০১ অধ্যায় – অনুমান

০১ অধ্যায় – অনুমান

সানজু বলেন:

যুদ্ধ হল একটা রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; জীবন-মরনের; কেননা এটা হল জীবন অথবা মৃত্যুর প্রশ্ন, এই পথটা হল বেঁচে থাকা বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার। তাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যুদ্ধবিদ্যা অধ্যয়ন অতীব প্রয়োজনীয় ব্যাপার।

লি চুয়ানের ভাষ্যমতে, ‘অস্ত্র হল অশুভ শক্তির উপাদান।’ যুদ্ধ খুবই ভাবনা চিন্তার একটা বিষয়; কেউ চাইলেই যেকোন সময় একটা যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে না।

তাই পরিবেশ পরিস্থিতি যুদ্ধের জন্য কতটা অনুকুলে সেটা পাঁচটা মৌলিক উপাদানের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে এবং সব মিলিয়ে সাতটা বিষয়ের সাথে তুলনা করতে হয়। যাতে করে আপনি এর গুরুত্বটা উপলব্ধি করতে পারেন। প্রথম উপাদানটা হল মোরাল ইনফ্লুয়েন্স বা নৈতিক প্রভাব। দ্বিতীয়ত, আবহাওয়া; তৃতীয়ত, ‘টেরেইন বা নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্র; চতুর্থত, কমান্ড; এবং পঞ্চমত, ‘ডক্ট্রিন’ বা পদসোপান বা সৈন্যবাহিনীর সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য-জ্ঞান।

চ্যাং ইউ এর ভাষ্যমতে, উপরে প্রদত্ত যুদ্ধের সব নিয়মগুলো একেবারে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। যখন সৈন্যরা তাদের শত্রুদেরকে শায়েস্তা করার জন্য তৈরি হয়, তখন টেম্পল কাউন্সিল প্রথমে তাদের শাসকদের যথাযথ উদারনৈতিকতা এবং জনগনের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি আস্থার বিবেচনা করে; এরপরেই বিবেচনা করে অনুকুল পরিবেশের প্রতি, এবং শেষে যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশের এলাকার ভূমিটাকে মাথায় রেখে প্রস্তুতি শুরু করে। এই তিনটা বিষয়ের ফয়সালা হয়ে গেলে আক্রমণের জন্য একজন জেনারেল নিয়োগ করা হয়। আর সৈন্যরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানায় পৌঁছে যায় তখন থেকে সকল আদেশ প্রদানের দায়িত্ব ঐ জেনারেলের উপর বর্তায়।

এক. নৈতিক প্রভাব বলতে সকলকে তাদের নেতার প্রতি অনুগত থাকার কথা বুঝিয়েছি যাতে করে তারা সকলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পর্যন্ত একতা থাকতে পারে। কোন ভয় তাদেরকে ছুঁয়ে যেতে না পারে।

চ্যাং ইউ বলেন, যখন কেউ সৈন্যদের সাথে উদারতা, সাম্যবাদ, অধিকার সচেতনতা আর সকলের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের চোখে দেখেন তখন সৈন্যদের মাঝে একতার একটা মানসিকতা গড়ে উঠে এবং সাথে সাথে নেতার প্রতি খুশি মনে আনুগত্য প্রকাশ করে।

দুই. আবহাওয়া বলতে প্রাকৃতিক ঋতুগত পরিস্থিতিকে আমি প্রাধান্য দিয়েছিঃ শীতের ঠান্ডা এবং গ্রীষ্মের গরমের কিরুপ প্রভাব পড়তে পারে এবং এইসব ঋতুগত পরিস্থিতিতে সামরিক আক্রমণগুলোর ক্ষেত্রে যোগাযোগের উপযোগিতাটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

তিন. ‘টেরেইন বা নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্র বলতে সৈন্যশিবির আর নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্রের দুরত্বের ব্যাপারটাকে প্রাধান্য দিয়েছি যেখানে দেখতে হবে দুটো জায়গার মধ্যে সহজ একটা যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে কিনা। দেখতে হবে জায়গাটা কি কোন খোলা প্রান্তর নাকি চারিদিকে ঘেরাও কোন জায়গা, এবং সেখানে জীবন-মৃত্যুর কতটুকু ঝুঁকি আছে।

মেই ইয়াও চেন বলেন, আক্রমণের জন্য সৈন্য পাঠানোর আগে যুদ্ধক্ষেত্র দূরত্বটাকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। দূরত্বটা জানতে পারলে আক্রমণের জন্য পরিকল্পনা করা হয়। আসা যাওয়ার পথটার খানা খন্দ অনুমান করে তারপরই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় পদাতিক সৈন্যবাহিনী নাকি অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে যুদ্ধের সুবিধাটা নেয়া হবে। যদি জানা যায় যে যুদ্ধক্ষেত্রটা খোলা প্রান্তর অথবা চারিদিক ঘেরাও কোন জায়গা তখনই হিসাব করা যায় যে কতটুকু সৈন্য পাঠানো হবে। যদি যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে পারা যায় তখনই কমান্ডার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে সৈন্যবাহিনী কি এক সাথে পাঠাবেন নাকি ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে স্থাপন করবেন।

চার. কমান্ড বলতে একজন জেনারেলের সামরিক জ্ঞান, আন্তরিকতা, মানবিকতা, সাহসিকতা, আর প্রয়োজনবোধে কঠোরতার কথা বলছি।

লি চুয়ান বলেন, এই পাঁচটা গুন একজন জেনারেলের প্রধানতম গুন। আর এই কারনেই বিশাল একটা সৈন্যবাহিনী তাকে সকলের সম্মানিত’ বলে মান্য করে থাকে।

তু মু (Tu Mu) বলেন, একজন কমান্ডার তখনই জ্ঞানী বলে খ্যাতি লাভ করবেন যখন তিনি পরিবেশ পরিস্থিতির পরিবর্তনটাকে বুঝতে পারবেন এবং সাথে সাথে সে প্রয়োজন অনুযায়ি যথাযথ কোন পদক্ষেপ নিতে পারবেন। যদি আন্তরিক হন তবে কোন সন্দেহ নেই তার সৈন্যবাহিনী পুরস্কার বা শাস্তির কথা সবসময় খেয়াল রাখবে। যদি তার মধ্যে মনুষ্যত্ব বিরাজ করে তবে তিনি সকলের প্রতি দয়ালু, অন্যের প্রতি সহানুভুতিশীল হন, তবে তাদের কঠোর পরিশ্রমের মূল্য দিতে জানেন। যদি সাহসি হন, তবে যে কোন সুযোগ গ্রহন করে জয়ের স্বাদ লাভ করতে সক্ষম হন। যদি কঠোর হন, তবে সৈন্যবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় থাকে কারণ তারা সকলে শাস্তির ভয়ে তাকে মান্য করে।

সেন পাও-সু বলেন, ‘যদি একজন জেনারেল অসম্ভব সাহসি না হন তবে তিনি সকল সন্দেহ জয় করে ভালো কোন পরিকল্পনা করতে পারবেন না।

পাঁচ. ডক্ট্রিন’ বলতে সৈন্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা, বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, সৈন্যদের মধ্যে পদসোপানের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত যোগান, এবং সৈন্যদের মাঝে প্রধান মৌলিক চাহিদাগুলির যথাযথ ভাগ বন্টন।

পৃথিবীতে এমন কোন সেনানায়ক নেই যে এই পাঁচটা প্রধানতম বিষয় সম্পর্কে জানেন না। যারা এই পাঁচটা গুনে গুনান্বিত তারা জয় লাভ করে; বাকিরা পরাজয়ের গ্লানি বহন করে। তাই প্রাথমিক পরিকল্পনায় এই উপাদানগুলোকে তুলনামুলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সাজাতে হয়।

.

২.

সানজুর মতে, যদি আপনি বলেন যে শাসক নৈতিকতা ধারন করে, যে কমান্ডার বেশি যোগ্য বা সামর্থবান, যে সৈন্যবাহিনী ঋতুগত পরিবর্তন মানিয়ে নিতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগ দুরত্বের সম্পর্কে ভাল অনুমান করে নিতে পারে, যে যুদ্ধের নিয়ম-কানুনগুলো সম্পর্কে ভাল ধারনা রাখতে পারে, যে সৈন্যরা অপেক্ষাকৃত বেশি দূর্ধর্ষ।

চ্যাং ইউ বলেন, সৈন্যদের যুদ্ধ গাড়িগুলো অসম্ভব শক্ত, ঘোড়াগুলো যতটা পারা যায় ক্ষিপ্র, সৈন্যরা অসম্ভব সাহসি, অস্ত্রগুলো অত্যন্ত শানিত হলে যখনই যুদ্ধ ধ্বনি শোনে তখনই যারা আক্রমনের জন্য হাসিমুখে তৈরি হয়ে তারাই সবচেয়ে শক্তিশালি সৈন্যবাহিনী।

যার অপেক্ষাকৃত বেশি দক্ষ উপদেষ্টা আর সৈনিক আছে;

তু-ইউ বলেন, আর তাই মাস্টার ওয়াং বলেছিলেন: যদি পদস্থ উপদেষ্টারা যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে যথাযথ উপযুক্ত না হয় তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কিত হয়ে যাবে এবং আক্রমণ করতে ইতস্তত করবে; যদি জেনারেল যথাযথ ট্রেনিংপ্রাপ্ত না হয় তবে শত্রু দেখামাত্র তারা ভয়ে পিছিয়ে আসবে।

এবং যে কতৃপক্ষ সৈন্যদের পুরস্কার ও শাস্তির ব্যাপারে যতটা সাবলীল ও যথাযথভাবে করবে;

তু-মু বলেন, অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যাতে না হয়।

তবে আমি আগে থেকেই বলে দিতে পারব কোন দল বিজিত আর কোন দল পরাজিত হবে। একজন সেনানায়ক যদি আমার এই কৌশলগুলি অনুসরন করেন তবে তার জয় সুনিশ্চিত। জয়ী সে হবেই! আর যদি কেউ আমার এই কৌশলগুলি অমান্য করে যুদ্ধে যায় তবে তার পরাজয় নিশ্চিত। সর্বনাশ তার হবেই!

.

৩.

সানজু বলেন, আমার এই কৌশলগুলোর সুবিধা নিতে হলে, সেনানায়ককে অবশ্যই সেই উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেগুলো সৈন্যদেরকে তাদের অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছতে সাহায্য করবে। সকল যুদ্ধ বিগ্রহের ফলাফল নির্ভর করে কৌশলের উপর। যেমন :

এক. যখন আপনি সক্ষম, তখন ভান করুন অক্ষমের; যখন দক্ষ, তখন অদক্ষের ভান করুন। কাছে থাকলে নিজেকে বহু দূরে উপস্থাপন করুন; আর যখন বহু দূরে তখন উপস্থাপন করুন আপনি একেবারে কাছে আছেন। শত্রুকে একটু প্রলোভন দেখাবেন; সৈন্যদের মাঝে বিশৃঙ্খলার ভান করবেন আর সুযোগ বুঝেই আঘাত হানবেন।

তু-মু বলেন, চাও সেনাবাহিনী লি মু গবাদি পশুর পালের সাথে তাদের মেষ পালকগুলোকে ছেড়ে দিয়েছিল; যখন সিয়াং নু খুব কাছে চলে আসার একটা ভান করেছিল, তবে তার পেছনে ছিল কয়েক হাজার সৈন্যবাহিনী। খবরটা খান শোনামাত্র আনন্দিত হয়ে শক্তিশালী একটা বাহিনী তার বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিল। লি মু তার বেশিরভাগ সৈন্য ডান এবং বামে সুসজ্জিত করে রেখেছিল, যারা তীব্র আঘাত হানে আর হান সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের এক লক্ষ ঘোড়াসওয়ারকে হত্যা করে।

দুই. যখন কেউ খুব মনোযোগি, সব দিক থেকে প্রস্তুত; যে আপনার থেকে বেশি শক্তিশালী তখন তাকে এড়িয়ে যান। শত্রুর সেনানায়ককে রাগিয়ে দিন, তাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করুন।

লি চুয়ান এর মতে, যখন সেনানায়ক বদরাগী হয়, তখন কতৃপক্ষ খুব সহজেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কারণ তার চারিত্রিক দৃঢ়তা থাকে না।

চ্যাং ইউ এর ভাষ্যমতে, শত্রুর সেনানায়ক যদি একগুয়ে আর ক্রোধান্বিত হয়, তবে তাকে অপমানিত করুন আর ক্রুদ্ধ করুন যার কারনে সে নিজেই বিরক্ত আর হতভম্ভ হয়ে যাবে এবং কোন পরিকল্পনা ছাড়াই সে আপনার দিকে অগ্রসর হবে।

তিন. শত্রুর থেকে অনুত্তম বলে নিজেকে প্রতিয়মান করুন আর তার অহংকার জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট থাকুন।

তু-মু বলেন, চিন রাজবংশের শেষের দিকে, মো-তুন এর সিয়াং নু ক্ষমতায় আরোহন করেন।পাশের রাজ্য ইস্টার্ন হু ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী আর তারা একজন রাজদুত পাঠালেন সিয়াং নু এর কাছে। তারা জানিয়েছিল, ‘আমরা এক হাজার ঘোড়া চাই।’ মোতুং তার উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনায় বসলেন। খবরটা শুনে সবাই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিল: ‘এক হাজার ঘোড়া! আমাদের সবচেয়ে দামি জিনিস এটা! তাদরকে ঘোড়া উপহার দেয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না! মোতুং জবাবে বলেছিলেন : কেন কিছু ঘোড়ার জন্য প্রতিবেশির সাথে যুদ্ধে যাব?’ আর তাই ঘোড়া পাঠানো হল।

অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ইস্টার্ন হু থেকে আবার দূত এল। সে বলল: ‘আমরা একজন রাজকুমারি চাই।’ মোতুং আবার তার উপদেষ্টা পরিষদদের সাথে আলোচনায় বসলেন যারা সকলেই রাগান্বিত হয়ে বললেন: ‘ইস্টার্ন হু রা তো দুবৃত্ত! আর তাই তারা এখন আমাদের একজন রাজকুমারি চাইছে! আমরা অনুরোধ করছি তাদেরকে আক্রমণ করার জন্য!’ মোতুং জবাবে বললেন; কেন একজন রাজকুমারির জন্য প্রতিবেশির সাথে বিরুপ পরিবেশ সৃষ্টি করব? আর তাই একজন রাজকুমারিকে পাঠানো হল ইস্টার্ন হু রাজ্যে।

তারপর একেবারে অল্প কিছুদিন পরে আবারও ইস্টার্ন হু রাজ্য থেকে খবর পাঠানো হল এই বলে আপনাদের একহাজার লি জমি পতিত রয়েছে, সেগুলো আমরা চাই। যথারীতি মোতুং তার উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনায় বসলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জমি দিতে রাজি হলেও বাকিরা সরাসরি তা নাকোজ করে দিল। এবার মোতুং বললেন: “জমি হল একটা রাজ্যের অস্তিত্ব, ভিত্তি। কিভাবে তার জনগন সেটা ছেড়ে দিতে পারে? আর তাই যারা জমি ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছিল তাদের সকলের গর্দান গেল।

মোতুং সাথে সাথে ঘোড়ায় চড়ে বসলেন, সকলকে আদেশ দিলেন যারা এখনও চুপ করে বসে থাকবে তাদের সকলের গর্দান যাবে। আর ইস্টার্ন হু রাজ্য অতর্কিত আক্রমণ করে বসলেন। ইস্টার্ন হু রাজ্যের সকলে ভয়ে পালাতে শুরু করল। কারণ তাদের কোন প্রস্তুতিও ছিল না। আক্রমণ করে তাদের নিশ্চিন্ন করতে শুরু করলেন। সেখান থেকে পশ্চিমে এগিয়ে গেলেন আর ইয়েহ তি আক্রমণ করে নিজের কজ্বায় আনলেন। দক্ষিণে দখল করে নিলেন লো ফান এবং শেষে জয় করলেন ইয়েন। আর এভাবে তিনি সিয়াং নু এর সকল জমি দখল করলেন যেগুলো অতীতে চিন সেনানায়ক মেং তিয়েন জয় করেছিলেন।

চার. শত্রুকে ক্রমাগত চাপের মুখে রাখতে হয়। শত্রু যখন শান্তি খুজবে তখনই তাকে জ্বালাতে হবে। অস্থির করে তুলতে হবে তাকে।

তু-মু এর ভাষ্যমতে, হান রাজ্যামলের শেষের দিকে লিউ পেই পরাজিত হন তাদের কাছে। পেই সেখান থেকে ইউয়ান সাও রাজ্যে পালিয়ে যায়। সেখানে আবার সৈন্য একত্রিত করে তাদেরকে আক্রমণ করে বসে। তিয়েন ফাং ছিলেন ইউয়ান সাওয়ের একজন কর্তব্যরত অফিসার। তিনি বলেছিলেন: “তাও সৈন্য পরিচালনায় অত্যন্ত সুদক্ষ ছিল। তার কাছে থেকে দূরে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ ছাড়া আর কিছু নয়। একজন সেনানায়ক হিসেবে আপনার উচিত পাহাড়-নদী পেরিয়ে দূরে সরে যাওয়া। বাহ্যিকভাবে সেখানে ক্ষমতাবান নোত আর নিজেদের মধ্যে তৈরি করুন সুদক্ষ সামরিক পরিকল্পনা। পরে সেখান থেকে অসাধারণ দক্ষ একটা দল গঠন করে, যখনই সুযোগ পায় শত্রুর অপ্রস্তুতার সুযোগটা গ্রহণ করে। দক্ষিণ দিকে নদী থেকে তাকে বিভিন্ন সমস্যায় ফেলে। যখনই সে ডানের সমস্যাটা সামাধান করে তখনই বাম দিক থেকে আক্রমণ করে; তাকে দৌড় করিয়ে অশান্ত করে তোলে। আর যদি এই যুদ্ধ কৌশলটা কেউ এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি সম্মুখ আক্রমনের ঝুঁকিটা গ্রহণ করে; তবে সেটা হবে সেই ভুল শুধরানোর জন্য দেরি। ইউয়ান সাও এই যুদ্ধ কৌশলটাকে অনুকরণ করেনি বলে শেষে পরাজিত হয়।

পাঁচ. যখনই শত্রু সৈন্যরা একত্রিত অবস্থায় থাকে, তাদেরকে ছন্ন ছাড়া করে দিন।

চ্যাং ইউ বলেন: মাঝে মাঝে ক্ষমতা এবং এর মালিকের মধ্যে একটা দুরত্ব সৃষ্টি করতে হয়; অন্যদিকে তার মিত্রদেরকেও আলাদা করে দিতে হয়। তাদের নিজেদের মধ্যে সন্দেহের চির ধরিয়ে দিতে হয় যাতে করে তারা আলাদা হতে পারে। তারপরই শত্রু শিবিরে আঘাত হানতে হয়।

ছয়. আক্রমণ করুন শত্রুর সবচেয়ে অরক্ষিত স্থানে; যেখানে শক্র কখনও ভাবেও নি যে সেই দিক দিয়ে আক্রমণ হতে পারে।

হো ইয়েন’সি বলেন, তাং রাজ্যের লি চ্যাং দশটা কৌশলের প্রস্তাব করে সিও সি দের বিরুদ্ধে করার জন্য। সৈন্যদের নির্দেশনা দেয়ার সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তার ওপর। আট মাসের মধ্যে সে কিউই চাও-এ তার সকল সৈন্যবাহিনী জড়ো করে।

শরৎকালে ইংতি নদীর পানি বেড়ে গিয়ে রাস্তা ঘাট সব তলিয়ে গেল। আর সিও সিয়েহ ভাবল লি চিং এই পরিস্থিতে নিশ্চই নিজের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত আছে। তাই সে যুদ্ধের কোনরুপ প্রস্তুতি গ্রহন করল না।

নবমতম মাসেই লি চিং তার সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে বললেন; যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ক্ষিপ্রতা; সুযোগ ছেড়ে দেয়ার মত মানুষ আমরা নই। আর আমরা যুদ্ধে মনোনিবেশ করব যেটা সিও সিয়েহ জানতেও পারবে না। নদীর এই ফুলে উঠাটাকেই আর্শিবাদ হিসেবে নিয়ে হঠাৎ সিও সিয়েহ এর রাজধানী আক্রমণ করব। ঠিক যেমনটা প্রবাদে আছে, ‘হাত তালি দেয়ার জন্য হাত দুটোকে একত্রিত করার পরে কান ঢেকে রাখার জন্য আর কিছুই বাকি রইল না। যদি সে আমাদের খবর পায়ও ততক্ষণে সে পরিকল্পনা করতে করতেই আমরা তাকে কুপোকাত করে দিতে পারব।

সৈন্যরা আই লিং এর দিকে আগানো শুরু করল আর সিও সিয়েহ তা দেখে ভরকে গেল। সাথে সাথে সে নদীর দক্ষিণে সৈন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করল। কিন্তু সৈন্যরা সময় মত সেখানে পৌঁছতেই পারল না। লি চিং শহর অবরুদ্ধ করে রাখলে সিও সিয়েহ শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পন করে।

সাত. এমন একটা জায়গা খুঁজে বের করুন যে জায়গা দিয়ে শত্রু আক্রমনের কোন আশংকাই করে নি।

অয়েই সেনানায়ক জেনারেল চাং হুই এবং তেং আই কে পাঠায় সু রাজ্য আক্রমণের জন্য। শীতের সময় অর্থাৎ দশমতম মাসে জেনারেল আই ইন পিং ছেড়ে হাজার লি দুরে গমন করলেন। এই জায়গাটায় কোন বাধার সম্মুখিন সে হয় নি। জায়গাটায় উঁচু উঁচু পাহাড় আর খোলা প্রান্তর ছিল। তাই শক্রর সম্মুখিন না হলেও এই পাহাড়গুলোর কারনে তাকে যথেষ্ট ভুগতে হয়েছে। তেং আই নিজেকে মোটা কার্পেটে জড়িয়ে পাহাড়ের ঢালে গড়াতে শুরু করল; আর তার উপদেষ্টারা পাহাড়ের গাছগুলো ধরে কোনমতে নিচে নামল। আর সৈন্যরা সেখানকার নদী থেকে মাছ খেয়ে শক্তি জোগাড় করে এগিয়ে চলে।

তেং আই প্রথমে সু রাজ্যের চিয়াং ইউ নামক জায়গায় পৌঁছুল। পাল্টা আক্রমণে না গিয়ে জেনারেল মোউ আত্মসমর্পন করল। হত্যা করা হল চাও কো চাং কে। আর এরই সাথে সাথে পতন ঘটল সু রাজ্যের।

এগুলো হল জয়ী হওয়ার আসল চাবিকাঠি। আর এগুলো হাতে কলমে না দেখানো পর্যন্ত ঠিকভাবে রপ্ত করাও সম্ভবপর নয়।

মেই ইয়াও চেন এর ভাষ্যমতে, শত্রুর দ্বারা আক্রমণ হওয়া ছাড়া তো তেমন পরিবেশই সৃষ্টি করা যাবে না। তাই কৌশলগুলি সেই পরিবেশ পরিস্থিতি ছাড়া কিভাবে আলোচনা করা যাবে? আর এখন আমার এই অনুমানগুলো যদি নিজেরা কোন বাধা বিপত্তি ছাড়াই চর্চা করে তবে সেটা বিজিত হওয়ার সুযোগটা বাড়িয়ে দেবে কারণ অনুমান বলছে সেখানে সেই উত্তম; আর যদি সেটা পরাজিত হওয়ার নির্দেশ করে তবে সেটার কারণ হবে সে নিজেকে শত্রুর থেকে কম শক্তিশালি বলে মনে করে। যত বেশি হিসাব-নিকাশ করে যুদ্ধ করে তার জয়ী হওয়ার সুযোগ ততটা বেড়ে যাবে। এর দ্বারা আমি বোঝাতে চাইছি যদি পরিবেশ পরিস্থিতিটাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন তবে ফলাফলটা খুব সহজেই আগ থেকেই বোঝা সহজ হয়ে যায়।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *