০১. স্নিগ্ধ গম্ভীর কণ্ঠস্বর

কার্ডস্ অন্ দি টেবিল (এরকুল পোয়ারো)

০১.

মঁসিয়ে পোয়ারো!…

আমেজ স্নিগ্ধ গম্ভীর কণ্ঠস্বর। যেন কেউ ইচ্ছে করেই মৃদু তারের ঝঙ্কার তুলল বাতাসে তবে সে শব্দ-তরঙ্গ শ্রুতিকটু নয়।

এরকুল পোয়ারো ফিরে দাঁড়ালেন।

 মাথা নত করে অভিবাদন জানালেন। হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন উচ্ছ্বসিত ভাবে।

তাঁর দু’চোখে শিকার বেড়ালের সন্ধানী দৃষ্টির ছায়া। স্নায়ুতন্ত্রীগুলো যেন হঠাৎ কিসের গন্ধ পেয়ে একযোগে সজাগ হয়ে উঠেছ। এধরনের অনুভূতির আস্বাদ জীবনে খুব কম সময়েই পাওয়া যায়।

–আসুন… আসুন কিঃ শ্যাতানা।

দুজনে মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন পরস্পরের দিকে। দেখলে মনে হয়, দুই মল্লযোদ্ধা আসন্ন সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন।

তাঁদের আশপাশ দিয়ে ভব্যসভ্য নিষ্প্রাণ জনতা মন্থর পদবিক্ষেপে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। মৃদু সুরেলা বা অস্পষ্ট ঘড়ঘড়ে, টুকরো টুকরো কণ্ঠস্বর থেকে থেকে কানে এসে লাগছে।

-এই, দেখো দেখো, কি চমৎকার! …

 –সত্যিই, তুলনা হয় না। না গো?

ঘটনাস্থল ওয়েসেক্স হল। লন্ডন হসপিটালের সাহায্যার্থে শিল্পকলামন্ডিত নস্যির কৌটো প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। দর্শনী এক গিনি।

–আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া আশাতীত সৌভাগ্যের কথা! শান্ত সংযত স্বরে বললেন মিঃ শ্যাতানা। এখন বোধহয় হাতে তেমন খুন-খারাপি মামলা নেই? অপরাধজগতের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে উঠেছে দেখছি। নাকি এই ওয়েসেক্স হলেই কোনো ডাকাতি ঘটতে চলেছে? …দৃশ্যটা তাহলে তো জমজমাট হয়!

–আপনাকে খুশি করতে পারলাম না বলে বিশেষ দুঃখিত। পোয়ারোর ঠোঁটের ফাঁকে মৃদু হাসির আভাস। ব্যক্তিগত খেয়ালেই আজ এখানে হাজির হয়েছি।

মিঃ শ্যাতানার মনোযোগ ততক্ষণে অন্যদিকে আকৃষ্ট হয়েছে। পাশ দিয়ে চলমান এক ক্ষীণকটি সুন্দরীকে হাত নেড়ে থামিয়ে দিলেন। –কি ব্যাপার? সেদিন আমার পার্টিতে এলেন না কেন? পার্টিটা অবশ্য সত্যিই খুব উপভোগ্য হয়েছিল। অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেকথা আমায় জানিয়ে গেছে।

তন্বী সুন্দরী ঈষৎ আধো আধো সুরে তার অনুপস্থিতির কারণ বোঝাতে লাগলেন। পোয়ারোও সেই অবসরে ভদ্রলোককে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে নিলেন। তার দৃষ্টি বিশেষভাবে মিঃ শ্যাতানার রেশম কালো গোঁফ জোড়াটার দিকেই নিবদ্ধ।

এমন সুচারু গোঁফজোড়া সচরাচর দেখা যায় না। সত্যিই খুব সুন্দর। সম্ভবত গোটা লন্ডনে এই একটিমাত্র গোঁফই পোয়ারোর গোঁফের সঙ্গে তুলনায় আসতে পারে।

যদিও ওটা অত জমকালো নয়। মনে মনে বিড়বিড় করলেন তিনি। সবদিক দিয়েই তার চেয়ে অনেক নিম্নমানের। তাহলেও গোঁফ জোড়াটার একটা বৈশিষ্ট আছে, যা সহজে নজর কেড়ে নেয়।

শুধু গোঁফ দিয়েই নয়। মিঃ শ্যাতানা সম্পূর্ণভাবেই দর্শনীয় বিষয়বস্তু। নিজেকে সেইরকম করেই গড়ে তুলেছেন। যেন প্রবীণ শয়তানের প্রাজ্ঞ অনুচর। পাতলা গড়ন। ঈষৎ লম্বাটে মুখে বিষাদঘন ভাবালুতা। গভীর কৃষ্ণবর্ণের ভ্রুজোড়া ধনুকের মতো বক্র। নাকের নীচে মসৃণ গোঁফজোড়ার দুই প্রান্ত মোম দিয়ে মাজা। সম্ভ্রান্ত পোষাক-পরিচ্ছদে বনেদি দরজির হাতের ছাপ। তবে তার মধ্যেও একটা বৈসাদৃশ্যের ঝোঁক সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ধরা পড়ে।

কোনো সুস্থ ভদ্রলোকই মিঃ শ্যাতানাকে সহজ চোখে দেখেন না। সকলেই তাঁর ওপর বীতশ্রদ্ধ। তাঁর সঙ্গে দেখা হলেও তাদের মনের মধ্যে একটা বুনো আদিম বাসনা দাপাদাপি শুরু করে। ইচ্ছে হয়, দিই পেছন থেকে প্রচন্ড এক লাথি কষিয়ে!

তাদের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যারা অবশ্য এতটা পাশবিক নন। তারা কিছুটা অন্য সুরে কথা বলেন। ভদ্রলোক যে সত্যিই ভয়ঙ্কর, এ তো জানা কথা। কিন্তু কি অগাধ ধনী! মাঝে মাঝে সকলকে ডেকে সুন্দর সুন্দর পার্টি দেন। আর সেই সমস্ত পার্টিতে যখন অপরের গুপ্ত কেলেঙ্কারি কথা রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশন করেন, তখন কি মজাই না লাগে!

মিঃ শ্যাতানা আর্জেন্তিয়ান, পতুগীজ, গ্রীক না অন্য কোনো জাতির লোক সে সম্বন্ধে, কারো কিছু জানা নেই। তবে তিনটি বিষয় সম্বন্ধে সকলেই সবিশেষ পরিচিত।

ভদ্রলোক পার্ক লেনের একটা বিরাট জমকালো ফ্ল্যাটে মহা আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে বাস করেন।

মাঝে মাঝে তিনি নানা রকমের পার্টি দেন। পার্টির আয়তন কখনো ছোট, কখনো বড়। কোনো পার্টি আবার বিশেষ অদ্ভুত ধরনের। কখনো কখনো নিমন্ত্রিতের তালিকায় কেবল কতিপয় বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিই স্থান লাভ করেন। তবে তার প্রত্যেক পার্টির মধ্যেই, একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে।

তৃতীয়ত, ভদ্রলোকের ব্যক্তিত্ব এমনই যে তাঁকে দেখলেই সকলে কেমন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন।

এই শেষেরটির কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। সকলের ধারণা, অনেক বিষয়েই ভদ্রলোকের দৃষ্টি প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজ করছে। তাদের সমস্ত গোপন বৃত্তান্তই শ্যাতানার নখদর্পণে। তাছাড়া তাঁর রসিকতার ধরণটাও কেমন অদ্ভুত। তাই সকলে সভয়ে তাঁকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে।

আজ বিকেলে তার কৌতুকপ্রবণতা খর্বাকৃতি পোয়ারোকে কেন্দ্র করেই গজিয়ে উঠল। তাহলে দেখা যাচ্ছে গোয়েন্দাদেরও অবসর বিনোদনের প্রয়োজন আছে?

পোয়ারো শান্তভাবে মৃদু হাসলেন। বললেন–তালিকায় দেখলাম, আপনিও তিনটে নস্যির কৌটো প্রদর্শনীতে ধার দিচ্ছেন?

মিঃ শ্যাতানা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন। এদিন-ওদিক থেকেই এইসব তুচ্ছ বস্তুগুলো সংগ্রহ করেছিলাম।…একদিন আমার ফ্ল্যাটে আসুন না;আপনাকে অনেক আকর্ষণীয় জিনিস দেখাতে পারব। অবশ্য আমার সংগ্রহশালা কোনো বিশেষ বিষয় বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।…

আপনি দেখছি অনেকটা প্রাচীনপন্থী ক্যাথলিক মনোভাবাপন্ন!

পোয়ারো তখনও তার গোঁফের ফাঁকে বাঁকা হাসির রেখাঁটিকে ধরে রেখে দিয়েছেন বলেন।

মিঃ শ্যাতানার চোখের তারা দুটো হঠাৎ কেমন অদ্ভুতভাবে নেচে উঠল। ঠোঁটের কোণে মৃদু কুঞ্চনের তরঙ্গ। ভ্রুজোড়া তির্যক ভঙ্গিতে দুদিকে ঝুলে পড়েছে। এমনকি, বিশেষভাবে আপনার চিত্তাকর্ষক অনেক কিছুই আমার সংগ্রহশালায় দেখতে পাবেন।

কেন, আপনি কি ফ্ল্যাটের মধ্যে খুন ডাকাতির জাদুঘর তৈরি করে রেখেছেন?

শ্যাতানার প্রস্তরকঠিন মুখের আড়ালে অবজ্ঞা আর কৌতুক। ওসব ছোটোখাটো ব্যাপারে আমি নজর দিই না। কোনো পেয়ালায় বিষ মিশিয়ে কে কাকে খুন করল বা প্রথিতযশা কোনো সিদেল চোর কাজের সময় কোন সিঁদকাঠি ব্যবহার করত–এ সমস্তই আমার কাছে খুব ছেলেমানুষি বলে মনে হয়। ওই ধরনের বাজে জঞ্জাল দিয়ে জাদুঘর ভরাতে আমার কোনো প্রবৃত্তি নেই। আমার সংগ্রশালায় কেবল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দ্রষ্টব্যগুলোই স্থান পেয়ে থাকে।

অপরাধ জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ দ্রষ্টব্য বস্তু বলতে আপনি তাহলে কি মনে করেন?

মিঃ শ্যাতানা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে পোয়ারোর দু’কাঁধে মৃদু আঙুলের চাপ দিলেন। তারপর গলা নামিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন, আমি তাদের কথাই বলছি, যারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ খুনি!

পোয়ারো ভ্রুজোড়া ঈষৎ কুঞ্চিত হল। শ্যাতানা সেদিকে নজর দিলেন না। আপন উচ্ছ্বাসে বলে চললেন, আমি হয়তো আপনাকে চমকে দিয়েছি।… কিন্তু মনে রাখবেন, আমাদের দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। সম্পূর্ণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ঘটনাটা নিরীক্ষণ করি। খুন হচ্ছে আপনাদের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এর পরবর্তী কার্যপদ্ধতিও সব ছকে বাঁধা। আপনারা অকুস্থলে হাজির হবেন, পারিপার্শ্বিক পর্যবেক্ষণ করবেন হয়তো কোনো সূত্রের সন্ধান পেতে পারেন। এবং পরিশেষে, যেহেতু আপনি একজন প্রকৃতই সুদক্ষ গোয়েন্দা, অপরাধীর বিচার ও শাস্তি। কিন্তু এ ধরনের তুচ্ছ ব্যাপারে আমি আগ্রহী নই! এরা হচ্ছে অপরাধ জগতের নিকৃষ্ট শ্রেণির উদাহরণ। ইতিহাস এইসব হতভাগ্যের কপালে কেবল ব্যর্থতার গ্লানিমাই এঁকে দিয়েছে। ..আমি শুধু তাদের কথাই বলছি, যাদের ললাটে সাফল্যের জয়টিকা! তারাই হচ্ছে অপরাধ জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী।

সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী? …অর্থাৎ…?

হ্যাঁ, যারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকেও নির্বিঘ্নে তাদের কাজ হাসিল করে গেছে। যাদের ইতিহাস কেবল সফলতায় ভরা কোনো ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ পর্যন্ত এই সমস্ত অপকীর্তির বিন্দুবিসর্গ জানে না। …খবরটা যে খুব উপভোগ্য তা নিশ্চয় স্বীকার করবেন।

শখ! পোয়ারো যেন তড়িতাহত হলেন।

মিঃ শ্যাতানা থামলেন না। নিজের আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলেন! একটা ভালো আইডিয়া মাথায় এসেছে। আপনি একদিন সন্ধ্যাবেলা আমার ফ্ল্যাটে আসুন। সেই সঙ্গে আমার প্রদর্শনীর দ্রষ্টব্য বস্তুগুলিও দেখে যাবেন। সত্যিই ব্যাপারটা খুব মজার হবে! কেন যে এতদিন এই ধারণাটা আমার মগজে উদয় হয়নি, সে কথা ভেবে এখন অবাক হয়ে যাচ্ছি। …হা ঠিক আছে; আমি যেন দিব্যদৃষ্টির সাহায্যে সবকিছু পরিষ্কার দেখেতে পাচ্ছি, তবে তার আগে অল্প দু-চারদিন সময় চাই। আগামী সপ্তাহে হবে না, তার পরের সপ্তায়। আপনি নিশ্চয় একটু অবসর করে নিতে পারবেন। …কবে আপনার সময় হবে, বলুন।

আপনার সুবিধেমতো যে-কোনো দিনই ঠিক করতে পারেন। মৃদুস্বরে সায় দিলেন পোয়ারো।

তাহলে শুক্রবার। আঠারো তারিখ, শুক্রবার…মনে রাখবেন। আমিও তারিখটা আমার পকেট-ডায়েরিতে নোট করে নিচ্ছি। …সত্যিই প্ল্যানটা এত চমৎকার!

আমার কাছে অতটা চমৎকারবোধ হবে কিনা সন্দেহ! পোয়ারো স্নানকণ্ঠে মনের কথা ব্যক্ত করলেন। অবশ্য আমি আপনার আতিথেয়তাকে বিন্দুমাত্র কটাক্ষ করছি না…কোনোমতেই সেরকম ভাববেন না…।

মিঃ শ্যাতানা হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, এটা আপনার বুর্জোয়া মনোবৃত্তিতে আঘাত করে, এই তো? কিন্তু এই পুলিশ চিন্তাধারার মধ্যে একটা সীমাবদ্ধতা আছে। প্রত্যেক বুদ্ধিমান লোকেরই এই ক্ষুদ্রতার মায়া কাটিয়ে ওঠা উচিত।

খুনের ব্যাপারে আমি যে পুরোপুরি বুর্জোয়া মনোভাবাপন্ন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু কেন? একট নোংরা খারাপ ঘৃণ্য কাজ–তাই বলে? ..হ্যাঁ, আপনার কথা আমি স্বীকার করছি। তবে জেনে রাখবেন, একটা নৃশংস খুনও খুবই নিখুঁতভাবে শিল্পসম্মত হতে পারে এবং তা একমাত্র দক্ষ শিল্পীর দ্বারাই সম্ভব।

আপনার কথা মেনে নিলেও…তবে কেন?… মিঃ শ্যাতানার কণ্ঠে ক্ষুব্ধ জিজ্ঞাসা।

প্রকৃতপক্ষে সে একজন খুনিই। এ সত্য অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু মঁসিয়ে পোয়ারো, কেউ যদি কোনো কাজ নিখুঁত শিল্পসম্মত উপায়ে সমাধা করতে পারে তবে তাকে নিশ্চয়ই পুরস্কার দেওয়া উচিত। সব খুনিকেই হাতকড়া পরিয়ে ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে হবে, দূরদর্শিতার অভাব থেকেই আপনার মনে এমন ধারণার উদ্ভব হয়েছে। আমার মতে সরকারের তরফ থেকে এইসব খুনির জন্য বিশেষ ভাতার বন্দোবস্ত থাকা প্রয়োজন। প্রত্যেক সভ্য নাগরিকের কর্তব্য, এদের মহা সমারোহে সান্ধ্যভোজে আপ্যায়িত করা।

পোয়ারো মাথা দোলালেন। এই ব্যাপারে আমি আপনার মতো অতটা শিল্পরসিক নই। আমি এদের হাতের কাজের প্রশংসা করি; আবার চিড়য়াখানার একটা ডোরাকাটা বাঘও আমার সম্প্রসংশ দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। তবে বাঘটাকে যতক্ষণ খাঁচার বাইরে থেকে দেখি ততক্ষণই সে আমার আনন্দের ইন্ধন জোগায়। তাই বলে আমি খাঁচার ভেতরে কখনো ঢুকব না। কারণ, আপনি নিশ্চয়ই জানেন বাঘ লাফাতে পারে!

শ্যাতানা উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠলেন। তাই বুঝি? আর খুনি…?

আবার খুন করতে পারে! পোয়ারোর কণ্ঠস্বর বিষাদগম্ভীর।

 কি সাংঘাতিক সাবধানী লোক আপনি!…তাহলে হয়তো আমার ব্যাঘ্র প্রদর্শনীতে আসছেন না?

না না, ঠিক এর বিপরীত। প্রবেশের অনুমতি পেলে নিজেকে চিরকৃতার্থ মনে করব।

বীরপুরুষ বলতে হবে।

মিঃ শ্যাতানা, আপনি আমার ওপর ভরসা করতে পারছেন না। এই ব্যাঘ্র প্রদর্শনীকে আপনি উপভোগ্য বলে মনে করছেন, আমার মতে এটা ভয়ঙ্কর। কথাগুলো হয়তো ভীরু মনের সাবধানবাণীর মতো শোনাবে। কিন্তু খুনিদের নিয়ে খেলা করবার কোনো বাসনা যদি জেগে থাকে তবে তা নিশ্চিতভাবেই খুব বিপজ্জনক। আমি আপনাকে নিষেধ করছি আপনি খুব মারাত্মক নেশায় মেতে উঠেছেন…!

উদ্ধৃত ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন মিঃ শ্যাতানা। তবে ওই দিনই ঠিক রইল।

হ্যাঁ…আঠারোই। অজস্র ধন্যবাদ…

ওই দিন একটা পার্টির আয়োজন করব। ভুলবেন না, রাত আটটায়…

মিঃ শ্যাতানা বিদায় নিয়ে সামনের দিকে এগোলেন। পোয়ারো অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন পেছন থেকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ালেন। সারা মুখে চিন্তাকুটিল অন্ধকার।

উর্দিপরা খানসামা নিঃশব্দে মিঃ শ্যাতানার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ধরল। পোয়ারো ভেতরে ঢুকলেন। সেই একই রকম নিঃশব্দে দরজা ভেজিয়ে বুড়ো খানসামা এবার পোয়ারোর দিকে এগিয়ে এলো। পোয়ারো তার মাথার টুপি গায়ের ওভারকোটের হাত থেকে নিস্তার পেলেন। 

বাবুকে কি নাম বলব? বিনীত কণ্ঠে প্রশ্ন করল খানসামা।

মিঃ এরকুল পোয়ারো।

খানসামা অদৃশ্য হল। ভেতর থেকে মৃদু কলগুঞ্জন বাতাসে ভেসে আসছে। ক্ষণকাল পরেই মিঃ শ্যাতানা বেরিয়ে এলেন। বাঁহাতে ধরা শেরীর গ্লাস; সহজাত নিখুঁত পোষাক পরিচ্ছদ। সর্বদাই টিপটপ। তার মধ্যে শয়তানির সূক্ষ্ম ভঙ্গিটি আজ একেবারে চরমে উঠেছে। দীর্ঘ ভ্রুজোড়া উদ্ধত ব্যঙ্গের ভারে কুঞ্চিত।

পোয়ারোকে মহাসমারোহে ভেতরে নিয়ে গেলেন শ্যাতানা। আসুন, সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।…ইনি হচ্ছেন শ্রীমতী অলিভার। চেনেন কি?

পোয়ারো পরিচিতের ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়লেন। শ্যাতানার বিদ্রূপপ্রাণ অন্তরে বিস্ময়ের মৃদু শিহরণ খেলে গেল।

গোয়েন্দা ও গল্পের লেখিকা হিসাবে ভদ্রমহিলার খ্যাতি সর্বজনবিদিত। অপরাধীর প্রবণতা, বিখ্যাত খুনিদের মানসিক গতিপ্রকৃতি, প্রেমের জন্য খুন বনাম লাভের জন্য খুন নামে গভীর তত্ত্বের কিছু প্রবন্ধও তিনি হাল্কা সুরে পরিবেশন করেছেন। তাঁকে খানিকটা মাথা পাগলা মহিলাও বলা চলে। বড় ধরনের কোনো খুন-খারাপির ব্যাপার ঘটলেই তিনি অকুস্থলে হাজির হবেন। আশপাশের পাঁচজনের কাছ থেকে খোঁজখবর সংগ্রহ করবেন। সম্ভব হলে সন্দেহজনক ব্যক্তিকে নিজে থেকে জেরা করতেও কসুর করবেন না। প্রায়শই তিনি একটি সখেদ মন্তব্য করে থাকেন, যদি কোনো মহিলাকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সর্বেসর্বা করা হত…।

মহিলাদের সহজাত অনুভূতি সোজা কথায় যাকে যশেন্দ্রিয় বলা হয়, তার ওপর তিনি প্রবলভাবে আস্থাবান।

সাদা চোখে শ্ৰীমতী অলিভারকে এমন কিছু চমকপ্রদ মনে হয় না। খুবই সাধারণ চেহারার মাঝবয়সি বিধবা ভদ্রমহিলা। পোশাক-পরিচ্ছদে পারিপাট্যের অভাব। দু’চোখের দৃষ্টি শান্ত অথচ গভীর। মাথায় ধূসর বর্ণের একরাশ ঝাঁকড়া চুল। এই চুল নিয়েই শ্ৰীমতী অলিভারের যত কিছু শখ শৌখিনতা। চুলগুলোকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কখনো তিনি মুখের ওপর বুদ্ধিজীবির ভাব ফুটিয়ে তোলেন, কখনো চুল বাঁধেন ম্যাডোনা ধাঁচের। কোনো সময় থোকা থোকা চুলের গুচ্ছ অবিন্যস্তভাবে মাথার ওপর ছড়িয়ে রাখেন। আজ তিনি চুলগুলো ঝালরের মতো মাথার পেছনে নামিয়ে দিয়েছেন।

ভদ্রমহিলা হাসিমুখে পোয়ারোকে সাদর অভিনন্দন জানালেন। এক সাহিত্য-সভায় ইতিপূর্বেই তাদের দুজনের আলাপ-পরিচয় হয়েছিল।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেলের সঙ্গে নিশ্চয় আপনার আলাপ আছে? ধীর গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন শ্যাতানা।

লম্বা চওড়া দীর্ঘদেহী ভদ্রলোক এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেলের মুখের ভাবে সর্বদাই একটা সুকঠিন গাম্ভীর্য ধরা থাকে। চেহারা দেখে মনে হয় খোদাই করা কাঠের মূর্তি। এবং সে কাঠও ইস্পাতের মতো মজবুত।

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সুচতুর অফিসারদের মধ্যে সুপারিটেনডেন্ট ব্যাটেলই সর্বশ্রেষ্ঠ। ভদ্রলোকের চোখের দৃষ্টিতে একটা নির্বোধ নিরাসক্তির ছায়া।

হ্যাঁ, মঁসিয়ে পোয়ারো আমার যথেষ্ট পরিচিত। সুপারিনটেনডেন্টের ঠোঁটের ফাঁকে অল্প হাসির আভাস খেলে গেল। তারপরই নিজেকে সংযত করে আগের মতো গম্ভীরভাবে বসে রইলেন।

কর্নেল রেস। শ্যাতানা আবার মুখ খুললেন।

 ভদ্রলোকের সঙ্গে ইতিপূর্বে পোয়ারোর কোনো চাক্ষুষ পরিচয় ছিল না। তবে ভদ্রলোক যে ব্রিটিশ সরকারের গুপ্তচর বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ ধুরন্ধর কর্মচারী এ কথা তিনি জাননে। সর্বদা বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ান। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। দেখলে অনেক কম বলেই মনে হয়। হাসিখুশি স্বাস্থ্যবান পুরুষ।

পোয়ারো এতক্ষণে মিঃ শ্যাতানার মনের গোপন অভিসন্ধির বিষয় যেন কিছুটা আঁচ করতে পারলেন। অতিথি নির্বাচনের ক্ষমতা আছে ভদ্রলোকের।

আমার অন্যান্য নিমন্ত্রিত এখনও এসে পৌঁছায়নি। হয়তো ভুল করে তাদের আটটা পনেরোয় ডিনারের টাইম দিয়ে ফেলেছি।

দরজা ঠেলে খানসামা প্রবেশ করল। ডাঃ রবার্টস…।

ডাক্তার রবার্টসের হাঁটা চলার মধ্যে একটা সহজ সাবলীল ভঙ্গি। ভদ্রলোক নিজেও যথেষ্ট প্রাণোচ্ছল। সবে যৌবনের সীমা পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছেন। মুখের তুলনায় চোখ দুটো অল্প ছোট। মস্তিষ্কের পশ্চাৎদেশে কিঞ্চিৎ টাকের প্রাদুর্ভাব ঘটতে শুরু করেছে। চেহারায় ঈষৎ স্থূলতার আভাস। পোশাক-পরিচ্ছদ নিখুঁতভাবে ঝকঝকে তকতকে। তিনি যে একজন বিচক্ষণ ডাক্তার এবং তার রোগ নির্ণয়ের মধ্যেও যে কেনো ভুল থাকে না, রুগীর মনে এ বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতেও ভদ্রলোক যথেষ্ট পারদর্শী।

আশা করি আমার খুব দেরি হয়ে যায়নি? মিঃ শ্যাতানার সঙ্গে করমর্দন করতে করতে সপ্রতিভ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন ডাঃ রবার্টস।

মিঃ শ্যাতানা তাকে অতিথির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিশেষভাবে সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেলের নাম শুনে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন তিনি।

আপনিই তো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বহু-আলোচিত মহাপুরুষ? এমন লোকের সঙ্গে আলাপ হওয়া খুবই ভাগ্যের কথা। আমি নিজেও অপরাধ জগতের সম্বন্ধে যথেষ্ট আগ্রহী। অবশ্য একজন ডাক্তারের পক্ষে এ-ধরনের মনোভাব পোষণ করা উচিত নয়। কথাটা জানতে পারলে আমার রুগীরা খুব নার্ভাস হয়ে পড়বে।

নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন ভদ্রলোক।

ভেজানো দরজা খুলে খানসামা উঁকি দিল। মিসেস লরিমার…

মিসেস লরিমারের বয়স ষাটের কাছাকাছি। ভব্যসভ্য পোশাক-পরিচ্ছদ। ধূসর বর্ণের মাথার চুল সুন্দরভাবে বিন্যস্ত। গলার স্বরও বেশ তীক্ষ্ণ।

এগিয়ে গিয়ে মিঃ শ্যাতানার সঙ্গে করমর্দন করলেন তিনি। তারপর ডাঃ রবার্টসের দিকে চেয়ে অল্প হাসলেন। বোঝা গেল তাদের দুজনের মধ্যে পূর্ব পরিচয় আছে।

মেজর ডেসপার্ড দীর্ঘকায় স্বাস্থ্যবান পুরুষ। কপালের এক পাশে একটা কাটার দাগ। তা না হলে তাঁর মুখশ্রী সত্যিই সুন্দর। আলাপ-পরিচয়ের পালা সাঙ্গ হলে তিনি কর্নেল রেসের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। নানা ধরনের শিকার সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা গল্প করতে লাগলেন দু’জনে।

আবার খানসামার আবির্ভাব ঘটল। মিস মেরিডিথ…

মিস মেরিডিথই সেদিনের শেষ অতিথি। বয়স বাইশ-তেইশের মধ্যে। সর্বাঙ্গে একটা বিষাদ-বিধুর কোমল শ্ৰী আছে। মাথার চুল ঈষৎ কটা। বড় বড় আয়ত দুই চোখ মুখে পাউডারের প্রলেপ থাকলেও প্রসাধনের প্রভাবে তাকে কৃত্রিম করে ভোলা হয়নি। গলার স্বরেও লাজুক লাজুক ভাব।

আমিই কি সবার শেষে এলাম। বিব্রত মুখে মিঃ শ্যাতানার দিকে ফিরে তাকালেন তিনি।

মিঃ শ্যাতানা তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে ভদ্রমহিলাকে সান্ত্বনা দিলেন। তারপর অন্যান্য অতিথির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন একে একে।

শেরীর গ্লাস হাতে ধরে মিস মেরিডিথ পোয়ারোর পাশে এসে বসলেন।

 নিষ্ঠাচারের ব্যাপারে আমাদের বন্ধু খুবই গোঁড়া প্রকৃতির। মৃদু চাপা কণ্ঠে কথা বললেন পোয়ারো।

মিস মেরিডিথ সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন। বললেন, আজকাল ভোজসভায় পরস্পরের মধ্যে পরিচয় ঘটিয়ে দেবার রীতি ক্রমশই উঠে যাচ্ছে। আশা করি আপনারা সকলেই সকলকে চেনেন,–এই ধরনের একটা ভাসা ভাসা কথা বলেই সাধারণত গৃহস্বামীরা তাদের কর্তব্য এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন।

আপনি হলে কি করতেন?

আমি হলে কি করতাম বলা যায় না। মাঝে মাঝে ব্যাপারটা খুব অস্বস্তিকর পর্যায়ে গিয়ে পড়ে…যেন জোর করে ভয় ভক্তি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতাম।

মিস মেরিডিথের চোখে মুখে ইতস্তত ভাব ফুটে উঠল। গলা নামিয়ে মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ওই ভদ্রমহিলাই কি ঔপন্যাসিক শ্রীমতী অলিভার?

শ্রীমতী অলিভার তখন মহা উৎসাহে ডাক্তার রবার্টসের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, যাই বলুন না কেন, মহিলাদের সহজাত অনুমতিকে কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কার মনে কোন ভাবের উদয় হচ্ছে, কে দোষী, কে নির্দোষ, তারা ঠিক বুঝতে পারে!

পোয়ারো ঘাড় নাড়লেন। হ্যাঁ, উনিই সেই বিখ্যাত লেখিকা।

 ‘গ্রন্থাগারে মৃতদেহ’ ওঁরই লেখা, তাই না?

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন।

 বিশাল আকৃতির গম্ভীর মুখের ওই ভদ্রলোক? …মিঃ শ্যাতানা যাঁকে সুপারিনটেনডন্ট ব্যাটেল বলে উল্লেখ করলেন?

উনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের একজন হোমরাচোমরা অফিসার।

আর আপনি…? বড় বড় চোখ তুলে মিস মেরিডিথ পোয়ারোর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন।

আমি? পোয়ারোর ঠোঁটের ফাঁকে মৃদু কৌতুকের রেখা।

আমি অবশ্য আপনার বিষয় অনেক কথাই কাগজে পড়েছি। মিস মেরিডিথ নিজের কথার খেই ধরে বলে চলেছেন, এ. বি. সি. মার্ডারের মতো লোমহর্ষক মামলার আসামীকে আপনিই তো পুলিসের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিও এই রহস্যের কোনো হদিশ খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

আপনার মুখে প্রশংসাবাণী শুনে নিজেকে বড়ই বিব্রত বোধ করছি, ম্যাডাম?

 মিস মেরিডিথের ভ্রুজোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠল। আর মিঃ শ্যাতানা…মিঃ শ্যাতানা….

কি যেন একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন মাঝপথে। তার দৃষ্টি তখনও অদূরে আলাপরত মিঃ শ্যাতানার দিকে নিবদ্ধ।

পোয়ারো শান্তকণ্ঠে বাকিটা ব্যক্ত করলেন। ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায় তিনি কিছুটা অপরাধপ্রবণ। একজনকে অপরজনের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে ওঁর উৎসাহ অপার। মিঃ শ্যাতানা এখনও উত্তেজিতভাবে শ্রীমতী অলিভার ও ডাক্তার রবার্টসের সঙ্গে মানবদেহে বিষের-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করছেন। এমন সব বিষ, যা ডাক্তারী পরীক্ষাতেও ধরা পড়া শক্ত!

মেরিডিথ শিউরে উঠলেন। তার চোখেমুখে ভয়ের বিষণ্ণ ছায়া। কি অদ্ভুত সাংঘাতিক  ধরণের লোক।

কার কথা বলছেন? …ডাক্তার রবার্টস?

না, …মিঃ শ্যাতানা। ভদ্রলোককে দেখলেই কেন জানি না বুকের মধ্যে একটা ত্রাসের সঞ্চার হয়। তিনি মনের মধ্যে কি প্যাঁচ এঁটেছেন বাইরে থেকে তার কোনো গন্ধ পাবার উপায় নেই। নিষ্ঠুরতার মধ্যেই যেন সবিশেষ আনন্দ উপভোগ করেন। দু-চোখের দৃষ্টিও কি ক্রুর!

যেন শিয়াল শিকারে বেরিয়েছেন।

মিস মেরিডিথ মৃদু তিরস্কারের দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে ফিরে তাকালেন। আমার বক্তব্য, তিনি কিছুটা আদিম মনোভাবাপন্ন। প্রথম দর্শনেই মনের মধ্যে বিরূপ-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আমি নিজেও যে ভদ্রলোককে খুব একটা পছন্দ করি, তা নয়।

কিন্তু ভদ্রলোকের ডিনারটা খুবই উপভোগ্য। পোয়ারো তাকে সান্ত্বনা দেবার সুরে বললেন। রান্নার ব্যাপারে এখানকার বাবুর্চির বেশ নামডাক আছে।

ক্ষণকাল সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে পোয়ারোকে নিরীক্ষণ করলেন মিস মেরিডিথ। তারপর মৃদু হেসে বললেন, রসনার পরিতৃপ্তি সব মানুষের সেই মানবজাতির একজন।

তাকিয়ে দেখুন। মিস মেরিডিথের কণ্ঠ আবার ফিসফিস করে উঠল, সব অতিথির মধ্যে কেমন একটা ভীতসন্ত্রস্ত ভাব!

কিন্তু ম্যাডাম, আপনার তত ভয় পাবার বয়স নয়। আপনি বরঞ্চ সবকিছু দেখে শুনে পুলকিত হয়ে উঠবেন। আটোগ্রাফের খাতা বার করে স্বাক্ষর সংগ্রহ করবেন।…

অপরাধ জগৎ সম্বন্ধে আমার কোনো আগ্রহ নেই। স্বভাবত সব মেয়েই এতে বীতশ্রদ্ধ। দেখা গেছে কেবল ছেলেরাই গোয়েন্দা গল্পের প্রধান গ্রাহক।

পোয়ারো ঈষৎ হতাশ হলেন। নিজের ভাগ্যকে অভিসম্পাত জানিয়ে আপন মনে বিড়বিড় করে উঠলেন, হায়! যদি একজন সামান্য দরের ফিল্মস্টারও হতে পারতাম। তাহলে হয়তো মহিলাদেরও কৃপাদৃষ্টির প্রসাদ লাভে একেবারে বঞ্চিত হতাম না!

ইতিমধ্যে ডিনারের ডাক পড়।

পোয়ারোর অনুমান একচুল মিথ্যা নয়। জমজমাট রাজকীয় আয়োজন। খাদ্য তালিকার প্রতিটি বস্তুই স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। ত্রুটিহীন পরিবেশন। মাথার ওপর মৃদু নীলাভ বৈদ্যুতিক আলো। ঝকঝকে পালিশ করা ডিনার টেবিল। আইরিশ কাঁচের ডিনার সেট থেকে সবুজ আলো ঠিকরে পড়ছে। একেবারে গোড়ার দিকে প্রথমের চেয়ারটা অলঙ্কৃত করে গৃহস্বামী মিঃ শ্যাতানা বসে আছেন। অস্পষ্ট নীল আলো তার দু’চোখের দৃষ্টিকে আরও জটিল, আর কুহেলিকাচ্ছন্ন করে তুলেছে।

নিমন্ত্রিতের তালিকায় পুরুষের চেয়ে মহিলার সংখ্যা কম হওয়াতে তিনি সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

মিসেস লরিমার বসেছেন গৃহস্বামীর ডান দিকে, বাঁদিকে শ্রীমতী অলিভার। সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল আর মেজর ডেসপার্ডের মাঝখানে মিস মেরিডিথ পোয়ারো বসেছেন ডাক্তার রবার্টস আর মিসেস লরিমারের মাঝের চেয়ারে।

ডাক্তার রবার্টস বৃদ্ধা লরিমারকে ইঙ্গিত করে পোয়ারোর কানে লঘু ঠাট্টার সুরে বললেন, আপনি চেয়ারটা খুব ভালোই বেছে নিয়েছেন দেখছি। সারাক্ষণ একা একা সুন্দরী মহিলার সুখসঙ্গ উপভোগ করবেন! ফরাসি দেশের পুরুষদের এটা একটা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

খুবই দুঃখের বিষয়, আমি একজন বেলজিয়ান! পোয়ায়োর কণ্ঠে বিনীত প্রতিবাদ।

মহিলাদের ব্যাপারে বেলজিয়ান আর ফরাসিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। তারপর লঘুভাব সংযত করে পেশাদারি ভঙ্গি তে ডান দিকে ঝুঁকে পড়ে কর্নেল রেসের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলেন। তাঁদের আলোচ্য বিষয়, বর্তমান জনজীবনে অনিদ্রা রোগের ক্রমবর্ধমানতা। মিসেস লরিমার পোয়ারোর সঙ্গে আধুনিক নাট্য-আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করলেন। ভদ্রমহিলা যে এ-সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজখবর রাখেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার মন্তব্যগুলোর মধ্যে প্রাজ্ঞ সমালোচকের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ। তিনি যে অতি বুদ্ধিমতী মহিলা পোয়ারোর চোখে সহজেই তা ধরা পড়ল।

অন্যদিকে শ্ৰীমতী অলিভার তখন মেজর ডেসপার্ডের সঙ্গে গল্প শুরু করলেন। সভ্য জগতের অজ্ঞাত কোনো বিষের সন্ধান মেজরের জানা আছে কিনা তিনি জানতে চাইলেন।

কেন, কিউরেয়ার?

ও সমস্ত অনেক পুরোনো। শ্রীমতী অলিভার অবহেলাভরে হাত নাড়লেন। কমপক্ষে এ ধরণের একশোটা খুনের মামলা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে। আমি চাই একেবারে আনকোরা নতুন কোনো কিছু।

মেজর ডেসপার্ড শুষ্ক স্বরে বললেন বুনো জাতিরা স্বভাবতই প্রাচীন পন্থী। তারা তাদের পিতা-প্রপিতামহের বহু ব্যবহৃত পুরোনো পন্থাই অনুসরণ করে চলে।

সেটা সত্যিই খুব ক্লান্তিকর। শ্রীমতী অলিভারের মুখে হতাশার চিহ্ন ফুটে উঠল, আমি ভেবেছিলাম ওরা লতাগুল্ম শেকড়বাকড় নিয়ে নিত্য-নৈমিত্তিক পরীক্ষা চালায়। নতুন নতুন ধরনের খুনের প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে, এমন সব বিষ ব্যবহার করে সভ্য জগৎ এখন যার নাম পর্যন্ত শোনেনি। ব্যাপারটা তাহলে সত্যি নয়!

আপনি বরঞ্চ সভ্য জগতের এমন উদাহরণ খুঁজে পাবেন। মেজর ডেসপার্ডের কণ্ঠে কিঞ্চিৎ উৎসাহ প্রকাশ পেল। এখানকার ল্যাবরেটরিতে নির্দোষ আকৃতির এমন অনেক জীবানুর সন্ধান পাওয়া যায় যা একজন মানুষকে চিরকাল দূষিত ক্ষতে পঙ্গু করে রাখবার ক্ষমতা ধরে।

আমার পাঠকদের জন্যে সেটা খুব কাজের হবে না, শ্ৰীমতী অলিভার অপ্রসন্ন কণ্ঠে গুনগুন করলেন। তাছাড়া স্ট্যাফাইলো, কক্কাস, স্টেপ্টোকক্কাস এই নামগুলোও এত বদখৎ যে আমার সেক্রেটারির পক্ষে সেগুলো টাইপ করা খুবই কষ্টকর হয়ে ওঠে।..সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল, এ-বিষয়ে আপনার কি বক্তব্য?

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে বাস্তব জীবনে লোকে অত সূক্ষ্মতার ধার ধারে না। তারা সাধারণত সাবেকি আর্সেনিকই পছন্দ করে। জিনিসটা খুব সহজলভ্য। এর অন্য অনেক সুখ সুবিধাও আছে।

শ্রীমতী অলিভার বিজ্ঞের হাসি হাসলেন। যেহেতু আর্সেনিক ঘটিত অনেক খুনের কোনো কিনারা স্কটল্যন্ড ইয়ার্ড করে উঠতে পারেনি সেইজন্য বিষয়টাকে আপনারা এত বেশি প্রাধান্য দেন। আমি অনেক আগেই বলেছি, যদি কোনো মহিলাকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সর্বেসর্বা করা হত…

কিন্তু ম্যাডাম, মহিলা বিভাগও তো..

ওসব মাথামোটা মহিলা পুলিশের কথা ধর্তব্যের মধ্যে আনবেন না। তারা কেবল মাঠে ময়দানে নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি করে বেড়ায়। আমি এমন মহিলার কথা বলছি, যিনি প্রকৃতপক্ষে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের প্রধান আসন অলঙ্কৃত করার যোগ্য। অপরাধ-জগৎ সম্বন্ধে যার প্রভূত জ্ঞান আছে।

তবে মহিলাদের মধ্যে অনেক প্রথম শ্রেণির অপরাধী খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যাটেল গম্ভীর কণ্ঠে তাঁর মন্তব্য প্রকাশ করলেন। সাংঘাতিক জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও তারা খুব মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করে।

মিঃ শ্যাতানা মৃদু হেসে উঠলেন। বললেন, বিষই হচ্ছে মহিলাদের প্রধান অস্ত্র। কত অসংখ্য মহিলা-খুনি যে সমাজের চোখে ধুলো দিয়ে দিব্যি সেজেগুজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

নিশ্চয়ই…! সে আর বেশি কথা কি! কাঁটা দিয়ে মাংসের টুকরো মুখে তুলতে তুলতে গর্বের সুরে বললেন শ্রীমতী অলিভার।

খুনের ব্যাপারে ডাক্তারদের সুযোগ-সুবিধাও বিস্তর। শ্যাতানার চোখে মুখে চিন্তার কালো ছায়া।

আমি আপনার কথার তীব্র প্রতিবাদ করছি। ডাক্তার রবার্টস কৃত্রিম রাগত স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন। অবশ্য ভ্রমক্রমে আমরা কখনো কখনো রুগির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াই, সেকথা অস্বীকার করার উপায় নেই তবে সেটা নিছক দুঘর্টনা মাত্র।

কিন্তু আমি যদি কখনো কাউকে খুন করতে উদ্যত হই…গম্ভীর থমথমে কণ্ঠে বলতে লাগলেন মিঃ শ্যাতানা। সমবেত অতিথিবৃন্দের জোড়া জোড়া চোখের দৃষ্টি একাগ্রভাবে তার দিকেই নিবদ্ধ।

..তাহলে আমি সবচেয়ে সোজা রাস্তাই অবলম্বন করব। যেমন ধরুন, শিকার করতে গিয়ে ভুল করে অন্য কাউকে মেরে বসা; এটাকে দুর্ঘটনা বলে চালানো খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়। অথবা অন্যমনস্কভাবে কোনো অসুস্থ রুগিকে বিষাক্ত কোনো ওষুধ খাইয়ে দেওয়া…

মিঃ শ্যাতানা হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে শেরীর গ্লাস তুলে নিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে এত অভিজ্ঞ লোক বর্তমান থাকতে আমি বলবার কে?…

ধীরে ধীরে গ্লাসে চুমুক দিলেন তিনি। মদের গ্লাসের লালচে আভা তার সারা মুখে স্বপ্নঘন কুহেলিকাময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সূচ্যগ্র গোঁফের দুই প্রান্ত, রাজকীয় পোশাক পরিচ্ছদ, ধনুকের মতো বক্ৰদীর্ঘ ভ্রুজোড়া সবকিছুর মধ্যেই যেন মায়াবী যাদুর প্রাদুর্ভাব।

সারা ঘর নীরব নিস্তব্ধ।

অবশেষে শ্ৰীমতী অলিভারই নীরবতা ভঙ্গ করে ফিসফিস স্বরে বলে উঠলেন, কি আশ্চর্য! আমি যেন একটা অশরীরী কালো ছায়ার রোমশ অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছি!..

.

০২.

খানাপিনা সাঙ্গ হলে সকলে আবার ড্রয়িং রুমে ফিরে এলেন। ব্রিজের জন্য টেবিল পাতা ছিল। বেয়ারা এসে কফি দিয়ে গেল।

আপনারা কে কে ব্রিজ খেলতে আগ্রহী? মিঃ শ্যাতানা মুখ তুলে প্রশ্ন করলেন, মিসেস লরিমার, আপনি তো খেলবেনই। ডাক্তার বার্টস, আপনারও কোনো আপত্তি থাকবার কথা নয়। মিস মেরিডিথ, আপনি…?

আমার কোনো অনীহা নেই। সুন্দরী মেরিডিথ মৃদুকণ্ঠে জানালেন, তবে ব্রিজ খেলায় আমি বড়ই কাঁচা, শেষকালে পার্টনারের গলগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে!

ওতেই চলবে..ওতেই চলবে…আর মেজর ডেসপার্ড, আপনিও নিশ্চয় আছেন? ভালো হল, আপনারা চারজনে তাহলে এখানেই খেলুন।

ব্রিজ খেলাটা আমি এত পছন্দ করি। পোয়ারোর দিকে চোখ তুলে বললেন মিসেস লরিমার, আমার মতো এত ব্রিজভক্ত বোধহয় আর কেউ নেই। ক্রমশই নেশাটা যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে। ডিনারের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি না। ডিনারের পর বসে বসে শুধু গল্পগুজব করা আমার ধাতে সয় না–কেমন ঘুম পেয়ে যায়। সকলের সামনেই বোকার মতো ঘুমিয়ে পড়ি। ব্যাপারটা অবশ্য বেশ দৃষ্টিকটু, কিন্তু তাই বলে সত্যকে তো অস্বীকার করা যায় না।

তাস টেনে পার্টনার নির্বাচন করা হল। একদিকে মিসেস লরিমার এবং মিস মেরিডিথ। অপর পক্ষে মেজর ডেসপার্ড ও ডাক্তার রবার্টস।

নারী বনাম পুরুষ…দক্ষ হাতে তাস সাফল করতে করতে হাল্কা সুরে মন্তব্য করলেন মিসেস লরিমার। এই নীলপরী আঁকা তাসটাই আমাদের থাক। কি বলেন পার্টনার! …আমার প্রারম্ভিক দুয়ের ডাক অন্তত এক রাউন্ড ধরে রাখবেন। এটা যেন ভুল না হয়।

আপনাদের জেতা চাই কিন্তু। শ্রীমতী অলিভারের নারীসত্তা উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল। পুরুষেরা দেখুক বুদ্ধির খেলায় মেয়েরাও তাদের হারাতে পারে।

ডাক্তার রবার্টস আর এক প্যাকেট তাস সাফল করতে করতে সহাস্যে বলে উঠলেন, ওদের জেহ্বার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। সত্যিই মহিলাদের জন্য মায়া হয়! …মিসেস লরিমার, আপনিই প্রথম ডিল শুরু করুন।

মেজর ডেসপার্ড ধীরে সুস্থে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। তার দুচোখের চকিত দৃষ্টি থেকে থেকে অ্যানা মেরিডিথের মুখের ওপর ছুটে বেড়াচ্ছিল। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, অ্যানা যে প্রকৃতই সুন্দরী তিনি যেন সে কথাটা সবেমাত্র আবিষ্কার করলেন।

দয়া করে তাসটা কেটে দিন। মিসেস লরিমারের কণ্ঠে অধৈর্যের সুর কান এড়ায় না।

মেজর ডেসপার্ড ঈষৎ বিব্রত বোধ করলেন। তারপর সোজা হয়ে বসে তাস কেটে দিলেন।

মিসেস লরিমার তাস কাটতে লাগলেন অভ্যস্ত হাতে।

পাশের ঘরে আর একটা ব্রিজ টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মিঃ শ্যাতানা অন্যদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানালেন।

তার পেছন পেছন বাকি চারজন পাশের ঘরে উপস্থিত হলেন। সুন্দর সাজানো-গোছানো ঘর। এক কোণায় পরিপাটিভাবে ব্রিজের টেবিল পাতা।

আসুন, আমরাও তাস টেনে জুটি ঠিক করে নিই। কর্নেল রেসই উদ্যোগী হয়ে প্রথম এগিয়ে আসেন।

আমি ব্রিজ খেলি না। মাথা নাড়লেন শ্যাতানা। ব্রিজের মধ্যে আমি কোনো আনন্দ পাই না।

অন্য সকলেও ব্রিজে বসতে তেমন উৎসাহ দেখালেন না। কিন্তু মিঃ শ্যাতানা কোনো কথা শুনলেন না। প্রায় জোর করেই তাদের ব্রিজের টেবিলে বসিয়ে দিলেন। মিঃ পোয়ারো আর মিসেস অলিভার বসলেন সুপারিনটেনডের ব্যাটেল ও কর্নেল রেসের বিপক্ষে।

শ্যাতানা কিছুক্ষণ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে লাগলেন। তার ঠোঁটের ডগায় বিজ্ঞজনসুলভ হাসির আভাস। মিসেস অলিভার কি তাস নিয়ে দুটো নোট্রাম্প খেলা শুরু করলেন একবার উঁকি মেরে দেখলেন। তারপর নিঃশব্দ পদসঞ্চারে পাশের ঘরে ফিরে গেলেন।

সেখানে ইতিমধ্যে পুরোদমে খেলা চলছে। সকলেই নিজের নিজের তাস নিয়ে গভীরভাবে মগ্ন। দ্রুতলয়ে ডাক শুরু হল। ওয়ান হার্ট’ পাস। থ্রি ক্লাবস। থ্রি স্পেডস। ফোর ডায়মন্ডস ডাবল। ফের হার্টস;

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ খেলা দেখলেন শ্যাতানা। তার বুকের মধ্যে মৃদু হাসির তরঙ্গ। তারপর তাদের টেবিল ছাড়িয়ে গিয়ে ঘরের অপর প্রান্তে দরজার কাছে ফায়ার প্লেসের সামনে একটা বড় আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিলেন। পাশের টেবিলে একটা সুদৃশ্য ট্রের ওপর সারি সারি মদের পাত্র সাজানো।

আলোকসজ্জার ব্যাপারে মিঃ শ্যাতানাকে একজন শিল্পী বলা চলে। শিল্পীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গীর সাহায্যেই তিনি ঘরের মধ্যে মধ্যে আলোর ব্যবস্থা করেছেন, তাঁর হাতের পাশে একটা অল্পশক্তির আলো আছে। প্রয়োজন হলে এর সাহায্যে তিনি লেখাপড়ার কাজ চালাতে পারেন। আলোর ওপর নানা ধরনের আবরণ দিয়ে সর্বত্র একটা আলো আঁধারির সৃষ্টি করা হয়েছে। কেবল ব্রিজ টেবিলের মাথার ওপর আলোটা বেশ স্পষ্ট। সেখান থেকে অবিচ্ছিন্ন ধারায় খেলোয়াড়দের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।

ওয়ান নোট্রাম্প। মিসেস লরিমারের তীক্ষ্ণ সুরেলা কণ্ঠস্বর।

 থ্রি হার্টস। বেশ ভরাট কণ্ঠস্বর ডাক্তার রবার্টসের।

নো বিড। শান্ত গলায় পাস দিলেন অ্যানা মেরিডিথ।

কল দেবার আগে প্রত্যেকবারই মেজর ডেসপার্ড অল্প সময় নিচ্ছেন। যেন শেষ সিদ্ধান্ত নেবার আগে ভালো করে ভেবে দেখছেন সবকিছু।

একটু ইতস্তত করলেন তিনি। ফোর হার্টস;

ডাবল।

 মৃদু হাসির ছটায় শ্যাতানার চোখমুখ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।

তিনি আজ মনে মনে সারাক্ষণই হাসছেন। কেবলই হেসে চলেছেন অবিশ্রান্তভাবে। সত্যিই তার অতিথিরা আজ তাকে অফুরন্ত আনন্দের ইন্ধন জোগাচ্ছে।

পাঁচটা ডায়মন্ডের খেলা হল। তার অর্থ গেম এবং রাবার। কর্নেল রেস বেশ উৎসাহিত হলেন। পোয়ারোকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, মঁসিয়ে পোয়ারো। তবে ভাগ্য ভাল বলতে হবে। স্পেড লিড পড়লে কি হত বলা যায় না!

ওতে এমন কিছু তফাত হত বলে মনে হয় না। সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল গম্ভীর স্বরে মন্তব্য প্রকাশ করলেন।

তার ক্ষোভের যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি স্পেড কল দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পার্টনার মিসেস অলিভার কি ভেবে ক্লাব খেলে বসলেন। তার ফলেই এই অঘটন সম্ভব হল।

কর্নেল রেস হাতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে ফিরে তাকালেন। সবে বারোটা বেজে দশ মিনিট মাত্র হয়েছে। এখনও আর একটা রাবার হতে পারে।

ব্যাটেল রাজি হলেন না। আমায় মাপ করবেন। বেশিক্ষণ রাত জাগা আমার সহ্য হয় না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়াই বরাবরের অভ্যাস।

আমিও এ বিষয়ে একমত। পোয়ারোও তাঁর কথাতেই সায় দিলেন।

তাহলে হিসেবটা কষে ফেলা যাক। ক্ষুণ্ণ চিত্তে কর্ণেল রেস হিসাব করতে বসলেন। এ-টেবিলে মোট পাঁচটা রাবার খেলা হয়েছে। ফলাফলে পুরুষরাই জয়ী হল। শ্ৰীমতী অলিভার সব মিলিয়ে তিন পাউন্ড সাত সিলিং হারলেন বাকি তিনজন জিতলেন। জয়ের বেশি অংশটা অবশ্য রেসের পকেটেই গেল।

শ্রীমতী অলিভার হেরে যাবার জন্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। হাসিমুখে হিসেব মিটিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আজকে সারা সন্ধ্যেটাই আমার ভাগ্য খুব খারাপ গেছে। অবশ্য মাঝে মাঝেই এমন ধারা ঘটে থাকে। গতকাল আমার তাস খুব ভালো উঠেছিল। পর পর তিনবার দেড়শো অনার্স পেয়েছিলাম। ভদ্রমহিলা হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে সৌখিন কাজকরা ভ্যানিটি ব্যাগটা তুলে নিলেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনি বোলালেন চুলে।

মিঃ শ্যাতানা বোধ হয় পাশের ঘরেই আছেন?

তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। সকলেই তার পেছন পেছন পাশের ঘরে প্রবেশ করলেন। মিঃ শ্যাতানা তার পূর্বের চেয়ারেই চোখ বুজে শুয়ে আগুন পোহাচ্ছেন। ব্রিজ খেলোয়াড়রা তাদের নিজেদের খেলা নিয়েই মত্ত।

ফাইভ ক্লাবস-এ আমার ডাবল রইল। মিসেস লরিমারের কণ্ঠস্বর শান্ত, উত্তাপহীন।

ফাইভ নো ট্রাম্পস।

ডাবল।

উৎসাহিতভাবে শ্রীমতী অলিভার ব্রিজ টেবিলের আরও কাছে সরে গেলেন। এই হাতটার মধ্যে নিশ্চয় অনেক উত্তেজনার খোরাক আছে।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেলও তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন।

কর্ণেল রেস শ্যাতানার চেয়ারের দিকে এগোলেন। তার পেছনে পোয়ারো।

এবার আমরা বিদায় নেব, মিঃ শ্যাতানা।

মিঃ শ্যাতানা, কর্নেল রেসের কথার কোনো জবাব দিলেন না। তার মাথাটা ঈষৎ সামনের দিকে হেলে পড়েছে। যেন গভীর নিদ্রামগ্ন। কর্নেল হতচকিত দৃষ্টিতে একবার পিছনে ফিরে পোয়ারোর দিকে তাকালেন। তারপর চেয়ারের আরও কাছে সরে এলেন। তার কণ্ঠ দিয়ে একটা অস্ফুট আর্ত চিৎকার ধ্বনিত হল। তিনি প্রায় চেয়ারের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। পোয়ারোও ইতিমধ্যে ভদ্রলোকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। জিনিসটা তাঁরও নজরে পড়েছে। কর্নেল রেসের বিস্মিত দৃষ্টিও সেই দিকে নিবদ্ধ। মিঃ শ্যাতানার কোটের ফাঁক দিয়ে কারুকার্যমণ্ডিত শক্তমতো কি একটা পদার্থ উঁকি মারছে।

পোয়ারো এগিয়ে গিয়ে নিদ্রামগ্ন শ্যাতানার একটা হাত অল্প তুলে ধরলেন। তারপর ধীরে ধীরেই হাতটা আবার নামিয়ে রাখলেন। কর্নেল রেস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিতে শান্তভাবে মাথা নাড়লেন পোয়ারো!

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল, দয়া করে একবার এদিকে আসুন।

ডাক শুনে এগিয়ে এলেন ব্যাটেল। শ্ৰীমতী অলিভার তখন একচিত্তে পাঁচটা নো ট্রাম্পের খেলা দেখতে মশগুল।

সুপারিনটেনডেন্টকে বাইরে থেকে দেখে অল্প বোকাসোকা মনে হলেও কাজেকর্মে অতিমাত্রায় ক্ষিপ্র। ভ্রু কুঁচকে নীচু গলায় প্রশ্ন করলেন, কি ব্যাপার, কিছু গন্ডগোল ঘটেছে নাকি?

কর্নেল রেস মৃদু ঘাড় নাড়িয়ে চেয়ারে শায়িত শ্যাতানার নিশ্চুপ দেহটার দিকে ইশারা করে দেখালেন।

ব্যাটেল চেয়ারের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। পোয়ারোর চোখের দৃষ্টি গভীরভাবে মিঃ শ্যাতানার মুখের ওপর নিবদ্ধ, সে মুখ থেকে ক্রুর শয়তানির নিষ্ঠুর আবরণ এখন খসে গেছে। তার বদলে ফুটে উঠেছে স্থল নির্বুদ্ধিতার ছাপ। মুখটা অল্প হাঁ হয়ে আছে।

এরকুল পোয়ারো মৃদুমন্দ মাথা দোলালেন।

সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন ব্যাটেল। মিঃ শ্যাতানার কোটের ফাঁকে উঁচু হয় থাকা শক্ত জিনিসটা স্পর্শ না করে তিনি যতদূর সম্ভব খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছেন। অসহায় ভঙ্গিতে ঝুলে-পড়া হাতটা একবার তুলে ধরে আবার আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখলেন। তার মধ্যে থেকে সান্ধ্য-মজলিসের মেজাজ ভাবটা সম্পূর্ণ অন্তর্হিত হয়েছে। তিনি এখন একজন কর্মব্যস্ত ভাবগম্ভীর পুলিশ সুপার। দক্ষ হাতে যে-কোনো জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

দয়া করে সকলে এদিকে এক মিনিট মনোযোগ দিন।

 ব্যাটেলের আদেশ-মাখানো উঁচু কণ্ঠস্বর এমন শোনালো যে ব্রিজ টেবিলের সকলেই তার দিকে ফিরে তাকালেন। মিস মেরিডিথ ডামি হয়েছিলেন। ইস্কাফনের টেক্কাটা তার হাতের মুঠোর মধ্যেই ধরা রইল।

খুবই দুঃখের সঙ্গে আপনাদের জানাতে বাধ্য হচ্ছি, গৃহস্বামী মিঃ শ্যাতানা মারা গেছেন।

 মিসেস লরিমার এবং ডাক্তার রবার্টস হুড়মুড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেজর ডেসপার্ডের নিষ্পলক দৃষ্টিতে বিস্মিত জিজ্ঞাসা। তার ভু জোড়া ঈষৎ কুঞ্চিত হয়ে উঠল। একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ নির্গত হল কুমারী অ্যানার কণ্ঠ দিয়ে।

ভদ্রলোক যে প্রকৃত মারাই গেছেন সে বিষয়ে আপনি কি একেবারেই নিশ্চিত? সংশয়ের সুরে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন ডাক্তার রবার্টস।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল তাকে বাধা দিলেন। এক মিনিট, ডাক্তার রবার্টস। ইতিমধ্যে কে কে এই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছেন বা ঘর ছেড়ে বাইরে গেছেন সে বিষয়ে কিছু জানেন?

রবার্টস প্রথমটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। তার মানে? …আপনার কথার মমার্থ কিছুই আমি বুঝে উঠতে পারছি না। বাইরে যাওয়া বা ভেতরে ঢোকার কথা বলছেন?…আমরা কেউই বাইরে যায়নি, ভেতরেও কেউ ঢোকেনি। . ব্যাটেল এবার মিসেস লরিমারের দিকে ফিরে তাকালেন। দুচোখে পেশাদারি নিরাসক্তি। আপনিও কি একথা সমর্থন করেছেন?

হ্যাঁ…ঠিকই!..।

বাবুটি না খানসামা…?

না; ব্রিজে বসবার আগেই খানসামা ট্রেতে পানীয় এনে টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে গেছে। তারপর তাকে আর দেখা যায়নি।

মেজর ডেসপার্ডও ঘাড় নেড়ে এ কথার সমর্থন জানালেন।

অ্যানা ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। হ্যাঁ, ঠিকই তো।

প্রথমেই সকলে এতটা উতলা হবেন না। ডাক্তার রবার্টস বিনীত সুরে আবেদন জানালেন, অনেক সময় মৃগী রুগিকেও সাধারণ দৃষ্টিতে মৃত বলে ভ্রম হতে পারে। মিঃ শ্যাতানা হয়তো কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। এটা খুব অস্বাভাবিক নয়। দয়া করে আমাকে আগে একবার পরীক্ষা করে দেখতে দিন।

আমি খবুই দুঃখিত, ব্যাটেলের কণ্ঠস্বর বিষাদগম্ভীর এটা অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো কোনো সাময়িক ঘটনা নয় এবং ডিভিশনাল সার্জন না আসা পর্যন্ত কেউ তাদের ছুঁতে পারবেন না। তার কারণ মিঃ শ্যাতানাকে হত্যা করা হয়েছে।

হত্যা! অ্যানার দুচোখে আতঙ্ক।

মেজর ডেসপার্ডের ধূসর দৃষ্টিতে সীমাহীন শুন্যতা।

মিসেস লরিমারের কণ্ঠে সুতীক্ষ্ণ বিস্ময়। খুন!…

 হায় ভগবান! অসহায় ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন ডাক্তার রবার্টস।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল সকলের দিকে তাকিয়ে মাপা তালে মাথা দোলালেন। এই মুহূর্তে তাঁকে স্টেজের ওপর দাঁড়ানো একজন দীর্ঘকায় চাইনিজ জাদুকরের মতো বোধ হচ্ছে। কথার সুরে দুজ্ঞেয় নিরাসক্তি।

বুকে ছুরি বসিয়ে ভদ্রলোককে খুন করা হয়েছে। এটা নিশ্চিতভাবে খুনই। আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। আপনাদের মধ্যে কেউ কি খেলার মাঝখানে কখনো টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়েছিলেন?

ব্যাটেল লক্ষ্য করলেন প্রত্যেকেরই শরীর ঈষৎ কেঁপে উঠল। চোখেমুখে আতঙ্ক, ভয় ও উত্তেজনার শিহরণ। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হতাশার ম্লান ছায়া। কিন্তু সুনির্দিষ্ট এমন কিছুর সন্ধান পাওয়া গেল না যা তাকে প্রতাশিত সমাধানের পথ দেখাতে পারে।

মেজর ডেসপার্ড অল্প ইতস্তত করে উঠে দাঁড়ালেন। তার দাঁড়াবার ভঙ্গিতে সৈনিকের দৃঢ়তা। দুচোখে বুদ্ধির উজ্জ্বল দীপ্তি। আমার মনে হয়, আমরা সকলেই কোনো না কোনো সময় ব্রিজ টেবিল ছেড়ে দরজার কাছে গিয়েছিলাম। হয় পানীয়ের প্রয়োজনে না হয় ফায়ারপ্লেসের আগুনটাকে উস্কে দিয়ে গনগনে করবার জন্য। আমি তো দুব্যাপারে দুবার উঠেছি। শেষবার যখন আগুনটা উস্কে দেবার জন্য ফায়ার প্লেসের কাছে গেলাম মিঃ শ্যাতানা তখন চেয়ারের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

তাকে তখন আপনি ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিলেন?

হ্যাঁ..মানে, আমার তো সেই রকমই মনে হল।

হতে পারে। ব্যাটেল মাথা নাড়লেন অথবা ইতিমধ্যে তিনি মারাও গিয়ে থাকতে পারেন। আমরা এবার সেই যিয়েই আলাপ-আলোচনা করব। তবে বর্তমানে আমি আপনাদের সকলকে পাশের ঘরে যাবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

কথা বলতে বলতে তিনি কর্নেল রেসের দিকে ঘুরে দাঁড়ালন। কর্নেল, আপনিও আশা করি পাশের ঘরে অপেক্ষা করবেন।

কর্ণেল নির্দ্বিধায় সম্মতি জানালেন। চারজন ব্রিজ খেলোয়াড় ধীরে ধীরে পাশের ঘরের দিকে এগোলেন।

অপর প্রান্তে একটা চেয়ারে বসে ফোঁপাতে লাগলেন শ্রীমতী অলিভার।

ব্যাটেল ফোন তুলে হেডকোয়ার্টারে খবর পাঠালেন। তারপর রিসিভারটা যথাস্থানে নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, স্থানীয় পুলিশবাহিনী খুব শীঘ্রই এসে পড়বে। হেডকোয়ার্টারের নির্দেশ, আমি যেন এই তদন্তের ভার সংগ্রহ করি। ডিভিসনাল সার্জেনের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তিনিও এসে পড়লেন বলে।

তারপর পোয়াটের দিকে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ভদ্রলোক কতক্ষণ আগে মারা গেছেন বলে আপনার অনুমান, মিঃ পোয়ারো? আমার মনে হয় অন্ততপক্ষে ঘন্টাখানেক তো হবেই।

তাই হওয়াই সম্ভব। তবে নিখুঁতভাবে ঘড়ি মিলিয়ে কোনো কিছুই বলতে পারা যায় না। আমাদের শক্তি খুবই সীমিত।

ব্যাটেল অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন। বললেন, ভদ্রলোক একেবারে ফায়ার প্লেসের ধারেই বসেছিলেন। সেইজন্য অনুমানে একটু তফাত হওয়া বিচিত্র নয়। গত একঘন্টা থেকে আড়াই ঘন্টার মধ্যে মিঃ শ্যাতানা মারা গেছেন, মনে হয় সরকারি ডাক্তার এই অভিমতই ব্যক্ত করবেন। অথচ কেউ কিছু দেখেনি বা শোনেনি। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! খুনি খুব প্রকান্ড এক ঝুঁকি নিয়েছিল। ভদ্রলোক আচমকা আঘাতে চিৎকার করে উঠতে পারতেন।

কিন্তু ঘটনাটা সেভাবে গড়ায়নি। এদিক দিয়ে খুনিকে ভাগ্যবান বলতে হবে। তবে সে যে একটা বিপজ্জনক ঝুঁকি নিয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মরিয়া না হয়ে উঠলে লোকে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না।

হত্যাকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কোনো ধারণা করতে পারেন?

পোয়ারো শান্তভাবে মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ, এ বিষয়ে আমার কিছু বক্তব্য আছে। –আচ্ছা, মিঃ শ্যাতানা আজ কি ধরনের পার্টি দিতে চেয়েছিলেন সে সম্বন্ধে কি আগে থাকতে আপনাকে কোনো আভাস দিয়েছিলেন?

না, মঁসিয়ে পোয়ারো, তিনি বিশদভাবে কিছু খুলে বলেননি। কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন করলেন কেন?

সদর দরজায় গাড়ি থামার শব্দ হল। কলিং বেলটাও বেজে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। নিশ্চয় স্থানীয় পুলিশবাহিনী এসে পড়েছে। কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন সুপারিনটেনডেন্ট। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব। আগে রুটিন বাঁধা কাজগুলো শেষ করি।

পোয়ারো সম্মতিসূচক সায় জানালেন।

মিসেস অলিভারের ফোঁপানি তখনও শেষ হয়নি।

এক পা, দু’পা করে ব্রিজ-টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন পোয়ারো। টেবিলের ওপর স্কোরশীটগুলো ভোলা অবস্থায় পড়ে আছে। সেইদিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ।

সত্যিই ভদ্রলোক অসম্ভব বোকা! মনে মনে বিড়বিড় করলেন তিনি। শয়তানের মতো পোশাক পরে সকলকে আতঙ্কিত করে তোলার প্রচেষ্টা। কী ভীষণ ছেলেমানুষি।

দরজা ঠেলে ডিভিশনাল সার্জন ঘরে প্রবেশ করলেন। ডান হাতে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ। তার পেছনে স্থানীয় পুলিশ ইন্সপেক্টর। সঙ্গে ক্যামেরাম্যান। সবার শেষে একজন পুলিশ কনস্টেবল।

রুটিন-বাঁধা পুলিশি কাজ শুরু হয় গেল।

.

০৩.

তিন ডাইনিং টেবিলের চারধারে চারজন বসেছিলেন। এরকুল পোয়ারো, শ্ৰীমতী অলিভার, কর্নেল রেস এবং সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল।

ইতিমধ্যে পুরো একঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে। মৃতদেহ পরীক্ষা করবার পর বিভিন্নভাবে তার ফটো নেওয়া হয়েছে। একজন ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশারদও এসেছিলেন। তিনি তাঁর কর্তব্য সমাধান করে যথারীতি বিদায় নিয়েছেন।

ব্যাটেল চোখ তুলে পোয়াবরার দিকে তাকিয়েছিলেন।

পাশের ঘরের চারজনকে ডেকে এনে জেরা করবার আগে আমি আপনার সঙ্গে এই ব্যাপারে কিছু আলোচনা করতে চাই। আজকের ডিনার পার্টি সম্বন্ধে তখন কি যেন একটা বলতে যাচ্ছিলেন।

হ্যাঁ, আমি এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করছিলাম।

পোয়ারো বিমর্ষভাবে মাথা নাড়লেন। বললেন, মিঃ শ্যাতানা ঠিক আক্ষরিক অর্থেই বক্তব্যটা বলতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে কোনো ভুলভ্রান্তির অবকাশ নেই। ভদ্রলোক ছিলেন অতিমাত্রায় দাম্ভিক। ভাবতেন, শয়তানের শ্রেষ্ঠ অনুচর সেজে পৃথিবীর ওপর প্রভুত্ব করে যাবেন। এই গর্বেই মারা পড়লেন। এর মধ্যে যে কতবড় বিপদ থাকতে পারে সে দিকটা হিসেব করে দেখেননি। কথামালার একচক্ষু বিশিষ্ট হরিণের মতো অবস্থা। লোকটা যে মূলত কতটা নির্বোধ এটাই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তাহলে ব্যাপারটা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে এই…সুপারিনটেনডেন্ট মনে মনে বিড়বিড় করলেন, নিমন্ত্রিতের সংখ্যা মোট আটজন। তার মধ্যে চারজনের ভূমিকা শুধু দর্শকের, বাকি চারজন হত্যাকারী। অন্ততপক্ষে মিঃ শ্যাতানা মনে করতেন।

এ অসম্ভব। দৃঢ়কণ্ঠে প্রতিবাদ জানালেন শ্রীমতী অলিভার। এর মধ্যে কেউ খুনি হতে পারে না। সকলেই বিশিষ্ট ভদ্রলোক।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল ধীরভাবে মাথা দোলালেন।

এ-বিষয়ে এখনই একেবারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। খুনিরাও অনেক সময় আমার আপনার মতো পোশাক পরেই বসে থাকে। চালচলন আচার ব্যবহার পর্যন্ত অনেক কিছুই ভদ্রদুরস্ত। বাইর থেকে বিন্দুমাত্র চেনবার উপায় নেই।

তাই যদি বলেন, শ্রীমতী অলিভার অল্প নড়েচড়ে বসলেন, তারপর গলা নামিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, সেক্ষেত্রে ডাক্তার রবার্টসকেই সন্দেহ করব। ডিনারের আগে যখন ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করছিলাম তখনই আমার স্বভাবসুলভ অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারলাম ভদ্রলোকের কোথায় যেন গলদ আছে। আমার অনুভূতি কখনো মিথ্যে বলে না।

ব্যাটেল মুখ তুলে কর্নেল রেসের দিকে তাকালেন। রেস হতাশ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন। শ্ৰীমতী অলিভারের অনুভূতি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য প্রকাশ করলেন না। পোয়ারোর কথার খেই ধরে আলোচনা চালিয়ে গেলেন।

ঘটনাটা সেইরকম হওয়াও মোটেই বিচিত্র নয়। বরঞ্চ খুবই স্বাভাবিক। মিঃ শ্যাতানা হয়তো আজকের ভোজসভায় কতিপয় খুনিদের এক অভূতপূর্ব সম্মেলন ঘটাতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি যাদের খুনি বলে ধারণা করেছিলেন তারা প্রত্যেকেই খুনি কিনা সেটা চিন্তা করে দেখতে হবে। তার ধারণার মধ্যেও ভুল থাকতে পারে। কিংবা তিনি কিছুটা আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। অবশ্য অন্তত একটি ক্ষেত্রে তার ধারণা যে নির্ভুল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তার মৃত্যুই একথা প্রমাণ করছে। একজন ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিল। তাই নয় কি, মিঃ পোয়ারো?

পোয়ারো মাথা নাড়লেন। ভদ্রলোকের একটা খ্যাতি ছিল। তার কৌতুক প্রবণতা ছিল বিপজ্জনক। ক্ষমাহীন নিষ্ঠুরতার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবেও পরলোকগত মিঃ শ্যাতানাকে বহুদিন লোকে স্মরণে রাখবে। খুনি হয়তো ভেবেছিল, ভদ্রলোক তাকে নিয়ে সারাক্ষণ আমোদ-প্রমোদ করে শেষকালে একসময় পুলিশের হাতে তুলে দেবে। সে মনে করত তার অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিঃ শ্যাতানার হাতে আছে।

তাই কি?

পোয়ারো অসহায় ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন। সে কথা আমরা নিশ্চিতভাবে কোনদিনই আর জানতে পারব না।

ডাক্তার রবার্টস, শ্ৰীমতী অলিভার তাঁর পুরানো জেদ বজায় রাখলেন, ভদ্রলোক বেশ দিলখোলা আমুদে প্রকৃতির, খুনিরাও ছদ্মবেশ ধরবার সময় অমন দিলখোলা ভাব ধারণ করে। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ভদ্রলোককে গ্রেপ্তার করতাম।

যদি সত্যিই কোনো মহিলা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সর্বোচ্চ আসন অলঙ্কৃত করে থাকতেন তবে আমরাও এ কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতাম না। সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেলের ভাবলেশহীন চোখে ক্ষণেকের জন্যে কৌতূহলের দীপ্তি ফুটে উঠল। কিন্তু পুরুষদের হাতেই যখন এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া রয়েছে তখন আমাদের আরও সাবধান হতে হবে। ধীর সতর্ক গতিতে লক্ষ্যে গিয়ে পৌঁছাতে হবে।

কেবল পুরুষ আর পুরুষ। শ্রীমতী অলিভার অধৈর্য হয়ে উঠলেন। তারপর আর বৃথা বাক্যব্যয় না করে প্রভাবতী সংবাদপত্রে কিভাবে ঘটনার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দেওয়া যায় তারই খসড়া রচনা করতে লাগলেন মনে মনে।

ভদ্রলোকদের আর বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা উচিত হবে না। সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল ব্যস্ত হয়ে বললেন। এবার তাদের জবানবন্দী নেওয়া প্রয়োজন।

তাহলে আমরা না হয় বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করি? কর্নেল রেস চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার ভাব দেখালেন।

ব্যাটেল অল্প ইতস্তত করলেন। সাদা দু চোখ তুলে শ্ৰীমতী অলিভারের দিকে ফিরে তাকালেন। কর্নেল রেসের সরকারি পদমর্যাদা সম্বন্ধে তিনি যথেষ্ট সচেতন। এরকুল পোয়ারোর সঙ্গেও অতীতে তাকে বেশ দু-চারবার কাজ করতে হয়েছে। তারা পরস্পরের বিশেষ পরিচিত। কিন্তু শ্ৰীমতী অলিভারকে এ ব্যাপারে নাক গলাতে দেওয়া সমীচিন নয়। তবে ব্যাটেল সহৃদয় ব্যক্তি। ভদ্রমহিলা যে ব্রিজ-টেবিলে একনাগাড়ে অনেক হেরে গেছেন একথা তাঁর স্মরণে আছে। তাই তাঁর মনে নতুন করে আঘাত হানতে ব্যাটেলের ভদ্রতায় বাধল।

আপনারা সকলেই থাকতে পারেন। বিশেষভাবে শ্রীমতী অলিভারকে উদ্দেশ্য করেই কথাটা তিনি বললেন, কিন্তু কাজের মাঝখানে কোনোরকম বাধা দেবেন না। তাছাড়া মাসিয়ে পোয়ারো ক্ষণপূর্বে যে ঘটনার আভাস দিয়েছেন সে সম্বন্ধেও সকলে নীরব থাকবেন। ওটা হচ্ছে মিঃ শ্যাতানার একটা মানসিক অভিব্যক্তি। এবং মিঃ শ্যাতানার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অস্তিত্বও লুপ্ত হয়ে গেছে। ..আশা করি আমার কথা সকলেই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন?

শ্ৰীমতী অলিভার সোৎসাহে জবাব দিলেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়।

ব্যাটেল উঠে দাঁড়িয়ে কর্তব্যরত কনস্টেবলকে ডাক দিলেন।

পাশের ঘরে এন্ডারসন ডিউটিতে আছে। ওকে গিয়ে বলবে, অতিথিদের মধ্যে ডাক্তার রবার্টস বলে যে ভদ্রলোক আছেন তিনি যেন অনুগ্রহ করে একবার অমার সামনে হাজির হন।

আমি হলে সবশেষে ভদ্রলোককে ডেকে পাঠাতাম। ছেলেমানুষির সুরে শ্রীমতী অলিভার তার মন্তব্য প্রকাশ করলেন? অবশ্য আমার রহস্য গল্পে।

বাস্তব জগতের সঙ্গে কল্পকাহিনির ফারাক খুবই দুস্তর। সুপারিনটেনডেন্ট গম্ভীর হয়ে উঠলেন।

তা জানি। সেইজন্যেই জীবনের ঘটনাবলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট ছন্দের এত অভাব।

তাদের কথার মাঝখানে দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকলেন ডাক্তার রবার্টস।

সত্যিই সুপারিনটেনডেন্ট, কি সাংঘাতিক একটা ব্যাপারের মধ্যে আমরা জড়িয়ে পড়লাম। আমি তো একথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি মাত্র কয়েক হাত তফাতে তিনজন বসে তাস খেলছে, এর মধ্যে বুকে ছুরি মেরে খুন করা…! না, এতখানি দুঃসাহস আমার নেই। তার ঠোঁটের ফাঁকে ঈষৎ রোগা হাসি ফুটে উঠল। বলুন কিভাবে আমার নির্দোষিতার প্রমাণ দিতে পারি?

মোটিভ; মোটিভই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।

তাহলে তো সমস্তই পরিষ্কার হয়ে গেল। মিঃ শ্যাতানাকে হত্যা করবার পেছনে আমার কোনো উদ্দেশ্যই থাকতে পারে না। ভদ্রলোককে আমি ভালো করে চিনি না পর্যন্ত। এমনিতে ওঁকে আমার বেশ ভালোই লাগত। মনে হত, বেশ মজার মানুষ। তাছাড়া আর কোনো সম্বন্ধ নেই। আপনারাও নিশ্চয়ই এ-বিষয়ে ভালোভাবে অনুসন্ধান করবেন। দেখবেন, মিঃ শ্যাতানাকে খুন করবার পেছনে আমার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। এবং খুনও আমি করিনি।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল নীরস ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।

আপনার কথা শুনে আশ্বস্ত হলাম, ডাক্তার রবার্টস। তবে আপনি তো জানেনই আমাকে আইনমাফিক তদন্ত চালাতে হবে? ঘরের অপর তিনজন অতিথি সম্পর্কে কোনো কিছু আপনার জানা আছে?

না, এ-বিষয়ে আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারলাম না বলে দুঃখিত। ডেসপার্ড এবং মিস মেরিডিথের সঙ্গে আজই আমার প্রথম পরিচয়। অবশ্য মেজর ডেসপার্ডের নাম আমি আগেই শুনেছি। তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনি আমার খুবই প্রিয়।

ভদ্রলোকের সঙ্গে মিঃ শ্যাতানার যে আলাপ আছে একথা আপনি আগে জানতেন?

না, মিঃ শ্যাতানা আমাকে সে-বিষয়ে কিছু বলেননি। তাছাড়া ভদ্রলোকের নাম আগে শুনলেও আজই প্রথম আমাদের আলাপ হল। মিস মেরিডিথের সঙ্গেও ইতিপূর্বে আলাপ ছিল না, অবশ্য মিসেস লরিমারের সঙ্গে আগে থেকেই আমার অল্পবিস্তর আলাপ-পরিচয় ছিল।

ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে আপনি কি কিছু জানেন?

 বিশেষ কিছু নয়। তবে জানতাম তিনি একজন বিধবা ভদ্রমহিলা। মোটের ওপর ধনীই বলা চলে। যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। ব্রিজ খেলাতে খুবই এক্সপার্ট। সত্যি বলতে কি এক বন্ধুর বাড়ির ব্রিজের টেবিলেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে।

মিঃ শ্যাতানা কি কখনো আপনার কাছে তাঁর নাম উল্লেখ করেছিলেন?

না।

হুঁ…..যদিও সেটা আমাদের বিশেষ কোনো উপকারে লাগবে না…আচ্ছা ডাক্তার রবার্টস, ভালো করে ভেবেচিন্তে বলুন তো, ব্রিজ টেবিল ছেড়ে কতবার আপনি আজ উঠেছিলেন এবং বাকি তিনজনের গতিবিধিই বা কি রকম ছিল?

ডাক্তার রবার্টস মনে মনে মিনিটখানেক চিন্তা করে নিলেন। তারপর সোজাসুজি স্বীকার করলেন, আপনার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন কাজ। আমার নিজের গতিবিধির কথা বলতে পারি। মোট তিনবার আমি আসন ছেড়ে উঠেছিলাম। সে কবার আমি ছিলাম ডামি। প্রথমবার উঠে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের আগুনটাকে একটু উস্কে দিয়ে এলাম। দ্বিতীয়বার একজন মহিলার জন্য জল আনতে গেলাম। তৃতীয়বার কিঞ্চিত হুইস্কির প্রয়োজনেই আমাকে উঠতে হয়েছিল।

সময়ের কথা আপনার কিছু স্মরণে আছে?

মোটামুটি একটা আন্দাজ দিতে পারি, যেমন ধরুন, সাড়ে ন’টা নাগাদ আমরা প্রথম খেলতে বসি। অন্তত তার এক ঘন্টা বাদে ফায়ার প্লেসের কাছে গিয়েছিলাম। ডিল দু তিন বাদে আবার জল আনতে যাই। শেষবার যখন হুইস্কি আনতে গেলাম তখন রাত সাড়ে এগারোটা হবে। তবে সমস্তটাই আন্দাজে বলছি; ঘড়ি দেখিনি, তাই ভুল হওয়া কিছু বিচিত্র নয়।

মিঃ শ্যাতানার চেয়ারের পাশের টেবিলেই তো পানীয়ের গ্লাস সাজানো ছিল?

তাঁ, তার অর্থ আপনি মোট তিনবার ওই চেয়ারটার পাশ দিয়ে যাতায়াত করেছেন। এবং প্রতিবারই কি তাঁকে আপনি ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিলেন? অন্তত আপনার কি তাই মনে হয়েছিল?

প্রথমবার সেইরকম ভেবেছিলাম। দ্বিতীয়বার আমার মাথায় তাসের চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। ভদ্রলোকের দিকে তেমনভাবে নজর দিইনি। তৃতীয়বার তার পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে হয়েছিল ভদ্রলোক খুব ঘুমোতে পারেন যা হোক! তবে প্রকৃতপক্ষে কোনোবারই তার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে দেখিনি।

অন্যান্যরা কখনো তাঁদের আসন ছেড়ে উঠেছিলেন?

ডাক্তার রবার্টস ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করলেন। খুবই কঠিন প্রশ্ন…। ডেসপার্ড একবার উঠে গিয়ে একটা অতিরিক্ত অ্যাসট্রে নিয়ে এসেছিলেন। ভদ্রলোক একবার যেন পানীয়ের প্রয়োজনেও উঠেছিলেন। তবে সেটা আমার আগে কারণ যাবার সময় আমায় জিজ্ঞেস করলেন, আমার জন্য একটা গ্লাস আনবেন কিনা। সেই মুহূর্তে আমার হুইস্কির কোনো দরকার ছিল না। তাই তাকে নিষেধ করেছিলাম। 

আর মহিলারা..? মিসেস লরিমার একবার ফায়ার প্লেসের কাছে গিয়েছিলেন। বোধহয় আঁচটাকে গনগনে করার জন্য। তিনি যেন একবার শ্যাতানার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। সেই রকমই মনে হল তখন আমি একটা নো ট্রাম্পের খেলায় মত্ত ছিলাম। তাসটাও ছিল খুব জটিল।

মিস মেরিডিথ?

ভদ্রমহিলা একবার যে টেবিল ছেড়ে উঠেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফিরে আসার সময় পেছন থেকে উঁকি মেরে আমার হাতের তাস দেখে যান। সে-সময় আমি ছিলাম তার পার্টনার। তারপর ঘুরে অন্যদের হাতের তাস দেখলেন। শেষটায় ঘরের মধ্যে একপাক পায়চারি করলেন। আমি তার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিইনি। তাই কি করছিলেন বলতে পারব না। 

সুপারিনটেনডেন্টকে বেশ চিন্তান্বিত মনে হল। সেই সুরেই প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, আপনারা যখন তাস খেলছিলেন তখন কি কেউ ফায়ার-প্লেসের দিকে মুখ করে বসেছিলেন?

না, প্রত্যেকেরই চেয়ার ছিল একটু কোণাকুণিভাবে ঘোরানো। তাছাড়া মাঝখানে একটা মেহগনী কাঠের শৌখিন আলমারিও আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিল। একথা ঠিক যে সেই সময় মিঃ গ্যাতানাকে ছুরি মেরে খুন করা খুব একটা দুঃসাধ্য কাজ নয়। কারণ আপনি যখন ব্রিজ খেলছেন তখন ব্রিজই খেলছেন। চারপাশে কি ঘটছে না ঘটছে তাকিয়ে দেখবার অবকাশ থাকে না। এক মাত্র যার খুন করার সুযোগ থাকে সে হচ্ছে ডামি। আর এক্ষেত্রে…

এক্ষেত্রে ডামিই হচ্ছে খুনি তাতে কোন সন্দেহ নেই।

অবশ্য তাকে যে খুব একটা বিপজ্জনক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল এটা তো ঠিক। শেষ মুহূর্তে যে কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারত।

হ্যাঁ, ঝুঁকিটা সত্যিই খুব বিপজ্জনক। তাই মনে হচ্ছে মোটিভটাও খুব জোরালো ছিল। যদি একবার কোনোরকমে এই উদ্দেশ্যটা জানতে পারি…

আপনি নিশ্চয় তা খুঁজে বার করতে পারবেন। আপনার অসাধ্য কিছুই নেই। ভদ্রলোকের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখলেও এ ব্যাপারে কোনো হদিশ মিলতে পারে, নিশ্চয়ই কোথাও কোনো সূত্র পাওয়া যাবে।

সেই অবশ্য করছি। মন্থর ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন ব্যাটেল। তারপর অন্য সকলের দিকে এক নজর দেখে নিয়ে মৃদুকণ্ঠে আবার বললেন, এই বিষয়ে যদি আপনার ব্যক্তিগত মতামতটা জানতে পারি….

নিশ্চয়, নিশ্চয়! বলুন আপনি কি জানতে চান?

তিনজনের মধ্যে কাকে খুনি বলে আপনার সন্দেহ হয়?

ডাক্তার রবার্টস একটু থতমত খেয়ে গেলেন। তাঁর চোখে অসহায়তার ছাপ ফুটে উঠল। যদি সত্যিই আমার নিজস্ব মতামত জানতে চান তবে আমি মেজর ডেসপার্ডকেই হত্যাকারী বলে সন্দেহ করি। ভদ্রলোকের নার্ভ খুবই শক্ত। আজীবন বিপজ্জনক পারিপার্শ্বিকের মধ্যে কাটিয়েছেন। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেও তিনি অভ্যস্ত। এতবড় ঝুঁকি নেওয়া একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব। মহিলাদের কেউ এ ব্যাপারে জড়িত বলে আমার বিশ্বাস হয় না। কারণ এইভাবে খুন করার মতো মানসিক শক্তি তাদের মধ্যে সচরাচর দুর্লভ। তাছাড়া এব্যাপারে দৈহিক শক্তিরও বিশেষ প্রয়োজন।

না, এক্ষেত্রে গায়ের জোরের তেমন দরকার পড়েনি। এইটার দিকে তাকিয়ে দেখুন। সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল ডাক্তারের চোখের সামনে একটা লম্বা পাতলা ছোরা তুলে ধরলেন। ছোরাটার হাতলে চুনী-পান্নার কাজ করা। ধাতু-নির্মিত ফলা থেকে একরাশ ঝকঝকে আলো ঠিকরে পড়ছে।

ডাক্তার রবার্টস সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে পেশাদারি দৃষ্টি দিয়ে জিনিসটাকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। আলতোভাবে ছোরার ডগায় আঙ্গুল ঠেকালেন একবার।

তারপর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, কি সাংঘাতিক অস্ত্র। এই ছোট্ট খেলনাটা যেন কেবল খুনের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল। একটু ঠেকালেই একেবারে মাখনের মতো ঢুকে যাবে। খুনি নিশ্চয় এটা তার সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিল।

মাথা নাড়লেন ব্যাটেল। ছোরাটা মিঃ শ্যাতানার সম্পত্তি। দরজার পাশের টেবিলে অনেক পুরানো জিনিসপত্রের সঙ্গে এটাও পড়েছিল।

তাহলে খুনিই অস্ত্রটা খুঁজে বার করেছে? তার পক্ষে এমন একটা জিনিস হাতের কাছে পাওয়া খুব সৌভাগ্যের বলতে হবে।

শান্তকণ্ঠে সায় দিলেন ব্যাটেল। হ্যাঁ, একদিক থেকে দেখলে আপনার কথাই সত্য বলে স্বীকার করতে হয়।

অবশ্য মিঃ শ্যাতানার পক্ষে এটা সৌভাগ্যসূচক হয়নি। ভদ্রলোকের বরাতটাই খারাপ।

আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছিলাম। ঘটনাটা এমনও হতে পারে যে ছোরাটা দেখবার পরেই খুনির মাথায় হত্যার মতলব এসেছে।

আপনি বলতে চান, ছুরিটা দেখবার পরই খুনির মাথায় হত্যার বাসনা জাগে অর্থাৎ বিষয়টা মোটেই পূর্ব পরিকল্পিত নয়। এখানে আসবার পর কারো মনে এই চক্রান্তের উদয় হয়েছে এমন ধরনের কোনো ইঙ্গিত কি ইতিমধ্যে পেয়েছেন? কথাগুলি বলে ডাক্তার রবার্টস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ব্যাটেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

না, না, এটা একটা ধারণা মাত্র।

খুব একটা অসম্ভব ধারণা নয়। শান্তকণ্ঠে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করলেন রবার্টস।

ব্যাটেল অল্প কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন। আপনাকে আর বেশিক্ষণ আটকে রাখব না। আপনার সাহায্যের জন্য অজস্র ধন্যবাদ। যাবার আগে দয়া করে শুধু ঠিকানাটা রেখে যাবেন।

নিশ্চয়, এতে আর আপত্তির কি আছে। ২০০ নম্বর গ্লুকোস্টার টেরেস। ফোন নম্বর, বেস ওয়াটার, ২৩৮৯৬।

ধন্যবাদ, হয়তো আগামী দু-চারদিনের মধ্যেই আপনার আস্তানায় হাজির হতে পারি।

সে তো আমার পরম সৌভাগ্য। যে কোনো দিন সুবিধেমতো চলে আসবেন। একটা কথা, আশা করি খবরের কাগজে নিশ্চয় এ নিয়ে বেশি কিছু লেখালেখি হবে না। এতে আমার রুগীরা নার্ভাস হয়ে পড়তে পারে।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল পোয়ারোর দিকে ফিরে তাকালেন। মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার কিছু নতুন করে জিজ্ঞাসার নেই তো? আমার মনে হয় না ডাক্তার রবার্টস তাতে কোনো আপত্তি প্রকাশ করবেন।

নিশ্চই না, নিশ্চই না। আমি আপনার একজন বিশেষ গুণমুগ্ধ ভক্ত। আপনার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং অভুতপূর্ব বিশ্লেষণী ক্ষমতার কথা ইতিমধ্যে অনেক পড়েছি। নিশ্চয় খুব একটা সাংঘাতিক জটিল প্রশ্ন করবেন?

পোয়ারো স্বভাবসুলভ নিজস্ব ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন। না না, আমি সমস্ত জিনিসটা পরিষ্কারভাবে জানতে চাই। যেমন ধরুন, আপনারা কটা রাবার খেলেছিলেন?

তিনটে। চটপট জবাব দিলেন রবার্টস। চতুর্থ রাবারে যখন দু-পক্ষেরই একটা করে গেম হয়েছিল তখনই আপনারা এসে হাজির হলেন।

কোন রাবারে কে কার জুটি হয়ে খেলেছিলেন?

আমি আর মেজর ডেসপার্ড প্রথম রাবারে ভদ্রমহিলাদের প্রতিপক্ষ ছিলাম। চক্ষের পলক ফেলতে না ফেলতে মহিলারা আমাদের হারিয়ে দিলেন। স্বয়ং ঈশ্বর যাদের সাহায্য করেন তাদের মারে কে? ভালোমতো একটা হাতও আমরা তুলতে পারিনি। দ্বিতীয় রাবারে ছিল মেরিডিথ আর আমি খেলেছিলাম মেজর ডেসপার্ড আর মিসেস লরিমারের বিরুদ্ধে। তৃতীয়বারে আমার পার্টনার ছিলেন মিসেস লরিমার। বিপক্ষে মিস মেরিডিথ আর মেজর ডেসপার্ড। প্রত্যেকবারই আমরা তাস টেনে জুটি নির্বাচন করেছিলাম। এবং আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবারই সবার বরাতে নতুন নতুন পার্টনার জুটেছিল। চতুর্থ রাবারে আবার আমি আর মিস মেরিডিথ জুটি বেঁধেছিলাম।

হারজিতের ভাগ্যে কার কিরকম ভূমিকা?

মিসেস লরিমার প্রতিবারই জিতেছেন। মিস মেরিডিথ প্রথমবার মাত্র জিতেছিলেন। বাকি দুবার হারার দলে। সব মিলিয়ে আমার অল্প কিছু জিতই থাকবে। মিস মেরিডিথ আর মেজর ডেসপার্ড বেশ কিছু হারলেন।

পোয়ারো মৃদু হেসে প্রশ্ন করলেন, সুপারিএটেনডেন্ট ব্যাটেল খানিক আগে আপনার কাছে জানতে চাইছিলেন কাকে এই অপকীর্তির নায়ক বলে সন্দেহ করেন। আমি কিন্তু অন্য প্রশ্ন করব। আমার জিজ্ঞাসা, ব্রিজ খেলোয়াড় হিসেবে এঁদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা?

মিসেস লরিমার নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ খেলোয়াড়। ডাক্তার রবার্টস সঙ্গে সঙ্গে তার অভিমত ব্যক্ত করলেন। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ভদ্রমহিলা ব্রিজ খেলে সারা বছর বেশ দু’পয়সা রোজগার করেন। ডেসপার্ডের খেলাও বেশ ভালো। তবে কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখেন। মিস মেরিডিথ একেবারে কঁচা না হলেও এমন কিছু ভালো নয়। খুবই সাদামাটা ধরনের। তবে চট করে বড়রকম কোনো ভুল করে বসেন না। কম কম বিড দেন। কিন্তু খেলার মধ্যে তেমন বুদ্ধির জৌলুস নেই।

আর আপনি?

 ডাক্তার রবার্টস চোখ মিটমিট করলেন, আমি সাধারণত হাতের তুলনায় ডাকটা একটু বেশি দিয়ে থাকি। অন্তত অন্যরা তো আমার সম্পর্কে এই ধারণাই পোষণ করেন। তবে দেখছি তাতে লোকসান খুব একটা হয় না। বরঞ্চ লাভই হয় বেশি।

পোয়ারোর সযত্নলালিত গোঁফের ফাঁক দিয়ে বিজ্ঞ হাসির রেখা ফুটে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রবার্টস। আর কিছু জিজ্ঞাসার আছে?

পোয়ারো মাথা নাড়লেন।

তবে আজ চলি। শুভরাত্রি, মিসেস অলিভার। আপনার আগামী উপন্যাসের একটা ভালো প্লট পেয়ে গেলেন। অদৃশ্য বিষের চাইতে এটা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক হবে।

দ্রুত পায়ে ডাক্তার রবার্টস ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। সেইদিকে চোখ তুলে ব্যজার মুখে তাকিয়ে রইলেন শ্রীমতী অলিভার। তার কণ্ঠে বিরক্তির ছোঁওয়া। বললেন, সকলেরই ধারণা আমি যেন গল্পের প্লটের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। নির্বোধগুলো জানে না আমি আমার ঘরে বসেই এর চেয়ে উন্নত ধরনের খুনের উপায় আবিষ্কার করতে পারি। প্লট নিয়ে আমায় কোনোদিন মাথা ঘামাতে হয় না। আর যারা আমার বইয়ের একনিষ্ঠ পাঠক, তারা স্বাদ বর্ণ গন্ধহীন বিষের প্রয়োগই বেশি পছন্দ করে।

.

০৪.

 মিসেস লরিমার যথোচিত ভদ্রভাবেই ঘরে প্রবেশ করলেন। তাকে ঈষৎ ফ্যাকাশে দেখালেও চালচলন ধীর সংযত।

আপনাকে এমনভাবে বিরক্ত করবার জন্য আমি সবিশেষ দুঃখিত। বিনীত ভঙ্গিতে ক্ষমা চাইলেন ব্যাটেল।

না না, এতে বিরক্তির কি আছে। আপনার কর্তব্য তো করে যেতেই হবে। পরিস্থিতিটা যদিও খুব অস্বস্তিকর, কিন্তু তাই বলে তাকে তো আর এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া এটাও জলের মতো পরিষ্কার আমাদের চারজনের মধ্যেই কেউ হত্যাকারী। কাজেই শুধু মুখের কথায় আপনি আমাকে নির্দোষ বলে মেনে নিন এমন একটা আব্দার করাও যুক্তিযুক্ত নয়।

কর্নেল রেসের নির্দেশিত চেয়ারেই মিসেস লরিমার বসলেন। একেবারে সুপারিনটেনডেন্টের মুখোমুখি! ভদ্রলোক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিসেস লরিমারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পলকের জন্য দু’জনের চোখাচোখি হল। মিসেস লরিমার বুদ্ধিদীপ্ত সর্তক চোখে প্রশ্নের অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ব্যাটেল জেরা শুরু করলেন। মিঃ শ্যাতানাকে আপনি নিশ্চয় খুব ভালো করে চিনতেন?

খুব ভালো যে চিনতাম এমন কথা বলা যায় না। কয়েক বছর মাত্র আমাদের পরিচয় হয়েছে। তবে ভদ্রলোকের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠভাবে কখনো মিশিনি।

প্রথম কোথায় তার সঙ্গে আলাপ হয়?

মিশরের একটা হোটেলে। খুব সম্ভবত হোটেলটার নাম প্যালেস।

তার সম্বন্ধে আপনার কি রকম ধারণা?

মিসেস লরিমার। কিঞ্চিৎ অসহায় বোধ করলেন। ভদ্রলোকের সম্পর্কে আমার ধারণা অবশ্য তেমন উচ্চ নয়। তাকে একজন প্রকৃত সৎ ব্যক্তি বলে মেনে নেওয়া কঠিন।

মাপ করবেন, একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হচ্ছি। মিঃ শ্যাতানারে মৃত্যুতে নিশ্চয় আপনার কোনো স্বার্থসিদ্ধি ঘটবে না?

মিসেস লরিমারের কণ্ঠে কৌতুকের সুর শোনা গেল। যদি সত্যিই তেমন কিছু থেকে থাকে তবে আপনি কি মনে করেন এত সহজে আমি সেটা স্বীকার করে নেব?

হয়তো করবেন। কারণ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক মানুষেরই জানা আছে সকল গুপ্ত কথাই একদিন না একদিন প্রকাশ হয়ে পড়ে। তখন বিপদটা আর জোরালো ভাবে ঘনিয়ে আসার সম্ভাবনা।

চিন্তিত চিত্তে মাথা দোলালেন মিসেস লরিমার। বললেন, কথাটা খুবই খাঁটি। কিন্তু না সুপারিনটেনডেন্ট, মিঃ শ্যাতানার মৃত্যুতে আমি কোনো দিক থেকেই বিন্দুমাত্র লাভবান হব না। তিনি জীবিত বা মৃত যাই বলুন তাতে আমার কিছু যাবে আসবে না। ভদ্রলোক ছিলেন বেশ দাম্ভিক। তাঁর হাবভাব চালচলন সবই যেন থিয়েটারি ঢংয়ের। সেইজন্য মাঝে মাঝে আমার কেমন অস্বস্তি বোধ হত। এছাড়া তার সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা নেই।

ক্ষণকাল নীরব থেকে ব্যাটেল মনে মনে কি যেন চিন্তা করে নিলেন। তারপর আবার জেরা শুরু করলেন। আপনার বাকি তিনজন সঙ্গী সম্বন্ধে কোনো কিছু বলতে পারেন?

ওঁদের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু আমি জানি না। মেজর ডেসপার্ড এবং মিসেস লরিমারের সঙ্গে আজকেই প্রথম আলাপ। দুজনকেই বেশ হাসি খুশি আমুদে ধরনের বলে মনে হল। ডাক্তার বার্টসের সঙ্গে অবশ্য আমার আগে থেকেই অল্প পরিচয় আছে। শুনেছি তিনি একজন বেশ নামকরা বড় ডাক্তার।

আপনি নিশ্চয় তার পেশেন্ট নন,

না না…..

আচ্ছা মিসেস লরিমার, আজ ব্রিজ খেলার সময় কতবার আপনি নিজের টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়েছিলেন তা কি আপনার স্মরণ আছে? এবং কি প্রয়োজনেই বা উঠেছিলেন?

মিসেস লরিমার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বিন্দুমাত্র সময় নিলেন না। বললেন, এমন ধরনের কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন যে হতে হবে সেটা আগেই আন্দাজ করেছিলাম! তাই সঠিক উত্তরটাও ভেবে রেখেছি। একবার ডামি অবস্থায় আমি চেয়ার ছেড়ে ফায়ার প্লেসের কাছে গিয়েছিলাম। মিঃ শ্যাতানা তখন জীবিত ছিলেন। আমি তাকে বললাম, ঘর গরম রাখার জন্য আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বৈদ্যুতিক চুল্লির ব্যবস্থা করলেই তো পারেন? তার উত্তরে তিনি জানালেন, সাবেকি আমলের কাঠের চুল্লিই তার পছন্দ।

আপনাদের এই কথোপকথন ঘরের মধ্যে অন্য কেউ কি শুনতে পেয়েছিলেন?

সেটা আমি যাচাই করে দেখিনি। তবে না শোনাই সম্ভব। কারণ অন্য খেলোয়াড়দের মনোসংযোগে যাতে কোনো অসুবিধের সৃষ্টি না হয় সেই উদ্দেশ্যে আমি খুব গলা নামিয়ে কথা বলেছিলাম। মিসেস লরিমার অল্প ইতস্তত করলেন। তারপর শুষ্ক স্বরে বললেন, প্রকৃতপক্ষে মিঃ শ্যাতানা যে তখন জীবিত ছিলেন এবং আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তার কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত করতে পারব না। একমাত্র আমার উক্তিই এক্ষেত্রে সত্য বলে মেনে নিতে হবে।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করলেন না। তিনি তাঁর নিজের পথেই জেরা চালিয়ে গেলেন। বললেন, তখন সময় আন্দাজ কত?

খেলা শুরু হবার ঘন্টাখানেক কি তার কিছু পরে।

অন্যেরা কে কখন নিজেদের আসন ছেড়ে উঠেছিলেন?

ডাক্তার রবার্টস একবার উঠে গিয়ে আমার জন্যে এক পাত্র পানীয় নিয়ে আসেন। তিনি নিজেও পানীয়ের প্রয়োজনে একবার উঠেছিলেন। তবে সেটা আরও পরে মেজর ডেসপার্ডও একবার পানীয় আনতে উঠে যান। তখন প্রায় সওয়া এগারোটা।

তিনি সারাক্ষণের মধ্যে মাত্র একবারই উঠেছিলেন?

না, বোধহয় দুবার। পুরুষরা মাঝে মাঝেই উঠে যাচ্ছিলেন। তাই তেমন নজর দিয়ে দেখিনি। যতদূর মনে পড়ছে মিস মেরিডিথ একবার মাত্র তার আসন ছেড়ে উঠেছিলেন। পেছন থেকে উঁকি মেরে পার্টনারের হাতের তাস দেখাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

কিন্তু তিনি তো ব্রিজ টেবিলের আশে পাশেই ছিলেন?

তা আমি সঠিক বলতে পারব না। এধার-ওধার অল্প পায়চারিও করতে পারেন।

ব্যাটেল বিমর্ষ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বললেন, সমস্ত ব্যাপারটাই এত জটিল আর গোলমেলে আর এত অদ্ভুতভাবে অস্পষ্ট….

আমি খুবই দুঃখিত, ম্লান কণ্ঠে সমবেদনা জানালেন মিসেস লরিমার। এর বেশি বিশেষ কিছু লক্ষ্য করিনি।

সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল আবার আগের মতোই আচমকা ছোরাটাকে বার করে আলোতে মেলে ধরলেন। লম্বা তীক্ষ্ণ ইস্পাতের মসৃণ ফলাটা আলোর নীচে ঝলমলিয়ে উঠল। বললেন, মিসেস লরিমার, জিনিসটাকে একটু পরীক্ষা করে দেখবেন নাকি?

মিসেস লরিমার নির্বিকার দৃষ্টিতে ছোরাটার দিকে তাকালেন।

আগে কি কখনো এটা দেখেছিলেন?

না।

অথচ ড্রয়িং রুমের একটা টেবিলের ওপরই ভোলা অবস্থায় পড়েছিল।

আমি অতটা লক্ষ্য করিনি।

আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন মিসেস লরিমার, এমন একটা অস্ত্রের সাহায্যে পুরুষের মতো যে কোনো মহিলাও অনায়াসে খুন করতে পারেন।

হয়তো পারে। শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন মিসেস লরিমার। তারপর সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে ছোরাটা আবার ব্যাটেলের হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

তবে খুনিকে যে অপরিসীম ঝুঁকি নিতে হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এক্ষেত্রে ধরা পড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা ছিল।

কথাটা বলে সুপারিনটেনডেন্ট ব্যাটেল অল্প অপেক্ষা করলেন কিন্তু মিসেস লরিমার কোনো উত্তর দিতে আগ্রহ দেখালেন না।

অপর তিনজনের সঙ্গে মিঃ শ্যাতানার কি ধরনের সম্পর্ক ছিল সে বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত দিতে পারেন?

লরিমার দৃঢ়ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। বললেন, না।

এই তিনজনের মধ্যে কাকে আপনি খুনি বলে সন্দেহ করেন?

লরিমার কঠিন দৃষ্টিতে ব্যাটেলের চোখের দিকে ফিরে তাকালেন। মাপ করবেন, প্রশ্নটা আমার কাছে রীতিমতো অসঙ্গত বলে মনে হচ্ছে। আমি এর উত্তর দিতে অপারগ।

ব্যাটেলের মুখের চেহারা দেখে মনে হল তিনি যেন খুব ছোট দুষ্টু ছেলে। এইমাত্র দুষ্টুমি করবার জন্য ঠাকুমার কাছ থেকে বকুনি খেলেন।

আপনার ঠিকানা? পকেট ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে প্রশ্ন করলেন ব্যাটেল।

একশো এগারো নম্বর চেইন লেন, চেলসি।

ফোন নম্বর?

চেলসি–৪৫৬৩২।

 মিসেস লরিমার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

ব্যাটেল তাড়াতাড়ি পোয়ারোকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনি কি কোনো প্রশ্ন করতে চান, মিঃ পোয়ারো?

মিসেস লরিমার অপ্রসন্ন মুখে পোয়ারোর দিকে ফিরে তাকালেন।

আমি ম্যাডাম; আপনাকে কোনো অসঙ্গত প্রশ্ন করব না। এই তিনজনের মধ্যে কাকে আপনি খুনি বলে সন্দেহ করেন তা আমি জানতে চাই না। তবে ব্রিজ খেলোয়াড় হিসাবে এঁদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা যদি সেটা দয়া করে ব্যক্ত করেন….

এ-প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিলেন পরিমার, কিন্তু হত্যাকান্ডের সঙ্গে এর কি সম্পর্ক থাকতে পারে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

সে-বিচারের ভারটা না হয় আমার ওপরেই ছেড়ে দিন। আমি শুধু উত্তরটা জানতে পারলেই সবিশেষ বাধিত হব।

অসীম ধৈর্য সহকারে মা যেমন তাঁর অবোধ শিশুর সমস্ত অবান্তর প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকেন সেই সুরেই মিসেস লরিমার বললেন, মেজর ডেসপার্ড দস্তুর মতো হিসেবি খেলোয়াড়। ডাক্তার রবার্টসের হাতের লেখা খুবই ভালো তবে তিনি একটু বেশি বেশি ডাক দেন। মিস মেরিডিথের খেলাও মন্দ নয় কিন্তু খুব সাবধানী মহিলা। এছাড়া আর কিছু জানবার আছে?

ব্যাটেল যেরকম আচমকা ছোরাটা আলোতে মেলে ধরেছিলেন সেই রকম দ্রুত হাতে পোয়রা তার পকেট থেকে চারটে দলা পাকানো স্কোরশীট বার করলেন।

এর মধ্যে কোনো স্কোর কি আপনি লিখেছিলেন?

ভদ্রমহিলা একপলক সেইদিকে তাকিয়ে একটা স্কোরশীট হাতে তুলে নিলেন। এইটা আমার হাতের লেখা। তৃতীয় রাবারের সময় আমার ওপর স্কোর রাখার দায়িত্ব পড়েছিল।

আর এটা?

এটা নিশ্চয় মেজর ডেসপার্ডের লেখা হবে। তিনি স্কোর লেখার সময় কেটে কেটে চলেন যাতে এক নজরে হারজিতটা সহজে বোঝা যায়।

নীল কালিতে লেখা এই স্কোরটা?

এটা মিস মেরিডিথের। প্রথম রাবারের হিসেব।

 তাহলে এই অসমাপ্ত রাবারের হিসেবটা নিশ্চয় ডাক্তার রবার্টস রাখছিলেন।

হ্যাঁ।

অসংখ্য ধন্যবাদ ম্যাডাম। আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।

মিসেস লরিমার অপর দু’জনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। শুভরাত্রি, মিসেস অলিভার। কর্নেল রেস, শুভরাত্রি। তারপর চারজনের সঙ্গে করমর্দন করে তিনি ঘর থেকে বিদায় নিলেন।