৩.৫ তুষার ঝড়ের কবলে

১৯. তুষার ঝড়ের কবলে

শীতের সূর্য ইতিমধ্যেই দিগন্তের অনেক কাছে নেমে এসেছে, যখন হুমায়ুন কাবুল থেকে তাদের ফিরতি যাত্রার পথে খাড়া নীচের দিকে নেমে যাওয়া একটা গিরিপথ দিয়ে সে আর তার সৈন্যরা নামার সময়ে হিমশীতল বাতাসের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে ভেড়ার চামড়ার আস্তরন দেয়া একটা আলখাল্লায় নিজেকে ভালো করে মুড়ে নিয়েছে, আহমেদ খানকে তাঁর দিকে ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে আসতে দেখে।

সুলতান, আমরা শিবির স্থাপন করতে পারবো, এমন একটা স্থান এখান থেকে মাইল চারেক সামনে আমার গুপ্তদূতেরা চিহ্নিত করেছে। জায়গাটা পর্বতশীর্ষের কাছাকাছি একটা উঁচুভূমি যা বায়ুপ্রবাহ থেকে রক্ষিত আচ্ছাদিত দিকে অবস্থিত হওয়ায় আমাদের বাতাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে এবং কেউ আমাদের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে, আমাদের প্রহরীরা উঁচুভূমিতে অবস্থান করায় অনেক আগেই তাদের দেখতে পেয়ে আমাদের হুশিয়ার করতে পারবে।

দারুণ দেখিয়েছে, আহমেদ খান।

হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে তার গুপ্তদূতদের প্রধান কথা শেষ করে পুনরায় সৈন্যসারির সম্মুখের দিকে এগিয়ে যায়। কাবুলের উপর থেকে সহসা অবরোধ তুলে নেবার কারণ সম্বন্ধে সে তার কোনো সেনাপতিকে অবহিত করেনি, তাঁর কারণ এই না যে তাদের আনুগত্যের প্রতি সে সন্দেহ পোষণ করে, তার কারণ এই যে তাদের যে কোনো একজনের একটা আলটপকা মন্তব্যে হয়ত পুরো ব্যাপারটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। সে বরং তাঁদের বুঝিয়েছে অবরোধের বিষয়ে সে ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠেছে- বলেছে যে সে পর্বতমালার পূর্বদিকে অবস্থিত বাগে-গজরে যেতে ইচ্ছুক যেখানে কামরানের অনুগত লোকদের প্রহরীধীন অবস্থায় অন্যান্য অনেক ছোট ছোট দূর্গ রয়েছে দখল করার মতো এবং সেখান থেকে সে আরো লোক সংগ্রহ করার আশা রাখে। বরফ একেবারে গলে যাবার পরেই সে কাবুলে ফিরে এসে পুনরায় অবরোধ আরোপ করবে।

জাহিদ বেগ, আহমেদ খান আর নাদিম খাজা নিজেদের ভিতরে বিস্মিত ভঙ্গিতে দৃষ্টি আদান-প্রদান করে। হিন্দালের নৈশকালীন গোপন অভিসারের সাথে হুমায়ুনের এই আকষ্মিক সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা সে বিষয়ে জাহিদ বেগ যদি কিছু আঁচ করতে পারেও তার অভিব্যক্তিতে সেটা প্রকাশ পায় না বরং অন্যান্যদের মতোই সেও সাথে সাথে শিবির গুটিয়ে নেয়ার ঝক্কিপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করে। কেবলমাত্র বৈরাম খানের আগ্রহী চোখের দৃষ্টিতে হুমায়ুনের মনে হয়- তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে সে অনুমানের ঢেউ খেলা করতে দেখেছে কিন্তু অন্যদের মতো পারস্যের অধিবাসীও মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। হুমায়ুন এসব কিছুর মূলে যে কারণ রয়েছে সেটা গুলবদনকে খুলে বলেছে। হিন্দালের বোন হবার কারণে তার জানবার অধিকার রয়েছে। হামিদার মতোই, গুলবদনও নিশ্চিত হিন্দালের প্রস্তাবে কোনো গলদ নেই।

হুমায়ুন সহসা নিজের পেছন থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পায় এবং তাঁর সৈন্যসারির একেবারে পেছন থেকে অস্পষ্ট হট্টগোলের শব্দ ভেসে আসে। অতর্কিত হামলার জন্য এই আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ গিরিপথটা, যার একদিকে দুরারোহ ঢাল নিচে শীতে জমে থাকা নদীর বুকে গিয়ে থেমেছে একটা আদর্শ স্থান। হুমায়ুন তাঁর পর্যানের উপর ঘুরে পেছনে তাকায় কিন্তু আঁকাবাঁকা বাঁকের কারণে শব্দটা যেখান থেকে আসছে, সেটা দেখতে পায় না। সে যেটা দেখতে পায় সেটা হল তার লোকদের কয়েকজন ইতিমধ্যে নিজেদের ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পেছনের পশ্চাক্ষীদের অবস্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। তার ভাবনায় সেই ভয়টা সাথে সাথে ফিরে আসে, যা থেকে সে কখনই আসলে পুরোপুরি মুক্তি পায়নি। হিন্দাল নিশ্চয়ই তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না এবং কামরান আর তার অনুগত বাহিনীকে তাঁর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিবে না? তার সৎ-ভাইদের একজনের দ্বারা পুনরায় প্রতারিত হবার মতো এতবড় আহাম্মকি সে করেনি, নাকি করেছে? হুমায়ুন তার কালো ঘোড়াটার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং তাঁর বিভ্রান্ত সৈন্যদের ভিতর দিয়ে গিরিপথের ভেতর নিজের পথ করে নিয়ে এগিয়ে যায়, তাঁর দেহরক্ষীরা তাঁকে নিরবে অনুসরণ করে।

সে এমনকি যখন প্রথম বাকটা ঘুরে সে তখনও কিছু দেখতে পায় না, কিন্তু পেছন থেকে ভেসে আসা বিক্ষোভের আওয়াজ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিনিয়ত জোরাল হচ্ছে। তারপরে, হৃৎপিণ্ডে মাদলের বোল নিয়ে সে দ্বিতীয় বাকটা অতিক্রম করে এবং উত্তেজনার কারণটা দেখতে পায়। আল্লাহতালাকে অশেষ শুকরিয়া, ব্যাপারটা কোনো অতর্কিত হামলা নয়। সংকীর্ণ গিরিপথে পাশাপাশি চলতে গিয়ে দুটো গরুর গাড়ির চাকা পরস্পরের সাথে আটকে গিয়েছে। একটা গাড়ি পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে গিয়েছে। গাড়িটার পেছনের চাকা শূন্যে ঝুলে আছে আর কিছু লোক ভারী কাঠের জোয়াল ধরে ষাড় দুটোর মাথা নিজেদের দিকে টানছে এবং সামনের চাকার পেছনে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে চেষ্টা করছে গাড়িটাকে পুনরায় শক্ত মাটির উপরে নিয়ে দাঁড় করাতে।

কিন্তু মূল সমস্যা সৃষ্টি করেছে দ্বিতীয় গাড়িটা যা সম্ভবত এই পুরো দুর্ঘটনার সূত্রপাতকারী। গাড়িটার অন্তত অর্ধেক লোকজন ষাড়সহ কিনারা দিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়েছে। নীচের গিরিসঙ্কটের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন তাদের তিনজনের নিথর দেহগুলো জমে বরফ হয়ে থাকা নদীবক্ষের ধারাল আর এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা পাথরের উপরে পড়ে থাকতে দেখে, তাদের দেহ থেকে বের হওয়া রক্তে চারপাশের বরফ লাল হয়ে উঠেছে। আরেকটা ষাড় ঢালের উপর থেকে ছিটকে গিয়ে ঝুলে আছে, দড়ির প্রান্ত থেকে জীবন্ত ঝুলে আছে এবং গাড়িটার দুজন গাড়োয়ান সামনের দিকে ঝুঁকে এসে, গাড়ির সাথে গরু জুড়ে দেবার সরঞ্জামাদি ধরে বেচারাকে টেনে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। অন্যান্যরা চেষ্টা করছে গাড়িটা যাতে ভারের কারণে ঢাল দিয়ে গড়িয়ে না পড়ে যায় সেজন্য এর চাকার সামনে পাথর দিয়ে উন্মত্তের ন্যায় প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে। হুমায়ুনের চোখের সামনে দুই গাড়োয়ানের একজন বরফের উপরে আছাড় খায় এবং ভারসাম্য হারিয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে গিরিসঙ্কট থেকে ছিটকে যায়। নিচের মাটিতে পড়ে থাকা ষাড়গুলোর একটার পাশে আছড়ে পড়ার আগে তাঁর দেহটা গিরিসঙ্কটের পাথুরে পার্শ্বদেশে দুবার ধাক্কা খায়।

দড়িগুলো কেটে দাও। ষাড়গুলোকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে যেও না, চিৎকার করে হুমায়ুন আদেশ দেয়। আরো প্রাণহানির কোনো অর্থ হয় না। তোমাদের যদি সেজন্য গাড়িগুলোর মায়া ত্যাগ করতে হয় তবে তাই কর।

দীর্ঘদেহী, লাল পাগড়ি পরিহিত এক লোক দ্রুত নিজের কোমরবন্ধ থেকে একটা লম্বা খঞ্জর বের করে এবং বেকায়দায় ঝুলে থাকা ষাড়ের দিকে দৌড়ে যায়। দুই মিনিটেরও কম সময়ে সে চামড়ার দড়িগুলো কেটে ফেলে আর ষাড়টা জান্তব গর্জন করে আর উন্মত্তের মতো শূন্যে পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে গা গুলিয়ে ওঠা একটা আওয়াজ করে নিচের পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ে। গরুর গাড়িটা, হুমায়ুন এতক্ষণে খেয়াল করে সেটায় বিশালাকৃতি কয়েকটা তামার কড়াই আর রান্নার অন্যান্য সরঞ্জামাদি রয়েছে, রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। ভালো, হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, এই আবহাওয়ায় তার সৈন্যদের গরম খাবার প্রয়োজন। অন্য গাড়িটাকে যারা শীতের বাতাসে গরম শ্বাস নির্গত করে ধাক্কা দিচ্ছিল আর টানছিলো তারাও শেষ পর্যন্ত, বরফ হয়ে থাকা মাটিতে গাড়িটায় বহন করা তাবুর একটা অংশ নামিয়ে রেখে, এর পেছনের চাকা পুনরায় গিরিসঙ্কটের উপরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

হুমায়ুন স্বস্তির শ্বাস নেয়। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হতে পারতো। তার আরো লোক মারা যেতে পারতো কিংবা তাঁর সবেধন নীলমনি ভারবাহী হাতির পালের দুই একটা নিচের মাটিতে আছড়ে পড়তে পারতো। তার আর তার লোকদের এবার যাত্রাবিরতি করার সময় হয়েছে এবং হিন্দালের আন্তরিকতার একভাবে বা অন্যভাবে প্রমান পেতে আর পরিস্থিতির অগ্রগতি সম্বন্ধে জানতে সে অপেক্ষা করবে। আজ রাতে, সে তার লোকদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করবে যে কাবুলের সাথে চল্লিশ মাইলের বেশী দূরত্ব তৈরী করার পরে আর একটা চমৎকার স্থান পাবার কারণে তারা এখানে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে কয়েকদিন বিশ্রাম নেবে এবং নিজেদের অস্ত্র আর অন্যান্য যুদ্ধ উপকরণের পরিচর্যা করবে। বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে তার লোকদের খুশী হবার কথা, যদিও তাদের সবারই মন মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে, বিক্ষুব্ধও বলা যায়। কাবুলের আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলোর অনেকেই ইতিমধ্যে অন্যত্র রওয়ানা দিয়েছে, তাঁদের লুটতরাজ করার আশা শেষ হয়ে গিয়েছে বিশ্বাস করে, কিন্তু হুমায়ুন জানতো এমনটা ঘটতেই পারে তাই সে মনে মনে এর জন্য প্রস্তুত ছিল। হিন্দালের পরিকল্পনা যদি সফল হয় তাহলে অচিরেই সে কাবুল ফিরে যাবে সেখানের দূর্গপ্রাসাদ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আক্রমণ করতে। তাঁর কামানগুলো আরো একবার গোলাবর্ষণ শুরু করলে যারা তাঁকে ত্যাগ করেছিল তারা অচিরেই আবার এসে যোগ দেবে…।

সে তার লোকদের নিয়ে কোনদিকে যাবে এবং মোটামুটি কতটা দূরে সে বিষয়ে হিন্দালের সাথে সে একমত হয়েছিল। তাদের অস্থায়ী শিবির স্থাপণ একবার শেষ হলে সে আহমেদ খানকে আদেশ দেবে- দিন রাত তার গুপ্তদূতেরা যেন নজরদারি বজায় রাখে। তাঁরা তাহলে বিশ্বাস করবে কামরানের সৈন্যদল কর্তৃক অনুসরণের লক্ষণের জন্য তারা পাহারা দিচ্ছে। অবশ্য হিন্দালের পরিকল্পনা যদি ব্যর্থ হয় বা হিন্দাল তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নেবে…

*

ভেড়ারচামড়া আর পশমের পুরু একটা স্তরের নীচে শুয়ে হুমায়ুন অস্থিরভঙ্গিতে নড়াচড়া করে, তার ভাবনা আর দুশ্চিন্তাগুলোর কারণে আজকাল ঘুমান তারপক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হিন্দালকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি, পারি না আমরা? সে জিজ্ঞেস করে। একমাসেরও বেশী সময় অতিক্রান্ত হতে চলেছে এবং আমরা এখনও অন্ধকারেই রয়েছি।

তার পাশে শুয়ে থাকা একই রকম নিদ্রাহীন হামিদাও কেবল এপাশ ওপাশ করে। আমি সত্যিই সেটা বিশ্বাস করি। আমার আব্বাজানের নিকট একজন পরামর্শদাতা হিসাবে কর্মরত থাকার সময়ে তাঁর সম্বন্ধে তিনি যা কিছু বলেছিলেন আমাকে সেটাই বিশ্বাস করতে বলে। ভাইয়ের জন্য গুলবদনের ভালোবাসা আর সমীহবোধও সেই কথাই বলে। আমাদের সাথে সে বিশ্বাসঘাতকতা করবে সেটা না বরং সেই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হবে বা কোনো কারণে আকবরকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হবে আমি এটা ভেবেই বেশী উদ্বিগ্ন। কামরান তখন তাহলে কি করবে? সে নিশ্চয়ই আকবরকে হত্যা করবে না, নাকি করতেও পারে…?

প্রশ্নটা এই প্রথমবারের মতো হামিদা উচ্চারণ করে। না, সে যতটা নিশ্চিত তার চেয়ে বেশী নিশ্চয়তা কণ্ঠে আরোপ করে সে বলে। বন্দি হিসাবে আকবরের গুরুত্ব সম্বন্ধে সে আরো বেশীমাত্রায় সচেতন হয়ে উঠবে- যদিও হিন্দালের জন্য পরিস্থিতিটা সুখকর নাও হতে পারে।

আপনি ঠিকই বলেছেন, কিছুক্ষণ পরে হামিদা সায় দেয়। আর তাছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে এমন ভাববার কোনো কারণ এখনও ঘটেনি। নিজেকে কামরানের অনুগ্রহভাজন করে তুলতে হিন্দালের সময় লাগবে যাতে সে বিশ্বস্ততার এমন একটা অবস্থানে পৌঁছাতে পারে যা ব্যবহার করে সে আমাদের সন্তানকে উদ্ধার করতে পারবে। আমাদের ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই।

ধৈর্য আর অনিশ্চয়তা বরাবরই আমাকে অস্থির করে তুলে। আমি অধীর হয়ে আছি এই যন্ত্রণাদায়ক অনিশ্চয়তার পরিসমাপ্তি ঘটাতে, যাতে করে কর্ম আর কর্মফলের প্রতি আমি নিজেকে মনোযোগী করতে পারি।

অনিশ্চয়তা আর ধৈর্য সব নশ্বর জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। সান্নিপাতিক জ্বরে আমাদের যেকোনো সময়ে মৃত্যু হয়ে, আমাদের সব আশা আর স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ হতে পারে তবুও আমরা প্রতিদিন এটা নিয়ে ভাবি না। আমাদের মেনে নিতেই হবে যে কখনও কখনও পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে।

আমি জানি সেটা, কিন্তু আকবরের পিতা আর সেই সাথে একজন নেতা হিসাবে আমি যেমনটা চাই, সবকিছু যাতে সেভাবে ঘটে, সেই চেষ্টা করা আমার দায়িত্ব এবং আমি এখানে বসে যতই দুশ্চিন্তা করি কাবুলে এই মুহূর্তে যা ঘটছে আমি কিছুতেই তাঁকে প্রভাবিত করতে পারবো না।

তাহলে আপনার দুশ্চিন্তা না করার চেষ্টাই করা উচিত …এতে কোনো লাভ হবে না। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। হামিদা তাঁর দুহাত দিয়ে হুমায়ুনকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে এবং অবশেষে পশমের পুরু নিরাপত্তার মাঝে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তারা ঘুমিয়ে পড়ে।

শীতের সেই দীর্ঘ রজনীগুলো যখন তাঁরা নিদ্রাদেবীর বরাভয় বঞ্চিত হামিদার সাথে হুমায়ুনের এমন কথোপকথন এই শেষবার না। যাই হোক, মাঝে মাঝে সে কোনভাবেই নিজেকে তাবু থেকে বের হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না, বাইরে এসে সে শীতের তারকারাজির দিকে তাকিয়ে থেকে খুঁজতে চেষ্টা করে যদি সেখানে তার জন্য কোনো বার্তা নিহিত থাকে কিন্তু সেখানেও সে কোনো উত্তর পায় না। বৃদ্ধ শারাফকে সে যখন ডেকে পাঠায়, যার শীর্ণ বিবর্ণ হাত গাঁটঅলা থাবার মতো তার ভেড়ারচামড়ার আলখাল্লার আস্তিনের ভিতর থেকে বের হয়ে থাকে, সেও কিছু খুঁজে পায় না।

একটার পর একটা দিন অতিক্রান্ত হয়, তুষারাবৃত প্রেক্ষাপটে ব্যস্ত শিয়াল আর পাহাড়ী খরগোসের পাল ছাড়া আর কিছুই নড়াচড়া করে না, যা হুমায়ুনের লোকেরা রান্নার জন্য শিকার করে। হুমায়ুন শারীরিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। বৈরাম খান তাকে তরবারি চালনার পারস্যরীতির কিছু কার্যকরী চালাকি দেখিয়ে দেয়, যার ভিতরে রয়েছে কিভাবে নিজের তরবারির অগ্রভাগ প্রতিপক্ষের হাতের রক্ষাকারী বর্মে আটকে দিয়ে, সে তার শত্রুর কব্জি মোচড় দিয়ে তাকে অস্ত্র ফেলে দিতে বাধ্য করতে পারে। সে একইসাথে, তুষারাবৃত ভূমিতে পোথিত দণ্ডের উপরে রাখা খড়ের নিশানা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে, নিজের তীরন্দাজি চর্চাও করে! তার চোখের দৃষ্টি আগের মতোই ক্ষুরধার আর হাত বরাবরের মতোই নিশ্চল রয়েছে দেখে তার মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠে, যদিও এরফলে সত্যিকারের যুদ্ধের জন্য সে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠে হিন্দালের কাছ থেকে কোনো সংবাদ পাবার পরেই কেবল যার সম্ভাবনা মূর্ত হবে। কিন্তু অবশেষে, একদিন দুপুরবেলা হুমায়ুন যখন বাজপাখি নিয়ে শিকার করতে গিয়েছে, হাল্কা নীল আকাশে, যা আসন্ন বসন্তের ইঙ্গিত বহনকারী, বৃত্তাকারে উড়তে থাকা পাখির দিকে তাকিয়ে থাকার মাঝে সে আহমেদ খানকে গিরিসঙ্কটের উঁচুভূমির দিক থেকে বল্পা চালে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে।

সুলতান, আমার গুপ্তদূতেরা একদল অশ্বারোহীকে এদিকে আসতে দেখেছে।

কতজন অশ্বারোহী?

অল্প কয়েকজন, বেশীর ভাগই খচ্চরের পিঠে রয়েছে- সম্ভবত বণিকদের একটা ক্ষুদ্র কাফেলা। তারা এখনই দুই মাইল দূরে রয়েছে কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে : তাঁরা এদিকেই আসছে।

তাদের কাছে আমাকে নিয়ে চল।

আহমেদ খানকে পাশে নিয়ে দশ মিনিট পরে হুমায়ুন যখন বল্লা চালে ঘোড়া ছোটায় তখন তার হৃৎপিণ্ডে দামামার বোল বাজছে। ব্যাপারটা সম্ভবত কিছুই না। আহমেদ খান যেমন বলেছে তেমনই মামুলি কয়েকজন বণিকের দল- কিন্তু নিজের মনের গভীর একটা বুনো আশার উপচে উঠা সে কিছুতেই দমন করতে পারে না। সে চোখ কুচকে দূরের ঝাপসা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে, আপাতদৃষ্টিতে নিরানন্দ, বিরান সাদা ভূ-দৃশ্যের মাঝে নড়াচড়ার লক্ষণ সনাক্ত করতে অধৈর্য। প্রথমে কোথাও কিছু নজরে পড়ে না, কিন্তু তারপরেই সে জোরে শ্বাস নেয়। পশ্চিমদিক- যেদিকে কাবুল অবস্থিত সেখান থেকে থেকে মন্থরভাবে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাদের অবস্থানের দিকে কিছু একটা যা দেখে কালো বিন্দুর মালার মতো মনে হয় এগিয়ে আসছে।

হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার গলার কাছে ঝুঁকে এসে জন্তুটার কানের কাছে ফিসফিস করে তাকে ছুটতে বলে এবং অচিরেই আহমেদ খানকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। কালো বিন্দুগুলো পুরোটা সময়েই কেবল বড় আর স্পষ্ট হতে থাকে ধীরে ধীরে অবয়ব গ্রহণ করতে শুরু করে। সে যখন আরো কাছে পৌঁছে যায় এখন মাত্র চারশ কি পাঁচশ গজ হবে দূরত্ব- তাঁর মনে হয় সে আটজন কিংবা নয়জন অশ্বারোহীকে দেখতে পেয়েছে; এমন অনিশ্চিত সময়ে একাকী ভ্রমণের পক্ষে বলতেই হবে খুবই ক্ষুদ্র একটা কাফেলা।

কাফেলাটা দাঁড়িয়ে যায় এবং একেবারে সামনের আরোহী রেকাবের উপরে উঠে দাঁড়ায় আর, একহাতে চোখের উপর আড়াল তৈরী করে, তার অবস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই দূরত্ব থেকেও এমনকি, বিশাল অবয়বটার ভিতরে খুবই পরিচিত কিছু একটা রয়েছে বলে মনে হয়… সে নিজেকেই নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত করছে না, করছে কি? অবয়বটা হিন্দালের হতে পারে, সেটা হওয়াটা কি অসম্ভব? হুমায়ুন চক্রাকারে ঘুরিয়ে নিজের বাহনকে দাঁড় করিয়ে ব্যগ্র দৃষ্টিতে সেও এবার সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আহমেদ খান আর তাঁর দেহরক্ষীরা কিছুক্ষণ পরেই বল্লা চালে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে উপস্থিত হয়, তাঁদের ঘোড়ার খুর থেকে ধোয়ার মতো তুষারের গুড়ো বাতাসে ছিটকে উঠছে।

সুলতান, আমি কি তাদের পরিচয় জেনে আসবার জন্য লোক পাঠাব? আহমেদ খান জানতে চায়।

না… আমি নিজেই যাবো… তোমরা সবাই এখানেই অপেক্ষা কর! আহমেদ খানের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে, হুমায়ুন তার ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দেয়। তার সন্তানের ভাগ্যে কি ঘটেছে অশ্বারোহীদের দলটা যদি সেই সংবাদ বয়ে নিয়ে এসে থাকে তাহলে কেবল তারই প্রথম সেটা শোনা উচিত এবং সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে রাজি নয়। বরফাবৃত মাটির উপর দিয়ে সে যখন ঘোড়া হাকায়, খুরের শব্দ তাঁর কানে প্রতিধ্বনি তোলে, সে তাকিয়ে দেখে যে সামনের আরোহী নিশ্চল ভঙ্গিতে তখনও তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বিশালদেহীকে ছাপিয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করতে, হুমায়ুন আবিষ্কার করে যে কাফেলার বাকি সদস্যদের মধ্যে অধিকাংশই ছয়জন পুরুষ আর ছোটখাট অবয়বের হাল্কাপাতলা দেখতে একটা আকৃতি- একজন মহিলা যার মাথার কালো ভেড়ার পশমের তৈরী একটা উস্কোখুস্কো টুপির নীচে থেকে লম্বা বেনী বের হয়ে রয়েছে- সবাই খচ্চরের পিঠে উপবিষ্ট। মহিলাটার হাতে আরেকটা খচ্চরের লাগাম ধরা রয়েছে। সে আরেকটু এগিয়ে গেলে বুঝতে পারে যে আরোহীবিহীন খচ্চরটার পিঠে বেতের একটা ঝুড়ি বাঁধা রয়েছে যার ভিতরে তাঁর মুহূর্তের জন্য মনে হয় সে দুটো বেলনাকারে মোড়ান দুটো বস্ত্রখণ্ড দেখেছে বা সেটা কি দুটো শিশু হওয়া সম্ভব, ভেড়ার চামড়া দিয়ে মোড়ান হলে তাদের দেখতে অবিকল প্রায় গোলকাকার মনে হবে?

হুমায়ুন এখন কাফেলাটা থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরে রয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য, সে টের পায় সামনে যেতে তার ভয় করছে কি হবে যদি তুষারাচ্ছন্ন প্রেক্ষাপটে তাঁর সামনের ঐ লোকগুলো কেবলই, তাঁর নিজের আশা আর আকাঙ্খ দ্বারা সৃষ্ট, একটা বিভ্রম হিসাবে প্রমাণিত হলে। লাগাম টেনে ধরে এবং লোকগুলোর উপর থেকে একবারের জন্যও দৃষ্টি না সরিয়ে হুমায়ুন তার পর্যান থেকে আলতো ভঙ্গিতে পিছলে মাটিতে নেমে আসে এবং পায়ে হেঁটে শেষ কয়েকগজ দূরত্ব অতিক্রম করে, প্রথমে ধীরে ধীরে আর শেষের দিকে তাকে রীতিমতো দৌড়াতে দেখা যায়, বরফের উপরে পা কখনও পিছলে যায় কখনওবা হড়কে যেতে চায়।

তার দিকে উদগ্রীবভাবে তাকিয়ে থাকা, কাফেলাটার একেবারে সামনের অশ্বারোহী, পুরু পশমের আলখাল্লায় আপাদমস্তক আবৃত অবস্থায় আসলেই হিন্দাল। সে কি করছে সেবিষয়ে একেবারেই বেখেয়াল এবং ইতিমধ্যেই তাঁর চোখে আনন্দের অশ্রুর বাণ ডেকেছে হুমায়ুন হিন্দালকে অতিক্রম করে চামড়া দিয়ে মোড়ান পুটলি দুটো বহনকারী খচ্চরটার দিকে এগিয়ে যায়। সে মাহাম আগাকে সুলতান বলে চিৎকার করতে শুনে কিন্তু তারপরে সে দেখে যে চামড়ার পুটলি দুটোতে আসলেই বাচ্চা ছেলে রয়েছে এবং নিজের দুধ-ভাই আদম খানের পাশে শান্তভাবে শুয়ে রয়েছে, আকবর যাঁর কথাই সে এতোদিন কেবল ভেবেছে। হুমায়ুন নীচু হয়ে আকবরের দিকে ঝুঁকে এলে, সে ভেড়ার চামড়ার তৈরী পুটলির ভিতর থেকে হুমায়ুনের দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কামরান তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবার পরের চৌদ্দমাসে সে অনেক বদলে গিয়েছে কিন্তু এখনও সন্দেহাতীতভাবে সে সেই আকবরই রয়েছে। আদম খান তাতস্বরে কাঁদতে শুরু করলে হুমায়ুন আকবরকে আলতো করে ঝুরি থেকে তুলে নেয় এবং তাকে বুকের কাছে আকড়ে ধরে তার দেহের উষ্ণ গন্ধে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়।

আমার বেটা, সে ফিসফিস করে বলে, বেটা আমার।

এক ঘন্টা পরে, হুমায়ুন খুদে কাফেলাটার পুরোভাগে অবস্থান করে তাঁর শিবিরে ফিরে আসে। জেনানাদের তাবুর সামনে পৌঁছে, সে ঘোড়া থেকে নামে আর তারপরে সাবধানে আকবরকে ঝুড়ি থেকে কোলে তুলে নেয়। খচ্চরটা পুনরায় চলতে শুরু করায় ছেলেটা শান্ত হয়ে আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। মাহাম আগাকে পাশে নিয়ে হুমায়ুন হামিদার তাবুর ভিতরে প্রবেশ করে। হামিদা তাঁর প্রিয় কবিতাগুলো থেকে পাঠ করছিলো কিন্তু পাণ্ডুলিপিটা এখন তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে রয়েছে এবং লাল আর সোনালী জরির কাজ করা মখমলের তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সেও এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হামিদার মুখের উপরে রেশম চুলের গোছা এলিয়ে থাকায় তাকে এখন কত অল্প বয়সী মনে হচ্ছে আর তাঁর নিটোল স্তনযুগল নিঃশ্বাসের সাথে সাথে মৃদুভঙ্গিতে উঠা নামা করছে।

হামিদা, হুমায়ুন ফিসফিস করে ডাকে, হামিদা…আমি তোমার জন্য কিছু উপহার নিয়ে এসেছি- একটা উপহার…

হামিদা যখন চোখ খুলে তাকায় এবং আকবরকে দেখতে পায়, তার চোখমুখ এমন অনাবিল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে যা হুমায়ুন আগে কখনও কারো ভিতরে প্রত্যক্ষ করেনি। কিন্তু হুমায়ুন আকবরকে হামিদার কোলে তুলে দিতে, সে জেগে উঠে। মুখ তুলে হামিদাকে দেখতে পেয়ে, সে হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে উঠে এবং কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে শুরু করে। মাহাম আগা দ্রুত সামনে এগিয়ে আসে, এবং তাঁকে দেখা মাত্র আকবর নিমেষে শান্ত হয়ে যায়। সে হাসি হাসি মুখে তাঁর নাদুসনুদুস হাত দুটো দুধ-মার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

*

আকবরকে ফিরে পাবার আনন্দে আয়োজিত ভোজসভার উচ্ছিষ্টের মাঝে, হুমায়ুনের লাল টকটকে নিয়ন্ত্রক তাঁবুর ভিতরে যত্নের সাথে বিন্যস্ত বিশালাকৃতি সব তাকিয়ায় হুমায়ুনের চারপাশে তার সব আধিকারিকেরা হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। ভোজসভার পূর্বে সেদিন দুপুরবেলা সে তাঁর সব লোকদের সমবেত হবার আদেশ দেয় এবং তাদের সামনে আকবরের উদ্ধার পাবার বিষয়টা ঘোষণা করে।

আমার অনুগত যোদ্ধারা আমাদের ভবিষ্যতের প্রতীক, আমার কাছে নিরাপদে ফিরে এসেছে, তোমাদের সামনে আমি আমার সন্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত করছি… হুমায়ুন তার অস্থায়ী শিবিরের কেন্দ্রস্থলে তড়িঘড়ি করে নির্মিত একটা কাঠের বেদীর উপরে দাঁড়িয়ে, সে আকবরকে তার মাথার উপরে উঁচুতে তুলে ধরে। ঢালের উপরে তরবারি দিয়ে আঘাতের সাথে একটা হর্ষোফুল্ল চিৎকারে তার চারপাশ গমগম করতে থাকে। হুমায়ুন মাহাম আগার কোলে আকবরকে যখন ফিরিয়ে দেয়- সে তখনও হঠাৎ সৃষ্ট এই হুঙ্কারে বিস্মিত হয়ে চোখ পিটপিট করছে, কিন্তু এবার সে কেঁদে উঠে না। এটা একটা শুভ লক্ষণ। হুমায়ুন হাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে ইঙ্গিত করে।

আমরা যা শুরু করেছিলাম সেটা সমাপ্ত করতে আর নিষ্পাপ শিশুদের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকে এমন ষড়যন্ত্রকারীকে উৎখাতের জন্য আমাদের কাবুলে ফিরে যাবার সময় হয়েছে। আমরা ন্যায়ের পক্ষে রয়েছি এবং আল্লাহ্তালা আমাদের সাথে আছেন। আজ রাতে আমরা ভোজের আয়োজন করবো কিন্তু কাবুল একবার আমাদের অধিকারে আসবার পরে আমাদের আজকের ভোজসভার সাথে সেদিনের উৎসবের কোনো তুলনায় চলে না। আগামীকাল সকালে আমরা শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবো।

শিবিরের বাবুর্চিরা তাঁদের রান্নার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছে, অতিকায় আগুনের কুণ্ড তৈরী করে শিক কাবার আর মাংস রোস্ট করা হচ্ছে যা থেকে পোয়র রাশি আকাশে ঢেউয়ের মতো উঠে যাচ্ছে। তার সন্তান এখন যখন নিরাপদ হুমায়ুন তখন কতদূর থেকে তাঁর শিবির দৃশ্যমান হচ্ছে সেসব নিয়ে মোটেই পরোয়া করে না।

তার সেনাপতিদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্রের কীর্তি নিয়ে রচিত বীরোচিত গান, হারেমের আরো বড় কীর্তিকলাপ নিয়ে রচিত স্থূল, অশ্লীল গান গাইতে আরম্ভ করে। হুমায়ুন তার চারপাশে তাকিয়ে দেখে জাহিদ বেগ সামনে পেছনে দুলছে, করোটির মতো মুখ গজনীর কড়া লাল সুরার প্রভাবে জ্বলজ্বল করছে কাবুল সালতানাত যে সুরার কারণে বিখ্যাত আর তার নিজের আব্বাজানও যা দারুণ পছন্দ করতেন। এমনকি সাধারণত স্বল্পভাষী আর গম্ভীর করিমও তাবুর এককোণে যেখানে নিজের বৃদ্ধ শরীরটার জন্য তিনি একটা আরামদায়ক স্থান খুঁজে পেয়েছেন বসে আপনমনে গান গাইছেন।

হুমায়ুন আর বৃথা কালক্ষেপন না করে তাঁর বিশ্বস্ত সহচরবৃন্দ, তাঁর ইচকিদের বলে যে অবরোধ তুলে নেবার বিষয়টা একটা কূটচাল ছিল। খবরটা শোনার পরে তাঁদের বেশীরভাগকেই দেখে মনে হয় তারা সত্যিই বিস্মিত হয়েছে। বৈরাম খানের অভিব্যক্তিতেই কেবল সামান্য বিস্ময় প্রকাশ পায় এবং ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য হুমায়ুনকে গম্ভীরভাবে অভিনন্দিত করার সময় তাঁর তীক্ষ্ণ নীল চোখে ফুটে থাকা অবগত ভাবের কারণে, হুমায়ুন দ্বিগুণ নিশ্চিত হয় যে পার্সী যোদ্ধা আগা গোড়াই সবকিছু জানতো। একম একটা লোককে মিত্র হিসাবে পাশে পাবার জন্য সে আগের। চেয়েও বেশী কৃতজ্ঞবোধ করে।

হুমায়ুন আড়চোখে তাঁর পাশেই উপবিষ্ট হিন্দালের দিকে তাকায়। উৎসবে মত্ত অন্যান্যদের তুলনায় সে অল্পই কথা বলেছে এবং হুমায়ুন আর তাঁর আধিকারিকদের সাথে বসার কারণে তাকে অন্যমনস্ক আর আড়ষ্ঠ দেখায়। গতকাল সন্ধ্যাবেলা তারা শিবিরে ফিরে আসবার পর থেকে, হুমায়ুন তাঁর সৎ-ভাইয়ের সাথে খুব অল্পই সময় কাটিয়েছে। ছেলের সাথে পুনর্মিলিত হবার স্বস্তিতে সে বরং আকবর আর হামিদার সাথেই বেশী সময় অতিবাহিত করেছে। হামিদার কেবল একটাই দুঃখ, তাঁদের সন্তান এখনও মাহাম আগাকেই আকড়ে রয়েছে। হামিদা যতবারই তাকে কোলে নিতে চেষ্টা করে, সে চিৎকার করে হুলস্থূল বাধায়। হামিদা ছেলের নিরাপদে ফিরে আসার স্বস্তি আর উল্লাসের সাথে এই কয়মাসে ছেলেটা কত বড় হয়ে গিয়েছে এবং কয়েকমাস আলাদা থাকায় তার কাছে আগন্তুকে পরিণত হবার দুঃখে সে একটা টানাপোড়েনের ভিতরে পড়ে, হুমায়ুন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে এটা একটা সাময়িক ব্যাপার কেটে যাবে। তার প্রাণবন্ত হাত পা ছোঁড়া একটা বিষয় অন্তত নিশ্চিত করে যে এই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তার স্বাস্থ্য ভালোই আছে, হামিদা ঠোঁটে হাসি আর চোখে কান্না নিয়ে শেষ পর্যন্ত বলে। তারপরে সে ভুলে গিয়েছে এমন ভঙ্গিতে যোগ করে, আমার হয়ে হিন্দালকে আপনি ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না যেন।

হুমায়ুন হিন্দালের আপাত অন্যমনস্ক মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এই কাজটা হামিদা যেমনটা ভেবেছিল কাজটা তারচেয়েও কঠিন।

হিন্দাল… হুমায়ুন তার সৎ-ভাইয়ের পূর্ণ মনোযোগ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তারপরে কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নীচু করে কথা শুরু করে, যাতে অন্য কেউ তাঁদের আলোচনা আড়ি পেতে শুনতে না পায়। আমি জানি তুমি আমার জন্য না হামিদার কথা চিন্তা করেই যা করবার করেছে। সে আমাকে বলেছে তার পক্ষে আমি যেন তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।

তাকে বলবেন এর কোনো প্রয়োজন নেই। পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনা করেই…

তুমি হয়ত এসব কথা শুনতে চাও না কিন্তু তারপরেও বলছি আমিও তোমার কাছে চিরতরে ঋণী হয়ে রইলাম। তোমার কর্মকাণ্ডের পেছনে যে কারণই থাকুক না কেন সেটা তোমার প্রতি আমার দায়বদ্ধতা থেকে আমাকে মুক্তি দেয় না।

হিন্দাল হাল্কা কাঁধ ঝাঁকায় কিন্তু কোনো মন্তব্য করে না।

আমাকে এবার বল, তোমার পরিকল্পনা কি তোমার প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করেছিল? কাবুলে আসলেই কি ঘটেছে সেটা জানার জন্য হামিদা উদগ্রীব হয়ে রয়েছে…

হিন্দালের ঠোঁটের কোণে এততক্ষণ পরে হাল্কা হাসির একটা রেখা ফুটে উঠে। আমি যেমনটা আশাও করিনি তারচেয়েও ভালো কাজ করেছে। কাবুল থেকে আপনার অবরোধ তুলে নেবার খবর আমার গুপ্তদূতদের কাছ থেকে জানবার কয়েকদিন পরে, আমি আমার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে পাহাড় থেকে নীচে নেমে আসি এবং দূর্গপ্রাসাদে আমার বার্তাবাহককে পাঠাই কামরানকে বলার জন্য যে আমাদের পরিবারের সত্যিকারের প্রধান হিসাবে তাঁকে সমর্থণের অঙ্গীকার করতে আমি প্রস্তুত। কামরানের মতো উদ্ধত আর আত্মগর্বী এবং আপনার প্রস্থানের কারণে খুশীতে আত্মহারা অপদার্থের কাছে, আমি ঠিক যেমনটা প্রত্যাশা করেছিলাম, সে আমাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। আহাম্মকটা এমনকি বিষয়টা উদযাপনের জন্য ভোজসভার আয়োজন করে এবং আমাকে নানা উপঢৌকন দেয়…

সে আসলেই কিছু সন্দেহ করেনি?

কিস্যু না। আপনাকে পরাস্ত করতে পেরেছে বিশ্বাস করায় তাঁর আত্মবিশ্বাস তাঁকে অন্ধ করে ফেলেছিল। আমি পৌঁছাবার আগেই সে এমনকি কাবুল শহর আর দূর্গপ্রাসাদ উভয়ের প্রধান প্রবেশদ্বার দিনের বেলায়ও খুলে রাখার আদেশ দিয়েছিল। আমি সেখানে পৌঁছাবার এক সপ্তাহের ভিতরেই সে শীতের তীব্রতা আর ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়ে প্যাচান শিংঅলা ভেড়া আর নেকড়ের সন্ধানে দক্ষিণে একটা শিকার অভিযানে যাবার কথা বলতে শুরু করে। আমি তাকে উৎসাহিত করি এমনকি তার সাথে শিকারে যাবার আগ্রহও দেখাই। কিন্তু, আমি তাঁর কাছে থেকে যেমনটা আশা আর ধারণা করেছিলাম, সে আমাকে দূর্গপ্রাসাদেই অবস্থানের আদেশ দেয়। তাঁর দেহরক্ষীদের প্রশিক্ষণ দেবার মতো কাজ সে ইতিমধ্যেই আমার জন্য নির্ধারিত করেছে। সে রসিকতার ছলে বলে যে আমার মনে কাবুল দখলের মতো কোনো দুর্বুদ্ধির যাতে উদয় না হয় সেজন্য যথেষ্ট সংখ্যক বিশ্বস্ত সৈন্য সে মোতায়েন করেই শিকারে যাবে।

কামরান শিকারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে, আমি কেবল আমাকে দেয়া আদেশ পালন করতে থাকি, সতর্ক থাকি এমন কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকতে, যাতে কারো মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। আমি এটাও নিশ্চিত হতে চাইছিলাম যে সে আসলেই কয়েক দিনের জন্য বাইরে গিয়েছে। তারপরে, চতুর্থদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবার পরে সেই রাতে কামরানের ফিরে আসবার কোনো লক্ষণ না দেখে আমি আমার পরিকল্পনামাফিক কাজ শুরু করি। আপনার কি ছেলেবেলায় দেখা দূর্গপ্রাসাদের পূর্বদিকে অবস্থিত ছোট আঙ্গিনাটার কথা মনে আছে। যার একপাশের দেয়াল জুড়ে অবস্থিত তালাবদ্ধ ঘরে শস্য আর সুরা মজুদ করে রাখা হত?

বেশ, আমি দেখি যে কামরান গুদামঘর হিসাবে ব্যবহৃত সেইসব কক্ষের কয়েকটার পরিবর্তন সাধন করে বসবাসের উপযোগী করে তুলেছে, যেখানে সে মাহাম আগা আর তার সন্তানের সাথে আকবরকে প্রহরাধীন অবস্থান বন্দি রেখেছে। আমি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত চারজন দেহরক্ষীকে সাথে নিয়ে নিরবে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হই। আমরা আঙ্গিনায় পৌঁছাবার পরে আমার লোকেরা শস্য মজুদের জন্য রক্ষিত বিশালাকৃতি জালার পিছনে আত্মগোপন করে অবস্থান করতে থাকে। আমি একলা বন্ধ দরজায় উঁকি দেবার জন্য নির্মিত ফাঁকা অংশের সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে প্রহরায় নিয়োজিত দুই রক্ষীকে বলি যে, তারা যাকে পাহারা দিচ্ছে তার চাচাজান হিসাবে আমি তার সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে চিনতে পেরে তারা দরজা খুলে দেয়। আমি তাঁদের সাথে কথোপকথন অব্যাহত রাখি, সেই সুযোগে আমার লোকেরা লুকোন স্থান থেকে দ্রুত বেড়িয়ে এসে তাঁদের কাবু করে ফেলে তারপরে তাঁদের হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে দেয়া হয়।

মাহাম আমাকে নিয়েই আমায় সবচেয়ে বেশী ঝামেলা পোহাতে হয়েছে- সে কোথা থেকে একটা লুকান খঞ্জর বের করে আমাকে আঘাত করতে চেষ্টা করে আর সেই সাথে গলার স্বর সপ্তমে তুলে চিৎকার। আমি খঞ্জরটা তার কাছ থেকে সহজেই কেড়ে নেই- সে পরে আমাকে বলে যে খঞ্জরের ফলায় বিষ মাখান ছিল- কিন্তু তার চিৎকার বন্ধ করাটা তত সহজ কাজ ছিল না। আমি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে, তার কানে বারবার বলতে থাকি যে আকবরের কোনো ক্ষতি করার অভিপ্রায় আমার নেই… যে আমি আপনাকে জানিয়ে আর সম্মতি নিয়েই তাদের উদ্ধার করতে এসেছি।

অবশেষে সে শান্ত হয়, কিন্তু পুরোটা সময় আমরা সবাই তটস্থ ছিলাম। আমরা যদিও দূর্গপ্রাসাদের একটা নির্জন কোণে ছিলাম কিন্তু আমি জানি যেকোনো মুহূর্তে কেউ আমাদের দেখে ফেলতে পারে। ভাগ্যক্রমে সেখানে কেউ এসে হাজির হয় না। কিন্তু আমাদের সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। আমি জানতাম যে দূর্গপ্রাসাদের প্রবেশদ্বার আগামী আধঘন্টার ভিতরে রাতের মতো বন্ধ করে দেয়া হবে। আমাদের দ্রুত এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে এবং সেটা এমনভাবে যেন কারো দৃষ্টি আকৃষ্ট না হয়। আমি আগেই লক্ষ্য করেছিলাম যে প্রতিদিন দূর্গপ্রাসাদে ব্যবসার উদ্দেশ্যে অবরোধ এখন উঠে যাবার কারণে পুনরায় রসদ সরবরাহ শুরু হয়েছে যেসব বণিকেরা আসে তাদের অনেকেই সন্ধ্যার দিকে সাধারণত শহরে ফিরে যায়। আমি আমার লোকদের তাই আদেশ দেই পাগড়ি আর আলখাল্লা নিয়ে আসতে- মাহাম আগার জন্যও আনতে বলি- যাতে করে আমরা সবাই বণিকে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারি। আমরা সাথে করে ভেড়ার চামড়া নিয়ে এসেছিলাম যাতে মুড়ে নিয়ে বাচ্চা দুটোকে লুকিয়ে রাখা যায় এবং একটা শিশিতে গোলাপজলের সাথে আফিম মিশিয়ে আনা হয়েছিল তাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করতে, যাতে তাঁরা কান্নাকাটি না করে। আমি মাহাম আগাকে আদেশ দেই শিশিতে রক্ষিত তরল থেকে দুজনকেই সামান্য পরিমাণ দিতে। সে ইতস্তত করতে আমি নিজে শিশি থেকে খানিকটা পান করি তাঁকে বোঝাতে যে শিশিতে বিষ দেয়া নেই।

আফিম দ্রুত কাজ করে এবং ভেড়ার চামড়া দিয়ে আমরা যখন তাদের মুড়ে দেই তখন তারা চুপচাপই থাকে। তারপরে, আকবরের অন্তধানের সংবাদ যতক্ষণ সম্ভব গোপন রাখতে বন্দি দুই প্রহরীকে গুদামঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেই, এবং যত শীঘ্র সম্ভব বণিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে দূর্গপ্রাসাদের অলিগলি দিয়ে দ্রুত তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে গিয়ে ঢালু পথ দিয়ে নীচের শহরের দিকে নামতে থাকা মানুষ আর পশুর ভিড়ে মিশে যাই। কেউ আমাদের সন্দেহ করেনি। আমরা ভিড়ের ভিতরে মিশে গিয়ে শহরের দিকে এগিয়ে যাই, যেখানে তোরণদ্বারের ঠিক বাইরে আমার আরো লোক দলের সবার জন্য ঘোড়া আর খচ্চর নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমি আশা করেছিলাম বাহন হিসাবে খচ্চর ব্যবহার করায় আমাদের দেখে যোদ্ধা মনে না হয়ে বণিক মনে হবে। অন্ধকার পুরোপুরি নেমে আসবার পরে আমরা দ্রুত নিজ নিজ বাহন নিয়ে প্রথমে আমরা উত্তরদিকে যাই, যদি শহর ত্যাগ করার সময় কেউ আমাদের অনুসরণ বা লক্ষ্য করে থাকে তার কাছে আমাদের মূল গন্তব্য গোপন করতে। সারা রাত হাড় কাঁপান শীতের ভিতরে ঘোড়া ছোটাবার পরে সকালের দিকে আমরা বৃত্তাকারে পূর্বদিকে ঘুরে যাই এবং উদীয়মান সূর্যের আলোয় আমাদের মুখ উদ্ভাসিত হলে পরে আমরা সন্ধানে যাত্রা শুরু করি।

হিন্দাল যখন তাঁর অভিযানে গল্প বলছিল, দুরূহ আর বিপজ্জনক কাজে সাফল্য লাভ করায় তার চোখে বালকসুলভ উত্তেজনা আর উল্লাস জ্বলজ্বল করছিল। হিন্দাল এখন তাঁর বর্ণনা শেষ করার পরে, হুমায়ুন তার সবচেয়ে ছোট সৎ-ভাইটির প্রতি তার সতর্ক ও যথাযথ পরিকল্পনা, শান্ত অনুত্তেজিত মনোভাব আর সদ্ধান্ত গ্রহণে দ্রুত বুদ্ধির কারণে এক নতুন আর গভীর শ্রদ্ধাবোধে আপুত হয়। সর্বোপরি, হিন্দাল যেভাবে কামরানকে পুরোপুরি বুঝতে পেরে, তাঁর অহমিকার সুযোগ নিয়ে তাঁর কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে, সেটা তাঁকে মুগ্ধ করে। নিজেদের শত্রুকে চিনে নিতে, বাবর তাঁদের সবসময়, এমনকি ছেলেবেলায় পর্যন্ত, সতর্ক করে কি দেননি? হিন্দাল সবসময়ে নিরবে শুনে যেত, কিন্তু সে নিজে কি দারুণভাবে অন্যদের কেবল শত্রু না বন্ধু এমনকি পরিবারের সদস্যদের মনোভাবের সাথে একাত্ম হবার প্রয়োজনীয়তা সত্যিই বুঝতে পেরেছে? হিন্দালের মনোভাব বোঝার জন্য সে কি কখনও পর্যাপ্ত সময় দিয়েছে এবং তার দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখেছে?

তারা দুজনে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। তারা হয়ত আবার আগের মতোই হয়ে উঠবে… তার পান করা লাল সুরার প্রভাবে পরের কথাটা তার পক্ষে বলাটা সহজ হয়। হিন্দাল, তুমি এইমাত্র কাবুলে আমাদের ছেলেবেলার কথা বলছিলে। তুমি আর আমি অনেক কিছুই, কেবল আমাদের রক্ত আর ঐতিহ্যই না, আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতিও, সমানভাবে ধারণ করি। আমার আম্মিজান তোমাকে নিজের পুত্রবৎ জ্ঞান করতেন। আমার সব সৎ-ভাইদের ভিতরে আমি তোমাকেই আপন মনে করি আর তোমাকেই আমার বন্ধু করতে চাই। আমি জানি যে অনিচ্ছাকৃতভাবে- হয়ত স্বার্থপরতাও ছিল- আমি তোমাকে আঘাত দিয়েছি। আমি সেজন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত আর তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি…

হুমায়ুন…

কিন্তু তাঁর বক্তব্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত হিন্দালকে কথা বলার সুযোগ দিতে অনিচ্ছুক হুমায়ুন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকে। আমাদের ভিতরে অতীতে যা কিছু ঘটেছে- আমরা কি সেটা ভুলে যেতে পারি না? পূর্বের মতো আবার আমার মিত্র হয়ে এসো, আমরা একসাথে কাবুল বিজয়ের অভিযানে অংশ নেই। আমরা যদি কেবল সাহসী হয়ে অগ্রসর হই তাহলে দেখবে ভবিষ্যতের গর্ভে অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে- হিন্দুস্তান একদিন আবার মোগলদের অধিকারে আসবে এবং আমি প্রতিজ্ঞা করছি, সেখানে সম্মান আর ক্ষমতাপূর্ণ একটা স্থান আমি তোমার জন্য নির্ধারিত রাখবো। হিন্দাল… তুমি কি আমাকে একবার ক্ষমা করতে পারো না? আমার সাথে কি তুমি নিয়তির সেই বরাভয় ভাগ করে নিতে চাও না?

কিন্তু হিন্দাল তাঁর মাথা ভর্তি কালো ঝাকড়া চুল নাড়তে থাকে। আমাদের ভিতরে শেষবার যখন কথা হয়েছিল তখনই আমি আপনাকে বলেছিলাম আমাদের ভিতরে কোনো ধরনের আপোষ সম্ভব না এবং সেটাই বাস্তবতা। আমি আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করেছি আর বিষয়টা এখানেই শেষ হবে। আপনার শিবির আমার বাসস্থান নয়। আমি এতক্ষণ এখানে অপেক্ষা করেছি কেবল একটা বিষয়ে নিশ্চিত হতে যে এখানে আসবার সময়ে আমাকে কেউ অনুসরণ করেনি এবং কামরানকে আপনার এখানে নিয়ে আসিনি আর সেই সাথে অবশ্য আমার বোন গুলবদনের সাথেও কিছুটা সময় অতিবাহিত করতে চেয়েছি।

তোমার তাহলে এটাই শেষ কথা?

আপনি এখনও আমার কথা বুঝতে পারেন নি, তাই না? আপনি যা চান সেটা পাবার জন্য আপনি আপনার মায়ের মতোই লোভী এবং বঞ্চিত হতে পছন্দ করেন না। অন্যের সুখের তোয়াক্কা না করে কেবল নিজের সুখের কথা ভেবে তিনি আমার মায়ের কাছ থেকে আমায় কেড়ে নিয়েছিলেন। আপনি এখন চাইছেন যে আমাদের ভিতরে অতীতে যা কিছু ঘটেছে- আপনার অচিন্তনীয় ঔদ্ধত্য আর চুড়ান্ত স্বার্থপরতা- সে সব কিছু ভুলে গিয়ে আবারও আপনার অনুগত আর অন্তরঙ্গ ভাইয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। আমি সেটা পারব না। সেটা করলে মিথ্যাচার করা হবে আর আমার আত্মসম্মানবোধ আমাকে সেটা করার অনুমতি দেয় না।

হিন্দাল…

না, হুমায়ুন। আপনার স্ত্রী পুত্র রয়েছে। অচিরেই হয়ত আপনি আবার সিংহাসনে উপবেশন করবেন। এত কিছু কি আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট না? আগামীকাল ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমি আমার অবশিষ্ট লোকদের খুঁজতে বের হব, যাদের আমি আদেশ দিয়েছিলাম কামরান ফিরে আসবার আগেই কাবুল ত্যাগ করতে। আমি তাঁদের যখন খুঁজে পাবো, আমরা আবার তখন পাহাড়ে ফিরে যাব। আমি জানিনা কখন কিংবা কোনো পরিস্থিতিতে আবার আমাদের দেখা হবে। হয়ত আর কখনই হবে না…

হিন্দাল কথা শেষ করে চুপ করে থাকে। হুমায়ুনের কাছে মনে হয় সে বুঝি আরো কিছু বলতে চায় কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তার সৎ-ভাইটি উঠে দাঁড়ায় এবং পেছন দিকে একবারও না তাকিয়ে ভোজসভার অতিথিদের ভিতর দিয়ে হেঁটে যায় এবং তাবুর পর্দা সরিয়ে রাতের আঁধারে হারিয়ে যায়।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *