দুর্বাসা তরু

দুর্বাসা তরু

মাথাটা ঘুরে উঠতেই ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন অজিতবাবু। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন তিনি। কতটা এই হঠাৎ অসুস্থতার দরুন, আর কতটাই বা বিস্ময়ের ধাক্কায় তিনি এইভাবে থাকলেন, তা হয়তো নিজেও জানেন না। অবাক হয়ে ভাবেন, তবে কি তাঁর বন্ধু কৃষ্ণন নামবিয়ার যা বলেছিল, সেটা সত্যি নেহাত কথার কথা নয়? তাঁর বাড়ির লোকেরও একটা সংস্কার দানা বেঁধেছে এ ব্যাপারে। কাক ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাল দু-একবার পড়তেই পারে। কিন্তু প্রতিবারই যদি পড়ে, তখন তার মধ্যে একটা কার্যকারণ সম্পর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। তিনি ঠিক করে ফেললেন, আজ বিকেলেই যাবেন তাঁর পরিচিত বটানির অধ্যাপক বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি নিশ্চয় বলতে পারবেন, ব্যাপারটার মধ্যে কোনও বিজ্ঞানসম্মত কারণ আছে–না, শুধুই মনের ধারণামাত্র।

সে দিন দুপুরে গৌহাটি থেকে ভাইপোর টেলিগ্রামে দাদার গুরুতর অসুখের সংবাদ পেয়ে আরও ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। তবে কি সবই এই দুর্বাসা তরুর অভিশাপের ফল? দাদার এই অবস্থায় তাঁকে দু-একদিনের মধ্যেই গৌহাটি রওনা হতে হবে। হাজরার মোড়ে রেলের টিকিট করার অফিস আছে। সেখান থেকে টিকিট কেটে একেবারে প্রফেসার বিনয় দেবের সঙ্গে দেখা করেই আসবেন–অজিতবাবু ভাবলেন। বিনয়বাবু ওখানেই থাকেন।

এই ফাঁকে অজিতবাবুর কথা কিছু বলা যাক। অজিতমোহন রায় একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী। অফিসের কাজে তিনি ভারতের নানা জায়গায় থেকেছেন। বর্তমানে কলকাতায় বদলি হয়ে এসে শহরতলিতে নিজের বাড়িটাতে আছেন। তিনি যখন কুইলনে ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় কৃষ্ণন নামবিয়ারের। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। কৃষিবিভাগে কাজ করতেন নামবিয়ার। কিন্তু তাঁর আর-এক পরিচয়–সেটা তিনি নিজেই বলতেন–তিনি ছিলেন প্রকৃতিপরায়ণ। নামবিয়ার বলতেন, বিজ্ঞানের বলে হঠকারিতা করে কিছু করলে মানুষ নিজেই বিপদ ডেকে আনবে। বিজ্ঞান মানুষকে অসীম শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার বর দিলেও হিরণ্যকশিপুর বা রাবণের বরের মতো তাতে একটা বিরাট ফাঁক আছে। কেরলের সাইলেন্ট ভ্যালির নিবিড় অরণ্যের অনেকখানি ধ্বংস করে যখন সেখানে বিরাট এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন নামবিয়ার প্রবল প্রতিবাদ করলেন। তারপরই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। আর সেরে উঠলেন না। অজিতবাবুর মনে হয়েছিল, তিনি যেন আত্মাহুতি দিয়ে প্রকৃতিকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করলেন।

মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে নামবিয়ার অজিতবাবুকে এই গাছের ছোট্ট চারাটা দিয়ে বলেছিলেন, এটা আমার সৃষ্ট প্রকৃতি রক্ষীবাহিনীর একজন সৈন্য। একে যত্ন করবেন, এ আপনাদের সুখশান্তির বর দেবে। কিন্তু সাবধান, দুর্ব্যবহার কিন্তু সইবে না। তখন আপনাকে ভোগাবে। এখন ভেবে দেখুন, নেবেন কি না।

তখন এটাকে ঠাট্টা মনে করেই অজিতবাবু চারাটাকে নিয়ে এসেছিলেন। কোয়ার্টারসের বাগানে লাগিয়ে যত্নও করেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রোমোশন পেয়ে যখন কলকাতায় বদলি হয়ে এলেন, তখন বন্ধুর স্মৃতি মনে করে গাছটাকেও নিয়ে এসে বাড়ির ছোট্ট বাগানটাতে জানলার ধারে পুঁতলেন।

এরপরেই একের পর এক কয়েকটি ঘটনায় নামবিয়ারের সতর্কবাণী মনে পড়ল তাঁর। প্রথম দু-একবার অত গুরুত্ব দেননি। যেমন, এখানে এসেই প্রথম দিন তাঁর স্ত্রী ঘরদোর পরিষ্কার করে ময়লাগুলো জানলা দিয়ে গাছটির ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেন। সে দিনই বঁটিতে হাত কাটল তাঁর। অজিতবাবু তখন ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বোঝো এখন ঠেলা–কর্মের ফল। গাছ বলে কি সে মানুষ নয়?

এর পরের ঘটনাটা একটু গুরুতর। বাড়ি চুনকাম করতে এসে একজন মিস্ত্রি বালতির চুনজলের কিছুটা গাছটার ওপর ঢেলেছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে মই থেকে পা হড়কে পড়ে গিয়ে হাত ভাঙল। তখন আবার তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাসে এক হেনস্থা।

তাঁর চাকর ভোলা একদিন গরম জল ছুঁড়ে ফেলল গাছটার পাতার ওপর। তারপর পেছন ফিরে এক পা যেতেই পিছলে পড়ে কপাল কাটল।

অজিতবাবু তখনও বিশ্বাস করেননি যে এগুলো গাছটির অভিসম্পাতের ফল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী বিশ্বাস করে তুলসী গাছের মতো পুজোই করতে লাগলেন গাছটার। আর গাছটিও লাই পেয়ে বেশ বেড়ে উঠল। কলকাতায় এসে নিজের বাগান নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্যেই কি না কে জানে, তাঁর স্ত্রী-র পুরোনো হাঁটুর বাতের ব্যথাটাও এখন আর নেই।

তাঁর ছেলে শান্তুর আবার দুর্বাসা মুনির ওপর খুব রাগ। তার মা গাছটাকে প্রায়ই দুর্বাসা গাছ বলায় সে একদিন লুকিয়ে তার খেলার বাঁশের তরোয়াল দিয়ে গাছটার গুঁড়িতে পেটাতে লাগল খুব করে। একটু পরেই তার আর্ত চিৎকারে অজিতবাবু আর তাঁর স্ত্রী ছুটে এসে দেখেন, রক্তারক্তি কাণ্ড। বাঁশের ছুঁচোলো আগায় শান্তুর পায়ের অনেকখানি চিরে গিয়েছে।

তারপরে তাঁর স্ত্রী-র মতন গাছটির তোয়াজ না করলেও তিনি আর ওটাকে ঘাঁটাতেন না। শান্তু ভোলা এদেরও বারণ করে দিয়েছিলেন।

আজ এত দিন পরে গাছটার একটা ডাল জানলার দিকে অনেকটা এগিয়ে আসতে দেখে তাঁর কী খেয়াল হল–ভাবলেন, কেটে দেবেন। যে-কোনও গাছ হলেই হয়তো তা করতেন। কিন্তু এবারের ইচ্ছের মধ্যে যেন একটা পরীক্ষা করার লোভ উঁকি দিয়েছিল। দেখাই যাক-না ফলটা কী হয়।

ফলটা পেলেন সঙ্গে সঙ্গেই। ডালে কোপ মারতেই মাথাটা ঘুরে উঠল আর সেই মাথাধরা চলল সারাদিন, সারারাত। স্ত্রী-কে আর বললেন না কথাটা। তাঁর মনে পড়ল, নামবিয়ারের বাগানে এই গাছ তো অনেকগুলো ছিল। নামবিয়ার বলেছিল, এই গাছের ফুল-ফল হয় না। গাছটি মরে গেলেই তার আর কোনও বংশ থাকবে না। নামবিয়ার কি অরণ্যকে রক্ষা করতে এই গাছ বনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল? কোথায় পেল সে এই গাছ? সে বলেছিল বটে, নিজের সৃষ্টি। কিন্তু গাছ তো আর যন্ত্রপাতি নয় যে, কলকবজা জুড়ে তৈরি করবে। এ বিষয়ে হয়তো বিনয়বাবু বলতে পারবেন।

হঠাৎ অজিতবাবুর মনে হল, নামবিয়ার কি এই গাছের ওপর কোনও দুর্ব্যবহার করেছিল শেষদিকে? নইলে হঠাৎ ওভাবে সে মারা গেল কেন?

বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সে দিনই। সব শুনে বিনয়বাবু হো-হো করে অনেকক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন, অজিতবাবু, এর চেয়ে যদি বলতেন, আপনার বাগানে একটা মানুষখেকো গাছ আছে, তাহলে হয়তো বিশ্বাস করলেও করতে পারতাম। হ্যাঁ–প্রত্যেক প্রাণীর মতো গাছেরও আত্মরক্ষার জন্যে প্রকৃতির অনেক ব্যবস্থা আছে। গায়ে কাঁটা বা শুয়ো, পাতায় তেতো স্বাদ বা অনিষ্টকর রস এইসব গাছকে গোরু-ছাগলের হাত থেকে বাঁচায়। অবশ্য মানুষের কাছে ওসব কোনও প্রতিরোধই নয়। তাই বলে, গাছ দুর্বাসা মুনির মতন অভিশাপ দেয়, বা শিবের মতন বর দেয়–এসব কথা ওই আষাঢ়ে গল্প-লেখকদের বলুন, কাজে দেবে। আরে মশাই, একজন মানুষের ক্ষতি করেই আরেকজন মানুষ কত বহাল তবিয়তে ঘুরছে। যাদের ক্ষতি হচ্ছে, তারা কিছু করতে পারছে? আর এ তো একটা গাছ মাত্র। যা-ই হোক, আমার কলেজে তো ছুটি চলছে। কাল সকালেই আপনার বাড়ি গিয়ে সেই তরুদেবতাকে দেখে আসব।

পরদিন সকালে বিনয়বাবু সত্যিই এলেন এক ঘণ্টা বাস ঠেঙিয়ে। অজিতবাবু মাথার যন্ত্রণায় আর দাদার চিন্তায় তখনও বেশ কাহিল। বিনয়বাবু এসে বললেন, দেখি আপনার গাছ। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকালেন গাছটার দিকে। তারপর বললেন, কোথা থেকে আপনার বন্ধু গাছটা সংগ্রহ করলেন বলতে পারেন? গাছটার ব্যাপারে দেখতে হবে। পাতাগুলো দেখেছেন? আকাশিয়া, আরাবিকা বা বাবলার মতন। অথচ ডালে কাঁটা নেই। কাণ্ডটা আবার ফাইকাস ইলাসটিকার মতন। কোথায় কোপ মেরেছিলেন, দেখি। একটা সবুজ রঙের সিক্রেশন বেরিয়ে জমে আছে দেখছি। সত্যিই স্ট্রেঞ্জ!

বিনয়বাবুর বলা নামগুলো অজিতবাবুর কাছে হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের নামের মতোই খটমট লাগল। তিনি যখন বললেন, গাছটার কোনও ফুল-ফল হয় না আর গাছটা মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বংশও বিলুপ্ত হয়, তখন বিনয়বাবু আগের দিনের মতোই হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, এই গাছটা তবে কি ব্রহ্মার কমণ্ডলুর জলের ছিটেয় জন্মেছিল?

হঠাৎ একটা কাণ্ড করলেন বিনয়বাবু। শান্তুকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ আনতে বললেন। কাগজ আনা হলে সেটা গাছের সেই আহত ডালে পেঁচিয়ে নিজের লাইটার দিয়ে কাগজটা জ্বালিয়ে দিলেন। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল।

তা-ই দেখে অজিতবাবু প্রায় আর্তনাদ করে ছুটে এসে ধাক্কা দিয়ে বিনয়বাবুর হাতটা সরিয়ে দিলেন। লাইটার ছিটকে মাটিতে পড়ল। অজিতবাবু নিজের হাতেই দ্রুত জ্বলন্ত কাগজটা খুলে ফেলে প্রায় হাঁপাতে লাগলেন।

তাঁর কাণ্ড দেখে বিনয়বাবু হাসলেন। তারপর লাইটারটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, না, সত্যিই আপনার মনটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওসব উদ্ভট চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন তো। অনেক লোক হাতে-গলায়-কোমরে একগাদা মাদুলি-কবচ ঝুলিয়েও তো ধুকছে। কই, আপনার হাতে তো কিছু নেই। আপনি কি খারাপ আছেন? সবই মনের ব্যাপার।

অনেক উপদেশ দিয়ে বিনয়বাবু একসময় চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পরই অজিতবাবু হঠাৎ অবাক হয়ে অনুভব করলেন, তাঁর মাথাধরাটা এখন আর নেই। সে দিনই আরেকটা বিস্ময় তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছিল। সন্ধেবেলা ঘরে টেলিফোন বেজে উঠতেই তিনি ধরলেন। গৌহাটি থেকে ট্রাংককল। শুনে তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠল। কিন্তু বিস্ময়ে আর আনন্দে অভিভূত হয়ে শুনলেন তাঁর দাদারই গলা। তিনি ভালোই আছেন। ডাক্তার বলেছে, পেটের থেকেই হয়েছিল। হার্ট থেকে নয়। আজ সকালেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাই ভাইকে হন্তদন্ত হয়ে রওনা হতে বারণ করে দিলেন।

অজিতবাবু ভাবেন, এটাও কি আশুতোষ বৃক্ষের আশীর্বাদ?

পরদিন সকালে আবার হাজরায় এলেন টিকিট ক্যানসেল করতে। কাজ হয়ে গেলে ভাবলেন, একবার বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি। তাঁকে ঘটনাটা বলতে হবে। এটাও কি কাকতালীয়?

শেষ বিস্ময়টা তাঁর জন্যে এখানেই বোধহয় জমা ছিল। বাইরের ঘরে কয়েকজন ভদ্রলোক বসে আছেন, কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। অজিতবাবুকে দেখে তাঁরা চোখ তুলে চাইলেন। বিনয়বাবুর কথা জিজ্ঞেস করতে সবাই যেন অবাক হলেন। তারপর একজন ধীরে ধীরে যা বললেন, তা হল–তিনি কি খবর শোনেননি? কাল রাত্রে সিগারেট মুখে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বিনয়বাবু। সিগারেটটা চাদরে পড়ে আগুন ধরায়। চাদর থেকে বিনয়বাবুর পোশাকে। বিনয়বাবুর এখন হাসপাতালে এখন-তখন অবস্থা।

কিছুক্ষণ পরে বজ্রাহতের মতো বাস রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন অজিতবাবু। এখন হাসপাতালে দেখা করতে দেবে না। তবুও তাঁকে যেতে হবে। খবরটা অন্তত পাবেন। একটা অপরাধবোধ তাঁকে খোঁচা দিতে থাকল। তাঁর জন্যেই তো বিনয়বাবুর ওপর গিয়ে পড়ল ওই ভয়ংকর গাছের অভিশাপ।

একটু দূরে পার্কের মধ্যে কাজ হচ্ছে। মাটির তলায় রেল চলবে, তার তোড়জোড়। এই পাশে একটা ছোট্ট ভাস্কর্য ছিল। মা আদর করে দু-হাতে বাচ্চাকে তুলে ধরেছে ওপরে। বাচ্চাটাও তার হাত দুটো বাড়িয়ে মায়ের কোলে নামার চেষ্টা করছে। লোহালক্কড়ের আঘাতে এখন মা আর শিশু দু-জনের দেহ থেকেই প্লাস্টারের মাংস খসে পড়ে লোহার শিকের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ছে। খুব খারাপ লাগল অজিতবাবুর।

হঠাৎ দেখলেন, একজন শ্রমিক কোদালের কোপে নির্মূল করতে লাগল একটা সুন্দর সবুজ কুঞ্জলতার ঝোঁপ। চোখের সামনে যেন একটা খুন দেখছেন–অজিতবাবু এমনভাবে অস্ফুট একটা আর্তনাদ করে চোখ বুজে ফেললেন।

বাসটাও সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল।

[আনন্দমেলা, ২৫ মাঘ ১৩৯০]

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুর্বাসা তরু
গল্প - রেবন্ত গোস্বামী
ছড়া - রেবন্ত গোস্বামী
সাক্ষাৎকার

দুর্বাসা তরু

দুর্বাসা তরু

মাথাটা ঘুরে উঠতেই ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন অজিতবাবু। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন তিনি। কতটা এই হঠাৎ অসুস্থতার দরুন, আর কতটাই বা বিস্ময়ের ধাক্কায় তিনি এইভাবে থাকলেন, তা হয়তো নিজেও জানেন না। অবাক হয়ে ভাবেন, তবে কি তাঁর বন্ধু কৃষ্ণন নামবিয়ার যা বলেছিল, সেটা সত্যি নেহাত কথার কথা নয়? তাঁর বাড়ির লোকেরও একটা সংস্কার দানা বেঁধেছে এ ব্যাপারে। কাক ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাল দু-একবার পড়তেই পারে। কিন্তু প্রতিবারই যদি পড়ে, তখন তার মধ্যে একটা কার্যকারণ সম্পর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। তিনি ঠিক করে ফেললেন, আজ বিকেলেই যাবেন তাঁর পরিচিত বটানির অধ্যাপক বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি নিশ্চয় বলতে পারবেন, ব্যাপারটার মধ্যে কোনও বিজ্ঞানসম্মত কারণ আছে–না, শুধুই মনের ধারণামাত্র।

সে দিন দুপুরে গৌহাটি থেকে ভাইপোর টেলিগ্রামে দাদার গুরুতর অসুখের সংবাদ পেয়ে আরও ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। তবে কি সবই এই দুর্বাসা তরুর অভিশাপের ফল? দাদার এই অবস্থায় তাঁকে দু-একদিনের মধ্যেই গৌহাটি রওনা হতে হবে। হাজরার মোড়ে রেলের টিকিট করার অফিস আছে। সেখান থেকে টিকিট কেটে একেবারে প্রফেসার বিনয় দেবের সঙ্গে দেখা করেই আসবেন–অজিতবাবু ভাবলেন। বিনয়বাবু ওখানেই থাকেন।

এই ফাঁকে অজিতবাবুর কথা কিছু বলা যাক। অজিতমোহন রায় একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী। অফিসের কাজে তিনি ভারতের নানা জায়গায় থেকেছেন। বর্তমানে কলকাতায় বদলি হয়ে এসে শহরতলিতে নিজের বাড়িটাতে আছেন। তিনি যখন কুইলনে ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় কৃষ্ণন নামবিয়ারের। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। কৃষিবিভাগে কাজ করতেন নামবিয়ার। কিন্তু তাঁর আর-এক পরিচয়–সেটা তিনি নিজেই বলতেন–তিনি ছিলেন প্রকৃতিপরায়ণ। নামবিয়ার বলতেন, বিজ্ঞানের বলে হঠকারিতা করে কিছু করলে মানুষ নিজেই বিপদ ডেকে আনবে। বিজ্ঞান মানুষকে অসীম শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার বর দিলেও হিরণ্যকশিপুর বা রাবণের বরের মতো তাতে একটা বিরাট ফাঁক আছে। কেরলের সাইলেন্ট ভ্যালির নিবিড় অরণ্যের অনেকখানি ধ্বংস করে যখন সেখানে বিরাট এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন নামবিয়ার প্রবল প্রতিবাদ করলেন। তারপরই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। আর সেরে উঠলেন না। অজিতবাবুর মনে হয়েছিল, তিনি যেন আত্মাহুতি দিয়ে প্রকৃতিকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করলেন।

মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে নামবিয়ার অজিতবাবুকে এই গাছের ছোট্ট চারাটা দিয়ে বলেছিলেন, এটা আমার সৃষ্ট প্রকৃতি রক্ষীবাহিনীর একজন সৈন্য। একে যত্ন করবেন, এ আপনাদের সুখশান্তির বর দেবে। কিন্তু সাবধান, দুর্ব্যবহার কিন্তু সইবে না। তখন আপনাকে ভোগাবে। এখন ভেবে দেখুন, নেবেন কি না।

তখন এটাকে ঠাট্টা মনে করেই অজিতবাবু চারাটাকে নিয়ে এসেছিলেন। কোয়ার্টারসের বাগানে লাগিয়ে যত্নও করেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রোমোশন পেয়ে যখন কলকাতায় বদলি হয়ে এলেন, তখন বন্ধুর স্মৃতি মনে করে গাছটাকেও নিয়ে এসে বাড়ির ছোট্ট বাগানটাতে জানলার ধারে পুঁতলেন।

এরপরেই একের পর এক কয়েকটি ঘটনায় নামবিয়ারের সতর্কবাণী মনে পড়ল তাঁর। প্রথম দু-একবার অত গুরুত্ব দেননি। যেমন, এখানে এসেই প্রথম দিন তাঁর স্ত্রী ঘরদোর পরিষ্কার করে ময়লাগুলো জানলা দিয়ে গাছটির ওপর ছুঁড়ে ফেলে দেন। সে দিনই বঁটিতে হাত কাটল তাঁর। অজিতবাবু তখন ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বোঝো এখন ঠেলা–কর্মের ফল। গাছ বলে কি সে মানুষ নয়?

এর পরের ঘটনাটা একটু গুরুতর। বাড়ি চুনকাম করতে এসে একজন মিস্ত্রি বালতির চুনজলের কিছুটা গাছটার ওপর ঢেলেছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে মই থেকে পা হড়কে পড়ে গিয়ে হাত ভাঙল। তখন আবার তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাসে এক হেনস্থা।

তাঁর চাকর ভোলা একদিন গরম জল ছুঁড়ে ফেলল গাছটার পাতার ওপর। তারপর পেছন ফিরে এক পা যেতেই পিছলে পড়ে কপাল কাটল।

অজিতবাবু তখনও বিশ্বাস করেননি যে এগুলো গাছটির অভিসম্পাতের ফল। কিন্তু তাঁর স্ত্রী বিশ্বাস করে তুলসী গাছের মতো পুজোই করতে লাগলেন গাছটার। আর গাছটিও লাই পেয়ে বেশ বেড়ে উঠল। কলকাতায় এসে নিজের বাগান নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্যেই কি না কে জানে, তাঁর স্ত্রী-র পুরোনো হাঁটুর বাতের ব্যথাটাও এখন আর নেই।

তাঁর ছেলে শান্তুর আবার দুর্বাসা মুনির ওপর খুব রাগ। তার মা গাছটাকে প্রায়ই দুর্বাসা গাছ বলায় সে একদিন লুকিয়ে তার খেলার বাঁশের তরোয়াল দিয়ে গাছটার গুঁড়িতে পেটাতে লাগল খুব করে। একটু পরেই তার আর্ত চিৎকারে অজিতবাবু আর তাঁর স্ত্রী ছুটে এসে দেখেন, রক্তারক্তি কাণ্ড। বাঁশের ছুঁচোলো আগায় শান্তুর পায়ের অনেকখানি চিরে গিয়েছে।

তারপরে তাঁর স্ত্রী-র মতন গাছটির তোয়াজ না করলেও তিনি আর ওটাকে ঘাঁটাতেন না। শান্তু ভোলা এদেরও বারণ করে দিয়েছিলেন।

আজ এত দিন পরে গাছটার একটা ডাল জানলার দিকে অনেকটা এগিয়ে আসতে দেখে তাঁর কী খেয়াল হল–ভাবলেন, কেটে দেবেন। যে-কোনও গাছ হলেই হয়তো তা করতেন। কিন্তু এবারের ইচ্ছের মধ্যে যেন একটা পরীক্ষা করার লোভ উঁকি দিয়েছিল। দেখাই যাক-না ফলটা কী হয়।

ফলটা পেলেন সঙ্গে সঙ্গেই। ডালে কোপ মারতেই মাথাটা ঘুরে উঠল আর সেই মাথাধরা চলল সারাদিন, সারারাত। স্ত্রী-কে আর বললেন না কথাটা। তাঁর মনে পড়ল, নামবিয়ারের বাগানে এই গাছ তো অনেকগুলো ছিল। নামবিয়ার বলেছিল, এই গাছের ফুল-ফল হয় না। গাছটি মরে গেলেই তার আর কোনও বংশ থাকবে না। নামবিয়ার কি অরণ্যকে রক্ষা করতে এই গাছ বনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল? কোথায় পেল সে এই গাছ? সে বলেছিল বটে, নিজের সৃষ্টি। কিন্তু গাছ তো আর যন্ত্রপাতি নয় যে, কলকবজা জুড়ে তৈরি করবে। এ বিষয়ে হয়তো বিনয়বাবু বলতে পারবেন।

হঠাৎ অজিতবাবুর মনে হল, নামবিয়ার কি এই গাছের ওপর কোনও দুর্ব্যবহার করেছিল শেষদিকে? নইলে হঠাৎ ওভাবে সে মারা গেল কেন?

বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সে দিনই। সব শুনে বিনয়বাবু হো-হো করে অনেকক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন, অজিতবাবু, এর চেয়ে যদি বলতেন, আপনার বাগানে একটা মানুষখেকো গাছ আছে, তাহলে হয়তো বিশ্বাস করলেও করতে পারতাম। হ্যাঁ–প্রত্যেক প্রাণীর মতো গাছেরও আত্মরক্ষার জন্যে প্রকৃতির অনেক ব্যবস্থা আছে। গায়ে কাঁটা বা শুয়ো, পাতায় তেতো স্বাদ বা অনিষ্টকর রস এইসব গাছকে গোরু-ছাগলের হাত থেকে বাঁচায়। অবশ্য মানুষের কাছে ওসব কোনও প্রতিরোধই নয়। তাই বলে, গাছ দুর্বাসা মুনির মতন অভিশাপ দেয়, বা শিবের মতন বর দেয়–এসব কথা ওই আষাঢ়ে গল্প-লেখকদের বলুন, কাজে দেবে। আরে মশাই, একজন মানুষের ক্ষতি করেই আরেকজন মানুষ কত বহাল তবিয়তে ঘুরছে। যাদের ক্ষতি হচ্ছে, তারা কিছু করতে পারছে? আর এ তো একটা গাছ মাত্র। যা-ই হোক, আমার কলেজে তো ছুটি চলছে। কাল সকালেই আপনার বাড়ি গিয়ে সেই তরুদেবতাকে দেখে আসব।

পরদিন সকালে বিনয়বাবু সত্যিই এলেন এক ঘণ্টা বাস ঠেঙিয়ে। অজিতবাবু মাথার যন্ত্রণায় আর দাদার চিন্তায় তখনও বেশ কাহিল। বিনয়বাবু এসে বললেন, দেখি আপনার গাছ। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকালেন গাছটার দিকে। তারপর বললেন, কোথা থেকে আপনার বন্ধু গাছটা সংগ্রহ করলেন বলতে পারেন? গাছটার ব্যাপারে দেখতে হবে। পাতাগুলো দেখেছেন? আকাশিয়া, আরাবিকা বা বাবলার মতন। অথচ ডালে কাঁটা নেই। কাণ্ডটা আবার ফাইকাস ইলাসটিকার মতন। কোথায় কোপ মেরেছিলেন, দেখি। একটা সবুজ রঙের সিক্রেশন বেরিয়ে জমে আছে দেখছি। সত্যিই স্ট্রেঞ্জ!

বিনয়বাবুর বলা নামগুলো অজিতবাবুর কাছে হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের নামের মতোই খটমট লাগল। তিনি যখন বললেন, গাছটার কোনও ফুল-ফল হয় না আর গাছটা মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বংশও বিলুপ্ত হয়, তখন বিনয়বাবু আগের দিনের মতোই হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, এই গাছটা তবে কি ব্রহ্মার কমণ্ডলুর জলের ছিটেয় জন্মেছিল?

হঠাৎ একটা কাণ্ড করলেন বিনয়বাবু। শান্তুকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ আনতে বললেন। কাগজ আনা হলে সেটা গাছের সেই আহত ডালে পেঁচিয়ে নিজের লাইটার দিয়ে কাগজটা জ্বালিয়ে দিলেন। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল।

তা-ই দেখে অজিতবাবু প্রায় আর্তনাদ করে ছুটে এসে ধাক্কা দিয়ে বিনয়বাবুর হাতটা সরিয়ে দিলেন। লাইটার ছিটকে মাটিতে পড়ল। অজিতবাবু নিজের হাতেই দ্রুত জ্বলন্ত কাগজটা খুলে ফেলে প্রায় হাঁপাতে লাগলেন।

তাঁর কাণ্ড দেখে বিনয়বাবু হাসলেন। তারপর লাইটারটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, না, সত্যিই আপনার মনটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওসব উদ্ভট চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন তো। অনেক লোক হাতে-গলায়-কোমরে একগাদা মাদুলি-কবচ ঝুলিয়েও তো ধুকছে। কই, আপনার হাতে তো কিছু নেই। আপনি কি খারাপ আছেন? সবই মনের ব্যাপার।

অনেক উপদেশ দিয়ে বিনয়বাবু একসময় চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়ার পরই অজিতবাবু হঠাৎ অবাক হয়ে অনুভব করলেন, তাঁর মাথাধরাটা এখন আর নেই। সে দিনই আরেকটা বিস্ময় তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছিল। সন্ধেবেলা ঘরে টেলিফোন বেজে উঠতেই তিনি ধরলেন। গৌহাটি থেকে ট্রাংককল। শুনে তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠল। কিন্তু বিস্ময়ে আর আনন্দে অভিভূত হয়ে শুনলেন তাঁর দাদারই গলা। তিনি ভালোই আছেন। ডাক্তার বলেছে, পেটের থেকেই হয়েছিল। হার্ট থেকে নয়। আজ সকালেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাই ভাইকে হন্তদন্ত হয়ে রওনা হতে বারণ করে দিলেন।

অজিতবাবু ভাবেন, এটাও কি আশুতোষ বৃক্ষের আশীর্বাদ?

পরদিন সকালে আবার হাজরায় এলেন টিকিট ক্যানসেল করতে। কাজ হয়ে গেলে ভাবলেন, একবার বিনয়বাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি। তাঁকে ঘটনাটা বলতে হবে। এটাও কি কাকতালীয়?

শেষ বিস্ময়টা তাঁর জন্যে এখানেই বোধহয় জমা ছিল। বাইরের ঘরে কয়েকজন ভদ্রলোক বসে আছেন, কিন্তু কারও মুখে কথা নেই। অজিতবাবুকে দেখে তাঁরা চোখ তুলে চাইলেন। বিনয়বাবুর কথা জিজ্ঞেস করতে সবাই যেন অবাক হলেন। তারপর একজন ধীরে ধীরে যা বললেন, তা হল–তিনি কি খবর শোনেননি? কাল রাত্রে সিগারেট মুখে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বিনয়বাবু। সিগারেটটা চাদরে পড়ে আগুন ধরায়। চাদর থেকে বিনয়বাবুর পোশাকে। বিনয়বাবুর এখন হাসপাতালে এখন-তখন অবস্থা।

কিছুক্ষণ পরে বজ্রাহতের মতো বাস রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন অজিতবাবু। এখন হাসপাতালে দেখা করতে দেবে না। তবুও তাঁকে যেতে হবে। খবরটা অন্তত পাবেন। একটা অপরাধবোধ তাঁকে খোঁচা দিতে থাকল। তাঁর জন্যেই তো বিনয়বাবুর ওপর গিয়ে পড়ল ওই ভয়ংকর গাছের অভিশাপ।

একটু দূরে পার্কের মধ্যে কাজ হচ্ছে। মাটির তলায় রেল চলবে, তার তোড়জোড়। এই পাশে একটা ছোট্ট ভাস্কর্য ছিল। মা আদর করে দু-হাতে বাচ্চাকে তুলে ধরেছে ওপরে। বাচ্চাটাও তার হাত দুটো বাড়িয়ে মায়ের কোলে নামার চেষ্টা করছে। লোহালক্কড়ের আঘাতে এখন মা আর শিশু দু-জনের দেহ থেকেই প্লাস্টারের মাংস খসে পড়ে লোহার শিকের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ছে। খুব খারাপ লাগল অজিতবাবুর।

হঠাৎ দেখলেন, একজন শ্রমিক কোদালের কোপে নির্মূল করতে লাগল একটা সুন্দর সবুজ কুঞ্জলতার ঝোঁপ। চোখের সামনে যেন একটা খুন দেখছেন–অজিতবাবু এমনভাবে অস্ফুট একটা আর্তনাদ করে চোখ বুজে ফেললেন।

বাসটাও সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল।

[আনন্দমেলা, ২৫ মাঘ ১৩৯০]