০৪. যশোমতী পাঠক

০৪.

 যশোমতী পাঠক একবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল।

আজকাল ছবিতে গল্পে যে-রকম পালানো দেখা যায়, ঠিক সেই রকম পালানো। আর ছবিতে পালানোর যে সব কারণ দেখা যায়, সেই গোছেরই পালানো। যশোমতী পাঠক সেই পালানোর মহড়া দিয়েছে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে। বয়স যখন তার টেনে-টুনে এক কুড়ির বেশি নয়–তখন।

সেদিনের সেই যশোমতীকে নিয়ে কল্পনার অভিসারে গা ভাসায়নি শহরের অভিজাত ঘরের বয়সকালের এমন একটি ছেলেও ছিল কিনা সন্দেহ। সেই রোমান্স নিয়ে যে বড় রকমের হৃদয়বিদারক অঘটন কিছু ঘটে যায়নি, সেটাই আশ্চর্য। শহরের সর্বত্র তখন এমন আধুনিকতার ছাপ পড়েনি। মেয়েরা বেশির ভাগই তখন বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে অন্তরীণ। তারা লেখা-পড়া শিখছে বটে, স্কুলে কলেজেও যাচ্ছে–কিন্তু সেটা যতটা সম্ভব পুরুষের ছোঁয়া বাঁচিয়ে দৃষ্টি বাঁচিয়ে। আর তাদের সংখ্যাও নামমাত্র। কারণ পনেরো না পেরুতে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় তখন। বাইরের দিকে একটু তাকাবার অবকাশ যখন মেলে তখন তারা পাকাঁপোক্ত মায়ের আসনে বসে।

এমন দিনেই তরুণ মনে মেয়েদের এক বিশেষ অস্তিত্বের জোরালো ঘোষণার রোমাঞ্চ জাগিয়েছিল যশোমতী পাঠক। সেই ঘোষণা প্রাণ সম্পদ হয়ে দেখা দেবে কি প্রগতির বিকার হয়ে, রক্ষণশীল পরিণত বয়সের মহোদয় বা মহিলারা নিঃসংশয় নয় আদৌ। তবু কেউ উৎসাহ দিয়েছে, কেউ বা খুব সন্তর্পণে একটু উপদেশ দিয়েছে কিন্তু বাধা কেউ দিতে পারেনি। মেয়েদের ক্লাব হয়েছিল, মেয়েদের গান-বাজনা শেখার কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। মেয়েদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে বছরে দু-তিনবার অন্তত গোটা শহর মেতে উঠেছিল।

এই সমস্ত পরিকল্পনা আর উদ্দীপনার মূলে যশোমতী পাঠক। ইচ্ছে থাকলেও বাধা দেওয়া সম্ভব হয়নি এই কারণেই।

পনেরো বছরে স্কুলের পড়া শেষ করেছে যখন, তখন সকলে তাকে লক্ষ্য করেছে। উনিশ বছরে কলেজের প্রড়া শেষ করেছে যখন, তখন বহু তরুণের বুকের তলায় আগুন জ্বলেছে। কুড়ি বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছে যখন, তখন সে বলতে গেলে শহরের সমস্ত প্রগতি-পন্থী রমণী কুলের মুরুবি।

এই সবই সম্ভব যে জিনিসটি অঢেল পরিমাণে থাকলে সেই বস্তুটি টাকা। যশোমতীর বাবা চন্দ্রশেখর পাঠকের সেই পরিমাণ টাকা ছিল, যে পরিমাণ টাকা থাকলে স্বর্গের দরজা আর নরকের দরজা দুই-ই অক্লেশে খোলা যেতে পারে। দ্বিতীয় দরজার প্রশ্ন এখানে নেই কারণ, নিজের উপার্জনের টাকা চেনার মতো চোখ লোকের সচরাচর থাকেই। বিশেষ করে সে যদি ব্যবসায়ী হয়। চন্দ্রশেখরও টাকা চিনত, টাকার সম্মান করতে জানত, টাকার জাল ফেলে টাকা তুলতে পারত।

সূতো আর কাপড়ের কলের ব্যবসা এখানে সুদূরকালের। কিন্তু সেই যুগে ম্যাঞ্চেস্টার-ফেরৎ চন্দ্রশেখরই বস্ত্রশিল্পের অগ্রগণ্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি, অনুরাগীদের মুখে এমন কথাও শোনা গেছে। ব্যবসার স্বর্ণ শিখরে আরোহণের তাগিদে একবার নয়, একাধিকবার সে সাগর পাড়ি দিয়েছে।

এই মানুষের সুরূপা কন্যা বিশ বছর বয়েস পর্যন্ত অবিবাহিতা থাকলে লোকের চোখে কাঁটা ফোটে না। প্রায় তুলনীয় অভিজাত ঘরে এই ব্যতিক্রম বরং অনুকরণীয় বলে গণ্য হয়। বাপ বা অভিভাবকের তাড়ায় বিয়ে যাদের হয়ে গেছে, একটু বেশি বয়স পর্যন্ত অবিবাহিত থাকার চটক দেখে অনেকে তাদের মনে মনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু প্রায় সমতুল্য ঘর সেদিন খুব বেশি ছিল কিনা সন্দেহ। চন্দ্রশেখরের কটন মিল যখন জাঁকিয়ে উঠেছে–তার সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী তখন একজনও ছিল কিনা সন্দেহ।

গর্বিত, রাশভারী মানুষ চন্দ্রশেখর। সমালোচনা বরদাস্ত করতে পারে না, কোনরকম প্রতিবাদও সহ্য করতে পারে না। নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়েছে–নিজের শক্তিতে চলে ফেরে ওঠে বসে। নিজের মগজের ওপর অফুরন্ত আস্থা তার। ফলে, অনেকে তাকে দাম্ভিক স্বেচ্ছাচারী ভাবে, ভয় তোকরেই। কিন্তু বিপুল বিত্তের অধিকারী এই মানুষটি ভিতরে ভিতরে লোক খারাপ ছিল না। প্রবল ব্যক্তিত্বের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রেখে লোকের উপকার ছাড়া অপকার কখনো করেনি। কোনো কিছু দৃষ্টি এড়াতো না, কিন্তু ঘরের মেয়েটি যে তার আচার আচরণে সর্বতোভাবে তারই উত্তরাধিকারিণী হয়ে উঠেছিল, সে-সম্বন্ধেই খুব সচেতন ছিল না ভদ্রলোক।

সচেতন হয়েছিল কিছু দেরিতে।

সকলে সমীহ করত তাকে। মনে মনে স্ত্রী কমলাদেবীও একটু ভয়ই করত। ভয় করত বলেই সাড়ম্বরে সেটা অস্বীকারও করত সর্বদাই। কিন্তু জীবন-সংগ্রামের শুরু থেকে চেনা বলে ভদ্রলোকের খিটির-মিটির বাধত এই একজনের সঙ্গেই।

চন্দ্রশেখর সেটা এড়াতে চেষ্টা করত, কিন্তু পেরে উঠত না সব সময়। এত অর্থ আর এতবড় ব্যবসার একটা আনুষঙ্গিক উৎপাতও শরীরে দেখা দিয়েছিল। সেটা ব্লাডপ্রেসার। চুপ করে থাকবে ভাবলেও সর্বদা হয়ে ওঠে না। ফলে চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করে তোলে, যখন মেজাজ চড়ে। বাড়ির শান্তি বজায় রাখার জন্য একটা স্বাধীনতা বরাবর দিয়ে এসেছে। টাকার স্বাধীনতা। ব্যাঙ্কে স্ত্রীর নামে, ছেলের নামে, আর মেয়ের নামে অঢেল টাকা জমা করে রেখেছে। টাকা অন্যায়ভাবে তছনছ করা হচ্ছে কিনা সেটা শুধু খোঁজ-খবর করত ছেলে গণেশ পাঠকের বেলায়। ছেলেরা যত সহজে টাকা নষ্ট করতে পারে, মেয়েরা তার সিকিও পারে না বলে তার ধারণা। টাকা নষ্ট হলেও আক্ষেপ নেই খুব, কিন্তু ছেলে বিপদে পা বাড়ালে সেটা সহ্য হবে না। মেয়ে অথবা মেয়ের মায়ের খরচ নিয়ে ভদ্রলোক একটুও মাথা ঘামাত না। তাদের খরচ বলতে তো শুধু শাড়ী-গয়না-পার্টি আর পার্টির চাঁদা। কত আর খরচ করবে?

তবু স্ত্রীর সঙ্গে যে এক একসময় ঝগড়া বেধে যেত, তার একটা কারণ আছে। কমলাদেবী মহিলাটি একেবারে যে নির্বোধ তা নয়। কিন্তু স্বামীর বুদ্ধি আর চিন্তার সঙ্গে তাল রেখে চলা সত্যিই কঠিন ব্যাপার। অথচ এমন একজনের ঘরণী সে, সর্বদা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেই বা কি করে। নিজের যথাযোগ্য মর্যাদা বজায় রাখতে গিয়ে, অর্থাৎ সমান তালে বুদ্ধি আর চিন্তা খাটাতে গিয়েই যত গণ্ডগোল। মহিলা এমন কাণ্ড করে বসে এক-একসময়, বা এমন কিছু বলে যে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখা দায়। বাইরের অনেক আচার-অনুষ্ঠানে শুধু মাত্র স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়েই ভদ্রলোকের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। আর তাই নিয়েই তুমুল হয়ে যায় এক-একদিন।

বাবা-মায়ের এই ঝগড়াঝাটি যশোমতী বেশ উপভোগ করে। মায়ের হেনস্থা দেখে তার স্বাধীনচেতা মন এক এক সময় ভ্রুকুটি করে ওঠে। আবার বয়স্কদের ছেলেমানুষী দেখে হেসে গড়ায়। তবু, বাইরের দিক থেকে বাবার চেয়েও মায়ের ওপরেই তার টান বেশি। তার কারণ, বাবার মেজাজ যে তার নিজেরও। ফলে, মেজাজ যে বেশি দেখায় তার ওপরেই তার মেজাজ চড়তে চায়।

কিন্তু বাড়িতে একদিন গণ্ডগোল পাকিয়ে উঠল যশোমতীকে নিয়েই। অর্থাৎ, তার বিয়ে নিয়ে। যশোমতী তখন এম-এ পড়ছে। যশোমতী ততদিনে মেয়েদের ক্লাব করেছে। যশোমতী ততদিনে অনেক আসরে গানের খ্যাতি কুড়িয়েছে। যশোমতী এমন অনেক কিছু করেছে যা তার বয়সে কেউ কখনো কল্পনাও করেনি। ফলে যশোমতী তখন নিজের থেকে বেশি বুদ্ধিমতী আর কাউকে মনে করে না।

কিন্তু তার বিয়ে নিয়ে বাড়িতে বাবা-মায়ের একটা বিবাদের প্রহসন অনেকদিন ধরেই তলায় তলায় জমাট বেঁধে আসছিল। যশোমতী তা লক্ষ্য করত আর উপভোগ করত। বাবা-মা আর দাদার ত্রিমুখী ধারা দেখে তার বেশ মজাই লাগত। বাবা কারো সঙ্গে পরামর্শ করার মানুষ নয়। তার সব থেকে প্রিয়পাত্র গোফওলা বিশ্বনাথ যাজ্ঞিক। চোখে পড়ার মতো প্রশ্রয় বাবা সচরাচর কাউকে দেয় না। কিন্তু বিশ্বনাথের ব্যাপারে তার পক্ষপাতিত্ব যশোমতীর চোখে অন্তত পড়ত। বাড়ির যে-কোনো অনুষ্ঠানে ওকে নেমন্তন্ন করা চাই। কোথাও বেড়াতে যাওয়া হবে ঠিক হলে বাবা তক্ষুনি বলবে, বিশ্বনাথকে খবর দেওয়া যাক, ও সঙ্গে থাকলে নিশ্চিন্তি।

যশোমতীর মতেও হয়তো লোকটা খুব মন্দ নয়, অনেক ব্যাপারে তার খুঁত ধরতে চেষ্টা করেও সামনাসামনি বিরূপ হবার মতো কোনো বড় গোছের ত্রুটি দেখতে পায় নি। তার ওপর লোকটা ধীর-স্থির বিনয়ী স্বল্পভাষী। বাড়িতে সর্বদাই যাওয়া-আসা। কিন্তু ওই গোঁফ চক্ষুশূল যশোমতীর। সে মুখের কথা খসালেই বিশ্বনাথ গোঁফ নিমূল করে ফেলবে, তাতে অবশ্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সে বলতে যাবে কেন? ওই গোফ থেকেই ভিতরের রুচি বোঝা যায়। আসলে গোঁফের এই ত্রুটি আবিষ্কার যে উপলক্ষ মাত্র, যশোমতী নিজেও তা ভালো জানে না। ছেলেটার আসল অপরাধ, সে তার বাবার নির্বাচিত ব্যক্তি। বাবার ব্যবস্থা নাকচ করে দেবার মতো সাবালিকাত্ব যশোমতী অর্জন করেছে। বাবার আদরের মানুষ বলেই তার ওপর রাগ। বাপকে বশ করে যে মেয়ে ধরতে চায়, তার দিকে তাকাতেও রাজি নয় যশোমতী।

অথচ বাবার দুনিয়ায় এক মাত্র বিশ্বনাথই তার মেয়ের যোগ্য ছেলের মতো ছেলে। বাবার এক-নম্বর সেক্রেটারী। বাবার সঙ্গে বার-দুই বিলেত ঘুরে এসেছে। সৎ ব্রাহ্মণবংশের ছেলে। বনেদী বড় ঘর। কর্মঠ। এরই মধ্যে ব্যবসার নাড়ী-নক্ষত্র সব বুঝে নিয়েছে। তাদের নিজেদের বাড়িতে টাকার ছড়াছড়ি, শুধু বাবার আকর্ষণেই নাকি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। দরকার পড়লে এই এতবড় ব্যবসাটা সে নিজের হাতে চালাতে পারে এখন, এই বিশ্বাসও বাবার বদ্ধমূল।

আর সেই দরকার একদিন-না-একদিন তো পড়বেই। কারণ, ক’বছর আগেই দাদার জন্য বিরাট একটা আলাদা মিল কিনেছে বাবা। সেই মিলের একচ্ছত্র মালিক দাদা। দাদা সেটা চালাচ্ছে এখন। বাবা তাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, নিজের মিল যত পারে বড় করে তুলুক–বাপের মিলের কোনো অংশ সে যেন আশা না করে। অর্থাৎ বাবার অবর্তমানে এই মিলের মালিক হবে মেয়ে। এই থেকেই মেয়ের প্রতি বাপের প্রচ্ছন্ন পক্ষপাতিত্বটুকু বোঝা যাবার কথা। কিন্তু তখন বোঝার মতো চোখ কারো ছিল না। যশোমতীর তো ছিলই না, কারণ, ব্যবসা চালানোর ব্যাপারে বিশ্বনাথের মুখাপেক্ষী না হলে অথৈ জলে হাবু-ডুবু খেতে হবে মেয়েকে–বাবার এই ধারণার বিরুদ্ধেই যশোমতী মনে মনে ভ্রুকুটি করে এসেছে সর্বদা।

যাই হোক, নিজের মিল বাবার সাহায্যে দাদা ভালই দাঁড় করিয়েছে। দাদা বয়সে সাত-আট বছরের বড় যশোমতীর থেকে। দাদাটি বিয়ে করেছিল বাইশ বছর বয়সে। মস্ত বড় ঘরেই বিয়ে হয়েছিল তার। স্বভাবতই এই ভ্রাতৃবধুটিও বড় ঘরের মেজাজ নিয়েই এসেছিল এ-বাড়িতে। প্রথম দু’চার বছর ইচ্ছেয় হোক আর অনিচ্ছেয় হোক সে মানিয়ে চলেছে। তার পরেই তার হাব-ভাব চাল-চলন বাপের বাড়ির ধারায় বদলাতে শুরু করল। এক পরিবারে দুই কত্রীর আধিপত্য টেকে না। মায়ের সঙ্গে বউয়ের একটু-আধটু মনকষাকষির সূত্রপাতেই দাদার আলাদা বাড়ি হয়েছে। ভালো জমি বাবা আগেই কিনে রেখেছিল, দাদার বাসনা বুঝে বাড়িও বাবাই তুলে দিয়েছে। সেই বাড়িতে সর্বাধুনিক হাল-ফ্যাশনের ব্যবস্থাগুলো শুধু দাদার টাকায় হয়েছে। অতএব ষোল বছর বয়স না হতেই যশোমতী জানে, বাবার এই বাড়ির একচ্ছত্র ভাবী মালিক সে-ই।

যাই হোক, বাবার মগজে চেপে বসে আছে বিশ্বনাথ যাজ্ঞিক। তার সঙ্কল্প, ফুরসত মতো বিয়েটা দিয়ে দেবেন। আর তারপরেও মেয়ে-জামাই চোখের আড়াল হবে না। এখানেই থাকবে তারা। সঙ্কল্পের কথা বাবা মুখ ফুটে কখনো বলে নি অবশ্য। অন্তত, এখন পর্যন্ত যশোমতী নিজের কানে বলতে শোনে নি। কিন্তু বাবার মনে কি আছে বোঝা একটুও কঠিন নয়।

দাদা আলাদা বাড়িতে আছে বলেই তার সঙ্গে প্রীতি এবং সন্তাব সম্পূর্ণ বজায় আছে। সে নিয়মিত আসে, বাবা-মায়ের খোঁজখবর করে। খোঁজ-খবরটা যশোমতীর আরো বেশি নিতে শুরু করেছে ইদানীং–সোজা তার কাছেই আসে, গল্প করে। যশোমতী এবং তার মায়েরও ছেলের বাড়িতে যাওয়া-আসা আসে। এই হৃদ্যতার ফলেই বোনের ওপর কিছুটা জোর আছে ধরে নিয়েছিল দাদা। মনে মনে তাই যশোমতীর জন্যে সে-ও একটি পাত্র স্থির করে বসে আছে। অবশ্য নিজের তাগিদে করে নি, করেছে স্ত্রীর তাগিদে–আর শ্যালকের তাগিদে। শুধু শ্যালক নয়, শ্যালক বন্ধুও বলা যেতে পারে।

এই শ্যালকটি স্বয়ং দ্বিতীয় পাত্রবীরেন্দ্র যোশী। দাদার নিজের শ্যালক, অর্থাৎ বউদির ভাই। দাদার থেকে বছর দুই ছোট হলেও তারা পরস্পরের গুণমুগ্ধ ভক্ত। দাদার ব্যবসায়ের সে ডান হাত। বিশ্বনাথ যাজ্ঞিক বাবার যেমন ডান হাত, সে-রকম নয়। তার থেকে অনেক বেশি। বাবার ধারণা, ডান হাত দিয়ে সে আর একটি ডান হাত গড়ে তুলেছে, কিন্তু দাদার বিশ্বাস এই শ্যালক বন্ধুর একাগ্র নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের ফলেই তার ব্যবসা এমন চট করে ফুলে ফেঁপে উঠতে পেরেছে।

যশোমতী ধরেই নিয়েছে তাকে বিয়ে করার ইচ্ছেটা সে-ই সঙ্গোপনে দাদার কাছে প্রকাশ করেছে। আর তারপর দাদা-বউদি মেতে উঠেছে। এই মাতামাতিটা আজকাল একটু বেশিই করেছে তারা। দাদার বাড়ি গেলেই তার দেখা অবধারিত মিলবে। বউদিই হয়তো আগে থাকতে খবর দিয়ে রাখে ভাইকে। বীরেন্দ্র যোশর ইচ্ছেটা তার হাব-ভাবে অনেক আগেই যশোমতী বুঝে নিয়েছিল। তার দিক থেকে উৎসাহ বোধ করার মত কোনরকম সদয় আভাস না পেয়ে শেষে দাদাকে মুরুবি পাকড়েছে। লোকটির প্রতি দাদা, এত নির্ভরশীল যে হয়তো তাকে আশ্বাসই দিয়ে বসেছে, কিছু ভাবনা নেই, ব্যবস্থা হবে।

যখন-তখন দাদা তার শ্যালক-বন্ধুকে নিয়ে এ বাড়িতে হানা দিচ্ছে আজকাল। পরম স্নেহভরে হাঁকডাক করে বোনকে ডাকে। আর ফাঁক পেলেই বন্ধুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। ছদ্ম বিস্ময়ে যশোমতী এক একসময় হাঁ করে চেয়েই থাকে বীরেন্দ্র যোশীর দিকে–অর্থাৎ এত গুণ কোনো এক মানুষের থাকে সেই বিস্ময়েই যেন তার চোখের পলক পড়ে না।

আনন্দে পুলকে বীরেন্দ্র যোশী ঘামতেই থাকে বোধহয়। এখানে বিয়ে হলে এই দিকের বিশাল সম্পত্তিও নিজেদের মধ্যেই থেকে গেল ….দাদার কানে বউদির এই মন্ত্র ঢোকানও বিচিত্র নয়।

কিন্তু এই পাত্রও যে আদৌ পছন্দ নয়, সে শুধু যশোমতীই জানে।

মায়ের হাতেও তার বিশেষ পছন্দের পাত্র আছে একটি। তৃতীয় ক্যাণ্ডিডেট। রমেশ চতুর্বেদী। বড় মিল-মালিকের ছেলে সে-ও। রমেশ চতুর্বেদীর মায়ের সঙ্গে যশোমতীর মা কমলা দেবীর ইদানীং খুব ভাব। ভাবের সমস্ত রাস্তা রমেশের মা-ই প্রসারিত করেছে। সেটা ছেলের মুখ চেয়ে। রমণীমহলে মহিলাটি কমলা দেবীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে চেষ্টা করা দূরে থাক, উন্টে তাঁর কথায় সর্বদা সায় দিয়ে চলে। মায়ের বিচারবিবেচনা বুদ্ধির প্রশংসা তার মুখে যত, আর কারো মুখে তত নয়। আর ছেলের তো কথাই নেই, মাসি বলতে অজ্ঞান। সে যে অনুষ্ঠানের মাতব্বর, মাসি অর্থাৎ যশোমতীর মায়ের সেখানে সর্বাগ্রগণ্য মর্যাদা। যশোমতী দেখে আর হাসে আর ভাবে এমন ভাবী শাশুড়ী ভক্ত মানুষ সচরাচর দেখা যায় না বটে।

অতএব মায়ের মতে রমেশ চতুর্বেদী হীরের টুকরো ছেলে। বিয়ে না হতেই যে ছেলে তাকে এতটা মর্যাদা দেয়, বিয়ে হলে সে কি করবে? অভিজাত মহলে একটু বিশেষভাবেই গণমান্য হয়ে ওঠার ইচ্ছেটা মায়ের একটু বেশিই। তার ধারণা জামাই হলে রমেশ এ ব্যাপারে সকলের থেকে কাজের হবে। বছরে দু’তিনটে বড় ফাংশানের মাতববর সে বটেই, তার জামাই হলে ভবিষ্যৎটা আরো উজ্জ্বল তো হবেই। যশোমতী মায়ের বাসনা বুঝে মনে মনেই শুধু হাসে, বাইরে নির্বোধের মতো থাকে। কারণ, তার বিবেচনায় রমেশ চতুর্বেদীও বাতিল। কেন বাতিল, সেটা অত তলিয়ে ভাবে নি, নির্বাচনটা মায়ের বলেই হয়তো নির্দ্ধিধায় বাতিল।

সকলকে বাদ দিলেও ক্যাণ্ডিডেট তার নিজের হেপাজতেও জনা দুই অন্তত আছে। প্রত্যাশীর সংখ্যা তার ঢের বেশি, কিন্তু তাদের মধ্যে এই দু’জন আর কোনো সুপারিশের ওপর নির্ভর না করে বুদ্ধি মানের মতো নিজেরাই এগিয়ে আসতে চেষ্টা করছে। শিবজী আর ত্রিবিক্রম। এরাও মস্ত ঘরের ছেলে। কুল-মান-যশে কারো থেকে ফেলনা নয়। অন্যদের মতোই রুপোর চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। লেখা-পড়ায় তো ভালই আবার পাঁচ কাজে চটকদার উদ্ভাবনী শক্তিও আছে। বিশ্বনাথ বাবার মুখ চেয়ে আছে, রমেশ চতুর্বেদী মায়ের আর বরেন্দ্র যোশী দাদার। এদের তুলনায় শিবজীর চালচলন শিবজীর মতোই সুতৎপর, আর ত্রিবিক্রমের রসিকতার বিক্রম অন্তত তিনগুণ বটে। এই দুজনের একজনকেই যে একেবারে স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করে বসে আছে যশোমতী, এমন নয় আদৌ। তবে ঘরের কল্পনা যদি কখনো-সখনো করতে হয়, এই দুজনের একজনকে নিয়েই করতে চেষ্টা করেছে। কখনো ভাল লাগে নি, কখনো বা একেবারে মন্দ মনে হয় নি। তবে অন্য সকলের থেকে এই দুজনের প্রতি যশোমতীর একটু অনুকম্পা বেশি, কারণ, তারা শুধু তারই ওপর নির্ভর করে আসছে। তাদের সুপারিশ সরাসরি তারই কাছে।

দাদা বলে, যোশীর শিকারে বেরুবার ইচ্ছে, আমরাও যাব ভাবছি, তুই যাবি?

অবধারিত ভাবেই যশোমতীর দু’ চোখ কপালে উঠবে। কারণ, দাদা এক-এক সময় যোশীর এক-একটা গুণ আবিষ্কার করে থাকে। তারপর চোখের নীরব বিস্ময় চৌচির হয়ে গলায় এসে ভাঙে।–….কি আশ্চর্য, তার আবার শিকারের শখও আছে নাকি!

-শখ মানে? নেশা! ক’টা বছর ব্যবসা নিয়ে মেতেছিল বলে, নইলে কোন্ গুণ না আছে তার? এ-রকম একটা ছেলেও তত আজকাল আর দেখা যায় না। দেখা যায় না সেই খেদে দাদার দীর্ঘনিঃশ্বাই পড়ে।

চমৎকৃত না হয়ে উপায় নেই যশোমতীর, মাথা নেড়ে সায় দেয়, সত্যি….ভদ্রলোক গান-বাজনায় ভালো, খেলাধুলোয় তো কথাই নেই, হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় ছেড়ে না দিলে লেখাপড়াতেও তার জুড়ি ছিল না শুনেছি, ব্যবসায়ও এত মাথা, এখন আবার শুনছি শিকারেও ওস্তাদ। আর আজকালকার ছেলেগুলো যা হয়েছে, কিছুতে পাকা হতেই মেরুদণ্ড বেঁকে যায়।

দাদার উদ্দীপনা চতুর্থন। গলা খাটো করে বলে, সেই জন্যেই তো বলছি, ওই রকম একটা ছেলেকে আত্মীয় করে নিতে পারা ভাগ্যের কথা।

যশোমতীর বোক বোক। বিস্ময়, তোমার নিজের শালা…. আত্মীয়ই তো!

ফলে বোনকে বোকাই ভাবে দাদা, এই এক ইঙ্গিত যে কতবার কত ভাবে করেছে, ঠিক নেই। কিন্তু ওর মাথায় কিছু ঢুকলে তো, বাবার টাকায় হৈ-চৈ করে, লোকে ভাবে বুদ্ধিমতী। ফলে মাথায় ঢোকানোর চেষ্টায় সেই অগুঢ় ইঙ্গিতের পুনরাবৃত্তি করতে হয়। শুনে যশোমতী লজ্জা পায় প্রথম, পরে চিন্তিত মুখে বলে, কিন্তু বাবার যে আবার অন্যরকম ইচ্ছে।

–দূর দূর দূর। বিতৃষ্ণায় নাক-মুখ দেখার মতোই কুঁচকে ওঠে দাদার।-কোথায় যোশী আর কোথায় বিশ্বনাথ। আত্মসম্মানবোধ থাকলে কেউ সেক্রেটারির কাজ করে। নিজেদের একটা কর্মচারীকে বিয়ে। বংশের কে কবে রাজা-উলীর ছিল বাবার কাছে সেটাই বড়। তুই জোর দিয়ে আপত্তি কর, লেখাপড়া শিখেছিস, অন্যের কথায় বিয়ে পর্যন্ত করতে হবে নাকি? আর বাবা তো তোকে একটু ভালোই বাসে, তোর আপত্তি শুনলে এগোবে না।

দাদার বরাবরই বিশ্বাস তার থেকেও বাবার চাপা স্নেহ এই বোকা বোনটার প্রতিই অনেক বেশি।

নিরীহ এবং চিন্তাচ্ছন্ন মুখে যশোমতী প্রস্তাব করে, আমার হয়ে বাবার কাছে আপত্তিটা তুমিই করে দাও না?

দাদা তিক্ত বিরক্ত, বিয়ে করবি তুই আর আমি যাব আপত্তি করতে। তাছাড়া বাবা অমনি ধরে নেবে আমার শালার টানেই ব্যাগড়া দিতে গেছি।

যশোমতী আরো কাতর মুখ করে জবাব দেয়, ধরলেই বা, সেটা তো আর সত্যি নয়, তুমি তো আমার মুখ চেয়েই বলতে যাচ্ছ। তা যদি না পারো তাহলে থাকগে, আমার কপালে যা আছে তাই হবে।

প্রায় হাল ছেড়েই দাদা আবার নতুন করে বোঝাতে বসে তাকে, সাহস দেয়, উদ্দীপনা সঞ্চার করে। যশোমতী শেষে তাকে ভরসা দিয়ে বলে, আচ্ছা, মনে মনে কিছুদিন আগে জোর গলায় আপত্তি করি, শেষে ঝপ করে বাবাকে একদিন বলে ফেলতে পারব।

সুযোগ পেলে মা-ও তার প্রস্তাব নিয়ে উপস্থিত হয়। তবে মা দাদার মতো অত বাঁকা রাস্তা ধরে এগোয় না। সোজা ব্যাপার ছাড়া মাথায় ঢোকে না, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতেও পারে না। মা সোজাসুজি বলে, মিসেস চতুর্বেদী তো মুখের কথা পেলেই কাজে নেমে পড়ে, আমাদের দিক থেকে আর দেরি করা উচিত নয়, রমেশের মতো ছেলের জন্য কত মেয়ের মা তো হাত বাড়িয়েই আছে।

আবার সেই নির্বুদ্ধিতার পুনরাভিনয়।–মেয়ের মা হাত বাড়িয়ে আছে কি না?

-আঃ! কমলা দেবী বিরক্ত, কিছু যদি বুঝিস–হাত বাড়িয়ে আছে মানে রমেশের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে আছে।

-ও…. তা দিচ্ছে না কেন?

কতবার বলব তোকে, তারা যে আমাদের সঙ্গেই কাজ করতে চায়!

যশোমতীর মুখখানা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হবেই এবার। মাকে তাতিয়ে তোলার মোক্ষম উপায়ই জানা আছে তার, অতএব হেসে ফেললে মুশকিল। তাই তার মতে সায় দেবার মতো করেই সমস্যাটা ব্যক্ত করবে। বলবে, দাদা যে আবার তার শালার কথা বলে?

-কি! মায়ের মেজাজ চড়বে তৎক্ষণাৎ।–এখনো বুঝি সে সেই মতলবে আছে? এক মেয়ে এনেই খুব আক্কেল হয়েছে, আবার ওই খানে। আস্পর্ধার কথা শুনলে গা জ্বলে যায়। সাফ না বলে দিবি। তাছাড়া বীরেন্দ্রও ছেলে আর রমেশও ছেলে….কার সঙ্গে কার তুলনা।

একজনের তুলনায় আর একজন ছেলে কিনা মায়ের প্রায় সেই সংশয়। মেয়েকে বোকার মতো চেয়ে থাকতে দেখে তার অস্বস্তি বাড়ে, আবার তোকে কি বলেছে শুনি?

করুণ অবস্থা যশোমতীর মুখের, বলছিল, যোণীর মতো এত গুণের ছেলে অর্ডার দিলেও আর মিলবে না, ভগবানের হাত ফস্কে ওই একজনই এসে গেছে।

রসিকতার ধার দিয়ে না গিয়ে মা রেগে লাল, ও বলল আর তুই অমনি ভুলে গেলি?

–ভুলব না বলছ?

দেখ, তোর বয়স হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছিস, একটু বুদ্ধি রেখে চলতে চেষ্টা কর। এই সব ওই বউয়ের কারসাজি, একজনকে তো কেড়েছে আবার তোর দিকে চোখ পড়েছে। রমেশের পাশে ওই যোশী একটা বাঁদর-যাকে বলে একটা কাক-বুঝলি?

মায়ের রাগের মুখে এই গোছেরই উপমা বেরোয়। যশোমতীরদু’চোখ কপালে, উচ্ছ্বসিত হাসির দমক আর ঠেকাতে পারেই না বুঝি।

এদিকে শিবজী আর ত্রিবিক্রম চুপ করে বসে নেই। তারা বিশ্বনাথ যাজ্ঞিককে চেনে রমেশ চতুর্বেদীকে চেনে। আর তাদের খুটির খবরও রাখে। ওরা নিজেরা দু’জনে আবার একাত্ম বন্ধু। ফলে রেষারেষিটা বাইরে থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। রমেশ বা বীরেন্দ্রর জন্য তাদের চিন্তা নেই। খোদ কর্তার ক্যাণ্ডিডেট বলে তাদের যা কিছু দুর্ভাবনা বিশ্বনাথকে নিয়ে আর পরস্পরকে নিয়ে। যখন আসে, প্রায়ই একসঙ্গে আসে দু’জনে। আর বৈচিত্র্যের আশায় দু-একটা প্রস্তাব তারাও করে, অনেকদিন একঘেয়ে কাটছে, একটু এক্সকারশনে বেরুলে হত….

যশোমতী চোখের কোণে দু’জনকেই লক্ষ্য করে নির্লিপ্ত জবাব দেয়, বীরেন্দ্র যোশী শিকারে যাবার কথা বলছিল।

সঙ্গে সঙ্গে মুখে আঁচড় পড়ে ওদের। শিবজী বলে, হুঃ! বাপের আমলের বন্দুকে মরচে পড়ে গেছে শুনেছি

ত্রিবিক্রম নড়ে-চড়ে বসে বিতৃষ্ণার আবেগ সংযত করে হালকা সুরেই জিজ্ঞাসা করে, কোথায় শিকারে যাবে, চিড়িয়াখানায়?

এই সবই উপভোগ করে যশোমতী। ছেলেদের নিয়ে খেলা করে যে মেয়ে, যশোমতী তাদের একজন নয়। সে কাউকে ডাকে না, কাউকে কোনো রকম চটুল আশায় বা আশ্বাসে ভোলায় না। নিজের স্বভাব কৌতুক ছাড়া কারো সঙ্গে রঙ্গ-রসে মেতে ওঠে না। তবু আসেই যদি সব, ও কি করতে পারে। তাই বাস্তবিকই মজা লাগে তার। বাবাই শুধু কিছু বলে না। অর্থাৎ তার বিবেচনার ওপর কথা বলার কেউ নেই–এই ভাব।

.

কিন্তু এ-ধরনের পারিবারিক অথবা বাইরের মানুষদের নিয়ে প্রহসন যত কৌতুককরই হোক, শুধু এই নিয়ে দিন কাটানো শক্ত। তার সান্নিধ্যে আসার রেষারেষি যাদের, সকলেই তারা বিত্তবান। তাদের ঘিরে অনেক মেয়ের বাবা মায়ের আগ্রহ। কিন্তু বিত্তের মোহ আর যাই থাক যশোমতীর থাকার কথা নয়। সে যে কোন্ বিত্ত খোঁজে, নিজেও ভালো করে জানে না। এক-এক সময় কেমন ক্লান্তি অনুভব করে। এ ক্লান্তি ঠিক বাইরের নয় তাও অনুভব করতে পারে। বিলাস-প্রাচুর্যে ভরা জীবনের এই বাঁধা-ধরা ছকের মধ্যে কি যেন কঁক খোঁজে একটা। পড়াশোনা করে, গান করে, ক্লাব নিয়ে মেতে ওঠে। কিন্তু তবু ওই অগোচরের ফাঁকটা যেন ভরাট করে তোলা যায় না।

এমন দিনে, বাবার সঙ্গে মায়ের তুমুল বেধে গেল। বাধল মেয়ের বিয়ে নিয়েই। আলোচনার গোড়ায় দাদাও উপস্থিত ছিল, মনে মনে সে অনেক শক্তি সংগ্রহ করে অনেক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল। বাপ-মায়ের মুখের উপর এক বীরেন্দ্র ছাড়া আর সকলকে বাতিল করার সঙ্কল্প মনের তলায় দানা বেঁধে উঠেছিল। সম্ভব হলে আর ফাঁক পেলে নিজের ইচ্ছেটা যশোমতীর ইচ্ছে বলে চালিয়ে দিতেও আপত্তি নেই। কিন্তু চেষ্টার মুখেই বেগতিক দেখে পালিয়েছে।

প্রশ্নটা মা-ই তুলেছিল।–মেয়ে এম-এ পাস করতে চলল, বিয়েটা আর কবে হবে?

বাবা বলল, দিলেই হয়, চমৎকার ছেলে তো হাতের কাছে রয়েছে।

মা জেনেশুনেই আকাশ থেকে পড়ল।

–কে চমৎকার ছেলে, বিশ্বনাথ? সেক্রেটারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবে। কি-যে উদ্ভট চিতা তোমার মাথায় আসে….লোকে বলবে কি? আমি তো ভাবতেও পারি নে–তার থেকে রমেশ অনেক ভাল ছেলে, তাদেরও খুব ইচ্ছে।

যশোমতী ও-ঘরের আড়াল থেকে দেখছে, শুনছে, হাসছে। মায়ের দিকে বাবা এমন করে তাকালো যাতে ভরসা পেয়ে দাদা বলল, আমার বিবেচনায় বিয়েটা বীরেন্দ্রর সঙ্গে হলেই সব থেকে ভালো হয়, তাদেরও খুব আগ্রহ।

বীরেন্দ্র কে? বাবার গম্ভীর দৃষ্টিটা সরাসরি দাদার মুখের ওপর।

 আর দাদার এই মুখ দেখে দাতে করে ঠোঁট কামড়ে যশোমতী। হাসি সামলাচ্ছে। মাথা চুলকে দাদা জবাব দিল, ইয়ে….আমাদের বীরেন্দ্র।

তোমাদের বীরেন্দ্র। ও….তোমার সম্বন্ধী বীরে?

–আজ্ঞে।

–তা খুব আগ্রহটা কার?

–ওদের বাড়ির সকলেরই

 নিশ্বাস রুদ্ধ করে দেখছে যশোমতী, শুনছে। মা ঝলসে ওঠার আগে বাবাই গম্ভীর মুখ করে জবাব দিল, তোমার বোনকে বিয়ে করার বা ঘরে নেবার আগ্রহ অনেকেরই হতে পারে। অন্যের আগ্রহের কথা ভেবে কাজ নেই, তোমার বোনের বিয়ে আমাদের আগ্রহ অনুযায়ী হবে।

ব্যস, দাদার আর কথা বলার সাহস নেই। মনে মনে বোনকে তাতানোর সঙ্কল্প নিয়েই প্রস্থান করতে হল তাকে। ঘরে পুরো দমে পাখা ঘুরছিল, তা সত্ত্বেও ঘেমে নেয়ে একাকার। দাদা চলে যেতে বাবা আবার বলল, রমেশের সঙ্গে নয়, বিয়ে বিশ্বনাথের সঙ্গেই হবে। আমি অনেক ভেবেই স্থির করেছি।

সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মর্যাদায় ঘা পড়ল যেন। দাদার মতো মা-ও যে নিজের ইচ্ছেটাকে যথাস্থানে তুলে ধরার কতরকম জল্পনা-কল্পনা করেছে আর কতবার কতরকমভাবে মন স্থির করছে সে শুধু যশোমতীই আঁচ করতে পারে। বাবার এক কথায় সব ধুলিসাৎ যেন। বলে উঠল, মেয়েটাকে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দাও না তার থেকে

বাবা রাগলেও গোড়ার দিকে খানিকক্ষণ ঠাণ্ডা মুখেই কথা বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু বচন কদাচিৎ মোলায়েম হয়ে থাকে। বলল, তোমাদের মেয়েদের যেখানেই ফেলা হোক, হাত-পা বেঁধেই ফেলতে হয়। জলে না ফেলে আমি ভালো জায়গাতেই ফেলছি। যা বোঝো না, তা নিয়ে মাথা ঘামিও না।

বাবার এই অবজ্ঞার কথা শুনে এঘরে যশোমতী ভুরু কোঁচকাল। কিন্তু ও-ঘরে মায়ের গোটাগুটি মানহানি ঘটে গেছে। মোটা শরীর নিয়ে ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে মা ফুঁসে উঠল, কি বললে? আমাদের হাত-পা বেঁধে ফেলতে হয়। আমার মেয়ে আমি বুঝি না, আর তুমি দিনরাত ব্যবসায় ডুবে থেকে সব বোঝো? আমার মেয়ের বিয়ে কোথায় দেবে আমাকে জিজ্ঞাসা করারও দরকার মনে করো না, কেমন? আমাদের মান-মর্যাদা বলে কিছু নেই–রমেশের মাকে আমি আশা দিয়েছি সেটা কিছু নয়?

বাবার মন্থর পায়চারি করা থেমে গেল। স্নায়ু তেতে ওঠার উপক্রম হলেই ও রকম পায়চারি করে থাকে। চাপা গর্জন করে উঠল, মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা শাড়ি গয়না দেওয়া নয়, কে তোমাকে আশা দিতে বলেছে?

মায়ের পাল্টা জবাব, কেন দেব না? আমি মেয়ের ভালো-মন্দ বুঝি না?

এই থেকেই বিবাদ চড়চড় করে অন্তরায় একেবারে। বাবা অজস্র কথা বলতে লাগল। মায়ের প্রিয়পাত্রের প্রতি অর্থাৎ রমেশ চতুর্বেদীর প্রতি যশোমতীর এতটুকু টান নেই, কিন্তু তবু গোটা মেয়েজাতটার প্রসঙ্গে বাবার অপমানকর উক্তিগুলি যেন তপ্ত গলানো সিসের মতো যশোমতীর কানে ঢুকতে লাগল। যা বলে গেল তার সারমর্ম, ভালো মন্দ বোঝা দূরের কথা, অন্যের ওপর নির্ভর না করে দুনিয়ায় এক পা চলার মুরোদ নেই মেয়েদের। কাড়ি কাড়ি টাকা হাতের ওপর এনে। ঢেলে দেওয়া হচ্ছে বলেই আজ মান-মর্যাদার কথা। টাকায় মুড়ে রাখা হয়েছে বলেই দুনিয়াটা কি তারা টের পায় না–শো-কেসের পুতুলের মত নিরাপদ আভিজাত্যের কাঁচ-ঘরে সাজিয়ে না রাখলে নিজেদের ক্ষমতায় দু’দিন যাদের বেঁচে থাকার সামর্থ্য নেই দুনিয়ায়, তাদের আবার মতামত, তাদের আবার বিবেচনা। আরো বলেছে বাবা। বলেছে পায়ে হেঁটে একদিন রাস্তায় নেমে দেখে এসো কেমন লাগে, কত ধানে কত চাল-তারপর মান-মর্যাদার কথা বোলো। আর বলেছে, এই বাড়ি-ঘর এই ঐশ্বর্যের বাইরে গিয়ে দশ পা মাটিতে ফেলে হেঁটে দেখে নাও মাটির দুনিয়াটা কেমন, তারপর ভালো-মন্দ বোঝার দম্ভ দেখিও। হুঁঃ, ভালো-মন্দ বোঝে, মান মর্যাদার লড়াই–কে ফিরে তাকায় তোমাদের দিকে আগে একবার বুঝে আসতে চেষ্টা করলে ওই লম্বা লম্বা বুলি আর মুখে আসত না।

মায়ের এক একটা ক্রুদ্ধ জবাবের ইন্ধন পেয়ে বাবা এ-রকম অজস্র কথা বলে গেল। কথা নয়, এক এক প্রস্থ গলানো আগুন ঝরলো যেন। প্রতিটি রোযোক্তিতে সমস্ত নারীজাতির মান-সম্ভম একেবারে যেন আঁস্তাকুড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল।

মা তখনকার মতো কান্না জুড়ে দিতে বাবা ক্ষান্ত হল। কিন্তু যশোমতী কাঁদবে কি, তার দু’চোখ ধকধক করে জ্বলছে। সে এম-এ পড়ে, সে গানের স্কুল করেছে, সে মেয়েদের ক্লাব করেছে, সে যেখান দিয়ে হেঁটে যায় পুরুষের সঙ্গোপন অভিলাষ তার সঙ্গে ছোটে–এই নিয়েই পরম আনন্দে ছিল সে। কিন্তু বাবা এ-সব কি বলছে? বাবাও পুরুষ, পুরুষের চোখে আসলে তাহলে কতটুকু মর্যাদা তাদের? বাবার এই উক্তি যেন সমস্ত পুরুষেরই উক্তি। আজ যারা আশায় আশায় যশোমতীর দিকে এগিয়ে আসতে চাইছে, তারাও একদিন ওই কথাই বলবে। না যদি বলে, টাকার লোভে টাকার খাতিরে বলবে না। কিন্তু মনে মনে বাবা যা বলল তাই বলবে। বাবা যা ভাবে তাই ভাববে। বাবার তাহলে এই ধারণা? এই বিশ্বাস? তার টাকা আছে বলেই এই অভিজাত সমাজে তাদের যেটুকু দাম যেটুকু খাতির, যেটুকু মর্যাদা! তার শো-কেসের পুতুল, আভিজাত্যের কাঁচ-ঘরে লালন করে কোনো রকমে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়, নিজের পায়ের নির্ভরে দুনিয়ায় দুটো দিন তাদের বেঁচে থাকারও ক্ষমতা পর্যন্ত নেই! এত তুচ্ছ এত অক্ষম এত কৃপার পাত্রী তারা? বাবার এমন কথা!

সমস্ত রাত ধরে আগুন জ্বলল যশোমতীর মাথায়। কিছু একটা করতে হবে তাকে, জবাব দিতে হবে। সমস্ত মেয়েজাতের ওপর পুরুষের এত অবজ্ঞা এত অপমান সে বরদাস্ত করবে না। যশোমতী জবাব দেবে। দেবেই। সমস্ত রাত ধরে সঙ্কল্প দানা বেঁধে উঠতে লাগল।

পরদিন মা গভীর, কিন্তু যশোমতীর মুখ পাথরের মতো কঠিন। জীবনে কিছু একটা আমুল পরিবর্তন ঘটে গেছে তার। রাতের সঙ্কল্প দিনের আলোয় আরো বেশি আঁট হয়ে বসেছে মুখে।

যশোমতী প্রতীক্ষা করছে।

সকালে খুব ভালো করে চান করে উঠেছে। তারপর আবার প্রতীক্ষা করছে। এই বাড়ির কোনোদিকে সে তাকাতে পারছে না, কোনোদিকে চোখ ফেরাতে পারছে না–সর্বত্র শো-কেস দেখছে। আভিজাত্যের নিরাপদ শো-কেস। এই শো-কেস যোগায় বলে পুরুষের এত গর্ব এত দর্প আর তাদের প্রতি এত অবজ্ঞা।

যশোমতীর দম বন্ধ হবার উপক্রম।

দশটা না বাজতে বড় গাড়ি নিয়ে বাবা অফিসে বেরিয়ে গেল। যশোমতী আগেই ঠাণ্ডা মাথায় খেয়ে নিয়েছিল কিছু। কোনো ব্যাপারে ছেলেমানুষি করবে না। শো-কেস ভাঙতে চলেছে, ছেলে মানুষী করলে দ্বিগুণ হাসির ব্যাপার হবে। সে বাস্তবে নামতে যাচ্ছে, বাস্তব দেখতে যাচ্ছে, বাস্তব বুঝে চলতে হবে।

বেরুবার জন্য প্রস্তুত হয়ে মাকে বলল, এক বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে, ফিরতে দেরি হবে।

এটুকু মিথ্যার আশ্রয় না নিলেই নয়। যাই হোক, এই মিথ্যার পরমায়ুও বেশি হবে না নিশ্চয়। সত্য যা, তার আলমারির দেরাজে লেখা আছে। মাকে লেখে নি, তার জ্বালা আর যাতনা মা বুঝবে না। কতখানি অপমান বাবা করেছে মা জানে না। তাই আলমারির দেরাজে খামের চিঠি বাবার উদ্দেশ্যে লেখা। লিখছে, শো-কেসের পুতুল হয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছে নেই, মাটির দুনিয়া দেখতে চললাম, এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সামর্থ্য যদি না-ই থাকে, তখন নিজেই তোমার শো-কেসে ফিরে আসব আবার, আর তোমার সব অপমান মাথায় তুলে নেব। তার আগে দয়া করে খোঁজ করে না। যশোমতী।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্যাঙ্কে এলো প্রথম। বাস্তব বুঝে চলতে হবে, তাই টাকা কিছু লাগবেই। দ্বিতীয় একখানা শাড়ি শুধু শৌখীন বড় ব্যাগটার মধ্যে পুরে নিয়েছে। ওই ব্যাগ ছাড়া সঙ্গে আর কিছু নেই।

প্রথমেই টাকা তুলতে হবে ব্যাঙ্ক থেকে। বলতে গেলে শূন্য হাতে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। ব্যাঙ্কে এলো। চেকে টাকার অঙ্ক বসানোর আগে ভাবল কত টাকা তুলবে। পঞ্চাশ হাজার, ষাট হাজার, সত্তর হাজার–যা খুশি তুলতে পারে। কত যে আছে সঠিক হিসেব রাখে না, আছে যে অনেক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার নামে থাকলেও কার টাকা তুলবে? বাবারই টাকা। যে-বাবার মতে তারা শো-কেসের পুতুল, নিজের পায়ের ওপর ভর করে যারা দাঁড়াতে শেখে নি। অতএব যত কম তোল যায়, কারণ যা তুলবে তা ধার হিসেবেই তুলবে। সেই ধারও একদিন শোধ করবে। করবেই। ভেবেচিন্তে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা তুলল। এতকালের প্রকৃতি ডিঙিয়ে পাঁচ হাজার টাকার থেকে নগণ্য অঙ্কের টাকা আর ভাবা গেল না। টাকা চেক-বই কলম ব্যাগে পুরে আবার বেরিয়ে পড়ল।

কোথায় যাবে বা কি করবে এখনো ভাবা হয় নি। ভাবতে হবে। কিন্তু এখানে বসে নয়, বেশ দুরে কোথাও গিয়ে ভাবতে হবে। যেখানে গেলে কেউ তার হদিস পাবে না। তারপর ভেবেচিন্তে আরো অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে হবে। এই আভিজাত্যের শো-কেস থেকে অনেক দূরে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *