গোল রহস্য

গোল রহস্য

 তিনিও এলেন এবং চলে গেলেন। যেমন এর আগে দু-জন এসেছেন ও চলে গেছেন। জুতোর ডগাটা ঠেকাবার চেষ্টা করে বিস্তর গুতো খেয়ে তিনবারই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে হয়েছে। আবার একটা আসছে। এই বাসটায় উঠতে না পারলে অফিসে নির্ঘাত লেট। ছাতাটা বন্দুকের মতো ব্যাগে পুরে পাকা সোলজারের মতো তৈরি হয়ে আছেন। ঠিক সময়মতো, ওয়ান টু থ্রি–একেবারে চার্জ করে ঢুকে যাবেন। বাসটা থামামাত্র তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী ধেয়ে গেলেন। কী আশ্চর্য, বাসটা একেবারেই ফাঁকা যে! অনায়াসে পাদানির ওপর দুটো পা-ই জায়গা পেয়ে গেল। তাঁর বুকটা মহানিশ্চিন্তির একটা হাঁপ ছাড়ল, কনডাক্টর বাস ছাড়ার টিং টিং হুকুম দিয়ে দিল, আর অমনি তড়বড় করে দু-জনের পা মাড়িয়ে, ছাতার বাঁটের টানে একজনের পাঞ্জাবির পকেট ফাঁসিয়ে হরিহরবাবু আবার। নেমে পড়লেন। লোকটা পাগল নাকি! এত কাণ্ড করে উঠে

হরিহরবাবু বাস থেকে নেমেই বাস স্টপে আড্ডারত দুটো ছেলেকে চোখ পাকিয়ে জামার আস্তিন গুটিয়ে ধমক লাগালেন, ছি ছি–সাতসকালে এমন অলক্ষুনে কথা বলে কেউ! বোঝা গেল, এদেরই কোনও একটা কথা শুনে তাঁকে নেমে আসতে হয়েছে।

একটা ছেলে বিমর্ষ কণ্ঠে বলে ওঠে, অলক্ষুনে কথা নয় দাদা। একেবারে সত্যি কথা। কাবুর দাদা আনন্দবাজারের অ্যাকাউন্ট্যান্ট। উনি নিজে বলেছেন, ফুমাঞ্চু আজ খেলবে না।

কেন কেন? হলটা কী তার?

 দারুণ জ্বর। নিউমোনিয়া।

হায় হায় করে ওঠেন হরিহরবাবু। শেষ পর্যন্ত কূলে এসে ভরাডুবি! কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে ফুমাঞ্জুকে বর্মা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। আজই সে প্রথম মাঠে নামবে এবং সবাই জানে যে, ইস্ট বাগানকে অন্তত দুটো গোল সে দেবেই। নাঃ, মোহন বেঙ্গলের লাকটাই খারাপ।

আচ্ছা, এর পেছনে ষড়যন্ত্র নেই তো? হরিহরবাবু হঠাৎ কুটিল হয়ে ওঠেন।

ঠিক বলেছেন দাদা। আমার একেবারে মনের কথাটা বলে ফেলেছেন। সমীরও হরিহরের সন্দেহে সন্দেহ মেশায়।

হরিহরবাবু সমীর আর অপুর সঙ্গে কাফে ডি কেস্টোয় ঢুকে বেঞ্চিতে বসে পড়লেন। মনের এরকম অবস্থায় অফিস করা সাজে না। এখানেই ঘণ্টাদুয়েক কাটিয়ে সাড়ে এগারোটা নাগাদ মাঠের দিকে রওনা হয়ে যাবেন।

দক্ষিণ কলকাতায় হরিহরবাবুর অফিস যাওয়াটা যখন পণ্ড হয়ে গেল, ঠিক সেই সময় তুলকালাম চলেছে উত্তর কলকাতার রমেশ ঘোষাল বাই লেনের পাঁচের-একের-তিনের উঠোনে। ভ্যাবলা ভেউ ভেউ করে কাঁদছে, হাবলা কান ধরে নিল-ডাউন, ভ্যাবলা-হাবলার মা একবার করে ঘরে ঢুকছে আর ছুটে বেরিয়ে আসছে।

দেখ দেখ–এইটা নয় তো?

 তোমার মাথায় কি কোনওদিন বুদ্ধি ছিল? রঘুবাবুর হুংকারে বাড়ি থরথর করে কাঁপছে। হাফপ্যান্টের পা অত লম্বা হয় নাকি? হাফপ্যান্ট মানে জানো?

হাবলা-ভ্যাবলার বাবা খেপে আগুন। তাঁর হাফপ্যান্টটা লোপাট। এ এক অদ্ভুত বাড়ি। এতগুলো লোক রয়েছে, তবু কোনও জিনিসটা যদি ঠিক জায়গায় পাওয়া যায়। দুখানা আলমারি, তিনটে তোরঙ্গ, দুটো আলনা সব উপুড় করে খোঁজা হয়ে গেছে, তবু হাফপ্যান্টটা পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই না, রঘুবাবুর সন্দেহ ক্রমেই ঘোরতর বিশ্বাস হয়ে উঠছে যে, তাঁর হাফপ্যান্টটা দরজিকে দিয়ে কাটিয়ে নিশ্চয় ভ্যাবলাটার ফুলপ্যান্ট বানানো হয়েছে, আর নয়তো ওই নতুন স্টেনলেস স্টিলের গেলাসটা কেনার সময় বাসনউলিকে… রঘুবাবুর গলা চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এক ঝটকায় গেলাসটাকে তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। ওই গেলাসটাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রুর। ওই গেলাসটার জন্যই নিশ্চয় তাঁর সাধের ইস্ট বাগানকে দুর্ভোগে পড়তে হবে।

গেলাসের খনখন শব্দে রঘুবাবুর মা বাতের ব্যথা অগ্রাহ্যি করে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। চশমার লগবগে ডাঁটিটা কানের খাঁজে খুঁজে তিনি মোটা গলায় ধমক লাগালেন, বাড়িটাকে যে একেবারে মেছো পট্টি করে তুলেছিস! ছেলেগুলোর ওপরেও দয়া-মায়া বলে পদার্থ নেই মোটে! বুড়ো খোকার নাচনকোঁদন দেখ একবার। হাফপ্যান্ট হাফপ্যান্ট করে একেবারে হেদিয়ে পড়ল। কী ছিরির চেহারা, হাফপ্যান্ট পরে আরও খুলবে। তা বলি, কচি খোকা হবার আবার সাধ জাগল কেন?

মায়ের ধমকে রঘুবাবু একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুমার বকুনি শুনে হাবলার জলে ভেজা মুখে হাসি ফুটতে দেখে আবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি। হ্যাঁ, সবাই এখন মজা পাচ্ছে আমায় দেখে। সব ঘরের শত্রু বিভীষণ! কেন হাফপ্যান্ট খুঁজছি, সেটা জান?

বলে কেতাত্থ করো, শুনি। মায়ের তবু মন ভেজে না।

এই প্যান্ট, আমার পয়মন্ত প্যান্ট। এই হাফপ্যান্ট পরেই দু-বছর আগে ইস্ট বাগানকে নিশ্চিত হারের হাত থেকে বাঁচিয়ে এনেছি। আর গত বছর খেলার মাঠে যাইনি বলেই ইস্, একেবারে দু-দুটো গোল। না না–এই প্যান্ট আজকে আমার চাই-ই চাই। যেখান থেকে পার নিয়ে এসো। আজ ইস্ট বাগান যদি না জেতে–

এই নে তোর পয়মন্ত প্যান্ট রঘুবাবুর মা তালগোল পাকানো একটা জিনিস ছুঁড়ে দিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন রঘুবাবু–পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে–ভ্যাবলা, হাবলা, ভ্যাবলা হাবলার মা, রঘুবাবু সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাপড়ের ডেলাটার ওপর।

মা যথাস্থানে দাঁড়িয়ে হাফপ্যান্ট হারানোর রহস্যভেদ করে দেন, ওদের কারও দোষ নেই। আমিই ওটাকে ঠাকুরঘরের ন্যাতা করেছিলাম।

হাফপ্যান্টটা পাওয়া গেলেও ন্যাতা হিসেবে সে একেবারেই নেতিয়ে পড়েছে। তার সাদা রং কালো কুটকুটে হয়েছে। সবেধন নীলমণি একটা বোতাম শুধু ঝুলঝুল করছে, তারও অর্ধেকটা ভাঙা, কিন্তু রঘুবাবু বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। হাবলা-ভ্যাবলার মা-কে আদেশ জারি করে দিয়েছেন, এখুনি ফুটন্ত জলে সোডা-সাবান দিয়ে ওটাকে কেচে নাও। তারপর ইস্ত্রি করে শুকিয়ে নিয়ে কটা বোতাম লাগিয়ে দিলেই হল। হাফপ্যান্ট যখন পাওয়া গেছে, ইস্ট বাগানকে আজ ঠেকায় কার সাধ্যি? মোহন বেঙ্গলকে খুব কম করে হলেও দু-দুটো তো ঘোসাবেই!

.

খেলা শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগে লালবাজারের কন্ট্রোল রুম থেকে ফোর্ট উইলিয়ামে ফোন ছুটল। তিন মিনিটের মধ্যে ময়দানে পলটনদের তলব করা হয়েছে। আজ যা ঘটতে চলেছে তা ঠেকাবার সাধ্য কলকাতা পুলিশের বা সিআরপি-র নেই। আজ বোধহয় এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দাঙ্গা বাধবে কলকাতায়। মোহন বেঙ্গল ইস্ট বাগানের রেষারেষি তো আছেই, কিন্তু তা বলে এরকম ঘটনা কেউ কখনও দেখেনি। এমনকী যে মোহন বেঙ্গল দুই-একে জিততে যাচ্ছে, তাদের সমর্থকরাও নিশ্চয় বুকে হাত রেখে বলতে পারবে না, মোহন বেঙ্গল ভালো খেলে জিতেছে। রঘুবাবুর পয়মন্ত হাফপ্যান্ট, ও আরও তিরিশ হাজার মানুষের কারও ঠনঠনে কালীর জবা ফুল, কারও দই-হলুদের ফোঁটা ও কারও বিভূতি বিফল করে সেকেন্ড হাফের তিরিশ মিনিট বাদে পরপর দুটো গোল খেয়ে গেছে ইস্ট বাগান। আর গোল মানে কী, বল দুটো যেন আপন মনে গড়াতে গড়াতে গেলে ঢুকে গেল। রেফারির বাঁশি বাজার পর বল যখন আবার মাঝমাঠে বসানো হচ্ছে, তখন বোঝা গেল, সত্যিই গোল হয়েছে। এমনকী মোহন বেঙ্গলের সমর্থকরা অবধি উল্লাসে ফেটে পড়তে দেরি করেছে। একটা গোলও না-হয় সহ্য করা যেত, ভুল মানুষমাত্রেরই হয়। সুজয় গোলকি হিসাবে ইস্ট বাগানকে অনেক বিপদ থেকে উদ্ধারও করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটা? ছি ছি ছি! রঘুবাবু হলফ করে বলতে পারেন, তাঁর পুঁচকে ভ্যাবলাও বলটাকে রুখে দিতে পারত। কত কাণ্ড করে হাফপ্যান্টটা জোগাড় হল–কিন্তু হাফপ্যান্টের তো দোষ নেই। হাফ টাইম অবধি ইস্ট বাগানই তো জিতছিল এক গোলে এবং সত্যিকার ভালো খেলে। ইস্ট বাগানের দাপটের সামনে কুঁকড়ে গিয়েছিল মোহন বেঙ্গল। চিটিংবাজি–সব চিটিংবাজি! গোলকিকে ঘুষ খাওয়ানো হয়েছে–এ ছাড়া এরকম অঘটন ঘটতেই পারে না। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল একেবারে! জ্বরের রুগি ফুমাঞ্চু পুঁকতে ধুঁকতেও দুটো গোল ঢুকিয়ে দিয়েছে।

ইস্ট বাগানের সুজয়, কলকাতার মাঠের সেরা গোলকি যে ঘুষ খেয়ে দু-দুটো জোলো বল গোলে ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেটা একেবারে প্রমাণ হয়ে গেল খেলা ভাঙার আড়াই মিনিট আগে। ইস্ট বাগানের তিরিশ হাজার সমর্থক তখন মিলেমিশে একটা বুভুক্ষু রক্তচোষা দৈত্যের দেহ ধারণ করছে। খেলাও শেষ হবে আর দৈত্যটাও ঝাঁপিয়ে পড়বে। তিরিশ হাজার মানুষের ষাট হাজার চোখ সুজয়ের ওপর। কিন্তু সুজয় সবাইকে একেবারে ভেলকি দেখিয়ে দিল। খেলা শেষ হবার আড়াই মিনিট আগে হঠাৎ সে মাঠ ছেড়ে সোজা দৌড় লাগাল টেন্টের দিকে। ব্যাপারটা বোঝার আগেই পুলিশ মিলিটারি তাকে ঘিরে ধরে মাঠের বাইরে নিয়ে চলে গেল। এইভাবে কোনও জানান না দিয়ে, গোল ফাঁকা রেখে কেউ মাঠ ছেড়ে চলে যেতে পারে? আজ অবধি ইস্ট বাগান-মোহন বেঙ্গলের ইতিহাসে এরকম ঘটনা ঘটেছে কোনওদিন? যে এতখানি দায়িত্বজ্ঞানহীন, তার পক্ষে ঘুষ নিয়ে টিমকে হারানো তো খুবই সহজ ব্যাপার।

সুজয়কে ধরতে না পারার রাগটা পুষিয়ে নিয়েছে সমর্থকেরা নিজেদেরই টেন্টে আগুন দিয়ে। যেন ভাই বেইমানি করেছে বলে দাদা নিজের ঘরই পুড়িয়ে দিল।

কলমটা রেখে অভিরূপ মুড়ির ঠোঙাটা তুলে নিল। খবরের কাগজের প্রেস রুমটা খাঁ খাঁ করছে এখন। শুধু টেলিপ্রিন্টার যন্ত্রটাই মাঝে মাঝে কটকটে গলায় আপন মনে একবার করে একটু বক্তৃতা দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে। অভিরূপের আজ নাইট ডিউটি। কিছুক্ষণ আগে অবধি বিকেলের অঘটন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলেছে। খেতে যাওয়াটাও হয়ে ওঠেনি। মুড়ি চিবিয়েই কাটাতে হবে রাতটা। অভিরূপের হয়েছে সত্যিকার জ্বালা। সুজয় তার অনেক দিনের বন্ধু। ঘুষ নেবার ছেলে সুজয় নয়। তবু নিজের চোখকেও অবিশ্বাস করতে পারে না অভিরূপ। কাউকে বোঝানো যাবে না, কী করে ওইরকম গোল খেতে পারে সুজয়। কোনও ফার্স্ট ডিভিশন… নাঃ, ভেবে আর লাভ নেই, রিপোর্টটা শেষ করা দরকার। ঠোঙাটা টেবিলে রেখে কলমটা সবে হাতে নিয়েছে, ম্লান কণ্ঠে টেলিফোনটা ডাক দিল।

হ্যালো

প্রেসরুম? অভিরূপবাবুর ফোন।

কথা বলছি।

হ্যালো, অভিরূপ বলছিস?

 হ্যাঁ।

আমি সুজয়। কোনও ভয় নেই, আমি নিরাপদেই আছি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। আমি শুধু একটা কথা জানাব বলে ফোন করছি। আচ্ছা, তুইও কি বিশ্বাস করছিস যে, আমি ঘুষ খেয়েছি?

না, মানে তা নয়, কিন্তু কিছুই তো

বিশ্বাস কর অভিরূপ, ঘুষ আমি খাইনি। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু ঘুষ খাওয়ার নয়। কে কী মনে করে আমার সম্বন্ধে, তাতে কিছু যায়-আসে না। তুই ভালো করেই জানিস, আমি সেইভাবে পয়সার কাঙাল নই।

কিন্তু কী করে তুই এরকম– অভিরূপ জানে, এখন এ কথাটা না বললেই বন্ধুর মতো হত। কারণ ইস্ট বাগানের সমর্থকদের হাতে পড়লে সুজয়কে আর বাঁচানো যাবে না। তবু জিজ্ঞেস না করে পারে না।

আরে, সেইটা বলব বলেই তো ফোন করা। কেন ওভাবে গোল খেলাম, জানিস? একসঙ্গে দুটো বল দেখেছিলাম।

কী? কী বললি? দুটো বল? কী বলছিস তুই? কিছুই বুঝতে পারছি না।

 বিশ্বাস কর বা না কর আমি একসঙ্গে দুটো করে বল দেখেছি। সবসময় নয়, হঠাৎ হঠাৎ। হাফ টাইমের আগে যখন দেখেছিলাম, গোলটা খাইনি, কারণ আসল বলটার দিকে নজর দিয়েছিলাম। আর এই দুটো গোল যে খেয়েছি, তার কারণ ওই দুটো বলের মধ্যে আসল বলটাকে চিনতে পারিনি।

অভিরূপ আর বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না। বেশ বিরক্ত হয়েই বলে, তোর এইসব গাঁজাখুরি গল্প কেউ বিশ্বাস করবে না। এ কখনও হতে পারে?

সুজয়ের কিন্তু কোনও বিকার নেই। সে দৃঢ় গলায় দাবি করে, কেউ বিশ্বাস করবে না জানি। আমি নিজেও তো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। ঠাকুর-দেবতায় বিশ্বাস থাকলে না হয় ভেবে নিশ্চিন্ত হতাম, তাঁরই লীলা বলে। থাক গে, কী আর করা যাবে, তুইও যখন–

অভিরূপ তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, কোথায় আছিস তুই?

 সে কথা জেনে আর কী হবে বল?

না, আসলে তোর খুব সতর্ক হয়ে থাকা দরকার। বুঝতেই তো পারছিস। আচ্ছা, তোর চোখটাখ খারাপ…।

আমার চোখের জ্যোতি ও মাথার বুদ্ধি–দুটোই তোর থেকে বেশি! বুঝলি?

খটাস করে ফোনটা ছেড়ে দিল সুজয়। অভিরূপ রিসিভারটা তখনও নামায়নি, পায়ের শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকাল। ফোটোগ্রাফার রায়চৌধুরী মুখ চুন করে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

রিসিভারটা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল অভিরূপ, কী হে রায়চৌধুরী, ব্যাপার কী?

রায়চৌধুরী টেবিলের ওপর একটা খাম ফেলে দিয়ে ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ল। আমার শুধু পাগল হতে বাকি আছে। তিন ঘণ্টা ধরে শুধু একটা নেগেটিভ দেখছি আর প্রিন্ট করছি!।

ব্যাপারটা তো কিছুই বুঝছি না।

 বোঝার আর কী আছে? খামটা খুলে দেখ, তাহলেই বুঝবে।

অভিরূপ খামটা খুলতেই তিন-চারটে ছবি আর একটা নেগেটিভ বেরিয়ে পড়ল। আজকের খেলার মাঠের ছবি। ফোটোটা চোখের কাছে তুলেই যেন বিদ্যুতের ঝিলিক লাগল সারা শরীরে। জালের কাছে একটা জটলার ছবি। ফুমাঙ্কুর পায়ে একটা বল, আর একটা বল ঠিক তারই কিছুটা ডান দিক চেপে। দুটো বল! সঙ্গে সঙ্গে অভিরূপের মনে পড়ে গেল সুজয়ের কথা। সে-ও দুটো বল দেখেছে। ভুরু কুঁচকে আরেকবার মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখল অভিরূপ, তারপর খাম থেকে নেগেটিভটা টেনে নিয়ে উঁচু করে আলোর সামনে ধরল।

রায়চৌধুরী বিষঃ গলায় বলে উঠল, দেখার কিছু নেই। সত্যিই দুটো বল ধরা পড়েছে। ক্যামেরার চোখে।

ছবিটা তো তুমিই তুলেছ, তখন দেখতে পাওনি? অভিরূপ প্রশ্ন করে।

না। তবে সেটার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। ফোটোগ্রাফাররা খুব যান্ত্রিকভাবে এইসব অ্যাকশন শট নেয়। আগের থেকেই সব রেডি করা থাকে, শুধু সুযোগ ও সময়মতো শাটার টেপা।

কিন্তু আমি তো ভাবতেই পারছি না, এ কী করে সম্ভব! সুজয় তো তাহলে ঠিকই বলেছে। কিন্তু আমরা যদি এই ছবি ছেপেও দিই, তবু কি কেউ বিশ্বাস করবে? বলবে গাঁজাখুরি। খবরের কাগজের কারসাজি। অভিরূপ রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়ে।

রায়চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, এই ছবি কাল ছাপতেই হবে, না হলে আমি রিজাইন করব। যে কোনও বিজ্ঞানী, ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট টেস্ট করে দেখতে পারে নেগেটিভ। শুধু একটা নয়–দু-দুটো নেগেটিভে এইরকম দুটো বলের ছবি উঠেছে।

রায়চৌধুরী রেগে পা ঠুকতে ঠুকতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে রইল অভিরূপ। এখন উপায়? হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, রায়চৌধুরী মোহন বেঙ্গলের একেবারে কট্টর সাপোর্টার। সেই জন্যেই সে সারাক্ষণ ইস্ট বাগানের গোলপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। মোহন বেঙ্গলের সাপোর্টার হয়েও সুজয়ের দুটো বল দেখার কথাকে সমর্থন করার জন্যে বুজরুকি করবে–অসম্ভব–অকল্পনীয়।

অভিরূপ মনস্থির করে ফেলল, ওই দুটো বল দেখার কাহিনি ছবি সমেতই কালকের কাগজে ছেপে দেবে।

.

খবরের কাগজের ভ্যান ভোর ছটা নাগাদ দৈনিক বার্তাবহকে কলকাতার বিভিন্ন কেন্দ্রে পৌঁছে দিল আর তার দু-ঘণ্টার মধ্যে মধ্য কলকাতার দৈনিক বার্তাবহর অফিসের কোনও জানালার একটি শার্শিও আর অটুট রইল না। আবার নতুন করে দাঙ্গা লাগার উপক্রম। হাজার হাজার মানুষ হাজার রকমের মতামত নিয়ে জমা হয়েছে। একদিকে তাদের নিজেদের মধ্যে চুলোচুলি, অন্যদিকে দৈনিক বার্তাবহর প্রতি আক্রোশ। এইরকম একটা ঘটনা নিয়েও খবরের কাগজের মুনাফা লোটার মনোভাব বরদাস্ত করা যায় না। চল্লিশ পয়সা দামের দৈনিক বার্তাবহর দাম উঠেছে দশ টাকা।

অবস্থা একেবারে আয়ত্তের বাইরে চলে যাবার উপক্রম। অভিরূপের প্রায় হাত কামড়ানোর দশা। কী কুক্ষণেই যে খবরটা ছেপেছিল! এইরকম সময়ে হঠাৎ একটা টেলিগ্রাম এসে পৌঁছাল। দীর্ঘ টেলিগ্রাম। বিরক্ত হয়েই টেলিগ্রামটা খুলেছিল অভিরূপ, কিন্তু তারপরেই চমকে উঠল। চশমা লাগিয়ে ঝুঁকে পড়ল টেলিগ্রামের ওপর

ডিয়ার স্যার। গোলকিপার সুজয় সত্যিই দুটো বল দেখেছিল। ফোটোগ্রাফারের ছবিতেও সেই বল দুটোই ধরা পড়েছে। সুজয়ের কোনও দোষ নেই। এর জন্য আমিই দায়ী। দয়া করে মার্জনা করে দেবেন আমাকে। দশ বছর আমি দেশছাড়া। পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণার ফাঁকে ছুটি পেয়ে দেশে এসেছিলাম। আমরা তিন পুরুষ মোহন বেঙ্গলের সাপোর্টার। পুরানো টিমকে যদি সাহায্য করতে পারি–এই ভেবেই কাণ্ডটা করে ফেলেছি। বুঝতেও পারিনি যে, এখন ইস্ট বাগান-মোহন বেঙ্গলের খেলা নিয়ে এইরকম কাণ্ড হয়। যা-ই হোক, এবার দুটো বল দেখার রহস্যটা ভেদ করে নিই। আমি লেজার রশ্মি নিয়ে গবেষণা করছি। আপনারা হয়তো লেজার রশ্মির বিস্ময়কর ক্ষমতার কথা শুনেছেন। পেনসিল টর্চের আলোর মতো সরু একটা লেজার রশ্মি পাঠিয়ে মহাকাশযানকে খতম করে দেওয়া, বাড়িঘর বা ধাতব বস্তু ইত্যাদি পুড়িয়ে দেওয়ার অনেক গল্পই আজকাল সায়েন্স ফিকশনে লেখা হচ্ছে। এই লেজার রশ্মির বিশেষ একটি ধর্মকে কাজে লাগিয়ে আজকাল এক ধরনের ছবি তোলা হয়, তার নাম হলোগ্রাম। আমরা সাধারণত যেসব ফোটো বা সিনেমা দেখি, সেগুলো দ্বিমাত্রিক, অর্থাৎ সেই ছবি থেকে বস্তুর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থই শুধু বোঝা যায়, বস্তুর গভীরতা টের পাওয়া যায় না। কিন্তু একটি বস্তুর যাবতীয় তথ্য রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় হলোগ্রামের ফলকে মুদ্রিত থাকে। তার মানে হলোগ্রাম হল বস্তুর ত্রৈমাত্রিক চিত্রের নেগেটিভ। এই হলোগ্রামের ওপর আলো ফেললে নির্গত আলো ওই বস্তুটির ত্রৈমাত্রিক প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে। সবচেয়ে মজার কথা হল, এই প্রতিবিম্ব কোনও পরদার ওপর ফেলার দরকার হয় না। এটা শূন্যের মধ্যেই দেখা যায় এবং এই বাস্তব প্রতিবিম্বের ছবি ক্যামেরাতেও ধরা পড়ে। হলোগ্রামের প্রতিবিম্বর আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে। ধরুন, একটা মোটর গাড়ির হলোগ্রাম তোলা হল। এবার আপনি একটা দৃষ্টিকোণ থেকে মোটরগাড়ির সামনেটা দেখতে পারেন, আবার দৃষ্টিকোণ পালটালে মোটরগাড়ির পাশে দরজার দিকটাও দেখতে পারেন। অর্থাৎ আসল মোটরগাড়িটাকে ঘুরে ঘুরে দেখলে যেমন দেখায়, তেমনি দেখায় এই হলোগ্রামের প্রতিবিম্বেও। যাক গে, এ বিষয়ে আপনারা যে কোনও পদার্থবিদের কাছে বিশদভাবে জেনে নিতে পারবেন। আসল কথাটা এবার বলি। আমি খেলার মাঠে এসেছিলাম একজন প্রেস ফোটোগ্রাফারের কার্ড জোগাড় করে। সঙ্গে ছিল ফুটবলের একটা হলোগ্রাম এবং হলোগ্রামের প্রতিবিম্ব দেখাবার উপযুক্ত প্রোজেক্টার ইত্যাদি। গোলকিপারের সামনে এমন একটা জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, যাতে মাঝে মাঝে হলোগ্রামের বলের প্রতিবিম্ব দেখিয়ে গোলকিপারকে ধাঁধা লাগিয়ে দেওয়া যায়। সুজয় যে গোল দুটো খেয়েছে, তার কারণ এইটাই। আমি আজকের ফ্লাইটেই কলকাতা ছেড়ে যাচ্ছি, আর খেলাটা যাতে আবার অনুষ্ঠিত হয়, তার জন্যে আইএফএ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কাছে হলোগ্রামটি সমেত আমার স্বীকারোক্তি পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করি এরপর সুজয় এবং আপনারা দুর্ভোগের হাত থেকে রেহাই পাবেন।–ক, বা.

অভিরূপ টেলিগ্রামটা তিনবার পড়ে আবার চতুর্থবার পড়ার জন্য মুখ নিচু করল।

[প্রথম প্রকাশ: কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, ১৯৮০]

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *