফের মোপেড। সকাল হাঁই হাঁই করে এগোচ্ছে দুপুরের পানে। সূর্যদেব গনগনে চোখে আগুন ঝরাচ্ছেন যেন। মাঝে অনেকটা পথ, দু’ধারে কোনও গাছপালা নেই। রোদের দাপটে জ্বলে যায় গা-হাত-পা। মাঝে তারকনগরে পিচ পড়ছে রাস্তায়। বোধহয় আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রস্তুতি। একটা মিনি রোড রোলার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে। নেমে মোপেড ঠেলতে ঠেলতে হাঁটতে হল বেশ খানিকটা। যখন বাড়ি এসে পৌঁছোল, ঘামে ধুলোয় চ্যাটচ্যাট করছে অহনার সর্বাঙ্গ।

এক্ষুনি একটা স্নান দরকার। তার আগে রুটিন মাফিক আশাবরীর অফিসে ঢুঁ দিল অহনা। বাইরে থেকে মেয়েলি গলার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, অহনা ঢোকামাত্র অখণ্ড নীরবতা। সাতজন মেয়েই ভারী মন দিয়ে কাজ করছে। ম্যাডামের মর্জি মালুম না হওয়া পর্যন্ত তাদের মুখ থেকে কুলুপ হঠবে না।

অহনা নিজের ঘরটিতে এল। নেহাতই ছোট অফিসকক্ষ। খান চারেক চেয়ার, একটা সাদামাটা টেবিল আর একখানা স্টিলের ক্যাবিনেটেই ঘরের অর্ধেকটা ভরে আছে।

স্ট্যান্ড ফ্যানখানা চালিয়ে দিয়ে অহনা বসল নিজের আসনে। অন করল কম্পিউটার, টানল বিল চালানের ফাইল। কাল আবার যাবে কলকাতায়। মেহতা অ্যাসোশিয়েটসে দেড় মাস আগে মাল ডেলিভারি হয়েছে, সম্ভবত কাল পেমেন্ট মিলবে, বিলের কপিটা ব্যাগে রাখা দরকার।

ইলা দরজায়। পাশের গ্রাম ঈশ্বরপুরের মেয়ে, আলাইপুরের বউ। আশাবরীতে সৌরবিদ্যুৎ চালিত যন্ত্রপাতি তৈরির জন্মলগ্ন থেকে কাজ করছে ইলা। কাজেকর্মে যেমনি দড়, গল্পগাছায় তেমনি ওস্তাদ। তবে সবচেয়ে বড় গুণ, খুব বিশ্বাসী। আশাবরীর স্টোরের মালপত্র ইলার জিম্মাতেই রেখেছে অহনা।

অহনা স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষ স্বরে বলল, “উঁকি মারছ কেন? কী চাই?”

“একটা চিঠি এসেছে। বিডিও অফিস থেকে।”

ভ্রূকুটি করল। সরকারি চিঠি মানেই কোনও বখেড়া নির্ঘাত। সরকার তো ভাল কাজে লাগে না, শুধু ঝামেলা পাকানোর জন্যই মুখিয়ে থাকে। অহনা কী অপরাধ করল কে জানে!

অহনা জিজ্ঞেস করল, “কখন এল?”

“এই তো, আধ ঘণ্টাও হয়নি।” আঁচলের আড়াল থেকে বাদামি খামটা বার করে বাড়িয়ে দিল ইলা, “সাইকেল মেসেঞ্জার এনেছিল, দেওয়ার সময় কাগজে সই করিয়ে নিল।”

ধুকপুকুনিটা আরও বেড়ে গেল যেন। লেফাফার মুখটা ছিঁড়ে চোখ রেখেছে সরকারি পত্রে। পড়তে পড়তে চোখ বড় বড়। চিঠির প্রেরক কৃষ্ণনগর ডি-এম অফিস। দিল্লির পরিবেশ দপ্তর নাকি গ্র্যান্ট পাঠিয়েছে। অফিসে অফিসে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য। আশাবরীর উপর হঠাৎ নেকনজর পড়েছে জেলাশাসক দপ্তরের, তারা আশিখানা সোলার ইমার্জেন্সি লাইট সাপ্লাই দিতে বলছে আশাবরীকে। দামটা বেশ ভালই দেবে, ডিলারদের অহনা যে রেটে বেচে, তার চেয়ে প্রতিটি পিসে একশো সাঁইত্রিশ টাকা বেশি। তবে চিঠি পাওয়ার একুশ দিনের মধ্যে ডেলিভারি শেষ করতে হবে, মাল কৃষ্ণনগরে পাঠাতে হবে নিজের খরচায়… ইত্যাদি ইত্যাদি।

চিঠি শেষ করে অহনা থম মেরে বসে। আশিটা আলো বিক্রি করে ফেলে ছড়িয়ে চল্লিশ হাজার টাকা লাভ থাকবে অর্থাৎ দু’মাস কারখানা চালানোর প্রায় যাবতীয় খরচ উঠে আসবে, তবু যেন আনন্দ হচ্ছে না কণামাত্র। শুধু মনে হচ্ছে আরও যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল। কেন যে কোনও সমাচারেই হৃদয়ে প্রফুল্লতা জাগে না।

ইলা দাঁড়িয়েই আছে। একটু যেন ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “খারাপ খবর আছে নাকি কিছু?”

“নাহ।” অহনা শ্বাস ফেলল, “গুড নিউজ। একটা বড় অর্ডার পেয়েছি।”

“আমি জানতাম, আমি জানতাম।” ইলার গলায় উচ্ছ্বাস, “আগেই বুঝেছি ভাল খবরই এসেছে।”

“এমনটা ভাবার কারণ?”

“বিডিও অফিসের লোকটা বলল যে।”

“কী বলল?”

“তোমার ম্যাডামকে বলে রেখো, একদিন এসে মিষ্টি খেয়ে যাব।”

এমন আবদারে হেসে ফেলাটাই ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু অহনা ঝপ করে রেগে গেল। ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “বায়নার বলিহারি। পরিশ্রম করবে আশাবরী, আর মিষ্টি খাবেন ওঁরা!”

অহনার মুড দেখে সরে পড়ছিল ইলা, পেছন থেকে ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। গম্ভীর সুরে অহনা বলল, “আমাদের ক’খানা ইমার্জেন্সি লাইট রেডি আছে?”

“আট পিস। চারটে রানাঘাট যাবে, চারটে কল্যাণী।’’

“একটাও ছাড়বে না এখন। আর কাল থেকে অন্য মাল তৈরি স্টপ। যদ্দিন না বলি, শুধু ওই একটা আইটেমই বানাও।”

“অনেকগুলো টর্চ আর সোলার কুকারের অর্ডার ছিল যে?”

“আহ যা আমি বলছি, তাই করবে। পাকামি মেরে নিজেরা কোনও ডিসিশন নেবে না।”

ঘাড় নেড়ে চলে গেল ইলা। অহনাও উঠি উঠি করছিল, কী ভেবে মোবাইলটা নিল হাতে। সুশোভন স্যারের নম্বরটা টিপছে।

ওফ কী জ্বালা, আউট অব রিচ! গেলেন কোথায় স্যার!

কিন্তু এই অর্ডার পাওয়ার খবরটা তো এক্ষুনি দিতে হবে স্যারকে। নিজের কাজের সূত্রে এখানকার প্রায় সব সরকারি অফিসেই স্যারের নিত্যদিন যাতায়াত, কেউ না কেউ আশাবরীর সুসমাচার ওঁকে শোনাবেই। তারা বলার আগে অহনা যদি না জানায়, স্যার দুঃখ পেতে পারেন। আর ওই মানুষটিকে আহত করা অহনার মোটেই সাজে না।

সত্যি, স্যার অনেক কিছু করেছেন অহনার জন্য! অহনা যখন আলাইপুরে পা রাখল, তখন তো সে মানসিক ভাবে যথেষ্ট বিধ্বস্ত। মা সঙ্গে রয়েছে বটে, কিন্তু মা তখন অহনার সঙ্গী নয়, স্রেফ বাস করে একত্রে। অবশ্য শেফালিকে কবেই বা মনের প্রাণের সঙ্গী ভাবতে পেরেছে অহনা! যাই হোক, অহনা তখন মানসিক ভাবে ভীষণ রকম একা। অথচ ভিতরে একটা ভয়ংকর ক্রোধ, উঁহু শুধু রাগ নয়, একটা তীব্র আক্রোশও যেন তাকে দগ্ধাচ্ছে দিনরাত। সে হেরে গেছে, তাকে চরম অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে, অথচ সে কিছুই করে উঠতে পারছে না, নিদেনপক্ষে নিজের মতো করে বাঁচার উপায় পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছে না, এই অসহায়তা যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে জ্বালাপোড়া। কান্না পর্যন্ত আসে না তখন, টের পায় অশ্রুর উত্সটাই শুকিয়ে মরুভূমি…।

তখনই স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ হয় অহনার। সুশোভন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের অধ্যাপক, অহনা তাঁর ছাত্রী ছিল এক সময়ে। টিয়াডাঙা স্টেশনের ওপারে সুশোভনের পৈত্রিক বাড়ি, রিটায়ারমেন্টের পর সেখানে একটা এনজিও খুলে অনাথ শিশুদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। গোটা অঞ্চলটাই চষে বেড়ান বলে কীভাবে যেন ছাত্রীর আলাইপুরে আগমনের খবরটা বোধহয় পৌঁছে গেছিল সুশোভনের কানে। নিজেই একদিন বাড়িতে এসে হাজির। অহনাকে দেখে, তার সঙ্গে কথা বলে কিছু বোধহয় আন্দাজ করেছিলেন সুশোভন, তবে ছাত্রীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাড়তি কৌতূহল দেখাননি। উলটে সুচতুর ভাবে কিছু একটা করে দেখানোর জেদ গেঁথে দেন অহনার মাথায়। শুধুই পাখিপড়ার মতো করে বোঝাতেন, জীবনটা অলস খাতে বয়ে যেতে দিয়ো না, কিছু একটা করো। অঙ্কে ছাত্রীর মাথা যথেষ্ট সাফ, জেনেই বুঝি মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসা করার বুদ্ধি দিলেন অহনাকে। আশাবরী নামটা অবশ্য অহনার পছন্দ। ঠাকুমা, ছোট্টবেলায় যে ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়জন, তার নামেই কারবার শুরু হল আলাইপুরে। যতটা না আলাইপুরের আশপাশের মানুষের জন্য, তার চেয়েও বেশি নিজের জন্য।

প্রথম প্রথম কথাটা মানতে চায়নি অহনা। নানান অছিলায় বন্ধ করে দিতে চেয়েছে আশাবরী। সুশোভন ছাড়েননি, অহনার প্রতিটি অসুবিধের জট সযত্নে ছাড়িয়েছেন। নিজেই খুঁজে দিয়েছেন আশাবরীর কয়েকজন মহিলা কর্মী, স্বনির্ভরগোষ্ঠী তৈরিতে সাহায্য করেছেন, যোগাযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ব্যাঙ্কের সঙ্গে, হয়েছেন অহনার গ্যারান্টার…। আশাবরী যে এখন সৌরবিদ্যুতের নানান যন্ত্রপাতি বানাচ্ছে, এও তো সুশোভনের প্ল্যান। সুশোভন বলেছিলেন, লাভের আশা কোরো না, তোমার মাইক্রোফিনান্সের ব্যাবসায়ে যতটুকু যা বাড়তি হাতে আসবে, তার একটা অংশ এই কাজে লাগাও। তোমার টর্চ-কুকার-হিটার ইমারজেন্সি ল্যাম্পই হবে আশাবরীর বিজ্ঞাপন। এর জোরেই তোমার মেন ব্যাবসায়ের গুডউইল তৈরি হবে।

কী আশ্চর্য, তাই হয়েছে কিন্তু! তার ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা কিন্তু ওই সোলার ইউনিটের সঙ্গে দিব্যি হাত ধরাধরি করে চলছে! যা একটা অর্ডার এল, এবার সোলারই না এগিয়ে যায়!

কিন্তু আরও গভীরভাবে কাজের জগতে গেঁথে যাচ্ছে অহনা, নয় কি? একসময়ে ভেবেছিল কোনও একটা কিছুতে ডুবে থেকে মনের ক্লান্তি কাটাবে, অথচ কাজই যেন বোঝার মতো চেপে বসছে। অহনার তো বিশেষ কোনও চাহিদা নেই, তা হলে ব্যাবসা বেড়েই বা লাভটা কী?

একটা বাজে। খিদে পাচ্ছে অল্প অল্প। চেয়ার ছেড়ে উঠল অহনা। পাশের ঘরে গিয়ে দাঁড়াল একটু। তার ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে। কিছুই অবশ্য বানানো হয় না আশাবরীতে, যন্ত্রাংশ কিনে এনে শুধু জোড়া লাগায় মেয়েরা। বাঁধা গতের কাজ, তবু শিখতে হয়েছে। ট্রেনিং দেওয়ার জন্য সুশোভন স্যারই একটা ছেলেকে জোগাড় করে দিয়েছিলেন। এখনও সে মাসে একদিন করে এসে চোখ বুলিয়ে যায় কাজকর্মে। মেয়েরা যদিও ভালই শিখে নিয়েছে। এবং করেও যথেষ্ট নিপুণ হাতে।

ফাইবার গ্লাসের ফ্রেমে সরু টিউবলাইট আটকাচ্ছিল স্বপ্না। কাজ থামিয়ে একটু যেন উসখুস করছে। অহনা ভুরু কুঁচকোল, “কিছু বলবে?”

“হ্যাঁ ম্যাডাম।” বছর পঁয়ত্রিশের শ্যামলা বউটি স্ক্রু-ডাইভারখানা রাখল পাশে, “আমাকে ক’দিন ছুটি দিতে হবে।”

“কেন?”

“ছোট জায়ের পেটে ক’দিন ধরেই বড় বেদনা হচ্ছিল। আমার দেওর বউকে রানাঘাট নিয়ে গিয়ে পেটের ছবি তুলিয়েছে। ডাক্তার বলছে পাথর হয়েছে, শিগগিরি অপারেশন করাতে হবে। তাই বলছিলাম…”

“অপারেশন তো তোমার হবে না?”

“বা রে, জা বিছানায় পড়ে থাকলে সংসার দেখবে কে? রান্নাবান্না, বাচ্চাদের সামলানো, ঘরদোরের আরও হাজারও রকম কাজ…”

“বুঝেছি, বুঝেছি।… তা কবে থেকে কামাই করবে? কদ্দিনের জন্য?”

“সামনের সোমবার যুথি ভরতি হবে হাসপাতালে। ওই দিন থেকে ধরুন আরও দু’সপ্তাহ। পারলে তার আগেই কাজে লেগে যাব।”

“থাক, বাজে কথা বোলো না। এক মাসের আগে তোমার টিকি দেখা যাবে না।” অহনা গজগজ করে উঠল, “যেই না একটা বড় কাজ এল, অমনি তোমাদেরও বায়নাক্কা শুরু হল।… তা তোমার কাজ কে তুলবে?”

দিলারা বলে উঠল, “আমি করে দেব। দরকার হলে ওভারটাইম খাটব।”

মিতা বলল, “তুমি তো চারটে বাজলেই ঘনঘন দড়ি দ্যাখো, বাড়তি সময় তুমি থাকবে কী করে? বরং আমি…”

বাকি মেয়েরাও স্বপ্নার হয়ে খেটে দিতে রাজি। কেউই তেমন উচ্চকিত নয়, তবে চাপা একটা রেষারেষির ভাব বেশ টের পাওয়া যায়। স্বপ্নার মজুরিটাই লক্ষ, কাজটা উপলক্ষ, অহনা জানে।

অহনা অবশ্য অন্য কথা ভাবছিল। বিশ্বজিতের মেজদি খুব ঘ্যানাচ্ছে, পরশুও শুকনো মুখ করে অনেকক্ষণ বসে ছিল অফিসে। ওকে যদি এই সময়টায় নেওয়া যায়, মেয়েটা কাজ শিখে যাবে মোটামুটি। একটা কাজ জানা বাড়তি মেয়ে সর্বদাই হাতে থাকা দরকার, এতে বাকিদের কামাই করার প্রবণতা কমবে।

তুৎ, আবার সেই লাভ লোকসানের চিন্তা! এসব ভেবে কী হবে রে অহনা?

নিজেকে আলগা ধমক দিয়ে স্বপ্নার ছুটি মঞ্জুর করে অহনা বাড়িতে ঢুকল। অর্ঘ্যও ফিরেছে, মধ্যাহ্নভোজ সেরে গড়াচ্ছে ছোট ঘরটায়। আবার বোধহয় বিকেলে বেরোবে।

শেফালি মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল। গায়ে মাথায় জল ঢেলে এল অহনা। মা-মেয়ে বসেছে আহারে।

খেতে খেতে শেফালি বলল, “ঝুমা আজ সকালে ফোন করেছিল। অনেকক্ষণ গল্প হল।”

অহনা খুব একটা গুরুত্ব দিল না। আলগা ভাবে বলল, “ও।”

“টুকাইয়ের তো গরমের ছুটি চলছে। ঝুমারও।”

“তোমার ছেলের বউ আর নাতির স্কুলে গরমকালে সামার ভেকেশন হয়, এটাই ঘটা করে শোনাল বুঝি?’’

মেয়ের বাঁকা মন্তব্যে শেফালি যেন একটু গুটিয়ে গেল। সামান্য চুপ থেকে বলল, “তা নয়…। ঝুমা বলছিল সামনের সপ্তাহে বাপের বাড়ি যাবে। টুকাইকে নিয়ে। পুজোর সময়ে যাওয়া হয়নি, এবারও নাকি লাল্টু অক্টোবরে সাউথ ইন্ডিয়া যাওয়ার প্ল্যান করছে, তাই এখন দিন দশ-বারোর জন্য ঘুরে আসবে।”

“খুব ভাল। এই সময়ে জলপাইগুড়ির আবহাওয়া নিঃসন্দেহে কলকাতার চেয়ে মনোরম। চাইলে ছেলেকে প্রাণ ভরে হাতি-গন্ডার দর্শন করিয়ে আনতে পারবে।”

“সে যা খুশি করুক। কিন্তু আমাকে ভারী বিপদে ফেলছে যে।”

সুরটা বিপন্নতার না আহ্লাদিপনার ঠিক ধরতে পারল না অহনা। ঝুমার সঙ্গে মা’র সম্পর্ক বিশেষ মধুর নয়, আবার তেমন একটা তেতোও নয়। ঝুমা অত্যন্ত চালাক মেয়ে, সামনাসামনি মা’র সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করে না। কিন্তু আড়ালে আবডালে যে টিপ্পনিগুলো ভাসায় তা যথেষ্ট জ্বালা ধরানো। মেয়ের ঘাড়ে চেপে মজাসে আছে মা, ছেলে-ছেলের বউয়ের সংসারের প্রতি শেফালি তার দায়িত্ব পালন করল না…। অহনার ওপরেও মোটেই সন্তুষ্ট নয় ঝুমা। তার বদ্ধমূল ধারণা, দাদা-বউদিকে জাঁতা দেওয়ার জন্যই নাকি মাকে আটকে রেখেছে অহনা। যাতে বউদি টেনশনমুক্ত হয়ে স্কুলের চাকরিটা করতে না পারে, ছেলেকে ঠাকুমার ঘাড়ে চাপিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাটা আটকে যায়…। তবে ঝুমা তো মুখমিষ্টি টাইপ, এসব ক্ষোভ কখনও উষ্মার আকারে প্রকাশ করবে না। মিছরি মাখিয়ে ছাড়ে হঠাৎ হঠাৎ।

ঈষৎ কৌতূহল নিয়ে অহনা প্রশ্ন করল, “কেন? কী করল বউদি?”

“বলছে, জানেনই তো আপনার ছেলে কেমন ক্যালাস, ওকে একা একা রেখে যেতে ভরসা হয় না। তাই আমি গিয়ে যদি ক’দিন বেহালায় থাকি, ও নাকি নিশ্চিন্ত হয়।”

“ভালই তো। যাও। দাদাকে ক’দিন আদরযত্ন করে এসো।”

শেফালি ভৎসনার সুরে বলল, “যাহ, তা হয় নাকি?”

“না হওয়ার কী আছে? যাও তো মাঝেসাঝেই।” অহনা টেরিয়ে তাকাল, “আমি কি তখন জলে পড়ে থাকি?”

“কী যে বলিস না!” শেফালি হঠাৎ স্বর নামাল, “এখন কি আমার নড়ার উপায় আছে?”

“মানে? নেই কেন?”

গলা আরও খাদে নামিয়ে শেফালি প্রায় ফিসফিস করে বলল, “বা রে, ছেলেটা আছে না?”

“তো? ও ওর মতো থাকবে। যতটুকু যত্নআত্তি করার করব। মনে হয় ও কিছু মাইন্ড করবে না।” অহনা ঠোঁট ওলটাল, “আর করলেই বা আমার কী যায় আসে?”

“তুই দিনকে দিন আবোধা হচ্ছিস।” শেফালি যেন এবার বেশ বিরক্ত, “একটা ফাঁকা বাড়িতে তুই আর ওই ছেলেটা থাকবি… আমি দিব্যি ড্যাংডেঙিয়ে চলে যাব…”

এতক্ষণে শেফালির আপত্তির কারণ মগজে সেঁধিয়েছে অহনার। ওমনি যেন আগুন জ্বলে উঠেছে মাথায়। তীক্ষ্ন স্বরে বলল, “কী বলতে চাও তুমি? শুধু অর্ঘ্য আর আমি এখানে থাকলে কী হবে?”

“মুখ করছিস কেন? অনায্য কথাটা কী বলেছি?” শেফালিরও গলা চড়ে গেছে, “এমন একটা অস্বৈরণ ব্যাপার আমি ঘটাব? মা হয়ে?”

অপমানে কান ঝাঁ-ঝাঁ করছিল অহনার। অজানা অচেনা নয়, অহনারই বান্ধবীর ভাই, অহনার ভ্রাতৃতুল্য ভেবেই নাচতে নাচতে থাকতে দিল এখানে, অথচ এক বাড়িতে দু’জনকে ছেড়ে গেলে সর্বনাশ ঘটে যাবে। অহনা একটা আটত্রিশ বছরের মেয়ে, তাকে মেয়ে না বলে আধবুড়ি বললেই হয়তো বেশি মানায়, জীবনের চরম চরম কুত্সিত মুহূর্ত দেখে পুরুষ সম্পর্কে তার ভেতরটা কবেই শীতল হয়ে গেছে, তবু তার মতো এক প্রায় বিবাহবিচ্ছিন্না মেয়েকেও ভাইয়ের মতো একটা পুরুষের সঙ্গে ছেড়ে রাখতে মা’র বুক কাঁপে? তবে শেফালিও কি তাকে একটা ক্ষুধার্ত মেয়েমানুষ ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না? নাকি ধরেই নিয়েছে, নারী আর পুরুষ সারাক্ষণ জৈবিক লালসায় লকলক করে? মা তো নিজেও মেয়েমানুষ, বোঝে না এই অবিশ্বাস তার নিজের নারীসত্তারও অসম্মান?

অহনা বরফকঠিন স্বরে বলল, “তোমার কী ধারণা, তুমি না থাকলেই আমি অর্ঘ্যর সঙ্গে নষ্টামি শুরু করব? সেই কাজটা তো আমি তোমার সামনেও করতে পারি। পারবে আটকাতে?”

“আহ অহনা, আমি ওসব ভেবে বলিনি।” শেফালির গলা কাঁপছে, “তোকে নিয়ে ফের কথা উঠবে, পাঁচজনে কে কী বলবে, কানাকানি করবে… এই আলাইপুরে সবাই তোকে মান্যিগন্যি করে,… সেখানে যদি তোর চরিত্রে কাদার ছিটে লাগে… বুঝিসই তো, এরা গাঁয়ের মানুষ… শহরে যা চলে, তার অনেক কিছুই এদের চোখে দৃষ্টিকটু…”

“থাক মা, নিজের কথার সাফাই গাইতে গিয়ে এখানকার লোকদের তুমি ইনসাল্ট কোরো না।” অহনার গোলচে মুখখানা বিদ্রূপে বেঁকে গেল, “তোমরা শহরের লোকরা কী চিজ তাও তো জানতে আমার বাকি নেই? আমাকে নিয়ে যে ভয়টা তুমি পাচ্ছ, সেই কাজটাই তো শহরে বুক ফুলিয়ে করছে কেউ কেউ, আর এই তোমরা গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে দেখতে হাততালি দিচ্ছ।”

“আমাদের তুই অকারণে দুষছিস।” শেফালির গলা এবার ভিজেভিজে শোনাল, “আমরা কেউই অন্যায়কে সাপোর্ট করিনি।”

“শুধু যে অন্যায় করছে, আমাকে তার পা চাটতে বলেছিলে। একটা ভুল করেছি বলে সারাজীবন ভুলটাকে মাথায় করে বইতে বলেছিলে।” অহনা সরু চোখে তাকাল, “সেই বোকাসোকা ভালমানুষ মেয়েটা, যে মরিয়া হয়ে তার আপনজনদের আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল, মরে গেছে মা। সে এখন কী করতে পারে তুমি জানো না। দেখতে চাও?”

“কী করবি তুই?”

“দেখতে চাও কি না বলো?”

“তুই কোনও পাগলামির কথা বলবি নির্ঘাত।”

“না, মোটেই খ্যাপামি নয়। যে সংশয়টা তোমাদের মন থেকে কিছুতেই মোছে না, সেটাই হাতে কলমে করে দেখাতে চাই।” অহনার নাক দিয়ে হলকা বেরুচ্ছে, “এক্ষুনি ছোট ঘরে ঢুকে জামাকাপড় খুলে অর্ঘ্যকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি?’’

“আহ অণু, চুপ কর। শান্ত হ।” শেফালি প্রায় ককিয়ে উঠলেন, “আমার ঘাট হয়েছে। তুই এবার মুখে লাগাম দে।”

“দিতে পারি। যদি লাগাম ধরার অভ্যাসটা ছাড়ো।”

“তোমার ভালর জন্যেই বলা।… মা হয়ে আমি তো তোমার খারাপ চাইতে পারি না।”

“আবার? আবার সেই সেন্টুমারা ডায়লগ? কেন বোঝো না…”

অহনা ঝুপ করে থেমে গেল। অর্ঘ্য বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। পরনে বারমুডা আর টি-শার্ট। খাওয়ার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মা-মেয়ের থালায় চোখ বুলিয়ে বলল, “খুব সিরিয়াস টপিক নিয়ে আলোচনা চলছে বুঝি? ডালমাখা ভাত তো শুকিয়ে কাঠ?”

মুখে একটা হাসি টানতে হল অহনাকে। তরল করতে হল স্বর, “মাতাশ্রী মহোদয়াকে একটু কাউন্সেলিং করছিলাম।”

“কী বিষয়ে?”

“অ্যাডাল্ট সাবজেক্ট। বাচ্চাদের বলা যাবে না।” ঝটপট খাবারে হাত লাগাল অহনা। মুখে বড় গরাসে ভাত তুলে বলল, “আজ কোন দিকে গেছিলি?”

“কাছেই। ঈশ্বরপুর।”

“কাজ এগোচ্ছে?”

“শনৈঃ শনৈঃ মেন তথ্য যেটা পাচ্ছি, সর্বত্র আশাবরীর সুখ্যাতি।”

একটু যেন বেশি বেশিই প্রশংসা করে অর্ঘ্য। কিন্তু সত্যিই কাজ তেমন করছে কি? অহনার সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়েও গত তিন দিনে একবারও ছ’-সাত কিলোমিটার দূরের গ্রামে যেতে পারেনি এখনও। এক মাসে শেষ হবে তো কাজ? নয়তো এ ছেলে নড়বে না। এমন সুখের গৃহ পেয়েছে!

ফোন বাজছে অহনার। মায়া অফিসে এসেছে, কী যেন কথা আছে ম্যাডামের সঙ্গে। থালা শেষ করে চটপট উঠে পড়ল অহনা। আঁচাতে আঁচাতে শেফালিকে বলল, “তুমি তা হলে যাচ্ছ কলকাতা? নো মোর বাহানা?”

তাকে নিয়েই কথা, কিন্তু অর্ঘ্য যেন বুঝল না। একবার শেফালিকে দেখছে, একবার অহনাকে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *