১.৪ প্রবেশ পথটা শিকল দিয়ে আটকে রাখা

০৪.

প্রবেশ পথটা শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। আটটা বাড়ির ফ্রাড লাইটের আলোয় দিনের মত উজ্জ্বল হয়ে আছে প্রাঙ্গণটা। ধনুকের মত বেঁকে যাওয়া কংক্রিটের রাস্তায় দশ-বারোটা গাড়ি দেখতে পাচ্ছে মাইকেল। লোহার শিকলটার উপর ভর দিয়ে যে দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, কে?

নিজের নাম বলল মাইকেল।

কাছের বাড়িটা থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে খুঁটিয়ে দেখল মাইকেলকে, তারপর প্রহরীদেরকে বলল, ডনের ছোট ছেলে ইনি। তারপর মাইকেলকে বলল, ভিতরে আসুন।

বাড়ি ভর্তি লোক, কিন্তু সবাই অচেনা, শেষ পর্যন্ত ড্রয়িংরুমে ঢুকে হেগেনের স্ত্রী টেরিনাকে পেল, মাইকেল। একটা সোফায় পা গুটিয়ে বসে সিগারেট খাচ্ছে। সামনের কফি টেবিলটাতে হুইস্কি ভর্তি একটা গ্লাস। সোফার আরেক ধারে ভাবলেশহীন মুখে মোটাসোটা ক্যাপোরেজিমি ক্লেমেঞ্জা বসে আছে, তার কপালের ঘাম আর হাতের চুরুটে লেগে থাকা থুথু উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে।

মাইকেলের হাত ধরে নাড়া দিল ক্লেমেঞ্জা, সান্তনার সুরে বলল, তোমার বাবাকে হাসপাতালে দেখতে গেছেন তোমার মা-গুর্ন সুস্থ হয়ে উঠবেন।

একটা চেয়ার ছেড়ে করমর্দনের জন্যে উঠে দাঁড়াল পলি। মাইকেল জানে, পলি গাটো বাবার দেহরক্ষী। কিন্তু পলি আজ বাড়ি থেকে বেরোয়নি, তা এখনও জানে না ও। তাই কৌতুক মেশানো কৌতূহলের সাথে পলির দিকে তাকিয়ে থাকল।

পলির তীক্ষ্ণ চেহারার মধ্যে চাপা উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। চটপটে আর দক্ষ বলৈ সুনাম আছে তার। হাঙ্গামার সৃষ্টি না করে নানা ধরনের সূক্ষ্ম কাজ সারতে জুড়ি নেই ওর। লোকটার জন্যে দুঃখ হলো মাইকেলের এই ভেবে যে আজ সে তার দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

ড্রয়িংরুমে এখানে সেখানে আরও অনেকেই বসে আছে। কাউকে চেনে না মাইকেল। তবে এরা ক্লেমেঞ্জার দলের কেউ নয়। দেখেশুনে পরিষ্কার বুঝতে পারছে সে, বিশ্বাসঘাতক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে ক্লেমেঞ্জা আর গাটোকে।

ফ্রেডি কেমন আছে? জানতে চাইল সে।

ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে ওকে, বলল ক্লেমেঞ্জা।

ঝুঁকে পড়ে হেগেনের স্ত্রী টেরিসার গালে একটা চুমো খেলো মাইকেল। খুব ভাল সম্পর্ক দুজনের মধ্যে। চিন্তা কোরো না, নিচু গলায় বলল ও, নিরাপদে আছে টম। সনির সাথে কথা হয়েছে তোমার?

মাইকেলের একটা হাত শক্ত করে ধরে কয়েক সেকেণ্ড স্থির হয়ে থাকল টেরিসা, তারপর মাথা দোলাল। এমনিতে আশ্চর্য সুন্দরী, তার উপর মাথা দোলনোটা অদ্ভুত সুন্দর লাগল মাইকেলের হাত ধরে টেনে তুলল তাকে। সাথে করে নিয়ে গেল শেষ প্রান্তে রাবার অফিস কামরায়।

ডেস্কের পিছনে রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে সনি। তার এক হাতে হলুদ রঙের প্যাড, আরেক হাতে পেন্সিল। টেসিওকে চেনে মাইকেল, সে ছাড়া আর কেউ নেই কামরায়। তাকে দেখেই বুঝে নিল ও বাড়ির সব লোক টেসিওর। কাগজ আর পেন্সিল তার হাতেও দেখতে পাচ্ছে মাইকেল।

চেয়ার ছেড়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল সনি, ডেস্ক, ঘুরে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল টেরিকে। একটুও চিন্তা কোরো না, বলল সে। একটা প্রস্তাব দিয়ে টমকে ফেরত পাঠাচ্ছে ওরা। আমাদের তৎপরতার সাথে ওর কি সম্পর্কও তো শুধু আমাদের উকিল। ওর ক্ষতি কেন করবে ওরা? •

টেরিসাকে ছেড়ে দিয়ে এবার মাইকেলকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো সনি।

হতভম্ব দেখাচ্ছে মাইকেলকে। অরে, করো কি! সনিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে হাসতে শুরু করল সে। মেরে ধরে হাড়ে দাগ বসিয়ে দিয়েছ, সেটাই তো অভ্যাস হয়ে গেছে-এখন আবার এসব কি? অল্প বয়সে মারপিট লেগেই ছিল, ওদের মধ্যে।

কাঁধ আঁকাল সনি। শোন তবে তোর খোঁজ না পেয়ে ভয়ে কলজে শুকিয়ে গিয়েছিল আমার। তোকে ওরা মেরে ফেললে বা কি, বাঁচিয়ে রাখলেই বা কি কিছু এসে যেত না আমার কিন্তু বুড়ি মাকে খবরটা সেই আমাকেই গিয়ে দিতে হত, ওখানেই আমার আপত্তি।

বাবার খবরটা কিভাবে নিল মা? জানতে চাইল মাইকেল।

 এ তো আর নতুন কিছু নয়, বলল সনি। এরকম আগেও হয়েছে। তখন তুই ছোট ছিলি, তাই মনে নেই। আমি বা মা-দুজনেই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছি ব্যাপারটাকে। একটু বিরতি নিল সে। বাবার কাছেই আছে মা। বাৰা সুস্থ হয়ে উঠবেন।

আমরাও সেখানে যেতে পারি না?

একটু গম্ভীর হলো সনি। সব না মিটলে বাড়ি থেকে বেরোনোমার পক্ষে সম্ভব নয়। শব্দ শুনে টেলিফোনের দিকে হাত বাড়াল সে।

ডেস্কের উপর থেকে হলুদ প্যাডটা তুলে কি লেখা রয়েছে দেখছে মাইকেল। একটা তালিকা, তাতে সাতজনের নাম লেখা। তালিকায় প্রথম তিনজনে সাধ্যে রয়েছে সোযো, ফিলিপ টাটাগ্লিয়া, জন টাটাগ্লিয়া। কাকে কাকে মারতে হবে তার একটা অলিকা এটা, হঠাৎ চমকে উঠে বুঝতে পারল মাইকেল।

রিসিভার নামিয়ে রাখল সনি। টেরিসা আর মাইকেলকে বলল, একটু বাইরে গিয়ে বসবে তোমরা?

মাইকেল বুঝল, টেসিওর সাথে বসে তালিকাটা এখন চূড়ান্ত করবে সনি। কাঁদছে টেরিসা, তাকে ধরে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল সনি। কামরা থেকে বেরিয়ে না গিয়ে ইতিমধ্যে একটা সোফায় গ্যাট হয়ে বসে পড়েছে মাইকেল।

দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। বলল, এখানে থাকলে এমন সব কথা শুনতে হবে, যা ভাল লাগবে না তোর।

একটা সিগারেট ধরাল মাইকেল। আমিও কাজে লাগতে পারি।

অসম্ভব। এর মধ্যে তোকে জড়ালে বাবা আমাকে আস্ত রাখবেন না।

হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মাইকেল, চিৎকার করে বলল, উনি কি তোমার একার বাবা? এই বিপদে তাঁকে আমি সাহায্য করতে পারব না, এ তুমি কেমন কথা বলছ! বাইরে বেরিয়ে মানুষ খুন না করলেও কাজে লাগা যায়। আমার সাথে এমন আচরণ করছ, এখনও যেন কচি খোকা আমি। তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি একজন যুদ্ধফেরত সৈনিক। গুলিও খেয়েছি, দুচারটে জাপানীও মেরেছি। আমার সামনে কাউকে মেরে ফেললে, কি মনে করো তুমি, ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব?

দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে সনি। আরে রসো! বেয়াদবি মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে আমাকে না আবার তোমার গায়ে হাত তুলতে হয়। ঠিক হ্যায়, শখ যখন হয়েছে, থেকেই যাও-ফোন এলে ধরো। টেসিওর দিকে ফিরল সে। বলল, যে খবরের অপেক্ষায় ছিলাম, একটু আগের ফোনে সেটা পেয়েছি।

একটু থেমে মুচকি হাসল সনি, মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, কেউ একজন নিশ্চয়ই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ক্লামেঞ্জা হতে পারে। পলি গাটো হতে পারে। তার আবার আজ সর্দি লেগেছে বলে বাড়ি থেকে নাকি বেরোয়নি। মাইক, খুব তো কলেজে পড়িস, বল দেখি, কে সলোযোর টাকা খেয়েছে?

ধীরে ধীরে আবার সোফায় বসল মাইকেল। ভাবছে সে। কর্লিয়নি পরিবারের একজন ক্যাপোরেজিমি ক্লামেঞ্জা। ডনের বিশ বছরের পুরানো, ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে, ডন তাকে লক্ষপতি করে দিয়েছেন। ডন মারা গেলে তার কি লাভ? আরও টাকার লোভ? কিন্তু টাকা কম নেই তার। তবে, একথাও ঠিক যে টাকার লোভ কখনও মেটে না মানুষের। নাকি আরও ক্ষমতার মোহ? নাকি কোন অপমান বা অবহেলার প্রতিশাধ? তাকে বাদ দিয়ে হেগেনকে কনসিলিয়রি করা হয়েছে বলে? অথবা ব্যবসায়ী বুদ্ধিতে বুঝেছে শেষ পর্যন্ত জিতবে সলোযো, তাই তার পক্ষ অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ, তাই কি?

উহু এসব সম্ভাবনা মনে মনে বাতিল করে দিল মাইকেল। ক্লেমেঞ্জা বেঈমানী করেছে একথা বিশ্বাস করতে রাজি নয় সে। কিন্তু পরমুহর্তে বিষণ্ণ মনে ভাবল, দুনিয়ায় অসম্ভব, অবিশ্বাস্য বলে কিছু আছে কি? নেই।

আসলে ভালবাসা ওর বিচার বুদ্ধিকে ঘোলা করে তুলছে। ক্লেমেঞ্জার মৃত্যু চায় না ও। ছোটবেলায়কত উপহার এনে দিত লোকটা তাকে। কাঁধে তুলে সেই তো ওকে বেড়াতে নিয়ে যেত। উঁহু, মনস্থির করে ফেলল মাইকেল, ক্লেমেঞ্জা নয়।

পলি গাটো?

ওর সম্পর্কে সবাই আশাবাদী, সংগঠনে ওর উন্নতি হবে বলে মনে করা যায়, তবে আর সবার মত খেটেই উঠতে হবে ওকে। এখনও ধনী নয় ও। কম বয়সের অসংযত উচ্চাশা এবং খাটনি কমাবার হটকারী প্রবণতা ওর মধ্যে থাকতে পারে। সম্ভবত পলিই অপরাধী। কিন্তু পরমুহূর্তে মাইকেলের মনে পড়ে গেল স্কুলে ওরা ষষ্ঠ গ্রেডে একই ক্লাসে বসে লেখাপড়া করেছে–পলি অপরাধী বলে প্রমাণ হোক তাও সে চায় না।

মাথা নেড়ে বলল মাইকেল, ওরা কেউ নয়। সনি একটু আগে আভাসে বলেছে যে কে অপরাধী তা সে টের পেয়েছে, সেজন্যেই এই উত্তরটা দিল মাইকেল। ভোট দেবার প্রশ্ন উঠলে ক্লেমেঞ্জাকে নিরপরাধ বলে ভোট দিতে হয় তার।

মাইকেলের দিকে তাকিয়ে হাসছে সনি। বলল, ভেব না, ক্লেমেঞ্জা নির্দোন কাজটা পলিই করেছে।

মাইকেল লক্ষ করল বিরাট একটা হাঁপ ছাড়ল টেসিও। সে-ও এক ক্যাপোরেজিমি; তাই ক্লেমেঞ্জা নির্দোষ প্রমাণ হওয়াতে খুশি হয়েছে সে। তার ক বিষয়টা আরও একটা কারণে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো অত্যন্ত উঁচু প একজনকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছিল। ধীরেসুস্থে বলল সে, কাল আনা লোকদের ফেরত নিতে পারব তো?

পরশু, বলল সনি। তার আগে ব্যাপারটা প্রকাশ হোক তা আমি চাই না। এবার আমার ভাইয়ের সাথে ব্যক্তিগত কিছু আলাপ করব। বাইরের ঘরে থাকে তুমি, কেমন? তালিকাটা পরে শেষ করলেও চলবে। ক্লেমেঞ্জাকে সাথে নিয়ে তুমিই এটা করে ফেলো।

ঠিক আছে, কামরা থেকে বেরিয়ে গেল টেসিও।

পলি দোষী জানলে কিভাবে? প্রশ্ন করল মাইকেল।

এ-মাসে অসুস্থতার অজুহাতে তিনদিন কাজে আসেনি পলি, বলল সনি। এই তিন দিনই বাবার অফিসের উল্টোদিকের রাস্তার একটা বুথ থেকে কেউ ফোন করেছিল পলিকে। আজও। ওরা সম্ভবত খোঁজ নিচ্ছিল বাবার সাথে পলি যাচ্ছে, নাকি অন্য কেউ। কাঁধ ঝাঁকাল সনি। যাই হোক, ভাগ্য ভাল যে ক্লেমেঞ্জা দোনা নয়। ওকে এখন আমাদের বড় দরকার।

একটু ইতস্তত করে মাইকেল বলল, একেবারে মরণপণ যুদ্ধ বেধে যাবে নাকি?

সনির চোখ দুটোয় নিষ্ঠুরতার ঝিলিক খেলে গেল। টম এসে পৌঁছলেই শুরু করব আমি। বাবা যতক্ষণ নিষেধ না করেন।

সেক্ষেত্রে বাবা কিছু না বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেই তো পারো।

একটু তাচ্ছিল্য এবং কৌতুকের সাথে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল সনি। যুদ্ধে তুই এত পদক পেলি কিভাবে ভেবে পাই না। আমরা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি, দেখছিস না? যুদ্ধ না করে উপায় নেই আমাদের। আমার একটাই ভয়-টমকে যদি না ছাড়ে?,

রীতিমত বিস্মিত হলো মাইলে, কেন, ছাড়বে না কেন?

ধৈর্যের সাথে, বুঝিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল সনি, বাবাকে মেরে ফেলতে পেরেছে মনে করে টুমকে হাইজ্যাক করেছিল ওরা, টমকে দিয়ে যাতে প্রস্তাব পাঠাতে পারে আমার কাছে। কিন্তু বাবা বেঁচে যাওয়ায় আমি আর কিছু নই ওদের কাছে, তাই টমও ওদের কোন কাজে আসছে না। তাকে ওরা যা খুশি করতে পারে এখন-খুনও করতে পারে, আবার ছেড়েও দিতে পারে। খুন করার একমাত্র অর্থ হবে আমাদেরকে জানিয়ে দেয়া যে ওদের সাথে লাগলে তার পরিণাম ভাল হবে না, এবং আমাদের ওপর জোর-জবরদস্তি খাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা।

মৃদু গলায় জানতে চাইল মাইকেল, বাবা মারা যাবার পর প্রস্তাব পাঠালে তুমি আপস করবে, এ-কথা সলোযোর মনে হলো কেন?

সাথে সাথে টকটকে লাল হয়ে উঠল সনির মুখটা। কয়েক মুহূর্তে চুপ করে থাকার পর বলল সে, কয়েক মাস আগে সলোহোর সাথে একটা আলোচনায় বসেছিলাম আমরা। ড্রাগ ব্যবসার একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল সে। বাবা সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু, নিজের উপর রাগে-অনুশোচনায় কালো হয়ে গেল সনির মুখটা, আমি একটু বেশি কথা বলে ফেলেছিলাম, যার ফলে সলোযো বুঝতে পেরেছিল ওর প্রস্তাবটাতে আমার সমর্থন আছে।

চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ সনি, তারপর বলল, এত বড় অন্যায় জীবনে আর করিনি। যাই হোক, বাবার সাথে আমার এই মত পার্থক্য লক্ষ করে সলোযো ভাবল ডন বেঁচে না থাকলে আমার সাথে ব্যবসাটা করতে পারবে সে। বাবা মারা গেলে এই পরিবারের অবস্থা কি দাঁড়াতে পারে তা কল্পনা করতে অসুবিধে হয়নি তার। রাতারাতি অর্ধেক কমে যেত আমাদের ক্ষমতা। বাবার গড়া ব্যবসাগুলোকে টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খেয়ে যেতাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে ড্রাগের ব্যবসা ধরে নিজেদেরকে রক্ষার চেষ্টা করতাম। অন্তত তাই ভেবেছিল সলোমো, বাবাকে তার এই খুন করার চেষ্টা আর কিছু নয়, এর মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্য কিছু নেই, স্রেফ ব্যবসার একটা চাল মাত্র। অবশ্য আমাকে ব্যবসায় নামিয়ে খুব সাবধানে থাকত সে, কখনও খুব কাছে ঘেঁষতে দিত না, যাতে সরাসরি গুলি করতে না পারি তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রাখত। এবং একথাও তার জানা আছে যে একবার তার প্রস্তাবে রাজি হলে ভবিষ্যতে আর কখনোই প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে লড়াই শুরু করতে পারব না আমি। অন্য পরিবারগুলো যেভারে থোক বাধা দেবে আমাকে। আপোস হয়ে যাবার পর শান্তিভঙ্গ করার চেষ্টা একটা মারাত্মক অন্যায় বলে মনে করবে সবাই।

বাবা মারা গেলে কি করতে তুমি?

সরল এবং সত্য কথাটা সহজ ভাবে বলল সনি, সলোযো আর টাটাগিয়া পরিবারকে জড় সুদ্ধ নির্মুল করতাম। তাতে যদি নিউ ইয়র্কের পাঁচটা পরিবারের সাথে যুদ্ধ করতে হত–তাও করতাম। তাতে যদি এই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ডুবতে হত–তাও ডুবতাম।

 একটু ইতস্তত করল মাইকেল, তারপর ধীর ভঙ্গিতে, মৃদু কণ্ঠে বলল, তুমি যেভাবে নিচ্ছ, বাবা কিন্তু সেভাবে নিতেন না।

হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ করল সনি, বলল, জানি, বাবার মত আমি হতে পারিনি। কিন্তু তোমাকে বলছি, কথাটা বাবাও জানেন, যখন সত্যি কাজের সময় আসে তখন যে কোন দক্ষ লোকের মত সবদিক আমিও সামলাতে পারি। সলোযো, ক্লেমেঞ্জা, টেসিও-এদেরও জানা আছে ব্যাপারটা। শেষ পরিবারিক লড়াইয়ে বাবাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছি আমি। সুতরাং, সামলাতে না পারার ভয় আমার মধ্যে নেই। তাছাড়া, এ-ধরনের পরিস্থিতিতে লড়াই করার সবচেয়ে ভাল আয়োজন আমাদেরই রয়েছে। এখন শুধু লুকার জন্যে অপেক্ষা করছি, সে এলেই কাজ শুরু করব।

কৌতূহলী হয়ে উঠল মাইকেল, বলল, আচ্ছা, লুকার ব্যাপারটা কি? সবাই তাকে সাংঘাতিক কিছু একটা বলে মনে করে। সত্যিই কি সে তাই?

লুকা ব্রাসি? মুগ্ধ মুখভঙ্গি করে মাথা নাড়ল সনি! সে একাই একশো। টাটাগ্লিয়াদের পিছনে লেলিয়ে দেব ওকে। সলোযোর ব্যবস্থা আমি নিজে করব।

অবস্তি বোধ করছে মাইকেল। বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মাঝেমধ্যে অদ্ভুত একটা আক্রোশ আর নিষ্ঠুরতা দেখা গেলেও মনটা আসলে ভাল সনির। অথচ সেই সনি কেমন শান্তভাবে, ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করার কথা বলছে। কাকে কাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে তার তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সে টেসিও. আর ক্লেমেঞ্জাকে–সে যেন সিংহাসনে আসীন রোমের একজন প্রতাপশালী সম্রাট। নিজের কথা ভেবে স্বস্তি বোধ করল মাইকেল। বাবা বেঁচে আছেন, সুতরাং প্রতিশোধ নেবার জন্যে এই গণ্ডগোলে তাকে জড়িয়ে পড়তে হবে না। টুকটাক সাহায্য করবে, ফাইফরমাশ খাটবে, টেলিফোন ধরবে,-তার বেশি কিছু না। সনি, এবং সুস্থ হয়ে উঠে বাবা, এরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করতে পারবে। তাছাড়া লুকা যখন আছে, চিন্তার কিছু নেই।

হঠাৎ বাইরে থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এল।

ব্যাপার কি, ভাবল মাইকেল, গলাটা হেগেনের স্ত্রীর না? ঝট করে উঠে দরজার দিকে এগোল সে।

দরজা খুলে মাইকেল দেখল বাইরের কামরায় উঠে দাঁড়িয়েছে সবাই। টম হেগেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে কামরার মাঝখানে, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে তার স্ত্রী।

স্ত্রীকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে সিধে হলো: টম হেগেন। মাইকেলের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি আমি, মাইক। টেরিসা কাঁদছে। এখনও, কিন্তু তার দিকে না তাকিয়ে দীর্ঘ পদক্ষেপে অফিস কামরায় এসে ঢুকল হেগেন। অদ্ভুত একটা গর্বে মুখটা লাল হয়ে উঠল মাইকেলের। ভাবছে, কর্লিয়নি পরিবারে বৃথাই কি আর দশটা বছর কাটিয়েছে টম। বাবার খানিকটা বৈশিষ্ট্য সে-ও পেয়েছে, সনিও পেয়েছে এবং কি আশ্চর্য বাড়ি থেকে দূরে দূরে কার্টালে কি হবে, বাবার কিছু গুণ তার গায়েও লেগে আছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *