১. ঝন্টুমামার দেড় হাত

ঝন্টুমামার কাণ্ড – উপন্যাস সিদ্ধার্থ ঘোষ  

০১. ঝন্টুমামার দেড় হাত

অনেকদিন ঝন্টুমামার দেখা নেই। নিলয়ই কথাটা পাড়ল, কী রে, যাবি নাকি একবার চক্রবেড়িয়ায়?

-তা গেলেই হয়।

–যেতে চাস তো আজই চল্। না হলে ঝন্টুমামা হয়তো চান্স পেয়ে যাবে বলার, ঘুরে। এলাম একটু। ওই তোমাদের অলিম্পিক গেমস দেখতে আর কী!

এতদিন ধরে ঝন্টুমামার সঙ্গে মিশেছি, তবু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না, ঝন্টুমামা কখন গুলপট্টি মারে আর কখন সত্যি কথাটা বলে। মাঝে মাঝে ওঁর কথা শুনলে ব্ৰহ্মতালু অবধি বিদ্রোহ করে। মনে হয় এমন হামবড়া, আত্মম্ভরী লোক… আবার কখনও মনে হয়। ঠিক উলটোটা। তা লোকটার যতই গুণ থাকুক, আমাদের বড় নাস্তানাবুদ করেন।

–শোন্, নিলয়। বলছিস যখন চল, কিন্তু ঝন্টুমামাকে আজ একটু মানে

–একটু টাইট দিতে পারলে হত, তা-ই তো?

–ঠিক বলেছিস। মাথায় একটা বুদ্ধিও এসেছে। যেতে যেতেই বলব তোকে।

 তেজপাতা গাছের ছায়া মাড়িয়ে ৩৭ নম্বর চক্রবেড়িয়া স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছালাম। সদর দরজা খোলাই ছিল। তার মানে ঝন্টুমামা আছেন। পুরানো আমলের বাড়ি, চৌকাঠের পর দু-ধারে দুটো ঘর পেরিয়েই সামনে উঠোন, তার তিন ধারে বারান্দা। ঝন্টুমামার বিখ্যাত গবেষণা তথা ড্রয়িং তথা শোয়ার ঘর বারান্দার দক্ষিণ পারে। দুপুরবেলাতেও পায়রাদের বকম বকমের বিরাম নেই। ঝন্টুমামা বলে, ওরা নাকি এ বাড়ির আদি বাসিন্দাদের ডিরেক্ট বংশধর। দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে পা রেখে কোনওদিকে আর তাকাবার উপায় রইল না। অর্থাৎ বিশেষ একদিকে তাকাতে বাধ্য হলাম। আদিদাস দেখি টুলে চড়ে দণ্ডায়মান।

সাড়ে তিনমনি আদিদাস যে হাত দুটো মুঠো করলেই পেশি দিয়ে শক্তিরা বয়ে যায় তরঙ্গ তুলে–সে কিনা স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ! ভবানীপুরশ্রী, ব্যায়ামবীর চম্পককুমারের এই দশা বছর পাঁচেক আগেও কেউ চিন্তা করতে পারত না। কিন্তু ঝন্টুমামার শাগরেদ হবার ইচ্ছায় সে গুরুর সব অত্যাচারকে আদেশজ্ঞানে শিরোধার্য করছে।

নিলয় বলল, কী হে, কী অপরাধে এমন শাস্তি?

শাস্তি হবে কেন! কাজ করছে।-ঝন্টুমামার গলা শুনে চমকে উঠলাম। তাকিয়ে দেখি, ঘরের ছাতের কাছে একটা মাচার ওপর তক্তপোশে শুয়ে আছেন। এটা নতুন সংযোজন। বুঝলাম, যন্ত্রপাতির যা আবর্জনা নিচে জমেছে (ঝন্টুমামা অবশ্য বলেন–এটা মিউজিয়াম), তাতে আর বাস করা যাচ্ছে না।

দমকলের হেড অফিসের ব্যবস্থার মতো চকচকে একটা রড বেয়ে সাঁ করে নেমে এলেন ঝন্টুমামা। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে লক্ষ করলাম, ভিজে খবরের কাগজ ঘষে দেয়ালে টাঙানো প্রায় সাত ফুট লম্বা একটা ছবির কাঁচ সাফ করছে আদিদাস। দু-পা কাছে এগিয়ে গিয়ে আমি শুধু আড়চোখে নিলয়ের দিকে একবার তাকালাম। কারণ, এটাকে ছবি বলার কোনও কারণ নেই। এটি একটি অতি সুদৃশ্য কিন্তু সুন্দর ছবির ফ্রেম মাত্র। কাঁচও আছে, কিন্তু ছবি নেই।

ঝন্টুমামা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পাচ্ছি না। কোথাও পাচ্ছি না। এই ঊনবিংশ শতাব্দীর সোনালি কারুকার্যময় লাখ টাকার ফ্রেমে রাখার মতো কোনও বাঙালির মুখ খুঁজে পাচ্ছি না।

-ঊনবিংশ শতাব্দীর এমন কোনও বাঙালি নেই…

–আহা, থাকবে না কেন, নিশ্চয় আছে–কিন্তু আমার যারা আইডিয়াল তাদের ছবি কেউই আঁকেনি বা ফোটো তোলেনি।

নিলয় নিশ্চয় প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল। আস্তে করে টিপে দিলাম, এখন এসব নিয়ে কথার পিঠে কথা বলা মানেই ঝন্টুমামার ট্র্যাপে পা দেওয়া। কোত্থেকে শুরু করে শেষে কোথায় গিয়ে তিনি আমাদের ঠেকাবেন বা ডোবাবেন, কেউ বলতে পারে না।

ভাঙা ব্যাটারি টেনে বসে পড়ে নিলয়কে বললাম, কীরে, সন্দেশের প্যাকেটটা আর কখন। খুলবি?

নিলয় লজ্জিত মুখে, থতমত খেয়ে বলল, ওহ হো, তা-ই তো! ঝন্টুমামা, আসুন, আসুন। আদিদাস, শিগগির। জুড়িয়ে যাবে।

ঝন্টুমামা ইচ্ছা-বধিরতার মন্ত্র জানেন। সব কথা কানেই ঢোকে না। সন্দেশ জুড়িয়ে যাবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। আদিদাস টুল থেকে নামতেই তাকে বললেন, আগে ওটা ঘরের বাইরে রেখে এসো।

টুল রেখে আসতে আসতেই সব ফাঁক। আধখানা ভাঙা সন্দেশ পেয়েছে আদিদাস। ঝন্টুমামা বললেন, যাও, জল নিয়ে এসো। তোমার যা শরীর, বেশি। শুগার গ্রহণ না করাই ভালো। বয়সকালে রোগ হবে।

জল খেয়ে ঝন্টুমামা উইলিস জিপের পেছন থেকে নামানো লম্বা সিটে পা তুলে দিলেন। ডান হাতটাকে ত্রিভুজের মতো করে তার ওপর মাথার ভার রেখে আমাদের দিকে ফিরে কাত হয়ে শুয়েছেন। নিমীলিত নেত্র।

এবার আমরা শুরু করলাম আলোচনা। ঝন্টুমামার কথা বেবাক বিস্মরণ হয়ে গেছি দু জনেই। কথার পিঠে কথা। শান্ত গলায় তর্ক চলতে লাগল।

-যাঃ, কী যে বলিস, কোনও মাথামুন্ডু হয় না।

–কেন কেন? ভুলটা কী বলেছি শুনি?

–ভুল স্বীকার না করলে তো তোকে আহাম্মক বলতে হবে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি যে, এতদিন একজনের সঙ্গে মেশার পরেও মানুষ কী করে…

তার মানে তুই বলতে চাস, ঝন্টুমামা গল্প লিখতে পারেন না?

–লিখতে পারেন কি না, সে তো পরের কথা, কিন্তু তার আগে বল, কেন লিখবেন? কোন দুঃখে

–ও, লোকে তাহলে শুধু দুঃখ পেলেই গল্প লেখে বুঝি?

নিলয় এবার তীব্রবেগে মাথা নেড়ে জানাল, ঝন্টুমামা আলোগ্রাফার। আলোছায়া নিয়ে তাঁর কারবার। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি বৈজ্ঞানিক। খামকা গল্প লিখতে যাবেন কেন?

যাকে শুনিয়ে শুনিয়ে এত কথা, তেনার কিন্তু কোনও বিকার নেই। পকেটওয়ালা লুঙ্গি পরে পা ছড়িয়ে বসে মুনিঋষির মতো নিবিষ্ট মনে হাসেলব্লাড ক্যামেরার লেন্স সাফ করছেন টিস্যু পেপার দিয়ে। কিন্তু আজ আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। ঝন্টুমামাকে নিজের মুখে স্বীকার করতেই হবে যে তিনি সবজান্তা নন–গল্প লেখার ব্যাপারটা তাঁর আসে না।

ও! বৈজ্ঞানিকরা তাহলে তোর মতে গল্পটপ্পর ধার ধারে না? আচ্ছা, জগদীশ বোসকে কি তুই বিজ্ঞানী বলে স্বীকার করিস?

–এ কথার মানে?

–মানে তো স্বচ্ছ। জগদীশচন্দ্রও গল্প লিখেছিলেন, সায়েন্স ফিকশন।

–সে তো জে বি এস হালডেন, অ্যাসিমভ, ক্লার্ক –

তাহলে সায়েন্স ফিকশন তোর কাছে সাহিত্য নয়?

–না, তা বলছি না।

–এসো বৎস, পথে এসো। এবার বল, তাহলে ঝন্টুমামাই বা সায়েন্স ফিকশন লিখতে পারবেন না কেন?

ঝন্টুমামাকে দেখে মনে হচ্ছে না, এ অবধি একটা কথাও তাঁর কানে ঢুকেছে। তবে কি টোপ খাবেন না বলেই উনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন!

–আসলে, আমার ধারণা, ঝন্টুমামা ইচ্ছে করেই লেখেন না। উনি জানেন, আজকাল কেউ জ্ঞান শুনতে চায় না। অথচ ঝন্টুমামার চরিত্র অনুযায়ী তাঁর লেখাতেও নিশ্চয় ওই মানবিক ব্যাপারস্যাপার, দুষ্টের দমন ইত্যাদি নীতিকথা এসে পড়বেই।

-সরি। মানা গেল না। যার কথাই লেখ–সে ভূতের হোক, কি স্কটল্যান্ডের টিকটিকির বা গ্রহান্তরের শুড়ওয়ালাদের, প্রথমেই সেটার গল্প হয়ে ওঠা চাই। আর গল্প যে কীসে ভালো হয়, সে সমস্যাটা…

–সমস্যাটা দেড় হাতের।

অতঃপর ঝন্টুমামা হঠাৎ আমাদের আলোচনায় প্রবেশ করলেন। কিন্তু উৎফুল্ল হয়ে ওঠার সুযোগ পাইনি। নিজেরাই এখন প্যাঁচে পড়েছি। কয়েক মিনিটের নীরবতার পরেও দেড় হাতের সঙ্গে গল্পের এস্থেটিক্সের কোনও সম্পর্ক খুঁজে পেলাম না। এদিকে হাসেলব্লাড ব্যাগের মধ্যে অন্তর্ধান করেছে। অবিলম্বে নতিস্বীকার না করলে হয়তো পুরো পরিকল্পনাটাই বানচাল হয়ে যাবে।

–ঝন্টুমামা, কিছু বললেন?

শুনতে না পাওয়ার ভান করেও কিছুই সামলানো গেল না। ঝন্টুমামা এবার গলা চড়িয়ে কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, হ্যাঁ, বলছি যে সমস্যাটা দেড় হাতের।

এবার পুরোপুরি সারেন্ডার। ঝন্টুমামা, যদি ব্যাপারটার ওপর কিঞ্চিৎ আলোকপাত করেন…

তাল গাছে চড়ে রস সংগ্রহ করতে দেখেছ? কলসি বেঁধে রাখে। তারপরে সেই কলসিতে রস জমলে পেড়ে আনে। তাল গাছে চড়া তেমন কিছু শক্ত কাজ নয়। মানে প্রথম চোটে তেমন অসুবিধে হয় না। কিন্তু গাছের মাথার দিকে শেষ দেড় হাত–ওই সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে যারা…

-না ঝন্টুমামা, এবার আর আপনাকে ছাড়ব না। নিশ্চয় গল্প লিখছেন আপনি। না হলে এত প্রাঞ্জলভাবে কখনওই বোঝাতে পারতেন না।

-লিখি মানে, একটা এসএফ একবার…

–কোথায় বেরিয়েছিল গল্পটা, মানে প্রকাশিত…

শেষে কি তীরে এসে তরি ডুববে? নিলয়কে ধমকে থামিয়ে দিলাম, চুপ করতো। গল্পটা শুনব, না তার ইতিহাস, ভূগোল নিয়ে যত কচকচানি। বলুন ঝন্টুমামা।

ঝন্টুমামা শুরু করলেন।

জীববিজ্ঞানী বিএলবি, অর্থাৎ বনোয়ারিলাল বনার্জির মেজাজটা আজ বড়ই শরিফ। প্রচণ্ড গরমে কলকাতা গত সাত দিন ধরে নাগাড়ে ঘামছে। আর ঠিক এই সময়েই বনার্জির সাবানটা গিয়েছিল ফুরিয়ে। প্রতিদিনই স্নান করার সময়ে ভাবতেন, বেরিয়েই ভজাকে ডেকে বলে দেবেন একটা সাবান এনে রাখার জন্য। কিন্তু তারপরেই বিস্মরণ (ভালো বিজ্ঞানীর লক্ষণ)। শেষ পর্যন্ত নিজেই কিনে এনেছেন কাল। সেটাও অবশ্য খেয়াল ছিল না, সিগারেটের প্যাকেট খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ পকেট থেকে বেরিয়ে না পড়লে আজও সাবান মাখা হত না। বাথরুমে তেল, মাজন ও দাড়ি কামাবার সরঞ্জামের পাশে সাবানটাকে রেখে আসতে দেরি করেননি তিনি।

কলটা খুলে সাবানের মোড়কটা ছিঁড়েই চমকে গেলেন বনার্জি। এ কী কাণ্ড! সাবানের যে ক্ষতবিক্ষত দশা। এরকম হল কী করে? তাড়াতাড়ি মোড়কটা তুলে পরীক্ষা করতেই চোখে পড়ল কাগজটাও জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। আবার খুঁটিয়ে দেখলেন সাবানটা। বেশ কয়েকটা গভীর আঁচড়ের দাগ। খোবলা-খোবলা হয়ে আছে। আর একটা পাশ যেন পুরো চিবিয়ে ফেলেছে কেউ। বনার্জি বুঝলেন, খুব ধারালো দাঁতওয়ালা কোনও প্রাণীর কারবার। কিন্তু বাথরুমে সেরকম প্রাণী কি থাকতে পারে?

ভজা বলে হাঁক ছাড়লেন। শুনতে পায়নি বোধহয়। দ্বিতীয়বার ডাকতে গিয়ে মনে হল, এখুনি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে আসবে। ভাববে, বনার্জি আরশোলা দেখে ঘাবড়ে গেছে। লোকটাকে কিছুতেই বোঝানো গেল না যে এটা ঘাবড়ে যাবার ব্যাপার নয়। ও যদি জানত, আরশোলা কত রকমের ডিজিজ ট্রান্সমিট করে তাহলে… শুধু তা-ই নয়, আহত আরশোলা আবার ফ্লায়িং টাইপ-সাঁ করে বেমক্কা এমন…।

শিউরে উঠলেন বনার্জি, তারপরেই বুঝতে পারলেন, নাঃ, টিকটিকির ডাক। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, টিকটিকিটাও কাণ্ডটি বাধিয়ে থাকতে পারে। আরেকবার নিরীক্ষণ করলেন সাবানটাকে। নিশ্চিত হতে পারেননি। আঁচড়ের দাগগুলোর আকার দেখে মনে হয় না যে টিকটিকির পক্ষে…

স্নানে ইস্তফা দিয়েই বেরিয়ে পড়তে হল। ভজাকে বলে এসেছেন, ফিনাইল ও কার্বোলিক অ্যাসিড ঢেলে বাথরুমটা যেন পরিষ্কার করে রাখে। তা ছাড়া আরশোলা, টিকটিকি, মাকড়সা সব ঝেটিয়ে বিদেয় করে দেওয়া চাই।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। ভজা টেবিলের ওপর তারের জাল চাপা দিয়ে খাবার রেখে শুতে গেছে। হাত ধুতে বাথরুমে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন। ঝকমক করছে। মেঝে, দেওয়াল, বেসিন, বালতি। ডিঙি মেরে দেখলেন, তাকের ওপরেই আছে সাবানটা। আর কোনও ক্ষতি হয়নি। যাক! সন্তর্পনে দু-আঙুলে ধরে পোকায় খাওয়া সাবানটাকে জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিলেন। নতুন সাবান কিনে এনেছেন তিনি।

পরের দিন এসব আর কিছুই মনে ছিল না। বনার্জির দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল, এটা কোনও বিদঘুটে পোকার কীর্তি। কিন্তু বাথরুমে ঢুকেই চক্ষুস্থির। নতুন সাবানটাও আক্রান্ত। এবং ঠিক একইভাবে। বনার্জি অবশ্য কালকের মতো ভয় পাননি। এবার তাঁর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল জেগেছে। ভাগ্যিস লোডশেডিং হয়নি! আলো জ্বেলে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস নিয়ে তিনি অনুসন্ধানে নামলেন।

কিছুই লাভ হল না। নতুন কোনও তথ্য উদঘটিত হয়নি। সাবানের ওপর নখ বা দাঁতের ক্ষতচিহ্ন যথা পূর্বং। তবে মনে হচ্ছে, একটু বেশি পরিমাণে খেয়েছে। না খেলে তো গুঁড়ো গুড়ো বা ফালি ফালি সাবান আশপাশে পড়ে থাকত।)

বনার্জি স্থির করলেন, একটা সাবান রাখার বাক্স কিনতে হবে। বর্তমানে টিনের খোপে সাবান রাখা হয়। তার ঢাকনিটা বহুদিন আগেই উধাও হয়ে গেছে। সাবানটাকে তিনি ফেললেন না।

অফিসে গিয়ে কেমিক্যাল হ্যান্ডবুক খুলে বসলেন বনার্জি। কী কী রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে সাবান তৈরি হয়, জানতে হবে। স্টিয়ারিক, পামিটিক ও ওলিয়িক অ্যাসিডের সোডিয়াম ও পটাশিয়াম সল্টের মিশ্রণ থেকেই তা তৈরি হয়। হাইড্রোলিসিস প্রক্রিয়ায় চর্বির ওপর সোডিয়াম বা পটাশিয়াম হাইড্রক্সাইডের বিক্রিয়াকে কাজে লাগানো হয়। সশব্দে বইটা বন্ধ করে ফেললেন বনার্জি। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। জীব বা কীটপতঙ্গ জগতের পক্ষে বিশেষভাবে লোভনীয় কোনও কিছুর হদিশ মেলেনি। অবশ্য সাবানের সঙ্গে সিট্রোনিল, সিনামন বা ল্যাভেন্ডার অয়েল ইত্যাদি সুগন্ধিও মেশানো হয়। কিন্তু তাতেও সমস্যার কোনও সুরাহা হল না।

সারাদিন অফিসের কোনও কাজে মন বসল না। মনটা ছটফট করছে বাড়ি ফেরার জন্য। সাবান ও সাবানদানি কিনে বাড়ি ফিরেই সোজা ঢুকে গেলেন বাথরুমে। পুরো সাবানটাই উধাও।

নতুন সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে সেটাকে সাবানদানিতে রেখে ভালো করে ঢাকনাটা টিপে আটকে দিলেন। যে-ই দুষ্কর্মটা করুক, এবার নিশ্চয়

রাত্তিরের খাওয়া শেষ করে টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে এরকিউল পোয়ারোর মৃত্যুর কাহিনি পড়বেন বলে কার্টেন উপন্যাসটা সবে হাতে নিয়েছেন… ঝনঝন শব্দে চমকে গেলেন। সেই বাথরুম থেকে…

একা যেতে সাহস পেলেন না। ভজাকে ঢেকে আনলেন। বাথরুমের দরজা খুলে দেখেন তেলের শিশি মেঝেয় পড়ে খানখান। টুথপেস্টের টিউব, দাড়ি কামাবার বুরুশ গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সাবানদানিটার ঢাকনা খসে পড়েছে মেঝের ওপর। তাড়াতাড়ি সাবানটা হাতে তুলে নিয়ে বনার্জি দেখলেন, দুষ্কৃতকারী কামড় বসাবার সুযোগ পায়নি।

ভজা বলল, এ শালা নিশ্চয় কোনও বিল্লির কাজ। ওই জানলার শিক গলে ঢুকেছিল।

বেড়াল? বেড়াল সাবান খাবে কেন? এবং খাওয়া বলে খাওয়া–তেড়েফুঁড়ে খাওয়া, রোজ খাওয়া, হামলা করা… কিন্তু এসব কথা ভজাকে বলে লাভ নেই।

ভজা ইতিমধ্যে পুরানো জানলার পাল্লাটা টেনে বন্ধ করে ছিটকিনি লাগাবার চেষ্টা করছে। এদিকে কোনও বাড়ি নেই বলে জানালাটা বন্ধ করা হয় না। অনেক কষ্টে লাগল ছিটকিনিটা। ভজাকে তিনি বাধা দেননি, কিন্তু মনে মনে ঠিক করে ফেলেছেন যে, জানলাটা একটু পরেই খুলে দেবেন এবং অন্ধকারে বসে নজর রাখবেন।

কিন্তু জানলা খোলার জন্য সময় পেলেন না। ভজা চলে যাওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই। একটা খরখর খরখর শব্দ কানে এল। বনার্জির শরীরের রক্তস্রোত যেন থেমে গেছে। চোখ বুজে, গভীর শ্বাস টেনে তিনি বল ফিরে পেতে চাইলেন। মনকে বোঝালেন, ও কিছু নয়, শোনার ভুল।

আবার সেই শব্দ এবং আরও ঘন ঘন। কেউ যেন নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে। বেড়াল! হঠাৎ বনার্জির মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় দেখেছিলেন, একটা বেড়াল নখ বার করে দেওয়ালের গায়ে আঁচড়াচ্ছিল। ভজা ভুল বলেনি–বেড়ালই আসত সাবান খেতে। কিন্তু তা বলে বন্ধ জানালা আঁচড়ে, তেলের শিশি ভেঙে, ঢাকনা খুলে–কীরকম বেড়াল? বনবেড়াল নয় তো?

ঘরের কোণ থেকে ছাতাটা তুলে নিলেন। বাথরুমের আলো জ্বেলে মিনিটখানেক অপেক্ষা। না, আঁচড়ানো থামেনি, বরং এখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন তার ক্রুদ্ধ ফ্যাঁসফাঁসানি। কোনও বেড়ালসুলভ ছিচকান্না নয়। কুকুরের সামনে পড়লে পিঠ ডোঙা করে যেভাবে রুখে দাঁড়ায় প্রাণ বাঁচাতে–কিন্তু এক টুকরো সাবানের জন্যে…

ছাতাটা বাগিয়ে বাথরুমে ঢুকে হঠাৎ সড়কির মতো সেটা বসিয়ে দিলেন জানলার কাচের উপর। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে….।

বনার্জি আর্তনাদ করে পেছন ফিরতে গিয়েই চৌকাঠে পা বেঁধে উলটে পড়লেন। হাতের ছাতাটাই তেরচা হয়ে বুকের পাশে এসে লেগেছে। বাঁ কনুইটার ওপর ভর না পড়লে মাথা চৌচির হয়ে যেত। বনার্জি প্রাণভয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলেন বাথরুম থেকে। ছাতাটা হাতছাড়া করেননি। কোনওক্রমে উঠে দাঁড়িয়ে পালাবার আগে আরেকবার পেছন ফিরে না তাকিয়ে পারলেন না। বিজ্ঞানীর অনুসন্ধিৎসার কাছে মানুষের ভয় পরাস্ত হল।

হাত থেকে খসে পড়ল ছাতাটা। ঠোঁট ফাঁক হয়ে দু-চারটে দাঁতও বেরিয়ে পড়ল। বনার্জি দেখলেন, ছোট্ট একটা বেড়াল, বোধহয় মেনি বেড়ালই হবে, একটা থাবা দিয়ে সাবানটাকে ধরে কচকচ করে খাচ্ছে! তার আর কোনও দিকে হুঁশ নেই। বার চারেক মাথা নেড়ে ঢোক গিলে বেড়ালটা সাবানটাকে মুখে নিয়ে এক লাফে জানলা গলে পালাল।

এর আগে কিন্তু সাবান নিয়ে পালায়নি কখনও। বনার্জির স্থির বিশ্বাস, বেড়ালটা ক্রমেই খাদ্য হিসাবে সাবানের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। কুকুর-বেড়ালকে অনেক সময় ঘাস খেতেও দেখা যায়। অবশ্য অসুস্থ হলে তবেই। তাহলে কি এই বেড়ালটাও অদ্ভুত কোনও রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলেই প্রবৃত্তিবশত… নাকি এর মধ্যে কোনও নেশার ব্যাপারট্যাপার আছে?

ঘরে ঢুকে চুপ করে বসে রইলেন বনার্জি। থিঙ্কিং অ্যান্ড মোর থিংকিং। একটা ইন্টারেস্টিং কেস স্টাডি। বেড়ালটার আচরণবিধির ওপর নজর রাখা ও অনুসন্ধানের ফলাফল নোট করা দরকার।

প্যাডের কাগজে বেড়ালের দৈহিক বিবরণটাই প্রথম লিপিবদ্ধ করলেন বনার্জি। সাধারণ আকারের মধ্যবয়স্ক বিড়াল। সম্ভবত মাদী। পুরো শরীরটাই সাদা; ব্যতিক্রম শুধু কপাল ও দুই চোখের মধ্যবর্তী অঞ্চলে তিলক কাটার মতো একটি অংশ। তা ছাড়া লেজের একেবারে শেষ এক ইঞ্চি মিশমিশে কালো।

স্টিল ক্যামেরা, সুপার এইট মুভি, তার স্ট্যান্ড ও সানগান সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরার পথে বনার্জি গড়িয়াহাট বাজারে নামলেন। সাবান কিনতে হবে। এক-আধটা নয়– পুরোপরি এক কার্টুন। চেনা দোকান, জানে, বনার্জি কী সাবান ব্যবহার করেন। সাবান চাইতেই বলল, আজ কিন্তু আপনার জিনিস নেই। এইটা নিয়ে যান। ভালোই হবে।

বনার্জির মনে হল, বেড়ালটা এ অবধি শুধু একটাই ব্র্যান্ডের সাবান খেয়েছে। এটাও পরীক্ষা করে দেখা উচিত যে সব সাবানই ওর সমান পছন্দ কি না।

বাড়ি ফিরে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। বেড়াল বাবাজি বা মাইজি এসে পড়েছেন। এবং আজ তিনি একা নন, আরও দু-জন সঙ্গীকে এনেছেন। সানগানের প্রখর আলোকে তোয়াক্কা না করে, বনার্জিকে দাঁত খিঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে তারা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাবানের কৌটোটার ওপরে। কৌটো খসে পড়ল….

কিন্তু তারা সাবানটা খেল না। শুধু খেল না বললেই সব কথা বলা হয় না। খেল তো না উলটে প্রচণ্ড বিরক্তিভরে তারা আক্রমণ করল বাথরুমের অন্যান্য জিনিসপত্র। বালতির গায়ে নখের আঁচড়, টুথপেস্টের দফারফা–সে এক লঙ্কাকাণ্ড। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতেও বনার্জি সুপার এইট চালিয়ে যাচ্ছেন।

মিনিট পাঁচেকের তাণ্ডবনৃত্যের পর বেড়ালগুলো অবশ্য চলেই গেল।

জামা খুলে ফ্যানের তলায় বসেও দরদর করে ঘামছেন বনার্জি। কাল যদি ওরা দলে আরও ভারী হয়ে হানা দেয়… কী করবেন বনার্জি? ওদের পছন্দমতো জিনিস সরবরাহ করবে, না জানলা-দরজা এঁটে… কিন্তু ওরা যদি ভয়ানক হিংস্র। হয়ে উঠে দিনের বেলাতেই অ্যাটেম্পট নেয়….

ঝন্টুমামা থামলেন। আমরা সোজা হয়ে বসলাম।

-তারপর?

–এতক্ষণ এই যে শুনলে, এটা কিন্তু আমার লেখা নয়, আমার অত সময় কোথায় গল্প। লেখার, তাই মাঝেসাঝে কারও লেখায় তেমন পসিবিলিটি দেখলে, গল্প শেষ করে দিই। শেষ না হলে তো গল্প হয় না।

ঝন্টুমামার তাল গাছের কথা মনে পড়ে গেল। এবার তাহলে ঝন্টুমামা শেষ দেড় হাতে ওস্তাদের কেরামতি দেখাবেন।

–বেশ, তাহলে শেষই করুন। আপনার খেলটাই…

হ্যাঁ। বলছি। সাধুভাষাতেই বলি শেষটুক, না হলে ঠিক জমবে নাঃ এতক্ষণ আপনারা সুগন্ধি সাবান অ্যারোলিম স্কিনফুড প্রস্তুতকারীর বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিং স্ক্রিপ্ট অবলম্বনে গঠিত একটি গল্প শ্রবণ করিলেন।