১৩. সীমান্ত ও দেশের অতন্ত্র প্রহরী

তারা আমাকে ধ্বংস করে দিলো এভাবেই তারা অসংখ্য মর্দে মুজাহিদকে ধ্বংস করেছে যারা ছিল সীমান্ত ও দেশের অতন্ত্র প্রহরী

সিককা শহর ধ্বংসের খবর হিন্দুস্তানের রাজা মহারাজের মধ্যে দেখা দিলো আতঙ্ক। সারা হিন্দুস্তান জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সিককা শহর ধ্বংসের খবর। রাজা দাহির জীবিত থাকাবস্থায় তার আশপাশের রাজরাজড়াদেরকে আরব বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। তার পরিবার, উজির, পরামর্শদাতা ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতো, রাজা দাহির আরবদের বিরুদ্ধে হিন্দুস্তানের রাজা মহারাজাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য চেষ্টা করছেন। এর ফলে রাজা দাহির নিহত হওয়ার পরও তার ছেলেসহ অন্যান্য লোকেরা মনে করেছিল, যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দাহির হিন্দুস্তানের অন্যান্য রাজ্যে সৈন্য সাহায্যের জন্যে চলে গেছেন। কিন্তু বিন কাসিমের কৌশল ও অব্যাহত দুর্গ দখলের ফলে অল্প দিনের মধ্যে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়, রাজা দাহির আসলে বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে তার রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী দুর্গগুলোর একের পর এক পতনে তিনি নীরব থাকতে পারতেন না।

ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকগণ লিখেছেন, কোন একটি দুর্গ কিংবা অবরোধে রাজা দাহির যদি মুসলমানদের হারিয়ে দিতে পারত তাহলে সেখানে প্রতিবেশী রাজা ও শাসকরা এসে ভীড় করত। সেই বিজয় তখন শুধু রাজা দাহির নয় সকলের ঐক্যতানে মহাবিজয়ে রূপান্তরিত হতো। কিন্তু বিন কাসিমের অভিযানের ক্ষেত্রে তেমন কোন ঘটনাই ঘটল না। তার বাহিনী প্লাবনের বানের মতোই ধেয়ে আসছিল। তার সেনাদের সামনে একের পর এক দুর্গ বালির ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ছিল। রাজা দাহির এসব দেখেও তার রাজধানী ছেড়ে বাইরে বের হয়নি। দাহির ভেবেছিল, বিন কাসিমের সৈন্যরা

দাহিরের রাজধানীতে পৌছার আগেই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বেকার হয়ে যাবে। তখন সে তার উদ্যমী সেনাবাহিনী নিয়ে আরব বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে সহজেই আরবদের কচুকাটা করে তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। কিন্তু তার প্রতিবেশী রাজা-মহারাজারা প্রত্যক্ষ করছিল, রাজাদাহির একের পর এক দুর্গ হাতছাড়া করেও নির্বিকার আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিল, নিজেকে মুসলমানদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।

অবশেষে রাজধানী বাঁচানোর জন্য যখন দাহির বিন কাসিমের মুখোমুখি হয় তখন সাদা হাতিসহ সে নিহত হলো। এ খবর শোনার পর দাহিরের প্রতিবেশী রাজ্যশাসকরা সতর্ক হয়ে ভাবল, সত্যিই যদি দাহির নিহত হয়ে থাকে, তবে মুসলমানদের মুখোমুখি যুদ্ধের আগে অন্তত দশবার চিন্তা করতে হবে। এরপর তারা দেখলো, দাহিরের খ্যাতিমান যোদ্ধাপুত্র ও ভাতিজারাও মুসলিম সৈন্যদের মোকাবেলায় পরাস্ত হয়ে তাদের অগ্রভাগে পালিয়ে আসছিল। তারা এটা প্রত্যক্ষ করল, দাহিরের ছেলে ও ভাতিজারা নিজেদের দুর্গ থেকে চুপিসারে নিজেদের একান্ত ভৃত্যদের নিয়ে পালিয়ে এসে অন্য দুর্গে আশ্রয় নিচ্ছিল। এমতাবস্থায় অন্যান্য রাজা ও শাসকরা সিদ্ধান্ত নিলো, এ মুহূর্তে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই না করে তারা স্বাধীন মতো প্রয়োজনে লড়াই করবে, নয়তো মুসলমানদের সাথে মৈত্রীচুক্তি কিংবা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেবে।

মুসলমানদের হাতে সিককা নগর নিশ্চিহ্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে উচিত ছিল, হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজার ঐক্যবদ্ধভাবে বিন কাসিমের মোকাবেলায় অগ্রসর হওয়া। কিন্তু তখন কেউই কারো নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে পারছিল না। ফলে সবাই চাচ্ছিলো, নিজেদের করণীয় সম্পর্কে তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।

বিন কাসিম ধ্বংসকৃত সিককা নগরের অনতি দূরে দাঁড়িয়ে শহরের ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করছিলেন। জানা নেই তার হৃদয়ে তখন কি ভাবনার উদয় ঘটেছিল। একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে তার সেনাদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর দৃষ্টি প্রদক্ষিণ করছিল তার সেনাদের ওপর। তিনি দেখছিলেন তার কয়েকজন আহত সেনাকে যাদের দেহে পট্টি বাঁধা। তিনি তখন কিভাবে ছিলেন তা বলা সম্ভব না হলেও তার চেহারায় যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠছিল, তা আর কখনো দেখা যায়নি।

কিছুক্ষণ পর বিন কাসিম একটি ঘোড়ার পিঠে চড়ে নদীর দিকে রওয়ানা হলেন। নদীটির নাম ছিল ‘চন্নাব নদী। এই নদী সিককা ও মুলতান শহরকে বিভক্ত করে রেখেছে। নদীটি না থাকলে সিক্কা ও মুলতান এক শহরেই পরিণত হতো। মুলতান ছিল সম্পূর্ণ দুর্গবন্দি শহর। বিন কাসিমের কাছে এখন সর্বাগ্রে মুলতান শহরের দুর্গপ্রাচীরের অবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খোঁজ-খবর নেয়াটাই জরুরী বিষয় হয়ে দেখা দিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের লেবাস পরিহিত তিন চারজন লোক বিন কাসিমকে নদীর দিকে এগুতে দেখে তার দিকে এগিয়ে এলো। আগন্তুকদের একজনকে বিন কাসিম দূর থেকেই চিনি ফেললেন। তিনি ছিলেন তারই গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী। কৌশলগত কারণে গোয়েন্দা প্রধান নিজেও স্থানীয় মানুষের বেশভূষা ধারণ করেছিলেন। বেশ বদলালেও বিন কাসিম তার গোয়েন্দা প্রধানকে ঠিকই চিনে নিতে পারতেন। আগন্তুক সবাই বিন কাসিমের কাছে এসে থেমে গেল। শাবান ছাকাফী দুই সঙ্গিকে বিন কাসিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ইবনে কাসিম! এরা দুজন জেলে। এরা বলছে, সিক্কার শাসক বজরা এদের নৌকা করেই নদীর অপর পারে চলে গেছে।

‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বজরা নদী পার হয়ে মুলতান দুর্গে আশ্রয় নিয়েছে। এরা হয়ত আপনাকে এও বলেছে, সিককা থেকে কি পরিমাণ সৈন্য নদী পেরিয়ে মুলতানে আশ্রয় নিয়েছে।’ তা বলেছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা তেমন আশঙ্কাজনক নয়। জবাব দিলেন গোয়েন্দা প্রধান। এদের ছাড়া আমি আরো নৌকাওয়ালাদের জিজ্ঞেস করেছি, তখন নদীতে বেশী নৌকা ছিল। এই দুই জেলেকে বজরার লোকেরা পাকড়াও করে তাদেরকে নদী পার করে দিতে বাধ্য করেছিল।

কথাবার্তার পর দুই জেলেকে ছেড়ে দেয়া হলো। বিন কাসিম গোয়েন্দা প্রধানকে চোখের ইশারায় একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মুলতান দুর্গের খবর সংগ্রহের জন্য যাদের পাঠিয়েছিলেন এরা কি ফিরে এসেছে?

সিক্কা বিজয়ের আগের দিনই মুলতানে কয়েকজন স্থানীয় লোককে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠানো হয়েছিল। প্রেরিত লোকদের সবাই ছিল মুকুর দলের লোক। এরা স্থানীয় হলেও বিন কাসিমের প্রতি ছিল শ্রদ্ধাশীল ও বিশ্বস্ত। মুকু নিজেও বিন কাসিমের সাথে ছিল। সংখ্যা বেশী না হলেও স্থানীয় হওয়ার কারণে এরা ছিল বিন কাসিমের অভিযানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী।

বিন কাসিম গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে যেদিন মুলতান প্রেরিত গোয়েন্দাদের ফিরে আসার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, এর পূর্ব রাতেই ফিরে এসেছিল গোয়েন্দারা। এরা সিককা থেকে পালিয়ে যাওয়া উদ্বাস্তুদের দলে মিলে গিয়েছিল ওদের মতোই পোশাক পরিচ্ছদে। তারা কৌশলে মুলতান শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সৈন্য সংখ্যা, দুর্গের গঠন ও দুর্বলতার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে গিয়েছিল। এ ছাড়াও তারা মুসলিম সৈন্যদের ব্যাপারে মুলতানবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে দেয়। এরা একজন একজন করে দল ছেড়ে বিভিন্ন মানুষের জটলায় গিয়ে সিককায় মুসলমানদের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা এবং মুসলিম সৈন্যদের বীরত্ব ও শৌর্য বীর্যের কাহিনী এমন ভাষায় বর্ণনা করছে, যা শুনে সাধারণ মুলতানবাসীতো বটেই সৈন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

এটা ছিল এক ধরনের প্রচারণা যুদ্ধ। এই কৌশল ছিল খুবই কার্যকর একটা ব্যবস্থা। যেসব সেনা সিককা থেকে পালিয়ে এসেছিল এরাও বলছিল, মুসলিম সৈন্যরা খুবই দুঃসাহসী। তারা নিজেরাও কাপুরুষ ছিল না। কিন্তু তারপরও তাদের পালিয়ে আসা ও পরাজয়কে যুক্তিগ্রাহ্য করতে মুসলিম সৈন্যদের বীরত্ব ও যুদ্ধ কৌশলের কথা এভাবে বলছিল যে, মুসলমানদের মোকাবিলা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ওদের সাথে অলৌকিক শক্তি রয়েছে।

মুলতান দুর্গে এ খবর ছড়িয়ে পড়ল, সিক্কার শাসক বজরা দুর্গ থেকে পালিয়ে মুলতান এসে আশ্রয় নিয়েছে। এ খবরে মুলতানের সেনা বাহিনীর মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু বজরা ততোটা ভীত ছিল না। মুলতানের শাসক ছিল রাজা কুরসিয়া। কুরসিয়া ছিল রাজা দাহিরের সম্পর্কে ভাতিজা। দাহিরের এক ভাই চন্দ্রের ছেলে কুরসিয়া। বজরা সেখানে গিয়ে কুরসিয়াকে উজ্জীবিত করছিল।

“মহারাজ! এখন আমাদের কাজ হলো, আরব সেনাদের জন্য মুলতানকেই শেষ ঠিকানায় পরিণত করা এবং মুলতান দুর্গ এদের জন্য কবরস্থানে রূপান্তরিত করা।” বলল কুরসিয়ার এক সেনা কর্মকর্তা। মুলতানেও যদি আমরা এদের পথ রুদ্ধ করতে না পারি তাহলে ইসলামের পাবনকে কেউ রোধ করতে পারবে না। তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের ঘৃণা ভরে স্মরণ করবে, আর বলবে, আমরা কাপুরুষের মতো গোটা সিন্ধু

এলাকা মুসলমানদের হাতে তুলে দিয়েছি। সেই সাথে ভবিষ্যত প্রজন্ম। আমাদেরকে এই অপরাধেও অপরাধী সাব্যস্ত করবে, মুসলমানদের জন্য সিন্দু অঞ্চলের দরজা আমরাই খুলে দিয়েছি।

কি বলতে চাচ্ছো তুমি? তুমি কি মনে করছ, আমি লড়াই এড়িয়ে যেতে চাচ্ছি। তুমি কি আমাকে কাপুরুষ ভাবছো? বলল রাজা কুরসিয়া। না, মহারাজ! আমি আপনার কাছে এসেছি, একথা জানানোর জন্য যে, কাকসা ও সিককা থেকে যেসব সৈন্য ও বাস্তহারা লোক আমাদের দুর্গে এসেছে, এরা মুসলমানদের সম্পর্কে সেনাবাহিনী ও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়ানক কথা এরা যা বলছে, তাহলো, মুসলমানরা দানবের মতো যুদ্ধ করে। কিন্তু যারা যুদ্ধ ও লড়াই না করে তাদের সামনে আত্মসমর্পণ করে, তাদের সাথে তারা সহোদর ভাইয়ের মতোই সদাচরণ করে। তারা কারো ঘর-সম্পদ লুটতরাজ করে না, বরং সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি নিরাপত্তা দেয়। তাছাড়া একথাও প্রচারিত হচ্ছে, মুসলমানরা কাউকে ধর্মান্তরে বাধ্য করে না। এটার অবশ্যই একটা বিহিত করা দরকার মহারাজ। তাছাড়া লোকজনের মধ্যে একথাও ছড়িয়ে পড়েছে সিককার শাসক মহারাজ বজরাও পালিয়ে এখানে চলে এসেছেন।

এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি পালিয়ে আসিনি। আমি লড়াই থেকেও বিমুখ ছিলাম না। কিন্তু আমার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রতারণা করে আমার দুর্গের দরজা খুলে দিয়েছিল কুচক্রীরা। তোমরা শহরের লোকজনকে এক জায়গায় জড়ো করো, আমি তাদের মুখোমুখি হয়ে এসব মিথ্যা প্রচারণার জবাব দেবো। এসব আসলে আমাদের শত্রুদের চালানো অপপ্রচার। বলল বজরা। সে তখন কুরসিয়ার পাশেই বসা ছিল।

সেই দিনই মুলতান দুর্গের সকল সৈন্য ও গণ্যমান্য লোককে এক জায়গায় জড়ো করা হলো। কুরসিয়া ও বজরা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সভাস্থলে হাজির হলো। বজরা তার ঘোড়াকে এগিয়ে নিয়ে উপবিষ্ট সৈন্য ও শহরের প্রভাবশালীদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল এবং বলল-প্রিয় দেশমাতৃকার সাহসী সন্তানেরা! শোন! “আমাদের বলা হয়েছে, শহরে এমন সব অপপ্রচার চলছে, যা শুনে সাধারণ মানুষ মুসলমানদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এসব অপপ্রচার আমাদের ভিতরের লোকজনই প্রচার করছে। এরা এদেশের গাদ্দার। এরা সেইসব কাপুরুষদের চর যারা মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ

করে গোলামীর জীবন বেছে নিয়েছে। এরা গোলামীর বিনিময়ে নগদ টাকাপয়সা ও মুসলমানদের দেয়া পদ লাভ করেছে। আমার সম্পর্কে বলা হচ্ছে, আমি মুসলমানদের হাতে দুর্গ তুলে দিয়ে এখানে পালিয়ে এসেছি। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। কতিপয় গাদ্দার শত্রুদের সুযোগ করে দিতে আমার দুর্গের একটি গেট রাতের অন্ধকারে খুলে দিয়েছিল। অসীম সাহসিকতার জন্যই এমতাবস্থায়ও আমি দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। নয়তো আমি কাপুরুষ হলে তাদের হাতে আত্মসমর্পণ করতে পারতাম। এখানে আমি এসেছি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। আগামী দিনে তোমরা নিজেদের চোখে দেখতে পারবে, আমি কিভাবে তাদের হত্যা করি।

মুসলমানরা দানবের মতো লড়াই করে, এটা বিলকুল মিথ্যা কথা। যারা তাদের সামনে আত্মসমর্পণ করে তাদেরকে ওরা খুব খাতির যত্ন করে এ কথাও সত্য নয়। এরা কাউকেই ক্ষমা করে না। সকল হিন্দুর ঘর সম্পদ লুটে নেয়, আর হিন্দু যুবতীদের ধরে নিয়ে যায়। তোমরা সিককার অবস্থায়ই দেখো না, জানোয়ারগুলো গোটা শহরটা ধ্বংস করে দিয়েছে। আর সকল যুবতী মেয়েদেরকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে। এখানে তোমরাও যদি কাপুরুষের বহিঃপ্রকাশ ঘটাও তাহলে তোমাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। লড়াই না করলেও তোমাদেরকে ওরা প্রাণভিক্ষা দেবে না। তোমাদের যুবতী কন্যা জায়াদের সম্বম বাঁচাবে না। বাকী জীবনটা ওদের গোলামী করে ক্ষুধাপিপাসায় ধুকে ধুকে মরতে হবে। যারা ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হবে তারা হয়তো কদিনের সুখ পাবে। কিন্তু ধর্মত্যাগের অপরাধে নিশ্চয়ই তাদেরকে দেবদেবীদের অভিশাপে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।

বজরার ভাষণ ছিল আবেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী। মিথ্যার বেসাতী করে বাস্তব সত্যকে আড়াল করে ফেলেছিল সে। বজরার প্রত্যাশা মতো তার ভাষণ শুনে স্রোতারাও উত্তেজিত হয়ে উঠল। উপস্থিত সৈন্য ও শহরের অভিজাত শ্রেণির লোকেরা বজরার বক্তৃতায় উত্তেজিত হয়ে মুসলমান বিরোধী শ্লোগানে সভাস্থল মুখরিত করে তুলল। উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান শুনে শহরের অন্যান্য লোকেরাও এসে জমায়েত হলো এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্লোগানে শ্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলল।

এরপর কুরসিয়া ও বজরা মিলে শহরের প্রতিরক্ষা ব্যুহকে আরো মজবুত করার কাজে মনোযোগী হলো। এদিকে বিন কাসিমকে আগেই অবহিত করা হয়েছে, মুলতান দুর্গপ্রাচীরের ওপরে বহুসংখ্যক ছোট ছোট মিনজানিক স্থাপন

করা হয়েছে। এগুলো দিয়ে ছোট আকারের পাথর অনবরত নিক্ষেপ করা যায়। অবশ্য গোয়েন্দারা বহু খোঁজ-খবর নিয়ে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলো যে, মুলতানের সৈন্যদের কাছে অগ্নিবাহী কোন তীর নিক্ষেপণ ব্যবস্থা নেই।

সিককা শহরকে ধ্বংস করে দেয়ার কারণে সেখানে কোন প্রশাসক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের চিন্তা ছিল না। ফলে রাতেই নদী পার হওয়ার জন্য নৌকার পুল তৈরির নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। পুল তৈরির কাজ শুরু হওয়ার সাথে সাথে কিছু সৈনিককে নৌকা দিয়ে নদীর অপর প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়া হলো। যাতে পুল তৈরিতে শত্রুবাহিনী কোন ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে। সকালে সূর্য ওঠার আগেই মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নদীর ওপারে চলে যেতে সক্ষম হয়। বড় বড় মিনজানিকগুলোকে বড় বড় নৌকায় করে বয়ে আনা হয়েছিল। নদী পেরিয়ে মুলতানের কিছুটা দূরে শিবির স্থাপনের জন্য বিন কাসিম সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন। মুসলিম বাহিনী নদী পার হওয়ার সাথে সাথেই মুলতান দুর্গে খবর পৌছে গেল। মুসলিম বাহিনী এসে গেছে; এ খবরে দুর্গ জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে গেল। রাজা কুরসিয়া ও বজরা এ খবরের সত্যতা যাছাই করার জন্য দুর্গপ্রাচীরে এসে দাঁড়াল। তারা দেখতে পেল, মুসলিম সৈন্যরা মুলতান দুর্গের অনতি দূরে শিবির স্থাপন করছে।

সাথে সাথে রাজা কুরসিয়া বললেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি দুর্গের প্রতিটি গেট শক্ত করে বন্ধ করে দাও এবং প্রতিটি ফটকের নিরাপত্তা রক্ষীর সংখ্যা দ্বিগুণ করে দাও।

এটার দরকার নেই কুরসিয়া! বলল বজরা। আমরা মুসলিমদের দুর্গ অবরোধের সুযোগই দেবো না। আমরা ওদেরকে দুর্গের বাইরেই ধ্বংস করে দেবো। বলল বজরা। আমরা দুর্গের বাইরে গিয়ে ওদের ওপর আক্রমণ চালাবো। শহরে ঘোষণা করে দাও, যেসব অধিবাসী তীর-ধনুক চালাতে পারে তারা সবাই যেন দুর্গপ্রাচীরের ওপরে চলে আসে, আর যারা অশ্বারোহণ ও তরবারী চালাতে পারে তারা সবাই যেন দুর্গের প্রধান ফটকে এসে জড়ো হয়। আর সৈন্যদেরকে বলো, সবাই যাতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই শহরে ঢোল পেটানো শুরু হলো এবং কয়েকজন ঘোষক উচ্চ আওয়াজে মুসলিম সৈন্যদের আগমন ও রাজা কুরসিয়ার নির্দেশ ঘোষণা করতে লাগল। শহরের যেসব অধিবাসীর কাছে বেশী পরিমাণ ধনসম্পদ ও

স্বর্ণরূপা আছে তারা এগুলোকে লুকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে গেল। শহরের লোকজন এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল আর সৈন্যরা দ্রুততার সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। এদিকে মুসলিম সৈন্যরা নদী পার হয়ে শিবির স্থাপনের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। এমন সময় মুলতান দুর্গের একটি ফটক খুলে দুর্গের ভিতর থেকে সশস্ত্র সৈন্য বাইরে আসতে শুরু করল। বাইরে বের হয়ে দুর্গের সৈন্যরা রণপ্রস্তুতি নিয়ে কাতার বন্দি হতে শুরু করল। কিন্তু এদিকে মুসলিম সৈন্যরা তখনো তাবু তৈরিতে ব্যস্ত।

মুলতানের যেসব সৈন্য যুদ্ধ করতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলো, তাদের কমান্ড ছিল বজরার হাতে। দুর্গ থেকে বের হওয়ার সময় সে উত্তেজিত কণ্ঠে ঘোষণা করল, আজকের এক আক্রমণেই সে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংস করে দেবে। রাজা কুরসিয়াও বজরার হাতে কমান্ডের দায়িত্ব দেয়া সমীচীন মনে করল। কারণ বজরা ইতোমধ্যে মুসলমানদের সাথে মোকাবেলা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

কুরসিয়া ও বজরা মনে করেছিল মুসলমানদের ওপর আক্রমণের এটিই মোক্ষম সময়। কারণ তারা জানত সারারাত মুসলিম বাহিনী নদী পারাপারে কাটিয়েছে। আর এখন শিবির স্থাপনে ব্যস্ত। অতএব বিরামহীনভাবে পরিশ্রমে ওরা ক্লান্ত-শ্রান্ত, নির্ঘম বিশ্রামহীন। অভিজ্ঞতার আলোকে শিবির স্থাপনে ব্যস্ত সৈন্যদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য রণসাজে সজ্জিত একদল সৈন্যকে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত রেখেছিল বিন কাসিম। এই সৈন্যরা দুর্গ ও শিবিরের মাঝামাঝি জায়গায় সতর্ক অবস্থায় ছিল। প্রহরারত সৈন্যদের চেয়ে তিনগুণ বেশী সৈন্যকে বজরা আক্রমণের জন্য নির্দেশ দিয়ে দিলো। বিন কাসিম যখন দেখলেন বিপুল শত্রু বাহিনী তুফানের মতো এগিয়ে আসছে। তার নিযুক্ত পদাতিক ও মষ্টিমেয় আশ্বারোহী প্রহরীদের পক্ষে ওদের প্রতিরোধ করা অসম্ভব। তিনি তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন, যেই অবস্থায় আছো, অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হও। কিন্তু আক্রমণকারীরা ছিল দ্রুতগামী। কর্মব্যস্ত সৈন্যরা তাদের ঘোড়ার জিন লাগানোর আগেই বজরার সৈন্যরা প্রহরীদের কাছে পৌছে গেল। শুরু হলো তিনগুণ বেশী সৈন্যের সাথে এক তৃতীয়াংশ জনবলের আরেকটি অসম লড়াই। বজরা ছিল খুব সতর্ক। সে আগেই তার কমান্ডারদের বলে দিয়েছিল, মুসলিম সৈন্যরা যদি পিছনে সরতে থাকে তবে তাদের পশ্চাদধাবন করা থেকে বিরত থাকবে, নইলে ওদের ঘেরাওয়ে পড়তে হবে। কারণ সে

জানতো, শিবির স্থাপনে ব্যস্ত সৈন্যরাও কাল বিলম্ব না করে তাদের সহযোগীদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসবে।

বিন কাসিমের অবস্থা ছিল ত্রিশঙ্কু। কারণ তখনো আরব থেকে তার সাহায্য সামগ্রী এসে পৌছেনি। তিনি আশঙ্কা করছিলেন দুর্গে বিপুল পরিমাণ সৈন্য রয়েছে। বাইরের সৈন্যরা যদি মুসলমানদের কাবু করতে পারে তাহলে দুর্গের অবশিষ্ট সৈন্যরা বেরিয়ে এসে যুদ্ধের পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।

আক্রমণকারীরা বাস্তবেই প্রহরাধীন ইউনিটের ওপর সংহারী আক্রমণ চালালো। বিন কাসিম নিজেকে সামলে নিয়ে কমান্ডারদের বললেন, তোমরা আক্রমণকারীদের পিছন দিকে যেতে চেষ্টা করো এবং দু’পাশ দিয়ে ওদের দু’পাশে জোরদার আক্রমণ করো।

কমান্ডারগণ বিদ্যুৎ বেগে তাদের সৈন্যদেরকে সারিবদ্ধ করে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল। মুসলিম সৈন্যদেরকে আসতে দেখে বজরা তার সৈন্যদের চিৎকার করে পিছনে চলে আসার নির্দেশ দিতে শুরু করল।

এদিকে বিন কাসিম তাঁর সৈন্যদের বললেন, তোমরা ওদের পিছনে চলে যাও, ওদের পিছানোর সুযোগ দেবে না। বিন কাসিমের প্রতিটি নির্দেশ দ্রুততার সাথে বার্তাবাহকদের মাধ্যমে কমান্ডারদের কাছে পৌছে যাচ্ছিল। কারণ যুদ্ধরত অবস্থায় পয়গাম পৌছানোর কাজে এসব বার্তাবাহক ছিল অস্বাভাবিক পারদর্শী। আরব সৈন্যরা বজরার সৈন্যদের ঘেরাও করার জন্য দুই বাহু প্রলম্বিত করতে শুরু করলে বজরা তার সৈন্যদেরকে দুর্গে ফিরে আসার জন্য চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছিল। নির্দেশ মতো বজরার সৈন্যরা দুর্গফটকের কাছাকাছি পিছিয়ে যেতে লাগল। এদিকে বিন কাসিম তার কমান্ডারদের পয়গাম পাঠালেন, শত্রু সেনাদেরকে তাড়া করে তোমরা দুর্গফটকের কাছে চলে যাও, শত্রু সেনারা যখন দুর্গে প্রবেশ করতে শুরু করে তখন তোমরা ওদের পিছু ধাওয়া করে দুর্গে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করো।

কিন্তু কুরসিয়া মুসলিম সেনাদের দুর্গে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল। তাই সে একটি সেনাদলকে দুর্গের বাইরে যুদ্ধরত সৈন্যদেরকে দুর্গে প্রবেশে সহযোগিতার জন্য ফটকের কাছে পাঠিয়ে দিলো এবং দুর্গপ্রাচীরের ওপরে অবস্থানরত শত শত তীরন্দাজ ও বর্শাধারী সৈন্যকে নির্দেশ দিলো শত্রু সেনারা আয়ত্ত্বের ভিতরে আসলেই তোমরা তীরবৃষ্টি ও বল্লম নিক্ষেপ করতে শুরু করবে।

অবস্থা তাই হলো। বজরার সৈন্যরা দ্রুত গতিতে দুর্গে প্রবেশ করতে শুরু করে। মুসলমানদের ঘেরাও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে ওরা দেয়নি। তদুপরি কিছু সংখ্যক জানবাজ মুসলিম যোদ্ধা দুর্গফটকে চলে গেল এবং হিন্দু সৈন্যদের তাড়া করে দুর্গে প্রবেশের চেষ্টা করল। কিন্তু তারা সফল হলো না। সফল হওয়ার মতো কোন অবস্থাও ছিল না। দৃশ্যত এটা ছিল এই জানবাজদের জন্য আত্মহুতির নামান্তর। কারণ হিন্দু সৈন্যরা যখন এক সাথে দুর্গে প্রবেশের জন্য তাড়াহুড়ো করছিল তখন ওদের মধ্যেই জট সৃষ্টি হয়ে যেত। এমতাবস্থায় যে মুসলিম যোদ্ধা সেখানে চলে যেতো সেও জটে আটকে যেত। জট ভেঙ্গে কেউ ভিতরে প্রবেশ করলেও তার নিহত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকত না। যে জানবাজ মুসলিম যোদ্ধা সর্বাগ্রে মুলতান দুর্গে প্রবেশের জন্য প্রাণঘাতি উদ্যোগ নিয়েছিল তার নাম ইতিহাসে আজো স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তার নাম ছিল জায়েদ বিন আমের তাঈ। জায়েদের এই দুঃসাহসী অভিযানে আরো কয়েকজন যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে দু’তিন জন ছাড়া আর কারো পক্ষে জীবন নিয়ে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের পর জায়েদের মৃতদেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, জায়েদ শত্রু সেনাদের সাথে দুর্গের ভিতরে ঢুকে নিহত হয়েছিল। যার ফলে তার মৃতদেহ হিন্দুরা পুড়িয়ে ফেলে। বজরা তার সৈন্যদের নিয়ে দুর্গে ঢুকে পড়ল। সূর্যও তখন পশ্চিমাকাশে শেষ আলো বিকিরণ করে ডুবে গেছে। চতুর্দিকে নেমে এসেছে অন্ধকার। কিন্তু দুর্গের বাইরে তখনও শত শত মুসলিম যোদ্ধা দণ্ডায়মান। এমতাবস্থায় দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে শত্রু সেনারা তীব্র তীরবৃষ্টি ও বল্লম নিক্ষেপ করতে শুরু করে। তাতে কয়েকজন মুসলিম যোদ্ধা ও কয়েকটি ঘোড়া মারাত্মকভাবে আহত হয়। পরিস্থিতি সামলাতে মুসলিম কমান্ডারগণ তাদের সহযোদ্ধাদেরকে দুর্গপ্রাচীরের কাছ থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন। এদিকে যুদ্ধ থামতেই মুসলিম শিবিরের মহিলারা আহতদের সেবার জন্য পানির মশক ও ওষুধপত্র নিয়ে দৌড়ে রণাঙ্গনে চলে এলো। তারা আহতদের পানি পান করাতে লাগল এবং অক্ষমদেরকে রণাঙ্গন থেকে উঠে আসার সহযোগিতা দিচ্ছিল। সেবিকাদের সহযোগিতার জন্য কিছু সংখ্যক সৈন্য রণাঙ্গনে অপেক্ষা করল আর বাকীরা শিবিরে ফিরে এলো।

যুদ্ধ শেষে অসমাপ্ত তাবু ও শিবির স্থাপনের কাজে আবারো মনোযোগী হলো সৈন্যরা। বিন কাসিম তাঁর সেনাপতি ও কমান্ডাদের ডেকে পরামর্শ সভায় বসলেন।

তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আজকের লড়াই থেকে শত্রু বাহিনীর রণকৌশল অনুমান করা যায়। বিগত কয়েকটি দুর্গেও শত্রু বাহিনী এই কৌশলই অবলম্বন করেছে। এখানকার শাসক কুরসিয়াকে হয়তো সিককার শাসক বজরা এই কৌশল বলেছে। সকল সৈন্যদেরকে বলে দিন, এখানেও আমাদেরকে প্রতি দিনই মোকাবেলা করতে হবে এবং শত্রুরা আমাদেরকে অবরোধ পূর্ণ করার অবকাশ দেবে না।’ চৌকস একটি ইউনিটকে দুর্গপ্রাচীরের বাইরে টহলরত অবস্থায় রাখতে হবে। যাতে বাইরে থেকে দুর্গবাসীর কাছে কোন ধরনের সাহায্য পৌছতে না পারে। আর দুর্গের কোন লোক বাইরে যেতে না পারে। তিনি আরো বললেন, টহলরত দলের কমান্ডার যদি মনে করে যুদ্ধাবস্থায় তাদেরও সহযোগিতা দরকার, তবে টহলরত ইউনিটের অর্ধেক সৈন্যকে সুযোগ মতো যুদ্ধরতদের সহযোগিতার জন্য পাঠিয়ে দেবে আর বাকিরা টহল বজায় রাখবে। রণকৌশল সম্পর্কে জরুরি দিক নির্দেশনা দেয়ার পর সেনাপতি ও কমান্ডদের উদ্দেশ্যে বিন কাসিম বললেন, প্রিয় বন্ধুগণ! সকল সৈন্যদের জানিয়ে দিন, আমরা এমন এক পর্যায়ে এসে গেছি, এই দুর্গ যদি আমরা নিরাপদে সাফল্যের সাথে জয় করতে পারি, তাহলে হিন্দুস্তানের জন্য আমার প্রধান বাধা দূর হয়ে যাবে। বন্ধুগণ, মুলতান হবে হিন্দুস্তানের জন্য ইসলামের আলোর মিনার।

বিভ্রান্ত হিন্দুস্তানবাসী এই মিনার দেখে সঠিক পথের দিশা পাবে। কেয়ামত পর্যন্ত হিন্দুস্তানবাসীদের জন্য এ মিনার আলো বিকিরণ করতে থাকবে। সেই সাথে কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষ এই আলোর মিনার স্থাপনের জন্য আপনাদেরকে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। বন্ধুগণ, নিজ নিজ ইউনিটের যোদ্ধাদের বলে দিন, মুলতান জয় করতে আমরা জীবন কুরবান করে দেবো। মুলতান জয় না হলে আমরা আর ফিরে যাব না। সহযোদ্ধাদের বলে দিন, আমাদের সামনে জান্নাত হাতছানি দিচ্ছে, আর পেছনে রয়েছে। জাহান্নাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব হলো, দেহের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে আমরা হিন্দুস্তানের মানুষের জন্য আলোর পথ নির্মাণ করব। এটাই আমাদের লক্ষ্য এটাই আমাদের তকদীর। আমরা সৌভাগ্যবান যে, এমন মহান কর্তব্য পালনের সুযোগ আমরা পেয়েছি। আমরা এই কর্তব্য

পালনে সফল হবো ইনশাআল্লাহ। সকল যোদ্ধাদের বুঝিয়ে দিন, আমরা এখানে রাজ্য বিস্তারের জন্যে খলিফা কিংবা শাসক হাজ্জাজের জন্য লড়াই করছি না, কুফরিস্তানে আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষকে আল্লাহর পথ দেখানোর জন্যে আল্লাহর দুশমনদের সাথে লড়াই করছি।

ঐতিহাসিক মাসুমী লিখেন, এসব কথা বলতে বলতে বিন কাসিম আবেগ আপুত হয়ে উঠলেন। তাঁর চেহারা রক্তিম হয়ে গেল। সেই রাতেই সেনাপতি ও কমান্ডারগণ নিজ নিজ ইউনিটের যোদ্ধাদের একত্রিত করে বিন কাসিমের দেয়া নির্দেশনা জানিয়ে দিলেন।

বস্তুত এ সময় যোদ্ধাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে অবস্থায় পৌছানোর পরিকল্পনা করেছিল রাজা দাহির। একাধারে যুদ্ধের পর যুদ্ধ ও বিশ্রাম না করার কারণে প্রত্যেক যোদ্ধার শরীর ক্লান্তি ও অবসন্নতায় কাবু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের মনের শক্তিতে কোন ঘাটতি ছিল না। দীর্ঘ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে তাদের দেহ ভেঙ্গেচুরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেও তাদের মনের আবেগ, উদ্দীপনা সেই প্রথম দিনের সিন্ধু অভিযানের মতোই উজ্জীবিত ছিল। মুলতান যুদ্ধের সূচনায় বিন কাসিমের এই আবেগপূর্ণ নির্দেশনা তাদের অচল ও অবসাদগ্রস্ত দেহেও নতুন প্রাণ ও শক্তি সঞ্চার করল।

ভোরবেলায় একটি উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে কোন এক যোদ্ধা ফজরের আযান দিল। আজকের আযানে আবারো সেই উদ্দীপনা ও নতুন প্রাণময় দো্যতনা ছড়িয়ে পড়ল মুসলিম শিবিরে। আযানের দোতনা ইথারে ভাসতে ভাসতে মুলতান দুর্গের প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে দুর্গের ভিতরেও ছড়িয়ে পড়ল। ক্লান্ত শ্রান্ত যোদ্ধারা রাতের আড়মোড়া ভেঙ্গে অযু এস্তেঞ্জা সেরে সবাই নামাযের প্রস্তুতি নিয়ে এসে জড়ো হলো। সেনাপতি বিন কাসিমের নেতৃত্ব ও ইমামতিতে সবাই নামায আদায় করতে কাতারবদ্ধ হলো।

ফজরের নামাযের পর দ্রুত পানাহারের পর্ব শেষ করে মুসলিম যোদ্ধারা অবরোধ আরোপের জন্যে প্রস্তুতি নিলো। সেনাপতি ও কমান্ডারগণ যখন নিজ নিজ যোদ্ধাদের নিয়ে দুর্গের দিকে রওয়ানা হলো, তখন শিবিরে অবস্থানরত নারী ও শিশুরা তাদের হাত নেড়ে আল্লাহ সহায় হোন, তোমরা কামিয়াব হও ইত্যাদি বলে দোয়া ও শুভ কামনায় বিদায় জানালো। এমন সময় পূর্বাকাশে সকালের সূর্য আলো বিকিরণ করতে শুরু করেছে।

মুসলিম যোদ্ধারা কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর এক পাশের দুর্গফটক খুলে গেল। সাথে সাথে কিছু সংখ্যক সৈন্য দুর্গ থেকে দ্রুতবেগে বের হয়ে এলো। হিন্দু সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়েই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে কাতারবন্দি হয়ে গেল। আজকের এই যোদ্ধাদেরও কমান্ড দিচ্ছিল বজরা। এদিকে দুর্গপ্রাচীরের ওপর ছিল তীরন্দাজ, বল্লম ও বর্শাধারীদের মানব প্রাচীর। দুর্গপ্রচীরের উপরে দাঁড়ানো হিন্দুদের জোশ ও তাদের দুর্নিবার স্লোগান চিঙ্কার বলে দিচ্ছে, তারা পরাজয় বরণ করতে মোটেও প্রস্তুত নয়। অন্যান্য দুর্গের মতোই এই দুর্গপ্রাচীরে থেকে মুসলমানদের প্রতি নানা বিদ্রুপাত্মক কটাক্ষবান উচ্চারিত হচ্ছিল। এদিকে মুসলিম যোদ্ধাদের একটি ইউনিট দূর দিয়ে দুর্গের পেছন দিকে গিয়ে অবরোধ আরোপের জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। বিন কাসিম আগেই বলে দিয়েছিলেন, যথাসম্ভব আক্রমণাত্মক যুদ্ধ না করে আত্মরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করবে।

শত্রু বাহিনী যাতে অগ্রসর হয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় সেই সুযোগ দিতে হবে। বিন কাসিম যথাসম্ভব তার সেনাদের শক্তিক্ষয় রোধ করতে চাচ্ছিলেন, সেই সাথে তিনি এই মোকাবেলাকে দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছিলেন। এ জন্য দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে সৈন্যদেরকে অবরোধ আরোপের নির্দেশ করেছিলেন। আর অগ্রগামী দুই কমান্ডারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সুযোগ মতো আক্রমণ করতে এবং আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা নিতে। এ দিন সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত লড়াই চলল। মুসলিম সৈন্যরা আত্মরক্ষামূলক লড়াই বজায় রাখল, সেই সাথে সুযোগ মতো আক্রমণও করল। অন্যান্য দুর্গের মতো এখানেও দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি যাওয়া ছিল সংকটজনক। ফলে তাদেরকে দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে লড়াই করতে হলো। শত্রু বাহিনী পুরোপুরি দুর্গের সুবিধা পাচ্ছিল। তাদেরকে পিছন দিক থেকে ঘিরে ফেলার কোনই অবকাশ ছিল না।

বেলা ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে বজরার সৈন্যরা একে একে সবাই দুর্গে ফিরে যেতে শুরু করল। বিন কাসিমের কয়েকজন জানবাজ যোদ্ধা তাদের তাড়া করে দুর্গফটক দিয়ে ভিতরে ঢোকার জন্য প্রস্তুতি নিল কিন্তু বিন কাসিম তাদের নিবৃত করলেন। বিন কাসিম গোটা রণাঙ্গন ঘুরে ঘুরে শত্রুবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করলেন। তাঁর সেনাদের ক্ষয়ক্ষতিও তিনি নিরূপন করলেন। সকল ঐতিহাসিকগণই বলেছেন, দ্বিতীয় দিন শত্রুবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলো। তারা বহু লাশ ও আহত সৈন্যকে রণাঙ্গনে ফেলে দুর্গের ফটক বন্ধ করে দিল।

বিন কাসিম তার সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতি ও শত্রুবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে খুবই আশ্বস্ত হলেন। রাতের বেলায় সেনাপতি ও কমান্ডারদের ডেকে তিনি বললেন, যুদ্ধ কৌশল এমনটাই থাকবে। নাটকীয় কোন ঘটনা না ঘটলে এর তেমন ব্যত্যয় ঘটবে না। তোমরা শত্রু সেনাদের বোঝাতে চেষ্টা করবে, তোমরা ক্লান্ত, আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ তোমাদের নেই। তাহলে শত্রুবাহিনী অগ্রগামী হয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে আর তোমরা তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হত্যা করতে চেষ্টা করবে। আমরা ধীরে ধীরে ওদের জনবল নিঃশেষ করে দিতে চাই।

বিন কাসিমের এই নীতি মুলতান বাহিনীর কোমর ভেঙে দিল। প্রতিদিনই ওরা বিপুল সহযোদ্ধাকে নিহত ও আহত করে দুর্গে ফিরে যাচ্ছিল। মুসলিম বাহিনী দেখে দেখে শত্রু সেনাদের মধ্য থেকে দু’চারজন আহতকে তুলে আনতো। আর নিহতদের মৃতদেহগুলো বড় গর্তে পুঁতে ফেলতো। কারণ নয়তো এগুলো পচে-গলে পরিবেশ দূষণ ঘটাবে। রোগ ব্যাধি ছড়াবে। যা হবে তাদের জন্য ভয়ঙ্কর।

দীর্ঘ দু’মাস পর্যন্ত চলল একই রীতির লড়াই। দু’মাস পর হিন্দু বাহিনী ঠিক এমন পর্যায়ে চলে গেল বিন কাসিম ওদের যে পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন। দু’মাসে তাদের অর্ধেকের চেয়ে বেশি সৈন্য মারা পড়ল। এরপরও হিন্দু সৈন্য সংখ্যা ছিল মুসলিম সৈন্য সংখ্যা থেকে দ্বিগুণ। তাছাড়া শহরের সব অধিবাসীই যুদ্ধে শরীক ছিল। বিন কাসিম মুলতানকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি হিসাবেই সাব্যস্ত করেছিলেন। শত্রু বাহিনীও বুঝতো, মুলতান দুর্গের পতন ঘটলে মুসলিম বাহিনীকে আর কোথাও ঠেকানো যাবে না। গোটা সিন্ধু অঞ্চল মুসলমানদের দখলে চলে যাবে। হিন্দুস্তানের দূরদরাজ পর্যন্ত মুসলমানদের পদানত হয়ে যাবে। এ জন্য বজরা ও কুরসিয়া মুলতান দুর্গ রক্ষার জন্য বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুতি নিল।

দু’মাসের মাথায় দুর্গের সৈন্যরা বাইরে এসে আক্রমণ করা বন্ধ করে দিল। বিন কাসিম দুদিন অপেক্ষা করলেন। কিন্তু দুদিনের মধ্যে দুর্গ থেকে একটি প্রাণীও বাইরে এলো না। দুদিন পর বিন কাসিম দুর্গ অবরোধ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন। দ্রুত গতিতে বিন কাসিমের সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করে প্রতিটি ফটকের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিল।

বিন কাসিম আগেই খবর পেয়েছিলেন, মুলতান দুর্গের প্রাচীরের ওপরে শত্রু সেনারা বহু ছোট ছোট মিনজানিক স্থাপন করেছে। এগুলো থেকে ছোট ছোট পাথর অবিরাম বর্ষণ করা মোটেও কোন মুশকিলের ব্যাপার নয়।

মুসলিম সৈন্যদের অবরোধ আরোপ করতে দেখে দুর্গপ্রাচীর থেকে বিরামহীন পাথর বর্ষণ শুরু হলো। অবশ্য এসব পাথর বেশী বড় ছিল না বলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু পাথরের আঘাত থেকে গা বাঁচানোর জন্য আরব সৈন্যরা তাদের অবস্থান একটু পিছিয়ে আনল।

শত্রুবাহিনীর পাথর নিক্ষেপের জবাবে বিন কাসিম তার বড় বড় মিনজানিক থেকে পাথর নিক্ষেপ করে শহরে হৈ চৈ ফেলে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি বেসামরিক লোকদের জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ও শহর ধ্বংসের আশঙ্কায় শত্রুদের আক্রমণের জবাব দেয়া থেকে নিবৃত্ত রইলেন। একেবারে নিরূপায় হওয়া ছাড়া তিনি মিনজানিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতেন।

অবরোধ আরোপের পর বিন কাসিম ঘোড়ায় চড়ে দুর্গপ্রাচীরের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে দুর্গের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু দুর্গপ্রাচীরের কোথাও কোন দুর্বলতা তাঁর গোচরিভূত হচ্ছিল না। বিন কাসিমের তীরন্দাজ ইউনিট তীব্রগতিতে এগিয়ে দুর্গপ্রাচীরে অবস্থানরত শত্রু সেনাদের ওপর তীর বর্ষণ করে ফিরে আসতো। তাতে শত্রু সেনাদের অনেকেই আহত ও নিহত হতো বটে কিন্তু তাতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ কোন প্রভাবিত হচ্ছিল না। এ অবস্থা চলল বেশ কদিন। হঠাৎ একদিন বিন কাসিমকে খবর দেয়া হলো, সৈন্যদের জন্য সংরক্ষিত আহার্য কাচামাল শেষ হয়ে গেছে।

প্রয়োজন মতো খরচ করে বড়জোর আর তিন চার দিন চলবে। সেনাদের জন্য প্রয়োজনীয় আহার সামগ্রী আসবাবপত্র নিরূন, ব্রাহ্মণাবাদ ও উরুঢ়ে রয়ে গেছে। কিন্তু এগুলোর অবস্থান এতটাই দূরে যে, দু’এক দিনে সেখান থেকে আহার সামগ্রী এখানে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। যে গতিতে সেনাবাহিনী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয় আসবাব ও আহার সামগ্রী স্থানান্তর সেভাবে অসম্ভব। কারণ সেই যুগে গরুর গাড়ী উট ও গাধার পিটে করে ভারী মালপত্র পরিবহন করা হতো। নদী পথে নৌকা করে বহন করা হতো ভারী জিনিসপত্র। বস্তুত আহার সামগ্রী মুলতান থেকে দূরে ছিল বটে কিন্তু দীর্ঘ দিন মুলতানে অবস্থানের পরও বিন কাসিম কেন অতিরিক্ত আহার্য এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন না, এ ব্যাপারটি কোন ঐতিহাসিক উল্লেখ করেননি। হতে পারে প্রতি দিনের যুদ্ধ ব্যস্ততার কারণে আহার ও রসদ সামগ্রী

আমদানীর ব্যাপারটিকে আমলে নিতে পারেননি বিন কাসিম। এছাড়া হতে পারে তিনি যে কোন সময় দুর্গ জয়ের আশাবাদী ছিলেন। অথবা তার খাদ্য বিষয়ক কর্মকর্তারা সময় মতো তাঁকে খাদ্য পরিস্থিতির ব্যাপারটি অবহিত করতে পারেনি। সামগ্রিক ব্যাপারটি হতে পারে অব্যাহত দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সবাই এতোটা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আহার সামগ্রী নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তেমনভাবে নজরে আনতে পারেনি। অবশ্য কাঁচামাল এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। খবর শুনেই বিন কাসিম খাবারের পরিমাণ অর্ধেক করার নির্দেশ দিলেন। ফলে মুসলিম যোদ্ধারা পূর্ণ আহারের জায়গায় অর্ধেক খাবার খেতে শুরু করল। এমতাবস্থায় কয়েকদিন চলার পর ভারবহন করার জন্য মুসলিম শিবিরে যেসব গাধা ছিল কিছু সৈনিক কয়েকটি গাধা জবাই করে খেয়ে ফেলল।

ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেছেন, দুর্গের বাইরের একটি ছোট খাল দুর্গপ্রাচীরের ভিতর দিয়ে দুর্গ ভেদ করে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। এই নালাটি সতত প্রবাহমান এবং দুর্গবাসীর খাবার পানির প্রধান উৎস। আহত এক হিন্দু সৈনিক মুসলমানদের হাতে বন্দি ছিল। এই বন্দির ক্ষত তখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। মুসলমান সৈন্য শিবিরে যখন খাবার সংকট দেখা দিল তখন অফিসার সিপাহী সবার জন্যেই খাবার বরাদ্দ হ্রাস করে দেয়া হলো। এমতাবস্থায় কয়েদীদেরকেও অর্ধেক খাবার দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। বন্দিরা ভাবতে শুরু করল বন্দি হওয়ার কারণে তাদেরকে অর্ধেক খাবার দেয়া হচ্ছে। খাবার স্বল্পতায় কাতর হয়ে এই বন্দি এক পর্যায়ে মুসলিম সৈন্যদের কাছে আবেদন নিবেদন করতে শুরু করল। মারাত্মক জখম এমনিতেই তাকে দুর্বল করে ফেলেছে। এর ওপর অর্ধেক খাবারের পরিবর্তে তাকে যেন পুরোপুরি খাবার দেয়া হয়। সৈন্যরা তাকে জানালো বিষয়টি এমন নয়, শিবিরে খাবার সংকট দেখা দিয়েছে, এ জন্য খাবার অর্ধেক করে দেয়া হচ্ছে।

এই আহত সৈনিক জখম ও খাবার স্বল্পতার যাতনায় মুসলিম সৈন্যদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করে দিল। হায়, তোমরা খাবার স্বল্পতায় ভুগছো? আমি তোমাদের বলে দিচ্ছি। অমুক জায়গা দিয়ে দুর্গের ভিতরের একটি ছোট খাল প্রবাহিত হচ্ছে। শহরের সকল মানুষ এই খালের পানিই পান করে এবং এই পানি দিয়েই তারা পশুগুলোকে গোসল করায় পানি পান করায়। এই প্রাকৃতিক পানি। প্রবাহ থাকার কারণে দুর্গের ভিতরে কূয়া তেমন বেশী নেই। তোমরা যদি

এই পানি প্রবাহ বন্ধ করে দাও, তাহলে শহরের মানুষ পানির অভাব ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে দুর্গের ফটক খুলে দেবে। হায়, আমি তোমাদের একথা বলে বিরাট পাপ করে ফেলেছি। আমাদের সবাইকে মন্দিরের সামনে নিয়ে গিয়ে শপথ করানো হয়েছিল। আমরা যাতে শত্রুদের হাতে বন্দি হলেও দুর্গ ও সৈন্যদের ব্যাপারে কোন তথ্য প্রকাশ না করি। বিশেষ করে এই খালের কথা কোন অবস্থাতেই যাতে প্রকাশ না করা হয়। এ জন্য বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। দেখো, আমি কতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তোমাদের দিয়েছি, তা কয়েক দিনের মধ্যেই তোমরা বুঝতে পারবে। দয়া করে আমাকে তোমরা পেট ভরে খেতে দাও, আর আমার জখমের সঠিক চিকিৎসা দাও। জখমের যন্ত্রণা ও ক্ষুধার জ্বালায় আমি কি সর্বনাশই না করে ফেলেছি।

খালটি কোন জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, জায়গাটিও আহত হিন্দু বলে দিল। এই খালটি এই হিন্দুর বলার আগেই মুসলমানরা দেখেছে। কিন্তু এটিকে বেশী গুরুত্ব দেয়নি। কারণ খালটি একেতো খুব ছোট, তাছাড়া লতাপাতা ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে ঢাকা ছিল। এটি কোথা থেকে কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে তা বোঝার উপায় ছিল না।

আহত হিন্দু সৈনিক বলার পর তখনি বাঁধ দিয়ে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হলো।

এর তিন-চার দিন পর যুদ্ধে আবার উত্তাপ দেখা দিল। কিছু দিন এমন ছিল যে, মুসলমান তীরন্দাজরা দুর্গপ্রাচীরের কাছে গিয়ে তীর চালালে দুর্গপ্রাচীরের হিন্দুরা নিজেদের গা বাঁচিয়ে প্রতিরোধ করতো। কিন্তু এবার দুর্গপ্রাচীরের হিন্দুরাও আক্রমণের মাধ্যমে মুসলমানদের ঘায়েল করতে সচেষ্ট হলো। মুসলমানরা ছিল ক্ষুধার তাড়নায় ক্ষিপ্ত। তারা চাচ্ছিল দ্রুত যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দুর্গে প্রবেশ করে প্রাণভরে পেটপুরে আহার করতে। অপরদিকে মুলতানের দুর্গবাসী পানির অভাবে পিপাসায় কাতর হয়ে উঠেছিল। তারাও চাচ্ছিল মুসলমানদের পরাজিত করে পানির প্রবাহ খুলে দিতে। এভাবে আরো দু’তিন দিন যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন বিপুল সংখ্যক সৈন্য দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলমানদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালালো। মুসলিম সৈন্যরা দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করে তাদেরকে ঘেরাও-এর মধ্যে

নিয়ে আসার চেষ্টা করল বটে কিন্তু সফল হলো না। শেষ পর্যন্ত হিন্দু সৈন্যরা বহু মৃতদেহ আর আহত সৈন্যকে রণাঙ্গনে ফেলে রেখেই দুর্গে ফিরে গেল। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, খুব সাধারণ জখমে আহত হয়েও হিন্দু যোদ্ধারা রণাঙ্গন থেকে উঠে দুর্গে ফিরে যেতে আগ্রহবোধ করার চেয়ে মুসলমানদের হাতে নিজেদের সপে দিতে কুণ্ঠাবোধ করল না। মুসলমানরা ওদের বন্দি করার পর সর্বাগ্রে এরা তাদের কাছে যে জিনিসটির জন্য অনুরোধ জানাল তা হলো পানি। তাতে মুসলমানরা নিশ্চিত হলো, দুর্গভ্যন্তরে পানির স্বল্পতা মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পানির তীব্র অভাব হিন্দুদের ঘোড়াগুলোর মধ্যেও প্রকট হয়ে উঠেছিল। ওদের ঘোড়াগুলো দুর্গ থেকে বের হয়ে নেতিয়ে পড়ছিল নয়তো বেকার হয়ে উম্মুক্ত মাঠে ছুটে পালাতে চেষ্টা করত।

এভাবে আরো দু’তিন দিন চলল। দুর্গের সৈন্যরা বের হয়ে তীব্র আক্রমণ করতো আর আহত যোদ্ধাদের ফেলে রেখে চলে যেতো। আহতরা সর্বাগ্রে মুসলমানদের কাছে পানির জন্য অনুরোধ করত। আহতরা জানাচ্ছি ভিতরে পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। পানির প্রবাহ বন্ধ। ভিতরে পর্যাপ্ত কূয়া নেই। যাও আছে তা দিয়ে প্রয়োজনের কিছুই হয় না। নতুন কুয়া খননের কাজ চলছে। কিন্তু তাতেও পানির দেখা মেলে খুব কম।

এদিকে বিন কাসিমের জন্য খাদ্য ঘাটতি বিরাট সমস্যা হয়ে দেখা দিল। তিনি দ্রুত সংবাদ বাহক পাঠালেন বটে কিন্তু ব্রাহ্মণাবাদ ও বেড়া থেকে চটজলদি আহার সামগ্রী মুলতান পৌছানোর ব্যাপারটি সহজসাধ্য ছিল না। অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হলো যে, ক্ষুধার তাড়নায় মুসলমান সৈন্যরা আগে অস্ত্র সমর্পণ করে না পিপাসায় কাতর হয়ে দুর্গবাসী ফটক খুলে দেয় এটি ছিল দেখার বিষয়। আপাতত দৃষ্টিতে সমাধানের পথ ছিল একটা সমঝোতার ভিত্তিতে দুর্গবাসী মুসলমানদের জন্য ফটক খুলে দিবে আর মুসলমানরা দুর্গবাসীর জন্যে পানির সরবরাহ খালের বাঁধ খুলে দেবে।

পরদিন প্রত্যুষেই দুর্গের সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে মুসলিম সৈন্যদের ওপর আঘাত হানল। বিন কাসিম ইতোমধ্যে জেনে নিয়েছিলেন দুর্গের সৈন্যরা পানির পিপাসায় কাতর। তিনি কমান্ডারদের নির্দেশ দিলেন, এখন উভয় বাহু থেকে ওদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক হামলা করবে। অর্ধাহারে এমনকি প্রায় অনাহারে মুসলিম যোদ্ধাদের অবস্থা ছিল শোচনীয় তবুও শেষ রক্ষা হিসাবে তারা প্রচণ্ড হামলা চালালো। মুসলমানরা আহার সংকটে ভুগছিল বটে। কিন্তু তাদের পানির কোন সংকট ছিল না। তাদের ঘোড়াগুলোও ছিল

তাজা ফুরফুরে। ভোলা ময়দানে এগুলো ইচ্ছামতো চরে বেড়াতে এবং পর্যাপ্ত ঘাসপানি আহার করে তাজা-তাগড়া হয়ে উঠেছিল।

এদিনের যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এক কমান্ডার আহত অবস্থায় মুসলমানদের হাতে বন্দি হলো। ওদের সৈন্যরা দিন শেষে দুর্গে ফিরে গেলেও বেশী আহত হওয়ায় ওর পক্ষে দ্রুত ফিরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ওর পোশাক দেখে মুসলিম যোদ্ধারা ওকে কয়েদ করে নিয়ে এলো। এই বন্দি মুসলমানদের কাছে ছিল মূল্যবান হাতিয়ার। তাই তাঁবুতে নিয়ে এসে ওর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে ওষুধ দেয়া হলো। এরপর গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী ওর কাছ থেকে তথ্য বের করার জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এলেন। তিনি বন্দির কাছে জানতে চাইলেন, তোমাদের দুর্গের অবস্থা কি? তোমরা আর কত দিন প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে? দুর্গে আর কি পরিমাণ সৈন্য আছে? তোমাদের সামরিক আয়োজন কি পরিমাণ এখনো অবশিষ্ট আছে?

“হে আরব বন্ধু! আমি কোন সাধারণ সিপাহি হলে তোমাকে হয়তো অভ্যন্তরীণ অবস্থা বলে দিতাম। আমি মুলতানের সেনা বাহিনীর একজন কমান্ডার। তাছাড়া বংশে আমি একজন ব্রাহ্মণ। তুমি হয়তো জানো না, হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ সবচেয়ে সম্মানিত জনগোষ্ঠী। ব্রাহ্মণ ছাড়া হিন্দুদের কেউ মন্দিরের পুরোহিত হতে পারে না। রাষ্ট্র ও ধর্মের কর্ণধার হওয়ার অধিকার ব্রাহ্মণদের জন্যেই সংরক্ষিত। এমতাবস্থায় তুমি এই আশা করতে পারো না যে, আমি জাতি, রাষ্ট্র ও ধর্মের সাথে গাদ্দারী করে তোমাকে আমাদের দুর্বলতা ও আমাদের গোপন তথ্য বলে দেবো।

তুমি না বললেও তোমাদের অন্য কেউ ঠিকই বলবে, বললেন শাবান ছাকাফী। তবে এরপর আর তুমি আমাদের কাছে কোন ধরনের সহমর্মিতা ও সৎ ব্যবহারের আশা করতে পারো না। কারণ আমরা তোমাকে ক্ষমা করতে পারি না। তোমাদের কারণে ইতোমধ্যে আমাদের বহু সহযোদ্ধা নিহত হয়েছে।

এই দেশ, এই দুর্গ আর ধর্মের জন্য আমি জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত, বলল বন্দি হিন্দু কমান্ডার। তোমরা আমাকে যা ইচ্ছা সেই শাস্তি দিতে পারো। সব শাস্তিই আমি মাথা পেতে মেনে নেব এবং খুশী মনে জীবন ত্যাগ করব। তুমি কিন্তু আমার কথা শেষ করার সুযোগ দাওনি। আমরা

এমনিতেই খুব কষ্টে ছিলাম, এখন আরেক কষ্টের শিকার হলাম। আমাকে কিছু সময় একান্তে চিন্তা করার অবকাশ দাও। ঠিক আছে, কি তোমার অসমাপ্ত কথা, আমাকে বলো, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে চিন্তা করার সুযোগ দেবো। বললেন, গোয়েন্দা প্রধান। দুর্গে প্রচণ্ড পানি সংকট চলছে। পিপাসায় এখনো মৃত্যুর সংখ্যা বেশী না হলেও এই অবস্থা আর দুই তিন দিন অব্যাহত থাকলে মানুষ পানির অভাবে মরতে শুরু করবে বলল, হিন্দু কমান্ডার। পানি প্রবাহ তোমরা বন্ধ করে দিয়েছে। এটিই ছিল দুর্গবাসীর পানির একমাত্র উৎস। দুর্গের ভিতরে মাত্র কয়েকটি কূয়া সচল আছে, এগুলোর পানি সৈন্য ও যুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে বণ্টন করে দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ার কারণে আমি তেমন পিপাসিত নই বটে কিন্তু পিপাসার যাতনায় যখন আমি দুইটি অবোধ শিশুকে মরতে দেখেছি, তখন থেকেই আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন ওদের হত্যা করেছি।

আমি তো জানতে পেরেছি, দুর্গের পানি সংকট দূর করতে কূপ খননের কাজ চলছে? বললেন শা’বান ছাকাফী। সেই চেষ্টা অবশ্য চলছে। কিন্তু এখানকার মাটির অবস্থাই এমন যে, এখানে কূপ খনন করে পানি বের করা সহজ নয়। ব্যাপক চাহিদা মতো কূপ খনন করে পানি সরবরাহ করতে করতে বহু মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হবে। আমি যে কোন মূল্যে এসব নিরীহ লোকদের প্রাণ বাঁচাতে চাই। আমি সেনা কর্মকর্তা হয়ে পানি পান করছি, আর দুর্গের শিশুরা পানির অভাবে মৃত্যু বরণ করছে, মায়েরা পানি পান করতে না পারায় তাদের কোলের শিশুকে বুকের দুধ পর্যন্ত খাওয়াতে পারছে না। এজন্য নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। “এমনই যদি অবস্থা হবে তারপরও তোমাদের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করছে না কেন? জানতে চাইলেন শাবান ছাকাফী। সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করবে না। আমি একথা তোমাকে হলফ করেই বলতে পারি। তবে তোমাকে বলছি, গত রাতে কুরসিয়া এই দুর্গ থেকে চলে গেছে। সে যাওয়ার সময় তার আত্মীয় পরিবার সবাইকে নিয়ে গেছে।

কোন পথে গেছে কুরসিয়া? জানতে চাইলেন ছাকাফী। সে হয়তো আগে থেকেই এ ব্যাপারে খোজ-খবর নিয়েছে এবং পর্যবেক্ষণ করেছে। যে দিকে তোমাদের লোক কমছিল অথবা ফাকা ছিল

সেই জায়গা দিয়েই বেরিয়ে গেছে কুরসিয়া। তুমি জান কি-না জানি না। সেই কিন্তু দুর্গের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব কাঁদে নিয়েছিল। বন্দি কমান্ডার বলল।

বজরা কোথায়? সে তো এখনো দুর্গেই আছে? জানতে চাইলেন গোয়েন্দা প্রধান। বজরা এখনো সৈন্যদেরকে তার নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। বলল বন্দি কমান্ডার। কিন্তু তোমরা তাকে ধরতে পারবে না। তোমরা দুর্গে প্রবেশ করলে সে ঠিকই দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাবে…। তোমরা আমার একটা কথা শোনো…। আমি জানি তোমরা দুর্গবাসীদের পানি প্রবাহ খুলে দেবে না। তা ঠিক। কিন্তু তুমি যদি ফিরে গিয়ে দুর্গের ফটক খুলে দিতে পার তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, আমরা পানি প্রবাহ ছেড়ে দেবো। আমি গিয়েও দুর্গফটক খুলে দিতে পারব না। বলল বন্দি কমান্ডার। তবে আমি তোমাদের দুর্গে প্রবেশের একটা পথ বলে দিতে পারি। আর এটা আমি করছি, আমার দুর্গ ও জাতি ধর্মের শিশুরা যাতে পানির অভাবে মৃত্যুবরণ না করে এজন্য। তোমরা পানি প্রবাহ ছেড়ে দিয়ে দুর্গে প্রবেশের রাস্তা করতে পারো। এজন্য তোমাদেরকে আগে পানি প্রবাহ খুলে দিতে হবে।

সত্যিই সেটি ছিল একটি নাটকীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা। বন্দি হিন্দু কমান্ডার দুর্গের নারী-শিশুদেরকে পিপাসার তাড়নায় মরতে দেখে আবেগ প্রবণ হয়ে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান সকাফীকে দুর্গপ্রাচীরের এমন একটি জায়গার কথা বলে দিল, যে জায়গাটি ছিল সবেচেয়ে দুর্বল। এই জায়গার দুর্গপ্রাচীরে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। জায়গাটি ছিল দুর্গের ভিতরে প্রবেশকারী নালার দিকে। বিন কাসিমকে এ তথ্য জানানোর পর তিনি বড় মিনজানিকগুলো সেদিকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সব বড় বড় মিনজানিক থেকে এক সাথে পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ভগ্ন দেয়ালে বিরাট ভাঙন দেখা দিল এবং ওপরের দিকে দেয়াল ভেঙ্গে গেল। কিন্তু এই ভাঙন দেয়ালের এতোটা ওপরে ছিল যে এত ওপর দিয়ে ঘোড়া দুর্গে প্রবেশ করতে পারত না।

এবার নীচের দিকে পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেয়ালের নীচের দিকেও ভাঙন শুরু করল এবং ওপরের দিকের ভাঙন আরো নীচের দিকে প্রলম্বিত হতে লাগল। তখন বিন কাসিম সৈন্যদের একটি অংশকে নির্দেশ দিলেন তোমরা পানি প্রবাহ ছেড়ে দাও। দুর্গের পানি প্রবাহ ছেড়ে দেয়ার পর মানুষ যখন দেখলো নালা দিয়ে পানি দ্রুত প্রবাহিত হচ্ছে, তখন পিপাসার্ত সকল মানুষ পানি সংগ্রহের জন্য F.31

ঝাপিয়ে পড়ল। যেসব সৈন্য দুর্গপ্রাচীরের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ছিল। পিপাসায় এরাও ছিল কাতর। পানি আসার খবর শুনে তারাও দুর্গপ্রাচীর ছেড়ে পানি সংগ্রহে লিপ্ত হলো। মোট কথা পানি আসার খবরে গোটা দুর্গ জুড়ে চরম হৈ হুল্লোড় পড়ে গেল। তখনো অনেকটা উঁচু রয়ে গিয়েছিল দেয়াল। মিনজানিকের আঘাতে তখনো দেয়ালকে সম্পূর্ণ ভেঙে মাটির সমান করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু দুর্ধর্ষ ও অশ্বচালনায় পটু আরব অশ্বারোহী যোদ্ধারা ভগ্ন উঁচু দেয়ালের ওপর দিয়েই ঘোড়া ছুটাল। প্রশিক্ষিত ঘোড়াগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে দেয়াল টপকে দুর্গে প্রবেশ করতে শুরু করল। দুর্গের সশস্ত্র সৈন্যরা মুসলিম যোদ্ধাদের মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হলো। অবশ্য এর আগেই বিন কাসিম নির্দেশ দিলেন দুর্গের কোন নারী-শিশু ও বেসামরিক লোককে আঘাত করবে না। কিন্তু কোন সামরিক সৈন্যের প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া প্রদর্শন করবে না।

দুর্গের সৈন্যরা প্রতিরোধ চেষ্টা করলো বটে কিন্তু ক্ষিপ্ত ও ক্ষুব্ধ মুসলিম যোদ্ধাদের মোকাবেলায় পিপাসায় কাতর হিন্দু সৈন্যরা দাঁড়াতেই পারল না। ইতিহাসগ্রন্থ চাচনামায় লেখা হয়েছে, সেদিন মুলতান দুর্গের অন্তত ছয় হাজার হিন্দু সৈন্য মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছিল। প্রধান ফটক খুলে দিলে বিজয়ী বেশে বিন কাসিম দুর্গে প্রবেশ করেই ঘোষণা দিলেন, শহরে একথা প্রচার করে দাও, কোন সাধারণ বাসিন্দা যেন দুর্গ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা না করে এবং কেউ যেন কোন হিন্দু সৈন্যকে আশ্রয় না

দেয় এবং সকল অধিবাসী যেন নিজ নিজ বাড়ীর গেট খোলা রাখে। সেই সাথে রাজপরিবারের কোন লোককে যেন শহরের কোন অধিবাসী নিজ বাড়ীতে আশ্রয় না দেয়। মুসলিম সৈন্যদের কেউ কারো বাড়িতে প্রবেশ করবে না। সবার সহায়-সম্পদ, মান সম্ভ্রমের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

স্থানীয় লোকদের দৌড়ঝাপ তবুও বন্ধ ছিল না। এর মধ্য দিয়েই মুসলিম শিবিরের সৈন্য ও অন্যান্যরা দুর্গে প্রবেশ করছিল। যে ফটক দিয়ে মুসলমানরা প্রবেশ করছিল ভয়ে আতঙ্কে দুর্গ ছেড়ে পালানোর জন্য অন্য ফটকের দিকে দৌড়াচ্ছিল হিন্দু অধিবাসীরা। অবস্থা দেখে মুসলমান সৈন্যরা দুর্গ ফটকগুলো বন্ধ করে দিল। কিন্তু ততক্ষণে বেশ কিছু হিন্দু অধিবাসী শহর থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এদের মধ্যে বাজরা ও তার খান্দানের লোকজনও ছিল। ‘ পিপাসায় কাতর মানুষ পানির জন্য যেসব আধারে পানি এনে জমা করা হচ্ছিল সেগুলোতে ঝাপিয়ে পড়ল। ঘর-সম্পদের নিরাপত্তার ব্যাপারটির

চেয়েও তখন তাদের কাছে জীবন বাঁচানোটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জনসাধারণের মধ্যে এই উদ্বেগ ছিল বিজয়ী বাহিনী তাদের ধন-সম্পদ লুট করবে এবং তাদের যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাবে। কিন্তু পানি সংগ্রহ করে ঘরে ফেরা মানুষ চরম বিস্ময়ে লক্ষ করল, দরজা খোলা থাকার পরও কোন মুসলিম সৈন্য তাদের কারো ঘরে প্রবেশ করেনি এবং কোন যুবতী তরুণির প্রতি চোখ তুলে তাকায়নি কোন বিজয়ী সৈনিক। বিন কাসিমের বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর বিন কাসিম শহরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তলব করলেন এবং শহরের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য লোকদেরকে তার কাছে হাজির করার নির্দেশ দিলেন।

কিছুক্ষণ পর শহরের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিন কাসিম সকাশে এসে হাজির হলো। তিনি তাদেরকে সসম্মানে বসার নির্দেশ দিয়ে বললেন, তোমাদের শহরে যে পরিবর্তন এসেছে তোমরা নিজ চোখে দেখেছ। আমরা বিজয়ী বটে। কিন্তু আমরা তোমাদেরকে পরাজিত প্রজা মনে করি না। আমি নিজেকে তোমাদের বাদশা মনে করি না এবং তোমাদেরকে আমার প্রজা মনে করি না।

আমরা আপনার অনুগত প্রজা সম্মানিত সেনাপতি! দু’হাত প্রসারিত করে মাথা ঝুকিয়ে বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বলল এক অভিজাত ব্যবসায়ী। সে আরো বলল, আমরা সবসময়ই প্রজা হিসাবেই থেকেছি। আপনার একজন অনুগত প্রজা হিসাবে থাকব। আমরা আপনার আগমনকে একজন রাজার বিদায়ে আরেকজন রাজার আগমন হিসাবে দেখছি।

আমরা তোমাদেরকে একথাই বলতে এসেছি যা তোমাদের কেউ জানেনা। বললেন বিন কাসিম। আমি তোমাদের যে কথা বলতে চাচ্ছি সেটি আমার ব্যক্তিগত কথা নয়, আমাদের ধর্মের নির্দেশ। আমাদের ধর্মে কেউ রাজা আর কেউ প্রজা হতে পারে না। আমাদের ধর্মের দৃষ্টিতে রাজত্ব শুধুই আল্লাহর। আমরা আল্লাহর নির্দেশ মতো তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রতিনিধিত্ব করছি মাত্র। তোমরা নিজেদেরকে কখনো পরাধীন মনে করো না। তোমরা স্বাধীন মতো নিজেদের ধর্মকর্ম করতে পারবে। তোমরা তোমাদের মন্দিরের দরজা নিঃসংকোচে খুলে রাখতে পারবে, কোন মুসলমানকে তোমাদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে না।

আপনি কি আমাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করবেন না? বিনীত কণ্ঠে জানতে চাইলো একজন অভিজাত হিন্দু।

আমরা কিছুতেই তোমাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করব না, বললেন বিন কাসিম। আমাদের ধর্মই এমন সুন্দর তোমরা যখন নিজের চোখে আমাদের ধর্মের কার্যক্রম দেখবে, তখন তোমরাই এই ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে। তোমরা শহরের সকল অধিবাসীদের জানিয়ে দাও, তারা যেন মন থেকে সব ধরনের ভয় আতঙ্ক দূর করে স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে থাকে। তবে তাদেরকে একথাও জানিয়ে দিও, আমাদের এই অবারিত সুযোগের অপব্যবহার করে কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের গাদ্দারি করে, কোন নাশকতা কিংবা দুস্কৃতির চেষ্টা করে তবে তাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। এখন আমি তোমাদের একটা কথা জানিয়ে দিতে চাই, আমরা এখন শহরের অধিবাসীদের কাছ থেকে একটা কর আদায় করবো। এ করকে আমরা জিযিয়া বলে থাকি। এটা এতো স্বল্প পরিমাণ হবে যে, শহরের যে কোন গরীব লোকের পক্ষেও তা আদায় করা কঠিন হবে না। জিযিয়া প্রাপ্তির পর শহরের সকল অধিবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য হয়ে পড়বে এবং মানুষ হিসাবে আমাদের ধর্মের স্বীকৃত সব অধিকার তোমাদের দিতে আমরা বাধ্য থাকব।

ঠিক আছে, আপনি জিযিয়া ধার্য করে দিন, আমরা যথাশীঘ্র আপনার জিযিয়া আদায় করে দেবো। বলল শীর্ষস্থানীয় এক ব্যবসায়ী।

এই কর আমি নিজে আদায় করব না, আমি এ কাজের জন্য যাকে যাকে নিয়োগ দেবো, সে তা আদায় করবে। কিন্তু এই শহরের যারা বিত্তশালী এবং যারা বড় ব্যবসায়ী আমি তাদের কাছ থেকে কিছু অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে চাই। এই অতিরিক্ত পয়সা এ জন্য নিচ্ছি, এই দুর্গ জয় করতে আমাদেরকে খুব বেশী মূল্য দিতে হয়েছে এবং আমার শিবিরে আহতের সংখ্যা অনেক বেশী। এটাকে তোমরা জরিমানা বলো আর যুদ্ধ ব্যয় বলল, যাই বলো না কেন, পয়সাটা আমাকে দিতেই হবে। তবে এর পরিমাণ আমি নির্ধারণ করে দেবো না। তোমাদের বিত্তশালীরাই ঠিক করবে কি পরিমাণ দিতে পারবে তোমরা। ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে মুলতান দুর্গের সকল হিন্দু অধিবাসী জিযিয়া আদায় করে দিল এবং শহরের বিত্তশালীরা জিযিয়ার অতিরিক্ত টাকাও দিল। তাদের দেয়া অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ষাট হাজার দিরহাম। বিন কাসিম এই ষাট হাজার দিরহাম তার

সকল সেনাদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। ৯৫ হিজরী সনে মুলতান বিন কাসিমের শাসনাধীনে নত হলো।

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বিন কাসিমের শাসনে মুলতানের অধিবাসীরা যেমন নিরাপত্তা, শান্তি ও নিশ্চিন্ত জীবন যাপনের পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছে, এর আগে মুলতানবাসী কখনো তা প্রত্যক্ষ করেনি। বিন কাসিমের প্রশাসনের পূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রজাহিতৈষী কর্মকাণ্ডে নিশ্চিন্ত হয়ে মুলতানের ব্যবসায়ী, কৃষক ও নানা পেশার লোকজন নিজ নিজ কাজ-কর্মে মনোনিবেশ করে। মুলতানের শাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিন কাসিম আরো সামনে অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার প্রতি মনোযোগ দিলেন। ইত্যবসরে তিনি রাজা কাকসা ও সিককার কাছ থেকে আদায়কৃত জিযিয়া এবং অন্যান্য জায়গার আদায়কৃত জিযিয়া একত্রিত করে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

খলিফাকে দেয়া হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রতিশ্রুতি বিন কাসিমকে চিন্তায় ফেলে দিচ্ছিল। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিকের কাছ থেকে এই শর্তে সিন্ধু অভিযানের অনুমতি নিয়েছিলেন, সিন্ধু অভিযানে খেলাফতের কোষাগার থেকে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হবে অভিযান শেষে তিনি এর দ্বিগুণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবেন। মুলতান অভিযানের পর কিছু দিন অবকাশ যাপনকালে বিন কাসিম হিসাব করছিলেন, এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কোষাগারে তিনি কী পরিমাণ অর্থ প্রেরণ করেছেন। তার হিসাবমতে বাগদাদে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ তেমন ছিল না। তার ধারণা এ পর্যন্ত সিন্ধু অভিযানে বাগদাদের কোষাগার থেকে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে এর চেয়ে অনেক কম তিনি প্রেরণ করেছেন। এর অন্যতম কারণ হলো, শাসক হিসাবে বিন কাসিম ছিলেন উদারচিত্তের অধিকারী। তিনি যথাসম্ভব কম জিযিয়া ধার্য করতেন, যাতে তা আদায়ে মানুষের কষ্ট না হয়। তাছাড়া তিনি যদি জানতে পারতেন, যে কর তিনি ধার্য করেছেন তাও প্রজাদের দিতে কষ্ট হচ্ছে। কিংবা কোন কোন জনগোষ্ঠী তা দিতে সক্ষম নয়। তখন তিনি গোটা জিযিয়া মাফ করে দিতেন এবং তার ব্যাপারে আরেকটি কথাও বেশ প্রসিদ্ধ ছিল, তিনি পারত পক্ষে কারো ওপর জরিমানা ধার্য করতেন না। যেসব দুর্গ তিনি জয় করেছেন, সেগুলোতে প্রচুর ধন-সম্পদ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তিনি যেসব দুর্গ জয় করেছেন, সেগুলোর শাসকদের

খাজানা ভাণ্ডার তিনি শূন্যই পেয়েছেন, কারণ প্রায় প্রত্যেক দুর্গের শাসকরাই নিজেদের সব ধনরত্ন নিয়ে পরাজয় অবশ্যাম্ভাবী মুহূর্তে পালিয়ে গেছে।

আমরা আগেই জেনেছি, দাহিরে রাজধানী দখলের অনেক আগেই দাহিরের ছেলে ও তার ভাতিজা দাহিরের গচ্ছিত ধন-রত্ন নিয়ে পালিয়ে যায়। ওদের পালিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণই ছিল তাদের ধন-রত্ন যাতে মুসলমানরা কব্জা করতে না পারে। সর্বশেষ বিজিত দুর্গ মুলতানেও তাই ঘটলো। পরাজয় ঘনিয়ে আসতে দেখে বজরা ও তার রাজা কুরসিয়া পালানোর সময় ধনভাণ্ডার নিজেদের সাথে নিয়ে যায়। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ লিখিতভাবে খলিফাকে অঙ্গীকার করেছিলেন। অঙ্গীকারের বিষয়টি বিন কাসিম জানতেন। তাই সিন্ধু এলাকার অধিকাংশ বিজয় হয়ে যাওয়ার পরও প্রতি অর্থ অপূর্ণ থাকার বিষয়টি তাকে খুবই পীড়া দিচ্ছিল।

বিন কাসিম ছিলেন আল্লাহর পথে জিহাদকারী সেনাপতি। এই জিহাদে তাঁর কোন ব্যক্তিগত উচ্চাশা উচ্চাভিলাষ ছিল না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বিন কাসিম তাঁর জীবন ও যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক বাসনা ও নিষ্ঠার কারণে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি রণাঙ্গনেই তাকে প্রত্যাশিত সাহায্যে সফলকাম করেছেন। এই মুলতান দুর্গ জয়ের আগে যদি বাইরের পানির প্রবাহের ব্যাপারটি বিন কাসিম জ্ঞাত হতে না পারতেন তবে শেষ মুহূর্তে এসে মুলতান রণাঙ্গনে তার বাহিনীকে শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হতো। এ পর্যায়ে এসেও খলিফাকে দেয়া প্রতি অর্থ সরবরাহ না করতে পারার জন্য তার মধ্যে এই আশঙ্কা দেখা দিলো। কিন্তু জয়ের তাৎপর্য দূরে রেখে এটিকে অনর্থক ঝামেলা মনে করে যদি খলিফা তার অগ্রাভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে দেন, তাহলে তার বাহিনীর এই সীমাহীন কুরবানী তীরে এসেও তরি ডুবাবে। এ চিন্তা-ভাবনায় আরো কিছুদিন চলে গেল। মুলতান শহরের পুনর্গঠন ও শাসন ব্যবস্থা ইতোমধ্যে ঠিকঠাক হয়ে গেল। এক দিন বিকেলে আশ্বারোহণ করে বিন কাসিম শহরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বের হলেন। গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী তার পাশাপাশি। তাদের পিছনে চারজন অশ্বারোহী নিরাপত্তারক্ষী। বিন কাসিম মুলতান শহর জয় করার পরদিনই বলেছিলেন, এখানে এমন একটি মসজিদ তৈরি করতে হবে ভবিষ্যত প্রজন্ম যেটিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। মসজিদের জন্য জায়গাও নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং নির্মাণকাজের জন্য খননকাজও শুরু করে দিয়েছিল নির্মাণকারীরা।

শহরের প্রধান মন্দিরের কাছে পৌছলে তিনি দেখতে পেলেন, মন্দিরের প্রধান দুই পুরোহিত মন্দিরের বাইরে দাঁড়ানো। বিন কাসিমকে দেখে তারা উভয়েই দৌড়ে মন্দিরের ভিতরে চলে গেল। বিন কাসিম যখন মন্দিরের সম্মুখ পথ অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন মন্দিরের শীর্ষ পুরোহিত বেরিয়ে এলো। এই পুরোহিত ছিল সম্মোহনী চেহারার অধিকারী। মন্দিরটি একটি টিলাসম উঁচু জায়গায় অবস্থিত। মন্দিরের মূল বেদীতে উঠতে দশপনেরোটি সিঁড়ি ভাঙতে হয়। প্রধান পুরোহিত মন্দির থেকে বেরিয়ে এভাবে বেদীর সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামছিল। তার নামা দেখে মনে হচ্ছিল সে বিন কাসিমকে কিছু একটা বলতে আগ্রহী। পুরোহিতের এই মনোভাব দেখে বিন কাসিম তার ঘোড়া থামালেন। পুরোহিত ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে বিন কাসিমের ঘোড়ার সামনে এসে থামল এবং তার পাশে রেকাবীতে থাকা বিন কাসিমের পা ধরে তার মাথা বিন কাসিমের পায়ে ঠেকাল। পায়ে মাথা ঠেকাতে দেখে বিন কাসিম দ্রুত তার পা সরিয়ে নিলেন। অতঃপর পুরোহিত দু’হাত ওপরে তুলে বিড়বিড় করে কি যেন বলল। একজন দুভাষী সব সময়ই বিন কাসিমের সাথে থাকত। দুভাষী দ্রুত এগিয়ে এসে পুরোহিত ওপরের দিকে তাকিয়ে কি বললো তা জানালো। দুভাষী জানালো, পুরোহিত আপনার সাথে একান্তে জরুরি কথা বলতে চায়। বিন কাসিম একথা শুনে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন এবং বয়োবৃদ্ধ পুরোহিতের সাথে সিঁড়ি ভেঙ্গে কয়েক ধাপ ওপরে উঠে বৃদ্ধ পুরোহিতকে একটি সিড়িতে বসিয়ে দিয়ে নিজে একধাপ নিচের সিড়িতে বসে পড়লেন। তার ইশারায় দুভাষী তাঁর কাছে গিয়ে বসল এবং দুভাষীর মাধ্যমে দুজনের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো।

নিজ চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছি না। কে বিশ্বাস করবে একজন সাধারণ প্রজা ওপরে আর বাদশা তার নীচে বসতে পারে?

কেউ বিশ্বাস না করলেও মুসলমানরা বিশ্বাস করতে পারে, বললেন বিন কাসিম। তিনি পুরোহিতের উদ্দেশে বললেন, এসব হালকা স্তুতিবাক্য ছাড়া যে জরুরি কথা বলার জন্য আপনি আমাকে থামিয়েছেন সেই কথা বলাটাই কি ভালো হয় না? আমি আপনার বিস্ময় ও হতবাক হওয়ার জবাব দিয়ে দিচ্ছি। আমার নীচে বসাটা মোটেও বিস্ময়কর বিষয় নয়, কারণ আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, আমি আপনার নাতিপুতিদের বয়সের মানুষ।

বিন কাসিমের এ কথায় পুরোহিত হতচকিয়ে গেল। কিছুটা পিছিয়ে গেল সে।

‘আমি আপনাকে একটি গোপন কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। আমি যে কথা আপনাকে বলতে চাচ্ছি, তা আপনার জন্য বড় ধরনের একটা পুরস্কার। বার্ধক্যের কারণে আমি যদি অপ্রাসঙ্গিক কোন কথা বলে ফেলি তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। যে দিন আপনি বিজয়ী বেশে দুর্গে প্রবেশ করছিলেন সেদিন প্রথম আপনাকে আমি দেখি। আমি শুনেছিলাম, আরব সেনাপতি খুবই অল্প বয়স্ক। তাতে আমি মনে করেছিলাম, আপনার বয়স হয়তো ত্রিশ-পয়ত্রিশের মাঝামাঝি হবে। কিন্তু আপনাকে প্রত্যক্ষ দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি ভেবেছি, আরে! এতো বাচ্চা। এ বাচ্চা হয়তো কোন শাহজাদা হবে এবং রাজকুমারদের মতোই আনাড়ীপনা করবে। আমি মন্দিরের অন্যান্য পুরোহিতদের বলেছি, শহরের নাগরিকদের বলে দিয়ে, প্রত্যেকই যেন তাদের যুবতী ও কুমারী মেয়েদের লুকিয়ে রাখে নয়তো জীবন্ত পুঁতে ফেলে। আমি শহরের লোকজনকে এ পয়গামও দিয়েছি, সবাই যেন তাদের সোনারূপা মূল্যবান ধন সম্পদ মাটির নীচে লুকিয়ে ফেলে। আমি এ আশঙ্কাও করেছিলাম এই মন্দির হয়তো ধ্বংস করে দেয়া হবে। ধ্বংস না করলেও বন্ধ করে দেয়া হবে এবং আমাদেরকে আপনি পাইকারীহারে হত্যা করার জন্যে সৈন্যদের নির্দেশ দেবেন।

নয়তো আমাদেরকে গোলামে পরিণত করে অপমানকর কোন শ্রমঘন কাজ করতে বাধ্য করবেন…। এ বয়সে এসে এমন অপমানকর অপ্রত্যাশিত বিড়ম্বনার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় ভীত ছিলাম আমি। এই ভয়ে শহরের অনুন্নত এলাকার একটি ভাঙ্গা ঝুপড়ী ঘরে আমি আশ্রয় নেই। নিজেকে লুকিয়ে ফেলি। আমার দেখা শোনা করার জন্য আমার এক ভক্ত সাথে ছিল। সে ঝুপড়ী থেকে বেরিয়ে শহরের দৈনন্দিন খবর সংগ্রহ করে আমাকে শোনাতো। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না আপনার সৈন্যদের শহরে প্রবেশের পর শহরের অবস্থা এমন শান্তিময় থাকবে। আমাকে যখন শোনানো হলো বিজয়ী বাহিনী শহরের কোন একটি ঘরও লুটপাট করেনি এবং কোন একজন তরুণী যুবতীও নিখোজ কিংবা ধর্ষণ-শীলতাহানির শিকার হয়নি।

গতকাল আমি ঝুপড়ী ছেড়ে মন্দিরে চলে আসি। এসে দেখি মন্দির যেভাবে ছেড়ে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনই রয়ে গেছে। এসে দেখি নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বিগ্ন মনে নারীপুরুষ পূজারীরা মন্দিরে পূজা অর্চনা করছে, আর আলাপ

চারিতায় আপনার ভূয়সী প্রশংসা করছে। শহরের নাগরিকরা আপনার বিজয়কে আশির্বাদ হিসাবে দেখছে। আমাকে তাদের কথাবার্তা শুনে বিশ্বাস করতে হলো, আপনি আসলে মানুষরূপী একজন দেবতা। আপনি আমাকে আমার মন্দির ফিরিয়ে দিয়েছেন। মন্দিরই আমার জগৎ মন্দিরই আমার সবকিছু। গতরাতে আমি শহরের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির সাথে সাক্ষাত করে বলেছি আপনার সাথে আমি সাক্ষাত করতে চাই। সে আমাকে আশ্বাস দেয়, আপনার সাথে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে মন্দিরের দুই পুরোহিত আমাকে খবর দেয়, আপনি এদিকে আসছেন। খবর শুনে আমি আপনার সাক্ষাতের জন্য বেরিয়ে এসেছি।

আপনি বলেছিলেন, আমার সাথে আপনি জরুরি কোন কথা বলতে চান; বললেন বিন কাসিম। চতুর্দিকটা একবার দেখে নিয়ে বিন কাসিমের দিকে আরো ঝুকে ক্ষীণ আওয়াজে পুরোহিত বললেন, আপনি এই দুর্গের মানুষের প্রতি, আমার মন্দিরের প্রতি, যে সম্মান ও অনুগ্রহ দেখিয়েছেন এ জন্য আমি আপনাকে এর প্রতিদান দিতে চাই। অনেক দিন আগের কথা। এই এলাকায় এক রাজা এসেছিল। সে ছিল কাশ্মীরের রাজা। তার নাম ছিল যশোবন্ত। সে তার রাজ ভাণ্ডারের সকল সোনাদানা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। পণ্ডিত মহারাজ। নির্মোহ কণ্ঠে বললেন বিন কাসিম। এসব ধনরত্নের কাহিনী অনেক পুরনো। আপনি একজন বিজ্ঞলোক। আপনিও আমাকে সেই পুরনো দিনের গল্প শোনাচ্ছেন। বলুন তো, যে কাহিনী আপনার জন্মের আগে থেকে মানুষ মুখেমুখে শুনে আসছে, সেটি যে সত্যিই হবে একথা আপনি কিভাবে নিশ্চিত বিশ্বাস করেন? ধন ভাণ্ডারের প্রতি নিরাসক্তি বিন কাসিমের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তিনি ছিলেন যথার্থ অর্থেই রণাঙ্গনের লোক এবং দুনিয়া বিমূখ মর্দে মুমিন। কিন্তু এ সময়টাতে তার অর্থের খুব প্রয়োজন ছিল। অর্থাভাবে তিনি বেশ কিছুদিন যাবত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু তাই বলে গচ্ছিত ধনভাণ্ডারের কাহিনী শুনে এই বুড়ো পুরোহিতের কথায় আসক্ত হবার পাত্র নন বিন কাসিম। কারণ পুরোহিতের এ কথায় প্রতারণা থাকতে পারে। কারণ লোকটি আগাগোড়া সম্মোহনী শক্তির অধিকারী। তার রন্ধ্রে বন্ধ্রে পৌত্তলিকতার অনুসরণ। সে যেকোন মূল্যে মুসলিম এই বিজয়ে প্রতিশোধের ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই বিন কাসিম তাকে পরখ করার জন্যে বললেন, পুরোনো দিনের এই পৌরনিক

কাহিনী সে কিভাবে বিশ্বাস করল। এই গল্প তো যুগযুগ ধরে মানুষের মুখেমুখে চলে আসছে?

‘আমার কথা ঠিক নয়’ আপনার এমন সংশয় প্রমাণ করে আপনি যথার্থই বুদ্ধিমান ও দুরদর্শী বললেন, পুরোহিত। কারণ মানুষ গচ্ছিত ধনভাণ্ডারের কথা শুনলেই তা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে পড়ে। কিন্তু আপনি আমার কথা শুনে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অবশ্য আপনি বলতেই পারেন, হে বুড়ো পূজারী! তুমি যদি জেনেই থাকো, কেউ অমুক জায়গায় অঢেল ধনভাণ্ডার পুঁতে রেখে মরে গেছে, তাহলে তুমি তা উত্তোলন করনি কেন? এর জবাবে আমি বলবো, আমি একা মানুষ। এসব ধনরত্ন দিয়ে আমি কি করব! তাছাড়া দুনিয়ার ভোগ বিলাসের আকাক্ষা আমি মন থেকে ঝেড়ে ফেলেছি। আপনি বাদশা। বাদশাহী চালানোর জন্যে ধনভাণ্ডারের প্রয়োজন আছে।

আচ্ছা, কোথায় আপনার জানা ধনভাণ্ডার বললেন বিন কাসিম। বলুনতো কাশ্মীরের রাজা এই ধনরত্ন মাটির নিচে পুতে ফেলল কেন?

এইতো কাছেই। আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দেখিয়ে দেবো…। কাশ্মীরের রাজা ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ণ। তিনি বেশীরভাগ সময় ধর্মসাধনায় ব্যয় করতেন। এটা এমন সময়ের ঘটনা যখন মুলতান ও কাশ্মীর একই শাসনাধীন ছিল এবং রাজা যশোবন্তই ছিলেন গোটা অঞ্চলের শাসক। অবশ্য কেন তিনি ধন-রত্ন পুঁতে রেখেছেন এ ব্যাপারটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা ঠিক যে তিনি এখানে এসে এই মন্দিরে ধর্ম সাধনায় বসেছিলেন।

আমার দাদা পরদাদাদের মধ্যে যিনি তখন এই মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন, তিনি ছিলেন মহাঋষি। তিনি রাজা যশোবন্তের সাথেই থাকতেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাজা যশোবন্ত মন্দিরের একটি গোপন কক্ষে সোনাদানা ভর্তি চল্লিশটি মটকি রাখেন। কয়েক মন ওজনের সোনার ইট ও তৈরি অলংকার সেগুলোতে ভর্তি করেন। সোনাদানা ভর্তি মটকিগুলোকে মাটির নিচে পুঁতে সেখানে তিনি সোনার তৈরি একটি মূর্তি বানিয়ে রাখেন, যাতে এর নীচে সোনা দানা আছে মানুষ এমনটি না ভাবতে পারে। জায়গাটির চারপাশে তিনি গাছগাছালি রোপন করেন।

আমার কাছে যশোবন্তের যে কাহিনী পৌছেছে তা হলো, তার বাবা ধন সম্পদ জড়ো করার প্রতি বেশী মনোযোগী হয়ে পড়েছিল। যশোবন্তকেও সে এ শিক্ষাই দিয়েছিল। যশোবন্তের বাল্য কৈশোর যৌবন কেটেছে চরম বিলাসিতায়

ও আরাম আয়েশে। সে ছিল মা বাবার কাছে খুবই প্রিয়, সেই সাথে যশোবন্তও তার মা-বাবাকে অনেক ভালোবাসতো। হঠাৎ একদিন তার বাবা মারা গেল। এরপর অল্পদিনের মধ্যেই মারা গেল মা। বাবার মৃত্যুতে সে জ্যোতিষী ও গণকদের বলল, যে তার বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে, পুরস্কার স্বরূপ তাকে বাবার ওজনের সমান সোনা দেবে। কিন্তু কেউই তার মৃত বাবাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারল না। এরপর তার মা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল তখন সে আগের মতোই সোনা দেয়ার ঘোষণা দিলো কিন্তু তাতেও কোন কাজ হলো না।

মাকেও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারল না কেউ। সৃষ্টিকর্তা যশোবন্তকে আরো একটা শিক্ষা দিলেন। এক সুন্দরী নর্তকীকে প্রাণাধিক ভালোবাসতো যশোবন্ত। হঠাৎ একদিন এই নর্তকীও অসুস্থ হয়ে পড়ল। এবার যশোবন্ত ঘোষণা করল, যে তার প্রিয় নর্তকীকে সুস্থ করে দেবে, সে চিকিৎসক ও নর্তকীর ওজনের সমান সোনা তাকে পুরস্কার দেবে। একথা শুনে বহু দূর দরাজ থেকে বহু বৈধ্য, সন্নাসী, কবিরাজ এসে চিকিৎসা করল। কিন্তু কারো চিকিৎসা ফলপ্রসূ হলো না। অবশেষে এই নর্তকীও মারা গেল। প্রিয় নর্তকীর মৃতদেহ যখন চিতার আগুনে জালানোর জন্য কাঠখড়ির ওপর রাখা হলো। তখন যশোবন্ত শিশুদের মতো চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিল। এই অবস্থা দেখে আমার মতো বৃদ্ধ এক সন্নাসী যশোবন্তকে বুকে জড়িয়ে স্নেহে বলল, মহারাজের রাজভাণ্ডারের সমস্ত সোনাদানা দিয়ে দিলেও কোন মানুষকে এক নিঃশ্বাসের জন্যও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

সোনা দিয়ে এক নিঃশ্বাসের আয়ুও বাড়ানো সম্ভব নয়। তুমি সোনা দিয়ে মানুষের আয়ু কিনতে চাও। দেখো, এই নতকীর রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তুমি পাগলের মতো হয়ে গেছে। চেয়ে দেখো এই রূপ জৌলুস সবই পুড়ে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। তোমার রাজভাণ্ডারের সমস্ত সোনাদানা এনেও যদি আগুনে ফেলে দাও, আগুন সব কিছুকেই পুড়িয়ে গলিয়ে দেবে। কিন্তু তোমার নর্তকীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাই এসব ছেড়ে মনকে শান্ত করার জন্যে মন্দিরে চলো। মন্দিরে গিয়ে পূজা-অর্চনা করো। দেবীর পদতলে কপাল ঠেকাও, মনের সব দুঃখ চলে যাবে…। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে যশোবন্তর মন্দিরে গিয়ে পূজা-অর্চনা শুরু করল। মন্দিরে থাকতে থাকতে তার মন থেকে পৃথিবীর রঙ্গরস ধনসম্পদের মায়া দূর হয়ে গেল। দিনমান সে পূজা-অর্চনায় মগ্ন হয়ে পড়ল। এক পর্যায়ে এখানে এসে সমস্ত সোনারূপা দাফন করে এর ওপর এই মন্দির তৈরি করল। আমি

মানি আপনি যে সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করেন তিনি সর্বক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করেন। আপনি যেখানেই যান সেখানকার লোকজন আপনাকে পেয়ে খুশী হয়ে আপনাকে ভালোবাসতে শুরু করে। কিন্তু তবুও আমি আপনাকে অনুরোধ করবো, এই মন্দিরের সোনাদানা আপনি উঠিয়ে নিন। আমি শুনেছি, মাটির নীচে পুঁতে রাখা সম্পদের সাথে দুর্ভাগ্য এবং নানা ধরনের অমঙ্গল জড়িয়ে থাকে। গচ্ছিত সম্পদ সম্পর্কে এ পর্যন্ত আমি যেসব গল্প কাহিনী শুনেছি, তার সবগুলোই এমন যারা গচ্ছিত ধন-সম্পদ উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে তাদের সবারই দুঃখজনক পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। বললেন বিন কাসিম।

আমার বিশ্বাস, আপনি প্রাপ্ত এই সম্পদ আপনার ব্যক্তিগত আরাম আয়েশে খরচ করবেন না। আমি আপনাকে এই অনুরোধও করব, এই সম্পদ আপনি ব্যক্তিগতভাবে খরচ করবেন না। বলল পুরোহিত।

ওপরে উল্লেখিত গুপ্তধনের কথা কোন কল্পকাহিনী নয়। বাস্তবেই এমন গুপ্তধনের কথা আলোচিত হয়েছে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ “ফতহুল বুলদান, তারিখে মাসুমী ও চাচনামায়। বিন কাসিম পুরোহিতের কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফীকে আদ্যোপান্ত জানালেন।

‘এটা একটা প্রতারণা হতে পারে ইবনে কাসিম’ বললেন গোয়েন্দা প্রধান। এটা আপনাকে হত্যার একটা মায়াবী চক্রান্তও হতে পারে। সোনা থাকতেই পারে, কিন্তু কিছুতেই আপনি একাকী যাবেন না। অন্তত আরো পাঁচ ছয়জন সঙ্গে নিয়ে যাবেন। বললেন গোয়েন্দা প্রধান। না, তুমি ছাড়া আমার সাথে আর কেউ যাবে না। বললেন বিন কাসিম। তুমি কি এমন কাহিনীর কথা শোননি। কয়েকজন মিলে কোন গুপ্তধন উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেরাই গুপ্তধনের মালিকানা কব্জা করতে গিয়ে খুনোখুনিতে মেতে উঠেছে! ধন সম্পদ মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দেয়। আমি চাচার কৃত ওয়াদা পূরণ করতে চাই শাবান। পুরোহিতের এই গুপ্তধনের সন্ধানকে আমি আল্লাহর অনুগ্রহ মনে করছি। শা’বান সাকফীর সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে বিন কাসিম বৃদ্ধ পুরোহিতকে জানালেন, তিন-চার দিন পর তিনি পুরোহিতের সাথে ওই মন্দিরে যাবেন।

পুরোহিতের সাথে কথা শেষ করে যেখানে মুলতানের প্রধান মসজিদ তৈরির জন্য সৈন্যরা খনন কাজ করছিল সেখানে গেলেন বিন কাসিম।

প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, খনন কাজ দেখতে গিয়ে বিন কাসিম কোদাল হাতে নিয়ে নিজেই খনন কাজে শরীক হলেন। কোদাল মারতে মারতে শরীর ঘেমে যখন তার চোখে ঘাম ঝরে পড়ছিল এবং কোদাল চালাতে গিয়ে বারবার তাঁকে চোখ মুছতে হচ্ছিল তখন তিনি হাত থেকে কোদাল ছাড়লেন। খনন স্থান থেকে চার-পাঁচজন সৈন্য ও গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে সাথে নিয়ে মন্দিরে চলে এলেন। মন্দিরে এসে তিনি বৃদ্ধ পুরোহিতকে ডেকে বললেন, তিনি যেন এখনই তাদের সাথে মন্দিরে চলেন। শা’বান ছাকাফী এই পরিকল্পনা করেছিলেন যে, তিন চার দিন পরের কথা বলে পুরোহিতকে এক ধরনের অন্ধকারে রাখা হোক। এর কিছুক্ষণ পর আকস্মিক ভাবে তখনি পুরোহিতকে মন্দিরে যাওয়ার কথা বললে পুরোহিতের মনে কোন চক্রান্তের বিষবাষ্প থেকে থাকলেও তা আর বাস্তবায়নের আবকাশ থাকবে না।

গুপ্তধনের মন্দিরের অবস্থান খুব বেশী দূরে ছিল না। সে সময়কার মুলতানের ভূপ্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। উঁচু টিলা, খানা খন্দক আর ঝোপঝাড়ে ভর্তি ছিল গোটা মুলতান। একটি নির্জনস্থানে ছিল মন্দির।

বিন কাসিম যখন মুলতান জয় করেন তখন এ মন্দির ছিল পরিত্যক্ত। পূজাপাট তো দূরের কথা কোন জনমানুষ সেই মন্দিরের ধারে কাছেও যেতো না। লোকজন সেটিকে ভূত-পেত্নীর আবাসস্থল বলে মনে করতো। মানুষ বিশ্বাস করতো, পাপীদের আত্মাগুলোকে সেই মন্দিরে নিয়ে শাস্তি দেয়া হয়। মন্দিরের আশেপাশে কোন হিংস্র জন্তু জানোয়ার দেখলে লোকেরা বলতো এগুলোই পাপীদের প্রেতাত্মা। এই বৃদ্ধ পুরোহিতের বাপদাদারা অনেকটা ইচ্ছা করেই এই মন্দির সম্পর্কে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল। যাতে ওখানকার গুপ্তধনের খবর কেউ জেনে না যায়। বিন কাসিম সেখানে পৌছে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। পুরোহিত কেন জানি অজ্ঞাত এক কারণে বিন কাসিমকে বলল, আপনি একাকী আমার সাথে চলুন!” মন্দিরে হাউজটি ছিল শুকনো। সেটিতে নামার জন্য সিঁড়ি ছিল। পুরোহিত আগে অ। সিঁড়ি ভেঙে নামছিল। তার পিছনে বিন কাসিম সিঁড়ি ভাঙছিলেন। তারা যতোই সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন অন্ধকার গাড়া হচ্ছিল।

হঠাৎ পুরোহিত বাম দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল, তার শুধু আওয়াজ শোনা গেল এদিকে। বিন কাসিম বাম দিকে মোড় নিলেন। এই সিঁড়িটি ছিল নীচের দিকে। এখানে এমন এক প্রকট দুর্গন্ধ ছিল যে, তীব্র গন্ধে দমবন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। ঠিক সেই সময় ফড়ফড় শব্দ শুরু হলো। সেই সাথে চামচিকার উড়াউড়ির আওয়াজ। বিন কাসিমের মতো সাহসী লোকও এই আওয়াজে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন। বসে যান’ বলল পুরোহিত। এটা একটা বড় চামচিকা। বিন কাসিম বসতেই চামচিকার দল তার মাথার ওপর দিয়ে বের হতে শুরু করল। নীরব নিথর এই জায়গা নিরাপদ ভেবে চামচিকারা দল বেঁধে এটিকেই আবাসস্থল বানিয়ে ফেলে। হঠাৎ দুজন মানুষের আগমনে ভয় পেয়ে চামচিকাগুলো ভয়ে স্থান ছেড়ে পালানোর জন্য বিক্ষিপ্ত উড়াউড়ি শুরু করে দেয়। বিন কাসিম সিঁড়িতে বসে পড়ায় ওরা পথ পেয়ে পালাতে শুরু করে। এরপর পুরোহিত সিঁড়ি ভেঙ্গে আবারো নিচের দিকে যেতে লাগল।

বিন কাসিম তার অনুসরণ করলেন। এক পর্যায়ে অন্ধকার এমন হলো যে, আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। পুরোহিত বিন কাসিমের হাত ধরে তাকে প্রথমে ডানে এবং পরে বামে নিয়ে গেল। হঠাৎ অন্ধকার গর্ত পথে কিছুটা আলোর আভা দেখা দিল। বিন কাসিম কোন মানুষের আবির্ভাব মনে করে তরবারী কোষমুক্ত করে ফেললেন। এক পর্যায়ে একটি কক্ষ পরিষ্কার দেখতে পেলেন বিন কাসিম। সেটি মৃদু আলোকিত। কক্ষটির একটি জানালা। তবে সেটি জালের মতো লোহার তারে আটকানো। কক্ষে একটি লোক দাঁড়ানো। অন্ধকারে তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু দেখেই বোঝা যায় সে আঘাতহানার জন্য প্রস্তুত।

বিন কাসিম চক্রান্তের চূড়ান্ত মনে করে বিদ্যুৎ গতিতে তরবারী কোষমুক্ত করে লোকটিকে আঘাতের জন্য এগিয়ে গেলেন কিন্তু আঘাতের আগেই পুরোহিত তার বাহু ধরে ফেলল।

থামন আরব সেনাপিত’ এটি কোন জ্যান্তলোক নয়। এটি একটি সোনার মর্তি। যশোবন্ত এটিকে এখানে প্রহরী সাজিয়ে রেখে দিয়েছে। এর নীচেই আছে সব লুকানো ধনরত্ন। এখন আপনি আপনার লোকদের ডেকে এই ধনরাজি নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এমন লোকদেরই এখানে আনুন। ধনসম্পদ দেখে যাদের ঈমান নষ্ট হয়ে না যায়। ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেছেন, সোনার সেই মূর্তির চোখ ছিল ইয়াকুত পাথরের তৈরি। এ পাথর আলো ছড়াতো।

সে সময়কার মুসলমানদের ঈমান এতটুকু মজবুত ছিল সোনার ঝলক তাদের ঈমানে কোন ফাটল ধরাতে পারতো না। বিন কাসিম মন্দিরের বাইরে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী ও আরো চারজন নিরাপত্তারক্ষীকে দাঁড় করিয়ে এসেছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তারাও পা টিপে টিপে বিন কাসিম ও পুরোহিতের পিছু পিছু অগ্রসর হচ্ছিল। বিন কাসিম বিলক্ষণ জানতেন, মন্দিরের এই অন্ধকার প্রকোষ্টে তিনি একা নন। তাঁর আরো পাঁচ সহযোদ্ধা আছে। তিনি একটু সময় নিয়ে হাতে তালি দিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই পাঁচজন তার কাছে চলে এলো। শাবান ছাকাফীকে বিন কাসিম বললেন, এই মূর্তি সরিয়ে নীচ থেকে সোনাদানা উদ্ধার করতে হবে। গোয়েন্দা প্রধান জানতেন, একাজে কারা যোগ্য এবং বিশ্বস্ত। তিনি তাদের ডেকে আনলেন। মন্দিরের ভিতরে মশাল জালিয়ে দেয়া হলো। সেদিন সন্ধ্যার আগেই সকল গুপ্তধন মন্দিরের বাইরে মুক্ত জায়গায় উঠিয়ে আনা হলো। ফতহুল বুলদানে বর্ণিত হয়েছে, সেই মন্দিরের গোপন কুঠুরী থেকে যে সোনা উদ্ধার করা হয়েছিল এর মোট ওজন ছিল এক হাজার তিন মন।

পর দিনই বিন কাসিম হাজ্জাজের চিঠি পেলেন। এই চিঠিতে তিনি মুলতান জয়ের মোবারকবাদ দিয়ে লিখেছেন, খলিফাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি আমি রক্ষা করেছি। আমি হিসাব করে দেখেছি, তোমার বাহিনীর জন্য এ পর্যন্ত আমি ষাট হাজার দিরহাম খরচ করেছি। কিন্তু তুমি এ পর্যন্ত নগদ ও পণ্য মিলিয়ে যা পাঠিয়েছে, তা এক লাখ বিশ হাজার দিরহাম মূল্যমানের হবে। সেই চিঠিতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ একথাও লিখলেন, প্রতিটি শহরে এমন শানদার মসজিদ তৈরির ব্যবস্থা করো, যে মসজিদ ভবিষ্যতের লোকদের কাছে সেখানে ইসলামের দাওয়াত বহণকারী ও ইসলাম প্রচারে আত্মত্যাগকারীদের স্মৃতিবহণ করবে। এখন থেকে জুমআর খুতবায় খলিফার নাম নিতে পারো এবং খলিফার নামে মুদ্রাও প্রচলন করতে পারো। বিন কাসিম হাজ্জাজের কাছে যে এক লাখ বিশ হাজার দিরহাম পাঠিয়েছিলেন তাতে পুরোহিত নির্দেশিত মন্দিরের গুপ্তধনের সোনা রূপা মনিমুক্তা ছিল না। ফলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের চিঠি পাওয়ার পর বিন কাসিম মন্দিরের লুকানো সোনা রূপার এক পঞ্চমাংশ আলাদা করে নৌকা করে ডাভেল বন্দর এবং সেখান থেকে জাহাজে করে ইরাক পাঠিয়ে দিলেন।

বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানে মোট কতো ব্যয় হয়েছিল এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতভেদ দেখা যায়। কেউ বলেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানে মোট ছয় কোটি দিরহাম ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে বাগদাদ খেলাফতকে যা দেয়া হয়েছিল তার পরিমাণ বারোকোটি দিরহামের চেয়েও বেশি ছিল। উল্লেখিত অংকের দাবিদার ঐতিহাসিগণ হাজ্জাজ বিন ইউসুফের একটি চিঠিকে এর প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। তাতে হাজ্জাজ লিখেছেন, আমরা হিন্দুদের মুসলিম হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি এবং এই অভিযানে আমাদের যা খরচ হয়েছে তাও উসূল করে নিয়েছি। বরং ছয় কোটি দিরহাম আরো অতিরিক্ত খেলাফতের ভাণ্ডারে জমা হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি গাদ্দার রাজা দাহিরের কর্তিক মস্তক বাগদাদ খেলাফতের পদতলে নীত হয়েছে।

বিন কাসিম দাউদ বিন নসর আম্মানীকে মুলতানের কেন্দ্রীয় শাসক এবং মুলতান রাজ্যের অধীনস্থ অন্যান্য ছোট ছোট এলাকার জন্য ইকরামা বিন রায়হান শামী আহমদ বিন খুযাইমা মাদানীকে শাসক নিযুক্ত করলেন। মুলতান রাজ্য ছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। এ জন্য গোটা এলাকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খুব চিন্তা ভাবনা করে প্রশানসিক কাঠামো বিন্যাস করলেন বিন কাসিম। বিন কাসিম মুলতান জয়ের পর পঞ্চাশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিজের সাথে রাখলেন। আর অশ্বারোহী ও পদাতিক মিশ্রণে অন্যান্য এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজন মতো সৈন্য মোতায়েন করলেন বিন কাসিম। বিন কাসিমের মুলতান জয়ের ফলে বর্তমানের গোটা পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের কিছু অংশ ইসলামী শাসনের অধীনে চলে আসে। মুলতান বিজয়ের পর গোটা এলাকার ছোট ছোট শাসকরা বিন কাসিমের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে তার অনুগত্যের চুক্তি করে। এরপর বিন কাসিম মূল ভারতের দিকে মনোনিবেশ করেন। মুলতানের পর বিন কাসিমের সামনে মূল ভারতের মধ্যে প্রথম টার্গেট ছিল কন্নৌজ। সে সময় কন্নৌজ ছিল ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী রাজ্য। একদিন বিন কাসিম তার সেনা কর্মকর্তাদের ডেকে তার আগামী গন্তব্যের কথা ব্যক্ত করলেন এবং অভিযানের কলাকৌশল নিয়ে কমান্ডার ও কর্মকর্তাদের সাথে সলাপরামর্শ করলেন। সর্বসম্মত প্রস্তাব উঠল, কন্নৌজের

রাজাকে সর্বাগ্রে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হবে। এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর বিন কাসিম সেনাপতি ও কমান্ডারদের ওপর দৃষ্টি ফেরালেন। হঠাৎ এক সেনাপতির ওপর তার দৃষ্টি আটকে গেল।

আবু হাকিম শায়বানী! আল্লাহর কসম! কন্নৌজ রাজার কাছে ইসলামের দাওয়াত ও আমাদের পয়গাম নিয়ে যাওয়ার জন্য তোমাকেই আমার কাছে যথার্থ ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে। ভালো হবে কি মন্দ হবে জানি না বিন কাসিম! তবে আমাকে দায়িত্ব দিলে দায়িত্ব পালন করেই আপনার ধারণার যথার্থতা প্রমাণ করব, বলল শায়বানী। ঠিক আছে, এ অভিযানের দায়িত্ব তোমাকেই দেয়া হলো। দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য যাবে তোমার সাথে। এছাড়া থাকবে স্থানীয় পথ প্রদর্শক ও সহযোগী দল। রাস্তার অবস্থা ও প্রয়োজনীয় কি জিনিসের দরকার হবে এ ব্যাপারে তুমি খোঁজ-খবর নিয়ে আমাকে জানাও। যা যা লাগবে আমি সংগ্রহ করে নেব’ সম্মানিত সেনাপতি! বলল আবু হাকিম শায়বানী। কন্নৌজের রাজাকে আমার কি বলতে হবে?

তাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেবে। ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত কাকে কোন ভাষায় দিতে হয় এ বিষয় তুমি ভালোই জানো। সে যদি ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জানায় তাহলে আমাদের অনুগত্য করে বশ্যতা স্বীকার করে নেয়ার প্রস্তাব করবে এবং বলবে এমতাবস্থায় তাকে জিযিয়া দিতে হবে। তাকে জানাবে, ডাভেল থেকে শুরু করে কাশ্মীর পর্যন্ত যেসব রাজা ইসলাম কবুল করেছে, আর কারা কারা ইসলাম গ্রহণ না করে বশ্যতা স্বীকার করে জিযিয়া আদায় করছে। পক্ষান্তরে কোন কোন রাজা ও শাসকরা যুদ্ধ করে নিহত ও রাজ্য হারিয়ে দেশান্তরিত হয়েছে তাও অবহিত করবে।

সে যদি আমাদের প্রস্তাব না মেনে বরং আমাদের সাথে মোকাবেলার জন্য যুদ্ধের আহবান করে, তাহলে আমাকে কি করতে হবে? আমি কি এই দশ হাজার সৈন্য নিয়ে তার মোকাবেলা করবো? বললেন সেনাপতি আবু হাকিম শায়বানী। না আবু হাকিম। প্রথমেই তুমি মোকাবেলায় যাবে না। এই বাহিনী নিয়ে তুমি উদয়পুর পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে একজন দূত সঙ্গে নিয়ে কন্নৌজ রাজার কাছে যাবে। সৈন্যরা উদয়পুরে অবস্থান করবে।

আবু হাকিম শায়বানী দশ হাজার অশ্বারোহী নিয়ে উদয়পুর পৌছে সেখানে সৈন্যদের শিবির স্থাপন করলেন এবং একজন দূত ও কিছু সংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী সঙ্গে নিয়ে কন্নৌজ রাজার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন।

কন্নৌজের রাজা ছিলেন রায় হরিচন্দ্র। রায় হরিচন্দ্রের কাছে খবর পৌছাল এক আরব সেনাপতি মহারাজের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছে। তার সাথে এসেছে উদয়পুরের এক কর্মকর্তা। রায় হরিচন্দ্র খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তাদেরকে তার রাজ দরবারে ডেকে পাঠালেন।

আবু হাকিম শায়বানী রাজদরবারে প্রবেশ করে দেখলেন, কন্নৌজের রাজা অত্যন্ত উঁচু একটি সিংহাসনে উপবিষ্ট। তার পিছনে অর্ধনগ্ন সুন্দরী তরুণী ময়ূরের পালকের তৈরি পাখা দিয়ে বাতাস করছে। দুজন চৌকিদার রাজার ডান ও বাম পাশে সশস্ত্র অবস্থায় দাঁড়ানো। আবু হাকিমের সাথে রাজ দরবারে উদয়পুরের একজন কর্মকর্তা ও একজন দুভাষী ছিলেন।

হে আরব! আমি জানি তোমরা কেন এসেছ। তবুও আমি তোমার মুখেই শুনতে চাই। আবু হাকিমের উদ্দেশে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন রাজা। রাজা বললেন, বলো তোমরা কি বার্তা নিয়ে এসেছ।

আবু হাকিম শায়বানী রাজার দিকে তার লিখিত পয়গাম বাড়িয়ে দিলেন।

মনে হয় বিভ্রান্তির শিকার হয়ে তোমরা এখানে এসেছ? বিগত দেড়হাজার বছর ধরে এ রাজ্য শাসন করছে আমার খান্দান। আজ পর্যন্ত এই জমিনে কোন বহিঃশত্রু পা রাখার দুঃসাহস করেনি। আর তোমরা আমাকে আমার বাপ-দাদার সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করার কথা বলার মতো ধৃষ্টতা দেখাচ্ছ। আরো বলছ, আমরা তোমাদের ধর্ম গ্রহণ না করলে তোমাদেরকে জরিমানা দিতে হবে।

সম্মানিত রাজা। সিন্দু রাজা দাহিরও আপনার মতোই কথা বলেছিল। বললেন আবু হাকিম। দাহিরও রাজ সিংহাসনে বসে এমন ভাষায়ই কথা বলতো। কিন্তু আজ দেখুন, কোথায় আজ দাহির। কোথায় আজ তার রাজত্ব! এ ধরনের ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারীকে আমরা কখনো ক্ষমা করি না, কঠোর কণ্ঠে বলল রাজা রায় চন্দ্র। ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারীকে আমরা এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর শাস্তি দিই যে, সেই শাস্তি দর্শনকারী ও শ্রবণকারী ভয়ে কাঁপতে থাকে।

কিন্তু তুমি একজন দূত। দুভাষী সাথে নিয়ে এসেছ। তুমি ফিরে গিয়ে সেনাপতিকে বলো, সাহস থাকলে সে যেন সৈন্য নিয়ে আসে। আমরা তার পয়গামের জবাব তরবারী দিয়েই দিতে চাই।

রাজার কথা শুনে আবু হাকিম শায়বানী মুলতান ফিরে এসে কন্নৌজের রাজার জবাবের কথা জানালেন। তিনি বিন কাসিমকে আরো জানালেন, রাজা তার সাথে কথা বলার সময় অত্যন্ত অহংকার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখিয়েছে। বিন কাসিম আবু হাকিমের বক্তব্য শোনার পর সেনাবাহিনীকে অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন।… তবে বলেদিলেন, এবারের প্রস্তুতি যেন মুলতান অভিযানের মতো না হয়। আমরা সেখানে পৌছার পর যেন কোন ধরনের রসদ ঘাটতির মুখোমুখি না হতে হয়। তোমাদের মনে রাখতে হবে কন্নৌজের সেনাবাহিনী পূর্ণউদ্যোমে থাকবে। আল্লাহর শোকর রণক্লান্ত ও সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ার পরও তিনি প্রতিটি যুদ্ধে আমাদের মদদ করেছেন। অবশ্য আমাদেরকে আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের ওপরই ভরসা রাখতে হবে। কিন্তু তোমরা বিলক্ষণ জানো, আল্লাহ সেই মুসলমানদেরই সাহায্য করেন, সামর্থের সবটুকু প্রস্তুতি যখন মুসলমানরা সম্পন্ন করে।

হিন্দুস্তানের শাসক ও সৈন্যরা তাদের সংখ্যাধিক্য ও হস্তিবাহিনী নিয়ে খুব গর্ব করে। রায় হরি চন্দ্রের কাছে হয়তো সে খবর পৌছেছে, দাহির আমাদেরকে তার বিশাল হস্তিবাহিনীর ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু দাহিরের হস্তি বাহিনীর ওপর যখন মুজাহিদদের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল, তখন নিজ সৈন্যদেরকেই জঙ্গি হাতির পদতলে পিষ্ট হতে হলো। দেখবে কন্নৌজ রাজ্যের অহংকার তার হাতিরাই ধূলায় মিশিয়ে দেবে।

শুরু হয়ে গেল কন্নৌজ অভিযানের প্রস্তুতি। রণক্লান্ত মুসলিম যোদ্ধাদেরকে বিশ্রামের জন্য আরো কয়েকদিন অবকাশ যাপনে রাখা জরুরি ছিল, সেই সাথে মুলতান যুদ্ধে আহতদের সুস্থ হয়ে ওঠার জন্যেও দরকার ছিল আরো কিছুদিন। ফলে সপ্তাহ খানিক অভিযান বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন বিন কাসিম।

দুই তিনবার বাগদাদ থেকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দূত এলো। বিন কাসিম আগেই নিরাপত্তা রক্ষীদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাগদাদ থেকে যখনই কোন পয়গামবাহী আসবে তাকে না আটকিয়ে সাথে সাথে আমার কাছে নিয়ে আসবে। এক পর্যায়ে এটা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছিল, হাজ্জাজের যে কোন দূত এসে সরাসরি বিন কাসিমের কাছে চলে যেত। সে দিনও হাজ্জাজের পয়গামবাহী সরাসরি এসে বিন কাসিমের তাবুর সামনে ঘোড়া থেকে নেমে অনুমতি নিয়ে সালাম দিয়ে বিন কাসিমের তাঁবুতে প্রবেশ করল। বিন কাসিম আনন্দচিত্তে বসা থেকে উঠে পয়গাম দেখার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। বিন কাসিম মনে করেছিলেন, তিনি যেসব সোনাদানা হাজ্জাজের কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেগুলো নিশ্চয়ই পৌছে গেছে এবং তা হাতে পেয়ে হাজ্জাজ তাকে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন।

কিন্তু বিন কাসিম উচ্ছাসে এগিয়ে এলেও পয়গামবাহী ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, কারণ তার কাছে লিখিত কোন পায়গাম ছিল না। আগম্ভকের চেহারায় গাঢ় ক্লান্তির ছাপতো ছিলই তার চেয়ে বেশী ছিল বিষন্নতা।

আল্লাহর কসম! এমন কোন ব্যাপার কি ঘটেছে, যা তুমি বলতে দ্বিধা করছো? জী হ্যাঁ, সিন্ধুর শাসক! বলতেই আগন্তুকের কণ্ঠ বাকরুদ্ধ হয়ে এলো এবং তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো।

বলো কি খবর এনেছ? আমাকে বিজয়ের আনন্দে দুঃখ দাও…। দেরী করো না? কঠোর কণ্ঠে বললেন বিন কাসিম।

আমীরে বসরা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, ইন্তেকাল করেছেন, বলেই সংবাদবাহক হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ইন্নালিল্লাহ! বলে দুহাতে মুখ ঢেকে বিন কাসিমও হাজ্জাজের ইন্তেকালের খবর শুনে শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্বাররক্ষীকে ডেকে বললেন “সবাইকে ডাকো।”

দ্বাররক্ষী জানতো সবাই বলতে কাকে কাকে ডাকতে হবে।

অল্প সময়ের মধ্যেই সকল সেনাপতি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিন কাসিমের উপদেষ্টাবৃন্দ তাঁর তাঁবুতে প্রবেশ করল।

আমার মাথার ওপরে সবচেয়ে জরুরি ছায়াদানকারী ব্যক্তিটি আজ আর নেই। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইন্তেকাল করেছেন।

ধরা গলায় বললেন বিন কাসিম। সৌম্য ক্লান্তিময় বিন কাসিমের চেহারা মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো কালো হয়ে গেল। হাজ্জাজের ইন্তেকাল শুধু সিন্ধু অভিযানের অগ্রাভিযানই থামিয়ে দিল না, প্রকারান্তরে হাজ্জাজের ইন্তেকালের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল বিন কাসিমের ভারত অভিযানের যবনিকা।

বিষন্ন কণ্ঠে বিন কাসিম সেনাধ্যক্ষদের উদ্দেশ্যে বললেন, এখন আর আমরা কন্নৌজ অভিযান শুরু করব না। আশা করি খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিক আমাদের সাথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না। আমরা তার পাওনা মিটিয়ে দিয়েছি। বরং তিনি যা খরচ করেছিলেন তার চেয়ে দ্বিগুণ রাজকোষে জমা করেছি। তাছাড়া বিশাল এক রাজত্ব মুসলিম সালতানাতে অন্তর্ভুক্ত করেছি। আশা করি তিনি আমাদের সংকল্পের সামনে কোন প্রাচীর সৃষ্টি করবেন না। তবুও আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। কারণ এখন আর দ্বিতীয় কোন হাজ্জাজের উদ্ভব হবে না, যিনি খলিফার ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে তাকে রাজত্বের বিলাসিতা থেকে নিবৃত্ত রাখবেন এবং আমাদেরকে পদে পদে উৎসাহিত উজ্জীবিত ও দিক নির্দেশনা দেবেন। এখন আর আগের অবস্থা নেই। হতে পারে, আমরা শত্রুদের মোকাবেলায় লিপ্ত আর এমন অবস্থায় বাগদাদ থেকে নির্দেশ এসে গেল- থেমে যাও, সিন্ধুর জন্য নতুন আমীর নিযুক্ত হয়েছেন।

আমাদের পক্ষে নির্বিকার বসে থাকাও ঠিক হবে না। বললো এক সেনাপতি। এমনটি দেখলে শত্রুরা আমাদের ওপর চড়াও হতে পারে। ওরা ভাবতে পারে আমরা দুর্বল হয়ে গেছি। অথবা ক্লান্ত হয়ে গেছি কিংবা কোন কারণে আমাদের পক্ষে আর অভিযান করা সম্ভব নয়।

এই অবস্থায় আমরা যদি শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি করি, তাহলে সৈন্যরা লড়াইয়ের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে, আমাদেরকে কোন না কোন দিকে অভিযান পরিচালনা করতেই হবে বলল আরেক সেনাধ্যক্ষ বিন কাসিম দেখলেন, সেনাধ্যক্ষদের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কন্নৌজ অভিযান মুলতবি রেখে অন্যান্য কার্যক্রম তিনি অব্যাহত রাখলেন। যেসব হিন্দু শাসক বিনা যুদ্ধে বিন কাসিমের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল, আজ আর সেসব শহর নগরের অস্তিত্ব নেই। প্রকৃতি সেগুলো বদলে ফেলেছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ হয়েছে স্থানান্তরিত। কালের বিবর্তনে সেই সময়ের নগর জনপদের নামচিহ্নও বদলে গেছে।

বিন কাসিমের বিজয় অভিযানে বর্তমান ভারতের কিছু অংশও মুসলিম সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তম্মধ্যে একটি রাজ্যের নাম ছিল খীরাজ। খীরাজ শহরের নাম শুধু বিন কাসিমের ভারত অভিযানের ইতিহাসেই পাওয়া যায়। বর্তমানে এই জায়গাটি কোথায় কি নামে পরিচিত তা উদ্ধার করা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। ইতিহাস শুধু এতটুকু বলেছে, খীরাজ অভিযানে বিন কাসিম নিজে সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন। খীরাজের রাজা ছিল দুবড়া। দুবড়া বিন কাসিমকে মোকাবেলা করার জন্য সৈন্যদেরকে দুর্গের বাইরে নিয়ে এসেছিল এবং নিজে ছিল সৈন্যদের অগ্রভাগে। রাজা দুবড়া এতোটাই দুঃসাহসী ভূমিকায় অবর্তীণ হয়েছিল যে, সে তার সৈন্যদের সারি থেকে এগিয়ে মুসলিম সৈন্যদের সারিতে হামলা করছিল। তার তরবারীর সামনে কোন মুসলিম যোদ্ধাই দাঁড়াতে পারছিল না। যেই তার মুখোমুখি হচ্ছিল তার তরবারী তাকে ধরাশায়ী করছিল। এক পর্যায়ে সে বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। রাজা দুবড়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিন কাসিম তার দিকে এগিয়ে গেলেন কিন্তু বিন কাসিমের একান্ত নিরাপত্তা রক্ষীরা নিজেদের জীবনের চেয়ে তরুণ বিন কাসিমের জীবনকে মূল্যবান মনে করে। চারজন এগিয়ে গিয়ে রাজা দুবড়াকে ঘিরে ফেলে। রাজা দুবড়ারও নিরাপত্তা বলয় ছিল। দুবড়ার নিরাপত্তা রক্ষীরা বিন কাসিমের নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর হামলে পড়ল। রাজা দুবড়ার সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেও বিন কাসিমের নিরাপত্তা রক্ষীরা রাজা দুষ্ককে বেষ্টনীর মধ্যে আটকে রাখতে চাচ্ছিল। কিন্তু বহু সংখ্যকের আক্রমণে বিন কাসিমের তিন জন নিরাপত্তারক্ষীই প্রতিপক্ষের আঘাতে ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে চতুর্থ নিরাপত্তারক্ষী মুসলিম যোদ্ধা রাজা দুবড়ার ওপর এমন তীব্র আঘাত হানে যে, রাজার পক্ষে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। মুসলিম যোদ্ধার আঘাতে রাজা দুবড়া ঘোড়া থেকে মাটিতে ছিটকে পড়ল। নিজেকে শামলে নিয়ে রাজা যখন উঠতে চেষ্টা করছিল ঠিক এমন সময় তারই এক নিরাপত্তারক্ষীর ঘোড়া আহত রাজার উপরে উঠে গেল। আঘাতের কারণেই রাজার মৃত্যু হতো কিন্তু তাড়া খাওয়া ঘোড়ার এক পা পড়ল রাজার বুকে, আর তাতে মুহুর্তের মধ্যেই রাজার দেহ নিথর হয়ে গেল। রাজার মৃত্যুতে খীরাজের সৈন্যরা হতোউদ্যম হয়ে গেল। যে যেদিকে পারল পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করল। রাজাকে সাঙ্গ করে মুসলিম যোদ্ধারা এমন তীব্র আক্রমণ করল যে, অল্পক্ষণের মধ্যেই ময়দান ফাঁকা হয়ে গেল।

মোকাবেলার চেষ্টা ত্যাগ করে নেতৃত্ব শূন্য সৈন্যদের কিছু অংশ দুর্গে আশ্রয় নিল আর অধিকাংশই আহত-নিহত ও চতুর্দিকে পালিয়ে গেল। বিজয়ী বেশে বিন কাসিম খীরাজ দুর্গে প্রবেশ করলেন। খীরাজ বিজয়ের ফলে বিশাল অঞ্চল বিন কাসিমের অধিকারে অন্তর্ভুক্ত হলো।

৯৬ হিজরী সনের জুমাদিউসসানী। হঠাৎ এক দিন বাগদাদের খলিফার পক্ষ থেকে এক দূত বিন কাসিমের কাছে জরুরি বার্তা নিয়ে এলো। খলিফা লিখেছেন, সেনাবাহিনী যে অবস্থানে আছে সেখানেই রাখো, আর কোন দিকে অভিযান করো না।’

পয়গাম শুনে বিন কাসিম বার্তা বাহককে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বলতে পারো? ওখানকার পরিস্থিতি কি? কেন এমন নির্দেশ দেয়া হলো?

সেই যুগে সেনাবাহিনীর চৌকস মেধাবী কর্মকর্তাদেরই সাধারণত বার্তাবাহক বা দূতের দায়িত্ব দেয়া হতো। এই দূতও ছিল তেমনই একজন সেনা কর্মকর্তা ও বুদ্ধিদীপ্ত চৌকস ব্যক্তি। বিন কাসিমের প্রশ্নের জবাবে দূত বলল, সম্মানিত আমীরে সিন্ধু! হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বেঁচে থাকার সময় যে অবস্থা ছিল বর্তমানে বাগদাদের সেই অবস্থা নেই। খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিক মারাত্মক অসুস্থ। এই অসুখ থেকে মনে হয় না খলিফা আর সুস্থ হবেন। খেলাফতের স্থলাভিষিক্ত কে হবে এ নিয়ে এখনই টানা হেঁচড়া শুরু হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বনি উমাইয়ার শাসক গোষ্ঠী মসনদের আত্মকলহে খুন খারাবী করে নিঃশেষ হয়ে যাবে। খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান তার বড় ছেলে খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিককে তার স্থলাভিষিক্ত করে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন ওয়ালীদের পর তার ছোট ভাই স্থলাভিষিক্ত হবে। কিন্তু খলিফা ওয়ালীদ তার বড় ছেলে আব্দুল আযীযকে তার স্থলাভিষিক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন।

বিন কাসিম! আপনার ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমার মনে দারুণ শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আপনার চাচা হাজ্জাজ ছিলেন খলিফা ওয়ালীদের সমর্থক। তিনি বাগদাদের প্রভাব ও প্রতাপশালীদেরকে আয়ত্তে রেখেছিলেন। তিনি বাগদাদের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একথাও বলছিলেন, তারা যেন খলিফার অবর্তমানে আব্দুল আযীযকেই খলিফা হিসাবে মেনে নেয়। সুলায়মানের খলিফা হওয়ার ব্যাপারে বিরোধিতা করে। একথা বলার কারণে হাজ্জাজ ও

সুলায়মানের মধ্যে কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন সুলায়মানের কোন কর্তৃত্ব ছিল না। ইচ্ছা থাকলেও তার পক্ষে হাজ্জাজের মতো পরাক্রমশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব ছিল না। সুলায়মান তখন থেকেই হাজ্জাজকে জানের দুশমন মনে করতো। এখন হাজ্জাজ মুত্যুবরণ করেছেন, সুলায়মান মাথা উঠানোর সুযোগ পেয়েছে। সুলায়মানের ভবিষ্যত সংকল্প খুবই ভয়ানক…। খলিফা ওয়ালীদ দূরদর্শী লোক। তিনি বিছানায় পড়ে থেকেও দূরবর্তী সকল শাসক ও সেনাপতিদের নির্দেশ পাঠিয়েছেন প্রত্যেকেই যেন সেনাবাহিনীকে নতুন অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত রাখে। নয়তো বিপদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন, তার জীবন আর বেশী দিন নেই। তিনি হয়তো এই আশঙ্কায় আপনার কাছেও এই পয়গাম পাঠিয়েছেন। এমন না হয়ে যায় আপনি সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন আর ঠিক সেই মুহূর্তে সুলায়মান নির্দেশ পাঠালো লড়াই বন্ধ কর। তার অর্থ হলো পিছু হটে এসো। পরাজয় স্বীকার করে নাও। আমীরে সিন্ধ! পশ্চিম আকাশ মেঘাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। ভয় হচ্ছে কোন মুসিবত আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।

শৈশব থেকে যার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা সেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ, প্রিয় অভিভাবক আপন চাচা ও পথনির্দেশক হাজ্জাজের মৃত্যু শোক তখনো ভুলতে পারেননি বিন কাসিম। এরই মধ্যে খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিকের শয্যাশায়ী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ বিন কাসিমকে উদ্বেগাকুল করে ফেলল। খেলাফতকে ঘিরে উত্তরাধিকারীদের আত্মকলহের খবর বিন কাসিমকে আরো বেশী পেরেশান করে তুলল। সুলায়মান বিন আব্দুল মালিকের কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা ছিল।

কারণ সেই কৈশর থেকেই বিন কাসিমের প্রতি সুলায়মান ছিল হিংসা ও বিদ্বেষে শক্ত ভাবাপন্ন। তুমি ঠিকই বলেছ। পশ্চিমাকাশে অন্ধকার ঘনিভূত হচ্ছে, আমাদের ভবিষ্যতও না জানি অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রহম করুন।

হাজ্জাজের মৃত্যু ও খলিফার অসুস্থতার সংবাদ দিয়ে দূত ফিরে যাওয়ার কয়েক দিন পরই নতুন এক সংবাদ বাহক খবর নিয়ে এলো, খলিফা ওয়ালীদ

ইন্তেকাল করেছেন। খেলাফতের মসনদে আসীন হয়েছেন সুলায়মান।… এবং নতুন খলিফার আনুগত্য স্বীকার করে বিশ্বস্ততা ও নির্দেশ পালনের লিখিত অঙ্গীকার নামা দেয়ার জন্য আপনার প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিন কাসিম শঙ্কা ও চাপের পাহাড় মাথায় নিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অঙ্গীকারনামা লিখে দিলেন। তিনি সেনাধ্যক্ষ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডেকে তার অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর দেওয়ার কথা জানিয়ে দিলেন।

বিন কাসিমের সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তাঁর চেয়ে দিগুণের চেয়েও বয়সে প্রবীণ। তারা বাগদাদের শাসনতান্ত্রিক অবস্থা ও সামাজিক পরিস্থিতি যতটুকু জানতেন ততটুকু বিন কাসিমের জানা ছিল না। বিন কাসিম ছিলেন আল্লাহ প্রদত্ত সামরিক জ্ঞানে দক্ষ এবং যুদ্ধবিদ্যা ও সেনা পরিচালনায় পারদর্শী। ধন-সম্পদ, বিষয় সম্পত্তি ও রাজনৈতিক মারপ্যাচের কুটিল চালের প্রতি তার কোন আকর্ষণ ছিল না। কোন মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থে জীবন বিসর্জন দেয়, জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে জাতির উন্নত শীর অবদমিত করে, মানুষের এই হীন দিকটি বিন কাসিমের কাছে উম্মুক্ত ছিল না। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি ক্ষমতার মোহ ও মসনদের চক্রান্ত তাকে কেমন গ্যাড়াকলে আটকে ফেলেছে। ফলে খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুতে যতোটা না বিন কাসিম উদ্বিগ্ন হলেন এর চেয়ে বেশী চিন্তিত হয়ে পড়লেন তার অধীনস্থ সেনাধ্যক্ষ ও কর্মকর্তাবৃন্দ। যে সেনারা সর্বক্ষণ অগ্রাভিযানের চিন্তায় বিভোর থাকতো, কোন বাধা বিপত্তিই যাদের বিন্দুমাত্র হতোদ্যম করতে পারতো না, সুলায়মানের খেলাফতের মসনদে আরোহণে তারা সবাই কেমন যেনো ঝিমিয়ে পড়ল। রাজ্যের ক্লান্তি অবসাদ আড়ষ্টতা যেন তাদের গ্রাস করল। আকুতোভয় বীর যোদ্ধাদের সব আবেগ উদ্দীপনা উচ্ছাস যেন হাওয়ায় বিলীন হয়ে গেল।

কোন অভিযান ছাড়া নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আরো কিছুদিন অতিবাহিত হলো। একদিন বিলাল বিন হিশাম নামের এক ব্যক্তি দামেশক থেকে সিন্ধুতে এলেন। দীর্ঘ বিরতিহীন সফরের ক্লান্তি তার চোখে মুখে। তাছাড়া রাজ্যের বিষন্নতা তার চেহারায়। বিন কাসিম তখন খীরাজ রাজ্যের এক জায়গায় ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শাবান ছাকাফীর সাথে কথা বলছিলেন। আগন্তক বিলাল বিন হিশাম তাদের পাশে গিয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন। প্রথমে তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিম ও পরে শা’বান ছাকাফীর সাথে কোলাকুলি

করলেন। কোলাকুলী করা অবস্থাতেই বিলাল হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। দুজনে ধরাধরি করে তাকে বিন কাসিমের কক্ষে নিয়ে বসালেন।

বিন কাসিম! আপনি যদি প্রাণে বেঁচে থাকতে চান তাহলে স্বাধীন খেলাফতের ঘোষণ দিন, দৃঢ় প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন বিলাল বিন হিশাম। যে বিশাল এলাকা আপনি জয় করেছেন, আপনি নিজেকে এটির স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করুন। আর যতোক্ষণ সুলায়মান বাগদাদের খলিফা থাকবে ততো দিন খেলাফতের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে রাখুন। হয়েছে কি, তুমি এসব কেন বলছো? ওখানকার অবস্থা কি তা বলো? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।

হয়েছে কি, না বলে বলুন কি হয়নি সেখানে? বললেন বিলাল। বাগদাদে এখন চলছে সুলায়মান বিন আব্দুল মালিকের বারীর শাসন। মরহুম খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিক ও হাজ্জাজের সহযোগী ও সমর্থকদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের অধিকাংশ নিহত হয়েছে। উচ্চ পদে যারা আসীন ছিলেন তাদের সবাইকে পদচ্যুত করা হয়েছে। তাদের নামে এমন লজ্জাকর অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তাদের পক্ষে সমাজে মুখ দেখানোর উপায় নেই। যে কারো প্রতি একবার ইঙ্গিত করে যদি কেউ বলে দেয় এই লোকটি হাজ্জাজের সহযোগী কিংবা সমর্থক ছিল ব্যস, তার কোন প্রমাণের দরকার নেই। সুলায়মান তাকে হত্যা করাচ্ছে। ইবনে কাসিম সুলায়মান এতোটাই বেপরোয়া ও অপরিনামদর্শী বিনাসী তৎপরতায় মেতে উঠেছে যে, চীন বিজয়ী কুতাইবা বিন মুসলিম এবং স্পেন বিজয়ী মুসা বিন নুসায়েরকে ডেকে এনে গ্রেফতার করে তাদের পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে দিয়েছে। তাদের পরিবার পরিজনকে পথের ভিখারীতে পরিণত করেছে। শুনেছি, ক্ষণজন্মা এই দুই বিজয়ী সেনাপতিকে সে নির্মম শাস্তি দিয়ে হত্যা করবে।

অবশ্য পরবর্তীতে তাই ঘটেছিল। স্পেন বিজয়ী মূসা বিন নুসায়েরকে সুলায়মান পঙ্গু বানিয়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং মক্কায় আগত হজ্জব্রত পালনকারীদের কাছ থেকে ভিক্ষা করতে সে বাধ্য করেছিল।

বাগদাদ সালতানাতের অধীনস্ত সকল আঞ্চলিক আমীর তথা শাসকদের পদচ্যুত করেছে সুলায়মান, বললেন বিলাল বিন হিশাম।

ইয়াযিদ বিন মাহবকে বানিয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় শাসক। আপনি হয়তো জানেন, ইয়াযিদ বিন মাহলাব আপনার খান্দানের ঘোতর দুশমন। হাজ্জাজের প্রতি ছিল তার প্রাণনাশী শত্রুতা। ইয়াজিদ বিন মাহতাব এক

খারেজী সালেহ বিন আব্দুর রহমানকে খীরাজের শাসক নিযুক্ত করেছে। সেও আপনার খান্দানের আরেক শত্রু। এরা আমার সামনেই বলেছে, বনী সাকীফকে আমরা ধুলায় মিশিয়ে দেবো…। বিন কাসিম! কোন ছাকাফীকে এরা বেঁচে থাকতে দেবে না। আপনি একজন ছাকাফীর কৃতী সন্তান। আপনাকে বরখাস্তের পয়গাম ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। আপনার হয়তো জানা আছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী খারেজী হওয়ার কারণে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সালেহ বিন আব্দুর রহমানের ভাইকে হত্যা করিয়ে ছিলেন। সালেহ এখন প্রকাশ্যে বলছে, সে তার ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ নেবে গোটা বনী সাকীফের ওপর। বিন কাসিম! আপনি হবেন এই শত্রুতার প্রথম শিকার। তাই আপনাকে অনুরোধ করছি, বরখাস্তের আগেই আপনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিন। ‘হ্যাঁ, বিন কাসিম! সমুদ্র তীর থেকে সুরাট পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল সৈন্য আপনার সাথে থাকবে। এদেশের হিন্দুরা পর্যন্ত আপনার আনুগত্য করেছে এবং আপনার প্রতি বিশ্বস্ত, আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিন, বললেন বিন কাসিমের গোয়েন্দা প্রধান দূরদর্শী সেনানায়ক শা’বান ছাকাফী।

না, শাবান ছাকাফী! আমি যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করি, তাহলে আমার মতো যেসব জায়গায় সেনাধ্যক্ষরা শাসকের দায়িত্বে রয়েছে তারা সবাই স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। ফলে ইসলামী সালতানাত ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমি এমনটি হতে দিতে পারি না।’ বললেন বিন কাসিম। বিন কাসিম একথা বলার আগেই অন্যান্য সেনা কর্মকর্তারাও সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। একে একে তাদের সবাই বিন কাসিমকে স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু বিন কাসিম কারো কথায় সায় দিলেন না। তিনি বারবার বলছিলেন, খেলাফত কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের খেলা নয়, এটি রাসূল সাঃ-এর পবিত্র আমানত। আমি রাসূল সাঃএর নির্দেশের পরিপন্থী কাজ করতে পারি না।

সকল সহযোদ্ধারা আবেদন নিবেদন করেও বিন কাসিমকে স্বাধীন সিন্ধু শাসক হিসাবে ঘোষণা করাতে পারলেন না। মুসলিম সালতানাতের ঐক্য অটুট রাখতে যে কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন বিন কাসিম।

আর এদিকে বাগদাদ ও দামেস্কে সুলায়মানের নির্দেশে তার বিরোধিতা কারীদের রক্ত ফুরাত বইতে শুরু করল। বনী সাকীফের সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রথমে সুলায়মান বরখাস্ত করল এবং হত্যা করতে শুরু করল। কোন ছাকাফী নারীও সুলায়মানের নৃশংসতা থেকে রেহাই পেল না। অতঃপর একদিন বিন কাসিমের বরখাস্তের পয়গাম এসে গেল। পয়গামে বিন কাসিমকে বরখাস্ত করে ইয়াযিদ বিন কাবশাকে সিন্ধু অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করা হলো। কি অভিযোগে বিন কাসিমকে সুলায়মান বরখাস্ত করল ইতিহাসে এর কোন উল্লেখ নেই। আসলে কোন অভিযোগের প্রয়োজনই ছিল না। কারণ বিন কাসিমের প্রতি সুলায়মানের ছিল গোষ্ঠীগত, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ। ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও কাপুরুষতার জ্বালা মেটানোর জন্য অনুপম সাফল্য ও বিজয়ের অধিকারী বিন কাসিমকে নিঃশেষ করে তার কীর্তিকে স্নান করার হীন চেষ্টা চরিতার্থ করলেন সুলায়মান।

সুলায়মানের নিযুক্ত নতুন সিন্ধু শাসক ইয়াজিদ বিন কাবশা সিন্ধুতে পদার্পন করল। সাথে নিয়ে এলো পূর্বাঞ্চলীয় শাসক ইয়াজিদ বিন মাহলাবের ভাই মুআবিয়া বিন মাহলাবকে। ইয়াজিদ এসেই হুকুম করল- “বিন কাসিম। মুআবিয়া বিন মাহতাব তোমাকে গ্রেফতার করে দামেস্ক নিয়ে যাবে। একাজের জন্যই খলিফা তাকে আমার সাথে পাঠিয়েছেন।’ কোন কথা না বলে স্বেচ্ছায় নিজেকে গ্রেফতারের জন্য পেশ করলেন বিন কাসিম। সিন্ধু বিজয়ী, পৌত্তলিক ভারতে ইসলামের আলো প্রজ্জ্বলনকারী, অসংখ্য মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা, লক্ষ লক্ষ বঞ্চিত নিপীড়িত মূর্তিপূজার অন্ধকারে থাকা ভারতবাসীকে সত্য সুন্দর তৌহিদের পথ নির্দেশকারী ইতিহাসের ক্ষণজন্মা কিশোর সেনানী অপোবদনে হাতকড়া পরানোর জন্যে দু’হাত প্রসারিত করে দিলেন। তার শরীরের পরিধেয় কাপড় খুলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের কাপড় পরিয়ে দেয়া হলো। হাত-পায়ে বাধা হলো ডান্ডা বেড়ি।

আফসোস, হিংসুটে সুলায়মান একবারও ভাবল না, সে শুধু একজন বিন কাসিমকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দি করছে না, ইসলামের বিজয় অভিযান ও সম্প্রসারণকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। প্রাণ প্রিয় সেনানায়কের এই করুণ পরিণতি তার সহযোদ্ধারা মর্মজ্বালা নিয়ে দেখছিলেন, তাদের সবার দুচোখ গড়িয়ে বুক ভেসে যাচ্ছিল অনুতাপ, দুঃখ আর যন্ত্রণায়। সিন্ধুর আকাশ সে দিন

প্রত্যক্ষ করছিল ইতিহাসের নির্মমতা। বন্দীত্ববরণ করে সিন্ধু বিজয়ী বিন কাসিম সহযোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে উচ্চ আওয়াজে বলেছিলেন একটি আরবী পংক্তি। “আফসোস! ওরা আমাকে ধ্বংস করে দিল, এরা কতো জোয়ানকে ধ্বংস করেছে যারা রণাঙ্গনে বীর ছিল, সীমান্তের ছিল অতন্ত্র প্রহরী।”

বিন কাসিমকে বন্দী করে বাগদাদ নিয়ে গেলে সুলায়মান তার মুখোমুখি হলো না। সুলায়মানের শিখণ্ডি খীরাজের নবনিযুক্ত শাসক খারেজী সালেহ বিন আব্দুর রহমান সৈন্যদের নির্দেশ দিলো, ওকে ওয়াসতা বন্দিশালায় বন্দি করে রাখো, যেখানে হাজ্জাজের খান্দান ও তার জ্ঞাতি গোষ্ঠীকে বন্ধি করে রাখা হয়েছে। বন্ধিশালার দরজায় দাঁড়িয়ে বিন কাসিম বললেন-“তোমরা আমাকে জেলখানায় বন্দি করে এবং আমার হাতে পায়ে জিঞ্জির দিয়ে আমাকে বেকার করে দিয়েছে বটে কিন্তু আমার সেই সম্মান ও সাফল্যকে ম্লান করতে পারবে

আমি ছিলাম সেই বিন কাসিম, যাকে দেখলে সুলায়মানের মতো কাপুরুষ যোদ্ধাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত, আর আমি ইসলামের শত্রুদের শুধু হত্যাই করিনি তাদের জন্য ছিলাম জীবন্ত ত্রাস। বিন কাসিম আফসোস করে সর্বশেষ বলেন, হে সময়! বড় দুঃখ হয়; তুই মর্যাদাবানদের প্রতি খুবই অবিশ্বস্ত।

অতঃপর জেলখানায় বিন কাসিমকে একের পর এক শাস্তি দেয়া শুরু হলো। সীমাহীন ধৈর্য ও সহিষ্নুতায় বিন কাসিম নীরবে সব যন্ত্রণা সহ্য করে যেতে লাগলেন। সুলায়মান প্রতি দিনই বিন কাসিমদের মৃত্যু সংবাদ শোনার জন্য উদগ্রীব থাকতো। অবশেষে একদিন বিন কাসিমকে হত্যার ইঙ্গিত দিলো সুলায়মান। সুলায়মানের ইঙ্গিতে সালেহ বিন আব্দুর রহমান জেলখানাতেই বিন কাসিমকে আকীল গোত্রের হাতে তুলে দিলো। আকীল গোত্রের লোকেরা দলবেধে বিন কাসিমকে পেটাতে শুরু করল। বহুজনের প্রহারে বিন কাসিম সম্বিত হারিয়ে জীবন্ত লাশে পরিণত হলেন। প্রহারের ধকল সহ্য করতে না পেরে একদিন মৃত্যু আলীঙ্গন করলেন বিন কাসিম। তখন তাঁর বয়স বাইশ বছর।

যে বীর ইসলামের শত্রুদের হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিতেন, সেই বীর সেনানী নির্মমতার শিকার হয়ে স্বজাতির গাদ্দারদের হাতে নিহত হলেন। বিপন্ন বিন কাসিমের লাশ দেখে সেকালের কবি হামজা বিন রিয়াজ কাব্য করে বলেছিলেন

“সে তো দীপ্ত পৌরুষ, লৌহমানব, প্রসারিত জীবনের প্রতিচ্ছবি ছিল। সতেরো বছর বয়সে সৈন্য পরিচালনা করেছে। সে তো ছিল জন্মগত স্বভাবজাত সেনাপতি। অন্য এক কবি বলেছিলেন

“সতেরো বছর বয়সে সে ছিল রণাঙ্গনের সেনানী

তার বয়সের ছেলেরা খেলে ফিরে সারা দিন।”

ভারতের জমিনে চমকে দিয়েছিল যে সিতারা সে হঠাৎ নিভে গেল। সে দিন থেকেই ইসলামের ইতিহাসে শুরু হলো ক্ষমতার সংঘাত আর ভোগবাদীদের রাজত্বের খেলা। প্রতিপক্ষকে হত্যা ও নিঃশেষ করে দেয়ার জঘন্য রাজনৈতিক রীতি। এখনো মুসলিম দুনিয়া ক্ষমতা লিপ্সু ভোগবাদী রাজন্যবর্গের কব্জা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। যার ফলে ইসলামের আলোক মশাল বিভা হারিয়ে অন্ধকারে চাপা পড়ে আর্তনাদ করছে। আর অপেক্ষা করছে এমন একজন ঈমানদীপ্ত ত্রাণকর্তার, যে সকল অন্যায় অন্ধকার দু’পায়ে ঠেলে ইসলামের আলো পুনর্বার দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে দেবে।

সমাপ্ত

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *