বিজয়ী টারজান (টারজান ট্রায়াম্ফ্যান্ট)

বিজয়ী টারজান (টারজান ট্রায়াম্ফ্যান্ট)

জীবন যদি হয় বুটিদার বস্ত্র তাহলে সময় তার টানা। সময় চিরন্তন, স্থির, অপরিবর্তনীয়। সুদক্ষ শিল্পী ভাগ্যদেবী তার পোড়েন সংগ্রহ করে পৃথিবীর চার কোণ ও অষ্টবিংশতি সমুদ্র থেকে, আকাশ থেকে আর মানুষের মন থেকে। তারপর যে নক্সা সে ফুটিয়ে তুলতে থাকে তা কোন দিন শেষ হয় না।

একটা সুতো এখান থেকে, একটা ওখান থেকে আর একটা সুতো আসে সুদূর অতীত থেকে যে অতীত দীর্ঘকাল অপেক্ষা করে আছে সঙ্গী সুতোটির জন্য যাকে না পেলে ছবিটি সম্পূর্ণ হবে না।

কিন্তু ভাগ্যদেবী বড়ই ধৈর্যশীলা। যে বুটিদার বস্ত্রটি সে তৈরি করতে চায়, যে অনাদি ও অনন্ত নক্সাটি সে ফুটিয়ে তুলতে চায়, তার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় দুটি সুতোর মিলন ঘটানোর জন্য সে একশ’ বছর, হাজার বছর অপেক্ষা করে থাকে।

এক হাজার আটশ’ পঁয়ষট্টি বছর আগেকার কথা (সঠিক তারিক সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নয়)। টারসাসের পল রোমে শহিদ হয়েছিল।

দূর অতীতের সেই শোকাবহ ঘটনাটি যে একজন ইংরেজ বিমান-চালিকা ও আমেরিকার একজন ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানের অধ্যাপকের জীবন ও ভাগ্যের উপর এতখানি প্রভাব বিস্তার করবে সেটা আমাদের কাছে আশ্চর্য মনে হলেও ভাগ্যদেবীর কাছে তা নয়। যে ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে আমি বসেছি, প্রায় দু’হাজার বছর ধরে সে তো ধৈর্য সহকারে তারই অপেক্ষা করেছিল।

কিন্তু পল এবং এই দুটি যুবক-যুবতীর মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। সে ইফেসের অ্যাঙ্গাস্টাস। অ্যাঙ্গাস্টাস ছিল ওনেসিফোরাস পরিবারের ছেলে। খেয়ালী ও অপম্মার রোগগ্রস্ত যুবক। টাসাসের পল যখন প্রাচীন আইওনিয়ার ইফেসাস শহরে প্রথম এসেছিল তখন যে সমস্ত লোক নবধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল তাদের অন্যতম ছিল অ্যাঙ্গাস্টাস।

ছেলেবেলা থেকেই সে অপম্মার রোগগ্রস্ত। ধর্মের ব্যাপারেও অত্যধিক উন্মাদনা প্রিয়। যীশুর অন্যতম প্রধান শিষ্যটিকে মর্ত্যে ঈশ্বরের প্রতিনিধিরূপেই পূজা করে। তাই পলের শহিদ হবার সংবাদ তাকে এতই অভিভূত করে যে সে মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলে।

পাছে তার উপরেও অত্যাচার হয় এই ভয়ে সে আলেক্সান্দ্রিয়ার জাহাজ ধরে ইফেসাস থেকে পালিয়ে যায়। ছোট জাহাজটার ডেকের উপর ভয়ার্ত রুগ্ন অবস্থায় কোন রকমে ঢাকাটুকি দিয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় রেখেই তার কথা আমরা শেষ করতে পারতাম। কিন্তু আরও একটা ঘটনা ঘটল। জাহাজটা রোডস দ্বীপে থামলে অ্যাঙ্গাস্টাস সেখানে নেমে পড়ে এবং (ধর্মান্তরের পথেই হোক আর অর্থের বিনিময়েই হোক) সুদূর উত্তর থেকে আগত বর্বর জাতির একটি সুকেশী ক্রীতদাসীকে সগ্রহ করে।

এখানেই আমরা অ্যাঙ্গাস্টাস ও সিজারের কালকে বিদায় জানাই, আর কল্পনা করি, অ্যাঙ্গাস্টাস ও সুকেশী ক্রীতদাসী মেয়েটি আলেক্সান্দ্রিয়া বন্দর থেকে মেসি ও থিবির ভিতর দিয়ে আফ্রিকায় পালিয়ে গেল।

আফ্রিকার সূর্য অস্ত যেতে তখনও ঘণ্টাখানেক বাকি। নিষিদ্ধ ঘেঞ্জি পর্বতমালার রহস্যময় দুরারোহ সুউচ্চ শিখরশ্রেণী ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। পড়ন্ত সূর্যও ঢাকা পড়েছে সে মেঘের আড়ালে।

সেই ঘন মেঘের ভিতর থেকে ভেসে আসছে ভয়াল বিচিত্র ভ্রমণের গুঞ্জণ। ঘেঞ্জি বন্ধুর শিখরগুলোকে ঘিরে ভ্রমরটা পাক খাচ্ছে। শব্দটা কখনও বাড়ছে, কখনও কমছে।

লেডি বারবারা কলিস চিন্তিত হয়ে পড়েছে। পেট্রল ফুরিয়ে আসছে। এই সংকটকালে কম্পাসটাও অকেজো হয়ে পড়েছে। মেঘের ভিতর দিয়ে সে অন্ধের মত উড়ে চলেছে।

জ্বালানি নিঃশেষ হবার মুখে। মেঘের নিচে পাহাড়ের উপর নামবার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। তাই শেষ পথটিই সে বেছে নিল। ক্ষণিক প্রার্থনা সেরে দশ গুণতে গুণতেই প্যারাসুটের দড়িতে টান দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘেঞ্জি পর্বতমালার বহুদূর দক্ষিণে বুঙ্গালো উপজাতির সর্দার কাবারিগা অরণ্যরাজ টারজনের সামনে নতজানু হয়ে বসেছে।

আর মস্কোতে লাল রাশিয়ার ডিক্টেটর স্তালিনের কার্যালয়ে ঢুকল লিওন্ স্তাবুচ।

নিগ্রো সর্দার কাবারিগা, অথবা লিও স্তাবুচ বা লেডি বারবারা কলিসের কথা কিছুমাত্র না জেনেই ফিল শেরিডন মিলিটারি একাডেমির ভূতত্ত্ববিজ্ঞানের অধ্যাপক লাফায়েৎ স্মিথ, এ. এম. পি-এইচ, ডি, এস-সি. ডি. নিউ ইয়র্কের বন্দর থেকে একটি স্টিমশিপে চেপে বসল। মিঃ স্মিথ একজন শান্ত, বিনয়ী, পণ্ডিতদর্শন যুবক। চোখে সিং-এর ফ্রেমের চশমা। তার চোখের কোন দোষ নেই, তবু সে চশমা পরে কারণ তার বিশ্বাস চশমা পরলে তাকে মর্যাদাসম্পন্ন ও বয়স্ক দেখায়। এক বছর হল পশ্চিমের একটা অখ্যাত মিলিটারি একাডেমিতে সে পড়াচ্ছে। সেই সুযোগে জীবনের আর একটি ইচ্ছাকে পূরণ করতে সে আফ্রিকাতে যাচ্ছে সেই অন্ধকার মহাদেশের পাহাড়ের বড় বড় ফাটলের গঠন-রীতি নিয়ে গবেষণা করতে।

নিউ ইয়র্কে সময় যখন মধ্যাহ্নের দু’ঘণ্টা আগে, মস্কোতে তখন সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা বাকি। কাজেই লাফায়েৎ স্মিথ যখন সকালবেলা জাহাজে চাপল, ঠিক সেই সময় পড়ন্ত অপরাহ্নে লিওন, স্তাবুচ রুদ্ধদ্বার কক্ষে স্তালিনের সঙ্গে আলোচনায় রত।

স্তালিন বলল, এই কথা রইল। সব বুঝেছ তো?

স্তাবুচ বলল, সব বুঝেছি। পিটার জাভেরির হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে, আর যে কারণে আফ্রিকায় আমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে তা দূর করতে হবে।

স্তালিন বলল, শেষেরটাই বেশি দরকারী। একটা গোরিলা-মানব হলেও একটি সুসংগঠিত লাল অভিযানকে সে সম্পূর্ণ পরাভূত করেছে। সে না এসে পড়লে আবিসিনিয়া ও মিশরে অনেক কিছুই ঘটতে পারত। তোমাকে আরও জানিয়ে রাখছি কমরেড, আরও একটা অভিযান আমরা চালাব। তবে তোমার রিপোর্ট হাতে আসার এবং সেই বাধা দূর হবার আগে নয়।

স্তাবুচ বুক ফুলিয়ে বলল, আমি কি কখনও ব্যর্থ হয়েছি।

স্তালিন উঠে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, লাল রাশিয়া OGPU- র কাছে পরাজয় আশা করে না। কথা বলার সময় শুধু তার ঠোঁট দুটি হাসল।

সেই রাতেই লিওন স্তাবুচ মস্কো ত্যাগ করল। ভেবেছিল, সে যাচ্ছে একা গোপনে, কিন্তু রেলের কামরায় তার পাশেই বসেছিল ভাগ্যদেবী।

পায়ের কাছে নতজানু নিগ্রো সর্দারের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে টারজান বলল, উঠে দাঁড়াও! তুমি কে? কেনই বা টারজনের কাছে এসেছ?

মহান বাওয়ানা! আমি কাবারিগা-বুঙ্গালো উপজাতির সর্দার। মহান বাওয়ানার কাছে আমি এসেছি আমার লোকজনদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনের আশায়।

তোমার লোকজনদের কিসের দুঃখ? কার জন্য দুঃখ? টারজান জানতে চাইল।

কাবারিগা বলল, দীর্ঘকাল ধরে আমরা সকলের সঙ্গে শান্তিতে বাস করছি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোনরকম যুদ্ধ-বিগ্রহ করি না। কিন্তু একদা আবিসিনিয়া থেকে একদল লোক আমাদের দেশে এসে বাসা বেঁধেছে। তারা আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে, আমাদের ফসল, ছাগল ও লোকজনদের চুরি করে নিয়ে যায়, তারপর দূর দেশে সে সব বিক্রি করে দেয়।

কিন্তু তুমি আমার কাছে এসেছ কেন? আমার দেশের সীমানার বাইরে কোন জাতির ব্যাপারে আমি তো হস্তক্ষেপ করি না।

নিগ্রো-সর্দার বলল, মহান বাওয়ানা, আমি তোমার কাছে এসেছি কারণ তুমি একজন সাদা মানুষ, আর যারা আমাদের উপর উৎপীড়ন করছে তাদের সর্দারও একজন সাদা মানুষ। সকলেই জানে, তুমি খারাপ সাদা মানুষদের যম।

টারজান বলল, সে কথা আলাদা। আমি তোমার সঙ্গে তোমাদের দেশে যাব।

এইভাবে নিগ্রো-সর্দার কাবারিগার কাজের ভার চাপিয়ে দিয়ে ভাগ্যদেবী টারজানকে নিয়ে গেল উত্তরের দিকে। তার নিজের লোকেরা জানলও না সে কোথায় গেল, কেন গেল- এমন কি তার একান্ত বন্ধু ছোট্ট নকিমাও জানল না।

অনেক উঁচু একটা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাহামের ছেলে আব্রাহাম। সকলেই দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে মুখ করে। সকলের মুখেই ফুটে উঠেছে বিস্ময়, জিজ্ঞাসা, ভয়। সকলেই কান পেতে শুনছে, ঘন কাল মেঘের আড়াল থেকে ভেসে আসছে এমন একটা বিচিত্র বিপজ্জনক গুঞ্জন-ধ্বনি যা তারা আগে কখনও শোনেনি।

সমবেত নর-নারীর একেবারে পিছনে দাঁড়িয়েছিল একটি কিশোর। হঠাৎ সে মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল; তার মুখ দিয়ে ফেনা গড়াতে লাগল। একটি নারীও আর্তনাদ করে মূৰ্ছা গেল।

আব্রাহাম প্রার্থনার ভঙ্গীতে বলে উঠল, হে প্রভু, সত্যি যদি তুমি এসে থাক তাহলে তোমার অনুগত জনরা তোমার আশীর্বাদ ও নির্দেশ শুনবার জন্য অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু তুমি যদি আমাদের প্রভু না হও, তাহলেও তোমার কাছে আমাদের প্রার্থনা-তুমি আমাদের সকলকে বিপদ থেকে রক্ষা কর।

এ হয়তো গেব্রিয়েল, লম্বা দাড়িওয়ালা একজন বলল।

একটি নারী কেঁদে বলল, ওই শোন তার শিঙার আওয়াজ-শেষের দিনের শিঙাধ্বনি।

চুপ কর! আব্রাহাম কর্কশ গলায় বলল।

কিশোরটি তখনও মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আরও একজন পড়ে গিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে লাগল। তারও মুখ দিয়ে ফেনা গড়াতে লাগল।

এবার চারদিকে অনেকেই পড়ে যেতে লাগল। কারও শরীর কাঁপছে। কেউ মূৰ্ছা যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কারও নজর নেই।

আবার সেই ভয়ঙ্কর শব্দ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। শব্দটা ক্রমেই বাড়ছে। একেবারে মাথার উপর এসে গেছে। এমন সময়

মেঘের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ভৌতিক মূর্তি একটা প্রকাণ্ড সাদা বস্তু আর তার নিচে এদিক-ওদিক দুলছে একটা ছোট্ট পুতুল। সেটা ধীরে ধীরে নেমে আসছে। তা দেখে আরও ডজনখানেক মানুষ মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল, তাদের মুখ থেকেও ফেনা গড়াতে লাগল।

প্রায় পাঁচশ’ নর-নারী ও শিশুর চোখের সামনে লেডি বারবারা কলিস ভাসতে ভাসতে নেমে এল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে সকলে নতজানু হয়ে বসে পড়ল।

কী আশ্চর্য, তারা সকলেই সাদা মানুষ! আফ্রিকার বুকের মধ্যে সে নেমেছে একটি সাদা মানুষদের উপনিবেশে। লেডি বারবারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মানুষগুলোর দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষ করে তার চোখে পড়ল-সকলেরই বড় বড় নাক আর ছোট থুতনি। নাকটা এত বড় যে মুখটাই কদাকার দেখায়, আর অনেকেরই থুতনি বলে কিছু নেই বললেই চলে।

আরও দুটি পরস্পরবিরোধী জিনিস তার চোখে পড়ল–প্রায় এককুড়ি অপস্মারগ্রস্ত মানুষ মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে, আর একটি স্বর্ণকেশী সুন্দরী উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখ মেলে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

লেডি বারবারা কলিস মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসল। মেয়েটিও হাসল, কিন্তু পরক্ষণেই সভয়ে চারদিকে তাকাল।

লেডি বারবারা শুধাল, আমি কোথায় এসেছি? এটা কোন্ দেশ? এরা সব কারা?

মাথা নেড়ে মেয়েটি শুধাল, তুমি কে? তুমি কি প্রভুর দেবদূত?

এবার বারবারার মাথা নাড়ার পালা। মেয়েটির ভাষা সে কিছুই বুঝতে পারেনি।

সাদা লম্বা দাড়িওয়ালা লোকটি এবার সাহস করে এগিয়ে এসে মেয়েটিকে বলল, চলে যাও জেজেবেল! এই স্বর্গীয় অতিথির সঙ্গে কথা বলার দুঃসাহস তোমার হলো কেমন করে?

মেয়েটি ভয়ে পিছিয়ে গেল। হঠাৎ কি মনে করে সে থেমে গিয়ে লেডি বারবারার দিকে তাকাল। বারবারার ঠোঁটে সেই মিষ্টি হাসি। তা দেখে মেয়েটির সাহস বেড়ে গেল। দুষ্টুমি করে বলল, জান জাবোব, ও বলল যে স্বর্গ থেকে তোমাদের জন্য বার্তা নিয়ে এসেছে, আর সে বার্তা জানাবে শুধু আমার মুখ দিয়ে, আর কাউকে নয়।

সঙ্গে সঙ্গে কথাটা রাষ্ট্র হয়ে গেল। সরল মনে সকলেই কথাটা বিশ্বাস করল। ফলে লেডি বারবারার সঙ্গে জেজেবেলের প্রতিও সকলের শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। তাদের দুজনের একত্রে থাকার সব রকম ব্যবস্থা করে দেয়া হল।

রাতে শুয়ে লেডি বারবারা এখানকার লোকদের লম্বা নাক, ঘোট থুতনি ও অপআর রোগের কথাই ভাবতে লাগল। কিন্তু কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যাই খুঁজে পেল না। পাবেই বা কেমন করে? কেউ তো তাকে বলে নি অ্যাঙ্গাস্টাস ও সুকেশী ক্রীতদাস মেয়েটির প্রাচীন কাহিনী। আসলে এখানকার কেউ জানেই না যে অ্যাঙ্গাস্টাসের ছিল বড় নাক, ছোট থুতুনি ও অপর রোগ। প্রায় উনিশ শতাব্দী আগে যে। ক্রীতদাসী মেয়েটি মারা গেছে তার যে ছিল সুস্থ্য মন ও উজ্জ্বল স্বাস্থ্য যার জন্য আজও এদের মধ্যে জেজেবেলের মত সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী মেয়ে জন্মায় সে কথাও এরা কেউই জানে না।

বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিক ডেক-চেয়ারে হেলান দিয়ে আরামে শুয়ে আছে। তার পোশাকের মধ্যে নিরাপদে লুকানো আছে ২০ জি, বা বগলের নিচে বিশেষভাবে তৈরি খাপের মধ্যে লুকানো আছে একটা ৪৫। বন্দুকবাজ প্যাট্রিক জানে, বেশ কিছুদিন এটাকে ব্যবহার করতে হবে না, তবু তৈরি থাকা ভল। বন্দুকবাজ শিকাগোর লোক। সেখানে যে সমাজে সে চলাফেলা করে তারা সকলেই তৈরি থাকার। ব্যাপারটায় বিশ্বাসী।

আপাতত জাহাজের ডেক-চেয়ারে বসে সে রোদ পোয়াচ্ছে। একটানা তিন দিনের সমুদ্রযাত্রায় ড্যানি বিরক্ত হয়ে উঠেছে। সহযাত্রীরা কেউ তার সঙ্গে বড় একটা কথাবার্তা বলে না। কেন বলে না তাও সে বুঝতে পারে না।

যাই হোক আজ তৃতীয় দিনে একটি যুবক এসে তার পাশে বসল। তার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, সুপ্রভাত। আবহাওয়াটা ভারি সুন্দর।

ড্যানি নিরুত্তাপ নীল চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই বুঝি? তারপর আবার চোখ ফেরাল তরঙ্গমুখর অসীম সমুদ্রের বুকে।

লাফায়েৎ স্মিথ হেসে একটা বই খুলে চেয়ারে হেলান দিল। ধীরে ধীরে অভব্য প্রতিবেশীটির কথা ভুলেই গেল।

সেদিন বিকেলে ড্যানি যুবকটিকে আবার দেখতে পেল সুইমিং পুলে। একটি জিনিস তাকে মুগ্ধ করল। কি সাঁতারে, কি ডাইভিং-এ, যুবকটি অন্য সকলের চাইতে অনেক বেশি দক্ষ। তার রোদে-পোড়া তামাটে রং দেখেই বুঝল, যুবকটি দীর্ঘ সময় সুইমিং পুলে কাটাতে অভ্যস্ত।

পরদিন সকালে ডেকে এসেই ড্যানি দেখল, যুবকটি তার আগেই এসে চেয়ারে বসে আছে। নিজের চেয়ারে বসে সে বলল, সুপ্রভাত। সকালটা বড় ভাল।

বই থেকে মুখ তুলে যুবকটি বলল, তাই বুঝি? তারপর আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখল।

ড্যানি হেসে বলল, আমার কথাটাই আমাকে ফিরিয়ে দিলে? কি জান, আমি ভেবেছিলাম তুমিও ওই সব উঁচু টুপিওয়ালাদের একজন। কিন্তু কাল তোমাকে পুকুরে দেখেছি। তুমি বেশ ভাল লাফাতে পার।

লাফায়েৎ স্মিথ, এ. এম. পি-এইচ. ডি. এস-সি.,ডি, বইটা কোলের উপর রেখে যুবকটির দিকে তাকাল। মুখে দেখা দিল বন্ধুত্বের হাসি।

প্রমোদ ভ্রমণে চলেছ বুঝি? ড্যানি প্রশ্ন করল।

আশা করি, ভ্রমণটা সুখেরই হবে। তবে এটাকে ব্যবসায়িক ভ্রমণও বলা যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা। আমি একজন ভূ-তত্ত্ববিদ।

ইংল্যান্ডে যাচ্ছ কি?

দিন দুই মাত্র লন্ডনে থাকব, স্মিথ জবাব দিল।

আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি ইংল্যান্ডে যাচ্ছ।

লাফায়েৎ স্মিথ বিব্রত বোধ করল। তারপর হেসে বলল, দেখ, লন্ডন হচ্ছে ইংল্যান্ডের রাজধানী। কাজেই লন্ডনে থাকা মানেই ইংল্যান্ডে থাকা।

ড্যানি চেঁচিয়ে বলল, গী! কি জান, আমি কোনদিন আমেরিকার বাইরে যাইনি।

স্মিথ বলল, আমার তো মনে হয় লন্ডন তোমার ভালই লাগবে।

 তারপর ড্যানি পাল্টা প্রশ্ন করল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

আফ্রিকা।

সেই বাঘ-হরিণ সিংহ-হাতির দেশে যাচ্ছ কেন? শিকারে?

শিকারেই বটে, তবে জন্তু-জানোয়ার নয়, পাথর শিকারে।

গী! পাথর শিকারে কে না যাচ্ছে? তা নিয়ে কত রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটছে।

 স্মিথ হেসে বলল, সে পাথর নয়।

তার মানে তুমি হীরের খোঁজে যাচ্ছ না?

না। আমি যাচ্ছি পাহাড়ের গঠন-রীতি জানতে।

সেটা বাজারে বিক্রি করতে পারবে?

না।

কি ভেবে মাথা নাড়তে নাড়তে ড্যানি শুধাল, আচ্ছা, আমি যদি তোমার সঙ্গে যাই তো কি বল মিস্টার?

লাফায়েৎ স্মিথ অবাক হল। এই যুবকটিকে তার ভাল লেগেছে। হয়তো সঙ্গী হিসেবে সে ভালই হবে। আফ্রিকার জঙ্গলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটাতে আর একজন শ্বেতকায় সঙ্গী পেলে সময়টাও ভাল কাটবে। তবু সে ইতস্তত করতে লাগল। এই লোকটি সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। কোন পলাতক আসামীও তো হতে পারে।

তাকে ইতস্তত করতে দেখে ড্যানি বলল, খরচের কথা নিয়ে ভেবো না। আমার খরচটা আমিই দেব।

না, না, খরচ নিয়ে আমি ভাবছি না। কি জান, আমরা কেউ কাউকে জানি না। দুজনের মতের মিল নাও হতে পারে।

ড্যানি এবার জোর দিয়ে বলল, আমি কিন্তু আফ্রিকা যাবই। আর তুমিও যখন যেখানেই যাবে তখন দু’জন একসঙ্গে গেলে ক্ষতি কি? তাতে খরচ কম পড়বে, আর একজন সাদা মানুষের বদলে দু’জন সাদা মানুষ নিশ্চয়ই ভাল। এখন ভেবে বল, আমরা একসঙ্গে যাব না আলাদা-আলাদা?

লাফায়েৎ স্মিথ হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, একসঙ্গে।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটল। ট্রেনের ঝক-ঝক। স্টীমারের ধ্ব-ধ্ব। পুরনো পথে অনেক কালো মানুষের পায়ের ছাপ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সাদা মানুষদের নেতৃত্বে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সাফারি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ঘেঞ্জি পর্বতমালার অরণ্য-অঞ্চলের দিকে। কেউ কারও খবর রাখে না, কার কি উদ্দেশ্য তাও জানে না।

পশ্চিম দিক থেকে এল লাফায়েৎ স্মিৎ ও বন্দুকবাজ প্যাট্রিক; দক্ষিণ দিক থেকে এল বড় ইংরেজ শিকারী লর্ড পাস্মোর; পূর্ব দিকে থেকে লিওন স্তাবুচ।

ঘেঞ্জি পর্বতমালার সানুদেশের ঢালু জমিতে স্তাবুচরা থেমেছে দুপুরের বিশ্রামের জন্য। তার লোকজনদের মধ্যে কিছুটা গোলমাল চলেছে। একদল কুলি গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। তাদের দেখিয়ে স্তাবুচ সর্দারকে জিজ্ঞাসা করল, ওরা কি করছে?

সর্দার বলল, ওরা ভয় পেয়েছে বাওয়ানা।

জেনেশুনেও স্তাবুচ বলল, কিসের ভয়?

দস্যুর ভয় বাওয়ানা। কাল রাতে ওরা তিনজন পালিয়েছে। আরও পালাবে। সকলেই ভয় পাচ্ছে।

স্তাবুচ ধমক দিয়ে বলল, এবার ওরা আমাকে ভয় করবে। আর কেউ পালালে আমি-আমি

কিন্তু সে কথা আর বলা হল না। একজন কুলি হঠাৎ দাঁড়িয়ে সভয়ে চীৎকার করে পশ্চিম দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ দেখ! দস্যুরা আসছে।

দূরে আকাশ-পটে কালো ছায়ার মত দেখা দিল একদল অশ্বারোহী। তারা সবেগে ধেয়ে আসছে। সাদা আলখাল্লা বাতাসে উড়ছে, রাইফেলের নল ও বর্শার ফলা রোদ্দুরে চকচক করছে।

হঠাৎ একটা কুলি ছুটে গিয়ে একটা তল্পি কাঁধে তুলে নিল। সঙ্গে সঙ্গে সকলেই ছুটে গেল স্কুপ করা তল্পিতল্পার দিকে।

সর্দার ও আস্কারিরা ছুটে গেল। কুলিরা ততক্ষণে তল্পিতল্পা নিয়ে পিছনের পথ ধরে পালাতে ব্যস্ত। সর্দার বাধা দেয়াতে একটা কুলি ঘুষি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সকলেই পালাতে লাগল কুলিরা, আস্কারিরা, এমন কি সর্দার পর্যন্ত।

স্তাবুচ একা। সেও পালাতে যাচ্ছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল পালাবার চেষ্টা বৃথা। হুংকার দিতে দিতে অশ্বারোহীরা ছুটে আসছে শিবির লক্ষ্য করে। একেবারে তার সামনে এসে তারা ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল। বদখৎ চেহারাতেই তাদের স্বভাব পরিস্ফুট।

দস্যু-সর্দার স্তাবুচকে কি যেন বলল, কিন্তু সে তার কিছুই বুঝতে পারল না। দু’জন দস্যকে স্তাবুচের পাহারায় রেখে বাকিরা শিবিরে ঢুকে সব কিছু লুটপাট করে এসে ঘোড়ার পিঠে চাপাল। তারপর স্তাবুচকে নিরস্ত্র ও বন্দী করে সব কিছু নিয়ে যে দিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই ঘোড়া চালিয়ে দিল।

ঘন জঙ্গলের আড়ালে থেকে দুটি তীক্ষ্ণ ধূসর চোখে কিন্তু সব কিছুই দেখল। স্তাবুচরা দুপুরের বিশ্রামের জন্য থামার পর থেকেই সে শিবিরের উপর নজর রেখেছিল। দস্যুরা চলে যেতেই এক লাফে গাছে চড়ে সে দুলতে দুলতে চলল উল্টো পথে অর্থাৎ যে পথে স্তাবুচের লোকেরা পালিয়েছে।

দলের সর্দার গোলোবা সদলে ছুটছে বনের পথ ধরে। কিন্তু যখন দেখল যে দস্যুরা তাদের তাড়া করছে না, তখন সে থামল। এমন সময় গাছের আড়াল থেকে একটি ব্রোঞ্জ-কঠিন সাদা মানুষ পথের সামনে হঠাৎ দেখা দিল। একটুকরো কটিবস্ত্র ছাড়া সে প্রায় নগ্নদেহ। তাকে দেখেই ভয়ে ও বিস্ময়ে সকলে থেমে গেল।

লোকটি নিজের ভাষায় প্রশ্ন করল, তোমাদের সর্দার কে? সকলেরই চোখ ঘুরে গেল গোলোবার দিকে।

নিগ্রো সর্দার বলল, আমি।

তোমার বাওয়ানাকে রেখে চলে এলে কেন?

উত্তর দিতে গিয়েও গোলোবার থেমে গেল। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, সর্দার গোলোবাকে সে কথা শুধোবার তুমি কে হে?

সাদা লোকটি বলল, আমি অরণ্যরাজ টারজান।

গোলোবা বজ্রাহত। অরণ্যরাজ টারজানকে সে কখনও চোখে দেখে নি, কিন্তু এই বড় বাওয়ানার কীর্তি-কাহিনী সবই শুনেছে। প্রশ্ন করল, তুমি টারজান?

সে মাথা নাড়ল। গোলোবা সভয়ে নতজানু হয়ে বলল, দয়া কর বড় বাওয়ানা! গোলোবা জানত না।

 টারজান ধমক দিয়ে উঠল, আমি সব জানি। এবার ভালয় ভালয় ফিরে যাও।

গোলাবা ভয়ে ভয়ে বলল, দস্যুরা যদি আবার তাড়া করে?

করবে না। তারা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। তোমার বাওয়ানাকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। ভাল কথা। লোকটা কে? এখানে কি করছে?

অনেক দূরে উত্তরের দেশ থেকে সে এসেছে। সে বলে দেশটার নাম রুশা।

টারজান বলল, হ্যাঁ। আমি সে দেশের কথা জানি। সে এখানে এসেছে কেন?

 তা জানি না। তবে শিকার করতে আসে নি, কারণ খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া সে শিকার করে না।

সে কি টারজনের কখা কখনও বলেছে?

হ্যাঁ, প্রায়ই বলে। সব গ্রামেই সে টারজনের কথা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না।

 টারজান বলল, ঠিক আছে। তুমি যেতে পার।

মিডিয়ান দেশের উপত্যকার একেবারে নিচে অবস্থিত হ্রদটার দিকে এগিয়ে চলেছে লেডি বারবারা কলিস ধূলি-ধূসরিত পথ ধরে। তার ডানদিকে চলেছে আব্রাহামের ছেলে আব্রাহাম, বাঁদিকে চলেছে স্বর্ণ কেশিনী জেজেবেল। তাদের পিছনে বিষমুখ একটি তরুণীকে ঘিরে এগিয়ে চলেছে শিষ্যের দল। তারও পিছনে সর্দারের নেতৃত্বে চলেছে বাকি গ্রামবাসীরা।

শোভাযাত্রীরা হ্রদের তীরে এসে হাজির হল। এখানকার লোকেরা মনে করে হ্রদটা অতলান্ত। যে জায়গাটায় এসে তারা থামল সেখানে জমাট লাভা-পাথরের কয়েকটা বড় চাই হ্রদের উপর ঝুলে আছে। আব্রাহামের পুত্র আব্রাহাম শিষ্যদের নিয়ে তারই একটা পাথরের উপর বসল। তাদের মাঝখানে সেই তরুণীটি। জিহোবাবের একটিমাত্র ইঙ্গিতে আধা ডজন যুবক এগিয়ে এল। তাদের একজনের হাতে শক্ত সুতোর একটা জাল, অপর দুজনের হাতে একটা ভারী জমাট লাভার চাই। দ্রুতগতিতে তারা ভীত, ত্রস্ত, আর্তনাদকারী তরুণীটির উপর জালটাকে ছড়িয়ে দিয়ে লাভা-পাথরটাকে তার সেঙ্গ বেধে দিল।

আব্রাহামের পুত্র আব্রাহাম মাথার উপর হাত তুলে সংকেত করতেই অন্য সকলে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ল। সে তখন অপরিচিত হযবরল-র মত এমন কতকগুলো শব্দ উচ্চারণ করতে লাগল যেটা মিডিয়ান ভাষা নয়, কোন ভাষাই নয়।

মেয়েটি ততক্ষণে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এলিয়ে পড়েছে। যুবকরা জালটাকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

সহসা আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম অর্থহীন মন্ত্র ছেড়ে স্থানীয় ভাষায় বলতে লাগল, মেয়েটি পাপ করেছে, তাই তাকে শাস্তি পেতেই হবে। তবে অপার করুণাময় জিহোবার ইচ্ছায় তাকে আগুনে পোড়ানো হবে না, চিন্নেরেথের জলে তাকে তিনবার ডোবানো হবে যাতে শরীর থেকে সব পাপ ধুয়ে যায়।

কথা শেষ করে ইঙ্গিত করতেই চারটি যুবক দু’দিক থেকে জালটাকে তুলে ধরল, আর বাকি দুজন ধরে রইল জালের লম্বা দড়িটার দুই প্রান্তে। এবার তারা দুই প্রান্ত থেকে মেয়েটিকে দোলাতে লাগল ঘড়ির পেন্ডুলামের মত। চেনেথের হ্রদের শান্ত জলরাশির উপর দোদুল্যমান মেয়েটির আর্ত চীষ্কারের সঙ্গে মিশে গেল সেই সব দর্শকদের চীৎকার ও আর্তনাদ যাদের দুর্বল স্নায়ু এই চরম উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে আকস্মিক অপর রোগের প্রকোপে মাটিতে পড়ে গোঙ্গাতে শুরু করেছে।

ভীত এস্ত মেয়েটিকে যুবকরা ক্রমেই দ্রুততর বেগে দোলাতে লাগল। হঠাৎ তাদের একজনও মাটিতে এলিয়ে পড়ল। তার ফেনায়িত মুখ থেকে গোঁ-গোঁ শব্দ বের হতে লাগল। মেয়েটির নরম দেহটা শক্ত লাভা-পাথরের উপর আছড়ে পড়ল। জেহোবার ইঙ্গিতে আর একটি যুবক এসে তার জায়গায়। দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়েটি অবিরাম দুলতে লাগল একবার চিনেরেথের জলের উপর, একবার শক্ত লাভা পাথরের উপর।

জাল দোলানোর তালে তালে আব্রাহামের পুত্র আব্রাহাম মন্ত্রের মত উচ্চারণ করতে লাগল, জিহোবার নামে! আর তার পুত্র পলের নামে!

এটাই বোধ হয় সংকেত। চার যুবক সঙ্গে সঙ্গে জালের দড়িতে ঢিলে দিল আর জল শুষ্টু মেয়েটি সটান ডুবে গেল হ্রদের জলে। খানিকটা জল ছলকে উঠল। তার ঢেউ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল হ্রদের বুকে। কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ। শুধু শোনা যেতে লাগল মিডিয়ানদের অনিবার্য নিয়তির শিকার আরও অনেক অপম্মার গ্রস্ত মানুষের আর্তনাদ ও গোঙানির শব্দ।

কয়েক সেকেন্ড পরে আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম আবার সংকেত দিতেই ছয় যুবক জলশুদ্ধ মেয়েটিকে টেনে তুলল জলের উপরে। কিছুক্ষণ সেইভাবে রেখে পয়গাম্বরের নির্দেশে আবার তাকে জলের মধ্যে ডুবিয়ে ধরল।

ছয় যুবক জালটাকে তুলে মেয়েটির অসার দেহটাকে পাথরের উপর নামিয়ে দিল ঠিক সেইখানে যেখানে লেডি বারবারা নতজানু হয়ে প্রার্থনায় রত।

পয়গাম্বর তার দিকে ফিরে বলল, কি করছ তুমি?

অসহায় মেয়েটির জীবন রক্ষার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি।

মুখ বিকৃত করে পয়গাম্বর বলল, ওই দেখ তোমার প্রার্থনার জবাব। মেয়েটি মরে গেছে। এর দ্বারা জেহোবা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল, আব্রাহাম-পুত্র আব্রাহামই তার পয়গাম্বর, আর তুমি একটি ধাপ্পাবাজ!

জেজেবেল অস্পষ্ট গলায় বলল, আর আমাদের রক্ষা নেই!

সেটা লেডি বারবারাও বুঝতে পারল; তবু সংকটকালে আত্মহারা হয়ে পয়গাম্বরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে বলল, হ্যাঁ, মেয়েটি মারা গেছে, কিন্তু জেহোবা তাকে নতুন জীনব দান করতে পারে।

আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম বলল, তা পারে, কিন্তু দেবে না।

তোমার কথায় দেবে না, কারণ সে তোমার উপর ক্রুদ্ধ হয়েছে, তার পয়গাম্বর হয়েও তুমি তাকে অমান্য করেছ। দ্রুতপায় প্রাণহীন দেহটার পাশে এগিয়ে গিয়ে লেডি বারবারা আবার বলল, কিন্তু আমার প্রার্থনায় জেহোবা ওকে নতুন জীবন দেবে। এস জেজের্বেল, আমাকে সাহায্য কর।

আধুনিক খেলা-ধূলায় অভিজ্ঞ অন্য অনেক নারীর মতই লেডি বারবারাও জলমগ্ন মানুষের চিকিৎসা পদ্ধতি বেশ ভালই জানে। সেই সব প্রক্রিয়াই সে মেয়েটির উপর প্রয়োগ করতে লাগল। কিন্তু তার সঙ্গে একটু ভড়ং যোগ করল সমবেত নর-নারীদের মনে বিস্ময় ও শ্রদ্ধা জাগাতে। তার নানা রকম নির্দেশমত জেজেবেল কাজ করতে লাগল, আর লেডি বারবারা মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গীতে গড় গড় করে আবৃত্তি করতে লাগল কখনও চার্জ অব দি লাইট ব্রিগেড থেকে, কখনও এলিস ইন ওয়ারল্যান্ড থেকে, আবার কখনও কিপ লিং বা ওমর খৈয়াম থেকে। এইভাবে দশ মিনিট চিকিৎসার পরে মেয়েটির দেহে যখন জীবনের লক্ষণ দেখা দিল তখন সে লিংকনের গেটিবুর্গ ভাষণ-এর অংশবিশেষ আবৃত্তি করে তার মন্ত্র পাঠ শেষ করল।

পয়গাম্বর, শিষ্যবৃন্দ, প্রধানগণসহ সমবেত জনতা মুগ্ধবিস্ময়ে এই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করল।

উঠে দাঁড়িয়ে লেডি বারবারা তখনও আবৃত্তি করে চলেছে, জনগণের কল্যাণে জনগণকে নিয়ে গঠিত জনগণের এই সরকার কখনও পৃথিবী থেকে লুপ্ত হবে না। মুখ ফিরিয়ে জালধারী ছয়জন যুবককে আদেশ করল, মেয়েটিকে ওই জঙ্গলের মধ্যে শুইয়ে তার বাবা-মার কাছে নিয়ে যাও। এস জেজেবেল। আব্রাহাম পুত্র আব্রাহামের দিকে একবার ফিরেও তাকাল না।

একজন অশ্বারোহী লুটেরার পিছনে বসে বন্দী লিও স্তাবুচ অজ্ঞাত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। ঘটনাচক্রে একবার মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলেও যে কোন দ্বিতীয় সুযোগেই লুটেরারা যে তাকে শেষ করে ফেলবে তা সে বুঝতে পারছে।

একটা পাহাড়ি খাড়ি-পথ ধরে লুটেরারা এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পরেই দূরে একটা প্রাচীরঘেরা গ্রামে লুঠেরারা ঢুকে পড়ল। গ্রামবাসীরা চীৎকার করে তাদের অভ্যর্থনা জানাল।

একটা ভাঙা ঘর থেকে বেরিয়ে এল একজন বেঁটে দাড়িওয়ালা সাদা মানুষ। তাকে দেখেই স্তাবুচ যেন কিছুটা স্বস্তি পেল।

দলের সর্দার সেই দাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে সব কথা বলতে লাগল। সেই ফাঁকে স্তাবুচকে সেখানে নিয়ে আসা হল।

সর্দারের কথা শুনে দাড়িওয়ালা হাসিমুখে স্তাবুচকে কি যেন বলল। স্তাবু বুঝল যে লোকটি ইতালীয় ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু সে ভাষা তো সে বুঝতেও পারে না। তখন সে ইংরেজিতে কথা বলল।

দাড়িওয়ালা ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ইংরেজি ভাষা আমি একটু-একটু বুঝি। তুমি কে? কোন্ দেশ থেকে এসেছ তুমি?

স্তাবু বলল, আমি একজন বিজ্ঞানী। আগে কথা বলেছিলাম রুশ ভাষায়।

 রাশিয়া কি তোমার দেশ?

হ্যাঁ।

এবার পরিবর্তিত সুরে দাড়িওয়ালা শুধাল, তোমার নাম কি কমরেড?

আমার নাম লিওনা স্তাবুচ। আর তোমার নাম কি?

দোমিনিক কাপিয়েত্রো। এস, ভিতরে গিয়ে সব কথা হবে। আমার কাছে একটা বোতল আছে। সেটা দিয়েই শুভ-সূচনা করা যাবে।

পাত্রের পর পাত্র মদ ফুরোতে লাগল। ক্রমে দু’জনের মেজাজও দিলদরিয়া হয়ে উঠল। সামনে দুটো খালি বোতল; আর একটা নতুন ভোলা হয়েছে। মদের ঝোঁকে স্তাবুচের গলা জড়িয়ে ধরে ভদ্রলোকটি নিজে থেকেই বলতে শুরু করল, কমরেড তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। অতএব আমাকে বলতেই হবে কেন আমি এই নোংরা গলা-কাটা লোকগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। আমি ছিলাম ইতালীয় বাহিনীর একজন সৈনিক। আমার রেজিমেন্ট তখন ইরিত্রিয়াতে অবস্থিত। একজন সাচ্চা কমুনিস্ট হিসেবে সেখানেই বিভেদ ও বিদ্রোহের উস্কানি দিতে শুরু করলাম, আর একটা ফ্যাসিস্ট কুকুর কম্যান্ডিং অফিসারকে বলে দিল। আমি গ্রেফতার হলাম। আমাকে নির্ঘাৎ গুলি করে মারা হত, কিন্তু তার আগেই আমি আবিসিনিয়াতে পালিয়ে গেলাম।

পথে নেমে কিছু ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র চুরি করলাম। পথে একদল ডাকাতকেও দলে ভিড়িয়ে নিলাম। তাদের নিয়েই শুরু করলাম পথে পথে চুরি-ডাকাতি। কিন্তু তাতে মালকড়ি সামান্যই জুটত। কাজেই সুদূর ঘেঞ্জি অঞ্চলে গিয়ে শুরু করে দিলাম কালো হস্তিদন্তের ঢালাও লাভের ব্যবসা।

কালো হস্তিদন্ত? এরকম কোন জিনিসের নাম তো শুনিনি।

কাপিয়েত্রো হেসে বলল, আরে, দু-পেয়ে হাতি।

স্তাবুচ শিস্ দিয়ে বলে উঠল, এবার বুঝতে পেরেছি। তুমি একজন ক্রীতদাস-শিকারী থাক, ওসব কথা। এবার তোমার কথা বল।

আমি একটি লোকের সন্ধান করছি।

আফ্রিকার উপকূল অঞ্চলে তো অনেক লোক আছে। তার জন্য এই সুদূর ঘেঞ্জি অঞ্চলে এসেছ কেন?

স্তাবুচ উত্তরে বলল, আমি যার খোঁজ করছি তাকে ঘেঞ্জির দক্ষিণেই কোথাও পাওয়া যাবে বলে আমার ধারণা।

নেশার ঘোরে না থাকলে হয় তো একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত লোককে নামটা বলত না। সে নির্দ্বিধায় বলল, অরণ্যরাজ টারজান নামে একজন ইংরেজকে আমি খুঁজছি।

কাপিয়েত্রোর চোখ দুটো কুঁচকে গেল। প্রশ্ন করল, সে কি তোমার বন্ধু?

তাকে কখনও দেখিও নি, স্তাবুচ জবাব দিল।

কাপিয়েত্রো বলল, তার দেশ ঘেঞ্জির অনেক দক্ষিণে। কিন্তু অরণ্যরাজ টারজনের সঙ্গে তোমার কি কাজ?

আমি মস্কো থেকে এসেছি তাকে হত্যা করতে। কথাটা বলে ফেলেই স্তাবুচের মনে হল, কাজটা ভাল হয় নি।

কাপিয়েত্রো বলল, যাক, আশ্বস্ত হলাম।

কেন?

কালো হস্তিদন্ত সগ্রহের ছোটখাট কাজে সেই আমার পথে সবচাইতে বড় বাধা। সে আমার পথ থেকে সরে গেলেই আমি বেঁচে যাই।

লর্ড পাসমোরের সাফারি ঘেঞ্জি পর্বতমালার পশ্চিম দিক ধরে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ দিকে। তার দীর্ঘদেহ কুলিরা সুশিক্ষিত সেনাদলের মত সঠিক পদক্ষেপে এক তালে এগিয়ে চলেছে। সর্বত্র শৃঙ্খলার চিহ্ন সুপরিসস্ফুট।

পূর্ব দিকে কয়েক মাইল এগিয়ে একটা চড়াই বেয়ে উঠবার সময় দুটি সাদা মানুষ একটি মাত্র ভৃত্য ও একটি বন্দুকবাহককে নিয়ে দল ছেড়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে চলেছে।

লাফায়েৎ স্মিথ বন্দুকবাজকে বলল, তুমি সাফারির সঙ্গে এখানে থাক। জায়গাটা ভাল, এখানে একটা শিবির বসাবার ব্যবস্থা কর। আরও কিছুটা দেখে আসি। এখনও অনেক বেলা আছে।

খোলা জায়গা পেরিয়ে লাফায়েৎ স্মিথ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। পথ ক্রমেই আরও দুরারোহ; যেমন চড়াই, তেমনি ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি। বেশ কষ্ট করে সে উপরে উঠতে লাগল।

এক সময় একটা পাহাড়ের মাথায় উঠল। সামনে দূরে মাইলের পর মাইল জুড়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি। এ পাহাড় থেকে সামনের পাহাড়ে যাবার পথে একটা বড় খাড়ি।

 লাফায়েৎ স্মিথ খাঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। যতটা ভেবেছিল খাড়িটা তার চাইতেও বেশি গভীর। তবু গভীর আগ্রহে নিচে নেমে সে আবার উপরে উঠতে লাগল পরের পাহাড়টা বেয়ে। কৌতূহল তাকে এতই অভিভূত করে রেখেছে যে সময়ের দিকে কোন খেয়ালই রইল না।

খাড়ির উপরে উঠেই রাত নেমে এল। তবু সে ধীরে ধীরে উঠতে লাগল। আরও কয়েক ঘণ্টা পার হবার আগে স্মিথ বুঝতেই পারেনি যে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে।

একটু একটু করে লাফায়েৎ স্মিথ এগিয়ে চলল সুড়ঙ্গ-পথ ধরে। আবিষ্কারের নেশায় ভুলে গেল ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও নিরাপত্তার কথা। সুড়ঙ্গটা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে। এক সময় দু’দিকের দেওয়াল এত বেশি চেপে এসেছে যে কোনরকমে একটা মানুষ তার ভিতর দিয়ে গলে যেতে পারে।

অন্ধকার ক্রমেই বাড়ছে। এক সময় সে হাতে পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। মনে সর্বদাই ভয়-না জানি কি আছে এ পথের শেষে।

এক সময় একটুকরো দিনের আলো হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠল গুহার মুখে। হামাগুড়ি দিয়ে বের হতেই সামনে পড়ল একটা উপত্যকা। সম্মুখে প্রসারিত ঝোপঝাড়ে ভর্তি বিস্তীর্ণ প্রান্তর; মাঝখানে একটা নীল হ্রদ পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করছে।

সেখান থেকে চারদিকে তাকিয়ে একটা আশ্চর্য দৃশ্য তার চোখে পড়ল। কুঁড়ে ঘরে সাজানো একটা গ্রাম। কিন্তু না, সে নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছে। এই পরিত্যক্ত জায়গায় গ্রাম আসবে কোথা থেকে? নিশ্চয় এটা তার চোখের ভুল।

এগিয়ে চলল গ্রামটার দিকে–আশ্রয় ও আহার্যের আশায়। হ্রদের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা দৃশ্য চোখে পড়তেই সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দুটো ক্রুশ-কাষ্ঠের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুটি মেয়ে। আগুনের আভা পড়েছে তাদের মুখে। দু’জনই সুন্দরী।

লাফায়েৎ স্মিথ বুঝতে পারল একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছে। ক্রুশ দুটোর নিচে স্তূপীকৃত করা হয়েছে শুকনো ঘাস-পাতা ও জ্বালানি-কাঠ। একদল যুবকের হাতে জ্বলন্ত মশাল। জ্বালানি-কাঠে আগুন ধরাবার আয়োজন চলছে।

একটি বৃদ্ধ মন্ত্র পাঠ করছে। এখানে-ওখানে মাটিতে পড়ে আছে কিছু মানুষ। নিশ্চয় দশা পড়েছে। বুড়ো লোকটি সংকেত করতেই শুকনো কাঠে আগুন ধরানো হল।

আর দেরী করা চলে না। এক লাফে এগিয়ে গিয়ে গ্রামবাসীদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে লাফায়েৎ স্মিথ ক্রুশকাষ্ঠের কাছে হাজির হল। পায়ের বুট দিয়ে জ্বলন্ত কাঠগুলোকে লাথি মরে সরিয়ে দিল। তারপর ৩২- টাকে উঁচিয়ে ঘুরে দাঁড়াল বিস্মিত ক্রুদ্ধ জনতার দিকে।

আব্রাহাম পুত্র আব্রাহাম হতচকিত। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। সম্বিত ফিরে পেয়ে সে চীৎকার করে বলল, কে এই মহাপাপী? ওকে আক্রমণ কর! ওর হাত-পা-মুণ্ডু ছিঁড়ে ফেল।

স্মিথের পেছন থেকে ভেসে এল একটি ইংরেজ কণ্ঠঃ এই মুহূর্তে গুলি চালাও; নইলে ওরা তোমাকে শেষ করে ফেলবে।

লাফায়েৎ স্মিথের বিস্ময়ের শেষ নেই। এ যে এক ইংরেজ মহিলার কণ্ঠস্বর। একজন মশালধারী এগিয়ে আসতেই স্মিথ গুলি করল। আর্তনাদ করে বুক চেপে ধরে সে স্মিথের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। তা দেখে আর যারা এগিয়ে আসছিল তারা পিছিয়ে গেল। অতি-উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে অ্যাঙ্গাস্টাসের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অপম্মার রোগগ্রস্ত বাকি লোকগুলো মাটিতে পড়ে গোঙ্গাতে লাগল।

তাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার সেই সুযোগে লাফায়েৎ স্মিথ দুই বন্দিনীর হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিল। দু’জনকে দুই হাতে তুলে ধরল। জেজেবেলকে ক্রুশে বাঁধা হয়েছিল অনেকক্ষণ আগে। সে কোনমতেই একাকী দাঁড়াতে পারছিল না। লেডি বারবারা ও স্মিথ দু’জনেই তাকে ধরে রইল যতক্ষণ না। তার পায়ের স্বাভাবিক রক্ত-চলাচল ফিরে আসে।

পয়গাম্বরের দিকে পিছন ফিরে তারা দাঁড়িয়েছিল। সেই সুযোগে বুড়ো পয়গাম্বর বলির খড়টা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল তাদের দিকে। তার সব রাগ পড়ল লেডি বারবারার উপর। সেই তো যত নষ্টের গোড়া। চুপি চুপি এগিয়ে লেডি বারবারার পিছনে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পয়গাম্বর খসমেত ডান হাতটা মাথার উপর তুলল আঘাত হানার উদ্দেশ্যে। সমবেত দর্শকরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। সহসা তাদের কানে এল পয়গাম্বরের রুদ্ধশ্বাস আকস্মিক আর্তনাদ; তার অবশ মুঠি থেকে খগা পড়ে গেল; সে নিজেও ভূতলশায়ী হল। নবাগতদের দৃঢ় মুষ্ঠি আর গলা চেপে ধরেছে।

লেডি বারবারা বলল, এখনই পালাও। মুহূর্তের মধ্যে ওরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

স্মিথ বলল, তোমার বন্ধুটিকে সঙ্গে নিতে আমার সঙ্গে তোমাকেও হাত লাগাতে হবে। সে একা হাঁটতে পারবে না।

লেডি বারবারা বলল, তুমি ওকে বাঁ হাত দিয়ে ধর। তাহলে ডান হাতে পিস্তল চালাতে পারবে। আমি অপর দিকটা ধরছি।

জেজেবেল মিনতি করে বলল, আমাকে রেখে যাও। আমার জন্য তোমরাও পালাতে পারবে না।

স্মিথ বলল, বাজে কথা রাখ। আমার গলা জড়িয়ে ধর।

লেডি বারবারা আশ্বাস দিয়ে বলল, রক্ত-চলাচল স্বাভাবিক হলেই তুমি হাঁটতে পারবে। চলে এস। যত তাড়াতাড়ি পারি পালাই এখান থেকে।

বাধা দিল জোবাব। নোংরা জামার ভিতর থেকে একটা ছুরি বের করে চীৎকার করে বলল, ওদের আইকাও।

জোবাবের দিকে পিস্তল তাক করে স্মিথ হুকুম করল, একপাশে সরে দাঁড়াও!

মুহূর্তের মধ্যে জোবাবের পাঁজরে নলটা ঠেকিয়ে ঘোড়া টিপল। বিকৃতস্বরে চীৎকার করে সে মাটিতে পড়ে যেতেই নলের মুখটা জনতার দিকে ঘুরিয়ে আবার গুলি করল। ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে মিডিয়ানরা পালিয়ে গেল।

জেজেবেল বলল, যে কোন মুহূর্তে ওরা আবার আসতে পারে। এই সুযোগে আমাদের পালাতে হবে।

 স্মিথ বলল, আমার পিছনে পিছনে এস। আমি যে পথে এসেছি সেই পথে তোমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব।

বেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে পথ চলার পরে লাফায়েৎ স্মিথই প্রথম মুখ খুলল। বলল, তোমাদের দুজনের পরিচয়টা কিন্তু এখনও জানা হয়নি।

লেডি বারবারা বলল, জেজেবেল এখানকারই মেয়ে।

আর তুমি? তুমিও কি এখানকার মেয়ে?

লেডি বারবারা জবাব দিল, আমি ইংরেজ।

অথচ কোন্ পথে এখানে এসেছ তাও জান না?

জানি-আমি এখানে নেমেছি প্যারাসুটে।

 স্মিথ হাঁ করে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি লেডি বারবারা কলিস!

তুমি কি করে জানলে? তুমি কি আমাকে খুঁজছ?

না, কিন্তু লন্ডন হয়ে আসার সময় খবরের কাগজে তোমার বিমানে ওড়া ও নিখোঁজ হবার খবর অনেক পড়েছি–ছবি ছাপাও বেরিয়েছিল। বুঝলে তো?

আর ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে গেল তোমার সঙ্গে। আশ্চর্য যোগাযোগ! কি সৌভাগ্য আমার।

স্মিথ মুখ নিচু করে বলল, কি জান, আসলে আমিও পথ হারিয়ে ঘুরছি। ফলে তোমার ভাগ্যের বিশেষ হেরফের কিছু হয়নি।

তা কেন? তুমিই তো আমাকে কবরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছ। ও

রা কি সত্যি তোমাকে পুড়িয়ে মারত না কি? আজকের সভ্য জগতেও কি তা সম্ভব?

মিডিয়ানরা দু’হাজার বছর আগেকার যুগে বাস করে। তা ছাড়া, তারা যেমন ধর্মভীরু তেমনি জন্মগত উন্মাদ।

স্মিথ জেজেবেলের দিকে তাকাল। সদ্য-উদিত চাঁদের আলো পড়েছে তার মুখে। স্মিথের মনোভাব বুঝতে পেরে লেডি বারবারা বলল, জেজেবেলের কথা আলাদা। কারণটা বুঝিয়ে বলতে পারব না, কিন্তু সে তার দেশের অন্য লোকদের মত নয়। সেই আমাকে বলেছে, মাঝে মাঝে নাকি তার মত দু’একটি ছেলেমেয়েও এ দেশে জন্মায়।

কিন্তু সে তো ইংরেজিতে কথা বলে, স্মিথ বলল।

আমি ওকে ইংরেজি শিখিয়েছি, লেডি বারবারা বলল।

বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনকে ছেড়ে ও কি সত্যি আমাদের সঙ্গে যাবে?

এবার কথা বলল জেজেবেল। নিশ্চয় যাব। এখানে থাকব কি খুন হবার জন্যে? আজ রাতে আমার বাবা, মা, ভাই-বোনরা সকলেই ছিল ক্রুশকাষ্ঠের কাছে। তারা আমাকে ঘৃণা করে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই ঘৃণা করে। আমি তাদের মত নই। তাছাড়া, মিডিয়ানদের দেশে ভালবাসা বলে কিছু নেই। আছে শুধু ধর্ম। তারা মুখে ধর্মের কথা বলে আর কার্যক্ষেত্রে ছড়ায় শুধু ঘুণা।

জেজেবেলের পায়ের অবশ ভাবটা কেটে গেছে। এখন সে একাই হাঁটতে পারছে। নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে তিনটি প্রাণী। আফ্রিকার ভরা চাঁদ উঠেছে আকাশে। তারই আলোয় পথ চলা সুগমতর হয়েছে। চিন্নেরেথের নীল জলরাশিকে ডাইনে রেখে তারা এগিয়ে চলেছে।

মাঝরাতের কিছু পরেই স্মিথ প্রথমবার হোঁচট খেয়ে পড় গেল। তাড়াতাড়ি উঠে আবার হাঁটতে লাগল। পিছন থেকে জেজেবেল বুঝতে পারল, তার পা টলছে। স্মিথ আবার পড়ে গেল। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সে যখন তৃতীয়বার পড়ে গেল তখন লেডি বারবারা ও জেজেবেল তাকে ধরে তুলল।

লেডি বারবারা বলল, তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।

না, না, আমি ঠিক আছি।

 তুমি শেষবার কখন খেয়েছ? লেডি বারবারা শুধাল।

স্মিথ বলল, সঙ্গে কিছু চকোলেট ছিল। বিকেলের দিকে তাই খেয়েছি।

লেডি বারবারা তবু প্রশ্ন করল, আমি জানতে চাইছি, পুরো খাবার কখন খেয়েছ?

দেখ, হাল্কা লাঞ্চ খেয়েছি গতকাল দুপুরে, বরং বলতে পার তার আগের দিন।

লেডি বারবারা সবিস্ময়ে বলল, আর এখন মাঝ রাত পার হয়ে গেছে। অথচ সেই থেকে তুমি হেঁটেই চলেছ?

দুর্বল হাসি হেসে স্মিথ বলল, কিছুক্ষণ দৌড়তেও হয়েছে; একটা সিংহ তাড়া করেছিল যে।

ইংরেজ মেয়েটি বলল, তুমি একটু সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই বিশ্রাম নেব।

স্মিথ মাথা নেড়ে বলল, না, না, তা করো না। দিনের আলো ফুটবার আগেই আমাদের এই উপত্যকাটা পার হতে হবে। সূর্য উঠলেই তারা আমাদের খুঁজতে বের হবে।

লেডি বারবারা কঠিন গলায় বলল, সে যা হয় হবে। তোমাকে বিশ্রাম নিতেই হবে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও লাফায়েত বসে পড়ল। বলল, আমার দ্বারা তোমাদের বিশেষ কোন সাহায্য হবে বলে তো মনে হয় না। এ সময় ড্যানি থাকলে খুব ভাল হত।

কে ড্যানি?

আমার বন্ধু; এই অভিযানে আমার সঙ্গী।

তার কি আফ্রিকা-অভিযানের অভিজ্ঞতা আছে?

 তা নেই, তবে সে কাছে থাকলেই যে ভরসা পাওয়া যায়। তাছাড়া সে গুলিগোলা ছুঁড়তে খুব ওস্তাদ।

চিৎ হয়ে শুয়ে স্মিথ চাঁদের দিকে তাকাল। এখন সে অনেকটা সুস্থ বোধ করছে। শুয়ে শুয়ে গত ত্রিশ ঘণ্টার ঘটনাবলীই তার মনের মধ্যে নড়াচড়া করতে লাগল। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।

পাছে তার ঘুম ভেঙে যায় তাই লেডি বারবারা ইশারায় জেজেবেলকে ডেকে নিয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে বসল। বলল, আহা বেচারী! অনেক ধকল গেছে ওর উপর দিয়ে।

ও কি তোমার দেশের মানুষ? জেজেবেল প্রশ্ন করল।

না, ও মার্কিনী। কথা শুনেই বুঝেছি।

 ও খুব সুন্দর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেজেবেল বলল।

কয়েক সপ্তাহ ধরে কেবল আব্রাহাম পুত্র আব্রাহামকে দেখলে তোমার সঙ্গে আমাকেও একমত হতে হবে যে সন্ত গান্ধীও একটি এডোনিস, লেডি বারবারা বলল।

তারপর একটা হাই তুলে বলল, ও সব কথা পরে হবে। এস একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক।

লেডি বারবারা মাটির উপর শুয়ে অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল। সারাটা দিন তার উপর দিয়েও তো অনেক ধকল গেছে।

মাঝ রাতের পরে একটা শব্দ শুনেই টারজনের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

মাথা তুলে কান পাতল; তারপর মাথা নিচু করে মাটিতে কান রাখল। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বলল, অশ্ব ও অশ্বারোহী।

এত রাতে অশ্বারোহী আসছে কেন? তারা কারা?

টারজান তো জানে না ড্যানি ডাকাতের সর্দার কাপিয়েত্রো-র হাতে বন্দী হয়েছে। তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলেছে তাদের শিবিরে।

অন্ধকারে বন্দুকবাজ টলতে টলতে চলেছে। বিশ বছরেও বেশি কালের জীবনে এত ক্লান্তি সে কোনদিন অনুভব করেনি। প্রতিটি পদক্ষেপই মনে হচ্ছে শেষ পদক্ষেপ।

শেষ পর্যন্ত ডাকাতের দলটা ডোমিনিক কাপিয়েত্রোর গ্রামের ফটক দিয়ে ঢুকল। বন্দুকবাজ-কে নিয়ে যাওয়া হল এক কুটিরে। হাতের বাঁধন কেটে দিতেই সেখানকার কঠিন মাটিতেই তার দেহটা এলিয়ে পড়ল।

ঘুম ভেঙে কোন রকমে কিছু পেটে দিয়েই সে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। একটা ক্লান্ত ডাকাত কুটিরের মুখে ঘুমে ঢুলতে লাগল।

ডাকাতরা যখন সারি দিয়ে গ্রামের ভিতরে ঢুকছিল টারজান তখন নেমে এসেছিল উপরকার পাহাড়ের মাথায়। ভরা জ্যোৎস্নায় অশ্বারোহীদের বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। কাপিয়েত্রো ও স্তাবুচকে দেখেই সে চিনতে পারল; মার্কিন ভূ-তত্ত্ববিদের দলের সর্দার ওপোনিয়োকেও দেখতে পেল; আরও দেখল, বন্দুকবাজ অত্যন্ত কষ্টে টলতে টলতে চলেছে।

ক্রমে রাত বাড়ল। চারদিক নিস্তব্ধ। পাহাড়ের উপর থেকে সব কিছু দেখে-শুনে-বুঝে টারজান নিঃশব্দে নেমে এল গ্রামের পাঁচিলের পাশে। এক লাফে উঠে গেল পাঁচিলের মাথায়। আর এক লাফে পাঁচিল থেকে নামল। এগিয়ে গেল সেই কুটিরটার দিকে যেখানে ঘুমিয়ে আছে সাদা যুবকটি। দরজার পাশে বসে আছে পাহারাদার। রাইফেলটা হাঁটুর নিচে। ধীরে ধীরে সে পা ছড়িয়ে বেড়ার গায়ে হেলান দিল। প্রহরী ঘুমিয়ে পড়েছে।

নিঃশব্দে টারজান এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। দুই হাত বাড়াল। মটু করে একটা শব্দ হল। ইস্পাত-কঠিন মুঠোর এক মোচড়ে গলার হাড়টা ভেঙে গেল।

অন্ধকারেই মৃতদেহটাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে টারজান ঘরের ভিতরে ঢুকল। খুব সাবধানে ঘুমন্ত বন্দুকবাজ-কে ঠেলে দিল। কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। আরও জোরে ঠেলা দিয়েও যখন কোন কাজ হল না তখন এক চড় কসিয়ে দিল তার গালে।

বন্দুকবাজ নড়েচড়ে বলে উঠল, গীজ! তোমরা কি একটু ঘুমতেও দেবে না। বলেছি ত মুক্তিপণ পাবে।

মুচকি হেসে টারজান ফিসফিস্ করে বলল, উঠে পড় হে। হৈ-চৈ করো না। আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

তুমি আবার কে?

অরণ্যরাজ টারজান।

গীজ! বন্দুকবাজ উঠে বসল।

টারজান বলল, আমাকে অনুসরণ কর। যাই ঘটুক না কেন আমার খুব কাছে কাছেই থেকো। আমি তোমাকে ছুঁড়ে দেব পাচিলের মাথায়। কোন রকম শব্দ করো না, আর খুব সাবধানে ও-পাশে নেমো, ওদিকের মাটি অনেকটা নিচু।

পাঁচিলের কাছে পৌঁছে বন্দুকবাজ উপরে তাকাল। তার সন্দেহ ঘনীভূত হল। তার একশ’ আশি পাউন্ড ওজনের দেহটাকে ছুঁড়ে দেবে পুঁচিলের উপরে- পাগল না কি!

বন্দুকবাজে’র কলার ও ব্রীচেস চেপে ধরে তাকে কয়েকবার ঝুলিয়ে টারজান ছুঁড়ে দিল পাঁচিলের উপরে। পর মুহূর্তে ড্যানি প্যাট্রিকের প্রসারিত আঙুলগুলো পাঁচিলে মাথাটাকে আঁকড়ে ধরল।

 বন্দুকজাব ড্যানি প্যাট্রিক তো হতবাক। কী মানুষ রে বাবা! জীবনে কখনও সে এ রকমটি দেখেনি, দেখার আশাও করে না।

পাঁচিল থেকে নেমে দু’জন নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। পাহাড়ের অনেক উপরে যেখানে সে গত রাতটা কাটিয়েছে, সেখানেই দু’জন পৌঁছে গেল। টারজান বলল, ভোর পর্যন্ত যতটা পার বিশ্রাম করে নাও। তুমি খুব ক্লান্ত।

গীজ! আহা, এ রকম দরদভরা কথা কতকাল শুনিনি, ড্যানি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।

একটু দূরে টারজান শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু ভোর হবার সাথে সাথেই তার ঘুম ভেঙে গেল। সঙ্গীটি তখনও ঘুমোচ্ছে। নিঃশব্দে সে কাছাকাছি একটা জলার দিকে এগিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে ড্যানির ঘুম ভাঙল। উঠে দেখে টারজান নেই। কোথায় গেল? তাকে ফেলে পালিয়েছে? তাকে তো সে রকম মানুষ বলে মনে হয়নি। তবু-কিছুই বলা যায় না।

বন্দুকবাজ ভাবতে লাগল; এখন আমি কি করি? গীজ! ক্ষিধেও পেয়েছে খুব। তার জন্যে অপেক্ষা করব, না চলতে শুরু করব? যাবই বা কোথায়? কি খাব? মহা মুস্কিল।

যতদূর দৃষ্টি যায় চারদিকে তাকাল। কোথায় টারজান?

সামনের লম্বা ঘাসকে দু’ভাগ করে দেখা দিল টারজান। তার কাঁধে একটা মরা শুয়োর। আজকের খাদ্য।

টারজান শুয়োরটাকে নামিয়ে রেখে বলল, এই নাও, প্রাতরাশ এনেছি। এবার শুরু করে দাও।

ড্যানি বলল, খুব ভাল করেছ; আমি এটাকে কাঁচাই খেয়ে ফেলব।

খুব ভাল কথা। টারজান বসে পড়ল। দুটুকরো মাংস কেটে একটা কুটররা ড্যানিকে দিয়ে বলল, খাও।

আহারাদি শেষ করে দু’জন পথে নামল লাফায়েত স্মিথের খোঁজে। টারজান অচিরেই তার পায়ের দাগ দেখতে পেয়ে সেই পথ ধরে এগোতে লাগল; কিন্তু ড্যানির চোখে এমন কিছু পড়ল না যাকে মানুষের পায়ের দাগ বলে মনে হতে পারে।

অদূরে একটা গ্রাম দেখতে পেয়ে কৌতূহলবশে টারজান স্মিথের পায়ের দাগ ছেড়ে সেই গ্রামের দিকে হাঁটতে লাগল। ড্যানি প্যাট্রিক তখনও ফাটলের পথের পাথরের ঠোক্কর খেতে খেতে কোন রকমে এগিয়ে চলেছে।

এইভাবে ক্লান্ত দেহে সে যখন ফাটলের শেষ প্রান্তে পৌঁছে একটি আশ্চর্য উপত্যকার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ততক্ষণে টারজান তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে।

 বন্দুকবাজ বলে উঠল, গীজ! কে জানত যে এমন একটা জায়গা এখানে আছে? আর টারজানই বা কোন পথে গেল?

খানিক ভেবেচিন্তে ভুল পথ ধরে সে এগোতে লাগল।

বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিক ক্লান্ত, বিরক্ত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে হেঁটেছে কিন্তু বন্ধুর কোন হদিস পায়নি। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

সে হ্রদের দিকে চলতে লাগল। পথময় বড় বড় পাথর ছড়ানো। একটা বড় পাথরের চাই ঘুরে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। তার দিকেই এগিয়ে আসছে একটি স্বর্ণকেশী মেয়ে। সেও দাঁড়িয়ে পড়ল। মৃদু হেসে সে বলল, আরে, তুমি আবার কে?

তার মিডিয়ান ভাষা বন্দুকবাজ কিছুই বুঝতে পারল না।

ড্যানি বলল, এতদিনে আমার আফ্রিকা আসার একটা মানে পাওয়া গেল। এবার বলতো খুকি, তুমি ভাল আছ তো?

জেজেবেল ইংরেজিতে বলল, ধন্যবাদ। আমাকে তোমার ভাল লেগেছে জেনে খুশি হলাম।

 ড্যানি বলল, গীজ, তুমি দেখছি যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলছ? তুমি কোন দেশের মেয়ে?

আমি মিডিয়ান থেকে আসছি।

সে দেশের নাম তো কখনো শুনিনি। তা তুমি এখানে কি করছ?

আমি অপেক্ষা করছি লেডি বারবারার জন্য; আর স্মিথের জন্য।

স্মিথ! কোন্ স্মিথ? ড্যানির সাগ্রহ প্রশ্ন।

ও, সে খুব সুন্দর, জেজেবেল খোলাখুলি বলল।

ড্যানি বলল, এখানে তো একমাত্র সুন্দর তুমি জেজেবেল!

নিজেদের কথা নিয়ে তারা এতই মশগুল হয়ে পড়েছিল যে অন্য কোন দিকেই তাদের নজর ছিল না। হঠাৎ জেজেবেল চেঁচিয়ে বলে উঠল, ওই দেখ, কারা যেন আসছে। অনেকগুলো কালো মানুষ। ওঃ ড্যানি, আমার ভয় করছে।

একনজর দেখেই বন্দুকবাজ তাদের চিনতে পারল। বলল, ওরা ডাকাত জেজেবেল, পালাও।

দু’জনে ছুটতে শুরু করল, কিন্তু ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ডাকাতরা সহজেই তাদের ধরে ফেলল। ড্যানি দ্রুতগতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা ডাকাতের পা ধরে টেনে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। তার হাতের ছিটকে পড়া রাইফেলটা তুলে নিয়ে তারই মাথায় সজোরে আঘাত করল। ডাকাতের মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল।

এইভাবে তিনটে ডাকাতকে ঘায়েল করার পরে ড্যানি নিজেই ঘায়েল হল। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গিয়েও একটা ডাকাত ড্যানির পা ধরে টেনে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ডাকাতরা আঘাত করল তার মাথায়।

জেজেবেল সভয়ে দেখল, ড্যানির মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। সে ছুটে গেল তার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তারা তাকে ধরে ফেলল। একটা ঘোড়ার পিঠে তাকে তুলে নিয়ে ডাকাতরা জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।

বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিকের নিশ্চল দেহটা তার নিজের রক্তের মধ্যেই পড়ে রইল।

ক্রীতদাস-শিকারীরা নতুন সুন্দরী বন্দিনীকে নিয়ে গ্রামে ঢুকতেই সকলে হৈ-চৈ করে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে লাগল। কাপিয়েত্রো ও স্তাবুচও তাদের কুটিরের দরজায় এসে দাঁড়াল।

কালো শয়তানরা কি এনেছে? কাপিয়েত্রো শুধাল।

মনে হচ্ছে একটি সুন্দরী, স্তাবুচ জবাব দিল।

কাঁপিয়ে বলল, আরে, তাই তো! একে কোথায় পেলে?

খুব কাছেই। সঙ্গে একটা পুরুষও ছিল। নর-বানরের সঙ্গে যে পালিয়েছিল সেই।

সে কোথায়? তাকেও ধরে আনলে না কেন?

সে আমাদের সঙ্গে লড়ল; তাই তাকে মেরে ফেলতে বাধ্য হয়েছি।

কাপিয়েত্রো জেজেবেলের হাত ধরে কুটিরের ভিতরে নিয়ে গেল। স্তাবুচও পিছন-পিছন গেল।

জেজেবেল বলল, আমাকে এখানে এনেছ কেন? আমি তো তোমাদের কোন ক্ষতি করিনি। আমাকে ড্যানির কাছে ফিরে যেতে দাও। সে গুরুতর আহত।

আহত নয়, মৃত, কাঁপিয়ে বলল। তার জন্য দুঃখ করো না। এক বন্ধু গেছে, দুই বন্ধু পেয়েছ।

ক্ষুধার্ত চোখে স্তাবুচ মেয়েটিকে দেখছিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ওকে পেতেই হবে। বলল, কেঁদো না। আমি তোমার বন্ধু। সব ঠিক হয়ে যাবে।

সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে চোখ তুলে জেজেবেল বলল, তুমি যদি আমার বন্ধু, তাহলে আমাকে ড্যানির কাছে। নিয়ে চল।

একটু পরেই সব হবে। বলে স্তাবুচ কাপিয়েত্রোকে শুধাল, কত চাও?

কাপিয়েত্রো বলল, প্রিয় বন্ধুটির কাছে ওকে বিক্রি করব না। এস, একটু পান করা যাক, তারপর সব বুঝিয়ে বলব।

বোতল থেকে দু’জনই বেশ খানিকটা করে মদ গিলল।

মদের নেশায় ক্রমে দু’জনের মধ্যে তর্কাতর্কি শুর হল। তা থেকে ধস্তাধস্তি। চীৎকার করে উঠে কাঁপিয়ে এক ঘুষি কল স্তাবুচের চোয়ালে। স্তাবুচও পাল্টা ঘুষি চালাল। দুজন দুজনের গলা টিপে ধরল। স্তাবুচ তার কোটের নিচে থেকে একটা সরু ছুরি বের করল। কাপিয়েত্রো তা দেখতে পেল না। স্তাবুচের ডান হাতের ছুরিটা সজোরে বসে গেল কাপিয়েত্রোর পিঠে। কাপিয়েত্রো আর্তনাদ করে উঠল। তারপরই কাঠ হয়ে পড়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। এবার কি ঘটবে ভেবেই স্তাবুচ শিউরে উঠল।

তাড়াতাড়ি জেজেবেলকে ধরে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে স্তাবুচ নিজে উঠল আর একটা ঘোড়ায়। তারপর প্রায় পঞ্চাশজন ডাকাতের চোখের সামনে দিয়ে তারা গ্রামের ফটকটা পার হয়ে গেল।

তারা যখন ঘোড়ার মুখ পাহাড়ের উপরের দিকে সরিয়ে দিল ততক্ষণে রাতের আঁধার নেমে এসে তাদের ঢেকে দিল।

বন্দুকবাজ ড্যানি প্যাট্রিক চোখ মেলে আফ্রিকার সুনীল আকাশের দিকে তাকাল। ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে এল। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। হাতটা তুলে মাথায় রাখল। একি! হাতটা রক্তে লাল হয়ে গেছে।

আপন মনেই বলে উঠল, গীজ! ওরা আমাকে খুব ঠেঙিয়েছে!

হঠাৎ তার মনে পড়ল শিবিরে ফিরতে হবে। সে না ফিরলে স্মিথ খুব চিন্তা করবে। ওবান্বিই বা কোথায়? চারদিকে তাকাল। জীবিত অথবা মৃত-তাকে কোথাও দেখতে পেল না। অগত্যা সে একাই শিবিরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।

চলতে চলতে পাহাড়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল। সেখান থেকে নিচের গ্রামটা দেখা যায়। সেখানে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েই সে ডাকাতদের গ্রামের উপর চোখ রাখল।

দেখল, স্তাবুচ কুটির থেকে বেরিয়ে ঘোড়াগুলোর কাছে গেল। ফিরে এল দুটো ঘোড়া নিয়ে। কুটিরের ভিতরে ঢুকে বেরিয়ে এল জেজেবেলকে সঙ্গে নিয়ে।

হঠাৎ ‘বন্দুকবাজ’ ড্যানি প্যাট্রিকের মাথার মধ্যে একটা অদ্ভুত খেলা শুরু হয়ে গেল। সব কথা মনে পড়ে গেল। জেজেবেলকে দেখামাত্রই তার স্মৃতি ফিরে এল।

উঠে দাঁড়িয়ে সেও পাহাড়ের ধার ধরে ছুটতে লাগল দুই অশ্বারোহীর সমান্তরালে থেকে। গোধূলি নেমে এসেছে। একটু পরেই অন্ধকার হবে। সব ক্লান্তি ভুলে সে ছুটতে লাগল। তবু এক সময় ঘন অন্ধকারে তারা দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল।

ওদের ধরতে হবে- ধরতে হবেই। হোঁচট খেতে খেতে সে ছুটে চলল। বার বার চলতে লাগল, বেচারি খুকি! বেচারি খুকি! ঈশ্বর! আমার সহায় হও।

রাত নেমেছে। লেডি বারবারা কলিস ও লাফায়েৎ স্মিথকে নিয়ে অরণ্যরাজ টারজান চলেছে মিডিয়ান দেশের উপত্যকা পেরিয়ে। কিন্তু জেজেবেল ও বন্দুক বাজ’-এর কোন চিহ্নই খুঁজে পাচ্ছে না।

সঙ্গী দুটি ক্লান্তির শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু কেউই টারজানকে সে কথা বলেনি, কারণ তারা। জানে, তাতে জেজেবেল ও ড্যানির অনুসন্ধানে বাধা পড়বে।

হোঁচট খেতে খেতে লেডি বারবারা একবার মাটিতে পড়ে গিয়ে অস্ফুট চীৎকার করে উঠল। তা শুনে পিছন ফিরে তাকে ঐ অবস্থায় দেখে টারজান ঘরে এসে তাকে কোলে তুলে নিল।

বলল, আর বেশি দূর নয়।

শিবিরের প্রান্তে গিয়ে টারজান দাঁড়িয়ে পড়ল।

কয়েকজন আস্কারি ছিল পাহারায়। তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলে টারজান লেডি বারবারাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল, ওদের বলে দিলাম, তাদের বাওয়ানাকে যেন বিরক্ত না করে। এখানে একটা বাড়তি তাঁবু আছে; লেডি বারবারা সেটাতে থাকতে পারবে। সর্দার নিজেই স্মিথের থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। এখানে তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। ওরা বলছে ওদের বাওয়ানা লর্ড পাসমোর। সেই তোমাদের রেল-স্টেশনে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবে। আপাতত আমি চললাম তোমাদের বন্ধুদের খোঁজে।

কথা শেষ হল। তারা মৌখিক ধন্যবাদ জানাবার আগেই টারজান রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

ওদিকে স্তবুচ ও জেজেবেল সারা রাত ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। স্তাবুচ পথ হারিয়ে নাস্তানাবুদ।

ভোরের দিকে একটা বনের প্রান্তে তারা থামল। স্তাবুচের আর চলবার শক্তি নেই। ঘোড়া থেকে। নেমে বলল, একটু না ঘুমিয়ে পারছি না।

জেজেবেলও ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়া দুটোকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে মাটিতে টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল স্তাবুচ। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।

দূরে পাহাড়ের মাথায় পুবের আকাশে আলো ফুটছে। স্তাবুচ ঘুম থেকে উঠে বলল, বড় ক্ষিধে পেয়েছে। তুমি ঐ গাছটাতে উঠে বস। আমি বনের মধ্যে ঢুকে দেখি শিকার পাই কি না।

জেজেবেল গাছে চলে বসল; স্তাবুচ শিকারের সন্ধানে বেরিয়ে গেল।

একটা ছোট হ্রদ দেখতে পেয়ে স্তাবুচ একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। কোন জন্তু জল খেতে এলেই তাকে গুলি করবে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। হঠাৎ একটা প্রাণী এসে আবির্ভূত হল হ্রদের অপর তীরে।

স্তাবুচের শয়তানী চোখ দুটি সংকুচিত হল। এই তো সেই লোক যাকে খুন করতে সে মস্কো থেকে এত দূরে এসেছে। সুবর্ণ সুযোগ! ভাগ্য সুপ্রসন্ন।

হাতের রাইফেল তুলে খুব সাবধানে তাক করল। ঝোপের আড়াল পড়ায় টারজান বন্দুকের নলটা দেখতে পেল না।

স্তাবুচ বুঝতে পারল, উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে। শিকারও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনি গুলি করতে হবে। লোকটা তো চিরকাল একভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে না। সে ঘোড়ায় আঙুল রাখল।

রাইফেল গর্জে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শিকার এক লাফে একটা নিচু ডাল ধরে মুহূর্তের মধ্যে পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। স্তাবুচ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

এবার সে ভয় পেল। ছুটে পালিয়ে গেল। মন থেকে মুছে গেল সুন্দরী জেজেবেল। এখন চাচা আপন প্রাণ বাঁচা!

বনের ভিতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ বাহুতে একটা যন্ত্রণা বোধ করায় তাকিয়ে দেখল একটা তীরের পালক-লাগানো দিকটা বাহুর সঙ্গে ঝুলছে।

তীরটা বাহুতে বিঁধে এফোঁড়-ওফোড় হয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে আরও জোরে ছুটতে লাগল। মাথার উপরেই রয়েছে তার যম!

আর একটা তীর এসে বিধল তার অপর বাহুর মাংস-পেশীতে। আতংকে ও যন্ত্রণায় স্তাবু নতজানু হয়ে বসে পড়ল। দুই হাত তুলে বলল, বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও। আমি তোমার কোন ক্ষতি করিনি।

আর একটা তীর সোজা এসে তার গলায় বিধে গেল। আর্তনাদ করে সেটাকে চেপে ধরে স্তাবুচ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।

অরণ্যরাজ টারজান নীরবে গাছ থেকে নেমে মুমূর্ষ লোকটির দিকে এগিয়ে গেল। যন্ত্রণায় কাত্রাতে কাত্রাতে স্তাবুচ পাশ ফিরেই ধনুর্ধর টারজানকে দেখতে পেল। যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সে এতদূর এসেছে সেটা সম্পূর্ণ করার জন্য সে কোমরের রিভলবারটার দিকে হাত বাড়াল।

সঙ্গে সঙ্গে অরণ্যরাজের হাত থেকে ছুটে এল আর একটা তীর। বিদ্ধ হল স্তাবুচের বুকে। হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ হল। একটা আর্তনাদও ফুটল না মুখে। লিও স্তাবুচের মাথাটা ঢলে পড়ল। মুহূর্তকাল পরে একটা গোরিলা মানুষের বিজয় হুংকার জলের মধ্যে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

সেই হুংকার শুনে জেজেবেলের বুকটা কেঁপে উঠল। সভয়ে গাছ থেকে নেমে সে ছুটতে শুরু করল। কোথায় চলেছে তা জানে নাতার একমাত্র লক্ষ্য এই নির্জনতার আতংক থেকে দূরে চলে যেতে হবে।

দিনের আলোয় বন্দুকবাজ দেখল কাছেই একটা বন। সারারাত ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ কানে আসেনি। এখন দিনের আলোেয় চারদিকে ভাল করে তাকাল। স্তাবুচ ও জেজেবেলের চিহ্ন নেই।

সব ক্লান্তি ভুলে আবার সে উত্তর দিকে ছুটতে লাগল। হয় তো এখনও জেজেবেলকে বাঁচাতে পারবে।

একটু পরেই সিংহটা থমকে দাঁড়িয়ে উত্তর-পূর্ব দিকের ঢাল বেয়ে নেমে গেল। ড্যানি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। নিজের জন্য নয়- জেজেবেলের নিরাপত্তার আশায়।

দূর থেকে একটা গুলির আওয়াজ কানে এল। স্তাবুচের রাইফেলের শব্দ। বন্দুকবাজ আরও জোরে পা চালিয়ে দিল। কয়েক মিনিট পরেই কানে এল রুশীয়টির আর্তনাদ, আর পরক্ষণেই ভেসে এল টারজনের বিজয়-হুংকার।

নতুন করে বনের দিকে এগোতে গিয়েও হঠাৎ সে থেমে গেল। বন-বাদাড় ভেঙে কে যেন ছুটে আসছে। দেখা দিল সেই ছুটন্ত মূর্তি।

তার সামনে লাফিয়ে পড়ে ড্যানি চেঁচিয়ে ডাকল, জেজেবেল! তার গলা আবেগে কাঁপছে।

আর্তনাদ করে মেয়েটি থেমে গেল। ড্যানি! উত্তেজনায় তার স্নায়ুর সব শক্তি উবে গেল। মাটিতে বসে পড়ে পাগলের মত কেঁদে উঠল।

বন্দুকবাজ ও কয়েক পা এগিয়ে টলতে টলতে বসে পড়ল। তার পরই ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। তার চোখ ফেটে জল এল। উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে সেও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

তারা যখন গল্পে মত্ত, অরণ্যরাজ টারজান তখন বন ছেড়ে তাদের খোঁজে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।

ওদিকে দিন হতেই একশ’ ডাকাত ঘোড়ায় চেপে গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়ল। কাপিয়েত্রোর মৃতদেহ দেখে বুঝতে পারল যে রুশীয়টি তাদের ধোঁকা দিয়ে সর্দারকে মেরে পালিয়ে গেছে।

দূর থেকে টারজানকে দেখতে পেয়ে হুংকার ছেড়ে ডাকাত-সর্দার জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। বাকি দলটিও হৈ-হৈ রবে তার পিছু নিল।

টারজান বুঝতে পারল, পাহাড়ে উঠবার আগেই ওরা তাকে ধরে ফেলবে। তবু সে সমান বেগে ঘোড়া ছোটাতে লাগল।

অসভ্য চীৎকার করতে করতে ডাকাতদল ধেয়ে আসছে। সকলের আগে সর্দার।

ডাকাতদের অর্ধবৃত্ত পূর্ণ হয়ে এল। টারজান তীরের পর তীর ছুঁড়ছে। তূণ শূন্য হয়ে গেল। আর তীর নেই। ডাকাতরা তাকে ঘিরে ধরল।

পিছন থেকে একজন চীৎকার করে উঠল, মেরো না! ও যে অরণ্যরাজ টারজান। ওর জন্য অনেক টাকা মুক্তিপণ মিলবে।

অনেক প্রাণের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত ডাকাতরা টারজানকে বন্দী করল। হাত-পা বেঁধে তাকে একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দিল। চার ডাকাত তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল গ্রামে। বাকিরা স্তাবুচ ও জেজেবেলের খোঁজে এগিয়ে গেল।

জেজেবেল ও বন্দুকবাজ হাতে হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।

ড্যানি বলল, আশ্চর্য এই দুনিয়া। ভাব তো জাহাজে যদি স্মিথের সঙ্গে আমার দেখা না হত তাহলে তোমার সঙ্গে এখানে আমার দেখা হত না। সেই থেকেই তো শুরু। একটু থেমে আবার বলতে লাগল, এখান থেকে আমরা এমন কোথাও চলে যাব যেখানে কেউ আমাদের চেনে না। নতুন করে জীবন শুরু করব। একটা গ্যারেজ নেব, অথবা একটা ফিলিং-স্টেশন; আর একটা ফ্ল্যাট। গীজ, সেখানে তোমাকে এমন সব জিনিস দেখাব যা কোন দিন চোখে দেখনি–মুভি, রেল, জাহাজ! গীজ! তুমি তো কিছুই দেখনি। আর আমি ছাড়া দেখাবেই বা কে?

জেজেবেল বলল, সত্যি ড্যানি, কী যে ভাল লাগছে!

ভেসে এল রাইফেলের গর্জন। চমকে জেজেবেল বলল, ওটা কি?

কোথাও লড়াই হচ্ছে। চল, লুকিয়ে পড়ি, বলে জেজেবেলের হাত ধরে ড্যানি একটা ঝোপের ভিতরে ঢুকে গেল। আরও কাছে এগিয়ে এল ডাকাতদলের অশ্বক্ষুরের শব্দ। তাদের পাশ দিয়েই ডাকাতরা একে একে ছুটে গেল। হঠাৎ এক ডাকাতের চোখ পড়ল তাদের উপর। তার চীকারে অন্য ডাকাতরা ঘুরে এসে দু’জনকে ঘিরে ফেলল।

বেচারি বন্দুকবাজ! বেচারি জেজেবেল! বড় ক্ষণস্থায়ী তাদের সুখের জীবন। আবার তারা বন্দী হল। দুই কালা শয়তানের পাহারায় দু’জন এগিয়ে চলল গ্রামের দিকে।

অন্ধকার কুটিরে টারজান প্রাণপণে বন্ধর-মুক্তির চেষ্টা করে চলেছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার কপালে।

অবশেষে চেষ্টা সফল হল। বেড়ির ভিতর দিয়ে একটা হাত গলে বেরিয়ে এল। তারপর বাকি বেড়ি খুলতে দেরি হল না। টারজান মুক্ত হল।

নিচু গলায় গর্জন করে সে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে এগিয়ে গেল। উঠোনে ডাকাতরা বসে আছে।

টারজান এক লাফে পাঁচিলে উঠে গেল। কয়েকটা গুলি ছুটে এল তাকে লক্ষ্য করে; ততক্ষণে সে লাফিয়ে ওপারে পড়েই রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

জেজেবেল দাঁত দিয়ে ড্যানির হাতের বাঁধন কেটে দিল। দু’জনেই উঠে দাঁড়াল।

 বাঁচা গেল, বলেল উঠল বন্দুকবাজ।

এবার মুক্তি, বল জেজেবেল।

কি মনে পড়ায় বন্দুকবাজ বলল, প্রথমেই দেখতে হবে আজ আমি কিসের উপর শুয়েছিলাম। কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছিল।

কুটিরের এককোণে রাখা ছেঁড়া কম্বলগুলো হাতড়ে একটু পরেই সে উঠে দাঁড়াল। এক হাতে টমসন। মেশিনগান ও রিভলবার, অন্য হাতে একটা খাপ ও বেল্ট।

ঠিক সেই মুহূর্তে ভেসে এল বহু কণ্ঠের হুংকার ও ফটকে পাহারারত শাস্ত্রীর রাইফেল থেকে গুলির শব্দ। অস্পষ্ট দিনের আলোয় সে দেখতে পেয়েছে একটা শত্ৰু-বাহিনী নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে গ্রামের দিকে।

দরজার কাছে ছুটে এসে বাইরে তাকিয়ে ড্যানি প্যাট্রিক অবস্থা কিছুটা বুঝতে পারল। দু’পক্ষ থেকেই গুলি-বিনিময় চলছে। কিন্তু সে বুঝতে পারল না–ডাকাতদলের এই শত্রু কারা।

ফটকে অনেক ডাকাত জমায়েত হয়েছে। দূরের শত্রুপক্ষকে লক্ষ্য করে তারা রাইফেল চালাচ্ছে। বন্দুকবাজ হাঁটু গেড়ে বসে মেশিনগান কাঁধে তুলে নিল। ডজনখানেক ডাকাত মাটিতে উপুর হয়ে পড়ল।

সামনে-পিছনে দু’দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে বাদবাকি ডাকাতরা রাইফেল ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল।

বন্দুকবাজ ও জেজেবেলকে অক্ষতদেহে দেখতে পেয়ে টারজান তাদের সাদর সম্ভাষণ জানাল। ড্যানি বলল, ভাগ্যিস ঠিক সময়ে তুমি এসে পড়লে। কিন্তু তোমার এই বন্ধুরা কারা? এদের কোথায় পেলে?

ওরা সবাই আমার লোক।

বন্দুকবাজ সোৎসাহে বলে উঠল, বহুৎ আচ্ছা! কিন্তু বুড়ো স্মিথকে দেখেছ কি?

 সে আমার শিবিরে নিরাপদেই আছে।

আর বারবারা? সে কোথায়?

 সে স্মিথের সঙ্গেই আছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সঙ্গে দেখা হবে।

 ডাকাতদলের বন্দীদের সঙ্গে কথা বলতে টারজান সেই দিকে চলে গেল।

বন্দীদের নানা দলে ভাগ করে তাদের একজন করে দলপতি স্থির করে টারজান সকলকে যার যার গায়ে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করল। গালাদের নেতৃত্বে বন্দী ডাকাতদের পাঠানো হল আবিসিনিয়ার পথে।

আধ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রামটা খালি হয়ে গেল। গ্রামের নানান অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হল। কালো ধোঁয়ার কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠতে লাগল নীল আকাশের দিকে। নানা দলে ভাগ হয়ে বন্দীরা সকলেই যাত্রার জন্য প্রস্তুত। যাবার আগে সব দলপতি অরণ্যরাজের সম্মুখে নতজানু হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাল।

লাফায়েত স্মিথ ও লেডি বারবারার বিস্মিত চোখের সামনে লর্ড পাসূমোরের শান্ত শিবিরটি কর্ম কোলাহলে মুখর হয়ে উঠল। সারাটা দিন সৈনিকরা তৈরি হয়ে নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে রইল। সে অপেক্ষা চলল রাত পর্যন্ত। সর্বত্র চাপা উত্তেজনা। শিবিরে আগেকার মত গান নেই, হাসি নেই। যোদ্ধারা বসে আছে আগুনের ধুনিকে ঘিরে। হাতে-হাতে রাইফেল মজুদ।

ডাক এল অনেক রাতে। কালো কালো মানুষগুলোর ছায়া মিলিয়ে গেল জঙ্গলের অন্ধকারে। মাত্র চারজন রইল পাহারায়, আর রইল দুই সাদা অতিথি।

সকালে তাঁবু থেকে বেরিয়ে লেডি বারবারা দেখল, শিবির প্রায় পরিত্যক্ত। আছে শুধু রাঁধুনি ছোকরা আর তিনটি কালা আদমি।

দিন গড়িয়ে বিকেল হল। অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটল না। লর্ড পাস্মোর বা তার যোদ্ধারা কেউ ফিরল না।

হঠাৎ ছোকরাটি উঠে দাঁড়িয়ে কান পাতল। বলে উঠল, ওরা আসছে।

ক্রমে সৈন্যদের পায়ের শব্দ স্পষ্টতর হল। সেদিকে তাকিয়ে লাফায়েত স্মিথ উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, উঠল, ঐ তো বন্দুকবাজ! সঙ্গে জেজেবেল। কী আশ্চর্য! ওরা দুজন এক সঙ্গে।

লেডি বারবারা চীৎকার করে বলল, সঙ্গে আবার অরণ্যরাজ টারজান! সেই ওদের দুজনকে উদ্ধার করেছে।

অবশেষে চারজনকে মিলিত হতে দেখা টারজনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে গেল।

লেডি বারবারা বলল, বড়ই দুঃখের কথা যে এই সুখের ক্ষণে লর্ড পাসূমোর এখানে নেই।

আছে, বলল, টারজান।

 চারদিকে তাকিয়ে লেডি বারবারা প্রশ্ন করল, কোথায়?

আমিই লর্ড পাসূমোর; টারজান জবাব দিল।

তুমি?

হ্যাঁ। কাপিয়েত্রো ও তার দলবলের কথা শুনেই আমি এই ভূমিকাটি নিয়েছিলাম। আমি জানতাম কাপিয়েত্রোর দল আমার শিবিরও আক্রমণ করতে আসবে।

বন্দুকবাজ বলে উঠল, গীজ! ব্যাটারা নিশ্চয় জোর ঠেঙানি খেয়েছে।

লেডি বারবারা হেসে বলল, তাই আমাদের আশ্রয়দাতা লর্ড পাসূমোরকে কখনও চোখে দেখতে পাইনি।

টারজান বলল, আমি কিন্তু তোমাদের কাছাকাছিই ছিলাম। তোমার বন্ধুদের খুঁজতে গিয়ে নিজেই বন্দী হয়েছিলাম। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সব বিপদ কেটে গেছে।

ড্যানি বলে উঠল, আমরা কালিফোর্নিয়ায় ফিরে যাচ্ছি। সেখানে একটা গ্যারেজ ও ফিলিং-স্টেশন কিনব।

আমরা? লেডি বারবারা প্রশ্ন করল।

নিশ্চয়; আমি আর জেজ, ড্যানি বলল।

সত্যি? লেডি বারবারা উচ্ছ্বসিত। ও কি সত্যি বলছে জেজেবেল?

 সবই ও. কে., স্বর্ণকেশিনী উত্তর দিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *