০১. পাঁচ-পাঁচটা বউ

উড়ো মেঘ

একটা নয়, দুটো নয়, একসঙ্গে পাঁচ-পাঁচটা বউ নিয়ে সুখে ঘর করছিলেন স্বঘোষিত বহুগামী টমাস গ্রিন। বাধ সাধল উটা প্রদেশের এক আদালত। বহুবিবাহের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলেন গ্রিন। জুরিদের রায়দানপর্বে গ্রিনের দুই গিন্নি সশরীরে হাজির ছিলেন আদালতে, দুজনেই কাঁদছিলেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। দুজনেই সমস্বরে আদালতকে জানান ওই বহুগামী স্বামীতেই তাঁরা সন্তুষ্ট, ওই স্বামীতেই তাঁরা একনিষ্ঠ। ঊনত্রিশটি সন্তানের জনক টম গ্রিন জুরিবর্গের এই সিদ্ধান্তে যথেষ্ট ব্যথিত, তিনি উচ্চতর আদালতে আবেদনের কথা ভাবছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উটা প্রদেশে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছে ১৮৯০ সালে। এবং বিগত পঞ্চাশ বছরে আমেরিকায় বহুগামিতার অভিযোগের মামলা এই প্রথম।…

রয়টার্সের পাঠানো মুখরোচক খবরটার মাপ মতন কপি তৈরি করতে করতে মুচকি মুচকি হাসছিল দেয়া। আপন মনে। কল্পচোখে দেখার চেষ্টা করছিল দৃশ্যটাকে। গাউন পরিহিতা দুই স্থূলকায়া মধ্যবয়সি মেমসাহেব (হ্যাঁ, মধ্যবয়সিই হবে নির্ঘাৎ। সাহেব যখন ঊনত্রিশটি বালবাচ্চার বাপ, তার বউরাও নিশ্চয়ই আর কচি খুকিটি নেই। অবশ্য প্রতিটি বউ-এর যদি গড়ে পাঁচ থেকে ছটা বাচ্চা থাকে, তাদের বয়স কিছুটা কম হলেও হতে পারে। তবে বউগুলো মধ্যবয়সি আর মোটাসোটা হলেই যেন দৃশ্যটা খোলে ভাল।) পরস্পরের কাঁধে মাথা রেখে হাপুস নয়নে কাঁদছে, এ ওর চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে রুমালে, পিঠে আলতো চাপড় দিচ্ছে সান্ত্বনার। দেখে জুরিদের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল কি? নাকি হিংসেয় জ্বলে যাচ্ছিল তারা? অথবা টম সাহেবের বুকের পাটা দেখে মনে মনে ব্রাভো ব্রাভো করছিল?

টেবিলের সামনে সুকন্যা, —কী রে, তোর কদূর?

দেয়ার হাতে ঘড়ি নেই। শীত চলে গেলেই ঘড়ি পরা বন্ধ হয়ে যায় দেয়ার, কবজিতে চিলতে ঘাম জমলেই তার চামড়ায় র‍্যাশ বেরোয়। চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল, —ছটা বেজে গেছে?

—অনেকক্ষণ। ছটা চল্লিশ।

—একটু দাঁড়া। অশেষদাকে এটা দিয়ে আসি। কম্পিউটার থেকে সমাচারের প্রিন্ট আউট বার করল দেয়া, —নিউজটা পড়ে দ্যাখ।

ভুরু কুঁচকে পড়ল সুকন্যা। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, —নেকু। বউ দুটোকেই আগে গারদে পোরা উচিত ছিল।

—আহা রে, মেমসাহেবদের যদি সতীন নিয়ে ঘর করতে সাধ জাগে…

—শিট। পড়ত আমার পাল্লায়, দুদিনে টম গ্রিনের বিষ ঝেড়ে দিতাম।

—যাই বল, সাহেবের কিন্তু গাট্‌স আছে। বেশির ভাগ ছেলেই তো মনে মনে পলিগ্যামিস্ট, ছাতি ফুলিয়ে ঘোষণা করতে পারে কজন? ক্যালিটাও ভাব। একসঙ্গে পাঁচ-পাঁচটা বউ সামলানো…

—এ আর কী এমন কঠিন কাজ! নিশ্চয়ই ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি চালাত। হাঁদিগুলোকে একে ওর পেছনে লেলিয়ে দিয়ে বসে বসে গোঁফে তা দিত।

—যাহ্‌, তাহলে কি ওরা কোর্টে এসে গলা জড়াজড়ি করে কাঁদে? লোকটা তুখোড় প্রেমিক, আই বেট। লোকটার হার্টটা ইয়া বড়, নরমাল সাইজের পাঁচগুণ।

—ডায়েলেটেড হার্ট বলছিস? হি হি, ওটা তো একটা অসুখ।

—পাঁচটা বউ নিয়ে ঘর করা মানুষ তো এক রকম অসুস্থই রে।

—কী জানি বাবা। তোর বর আছে, আমার চেয়ে তুই ভাল বুঝবি।

—বলছিস? ম্যাটারটা সুকন্যার হাত থেকে নিয়ে চোখ টিপল দেয়া। উঠতে উঠতে বলল, —দাঁড়া, বাড়ি গিয়ে সৌম্যকে ধরছি। দেখি নিউজটায় ও কীভাবে রিঅ্যাক্ট করে!

বিকেলের শেষ, সন্ধের শুরু। সংবাদপত্র অফিস সরগরম। বিশেষত বার্তা বিভাগ। গভীর মনোযোগে কাজ করছে জনা বারো সংবাদকর্মী। বেশিরভাগই কমবয়সি, জনা তিনেক প্রবীণ। কারওর চোখ কম্পিউটারের মনিটারে, কেউ বা কলম চালাচ্ছে খসখস। কম্পিউটারে লে-আউট চলছে, তৈরি হচ্ছে ডামি। বাতানুকূল ঘরে ধ্বনি উঠছে নানা রকম। ফ্যাক্স, টেলিপ্রিন্টার, টেলিফোন, কম্পিউটারে কী-বোর্ডের খটখট। কেজো কথোপকথন। ইন্টারনেট থেকে খবর মিলছে নিঃসাড়ে। কাল ভোরের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে নবপ্রভাত।

দেয়া সহসম্পাদক অশেষ দত্তগুপ্তর টেবিলে এল। অশেষের বয়স বছর পঞ্চাশ, শুকনো পাকানো চেহারা, মাথা ভর্তি হিজিবিজি রকমের কোঁকড়া চুল। অশেষের ত্রিভুজাকৃতি মুখে সর্বদাই গাম্ভীর্যের একটা পুরু পলি পড়ে থাকে। সহকর্মীদের অনেকেরই আশা আছে কর্মজীবনের শেষ দিনে অশেষ প্রথম হাসিটি হাসবে।

অশেষের টেবিলে প্রিন্টআউটের ডাঁই। ছ নম্বর পাতার ডামি তৈরি করছে অশেষ। দেয়ার বাড়ানো কাগজখানা স্তুপে চালান করতে গিয়েও কী ভেবে আলগা চোখ বোলাল, —এ কী? হেডিং দাওনি কেন?

দেয়া লঘু স্বরে বলল, —ভাবছি কী দিই! ধন্য পতিপ্রেম দেব?

—না। হালকা হয়ে যাবে। চোখ বন্ধ করে মুখটাকে বিষতেতো করল অশেষ, —বহুবিবাহের সাজা দাও।

দেয়া মনে মনে বলল, সাধে কি আর লোকে তোমায় রামগরুড় বলে!

মুখে বলল, —খবরটা কিন্তু বেশ মজার ছিল অশেষদা।

অশেষ কথাটা কানেই তুলল না। চোখের চশমা টেবিলে নামিয়ে বলল, —কাল থেকে তোমার ইভনিং শিফট না?

—কাল নয়, পরশু।

—কেন?

—কাল আমার ডে-অফ।

—অ।…কটা কথা বলি, মন দিয়ে শোনো। ইভনিং শিফটে কিন্তু পালাই পালাই করবে না। নটার জায়গায় এগারোটাও বাজতে পারে। তখন কাঁইকাঁই চলবে না।

—আমি কাঁইকাঁই করি কখনও? এপ্রিলে ছটা স্টেটের ইলেকশান হল, তখন তো রোজ আটটা সাড়ে আটটা অব্দি থেকেছি। কোনও দিন বলেছি কিছু?

—তুমি হয়তো বলোনি…।

—তাহলে আমায় শোনাচ্ছেন কেন? দেয়া মিটিমিটি হাসছে, —ইভনিং শিফটের ছেলেরা কখন যায় না যায় আমি কি জানি না?

—জানা তো উচিত। তোমারই ইভনিং শিফট করার আগ্রহ ছিল সব থেকে বেশি।…মনস্কামনা তো এবার পূর্ণ হল, কাজটা মন দিয়ে কোরো।

অশেষের বাগ্‌ভঙ্গিতে ব্যঙ্গের সুর স্পষ্ট। রণেন সমাদ্দার এই ভাষায় কথা বললে তাও মানা যায়, তিনিই নবপ্রভাতটা চালান। অশেষদা কি নতুন নিয়মে খুশি নয়?

নিজের জায়গায় ফিরে চটপট হেডিংটা কম্পোজ করে অশেষকে দিয়ে এল দেয়া। চেয়ারে ঝোলানো ঢাউস ভ্যানিটি ব্যাগখানা কাঁধে তুলে নিয়েছে। সুকন্যাও প্রস্তুত, দরজায় দাঁড়িয়ে প্রবল বেগে মাথা নেড়ে নেড়ে কথা বলছে তথাগতর সঙ্গে। ছ ফুট এক তথাগতর পাশে চার এগারোর ফোলা ফোলা গাল মিষ্টি মিষ্টি সুকন্যা যেন একটা টকিং ডল। আজ আবার জিন্‌স পাঞ্জাবি পরেছে সুকন্যা, আরও ছোট্ট দেখাচ্ছে তাতে। সাইজ ওইটুকুন হলে কী হবে, তেজ আছে মেয়ের। বেজায় মুখফোঁড়, অফিসসুদ্ধ লোক ওকে ডরায়।

দ্রুত পায়ে টয়লেট ঘুরে এসে গালিভার আর লিলিপুটের মাঝখানে দাঁড়াল দেয়া। মাঝামাঝি হয়ে। তাড়া লাগাল সুকন্যাকে, —যাবি না বাড়ি?

—এক সেকেন্ড। বলেই সুকন্যা ঘাড় হেলিয়ে আকাশচুম্বী তথাগতর দিকে তাকিয়েছে, —সো…? আর তাহলে তোদের গ্রামবল করার স্কোপ রইল না?

—কীসের গ্রামবল রে?

—বলে না কথায় কথায়, আমরা নাকি প্রিভিলেজড ক্লাস! নাইট করতে হয় না, ইভনিংও নেই, বারোটায় এসে ছটায় কেটে পড়ি…!

ফিলমস্টার সঞ্জয় দত্তর সঙ্গে চেহারায় আবছা মিল আছে তথাগতর। এবং সে বিষয়ে তথাগত যথেষ্ট সচেতন। যথারীতি চুলে একটা কায়দার ঝটকা মেরে বলল, —সবে তো তোদের ইভনিং শুরু হচ্ছে, এর মধ্যেই ডায়ালগবাজি? কদিন যাক, তারপর আস্তে আস্তে নাইটে ঠেলুক…

—তো? দিলে করব নাইট। ভয় পাই নাকি? কত নিউজপেপার হাউসেই তো মেয়েরা নাইট করছে।

—ঠিক আছে, ঠিক আছে। অ্যাদ্দিন তো ছাড় পেয়েছিস, এটা তো ফ্যাক্ট। কেন পেয়েছিস সেটা ভাব। ভাবতে ভাবতে কেটে পড়। আমার এখন হুঁকোমুখোর সঙ্গে একটা প্রাইভেট কথা আছে!

দেয়া হেসে ফেলল ফিক করে। বেচারা অশেষ দত্তগুপ্ত! গোমড়াথেরিয়াম, রাগুদাদা, মিস্টার কনস্টিপেশন, কত নাম যে চালু আছে অশেষদার! আহা, অশেষদা যদি জানত!

হিমেল হলঘরের বাইরে টানা চওড়া প্যাসেজ। ছিল রুমাল হয়ে গেছে বেড়াল। বনেদি দুই মহলা প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ির ভেতরবারান্দা ভোল পালটে ওই রকমই একটা নাম নিয়েছে বটে। এ পাশে প্যাসেজের দুধারে নিউজরুম, সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রের দফতর, আঁকাজোকার বিভাগ…। ওদিকে অ্যাকাউন্টস, ক্যাশ, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সারকুলেশন…। এই মহলে সম্পাদক বসেন, ওই মহলে মালিক। বিজ্ঞাপন আর প্রিন্টিং প্রেস একতলায়। দুই মহল জোড়া দিয়েছে সাঁকো প্যাটার্নের ওভারব্রিজ, মাথায় তার সবুজ কাঠের ছাদ, খাঁজ কাটা কাটা সবুজ সানশেড। মালিক মোহিত মল্লিকের রুচিবোধ আছে। সংবাদপত্র অফিসের জন্য ন্যূনতম যেটুকু পরিবর্তন প্রয়োজন তার চেয়ে বাড়তি খোদার ওপর খোদকারি করেনি। অক্ষুন্ন আছে উঁচু উঁচু সিলিং, বিশাল বিশাল দরজা জানলা, এমনকী বাহারি কারুকাজ শোভিত রেলিংসহ ঈষৎ লগবগে কাঠের সিঁড়িটাও। মোটা দেওয়ালঅলা বাড়িটায় এখনও ভিক্টোরিয়ান যুগের গন্ধ।

সিঁড়িতে খুটখুট আওয়াজ বাজিয়ে দেয়া আর সুকন্যা নীচে এল। ফটক পেরিয়ে ফুটপাথে পা রেখেই টের পেল গরমটা আজ জব্বর পড়েছে। নবপ্রভাতের অন্দরে বসে আঁচ পাওয়া যায় না। তরল সন্ধ্যা নেমেছে পথে, তবু এখনও কী তাত! হাওয়া নেই, আর্দ্রতাও চরমে, মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ঘাম। জ্যৈষ্ঠ এসে গেল, এখনও তেমন কালবৈশাখী কোথায়!

এলগিন রোডের এদিকটায় আলো কম, কী এক অজ্ঞাত কারণে নিবে আছে পথবাতি। চোখ ধাঁধিয়ে ছুটছে গাড়িঘোড়া, আবছায়া চিরে।

হাঁটতে হাঁটতে সুকন্যা বলল, —দেখলি, তথাগতটা কেমন লেজ গুটিয়ে পালাল? ব্যাটাকে আজ পুরো সাইজ করে দিয়েছি।

দোপাট্টায় ঘাড়গলা মুছছিল দেয়া। হাসল সামান্য, —আমিও দিয়েছি অশেষদাকে আজ। হালকা করে।

—কেন, কী বলছিল?

—ভয় দেখাচ্ছিল। নটার জায়গায় এগারোটা বাজতে পারে, তখন কোনও ট্যাঁ ফোঁ চলবে না।… স্ট্রেট বলেছি আমাকে এসব শোনাবেন না।

—ইস্‌, আমাকে যদি বলত!

—আসলে বুঝলি, ঝিকে মেরে বউকে শেখাচ্ছিল।

—মানে?

—মানে জয়শ্রী। দেয়া ভ্রূভঙ্গি করল, —জয়শ্রীটাই না ডুবিয়ে দেয়। বেচারা হেভি নার্ভাস হয়ে আছে।

—কেন?

—ফেরা নিয়ে। যদি বেশি রাত হয়…

—তো? রাত হয়ে গেলে অফিস তো পুলকার দেবে।

—ট্রান্সপোর্ট ওর প্রবলেম নয়। ওর সমস্যা শ্বশুর শাশুড়ি। মেইনলি শাশুড়ি। বউ মধ্যরাতে অফিস থেকে ফিরলে তিনি নাকি হার্টফেল করবেন। একে কনজারভেটিভ বাড়ি, তায় জয়েন্ট ফ্যামিলি…

—ফ্যামিলির কথা ছাড়। আসল লোক তো হল বর। তারও কি আপত্তি?

—সে নাকি সুইজারল্যান্ড। মিত্রশক্তিতেও নেই, অক্ষশক্তিতেও নেই। মা বউ-এর মন কষাকষিতে তিনি নাকি গোল্ডেন নিউট্রাল।

—মানে আদতে মায়েরই আঁচলধরা। তাহলে আর কী, চাকরিটা ছেড়ে দিক। এম এ-র ডিগ্রিটা হাতে মাদুলি করে বেঁধে ঘোমটা টেনে ঘরে বসে থাকুক, আর বাচ্চাকে টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার শেখাক।

—সত্যি, আমাদের প্রফেশানে জয়শ্রী একেবারে মিসফিট।

—এক্কেবারে। এসব মেয়েদের লাইন হচ্ছে স্কুলটিচিং। এক পথচারী হনহনিয়ে টপকে গেল সুকন্যাকে। বুঝি তার সঙ্গে আলগা ঠোক্কর লেগেছিল সুকন্যার, আলো-আঁধারে লোকটাকে ঝলক দেখার চেষ্টা করল। ফের মুখ ফিরিয়ে বলল, —আসলে উইকনেস জয়শ্রীর নিজের মনে। শ্বশুরবাড়িটা বাহানা।

হালকা মেজাজে গল্প করতে করতে এলগিন রোডের মোড়ে এসে পড়েছে দুই বান্ধবী। সুকন্যা যাবে টালিগঞ্জ, কোনাকুনি রাস্তা পার হয়ে মেট্রো ধরতে নেমে গেল পাতালে। দেয়ার গন্তব্য সন্তোষপুর, মিনিবাস পেতে তাকে আর একটু হাঁটতে হবে।

চলা শুরু করেও ক্ষণেক দাঁড়াল দেয়া। সবে তো সাতটা সওয়া-সাতটা, একবার গোপালনগর ঘুরে গেলে হয় না আজ? সকালেও মা টেলিফোনে বলছিল বাবার শরীরটা নাকি ভাল যাচ্ছে না, খুব নাকি খিটখিটেও হয়ে গেছে বাবা! বেচারা মা, একেই ঠাকুমাকে নিয়ে জেরবার, তার ওপর বাবা…। দাদা বউদিও নেই, দেরাদুন, মুসৌরি, হরিদ্বার বেড়িয়ে তাদের ফিরতে এখনও দিন দশেক। একা মা এখন খুব চাপে আছে। কিন্তু আজ গেলেও তো বেশিক্ষণ বসা হবে না। কাল অফিস নেই, কালই বরং…

লোয়ার সার্কুলার রোডের মুখে এসে কপালগুণে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সন্তোষপুরের মিনিবাস। ভিড় খুব, দেয়া উঠেছে ঠেলেঠুলে। জায়গা করে দাঁড়াল ড্রাইভারের সিটের পিছনটায়। পাশেই গায়ে গা লাগিয়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক পুরুষ, হাতে ব্রিফকেস, চেহারা পোশাক আশাকও যথেষ্ট মার্জিত। শরীর নিয়ে দেয়ার অযথা ছুঁৎমার্গ নেই, তবু কায়দা করে সরে গেল সামান্য। বাসে-ট্রামে মধ্যবয়সি পুরুষদের সে একটু এড়িয়েই চলে।

ছুটছে মিনিবাস। বিদঘুটে গতি। কখনও শামুক তো কখনও পাগলা ষাঁড়। ড্রাইভার মুড়ির টিনের মতো ঝাঁকাচ্ছে বাহনটাকে, যদি আর একটু শূন্যস্থান বার করা যায়। প্রায় কান ঘেঁষে টপকাচ্ছে অন্য বাসকে, জানলার ধারের যাত্রীরা সিঁটিয়ে যাচ্ছে ভয়ে। দু-চারজন নিয়ম মাফিক প্রতিবাদ জুড়ল, কন্ডাক্টার ড্রাইভার নিয়ম মতোই নির্বিকার। বেকবাগানের কাছে এসে বিপজ্জনকভাবে ব্রেক কষল একটা, হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বাসসুদ্ধু লোক। ট্রাফিক সারজেন্ট অশ্রাব্য ভাষায় হুঙ্কার ছুড়ল, ড্রাইভারের ভ্রূক্ষেপ নেই, দাঁত বার করে হাসছে।

সবই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দেয়ার গা-সওয়া। তবে ভাগ্যদেবী তার প্রতি আজ সত্যিই সুপ্রসন্ন, মিন্টো পার্কে বসার জায়গা পেয়ে গিয়েছিল, এখন তার দৃষ্টি জানলার বাইরে। পরিচিত শহর সরে সরে যাচ্ছে পিছনে, দেয়া তেমন কিছুই দেখছিল না। অফিস ঘিরে এলোমেলো চিন্তা ঘুরছে মাথায়। তাদের নবপ্রভাতের বার্তা বিভাগে প্রমীলার সংখ্যা সাকুল্যে তিন। মেয়েদের কাজ মোটামুটি বাঁধা গতের। বারোটায় এসো, সন্ধ্যায় ছুটি। যুদ্ধ-বন্যা-নির্বাচন-ভূমিকম্প বা বড়সড় কোনও ইন্দ্রপতনের ঘটনা না ঘটলে কিছু খবরের কপি তৈরি করো, নয়তো বসে বসে শব্দসন্ধান, বিনোদন, রাশিফল, আবহাওয়াবার্তা, দিনপঞ্জিকা, সভাসমাবেশ গোছের পাতাভরানো খুচরো-খাচরা হাবিজাবিগুলোর ম্যাও সামলাও। চার বছর ধরে এই এক থোড় বড়ি খাড়া, আর খাড়া বড়ি থোড়। যাক, এবার তবে রং বদলাচ্ছে! কিন্তু রামগরুড় তার ওপর বিরক্ত কেন? মেয়েদের ইভনিং শিফট করা নিশ্চয়ই অশেষদার পছন্দ নয়। এবং ভাবছে দেয়াই নিয়মটা চালু করাল।

অবশ্য কাজের প্রকৃতি আর একঘেয়েমির কথা দেয়াই সম্পাদককে বলেছিল বটে। রণেন সমাদ্দার প্রবীণ সাংবাদিক, বহু ঘাটের জল খাওয়া। নবীনা সাব এডিটারের মনোবেদনা শুনে হা হা হেসেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, —নিউজ পেপারের চাকরি মানে কি শুধুই রোমাঞ্চ, অ্যাঁ? মনে রেখো, সংবাদপত্র আদতে এক বৃহৎ সংসার। একটা বড় সংসারে কম খুঁটিনাটি কাজ থাকে! মেয়েরা ইনবর্ন গৃহিণী, খুঁটিনাটিগুলো তারাই ভাল সামলাতে পারে। ডেইলি কলামের একটাতেও সামান্য গলতি থাকলে কাগজকে কত চিঠি খেতে হয় জানো!

সান্ত্বনা দিয়েছিলেন কি রণেনদা? তবে মুখে যাই বলুন, রণেনদাই কিন্তু ডেকে ডেকে বেশ কয়েকটা কাজ দিয়েছেন দেয়াকে। ছকে বাঁধা ডিউটির বাইরেও। নতুন রাজ্যপালের স্ত্রীর ইন্টারভিউ, গিরিজা দেবীর একান্ত সাক্ষাৎকার, হাসপাতালে গিয়ে শিশু লোপাটের ঘটনা নিয়ে সুপারিন্টেন্ডেন্টকে পুছতাছ …। গত বছর পার্লামেন্ট ইলেকশানে হাওড়া জেলার একটা নির্বাচনী সমীক্ষার কাজ তো দেয়াই পেয়েছিল।

সৌম্য অবশ্য বলে, দেয়ার উৎসাহ দেখে নয়, কাজগুলো দেয়াকে চাপানো হয়েছিল স্রেফ রিপোর্টারের অভাবে। হাতের কাছে তক্ষুনি কোনও ছেলে ছিল না তাই।

হতে পারে। হতেই পারে। নবপ্রভাতের লোকবল তো কম বটেই। চার বছর আগে দেয়া যখন নবপ্রভাতে ঢুকেছিল, কাগজটার তখন হাঁটি হাঁটি পা পা দশা, সারকুলেশান মাত্র বিশ-পঁচিশ হাজার। নিউজ ডেসকে কর্মীর সংখ্যা তখন সাকুল্যে নয়। দেয়া, কণাদ, সুকন্যা, তথাগত, চার ট্রেনি সাব-এডিটর। সঙ্গে তিনজন সাব-এডিটার, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটার, বার্তা সম্পাদক। রিপোর্টিং-এ স্থায়ী কর্মীর সংখ্যাও তখন কত কম। দীপক সেনকে সরিয়ে রণেন সমাদ্দারকে সম্পাদক করে আনার পর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল নবপ্রভাত, এখন তো প্রচারসংখ্যা দেড় লাখ ছুঁই ছুঁই। প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় বার্তা বিভাগে লোক কি খুব বেড়েছে? সব মিলিয়ে ডেসকে তারা এখন স্থায়ী কর্মী মোট উনিশজন, বার্তা সম্পাদক, সহ-সম্পাদক সব ধরেটরে। স্থায়ী কর্মীসংখ্যা বাড়তে না দেওয়াটাই মালিক মোহিত মল্লিকের প্ল্যান। মোহিত ঝানু ব্যবসাদার। তিন পুরুষের লোহার কারবার মল্লিকদের। পারিবারিক ব্যবসাকে মোহিতই ছড়িয়েছে নানান দিকে। এক্সপোর্ট হাউস, জেনারেটার ম্যানুফ্যাকচারিং, আরও কী কী সব যেন। কলকাতার বণিক মহলে মোহিত এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। হঠাৎ সংবাদপত্রের দুনিয়ায় তার কেন পদার্পণ ঘটল কে জানে! সম্ভবত সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বাড়ানোর আকাঙক্ষাতেই। তবে নাফার বোধটি তো মোহিতের রক্তেই আছে, কম লোককে দিয়ে কীভাবে বেশি কাজ তোলানো যায় সে ভালই বোঝে। হয়তো খানিকটা সেই কারণেই মেয়েদের জন্য সান্ধ্য কাজের সূচনা। খানিকটা কেন, অনেকটাই। কাগজের অফিসে বিকেল সন্ধে থেকে কাজের চাপ বাড়ে, এতদিন ছেলেরাই শুধু সন্ধে রাতের ঝক্কিটা সামলেছে, সব্বাইকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ডিউটি দিলে তাদের বোঝাও কিছুটা লাঘব হয়। নবপ্রভাতের এখন যথেষ্ট নাম, কম পয়সায় বেশি খাটালে ক্ষোভ বাড়বে, কাজের ছেলেরা ডানা মেলে উড়েও যেতে পারে বিগহাউসে— এই আশঙ্কাও হয়তো জেগেছে মোহিতের মনে। তবে পরিকল্পনাটার পিছনে রণেনদা আছেনই। মোহিত যাই ভাবুক, রণেনদা না চাইলে নবপ্রভাতে সেটি এখন হওয়ার নয়।

তা যাই হোক, পরিবর্তন একটা এল তো। দেয়াকে কাজ দিয়ে রণেনদাও নিশ্চয়ই বুঝেছেন মেয়েদের আর এলেবেলে করে রাখার মানে হয় না। দেয়া সেটা প্রমাণ করেছে। হ্যাঁ, দেয়াই। সুকন্যা যতই মুখে ফটর ফটর করুক নিজে আগ বাড়িয়ে কোনও কাজ করার বান্দা নয় সুকন্যা। জঙ্গলে পাঠালে হাসিমুখে জঙ্গলে যাবে, ইভনিং দিলে খুশিমনে ইভনিং করবে, নাইট পড়লে বিনা প্রতিবাদে নাইট। কিন্তু যেচে…? উহুঁ। মেয়েটা যেন বড্ড বেশি ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট। বিয়েথা করিসনি, এখনই কোথায় বেশি উৎসাহ দেখাবি, তা নয়…

কর্তৃপক্ষের চকিত সিদ্ধান্তের পিছনে একটু হলেও দেয়ার ভূমিকা আছে এ ভাবনাটুকু দেয়ার মনকে আরও ঝরঝরে করে দিল। অন্য দিন এ সময়টায় বেশ ক্লান্তি অনুভব করে, আজ বাস থেকে নেমে দিব্যি চনমনে মেজাজে কেনাকাটা সারল কিছু। সংসারের যাবতীয় বাজারহাট করাটা দেয়ারই কাজ, সৌম্যর সময় কোথায়? সাড়ে আটটার মধ্যে নাকেমুখে ব্রেকফাস্ট গুঁজে অফিস দৌড়চ্ছে, এবং প্রায়শই নটার আগে সে বাড়ি ঢোকে না। আর ছুটির দিনে সে তো হাফ নবাব। সামনের দোকানে একটু যেতে বললেও এমন বিটকেল বিটকেল বাহানা জোড়ে।

মোড়ের দোকান থেকে বড়সড় একখানা পাঁউরুটি কিনল দেয়া, সঙ্গে আধ ডজন ডিম। সৌম্যর চা-কফির নেশা নেই, জলখাবারে সে দুধকর্নফ্লেক্স বেশি পছন্দ করে, কর্নফ্লেক্স ফুরিয়ে এসেছে, নামী ব্র্যান্ডের প্যাকেট নিল একটা। দোকানটায় ইদানীং নানা রকমের হিমায়িত খাবারও রাখছে, হ্যাম নিয়ে নিল খানিকটা, কাল সকালে সৌম্যকে স্যান্ডুইচ বানিয়ে দেবে।

বাসরাস্তা থেকে বাড়ি খুব একটা দূরে নয়। তিনতলায় উঠে বেল টিপতেই দরজা খুলেছে লক্ষ্মী। পুরোন কাজের লোক, দেয়ার বাপের বাড়িতে ছিল দীর্ঘদিন, বিয়ের পর দেয়া তাকে নিজের কাছে এনে রেখেছে।

হাতের প্যাকেটগুলো লক্ষ্মীকে ধরিয়ে দিল দেয়া, ভ্যানিটি ব্যাগখানা চাপিয়ে দিল লক্ষ্মীর কাঁধে। চটি ছাড়তে ছাড়তে চোখ নাচাল, —সাহেব ফিরেছে?

—উঁহু।

—চটপট এক গ্লাস জল খাওয়াও তো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

—হবেই তো। যা গরম।

বলতে বলতে মন্থর পায়ে যাচ্ছে লক্ষ্মী। একটু দুলে দুলে। যথেষ্ট বয়স হয়েছে, ইদানীং হাঁটু কোমরের ব্যথায় ভুগছে খুব, এখন আর ছুটোছুটি করে কাজ করতে পারে না।

দেয়া সোজা ঘরে গেল না, পাখা চালিয়ে শরীর ছড়িয়ে দিয়েছে সোফায়। ঘাম শুকোচ্ছে। আরাম লাগছে। পা দুটো তুলে দিল সেন্টারটেবিলে, নাচাচ্ছে মৃদু মৃদু। ছোট্ট একটা হাই তুলল।

লক্ষ্মী জল এনেছে। গ্লাস ছুঁয়েই বাচ্চা মেয়ের মতো মুখ কুঁচকাল দেয়া, —এমা, এমনি জল কেন? ফ্রিজ থেকে দাও।

—এমনিই খাও। লক্ষ্মীর গলায় অভিভাবকের সুর, —ঘেমেনেয়ে ঢুকছ, এক্ষুনি ঠাণ্ডা খেতে হবে না। সর্দি লেগে যাবে।

—কিচ্ছু হবে না। দাও তো।

—অবাধ্য মেয়ে। কোনও কথা শোনে না। গজগজ করতে করতে প্রতিদিনের মতোই ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল আনল লক্ষ্মী। অসন্তুষ্ট মুখে বলল, —খাও, বেশি করে খাও। যখন জ্বরে পড়বে, বুঝবে।

—অভিশাপ দিচ্ছ? গলায় ঢকঢক জল ঢালতে ঢালতে থামল দেয়া। মুখে ছদ্ম দুঃখী ভাব ফোটাল, —সারাদিন খেটেখুটে এলাম, কোথায় গরম গরম লুচির থালা হাতে তুলে দেবে তা নয়…

—খাবে লুচি? সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীর দোক্তা খাওয়া দাঁত বিকশিত, —ময়দা মেখে রেখেছি।

—থাক। এখন লুচি খেলে আর ডিনারটা জমবে না। বরং গরম গরম এক কাপ চা খাওয়াও।… বাই দা বাই, হঠাৎ ময়দা মেখে রেখেছ যে?

—ভাবলাম রাতে আজ পরোটা করি। মাংস হয়েছে… দাদা সেদিন বলছিল ভাতের চেয়েও পরোটা দিয়ে মাংস বেশি ভাল লাগে।

—ওওও, শুধু দাদার খাওয়ার দিকেই নজর, অ্যাঁ? আমি আর কেউ নই?

—আহা, তুমি যেন কত খাও! তুমি তো ছিলিম হচ্ছ!

—কী হচ্ছি?

—ছিলিম ছিলিম। প্যাকাটি হওয়ার সাধনা করছ। ওইটুকু করে খেয়ে কী করে সারাদিন কাজকম্মো কর বুঝি না বাপু।

—আমি রোগা? দেয়া তড়াং করে সোজা হয়েছে। কামিজের ওপর দিয়ে পেটে চিমটি কেটে বলল, —দ্যাখো দ্যাখো পেটে কত চর্বি জমে গেছে।

—বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েদের ওইটুকু চর্বি জমা ভাল। ভর ভরন্ত দেখায়।

—তাই বুঝি?

—নয় তো কী? …একতলার ওই বউটাকে দ্যাখো না? কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে, হনু দুটো ঠেলে উঠেছে… মলিনা বলছিল ওর বউদি নাকি আজকাল দুপুরে ভাতটাত খায় না, জলে কীসব গুঁড়ো মিশিয়ে জলটা খেয়ে নেয়! অমন মড়াখেকো শকুনির মতো রূপ তৈরি করলে বর বেশিদিন টিকবে?

—কেন? টিকবে না কেন?

—ব্যাটাছেলেরা একটু গায়েগতরে মেয়েমানুষ ভালবাসে।

অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখেছিল দেয়া, এবার লুটিয়ে পড়ল। ছোটবেলা থেকে লক্ষ্মীদিকে দেখছে সে, লক্ষ্মীদি বরাবরই একটু মোটাসোটা। লক্ষ্মীদির বর যখন লক্ষ্মীদিকে ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় তখনও লক্ষ্মীদি কম হৃষ্টপুষ্ট ছিল বলে মনে হয় না!

দেয়ার হাসি দেখে লক্ষ্মী বুঝি অপ্রতিভ হয়েছে সামান্য। টেবিল থেকে বোতলটা নিয়ে ঘুরে তাকাতে তাকাতে চলে যাচ্ছে রান্নাঘরে।

টিভি অন করে রিমোট হাতে দেয়া ফের বসল সোফায়। গা প্যাচপ্যাচ করছে ঘামে। স্নান না করলে চলবে না। উঠতেও ইচ্ছে করছে না চা না খেয়ে। এ চ্যানেল ও চ্যানেলে ঘুরছে চোখ। একটা বাংলা চ্যানেলে এসে স্থিত হল। খবর চলছে। আবার এক সদ্যোজাত কন্যাশিশুকে ডাস্টবিনে পাওয়া গেল! আজই ভোরে, শ্যামবাজারে। খবরটা নবপ্রভাত কি পায়নি? অন্তত সন্ধে ছ’টা অবধি তো অফিসে পৌঁছয়নি খবরটা, এলে ঠিক কানে আসত। দেরি করে হলেও কেউ নিশ্চয়ই ছোট করে কভার করবে ঘটনাটা, এসব রোমাঞ্চকর কাহিনী পাঠকরা খুব খায়। কী বিশ্রী ব্যাপার, এই নিয়ে গত ছ’মাসে বোধহয় খান চারেক বাচ্চাকে কুড়িয়ে পাওয়া গেল। আশ্চর্য, সব কটাই মেয়ে! সমাজ এগোচ্ছে, না পিছোচ্ছে?

লক্ষ্মী রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়েছে, —তোমার একটা ফোন এসেছিল গো। এই খানিক আগে।

বোতাম টিপে টিভির শব্দ কমাল দেয়া, —কে? কী নাম?

—ওই যে গো তোমার সেই কলেজের বন্ধু। সুজিৎ।

দেয়া আকাশ থেকে পড়ল, —সুজিৎ? সুজিৎ নামে তো আমার কোনও বন্ধু নেই!

—নেই বুঝি? তাহলে বোধহয় তপন।

—ধ্যাৎ। মনে করে বলো।

—ওই যে গো ওই ছেলেটা… যে এসেই আগে ফ্রিজ খুলে দেখে কী খাবার আছে… খুব আমুদে…

—ঋতম?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, ঋতম।

—স্ট্রেঞ্জ! এতদিন ধরে ঋতমকে দেখছ, ঋতমের নাম মনে থাকে না?

—মাঝে মাঝে ভুলে যাই। লক্ষ্মী লাজুক হাসল, —তোমার সঙ্গে কী জরুরি দরকার আছে বলছিল।

ঋতমটা এক্কেবারে পাগল। নিজের খেয়ালে থাকে। মাথার ক্যাড়া নড়লে হঠাৎ হঠাৎ ফোন করে ভাট বকে যায়। বহুকাল পর পর দুমদাম ধূমকেতুর মতো উদয় হয় বাড়িতে। দেয়ার বিয়ের দিন প্রকাণ্ড একখানা বোকে নিয়ে উপস্থিত, এত বড় পুষ্পস্তবক যে দরজা দিয়েই ঢোকে না। তোর সঙ্গে আমার যতদিনের পরিচয় ঠিক ততগুলো গোলাপ আছে এতে, গুনে নিস! খ্যাপা আর কাকে বলে! সাহিত্য করে করে মাথাটা গেছে।

ঋতমের জরুরি দরকার? তুৎ, কে এখন পাগলের বকর বকর শুনবে!

চা খেয়ে শোওয়ার ঘরের লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে গেল দেয়া। তাদের এই দুকামরার ফ্ল্যাটটা বেশ সুসংবদ্ধ। ঘরগুলো মাঝারি সাইজের, ড্রয়িং-ডাইনিং হলটাও মন্দ নয়, কিচেনটাও যথেষ্ট ভাল। শোওয়ার ঘরের সঙ্গে অলিন্দও আছে একখানা। সরু। পশ্চিমমুখো। অন্য টয়লেটখানা মাপে বড় বটে, তবে এই বাথরুমখানাই বেশি সাজানো গোছানো। এই ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার পর নিজের পছন্দ মতো কাচের র‍্যাক, সুদৃশ্য বেসিন, দেখনবাহার টাওয়েল রড, টেলিফোন শাওয়ার লাগিয়ে নিয়েছে দেয়া। রট আয়রনের ফ্রেমঅলা ডিম্বাকৃতি একখানা আয়নাও ফিট করেছে বেসিনের মাথায়। স্নানঘরের ব্যাপারে দেয়া ভারী শৌখিন, আর একটু জায়গা পেলে সে এখানে একটা আস্ত বাথটব বসিয়ে নিত।

নকশাদার ঘোমটা পরা ছোট্ট টিউবলাইটের আলোয় আয়না উজ্জ্বলতর। স্নানরত দেয়া প্রতিফলিত হয়েছে আয়নায়। আগে সে লিকলিকে রোগা ছিল, বিয়ের পর তার তনুলতাটি এখন দিব্যি ভরাট। গায়ের রং তার ফর্সা নয়, বরং একটু কালোর দিকেই, তবে ওই শ্যামলা রঙেই যেন তাকে মানায় ভাল। চোখ ধাঁধানো রূপসী না হলেও সে যথেষ্ট লাবণ্যময়ী, তার মুখমণ্ডলে এক অপাপবিদ্ধ সরলতা স্থির হয়ে আছে। ওই সারল্যই যেন তার বয়স বাড়তে দিচ্ছে না, উনত্রিশেও তাকে পঁচিশের বেশি ভাবা কঠিন।

স্নান সেরে দেয়া একটা পাতলা নাইটি পরে নিল। রাত হয়েছে, এখন আর বাইরের লোকের আসার সম্ভাবনা নেই, এই রাতপোশাকেই এখন আরাম হবে বেশি। চুলে আলগা চিরুনি বোলাতে বোলাতে টিভি চালিয়েছে আবার। রঙিন পর্দায় প্রকাণ্ড এক জাহাজের ডেক। নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে বিষগ্ন নায়িকা। পাশে এসে দাঁড়াল নায়ক। বিষন্ন নায়িকার দুঃখে নায়ক আনন্দের প্রলেপ দিচ্ছে। ছবিটা দেয়া দেখেছে হলে। বেশ লেগেছিল। অন্য চ্যানেল আর ঘোরাল না, নতুন করে মজেছে ছবিটায়।

লক্ষ্মী পায়ের কাছে এসে বসল। কার্পেটে। টিভি দেখার নেশা নেই লক্ষ্মীর, একা থাকলে কখনওই সে যন্ত্রটা চালায় না। তবে সৌম্য দেয়া চালালে কখনও কখনও এসে বসে।

এখন বোধহয় ইংরিজি সিনেমাটা ভাল লাগছিল না লক্ষ্মীর। উশখুশ করছে। হঠাৎ বলল, —একটা কথা তোমায় বলাই হয়নি। আজ আমার ছোটজামাই এসেছিল।

—হঠাৎ?

—হঠাৎ আর কী, টাকা চাই। রিকশা কিনবে।

—হঠাৎ নিজের রিকশার কী দরকার পড়ল?

—বলছিল রোজ মালিককে যা জমা দিতে হয় তারপর আর কিছু থাকে না… কী করি বলো তো? দেব?

লক্ষ্মীর দুই মেয়ে। দুই জামাই’ই শাহেনশা। বড় জামাই কাঠের মিস্ত্রি, ছোট সোনারপুরে রিকশা চালায়, দুজনেই প্রাণ ভরে শাশুড়িকে নিংড়োয়। মাইনের টাকা ব্যাংকে জমাবে কি লক্ষ্মী, মেয়ে জামাইদের কল্যাণে তার আগেই ফুড়ুৎ।

দেয়া মনে মনে বলল, আমি হ্যাঁ বললেও তুমি দেবে, না বললেও দেবে। ওদের মায়া তুমি কাটাতে পারো কই!

মুখে বলল, —কত চায়?

—বারোশো মতন।

—ওরে ব্বাস্‌, অত?

উত্তরে কী একটা বলছিল লক্ষ্মী, তার আগেই ফোন বেজে উঠেছে। দেয়া হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেট তুলল, —হ্যালো?

—কী রে, ব্যাপার কী তোর? সন্ধে সাড়ে সাতটাতেও ফোন করলে পাওয়া যায় না, সকাল দশটাতেও নট অ্যাভেলেবল… তোকে কি নবপ্রভাত কিনে নিয়েছে নাকি?

ঋতম। তোড়ে প্রলাপ বকছে।

দেয়া লঘু ধমক দিল, —অ্যাই, গুল মারছিস কেন রে? সকালে তুই কোথায় ফোন করেছিলি? সওয়া এগারোটা অব্দি আমি বাড়িতে…

—অ। সকালে করিনি বুঝি? তাহলে বোধহয় করব করব ভেবেছিলাম। … যাক গে যাক, এখন করছিস কী?

—ফ্রায়িং ভ্যারেন্ডা। টিভি দেখছি।

—ইডিয়েট বাক্স?

—কেব্‌লে ভাল সিনেমা দেখাচ্ছে একটা। টাইটানিক।

—অ। বজরায় ক্যাজরা!

পেট গুলিয়ে হাসি উঠে এল দেয়ার। কী ফিল্মের কী নামকরণ! ঋতমই পারে বটে জুরাসিক পার্কেরও কী একটা নাম দিয়েছিল যেন? খাইসে, ডায়নো আইসে! বিচিত্র নামকরণ করেছিল আর্নল্ড শোয়্যারজেনেগারের। দানবকুমার!

হাসতে হাসতেই বলল, —হ্যাঁ, তাই। তোর বাড়ির খবর কী?

—হোমফ্রন্ট এখন শ্মশান। শান্তি বিরাজমান।

—গল্প লেখা ছেড়ে কবিতা লেখা শুরু করেছিস নাকি? খুউব ছন্দ মেলাচ্ছিস?

—তুই কবিতাও পড়িস না, তাই না?

—কেন?

—পড়লে জানতিস ওসব ছন্দ অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাতিল হয়ে গেছে। এখন ওই ছন্দই কঠোর গদ্য।

—বুঝলাম। তা শ্রাবণীর কী খবর? মাসিমা? পুচকিটা কেমন আছে?

—একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্ন করিস কেন? কেউই তেমন বলার মতো অবস্থায় নেই।

—মানে?

—মানে ভালই আছে। অ্যাজ ইউজুয়াল। টুসকি বাড়ছে, শ্রাবণী কমছে, মা একই আছে।

—কী কথার ছিরি! তা হঠাৎ তোর জরুরি দরকারটা কী?

—অর্থনৈতিক। তোদের কাগজে গল্প বেরোলে কীরকম মাল্লু দেয় রে?

—নবপ্রভাতে তোর গল্প বেরোচ্ছে?

—সাহিত্যের কোনও খবরই রাখিস না? এত বড় একটা লিটেরারি ইভেন্ট, ঋতম সেনগুপ্তর গল্প বেরোচ্ছে…

—রোববারের পাতার খবর আমি কী করে জানব বল। ওটা তো একদম অন্য ঘরে। কবে বেরোচ্ছে?

—দিস সানডে, কিংবা নেক্সট সানডে। কমপোজ হয়ে গেছে, আমি খবর পেয়েছি।

—তুই আমাদের অফিসে আসিস নাকি? দেখা করিস না তো?

—একদিনই গিয়েছিলাম। গল্পটা জমা করতে। মাস দুয়েক আগে। তুই সেদিন ছিলি না। যাক গে, ফালতু কথা ছাড়, পয়েন্টে আয়। কত দেবে রে?

—কী জানি। বোধহয় তিন চারশো। ওরকমই তো দেয় শুনেছি।

—মাত্র? ফোর ফিগারও দেয় না? ঋতমের গলা কিঞ্চিৎ হতাশ শোনাল, তোদের মল্লিকের পো মহা কিপ্‌টে তো!

—কিপ্‌টে নয়, মিতব্যয়ী। তোরা বানিয়ে বানিয়ে গপ্পো লিখবি, আর তোদের পেছনে টাকা ওড়াবে? নতুন কাগজ হিসেবে যথেষ্ট দেয়। ঋতমকে খেপিয়ে মজা পেতে চাইল দেয়া।

—বল বল, বলে নে। নোবেলটা পাই, তখন টের পাবি কাকে টিজ করছিস।

—তুই কি খালি সাহিত্যই করছিস? চাকরিটার খবর কী?

—আছে এখনও। অন্তত আজ পর্যন্ত।

—আয় একদিন। অনেকদিন তো আসিসনি।

—যাব। এখন একটু ফ্রি হয়েছি। মাঝে কদিন যা ঝঞ্ঝাট গেল!

—ঝঞ্জাট?

—আর বলিস না। সে এক কেলো কেস। আমার বড়পিসির বাড়ি যে রান্না করে… কানন… তার মেয়ে হঠাৎ লা-পতা। কানন আমার পিসির পায়ে হত্যে দিয়ে পড়েছিল, ও মাগো আমার মেয়েকে খুঁজে এনে দাও। পিসির কেন যেন ধারণা আছে দুনিয়ার সব অড কাজগুলো আমিই করতে পারি। অতএব এই বেঁড়ে ব্যাটাকেই ধর।

—পুলিশে জানাসনি?

—সব হয়েছিল। থানা, পুলিশ, হাসপাতাল, মর্গ, শ্মশান… পুরোদস্তুর ডিটেকটিভ সেজে ঢুঁড়েছি রে। কার কার সঙ্গে মেয়েটার দোস্তি ছিল, কোনও লটঘট ছিল কিনা…। একটা উড়ো খবর পেয়ে দিঘা ছুটলাম, আর একটা খবর পেয়ে বর্ধমান। ষোড়শী বালিকা আমায় প্রচুর ঘোল খাইয়েছে।

—তারপর? পাওয়া গেল?

—নিজেই ফিরে এসেছে। টু বি এগজ্যাক্ট, পালিয়ে এসেছে।

—কোথ্‌থেকে?

—সে এক অকহতব্য জায়গা। মুম্বই-এর রেডলাইট এরিয়া। সম্ভবত ফর্কল্যান্ড রোড। মেয়েটার দিল কি হিরো করিশমা বানিয়ে বুকে করে রাখবে বলে আরব সাগরের পারে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর ওই গাটারে মেয়েটাকে…

—লোকটাকে ধরা গেছে?

—দূর, সে তো আগেই ধাঁ। মেয়েটা যে কীভাবে ফিরে এসেছে সেও এক রোমহর্ষক কহানি। তোদের নবপ্রভাত পেলে লুফে নেবে।

—বলছিস? দেয়া নড়ে চড়ে বসল, —স্টোরি করা যাবে?

—করবি?

—মেটিরিয়াল পেলে করাই যায়। এরকম একটা ঘটনা… একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে গেল… ঠিক মতো লেখালিখি হলে পুলিশ হিরোটাকে খুঁজতে বাধ্য হবে।

—হুম। সে ব্যাটাকে পাকড়াতে পারলে তো ভালই হয়। ব্যাটা হারামির হাতবাক্স,..

আরও দু-চারটে টুকটাক কথা বলে টেলিফোন রেখে দিল ঋতম। হ্যান্ডসেটখানা কোলে নিয়ে বসে দেয়া ভাবছিল। লেখা উচিত, লেখা উচিত। সরাসরি রণেনদাকে গিয়ে বলতে হবে। রণেনদাকে বলবে, নাকি বার্তা সম্পাদক তীর্থঙ্করদাকে…?

ভাবনা ছিঁড়ে গেল। কলিংবেল।

সৌম্য ফিরেছে।

দুই

ঝাঁ ঝাঁ দুপুর মাথায় নিয়ে বাস থেকে নামল ঋতম। প্রিন্স আনওয়ার শাহ্‌ রোডের মতো ব্যস্ত রাস্তাও এখন বেবাক ফাঁকা। পথের কুকুরগুলো পর্যন্ত ছায়া খুঁজে নিয়ে ঝিমোচ্ছে। গলে গেছে রাস্তার পিচ, আটকে আটকে যাচ্ছে চটি। গলগল ধোঁয়া ছড়িয়ে গরম বাতাসকে আরও বিষাক্ত করে দিয়ে গেল এক প্রাইভেট বাস। খানিক দূরের পৃথিবী কাঁপছে তিরতির। মরুভূমির মতো। উঁহু, মরুভূমি নয়, মরীচিকা। চোখে ধাঁধা লেগে যায়।

একটুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে ঋতম কাঁপনটা দেখছিল। গরমকালটা তার বেশ লাগে। বিশেষ করে এই দুপুরগুলো। এক নির্জন মন কেমন করা অনুভূতি ছেয়ে থাকে বুকে, মাথাটা অসম্ভব হালকা হয়ে যায়। অসংখ্য দানা দানা কষ্ট চক্রাকারে ঘুরতে থাকে হৃৎপিণ্ডে।

ধুস, কষ্ট কীসের? ঋতমের তো এখন সুখই সুখ। দৌড়ে রাস্তা পার হল ঋতম। আজ থেকে সে আবার মুক্ত বিহঙ্গ। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করল। মাত্র তিনটে পড়ে। একটা ধরাবে কি এখন? থাকবে দুটো। অর্থাৎ ফুরিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। মুশকিল মুশকিল, পাঁচটার আগে কালীদা দোকান খুলবে না, কিনতে হলে সেই নবীনা সিনেমা অবধি ছোটো। তবু ইচ্ছে যখন চেগেছে, একটা ধরানোই যায়। ছোট ছোট হৃদয়বাসনাকে অহেতুক দমন করতে নেই। ঋতম হাসল মনে মনে। খা, খেয়ে নে, আবার তো সিগারেট র‍্যাশন করার দিন শুরু হল। এবার বিড়ি ধরলে কেমন হয়? লেখার সময়ে ধোঁয়া তো লাগবেই।

মেজাজে সিগারেট টানতে টানতে পাড়ায় ঢুকল ঋতম। বাড়ির দরজায় এসে যখন পৌঁছল, তখনও সিগারেটটা ফুরোয়নি। ফেলে দিতে মায়া হচ্ছে, এখন নো অপচয়। সযত্নে নিবিয়ে আধপোড়া সিগারেটখানা রেখে দিল পকেটে।

অসময়ে ছেলের আবির্ভাবে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছে অতসী, —কী রে, তুই? এখন?

—এলাম। ঋতম কাঁধ ঝাঁকাল।

—শরীর খারাপ?

—দেখে মনে হচ্ছে? সুড়ুৎ করে মাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে গেল ঋতম। অতসীও এসেছে ছেলের পিছন পিছন, অফিস কি ছুটি হয়ে গেল?

—কোন দুঃখে ছুটি হবে? অফিস অফিসের মতোই চলছে।

অতসীর চোখে সন্দেহ ঘনাল। ঋতমের এই হাবভাব তার অচেনা নয়। অস্ফুটে বলল, —তুই কি এই চাকরিটাও…?

—ছেড়ে দিয়েছি।

—সর্বনাশ! কেন? কী হল?

বাইরের প্যান্টশার্টেই হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে ঋতম। আড়মোড়া ভেঙে বলল, —পোষাচ্ছিল না মা।

একটুক্ষণ বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইল অতসী। যেমনটা সে প্রতিবারই থাকে। তারপরেই ঝামরে উঠেছে, —তোমার তো কোনও চাকরিই পোষায় না।

—বলেছি তো মা, এ কাজটাও সুবিধের নয়। এত কারেন্ট ক্রস কারেন্ট…

—তোমার সুবিধের কাজ কোনটা শুনি? এবার কি তোমায় রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতি করে দিতে হবে?

—প্লিজ মা, ওই চাকরি দিও না। প্রোটোকল ফোটোকলে জিনা হারাম হয়ে যাবে।

—তুই কীই রে? অতসীর মুখ কাঁদো কাঁদো। ধপ করে বসে পড়েছে ছেলে-ছেলের বউ-এর বিছানার কোণটিতে। আট মাসের টুসকি ঘুমোচ্ছ খাটে, অয়েলক্লথ সুদ্ধ নাতনিকে সরিয়ে দিল একটু। আঁচলের খুঁটে চোখ মুছছে, —অম্বরকে যে আমি কী করে মুখ দেখাব। রুনুটাও খুব দুঃখ পাবে।

—দেখিও না মুখ। ঋতমের তুরন্ত জবাব, —দিদি জামাইবাবু এলে খাটের তলায় লুকিয়ে পোড়। কিংবা আলমারির পেছনটায়। আমি বলে দেব, মা বাড়ি নেই।

—হারামজাদা ছেলে, মারব এক থাপ্পড়। তোর কি লজ্জাশরম কিছুই নেই রে? বিয়ে করেছিস, একটা বাচ্চা হয়ে গেছ…

—আশ্চর্য, বিয়ে করা কি লজ্জার কাজ? বিয়ে তো মানুষ করেই। তুমিও করেছিলে। আর বিয়ে করলে বাচ্চা হয় এও তো জানা কথা। আনলেস হাজব্যান্ড ওয়াইফের একজন ইজ ফাউন্ড টু বি আনফিট টু প্রোডিউস আ চাইল্ড।

—আই অ্যাই, একদম বুকনি নয়। ঋতমের দোদুল্যমান হাঁটুতে ক্ষুব্ধ চাঁটি কষাল অতসী, —ওইটুকু ফুলের মতো মেয়েটাকে দেখেও তোর কষ্ট হয় না?

—টুসকিকে দেখে কষ্ট? কেন? আমার তো ওকে দেখে বুকটা ভরে যায়। বলেই মেয়ের দিকে পাশ ফিরেছে ঋতম। ঝুঁকে আলতো নাক ঘষল মেয়ের নাকে। আঙুল বুলিয়ে গালে সুড়সুড়ি দিল, —সুন্টুমুটুরুন্টুটুন্টু… টুসকিফুসকিখুশকিরুশকি… তুমি এখনও ঘুমোচ্ছ কেন বাবু? চারটে বাজে। ওঠো। খেয়ে দেয়ে ঠাম্মার সঙ্গে বেই বেই যাবে না?

—অ্যাই, ওকে জাগাবি না। অনেক সাধ্যসাধনা করে ওকে ঘুম পাড়িয়েছি। ঘুম চটে গেলে ভীষণ ঘ্যানঘ্যান করবে।

—তাহলে মানে মানে কেটে পড়ো। দশ মিনিট অন্তত চাকরি ছাড়ার আনন্দটা ঠিক মতো এনজয় করতে দাও। নইলে কিন্তু ওকে সত্যিই তুলে দেব। সারা বিকেল তোমার কানের পাশে প্যাঁ পোঁ ক্লারিওনেট বাজাবে।

অতসী চুপ। মুখ ভার। মুচকি হেসে চোখ বন্ধ করার ভান করল ঋতম। চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করছে সত্যি সত্যি অতসী উঠে যায় কিনা।

উঁহু, মা কি নড়ার চিজ! এখন যে কত শ্বাসপতনের শব্দ শুনতে হবে। ফোঁচফোঁচ, ফোঁসফোঁস, ফ্যাঁচফ্যাঁচ…। সরাসরি বাড়ি ফেরাটা কি ভুল হল? টিউশ্যনিটা সেরে সন্ধের পর ফিরলেই বুঝি…। তারপর নয় খাবার টেবিলেই নাটুকে ঢঙে ঘোষণাটা করে দিত। শাশুড়ি বউ দুজনেই তখন মুখোমুখি, পরস্পরের সামনে কেউই তেমন জুত করে আক্রমণ শানাতে পারত না!

ঋতম আড়াআড়ি হাতে চোখ ঢাকল। ওই অম্বরদাই যত নষ্টের গোড়া। কেন যে ঋতমের পিছনে আদাজল খেয়ে পড়েছে? এ যেন এক খেলা! কম্পিটিশান! দেখি কে হারে! জামাইবাবু বেশি চাকরি জোটাতে পারে, না শালা বেশি চাকরি ছাড়তে পারে! কানেকশান কী, বাপস! নয় নয় করে কম জায়গায় ঢোকাল! তিন তিনটে কোম্পানির সেলসে। প্রোডাক্টগুলো নিয়ে এত ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে বলতে হত, বাড়ি আসার পরেও অসাড় হয়ে থাকত জিভ। তারপর কস্‌মেটিকস কোম্পানির অ্যাকাউন্টসে। জন্মে হিসেবের কাজ করেনি ঋতম, সে কমার্সের স্টুডেন্টই নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এম এ হয়ে ব্যালান্সশিট বানাচ্ছে! করো করো, লেগে থাকো, ঠিক শিখে যাবে! ছমাসেই শিক্ষালাভ হল বৈকি। হিসেবে গ্যালন গ্যালন জল মেশানো চলছে, ঝুটা ভাউচার বানাতে বানাতে হাতে কড়া পড়ে গেল। আয়নার দিকে তাকালেই মনে হত এক পাপিষ্ঠের মুখ দেখছে। আত্মায় দাগ পড়ে গেলে মানুষের আর থাকেটা কী? এরপর অম্বরদা ঢোকাল এক বন্ধুর ফার্মে। তোমায় কিচ্ছুটি করতে হবে না, তুমি শুধু শ্যামলকে সঙ্গ দাও! বাপস্‌, সঙ্গটাই কী ভয়ংকর! শুধুই সেলস্‌স্ট্যাক্স ইনকামট্যাক্স আর এক্সাইজ অফিসে ছোটো। সকালে ব্যাম্বু ভিলা, তো বিকেলে হুড়কো ভিলা। কেঁদে কেঁদো সরকারি ছিনতাইবাজগুলোর সঙ্গে কী মিহি সুরে কথা বলতে হয়, ছ্যা! কপাল ভাল, ওখানে রিজাইন করতে হয়নি। শ্যামল মজুমদারের ব্যবসাই শুয়ে পড়ল। এই একটা চাকরি ছাড়া নিয়ে দিদি খোঁটা দিতে পারেনি। মনের দুঃখে আবার লেলিয়ে দিয়েছিল অম্বরদাকে। পরিণামে এই স্টোরবাবু হওয়ার শাস্তি। দুকেজি গ্রিজ বার করে দাও, ছখানা বোল্টু গুনে দাও, আলপিন থেকে বেয়ারিং প্রতিটি আইটেমের রেকর্ড রাখো। পিছন দিয়ে দু হাত্তা মাল গলে যাচ্ছে, ওপর ওপর সব টিপটপ! দেখেও কিছু বলা চলবে না, চোখে ঠুলি এঁটে বসে থাকো! কত সহ্য হয়? কত সহ্য হয়?

ভাবনার মাঝেই ঋতম টের পেল অতসীর স্বরযন্ত্র ফের চালু হয়েছে, —অম্বর বলেছিল, এবার কিন্তু খুব বড় ফার্মে বাবুয়ার চাকরি হল মা। এখানে টিকতে পারলে চড়চড় করে ওপরে উঠে যাবে। …সবই আমার কপাল!

অতসীর গলায় হতাশা অতি প্রকট। একটু একটু খারাপ লাগছিল ঋতমের। মাটা কেন যে এত সরল? চড়চড় করে উঠতে গেলে এ বাজারে যে যে গুণ লাগে তা যে ঋতমের নেই, মা কেন এখনও বুঝতে পারে না?

ঋতম চোখ বুজেই বলল, —অম্বরদা কেন করে এত? পলিটিকসের লোকগুলোর কোনও মাত্রাজ্ঞান নেই। এবার থামতে বলো না।

—তোকে ভালবাসে বলেই করে। তুই বসে বসে মাছি তাড়াচ্ছিস দেখে খারাপ লাগে বলেই করে।

—আমি চুপচাপ বসে থাকি? কিছু করি না?

—কী করো? বসে বসে খালি ছাইপাঁশ লেখো, আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াও। অতসী এক কিলোমিটার লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলল, —আমারই হয়েছে যত জ্বালা। কপাল মন্দ হলে যা হয়। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম জীবনে, কিছুই কি পূরণ হল? সে মানুষটা তো দিব্যি ড্যাং ড্যাং করে ওপরে চলে গেল, দুনিয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে আমিই পড়ে রইলাম। ভেবেছিলাম স্বামী গেছে তো কী আর করা, ছেলে তো রইল। সেই সন্তান দুখিনী মাকে কী প্রতিদান দিচ্ছে! কবে যে আমার মরণ আসবে!

খুবই কাঁচা ডায়ালগ। সারা দুপুর বসে বসে টিভিতে বাংলা সিরিয়াল গেলার ফল। এই সব জোলো ক্ষেপোক্তির উত্তর দেওয়াও পণ্ডশ্রম। ঋতম টু শব্দটি না করে মটকা মেরে পড়ে রইল।

অতসী নিরস্ত হওয়ার পাত্রী নয়। ঠেলছে ছেলেকে, —কী রে, চুপ মেরে গেলি যে বড়? কেন ছাড়লি চাকরি? কী অসুবিধে হচ্ছিল?

—ও তুমি বুঝবে না।

—তোমার বউ তো বুঝবে। শ্রাবণী কলেজ থেকে ফিরুক, সে তোমার ধুধধুড়ি নেড়ে দেবে। বউ খেটেখুটে রোজগার করে এনে খাওয়াবে আর পুরুষমানুষ শুয়ে শুয়ে ঠ্যাং নাচাবে…।

—এতে দোষের কী আছে মা? ঋতম চোখ খুলল। একগাল হেসে বলল, —জমানা বদলে গেছে। চিরটাকাল পুরুষমানুষ রোজগার করে এনে খাওয়াবে আর মেয়েরা বসে বসে ল্যাজ নাচাবে, ওটি আর হচ্ছে না।

—কথাটা বউকে বোলো।

—ও বলাবলি তো আমাদের আগেই হয়ে গেছে।

—হুঁহ্‌, কী ঢঙের কথা! … শ্রাবণী এসে যে কী অনর্থ করবে ভাবতে আমার বুক হিম হয়ে যাচ্ছে।

এতক্ষণে ঝুড়ি থেকে আসলি বেড়াল বেরোল। ক্ষোভ দুঃখ হতাশা ছাপিয়ে মূলত ভয়ের অনুভূতিটাই ক্রিয়া করছে অতসী দেবীর মনে। কষ্ট পাচ্ছে, তবে তার সবটুকুই ঋতমের চাকরি ছাড়ার কারণে নয়। শ্রাবণী কলেজ থেকে ফিরে তার আদরের বাবুয়াকে কী ভাবে ডলবে পিষবে এই শোকেই মা মুহ্যমান।

বেচারা মা। এত বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মা আগে অনেক বেশি ব্যক্তিত্বময়ী ছিল, সংসারের অনেক ঝড়ঝাপটা হাসিমুখে সামলেছে। আসলে বাবা হঠাৎ মারা যাওয়াতেই মা কেমন যেন হয়ে গেল। কেমন নুয়ে পড়া, ভিতু ভিতু। ভাবতে অবাক লাগে এই মা-ই একদিন শরিকি ভাগাভাগির সময়ে কাকু জেঠুদের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছে, প্রাপ্য অংশ বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে বাবাকে দুর্বল হতে দেয়নি। বরং বাবাই অসহায় অসহায় ধরনের ছিল। জোর করে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে পারত না, চেঁচিয়ে নিজের ইচ্ছেটাকে ঘোষণা করার ক্ষমতা ছিল না …। সে কি বা বাড়িতে, কি বা অফিসে। বাবার মৃত্যুটাও এক অসহায় মৃত্যু। অফিসের কাজে ভুবনেশ্বর গিয়েছিল, রাতদুপুরে গেস্টহাউসে স্ট্রোক, ভোরবেলা দরজা ভেঙে আবিষ্কার করা হল মরে পড়ে আছে বাবা। মেঝেয়। একেবারে দরজার সামনে। হৃৎপিণ্ডের আঘাতে ছটফট করতে করতে বোধহয় দরজা খুলতে গিয়েছিল, ডাকতে চেয়েছিল কাউকে, পারেনি। সুস্থ সবল মানুষ, হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, তার এমন আকস্মিক চলে যাওয়া কি মেনে নেওয়া সহজ? অন্তত পরিবারের লোকজনদের পক্ষে? ঋতমের তখন বি. এ. সেকেন্ড ইয়ার, দিদির সবে বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়েছে … ঋতমের তো মনে হয়েছিল তার মাথার ওপর থেকে আকাশটাই বুঝি সরে গেল, দিদিও মনমরা ছিল বহুদিন। তবে তারা সামলেও গিয়েছিল ক্রমশ। শুধু মা’ই পারেনি। টাকাপয়সার দিক দিয়ে মাকে যে খুব অনটনে পড়তে হয়েছিল তা নয়, বাবার অফিস থেকে মোটামুটি ভালই টাকা পাওয়া গিয়েছিল। বাবার লাইফ ইনশিওরেন্স টিওরেন্সও ছিল। সব কিছু কুড়িয়ে বাড়িয়ে পেটে টান পড়ার দশা তো কখনওই হয়নি। ঋতমের পড়াশুনো চালাতেও তেমন অসুবিধে হয়নি, দিদির বিয়েটাও মসৃণভাবে চুকে গিয়েছিল। শুধু বাহুল্য টাহুল্যগুলো একটু কাটছাঁট করা হয়েছিল, এই যা। তাছাড়া ঋতম কলেজে পড়ার সময় থেকেই নিয়মিত টিউশ্যনি করেছে, দিদিও ব্যাংকের চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিল… তবু পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার অনুভূতিটা কিছুতেই মার মোছেনি।

এখন অবশ্য অন্য ধরনের বিপন্নতায় ভোগে মা। ছেলে তেমন কামাচ্ছে না, বউ-এর টাকায় সংসার চলে, এতেই মা যেন কেমন কেঁচো হয়ে থাকে। কিন্তু কেন? ছেলের রোজগার বেশি হলে সংসারে মার কত্রীর আসনটা আরও সুরক্ষিত হত, এমনটাই মার মনে হয় কি? অথচ ভাবার কোনও কারণই নেই। শ্রাবণী মাঝে মাঝে নিজের মতামত ফলায় বটে, তবে মার আসনটা কেড়ে নেওয়ার বাসনা তার নেই, বরং অনেক ব্যাপারেই শ্রাবণী শাশুড়ির ওপর নির্ভর করতে ভালবাসে। ঋতম জানে।

অতসী বসে আছে শুকনো মুখে। ঋতম গড়িয়ে এসে মার গালখানা আলতো করে নেড়ে দিল। নরম হেসে বলল, —অত ভাবছ কেন? শ্রাবণীর সঙ্গে ব্যাপারটা আমায় বুঝে নিতে দাও। আই শ্যাল ফেস দা মিউজিক। তুমি শুধু একটু…

—কী? অতসী নাক টানল।

—তুমি শুধু শ্রাবণীর সঙ্গে তবলাটা বাজিয়ো না।…যাও, আমায় একটু ফুয়েল সাপ্লাই করো তো।

—চা?

—প্লিজ। এক কাপ। কড়া করে।

ভারী মর্মাহত এক দৃষ্টিতে ঋতমকে বিদ্ধ করে অতসী উঠে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়েছে ঋতমও। সিগারেট দেশলাই হাতে পায়ে পায়ে জানলার ধারে। ঠাকুরদার আমলে তৈরি বলে এ বাড়ির ঘরগুলো বেশ বড় বড়। জানলা দরজার আকৃতিও নেহাত ছোট নয়। জানলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেলে নিশ্চয়ই টুসকির ফুসফুসের ক্ষতি হবে না! শ্রাবণী বাড়ি থাকলে অবশ্য এও বারণ। এ ঘরে ধূমপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আধপোড়া সিগারেটখানা ফের ধরিয়ে দেশলাইকাঠি জানলার বাইরে ছুড়ে দিল ঋতম। পিছনের বাগানটায়। নামেই বাগান, আদতে ঝোপঝাড় আর আগাছা। চার শরিকের বাড়িতে ওপরতলাটা ঋতমের কাকা, জেঠার, ঋতমদের একতলা। একতলার একটা ভাগ দুই পিসির, তাদের অংশটা বন্ধই থাকে বারো মাস। পিসিরা অবশ্য সেভাবে দাবি করেনি! কাকুর মৃদু আপত্তি সত্ত্বেও বাবা জেঠুই জোর করে ওইটুকু অংশ দিয়ে রেখেছে বোনদের। বাগানখানা এজমালি, সুতরাং কারওরই তেমন রক্ষণাবেক্ষণের দায় নেই। তবু দক্ষিণ কলকাতার এমন ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চলে একটুখানি সবুজ আছে, এই তো অনেক। যদিও সন্ধের আগে এদিকের জানলাটা বন্ধ করে দিতে হয়, নাহলে ঝোপ আগাছা থেকে মশকবাহিনী জোর আক্রমণ চালায়।

বাগানে একটা পাখি ডাকছে। বিচিত্র আওয়াজ। পিক পিক পিইইক। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঋতম ঝোপঝাড়ে পাখিটাকে খুঁজল। দেখা যাচ্ছে না। বাড়ি ফেরার পথে ভাল একটা গল্পের প্লট ঘুরছিল মাথায়। কী যেন? কী যেন? ওই পাখিটার মতোই লুকোচুরি খেলছে মস্তিষ্কের অরণ্যে, এক্ষুনি আর খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

সিগারেট শেষ করতে না করতেই চা এসে গেছে। চা শেষ হওয়ার আগেই শ্রাবণী। ঋতমকে বাড়িতে দেখে শ্রাবণী কণামাত্র বিস্ময় প্রকাশ করল না। আলনার পাশআংটায় ভ্যানিটিব্যাগখানা ঝোলাল, হাওয়াই চপ্পল গলাল পায়ে, ঝুঁকে ঘুমন্ত মেয়েকে দেখছে। বাইরে থেকে এসে রাস্তার হাতে টুসকিকে ছোঁয় না শ্রাবণী।

দরজায় অতসী। চোখ ঘুরছে। এ কোর্ট, ও কোর্ট। মিহি গলায় জিজ্ঞেস করল, —চা খাবে, শ্রাবণী?

—দিন।… টুসকি কতক্ষণ ধরে ঘুমোচ্ছে?

—এই তো, তিনটেরও পর। কোলে নিলে দিব্যি চোখ বুজছে, শোওয়ালেই কান্না।… এই এবার উঠল বলে।

—সেরেল্যাক পুরোটা খেয়েছে?

—মোটামুটি। দুটো নাগাদ ফলের রসও দিয়েছি। মুসম্বির রসটা খুব ভালবেসে খায়।

অতসী সরে গেল। শ্রাবণী শাড়ি বদলাচ্ছে। ঋতম আড়ে আড়ে তাকাল। বাচ্চা হওয়ার পরও শ্রাবণী এতটুকু মেদ জমতে দেয়নি শরীরে, আবার ফিরে এসেছে তার ছিপছিপে চেহারা। ফর্সা রং রোদে পুড়ে ঈষৎ তামাটে লাগছে এখন। চোখ মুখ নাক কিছুই তেমন ধারালো নয় শ্রাবণীর, তবে টানটান ফিগারের জন্য সে রীতিমতো আকর্ষণীয়।

ঋতম গলা ঝাড়ল,—কী, মুখ এত হাঁড়ি কেন?

উত্তর নেই।

—প্রিন্সিপালের কাছে ঝাড় খেয়েছ বুঝি?

জবাব নেই।

—মৌনী নিলে নাকি?

এবারও মুখে রা নেই। শাড়ি পাট করে আলনায় রাখছে।

ঋতম হাসিটাকে একটু চওড়া করল,—তোমার জন্য একটা নিউজ আছে।

—জানি৷ শ্রাবণীর বাক্যি ফুটল।

—জানতেই পারো না।

—বললাম তো জানি। শ্রাবণীর স্বর নিরুত্তাপ, —চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছ।

—আইব্বাস, কী করে জানলে? গন্ধ শুঁকে?

—দিদি কলেজে ফোন করেছিল।

—দিদি? ঋতম চমকিত, —দিদি কী করে খবর পেল?

—অম্বরদার কাছ থেকে।

—অম্বরদা?

—বলতে পারব না। বোধহয় তোমার বস দেবাশিসবাবু…

একেই বলে তথ্যপ্রযুক্তির যুগ! কী নেটওয়ার্ক! স্যাট স্যাট ফোনাফুনি হয়ে গেল, বিদ্যুতের গতিতে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল বারতা! মাকে আগে না বলে দিদি শ্রাবণীর কলেজে ফোন করল যে বড়? দিদিটা মহা চুকলিবাজ হয়েছে, নির্ঘাৎ উসকেছে শ্রাবণীকে।

ঋতম মুখের হাসিটাকে ধরে রাখল, —অ। এই জন্য তেতে আছ?

—আমার ভারী দায় পড়েছে। তুমি তোমার মর্জিমতো চলবে, আমি কেন তাততে যাব?

—যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। এবার লেখার জন্য পুরো টাইম ডিভোট করতে পারব।

—হুম্‌।

—বার বার এই চাকরি চাকরি খেলা আমার আর ভাল্লাগছে না।

—হুম্‌।

—বিয়ের আগে তোমার সঙ্গে তো আমার এগ্রিমেন্ট হয়ে গিয়েছিল, বলো? আমি সাহিত্য করব, তুমি সংসার চালাবে…

—হুম্।

হুম হুম করতে করতেই শ্রাবণী ঘরের বাইরে। ঋতম চোখ ছোট করে দেখল। আজ শ্রাবণী জোর চটিতং। নাহ্‌, রাগ ভাঙাতে হবে, রাগ ভাঙাতে হবে।

বাগানে আবার ডাকছে পাখিটা। পিক পিক পিইক। ঋতম ঝটিতি আবার জানলায় এল। উঁহু, দেখা যাচ্ছে না। ঋতমের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে নাকি? আরও একটুক্ষণ সন্ধান চালিয়ে হাল ছেড়ে দিল ঋতম। শার্ট প্যান্ট বদলে সোজা চলে এসেছে নিজের গলতায়।

খুদে ঘরখানা এককালে যৌথ পরিবারের ভাঁড়ারঘর ছিল, এখন চেয়ার টেবিল র‍্যাক শোভিত হয়ে ঋতমের সাহিত্যচর্চার স্থান। শ্রাবণীর কলেজের বইপত্রও থাকে এখানে, অবরে সবরে সে-ও ব্যবহার করে জায়গাটা।

টেবিলটা এলোমেলো। বই পত্রিকা আর কাগজের ডাঁই। ঘেঁটেঘুটে ক্লিপে আঁটা কয়েকটা লেখা পাতা বার করল ঋতম। একটা গল্প অর্ধসমাপ্ত হয়ে পড়ে আছে, আলগা চোখ বোলাল পাতাগুলোয়। হয়নি, হয়নি, কাঠামোটা কাঁচা লাগছে। বড্ড বেশি স্কিমেটিক যেন। আর একবার প্রথম থেকে লিখলে হয়। কিন্তু খোলনলচে আমূল বদলালে দাঁড়াবে তো? ফাটা শ্বেতপাথরের টেবিলের সঙ্গে ভারতবর্ষের বর্তমান যে চেহারাটা আনার চেষ্টা করছে সেটা আরোপিত মনে হবে কি? অ্যালিগরিটা বোঝা যাবে তো? রবিবার বেলঘরিয়ার অণিমা স্মৃতি পাঠাগারে গল্পপাঠের আসর, উদ্যোক্তারা চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ঋতমকে। শুভঙ্কর, দিলীপ আর তমোনাশও গল্প পড়বে, অসিত সান্যাল সভাপতিত্ব করবেন। অসিতদা ব্যস্ত লেখক, আজকাল সহজে গল্পপাঠের আসরে তাঁকে পাওয়া যায় না, অসিতদার সামনে গল্পটা পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। যাক গে, তাড়াহুড়োর দরকার নেই। লেখা নিজের পছন্দমতো না হলে কোথাও পাঠাতেও মন চায় না ঋতমের, পড়তেও ভাল লাগে না।

ফোন বাজছে বাইরের ঘরে। ঋতম পলকের জন্য অন্যমনস্ক। দিদি? ফের না ফ্যাচফ্যাচ শুরু হয়। ধুস, পাত্তা না দিলেই হল।

আবার গল্পে চোখ রাখল ঋতম। ডুবছে লেখায়, ঠোঁটি সরু করে পেন চুষছে। অস্থির হাতে খচখচ কলম চালাল, ছেঁটে দিল পুরো একটা প্যারাগ্রাফ। শব্দ বদলাল কয়েকটা। শব্দ ব্যবহার নিয়ে সে বেজায় খুঁতখুঁতে। নাহ্‌, তবু হচ্ছে না কিছু, পুরোটাই ভাঙতে হবে। সিগারেটের জন্য টেবিল হাতড়াল। নেই। পাঞ্জাবির পকেট। নেই। ছটফট করে উঠল ঋতম, সিগারেট কাছে না থাকলে তেষ্টা আরও বেড়ে যায়।

উঠে ওঘর থেকে প্যাকেটটা আনতে যাচ্ছিল, দরজায় শ্রাবণী। নিরুত্তাপ স্বরে বলল, —তোমার ফোন।

—কে?

—তোমার প্রাণের বন্ধু।

—সে আবার কে?

—একজনই তো আছে। দেয়া।

ঋতম হেসে ফেলল, —আমার পরানসখী তো তুমি প্রিয়া।

শ্রাবণী এখনও সমে ফেরেনি। গলল না, কেটে কেটে বলল, —দেয়া তোমার অফিসের ফোননাম্বার চাইছিল। ওর ধারণা এখনও তুমি অফিসে আছ!

ঋতম কাঁধ ঝাঁকাল। নতুন করে রসিকতা করতে গিয়েও সামলে নিয়েছে। গিয়ে ফোনটা ধরল, —কী মহারানি, তলব কেন?

—তোকে বাড়িতে পাব ভাবতেই পরিনি। অফিস কেটেছিস? নাকি আজ পুরো দিনটাই বাংক?

সুসমাচারটা শ্রাবণী শোনায়নি? আশ্চর্য! তাহলে বোধহয় ঋতমেরও না বলাই ভাল। অন্তত আজ। এই মুহূর্তে।

ঋতম ফাজলামির সুরে বলল, —কাজের লোেককে বেশিক্ষণ অফিসে থাকতে হয় না। তোদের আট ঘণ্টা মানে আমার এক ঘণ্টা।

—হাহ্, সে তো বটেই।…যাক শোন, কাজের কথা আছে। যে জন্য তোকে ফোন করা। দেয়ার গলা উত্তেজিত শোনাল,—এইমাত্র আমার এডিটারের সঙ্গে কথা হল। রণেনদা রাজি। বললেন, আগে একটা ইন্টারভিউ করে এসো।

—ইন্টারভিউ? কাকে?

—সে কী, পরশুদিন তোর সঙ্গে কথা হল না? তোর পিসির বাড়ির সেই মেয়েটা… মুম্বই-এর রেডলাইট এরিয়ায়…। মেয়েটাকে আমি মিট করতে চাই।

ঋতম হোঁচট খেয়ে গেল। গল্পচ্ছলে কী না কী বলেছে তাই নিয়ে সত্যি সত্যি সিরিয়াস হয়ে গেল দেয়া? কী বখেড়া রে বাবা! কেন যে ঋতমের মেপেজুপে কথা বলার অভ্যেস হল না!

আমতা আমতা করে ঋতম বলল, —যাহ, ওটা কি নিউজ করার মতন সাবজেক্ট?

—বা রে, তুইই তো সেদিন বললি…! রণেনাও শুনে খুব মুভড়। সুন্দর একটা লাইনও ধরিয়ে দিয়েছেন। কলকাতা শহরে প্রতি বছর কত অজস্র মেয়ে হারিয়ে যায় তাদের একটা মোটামুটি স্ট্যাটিস্টিকস যদি বানানো যায়, সঙ্গে মেয়েগুলোর সোশিও ইকনমিক অবস্থান… কতজন ফিরে এসেছে, কতজন নো ট্রেস, তার একটা অ্যাকাউন্ট… এবং তার মধ্যেই মেয়েটার স্টোরি…। একটা গল্প থাকলে ফিচারটা নীরস হবে না।

—কিন্তু..। ঋতম ঢোঁক গিলল, —অ্যাই দেয়া শোন, ওই মেয়েটাকে নিয়ে আর নাড়াঘাঁটা করা কি ঠিক হবে?

—কেন হবে না? এটা মোটেই আইসোলেটেড কেস নয়। মনে আছে, পুজোর পর আমাদের কাগজে বড় করে নিউজ ছিল মহারাষ্ট্রের জলগাঁও থেকে তিনটে বাঙালি মেয়ে উদ্ধার? তাদেরও তো ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে গিয়ে ব্লুফিলম টুফিলমের ব্যবসায় নামিয়েছিল।…কলকাতায় এখন একটা বড় মেয়ে চালানের র‍্যাকেট কাজ করছে, মেয়েটার কেসটা তুলে ধরতে পারলে ব্যাপারটা পোক্ত হবে।

—তবু…

—এত কিন্তু তবু করছিস কেন? দেয়া ঝরঝর হাসল, —ভাবছিস মেয়ে চালানের র‍্যাকেট তোকে…

—নারে, আমি তোর কথা ভেবেই…। ঋতম ঝটপট যুক্তি বানাল, —মানে ব্যাপারটার তো সেরকম কোনও প্রমাণ নেই, পুলিশকেও আর পরে তেমন কিছু বলা হয়নি…। এখন মেয়েটা যে সত্যি বলেছে তার প্রমাণ কী?

—সে আমি কথা বলে বুঝে নেব। মেয়েদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সোজা নয়। তা ছাড়া কোনও মেয়ে কি মিথ্যে করে বলতে পারে সে রেডলাইট এরিয়ায় কাটিয়ে এসেছে?

—তা বটে। ঋতম সামান্য সময় নিয়ে বলল, —তবু কী দরকার রে দেয়া? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। বাচ্চা মেয়ে, আমি মেয়েটাকে দেখেছি, বড় জোর পনেরো ষোলো বছর বয়স…এই বয়সে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে…

—তোদের এই মিনমিনে অ্যাটিচিউডটাই খারাপ। এই জন্যই ভিসাস সার্কলগুলো পেয়ে বসে। কেউ এগিয়ে না এলে এদের আনআর্থড় করা যাবে কী করে? পুলিশকেও তো একটু ঝাঁকানো দরকার। আমরা সংবাদপত্রের লোকেরা সোশাল রেসপনসিবিলিটি পালন করব না?

—কিন্তু খবরটা বেশি চাউর হয়ে গেলে মেয়েটা হয়তো অসুবিধেয় পড়তে পারে।

—সে আমি কায়দা করে লিখব। থোড়াই মেয়েটার নাম ঠিকানা থাকবে। তার পরেও কিছু ঘটলে তো আমরা আছি। বলতে বলতে দেয়ার উত্তেজিত স্বর সহসা খাদে নেমে গেছে, —অ্যাই ঋতম, প্লিজ পালটি খাস না। আমি নিজে থেকে রণেনদাকে বললাম, রণেনদা উৎসাহ দেখালেন, এখন কোন মুখে রণেনদাকে বলব মেয়েটাকে পাওয়া যাবে না? বুঝছিস তো, এটা এখন ম্যাটার অফ প্রেসটিজ। এরপর আমি আর কোনও দিন কোনও অ্যাসাইনমেন্ট চাইতে পারব? তুই আমায় নাচিয়ে মই কেড়ে নিবি?

ঋতম হতাশ শ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল, তুই এভাবে বললে আমি কী করে না বলি দেয়া?

মুখে বলল, —মেয়েটার সঙ্গে কবে দেখা করতে চাস?

—তুইই বল্‌। কাল পরশু তরশু…। ও, তোকে তো বলাই হয়নি, আমার এখন ইভনিং শিফ্‌ট। বেলা দুটো অব্দি ফ্রি। তুই এর মধ্যে একটা দিন অফিস ম্যানেজ করতে পারবি?

ঋতমের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। স্বর স্বাভাবিক রেখে বলল, —কাল দশটায় চলে আয়। আমি বাড়িতেই থাকব।

টেলিফোন নামিয়ে রেখে ঈষৎ চিন্তিত মুখে ফিরল ঋতম।

চেয়ারে বসতে না বসতেই শ্রাবণী, —মুখটা অমন ভার হয়ে গেল কেন? কী বলল বান্ধবী?

ঋতম দুদিকে মাথা নাড়ল।

শ্রাবণীর দৃষ্টি তির্যক,—আমাকে বলা যায় না?

চোরা অস্বস্তির মধ্যেও শ্রাবণীর মুখটা দেখে হাসি পেয়ে গেল ঋতমের। ক্ষোভ রাগ উবে গেছে, শ্রাবণীর চোখে এখন চাপা অসূয়া। এম এ পড়ার সময়ে সহপাঠিনী দেয়ার প্রতি এক ধরনের মুগ্ধতা ছিল ঋতমের। মুগ্ধতা নয়, দুর্বলতা। সত্যি বলতে কি, দেয়ার প্রেমেই পড়ে গিয়েছিল ঋতম। তবে সবটাই ছিল একতরফা। দেয়া জানেও না, ঋতম কোনওদিন মুখ ফুটে কিছু বলেওনি। বলার প্রশ্নই নেই। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পা রাখার আগে থেকেই সৌম্যর সঙ্গে দেয়ার গভীর প্রেম। শ্রাবণী সবটাই জানে, ঋতমের মুখ থেকেই শুনেছে। বিয়ের আগে একদিন মজা করেই শ্রাবণীকে বলেছিল ঋতম। তারপর তারা একসঙ্গে সংসার শুরু করেছে, টুসকি এসে গেছে, তবু এখনও শ্রাবণী ঠিক মনে রেখে দিয়েছে কথাটা। এখনও দেয়ার সঙ্গে ঋতমের সামান্যতম যোগাযোগ হলেও শ্রাবণীর মুখে ছায়া ঘনায়।

পাগলি। কেন যে শ্রাবণী এখনও এত ভালবাসে ঋতমকে?

ঋতম বউকে কাছে টানল। দেয়ার টেলিফোন করার কারণটা বলল সংক্ষেপে। জিজ্ঞেস করল, —তোমার কী মনে হয় বলো তো? কাজটা কি উচিত হবে? দেয়া তো একেবারে নাছোড়বান্দার মতো ধরেছে।

—তুমি বোঝো। তোমার দেয়া তোমায় ধরেছে⋯

—ইস্‌, দেয়া কেন আমার হতে যাবে? আমার তো শ্রাবণী। ঋতম আলগা বেড় দিল শ্রাবণীর কোমরে। শ্রাবণীর মসৃণ নাভিদেশে মুখ রেখে বিনবিন করে উঠল,—শ্রাবণী টুনটুনি ঝুনঝুনি সোনামণি⋯

—এই ছাড়ো। কাতুকুতু লাগছে।

—ছাড়ব না। আগে আদর করো।

—কী হচ্ছে কী? টুসকি উঠে পড়েছে, দুধ খাওয়াতে হবে। শ্রাবণী ঋতমের চুল ঘেঁটে দিল,—ছাড়ো, প্লিজ।

—উম্‌ম্‌ উমম্‌…

—এক্ষুনি মা এসে ডাকবে।

—আসুক।

—টুসকি কাঁদবে।

—কাঁদুক। টুসকিকে মা দেখবে।

বাগানে আবার পাখিটা ডাকছে। পিক পিক পিইইক। বিকেলটা মায়াবি হয়ে যাচ্ছিল ঋতমের। একটা গন্ধ পাচ্ছিল সে। বুনো। শ্রাবণীর শরীর থেকে।

তিন

বড় একটা মাটির উঠোন ঘিরে খুপরি খুপরি ঘর। পাকা বাড়ি, তবে টালির চাল। উঠোনে আধন্যাংটো বাচ্চাদের ক্যালরব্যালর, কর্পোরেশানের টাইম কলে বালতি, ঘড়া, কলসির লাইন, আঁশটে একটা গন্ধ। ঠিক বস্তি নয়, আধা বস্তি। ছত্রিশ ঘর এক উঠোনও বলা যায়। দেয়া লক্ষ করল বেশ কয়েকটা ঘরের মাথায় টিভির অ্যান্টেনা আছে, কেব্‌লের তারও ঢুকেছে এক আধ জায়গায়। মলিন ছেঁড়াখোঁড়া হলেও অনেক ঘরে পর্দা ঝুলছে।

ঋতম একটা ভেজানো দরজার সামনে এসে ডাকল,—শিউলি?

সাড়াশব্দ নেই।

ঋতম গলা খাঁকারি দিল,—শিউলি⋯ আছিস নাকি?

আশপাশের ঘর থেকে দু-চারটে মুখ উঁকিঝুঁকি মারছে। মহিলার। এক চেক লুঙ্গি খালি-গা বগল চুলকোতে চুলকোতে পিছনে এসে দাঁড়াল। ভুরুতে ঈষৎ ভাঁজ ফেলে পর্যবেক্ষণ করছে দেয়া ঋতমকে।

দেয়া ফিসফিস করল, —কেউ নেই নাকি রে?

চেক লুঙ্গি শুনে ফেলেছে। নির্বিকার গলায় বলল,—জোরে ডাকুন। আছে ভেতরে।

ঋতমকে অবশ্য আর ডাকতে হল না। ভেজানো দরজা ফাঁক হয়েছে,—কে?

—আমি কাননদি। কী করছ?

এবার দর্শন মিলল। পরনে সস্তা দামের সবুজ তাঁতের শাড়ি, রোগাসোগা চেহারা, মাজা রং, অল্প বয়সে বুড়িয়ে-যাওয়া-মুখ কাননের চোখে বিস্ময়,—ওমা, বাবুয়াদা তুমি! হঠাৎ এখানে যে? এখন?

—দরকার আছে একটু। তুমি আজ কাজে বেরোওনি?

—কেন, তোমার পিসির বাড়ি তো সেরে এসেছি।⋯ শরীরটা চলছে না, তাই একটু শুয়ে ছিলাম। কানন একবার আড়চোখে দেখে নিল দেয়াকে, তারপর দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়েছে,—এসো, ভেতরে এসো।

ঋতমের পিছু পিছু কুঠুরিটায় ঢুকল দেয়া। কুঠুরিই। দেয়ার রান্নাঘরের চেয়ে একটু বুঝি বড় হবে। ঘরে আসবাব বলতে একটা পাতলা তোষক পাতা তক্তপোশ, যেমন তেমন কাপড় ঝোলানো আমকাঠের আলনা, কালচে হয়ে আসা দুখানা ট্রাংক। ওরই মধ্যে এক পাশে রান্না খাওয়ার সরঞ্জাম। হাঁড়ি, কড়া, খুন্তি, থালা, গেলাস, কেরোসিন স্টোভ। ঠাকুরের আসনও আছে এক ধারে। রংজ্বলা দেওয়ালে মা কালীর ছবিওলা ক্যালেন্ডার আর ফ্রেমে বাঁধানো রঙিন সুতোর কাজে আশিস বচন। সুখে থাকো।

তক্তপোশে একরাশ নতুন ব্লাউজ ছড়ানো, সঙ্গে কাঁচি সুতো, কৌটোয় একগাদা হুক। আর চোখের তলায় গাঢ় কালি, ভিতু ভিতু মুখ, ছিটের নাইটি পরা শিউলি।

মেয়েটা ব্লাউজে হুক বসাচ্ছিল। ধড়মড় করে নেমে দাঁড়িয়েছে।

ঋতম হাসল,—উঠলি কেন? বোস। কী করছিলি? সেলাই ফোঁড়াই?

মেয়ের হয়ে কানন উত্তর দিল,—আমিই করতাম। ওকে এখন ধরিয়ে দিয়েছি। হেম করি, হুক বসাই…

—বাহ্। বাহ্। পার ব্লাউজ কত পাও?

—এক টাকা⋯ এক টাকা পঁচিশ⋯জর্জেট হলে দেড় টাকা।

—কোথ্‌থেকে আনো কাজ?

—শেয়ালদায় একটা দোকান আছে।

—বেলেঘাটা থেকে শেয়ালদায় গিয়ে নিয়ে আসো?

কানন সোজাসুজি জবাব না দিয়ে শুকনো হাসল,—পেটের দায় দাদা। তোমার পিসির বাড়ি দুবেলা রান্না করি, আরেক বাড়ি এক বেলা সাড়ে নশো মতন হয়। এ ঘর ভাড়াই তো আমার একশো আশি।

হুম্‌, প্রবলেম। ঋতম মাথা দোলাল,—কেরোসিন তেলই তো আঠেরো টাকা লিটার।

ঋতম কি সর্বত্রই ভাট বকবে? পৌনে বারোটা বাজে, দেয়াকে এখান থেকে অফিস যেতে হবে⋯! দেয়া অধৈর্য হচ্ছিল। চাপা গলায় বলল,—কাম টু দা পয়েন্ট ঋতম। আই অ্যাম গেটিং লেট।

—ও হ্যাঁ। ঋতম দন্ত বিকশিত করল, —আমার বন্ধুর সঙ্গে এতক্ষণ আলাপই করিয়ে দিইনি। এর নাম দেয়া। খুব ভাল মেয়ে। শিউলির সঙ্গে একটু আলাপ করতে চায়।

সঙ্গে সঙ্গে পক্ষীমাতার মতো সচকিত হয়েছে কানন। সতর্ক গলায় বলল, —শিউলির সঙ্গে? কেন?

—এমনিই। দেয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠল,—ঋতম⋯ মানে বাবুয়ার কাছে তোমার⋯ আপনাদের কথা অনেক শুনেছি তো।

—হ্যাঁ কাননদি, দেয়া খবরের কাগজে চাকরি করে। এদের অনেক ক্ষমতা। ওরা বললে পুলিশ ওই লোকটাকে⋯কী যেন নাম⋯হ্যাঁ, শ্যাম⋯শ্যামবাবাজিকে পাতাল থেকে খুঁজে বার করবে।

কাননের মুখটা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেল। স্বর নিস্তেজ হয়ে গেছে,—ওসব করে আর কী হবে বাবুয়াদা? আমার মেয়ের যা সর্বনাশ হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।

—তা বলে লোকটাকে আপনি ছেড়ে দেবেন? শাস্তি দেবেন না?

—কী লাভ দিদি? ওই শয়তান জেলের ঘানি টানলেও আমার মেয়ে তো আর আগের দশায় ফিরবে না।

—কে বলেছে ফিরবে না? আজকাল কত ধরনের রিহ্যাবিলিটেশান⋯মানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে⋯হোম আছে⋯। সেখানে হাতের কাজ শিখতে পারবে, তোমার মেয়েকে তারা নিজের পায়ে দাড় করিয়ে দেবে, লেখাপড়াও চাইলে করতে পারে। কত মেয়ের জীবন আবার নতুন করে ফিরে যাচ্ছে…

কানন অবিশ্বাসী চোখে তাকাল, —আমার মেয়েকে তারা নেবে?

—কেন নেবে না? আমরা তো আছি, আমরা ব্যবস্থা করব।

শিউলি এখনও জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে। কানন একবার মেয়েকে দেখল, একবার দেয়াকে। তারপর বলল,—তোমরা দাঁড়িয়ে কেন দিদি? বোসো।

ঋতম বলল, —দেয়া তুই বোস। যা কথা সারার সেরে নে। আমি মোড়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।⋯তোর কতক্ষণ লাগবে?

—বেশি নয়, বিশ পঁচিশ মিনিট।

তোষকের ওপর বিছোনো জীর্ণ চাদরখানা টান টান করে দিচ্ছে কানন। ব্লাউজ কাঁচি সুতো সরিয়ে দিল এক পাশে। ঋতম চলে যাওয়ার পর বসেছে দেয়া। বসতে পেরে স্বস্তিও হল একটু। তবে গরম লাগছে খুব। এই প্রচণ্ড উত্তাপে পাখা টাখা ছাড়া গরিব মানুষগুলো থাকে কী করে?

দেয়ার মনের কথা বুঝি পড়তে পেরেছে কানন। শিউলিকে বলল,—হাতপাখাটা দিয়ে দিদিকে একটু বাতাস কর না।

—না না, কিচ্ছু লাগবে না। দেয়া হাত ধরে টানল শিউলিকে,—এসো তো, তুমি আমার কাছে বোসো।

শিউলি যেন এতক্ষণে একটু সহজ হয়েছে। মাথা নিচু করে বসল পাশে। মেয়েটা সত্যি একেবারে বাচ্চা। মুখটা একদম কচি, শরীরে এখনও পুরোপুরি যৌবন আসেনি। এইটুকুনি মেয়েকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে যারা পাপ ব্যবসায় নামায়, তারা কী স্তরের হৃদয়হীন?

কানন মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসল। খুপরি ঘরের পিছনে ছোট্ট জানলা, ওপারে প্রখর রোদ্দুর দোর্দণ্ডপ্রতাপে বিরাজমান। তবে ঘরে তার তাপটাই ঢুকছে, আলো নয়। নির্জীব আলোয় কাননকে যেন আরও বেশি দুঃখী দুঃখী দেখাচ্ছিল। কানন কি রক্তাল্পতায় ভোগে? এত ফ্যাকাসে কেন রংখানা?

মা-মেয়েকে আর একটু সাহস দেওয়ার জন্য দেয়া হঠাৎ কেতাবি সংলাপ আওড়াল, —শোনো, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আর একদম ভাববে না। দেহ অশুচি হওয়া অত সহজ নয়। মন অশুচি না হলে দেহ অপবিত্র হয় না।

কানন কী বুঝল কে জানে, আঁচলের খুঁটে চোখ মুছল। বলল, —তোমরা কত লেখাপড়া শিখেছ দিদি, কত বড় ঘরের মেয়ে⋯| আমরাও অবিশ্যি জাতে বামুন। দেশ ফুলিয়ায়। আমার বাপ ছিল পুরুত। গরিব, বড় গরিব। আমাদের বেশি দূর লেখাপড়া শেখাতে পারেনি। তাও দুই দিদি এইট অব্দি পড়েছিল, আমি সিক্স। ছেলের আশা করতে করতে সাত সাতটা মেয়ে⋯ আমি ছিলাম ছ নম্বর। তা আমাদের বিয়ে দিতে দিতেই বাপ⋯। আমার শ্বশুরবাড়ি চক্রবর্তী⋯

ঋতম ভুল বলেনি। কানন যে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, তার বাচনভঙ্গিতেই বুঝতে পারছিল দেয়া। কাননের কাহিনী বোর করছে, তবু শুনে রাখা ভাল। স্টোরিতে কালার আনবে।

কানন এক সুরে বলেই চলেছে, —শিউলির বাপ ইস্কুল পাশ। ওই অবিনাশ মিত্তির রোডের কারখানা থেকে ধূপকাঠি নিয়ে বেচত ট্রেনে ট্রেনে। হকার। ওই মেয়ের যখন ছবছর, দুর্গানগরে কাটা পড়ল। রেলকোম্পানি এক পয়সা ক্ষতিপূরণ দেয়নি। দেওর ভাসুরও ঠাঁই দিল না। তখন থেকে একাই মুখের রক্ত তুলে ওই মেয়েকে মানুষ করেছি। সাধ ছিল মেয়েটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে দাঁড় করাব ⋯। কানন হঠাৎ ডুকরে উঠল, —কী করে জানব দিদি, বাপখাকি মেয়ে ইস্কুলের নাম করে বেরোচ্ছে, পড়াশুনোর নামে অষ্টরম্ভা, আজেবাজে লোকের সঙ্গে পিরিত করে বেড়াচ্ছে! ঢং করে আবার কালীঘাটে মালাবদল করা হয়েছিল! মুখে নুড়ো জ্বেলে দিতে হয়। আমারও তো কাঁচা বয়স ছিল, আমিও তো কুপথে যেতে পারতাম। গিয়েছি? ওই হারামজাদি মেয়ে বংশের গায়ে গু লেপে দিল!

শিউলির ঘাড় আরও গোঁজ। দেয়া শিউলির পিঠে হাত রাখল,—আহা, অমন করে বলছ কেন? ও কি জানত লোকটার পেটে পেটে খারাপ প্ল্যান ছিল? কী শিউলি, বলো?

শিউলি চোখ তুলেছে। কৃতজ্ঞ দৃষ্টি। ঘাড় নাড়ল ঢক করে।

—তুমি আমায় প্রথম থেকে বলো তো ঠিক কী কী হয়েছিল? দেয়া ভ্যানিটিব্যাগ থেকে ছোট্ট টেপরেকর্ডারখানা বার করল।

মুহূর্তে মুখভাব বদলে গেছে কাননের,—ওটা কেন দিদি?

—বা রে, লোককে জানাতে হবে না শিউলির ওপর কী হরিবল অত্যাচারটা হয়েছে। নিজের মুখেই শিউলি বলুক⋯

—আশপাশের পাঁচজন কিন্তু অন্য কথা জানে দিদি। বলেছি, লোকটা ওকে বিয়ে করবে বলে নিয়ে গিয়েছিল, ফেলে পালিয়ে গেছে। বাবুয়াদা আমার জন্য অনেক করেছে, তাই ওরাই শুধু⋯

—অযথা ভয় পাচ্ছ কেন? কাগজে তো তোমার মেয়ের নামও বেরোবে না, তোমার নামও না। আমি কি তোমাদের খারাপ চাইতে পারি?

—তবু দিদি⋯ এখন তাও একরকম বদনাম, তখন তো⋯

—বললাম তো কিচ্ছু হবে না। আমি আছি। দেয়া শিউলির দিকে ফিরল, —কী শিউলি, খুলে বলবে তো সব? কী ভাবে কী হল, কী বলে লোকটা তোমায় ওখানে নিয়ে গিয়ে তুলেছিল⋯!

কাননের মুখে এখনও প্রবল দ্বিধা। তবে শিউলি ভরসা পেয়েছে। স্পষ্ট স্বরে বলল, —হ্যাঁ, বলব।

ইভনিং শিফটের দ্বিতীয় দিনেই বাড়ি ফিরতে রাত এগারোটা। বেশ কয়েকটা জরুরি খবর এসে গেল সন্ধের মুখে মুখে। কাশ্মীরে জঙ্গিহানায় বাইশজনের মৃত্যু হয়েছে, উড়ে গেছে বেতারকেন্দ্র। মুম্বইতে সাত সাতজন নামী চিত্রপ্রযোজকের বাড়ি একসঙ্গে হানা দিয়েছে আয়কর দফতর। বিকেলবেলা আগ্রার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন প্রখ্যাত সরোদিয়া রহিম খান। লে-আউট বদলাতে হল, ঢেলে সাজানো হচ্ছে দু-দুটো পাতা। নাইটে আজ দুজন অ্যাবসেন্ট, চোখে সর্ষেফুল দেখতে দেখতে দেয়াদেরই সাড়ে দশটা অবধি তুলতে হল কাজগুলো। লোক কম থাকলেই বুঝি খবরের প্লাবন আসে।

অফিসের গাড়ি নামিয়ে দিয়ে গেছে। দেয়া এখনও তেমন ক্লান্ত নয়, কাজের উত্তেজনা তাকে এখনও বেশ চনমনে করে রেখেছে। নীচ থেকেই দেখল অন্ধকার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ্মী।

দরজা খুলেই লক্ষ্মীর গলায় শাসন, —রাত কটা বাজে খেয়াল আছে?

দেয়া কাঁধ ঝাঁকাল, —এই তো শুরু, এরপর আরও রাত হতে পারে। …দাদা খেয়েছে?

—দাদা কি তোমার মতো? ঠিক টাইম ধরে খেয়ে নেয়।

শোওয়ার ঘরে যেতে যেতে ঠোঁট টিপে হাসল দেয়া। ঘড়ি ধরে সাড়ে নটায় নৈশাহারে বসা সৌম্যদের বাড়ির রেওয়াজ। বিয়ের পরও মায়ের গড়ে দেওয়া অভ্যেসটা ছাড়তে পারেনি সৌম্য। বাড়ি ফিরেই সে পোশাকটি বদলে ডাইনিং টেবিলে বসে যায়। প্রথম প্রথম দেয়ার বেশ অসুবিধে হত, তাদের বাড়ির খাওয়া দাওয়া চোকে বেশ রাত করে। এখন সে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছে, দুজনেই বাড়ি থাকলে নিয়মটার ব্যত্যয় ঘটে না। মেয়েদের এই বদলটাই কি বিয়ে?

বিকেলের দিকে বৃষ্টি হয়েছিল আজ। কদিন টানা গরমের পর একটু যেন জুড়িয়েছে শহরটা। মরসুমের শেষ কালবৈশাখীটা বুঝি আজ হয়ে গেল। আকাশে তারা ফুটে গেছে, তবু ঝড়ের রেশ যেন রয়ে গেছে এখনও। তাপমাত্রা এখন অনেকটাই কম।

দেয়া স্নান করল না। অফিসে ঠাণ্ডা, বাইরে প্রচণ্ড তাপ, সব মিলিয়ে সর্দি সর্দি হয়েছে সামান্য। জামাকাপড় বদলে হাতে মুখে জল ছিটিয়ে নিল দেয়া। লক্ষ্মী টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে, আহারে বসার আগে উঁকি দিয়েছে পাশের ঘরে।

শয়নকক্ষটি দেয়া ফাঁকা ফাঁকা রেখেছে, কিন্তু এই ঘরখানা জিনিসপত্রে ঠাসা। দুখানা আলমারি, ইস্ত্রি করার টেবিল, ডিভান, খানতিনেক বেঁটে বেঁটে চেয়ার, বুককেস। এবং কম্পিউটার। ডিভানে কাচা জামাকাপড় ডাঁই হয়ে আছে, বুককেসের মাথায় বই ম্যাগাজিনের স্তূপ।

কম্পিউটারের সামনে সৌম্য। টের পেয়েছে দেয়ার উপস্থিতি। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,—এত দেরি হল যে?

—খুব রগড়েছে আজ। রহিম খান আজ জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

—কে রহিম খান?

—ওস্তাদ রহিম খান।

—কীসের ওস্তাদ?

—স্ট্রেঞ্জ! সরোদিয়া রহিম খানের নাম শোনো নি? ইন্দোর ঘরানার…

—ও আচ্ছা, পিড়িং পিড়িং!

—সন্ধের পর খবর এল রহিম খান মারা গেছেন। ব্যস্‌, হয়ে গেল। লাইন দিয়ে ফোনে ইন্টারভিউ করে যাও। একে পাই, তো তাকে পাইনা…। তাও চারজনকে ধরেছি। পণ্ডিত বিমলেন্দু আচার্য, ওস্তাদ নিসার আলি, বিষ্ণু বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিকিষাণ শাস্ত্রী…। বিষ্ণু বন্দ্যোপাধ্যায় তো আবার বলতে আরম্ভ করলে থামেন না। হাজারো জলসা, হাজারো গপ্পো। সেগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে কমপোজ করো, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীদের শোকবার্তার প্রেসি বানাও…। তীর্থঙ্করদা ক্লাসিকাল মিউজিকের পোকা, তিনি নিজে অবিচুয়ারিটা লিখলেন। অনেকটা। ষাট সি এম। তিন নম্বর পাতার নতুন করে মেকআপ হল। মেন নিউজটা ফাস্ট পেজে থাকবে। গোটাটা আমার করা। পোড়ো।

—মনে হচ্ছে খুব খুশি? তাহলে আর রগড়েছে বলছ কেন?

দেয়া ফিক করে হাসল।

—যাও, চটপট খেয়ে নাও। লক্ষ্মীদি ঢুলছে।

লক্ষ্মীর ভ্রূভঙ্গি উপেক্ষা করে দুটো রুটি গপগপ গিলে উঠে পড়ল দেয়া। ফের এসেছে সৌম্যর কাছে। সৌম্য এখনও কম্পিউটারে মগ্ন। চ্যাট মোডে কার সঙ্গে যেন যন্ত্রালাপ চালাচ্ছে। সৌম্য সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, পেশাগত কারণে কম্পিউটারেই বসে থাকে সারাদিন। অফিসে কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে থেকে মাথা ধরে যায় বলে বাড়িতে কম্পিউটারের সামনে বসে মাথা ছাড়ায়। বন্ধু হাতড়ায় যন্ত্রগণকে, অচেনা অজানা মানুষের সঙ্গেও দিব্যি যন্ত্রমিতালি পাতিয়ে নিতে পারে সৌম্য। এ যেন এক ধরনের খেলা সৌম্যর। দেয়াও খেলাটায় নামে ক্কচিৎ কখনও, তবে তার তেমন মনঃপূত নয়। ধূসর পর্দার বুকে ফুটে ওঠা অক্ষরে কি বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে?

দেয়া জিজ্ঞেস করল, —শুতে যাবে না?

সৌম্য ছোট্ট হাই তুলল, —উঠি এবার। …তুমিও তো খুব টায়ার্ড!

—উহুঁ। তুমি নড়লে আমি কম্পিউটারে বসব।

—এখন?

—ইয়েস স্যার। কাজ আছে।

—ই-মেল খুলবে?

—নো স্যার। অফিস জব।

—হেভি এনথু বেড়েছে তো! এখন আবার কাজে বসবে?

—কী কাজ গেস করো তো। দেয়ার মুখে রহস্যময় হাসি, —বলো। গেস গেস…। বলতে বলতে অপেক্ষা না করে নিজেই বলে ফেলল,—আজ ঋতমের সেই মেয়েটার ইন্টারভিউ নিয়ে এলাম।

—ও হ্যাঁ, তোমাদের তো আজ এক্সপিডিশান ছিল। হল কাজ?

—সহজে কি মুখ খুলতে চায়। বহুৎ পটিয়ে পাটিয়ে ম্যানেজ করতে হল। …দাঁড়াও, এক সেকেন্ড। ছুট্টে গিয়ে ব্যাগ থেকে টেপরেকর্ডারটা নিয়ে এল দেয়া, —শোনো কী প্যাথেটিক কেস!

—প্লিজ, আজ নয়। সৌম্য মনিটার অফ করে উঠে পড়েছে। রূপবান দীর্ঘ শরীরখানা ঝুঁকিয়ে দেয়ার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল, —ইটস টাইম টু বেড হানি।

—আহা, এতক্ষণ তো দিব্যি চ্যাট চালাচ্ছিলে। আমার কোনও কাজের কথা হলেই ওমনি…। দেয়া ঠোঁট ফোলাল, —বোসো না বাবা একটু। কাল তো রবিবার, অনেকক্ষণ পড়ে পড়ে ঘুমোবে।

—চলো, বিছানায় শুয়ে শুয়ে গপ্পো করছি।

—হুঁহ্‌, এক মিনিটে নাক ডাকবে…! অমন করছ কেন?… শোনোই না। লোকটা কী ডেঞ্জারাস তুমি ভাবতে পারবে না। পুরো প্ল্যান করে এগিয়েছে। মেয়েটার সঙ্গে আলাপ করেছে বেলেঘাটার এক সিনেমা হলে। কোল্ডড্রিঙ্কস খাইয়েছে, রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেছে…। বলেছে মুম্বইতে নাকি চাকরি করে, দু মাসের জন্য কলকাতা এসেছে, বাবা মা বিয়ের সম্বন্ধ করেছে কিন্তু সেই মেয়েকে নাকি তার পছন্দ নয়, শিউলি ছাড়া সে বাঁচবে না, শিউলিকে বিয়ে করে সে মুম্বইতে নিয়ে চলে যাবে। মাকে পর্যন্ত জানাতে বারণ করেছিল, পাছে মা খোঁজখবর করে। মেয়েটাও বোকার ডিম, গলে একেবারে পাঁক। শ্যামের বাঁশি শুনে…। লোকটার নামটাও খাপে খাপে ফিট করে যায়। শ্যাম। প্রেমে ধোঁকা দেওয়ায় একদম নাম্বার ওয়ান।…তারপর তো একদিন শুভলগ্নে সিঁদুর পরিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে ভাগল্‌বা। নিয়ে গিয়ে প্রথমে তুলেছিল ধারাভিতে। খুউব শ্যাবি জায়গা, সে নাকি এক এন্ডলেস বস্তি। সেখানে এক ফ্যামিলির সঙ্গে দিন সাতেক ছিল, মেয়েটাকে নিয়ে। সেই ফ্যামিলির চাচিই হল কিং পিন। শ্যাম একদিন চাকরিতে যাচ্ছি বলে বেরোল, তারপর তার আর নো ট্রেস। অবভিয়াসলি, যা হয়, মেয়েটা খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল, কান্নাকাটি করছিল খুব। ওই চাচিই তখন শ্যামের মাসির বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি বলে শিউলিকে নিয়ে স্ট্রেট ব্রথেলে। অ্যাকর্ডিং টু দ্যাট গার্ল, মেয়েটা প্রথমে ওই কাজে নামতে রাজি হয়নি। ওরা তখন নাকি লিটারালি চাবুক দিয়ে পিটিয়েছে। এখনও গায়ে দাগ আছে…আমায় দেখাল। তারপর সব থেকে র লোকগুলোকে ভিড়িয়ে দিতে লাগল ওর ঘরে। এক রাত্তিরে তিনজন চারজন পাঁচজন… মেয়েটার নড়ার ক্ষমতা থাকত না তবু… বলতে পারো কনটিনিউয়াস রেপ চলেছে। ওখানে হপ্তা দুয়েক মতো ছিল। ওখানকার একটা নেপালি মেয়ে ওকে হেলপ করে ওখান থেকে কেটে পড়তে। মায়া হয়েছিল বোধহয়। মনে হয় ভেবেছিল এভাবে চললে কবে একদিন মরে পড়ে থাকবে।… ইনফ্যাক্ট, ও যখন ছিল, সেই সময়েই নাকি ওখানে একটা মেয়ে মরেছে। ওরই বয়সি।… ও পালিয়েছে টের পেয়েই নাকি দুটো লোক ওকে ধরতে এসেছিল স্টেশনে। গন্ধ শুঁকে শুঁকে।… মুম্বই-এর দাদা তো, মাফিয়া ডন। সাংঘাতিক নেটওয়ার্ক। মেয়েটা ট্রেনের বাথরুমে লুকিয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ।…ভাবো তো কী ট্রমাটিক এক্সপিরিয়েন্স!

এতক্ষণ একটাও প্রশ্ন না করে, টুঁ শব্দটি না করে দীর্ঘ বিবরণী শুনছিল সৌম্য। বহুক্ষণ পর ঘাড় নাড়ল, —হুম্‌। অতীব দুঃখজনক। গ্রেট ট্রাজেডি।

—শুনবে মেয়েটার মুখ থেকে? শুনবে?

দেয়া টেপটা চালাতে যাচ্ছিল, সৌম্য হাত বাড়িয়ে আটকাল, —নতুন কী শুনব, অ্যাঁ? তুমি তো পুরো এপিসোডটাই রিমেক করে দিলে।

—না মানে…মেয়েটা কেমন বলতে বলতে কাঁদছিল…

—রাতদুপুরে কান্না শোনাবে? তার চেয়ে বরং কাজের কথা শোনো। বেঁটে চেয়ারে উলটো করে বসেছে সৌম্য, চেয়ারের পিঠ জড়িয়ে ধরে। লম্বা লম্বা ঠ্যাং দুখানা দুদিকে আরও ছড়িয়ে দিয়ে বলল, —ইন্দ্রজিৎবাবু আজ অফিসে ফোন করেছিলেন।

—কেন? শিউলির কাহিনীর মধ্যে ঢুকে ছিল দেয়া, অন্যমনস্কভাবে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল মুখ থেকে।

—গত মাসে ভাড়া নেওয়ার সময়ে বলছিলেন না, ওর দাদা বোধহয় আর দেশে ফিরবে না, দাদা মনে হচ্ছে এ ফ্ল্যাটটা বেচেই দেবে…?

দেয়া সংসারে ফিরেছে। মাথা নেড়ে বলল, —হ্যাঁ, বলেছিল বটে।

—আজ ঝেড়ে কাশল। জিজ্ঞেস করছিল আমরা কিনতে ইন্টারেস্টেড কিনা। আমাদেরকে উনি ফার্স্ট প্রেফারেন্স দিচ্ছেন, আমরা না নিলে অন্য পার্টি দেখবেন।

—প্রাইস কী রকম চাইছে?

—বলছিল সাত লাখ। আমাদের জন্য সিক্স পয়েন্ট ফাইভ অব্দি নামতে পারে।

—মোট আটশো কত স্কোয়্যার ফিট আছে না?

—আটশো দশ। স্কোয়্যারফিট অ্যারাউন্ড আটশো টাকা পড়বে।

—মোটামুটি তো রিজ্‌নেবল। এদিকে তো রেট আরও বেশি!

—সেকেন্ডহ্যান্ড কি নতুনের রেট হবে? ডেপ্রিসিয়েশান নেই?

—কিন্তু নতুনের মতোই তো লাগে। আমরা তো কিনে নিতেই পারি। এত সুন্দর কমপ্যাক্ট অ্যাপার্টমেন্ট, পাশেই লেক…

—ডোন্ট কল ইট লেক। ছিল একটা পুকুর, সিমেন্ট দিয়ে একটু পাড় বাঁধাল, ওমনি পুকুর লেক হয়ে গেল?

—ঠিক আছে বাবা, পুকুরই। হাওয়া তো আসে। …তুমি তো অফিস থেকে লোন পাবে…। ব্যাংকও আছে…

এবার সৌম্য মুচকি হাসল, —আমি ডিসিশান জানিয়ে দিয়েছি।

—নিচ্ছ? নেবে?

—নো। সৌম্য সিন্‌হা রয় ডাজন্‌ট বিলিভ ইন সেকেন্ডহ্যান্ড। গাড়ি, বাড়ি, বউ, গ্যাজেট কম্পিউটার—আমার পজেশানে যখন আসবে দে শ্যাল হ্যাভ টু বি ভারজিন।

—অ্যাই। দেয়া চোখ পাকাল, —আমি তোমার পজেশান?

—ওটা একটা কথার মাত্রা।

—বিয়ের সময়ে তোমার বউটা ভারজিন ছিল কিনা তুমি জানলে কী করে?

—রসিকতা হচ্ছে? দেয়ার ছদ্ম কোপকে আমল দিল না সৌম্য। আবেগবর্জিত গলায় বলল,—সেকেন্ডহ্যান্ড কিনব না বলেই এখনও দুচাকা ঠ্যাঙাচ্ছি। আর বাড়ির ব্যাপারে তো লংটার্ম ভাবনা ভাবতে হবে। আজ একটা আটশো স্কোয়্যারফিট ফ্ল্যাট কিনে ফেললাম, কাল মনে হবে ছোট… নো। দুটো ক্রাইটেরিয়া মাথায় রাখতে হবে। ফ্ল্যাট একবারই কিনব। ফ্ল্যাট বাড়ানো কমানো যাবে না। সো হাজার স্কোয়্যারফিট প্লাস শুড বি মিনিমাম। আমার টার্গেট চোদ্দোশো। থ্রি রুম, লিভিং হল, অ্যাটলিস্ট তিনটে বাথ, যার অন্তত দুটো অ্যাটাচড, কিচেন, ব্যালকনি এটসেট্রা এটসেট্রা। এবং সেটি হবে প্রপার কলকাতায়। সাউথেই।

—বাপ রে, সে তো অনেক দাম পড়বে। কম করে পনেরো যোলো লাখ!

—বেশিও হতে পারে। কিন্তু কিনব। সৌম্য উঠে দাঁড়াল, —আমার সব কিছুরই ডেটলাইন ফিক্স করা আছে। সামনের বছর গাড়ি। দু বছরের ইনস্টলমেন্ট। তিন বছরের মাথায় বাড়ি। দাম শোধ করব পাক্কা দশ বছরে। যখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে, তখন আমি সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত মানুষ। বাবাদের মতো মিডল এজের টেনশানটা আর নিতে হবে না।

হিসেবি বটে। নাকি দূরদর্শী? কত দূর অবধি দেখতে পায় সৌম্য? বার্ধক্য পর্যন্ত?

সৌম্য মিনি জলহস্তী সাইজের হাই তুলছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও দরজায় দাঁড়াল। আধবোজা স্বপ্ন স্বপ্ন চোখে বলল, —ডোন্ট গেট নার্ভাস। আমার কথা হচ্ছে ওয়াদা। নো আর্থলি ফোর্স ক্যান চেঞ্জ মাই শিডিউল। ইটস ম্যাটার অফ উইলফোর্স, হানি।

হ্যাঁ, ইচ্ছের জোর সৌম্যর আছে। দেয়া হাড়ে হাড়ে জানে। কখনও কখনও এই জোর যেন জেদেরই সমার্থক। কী জিদ্দি ছেলে! এই যে দেয়ারা বিয়ের পর আপনি কোপনির সংসার পেতেছে, এর মূলেও তো সৌম্যর ওই জেদ। মা যখন তোমার আমার বিয়েটা মানছে না, আমিও মার সঙ্গে সম্পর্ক রাখব না! আশ্চর্য, সম্পর্ক না রাখা মানে এই? তিন বছর হতে চলল, একবারের জন্যও মার নাম মুখে আনে না!

অবশ্য সে ভাবে দেখতে গেলে সৌম্যর মা-ই বা কম কীসে। নিজের পছন্দর মেয়েকে সৌম্য বিয়ে করল না বলে পুরোপুরি ত্যাগ করল ছেলেকে? ভুলেও নাকি সৌম্যর কথা বলে না!

বিয়ের পর দেয়াই যেচে সৌম্য আর সুপ্রিয়ার মাঝে সেতু বাঁধার চেষ্টা করেছিল। মান অভিমান শিকেয় তুলে এক দুবার গেছে ফার্ন রোডের বাড়িতে। সুপ্রিয়া তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি, তবে শীতল অভ্যর্থনা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে দেয়ার আগমন তার একেবারেই না-পসন্দ। সৌম্যও কি এতটুকু আহ্লাদিত দেয়ার প্রচেষ্টায়? দুজনেরই মনোভাব স্পষ্ট, মা ছেলের লড়াইয়ে তৃতীয় পক্ষের নাক গলানো তাদের কারুরই অভিপ্রেত নয়।

বেচারা সৌম্যর বাবা। গজকচ্ছপের যুদ্ধে এক অসহায় দর্শক। দেবব্রত নিপাট ভালমানুষ, দেয়াকে সেও স্নেহও করে খুব, ছেলের সংসারে তার নিয়মিত যাতায়াতও আছে, কিন্তু ওই প্রসঙ্গটি সেও সতর্কভাবে পরিহার করে চলে।

কী উদ্ভুট্টে কাণ্ড! দেয়ার মগজে ঢোকে না। ওই মা বলতে সৌম্য নাকি একসময়ে অজ্ঞান ছিল! মাও নাকি প্রতি পলে চোখে হারাত ছেলেকে!

উইলফোর্সটা সৌম্যর রক্তেই আছে।

দেয়া টেপ চালিয়ে কাজ শুরু করল। শুনছে খানিক, ভাবছে একটু, ধীর লয়ে লিখছে কম্পিউটারে। ইস্‌, ওইটুকু বাচ্চা মেয়ের ওপর কী পাশবিক অত্যাচারটাই না হয়েছে! একদম দেরি করা চলবে না, সামনের সপ্তাহে ডে-অফের আগেই রণেনদাকে ধরিয়ে দেবে লেখাটা। হাজার শব্দের ফিচার, অনেকটাই হবে। মেয়েটা সত্যিই নির্বোধ, ধারাভিতে সাতদিন থাকার সময়েও ওই চাচিকে দেখে কিছুই আন্দাজ করতে পারল না? তখনও যদি পালাত, র্ফকল্যান্ড রোডের কুৎসিত পৃথিবীটা থেকে তো রেহাই পেত। ফার্স্ট পেজে মনে হয় দেবে না, থার্ড কিংবা সিক্সথ। তৃতীয় পাতাটাই বেটার। যাক গে, যে পাতাতেই দিক লেখা জোরালো হলে প্রতিক্রিয়া একটা হবে। বর্ণনা দেওয়ার সময়ে কী তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠছিল শিউলির চোখেমুখে। মানুষের ওপর ঘৃণা। দুনিয়ার ওপর ঘৃণা। ভালবাসার প্রতি ঘৃণা। এত ঘৃণা নিয়ে মেয়েটা বাঁচবে কী করে?

শিউলির কথাগুলো মোটামুটি গোছানো গেছে। কাল থেকে শুরু করতে হবে তথ্যসংগ্রহ অভিযান। খবরের জন্য মলয়দার নিয়মিত যাতায়াত আছে লালবাজারে, মলয়দা বলেছে মিসিং পারসনস স্কোয়াডে নিয়ে যাবে। কিন্তু থানাগুলো? সব থানায় কি যাওয়া সম্ভব? টেলিফোন আছে কী করতে? তবে শিউলিদের থানায় একবার ঢুঁ মারতেই হবে। জেনে রাখা দরকার শিউলি নিখোঁজ তদন্তে ওরা কতদূর এগিয়েছিল। পুরনো নবপ্রভাতটাও জোগাড় করে নিতে হবে কাল। জলগাঁও-এর খবরটা লাগবে।

কম্পিউটারকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া শোওয়ার ঘরে এল। নিদ্রা উবে গেছে, বুকটা ভার ভার। দেয়া পায়ে পায়ে ব্যালকনিতে। বাতাস নিচ্ছে।

গভীর রাতের রাস্তা এখন সম্পূর্ণ নিঝুম। আকাশে চাঁদ নেই। অদূরে জলাশয়ের দিকটা অন্ধকার অন্ধকার, ঠিক তার সামনেই পথবাতির নির্জন আলো।

দেয়া আলো দেখছিল। দেয়া অন্ধকারটাও দেখছিল।

চার

কাঠে ঘেরা ক্ষুদ্র কক্ষের দোলদরজা ঠেলে উঁকি দিল ঋতম। আছে বলরাম ঘোষ, মন দিয়ে পড়ছে কী যেন। কোনও পাণ্ডুলিপি?

ঋতম গলা খাঁকারি দিল, —আসতে পারি?

বলরাম মুখ তুলেছে, —আরে ঋতমবাবু যে? কী খবর?

—চলছে…। খুব ব্যস্ত?

—ওই একটু।… বসুন। অনিল, ভেতরে দুটো চা দিতে বলো তো। গলা উঁচিয়ে হুকুম ছুড়ে পিঠে তোয়ালে জড়ানো প্রাচীন কুর্সিতে হেলান দিল বলরাম, —তারপর? লেখালেখি চলছে কেমন?

—যেমন চলে। কখনও খুড়িয়ে খুঁড়িয়ে। কখনও দৌড়ে দৌড়ে।

—খাসা বলেছেন। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে! দৌড়ে দৌড়ে! শব্দগুলো জিভে নিয়ে পাখলাল বলরাম। হাতের ডটপেন বন্ধ করে স্মিত মুখে বলল, —তা আপনার এখন কী স্টেজ? দৌড়চ্ছেন, না খোঁড়াচ্ছেন?

—হাঁপাচ্ছি।

—কেন?

—আপনারা মালকড়ি দিচ্ছেন না… অবিরাম ছুটতে হচ্ছে…

—সেকি! পাননি আপনি টাকাটা? কোন ইস্যুতে যেন আপনার গল্প বেরিয়েছিল?

—ফেব্রুয়ারি। চার মাস হয়ে গেছে।

—তাই নাকি? বলরাম আবার গলা ওঠাল, —অনিল…?

তালসিড়িঙ্গে কালোবরণ একটা লোক ঘরে ঢুকেছে। সামান্য অবাক হল ঋতম। ছোট্ট দফতরটায় যে ছেলেটা বসে তাড়া তাড়া প্রুফ দেখে তার নামই তো অনিল বলে জানত এতদিন! এও অনিল? মহাকালের এই’অফিসে গোটা চার পাঁচ কর্মী দৃশ্যমান, তারা কি সবাই অনিল? নাকি মহাকাল পত্রিকায় অনিল একটা সাংকেতিক নাম? এখানে কাজ করলেই তাকে অনিল বলে ডাকা হয়?

অনিল নামক সম্ভাব্য সাংকেতিক নামের অধিকারী মানুষটা জিজ্ঞেস করল,—ডাকছিলেন বলরামদা?

—ঋতম সেনগুপ্তর গল্প বেরিয়েছে ফেব্রুয়ারিতে, এখনও পেমেন্ট পায়নি কেন?

লোকটা টেরচা চোখে ঋতমকে দেখল। চোখ তো নয়, মেটাল ডিটেকটার। গোমড়া মুখে বলল, —এখন তো ডিসেম্বর ছাড়া হচ্ছে।

—অ। কী যেন ভাবল বলরাম, তারপর বলল, —ঋতমবাবুরটা ক্যাশ করে দেওয়া যায় না?

—আপনি বললেই যায়। লোকটার মুখ আরও গোমড়া, —তবে একটু অনিয়ম হয়ে যায়, এই যা।

—তা হোক। ভাউচারে পেমেন্টটা করে দাও।

লোকটা বেরিয়ে যেতেই বলরাম বলল, —আর একটা গল্প দিয়ে যাবেন।

—আবার সেই গল্প? এবার একটা বড় কিছু ছাপুন।

—উপন্যাস?

—আমার একটা উপন্যাস রেডি আছে। কলকাতার পটভূমিকায়। বর্তমান সময়ের পারসপেক্টিভে।

—দিয়ে যাবেন। পড়ে দেখব।

—তার মানে ঝোলাচ্ছেন? একটু চান্স টান্স দিয়ে দেখুন। শুধু বড় লেখকদের পেছনে দৌড়লেই হবে?

—কাগজটাকে তত বেচতে হয় ভাই। বড় লেখকদের নাম না থাকলে বিজ্ঞাপনই বা আসবে কেন?

—কিন্তু ছোটদের চান্স না দিলে ছোটরা বড় হয় কী করে?

চা এসে গেছে। বেঁটে গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলরাম বলল, —বড় কি আর কেউ কাউকে করে? বড় এমনি এমনিই হয়।

—বুঝেছি। নামকরা পত্রিকায় লিখে একটু খ্যাতি ফ্যাতি হবে, তারপর আপনারা তাদের দর দেবেন।

—অত ছটফট করছেন কেন ভাই? আপনার লেখা তো নিয়মিত ছাপি। ছাপি না? ভাল লাগে বলেই তো ছাপি। …আর একটু বয়স হোক, আর একটু হাত পাকুক…

—অর্থাৎ প্রথম বড় লেখা যখন বেরোবে, তখন আমি একজন প্রবীণ ঔপন্যাসিক, তাই তো?…বলরামদা, আমার বয়সে মানিকবাবুর পুতুলনাচের ইতিকথা লেখা হয়ে গেছে। দিবারাত্রির কাব্যও বেরিয়ে গেছে।

—তিনি নমস্য ব্যক্তি…

—আমাদের নমস্য হওয়ার সুযোগ কই? ছোটগল্প লিখতে লিখতে মনটা পর্যন্ত ছোট হয়ে যাচ্ছে। নইলে দেখছেন না, সামান্য তিনশোটা টাকার জন্য এসে তাগাদা করি?

—তিনশো নয়, আড়াইশো। বলরাম ঝটিতি সংশোধন করে দিল।

—ও। আরও পঞ্চাশ কম। তাহলেই ভাবুন। ঋতম মুচকি হাসল। গোপন সংবাদ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, —আপনাকে একটা কথা বলি বলরামদা। চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। ফুলটাইম লেখক হতে চাই। অর্থাৎ লেখাই হবে আমার জীবিকা। কিন্তু গোড়াতেই যদি আপনারা বয়সটাকে দেখে উৎসাহে জল ঢেলে দ্যান…

বলরাম একটুক্ষণ জুলজুল চোখে নিরীক্ষণ করল ঋতমকে। বোধহয় বুঝতে চাইল আদৌ ঋতম চাকরি করত কিনা। তারপর বলল, —আপনার তো খুব সাহস!

—তাহলে? এই সাহসটার একটা মূল্য দেবেন না?

বলরাম হেসে ফেলল, —বলছি তো জমা করে যান উপন্যাস। দেখছি…। একটা প্রস্তাব দেব?

—বলুন।

—বসেই তো আছেন, ছোটখাটো ফিচার লিখে দিন না কিছু। আপনার কলম খুব ঝরঝরে, লেখায় টান আছে, পাঠককে শেষ অব্দি নিয়ে যায়। …সাম্প্রতিক কোনও ইন্টারেস্টিং বিষয় নিয়ে লিখুন।

—যেমন?

—সাবজেক্ট আমি কিছু বলব না, ওটা আপনিই বাছবেন। পলিটিকস, ফিল্‌ম, কলকাতা, সাহিত্য, খেলাধুলো, যা আপনার পছন্দ। পেমেন্ট মোটামুটি রেগুলারই করব।

—এখন যেমন করছেন?

—হা হা হা, অ্যাংরি ইয়ং ম্যান। বলেই টেবিল-সংলগ্ন দেরাজ থেকে ঘেঁটে ঘেঁটে একখানা পোস্টকার্ড বার করেছে বলরাম, —পড়ুন, রাগ জল হয়ে যাবে।

চিঠিটায় চোখ বোলাল ঋতম। মহাকালের সম্পাদকের উদ্দেশে লেখা। …ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত ঋতম সেনগুপ্তর ‘রূপকথার মৃত্যু’ গল্পটি বেশ ভাল লেগেছে। লেখককে আমার ধন্যবাদ জানাবেন। আপনাদের শরীরস্বাস্থ্য বিভাগে সলভাসন আর ভুজঙ্গাসনের ছবি দেননি কেন? প্রতিটি আসনের সচিত্র বিবরণ না থাকলে পাঠকরা কী করে তা রপ্ত করবে? সিনেমার পাতার ছবিগুলো রঙিন হলে ভাল হয়। …

পুরোটা শেষ করতে পারল না ঋতম, বছর পঞ্চাশের এক টাক-মাথা এসেছে ঘরে। সম্ভবত আর এক অনিল। ঋতমকে বাড়িয়ে দিয়েছে ভাউচার। সই করতেই হাতে গার্ডারে আটকানো নোটের গোছা। ঋতম স্তম্ভিত হয়ে লক্ষ করল ময়লা ময়লা পাঁচ টাকার নোটের তাড়া দিয়েছে। চলবে তো টাকাগুলো? কোন এক চিটফান্ডের মালিক নাকি মহাকাল চালায়, টাকাগুলো কি চিটফান্ডের কালেকশান?

পোস্টকার্ড আর টাকা এক সঙ্গে পকেটে রেখে ঋতম উঠে দাঁড়াল, —উপন্যাসটা তাহলে দিয়ে যাচ্ছি?

—ফিচারটার কথাও মাথায় রাখবেন। একটু রসিয়ে রসিয়ে যদি লিখতে পারেন… বুঝতেই তো পারছেন, পাঠকদের পড়ার মতো জম্পেশ ম্যাটার চাই।

কথাটায় কি বিদ্রূপ আছে? ঋতমরা যে গল্প, উপন্যাস লেখে সেগুলো কি নন-ম্যাটার?

এক চিলতে খুশিটুকু নষ্ট না করে মহাকাল থেকে বেরিয়ে এল ঋতম। সামনেই ফুলবাগানের মোড়, ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে বের করল পোস্টকার্ডখানা। নাম ঠিকানা দেখল। কোনও এক শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র মালের লেখা, বাঁকুড়া থেকে। জুতোর দোকান আছে লোকটার, ‘পদশোভা’র রাবারস্ট্যাম্প মেরে দিয়েছে নামের তলায়। নাহ্, দোকানদার বলে হেলাফেলা করা উচিত নয়, লোকটার সাহিত্যবোধ থাকতেই পারে। যোগাসন নিয়ে যতই চিন্তিত থাকুক, গল্পটা পড়েছে তো। এই চিঠিটাকে কি ফ্যানমেল বলা যায়? তাহলে এই নিয়ে ছটা হল। বাড়বে বাড়বে, এভাবেই বাড়বে। কথায় বলে না, রাই কুড়িয়ে বেল! ঋতম সেনগুপ্ত একদিন পৌঁছে যাবেই পাঠকের ঘরে ঘরে। হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে অকপট বাস্তবকে যদি সে তুলে ধরতে পারে, কেন তাকে পড়বে না পাঠক? বলরামদা ফিচারের কথা বলেছে, লিখলে হয়। কলম যত চলবে, তত স্বচ্ছন্দ হবে। আত্মবিশ্বাস বাড়বে। …বলরামদা মানুষটা খারাপ নয়। অনেক সম্পাদক তো বসতেই বলে না, বলরাম ঘোষ তাও সময় তো দিল। নগদানগদি টাকাটাও। বলরাম ঘোষ বোধহয় ঋতমকে একটু ভয়ও পায়। সাহিত্যমহলে ঠোঁটকাটা বলে ঋতমের যা বদনাম!

দুপুরে ফুরিয়ে বিকেল আসছে। আকাশে অল্প অল্প মেঘ। ডেলা ডেলা। ভারী ভারী। সূর্যর সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে মেঘেরা, কখনও ছায়া, কখনও রোদ্দুর।

সামনের পানের দোকান থেকে এক প্যাকেট দামি সিগারেট কিনল ঋতম। টিউশ্যনির টাকা পেতে এখনও দিন দশ বারো, পকেট ফুরিয়ে এসেছিল, ফুসফুসে অনেকখানি অক্সিজেন ভরে দিল মহাকাল। মা অবশ্য চাইলেই দিয়ে দেয়, শ্রাবণীও কখনও না বলে না, তবুও…। এটা কি ঋতমের সংস্কার? শিরায় ধমনীতে আবহমানকাল ধরে বয়ে আসা পৌরুষের অহমিকা? কাটাতে হবে, কাটাতে হবে, সামনে এখন দীর্ঘ পথ…।

সিগারেট খেতে খেতে দুটো বাস ছেড়ে দিল ঋতম। কবজি উলটে ঘড়ি দেখল, সবে চারটে দশ। কফি হাউসে কি কাউকে পাওয়া যেতে পারে? সম্ভাবনা কম, সাড়ে পাঁচটা ছটার আগে কেই বা আসে। সোজা বাড়ি ফিরবে? তার লেখার সময় হল গভীর রাত কিংবা সকালবেলাটা, এখন তো কাগজ কলম নিয়েও বসতে পারবে না। অবশ্য টুসকিকে খানিকক্ষণ চটকানো যেতে পারে। বড্ড মায়াকাড়া হয়েছে মেয়েটা। ফোলা ফোলা গাল, থোকা থোকা চুল, পুতুল পুতুল হাত পা…। সব থেকে সুন্দর টুসকির হাসিটা। শুধু কি মুক্তো, হিরে, পান্না, চুনি, পোখরাজ কত কী যে ঝরে ওই হাসিতে। কোলে নিলে বুকটা শিরশির করে ওঠে। একেই বুঝি বলে পিতৃত্ব।

ধুস, ঋতম হয়তো গিয়ে দেখবে টুসকি ঘুমোচ্ছে। এত ঘুম যে শিশুদের চোখে আসে কোথ্‌থেকে! একবার বড়পিসির বাড়ি গেলে হয়। আগের দিন যখন গিয়েছিল, দুই ভাইঝিই সেদিন ঘঙঘঙ কাশছিল। ঋতম কথা দিয়েছিল কাশি সারলে দুজনকে আইসক্রিম খাওয়াবে। পকেটে আজ নোট কড়কড় করছে, প্রতিশ্রুতি পালনের আজই সেরা দিন।

ফুলবাগান থেকে বেলেঘাটায় পিসির বাড়ি হাঁটাপথে মিনিট দশেক। ছোট্ট দোতলা বাড়ি, সামনে একটু খোলা চাতাল, সেখানে একমনে স্কিপিং করে চলেছে বছর আষ্টেকের এক বালিকা।

গেট দিয়ে ঢুকেই ঋতম মেয়েটার মাথায় আদরের চাঁটি কষাল, —কী রে মিকি, শরীর একেবারে ফিট?

মেয়েটি অভিমানের সুরে বলল, —তুমি আজও ভুল করলে বাবুয়াকাকা? আমি মিকি নই, ঝিকি।

—তা কী করে হয়! ঋতমের চোখ বড় বড়, —ঝিকির তো লম্বা চুল!

—মা কাটিয়ে দিয়েছে। কিছুতেই সর্দিটা সারছিল না…

কোনও মানে হয়! যমজ বোন দুটোকে শুধু ওই চুল দিয়েই যা আলাদা করা যেত। দুই বোনকে এক করে দিয়ে জুলিবউদি কি লোকের পর্যবেক্ষণশক্তির পরীক্ষা নিতে চায়?

ঋতম হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, —তা তোর কাউন্টারপার্টটা কোথায়?

—মার সঙ্গে স্কুলের স্পোর্টস ইউনিফর্ম কিনতে গেছে।

—স্পোর্টসেরও আলাদা ইউনিফর্ম হয়?

—হিহি বাবুয়াকাকা, তুমি কিছু জানো না।

—তা তুই যাসনি যে বড়? তোর ড্রেস লাগবে না?

—একজন গেলেই তো হয়।

কথোপকথনের মাঝেই বেরিয়ে এসেছে ইন্দিরা। ঋতমকে দেখে তার ভুরু জড়ো, —তুই কখন এলি?

—এই তো এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। কিংবা অকাজেও বলতে পারো। ঋতম ঝকঝকে হাসল, —পিসেমশাই কোথায়?

—ভেতরে।… তুই এসেছিস ভালই হয়েছে। আয়, তোর সঙ্গে কথা আছে।

পিসির মুখভাবে ঋতমের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সক্রিয় হল। কিছু একটা ঘটেছে!

ঋতম ড্রয়িংরুমের সোফায় এসে বসল। ফ্যান চালিয়ে ইন্দিরা মুখোমুখি। ভুরুর ভাঁজ ঘনতর, —তোদের ফোন খারাপ ছিল নাকি রে?

—গড়বড় করছিল একটু। ডায়ালটোন চলে যাচ্ছিল। কেন বলো তো?

—তোকে কদিন ধরেই আমি ধরার চেষ্টা করছি। তুই কাননের বাড়ি গিয়ে কী করে এসেছিস?

ঋতম থতমত খেয়ে গেল, —কী করেছি?

—খবরের কাগজের অফিসের কোন এক মেয়েকে নাকি নিয়ে গিয়েছিলি?

—হ্যাঁ, আমার বন্ধু। দেয়া।

—শিউলিকে নিয়ে সে কী সব লিখেছে, অ্যাঁ? কাননের তো জীবন অন্ধকার।

—কাগজে তো শিউলির নাম ছিল না! ও তো একটা জেনারেল আর্টিকল মতন লিখেছিল। তার মধ্যে একটু শিউলির গল্পটা এসেছে।

—দ্যাখ বাবুয়া, আমায় উলটোপালটা বোঝস না। আমি কাগজটা আনিয়ে পড়েছি। নাম না দিলেও পরিষ্কার বোঝা যায় ওটা শিউলির গল্প। লোকে কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলে? পূর্ব কলকাতা… আধা বস্তি… মা রান্নার কাজ করে… মেয়ে এক মাসের জন্য নিখোঁজ হয়েছিল…

—এ কিন্তু অন্যায় কথা পিসি। কাগজে যখন শিউলির নাম নেই, তখন ওটা তোমরা শিউলির গল্প বলে ধরবে কেন?

—একদম বাজে কথা বলবি না। জানিস কী হাল হয়েছে কাননের? বেচারা অনেক কষ্টে ঘটনাটাকে চেপেচুপে রেখেছিল, দু-চারজন হয়তো ফুটফাট মন্তব্য করত, তাও ঠারেঠোরে, এখন তো টি টি পড়ে গেছে। সর্বক্ষণ এখন কটুকাটব্য চলছে। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে পুলিশ। তারা যখন তখন এত্তেলা পাঠাচ্ছে মা মেয়েকে। কানন তো প্রায় কাজেই আসছে না, অর্ধেক দিন কামাই।

—কিন্তু পুলিশ কেন কাননদের টানাটানি করবে?

—ন্যাকা। তুমি যেন কিচ্ছুটি বোঝো না! হাওয়া খেয়ে বড় হয়েছ। ইন্দিরা এমনিতে ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, ঋতমকে সে ভালওবাসে খুব, কিন্তু মেজাজ চড়ে গেলে তার আর জ্ঞান থাকে না। তপ্ত গলায় বলল, —পুলিশকে তুমি চেনো না? কাগজে বেরোবে, কলকাতা পুলিশের কি টনক নড়বে… আর সেটা পড়ে বুঝি লোকাল থানা নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোবে? কাজের বেলায় পুলিশ ঢুঁ ঢুঁ, কিন্তু উত্ত্যক্ত তো করতে পারে!

ঋতম চুপ হয়ে গেল। দেয়ার লেখা পড়ে লালবাজার কি গুঁতো দিয়েছে থানাকে? হতে পারে। অবশ্য দেয়া নিজেও তো থানায় গিয়েছিল, সেখান থেকেও দুয়ে দুয়ে চার করতে পারে পুলিশ।

ইন্দিরা ফের সরব হয়েছে, —পুলিশ মা মেয়েকে নাজেহাল করে ছাড়ছে। মেয়ে ফিরে এসেছে জানাওনি কেন? থানায় এজাহার দিয়ে যাওনি কেন? সেই বজ্জাত লোকটা দেখতে কেমন, থাকত কোথায়? বয়স কত, কবে বিয়ে হয়েছিল, কালীঘাটের কোন ঘরে বিয়ে হয়েছিল, পুরুত কে ছিল, লোকটার কোনও স্যাঙাতকে শিউলি চেনে কিনা…।

ঋতম ফস করে বলে ফেলল, —ওরা স্ট্রেট অস্বীকার করলেই পারত। বলতে পারত কাগজে যার কথা বেরিয়েছে সেটা শিউলি নয়।

—বোকার মতো কথা বলিস না। পুলিশের জেরা কাকে বলে জানিস না? কানন শিউলির বুকের পাটা আছে ওদের কাছে কথা চেপে রাখার? …মাঝখান থেকে হল কী, পুলিশের আনাগোনায় ব্যাপারটা বিশ্রীভাবে জানাজানি হয়ে গেল।

ঋতম আবার একটা নির্বোধের মতো প্রশ্ন করে বসল, —কেন, পুলিশ কি ঢেঁড়া পিটিয়েছে? পুলিশ তো এমনিও নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে কোয়্যারি করতে ডাকতে পারে।

ইন্দিরার এবার রাগে প্রায় বাক্‌রোধ হওয়ার দশা। গনগনে আঁচ ছড়িয়ে বলল, —তোর মাথায় গোবর আছে, গোবর। পিকলু ঠিকই বলে, তোর জীবনে বুদ্ধি পাকবে না। কাগজে খবর বেরিয়েছে, কেউ কিছু বুঝতে পারবে না…! পুলিশ বার বার ডাকতে আসছে, কেউ কিছু জানতে পারবে না…! আরও কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে শুনবি? পরশুদিন কানন কাজ সেরে ফিরছিল, তখন নাকি এক গুণ্ডা মতন ছোকরা পথে ধরেছিল কাননকে। যা নয় তাই বলে শাসিয়েছে। বলেছে, পুলিশের কাছে শিউলি বেশি ভ্যানর ভ্যানর করলে শিউলি নাকি চিরতরে লোপাট হয়ে যাবে, এক মাস পরে শেয়াল-কুকুরে খাওয়া লাশ ভেসে উঠবে গঙ্গায়!

ঋতম লাফ দিয়ে উঠল, —এত দূর স্পর্ধা! কানন জানিয়েছে পুলিশকে?

—না।

—কেন?

—কারণ কানন তোমার মতো নিরেট নয়। তাকে মেয়ে নিয়ে থাকতে হবে। পুলিশ কি তাকে পাহারা দেবে চব্বিশ ঘণ্টা?

ঋতম মিইয়ে গেল। বসে বসে নখ খুঁটছে দাঁতে। অস্ফুটে বলল, —আমরা কিন্তু শিউলির ভাল চেয়েছিলাম। শিউলির মতো অন্য কোনও মেয়ে যেন আর বিপদে না পড়ে…

—কে তোমাদের ভাল চাইতে বলেছিল বাবুয়া? ইন্দিরার মুখ বিদ্রূপে বেঁকে গেছে, —কোনটা ভাল কোনটা মন্দ বোঝার জ্ঞান আছে তোমার? তাহলে অন্তত কাননের বাড়ি নিউজপেপারের লোক নিয়ে যাওয়ার আগে আমায় একবার জিজ্ঞেস করতে।…তোমার বন্ধুরও বলিহারি। সে নিজে মেয়ে হয়েও বুঝতে পারে না কীসে মেয়েদের ভাল হয়, আর কীসে মেয়েদের মন্দ হয়?

দেয়ার নিন্দে একটু যেন গায়ে লাগল ঋতমের। মৃদু প্রতিবাদ জুড়ল, —দেয়াকে দোষ দিচ্ছ কেন? আমিই ওকে বলে কয়ে…

—সে আমি আগেই বুঝেছি। তুমিই পালের গোদা। কাননের ব্যাপারে তোমাকে আদৌ ডাকাটাই আমার ভুল হয়ে গেছে। ইন্দিরা ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। প্রাণভরে বাবুয়ার ওপর বিস্ফোরিত হতে পেরে রাগটাও একটু কমেছে যেন। গলাও নেমেছে, —কী যে সর্বনাশ করলি মেয়েটার! মোটামুটি ভদ্রঘরের মেয়ে বলে বস্তিতে কাননের তাও একটু মানমর্যাদা ছিল, সেটুকুও গেল। ওই মেয়ে নিয়ে কানন যে এখন কী করবে! অন্য কোথাও যদি চলেও যায়, তাতেও কি মুক্তি আছে? আর যাবেই বা কোথায়? যেখানেই যাবে, কোনও না কোনওভাবে খবর রাষ্ট্র হবেই। শিউলির বিয়েথার তো আর কোনও প্রশ্নই নেই, মেয়েটা কোথাও আর খেটে খেতেও পারবে না। অন্তত এই চত্বরে।

—ঠিক আছে ঠিক আছে, ব্যাপারটা দেখছি।

—তুই কী দেখবি?

—যদি একটা বন্দোবস্ত করতে পারি। বিপদে যখন পড়েছে, আমাদের তো পাশে দাঁড়ানো উচিত। তেমন হলে ওদের এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও…

—হাত জোড় করছি বাবুয়া, তুই আর নাক গলাস না। অনেক হয়েছে।

—না শোনো… দেয়াও বলেছিল দরকার পড়লে শিউলির জন্য ও একটা কিছু করবে।

—হুঁহ্‌। সে তো তার কাজ গুছিয়ে নিয়েছে। এখন তার ভারী দায় পড়েছে।

—দেয়া ওরকম মেয়ে নয় পিসি। খুব নরম, ওর মনে খুব মায়াদয়া। দায়িত্ব নিয়ে যখন লিখেছে, নিশ্চয়ই কিছু একটা করবে।

—কী জানি বাবা কী করবে! আমার তো কিছু মাথায় ঢুকছে না। কানন আমার এতদিনের পুরনো লোক, মেয়েটাকেও সেই কবে থেকে দেখছি…। ইন্দিরা আবার ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল, —মা মেয়েকে যে বলব এখানে এসে থাকো সে ভরসাও তো পাই না। কোথ্‌থেকে আবার কী বিপদ আসে! বাড়িতে উৎপাত হলে পিকলু আর পিকলুর বাবা কি আমায় ছেড়ে কথা বলবে! তোর পিসেমশাই তো এখনই বলছে ঝুটঝামেলা হঠাও, কাননকে ছাড়িয়ে দাও। আমি আর জুলি তাও অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে… কাননের হাতের রান্নাটা তো ভাল।

ইন্দিরা নীরব হয়ে গেল। ঘরে বিষণ্ণতার বাতাবরণ। একমুখ ঘাম নিয়ে ঝিকি এসেছে ঘরে, ঠাকুমার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে জুলজুল তাকাচ্ছে।

ঋতম মাথা নামিয়ে বসেছিল। একবার অপাঙ্গে দেখল ভাইঝিকে। নিচু গলায় বলল, —আজ তবে উঠি।

—উঠবি কেন? বোস। চা টা খা। ইন্দিরা যেন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রায় স্বাভাবিক গলায় বলল, —তোর পিসেমশাই ভাল আম এনেছিল বাজার থেকে। কেটে দেব? খাবি?

—থাক না। অনেক খাইয়েছ তো, আর খিদে নেই। ঋতম স্নান হাসল, —পেট গজগজ করছে।

—রাগ করিস কেন বাবা? মনটা কদিন ধরে খুব খারাপ হয়ে আছে, যা নয় তাই বলে ফেলেছি।…দ্যাখ না, আজও কানন আসেনি। আমাকেই রান্না সারতে হল সব। হাঁটুর ব্যথা নিয়ে।

পিকলুদার বউ কী করছিল? জুলিবউদি রান্নাটা করতে পারে না? কথাটা প্রায় ঠোঁটের ডগায় এসে গিয়েছিল, দমন করে নিল ঋতম। উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত মুখে বলল, —রাগ করব কেন পিসি? হক কথাই তো বলেছ। শিউলিরা কতটা বিপদে পড়তে পারে আমার আন্দাজ করা উচিত ছিল।…আজ যাই।

—পিসেমশাইয়ের সঙ্গে একবার দেখা করবি না? কোন পত্রিকায় যেন তোর একটা গল্প পড়েছে পিসেমশাই, তাই নিয়ে তোকে কী যেন বলবে বলছিল।

—আজ থাক। পরে একদিন…

ঝিকির মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে ঋতম আবার রাস্তায়। মেঘ সরে ঝকঝক করছে দিনটা, তবু আলোটাকে কেমন পাঁশুটে লাগছিল ঋতমের। মনোরম বিকেলটাকে অসহ্য ঠেকছে। কেন এই মূর্খামি করল সে! দেয়াকে সরাসরি না করে দেওয়াটাই তো ঠিক ছিল।

সামনেই পাবলিক বুথ। ফাঁকা। পকেট থেকে ক্ষুদে ‘নোটবই বার করে নবপ্রভাতের নম্বর দেখল ঋতম। আজ দেয়ার ডেঅফ নয়, যে শিফটই হোক দেয়া অফিসে থাকবে।

নবপ্রভাতের দুটো লাইন। দুটোই সমানে এনগেজড। বার কয়েক চেষ্টা করে ঋতম হাল ছেড়ে দিল। দাঁড়িয়ে ভাবল একটু, সরাসরি নবপ্রভাতের অফিসে চলে যাবে কিনা। ধুৎ, ভাল্লাগছে না। এত বিরক্তি নিয়ে কি দেয়ার সামনে দাঁড়ানো যায়! সোজা কফিহাউসে চলে এল ঋতম। নীচে ইসমাইলের দোকান থেকে সস্তার সিগারেট কিনল এক প্যাকেট, দামি প্যাকেট ওপরে বার করলেই সাফ হয়ে যাবে।

বন্ধুবান্ধব কেউই আসেনি এখনও। গমগমে হলঘরটার কোণের টেবিলে নির্জন হয়ে ঋতম কালো কফি নিল একটা। মাথা থেকে জোর করে তাড়াতে চাইছে শিউলিপ্রসঙ্গ, ফিচারের বিষয় ভাবছে। কফিহাউস নিয়ে লিখলে কেমন হয়? কত পত্রিকার জন্ম মৃত্যু ঘটছে এখানে, প্রেমের কুঁড়ি ফুটছে, ঝরে যাচ্ছে। শ্রাবণীর সঙ্গে তো এখানেই প্রথম আলাপ। জনপদ পত্রিকায় প্রকাশিত সমুদ্রের স্বর গল্পটা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিল শ্রাবণী, এক বান্ধবীকে নিয়ে লাজুক মুখে এসে পরিচয় করেছিল। তখন শ্রাবণী স্কটিশ চার্চে পড়ত। থার্ড ইয়ারে। বান্ধবীটির নাম ছিল অরুণিমা। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই আসত দুই বান্ধবী। অরুণিমা এমন গাঢ় চোখে তাকিয়ে থাকত, মনে হত সে-ই ঋতমের প্রেমে পড়েছে, শ্রাবণী তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। ভুল ভাঙল মাস দুয়েক পর, অরুণিমা যেদিন বিয়ের কার্ডটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেল। এই কফিহাউসেই। অরুণিমার মুখে সেদিন টিপটিপ হাসি৷ আমি আর বাবা তোমাদের মাঝখানে থাকছি না, শ্রাবণীর যা বলার সরাসরিই বলুক। বলেই মরালীর মতো সুছন্দে হেঁটে কফিহাউস ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল অরুণিমা। শ্রাবণী তখন লজ্জায় লাল। ঘামছে। সে এক দৃশ্য!

—কী রে, বসে বসে প্লট ভাঁজছিস?

ঋতম চমকে তাকাল। তমোনাশ। চশমা-দাড়ি-ঝোলাব্যাগ শোভিত। পরনে গেরুয়া পাঞ্জাবি, দেখে সাধুসন্ত বলে ভ্রম হয়।

চেয়ার টেনে বসল তমোনাশ, —কতক্ষণ?

—মিনিট পনেরো।…তুই কি সোজা অফিস থেকে?

—আর কোথ্‌থেকে! তোর মতো ভ্যাগাবন্ড তো হতে পারলাম না। বউ বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে সে আশাও নেই।

—হাহ্। বসে খাওয়ার জন্য চামড়া অনেক পুরু করতে হয়। হালকা হওয়ার চেষ্টা করা সত্ত্বেও গলা দিয়ে ঈষৎ ঝাঁঝ বেরিয়ে এল ঋতমের। খানিক আগে ইন্দিরার প্রয়োগ করা চোখা চোখা বিশেষণগুলো কানে বেজে উঠেছে ঝনঝন। প্রচ্ছন্ন বিষাদের সুরে বলল, —ভ্যাগাবন্ড হওয়ার সবটাই সুখের নয় রে।

—বউয়ের কাছে ঝাড় খেয়েছ নাকি বস?

—শুধু বউ কেন। যে পারে সেই ঝাড়ে। ঋতম তেতো হাসল, —ছাড়। তোর গল্পের কালেকশান কদ্দূর?

—বলছে তো বুকফেয়ারে বেরোবে। না পারলে নেক্সট পয়লা বৈশাখ। পরশু গেছিলাম দত্ত পাবলিশার্সে, রবীনদার সঙ্গে সরাসরি কথা হল।

—দত্তদের কিন্তু বদনাম আছে। ওরা নাকি লেখকদের টাকা মেরে দেয়।

—সে যাদের রয়্যালটি হয় তাদেরটা মারে। আমি তো নাঙ্গা। তবে হ্যাঁ, পাবলিশিং লাইনে মুরগা তো একটাই। কম্পোজিটার, প্রেস, বাইন্ডার, কাগজ, প্রচ্ছদ, সবারই তো ফ্যালো কড়ি মাখো তেল। সুতরাং জবাইয়ের জন্য পড়ে থাকে লেখক। যাদের দৌলতেই ব্যাটাদের রমরমা।

—তুই একটা এগ্রিমেন্ট করে নিলে পারতিস।

—হুঁহ্‌, এগ্রিমেন্ট করেও কত আচ্ছা আচ্ছা লেখকদের ঘোল খাইয়ে দিল। হাজার ছাপছি বলে পাঁচ হাজার ছাপলে কোন শালা ধরবে?…আমার আর কী, দিলে দেবে, না দিলে না দেবে। বিক্রি তো হোক। উৎসাহ নিয়ে ছাপছে এই না কত!

ঋতমের মেজাজটা আরও খাট্টা হয়ে গেল। গত সপ্তাহে সাহিত্যবন্ধনের সুপ্রকাশবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, লোকটা কী জঘন্য ব্যবহার করল তার সঙ্গে! গল্পসংকলন বের করে কি গোডাউনে ফেলে পচাব! তমোনাশটা যে কী করে পাবলিশার ম্যানেজ করল? ঋতমের চেয়ে তমোনাশ বছর কয়েকের বড় বটে, তবে সাহিত্যের লাইনে ঋতম সিনিয়র। তমোনাশের পাঠকসংখ্যাও ঋতমের চেয়ে বেশি বলে মনে করার কারণ নেই। তমোনাশ কি টেকো রবীনের মাথায় প্রচুর তেল ঢেলেছে? ঋতম ও কাজটি পারবে না, মরে গেলেও নয়। সাহিত্যও এখন এক কঠিন প্রতিযোগিতা, হয়তো সে এক কদম পিছিয়ে পড়বে, তবুও না।

ঈর্ষাটা যাচ্ছে না মন থেকে। কুটকুট করছে।

কীটের দংশন উপেক্ষা করে ঋতম দেঁতো হেসে বলল, —তা বড়িয়া নিউজটা কবে সেলিব্রেট করছিস?

—এনি ডে। কী খাবি?

—যা খাওয়াবি।

—তুই তো আবার জলপথে চলিস না!

—তো কী? এক আধদিন পানসি বাওয়া যেতেই পারে। হুইস্কি, ভদকা, রাম, যা খুশি।

—আমি কিন্তু সাত্ত্বিক মানুষ। রামভক্ত।

—রামই খাওয়াস তাহলে। রামনামে আমারই বা কীসের আপত্তি!

তমোনাশ উত্তর না দিয়ে স্কুলের ছাত্রদের মতো হাত তুলেছে। ইয়েস স্যার বলার ভঙ্গি। ঋতম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সোমশংকর মজুমদার ঢুকেছে কফিহাউসে। বয়সে মাঝারি, সাইজে মাঝারি, সাহিত্যিক হিসেবেও মাঝারি। দু যুগ ধরে কলম ঘষটাচ্ছে, সে তুলনায় নাম হয়নি বিশেষ। অথচ এমন হাবভাব করে যেন রবীন্দ্রনাথ! দিনকাল, জনপদের মতো নামী দামি পত্রিকাকে তুড়ে গালাগাল করছে অহরহ, আবার ওই সব পত্রিকাতেই গোপনে গোপনে লেখা গুঁজে দিয়ে আসছে। চাল মারা বুলিও আছে! চাইলে তো আর না করতে পারি না! এমন পাকা আর দুমুখো মানুষ ঋতমের দু চক্ষের বিষ। তমোনাশ যে কেন ওকে দেখে গলে পড়ে!

তমোনাশের উত্থিত কর দেখতে পেয়েছে সোমশংকর। এদিক ওদিক চোখ হাতড়ে নিজস্ব সঙ্গীদের খুঁজল একবার, দেখতে না পেয়ে ঋতমদের টেবিলে এসেই বসেছে।

তমোনাশ বিগলিত স্বরে বলল, —ভাল আছেন তো সোমদা?

—ভাল থাকাটা তো একটা রিলেটিভ টার্ম ভাই। টেবিলে পড়ে থাকা ঋতমের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট তুলে নিল সোমশংকর, হাত বাড়িয়ে তমোনাশের কাছ থেকে দেশলাই। জ্বলন্ত সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, —আমি কতটা ভাল আছি সেটা ঠিক হবে তুমি কতটা খারাপ আছ তার ওপরে।

তমোনাশ ঘাড় দোলাল, —তা তো বটেই। তা তো বটেই।

সোমশংকর প্রীত মুখে বলল, —তোমার গল্পটা পড়লাম তমোনাশ। বেশ চলছিল, কিন্তু শেষটা কেমন গেঁজিয়ে ফেললে। প্রেম নিয়ে এত কচকচি করো কেন?

—বা রে, প্রেমের গল্পে প্রেম থাকবে না?

—আদৌ প্রেমের গল্প লেখার দরকারটা কী? প্রেম বলে সত্যিই কি কিছু এগজিস্ট করে?

—করে না বুঝি? ঋতম ফুট কাটল।

—নাহ্‌। প্রেম আদতে একটা বায়োলজিকাল কনসেপ্ট। নারী পুরুষের প্রেম মানে শুধুই শরীর। তুমি মনে মনে যে মেয়েটিকে ভালবাসছ, সেটা ভালবাসা নয়। তুমি আদতে তার শরীরটাকে চাইছ। তুমি এটাকে তোমার গোপন লালসা বলতে পারো। কিংবা অবচেতন জৈবিক তাড়না। তুমি হেনরি মিলার পড়েছ?

—না।

—ফ্রয়েড়?

—একটু একটু।

—আর একটু ঘাঁটো। জয়েসটাও পড়ো।

তমোনাশ ফের বিগলিত স্বরে বলল, —আমার একটা গল্পের কালেকশান বেরোচ্ছে সোমদা।

ক্ষণিকের জন্য থমকাল সোমশংকর, পরমুহূর্তেই মুখে প্রাজ্ঞ হাসির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে বলল, —বই বেরোনোটাই জীবনের মোক্ষ নয়। কাফকার জীবিতকালে তো কোনও লেখাই বই হয়ে বেরোয়নি।

তমোনাশ যেন একটু নিবে গেল। কিন্তু জ্বলে উঠল ঋতম। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,—একটা প্রশ্ন করব সোমদা?

—করো।

—আপনি বিলিতি খান, না দিশি?

—মানে?

—তখন থেকে আপনি শুধু সাহেবদের নাম করে যাচ্ছেন তো। কিন্তু আমি যে আপনাকে তালতলায় বাংলা চড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি! এক আধটা দিশি লেখকেরও নাম করুন।

সোমশংকর গম্ভীর মুখে বলল,—ভাষাটা একটু সংযত করো ঋতম।

—অ্যাই ঋতম, কী হচ্ছে?

—খারাপ কিছু বলেছি? তখন থেকে শুধু জ্ঞান বিতরণ করছে!

সোমশংকরের চোয়াল শক্ত হয়েছে, —আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলেছি ঋতম। সাহিত্য দেশকালের ঊর্ধ্বে। আমি যাঁদের কথা বলছি তাঁরা প্রত্যেকেই কালজয়ী। তোমার পছন্দ না হলেও এটাই সত্যি। ওঁদের মতো করে জীবনটাকে দেখা…

—ফের বুকনি! ঋতম ফেটে পড়ল সহসা,—এত্ত হেভি হেভি বাত মারেন কেন? আয়নায় নিজের মুখ দেখেছেন কখনও? একা একা? মনে হয় না ওটা একটা নিকৃষ্ট শ্রেণীর ধাপ্পাবাজের ফেসকাটিং?

ঋতমের গলা যথেষ্ট চড়ে গেছে। কফিহাউস এখন ভরভর্তি, ধোঁয়ায় গুঞ্জনে জমজমাট। তার মধ্যেও আশপাশের টেবিল থেকে বেশ কয়েকটা মুখ ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে।

সোমশংকরও খিঁচিয়ে উঠল,—তমোনাশ, তোমার বন্ধুকে রেস্ট্রিক্ট করো। সিনিয়ারদের সঙ্গে কী ভাষায় কথা বলতে হয় জানে না। একটা দুটো গল্প লিখে নিজেকে খুব কেউকেটা ভাবছে।

—আর আপনি নিজেকে কী ভাবেন, অ্যাঁ? সাহিত্যের গুরুঠাকুর?

—অ্যাই ঋতম, চুপ কর।

—কেন? কেন চুপ করব? রোজ রোজ ওর বাক্‌তাল্লা হজম করতে হবে? সোমশংকরের নাকের সামনে তর্জনী নাচাল ঋতম,—আপনি একটি লায়ার। একটি আস্ত মিথ্যেবাদী। ভণ্ড। আমি আপনার অন্তত এক ডজন প্রেমের গল্প পড়েছি। প্যানপেনে। ক্যাতকেতে। ঘিনঘিনে। ভদ্রলোকের পাতে দেওয়ার মতো নয়। বই বেরোনো কিছু নয়, অ্যাঁ? নিজের বই বার করার জন্য তা হলে হরিমাধববাবুর বাড়ি হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন কেন?…শুনুন শুনুন, মানুষের শরীর ছাড়াও আর একটা জিনিস আছে। মন। হৃদয়। আপনার সেটা নেই বলে লেখক হিসেবে আপনি টোটাল ফেলিওর। বুঝেছেন?

সোমশংকরের মুখ কালো, ক্রোধে বাক্যস্ফুর্তি হচ্ছে না।

ঋতম তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। টেবিল থেকে সিগারেটের প্যাকেটখানা খামচে তুলে হনহনিয়ে নেমে এসেছে একতলায়। হাঁটছে। হাঁটছে। এখনও দপদপ করছে রগ দুটো। একটা সিগারেট ধরাল, দু টান দিয়েই ছুড়ে ফেলে দিল। নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে এবার। কী দরকার ছিল সোমশংকরকে ওভাবে বলার? প্রতিটি মানুষই তো নিজের মতো করে বেঁচে আছে, সোমশংকরও তো তাই। এত রেগে যাওয়ার কোনও অর্থ হয়? অন্য দিন কথাগুলোকে হাসিতামাশা করে উড়িয়ে দেয় ঋতম। আজ পারল না কেন?

তবে কি রাগটা আজ ভেতরে ভেতরে ছিল? কোন রাগ? কীসের রাগ? শিউলি কাননের বিপন্নতা কি হানা দিচ্ছিল অবচেতনায়? নিজেরই মূঢ়তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল?

নাকি রাগটা অন্য কারুর ওপর? দেয়া…দেয়া…দেয়া!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *