রাজসাহী – হাজরা নাটোর তালন্দ বীরকুৎসা

রাজসাহী

হাজরা নাটোর

বর্ষা নেমেছে চলনবিলের বুকে। জলে টইটম্বুর। যতদূর চোখ যায় জলে জলময়। শালুক ফুলে বিল যায় ভরে। সকালের কাঁচা রোদ সস্নেহে চুম্বন দিয়ে যায় উত্তর বাংলার এই গ্রাম হাজরা নাটোরের ধূলিকণায়। রাঙা মাটির দেশ এই বরেন্দ্রভূমি। প্রাতঃস্মরণীয়া রানি ভবানীর দেশ এই নাটোর। আজকের দিনে শিল্পীমন এই নাটোরেই হয়তো বনলতা সেনকে খুঁজে পেয়েছেন। সব কিছু মিলিয়ে এ গ্রাম আমার স্মৃতির সবটুকু জড়িয়ে আছে। আজ দেখছি ছেড়ে-আসা গ্রামের কাহিনির মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বাংলার গ্রাম কথা কয়ে উঠেছে। জেগে উঠেছে দীর্ঘদিনের সুষুপ্তি থেকে। সে-কাহিনি শুনে মন ভরে যায়। বাংলার মূক মাটি এমন করে মুখর হয়ে ওঠেনি কোনোদিন। হাঁসুলী বাঁকের উপকথার মতোই পদ্মা মেঘনা আর চলনবিলের তীরের বাসিন্দারা নতুন ইতিবৃত্ত বলতে শুরু করেছে। সে-কাহিনির অনন্ত মিছিলে আমার গ্রাম নাটোরও একান্তে মিশে যায়।

শৈশবের কথা মনে পড়ে। নাটোরের আকাশে শীত ঘনিয়ে আসে। কাকলিমুখর শীতের ভোরবেলাটায় উঠি উঠি করেও মা-র কোল ছেড়ে কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করত না। বাগানের শিউলিতলায় একরাশ সাদা ফুলের গন্ধ কেমন করে জানি টের পেতুম। সেই ভোরে হরিদাসী বোষ্টমি করতাল বাজিয়ে বাড়ির দুয়ারে দুয়ারে হরিনাম কীর্তন করে সকলকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলত। হরিদাসী বোষ্টমির সুরেলা কণ্ঠের সে-গান আজও ভুলতে পারি না—

আর নিশি নাই ওঠ রে কানাই,
গোঠে যেতে হবে–দ্বারে দাঁড়ায়ে বলাই।

সে-গানের শব্দ অনেক দূর থেকে ভেসে আসত। আর বিছানায় থাকা সম্ভব হত না। কাঠবাদাম আর ফুল কুড়োবার লোভে খুব শীতের মধ্যেও উঠে পড়তাম। বাড়ির পাশেই জমিদারদের বাগানবাড়ি। সে-বাগানে সবরকম ফলের গাছই ছিল। উদ্যান-বিলাসী জমিদারবাবুরা বংশানুক্রমে এ বাগানে নানারকম ফলের গাছ পুঁতেছিলেন। আমাদের কৈশোরের দৌরাত্মময় রোমাঞ্চকর দিনগুলো অতিবাহিত হত সে-বাগানের গাছে গাছে। সেজন্যে যে কতদিন বাগানের মালির হাতে তাড়া খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। গ্রীষ্মের দুপুরে চারধার যখন নিঃসাড় নিঝুম হয়ে যেত, মধ্যাহ্নের অলসতায় দ্বাররক্ষী তন্দ্রারত, সেই অবসরে পাঁচিল টপকে গাছে গিয়ে উঠতাম। এমনই করে প্রতিদিন গাছগুলোকে তছনছ করে চলে আসতাম আমরা; আরেকটি বিশেষ আনন্দের দিন ছিল, শ্রীপঞ্চমীর পুজোর দিনটি। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই মন ওই দিনটির জন্যে উন্মুখ হয়ে থাকত। সরস্বতী পুজো এলেই গ্রামের তরুণদের মন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠত। পুজোর আগেই সারারাত খেটে পুজোর আটচালা মন্ডপ তৈরি করতাম, গেট সাজাতাম। সব কাজের শেষে মধ্যরাত্রির অন্ধকারে চুপি চুপি খেজুরের ভাঁড় নামিয়ে রস চুরি করার মধ্যে যে-রোমাঞ্চ ছিল তা আজও ভুলতে পারিনি। মিলাদ শরিফ উপলক্ষ্যে স্কুলে মুসলমান ছেলেদের উৎসবেও সকলে মিলে যথেষ্ট আনন্দ উপভোগ করতাম। মুসলমান ছাত্ররা আমাদের মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়িত করত। আমরাও নিঃসংকোচে তা গ্রহণ করেছি, সবাই মিলে আনন্দ করেছি।

বৈশাখের ঝড়ে সে-এক রুদ্রমূর্তি চোখে পড়ত। শ্রাবণের বর্ষণে দিগন্তের কোণে কালো মেঘ নিরুদ্দেশ হয়ে যেত চলনবিলের ওপারে। আমাদের বাড়ির ঘরের টিনের চালে বিষ্টির আওয়াজ এক অদ্ভুত ঐকতানের সৃষ্টি করত। ধান লাগানোর জন্যে কৃষকের মন তখন চঞ্চল হয়ে উঠত। সময় সময় আমিও বাবার সঙ্গে ধান লাগানো দেখতে যেতাম। কাদার মধ্যে উপুড় হয়ে একসঙ্গে কৃষকদের ধান লাগানোর দৃশ্য অবর্ণনীয়। হেমন্তে যখন ধান উঠত কৃষকদের গোলায় তখন ভোরের দিকে পাশের পাড়া থেকে কৃষক-বউদের ধান ভানার আওয়াজ শুনতে পেতাম। সেই চেঁকির আওয়াজে কেমন জানি একটা গ্রামীণ আত্মীয়তার স্পর্শ লাগত মনে। মেয়েরা ধান ভানছে, কেউ-বা ধান ঢেলে দিচ্ছে গর্তে। আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে নানারকম গেরস্তির কথা। চমৎকার ঘরোয়া সেই রূপটি আজ কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি। কখনো ধান ভানতে ভানতে মেয়েরা সুর করে গান ধরেছে। সে-গানের কলি আজ মনে নেই, কিন্তু সুরটা আজও বাজছে হৃদয়ের মাঝখানে।

বিকেলের দিকে আমরা কয়েকজন প্রায়ই কুঞ্জবাড়ির দিকে বেড়াতে যেতাম। নির্জন, নিস্তরঙ্গ সন্ধ্যা। রথের মেলা বসত এইখানটায়। দু-ধারে বন্য জামগাছের সারি। সামনে বিল। সূর্যাস্তের ছায়া পড়ে বিলের জল কেমন জানি অতীত-মুখর হয়ে উঠত। বহুদূর অতীতের কথা, রানি ভবানীর আমলের কথা, বাংলার বিগতশ্রী অবিস্মরণীয় দিনের কথা। কুঞ্জবাড়ির পথের বাঁ-দিকে একটা বটগাছের তলায় মুসলমানদের একটি পীঠস্থান আছে। গ্রামের হিন্দু মুসলমানদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে বছরে তিন দিন সেখানে গানের পালা হত। বিরাট চাঁদোয়া খাটানো হত ওপরে। সত্যপীরের গান, কৃষ্ণলীলার গান, দেহতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, মুক্তিতত্ত্ব সমস্ত কিছুই সেখানে গান গেয়ে আলোচনা করা হত। হিন্দু-মুসলিম সমস্ত গ্রামবাসী স্তব্ধ কৌতূহলী হয়ে সে-গান শুনত। গানের পালার মাঝে মাঝে ঢাক-ঢোল বেজে উঠত। পরচুলা ঝাঁকানি দিয়ে ঘন ঘন নৃত্য হত। অনেক হিন্দুও সেই দরগায় সিন্নি দিত, কেউ রুগণ ছেলের রোগমুক্তির জন্যে, কেউ হয়তো স্বামীর সুস্থতার জন্যে।

হাজরা নাটোর গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে জেলা বোর্ডের রাস্তা। দু-পাশে ঝাউগাছের সারি। তরুণদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলবার জন্যে গ্রামে আমরা একটা পাঠাগার স্থাপন করেছিলাম। পাঠাগারের ভেতর দিয়ে গ্রামের তরুণদের রাজনীতিমূলক শিক্ষা দেওয়া হত। ভেবেছিলাম আমরা সমস্ত তরুণরা মিলে সংঘবদ্ধ হয়ে গ্রামের সেবা করব, সে-আশা আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এমনই ধূলিসাৎ হওয়া স্বপ্ন নিয়ে কলকাতার রাজপথে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল গ্রামের এক প্রতিবেশীর সঙ্গে। ‘হঠাৎ আপনি এখানে?’–বহুদিন পর দেখা হওয়ায় বিস্ময়ে প্রশ্ন করি। ‘এই এলুম একটু এদিকে, দেখি যদি কিছু সুবিধে হয়।– নিস্তেজ হতাশ উত্তর। কৃপাপ্রার্থীর ভাব তার কথায় আর হাবভাবে। দেশসেবার পুরস্কারস্বরূপ বহুকাল কারাজীবন অতিবাহিত করেছেন তিনি। কোনোদিন ভেঙে পড়েননি। আজ যেন সত্যিই তিনি ভেঙে পড়েছেন। একদিন এঁকে দেখেছি বিপুল প্রাণশক্তির প্রতীকরূপে। আজ কলকাতার জনারণ্যে তাঁর মধ্যে কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পেলাম না। মিছিলের মধ্যে তিনিও মিশে গেছেন শরণার্থী হয়ে।

.

তালন্দ

উত্তরবঙ্গের রাজসাহী জেলার ছোট্ট এক টুকরো গ্রাম। তালন্দ তার নাম। পাশেই একদিকে ছড়ানো রয়েছে দীর্ঘ প্রসারিত বিল। অন্য দিকে ছোটো একটি জলরেখার মতো শীর্ণ শিব নদী। নদীটি ছোটো কিন্তু ঐতিহ্যে বিশিষ্ট। অনেক ইতিহাস-মুখর দিনের নীরব সাক্ষ্য বহন করছে এই নদী। আজ সে বিগতযৌবনা। বর্ষাকালে বিলের সঙ্গে মিশে নিজের অস্তিত্বটুকুও হারিয়ে ফেলে। পশ্চিম দিকে সজাগ প্রহরীর মতো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চওড়া রাস্তাটা আরও উত্তরে বিলটিকে লাফিয়ে পার হয়ে দূরান্তের গ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে।

গ্রামটি ছোটো। কিন্তু সুখ-সুবিধা অপ্রচুর নয়। রাজনৈতিক দূতক্রীড়ায় উলুখড়দের জীবনাবসান হয়েছে। কিন্তু তবুও ভুলতে পারি না ছেড়ে-আসা গ্রামের রাঙামাটির স্পর্শ। নুন তেল, রেশনকার্ড আর চাকরির বাইরে যখন মনের অবসর রেণু রেণু হয়ে উড়ে যায়, স্মৃতির টুকরো তখন ঘা দেয় অবচেতন মনের দরজায়।

প্রাণচঞ্চল গ্রাম্য আবহাওয়া প্রতিঋতুর সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। গ্রীষ্মকালে কালবৈশাখীর সঙ্গে যখন আম কুড়োবার ধুম পড়ে, যখন আম-জাম-কাঁঠালের রসালো চেহারা লুব্ধ করে আমাদের, তখন গ্রামের বুকে দেখা দেয় ‘মাসনা’ খেলা। ঢাকের বাজনার সঙ্গে বিভিন্ন ঢঙের মুখোশ পরে নাচতে থাকে স্থানীয় খেলোয়াড়গণ এবং অনেক সময় চেতনা হারিয়ে ফেলে দর্শকদের রুদ্ধবাক চেহারার সামনে। গ্রীষ্মের শেষে আম-কাঁঠালের বিদায়কালে আকাশের চক্ষু যেন সজল হয়ে আসে–দেখা দেয় ‘শ্যামাঙ্গী বর্ষাসুন্দরী। বিলের দেহে আস্তে আস্তে জল জমতে থাকে। ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা ছোট্ট এক একটা হাত-ছিপ নিয়ে জল ঘুলিয়ে মাছ ধরে। দেখতে দেখতে তাদের ছোটো ছোটো খলই’ কই, রুই, সিঙ্গি, ট্যাংরা, পাবদা মাছে ভরে ওঠে। বিলের বুকে তখন দেখা যায় নৌকার কালো রেখা। দু-দিক থেকে নৌকাগুলো পরস্পরের কাছে এগিয়ে এসে পরমুহূর্তেই ছিটকে বেরিয়ে যায় বিপরীত দিকে। সেই সময় প্রশ্নোত্তর চলে—’লাও কোতদূর কারা? তানোরের’ ইত্যাদি। এরই সমসাময়িক আর এক অনুষ্ঠান শীতলা পুজো। ভক্তের ভক্তিনম্র ডাক পাষাণ-প্রতিমার প্রাণে সাড়া জাগায় কিনা জানি না, তবে এমন করেই কেটে যায় বর্ষার দুঃসহ পরিবেশ। মাটির বুকে জেগে ওঠে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশফুল। হাতছানি দিয়ে তারা যেন ডাকে শরতের মেঘদলকে। টুকরো টুকরো মেঘও তাই মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে কাশফুলের শুভ্র অঙ্গে স্নেহের পরশ দেয়–নেমে আসে একপশলা বৃষ্টি। নির্মল আকাশের বুকে বকের ঝাঁক উড়ে চলে শরৎকে অভিনন্দন জানাতে। শুভ মুহূর্তে ধরণির বুকে নেমে আসেন দশপ্রহরণধারিণী মা। গ্রামের প্রান্তে প্রান্তে আনন্দের বন্যা ছুটে চলে। থিয়েটারে, নাচে, গানে, ঢাকের বাজনায় বছরের জমানো ক্লেদ যেন পরিষ্কার হয়ে যায়, মায়ের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মায়ের বিদায়ে সান্ত্বনা দিতে হেমন্তে উঠে আসেন ধান্যলক্ষ্মী। নবান্নের উৎসবে আবার নতুন করে আলপনা পড়ে দুয়ারে দুয়ারে। মঙ্গলঘটের ওপর ধানের গুচ্ছ রেখে পুজো সারা হলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে উৎসবের ভাগী হতে হয়। আস্তে আস্তে শীতের আমেজ পাওয়া যায়। পৌষ-সংক্রান্তিতে রাখালদের বাস্তু পুজো’র লোকসংগীত সারাদেশ ধ্বনিত করে। তার পরেও আছে পিঠেপুলি, চড়কপুজোর হইহই। এমনি করেই বছরের বারোটা মাস ঘুরে ঘুরে আসে ছোটো গ্রামখানির বুকের ওপর এবং তারা চিহ্নও রেখে যায় নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের।

মনে পড়ে গ্রামের ডাকঘরটিকে। সারাদুনিয়ার পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্ষুদ্র ঘরটি। তার পাশেই দাঁতব্য চিকিৎসালয়, ছেলে-মেয়েদের হাই স্কুল, মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়। সংস্কৃত শিক্ষার্থীদের জন্যে টোল। তা ছাড়াও আছে পল্লি পাঠাগার ও ক্লাব। গ্রামটি স্বয়ংসম্পূর্ণ।

মাঝখানে একবার গিয়েছিলাম আমার ছেড়ে-আসা গ্রামের লাল মাটিতে। নজরে পড়ে গেল বাঁশবাগানের মাঝে পুরোনো মসজিদটার ওপর। দু-ধারের দুটি অশ্বত্থ গাছের চাপে অবস্থা তার বিপর্যস্ত। মনে হয় মুসলমানরাই এখানে প্রাচীন। পরে ক্রমশ হিন্দুপল্লি গড়ে উঠেছে এবং হিন্দুধর্মের নিদর্শন ছড়িয়ে পড়েছে এধারে-ওধারে। তালন্দের শিবমন্দিরের নাম ডাক আছে–তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি জনশ্রুতিতে,

বিল দেখিস তো ‘চলন’
আর শিব দেখিস তো ‘তালন’।।

গ্রামের মুসলমানরাও ছিল আমাদের আপনজন। পুজো-পার্বণে এদের অনেক সাহায্য পেয়েছি। গ্রামের কাজে এরা করেছে সহযোগিতা। কিন্তু আজ? একসুরে বাঁধা বীণার তার কোথায় যেন ছিঁড়ে গেছে। তাই আজ সুরহীন হয়ে পড়েছে সব। প্রাণমাতানো সংগীতের মীড়ে কোথায় যেন ঘটেছে ছন্দপতন। যে ক-দিন ছিলাম গ্রামে, গমকে গমকে এই কথাটাই প্রাণের ভেতর বেজেছে বেশি করে।

স্কুল দুটি প্রাণহীন, পাঠাগার অগোছালো, ক্লাবঘর স্তব্ধ; হাট, ঘাট ও মাঠে বিষাদের সুর। সারাগ্রামখানিই যেন ছেড়ে-যাওয়া একটা বাড়ি, স্থানে স্থানে পড়ে রয়েছে ছেঁড়া কাগজ, জিনিসপত্রের টুকরো–উঠে-যাওয়া বাসিন্দাদের অবস্থানের চিহ্ন।

শুধু একজনকে দেখলাম গ্রাম ছেড়ে চলে যাননি। তিনি হচ্ছেন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ দাদু। মাটি-মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার তুলনা হয় না। প্রাণের মায়ায় মাটি ছেড়ে গিয়ে জন্মভূমিকে যারা ব্যথিত করেছে, তাদের দলে দাদু নন। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন মানুষের শুভবুদ্ধির আশায়। তিনি যে দেশকে ভালোবাসেন।

তাঁর সম্বন্ধে অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা মনে পড়ে। মনে পড়ে রাস্তা ছায়াচ্ছন্ন করবার জন্যে নিজের হাতে তাঁর গাছ লাগানোর কথা। যাতায়াতের সুবিধের জন্যে নিজের জমি কেটে রাস্তা করার কথা। গরিব কৃষকদের জন্যে কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার কথা। জনসাধারণের প্রত্যেকটি ভালো কাজে দেখেছি তাঁর মঙ্গল হস্তের স্পর্শ। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে একবার ঠিক হয়েছিল, কিছু চাঁদা তুলে তাঁর স্মৃতিভান্ডারে পাঠানো হবে। দাদু শুনে বললেন—’টাকা পাঠাবে সে তত ভালো কথা। কিন্তু সেখানে টাকা পাঠাবার জন্যে অনেক বড়োলোক রয়েছেন। তোমাদের এই সামান্য টাকা সেখানে না পাঠিয়ে, তাই দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বই কিনে সবাইকে পড়াও। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। তবেই তো এরা বুঝবে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কী ছিলেন।’ তাঁর কথা তখন কেউ শোনেননি। আত্মকেন্দ্রিক বলে সবাই তাঁর কথা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ কিন্তু তাঁর সে-কথার মর্মার্থ বেশ বুঝতে পারছি।

তিনি আধুনিক বাণীসর্বস্ব নেতাদের মতো বিশ্বপ্রেমিক না হতে পারেন, কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম যে খাঁটি, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

গ্রামের দেওয়ালে দেওয়ালে বর্ণপরিচয়ের প্রথম পাঠ তিনি লিখে দিয়েছিলেন জবাফুলের সাহায্যে। সংখ্যাতত্ত্বের পাঠও ছিল তার সঙ্গে। উদ্দেশ্য গণশিক্ষার প্রসার। গরিব কৃষকদের বই কিনে স্কুলে পড়া না হতে পারে, কিন্তু দেওয়ালের বড়ো বড়ো অক্ষরগুলো পড়ে অনায়াসেই তারা শিখতে পারবে মাতৃভাষা। পাঠাগারের গায়ে তিনি লিখে দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের মাতৃমন্ত্র–বন্দেমাতরম। রাস্তার ওপরেই ছিল তাঁর বাড়ির চওড়া দেওয়াল। ওটাই হল দাদুর প্রচারকেন্দ্র। প্রায় দিনই দেখা যেত পঞ্চমুখী জবাফুল দিয়ে দাদু ওই দেওয়ালের গায়ে প্রাণ ঢালা ভাষায় লিখে চলেছেন গ্রামের খবর। সেই সঙ্গে থাকত কোথায় রাস্তা করতে হবে, গ্রামের কোন পুলটার মেরামত প্রয়োজন, কৃষকরা ঋণ পেয়ে কী করবে ইত্যাদি। এ ছাড়াও ছিল তাঁর চিঠিপত্র লেখা ও বৈঠকে ছোটো ছোটো বক্তৃতা দেবার বাতিক। এমনি করেই দেশসেবায় তিনি নিমগ্ন থাকতেন সবসময়, আর থাকবেনও জীবনের বাকি ক-টা দিন। দাদুর অর্থপ্রাচুর্য নেই, দল নেই, দলীয় প্রচারপত্রও নেই, কিন্তু যে-জিনিসের তিনি অধিকারী সে-জিনিসেরই আজ বড়ো বেশি অভাব। সে হচ্ছে তাঁর হৃদয়। বাংলার গ্রামের মানুষের সেই হৃদয় আজ হারিয়ে গেছে। সেই হৃদয়কে আবার উদ্ধার করতে হবে।

.

বীরকুৎসা

বীরকুৎসা কি কোনো গ্রামের নাম হতে পারে? যদিও-বা হয় তাহলে কী করে এ নাম হল সে-সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের জবাব হয়তো দিতে পারতেন গ্রামের প্রাচীন প্রাজ্ঞরা। কিন্তু আমার তা জানা নেই। তবু আমার গ্রামের নাম বীরকুৎসা। রাজসাহী জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। আজ তার ইতিবৃত্ত বলতে বসে কেবলই মনে প্রশ্ন যাগে, সে গ্রাম কী করে এরই মধ্যে এত দূরের হয়ে গেল! ভাবতে কষ্ট হয়, তবু ভাবি। এখনও যেন স্পষ্ট দেখতে পাই ভোর হয়ে আসছে গ্রামের দিগন্তে। জেগে উঠেই দেখতাম তছির সর্দার আর শুকাই প্রামাণিক লাঙল কাঁধে নিয়ে সেই কুয়াশা-ছড়ানো নরম ভোরের আলো-আঁধারিতে গোরু নিয়ে চলেছে মাঠে। ওপাড়ার নলিন জেলে জনকয় সঙ্গী নিয়ে খুব বড়ো একটা বেড়াজাল কাঁধে ফেলে শীতে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে চলেছে আত্রাই নদীর দিকে। এ সবই আজ আমার কাছে অতীত। অনেক দূরের ব্যাপার। তবু তো থেকে থেকে মন বলে, চলো সেখানেই যাই।

শহরে সময় চলে দৌড়ে, গ্রামে যেন তার কোনো তাড়াই নেই। ধীরেসুস্থে গড়িয়ে যায় প্রহরের পর প্রহর। ভোরের সূর্য ওঠে। পাশের গ্রাম দুর্লভপুরের উঁচু বটগাছটার মাথার ওপর দিয়ে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে বীরকুৎসার আনাচে-কানাচে। দেখতাম ওপাড়ার পূর্ণ সাহা কম্বল মুড়ি দিয়ে নিমের ডালে দাঁত ঘষতে ঘষতে আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াত। আর এ বছরের শীত যে খুব বেশি এবং গত আট-দশ বছরের মধ্যে তার কোনো তুলনা পাওয়া যায় কি না তারই ব্যর্থ আলোচনা নিয়ে সকালটা মাত করে রাখত। শহরে এসে যেদিকে তাকাই মানুষের হাতে গড়া ইট, কাঠ, পাথরের সৌধ। কিন্তু গ্রাম যেন মানুষের গড়া নয় প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে সে যেন আপনাতে আপনিই বিকশিত। নরম মাটির গন্ধ, ভাঁটফুল, বনতুলসী আর ঘেঁটু ফুলের আরণ্যক সমৃদ্ধি মনকে এমনিতেই কেমন জানি উতলা করে রাখত।

বাড়ির দক্ষিণ দিকে ছিল ছোটো একটি খাল। বর্ষায় সেই বিশীর্ণ খালে আসত যৌবনের জোয়ার। উত্তরবঙ্গের মাঝিরা যে খাল বেয়ে যেত গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। নৌকার লগি ঠেলার আর বৈঠার টানের শব্দে কত রাত্রে ঘুম যেত ভেঙে। মনে হত গ্রাম মৃত্তিকার স্পন্দন-ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি বুকের কাছটিতে।

গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ আশু দাদুর প্রকান্ড বৈঠকখানায় প্রতিসন্ধ্যায় বসত তরুণদের জলসা। সর্বজনীন কালীপুজো, দুর্গাপুজো প্রভৃতি উৎসব উপলক্ষ্যে যাত্রা, থিয়েটারের গৌরচন্দ্রিকা অর্থাৎ মহড়া চলত সেখানে। পাঁচন মোল্লা, সরিতুল্লা, বৈদ্যনাথ আর ফকির পাল প্রভৃতি হিন্দু-মুসলমান মিলে যাত্রা গান প্রভৃতি অনুষ্ঠানে মেতে থাকত। সেদিন তো কোনো বিচ্ছেদ, বিভেদের প্রশ্ন ওঠেনি! বাহারদা ছিলেন বাঁশি বাজাতে ওস্তাদ। তাঁর বাঁশের বাঁশির সুরযোজনা গ্রামবাসীকে মুগ্ধ করেছে কত অলস অপরাহ্ন,ে কত সন্ধ্যায়। তিনি মুসলমান ছিলেন বলে তো হিন্দুর উৎসবে তাঁর আমন্ত্রণ বাদ পড়েনি আনন্দ পরিবেশনে? গ্রামের পোস্টমাস্টার ধীরেন মজুমদার ও পুরোহিত রুক্মিণী চক্রবর্তী ছিলেন রসিকপ্রবর। এঁদের মুখে সত্যি-মিথ্যে অতিরঞ্জিত কাহিনি শোনবার জন্যে গ্রামবাসীরা সাগ্রহে ভিড় করত। এঁদের সকলকে নিয়েই তো গ্রাম। তাঁদের ভুলি কী করে?

স্কুলের মাঠে খেলাধুলোর প্রায় সকলরকম ব্যবস্থাই ছিল। স্টেশনের অদূরে কুঁচেমারা’ নামে একটি রেলের সাঁকোর ওপরে ভিড় জমত ছেলে-বুড়ো অনেকেরই। এই আড্ডাটির লোভ সংবরণ করতে পারত না কেউ। শত কাজ ফেলেও সন্ধের দিকে কুঁচেমারা’ সাঁকোর কাছে যাওয়া চাই-ই। চমৎকার সে জায়গাটির পরিবেশ। একধারে সবুজ গ্রাম, আর একধারে বিস্তীর্ণ মাঠ। সূর্যাস্তের সময় কবিগুরুর কথা মনে হত– সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে। সাঁকোর তলা দিয়েই চলে গেছে খাল। সেখানে জেলেরা খেয়া পেতে মাছ ধরত। বড়ো বড়ো নৌকা পাল তুলে চলে যেত অনবরত। কোনো কোনো নৌকা জেলেনৌকার পাশে ভিড়িয়ে মাছ কিনে নিত।

গ্রামের জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে অতীতকালের সাক্ষী রয়েছে এক বিরাট বকুলগাছ। চিরদন্ডায়মান গাছটি পথক্লান্ত পথিকদের যেন আহ্বান জানায়। গাছের তলাটি বহুদিন আগে জমিদার বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। বিরাট বাঁধানো বেদির ওপর কেউ কেউ তাস পাশা খেলায় মগ্ন থাকত, ছেলেরা ছক কেটে বকুলের বিচি সাজিয়ে ‘মোগল পাঠান’ প্রভৃতি খেলায় জমে যেত। ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা বকুল ফুলের মালা গাঁথবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে ফুল কুড়োত।

নিকটেই ছিল ডাকঘর। ডাক-হরকরার প্রতীক্ষায় যুবক-বৃদ্ধ সবাই গাছটার তলায় জড়ো হত এবং ডাক পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গেই দু-তিনখানা পত্রিকা নিয়ে বকুলতলার আড্ডার প্রথমপর্ব শেষ করত। সংবাদপত্রের খবর নিয়ে মাঝে মাঝে বচসাও হত। এখন সেই বেদিটিতে বড়ো বড়ো ফাটল ধরেছে, সেখানে খবরের কাগজও আর পড়া হয় না, বকুলফুলও আর ছেলে-মেয়েদের আকর্ষণ করে না।

বৈশাখে একমাস ধরে ‘নগর-কীর্তন’–এপ্রথা বহুকালের। গ্রামের প্রান্তরে এক ঘন জঙ্গলে বুড়ো কালীর বাঁধানো বেদি এবং তারই পাশে প্রকান্ড এক শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত। সেখান থেকে ‘নগর-কীর্তন’ আরম্ভ হয়ে নানা পথ ঘুরে আশু দাদুর মন্ডপে এসে শেষ হত। এতে কিশোরী চৌকিদার, জহিরউদ্দিন প্রভৃতি মুসলমানরাও যোগ দিত। এদের গাইবার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। গ্রামে মহরমের মেলায় ‘তাজিয়া’ শোভাযাত্রায় রমেশ, টেপা প্রভৃতির লাঠি খেলা দর্শকদের অবাক করে দিত। তখন কেউ জানত না হিন্দু-মুসলমান দুটো পৃথক জাত। একটা মিথ্যেই শেষে সত্যি হল।

মাতব্বর হালিম চাচা সকালে কাশতে কাশতে বাজারে এসে গল্প জুড়ে দিতেন। তাঁর কথা বলার একটা অদ্ভুত ভঙ্গি ছিল। সব কথা সত্যি না হলেও কথার প্যাঁচে সবাইকে স্বমতে নিয়ে আসতেন। শান্তাহারের হাঙ্গামার পর যখন গ্রামকে গ্রাম হিন্দু-শূন্য হতে লাগল তখন তিনি কেঁদে কেঁদে বললেন–বাবা কালা, মদা তুরা য্যাস না, আমরা গাঁয়ে থাকতে আল্লার মর্জিতে তুদের কিছু হবে না…। কিন্তু গ্রামের লোক সেদিন তাঁর কথায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। গ্রাম ছেড়ে আসার দিন আমার প্রিয় বন্ধু আহমেদ মিয়াও আমাকে বলেছিল–ভাই, তুইও আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছিস? এই কথাটির মধ্যে যে কত ব্যথা লুকোনো ছিল তা একমাত্র আমিই জানি। আজও মনে হয় হালিম চাচার, আহমেদ মিয়ার করুণ স্নেহ-সম্ভাষণ। আমাদের মাঝখানের এই দুস্তর ব্যবধান একদিন ঘুচবেই। মিথ্যে তো কখনো সত্যি হতে পারে না!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *