মহীয়ান টারজান (টারজান দি ম্যাগনিফিসেন্ট)

মহীয়ান টারজান (টারজান দি ম্যাগনিফিসেন্ট)

সেদিন আফ্রিকার বিষুবরেখার পাঁচ ডিগ্রী উত্তরে এক শূন্য বিশাল প্রান্তরে আকাশ থেকে অগ্নিবৃষ্টি করে যাচ্ছিল জ্বলন্ত সূর্য। একটি লোক একটা ছেঁড়া শার্ট আর ছেঁড়া পায়জামা পরে টলতে টলতে অতি কষ্টে পথ হাঁটছিল। তার জামা ও পায়জামার উপর ছিল শুকনো রঙের দাগ। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে মাটিতে পড়ে গিয়ে অনড় হয়ে শুয়ে রইল।

ঝোপে-ঢাকা একটা ছোট পাহাড়ের মাথা থেকে একটা সিংহ এই দৃশ্যটির উপর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে ছিল।

একটা শকুনি আকাশে ঘুরতে ঘুরতে শায়িত লোকটিকে মৃত ভেবে লক্ষ্য করছিল তীক্ষ্ণ ও লুব্ধ দৃষ্টিতে।

সেই প্রান্তরটার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে অন্য একটি লোক এগিয়ে আসছিল উত্তর দিকে। কোন ক্লান্তি বা অবসাদের চিহ্ন ছিল না লোকটির মধ্যে। তার পেশীবহুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেহে বাদামী রঙের চামড়াটা চকচক করছিল। এক অবাধ উচ্ছলতায় ভরা তার প্রতিটি নিঃশব্দ পদক্ষেপ শীতা বা চিতাবাঘের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তার চেহারায় বা চোখে মুখে কিছুমাত্র সংশয় বা শঙ্কার চিহ্নমাত্র ছিল না। পোশাক বলতে একটা শুধু কৌপীন জড়ানো ছিল তার কোমরে। তার একদিকের কাঁধে ঝোলানো ছিল একটা ঘাসের দড়ি আর একদিকের কাঁধে ছিল তীরভরা একটা তৃণ। কোমরে ঝোলানো ছিল খাপে ভরা। একটা ছোরা। তার এক হাতে ছিল একটা বর্শা আর এক হাতে ছিল একটা ধনুক। তার শান্ত ধূসর একজোড়া চোখের উপর একঝক কালো লম্বা চুল এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিল মাথাটার চারপাশে।

সিংহটার বাসা এখান থেকে অনেক দূরে উত্তর দিকে হলেও এ জায়গাটা অচেনা নয় তার।

 দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে এগিয়ে আসা লোকটা হলো টারজান।

সে এখানে এসেছে এক সম্রাটের আদেশে একটি গুজবের বিষয়ে তদন্ত করতে। গুজবটা হলো এই যে ইউরোপীয় শক্তি নাকি ঘুষ নিয়ে স্থানীয় এক উপজাতি দলের সর্দারকে হাত করছে। তখন যুদ্ধ চলছিল সারা দেশ জুড়ে।

টারজান পথ চলতে চলতে তার সামনে সাদা চকচকে কি একটা বস্তুকে পড়ে থাকতে দেখল। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সে দেখল শুধু একটা মাথার খুলি নয় একটা গোটা নরকঙ্কাল পড়ে রয়েছে। আরও দেখল কঙ্কালটা অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। কিছু কাঁটা গাছ গজিয়ে উঠেছে তার মধ্যে থেকে। দেখল তার পাশে একটা ভাঙ্গা লাঠির ডগায় এক টুকরো রেশমী কাপড়ে বাঁধা একটা চিঠি। কাপড়টা শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে গেলেও তার ভিতরে চিঠিটা ঠিক আছে।

টারজান চিঠিটা খুলে দেখল সেটা ইংরেজিতে লেখা এবং হাতের লেখাটা বেশ পরিষ্কার। চিঠিতে লেখা আছে, জানি না এ চিঠি কার হাতে পৌঁছবে। আমি এই চিঠি একজনের মাধ্যমে পাঠাচ্ছি, কিন্তু জানি না সে এই অভিশপ্ত দেশ থেকে বার হতে পারবে কি না। সে আশা আমি করি না। তবে যদি কোনদিন এ চিঠি কোন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির হাতে পড়ে তাহলে তিনি যেন নিকটবর্তী কোন রেসিডেন্ট কমিশনার বা কোন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যাতে তারা তাড়াতাড়ি আমাদের সাহায্যের ব্যবস্থা করতে পারেন।

আমি আর আমার স্ত্রী রুডলফ উত্তরাঞ্চলে অভিযানে বেরিয়েছিলাম সে আজ বহুদিন আগের কথা। আমরা তখন যে অঞ্চলে ছিলাম সে অঞ্চলে এক ভয়ঙ্কর উপজাতি বাস করত। নানারকম গুজব শুনে আমাদের ভৃত্যেরা আমাদের ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবু আমরা যে কোন অতিপ্রাকৃত শক্তির টানে এগিয়ে চলেছিলাম।

মাফা নদী যেখানে নিউবারি নদীতে পড়েছে সেইখানে একটা খাদ পার হয়ে একটা মালভূমিতে গিয়ে পড়তেই কাজী নামে এক ভয়ঙ্কর নারী উপজাতির মেয়েরা ধরে ফেলল আমাদের। এক বছর পর আমার কন্যা জন্মগ্রহণ করে। কন্যাসন্তান প্রসব করার সঙ্গে সঙ্গেই আমার স্ত্রীকে বধ করে কাজীদের নারী শয়তানরা। আমার স্ত্রী পুত্র সন্তান প্রসব করলে মারত না তারা। তারা শ্বেতাঙ্গ লোক চায়। তাই আমাকে আর আরো বারোজন শ্বেতাঙ্গ বন্দীকে হত্যা করেনি তারা।

যে জলপ্রপাত থেকে উৎসারিত হয়েছে মাফা নদী সেই জলপ্রপাতের উপরে এক বিস্তৃত মালভূমির উপরে অবস্থিত কাজীদের দেশটা। জায়গাটা কিন্তু খুবই দুর্গম। কেমলমাত্র মাফা নদী আর নিউবারি নদীর সঙ্গমস্থলের কাছ দিয়ে যাওয়া যায়।

একমাত্র সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গদের বড় রকমের একটা দল অভিযান চালিয়ে আমাকে ও আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারে কাজীদের কবল থেকে। আমার মনে হয় কৃষ্ণকায় কোন আদিবাসী এ দেশে প্রবেশ করবে না কিছুতেই। কাজী মেয়েরা শয়তানের মত লড়াই করে। তাদের এক অদ্ভুত অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে। আমি নিজের চোখে তাদের সে শক্তির নিদর্শন দেখেছি।

এমন কি শ্বেতাঙ্গদের এক বড় বাহিনীও কাজীদের কাছে হেরে যেতে পারে। কারণ অতি প্রাকৃত শক্তিসমূহের সঙ্গে লড়াই করে পেরে ওঠা সম্ভব নয়।

কাজীদের দখলে আছে প্রচুর পরিমাণে হীরে। আমি যতদূর জানি কাজীদের হীরের ওজন হলো ছয় হাজার ক্যারেট আর দাম হবে দু’লক্ষ পাউন্ড। কাজেই বিপদের ঝুঁকির তুলনায় পুরস্কারটাও কম নয়।

এ চিঠি কারো মারফৎ বাইরের জগতে পাঠাতে পারব এ আশা আমি কোনদিন করিনি। পরে একদিন এদেরই এক নিগ্রোগুপ্তচরকে ঘুষ দিয়ে বশ করে এ চিঠি বয়ে নিয়ে যেতে রাজি করিয়েছি।

ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি এ চিঠি যেন যথাসময়ে কোন যোগ্য ব্যক্তির হাতে পৌঁছায়। ইতি মাউন্টফোর্ড।

চিঠিখানার শুরু হতে শেষ পর্যন্ত দু’বার পড়ল টারজান। মাউন্টফোর্ড! সে মনে করে দেখল অনেকদিন আগে লর্ড ও লেডী মাউন্টফোর্ড-এর রহস্যময় নিখোঁজের কথা সে শুনেছিল। সেই মাউন্টফোর্ড এখনো বেঁচে আছে এ কথা সে ভাবতেই পারেনি।

এতদিনে আসল খবরটা জানতে পারল, কিন্তু বড় দেরী হয়ে গেছে। কুড়ি বছর হয়ে গেছে লেডী মাউন্টফোর্ড মারা গেছেন। লর্ড মাউন্টফোর্ড আজ বেঁচে আছেন কি না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। ছোট থেকে এই সব অসভ্য বর্বর নারীদের মাঝখানে তাদের কন্যাও কখনো এতদিন বেঁচে থাকতে পারে না।

এবার সে মন থেকে এ সব কথা সরিয়ে দিয়ে বাস্তাব পরিবেশের দিকে মন দিল।

একটা শকুনির লক্ষ্যবস্তুটার দিকে এগিয়ে গেল টারজান। দেখল একটা সিংহও একটা উঁচু জায়গা থেকে নেমে আসছে একই লক্ষ্যের দিকে। সিংহটা যেমন টারজনের উপস্থিতিটাকে গ্রাহ্য করল না তেমনি টারজানও সিংহটাকে আসতে দেখেও তার গতি পরিবর্তন করল না।

এইভাবে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি শ্বেতাঙ্গ লোকের শায়িত দেহ দেখতে পেল।

টারজান দেখল সিংহটা শুধু কৌতূহলের বশেই ঝাঁপ দিয়েছে লোকটার উপরে। সে ক্ষুধার্ত নয়। তার পেট ভর্তি।

লোকটি দেখল সিংহটা একেবারে তার কাছে এসে পড়তেই একটা নগ্নপ্রায় লোকও সিংহের মত গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগল।

টারজান এবার লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, তুমি কি আহত না ক্ষুধা-তৃষ্ণায় এমন দুর্বল হয়ে পড়েছ?

যার মুখ থেকে পশুর গর্জন বেরিয়ে এসেছিল তাকে ভদ্রলোকের মত ইংরেজিতে কথা বলতে শুনেও তেমনি আশ্চর্য হয়ে গেল লোকটি। সে দেখল সিংহটা যেদিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই চলে গেল।

লোকটাকে নিরুত্তর দেখে টারজান বলল, তুমি ইংরেজি জান?

লোকটি বলল, হ্যাঁ। আমি একজন আমেরিকান। আমি আহত নই। কয়েকদিন কিছুই খেতে পাইনি আমি। আজ একেবারেই জল পাইনি।

লোকটিকে তার কাঁধের উপর তুলে দিয়ে টারজান বলল, যেখানে খাদ্য ও জল পাওয়া যাবে সেখানে যাব আমরা। তারপর তোমার সব কথা শুনব।

অবশেষে জলের ধারে এসে টারজান লোকটিকে একটা গাছের তলায় শুইয়ে দিল। এরপর জল এনে লোকটির মাথা তুলে ঠোঁট দুটো ফাঁক করে কয়েক ফোঁটা জল ঢেলে দিল। ঠাণ্ডা জল দিয়ে লোকটির চোখ মুখ ধুইয়ে দিল।

টারজান তাকে বলল, এখন শান্ত হও। চুপ করে থাক। আমি খাবার নিয়ে আসছি।

অল্পক্ষণ পরেই খাবার নিয়ে এসে টারজান দেখল লোকটি শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। তখন রাত্রির অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে।

টারজান তার তীর ধনুক দিয়ে একটা পাখি আর একটা খরগোস মেরে এনেছিল। মরা পাখিটার উপর একতাল কাদা লেপে দিয়ে আগুন জ্বেলে তাতে পোড়াতে দিল। মরা খরগোসটাকে একটা কাঠিতে গেঁথে আগুনে ঝলসে নিল। আগুনে কাদাটা শুকিয়ে গেলে শুকনো মাটির সঙ্গে পাখির গায়ের পালকগুলোও উঠে গেল।

পেট ভরে খাবার ও জল খেয়ে লোকটি টারজানকে বলল, এবার বল তুমি কে? কেনই বা আমাকে বাঁচালে।

টারজান বলল, তার আগে বলত তুমি কে? এ অঞ্চলে কি করছিলে তুমি?

লোকটি এবার বলল, আমার নাম উড, আমি একজন লেখক। বেশি টাকাকড়ি না নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এই জন্যই এক নির্জন বনপথে আমাকে অসহায় ও বিপন্ন অবস্থায় দেখেছিলে তুমি। আমার অবস্থা যত অসহায়ই হোক আমার মাথায় এমন এক অভিজ্ঞতার কথা আছে যা আজ পর্যন্ত কোন ভ্রমণ কাহিনীতে কেউ লিখতে পারেনি। আমি যে সব জিনিস দেখেছি তা সভ্য জগতের কোন লোক স্বপ্নেও দেখেনি কখনো এবং সে সব জিসিন বিশ্বাস করতে পারবে না তারা। আমি নিজের চোখে দেখেছি এবং নিজের হাতে ধরেছি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় হীরকখণ্ড। আমার মনে হচ্ছে আমি মনে করলে তা সঙ্গে করে আনতেও পারতাম।

আবার পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা সুন্দরী এবং নিষ্ঠুরতমা নারীকেও দেখেছি। আমার মনে হয় আমি তাকেও আনতে পারতাম আমার সঙ্গে। আমি তাকে ভালবাসতাম, এখনো বাসি। আবার তাকে ঘৃণাও করি, মাঝে মাঝে অভিশাপ দিই তাকে। ঘৃণা আর ভালবাসা-এই দুটি পরস্পর-বিরুদ্ধ আবেগ।

আর লেডী মাউন্টফোর্ডের রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কথা নিশ্চয় শুনে থাকবে?

টারজান বলল, কে তা না শুনেছে।

লোকটি বলল, আজ হতে কুড়ি বছর আগে তারা সভ্য জগৎ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের সম্বন্ধে আজও কত গুজব রটে চারদিকে। এই রহস্যময় ব্যাপারটা এমনইভাবে মায়ায় জড়িয়ে ফেলে আমার মনটাকে যে এই গুজবের সত্যাসত্য যাচাই করে দেখার জন্য নিজেই এক অভিযানে বার হবার মতলব করি আমি।

আমি বব ভ্যান আইককে আমার পরিকল্পনার কথা বলতেই সে আমার সঙ্গে এক অভিযানে যেতে। চাইল এবং খরচপত্রের দায়িত্ব বহন করতে চাইল। ভাবলাম আমার পরিকল্পনাটা অবশ্যই সাফল্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে এবার।

পুরো একটি বছর ধরে ইংল্যান্ড ও আফ্রিকায় অনুসন্ধানকার্য চালিয়ে বেশ বুঝতে পারলাম যে নিউবারি নদীর ধারে রুডলফ হ্রদের উত্তর-পশ্চিম দিকে কোন একটা জায়গা থেকে নিখোঁজ হন লর্ড ও লেডী মাউন্টফোর্ড।

আফ্রিকার জীবনযাত্রার সঙ্গে অভিজ্ঞতা আছে এমন কিছু শ্বেতাঙ্গ শিকারী নিয়ে এক সফরী গড়ে তুললাম আমরা।

নিউবারি নদীর ধারে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত ভালই চলল আমাদের অভিযান।

ক্রমে আমাদের দল ছেড়ে চলে যেতে লাগল আমাদের নিগ্রোভৃত্যরা। কেউ কোন কারণ বলল না।

অবশেষে নিগ্রোভূত্যদের একজন সর্দার আমাদের একদিন বলল, যে সব আদিবাসীদের সঙ্গে এর আগে তাদের কথা হয়েছে তারা তাদের বলেছে নিউবারি নদীর উপরদিকে উত্তরে এক ভয়ঙ্কর উপজাতি আছে। তাদের দেশে কোন পুরুষ নেই, সবাই মেয়ে। কিন্তু তারা বড় নিষ্ঠুর, বড় নির্মম। তাদের দেশে কোন নিগ্রো গিয়ে পড়লে তাকে হয় তারা ক্রীতদাস করে রাখবে চিরদিনের জন্য, না হয় তাকে হত্যা করবে। তারা এক যাদু জানে, তাদের হাতে এমন এক অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে যার জন্য যদিও তাদের কোন বন্দী তাদের হাতছাড়া হয়ে কোনরকমে পালিয়ে আসে তাহলেও তার নিষ্কৃতি নেই। সেই পলাতক বন্দী তার নিজের দেশে পৌঁছনোর আগে কোন না কোনভাবে মৃত্যু ঘটে তার। যুদ্ধ করে সেই উপজাতিয় মেয়েদের পরাজিত বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। কারণ ওরা মানুষ নয়, ওরা নারীরূপিনী রাক্ষসী।

আমাদের অভিযাত্রীদলে স্পাইক ও স্ট্রোল নামে যে দু’জন শিকারী ছিল, আমি সর্দারের,কথাটা তাদের জানাতেই তারা হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা।

তাই তারা অবশিষ্ট নিগ্রোদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে লাগল। পরদিন সকালে দেখা গেল একজন নিগ্রোভৃত্যও আমাদের দলে নেই। আমরা তখন মাত্র চারজন শ্বেতাঙ্গ ছাড়া আর কেউ ছিল না আমাদের দলে। অথচ সঙ্গে যা মালপত্র ছিল তা বহন করার জন্য পঞ্চাশজন লোকের দরকার। বব, ভন আইক, স্পাইক আর স্ট্রোল- আমরা তখন ছিলাম মোট এই চারজন।

এ রকম পরিস্থিতিতে জীবনে কখনো পড়িনি এর আগে। কোন প্রত্যক্ষ বিপদ নেই, কোন প্রত্যক্ষ ভয়ের বস্তু নেই। আমাদের কেবলি মনে হত অদৃশ্য অবস্থায় কারা যেন লক্ষ্য করছে আমাদের সব সময়। তার উপর মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেতাম।

সেদিন রাত্রিতে চারজনে মিলে এক পরামর্শ সভায় বসলাম। স্পাইক ও স্ট্রোল বলল, এখন আমাদের উচিত ঐ শব্দ লক্ষ্য করে এক অভিযান চালানো। আমরা বেশি কিছু সঙ্গে নেব না। শুধু একটা করে রিভলবার, রাইফেল, কিছু অস্ত্রশস্ত্র আর খাবার। বাকি সব রেখে যাব শিবিরে।

পরদিন সকালে নীরবে প্রাতরাশ করার পর সঙ্গে যা নেবার নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

পাঁচ মাইল যাবার পর পথের উপর একজন শ্বেতাঙ্গ লোককে শুয়ে থাকতে দেখলাম। লোকটির বয়স পঞ্চাশের মধ্যে। সে যেমন অতি বৃদ্ধ নয়, তেমনি ক্ষুধা-তৃষ্ণাতেও কাতর বলে মনে হলো না। তবু মনে হলো চলার শক্তি নেই তার।

আমরা তার পাশে থামতেই সে চুপি চুপি আমাদের বলল, ফিরে যাও।

তার কথা শুনে বুঝলাম সে এত দুর্বল যে কথা বলতে পারছে না।

আমার কাছে ফ্লাস্কে ভরা কিছু ব্রান্ডি ছিল। লোকটিকে তাই কিছুটা খাইয়ে দিতে একটু শক্তি ফিরে পেল সে।

তখন লোকটি বলল, ঈশ্বরের নামে বলছি, তোমরা ফিরে যাও। তোমরা সংখ্যায় বেশি নেই। ওরা তোমাদের ধরে ফেলবে। আমাকে যেমন বিশ বছর ধরে আটকে রেখেছিল তেমনি তোমাদেরকেও আটকে রাখবে। তোমরা পালাতে পারবে না। কুড়ি বছর ধরে আমি কত বার পালাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাদের শক্তির কাছে হার মেনেছি আমি। আমার অবস্থা দেখছ। আমি মুমূর্ষ। তোমরা বরং ফিরে গিয়ে শ্বেতাঙ্গদের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে এসে আক্রমণ করবে ওদের। নিগ্রোরা ওদেশে ঢুকবে না। এ হলো কাজীদের দেশ। কিন্তু সমস্ত শক্তি আছে একটি মাত্র লোকের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। সে-ই সব মেয়েদের শেখাচ্ছে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কে সে?

সে বলল, মাফকা।

সে-ই কি সর্দার?

না, সে সর্দার নয়, তবে সর্বশক্তিমান। সে যাদুকরের থেকেও অনেক বেশি শক্তিমান। সে হচ্ছে আস্ত একটা শয়তান।

আমি লোকটিকে বললাম, তুমি কে?

সে বলল, আমি মাউন্টফোর্ড।

লর্ড মাউন্টফোর্ড?

 সে বলল, হ্যাঁ।

টারজান উডকে জিজ্ঞাসা করল, লোকটি তোমাকে হীরের কথা কিছু বলেছিল?

উড তখন টারজনের মুখপানে তাকিয়ে বলল, তুমি কি করে জানলে এ কথা?

টারজান বলল, কিছুক্ষণ আগে তুমি ভুল বকছিলে। তার থেকে জানতে পারি।

উড বলল, কাজীদের হীরে আকারে সত্যিই বিরাট, তার দাম হবে প্রায় দশ মিলিয়ন ডলার। মাউন্টফোর্ডের কাছ থেকে হীরের কথাটা শুনে স্পাইক ও স্ট্রোল হীরের লোভে কাজীদের দেশের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। মাউন্টফোর্ডের কথায় মোটেই ভয় পেল না তারা। তাছাড়া তখন হয়ত ইচ্ছা করলেও ফিরতে পারতাম না আমরা।

টারজান তখন উডকে বলল, তারপর মাউন্টফোর্ডের কি হলো?

উড বলল, তিনি একটি মেয়ের সম্বন্ধে বিড় বিড় করে কি বলছিলেন। কিন্তু তখন মৃত্যুর আর দেরী ছিল না। বেশি কিছু বলতে পারলেন না। তাঁর কথাটা ছিল …. মেয়েটাকে বাঁচিও। মাফকাকে হত্যা করো।

এই কথা বলেই মারা গেলেন মাউন্টফোর্ড।

আমরা কিন্তু কাজীদের দেশে যাওয়ার পরেও তিনি যে লোকটার কথা বলেছিলেন সেই মাফকা লোকটাকে দেখতে পাইনি। শুনেছি বহু শতাব্দী আগে নির্মিত এক প্রাচীন আমলের প্রাসাদে থাকত সে। সেই প্রাসাদেই হীরে থাকত। কেউ বলত প্রাসাদটা নির্মাণ করে পর্তুগীজরা তাদের আবিসিনিয়া অভিযানের সময়ে। আবার ভন আইক বলত এটা নির্মিত হয় ক্রুসেড ধর্মযুদ্ধের কালে। এ প্রাসাদ যারাই গড়ে তুলুক, মোট কথা কাজীরা করেনি।

কাজীরা মনে করে বড় হীরকখণ্ডটাই ওদের যত কিছু শক্তির উৎস। তারা তাই প্রাসাদটাকে চারদিক থেকে কড়া পাহারা দিয়ে ঘিরে রেখেছে। মাফকা আর তাদের রানীও সেই প্রাসাদেই থাকে।

এ কথা বলতে আমার কোন দ্বিধা নেই যে ওদের রানী হলো সমস্ত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তার মত সুন্দরী মেয়ে জীবনে আমি কোথাও কখনো দেখিনি। এক এক সময়ে রানীর মধ্যে নারীসুলভ দয়া-মায়া, মমতা প্রভৃতি গুণগুলোর পূর্ণ পরিচয় পেয়েছি, কিন্তু আবার পরমুহূর্তেই তাকে মনে হয়েছে এক নিষ্ঠুর শয়তান, যেন একটা আস্ত রাক্ষসী। রানীকে ওরা বলে কনফালা আর হীরকখণ্ডটাকে বলে কনফাল।

এই রানীই তার নারীসুলভ দয়ামায়ার বশবর্তী হয়ে কোন এক দুর্বল মুহূর্তে আমাকে মুক্ত করে দেয়। পরে সে হয়ত অনুতপ্ত হয়ে মাফকাকে বলে দেয়, মাফকার শক্তিবলেই আমার এই শোচনীয় অবস্থা হয়।

তারা এখনো সেখানে বন্দী হয়ে আছে।

আমি মুক্তি পেয়ে ভাবি শ্বেতাঙ্গদের একটি বড় দল নিয়ে এসে তাদের মুক্ত করব।

টারজান বলল, তারা কি এখনো জীবিত আছে?

উড বলল, হ্যাঁ। কাজীরা তাদের বাঁচিয়ে রেখে বিয়ে করবে। কাজীদের দেশে সবাই মেয়ে। তারা একদিন কৃষ্ণকায় ছিল। তাই তারা শ্বেতাঙ্গদের বিয়ে করে ওরাও শ্বেতাঙ্গ হতে চায় এবং কৃষ্ণকায় নিগ্রোদের তাড়িয়ে দেয়। শ্বেতাঙ্গদের বিয়ে করা তাদের ধর্মের একটা অঙ্গ।

টারজান বলল, যদি ওরা পুত্র সন্তানদের এইভাবে মেরে ফেলে তাহলে যোদ্ধা পায় কোথা থেকে?

উড বলল, এখানে মেয়েরাই যুদ্ধ করে। আমি ওদের যুদ্ধ কখনো দেখিনি। তবে যা শুনেছি তাতে মনে হয় যোদ্ধা হিসেবে ওরা বড় ভয়ঙ্কর, বড় হিংস্র।

এ ছ’মাস আগের ঘটনা। বব পেয়েছে এক দুঃসাহসিক অভিযানের রোমাঞ্চ। আমি পেয়েছি লেখার উপাদান। স্পাইক আর স্ট্রোল হীরে পায়নি, কিন্তু তারা প্রতেকে সাতজন করে স্ত্রী পেয়েছে। গনফালা রানী হিসেবে শ্বেতাঙ্গ বন্দীদের স্ত্রী নির্বাচন করে দেয় ওদের মধ্য থেকে। কিন্তু গনফালা নিজে কাউকে বিয়ে করতে পারে না।

 উড একসময় চীৎকার করে টারজানকে বলল, তুমি চলে যাও। আমি মাফকার কবলে পড়ে গেছি। মাফা নদী পার হয়ে কাজীদের দেশে যাচ্ছি আমি।

টারজান পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি আমার সঙ্গে যাবে বলেছিলে ত?

উড বলল, বলেছিলাম, কিন্তু আমার পাগুলো ওইদিকে টানছে। অন্য দিকে যেতে পারছি না আমি।

টারজান উডকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, মাফকা যে ওষুধ তৈরি করে তার থেকে বেশি শক্তিশালী ওষুধ আছে আমার কাছে।

ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর এক জায়গায় উডকে তার কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল। বলল, এবার তুমি বোধ হয় নিজেই হাঁটতে পারবে।

এই বলে টারজান আবার উত্তর দিকে হেঁটে যেতে লাগল।

এদিকে উড মুখে এক আতঙ্কের ছাপ নিয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটতে লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলল টারজান।

উড আর্তকণ্ঠে টারজানকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি মনে করো আমি কোনদিন শয়তান মাফকার ভয়ঙ্কর ইচ্ছাশক্তির কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারব?

টারজান বলল, হয়ত পারবে না। কারণ আমি শুনেছি আফ্রিকার অনেক সাধারণ যাদুকর অনেক বন্দী পলাতককে অনেক বছর পরেও শত শত মাইল দূর থেকে ফিরিয়ে আনে তাদের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা। মাফকার শক্তি নিশ্চয় সাধারণ যে কোন যাদুকরের শক্তির থেকে বেশি।

সে রাতে নিউবারি নদীর ধারে এক জায়গায় দু’জনে শুয়ে পড়ল। পরদিন সকালে উঠে টারজান। দেখল উড চলে গেছে।

উড চলে যাওয়ার পর তৃতীয় দিন বিকালবেলায় টারজান উঁচু পাহাড়ের ধারে এসে থামল। তার সামনে এক খরস্রোতা পার্বত্য নদী বয়ে যাচ্ছিল। তার মনে হলো, কাজী আর জুলিদের দেশের মধ্যবর্তী এক জায়গায় এসে পড়েছে সে।

তার পিছনে ছিল পূর্ব দিকে উঁচু পাহাড়। তার সামনে পশ্চিম দিক থেকে বইতে থাকা বাতাসে বেবুন, চিতাবাঘ আর বুনো মোষের গন্ধ পাচ্ছিল। কিন্তু টারজান বুঝতে পারেনি তার পিছনে পাহাড়ের মাথা থেকে কয়েক জোড়া চোখ লক্ষ্য করছে তাকে।

পাহাড়টার উপরে তখন ছিল এগারজন যোদ্ধা। তাদের মধ্যে দু’জন ছিল দাড়িওয়াল শ্বেতাঙ্গ আর পাঁচজন ছিল কৃষ্ণকায় আদিবাসী। তাদের হাতে ছিল তীর ধনুক আর বর্শা। পিঠে ঢাল। তাদের গলায় ছিল বিভিন্ন জন্তুর দাঁতের ও হাড়ের মালা।

যোদ্ধাদের মধ্যে বলিষ্ঠ চেহারার একজন শ্বেতাঙ্গ ছিল দলনেতা। তার মাথার ও দাড়ির চুল কিছু কিছু পাকা ছিল। তার চোখে মুখে বুদ্ধির ছাপ ছিল। দলের লোকেরা তাকে লর্ড বলে ডাকছিল।

তিনদিন ধরে অনেক পাহাড় ডিঙ্গিয়ে খাদ পার হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল টারজান। তার উপর চিতাবাঘদের জ্বালায় গতরাতে মোটেই ঘুম হয়নি তার।

তখনো ঘণ্টাখানেক বেলা ছিল। একটা ঝোপের পাশে নদীর ধারে ঢালু জায়গাটায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল টারজান।

তার যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন সে দেখল তখনো দিনের আলো নিভে যায়নি। দেখল প্রায় ডজনখানেক সাদাকালো চেহারার যোদ্ধা ঘিরে আছে তাকে। তাদের হাতে সে এখন বন্দী। এখন করার কিছু নেই। মুক্তির জন্য চেষ্টা করেও কোন লাভ নেই। তাই চুপচাপ শুয়ে রইল টারজান।

টারজনের কোন ভয় উত্তেজনার চিহ্ন দেখতে না পেয়ে আশ্চর্য হলো যোদ্ধারা।

অবেশেষ লর্ড বলল, তাহলে কাজী, তুমি এখন আমাদের হাতে বন্দী। কারণ আমরা জানি জুলি আর কাজী ছাড়া এই পার্বত্য অঞ্চলে অন্য কেউ আসে না।

এরপর লর্ড তার লোকদের টারজনের হাত দুটো পিছনের দিক করে বেঁধে দিতে বলল।

তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। কাজী টারজানকে নিয়ে যোদ্ধারা পার্বত্য পথে দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল তাদের বস্তিতে। টারজান পথটা ঠিক চিনতে পারল না।

অবশেষে এক সমতল উপত্যকায় এসে পড়ল ওরা। টারজান দূরে অনেকগুলো জ্বলন্ত আগুনের আলো দেখে বুঝতে পারল ওটাই ওদের গা।

ওরা গাঁয়ের গেটের সামনে এসে পড়লে লর্ড হাঁক দিয়ে কি বলল। কয়েকজন সশস্ত্র নারী যোদ্ধা। পাহারা দিচ্ছিল গেটে। তাদের দেখে টারজনের মনে হল তারা সবাই শ্বেতাঙ্গ।

গাঁয়ের ভিতরে ঢুকে জ্বলন্ত আগুনের আভায় টারজান দেখল পথের ধারে ধারে সারবন্দী অনেক পাথরের ঘর রয়েছে। ঘরগুলোর দেওয়াল পাথরের আর ছাউনিগুলো শুকনো ঘাসের। গাঁয়ের মাঝখানে একটা দোতলা পাথরের বাড়ি রয়েছে।

টারজান আরো দেখল কতকগুলো সামনে জ্বলন্ত আগুনের পাশে কতকগুলো মেয়ে বসেছিল। তাদের পাশে ছিল কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে মেয়েরা কৌতূহলী হয়ে উঠল।

ছয়জন নারী প্রহরীসহ লরো লর্ড ও টারজানকে উরার ঘরের মধ্যে নিয়ে গেল।

একটা বড় ঘরে ঢুকে টারজান দেখল দূরে এক ধারে একটা উঁচু মঞ্চের উপর মাথার একরাশ চুল নিয়ে খুঁড়ি মোটা একটা লোক বসে আছে। তার চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলজ্বল করছিল। প্রায় বিশজন সশস্ত্র নারীযোদ্ধা চারদিক থেকে ঘিরে ছিল মঞ্চটাকে।

টারজানকে মঞ্চের সামনে নিয়ে যাওয়া হলে তার দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল উরা। দেখে কেমন যেন বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল সে। তারপর টারজানকে প্রশ্ন করল, আমার ভাই কেমন আছে?

টারজান বলল, আমি তোমার ভাইকে চিনি না।

উরা রাগতভাবে বলল, কি, আমার মিথ্যাবাদী, খুনী, চোর ভাইকে চেন না তুমি।

টারজান ঘাড় নেড়ে বলল, না আমি তোমার ভাইকে চিনি না। আমি কাজী নই।

উরা তখন লর্ড এর উপর অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, তুমি বলেছিলে তুমি একজন কাজীকে বন্দী করে এনেছ?

লর্ড বলল, আমরা ওকে মাফা নদীর উৎসের কাছে বন্দী করি। ও অঞ্চলে কাজী ছাড়া আর কে আসবে?

উরা গর্জন করে উঠল, তুমি একটা আস্ত বোকা। আমি ওকে প্রথম দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছি ও কাজী নয়।

এরপর টারজনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে উরা বলল, তুমি জুলিদের দেশে কি করছিলে?

টারজান বলল, আমার একজন হারানো সঙ্গীর খোঁজ করছিলাম।

 তুমি কি ভেবেছিলে আমাদের দেশে সে আছে?

না, আমি তোমাদের দেশে আসতে চাইনি; আমি কাজীদের দেশে যেতাম।

তুমি মিথ্যা কথা বলছ। কাজীদের দেশ না হয়ে কেউ কখনো মাফা নদীর উৎসমুখে আসতে পারে না।

আমি কাজীদের দেশে না গিয়ে অন্য পথে এখানে এসেছিলাম।

উরা বলল, আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি কাজী নও, তুমি হচ্ছ মাফকার চর। তার দ্বারা নিযুক্ত এক চাকর। সে আমাকে খুন করার জন্য পাঠিয়েছে তোমাকে।

উরার প্রাসাদের দোতলার একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিল টারজান আর লর্ডকে। সে ঘরে ছিল একটামাত্র জানালা। জানালাটা কাঠের রড দিয়ে ঘন করে ঘেরা ছিল।

প্রহরী ঘরের দরজা বন্ধ করে চলে গেলে টারজান উঠে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল। সেদিন ছিল জ্যোৎস্না রাত। আকাশে কোন মেঘ ছিল না। চাঁদের আলোয় টারজান দেখল বাইরে পাঁচিল ঘেরা খানিকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে।

টারজান এবার মুখ ঘুরিয়ে লর্ডকে বলল, আমি তখন তোমাকে বললাম আমি কাজী নই। কিন্তু তুমি তখন শুনলে না আমার কথা। শুনলে তোমাকে এই বিপদে পড়তে হত না।

লর্ড বলল, আমাকে হত্যা করার এটা একটা অজুহাত মাত্র। ওরা আমাকে মারার একটা সুযোগ খুঁজছিল। এই জুলিদের দেশে পুরুষদের প্রয়োজন আছে। তারা যুদ্ধ করে। উরা শুনেছে একদল লোক এখান থেকে ওদের ধাতুটাকে নিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে আবার উরাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও জড়িয়ে আছে। কাজীদের ছাড়া এখান থেকে বাইরের জগতে যাবার অন্য কোন পথ নেই। তাই ভেবেছিলাম ঐ পান্না ধাতুটা মাফকাকে ঘুষ দিয়ে তাদের দেশ থেকে বেরিয়ে যাবার অনুমতি পাব। উরার বিশ্বাস আমিই এই ষড়যন্ত্রের নায়ক। তাই ও আমার জীবন নাশ করতে চায়।

উরা ইচ্ছা করলেই অবশ্য যে কোন সময়ে আমাকে মারতে পারে। কিন্তু সুযোগ খুঁজছিল।

লর্ড আরো বলল, শোনা যায় উরা আর মাফকা দুই যমজ ভাই। বহুদিন আগে ওরা নাকি কলম্বিয়া থেকে পালিয়ে আসে। সঙ্গে পান্নার তালটা ছিল। কাজীরা গলফান নামে হীরকখণ্ডটা কি করে পায় তা আমি জানি না। হয়ত ওরা কোথাও থেকে চুরি করে আনে। ওদের বিশ্বাস কাজীদের গলফান আর জুলিদের পান্নাই সব শক্তির উৎস। কিন্তু উরাকে না মারলে পান্নাটা পাওয়া যাবে না। আমরা তাই উরাকে মারতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সে স্বপ্ন ব্যর্থ হয়ে গেল। এখন আমাকে উরা সিংহের মুখে ফেলে দিয়ে মজা পাবে। আর তোমাকে ওরা টুকরো টুকরো করে কাটবে।

টারজান বলল, কিন্তু দু’জনের এই মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে তফাৎ কেন?

 কারণ উরার ধারণা তোমার মস্তিষ্কে বুদ্ধি আছে। তোমার মাথাটাকে তাই চায় ওরা।

কিন্তু কি করে তা সম্ভব?

ওরা তা খাবে।

বুঝেছি। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের প্রথা আছে। ওদের ধারণা ওরা কারো মস্তিষ্কটা খেলে তার বুদ্ধিটা পাবে। কোন বীর শত্রুর হৃৎপিণ্ড খেলে তার সাহস পাবে। কোন দ্রুতগামী মানুষের পায়ের পাতা খেলে তার মত ছুটতে পারবে আর কোন তীরন্দাজের হাতের তালু খেলে তার মত তীর ছুঁড়তে পারবে।

যত সব বাজে কুসংস্কার।

টারজান বলল, তবে আমার ধারণা যদি তুমি পালাতে চাও তাহলে ওরা তোমাকে সিংহের মুখে ফেলতে পারবে না আর আমারও মাথা খেতে পারবে না।

পালাব? পালানোর কোন পথ নেই।

 পথ অবশ্য আমি জানি না। তবে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

কি করে পালাব? দরজা জানালাগুলো দেখ। বাইরে জানালার নিচে তাকিয়ে দেখ। বাইরে আছে চিতাবাঘ।

টারজান আবার জানালার ধারে গিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর বলল, জানালাটা অশক্ত।

এই বলে সে জানালাটা ভেঙ্গে দিয়ে দুটো কাঠের রড নিজে নিয়ে একটা রড লর্ডকে দিল। বলল, এইগুলোই হবে এখন আমাদের অস্ত্র।

লর্ড বলল, কিন্তু চিতাটা। আমরা পালাতে গেলেই চিতাটা চীৎকার করবে আর তখন প্রহরীরা ছুটে আসবে।

টারজান দেখল, বাইরে ফাঁকা জায়গাটার মধ্যে একটা বড় কালো চিতাবাঘ তার পানে তাকিয়ে গর্জন করছে।

টারজান বলল, আমরা গাঁয়ের বাইরে গিয়ে পড়লে তুমি পথ চিনতে পারবে? নাকি মাফকার মত উরার ইচ্ছাশক্তি আবার তোমায় ফিরিয়ে আনবে?

এই জন্যই ত উরাকে আমরা খুন করতে চেয়েছিলাম।

জুলিদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কি রকম? তারা কি ওর প্রতি অনুরক্ত?

ওরা তাকে ভয় করে এবং ঘৃণা করে। ওদের উপর উরার প্রতাপের একমাত্র ভিত্তি হলো ভয়।

সব মেয়েরাই?

হ্যাঁ, প্রত্যেকেই।

 উরার মৃত্যু হলে ওরা কি করবে?

যে সব কৃষ্ণকায় ও শ্বেতাঙ্গ বন্দী হয়ে আছে তারা সবাই একযোগে মেয়েদের সঙ্গে বাইরের জগতে পালিয়ে যাবে। এখানকার মেয়েরা বিদেশীদের মুখ থেকে বাইরের জগতের নানা কথা শুনে সেখানে যেতে চায় তারা। শ্বেতাঙ্গরা জুলিদের বুঝিয়েছে, যে পান্নার তালটা উরার কাছে আছে এটা এক মূল্যবান ধাতু। ওটা বিক্রি করলে অনেক টাকা হবে। তারা অনেক সুখে থাকতে পারবে।

কিন্তু উরাকে ওরা খুন করেনি কেন এতদিন?

কারণ এক অতিপ্রাকৃত শক্তির ভয়। ওরা নিজের হাতে ত মারতে পারবেই না, আবার কাউকেও মারতে দেবে না।

টারজান এবার জিজ্ঞাসা করল, উরা কোথায় ঘুমোয়?

ওর সিংহাসনের পিছনে একটা ঘরে। কিন্তু এ কথা জানতে চাইছ কেন?

টারজান বলল, আমি তাকে হত্যা করতে যাচ্ছি। এছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

কিন্তু কেন তুমি ওকে মারতে যাচ্ছ?

কারণ আমার একজন দেশবাসী কাজীদের হাতে বন্দী আছে। উরাকে মেরে জুলিদের সাহায্যে আমি তাকে মুক্ত করতে পারব। তার সঙ্গে অন্যান্য বন্দীদেরও মুক্ত করব।

উরা যে ঘরে বসে সে ঘর ছাড়া অন্য কোন পথ দিয়ে কি তার শোবার ঘরে যাওয়া যায়?

পথ একটা আছে, কিন্তু সে পথে তুমি যেতে পারবে না। আমাদের নিচের তলায় যে ঘরে শোয় উরা বাইরের ঐ উঠোনটার দিকে একটা জানালা আছে।

টারজান বলল, উরার জীবনযাত্রা সম্বন্ধে সব কিছু বলত। কে ওর কাছে থাকে। কখন খায়? কখন শোয় বা ওঠে?

লর্ড বলল, আমরা যতদূর জানি ওর কাছে কেউ শোয় না। রোজ সূর্য ওঠার পরেই ও ওঠে। ওর ঘরের মধ্য একটা ফুটো দিয়ে ওর প্রাতরাশ দেয়া হয়। ওর তিনটে ঘর আছে। সে সব ঘরে ও কি করে তা কেউ জানতে পারে না। কেউ সেখানে যেতে পায় না। ভয়ে কেউ কোন কথা বলে না। প্রাতরাশ খাওয়ার একঘণ্টা পর দরবার ঘরে মঞ্চের সিংহাসনে এসে বসে উরা; সেখানে অনেক অভিযোগ ওকে শুনতে হয়, বিচার করে শাস্তির বিধান করতে হয়। শিকারীদল ও যোদ্ধাদের নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে দিতে হয়। কৃষিকার্য সম্বন্ধেও যাবতীয় নির্দেশ দিতে হয়। সব কাজ সেরে তার ভিতরকার ঘরে চলে যায় উরা। তবে রাতের খাওয়াটা সে দরবার ঘরে বসে খায়।

টারজান বলল, ঠিক আছে।

কিন্তু চিতা?

সেটা দেখা যাবে।

টারজনের এক হাতে ছিল ভাঙ্গা জানালা থেকে নেয়া মোট একটা বড় রড। তাই নিয়ে জানালার বাইরে গিয়ে জানালার নিচেকার কাঠটা এক হাতে ধরে ঝুলতে লাগল। তারপর লাফ দিয়ে নিচে পড়ল।

লর্ড জানালার ধার থেকে দেখতে লাগল রুদ্ধ-নিঃশ্বাসে। নেমেই নিঃশব্দে ঘুমন্ত চিতাটার দিকে এগিয়ে গেল সে। কিন্তু অর্ধেক পথ যেতেই জেগে উঠল চিতাটা।

কালো চিতাটা যথাসাধ্য প্রচণ্ডতার সঙ্গে নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজনের উপর। কোন গর্জন করল না। শুধু মাটির উপর ধুপধাপ শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতাটাকে ভঙ্গ করল না।

 টারজান তখন দু’হাতে সেই কাঠের মোটা রডটাকে ধরে এক আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিতাটার মাথায় ক্রমাগত মেরে চলেছিল।

কোনক্রমেই চিতাটা তার চোয়াল বার করা দাঁতগুলো বসিয়ে দিতে পারছিল না টারজনের গায়ে।

লর্ড যখন রুদ্ধশ্বাসে চিতার সঙ্গে টারজনের এই লড়াই দেখছিল তখন উরার ঘরের জানালা দিয়ে আর একজোড়া চোখ নিঃশব্দে দেখছিল সে লড়াই।

লাঠির ঘায়ে চিতার মাথাটার হাড়গুলো সব ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে গেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল চিতাটা। তা দেখে ভয় পেয়ে গিয়ে উরার ঘরের জানালা থেকে সেই চোখ জোড়াটা সরে গেল। নিঃশব্দে ভিতরের ঘরের অন্ধকারে চলে গেল।

চিতাটাকে বধ করার পর উরার ঘরের দিকে চলে গেল টারজান। খোলা জানালাটার ভিতর দিয়ে লাফিয়ে পড়ল ঘরের ভিতরে। গন্ধ শুঁকে দেখল সে ঘরে কোন লোক নেই। সে শুনেছে ভিতরে উরার তিনখানা ঘর আছে। কিন্তু কোন ঘরটাতে উরা আছে কে জানে? তার মনে হলো উরা তার ঘর থেকে চিতাটার সঙ্গে তার লড়াই দেখে ভয়ে ভিতরদিকে একটা ঘরে ঢুকে পড়েছে। সে নিশ্চয় রক্ষীদের ডাকতে যায়নি। তাহলে শব্দ হত হাঁক-ডাকের।

চাঁদের কিছুটা আলো ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় টারজান দেখল সেই ঘরের দেওয়ালে একটা দরজা রয়েছে। নিঃশব্দে দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ল সে। গন্ধ শুঁকে বুঝল কিছুক্ষণ আগে উরা সে ঘরে ছিল, কিন্তু এখন নেই। ঘরটা অন্ধকার।

সেই ঘর থেকে ভিতরে অন্য একটা ঘরে যাবার একটা দরজা ছিল। টারজনের মনে হল ঐ দরজা দিয়ে উরা ভিতরে আর একটা ঘরে চলে গেছে। সেই ঘরে যাবার জন্য সে পা বাড়াতেই পায়ের তলায় জালের দড়ি ঠেকল তার। তার সন্দেহ হলো এটা একটা ফাঁদ। তাকে ধরার জন্য পাতা আছে।

আর না এগিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ফিরে যাবার চেষ্টা করল টারজান। কিন্তু কোথা থেকে জালটা টানতেই মোটা দড়ি দিয়ে বোনা জালটায় আটকে পড়ল সে। শত চেষ্টা করেও জাল থেকে মুক্ত করতে পারল না কিছুতেই।

এমন সময় তার সামনে দরজাটা খুলে ভিতরের একটা আলোকিত ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল উরা। টারজান দেখল উরার পিছনে আলোকিত ঘরের দেওয়ালে অনেক মাথার খুলি সাজানো রয়েছে। একটা টেবিলের উপর মধ্যযুগীয় যাদুবিদ্যার নানা উপকরণ রয়েছে সাজানো। টেবিলের উপর পান্নার সেই তালটা থেকে একটা সবুজ আলো বিকীর্ণ হচ্ছিল।

উরা জালের মধ্যে আবদ্ধ টারজানকে বলল, আমরা ভেবেছিলাম তোমাকে পরে মারব। কিন্তু এখনই তোমাকে ভয়ঙ্করভাবে মারা হবে।

টারজান কোন কথা না বলে জালটাকে পরীক্ষা করে দেখল। জালের দড়িগুলো চামড়ার দড়ি দিয়ে বোনা।

উরার চোখে মুখে আর কোন ভয়ের চিহ্ন ছিল না। তার পরিকল্পনা সফল হওয়ায় সে খুশি হয়েছিল।

উরা বলল, এখানে তোমাকে কিছুক্ষণ ধরে পরীক্ষা করব। তারপর আমার প্রিয় পোষা এত ভাল চিতাটাকে মারার জন্য আমি চরম প্রতিশোধ নেব তোমার উপর। তীব্র যন্ত্রণা আর পীড়নের মধ্য দিয়ে তোমার মৃত্যুকে দীর্ঘায়িত ও বিলম্বিত করব। কিন্তু তুমি যাতে সে পীড়নের কিছু দেখতে না পাও তার জন্য তোমার চোখদুটোকে আগে নষ্টা করে দেব। উরার শক্তি এবার দেখ।

এই বলে সে পাশের ঘরে গিয়ে একটা উনোনে জ্বলতে থাকা কয়লার আগুনে একটা সঁচলো লোহার রড পোড়াতে দিল। সেই রডটা হাতে করে এনে উরা বলল, এই জালের দড়ি পাগলা হাতিতেও ছিঁড়তে পারে না।

এই বলে সে সেই রডের চলো লাল গরম মুখটা টারজনের চোখে ঢুকিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে এল।

কিন্তু টারজান পর পর দু’বার সেই রডটা হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। রডটাকে উরা টারজনের চোখের কাছে আনতেই পারল না। টারজান কোন ক্ষমা প্রার্থনা না করায় এবং তার রডটা ঠেলে সরিয়ে দেয়ায় উরা আরও রেগে গেল।

উরা পাশের ঘর থেকে একটা রড নিয়ে এসে বলল, এটা আরো গরম। এটা দিয়ে তোমার চোখদুটোকে এবার ঠিক বিদ্ধ করব।

টারজান দেখল সে রডের উপরটা জ্বলন্ত অঙ্গারের মত লাল হয়ে উঠেছে। সেই রডটা ধরে উরা টারজনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, এবার তুমি নিশ্চয়ই চীৎকার করে ক্ষমা চাইবে।

কিন্তু টারজান দেখল তার পিছনে দরজাটা ঠেলে কে প্রবেশ করল ঘরে। মুখ ঘুরিয়ে সে দেখল কাঠের সেই মোটা রডটা নিয়ে লর্ড এসে ঘরে ঢুকেছে।

ঘরে ঢুকেই লর্ড তার দু’হাতে রডটাকে লাঠির মত ধরে সজোরে উরার হাতে মেরে তার হাতের কব্জি ভেঙ্গে দিল। জ্বলন্ত রডটা পড়ে গেল তার হাত থেকে। তারপর সে তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয় উরার মাথায় ক্রমাগত ঘা দিয়ে যেতে লাগল। উরার মাথাটা ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ে গেল উরা।

টারজান এবার লর্ডকে বলল, ঠিক সময়েই এসে পড়েছ।

লর্ড বলল, কিভাবে চিতাটাকে মেরেছ আমি তা নিজের চোখে দেখেছি। তারপর তুমি উরার ঘরের দিকে এগিয়ে এলে আমিও অনুসরণ করি তোমায়।

এই বলে একটা ছুরি উরার টেবিল থেকে তুলে নিয়ে জালের দড়ি কেটে মুক্ত করল টারজানকে।

লর্ড এরপর টারজানকে বলল, এখন এই পান্নার তালটা আমাদের দুজনের। এখনো রাত শেষ হতে অনেক দেরী। চল আমরা এখান থেকে চলে যাই। এখন উরার ঘরে কেউ আসবে না। ওর মৃতদেহটা আবিষ্কার করতে কয়েকদিন সময় লেগে যেতে পারে।

টারজান লর্ডকে বলল, তুমি তোমার বন্ধুদের কথা ভুলে গেছ।

লর্ড বলল, উরা মরে গেছে। এবার ওরা মুক্তি পাবে। ওদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছি। এই ধাতুটা এখন আমাদের।

টারজান বলল, তুমি কাজীদের কথাও ভুলে গেছ। তাদের দেশের ভিতর দিয়ে কি করে এটা নিয়ে যাবে? মাফকার শক্তি উরার থেকে আরো বেশি। মাফকার হাত থেকে পালাতে পারবে না।

তাহলে এখন কি করব আমরা?

টারজান বলল, আমি আগে সেখানে গিয়ে মাফকাকে খতম করব।

লর্ড বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।

মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে টারজান বলল, না, আমি একা যাব। মাফকার অলৌকিক শক্তি দূর থেকেও তার শত্রুদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। সে শক্তির কবল থেকে তুমি মুক্ত করতে পারবে না নিজেকে। একমাত্র আমার উপর সে শক্তি কাজ করবে না। তুমি গেলে আমাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে।

এই বলে সে একটা ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পান্নার তালটাকে জড়িয়ে রাখল।

ওটা নিয়ে কি করবে তুমি?

 এটা সঙ্গে থাকলে মাফকার দেখা পাওয়া সহজ হবে আমার পক্ষে।

লর্ড হেসে বলর, তুমি কি ভেবেছ আমাকে বোকা বানিয়ে এটা একা নিয়ে যাবে তুমি? তুমি জান এটার কত দাম। আমরা দুজনে এটা ভাগ করে নেব।

টারজান বলল, তুমি দেখেছ আমি কিভাবে চিতাটাকে মেরেছি। তুমি যদি আমার কাজে হস্তক্ষেপ কর তাহলে

লর্ড বলল, কিন্তু এর দাম অনেক।

টারজান বলল, দাম যাই হোক, আমার তাতে প্রয়োজন নেই। আমি এটাকে নিয়ে গিয়ে মাফকার কবল থেকে আমার লোকদের উদ্ধার করার কাজে এটাকে ব্যবহার করতে চাই শুধু।

এই বলে দড়ি দিয়ে কাপড়ে জড়ানো পান্নার তালটাকে ভাল করে বেঁধে তার কোমরের সঙ্গে বেঁধে দড়িতে ঝুলিয়ে নিল। তারপর ছুরিটা তুলে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।

যাবার জন্য উদ্যত হয়ে সে বলল, একদিন পর তুমি যারা এখান থেকে যেতে চায় তাদের নিয়ে। কাজীদের দেশে তাদের সঙ্গে লড়াই করে পথ করে চলে যাবে। তবে আমি মাফকাকে আমাদের পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারলে তোমাদের সুবিধা হবে। কাজ সেরে আমি এই পান্নাটাকে নিউবারি আর মাফা নদীর সঙ্গমের কাছে এক জায়গায় রেখে আমার কাজে চলে যাব। তিন সপ্তাহ পর আমি আবার ফিরে এসে সেই পান্নার তালটাকে জুলিদের হাতে তুলে দেব।

লর্ড বলল, তাহলে আমার কি হবে? তুমি জুলিদের দেবে? এই জন্যই কি আমি উরার হাত থেকে তোমাকে বাঁচালাম?

টারজান বলল, আমি চাই এটা তোমরা সবাই মিলে ভাগ করে নাও। তুমি ত বলেছিলে এটা কাজীদের ঘুষ দিয়ে তাদের দেশের ভিতর দিয়ে পথ করে বাইরের জগতে চলে যাবে। তুমি অন্য সবাইকে ফাঁকি দিয়ে একা এটা নিতে চাও তা ত আমি জানতাম না।

টারজান ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে লর্ড দরবার ঘরে চলে গেল। সেখান থেকে বেরিয়ে রক্ষীদের ঘরে গেল।

উরার দরবার ঘর থেকে লর্ডকে ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে রক্ষীরা অবাক হয়ে গেল। মেয়ে যোদ্ধাদের মধ্যে লরো বলল, কি হলো লর্ড, তুমি কিভাবে তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে?

লর্ড বলল, সেই কাজী বন্দীটা উরাকে খুন করে পান্নার তালটা নিয়ে পালিয়েছে।

সব মেয়ে যোদ্ধারা তখন একযোগে বলে উঠল, উরাকে খুন করেছে! উরা তাহলে মৃত!

হা হা, উরা খুন হয়েছে। কিন্তু পান্নার তালটা চুরি গেছে।

জুলি মেয়েরা তখন উল্লসিত হয়ে ছুটে বেরিয়ে গায়ের পথে পথে এই সুখের সংবাদটা প্রচার করতে লাগল।

এদিকে টারজান তখন গাঁ থেকে কিছুটা দূরে অন্ধকারে একা একা পথ চলতে চলতে গাঁ থেকে অনেক হৈ হুল্লোড়ের শব্দ শুনতে পেল। সেই সেঙ্গ যুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে জয়ঢাক বাজানোর শব্দও শুনতে পেল।

টারজান বুঝতে পারল লর্ড সবাইকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। তারা এবার একযোগে তাকে, ধরতে আসে।

টারজান তার চলার গতি বাড়িয়ে দিল।

এদিকে লর্ড জুলির সকলকে বোঝাতে লাগল, যদি আমরা পান্নার তালটাই না পাই তাহলে উরার মৃত্যুতে আমাদের কি লাভ হবে। আমরা মুক্ত হয়ে বাইরের জগতে গিয়ে কি করব?

টারজান এবার তার অনুসরণকারীদের পদশব্দ স্পষ্ট শুনতে পেল। সে বুঝতে পারল তারা এখন বিক্ষুব্ধ। তারা যদি একবার ধরতে পারে তাকে তাহলে তার জয়ের উদ্দেশ্য সাধনের কোন আশাই থাকবে না।

নদীর ধারে আরো কিছুটা এগিয়ে গেলে টারজনের মনে হল সে যেন একা নেই। ছায়ার মত কে যেন তাকে জড়িয়ে ধরে তার সঙ্গে হাঁটছে। তার নিঃশ্বাস পড়ছে তার গায়ে। অথচ তার তীব্র ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমে সে বুঝল কেউ নেই।

কোন যাদুশক্তি বা মায়ায় বিশ্বাস করে না টারজান। অথচ অশরীরী প্রেতের মত কে তাকে অনুসরণ করছে তা বুঝতে পারল না। একবার মনে হলো উরার প্রেতাত্মা। কিন্তু পরে বুঝল এটা হলো পান্নার ধাতব শক্তি।

তা যদি হয় তাহলে কাজীদের হীরকখণ্ড গলফানের মধ্যেও আছে এই একই শক্তি। সেই গলফানই হলো মাফকার সকল শক্তির উৎস এবং মাফকা এই পান্নার তালটা পেলে দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

টারজান এবার পথটা ছেড়ে এক পাশের এক বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে রইল। দেখল তার অনুসরণকারী জুলিরা লর্ড এর নেতৃত্বে অনেক কাছে এসে পড়েছে। ওদের দলে আছে পঞ্চাশজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর প্রায় চারশো জুলি মেয়ে যোদ্ধা। ওদের ধারণা পলাতক বেশি দূরে যেতে পারেনি।

টারজান পান্নার তালটার উপর থেকে কাপড়টা সরিয়ে দু’হাত দিয়ে ছুঁয়ে মেরে যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে মনে মনে বলতে লাগল, তোমরা ফিরে যাও। নিজেদের গাঁয়ে ফিরে যাও।

মেয়েরা তবু সেই পথ ধরে এগিয়ে আসছিল অব্যাহত গতিতে। টারজান তবু হতাশ হলো না। পান্নার। তালটা থেকে সব আবরণ সরিয়ে সেটা তুলে ধরতেই চাঁদের আলোয় চকচক করতে লাগল সেটা। এক উজ্জ্বল সবুজ আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল টারজনের দেহটা। সে বেশ বুঝতে পারল এক নতুন শক্তি সঞ্চারিত হয়েছে তার দেহে। যতবারই সে ডান হাত দিয়ে পান্নার তালটাকে স্পর্শ করে ততবারই অলৌকিক বৈদ্যুতিক শক্তির তরঙ্গ সঞ্চারিত হয় তার দেহের প্রতিটি শিরায়। মেয়েদের লক্ষ্য করে সে আবার তার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করল। মনে মনে বলল, ফিরে যাও।

জুলি মেয়েরা হঠাৎ থেমে গেল চলতে চলতে।

শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের একজন বলে উঠল, কি হলো, থামলে কেন?

 একজন মেয়েযোদ্ধা বলল, আমরা ফিরে যাচ্ছি।

কেন?

তা জানি না। আমরা বিশ্বাস করি না উরা মরে গেছে। সে আমাদের ডাকছে। ফিরে যেতে বলছে।

লর্ড বলল, বাজে কথা। আমি নিজে দেখেছি সে খুন হয়েছে। তার মাথাটা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে একতাল মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।

মেয়েরা ফিরে যেতে লাগল।

লর্ড বলল, ওদের যেতে যাও।

লর্ডের নেতৃত্বে পঞ্চাশজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ দাঁড়িয়ে রইল। জুলির মেয়েযোদ্ধারা ক্রমে পথের বাঁকটায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

লর্ড বলল, ভাল হলো। আমরা মোট পঞ্চাশজন আছি। পান্নাটা পেয়ে মেয়েগুলোকে আর ভাগ দিতে হবে না।

আড়াল থেকে মুচকি হাসল টারজান।

 লর্ড তার দলের লোকদের বলল, এগিয়ে চল। দেরী করছ কেন?

কিন্তু কেউ নড়ল না। কেউ পা তুলতে পারল না। এমন কি লর্ড নিজেও চলতে পারল না।

একজন লর্ডকে বলল, কি হলো, যাচ্ছ না কেন?

 লর্ড বলল, তোমরাই বা যেতে পারছ না কেন?

লর্ডের মুখখানা ম্লান হয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন দারুণ ভয় পেয়ে গেল। সে বলল, আমি বা তোমরা কেউ যেতে পারবে না। মেয়েরা ঠিকই বলেছিল, উরার শক্তি কাজ করছে।

লর্ড বলল, আমি নিজে দেখেছি সে মরে গেছে।

তাহলে তার প্রেতাত্মা। ঐ দেখ।

এই বলে পথের ধারে যে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল টারজান সেই দিকে হাত বাড়িয়ে দেখাল।

সবাই দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। পাথরের ওধার থেকে একটা সবুজ আলো বেরিয়ে এসে চাঁদের আলোকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

শ্বেতাঙ্গরা ভয়ে বুকে ক্রশ আঁকতে লাগল তা দেখে।

এমন সময় পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল টারজান।

লর্ড বলল, সেই কাজী।

অন্য একজন বলল, সেই পান্নার তাল।

কিন্তু কেউ অস্ত্র তুলল না। কেউ এগিয়ে গেল না টারজনের দিকে।

টারজান এবার তাদের কাছে এসে বলল, তোমরা সংখ্যায় পঞ্চাশজন আছ। আমার সঙ্গে কাজীদের দেশে এস। সেখানে আমার কয়েকজন লোক বন্দী হয়ে আছে। তাদের মুক্ত করে আমরা ওদেশ থেকে বেরিয়ে যাব। তারপর যার যেখানে ইচ্ছা চলে যাবে।

লর্ড বলল, কিন্তু পান্নাটা? তুমি বলেছিলে আমাকে তার ভাগ দেবে।

টারজান বলল, কিছুক্ষণ আগে তুমি আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলে। ফলে সে অধিকার তুমি হারিয়ে ফেলেছ। তাছাড়া আমি এখন এই পান্নার শক্তির স্বরূপটা বুঝতে পেরেছি। এ শক্তি বিপজ্জনক। তোমার মত অযোগ্য লোকের হাতে পড়লে তা দারুণ ক্ষতি করবে। কাজীদের দেশ থেকে আমি বেরিয়ে গেলে নিউবারি নদীর জলে এটা ফেলে দেব যাতে কেউ এটাকে খুঁজে না পায়।

লর্ড বলল, আসলে তুমি এটা নিজের কাছেই রেখে দিতে চাও। কাউকে ভাগ দিতে চাও না।

টারজান বলল, যা খুশি ভাবতে পার। এখন এস আমার সঙ্গে।

 টারজনের পিছু পিছু নীরবে এগিয়ে যেতে লাগল ওরা।

পরদিন সন্ধ্যার কিছু আগে পথের ধারে একটা উঁচু জায়গা থেকে টারজান কাজীদের নগর আর মাফকার দুর্গটা দেখতে পেল। একটা উপত্যকার এক প্রান্তে একটা খাড়া পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠেছে। নগরটা। জুলিদের গ্রামের থেকে এ নগরটা অনেক বড় এবং আরো বিস্তৃত জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে।

দূর থেকে কাজীদের নগরটা দেখার পর টারজান তার দলের লোকদের বলল, আমরা অনেক পথ হেঁটেছি। তার উপর কিছুই খাওয়া হয়নি। তোমরা সবাই ক্লান্ত। রাত্রির অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠা পর্যন্ত। ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। সুতরাং তোমরা এখন বিশ্রাম করো।

একজনের কাছ থেকে একটা বর্শা নিয়ে তার মুখ দিয়ে একটা জায়গার চারদিকে একটা গণ্ডী টেনে দিল টারজান। তারপর বর্শাটা যার হাত থেকে নিয়েছিল তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, তোমরা কেউ এই গণ্ডীর বাইরে পা বাড়াবে না।

এই বলে সেই গণ্ডীর রেখার বাইরে কিছুটা দূরে সে নিজে শুয়ে পড়ল। পান্নার তালটা তার পাশে রাখল এবং তার উপর একটা হাত চাপিয়ে রাখল।

সকলেই বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে শুয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। একমাত্র লর্ড একা জেগে রইল। পান্নাটার দিকে সব সময়ের জন্য নিবদ্ধ করে রাখল তার জাগ্রত দৃষ্টি। ধাতুটা থেকে বিচ্ছুরিত এক সবুজ আভার বৃত্তসীমার মধ্যে অর্থ দ্বারা ক্রয়যোগ্য সভ্য জগতের সকল সম্পদ ও সকল ঐশ্বর্যকে আবদ্ধ দেখতে পেল সে।

সন্ধ্যা গিয়ে রাত্রি এল। তবু চাঁদ উঠল না আকাশে। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। শুধু পান্নার সবুজ একটুখানি অস্পষ্ট আলো এ জায়গার কিছুটা অন্ধকার দূর করেছিল।

লর্ড লক্ষ্য করল টারজনের একটা হাত পান্নার উপর চাপানো আছে। তার মনে পড়ল উরা যখন কাউকে দিয়ে জোর করে কিছু করাত তখন সে পান্নাটার উপর হাত দিয়ে রাখত। সে তাই বুঝল যতক্ষণ কেউ তার কোন অঙ্গ দিয়ে ছুঁয়ে থাকবে পান্নাটাকে ততক্ষণই সে এক অলৌকিক অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী থাকবে।

দেখতে দেখতে লর্ড এক সময় দেখল ঘুমের মধ্যে একবার পাশ ফিরতেই টারজনের হাতটা পান্নার উপর থেকে খসে পড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের বর্শাটা নিয়ে ঘুমন্ত টারজনের দিকে এগিয়ে গেল। লর্ড গণ্ডীটা পার হবার সময় একটু ইতস্তত করল। তারপরই সে টারজনের কাছে গিয়ে পান্নাটা তুলে নিল। বর্শা দিয়ে টারজানকে হত্যা করার কথাও একবার ভেবেছিল সে। কিন্তু তা করল না কারণ ভাবল তাকে বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করলেও মরার আগে সে চেঁচালে সকলে জেগে উঠবে। তখন পান্নাটা নিয়ে একা পালাতে পারবে না। তাহলে সকলকেই ভাগ দিতে হবে।

পান্নার তালটা নিয়ে লর্ড একা নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে।

হঠাৎ চমকে ঘুম থেকে জেগে উঠল টারজান। চাঁদের আলো ঝরে পড়ছিল তার মুখের উপর। তার মনে হলো সে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। হাতের কাছে পান্নার তালটা না পেয়ে তাঁর খোঁজ করতে লাগল।

কিন্তু সেটা না পেয়ে লাফ দিয়ে উঠে ঘুমন্ত লোকগুলোর কাছে গেল। দেখল সবাই ঘুমোচ্ছ। শুধু লর্ড নেই। টারজান ভাবল লোকগুলোকে জাগিয়ে তুলে কোন লাভ হবে না। কারণ এখন তার সব শক্তির উৎস পান্নার তালটা নেই। এখন সে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এখন তারা সবাই শক্ত হয়ে উঠবে।

সারা শিবিরটার চারদিকে ঘুরে গন্ধসূত্র ধরে সে বুঝতে পারল লর্ড মাফা নদীর উপত্যকার উপর দিয়ে পালিয়ে গেছে। সে গেছে নিউবারি নদীর দিকে। লর্ড হয়ত ঘণ্টা দুই আগেই চলে গেছে। কিন্তু যত আগেই সে যাক সে তাকে ধরবেই।

রাত্রির অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান।

প্রায় একঘণ্টা ধরে লর্ডকে অনুসরণ করার পর টারজান দূরে অস্পষ্ট একটা সবুজ আলো দেখতে পেল। দেখল আলোটা ডান দিকে ঘুরে একটা পথ ধরল। মনে হলো লর্ড বোধ হয় কাজীদের নগরটাকে পাশ কাটিয়ে অন্য একটা পথ ধরেছে। কিন্তু ও যে পথেই যাক তাকে ধরে ফেলবে সে।

দ্রুতপায়ে পথ চলতে চলতে হঠাৎ টারজনের পায়ের মাটিটা নেমে গেল। সে একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে পড়ে গেল। সে বুঝল গর্তের উপরটা নরম মাটি আর ডালপালা দিয়ে ঢাকা ছিল। আসলে এটা চিতাবাঘ ধরার একটা ফাঁদ। ফাঁদটা কাজীরা পেতেছে।

টারজান দেখল গর্তের মুখটা অনেক উঁচুতে। লাফ দিয়ে সেখানে উঠে বার হওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। সে বুঝল কাজীরা কাল দিনেরবেলায় ফাঁদটা দেখতে আসবে। ততক্ষণ চুপচাপ অপেক্ষা করা ছাড়া। আর কোন উপায় নেই। তারা এসে হয় তাকে বধ করবে পশুর মত অথবা বন্দী করে নিয়ে যাবে। তবে ফঁদের মুখটা আর ঢাকা নেই বলে কোন চিতা অন্তত এ গর্তে আর পড়বে না।

রাত্রি গম্ভীর হতেই ঘুমিয়ে পড়ল টারজান সেই অন্ধকার গর্তটার মধ্যে। আসন্ন বন্দীত্ব বা মৃত্যুর সম্ভাবনাপূর্ণ এই শোচনীয় অবস্থাও কিছুমাত্র বিচলিত করতে পারল না তার মাথার স্নায়ুগুলোকে।

টারজনের যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন সূর্য মাথার উপরে উঠে গেছে অনেকটা। সে কান পেতে একসঙ্গে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। তাদের কথাবার্তাও শুনতে পাচ্ছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই টারজান মুখ তুলে দেখল কয়েকজন মেয়ে যোদ্ধা আর কয়েকজন পুরুষ গর্তের উপর থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখছে তাকে। তাদের একজন বলল, চমৎকার একটা চিতা ধরা পড়েছে।

আর একজন বলল, মাফকা খুশি হবে। কিন্তু আমাদের নগরের কাছে উপত্যকায় যে সব প্রহরী ছিল তাদের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে ও এল কি করে?

গর্তের মধ্যে একটা মোটা দড়ি ফেলে দিল ওরা। টারজান বলল, ধর দড়িটা, আমি উঠছি।

দুটো কারণে ধরা দিতে চাইল টারজান। প্রথমতঃ এখানে বাধা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে যাওয়া মানে অবধারিত মৃত্যু। দ্বিতীয়তঃ তাকে বন্দী মাফকার কাছে নিয়ে গেলে সে অন্তত উড ও তার সঙ্গীদের উদ্ধার করার সুযোগ পাবে একটা।

দড়ি ধরে উঠে গর্তের উপর টারজান পা দিতেই কতকগুলো বর্শা তার চারদিকে উঁচিয়ে ধরল যোদ্ধারা।

টারজান দেখল আটজন মেয়েযোদ্ধা আর চারজন পুরুষ। সকলেই শ্বেতাঙ্গ এবং সশস্ত্র।

 একজন মেয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল, কে তুমি?

 টারজান বলল, আমি একজন শিকারী।

এখানে এলে কি করে?

টারজান বলল, আমি উত্তর দিক থেকে পার্বত্য অঞ্চলে শিকার করতে করতে আসছি। পরে পার্বত্য এলাকা এড়িয়ে এই উপত্যকার পথে চলে আসি। আমি আবার নিউবারির দিকে চলে যাব।

মেয়েযোদ্ধাটি বলল, না, তুমি এখন আমাদের বন্দী। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।

টারজান বলল, ঠিক আছে, তাই নিয়ে চল। তোমরা বারোজন, আমি একা। তোমাদের হাতে অস্ত্র আছে, আর আমি নিরস্ত্র।

টারজানকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল ওরা। কিন্তু হাত দুটো বাঁধল না।

ইচ্ছা করলেই পালাতে পারত টারজান। তার সঙ্গে ছুটে পারত না ওরা। কিন্তু যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও পালালো না সে। কারণ সে কাজীদের দেশেই যেতে চায়।

যে চারজন শ্বেতাঙ্গ লোক টারজনের সঙ্গে যাচ্ছিল তাদের কথাবার্তা হতে টারজান জানতে পারল তাদের একজনের নাম স্ট্রোল। স্ট্যানলি উডের মুখ থেকে তার সঙ্গী স্ট্রোল ও ভন আইকের নাম শুনেছিল।

টারজান তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি উড আর ভন আইকের সঙ্গে ছিলে?

 স্ট্রোল বিস্মিত হয়ে টারজনের মুখপানে তাকাল। তুমি উডকে চিনতে?

টারজান বলল, হ্যাঁ, সে কি আবার ধরা পড়েছে?

স্ট্রোল বলল, হ্যাঁ, মাফকার কবলে একবার পড়লে আর নিষ্কৃতি নেই। সে তোমাকে দূর থেকেও টেনে আনবেই। উড পালিয়ে গিয়েও আবার ফিরে এসেছে। আচ্ছা তোমার নাম কি ক্লেটন?

টারজান বলল, হ্যাঁ।

তোমার কথা উডের কাছ থেকে অনেক শুনেছি। তোমার চেহারার বর্ণনা তার মুখ থেকে শুনেছিলাম বলেই তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারি।

উড কি এখনো বেঁচে আছে?

হ্যাঁ, মাফকা এখনো মারেনি তাকে। তবে ওকে মারতেই হবে। মাফকা ওর পালানোর জন্য দারুণ রেগে আছে। লোকটা ভয়ঙ্কর। একমাত্র টমি সেনাদের এক বিরাট দলই তাকে জব্দ করতে পারে।

টারজান আবার জিজ্ঞাসা করল, মাফকা কি সত্যি সত্যিই মৃত্যুদণ্ড দিতে চায় উডকে?

স্ট্রোল বলল, ও হয়ত উডের শুধু পালানোর জন্য এত রাগত না। উডের সবচেয়ে বড় অপরাধ সে রানী গলনালাকে ভালবাসে এবং গলনালারও একটা দুর্বলতা আছে তার প্রতি।

সারা পথটা স্ট্রোল টারজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে যেতে লাগল। নগরের কাছাকাছি এসে টারজান দেখল নগর প্রাচীরটা পাথর দিয়ে গাঁথা। নগরের ভিতরের বাড়িগুলো সব পাথরের এবং সেগুলো একতলা অথবা দোতলা। একমাত্র মাফকার প্রাসাদটা চারতলা।

রাজপথের উপর দিয়ে টারজানকে নিয়ে ওরা মাফকার প্রাসাদের দিকে এগিয়ে চলল। পথে অনেক কৃষ্ণকায় নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর মেয়ে যোদ্ধা দেখল। পথে যে সব শিশুরা খেলা করছিল তারা সাবই মেয়ে।

মাফকার প্রাসাদের কাছে এলে চারজন পুরুষ সরে গেল। শুধু আটজন মেয়েযোদ্ধা প্রাসাদের ভিতরে নিয়ে গেল টারজানকে। টারজান দেখল উরার প্রাসাদের থেকে মাফকার প্রাসাদের ঐশ্বর্যের পরিমাণ অনেক বেশি। মাফকা অনেক লুটের মাল পায়, উরা সেটা পায় না।

দরবার ঘরে ঢুকে টারজান দেখল ঘরের শেষ প্রান্তে একটি মঞ্চের উপর পাতা একটি সিংহাসনে যে মানুষটি বসে আছে তাকে দেখতে অবিকল উরার মত। দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সে। তখন উডের কথাটা মনে পড়ল তার। উড বলেছিল আসলে মাফকা আর উরা দুই যমজ ভাই; দেখতে একই রকমের।

টারজানকে ধরার সময় যে সব মেয়েযোদ্ধারা ছিল তারা বন্দী সম্বন্ধে বিবরণ পেশ করল মাফকার কাছে। মাফকা সে বিবরণ খুঁটিয়ে দেখার পর উরার মতই গলফান নামক সেই হীরের তালটার উপর হাত রেখে টারজানকে প্রশ্ন করল, কে তুমি?

টারজান বলল, আমি একজন ইংরেজ, শিকার করছিলাম।

 কি কারণে?

 খাদ্যের জন্য।

মাফকার পাশেই একটি চেয়ারে একটি সুন্দরী মেয়ে বসেছিল। টারজান বুঝতে পারল ঐ মেয়েটিই হলো গনফালা অর্থাৎ কাজীদের রানী। তার বুকে ও পেটের উপর খাঁটি সোনার বক্ষাবরণী ও উদরবেষ্টনী। পরনে ছিল চিতার নরম চামড়া দিয়ে তৈরি স্কার্ট। তার হাতে, বাহুতে ও পায়ে ছিল অনেক তামা ও সোনার গয়না। তার মাথার উপর ছিল হালকা একটা মুকুট।

উরার মত মাফকার পরনে ছিল মাত্র একটা কৌপীন এবং ভূঁড়িটা মোটা। টারজান বুঝল রানীর বেশভূষা যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, তার মুকুট যতই শক্তির প্রতীক হোক, আসল শক্তি আছে কৌপীন পরা ঐ কুৎসিতদেহী লোকটার হাতে।

টারজানকে ভাল করে খুঁটিয়ে দেখার পর মাফকা হুকুম দিল, নিয়ে যাও ওকে এখান থেকে। ওকে হত্যা করা হবে।

রক্ষীরা টারজানকে উপরতলার একটি বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে একা রেখে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল। দুটো বেঞ্চ ছাড়া আর কোন আসবাবপত্র ছিল না সে ঘরে। ঘরের দেয়ালে নগরের দিকে কতকগুলো ছোট ছোট জানালা ছিল। তাই দিয়ে বাইরে থেকে কিছু আলো আসছিল। একদিকের দেয়ালে আগুন জ্বালাবার একটা বড় চুল্লী ছিল। কিন্তু সেখানে কোন আগুন জ্বালানো ছিল না।

ঘরটা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখল টারজান। জানালাগুলো ঘরের অনেক উপরে। সেদিক দিয়ে বাইরে যাবার কোন উপায় নেই।

সে তখন আগুন জ্বালাবার শূন্য চুল্লীটাকে পরীক্ষা করে দেখল। দেখল সেটা আসলে কোন চুল্লী নয়, নিচের তলায় যাবার একটা গুপ্ত পথ। সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ দিয়ে নিচের তলায় একটি বড় ঘরে গিয়ে পড়ল টারজান। ঘরটির দরজায় ভিতর থেকে খিল আঁটা ছিল। মৃদু আলোকিত সেই ঘরের একপ্রান্তে একটি চেয়ারের উপর কাজীদের রানী গনফালা বসে তন্ময় হয়ে কি ভাবছিল।

নিঃশব্দে গনফালার দিকে এগিয়ে গেল টারজান। বুঝতে পেরে মুখ ফিরিয়ে টারজানকে দেখে বিস্মিত হলো গনফালা। কিন্তু চীৎকার করল না।

টারজান বলল, ভয় পেও না। আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে আসিনি।

গনফালা বলল, আমি ভয় পাইনি। আমার হাতের নাগালের মধ্যে অনেক যোদ্ধা আছে এবং ডাকলেই তারা ছুটে আসবে। কিন্তু তুমি কি করে এলে এখানে?

টারজান দেখল রানী গনফালার মধ্যে প্রভুত্বসূচক কোন কঠোর বা উদ্ধত ভাব নেই। সে এখন শান্ত মিষ্টি একটি মেয়ে।

টারজান তার কোন জবাব না দিয়ে বলল, স্ট্যানলি উড এখন কোথায়? ওরা ওকে নিয়ে কি করবে?

তুমি স্ট্যানলি উডকে চিনলে কি করে?

আমি তার বন্ধু। সে এখন কোথায়?

গনফালা বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে টারজনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি তার বন্ধু? তাতে কিছু যায় আসে না। তার যত বন্ধুই থাক, কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না।

তোমারই সাহায্যে সে কিন্তু একদিন মুক্ত হয়ে পালিয়ে যায়।

চুপ করো। মাফকা আমাকে এ ব্যাপারে সন্দেহ করে বলেই আমাকে কড়া পাহারায় এ ঘরে নজরবন্দী করে রেখেছে। সে বলে আমারই নিরাপত্তার জন্যই এই পাহারার ব্যবস্থা। কিন্তু আমি জানি এর আসল কারণ কি।

মাফকা কোথায়? আমি তাকে দেখতে চাই।

তুমি তাকে আগেই দেখেছ। তোমাকে বন্দী করে তারই কাছে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিন্তু তুমি একজন বিদেশী হয়ে তাকে না জানিয়ে তার নগর সীমানার মধ্যে প্রবেশ করেছ শুনে তোমাকে দেখতে চায় সে। কিন্তু তুমি আসলে কে?

টারজান নিচু গলায় বলল, কিন্তু তুমি স্ট্যানলি উডকে মুক্ত করতে চাও এবং তার সঙ্গে তুমি যেতে চাও। তবে তুমি কেন আমাকে সাহায্য করছ না?

কিন্তু কি করে তোমায় সাহায্য করতে পারি আমি?

তুমি শুধু আমাকে বলে দাও মাফকাকে একা কোথায় পেতে পারি আমি।

সহসা গনফালার মুখের ভাবটা বদলে গেল একেবারে। এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার ছাপ ফুটে উঠল তার চোখে মুখে। উডের কথাটা মনে পড়ে গেল টারজনের। মাঝ মাঝে এমনি করে আশ্চর্যভাবে বদলে যায় গনফালা।

কোন কথা না বলে রক্ষী রক্ষী বলে চীৎকার করে উঠল গনফালা। সে তার কোমরের খাপ থেকে ছুরিটা বার করে টারজানকে মারতে গেল লাফ দিয়ে। টারজান তার হাতের কব্জিটা ধরে ফেলে কেড়ে নিল ছুরিটা। তারপর বলল, বল, কিছু হয়নি। ওদের যেতে বল।

রক্ষীরা গনফালার চীৎকার শুনে রুদ্ধ দরজায় করাঘাত করছিল। গনফালা আরো জোরে চীৎকার করতে লাগল সাহায্যের জন্য।

টারজান তখন তাকে ধরে ঘরের অন্য দিকের একটি দরজা খুলে ভিতর দিকের একটি ঘরে তাকে ভরে দরজাটায় শিকল তুলে দিল। তারপর যে গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে এসেছিল সেই পথে এক মুহূর্তে তার উপরতলার ঘরে চলে গেল।

রক্ষীরা সেই ঘর খুলে গনফালাকে মুক্ত করলে গনফালা বলল, নোকটা কোথায়? তাকে ধরেছ?

 রক্ষীবাহিনীরা একজন বলল, এ ঘরে ত কেউ নেই।

যে লোকটাকে আজ বন্দী করে আনা হয় সেই লোকটা নেই।

এখানে ত কেউ ছিল না।

মাফকার কাছে গিয়ে এখনি জানাও বন্দীটা পালিয়েছে। তোমাদের মধ্যে কয়েকজন বন্দীর ঘরে এখনি গিয়ে দেখ সে সেখানে আছে কি না। আমি বলছি লোকটা আমার ঘরে একটু আগে এসেছিল। আমার ছুরিটা সে কেড়ে নিয়ে ঐ ঘরে আমাকে ভরে রাখে। তোমরা কয়েকজন এ ঘরে থাক। সে আবার আসতে পারে।

রক্ষীরা টারজনের ঘরে গিয়ে যখন দেখল সে বসে আছে সেই ঘরে তখন তারা আশ্চর্য হয়ে গেল সকলে।

একজন রক্ষী জিজ্ঞাসা করল তাকে, কোথায় গিয়েছিলে তুমি?

 কোথায় আর যাব?

তুমি রানী গনফালার ঘরে গিয়েছিলে।

সেটা আমাকে জিজ্ঞাসা না করে রানীকে জিজ্ঞাসা করগে। কেউ যদি পাগল হয়, আমি ত আর পাগল নই।

রক্ষীরা চলে গেল ঘর বন্ধ করে। ঘণ্টাখানেক পর ডজনখানেক মেয়েযোদ্ধা এসে টারজানকে সঙ্গে করে মাফকার কাছে নিয়ে গেল। টারজান দেখল মাফকার শোবার ঘরটা রানীর ঘরের পাশেই।

একটা টেবিলের ধারে তখন দাঁড়িয়ে ছিল মাফকা। টেবিলের উপর কাপড় জড়ানো কি একটা জিনিস ছিল। তার পাশেই ছিল গনফাল নামে সেই হীরকের তাল। মাফকা তার উপর একটা হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল।

নাকে রক্তের গন্ধ পেল টারজান। সে দেখল কাপড় ঢাকা সে বস্তুটা টেবিলের উপর ছিল তার উপর রক্তের দাগ রয়েছে। সে বুঝল বস্তুটা যাই হোক সেটা তাকে দেখাতে চায় মাফকা।

মাফকার সামনে দাঁড়িয়েছিল টারজান। দু’জনেই ছিল নীরব নির্বাক, শুধু মনে মনে যুদ্ধ চলছিল।

হঠাৎ মাফকা প্রশ্ন করল টারজানকে, রানীর ঘরে কি করে গিয়েছিলে?

টারজান কড়া গলায় বলল, কিন্তু তুমি কেমন করে জেনেছ যে আমি রানীর ঘরে গিয়েছিলাম?

গনফালা তোমাকে দেখেছে।

গনফালা আমাকে সশরীরে দেখেছে না এটা তার মনের অসার কল্পনা। তাছাড়া এমনও হতে পারে যাদুকর মাফকাই হয়ত তার মনে এই চিন্তাটা ঢুকিয়ে দিয়েছে।

মাফকা গর্জন করে উঠল, না, আমি তা করিনি।

টারজান এবার বুঝল উপরতলার কারাকক্ষ থেকে নিচের তলায় গনফালার ঘরে যাবার যে একটা গোপন সুড়ঙ্গপথ আছে মাফকা তা জানে না।

টারজান আরও লক্ষ্য করল যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছে মাফকা সে ঘরের পিছনে আর একটি আলোকিত ঘর রয়েছে। সেইটিই তার শোবার ঘর ও গবেষণাগার।

এবার এক নতুন প্রশ্ন করল মাফকা, কেন তুমি আমাকে না জানিয়ে জুলিদের দেশে গিয়েছিলে?

টারজান বলল, এ কথা কে বলেছে আমি ওখানে গিয়েছিলাম।

তুমিই আমার ভাই উরাকে মেরেছ। তুমিই তার পান্নার তালটা চুরি করেছিলে। তুমি আমাকে হত্যা করার জন্য এ দেশে এসেছ। তুমি জানতে চাইছিলে কে বলেছে আমাকে এ সব কথা। বলেছে এই লোকটি।

এই কথা বলেই সেই রক্তমাখা কাপড়টা টেনে সরিয়ে দিল মাফকা। সঙ্গে সঙ্গে লর্ডের কাটা মুণ্ডটা আর তার পাশে পান্নার সবুজ ধাতব তালটা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে।

কিন্তু টারজনের মুখের ভাবের মধ্যে কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। সে মোটেই বিচলিত হলো না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মাফকা বলল, মাফকার শত্রুদের এই অবস্থায়ই হয়। তোমাকেও এইভাবে মরতে হবে। যারা আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে, আমার লোকদের উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ করে। তুলছে তাদেরকেও মরতে হবে এমনি শোচনীয়ভাবে।

এরপর সে তার রক্ষীদের ডেকে বলল, যাও, লোকটাকে সেই ঘরে বন্দী করে রাখগে। অন্য সব ষড়যন্ত্রকারীদেরও ওর সঙ্গে একই ঘরে রাখবে। একই সঙ্গে মারা হবে ওদের।

আগে যে ঘরে টারজান ছিল উপরতলার সেই ঘরে রক্ষীরা নিয়ে গেল তাকে। আর কোন্ কোন্ বন্দীকে তার ঘরে আনা হবে তা বুঝতে পারল না টারজান। সে জানালা দিয়ে নগরটার দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে তা দেখার চেষ্টা করছিল আর ভাবছিল উডের সঙ্গে কিভাবে দেখা হতে পারে তার।

টারজান একটা পরিকল্পনা খাড়া করল বটে, কিন্তু সেটা নির্ভর করছে উডের উপর।

টারজান যখন আপন মনে এই সব কথা ভাবছিল হঠাৎ তখন ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে খোলা হলো। চারজন বন্দী ঘরে ঢুকল। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে টারজান দেখল চারজন বন্দীর মধ্যে উড একজন।

টারজানকে দেখেই চীৎকার করে উঠল উড, ক্লেটন না? আরে তুমি কি করে এখানে এলে? এখানে কি করছ তুমি?

তোমাদের মতই মৃত্যুর জন্য প্রহর গণনা করছি।

তুমি কি করে ধরা পড়লে? আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ওরা কিছুতেই ধরতে পারবে না।

টারজান তখন তাকে বুঝিয়ে বলল, কিভাবে সে এদিকে আসতে আসতে চিতাবাঘ ধরার ফাঁদে পড়ে যায় এবং কিভাবে তারা ধরে তাকে।

উড তখন তার সঙ্গী তিনজনের সঙ্গে টারজনের পরিচয় করিয়ে দিল। তার সঙ্গে ভন আইক, স্ট্রোল আর স্পাইক। স্ট্রোলের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল টারজনের। এই তিনজন সঙ্গী তাদের সফরীতে ছিল।

টারজান বলল, মাফকা আমাকে একটু আগে বলেছে, আমাদের সবাইকে মারবে ওরা। মাফকা। বলেছে তোমরা গোলমাল বাধাও।

ভন আইক বলল, কোন গোলমাল বাধাবার আগেই ও সব জানতে পারে। তুমি কিছু ভাববার আগেই ও তা জানতে পারে।

টারজান বলল, স্পাইক ঠিকই বলেছে, গনফালার মধ্যে নিগ্রো রক্ত আছে। আমি কিছুক্ষণ আগে ওকে দেখেছি।

তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু বলেছ তাকে?

হা বলেছি। সে তোমাকে সাহায্য করতে চায়।

প্রথমে সে এ ব্যাপারে উৎসাহী ছিল এবং আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু পরে হঠাৎ সে বদলে যায় এবং চীৎকার করে আমাকে ধরাবার জন্য প্রহরীদের ডাকতে থাকে অকারণে।

টারজান বলল, এখন আমাদের একমাত্র ভাববার বিষয় হলো কিভাবে আমরা মুক্তি পেতে পারি। তবে আমাদের যা কিছু তাড়াতাড়ি করতে হবে। হঠাৎ ওকে ধরতে হবে।

উড বলল, কিন্তু কড়া পাহারার মধ্যে রুদ্ধদ্বার ঘরে বন্দী থাকাকালে কিভাবে ওকে হঠাৎ ধরব?

টারজান বলল, অন্য বন্দীদের খবর কি? তারা কি আমাদের দলে যোগদান করবে?

উড বলল, একবার যদি হীরের তালটা হস্তগত করতে পারতাম! ঐ ধাতুটাই ওর সমস্ত শক্তির উৎস।

টারজান বলল, ওটা আমরা হাত করতে পারি।

উড বলল, অসম্ভব। মাফকা তার ঔষধবিদ্যা আর যাদু জানে। তার সাহায্যে ও একটা নকল হীরকখণ্ড তৈরি করেছে। সেটা যখন তখন দেখায়। আসল হীরেটা লুকিয়ে রাখে। রাত্রিবেলায় নকল হীরেটা সামনে রেখে আসলটা তার কাছেই কোনভাবে লুকিয়ে রাখে। রাত্রিবেলায় কেউ হীরে চুরির জন্য তার ঘরে ঢুকলে নকল হীরেটাই দেখতে পাবে সামনে। অবশ্য আসল হীরেটা ও কাছেই রাখে।

ভন আইক বলল, হীরেটা নিতে হলে রাত্রিবেলায় ওর নির্জন ঘরে ঢুকতে হবে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়।

টারজান বলল, মাফকার ঘরটা কি গনফালা বা রানীর ঘরের পাশেই?

 হ্যাঁ পাশেই, কিন্তু মাফকা দুটো ঘরের মাঝখানের দরজাটা তালাবন্ধ করে রাখে রাত্রিতে।

টারজান বলল, আমার মনে হচ্ছে মাফকার ঘরে আমি যেতে পারব। আমি যাচ্ছি।

কেমন করে যাবে শুনি?

 এরপর সে সেই চুল্লীর ভিতর দিয়ে সুড়ঙ্গপথে চলে গেল।

ভন আইক উডকে জিজ্ঞাসা করল, লোকটা কে?

ক্লেটন নামে এক ইংরেজ। আমি অন্তত তাই জানি। ও নিজে আমাকে বলেছে।

আমার মনে হয় টারজান নামে যদি কোন লোক থাকে ত ও হচ্ছে সেই।

উড বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছিল। ও গাছের উপর দিয়ে বাঁদরের মত যাওয়া আসা করে। তীর ধনুক দিয়ে জীবজন্তু মেরে কাঁচা মাংস খায়।

যে সুড়ঙ্গপথ দিয়ে গনফালার ঘরে গিয়ে পড়েছিল টারজান সেই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে সে গনফালার ঘরটা পাশে ফেলে রেখে মাফকার বড় ঘরটায় গিয়ে পৌঁছল। দেখল মাফকা তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে নাক ডাকিয়ে গভীরভাবে ঘুমোচ্ছে। তার খাটের পাশে টেবিলে হীরে ও পান্নার দুটো তালই রয়েছে। টেবিলের উপর একটা ধারাল দা আর একটা বড় ছোরা রয়েছে। গনফালার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া ছুরিটা টারজনের হাতে ছিল।

টারজান নিঃশব্দে মাফকার খাটের কাছে গিয়ে টেবিল থেকে অস্ত্রগুলো সরিয়ে রাখল। তারপর মাফকার ঘাড় ধরে তাকে কিছুটা নাড়াল। মাফক!জেগে উঠতেই টারজান বলল, চুপ করে থাক। তাহলে তোমার কোন ক্ষতি করা হবে না।

মাফকা তার ঘরের চারদিকে তাকাল। দেখল সাহায্যের কোন আশা নেই।

সে কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, বল কি চাও? তুমি আমাকে মেরো না। যা চাও তাই দেব।

টারজান এবার মাফকাকে উপুড় করে শুইয়ে তার হাত দুটো পিছন থেকে বেঁধে ফেলল। তারপর তার মুখটা আর চোখ দুটোও বেঁধে দিল। তারপর মাফকাকে তার খাটের উপর সেইভাবে ফেলে রেখে গনফালার ঘরে চলে গেল। গিয়ে দেখল গনফালা তার ঘরের মাঝখানে বিছানার উপর বসে আছে।

টারজান বলল, মাফকা যদি কোনরকম হস্তক্ষেপ না করে তাহলে মেয়েযোদ্ধারা তোমার কথা শুনবে ত?

হ্যাঁ।

কোথায় যাবে তুমি?

 ইংল্যান্ডে।

ইংল্যান্ডে কেন যাবে?

কারণ আমাকে স্নেহ ও অনুগ্রহ করতেন এমন একজন আমাকে চিঠি দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন মুক্তি পেলে আমি যেন ইংল্যান্ডে চলে যাই।

ঠিক আছে, তোমার চিঠি সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুত হও। তুমি মুক্তি পাবে আজই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি উড আর তার তিনজন সঙ্গী তোমার কাছে আসব। তুমি তৈরি হয়ে থাকবে। তবে তোমার মেয়েযোদ্ধারা যাতে আমাদের যেতে বাধা না দেয় তার জন্য তাহাদের হুকুম দেবে তুমি।

সেখানে থেকে বেরিয়ে টারজান সোজা সেই ঘরটায় চলে গেল উড আর তার সঙ্গীরা যেখানে ছিল। টারজান তাদের চুপি চুপি কি বলতে টারজনের পিছু পিছু তারাও বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

টারজান তাদের সোজা মাফকার ঘরে নিয়ে গেল। হীরে আর পান্না দুটোর ধাতব তাল থেকে আলোর ছটা বেরিয়ে আসছিল ঘর থেকে। স্পাইক আর স্ট্রোল দু’জনে ধাতু দুটোর সামনে দাঁড়িয়ে এক মুগ্ধবিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারা বুঝল পান্নার তালটা জুলিদের দেশ থেকে আনা হয়েছে।

স্ট্রোল হাত দিয়ে ধাতু দুটোকে স্পর্শ করতে গিয়ে ভয়ে স্পর্শ করতে পারল না। এই দুটো ধাতুর শক্তির কথা সে জানত।

উড আর তার সঙ্গীরা মাফকাকে বিছানায় চোখ, মুখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দারুণ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল।

উড টারজানকে বলল, কি করে তুমি এ কাজ করলে?

টারজান বলল, আমি প্রথমে ধাতু দুটোকে সরিয়ে নিয়েছিলাম ওর কাছ থেকে। আসলে ঐ দুটো ধাতু থেকেই ও সব শক্তি পেত। এবার এখান থেকে চলে যাব আমরা।

এরপর উডের দিকে মুখ ঘুরিয়ে টারজান বলল, তুমি আর ভন আইক ধাতু দুটোকে নাও। স্ট্রোল আর স্পাইক মাফকাকে বয়ে নিয়ে যাবে।

ভন আইক ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাব আমরা?

 সে জানত মাফকার ঘরের বাইরে বারান্দায় মেয়েযোদ্ধারা পাহারা দিচ্ছে।

টারজান বলল, আমরা প্রথমে যাব গনফালার ঘরে।

স্পাইক বলল, সে চীৎকার করে উঠলেই মেয়েযোদ্ধারা ছুটে এসে সব বানচাল করে দেবে।

গনফালার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমাকে যা বলছি তাই করো। তবে সঙ্গে এই সব অস্ত্রগুলোও নিতে পার। বলা যায় না, দরকার হতে পারে।

তারা চলে গেল গনফালার ঘরে।

ওরা গিয়ে দেখল গনফালা যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মাঝখানে। মাফকার অবস্থা দেখে ভয়ে চুপসে গেল। তারপর উডকে দেখে ছুটে গেল তার কাছে।

ভন আইক টারজনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি স্পাইকের সঙ্গে একমত। ওকে না মারলে যখন আমাদের মরতে হবে তখন আমরা ওকে খুন করব না কেন?

টারজান বলল, এখন মাফকাকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। কারণ কাজী মেয়েদের মনোভাব আমরা জানি না। ওকে তারা দেবতার মত মানে। মাফকাকে মেরে ফেললে ওরা ক্ষেপে যেতে পারে।

উড বলল, ক্লেটন ঠিক বলেছে।

গনফালার ঘরের বাইরে দারুণ গোলমাল ও চেঁচামেচির শব্দ শোনা গেল। অনেকে মাফকার ঘরের দরজায় ঘা দিয়ে মাফকার নাম ধরে ডাকছে।

টারজান তখন গনফালাকে বলল, তুমি মেয়েযোদ্ধাদের মধ্যে প্রধান একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করো ওরা কি চায়। আমরা পাশের ঘরে যাচ্ছি।

অন্যদের ডেকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল টারজান।

গনফালা দরজার কাছে যে নাকাড়া ছিল তাতে তিনবার ঘা দিয়ে দরজা খুলে দিল। একজন মেয়েযোদ্ধা ঘরে প্রবেশ করে নতজানু হলো।

মেয়েযোদ্ধাটি বলল, জুলিরা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসছে। তারা একজন দূত পাঠিয়ে তাদের পান্নার তালটাকে ফেরৎ চাইছে। তারা সংখ্যায় অনেক। আমরা তাই মাফকার শক্তির শরণাপন্ন হয়েছি। আমরা চাইছি মাফকার শক্তি দিয়ে তাদের দুর্বল করে দিতে। তখন আমরা তাদের যুদ্ধে পরাজিত করে সহজেই তাড়িয়ে দিতে পারব।

গনফালা বলল, তাদের এখন কোন শক্তি নেই, কারণ উরা এখন মৃত। আমাদের যোদ্ধাদের বল, আমি রানী গনফালা তাদের হুকুম দিচ্ছি তারা যেন জুলিদের মেরে তাড়িয়ে দেয় আমাদের নগর থেকে।

জুলিরা আমাদের নগরদ্বারে ঢুকে পড়েছে। আমাদের যোদ্ধারা ভয় পেয়ে গেছে। মাফকার শক্তি ছাড়া তারা দুর্বল বোধ করছে। কিন্তু মাফকা কোথায়? আমাদের ডাকে সে সাড়া দিচ্ছে না কেন?

গনফালা মেঝের উপর পা ঠুকে বলল, আমি যা বলছি তাই করো। আমার সামনে প্রশ্ন করার কোন অধিকার নেই তোমার। যাও, নগর রক্ষা করো। আমি রানী হিসেবে তোমাদের শক্তি যোগাব। তোমরা জুলিদের পরাজিত করবে।

মেয়েযোদ্ধাটি তখন ক্রুদ্ধভাবে বলল, মাফকাকে একবার দেখতে দাও আমাদের।

গনফালা বলল, ঠিক আছে। আগে আমার হুকুম তামিল করো। তারপর জুলিদের বন্দী করে নিয়ে দরবার ঘরে এস। তখন মাফকাকে দেখতে পাবে।

মেয়েযোদ্ধাটি চলে গেলে যে ঘরে টারজানরা অপেক্ষা করছিল গনফালা সে ঘরের দরজা খুলে দিল। টারজান বেরিয়ে এসে বলল, আমি সব শুনেছি। তোমার এখন পরিকল্পনা কি?

আমি কিছু সময় চাই।

এরপর তাহলে মাফকাকে দরবার ঘরে হাজির করাতে চাও?

না, কারণ মাফকাকে বাঁধা অবস্থায় দেখলে ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। আবার মাফকাকে ছেড়ে দিলেও সে আমাদের হত্যা করবে।

তাহলেও এটা একটা ভাল মতলব। আমরা এটাই করব।

টারজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।

গনফালা বলল, তুমি কি পাগল হয়েছ?

হয়ত তাই। আমরা যদি এখন এখান থেকে চলে যাই তাহলে আমরা কাজীদের সঙ্গে যুদ্ধ না করে যেতে পারব না। মেয়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই না আমি। আমার মনে হয় উপায় একটা আছে। আচ্ছা তুমি জান আসল গনফালটা কোথায় আছে?

হা জানি।

এই বলে গনফালা মাফকার ঘরে গিয়ে একটি দরজা খুলল। সেই দরজা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে নেমে আবার একটা ছোট দরজা পেল। সেই দরজা খুলে বেরিয়েই তারা দরবার ঘরে মঞ্চের পিছনে এসে পড়ল।

দরবার ঘর তখন শূন্য। মেয়েযোদ্ধারা তখনো ফিরে আসেনি। টারজনের নির্দেশ অনুসারে উড সিংহাসনের পাশে একটা উঁচু জায়গায় আসল গনফালটা রাখল। স্ট্রোল আর স্পাইক হাত, পা ও চোখ মুখ বাধা অবস্থায় মাফকাকে তার চেয়ারে বসিয়ে দিল। গনফালা পাশের একটি চেয়ারে বসল।

টারজান গনফালা বা হীরের তালটায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্যরা চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে রইল। ভন আইক পান্নার তালটা চামড়া দিয়ে ঢেকে রাখল।

এমন সময় ঘরের বাইরে বারান্দায় পদশব্দ শোনা গেল। ঘরের দরজা খুলে দেয়া হলো। কাজী যোদ্ধাদের নেত্রীরা ঘরে ঢুকল। মাফকা আর রানীর প্রতি শ্রদ্ধাবশত তারা সবাই মাথা নত করল।

কিন্তু মাফকার অবস্থা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। একজন ক্রুদ্ধভাবে গনফালাকে প্রশ্ন করল, এ সবের অর্থ কি গনফালা?

কয়েকজন অপরিচিত বিদেশীকে মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো আশ্চর্য হয়ে গেল তারা।

তাদের প্রশ্নের উত্তর দিল টারজান। বলল, এর অর্থ হচ্ছে এই যে মাফকার আর কোন শক্তি নেই। সে তোমাদের সকলের জীবনকে তার হাতের মুঠোর মধ্যে রেখেছিল। সে তার নিজের স্বার্থের জন্য তোমাদের দিয়ে যুদ্ধ করিয়ে নিয়ে যুদ্ধের সব ফল সে একা ভোগ করেছে। তোমাদের সে বন্দী করে রেখেছিল। তোমরা তাকে ভয় করতে, ঘৃণা করতে। কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারতে না।

মেয়েযোদ্ধাটি তখন বলল, মাফকা আমাদের শক্তি যোগ্যতা। তার শক্তি চলে গেলে আমরা শক্তিহীন হয়ে পড়ব।

টারজান বলল, সে শক্তি যায়নি। শুধু সে শক্তি এখন মাফকার হাতে নেই।

মেয়েযোদ্ধাদের একজন বলল, ওদের মেরে ফেল। মেরে ফেল।

তখন সবাই এই কথা বলে চীৎকার করতে লাগল। তারা এইভাবে চীৎকার করতে করতে মঞ্চের দিকে এগোতে লাগল।

টারজান তখন গণফালার উপর একটা হাত রেখে বলল, থাম, তোমরা রানীর সামনে নতজানু হও।

কথাটা শুনতে পাবার সঙ্গে সঙ্গে যোদ্ধারা সবাই নতজানু হলো।

টারজান বলল, এবার উঠে দাঁড়াও। যাও, নগরদ্বারে যাও। বন্দীদের নিয়ে এস। তারা আসবে। যুদ্ধ বন্ধ হবে না।

যোদ্ধারা সকলে দরবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে টারজান তার দলের লোকদের বলল, আমাদের পরিকল্পনা ঠিকমত কাজ করেছে। আমি জানতাম এতে কাজ হবে। মাফকার যা কিছু অলৌকিক শক্তি ছিল তা এই গণফানের মধ্যেই আছে নিহিত। পান্নার তালটাতেও একই শক্তি আছে। তবে বাজে লোকের হাত পড়লে এর ফল খারাপ হবে। এ শক্তিকে ভাল কাজে নিয়োজিত করতে হবে।

গনফালা সব কিছু মন দিয়ে শুনছিল। এমন সময় বারান্দায় আবার পদশব্দ শোনা গেল। গনফালা বলল, ওরা আসছে।

পঞ্চাশজন মেয়েযোদ্ধা ঘরে ঢুকল। তাদের মধ্যে অর্ধেক ছিল কাজী আর অর্ধেক জুলি। অনেকের গা থেকে তখন রক্ত ঝরছিল। তাদের দেহে অনেক ক্ষত ছিল।

টারজান তাদের বলল, এখন তোমরা মুক্ত। উরা আর মাফকা দুজনেরই শাসন থেকে মুক্ত তোমরা। উরা মৃত। আর মাফকাকে আমি তোমাদের হাতে তুলে দেব। তোমাদের যা খুশি করবে। গনফালটা সরিয়ে নেবার সঙ্গে সঙ্গে তার সব শক্তি চলে গেছে। আমরা এ দেশ থেকে চলে যাচ্ছি। রানী গনফালাও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে। যে সব বন্দী ও ক্রীতদাসরা আমাদের সঙ্গে যেতে চায় তারা যেতে পারে। আমরা নিরাপদে এ দেশের সীমানা ছেড়ে চলে গেলে গনফালটা আমি তোমাদের হাতে দিয়ে দেব। এখন সকাল হয়ে গেছে। আমরা যাচ্ছি। এই নাও মাফকাকে।

এই বলে টারজান মাফকাকে দু’হাত দিয়ে তুলে মেয়েযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিল।

মেয়েযোদ্ধারা সব স্তব্ধ হয়ে রইল। টারজান তার দলের লোকদের নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার হাতে ছিল চামড়া ঢাকা গনফাল। ভন আইকের হাতে ছিল জুলিদের পান্নার তালটা।

নগরের রাজপথে এলে তারা দেখল একদল নিগ্রো ক্রীতদাস ও শ্বেতাঙ্গ বন্দী দাঁড়িয়ে ছিল পথের ধারে।

 টারজান তাদের বলল, আমরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমরা ইচ্ছা করলে আমাদের সঙ্গে যেতে পার।

বন্দীরা ভয়ে ভয়ে বলল, মাফকা আমাদের খুন করবে।

টারজান বলল, মাফকা আর কাউকে খুন করতে পারবে না।

নিরাপদে তারা কাজীদের দেশের সীমানাটা পার হয়ে গেল। গনফাল হাতে টারজান তাদের পথ। দেখিয়ে নিয়ে গেল। বন্দী ও ক্রীতদাসদের মন থেকে ভয় কাটেনি তখনো।

অবশেষে নিউবারি নদীর উপত্যকায় এসে পড়ল।

টারজান তখন সবাইকে বলল, আমি এবার চলে যাব। তোমরা যাবে দক্ষিণে আর আমি যাব উত্তরে।

এই বলে সে তার হাত থেকে হীরের তালটা ভন আইকের হাতে দিয়ে বলল, এটা আজ রাতের মত রেখে দাও। কাল সকালে আমাদের সঙ্গে যে তিনজন কাজীদের মেয়েযোদ্ধা এসেছে তাদের একজনকে এটা দেব।

এরপর সে মেয়েযোদ্ধাদের বলল, আমি তোমাদের হাতে এটা তুলে দেব বলেছিলাম। এটা তোমরা ভাল কাজে ব্যবহার করবে। কোন অন্যায় করবে না।

এবার উডকে বলল, উড, গনফালার পক্ষ থেকে এই পান্নার তালটা নাও। আশা করি এর দ্বারা সুখী হবে সে।

স্পাইক বলল, তাহলে আমরা কি পাব?

টারজান বলল, শুধু মুক্তি নিয়ে চলে যাবে তোমরা। দিনকতক আগে এই মুক্তির কথাও ভাবতে পারতে না তোমরা।

স্পাইক বলল, এত বড় হীরের তালটা ঐ সব নিগ্রো মেয়েদের দিয়ে দিলে? আমরা তার একটা অংশও পাব না। এটা কিন্তু ঠিক নয়। এটা তুমি করতে পার না।

টারজান বলল, আমি তা ইতোমধ্যেই করে ফেলেছি।

স্পাইক তখন তার সঙ্গীদের বলল, এর জন্য তোমরা সবাই রুখে দাঁড়াবে না? ঐ দুটো ধাতু আমরা লন্ডনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে সব টাকা সমানভাবে ভাগ করে নেব।

ভন আইক বলল, আমি আমার জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছি-এতেই আমি খুশি। গনফালার একটা ধাতুতে অধিকার আছে। অন্য ধাতুটা জুলি আর কাজীরা ভাগ করে নেবে। তাই নিয়ে তারা বাইরের জগতে চলে যাবে। তারপর যা হয় হবে।

কয়েকজন বন্দী শ্বেতাঙ্গ সমর্থন করল স্ট্রোলকে। অন্য শ্বেতাঙ্গরা বলল, আমরা মুক্তি পেয়েছি এটাই যথেষ্ট।

টারজান তাকে বলল, তুমি পাবে না। আমি যা বলার সব বলে দিয়েছি। আমি এখন উত্তর দিকে যাচ্ছি। কিন্তু তোমরা এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাবার আগেই আবার আমি ফিরে আসব দক্ষিণ দিকে। আমি এসে দেখব তোমরা কেউ কোন অন্যায় কাজ করছ কি না।

এই বলে চলে গেল টারজান। রাত্রির অন্ধকার তখন ঘন হয়ে উঠেছে। একশোজন পলাতকের সেই দলটি তখন শিবির স্থাপন করে রান্না খাওয়ায় মন দিল। যে সব নিগ্রো ক্রীতদাস হয়ে ছিল কাজীদের। দেশে তারা এখন কুলির কাজ করতে লাগল আর শ্বেতাঙ্গদের ভৃত্য হিসেবে ফাই-ফরমাশ খাটতে লাগল।

উড আর ভন আইক টারজনের সহকারী ছিল। টারজনের অনুপস্থিতিতে তারা এখন দলের নেতৃত্ব করতে লাগল। টারজান তাদের বলে গেছে দক্ষিণ দিকে মাইল তিনেক গেলেই আদিবাসীদের একটা গা পাবে। তারপর এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাওয়া সহজ হবে তাদের পক্ষে।

গনফালা বলল, সে যতক্ষণ আমাদের মাঝে ছিল বড় নিরাপদ বোধ করতাম। ও যে আফ্রিকার। একটা অংশ। এখানকার সব কিছুই ওর জানা।

রাত্রিটা ছিল মখমলের মত নরম। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল শিবিরের উপর। নিগ্রোরা কিছু তীর ধনুক তৈরি করল।

শ্বেতাঙ্গরা এক একটা ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গল্প করতে লাগল। উড গনফালা আর ভন আইক কাজীদের দেশ থেকে আনা একটা চামড়ার উপর শুয়ে ভবিষ্যতের কথা আলোচনা করতে লাগল। গনফালা যাবে লন্ডনে। অন্যান্য শ্বেতাঙ্গরা আমেরিকায় তাদের বাড়ির কথা ভাবতে লাগল। তাদের বাড়ির লোকেরা তাদের মৃত ভেবে তাদের আশা ত্যাগ করেছে।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর গনফালা তার ছোট আস্তানাটায় শুতে চলে গেল। উডও শুয়ে পড়ল। গনফালার কিন্তু ঘুম এল না চোখে।

কিছুক্ষণের মধ্যে শিবির থেকে নিঃশব্দে বনচ্ছায়ার মধ্যে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল। শিবিরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। চাঁদ তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে।

গাছের ছায়ার মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছিল গনফালা ধীর পায়ে।

সহসা এক জায়গায় কাদের কথা বলার চাপা শব্দ শুনতে পেল।

গনফালা স্পষ্ট শুনতে পেল আড়াল থেকে কে একজন বলছে, হীরে আর পান্না দুটোই হাতছাড়া হয়ে গেল আমাদের। তার দাম কত জান স্ট্রোল? আমরা কিছুই পেলাম না।

স্ট্রোল বলল, পান্নার তালটাকে ও নিগ্রো মেয়েটাকে দিয়ে দিল জোর করে। ওটা কিন্তু দেখো, উড নামে ঐ আমেরিকানটা ভালবাসবার নাম করে ভুলিয়ে নেবে ওর কাছ থেকে, ও কখনো নিগ্রো মেয়েটাকে বিয়ে করবে না।

কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আর দাঁড়াল না গনফালা। ছায়াঘেরা নৈশ বনপথের মধ্যে। ছুটতে লাগল সে। কোথায় যাবে সে তা জানে না।

পরদিন সকালে উড ঘুম থেকে উঠেই কামুদিকে ডাকল। বলল, সবাইকে ডাক। আজ আমরা তাড়াতাড়ি রওনা হব।

ভন আইক চারদিকে তাকিয়ে কিসের খোঁজ করতে লাগল। হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠল।

ভন আইক বলল, গনফাল নেই। গতরাতেও এইখানে ছিল একটা চামড়ায় মোড়া।

উড তার বিছানাটা ভাল করে খুঁজে দেখল, তারপর হতাশ হয়ে বলল, পান্নার তালটাও নেই। কে এ কাজ করল?

এরপর তারা দু’জনে শিবিরের অন্য জায়গায় গিয়ে মেয়েযোদ্ধারা যেখানে শুয়ে ছিল সেখানে গিয়ে খোঁজ করল।

টারজান সেটা রাত্রির মত ভন আইককে রাখতে দিয়েছিল।

এরপর দেখা গেল স্পাইক আর স্ট্রোল শিবিরে নেই।

 এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল ওরা।

উড বলল, এরকম কিছু একটা ঘটবে তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। ওরাই সেটা নিয়ে পালিয়েছে।

উড তখন গনফালার তাঁবুতে গেল। গণফালার নাম ধরে অনেক ডাকাডাকি করল। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না। তারপর ও নিজে ঢুকল তাবুতে। কিন্তু হতাশ হয়ে বেরিয়ে এল পরমুহূর্তে। মুখখানা সাদা হয়ে উঠল ওর। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ওরা ওকেও নিয়ে পালিয়ে গেছে।

ভন আইক বলল, কিন্তু তা কি করে সম্ভব? গনফালা ত তাহলে চীৎকার করত। তাহলে শিবিরের সবাই জেগে উঠত। ওকে ত ওরা জোর করে নিয়ে যেতে পারবে না।

উড পাগলের মত বলল, তাকে আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে। তাড়াতাড়ি করতে হবে।

ওরা যে পথে পালিয়ে গেছে নিগ্রোভৃত্যরা সেই পথই ধরল। পথটা চলে গেছে দক্ষিণ দিকেই।

এরপর দু’সপ্তা কেটে গেল। টারজান তার কাজ সেরে উত্তর দিক থেকে ফিরতে লাগল।

সেদিন বিকালের দিকে টারজান বনের মধ্যে শিকারীদের পায়ে চলা একটা পথ পেল। হালকা মৃদুমন্দ বাতাসে তার মাথায় কালো লম্বা চুলগুলো দুলছিল। সহসা সামনের দিক থেকে একটা সিংহের গন্ধ এসে লাগল তার নাকে। গন্ধ থেকে টারজান বুঝল সিংহটা বুড়ো।

এর পরেই টারজান আর একটা গন্ধ পেল। সে গন্ধ হলো এক শ্বেতাঙ্গ মহিলার।

গাছের উপর দিয়ে সেই দিকে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখল আলুথালু বেশে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে একটি শ্বেতাঙ্গ মেয়ে বন পথে কোনরকমে পা টেনে টেনে চলেছে। তার পরনের পোশাক ময়লা এবং ছেঁড়া। ক্রমাগত অনাহার, অনিদ্রা আর পথকষ্টে তার ইন্দ্রিয়চেনাগুলো ভোতা হয়ে গিয়েছিল। কোন কিছু সে যেন শুনতে পাচ্ছিল না।

সহসা পিছন ফিরে একটা সিংহকে দেখে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।

গনফালা থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে সিংহটাও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মাটিতে পেটটা ঠেকিয়ে শুয়ে ঝাঁপ দেবার জন্য গর্জন করে উঠল ভয়ঙ্করভাবে। এমন সময় গনফালা তার বিস্ফারিত চোখ দিয়ে দেখল একটা গাছের ডাল থেকে একজন নগ্নপ্রায় লোক সিংহটার পিঠের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সিংহটার মত এক ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠল। সে দেখল একটা ধারাল চকচকে ছুরি বারবার ওঠানামা করতে লাগল। তারপর শেষবারের মত একবার গর্জন করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সিংহটা।

লোকটি এবার খাড়া হয়ে উঠে দাঁড়াতে গনফালা চিনতে পারল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।

গনফালা তখন যা যা হয়েছিল সব বলল। বলল, এই সব শুনে আমি বুঝলাম আমি থাকলে বিপদ নেমে আসবে উডের জীবনে। তাই আমি শিবির ছেড়ে একা পালিয়ে এসেছি। ওরা দক্ষিণ দিকে যাবে বলেই আমি এসেছি উত্তর দিকে।

গনফালা সব শেষে বলল, সে এখন কাজীদের দেশেই ফিরে যেতে চায়। কারণ সে তাদেরই শুধু চেনে।

 টারজান বলল, সেখানে যাবে না তুমি। এখন মাফকা নেই। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।

টারজান বলল, এখন তুমি আমার সঙ্গে এস। পরে যা হোক একটা ব্যবস্থা হবে। উডের সঙ্গে অবশ্যই দেখা হবে।

কয়েক সপ্তা ধরে পথ চলার পর টারজান তার আফ্রিকার বাংলোতে তার স্ত্রীর কাছে নিয়ে গেল গনফালাকে। তার স্ত্রী গনফালাকে যথেষ্ট আদর যত্নের সঙ্গে রেখে দিল বাড়িতে।

এদিকে উড ও ভন আইকের অনেক খোঁজ করল। কিন্তু তাদের বা তাদের দলের কোন সন্ধান পেল না। এরই মধ্যে কোথায় কতদূরে গেল তারা তা বুঝতে পারল না টারজান।

দু’জন শ্বেতাঙ্গ অন্ধকার বনপথ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা পথ হারিয়ে ফেলেছিল।

উড একবার থেমে মাথার ঘাম মুছল। তারপর ভন আইককে বলল, আমরা যদি পূর্ব দিকে আরও এগিয়ে যাই তাহলে কোন গাঁ পাব। তাহলে আমরা কাউকে পথ-প্রদর্শক হিসেবে নিতে পারব।

এক ঘণ্টার মধ্যেই তারা একটা বড় বাংলোবাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছল। ভিতরে মুভিরো খবর পাঠাতেই টারজান বেরিয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে।

টারজানকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য হয়ে গেল উড আর আইক। দু’জনেই একবাক্যে বলে উঠল, ক্লেটন!

টারজান বলল, তোমাদের অনেক খোঁজ করেও কোন খবর পাইনি। ওখানে কি করছিলে? যাই হোক, তোমাদের দেখে খুব আনন্দ পেলাম। কোথায় ছিল এতদিন?

উড বলল, যে রাতে তুমি চরে আস সেই রাতেই স্পাইক আর স্ট্রোল গলফান আর পান্না দুটো ধাতুই চুরি কের নিয়ে পালিয়ে যায়। গনফালাকেও ধরে নিয়ে যায়। আমরা তাদের খোঁজ করে বেড়াচ্ছি।

টারজান বলল, হীরে আর পান্না দুটোই চুরি গেছে? একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। ওগুলো সুখের থেকে দুঃখই নিয়ে আসত তোমাদের জীবনে।

উড বলল, ওসব পাথর চুলোয় যাক। আমি শুধু গনফালাকেই চাই।

টারজান বলল, আমার মনে হয় খুব শীঘ্রই তাকে পাওয়া যাবে। এখন চল তোমাদের থাকার ঘর দেখিয়ে দিই। তোমরা স্নান করে নতুন পোশাক পাবে। তারপর বাগানে চলে যাবে। সেখানে আমরা থাকব।

ভনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে লাফিয়ে উঠল গনফালা। বব তুমি! সে কোথায়?

গনফালা তুমি! উড এখানে আছে। তুমি স্পাইক আর স্ট্রোলের হাত থেকে মুক্তি পেলে কি করে?

স্পাইক আর স্ট্রোলের সঙ্গে আমি কখনো ছিলাম না। আমি ত একাই চলে আসি।

এরপর সে রাতের ঘটনাটা সব বলল গনফালা।

গনফালা বলল, আমি তখন দেখলাম আমার জন্য স্ট্যানলির জীবন বিপন্ন হতে পারে। সে শুধু পান্না ধাতুটার জন্য আমাকে চায় এটা আমি ভাবতেই পারিনি।

ভন আইক বলল, একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম তার সঙ্গে। সে আমাকে বলেছে দরকার হলে তোমাকে নিয়ে নরকে যাবে, তোমার তুলনায় পান্না তুচ্ছ তার কাছে।

গনফালার চোখে জল এল। বলল, তার সঙ্গে এখন দেখা হবে?

এমন সময় উড বাগানে এসেই গনফালাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি যে গনফালাকে কত কষ্ট করে খুঁজে আসছে এতদিন সেই গনফালাকে এখানে দেখতে পেয়ে যাবে।

সন্ধ্যাবেলায় তারা সকলে মিলে ভবিষ্যতের কথা আলোচনা করতে লাগল।

 উড বলল, আমরা এখন আমেরিকায় চলে যেতে চাই। সেখানেই আমাদের বিয়ে হবে।

কিন্তু গনফালা বলল, আমাকে তার আগে একবার লন্ডনে যেতে হবে। ঔপনিবেশিক দপ্তর থেকে আমি একখানি চিঠি পেয়েছি।

গনফালা উঠে গিয়ে তার ঘর থেকে একখানা চিঠি বার করে এসে টারজানকে পড়তে দিল।

এই চিঠিখানি আমি লিখছি আমার মেয়ের উদ্দেশ্যে। সে যদি ভাগ্যক্রমে কাজীদের দেশ থেকে কখনো মুক্তি পায় তাহলে সে যেন লন্ডনে গিয়ে পরিচয় দান করে। কাজীদের দেশেই তার জন্ম হয় এবং তার জন্মের পরেই কাজীরা তার মাকে হত্যা করে। পরে তাকে তারা তাদের রানী করে এবং তাকে গনফালা নামে অভিহিত করে। মাফকা নিষেধ করায় আমি তাকে বলতে পারিনি সে আমার মেয়ে। কারণ মাফকা তাকে তার মেয়ে বলেই প্রচার করত।–মাউন্টফোর্ড।

বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে উড এক সময় গনফালাকে বলল, খুব ক্লান্তি বোধ হচ্ছে?

গনফালা বলল, মোটেই না।

ভন আইক বলল, কষ্ট হবে বৈকি! তুমি ত শুধু ওখানে সারাদিন সিংহাসনে বসে থাকতে।

গনফালা বলল, কিন্তু মাঝে মাঝে কাজীদের সঙ্গে শিকার করতাম আমি, তাই আমার সঙ্গে ছুটে পারবে না তোমরা।

গনফালা, উড আর ভন আইক পথ চলছিল বনের ভিতর দিয়ে। ওরা টারজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলেছে সভ্য জগতের দিকে। টারজান ওদের জন্য এক ভাল ও নির্ভরযোগ্য সফরী আনিয়ে দিয়েছে।

সারাদিন পথ চলার পর ওরা এক জায়গায় শিবির গড়ে তুলল। রাত্রিতে শিবিরের ধারে আগুন জ্বালিয়ে পাহারার ব্যবস্থা হলো।

এদিকে এই শিবিরের উত্তর দিকে এক মাইল দূরে স্পাইক আর স্ট্রোল আগুন দেখতে পেল।

 ওটা কাদের শিবির, কারা ও আগুন জ্বেলেছে তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল দু’জনে। ও আগুন আদিবাসীরা জ্বালাতে পারে আবার শ্বেতাঙ্গ শিকারীদলও হতে পারে। আবার ক্লেটনও হতে পারে।

রাত্রিকালে এই বনাঞ্চলে সিংহের দারুণ ভয়। তবু ওরা আগুনটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে লাগল। তারা তখন সংখ্যায় মাত্র চারজন।

আগুনের কাছে গিয়ে শিবিরটাকে ভাল করে দেখল।

হঠাৎ গনফালাকে দেখতে পেযে স্পাইক চুপি চুপি স্ট্রোলকে শিবিরের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, ঐ দেখ কে।

স্ট্রোল দেখতে পেয়ে বলল, গনফালা।

তার সঙ্গে আছে উড আর ভন আইক।

স্ট্রোল বলল, আমরা শুধু গনফালাকে চাই। ওরা চুলোয় যাক।

কিন্তু গনফালাকে নিয়ে কি করব আমরা? কি কাজ হবে আমাদের?

তুমি একটা আস্ত বোকা। গনফালা কাছে থাকলে আমাদের হীরেটা কাজ করবে। যেমন করত মাফকার হাতে।

শিবিরের মধ্যে তখন উড, ভন আইক আর গনফালা কথা বলছিল। তাদের কথাবার্তার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্ট্রোল আর স্পাইক।

পরদিন ওরা কি করবে তার একটা কর্মসূচি তৈরি করছিল ভন আইক।

পরদিন সকালে প্রাতরাশের পরই শিকারে বেরিয়ে পড়ল ওরা তিনজন। ভন আইক গেল পূর্ব দিকে, উড গেল দক্ষিণে আর গনফালা গেল উত্তর দিকে। প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল বন্দুক হাতে একজন করে সহকারী।

উডদের শিবিরের উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি ছোট পাহাড়ের উপর থেকে স্ট্রোল আর স্পাইক উডদের এই শিকার-অভিযান লক্ষ্য করতে লাগল। গনফালা তার বন্দুকধারী সহকারীকে নিয়ে কোন দিকে গেল তা বিশেষ করে নজর রাখতে লাগল তারা।

গনফালাকে একা ভিন্ন এক দিকে শিকারে যেতে দিতে কিছুতেই মন চাইছিল না উডের। কিন্তু গনফালা না ছাড়ায় বাধ্য হয়েছে তাকে যেতে দিতে।

কিন্তু গনফালা তখন ঘৃণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি একটা পাহাড়ের উপর থেকে স্ট্রোল আর স্পাইক তাকে লক্ষ্য করছে।

এমন সময় দুটো রাইফেলের গুলির আওয়াজ শুনে গনফালা তার বন্দুকবাহককে বলল, ওরা কেউ শিকার পেয়েছে। আমরা হয়ত ভুল পথে এসেছি।

বন্দুকবহনকারী বলল, না মেমসাহেব, ঐ দেখুন।

এই বলে একদিকে হাত বাড়িয়ে গণফালাকে দেখল। গনফালা সেদিকে তাকিয়ে একটা গাছের তলায় বড় খাদের মাঝে একটা সিংহকে দেখতে পেল।

গনফালা হাঁটু গেড়ে বসে তার বন্দুক থেকে গুলি করল। গুলিটা সিংহটার পায়ে লাগল, কিন্তু সে থামল না। সিংহটা মাটিতে পড়ে গিয়ে একবার গড়াগড়ি দিয়ে আবার উঠে ভয়ঙ্করভাবে দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে। গনফালা আবার গুলি করল। কিন্তু গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। তখন তার বন্দুকবাহক একটা গুলি করল। কিন্তু সে গুলিটাও লাগল না। সে তখন ছুটে পালাতে লাগল।

সিংহটা তখন গনফালাকে ছেড়ে পলাতক বন্দুকবাহকের দিকে ছুটতে লাগল। গনফালা আবার গুলি করল। গুলিটা এবার সিংহের গায়ে লাগল। কিন্তু সিংহটা পলাতক বন্দুকবাহকে ধরে ফেলল। তাকে ধরেই তার মাথায় একটা কামড় বসিয়ে দিল।

গনফালার বন্দুকবাহক লোকটা মারা যেতেই স্ট্রোল স্পাইককে বলল, ভালই হলো, আমরা মেয়েটা আর সেই সঙ্গে দুটো বন্দুক পেয়ে যাব।

স্ট্রোল আর স্পাইক এবার গনফালার দিকে এগিয়ে গেল।

তারা গনফালার কাছে এসে অন্তরঙ্গতার হাসি হেসে বলল, তুমি অল্পের জন্য বেঁচে গেছ।

গনফালা তাদের জিজ্ঞাসা করল, এখানে কি করছিলে তোমরা?

স্পাইক বলল, আমরা কোন একটা রেলস্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম। তারপর পথ হারিয়ে ফেলি।

স্ট্রোল এবার মৃত বন্দুকবাহকের রাইফেল আর গুলিগুলো নিয়ে নিল। স্পাইক তখন গনফালার ভাল বন্দুকটাকে লক্ষ্য করতে লাগল।

গনফালা বলল, তোমরা আমাদের শিবিরে চলে আসতে পার। আমরাও রেলস্টেশনের দিকেই যাব।

সে কথার উত্তর না দিয়ে স্পাইক তাকে বলল, তোমার বন্দুকটা ত চমৎকার। একবার দেখি।

গনফালা কোন সন্দেহ না করেই বন্দুকটা তুলে দিল তার হাতে।

গনফালা বলল, তোমাদের লোকেরা আমার মৃত লোকটাকে আমাদের শিবিরে বয়ে নিয়ে যাক।

স্পাইক বলল, আমরা তোমাদের শিবিরে যাব না।

তুমি আর তোমাদের শিবিরে ফিরে যাবে না।

 কি বলতে চাও তোমরা?

 তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে।

না, আমি যাব না।

স্পাইক বলল, দেখ গনফালা, আমরা তোমার সঙ্গে কোন ঝামেলা করতে চাই না। তোমাকে কোনরকম আঘাত করতেও চাই না। সুতরাং আশা করি তুমি শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের সঙ্গে আসবে। তোমাকে আমাদের প্রয়োজন আছে।

কিন্তু কেন? কি প্রয়োজন?

তুমি ছাড়া হীরেটা কোন কাজ করছে না।

কাজ করছে না মানে?

আমরাও মাফকার মত এখানে একটা রাজ্য গড়ে তুলতে চাই এই ধাতুটার সাহায্যে। এর একটা অলৌকিক শক্তি আছে। আমরা সেই শক্তির সাহায্যে সে রাজ্যের রাজা হব আর তুমি হবে তার রানী।

স্ট্রোল তাকে থামিয়ে বলল, না তুমি তা পার না। ওর উপর আমারও অধিকার আছে। ও আমার।

গনফালা বলল, না, আমি তোমাদের কারোরই হবে না। তোমরা বোকা। তোমরা আমাকে জোর করে নিয়ে গেলে তোমাদের খুঁজে বার করে হত্যা করা হবে। যদি তোমাদের মাথায় সুবুদ্ধি থাকে ত আমাকে ছেড়ে দেবে।

স্পাইক বলল, না তোমাকে যেতেই হবে আমার সঙ্গে।

ভন আইক পর পর দুটো গুলি করে একটা সিংহকে মেরে ফেলে। উডের ভাগ্যে কোন শিকার জোটেনি। সে তখন গনফালার নিরাপত্তার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল।

দু’ঘন্টা ধরে তারা গনফালার খোঁজ করে বেড়াল। তার নাম ধরে ডাকল। কিন্তু তাকে দেখতে পেল না বা তার কোন সাড়া পেল না। তারপর খুঁজতে খুঁজেত গনফালার সঙ্গে সিংহটার যেখানে লড়াই হয়। সেখানে এসে পড়ল তারা। দেখল বন্দুকবাহকটার মৃতদেহের উপর একটা সিংহ মরে পড়ে আছে। কিন্তু গনফালা সেখানে নেই। মৃত লোকটার বন্দুকও নেই।

শিবিরে গিয়ে দেখল গনফালা সেখানেও নেই।

তখন বিকাল হয়ে গেছে। তবু উড বলল, এখনি তার খোঁজে বার হতে হবে। সে তখন শিবিরের সব লোককে তিন দলে ভাগ করে দুটি দল সে নিজে ও ভন আইককে নিয়ে বেরিয়ে গেল। একটি দলকে শিবির রক্ষার কাজে রেখে গেল। বলল, তারা যেন সারারাত একটি বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বেলে রাখে এবং মাঝে মাঝে বন্দুকের আওয়াজ করে। গনফালা যাতে পথ হারিয়ে ফেললে ফিরে আসতে পারে শিবিরে।

কিন্তু উড বা ভন আইক কোন খোঁজ পেল না গনফালার। অবশেষে পরদিন দুপুরবেলায় ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে ফিরে এল শিবিরে।

ভন আইক বলল, গনফালা বেঁচে থাকলে আমাদের বন্দুকের আওয়াজ শুনে ঠিক ফিরে আসত সে।

উড বলল, সে মারা গেছে এটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। তার দুটো বন্দুক ছিল। মৃত বন্দুকবাহকের বন্দুক আর সব গুলি সে নিয়েছে।

ভন বলল, কোন আশা থাকলে আমিও থেকে যেতাম। কিন্তু যেহেতু কোন আশা দেখছি না চল আমরা বাড়ির পথে রওনা হই। দেশে ফিরে গেলে তুমি সব ভুলে যাবে।

আমি আবার টারজনের কাছে ফিরে যাব। সে আমাকে সাহায্য করতে পারবে এ ব্যাপারে। যদি কেউ তাকে খুঁজে বার করতে পারে ত একমাত্র টারজানই পারবে।

দশদিন ধরে সেই শিবিরে রয়ে গেল উড। সে টারজনের বাড়িতে না গিয়ে একজন লোককে একটা চিঠি দিয়ে পাঠিয়ে দিল।

একদিন উড যখন তার শিবিরের মধ্যে শুয়ে শুয়ে গনফালার কথা ভাবছিল তখন হঠাৎ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল টারজান। টারজানকে দেখেই লাফিয়ে উঠে পড়ল উড। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, টারজান। তুমি মানুষ নও দেবতা, আমি জানতাম তুমি আসবে।

টারজান বলল, তোমার চিঠি পেয়েই আমি চলে এসেছি।

উড তার ব্যর্থতার কথা সব বলল।

 টারজান বলল, আজ আর হবে না। কাল খোঁজ করব।

পরদিন সকালেই উড আর টারজান সেই শিবিরটাতে গেল প্রথমে যেখানে একদিন স্পাইক আর স্ট্রোল ছিল এবং যেখান থেকে তারা গনফালার গতিবিদি লক্ষ্য করে।

আগে উড এ শিবিরটাকে দেখে ভেবেছিল এখানে হয়ত একজন নিগ্রো আদিবাসী থাকত সাময়িকভাবে। কোন শ্বেতাঙ্গ ছিল না।

কিন্তু টারজান শিবিরের উঠোনের ঘাসগুলো পরীক্ষা করে দেখে বলল, এখানে একদল লোক ছিল। তাদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গও ছিল।

তাদের গন্ধসূত্র ধরে উত্তর দিকে উডকে নিয়ে এগিয়ে চলল টারজান। ক্রমে তারা সেই জায়গায়টায় গিয়ে পড়ল যেখানে সেই সিংহটা আর গনফালার বন্দুকবাহকটা মরে পড়েছিল।

টারজান বলল, এখান থেকেই একদল লোক ধরে নিয়ে যায় গনফালাকে।

উড বলল, সে আজ প্রায় এগার দিনের কথা।

টারজান বলল, আমি একা যাব। তুমি তোমার শিবিরে ফিরে যাও আজকের মত। কাল সকালে আমার বাড়িতে গিয়ে থাকবে। আমি গিয়ে খোঁজ করতে করতে যদি কোন সাহায্যের প্রয়োজন বোধ করি তাহলে একজন লোক দিয়ে খবর পাঠাব। তুমি তাহলে আমার ওয়াজিরিদের সঙ্গে নিয়ে আমার সাহায্যে যাবে। এখন আমার সঙ্গে এত তাড়াতাড়ি যেতে পারবে না।

এই বলে সেখান থেকে চলে গেল টারজান সঙ্গে সঙ্গে।

 বিষণ্ণ মনে একা একা তার শিবিরে ফিরে গেল উড।

দু’দিন ধরে গন্ধসূত্র ধরে উত্তর দিকে এগিয়ে চলল টারজান। তারপর বাতাঙ্গো নামক এক উপজাতিদের এলাকায় এসে পড়ল। এই বাতাঙ্গোরা বড় যুদ্ধবাজ আর নরখাদক। তারা ওয়াজিরিদের চিরশত্রু।

টারজান ভাবল যারা গনফালাকে ধরে নিয়ে গেছে তারা এদিকে এসে পড়লে বন্দী হতে পারে বাতাঙ্গোদের হাতে। তারা ধরা পড়েছে কিনা সে বিষয়ে বাতাঙ্গোদের সর্দারের গায়ে গিয়ে খোঁজ করতে হবে।

টারজান দেখল,তার পূর্ব দিকে কতকগুলো ছোট ছোট পাহাড় উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়ে আছে। সে সব পাহাড়গুলোর কাছে গিয়ে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টার উপর উঠে দূরে কতকগুলো গাঁ দেখতে পেল।

টারজান দেখল সব গাগুলোর মধ্যে কোন্ গাঁটা সবচেয়ে বড়। সে বুঝল ঐ গাঁটাই তাহলে বাতাঙ্গোদের সর্দারের গাঁ।

ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে এল। আকাশে চাঁদ ছিল না। দূর থেকে জ্বলন্ত উঠোনের আগুনের আলো দেখতে পাচ্ছিল।

পাহাড় থেকে একটা সিংহও নেমে এগিয়ে যাচ্ছিল সেই সব গাগুলোর দিকে।

গাগুলোর কাছাকাছি গিয়ে গ্রামবাসীদের ভীতি-বিহ্বল দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আকাশের দিকে মুখ করে বুকের ভিতর থেকে পশুসুলভ এক ভীষণ চীৎকার করল টারজান।

সে চীৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেল বাতাঙ্গোরা। পুরুষরা অস্ত্র তুলে নিল হাতে। মেয়েরা তাদের শিশুগুলোকে কোলে তুলে নিল।

একজন বাতাঙ্গো বলল, একটা দানব।

বাতাঙ্গোদের সর্দার বলল, এ চীৎকার আমি এর আগে একবার শুনেছিলাম। ওটা হলো ওয়াজিরিদের শয়তান অপদেবতার চীৎকার। বহুকাল আগে আমরা একবার ওয়াজিরিদের দেশ আক্রমণ করেছিলাম।

তার কথায় কান না দিয়ে সকলে আবার এই ধরনের কোন চীৎকার হয় কিনা তা শোনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে রইল।

টারজান গাঁয়ে গেটের কাছে এসে দেখল তার পাশে একটা বড় গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখল গায়ের চারদিকে একটা অনুচ্চ পাঁচিল ঘিরে আছে গাঁটাকে।

খাওয়ার পর বাতাঙ্গোদের অনেকেই তাদের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। একদল নাচগান করতে লাগল বাজনা বাজিয়ে। গায়ের কাছে এসে একটা সিংহ গর্জন করছিল মাঝে মাঝে।

টারজান এবার সর্দারের কুঁড়েটাকে দেখতে গেল দাওয়ায় যে মশালের আলো জ্বলছিল তাতে সে দেখতে পেল একটা টুলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে সর্দার। তার পায়ের কাছে রয়েছে সেই পান্নার তালটা যা স্ট্রোল আর স্পাইক নিয়ে পালিয়ে আসে।

তা দেখে টারজনের সন্দেহ হলো গনফালা, স্ট্রোল আর স্পাইক এই গাঁয়েই বন্দী হয়ে আছে।

অবশেষে রাত গম্ভীর হতে নাচগান বন্ধ হয়ে গেল। গাঁয়ের পথঘাট একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়লে গাছ হতে নিঃশব্দে নেমে পড়ল টারজান। ছায়ার মত গাঁয়ের পথ ধরে প্রতিটি কুঁড়ের সামনে থেকে বাতাসে গন্ধ শুঁকে খুঁকে পরীক্ষা করল ঘরগুলো। কিন্তু কোথাও কোন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ বা মহিলার সন্ধান পেল না।

অবশেষে সর্দারের ঘরের দরজার সামনে এসে টারজান দেখল ঘরের দরজার কাছে মেঝের উপর পান্নার তালটা পড়ে আছে। সর্দার তার স্ত্রীদের নিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।

টারজান এবার ঘরে ঢুকে সর্দারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার গলাটাকে আলতোভাবে দু’হাত দিয়ে ধরল।

সর্দার চমকে জেগে উঠতেই টারজান চুপি চুপি বলল, যদি বাঁচতে চাও ত চেঁচাবে না।

সর্দার নিচু গলায় বলল, কে তুমি? কি চাও?

আমি শয়তান-দেবতা। দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা কোথায়?

আমি কোন শ্বেতাঙ্গা নারী দেখিনি। বেশ কিছুদিন আগে বনে শিকার করতে গিয়ে বনের দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে দেখি। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোন নারী ছিল না। একটা সিংহ আমাদের সকলকে আক্রমণ করতেই তারা ছুটে পালিয়ে যায়।

টারজান আবার সর্দারকে বলল, তারা কোন্ দিকে পালিয়েছে? সঙ্গে লোক ছিল?

জঙ্গলের পশ্চিম দিকে। তারা ছিল মোট দু’জন। দু’জন শ্বেতাঙ্গ আর সব আদিবাসী। বন্দুক বা খাবার ছিল না তাদের সঙ্গে।

টারজান বলল, এই পান্নাটা তোমরা চুরি করে এনেছ?

সর্দার বলল, না, তারা ভয়ে পালিয়ে যাবার সময় এটা ফেলে যায়। তারা সাদা পাথরুটা সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

টারজান বলল, আচ্ছা, পরে কি কোন শ্বেতাঙ্গ মহিলা তোমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে যায়?

কোন শ্বেতাঙ্গ মহিলা আমাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে যায়নি। গেলে অবশ্যই আমি জানতে পারতাম।

আর কিছু না বলে নিঃশব্দে পান্নার তালটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল টারজান। গেটের কাছে। এসে দেখল সিংহটা তখনো ওৎ পেতে বসে আছে। টারজান আর সে রাতে সিংহটাকে না ঘাটিয়ে সেই গাছটার উপর শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিল।

এদিকে স্ট্রোল আর স্পাইকের সঙ্গে সমানে উত্তর দিকে হেঁটে চলল গনফালা। বাতাঙ্গোদের গাঁটাকে এড়িয়ে যাবার জন্য অনেকটা ঘুরতে হয় তাদের।

একজন নিগ্রোভূত হীরের তালটাকে বয়ে নিয়ে যেত।

কিছুক্ষণ একটা সফরীর সঙ্গে যাবার সময় স্পাইক পাহাড়ঘেরা একটা উপত্যকা দেখে। ও এখন সেই জায়গাটায় যেতে চাইছিল।

সে একদিন গনফালাকে বলে, জায়গাটা যেন স্বর্গোদ্যান মিস। আমরা সেখানে রাজার হালে থাকব। সেখানকার আদিবাসীরা শান্তিপ্রিয়।

এদিকে বাতাঙ্গোদের গাঁটাকে ফেলে পশ্চিম দিকে গিয়ে বনের প্রান্তে এসে দাঁড়াল টারজান। সেইখানে সে কয়েকটা গাছে ঘেরা ত্রিভুজাকৃতি একটা জায়গায় মাটি খুঁড়ে পান্নার তালটা পুঁতে রেখে। মাটি চাপা দিয়ে তার উপর কিছু ঘাস আর গাছের পাতা দিয়ে সেখানকার মাটিটা ঢেকে দিল।

ঝড়েতে গন্ধসূত্রটা হারিয়ে যাওয়ায় পলাতকদের অনুসরণের পথে বাধা পড়ল।

সে ভাবল, ওরা যখন গনফালাকে পেয়েছে তখন তাকে দিয়ে হীরের তালটাকে কাজে লাগাবে। তার অলৌকিক শক্তির দ্বারা অনেক কিছু চাইবে তারা এবং তার জন্য নিশ্চয় ওরা অন্য কোথাও না গিয়ে কাজীদের দেশেই ফিরে যাবে। সেখানে গিয়ে গনফালাকে রানী করে রাজ্যসুখ ভোগ করতে চাইবে ওরা। কারণ কাজীরা গনফাল আর গনফালার মর্ম বোঝে।

এই ভেবে টারজানও উত্তর দিক বরাবর স্পাইকদের পথের সমান্তরাল একটা পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল।

দু’দিন যাওয়ার পর পথে এক জায়গায় হায়েনার অট্টহাসি শুনে সেখানে গিয়ে দেখল একটা বড় গর্তের মধ্যে একটা বড় হাতি পড়ে আর্তনাদ করছে।

এই হাতিটা টারজনের সেই হাতিবন্ধু প্রিয় ট্যান্টর না হলেও তারই সমজাতীয়। টারজান তাই গর্জের একপাশে মাটি খুঁড়ে মুক্ত করল হাতিটাকে। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে তার শুড় দিয়ে টারজনের দেহটাকে সোহাগভরে স্পর্শ করল কিছুক্ষণ ধরে। তারপর আবার উত্তর দিকে রওনা হয়ে পড়ল টারজান।

এদিকে টারজনের বাড়িতে টারজান ফিরে না আসায় অধৈর্য হয়ে পড়ল স্ট্যানলি উড। টারজনের কোন খবর পেল না সে। তাই একদিন ওয়াজিরিদের সর্দার মুভিরোকে উড বলল, আমাকে কিছু লোক দাও, আমি নিজেই গনফালার খোঁজে বার হব।

অবশেষে মুভিরো তাকে দু’জন ওয়াজিরি যোদ্ধা দিল। তাই নিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়ল উড।

বাতাঙ্গোদের দেশে তারা এসে পড়লে ওয়াজিরিরা সেদিকে না গিয়ে স্ট্রোল ও স্পাইকদের মত অন্য পথে যেতে লাগল।

কয়েকসপ্তা যাবার পর আদিবাসীদের একটা গায়ে এসে তারা বুঝল, ঠিক পথেই এসেছে তারা। আদিবাসীদের সর্দার বলল, ন’জন লোকের এক সফরী এসেছিল তাদের গায়ে। তাতে ছিল দু’জন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা আর ছ’জন নিগ্রোভৃত্য। সর্দার তাদের সঙ্গে পথ প্রদর্শক দিয়ে উত্তরের দিকে আর এক গাঁয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।

তা শুনে আশান্বিত হলো উড। বুঝল গনফালা তাহলে বেঁচে আছে এখনো।

সেদিন উত্তরাঞ্চলের এক গাঁয়ে এক আদিবাসী সর্দারের সঙ্গে কথা বলছিল স্ট্রোল আর স্পাইক।

স্পাইক একসময় জিজ্ঞাসা করল সর্দারকে, উত্তর দিকে কি আছে?

সর্দার বলল, শুধু পাহাড় আর পাহাড়।

আমি যে উপত্যকার কথা বলছি সে উপত্যকাটা ঐ পাহাড়গুলো দিয়েই ঘেরা।

সর্দার বলল, আমি আগামীকাল তোমাদের সঙ্গে কিছু পথ-প্রদর্শক দেব।

স্পাইক তখন নিশ্চিন্ত হয়ে স্ট্রোল আর গনফালার পাশে বসে কথা বলতে লাগল। সে তার পরিকল্পনাটার কথাটা তুলে বলল, আর দেরী নেই। সেই উপত্যকাটায় একবার গিয়ে পৌঁছলেই আমরা নিরাপদ হয়ে উঠব।

গনফালা বলল, মোটেই না। স্ট্যানলি আর টারজান তোমাদের খুঁজে বার করবেই।

স্পাইক বলল, আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে ওরা যেতেই পারবে না। সে জায়গা কখনো খুঁজে পাবে না।

সর্দার ওদের পথ-প্রদর্শক দেবে যেমন আমাদের দিচ্ছে।

সে রাতে ভাল করে খাওয়ার পর তারা শুতে চলে গেল তাড়াতাড়ি। কিন্তু স্ট্রোল ঘুমোল না। ইচ্ছা করে জেগে কান পেতে রইল।

স্ট্রোল শুধু ভাবতে লাগল স্পাইক কখন ঘুমিয়ে পড়বে গভীরভাবে। এই স্পাইকই তার সেই মধুর স্বপ্ন পূরণের পথে একমাত্র বাধা।

স্ট্রোল বিছানা থেকে উঠে ঘরের দরজার কাছে এসে দেখল গায়ের সব লোক ঘুমিয়ে পড়েছে।

ঘর থেকে নিঃশব্দে বার হতে গিয়ে একটা রান্নার পাত্রে তার পা লেগে গিয়ে জোর শব্দ হলো। স্পাইকের ঘুমটা সে শব্দে কিছুটা ব্যাহত হলো, কিন্তু ভাঙ্গল না একেবারে। তবে ঘুমটা পাতলা হয়ে গেল তার।

এদিকে গনফালার ঘরের দিকে চুপিসারে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল স্ট্রোল।

গনফালা তখনো ঘুমোয়নি। সে দরজার ওপারে অন্ধকারে তাকিয়ে ছিল শূন্য দৃষ্টিতে। সহসা দরজার কাছে কার চাপা পদশব্দ শুনে চমকে উঠল সে। বুঝতে পারল কে একজন হাতে পায়ে হেঁটে গুঁড়িমেরে তার ঘরে ঢুকছে।

গনফালা ভয়ে ভয়ে বলল, কে তুমি? কি চাও?

স্ট্রোল চাপা গলায় বলল, চুপ কর। কোন গোলমাল করো না।

স্ট্রোল তেমনি চাপা গলায় বলল, আমার কথা শোন। ওই উপত্যকায় যাবে না তুমি। তুমি নিশ্চয় স্পাইকের সঙ্গে সারা জীবনটা কাটাতে চাও না সেখানে। সেখানে গেলেই সে আমাকে খুন করে একা আধিপত্য করবে তোমার উপর। আমি ওকে জানি। তার থেকে আমার সঙ্গে হীরেটা নিয়ে ইউরোপে চল।

আমি তোমার সঙ্গে কোথাও যেতে চাই না। চলে যাও এখান থেকে। তা না হলে আমি স্পাইককে ডাকব।

গনফালার গলাটা টিপে ধরল স্ট্রোল। গনফালা স্পাইকের নাম ধরে চীৎকার করে উঠল। সে স্ট্রোলের হাত দুটো তার গলা থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগল। সে ছটফট করতে লাগল।

চীৎকার শুনে জেগে উঠল স্পাইক। সে স্ট্রোলের নাম ধরে ডাকতে লাগল। কিন্তু দেখল স্ট্রোল ঘরের মধ্যে তার বিছানায় নেই।

স্পাইক তখন গনফালার ঘরের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু দরজার কাছেই বাধা দিল স্ট্রোল। সে ঘুষি পাকিয়ে গর্জন করতে লাগল। গনফালা ঘরের এককোণে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওরা দু’জনে জড়াজড়ি করে খালি হাতে মারামারি করতে লাগল।

কিন্তু সর্দার তার যোদ্ধাদের পাঠাবার আগেই ওরা নিজেরাই থেমে গেল।

স্পাইক গুঁড়ি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। গনফালা তা দেখে ভাবল স্পাইক নিশ্চয় স্ট্রোলকে খুন করে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। সে তাই ছুটে গিয়ে গাঁয়ের একটা কুঁড়ের মধ্যে আশ্রয় নিল।

দু’জনের মধ্যে স্পাইককেই সব সময় বেশি ভয় করত গনফালা। সে-ই বেশি বিপজ্জনক দু’জনের মধ্যে। কারণ সে বেশি শক্তিমান এবং দুঃসাহসী। স্ট্রোলের অতটা সাহস বা শক্তি ছিল না তার মত।

কিন্তু আসলে স্ট্রোল মরেনি। পরদিন সকালে গায়ে একটা রাস্তার উপর আহত অবস্থায় পড়ে ছিল স্ট্রোল। তা দেখতে পেয়ে স্পাইক তার কাছে গেল।

স্ট্রোল বলল, কি হয়েছিল, আমার এই অবস্থা হলো কেন?

স্পাইক বলল, তুমি লরীচাপা পড়েছিলে। কই, আমি ত কোন লরী দেখিনি।

গনফালা যে ঘরে লুকিয়ে ছিল সে ঘর থেকে ওদের দুজনকে দেখতে পেয়ে বেরিয়ে তাদের দুজনের সামনে এসে হাজির হলো।

তাকে দেখে স্ট্রোল বলল, মেয়েটিকে দেখতে আমার বোনের মত মনে হচ্ছে।

স্পাইক দেখল, স্ট্রোল বেশি আহতও হয়নি। তবে তার মাথাটায় হয়ত কোন গোলমাল হয়েছে।

যাই হোক, সেদিন সকালেই কিছু খাওয়ার পর দু’জন পথ-প্রদর্শককে সঙ্গে নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল তিনজনে। স্পাইক চলল আগে আগে। স্ট্রোল গনফালার পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। এক বিহ্বলতার ভাব ছিল তার চোখে।

গনফালা বলল, চল আমরা ফিরে যাই। কি হবে আর এগিয়ে গিয়ে তার থেকে আমায় আমার। বন্ধুদের কাছে নিয়ে চল। অজানা দেশে গিয়ে তুমি নিজেই যদি নিহত হও তাহলে গলফান নিয়ে কি হবে? কিন্তু আমাকে আমার বন্ধুদের কাছে নিয়ে গেলে আমি তাদের বলে গলফানটা তোমায় দিয়ে দেব এবং তোমাকেও ছেড়ে দেয়া হবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। আমি উডকে যা। বলব সে তাই করবে।

স্পাইক মাথা নেড়ে বলল, না, তোমাকে আমি ছাড়ব না। আমি যেখানে যাবার ঠিক যাব তোমাকে নিয়ে। তাতে যদি গলফানটা আমায় হারাতে হয় ত হবে।

গনফালা বলল, আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিলাম। তুমি বোকা বলে তা গ্রহণ করতে পারলে না।

পথ-প্রদর্শকরা চলে গেলে ওরা অজানা পার্বত্য পথে দিনের পর দিন ধরে এগিয়ে চলল। প্রতিদিনই সকাল হলেই স্পাইক ভাবে আজ সে ঠিক তার স্বপ্নের সেই মায়াময় দেশে পৌঁছে যাবে। প্রতি রাত্রেই সে বলে পরের দিন সে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে।

স্ট্রোলের মানসিক অবস্থা সেই একই রকমের রয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল গনফালা তার বোন। এই ভেবে গনফালার নিরাপত্তা সম্বন্ধে বেশি তৎপর হয়ে উঠল সে।

স্ট্রোল জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে। দিনের পর দিন সে শুধু মূক পশুর মত নীরবে পথ। হেঁটে যায়।

এইভাবে বহুদিন ধরে সেই পার্বত্য অঞ্চলে সেই মায়াময় উপত্যকার সন্ধানে এগিয়ে যেতে লাগল। স্পাইকরা। অবশেষে একদিন একটা পাহাড়ের উপর একটা ঝর্ণার ধারে বিকালের দিকে শিবির স্থাপন। করল ওরা।

তখন বিকালবেলা। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল পশ্চিম আকাশে। স্পাইক বসেছিল গনফালার পাশে।

স্পাইক বলল, ওটা সূর্য নয়, আগুন। হয়ত ওখানে একটা আগ্নেয়গিরি আছে। মনে হয় আমরা। আমাদের সেই আকাঙ্খিত উপত্যকায় এসে গেছি।

গনফালা কোন উত্তর দিল না। এখন আর সে ভয় করল না স্পাইককে। কারণ সে জানে স্পাইক তার কোন ক্ষতি করতে এলে বা পীড়ন করলে স্ট্রোল খুন করবে ইককে।

সেদিন রাতে খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছিল স্পাইককে। কিন্তু পরদিন যখন সে শুনল তাদের দুজন নিগ্রোভৃত্য তাদের সফরী ছেড়ে চলে গেছে তখন তার মুখের হাসি মুখেই মিলিয়ে গেল। তবে দেখল গলফানটা নিয়ে যায়নি তারা।

এরপর থেকে স্পাইক গলফানটা কাছে নিয়ে শুত।

সেদিন দুপুরের দিকে একটা বিস্তীর্ণ উপত্যকা পেল তাদের সামনে।

 একজন নিগ্রোভূত্য হঠাৎ থেমে কান খাড়া করে কি শুনে বলল, একদল মানুষ আসছে বাওয়ানা।

 স্পাইক গনফালার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ত কিছু শুনতে পাচ্ছি না, তুমি পাচ্ছ?

গনফালা বলল, হ্যাঁ, আমি মানুষের গলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

স্পাইক বলল, তাহলে পথ থেকে সরে গিয়ে আমরা এক জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারি।

এই বলে সে তাদের সব লোকদের একশো গজ দূরে একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে গেল। তারপর সেখানে থেমে কান পেতে কি শুনতে লাগল। তারা বুঝল আগন্তুকরা সেইদিকেই আসছে।

স্পাইক কোন লুকোবার জায়গা পেল না। তাদের পিছনে যে একটা ঝোপ ছিল তাতে প্রবেশ করা যাবে না, বড় দুর্গম।

পিছন ফিরে তাকিয়ে গনফালা দেখল, আগন্তুকদের যে দলটা উপত্যকার উপর দিয়ে এগিয়ে আসছিল তাদের সামনে ছিল প্রায় বারোজন কৌপীন পরা নিগ্রো। তাদের পিছনে ছিল ছ’জন অদ্ভুত পোশাক পরা শ্বেতাঙ্গ। তাদের সেই পোশাকের মধ্যে জাঁকজমক ছিল। তাদের পিছনে কিছুদূরে ছিল আরো বিশজন সশস্ত্র শ্বেতাঙ্গ। তবে তাদের পোশাকে কোন জাঁকজমক ছিল না। তাদের হাতে ছিল বর্শা আর তরবারি। একজন যোদ্ধার হাতে একটা মানুষের রক্তাক্ত কাটা মুণ্ডু ঝোলানো ছিল।

গনফালা বলল, ওরা শ্বেতাঙ্গ। ওরা আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে পারে।

স্পাইক বলল, আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না। গনফালা আর তোমার নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি আমি।

এই বলে গনফালা দলের অন্যদের মত পালাবার চেষ্টা না করে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। বলল, তোমার থেকে যে কোন লোকই ভাল আমার কাছে।

স্পাইক চীৎকার করে বলল, বোকামি করো না, চলে এস।

এই বলে সে গনফালার একটা হাত ধরে তাকে টানতে লাগল।

গনফালা স্ট্রোলকে বলল, স্ট্রোল, তুমি আমাকে বাঁচাও।

স্ট্রোল তাদের কিছুটা আগে ছিল। গনফালার ডাকে সে পিছন ফিরে দেখল স্পাইক আর গনফালা ধস্তাধস্তি করছে।

স্ট্রোল তা দেখে রেগে গিয়ে চীৎকার করে স্পাইককে বলল, ছেড়ে দাও ওকে, আমার বোনকে ছেড়ে দাও।

বলতে বলতে স্পাইকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল স্ট্রোল। দু’জনে পরস্পরকে কিল, চড়, ঘুষি মারতে লাগল।

প্রথমে কি করবে তা ভেবে পেল না গনফালা। তারপর সে অগ্রসরমান যোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এগিয়ে গেল কিছুটা। আসলে সে স্পাইকের কাছ থেকে মুক্তি পেতে চাইছিল। সে দেখল যোদ্ধারা। তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। দেখল সামনের সারির নিগ্রোদের দু’জন একটা সিংহকে ধরে আছে।

গনফালা দেখল সহসা আগন্তুক দলের একজন যোদ্ধা থমকে দাঁড়িয়ে উপত্যকার একদিকে হাত বাড়িয়ে কি দেখাল। তখন তাদের সকলেই তাদের পথ থেকে অন্য দিকে ছুটতে লাগল। চামড়ার দড়িবাঁধা সিংহটাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল তারা।

গনফালা ওদের পালাবার কারণ খুঁজতে গিয়ে যোদ্ধাটা যে দিকে হাত বাড়িয়ে দেখিয়েছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় একশোটা হাতির পিঠে কয়েকজন করে যোদ্ধাকে নিয়ে এই দিকেই এগিয়ে আসছে। এদিকে তার পায়ের কাছে তখন স্ট্রোল আর স্পাইক মারামারি ও ধস্তাধস্তি করছিল ভয়ঙ্করভাবে।

স্পাইকরা যেখানে তাদের পথ-প্রদর্শকদের ছেড়ে দিয়ে একটি পথ ধরে এগিয়ে চলতে থাকে স্ট্যানলি উড ছ’জন ওয়াজিরি যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে সেই পথই ধরে।

উড হতবুদ্ধি হয়ে গেল। ভাবল আজ টারজান থাকলে অনায়াসে পথ খুঁজে পেত।

এমন সময় হঠাৎ একজন ওয়াজিরি উডকে একদিকে দেখাল, একটা নগর দেখা যাচ্ছে বাওয়ানা।

সেদিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল উড। দেখল, খড়ের চালওয়ালা কতকগুলো কুঁড়ে ঘরের সমন্বয়ে গড়া কোন গাঁ নয়। সাদা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সোনার গম্বুজ ও চূড়াওয়ালা অসংখ্য প্রাসাদ আর অট্টালিকায় ভরা এক মনোরম নগর।

উড সেই ওয়াজিরিকে জিজ্ঞাসা করল, এ কোন্ নগর?

আমি ওদিকে কোনদিন যাইনি বাওয়ানা তাই ঠিক জানি না।

অন্য একজন ওয়াজিরি যোদ্ধা বলল, মেমসাহেব বোধ হয় ঐ নগরেই আছে বাওয়ানা।

উড বলল, হয়ত আছে। কিন্তু ওখানকার লোকগুলো কেমন হবে তা জানি না। যদি শত্রুভাবাপন্ন। হয় তাহলে সেখানে গেলেই তারা আমাদের সবাইকে বন্দী করবে।

ওয়াজিরি যোদ্ধারা বলল, আমরা ওয়াজিরি, আমাদের সবাইকে বন্দী করতে পারবে না। আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমরা ভয় পাইনি।

উড বলল, তোমরা বরং ফিরে গিয়ে টারজানকে খবর দাও। সে যা হয় ব্যবস্থা করবে। টারজান না থাকলে মুভিরোকে বলবে।

ওয়াজিরি যোদ্ধারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে গেল। উড তখন একা পা চালিয়ে দিল সেই স্বৰ্ণনগরীর পথে।

এদিকে টারজান তখন সেই ওনথার উপত্যকার একধারে একটি উঁচু মালভূমির একটি প্রান্ত থেকে সেই স্বৰ্ণনগরী ক্যাথনির দিকে তাকিয়ে ছিল। নগরদ্বারের কাছে যে একটা নদী ছিল তার উপর একটা সোনার সেতু চকচক করছিল সূর্যের আলোয়।

কিন্তু ওই স্বৰ্ণনগরী অজানা নয় টারজনের। ও নগরে একদিন বন্দী ছিল সে। তারপর সেখানকার রাজনৈতিক উত্থানপতনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। স্বৰ্ণনগরী ক্যাথনি থেকে কিছু দূরে এথ্যানি নামে আর একটা নগর আছে। সেখানকার সবকিছু হাতির দাঁত দিয়ে বাঁধানো অথবা নির্মিত। তাই বলা হয় ক্যাথনি যেমন স্বৰ্ণনগরী তেমনি এ্যাথনি হচ্ছে হাতির দাঁতের নগরী।

এই দুই নগরীর অধিবাসীদের মধ্যে এক তীব্র বিরোধ ও শত্রুতা চলে আসছে। সুযোগ পেয়ে এক নগরের লোকেরা আক্রমণ করে অন্য নগরের লোকদের। ক্যাথনির যোদ্ধারা পোষমানা সিংহদের গলার দড়ি ধরে ঘুরে বেড়ায় আর এ্যাথনির যোদ্ধারা হাতির পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়।

টারজান ভাবল একদিন সে নগরে বন্দী থাকলেও আজ সে নগরীতে আর শত্রু নেই তার। কারণ তার প্রধান শত্রু রানী নেমোনি আজ আর নেই। আলেক্সটার নামে তার নিজের যে ভাইকে কারাগারে বন্দী করে রাখে রানী নেমোনি সেই ভাইই আজ রাজা হয়েছে এবং ফোর্সো, যুডো, জেমনন নামে টারজনের অন্তরঙ্গ বন্ধুরাই তাকে রাজা করে। তার সেই সব বন্ধুরা আজও আছে সে নগরীতে। রানীর প্রধান পরামর্শদাতা কুখ্যাত তোমো হয়ত এতদিনে নিহত হয়েছে। তাকে আর ভয় করার কিছু নেই।

এই ভেবে সাহসের সঙ্গে উপত্যকাটা পার হয়ে নগরদ্বারে উপস্থিত হলো টারজান। প্রহরীরা টারজানকে এগিয়ে আসতে দেখে আগেই চিনতে পেরেছিল।

নগরদ্বারের কাছে এসে টারজান থামতেই অভ্যর্থনা জানাল তাকে।

 প্রহরীদের ক্যাপ্টেন টারজানকে সঙ্গে করে রাজ প্রাসাদের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।

ক্যাপ্টেন বিষাদগম্ভীর মুখে বলল, আমি দুঃখিত টারজান, আলেক্সটার আমাকে আপনাকে গ্রেপ্তার করার হুকুম দিয়েছেন।

টারজান দেখল কুড়িটা বর্শা তাকে ঘিরে আছে। আলেক্সটারের অকৃতজ্ঞতায় সে বিস্মিত ও মর্মাহত হলেও বাইরে সে বিস্ময়ের বা বিহ্বলতার ভাবটা প্রকাশ করল না।

যোদ্ধারা টারজনের সব অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাকে রাজপ্রসাদের দোতলার একটা ঘরে নিয়ে গেল। টারজান দেখল এই ঘরটা বড় এবং তাতে আলো বাতাস আছে। আগের ঝরে সে যখন বন্দী ছিল এখানে তখন তাকে একটা অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছিল।

যোদ্ধারা ঘরের দরজাটা বন্ধ করে চলে গেলে টারজান একটা ভোলা জানালার ধারে দিয়ে বাইরে উঠোনের দিকে তাকিয়ে কি দেখতে লাগল। তারপর একটা বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়ে কোন বিপদের কথা চিন্তা না করেই ঘুমিয়ে পড়ল।

রাত্রির অন্ধকার বাইরে ঘন হয়ে উঠলে টারজনের ঘরের দরজা খুলে একজন ঘরে ঢুকল। তার হাতে। ছিল একটা জ্বলন্ত মশাল। সে ঘরে ঢুকে তার পিছনের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর সে টারজনের কাছে এসে তার কাঁধের উপর একটা হাত রেখে টারজনের প্রতি তার বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের কথা জানাল।

টারজান তাকে চিনতে পেরে বলল, তোমাকে দেখে খুশি হলাম জেমনন। ডোরিয়া আর তার বাবা মা ভাল আছে ত? তোমার বাবা ফোর্ডোই বা কেমন আছেন?

জেমনন বলল, তারা সবাই ভাল আছে, কিন্তু কেউ সুখে নেই। তোমার প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে। তার থেকে তুমি অনুমান করতে পেরেছ রাজ্যের অবস্থা কি চলছে।

টারজান বলল, বুঝতে পারছি কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু কি তা জানি না।

শীঘ্রই সব বুঝতে পারবে। দেশের অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক।

মানুষই হচ্ছে সব পশুদের মধ্যে জঘন্য এবং নিকৃষ্ট। আমি ত ভেবেছিলাম নেমোনির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সব অশান্তির অবসান ঘটেছে।

আমরাও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু আমাদের সে ধারণা ভুল। আলেক্সটার অকৃতজ্ঞ, কাপুরুষ এবং দুলমনা। রাজা হওয়ার পরই সে তোমোর প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। এর ফল কি হতে পারে তা জান তুমি। আমরা সকলেই তার কুনজরে পড়ে আছি। আসলে তোমোই হচ্ছে এ রাজ্যের প্রকৃত শাসক। তবু জনগণ আমাদের ভালবাসে বলে গণ-বিক্ষোভের ভয়ে আমাদের মেরে ফেলতে সাহস পায় না ওরা।

এরপর জেমনন বলল, কিন্তু তোমার খবর কি? তুমি আবার ক্যাথনিতে ফিরে এলে কি করে?

টারজান বলল, সে এক দীর্ঘ কাহিনী। একটি কুমারী মেয়ে আর তার প্রেমিক আমার হেফাজতে ছিল। তারা বাড়ির পথে রওনা হলে মেয়েটিকে দু’জন শ্বেতাঙ্গ চুরি করে নিয়ে যায়। আমি এ কথা জানতে পারার পর মেয়েটির খোঁজে বেরিয়েছিলাম।

জেমন বলল, আর তোমাকে বেশি খুঁজতে হবে না। আমি জানি মেয়েটি কোথায় আছে। তবে এখন তুমি তোমার বন্দী। সুতরাং তা জেনেও কোন লাভ হবে না তোমাদের কারো।

টারজান বলল, কি করে জানলে মেয়েটি কোথায় আছে?

জেমনন বলল, আলেক্সটার আমাকে প্রায়ই থেনার উপত্যকায় এ্যাথনির লোকদের আক্রমণ করার জন্য পাঠায়। যে সব সামন্তকে সে ভয় করে তাদেরও পাঠায় সে। সম্প্রতি আমি এই ধরনের এক অভিযানে গিয়েছিলাম। আমরা সংখ্যায় বেশি ছিলাম না বলে আমাদের অভিযান সফল হয়নি তেমন। শুধু শত্রুদের একটা মাথা নিতে পেরেছিলাম। আসার সময় পথে আমরা এ্যাথনির একদল লোককে হাতির পিঠে চড়ে আসতে দেখি। সেই সময় উপত্যকায় একদল লোককে দেখি। সে দলে দু’জন শ্বেতাঙ্গ, একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা আর চার-পাঁচজন নিগ্রোভৃত্য ছিল। আমাদের দেখতে পেয়ে মেয়েটি ছুটে আসতে থাকে সাহায্যের জন্য। আমরা তাদের সকলকে হয়ত বন্দী করে আনতাম।

টারজান বলল, এখন তোমো আমাকে নিয়ে কি করবে?

তুমি অবশ্য একটা পরিকল্পনা খাড়া করতে পার।

টারজান বলল, আগে আমাকে তোমোর পরিকল্পনার কথা জানতে হবে। এখন আমার কথা হলো তুমি আমার ঘর থেকে চলে যাও এই মুহূর্তে। কেউ দেখে ফেলতে পারে।

জেমনন বলল আমি কি তোমার জন্য কিছুই করতে পারি না? তুমি আমার জন্য কত করেছিলে।

টারজান বলল, তুমি শুধু তোমার ছোরাটা আমাকে দিয়ে যাও। আমি আমার কৌপীনের নিচে সেটা লুকিয়ে রাখব।

জেমনন ঘর থেকে চলে গেলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল টারজান। বন্য পশুর মতই সকল অবস্থাতেই নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বিগ্ন সে।

টারজানকে মৃত্যুদণ্ড দান করেছে আলেক্সটার। তোমোর পরামর্শেই এই দণ্ডের বিধান করেছে সে।

তখন বেলা এগারটা বাজে। সূর্য উজ্জ্বলভাবে কিরণ দিচ্ছিল আকাশে।

টারজানকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় প্রহরীরা প্রাসাদ-প্রাঙ্গণ পার হয়ে রাজপথে নিয়ে গিয়ে থামল। রাস্তার দু’ধারে জনতা ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেখান থেকে এক মিছিল বার হয়ে নগরের বাইরের এক প্রান্তরে যাবে। মিছিলের সামনে ছিল রাজ্যের সামন্ত ও যোদ্ধারা, তারপর ছিল সিংহটানা রাজার রথ আর তারপরে কয়েকজন নিগ্রো একটা সিংহকে গলবদ্ধ অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছিল।

এ মিছিল আগেও একবার দেখেছিল টারজান। টারজানকে রাজার রথের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছিল শিকল দিয়ে।

সিংহপ্রান্তরে মিছিলটা পৌঁছলে টারজনের শিকল খুলে দেয়া হলো। শিকল বাঁধা শিকারী সিংহটাকে কখন খুলে দেয়া হবে, কখন সে সিংহ বন্দীর দেহটাকে ছিঁড়ে খাবে সে দৃশ্য দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল জনতা। রাজা আলেক্সটারের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। তার বয়স তিরিশের কাছাকাছি। টারজান দেখল মুখখানা নিষ্ঠুরতায় ভরা।

আলেক্সটার একসময় বলল, তাড়াতাড়ি করো, আমার ভাল লাগছে না।

রাজার আদেশে আসল অনুষ্ঠানের জন্য সবাই তাড়াহুড়ো করতে লাগল। তাড়াতাড়ি এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেল। শিকারী সিংহটাকে যে নিগ্রোটা ধরে ছিল হঠাৎ তার হাত থেকে শিকলটা পড়ে যায় আর সঙ্গে সঙ্গে সিংহটা গর্জন করতে করতে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বর্শাধারী যোদ্ধাদের আক্রমণ করল। নিরস্ত্র জনতা প্রাণভয়ে পালাতে লাগল।

চারদিকে বিরাট গোলমাল ও হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। সামন্তরা বিব্রত হয়ে পড়ল। তখন রথের উপর দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিল আলেক্সটার। সে চীৎকার করে বার বার বলতে লাগল, যে এই সিংহটাকে মারতে পারবে তাকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হবে। সে যা চায় তাই দেয়া হবে।

কিন্তু সবাই তখন নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কেউ তার কথায় কান দিল না।

 তার প্রধান পরামর্শদাতা তোমোও তখন পালিয়ে গেছে সেখান থেকে।

আলেক্সটার কিন্তু পালাতে পারল না।

সহসা মুখ ঘুরিয়ে রথের উপর দাঁড়িয়ে থাকা আলেক্সটারকে লক্ষ্য করে ছুটে আসতে লাগল সিংহটা। এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেল আলেক্সটার। অথচ পালাবার কোন উপায় নেই, কোন পথ নেই। ভয়ে হিম হয়ে গেল তার গায়ের রক্ত।

আলেক্সটারের কয়েকজন দেহরক্ষী শুধু সিংহটাকে বর্শা দিয়ে আক্রমণ করল। আর সবাই পালিয়ে গেছে। আর আছে শুধু বন্দী টারজান।

এমন সময় বন্দী তার পরনের কৌপীনের ভিতর থেকে একটা ছোরা বার করে রথের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া সিংহটাকে আক্রমণ করল। সিংহটা তাকে লক্ষ্য করে একটা জোর লাফ দিতেই টারজান বসে পড়ে পিছন থেকে সিংহটার পিঠে চেপে পড়ে তার কেশর ধরে ফেলল। সিংহটার মত টারজান অদ্ভুতভাবে একধরনের গর্জন করতে লাগল। সে তার ছুরিটা সিংহটার বুকে পাঁজরে পিঠে বারবার বসিয়ে দিতে লাগল।

আলেক্সটার আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল একবার টারজান সিংহটার পিঠে আর একবার সিংহটা টারজনের পিঠে চেপে দু’জনেই গড়াগড়ি দিতে লাগল। তবে টারজান বারবার ছুরিটা বসাতে লাগল সিংহটার ঘাড়ে।

এদিকে রাজার দেহরক্ষীরা লড়াইরত টারজান ও সিংহটাকে চারদিকে ঘিরে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু টারজানকে বাদ দিয়ে সিংহটার গায়ে বর্শা দিয়ে আঘাত করার কোন সুযোগই পাচ্ছিল না তারা।

অবশেষে আপনা থেকে অবশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল সিংহটা। টারজান তার মৃতদেহের উপর একটা পা রেখে আকাশের দিকে মুখ তুলে বাঁদর-গোরিলাদের মত এমন অদ্ভুতভাবে চীৎকার করল যা শুনে ভয় পেয়ে গেল আলেক্সটার। আগে সে সিংহটাকে ভয় করছিল এখন তার ভয় এই লোকটাকে। তার মনে হলো এ লোক সিংহের থেকেও ভয়ঙ্কর। এ নিশ্চয় তাকে একদিন খুন করবে।

একজন সামন্ত আলেক্সটারকে জিজ্ঞাসা করল, এখন কি করব একে নিয়ে?

আলেক্সটার বলল, ওকে নিয়ে যাও। ওকে মেরে ফেল।

 সামন্ত বলল, কিন্তু ও আপনার জীবন রক্ষা করেছে।

 আলেক্সটার বলল, এখন নিয়ে যাও। ঘরে আটক করে রাখ। পরে যা হয় করা যাবে।

সামন্ত রক্ষীদের টারজানকে আবার সেই কারাকক্ষে নিয়ে যেতে বলল। আলেক্সটারের কথায় সে নিজেই লজ্জিত হলো। সেও বন্দী টারজনের সঙ্গে প্রাসাদের দিকে যেতে লাগল। পথে সে টারজানকে বলল, তুমি যা করেছ তার জন্য এর থেকে অনেক বড় পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল।

টারজান বলল, আমি নিজে শুনেছি রাজা বলেছিল সিংহটাকে কেউ মারতে পারলে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেয়া হবে তাকে। সে যা চাইবে তাই দেয়া হবে।

হ্যাঁ আমিও শুনেছি।

আমার মনে হয় উনি তা ভুলে গেছেন।

কিন্তু তুমি কি চাইতে?

কিছুই না।

 সামন্ত বিস্মিত হয়ে বলল, সেকি! কিছুই না?

 শত্রুর কাছ থেকে আমি কিছুই চাই না।

সামন্ত বলল, আমার কাছে বলতে পার, আমি ত তোমার শত্রু নই।

আমি সকাল থেকে কোন খাদ্য বা পানীয় পাইনি।

তুমি দুটোই পাবে।

টারজানকে এবার রাজপ্রাসাদের অন্য একদিকের দোতলায় রাস্তার দিকের একটি ঘরে রাখা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন যোদ্ধা দরজা খুলে ঘরে ঢুকে টারজানকে খাবার দিয়ে গেল।

যোদ্ধাটি বলল, সিংহের সঙ্গে তোমার লড়াই আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি রানী নেমোনির সামনে ফোবেগের সঙ্গে তোমার লড়াইও দেখেছিলাম। ফোবেগকে তুমি হারিয়ে দিয়েছিলে। তাকে তুমি তখন মেরে ফেলতে পারতে। জনতা তাকে মারবার জন্য বারবার উত্তেজিত করছিল তোমায়। তবু তাকে তুমি মারনি।

টারজান বলল, ফোবেগ এখনো বেঁচে আছে?

হ্যাঁ, সে এখন মন্দিরে রক্ষীর কাজ করছে।

তাকে আমার শুভেচ্ছা জানিও।

যোদ্ধাটি এবার টারজনের কাছে এসে তার কানে কানে বলল, কোন মদপান করবে না এখানে। আর কোন ঘরে ঢুকলে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াবে।

টারজান ভেবে দেখল যোদ্ধাটি তাকে ঠিক পরামর্শ দিয়েছে। মদের সঙ্গে ওরা বিষ মিশিয়ে দিতে পারে আর তাকে পিছন থেকে মারার জন্য কোন আততায়ীকে পাঠাতে পারে। সে বুঝল ক্যাথনির যোদ্ধাদের মধ্যে তার অনেক বন্ধু আছে।

টারজান দেখল, রাজপথের ওধারে একদল লোক জড়ো হয়ে কি বলাবলি করছে। তারা মাঝে মাঝে রাজপ্রাসাদের দিকে তাকাচ্ছে।

টারজান দেখল জনতার ভিড় ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। চারদিক থেকে বহু লোক এসে যোগ দিচ্ছে সেই জনতার সঙ্গে। তাদের মধ্যে অনেক যোদ্ধাও ছিল। অন্ধকার হয়ে উঠলে অনেকে মশাল হাতে ছোটাছুটি করতে লাগল। তারা প্রাসাদের সামনে এসে জড়ো হতে লাগল।

প্রাসাদ থেকে একজন সামন্তর অধীনে একদল যোদ্ধা. এসে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করল। কিন্তু জনতা চীৎকার করে বলে উঠল, টারজানকে ছেড়ে দাও। তাকে মুক্ত করে দাও।

বলিষ্ঠ চেহারার একজন লোক হাতের জ্বলন্ত মশালটা নাড়িয়ে চীৎকার করে উঠল, ধিক আলেক্সটারকে। তার লজ্জা হওয়া উচিত।

টারজান চিনতে পারল লোকটি হলো ফোবেগ।

এরপর রাজার যোদ্ধাদের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার মারামারি শুরু হয়ে গেল। অনেকের মাথা ভাঙ্গল। অনেকে আহত হলো। রাজার যোদ্ধারা হেরে গিয়ে প্রাণ নিয়ে কোনরকমে পালিয়ে গেল প্রাসাদের মধ্যে।

গোটা রাজপথ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ে। প্রাসাদের সামনে গেটের উপর করাঘাত করতে করতে জনতা ধ্বনি দিতে লাগল, তোমো নিপাত যাক। তোমার মৃত্যু চাই।

এমন সময় জনতার মধ্য থেকে একজন লোক বলল, আলেক্সটার শিকারী সিংহদের ছেড়ে দিয়েছে আমাদের মারার জন্য। আলেক্সটার নিপাত যাক।

টারজান দেখল প্রাসাদের আস্তাবল থেকে পঞ্চাশটা শিকারী সিংহকে দড়ি ধরে তাদের রক্ষীরা এগিয়ে আসছে জনতার দিকে। এদিকে জনতার ক্ষোভ তখন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তারা তবু ছুটে পালাল না সিংহদের ভয়ে। তারা সমানে ধ্বনি দিতে লাগল টারজনের মুক্তির জন্য।

টারজান তখন আর চুপ করে থাকতে পারল না। তারই জন্য এতগুলো লোক জীবন বিপন্ন করে লড়াই করছে অথচ তাদের জন্য কিছুই করতে পারবে না সে। না, সে আর কিছুতেই দাঁড়িয়ে থাকবে না চুপ করে।

তাই সে গর্জন করে জানালার গরাদগুলো ভেঙ্গে দেখল, জানালার নিচে উঠোনটা একেবারে খালি। উঠোনের বাইরেই রাজপথ। রাজপথে সমবেত জনতার দিকে সিংহগুলোকে নিয়ে তাদের রক্ষীরা এগিয়ে। আসছে।

টারজান জানালা থেকে উঠোনটায় নেমে পিছনের দরজা দিয়ে সোজা জনতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জনতার মধ্য থেকে কয়েকজন তাকে চিনতে পেরে ধ্বনি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল।

টারজান বলল, যাদের হাতে মশাল আর বর্শা আছে তারা সামনে এগিয়ে এস।

এই বলে সে নিজে একটা মশাল ধরে কয়েকজনকে মশাল নিয়ে তার সঙ্গে সিংহগুলোর মুখের কাছে যেতে বলল। অন্যান্য জন্তুদের মত সিংহরাও আগুনকে ভয় করে। মুখের কাছে জ্বলন্ত মশালের আঁচ পেয়ে সিংহগুলো পিছিয়ে যেতে লাগল। তাদের রক্ষীরাও পিছু হটতে লাগল।

জনতা এবার অধৈর্য হয়ে প্রাসাদের মধ্যে ঢুকতে চাইল। টারজান তাদের বলল, থাম, সিংহগুলোকে আগে চলে যেতে দাও। তারপর আমি আলেক্সটার আর তোমার কাছে যাব।

ফোবোগ এগিয়ে এসে বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।

টারজান জনতাকে বলল, আমরা সামনের গেট দিয়ে নয়, পিছনের দরজা দিয়ে যাব। তোমরাও। আমাদের সঙ্গে চল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাসাদের মধ্যে ঢুকে টারজান দেখল একটি ঘরের মধ্যে রাজা আলেক্সটার কয়েকজন। সামন্তের সঙ্গে নৈশভোজন করছে। বিক্ষুব্ধ জনতার ধ্বনি ক্রমাগত শুনতে শুনতে ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। তার উপর শিকারী সিংহরা জ্বলন্ত মশালের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছে শুনে আরো ভয় পেয়ে গেছে সে। তোমো। তাকে বোঝাচ্ছিল সিংহরা পালালেও প্রাসাদের যোদ্ধারা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেবে।

আলেক্সটার বলল, তোমার জন্যই এমন হলো তোমো। সব তোমারই দোষ। তুমি ঐ বুনো লোকটাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে বলেছিলে। তার ফলে কি হলো দেখ। জনগণ আমাকে সিংহাসনচ্যুত ও হত্যা করতে চাইছে। এখন কি করব?

আলেক্সটারের মত তোমোও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জনতাও তার মৃত্যু চায়-এই ধ্বনি সে নিজের কানে শুনেছে।

তোমো তাই একটা পরিকল্পনা খাড়া করে বলল, ঠিক আছে, বুনো লোকটাকে এখানে আনাও। তাকে মুক্তি দিয়ে কিছু টাকা দিয়ে দাও। তারপর জনতাকে একথাটা জানিয়ে দাও লোক মারফৎ।

আলেক্সটার সেইমত আদেশ দিল তার লোকদের।

তোমো বলল, তারপর অবশ্য আমরা এক কাপ মদ পান করতে দিতে পারি লোকটাকে।

সঙ্গে সঙ্গে টারজানকে উপরতলা থেকে আনার জন্য একজন সামন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরোতেই সে দেখল টারজান দাঁড়িয়ে আছে। সে তাদের কথা শুনছিল।

 সামন্ত ফিরে এসে ঘরে ঢুকে আলেক্সটারকে জানাল, টারজান এসে গেছে।

 সঙ্গে সঙ্গে টারজান ঘরে ঢুকে পড়ল। তার পিছু পিছু ফোবেগ ও জনতার একটি অংশ ঘরে ঢুকে পড়ল।

তাদের দেখে আলেক্সটার, তোমা ও সামন্তরা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।

আলেক্সটার ও তোমো দু’জনে পালাবার চেষ্টা করছিল ভিতরের দরজা দিয়ে। কিন্তু টারজান এগিয়ে গিয়ে ধরে ফেলল তাদের।

কোন সামন্তই তরবারি কোষমুক্ত করে এগিয়ে এল না আলেক্সটারের সাহায্যে। তারা সকলেই তাকে ছেড়ে চলে গেল।

আলেক্সটার টারজনের সামনে নতজানু হয়ে তার জীবন ভিক্ষা করতে লাগল। সে বলল, তুমি বিশ্বাস করো, কিছুক্ষণ আগেই আমি আদেশ দিয়েছি তোমাকে মুক্ত করে দেবার জন্য। তোমাকে এখানে এনে অনেক ধনরত্নও দিতাম। তোমার জন্য একটি প্রাসাদ, দাসদাসী এবং অনেক সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দিতাম।

টারজান বলল, এ কথা সেই সিংহপ্রান্তরে তোমার ভাবা উচিত ছিল। তোমার দান আমি গ্রহণ করি বা না করি, জনগণ অন্তত এভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠত না।

আলেক্সটার বলল, তাহলে এখন আমাকে নিয়ে কি করতে চাও তোমরা?

টারজান বলল, তোমার প্রজারা কি করবে তা জানি না, তবে যুডোকে যদি তারা রাজা না করে তাহলে ভুল করবে।

টারজান জানত সামন্তদের মধ্যে যুডোই রাজা হবার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। সে অভিজাতবংশীয়। দ্র, উদার এবং মার্জিত স্বভাব। জনগণ তাকে ভালবাসে।

টারজনের মুখ থেকে যুডোর নাম শুনে তার নামে সমর্থনের ধ্বনি দিতে লাগল জনগণ।

তা শুনে আলেক্সটারের মুখখানা ভয়ে সাদা হয়ে গেল। সে তখন ধীর পায়ে তোমোর কাছে গিয়ে বলল, তুমিই আমার এই সর্বনাম করলে। আমার বোনের আমলে তুমি আমাকে চক্রান্ত করে বছরের পর বছর ধরে কারাগারে বন্দী করে রাখ। তুমিই আমার বোনের জীবন মাটি করে দাও। আমার জীবনকেও কুপরামর্শ দিয়ে মাটি করে দিয়েছ। তোমার জন্যই আমি সিংহাসন হারালাম। কিন্তু আর তুমি কারো সর্বনাশ করতে পারবে না।

এই বলে সে মুহূর্তের মধ্যে খাপ থেকে তরবারি খুলে এত তাড়াতাড়ি এবং এত জোরে তোমোর মাথায় মারল যে তার মাথাটা দু’ফাঁক হয়ে গেল চোখের নিমেষে।

তার বোন নেমোনি যেমন একদিন পাগল হয়ে গিয়েছিল, তেমনি আলেক্সটারও পাগল হয়ে গেল। তোমোকে হত্যা করার পর সে এক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সেই তরবারিটা নিজের বুকে ঢুকিয়ে দিল।

তারপর পড়ে গেল।

এইভাবে ক্যাথনির রাজবংশের শেষ রাজা আলেক্সটারের জীবনের অবসান ঘটল।

ক্যাথনি থেকে যে পথটা এ্যাথনি নগরের দিকে চলে গেছে সেই পথ দিয়ে যেতেই এ্যাথনির দক্ষিণ দিকের নগরদ্বার পাওয়া যায়। নগরদ্বারের সামনে আছে এক বিস্তীর্ণ সমতল প্রান্তর। সেখানে যোদ্ধারা

হাতিদের প্রশিক্ষণ দেয়। নগরের উত্তর দিকে আছে প্রচুর চাষের জমি। সেখানে ক্রীতদাসরা চাষের কাজ করে।

তখন বিকাল বেলা। নগরদ্বারের উপরে যে পর্যবেক্ষণের ঘর ছিল সেখানে প্রহরীরা দিনরাত পাহারা দেয়।

সহসা একজন প্রহরী বলে উঠল, দক্ষিণ দিক থেকে একটা লোক আসছে।

 পাশা খেলতে খেলতে অন্যান্য প্রহরীরা বলল, কত জন?

 বললাম ত একজন।

তাহলে বিপদসূচক ঘণ্টা বাজাবার দরকার নেই। কিন্তু একা এ্যাথনিতে কে আসবে? ও কি ক্যাথনির লোক?

প্রথম প্রহরী বলল, লোকটা অবশ্য এখনো অনেক দূরে আছে। তবে তার পোশাক দেখে ত ক্যাথনির লোক বলে মনে হচ্ছে না। ওর পোশাকটা অদ্ভুত ধরনের মনে হচ্ছে।

প্রহরীদের অফিসার আরো উপরে উঠে গিয়ে ভাল করে দেখুল। পরে বলল, লোকটা ক্যাথরি নয়। লোকটা হয় খুব বোকা না হয় খুব সাহসী। তা না হলে একা ও এ্যাথনিতে আসত না।

স্ট্যানলি উড একা হাঁটতে হাঁটতে নগরদ্বারের কাছে এসে পড়লে প্রহরীরা যে ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল সে ভাষা বুঝল না সে।

উড ইশারা করে বলল, সে বন্ধু।

গেট খুলে বেরিয়ে এল প্রহরীরা। তারা উডের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু উড তাদের কোন কথা বুঝতে না পারায় তারা নগরের ভিতরে নিয়ে গেল।

উড দেখল রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট পাকা দোকান ঘর রয়েছে।

উডকে দেখার জন্য রাস্তার ধারে ধারে কিছু ভিড় জমে উঠল। তাদের ভাষা বুঝতে না পারার জন্য খুবই অস্বস্তিবোধ করতে লাগল উড। গনফালা সম্বন্ধে সে কার কাছে কিভাবে খোঁজখবর নেবে তা বুঝতে। পারল না। তাছাড়া ওরা বন্দী করবে না অতিথি হিসেবে রেখে দেবে তাও বুঝতে পারল না।

উড ঠিক করল যেমন করে হোক ওদের ভাষাটা আগে শিখে নিতে হবে।

উডকে প্রথমে নগরের মাঝখানে এক বিরাট প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটা বড় বাড়ির উঠোনে নিয়ে যাওয়া হলো।

উডকে সেখান থেকে বার করে তার দিয়ে ঘেরা একটা চারকোণা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণকায় মিলে প্রায় পঞ্চাশজন বন্দী ছিল। উড বুঝল তাকে ওরা বন্দী করেছে।

হঠাৎ বন্দীদের মধ্যে কে একজন উডের নাম ধরে ডাকতেই চমকে উঠল উড। দেখল, শ্বেতাঙ্গ বন্দীদের মধ্যে স্পাইক আর স্ট্রোল রয়েছে।

স্পাইককে দেখার সঙ্গে সঙ্গে রাগে জ্বলে উঠল উডের সর্বাঙ্গ। সে ঘুষি পাকিয়ে তাকে মারতে গেল। স্পাইক আর স্ট্রোলই বিশ্বাসঘাতকতা করে গলফান ও গনফালাকে চুরি করে নিয়ে পালায়।

কিন্তু স্পাইক রাগল না। সে উডকে বলল, কি করে তুমি এলে এখানে? এখন ওসব করে বা ঝগড়াঝাটি করে কোন লাভ হবে না। এখন একযোগে কাজ করতে হবে। উদ্ধারের কথা ভাবতে হবে।

উড বলল, গনফালা কোথায়? তাকে নিয়ে কি করেছ তোমরা?

স্ট্রোল বলল, ওরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে। তার পর থেকে তার আর দেখা পাইনি আমরা। যেদিন আমাদের বন্দী করে ওরা সেদিন থেকেই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

স্পাইক বলল, আমার মনে হয় গনফালাকে রাজপ্রাসাদে রাখা হয়েছে। ওরা বলছে ওদের রাজার নজর পড়েছে গনফালার উপর। সেই নোংরা লোকটা গলফান আর গনফালা দুটোকেই নেবে।

উড বলল, তোমরা কি জন্য তাকে চুরি করেছিলে? যদি তোমাদের কেউ তার কোন ক্ষতি করে থাক তাহলে

স্ট্রোল বলল, আমার বোনের ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।

স্পাইক বলল, এখান থেকে তাকে নিয়ে যাবার আগে পর্যন্ত কেউ তার কোন ক্ষতি করেনি। তবে এখান থেকে তাকে নিয়ে যাবার পর কি হয়েছে জানি না।

স্পাইক বলল, সত্যিই পাথরটা সব সময় অভিশাপ হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে। ওটা শুধু দুর্ভাগ্যই এনেছে। আমার ও স্ট্রোলের দিকে একবার তাকিয়ে দেখ। আমাদের অবস্থা কি হয়েছে দেখ। আমার পান্নাটা হারিয়েছি, হীরেটাও হারালাম। এখন আমাদের হাতির খাদ্য একরকমের ভুষি খাওয়ানো হয়।

উড দেখল স্পাইক ইতোমধ্যেই ঐ অঞ্চলের কিছু ভাষা শিখেছে। তার কিছু কিছু কথা অন্যান্য বন্দীরা বুঝতে পারছে।

উড এবার নিজেকে বুঝিয়ে ঠিক করল, স্পাইক আর স্ট্রোলের প্রতি তার মনোভাবের পরিবর্তন করা উচিত। তারা যত শত্রুতাই করে থাক, এখন তাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা না করে একসঙ্গে মুক্তির কোন উপায়ের জন্য বরং চেষ্টা করা উচিত।

এরপর উডকে ভালথরের কাছে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল ওদের ভাষায়। বলল, আমার বন্ধু তোমার কাছে তোমাদের ভাষা শিখতে চায়।

ভালথর উডের বাড়িয়ে দেয়া হাতটা মর্দন করে হাসিমুখে বলল, ঠিক আছে, ও আমাকে ইংরেজি ভাষা শিখিয়ে দেবে, আমি ওকে আমাদের ভাষা শিখিয়ে দেব।

সেদিন থেকে স্বৈরাচারী শাসক ফোরোসের প্রাসাদের অস্তাবলে হাতিদের দেখাশোনার কাজ করতে লাগল উড অন্যান্য ক্রীতদাসদের মত।

আস্তাবলের কাজ ছাড়াও আর একটা কাজ করতে হত উডকে। ভালথর, স্পাইক আর স্ট্রোলের সঙ্গে তাকে নগরের দক্ষিণ দিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে হাতির পিঠে চড়ে গিয়ে হাতিদের বশ করতে হত। সাধারণ ক্রীতদাসদের থেকে তার বুদ্ধি বেশি ছিল বলে এ কাজের ভার দেয়া হয় তাকে।

রোজ সকালের দিকেই হাতির পিঠে চড়ে ফাঁকা মাঠে যেতে হত তাদের। একদিন সকালবেলায় মাঠ থেকে ফিরে আসার পর যখন হাতিদের গা ধুয়ে দিচ্ছিল তখন হঠাৎ হুকুম আসে তাদের আবার হাতি নিয়ে মাঠে যেতে হবে।

হাতির পিঠে চড়ে মাঠের দিকে তারা এগোতেই যোদ্ধারা তাদের বলল, একটা বুনো হাতিকে বশ করে আস্তাবলে নিয়ে আসার জন্যই তাদের পাঠানো হচ্ছে। বুনো হাতিটা মাঠের ফসলের ক্ষতি করছে এবং কিছুতেই পোষ মানতে চাইছে না।

একজন যোদ্ধা আবার বলল, হাতিটা একেবারে বুনো এবং পাগলা। তা যদি হয় তাহলে আমরা কেউ জীবন নিয়ে আর ফিরতে পারব না।

ভালথর বলল, জাইগোর শাসনকালে সামন্তরা বুনো হাতি বশ করে আনতে যেত, ক্রীতদাসদের পাঠানো হত না।

ভালথর একজন সামন্ত। তাই ভালথরের দু’পাশে যোদ্ধা ও ক্রীতদাসরা হাতি চালিয়ে যেতে লাগল। উড ছিল ভালথরের একেবারে পাশে।

একজন যোদ্ধা চীৎকার করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দেখা গেল দূরে একটা বাঁশবন থেকে সেই বুনো হাতিটা বেরিয়ে আসছে।

ভালথর উডকে সাবধান করে দিল, হাতিটা আকারে বিরাট এবং একেবারে বুনো। ও এই দিকেই আসছে। একটুও ভয় নেই। তুমি সাবধানে এগোবে, রক্ষীরা যাই বলুক বেশি এগোবে না ওর কাছে তাহলে সংযত করতে পারবে না তোমার হাতিকে।

উড বলল, এত বড় হাতি আমি কখনো দেখিনি।

ভালথর বলল, আমিও না। ওর দাঁতটা আবার কালো।

উড বলল, এখন আমাদের কি করতে হবে? কিভাবে ওকে বশ করা হবে আমি ত তার কিছু খুঁজে পাচ্ছি না।

ভালথর বলল, কয়েকটা মেয়ে হাতিকে ওর আশে পাশে পাঠিয়ে ওকে ভুলিয়ে নগরদ্বারের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে।

এমন সময় বুনো হাতিটা ওদের দেখে তার গুঁড়টা তুলে কুদ্ধভাবে গর্জন করতে লাগল। যে অফিসার ওদের নেতৃত্ব দান করছিল সে কয়েকজন ক্রীতদাসকে তাদের মেয়ে হাতি নিয়ে বুনো হাতিটার কাছে। যেতে বলছিল।

কিন্তু বুনো হাতিটা মেয়ে হাতিদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অফিসার যে পুরুষ হাতিটার পিঠে চেপে ছিল সেই পুরুষ হাতিটাকে আক্রমণ করল। হাতিটা পড়ে যেতে তার পিঠ থেকে অফিসারও পড়ে গেল। অফিসারের আর্ত চীৎকারের সঙ্গে বুনো হাতিটার গর্জন মিশে গেল। অফিসার ছুটে পালাতে লাগল।

ভালথর উডকে নিয়ে তাদের মেয়ে হাতি দুটোকে চালিয়ে বুনো হাতিটার দিকে যেতে লাগল। কিন্তু তারা তার কাছে যাবার আগেই বুনো হাতিটা ছুটতে থাকা অফিসারকে হুঁড় দিয়ে ধরে পা দিয়ে পিষে ফেলল।

তার ক্রোধের বস্তুটাকে ইচ্ছামত মেরে পিষে ফেলার পর শান্ত হয়ে লেজ নাড়ছিল বুনো হাতিটা। ঠিক তখনি ভালথর আর উড তাদের দুটো মেয়ে হাতি নিয়ে গিয়ে বুনো হাতিটার দুপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন আর পাগলামির চিহ্নমাত্র নেই তার মধ্যে।

এ্যাথনির লোকেরা হাতি ধরার সময় অনুচ্চ স্বরে এক ধরনের সুরের গান গাইত। সে গানের কোন বাণী ছিল না।

দুটো মেয়ে হাতির মাঝখানে বুনো হাতিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল নগরের দিকে। আর কোন দৌরাত্ম্য দেখাল না। অন্যান্যরা তাদের পিছু পিছু আসতে লাগল।

সকলেই ভালথরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে লাগল। উড তাকে বুনো হাতি ধরতে সাহায্য করায় তার কথা রাজপ্রাসাদে চলে গেল।

পরদিন একজন অফিসার এসে উডকে জানাল ফোরোস তাকে দেখতে চেয়েছে।

সূর্য কিছুক্ষণ আগে পশ্চিম আকাশটাকে রাঙিয়ে দিয়ে গেছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নিঃশব্দে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছিল থেনারের উপত্যকার উপরে। টারজান তখন একা ক্যাথনি থেকে এ্যাথনি নগরীর দিকে এগিয়ে আসছিল গনফালার খোঁজে।

টারজনের সহায়তায় যুড়ো ক্যাথনির সিংহাসনে বসার পর সে টারজানকে একা এ্যাথনিতে যেতে নিষেধ করে। জেমননও তাকে এ কাজ থেকে প্রতিনিবৃত্ত করার অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু কারও কথা শোনেনি টারজান। সঙ্গে কোন সেনাদল না নিয়েই একা যাবে এ্যাথনিতে।

যুডো তখন তাকে বলে, ঠিক আছে, তুমি যাও। কিছুদিনের মধ্যে ফিরে না এলে তোমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি এক সেনাদল পাঠাব।

টারজান বলল, আমি ফিরে না এলে বুঝবে আমি মরে গেছি।

যুডো বলল, ওরা তোমাকে মারবে না। ওদের নগরে এখন কাজের লোকের দরকার। তোমার মত চেহারার লোককে ওরা কিছুতেই মারবে না।

জেমনন বলল, হাতির পরিচর্যা না করিয়ে তোমাকে ওরা যুদ্ধের কাজে লাগাবে।

থেনারের উপত্যকায় অনেক সিংহ আছে বলে দিনেরবেলায় সেদিকে পথ চলত না টারজান। থেনারের উপত্যকার সিংহগুলো সাধারণ সিংহ নয়। তাদের বেশির ভাগই ক্যাথনি থেকে পালিয়ে মানুষ শিকারের জন্য প্রশিক্ষণ পাওয়া সিংহ। তাদের মানুষের মাংস খেতে দেয়া হত।

টারজান দেখল তার সামনে কিছুদূরে একটা পাহাড়ের উপর চাঁদ উঠেছে।

টারজান তার চলার গতি বাড়িয়ে দিল। সে ডাক শুনে বুঝল মোট পাঁচটা সিংহ একসঙ্গে আসছে। সে আরও বুঝল সিংহগুলো তার পিছনে এক মাইল দূরে আছে আর তার সামনে যে বন আছে তার দূরত্ব সেখান থেকে তিন মাইল।

এবার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল টারজান। কিন্তু বনের কাছে যেতেই দেখল সামনে একটা সিংহ তার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে তার পিছনে সেই পাঁচটা সিংহ এগিয়ে আসছে দ্রুত গতিতে। টারজান তখন তার বুকের ভিতর থেকে বাদর গোরিলাদের মত এক ভয়ঙ্কর শব্দ বার করে চীৎকার করে উঠতেই তার পথ থেকে সরে গেল সিংহটা। টারজান এক লাফে একটা গাছের ডালে গেল উঠে পড়ল। এদিকে সেই পাঁচটা সিংহ তাকে ধরার জন্য লাফ দিল একসঙ্গে।

টারজান গাছের অনেক উপরে তাদের নাগালের বাইরে উঠে গিয়ে গাছ থেকে পাতা আর শুকনো ডাল ফেলে সিংহগুলোর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে তাদের রাগিয়ে দিল আরও। তারপর সেখানে আর সময় নষ্ট না করে গাছের ডালে ডালে এ্যাথনির দিকে চলে গেল।

বাগানটার একদিকে একটা টিনের চালা ছিল। তার মাথায় উঠে দেখল সেদিকে প্রাচীরের ওপারেই একটা রাস্তা নগরের মধ্যে চলে গেছে। টিনের চাল থেকে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ল টারজান।

চাঁদের আলোয় পথঘাট সূব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। পথে কোন লোক ছিল না। পথের দু’ধারের বাড়িগুলোর সব দরজা বন্ধ। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সহসা টারজান দেখল একটা বাড়িতে জানালা খুলে একটা লোক তাকে প্রশ্ন করল, কে তুমি? এত রাতে এখানে কি করছ?

টারজান অনুচ্চ গলায় উত্তর করল, আমি ডাইমন।

এটা জেমননের কাছ থেকে শিখেছিল সে। জেমনন অকে বলেছিল এ্যাথনির লোকেরা বিশ্বাস করে ডাইমন নামে এক প্রেতাত্মা রাত্রিতে ঘুরে বেড়ায় এবং ইচ্ছামত যে কোন মানুষের জীবন নাশ করতে পারে। তাই হঠাৎ কারো মৃত্যু ঘটলে বা রাত্রিতে কেউ মারা গেলে তারা বলে ডাইমন তাকে নিয়েছে।

টারজনের মুখ থেকে ‘ডাইমন’ নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধ করে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল সেই লোকটা।

ছায়াচ্ছন্ন সেই রাস্তাটা দিয়ে এগিয়ে নগরের মাঝখানে রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি এসে পড়ল টারজান। সে শুনেছিল এ্যাথনির রাজপ্রাসাদের উত্তর ও দক্ষিণদিকের দরজাতেই দিনরাত পাহারা থাকে।

প্রাসাদের চারদিকে যে প্রাচীর ছিল, পশ্চিম দিকে গিয়ে সেই প্রাচীরের উপর উঠে পড়ল। টারজান উঠে দেখল তার গায়ে একটা সুন্দর সাজানো বাগান রয়েছে। সেই বাগানে নেমে সে একটা বড় বাড়ির কাছে চলে গেল। সে বুঝল এটাই রাজপ্রাসাদ। দেখল বাড়িটার মধ্যে অনেকগুলো ঘরে তখনো আলো জ্বলছে।

সেই সব ঘরগুলোর মধ্যে একটা ঘরে দেখল ভোজসভার অনুষ্ঠান চলছে। প্রশস্ত ঘরখানার মাঝখানে একটা বিরাট লম্বা টেবিলের চারদিকে প্রায় একশোজন তোক খাওয়ার পর ঝিমোচ্ছে। বেশির ভাগ লোকই অতিরিক্ত মদ খেয়ে মাতাল হয়ে উঠেছে। অনেকে কথা বলছে, হাসছে, আবার মারামারি করছে।

লোকগুলোকে দেখে ক্যাথনির সামন্তদের মত ভদ্র বলে মনে হলো না টারজনের। এই ভোজসভার যে প্রধান সে টেবিলের সামনে বসে ছিল। লোকটাকে একটা পশু বলে মনে হচ্ছিল। সে কেবল ভৃত্য ও ক্রীতদাসদের হুকুম করছিল। এই লোকটিই হলো রাজা ফোরোস।

এক সময় সেই গৃহস্বামী লোকটা টেবিল চাপড়ে একজন ক্রীতদাসকে বলল, আমি তাকে নিয়ে আসার জন্য বলিনি তোকে?

ক্রীতদাসটি বলল, কাকে হুজুর?

 কেন, সেই মেয়েটিকে।

কোন্ মেয়েটিকে?

ক্রীতদাসটি ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, আমি আনতে পারব না। মেনোফ্রা তাহলে আমার পিঠের চামড়া তুলে নেবে।

ফোরোস বলল, মেনোফ্রা জানতে পারবে না। সে এখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

ফোরোসের পাশে যে একটা লোক বসেছিল সে কিন্তু অন্যান্যদের মত মাতাল হয়নি। সে ফোরোসকে পরামর্শ দিল, কাউকে পাঠিও না মেয়েটাকে আনার জন্য। ওকে আনতে হবে না। মেনোফ্রা তাহলে যে আনতে যাবে তার ও তোমার হৃৎপিণ্ড উপড়ে নেবে।

ফোরোস তখন চীৎকার করে বলে উঠল, তাহলে রাজা কে?

অন্য লোকটি বলল, মেনোফ্রাকে জিজ্ঞাসা করো একথা।

ফোরোস জোর গলায় বলল, আমি রাজা।

এই বলে সে একজন ক্রীতদাসকে ডাকল। কিন্তু ক্রীতদাসটা অন্য দিকে তাকিয় থেকে না শোনার। ভান করল। ফোরোস তখন একটা মদের পেয়ালা ছুঁড়ে দিল লোকটার দিকে। একটুর জন্য বেঁচে গেল। তার মাথাটা।

ফোরোস গর্জন করে বলল, যাও, মেয়েটাকে নিয়ে এস।

ক্রীতদাসটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে ফোরোস বলল, মেনোফ্রা যদি তার কাজে নাক গলাতে আসে তাহলে সে তাকে ছেড়ে দেবে না।

এই বলে জোরে হাসতে গিয়ে ফোরোস পড়ে গেল মাটিতে। এমন সময় সকলেই ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে মুখ তুলে তাকাল।

ঘরখানার বাইরে পিছন দিক থেকে সব দেখছিল ও শুনছিল টারজান। সারাক্ষণ নীরবে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল সে। তবে ফোরোসের কথা শুনে বুঝতে পারল না যে মেয়েটিকে সে আনতে বলল সে। মেয়েটি কে।

ঘরের সকলে দরজার দিকে মুখ তুলে তাকাতেই টারজানও সেদিকে তাকাল। সে দেখল, উঁচু পুরুষালি চেহারার একটি মেয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। টারজান দেখল মেয়েটার গালপাট্টা আর নাকের নিচে স্পষ্ট মোচের রেখা রয়েছে।

টারজান বুঝল এই মেয়েটাই ফোরোসের স্ত্রী মেনোফ্রা।

মেনোফ্রা সোজাসুজি ফোরোসকে জিজ্ঞাসা করল, এই অসময়ে তুমি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছ কেন?

ফোরোস অবাক হয়ে গেল। সে ভয় পেয়ে গেল।

 ফোরোস বলল, আমরা এই উৎসবে যোগদান করার জন্য তোমাকে ডাকছিলাম।

মেনোফ্রা ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল, কিসের উৎসব?

ফোরোস তার পাশের লোককে বলল, কিসের উৎসব ক্যান্ডো?

 ক্যান্ডো কি উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে জিব দিয়ে ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নিতে লাগল।

মেনোফ্রা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, আমার কাছে মিথ্যা কথা বলো না। আসলে তুমি আমাকে নয়, অন্য কোন মেয়েকে ডেকে পাঠিয়েছিলে।

এরপর যে ক্রীতদাস তাকে ডাকতে গিয়েছিল তার দিকে ঘুরে মেনোফ্রা বলল, বল আমাকে আনতে গিয়েছিল কি ও পাঠিয়েছিল তোমায়?

ক্রীতদাসটি নতজানু হয়ে বলল, হে মহীয়সী রানীমা, আমি ভেবেছিলাম উনি আপনাকেই আনতে।

ওকে কি বলেছিল তোমায়?  

উনি বলেছিলেন, মেয়েটিকে নিয়ে এস। আমি যখন ওঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন্ মেয়েটি? তখন উনি বললেন এ্যাথনিতে ত একটিই মেয়ে আছে।

মেনোফ্রা এবার ভ্রূকুঞ্চিত করে বলল, এবার বুঝেছি কোন্ মেয়ে। সেই বিদেশী মেয়েটা যাকে দুটো লোকের সঙ্গে ধরা হয়েছিল। অনেকদিন থেকেই তুমি এটা চাইছিলে। কিন্তু সাহস পাওনি।

এরপর মেনোফ্রা উপস্থিত সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলল ঘর থেকে। বলল, যত সব শুয়োরের দল। বেরিয়ে যাও ঘর থেকে।

এই বলে সে সোজা ফোরোসের কাছে গিয়ে তার একটা কান ধরে বলল, এই রাজামশাই, তুমি এবার আমার সঙ্গে এস ত।

টারজান এবার সেই ঘরের বাইরে জানালা থেকে সরে গিয়ে দোতলার দিকে তাকাল। তার মনে হলো দোতলার কোন একটা ঘরেই শুয়ে আছে গনফালা। চুপ করে উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে তার তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তির দ্বারা উপর তলার ঘর থেকে আসা গন্ধের শ্রেণীবিশ্লেষণ করে দেখতে লাগল সে। নাক ডাকার শব্দে সে বুঝতে পারল সে ঘরে কেউ একজন ঘুমোচ্ছে। সে ঘরটা ছিল একেবারে অন্ধকার।

টারজান সেই জানালা দিয়ে উপর তালায় উঠে গরাদহীন জানালার ভিতর দিয়ে দোতলার অন্ধকার ঘরটায় পড়ল।

একটা ঘর থেকে জোর বাক-বিতণ্ডার শব্দ আসছিল। টারজান বুঝল ফোরোস আর মেনোফ্রার মধ্যে। জোর ঝগড়া হচ্ছে। হঠাৎ সেই ঘরের মেঝের উপর একজনের পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। তারপরই সব চুপ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফোরোস দরজা খুলে একটা রক্তমাখা তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে। আসতে লাগল।

টারজান তখন সেই অন্ধকার ঘরখানার মধ্যে দরজটা অর্ধেক খুলে তার পাশে লুকিয়ে রইল। সে দেখল ফোরোস সেই বারান্দাটার শেষ প্রান্তে গিয়ে আর একটা বারান্দায় গিয়ে পড়ল। টারজান অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগল।

তারপর দেখল ফোরোস চাবি বার করে একটা ঘরের তালা খুলে তার মধ্যে ঢুকে পড়ল। কিন্তু দরজাটা বন্ধ করল না। টারজানও দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে নিঃশব্দে এমনভাবে ঢুকে পড়ল যে ফোরোস তা টের পেল না। চর্বি দিয়ে জ্বালানো একটা প্রদীপের আলোয় স্বল্প আলোকিত ছিল ঘরখানা।

সেই ঘরের এক কোণে হাত পা বাঁধা অবস্থায় গনফালা শুয়ে ছিল। আর এক কোণে সেইভাবে শুয়েছিল স্ট্যালিন উড।

ফোরোস হঠাৎ তরোয়ালটা নিয়ে গনফালার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সে তরোয়ালটা ধরে গনফালাকে হত্যা করার জন্য তুলতেই টারজান সেটা পিছন থেকে কেড়ে নিয়ে ফোরোসকে ফেলে দিল মেঝের উপর।

টারজান চাপা গলায় বলল, চুপ করে থাকবে, তা না হলে তোমায় খুন করব।

ফোরোস দেখল নগ্নপ্রায় এক দৈত্যাকার মূর্তি তারই তরোয়ালটা তার বুকের উপর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

ফোরোস বলল, কে তুমি? বল কি চাও? তুমি যা চাও তাই দেব, শুধু আমাকে প্রাণে মেরো না।

টারজান বলল, আমি যা চাই তা আমি ঠিক নেব, তুমি নড়বে না।

এই বলে সে প্রথমে উডের ও তারপর গনফালার বাঁধন কেটে দিল। এরপর উডকে বলল, ফোরোসকে বেঁধে ফেল। তার মুখটাও বেঁধে দাও যাতে চেঁচাতে না পারে।

উড তাই করলে টারজান তাকে বলল, এখানে কি করে এলে?

উড বলল, আমি গনফালার খোঁজ করতে করতে এই নগরে এসে পড়ি। তারপর ওরা বন্দী করে আমায়। স্পাইক স্ট্রোলকেও ওরা বন্দী করে রেখেছে। তাদের কাছ থেকে গনফালটাও নিয়ে নিয়েছে।

এরপর তিনজনেই স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সহসা বারান্দায় কার পায়ের শব্দ শুনতে পেল ওরা। সঙ্গে সঙ্গে দরজা ঠেলে দরজার সামনে একবার দাঁড়িয়ে তাদের দেখে নিল মেনোফ্রা। তার মাথা ও কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছিল তখনো। তার পোশাকটা রক্তে ভিজে গেছে।

মেনোফ্রা কিছু না বলে দরজাটায় তালা দিয়ে রক্ষীদের ডাকতে গেল।

 উড বলল, আমরা বেশ ফাঁদে পড়লাম।

 গনফালা বলল, কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য! উড বলল, রক্ষীরা ছুটে আসছে।

 বারান্দায় মেনোফ্রার সঙ্গে রক্ষীদের কথাবার্তা হচ্ছিল।

মেনোফ্রা দরজা খুলে রক্ষীদের বলল, একটা বুনো লোক ঢুকে বন্দীদের মুক্ত করে দিয়েছে আর রাজাকে বেঁধে রেখেছে। ওরা রাজাকে মেরে ফেলতে পারে। আমি সেটা চাই না। আমি নিজের হাতে রাজাকে মারতে চাই। তোমরা বিদেশীদের বন্দী করে রাজাকে আমার কাছে নিয়ে এস।

টারজান দরজার কাছে গিয়ে রক্ষীদের বলল, যদি তোমরা আমার বিনা অনুমতিতে ঘরে ঢোক তাহলে রাজাকে আমি হত্যা করব।

রক্ষীরা মুস্কিলে পড়ল। কি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল মেনোফ্রার সঙ্গে।

উড ফোরোসকে বলল, রানী তোমাকে পেলে মেরে ফেলবে।

 কিন্তু মুখ বন্ধ থাকায় ফোরাস কোন কথা বলতে পারল না।

টারজান বলল, ভালথর আমাদের কোনভাবে সাহায্য করতে পারে না?

উড বলল, তাকে ওরা ক্রীতদাস করে রেখেছে।

 টারজান বলল, আমি ক্যাথনিতেই এসব শুনেছিলাম। তাই এখানে এসে ভালথরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম।

এমন সময় দরজায় কারা ঘা দিল।

 টারজান বলল, কি চাও তোমরা?

রক্ষীরা দরজা খুলে বলল, রাজাকে রানীর হাতে তুলে দাও। তাহলে তোমাদের মুক্তি দেয়া হবে। কোন ক্ষতি করা হবে না।

টারজান তখন উডকে রাজার মুখের বাঁধন খুলে দিতে বলল।

ফোরোস কাতর মিনতির সুরে বলল, আমাকে তোমরা রানীর হাতে তুলে দিও না। ও আমাকে খুন করবে।

টারজান বলল, আমরা তাহলে একটা চুক্তি করতে পারি।

ফোরোস বলল, যে কোন শর্ত আমি মেনে নেব।

 টারজান বলল, আমাদের মুক্তি দিয়ে প্রহরীসহ থেনার উপত্যকা পার করে দিতে হবে।

ফোয়োস বলল, কথা দিচ্ছি তাই হবে।

উড বলল, হীরের তালটাও দিতে হবে।

হ্যাঁ, তাই দেয়া হবে।

টারজান বলল, কি করে জানব তুমি তোমার কাজ করবে? আমরা তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। তারপর ছেড়ে দেব।

ফোয়োস বলল, আমি তোমাদের সব দাবি মেনে নেব। শুধু রানীর হাতে আমাকে তুলে দিও না।

 টারজান বলল, আর একটা কথা। ভালথরকে মুক্তি দিতে হবে।

 সে দাবিও মঞ্জুর করলাম!

উড টারজানকে বলল, ফোরোসকে তুমি নগরের বাইরে নিয়ে গেলেই ওরা অন্য কাউকে রাজা করবে।

এরপর সে ফোরোসকে বলল, রক্ষীরা তোমার কথা শুনবে ত?

ফোরোস বলল, তা ত জানি না। ওরা সবাই রানীকে ভয় করে।

 টারজান এবার ফোরোসের বাঁধন খুলে বলল, আমার সঙ্গে দরজার সামনে চল।

 ফোরোস মেনোফ্রাকে বলল, আমার কথা শোন।

মেনোফ্রা বলল, কোন কথা শুনব না, খুনী কোথাকার। আমি শুধু তোমাকে একবার আমার হাতে পেতে চাই।

ফোয়োস বলল, আমার কথা শোন। ক্যান্ডোকে ডেকে পাঠাও। তাকে সব কথা বল।

মেনোফ্রা রক্ষীদের বলল, কাপুরুষদের দল, দেখছ কি? তাদের টেনে বার করে আন ঘর থেকে।

ফোরোস বলল, থান তোমরা, এগোবে না। আমি রাজা। রাজার আদেশ।

মেনোফ্রা বলল, আমি রানী। আমি বলছি যাও, রাজাকে মুক্ত করে আন।

ফোরোস বলল, আমি ঠিক আছি। আমাকে মুক্ত করার প্রয়োজন নেই।

 তখন একজন অফিসার গিয়ে ক্যান্ডোকে ডেকে আনল।

ক্যান্ডো এসে রানীর সব কথা শুনে রানীকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে কি আলোচনা করল। তারপর সে টারজনের সামনে এসে বলল, সব ঠিক হয়ে গেছে। রানী অনুমতি দিয়েছেন। তোমরা কাল সকালেই প্রাতরাশ খাওয়ার পর মুক্তি পেয়ে চলে যাবে। তোমাদের সঙ্গে প্রহরী দেয়া হবে। এখন রাত্রিকাল। তাই বেরোন ঠিক হবে না। শুধু তোমরা কথা দেবে তোমরা রাজার কোন ক্ষতি করবে না।

টারজান বলল, কথা দিলাম।

পরদিন সকাল হতেই উডের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে ভাবল সব বিপদ কেটে গেছে একেবারে। সে বলল, এখন আমার ক্ষিদে পেয়েছে। এখন খাবার চাই।

এমন সময় কে একজন দরজার তালা খুলে দুটো খাবারের থালা ঘরের মধ্যে রেখেই দরজা বন্ধ করে চলে গেল।

খাবার মানে শক্ত জিনিস কিছু নেই। শুধু দু’থালা ঝোল। তরল ঝোলের সঙ্গে কুচি কুচি মাংস মেশানো ছিল। ওরা তিনজনে ভাগ করে তাই খেল।

ফোরোস বলল, এটা খুবই সুস্বাদু খাবার। মেনোফ্রা ভাল খাবারই পাঠিয়েছে।

 কিন্তু সে খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম নেমে এল গনফালার চোখে। সে বলল, আমার বড় ঘুম পাচ্ছে। চোখ দুটোকে খুলে রাখতে পারছি না।

উডেরও তাই হলো। উডও তাই বলল।

দেখতে দেখতে সকলেরই চোখ জড়িয়ে এল। গভীর ঘুমে অচৈতন্য হয়ে উঠল সবাই।

একটি ঘরের মধ্যে খাটের উপর পাতা বিছানায় কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে হাতের তালুতে মাথা রেখে শুয়ে ছিল মেনোফ্রা। দরজার কাছে চারজন যোদ্ধা পাহারায় নিযুক্ত মেনোফ্লার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাভো। তার পায়ের দিকে খাটের নিচে উড আর গনফালা অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে ছিল। ফোরোসও অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে ছিল। তবে তার হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছিল।

মেনোফ্রা ক্যান্ডোকে জিজ্ঞাসা করল, আমার কথামত বুনো লোকটাকে ক্রীতদাসদের ঘরে বেঁধে রেখেছ?

ক্যান্ডো বলল, হ্যাঁ রানীমা। সে খুব বলবান বলে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি।

উডই প্রথমে চোখ খুলল। তার জ্ঞান ফিরলে সে দেখল তার পাশে শুয়ে আছে গনফালা। তার তখনো জ্ঞান ফেরেনি। তবে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তার বুকটা ওঠানামা করছিল বলে বুঝল সে এখনো বেঁচে আছে।

উড এবার রানী ও ক্যান্ডোর পানে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলল, এইভাবে তোমরা তোমাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করছ। আমাদের আর একজন কোথায়?

ক্যান্ডো বলল, সে নিরাপদেই আছে। রানীমা দয়া করে তোমাদের কাউকেই মারেননি।

উড আবার জিজ্ঞাসা করল, আমাদের নিয়ে কি করতে চাও তোমরা?

মেনোফ্রা বলল, বুনো লোকটাকে সিংহের মুখে ফেলে দেয়া হবে। আর আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের হত্যা করা হবে না।

কি তোমার উদ্দেশ্য?

 কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারবে।

এই বলে সে ক্যান্ডোকে আদেশ করল, একজন পুরোহিতকে ডেকে আন। ফোরোস এখনি জেগে উঠবে।

গনফালা এবার জেগে উঠে বসে বলল, আমরা এখন কোথায়? কি হয়েছে?

 উড বলল, আমরা এখন বন্দী। ওরা আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

গনফালার চোখে জল এসেছিল। উড তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, সাহস অবলম্বন করো, ধৈর্য ধরো।

এমন সময় ফোরোস, জেগে উঠল। মেনোফ্রা বলল, ইঁদুরটা জেগে উঠেছে।

ফোরোস বলল, তুমি তাহলে আমাকে উদ্ধার করেছ?

এখন তা বলতে পার। পরে বুঝতে পারবে।

ফোরোস বলল, ক্যান্ডো, আমার বাঁধন খুলে দাও। রাজাকে এভাবে বেঁধে রাখাটা ভাল দেখায় না।

 আমার কিন্তু ভালই লাগছে দেখতে। তপ্ত লোহার শিকল দিয়ে তোমাকে বেঁধে রাখা উচিত ছিল।

এমন সময় একজন যোদ্ধা এসে খবর দিল, পুরোহিত এসে গেছে।

মেনোফ্রার আদেশে উড আর গনফালা একটা বেঞ্চের উপর বসল।

পুরোহিত ঘরে ঢুকলে মেনোফ্রা তাকে বলল, এদের বিয়ে দিয়ে দাও।

বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল উড আর গনফালা। গনফালা বলল, এটা কখনই স্বাভাবিক বিয়ে নয়। এর মধ্যে কোন কুমতলব আছে।

অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়েটা হয়ে গেল। বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল মেনোফ্লার মুখে। রাগে লাল হয়ে উঠল ফোরোসের মুখখানা।

 বিয়েটা হয়ে গেলে মেনোফ্রা ফোরোসকে বলল, আমাদের দেশের আইন তুমি জান। রাজা বা প্রজা যেই হোক, এদের মাঝখানে এলেই তার মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হবে। এবার ফোরোস চিরদিনের মত মেয়েটাকে হারাল। আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব। একই ঘরে তুমি মেয়েটার সঙ্গে বাস করবে। কিন্তু খুব সাবধান। আমি তোমার উপর লক্ষ্য রাখব।

এরপর সে রক্ষীদের বলল, এই লোকটাকে ক্রীতদাদের ঘরে নিয়ে যাও। তবে দেখবে এর যেন কিছু না হয়। আর ফোরোস ও মেয়েটাকে আমার ঘরের পাশের ঘরটায় তালাবন্ধ করে রাখবে।

এদিকে টারজান জ্ঞান ফিরলে দেখল তার হাত পা শিকল দিয়ে বাঁধা। তার গলায় লোহার বেড়ী। সে যে ঘরে বন্দী হয়ে আছে সে ঘরে আর কেউ নেই।

সূর্যের অবস্থান দেখে সে বুঝল খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল এবং সেই খাবার খেয়ে এমন ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল সে। ওষুধের ক্রিয়া এখন শেষ হয়ে গেছে। জ্ঞান ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই উড আর গনফালার জন্য ভাবনা হতে লাগল তার।

সহসা টারজান দেখতে পেল রক্ষীরা উডকে তার ঘরের দিকে নিয়ে আসছে।

উড এসে তাকে বলল, আমি ত ভাবছিলাম তোমাকে ওরা মেরে ফেলেছে।

এরপর যা ঘটেছিল তাদের ভাগ্যে সব টারজানকে বলল সে। শেষে বলল, মেনোফ্রা একটা মেয়ে। নয়, রাক্ষসী, একটা পশু। কিন্তু ওরা আমাদের না বেঁধে শুধু তোমাকে বাঁধল কেন তার কিছু জান?

টারজান বলল, ওরা হয়ত আমাকে নিয়ে কোন বিশেষ মজা পেতে চায়।

 বিকালের দিকে ভালথর এসে দেখা করল টারজনের সঙ্গে। ভালথর বলল, টারজান তুমি?

 টারজান বলল, হ্যাঁ ভালথর, আমি।

এরপর ভালথর এসে বলল, তুমি তাহলে আবার ফিরে এসেছ? আমি ত ভেবেছিলাম তোমাকে আর দেখতেই পাব না। কি হয়েছিল?

উড তাকে যা যা হয়েছিল সব বলল।

ভালথর বলল, মেনোফ্রা যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন গনফালা নিরাপদ। কিন্তু ক্যান্ডো মেনোফ্রাকে বেশিদিন বাঁচতে দেবে না। তখন ফোরোস আবার রাজা হবে। সে রাজা হলে সে তোমাকে ধ্বংস করবে। তখন গনফালার আর কোন আশা থাকবে না। ভূতপূর্ব রাজা জাইগো আবার শাসনক্ষমতায় ফিরে না এলে অবস্থার কোন উন্নতি হবে না।

একজন লম্বা নিগ্রো টারজনের কাছে এসে বলল, আমাকে চিনতে পারছ না মালিক?

টারজান বলল, হ্যাঁ পারছি। তুমি হচ্ছ জেম্বা। তুমি ক্যাথনিতে যুডোর বাড়িতে কাজ করতে। কি করে এলে এখানে?

জেম্বা বলল, একবার অভিযানের সময় এরা আমাকে বন্দী করে আনে। সেই থেকে বন্দী হয়ে আছি। এরা বড় নিষ্ঠুর। এখানে খাটুনিও বেশি। আমি এখন ক্যাথনিতে ফিরে যেতে চাই।

টারজান বলল, সেখানে গেলে তুমি স্বাধীনতা পাবে। তোমার পুরনো মালিক এখন ক্যাথনির রাজা হয়েছে।

সে যদি জানতে পারে আমি এখানে বন্দী হয়ে আছি তাহলে সে এ্যাথনির উপর যুদ্ধ ঘোষণা করে আমাকে মুক্ত করবে।

ভালথর বলল, তাহলে ক্যাথনির সেনাদলকে আমরা বরণ করে নেব। কিন্তু তার সম্ভাবনা নেই। কারণ তাকে তোমার সম্বন্ধে কিছু জানাবার কোন উপায় নেই।

টারজান বলল, আমার এই গলার বেড়ীটা একবার খুলতে পারলে আমি নিজে ক্যাথনিতে গিয়ে যুডোর সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসতাম। যুডো নিজে এসে আমার বন্ধুদের মুক্ত করত।

দিনকতক এইভাবে কেটে গেল। তবু মনের জোর কমে না টারজনের।

একদিন বিকালবেলায় ক্রীতদাসরা কাজ থেকে ফিরলে কয়েকজন অফিসার এসে প্রতিটি ক্রীতদাসকে গুণে হিসাব নিতে লাগল। সব ক্রীতদাসদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল। টারজান জানতে পারল কয়েকজন ক্রীতদাসের একটি দল পালাবার চেষ্টা করে এবং তাদের হাতে একজন অফিসার নিহত হয়। হিসাব নিয়ে দেখা গেল তিনজন ক্রীতদাস পালিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে জেম্বাও আছে।

অফিসাররা চলে গেলে টারজান দেখল ক্রীতদাসরা সব বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে। একটু উস্কানি পেলেই তাদের চাপা ক্ষোভ ফেটে পড়ে আগুনের মত জ্বলে উঠবে। ভালথর তাদের বুঝিয়ে ধৈর্য ধরে শান্ত হয়ে থাকতে বলল।

ভালথর বলল, এখন আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। সুশিক্ষিত সশস্ত্র যোদ্ধাদের সঙ্গে পেরে উঠব না। নগরবাসীদের মধ্যেও দারুণ অসন্তোষ। জাইগো একদিন ফিরে এসে আবার রাজা হবে।

একজন ক্রীতদাস বলল, রাজা যেই হোক, আমাদের ত ক্রীতদাসই থাকতে হবে।

 ভালথর বলল, না, জাইগো রাজা হলে তোমরা মুক্তি পাবে। আমি কথা দিচ্ছি।

 ক্রীতদাসরা বলল, আমরা একমাত্র তোমার কথায় বিশ্বাস করি।

রাত্রিতে ক্রীতদাসরা তাদের খাবার রান্না করে নিত। হাতির মাংস আর মাঠ থেকে চুরি করে আনা কিছু শাকসজী দিয়ে একটা ঝোল রান্না করত ওরা।

টারজান আসার পর থেকে স্পাইক খুব ভয় পেয়ে যায়। সে বুঝতে পারে তারা এখান থেকে মুক্তি পেলেও হীরেটা টারজান নিয়ে নেবে। স্ট্রোলের অবশ্য কোন ভয় নেই। তার শুধু একমাত্র চিন্তা তার বোন গনফালার কেউ যেন কোন ক্ষতি না করে। এখনো তার ধারণা গনফালা তার বোন। হীরেটা সম্বন্ধে তার কোন চিন্তা নেই।

একদিন সন্ধ্যার পর একজন অফিসার এসে ভালথরের গলায় একটা লোহার বেড়ী পরিয়ে দিয়ে গেল।

ভালথর অফিসারকে বলল, জানতে পারি কি ফোরোস আমাকে এভাবে কেন সম্মানিত করেছে?

অফিসার বলল, ফোরোস নয়, মেনোফ্রার আদেশ। তিনিই এখন দেশ শাসন করছেন।

 ভালথর বলল, ফোরোস তাকে বিয়ে করার আগে মেনোফ্রা ছিল একটা রাস্তার মেয়ে।

ভালথরের গলায় লোহার বেড়ী পরিয়ে দিলে ক্রীতদাসরা আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। রানীর ধারণা ভালথরই ক্রীতদাসদের ক্ষেপিয়ে তুলছে। তাই তার এই শাস্তি।

উড একদিন জানতে পারল দু’একদিনের মধ্যেই টারজান আর ভালথরকে নগরের বাইরে ক্রীড়াঙ্গনে নিয়ে গিয়ে সিংহকে দিয়ে খাওয়ানো হবে। সিংহের সঙ্গে সকলের লড়তে হবে তাদের। অথবা হাতি দিয়ে পিষিয়ে মারা হবে।

নির্দিষ্ট দিনে বিকেলবেলায় প্রায় পঞ্চাশজন যোদ্ধা এসে টারজান আর ভালথরকে বন্দীশালা থেকে বার করে নিয়ে গেল। প্রাসাদ থেকে এক বিরাট মিছিল বেরিয়ে তা নগরের বাইরে ক্রীড়াঙ্গনে যাবে। তার সঙ্গে নগরের বহু লোক যাবে দর্শক হিসেবে।

প্রাসাদের সামনেই মিছিলটাকে গড়ে তোলা হচ্ছিল। মিছিলে অনেক সুসজ্জিত হাতি ছিল। সেই সব হাতির পিঠে একজন করে গণ্যমান্য লোকদের বসার জন্য একটা হাওদা সাজানো হয়েছিল। সব হাওদাগুলোই খোলা ছিল এবং তাতে কয়েকজন করে বসবে। একটা হাওদা রানী মেনোফ্রার জন্য বিশেষভাবে সাজানো হয়েছিল। তাতে শুধু রানী একা বসবে।

একশোটা সুসজ্জিত হাতি সারবন্দীভাবে এগিয়ে চলতে লাগল ধীর গতিতে। সশস্ত্র যোদ্ধারা পায়ে হেঁটে যেতে লাগল। দুপাশে দর্শকরা যেতে লাগল নীরবে।

টারজান দেখল মিছিলটা যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, তার মধ্যে প্রাণ নেই। জনতার মধ্যে নেই কোন উল্লাস বা হর্ষধ্বনি।

টারজান আর ভালথরকে শৃংখলিত অবস্থায় পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বধ্যভূমির দিকে। তাদের দেখে জনতার ক্ষোভ বেড়ে যাচ্ছিল। ক্রীড়াঙ্গন নয়, যেন এক বধ্যভূমির দিকে নীরব নিষ্প্রাণ একটা মিছিল এগিয়ে চলেছিল ধীর গতিতে।

রাজপথের উপর দিয়ে গিয়ে দক্ষিণ দিকের নগরদ্বারে গিয়ে পৌঁছল শোভাযাত্রাটা। অবশেষে নগরদ্বার পার হয়ে পূর্ব দিকে ঘুরে ক্রীড়াঙ্গনে মিছিলটা যেতেই টারজান আর ভালথরকে শোভাযাত্রা থেকে বার করে কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। ঢোকার মুখে অনেক সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা ছিল।

আরো অনেক বন্দীকে টারজানদের কাছে আনা হলো। ভালথর টারজানকে বলল, এরা হচ্ছে সেই সব সামন্ত যারা এরিথরাদের দলে যোগদান করেনি। ফোরোস আর মেনোফ্রা মনে করে সব সামন্ত ও অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করে তারা নিষ্কণ্টক হয়ে উঠবে। তাদের বিরোধিতা করার আর কেউ থাকবে না। কিন্তু এভাবে শত্রুর শেষ করা যায় না। শত্রুর শেষ করতে গিয়ে আরো শক্ত বাড়াচ্ছে।

কুস্তিখেলা অর্থাৎ নিধনযজ্ঞ শুরু হলো। হাতির পিঠ থেকে নেমে মেনোফ্রা প্রজার জন্য নির্মিত মঞ্চে গিয়ে বসল।

টারজান ভালথরকে বলল, মোটা লোকটাকে সহজেই মারতে পারত ও।

পরের প্রতিযোগী ছিল একজন বৃদ্ধ লোক আর একটা সিংহ। বৃদ্ধের হাতে ছিল শুধু একটা ছোরা।

 টারজান বলল, সিংহটাও বুড়ো। তার অনেকগুলো দাঁত নেই।

 ভালথর বলল, তবু লোকটাকে মেরে ফেলার মত শক্তি ওর আছে।

সেই রক্ষীটি তখন টারজনের পাশ থেকে বিদ্রুপের সুরে বলল, তুমি কি সিংহটাকেও মেরে ফেলতে পারবে নাকি?

টারজান বলল, সম্ভবত পারব।

এ কথা শুনে হো হো শব্দে হেসে উঠল রক্ষীটি।

সিংহটার হাতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু ঘটল বৃদ্ধটির। এরপরই হায়ার্কের সঙ্গে টারজনের লড়াই এর অনুমতি দিল মেনোফ্রা। অফিসার অনুমতি পেয়ে ঘোষণা করল, একদিনের মধ্যে দুটো লোককে মারতে পারলে হায়ার্ককে ক্যাপ্টেন করবে রানী মেনোফ্রা।

সেই রক্ষী তখন অফিসারকে বলল, এই বুনো লোকটা বলছে সিংহটাকেও মারতে পারবে ও।

অফিসার বলল, তার আগে হায়ার্কই ত ওকে মেরে ফেলবে। তাহলে কি করে বুঝব ও সিংহ মারতে পারবে।

টারজান চীৎকার করে বলল, একই সঙ্গে হায়ার্ক আর সিংহটাকে সঙ্গে লড়াই করব অবশ্য হায়ার্ক যদি সিংহ দেখে ভয় না পায়।

 অফিসার উৎসাহিত হয়ে বলল, তাহলে ত খুব ভাল কথা। এখনই অনুমতি নিয়ে আসছি।

কিছুক্ষণের মধ্যে মেনোফ্রার অনুমতি নিয়ে এল অফিসার।

 হায়ার্কের কিন্তু এ প্রতিযোগিতায় মন ছিল না। সে মেনোফ্রাকে জানাল তার স্ত্রী অসুস্থ। তাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে তখনি। কিন্তু মেনোফ্রা বলল, সে যদি বুনো লোকটার সঙ্গে লড়াই না করে তাহলে তাকে সে খুন করবে।

টারজানকে একটা ছোরা দেয়া হলো। লড়াই শুরু হয়ে গেল। একটা সিংহকে ছেড়ে দেয়ার জন্য, লোক চলে গেল। হায়ার্ক ভাবল সিংহটা আসার আগেই টারজানকে মেরে ফেলতে পারলে তার আর কোন ভয় থাকবে না। তাই সিংহটা আসার আগেই সে তার বর্শাটা সজোরে ছুঁড়ে দিল টারজনের খোলা বুকটা লক্ষ্য করে।

কিন্তু টারজান এক আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বর্শার বাটটা ধরে ফেলল। তারপর বর্শাটাকে একধারে ছুঁড়ে ফেলে দিল। হায়ার্ক তখন তার তরবারিটা বার করতে গেল। কিন্তু আগেই টারজান লোহার মত শক্ত হাত দিয়ে তাকে ধরে বন্বন্ করে ঘোরাতে লাগল। দর্শকরা হর্ষধ্বনি করে অভিনন্দন জানাল টারজানকে।

এমন সময় সিংহটা টারজনের দিকে আসতে লাগল। টারজান তার ছোরাটা আগেই ঢুকিয়ে রেখেছিল তার কৌপীনের মধ্যে। তাতে দর্শকরা আরো আশ্চর্য হয়ে যায়।

টারজান তার পরিকল্পনা মত হায়ার্ককে ধরে সিংহের দিকে ছুঁড়ে দিল। হায়ার্ক উঠেই প্রাণভয়ে ছুটতে লাগল। টারজান জানত ছুটন্ত লোককে আগে ধরে সিংহরা। হলোও ঠিক তাই। হায়ার্ক যদি একপাশে দাঁড়িয়ে থাকত তাহলে সিংহটা টারজানকেই ধরতে যেত। হায়ার্ক সিংহটার সঙ্গে ছুটে পেরে উঠল না। এক লাফে তাকে ধরে তার মাথাটা চিবোতে লাগল সিংহটা। মেনোফ্রার মঞ্চের কাছেই হায়ার্ক ধরা পড়ে সিংহের হাতে।

টারজান এবার ফেলে দেয়া বর্শাটা কুড়িয়ে নিয়ে সিংহটার কাছে নির্ভয়ে চলে গেল। সিংহটা তখন হায়ার্কের মৃতদেহটাকে খাচ্ছিল। তার কাছে গিয়ে টারজান হাত থেকে বর্শাটা ফেলে দিয়ে সিংহটার কেশর আর তার পিঠের আলগা চামড়া ধরে তাকে মৃতদেহটা সমেত শূন্যে তুলে ফেলল। তারপর তার অতি মানবিক শক্তির সাহায্যে সিংহটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে মেনোফ্রার মঞ্চের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। চেয়ারসমেত উল্টে পড়ে গেল মেনোফ্রা। কিন্তু তার কোন ক্ষতি হলো না। কারণ সিংহটা ভয়ে আর্তনাদ করছিল। সে উঠেই মুক্তির জন্য পালাতে লাগল।

চারদিকের তুমুল চীৎকার ও হৈচৈ স্তব্ধ হয়ে গেলে ভারপ্রাপ্ত অফিসার টারজনের কাছে এসে জানাল, তুমি সিংহটাকে মেনোফ্রার চেয়ারের উপর ফেলে না দিলে মেনোফ্রা তোমাকে মুক্তি দিত। এখন ও তোমাকে অবিলম্বে মারার জন্য আদেশ দিয়েছে। তোমাকে হাতির পায়ের তলায় পিষে মারা হবে।

রঙ্গভূমির কেন্দ্রে টারজান আর ভালথরকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাতিটা প্রথমে ওদের দেখতে পায়নি। সে পালাবার পথ খুঁজছিল।

হাতিটা হঠাৎ টারজানদের দেখতে পেয়ে শুড় দুলিয়ে সেইদিকে আসতে লাগল।

টারজান দেখল হাতিটার একটা দাঁত কালো। তা দেখে ওর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, একদিন ও এই হাতিটাকেই গর্ত থেকে উদ্ধার করেছিল। গর্তের উপর দাঁড়িয়ে কয়েকটা হায়েনা অট্টহাসি হেসেছিল। মাথার উপর শকুনি উড়ে বেড়াচ্ছিল।

হাতিটা গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছিল। টারজান তখন কিছুটা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা হাত তুলে তাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল ডান্ডো ট্যান্টর! টারজান হো!

 সে ডাক শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়াল সেই বিরাট হাতিটা। ভালথরকে তার পিছু পিছু আসতে বলে টারজান হাতিটার কাছে গিয়ে তার গুঁড়ে হাত বুলিয়ে তাকে বলল, টারজান! টারমাঙ্গানি!

হাতিটা তখন একে একে টারজান আর ভালথরকে শুড় দিয়ে জড়িয়ে পিঠের উপর তুলে নিল। টারজান তখন পশুদের ভাষায় পালিয়ে যেতে আদেশ করল এবং হাতিটা তার কথা বুঝল।

কাঠের বেড়া ভেঙ্গে হাতিটা বেগে চলে গেল ক্রীড়াঙ্গনের সীমানার বাইরে। এ্যাথনির যোদ্ধারাও মিছিলের হাতিগুলোর পিঠে চেপে তাদের ধরতে বেরিয়ে গেল।

টারজানরা আধ মাইল যাবার পর দেখল একদল হাতির পিঠে চেপে এ্যাথনির যোদ্ধারা তাদের ধরতে আসছে। টারজান বলল, পিঠে পাঁচ-ছয়জন করে লোক আছে। ওদের আসতে দেরী হবে।

ভালথর বলল,আর আধ ঘণ্টা যেতে পারলে আমাদের আর ধরতে পারবে না।

একসময় হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। টারজানকে বলল, ঐ দেখ, এক দিকে হাতির দল আর এক দিকে ক্ষুধিত সিংহের মাঝখানে পড়ে গেছি আমরা।

মুখ ঘুরিয়ে দেখল টারজান, ভয়ঙ্কর একদল সিংহ নিয়ে ক্যাথনি থেকে এক সেনাবাহিনী আসছে এ্যাথনির দিকে।

ভালথর বলল, একটা উপায় আছে। পূর্ব দিকের পাহাড়গুলোর দিকে হাতিটাকে চালিয়ে নিয়ে যাও। সেখানে গিয়ে জাইগো আর তার অনুচরদের সঙ্গে কথা বলব।

টারজান বলল, ক্যাথনি থেকে যারা আসছে তারা আমাদের বন্ধু। ওদের কাছ থেকে পালাব কেন?

ভালথর বলল, তবে তোমাকে চিনতে পারার আগে যেন শিকারী সিংহগুলোকে ছেড়ে না দেয়।

টারজান হাতিটাকে কি বলতে সে তাদের নামিয়ে দিল। তারপর টারজান হাতিটার কানে কানে কি বলতে সে মুখ ঘুরিয়ে এ্যাথনির হস্তীবাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য ছুটে গেল।

টারজান বলল, আমরা অন্তত কিছুক্ষণ সময় পাব।

ক্যাথনির যোদ্ধাদের মধ্য থেকে একজন অফিসার টারজানকে তাদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে ছুটে এল টারজনের কাছে। টারজান দেখল সে হলো জেমনন। সে বলল, আমরা ত তোমাকেই উদ্ধার করতে যাচ্ছি। আমি দূর থেকেই তোমাকে দেখতে পাই।

টারজান বলল, কি করে জানলে আমি বন্দী হয়ে আছি?

জেম্বা পালিয়ে যায় এখান থেকে। সে-ই খবর দেয় আমাদের। জেষা যুডোকে খবর দেয় তোমাকে ওরা হত্যা করবে।

টারজান বলল, আমার দু-তিনজন বন্ধু এখনো বন্দী হয়ে আছে এ্যাথনিতে। তবে ফোরোদের একদল সৈন্যকে ছত্রভঙ্গ অবস্থায় এখানেই পাবে।

যুড়োও এগিয়ে এসে ওদের অভ্যর্থনা জানাল। যুড়ো ও জেমনন ভালথরকে চিনত। তারা দুজনেই ভালথরকে অভ্যর্থনা জানাল।

যুডো বলল, এ্যাথনির আগেকার সামন্তদের প্রতি আমার সমর্থন আছে।

ভালথর বলল, যুড়ো আমাদের সহায় আছে। আমরা জাইগোকে আবার সিংহাসনে বসাব। তোমাদের সিংহবাহিনীকে ছেড়ে দাও।

এদিকে কালো দাঁতওয়ালা বুনো হাতিটা এ্যাথনির হস্তীবাহিনীকে আগেই ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। অনেক যোদ্ধা হাওদা থেকে পড়ে গেছে। আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে অনেক হাতি মরে গেছে।

এমন সময় ক্যাথনির শিকারী সিংহরা হাতিগুলোর পিঠে লাফ দিয়ে উঠে যোদ্ধাদের ছিঁড়ে খুঁড়ে খেতে লাগল। তারা হাতিগুলোর কোন ক্ষতি করল না। হাতির পিঠ থেকে নেমে এ্যাথনির যোদ্ধারা বর্শা নিয়ে আক্রমণ করার আগেই ক্যাথনির পদাতিক সৈন্যরা আক্রমণ করল। এ্যাথনির সৈন্যরা নগরে না গিয়ে বিভিন্ন দিকে পালাতে লাগল।

যুডো তার বিজয়ী বাহিনীকে নিয়ে এ্যাথনিতে প্রবেশ করল। টারজান আর ভালথর সঙ্গেই ছিল। কেউ তাদের বাধা দিল না।

তারা গিয়েই প্রথমে, উড, স্পাইক আর স্ট্রোলকে মুক্ত করল। তারপর উডকে নিয়ে তার প্রাসাদের মধ্যে গনফালার খোঁজে চলে গেল। রক্ষীরা ভয়ে পালাতে লাগল।

গনফালা যে ঘরে বন্দী ছিল সে ঘরের তালা ভেঙ্গে ঢুকে ওরা দেখল ছুরি হাতে ফোরোসের মৃতদেহের। উপর দাঁড়িয়ে আছে গনফালা। উডকে দেখতে পেয়েই গনফালা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

 গনফালা বলল, মেনোফ্রা মরে যাওয়ায় ফোরোস আমায় জ্বালাতন করতে থাকে। তাই তাকে আমি। হত্যা করেছি।

 জাইগোকে ডাকিয়ে আনিয়ে তাকেই এ্যাথনির সিংহাসনে বসানো হলো।

টারজান এক সপ্তাকাল এ্যাথনিতে থেকে গেল। তারপর তার বাড়ির দিকে রওনা হলো টারজান। নগরের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ দিকে এগোতে লাগল তারা। কিছুদূর যাবার পর মুভিরোর সঙ্গে দেখা হলো তাদের। একসোজন যোদ্ধার এক দল নিয়ে টারজনের খোঁজে আসছিল মুভিরো।

স্পাইক আর স্ট্রোলকে এই শর্তে মুক্তি দিল যে তারা সোজা কোন উপকূলে চলে যাবে, এবং তারা কখনো আফ্রিকায় আসবে না। উড আর গনফালা টারজনের সঙ্গে তাদের বাড়িতে যাবে।

স্পাইকের কাতর অনুনয় বিনয়ে হীরের তালটা তাকে দিয়ে দিল টারজান। ওরা চলে গেলে উড আর গনফালা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে টারজান হেসে বলল, ওটা আসল গনফাল নয়। আসলটা আমার বাড়িতে আছে। ওটা নকল গনফাল মাফকার কাছে থাকত। পান্নার তালটাও আমি উদ্ধার করে পথে এক জায়গায় পুঁতে রেখেছি।

[সমাপ্ত]

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *