৩. তৃতীয় সফর

১০.

পোয়ারো মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য তার তৃতীয় সফরটা মুলতুবী রেখেছিলেন। আধসেদ্ধ মাংস, নরম জল জল আলুসেদ্ধ আর প্যানকেক অবশ্য মরিনের কথা যদি মানতে হয় খাবারের তালিকায়। কি যে অদ্ভুত খেতে।

পোয়ারো টিলা বেয়ে উঠতে লাগলেন। ল্যাবারনাম এসে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। দুটো কটেজ মিলিয়ে একটা করা হয়েছে, আধুনিক মোটামুটি। রুচিসম্মত ভাবে তৈরি মিসেস আপওয়ার্ড এবং তার পুত্র উদীয়মান নাট্যকার রবিন আপওয়ার্ড থাকেন এখানে।

ভেতরে গেট দিয়ে ঢোকবার আগে এক মূহুর্ত থামলেন পোয়ারো। গোঁফটা একবার হাত দিয়ে ঠিক করে নিলেন। ঠিক এই সময় খুব ধীরে ধীরে টিলা থেকে একটা গাড়ি নামছিল আর একটা আধখাওয়া আপেল উড়ন্তবস্থায় এসে ঠিক করে তার গালে লাগল।

হতচকিত পোয়ারো চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতেই থেমে গেল গাড়িটা আর গাড়ির জানলা দিয়ে বেরিয়ে এল একজনের মাথা।

-ওহ ভীষণ দুঃখিত। খুব কি লেগেছে আপনার? উত্তেজিত ভাবে উত্তর দিতে যাবার মুহূর্তে প্রশ্নকারিণীর দিকে পোয়ারো তাকালেন।

গোবেচারা, মুখ ঘন ভুরু, ধূসর রংয়ের একরাশ চুল দেখেই চিনতে পারলেন তিনি মহিলাটিকে (অবশ্য খাওয়া আপেল ছুঁড়ে ফেলার অভ্যেসটাও এই চেনার ব্যাপারে যথেষ্ট ভূমিকা নিয়েছিল)।

–আরে আপনি? মিসেস অলিভার।

সত্যিই তাই। ভদ্রমহিলা হলেন বিখ্যাত রহস্যকাহিনী লেখিকা মিসেস অলিভার।

উচ্ছ্বসিতা অলিভার গাড়ি থেকে নামতে উদ্যত হলেন। ছোট গাড়িটা অথচ মিসেস অলিভার বিশালবপু। পোয়ারো ওর দুর্দশা দেখে সাহায্য করলেন ওঁকে।

মিসেস অলিভার কৈফিয়ত দেবার সুরে বললেন, খিল ধরে গেছে হাতে পায়ে গায়ে, অনেকক্ষণ গাড়িতে তো।

একরাশ আপেল ওর নামার সঙ্গে সঙ্গে গড়াতে গড়াতে মাটিতে পড়ল।

–ফেটে গেল ব্যাগটা, বুঝলেন মঁসিয়ে।

জামা ঝেড়েঝুড়ে আরও তিনি কয়েক টুকরো আপেল বের করে বেশ গর্বিত ভাবে তাকালেন পোয়ারোর দিকে।

–এগুলো বাক্সের আপেল ছিল। যাকগে, নিশ্চয়ই আপেলের অভাব এদিকেও থাকবে না। আবার যা কপাল আমার, হয়ত অন্য জায়গায় সবই চালান হয়ে গেল। থাক ওসব, বলুন কেমন আছেন? আপনি নিশ্চয়ই এদিকে যাচ্ছেন না? কোনো খুনটুনের ব্যাপারে যে আপনি এসেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার। যে বাড়িতে আমি অতিথি আশা করি সেই বাড়ির গৃহকত্রী নন?

–কে নিমন্ত্রণ করেছেন আপনাকে?

-ওই যে একটা বাড়ি দেখছেন টিলার ওপর ল্যাবারনাম– একটু নেমে গিয়ে চার্চের পাশে, আমি ওই বাড়িতে যাব। কেমন ভদ্রমহিলা?

চেনেন না আপনি?

–না, একান্ত বৈষয়িক কাজেই এসেছি আমি রবিন আপওয়ার্ড আমার একটা বইয়ের নাট্যরূপ দিচ্ছে কিছু কিছু কাজ আছে আমাদের একসঙ্গে।

-আচ্ছা, মাদাম খুবই আনন্দের কথা।

-না, সেরকম সুখকর কিছু ব্যাপার নয়। যথেষ্ট দুঃখজনক পরিস্থিতি–ভাবতেই পারিনি আমি। কেন যে নাক গলাতে এলাম এ সবের ভেতর। আমার যথেষ্ট আয় হয় বই থেকেই আর আয় বাড়া মানেই কর বাড়া। কখনোই সেজন্য অতিরিক্ত আয়ের দিকে ঝোঁক নেই আমার। কিন্তু আপনি ধারণাই করতে পারবেন না যে সৃষ্টি করা আপনার চরিত্র বা এমন সব কথা বলছে মূল বইতে আদপেই ছিল না। বলতে যান কিছু শুনতে হবে এসব উৎকৃষ্ট নাটকের জন্য দরকার। এই সবই করে রবিন আপওয়ার্ড। ও নাকি খুব চালাক সকলের ধারণা। এটা তো আমার মাথায় কিছুতেই ঢোকে না যে ও যদি যথেষ্ট বুদ্ধিমানই হয় তবে একটা মৌলিক নাটক ও নিজে কেন লেখে না? ফিনল্যাণ্ডীয় আমার গোয়েন্দাটিকে অব্যাহতি দিলেই তো পারে। ওঃ, এখন সে তো আবার ফিনল্যাণ্ডের লোকও নয়। নরওয়ের প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য একজন। ওহ হো, টুপিটা যে কোথায় ফেললাম। মাথায় হাত দিলেন মিসেস অলিভার।

গাড়ির ভেতর পোয়ারো উঁকি মেরে বললেন, মাদাম আমার মনে হয় ওটার ওপর আপনি বসেছিলেন।

টুপিটা পর্যবেক্ষণ করে মিসেস অলিভার সমর্থন সূচক গলায় বললেন, সত্যিই তাই। যাকগে। শুনুন, যা বলছিলাম। আমি গীর্জায় যাই প্রতি রবিবার আর বিশপ যাই বলুন না কেন, সেটা টুপী পরার থেকেও বেশি সেকেলে ব্যাপার। সেসব কথা থাক এখন। বলুন তো দেখি এবার খুনের ব্যাপারটা। মনে আছে আপনার সেই আমাদের খুনের তদন্তের কথা?

নিশ্চয়ই, খুব ভালো করে।

–মজা হয়েছিল বেশ, না?

–মানে খুন হবার পরের ঘটনাগুলোর কথা বলছি আর কি। কে খুন হল এবার?

–মিঃ শ্যাতানার মত নামীদামী অত কেউ নয়। বয়স্কা একজন মহিলা। টাকাকড়িও তাঁর খোয়া গেছে। প্রায় পাঁচ মাস আগের ঘটনা। হয়ত আপনি কাগজেও পড়েছেন। মিসেস ম্যাগিনটি….অপরাধী সন্দেহে একটি যুবক গ্রেপ্তার হয়েছে এবং শাস্তি স্বরূপ তার ফাঁসির হুকুম জারী করেছে আদালত।

এবং খুন সে করেনি। এক নিঃশ্বাসে মিসেস অলিভার বলে চললেন, খুন সে করেনি কে করেছে আপনি জানেন এবং তা প্রমাণও করবেন। চমৎকার চমৎকার।

পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বড় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আপনি মাদাম। আমি এখনো পর্যন্ত জানি না কে করেছে এই খুনটা আর জানা গেলেও তা প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ।

অধৈর্যভাবে মিসেস অলিভার বললেন, এত ধীরে ধীরে আপনারা পুরুষেরা সব কাজ করেন। আপনাকে খুব শীগগিরই জানিয়ে দেব এ কাজ কে করেছে? বোধহয় এখানকারই কোনো একজন বাসিন্দা। আমায় দু-একদিন একটু ঘুরে দেখার সময় দিন। ঠিক চিনে নেব খুনীকে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যা তীক্ষ্ণ একজন মহিলার… সেটাই অভাব আপনাদের। আমি তো ঠিকই আঁচ করেছিলাম শ্যানার খুনের মামলায়।

পোয়ারো ভদ্রমহিলাকে মনে করিয়ে দিলেন যে, তখন কত দ্রুত উনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতেন।

–আপনারা পুরুষেরা। কোনো মহিলা যদি আজ স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের প্রধান হতেন তবে….

একটা শব্দ হঠাৎ শুনে নিজের এই বদ্ধমূল ধারণা আর অন্তত কয়েকশো বার বলা কথাটি থামিয়ে দিলেন মাঝপথেই।

–হ্যালো। মিসেস অলিভার।

-এই যে আমি, মিসেস অলিভার এই বলে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, সংক্ষেপেই সারব আমি।

-না মাদাম না, ব্যস্ততা দেখালেন পোয়ারো। বরং আপনি ঠিক উল্টোটাই করুন।

গেট খুলে রবিন আপওয়ার্ড রাস্তা দিয়ে নেমে এল। তার গায়ে বহু পুরনো প্রায় বিবর্ণ ধূসর রংয়ের ফ্লানেলের ট্রাউজার্স আর স্পোর্ট কোট। টুপি নেই মাথায়। বেশ সুপুরুষ চেহারা।

এরিয়েন রবিন উষ্ণ আলিঙ্গন করল মিসেস অলিভারকে। তার চোখে প্রশংসার দৃষ্টি। মহিলার কাঁধে হাত দুটো রেখে বলল এরিয়েন, আপনার কাহিনীর জন্য নাটকের দ্বিতীয় অংক লেখার চমৎকার একটা পরিকল্পনা মাথায় এসেছে আমার।

-তাই নাকি? বিশেষ উৎসাহ দেখালেন না মিসেস অলিভার। এই যে রবিন, ইনি মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো।

–আচ্ছা বাঃ বেশ তো, মিসেস অলিভার নিশ্চয়ই আপনার সাথে মালপত্র আছে?

–হা গাড়ির পেছনে। গাড়ির পেছনের বুট থেকে রবিন দুটো স্যুটকেস নিয়ে এল।

–এত বিরক্তিকর। নিজের লোক বলতে ঠিক যা বোঝায় তা নেই আমাদের, শুধু ঐ বুড়ি জ্যানেট। একটা না একটা কিছু সব সময় তার লেগেই আছে। যাচ্ছেতাই একেবারে। ওঃ বেশ তো ভারী স্যুটকেস। বোমাটোমা ভেতরে পুরে রেখেছেন নাকি?

রবিন খাড়া রাস্তা দিয়ে উঠতে উঠতে ঘাড় ফেরালো।

-আসুন না, একসঙ্গে কিছু পান করা যাক।

–আপনাকে রবিন বলছে সঙ্গে যেতে, মাসিয়ে, গাড়ির সামনের আসন থেকে মিসেস অলিভার হাতব্যাগ, একটা বই আর পুরনো একজোড়া জুতো বের করতে করতে বলে চললেন, একটু আগে কি আপনি কাঠখোট্টা কথাবার্তা রবিনের সাথে বলতে বারণ করলেন আমায়?

–হ্যাঁ মিসেস অলিভার। যত আন্তরিকতা আপনি দেখাবেন ততই ভালো।

-যদি আমি আপনি হতাম তবে এ ধরনের কথা বলতাম না। যা হোক, এটা তো আপনার ব্যাপার। আপনাকে সাহায্য করব আমি।

রবিন আপওয়ার্ডকে দেখা গেল তার বাড়ির দরজায়।

–চলে আসুন, চলে আসুন। পরে করা যাবে গাড়ির ব্যবস্থাটা আপনাদের দেখার জন্য মামনি অস্থির হয়ে উঠেছেন।

মিসেস অলিভার দ্রুতপায়ে এগোলেন, ওকে অনুসরণ করলেন পোয়ারো।

খুব মনোরমভাবে সাজানো ল্যাবারনাম কুটিরের ভেতরটা। অনুমান করলেন পোয়ারো এর জন্য যথেষ্ট অর্থব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু সে অর্থব্যয় সার্থক হয়েছে। স্বাভাবিকতা আর সৌন্দর্যের সুষম সংমিশ্রণ ঘটেছে গৃহসজ্জায় অকৃত্রিম ওক কাঠের তৈরি প্রতিটি আসবাবে।

মিসেস লরা আপওয়ার্ড ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা হুইল চেয়ারে বসেছিলেন। তিনি সুমিষ্ট অভ্যর্থনার হাসি হাসলেন। ষাট বছর বয়স, ধূসর কালচে চুল। এক নজরেই বোঝা যায়, যথেষ্ট উদ্যমী।

লরা একগাল হেসে বললেন, আপনার সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হওয়ায় অত্যন্ত আনন্দিত আমি মিসেস অলিভার। মনে হয় আমার, হাতের কাছে আপনাকে পেলেই যারা বই নিয়ে আপনাকে বিরক্ত করে, আপনি তাদের অপছন্দ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন আমি বাতে অসমর্থ তাই আপনার বিরক্তি উৎপাদন করেও বলতে পারি আপনার বইগুলোই আমার অবসর বিনোদনে প্রধান সঙ্গী।

–মিসেস আপওয়ার্ড, আমার তো এ সৌভাগ্য। (বাচ্চা মেয়ের মত মিসেস অলিভার হাত ওল্টালেন) এই ভদ্রলোক মঁসিয়ে পোয়ারো, বহুকালের বন্ধু আমার। হঠাৎই বহুদিন বাদে আপনার বাড়ির সামনে দেখা হয়ে গেল। আসলে ওর গায়ে গিয়ে লেগেছিল আমার আধখাওয়া আপেলের টুকরো…. অনেকটা সেই উইলিয়ম টেলের মতো ব্যাপারটা…

–মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুশী হলাম খুব। রবিন

 –কি মামনি?

–পানীয় নিয়ে এস কিছু। কোথায় সিগারেটগুলো?

–ওপরেই আছে টেবিলের।

-মঁসিয়ে, আপনিও লেখক, মিসেস অলিভার বলে উঠলেন, না না, একজন বিখ্যাত গোয়েন্দা উনি শার্লক হোমসের মতো। খুব বিখ্যাত। একটা খুনের তদন্তে এসেছেন এখানে।

একটা ঠুং করে শব্দ হল–হালকা গ্লাস ভাঙার শব্দের মতো।

লরা বললেন, রবিন সাবধানে কাজ কর। এরপর তাকালেন পোয়ারোর দিকে। –তাই নাকি মঁসিয়ে পোয়ারো?

বিস্মিতভাবে রবিন বলল, তাহলে তো মরিন সামারহেস ঠিকই বলেছে। ও বলেছিল কদিন আগে। একজন গোয়েন্দা এসেছেন এখানে অবশ্য ওর কাছে একটা খুব মজার ব্যাপার। কিন্তু সত্যিই তো ব্যাপারটা গুরুতর তাই না?

মিসেস অলিভার বললেন, নিশ্চয়ই, একজন অপরাধী আপনাদের মধ্যেই লুকিয়ে বসে আছে।

-হ্যাঁ, কিন্তু খুন হল কে? নাকি কিছু পাওয়া গেছে মাটি খুঁড়ে? এসব নিয়ে কি পুলিশ গোপনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে?

-মোটেই না, কোনো গোপনীয়তার কারণই নেই। আপনারা খুনের ঘটনাটা সকলেই জানেন।

–মিসেস ম্যাগি…., ওই রকম কি যেন নামটা বৃদ্ধা কর্মচারিণীর গোছের একজন কেউ মিসেস অলিভার বললেন।

হতাশার সুর রবিনের গলায়–কিন্তু সে তো মিটে গেছে কবেই। আবার মিসেস অলিভার বললেন মোটেই মেটেনি। ভুল লোককে ধরেছে ওরা। আসল খুনীকে মঁসিয়ে পোয়ারো ধরতে না পারলে ফাঁসিতে ওই বেচারীকেই লটকানো হবে। ভয়ঙ্কর এবং উত্তেজনাপূর্ণ সবটাই।

পানীয় বিলি করল রবিন–মামনি, তোমার জন্য হোয়াইট লেডি।

–রবিন ধন্যবাদ লক্ষ্মী ছেলে। সামান্য ভুরু কুঁচকালেন পোয়ারো।

 মিসেস অলিভার এবং তাকেও পানীয় দিল রবিন। তারপর বলল, আসুন, আপনার সাফল্য কামনা করে পান করা যাক।

রবিন পান করতে করতে হঠাৎ বলল, আমাদের এখানে উনি কাজ করতেন।

-মিসেস ম্যাগিনটি? মিসেস অলিভার জিজ্ঞেস করলেন।

–হ্যাঁ, তাই না মামনি?

–হ্যাঁ, অবশ্য তাকে যদি কাজ বল। সপ্তাহে একদিন সে আসত। দুপুরের দিকে কখনো কখনো এসে হাজির হত, অসময়ে।

-উনি কেমন ছিলেন? মিসেস অলিভার জিজ্ঞাসা করলেন।

-যথেষ্ট প্রশংসা করবার মত। আর বড় পরিষ্কার, পরিষ্কার বাতিক ছিল। খুব গুছিয়ে রাখতেন সব জিনিস। যা পেতেন হাতের কাছে চালান দিতেন দেরাজের মধ্যে, কাজের জিনিস খুঁজে বের করা মুশকিল হত।

মিসেস আপওয়ার্ড বললেন, কিন্তু যদি সপ্তাহে একদিনও ঘর না পরিষ্কার করা হয়, তবে আর ঘরে পা ফেলা যাবে না।

–হ্যাঁ মামনি। কিন্তু দরকারী কাগজপত্র সব আমার ওলট পালট হয়ে যায়।

–তা অবশ্য ঠিক। তবে পুরনো কাজের মেয়েটি আমাদের শুধু রান্নাই করতে পারে।

–আপনার কি আর্থারাইটিস আছে? মিসেস অলিভার জিজ্ঞাসা করলেন।

হয়ত ভবিষ্যতে নামের ওপর চব্বিশ ঘন্টাই নির্ভর করতে হবে অথচ মনে প্রাণে আমি স্বনির্ভর হতে চাই। আমার একেবারে মেয়ের মত রবিন। আমার সব কাজ ও করে দেয়।

উঠে পড়লেন পোয়ারো। এবার আমায় যেতে হবে আর একজনের বাড়ি হয়ে ট্রেন ধরব মিসেস আপওয়ার্ড, ধন্যবাদ আপনার আতিথেয়তার জন্য।

মিসেস অলিভার বললেন, শুভেচ্ছা রইল খুনের তদন্তের জন্য। রবিন বলল, এটা কি সত্যি খুব দরকারী না ঠাট্টা করছেন আপনি?

-না না, খুবই দরকারী এটা। খুনীর নামটাও উনি জানেন, কিন্তু বলবেন না।

-আরে না না। সত্যিই আমি অতদূর এগোইনি। মৃদু আপত্তি তুললেন পোয়ারো। মিসেস অলিভার বললেন, বলছেন বটে আপনি তবে আমার ধারণা সবই জানেন আপনি। আপনার গোপন করা স্বভাব….

মিসেস আপওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি সত্যি না শুধুই কৌতুক?

–না, কৌতুক নয় এটা–পোয়ারো অভিবাদন করে বিদায় নিলেন।

তিনি পথে নামতে নামতে রবিনের কথা শুনতে পেলেন।

–কিন্তু এরিয়েন, সবই ভালো অথচ ঐ গোঁফটোফ দেখলে ইচ্ছে করে না বিশ্বাস করতে। কি বলছ তুমি, সত্যি উনি কাজের লোক?

নিজের মনে পোয়ারো হাসলেন। সরু রাস্তাটা পার হতে গিয়ে থামলেন। মিঃ সামারহেসের স্টেশন ওয়াগনটা এসে পড়েছে। গলা পাওয়া গেল ওঁর যেতে হবে স্টেশনে, কনভেন্ট গার্ডেনের ট্রেনটা ধরা দরকার।

ট্রেন ধরারও তাড়া ছিল পোয়ারোর। স্পেন্সের সঙ্গে দেখা করার জন্য উৎসুক তিনি।

পাহাড়ের গা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি একটা ছোট্ট আধুনিক ফ্যাশনের বাড়ির সামনে এসে থামলেন। মিঃ আর মিসেস কার্পেন্টারের বাড়ি এটাই। বেশ ধনী এবং বিখ্যাত ভদ্রলোক তিনি। কাপেন্টার ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়াকর্স-এর মালিক। ভদ্রলোক এখন রাজনীতি করেন। সদ্য বিবাহিত।

একজন ভৃত্য বাড়ির দরজা খুলে দিল। কোনো জিনিস বিক্রি করতে এসেছে ভেবে কেউ নেই বাড়িতে বলে পোয়ারোর মুখের ওপর বন্ধ করে দিল দরজা।

পোয়ারো ডেকে বললেন, তাহলে আমি অপেক্ষা করছি।

–ওঁরা ফিরবেন কখন আমি জানি না।

পোয়ারো নিরাশ হয়ে ফিরে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। তার নজরে পড়ল একজন ভদ্রমহিলা। পিংক কোট মহিলার পরনে।

–হ্যালো, কি চান আপনি?

–মিঃ আর মিসেস কার্পেন্টারের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। আপনিই মিসেস কার্পেন্টার?

-হ্যাঁ।

 –আমি এরকুল পোয়ারো।

মহিলার মনে নামটি খুব বেশি রেখাপাত করল না। তিনি জানতেন না যে, মিসেস সামারহেসের অতিথি পোয়ারো।

–বলুন, কি দরকার আপনার?

–সাংসারিক বিষয়ে আমি কতকগুলো খবর জানতে চাই।

–আমরা কিন্তু কিছু কিনতে চাই না।

 –ভুল বুঝেছেন আপনি, শুধু কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই আমি।

–আচ্ছা, ভেতরে আসুন আপনি।

যে ঘরে পোয়ারো ঢুকলেন, রুচিসম্মতভাবে সেটা সাজানো। কোথাও আসবাবপত্রের বাহুল্য নেই।

-বসুন মিঃ পোয়ারো।

–জানতে এসেছি মিসেস ম্যাগিনটির সম্বন্ধে। উনি গত নভেম্বরে মারা গেছেন।

–মিসেস ম্যাগিনটি, কিছুই আমি বুঝতে পারছি না।

–মনে করতে পারছেন না?

–না।

–খুন হয়েছিলেন উনি।

–ও হ্যাঁ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম ওঁর নামটা।

–এখানে উনি কাজ করতেন?

–না, আমি জানি না। মাত্র তিন মাস আগে আমার বিয়ে হয়েছে।

-উনি কিন্তু কাজ করতেন আপনার বাড়িতেও, প্রতি শুক্রবার সকালে। রোজ কটেজে –তখন আপনার পচিয় ছিল মিসেস সেলকার্ক।

-যদি আপনি সবই জানেন, তবে কেন শুধু শুধু জিজ্ঞেস করছেন? আর কেনই বা এত সব জানতেন বা চাইছেন?

তদন্ত করছি আমি।

–কেন এসেছেন আমার কাছে?

–হয়ত আপনি কিছু জানতে পারেন এই ভেবে।

–কিছু জানি না আমি। উনি নিতান্তই নির্বোধ ছিলেন। কেউ টাকা রাখে মাটির নিচে? সেজন্যই তো ওঁকে কেউ খুন করল। রবিবারের কাগজের খবরের মত আজগুবি যত কাণ্ড।

-রবিবারের কাগজ মানে, সানডে কম্প্যানিয়ন?

 লাফিয়ে উঠলেন ভদ্রমহিলা। চেঁচাতে লাগলেন জানলার কাছে গিয়ে গীই গীই…..

–ইভ, কি বলছ?

 –একবার এস শীগগির।

বয়স বছর পঁয়ত্রিশ হবে জানলার কাছে এলেন এক ভদ্রলোক।

ইভ বললেন, বিদেশী ভদ্রলোক এসেছেন একজন। যে ভদ্রমহিলা গত বছরে খুন হয়েছিলেন সেই ব্যাপারে কি সব আজেবাজে প্রশ্ন করছেন আমায়। এসব আমি অপছন্দ করি তুমি জানো।

ভদ্রলোক জানলা টপকিয়ে ঘরে এলেন।

–কি মশাই, বিরক্ত করছেন আমার স্ত্রীকে?

–না, না, ছিঃ। তদন্তের ব্যাপারে আমি ভেবেছিলাম উনি আমায় সাহায্য করবেন।

–কিসের তদন্ত?

 –মিসেস ম্যাগিনটির হত্যার ঘটনার। পূর্ণতদন্ত হচ্ছে।

–কিন্তু সে তো চুকে গেছে।

–না, যায়নি।

–পুলিশ করছে। কিন্তু আপনি তো মনে হচ্ছে পুলিশ পক্ষের নন বলেই।

–আমি নিরপেক্ষ তদন্তে নেমেছি পুলিশের অনুরোধে।

–দেখ, নিশ্চয়ই কোনো প্রেস থেকে এই ভদ্রলোক এসেছেন, কোনো রবিবাসরীয় পত্রিকার তরফ থেকে।

সতর্কতার আভাস মিঃ কার্পেন্টারের চোখে।

-আমার স্ত্রী খুব নরম প্রকৃতির মানুষ। ওই ভদ্রমহিলাকে উনি প্রায় চিনতেনই না।

ইভ বললেন, উনি নির্বোধ ছিলেন আর খুব মিথ্যেবাদী।

–তাহলে মিথ্যেবাদী ছিলেন উনি? খুব দরকারী তথ্য এটা। পোয়ারো বললেন।

–কি হিসেবে?

–খুনের কারণ হিসেবে। এ পথেই এগোচ্ছি আমিও।

–কিন্তু শুনেছি টাকাকড়ির জন্য উনি মারা যান।

–তাই কি? মিসেস কার্পেন্টারকে আমি অস্বস্তিতে ফেলার জন্য দুঃখিত।

–আমরা দুঃখিত, কোনো তথ্য আপনাকে সরবরাহ করতে না পারার জন্য।

–কিন্তু তা আপনারা করেছেন।

–আপনি কি বলছেন?

–ওই যে বললেন মিথ্যে বলতেন উনি। আচ্ছা, কি ধরনের মিথ্যে?

–কি জানি, সঠিক মনে নেই আমার। সব বেশির ভাগই আর্যাঢ়ে গল্প, নানা লোকের সম্বন্ধে।

–ওঁর কথাবার্তা তাহলে খুব সাংঘাতিক ছিল, বলুন।

–না, তা ঠিক নয়। গল্পচ্ছলে বলতেন। গল্পচ্ছলে?

বিদায় নিয়ে উঠলেন পোয়ারো, হল পর্যন্ত মিঃ কার্পেন্টার সঙ্গে এলেন।

–রবিবারের পত্রিকা আপনার কোনটা?

আপনার স্ত্রীকে সেটার কথা বলেছিলাম। তা সানডে ক্যানিয়ন।

–সানডে কম্প্যানিয়ন, আমি ওটা বিশেষ পড়ি না।

-মাঝে মাঝে ওটাতে বেশ নতুন ধরনের ঘটনার উল্লেখ থাকে। আমাকে এবার বিদায় দিন। আপনাদের বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।

পোয়ারো ফিরে যেতে যেতে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, অবাক হচ্ছি আমি, সত্যি অবাক হচ্ছি।

.

১১.

সুপারিন্টেডেন্ট স্পেন্স যিনি পোয়ারোর সামনে বসা তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মিঃ পোয়ারো, আমি বলছি না যে, কোনো তথ্য পাননি আপনি। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি হয়ত কিছু পেয়েছেন আপনি কিন্তু তা বোধহয় খুবই সামান্য। দরকার আরও তথ্য। ওই রবিবারের কাগজটা অনেক আগেই আমার বা আমার সহকারীর নজরে আসা উচিত ছিল।

–আপনি নিজেকে এ জন্যে দোষারোপ করতে পারেন না। যে রকম পারিপার্শ্বিক অবস্থা ছিল, তাতে কাগজ দেখার কথা মনেও আসে না।

-তবুও আমাদের ওটা দেখা উচিত ছিল। আর কালির বোতলটা?

–আমি দৈবাৎ ওটার কথা জানতে পারি।

–ওটাও কি কাজের পক্ষে আপনার দরকারী?

–সেটা শুধু চিঠি লেখার কথা ভেবে।

–ঐ চারজন কাগজের মহিলার পুরনো ছবি থেকে কাউকে সনাক্ত করা শক্ত হবে বলে মনে হয়। দিনকাল সব দিক দিয়েই যা পাল্টাচ্ছে।

–আপনারও কি মনে হয় আমার মত যে ভেরা ব্লেককে বাদ দিতে পারি।

–হ্যাঁ। যদি ভেরা ব্লেক এখানে আসত, তবে তার কাহিনী সবাইকে শুনিয়ে বেড়াত।

 –আর অন্য তিনজন?

 –কেন দেশত্যাগী হয়েছিল ইভা। সে নাম নিয়েছিল ইভলিন হোপ।

–এরকম রোমান্টিক নাম কবিতায় পাওয়া যায়।

–তাহলে কি আসল নাম তার ইভালিন ছিল?

–হ্যাঁ, তবে সে বেশি পরিচিত ছিল ইভা নামেই।

–ইভা কেন সম্বন্ধে কি মনে করে পুলিশ।

–তখন অল্প বয়েস আমার। আলোচনা শুনে বুঝতাম কোনো প্রমাণ না থাকলেও মোটেও নির্দোষ নয় ইভা কেন। সম্ভবত হত্যার পরিকল্পনাটা তারই ছিল। মিঃ ক্রেগের অনুপস্থিতির সুযোগে নিয়েই হয়ত সে হত্যা করেছিল ভদ্রমহিলাকে। তারপর বাড়ি ফিরে মিঃ ক্রেগ ব্যাপার দেখে তাড়াতাড়ি সবকিছু চাপা দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় নিজে।

–জেনিস কোর্টল্যাণ্ড? এডিথ থাপসনকে খুনের দায়ে শাস্তি দিলেও উচিত হয়নি জেনিসকে ছেড়ে দেওয়া।

আর সেও সম্ভবত সরিয়ে দিতে চেয়েছিল স্বামীকে।

–আবার কি পরে জেনিস বিয়ে করে?

সঠিক জানা নেই।

–সে বিদেশে যায়, তারপর? –সে স্বাধীনভাবে বসবাস করার অধিকার পেয়েছিল।

–একটা ককটেল পার্টিতে কোনো সময় যে কেউ তার সাক্ষাৎ হঠাৎ পেতে পারে।

নিশ্চয়ই।

–আর লিলি গ্যাম্বল?

–শাস্তি পাবার পক্ষে ছোট ছিল যথেষ্ট। ও স্কুলে যায় এরপর চাকরি যোগাড় করে শর্টহ্যাণ্ড, টাইপিং শিখে। আর কিছু তার পরের খবর জানা নেই। মনে হয় আমার ওকেও বাদ দেওয়া যেতে পারে। ও একটা খুন করে ফেলেছিল রাগের মাথায়।

–বাদ দিতে পারতাম। কিন্তু বাদ সাধছে মাংস কাটার বড় ছুরিটাই। প্রায় একই ধরনের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মিসেস ম্যাগিনটিকেও লিলির পিসীমার মত হত্যা করা হয়েছে।

–হয়ত ঠিকই বলছেন আপনি। আচ্ছা, ঘটনাস্থলের প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই চারজনকে মেলাতে গেলে কেমন হয়?

–এখন বেঁচে থাকলে ইভা কেনের বয়স ষাটের কাছাকাছি হত। ত্রিশের কোঠায় তার মেয়ের বয়স। লিলি গ্যাম্বলেরও সেই বয়স। জেনিস কোর্টল্যাণ্ডের প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই হবার কথা।

–হ্যাঁ, হিসেবটা ঠিকই করেছেন।

–এখন দেখতে হবে মিসেস ম্যাগিনটি কার কার বাড়িতে কাজ করতেন।

ফটোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন?

–হ্যাঁ দেখতে হবে। যাদের বাড়িতে উনি কাজ করতেন তাদের খুঁটিয়ে দেখতে হবে।

–নিশ্চয়ই।

মারা যান যেদিন, সেদিন ওয়েদারবিদের বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। ইভা কেনের মতই মিসেস ওয়েদারবির বয়স আর তার মেয়েও ইভার মেয়ের বয়সী হবে। আবার দেখা যাচ্ছে ইভার মেয়েও তার আগের পক্ষের মেয়ে ছিল।

ফটোর সঙ্গে মিলিয়ে বলছেন?

–বন্ধু, ফটোর সাথে মিলিয়ে ঠিক ঠিক বলা কখনোই সম্ভব নয়। আমার মনে হয় যতদূর এককালে মিসেস ওয়েদারবি সুন্দরী ছিলেন। হয়ত আপনারা ভাবছেন উনি অশক্ত মহিলা। কিন্তু আমরা যতক্ষণ না জানতে পারছি সঠিকভাবে যে কোন অস্ত্রটা দিয়ে খুন করা হয়েছে ততক্ষণ কারও শারীরিক শক্তি সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না।

–হ্যাঁ, অস্ত্রটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তারপর?

–দেখুন, স্বামীর কানে যাতে অতীতের কলঙ্ক পৌঁছয়, সেজন্যও ভদ্রমহিলা খুন করতে পারেন। আবার ঐ একই কারণে খুনী হতে পারে মেয়েটিও। অন্যদিকে পারিবারিক কলঙ্ক চাপা দেবার জন্য স্বামী ভদ্রলোকটিও হত্যা করতে পারেন। একটা জিনিস ওদের বাড়িতে গিয়ে পরিষ্কার বুঝেছি মেয়েটি মাকে যথেষ্ট ভালোবাসলেও ভীষণ অপছন্দ করে সৎপিতাকে।

সানডে কম্প্যানিয়ন-এর কথা চিন্তা করলে সবচেয়ে সন্দেহজনক চরিত্র ওরাই।

-হ্যাঁ। ইভা কেনের বয়সী আর মাত্র একজনই আছেন এখানে। তিনি মিসেস আপওয়ার্ড। কিন্তু দুটো কথা থেকে যাচ্ছে বিপক্ষে। এক উনি আর্থারাইটিসের রুগী হুইল চেয়ারে ঘোরেন সর্বক্ষণই….

–সত্যি না হয়ে হুইল চেয়ারের ব্যাপারটা অভিনয়ও হতে পারে।

–দ্বিতীয়ত, হাবভাব সবই ওঁর ইভা কেনের ঠিক বিপরীত।

–তা ঠিক। খুনী হওয়া যেমন মিসেস আপওয়ার্ডের পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতাও তেমন নয়। আর জেনিস কোর্টল্যাণ্ড?

–ঠিক ওই বয়সের কেউ নেই। যদি না নাক উঁচু ভদ্রমহিলার কেউ হন।

এখানে তিনজন ত্রিশোত্তীর্ণ বা ত্রিশের কাছাকাছি ভদ্রমহিলা আছেন। একজন, ডঃ রেগুলের স্ত্রী, আরেকজন মিসেস কার্পেন্টার, শেষজন ডীডার হেণ্ডারসন। এদের মধ্যে আবার যে কেউই লিলি গ্যাম্বল হতে পারে। লম্বা না বেঁটে ইভা কেনের মেয়ে, কেমন গায়ের রং আমরা সে সব কিছুই জানি না। আমার মনে হয় কোনো কারণে মিসেস রেগুল ভয় পেয়েছেন।

-আপনার সম্পর্কে?

–তাই তো মনে হয়। নিশ্চয়ই এর কোনো তাৎপর্য আছে। হয়ত উনি ইভার মেয়ে বা লিলি। ওঁর চুলের রং গাঢ় না হালকা?

-হালকা।

–লিলিরও তাই।

–মিসেস কার্পেন্টারের চুলের রঙও হালকা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ওঁর চোখ। বড় বড় গাঢ় সুন্দর নীল চোখ। যখন উনি দুহাত বাড়িয়ে ডাকছিলেন স্বামীকে, ওকে দেখাচ্ছিল ঠিক যেন বিরাট এক প্রজাপতি। 

–মিঃ পোয়ারো বড় ভাবপ্রবণ আপনি।

–মোটেই না। আমার বন্ধু হেস্টিংস, বরং ভাবপ্রবণ সে আর কল্পনাবিলাসী। বলতে চাইছি আমি যে একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য তার চোখে। আচ্ছা…

পোয়ারো এই পর্যন্ত বলে লিলির চশমা পরা ছবির ওপর হাত দিলেন।

–মিঃ পোয়ারো তাহলে আপনি বলতে চান লিলি গ্যাম্বলই….

-না, শুধু সম্ভাবনার দিকটা আমি বিচার করছি। যখন মিসেস ম্যাগিনটি মারা যান, তখন মিসেস কার্পেন্টার ছিলেন বিধবা, যাকে বিয়ে করতে মনস্থ করেন মিঃ কার্পেন্টার। কিন্তু উনি যদি লিলি হন, অথবা ইভা কেনের মেয়ে তবে খোঁজখবর নেবার পর কি ওকে মিঃ কার্পেন্টার বিয়ে করতে রাজী হতেন? ভালোবাসার প্রশ্ন হয়ত তুলবেন আপনারা। কিন্তু যে প্রকৃতির মানুষ মিঃ কার্পেন্টার তাতে মনে হয় ওর কাছে মর্যাদাবোধের তুলনায় ভালোবাসা তুচ্ছ। তবে এটা খুব স্বাভাবিক হবে যে, ভদ্রমহিলা সর্বদাই কান বাঁচিয়ে চলেছেন ওর স্বামীর।

–তাহলে আপনি ওঁকেই সন্দেহ করেন?

-বারবার তো আপনাকে বলছি যে, এখনো আমি জানি না। শুধু আলোচনা করছি সম্ভাবনার কথা। অত্যন্ত সর্তক মিসেস কার্পেন্টার এবং আমায় সন্দেহের চোখে দেখেন।

–সেটা খুব খারাপ।

-হ্যাঁ। শিকারীর মত হয়েছে আমার অবস্থা। মিসেস কার্পেন্টার যে বললেন মিথ্যেবাদী মিসেস ম্যাগিনটি হয়ত এ কথারও কোনো সঙ্গত কারণ আছে।

–সত্যি সত্যি কি মনে হয় আপনার?

 –কি মনে হয় তার চেয়েও বড় কথা কি জানতে হবে আমায়।

–আমরা যেটাকে খুনের কারণ বলে ভাবছি, সেটা কি সত্যিই খুনের কারণ?

–পারিবারিক ব্যাপারের ওপর তা নির্ভর করছে। ব্যক্তিগত কথা সকলেই গোপন করতে চায়। হয়ত সেইজন্যই প্রয়োজন হয়েছিল মিসেস ম্যাগিনটিকে হত্যা করার।

–ওয়েদারবিদের সন্দেহ করেন আপনি?

-না, তাদের যদিও সব কিছুই সন্দেহজনক। স্বভাবের দিক ভাবলে মিসেস ওয়েদারবির চেয়ে মিসেস আপওয়ার্ডের ওপর বেশি হয় সন্দেহটা। অতীত জীবনে হতে পারে এমন কেউ তিনি ছিলেন যা ছেলেকে জানতে দিতে চান না।

–রবিন কি কিছু মনে করবে তেমন কিছু হলে?

–তেমন মনে হয় না আমার। আধুনিক তার দৃষ্টিভঙ্গী। তার মায়ের প্রতি ততটা টান আছে বলে মনে হয় না যতটা আছে তার প্রতি তার মায়ের।

-কিন্তু মায়ের কলঙ্কিত অতীত গোপন রাখার জন্য খুন কি রবিন করতে পারে না?

–না। আমার তো মনে হয় সে বরং এটাকে নিয়ে নাটক লিখতে বসবে, মানে কাজে লাগাবে প্লটটাকে।

খুব শক্ত ব্যাপারটা বোঝা সব রকমের সম্ভাবনা আছে।

–আস্তে আস্তে হয়ত এগোতে পারব।

স্পেন্সের ঘর থেকে পোয়ারো বেরিয়ে এলেন।

তিনি ট্রেনের জন্য কিলচেষ্টার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। একটু ঝুঁকে দেখতে পেলেন ট্রেন আসছে। পিঠে হঠাৎ ধাক্কা খেলেন। লাইনের ওপর একটু হলেই পড়তেন। পাশে দাঁড়ানো এক ভদ্রলোক ঠিক সময়ে তাক ধরে ফেলে সামলে দিলেন।

-কি হল আপনার? আর একটু হলেই তো ট্রেনের তলায় পড়ে খোয়াতে হত প্রাণটা।

–অজস্র ধন্যবাদ আপনাকে।

–আসুন, সাহায্য করি আপনাকে। ট্রেনের কামরায় পোয়ারোকে ভদ্রলোক তুলে দিলেন।

বুঝতে পারলেন পোয়ারো তাকে কেউ ঠেলে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তদন্তে নিযুক্ত হওয়াতে তিনি কেউ একজন ভয় পেয়েছে, যে তাকে আজ হত্যা করতে চেষ্টা করেছিল।

পোয়ারো স্টেশনে পৌঁছে স্পেন্সকে ফোন করলেন।

–মিঃ স্পেন্স, খবর আছে, আমাকে একটু আগে মেরে ফেলবার চেষ্টা করেছিল কেউ একজন।

না না, কোনো আঘাত লাগেনি আমার তবে আর একটু হলেই মারা পড়তাম। চেষ্টা কে করেছিল জানি না। তবে জানবই। স্পষ্ট বোঝা গেল এবার ঠিক পথেই আমরা এগোচ্ছি।

.

১২.

বৈদ্যুতিক গোলযোগ মেরামতের জন্য গী কার্পেন্টারের বাড়িতে মিস্ত্রী এসেছিল। গৃহ ভৃত্যটি তার কাজে নজর রাখছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের দুজনের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল।

–মিটিঙে গিয়েছিলেন কাল আপনি?

–না।

–আপনার মনিব মিঃ কার্পেন্টার বক্তৃতা দিয়েছেন খুব চমৎকার। ওঁর গাড়ি মিটিঙে যাওয়ার সময় সব সময়ই আপনিই চালান তাই না?

–না, নিজে উনি চালাতে ভালোবাসেন। একটা রোলস বেন্টলে গাড়ি আছে ওঁর।

 –খুব ভালো গাড়ি। ওঁর স্ত্রীও কি নিজে চালান?

–হ্যাঁ, তবে বড় জোরে।

–ওঁর স্ত্রী ছিলেন কালকের মিটিঙে? নাকি উনি রাজনীতি পছন্দ করেন না?

–ভাব দেখান যেন খুবই পছন্দ করেন। মাথা ধরেছিল বলে মিটিঙের মাঝখানেই উঠে চলে এসেছিলেন গতকাল।

-আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে।

 মিস্ত্রী চলে যাবার পথে নোটবই একটা খুলে লিখল :

গতকাল রাত্রে মি একা গাড়ি চালিয়ে রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি ফিরেছে। ওই বিশেষ সময়টাতে কাজেই তার কিলচেষ্টার স্টেশনে উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক আগে মিসেস মি মিটিঙ থেকে উঠে রওনা দেন এবং মি র মাত্র দশ মিনিট আগে বাড়ি ফিরেছেন ট্রেনে করে।

নোটবইয়ের আগের পৃষ্ঠায় লেখা ছিল :

ডঃ আর কাল রাত্রে কিলচেষ্টারের দিকে রুগী দেখতে গিয়েছিলেন। সুতরাং ওই সময়ে কিলচেষ্টার স্টেশনে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল না তার পক্ষে। মিসেস আর সারাক্ষণ বাড়িতে ছিলেন। পরিচারিকা কফি এনে দেবার পর মিসেস স্কাটের কিন্তু তার সাথে দেখা হয়নি। নিজের গাড়ি আছে ভদ্রমহিলার।

.

পুরোদমে নাটক নিয়ে রবিনদের বাড়িতে কাজ চলছে।

–এরিয়েন, নাটকের এই লাইনটা আপনি বুঝতেই পারছেন না। কি চমৎকার!

–হ্যাঁ রবিন।

-কিন্তু আপনার সুখী ভাবা উচিত ছিল নিজেকে। নায়ক এখানে একজন পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক।

-না, ষাট বছরের ভদ্রলোক….

–না না,

–হা নিশ্চয়ই।

–কিন্তু আমার তো মনে হয় পঁয়ত্রিশ বছরের একটুও বেশি হওয়া উচিত নয়।

–গত তিরিশ বছর ধরে ভুলে যাচ্ছ কেন তাকে নিয়ে বই লিখছি। আমার প্রথম বইয়ের এই চরিত্রে তার বয়স পঁয়ত্রিশের কাছে ছিল।

–কিন্তু ষাট বছরের ভদ্রলোকটি হলে সব ব্যাপারটাই গুলিয়ে যাচ্ছে কেমন।

–তাই তো চাই।

–না না, পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি করা চলবে না ওকে।

–তা হলে তার আর স্তেন জারসন হওয়া চলবে না, সাধারণ কোনো লোক হতে হবে। –কিন্তু বইতো নায়কের নামেই কাটবে।

-তা বললে চলবে কেন? যারা আমার বই পড়ে সবাই তারা জানে গল্পের নায়ক আমার কেমন। নিশ্চয়ই নতুন করে তুমি নায়ক বানাতে পারো না।

–এটা কিন্তু বই নয়, নাটক। দর্শকের তো আমাদের ভালো লাগা দরকার।

–একটু বাইরে থেকে আমি ঘুরে আসছি।

–আমি সাথে যাব?

–না থাক।

–একটু চিন্তা করবেন নাটকটার কথা।

মিসেস অলিভার পথ চলতে চলতে আগাগোড়া খুঁটিয়ে ভাবতে লাগলেন। এরকুল পোয়ারোকে সাহায্য করা খুব দরকার।

তিনি পোস্ট অফিসে এসে আলাপ জমালেন মিসেস সুইটিম্যানের সঙ্গে।

–আমি আপনাকে চিনি। তিনখানা বই আছে আপনার আমার কাছে। এই দেখুন না, এখানেই আছে। হত্যা রহস্যের কাহিনী আপনি লেখেন, তাই না?

বইগুলোর দিকে মিসেস অলিভার নজর দিলেন। দ্বিতীয় সোনালী মাছের কীর্তি-বইটা মন্দ নয়। বেড়ালের মৃত্যু বইটারও খুব কাটতি হয়েছিল।

–সবই খুব ভালো বইগুলো, মিসেস সুইটিম্যান বললেন, এর একখানাও যদিও ভালো করে পড়ার সময় হয়নি আমার।

–আপনাদের এখানেই তো একটা খুন হয়েছে?

–হ্যাঁ, গত নভেম্বরে। বলতে গেলে একেবারে পাশেই।

–একজন গোয়েন্দা এসেছেন।

–ও, ছোটোখাটো সেই বিদেশী ভদ্রলোক? গতকাল উনি এখানে এসেছিলেন আর…

মিসেস সুইটিম্যান অন্য খরিদ্দার সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। একজন তরুণী পোস্ট অফিসে ঢুকতেই তিনি বললেন, মিস হেণ্ডারসন গুড মর্নিং, বেশ গরম আজ না? কেমন আছেন আপনার মা মিসেস ওয়েদারবি?

-ভালোই। খুব একটা বাইরে বেরোন না আজকাল।

–একটা দারুণ ছবি (সিনোমা) এসেছে কিলচেস্টারে।

–ভেবেছিলাম কাল যাব, কিন্তু আর হয়ে উঠল না।

পোস্ট অফিস থেকে মেয়েটি বেরিয়ে গেলে মিসেস অলিভার বললেন, মিসেস ওয়েদারবি পঙ্গু, না?

–সম্ভবত। এদের হাত পা একটু চালনা করা দরকার।

–হ্যাঁ, আমিও ও কথা বলবো ভাবছি মিসেস আপওয়ার্ডকে।

সবাই ইচ্ছে করলেই এঁরা উঠতে পারেন।

–সত্যি নাকি?

যাবার জন্যে মিসেস অলিভার পা বাড়ালেন। ডীডার হেণ্ডারসনের সাথে পথেই দেখা হল। ডীডারের সঙ্গে ছিল তার কুকুর।

-কি সুন্দর কুকুর!

–সত্যি খুব সুন্দর না? বেন, খুব সুন্দর তুমি। আহ্লাদে কুকুরটা ল্যাজ নাড়তে লাগল।

–তোমার বেন কি ঝগড়া করে? খুব ঝগড়াটে হয় এই জাতের কুকুররা।

–ঠিক বলেছেন। সেজন্য আমি ওকে সঙ্গে নিয়ে বেরোই।

–তাই ভাবছিলাম আমিও। হঠাৎ ডীডার বলে উঠল, এরিয়েন অলিভার আপনি তাই না?

–হ্যাঁ। মিসেস আপওয়ার্ডের ওখানে আমি আছি।

–আপনি আসছেন রবিন বলেছিল। আমার খুব ভালো লাগে আপনার বই।

মিসেস অলিভার লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন।

–জানেন, এই ধরনের বই পড়তে আমি খুব ভালোবাসি কিন্তু স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে বলে মা বিশেষ পড়তে দেন না।

-আপনাদের এখানে তো সত্যিকারের খুন হয়েছে।

–হ্যাঁ, ওই বাড়িটায়।

মিসেস অলিভার তাকালেন মিসেস ম্যাগিনটির বাড়ির দিকে। একটা বেড়ালকে দুটি বাচ্চা জ্বালাতন করছিল। বেড়ালটা সুযোগ পেয়ে আঁচড় দিয়ে পালালো।

বেশ হয়েছে। স্বগোতোক্তি করলেন মিসেস অলিভার।

-মনেই হয় না এই বাড়িটা দেখে কেউ খুন হয়েছে এখানে, তাই না?

—যা বলেছেন।

-বৃদ্ধা একজন মহিলা। না? আর বোধহয় ওর টাকাও খুনী চুরি করেছিল?

–ওঁর পেয়িংগেস্ট। টাকা ছিল মাটির নিচে।

–ও।

হঠাৎ ডীডার বলে উঠল, হয়ত ও মোটেই খুন করেনি। এক বিদেশী ছোটোখাটো চেহারার ভদ্রলোক। এরকুল পোয়ারো এই সব বলছিলেন।

–এরকুল পোয়ারো? আমি খুব ভালোভাবে ওকে জানি?

–সত্যি কি উনি ডিটেকটিভ?

উনি খুব চালাক আর অসম্ভব জনপ্রিয়।

-উনি হয়ত তাহলে সত্যিই প্রমাণ করতে পারবেন যে ও খুনটা করেনি।

কে?

 –ওই জেমস বেন্টলী। মনেপ্রাণে আমি চাই যেন ও মুক্তি পায়।

 –তুমি চাও, কিন্তু কেন?

 –আমি চাই না যে ও খুনী প্রতিপন্ন হোক। এ ধরনের মানুষ নয় ও ঠিক।

–ওকে তুমি চেন?

-না, ওর ঠিক পরিচিত নই আমি, আমার কুকুর বেন একবার আটকা পড়েছিল ফাঁদে। বেনকে মুক্ত করার সময় আমাকে ও সাহায্য করেছিল। অল্পক্ষণ কথাবার্তা হয়েছিল। আমাদের মধ্যে।

-কেমন ছেলেটি?

–খুব নিঃসঙ্গ। ভেঙে পড়েছিল মায়ের মৃত্যুর পর। খুব বেশি যোগ ছিল মায়ের সঙ্গে।

–তোমার মাকে তুমিও খুব ভালোবাসো।

–হ্যাঁ, তাই আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওর মনের কষ্টটা। শুধু আমি আর মা পরস্পরকে নিয়ে বেঁচে আছি।

-আমাকে রবিন বলেছিল তোমার সৎপিতা আছেন?

–হ্যাঁ, সৎপিতা।

-জানি আমি; এর অনেক তফাত নিজের বাবার সঙ্গে। নিজের বাবার কথা কি তোমার মনে পড়ে?

-না। আমার বাবা মারা যান আমি জন্মাবার আগেই। যখন আমি চার বছরের দ্বিতীয়বার আমার মা বিয়ে করেন। আমি ঘৃণা করি আমার সৎপিতাকে। আমার মা….কোনোদিন ওঁর কাছ থেকে একফোঁটা সহানুভূতি পাননি, বড় নিষ্ঠুর কঠিন উনি।

–জেমস বেন্টলী তাহলে তোমার মতে খুনী প্রকৃতির নয়?

–আমি তো ভাবতেই পারিনি ওকে পুলিশ ধরবে।

হয়ত পোয়ারো পারবেন প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে।

-হ্যাঁ, হয়ত উনি তা পারবেন। ডীডার চলে যাবার পর মিসেস এরিয়েন অলিভার তার নোটবই খুলে লিখলেন, ডীডার হেণ্ডারসন নয়। শেষের নয়কথাটির নিচে দাগ দিলেন এত জোরে যে ভেঙে গেল পেনসিলটা। বাড়ি ফেরার পথে এরিয়েনের সাথে রবিন ও একজন সুন্দরী তরুণীর দেখা হয়ে গেল।

রবিন বলল, এই ভদ্রমহিলা হলেন বিখ্যাত এরিয়েন অলিভার। এত দয়ালু ধরনের এর চেহারাটা যে বোঝাই যায় না ইনি রহস্য গল্প লেখেন। আর ইভ কার্পেন্টার ইনি। আমাদের পরবর্তী লোকসভার সদস্য এর স্বামী। যিনি বর্তমানে নির্বাচিত সদস্য আছেন তিনি একটি বুড়ো ভাম।

ইভ বলল, অনেক সময় তুমি বড় বাজে কথা বল। দলবিরোধী এসব কথা।

–তাতে কি? আমি তো নির্দলীয়। এরিয়েন ইভ আজ সন্ধেবেলা আমাদের সঙ্গে গল্প করতে চায়। এখানে আপনার আসা উপলক্ষ্যে খুশী হয়ে অয়োজন করেছি একটা ছোট্ট পার্টির বরং আপনি পরের বইটা আমাদের লিখুন এই ব্রডহিনির পটভূমিকায়।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, লিখুন। ইভ বলল। রবিন বলল, একবার স্তেনজারসনকে এখানে আনুন। যাকগে, মিঃ পোয়ারোকে আমরা নিমন্ত্রণ করতে যাচ্ছি। ইভ বলছিল, ও কাল ভদ্রলোকের সঙ্গে খুব রূঢ় ব্যবহার করেছে, তাই ক্ষমা চাওয়া দরকার। কিন্তু আপনি সত্যি পরের বইতে এ জায়গার সম্বন্ধে লিখবেন।

-হা মিসেস অলিভার। রবিন বলল, খুনী হবে কে আর কাকেই বা খুন করা হবে?

মিসেস অলিভার জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে মিসেস ম্যাগিনটির জায়গায় কে এসেছে বর্তমানে?

-না না, ও ধরনের নয় বরং খুনের জন্য ইভকে নির্বাচন করুন। ওর বেশ নিজের গলায় নিজের মোজাতেই ফঁস আটকিয়ে মৃত্যু হবে।

-না রবিন আমি না, বরং তুমি খুন হও। গ্রামের কুটিরে তরুণ নাট্যকারকে হত্যা।

রবিন বলল, কে হবে হত্যাকারী?

 আমার মা হতে পারেন। হুইল চেয়ারে বসে খুন করলে পায়ের ছাপ থাকবে না।

–ইভ বলল তোমার মা তো আর খুন করতে পারেন না তোমাকে।

–না, তা পারেন না। তবে ধর তোমাকে যদি খুন করেন!

-না, তোমাকে খুন করা হোক আর বরং মিস হেণ্ডারসন হল খুনী তাকে কেউ কোনোদিন খুনী ভাবতেই পারবে না।

রবিন বলল, দেখুন এরিয়েন আপনার বইয়ের প্লট মজুত। ও বাবা, কি ভয়ংকর মরিনের কুকুরগুলো।

দুটো আইরিশ নেকড়ে কুকুর ছুটে আসছে চেঁচাতে চেঁচাতে সকলে তাকিয়ে দেখলেন। একটা বালতি হাতে বেরিয়ে এল মরিন। ডাক দিল কুকুরদের, ফ্লিন, করমিক, এদিকে এস। ও আপনারা, এতক্ষণ শুয়োরগুলোর ঘর আমি পরিষ্কার করছিলাম।

রবিন বলল, তা জানি আমরা। সেই গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তোমার গায়ে। তা কেমন আছে শুয়োরগুলো?

ওদের নিয়ে আমরা কাল খুব ভয়ে ছিলাম। কিছু খেতে চায়নি। তবে ভালোই আছে আজ। জনিকে তো আজ প্রায় গুঁড়িয়ে ফেলেছিল।

রবিন বলল, তোমরা কি দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ জীবনযাপন করছ।

–জনিকে নিয়ে তুমি আজ সন্ধ্যেবেলার পার্টিতে আসছ তো, জিজ্ঞাসা করল ইভ।

–হ্যাঁ।

–আলাপ করতে চাও মিসেস অলিভারের সাথে? ইনিই মিসেস অলিভার।

–নমস্কার। একটা নাটক নিয়েছেন না আপনি আর রবিন একসঙ্গে?

–চমৎকার এগোচ্ছে কাজটা, রবিন বলল, জানেন এরিয়েন, চরিত্রগুলো কিভাবে বন্টন করলে ভালো হয় তা নিয়ে আমি ভেবেছি আপনি বেরোবার পরই।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মিসেস অলিভার। –ও চরিত্র বন্টন রবিন বলল, সিসিল লীচকে খুব মানাবে এরিকের চরিত্রে, এখন ও নিটলরেপ এ অভিনয় করছে। গিয়ে দেখে আমার একদিন।

ইভ বলল, মরিন, আমরা তোমার পেয়িংগেস্টকেও নিমন্ত্রণ করব। কোথায় উনি?

–ঠিক আছে। আমরা ওঁকে সঙ্গে নিয়ে যাব।

–না ওঁকে আমি নিজে করতে চাই। কারণ ওঁর সঙ্গে রূঢ়ভাবে আমি কথা বলেছিলাম।

-বোধহয় বাগানেই আছেন উনি। করমিক, ফ্লিন, কি হচ্ছেটা কি? মরিন বালতি ফেলে ছুটে গেল পুকুরের দিকে। ঐ পুকুরের দিক থেকে হাঁসেদের কোলাহল ভেসে এল কানে।

.

১৩.

পার্টি প্রায় শেষ হবার মুখে। হাতে পানীয় নিয়ে মিসেস অলিভার এগিয়ে গেলেন পোয়ারোর দিকে। এতক্ষণ সান্ধ্য সমাবেশে তাদের দুজনকে ঘিরেই মাতামাতি হচ্ছিল। সচরাচর হয়, পরিচিতেরা পাড়ার কেচ্ছা, নানা রকম স্থানীয় তথ্য সরবরাহ করা শুরু করলেন নিজেদের মধ্যে।

এই সুযোগে পোয়ারো এবং মিসেস অলিভার নিজেদের মধ্যে নিশ্চিন্তে কথা বলার সুযোগ পেলেন। ওঁরা কথা বলতে বলতে বাইরে বাগানে বেরিয়ে এলেন।

একটা কাগজ ছিল মিসেস অলিভারের হাতে। চুপিচুপি উনি সেটা গুঁজে দিলেন পোয়ারোর হাতে। সেটা পোয়ারো খুলে দেখলেন। তাতে ডঃ রেগুল লেখা আছে।

মিসেস অলিভারের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই উনি বললেন, ডঃ রেগুলই খুনী।

–জানলেন কি করে?

 –ওঁর ধরন দেখে।

–হতে পারে কিন্তু খুনের কারণটা কি?

–পেশাসুলভ আচরণের অভাব। সেটা বুঝতে পেরেছিলেন মিসেস ম্যাগিনটি। কিন্তু কারণ যাই হোক না কেন, খুনী উনিই।

–জানেন, কিলচেস্টার স্টেশনে কাল রাত্রে কেউ আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে চেষ্টা করেছিল রেল লাইনের ওপর ফেলে দিতে।

-হে ভগবান! মানে আপনাকে খুন করার মতলবে?

–হ্যাঁ, আমার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

–ডঃ রেগুল কিন্তু বাইরে গিয়েছিলেন রুগীর কল পেয়ে কাল রাত্রে, আমি সে খবর . জানি।

-হ্যাঁ, উনি কাল রাত্রে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন।

–তা হলে তো খুনী উনিই।

–নাও হতে পারেন কাল রাত্রে কার্পেন্টার দম্পতিও কিচেষ্টারে ছিলেন। কিন্তু একসঙ্গে না এসে আলাদা আলাদা ভাবে ওঁরা বাড়ি ফিরছিলেন। মিসেস রেগুল বলেছেন কাল সারাদিন উনি বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু সে কথার নিশ্চয়তা কি? মাঝে মাঝে মিস হেণ্ডারসনও সিনেমা দেখতে যান কিলচেস্টার-এ।

-কাল রাত্রে মিস হেণ্ডারসন যায়নি, বাড়িতে ছিল। আমাকে ও বলেছে।

–আপনার বিশ্বাস করা উচিত নয় সকলের কথা। কাল রাত্রে ওদের পরিচারিকা ফিজা সিনেমায় গিয়েছিল। তাই বাড়ির কেউ বাইরে গিয়ে থাকলে ওর তো জানতে পারার কথা নয়।

ঐ ব্যাপারটা স্টেশনে কটা আন্দাজ ঘটেছিল?

–নটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিটে। আমরা, মানে আমি, রবিন আর তার মা, তাস খেলছি রাত আটটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত।

–হয়ত আপনি আর রবিন দুজনেই খেলাতে মেতেছিলেন বড্ড বেশি।

–আর মিসেস আপওয়ার্ড আমাদের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন। আপনি না মঁসিয়ে পোয়ারো পাগল হলে না আমাদের চোখের সামনে উনি বরাবর ছিলেন। আপনি বোধহয় স্বপ্ন দেখছেন। যদি মিঃ স্পেন্সের মুখে এখন বিরাট কালো একজোড়া গোঁফ লাগিয়ে বলা হয় ইনিই মঁসিয়ে পোয়ারো তাহলে যা হয়, আপনার কল্পনাও ঠিক তেমনই অবাস্তব। কোনো কারণে বোধ হয় আপনি শারীরিক বা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

–হ্যাঁ হয়েছি মরিন সামারহেসের রান্না খেয়ে। শুধু যে খেয়ে তাই নয়, নানা জিনিস দেখেও। সর্বত্র ফাটল দেওয়ালে, ঠান্ডা হাওয়া, পেটের গণ্ডগোল, বেড়াল, লোমওয়ালা কুকুর, হাতলভাঙা পায়াভাঙা চেয়ার, আমার বিছানা-বড্ড পীড়াদায়ক এ সবই। বাথরুমের কল, ফুটো কার্পেট, বাজে কফি–এ সমস্তই যে কি খারাপ, বিশ্বাস করা যায় না, না দেখলে।

-ওঃ। কিন্তু সত্যিই মরিন সামারহেস সরল প্রকৃতির মহিলা।

–হ্যাঁ, বড্ড ভালো মানুষ। আমাকে সেটাই আরও গোলমালে ফেলেছে।

–ওই যে, এদিকেই আসছেন দেখছি উনি।

একটা গ্লাস মরিনের হাতে ধরা। পোয়ারো আর এরিয়েনকে দেখতে পেয়ে স্নিগ্ধ হাসি হাসলেন। বললেন, আমার কিন্তু অল্প নেশা হয়েছে। আমি পার্টি ভালোবাসি। এখানে আমাদের এসব বড় একটা হয় না। এটা আজ হচ্ছে আপনাদের আসা উপলক্ষে। আপনারা কত বিখ্যাত। ইস, যদি–আমিও বই লিখতে পারতাম। আসলে মুশকিল হল কোনো কাজই আমি নিখুঁতভাবে করতে পারি না।

–একজন আদর্শ স্ত্রী এবং মা আপনি, পোয়ারো তাকে বললেন।

চোখ দুটি মরিনের বিস্ময়ে বিস্ফারিত হল চোখ তার বড় সুন্দর। আন্দাজ করলেন মিসেস অলিভার মরিনের বয়েস ত্রিশের সামান্য ওপরে।

মরিন বললেন, সত্যি? যদিও আমি স্বামী আর সন্তানদের সকলকে ভীষণ ভালোবাসি কিন্তু যথেষ্ট কি সেটাই?

পোয়ারো বললেন, দেখুন, আমার মনে হয় যে সত্যি স্ত্রী তার স্বামীকে ভালোবাসেন, তাঁর উচিত স্বামীর পেটের প্রতি যত্ন নেওয়া।

-কিন্তু পেট তো জনির খুব ভালো, একেবারে চর্বি নেই। বলতে পারেন ওর পেটই নেই। অবাক হয়ে মরিন বললেন।

–না, না। খাবারদাবারের কথা আমি বলছি।

–ও বুঝেছি। আমার রান্নাবান্নার কথা আপনি বলতে চাইছেন। আমি আবার খাবারটাবারের ব্যাপারেও একেবারে চিন্তাই করি না। পোশাক-আশাকের ব্যাপারেও তাই।

মরিন দু-চার মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। অল্প নেশাগ্রস্ত চোখে যেন তাকিয়ে আছেন দূরে। হঠাৎ কথা বলতে শুরু করলেন আবার।

একটা চিঠি পড়ছিলাম সেদিন কাগজে। কেমন বোকা বোকা লাগল চিঠিটা। যদি বাচ্চাকে মানুষ করতে বাবামায়ের অসুবিধে থাকে অথচ দত্তক দিলে সেই বাচ্চার মানুষ হওয়ার সবরকম সুযোগ পাবার সম্ভাবনা ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা তবে দত্তক দেওয়া উচিত কি অনুচিত সেই সম্বন্ধে চিঠিতে আলোচনা করা হয়েছে। মনে হয় আমার এটা বাড়াবাড়ি। আমার মতে সবচেয়ে বেশি দরকার পেট ভরে বাচ্চাকে খেতে দেওয়া। তা পারলেই মিটে গেল সমস্যা।

শূন্য গ্লাসের দিকে মুখ নিচু করে তাকিয়ে মরিন মৃদুস্বরে বলে চললেন, একজনের দত্তক কন্যা ছিলাম আমি। আমায় আমার মা ত্যাগ করা সত্ত্বেও সমস্ত সুবিধে পেয়েছি আমি, তবু এখনো ভাবলে আমার কষ্ট হয় যে, আমার মায়ের কাছে আমি বঞ্চিত ছিলাম না।

-হয়ত সেটা আপনারই মঙ্গলের জন্য করা হয়েছিল। পোয়ারো বললেন।

মরিন পোয়ারোর চোখে চোখ রেখে বললেন, আমার কিন্তু তা মোটেই মনে হয় না। অবশ্য সমাজের কাছে এরকম জবাবদিহি করা সোজা। যাদের সন্তানকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় না, তারাই এরকম করতে পারে। আমিও মা, আমি কিন্তু জগতের সমস্ত সম্পদের বিনিময়েও কাছছাড়া করতে পারব না আমার সন্তানদের।

–আপনাকে সর্বান্তকরণে আমরা সমর্থন করি। পোয়ারো এবং মিসেস অলিভার দুজনেই একথা বললেন মরিনকে।

রবিন ইতিমধ্যে এগিয়ে এল। আপনাদের কি কথা হচ্ছে?

মরিন বলল, দত্তক নেওয়া সম্বন্ধে। আমার ভালো লাগে না নিজেকে দত্তক ভাবতে। তোমার লাগে?

রবিন বলল, কারও দত্তক সন্তান হওয়া নিশ্চয়ই ভালো অনাথ হওয়ার থেকে। যাকগে, এবার যাওয়া যাক চল।

সবাই উঠলেন অতিথিরা এর মধ্যেই ডঃ রেগুল চলে গিয়েছেন। ঢালু পথ ধরে সকলে এগোতে শুরু করলেন।

রবিন ল্যাবারলাম-এর গেটে পৌঁছতে বলে উঠল, একটু ভেতরে চলুন আপনারা, মাকে বলে যাবেন। উনি বড় অসহায় অথচ আনন্দ পেতে চান সাবইকে নিয়ে।

সবাই হৈ হৈ করে ভেতরে ঢুকল। ওদের সকলকে দেখে মিসেস আপওয়ার্ড খুশী হলেন বলে মনে হল।

উনি জিজ্ঞেস করলেন, আর কেউ এসেছিলেন, ওয়েদারবি পরিবারের ওরা?

-না, শরীরটা মিসেস ওয়েদারবির ভালো না থাকায় উনি আসেননি। তাই ওঁর মেয়েও আসেননি।

–একটু সংবেদনশীল মেয়েটি, না? শেলা রেগুল বললেন।

–একটু নয়। খুবই বেশি মনে হয় আমার। রবিন মন্তব্য করল।

–সেজন্য নিজেই মেয়েটির মা দায়ী। অনেক মা আছেন, এইভাবে যারা ছেলেমেয়ের মাথাটি খাচ্ছেন। হঠাৎ কথাটা বলে ফেলেই মরিন লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেলেন।

–রবিন, তোমার মাথাটি কি আমি খাচ্ছি? মিসেস আপওয়ার্ড জিজ্ঞেস করলেন।

–এ কি বলছ মামনি? তোমার কথাই হচ্ছে না।

অপ্রস্তুত হয়ে মরিন কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন। নিজের আইরিশ উলফ হাউণ্ডের বাচ্চার প্রসঙ্গ তুললেন উনি।

–মানুষ কুকুরদের মত বংশ পরম্পরায় পিতৃপুরুষের গুণ পায়। মিসেস আপওয়ার্ড সুনিশ্চিত ধারণা ব্যক্ত করলেন।

আমতা আমতা করে শেলা বললেন, এটা কি ঠিক? মনে হয় আমার পরিবেশও দায়ী তাতে অনেকটা।

–না বৎসে। যদি পরিবেশের প্রভাব কিছু থাকে, তবে তা ওপর ওপর। কেন মানুষ হবে তা বোঝা যাবে না তার বংশ পরিচয়েই।

অহেতুক শেলা জোর গলায় বললেন, খুব অন্যায় এটা। মানুষের বিচার করা ঠিক নয়। এভাবে। একটু লাল দেখালো শেলার মুখ।

কৌতূহল ভরে পোয়ারো শেলার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখলেন।

–জীবনটাই তো অন্যায়ে গড়া, শোনা গেল লরার কথা।

ধীরে ধীরে জনি সামারহেস বললেন, মিসেস আপওয়ার্ডের কথা আমি সমর্থন করি। মানুষের বংশধারার ধাত ব্যাপারটা খুব মানি আমি।

প্রশ্ন করলেন মিসেস অলিভার, আপনার কি মনে হয় সব গুণাগুণই মানুষের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তায়, তিন চার পুরুষ পরেও?

মরিন তার স্বাভাবিক সুমিষ্ট স্বরে বললেন, কিন্তু প্রবাদ আছে, যত খারাপই হোক না কেন একজন তাকে করুণা করা উচিত।

ক্রমেই বিষয়বস্তু গভীরতার দিকে এগোচ্ছে দেখে সকলে প্রসঙ্গান্তরে গেলেন। পোয়ারোকে লক্ষ্য করে বলা হল, এবার আপনি বরং মিসেস ম্যাগিনটির হত্যার ব্যপারে কিছু বলুন। কেন ওই পেয়িংগেস্টকে আপনার খুনী বলে মনে হয় না?

রবিন বলল, জানেন, রাস্তায় পায়চারী করবার সময় ওই লোকটা নিজের মনে বকবক করত। আমি প্রায়ই ওকে দেখতাম। কেমন যেন অদ্ভুত।

-ও যে খুন করেনি তার স্বপক্ষে আপনি নিশ্চয়ই কোনো প্রমাণ পেয়েছেন। একটু খুলে বলুন দয়া করে।

পোয়ারোকে সবাই ধরে বসল। পেয়ারো মৃদু হেসে গোঁফে হাত বোলাতে লাগলেন। বললেন, ও না করে থাকলে খুনটা কে করেছে?

-হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলুন আপনি। ও না করে থাকলে খুন করেছে কে?

লরা আপওয়ার্ড নীরস স্বরে বললেন, আপনাদের প্রশ্নে উনি কি রকম বিব্রতবোধ করছেন। আমাদের মধ্যে হয়ত কোনো একজনকেই খুনী বলে উনি সন্দেহ করেন।

ওরে বাবা আমাদের কেউ। চেঁচিয়ে উঠল সকলে।

মিসেস আপওয়ার্ডের চোখাচোখি হল পোয়ারোর সঙ্গে, ভদ্রমহিলার চোখে কৌতুক ছাড়া আরও কিছু ছিল কি? চ্যালেঞ্জ?

রবিন যেন মজার স্বরে বলল, আমাদের মধ্যে কাউকে? বাঃ মন্দ নয় তা। আচ্ছা মরিন, বল দেখি এবার তুমি সেদিন কোথায় ছিলে?

পোয়ারো তারিখটা মনে করিয়ে দিলেন-বাইশে নভেম্বর রাত্রে।

–তা তো মনে নেই আমার। মরিন বললে।

–এতদিন বাদে সঠিক ভাবে তা কেউই মনে করতে পারে না। সমর্থন জানালো শেলা।

রবিন বলল, মনে আছে আমার। আমি সেদিন কোলপোর্ট থিয়েটারে ব্যস্ত ছিলাম নাটক নিয়ে আলোচনায়। সেই আলোচনা চলছিল বহুক্ষণ। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল গলসওয়ার্দির নাটক সিলভারবক্স-এর পরিচারিকার চরিত্র। মিসেস ম্যাগিনটির মৃত্যুসংবাদ পরদিন বারবার আমাকে নাটকের ঐ চরিত্রটার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল।

-হ্যাঁ, হা, মনে পড়ছে আমারও, শেলা বললেন। তুমি সেদিন বলেছিলে একা থাকবেন তোমার মা কারণ সে রাত্রে জ্যানেট বাড়ি থাকবে না। তাই আমি রাত্রের খাওয়া সেরে ওঁকে খানিক সঙ্গ দিতে এসেছিলাম। যদিও ডেকে ডেকে কোনো সাড়া পায়নি ওর।

লরা খানিকটা ভেবে নিয়ে বললেন, সেদিন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল বলে। আমার আবার ঘরটা পেছনে, বাগানের দিকে।

আবার শুরু হল শেলার কথা।

খুন হবার কথা পরদিন জানতে পেরে আমার কেমন ভয় ভয় করছিল। এমন তো হতে পারে যে আমি রাস্তায় হত্যাকারীকে দেখেছি।

-এখনো আমার মনে পড়ছে না যে, আমি ঠিক কি কি করেছিলাম সেদিন। বলে চললেন মরিন, রুটিওয়ালা পরদিন সকালে আমাকে বলছিল মিসেস ম্যাগিনটির একটা কিছু হয়েছে। তার আগে দেরি দেখে যথারীতি ভাবছিলাম উনি কাজে আসছেন না কেন? উঃ কি সাংঘাতিক। প্রায় শিউরে উঠল মরিন।

তখনো লরার চোখ পোয়ারোর মুখের পর।

নিজের মনে পোয়ারো ভাবছিলেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ভদ্রমহিলা, নির্মম প্রকৃতির এবং স্বার্থপরও। কোনো কিছু করতে বসলে তা দৃঢ়তার সঙ্গে করার মত ওর মনের জোর আছে।

শেলা মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো সূত্র পেয়েছেন আপনি?

উৎসাহিত হলেন জনি সামারহেস-হা, ঠিক। কোনো সূত্র? এটাই তো গোয়েন্দা গল্পে আসল। একমাত্র গোয়েন্দা ছাড়া সূত্র থেকে আসল তথ্য আর কেউ উদ্ধার করতে পারে না।মশাই বলুন না যে কোনো একটা সূত্র, যা জেনেছেন আপনি।

হাসিমুখে সকলে পোয়ারোর দিকে তাকালেন তাদের কাছে এটা যেন অনেকটা মজার ব্যাপার (নিশ্চয়ই হত্যাকারী তা ভাবছে না)। কিন্তু আসলে এটা তো আর মজার ব্যাপার নয়। বড় ভয়ংকর জিনিস হত্যা।

পোয়ারো হঠাৎ পকেট থেকে সেই চারখানা ফটো বের করে রাখলেন টেবিলের ওপর। সূত্র চাইছিলেন আপনারা তাই না? এই সেই সূত্র। তিনি নাটকীয়ভাবে বললেন, একসঙ্গে সবাই টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ল। বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য শোনা গেল।

–দেখ দেখ।

–কি বিশ্রী ফটো।

 —টুপিটাও বিশ্রী।

-আরে, গোলাপের ছড়াছড়ি দেখেছ?

–কারা এরা?

–কি বিচ্ছিরি বাচ্চাটা।

–কেমন অদ্ভুত সব কিছুই।

এককালে কিন্তু এই ফটোর ভদ্রমহিলা দেখতে ভালোই ছিলেন।

–কেমন করে এ ফটোগুলো সূত্র হতে পারে?

চারদিক থেকে ঝুঁকে পড়া মুখগুলোর ওপর পোয়ারো নিজের দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেউ কি আপনারা ফটোর কাউকে চিনতে পারছেন? যে কোনো একজনকেও, সনাক্ত করতে পারছেন?

সনাক্ত?

–বলতে চাইছি আমি, এই ফটোর মত কোনো ফটো বা চেহারা আগে কোথাও দেখেছেন বলে কি কারও মনে হচ্ছে আপনাদের? হা, মিসেস আপওয়ার্ড, কিছু বলবেন আপনি, এই ফটো সম্বন্ধে?

লিলি একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে গ্যাম্বলের ছবিখানার ওপর আঙুল রেখে লরা বললেন, এই ধরনের, … মনে হচ্ছে যেন কোথায় দেখেছি….. কিন্তু কোথায়?

–আপনি দেখেছেন এরকম ফটো? কবে?

–খুব সম্প্রতি… কিন্তু কোথায়, মনে হচ্ছে যেন কোথায় দেখেছি… কিন্তু কোথায়? মনে করতে পারছি না। কিন্তু নিশ্চিত আমি, এই রকমই ঠিক দেখেছি।

কুঞ্চন দেখা গেল মিসেস অলিভারের কপালে। উঠে দাঁড়িয়ে শেলা বললেন, আমাকে এবার যেতে হবে মিসেস আপওয়ার্ড। আমার ওখানে আপনার চায়ের নিমন্ত্রণ রইল। একদিন কিন্তু আসতে হবে।

–নিশ্চয়ই, যদি আমাকে রবিন নিয়ে যেতে পারে।

–নিশ্চয়ই মা, সেটুকু জোর আছে আমার গায়ে। তবে ওয়েদারবিদের বাড়িতে যাবার দিন হঠাৎ পিছলে গিয়েছিলাম, পথে বেশ কাদা ছিল।

–আঃ, বলে লরা হঠাৎ শব্দ করে উঠলেন।

–মামণি কি হল?

–কিছু না, থামলে কেন?

ব্যাপারটা পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার সময় ঘটেছিল। তোমার হুইল চেয়ারটা প্রথমে পিছলে গেল, তারপর আমি, উঃ ভাবিনি, রক্ষা পাব সে যাত্রা।

হাসতে হাসতে সকলে বিদায় নিলেন। চিন্তান্বিতভাবে পোয়ারো হাঁটা দিলেন। তিনি কি ফটোগুলো দেখিয়ে ভুল করলেন? অনেকর মুখ দিয়েই নেশার ঝোঁকে বেফাঁস কথা কিছু বেরিয়ে যেতে পারে। তিনি যে নাটকীয়ভাবে সকলের সামনে ফটোগুলো বের করে দেখালেন, তার পেছনেও কি ঝোঁক ছিল নেশার? কে জানে।

কি ভেবে আবার তিনি উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ভেতরে গেট খুলে ঢুকে আবার বাড়িটাতে ফিরে এলেন। পোয়ারোর কানে এল রবিন আর মিসেস অলিভারের আলোচনা। রবিনই যেন দুজনের মধ্যে বেশি কথা বলছিল।

তিনি ডানদিকের দরজা ঠেলে মিসেস আপওয়ার্ডের ঘরে প্রবেশ করলেন। আর সকলের সাথে খানিক আগেই তিনিও কিছু সময় এ ঘরে কাটিয়ে গেছেন। ফায়ার প্লেসের সামনে ভদ্রমহিলা বসেছিলেন, চিন্তায় মগ্ন। সামান্য গলা খাকারি দিলেন পোয়ারো। উনি সেই শব্দে সচকিত হয়ে ফিরে তাকালেন।

–ও, আপনি, তাই বলুন। একেবারে আমি চমকে গিয়েছিলাম।

–আমি দুঃখিত। অন্য কাউকে কি আপনি আশা করেছিলেন? সে কে?

 লরা এড়িয়ে গেলেন প্রশ্নটা–আপনি কি কিছু ফেলে গেছেন, মিঃ পোয়ারো?

-যা আমি এখানে ফেলে গেছি, তা হল বিপদ। আপনি ফটোটা কার হতে পারে বলে সন্দেহ করেন?

–বিপদ?

-হ্যাঁ, আপনার বিপদ, কারণ আপনি একটা ফটো দেখে কোনো একজনকে চিনতে পেরেছেন। ঠিক যে চিনতে পেরেছেন তা নয়, পুরনো সব ফটোই প্রায় এক ধরনের লাগে।

মাদাম শুনুন, এ ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া আমাদের উচিত। একটা ফটো দেখে মিসেস ম্যাগিনটিও কাউকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাকে সেজন্য প্রাণ হারাতে হয়।

–কি বলতে চান আপনি? আমার ক্ষেত্রেও মনে হচ্ছে তাই ঘটবে বলে?

-হ্যাঁ। যা জানতে পেরেছেন আপনি, এখনই বলুন। নিরাপদ সময় এটাই। সেটাই শুভ হবে আপনার পক্ষে।

–দেখুন, এত সহজ নয় সব কিছু। আমি তো সঠিক কিছু জানি না। যা আবছা আবছা মনে পড়ে তা ভুলও হতে পারে। কোথায়, কখন, কবে, সবকিছুরই বেশ স্পষ্ট ছবি আসা দরকার মনের সামনে, যা বলছি, বুঝেছেন নিশ্চয়ই?

–কিন্তু মনে হয় আমার খুব ভালোভাবেই জানেন আপনি।

-আপনি আমায় ঘাবড়ে দিতে চান? জানেন, অনেক কিছুই খুঁটিয়ে ভাবা দরকার। ছুটে এসে আমার কাছে কোনো লাভ হল না আপনার। যা জানি আমি তা আমার নিজের কাছেই জানা থাক। আমি তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। ধীরভাবে এগোই। স্থির সিদ্ধান্তে আসার জন্য যেটুকু দরকার সেটুকু সময় নিতে আমি কার্পণ্য করি না।

-সব কিছু আপনি লুকোতে চান।

–হয়ত ঠিকই বুঝেছেন আপনি। মানুষের শক্তি জানার ক্ষমতাই মানুষকে সেটাই সঠিক পথ নির্দেশ করে। এরকম হালচাল আমাদের দেশের মানুষের বোধহয় পছন্দ হয় না। না, মিঃ পোয়ারো।

বিদেশী বলেই হয়ত আমি, আপনিও আপনার।

–তা কিন্তু আমি বলতে চাইনি যদি রাজী থাকেন আপনি, তবে স্পেন্সকে সুপারিন্টেডেন্ট ভাবা যেতে পারে।

–পুলিশ? না মিঃ পোয়ারো। তার দরকার এক্ষুনি আছে বলে মনে করি না আমি।

পোয়ারো নিরুপায় ভাবে কাঁধ ঝাঁকালেন।

–আমি আপনাকে সতর্ক করে দিলাম মাত্র। পোয়ারো ফিরে যেতে যেতে নিশ্চিত হলেন যে মিসেস আপওয়ার্ড ফটোখানা সুনিশ্চিতভাবে সনাক্ত করতে পেরেছেন।