৫.৫ তারকার পতন ধ্বনি

৫.৫ তারকার পতন ধ্বনি

আজ থেকে প্রায় এগারো’শ বছর আগে তৌহিদী মুসলিম ও পৌত্তলিকতাবাদী মূর্তিপূজারীদের মুখোমুখি সংঘর্ষে সোমনাথ দুর্গের প্রাচীরগুলো কাঁপছিলো। দুর্গের ভেতরে ছিলো হরি-হরিদেবের পূজারীদের ঔদ্ধত্য হুংকার । আর দুর্গের বাইরে ছিলো তৌহিদের জন্য আত্মনিবেদিত গযনী যোদ্ধাদের তাকবীর ধবনি। অবস্থা এতোটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিলো যে, গোটা হিন্দুস্তানই যেন পৌত্তলিকদের জয়ধ্বনি আর তৌহিদের তাকবীর ধ্বনীতে কেঁপে ওঠছিলো। সেদিন সন্ধ্যার পর সুলতান মাহমূদ তার সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের জড়ো করলেন। তিনি সবার চেহারার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন

তোমাদের চেহারা দেখে আমি যা অনুভব করছি এবং তোমরা যা ভাবছো, সম্ভবত আমার ভাবনাও তোমাদের চেয়ে ভিন্ন নয়। তোমরা কি বলতে পারো কেন আমাদের সবার কাছে মনে হচ্ছে, এই যুদ্ধই আমাদের জীবনের শেষ যুদ্ধ? কারণ হলো, এর আগে আমরা যেসব দুর্গ ও রাজ্য জয় করেছি, তাতে প্রতিপক্ষ ছিলো বিভিন্ন রাজা ও মহারাজারা।

কিন্তু সোমনাথ সেসব রাজা মহারাজাদের কোন রাজ্য বা দুর্গ নয়। এখানে হবে একটি ধর্মের সাথে আরেকটি ধর্মের মোকাবেলা । এখানে তোমরা একটি বাতিল ধর্মমতকে পরাজিত করে সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত করতে এসেছে। হিন্দু ধর্ম আমাদের দৃষ্টিতে বাতিল হলেও সেই ধর্মের অনুসারীরা তাদের ধর্ম রক্ষায় জীবন বিলিয়ে দিতে মোটেও কুণ্ঠাবোধ করে না। সোমনাথ সারা ভারতের হিন্দুদের জন্যে কা’বার মতো। তোমরা দেখতে পাচ্ছো হিন্দুরা খুবই উজ্জীবিত ও উত্তেজিত। তারা সোমনাথ রক্ষায় জীবন দিয়ে দিতে প্রস্তুত।

আমাদের সমস্যা হচ্ছে এখানকার শহরের ভেতরের কোন খবর আমাদের গোয়েন্দাদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। দুর্গের ভেতরের কোন খবরই আমরা জানি না। আল্লাহর দয়ায় আমরা যদি দুর্গে প্রবেশ করতে পারি তখনো আমরা ও বলতে পারব না দুর্গের কোথায় কি রয়েছে? আমাদের কেউ বলার নেই, ভেতরে কোন দিক থেকে আমাদের উপর আক্রমণ আসতে পারে? কোন দিক নিরাপদ? ই আর কোন জায়গা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? বাইরের কিছু খবর এবং তথ্য আমরা পেতে ও পারি এবং পাচ্ছি। এরই মধ্যে দুই মহারাজা তাদের সৈন্য সামন্ত নিয়ে সোমনাথের রাজাকে সাহায্য করতে আসছে। এরা পেছন থেকে আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে। আমাদের সেনাদের বিন্যাস সম্পর্কে আমি আগেই তোমাদের অবহিত করেছি। এবার আমি অন্যান্য ঝুঁকি ও আশংকা সম্পর্কে তোমাদের সৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তোমরা অনভিজ্ঞ ও আনাড়ী নও। তোমরা নিশ্চয় জানো, নিজ দেশ থেকে এতোটা দূরে এসে যুদ্ধে আগ্রহী যেকোন বাহিনীকে প্রতিপক্ষ ইচ্ছা করলে অনাহারেই পরাস্ত করতে পারে। এখানকার মাটি, মানুষ সবকিছুই আমাদের বৈরী। এখানে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা কিংবা রসদ পাওয়ার সম্ভাবনা আমাদের নেই। যে তীরটা আমাদের কামান থেকে একবার বেরিয়ে যাবে, সেটির ঘাটতি পূরণের আর কোন ব্যবস্থা আমাদের নেই….।

এই সংঘর্ষ ও যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে রসদ ও জনবলের ঘাটতিতে পড়ে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হবো। আমি তোমাদের সতর্ক করে দিতে চাই, ব্যর্থ হয়ে যদি আমাদের পিছু হটতে হয় তাহলে আমাদের সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলবে আর শত্রু বাহিনী আমাদের পিছপা হতে দেবে না। পিছু হটলে আমাদের কারো পক্ষেই জীবন নিয়ে গযনী পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

পেরিয়ে আসা মরুভূমির কথা তোমরা ভুলে যেও না। প্রায় দুই মাস লেগেছে আমাদের এই দূরত্ব অতিক্রম করতে। তাই ব্যর্থ হয়ে পিছু হটা সৈন্যদের পক্ষে এই বিশাল মরু পাড়ি দেয়া সম্ভব হবে না।

আমি জানি, তোমরা অনেকেই ভাবছো, গযনী থেকে এতোটা দূরে এসে এই দুর্গম শহরে যুদ্ধে নামা আমাদের উচিত হয়নি। এ ব্যাপারে আমি তোমাদের সাথে একমত। কিন্তু আশা করি আমার মতের সাথেও তোমরা একমত হবে। দীর্ঘ দিনের সাফল্য ও জীবনহানির পরও এই অভিযান ছাড়া আমাদের মিশন অসম্পূর্ণ থাকত। আমাদের কারো জীবনই তো আর সীমাহীন নয়? তোমরা জানো, আমি পৌত্তলিকতার এই বেদীমূলকে ভেঙে সাগরে নিক্ষেপ করতে চাই।

ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন সুলতান! আমি কি জানতে পারি, আমরা গোটা হিন্দুস্তানের সব মূর্তি কি ধ্বংস করে দিয়েছি যে, শুধু সোমনাথের মূর্তি রয়ে গেছে? এটাকে ভেঙে ফেললেই সব মূর্তি শেষ হয়ে যাবে? প্রশ্ন তুললো এক ডেপুটি সেনাপতি।

সোমনাথের মূর্তি ভেঙে ফেললে এবং সোমনাথ ধ্বংস করে দিলে কি হিন্দুদের মূর্তিপূজা শেষ হয়ে যাবে? হিন্দুস্তানের সকল হিন্দু কি মুসলমান হয়ে যাবে? এত দূরে আসার ঝুঁকি আমাদের নেয়া উচিত হয়নি সুলতান!

ডেপুটি সেনাপতির জবাবে প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ গর্জে উঠলেন। তিনি বললেন- আশা করি ডেপুটি সেনাপতি শত্রুদের ভয়ে ভীত হয়ে এসব কথা উত্থাপন করেননি।

সম্মানিত সেনাপতি! আমরা শত্রুদের সংখ্যা দেখে মোটেও ভীত নই। তারেক বিন যিয়াদ সম্পূর্ণ অজানা দেশে পাড়ি দিয়ে পিছু হটার সকল পথ বন্ধ করে দিতে সকল জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের কেউ শত্রুদের ভয়ে পিছু হটার চিন্তা করে বলে মনে হয় না।

আমি আমার হিন্দুস্তান অভিযানের শেষ পর্যায়ে এসে মাত্র কিছুদিন আগে জানতে পারি, সোমনাথের মূর্তিকে ভারতের হিন্দুরা সকল দেবদেবীর নেতা বলে বিশ্বাস করে বললেন সুলতান। আমি যদি ভারত অভিযানের শুরুতে সোমনাথের এই অবস্থার কথা জানতে পারতাম তাহলে আমার অভিযান সোমনাথ থেকেই শুরু হতো।

এ পর্যায়ে সুলতান মাহমূদ সোমনাথের অভ্যন্তরে কি কি অপকর্ম ঘটে এবং সোমনাথের হিন্দুরা সোমনাথকে কেমন পবিত্র স্থান মনে করে তা সবিস্তারে কমান্ডারদের জানালেন।

অবশেষে তিনি জানালেন, আমরা আজ এমন জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখান থেকে পিছু হটা সম্ভ। নয়। আমরা যদি আমাদের উপর আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব ভুলে যাই, তাহলে আমাদের লড়তে হবে জীবন বাঁচানোর জন্য। তোমরা লড়াইয়ে অভ্যস্ত এবং অভিজ্ঞ। তোমরা জানো, যে সৈনিক জীবনের জন্যে লড়াই করে সে এগিয়ে যাওয়ার দিকে দেখে না, তার নজর থাকে পেছনের দিকে। আর স্বাভাবিক ভাবেই এমন যোদ্ধারা কখনো জীবন বাঁচাতে পারে না।

আমরা সোমনাথকে ধ্বংস করে এটা প্রমাণ করতে চাই, সত্যের পতাকাবাহী, রসূলে আরাবী স.-এর পয়গামবাহী সৈনিকদের জন্যে কোন যুদ্ধক্ষেত্রই অনতিক্রম্য নয় এবং আল্লাহর পথের সৈনিকদের পথে কোন দুর্গমতাই বাধা হয়ে উঠতে পারে না। যেকোন বাধা তারা নিমিষেই জয় করে নেয়। হতে পারে আমার পর কোন মাহমূদ আমাদের প্রজ্জলিত আলো গোটা হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে দেবে। আর যদি এমনটি সম্ভব না হয়, তাহলে হিন্দুস্তানে মুসলমান ও হিন্দুর মধ্যে সংঘাত লেগেই থাকবে, আর হিন্দুরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের আক্রমণের প্রতিশোধ নেবে এখানকার মুসলমানদের হত্যা করে।

আগামীকাল জুমআর দিন। আমি আশা করবো, আগামীকালের সূর্য উঠার আগেই অবরোধের কাজ সমাপ্ত হবে। তোমরা জানো, যথার্থ অর্থে এখানে অবরোধ আরোপ সম্ভব নয়। কারণ, সোমনাথের তিন দিকেই সমুদ্র, মাত্র একদিকে স্থল। এই স্থলভাগেও রয়েছে গভীর পরিখা। আমাদেরকে দুর্গে আঘাত করতে হবে। তাই আমাদেরকে পরিখা পেরিয়ে যেতে হবে। অবশ্য তা আমরা করতে পারবো ইনশা আল্লাহ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে তীরন্দাজদের। দুর্গপ্রাচীর ও বুরুজের উপর যেসব হিন্দু রয়েছে তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে হবে। দুর্গ প্রাচীরের উপরে উঠার জন্য সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য আমি জানি, আমাদের এসব আয়োজন অনেকটাই আত্মহননের মতোই মনে হবে; কিন্তু এই দুর্গবন্দী শহর জয় করার জন্যে এছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই।

১০২৬ সনের ৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার পেরিয়ে পর দিন শুক্রবার রাত। এ রাতে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম করেননি সুলতান মাহমুদ। রাতভর তিনি সৈন্যদের কার্যক্রম তদারকি করলেন। সৈন্যরাও রাতের মধ্যেই নিজ নিজ অবস্থানে ঠাই নেয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিলো।

সুলতান মাহমূদ বারবার সৈন্য ও কমান্ডারদের মনে করিয়ে দিলেন, হিন্দুরা তাদের বিজয়ের জন্যে সুন্দর যুবতী মেয়েদের ব্যবহার করতে পারে। সাবধান! সবাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।

* * *

যে সময় সুলতান মাহমূদ তার কমান্ডারদের দিক-নির্দেশনা ও উজ্জীবিত করছিলেন, তখন সোমনাথ দুর্গের ভেতরে শিব মূর্তির সামনে দশ হাজার হিন্দু পুরোহিত নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়ে পূজা করছিলো। এরা মাথা শিবদেবের পায়ে ঠেকিয়ে আর্তনাদ করছিলো। আর মন্দিরের উন্মুক্ত ময়দানে হাজারো যুবতী, নর্তকী নগ্ন বা অর্ধ নগ্ন হয়ে উন্মাতাল নৃত্য করছিলো। নাচতে নাচতে একদল ক্লান্ত হয়ে গেলে এদের জায়গা অন্যেরা দখল করে নিচ্ছিলো। শহরের নারী পুরুষ সবাই শিব মূর্তির বেদীতে মাথা ঠেকিয়ে মুসলমানদের প্রতি শিবদেবের ক্ষোভকে উস্কে দেয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলো। তাদের বিশ্বাস ছিলো, তাদের শিবদেব একবার ক্ষুব্ধ হয়ে গেলে গযনী বাহিনীকে নিমিষেই ধ্বংস করে ফেলবে।

হিন্দুদের এই আর্তনাদের মধ্যে কোন ধরনের আতঙ্ক ও ভীতির ছাপ ছিলো না। তাদের মধ্যে বিরাজ করছিল চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা। আবেগ, উত্তেজনা ও ক্ষোভে প্রায় পাগল হয়ে পড়ে ছিলো হিন্দু জনতা। সবাই শিব মূর্তির পায়ে মাথা রেখে পণ করেছিলো মুসলিম সৈন্যদের ধ্বংস করে দিতে। তারা এতোটাই পাগল প্রায় হয়ে পড়েছিলো যে, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছিলো। তাদের ক্ষোভ এতোটাই আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছিলো যে, দেখে মনে হচ্ছিলো, কোন মুসলমান পেলে তারা জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।

হিন্দু পুরোহিতরা জনতাকে এই বিশ্বাস দিয়েছিলো, তাদের শিবদেব মুসলমানদেরকে টেনে এখানে নিয়ে এসেছে। এবার মুসলমানদের ধ্বংস অনিবার্য।

হিন্দুদের মধ্যে এমনই উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিলো যে, এক নর্তকী নাচের আসর থেকে দৌড়ে এসে শিবমূর্তির সামনে দাঁড়ালো। তার হাতে ছিলো ছুরি। সে উন্মাদ কণ্ঠে ঘোষণা করলো, আমি শিবদেবের চরণে আমার হৃদয় নজরানা দিচ্ছি। সে এমনিতেই স্বল্পবসনা ছিলো, এবার এক টানে পরনের রেশমী কাপড়টি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গেলো । নর্তকীর এ অবস্থা দেখে মন্দিরের সকল পূজা অর্চনা মুহূর্তের মধ্যেই থেমে গেলো।

নর্তকী হাতের ছুরিটি হঠাৎ তার বাম পাঁজরের নীচে সজোরে দাবিয়ে দিয়ে ডানে টান দিলো, মুহূর্তের মধ্যে তার পেট ফেঁড়ে গেলো এবং রক্তে নীচের দেহ ভেসে গেলো। কিন্তু কেউ তাকে বাধা দিলো না এবং মেয়েটিও পড়লো না। সে তার দু’হাত কাটা পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বললো- কোথায় আমার হৃদয়? আমার হৃদয় তোমরা দেখিয়ে দাও।

এক পুরোহিত দৌড়ে নর্তকীর কাছে পৌঁছলো। আর তখন নর্তকীর মাথা পুরোহিতের গায়ে ঢলে পড়লো। পুরোহিত নর্তকীর কাটা পেট ধরে তার মাথা নিজের কাঁধে নিয়ে নিলো। নর্তকীর হাত থেকে পড়ে যাওয়া ছুরিটি অন্য এক পুরোহিত নিজ হাতে নিয়ে নর্তকীর হৃদযন্ত্র কেটে হাত উপড়ে তুলে সমবেত জনতাকে দেখালো। পুরোহিত নর্তকীর হৃদপিণ্ডটি মূর্তির বুকে স্পর্শ করে শিবমূর্তির পায়ের কাছে রেখে ঘোষণা করলো, কেউ মনে করো না, সে সামান্য নর্তকী ছিলো। নর্তকী হলেও তাকে শিবদেব কবুল করেছেন। সে মরেনি, তাকে শিবদেব পূনর্জন্ম দেবেন।

অন্য এক পুরোহিত নর্তকীর মরদেহ তুলে নিয়ে মন্দিরের একটি গোপন কক্ষে রেখে দিলো। আরেক নর্তকী পর মুহূর্তেই দৌড়ে মন্দিরের মূল বেদীতে এসে দাঁড়িয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ফেললো। পুরোহিত তখনো ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো । নর্তকী এক ঝটকায় পুরোহিতের হাত থেকে ছুরিটি ছিনিয়ে নিয়ে আগের নর্তকীর মতোই এক টানে পেট চিরে পুরোহিতের কাছে আবেদন করলো, তার হৃদপিণ্ডও যেন শিবদেবের পায়ে রেখে দেয়া হয়। এই বলে নর্তকী ঢলে পড়ে ছটফট করতে লাগলো। এই অবস্থাতেই পুরোহিত নর্তকীর হৃদপিণ্ড কেটে শিবমূর্তির পায়ের কাছে রেখে দিল।

দুই নর্তকীর আত্মহুতির পর অন্য নর্তকীরা যে উত্তাল নাচ শুরু করলো, সেই নাচের মধ্যে নাচের তাল, লয়, মাত্রা ঠিক থাকলেও তা ছিল উন্মাদনা। দেখে মনে হচ্ছিল এটাই হবে এদের জীবনের শেষ নাচ। মনে হচ্ছিল নর্তকীদের মধ্যে জিন ভর করেছে। নয়তো কোন মানুষ এতো দীর্ঘ সময় এমন উত্তাল নাচে লিপ্ত থাকতে পারে না। অবশ্য এই নাচের আসরে নাচতে নাচতে কলোজন নর্তকী শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছিলো সেই পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। কিন্তু অনেকেই যে নিজেদেরকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিলো তা নিশ্চিত।

একদিকে মন্দিরের উন্মুক্ত মঞ্চে ছিলো নর্তকীদের উন্মত্তাল নাচ, বাদকদলের বিরামহীন বাজনা, অবিরাম মন্দিরের ঘণ্টার আর্তনাদ, অপরদিকে মন্দিরের মূলবেদীতে মূর্তির সামনে ছিলো দশ হাজার পুরোহিতের সমবেত ভজন। বস্তুত সব মিলিয়ে সোমনাথের সেই রাতটিকে ভক্ত পূজারী, পুরোহিত, সৈন্য আর শহরের অধিবাসীরা এক ভয়ঙ্কর কালো রাতে রূপান্তরিত করেছিলো।

মুহূর্তের মধ্যে গোটা শহরে এ খবর ছড়িয়ে পড়লো, দুই নর্তকী নিজ হাতে পেট চিরে তাদের হৃদপিণ্ড শিবদেবের পায়ে নজরানা দিয়েছে । শোনামাত্র গোটা শহরের নারীরা মন্দিরে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো এবং ঘাতিনী দুই নর্তকীর দেহ থেকে ঝড়ে পড়া রক্ত আঙুলে নিয়ে নিজেদের কপালে তিলক দেয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠলো।

সোমাথ শহরের পুরুষেরা যখন তাদের স্ত্রী কন্যা-মাতাদের কপালে রক্তের তিলক দেখলো তখন তাদের উন্মাদনা ও ক্ষোভ আরো উস্কে উঠলো। যুদ্ধের খবর সরকারি নির্দেশেই সারা শহরে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল। বারবার প্রচার করা হচ্ছিল, মুসলমানদেরকে শিবদেব নিশ্চিহ্ন করা জন্য এখানে টেনে নিয়ে এসেছেন। ভারত মাতার বুকে কোন ম্লেচ বেঁচে থাকতে পারবে না। শিবদেবের পূজারীগণ! স্লেচদের টুকরো টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দাও। খবরদার! হুশিয়ার! লড়াই করে যারা মারা যাবে, শিবদেব তাদের পুনর্জন্ম দেবেন।

* * *

উপমহাদেশে ইংরেজ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার পর এখানকার স্কুল কলেজ ও পাঠশালায় ইংরেজদের অনুমোদিত হিন্দুদের লেখা মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ ইতিহাস পাঠ্য করা হয়। সেসব ইতিহাসে বলা হয়, সুলতান মাহমূদ সতেরো বার হিন্দুস্তানে অভিযান চালিয়ে ছিলেন এবং তার সর্বশেষ অভিযান ছিলো সোমনাথ। সোমনাথ মন্দিরের বড় বড় মূর্তিগুলো ছিলো ভেতরে ফাঁপা এবং ফাঁপা জায়গাগুলো বহু মূল্যবান হিরে জহরত ও মণিমুক্তায় ঠাসা ছিলো। সুলতান মাহমূদ বহু মূল্যবান মণিমুক্তা ও হিরে জহরতের জন্যেই সোমনাথ আক্রমণ করেছিলেন।

বস্তুত ইংরেজ ও হিন্দুরা সুলতান মাহমূদের ঈমানী চেতনা, দ্বীনের দাওয়াত ও জুলুমের অবসান ঘটিয়ে ভারতের অগণিত মানুষকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মর্যাদা ও সম্মানপূর্ণ জীবন উপহার দেয়ার, হিন্দু কুচক্রীদের মুসলিম বিদ্বেষ ও প্রজাপীড়ন উৎখাত, জুলুম অত্যাচার এবং সাধারণ মানুষকে পৌত্তলিকতার অভিশাপ থেকে বাঁচানো এবং শাসকদের গোলামীর উৎসভূমি মন্দিরগুলোকে ধ্বংস করার জন্যে বারবার তিনি হিন্দুস্তানে এসেছিলেন, ধনরত্ন লুটতরাজের জন্য নয়। কারণ এসব মন্দিরের পুরোহিত ও পণ্ডিতেরাই ছিল পৌত্তলিকতার উৎস এবং প্রজাপীড়নের নিকৃষ্ট হাতিয়ার।

ইংরেজ ও হিন্দুরা মুসলিম বীরপুরুষদের বীরত্ব, আদর্শ ও গৌরব গাঁথাকে স্নান করার জন্যে মুসলিম শাসক ও বীরপুরুষদের চরিত্রে নানাভাবে কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টা করেছে। ইংরেজ ও হিন্দুরা আজো মুসলমানদের তৌহিদী চেতনা ও পৌত্তলিকতা বিরোধী ঈমানী শক্তিকে ভয় করে।

এদেশে ইংরেজরা আসার সাথে সাথে হিন্দুরা তাদের কর্তৃত্বকে মানসিকভাবে মেনে নেয়, অপরদিকে মুসলমানদের তুলনায় ইংরেজরা হিন্দুদেরকেই বেশী সহায়ক মনে করে। আর মুসলমানদেরকে বৈরী শক্তি বলেই বিশ্বাস করতো। একারণেই হিন্দু ও ইংরেজরা মিলে সর্বশক্তি দিয়ে ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের কৃষ্টিকালচার, ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুতেই নিষ্ঠুর হাতে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং বিকৃতি সাধনে লিপ্ত হয়।

সুলতান মাহমূদের সময়কার মুসলিম ইতিহাসবিদগণ বিশেষ করে আলবিরুনী, ফারিতা প্রমুখ যে ইতিহাস লিখেছেন, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, তখনকার পরিবেশ, পরিস্থিতি, গযনী থেকে হিন্দুস্তানের দূরত্ব ও পথের দুর্গমতা বিচার করলে কোন অর্থ লোভী, যুদ্ধবাজ লড়াকুর পক্ষে কোন অবস্থাতেই এমন দুরূহ অভিযানে বের হওয়ার কথা নয়। কারণ সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করলে গযনী থেকে সোমনাথে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত কোন বিবেকবান সেনানায়কের নেয়ার কথা নয়। এমন অভিযানে বের হতে পারে সেই যে হয়তো মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্ত, উন্মাদ, বাস্তবজ্ঞানহীন অথবা অব্যাহত বিজয়ে আত্মহারা কোন আগ্রাসী শাসক, নয়তো সমরবিদ্যায় অতুলনীয় যোগ্যতার অধিকারী কোন দূরদর্শী জেনারেল।

সমর বিশেষজ্ঞরা সুলতান মাহমূদের সোমনাথ অভিযানকে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের রুশ অভিযানের সাথে তুলনা করেন। অতি মাত্রায় আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে নেপোলিয়ন রাশিয়া গিয়ে ফাঁদে আটকে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হন। সুলতান মাহমূদও দৃশ্যত সোমনাথ অভিযানে নিশ্চিত পরাজয় এবং সৈন্যদেরকে আত্মহুতির দিকেই ঠেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অস্বাভাবিক দূরদর্শিতা, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং সত্যিকারের বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বের কারণে সেদিন গযনী বাহিনীকে নিশ্চিত নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে বিজয়ীর আসনে সমাসীন করেছিলেন কিংবদন্তী সুলতান মাহমুদ।

সুলতান মাহমূদ সোমনাথের ঐতিহাসিক মূর্তিকে ধ্বংস করে হিন্দুদের মিথ্যা চন্ত্রদেবতার কাহিনীকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে তাওহীদের বাণী উচ্চকিত করা জন্যেই এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে বেরিয়েছিলেন।

মূলত সোমনাথের যুদ্ধ ছিল হিন্দুরাদ ও তাওহীদের মধ্যকার একটি চূড়ান্ত লড়াই। দুইটি জাতির আদর্শিক লড়াই। আদর্শিক লড়াই না হলে উভয় পক্ষ বিজয়ের জন্যে এভাবে জীবন বিলিয়ে দিতে পারতো না।

১০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি মোতাবেক ৪১৬ হিজরী সনের ৫ যিলকদ শুক্রবার। রীতি অনুযায়ী অন্যান্য দিনের মতো ফজরের আযান ধ্বনীত হলো। গযনীর সেনারা নামাযের জন্য জামাতে শরীক হলো। সুলতান মাহমূদ নিজেও সেনাদের সাথেই এক ফাঁকে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করলেন।

ইমাম সাহেব আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে গয়নী বাহিনীর বিজয়ের জন্যে দুআ করলেন। নামাযের পর গযনীর সৈন্যরা সোমনাথের মন্দির কেন্দ্রিক দুর্গ অবরোধ করলো । এই অবরোধের মধ্যে ঐতিহাসিকদের মতো চমক সৃষ্টি করেছিলো গযনী সেনাদের সমন্বিত তাকবীর ধ্বনি। তাকবীর এতোটাই প্রাণবন্ত ও উচ্চকণ্ঠ ছিলো যে, গযনীর সেনাদের তাকবীর ধ্বনি সোমনাথ দুর্গে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলো। গযনী সেনাদের প্রচণ্ড তাকবীর ধ্বনি শুনে দুর্গ প্রাচীরে হাজার হাজার হিন্দু এসে সমবেত হলো। হিন্দুরাও মুসলিম সেনাদের বিপরীতে জয়হিন্দু, জয় সোমনাথ, জয় শিবদেব বলে চিৎকার শুরু করলো।

সুলতান মাহমূদ এদিন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্দেশ করার পরিবর্তে অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে গোটা এলাকা পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং সেনাদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তার একান্ত বার্তা বাহকদল তাকে অনুসরণ করছিলো এবং তার প্রতিটি নির্দেশ যথাযথভাবে উদ্দিষ্ট কমান্ডারের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলো।

অবরোধ আরোপের পর প্রথম সমস্যা দেখা দিল খাল। সোমনাথকে তিন দিকে ঘিরে রেখেছিলো সাগর আর এক দিকে ছিল স্থল। সেদিকে আবার গভীর খাল খনন করে একটি মাত্র পথ রেখে সোমনাথ দুর্গকে অজেয় করে রেখেছিল হিন্দুরা। এই খালই গযনী সেনাদের জন্যে কাল হয়ে দেখা দিল। কারণ দুর্গ প্রাচীর ও বুরুজের উপর থেকে গযনী বাহিনীর উপর তীরবৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল যাতে তারা একটি মাত্র স্থান দিয়ে খাল পার হতে না পারে।

সুলতান মাহমূদ খালের পাড়ে গয়নী বাহিনীর হাজার হাজার তীরন্দাজকে দাঁড় করিয়ে দুর্গ প্রাচীরে অবস্থানরত হিন্দুদের প্রতি বিরামহীন তীর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। গযনী বাহিনীর কামানগুলো ছিল হিন্দুদের কামান অপেক্ষা বেশী শক্ত। তাদের নিক্ষিপ্ত তীর হিন্দুদের নিক্ষিপ্ত তীরের চেয়ে অনেক দূরে গিয়ে পড়তো।

গয়নী সেনাদের আকস্মিক তীব্র তীরবৃষ্টিতে দুর্গপ্রাচীরের হিন্দুরা জীন বাঁচাতে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। ফলে তাদের তীরের তীব্রতা হ্রাস পেলো। এই সুযোগে গযনীর সেনারা উটের পিঠে করে নিয়ে আসা পাথরগুলো খালের মধ্যে নিক্ষেপ করছিল। এই ব্যাপারটি ছিল অনেকটা এক জায়গা থেকে মাটি এনে অন্য জায়গার নদী ভরাট করার মতো।

হিন্দুরা যখন দেখলো, তাদের প্রতিরক্ষা খাল গযনীর সেনারা ভরাট করতে শুরু করেছে, তারা জীবন উৎসর্গ করে গযনী বাহিনীর তীরের আঘাতের তোয়াক্কা না করে দুর্গ প্রাচীর থেকে গযনীর তীরন্দাজ ও পাথরবাহী সেনাদের উপর তীর নিক্ষেপের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। অবস্থা এমন হলো যে, মুসলিম তীরন্দাজদের তীর বিদ্ধ হয়ে শতে শতে হিন্দু দেয়ালের উপর থেকে পড়ে যাচ্ছিল কিন্তু তাতেও হিন্দুদের তীর আক্রমণে কোন ভাটা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না, মুহূর্তের মধ্যে সেই শূন্যস্থান অপর হিন্দুরা দখল করে নিচ্ছিল। হিন্দুরা মুসলমানদের ঠেকাতে জীবনের কোন পরোয়াই করছিল না। তারা গযনী বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হলো।

প্রতিরক্ষা খাল তখনো অর্ধেক ভরাট হয়েছে মাত্র। এমন সময় গযনীর তীরন্দাজ সেনারা লক্ষ্য করলো, হিন্দুদের বেপরোয়া তীরাঘাতে তাদের সহযোদ্ধা ভাইয়েরা নিহত হচ্ছে। তখন তাদের রক্ত টগবগিয়ে উঠলো এবং গযনীর তীরন্দাজরা প্রতিরক্ষা খালে ঝাঁপিয়ে পড়ে একে অন্যের হাত ধরে খালের অপর পাড়ে ঠাই করে নিলো। তারা জীবন বাজি রেখে একেবারে দুর্গপ্রাচীরের এতোটাই কাছে চলে গেলো যে দুর্গপ্রাচীরের উপরে দাঁড়ানো প্রতিটি ব্যক্তিকে আলাদা আলাদা ভাবে তারা সনাক্ত করতে সক্ষম। এমতাবস্থায় তারা জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে হিন্দুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ শুরু করলো।

গযনীর তীরন্দাজদের এই দুঃসাহসী ভূমিকায় শক্তি সঞ্চার করেছিল গযনী সেনাদের সম্মিলিত তকবীর ধ্বনি। গযনীর তীরন্দাজদের উপর ঠিক মাথার উপর থেকে শিলা বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল কিন্তু তারা তীরবিদ্ধ হয়েও প্রতিপক্ষের প্রতি বিরামহীন তীর নিক্ষেপ করেই যাচ্ছিল। মূলত তখন উভয় পক্ষের মধ্যে তীরযুদ্ধই হয়ে উঠেছিল মূল। হিন্দুরা চাচ্ছিল প্রতিরক্ষা খালকে কার্যকর রাখতে আর গয়নী সেনারা চাচ্ছিল প্রতিরক্ষা খালটি ভরাট করে দুর্গে আক্রমণ ব্যবস্থাকে অবারিত ও সাচ্ছন্দময় করতে । যাতে তারা সহজে দুর্গ প্রাচীর পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারে, খালের প্রতিবন্ধকতা থাকে।

এক পর্যায়ে খালের কিছুটা অংশ ভরাট হয়ে গেল। যাতে চারটি ঘোড়া একসাথে সমান্তরাল ভাবে খাল ডিঙাতে পারবে। ঠিক সেই সময় চারজন যোদ্ধা হাতে কুড়াল নিয়ে ঊধ্বশ্বাসে খাল পেরিয়ে দুর্গ প্রাচীরের দিকে ঘোড়া হাঁকাল। তাদের লক্ষ দুর্গ প্রাচীরের একটি ছোট ফটক।

তারা চাচ্ছিল দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেলে কুড়াল দিয়ে দরজা তারা ভেঙে ফেলতে পারবে। কিন্তু দু’জন দরজা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই তীরবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল আর অপর দু’জন দরজা পর্যন্ত পৌঁছলো বটে কিন্তু দরজায় কুঠারাঘাত করার আগেই দুর্গ প্রাচীরের উপরে অবস্থানরত দ্বাররক্ষীদের বর্শার আঘাতে ধরাশায়ী হলো।

প্রতিরক্ষা খাল কিছুটা ভরাট ও ঘোড়া দৌড়ে যাওয়ার উপযোগী হওয়ায় বাধভাঙ্গা বানের মতো গযনীর সেনারা দুর্গ প্রাচীরের দিকে ধাবিত হলো। তাদের কারো কারো হাতে ছিলো দীর্ঘ মই। দেয়ালে মই ঠেকিয়ে যাতে দ্রুত গযনীর সেনারা দুর্গ প্রাচীরের উপর ওঠে যেতে পারে এজন্য তারা দুর্গ প্রাচীরের উচ্চতার সমান মই নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। আর এই মই বহনকারীদেরকে শত্রুসেনাদের তীরাঘাত থেকে রক্ষার জন্যে পেছন দিক থেকে গযনীর তীরন্দাজ সেনারা দুর্গপ্রাচীরে অবস্থানরত শত্রুসেনাদের প্রতি তীব্র তীর নিক্ষেপ করছিল যাতে তীর নিক্ষেপরত হিন্দুরা জীবন বাঁচাতে মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তীরন্দাজ হিন্দুরা মাথা নীচু করে তীর নিক্ষেপ বন্ধ করেনি। তারা একের পর এক তীর বিদ্ধ হচ্ছিল বটে কিন্তু গযনীর মইবাহী সেনাদের অগ্রগতি রোধ করার চেষ্টায় মোটেও ক্রটি করেনি।

দৃশ্যত দুর্গ ফটক পর্যন্ত পৌঁছার কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এমতাবস্থায়ও কয়েকজন জানবাজ গযনী সেনা দুর্গফটকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারা দুর্গ ফটকের ফাঁক দিয়ে বুরুজে অবস্থানরত তীরন্দাজ ও দ্বাররক্ষীদের দিকে তীর নিক্ষেপ করার সুযোগও পেয়েছিল। এই সুযোগে কয়েকজন দেয়ালে মই দাঁড় করাতে সক্ষম হলো কিন্তু বিধি বাম। যেই মই বেয়ে দুর্গপ্রাচীরের উপরে উঠতে যাচ্ছে তাকেই তীর ও বর্শাবিদ্ধ হয়ে গড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।

এদিকে যখন দুর্গপ্রাচীরে চড়ার চেষ্টা চলছিল, অপরদিকে সমুদ্রের পানিপথেও তখন গযনীর সেনারা দুর্গপ্রাচীরে চড়াও হওয়ার চেষ্টা করছিল। সমুদ্রের পানিপথেও চলছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কারণ সোমনাথ দুর্গের দুই তৃতীয়াংশই ছিল পানিবেষ্টিত। গযনীর একজন ডেপুটি সেনাপতি পানিপথের সুযোগ নিয়ে দুর্গ প্রাচীরের উপরে উঠার দুঃসাহসী উদ্যোগ নিয়েছিল। গযনী সেনাদের কোন নৌকা ছিল না। কিন্তু দুর্গের পাশের সমুদ্র তীরে জেলেও সেনাদের শত শত নৌকা সারি সারি বাধা ছিল। গযনীর এক ডেপুটি সেনাপতি তার ইউনিট নিয়ে কিছু সংখ্যক মই নৌকায় তুলে জেলে মাল্লাদেরকে দুর্গ প্রাচীরের দিকে নৌকা চালানোর নির্দেশ দিল । কিন্তু গযনী সেনাদের এই উদ্যোগও দুর্গপ্রাচীরে পাহারারত হিন্দুসেনাদের চোখে পড়ে গেল। ফলে তারা আগুয়ান গযনী সেনাদের প্রতি দুর্গপ্রাচীরের উপর থেকে তীর নিক্ষেপ শুরু করলো। তীর আসতে দেখে হিন্দু মাঝি মাল্লারা প্রাণ বাঁচাতে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো। ফলে গযনী সেনাদের অনভ্যস্ততা সত্ত্বেও নৌকার হাল ধরতে হলো। সাগরেও শুরু হয়ে গেলো তীব্র লড়াই।

সেদিন ছিল জুমআর দিন। জুমুআর সময় প্রায় হয়ে যাচ্ছে। তখনও চলছে। খাল ভরাটের কাজ। কারণ খাল যতোটা বেশী ভরাট করা যাবে, আক্রমণও পশ্চাৎপসারণের কাজটা তততটাই সহজ হবে। এ সময় উভয় বাহিনীর সৈন্যরা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছিল। ঠিক জুমআর সময়ের আগে আগে সুলতান মাহমূদ হাত উঠিয়ে আল্লাহর কাছে বিশেষ মোনাজাত করলেন এবং মোনাজাত শেষ করে ঘোড়ায় চড়ে চিৎকার করে করে আক্রমণ আরো তীব্র করার জন্য সেনাদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তিনি তার অবস্থান থেকে অনেক সামনে অগ্রসর হয়ে সেনাদেরকে উজ্জীবিত করার জন্যে চিৎকার করে সঙ্গ দিচ্ছিলেন।

এমন সময় হিন্দুরা দুঃসাহসের পরিচয় দিল। তারা একটি ফটক খুলে দিল। দুর্গের ভেতর থেকে অশ্বারোহীরা বর্শা হাতে নিয়ে বিদ্যুৎবেগে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে গযনী সেনাদের উপর প্রচণ্ড আঘাত হানলো। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো বটে কিন্তু মুসলমানদেরকে দুর্গপ্রাচীর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে সক্ষম হলো।

সুলতান মাহমূদ তার সেনাদের নির্দেশ দিলেন, খোলা ফটক দিয়ে দুর্গের ভেতরে ঢুকে যাও। নির্দেশ পেয়েই বহু যোদ্ধা এক সাথে দুর্গ ফটকের দিকে ঘোড়া হাঁকালো কিন্তু ভেতর থেকে এতো বিপুল পরিমাণ হিন্দু সেনা গযনী সেনাদের ঠেকানোর জন্য ফটক আগলে দাঁড়ালো যে তাদের পক্ষে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হলো না। দুর্গ ফটকের সামনেই দুই বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেধে গেল।

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, অবস্থা এমন ছিলো যে, উভয় পক্ষের যোদ্ধারাই ছিলো মরা ও মারার জন্যে মরিয়া। গযনীর সেনারা শপথ করেছিলো হয় মৃত্যু নয়তো বিজয়। মুসলমানদের এই শপথের অগ্নিবাণ হিন্দুরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রোধ করছিলো।

দুর্গের ভেতরে খবর ছড়িয়ে পড়লো, গযনীর সেনারা দুর্গের প্রধান ফটক খুলে ফেলেছে। খবর পেয়ে দুর্গ প্রাচীরে ছড়িয়ে থাকা তীরন্দাজ হিন্দুরা প্রধান ফটকের উপরে এসে সমবেত হয়ে নীচে মুসলমানদের লক্ষ্য করে তীরবৃষ্টি বর্ষণ করতে শুরু করলো।

দুর্গপ্রাচীরে এ খবরও ছড়িয়ে পড়েছিলো, মুসলিম যোদ্ধারা দুর্গের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। খবর শুনে দুর্গপ্রাচীরের উপরে থাকা সৈন্যরা নীচে নেমে এলো মুসলমানদের প্রতিরোধ করতে। অপর দিকে দুর্গ প্রাচীর খালি দেখে গযনী সেনারা দেয়ালে ঠেকিয়ে একের পর এক দুর্গপ্রাচীরে উঠতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে দুর্গ প্রাচীরেও শুরু হয়ে গেলো দুই বাহিনীর মধ্যে হাতাহাতি লড়াই।

এদিকে মন্দিরেও খবর পৌঁছে গেলো, মুসলিম সেনারা দুর্গে ঢুকে পড়েছে। একথা শুনে যেসব পুরোহিত, ঠাকুর ও পণ্ডিত স্বাভাবিক পূজা-অর্চনা করছিলো, এরা সবাই মূর্তির পায়ে মাথা রেখে গড়াগড়ি করে রোদন করতে লাগলো । মন্দিরের প্রধান ফটক খোলা থাকার কারণে মুসলমানদের নারায়ে তাকবীর ধ্বনি মন্দিরের পূজারীদের কানে পৌঁছে গো পণ্ডিত পুরোহিতরা ছিলো ধর্মের কাণ্ডারী। এরা লড়াই করতে জানতো না। সুলতান মাহমূদ মন্দির ও মন্দিরের মূর্তি ধ্বংস করতেন কিন্তু কোন পূজারী বা পুরোহিতের গায়ে হাত তুলতেন না।

সোমনাথ মন্দিরের পণ্ডিত পুরোহিতদের কানে যখন গযনী সেনাদের তকবীর ধ্বনিত হতে লাগলো, তখন তাদের পূজার ধ্যান ছুটে গেলো। তখন হাজারো পুরোহিতের কিছু সংখ্যক পূজা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো। তারা দেখলো নৃত্যরত নর্তকীদের নাচ থেমে গেছে। তাদের চেহারা ফ্যাকাসে তারা ভীত সন্ত্রস্থ। পণ্ডিতেরা যখন দেখলো তাদের জীবনের শেষ সময় এসে গেছে তখন নৃত্যত্যাগী সুন্দরীদের সাথে করে প্রত্যেকেই মন্দিরের গোপন প্রকোষ্ঠে ঢুকে পড়লো এবং তাদের সাথে আদিম উল্লাসে মেতে উঠলো। কিন্তু দুর্গের সাধারণ হিন্দুদের অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা পণ্ডিতদের এই পৈশাচিকতার বিন্দু বিসর্গও জানতো না।

সোমনাত দুর্গের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে তেমন ভয়-ভীতি ছিলো না । পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহিলারাও মুসলিম যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলো । বৃদ্ধা মহিলারা সমবেত হয়েছিলো মন্দিরে। তারা মূর্তির বেদিতে মাথা ঠেকিয়ে রোনাজারী করছিলো। তারা মুসলমানদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে দেবদেবীদের সাহায্য প্রার্থনা করছিলো।

* * *

দুর্গফটক খুলে দেয়ার চালটি ছিলো সোমনাথ দুর্গের রাজা রায়কুমারের। রাজা রায়কুমার ইতোমধ্যে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, দুর্গফটক খুলে দিয়ে তিনি গযনী বাহিনীকে আরো বেশী পর্যদস্তু করতে পারবেন। কিন্তু রায় কুমারের প্রতিপক্ষ ছিলেন তার চেয়েও আরো বেশী দূরদর্শী জেনারেল। যে কোন বিপর্যয় থেকেও শিক্ষা নিয়ে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ঠেকিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার মতো পারদর্শী ছিলেন গযনীর সুলতান।

গযনীর সুলতান ও তার প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ দুর্গফটক খুলে দেয়ার সাথে সাথেই কিছু সেনাকে দুর্গফটকের উপরের বুরুজ ও মরিচায় দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারা সেখান থেকে কার্যকর ভাবে তীর নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয় তাদের সহায়তায় অন্য সেনারা মই বেয়ে দুর্গপ্রাচীরে উঠতে থাকে।

মহারাজা রায়কুমার এই অবস্থা দেখে বিপুল সংখ্যক সেনাকে দুর্গফটকের দিকে ঠেলে দিলেন। সংখ্যাধিক্য হওয়ায় তারা মানবঢাল তৈরী করে মুসলিম সেনাদেরকে দুর্গফটকের বাইরে ঠেলে নিয়ে গেলো। আর এ দিকে রাজার নির্দেশে দুর্গ ফটক বন্ধ হয়ে গেলো। এবার হিন্দু সৈন্যদের আর ভেতরে ফেরার কোন পথ থাকলো না। তারা সোমনাথের জন্য আত্মবিসর্জন দিতে লাগলো। একে একে সবাই মুসলিম যোদ্ধাদের হাতে নিঃশেষ হয়ে গেল।

দুর্গফটক বন্ধ করে দিয়ে সকল হিন্দু যেসব মুসলিম যোদ্ধা দুর্গ ফটকের উপরের বুরুজে অবস্থান নিয়েছিলো তাদের উপর হামলে পড়লো। এমতাবস্থায় প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গযনীর যোদ্ধারা লড়াই করে জীবন বিসর্জন দিলো। বুরুজ দখলকারী মুসলমানদের কাবু করার পর হিন্দুরা মই বেয়ে দুর্গ প্রাচীরে উঠে আসা বন্ধ করতে গযনী সেনাদের প্রতিরোধে লিপ্ত হলো। হিন্দুদের প্রবল তীর ও বর্শা বর্ষণের কারণে তারা একে অন্যের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগলো। দুর্গ প্রাচীরে আরোহণ সচেষ্ট মুসলিম সেনাদের কারো পক্ষেই জীবন নিয়ে ফিরে আসা সম্ভব হলো না।

সুলতান মাহমূদ দেখলেন, সূর্য দুর্গ প্রাচীরের আড়ালে চলে গেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। তিনি আরো খেয়াল করলেন তার যোদ্ধাদের মধ্যে আহতের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। এমতাবস্থায় তিনি দুর্গ প্রাচীরের কাছে থাকা সেনাদেরকে পিছিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন এবং যুদ্ধে বিরতি ঘোষণা করলেন।

রাতব্যাপী সুলতান এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমালেন না। তিনি সেনাপতি ও কমান্ডারদের দিক-নির্দেশনা দিলেন। ঘুরে ঘুরে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নিলেন এবং যেসব যোদ্ধা বহিঃশত্রুদের পথরোধ করার জন্য শিবির থেকে দূরে অবস্থান করছিলো তাদের সাথেও সাক্ষাত করলেন। মনে মনে তিনি কিছুটা চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। দৃশ্যত তার কাছে বিজয় সুদূর পরাহত মনে হচ্ছিল। কিন্তু তাতেও তিনি হতোদ্যম হলেন না। বস্তুত হতোদ্যম হয়ে রণেভঙ্গ দেয়ার ব্যক্তি তিনি ছিলেন না।

পরদিন সূর্য উঠার সাথে সাথেই নব উদ্যমে তিনি সেনাদেরকে দুর্গ প্রাচীরে আঘাত হানার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে সেনারা মই বেয়ে দুর্গ প্রাচীরে উঠার চেষ্টা করলো কিন্তু হিন্দুরা তাদের কোন চেষ্টাই সফল হতে দিলো না। সারাদিন চললো আঘাত প্রত্যাঘাত। কিন্তু কোন পক্ষেরই তেমন সফলতা এলো না। দিন শেষে সুলতান সেনাদের ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন।

* * *

১০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি। মহারাজা রায়কুমার একটি দুঃসাহসী চাল দিলেন। তিনি ভোরের সূর্য উদিত হওয়ার আগেই দুর্গফটক খুলে দিলেন। খোলা দরজা দিয়ে দুর্গের ভেতর থেকে দু’টি সেনাদল বের হয়ে মুসলিম শিবিরে আঘাত হানলো । হিন্দুরা ভেবেছিলো, মুসলিম যোদ্ধারা হয়তো তখনো ঘুমিয়ে আছে, নয়তো প্রস্তুতিতে লিপ্ত রয়েছে। বস্তুত সময়টা ছিলো ফজরের নামাযের। গযনীর সেনারা নামায শেষ করেছিলো মাত্র। হিন্দুরা ছিলো অশ্বসজ্জিত পক্ষান্ত রে গযনী সেনাদের পক্ষে অশ্বারোহণের জন্য ঘোড়ার কাছে যাওয়ার অবকাশ ছিলো না। এমতাবস্থায়ও সুলতান মাহমূদ দূতের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিলেন হিন্দু সেনাদেরকে ঘেরাও করে ফেল। হিন্দুরা অত্যধিক দুঃসাহস নিয়ে হামলে পড়েছিলো। তারা বুঝতে পারলো না তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলা হচ্ছে।

গযনীর একটি প্রহরী দল হিন্দু সেনাদেরকে মূল শিবিরে আঘাত হানার আগেই পথরোধ করে দাঁড়ালো। আর এদিকে হিন্দুদের উপর ডান ও বাম দিক থেকে প্রচণ্ড আঘাত হানা হলো। কিন্তু হিন্দুরা ছিলো মরিয়া। তারা মরণত্যাগী হয়ে লড়তে শুরু করলো ফলে তাদের পরাস্ত করতে মুসলিম সেনাদেরকেও ঘাম ঝরাতে হলো। অবশেষে কিছু হিন্দু সেনা ঘেরাও ডিঙিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হলো, আর তাদের জন্য পুনরায় খুলে গেলো দুর্গফটক। তারা ভেতরে চলে গেলো। কিছু সংখ্যক মুসলিম যোদ্ধা পলায়নপর হিন্দুদের পিছু ধাওয়া করলে সুলতান তাদের নিষেধ করলেন। কারণ খোলা ফটক মুসলিম যোদ্ধাদের জন্যে মরণ ফাঁদে পরিণত হতে পারে।

হিন্দু সেনাদের দুঃসাহসিকতায় সুলতান মাহমূদকে তাঁর রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করলো। হিন্দুদের মোকাবেলায় সুলতান মাহমুদ অত্যন্ত অভিজ্ঞ হলেও সোমনাতের হিন্দুদের রণকৌশল ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এদের নারীশিশু বৃদ্ধ আবাল বণিতা সকলেই ছিলো ধর্মীয় ভাবাবেগে উন্মাদ। হিন্দুদের আগ্রাসী তৎপরতায় যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন সুলতান। তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। ঠিক এই মুহূর্তে তার কানে ভেসে এলো শোরগোলের আওয়াজ। এ ধরনের শোরগোলের সাথে সুলতান পরিচিত।

মুহূর্তের মধ্যে তিনি দেখতে পেলেন, অন্য একটি ফটক খুলে সোমনাথ দুর্গ থেকে দু’টি অশ্বারোহী দল ও একটি পদাতিক দল দ্রুতগতিতে ধেয়ে এসে গযনী সেনাদের উপর হামলে পড়েছে। কিন্তু এবার আর ডানবাম দিক থেকে হিন্দুদের ঘিরে ফেলার কৌশল অবলম্বনের কোন সুযোগ হিন্দুরা রাখেনি। কারণ, দুর্গ প্রাচীর ও বুরুজের উপর থেকে অসংখ্য তীরন্দাজ তাদের সহায়তা করছিলো যাতে গযনী বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলতে না পারে।

প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ ঘেরাও কাজে নিয়োজিত সেনাদের পিছনে সরে আসার নির্দেশ দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন হিন্দুসেনারা এগিয়ে এলে দুর্গ প্রাচীর ও তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাবে। তখন দুর্গ প্রাচীরে অবস্থানরত তীরন্দাজদের তীরবৃষ্টির আওতামুক্ত হয়ে গযনীর সেনারা হিন্দুদের ঘেরাও করতে সক্ষম হবে এবং দুর্গ ফটক অতিক্রম করারও সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মহারাজা রায়কুমারের দেমাগ অস্বাভাবিক কৌশলী চাল দিচ্ছিল, তার প্রতিটি যুদ্ধ চালই ছিলো নিপুণ ও কার্যকর। রায়কুমার তার সেনাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তোমরা কোন অবস্থাতেই দুর্গপ্রাচীরের তীরন্দাজদের আওতার বাইরে যাবে না। রায়কুমার আবু আব্দুল্লাহর চাল অকার্যকর করে দিলেন। হিন্দু সেনারা তাদের আওতার বাইরে এলো না।

হিন্দু সেনারা সামনে অগ্রসর না হয়ে ডানে বামে ছড়িয়ে পড়লো এবং অবরোধকারী সেনাদের উপর খণ্ড খণ্ড হামলা করতে লাগলো। হিন্দুরা অবরোধ ভাংতে এবং গযনী বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা করছিল। এক পর্যায়ে হিন্দুদের উত্তেজনা উন্মাদনায় রূপ নিলো। এমন সময় দুর্গ প্রাচীরের উপর থেকে গযনী সেনাদের কানে ভেসে এলো মহিলাদের চিৎকার। সোমনাথ দুর্গের হিন্দুমহিলারা তাদের যোদ্ধাদের আরো উত্তেজিত ও উৎসাহিত করতে সমস্বরে চিৎকার করে নানা ধ্বনি দিচ্ছিলো। তারা বলছিলো- ‘সোমনাথের সুপুত্ররা! তোমরা স্লেচদের কচুকাটা করে ফেলো, নয়তো এরা তোমাদের মাবোনদের অপহরণ করে নিয়ে যাবে। এদের নিঃশেষ করে ফেলল, না হলে আমাদের কারো রক্ষা নেই…।’

রণাঙ্গনের অবস্থা এতোটাই মুসলমানদের জন্যে শোচনীয় হয়ে পড়লো যে, সুলতান মাহমূদ কেন্দ্রীয় কমান্ড তার একান্ত বিশ্বস্ত কয়েকজন সেনাকর্মকর্তার কাঁধে ন্যস্ত করে একটি চৌকস বাহিনী নিয়ে নিজেই আক্রমণকারী হিন্দুদের প্রতিরোধে লিপ্ত হলেন।

ঐতিহাসিক আলবিরুনী ও আবুল কাসিম ফারিশতা লিখেছেন- এ সময় গযনী বাহিনীর জন্যে সবচেয়ে অসুবিধা সৃষ্টি করেছিলো দুর্গ প্রাচীর থেকে আসা তীর ও বর্শা। এ সময় সুলতান মাহমূদ নিজেকে এবং গোটা গযনী বাহিনীকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলেন। কারণ সুলতান মাহমূদের উপর শত্রুদের একটি তীরই গযনী বাহিনীকে পরাস্ত করার জন্যে যথেষ্ট ছিলো।

প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ সুলতানের এই বেপরোয়া অবস্থা দেখে দ্রুত একটি তীরন্দাজ ইউনিটকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা দুর্গ প্রাচীরের কাছাকাছি গিয়ে প্রাচীরের উপর অবস্থানরত তীরন্দাজদের নিশানা করে তীর নিক্ষেপ করতে থাক। তীরন্দাজরা যখন দেখতে পেল সুলতান মাহমূদ তার প্রতিরক্ষাব্যুহ ভেঙ্গে সম্মুক ভাগে আক্রমণ চালাচ্ছেন, তখন তারা জীবনের পরোয়া না করে একেবারে দুর্গ প্রাচীরের কাছে গিয়ে হিন্দুদের উপর প্রচণ্ড তীর চালাতে লাগলো। হিন্দুদের নিক্ষিপ্ত বর্শায় একের পর এক গযনীর তীরন্দাজ ধরাশায়ী হচ্ছিলো কিন্তু তবুও তাদের তীর নিক্ষেপে কোনরূপ বিচ্যুতি ঘটলো না। অবস্থা এমন হলো যে, বাতাসে উভয় পক্ষের নিক্ষিপ্ত তীরে তীরে সংঘর্ষ ঘটতে লাগলো।

আবু আব্দুল্লাহর এই চালে এতটুকু কাজ হলো যে, দুর্গ প্রাচীরের হিন্দু তীরন্দাজদের লক্ষ্য সুলতান মাহমূদের দিক থেকে অন্য দিকে ঘুরে গেলো। সেই সাথে গযনীর অন্য যোদ্ধারা যখন দেখলো, তাদের সহযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছে, তীরন্দাজদের এই আত্মত্যাগে তারাও উজ্জীবিত ও শক্রদের বিরুদ্ধে এমন উত্তেজিত হলো যে, কমান্ডারের নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজেরাই অগ্রগামী হয়ে দুর্গ প্রাচীরে অবস্থানরত হিন্দু সেনাদের প্রতি প্রচণ্ড তীর বর্ষণ করতে লাগলো। তীব্র তীর বৃষ্টিতে টিকতে না পেরে শত্রুসেনারা দুর্গ প্রাচীর থেকে নেমে যেতে শুরু করলো এবং বহু সংখ্যক হিন্দু সেনা তীরবিদ্ধ হয়ে দুর্গ প্রাচীরের বাইরে গড়িয়ে পড়লো।

এর ফলে যেসব হিন্দু সেনা দুর্গের বাইরে এসে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলো তারা স্বগোত্রীয় তীরন্দাজদের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলো।

এদিকে সুলতান মাহমূদ তখনো বেপরোয়া ভাবে সামনের শত্রুসেনাদের কচুকাটা করতে ব্যস্ত। তার যেন আর কিছুর খবর নেই। প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ মুহূর্তের জন্যেও সুলতানের উপর থেকে দৃষ্টি সরাননি। তিনি সুলতানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন। সুলতান মাহমূদকে দৃশ্যত আবেগতাড়িত মনে হলেও তিনি মোটেও অসচেতন ছিলেন না, তীব্র লড়াইরত অবস্থায়ও তিনি এমনভাবে তার যোদ্ধাদের পরিচালনা করলেন যে, শত্রুসেনারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো।

আবু আব্দুল্লাহ যখন দেখলেন, হিন্দুসেনারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। তখন তিনি একটি অশ্বারোহী ইউনিটকে দুর্গপ্রাচীরের দিক থেকে আক্রমণের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। দ্বিমুখী উপর্যুপরি আক্রমণে হিন্দুসেনারা হতোদ্যম হয়ে পড়লো। এতোক্ষণ তারা মুসলমানদের বিপর্যস্ত করে রেখেছিলো কিন্তু এখন গযনী সেনাদের হাতে কচুকাটা হতে লাগলো।

এদের মধ্যে যারা ঘেরাও ডিঙ্গাতে পেরেছিলো তারা দুর্গ ফটকের দিকে অগ্রসর হতে চাচ্ছিলো কিন্তু মহারাজা রায়কুমার এতোটা বোকা ছিলেন না যে, গুটিকয়েক সেনার জীবন বাঁচাতে তিনি ফটক খুলে দেয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি নেবেন। কারণ তিনি দুর্গ প্রাচীরের উপরে সুরক্ষিত বুরুজে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এ মুহূর্তে প্রধান ফটক খুলে দিলে প্রাবনের পানির মতো গযনী সেনারা দুর্গে প্রবেশ করবে, তাদেরকে কোন অবস্থাতেই ঠেকানো যাবে না। তিনি বের হয়ে যাওয়া সেনাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। যেসব হিন্দু সেনা এই অভিযানে শরীক হয়েছিলো তাদের কারো পক্ষেই আর দুর্গে ফিরে যাওয়া সম্ভব হলো না এবং জীবন নিয়েও পালিয়ে যাওয়ার অবকাশ পেলো না কেউ। সবাইকে গযনী বাহিনীর হাতে প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো।

সুলতান মাহমূদ কখনো নির্বিচারে হত্যার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বিজয়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছাড়া কোন শত্রু সেনাকে হত্যা করতেন না। কিন্তু এদিন হিন্দুদের কাবু করার সাথে সাথে প্রধান সেনাপতি সকল কমান্ডারের কানে এ খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন, আমাদের কোন যুদ্ধবন্দীর দরকার নেই, সবাইকে হত্যা করে ফেলো। শত্রুদের যেখানে যে অবস্থায়ই পাও নিঃশেষ করে ফেলো।

কারণ এই পর্যায়ে গোটা যুদ্ধের অবস্থাই বদলে গিয়েছিলো। মরো এবং মাররা এটাই হয়ে উঠেছিলো উভয় পক্ষের অঘোষিত লক্ষ্য। এমতাবস্থায় যুদ্ধবন্দীদের সামলানোর ব্যাপার একটি বাড়তি ঝামেলা হয়ে পড়তো। তখন শক্রসেনাদের বন্দী করার চেয়ে তাদের তরতাজা ঘোড়া ও যুদ্ধাস্ত্র বেশী প্রয়োজনীয় বস্তু হয়ে উঠেছিলো। গযনী বাহিনী শত্রুসেনাদের পরাস্ত করে তাদের তাজাম ঘোড়া ও অস্ত্রগুলো কজা করলো। যুদ্ধ যখন শেষ হলো তখন কোথাও শত্রু সেনাদের কাউকে আর দেখা গেলো না।

* * *

দিন শেষে রাতের বেলায় সুলতান মাহমূদ সকল সেনা কর্মকর্তা, কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডারদের সমবেত করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি এর আগের কোন যুদ্ধে হিন্দুদেরকে এমন দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখেছেন?

এদের আবেগ ও উন্মাদনা দেখেই বুঝা যায় সোমনাথ মন্দিরকে এরা কতোটা পবিত্র জ্ঞান করে। আমি আপনাদের সবাইকে একথা বলতে ডেকেছি, আপনারা নিজ নিজ ইউনিটের সেনাদের বলবেন, তোমরা হিন্দুসেনাদের আবেগ উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনা দেখা এবং তা নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করো।

আমি সেইসব সেনাদের মোবারকবাদ জানাচ্ছি, যারা আজ নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোগী ও অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে শত্রুসেনাদের কাবু করেছিলো। আল্লাহ তাআলা তাদের এই সাহসী ভূমিকার যথার্থ প্রতিদান দেবেন। আমি চাই সেনাদের এই আবেগ ও উচ্ছ্বাসে যেন কোনরূপ ভাটা না পড়ে। আমি বলতে পারবো না, আগামীকাল কি ঘটবে, তাও বলতে পারবো না, যুদ্ধের পরিণতি কি হবে! তবে আমি আমার সেনাদের কাছে পয়গাম পৌঁছে দিতে চাই, আমরা যদি এ যুদ্ধে পরাজিত হই, তাহলে ভবিষ্যতের লোকেরা বলবে, হিন্দুদের দেবদেবীরাই সত্য, মানুষের জীবনমৃত্যু তাদেরই হাতে। ইসলাম আসলেই কোন সত্য ধর্ম নয়। ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদেরকে লুটেরা ও খুনী সন্ত্রাসী বলবে। আমাদেরকে জীবন দিয়ে হলেও ইসলামের সততা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই যুদ্ধকে আপনারা অন্য দশটি যুদ্ধের মতো মনে করবেন না। আগামী দিন হয়তো বিগত দিনের চেয়ে আরো রক্তক্ষয়ী হবে এবং আরো বেশী ধৈর্য ও সাহসের পরীক্ষা দিতে হবে। আপনাদেরকে ইতিহাস সৃষ্টি করতে হবে। এমন ইতিহাসের জন্ম দিতে হবে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ যখনই গযনী বাহিনীর আলোচনা করবে সাথে সাথে আসবে সোমনাথের নাম। মানুষ বলতে বাধ্য হবে, গযনীর সিংহশাবকেরা সোমনাথের পাথরের মূর্তিগুলোকে তাদের পায়ে পড়তে বাধ্য করেছিলো।

এরপর সুলতান সেনাকর্মকর্তাদেরকে যুদ্ধ সম্পর্কে জরুরি দিক-নির্দেশনা দিয়ে বললেন- আমাদেরকে অতি দ্রুত এই যুদ্ধের ইতি টানতে হবে, কারণ আমাদের লোকবল ও রসদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। লোকবল ও রসদের ঘাটতি পূরণ করার মতো কোন ব্যবস্থা আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ যথেষ্ট দূরদর্শী ও সাহসী। অবশ্য তারা আমাদের উপর আক্রমণ না করে যদি আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিতো আর অবরোধ প্রলম্বিত করতে বাধ্য করতো, তাহলে তাদের কোন জনবলই হারাতে হতো না, এক সময় রসদসামগ্রী নিঃশেষ হয়ে আমাদেরকে অভুক্ত থেকেই মরতে হতো। শত্রু বাহিনী এই কৌশলের আশ্রয় নেয়ার আগেই আমাদেরকে শহরে প্রবেশ করতে হবে। তবে আমরা আহত ক্ষুধার্ত বিড়ালের মতো নয় সিংহের মতো শহরে প্রবেশ করতে চাই।

এ রাতেও গযনী বাহিনীর কোন সদস্য ঘুমাতে পারেনি। সারারাত তারা রণপ্রস্তুতিতে কাটিয়েছে।

* * *

সেনা কর্মকর্তাদের বিদায় করার পর সুলতানকে জানানো হলো, এক বৃদ্ধ ঋষি এক তরুণীকে নিয়ে এসেছে। সে সুলতানের সাথে সাক্ষাত করতে চায়। ঋষি জানিয়েছে, তারা সোমনাথ মন্দির থেকে এসেছে।

সুলতান তাদেরকে ডাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন, এরা মহারাজা রায়কুমারের কাছ থেকে কোন পয়গাম নিয়ে আসতে পারে, হয়তো যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব নিয়ে এরা আসতে পারে নয়তো কোন হুমকি ধমকি কিংবা চক্রান্তের বীজও এদের আগমনে থাকতে পারে। কাজেই এদের কাছ থেকে তা জানার জন্যেই সাক্ষাত হওয়া দরকার। ঋষি ও তার সঙ্গীনীকে সুলতানের সামনে পেশ করার আগেই তাদের দেহ তল্লাশী করা হয়েছে।

বৃদ্ধ ঋষির গায়ে ছিলো আজানু লম্বিত চৌগা। তার চুল মেয়েদের ন্যায় দীর্ঘ, দাড়ি ও গোঁফ ছিল লম্বা। সে ছিলো যথার্থই বয়স্ক, তার চুলদাড়ি শ্বেত শুভ্র। কিন্তু ঋষির চেহারায় ছিলো আভিজাত্যের ছাপ ও দীপ্তি। সাধারণত হিন্দুদের চেহারা এমন দীপ্তিময় হয় না।

সুলতান মাহমূদ ঋষির চেহারা ছবি দেখে মুগ্ধ হলেন। ঋষির সঙ্গী তরুণী ছিলো আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা। এক পর্যায়ে বৃদ্ধ ঋষি তরুণীর চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে দিলেন। সুলতান মাহমূদ তরুণীকে এক পলক দেখলেন, তার মনে হলো, এমন সুন্দরী তরুণী দ্বিতীয়টি তিনি কখনো দেখেননি। সুলতানের দৃষ্টি অনুপম সুন্দরীর প্রতি হঠাৎ যেনো থমকে গেলো। চকিতে তরুণীর চেহারা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বৃদ্ধ ঋষিকে সুলতান জিজ্ঞেস করলেন- “আপনি কেনো এসেছেন? আপনাকে কি মহারাজা পাঠিয়েছেন? স্থানীয় একজন মুসলমান দুভাষীর মাধ্যমে ঋষির সাথে কথা বলছিলেন সুলতান।

আমি মহারাজার কাছ থেকে কোন পয়গাম নিয়ে আসিনি। দৃঢ়তার সাথে বললো বৃদ্ধ ঋষি। বৃদ্ধের কথার মধ্যে ভাবগাম্ভীর্য ও তীব্র সম্মোহনী শক্তি রয়েছে তা লক্ষ্য করলেন সুলতান। সুলতান তার প্রথম বাক্য থেকেই বুঝতে পারলেন, এই ঋষি কোন সাধারণ মানুষ নয়।

আমি মহারাজার পয়গাম নিয়ে আসিনি বটে তবে তার অনুমতি নিয়েই এসেছি। মহারাজাই চারজন অশ্বারোহী সহ আমাকে দুর্গ থেকে বের করে পথ বলে দিয়েছেন। অবশ্য আমি নিজের পক্ষ থেকে আপনার পরবারে একটি পয়গাম নিয়ে এসেছি। আমি সোমনাথ মন্দিরের পণ্ডিত নই। আমি প্রতি বছর পনেরো বিশ দিনের জন্যে এখানে আসি। আমার মূল ঠিকানা হিমালয়ের পাদদেশে। সেখানে সারাবছর বরফ জমে থাকে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো আমি যখন এখানে এসেছি ঠিক এর দুদিন পরই আপনি এখানে এসেছেন, বললো ঋষি।

বিগত কয়েক দিনে আপনি দেখেছেন, সোমনাথ দুর্গের অধিবাসীরা কি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আছে। এ কয়দিনে হওয়া আপনার ক্ষয়ক্ষতির দিকে একটু দৃষ্টি দিন। কত যোদ্ধাকে আপনার হারাতে হয়েছে। আসলে আপনার এই ক্ষয়ক্ষতির কারণ সোমনাথবাসীর ক্ষোভ ও জিঘাংসা নয় প্রকৃত পক্ষে সোমনাথ মন্দিরের মহাদেব-এর ক্ষোভই মানুষের রূপ ধারণ করে আপনার সেনাদের উপর আপতিত হয়েছে। যে দেবতার পা সাগরে আর মাথা আসমানে অধম সেই মহাদেব এর একজন খাস পূজারী।

আপনি কি আপনাদের দেবতা সম্পর্কে আমাকে ভয় দেখাতে এসেছেন? আর এই তরুণীকে কি আপনাদের রীতি অনুযায়ী উপঢৌকন হিসেবে নিয়ে এসেছেন? মুচকি হেসে বললেন সুলতান।

নিজে নিজেকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলবেন না সুলতান। আমি আপনাকে ভয় দেখাতে আসিনি এবং কোন উপঢৌকন দিতেও আসিনি। আমি এসেছি আপনার উপকার করতে, আপনাকে মুক্তি দিতে। এ জন্য আমি একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।

শিবদেব এর শক্তি সম্পর্কে আপনি জ্ঞাত নন। শিবদেব তার শক্তির সামান্য আমাকে দান করেছেন। আমার অর্জিত সামান্যটুকু এতোটাই নগণ্য যেমন সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা পানি কিংবা মরুভূমির একটি বালুর কণা। আপনি যদি চান তবে আমি এই কণা পরিমাণ অর্জিত শক্তির দাপট দেখাতে পারি। তা দেখলে আপনি শিবদেব-এর মহাশক্তির পরিমাণ আন্দাজ করতে পারবেন ।

আর এই তরুণী? জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।

এই তরুণী জীবিত নয় মৃত। এটি একটি মৃত আত্মার খাঁচা মাত্র। আপনাকে হয়তো কেউ এখনো জানায়নি, যারা মারা যায় তাদের সবার আত্মা সোমনাথে চলে আসে। এই আত্মাটি অনেক দূর থেকে এসেছিল। আমি এটিকে এখানে নিয়ে এসেছি। আপনি যদি বিশ্বাস না করেন, তবে আমি এটিকে বাতাসে ঝুলিয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে পারি।

একথা বলেই ঋষি তরুণীর মাথা তার হাতের তালুতে নিয়ে তরুণীর চোখে চোখ রেখে বিড়বিড় করে কি যেন বললো। এর সাথে সাথেই তরুণীর মাথা দুলতে লাগলো। এরপর ঋষি তরুণীকে পাজাকোলা করে উঁচিয়ে ধরে বললো, তুমি এখন পালঙ্কের উপর শুয়ে আছে। দু’পা ও মাথা সোজা করে শুয়ে পড়ো। তরুণীর দু’পা এমন ভাবে সোজা হয়ে গেলো যেন সে পালঙ্কের উপর শুয়ে আছে। এ পর্যায়ে ঋষি তার দু’হাত তরুণীর দেহের নিচ থেকে সরিয়ে ফেললো। বিস্ময়কর ভাবে তরুণী শূন্যে ভাসতে লাগলো। ঋনি। এবার তরুণীর উড়না দিয়ে তাকে আপাদমস্তক ঢেকে দিলো।

সুলতান মাহমুদের দুই প্রহরী তাঁবুর দরজার ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলো। ঋষি তাদের একজনকে হাতের ইশারায় নির্দেশ দিলো, তরবারী বের করে তরুণীর পেটে এমনভাবে আঘাত করো যাতে মেয়েটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়।

প্রহরী ঋষির নির্দেশ বুঝতে পেরে সুলতানের দিকে তাকালো। কারণ সুলতানের নির্দেশ ছাড়া তার পক্ষে কিছু করার অবকাশ ছিলো না। সুলতান চোখের ইশারায় বললেন, ঋষি যা বলছে করো।

প্রহরী তরবারী কোষমুক্ত করে পূর্ণশক্তিতে আঘাত করলো। কিন্তু কিছুই কাটলো না। তরবারীর আঘাতে শুধু কাপড়টি গিয়ে তরবারী সাথে মাটিতে ঠেকলো। অবাক করার মতো তরুণীর দেহাবয়বের কোন অস্তিত্ব চাদরের ভেতরে ছিলো না।

এই অবস্থা দেখে বিস্ময়ে প্রহরীর চোখমুখ বিবর্ণ হয়ে গেলো। কিন্তু সুলতান তা দেখে মুচকি হাসলেন।

এখানে কোন দেহ ছিলো না। বললো ঋষি। এটি ছিলো আত্ম। তরবারী দিয়ে আপনি দেহ কাটতে পারেন কিন্তু আত্মা দেহাতীত, আত্মাকে কাটা যায় না। মহামান্য সুলতান! আপনি যদি চান তাহলে অল্প সময়ের জন্যে আমি আপনাকেও আত্মার জগতে পাঠিয়ে দিতে পারি, যেখান থেকে এই তরুণীর রূহ এসেছে।

ঐতিহাসিক ইবনুল জাওযী ও ইবনে যফির তৎকালীন দু’জন ঐতিহাসিকের বর্ণনা উল্লেখ করে লিখেছেন, সুলতান মাহমূদ একবার তার আধ্যাত্মিক গুরু শায়খ আবুল হাসান কিরখানীর দরবারে উপস্থিত। শায়খ তাকে বললেন, হিন্দুস্তান যাদুগীর ও সাধু সন্ন্যাসীদের স্বর্গভূমি। এমন যেনো না হয় যে, আপনার যেসব সেনাপতি ও কর্মকর্তা হিন্দুস্তানের বিজিত এলাকায় বসবাস করে তারা যাদুগীর ও সাধু সন্ন্যাসীদের হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। হিন্দুরাও ইহুদী খ্রিস্টানদের মতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সুন্দরী ললনাদের ব্যবহার করে। মাকড়সা যেমন মশা মাছিকে তার জালের ফাঁদে আটকে হত্যা করে হিন্দুরাও সুন্দরী রূপসীদের ফাঁদে ফেলে মুসলিম ক্ষমতাবানদের নিঃশেষ করে ফেলে।

সুলতান মাহমূদ নিজেও ছিলেন তীক্ষ্ণধী আলেম। আলেমদের সাথে ছিলো তার গভীর সখ্য ও হৃদ্যতা। তিনি নিজেও হিন্দুস্তান সম্পর্কে গভীর পড়শোনা করেছেন। তাছাড়া অসংখ্য যুদ্ধে হিন্দুস্তানের বহু শিক্ষিত লোককে যুদ্ধবন্দী করে তিনি গযনী নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকেও প্রচুর তথ্য তিনি আত্মস্থ করেন। হিন্দুস্তানীদের অনেক যাদুটোনার ক্ষমতা ও যোগীদের সাধনার ফলাফল দেখে তিনি বিস্ময়াভিভূত হতেন। বিশ্বাস করাই কঠিন হতো কোন মানুষ এতোটা ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে! তিনি হিন্দুস্তানী যোগীদের সাধনার এমন ঘটনাও শুনেছেন, কোন কোন যোগী নাকি আধা ঘন্টা পর্যন্ত নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিয়ে সারা শরীরের রক্তপ্রবাহ ও হৃদকম্পন স্তব্ধ করে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় পরে আবার দেহে প্রাণ ও হৃদকম্পন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। যোগবাদ প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সাধনা। যোগীরা যোগবাদ দিয়ে অসুস্থ মানুষকে যেমন সুস্থ করতে পারে আবার সুস্থ লোককেও অসুস্থ বানিয়ে ফেলতে পারে ।

ঋষি তরুণীকে দৃশ্যত গায়েব করে দিয়ে সুলতানকেও কিছুক্ষণের জন্য আত্মার জগতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তার দিকে অগ্রসর হলো। সুলতান মুচকি হেসে হাতের ইশারায় তাকে থামতে বললেন। ঋষি তাতেও না দমলে এক প্রহরী ঋষিকে ধরে থামিয়ে দিল। এ সময় দুভাষী ঋষিকে বললো, সুলতানের ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ শোভনীয় নয়।

সুলতান দু’ভাষীর উদ্দেশ্যে বললেন, ঋষিকে বলে দাও, সে তো সামান্য সময়ের জন্য আমাকে রূহের জগতে পাঠাতে পারে কিন্তু আমি সব সময়েই রূহের জগতে বিচরণ করতে পারি। আর এই তরবারী দিয়ে যদি আমি ঋষির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি তবে ঠিকই তরুণীর দেহ দৃশ্যমান হয়ে যাবে। তাকে বলে দাও, এক্ষুণি যেন তরুণীকে দৃশ্যমান করে। আমি এখানে যোগীদের খেলা দেখতে আসিনি।

এরপর বৃদ্ধ ঋষি তরুণীর উড়নাটি দু’হাতে নিয়ে একটি ঝাড়া দিয়ে দু’হাত প্রসারিত করলে চাদরটি দীর্ঘায়িত হলো আর তরুণী এর আড়াল থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। তরুণীর চোখে মুখে আবেশমাখা। সুলতান ঋষিকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে যেতে প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন। প্রহরীরা ঋষিকে ধরে তাঁবুর বাইরে নিয়ে গেলো।

ঋষিকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর সুলতান দুভাষীর মাধ্যমে তরুণীকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বুড়ো কেন তোমাকে নিয়ে এখানে এসেছে, তা পরিষ্কার বলে দাও। যদি না বলল, তাহলে তোমাকে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।

তরুণী একথা শুনে দীর্ঘ সময় সুলতানকে পর্যবেক্ষণ করলো এবং কিছুটা বিস্ময় ও আতঙ্কভাব তার চেহারায় ফুটে উঠলো। অতঃপর বললো–

আমাকে বলা হয়েছে, আপনি মুসলমানদের বাদশা…। আপনি কেমন বাদশা? আমাকে হাতে পেয়েও আপনি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন; অথচ আমি এমন এক তরুণী যাকে হাত ছাড়া করতে চায় না কোন রাজা মহারাজা। আপনি জানেন না, আমি রাজা মহারাজাদের কাছে কি মূল্যবান রত্ন?

দেখো, আমি যে জন্যে সোমনাথ আক্রমণ করেছি এ সম্পর্কে আমি মোটেও অসতর্ক নই। আমি জানি আমার মিশন কিভাবে সফল করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কি কি বাধা বিপত্তি আসতে পারে। তরুণীর উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান।

আমি তোমার কাছে জানতে চাচ্ছি, এই বুড়োকে কি পাঠানো হয়েছে, না সে নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছে? তোমার রূপ সৌন্দর্য আর তোমার রূপের কূটনীতিতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। হিন্দু রাজাদের মতো আমরা মদ নারীতে আসক্ত নই। আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না। তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, তাহলে তোমাকে সসম্মানে ফেরত পাঠানো হবে।

তরুণী দুভাষীর দিকে তাকিয়ে বললো, আপনি বাইরে চলে যান। দুভাষী সুলতানকে বললো, তরুণী আমাকে বাইরে চলে যেতে বলছে।

একথা শুনে সুলতান রাগত ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তরুণীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি যদি এখানে মরতে এসে থাকো, তাহলে এক্ষুণি আমি তোমার মৃত্যুর ব্যবস্থা করছি। তবে এই মৃত্যু তরবারীর আঘাতে হবে না, তোমার দু’পা দু’টি ঘোড়ার সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হবে আর ঘোড়াকে দুর্গ ফটকের দিকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। দুর্গ ফটক পর্যন্ত যাওয়ার আগেই তোমার দেহ দুভাগ হয়ে যাবে আর হাড় থেকে মাংস খসে খসে পড়বে।

একথা দুভাষীর মাধ্যমে শোনার পর তরুণী আতঙ্কিত হয়ে পড়লো এবং বললো, তাকে সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মহারাজার কাছে নিয়ে যায়, মহারাজা তাকে এই বৃদ্ধ ঋষির সাথে আসতে এবং তার নির্দেশ মেনে চলার হুকুম করেন। আমাকে বলা হয়েছে, তোমরা যদি গযনী সুলতানের তাঁবু পর্যন্ত যেতে পারো তাহলে ঋষি ঋষির কাজ করবে, তোমার কাজ হবে রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে নিজেকে সুলতানের জন্য মেলে ধরা । সুলতান যেহেতু পুরুষ তাই সে নিশ্চয়ই মদ ও নারীভোগ করে থাকে। সুলতানকে রূপের যাদুতে আটকে তার পানীয়ের মধ্যে আংটির টোপের ভেতরের বিষয় মিশিয়ে দেবে। তরুণীর ডান হাতের মধ্যমায় একটি স্বর্ণের দৃষ্টিনন্দন আংটি ছিলো। সে এটির টোপ খুলে দেখালো এর ভেতরে সামান্য তুলা আছে, যাতে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিষ। এই বিষই সুলতানের পানীয়ের মধ্যে মেশানোর কথা ছিলো।

দুর্গের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে সে বললো, মন্দিরে এক দিকে চলছে নর্তকীদের নাচ ও আরাধনা আর অপর দিকে পুরোহিত পণ্ডিতেরা মন্দিরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নর্তকী ও সেবাদাসীদের নিয়ে তাদের সাথে পাশবিকতায় মেতে উঠেছে; আর বলছে, শিবদেব তোমাদের ইজ্জতের নজরানা চাইছেন। অধিবাসীদের সম্পর্কে তরুণী বললো, প্রতিটি নাগরিকই শহর ও মন্দির রক্ষার জন্যে তাদের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত কিন্তু দুঃসাহসী হলেও তাদের মধ্যে এখন আতঙ্কও বিরাজ করছে।

আমি এই মন্দিরের সবচেয়ে দামী সেবিকা। আমাকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। দেখতেও আমি সবচেয়ে সুন্দরী। সাধারণ হিন্দুরা এই মন্দির, পণ্ডিত ও আমাকে অতি পবিত্র জ্ঞান করে। কিন্তু আমি জানি এই মন্দির, সেবাদাসী ও পুরোহিত পণ্ডিতেরা কতোটা পবিত্র। আমার কোন রীতি ধর্ম নেই। আপনি আমাকে যৌনদাসীরূপে গ্রহণ করুন। এ মুহূর্তে আপনার কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা ও নিবেদন। আমি জীবন দিয়ে আপনার সেবা করবো কারণ প্রভুর সেবা ও মনোরঞ্জন আমার ধর্ম । আমার আর কোন ধর্ম নেই।

সুলতান মাহমূদ তরুণীর সাথে কথা আর দীর্ঘ না করে বৃদ্ধ ঋষিকে তাঁবুর ভেতরে ডেকে এনে বললেন, আমি বিগত পঁচিত বছর ধরে হিন্দুস্তানে আসা যাওয়া করছি। তুমি কি বুঝতে পারোনি, আমি হিন্দুস্তানের যোগী সন্ন্যাসীদের যাদুটোনা ও যোগসাধনা সম্পর্কে অনবহিত নই। আমি তোমাদের মতো মাটির নিষ্প্রাণ মূর্তির পূজারী নই ঋষি! আমি একটি পবিত্র ধর্মের অনুসারী। আমরা ধর্ম ও রাজত্ব রক্ষার্থে আমাদের মা বোনদের ইজ্জতের সওদা করি না বরং যে কোন নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে আমরা জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না। আমরা তোমাদের মতো আমাদের তরুণীদের উলঙ্গ করে নাচাই না এবং শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে মা-বোনদের শত্রু শিবিরে প্রেরণ করি না।

কার ধর্ম সত্য আর কোন ধর্ম অসত্য আমি এখানে এই নিয়ে বিতর্ক করতে আসিনি সুলতান! দৃঢ়কণ্ঠে বললো ঋষি। আমাদের মেয়েরা ধর্মের জন্য নিজেদের জীবন ও ইজ্জত কুরবান করে দেয় এটা আমাদের ধর্মের শিক্ষা। আপনার চেয়ে আমার বয়স ঢের বেশী সুলতান। আপনি আপনার সেনাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখুন না, তারা প্রত্যেকেই কি আপনার মতোই ঈমানদার? আপনি কি তাদের ঈমান রক্ষার জন্য সব সময় তাদের পাশে থাকবেন?

আপনার অবর্তমানে ঠিকই আমাদের তরুণীরা আপনার সেনাদের ঈমান তাদের রূপ জৌলুসে কিনে নেবে।

আমি যে উদ্দেশ্যে এসেছিলাম, আমার পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। তাই জীবনের শেষ লগ্নে আপনাকে কিছু সত্য কথা বলে দিচ্ছি। আপনি একদিন থাকবেন না, কিন্তু আমাদের তরুণীরা থাকবে, তারা ঠিকই ইজ্জতের বিনিময়ে আপনার লোকদের দাসে পরিণত করবে। কারণ তাদেরকে আমরাই এ শিক্ষা দিয়ে থাকি। আপনি আমাকে হত্যা করে ফেলুন, এই তরুণীকেও মেরে ফেলুন বা আপনার যৌনদাসী রূপে রেখে দিন। একথা বাস্তব, হিন্দুরা ভারত মাতার কোলে ইসলামের উত্থান ঠেকাতে যা যা করণীয় এর সবকিছুই করবে। এক সময় ঠিকই ভারতের সীমানা থেকে ইসলাম বিতাড়িত হবে।

সুলতান মাহমূদ বৃদ্ধ ঋষির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। তার মধ্যে না ছিলো ক্ষোভের লক্ষণ না ছিলো উদ্বেগ। তিনি স্মিত হাসছিলেন। বৃদ্ধ ঋষি বললো, মৃত্যুর আগে আমি আপনাকে মহারাজা রায়কুমারের একটি প্রস্তাব পেশ করছি। মহারাজা রায়কুমার বলেছেন, আপনার যতো ধন দৌলত সোনা দানা ও এমন সুন্দরী দরকার সবই আপনার তাঁবুতে পৌঁছে দেয়া হবে যদি আপনি যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে ফিরে যান। আমি আপনাকে এই প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছি, আপনার ফিরে যাওয়ার পথে আমাদের কোন সেনা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। যদি আমার প্রস্তাব আপনার মনোপুত না হয় তবে আমি আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে আরো তিন মহারাজার সৈন্যসামন্ত এখানে এসে পৌঁছে যাবে, তারা আপনাদের উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করবে, তখন হিন্দু সমরশক্তি ও সোমনাথের মাঝখানে আপনি দু’দিকের আক্রমণে ফেঁসে যাবেন। তখন হয়তো আপনার বাহিনীর কি পরিণতি হয়েছিলো এ খবরটি গযনীবাসীকে জানানোর জন্যেও আপনার কোন সেনা জীবন নিয়ে পালাতে পারবে না ।

চুপ কর! হিন্দুস্তানের কুত্তা…! ভাবভঙ্গিতে ঋষির কথা অনুধাবন করে গর্জে উঠলো এক প্রহরী এবং সে উত্তেজিত হয়ে তরবারী বের করে ফেললো।

সুলতান মাহমুদ হাতের ইশারায় প্রহরীকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, ‘আরে! একি করছো তুমি! এই বৃদ্ধ আমাদের বন্দী নয়, মেহমান। সে রাজার দূত হয়ে এসেছে।

সুলতান ঋষিকে বললেন, মাফ করবেন জনাব, আমার এই সৈনিক আপনার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে, এজন্য আমি আপনার কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি ।

আমাদের কোন মহারাজার সামনে যদি এমন গোস্তাখী করা হতো, তাহলে এমন ঔদ্ধত্যের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হতো। বললো বৃদ্ধ ঋষি।

‘আমরা এ মুহূর্তে আমাদের মহান প্রভু আল্লাহর দরবারে রয়েছি, বললেন সুলতান। এখানে কেউ কারো প্রভু কিংবা প্রজা নয়। তাই কেউ কাউকে হত্যা করার অধিকার রাখে না। এই সৈন্যরা আমার নির্দেশে এখানে আসেনি, আল্লাহর নির্দেশে এসেছে। আমাকে শুধু এদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমি তাদের আবেগ, ক্ষোভ ও উল্লাসকে শিকল বন্দী করতে পারি না।

একথা বলতে বলতে সুলতান দাঁড়িয়ে এক প্রহরীকে বললেন, এই বৃদ্ধ ও তার সঙ্গী তরুণীকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছে দিয়ে আস। যাওয়ার সময় সুলতান ঋষির উদ্দেশ্যে বললেন, রাজাকে গিয়ে বলবেন, সোমনাথকে একটি নষ্ট নর্তকী আর এক বুড়ো যোগী ও কিছু সোনাদানার বিনিময়ে রক্ষা করা যাবে না । আমরা এখান থেকে জীবন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যে আসিনি। ঋষি বাবু, আপনার এই নষ্টা মেয়েটিকে নিয়ে যান।

বৃদ্ধ ঋষি দীর্ঘক্ষণ এক পলকে সুলতানের দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ সে সামনে অগ্রসর হয়ে সুলতানের ডান হাত ধরে চুমু খেয়ে বললো- আমি দিব্যি সুলতানের বিজয় দেখতে পাচ্ছি। একথা শেষ করেই সে দ্রুত মেয়েটিকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল।

* * *

সোমনাথের বিজয়ের ঘটনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করলে হাজার পৃষ্ঠা লেগে যাবে। হিন্দুরা জীবন সম্পদ করার পাশাপাশি চক্রান্তমূলক বহু অপচেষ্টা করেছে গযনী বাহিনীর সেনাদের বিভ্রান্ত করতে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এ যুদ্ধে গযনী সেনারা যে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা ইতিহাসে বিরল। এছাড়া সুলতান মাহমূদের সোমনাথ অভিযানের তুলনা ইসলামের ইতিহাসের দু’একটির সাথে তুলনা করা চলে। মহাভারতের ইতিহাসে এটি ছিলো একটি অতুলনীয় স্মরণীয় যুদ্ধ। কিন্তু হিন্দু-ঐতিহাসিকগণ এই যুদ্ধকে গুরুত্বহীন করতে খুব কাটছাট করে তা বর্ণনা করেছেন।

যে রাত সুলতানের কাছে বৃদ্ধ ঋষি এসেছিলো, সুলতান মাহমূদের জীবনে সেই রাতটি ছিলো একটি স্মরণীয় রাত। তার কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছিলো, ইতোমধ্যে দুই হিন্দু মহারাজার সৈন্য মুসলিম বাহিনীকে ঘেরাও করার জন্যে অগ্রসর হচ্ছে। সুলতান সারারাত তার কমান্ডার ও সেনাদেরকে দুর্গ প্রাচীরে কার্যকর হামলার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছিলেন।

সুলতান বাইরের আক্রমণ আশঙ্কায় আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু তিনি অবাক হলেন, এই দুইটি বাহিনী এতোটা নীরবে কি করে এতোটা কাছে পৌঁছে গেলো!

সুলতান তার দূরদর্শিতায় হিন্দুদের আক্রমণ কৌশল বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈকে বললেন, এখন হামলা করবেন না, আমদের পেছন দিক থেকে যখন আক্রমণ হবে তখন ভেতরের সৈন্যরা ফটক খুলে বেরিয়ে এসে আমাদের উপর আক্রমণ করবে, আপনি দু’বাহুকে যথাসম্ভব ছড়িয়ে দিন। ফটক খুলে যেতেই ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করতে হবে।

পিছন দিক থেকে আসা দু’মহারাজার সেনাদের মধ্যে এক দলের নেতৃত্বে ছিলেন মহারাজা পরমদেব। কোন কোন ঐতিহাসিক তার নাম ভ্রম্মদেব লিখেছেন আর অপরজন ছিলেন দেবআশ্রম।

পিছন দিকের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে যে সেনা ইউনিট সুলতান মাহমূদ নিয়োগ করেছিলেন, তার নেতৃত্বে ছিলেন সেনাপতি আবুল হাসান। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে সুলতান তাদের কাছে পৌঁছলেন। তখন অবস্থা খুব সঙ্গীন। সুলতান সেনাপতিকে বললেন, মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে দুই বাহু দিয়ে আক্রমণ করো। সুলতান একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তখন উভয় দিকে সৈন্যরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে গেছে। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে অশ্বারোহী সৈন্যের ঘোড়া। গযনী সেনাদের নারায়ে তাকবীরে জমিন কাঁপছে।

এদিকে হামলা হতেই সোমনাথ দুর্গের প্রধান ফটক খুলে গেলো। বহু সংখ্যক সেনা দুর্গ থেকে বের হয়ে অবরোধকারীদের উপর একসাথে হামলে পড়লো। এবার হিন্দুরা নয় গযনী সেনারা ঘেরাও হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সুলতানের চেহারা মলিন হয়ে গেল। কারণ উভয় রাজার সৈন্যরা তাদের বাহুতে আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো। দ্রুতই তারা কৌশল বদল করে নিতে সক্ষম হলো।

অবস্থা এমন হলো যে, এটাকে কোন গতানুগতিক যুদ্ধ বলার অবকাশ ছিলো না। রীতিমতো একটা ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ। উভয় দিকের সৈন্যরাই হতাহত হচ্ছিল। জীবন দিতে আর জীবন নিতেই যেনো উভয় সেনাদল মরিয়া হয়ে পড়লো। অবশ্য প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ এমন অবস্থাতেও সাফল্যের সাথেই দুর্গ থেকে আসা হিন্দুসেনাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করছিলেন। এভাবে চলে গেলো দিনের অর্ধেক। সুলতান দেখলেন তার কোন চালই আশানুরূপ ফলপ্রসূ হচ্ছে না। দৃশ্যত গযনী বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে। কারণ হিন্দু সেনারা একেতো তাজাদম তদুপরি তারা নিত্য নতুন সৈন্য দিয়ে ঘাটতি পূরণ করে নিচ্ছে।

যুদ্ধের অবস্থা যখন চরম হতাশাজনক ঠিক এমন সময় সুলতান লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নীচে নেমে দু’রাকাত নফল নামায পড়লেন। এমনটি তিনি এবারই প্রথম করেননি। আরো বহু বার করেছেন এবং নামাযের পরই যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে যেতে দেখা গেছে। এবারও তিনি দু’রাকাত নামায পড়লেন। নামাযে তার দু’চোখ গড়িয়ে পড়লো অশ্রু। সেনাপতি আবুল হাসান তার কাছেই দাঁড়ানো। সুলতান নামায শেষ করে সেনাপতি আবুল হাসানের হাত ধরে উচ্ছ্বাসের সাথে বললেন, “আবুল হাসান! বিজয় আমাদের!” তিনি আবুল হাসানকেও অশ্বারোহণ করার কথা বলে গযনী বাহিনীর পতাকা আরো উঁচু করে ধরার নির্দেশ দিয়ে নিজে সাধারণ সৈনিকের মতোই লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে গেলেন। সেনারা তখন চিৎকার দিয়ে একে অপরকে জানিয়ে দিলো, গযনীর যোদ্ধারা। সুলতান নিজে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছেন, এগিয়ে যাও, মুশরিকদের কেটে ফেলো।

অন্যান্য যুদ্ধের মতো সুলতান হাতে তরবারী নেয়ার পর যুদ্ধের কায়া বদলে গেল। ঐতিহাসিক ফরিশতা লিখেছেন, সুলতান মাহমুদের নেতৃত্বের এই হামলা এতোটাই ভয়াবহ ছিলো যে, অল্পক্ষণের মধ্যে দুই রাজার সৈন্যদের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো এবং গযনীর কিছু সংখ্যক যোদ্ধা উভয় রাজার রক্ষণভাগে আক্রমণ করে তাদের ঝাণ্ডা গুঁড়িয়ে দিলো। ফলে উভয় রাজা জীবন বাঁচাতে রণাঙ্গন ছেড়ে পালালো। এরপর শুরু হলো উভয় রাজার সৈন্যদের কচুকাটা। কিছুক্ষণের মধ্যে পাঁচ হাজার হিন্দু সৈন্যের মরদেহ গযনী সেনাদের ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হতে লাগলো। কিছু সংখ্যক হিন্দু সেনা পালানোর চেষ্টা করলো কিন্তু গযনীর সিংহশাবকেরা তাদের পালাতে দিলো না। তরবারীর আঘাতে সবাইকে ধরাশায়ী করে ফেললো।

* * *

যুদ্ধরত অবস্থাতেও সুলতানের কাছে প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহর দুর্গ থেকে আসা হিন্দুদের মোকাবেলার পুনঃপুনঃ রিপোর্ট আসছিলো। এদিকের যুদ্ধ শেষ হলে সুলতান আবু আব্দুল্লাহর কাছে খবর পাঠালেন, তুমি যুদ্ধ করতে করতে ওদের না বুঝতে দিয়ে পিছিয়ে এসো। প্রধান সেনাপতি এই কৌশল অবলম্বন করলে সোমনাথ দুর্গের সৈন্যরা গযনী বাহিনীর উপর চাপ বৃদ্ধি করার লোভে অনেক খানি এগিয়ে এলো। এ পর্যায়ে সুলতান সেনাপতি আবু হাসানকে নির্দেশ দিলেন, তুমি দুর্গপ্রাচীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে হিন্দুদের উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করো। তখন দুর্গের ফটক বন্ধ ছিল।

গযনী বাহিনী যখন হিন্দুদের উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করল, তখন তারা জানতে পারলো তাদের সহায়তার জন্যে রাজা ব্ৰহ্ম ও রাজা দেবআশ্রমের নেতৃত্বে যে দুটি সেনাদল এসেছিলো তাদের সবাই নিহত হয়েছে এবং তারা এখন গযনী বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে রয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে হিন্দুদের মনোবল ভেঙ্গে গেল। ঝিমিয়ে পড়লো তাদের আক্রমণের তেজ। তখন হিন্দু সেনারা আত্মরক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত হলো এবং পিছিয়ে এসে দুর্গে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু গযনীর সেনারা তাদের পিছনে সরে যাওয়ার অবকাশ দিলো না। সামনে যাওয়া মাত্রই কচুকাটা করছিলো।

অপরদিকে গযনীর একদল প্রশিক্ষিত সৈনিক দুর্গ প্রাচীর ও ফটক ভাঙ্গার কাজে লেগে গেল। যেসব হিন্দু দুর্গপ্রাচীরের উপরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলো এরা চিৎকার শুরু করে দিলো, সোমনাথের সব সেনা মারা গেছে। মুহূর্তের মধ্যে সারা শহরে এখবর ছড়িয়ে পড়লো। এ খবর শুনে যেসব সেনা দুর্গের ভেতরে ছিল তারা দুর্গের পেছন তথা সমুদ্রপাড়ের ফটক খুলে নৌকা করে পালাতে শুরু করে দিলো। এ খবর সুলতান মাহমূদের কানে পৌঁছলে তিনি বললেন, ওপাশের সেনা ইউনিট যেন নৌকা কজা করে ওই ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে।

নির্দেশ পৌঁছা মাত্রই ওইপাশে কর্তব্যরত সেনা ইউনিট কিছু নৌকা কজা করে পলায়নপর হিন্দুসেনাদের উপর তীর বর্ষণ শুরু করলো আর কিছু সেনা নৌকায় আরোহণ করে সমুদ্রের দিকের ফটকে পৌঁছে গেল। ফটক ছিলো খোলা এবং সেখানে কোন নিরাপত্তারক্ষী ছিলো না। ফলে বিনা বাধায় তারা দুর্গে প্রবেশ করলো।

এদিকে তখন প্রধান দুই ফটক খুলে ফেলা হয়েছে। কারো কারো মতে শহরের চোরা গলিতে গযনী সেনাদের নাস্তানাবুদ করার জন্যে হিন্দুরাই দুর্গ ফটক খুলে দিয়েছিলো।

বস্তুত দুর্গে তখন গযনী সেনারা দলে দলে ঢুকে পড়েছে। শহরের অধিবাসীরা তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু সবাই কাটা পড়ছে। শহরের হিন্দুরা উপর থেকে তীর ছুঁড়ে অনেক গযনী সেনাকে আহত করেছে। বহু হিন্দু মহিলা ছাদের উপর থেকে গযনী সেনাদের উপর পাথর ছুঁড়ে হতাহত করেছে। এই অবস্থা দেখে কিছু সেনা কয়েকটি বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলে হিন্দুরা আতঙ্কিত হয়ে প্রতিরোধের আশা ত্যাগ করে আত্মরক্ষার জন্যে ছুটাছুটি শুরু করে। শহরের লোকদের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে সোমনাথের সকল প্রতিরোধ যোদ্ধা নিহত হয়েছে। যারা দুর্গের ভেতরে ছিলো তারাও সমুদ্র পথে পালিয়ে গেছে। এ খবর শোনার পর সাধারণ হিন্দুদের প্রতিরোধ যুদ্ধ থেমে যায়। তারা পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে যে যার মতো করে জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধ থেমে যায়।

এ যুদ্ধে সোমনাথ ও বাইরে থেকে আসা যোদ্ধারা মিলে প্রায় পঞ্চাশ হাজার হিন্দু নিহত হয়। প্রায় চার হাজার হিন্দু সমুদ্রপথে পালাতে চেষ্টা করে কিন্তু তাদের অনেকেই তীরাঘাতে নিহত হয়। কেউ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে মারা যায়। নৌকা উল্টে অনেকের সলিল সমাধি ঘটে।

১০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি ৪১৭ হিজরী সনের ১৬ যিলহজ্জ সোমনাথ মন্দির সুলতান মাহমূদের করতলগত হয়।

* * *

বিজয়ী সুলতান সোমনাথ মন্দির এবং মন্দিরের কারুকার্য দেখে অভিভূত হন। তখনকার সোমনাথ মন্দির ছিলো ভারতীয় স্থাপত্য শৈলীর অনুপম নিদর্শন। সোমনাথ মন্দিরের সিঁড়িতে হাজারো পুরোহিত পণ্ডিত হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। সুলতান পণ্ডিতদের এমন অবস্থা দেখে দুভাষীর মাধ্যমে বললেন, ওদেরকে বলো হাত গুটিয়ে নিতে, আমি সোমনাথের মূর্তি নই। এদের বলে দাও, তাদের উপর কোন অত্যাচার করা হবে না।

সুলতান মন্দিরের সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে উঠতে এক প্রহরীকে একটি সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের কুড়াল আনার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি মন্দিরের মূলবেদিতে আরোহণ করে মন্দিরের প্রধান শিবমূর্তির নাক ভেঙ্গে ফেললেন। সেনাদের নির্দেশ দিলেন, এই মূর্তিটিকে ভেঙ্গে ফেলো। সমবেত হাজার হাজার পণ্ডিত পুরোহিত আর্তচিৎকার করে উঠলো। শীর্ষস্থানীয় পুরোহিতেরা সুলতানের কাছে শিবমূর্তি না ভাঙ্গার জন্যে অনুরোধ করলো। তারা সুলতানের পায়ে পড়ে নিবেদন করলো, মন্দিরের সকল গোপন ভাণ্ডার আমরা আপনার পায়ে লুটিয়ে দেবো, দয়া করে এই শিবমূর্তি ও মন্দির অক্ষত রাখুন।

সুলতান ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে তাদের বললেন, গযনীর হাজার হাজার মায়ের বুক খালি করে এবং বোনকে বিধবা ও শিশুকে এতিম করে আমি এখানে সওদা করতে আসিনি। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন, সুলতানের দুই সেনাপতিও তার বড় ছেলে মাসউদ পণ্ডিতদের আবেদন মেনে নেয়ার জন্য সুলতানকে প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সুলতান তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, তোমরা কি আমার আখেরাত বরবাদ করে দেয়ার চেষ্টা করছো? আমি চাই, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আমাকে ডেকে বলুন, সবচেয়ে বড় মূর্তি সংহারী কোথায়? তাকে হাজির করো। আল্লাহ তাআলা যেন এভাবে না ডাকেন, সোনাদানার বিনিময়ে যে মূর্তিপূজারীদের মূর্তিদান করেছিলো সেই ব্যবসায়ী মাহমূদকে আমার সামনে হাজির করো। এই আহ্বানকে আমি ভয় পাই। ইতিহাস আমাকে মূর্তিপূজা সহায়ক না বলে মূর্তি সংহারী বলে অভিহিত করুক, এটা কি ভালো নয়?

সুলতান নির্দেশ দিলেন, শিবমূর্তির দু’টুকরো গযনী যাবে। একটি আমার বাড়ির সামনে রাখা হবে আর অপরটি রাখা হবে গযনী জামে মসজিদের সামনে। আর অন্য দুটি অংশ মক্কা মদীনায় পাঠানো হবে। অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন, সুলতানের নির্দেশ মতো শিবমূর্তির চারটি টুকরো সেভাবেই পাঠানো হয় এবং তা আজো সেভাবেই সংরক্ষিত আছে।

শিবমূর্তিকে ভেঙ্গে মন্দিরের বাইরে নিয়ে এলে সোমনাথ মন্দিরের কারুকার্যময় সেগুন কাঠের পায়ে দাহ্যপদার্থ ছিটিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। মুহূর্তের মধ্যে মহাভারতের হিন্দুদের গর্ব ও ঐতিহ্যের চন্দ্রদেবতার দেবালয় আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে উঠলো। বিশাল অগ্নিকুণ্ডলী ঘোয়া আর পোড়ার শব্দে হিন্দুদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ছাইভস্মে পরিণত হলো। যে দেবতারা ছিলো হিন্দুদের মতে জীবনমৃত্যুর মালিক তারা আজ নিজের অস্তিত্বকেই রক্ষা করতে পারলো না।

সোমনাথের মহারাজা রায়কুমার ছিলেন নিখোঁজ। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। সুলতান মাহমূদের সেনারা মন্দির থেকে যেসব সোনাদানা মণিমুক্তা সংগ্রহ করেছিলো বর্তমানের মূল্যে তা কয়েকশ হাজার কোটি টাকা মূল্যমান ছিলো।

মন্দির যখন জ্বলছিল, সুলতান তখন দুর্গ প্রাচীরে উঠে একটি বুরুজে দাঁড়িয়ে চারদিকের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। শহরের বহু জায়গা থেকে আগুনের কুণ্ডলী উঠছে। দলে দলে হিন্দু অধিবাসী ফটক গলে শহর ছেড়ে যাচ্ছে। তাদেরকে কেউ বাধা দিচ্ছে না। চতুর্দিকে রক্ত আর রক্ত। শহরের বাইরে শুধু লাশ আর লাশ। চারদিকে রক্ত আর লাশের স্তূপ। দুর্গের বাইরে অনেক আহত লোক উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, কেউ কেউ মাথা উঁচু করে আবার পড়ে যাচ্ছে। আহতরা সবাই হিন্দু সেনা। তাদের সেবা তত দূরে থাক, যারা শহর ছেড়ে যাচ্ছে, তারা আহত সেনাদের তাকিয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করছে না।

গযনী সেনারা সহযোদ্ধাদের লাশগুলো উঠিয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করছে আর আহতদের তুলে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। সুলতান মাহমূদের দৃষ্টি রণাঙ্গনের চতুর্দিক পর্যবেক্ষণ করছিলো। না জানি তার মনের মধ্যে কি ভাবনা তখন বিরাজ করছিল। তিনি দেখতে পেলেন, দুর্গের ফটক পেরিয়ে দলে দলে হিন্দু নারীপুরুষ ছেলে বুড়ো কন্যা জায়া দুঃখভারাক্রান্ত মনে দুর্গ ছেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা দেখে তিনি পাশে দাঁড়ানো একসেনা কর্মকর্তাকে বললেন, নীচে গিয়ে দুর্গ ফটকে ঘোষণা করে দাও, গযনীবাহিনীর অত্যাচারের ভয়ে কোন শহরবাসীকে শহর ছেড়ে যেতে হবে না। সাধারণ নাগরিকদের উপর গযনী বাহিনী কোন জুলুম করবে না। এ সময় সুলতান আপন মনেই স্বগোতোক্তি করলেন- এরা কি এখনো বুঝতে পারেনি, জয় পরাজয় জীবনমৃত্যুর মালিক এসব পাথুরে মূর্তির হাতে নয় লা শারিক আল্লাহর হাতে? তার একথার কোন জবাব কারো মুখে উচ্চারিত হলো না।

.

সুলতান মাহমুদের গোয়েন্দা শাখা স্থানীয় কয়েকজনকে গোয়েন্দা বিভাগে নিয়োগ দেয়। তারা জানায়, যেসব সেনা গযনী বাহিনীর উপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিলো, তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলো রাজা পরমদেব। এই আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে গযনী বাহিনীর তিনহাজার সেনাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। স্থানীয় গোয়েন্দারা জানালো, সোমনাথ থেকে একশ বিশ মাইল উত্তরে গভী নামক স্থানে রাজা পরমদেবের রাজধানী অবস্থিত। গভী চারদিক থেকে সাগর বেষ্টিত।

এই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সুলতান মাহমূদ এতোটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তিনি তাৎক্ষণিক গভী অভিযানের নির্দেশ দিলেন। সুলতান সেখানে পৌঁছে দেখলেন, গন্দভী দুর্গে পৌঁছা কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ চতুর্দিকেই অথৈই পানি। অবশ্য একপাশে পানি কিছুটা কম। আরো খবর পাওয়া গেলো, পরমদেব নিজেই নিজেকে দুর্গবন্দী করে রেখেছে।

আবুল কাসিম ফারিশতা লিখেছেন, একরাতে সুলতান মাহমুদ কুরআন কারীম তেলাওয়াত করলেন। কিছু বিশেষ আয়াত পাঠ করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে সাহায্যের জন্য মোনাজাত করলেন। পরদিন সকালে দেখা গেলো, সমুদ্রের পানি অনেক কমে গেছে। যেদিকে পানি কমছিল সেদিকের এলাকাটিতে পানি নেই বটে, কিন্তু অনেক কাদা। সুলতান তার সেনাদেরকে কাদার মধ্য দিয়ে অভিযানের নির্দেশ দিলেন এবং নিজেও সেনাদের সাথে দুর্গের কাছে পৌঁছে গেলেন।

গয়নী বাহিনী দুর্গে আক্রমণ পরিচালনার কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্গফটক খুলে গেল। দুর্গে প্রবেশ করে জানা গেল, রাজা পরমদেব সমুদ্রপথে পালিয়ে গেছেন। গভীর হিন্দু সেনা সোমনাথ যুদ্ধে গযনী বাহিনীর ভয়ঙ্কর আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে হাজার হাজার সহযোদ্ধাকে হারিয়ে মাত্র কিছুসংখ্যক প্রাণ নিয়ে গভীতে পালিয়ে আসতে পেরেছিল। এরা এমনিতেই ছিলো হতোদ্যম হীনবল। তারা প্রতিরোধের কোন চেষ্টা না করেই আত্মসমর্পণ করলো। সুলতান গন্ধভী দুর্গ লোকশূন্য করার নির্দেশ দিলেন।

সুলতান এ দুর্গে কিছুদিন অবস্থান করলেন। জায়গাটি ছিলো বর্তমান গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত। এখানকার আবহাওয়া ছিলো খুবই স্বাস্থ্যকর এবং পরিবেশ খুবই মনোমুগ্ধকর। সুলতানের জায়গাটি খুব পছন্দ হলো। তিনি এটি গযনী সালতানাতের কেন্দ্রীয় রাজধানী করার মত ব্যক্ত করলেন।

সুলতান তার ছেলে মাসউদকে বললেন, তুমি গযনী চলে যাও। সেখানকার প্রশাসনের দায়িত্ব তোমার হাতে নাও, আমি এখানেই থাকতে চাই।

আপনি এখানে থেকে গেলে সেলজুকী ও খোরাসানীরা কি বলবে না সুলতান মাহমূদ ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গেছে? বললেন মাসউদ। অথচ বহু রক্ত ক্ষয়ের বিনিময়ে আমরা খোরাসান জয় করেছি।

আপনি এখানকার কোন স্থানীয় লোককে এই অঞ্চলের গভর্নর নিযুক্ত করুন সুলতান! প্রস্তাব করলো সুলতানের এক উপদেষ্টা। কারণ গযনীর অবস্থা এমন যে, আপনার অনুপস্থিতিতে তার কেন্দ্রীয় মর্যাদা ও গুরুত্ব ধরে রাখতে পারবে না।

অনেক চিন্তা ভাবনা করে অবশেষে উপদেষ্টাদের পরামর্শ মেনে নিলেন সুলতান। তিনি পুনরায় সোমনাথ দুর্গে ফিরে গেলেন। যথেষ্ট যাচাই বাছাই করে অবশেষে রাজা দেবআশ্রমকে সোমনাতের গভর্নর নিযুক্ত করে তিনি গযনী ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে সেনাদের নির্দেশ দিলেন।

সুলতান নবনিযুক্ত গভর্নর দেবআশ্রমকে জানালেন, তিনি মুলতানের পথে ফিরে যেতে চান না। অন্য কোন সহজগম্য ও কম দূরত্বের পথে তিনি গযনী ফিরতে চান, তবে তার অন্য কোন পথ জানা নেই।

গভর্নর দেবআশ্রম সুলতানকে রানকোচ হয়ে বেলুচিস্তানের মাঝ দিয়ে গযনী যাওয়ার পথের কথা জানালেন। কারণ বেলুচিস্তান পৌঁছে গেলে সুলতান সহজেই গযনী পৌঁছতে পারবেন।

এ সময় রাজা দেবআশ্রমের রানী সেখানে উপস্থিত ছিল। রানী বললো, আমরা সুলতানকে এমন দুজন গাইড দেবো যারা সহজেই আপনাদের নিয়ে যেতে পারবে। কারণ রানকোচের পর যে মরু এলাকা সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে অনবহিত লোকের পক্ষে পানির উৎস খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

* * *

বিজয়ী আবেশে ফিরে যাচ্ছিল গযনী বাহিনী। তাদের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কয়েক হাজার সহযোদ্ধাকে হারিয়ে ছিল গযনী সেনারা। সহযোদ্ধাদের লাশগুলো সোমনাথ দুর্গের বাইরে একটি খোলা জায়গায় গণকবর দেয়া হয়। বহু আহত যোদ্ধাও ছিল কাফেলায়। ছিলো মাল পত্র ও মালে গযনীমত বোঝাই বহুসংখ্যক উট। সাধারণ যোদ্ধারা এখন আর তাকবীর ধ্বনী দিচ্ছিল না, তারা সমস্বরে রণসঙ্গীত গেয়ে সানন্দে পথ অতিক্রম করছিল। সোমনাথ যাওয়ার পথে তারা যে ভয়ঙ্কর মরুভূমি অতিক্রম করেছিলো, এই মরু ভয়াবহতার কথা তাদের আজীবন মনে থাকবে। এখনও তাদের সামনে ছিল জীবনহরণকারী মরুভূমি কিন্তু বিজয়ানন্দের উষ্ণতায় তাদের মধ্যে মরুকষ্টের যাতনা ছিলো না।

পথ চলতে চলতে বিজয়ী গযনী বাহিনী ভয়ঙ্কর মরুতে প্রবেশ করল । তিনদিন মরুর মধ্যেই তাদের চলে গেছে কিন্তু এর মধ্যে কোথাও এক ফোঁটা পানির সন্ধান পাওয়া গেল না। এবার সুলতান মাহমূদ সেনাদেরকে বেশী করে পানি বহনের নির্দেশ দেননি। ফলে সেনারা তাদের আহারের জন্যে যে পরিমাণ পানি সঙ্গে এনেছিল তা ফুরিয়ে গেছে। ঘোড়া ও উটগুলো পিপাসার্ত হয়ে পড়েছিল। হিন্দু রাজা তাদের পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য যে দুজন গাইড দিয়েছিল এরা আশ্বাস দিয়েছিল এমন পথে কাফেলাকে নিয়ে যাবে, যে পথে অঢেল পানির উৎস রয়েছে। গাইডদের যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, পানি কোথায়? তারা আশ্বাস দিলো আগামীকাল নিশ্চয়ই আমরা পানির কাছে পৌঁছে যাবো। কিন্তু চতুর্থ দিনও এভাবেই তপ্ত মরুর মধ্যেই কেটে গেলো পানির দেখা পাওয়া গেল না।

পঞ্চম দিন সেনাদের অধিকাংশই তৃষ্ণা পিপাসায় কাতর হয়ে গেল। অনেকের মাথা চক্কর দিতে লাগল। ঘোড়াগুলো হারিয়ে ফেলল ১লার শক্তি। সুলতান মাহমূদ প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ ও সেনাপতি আবুল হাসানকে বললেন, আমার কেন যেন গাইডদের ব্যাপারে সন্দেহ হচ্ছে, ওদের ডেকে আনো। পিপাসায় দুই গাইডেরও মাথা দুলছিল। তাদেরকে সুলতানের সামনে হাজির করা হলে সুলতান তাদের জিজ্ঞেস করলেন–

তোমরাও তো পিপাসায় কষ্ট পাচ্ছো, তোমাদের অবস্থা তো আমাদের সেনাদের চেয়ে আরো খারাপ, তোমরা বলছিলে এই মরুভূমিতে পানির অভাব নেই। কোথায় পানি?

পানি ঠিকই আছে সুলতান! তবে পানি পর্যন্ত আপনাদের পক্ষে জীবন নিয়ে পৌঁছা সম্ভব নয়। জবাব দিলো এক গাইড।

তোমরা কি জেনে শুনেই আমাদেরকে পানি থেকে দূরে নিয়ে এসেছো?

জী হ্যাঁ সুলতান! আমরা জেনে বুঝেই একাজ করেছি।

তাহলে তোমরা কি আমাদেরকে বিপথে নিয়ে আসার জন্যেই গাইড সেজেছিলে? তোমরা কি জানো না, তোমাদের এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড?

আমরা বিলক্ষণ তা জানতাম সুলতান! আমরা শিবদেবের সম্মানে আমাদের জীবন উৎসর্গ করেই সোমনাথ থেকে রওয়ানা হয়েছিলাম। আপনার কি মনে নেই, যখন মহারাজা দেবআশ্রম আপনাকে রাস্তার কথা বলছিলেন, তখন পাশে থাকা রাণী বলেছিলেন, তিনি আপনাকে এমন গাইড দেবেন, যারা আপনাকে এমন পথে নিয়ে যাবে যেপথে পানির কোন অভাব নেই। তিনি অবশ্য আপনার সাথে ওয়াদা করেছিলেন আপনাকে সৎ পথপ্রদর্শক দেবেন। কিন্তু আমরা দুজন তার ওয়াদাকে ভঙ্গ করে আপনাদেরকে পানি থেকে দূরে নিয়ে এসেছি। আমরা রাজা দেবআশ্রমের সাথে সোমনাথ রক্ষার্থে আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলাম কিন্তু আমরা সোমনাথ পৌঁছে দেখি সোমনাথের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এরপর আমরা একটি রাতও ঘুমাতে পারিনি। বহুবার আপনাকে হত্যার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোন সুযোগ পাইনি। অবশেষে যখন শুনলাম, আপনার গাইডের দরকার, তখন আমরা নিজেরাই স্বেচ্ছায় আপনাদের গাইড হওয়ার জন্য নিজেদের পেশ করলাম এবং খুব সাফল্যের সাথেই আমরা আমাদের কাজ করতে পেরেছি। আমরা শুধু আপনাকে নয়, আপনার গোটা বাহিনীকেই পানি থেকে দূরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। এখন আপনার গোটা বাহিনীর বিরুদ্ধেই আমরা প্রতিশোধ নিতে পেরেছি। আগামীকাল পানির অভাবে আমরা এমনিতেই মরে যাব। কাজেই আপনার মৃত্যুদণ্ড বরং আমাদের মৃত্যুকে আরো সহজ করবে কিন্তু আপনার গোটা বাহিনীকেই জীবন দিয়ে সোমনাথ ধ্বংসের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

সুলতান তাৎক্ষণিক এই দুই নরাধমকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। দুই সেনা। কর্মকর্তা সাথে সাথে তরবারী দিয়ে ওদের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল।

***

দুই গাইড যা বলেছিলো তা ছিলো খুবই বাস্তব। সত্যিকার অর্থেই গোটা বাহিনীর অবস্থা পানির অভাবে শোচনীয় হয়ে উঠেছিল। অধিকাংশ সেনা ক্ষুধা তৃষ্ণায় দুলছিল, কারো কারো শুরু হয়ে গিয়েছিল মৃত্যুযন্ত্রণা।

ষষ্ঠ দিন শেষে রাতের বেলায় সেনা শিবিরের ঘোড়াগুলো তৃষ্ণায় ছটফট করছিল আর আর্তচিৎকার করে হ্রেষারব করছিল। ভারবাহী উটগুলোর গতিও শ্লথ হয়ে এসেছিল। সেনারা ঘোড়া ও উটের উপর বসে থাকার সামর্থটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। সুলতান এশার নামাযের পর এমন করুণ অবস্থার মধ্যে শিবিরের বাইরে খোলা জায়গায় এসে কয়েক রাকাত নফল নামায পড়লেন। নামাযরত অবস্থায়ও সুলতানের কানে ভেসে আসছিল পিপাসার্ত উট ঘোড়া ও সেনাদের আর্তচিৎকার। অনেক সেনার কণ্ঠের আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। তারা যেন কান্নার সামর্থটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল।

সুলতান গোটা সেনাবাহিনীও ভারবাহী জন্তুদের করুণ অবস্থা সামনে রেখে আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন। সুলতান এতোটাই কাঁদলেন যে, এক পর্যায়ে তার কণ্ঠ থেকে আর কোন আওয়াজ বের হচ্ছিল না। কারণ, তিনি জানতে, আজ রাতে যে সেনারা তার সাথে আছে এভাবে পানিহীন অবস্থা থাকলে আগামী রাতে হয়তো তাদের অর্ধেকও বেঁচে থাকবে না।

সুলতানের দু’আ শেষ হতেই রাতের অন্ধকার আকাশে হঠাৎ একটি তারা ভেঙে পড়লো এবং অন্ধকার ভেদ করে একটি আলোর ঝলক একদিকে নেমে হারিয়ে গেলো। তা দেখে সুলতানের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো, আল্লাহ তাআলা আমাদের ইশারা দিয়েছেন, আগামীকালের মধ্যেই ইনশাআল্লাহ আমরা পানির দেখা পাবো।

মরুভূমিতে এ কয়দিন তারা কোন পাখি উড়তে দেখেনি। কিন্তু সকাল বেলায় সুলতানের কানে উড়ন্ত পাখির কলরব ভেসে এলো । সুলতান আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন এক ঝাক পাখি উড়ছে। তিনি পাখির ঝাকের দিকে এক পলকে তাকিয়ে রইলেন। দেখলেন পাখির ঝাকটি অনেকটা দূরে গিয়ে নীচে নেমে গেছে। সুলতান উচ্চ কণ্ঠে বলে উঠলেন, এগুলোই পানির পাখি । পাখিগুলো সেদিকেই গেছে। যেদিকে তারা ভেঙে পড়েছিল। সুলতান সূর্যের আলো প্রখর হওয়ার আগেই সবাইকে ওদিকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন।

প্রায় দ্বিপ্রহরের আগে আগে যখন গোটা কাফেলার অবস্থাই সঙ্গীন, বহু সেনার মধ্যে মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে ঠিক তখন তাদের নজরে এলো পানির অস্তিত্ব। এ পানি পানি নয়, রীতিমতো একটি ঝিল। ঘোড়াগুলো পানির গন্ধ পেয়ে লাগামহীন হয়ে পানির দিকে দৌড় দিলো। সেনারা অনেকেই পানিতে মাথা ভিজিয়ে শরীরে পানি ছিটালো আর প্রাণভরে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করল। কাফেলার সকল প্রাণি ও সেনা তৃপ্তিভরে পানি পান করে বিশ্রামের জন্য সেখানেই তাঁবু ফেললো এবং অবশিষ্ট দিন ও রাত আহারাদী সেরে বিশ্রাম করে শরীরটাকে তাজা করে নিল। সেই সাথে প্রত্যেকের সামর্থানুযায়ী পানি সাথে করেও নিয়ে নিলো।

* * *

তখনও গযনী বাহিনীর কষ্টের শেষ হয়নি। এবার তারা অজানা অচেনা পথে কোন জানাশোনা গাইড ছাড়াই অগ্রসর হচ্ছিল। এখন রাতের বেলা আসমানের তারা আর দিনের বেলা সূর্যই ছিলো তাদের পথ চেনার উপায়।

দু’দিন এভাবে চলার পর তারা একটি পল্লীর দেখা পেলো এবং স্থানীয় এক লোককে গাইড হিসেবে সাথে নিল। এই অজানা অচেনা গাইড গয়নী বাহিনীকে সিন্ধু নদীর এমন কূলে নিয়ে গেল যেখানে নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা ছিলো

অনেক বেশী।

এই গাইড সিন্ধু নদীর তীর ঘেঁষে কাফেলাকে একটি জটিল এলাকায় নিয়ে গেল আর সেখানে পৌঁছতেই সন্ধ্যা নেমে এলো। বাধ্য হয়েই গযনী বাহিনী সেখানে রাতযাপনের জন্য তাঁবু ফেললো। কিন্তু গভীর রাতে গযনী শিবিরে শুরু হয়ে গেল হৈ চৈ কোলাহল। পরিস্থিতি আঁচ করে সুলতান গাইডকে তলব করলেন, কিন্তু গাইডকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেলো, শিবিরের একটি অংশে অজ্ঞাত লোকেরা হামলা করেছিল । কিন্তু সতর্ক গযনীর সেনারা আক্রমণকারী কয়েকজনকে ঘেরাও করে ধরে ফেলতে সক্ষম হয় এবং তাদের কয়েকজন আহত হয়েও পালানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেলো, এই এলাকাটি হিন্দু জাঠদের এলাকা হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি আমরকোটের অংশ। ধৃত জাঠরা জানালো, তাদের একটা ছোটখাটো রাজত্ব আছে। জাঠরা খুবই দুঃসাহসী লড়াকু। লুটতরাজ করাই তাদের প্রধান পেশা।

ধৃতজাঠরা আরো জানালো, তাদের রাজা জানতে পেরেছিল গযনী বাহিনী সোমনাথ ধ্বংস করে সেখানকার সব সোনাদানা নিয়ে যাচ্ছে। ফলে সেই রাজাই এই গাইডকে কৌশলে পাঠিয়েছিলো। গাইড রাজার নির্দেশ মতো গযনী বাহিনীকে আক্রমণের উপযোগী জায়গায় এনে রাতের অন্ধকারে গায়েব হয়ে যায়। পরদিন দিনের বেলায় গযনী বাহিনী যখন রওয়ানা হলো, হঠাৎ পেছন দিকে জাঠদস্যুরা অতর্কিতে আক্রমণ করে দ্রুত ঘোড়া হাঁকিয়ে পালিয়ে গেলো। এভাবে কয়েকবার আক্রান্ত হওয়ার পর সুলতান কাফেলার গতি থামিয়ে ধৃতজাঠদের এনে জিজ্ঞেস করলেন, জাঠদের রাজধানী এখান থেকে কতোটা দূরে? ধৃত জাঠরা জানালো, ‘জাঠদের নির্দিষ্ট কোন রাজধানী নেই। আপনি জাঠদের ধ্বংসের পেছনে পড়লে লজ্জিত হবেন। কারণ তারা কোথাও এক জায়গায় এক সাথে থাকে না। দুর্গ বা স্থায়ী নিবাস তৈরীও তাদের স্বভাব বিরোধী।

সুলতানের মনোভাব বুঝে তার সেনাপতিগণ তাকে পরামর্শ দিলেন, গযনীর সেনা সংখ্যা অনেক কমে গেছে। তাছাড়া দীর্ঘ কষ্টকর সফরের কারণে অবশিষ্ট সেনাদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে লড়াই কিংবা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ নেই। এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা ও জনমানুষ সম্পর্কে আমাদের কোনই ধারণা নেই। জানা নেই এখানে আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরিণতি কি হয়? এমতাবস্থায় ধৃতকয়েদীদের উপরও ভরসা রাখা কঠিন। তাই যথাসম্ভব দ্রুত আমাদের উচিত গযনী পৌঁছার চেষ্টা করা।

সুলতান সেনানায়কদের যৌক্তিক পরামর্শ ও বাস্তবতা মেনে নিলেন। কিন্তু জাঠদের পরপর আক্রমণে বিপর্যস্ত গযনী সেনাদের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মোকাবেলা করতে না পারায় সুলতান রাগে ক্ষোভে দাঁতে দাঁত কামড়ে ক্ষোভ হজম করতে বাধ্য হলেন।

* * *

সোমনাথ জয় করে অজানা পথে গযনী পৌঁছতে গযনী বাহিনীর যে দুঃসহ যন্ত্রণা, অজানা শত্রুদের গেরিলা আক্রমণ এবং অচেনা মরুভূমিতে টানা ছয় সাতদিন পানিহীন পিপাসায় ছটফট করতে হয়েছে, যে কষ্ট সহ্য ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এই কুরবানী ও ক্ষয়ক্ষতি ছিলো যে কোন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়েও আরো বেশী। দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ফিরতি সফর শেষে ১০২৬ সালের ৬ এপ্রিল মোতাবেক ৪১৭ হিজরী সনের ১০ সফর সুলতান মাহমূদ সোমনাথ জয়ী বেঁচে থাকা সেনাদের নিয়ে গযনী পৌঁছেন। গযনীর সীমানায় পৌঁছা মাত্রই তিনি ঘোড়া থেকে নেমে দু’রাকাত শোকরানা নামায আদায় করলেন। এ নামায যুদ্ধ জয়ের জন্য নয় বহু ত্যাগ জীবনহানি ও সম্পদ হারিয়ে হলেও আল্লাহ তাআলা যে বিজয়ী কাফেলাকে শেষ পর্যন্ত গযনী পৌঁছার তওফিক দিয়েছেন এ নামায ছিলো এরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য।

সেনাদের সোমনাথ জয় করে আসার খবর শুনে গোটা গযনীর আবাল বৃদ্ধ বণিতা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আনন্দে মেতে উঠলো। মহিলারা বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে বিজয়ী সেনাদের কাপড় নেড়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। ছোট শিশুরা আনন্দে নেচে গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করছিল।

গযনী ফিরে রাতের বেলায় সুলতান মাহমূদ তার দেহে অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভব করলেন। অবশ্য ক্লান্তি এর আগেও তার অনুভূত হতো কিন্তু এবার তার মনে সাক্ষ্য দিচ্ছিল তার শরীর কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রত্যেকবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আসার পর সুলতানের একান্ত চিকিৎসক তার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা ও পরীক্ষা করতেন। চিকিৎসক এবারও রাতের বেলায় এসে সুলতানের দেহের অবস্থা জানার জন্য তার রক্ত সঞ্চালন বুঝতে হাতের নার্ভ টিপে ধরলেন। এর পর বুকের হৃদকম্পন বুঝার জন্য বুকে হাত রাখলেন। সুলতানকে নানা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন। সবকিছু বুঝে শুনে চিকিৎসকের কপালে ভাঁজ পড়লো। চিকিৎসক সুলতানের দেহের নাজুক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি সুলতানকে বললেন- সম্মানিত সুলতান! আপনার দেহের অবস্থা দেখে আমি যতোটা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি, এমন চিন্তা আপনার মধ্যে দেখা গেলে আপনার দৈহিক অবস্থার কখনো অবনতি ঘটতো না। আপনি খুবই অসুস্থ সুলতান! কমপক্ষে আপনাকে এক বছর বিরতিহীন বিশ্রাম নিতে হবে।

আমার আবার কি হয়েছে? আপনি কি শুনেননি, আমি কোত্থেকে এসেছি, কি করে, কতো যাতনা সহ্য করে দীর্ঘ দিনের কঠিন সফর শেষ করেছি। সফরের এই ধকলকে আপনি অসুস্থতা বলছেন?

জী সুলতান! আমি সত্যিই বলছি, আপনি অসুস্থ। আপনার কাছে উট আর ঘোড়ার পার্থক্য করা যেমন সহজ আমার কাছে সুস্থ ও অসুস্থতার ব্যবধান অনুধাবন করা এমনই সহজ।

এ সময় সুলতানের বেগম সাহেবা এবং তার এক কন্যা পাশে দাঁড়ানো ছিলেন। চিকিৎসকের কণ্ঠে অসুখের কথা শুনে তারা জানতে চাইলেন- কি রোগ হয়েছে সুলতানের? চিকিৎসক তাদের আশ্বস্ত করতে বললেন, না তেমন মারাত্মক কিছু নয়।

সুলতান স্ত্রী ও কন্যার উদ্দেশ্যে বললেন, আরে তোমরা শুধু শুধু দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এ কিছু না। সফরের ক্লান্তি আর কি? যাও তোমরা এ ঘর থেকে চলে যাও, আমি চিকিৎসকের সাথে কিছু প্রশাসনিক কথা বলবো।

স্ত্রী ও কন্যা সেই কক্ষ থেকে চলে যাওয়ার পর সুলতান চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কি রোগ হয়েছে শাইখুল আসফান্দ?

আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিনষ্ট হয়ে গেছে সুলতান! আমি বহু আগেই এ ব্যাপারে আপনাকে সতর্ক ও অবহিত করেছি সুলতান! এখন প্রায়ই আপনার বুকে ব্যথা হয়, কণ্ঠনালী ফুলে যায় তা কি আপনি অনুভব করেন না সুলতান?

আমি আপনাকে ভয় দেখানোর জন্যে বলছি না, শুধু সতর্ক করার জন্য বলছি। কারণ, এখন থেকে সতর্ক না হলে পরবর্তীতে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়বে। আপনার যক্ষ্মা রোগ হয়েছে সুলতান। তবে এটা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে।

আরে যক্ষ্মা রোগ আমার কি আর বিগড়াবে?

সম্মানিত সুলতান! এটাকে আপনি শরীরের ঘুণ পোকা মনে করতে পারেন। ঘুণ পোকা যেমন ভেতর থেকে কাঠ খেয়ে শেষ করে ফেলে, যক্ষ্মা রোগও তেমনি দেখা যায় না কিন্তু ভেতরে ভেতরে শরীরের সবকিছুকে নষ্ট করে দেয়। এখন থেকে যদি আপনি কঠিন পরিশ্রমের কাজ না করে পূর্ণ বিশ্রামে থাকেন এবং মাথা থেকে সব জটিল চিন্তা দূর করে দেন তাহলে আশা করা যায় রোগটি আর বাড়বে না। বর্তমানে আপনার শরীরের কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে।

আপনি কি আত্মিক শক্তিতে বিশ্বাস করেন? শাইখুল আসফান্দ?

আত্মিক শক্তিতে আমি অবশ্যই বিশ্বাস করি সুলতান। কিন্তু আত্মিক শক্তি ততোক্ষণই সক্রিয় থাকে যতক্ষণ দেহ আত্মাকে ধারণ করার সামর্থ রাখে । দেহ আত্মাকে ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে আত্মা দেহ পিঞ্জিরার বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়।

আমি হিন্দুস্তানের এমন সব যোগী সন্ন্যাসীকে দেখেছি, যাদের আত্মিক ক্ষমতা এতোটাই বিস্ময়কর যে, সাধারণ মানুষ সেইসব ক্ষমতাকে অপার্থিব বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। যোগীরা আমাকে বলেছে, এ ধরনের ক্ষমতা ইচ্ছা করলে যে কেউ অর্জন করতে পারে। যোগীদের চেয়ে কি আমার আত্মশক্তিকে হীন মনে করেন আপনি? চিকিৎসকের উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান।

সম্মানিত সুলতান! আপনি যাই বলুন না কেন, আমি তবুও বলবো, যক্ষ্মা যদি আপনার শরীরকে ভেতর থেকে ফোকলা করে ফেলে তবে সেই আত্মিক শক্তি কোত্থেকে পয়দা হবে?

দৈহিক শক্তি নয় আত্মিক শক্তির বলেই আমি সোমনাথের মতো কঠিন যুদ্ধ জয় করেছি এবং ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘ সফরও করেছি। আমার মনে আছে সোমনাথ অভিযানে যাওয়ার আগেই আপনি আমাকে বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন হয়তো আমাকে পরীক্ষা করে আপনি এই রোগের উপস্থিতি ধরতে পারেননি। আসলে রোগটি তখনও আমার মধ্যে ছিলো। এখন আপনি এটিকে স্বনামে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। অবশ্য আমি এটাকে একটা সাধারণ রোগই মনে করে আসছি। আজ আমি আপনার কাছ থেকে একটা প্রতিশ্রুতি নিতে চাই শাইফুল আসফান্দ! আমার এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথাটি কেউ যেনো জানতে না পারে।

এখনও পর্যন্ত আমি এটাকে যক্ষাই বলছি সুলতান! কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে এটা পাকস্থলীর রোগ। যদি তাই হয় তবে কিছু দিনের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়বে, তখন পরিষ্কার বোঝা যাবে এটি যক্ষ্মা না পাকস্থলীর রোগ। তবে আমি আপনাকে করজোড়ে নিবেদন করছি, এখন থেকে আপনি নিয়মিত বিশ্রাম, ওষুধ ও পথ্যের প্রতি মনোযোগী হবেন।

‘আরে শাইখ!’ আমি মরে গেলে কি আর ক্ষতি হবে। আমার ছেলেরা এখন বড় হয়েছে, আশা করি তারা সালতানাতকে সামলে নিতে পারবে।

আপনার খান্দানে সালতানাত চালানোর মতো লোকের অভাব হবে না। আরো বহু সুলতান হয়তো জন্ম নেবে কিন্তু মাহমূদ আর কেউ হবে না। আর কোন মূর্তি সংহারী জন্ম নেবে না। সবাই হয়তো আল্লাহ ও রাসূলের নামের উপরই সালতানাত চালাবে কিন্তু আল্লাহর নামে নিজেকে উৎসর্গ করার মতো শাসক আর পাওয়া যাবে না। হিন্দুস্তানের পাথুরে ভগবানদের টুকরো করে এনে গযনী শাহী মসজিদের পথে ছড়িয়ে দেয়ার শক্তি আর কারো হবে না। আমি আপনার ব্যক্তি স্বার্থে নয়, আপনার পরিবার, রাজত্ব কিংবা শাসন কার্যের স্বার্থে নয় ইসলামের স্বার্থে মুসলিম বিশ্বের মর্যাদার স্বার্থে আপনাকে আরো কিছুদিন জীবিত ও সক্ষম দেখতে চাই সুলতান!

জন্মমৃত্যু কোন মানুষের হাতে নয়, শাইখুল আসফান্দ! বললেন সুলতান মাহমূদ। আমাকে দুনিয়াতে আরো বহু কাজ করতে হবে। মুসলিম বিশ্বের প্রতি কতিপয় কেউটে সাপ উঁকি ঝুঁকি মারছে। হিন্দুস্তানের কালনাগিনী গুলোকেও আমার বিনাশ করতে হবে। এতোগুলো আক্রমণের পরও হিন্দুস্তানের কালনাগিনীগুলোকে নিঃশেষ করা সম্ভব হয়নি। সোমনাথ অভিযানে গিয়ে আমি হিন্দুস্তানের উপকূলীয় এলাকায় মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময়কার মুসলমানদের উত্তরসূরীদের দেখেছি।

হিন্দু শাসকরা তাদের জীবন সংকীর্ণ করে ফেলেছিল। তার পরও তারা এখনও নিজেদের আরবী ভাষাভাষী হিসেবে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। আমার একান্ত কর্তব্য তাদের জীবনযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করা এবং হিন্দুদের দুঃশাসন থেকে তাদের উদ্ধার করা । আমার আরো বহু কাজ করতে হবে শাইখুল আসফান্দ!

আমি যদি আমার দায়িত্বপালন না করি তাহলে ইসলামের অবিস্মরণীয় সিপাহ সালারের অপমৃত্যুর দায় আমার কাঁধে চাপবে সুলতান! আমি আল্লাহর কাছেও তো কোন জবাব দিতে পারবো না সুলতান! বললেন চিকিৎসক।

আর কেউ না দেখলেও আল্লাহ ঠিকই দেখছেন শাইখ! আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার কাছে আমার অনুরোধ, আমার অসুখের ব্যাপারটি গোপন রাখবেন। কারণ আমার শত্রুরা যদি আমার অসুখের খবর জেনে ফেলে, তাহলে তারা আমার মৃত্যুর জন্য আমার মোকাবেলা না করে অপেক্ষা করতে শুরু করবে, আমি ওদের সাক্ষাত পাবো না ।

আমার লাশ যখন দাফনের জন্যে নেয়া হবে, তখন ওরা আমার রাজ্যে আক্রমণ করে বসবে। এমন দুর্যোগ মুহূর্তে আমার ছেলেদের পক্ষে হয়তো ওদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। শাইখুল আসফান্দ! আপনি কি দেখছেন না, সেলজুকীরা আবারো কী রকম ভয়ংকর হয়ে উঠছে? ওরা এখন গযনীর জন্যে হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

আমি সবই দেখছি সুলতান! বললেন শাইখুল আসফান্দ!

আমাকে আরো একবার হিন্দুস্তান যেতে হবে, চিকিৎসকের উদ্দেশ্যে বললেন সুলতান। আমি যখন হিন্দুস্তান থেকে ফিরছিলাম তখন পথিমধ্যে জাঠ নামের একটি জনগোষ্ঠী আমার সেনাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করেছে। আমার সেনাদের পক্ষে তখন দৃঢ়ভাবে লড়াই করার মতো সামর্থ ছিলো না। এই দুর্বলতা আন্দাজ করে জাঠ দস্যুরা গেরিলা আক্রমণ করে আমার বহু সহযোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তবুও সাহস করে আমার সেনারা ওদের কয়েকজনকে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আমি জেনে নিয়েছি জাঠ জনগোষ্ঠীর জীবন যাপন রীতি পদ্ধতি ও সামরিক শক্তি। ধৃতরা জানিয়েছে, জাঠ জনগোষ্ঠী সোমনাথের শিবমূর্তির পূজারী। এরা খুবই লড়াকু ও সংখ্যায় বিপুল। এরা এতোটাই শক্তির অধিকারী, ইচ্ছা করলে আশেপাশের যে কোন মহারাজার ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে। তাছাড়া এরা মুসলমানদের জঘন্য শত্রু। এই ভয়ংকর শত্রুদের শায়েস্তা করতে আমাকে আরেকবার হিন্দুস্তানে যেতেই হবে শাইখুল আসফান্দ! আমি যদি এই বেয়াড়া জনগোষ্ঠীর কোমড় ভেঙ্গে না দেই; তা হলে এরা আবার অন্য কোন জায়গায় শিবমূর্তি দাঁড় করিয়ে দেবে, আর মুসলমানদের ধরে ধরে শিবমূর্তির পায়ে বলি দিতে থাকবে।

আপনি একটু বিশ্রাম নিন সুলতান! আমি আপনাকে ওষুধ দেবো।

শুধু দাওয়া ওষুধ) নয় দু’আও করুন শাইখুল আসফান্দ! এখন দাওয়ার চেয়ে দু’আ আমার বেশী প্রয়োজন। বললেন সুলতান মাহমুদ।

ওষুধ পত্র দিয়ে চিকিৎসক চলে যাওয়া পর সেই কক্ষে প্রবেশ করলেন সুলতানের স্ত্রী ও তার কন্যা।

চিকিৎসক কি বলে গেলেন? আপনি আমাদেরকে কক্ষ থেকে বের করে দিলেন কেন? এমন কি গোপন কথাছিলো চিকিৎসকের সাথে? এক নাগাড়ে প্রশ্ন কয়টি সুলতানের দিকে ছুঁড়ে দিলেন তার স্ত্রী।

‘হু’! চিকিৎসক বললেন, আরাম করুন। দায়িত্ব কর্তব্যের কথা ভুলে যান। বললেন সুলতান।

চিকিৎসক যদি আপনাকে বিশ্রামের কথা বলে থাকেন, তাতে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। মায়ের কণ্ঠ থেমে যেতেই বললেন সুলতানের কন্যা। কন্যার উদ্দেশ্যে সুলতান বললেন, চিকিৎসক বলেছে আমার শরীর নাকি খুব ভেঙে পড়েছে, বিশ্রাম নিতে হবে।

শাইখুল আসফান্দ যেভাবে বিশ্রাম নিতে বলেছেন, আপনার উচিত সেভাবেই বিশ্রাম নেয়া। বললেন সুলতানের বেগম। আমার ছেলেরা আপনার দায়িত্ব ঠিকই পালন করতে পারবে।

তা পারবে বৈকি বেগম! কিন্তু সেলজুকীদেরকে এরা শায়েস্তা করতে পারবে । হিন্দুস্তানের জাঠদের মাথা গুঁড়িয়ে দেয়াও এদের জন্যে কঠিন হবে বেগম। মরার আগে এই দু’টি কাজ করেই আমাকে মরতে হবে।

ঐতিহাসিক আলবিরুনী লিখেছেন, সত্যিকার অর্থেই তখন সুলতান মাহমূদের শরীর ভেঙে গিয়েছিল। দৃশ্যত তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি ক্লান্ত অসুস্থ। কিন্তু তিনি শরীরের তোয়াক্কা না করে চিকিৎসক চলে যাওয়ার পর বিশ্রাম না নিয়ে সেনাকর্মকর্তাদের ডেকে পাঠালেন এবং জরুরী নির্দেশনা দিয়ে বললেন, আগামীকাল সূর্য উঠার আগেই আমি গযনীর জামে মসজিদ ও আমার বাড়ীর সদর দরজার পথে সোমনাথ থেকে আনা শিবমূর্তির টুকরো এভাবে দেখতে চাই; যাতে মানুষ এগুলো মাড়িয়ে যাতায়াত করে এবং মক্কা ও মদীনার জন্যে দু’টি টুকরো আগামীকালই পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয় দিনই সুলতান মাহমূদ হিন্দুস্তানের জাঠ উপজাতির বিরুদ্ধে সেনাভিযানে প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে সেনাদের নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে সৈন্য ঘাটতি পূরণে নতুন সেনা ভর্তির নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চৌকস যোদ্ধায় পরিণত করার দিক নির্দেশনা দিলেন।

সুলতান মাহমূদ চিকিৎসকের সতর্কবাণীর পরোয়া না করে, অবসর ও বিশ্রাম নেয়ার কোন তোয়াক্কা না করে নতুন সেনা ভর্তি ও প্রশিক্ষণের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। সেই সাথে সরকারী প্রশাসনিক কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করলেন। অপর দিকে লাহোর ও মুলতানের গভর্নরের কাছে জাঠদের সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানোর জন্যে পয়গাম পাঠালেন।

সময় দ্রুত গড়িয়ে যেতে লাগলো। ইতোমধ্যে লাহোর ও মুলতান থেকে জাঠদের রিপোর্ট আসতে শুরু করলো। রিপোর্টে বলা হয়েছে, জাঠ জাতিগোষ্ঠী সিন্ধু অববাহিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ি রয়েছে। এরা জাতি হিসেবে লড়াকু এবং দুঃসাহসী। এদের সংখ্যা বিপুল। এরা সাধারণত ঝটিকা আক্রমণ, রাতের বেলায় চোরাগুপ্তা হামলা এবং নদী ও সাগরে দস্যিবৃত্তি করে। এরা নৌপথে লড়াইয়ে খুবই পটু।

তখনকার দিনে সিন্ধু নদী ছিলো খুবই চওড়া। নদীর মাঝে বহু চর ছিলো। যেগুলোর অবস্থা ছিলো অনেকটা দ্বীপের মতো। এসব দ্বীপ সদৃশ চরাঞ্চলগুলোতে ঘনজঙ্গলে বসবাস করতো হাজার হাজার জাঠ। সুলতান মাহমূদের কাছে খবর এলো, দিন দিন জাঠ জনগোষ্ঠী হিন্দুস্তানের মুসলমানদের জন্যে সমস্যারূপে আবির্ভূত হচ্ছে। এরা বংশানুক্রমে সোমনাথের পূজারী হওয়ায় নিরীহ হিন্দুস্তানী মুসলমানদের উপর অত্যাচার করে সোমনাথের প্রতিশোধ নিতে তৎপর।

এসময় হিন্দুস্তানের লাহোর মুলতান ও বর্তমান পাঞ্জাবের গোটা অংশই ছিলো গযনী সালতানাতের দখলে। এবং কাশ্মীর থেকে কনৌজ পর্যন্ত গোটা এলাকা ছিলো গযনী সালতানাতের বিজিত এলাকা। এবং এ অঞ্চলের সকল রাজা মহারাজাই সুলতান মাহমূদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

মূলত হিন্দুস্তানের মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধানের উদ্দেশ্যেই সুলতান মাহমূদ সম্ভাব্য হুমকি জাঠদের শক্তি খর্ব করতে চাচ্ছিলেন, যাতে ওরা মুসলমানদের জন্যে হুমকি হয়ে না উঠতে পারে এবং পুনর্বার সোমনাথ মন্দির নির্মাণ কিংবা শিবমূর্তির পূজার আয়োজন জোরদার না হয়।

.

১০২৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে সুলতানের কাছে খবর পৌঁছলো জাঠ জনগোষ্ঠী গযনীর মোকাবেলায় যুদ্ধ ঘোষণার জন্যে বিশাল রণপ্রস্তুতি শুরু করেছে। জাঠদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পর্কে ইতিহাস গ্রন্থে বলা হয়েছে, স্থানীয় এক মুসলমান গযনীর পক্ষে গোয়েন্দাগিরী করতে গিয়ে জাঠদের হাতে গ্রেফতার হয়। পরবর্তীতে সে ফেরার হয়ে ফিরে এসে সুলতানকে জানায়, জাঠদের খবর নেয়ার জন্যে একজন ভবঘুরে হিসেবে ছদ্মবেশে আমি ওদের এলাকার অনেক ভেতরে যাওয়ার জন্যে একদিন একটি ছোট নৌকায় সওয়ার হই। কিন্তু আমি ঝড় তুফান কিংবা বিরূপ পরিস্থিতিতে কিভাবে নৌকা সামলাতে হয় তা জানতাম না। আমি যখন নৌকায় সওয়ার হই তখন নদী ছিলো শান্ত, তেমন ঢেউ ছিলো । স্রোতের টানও আমি বেশী বুঝতে পারিনি। যেই নৌকায় আরোহণ করে নদীতে ভেসেছি স্রোতের টানে নৌকা ভেসে যেতে লাগলো।

আমি যতোই চেষ্টা করছি কূলে নৌকা ভেড়াতে, নৌকা আরো নদীর গভীরে যেতে লাগলো। ঠিক সেই সময় আকাশ অন্ধকার করে এলো প্রবল ঝড় বৃষ্টি। আমি নৌকাকে সামলাতে পারলাম না। নৌকা ঢেউ ও স্রোতের দ্বিমুখী নাচনে হঠাৎ উল্টে গেলো। আমি পানিতে হাবু ডুবু খেয়ে কোন মতে ভাসমান নৌকা আঁকড়ে থাকলাম। স্রোতের টান ও ঢেউ এর ধাক্কায় একসময় একটি দ্বীপ চড়ে গিয়ে আমার নৌকা আঁছড়ে পড়লো। আমি কোন মতে শরীরটাকে টেনে ডাঙ্গায় উঠালাম ঠিকই কিন্তু অচেনা অজানা বিজন জঙ্গল দেখে আমার দেহের অবশিষ্ট শক্তিও নিঃশেষ হয়ে গেলো ।

একসময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন দেখি আমি জাঠদের একটি ঝুপড়িতে শুয়ে আছি। আমার কাছে দুজন জাঠ মহিলা বসা ছিলো। হুঁশ ফিরতেই যুবতী মহিলা জানতে চাইলো তুমি কে? কোত্থেকে এসেছো? পানিতে পড়েছো কিভাবে? সে মহিলাদের কাছে নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে কথা বললো। কিন্তু জাঠ পুরুষরা যখন তার সাথে কথা বললো তখন তাদের কাছে এই গোয়েন্দার কথাবার্তা সন্দেহজনক মনে হলো। ফলে তারা বললো, তুই যদি তোর সত্যিকার পরিচয় না বলিস, তাহলে তোকে সাগরে ফেলে দেবো। এই বলে জাঠদের কয়েকজন তাকে ধরে সাগরে ফেলে আসার জন্যে কাঁধে উঠিয়ে নিলো। জীবন ভয়ে সে তখন তার আসল পরিচয় বলে দিলো। কিন্তু জাঠরা এতে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। তাকে বন্দি করে রাখলো ২ এবং অধিকতর তথ্য বলার জন্য উৎপীড়ন করতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে সে বলে দিলো, আমি গযনীর গোয়েন্দা। গযনী সরকার তোমাদের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অচিরেই তারা হামলা করবে।

কিন্তু তাতেও জাঠদের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেলো না সে। তাকে নজরবন্দি করে রাখলো। জাঠরা তার কাছ থেকে জানতে চাইতো গযনী বাহিনীর লড়াই করার কৌশল কি? এরা কিভাবে লড়াই করে। ডাঙ্গায় না পানিতে বেশী পটু ইত্যাদি। বন্দি গোয়েন্দা জাঠদের আস্থা অর্জনের জন্য গযনী বাহিনীর রণকৌশল, তাদের রণ প্রস্তুতি সম্পর্কে আরো বেশী কৰে তথ্য সরবরাহ করতে লাগলো। এক পর্যায়ে তার থাকা খাওয়ার সুবিধা কিছুটা বাড়ালেও তাকে সম্পূর্ণ নজর বন্দি থেকে মুক্তি দিলো না ।

যে যুবতী মহিলা প্রথম দিন তার পাশে বসা ছিলো, সে ছিলো এক জাঠ সর্দারের স্ত্রী। প্রথম দিন থেকেই এই মহিলা বন্দি গোয়েন্দার প্রতি একটু বেশী অনুরাগ দেখাচ্ছিল। জাঠরা যখন বন্দির প্রতি কিছুটা প্রসন্ন হয়ে তাকে স্বাভাবিক খাবার দাবার ও বন্ধনহীন চলাফেরার সুবিধা দিলো, তখন এই যুবতী মহিলা তার সাথে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা বলতে শুরু করলো। অল্প দিনের মধ্যেই বন্দি গোয়েন্দা ও যুবতীর মধ্যে গড়ে উঠলো হৃদ্যতা। একদিন সুবিধা পেয়ে মহিলা বললো, আমার স্বামী একজন জাঠ সর্দার। এই বুড়ো শয়তানটার সাথে ঘর করার চেয়ে মৃত্যু ভালো। আমার ইচ্ছা করে যদি কোথাও পালিয়ে যেতে পারতাম তাহলে চলে যেতাম।

সুযোগ পেয়ে বন্দি গোয়েন্দা বললো, তুমি যদি এখান থেকে আমার পালানোর ব্যবস্থা করতে পারো, তবে আমি তোমাকে সাথে নিয়ে মুলতান চলে যাবো। আর সেখানে গেলে তোমাকে বন্দিনী হয়ে থাকতে হবে না। রাজরানী হয়ে থাকবে।

বন্দির মুখে একথা শুনে মহিলা তাকে জানালো, তোমার আগেও এক মুসলমানকে এরা গ্রেফতার করেছিলো। তার কাছ থেকেই এরা জানতে পারে গযনীর মুসলমানরা জাঠদের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ খবর পাওয়ার পর থেকেই জাঠরা যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। শত শত নৌকা তৈরীর কাজ শুরু হয়। কিন্তু সেই গোয়েন্দা তাদের অনেক তথ্য জানানোর পরও তারা তাকে মুক্তি দেয়নি, হত্যা করে সাগরে ফেলে দেয়।

এক চাঁদনী রাতে নদীতে ভাটা পড়েছে। কোন বাতাস নেই, ঢেউ নেই, শান্ত পরিবেশ। সেই সর্দার পত্নী অতি সন্তর্পণে বন্দি গোয়েন্দার কাছে এসে বললো, যদি পালাতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি আমার সাথে এসো। যুবতী মহিলা গোয়েন্দাকে ঘর থেকে বের করে একটি জঙ্গলাকীর্ণ পথে নদী তীরে নিয়ে এসে একটি ছোট্ট নৌকায় বসিয়ে নৌকার বাঁধন খুলে পানিতে নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে বললো, তাড়াতাড়ি বৈঠা হাতে নিয়ে পানিতে চাপ দাও। মহিলা নিজে নৌকার হাল ধরলো এবং দ্রুত নৌকা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো।

তারা নদীর তীর থেকে কিছুটা ভেতরে যেতে না যেতেই নদী তীরে অনেকগুলো মশালের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেলো। চাঁদনী রাতের আলোয় জাঠদের বুঝতে অসুবিধা হলো না, সর্দার পত্নীই বন্দীকে নিয়ে পালানোর জন্যে নৌকায় উঠেছে। জাঠরা তাদের লক্ষ করে হুমকি দিলো, যদি বাঁচতে চাও ফিরে এসো। কিন্তু তারা হুমকি শুনে আরো প্রাণপণে নৌকা চালানোর জন্যে চেষ্টা করতে লাগলো। জাঠরা যখন দেখলো, তাদের ফেরার সম্ভাবনা নেই, তখন ওদের লক্ষ করে তীর বৃষ্টি শুরু করলো। হিংস্র ও জংলী জাতি হওয়ার কারণে জাঠরা ছিলো তীরন্দাজীতে পটু। ওদের প্রথম তীরটিই এসে বিদ্ধ হলো সর্দার পত্নীর গায়ে। সে আর্তচিৎকার দিয়ে নৌকায় পড়ে গেলো। অবস্থা বেগতিক দেখে গোয়েন্দা নৌকার তলায় শুয়ে পড়লো এবং জীবনের আশা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলো। গোয়েন্দাকেও পড়ে যেতে দেখে এবং পানির স্রোতে নৌকা ভাসতে দেখে জাঠরা নিশ্চিত হলো ওরা উভয়েই তীরবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেছে। ফলে শুধু নৌকা ধরার জন্য তাদের কেউ আর রাতের অন্ধকারে পানিতে ভাসতে চাইলো না।

নদীতে স্রোত ছিলো তীব্র। দেখতে দেখতে নৌকা জাঠদের আয়ত্বের বাইরে চলে গেলো এবং অদৃশ্য হয়ে গেলো! অনেকক্ষণ পর গোয়েন্দা যখন বুঝলো, আর কোন তীর নৌকায় আঘাতের শব্দ হচ্ছে না তখন সে আস্তে করে মাথা তুলে চারপাশটা দেখে নিলো। না, দৃষ্টি সীমার মধ্যে কোন বিপদের আশংকা নেই। তখন সে বৈঠা বেয়ে নৌকাকে বিপরীত তীরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে দিলো।

অনেক ভাটিতে গিয়ে বিপরীত তীরে নৌকা ভেড়াতে সক্ষম হলো গোয়েন্দা। তার শরীরে একাধিক তীরের আঘাত লেগেছে কিন্তু কোনটাই বিদ্ধ হয়নি। রক্তক্ষরণ ও অস্বাভাবিক অবস্থায় নৌকা চালানোয় তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু তীরে উঠে থামেনি সে। রাতের অন্ধকারেই সে মুলতানের পথ ধরলো এবং কোথাও বিশ্রাম না নিয়ে একটানা হেঁটে বহু কষ্টে আধামরা অবস্থায় কোনমতে মুলতান পৌঁছলো । মুলতান পৌঁছেই সে গযনীর কর্মকর্তাদের জানালো তার ইতিবৃত্ত। এ খবর গয়নী পৌঁছালে সুলতান মাহমূদ মুলতানের গভর্নরকে নির্দেশ দিলেন, আপনি দ্রুত কুড়িজন করে সৈন্য ধারণ ক্ষমতার একটি নৌবহর তৈরি করুন। খাওয়ারিজম শাহীর বিরুদ্ধে জিউন নদীর নৌ যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় বিশেষ ধরনের রণতরী তৈরী করার জন্যে একটি বিশেষ ডিজাইন উদ্ভাবন করে ছিলেন। সুলতান মাহমূদ সেই ডিজাইন মতো রণতরী তৈরীর কারিগর ও কয়েকজন অভিজ্ঞ মাল্লাহ এবং একজন কর্মকর্তাকে নৌকা তৈরির কাজ তদারকীর জন্যে মুলতান পাঠিয়ে দিলেন সুলতান।

১০২৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সুলতানের কাছে খবর এলো, আপনার নির্দেশ অনুযায়ী এক হাজার রণতরী তৈরী হয়ে গেছে। তা ছাড়া জাঠদের রণ প্রস্তুতি এবং তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যও রিপোর্ট আকারে সুলতানের কাছে পৌঁছে গেলো। সুলতান মাহমূদ সম্পর্কে অভিযোগ করা হয়, তিনি ধনরত্ন লুটতরাজ করার জন্যে বারবার হিন্দুস্তান আক্রমণ করেছেন। কিন্তু এই অভিযোগের অসাড়তা প্রমাণের জন্য জাঠদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তার সর্বশেষ অভিযানই যথেষ্ট। কেননা জাঠদের কোন স্থায়ী বসতি ছিলো না। ছিলো কোন রাজ-রাজত্ব রাজধানী কিংবা দুর্গ ধনাগার।

মূলত জাঠরা ছিলো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর যাযাবর উপজাতি। যারা সেলজুকীদের মতোই পয়সার বিনিময়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজার পক্ষে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের কাজে ব্যবহৃত হতো। শিবমূর্তির পূজারী এই উপজাতি জনগোষ্ঠীর লোকগুলো সেলজুকীদের মতোই গযনী সালতানাত এবং হিন্দুস্তানের মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যখন ব্যাপক দমন পীড়ন ও নির্মূল অভিযানে লিপ্ত হয় তখন বাধ্য হয়েই হিন্দুস্তানের মুসলমানদের সুরক্ষার জন্যে সুলতান মাহমূদ জাঠ দমন অভিযানের সংকল্প করেন।

৪১৮ হিজরী সন মোতাকে ১০২৭ সালের মার্চ মাসের শেষ ভাগে সুলতান মাহমূদ গযনী থেকে জাঠদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। মুলতান পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, এক হাজার চারশ ষাটটি রণতরী তার নির্দেশনা মতো তৈরি করা হয়েছে। সুলতান সফরের ক্লান্তি উপেক্ষা করে তখনি রণতরীগুলো পর্যবেক্ষণ করার জন্যে নদী তীরে চলে গেলেন। তিনি নদী তীরে গিয়ে সরাসরি একটি রণতরীতে আরোহণ করে মাল্লাদের তা চালাতে বললেন। মাল্লাদের রণতরী চালানোর কৌশল ও অভিজ্ঞতা দেখে তিনি কুড়িজন করে তীরন্দাজ ও বর্শাধারী সৈন্যকে একেকটি নৌকায় আরোহণ করিয়ে সবগুলো নৌকা নদীতে ভাসিয়ে যুদ্ধের মহুড়া দিতে নির্দেশ দিলেন। সৈন্যরা পরম উৎসাহে মনোমুগ্ধকর নৌ মহড়া দেখালো। মাল্লারা নৌকাগুলোকে তাদের অপার কৌশলে নানা দিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত ও প্রত্যাঘাতের অবস্থা সুলতানকে দেখালো। সুলতান নৌ-মহড়া দেখে মুগ্ধ হলেন এবং মহড়া সমাপ্ত করে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে আরো অধিকতর সামরিক দিক-নির্দেশনা দিলেন।

যেদিন সুলতান সুলতান পৌঁছলেন, সে দিনই জাঠদের অবস্থা জানার জন্যে গুপ্তচর পাঠিয়ে দেয়া হলো। অবশ্য সুলতানের নৌ-মহড়া এবং মুলতান আগমনের খবর জাঠদের কাছে গোপন রইলো না। কারণ তখন মুলতানেও ছিলো বিপুল হিন্দুর বসতি। এরা যথারীতি তাদের জ্ঞাতি জাঠদের কাছে সুলতানের নৌ প্রস্তুতির খবর পৌঁছে দিলো। অবশ্য জাঠরা এর বহু আগেই সুলতানের জাঠবিরোধী অভিযান প্রস্তুতির খবর পেয়ে গিয়েছিলো। তা ধৃত ও মুক্তিপ্রাপ্ত সুলতানের মুসলিম গোয়েন্দার জবানী থেকেই জানা গিয়েছিলো। পরবর্তীতে আরো জানা গেছে, জাঠরা তাদের বিরুদ্ধে গযনী সুলতানের অভিযানের খবর পেয়ে অন্তত চার হাজার বিশেষ ধরনের নৌকা তৈরী করেছিলো। জাঠদের ধারণা ছিলো জাঠবিরোধী অভিযানে নদীপথের বিভিন্ন বাধা থাকার কারণে গযনী বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধ করতে বাহন হিসেবে নৌকা ব্যবহার করবে। ফলে গযনী বাহিনীকে তারা ডাঙায় উঠার আগে নদীতেই প্রতিরোধ করবে এবং নদীতেই সবার সলিল সমাধি ঘটাবে।

গোয়েন্দারা জানিয়ে ছিলো, জাঠ জনগোষ্ঠী তাদের স্ত্রী সন্তানসহ নদীর চরাঞ্চলের দ্বীপগুলোয় গিয়ে আস্তানা গেড়ে ছিলো এবং যুদ্ধের জন্যে তৈরী হচ্ছিলো। তখন নদীর চরাঞ্চল ছাড়া মূল ভূখণ্ডে জাঠ জনগোষ্ঠীর কোন লোকজন ছিলো না।

এ খবর পেয়ে সুলতান মাহমূদ তার সেনাপতিদের নির্দেশ দেন, পরিণতি যাই হোক, আমাদেরকে নদীতে ওদের মোকাবেলা করতে হবে অধিকাংশ ইন্ডিয়ান ও ইংরেজ ঐতিহাসিকের কাছে সুলতান মাহমূদের জাঠ বিরোধী নৌ যুদ্ধ তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু যারা সেই সময়কার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সার্বিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের বর্ণনা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, জাঠদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গযনী বাহিনীর নৌ যুদ্ধ ছিলো গযনী বাহিনীর সামরিক উৎকর্ষ ও নৈপুণ্যের অন্যতম নিদর্শন। অবশ্য অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বর্ণনায় ঠিক কোন জায়গায় এই যুদ্ধ হয়েছিলো তা সবিশদ বলা হয়নি। কিন্তু মানচিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, চন্নাব নদীর তীরে মুলতান শহর অবস্থিত। এর ভাটিতে এক জায়গায় ঝিলম নদী ও রাবী নদী গিয়ে চন্নাব নদীর সাথে মিলিত হয়ে বিশাল মোহনার সৃষ্টি করেছে। এরপর আরো কয়েকটি নদী এই নদীর সাথে মিলিত হয়ে সবগুলোর সম্মিলিত স্রোতধারা গিয়ে সিন্ধু নদীতে পড়েছে।

আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে ছোট বড় কোন নদীতেই কোন বাধ ড্যাম সেতু তথা কোন প্রতিবন্ধকতা ছিলো না। ফলে স্রোতের পানি বন্ধনহীন ভাবে সব কিছু ভাসিয়ে নিতো। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায়, তখনকার সিন্ধুনদীর আকার ছিলো আরো বিশাল। এবং নদীর মাঝে প্রায় জায়গাই চর জেগে উঠেছিলো, যেগুলো ধারণ করেছিলো ছোট দ্বীপের আকার।

ঠিক কোন তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাস এ সম্পর্কে নীরব। জানা যায়, প্রায় চৌদ্দশ নৌযান নিয়ে মুলতান থেকে সুলতান মাহমূদের কাফেলা জাঠদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। ঐতিহাসিক আবুল কাসিম ফারিশতা লিখেছেন, গযনী বাহিনীর নৌযানগুলো ছিলো খুব শক্ত। তদুপরি এগুলোর চারপাশে বর্শার মতো ধারালো লোহার পাত সেঁটে দেয়া হয়েছিলো । যাতে সাধারণ কাঠের নৌকা আঘাত করলে এগুলোর কোন ক্ষতি না হয় এবং কাঠের নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি থেকে নৌকায় কেউ যাতে আরোহণ করতে না পারে এজন্যও গযনীর নৌযানগুলোতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো। তাছাড়া প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই নৌ যুদ্ধেই প্রথম সুলতান মাহমূদ আগুনের ঢিল ব্যবহার করেছেন।

মূলত তখনকার দিনে সেগুলো ছিলো জ্বালানী ভর্তি মাটির ঘটি; যাকে বর্তমানের হ্যান্ড গ্রেনেডের সাথে তুলনা করা যায়। মুলতান থেকে জাঠদের অবস্থান ছিলো ভাটিতে। ফলে গযনী বাহিনীর নৌযানগুলো স্রোতের টানে বিনা কষ্টেই ভাটির দিকে ভেসে যাচ্ছিল। প্রতিটি নৌযান ছিলো সমদূরত্বে। মাঝে ছিলো সুলতান মাহমুদের নৌকা। তা ছাড়া দ্রুত খবর পৌঁছানোর জন্য কিছু নৌকা ছিলো সংবাদবাহক। এগুলো ছিলো দ্রুতগামী এবং তাতে মাল্লাও ছিলো বেশী।

পঞ্চনদের মিলনস্থল পেরিয়ে কিছুটা এগুতেই জাঠদের নৌবহর দেখা গেলো। জাদের নৌকাগুলো ছিলো অর্ধবৃত্তাকারে রাখা। তাদের নৌযানের সংখ্যা এতোটাই বিশাল ছিলো যে, দেখে মনে হচ্ছিল পানি নয় শুধু নৌকা আর নৌকা। যেন বিশাল এলাকা জুড়ে নৌকার মেলা বসেছে। সুলতান মাহমূদ এক সারিতে আসা নৌকাগুলোর গতি থামিয়ে সবগুলোকে পাশাপাশি এক সারিতে স্থাপন করলেন, যাতে জাঠরা তাদেরকে ঘেরাও এর মধ্যে ফেলতে না পারে।

প্রথমে জাঠরা গযনী বাহিনীর দিকে তীর ছুঁড়ে আক্রমণের সূচনা করলো। এরপর সুলতান মাহমূদ আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তিনি প্রতিটি নৌযানের মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গা ফাঁকা রাখলেন, যাতে প্রতিটি নৌযান প্রয়োজনে ঘুরতে এবং অগ্রপশ্চাত হতে পারে। এক্ষেত্রে নদীর স্রোত ছিলো গযনী বাহিনীর পক্ষে কারণ তাদেরকে আক্রমণের জন্যে তেমন কষ্ট করতে হচ্ছিল না। কিন্তু জাঠদেরকে আক্রমণ করতে হতো স্রোতের বিপরীতে নৌকা বেয়ে। যাতে প্রচুর জনবল নিয়োগ করতে হতো। ফলে আক্রমণ প্রতি আক্রমণের জন্যে জাঠরা ততোটা সুবিধা পাচ্ছিল না।

এক পর্যায়ে সুলতান মাহমূদ পূর্ণ শক্তিতে জাঠদের প্রতি তীর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। জাঠদের তীর ছিলো গযনীর তীরের চেয়ে আরো বেশী সর্বনাসী।

গযনী সৈন্যরা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে বীর বি’ক্রমে হামলে পড়লো জাঠদের উপর। জাঠরাও তাদের ভাষায় চিৎকার দিচ্ছিল কিন্তু তাদের ভাষার চিৎকারের মধ্যে বাস্তবে উদ্দীপনামূলক কিছু ছিলো না। তবে তারা ছিলো লড়াকু ও নির্ভিক । দেখতে দেখতে অল্পক্ষণের মধ্যে উভয় বাহিনীর নৌযানের মধ্যে শুরু হলো সংঘর্ষ। গযনীর সৈন্যরা হঠাৎ করে তীরের পাশাপাশি জাঠদের নৌকার দিকে ছুঁড়তে শুরু করলো অগ্নিবাহি জ্বালানী ভর্তি ঘটি সদৃশ বোমা। এসব ঘটি নিক্ষিপ্ত হওয়ার সাথে সাথে প্রতিটি নৌযানে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিলো এবং মানুষ আসবাব নৌকাসহ সবকিছুকেই গ্রাস করছিলো আগুন প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ছিলো জাঠযোদ্ধারা কিন্তু অনাকাক্ষিত এই অগ্নি বোমার আঘাতেও জাঠরা হতোদ্যম হলো না। তারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুসলমানদের নৌকায় আরোহণ করার চেষ্টা করছিল কিন্তু আরোহণ করতে গিয়ে তারা গযনী বাহিনীর নৌযানের বহিরাবরণে সেঁটে রাখা ধারালো ইস্পাতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল আর উপর থেকে গযনীর তীরন্দাজ ও বর্শাধারীরা তাদের বর্শা ও বল্লম বিদ্ধ করে পানিতে ডুবিয়ে দিচ্ছিলো।

জাঠদের রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছিল নদীর পানি কিন্তু তবুও তারা দমার পাত্র ছিলো না। জাঠদের চার হাজার নৌকার বিশাল বহরে গমনী বাহিনীর চৌদ্দশ নৌকা হারিয়ে গিয়েছিলো, দৃশতঃ গঠন শৈলী ভিন্নতর না হলে জাঠদের নৌকার ভীড়ের মধ্যে গযনী বাহিনীকে খুঁজে বের করাই মুশকিল হতো।

নৌকার সাথে নৌকার সংঘর্ষ ঘটিয়ে নৌকা উল্টে দেয়ার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিলো গযনী সেনাদের। তারা এই কৌশল ব্যবহার করে কয়েকটি জাঠতরী উল্টে দিয়েছিলো কিন্তু জাঠদের তাতে কিছুই হলো না। দেখে মনে হচ্ছিলো এরা যেন পানির কীট। এরা উল্টে যাওয়া নৌকার নীচ থেকে ডুব দিয়ে দূরে ভেসে উঠে প্রতিপক্ষের নৌযানে আরোহণের চেষ্টা করছিলো। জাঠরা প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে একটা নতুন চাল দিলো। তারা দৃশ্যত পলায়নপর এমন ভাব বোঝানোর জন্য বহু নৌকা তীরে ভিড়িয়ে ডাঙায় নেমে গেলো। এবং কিছুটা ঘুরে নদীরকূল থেকে মুসলমানদের উপর তীর আক্রমণের কৌশল নিলো। কিন্তু জাঠদের এই কৌশলে কোন ফলোদয় হলো না। তাদের সম্ভাব্য এমন পরিস্থিতি মোকাবেলার ব্যবস্থা সুলতান আগেই করে রেখেছিলেন। তিনি রাতের অন্ধকারে দুই ইউনিট তীরন্দাজকে ডাঙায় নামিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন তীর থেকে দূরে ঘনজঙ্গল ও ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে। জাঠরা ওদিকে গেলে অজ্ঞাতস্থান থেকে তীর মেরে ইহলিলা সাঙ্গ করে দিতে। জাঠরা মোটেও জানতো না নৌযানের বাইরেও গযনীর সেনারা ডাঙায় লুকিয়ে থাকতে পারে। যেই না তারা ডাঙায় উঠে পথঘুরে মুসলমানদের উপর আক্রমণের চেষ্টা করলো অমনিতেই তারা গযনীর তীরন্দাজদের অজ্ঞাত তীর বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকলো। ফলে ফলাফল দাঁড়ালো, যেসব জাঠ ডাঙায় গিয়েছিলো এদের পক্ষে আর আক্রমণে ফিরে আসা সম্ভব হলো না। এদিকে নদীতে জাঠদের সবচেয়ে বেশী সমস্যা তৈরী করেছিলো গযনী বাহিনীর অগ্নিবোমা। অগ্নিবোমায় যেসব নৌযানে আগুন জ্বলে উঠেছিলো গযনীর মাল্লারা সেইসব জ্বলন্ত নৌকার দিকে অন্য জাঠ নৌকাগুলোকে ধাক্কা দিয়ে লাগিয়ে দিচ্ছিলো ফলে একটির আগুন ছড়িয়ে পড়ছিলো আরেকটিতে।

কোন মানুষই পুড়ে মরতে চায় না। জাঠরা অগ্নিদগ্ধ হওয়া থেকে বাঁচার জন্য নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তো আর মুসলমানদের নৌকায় আরোহণের চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের তীরবর্শা বিদ্ধ হয়ে নদীতে হাবুডুবু খেয়ে তলিয়ে যেতো। আর ডাঙায় গযনীর তীরন্দাজদের অজ্ঞাত তীরে বেঘুরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছিলো আবেগতাড়িত লড়াকু জাঠরা। তাদের শক্তি সামর্থ সাহস সবকিছুই ছিলো কিন্তু সুলতান মাহমূদের কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলো জাঠদের দুঃসাহস বীরত্ব। সময় যতই গড়াতে লাগলো সিন্ধুনদীর পানি জাঠদের রক্তে লাল হতে শুরু করলো। আহত জাঠরা পানিতে তরফাতে তরফাতে হাবুডুবু খেয়ে তলিয়ে যেতে লাগলো। সুলতান মাহমূদ তার মাল্লাদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা তরীগুলোকে তীরের কাছাকাছি রাখবে। এই নির্দেশের ফলে গযনীর মাল্লারা যখন তাদের তরীগুলোকে তীরের দিকে চাপাতে শুরু করলো যুদ্ধরত জাঠরা চাপে পড়ে গমনী বাহিনীর ঘেরাও-এর মধ্যে পড়ে এক জায়গায় আটকে গেলো। তারা না পারছিলো ডাঙায় উঠতে না পারছিলো গযনী সেনাদের উপর চড়াও হতে।

এর কিছুক্ষণ পরেই জাঠদের অবস্থা এমন হলো যে, তারা প্রতিরোধ যুদ্ধ চালানোর সামর্থও হারিয়ে ফেললো। যারা তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়লো। কারণ তাদেরকে সুবিন্যস্তভাবে যুদ্ধ করানোর মতো নেতৃস্থানীয় কেউ অবশিষ্ট ছিলো না। ফলে বেশীক্ষণ আর জাঠদের পক্ষে দৃঢ়ভাবে গযনী বাহিনীর মোকাবেলা করা সম্ভব হলো না। তারা বিক্ষিপ্ত হতে লাগলো। পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ভেবে অনেকেই নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে তীরে উঠে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিলো, কিন্তু তীরে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলো মৃত্যু। কারণ আগে থেকেই গযনীর সেনারা তীরের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কজায় নিয়ে নিয়েছিলো। যারাই তীরে উঠে ছিলো তাদের পক্ষে আর বেঁচে থাকা সম্ভব হলো না।

এক পর্যায়ে যখন নৌকা নিয়ে পালাতে শুরু করলো জাঠরা তখন গযনী বাহিনী তাদের পিছু ধাওয়া করতে লাগলো। এবং যখনই তারা কোন চর বা দ্বীপে উঠতে চেষ্টা করেছে গযনীর সেনারা সেই চরে অগ্নিবোমা নিক্ষেপ করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এভাবে চর ও দ্বীপের যেসব ঝুপড়িতে জাঠদের স্ত্রী সন্তানরা অবস্থান করছিলো সেগুলোও বোমার আগুনে পুড়তে লাগলো। আর নারী শিশুরা আর্তচিৎকার করে বাঁচার জন্যে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো কিন্তু তাদের আশ্রয় কিংবা বাঁচানোর মতো কোন সক্ষম জাঠ অবশিষ্ট ছিলো না । যেসব জাঠ প্রাণ ভয়ে ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিলো এদেরকেও ধরে ধরে গযনীর সেনারা নদীতে নয়তো নৌকায় নিক্ষেপ করছিলো। যেসব নারী শিশু বেঁচে ছিলো এরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলো। বস্তুত সংঘবদ্ধ জাঠ জনগোষ্ঠী বলে আর অবশিষ্ট কিছুই রইলো না। জাঠরা অতি আত্মবিশ্বাসে কচুকাটা হয়ে গেলো।

১০২৭ সালের জুলাই মাসে সুলতান মাহমূদ জাঠদের নিমূর্ল করে গযনী ফিরলেন। এবার চিকিৎসক তাকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। কারণ তখন অসুস্থতা ও দুর্বলতার ছাপ সুলতানের চেহারায় ফুটে উঠেছিলো। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এবার সুলতান যখন দ্বীপাঞ্চলে জাঠদের সাথে যুদ্ধ করতে গেলেন তখন চর দ্বীপের ম্যালেরিয়াবাহী মশা তার শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণুর সংক্রমণ ঘটায়। কিন্তু যুদ্ধে থাকার কারণে তিনি তার অসুস্থতার কথা সফরসঙ্গী চিকিৎসকদের বলেননি।

তিনি গযনী ফিরে এলে দীর্ঘদিনের ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রকোপে তার বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেলো। এক পর্যায়ে দেখা গেলো তার পাকস্থলীর কার্যকারিতাও রহিত হওয়ার উপক্রম হয়ে গেছে।

সুলতানের বয়স তখন ৫৭ বছর। এর মধ্যে ৪০ বছর তার কেটেছে যুদ্ধ ময়দান কিংবা রণ প্রস্তুতি কিংবা যুদ্ধ সফরে। এর মধ্যে যতটুকু সময় তিনি গযনী থেকেছেন তখন ব্যস্ত থেকেছেন শাসনযন্ত্র, সেনাবাহিনীর ঘাটতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়ে। তাছাড়া চতুর্মুখী প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করে অভিষ্ট লক্ষে উপনীত হওয়ার পাহাড়সম দুশ্চিন্তা তাকে সারাক্ষণ পেরেশান করে রাখতো। সুলতানের আশংকাজনক শারীরিক অবনতি দেখে তার একান্ত চিকিৎসক একদিন উজির ও প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আলতাঈ, সেনাপতি আরসালান জাযেব ও সেনাপতি আবুল হাসানকে একত্রিত করে বললেন

সুলতান তার মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ায় বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্যে আমার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন, কিন্তু এখন তার শারীরিক অবস্থা এতোটাই অবনতি ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, না জানানোটাকে আমি খেয়ানত মনে করছি। কারণ সুলতান মাহমূদ এর সুস্থতা শুধু তার পরিবার পরিজন স্ত্রী সন্তানের ব্যাপার নয়।

সুলতান মাহমূদ মুসলিম উম্মাহর জন্য অমূল্য সম্পদ। আপনারা জানেন, মুহাম্মদ বিন কাসিমের বহু বছর পর গয়নী একজন সুলতান মাহমূদ জন্ম দিয়েছে। কিন্তু ততো দিনে হিন্দুস্তান আবারো মূর্তি পূজার অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিলো এবং বিন কাসিমের জ্বালানো ইসলামের আলো বিলীন হয়ে পড়েছিলো। এখন সেই ক্ষণজন্মা সুলতান মাহমূদও যাওয়ার পথে। না জানি তিনি চলে গেলে আবার ইসলামের আলো নিষ্প্রভ হতে শুরু করে কি-না। কে জানে! আবার কখন আরেকজন বিন কাসিম আসবে আবার কখন আরেকজন সুলতান মাহমুদ আসবে। কে জানে আবার ইসলাম ও মুসলমানরা কাফেবদের রক্ত চক্ষুর শিকার হয়ে পড়ে কি-না?

কি হয়েছে সুলতানের? জানতে চাইলেন উজির।

সুলতানের যক্ষ্মা হয়েছে। সেই সাথে তার হৃদযন্ত্র ও পাকস্থলিও বিগড়ে গেছে। এটা আজ নয়, আমি তিন বছর আগেই এই রোগ সনাক্ত করেছি, তাকে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার অনুরোধ করেছি। বিশ্রাম ও ঠিকমতো ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়েছি কিন্তু তিনি কাজের চাপে দায়িত্বের ব্যস্ততায় নিজের শরীরের প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি। শরীরের যতটুকু বিশ্রাম ও যত্ন নেয়ার দরকার ছিলো তারপক্ষে মোটেও তা করা সম্ভব হয়নি। বরঞ্চ বলা চলে নিজের ভেতরে তিনি রোগ লালন করেছেন।

চিকিৎসক শাইখুল আসফান্দ বলেন, আমাদের সুলতান বড় বড় শক্তিধরকে পরাজিত করেছেন অবশেষে মৃত্যুকেও কাবু করে ফেলেছিলেন। কারণ যতো দিন থেকে তিনি এই অসুখে আক্রান্ত সুলতান ছাড়া যে কোন মানুষ হলে এতো দিনে নির্ঘাত মৃত্যু বরণ করতো কিন্তু সুলতানের দেহকোষকে এই মরণব্যাধি ভেঙে দেয়ার পরও তিনি আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে একের পর এক যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন, যদিও রোগ তার দেহের প্রতিরোধ শক্তি সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দিচ্ছিলো। সুলতান প্রমাণ করেছেন স্থির লক্ষবস্তু, অবিচল আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় সংকল্প এবং উদ্দেশ্য মহান ও পবিত্র হলে শরীর অক্ষম হলেও আত্মশক্তি দিয়ে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।

বস্তুত সুলতানকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অচলই বলা যায়। আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ! যে কোন মূল্যে আপনারা সুলতানকে সবকিছু থেকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেহের প্রতি মনোযোগী ও চিকিৎসার প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্যে রাজি করান। এটা শুধু সুলতানের পরিবারের প্রতি নয়, গোটা মুসলিম দুনিয়ার প্রতি খুবই কল্যাণকর হবে। সুলতানের সুস্থতা হিন্দুস্ত নের মুসলমানদের জন্যেও রহমত বয়ে আনবে। যারা শতশত বছর পর নিজের অতীত ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে এবং হিন্দুদের নিষ্পেষণ থেকে মুক্ত হয়ে মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম করতে পারছে। সুলতানের শারীরিক অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তার বিছানা থেকেই উঠা উচিত নয়।

রোগ ও অসুস্থতা সুলতান মাহমূদকে শয্যাশায়ী করতে পারলো না। কারণ তার উজির ও সেনাপতিগণ শুধু তার আজ্ঞাবহ ছিলেন না, ছিলেন তার বন্ধুও। তারা যেমন ছিলেন তার সহকর্মী তেমনই ছিলেন তার বহু গোপন রহস্য ও ভেদের বাহক। একদল নিবেদিত প্রাণ সহকর্মী যোদ্ধা এবং জীবনত্যাগী সঙ্গীর বদৌলতেই তিনি নতুন নতুন ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার সহযোদ্ধারা বিন্দুমাত্র তার প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাননি। আনুগত্যে নির্দেশ পালনে সামান্য ত্রুটি করেন নি। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও সুলতান সহকর্মী ও উপদেষ্টাদের পরামর্শে বদল করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিকে সম্মান করেছেন।

কিন্তু তারাই যখন সুলতানকে অসুস্থতাজনিত কারণে বিশ্রাম ও চিকিৎসার প্রতি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিলেন, তখন হেসে সকলের পরামর্শই তিনি উড়িয়ে দিলেন। তিনি তার ছেলেদের ডেকে বললেন, আমার মধ্যে যে শক্তি আছে তা আল্লাহ তোমাদের মধ্যেও দিয়েছেন। সেই সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোল, ইচ্ছাশক্তি ও লক্ষ উদ্দেশ্যকে পবিত্র রাখো। শুধু আল্লাহর সাহায্য কামনা করো এবং কুরআনকেই জীবনের পাথেয় এবং দিক নির্দেশক বানাও। তাহলে আত্মশক্তিতে তোমরা বলীয়ান হতে পারবে।

সুলতান মাহমুদের পরিবার এবং তার সহকর্মী ও কর্মকর্তাগণ যখন তার অসুস্থতা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় নিপতিত ঠিক সেই সময় সুলতান মাহমূদ শারীরিক এই দুরবস্থা উপেক্ষা করে নতুন এক রণক্ষেত্রে রওয়ানা হলেন। সেই রণক্ষেত্র ছিলো অবশিষ্ট সেলজুকী জনগোষ্ঠী। এরা সংগঠিত হয়ে আবারো গযনী সালতানাতের প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছিলো এবং গযনী সালতানাতের প্রতি নানা ধরনের হুঁশিয়ারীও উচ্চারণ করেছিলো। সেলজুকীদের শেষবারের মতো পদানত করে সুলতান মাহমূদ ইস্পাহান ও রায় এলাকাকে গযনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করলেন এবং তার ছেলে মাসউদকে বিজিত এলাকার শাসক নিযুক্ত করলেন।

অবশেষে তিনি হাওয়া বদল করতে বলখ চলে গেলেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর পক্ষে পূর্ণ বিশ্রাম নেয়া সম্ভব হলো না। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকলেন এবং বিভিন্ন প্রদেশ সফর করলেন। এভাবে ১০২৯ সালের শীত ও গ্রীষ্মকাল তিনি বলখেই কাটালেন। এক পর্যায়ে এখানকার আবহাওয়াও তার প্রতিকুল হয়ে উঠলো। আসলে তখন দুনিয়ার আবহাওয়াই তার জন্যে অসহ্য হয়ে উঠেছিলো।

একদিন তিনি বলখ ছেড়ে গযনী চলে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। কর্মকর্তারা তাকে বিশেষ বাহনে গযনী নিয়ে এলেন। কিন্তু গযনী পৌঁছেই তিনি জ্ঞান হারালেন। সুলতানের একান্ত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করলেন। চিকিৎসকের দু’চোখ গড়িয়ে অঝোরধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তিনি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন সুলতান। সুলতান কিছু একটা বলার জন্যে তার হাত উপরে উঠালেন কিন্তু হাত উঁচিয়ে রাখতে পারলেন না। হাত অসাড় হয়ে তার বুকে আঁচড়ে পড়লো। অন্তিম অবস্থা দেখে তাঁর স্ত্রী ডাকলেন, ছেলেরা আব্বা আব্বা করে বহু ডাকলো কিন্তু সুলতানের পক্ষে সাড়া দেয়া সম্ভব হলো না। তখন শুধু তার শ্বাসটুকুই অব্যাহত ছিলো কথা বলার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো।

এমতাবস্থায় শহরের সবচেয়ে সুকণ্ঠের অধিকারী হাফেযদেরকে তার শিয়রের কাছে কুরআন তেলাওয়াতের জন্যে বসিয়ে দেয়া হলো। কুরআনে কারীম তিলাওয়াতের সময় মাঝে মধ্যেই সুলতানের শরীর দুলে উঠছিলো এবং তার ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠছিলো। তাতে বুঝা যাচ্ছিলো, কুরআনের ভাষা তিনি শুনছিলেন এবং অনুধাবন করতে পারছিলেন । তেলাওয়াত শুরুর আগে তার শরীর কিছুটা নীলাভ ও বিবর্ণরূপ ধারণ করেছিল কিন্তু তেলাওয়াতের সাথে সাথে তা কমে আসে এবং একটা মায়াবী ও আলোকিত ভাব তার সারা দেহে ফুটে উঠে।

যে ক্ষণজন্মা অমিততেজী জগৎশ্রেষ্ঠ বীর অসংখ্য বীর পাহলোয়ানকে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন, অক্ষয় অজেয় পাথুরে খোদাদের যিনি টুকরো টুকরো করে ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট করেছিলেন, সেই দিগ্বিজয়ী বীর পুরুষ এখন স্থবির নিশ্চল। তাঁর দেহে একটু নড়াচড়া করার সামর্থও নেই।

১০৩০ সালের ৩০ এপ্রিল মোতাবেক ৪২১ হিজরী সনের ২৩ রবিউচ্ছানী বৃহস্পতিবার বিকাল পাঁচটায় শেষবারের মতো ইতিহাসের এই বীরপুরুষের ঠোঁটে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে উঠে এবং তখনই তিনি শেষবারের মতো নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দুনিয়া থেকে চিরদিনের জন্যে বিদায় নেন।

মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসক ডুকরে কেঁদে উঠেন। মুসলিম ইতিহাসে মূর্তি সংহারী নামে খ্যাত সুলতান মাহমূদকে সেই রাতের ইশার নামাযের পর মশালের আলোয় তার প্রিয় বাগান ফিরোজীবাগে দাফন করা হয়। এই বাগানে প্রায়ই তিনি বিশ্রাম করতেন, পায়চারী করতেন।

দাফনের পর সুলতান মাহমূদের ছেলেরা তার পিতার কবরকে কেন্দ্র করে বিশাল স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু এই কবরস্থানের প্রতি সাধারণ মানুষ ও পরবর্তীকালের মুসলিম বিদ্বেষীরা বহু অন্যায় ও অত্যাচার করেছে। অতি ভক্তরা বরকতের উদ্দেশ্যে তার কবরের মাটি ও স্থাপনার চৌকাঠ কেটে নিতে শুরু করে। ফলে বাধ্য হয়ে তার কবরটির চিহ্ন মুছে দিয়ে সেখানে আরো বহু কবর তৈরী করা হয়।

গযনীর মুসলিম সালতানাত নিঃশেষ হয়ে যখন এলাকাটি ইংরেজদের কবলে চলে যায়, তখন ইতিহাসের নিষ্ঠুর ও মুসলিম বিদ্বেষী ইংরেজ লর্ড মৃত সুলতান মাহমূদের সাথে সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম আচরণ করেন। তিনি তার কবরে নির্মিত স্থাপনার প্রধান দরজাটি খুলে হিন্দুস্তানে নিয়ে আসেন। ইংরেজ লর্ড-এর ধারণা ছিল সুলতান মাহমূদ এই দরজাটি হিন্দুস্তানের সোমনাথ মন্দির থেকে নিয়েছিলেন। গযনী শহর থেকে দেড় মাইল দূরে অবস্থিত ফিরোজীবাগের সেই ঐতিহাসিক কবরস্থানের আজ আর কোন চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। জায়গাটি একটি পরিত্যক্ত ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে। কবর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও যতো দিন পৃথিবীর বুকে সূর্য উঠবে, মানুষ থাকবে, মুসলমান থাকবে ততদিন অসংখ্য অগণিত মুসলমান সুলতানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে, আর মক্কা ও মদীনায় তার প্রেরিত শিবমূর্তির অবশিষ্ট টুকরোগুলো স্মরণ করিয়ে দেবে সুলতান মাহমুদ ইসলামের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। অম্লান তাঁর কীর্তি, অনিঃশেষ তার ঈমানী চেতনা। আজো তাঁর চেতনা ঈমানের দীপ্তি ছড়ায়। আল্লাহ আখেরাতে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন। আমীন!

-: সমাপ্ত :-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *