৬.১ মেয়েটি নিজের লাশ দেখল

মেয়েটি নিজের লাশ দেখল

 সুদর্শন যুবক আন-নাসের সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সেই কমান্ডোদের একজন, যারা মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে কথা বলে। খৃস্টানদের বিশ্বাস, সুলতান আইউবীর কমান্ডোদেরকে মৃত্যুও ভয় করে। মরুভূমির দুর্গমতা, সমুদ্রের উতলা, কণ্টকাকীর্ণ পর্বতমালা কিছুরই পরোয়া করে না তারা। দুশমনের রসদ ইত্যাদিতে অগ্নিসংযোগ করে নিজেরা আগুনে ঝাঁপ দিয়ে জীবন কুরবান করা তাদের পক্ষে একটি সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু জিন-পরী আর ভূত-প্রেতে প্রচণ্ড ভীতি সুলতান আইউবীর এই অকুতোভয় জানবাজ গেরিলাদের। তারা কখনো জিন-ভূত দেখেনি; শুধু গল্প-কাহিনী শুনেছে মাত্র, যাতে তাদের শতভাগ বিশ্বাস আছে। জিন-পরীর নাম শুনলেই ভয়ে তাদের গা ছমছম করে ওঠে।

আন-নাসের যদি আসিয়াত দুর্গে আপন মর্জিতে এবং সচেতন অবস্থায়। এসে পৌঁছতো, তাহলে এতোটা ভয় পেতো না। তাকে যদি কয়েদি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো, তাহলেও সে নির্ভীক থাকতো এবং পালাবার বুদ্ধি বের করে নিতো। কিন্তু তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে হাশিশের নেশায় মস্তিষ্কে অবাস্তব কল্পনা সৃষ্টি করে। সেই নেশার ঘোরে সে কাল্পনিক সবুজ শ্যামলিমা এবং বাগ-বাগিচার মধ্যদিয়ে পথ অতিক্রম করে এসেছে।

কিন্তু এখন তার নেশা কেটে গেছে। এই ভূখণ্ডে কোথায় কোথায় সবুজ শ্যামলিমা থাকতে পারে, তার স্মরণ আসতে শুরু করেছে। এখন সে বুঝে, মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ অঞ্চল এমন স্বর্গীয় হতে পারে না।

আন-নাসের যে রূপসী মেয়েটিকে পরী মনে করেছিলো, এখন সে তার পালঙ্কে বসা। মেয়েটি তার কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দরী। আন-নাসের মেয়েটিকে মানুষ বলে বিশ্বাসই করতে পারছে না। মেয়েটি যখন বললো, তুমি আমার উপর আস্থা রাখো, তখন তার ভয় আরো বেড়ে গেলো। সে শুনেছে, জিন-পরীরা চিত্তাকর্ষক প্রতারণার মাধ্যমে মানুষ খুন করে থাকে।

এই দুর্গটি তার কাছে জিন-পরী ও ভূত-প্রেতের আড্ডা বলে মনে হতে শুরু করেছে। তার সঙ্গীরা এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। 

আমি তোমার উপর কেন ভরসা রাখবো? আমার জন্য তোমার কেন এতো মায়া হলো? এখানে আমাকে কেন নিয়ে এসেছো? এটা কোন জায়গা? মনে সামান্য সাহস সঞ্চয় করে আন-নাসের জিজ্ঞেস করে।

তুমি যদি আমার উপর আস্থা স্থাপন না করো, তাহলে তোমার পরিণতি খুবই মন্দ হবে- মেয়েটি বললো- তুমি ভুলে যাবে, তুমি কে ছিলে। তোমার হাত তোমারই ভাইদের রক্তে রঞ্জিত হবে আর তুমি সেই রক্তকে ফুল মনে করে আনন্দিত হবে। আমি তোমার প্রতি এতো স্নেহশীল কেনো হলাম, সেই প্রশ্নের উত্তর আমি এখনই দিতে পারবো না। এটি একটি দুর্গ, যার নাম আসিয়াত। এটি ফেদায়ীদের দুর্গ। এখানে ফেদায়ীদের গুরু শেখ সান্নান অবস্থান করে থাকেন। তুমি কি ফেদায়ীদের সম্পর্কে জানো?

হ্যাঁ, জানি- আন-নাসের জবাব দেয়- খুব ভালো করে জানি। এবার আমি বুঝে ফেলেছি তোমরা কারা। তোমরাও ফেদায়ী। আমি জানি, ফেদায়ীদের কাছে তোমাদের ন্যায় রূপসী মেয়েরা থাকে!

তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই- মেয়েটি বললো- আমার নাম লিজা।

তোমার সঙ্গে আরো একটি মেয়ে ছিলো, সে কোথায়? আন-নাসের জিজ্ঞেস করে।

তার নাম থ্রেসা- লিজা জবাব দেয়- সে এখানেই আছে। তোমাদেরকে হাশিশের নেশায় আচ্ছন্ন করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।

লিজা আর কিছু বলতে পারলো না। হঠাৎ থ্রেসা এসে কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে যায় এবং ইশারায় লিজাকে বেরিয়ে যেতে বলে। লিজা আন নাসেরের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়।

এখানে কী করছো?- থ্রেসা জিজ্ঞেস করে- লোকটার এতো কাছাকাছি বসেও তোমার হুশ হলো না যে, মুসলমান ঘৃণ্য মানুষ? তুমি কি বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে অপরাধী হতে চাচ্ছো?

লিজার মাথায় কিছুই ধরছে না। সে কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। মুসলিম আমীরদের চরিত্রহননের পেশাটার প্রতি প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে তার। এই ঘৃণা-বিতৃষ্ণা এতোই প্রবল আকার ধারণ করেছে যে, নিজের কর্মকাণ্ডে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে লিজা। এখন তার মাথায় একটিই চিন্তা- হয় প্রতিশোধ গ্রহণ কিংবা পলায়ন।

আমিও একটি যুবতী মেয়ে- থ্রেসা বললো- আমারও এই মুসলিম গেরিলা আন-নাসেরকে ভালো লাগে। ভালো লাগার মতো সুদর্শন যুবক বটে। যদি বলো, লোকটা তোমার হৃদয়ে বাসা বেঁধে ফেলেছে, তাহলে আমি বিস্মিত হবো না। তোমার অন্তরে বৃদ্ধ মুসলমান আমীর ও সালারদের প্রতি যে ঘৃণা জন্মে গেছে, তাও আমি জানি। সে কারণেই তুমি তাদের খেলনা হয়ে থাকতে চাচ্ছে না। কিন্তু কর্তব্যকে তো আর ভুলে গেলে চলবে না। ক্রুশের মর্যাদাকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই মুসলমানরা তোমার দুশমন।

না থ্রেসা!- লিজা আপুত কণ্ঠে বললো- তার প্রতি আমার সেই আকর্ষণ নেই, যা তুমি মনে করছো।

 তাহলে তার পাশে গিয়ে বসেছিলে কেন?

বলতে পারবো না- লিজা বলুলো- জানি না কী ভেবে তার পাশে গিয়ে বসেছিলাম।

তার সঙ্গে তোমার কী কী কথা হয়েছে? থ্রেসা জিজ্ঞেস করে।

 বিশেষ কোন কথা হয়নি। লিজা বললো।

তুমি দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করছো- গ্লেসা বললো- এটি বিশ্বাসঘাতকতা, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

কিন্তু শুনে রাখো থেসা!– লিজা বললো- আমি ঐ বুড়োটার কাছে একা যাবে না। তিনি যদি জবরদস্তি করেন, তাহলে হয় তাকে নয়তো নিজেকে শেষ করে ফেলবো।

রূপসী কন্যা থেসা তো নিজেকে পাথর বানিয়ে নিয়েছে, যার রং ও চাকচিক্য যে কারো হৃদয়কে আকর্ষণ করে থাকে এবং যে কেউ তার মালিক হতে চায়। পাথরের নিজস্ব কোন পছন্দ-অপছন্দ থাকে না। লিজাও সেই অবস্থান থেকে বহু দূরে সরে এসেছে। সেখানে একজন নারীর আত্মচেতনা, ভালোবাসা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ বলতে কিছুই থাকে না।

থ্রেসা তাকে বললো- আমার বিলকুল ধারণা ছিলো না, তুমি এতো বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে। অন্যথায় আমরা এখানে আসতাম না। কিন্তু এটি ছাড়া কাছাকাছি আর কোনো কেল্লা ছিলো না। ত্রিপোলী পর্যন্ত পৌঁছা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আমি তোমাকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, শেখ সান্নান থেকে তোমাকে রক্ষা করার পুরোপুরি চেষ্টা করবো এবং এখান থেকে তাড়াতাড়ি বিদায় নেয়ার পন্থা বের করে নেবো। তুমি আবেগ ত্যাগ করো। আমি আমার ওয়াদা রক্ষা করবো।

আমি এই মুসলিম কমান্ডোদেরকে এখান থেকে আমাদের পলায়নের কাজে ব্যবহার করতে চাই- লিজা বললো- তুমি না নিজে এখান থেকে বের হতে পারবে, আমাকে বের করতে পারবে। এরা গেরিলা সৈনিক। আমি এদের বীরত্বের কাহিনী শুনেছি। সামান্য সুযোগ বের করে দিলেই তারা পালিয়ে যাবে এবং আমাকে ও তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। এছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।

আমি তাদের পারঙ্গমতা ও বীরত্ব স্বীকার করি- থ্রেসা বললো- কিন্তু আমরা যদি তাদের সহযোগিতায় পলায়ন করি, তাহলে তারা আমাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে আমাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেবে না। তুমি শক্রর সহায়তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকো। গোসল করে পোশাক বদল করে আসো। শেখ সান্নান আজ রাতের আহারে আমাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছেন। তার সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবে, আমি তোমাকে বলে দেবো। প্রকাশ করতে হবে, তুমি তাকে অপছন্দ করো না এবং তার থেকে পলায়নেরও কোন চেষ্টা করছে না। আমি এইমাত্র জানতে পেরেছি, হাররানের স্বাধীন শাসক গোমস্তগীনও এসেছেন। তুমি হয়তো জানো না, গোমস্তাগীন সালাহুদ্দীন আইউবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। তুমি তাকে বন্ধুরূপে বরণ করে নেবে। আমি বহু কষ্টে এই মুসলিম শাসকদের হাতে এনেছি এবং তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাচ্ছি।

***

লিজার চলে যাওয়ার পর আন-নাসের গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। এখন সে নিশ্চিত, মেয়ে দুটো পরী নয়। কিন্তু তার প্রতি লিজার দয়াপরবশ হওয়া তাকে অস্থির করে তুলেছে। মেয়েটি বলেছিলো, তাকে এবং তার সঙ্গীদেরকে হাশিশের নেশায় আচ্ছন্ন করে এ পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছে। তাতেই সে বুঝে ফেলেছে, এই মেয়েগুলো ফেদায়ী চক্রের সদস্য। তার মনে আরো সংশয় জাগে, হাশিশ ছাড়াও রূপসী যুবতীর দ্বারা তাকে হাত করা এবং আপন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা চলছে। আন-নাসের গেরিলা সৈনিক। কর্তব্য পালনে দুশমনের এলাকায় যেতে হবে বিধায় তাকে ফেদায়ী চক্র এবং তাদের রীতি-নীতি এবং হাশিশের ক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত করা হয়েছিলো।

আন-নাসের তার সঙ্গীদের জাগিয়ে তোলে। জাগ্রত হয়ে তারাও তাদের কমান্ডারের ন্যায় অস্থির হয়ে ওঠে। তারা আন-নাসেরের মুখপানে তাকিয়ে থাকে।

বন্ধুগণ!- আন-নাসের বললো- আমরা ফেদায়ীদের ফাঁদে এসে পড়েছি। এই দুর্গের নাম আসিয়াত। এটি ফেদায়ী ও তাদের ফৌজের আস্তানা। এই মেয়েগুলো জিন-পরী নয়। তারা আমাদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবে, আমি এখনই বলতে পারবো না। আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। ফেদায়ীরা কী কী পন্থা অবলম্বন করে থাকে, তোমাদের জানা আছে। আমি যদি এই কক্ষ থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাই, তাহলে দুর্গ থেকে পালাবার কৌশল ভেবে দেখবো। তোমরা চুপচাপ থাকবে। এরা কিছু জিজ্ঞেস করলে সংক্ষেপে উত্তর দেবে। এই শয়তানদের থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে না।

এরা কি আমাদেরকে কয়েদখানায় আটকে রাখবে? আন-নাসেরের এক সঙ্গী জিজ্ঞেস করে।

কারাগারে নিক্ষেপ করলে তো ভালোই হতো- আন-নাসের জবাব দেয়- কিন্তু এরা হাশিশ আর নারী দ্বারা আমাদের মন-মস্তিষ্ক এমনভাবে বদলে দেবে, আমাদের স্মরণই থাকবে না, আমরা কারা ছিলাম এবং আমাদের ধর্ম কী ছিলো।

পলায়ন ছাড়া মুক্তির আর কোনো উপায় আমার চোখে পড়ছে না। আন-নাসেরের এক সঙ্গী বললো।

আমরা মৃত্যুকে বরণ করে নেবো; তবু ঈমান বিনষ্ট হতে দেবো না। অপর একজন বললো।

তোমরা সাবধান থাকবে- আন-নাসের বললো- আমরা অতো তাড়াতাড়ি তাদের কজায় যাবো না।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এক ব্যক্তি এসে কক্ষে দুটি প্রদীপ রেখে যায়। লোকটি কোনো কথা বললো না। আসলে আর বাতিগুলো রেখে চলে গেলো। ক্ষুধার জ্বালায় তাদের পেট চোঁ চোঁ করছে। তাদের কক্ষ থেকে বেশ দূরে কেল্লার এক কোণে সান্নানের মহল। সেখানে নারী আর মদের জমজমাট আসর চলছে। সান্নানের খাস কামরায় রকমারী সুস্বাদু খাবার সাজিয়ে রাখা আছে। আছে মদের পিপা-পেয়ালাও। খাবারের গন্ধে মৌ মৌ করছে চারদিক। শেখ সান্নান দস্তরখানে উপবিষ্ট। তার এক পাশে প্রেসা, অপর পাশে লিজা বসে আছে। সম্মুখে গোমস্তগীন বসে আহার করছেন।

গোমস্তগীন হাররান নামক একটি দুর্গের অধিপতি। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর স্বাধীনতা ঘোষণা করে তিনি হাররান দুর্গ ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ছিলেন সুলতান আইউবীর মুসলমান শত্রুদের সমন্বয়কারী ব্যক্তি। তিনিও নিজের বাহিনীকে সেই সম্মিলিত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যাকে সুলতান আইউবী পরাজিত করেছেন। গোমস্তগীন নিজে বাহিনীর সঙ্গে যাননি। তিন বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন সাইফুদ্দীন। জোটের শরীক বাহিনীগুলোর ন্যায় গোমস্তগীনও খৃস্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। খৃস্টানরা তাদেরকে সৈন্য দিয়ে এখনো সাহায্য করেনি। তবে উপদেষ্টা, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসী দিয়ে রেখেছে এবং তাদেরকে নিজেদের কজায় রাখার জন্য উন্নত মদ, সুন্দরী নারী ও অর্থ সরবরাহ করছে।

গোমস্তগীনের পেটভরা কুটিল বুদ্ধি। ষড়যন্ত্র পাকানোর ওস্তাদ লোকটি। দুশমনের উপর মাটির নীচ থেকে আক্রমণ করা এবং আপনদের বিরুদ্ধে মনে মনে শত্রুতা পোষণ করা ছিলো তার নীতি। ভালবাসা-বন্ধুত্ব ছিলো তার শুধুই ক্ষমতার জন্য। রাজ্যের স্বাধীন সম্রাট হয়ে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। যারা সরল বন্ধুত্বে তাকে অকাতর সাহায্য করতো, তাদের প্রতিও তিনি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতেন।

সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যা মিশনে বেশ আগ্রহ-আন্তরিকতা ছিলো তার। তার ভালোভাবেই জানা ছিলো, ক্ষমতালোভী শাসকের সিংহাসন কেবল সামরিক শক্তিই উল্টাতে পারে। সুলতান আইউবীই একমাত্র সালার, যার হৃদয়সমুদ্রে জাতীয় চেতনা তরঙ্গায়িত ছিলো। সমর যোগ্যতার পাশাপাশি ঈমান ছিলো তাঁর বিশেষ এক শক্তি। গোমস্তগীন তার এই শক্তিটাকেই বেশি ভয় করতেন। এবার নিজের বাহিনীকে সাইফুদ্দীনের কমান্ডে দিয়ে তুকমান রওনা করিয়ে কাউকে না জানিয়ে তিনি শেখ সান্নানের নিকট আসিয়াত দুর্গে এসে পৌঁছেন। উদ্দেশ্য, সুলতান আইউবীকে হত্যা করার এমন একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, যা পূর্বেকার পরিকল্পনাগুলোর ন্যায় ব্যর্থ হবে না।

আসিয়াত দুর্গে তিনি আন-নাসের ও থ্রেসা-লিজার আগমণের একদিন আগে পৌঁছে যান। সাইফুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তার বাহিনীর সুলতান আইউবীর হতে কী পরিণতি ঘটেছে, এখনো তিনি জানেন না। বাহিনীকে রওনা করিয়েই তিনি আইউবী হত্যার ষড়যন্ত্র মিশন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং আসিয়াত এসে পৌঁছান।

***

গোমস্তগীন ভাই!- শেখ সান্নান বললো- তোমার বন্ধু তো তুর্কমান থেকে পালিয়ে গেছে। তারপর থ্রেসার প্রতি তাকিয়ে বললো- তুমি একে যুদ্ধের বিস্তারিত শোনাও।

পরাজয়ের সংবাদে গোমস্তগীন অকস্মাৎ এতোই ব্যথিত হয়ে পড়েন যে, বেশ সময় পর্যন্ত তার মুখ থেকে কথা বের হলো না। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি ব্যথিত ও বিস্মিত চোখে থ্রেসার প্রতি তাকিয়ে থাকেন। সুলতান আইউবী স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা সম্মিলিত বাহিনীর উপর কীভাবে আক্রমণ করেছেন এবং কীভাবে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন, থ্রেসা গোমস্তগীনকে তার বিবরণ প্রদান করে। থ্রেসা সাইফুদ্দীন সম্পর্কে জানায়। আমি তার ওখান থেকে রওনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি রণাঙ্গন থেকে নিখোঁজ ছিলেন।

গোমস্তগীন চুপচাপ থ্রেসার বক্তব্য শুনতে থাকেন। আমাকে আমার বন্ধুরা অপদস্ত করেছে- গোমস্তগীন ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন- আমি সাইফুদ্দীনকে তিন বাহিনীর কমান্ড প্রদানের পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু কেউই আমার কথা শুনলো না। জানি না, আমার বাহিনী কী অবস্থায় আছে!

খুবই খারাপ অবস্থায়- থ্রেসা বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর গেরিলারা আপনার বাহিনীকে শান্তিতে ও নিরাপদে পিছপাও হতে দেয়নি।

সান্নান ভাই! তুমি জানো, আমি এখানে কেন এসেছি। গোমস্তগীন বললেন।

 জানি তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যার মিশন নিয়ে এসেছে। সান্নান বললো।

হ্যাঁ- গোমস্তগীন বললেন- যা চাইবে, দেবো। আইউবীকে খুন করাও।

আমি আমাদের খৃস্টান মিত্র এবং সাইফুদ্দীনের পরিকল্পনা মোতাবেক আইউবীকে খুন করার লক্ষ্যে চারজন ঘাতক প্রেরণ করে রেখেছি- সান্নান বললো- কিন্তু তারা আইউবীকে খুন করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

আমার থেকে আলাদা পুরস্কার নিও- গোমস্তগীন বললেন- আমাকে নতুন লোক দাও। এদেরকে আমাকে দিয়ে দাও। কাজটা আমি নিজে করবো।

ওরা সর্বশেষ চার ফেদায়ী, যাদেরকে আমি প্রেরণ করেছি- শেখ সান্নান বললো- আমার কাছে ঘাতকের অভাব নেই। কিন্তু আমি সালাহুদ্দীন হত্যার মিশন থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছি।

কেনো? গোমস্তগীন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন- আইউবী আপনাকে কোন দুর্গ-টুর্গ দিয়ে দিয়েছে নাকি?

না- সান্নান বললো- লোকটাকে খুন করাতে আমি আমার বহু মূল্যবান ফেদায়ী নষ্ট করে ফেলেছি। আমার লোকেরা তার উপর ঘুমন্ত অবস্থায় খঞ্জর দ্বারা আক্রমণ করেছে। একবার তার গায়ে তীরও ছেঁড়া হয়েছিলো। তাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। আমি যা বুঝেছি, তাহলো, আইউবীর উপর খোদার হাত আছে। তার মধ্যে এমন কোন শক্তি আছে, যার ফলে তার উপর না খঞ্জর ক্রিয়া করে, না তীর-বর্শা। আমার গুপ্তচররা আমাকে বলেছে, আইউবীর উপর যখন সংহারী আক্রমণ হয়, তখন তিনি ভীত কিংবা ক্ষুব্ধ হওয়ার পরিবর্তে মুচকি হাসেন এবং মুহূর্ত মধ্যে ভুলে যান একটু আগে কী ঘটেছিলো।

পারিশ্রমিক কতো লাগবে বলো- গোমস্তগীন গর্জে ওঠে বললেন- আমি আইউবীকে জীবিত দেখতে চাই না। তুমি আনাড়ি ঘাতক প্রেরণ করেছে।

তারা সবাই ঘাঘু ছিলো- শেখ সান্নান বললো- তাদের হাত থেকে কখনো কেউ বাঁচতে পারেনি। তারা মৃত্যুকে ভয় করার মতো মানুষ ছিলো না। আমার কাছে তাদের চেয়েও দক্ষ ওস্তাদ আছে। তারা এমনভাবে খুন করে, পরে হত্যাকাণ্ডের কোন ক্রু খুঁজে বের করা যায় না। কিন্তু গোমস্তগীন! আমি আমার এই মূল্যবান লোকগুলোকে এভাবে নষ্ট করবো না। তোমরা তিনটি বাহিনী একত্রিত হয়ে আইউবীকে পরাজিত করতে পারলো না। আমার তিন-চারজন লোক কীভাবে তাকে খুন করবে?

তুমি আইউবীকে হত্যা করতে ভয় পেয়ে গেছো- গোমস্তগীন বললেন- এর কারণ অন্যকিছু হবে।

আরো একটি কারণ হলো- সান্নান বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। হাসান ইবনে সাব্বাই পয়গম্বর হতে চেয়েছিলো। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমার বাহিনীটি পেশাদার ঘাতক হয়ে গেছে। আমিও পেশাদার ঘাতক গোমস্তগীন আইউবী যদি তোমাকেও খুন করার জন্য আমাকে পারিশ্রমিক দেয়, তোমাকে হত্যা করাতেও আমি দ্বিধা করবো না।

সালাহুদ্দীন আইউবী কাপুরুষের ন্যায় কাউকে হত্যা করান না- লিজা বললো- এ কারণেই বোধ হয় তিনি কাপুরুষদের হাতে খুন হন না।

উহ!- সান্নান লিজাকে বাহুতে চেপে ধরে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললো তুমি এ বয়সেই জেনে ফেলেছে, যারা কাপুরুষ নয়, কাপুরুষরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না! সে গোমস্তগীনকে উদ্দেশ করে বললো সাইফুদ্দীন, আল-মালিকুস সালিহ এবং খৃস্টানরা শুধু এই জন্য একে অপরের বন্ধু হয়েছে যে, তারা সকলে সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রু। অন্যথায় তোমাদের মাঝে কোন বন্ধুত্ব নেই। তুমি বলো, আইউবীকে হত্যা করে তোমরা কী অর্জন করতে পারবে? তিনি মৃত্যুবরণ করলে তোমরা আপসে লড়াই করবে। মন দিয়ে শোন গোমস্তগীন! আইউবীর নিহত হওয়ার পর সাম্রাজ্যের এক বিঘত ভূমিও তোমার কপালে জুটবে না। তার ভাই ও সালারগণ ঐক্যবদ্ধ। তোমার যদি কাউকে খুন করাতেই হয়, সাইফুদ্দীনকে করাও এবং তাকে তুমি নিজেই হত্যা করতে পারবে। সে তোমাকে নিজের বন্ধু ও সহযোগী মনে করে। তুমি তাকে বিষ খাওয়াতে পারো, তার উপর হামলা করাতে পারো।

গোমস্তগীন গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। ক্ষণকাল নীরব থেকে পরে বললেন হ্যাঁ, সাইফুদ্দীনকে খুন করিয়ে দাও। বলো, তোমাকে কী দিতে হবে?

হাররানের দুর্গ। শেখ সান্নান বললো।

তোমার মাথা ঠিক আছে সান্নান?- গোমস্তগীন বললেন- সোনাদানা অর্থকড়ির কথা বলো।

সোনাদানা নয়। আমি বরং তোমাকে চারজন লোক দেবো- শেখ সান্নান বললো- তারা আমার ফেদায়ী নয়, আইউবীর কমান্ডো। এই মেয়ে দুটো তাদেরকে হাশীশের নেশায় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আমি তাদেরকে কারো কাছে হস্তান্তর করতে চাই না। এমন অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যায় না। ভাগ্যক্রমে আমি পেয়ে গেছি। হাশীশ আর আমার পরীরা তাদেরকে আপন রঙে রঙিন করে এমন ঘাতকে পরিণত করবে যে, তারা তাদের পিতা-মাতাকেও খুন করতে দ্বিধা করবে না। আমি তোমাকে নিরাশ করতে চাই না। তুমি এদেরকে নিয়ে যাও। এদেরকে তোমার জান্নাত দেখিয়ে দাও। তোমার হেরেমের রাজপুত্র বানাও। অজান্তে হাশীশ পান করাও। মদপানের অভ্যাস গড়ে তোেল। তারপর তারা তোমার ইশারায় নাচবে, উঠ-বস করবে।

সালাহুদ্দীন আইউবীর গেরিলারা অতো কঁচা নয়, যতটা তুমি মনে করছো। গোমস্তগীন বললেন।

তুমি তো জানো গোমস্তগীন!- সান্নান বললো- আমরা ফেদায়ী। আমরা মানুষের মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা-চেতনা নিয়ে খেলা করে থাকি। আমরা আমাদের শিকারের মস্তিষ্কে চিত্তাকর্ষক কল্পনা ঢুকিয়ে দিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করি যে, তারা কল্পনাকে বাস্তব ভাবতে শুরু করে। কোন মানুষের মাথায় নারীর সুদর্শন কল্পনা সৃষ্টি করে দাও, সেই সঙ্গে নেশাও পান করাও, দেখবে সে কল্পনার গোলাম হয়ে যাবে। মানুষকে নারীর কল্পনায় হারিয়ে থাকায় অভ্যস্ত করে তোল, তুমি তার ঈমান ও চরিত্র সামান্য মূল্যে ক্রয় করতে পারবে। তুমি এই চার ব্যক্তিকে নিয়ে যাও। এ কথা ভেবো না, তুমি এদেরকে নিজ কাজে ব্যবহার করতে পারবে না।

সান্নান মুচকি হেসে বললো- তুমি নিজের প্রতিই তাকিয়ে দেখো, নারী, মদ আর বিলাসপ্রিয়তা তোমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছে। মুসলমান হয়ে তুমি মুসলমানের শত্রু হয়ে গেছে।

শেখ সান্নান গোমস্তগীনকে তার মূল্য জানায়। চুক্তি সম্পাদিত হয়, গোমস্তগীন আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের হাররান নিয়ে যাবেন। সান্নান গোমস্তগীনকে পরামর্শ দেয়, এদেরকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ না করে রাজপুত্র বানিয়ে রাখবে। গোমস্তগীন দুদিনের মধ্যে সুলতান আইউবীর কমান্ডোদের নিয়ে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে উঠে যান।

***

গোমস্তগীন কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে শেখ সান্নানের এক লোক কক্ষে প্রবেশ করে। সে জিজ্ঞাসা করে, আজ যে চার ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে নিদের্শ কী?

হাররানের গভর্নর গোমস্তগীন এসেছেন- সান্নান বললো- তিনি তাদেরকে নিয়ে যাবেন। তাদের খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করো। আমি তাদেরকে রাখতে চাই না। তবে বিষয়টা তাদের বলবে না।

লোকটি চলে যায়। সে আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের জন্য খাবার পাঠিয়ে দেয়। আন-নাসের খেতে অস্বীকার করে। তার সন্দেহ, খাদ্যে হাশীশ মেশানো হয়েছে। সান্নানের লোকেরা বহু কষ্টে তাকে নিশ্চিত করে, খাদ্যে কিছু মেশানো হয়নি। আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা ক্ষুধায় অস্থির হয়ে আছে। সম্মুখে এমন উন্নত খাবার দেখে তারা আরো অস্থির হয়ে ওঠে। ঝুঁকি মাথায় নিয়ে খেতে শুরু করে।? শেখ সান্নান থ্রেসাকে বললেন, লিজাকে আমার কাছে রেখে তুমি চলে যাও। থ্রেসা বললো, মেয়েটা লাগাতার তিন-চার দিন সফরে ছিলো। এখন তার বিশ্রামের প্রয়োজন।

সান্নান হিংস্র প্রকৃতির এক অমানুষ-পশু। লোকটা লিজার সঙ্গে আগেও অসদাচরণ করেছে, যা থ্রেসার কথায় লিজা সহ্য করে নিয়েছে। এবারও প্রেসার অজুহাত উপেক্ষা করে লিজার প্রতি হাত বাড়াতে শুরু করেছে। ঘৃণায় লিজার শরীরটা রি রি করে ওঠে। মেজাজ চড়ে গিয়ে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যেতে শুরু করে। ইতিমধ্যে হঠাৎ কক্ষের দরজা খুলে যায়। দারোয়ান এক ব্যক্তির আগমনের সংবাদ জানায়। সান্নান ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো- এখন কেউ ভেতরে আসতে পারবে না। কিন্তু আগন্তুক তার অসম্মতির তোয়াক্কা না করে দারেয়ানকে ঠেলে একদিকে সরিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

লোকটা একজন খৃস্টান। এইমাত্র দুর্গে এসে পৌঁছেছে। সান্নান তাকে চেনে। তাকে দেখামাত্র সে তার নাম উল্লেখপূর্বক আনন্দ প্রকাশ করে। কিন্তু বললো- তুমি এখন গিয়ে বিশ্রাম নাও, সকালে কথা হবে।

আপনার সঙ্গে আমার সকালেই সাক্ষাৎ করার কথা ছিলো- খৃস্টান বললো- কিন্তু এখানে এসেই জানতে পারলাম, এই মেয়েরা এসেছে। এদের সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে, বহু কিছু জানতে হবে। আমি এদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।

সান্নান থ্রেসার কাঁধে হাত রেখে বললো- একে নিয়ে যাও। লিজাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললো- একে আমি এখানে রাখবো।

শেখ সান্নান!- লোকটি খানিকটা শ্লেষমাখা কণ্ঠে বললো- আমি দুজনকেই নিয়ে যাচ্ছি। তুমি জানো, আমি কী কাজে এসেছি। এই মেয়েগুলোর দায়িত্ব কী, তোমার জানা আছে। তোমার বগলের তলে বসে থাকা এদের কর্তব্য নয়। সে মেয়েরেদেক বললো- তোমরা দুজনই আমার সঙ্গে আসো।

মেয়েরা ঝটপট উঠে পড়ে লোকটির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

 তোমরা কি আমার সঙ্গে শত্রুতার ঝুঁকি মাথায় নিতে চাচ্ছো?- শেখ সান্নান বললো- তোমরা এখন আমার দুর্গে অবস্থান করছে। আমি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে অতিথি থেকে বন্দিতে পরিণত করতে পারি। সে গর্জে ওঠে লিজার প্রতি অঙুলি নির্দেশ করে বললো- একে আমার কাছে রেখে তোমরা বেরিয়ে যাও।

সান্নান- খৃস্টান লোকটি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো- তুমি কি ভুলে গেছে, এই দুর্গ তোমাকে আমরা দিয়েছি? তুমি কি ভুলে গেছো, আমরা যদি তোমার পিঠে হাত না রাখি, তাহলে তুমি এবং তোমার ফেদায়ীরা ভাড়াটে খুনী ছাড়া আর কিছুই থাকবে না?

শেখ সান্নান এই দুর্গের রাজা। তার এই দক্ষতা আছে যে, কোন রাজা বাদশাহকে যে কোন সময় এমনভাবে খুন করাতে পারে যে, কারো সন্দেহ করার উপায় থাকে না। বেশ কজন খৃস্টান অফিসারকেও সে খুন করিয়েছে। পারস্পরিক শত্রুতার কারণে খৃস্টানরাই তাকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছে। প্রয়োজনে এ কাজে তারা সান্নানকে ব্যবহার করতো।

লিজা থেকে হাত গুটিয়ে নিতে রাজি নয় সান্নান। সে খৃস্টান লোকটিকে বললো- আমি তোমাকে চিন্তা করার সময় দেবো। এই দুর্গে খোদার ফেরেশতাদেরও গুম করে ফেলা হয়, যা খোদা নিজেও টের পান না। এই মেয়েটিকে আমি দুর্গ থেকে বের হতে দেবো না। বাড়াবাড়ি করলে তুমিও বেরুতে পারবে না।

আমার এক সঙ্গী আগে চলে গেছে- খৃস্টান বললো- সে বলে দেবে আমি এখানে আছি। তুমি জানো, আমি এখানে দু-তিন দিন থাকতে এসেছি। তারপর আমাকে অন্যত্র যেতে হবে। আমার এখানে থাকার অধিকার আছে। তোমাকে দুর্গ দান করার সময় শর্ত দেয়া হয়েছিলো, প্রয়োজন হলে আমরা এখানে এসে থাকতে পারবো। এটি আমাদের আশ্রয়স্থল এবং অস্থায়ী ক্যাম্প। তুমি আমার হাড়-গোড় গায়েব করে ফেললেও তোমাকে জিজ্ঞেস করা হবে, আমাদের একজন লোক আর মেয়ে দুটি কোথায়? খৃস্টান লোকটি কি যেনো ভেবে পুনরায় বললো- তুমি যদি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করতে পারো, তাহলে এরূপ এক ডজন মেয়ে তোমার হাতে তুলে দেবো। কিন্তু তুমি আমাদের সোনা আর কড়ি কেবল হজমই করে যাচ্ছো, আইউবীকে হত্যা করতে পারোনি। আমি জানতে পেরেছি, তুমি আইউবীকে হত্যা করার জন্য চারজন ফেদায়ী প্রেরণ করে রেখেছে। কিন্তু আইউবী এখন পর্যন্ত জীবিত এবং বিজয়ী। তোমার অভিযানকে আমার কাছে ধাপ্পা বলে মনে হচ্ছে।

ধাপ্পা নয়- সান্নান নেশার ঘোরে ক্ষোভ-কম্পিত কণ্ঠে বললো- আমি সত্যি সত্যিই চার ব্যক্তিকে প্রেরণ করে রেখেছি। দিন কয়েকের মধ্যেই– সংবাদ পাবে সালাহুদ্দীন আইউবী খুন হয়ে গেছেন।

কাজ হোক। আমি ওয়াদা দিচ্ছি, আমার নিজের পক্ষ থেকে তোমাকে এর মতো দুটি মেয়ে উপহার দেবো। খৃস্টান বললো।

 দেখা যাক- সান্নান বললেন- এখন তুমি একে আমার কক্ষের বাইরে নিয়ে যাও। তবে দুর্গের বাইরে নিতে পারবে না। যাও, নিয়ে যাও। আমি দুর্গে খৃস্টানদের জন্য স্বতন্ত্র যে কক্ষ দিয়েছি, একে নিয়ে তুমি সেখানে চলে যাও। খাওয়া-দাওয়া করো, ফুর্তি করো। তারপর ভেবে-চিন্তে জবাব দাও, এই মেয়েটিকে আমার হাতে তুলে দেবে কিনা।

খৃস্টান লোকটি মেয়ে দুটোকে সঙ্গে নিয়ে সান্নানের শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। লোকটি খৃস্টানদের গোয়েন্দা ও নাশকতা বিভাগের অফিসার। মুসলিম এলাকায় ডিউটি পালন করে নিজ অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার পথে এখানে এসেছে। আসিয়াত দুর্গে খৃস্টানদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার ছিলো। খৃস্টানদের যখন যার ইচ্ছে সেখানে যেতে পারতো। থ্রেসাও এই সুযোগের সুবাদেই লিজা এবং আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের নিয়ে এখানে এসেছে। এই খৃস্টান লোকটিরও একই লক্ষ্যে এখানে আগমন। দু-একদিন পর তার সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম আছে। দুর্গে প্রবেশ করামাত্র কেউ একজন তাকে জানায়, দুটি খৃস্টান মেয়ে এসেছে, যারা এই মুহূর্তে শেখ সান্নানের কাছে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে দেখার জন্য সে ভেতরে চলে যায় এবং সান্নানের সঙ্গে উচ্চবাচ্যের পর মেয়ে দুটোকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

খৃস্টান লোকটি মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর শেখ সান্নান তার খাস লোকদের ডেকে বললো- এই খৃস্টান লোকটি এবং মেয়ে দুটো আমাদের কয়েদি নয়। তবে তাদেরকে আমার অনুমতি ছাড়া দুর্গ থেকে। বের হতে দেবে না। তাদের উপর নজর রাখবে। আর গোমস্তগীন যখন ইচ্ছা চার কয়েদিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে।

খৃস্টান লোকটিকে জানানো হলো, হাররানের গভর্নর গোমস্তগীনও এসেছেন এবং তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে ফিরছেন। তাকে আন-নাসের এবং তার সঙ্গীদের বিষয়টিও অবহিত করা হলো।

লোকটি থ্রেসা ও লিজাকে খৃস্টানদের জন্য নির্ধারিত খাস বিশ্রামাগারে নিয়ে যায়।

***

মুজাফফর উদ্দীনকে পরাজিত করে সুলতান আইউবী যাদেরকে পাকড়াও করেছেন, তাদের একজন হলেন সাইফুদ্দীনের উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন, যিনি মসুলে সাইফুদ্দীনের মন্ত্রীও ছিলেন।

সুলতান আইউবী ফখরুদ্দীনকে যুদ্ধবন্দিদের থেকে আলাদা করে নিজের তাবুতে নিয়ে যান এবং যথাযোগ্য সম্মানের সাথে রাখেন। গনীমতের সম্পদ বণ্টন করে সুলতান আইউবী সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত এই গ্রহণ করেন যে, তিনি পলায়নপর শত্রুদের ধাওয়া করবেন না। কোন কোন ঐতিহাসিক আইউবীর এই সিদ্ধান্তকে তার সামরিক পদস্খলন বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসের এই মর্দে মুজাহিদ বহু দূরের চিন্তা করতেন। এটা বাস্তব যে, তিনি যদি শত্রুসেনাদের ধাওয়া করতেন, তাহলে তাঁর বাহিনী চিরতরে নিঃশেষ হয়ে যেতো, যার ফলে দুশমন মোড় ঘুরিয়ে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো।

পরাজিত দুশমনকে ধাওয়া না করার একটি কারণ এই ছিলো যে, মুজাফফর উদ্দীনের সঙ্গে তিনি যে যুদ্ধ লড়েছেন, তাতে বিজয় অর্জন করতে তাঁকে চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। তাঁর ফৌজের ব্যাপক জীবনহানি ঘটেছে। আহতদের সংখ্যাও ছিলো বিপুল। সে কারণে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া তার পক্ষে সম্ভবও ছিলো না। অগ্রযাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তিনি তার রিজার্ভ বাহিনীকে ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। করেননি। একটি কারণ এও ছিলো যে, মুসলমানের হাতে মুসলমানের আরো অধিক রক্ত ঝরুক, তা তাঁর কাম্য ছিলো না। তিনি আপন জাতিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রক্তপাত থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন।

এই মুহূর্তে সুলতান আইউবী সেই স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে সাইফুদ্দীনের ব্যক্তিগত তবু ছিলো। সাইফুদ্দীনের তাঁবুটা ছিলো খুবই মূল্যবান। রেশমী কাপড়ের মহল। পর্দা ও শামিয়ানা ছিলো রেশমী। ভেতরে দাঁড়িয়ে শীশ মহলের কল্পনা করা যেতো। সাইফুদ্দীনের এক ভাতিজা ইযযুদ্দীন ফররুখ শাহ সুলতান আইউবীর ফৌজে সালার ছিলেন। বিস্ময়কর যুদ্ধের বিস্ময়কর এক দৃশ্য- ভাতিজা চাচার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তিনি ব্যতীত আরো কয়েকজন সৈনিক ছিলো, যারা তাদের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলো। সুলতান আইউবী সাইফুদ্দিনের এই তাঁবু পরিদর্শন করে তার ভাতিজা ইযযুদ্দীনকে কাছে ডেকে মুচকি হেসে বললেন- তোমার চাচার সম্পত্তির ওয়ারিশ তুমি। তার তাঁবুটা আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম। এই সম্পদ তুমি বুঝে নাও।

সুলতান আইউবী তো হাসিমুখে এই নজরানা পেশ করেছিলেন। কিন্তু ইযুদ্দীনের চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে আসে। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামায় অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় এই কাহিনী উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্যমতে, সুলতান আইউবী ইযযুদ্দীনের চোখে অশ্রু দেখে বললেন ইযযুদ্দীন! আমি তোমরা জযবা ভালো করেই বুঝি। কিন্তু আমার নীতি হলো, আমার পুত্রও যদি জিহাদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে, আমার তরবারী তাকেও রেহাই দেবে না। এটা ইসলামেরই শিক্ষা। পরাজিত চাচার তাঁবু দেখে তোমার চোখে অশ্রু নেমে এসেছে। কিন্তু আমি আমার ইসলাম ও জিহাদ বিরোধী পুত্রের কর্তিত মাথা দেখেও অশ্রু ঝরাবো না।

সুলতান আইউবী উক্ত এলাকা থেকে সামান্য সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে ছাউনী ফেলেন। অঞ্চলটা পাহাড়ি। তার নাম সুলতান পর্বত। ইতিহাসে জায়গাটাকে এ নামেই অভিহিত করা হয়েছে। সেখান থেকে হাবের দূরত্ব পনের মাইল। আল-মালিকুস সালিহর রাজধানী ও আবাসভূমি এই শহরটি এখন যৌথ বাহিনীর হেডকোয়ার্টার। পূর্বে উল্লেখ করেছি, এই শহরটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতো শক্ত এবং এখানকার মানুষ (যারা সকলে মুসলমান) এতো সাহসী ও যুদ্ধবাজ ছিলো যে, সুলতান আইউবীর অবরোধ ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিলো। এখন তিনি পুনরায় এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি অবরোধ করে দখল করতে চাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি নিজের অবস্থান মজবুত করে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন।

পথে দুটি দুর্গ। একটির নাম মাম্বাজ, অপরটি বুযা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে মাম্বাজকে মাম্বাস উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুর্গ দুটির অধিপতিদ্বয় ছিলেন স্বাধীন মুসলমান। এরূপ আরো কয়েকটি দুর্গ ও জায়গীর ছিলো, যেগুলোতে মুসলমানদের কর্তৃত্ব ছিলো। এভাবেই সালতানাতে ইসলামিয়া দুর্গ, জায়গীর ও প্রদেশে বিভক্ত হয়েছিলো। সুলতান আইউবী এই বিক্ষিপ্ত পরমাণুগুলোকে একত্রিত করে একটি সাম্রাজ্য গঠন করে তাকে এক খেলাফতের অধীনে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আমীর ও জায়গীরদারগণ নিজ নিজ স্বতন্ত্র মর্যাদা ও অবস্থান অটুট রাখতে চাইছেন। তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য খৃস্টানদের থেকে পর্যন্ত সাহায্য নিতে কুণ্ঠবোধ করছেন না।

সুলতান আইউবী বুয়ার আমীরের নামে একটি বার্তা লিখেন। আরেকটি লিখেন মাম্বাজের আমীরের নামে। বার্তা দিয়ে বুযায় ইযযুদ্দীনকে এবং মাম্বাজে সাইফুদ্দীনের উপদেষ্টা ফখরুদ্দীনকে প্রেরণ করেন। ফখরুদ্দীন সুলতান আইউবীর যুদ্ধবন্দি। কিন্তু তিনি সম্মান প্রদান করে তার মন জয় করে নিয়েছেন এবং ফখরুদ্দীনও তার আনুগত্য বরণ করে নিয়েছেন। সুলতান আইউবী যখন তাকে তার বিশেষ দূত বানিয়ে মাম্বাজ যেতে বললেন এবং তাকে মাম্বাজ দুর্গ জয় করার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার জন্য প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার প্রদান করলেন, তখন ফখরুদ্দীন হতবাক হয়ে বিস্ফারিত চোখে সুলতানের প্রতি তাকিয়ে থাকেন।

আপনি কি মুসলমান নন?- সুলতান আইউবী ফখরুদ্দীনকে বললেন আপনি আমার প্রতি এমন বিস্মিত চোখে তাকালেন, যেনো আমি একজন কাফেরকে আমার দূত ও প্রতিনিধি নিযুক্ত করে প্রেরণ করছি। আপনার কি আমার উপর ভরসা নেই, নাকি নিজের ঈমানের প্রতি আস্থা নেই? আমি মাম্বাজ দুর্গ দখল করতে চাই। আপনি তার অধিপতিকে আমার বার্তা পৌঁছিয়ে দেবেন এবং তার সম্মতি আদায় করবেন, যেন রক্তপাত ছাড়াই তিনি দুৰ্গটা আমাদের হাতে তুলে দেন এবং তার বাহিনীকে আমাদের বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে দেন।

ইযযুদ্দীন ও ফখরুদ্দীন রওনা হয়ে যান। বু্যর অধিপতি ইযযুদ্দীনকে সাদরে বরণ করে নেন এবং সুলতান আইউবীর বার্তা পাঠ করেন। তাতে লেখা ছিলো

আমার প্রিয় ভাই! আমরা এক আল্লাহ, এক রাসূল ও এক কুরআনের অনুসারী। কিন্তু আমরা এমনভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছি, যেমন একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গ মরুভূমির বালির উপর বিক্ষিপ্ত পড়ে থাকে। এমন দেহ কি নড়াচড়া করতে পারে? কোনো কাজে আসে? এই সুযোগে খৃস্টানরা স্বার্থ হাসিল করছে। তারা আমাদের কর্তিত অঙ্গগুলোকে শকুনের ন্যায় ভক্ষণ করছে। আমাদেরকে এক জাতির আকারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যথায় আমরা কেউ-ই বেঁচে থাকতে পারবো না। আমি আপনাকে এক জাতির আকারে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনি আপনার বর্তমান পদপর্যাদার কথা ভাবুন। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য আপনি শত্রুর প্রতিও হাত প্রসারিত করে থাকেন। আমি আপনাকে কুরআন ও ইসলামের পয়গাম পৌঁছালাম। এই পয়গাম বুঝবার ও তদনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করুন। প্রথম আবশ্যক হলো, আপনার দুর্গটা সালতানাতে ইসলামিয়ার কর্তৃত্বে অর্পণ করুন এবং আপনি আমার আনুগত্য মেনে নিন। এই প্রস্তাব। মেনে নিলে আপনার বাহিনী আমার বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে। আপনি দুর্গের অধিপতি থাকবেন এবং দুর্গের উপর সালতানাতে ইসলামিয়ার পতাকা উড্ডীন থাকবে। তবে যদি আমার এই প্রস্তাব গ্রহণ না করেন, তাহলে আমার ফৌজ আপনার দুর্গ অবরোধ করবে। আপনি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হোন। আমি আপনাকে হাল্ব, মসুল ও হাররানের সম্মিলিত বাহিনীর পরাজয় ও পিছপা হওয়ার ইতিহাস স্মরণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। তাতে আপনার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজ হবে। আপনি আমার সদাচরণের আশা রাখুন। আপনার সঙ্গে আমার কোন শত্রুতা নেই। আমি যা কিছু করছি, ইসলামের বিধান ও আল্লাহর আইন অনুসারেই করছি।

বুযার আমীর বার্তাটা পাঠ করে ইযযুদ্দীনের প্রতি তাকান। ইযযুদ্দীন বললেন- আপনার দুর্গ মজবুত নয়, আপনার সৈন্যও কম। এই ক্ষুদ্র বাহিনীকে আমাদের হাতে শেষ করে ফেলবেন না।

বুযার আমীর প্রস্তাব মেনে নেন এবং সুলতান আইউবী বরাবর পত্র লিখেন যে, আপনি আসুন এবং দুর্গ নিয়ে নিন।

মাম্বাজের আমীরও সুলতান আইউবীর আনুগত্য গ্রহণ করে নেন। ফখরুদ্দীন তার লিখিত বার্তা নিয়ে ফিরে যান।

সুলতান আইউবী স্বয়ং উভয় দুর্গে যান। সেখানে যেসব সৈন্য ছিলো, তাদেরকে দুর্গ থেকে বের করে নিজের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে নেন এবং নিজ বাহিনীকে দুর্গে পাঠিয়ে দেন। তিনি উভয় দুর্গে রসদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম জমা করেন। কিন্তু বাহিনীকে দুর্গে আবদ্ধ করে রাখেননি। হাবের সন্নিকটে এজাজ নামক একটি মজবুত দুর্গ ছিলো। এই দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হাবের হাতে ছিলো। তার অধিপতি ছিলেন হাবের আমীর আল মালিকুস সালিহর অফাদার। সুলতান আইউবী হাব অবরোধ করার আগে এই দুর্গটিও বিনা যুদ্ধে দখল করতে চাচ্ছিলেন। তিনি তার এক সালার আল-হিময়ারীকে লিখিত বার্তাসহ এজাজ রওনা করিয়ে দেন।

এজাজের আমীর সুলতান আইউবীর বার্তাটি পাঠ করে পত্রখানা আল হিময়ারীর দিকে নিক্ষেপ করে বললেন- তোমার সুলতান আল্লাহ ও রাসূলের নামে সারা পৃথিবীর রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তাকে বলবে, তুমি হাল্ব অবরোধ করে দেখেছো, এবার এজাজ অবরোধ করে দেখো।

আপনি কি সুলতানের হাতে মুসলমানের রক্ত ঝরানো পছন্দ করবেন?- আল হিময়ারী বললেন- আপনি কি চান, আমরা পরস্পর যুদ্ধ করি আর খৃস্টানরা আমাদের তামাশা দেখুক?

আপনাদের সুলতানকে খৃস্টানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বলুন। এজাজের আমীর বললেন।

তা আপনি কি খৃস্টানদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না?- আল-হিময়ারী জিজ্ঞেস করেন- আপনি কি তাদেরকে আপনার শত্রু মনে করেন না?  ও ২৩

এই মুহূর্তে আমরা সুলতান আইউবীকে আমাদের শত্রু মনে করি, যিনি আমাদেরকে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন– এজাজের আমীর বললেন- তিনি আমাদের থেকে এই দুর্গ তরবারীর জোরে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

এজাজের আমীর আল-হিময়ারীকে এক তিল মর্যাদা দিলেন না এবং তাকে চলে যেতে বললেন।

***

আসিয়াত দুর্গে আগন্তুক খৃস্টান গোমস্তগীনের নিকট উপবিষ্ট। থ্রেসা লিজাও তার সঙ্গে বসা। গোমস্তগীন ও এই খৃস্টান লোকটি পূর্ব থেকেই পরিচিত। খৃস্টান বললো- শুনলাম, আপনি নাকি সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করাতে করাতে এবার সাইফুদ্দীনকেও হত্যা করার মনস্থ করেছেন?

আপনি কি শুনেননি, সাইফুদ্দীন কীরূপ কাপুরুষতা ও সামরিক অদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন?- গোমস্তগীন বললেন- এই মেয়েরাই বলেছে, সে আমাদের তিন বাহিনীকে এমন শোচনীয় অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে যে, আমরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত যুদ্ধ করার শক্তি-সামর্থ হারিয়ে ফেলেছি। আমি আমাদের বিক্ষিপ্ত সৈন্যদেরকে একত্রিত করে আইউবীকে হাল্ব থেকে দূরে প্রতিহত করতে চাই। সাইফুদ্দীন যদি জীবিত থাকে, তাহলে আক্রোশ মেটানোর জন্য সে পুনরায় বাহিনীর কমান্ড হাতে নেয়ার জন্য জি ধরে বসবে এবং আমাদেরকে আরেকটি পরাজয়ের মুখে ঠেলে দেবে। আমি তো তাকে হত্যা না করে উপায় দেখছি না।

সাইফুদ্দীন অতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নয়, যতোটা আপনি মনে করছেন- খৃস্টান বললো- আমরা যা জানি আপনি তা জানেন না। আমরা আপনার প্রত্যেক বন্ধু ও প্রত্যেক শত্রুকে আপনার চেয়ে ভালো জানি। সে কারণেই আমরা আপনাকে আমাদের উপদেষ্টা দিয়ে রেখেছি। আমি আইউবীর বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশ ধারন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে ফিরছি, তা আপনার অস্তিত্ব এবং আপনার রাজ্যের বিস্তৃতির জন্যই। আমি যে পরিস্থিতি দেখে এসেছি, তার দাবি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর সবাই স্বাধীনতা লাভ করেছে। আপনি কেল্লাদার থেকে স্বাধীন শাসক হয়ে গেছেন। আইউবী মরে গেলে আপনি দশগুণ এলাকার শাসক হলেন। যুদ্ধ-বিগ্রহের আশংকা আজীবনের জন্য দূর হয়ে যাবে। আমি ত্ৰিপোলী যাচ্ছি। আপনার বাহিনীর উট-ঘোড়ার যে ক্ষতি হয়েছে, আমি অতি শীঘ্র তা পূরণ করে দেবো। অস্ত্রও প্রেরণ করবো।

আপনি সাহস হারাবেন না। আইউবী মারা গেলে আমরা আপনাকে এতো অধিক সাহায্য দেবো যে, সাইফুদ্দীন, আল-মালিকুস সালিহ ও সকল স্বাধীন মুসলমান শাসকের উপর আপনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে এবং এখন সালাহুদ্দীন আইউবীর যে মর্যাদা, আপনি সেই মর্যাদায় অধিষ্টিত হবেন।

ক্ষমতার মোহ এবং বিলাসপূজা গোমস্তগীনের বিবেকের উপর আবরণ ফেলে দিয়েছে। এতোটুকু বুঝ তার মাথায় ঢুকেনি যে, এই খৃস্টান লোক আপন জাতির প্রতিনিধি এবং সে যা কিছু বলছে ও করছে, তারই জাতির স্বার্থে করছে। লোকটি খৃস্টানদের একজন পদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নাশকতার হোেতা। সুলতান আইউবীর অগ্রযাত্রা কীভাবে প্রতিহত করা যাবে, ঘুরে-ফিরে তারই একটা ধারণা নেয়ার চেষ্টা করছে সে। প্রতিটি রণাঙ্গনে পরাজিত হয়ে খৃস্টানরা সমস্যার সমাধানে একটা পথ খুঁজে পেয়েছে। তাহলো, সুলতান আইউবীকে হত্যা করে মুসলিম শাসক গোষ্ঠীকে পরস্পর বিরাগভাজন করে তোলা, যাতে আইউবীর মৃত্যুর পর তারা আপসে লড়াই করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং আরব জগতের রাজত্ব খৃস্টানদের হাতে চলে যায়। এই লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তেই তারা মুসলিম আমীরদের মন মস্তিষ্কে অর্থপূজা এবং রাজত্বের মোহ ঢুকিয়ে দিয়েছে।

সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করা থেকে তো শেখ সান্নানও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন- গোমস্তগীন বললেন- তিনি নাকি চারজন ফেদায়ী প্রেরণ করে রেখেছেন। কিন্তু তিনি আশাবাদী নন।

এতোগুলো সংহারী আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর সান্নানকে আইউবী হত্যা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়াই উচিত- খৃস্টান বললো- সেই আক্রমণগুলো ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ, ফেদায়ীরা হাশীশের নেশায় অভিযানে গিয়ে থাকে। আইউবীকে কেবল সেই ব্যক্তিই হত্যা করতে পারে, যার হুশ-জ্ঞান ঠিক আছে এবং হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভব করে, জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনা থেকেই কাজটা করা উচিত। আপনি বোধ হয় মানবীয় স্বভাব বুঝেন না। আইউবীর উপর যে-ই সংহারী আক্রমণ করতে চায়, সে-ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। যখনই বিপরীত দিক থেকে মোকাবেলা শুরু হয়, তার নেশা দূর হয়ে যায় এবং সে নিজের জীবন রক্ষা করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে। আপনি বরং সান্নানকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে চেতনায় অন্ধ বানিয়ে এবং অন্তরে আইউবীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে প্রেরণ করুন। তাহলে সে আইউবীকে হত্যা করেই ঘরে ফিরবে।

শেখ সান্নান আমাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর চারজন গেরিলা দান করেছেন- গোমস্তগীন বললেন- এবং বলেছেন, এদেরকে প্রস্তুত করে আপনি তাদের দ্বারা সাফুদ্দীনকে হত্যা করান। এই গেরিলারা সাইফুদ্দীনকে তাদের শত্রু মনে করে। আমি এদের দ্বারা সাইফুদ্দীনকে হত্যা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আপনি তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত করছেন না কেন?- খৃস্টান বললো- তবে আপনি তাদেরকে হাশীশ কিংবা অন্য কোন নেশা দেবেন না। তাদের উপর আবেগের নেশা সৃষ্টি করে দিন।

এমন নেশা আপনিই সৃষ্টি করতে পারেন। গোমস্তগীন বললেন।

 খৃস্টান লোকটি থ্রেসা ও লিজার প্রতি তাকিয়ে মুচকি হাসে। লিজা বললো- আমি গেরিলাদের কমান্ডারকে প্রস্তুত করতে পারি। তার নাম আন-নাসের। অপর তিনজনের দায়িত্ব আপনি নিন।

তুমি আন-নাসেরকে প্রস্তুত করো- খৃস্টান বললো- অন্যদেরকে আপাতত এমনিতেই রেখে দাও। আমি মানবীয় স্বভাব যতটুকু জানি, আন-নাসের নিজেই তার সঙ্গীদেরকে তৈরি করে নেবে। তাদেরকে এখানে নিয়ে আসো। আন-নাসেরকে এক কক্ষে এবং অন্যদেরকে আরেক কক্ষে থাকতে দাও। আর তোমরা সতর্ক থাকবে। এই মেয়েটির প্রতি সান্নানের কুদৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে। এর প্রতি তার আসক্তি প্রবল। একে তার হাতে ফিরিয়ে না দিলে তিনি আমাকে মেহমানখানা থেকে কয়েদখানায় স্থানান্তরিত করবেন। তিনি আমাকে ভাববার সুযোগ দিয়েছেন।

আপনি তার ব্যাপারে অস্থির হবেন না- গোমস্তগীন বললেন- আমি এই চার গেরিলাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি এবং এই মেয়েরাও আমার সঙ্গে যাবেন।

***

আন-নাসের ও তার তিন সঙ্গীকে খৃস্টান সেনা অফিসারদের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। আন-নাসেরকে আলাদা কক্ষে রাখা হলো। কিন্তু সে আপত্তি জানায়, আমি আমার সঙ্গীদের ছাড়া আলাদা থাকবো না। থ্রেসা ও লিজা তাকে তাদের জালে আটকানোর জন্য আলাদা রাখতে চাইছে।

তুমি তাদের কমান্ডার- খৃস্টান লোকটি আন-নাসেরকে বললো মাকে তোমার অধীনদের থেকে আলাদা-ই থাকা উচিত। আমাদের কাছে উচ্চ-নীচুর ভেদাভেদ নেই- আন-নাসের বললো–স্বয়ং আমাদের সুলতান সাধারণ সৈন্যদের সঙ্গে থাকেন। আমি একজন সামান্য কমান্ডার মাত্র। সঙ্গীদের থেকে আলাদা অবস্থান করে অহংকার দেখালে আমার পাপ হবে।

আমরা তোমাকে সম্মান করতে চাই- খৃস্টান বললো- নিজ এলাকায় গিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে থেকো। আমরা অধীনদের সঙ্গে রেখে তোমাকে অপমান করতে চাই না।

না, আমাদের গেরিলা কমান্ডানগণ অধীনদের সঙ্গে একত্র থেকেই বাঁচে এবং তাদেরই সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে- আন-নাসের বললো- আমরা মৃত্যুপথের সহযাত্রী। আমরা একে অপর থেকে আলাদা হই না। আমরা যদি আপনার মেহমান হতাম, তাহলে আমি আপনার কথা মানতে পারতাম। কিন্তু আমরা আপনার কয়েদি। আমরা একজন আপনাদের থেকে যে কষ্ট-নির্যাতনের শিকার হবো, সকলে তার অংশীদার হতে চাই। এক সঙ্গীর জীবন রক্ষার জন্য আমরা অপর তিন সঙ্গী জীবন কুরবান করে দেবো।

তোমরা আমাদের বন্দিদশা থেকে পালাবার চেষ্টা করবে নাকি? গোমস্তগীন মুচকি হেসে বললেন।

আমরা মুক্ত হওয়ার চেষ্টা অবশ্যই করবো- আন-নাসের বললো- এটা আমাদের কর্তব্য। আমরা নিজেরা মৃত্যুবরণ করে মুক্ত হবো কিংবা আপনাদের সকলকে মেরে। আমাদেরকে যদি কয়েদখানায়ই রাখতে হয়, তো শিকল পরিয়ে দিন। আমাদেরকে ধোকা দেবেন না। আমরা ময়দানের পুরুষ। আমরা সাইফুদ্দীন-গোমস্তগীনের ন্যায় ঈমান-বিক্রেতা নই।

আমি গোমস্তগীন- গোমস্তগীন বললেন- হাররানের স্বাধীন শাসনকর্তা। তুমি আমাকে ঈমান বিক্রেতা বলেছো।

তাই নাকি! তাহলে আমি আপনাকে পুনরায় ঈমান-বিক্রেতা বলছি? আন-নাসের বললো- আমি আপনাকে গাদ্দারও বলছি।

কিন্তু এখন আমি না ঈমান-বিক্রেতা, না গাদ্দার।- গোমস্তগীন বললেন। আন-নাসেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য গোমস্তগীন মিথ্যা বললেন- দেখো না যুদ্ধ হচ্ছে তুর্কৰ্মনে আর আমি এখানে! আমি যদি তোমাদের শত্রু হতাম, তাহলে তোমরা এখন যেরূপ মুক্ত আছে, সেরূপ মুক্ত থাকতে পারতে না। আমি সাইফুদ্দীন ও আস-সালিহ থেকে আলাদা হয়ে গেছি। আমি তোমাদেরকে সম্মানের সাথে এই দুর্গ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি একজন সাধারণ কমান্ডার। কিন্তু তোমার বুকে সালাহুদ্দীন আইউবীর মর্যাদা ও চেতনা বিরাজমান।

কিন্তু আমি আমার সঙ্গীদের থেকে আলাদা থাকবো না- আন-নাসের বললো- আমার দ্বারা আপনারা এই পাপ করাবেন না।

আচ্ছা, ঠিক আছে- খৃস্টান বললো- তুমি তোমার সঙ্গীদের সাথেই থাকো।

আন-নাসেরের তিন সঙ্গী একটি প্রশস্ত ও মনোরম কক্ষে অবস্থান করছে, যেখানে পালঙ্কের উপর নরম গালিচা পাতা আছে। তাদের সেবার জন্য একজন খাদেম দেয়া হয়েছে। তারা খাদেমকে জিজ্ঞাসা করে, এটা দুর্গের কোন্ অংশ এবং এখানে কী হয়? খাদেম বললো, এটা মেহমানদের কক্ষ। এখানে শুধু উচ্চপদস্থ ও মর্যাদাসম্পন্ন মেহমানদেরই রাখা হয়।

আন-নাসেরের তিন সঙ্গী গভীরভাবে লক্ষ করলো, তাদের সঙ্গে বন্দির আচরণ করা হচ্ছে না। তারা ছিলো অতিশয় ক্লান্ত। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দেয়ামাত্র তাদের ঘুম এসে যায়। তারা গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়।

***

খৃস্টান ও গোমস্তগীন আন-নাসেরকে দীর্ঘ সময় নিজেদের সঙ্গে রাখে। তার সঙ্গে এমন সম্মানজনক কথাবার্তা বলে যে, আন-নাসেরের চেতনার প্রখরতা কিছুটা কমে আসে। এটা তাদের সাফল্যের প্রথম ধাপ। লিজা, উক্ত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আন-নাসের যখন সেই কক্ষ থেকে বের হয়, ততোক্ষণে তার সঙ্গীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। আন নাসের একটা কক্ষের বারান্দায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে, এমন সময় একটি নারীকণ্ঠ ফিস্ ফিস্ শব্দে তাকে ডাক দেয়। জায়গাটা অন্ধকার। আন নাসের দাঁড়িয়ে যায়। একটি কালোপনা ছায়া এগিয়ে আসে। মেয়েটি লিজা। লিজা আন-নাসেরের বাহু ধরে ফেলে বললো- এবার নিশ্চিত হয়েছে তো আমি পরী নই- মানুষ?

আমার কিছুই বুঝে আসছে না, এসব কী ঘটছে- আন-নাসের ঝাঝালো কণ্ঠে বললো- আমি একজন বন্দি। অথচ আমার সঙ্গে এমন সব আচরণ করা হচ্ছে, যেনো আমি রাজপুত্র!

তোমার বিস্ময় যথার্থ- লিজা বললো- একটু বুঝবার চেষ্টা করো। গোমস্তগীন তোমাকে বলে দিয়েছেন, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রুতা পরিত্যাগ করেছেন। এখন তিনি আইউবীর কোন সৈনিককে বন্দি মনে করেন না। তোমার এবং তোমার সঙ্গীদের সৌভাগ্য যে, তোমরা যখন এখানে এসেছে, গোমস্তগীন এখানে ছিলেন। দ্বিতীয় কারণ আমার ব্যক্তিসত্ত্বা। তুমি আমার পদমর্যাদা জানো না। আমি তোমার দৃষ্টিতে একটি দুশ্চরিত্র মেয়ে, যে কিনা রাজা-বাদশাহ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিনোদন কর্মী। আমার ব্যাপারে এসব তোমার ভুল ধারণা এবং কল্পনা মাত্র। লিজা আন-নাসেরের বাহুটা আরো শক্ত করে ধরে বললো- আসো, আমরা এখান থেকে দূরে কোথাও গিয়ে বসি। আসো, আমি তোমার ভুল শুধরে দিই। তারপরই তুমি মুক্ত হয়ে যাবে। তারপর তুমি আমার ব্যাপারে যা খুশি সিদ্ধান্ত নিয়ো।

দুর্গের এই অংশটা অতিশয় মনোরম ও আকর্ষণীয়। উন্মুক্ত ময়দান। মধ্যখানে বড় বড় টিলা। আশপাশ সবুজ-শ্যামল। স্থানে স্থানে কুল গাছ ও অন্যান্য বৃক্ষ। দুৰ্গটা বেশ প্রশস্ত ও চওড়া। লিজা আন-নাসেরকে কথায় কথায় কক্ষ থেকে দূরে টিলার আড়ালে নিয়ে যায়, যেখানে ফুলের সৌরভ মৌ মৌ করছে। লিজা যখন সেদিকে যাচ্ছিলো, তখন খৃস্টান লোকটি ও থ্রেসা একটি দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি দেখছিলো।

 লিজা লোকটাকে কাবু করে ফেলবে। খৃস্টান বললো।

মেয়েটি আবেগপ্রবণ- থ্রেসা বললো- কর্তব্য পালনে ভীত হয়ে তারই কাছে গিয়ে বসেছিলো। তবে অতোটা কাঁচা এবং আনাড়ীও নয়।

তুমি জানতে চেয়েছিলে আমি তোমার প্রতি এত দয়াপরবশ কেননা হয়েছি। লিজা বললো- আমাকে শত্রু মনে করে তুমি এই প্রশ্ন করেছিলে। তখন আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারিনি যে, শত্রুতা মূলত তোমার ও আমার রাজাদের মাঝে। আমার-তোমার মাঝে শক্রতার কী কারণ থাকতে পারে?

বন্ধুত্বেরই বা কী সূত্র থাকতে পারে? আন-নাসের বললো। লিজা গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আন-নাসেরের উভয় কাঁধে হাত রেখে বললো- তুমি একটা পাথর। আমি শুনেছি, মুসলমানের হৃদয় রেশমের ন্যায় কোমল হয়ে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য ধর্মকে দূরে সরিয়ে রাখো। নিজেকে মুসলমান কিংবা খৃস্টান না ভাবো। আমরা উভয়ে মানুষ। আমাদের বক্ষে হৃদয় আছে। তোমার অন্তরে কি কোনো কামনা, কোনো পছন্দ এবং কোন বস্তুর প্রতি ভালোবাসা নেই? আছে- অবশ্যই আছে। তুমি পুরুষ। তুমি তোমার হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো। আমি নারী। আমি পারি না। আমার অন্তর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। তুমি আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। আমরা যখন তোমাদেরকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দুর্গে নিয়ে এসেছি, তখন শেখ সান্নান তোমাদেরকে পাতাল কক্ষে আবদ্ধ করে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদি তার সেই নির্দেশ পালিত হতো, তাহলে তোমরা সেখান থেকে লাশ হয়ে বের হতে। তোমার ন্যায় সুদর্শন একটি যুবকের এই পরিণতি আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি শেখ সান্নানকে বললাম, এরা তোমার নয়। আমাদের কয়েদি। এরা আমাদেরই হেফাজতে থাকবে। এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে আমার ও প্রেসার মাঝে কথা কাটাকাটিও হয়। তিনি এক শর্তে আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তিনি বললেন- ঠিক আছে, যদি তাদেরকে পাতাল কক্ষ থেকে রক্ষা করতেই চাও, তাহলে তোমরা আমার শয়নকক্ষে এসে পড়ো। আমার অন্তরে বুড়োটার প্রতি ঘৃণা জন্মে যায়। আমি ইতস্তত করলে তিনি বললেন- ভিন্ন কোন কথা নেই- হয় তারা পাতাল কক্ষে যাবে, নয়তো তোমরা আমার শয়নকক্ষে আসবে। আমার গভীরভাবে অনুভূত হলো, যেনো আমি তোমাকে আজ থেকে নয়- শৈশব থেকেই কামনা করছি এবং তোমার খাতিরে আমি নিজের দেহ, জীবন ও ইজ্জত সবকিছু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি।

তুমি কি তোমার সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছো? আন-নাসের হঠাৎ চমকে ওঠে জিজ্ঞাসা করে।

না- লিজা বললো- আমি তাকে লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে কালক্ষেপণ করেছি। তিনি আমাকে এই বলে ছেড়ে দিয়েছেন যে, আমরা দুর্গে মুক্ত থাকবো; কিন্তু তার কয়েদি হয়ে থাকবো।

আমি তোমার ইজ্জতের হেফাজত করবো- আন-নাসের বললো।

তুমি কি আমার ভালোবাসা বরণ করে নিয়েছো? লিজা সহজ-সরল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে।

আন-নাসের কোন জবাব দেয়নি। খৃস্টান মেয়েরা রূপ-যৌবন ও সুদর্শন প্রতারণার জাল কীভাবে বিছিয়ে থাকে, প্রশিক্ষণে তাকে সে বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু সেসব মৌখিক নির্দেশনা আর বাস্তবতা এক নয়। তাকে তো সেই জাল থেকে আত্মরক্ষার বাস্তব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি এবং তা সম্ভবও নয়। এখন একটি খৃস্টান মেয়ে তেমনি জাল বিছালে আন-নাসেরের ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে মানবীয় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে বসে এবং সেই দুর্বলতা তার বিবেক-বুদ্ধির উপর জয়ী হতে শুরু করে। আন-নাসের পাহাড়-পর্বত ও মরু-বিয়াবানে মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করার মতো মানুষ ছিলো। লিজার ন্যায় মনকাড়া মেয়ে কখনো দেখেনি। কোন নারীর রূপ-যৌবন কোনোদিন তাকে আকর্ষণও করেনি। কিন্তু এখন যখন লিজার বিক্ষিপ্ত রেশমকোমল চুলগুলো তার গন্ডদেশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, তখন তার অস্তিত্ত্বে কেমন যেনো একটা ঢেউ খেলে যাচ্ছে এবং দেহে কেমন একটা কম্পন অনুভূত হচ্ছে।

একাধিকবার দুশমনের তীর আন-নাসেরের দেহ স্পর্শ করে অতিক্রম করেছে। বহুবার শত্রুর বর্শার আগা তার গায়ের চামড়া ছিলে দিয়েছে। কিন্তু তবু সে ভয় পায়নি। দেহ স্পর্শ করে চলে যাওয়া তীর-বর্শা তার দেহের উপর এক সেকেন্ডের জন্যও কম্পন সৃষ্টি করেনি। মৃত্যু কয়েকবার তার দেহ ছুঁয়ে অতিক্রম করেছিলো। কিন্তু তার দেহে সামান্যতম আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। নিজ হাতে লাগানো আগুনের মধ্য দিয়েও অতিক্রম করেছে। কিন্তু এখন একটি মেয়ের চুলের পরশে তার অস্তিত্ত্বে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। এই পরশ থেকে বাঁচবার জন্য সেরূপ চেষ্টা করছে না, যেমন চেষ্টা করতো তীর-বর্শা থেকে আত্মরক্ষার জন্য। ভাব জমাতে জমাতে লিজা যখন তাঁর আরো ঘনিষ্ট হয়, তখন তার মনে হলো, মেয়েটি এখনো তার থেকে দূরে অবস্থান করছে।

শিকারকে কীভাবে হেপটানাইজ করতে হয়, লিজাকে তার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আন-নাসেরের ক্ষেত্রে সেই বিদ্যা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে লিজা। আন-নাসেরের এমন এক ধরনের পিপাসা অনুভূত হতে শুরু করে, যা মরুভূমির পিপাসা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানি এই পিপাসা নিবারণ করতে পারে না। রাত যতোই গম্ভীর হচ্ছে, আন-নাসের তার আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। প্রথম আন-নাসেরের দেহ কেঁপে ওঠেছিলো। তারপর প্রকম্পিত হয়েছিলো ঈমান। চেতনার ভিত নড়ে ওঠেছিলো।

হ্যাঁ- আন-নাসের টলায়মান কণ্ঠে বললো- আমি তোমার ভালোবাসা কবুল করে নিয়েছি। কিন্তু এর পরিণতি কী হবে? তুমি আমাকে তোমার সঙ্গে যেতে বলবে? এ কথা কি বলবে, তুমি তোমার ধর্ম ত্যাগ করো? বিয়ে করে তোমাকে বউ বানাতে বলবে কি?

আমি এসব কিছুই ভাবিনি- লিজা বললো- তুমি যদি আমার সঙ্গ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো এবং আজীবনের জন্য আমাকে তোমার জীবনসঙ্গীনি বানিয়ে নিতে চাও, তাহলে আমিই বরং আমার ধর্ম পরিত্যাগ করবো। তুমি আমার থেকে কুরবানী কামনা করো। বিনিময়ে আমাকে তুমি সেই ভালোবাসা দাও, যা অপবিত্র নয়। সাময়িক ভালোবাস তো চাইলেই পাওয়া যায়। আমার আত্মা তোমার স্থায়ী ভালোবাসার প্রত্যাশী।

প্রেমের নেশা পেয়ে বসেছে আন-নাসেরকে। রাত অর্ধেকেরও বেশি কেটে গেছে। আন-নাসের জায়গা থেকে উঠতে চাচ্ছে না। লিজা বললো, তুমি তোমার কক্ষে চলে যাও।.ধরা পড়লে পরিণতি ভালো হবে না।

***

আন-নাসের কক্ষে ফিরে আসে। তার সঙ্গীরা গভীর ঘুমে বিভোর। সে শুয়ে পড়ে। কিন্তু তার ঘুম আসছে না। লিজা আপন কক্ষে প্রবেশ করলে প্রেসার চোখ খুলে যায়।

এতো দেরি? থ্রেসা জিজ্ঞাসা করে।

 পাথর এক ফুৎকারে মোম হয়ে যায় নাকি? লিজা উত্তর দেয়।

পাথর বেশি শক্ত নয় তো?

আমার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা ছিলো না- লিজা উত্তর দেয়- তবে নীরের শেষ তীরটিও আমাকে ছুঁড়তে হয়েছে। সে আমার পুরোপুরি গোলাম হয়ে গেছে।

নাকি নিজেই মোম হয়ে এসেছো? থ্রেসা সংশয় ব্যক্ত করে।

তাও হতে পারে- লিজা হেসে বললো- সুদর্শন সুপুরুষ কিনা। আমাকে অতো সরল মনে করো না। তবে এ ধরনের সহজ-সরল পুরুষ আমার ভালো লাগে, যাদের চরিত্রে কোন ফাঁকিবাজি নেই। হতে পারে লোকটাকে আমার ভালো লাগার কারণ, আমি সাইফুদ্দীনের ন্যায় বৃদ্ধ ও বিলাসী পুরুষদের থেকে অনীহ হয়ে পড়েছি।

আন-নাসের থেকেও অনীহ থাকতে হবে- থ্রেসা বললো- প্রেমের ফাঁদকে আরো বেশি যাদুকরী বানাতে হবে। মনে রাখবে, এর দ্বারা ক্রুশের সবচে বড় শত্রু সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাতে হবে।

থ্রেসা লিজাকে আরো কতিপয় নির্দেশনা প্রদান করে। নতুন দু-একটি পন্থা শিখিয়ে দুজনে শুয়ে পড়ে। আন-নাসের এখনো সজাগ। নির্জনে লিজার কথা বার্তা এবং প্রেম নিবেদনের ঘটনা নিয়ে চিন্তা করে। তার প্রশিক্ষণের কথা মনে পড়ে যায়, যাতে তাকে খৃস্টান মেয়েদের জাদুময় ফাঁদ সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিলো। লিজা তার কাছে একটি সুদর্শন প্রতারণা বলে মনে হলো। আবার ভাবনা জাগে, না, এটা প্রতারণা নয়- বাস্তব সত্য।

আন-নাসের একজন সুদর্শন সুপুরুষ। নিজের এই গুণ সম্পর্কে সে নিজেও অবহিত। মানবীয় চরিত্রের দুর্বলতাগুলো আন-নাসেরকে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত করতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত সে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলো না। তার দুচোখের পাতা বুজে আসে। আন-নাসের ঘুমিয়ে পড়ে।

এক ব্যক্তি আন-নাসেরকে জাগিয়ে বললো, থ্রেসা আপনাকে তার কক্ষে যেতে বলেছেন।

নাসের চলে যায়। কক্ষে প্রেসা একা।

বসো নাসের!- প্রেসা বললো- তোমার সঙ্গে আমার অনেক জরুরি কথা আছে।

আন-নাসের লিজার সম্মুখে বসে পড়ে। থ্রেসা বললো- আমি তোমাকে একথা জিজ্ঞেস করবো না, রাতে লিজা তোমাকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলো, নাকি তুমি তাকে নিয়ে গিয়েছিলে। আমি বলতে চাচ্ছি, এই মেয়েটা অত্যন্ত সরল ও নিষ্পাপ। আমি জানি, সে তোমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমি তোমাকে ও তাকে এভাবে রাতভর বাইরে বাইরে থাকার অনুমতি দিতে পারি না। তুমি লিজাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করো না।

আমি এমন কোনো চেষ্টা করিনি- আন-নাসের বললো- আমরা কথা বলতে বলতে সামান্য দূরে চলে গিয়েছিলাম।

আমি লিজাকে থামাতে পারবো না~ থ্রেসা বললো- তোমার থেকে আমি এই আশা রাখি, তুমি তার বয়স, রূপ-যৌবন ও আবেগ থেকে সুযোগ নিতে যেও না।

লিজা তোমারই ন্যায় রাজকন্যা- আন-নাসের বললো- আর আমি কয়েদি। আমি একজন তুচ্ছ মানুষ। লিজার ধর্ম এক, আমার আরেক। রাজকন্যা আর কয়েদির মাঝে প্রেম হতে পারে না।

তুমি বোধ হয় নারীর সহজাত সম্পর্কে অবহিত নও- প্ৰেসা বললো রাজকন্যা যখন স্বীয় কয়েদিকে মন দিয়ে বসে, তখন তাকে রাজপুত্র মনে করে নিজেকেই তার কয়েদি বানিয়ে নেয়। ভালোবাসা ধর্মের শিকল ছিঁড়ে ফেলে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। তার একই কথা, আমার জীবন মরণ দু-ই আন-নাসেরের জন্য। সে হয়তো বলবে, তুমি তোমার ধর্ম ত্যাগ করে, তাহলে আমি আমার গলা থেকে ক্রুশ খুলে ফেলে দেবো। তুমি জানো না আন-নাসের! লিজা শুধু তোমার খাতিরে শেখ সান্নানকে রুষ্ট করেছে। তিনি তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিজা তার শত্রুতা ক্রয় করে তোমাদেরকে রক্ষা করেছে। সান্নান লিজাকে যে শর্ত দিয়েছেন, তা মেনে নেয়া সেই মেয়ের পক্ষেই সম্ভব, যাকে কারো ভালোবাসা অন্ধ করে তুলেছে। আমরা যদি এই দুর্গ থেকে দ্রুত বের হতে না পারি, তাহলে লিজা সেই শর্ত পালন করতে বাধ্য হবে।

আমি তা হতে দেবো না- আন-নাসের বললো- লিজার সম্ভ্রমের জন্য আমি মৃত্যুকেও বরণ করে নিতে প্রস্তুত।

তোমার অন্তরে কি লিজার প্রতি ততোটুকু ভালোবাসা আছে, যতটুকু আছে তোমার প্রতি তার?

লিজা মেয়ে হয়ে যদি আমার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে, তাহলে আমি পুরুষ হয়ে পারবো না কেন? আমি লিজাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসি।

তোমার প্রতি আমার একটি মাত্র নিবেদন, তুমি তাকে ধোকা দিও না থ্রেসা বললো- তুমি আমাদের কয়েদি নও। গোমস্তগীন তোমাকে তার মেহমান মনে করেন।

লিজার ব্যাপারে আন-নাসেরের মস্তিষ্ক স্বচ্ছ হয়ে যায়। তার হৃদয় লিজার প্রেমে ভরে ওঠে। এই মুহূর্তে লিজাকে এক নজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে আন-নাসের। সে থ্রেসাকে জিজ্ঞাসা করে, লিজা কোথায়? থ্রেসা বললো, সারারাত ঘুমায়নি। অন্য কক্ষে শুয়ে আছে।

থ্রেসার তীর লক্ষ্যে আঘাত হানে। সে লিজার যাদুময়তা আন-নাসেরের বিবেকের উপর পুরোপুরি প্রয়োগ করে দেয়। এটাই তার লক্ষ্য। এই মেয়েগুলো সীমাহীন চতুর। এটাই তাদের দীক্ষা। মানবীয় দুর্বলতা নিয়ে খেলতে পারঙ্গম তারা।

আন-নাসের প্রেসার সম্মুখ থেকে উঠে যায়। এখন সে বাতাসে উড়ছে যেন। কক্ষে ফিরে গেলে সঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করে, কোথায় গিয়েছিলেন? আন-নাসের মিথ্যা জবাব দেয় এবং তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করে, সব ঠিক হয়ে যাবে।

আন-নাসের আপন কর্তব্য থেকে সরে যেতে শুরু করেছে।

***

খৃস্টান লোকটি গোমস্তগীনের নিকট উপবিষ্ট। গোমস্তগীন তাকে বলেছিলেন, আমি আন-নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে এক-দুদিনের মধ্যে হাররান নিয়ে যেতে চাই। ইত্যবসরে থ্রেসাও এসে পড়ে। সে বললো গেরিলাদের কমান্ডার আমাদের জালে এসে পড়েছে।

লিজা কীভাবে আন-নাসেরের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং নিজে কীভাবে তাতে পূর্ণতা দান করেছে, তার বিবরণ দেয়। থ্রেসা বললো- এই লোকটাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এখন দেখার বিষয় হলো, নিজের আসল পরিচয় ভুলে গিয়ে এ কাজের জন্য প্রস্তুত হতে তার কতো সময়ের প্রয়োজন হবে।

আমি এই চারজনকে এক-দুদিনের মধ্যে হাররান নিয়ে যেতে চাই গোমস্তগীন বললেন- তোমরা উভয়ে কিংবা শুধু লিজা আমার সঙ্গে যাবে কি? খুনের জন্য আন-নাসেরকে লিজাই প্রস্তুত করতে পারে।

মেয়েদেরকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি- খৃস্টান বললো- আমি বেশিদিন থাকতে পারবো না। সম্রাটদেরকে আমার তাড়াতাড়ি সংবাদ পৌঁছাতে হবে, হাল্ব, হাররান ও মসুলের ফৌজ সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছে এবং সেসব বাহিনীর সালারগণ পলায়ন ছাড়া আর কিছুই জানে না। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে আমি তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করার জন্য অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করার পরামর্শ দেবো। হতে পারে, আমাদের পক্ষ থেকে আপনারা যে সহায়তা পাচ্ছেন, তা বন্ধ করে দেয়া হবে।

এ কথা বলবেন না- গোমস্তগীন অনুনয়ের সুরে বললেন- আমাকে একটি মাত্র সুযোগ দিন। আমি আইউবীকে হত্যা করিয়ে দেবো। তারপর দেখবেন, কীভাবে আমি বিজয়ী বেশে দামেশক প্রবেশ করি। এই মেয়ে দুটোকে কিংবা শুধু লিজাকে আমাকে দিয়ে দিন। মেয়েটা গেরিলাদের কমান্ডারকে মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে। সে-ই তাকে প্রস্তুত করবে। আন-নাসের সালাহুদ্দীন আইউবীর কাছে বিনা বাধায় যেতে পারবে। আইউবীকে অনায়াসে হত্যা করা তার পক্ষে সম্ভব। তাছাড়া চিন্তা করে দেখুন, আপনি যদি লিজাকে নিয়ে যান, তাহলে আন-নাসের আমার কোন কাজের থাকবে না।

খানিক তর্ক-বিতর্কের পর খৃস্টান বললো- হাররান যাওয়ার পরিবর্তে আমরা এখানেই থাকি। মেয়ে দুটো আন-নাসেরকে প্রস্তুত করুক। হতে পারে তার সঙ্গী তিনজনকেও প্রস্তুত করে নেয়া যাবে। তাদের অন্তরে সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে।

আন-নাসের সম্পর্কে আমার অভিমত হলো, লোকটা অপরিপক্ক মানুষ। লিজা তার বিবেক কজা করে নিয়েছে। দু-তিনটি সাক্ষাতের পরই সে লিজার আঙুলের ইশারায় নাচতে শুরু করবে।

আজ তাদের চারজনকেই সঙ্গে বসিয়ে আহার করাও। খৃস্টান বললো।

খাওয়ার সময় হলে আন-নাসের এবং তার সঙ্গীদেরকেও খাওয়ার কক্ষে ডেকে নেয়া হলো। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ অকৃত্রিম সম্পর্ক গড়ে তোেলা হলো। এখনো খাবার এনে রাখা হয়নি। শেখ সান্নানের এক চাকর এসে খৃস্টান লোকটিকে বললো, শেখ সান্নান আপনাকে যেতে বলেছেন।

খৃস্টান চলে যায়।

ঐ মেয়েটির ব্যাপারে আপনি কী চিন্তা করেছেন? শেখ সান্নান জিজ্ঞাসা করে।

 আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবো। খৃস্টান জবাব দেয়।

তোমার যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে আমার কাছে থাকবে। সানান বললো।

আমি আজই চলে যাবো।

যাও- শেখ সান্নান বললো- আর মেয়েটিকে এখানে রেখে যাও। তুমি তাকে দুর্গ থেকে বের করতে পারবে না।

সান্নান! খৃস্টান বললো- এই দুর্গের প্রতিটি ইট বালিকণা হয়ে যাবে। আমাকে হুমকি দেয়ার দুঃসাহস দেখিও না।

মনে হচ্ছে, তোমার মাথাটা এখনো ঠিক হয়নি- সান্নান বললো- আজ রাত তুমি নিজে লিজাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। তারপর তুমি ইচ্ছে হয় থাকো, ইচ্ছে হয় যাও। এর অন্যথা হলে তুমি যাবে আমার পাতাল কক্ষে আর লিজা আসবে আমার শয়নকক্ষে। যাও, ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো।

***

খৃস্টান লোকটি খাওয়ার রুমে প্রবেশ করে। সকলে অস্থিরচিত্তে তার অপেক্ষা করছিলো। কক্ষে প্রবেশ করেই লোকটি ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলতে শুরু করে- বন্ধুগণ! শেখ সান্নান আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, আজ রাত লিজা তার কাছে থাকবে। তিনি এতোটুকুও বলেছেন, মেয়েটাকে আমি নিজে তার কক্ষে দিয়ে আসবে। অন্যথায় আমাকে পাতাল কক্ষে নিক্ষেপ করে লিজাকে ছিনিয়ে নেবেন।

আপনাকে পাতাল কক্ষে নিক্ষেপ করা হবে, আর আমরা বুঝি মরে যাবো?- আন-নাসের বললো- লিজাকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।

মেয়েটা তোমার আবার কী লাগে আন-নাসের? আন-নাসেরের এক সঙ্গী জিজ্ঞাসা করে।

তোমরা নিজেদেরকে আমাদের কয়েদি ভেবো না- গোমস্তগীন বললেন- বিপদটা আমাদের প্রত্যেকের জন্য আসছে।

তোমরা আমাদের নয়- শেখ সান্নারের কয়েদি- খৃস্টান বললো তোমরা আমাদের সঙ্গ দাও। বাইরে গিয়ে আমরা তোমাদেরকে ছেড়ে দেবো। এখন এখান থেকে বের হওয়ার পন্থা খুঁজে বের করো।

শেখ সান্নান আমাকে এই চারজনকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে রেখেছেন- গোমস্তগীন বললেন- আমি তাদেরকে আজই নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমাদেরকে সন্ধ্যার অনেক আগেই রওনা হতে হবে।

গোমস্তগীনের মেজাজটা বেশ চড়া। খাওয়ার মাঝে তিনি সবাইকে তার পরিকল্পনার কথা বলে দেন। আহার শেষে তিনি তার খাদেম ও দেহরক্ষীদের ডেকে বললেন, আমি এক্ষুনি দুর্গ থেকে রওনা হচ্ছি। তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র বেঁধে নাও।

তৎক্ষণাৎ কাফেলা প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। গোমস্তগীনের নিজের ঘোড়া ছাড়াও দেহক্ষীদের চারটি ঘোড়া। চারটি উটও আছে, যেগুলোতে খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও তাঁবু বোঝাই করা। সফর দীর্ঘ। তাই সঙ্গে তাঁবু রাখা আছে।

গোমস্তগীন শেখ সান্নানের নিকট গিয়ে বললেন, আমি যাচ্ছি এবং চার গেরিলাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।

সুলতান আইউবীর চার গেরিলার ব্যাপারে গোমস্তগীনের লেন-দেন চূড়ান্ত হয়ে আছে। মূল্য তিনি পরিশোধ করে দিয়েছেন।

আমার আশা, আমি যে চার ব্যাক্তিতে প্রেরণ করে রেখেছি, তারা সালাহুদ্দীন আইউবীকে শেষ করেই তবে ফিরবে- শেখ সান্নান বললো তুমি এদের দ্বারা সাইফুদ্দীনকে খুন করাও। তোমরা লড়াই করতে জানো না। তাই শত্রুকে গোপনে হত্যা করা ছাড়া তোমাদের উপায় নেই। ও আচ্ছা, তোমার খৃস্টান বন্ধু আর পরী দুটি কোথায়?

তাদের কক্ষে। গোমস্তগীন উত্তর দেন।

খৃস্টান মেহমান কি ছোট মেয়েটি সম্পর্কে কিছু বলেনি?

হ্যাঁ, শুনলাম তাকে বলছে, আজ রাত তুমি শেখ সান্নানের কাছে থাকো গোমস্তগীন বললেন- লোকটাকে আপনার ভয়ে বেশ ভীত মনে হয়েছে।

এখানে বড় বড় প্রতাপশালী লোকও ভয় পেয়ে থাকে- শেখ সান্নান বললো- লোকটা মেয়েটাকে আমার থেকে এমনভাবে লুকাচ্ছিলো, যেনো ও তার কন্যা।

গোমস্তগীন শেখ সান্নান থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। কাফেলা প্রস্তুত দন্ডায়মান। তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তার দেহরক্ষীরাও ঘোড়ায় চড়ে বসে। দুজন গোমস্তগীনের সম্মুখে চলে যায়। দুজন পেছনে। তাদের হাতে বর্শা। ঘোড়ার পেছনে আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা এবং তাদেরপেছনে মাল বোঝাই উটের পাল। দুর্গের ফটক খুলে যায়। কাফেলা দুর্গ থেকে বেরিয়ে যায় এবং ফটক বন্ধ হয়ে যায়।

***

শেখ সান্নানের আসিয়াত দুর্গ আর গোমস্তগীনের কাফেলার মাঝে দূরত্ব বাড়ছে। আকাশের সূর্যটা দিগন্তের পেছনে চলে যাচ্ছে। এক সময়ে সূর্য অস্তমিত হয়ে কাফেলা ও দুর্গকে লুকিয়ে ফেলে। দুর্গে প্রদীপ জ্বলে ওঠে। পুরোপুরি রাত নেমে এলে শেখ সান্নান দারোয়ানকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে খৃস্টান লোকটি মেয়েটিকে নিয়ে আসেনি? সে না সূচক জবাব পায়। পরপর তিন-চারবার জিজ্ঞাসা করার পরও একই উত্তর মিলে। খাস খাদেমকে ডেকে বললো- তুমি গিয়ে খৃষ্টান মেহমানকে বলল, যেনো সে ছোট মেয়েটিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আসে।

খাদেম খৃস্টানদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোতে প্রবেশ করে। সেখানে কেউ নেই। মেয়ে দুটোও নেই। সবগুলো কক্ষ শূন্য। সে ওদিক-ওদিক তাকায়। দুর্গের বাগিচায় ঘুরে-ফিরে দেখে। টিলার আশপাশে ঘুরে দেখে। কোথাও কেউ নেই। ফিরে এসে শেখ সান্নানকে জানায়, কাউকে পাওয়া যায়নি- খৃস্টান মেহমান এবং দুই মেয়ে কাউকেই নয়। সান্নান আকাশটা মাথায় তুলে নেয়। বাহিনীর কমান্ডারকে নির্দেশ দেয়, দুর্গের কোণায় কোণায় তল্লাশী চালাও। খৃস্টান লোকটাকে খুঁজে বের করো। বাহিনীতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। দুর্গের প্রতি ইঞ্চি জায়গায় অনুসন্ধান শুরু হয়ে যায়। সর্বত্র প্রদীপের ও মশালের আলো ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোন স্থান থেকে খৃস্টান লোকটাকে বের করা গেলো না।

শেখ সান্নান ফটকের প্রহরীদের তলব করে। তাদের জিজ্ঞাসা করে, গোমস্তগীনের কাফেলা ব্যতীত আর কার জন্য ফটক খোলা হয়েছে? তারা জানায়, আপনার আদেশ ব্যতীত কারো জন্য ফটক খোলা হয়নি এবং গোমস্তগীন ও তার কাফেলা ব্যতীত আর কেউ বেরও হয়নি। তারা গোমস্তগীনের কাফেলার হিসাব প্রদান করে। রেকর্ডে খৃস্টান লোকটি ও মেয়ে দুটো নেই।

শেখ সান্নান নিজ কক্ষে ফোঁস ফোঁস করছে।

রাতের প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। গোমস্তগীনের কাফেলা এগিয়ে চলছে। তিনি এক স্থানে ঘোড়া থামিয়ে উষ্ট্ৰচালকদের বললেন উটগুলোকে বসাও। ওদেরকে বের করো, আবার মরে যায় না যেনো।

কাফেলার উটগুলোকে বসিয়ে পিঠ থেকে তাঁবুগুলো নামানো হলো। পুটুলিবাঁধা তাঁবু খোলা হলে সেগুলোর মধ্য থেকে খৃস্টান লোকটি, থ্রেসা ও লিজা বেরিয়ে আসে। ঘামে ভিজে চিপপিপে হয়ে গেছে তারা। গোমস্তগীন তাদেরকে ভাবুর মধ্যে পেচিয়ে পুটুলির মতো বেঁধে আসিয়াত দুর্গ থেকে বের করে এনেছেন।

এখন তারা দুর্গ থেকে বহুদূর চলে এসেছে। ফেদায়ীদের ব্যাপারে কোন আশংকা নেই। তারা মুখোমুখি যুদ্ধ করার ঝুঁকি বরণ করে না। তথাপি গোমস্তগীন কাফেলাকে যাত্রাবিরতি দেয়ার সুযোগ দেননি। মেয়ে দুটোকে উটের পিঠে বসিয়ে দেয়া হলো। খৃস্টান লোকটি গেরিলাদের সঙ্গে পায়ে হাঁটছে। তার ও মেয়েদের ঘোড়া দুর্গে রয়ে গেছে। খৃস্টান এই অঞ্চলের ভাষা অনর্গল বলতে পারে। সে আন-নাসেরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে যাতে বন্ধুত্ব-ভালোবাসার রং-ই প্রবল। আন-নাসেরের মন থেকে ভয় দূর হয়ে যায়। লিজাকে কাছে পাওয়াই এখন তার একমাত্র কাম্য।

মধ্যরাতের পর অবস্থানের জন্য কাফেলা এক স্থানে থেমে গেলে এই সুযোগটা হাতে আসে। গোমস্তগীনের জন্য তাঁবু স্থাপন করা হয়। অন্য সকলের জন্য আলাদা আলাদা তাবু দাঁড় করানো হয়। চার গেরিলা, গোমস্তগীনের দেহরক্ষী ও অন্যান্যরা খোলা আকাশের নীচে শুয়ে পড়ে। তারা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখে ঘুম এসে যায়।

আন-নাসেরের ঘুম আসছে না। সে ভাবছে, লিজাকে তাবু থেকে ডেকে আনতে হবে নাকি সে নিজেই এসে যাবে। আন-নাসের ভুলে গেছে, সে সুলতান আইউবীর গেরিলা সৈনিক এবং তার বাহিনী কোন এক স্থানে যুদ্ধ করছে। তার মাথায় এই ভাবনাটাও জাগেনি যে, তাকে ফৌজে ফিরে যেতে হবে এবং পলায়নের এটাই মোক্ষম সুযোগ। এখন সবাই অচেতনের ন্যায় ঘুমিয়ে আছে। অস্ত্রও আছে। খাদ্য-পানীয় আছে। তার সঙ্গীরা তারই উপর নির্ভর করে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারা তো তাদের কমান্ডারের নির্দেশনা মান্য করতে বাধ্য। তাদের জানা নেই, তাদের কমান্ডার নিজের বিবেক, ঈমান ও চেতনা এক যুবতীর হাতে তুলে দিয়েছে। এক নারী চরম এক বিধ্বংসী পরিকল্পনা নিয়ে তার বিবেক কজা করে নিয়েছে।

আন-নাসের একটি ছায়া এগিয়ে আসছে দেখতে পায়। ছায়াটা তারই দিকে আসছে। খানিক পর দুটি ছায়া পরস্পর একাকার হয়ে যায়।

লিজা আন-নাসেরকে ঘুমন্ত কাফেলার মধ্য থেকে তুলে সামান্য দূরে একটি টিলার আড়ালে নিয়ে যায়। মেয়েটিকে আজ পূর্বাপেক্ষা বেশি আবেগময় মনে হলো। আন-নাসের পাগলের মতো হয়ে যায় প্রেমপাগল। লিজা তার আবেগের প্রকাশ উচ্চারণের চেয়ে আচরণ দ্বারা বেশি করছে। হঠাৎ সে সামান্য দূরে গিয়ে বলে ওঠলো- একটা প্রশ্নের উত্তর দাও নাসের! তোমার জীবনে কখনো কোন নারী প্রবেশ করেছে কি?   

মা এবং বোন ব্যতীত আমি কখনো কোন নারীর ছোঁয়া পাইনি- আন নাসের উত্তর দেয়- যৌবনের শুরুতেই আমি নুরুদ্দীন জঙ্গীর ফৌজে ঢুকে গিয়েছিলাম। অতীতের উপর চোখ বুলালে আমি নিজেকে যুদ্ধের ময়দানে, বালুকাময় প্রান্তরে এবং সঙ্গীদের থেকে দূরে শত্রুর এলাকায় রক্ত ঝরাতে এবং ব্যাঘ্রর ন্যায় শিকারের সন্ধানে ঘুরে ফিরছি দেখতে পাই। আমি যখন যেখানে ছিলাম, কর্তব্য পালনে ত্রুটি করিনি। কর্তবোধ আমার ঈমানের অংশ।

হঠাৎ আন-নাসেরের দেহটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো- লিজা! তুমি বোধ হয় আমার ঈমানের ভিত টলিয়ে দিয়েছো। বলল, তোমরা আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?

তার আগে বলো, তোমার হৃদয়ে আমার ভালোবাসা আছে, নাকি আমাকে দেখে তুমি পশু হয়ে যাও? লিজা এমন এক ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে, যাতে ভালোবাসা এবং রসিকতার বাম্পও নেই। তার বলার ধরনটা গত রাতের তুলনায় এখন ভিন্ন।

তুমি বলেছিলে, আমি ভালোবাসাকে যেনো অপবিত্র না করি- আন নাসের বললো- আমি প্রমাণ দেবো, আমি পশু নই। তুমি আমাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। তোমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন অপেক্ষা অপরজন অধিক সুশ্রী, বীর যোদ্ধা, সুঠামদেহী ও মর্যাদাসম্পন্ন পুরুষ আছে। তুমি কোনো রাজার দরবারে ঢুকে পড়লে তিনি সিংহাসন থেকে নেমে এসে তোমাকে স্বাগত জানাবেন। তারপরও তুমি আমার মধ্যে কী দেখেছো?

লিজার মুখে কোন উত্তর নেই। আন-নাসের মেয়েটার কাঁধে হাতে রেখে বললো- উত্তর দাও লিজা! লিজা মাথাটা হাঁটুর উপর রেখে দেয়। আন নাসের তার হেঁচকি শুনতে পায়। সে অস্থির হয়ে ওঠে, বার বার জিজ্ঞেস করে, কাঁদছো কেনো লিজা! কিন্তু লিজা কাঁদতেই থাকে। আন-নাসের স্বস্নেহে তাকে বাহুতে জড়িয়ে ধরে। লিজা তার মাথাটা আন-নাসেরের বুকের উপর রেখে দেয়। আন-নাসের বুঝতে পারেনি, যেভাবে তার ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে মানবীয় দুর্বলতা জেগে ওঠে তার বিবেকের উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে, তেমিন লিজাও একটি দুর্বলতার কবলে পড়ে গেছে। এ সেই দুর্বলতা, একজন রাণীকে তার ক্রীতদাসের সম্মুখে অবনত করে তোলে এবং যার কারণে সম্পদের প্রাচুর্যকে পাথরের স্তূপ জ্ঞান করে হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য মানুষ কুঁড়ে ঘরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।

লিজা ভালোবাসার পিয়াসী- সেই ভালোবাসা, যা আত্মাকে প্রশান্ত করে দেবে। দৈহিক ভালোবাসা পেয়েছে লিজা এবং পেয়েছে সেই পুরুষরে থেকে, যাদের প্রতি তার ঘৃণা ছিলো। আসিয়াত দুর্গে যাওয়ার সময় এবং দুর্গে পৌঁছেও সে প্রেসার কাছে তার এই মনোভাব ব্যক্ত করেছিলো। তখন কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সে আন-নাসেরের কাছে গিয়ে বসেছিলো এবং বলেছিলো- আমার উপর ভরসা রাখো।

সেসময় তার মনে কোন প্রতারণার পরিকল্পনা ছিলো না। সেটা ছিলো তার হৃদয়ের আওয়াজ। তখন সে তার আত্মার নির্দেশনায় আন-নাসেরের কাছে চলে গিয়েছিলো। থ্রেসা যদি তাকে সেখান থেকে সরিয়ে না নিয়ে যেতো, তাহলে না জানি মেয়েটি আরো কতো কথা বলতো। পরে তাকে আন-মাসেরকে জালে আটকানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। একাজে পরাকাষ্ঠাও প্রদর্শন করেছে সে। কিন্তু মন তার সঙ্গ দিচ্ছিলো না। এখন কর্তব্য আর হৃদয়ের মাঝে ঘুরপাক খেয়ে ফিরছে লিজা।

আন-নাসের জানে না, কাফেলা অবতরণ করে এখানে তাঁবু স্থাপনের সময় গোমস্তগীন লিজাকে কানে কানে বলেছিলেন- সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তুমি আমার তাঁবুতে চলে এসো। আমি তোমাকে তোমার জাতির প্রেরিত উন্নত মদ পান করাবো। আমি বড় কৌশলে তোমাকে শেখ সান্নানের কবল থেকে রক্ষা করে নিয়ে এসেছি।

লিজা গোমস্তগীনকে কোন উত্তর দেয়নি। তার নিকট থেকে সরে এলে, খৃস্টান তাকে বললো- খোদা তোমাকে এই বৃদ্ধ হায়েনাটার পাঞ্জা থেকে বাঁচিয়ে এনেছন। থ্রেসা ঘুমিয়ে পড়লে তুমি আমার তাঁবুতে চলে আসবে; ফুর্তি করবো।

লিজার নিজের রূপ-যৌবন আর দেহটার প্রতি ঘৃণা জন্মাতে শুরু করে। সে নিজের তাঁবুতে চলে যায় থ্রেসা ঘুমিয়ে পড়ে। লিজার দুচোখের পাতা এক হয় না। সে শয্যা থেকে উঠে পা টিপে টিপে আন-নাসেরের দিকে হাঁটা দেয়। আন-নাসেরও তারই অপেক্ষায় জেগে আছে।

লিজা আন-নাসেরের পার্শ্বে উপবিষ্ট। হঠাৎ আন-নাসের চমকে ওঠে বললো- দেখো তো কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছো মাকি? ঘোড়া আসছে!

হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি- লিজা বললো- সকলকে জাগিয়ে দাও। শেখ সান্নান আমাদের ধরার জন্য সৈন্য পাঠাতে পারে!

আন-নাসের দৌড়ে টিলার উপর উঠে যায়। সে অনেকগুলো প্রদীপ দেখতে পায়। সেগুলো ধাবমান অশ্বের চলনের সাথে সাথে উপর-নীচ হচ্ছে। ঘোড়ার পদশব্দ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। আন-নাসের দৌড়ে নীচে নেমে আসে। লিজাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমন্ত কাফেলার দিকে ছুটে যায়। সকলকে জাগিয়ে তোলে। সে তার সঙ্গীদের নিয়ে টিলার নিকটে চলে যায়। লিজাকে সঙ্গে রাখে। সকলের হাতে বর্শা ও তরবারী আছে। গোমস্তগীনের দেহরক্ষী এবং উষ্ট্ৰচালকরাও বর্শা-তরবারী হাতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

***

তারা পনের-ষোলজন। অশ্বারোহী। ছয়-সাতজনের হাতে প্রদীপ। এসেই তারা গোমস্তগীনের কাফেলাটি ঘিরে ফেলে। একজন হুংকার দিয়ে বললো- মেয়ে দুটোকে আমাদের হাতে তুলে দাও। শেখ সান্নান বলেছেন, মেয়েদেরকে দিয়ে দিলে তোমরা নিরাপদে চলে যেতে পারবে।

আন-নাসের অভিজ্ঞ গেরিলা যোদ্ধা। সে তার সঙ্গীদের আগেই সরিয়ে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে। তিন সঙ্গীকে নিয়ে সে হামলাকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা পেছন দিক থেকে সম্মুখের আরোহীদের উপর বর্শার আঘাত হানে। আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আরোহীরা মাটিতে পড়ে যায়। আন নাসের চীৎকার করে তার সঙ্গীদের বললো- এদের ঘোড়াগুলের পিঠে চড়ে বসো। নিজে একটি ঘোড়া ধরে তাতে চড়ে বসে এবং লিজাকে পিছনে বসিয়ে নেয়। লিজা আন-নাসেরের কোমর শক্ত করে ধরে বসে থাকে।

সান্নানের ফেদায়ীরা এলোপাতাড়ি আক্রমণ শুরু করে। তারা হাতের প্রদীপগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয়। প্রদীপগুলো জ্বলতে থাকে। আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা যথাসাধ্য মোকাবেলা করে। একটি ঘোড়ার ছুটে চলার শব্দ কানে আসে, যা দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। ঘোড়ার আরোহী গোমস্তগীন, যিনি নিজের জীবন রক্ষা করে পালিয়ে যাচ্ছেন। ফেদায়ীরা আন-নাসেরের ঘোড়ার পিঠে লিজাকে দেখে ফেলে। তারা মেয়েটাকে জীবিত ধরে ফেলার চেষ্টা করছে। তিন-চারটি ঘোড়া তাকে ঘিরে ফেলেছে এবং ঘোড়াটাকে আহত করার জন্য বর্শা দ্বারা আঘাত করছে। আন-নাসের অভিজ্ঞ যোদ্ধা। সে ঘোড়াটাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং দুজন ফেদায়ীকে ফেলে দেয়।

ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। দ্রুততার সাথে ঘোড়ার মোড় ঘোরানোর কারণে লিজা পা রেকাবে রাখতে পারছে না। হঠাৎ করে আন-নাসের ঘোড়ার মোড় ঘোরালে লিজা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যায়।

ফেদায়ীরা ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে। লিজা উঠে আন-নাসেরের দিকে দৌড় দেয়। কিন্তু দুজন ফেদায়ী তাকে ধরে ফেলে। আন-নাসের ঘোড়া হাঁকায় এবং বর্শা দ্বারা আঘাত হানতে উদ্যত হয়। ফেদায়ীরা ঢালস্বরূপ লিজাকে সম্মুখে এনে ধরে।

আন-নাসের তাঁর সঙ্গীদের কোন খোঁজ জানে না। ধাবমান ও পলায়নপর ঘোড়া এবং তরবারী ও বর্শার সংঘর্ষের শব্দ কানে আসছে তার। তিন-চারজন ফেদায়ীর মোকাবেলায় আন-নাসের একা। প্রতিটি আঘাতই ব্যর্থ যাচ্ছে তার। কারণ, সে আঘাত হানলেই ফেদায়ীরা লিজাকে ঢাল হিসেবে সম্মুখে এগিয়ে ধরে। অবশেষে সেও ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। প্রাণপণ লড়াই করে। নিজে আহত হয় এবং দুই ফেদায়ীকে আহত করে ফেলে দেয়। এমনি অবস্থায় লিজা চীৎকার দিয়ে বলতে থাকে নাসের! তুমি বেরিয়ে যাও। তুমি একা। কিন্তু আন-নাসের দিক-দিশা হারিয়ে ফেলেছে যেনো। সেও চীৎকার করে বলে ওঠে- চুপ থাকো লিজা! এরা তোমাকে নিতে পারবে না।

আন-নাসের তার ঘোষণা সত্যে প্রমাণিত করে দেখায় যে, ফেদায়ীরা লিজাকে নিতে পারেনি। সে ফেদায়ীদেরকে গুরুতর জখম করে অবস্থা শোচনীয় করে তোলে।

এই যুদ্ধ লড়তে গিয়ে আন-নাসের কাফেলার অবস্থান থেকে দূরে সরে গিয়েছিলো। সে একটি ঘোড়া ধরে লিজাকে তার উপর বসিয়ে ঘোড়া হাঁকায়। কিন্তু পলায়ন করেনি। রণাঙ্গন এখন নীরব। আন-নাসের নিকটে গিয়ে দেখে। ওখানে কয়েকটি লাশ পড়ে আছে এবং দু-তিনজন ফেদায়ী আহত হয়ে ছটফট করছে। তার সঙ্গী তিনজন মারা গেছে। খৃস্টান লোকটিরও লাশ পড়ে আছে। থ্রেসা নিখোঁজ। আন-নাসের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনি। সে আকাশের পানে তাকায়। ধ্রুবতারা দেখে দিক নির্ণয় করে ঘোড়া হাঁকায়। অনেকখানি পথ অতিক্রম করে সে ঘোড়ার গতি থামায়।

এবার বলো তুমি কোথায় যেতে চাও?- আন-নাসের লিজাকে জিজ্ঞাসা করে- একটি অসহায় মেয়ে বিবেচনা করে আমি তোমাকে সঙ্গে নিতে চাই না। যদি বলল, তাহলে আমি তোমাকে তোমার এলাকায় পৌঁছিয়ে দেবো। তাতে যদি আমি বন্দিও হই, পরোয়া করবো না। তুমি আমার আমানত।

আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও- লিজা বললো আমাকে তোমার আশ্রয়ে নিয়ে যাও আন-নাসের!

ঘোড়া রাতভর চলতে থাকে। রাত পোহাবার পর আন-নাসের এলাকা। চিনতে পারে। এ অঞ্চলেরই কোন এক স্থানে সে নিজ বাহিনীর সঙ্গে গেরিলা হামলা করেছিলো। এখানে মাটির টিলা ও বড় বড় পাথর আছে। চলতে চলতে সে একটি কূপের নিকট গিয়ে উপনীত হয়। কূপটি একটি টিলার পাদদেশে অবস্থিত। আন-নাসের নিজের জখম দেখে। কোনো জখমই গুরুতর নয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেছে। পুনরায় রক্ষক্ষরণ শুরু হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে জখম ধৌত করলো না। এই ফাঁকে লিজা হাঁটতে হাঁটতে এক দিকে চলে যায়। আন-নাসের তাকে টিলার অপর প্রান্ত থেকে খুঁজে বের করে। সেখানে গিয়ে লিজা বসে পড়ে। তার পিঠটা আন নাসেরের দিকে। সেখানে অনেক হাড়-গোড় ছড়িয়ে আছে, যেগুলো মানুষের হাড় বলে মনে হলো। আছে অনেক খুলিও। আছে কংকাল। হাত পা ও বাহুর হাড়। সেগুলোর মাঝে পড়ে আছে তরবারী ও বর্শা। 

লিজা একটি খুলিকে সামনে নিয়ে বসে আছে। কোন এক নারীর খুলি বলে মনে হচ্ছে। মুখমন্ডলে কোথাও কোথাও চামড়া আছে। মাথার দীঘল চুলগুলোর কিছু এখনো মাথার সঙ্গে আঁটা আছে। অবশিষ্টগুলো এদিকে ওদিকে বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে। বুকের খাঁচায় চামড়া নেই। পাজরে একটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে আছে। গলার হাড়ে একটি সোনার হার লেপ্টে আছে। লিজা একদৃষ্টে খুলিটার দিকে তাকিয়ে আছে।

আন-নাসের ধীরপায়ে লিজার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ লিজা তার উভয় হাত কানের উপর রেখে সজোরে একটা চীৎকার দেয়। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতবেগে উঠে মোড় ঘুরিয়ে দাঁড়ায়। আন-নাসের তাকে বাহুতে জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নেয়। লিজা তার মুখটা আন-নাসেরের বুকে লুকিয়ে ফেলে। শরীরটা তার থর থর করে কাঁপছে। আন-নাসের তাকে কূপের নিকট নিয়ে যায়।

***

লিজার চৈতন্য ফিরে আসার পর আন-নাসের জিজ্ঞাসা করে, তুমি চীৎকার দিলে কেন?

স্বচক্ষে নিজরে পরিণতি দেখে- লিজা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো- তুমি নিশ্চয় সেই শুষ্ক লাশটা দেখে থাকবে- কোনো এক নারীর লাশ। আমার মতো কেউ হবে। সেও আমার ন্যায় রূপের যাদু প্রয়োগ করেছিলো। যে কোন পুরুষের প্রতারণার একটি ফাঁদ ছিলো। বিশ্বাস ছিলো, তার এই রূপ কখনো নিঃশেষ হবে না। এই তরতাজা যৌবন আজীবন টাটকাই থাকবে। তার পাজরের খাঁচায় খঞ্জর বিদ্ধ দেখেছো? গলায় হার দেখেছো? এই হার ও খঞ্জর যে কাহিনী শোনাচ্ছে, তা আমারই কাহিনী। অন্য যেসব খুলি আর তাদের সঙ্গে পড়ে থাকা তরবারী-বর্শা পড়ে আছে, সেসব আমাকে শতবার শোনা কাহিনী ব্যক্ত করছে। সেসব কাহিনী আমি কখনো মনোযোগ সহকারে শুনিনি। আজ এই নারীর মাথার খুলি দেখে আমার মনে হলো, যেনো এটি আমার খুলি। শুষ্ক এই খুলিটায় গোশত চড়ানো হলে তা আমার চেহারা হয়ে যাবে। আমি একটি শকুনকে দেখেছি আমার চোখ দুটো খুলে ফেলছে। একটি সিংহকে দেখেছি, যে আমার গোলাপী গন্ডদেশ খাবলে খাবলে খাচ্ছে। ঐ হায়েনাগুলো আমার মুখমন্ডলটা খেয়ে ফেলেছে। এখন, শুধু খুলিটা পড়ে আছে। আমি দেখতে পেলাম, আমার চোয়াল আর ভয়ানক দাঁতগুলো নড়ছে। আমার কানে শব্দ ভেসে আসে- এই হলো তোমার পরিণতি। তারপর আমার হৃদয়টাকে একটি ভয়ংকর হিংস্র প্রাণী দাঁত দ্বারা কামড়ে ধরেছে।

ফেদায়ীরা যেখানে আমাদের উপর আক্রমণ করেছিলো, কয়েকদিন পর সেখানে গিয়ে দেখো- আন-নাসের বললেন- সেখানেও তুমি এ দৃশ্যই দেখতে পাবে। লাশের কংকাল, মাথার খুলি, তরবারী ও বর্শা এবং সম্ভবত তাদের থেকে খানিক দূরে প্রেসার খুলিও পড়ে আছে দেখবে। তার বুকেও খঞ্জর বিদ্ধ থাকবে। তারা সকলে নারীর জন্য মরেছে। এরাও নারীর জন্যই মরেছে।

আমি যদি আমার নীতি পরিবর্তন না করি, তাহলে নিজের যে দেহটা নিয়ে আমি আজ গৌরব করছি, যার প্রাপ্তির জন্য কেউ জীবনের নজরানা পেশ করছে, কেউ সম্পদ পেশ করছে, শৃগাল-শকুনরা একদিন মরুভূমিতে এমনি সেই দেহের গোশতও খাবলে খাবে- লিজা বললো- কিন্তু মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে না, নিজেদের ধ্বংস চোখে দেখে না। আমি নিজেকে চিনে ফেলেছি। লিজার আসল পরিচয় পেয়ে গেছি। তুমিও শুনে নাও আন নাসের! খোদা তোমাকে পুরুষের শক্তি ও পুরোষিত সৌন্দর্য দান করেছেন। যে নারীই দেখবে, সে-ই তোমার নিকটে আসবার আকাংখা ব্যাক্ত করবে। যাও, দেখে আসো, তুমিও তোমার পরিণতি দেখো আসো।

লিজা এমন ভঙ্গিতে বলছিলো, যেনো তার উপর প্রেতাত্মা ভর করেছে। তার সব চতুরতা ও প্রতারণা-ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে গেছে। এখন একজন দুনিয়াত্যাগী সূফী-দরবেশের ন্যায় কথা বলছে লিজা।

আমি কি তোমাকে আমার আসল পরিচয় বলে দেবো- লিজা আন নাসেরকে জিজ্ঞাসা করে- আমি কি তোমাকে দেখিয়ে দেবো, আমার পাজরের খাঁচায় কী আছে? মেয়েটি তার বুখে হাত মারে এবং চুপ হয়ে যায়। হাতটা তার সোনার হারের উপর গিয়ে পড়ে, যাতে হীরার মিশ্রণও আছে। সে হারটা মুঠি করে ধরে সজোরে টান দেয়। ছিঁড়ে হারটা হাতে চলে আসে। লিজা হারটা কূপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হাতের আঙুল থেকে হীরার আংটিগুলো খুলে ফেলে। এগুলোও কূপে ছুঁড়ে ফেলে লিজা। তারপর বলতে শুরু করে- আমি একটি প্রতারক ছিলাম আন-নাসের। আমার হৃদয়ে তোমার ভালোবাসাও জন্ম নিয়েছিলো। কিন্তু তার উপর আমার কর্তব্যের প্রেতাত্মারও প্রভাব ছিলো। ফেদায়ীরা আমাদের উপর হামলা করে খুবই ভালো করেছে। তার চেয়েও ভালো হয়েছে, আমি জীবদ্দশায়ই নিজের মাথার খুলি দেখে নিয়েছি। অন্যথায় আমি বলতে পারতাম না, আমরা তোমাদেরকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে– তোমাদের পরিণতি কী ঘটতো! আমার ভালোবাসার শেষ ফল কী দাঁড়াতে! তুমি ভয়াবহ একটি প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছিলে। আজ আমি মিথ্যা বলবো না। তোমাদের নিয়ে পরিকল্পনা ছিলো, আমি আমার রূপ ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে তোমার বিবেক কজা করে নেবো এবং তোমাদের হাতে। তোমাদেরই রাজা সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাবো। গোমস্তগীন আসিয়াত দুর্গে এই উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, যেনো শেখ সান্নান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য তাকে কয়েকজন ঘাতক প্রদান করেন। সান্নান বলেছেন, তিনি চারজন ফেদায়ী প্রেরণ করে রেখেছেন। তারাও যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ কাজের জন্য আর তিনি লোক প্রেরণ করবেন না। কেননা, এই মিশনে তিনি তার অনেক দক্ষ ও মূল্যবান ফেদায়ী খুইয়ে ফেলেছেন। শেষে লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় যে, গোমস্তগীন তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে নিয়ে যাবেন এবং সাইফুদ্দীনকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত করবেন। ইতিমধ্যে আমাদের অফিসার এসে পড়েন। তিনি সিদ্ধান্ত প্রদান করেন, সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাই বেশি জরুরি।

আমার পক্ষে এটুকুও সম্ভব হবে না যে, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর ছায়াকে বক্ত চোখে দেখবো- আন-নাসের বললো- পৃথিবীর কোন শক্তি আমাকে এমন নির্বোধ বানাতে পারবে না।

লিজা হেসে ওঠে। বলতে শুরু করে- আমি যে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তার প্রতি আমার মন ছিলো না। অন্যথায় আমি সীসাকেও পানিতে পরিণত করতে জানি।

লিজা আন-নাসেরকে অবহিত করে তার কর্তব্য আর চেতনার মাঝে কতোখানি পার্থক্য। সে জানায়, আমি সাইফুদ্দীনের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। জিজ্ঞাসা করে, তুমি আমার ন্যায় একটি অপবিত্র মেয়েকে বরণ করে নেবে কি? আমি সত্যমনে ইসলাম গ্রহণ করবো।

তুমি যদি সত্যমনে ইসলাম গ্রহণ করে নাও, তাহলে তোমাকে বরণ না করা আমার জন্য পাপ হবে- আন-নাসের বললো- কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অনুমতি ব্যতীত আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।

তুমি শান্ত হও। মন থেকে দুশ্চিন্তার বোঝা ফেলে দাও। তুমি যদি পবিত্র জীবন লাভ করতে চাও, তাহলে এমন জীবন একমাত্র আমাদের ধর্মেই পাবে। আন-নাসের জিজ্ঞাসা করে- তোমার কি জানা আছে, যে, চারজন ফেদায়ী সুলতান আইউবীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গেছে, তারা কোন্ বেশে গেছে এবং সংহারী আক্রমণ কোন্ পন্থায় করবে?

না, জানি না- লিজা উত্তর দেয়- আমার উপস্থিতিতে শুধু এটুকু কথা হয়েছে যে, চারজন ফেদায়ী পাঠানো হয়েছে।

আমাদেরকে উড়ে তুকমান পৌঁছতে হবে- আন-নাসের বললো সুলতান এবং তাঁর দেহরক্ষীদেরকে সতর্ক করতে হবে।

আন-নাসের লিজাকে পেছনে বসিয়ে ঘোড়া হাঁকায়। একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে তার বুকের সঙ্গে লেগে আছে। মেয়েটির রেশমকোমল চুলগুলো তার গন্ডদেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ছে। কিন্তু মস্তিষ্কে তার সুলতান আইউবী। কর্তব্যবোধ লোকটার আবেগ- স্পৃহাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। পবিত্র একটি লক্ষ তাকে রণাঙ্গনের পুরুষ এবং পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করেছে। একটি সুন্দরী অসহায় যুবতী হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও তার এই অনুভূতিটুকু যেনো নেই যে, সে পুরুষ এবং তার মধ্যে যৌনতা আছে। একজন খ্যাতিমান বক্তা যদি কয়েক বছরও ওয়াজ করে শোনাতেন, তা লিজার উপর ক্রিয়া করতে না। কিন্তু আন-নাসের ছোট্ট একটি বাক্যে তার হৃদয়ে এই বাস্তবতাকে প্রোথিত করে দিয়েছেন যে, পবিত্র জীবন যাপন করতে চাইলে তাকে ইসলামের ছায়াতলেই আশ্রয় নিতে হবে।

***

এজাজ দুর্গের অধিপতির জবাব সুলতান আইউবীকে অগ্নিশর্মা করে তোলে। এই দুৰ্গটা তাঁকে জয় করতেই হবে এবং এক্ষুনি হাব অবরোধ করে নগরীটা দখল করে নিতে হবে। তিনি মাম্বাজ ও বুযুর দুর্গ দুটি যুদ্ধ ছাড়াই পেয়ে গেছেন। সে গুলোতে যেসব সৈন্য ছিলো তাদেরকে নিজ বাহিনীতে যুক্ত করে তাদের স্থলে আপন বাহিনী মোতায়েন করেছেন। এখন তিনি এজাজ ও হাবের উদ্দেশ্যে অগ্রযাত্রার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন। যে স্থান দুটো অবরোধ করবেন, খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য সেখানে সৈন্য প্রেরণ করে রেখেছেন। গোয়েন্দারা তাকে হালব ও এজাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেছে। সুলতান আইউবী নিজেও ঘুরে ফিরে এবং সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে স্বচক্ষে পরিস্থিতি অবলোকন করতেন। এ জাতীয় ভ্রমণের সময় তিনি সঙ্গে পতাক রাখতেন না এবং দেহরক্ষীদেরও সঙ্গে নিতেন না, যাতে দুশমন চিনতে না পারে ইনি সালাহুদ্দীন আইউবী। এ সময় তিনি অন্যের ঘোড়া ব্যবহার করতেন। দুশমনের প্রধান সেনাপতি তার ঘোড়াটা চিনে।

দেহরক্ষী ছাড়া এভাবে দূরে যেতে তাকে বারণ করা হতো। কিন্তু তার নিজের নিরাপত্তার কোনোই পরোয়া ছিলো না। এখনো তিনি পুরোপরি ক্ষিপ্ত। তিনি তার মুসলমান দুশমনকে নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন। তাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার কাজটা বাকি আছে শুধু। এলাকাটি এমন যে, কোথাও টিলা-পর্বত কোথাও ঝোপালো গাছ-গাছালি। কোথাওবা গভীর খানা-খন্দক। এমন একটি অঞ্চলে রক্ষী বাহিনীর পাহারা ব্যতীত ঘোরা-ফেরা করা সুলতান আইউবীর পক্ষে খুবই বিপজ্জনক।

 সুলতানে মুহতারাম!- আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ একদিন তাকে বললেন- আল্লাহ না করুন আপনার উপর পরিচালিত কোন সংহারী আক্রমণ যদি সফলই হয়ে যায়, তাহলে সালতানাতে ইসলামিয়া আপনার ন্যায় আর কোনো মর্দে মুমিন জন্ম দিতে পারবে না। আমরা জাতিকে মুখ দেখাতে পারবো না। অনাগত প্রজন্ম আমাদের কবরের উপর অভিশাপ বর্ষণ করবে যে, আমরা আপনাকে রক্ষা করতে পারিনি।

আল্লাহর এটাই যদি সিদ্ধান্ত হয় যে, কোনো ফেদায়ী কিংবা ক্রুসেডারের হাতে আমার মৃত্যু হবে, তা হলে এমন মৃত্যুকে আমি কীভাবে প্রতিহত করতে পারি- সুলতান আইউবী বললেন- রাজা যখন আপন জীবনের হেফাজত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন আর তিনি দেশ ও জাতির মর্যাদা হেফাজতের যোগ্য থাকেন না। আমি যদি খুনই হতে হয়, তাহলে আমাকে তাড়াতাড়ি দায়িত্ব পালন করে ফেলতে দাও। তোমরা আমাকে রক্ষীদের কয়েদিতে পরিণত করো না। আমার উপর রাজত্বের নেশা সৃষ্টি করো না। তুমি তো জানো, আমার উপর কতোবার সংহারী আক্রমণ হয়েছে। প্রতিবারই আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। এখনো রক্ষা করবেন।

সুলতান আইউবীর ব্যক্তিগত আমলারা সর্বদা তার নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন থাকতো। তার উপর পরিচালিত প্রতিটি হামলার সময়ই তিনি একাকি ছিলেন। কিন্তু তাঁর রক্ষীসেনারা নিকটেই ছিলো। প্রতিবারই তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলো।

এখন তিনি পন্থা অবলম্বন করেছেন যে, ব্যক্তিগত আমলা ও রক্ষীদের কোনো এক স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে টিলা ও পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারপরও হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ এই ব্যবস্থা করে রেখেছেন যে, রক্ষী বাহিনীর কতক সদস্য দূরে দূরে থেকে সুলতানের উপর দৃষ্টি রাখছে। কিন্তু কেউ জানে না, দীর্ঘদিন যাবত চারজন লোক এই বিজন ভূমিতে ঘোরাফেরা করছে এবং সুলতান আইউবীর উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।

এরাই সেই চার ফেদায়ী, যাদের সম্পর্কে আসিয়াত দুর্গে শেখ সান্নান গোমস্তগীনকে বলেছিলো, সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য আমি চারজন ফেদায়ীকে প্রেরণ করেছি।

শেখ সান্নানের এই চার ঘাতক সদস্য জেনে ফেলেছে, সুলতান আইউবী রক্ষী বাহিনী ছাড়া ঘোরাফেরা করে থাকেন। তাদের পরিকল্পনা ছিলো, তারা যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের উদ্বাস্তুর বেশে সুলতান আইউবীর নিকট যাবে এবং তাঁকে হত্যা করবে। কিন্তু আইউবীর নিরাপত্তাবিহীন চলাফেলার তথ্য জেনে তারা পূর্বেকার এই পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে।

সুলতান আইউবী ঘাতকদের বড় মোক্ষম সুযোগ দিয়ে চলছেন। চার ঘাতকের পরিকল্পনা যথাযথ। কিন্তু তারা তীর-ধনুক সঙ্গে নিয়ে আসেনি। থাকলে তাদের ধরা পড়ার আশংকা ছিলো। যদি একটি তীর আর ধনুক থাকতো, তাহলে কোনো এক স্থানে বসেই তারা সুলতান আইউবীকে নিশানা বানাতে পারতো। এলাকাটায় লুকিয়ে থাকার জায়গা অনেক। কাজ সমাপ্ত করে অনায়াসে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও আছে। তাদের সঙ্গে আছে লম্বা খঞ্জ।

ওদিক থেকে আন-নাসের লিজাকে নিয়ে দ্রুত বেগে এগিয়ে আসছে। লিজা আন-নাসেরকে বলে দিয়েছিলো, চারজন ফেদায়ী সুলতান আইউবীকে হত্যা করতে গেছে। আন-নাসের অতি দ্রুত সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছাতে এবং তাঁকে সতর্ক করতে চাচ্ছে। কিন্তু সফর ছিলো দীর্ঘ! ঘোড়ার পিঠে দুজন আরোহীর বোঝা। এতো দ্রুত পথ অতিক্রম করা ঘোড়ার পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথে তিনি ঘোড়াকে বিশ্রাম দেন এবং পানি পান করিয়ে আবার ছুটতে শুরু করেন।

সুলতান আইউবী নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। চার ঘাতক লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখছে। এই অঞ্চলে কোন বাহিনী নেই। নেই কোন বসতিও। ফেদায়ীরা বনের হিংস্র পশুর ন্যায় দিনভর শিকারের সন্ধান করে ফিরছে আর রাতে সেখানেই কোথাও লুকিয়ে থাকছে।

সূর্য অস্ত গেছে। আন-নাসের ও লিজার ঘোড়া এগিয়ে চলছে। কিন্তু গতি তার কমে গেছে এবং ক্রমান্বয়ে কমছে। আন-নাসের ওজন কমানোর জন্য ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে। রাত কেটে যাচ্ছে। লিজা কয়েকবার বলেছে, আমি আর আরোহণ করতে পারছি না। মেয়েটা এখন হাড়েও ব্যাথা পাচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে চাচ্ছে সে। কিন্তু আন-নাসের নিজে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে বেহাল হয়ে পড়লেও থামলো না। লিজাকে বললো- তোমার-আমার জীবন থেকে সালাহুদ্দীন আইউবী অনেক বেশি মূল্যবান। আমি যদি বিশ্রামের জন্য এখানে থেমে যাই আর সুলতান আইউবী শত্রুর ঘাতকদের দ্বারা খুন হয়ে যান, তাহলে আমি মনে করবো, আমিই সুলতান আইউবীর খুনী।

***

পরদিন ভোর বেলা। আন-নাসের এখন পা টেনে টেনে হাঁটছে। লিজা ঘোড়ার পিঠে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। ঘোড়া ধীর গতিতে হাঁটছে। এক স্থানে ঘাস-পানি দেখে ঘোড়া দাঁড়িয়ে যায়। লিজা সজাগ হয়ে হঠাৎ চকিত হয়ে বললো- আল্লাহর দোহাই, তুমি পশুটাকে টেনে নিও না। একে একটু পানাহার করতে দাও।

ঘোড়ার পানাহার শেষ হলে আন-নাসের তার লাগাম ধরে হাঁটতে শুরু করে। ছুটে চলার মতো অবস্থা নেই ঘোড়াটার। আন-নাসেরও পরিশ্রান্ত দেহে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। লিজার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তার মুখ থেকে, এখন কথা সরছে না। আন-নাসের জানে না, সুলতান আইউবী কোথায় আছেন। তিনি তুর্কমানের দিকে এগিয়ে চলছেন। সুলতান আইউবী আরো সম্মুখে চলে গিয়েছিলেন। পরে সে স্থানটির কোহে সুলতান তথা সুলতান পর্বত নামকরণ হয়েছিলো। কিন্তু এখন তিনি সেখানেও নেই। তারও আগে চলে গেছেন তিনি। আন-নাসেরের তুকমান ও কোহে সুলতানের টিলা চোখে পড়তে শুরু করে। সূর্য অনেক উপরে উঠে এসেছে।

এই মুহূর্তে সুলতান আইউবী টিলাময় একটি বিজন অঞ্চলে কর্মকর্তাদের নিয়ে এলাকাটার পরিসংখ্যান ঠিক করছেন। তিনি আমলাদেরকে এক স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে একাকি একদিকে চলে যান। তাঁর মাথায় সম্ভবত বাহিনীর অগ্রযাত্রার কোনো পরিকল্পনা ছিলো। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে একটি টিলার উপর আরোহণ করেন। চার ফেদায়ী সেখান থেকে সামান্য দূরে এক স্থানে চুপিচুপি তাঁকে দেখছে। তিনি অনেক সময় পর্যন্ত টিলার উপর দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখতে থাকেন।

নীচে আসতে দাও। এক ফেদায়ী তার সঙ্গীদের বললো।

 দেহরক্ষীরা কাছেই কোথাও লুকিয়ে আছে হয়তো। আরেকজন বললো।

 বেটা আজ রক্ষা পাবে না। অপর একজন বললো।

 শুধু একজন এগিয়ে যাবে- চতুর্থজন বললো- আক্রমণ পেছন থেকে করতে হবে। প্রয়োজন হলে পরে অন্যরা এগিয়ে যাবো।

 সুলতান আইউবী টিলার উপর থেকে নেমে আসেন এবং ঘোড়ায় চড়ে অন্য একদিকে চলে যান। ঘাতকদল তার পেছনে পেছনে এগিয়ে যায়। আক্রমণের জন্য এই জায়গাটা উপযোগী নয়।

আন-নাসের এখনো অনেক দূরে। সুলতান আইউবী পুনরায় ঘোড়া থেকে অবতরণ করেন। অন্য একটি টিলায় আরোহণ করেন। খানিক পর সেখান থেকে নেমে ঘোড়ার লাগাম ধরে পায়ে হেঁটে রওনা দেন। ফেদায়ীরা তার থেকে সামান্য দূরে লুকিয়ে আছে। এক স্থানে এসে সুলতান ডান দিকে মোড় নেন। সম্মুখে খোলা মাঠ। তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করতে উদ্যত হন। এমন সময় তিনি ধাবমান পায়ের শব্দ শুনতে পান। এক ফেদায়ী এক ফুট লম্বা একটা খঞ্জর হাতে তার থেকে দু-তিন পা দূরে এসে উপনীত হয়ে। সুলতান তাকে দেখে ফেলেন।

 সুলতান আইউবী নিজের খঞ্জরটা বের করে হাতে নেন। দেখতে না দেখতে ফেদায়ী তার উপর আক্রমণ করে বসে। সুলতান নিজের খঞ্জর দ্বারা আঘাত করে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। আক্রমণকারী ফেদায়ী স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ। আঘাতটা সে শক্তির সাথেই করেছে। সুলতানের আক্রমণ ব্যর্থ যায়। টিলার আড়াল থেকে আরেক ফেদায়ী বেরিয়ে আসে। সেও আক্রমণ চালায়। সুলতান তার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করেন বটে; কিন্তু আঘাতে তার গায়ের চামড়া কেটে যায়। তিনি টিলার আড়ালে চলে যান। এক ফেদায়ী তার দিকে এগিয়ে এলে তিনি বাঁ হাতে তার মুখে ঘুষি মারেন। লোকটা ধাক্কা খেয়ে পেছনে গিয়ে পড়ে যেতে উদ্যত হয়। সুলতান তার বুকে খঞ্জরের আঘাত হেনে ঠেলা দিয়ে তাকে একদিকে ফেলে দেন। এই ফেদায়ী খতম হয়ে যায়।

অপরজন পেছন দিক থেকে সুলতানের উপর হামলা করে। কিন্তু তিনি যথাসময়ে নিজেকে সামলে নেন। সুলতান আইউবীর এক বাহুতে ফেদায়ীর খঞ্জরের আগার খোঁচা লাগে।

অপর দুই ফেদায়ীও বেরিয়ে এগিয়ে আসে। অপর দিকে ধাবমান। কতগুলো ঘাড়ার পদশব্দ কানে আসে, যা মুহূর্তের মধ্যে সুলতান আইউবীর নিকটে এসে পৌঁছে যায়। ফেদায়ীরা পালিয়ে যায়। একজন ধাবমান ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। একজনকে অশ্বারোহীরা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে। সর্বশেষ ফেদায়ীকে জীবিত ধরে ফেলা হয়।

আল্লাহ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এই আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন। ফেদায়ীরা যে সময় তার উপর আক্রমণ চালায়, তখন তার আমলারা তার থেকে সাত-আটশত গজ দূরে এক উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো। সুলতান তাদেরকে সেই স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছিলেন। ঘটনাক্রমে তাদের একজন, আক্রমণটা দেখে ফেলে। অন্যথায় এই আক্রমণ ব্যর্থ যাওয়ার মতো ছিলো না।

এটি ১১৭৬ সালের মে মোতাবেক ৫৭১ হিজরীর যিলকদ মাসের ঘটনা। ইতিহাসে এই ঘটনার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ভিন্ন ভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর ডাইরীতে শুধু লিখেছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এজাজ দুর্গ অবরোধ করতে যাওয়ার পথে চার ফেদায়ী তার উপর সংহারী আক্রমণ চালিয়েছিলো। মহান আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন।

মেজর জেনারেল আকবর খান বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ্য করে লিখেছেন এজাজ দুর্গ অবরোধ করার সময় সুলতান আইউবী দিনের বেলা তার এক সালার জাদুল আসাদীর তাঁবুতে ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন এক ফেদায়ী তাঁবুতে প্রবেশ করে তার উপর খঞ্জর দ্বারা আক্রমণ চালায়। ঘটনাক্রমে সে সময়ে তাঁর মাথায় সেই বিশেষ পাগড়িটা ছিলো, যেটা তিনি রণাঙ্গনে ব্যবহার করতেন। পাগড়িটার নাম ছিলো তারবুশ। আক্রমণকারীর খঞ্জর তারবুশে আঘাত হানে এবং সুলতান আইউবী সজাগ হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে চার পাঁচজন ফেদায়ী ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং তৎক্ষণাৎ সুলতানের দেহরক্ষীরাও এসে পড়ে। তারা আক্রমণ করে ঘাতকদের মেরে ফেলে।

জনাব আকবর খান লিখেছেন, কিছুদিন আগে এই ফেদায়ীরা প্রতারণার মাধ্যমে সুলতান আইউবীর রক্ষী বাহিনীতে ঢুকে গিয়েছিলো।

ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, আক্রমণকারীরা সুলতান আইউবীরই দেহরক্ষী ছিলো। এই ঐতিহাসিকগণ সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন যে, নিজ বাহিনীতে তিনি মোটেও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। এমনকি তাঁর দেহরক্ষীরা পর্যন্ত তাঁর অনুগত ছিলো না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ঘাতকরা না তার নিজস্ব লোক ছিলো, না তারা কারো প্রতারণার শিকার হয়ে আক্রমণ করেছিলো। তারা ছিলো কাপুরুষ ক্রুসেডারদের মদদপুষ্ট ভাড়াটে খুনী চক্র।

ধৃত ফেদায়ী স্বীকারোক্তি প্রদান করে যে, তারা চারজন আসিয়াত দুর্গ থেকে এসেছে। তাকে হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর হাতে তুলে দেয়া হয়। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ জিজ্ঞাবাদ করে তার থেকে আসিয়াত দুর্গের সকল তথ্য জেনে নেন। ভেতরে কলোজন সৈন্য আছে, তাদের লড়াই করার যোগ্যতা ও শক্তি কতখানি, তাও তিনি সংগ্রহ করেন। প্রাপ্ত তথ্যাদি সুলতান আইউবীকে অবহিত করা হয়।

আগামীকাল রাতের শেষ প্রহরে আমরা আসিয়াতের উদ্দেশ্যে রওনা হবো- সুলতান আইউবী বললেন। তিনি তাঁর হাই কমান্ডের সালারদের তলব করে বললেন- ফেদায়ীদের এই আস্তানাটি গুঁড়িয়ে দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে। দুর্গটি এক্ষুনি দখল করতে হবে। ফৌজের এক তৃতীয় অংশই যথেষ্ট। সৈন্য কতজন যাবে এবং তাদের বিন্যাস কীরূপ হবে সুলতান তা-ও বলে দেন।

সেদিন সন্ধ্যা বেলা। সুলতান আইউবী সংবাদ পান, আন-নাসের নামক এক গেরিলা কমান্ডার ফিরে এসেছে। ইতিমধ্যে হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ তার থেকে পূর্ণ রিপোর্ট নিয়ে ফেলেছেন। তাকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা জরুরি।

আন-নাসেরকে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা হয়। বিরামহীন সফর ও পিপাসা তাকে আধমরা করে তুলেছে। লিজা তার সঙ্গে। তার গায়ের রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

আন-নাসের সুলতান আইউবীকে বিস্তারিত কাহিনী শোনায়। কোন কথাই সে গোপন রাখলো না। লিজা সম্পর্কেও খোলামেলা তথ্য প্রদান করে। সুলতান লিজাকে বললেন, নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তুমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। মেয়েটি সম্ভবত নিজেকে বন্দি মনে করছিলো এবং অসদাচরণের আশঙ্কায় শঙ্কিত ছিলো। কিন্তু এখন দেখছে তার উল্টোটা। সে আন-নাসেরের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। তাকে বলা হলো, তোমাকে দামেক পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখানে তুমি নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর হেফাযতে থাকবে এবং কিছুদিন পর আন-নাসের তোমার সঙ্গে গিয়ে দেখা করবে।

আবেগময় বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে সুলতান আইউবী এরূপ মেয়েদের বিশ্বাস করতেন না। তাদেরকে সম্মান ও শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করতেন এবং গোপনে তাদের উপর নজর রাখতেন।

জখমের চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য আন-নাসেরকে পেছনের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

***

শেখ সান্নানের মেজাজ এখনো ঠান্ডা হয়নি। গোমস্তগীন তাকে ধোকা দিয়ে চলে গেছেন। গোমস্তগীনের কাফেলাকে ধাওয়া করতে যাদের প্রেরণ করেছিলেন, তাদের মাত্র দুজন ফেরত এসেছে। তারা থ্রেসাকে তুলে নিয়ে এসেছে। লিজাকে আন-নাসের রক্ষা করে নিয়ে গেছে। প্রেসা শেখ সান্নানের কোপানলে পড়ে যায়। মেয়েটিকে তিনি কয়েদখানায় নিক্ষেপ করেন। থ্রেসাও রূপসী। কিন্তু শেখ সান্নানের কামনার দৃষ্টি লিজার উপর নিবদ্ধ।

দিবসের শেষ প্রহর। আসিয়াত দুর্গের পাঁচিলের উপর দাঁড়িয়ে সান্ত্রীরা দূর দিগন্তে ধূলি-মেঘ দেখতে পায়। মেঘমালা এদিকেই এগিয়ে আসছে। সান্ত্রীরা তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণে মেঘের অভ্যন্তরে হাজার হাজার ঘোড়া চোখে পড়তে শুরু করে। সান্ত্রীরা ডংকা বাজায়। কমান্ডারগণ উপরে গিয়ে দেখে। শেখ সান্নানকে সংবাদ জানায়। এসে সে-ও সম্মুখের দেয়ালের উপর উঠে যায়।

এতোক্ষণে ফৌজ দুর্গের কাছাকাছি এসে অবরোধের বিন্যাসে বিন্যস্ত হতে শুরু করেছে। শেখ সান্নান মোকাবেলার নির্দেশ দেয়। দুর্গের পাঁচিলের উপর তীরন্দাজ বাহিনী পৌঁছে যায়। কিন্তু তারা তীর ছুঁড়ছে না। তারা বাইরের বাহিনীর গতিবিধি অনুধাবন করতে চাচ্ছে। সুলতান আইউবী দুর্গের ভেতরকার সব তথ্য আগেই সংগ্রহ করেছেন। আন-নাসের তার সঙ্গে আছে। দুটি মিনজানিক স্থাপন করা হয়েছে। শেখ সান্নানের মহল কোথায় এবং কতো দূর আন-নাসের তা জানিয়ে দেয়। তার নির্দেশনা মোতাবেক প্রথমে বড় পাথর ছোঁড়া হয়, যা লক্ষে গিয়ে আঘাত হানে। শেখ সান্নানের শক্ত দেয়াল ফেটে যায়।

দুর্গ থেকে তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। সুলতান আইউবীর নির্দেশে মিনজানিকের সাহায্যে দাহ্য পদার্থ ভর্তি পাতিল ভেতরে নিক্ষেপ করা হয়। পাতিলগুলো শেখ সান্নানের মহলের সন্নিকটে গিয়ে ভেঙে যায়। তরল দাহ্য পদার্থগুলো দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তাতে আগুন ধরানোর জন্য সলিতাওয়ালা তীর ছোঁড়া হয়। কিন্তু তীর তরল দাহ্য পদার্থের উপর গিয়ে পড়ছে না। এখান থেকে তীর ছুঁড়ে লক্ষে আঘাত হানা সহজ নয়। দুর্গের দেয়াল টপকে ভেতরে না ঢুকে সুবিধা করা যাবে না। ঘটনাক্রমে এক স্থানে আগুন জ্বলছিলো। একটি পাতিল তার এতো কাছে গিয়ে ফেটে যায় যে, দাহ্য পদার্থগুলো ছড়িয়ে পড়ামাত্র দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। দেখতে না দেখতে শেখ সান্নানের মহলে আগুন ধরে যায়।

প্রজ্বলমান অগ্নিশিখা শেখ সান্নানের মনে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। তার বাহিনী খৃস্টান-মুনাফিক সৈন্যদের ন্যায় দক্ষ যোদ্ধা নয়। মদ্যপ আর চরম অলস সৈনিক তারা।

শেখ সান্নান বাস্তবতাকে মেনে নেয়। সে দুর্গের উপর সাদা পতাকা উড়িয়ে দেয়। সুলতান আইউবী যুদ্ধ বন্ধের আদেশ প্রদান করে বললেন, শেখ সান্নানকে বাইরে আসতে বলো।

সর্বত্র নীরবতা ছেয়ে যায়।

 খানিক পর দুর্গের ফটক খুলে যায়। শেখ সান্নান দু-তিনজন সালারের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে। সুলতান আইউবী তাকে স্বাগত(!) জানানোর জন্য এগিয়ে আসেন। তাঁর দৃষ্টিতে সান্নান অপরাধী। সান্নান যখন সুলতান– আইউবীর সম্মুখে এসে দাঁড়ায়, সুলতান তাকে ও তার সালারদেরকে এতোটুকুও বললেন না যে, বসো।

সান্নান!- সুলতান আইউবী জিজ্ঞাসা করেন- তুমি কী চাও?

জীবনের নিরাপত্তা। শেখ সান্নান পরাজিত কণ্ঠে বললো।

আর দুর্গ? সুলতান জিজ্ঞাসা করেন।

আমি আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নেবো।

এক্ষুনি বাহিনীসহ দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাও- সুলতান আইউবী সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। সঙ্গে কোন মাল-সরঞ্জাম নিতে পারবে না। যাও, প্রস্তুতি গ্রহণ। করো। কোন কমান্ডার, কোন সৈনিকের সঙ্গে যেনো কোন অস্ত্র না থাকে। এখান থেকে শূন্য হাতে বেরিয়ে যাও। পাতাল কক্ষে যেসব কয়েদি আছে, তাদেরকে সেখানেই থাকতে দাও। সালতানাতে ইসলামিয়ার কোথাও থাকবে না। খৃস্টানদের নিকট পৌঁছে শ্বাস ফেলবে। আমাকে হত্যা করার লক্ষ্যে সর্বশেষ যে চার ঘাতককে প্রেরণ করেছিলে, তারাও মারা পড়েছে। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি তোমার সাদা পতাকার লাজ রাখলাম। আমি কুরআনের অনুসারী। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন কিনা, আমি বলতে পিরবো না। নিজেকে মুসলমান দাবি করা পরিত্যাগ করো। অন্যথায় আমি তোমাকে এবং তোমার চক্রকে রোম সাগরে ডুবিয়ে মারবো।

দিনের শেষ বেলা। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। দূর-দিগন্তে মানুষের দীর্ঘ সারি অবনত মস্তকে পথ চলছে। শেখ সান্নান এই মানব সারির প্রধান পুরুষ। আছে তার সালার, কমান্ডার ও সিপাহীরা। আছে পেশাদার খুনীরাও। সবাই নিঃস্ব। কারো সঙ্গে কোন সামান-সম্পদ নেই। বাহন উট ঘোড়াগুলোও দুর্গে রেখে এসেছে।

সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সুলতান আইউবীর বাহিনী দুর্গের দখল সম্পন্ন করে ফেলেছেন। পাতাল কক্ষের কয়েদিদের বের করে আনা হয়েছে। উদ্ধারকৃত সোনা-জহরত, মণি-মাণিক্য, অর্থ ও মালপত্রের কোন হিসাব নেই।

***

সুলতান আইউবী দুর্গটা এক সালারের হাতে তুলে দিয়ে রাতারাতি কোহে সুলতানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। তিনি এখন আর বেশি অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন না। দিন কয়েকের মধ্যেই অগ্রযাত্রা শুরু করেন এবং এজাজ দুর্গ অবরোধ করেন। হাল্ববাসীরা নিরাপত্তার দিক থেকে এই দুৰ্গটাকে অতিশয় দুর্ভেদ্যরূপে গড়ে তুলেছিলো। এটা ছিলো মূলত হাবেরই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তাতে যে বাহিনী ছিলো, তারা একেবারে নবীন। তারা কখনো ময়দানে যায়নি। সুলতান আইউবীর এমন আত্মবিশ্বাস নেই যে, তিনি অনায়াসে দুর্গটা কজা করে ফেলবেন। পেছন থেকে হালবের ফৌজ আক্রমণ করে বসতে পারে, এই আশংকাও তাঁর মাথায় আছে। তবে এই আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন। তবে আশার কথা হলো, হাবের বাহিনী এই কিছুদিন আগে তুর্কমানের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এসেছে। তাদের যুদ্ধ করার স্পৃহা-মনোবল ভেঙে পড়েছে।

এজাজ দুর্গের প্রতিরক্ষায় সৈন্যরা প্রাণপণ লড়াই করে। তারা সারাদিন ও সারারাত সুলতান আইউবীর বাহিনীকে দুর্গের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। কোনোদিক থেকে নিকটে গিয়ে দেয়াল ভাঙা যায় কিনা চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্গের তীরন্দাজ সৈন্যরা তাদেরকে এক পা-ও এগুতে দেয়নি। পরদিন বড় মিনজানিকের সাহায্যে দুর্গের ফটকের উপর ভারি পাথর ছোঁড়া হয়। দাহ্য পদাথ্য ভর্তি পাতিল নিক্ষেপ করে অগ্নিতীরও ছোঁড়া হয়। আগুনের লেলিহান জিহ্বা ফটক চাটতে শুরু করে। উপর থেকে দুর্গের তীরন্দাজরা মিনজানিক নিক্ষেপকারীদের উপর বৃষ্টির ন্যায় তীর নিক্ষেপ করে। বড় ধনুক দ্বারা ছোঁড়া এই তীরগুলো অনেক দূরে এসে আঘাত হানছে। তাতে মিনজানিকের দায়িত্বে নিয়োজিত আইউবীর কয়েকজন সৈন্য আহত ও শহীদ হয়। কিন্তু এই কুরবানী ব্যতীত দুর্গ জয় করাও সম্ভব নয়। একজন শহীদ হচ্ছে তো অপর একজন এসে তার স্থান পূরণ করছে।

দুর্গের ফটক জ্বলছে। তার উপর অবিরাম পাথর এসে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ পর ফটক ভেদ করে পাথর ভেতরে গিয়ে আঘাত হানতে শুরু করে। আগুনে ফটকের কাঠ জ্বলে গেছে। লোহার পেরেকগুলো পাথরের আঘাতে বাঁকা হয়ে গেছে।

রাতে আগুন নিভে যায়। ফটকের লোহার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে শুধু। পুড়ে যাওয়া ফটকের মধ্য দিয়ে মানুষ ঢুকতে পারলেও ঘোড়া ঢুকতে পারবে না। দুর্গ জয় করতে হলে জীবন বাজির খেলা খেলতে হবে। পদাতিক বাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত পোড়া ফটকের কাঠামোর মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এটা সুলতান আইউবীর পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। আদেশ পাওয়ামাত্র সৈন্যরা হুড় হুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু তাদেরকে শোচনীয় পরিণতি বরণ করতে হয়। এজাজের সৈন্যরা

তাদের সম্মুখের অংশটাকে সেখানেই খতম করে ফেলে। পেছনের অংশ সঙ্গীদের লাশের উপর দিয়ে সম্মুখে এগিয়ে যায়।

অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। জীবিত পদাতিক সৈন্যরা ভেতরে ঢুকে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাণপণ লড়াই করে। তারপর অশ্বারোহী বাহিনী ভিতরে ঢোকার নির্দেশ লাভ করে। সুলতান আইউবী দুর্গের ভেতরে অগ্নি সংযোগের নির্দেশ দেন। এক একটি ইউনিট এক এক স্থানে আগুন লাগাতে শুরু করে। এজাজের সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণ করার কোন লক্ষণ চোখে পড়ছে না।

দুর্গটি হাল্ব থেকে দেখা যায়। রাতের বেলা হাবের মানুষ দেখতে পায়, দুর্গের স্থানে আকাশটা জ্বলছে। আগুনের শিখা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠছে। তারা সুলতান আইউবীর এজাজ দুর্গ অবরোধের সংবাদ পেয়ে গেছে। হাবের হাই কমান্ড পেছন থেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা আঁটে। কিন্তু সালারগণ জানায়, ফৌজ যুদ্ধের সমর্থ নয়।

এ সময়ে সাইফুদ্দীন হাবেই অবস্থান করছিলেন। গোমস্তগীনও সেখানে চলে গেছেন। দুজনের মাঝে এজাজ ও হাবের প্রতিরক্ষার বিষয়ে উত্তপ্ত বিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে গোমস্তগীন সাইফুদ্দীনকে হত্যা করার হুমকি প্রদান করেন। সাইফুদ্দীন ঐক্য ভেঙে দেন এবং নিজের অবশিষ্ট যৎসামান্য সৈন্যকে হাব থেকে বের করে নিয়ে যান। তারা মূলত একে অপরের শত্রু ছিলো। আল-মালিকুস সালিহর বয়স এখন তের বছর অতিক্রম করেছে। কিছু বুঝ-বুদ্ধি হয়েছে তার। গোমস্তগীনের বক্তব্য ও আচরণে তিনি বুঝে ফেললেন, তার এই বন্ধুটা কুচক্রী। তিনি গোমস্তগীনকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করেন।

ইতিহাসে লিখিত আছে, হাব-এজাজের অবরোধ অবস্থায় গোমস্তগীন আল-মালিকুস সালিহর বিরুদ্ধে নতুন এক ষড়যন্ত্র এঁটেছিলো, যা ফাঁস হয়ে যায়। আল-মালিকুস সালিহ তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে দু তিনদিন পর হত্যা করে ফেলেন।

শেষ পর্যন্ত এজাজের রক্ষীরা অস্ত্র ত্যাগ করে। এর জন্য সুলতান আইউবীকে বহু মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছিলো। তার সৈন্যসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এজাজবাসীরা প্রমাণ করেছে, তারা কাপুরুষ নয়। সুলতান আইউবী তৎক্ষণাৎ হাল্ব অবরোধ করে ফেলেন। হাবের অবস্থান এজাজের নিকটেই। এজাজের অগ্নিশিখা হাবাসীদের রাতেই আতঙ্কিত করে ফেলেছিলো। তাদের জানা ছিলো, নগরী রক্ষা করার মতো শক্তি তাদের সৈন্যদের নেই। এই নগরবাসীরাই তাঁকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিলো, যার ফলে তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এখন এই নগরীটা যেনো এক মৃত্যুপুরী।

অবরোধের দ্বিতীয় দিন আল-মালিকুস সালিহর এক দূত সুলতান আইউবীর নিকট আসে। সে যে বার্তা নিয়ে আসে, সেটি সন্ধির প্রস্তাব নয়। সেটি ছিলো একটি আবেগময় পয়গাম, যা সুলতান আইউবীকে নাড়িয়ে তোলে। বার্তাটা হলো, নুরুদ্দীন জঙ্গীর কিশোরী কন্যা সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছে। মেয়েটির নাম শামসুন্নিসা।. শামসুন্নিসা আল মালিকুস সালিহর ছোট বোন। বয়স দশ-এগারো বছর। আল-মালিকুস সালিহ যখন হাল্ব চলে গিয়েছিলেন, তখন এই বোনটিকেও সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাদের মা রোজী খাতুন বিনতে মঈনুদ্দীন দামেশকেই থেকে গিয়েছিলেন। তিনি সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর সমর্থক ছিলেন।

সুলতান আইউবী দূতকে জবাব দেন, মেয়েটাকে নিয়ে আসো।

শামসুন্নিসা সুলতান আইউবীর দরবারে এসে উপস্থিত হয়। তার সঙ্গে আল-মালিকুস সালিহর দুজন সালার। সুলতান আইউবী জঙ্গীর এতীম মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত অঝোরে ক্রন্দন করেন। মেয়েটির হাতে আল-মালিকুস সালিহর লিখিত বার্তা।

সুলতান আইউবী পত্রখানা হাতে নিয়ে খুলে পড়েন। আল-মালিকুস সালিহ পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি সুলতান আইউবীকে সুলতান মেনে নিয়েছেন। তাঁর আনুগত্যও বরণ করে নিয়েছেন। পত্রে তিনি এ-ও লিখেছেন, আমি গোমস্তগীনকে হত্যা করে ফেলেছি। তাই আপনি হাররানকেও নিজের রাজ্য ভাবতে পারেন।

তোমরা মেয়েটাকে কেনো সঙ্গে এনেছো?- সুলতান আইউবী সালারদের জিজ্ঞাসা করেন। এই বার্তা তো তোমরা নিজেরাই নিয়ে আসতে পারতে?

উত্তর সালারদেরই দেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু তারা নিজেরা কিছু না বলে মেয়েটির দিকে তাকায়। জঙ্গীকন্যা সুলতান আইউবীকে বললেন মামাজান! আমাদেরকে এজাজ দুৰ্গটা দিয়ে দিন এবং আমাদেরকে হাবে থাকতে দিন। আগামীতে আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো না।

সুলতান আইউবী ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সালারদের প্রতি তাকান। তারা দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে জঙ্গীর মেয়েকে সঙ্গে এনেছে।

আমি এজাজ দুর্গ ও হাব তোমাদেরকে দিয়ে দিলাম শামসুন্নিসা!–সুলতান আইউবী মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ জারি করেন, এজাজ দুর্গ থেকে আমাদের সৈন্যদের বের করে হালবের অবরোধ তুলে নেয়া হোক। তিনি হাবের সালারদের বললেন- আমি এজাজ ও হাব এই মেয়েটাকে দান করেছি। তোমরা কাপুরুষ, আত্মমর্যাদাহীন ও বিশ্বাসঘাতক। তোমরা আমার বাহিনীতে থাকার উপযুক্ত নও।

১১৭৬ সালের ২৪ জুন মোতাবেক ৫৭১ হিজরীর ১৪ যিলহজ চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়। সুলতান আইউবী এজাজ ও হাবকে সালতানাতে ইসলামিয়ার অন্তভুক্ত করে নেন এবং আল-মালিকুস সালিহকে স্বায়ত্বশাসন দান করেন।

তার অব্যবহিত পর সাইফুদ্দীনও সুলতান আইউবীর আনুগত্য মেনে নেন এবং মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু জাতির অভ্যন্তরে বিশ্বাসঘাতক ও ঈমান বিক্রয়কারীদের তৎপরতা যথারীতি অব্যাহত থাকে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *