১. সি, আই, এ

অপারেশন সি. আই. এ. জেমস হেডলি চেজ / ভাষান্তর : পৃথ্বীরাজ সেন

০১. সি, আই, এ

শক্ত সমর্থ ভারিক্কী চেহারার ক্যাপ্টেন ও’হ্যালোরান প্যারীর মার্কিন দূতাবাসের সামনে গাড়ি থামিয়ে কালো চামড়ার ব্রিফকেসটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দূতাবাসে ঢোকে। রিসেপশন ক্লার্কের দিকে মাথাটা একটু নেড়ে লিফট বেয়ে দোতলায়, করিডর পেরিয়ে সিঁড়ির ছটা ধাপ ওপরে উঠতেই… দীঘল চেহারার একজন মেয়েমানুষ এগিয়ে এলো।

ওর নাম মার্সিয়া ডেভিস। মেয়েটা সি, আই, এর প্যারী শাখার সর্বাধিনায়ক জন ডোরির পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।

সুন্দরী মেয়ের ধূসর আঁখি লহমার মধ্যে দেখে নেয়, ক্যাপ্টেনের লাল মাংসল মুখ, থ্যাবড়া ভাঙা নাক। হাল্কা নীল চোখ এবং শক্ত ঠোঁট দুটো, মার্সিয়ার মনে হয় বুক উথাল পাথাল করে ডুবে যাচ্ছে।

শক্তসমর্থ পুরুষকে দেখে মার্সিয়া হাসছে।

 হ্যালো টিম

 বুড়ো আছে নাকি?

নড়বার নাম নেই। ছুটি নেবে না টিম?

ছুটি? এক্সমাসেও ছুটি হবে কিনা কে জানে? তোমার কি খবর?

সেপ্টেম্বর…জাহাজে চড়ে বেড়াতে যাব… ক্যা

প্টেন ভাবছে এই সুন্দরী যদি কোনদিন আমার সঙ্গে প্রেম করতে রাজি হয়…

 শ্রীমতি মার্সিয়া ডেভিস হেলেদুলে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য ক্যাপ্টেন দেখুক, ওর শরীর কেমন সুন্দর।

ক্যাপ্টেন এগিয়ে যায়। দরজার ওপরে লেখাঃ

 সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সী,
বিভাগীয় ডিরেক্টর,
জন ডোরি।

সি, আই, এ-র কর্মচারীরা বড়কর্তা জন ডোরি কদিন টিকবে, তাই নিয়ে জুয়া খেলেছিল। তখন ওয়াশিংটন প্যারী অফিসের প্রধান হিসেবে থরলি ওয়েলিকে পাঠিয়েছিল এবং আটত্রিশ বছর চাকরীর পর ডোরিকে দুনম্বরী পোস্টে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন ওয়েরলি, ওয়াশিংটনের ছেলে ওয়াশিংটনে ফিরে গেছে এবং এই ষাট বছর বয়সে বুড়ো জন ডোরির ঘাড়ে আবার রোয়া গজিয়েছে। লোকটাকে ক্যাপ্টেন পছন্দ করে। কারণ সে বিপদের ঝুঁকি নেয়, শর্টকাট করতে জানে এবং কল্পনা শক্তি আছে।

ক্যাপ্টেন দরজায় টোকা মেরে ঢোকে। জন ডোরি প্রকাণ্ড ডেস্কে বসে ফাইল পড়ছে। পাখীর মত হাল্কা ছোটখাট মানুষ, চোখে পাঁশান চশমা, ফিটফাট চশমার কাঁচের ওপর দিয়ে ক্যাপ্টেনের দিকে জন ডোরি তাকিয়ে, আরে টিম! কি ব্যাপার?

একটা লোক দুদিন আগে চার তারিখের সন্ধ্যেবেলা কুদ্যলা তুর্নেল-এ গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে দেখে, অন্ধকারে এক যুবতী মেয়েমানুষ শুয়ে আছে। পুলিশ এসে দেখলো যুবতী বেহুঁশ। ওর গলায় আমেরিকান জাতীয় পতাকার তারা আর ডোরা দাগ আঁকা রুমাল বাধা ছিল। তাই ওকে আমেরিকান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মেয়েমানুষটি বেশি মাত্রায় বারবিচুরেট জাতীয় ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। পরের দিন তার হুঁশ ফিরলে দেখা গেল, তার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, অ্যামনেসিয়ার দরুণ মেয়েটা তার নাম ঠিকানা মনে করতে পারছে না। এই মেয়েটা আমেরিকান উচ্চারণে ইংরেজী বলে কিন্তু তখন সে খুব নার্ভাস ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল। ডাঃ ফরেস্টার পুলিশে খবর দেন মেয়েটার আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নিতে যাতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া যায়। উনি ফরাসী পুলিশের কাছে রোগিনীর চেহারার বর্ণনা দিয়ে খবর পাঠালেন। ডাক্তারের ধারণা, নরওয়ে বা সুইডেনের দূতাবাসে খোঁজ নিলে জানা যাবে

সি, আই, এ-র ডিভিশন্যাল ডিরেক্টর ডোরি বিরক্ত হয়ে বললে, আমি এ ব্যাপারে কি করবো? আর ডাক্তারই বা কি করে ভাবলো যে দূতাবাসে খবর নিলেই মেয়েটার ঠিকানা পাওয়া যাবে? মেয়েটার কাছে কাগজপত্র কিছু নেই?

না, হ্যান্ডব্যাগ পর্যন্ত নেই। সোনালী চুল, লম্বা চেহারা, হয়তো নরওয়ে বা সুইডেনের মেয়ে হবে। সকালে ফরাসী পুলিশ খবর পাঠায়। ক্যাপ্টেন ফাইল খোলে, সুন্দরী, ব্লন্ড চুল, নীল চোখ, রোদে সেঁকা বাদামী রং, উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি, ওজন একমণ বাইশ সের। আইডেন্টিফিকেশন মার্ক :

এক : ডান হাতের কনুইয়ের নীচে ছোট্ট তিল।

দুই : বাম নিতম্বে উল্কিতে আঁকা চীনা হরফে তিনটি প্রতীকী অক্ষর।

ড্যাম। মেয়েছেলের শরীরে উল্কি? তাও আবার চীনা হরফে?

রাইট স্যার! চীনা হরফে তিনটে প্রতীকী অক্ষর মেয়েটার চামড়ায় উল্কি করে আঁকা। ফাইলটা ডেস্কে রাখে ক্যাপ্টেন ও হ্যালোরান।

সি, আই,এর প্যারী ডিভিশনের একটা ফাইল পড়েছি, কম্যুনিস্ট চীনের সেরা রকেট-রিসার্চ-, বিজ্ঞানী ফেং হো কুং-এর ব্যক্তিগত জীবনের অনেকে তথ্য ওই ফাইলে আছে। ওই চীনা বিজ্ঞানী । পাগলাটের মতো। তার যে কোন সম্পত্তিতে সে নিজের নামের তিনটে আদ্যাক্ষরের ছাপ দেয়। ফেং হো কুং নামের এই তিনটে অক্ষরের ছাপ লাগায় বাড়ি, গাড়ি, ঘোড়া, বাসনপত্র, জামাকাপড় সব কিছুতে। এমনকি যখন যে মেয়েমানুষের সঙ্গে প্রেম করে তার চামড়ার উল্কিতে তিনটে আদ্যাক্ষর এঁকে দেয়।

ফাইলে আরও ছিল, একবছর আগে এক সুইডিশ যুবতীকে পিকিং-এর রকেট বিজ্ঞানী রক্ষিতা রেখেছে। এই মেয়েটার শরীরে সেই তিনটে অক্ষর রয়েছে। তাই আপনাকে খবরটা জানালাম।

ডিরেক্টর ডোরি বললো, খবরটা কে কে জানে?

ব্রিটিশ দূতাবাস, স্ক্যান, ডিনেভিয়ান দূতাবাস এবং ফ্রাসঁ-মাতিঁ।

ফ্রাসঁ-মাতিঁ ম্যাগাজিনটা তার দুচোখের বিষ। কেচ্ছার গন্ধ পেলেই এই ফরাসী ম্যাগাজিনটা কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের করে।

ম্যাগাজিনের কপি ডোরির হাতে ক্যাপ্টেন দেয়।

ম্যাগাজিনের দুনম্বর পাতায় বড় হেডলাইন :

শরীরে উল্কির দাগ
আপনি কি এই মহিলাকে চেনেন?

অস্পষ্ট ফটো ক্যাপশনের নীচে নিউজ প্রিন্টে জেবড়ে গেছে। কুড়ি থেকে তিরিশের মধ্যে ব্লন্ড, ফটোটা বিশ্রী হলে মেয়েটা যে সুন্দরী তা বোঝা যাচ্ছে।

ডোরি পড়ে :

রহস্যময়ী এই রমণীর নীতম্বে চীনা অক্ষরে লেখা প্রতীকী চিহ্ন যা বোঝা যায়নি।

ওরা এসব জানলো কি করে?

কুড়ি মাইল দূরে ভাগাড়ে মরা পরলে শকুন কি করে টের পায় স্যার?

অনেক মেয়েই শখ করে আঁকায়..কিন্তু তিনটে চীনা আক্ষর।

ডোরি বলে টম এটা টপ লেভেল অপারেশন। এ পর্যন্ত তুমি কি করেছ?

মার্কিন জেনারেল ওয়েনরাইট ওই হাসপাতালেই চেক আপের জন্য ভর্তি আছেন মেয়েটির সঙ্গে একই তলায়। ওকে পাহারা দেবার অজুহাতে করিডরে একজন সান্ত্রী রেখেছি। ডাক্তার ফরেস্টারকে বলেছি মেয়েটির নিরাপত্তার জন্য ওঁর চেনা নার্স যেন দেওয়া হয়। সান্ত্রীকে বলেছি নার্স ছাড়া কেউ যেন ঐ ঘরে না ঢোকে। রিসেপশন ডেস্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোন ভিজিটরকে রোগিনীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হবে না।

ডোরি মাথা নেড়ে, বাঃ চমৎকার। প্রথমে আমাকে জানতে হবে সত্যিই কম্যুনিস্ট চীনের রকেট বিজ্ঞানী ফেং হো কুং-এর নামের তিনটে ইনিসিয়্যাল কিনা। যদি মেয়েটা সত্যিই কুং-এর রক্ষিতা হয়, ওর গুরুত্ব ভি, আই, পি,-দের থেকেও বেশি বেড়ে যাবে।

*

কুমুনিষ্ট চীনের স্পাইচক্র

প্যারী শহরের রু দ্য রেইনার এক কোণে ছোট্ট এক চীনা রেস্তোরাঁর নাম লা তেইমপ দী সিয়ে। কোন ট্যুরিস্ট গাইডে নাম না থাকলেও প্যারীর সেরা চীনা খাবার এখানে পাওয়া যায়। কোন ট্যুরিস্ট এখানে এলে জানানো হয় সব টেবিল রিজার্ভ হয়ে গেছে। এটা শুধু প্যারী, প্রবাসী চীনাদের জন্যে।

যখন সিয়ার প্যারী শাখার ডিরেক্টর ক্যাপ্টেন ও হ্যালোরানের সঙ্গে কথা বলছে, তখনই রেস্তোরাঁর মালিক চুং উ ক্যাস ডেস্কের পাশে বসে ওয়েটারদের ওপরে খবরদারী করছে। ওয়েটাররা প্রায় একডজন কাস্টমারকে লাঞ্চের খাবার দিচ্ছে। টেবিলগুলো ঘিরে সিল্কের উঁচু পর্দা। মাহ-জং টাইলের শব্দ, চড়া গলায় কথাবার্তার শব্দ। পপসঙ্গীতের গর্জনচীনাদের নিঃশব্দে লাঞ্চ খেতে ভালো লাগে না।

টেলিফোনে রিসিভার বাজতেই চুং উ ক্যান্টেন ভাষায় কথা বলে। রিসিভার পাশে রেখে সাদু মিচেলকে ডাকতে যায়।

সাদু মিচেল, চপ-স্টিকের কাঠি দুটো দিয়ে চিংড়িং মাছটা সবে খেতে যাচ্ছে তখন চুং উ, রেশমী পর্দা ঠেলে ঢুকে বলল, মঁসিয়ে…টেলিফোন…আর্জেন্ট…

জঘন্য ফরাসী উচ্চারণে চুং উ বলে।

ব্লাডি… মুখখিস্তি করে সাদু আর ওর সুন্দরী সঙ্গিনী খিলখিল হাসি হাসে। সাদু ফোন ধরতে ছোটে। সাদু মিচেল দেখতে লম্বা, একহারা গড়ন, মুখটা একটু লম্বা, কালো চুল, ফিটফাট পোশাক, বাদামের মত চোখে শক্ত চাউনি। সাদু মিচেল জনৈক মার্কিন ধমর্যাজকের জারজ সন্তান।

এই মার্কিন মিশনারী ভদ্রলোক তিরিশ বছর আগে কুয়োমিনটাং আমলে পিকিং-এ যান। চীনাদের ভুলিয়ে খৃস্টান করায় উনি ব্যর্থ হলে, মনের দুঃখে হুইস্কির বোতলে ডুবে যান। পাদ্রী সাহেবের মনের দুঃখ ঘোচাতে এক রূপসী চীনা যুবতী এলো। সেই সাক্তনার ফলুসাদু মিচেল আধা মার্কিন, আধা চীনা। নিজেকে জারজ সন্তান বলে এতো ঘেন্না করে সাদু যে গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সে নিজের শত্রু ভাবে।

রু দ্য রিভোলিতে তার ছোট বুটিক। দোকানে জেড পাথর আর পুরোনো দামী জিনিষপত্র বিক্রী হয়। মার্কিন ট্যুরিস্টদের ভিড় জমে।

মেয়েমানুষ ছাড়া সাদুর একদিনও চলে না। এখন তার সঙ্গিনী এক উত্তর ভিয়েনামী মেয়ে পার্ল কুও। সাদু দেখলো, তার থেকেও পার্ল মার্কিনীদের বেশি ঘেন্না করে। কারণ, উত্তর ভিয়েতনামে মার্কিন বোমারু বিমানের আক্রমণে পার্লের ঘরবাড়ি জ্বলে গেছে। মা-বাবা ভাইবোনেরা মরেছে। হ্যাঁনয়ে কুমনিষ্ট চীনের স্পাই হিসাবে পার্ল দীর্ঘদিন কাজ করেছে।

ওখান থেকে তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। সাদুর দোকানে অনেক মার্কিন ট্যুরিস্ট মাসে। বিদেশে এলে ওরা নিজেদের মধ্যে এমন ভোলামেলা কথাবার্তালে যেন কেউ ইংরেজী বোঝে না। ওদের বেফাঁস কথাবার্তা সাদু চীনা দূতাবাসের একজন কর্মচারীকে জানাতো। সেই খবর মার্কিনীদের বিরুদ্ধে কম্যুনিস্ট চীনের প্রোপাগাণ্ডার কাজে লাগাতো। মার্কিনীদের বেইজ্জৎ করে সে তার মার্কিন বাপের ওপরে বদলা নিত।

সাদু বোঝেনি যে কম্যুনিস্ট চীনের স্পাইচক্র তাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক কাজের জন্যে তালিম দিচ্ছে। পার্ল সূতো ছাড়ছে, ইয়েৎ সেন সুতো গুটোচ্ছে–সাদু মিচেলের আর ফেরার পথ নেই।

এই টেলিফোন-কল ধরার সঙ্গে সঙ্গেই সাদু পুরোপুরি ক্যুনিস্ট চীনের এজেন্ট হলো। রিসিভার তুলে সাদু, ইয়েস। কে বলছেন?

ফোনে প্যারীর স্পাই রিং-এর সর্বেসর্বা ইয়েৎ সেনের গলা, আমি তোমার দোকানের সামনে আছি। এক্ষুনি এসো।

এখন যেতে পারবো না, আমি

এক্ষুনি, লাইন কেটে যায়,

 সাদু ফিরে এসে, ইয়েৎ সেন, এক্ষুনি যেতে বলছে।

তোমাকে যেতে হবে ডার্লিং?

কেন? আমি কি ইয়েৎ সেনের চাকর?

তোমাকে যেতেই হবে, ডার্লিং।

বেশ, একটু বসো। আমি বেশি দেরী করবো না।

গাড়ি চালিয়ে দশ মিনিটের মধ্যেই দোকানে পৌঁছে যায় সাদু। যে স্থূলকায় চীনা ভদ্রলোক জেড পাথর দেখছিল, সে ঘুরে দাঁড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসে।

ইয়েৎ সেন বলে, এমার্জেন্সী, তোমাকে এজেন্ট হিসেবে বাছা হয়েছে, তোমার খুশী হওয়া উচিত। স্যুভের গার্ডেনসের কাছে গাড়ি থামাও।

সাদু মিচেল একটু আতঙ্কিত হয় ইয়েৎ সেনকে দেখে-মোটা লোকটার পরনে ভারী স্যুট, হলুদ মুখটা ভাবলেশহীন, মিনিস্তেয়ার দ্য ফিন্যান্স-এর সামনে সাদু গাড়ি থামায়।

হিপপকেট থেকে ফ্রাঁস-মাতি ম্যাগাজিনের কপি বার করে সাদুর হাতে দেয়।

শরীরে উল্কির দাগ
আপনি কি এই মহিলাকে চেনেন?

 ব্লন্ড যুবতীর অস্পষ্ট ফাটোতে আঙ্গুল দিয়ে ইয়েৎ সেন টোকা দেয়।

কাল সকালের মধ্যে এই মেয়েটাকে খুন করবে। সাদু, তোমাকে আমরা বিশ্বাস করি। তুমি সবরকম সাহায্য পাবে কিন্তু প্ল্যানের ডিটেলস্ তোমাকে ঠিক করতে হবে। আজ সন্ধ্যে ছটায় একজন লোক তোমার সঙ্গে দেখা করবে। সে পেশাদার খুনী, কিন্তু নির্বোধ। তোমাকে বুদ্ধি জোগাতে হবে। এবার শোনো, প্ল্যানটা ।

সাদু মিচেল খুনের প্ল্যান শুনে বুঝলল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে সে যে বীজ পুঁতেছে, আজ তারই বিষবৃক্ষে ফল ধরেছে।

*

 সোভিয়েত রাশিয়ার স্পাই

লন্ডনের বন্ড স্ট্রীটের ট্যুরিস্টদের কাছে একটা অদ্ভুত ধরনের আকর্ষণ আসে। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় দোকান বন্ধ হয়। কিন্তু তার পরেও পৃথিবীর নানান দেশের মানুষ ট্রাফিকের ভিড় ঠেলে ঘোরাঘুরি করে, প্রত্যেকটা দোকানের শো কেসের সামনে দাঁড়িয়ে পুরনো প্রিন্ট দেখে। চামড়ায় বাঁধানো বই, লিনেন, দামী ক্যামেরা, বিভিন্ন ধরনের উপহারের সামগ্রী।

পরনে বিদেশী কাটিং-এর ট, মার্ক অ্যান্ড স্পেশারের শার্ট ও টাই, মাথায় ছোট্ট করে কাটা রূপোলীচুল, চৌকোনা মুখ, চোখদুটো সবুজ ও সমতল–লোকটার বয়স তিরিশ থেকে চল্লিশের মাঝামাঝি। ছ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা, পেশীবহুল চেহারা প্রকাণ্ড হাত দুটো ট্রাউজারের দুই পকেটে, ট্রেনড বক্সারের মত হাল্কা পা ফেলে বন্ড স্ট্রীট বেয়ে চলেছে লোকটা, নাম মালিক। সোভিয়েত রাশিয়ার সবসেরা ও সবচেয়ে সফল স্পাই। তাকে বলা হয়েছে, তুমি এমন ভাবে ঘোরাফেরা করা এবং শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখো সবাই যেন ভাবে তুমি ট্যুরিস্ট। পরে দরকার হতে পারে। সোভিয়েত রাশিয়ার সেরা পাই মালিক ক্রমওয়েল রোডের এক অখ্যাত হোটেলে আছে। সে জানে যে বৃটেনের সরকারী স্পাই সংগঠন এম. ওয়ান, সিক্স তার ওপরে নজর রেখেছে। আরও, জানে তাদের নিজেদের সংগঠন আর একজন স্পাই রেখেছে মালিকের ওপর নজর রাখতে।

মালিকের কাছে তার কাজ একটা খেলা। খেলাটা উত্তেজনায় ভরপুর, সন্তুষ্টি আনে এবং ধর্ষনকারী ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন মেটায়।

বন্ড স্ট্রীটের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দোকানের পর দোকানের শো কেসে নানান ভোগ্যপণ্য দেখতে দেখতে তার লোভ জেগেছে।

ওই পোর্টেবল কালো সেটটা কিংবা রূপো ও পাথর বসানো পেনসেটের সঙ্গে চামড়ায় মোড়া সুন্দর ব্লটার–ওগুলো তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও শোকেসের দিকে না তাকিয়ে সে এগিয়ে গেল। সে জানে হিংসুক স্পাই এই মুহূর্তে তাকে ফলো করে ওপর তলায় রিপোর্ট পাঠাবে।

মোটর হর্ণের আওয়াজে মালিক ফিরে তাকায়। জাগুয়ার গাড়িটা খুব আস্তে তারই পাশে পাশে চলেছে। স্টীয়ারিং হুইলে যুবতী মেয়ে, ব্লন্ড, হাসিখুশী মুখ, বাইশ-তেইশ বছর হবে, কাঁধে পশুলোমের ষ্টোল, দুচোখে কামনার নিমন্ত্রণ, মেয়েটা বেশ্যা, মক্কেল খুঁজছে।

মালিক হাঁটতে থাকে। কিন্তু ইচ্ছে হয়, মেয়েটাকে দেখিয়ে দেয় রাশিয়ান পুরুষের পেশীবহুল শরীরের শক্তি। কিন্তু সেই স্পাই, রিপোর্ট পাঠাবে।

জাগুয়ার থামে। মেয়েটা বলে, একা কেন ডার্লিং? ফুর্তিটুর্তি হবে না?

নিঃশব্দে হাটে মালিক। সে হোটেলে ফিরে যেতে চায়। বন্ধ ঘর, জানালায় পর্দা, তালাবন্ধ দরজা-ঘরের ভেতরে কেউ নেই, সেখানে সে নিরাপদ।

পিকাডিলী পৌঁছতেই তার হাতঘড়িটা দপদপ করে ওঠে। দেখতে ঘড়ির মতো হলেও ওটা ইলেকট্রনিক পালসার-মালিককে সংকেত পাঠানোর জন্য। এই মুহূর্তে মলিককে ওদের দরকার। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে ওঠে মালিক।

মালিক বার্কলি হোটেলের বুথে ঢুকে ফোন তোলে, হ্যালো?

চার দুই ও ছয় যোগ করলে বারো হয়, নিজের সাংকেতিক আইডেন্টিটি কোড বলে মালিক।

এমার্জেন্সী। তুমি এই মুহূর্তে প্যারী যাবে। আটটা চল্লিশের ফ্লাইটে সীট বুক করা হয়েছে। তোমার জিনিসপত্র নিয়ে এস। লা বুর্জা বিমানবন্দরে এস তোমার সঙ্গে দেখা করবে।

এয়ার টার্মিনালে মালিকের স্যুটকেস, টিকিট ও ৩০০ ফরাসী ফ্র্যাঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করছে সোভিয়েত রাশিয়ার আর এক এজেন্ট দ্রিনা।

স্মারনফ বলেছে, ডিউটি-ফ্রি কিছু সিগারেট নিয়ে গেলে ভালো হয়–এই মোটা অগোছালো পোয়কের লোকটা স্পাই হিসেবে বিশেষ কাজের নয়। মালিক ব্যর্থতাকে ঘেন্না করে। লা বুর্জা এয়ার পোর্টে পুলিশ কোন ঝামেলা করে না। তার জাল পাসপোর্টে দেখানো হয়েছে সে মার্কিন নাগরিক। স্যাভ আমেরিকান এই ট্যুরিস্ট ফ্রান্সে ডলার খরচা করতে এসেছে।

রিসেপশন হলে অপেক্ষা করছে সোভিয়েত স্পাইচক্রের ফরাসী শাখার প্রধান বোরিস স্মারনফ। ওকে দেখে মালিক খুশী হয়। লোকটা চতুর, নির্মম এবং মানুষ খুন করতে ওস্তাদ। ওর জীবন দর্শন হলো : যে কাজ সম্ভব, তা তো হবেই। যে কাজ অসম্ভব তা চেষ্টা করে করতে হবে।

একটু আগেই এয়ারপোর্টের সামনে ছোটখাটো একটা মারদাঙ্গা হয়ে গেছে। এয়ারপোর্টের বেড়ার বাইরে হয়তো লন্ডন থেকে প্লেন আসার অপেক্ষায় এক নির্বিবাদী লোক ছিল। আচমকা তিন দিক থেকে তিন জন বীটনিক ছোকরা তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ কিছু বুঝবার আগেই ওদের একজন গাটাপার্চায় ঢাকা ধাতুর কোন বার করে লোকটার মাথায় মারে। পুলিশ আসার আগেই ওরা কেটে পড়ে। লোকটাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

লোকটা বৃটিশ স্পাই সংগঠন এম. আই. সিক্স-এর একজন এজেন্ট। রাশিয়ান স্পাই মালিক লন্ডন থেকে প্যারী আসছে জেনে সে নজর রাখতে এসেছিল।

বরিস স্মরনফের আদেশ ওকে মারধোর করা হয়েছে যাতে আর কেউ মালিকের ওপর নজর না রাখে।

সিগারেট এনেছো? হ্যান্ডশেক করার সময় স্মারনফ বলে।

বিষ খেতে চাও, নিজে খাও, আমি কেন বিষ জোগাবো?

তুমি নিজের জন্য ছাড়া অন্য কারোর কথা ভাবো না। আমি কখনো তোমাকে কারোর উপকার করতে দেখিনি।

গাড়িতে বসে ফ্রাসঁ-মাতিঁ ম্যাগাজিনটা স্মারনফ মালিকের হাতে তুলে দেয়।

শরীরে উল্কির দাগ,
আপনি কি এই মহিলাকে চেনেন?

আমেরিকান হাসপাতালে এই মেয়েটি আছে। খুব সম্ভব ও ক্যুনিস্ট চীনের রকেট বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী ফোং হো কুং-এর প্রাক্তন রক্ষিতা। ওকে হাসপাতাল থেকে কিডন্যাপ করে আমরা ম্যালমেইসের একটা বাড়িতে নিয়ে যাবো। অপারেশনের ইনচার্জ তুমি। মেয়েটা কে, মার্কিনীরা সন্দেহ করছে। ওরা হাসপাতালে সান্ত্রীর পাহারা রেখেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হয়তো মার্কিনীরা ওকে এমন কোথাও নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ওকে কিডন্যাপ করা শক্ত হবে। ওদের ধারণা, ও ফেং হো কুং-এর ব্যাপারে দামী খবর জানে।

অ্যাকশন পছন্দ করে মালিক। হাসপাতালে মার্কিন মিলিটারী পাহারা, তারই মধ্য থেকে একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করা–এই ধরনের দুঃসাহসিক কাজই তার পছন্দ।

স্মারনফ বলে, হাসপাতালের সামনে আমার একজন এজেন্ট রেখেছি। সব থেকে সোজা রাস্তা হাসপাতালে ঢুকে মেয়েটাকে নিয়ে আসা। একজন মার্কিন জেনারেল একই তলায় ভর্তি আছে। আমার কাছে মার্কিন ফৌজের জীপও আছে, ইউনিফর্ম আর অ্যাম্বুল্যান্সও আছে। আইডিয়াটা কেমন?

বরিস, তোমার ভাবনা চিন্তার ধরন আমার মতো। প্ল্যানটা চমৎকার, এতেই কাজ হবে।

স্মারনফ হেসে বলে, না, প্ল্যান পছন্দ হলে দায়িত্ব তোমার।

 বরিস, তোমার কোন উচ্চাশা নেই?

না, তোমার আছে নাকি?

বোধ হয় না।

ম্যালমেইসোয় নিয়ে যাবার পর স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মেয়েটার দেখাশোনা কে করবে?

মেয়েটা খুব সুরৎ। ওকে দেখতে পারলে খুশীই হতাম। কিন্তু চীফ কোভস্কা কাজটা দিয়েছে মারনা ডোরিনস্কাকে।

এই কুত্তীটা প্যারিসে কি করছে?

ও প্রায়ই এখানে আসে। লোকে বলে ও আর কোভস্কা—

কে বলে? মালিক ধমক দেয়।

তুমি জানো না?

জানি, কিন্তু ওই নিয়ে কথা না বলাই ভালো।

 দুজনেই হেসে ওঠে। তততক্ষণে গাড়ি প্যারীর রুশ দূতাবাসের সামনে থেমেছে।

*

 আবার সি. আই. এ.

 সিয়ার প্যারী শাখার ডিরেক্টর জন ডোরি বিকেল চারটে চল্লিশ মিনিটে আমেরিকান হাসপাতালে ঢুকলো। কিন্তু সত্যি সত্যিই চীনা রকেট বিশেষজ্ঞ ফেং হো কুং-এর নামের আদ্যাক্ষর কিনা আগে জানা দরকার।

মার্কিন দূতাবাসের চাইনিজ এক্সপার্ট নিকোলাস উলফার্টকে খুঁজে বার করতেই সময় নষ্ট হয়েছে। উলফার্ট একদিন ছুটি নিয়ে আবোয়াস-এ ওর ছোট্ট এস্টেটে মাছ ধরতে গিয়েছিল। তাকে খুঁজে হেলিকপ্টারে প্যারী নিয়ে আসতে–মূল্যবান চারঘণ্টা সময় নষ্ট। উলফার্টের সঙ্গে দূতাবাসের সেরা ফটোগ্রাফার জো ভজকেও সঙ্গে এনেছে ডোরি।

ডোরি বলে, ডক্টর, গোটা ব্যাপারটা টপ সিক্রেট, মেয়েটাকে খুন করার চেষ্টা হতে পারে। বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে ওর খাবার তৈরী করাতে হবে এবং তোমার বিশ্বস্ত নার্স ছাড়া কেউ ওর কাছে যাবে না। আমি ফটোগ্রাফার এনেছি, ওর উল্কির দাগগুলোর ফটো তুলবে।

তার মানে? ডাক্তার ভুরু কোচকায়, উল্কির দাগ মেয়েটার পাছায়। অচেনা একটা লোক তুলবেনা, আমি তা হতে দিতে পারি না।

ডোরি কর্কশ স্বরে বলে, ফটো আমার চাই, আর ফটোগুলো প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠাতে হতে পারে, বুঝেছো ডাক্তার? পেন্ট্যাথল ইনজেকশন দিয়ে তোমার রোগিণীকে ঘুম পাড়িয়ে তারপর ছবি ভোলা হোক। আমার চাইনিজ এক্সপার্ট ওর উল্কির দাগগুলো দেখবে। জলদি করো–

ব্যাপারটা যখন জরুরী, মিনিট দশেক পরে তোমার লোক যেতে পারে।

ফাইন। মেয়েটা কি অভিনয় করছে? স্কোপোলাসিন ইনজেকশন দিয়ে দেখলে হয় না?

তাতে অভিনয় করলে ধরা পড়ে যাবে সত্যি। কিন্তু স্মৃতিভ্রংশ হলে, স্মৃতি ফিরতে অনেক দেরী হবে।

চাইনিজ এক্সপার্ট উলফার্ট ঘরে ঢোকে। বয়স ছেচল্লিশ, কিন্তু বাচ্চা ছেলের মতো লালচে ফর্সা রং–মাথায় টাক, বেশ মোটাসোটা।

ওয়েল? ডোরি উঠে দাঁড়ায়।

এই মেয়েটাই কুং-এর রক্ষিতা ওলসেন।কুং-এর ব্যবহৃত জিনিসপত্র ওর স্বাক্ষরের প্রতিলিপি অনেকবার দেখেছি। ভুল হতে পারেনা।বিশেষ ধরনের উল্কি–বিশেষ রঙে-নকলকরা অসম্ভব ব্যাপার।

উলফার্ট চীনাদের ব্যাপারে উঁচুদরের বিশেষজ্ঞ। খুব চতুর আর্টিষ্ট হয়তো এই ধরনের উল্কি নকল করতে পারে। আমি আমার পেনশন বাজি রেখে বলতে পারি, এই মেয়েটাই কুং-এর রক্ষিতা।

টিম, আমি ওয়াশিংটনে খবর পাঠাচ্ছি। ওদের অর্ডার না পেলে কিছু করা যাবে না। আমি এমব্যাসীতে ফিরে যাচ্ছি।

নিশ্চিন্তে থাকুন স্যার। মেয়েটা এখানে নিরাপদেই থাকবে।

 কিন্তু ক্যাপটেন ও’হ্যালোরান জানে না যে সোভিয়েত রাশিয়ার সেরা স্পাই মালিক ততক্ষণে প্যারীতে পৌঁছে গেছে। মালিকের ওপর নজর রাখার জন্য যে ব্রিটিশ স্পাই মার খেয়েছে তার জন্য ব্রিটিশ পাই সংগঠন এম. আই. সিক্সের প্যারী শাখার বিভাগীয় ডিরেক্টর এতো রেগেছেন যে সোভিয়েত রাশিয়ার বিপজ্জনক স্পাই যে অরক্ষিত অবস্থায় প্যারীর রাস্তায় ঘুরছে এই খবরটা ও হ্যালোরানকে দিতেই ভুলে গেলেন। মালিক প্যারীতে ঘুরছে শুনলে ও’হ্যালোরানকে আরো সাবধান হতে হতো মেয়েটার ব্যাপারে।

করিডরে অটোমেটিক রাইফেল হাতে প্রহরারত সান্ত্রী ক্যাপটেন যথেষ্ট ভাবলো।

*

কমুনিষ্ট চীনের পেশাদার খুনী

সন্ধ্যে ছটার পর পরে পাতলা রোগা চেহারার এক ছোকরা সাদু মিচেলের দোকানে ঢুকলো। হাতে ছোট্ট পুরনো সুটকেশ, কোনাগুলো ধাতু বাঁধানোযে সুটকেশ ক্যানভাসাররা ব্যবহার করে। গায়ের রঙ মরা ও পচা মাছের মত, কালো চোখ দুটো যেন কাউকেই বিশ্বাস করে না।

দেখতে পঁচিশ-তিরিশ মনে হলেও ওর বয়স মাত্র আঠারো। ওর চলাফেরা দ্রুত ও কুটিল। নাম জো জো চ্যাডি।ওর জন্ম মার্সেইয়ে। সমুদ্রের ধারে জাহাজীক্যাপ্টেনদের মেয়েমানুষ সাপ্লাই করতে জো জোর বাবা। জো জোর মা কে কেউ জানে না। দশ বছর বয়সে জো জো ওর বাবাকে হারায়। ছোকরার তাইতেই হাড়ে বাতাস লাগে। এক নিগ্রো দেহজীবিনীর চামচে হয়ে মন্দ কামাতো না।

জো জো কিছু পয়সা জমিয়ে প্যারীতে আসে। সে ভেবেছিল মস্তানি বদমাইসির পক্ষে প্যারীই ঠিক জায়গা। কিন্তু তা নয়, বার কয়েক অ্যারেস্ট হয়ে পুলিশের আড়ং ধোলাই খেয়ে সে চীনে। রেস্তোরাঁর দাদাবনে যায়। ক্যুনিস্ট চীনের স্পাইচক্রের প্যারী শাখার প্রধান ইয়েৎসেনের এজেন্ট যে মেয়েটি জো জো ওর সঙ্গে আশনাই জমায়। মেয়েটা বুঝতে পারে, এই রোগা শয়তান ছেলেটা তাদের প্রয়োজনের অস্ত্র হতে পারে। ইয়েৎসেন জো জো-কে ট্রেনিং ও মালকড়ি দেয়। এক বছরের মধ্যে জো জো এখন ওদের স্পাইচক্রের পেশাদার খুনী।

যত বিপজ্জনক ও নোংরা কাজ হোক, সে যেকোন কাজ করতে রাজি আছে, মালকড়ির । বদলে। তার জীবনদর্শন, যতো মাল ছাড়বে তত মাল কামাবো। বিপদের ঝক্কির কথা ভাবাই বেকার।

পার্ল কুও অদ্ভুত ধরনের ফুলকাটা টুপি পরা মার্কিন মহিলাকে জেড পাথর বেচছিল। জো জো-কে ও চেনে। পার্ল ভাবছিলো এতোদিনে সাদু স্পাইচক্রে সত্যিকারের কাজে নামতে চলেছে।

মার্কিন খদ্দেররা যাবার পর পার্ল জো জোর দিকে তাকিয়ে হাসে। সাদু তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে, এদিকে এসো।কাঁচের কাউন্টারের পেছনের দরজাটা খোলে। সাদু মিচেল একটু আগে পার্লকে সব খুলে বলেছে।

ইয়েৎসেন এই মেয়েটাকে খুন করতে বলেছে। সাদুর ফ্যাকাশে মুখ, তার মানে মার্ডার! আমি কি করবো?

ডার্লিং, খুন করবে অন্য লোক, তুমি শুধু ব্যবস্থা করবে। সাদু,কমিউনিস্টচীনের স্বার্থে কাজটা তোমাকে করতেই হবে। তুমি কথা না শুনলে আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো আর ইয়েৎসেন তোমাকে খুন করবে। কিন্তু কাজটা ওরা আমাকে করতে বললে আমি খুশী হয়ে করতাম। ওরা তোমাকে বেছে নিয়েছে বলে তোমার গর্ব করা উচিত।

এবার সাদু গর্বের ভাব দেখাচ্ছে। সে মার্কিনীদের ঘেন্না করে। ওরা তার ক্ষতি করেছে। সুতরাং এটা মার্ডার নয় প্রতিশোধ।

বসো জো জো, তুমি ওই মেয়েটাকে খুন করবে। আর কাজটা যেন ঠিকভাবে হয়।

জো জো ছোট্ট সুটকেশটা হাঁটুর উপরে রেখে বসে। ওর শরীর থেকে ঘাম আর ময়লার গন্ধ ভেসে আসে। সাদু নাক কুঁচকিয়ে, প্রথমে আমাদের জানতে হবে। মেয়েটা হাসপাতালের কোন ঘরে আছে। তারপর দেওয়াল বেয়ে তোমাকে উঠতে হবে। পারবে তো?

এটা তোমার প্রথম কাজ বুঝি? তুমি শুধু গাড়ি চালাবে, ডিটেলস আমর ওপরে ছেড়ে দাও। তুমি নাম কিনবে, আমি টাকা পাবো। দুজনেই খুশী

তুমি আমার সঙ্গে এইভাবে কথা বলছে?সাদুরাগে লাল হয়ে উঠে দাঁড়ায়, আমি যা বলবো তোমাকে তাই করতে হবে।

সাদু…প্লীজ, কাজটা ওর ওপরেই ছেড়ে দাও।

পার্লের দিকে লোভী চাউনি হেনে সুটকেশ থেকে পয়েন্ট টোয়েন্টি ফাইভ অটোমেটিক ও সাইলেন্সর বার করে জো জো।

পিস্তলের নলে সাইলেন্সর এঁটে সে পিলটা ট্রাউজারের ভেতরে কোমরবন্ধনীর নীচের হলাটারে রাখে।

পিস্তল, সাইলোর, পেশাদার খুনীর নিপুণ কাজ দেখে সাদু স্তব্ধ হয়ে যায়।

জো জো বলে, আমরা এখন হাসপাতালে যাবো, পাছায় উল্কি আঁকা মেয়েটা কোন তলায় কোন ঘরে আছে আগে জানতে হবে।

সাদু, পার্ল বলে, ও যা বলছে, তাই করো, ও পেশাদার খুনী। ওর সঙ্গে কাজ করলে তোমার অভিজ্ঞতা বাড়বে।

সাদুর স্পোর্টসকার চলে যাওয়ার পর পার্ল ধূপকাঠি জেলে হাঁটু গেড়ে বসে ওদের সাফল্যের জন্যে প্রার্থনা করে।

*

 মার্ক গারল্যান্ড কোথায়?

এয়ারপোর্টে মালিক স্মরনফের সঙ্গে কথা বলছে। সেই সময় ওয়াশিংটন প্যারীর সিয়া-চীফ ডোরিকে তার প্ল্যানমাফিক কাজ করার অনুমতি দিল।

সি.আই.এ. ও এফ.বি.আই.-এর দুই সর্বাধিনায়ক তার প্রস্তাবটা ভেবে দেখেছে। ওরা এখুনি প্রেসিডেন্টকে খবর দিতে চায়নি। তবে অপারেশনের গুরুত্ব এরাও স্বীকার করেছে।

ডোরির বড়কর্তা ফোনে বলেছে :

জন, ব্যাপারটা আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিচ্ছি। প্রথম দিকের খরচাটা কোন অজুহাতে দেখানো যাবে। ব্যাপারটা এখনও আনঅফিসিয়াল থাক।

ডোরি মনে মনে খুশী হয়। ইচ্ছে মত ডোরি টাকা খরচ করতে পারবে। কারোর কাছে। জবাবদিহি করতে হবে না।

আটটা বাজছে। সোভিয়েত রাশিয়ার সেরা স্পাই মালিক প্যারীতে পৌঁছেছে। আমেরিকান হাসপাতালের বাইরে স্পোর্টসকারে কম্যুনিষ্ট চীনের স্পাইচক্রের পেশাদার খুনী জো জো চ্যাডি ও তার সাকরেদ সাদু মিচেল বসে আছে।

কুং-এর প্রাক্তন রক্ষিতা এরিকা ওলসেনকে পেন্ট্যাথাল ইনজেকশনের দরুণ ঝিমিয়ে রাখা হয়েছে।

মার্কিন ফৌজী সান্ত্রী উইলি জ্যাকসন অটোমেটিক রাইফেল কাঁধে এরিকার ঘরের বাইরে টহল দিচ্ছে।

সিয়ার ডিভিশনাল ডাইরেক্টর জন ডোরি ক্যাপটেন ওহ্যালোর্যানকে ফোন করে—

টিম…মার্ক গারল্যান্ডকে মনে পড়ে?

গারল্যান্ড? ও তো রোসল্যান্ডের হয়ে কাজ করতো তাই না?

ইয়া, ও এখন প্যারীতেই আছে। রু দ্য সুইসে ওর স্টুডিও। এক ঘণ্টার মধ্যে ওকে নিয়ে এসো–

এক সেকেন্ড স্যার, মার্ক গারল্যান্ড মারদাঙ্গায় ওস্তাদ। ও যদি আসতে না চায়—

দুজন ভালো এজেন্ট পাঠাও। এক ঘণ্টার মধ্যে আনতে হবে।খুশী হয়ে ফোন রাখে ডোরি।

মার্ক গারল্যান্ড।

চালু, ঠগ, জোচ্চোর, জীবনে দুটো ধান্দা : মেয়েদের সঙ্গে ভাব করা, আর মালকড়ি কামানো।

 মার্ক গারল্যান্ড!

দুনিয়ার সেরা পেশাদার স্পাই। ডোরির এই ঝামেলাটা মার্ক গারল্যান্ডই সামলাতে পারে। গারল্যান্ড রাজি হবে তো?